ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রন

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

জন্মনিয়ন্ত্রণ সমর্থকদের যুক্তি ও তার জবাব

(ক) অর্থনৈতিক উপকরণাদির অভাব আশংকা:

মানুষকে যে যুক্তি সব চাইতে বেশি ধোঁকা দিয়েছে তা হচ্ছে নিম্নরূপ:

‘দুনিয়াতে বাসোপযোগী স্থান সীমাবদ্ধ। মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজন  পূরণের উপকরণাদিও সীমাবদ্ধ। কিন্তু মানব জাতির বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা সীমাহীন। বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় তিনশত কোটির কাছাকাছি। অনুকূল পরিবেশ অব্যাহত থাকলে পরবর্তী ৩০ বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হ’বার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই সংগতভাবেই এ আশংকা করা যেতে পারে যে, ৫০ বছরের মধ্যে দুনিয়া জন মানবে পূর্ণ হয়ে যাবে এবং পরবর্তী বংশধরগণ জীন যাত্রার মান নিম্নগামী করতে বাধ্য হবে। এমনকি তাদের পক্ষে সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপনও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই মানবতাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্যে জন্মহার সীমিত করার মাধ্যমে  জনসংখ্যাকে সংগত সীমারখায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।”

এটা আসলে খোদার ব্যবস্থাপনার সমালোচনা। যে বিষয়টা হিসেবের মাধ্যমে এসব লোক এত সহজে জানতে পেরেছে, সে বিষয়টি সম্পর্কে খোদার কোন কিছু জানা নেই বলে এদের ধারণা। এরা মনে করে যে, দুনিয়ায় কত সংখ্যক জীবের সংস্থান সম্ভব, এখানে কত সংখ্যক লোকের জন্ম হওয়া উচিত এ বিষয়ে খোদার কোন হিসাব নাই।

(আরবী********)

“এরা অন্যায় ভাবে আল্লাহ সম্পর্ক অজ্ঞতার ধারণা পোষণ করে।” (কোরআন)

এদের জানা নেই যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বস্তকে বিশে পরিকল্পনাসহ সৃষ্টি করেছেন।

(আরবী*****) “নিশ্চয়ই আমি প্রত্যে বস্তুকে হিসাব মতে সৃষ্টি করে থাকি” (কোরআন)

তার ভান্ডার থেকে যা কিছু বের হয়ে আসে তা পরিমাণ মতোই এসে থাকে।

(আরবী*******)

“এমন কোন জীব নেই যার জীবন ধারণোপযোগী সরঞ্জামাদি আমার কাছে নেই- এবং একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যতীত আমি কোন কিছুই প্রেরণ  করি না। (কোরআন)

এদের ধারণ যা-ই হোক না কেন, ব্যাপার এই যে, এ বিশাল জগতের স্রষ্টা সৃষ্টি শিল্পে অদক্ষ নন।

(আরবী********) –“আমি সৃষ্টি সম্পর্কে বেখবর ইন।” (আল কোরআন)

যদি এরা স্রষ্টার কার্যকৌশল গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতো এবং তার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করতো তাহলে এদের নিকট এটা সুস্পষ্টরূপে ধরা পড়তো যে, তাঁর হিসাব ও পরিকল্পনা আশ্চর্যজনক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি সীমাবদ্ধ পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের জীব সৃষ্টি করেছেন। িএদের প্রতিটির মধ্যে এত বিপুল প্রজনন শক্তি রয়েছে যে, যদি মাত্র কোন এক ধরনের জীব বা বিশেষ বিশেষ জীনের মাত্র একটি জোড়ার বংশকে তার জন্মগত শক্তি অনুসারে বাড়তে দেয়া হয় তাহলে অল্পকালের মধ্যেই সমগ্র দুনিয়া শুধু ঐ ধরনের জীব দ্বারাই পূর্ণ হয়ে যাবে। অন্য কোন জীবের জন্যে সেখানে এক বিন্দু স্থানও থাকা সম্ভব নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা উদ্ভিদের মধ্যে (Sisymbrium Sophia)-র (সিসিমব্রীয়াম সোফিয়া) বংশ বৃদ্ধির বিষয় আলোচনা করতে পারি। এ জাতীয় প্রতিটি চারা গাছে সাধারণত সাড়ে সাত লাখ বীজ হয়। যদি এসব বীজ  জমিতে পড়ে অঙ্কুর হয় এবং তিন বছর পর্যন্ত এদের বংশ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে তাহলে দুনিয়াতে অন্য কোন বস্তুর  জন্যে এক কড়া জমিনও অবশিষ্ট থাকবে না। Star Fish বা তারা মাছ একবারে ২০ কোটি ডিম প্রসব  করে। যদি এ জাতীয মাছের মাত্র একটি বংশবাড়তে দেয়া হয় তাহলে অধস্তন তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে পৌঁছতে পৌঁছতে সারা দুনিয়ার পানি শুধু ঐ মাছেই পূর্ণ হয়ে যাবে এবং এক ফোটাও পানি অতিরিক্ত দেখা যাবে না। বেশী দূরে যাবার দরকার কি! একবার মানুষের প্রজনন শক্তিটাই দেখা যাক না। একটি পুরুষের দেহ থেকে এক সময়ে যে বীর্য নির্গত হয় তা দ্বারা ৩০/৪০ কোটি নারী গর্ভবতী হতে পারে। যদি একজন মাত্র পুরুষকে তার পূর্ণ প্রজনন শক্তি অনুসারে বংশ বাড়াবার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে কয়েক বছরে মধ্যে শুধু এক ব্যক্তির বংশ সমগ্র দুনিয়া দখল করে ফেলবে এবং তিল পরিমাণ  স্থানও বাকি থাকবে না। কিন্তু যিনি অসংখ্য জীবকে বিপুল প্রজনন  শক্তিসহ সৃষ্টি করেন এবং কোন একটিকেও নির্দিষ্ট সীমা লংঘন করতে দেন না, তিনি কে? এটা বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা না  স্রষ্টার হিকমত? বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, জীবিত জীব কোষের বৃদ্ধি সম্প্রসারণ ক্ষমতা সীমাহীন। এমন কি Uni Cellular Organism নামীয় কোষে সম্প্রসারণ শক্তি এত প্রবল যে, রীতিমত এর খাদ্য সরবরাহ এবং এর নিজকে পুনঃ পুনঃ বিভক্ত করার সুযোগ অব্যাহত থাকলে পাঁচ বছরের মধ্যে এত পরিমাণ জীবকোষের সৃষ্টি হতে পারে যে, এদের মিলিত আয়াতন পৃথিবীর চাইতে দশ হাজার গুণ বড় হয়ে যাবে। কিন্তু কে বিপুল ভাণ্ডার থেকে বিভিন্ন ধরনের জীব িএক নির্ধারিত পরিমাণ মাফিক বের করেছেন, তিনি কে?

যদি মানুষ স্রষ্টার এসব নিদর্শনের প্রতি লক্ষ্য করে তাহলে কখনো তার ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করতে সাহসী হবে না। মানুষ সৃষ্ট জগত এমন কি তার দেহে যেসব নিদর্শন আছে সেগুলো সম্পর্কে কোন চিন্তা গবেষণা করে না  বলেই তাদের মনে এসব অজ্ঞতাজনিত ধারণা জন্মায়। মানুষের প্রচেষ্টার শেষ সীমা কোথায় এবং কোন সীমান্ত রেখা থেকে আল্লাহর নিজস্ব ব্যবস্থাপনা শুরু হয়ে যায় তা এরা আজও বুঝতে পারে নি। আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ তো দূরের কথা একে বুঝে ওঠাও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের সাধ্য সীমা ডিঙিয়ে গিয়ে মানুষ যখন খোদায়ী ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে তখন আল্লাহর হিকমতের  কোন পরিবর্তন তো সম্ভব হয় না, তবে মানুষ নিজের মগজে অনেক জটিলতা নিজের চিন্তাধারায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ফেলে। তারা বসে বসে হিসেব করে যে দশ বছরের মধ্যে জনসংখ্যা দেড় কোটি বেড়ে গিয়েছে এবং পরবর্তী দশ বছরে আরও দু’কোটি বাড়বে। এভাবেই তারা বলে যে, ২০ বছরে তো জনসংখ্যা ১৬ কোটিতে পরিণত হবে এবং ১০০ বছরে চারগুণ হয়ে যাবে। তারপর এত লোক কোথায় সংকুলান হবে, কি খাবে, কিভাবে বাঁচবে- এসব ভেতে তারা শংকিত হয়ে পড়ে। এ চিন্তারই তারা বিভ্রান্ত  হয়- এ বিষয়ে প্রবন্ধ লিকে বক্তৃতা করে- কমিটি গঠন করে এবং জাতির বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের মনোযোগ আকর্ষণ করে সমস্যার গুরুত্ব বুঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহর এ বান্দারা কখনো চিন্তা করে না যে, হাজার হাজার বছর পর্যন্ত মানুষকে যে আল্লাহ পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনিই যাবতীয সমস্যার সমাধান করে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন এবং তিনি যদি মানব জাতিকে ধ্বংস করে দিতে চান তাহলে দেবেন। জনসংখ্যা বাড়ানো, কমানো এবং পৃথিবীতে এদের সংকুলান করানোর দায়িত্ব স্বয়ং  আল্লাহ তায়ালার:

(আরবী************)

“পৃথিবীতে চিরণশীল এমন কোন জীব নেই যার রেজেকের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেন নি এবং তিনিই প্রত্যেকের ঠিকানা এবং শেষ অবস্থিতির স্থান অবগত আছেন। এ সবই একটি সুস্পষ্ট গ্রন্থে লেখা আছে।” আল-কুরআন-১১:৬।

এসব ব্যবস্থাপনা আমাদের বুদ্ধি ও দৃষ্টির অগম্য কোন গোপন স্থান থেকে পরিচালিত হচ্ছে। আঠারো শতকের শেষাংশে ও উনশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন সংখ্যা এত দ্রুত বেড়ে যায় যে, সে দেশে চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ এ বিপুল  জনসংখ্যার সংকুলান ও খাদ্য ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ বিব্রত  বোধ করেন। কিন্তু সমগ্র বিশ্ব দেখতে পেয়েছনযে, ইংল্যান্ডের জন সংখ্যা বৃদ্ধির সংগে সংগে সংগতি রেখে রেজেকের উপায় উপাদানও বাড়তে থাকে এবং ইংরেজ জাতির সম্প্রসারণের জন্যে দুনিয়ার বড় বড় ভূখণ্ড তাদের হস্তগত হতে থাকে।

(২) দুনিয়ার অর্থনৈতিক উপকরণ ও জনসংখ্যা

বৃটিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি স্যার উইলিয়াম ক্রুক্‌স ১৮৯৮ সালে সভ্য জাগতকে হুশিয়অর করে দিয়ে বলেছিলেন যে, ইংল্যান্ড ও অবশিষ্ট সভ্যজগত শোচনীয় খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। তিনি আরও বলেছিলেন যে, দুনিয়ার খাদ্য উপকরণ মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ত্রিশ বছর পর খাদ্র সম্পর্কে কোন বিপর্যয় তো দেখা গেলই না, উপরন্তু খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ এত বেড়ে গেল যে, বাজারে প্রচুর দরুন খাদ্য চাহিদা মন্দা হয়ে গেল এবং আর্জেন্টিনা ও আমেরিকা অতিরিক্ত খাদ্য সম্ভার সাগরে নিক্ষেপ করত বাধ্য হলো।

মানুষ তার সংকীর্ণ দৃষ্টির দরুন বার বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করে, কিন্তু প্রতিবারই  বাস্তব অবস্থা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং স্রষ্টা উপকরণ বৃদ্দির যেসব পন্থা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার পরিমাণ নির্ণয় করা অসম্ভব। আজকের দুনিয়াও খাদ্য সংকটের আশংকায় যে হাঁক ডাক শুরু হয়েছে, তার মূলে কতখানি সত্য নিহিত আছে তা এবার বিচার করে দেখা যাক।

১. সর্বপ্রথম পৃতিবীতে বাসস্থান সমস্যা সম্পর্কেই আলোচনা করা যাক। পৃথিবীর স্থলভাগের পরিমাণ হচ্ছে ৫ কোটি ৭১ লক্ষ ৬৮ হাজার বর্গমাই। আর এর অধিবাসীদের সংখ্যা হচ্ছে (১৯৫৯ সালের হিসাবমুতাবিক ২ অর্বূদ ৮৫ কোটি। এ হিসাব অনুসারে প্রতি বর্গমাইলের লোক বসতি (Dcrite) হচ্ছে ৫৪ জন এবং অধ্যাপক ডাডলে ষ্ট্যাম্প-এর হিসেব অনুসারে পৃথিবীর প্রত্যেক অধিবাসীর জন্যগড়ে ১২.৫ একর জমি আছে। [Stamp, Dudly, “Our Developing World”, London, 1960, Page-39]

দুনিয়ায় কত লোক বসবাস করতে পারে এ সম্পর্কে কোন ধারণা করতে হলে জানা দরকার যে, বর্তমানে এক বর্গমাইল পরিমিত স্থানে হল্যাণ্ডে প্রায় ১.০০০, ইংল্যণ্ড ১.৮৫২ ও নিউইয়র্কে ২২,০০০ লোক  স্বচ্ছন্দে বসবাস করছে। দুনিয়ার বেশীর ভাগ অঞ্চলেই বহু জমি অতিরিক্ত ও অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। চীনে মোট জমির শতকরা ১০ ভাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকায় ব্যবহার যোগ্য জমির শতকরা ৬২ ভাগ (প্রায় ১ অর্বুদ ১৫ কোট একর) অকেজো অবস্থায রয়েছে। [Meormack, People, Space, Food.pp.20.21.] ব্রাজিল ২ অর্বুদ একর জমির মাত্র শতকরা ২.২৫ ভাগ জমিতে চাষাবাদ করছে আর কানাডা ২ অর্বুদ ৩১কোটি একর জমির মধ্য থেকে মাত্র শতকরা ৮ ভাগ জমিতে চাষাবাদ করে থাকে। [Britannica Book of the Year 1985, PP.387-8] এমতাবস্থায় জমির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে ঘোষণা করার অর্থ হচ্ছে বাস্তবের চোখে ধূরা নিক্ষেপ করা।

পুনরায় দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের লোক বসতির সংখ্যা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এখনও উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্র শূন্য পড়ে আছে। কয়েকটি বিশিষ্ট অঞ্চলের লোক বসতির হার নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

দেশের নাম প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোক বসতি [U.N. Demographic Year Book 1956, Table 1

ইউ.এন. ও.র হিসাব মাফিক প্রতি কিলোমিটারে যে লোক বসতি হয় একে ২.৫ দ্বারা  গুণ করে প্রতি বর্গমাইলের লোক বসতি পাওয়া যায়]

হল্যাণ্ড ৩৫৪
বেলজিয়াম ২৯৭
ইংল্যাণ্ড ২১৩
জার্মানী ২১০
পাকিস্তান ৯১
সংযুক্ত আরব প্রজতন্ত্র ২৩
আমেরিকা ১৯
ইরান ১২
দক্ষিণ আফ্রিকা ১২
নিউজিল্যোণ্ড
অষ্ট্রেলিয়া

মহাদেশগুলোর লোক বসতি নিম্নরূপ:

ইউরোপ প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮৫ জন
এশিয়া প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫৯ জন
আমেরিকা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯ জন
আফ্রেকিা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮ জন
ওসিয়ানা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২ জন
সমগ্র দুনিয়া গড়ে ২১ জন

এ আলোচনা থেকে জানা গেল যে, পৃথিবীতে উন্নয়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির এখনও বিপুল অবকাশ রয়েছে। বরং আফ্রিকা ও অষ্ট্রেলিয়াতে তো জনসংখ্যার অভাবে উন্নয়ন কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। [ডাডলে স্ট্যাম্পের উপরাল্লিখিত পুস্তকের ৫২ পৃষ্ঠায় লেখকের ভাষায়- The Third Difficulty is the Lack of Population.]

উল্লিখিত জমি ছাড়াও বিপুল পরিমাণ মরুভূমি ও কর্দমাক্ত জমি রয়েছে এবং এগুলোকে বেজ্ঞানিক শক্তির সাহায্যে আবাদযোগ্য করা যেতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান নদীর অববাহিকায় (Amazan Basin) এত পরিমাণ জমি রয়েছে যা ব্যবহারযোগ্য করার পর ইউরোপের সকল বাসিন্দার জন্যে সেখানে বসবাক  করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।  এ প্রসঙ্গে পার্কার হানস Patker Hanson রচিত ‘নিউ ওয়াল্ড ইমারজেন্সী’ (New worlds Emergency) নামক পুস্তক খুবই তথ্যবহুল কতক নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দেয়। এ পুস্তকে মরুভূমিকে মানুষের ব্যবহারোপযোগী করার পন্থা বাতলানো হয়েছে। [১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসের রিডার্স ডাইজেষ্ট-এ এড্‌উইন মুলার (Muller) লিখেছেন যে, পৃথিবীর বর্তমান জমিনের এক চতুর্থাংশ মরুভূমি। যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভূগর্ভস্থ পানিকে  ওপরে আনা যায় এবং সমুদ্রের লোনা পানিকে সূপেয় পানিতে পরিণত করার কোন স্বল্প ব্যয়সাধ্য আবিষ্কার করা সদ্ভব হয় তাহলে সমগ্র মরুভূমি শস্যশ্যামল কৃষিক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।]

প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে স্থানাভাব কোন সমস্যাই নয় এবং ভবিষ্যতে এধরনের সমস্যা দেখা দেয়ার কোন আশংকা নেই। মানুষের সাহসের অভাব এবং কর্মবিমুখতাইশ্রম ও চেষ্টার পরিবর্তে বংশ হত্যার তালিম দেয়।

২. দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে খাদ্যশস্যের উৎপাদন। পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগের মাত্র শতকরা ১০ ভাগে বর্তমানে চাষাবাদ করা হয়। অবশিষ্ট ৯০ ভাগ থেকে জংগল বাসস্থান ইত্যাদি বাদ দিলেও শতকরা ৭০ ভাগ এখনও অনাবাদী রয়েছে। শতকরা যে দশ ভাগ জমি চাষাবাদ করা হয়, তার মধ্যেই জমর পর্ণ উৎপাদন শক্তি ব্যবহারকারী চাষাবাদের পরিমাণ খুবই কম।চাষাবাদকৃত জমি কি পরিমাণ ও কোন উপায়ে বাড়ানো সম্ভব তা পরবর্তী পৃষ্ঠায় সংখ্যাতত্বের  তালিকায় দেয়া হলো।

এসব সংখ্যাতত্ত্ব থেমে জানাগেল:

*দুনিয়ার মোট ভূ-ভাগের মাত্র শতকরা দশ ভাগে এখন চাষাবাদ চলছে, অথচ শতকরা ৭০ ভাগ চাষ করা যেতে পারে অর্থাৎ শতকরা ৬০ ভাগ জমি এখনও অনাবাদী রয়েছে।

*বর্তমান যে জমিতে চাষাবাদ হয় তার পরিমাণ হচ্ছে ১,৩৩,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার এবং আরও ১,৩৫,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জমি বর্তমান চাষাবাদের ব্যবহৃত উপকরণ দ্বারাই চাষ যোগ্য করা যেতে পারে। এরপর নতুন পুঁজি ও যেসব যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে এব পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো ব্যবহার করে আরো ২,৮২,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জমি চাষ যোগ্য করে তোলা যায় এবং এ পরিমাণ জমি মোট জমির শতকরা ২১ ভাগ মাত্র। তারপরও অবশিষ্ট জমিথেকে ৩,৮৪,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জমি নয় উপকরণ আবিষ্কার করে চাষ যোগ্য করা যায় এবং মাত্রতা মোট জমির শতকরা ২৮ ভাগ।

এসব সংখ্যা থেকেই উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাব্য পরিমাণ সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা করা সম্ভব।

৩। উৎপাদন বৃদ্ধি সম্পর্কে আমাদের  এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, বর্তমানে পৃথিবীর সকল দেশের চাষাধীন জমির উৎপাদনের পরিমাণ সমান নয়। যেসব দেশে তুলনামূলকভাবে গড়ে প্রতি একর জমিতে কম ফসল উৎপন্ন হয় সেখানে উন্নত কৃষি প্রণালীর সাহায্যে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পাকিস্তানের তুলনায় প্রতি একর জমিতে জাপানেতিন  গুণ ও হল্যান্ডে চার গুণ ফসল উৎপন্ন হয়। উন্নত দেশগুলোতে একই জমি থেকে প্রতি বছর দুই বা তিনটি করে ফসল উৎপন্ন করা হয়। প্রতি একরে উৎপাদনের পার্থক্য নিম্নের হিসাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়।

গম উৎপাদন [Stamp Dudley, Oure Developing World, Page-73,]
দেশ েএকর প্রতি উৎপাদনের হার (মেট্রিক টন)

১৯৩৪-৩৮

১৯৫৬
ডেনমার্ক ১.২৩ ১.৬৩
হল্যাণ্ড ১.২৩ ১.৪৫
ইংল্যাণ্ড .৯৪ ১.২৬
মিশর .৮১ .৯৫
জাপান .৭৬ .৮৫
পাকিস্তান .৩৪ ৩০
ভারত .২৪ .২৯

হিসাব থেকে বোঝা যায় যে, প্রাচ্য দেশগুলো তাদের উৎপাদনের হার বর্তমান একর প্রতি উৎপাদনের তুলনায় ৩/৪ গুণ বাাতে পারে এবং পাশ্চাত্য দেশগুলোও গত ৩০ বছরে উৎপাদন অনেক বাড়িয়েছে। ইংল্যাণ্ডের বাড়তি শতকরা ৫০ ভাগের কাছাকাছি।

৪। বিগত পঁচিশ বছরের শস্য উৎপাদনের  হিসাব  করলে দেখা যায় যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে খাদ্য উৎপাদনের হার অনক বেশী। ডাডলে স্ট্যাম্পের হিসাব অনুসার বিগত পঁচিশ বছরের শস্য উৎপাদনের হার নিম্নরূপ। [Stamp Dudley, Oure Developing World, Page-71.]

১৯৩৪-৩৮ ১৯৪৮-৫২ ১৯৫৭-৫৯
খাদ্য ৮৫ ১০০ ১১৩
জনসংখ্যা ৯০১ ১০০ ১১২.২
(১৯৩৫) (১৯৫০) (১৯৫৭)

অর্থাৎ শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় বেশী। স্টাম্পের ভাষায়:

“আমরা যদি কৃষিজাত দ্রব্যদির উৎপাদন বৃদ্ধির অনুপাতের ওপর নির্ভর করি তাহলে পরিষ্কার দেখা যাবে যে, পৃথিবীতে খাদ্য সামগ্রীর উৎপাদন বৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অনেক  দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।”

ইউ. এনওর- ফুট এ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গেনাইজেশনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মোট খাদ্য উৎপাদনের অনুপাত ১৯৫২-৫৩ সালে ৯৪ ছিল। ১৯৫৮-৫৯-এ তা বৃদ্ধি পেয়ে ১১৩ হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্দিকেও যদি এতদসঙ্গে ধরাযায় তাহলে জনপ্রতি উৎপাদনের হিসাব নিম্নরূপ দাঁড়ায়: [Production year Book, Food and Agriculture Organaisaton of United Nations, Rome, Vol-13, 1959, PP 27-18]

জনপ্রতি উৎপাদন [উপরাক্ত গ্রন্থ, ৮৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১৯৫২-৫৩ ১৯৫৮-৫৯
খাদ্য ৯৭ ১০৬
মোট কৃষিজাত দ্রব্য ৯৭ ১০৫

এভাবে বিভিন্ন দেশের উৎপাদন হার পর্যালোচনা করলে বাড়তির হার নিম্নরূপ দেখা যায়:

খাদ্য উৎপাদনের হিসাব
দেশ ১৯৫২-৫৩ ১৯৫৮-৫৯
অস্ট্রিয়া ৯১ ১২২
গ্রীস ৮১ ১২০
ইংলণ্ড ৯৫ ১০৫
আমেরিকা ৯৮ ১১২
ব্রাজিল ৮৯ ১১৯
মেক্সিকো ৮৭ ১২৩
ভারত ৯০ ১০৫
জাপান ৯৭ ১১৯
ইসরায়ীল ৮২ ১৩০
তিউনীস ৯৫ ১৩৭
সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র ৮৬ ১১১
অস্ট্রেলিয়া ৯৮ ১২০

এসব দেশেই খাদ্র উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশী ছিল এবং সমগ্র দুনিয়ার জনসংখ্যা ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির  গতিও ছিল অনুরূপ।

৫. এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের অভিমত এই যে, উৎপাদনের অভাব অথবা অর্থনৈতিক অসংগতির কোন প্রকার সমস্যা রূপ ধারণ করার আশংকা নিকট ভবিষ্যতে তো নেই-ই, সুদূর ভবিষ্যতেও নেই।

জে. ডি. কর্ণেল লিখেন, “এখন থেকে এক শত বছর পর যখন জনসংখ্যা দ্বিগুণবা তিন গুণ হয়ে যাবে।” অর্থাৎ অনুমান করা যায় যে, একুশ শতকের শেষার্ধে জনসংখ্যা  ৬ অর্বুদ থেকে  ১২ অর্বুদের  মধ্যে পৌঁছে যাবে। এখন হিসাবে দৃষ্টে বোঝাযায় যে, বর্তমান কৃষি পদ্ধতিতে কোনস অস্বাভাবিক বোঝা না চাপিয়েই অর্থাৎ সমগ্র দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহৃত উপায়-উপকরণ  এবং বর্তমানে আধা শিল্পায়িত দেশগুলোতে যেসব বৈজ্ঞানিক উপাদান ব্যবহৃত হয়, সেসব সরঞ্জামাদির দ্বারাই উল্লিখিত জনসংখ্যার প্রয়োজন পূরণ করার উপযোগী খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। অন্য কথায় পরবর্তী একুশ বছরের মধ্যে খাদ্যাভাবের  কো আশংকাই নেই। যদি কোন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তবে তা মানুষের নির্বুদ্ধিতা ও স্বার্থপরতার দরুণ হতে পারে। [***৮১]

এফ. এ. ও. (F. A. O)-র দশসালা রিপোর্টে (১৯৪৫-৫৫) সমগ্র দুনিয়ার অবস্থা পর্যালোচনা করার পর এ সিদ্ধান্ত করা হয়, “এসব ত থ্য আমাদের বিশ্বাসকে আরো মজুদ  করে দেয় যে, পরবর্তী একশো বছরে ‍দুনিয়ার অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ স্থানে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেস ধরনেরই বিপ্লব সাধিত হবে যে এ ধরনের উন্নতি এ যাবত মাত্র এক-তৃতীয়াংশ স্থানে হয়েছে।”

উৎপাদন বৃদ্ধি সম্পর্কে উল্লিখিত রিপোর্ট প্রণেতা ডাঃ লামাটিন ইয়েট্‌স লিখেছেন:ঢ়

“গভীল আশাবাদিগণ আজ পর্যন্ত যে অনুমান  কায়েম  করেছেন তার  চাইতে উপরোল্লেখিত প্রোগ্রামে সামগ্রিকভাবে অধিকতর সাফল লাভ  করার ‍সুস্পষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।” [So Bols an nAim. F. A. O. 1955 P. 130]

এফ. এ. ও.-রই অন্য এক রিপোর্রেট বলা হয়েছে:

“জনসংখ্যা, খাদ্য, কৃষি ও শিল্প সম্পর্কি বিতর্কে যে সব ভিত্তি বিভ্রান্তি (Confusion) দেখা যায় এর কারণ হচ্ছে  বর্তমান ও ভবিষ্যতের উপকরণাদি সম্পর্কে আমাদের সঠিক তথ্য জানার অভাব। কখনও কখনও মনে হয় যে, কৃষি উৎপাদন যোগ্য জমির  উৎপাদন শক্তি ক্ষয়িষ্ণু (Exhaustible) বলে ধরে নেয়া হয়েছে। একটি কয়লার খনিতে যেভাবে উত্তরোত্তর কয়লার পরিমাণ হ্রাস পায় ঠিক সেভাবেই জমির উৎপাদন শক্তি কমে যায় মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, দূরদর্শিতার অভাবে ও ভুল পন্থায় কাজ করার দরুন এ শক্তি কমে যেতে পারে। কিন্তু জমির উৎপাদনক্ষমতা পুনর্বহাল করা যেমন সম্ভব তেমনি বাড়ানোও সম্ভব। নৈরাশ্যবাদী প্রচারণা আজ সর্বত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এ দলের লোকদের প্রধান বক্তব্য হচ্ছে এই যে, জমি তার উৎপাদন ক্ষশতার শেষ সীমায় উপনীত হয়েছে। কিন্তু আধুনিক  কালের বিশেষজ্ঞগণ এ নৈরাশ্যবাদী মতবাদের সঙ্গে মোটে একমত নন।” [Agriculture in the World Economy, Rome, F.A.O. 1956, Page, 35.]

বিখ্যাত অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ডঃ কলিন ক্লার্ক অনস্বীকার্য তথ্যাবলীর উপর নির্ভর করে  দাবী করেন যে, যদি  দুনিয়ার সকল  জমি সঠিকরূপে কার্যে নিয়োজিত হয় (যা হল্যান্ডের  চাষিগণ করে থঅকে) তাহলে বর্তমান কৃষি পদ্ধতিতেই বর্তমান জনসংখ্যা দশগুণ পরিমাণ মানুষকে (অর্থাৎ ২৮ অর্বুদ মানুষকে) পাশ্চাত্য দেশগুলোতে প্রচলত উচ্চমানের খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব এবং’ জনসংখ্যা সমস্যার রূপ পরিগ্রহ  করার কোন আশঙ্কা থাকে না। [Colin Clerk, Population and Living Standard”. International Labour Review, August, 1953.এ ব্যাপারে আরো পরিষ্কার ধারণা জন্মাবার জন্যে পড়ুন: বৃটিশ মেডিকেল জার্নাল, লন্ডন, ৮ই জুলাই, ৬১, ১১৯-২০ পৃষ্ঠা, বিশেষত লর্ড ব্রাবাজান (Lord Brabazan) ও লর্ড হেইলশ্যামের (Haisham) বক্তৃতা নোট।]

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উপকরণ ও জনসংখ্যা

পাকিস্তান সম্পর্কে তো এ কথা জোর  করে বলা যেতে পারে যে, আমাদের এ অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ হচ্ছে নিজেদের ভ্রান্তি ও অদূরদর্শিতা। নিছক অর্থনৈতিক দৃষ্টিতেও আমাদের জনসংখ্যা এবং বংশ বৃদ্ধির হার আমাদের জন্যে কোন সমস্যা নয়, বরং আল্লাহ র রহমতস্বরূপ। এ সম্পর্কে জরুরী  তথ্য পেশ করা হচ্ছে।

(ক) অর্থনেতিক দৃষ্টিতে উন্নত ও উন্নতশীল অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য থাকা অপরিহার্য। বিগত ২০০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সকল শিল্পপ্রধান দেশেই গঠন যুগে জনসংখ্যা অস্বাভাবিকরূপেবেড়ে  গিয়েছে এবং এ বৃদ্ধি সেসব দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে। জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা ও হ্রাসপ্রাপ্তি ঘটেছে ওই সব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী হয়ে যাবার পর। এর পূর্বে উন্নয়ন যুগে তা সম্ভব  হয়নি। প্রফেসর অর্গানস্কি (P. K. Organski) তাঁর একটি সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেছেন:

“অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইউরোপকে দুনিয়ার এক নম্বর শক্তিতে পরিণত করেছে। ইউরোপের জনসংখ্যার বিষ্ফোরণের ফলেই তার শিল্প প্রধান অর্থনীতি পরিচালনা করার জন্যে কর্মী এবং ইউরোপের বাইরে দুনিয়ায় ছড়িয়ে যাবার জন্যে প্রবাসী ও সৈন্য সংগ্রহ  করা সম্ভব হয় এবং এরা দূরদূরান্তে  বিস্তৃত অর্ধেক পৃথিবীব্যাপী সমগ্র জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের ওপর প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।” [ডন করাচী, ১৭ই জুলাই, ১৯৬১ সংখ্যায় প্রকাশিত আসাওয়ার্ড লোরীর “Population Explosion” শীর্ষক প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য।]

এ ব্যাপারে কলিন ক্লার্ক নিম্নলিখিত মত প্রকাশ করেন: “আধুনিক সমাজের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশীর ভাগই জনসংখ্যা বৃদ্ধি দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকে।” [Population Growth and Living Standard]

প্রফেসার থম্পসন নিম্নলিখিত ভাষায় একটি ঐতিহাসিক তথ্য উদ্‌ঘাটন করে বলেন:

“মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে সর্বপ্রথম জনসংখ্যাই প্রভাবান্বিত হয়, যার ফলে পাশ্চাত্য জাতিগুলোর জনসংখ্যার হার তীব্রগতিতে বাড়াতে থাকে। প্রায় এক শতাব্দীকাল পর্যন্ত লোকসংখ্যা বৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকে।” [থম্পসন “জনসংখ্যা সমস্যা” বিষয়ক পুস্তক, ৮৩ পৃঃ]

এজন্যেই  উন্নয়নশীল সমাজের সমস্যাবলীর সমাধানকল্পে তাকে উন্নত সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে বিচার  করা ভুল। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়া অপরিহার্য। এ ধরনের সমাজের জনসংখ্যা ‍বৃদ্ধির তুলনায় সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ যে অনেক বেশী তা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকেই সুস্পষ্টরূপে জানা যায়।

অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত সমাজে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিভিন্ন কারণে উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুধু যে উন্নতির প্রতিবন্ধক নয় তাই নয়,  বরং উন্নয়নের জন্যে অত্যন্ত জরুরী।

(খ) কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিবারের লোকসংখ্যা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। নিছক পুঁথিগত বিদ্যাই যাদের সম্বল, শুধু সংখ্যার উত্থান-পতনেই যারা ভীতচকিত হয়ে ওঠেন, তাদের পক্ষে বিষয়টি বুঝে ওঠা মুশকিল। কিন্তু  যাঁরা বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল তাঁরা জানেন যে, কৃষক পরিবারের লোক সংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক দৃস্টিতে বিরাট সম্পদ বলে প্রমাণিত হয়; কৃষিনির্ভরশীল পরিবার লোকাভাবের দরুন শ্রমিক নিয়োগ করতে বাধ্য হওয়ার চাইতে বড় বিপদ আর কিছুই নেই। অধুনা সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞগণও বিষয়টিকে ‍উপলব্ধি  করতে পেরেছেন। প্রফেসর ঈগন আর্নেস্ট বার্গেল (Egon Ernest Bergel) বলেন:

“সন্তান কৃষকর জন্যে অর্থনৈতিক পুঁজি  (Asset) এবং শহরবাসীর  জন্যে দায় (Liability)। কৃষকের দারিদ্র যত বেশী হবে, সন্তানহীনতা তার জন্যে ততই বেশী অসহ্য হবে। কৃষিভিত্তিক সমাজে ছোট শিশুর জন্যে কোন স্থান ও খাদ্য সংগ্রহ করা কিছুমাত্র কষ্টকর নয় এবং শিশুর লালন-পালনে কোন অসুবিধা দেখা দেয় না। কেননা  কৃষি ক্ষেত্রেই একমাত্র স্থান যেখানে মা তার সন্তানের দেখাশোনা করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের নিজের  কাজও অতি স্বচ্ছন্দে করে যেতে পারে। [Bergel Egon Ernest, Urban Sociology, 1955, P. 292.]

প্রফেসার আর্নল্ড গ্রীনও অন্যভাবে এই একই মত প্রকাশ করেছেন:

“প্রাচীন গ্রাম্য পারিবারিক প্রথায় সন্তান দুটি উপায়ে পিতার উপকার করতো:

প্রথমত, অল্পবয়সই সন্তান কৃষি কাজে অংশ গ্রহণ করে পিতার অর্থনৈতিক  মূরধনে পরিণত হতো।

দ্বিতীয়ত, সন্তান পিতার নাম ও বংশ-পরিচয় বহাল রাখার উপানস্বরূপ পিতাকে মানসিক শান্তি দান করতা। [আর্নল্ড গ্রীন- AModern Introduction to the Family. Page-566.]

পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৫ জন ‍কৃষি উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এমতাবস্থায় মেহনতী লোকের সংখ্যা  কমানা কিছুতেই সঙ্গত হতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশগুলোর অবস্থা দেখে দেশের সমস্যা সমাধানের জন্যে একই পন্থা অনুসরণ করা আমাদের জন্যে কখনও সুষ্ঠ চিন্তার পরিচায়ক হতে পারে না।

(গ) সাম্প্রতিক আদমশুমারী মুতাবিক দেশের মোট জনসংখ্যা  হচ্ছে ৯ কোটি ৩৮ লক্ষ ১ হাজার ৫শত ৫৬ জন এবং সমগ্র দেশে লোকবসতির হার হচ্ছে প্রতি বর্গমাইলে ২৫৬ জন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে জনসংখ্যার চাপ অত্যন্ত বেশী। এজন্যে দেশের দুই অংশে লোকবসতির হার একরূপ নয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বর্গমাইলে লোক বসতির গড় পড়তা ৯৯৩ জন, পশ্চিম পাকিস্তানে এর হার ১৩৮ জন। দুনিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যাবে যে, পশ্চিম পাকিস্তানে রীতিমত লোকাভার রয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানেও কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দেয় নি। কারণ প্রতি বর্গমাইলে লোক বসতির হার ইংল্যাণ্ডে ১,৮৩৫, হল্যাণ্ডে প্রতি বর্গমাইলে উচ্চমানের জীবন যাপনকারী প্রায় ১,০০০ লোকের বাস এবং জাপানের ব্যবহারযোগ্য জমিতে (শতকরা মাত্র ১৭ ভাগ ব্যবহার যোগ্য) প্রতি বর্গমাইলে ৩,০০০ লোকের বাস।

পৃথিবীর  কয়েকটি দেশের কৃষি- যোগ্য জমির পরিমাণ অনুপাতে প্রতি বর্গমাইলে লোকবসতির হার নিম্নরূপ:

আমেরিকা- ২৯৩

সুইডেন-৪৮৯

ফ্রান্স-৫১১

ভারত-৭৮৬

ইটালী- ৯৩৬

বেলজিয়াম- ২,১৫৫

হল্যান্ড-২,৩৯৫

সুইজারল্যান্ড- ২,৪০৬

জাপান- ৩,৫৭৫

উপরের সংখ্যাতত্ত্ব থেকে পরিস্কার বুঝা যায় যে, আমাদের দেশে এখনও অনেক লোক সংকুলানের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি আমাদের তুলনায় প্রতি বর্গমইলে ৪ গুণ বেশী লোক বসতি হওয়া সত্ত্বেও হল্যান্ড এবং পাঁচগুণ লোক বসতি সত্ত্বেও জাপান প্রয়োজনাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে নির্দিষ্ট হয়ে না থাকে তাহলে আমাদের জনসংখ্যা দেশের সমস্যা হয়ে দাঁড়াল কিভাবে? কিছুসংখ্যক লোকের মগজে এ ধরনের সমস্যা হয়তো বা রয়েছে কিন্তু আমাদের দশে বাস্তব ক্ষেত্র এ ধরনের কোন সমস্যার অস্তিত্ব মাত্রও নেই।

(ঘ) আমাদের দেশের মাট ভূ-খন্ডর মাত্র শতকরা  ২৬ ভাগে কৃষিকার্য হয়ে থাকে। শতকরা ১৩ ভাগ এমন ধরনের জমি রয়েছে যা বর্তমান কৃষি উপকরণের দ্বারাই কৃষিযোগ্য করে তোলা যেতে পারে। এছাড়া শতকরা ২৪ ভাগ জমি একনো  জরিফই করা হয়নি। এ-জমির বেশী অংশই অতি সামান্য চেষ্টা শ্রমের ফলে কৃষিযোগ্য হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। এ আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, দেশের মোট জমির শতকরা ১৫ ভাগের অদূর ভবিষ্যতেই কৃষিকার্য করা সম্ভব। সুতরাং জমির অভাব কোথায়?

(ঙ) একর প্রতি উৎপাদনের হার হিসাব করে দেখা যায় আমরা এখনও দুনিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পেছনে পড়ে আছি। কৃষি যন্ত্রপাতিকে উন্নত করে আমরা উন্নতি করে আমরা উৎপাদন বাড়াতে পারি।

আমাদের দেশের তুলনায় একর প্রতি গম উৎপাদনের পরিমাণ ডেনমার্ক ও হল্যান্ড ৫ গুণ, ইংলন্ড ও জার্মানীতে ৪ গুণ এবং জাপান ও মিশরে ৩ গুণ বেশী।[একর প্রতি উৎপাদনের হার তুলনা করে আমাদরে দেশের অবস্থা নিম্নরূপ দাঁড়ায়।] দুনিয়ার অন্যন্য দেশ তাদের উৎপাদনের পরিমাণকে যে পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে এবং যেখানে থেকে আরও উন্নতির জন্যে চেষ্টা করছে, আমরা আমাদের উৎপাদনের পরিমাণকে সে পর্যায়ে কেন পৌঁছাতে পারবো না?

কোন দেশের উৎপাদিত ফসল ওজন করার একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হচ্ছে এস. এন. ইউ. (SNU)। মিঃ ডাড্‌লে স্ট্যাম্প ঐ মানদণ্ডে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনা করে বলেছেন:

“জাপান প্রতি একর জমিতে ৬ থেকে ৭ এস. এন. ইউ ফসল উৎপন্ন করে নেয় অর্থাৎ প্রতি বর্গমাইলে তার উৎপাদনের পরিমাণ হচ্ছে, ৪০০০ এস. এন. ইউ এ হিসেব থেকে আমরা বলতে পারি যে, কৃষিযোগ্য জমির প্রতি বর্গমাইলে ৪০০০ লাকের ভরণপোষণের ব্যবস্থা হতে পারে। [ঐ পুস্তক, পৃ. ১২০]

(চ) এছাড়া শিল্প ও ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে এবং এসব ক্ষেত্রের মাধ্যমে সুখ-স্বাচ্ছন্দের উচ্চতম শিখরে পৌঁছান সম্ভব। এ উভয় পন্থায় উন্নতির সম্ভাবনাও সীমাহীন। মানুষ ভুলে যায় যে, দুনিয়াতে যারা আসে তাদের কারো খাবার আমাদের দিতে হয় না। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই তার রেজেকদাতা এবং ঐ নবাগত ব্যক্তি নিজের শ্রমের ফলেই তা ভোগ করতে থাকে। অর্থনৈতিক উপকরণ ও তথ্যাবলীর প্রতি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে, মানব বংশ ধ্বংস করার কর্মপন্থা গ্রহণের সপক্ষে কোন যুক্তিযুক্ত কারণ বর্তমান নেই। ম্যালথাসের অনুসারীরা চিত্রের মাত্র একটি দিকই পেশ করে এবং অর্থনীতির নামে এমন সব বিষয় প্রকাশ করে যেগুলোর কোন সমর্থনই অর্থনীতি বিজ্ঞানে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এ কারণেই প্রফেসার কলিন ক্লার্ক ম্যালথাসপন্থীদের অর্থনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ  বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তাদের এ দুর্বলতা সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত নির্ভিক ও স্পষ্ট ভাষায় নিম্নলিখিত মন্তব্য করেন:

“এ ভদ্রলোকেরা বলে থাকেন যে, এদের দৃষ্টিভঙ্গী খাঁটি বিজ্ঞানভিত্তিক। যদি তাই হয়, তাহারে এটাও সত্য কথা যে, এরা যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন সে বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানের দৈন্যে দুনিয়ার এদের সমকক্ষ অপর কোন বৈজ্ঞানিক দল নেই। ম্যলথাসের অবস্থা এইযে, তিনি  জনসংখ্যা সম্পর্কে মৌলিক ও সাধারণ বিষয়গুলোও জনেন না। আর জনসংখ্যা সম্পর্কে অল্পবিস্তুর কিছু যদিও জানেন, অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান প্রায় অজ্ঞতার কাছাকাছি।” [Colin Clark, “Population Growth and Living Standard” International Labour Revies, Vol-LXVIII No. 2 August, 1953]

দেশ গম (১৯৫৬) একর প্রতি উৎপাদন (মেট্রিক টন) দেশ গম (১৯৫৬) একর প্রতি উৎপাদন (মেট্রিক টন)
ডেনমার্ক ১.৬৩ স্পেন ২.৩৫
হল্যান্ড ১.৪৫ ইটালী ১.৯০
বেলজিয়াম ১.২৮ অষ্ট্রেলিয়া ২.১৪
ইংল্যান্ড ১.২৬ মিশর ২.২০
মিশর ৯৫ জাপান ১.৭০
জাপান .৮৫ পাকিস্তান .৬২
পাকিস্তান .৩

Our Developing World. Page 71-86 Stamp Dudely

উপরিউক্ত তথ্য ও যুক্তিসমূহ অধ্যয়ন করার পরও যদি কেউ বাড়তি জনসংখ্যা কি খাবে ও কোথায় থাকবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তাহলে ওটা তার নিজেরই ভুল। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে মানবীয় কর্মসীমার মধ্যে অবস্থান করে চিন্তা ও কাজ করা। এ সীমা অতিক্রম করে মানুষ যদি আল্লাহর কর্মসীমায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে তাহলে এমন সব জটিল সমস্যা সৃষ্টি করবে যার কোন সমাধান তাদের জানা নেই।

মৃত্যুর পরবর্তে জন্মনিরোধ

জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থকগণ স্বীকার করেন যে, বিভিন্ন ধরনের জীবের সংখ্যাকে এক সঙ্গত সীমার গণ্ডীতে আবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে এবং এ ব্যবস্থা মানব জাতির ওপরও কার্যকরী আছে। কিন্তু তারা বলে যে, প্রকৃতি মৃত্যুর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা বহাল রাখে এবং তদ্দুরুন মানুষকে কঠিন দৈহিক ও আত্মিক ক্লেশ ভোগ করতে হয়। কাজেই মৃত্যুর পরিবর্তে আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করে জনসংখ্যাকে সীমিত করতে বাধা কি? তারা আরো বলে,  জীবন্ত  মানুষের পক্ষে বিভিন্ন ধরনের যাতনায় ক্লিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ এবং দারিদ্রের নানাধিক দুঃ-কষ্টের মধ্যে জীবন যাপনের তুলনায় প্রয়োজনের অধিক সংখ্যক মানুষের জন্মরোধ করা শত গুণে শ্রেয়।

এখানে পুনরায় এ শ্রেণীর লোকের- অযৌক্তিকভাবে আল্লাহর  ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করে। আমি জিজ্ঞেস করি, তাদের সাবধানতা অবলম্বনের ফলেকি যুদ্ধ, মহামারি, রোগ, বন্যা, ভূমিকম্প, ঝড়, রেল, মোটরগাড়ী ও বিমান দুর্ঘটনাদি বন্ধ হয়ে যাবে? তারা কি আল্লাহর সঙ্গে অথবা (তাদের মতানুসারে প্রকৃতির সঙ্গে) এমন কোন চুক্তি করেছেযার ফলে তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ শুরু করলেই মৃত্যুর ভারপ্রাপ্ত ফেরেশতাকে অবসর দান করা হবে? যদি তা না হয়ে থাকে, আর নিশ্চয়ই তা হয় নি, তাহলে মৃত্যুর ফেরেশতা এবং তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ এ উভয় শক্তির চাপে বেচারা মানুষের কী দুর্গতি হবে? একদিকে তারা নিজ হাতেতই নিজেদের সংখ্যা কমিয়ে যাবে আর অপরদিকে  মৃত্যুর ফেরেশতা, ভূমিকম্প ইত্যাদির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে একই সঙ্গে মরণের কোলে ঠেলে দেব- বন্যা ও ঝড়ে জনপদের পর জনপদ উড়ে যাবে। দুর্ঘটনায় হাজার হাজর মানুষ মরতে থাকবে- মহামারী এসে জনপদগুলোকে একের পর এক জনশূন্য করবে—যুদ্ধে তাহাদের আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক মারণাস্ত্র লক্ষ—কোটি মানুষকে মৃত্যর কোলে শায়িত করবে। আর মৃত্যর ফেরেশতা এক এক করে পৃথকভাবে মানুষের প্রাণ হরণ করতে থাকবে। তারা কি এতটুকুও হিসাব করতে পারে না যে, আয় কমে গিয়ে খরচ পুরাদস্তুর বহাল থাকলে তহবিল কতদিন পূর্ণ থাকতে পারে, [ শুধু ইউরোপেই (রাশিয়া ছাড়া) প্রথম মহাযুদ্ধের দরুন ২ কোটি ২৬ লক্ষ লোক কমে যায়। সামরিক লোকদের মৃত্যু, সাধারণ মৃত্যুহারর অতিরিক্ত সংখ্যক নাগরিকদের মৃত্যু এবং জন্মাহার হ্রাসজনিত ১ কোটি ২৬ লক্ষ লোকের ঘাটতিও (Birth Deficit)-এর হিসাবে ধরা হয়েছে। রাশিয়াতে ১ম মহাযুদ্ধে ও সমাজতন্ত্রী বিপ্লবের দরুন জন্মাহার ১ কোটি কমতি দেখা যায়। জার্মানী সম্পর্কে অনুমান করা হয় যে, ১৯ লক্ষ লোক যুদ্ধে নিহত হয়, দাম্পত্য বিচ্ছেদের  দরুন ২৫লক্ষ শিশু এবং যুদ্ধজনিত জন্মহার হ্রাসের দরুন ২৬ লক্ষ শিশু  কম পয়দা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৫ লক্ষ থেকে এক কোটি পর্য়ন্ত অনুমিত হয়। জন্মহ্রাসের দরুন শুধু ফ্রান্সেই ১২ লক্ষ লোক হ্রাস পায়। বেলজিয়ামের অবস্থা এর চেয়েও শোচনীয় ছিলো, এজন্যেই বলা হয়ে থাকে যে, যুদ্ধ মানুষের সংখ্যা কমিয়ে দে। আর শুধু যে যুদ্ধের ময়দানেই মানুষ কমে যায় তাই নয়- যুদ্ধের অংশীদার দেশগুলোর ঘরে ঘরে সন্তানের সংখ্যাও কমে যায়। শুধু যুদ্ধে লিপ্ত মানব বংশই হ্রাস পায় না, বরং পরবর্তী বংশধরও কমে যায়। [লিন্ডেস, সোসাল প্রোবলেম্‌স ৪৭৭-৭৯ পৃঃ]

অনুরূপ ভাবেই দর্ভিক্ষের প্রশ্ন ওঠে। ১৯২০-২১ সালে চীনে ৫ লক্ষ লোক দুর্ভিক্ষের দরুন মারা যায়। ১৯৪০-৪৩ সালে পীত নদীর অববাহিকায় ৬০ লক্ষ লোক দুর্ভিক্ষ ও বন্যার কবলে পড়ে এবং তাদের অন্তত দশ লক্ষ লোক মনে গিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ১৯৪৩-৪৬ সালে  গ্রীসের সকল অধিবাসীই দুর্ভিক্ষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছিল। রেডক্রসের বিপুল পরিমাণ সাহায্য সত্ত্বেও হাজার হাজার লোক  মৃত্যু বরণ করে।

মহামারীতেও হামেশা বিপুল সংখ্যক লোক মৃত্যুবরণ করছে। ১৯১৮-১৯ সালে আমেরিকার ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে ৫ লক্ষ লোক মারা যায়। ঐ একই রোগে ভারতে দেড় কোটি এবং তাহিতী দ্বীপের এক-সপ্তমাংশ লোক মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধে যত লোক মারা যায় তার চাইতে বেশী পরিমাণ মরে কুৎসিত রোগে।] তাদের কাছে জনসংখ্যায় সঙ্গত পরিমাণ  জানার কোন উপায় আছে কি- না এ প্রশ্নটা না হয় ছেড়েই দিলাম। যদিও ধরে নেয়া যায় যে, এটা  তাদের জানাই আছে, তবুও প্রশ্ন ওঠে যে, তারাকি প্রয়োজন মোতাবেক সন্তান জন্মাতে ও প্রয়োজন পূরণ হলে জন্ম বন্ধ করতে সমর্থ? জনসাধারণের মধ্যে স্বার্থপরতা সৃষ্টি হলে এবং নিজের ব্যক্তিগত অবস্থা ও রুচি মোতাবেক সন্তানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ফায়সালা করার অধিকার অর্জন ও জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকরণাদি সকলের নিকট সহজলভ্য হলে দেশ ও জাতির জনসংখ্যাকে কোন নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব কি? অনুমানের কোন প্রয়োজন নেই- অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, দুনিয়ার সবচাইতে উন্নত দেশের পক্ষেও নিজেদের  জন্যে একটি সঙ্গত জনসংখ্যার সীমা নির্ধারণ এবং জনগণকে তদনুসারে আমল করতে বাধ্য করার ব্যাপারে সফলতা অর্জন সম্ভ হয় নি, তাই জিজ্ঞাসা করি, কোন হাতিয়ার নিয়েতারা খোদায়ী ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করে দেশ ও জনপদের জন্যে সঙ্গত জনসংখ্যা নির্ধারণ এবং তদনুসারে লোকসংখ্যা বাড়ানো বা  কমানোর ‍দুঃসাহসী কাজে অগ্রসর হতে চায়?

অর্থনৈতিক অজুহাত

জন্মনিরোধের সমর্থকগণ বলে, “সীমাবদ্ধ অর্থ উপার্জনকারী পিতামাতা অধিক সংখ্যক সন্তানকে ভাল শিক্ষা, স্বচ্ছন্দ সামাজিক পরিবেশ ও উন্নত জীবন সূচনা দান করতে পারে না। সন্তানের সংখ্যা পিতামাতার প্রতিপাল ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে গেলে পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামো বিগএড় যায়। এর ফলে সন্তানের শিক্ষা, লালন-পালন, আহার-বাসস্থান ও পোশাক-পরিচ্ছদ সবই নিকৃষ্ট ধরনের হতে বাধ্য হয় এবং এ ছাড়া ঐসব সন্তানের ভবিষ্যত উন্নতির পথও সব দিক দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় অযথা সন্তানের সংখ্যা বাড়ানোর চাইতে জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পিতামাতার শক্তির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সন্তান স্বল্প রাখাই ভাল। আর প্রতিকূল অবস্থায় সন্তান জন্মানোর ধারা  মূ?লতবীও রাখা যেতে পারে। সমষ্টিগত  কল্যাণ ও তরক্কীর  জন্যে এর চাইতে উত্তম ব্যবস্থা আর হতেই পারে না।”

আজকাল এ যুক্তি  মানুষের কাছে খুবই সমাদার লাভ  করছে। প্রকৃতপক্ষে পূর্বের দু’টি যুক্তির মতই এটি একটি দুর্বল যুক্তি। প্রথম কথা এই যে, ‘উত্তম শিক্ষা ও লালন-পালন, স্বচ্ছ সামাজিক পরিবেশ’ ও ‘উন্নত জীবন-সূচনা’ কথাগুলো অত্যন্ত  অস্পষ্ট। কেননা এগুলোর কোন ‍সুস্পষ্ট ও দুনির্দিষ্ট মানদন্ড নেই। প্রত্যেকের মনেই এসব বিষয়ে ভিন্ন  ভিন্ন ধারা বিরাজ করে এবং প্রত্যেকেকই নিজের অবস্থার সঙ্গে তুলনা না করে নিজের চাইতে অধিকতর সচ্ছল ব্যক্তির জীবনযাত্রার পর্যায়ে পৌঁছার লোভাতুর মনোভাব নিয়ে এসব বিষয়ে মাত্রা ঠিক করে, এ ধরনের ভ্রান্ত মানদণ্ডের ভিত্তিতে যদি সন্তানদের জন্য ‘উত্তম শিক্ষা ও লালন-পালন,’ ‘স্বচ্ছন্দ সামাজিক পরিবেশ’ এবং উন্নত জীবন সূচনা’র খাহেশ কেউ করে, তাহলে নিশ্চয়ই সে একটি বা  দু’টি সন্তানের বেশি পছন্দ করবে না। অনেকে তো নিঃসন্তান থাকাই পছন্দ করবে। কেননা সাধারণত মানুষের জীবন যাত্রার মান সম্পর্কিত ধারণা তার সমকালীন উপার্জনের পরিমাণের চাইতে অনেক উচ্চে থাকে এবং ভবিষ্যতের জন্যে সে যে  কাম্য বিষয়াদীর ফিরিস্তি তৈরি করে রাখে তা অনেক ক্ষেত্রেই হাসিল করা সম্ভব  হয় না। এটা নিছক যুক্তির খাতিরে  যুক্তি পেশ করার জন্য বলছি না, বরং এটা একটা বাস্তব সত্য। বর্তমান ইউরোপে লক্ষ লক্ষ দম্পতি রয়েছে যারা শুধু এজন্য নিঃসন্তান থাকা পছন্দ করেছে যে,  সন্তানদের শিক্ষা ও লালন-পালন সম্পর্কে  তার- এমন একটি উচ্চমান নির্ধারণ করে রেখেছে যার ফলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছার সাধ্যই নেই।

এছাড়া নীতিগতভাবেও উপরিউক্ত যুক্তি ভুল। সন্তান-সন্ততি আশৈশব সুখ-সম্পদ ও আরাম-আয়েশে লালিত হওয়া এবং  ‍দুখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, অভাব ও কঠোরতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা জাতির উন্নতির সহায়ক হয় না। এর ফল  স্কুল কলেজের  চাইতেও উন্নত শিক্ষার স্থল  বাস্তব কর্মক্ষেত্র  তাদের শিক্ষা দানের অনুপযোগী  হয়ে যায়।  বাস্তব জগতের শিক্ষাগার হচ্ছে যুগ ও কালের শিক্ষাগার। আল্লাহ তায়ালা এ শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করে তার মাধ্যমে মানুষের ধৈর্য, দৃঢ়তা, সাহসস ও উৎসাহের  পরীক্ষা নিয়ে থাকেন এবং যারা এতে পূর্ণরূপে যোগ্যতার  প্রমাণ দেয় তারাই উত্তীর্ণ হতে পারে।

(আরবী*************)

“নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ভয়-ভীতি, ক্ষুধা, দারিদ্র এবং জান-প্রাণ-ধন সম্পদ ও ফল-শস্যের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি। এ ব্যাপারে ধৈর্য ও দৃঢ়তা অবলম্বনকারীদের  জন্য  ‍সুসংবাদ।”

এটা একটা  হাপর যা  খাঁটি ও ভেজালকে পৃথক  করে দেয় এবং উত্তাপের পর উত্তাপ  সৃষ্টি  করে ভেজাল বস্তুকে বের  করে দেয়। এখানে বিপদ অবতীর্ণ হয় মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ শক্তি জন্মানোর উদ্দেশ্যে, দুঃখ-কষ্ট অর্পিত হয় মানুষের মনে এসব  জয়  করার  মত সংগ্রামী মনোভাব সৃষ্টি  করার  জন্যে এবং মানুষের  দুর্বলতা  আসে। এ খোদায়ী শিক্ষাগার থেকে যাঁরা ডিগ্রী নিয়ে বের হয় তাঁরা দুনিয়াতে কিছু করে দেখাতে  পারেন এবং আজ পর্যন্ত দুনিয়ার  বড় বড়  কাজ যাঁরা করে গেছেন তাঁরা সকলেই উল্লিখিত শিক্ষাগার থেকে ডিগ্রীপ্রাপ্ত। এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে বন্ধ করে দিয়ে দুনিয়াকে আরাম বিলাসিতার স্থানে পরিণত করার ফল  হবে এই যে, ভবিষ্যৎ বংশধরগণ আরামপ্রিয়, নিরুৎসাহী, কর্ম-বিমুখ ও কাপুরুষ হবে। প্রাচুর্যের মধ্যে  সন্তানের জন্ম, আসমান ছোঁয়া বিরাট শিক্ষাগার ও বিলাসবহুল বাড়ীতে শিক্ষা লাভ এবং যৌবনে  কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার  কালে মোটা অংকের অর্থ দ্বারা জীবনযাত্রার সূচনা- এসবের মাধ্যমে তাদের জীবন সফল ও উন্নত হবে বলে আশা করা অর্থহীন। এ ধরনের ব্যবস্থা দ্বারা শুধু তৃতীয় শ্রেণীর জীব তৈরী করা  সম্ভব, খুব বেশি চেষ্টা-যত্ন করেও দ্বিতীয় শ্রেণীর ঊর্ধ্বে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রথম শ্রেণীর যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ কখনও এ ব্যবস্থা থেকে সৃষ্টি হতে পারে না।

দুনিয়ার ইতিহাস ও মহামানবদের জীবনী  থেকেই ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যাবে। ইতহাসে প্রথম শ্রেণীর যত মানুষের জীবন  কথা পাওয়া যায়,ম তাঁদের শতকরা অন্তত ৯০ জন দরিদ্র ও সহায়-সম্বলহনি মাতাপিতার ঘরে জন্ম নিয়েছেন, দুঃখ মুসিবতের কোলে প্রতিপালিত হয়েছেন,  কামনা-বাসনার গলা টিপে হত্যা করে এবং মনের অনেক আশা-আকাঙ্খাকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে যৌবনকাল কাটিয়েছেন। এসব মহামানবদের প্রায় সকলকেই  সহায়-সম্বলহীন অবস্থায়  জীবনের মহাসাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁরা উত্তাল  তরঙ্গের আঘাতে সাঁতার শিখেছেন, পানির নির্মম  চপেটাঘাতে সামনে এগিয়ে যাবার শিক্ষা পেয়েছেন এবং এভাবে জীবন  সংগ্রামে অবিচল থাকার ফলেই একদিন সাফল্যের উপকূলে পৌঁছে বিজয়ের ঝাণ্ডা  উড্ডীন করেছেন।

আরও কয়েকটি যুক্তি

ওপরে তিনটি বড় বড় যুক্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। এদের সঙ্গে আরও তিনটি ছোট ছোট যুক্তিও আছে। আমরা সংক্ষেপে এগুলো উল্লেখ করবো এবং সংক্ষেপেই এদের  জবাব দিয়ে দেবো।

জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থকগণ বলেন, সুস্থ দেহ, মজবুত গঠন ও উচ্চতর কর্মক্ষমতার অধিকারী উন্নত ধরনের সন্তান নাকি জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই জন্মানো যায়। এ ধরনের বিশ্বাসের মূল হচ্ছে এই যে, কম সংখ্যক সন্তান জন্মানোর ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিশু শক্তিশালী, সুস্থ, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ হবে বলে  তাঁরা ধরে নিয়েছেন। তাঁদের ধারণা এই যে সন্তানের সংখ্যা বেশী হলে সকল সন্তানই  দুর্বল, রুগ্ন, অকর্মা ও নির্বোধ হবে। কিন্তু এসব ধারণার সমর্থনে গবেষণামূলক অথবা অভিজ্ঞতা-প্রসূত কোন প্রমাণ নেই। এগুলো নিছক ধারণামাত্র। বাস্তব  জগতে এর বিপক্ষে হাজার  হাজার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মানুষের জন্ম সম্পর্কে মানুষ কোন বিধি-ব্যবস্থা প্রবর্তন করতেই পারে না। এ কাজ সম্পূর্ণই আল্লাহর হাতে এবং তিনি যাকে যেভাবে ইচ্ছা পয়দা করে থাকেন।

(আরবী**********)

“তিনি (হচ্ছেন সেই সত্তা যিনি) তোমাদের মাতৃগর্ভে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আকার-আকৃতি দান করে থাকেন।”

বলিষ্ঠ, সুস্থ ও বুদ্ধিমান সন্তান জন্মানো এবং দুর্বল, রুগ্ন ও নির্বোধ শিশুর জন্মরোধ মানুষের ক্ষমতার  আওতা-বহির্ভূত।

ওপরের যুক্তিটরই কাছাকাছি আরও একটি যুকিত হচ্ছে এই যে, জন্ম নিয়ন্ত্রণ  মানুষকে অপ্রয়োজনীয় সন্তান লালন-পালনজনিত কষ্ট থেকে রেহায় দেয়। সম্পূর্ণ অকেজো বা বয়োপ্রাপ্তির পূর্বেই যারা মরে যাবে এমন সন্তানের লালন-পালন  করে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই।

এ যুক্তি  গ্রহণযোগ্য হতো যদি মানুষ পূর্ব থেকে কোন্‌ সন্তান কি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসছে তা  জানতে পারতো। কোন সন্তান যোগ্য অথবা অযোগ্য, কে শৈশবেই মরে যাবে বা  দীর্ঘজীবী হবে, কে কাজের লোক প্রমাণিত হবে আর কে অকেজো – এসব বিষয় যখন মানুষের নিকট সম্পূর্ণ  অজ্ঞাত তখন উপরিউক্ত যুক্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ আর অদৃশ্য বস্তুর প্রতি ঢিল নিক্ষেপ করা, একই কথা।

এ কথাও বলা চলে যে, অধিক  সন্তানের জন্ম হলে মায়ের স্বাস্থ্য নষ্ট হয় এবং তার সৌন্দর্য হ্রাস পায়। আমরা পূর্বে আলোচনায় বলে এসেছি যে, জন্ম নিরোধ ব্যবস্থা নারীর স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ণ রাখে না। অধিক সন্তান জন্মানোর ফলে নারীর স্বাস্থ্যের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, জন্মনিয়ন্ত্রণের দরুনও টিক সেই পরিমাণ ক্ষতি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর ভরসা  করেও কোন নারীর স্বাস্থ্য কত সংখ্যক সন্তান  জন্মানো পর্যন্ত অক্ষত থাকবে তা নির্ণয় করার উপায় নেই। এটা প্রত্যেক নারীর নিজস্ব অবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যদি কোন চিকিৎসা বিশেষ কোন  মহিলার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে  মত প্রকাশ ক রেন যে, উক্ত মহিলার স্বাস্থ্য গর্ভ ধারণ ও সন্তান প্রসবের  কষ্ট সহ্য করার অনুপযুক্ত,  তাহলে ন্যিঃসন্দেহে জন্মনিরোধ করার জন্যে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে যথাযোগ্য ব্যবস্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। এমনকি মায়ের জীবন রক্ষার জন্যে গর্ভপাত ঘটানো নাজায়েজ নয়। কিন্তু স্বাস্থ্য রক্ষার অজুহাত খাড়া করে জন্মনিয়ন্ত্রণকে সাধারণ ব্যবস্থা হিসাবে জারী করা এবং স্থায়ীভাবে ঐ ব্যবস্থাকে  কার্যকরী করতে থাকা কোনমতেই জায়েজ হতে পারে না।

ইসলামী নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী

জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থকদের উল্লিখিত যুক্তিগুলোর প্রতি গভীর মনোযোগ দিলে বোঝা যায়, নাস্তিকতা ও বস্তুবাদই এ বিষবৃক্ষের বীজ। যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করার ভিত্তিতে অথবা আল্লাহকে অথর্ব ও অকেজো বিবেচনা করে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ে নিজেরাই কর্মপন্থা নির্ণয় করে একমাত্র  তাদের  দ্বারাই এ আন্দোলন শুরু হয়েছে এবং ঐ ধরনের লোকদের মস্তিষ্কেই এসব যুক্তি প্রবেশাধিকার পেয়েছে। এ  কথা পরিষ্কার  হয়ে যাবার পর উল্লিখিত আন্দোলনটা যে ইসলাম বিরোধী এ বিষয়ের সন্দেহমাত্র থাকে না। এর যাবতীয় নীতি সম্পূর্ণরূপে ইসলামী নীতির পরিপন্থী এবং যে ধরনের  চিন্তাধারা থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রবর্তন  হয়েছে তার উৎখাত সাধনই ইসলামী জীবন বিধানের উদ্দেশ্য।

হাদীস থেকে ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণ পেশ

মুসলমাদের মধ্যে যারা জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থক তা্যঁরা তাঁদের সমর্থনে কোরআনের একটি শব্দও খুঁজে পাবে না। [এক ব্যক্তি কষ্ট করে (আরবী******) এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা পেশ করেছন। আমরা ইতিপূর্বে এ ভুল অপনোদন করে এসেছি।]

এজন্যে তাঁরা হাদীসের  আশ্রয় নেন এবং কতিপয় হাদীস পেশ করেন যাতে ‘আজল’-এর অনুমতি আছে। কিন্তু হাদীস থেকে দলিল পেশ  করার জন্যে কতিপয় বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার, অন্যথায় ফিকাহ্‌র কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পেঁছা অসম্ভব।

প্রথমত- আলোচ্য বিষয়ে হাদীসের বিশেষ অধ্যায়ে যত হাদীস আছে সবগুলোকে একত্র করে তাদর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান।

দ্বিতীয়- যে অবস্থায় ও পরিবেশে হাদীস বর্ণিত হয়েছে তা জানা।

তৃতীয়- ঐ সময় আরব দেশে যে অবস্থা প্রচলিত ছিলো তা অবগত হয়া।

আমরা এ তিনটি বিষয়কেই সামন রেখে এ সম্পর্কিত  হাদীসগুলো পর্যালোচনা করবো।

সকলেই অবগত আছেন যে, জাহেলিয়াতের যুগে আরব দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে হত্যা করারিই নিয়ম প্রচলিত ছিল। এর দুটি কারণ ছিল। প্রথমটি হচ্ছে অর্থনৈতিক দুরবস্থা। অনেক মাতাপিতাই দারিদ্রের  ভয়ে সন্তান  হত্যা করতো যাতে করে খাদ্যের অংশীদার  কম হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সীমাতিরিক্ত আত্মসম্মান জ্ঞান। অহমিকার  দরুনই তারা অনেক  সময় কন্যা সন্তানদের হত্যা করতো। ইসলাম এসে  কঠোরতার সঙ্গে এ কাজ করতে নিষেধ করে এবং অধিবাসীদের চিন্তার-মানসে পরিবর্তন সাধন করে।

এরপর মুসলমানদের মধ্যে ‘আজল’ অর্থাৎ স্ত্রীর যৌনপ্রদেশে বীর্যপাত না ঘটিয়ে সঙ্গম প্রবণতা জাগে। কিন্তু এ প্রবণতা প্রচলিত ছিলো না এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের কোন আন্দোলনও তখন জারী ছিলো না। ‘আজল’কে জাতীয পরিকল্পনায় শামিল করা সম্পর্ক তখন কেউ  চিন্তাও করে নি অথবা  জাহেলিয়াতের যুগে যেসব  কারণে সন্তান হত্যা করা হতো সেসব কারণে ‘আজল’ করা হতো না।

হাদীস থেকে জানা যায় যে, তিনটি কারণ আজল করা হতো।

প্রথমত- দাসীর গর্ভ থেকে নিজের কোন সন্তান জন্মানো এরা পছন্দ করতো না (কারণ সামাজিক মর্যাদায় দাসী পুত্র খাটো বিবেচিত হতো- অনুবাদক)

দ্বিতীয়- দাসীর গর্ভে  কারো সন্তান জন্মালে ‍উক্ত সন্তানের মাকে হস্তান্তর করা যাবে না অথচ  তারা স্থায়ীভাবে দাসীকে নিজেদের কাছে রেখে দিতেও প্রস্তুত ছিলো না।

তৃতীয়- দুগ্ধপায়ী শিশুর মা পুনরায় গর্ভ ধারণ করার ফলে প্রথম শিশুর স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার আশংকা করার মত।

এসব কারণে বিশেষ বিশেষ অবস্থায় কোন সাহাবী আজল করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং এর বিরুদ্ধে কোরআন ও সুন্নাহতে কোন নিষেধাজ্ঞা না থাকায় আজল করেছেন। এরূপ আমলকারীদের  মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা), হযরত সায়াদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) ও হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা) প্রমুখ নামধন্য সাহাবীদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অন্যতম হযরত জাবের (রা) হযরত রাসূলে করীম()-এর নীরবতাকই সম্মতি ধরে নিয়েছেন।  সুতরাং  তার মাধ্যমে বর্ণিত হাদীসের শব্দগুলো নিম্নরূপ:

(আরবী*******) “আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর  জামানায় আজল করতাম।”

(আরবী****) কোরআন নাজিল হচ্ছিল যে জামানায় সে জামানায় আমরা আজল করতাম।”

(আরবী******)

“আমরা হযরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর জামানায় আজল করতাম সে সময় কোরআনও নাজিল হচ্ছিল।”

এসব হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হযরত জাবের (রা) ও তাঁর সঙ্গে আরও যেসব সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত, তাঁরা স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকাটাতেই জায়েজ হিসাবে ধরে নিয়েছেন। এ সাহাবা প্রমুখদের বর্ণিত ভাষায় একটি  হাদীস ইমাম মুসলিম উদ্ধৃতি করেছেন। ঐ হাদীসে বলা হয়েছে, “আমরা রাসূলুললাহ (স)-এর জামানায় আজল করমাত, হুজুর (স) এ খবর জানতে পেরে আমাদের তা নিষেধ করেন।”

এহাদীসটির শব্দগুলোও অস্পষ্ট। হুজুর (স)কে আজল সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা হয়েছিলো কিনা- আর প্রশ্ন করা হয়ে থাকলে তিনি কি জবাব দিয়েছেন, একথা হাদীসে  স্পষ্টভাবে এ  হাদীস থেকে বুঝা যায় না।

এ বিষয়ে বর্নিত অন্যান্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, বিষয়টি সম্পর্কে হুজর (স) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। হযরত আবু সাঈদ খুদরী ()রা) থেকে বর্ণিত আছে:

আমারে হাতে কিছু সংখ্যক  দাসী এলো। আমরা আজল করতাম এবং এ সম্পর্কে হুজুর (স)-কে প্রশ্ন করায় তিনি বললেন:

তোমরা কি এরূপ কর?

তোমরা কি এরূপ কর??

তোমরা কি এরূপ কর???

“কেয়ামত পর্যন্ত যেসব শিশুর জন্ম নির্ধারিত আছে,তারা তো জন্মাবেই।” (বুখারী)

হযরত ইমাম মালেক (র) ‘মুয়াত্তা’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে এই আবু সাইদ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন:

বনী মুসতালাকের যুদ্ধে আমাদের হাত কতিপয় দাসী এলো। পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা আমাদের জন্যে খুবই কষ্টকর হচ্ছিল। আমরা দাসীদের ভোগ করার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু এদের বিক্রি করার ইচ্ছাও আমাদের ছিলো। এজন্যই আমরা আজল করতে মনস্থ করি যেন কোন সন্তান জন্মাতে না পারে। এ বিষয়ে আমরা হুজুর ()-কে প্রশ্ন করায় তিনি বললেন:

(আরবী**********)

“তোমরা এরূপ না করলে কি  ক্ষতি হবে? কেয়ামত পর্যন্ত যেসব শিশুর জন্ম নির্ধারিত আছে তারা তো জন্মাবেই।”

মুসলিম শরীফে এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আ- হযরত (স)-কে আজল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:

(আরবী*****)

“তোমরা এরূপ না করলে তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না।”

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে: (আরবী************)

“কেন তোমাদে  মধ্য থেকে কেউ এরূপ করবে?”

অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এসে বলেন, “আমার একটি দাসী আছে এবং তার গর্ভে কোন সন্তান হোক তা আমি চাই না।” এর উত্তর হুজুর (স) বললেন:

(আরবী***********)

“তুমি ইচ্ছা করলে আজল করতে পার- তবে তার তকদীরে যা লেখা আছে তা হবেই।”

এছাড়া ইমা তিরমিজি হযরত আবু সাঈদ খুদুরী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যাঁরা দীনী এলেমে বিশেষ পারদর্শ ছিলেন তাঁরা সাধারণত ‘আজল’কে মাকরূহ মনে করতেন। মুয়াত্তা গ্রন্থে হযরত ইমাম মালেক (র) বলেন যে, হযরত ইবনে ওমর (রা) ও ছিলেন  তাঁদের অন্যতম যারা ‘আজল’ পছন্দ করতেন না।

এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হযরত রাসূলে করীম (স) আজলের অনুমতি দেননি, বরং একটা নিরর্থক ও অপছন্দনীয় কাজ মনে করতেন। আর যেসব সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের ব্যাপারে তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তারাও এ বিষয়কে সুনজরে দেখতেন না। কিন্তু যেহেতু ‘আজল’ ক্রিয়ার স্বপক্ষে জাতির মধ্যে কোন আন্দলন শুরু হয়নি এবং এটাকে জাতির জন্যে বিশেষ  জরুরী বিষয় হিসাবেই পরিগণিত করার কোন  প্রচেষ্টা কোথাও দেখা যায়নি, বরং অল্প কয়েকজন  লোক ভিন্ন ভিন্ন অপরিহার্য  কারণে এ জাতীয় কাজে লিপ্ত হবেন; সেজন্যই হযরত (স) এ বিষয়ে  কোন সাধারণ নিষেধাজ্ঞাও প্রচার করেন নি। ঐ সময় যদি জন্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলন শুরু হতো তাহলে নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (স) কঠোরভাবে তাকে বাধা দিতেন।

‘আজল’-এর মাপকাঠিতেই আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণের অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (স) শুধু এ জন্যেই এগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রচার করেন নি যে, অনেক সময় অনেকেই বিবিধ ব্যক্তিগত কারণে জন্মনিরোধ করতে বাধ্য হয়। তাদেরকে প্রয়োজনের জন্যে এ  কাজ করতে দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ কোন নারীর স্বাস্থ্য এমন পর্যায়ে থাকা যে,  গর্ভসঞ্চার হলেই  তার প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে, অথবা তার স্বাস্থ্য অস্বাভাবিকরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে, অথবা দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাতৃদুগ্ধপানে ক্ষতির আশঙ্কা থাকতে পারে। এ ধরনের অন্য অবস্থায়ও যদি চিকিৎসকের পরামর্শে নিছক স্বাস্থ্যগত কারণে কেউ জন্মনিয়ন্ত্রণের কোন পথ  গ্রহণ করেন  তাহলে এর বৈধতা স্বীকৃত; এ কথা আমরা আগেও বলেছি। সুতরাং বিনা প্রয়োজনে জন্মনিয়ন্ত্রণকে একটা  সাধারণ কর্মসূচী ও জাতীয় পলিসিতে শামিল করা ইসলামী আদর্শের বিরোধিতা। আর যেসব ভাবধারার ভিত্তিতে এ ধরনের কর্মসূচী গৃহীত হয় সেগুলোও ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.