ইসলামী অর্থনীতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Picture9

ইসলামী অর্থনীতি

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (র)

শতাব্দী প্রকাশনী

সংকলন
প্রফেসর ড. খুরশিদ আহমদ
অনুবাদ
আব্বাস আলী খান
আবদুস শহীদ নাসিম
আবদুল মান্নান তালিব
সম্পাদনায়
অধ্যাপক শরীফ হুসাইন
শতাব্দী প্রকাশনী


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

আমাদের কথা

যেকয়টি প্রধান প্রধান উপাদান আধুনিক বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে তার অন্যতম হলো অর্থ। কারো কারো মতে তো অর্থই নিয়ন্ত্রক শক্তি। তাই অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা প্রচুর গবেষণা করেছেন এবং করছেন। গড়ে তুলেছেন বহু অর্থনৈতিক মতবাদ। একটার পর একটা মতবাদ চালু করা হচ্ছে মানব সমাজে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ব্যর্থতার ফলে কার্যকর করা হয় সমাতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা। এ ব্যবস্থাও তার অবাস্তব নীতির ফলে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়ে নিজ ঘরেই আত্মহত্যা করে। এখন পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির ছড়াছড়ি। আমাদের চোখের সামনে আছে ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক মতবাদ। এভাবে একটার পর একটা মতবাদ আসছে আর পরীক্ষা চলছে। কোনোটিই মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি, দিতে পারেনি মুক্তি।
আসলে মানব মস্তিষ্ক প্রসূত কোনো মতবাদই মানুষকে মুক্তি দিকে পারেনা। মানুষের সার্বিক মুক্তি, কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র খোদায়ী বিধান, তথা আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা। আর এ জীবন ব্যবস্থার নাম হলো ইসলাম। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। রাজনীতি, অর্থনীতিসহ মানব জীবনের সকল বিভাগকে পরিচালিত সঠিক নির্দেশনা দিয়েছেন ইসলাম। তাই ইসলামী অর্থনীতিই অর্থনৈতিক মুক্তিও উন্নয়নের একমাত্র চাবিচাঠি।
আধুনিক বিশ্বের সেরা ইসলামী চিন্তানায়ক সাইয়েদ আবুল আ’লা মুদূদী (র) মানব জীবনের প্রায় সকল বিভাগের ওপর ইসলামের নির্দেশনা উপস্থাপনা করেছেন। এ গ্রন্থটি ইসলামী অর্থনীতির ওপর তাঁর এক অনবদ্য গ্রন্থ। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডঃ খুরশীদ আহমদ গ্রন্থকারের ইসলামী বিষয়ক রচনাবল থেকে চয়ন করে সুনির্বাচিত লেখার এ সংকলনটি তৈরী করেছেন। এর প্রথম অংশে ইসলামী অর্থনীতির তাত্বিক ভিত্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, আর দ্বিতীয় অংশে চিত্রিত হয়েছে ইসলামী অর্থব্যবস্তার রূপরেখা। গ্রন্থটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের দারুণ কাজে লাগবে এবং অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের পাথেয় হবে বলে আশা করি।
গ্রন্থটি ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় প্রকাশিত হলো। এ সহযোগিতার জন্য ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন কর্তৃপকষকে মুবারকবাদ জানাই। মহান আল্লাহ এ গ্রন্থটি দ্বারা আমাদের জাতিকে উপকৃত করুন। আমীন।
আবদুস শহীদ নাসিম
পরিচালক
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী
ঢাকা ১. ৯. ১৯৯৪

কে কতটুকু অনুবাদন করেছেন

আবদুস শহীদ নাসিম
১৭….৯৪ পৃষ্ঠা
১২৫….১৭৩ পৃষ্ঠা
২২৯….২৫১ পৃষ্ঠা
২৭৫….২৮৪ পৃষ্ঠা
২৯৯….৩১৪ পৃষ্ঠা
আবদুল মান্নান তালিব
৯৫….১২৪ পৃষ্ঠা
১৭৪….২২৮ পৃষ্ঠা
২৫২….২৭৪ পৃষ্ঠা
৩১৫….৩২৮ পৃষ্ঠা
আব্বাস আলী খান
২৮৫….২৯৮ পৃষ্ঠা

গ্রন্থকারের কথা

এ গ্রন্থটি আমার সেসব রচনা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধের সংকরণ যেগুলি আমি বিগত ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর কালে বিভিন্ন সুযোগ ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ইসলামী অর্থনীতির মূলনীত ও বিধিমালার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং আধুনিক মানুষের জীবন সমস্যার ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ সম্পর্কে লিখে এসেছি। লেখাগুলো যথাসময়ে প্রকাশও হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এ লেখাগুলোকে একত্রিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছি। এ প্রয়োজন এজন্যে অনুভব করেছি যে, এর ফলে একদিকে সাধারণ পাঠকদের সামনে ইসলামী অর্থনীতির পূর্ণাংগ রূপরেখা এসে যাবে, অপরদিকে ইসলাম ও অর্থনীতি বিষয়ক ছাত্রদের জন্যেও এটি একটি পাঠ্য এবং সহায়ক গ্রন্থের কাজ দেবে। কিন্তু বহুমূখী ব্যস্ততার কারণে আজ পর্যন্ত এ কাজে হাত দেয়ার সযোগ পাইনি। আমি প্রফেসর খুরশী আহমদের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিক মনোযোগের সাথে সেই লেখাগুলোর সমন্বয়ে এমন একটি চমৎকার গ্রন্থ সংকলন করেছেন যে, আমার মনে হয় আমি নিজেও এর চেয়ে সুন্দরভাবে গ্রন্থখানি সংকলন করতে পারতামনা।
সংকলনের পর গোটা গ্রন্থটির উপর আমি নজর বুলিয়ে দিয়েছি, প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজনও করেছি। আমি আশা করি, খুরশীদ সাহেব যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ পরিশ্রম করেছেন, সে ক্ষেত্রে গ্রন্থটি অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হবে।
আবুল আ’লা
লাহোর
১৪ যিলহজ্জ ১৩৮৮ হিঃ
৩ মার্চ ১৯৬৯ ইং

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র বিরাজ করছে চরম অশান্তি ও অস্থিরতা। এই অস্থিরতার পেছনে যেসব শক্তির হাত রয়েছে এবং যেসব কারণে এ অশান্তির আগুন দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে, সেসবের মধ্যে অর্থনৈতিক কারণসমূহের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। অবশ্য অর্থনৈতিক উপাদানসমূহের এ ভূমিকার থাকার কারণ এ নয় যে, মানব জীবনে অর্থনৈতিক উপকরণসমূহের সিদ্ধান্তকর কোনে মর্যাদা রয়েছে; বরহ্চ তা এ কারণে যে, মানুষ অর্থনৈতিক কারণকে সেই মর্যাদা দিয়ে বসেছে, প্রকৃতিগতভাবে যে মর্যাদা তার নেই। তাই বিকৃতির কার্যকারণ অন্বেষণ এবং তার প্রতিকারের চেষ্টা সাধনা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ ও জটিল করে চলেছে। প্রথম দিকে মানুষের ধারণা ছিল, জীবিকার উপায় উপকরণের স্বল্পতাই মূল সমস্যা এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই যাবতীয় বিকৃতি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু উৎপাদন যখন শতগুণ বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজারগুণ বৃদ্ধি পেলো, তখনো সমস্যা ও বিকৃতি একই রকম থেকে গেলো। এরপর মানুষ উৎপাদনের অর্থনীতি (Economics of Production) থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বন্টনের অর্থনীতি (Economics of distribution) এর দিকে মনোযোগ দিলো এবং নিজেদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনা সেদিকেই নিবদ্ধ করলো। কিন্তু শত বছর যাবত সম্পদ বন্টন ও পুনর্বন্টনের (Redistribution of wealth ) এর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এখনো বিশ্ব ঠিক ঐ জায়গাতেই অবস্থান করছে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা (Scarcity) ব্যষ্টিক অর্থনীতির (Micro Economics) জন্ম দেয়। কিন্তু সর্বনাশা ব্যবসাচক্র (Trade cycle) এবং মন্দা এই ব্যবস্থর বাস্তব কার্যকারিতার প্রক্রিয়াকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে। এর ফলে সৃষ্টনতুন অবস্থা সামষ্টিক অর্থনীতির (Macro Economics) পথ সুগম করে দেয়। কিন্তু এ নতুন ব্যবস্থায় সম্পদের যে প্রাচুর্য (Affluence of wealth) দেখা দিয়েছে এবং তা নিজের সাথে যে সমস্যা বয়ে এনেছে, তার কারণে এ প্রাচুর্য স্বয়ং মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অর্থনীতির ছাত্ররা পুনরায় একটি নতুন অর্থনীনৈতিক ব্যবস্থার সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেছে। এ হচ্ছে একটি দুষ্টচক্র (Vicious circle) যার মধ্যে মানুষ বৃথা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং প্রতিটি আবর্তনে যার অবস্থা হলো এ প্রবাদ বাক্যর মতঃ
“রশির জট খুলে চলেছি দিবানিশি
আগা পাছার নেইকো খোঁজ!”
আজ আমরা মানব জাতিকে তাদের ধ্যান ধারণা ও মৌলিক দৃষ্টিভংগি পুনঃপরীক্ষা নিরীক্ষা ও পুনর্বিবেচনা কারা জন্যে আহবান জানাচ্ছি। চলার পথে উদ্ভূত জটিলতার কারণে আসল ক্ষতি ও অনিষ্ট সৃষ্টি হয়নি; বরঞ্চ অনিষ্ট ও ধ্বংসের মূল কারণ নিহিত রয়েছে সেই দৃষ্টিভংগি ও লক্ষ্যের মধ্যে যাকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করা হয়েছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান ও কর্ম প্রক্রিয়ার সূচনাতেই রযেছে ভ্রান্তি। তাই সূচনাবিন্দুই পুনর্বিবেচনার দাবী রাখ। মানুষ নিজের সঠিক পরিচয় ও প্রকৃত মর্যাদাকে উপেক্ষা করে তার চিন্তা দর্শনের ইমারত নির্মাণ করতে যাওয়ার কারণেই এই চরম ব্যর্থতার গ্লানি বইয়ে চলেছে।
আমাদের হাতের এই গ্রন্থটি মূলত অর্থনীতি বিজ্ঞানের (Economic Science) গ্রন্থ নয়। বরঞ্চ, এতে অর্থনৈতিক দর্শনের (Eocnomics Philosophy) রাজপথ প্রদর্শিত হয়েছে। এতে সেই মৌলিক বিষয়সমূহের আলোচনা করা হয়েছে, অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা সাধারণত যেগুলো সম্পর্কে চিন্তা না করেই সামনে অগ্রসর হন। এসব মৌলিক বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা থাকার কারণে সামনে অগ্রসর হতে গিয়ে প্রতিটি কদমে হোঁচট খাচ্ছেন, ধাক্কা খাচ্ছেন। গবেষক ও পথ প্রদর্শকদের উচিত এ দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ময়দানে এর বাস্তবায়ন করা। এতে লক্ষ্য অর্জন সহজতর হবে। অর্থনৈতিক চিন্তা দর্শনের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন, তার সূচনাবিন্দু হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করা উচিত। এ হিসেবে এ গ্রন্থটিকে আমরা অর্থনৈতিক দিকদর্শনে এ প্রশস্ত রাজপথ আখ্যা দিতে পারি।
মাওলানা সাইয়েদ আুল আ’লা মওদীদী একালের সর্বাধিক খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ। বিগত চল্লিশ বছরে তিনি ইসলামী সমাজ দর্শন ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি দিক ও বিভাগ সম্পর্কে কমবেশী কথা বলেছেন। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে আধুনিক কালের সমস্যাবলী ও জটিলতারকে সামনে রেখে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় কোনো প্রকার কমবেশী না করে হুবহু তা তুলে ধরেছেন। আসল সিদ্ধান্ত তো ভবিষ্যতই করবে, তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, শ্রদ্ধেয় মাওলানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো, তিনি ইসলামকে একটি পূর্ণাংগ দার্শনিক ও বাস্তব জীবন ব্যবস্থা এবং দীন দুনিয়ার কল্যাণধর্মী এক বিশ্বজনীন সংস্কার আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, বিগত চল্লিশ বছরের অবিরাম চেষ্টা সাধনার দ্বারা তিনি স্বীয় বিরোধীদের কাছ থেকে পর্যন্ত এ স্বীকৃতি আদায় করেছেন যে, জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের জন্যে ইসলাম তার নিজস্ব দৃষ্টিভংগির আলোকে মৌলিক পথ নির্দেশনা দন করেছেন। আর মুসলমান ব্যক্তি হিসেবে এবং জাতগতভাবে কেবল তখনই ইসলামের দাবী পূর্ণ করতে পারে, যখন সে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এসব পথনির্দেশের পূর্ণ অনুসরণ করবে।
এটা স্বাভাবিক কথা, যে মহান ব্যক্তিত্ব এই বিরাচ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন তিনি কেমন করে অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয়ে নীরব থাকতে পারেন? তাইতো দেখি, মাওলানা তাঁরা তরজামানুল কুরআন পত্রিকা প্রকাশনার প্রথম বছরই [১৯৩৩ ইং] “সুদ” ও “জন্ম নিয়ন্ত্রণের” বিরুদ্ধে জিহাধ শুরু করেছেন। এযাবত অর্থনীতি বিষয়ে তার গবেষণা, লেখা ও কথা বলা অব্যাহত রয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়ে এ পর্যন্ত তাঁর চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হলো, সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং, ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ, ভূমির মালিকানা বিধান এবং ইসলাম ও জন্মনিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়াও এ বিষয়ে মাওলানার বহু প্রবন্ধ, পুস্তিকা এবং বক্তৃতা রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই চারটি গ্রন্থের স্বতন্ত্র গুরুত্বতো অবশ্যই আছে এবং এগুলো ইনশাল্লাহ নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে যাবে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মাওলানার সকল লেখা সামনে রেখে একটি পূর্ণাংগ গ্রন্থ সংকলনের প্রয়োজনীয়তা আমি দীর্ঘদিন থেকে অনুভব করে আসছিলাম। এমন একটি গ্রন্থ, যাতে সকল মৌলিক অর্থনৈতিক বিষয়ে একই সাথে মাওলানর দৃষ্টিভংগিও জানা যাবে এবং অর্থনীতির ছাত্ররা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকও এক নজরে দেখতে পাবে। ফুল যতো সুন্দরই হোক নার তা বাগানময় যতো হাসিই ফুটাক, সেগুলো ফুলদানীতে সাজাবার মত একটি পুষ্পগুচ্ছে কেবল তখনই পরিণত হতে পারে, যখন মালি বাগান থেকে বেছে বেছে নির্বাচিত ফুলের সমন্বয়ে একটি গুচ্ছ তৈরী করবে।
এ কাজের প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন থেকেই উপলব্ধি করছিলাম। একটি রূপরেখাও তৈরী করে রেখেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এতোদিন এ কাজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি। ইতমধ্যে করাচী বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স ক্লাশের জন্যে ‘ইলামী অর্থনীতির’ একটি পত্র (Paper) সিলেবাসভুক্ত করেছে। তাছাড়া ‘দানশাগহে পাঞ্জাব’ও মাস্টার্ব-এ ইসলামী অর্থনীতি পড়ানো আরম্ভ করেছে। এ পদক্ষেপ নিতে দেরী হয়ে গেছে অনেক। কিন্তু এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা দেশ বিভাগের পরপরই যদি এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন, তবে হয়তো একটি শাস্ত্র হিসেবে ইসলামী অর্থনীতির উপর এতো দিনে অনেক মূল্যবান গ্রন্থাবলী রচিত হয়ে গেতো। যা হোক, এ পদক্ষেপকে আমরা আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। এ পদক্ষেপই আমাকে ত্বরিত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর শদ্ধেয় মাওলানার সকল গুরুত্বপূর্ণ রচনা একত্র সংকলন করে এ গ্রন্থ তৈরী করেছি, যাতে এক নজরে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণাংগ রূপরেখা পাওয়া সম্ভব হয়।
গ্রন্থটিকে দুই অংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম অংশে স্থান পেয়েছে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসমূহের পর্যলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়ানা এতে অর্থনীতি বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভংগিও তুলে ধরা হয়েছে পূর্ণাংগরূপে। বিস্তারিত বিশ্লেষণের সাথে সাথে পেশ করা হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহ প্রদর্শিত অপরিহার্য নীতিমালা। এ খন্ডটি আমাদের ভবিষ্যত কর্মীদের জন্যে মাইল ফলকৈর কাজ করবে। এখন প্রয়োজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন; এসব আদর্শ ও নীতিমালার আলোকে অর্থনীতির ভাষায় গবেষণা ও আলোচনা করা। এ রচনাগুলোর মর্যাদা আলোর মিনারের মতো। কিন্তু এ আলো স্বয়ং পথিক নয়; পথিকদের পথ-প্রদর্শক মাত্র। এ নির্দেশনার আলোকে অর্থনীতির ছাত্রদের সেই পথের সন্ধন করে নিতে হবে যার দিকে তা নির্দেশনা দান করছে। এটি একটি প্রদীপ। এ থেকে হাজারো নতুন প্রদীপ জ্বালাতে হবে। সুগম করতে হবে অন্যদের জন্যে চলার ও অনসরণ করার পথ। শ্রদ্ধেয় মাওলানা পথ চিহ্নিত করেছেন এখন মুসলিম অর্থনীতিবিদদের দায়িত্ব সম্মুখে অগ্রসর হওয়া এবং যুগোপযোগী পথ তৈরী করা।
গ্রন্থটির দ্বিতীয় খন্ডে স্থান পেয়েছে শ্রদ্ধেয় মাওলানার সেইসব রচনা, একদিকে যেগুলোর সম্পর্ক অর্থনৈতিক দর্শনের প্রয়োগের (Application) সাথে। এখানে এ প্রসংগে ইসলামী অর্থব্যবস্থার কেবল কয়েকটি দিক সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। তবে এতে কয়েকটি আলোচনা এমনও আছে, যেগুলো আমাদের সামনে অর্থনীতির বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে চিন্তা ও গবেষণার পথ ‍উন্মুক্ত করতে সহায়ক হবে। এ প্রবন্ধগুলো একদিকে কয়েকটি মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিষ্কার নির্দেশনা দান করছে; যেমন, ভূমির মালিকানা, সুদ, যাকাত এবং সামাজিক সুবিচার। অপরদিকে এ প্রবন্ধগুলো অর্থনীতির ছাত্রদের অংগুলি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলামের মৌলিক ধ্যান ধারণা এবং এর মৌলিক অ্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে বিশেষ বিশেষ জিজ্ঞাসা ও সমস্যার অধ্যয়ন কিভাবে করতে হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তথাকথিত প্রগতিশীল ভাঁড় ও অপরের অন্ধ অনুসারীদের মোকাবিলায় প্রকৃত সৃষ্টিধর্মী ও ইজতিহাদী রীতি কী? এটা চিন্তার স্বাধীনতার এক বিরাট কদাকার ধারণা যে, স্বাধীনতা ও ইজতিহাদ হলো স্বধর্মের শিক্ষাকে পরিবর্তন করা এবং পাশ্চাত্যের প্রতিটি ধ্যান ধারণার অন্ধ অনুকরণ করার নাম। এটা ‘চিন্তার স্বাধীনতা’ নয়, ‘মানসিক দাসতব’। চিন্তার প্রকৃত স্বাধীনতা হলো, আমরা নিরপেক্ষ মন এবং সমালোচনার দৃষ্টি নিয়ে সকল আধুনিক মতবাদ অধ্যয়ন করবো এবং “যা সঠিক তা গ্রহণ কর, যা ভ্রান্ত তা পরিত্যাগ কর” –এই নীতির অনুসরণ করবো। আমরা আমাদের মন মানসিকতার দুয়ার এমনভাবে বন্ধ করে দেবোনা যে, কোনো কল্যাণকর জ্ঞান থেকে উপকৃত হবো না। আবার নিজেদের মন মানসিকতার উপর অন্যদের প্রভাবও এতোটা গ্রহণ করবো না যে, দেখার সময় তাদের চোখে দেখবো, চিন্তার সময় তাদের মন দিয়ে চিন্তা করবো এবং বলার সময় তাদের মুখ দিয়ে বলবো।
গ্রন্থটির দ্বিতীয় অংশ মূলত এ ধরনের বিনির্মাণ ও সৃষ্টিধর্মী দৃষ্টিভংগির মুখপত্র। অর্থনীতির ছাত্ররা এ থেকে জানতে পারবে যে, বিশেষ বিশেষ ধরনের বিষয় ও সমস্যা সম্পর্কে কি পদ্ধতিতে চিন্তা-গবেষণা করতে হয়। এ খণ্ডটি মূলত একটি আদর্শ নমুনা। ভবিস্যতে যারা এ ময়দানে কাজ করবেন, তাঁদের অসংখ্য নতুন নতুন বিষয়ে কাজ করতে হবে। আমার বিশ্বাস তাঁদের চলার পথে এ সংকলনটি পথপ্রদর্শকের কাজ দেবে। শাস্ত্রীয় পরিভাষায় মাওলানা মওদূদী একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ [Economist] নন। কিন্তু তাঁর স্থান এর চেয়েও অনেক উর্ধ্বে। কোনো একটি নির্দিষ্ট শাস্ত্রের মানদন্ডে তিনি বিচার্য নন। তিনি এমন একজন চিন্তাবিদ যিনি ধর্মতত্ত্ব (Theology) থেকে শুরু করে প্রায় সকল সমাজ বিজ্ঞানের (Social Science) ময়দানে কেবল সিদ্ধান্তকর কথাই বলেননি, বরঞ্চ সেই সাথে ইসলামী দৃষ্টিভংগির আলোকে সেগুলোর কেন্দ্রীয় বিষয়বর্তুর (Central Core) নবনির্মাণ কাজের নীল নকশাও এঁকে দিয়েছেন। তাঁর অর্থনীতি বিষয়ক রচনাবলীর এ সংকলনটি অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই কাজই আঞ্জাম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ের উপর কাজ করা সেইসব মনীষীদের দায়িত্ব যাঁরা ইসলামের প্রতি অটুট বিশ্বাস রাখেন, সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সঠিক দৃষ্টিভংগি পোষণ করেন এবং যারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রায়োগিত দক্ষতার (Technical Competence) অধিকারী। আমাদের মতে এ গ্রন্থটিতে সাধারণ পাঠদের জন্যেও অনেক মূল্যবান উপকরণ রয়েছে; আর অর্থনীতির ছাত্র এবং আগামী দিনের ইসলামী অর্থনীতিবিদদের জন্যে রয়েছে দিকনির্দেশনা। আমার বিশ্বাস, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে পঠন পাঠনের ক্ষেত্রে এ গ্রন্থটি বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
গ্রন্থটি সংকলন সংক্রান্ত একটি কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন বোধ করছি। তা হোলো, এতে শ্রদ্ধেয় মাওলানার প্রবন্ধ এবং বক্তৃতা চাড়াও তাফহীমীল কুরআন থেকে সেই সব অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলোর বিষয়বর্তু অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত। একই ভাবে রাসায়েল মাসায়েল-এর সেইসব প্রশ্নের জবাবও এখানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে, যেগুলোকে আমাদের আলোচনার পরম্পরার সাথে সম্বন্ধযুক্ত মনে করেছি। এছাড়া ‘ভূমির মালিকানা বিধা’ এবং ‘সুদ’ গ্রন্থ থেকে প্রাসংগিক আলোচনাসমূহ গ্রহণ করে তা সংক্ষিপ্ত আকারে সংযোজন করেছি। কিন্তু এ গ্রন্থে সেসব বিষয়ের সূচী বিন্যাস করেছি আমাদের প্রয়োজনে। মনে রাখতে হবে এ গ্রন্থে সংকলিত অংশগুলো মূল গ্রন্থসমূহের বিকল্প (Substitute) হতে পারেনা। অবশ্য এ গ্রন্থে সংকলিত হয়ে একটি সীমা পর্যন্ত সেগুলো আমাদের প্রয়োজন পূরণ করছে। বিস্তারিত জানার জন্য আমরা সম্মানিত পাঠকদের মূল গ্রন্থ পাঠ করার অনুরোধ করবো।
এ গ্রন্থের উপকরণসমূহ নেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে। এগুলো লেখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। লেখার সময় গ্রন্থকারের সামনে ছিলো বিভিন্ন ধরনের পাঠক। এই সবগুলো লেখাকে একত্রিত করা এবং সেগুলোকে প্রাসংগিকভাবে বিন্যস্ত করা বড় কঠিন কাজ। আমার সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছি যাতে বক্তব্যের প্রাসংগিকতা ছিন্ন না হয়। তা সত্ত্বেও সম্মানিক পাঠকদের নিকট আমার নিবেদন, তাঁরা যেন গ্রন্থটি পাঠের সময় সংকলকের সেইসব সীমাবদ্ধতাকে সামনে রাখেন, এ ধরনের কাজে অপরিহার্যভাবে যেগুলোর সম্মুখীন হতে হয়। এ ধরনের সংকলনের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে আমি আশা করি এ গ্রন্থে যেসব বিষয়ে পুনরাবৃত্তি এসেছে তা প্রয়োজনীয় এবং সেগুলো আলোচ্য বিষয় অনুধাবনে কাজে লাগবে। গ্রন্থের প্রথম অংশে এরূপ পুনরাবৃত্তি একটু বেশী। আর সেখানে এমনটি হওয়া জরুরীও ছিলো। ইনশাল্লাহ এ পুনরাবৃত্তি উপকারেই আসবে।
পরিশেষে একটি ব্যক্তিগত কৈফিয়ত পেশ করছি। এ গ্রন্থ সংকলনের বেশীরভাগ কাজ ১৯৬৮ ইসায়ী সালের আগস্ট মাসের মধ্যেই স্পন্ন করেছিলাম। কেবল কয়েক সপ্তাহের কাজই বাকী ছিলো। এরি মধ্যে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্যে আমাকে ইংল্যাণ্ডে যেতে হয়। আকাশ ভ্রমণের সমস্যাবলীর মধ্যে একটি সমস্যা হলো, মানুষ তার প্রয়োজনের সব জিনিস সাথে নিতে পারেনা। আমি আশা করছিলাম, আমার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবো এবং কাজটি সম্পন্ন করতে পারবো। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। পাণ্ডুলিপি হাতে পৌঁছে ডিসেম্বর মাসে। তাছাড়া এখানে আসার পর তিন চার মাস অন্য কাজের চাপে এতোটা ব্যস্ত ছিলাম যে, গ্রন্থটি সম্পন্ন করতি আরো বিলম্ব হলো।
খুরশীদ আহমদ
লিস্টার, ইংল্যাণ্ড
২ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ ঈসায়ী
১৪ যুলকা’দা ১৩৮৮ হিজরী

সবকথার গোড়ার কথা

[১৯৪৮ সালের ২ মার্চ রেডিও পাকিস্তান [লাহোর] ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিষয়ে গ্রন্থকারের যে কথিকা প্রচার করেছিল, বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের কারণে এখানে সেটিকে ‘সব কথার গোড়ার কথা’ শিরোনামে সংকলন করা হলো।– সংকলক।]
মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সুবিচার ও সততার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যে ইসলাম কতিপয় মূলনীতি ও সীমা চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দিয়েছে। সম্পদের উৎপাদন, ব্যবহার ও বিনিয়োগের গোটা ব্যবস্থা এই সীমারেখার মধ্যে আবর্তিত হতে হবে। অবশ্য উৎপাদন ও বিনিয়োগ বিপণনের পন্থা পদ্ধতি কিরূপ হবে সে ব্যাপারে ইসলামের কোনো বক্তব্য নেই। কারণ সময় ও সভ্যতার উত্থান পতনের সাথে সাথে এসব পন্থা পদ্ধতি নির্ণিত ও পরিবর্তি হয়ে থাকে। বস্তুত, মানুষের অবসথা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে এগুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ইসলামের দাবী শুধু এতটুকু যে, সকল যুগ ও পরিবেশে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলী ও রূপই ধারণ করুক না কেন তাতে ইসলামের নির্দিষ্ট নীতিমালা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং নির্ধারিত সীমারেখা অবশ্যি অনুবর্তন করতে হবে।
ইসলামের বিঘোষিত দৃষ্টিভংগি হলো, এ বিশ্বজগৎ এবং এর যাবতীয় সম্পদ মহান আল্লাহ গোটা মানব জাতির কল্যাণের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাই পৃথিবীর বুক থেকে স্বীয় জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা করার অধিকার প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যেতে পারেনা। এক্ষেত্রে একজন অন্যজনের উপর অগ্রিধিকারও পেতে পারেনা। কোনো ব্যক্তি, বংশ, জাতি বা শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের উপর এমন কোনো বিধিনিষেধও আরোপ করা যেতে পারেনা যার ফলে তারা জীবিকার উপকরণের মধ্য থেকে কোনো কোনো উপকরণ ব্যবহারে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে অথবা কোনো বিশেষ পেশা গ্রহণের দরজা তাদের জন্যে বন্ধ থাকবে। একই ভাবে আইনত এমন কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করাও বৈধ হতে পারেনা যার করণে জীবিকার উপকরণসূহ বিশেষ কোনো শ্রেণী, বংশ, জাতি বা পরিবারের একচেটিয়া ইজারায় পরিণত হয়ে যাবে। আল্লাহর সৃষ্ট এই বিশ্বে তাঁরই দেয়া জীবিকার উপকরণসমূহের মধ্য থেকে নিজের অংশ লাভের চেষ্টা করার প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান। এ অধিকার লাভের সুযোগ সবার জন্যে সমভাবে উন্মুক্ত থাকতে হবে।
আল্লাহর দেয়া যেসব সম্পদ উৎপাদন করা কিংবা কার্যোপযোগী বানানোর ক্ষেত্রে কারো শ্রম বা যোগ্যতার বিনিয়োগ করতে হয়না তা সকল মানুষের জন্যে সাধারণবাবে বৈধ। নিজের প্রয়োজন অনুপাতে তা থেকে উকৃত হবার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে। নদী নালা ও সমুদ্রের পানি, বনের কাঠ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় উদগত ও লালিত গাছের ফল ফসল, স্বজাত ঘাস ও চারা, বায়ু, পানি, বিজন নের পশু, যমীনের উপর ভেসে উঠা খনিজ পদার্থ ইত্যাদি ধরনের সম্পদের উপর কারো একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। এগুলোর উপর এমন কোনো বিধিনিষেধও আরোপ করা যেতে পারেনা যার ফলে আল্লাহর বান্দারা কিছু ব্যয় করা ছাড়াই তা থেকে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে বাধাগ্রস্ত হবে। তবে হ্যাঁ, যারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব সম্পদের ব্যাপক ব্যবহার করতে চাই, েতাদের উপর করারোপ করা যেতে পারে।
আল্লাহ তা’আল্ মানুষের কল্যাণের জন্যে যেসব জিনিস সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো অনুৎপাদনশীল ও পতিত ফেলে রাখা উচিত নয়। ‘হয় নিজে সেগুলো দ্বারা লাভবান হও, অথবা অন্যরা যাতে উপকৃত হতে পারে সেজন্যে ছেড়ে দাও।’ এই মূলনীতির ভিত্তিতে ইসলামী শরীয়ত ফয়সালা দিয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি সরকার প্রদত্ত জমি তিন বছরের বেশী পতিত ফেলে লাকতে পারবেনা। যদি সে নিজে সে জমিতে খামার বা নির্মাণ কাজ না করে, কিংবা অন্য কোনো কাজে তা ব্যবহার না করে, তবে তিন বছর অতিক্রান্ত হবার পর তা পরিত্যক্ত ভূমি বলে গণ্য হবে এবং অপর কেউ তা কাজে লাগালে তাকে সেখান থেকে উৎখাত করা যাবে না। জমি তিন বছর পতিত ফেলে রাখলে সে জমি ফেরত নিয়ে নেবার অধিকার লাভ করবে এবং অপর কাউকে তা ব্যবহার করার জন্যে প্রদান করতে পারবে।
কেউ যদি সরাসরি প্রকৃতরি ভাণ্ডার থেকে কোনো জনিস সংগ্রহ বা আহরণ করে এবং নিজের শ্রম ও যোগ্যতা খাটিয়ে একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে, তবে সে-ই হবে সে জিনিসের মালিক। যেমন, যে পতিত জমির উপর এখনো কারো মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কেউ যদি তা অধিগ্রহণ করে এবং কোনো লাভজনক কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে, তবে তাকে সে জমি থেকে বেদখল করা যেতে পারেনা। বস্তুত ইসলামের দৃষ্টিভংগি অনুযায়ী পৃথিবীতে স্বত্বাধিকারের সূচনা হয়েছে নিম্নরূপে: প্রথমে যখন পৃথিবীতে মানুষের বসবা আরম্ভ হয়, তখন সকল জিনিস সকল মানুষের জন্যে সমানভাবে বৈধ ছিলো। অতঃপর যে ব্যক্তি যে বৈধ জিনিস নিজের মালিকানায় গ্রহণ করে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় তাকে ব্যবহার উপযোগী করে নিয়েছে, সে-ই হয়েছে সে সম্পদের মালক। অর্থাৎ সে জিনিসের ব্যবহার কেবল তার নিজের জন্যে নির্দিষ্ট করা হযেছে এবং অপরকে ব্যবহার করতে দেয়ার ক্ষেত্রে সে বিনিময় গ্রহণ করবার অধিকার লাভ করেছে। এ হলো মানুষের গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বাভাকি ভিত্তি। এ ভিত্তি এর নিজ স্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকা অপরিহর্য।
শরীয়তসম্মত বৈধ পন্থায় পৃথিবীতে সে স্বত্বাধিকার অর্জিত হয়, তা অবশ্যই সম্মানযোগ্য। এ ব্যাপারে মতভেদ থাকলে তা কেবল এতটুকু থাকতে পারে যে, মালিকানা অর্জন আইনগতভাবে বিশুদ্ধ হয়েছে কিনা! আইনগতভাবে যেসব মালিকানা অবৈধ, সেগুলো অবশ্যি খতম করতে হবে। কিন্তু শরীয়তসম্মত বৈধ মালিকানা হরণ করার অধিকার কোনো সরকার বা আইন পরিষদের নেই। এমনকি, কোনো মালিকের শরীয়তসম্মত অধিকারের কমবেশী করবার অধিকারও কাউকে দেয়া হয়নি। সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা কায়েম করা যেতে পারেনা, যা জনগণের শরীয়ত প্রদত্থ অধিকারকে পদদলিত করে। সমষ্টির কল্যাণে ব্যক্তির মালিকানার উপর স্বয়ং শরিয়ত যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তাতে হ্রাস করা যতো বড় অন্যায় সংযোজন করার ঠিক ততো বড় যুলুম। ব্যক্তির শরীয়ত প্রদত্ত অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তা থেকে শরীয়ত নির্ধারিত সমষ্টিক অধিকার আদায় করা ইসলামী সরকারের অন্যতম কর্তব্য।
আল্লাহ তা’আলা তার দান ও অনগ্রহসমূহ বন্টনের ক্ষেত্রে সাম্যনীতি গ্রহণ করেননি। বরঞচ নিজের মহাপ্রজ্ঞার ভিত্তিতে কিছু মানুষকে অপর কিছু মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সৌন্দর্য, সুন্দর কণ্ঠস্বর, সুস্থতা, দৈহিক শক্তি, মেধা, জন্মগত পরিবেশ এবং অরুরূপ অপরাপর জিনিস সব মানুষকে সমভাবে প্রদান করা হয়নি। অরূপভাবে জীবিকার ব্যাপারেও এই একই কথা প্রযোজ্য। মানুষের মধ্যে জীবিকার তারতম্য হওয়অ আল্লাহ্‌র সৃষ্ট প্রকৃতিরই দাবী। সুতরাং মানুষের মধ্যে কৃত্রিম অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যে যতো কর্মকৌশলই গ্রহণ করা হোকনা কেন, ইসলামের দৃষ্টিতে, লক্ষ্যে ও মূলনীতির দিক থেকে তা সবই ভ্রান্ত। ইলাম যে সাম্যের সমর্থক, তা জীবিকার ক্ষেত্রে নয় বরঞ্চ জীবিকা লাভের প্রচেষ্টা ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধার সাম্য। ইসলাম চায়, সমাজে এমন কোনো আইনগত ও প্রথাগত প্রতিবন্ধকতা অবশিষ্ট না থাকুক, যার কারণে কোনো ব্যক্তি নিজের শক্তিসামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ উপার্জনের চেষ্টা সাধনার পথে বাধার সম্মুখীন হবে। অপরদিকে কোনো শ্রেণী, বংশ বা পরিবারের জন্মগত সৌভাগ্যকে আইনের দ্বারা স্থায়ী করার মতো বৈষম্যমূলক নীতিও ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ দুটি পন্থা মানুষে মানুষে স্বাভাবিক প্রকৃতিগত বৈষম্যের স্থলে মানব সমাজে একটি জবরদস্তিমূলক কৃত্রিম বৈষম্যের সৃষ্টি করে। তাই ইসলাম এসব প্রথা ও আইনকে নির্মূল করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এমন একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে যেখানে প্রতিটি মানুষের জন্যে জীবিকা উপার্জনের সুযোগ সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু যারা জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে চেষ্টা করার মাধ্যম এবং ফলাফল লাভের ব্যাপারে সব মানুষকে জবরদস্তিমূলক একই সমতলে নিয়ে আসতে চায়, ইসলাম তাদের সাথে একমাত্র নয়। কেননা তারা প্রাকৃতিক অসাম্যকে কৃত্রিম সাম্যে রূপান্তরিত করার অসাধ্য সাধন করতে চায়। বস্তুত প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ব্যবস্থা তো কেবল সেটাই হতে পারে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি অর্থ উপার্জনের প্রচেষ্টা ক্ষেত্রে, ঠিক সেই স্থঅন এবং পরিবেশ থেকে যাত্রা শুরু করবে, যেখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে সৃষ্টি করেছেন। যে মটরগাড়ী নিয়ে জন্ম নিয়েছে, সে মটরগাড়ী নিয়ে যাত্রা শুরু করবে, যে কেবল দুই পা নিয়ে এসেছে সে পদদলে চলতে আরম্ভ করবে, আর যে খোড়া হয়ে জন্ম নিয়েছে তাকে খোড়া অবসথায়ই যাত্রা শুরু করতে দিতে হবে। সমএজ এমন আইন প্রথা কোনো অবস্থাতেই চালু হওয়অ এবং চালু থাকা উচিত নয়, যপর ফলে মটরগাড়ী নিয়ে জন্ম নেয়া ব্যক্তি অযোগ্য হওয়অ সত্ত্বেও কেবল আইন ও প্রথার বলে চিরদিনই মটরগাড়ীর মালিক থাকবে এবং পংগু হয়ে জন্ম নেয়া লোকেরা আইন প্রথার বাধা ডিঙ্গিয়ে কোনোদিনই মটর গাড়ীর মালিক হতে পারবেনা। অপরপক্ষে সমাজে এমন ব্যবস্থা থাকাও কিছুতেই সমীচীন নয় যে, সকল মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে একই স্থান এবং পরিবেশ থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে এবং সমগ্র পথে সকলকে একই সাথে গ্রথিত থাকতে হবে। বরঞ্চ সমাজের আইন ও প্রথাগত ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত এবং সাধারণভাবে এই সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকা আবশ্যক যাতে, কোন ব্যক্তি পংগু অবস্থায় যাত্রা শুরু করা সত্ত্বেও যদি মটর গাড়ী লাভ করার মত শ্রম, যোগ্যতা প্রতিভা তার থাকে তাহলে অবশ্যই যেন সে মটরগাড়ীর মালিক হতে পারে। অপরদিকে কেউ মটরগাড়ী দিয়ে যাত্রা শুরু করেও যদি নিজের অযোগ্যতার কারণে মটরগাড়ী হারিয়ে ফেলে, তবে তার সে অযোগ্যতার ফলও তার পাওয়অ উচিত।
ইসলাম কেবল এতটুকুই চায়না যে, সমাজ জীবনে কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত এবং অবাধ থাকবে; বরঞ্চ সেইসাথে এটাও চায় যে, এ ময়দানে প্রযোগীগণ পরস্পরের প্রতি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হবার পরিবর্তে সহমর্মী ও সগযোগী হবে। ইসলাম একদিকে নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে অক্ষম ও পিছে পড়ে থাকা মানুষের আশ্রয় প্রদানের মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায়; অপরদিকে সমাজে এমন একটি শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তুলতে চায় যে অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাহায্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যেসব লোকের জীবিকা উপার্জনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা থাকবে না, তারা এই সংস্থা থেকে নিজেদের অংশ পাবে; যারা দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বে, এই সংস্থ তাদের উঠিয়ে এনে আবার চলার যোগ্য করে দেবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্যে যাদের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, এই সংস্থা থেকে তারা সাহায্য সহযোগিতা লাভ করবে। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম আইনগতভাবে দেশের গোটা সঞ্চিত সম্পদ থেকে বার্ষিক ২.৫% ভাগ এবং গোটা বাণিজ্যিক পুঁজি থেকে বার্ষিক ২.৫% ভাগ যাকাত সংগ্রহ করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। সমস্ত উশরী জমির উৎপন্ন ফসল থেকে ১০% ভাগ কিংবা ৫% ভাগ উশর এবং কেনো কোনো খনিজ সম্পদের উৎপাদন ২০% ভাগ যাকাত উসুল করতে বলেছে। এছাড়া গৃহপালিত পশুর উপরও বার্ষিক যাকাত আদায় করবে বলেছে। এই গোটা সম্পদ সামগ্রী ইসলাম গরীব, এতীম, বৃদ্ধ, অক্ষম, উপার্জনহীন, রাগী এবং সব ধরনের অভাবী ও দরিদ্রের সাহায্যার্থে ব্যবহার করতে বলেছে। এটা এমন একটা সামাজিক বীমা, যার বর্তমানে ইসলামী সমাজে কোনো ব্যক্তি জীবন যাপনে অপরিহার্য সামগ্রী থেকে কখনো বঞ্চিত থাকতে পারেনা। কোনো শ্রমজীবী মানুষকে অভুক্ত থাকার ভয়ে কারখানা মালিক বা জমিদারের যেকোনো অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হতে হবেনা। আর উপার্জনের প্রতিযোগিতায় নামার জন্যে ন্যূনতম যে শক্তি সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য, কোনো ব্যক্তির অবস্থাই তার চেয়ে নীচে নেমে যাবেনা।
ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এমন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাতে ব্যক্রি ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে, আর সামাজিক স্বার্থের জন্যেও তার স্বাধীনতা কোন ক্ষতির কারণ না হয়; বরং অবশ্যি কল্যাণবহ হয়। ইসলাম এমন কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাঠামো সমর্থন করেনা, যা ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা ও স্বাধীনতাকে বিলীন করে দিয়ে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। কোনো দেশের সমুদয় উৎপাদনের উপকরণকে জাতীয়করণ করার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো, দেশের সবগুলো মানুষকে সামাজিক স্বার্থের কঠোর নিগড়ে আবদ্ধ করা। এমতাবস্থায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জন্যে যেমন রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা প্রয়োজন তেমনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বড় বেশী দরকার। আমরা যদি ব্যক্তিত্বের মূলোৎপাটন করতে না চাই, তাহলে আমাদের সামাজিক জীবনে প্রতিটি মানুষের জন্যে এ সযোগ অবশ্যি বর্তমান রাখতে হবে, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বাধীনভাবে নিজের জীবিকা উপার্জন করে নিজের মন মানসিকতার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারে এবং নিজের মানসিক ও নৈতিক তথা সমুদয় যোগ্যতাকে নিজের ঝোঁঁকপ্রবণতা অনুযায়ী বিকশিত করতে পারে। পরে মুষ্টিবদ্ধে রেশনের খাদ্য যতো প্রচুরই হোকনা কেন, তা মানুষের জন্যে তৃপ্তিদায়ক হতে পারেনা। কেননা, তাতে মনের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশে যে ক্ষতি হয়, কেবল মেদবহুল দেহ তা পূরণ করতে পারে না।
ইসলাম এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থাকে সমর্থন করেনা; অরুরূপভাবে এমন সমাজ ব্যবস্থাকেও ইসলাম সমর্থন করেনা, যা ব্যক্তিকে সামাজিক ও অর্থনৈাতিক ক্ষেত্রে লাগামহীন স্বাধীনতা প্রদান করে এবং নিজের অবাধ কামনা বাসনা ও স্বার্থের জন্যে সমাজকে যথেচ্ছ ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ করে দেয়। এ দুটি প্রান্তিক ব্যবস্থার মাঝখানে ইসলাম যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে তা হলো- প্রথমত, সমাজের স্বার্থে ব্যক্তির উপর কিছু দায় দায়িত্ব এবং সীমারেখা আরোপ করা হবে। অতঃপর তার নিজের কর্মক্ষেত্রে তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে। ইসলাম নির্দেশিত এ সীমারেখা এবং দায় দায়িত্বের বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই; এখানে কেবল একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র পেশ করা হচ্ছে।
প্রথমত জীবিকা উপার্জনের বিষয়টিই আলোচনা করা যাক। এক্ষেত্রে ইসলাম যতোটা ‍সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বৈধ অবৈধের পার্থক্য করেছে, বিশ্বের অন্য কোনো ব্যবস্থা তা করেনি। ইসলাম বেছে বেছে উপার্জনের সেই সকল উপায় ‍উপকরণ বা মাধ্যমকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যেগুলোর দ্বারা এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে বা সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজকে নৈতিক ও বস্তুগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে স্বীয় স্বার্থ হাসিল করার সুযোগ পায়। মদ এবং মাদকদ্রব্য তৈরী ও বিক্রয় করা, বেশ্যাবৃত্তি, গান বাজনা ও নৃত্যগীতের পেমা, জুয়া, প্রতিজ্ঞাপত্র [এক প্রকার জুয়া], লটারী, সুদ; অনমান, প্রতারণা এবং এমন ব্যবসা যাতে এক পক্ষের লাভ নিশ্চিত এবঙ অপর পক্ষের লাভ অনিশ্চিত; মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্যে মজুতদারী এবং অনুরূপ অন্যান্য কায়কারবার যা সমাজের জন্যে অনিষ্টকর, ইসলামী আইনে তা সবই দ্ব্যর্থহীনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বস্তুত ইসলামের অর্থনৈতিক আইনকানুন পর্যালোচনা করলে উপার্জনের অবৈধ পন্থাপদ্ধতির এক বিরাট তালিকা পাওয়া যাবে। এ তালিকার মধ্যে এমন পন্থাপদ্ধতিও আছে যেগুলো প্রয়োগ করে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ কোটিপতি হচ্ছে; কিন্তু ইসলাম এসব পন্থাপদ্ধতিকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ইসলাম কেবল সেইসব পন্থায়ই মানুষকে উপার্জনের স্বাধীনতা প্রদান করেছে, যেগুলোর মাধ্যমে সে অন্য লোকরেদ প্রকৃত ও কল্যাণকর কোনো সেবা করে সুবিচারের সাথে পারিশ্রমিক লাভ করতে পারে।
ইসলামী বৈধ উপায়ে উপার্জিত সম্পদের উপর ব্যক্তির স্বত্তাধিকার স্বীকার করে। কিন্তু এ অধিকারও নিয়ন্ত্রণহীন নয়। এক্ষেত্রে ইসলাম ব্যক্তিকে তার বৈধ উপার্জন বৈধ উপায়ে ও বৈধ পথে ব্যয় করতে বাধ্য করে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে ব্যক্তি সদাসিধে ও পূত-পবিত্র জীবনযাপন আবশ্যি করতে পারবে কিন্তু বিলাসিতার জন্যে অর্থ উড়াবার সুযোগ তার থাকবে না । জাঁকজমক প্রদর্শন করে এতোটা সীমাতিক্রম করারও সুযোগ পাবেনা, যার ফলে অন্যদের উপর তার প্রভুত্বের চাকা জেঁকে বসতে পারে। অপব্যয়ের অনেকগুলো খাতকে তো ইসলামী আইন সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। আর কোনো কোনো খাতকে যদিও সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু বাজে ও অন্যায় ব্যয় থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্যে নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা ইসলামী রাষ্ট্রকে দেয়া হয়েছে।
বৈধ ও ‍যুক্তিসংগত আয়-ব্যয়ের পর ব্যক্তির হাতে যে অর্থসম্পদ উদ্বৃত্ত থাকবে, তা সে সঞ্চয়ও করতে পারে এবং অধিক আয় উপার্জনের কাজে বিনিয়োগও করতে পারে। কিন্তু এ দুটি অধিকারের উপর কিছু বিধিনিশেষ আরোচ করা হয়েছে। সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে তাকে নিসাবের অতিরিক্ত সম্পদের জন্যে বার্ষিক শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত প্রদান করতে হবে; আর বিনিয়োগ করতে চাইলে কেবল বৈধ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। বৈধ বিনিয়োগ সরাসরি নিজেও করতে পারে; আবার ইচ্ছা করলে অপরকে নিজের পুঁজি টাকা, জমি, যন্ত্রপাতি এবং সাজসরঞ্জাম ইত্যাদি আকারে প্রদান করে লাভ লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসাও করতে পারে। এ উভয় পন্থায়ই বৈধ। এইসব সীমরারেখার মধ্যে অবস্থান করে কেউ যদি কোটিপতিও হয় তাতে ইসলামের দৃষ্টিতে আপত্তির কিছু নেই। বরঞ্চ এটা তার প্রতি আল্লাহর অনুগ্র বলে বিবেচিত হবে। তবে সমাজের স্বার্থে ইসলাম এরূপ ক্ষেত্রে দুটি শর্ত আরোপ করেছে; একটি হলো, উক্ত কোটিপতিকে তার ব্যবসার যাবতীয় সম্পদের যাকাত এবং কৃষি উৎপাদনের উশর প্রদান করতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, সে তার ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প কারখানা এবং ক্ষেত খামারে যেসব লোকের সাথে অংশীদারিত্বের কিংবা পারিশ্রমিকের ভিত্তি কর্মসম্পাদন করবে, তাদের সকলের সাথে আবশ্যি সুবিচারমূলক আচরণ করতে হবে। সে স্বয়ং যদি এ সুবিচার না করে, তবে ইসলামী রাষ্ট্র তাকে সুবিচারের জন্যে বাধ্য করবে।
এসব বৈধ সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করে ব্যক্তি যে সম্পদের মালিক হবে, ইসলাম তাও দীর্ঘদিন ধরে জমা করে রাখার অনুমতি দেয়নি; বরঞ্চ উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় তা বন্টন করে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এক্ষেত্রে ইসলামী আইনের লক্ষ্য বিশ্বের অন্য সকল আইনের চেয়ে ভিন্নতর। অন্যান্য আইন চেষ্টা করে একবার যে সম্পদ অর্জিত হয়েছে, তা যেনো পুরুষানুক্রমে চিরদিন বহাল থাকে। পক্ষান্তরে ইসলামী আইন অনুযায়ী ব্যক্তি সারাজীবনে যে সম্পদ সঞ্চয় করেছে, তার মৃত্যুর সাথে সাথে তা তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দিতে হয়। নিকটাত্মীয় না থাকলে অংশ অনুপাতে দূরের আত্মীয়রা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর দূরের কোনো আত্মীয়ও যদি না থাকে তাহলে গোটা মুসলিম সমাজ তার উত্তরাধিকার লাভ করবে। এই আইন বিরাট বিরাট সঞ্চিত পুঁজি এবং জমিদারীকে বেশীদিন টিকে থাকতে দেয়না। উল্লিখিত সকল বিধিনিষেধ সত্ত্বেও কারো সম্পদের আধিক্যের কারণে যদি সমাজে কোনো বিকৃতি সৃষ্টি হয়ও, তবে এই শেষ আঘাতই তা নির্মূল করে দেবে।


প্রথম খণ্ডঃ ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন

এ খণ্ডে আছে
১ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার ইসলামী সমাধান
২ কুরআনের অর্থনৈতিক নির্দেশনা
৩ ইসলামী অর্থ্যব্যবস্থা ও পুঁজিবাদের মধ্যে পার্থক্য
৪ ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি ও লক্ষ্য
৫ কুরআনের আলোকে অর্থনৈতিক জীবনের কতিপয় মৌলিক নীতিমালা

প্রথম অধ্যায়ঃ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধান

[গ্রন্থকার এ নিবন্ধটি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমিতির’ আমন্ত্রণে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেজী হলে ১৯৪১ সালের ৩০ অক্টোবর তারিখে পাঠ করেন।]
আধুনিককালে দেশ ও জাতি এবং সামষ্টিকভাবে গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সম্ভবত এর আগে এতোটা স্পষ্টভাবে এর উপর এতো অধিক গুরুত্ব আর কখনো দেয়া হয়নি। “স্পষ্টভাবে” শব্দটি এজন্যে ব্যবহার করেছি যে, আসলে মানুষের জীবনে তার জীবিকা যে পর্যায়ের গুরুত্ব পাওয়া দাবি রাখে, প্রতিটি যুগেই ব্যক্তি, সমাজ, জাতি, দেশ এবং সমগ্র মানুষ এর প্রতি সে অনুযায়ী গুরুত্ব আরোপ করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানকালে অর্থনৈতিক সমস্যার উপর যে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা অতীতের সকল গুরুত্বকে ছাড়িয়ে গেছে। যে জিনিস এ গুরুত্বকে ‘স্পষ্টতা’ ও ‘স্বাতন্ত্র্য’ দান করেছে, তা হলো, আজকাল অর্থনীতি রীতিমতো একটি বিরাট শাস্ত্র হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। এর উপর বড় বড় গ্রন্থ রচিত হয়েছে। চকপ্রদ অসংখ্য পরিভাষিা সৃষ্টি হয়েছে; অর্থনীতির বিকাশ ও সম্প্রসারণের জন্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অগণিত জাঁকজমকপূর্ণ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। আবার এর সাথে সাথে মানব জীবনের অপরিহার্য সামগ্রীর উৎপাদন, সংগ্রহ, সরবরাহ ও উপার্জনের পন্থাপদ্ধতিও হয়ে উঠেছে জটিল থেকে জটিলতর। এসব কারণে আজ বিশ্বে অর্থনৈতিক সমস্যার উপর যে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ চলছে, তার তুলনায় মানব জীবনের অন্যান্য সকল সমস্যা যেন ম্লান হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার য, যে বিষয়ের প্রতিগোটা বিশ্বের দৃষ্টি এভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তার সহজ সুষ্ঠু সমাধান হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন যেন আরো অধিক জটিল ও ধূম্রজালে পরিণত হচ্ছে। অর্থনীতি-বিজ্ঞঅনের জটিল জটিল পরিভাষা আর অর্থনীতিবিদদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ, গবেষণাপ্রসূত কথাবার্তা এ বিষয়ে জনগণকে রীতিমতো শংকিত ও আতংকিত করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ এসব পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ও বিতর্ক শুনে নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যার ভয়াবহতায় ভীত এবং তা সমাধানের সম্ভাবনা সম্পর্কে চরমভাবে নিরাশ হয়ে পড়েছে। কোন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসকের মুখে তার রোগের জটিল ল্যাটিন নাম শুনে যেনন ভীত বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং তার রোগমুক্তি সম্পর্কে নিরাশ হয়ে যায়, অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্পর্কে একালের মানুষের অবসথাও ঠিক তাই হয়েছে।
অথচ অর্থনীতির এসব পরিভাষা ও শাস্ত্রীয় বিতর্কের ধূম্রজাল অপসারণে করে বিষয়টিকে সাদাসিধে ও স্বাভাবিকভাবে দেখলে অর্থনৈতিক সমস্যার প্রকৃত রূপ সহজেই উপলব্ধি করা যায় এবং এ সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্বে আজ পর্যন্ত যেসব উপায় পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর সার্থকতা ও ব্যর্থতার দিকও অনায়াসেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাছাড়া এ সমস্যা সমাধানের সঠিক ও স্বাভাবিক পদ্ধতি কোনটি তা বুঝতেও তেমন কষ্ট হয় না।

খণ্ডিত বিষয়পূজার বিপর্যয়

পূর্বেই বলেছি যে, পরিভাষা এবং শাস্ত্রীয় জটিলতার ভোজবাজি অর্থনৈতিক সমস্যাকে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দূরূহ করে তুলেছে। এ সমস্যা আরো অধিক জটিল হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক সমস্যাকে মানব জীবনের অন্যান্য সমস্যা থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখার ফলে। বস্তুত মানব জীবনের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে অর্থনৈতিক সমস্যা হচ্ছে একটি। কিন্তু সামগ্রি জীবন থেকে অর্থনৈতিক সমস্যাকে পৃথক করে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সমস্যা হিসেবে দাঁড় করানো হযেছে। ধীরে ধীরে এর স্বাতন্ত্র্য এমন পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে যে, অর্থনৈতিক সমস্যাকেই মানব জীবনের একমাত্র সমস্যা মনে করা হচ্ছে। প্রথমোক্ত ভুল থেকে এটি অনেক বড় ভ্রান্তি। এর কারণেই এ সমস্যাট গাঁট খোলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো সহজে বোধগম্য হতে পারে। কোনো হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ যদি মানবদেহের সামগ্রিক কাঠামো থেকে হৃদপিন্ডকে আলাদা করে দেখতে শুরু করে এবং সেই কাঠামোর মধ্যে হৃদপিণ্ডের যে গুরুত্ব তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হৃদপিণ্ডকে নেহায়েত হৃদপিন্ড হিসেবে বিচার করে এবঙ শেষ পর্যন্ত যদি সে হৃদপিণ্ডকেই গোটা মানব দেহ বলে বিবেচনা করতে থাকে তাহলে কিরূপ মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হবে তা সহজেই অনুমেয়। এবার ভেবে দেখুন, মানব স্বাস্থ্যের গোটা সমস্যাকে যদি হৃৎপিণ্ডের চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ্য করার চেষ্টা করা হয়, তবে এ সমস্যা করোটা জটিল ও সমাধান অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং বেচারা রোগীর জীবনই বা কতোট বিপদসংকুল হয়ে পড়ে। এ দৃষ্টান্ত সামনে রেখে ভেবে দেখুন, যদি অর্থনৈতিক সমস্যাকে মানুষের অন্যসব সমস্যা থেকে বের করে এনে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দেখা হয়, অতঃপর একে মানুষের একমাত্র সমস্যা বলে ধরা হয় এবং কেবল এর মাধ্যমেই জীবনের অন্যসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তাহলে এ থেকে বিভ্রান্তি আর হতাশা ছাড়া মানুষ আর কি পেতে পারে!
আধুনিক কালের অন্যান্য অনিষ্টের মধ্যে বিশেষজ্ঞ (Specialists) তৈরীর অনিষ্ট একটি বড় অনিষ্ট। এর ফলে জীবন এবং এর সমস্যাবলীর উপর সামগ্রিক দৃষ্টি দিন দিন ক্ষীন থেকে ক্ষীণতার হয়ে পড়ছে। মানুষ এখন জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি-বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি গোটা জগতের জটিলতা ও সমস্যাবলী কেবল প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মাধ্যমেই সমাধান করতে চায়; যার মগজে মনোবিজ্ঞান চেপে বসেছে, সে শুধু মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই একটি পূর্ণ জীবনদর্শন রচনার প্রয়াস পায়; যার দৃষ্টি যৌনতত্ত্বের গিড়ে আবদ্ধ হয়েছে, সে মনে করে গোটা মানব জীবন কেবল যৌনতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। এমনকি, মানুষের মধ্যে আল্লাহ্‌র সম্পর্কে বিশ্বাসও নাকি এ পথেই সৃষ্টি হয়েছে। অনুরূপভাবে যারা অর্থনীতি শাস্ত্রের গহীনে নিমগ্ন হয়েছে তারা মানুষের মনে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করতে চায় যে, জীবনের আসল ও মূল সমস্যা হলো অর্থনৈতিক সমস্যা; অন্যসব সমস্যা এ মূল সমস্যারই শাখা প্রশাখা মাত্র। অথচ, সত্য কথা হলো এসব সমস্যা হলো একটি পূর্ণাংগ এককের বিভিন্ন অংশ মাত্র। সেই পূর্ণাংগ এককের মধ্যে এসব সমস্যার প্রত্যেকটিরই একটি নির্দিষ্ট অবস্থান রয়েছে। আর সেই অবস্থানের ভিত্তিতেই প্রতিটি সমস্যারই নির্দিষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। মানুষ একটি দেহের অধিকারী। আর এ দেহটি চলছে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে। এ হিসেবে মানুষ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়, কিন্তু মানুষ কেবল দেগ মাত্রই নয়; তাই শুধু প্রাকৃতিক বিজ্ঞান দ্বারা মানুষের সকল সমস্যার সমাধান করা যেতে পারেনা। মানুষ একটি প্রাণবিশিষ্ট সত্তা। তাই সে জৈবিক নিয়মের অধীন। এদিক থেকে মানুষ জীববিজ্ঞানের (Bioloigy) বিষয়বস্তু। কিন্তু মানুষ কেবল একটি জীবই নয়। সুতরাং কেবল জীববিজ্ঞঅন বা প্রাণীবিজ্ঞান (Zoology) থেকে মানব জীবনের পূর্ণাংগ আইনবিধান গ্রহণ করা যেতে পারেনা। বেঁচে থাকার জন্যে মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রয়োজন। এ হিসেবে অর্থনীতি মানব জীবনের একটি বড় অংশকে পরিবেষ্টন করে আছে। কিন্তু মানুষ কেবল পানাহার গ্রহণকারী, পোশাক পরিধানকারী এবং বাসস্থান নির্মাণকারী পশু নয়। তাই শুধুমাত্র অর্থনীতির উপর মানব জীবনদর্শনের ভিত রচনা করা যায় না। মানুষকে তার জাতি রক্ষার জন্যে বংশবৃদ্ধি করতে হয়। তাই তার মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড যৌন প্রবৃত্তি। এ হিসেবে মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাথে যৌন বিজ্ঞানে সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তাই বলে গোটা মানুষটি কেবল একটি বংশবৃদ্ধির যন্ত্র নয়; তাই শুধুমাত্র যৌন বিষয়ক চশমা দিয়ে তাকে দেখা সংগত হতে পারেনা। মানুষের একটি মন আছে। এতে অনুভূতি ও চেতনা শক্তি এবং আবেগ, আকাংখা ও লোভলালসা বর্তমান। এ হিসেবে মনোবিজ্ঞান মানুষের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু মানুষের আপাদমর্তক কেবল মন আর মন নয়। তাই শুধু মনোবিজ্ঞান দিয়ে তার জীবনের স্কীম তৈরী করা যেতে পারেনা। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, তার প্রকৃতিই তাকে অন্য মানুষের সাথে মিলে মিশে জীবন যাপন করতে বাধ্য করে। এ হিসেবে মানব জীবনের একটি বড় অংশ সমাজ বিজ্ঞানের সাথে জড়িত। কিন্তু মানুষ নিছক একটি সামাজিক জীব মাত্রই নয়। তাই কেবল সমাজ বিজ্ঞানীরা তার জীবন ব্যবস্থা রচনা করতে পারেনা। মানুষ একটি বুদ্ধিমান জীব। তার মধ্যে অনুভূতির উর্ধ্বে বিবেক বুদ্ধির দাবীও রয়েছে। সে বিবেক বুদ্ধিগত প্রশান্তিও চায়। এ হিসেবে যুক্তিবিদ্যা তার একটি বিশেষ দাবী পূরণ করে। কিন্তু মানুষের গোটা সত্তা কেবল বুদ্ধিবিবেক নয়। তাই কেবল তর্কশাস্ত্র দিয়ে তার জীবরে কর্মসূচী তৈরী করা যেতে পারেনা। মানুষ একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সত্তাও বটে। তাই অনুভূতি ও যুক্তির উর্ধ্বে ভালমন্দ ও ন্যায় অন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যে ‍উপনীত হওয়ার আকাংখা তার মধ্যে বর্তমান। এ হিসেবে মানব জীবনের একটি অংশ জুড়ে রয়েছে নীতিবিজ্ঞান ও অধ্যাত্মতত্ত্ব। কিন্তু মানুষ কেবল নীতিবোধ ও আধ্যাত্মিকতা সর্বস্ব জীন নয়। তাই শুধুমাত্র নীতিবিজ্ঞান ও অধ্যাত্মবিদ্যা দিয়ে তার জীবন ব্যবস্থা রচিত হতে পারেনা।
প্রকৃত ব্যাপার হলো, মানুষ একই সাথে এ সবগুলো বিষয়ের সমন্বয়। এ সবগুলো বিষয় তার মধ্যে যথাস্থানে বর্তমান রয়েছে; এছাড়া মানব জীবনের আরা একটি বড় দিক রয়েছে; তা হলো গোটা বিশ্ব জগতের সামগ্রিক ব্যবস্থার সে একটি অংশও। তাই তার জীবন ব্যবস্থা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, গোটা জগতের সামগ্রিক ব্যবস্থায় তার অবস্থান কোথঅয় এবং এর একটি অংশ হিসেবে তার কি ধরনের কাজ করা উচিত? তাছাড়া নিজ উদ্দেশ্য লক্ষ্য নির্ণয় করাও তার জন্যে অপরিহার্য। আর সে হিসেবে কি কাজ তার করা উচিত, সে সিদ্ধান্তও তাকে গ্রহণ করতে হবে। শেষোক্ত দুটি প্রশ্ন মানব জীবরে মৌলিক প্রশ্ন। এগুলোর ভিত্তিতেই রচিত হয় জীবনদর্শন। অতপর মানব জীবরে সাথে সম্পর্কিত বিশ্বের সকল জ্ঞান বিজ্ঞান সেই জীবনদর্শনের অধীনেরই নিজ নিজ পরিসরভুক্ত তথ্য ও জ্ঞান আহরণ করে এবং কমবেশী এ সবগুলোর সমন্বয়েই রচিত হয় মানব জীবরে কর্মসূচী। অতপর এর ভিত্তিতেই পরিচালিত হয় মানব জীবনের গোটা কাঠামো।
আপনি যদি আপনার জীবরে কোনো একটি সমস্যাকে বুঝতে চান, তবে দূরবীন লাগিয়ে কেবল সে সমস্যার মধ্যে নিজের দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যে কোনো সঠিক পন্থায়ন সে কথাটাই এতোক্ষণে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে। এতে আরো স্পষ্ট হয়েছে যে, সমস্যাটির সাথে জড়িত জীবনের সেই নির্দিষ্ট বিভাগের প্রতি অন্ধ প্রবণতা নিয়ে গোটা জীবনসমস্যার উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করাও সঠিক কাজ নয়; বরং সে নির্দিষ্ট সমস্যাটিকে জীবনসমস্যার সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে তার অবস্থানের প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করার মাধ্যমেই তার সঠিক সমাধান উপলব্ধি করা যেতে পারে। বস্তুত বিচার বিশ্লেষণের এটাই নির্ভুল পন্থা। একইভাবে আপনি যদি জীবনের ভারসাম্যের সমধ্যে কোনো বিকৃতি দেখতে পান এবং তা শোধরাতে চান, তবে স বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, কোনো একটি সমস্যাকে সমগ্র জীবনসমস্যা ধরে নিয়ে একে কেন্দ্র করে জীবনের গোটা কারখানাকে ঘুরাতে থাকলে যে বিপদ সৃষ্টি হতে তার চেয়ে বড় বিপদ আর কিছু হতে পারেনা। এরূপ পদক্ষেপের মাধ্যমে তো আপনি গোটা ভারসাম্যকে বিনষ্টই করে দেবেন। সংশোধনের সঠিক পন্থা হলো, আপনাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভংগি নিয়ে পূর্ণাং জীবন কাঠামোকে এর মৌলিক দর্শনসহ প্রাসংগিক বিষয়াদি পর্যন্ত সবকিছু দৃষ্টিতে আনতে হবে এবং বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে কোথায় বিকৃতি সৃষ্টি হয়েছে আর তার ধরনই বা কি?
মানুষের অর্থনৈকিত সমস্যা বুঝা এবং যথার্থভাবে তা সমাধানের ক্ষেত্রে যে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে তার বড় কারণ হলো, কিছু লোক সমস্যাটিকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দেখছে। আবার কিছু লোক এর গুরুত্বের প্রতি এতোটা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে যে, তারা এটাকেই মানব জীবনের একমাত্র সমস্যা বলে ধরে নিয়েছে। আবার অন্য কিছু লোকের বাড়াবাড়ি চরম সীমায় উপনীতি হয়েছে। তারা জীবনের মূল দর্শন, নৈতিকতা ও সমাজের গোটা কাঠামোকে অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ অর্থনীতিকে যদি মানব জীবনের মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ অর্থনীতিকে যদি মানব জীবনের মূলভিত্তি মনে করা হয়, তাহলে তো মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য আর একটি গরুর জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকেনা। একটি গরু এর চূড়ান্ত চেষ্টা সাধনা নিয়োজিত করে সবুজ শ্যামল ঘাস খেয়ে সুখী শক্তিমান জীবন এবং জগতের চারণভূমিতে স্বাধীন পশুর মর্যাদা লাভ করার জন্যে। মানুষও যদি কেবল অর্থনীতি সর্বস্ব হয়ে পড়ে তাহলে এই পশুটির সাথে তার আর কোনো পার্থক্য থাকেনা।
অনুরূপভাবে নীতিবিদ্যা, অধ্যাত্মবিদ্যা, তর্কশাস্ত্র, সমাজ বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং অন্যান্য সব বিষয় ও শাস্ত্রের মাঝে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণকে প্রভাবশালী করার দ্বারা সাংঘাতিক বিপর্যয় ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে বাধ্য। কারণ, মানব জীবনের এসকল বিভাগের ভিত্তি তো অর্থনীতি নয়। সবকিছুকে যদি অর্থনীতির ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হয়, সেক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিকতা প্রবৃত্তিপূজা ও বস্তুপূজায় রূপান্তরিক হবে, যুক্তিবিদ্যা অন্যবিদ্যায়, সমাজ বিজ্ঞানের সমগ্র স্তর সামাজিক তত্ত্ব ও তথ্য বিচারেরর পরিবর্তে ব্যবসায়িক কার্যধারায় এবং মনোবিজ্ঞঅন মানসিকতা অধ্যয়নের পরিবর্তে মানুষকে নিছক অর্থনৈতিক জীব হিসাবে বিশ্লেষণ করার শাস্ত্রে রূপান্তরিত হতে বাধ্য। এমতাবস্থায় মানবতার প্রতি এর চেয়ে বড় অবিচার আর হতে পারেনা।

অর্থনৈতিক সমস্যা আসলে কি?

আমরা যদি পরিভাষাগত এবং শাস্ত্রীয় জটিলতার ধূম্রজালকে একপাশে রেখে একেবারে সহজ, সরল ও সাধারণভাবে দেখি তাহলে সহজেই মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যর প্রকৃত রূপ বুঝতে পারি। সমাজের বিবর্তন ও ক্রমোন্নতির ধারা অব্যাহত রেখে কিভাবে সকল মানুষের অপরিহার্য জীবন সামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায়; কিভাবে সমাজের প্রতিটি মানুষকে তর সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী উন্নত করা যায় এবং কিভাবে তার ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে যোগ্যতার চরম শিখরে পৌছার সযোগ করে দেয়া যায়, আসলে তা-ই হলো মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার মূলকথা।
সুপ্রাচীন কালে মানুষের জীবিকার বিষয়টি ছিলো পশুপাখির জীবিকার মতোই সহজ ও জটিলমুক্ত। আল্লাহর এই যমীনের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সীমাসংখ্যাহীণ জীবন সামগ্রী। প্রতিটি সৃষ্টির জন্যে যা প্রয়েঅজন তার তুলনায় জীবিকার সরবরাহ ছিল অঢেল ও অগাধ। প্রত্যেকেই স্বীয় জীবিকার অন্বেষণে বের হতো আর পৃথিবীর ভাণ্ডার থেকে তা সংগ্রহ করে নিত। এজন্যে কাউকেও মূল্য পরিশোধ করতে হতো না। এক সৃষ্টির জীবিকার অপর সৃষ্টির নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধও ছিল না। প্রাচীনতম কালে মানুষের অবস্থাও প্রায় এরকমই ছিলো। সে সময়ে মানুষবেরিয়ে পড়তো আর প্রকৃতির ভাণ্ডার থেকে সংগ্রহ করে নিতে নিজের প্রয়োজনীয় জীবিকা। এসব রুজি ছিল ফল পাকড়া এবং শিকার করা পশুপাখি। সে সময়ে মানুষ প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে ঢেকে নিতো নিজেদের শরীর। পৃথিবীর বুকে যেখানেই সুযোগ দেখতো, সেখানেই মাথা গোঁজার জন্যে জায়গা বানিয়ে নিতো।
কিন্তু এ অবস্থায় দীর্ঘকাল থাকার জন্যে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেননি। আল্লাহ মানুষের মধ্যে এমন সৃজনশীল প্রতিভা ও আকাংখা অন্তর্নিহিত করে দিয়ে্যেছন যার ফলে মানুষ ব্যষ্টিক ও স্বতন্ত্র জীবন যাপন রীতি পরিত্যাগ করে সমাজবদ্ধ জীবন যাপনের প্রক্রিয়া অবলম্বন এবং নিজের কর্মকৌশলের মাধ্যমে প্রাকৃতির সরবরাহকৃত উপকরণ ব্যবহার করে নিজেদের জীবন উপকরণকে আরো উন্নত করার প্রয়াস পেয়েছে। নারীপুরুষের মাঝে স্থায়ী সম্পর্কের প্রকৃতিগত আকাংখা, মানবশিশুর দীর্ঘ সময় ধরে মা বাবার প্রতিপালনের মুখাপেক্ষী হওয়অ, নিজ সন্তান-সন্ততি ও বংশের প্রতি মানুষে গভীর আকর্ষণ এবং রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়দের প্রতি মহব্বত ভালবাসা এসব প্রবণতা মানব প্রকৃতিতে এমনভাবে নিহিত রাখা হযেছে যাতে মানুষ সমাবদ্ধ জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। একইরূপে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত উপকরণে তুষ্ট না হয়ে কৃষিকাজর মাধ্যমে নিজের খাদ্য উৎপাদন, পত্রপল্লব দিয়ে দেহ আবৃত করার পরিবর্তে নিজের জন্যে শিল্পসম্মত পোশাক তৈরী, গুহায় থাকার উপর সন্তুষ্ট না থেকে ঘরবাড়ী বানানো এবং নিজের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে দৈহিক যন্ত্রপাতির উপর তুষ্ট না হয়ে লোহা পাথর, কাঠ, ইত্যাদির সাহায্যে যন্ত্রপাতি নির্মাণ করা ইত্যাদি সবই প্রকৃতি মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত করে দিয়েছে। এরই অপরিহার্য ফল স্বরূপ মানুষ ধীরে ধীরে সমাজবদ্ধ হয়েছে। এটা মানুষের কোনো অপরাধ নয়; বরঞ্চ এই ছিলো মানব প্রকৃতির দাবি এবং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।
সামাজিক জীবনে প্রবেশের সাথে সাথে মানুষের জন্যে কিছু বিষয় অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। সে বিষয়গুলো হচ্ছেঃ
এক
ধীরে ধীরে মানুষের জীবনোপকরণের চাহিদা বেড়ে গেল। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের যাবতীয় চাহিদা নিজেই পূরণ করতে অসমর্থ হয়ে পড়লো। ফলে একজনের কিছু চাহিদা অন্যদের সাথে এবং অন্যদের কিছু চাহিদা তার সাথে সম্পর্কিত হলো এবং মানুষ পরস্পরের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে পড়লো।
দুই
জীবন যাপনের অপরিহার্য সামগ্রীর বিনিময় (Exchange) রীতি চালু করা অবশ্য হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বিনিময়ের একটি মাধ্যম (Medium of Exchange) নির্দিষ্ট হলো
তিন
প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী তৈরী করার জন্যে যন্ত্রপাতির আবিষ্কার ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হলো এবং চিন্তা গবেষণার মাধ্যমে মানুষ নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার এবং তা থেকে উপকৃত হতে লাগলো।
চার
এসববের সাথে সাথে মানুষ এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে চাইলো যে, নিজর শ্রমের মাধ্যমে সে যেসব জিনিস লাভ করেছে, যেসব যন্ত্রপতি দিয়ে সে কাজ করছে, যে জমিতে সে ঘর বানিয়েছে এবং যেখানে সে নিজের পেশাগত কাজ করছে, সেসবকিছুই যেনো তার অধিাকারে থাকে এবং তার মৃত্যুর পর ঐসব লোকেরাই যেনো এসবের স্বত্বাধিকারী হয়, যারা অন্যদের তুলনায় তার অধিকতর নিকটবর্তী।
এভাবে বিভিন্ন পেশার জন্ম হয়, ক্রয়বিক্রয় ও দ্রব্যসামগ্রীর ‍মূল্য নির্ধারণ রীতি চালূ হয়, মূল্য নিরূপণের মানদন্ড হিসেবে মুদ্রার প্রচলন হয়, আন্তর্জাতিক আদান প্রদান এবং আমদানী রপ্তানীর সুযোগ সৃষ্টি হয়, নতুন নতুন উৎপাদন উপকরণ ( Means of Production) আবিষ্কৃত হয় এবং স্বত্বাধিকার ও উত্তরাধিকার রীতি চালূ হয়। এসবই ছিলো স্বাভাবিক এবং প্রকৃতির দাবী এবং এগুলোর মধ্যে কোনটিই গুনাহ্‌র কাজ ছিলনা যে, এখন তার জন্যে তওবা করতে হবে।
এছাড়া মানব সমাজের ক্রমবিকাশের সাথে সাথে নিম্নোক্ত জিনিসগুলোও অপরিহার্য হয়ে পড়েঃ
[১] মানুষের শক্তি সামর্থ এবং যোগ্যতা প্রতিভার ক্ষেত্রে স্বয়ং আল্লাহ যে পার্থক্য রেখে দিয়েছেন, তর ফলশ্রুতিতে কিছু মানুষ তার প্রকৃত চাহিদার চেয়ে অধিক উপার্জনে সক্ষম হওয়া কিছু লোক চাহিদা মেটানোর মতো উপার্জন করা এবং আর কিছু লোক নিজেদের চাহিদা পূরণ করার মতো উপার্জন করতে না পারা স্বাভাবিক ছিল।
[২] উত্তরাধিকারের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পত্তির কারণে কিছু লোকের জীবনের সূচনাই অগাধ উপায় উপকরণের মধ্যে হওয়া, কিছু লোক স্বল্প উপায় উপকরণ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এবং আর কিছু লোক সহায় সম্বলহীন অবস্থায় নিঃসম্বল হয়ে জীবন যুদ্ধে নামাও অপরিহার্য ছিল।
[৩] প্রাকৃতিক কার্যকারণেই প্রতিটি জনবসতিতে এমন কিছু লোকও বর্তমান থাকা স্বাভাবিক ছিল যারা জীবিকা উপার্জনের কাজে অংশগ্রহণে অযোগ্য এবং বিনিময়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জীবনসামগ্রী সংগ্রহ করতেও অক্ষম। যেমন শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, অক্ষম প্রভৃতি।
[৪] এছাড়া প্রত্যেক সমাজে এমন কিছু লোক থাকা স্বাভাবিক ছিল যারা সেবা গ্রহণ করবে, আর কিছু লোক থাকবে যারা সেবা প্রদান করবে। এভাবেই সৃষ্টি হবে স্বাধীন শিল্প কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য এবং কৃষিকার্য; চালূ হবে অপরের চাকুরী করা এবং শ্রম বিনিময়ের প্রথা।
মানব সমাজে এসবই ঘটেছে স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক কার্যকারণে। এসব অবস্থা সংগঠিত হবার করণে এমন কোনো অন্যায় বা অপরাধ হয়নি যে, এখন সেগুলোকে উচ্ছেদের চিন্তা করতে হবে। সামাজিক বিপর্যয় ও বিকৃতির অন্যন্য কারণ থেকে যেসব অনিষ্ট সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়ে বহুলোক ঘাবড়ে যায়। ফলে কখনো ব্যক্তি মালিকানাকে, কখনো অর্থকড়িকে, কখনো যন্ত্রপাতিকে, কখনো মানুষের মধ্যে বিরাজমান স্বাভাবিক অসাম্যকে এবং কখনোবা সমাজকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু আসলে এটা ভ্রান্ত মূল্যায়ন এবং রোগ ও ওষুধ নিরূপণের ভ্রান্তি ছাড়া কিছু নয়। মানব প্রকৃতির দাবী অনুসারে যে সামাজিক বিবর্তন ঘটে এবং তার ফলে সমাজ কাঠামো যে রূপ পরিগ্রহ করে, তা প্রতিহত করার চেষ্টা করা অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। এরূপ চেষ্টায় সাফল্যের তুলনায় ধ্বংস ও অনিষ্টের আশংকাই অধিক। কিভাবে সামাজিক উন্নয়ন প্রতিহত করা যায়, কিংবা কিভাবে স্বাভাবিক রূপ কাঠামোকে পাল্টানো যায়- মানুষের আসল অর্থনৈতিক সমস্যা এটা নয়। বরঞ্চ তার আসল অর্থনৈতিক সমস্যা হলো, সমাজের স্বাভাবিক ক্রমবিকাশের ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে সামাজিক যুল্‌ম অবিচার কিভাবে প্রতিহত করা যায়। ‘প্রতিটি সৃষ্টি তার জীবিকা লাভ করুক’ –প্রকৃতির এই উদ্দেশ্য কিভাবে পূর্ণ করা যায় এবং কিভাবেই বা সেইসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা যায়, যেগুলোর কারণে কেবল উপায় উপকরণ নেই বলে অসংখ্য মানুষের শক্তি সামর্থ্য ও যোগ্যতার প্রতিভা বিনষ্ট হয়ে যায়; মূলত এগুলো হচ্ছে মানুষের সত্যিকার অর্থনৈতিক সমস্যা।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আসল কারণ

এবার আমরা দেখবো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকৃতি ও বিপর্যয়ের সত্যিকার কারণ কি আর এই বিকৃতি ও বিপর্যয়ের ধরনই বা কি?
মূলত, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিকৃত ও বিপর্যয়ের সূচনা হয় স্বার্থপরতার ক্ষেত্রে বেপরোয়া সীমালংঘন থেকে। অতপর অন্যান্য নৈতিক অসাধুতা এবং ভ্রান্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাহায্যে এ বিকৃতি-বিপর্যয় আরো বৃদ্ধি এবং প্রসার লাভ করে। এমনকি, তা গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিয়ে জীবনের অন্যান্য বিভাগেও তার বিষাক্ত ছোবল সম্প্রসারিত করে থাকে। আমি একটু আগেই বলেছি, ব্যক্তিমালিকানা এবং কিছু লোকের তুলনায় অপর কিছু লোকের আর্থিক অবস্থা ভালো হওযা মূলত প্রকৃতিরই দাবী এবং অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা মূলত কোনো প্রকার অনিষ্টের কারণ নয়। মানুষের সকল নৈতিক গুণবৈশিষ্ট্য যদি সুসামাঞ্জস্যের সাথে কাজ করার সুযোগ পায় আর বাইরেও যদি ইনসাফ ও সুবিচার ভিত্তিক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে এ দুটি জিনিস থেকে কোনো প্রকার অনিষ্ট সৃষ্টি হতে পারেনা। কিন্তু স্বাভাবিক কারণে যাদের আর্থিক অবস্থা ভাল তাদের স্বার্থপরতা, সংকীর্ণ ‍দৃষ্টিভংগি, অনিষ্ট চিন্তা, কার্পণ্য, লোভ লালসা, দুর্নীতি এবং প্রবৃত্তিপূজার ফলে এগুলোকে অনিষ্ট সৃষ্টির কারণ বানিয়ে দিয়েছে। শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিয়ে বুঝিয়েছে যে, প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে অধিক যেসব অর্থসামগ্রী তোমাদের হাতে আসে এবং যেগুলো তোমাদের মালিকানাবুক্ত হয়, সেগুলো ব্যয়-বিনিয়োগের সঠিক এবং যুক্তিসংগত খাত হলো দুটিঃ এক, সেগুলো নিজের আরাম আয়েশ, বিলাসিতা, আনন্দ স্ফুর্তি এবং সুখ স্বাচ্ছন্দের কাজে ব্যয় করবে। আর দ্বিতীয় হলো, আরো অধিক অর্থসামগ্রীর উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজে সেগুলোকে বিনয়োগ করবে এবং সম্ভব হলে এগুলোর মাধ্যমে মানুষের প্রভু এবং অন্নদা হয়ে বসেব।

প্রবৃত্তিপূজা এবং বিলাসিতা

শয়তান এ পয়লা শিক্ষার পরিণতি এই দাঁড়ালো যে, সম্পদশালীরা সমাজের সেসব লোকের অধিকার মেনে নিতে অস্বীকার করলো যারা বঞ্চিত কিংবা যারা প্রয়োজনের তুলনায় কম সম্পদ লাভ করেছে। তারা এ লোকগুলোকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুরবস্থায় নিক্ষেপ করতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করলো না। নিজেদের সংকীর্ণ দৃষ্টির কারণে তারা একথা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলো যে, তাদের আচরণের ফলে সমাজের বহু মানুষ অপরাধের কাজে লিপ্ত হতে পারে, অনেকে নৈতিক অধঃপতনের গহ্বরে নিমজ্জিত হতে পারে এবং শারীরিক দুর্বলতা ও রোগব্যধির শিকার হতে পারে। ফলে তারা তাদের মানসিক ও শারীরিক শক্তি ও যোগ্যতা প্রতিভা বিকশিত করা এবং সমাজ সভ্যতার উন্নতিতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হয়ে পড়বে। এতে সামষ্টিকভাবে সেই সমাজটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে ধনীগণ নিজেরাও যার অংশ। সমাজের বিত্তশালী সদস্যরা এতোটুকু করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ এরা নিজেদের প্রকৃত প্রয়োজনের উপর আরো অসংখ্য প্রয়োজনকে সংযোজন করে নিয়েছে। আর নিজেদের দুষ্ট প্রবৃত্তির মনগড়া এসব উদগ্র কামনা বাসনা পূরণের জন্যে তারা এমন অসংখ্য মানুষকে নিয়োজিক করেছে যাদের যোগ্যতা প্রতিভা সমাজ সভ্যতার কল্যাণময় সেবায় ব্যবহৃত হতে পারতো। জ্বিনা ব্যভিচারকে তারা নিজেদের জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয় কাজ বানিয়ে নিয়েছে। আর এ লালসা চরিতার্থ করার জন্র তারা অসংখ্য নারীকে দেহব্যবসা ও রূপ-যৌবনের বিপণি সাজাতে বাধ্য করলো। গানবাজনাকে তারা তাদের অপরিহার্য প্রয়োজনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিল। এজন্যে তৈরী করা হলো গায়ক গায়িকা, নর্তকী এবং বাদকদের দল; বহু লোককে নিয়োগ করা হলো বাদ্যযন্ত্র তৈরীর কাজে। তাদের আনন্দস্ফুর্তি ও চিত্ত বিনোদনের জন্য নানা ধরনের ভাঁড়, রসিক, অভিনেতা অভিনত্রী, গাল্পিক, অংকনশিল্পী, চিত্রশিল্পী এবং অন্যান্য অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় পেশা ও পেশাদারের জন্ম হলো। এসব ধরশালীদের বিলাস চরিতার্থ করার জন্যে অগণিত লোককে ভালো কল্যঅণময় কাজের পরিবর্তে বনের পশুপাখি তাড়িয়ে ফেরার কাজে নিযুক্ত করা হয়। তাদের আনন্দস্ফুর্তি ও নেশার প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে অসংখ্য মানব সন্তানকে নিয়োগ করা হয় মদ, কোকেন, আফিম এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য তৈরী ও সরবরাহের কাজে। মোটকথা, এভাবে শয়তানের এসব সাথীরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ‍ও নির্দয়ভাবে সমাজের একটি বিরাট অংশকে শুধুমাত্র নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং দৈহিক ধ্বংসের গহ্বরে নিমজ্জিত করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ আরো অগ্রসর হয়ে সমাজের আরেকটি বড় অংশকে সঠিক ও কল্যাণময় কাজ থেকে তাড়িয়ে নিয়ে অর্থহীন, অপমানকর ও ক্ষতিকর কাজে নিযুক্ত করেছিল। সমাজের গতিকে এর সঠিক ও ন্যায়সংগক পথ থেকে বিচ্যুত করে এমন পথে পরিচালিত করলো, যা মানবতাকে নিয়ে যায় ধ্বংসের অতল গহ্বরে। সম্পদশালীদের যুল্‌ম, অবিচার ও ধ্বংসাত্মক কার্যধারার এখানেই শেষ নয়। তারা কেবল মানবীয় মূলধনকে (Human Capital) অপচয় ও ধ্বংস করেছে তাই নয়। বরং সেইসাথে তারা বস্তুগত মূলধনকেও ভ্রান্ত পথে বিনিয়োগ ও ব্যয় ব্যবহার করেছে। নিজেদের প্রয়োজনে তারা বড় বড় প্রাসাদ, অন্দরমহল, গুলবাগিচা, প্রমোদকঞ্জ, নৃত্যশালা, নাট্যশালা, প্রেক্ষাগার এমনকি মরার পর সমাধির জন্যও তারা বিরাট ভূমিখন্ডের উপর জাঁজমকপূর্ণ সমাধিসৌধ নির্মাণ করে নিল। এভাবে আল্লাহর অসংখ্য বান্দার বাসস্থঅন ও জীবিকার জন্যে যে জমি ও দ্রব্যসামগ্রী কাজে লাগতে পারতো, তা মাত্র গুটিকয়েক বিলাসী ব্যক্তির পৃথিবীতে জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থান ও বিদায়ের ব্যবস্থা করার জন্যে ব্যয় করা হলো। দামী দামী অলংকার মনোরম পোশাক উঁচুদরের সাজসজ্জা সৌন্দর্য ও বিলাসিতার সামগ্রী, জাঁকালো মডেলের যানবাহন এবং আরো অনেক জানা অজানা বাহারী সামগ্রীর জন্য তারা অঢেল সম্পদ ব্যয় করলো। এমনকি, এসব যালিমরা জানালা দরজায় দামী দামী পর্দা ঝুলালো, ঘরের দেয়ালগুলোতে বহু টাকা ব্যয় করে ছবি চিত্র এঁকে নিলো, ঘরের মেঝোতে বিছিয়ে দিলো হাজার হাজার টাকা মূল্যের কার্পেট ও গালিচা। তারা তাদের কুকুরগুলোকে পর্যন্ত মখমলের পোশাক আর সোনার শিকল পরিয়ে দিলো। এভাবে বিপুল পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী এবং অসংখ্য মানুষের শ্রম ও সময় যা দুঃস্থ মানুষের দেহাচ্ছাদন ও ক্ষুধা নিবৃত্ত করার কাজে লাগতে পারতো, তা মাত্র গুটিকয়েক বিলাসী ব্যক্তি ও প্রবৃত্তির দাসানুদাসের লালসা চরিতার্থ করার জন্যে নিঃশেষ হয়ে গেলা।

বস্তু পূজা

এযাবত যে মারাত্মক চিত্র তুলে ধরলাম, এসবই হলো শয়তানী নেতৃত্বের মাত্র একটি দিকের পরিণতি। শয়তানী নেতৃত্বের অন্য দিকটির পরিণতি এর চেয়েও ভয়াবহ। প্রকৃত প্রয়োজনের অধিক যে সম্পদ ও উপায় উপকরণ কোনো ব্যক্তির হস্তগত হয়েছে, সেগুলোকে ‘জমিয়ে রাখবে এবং আরও সম্পদ অর্জনের কাজে বিনিয়োগ করবে’ এই নীতি একেবারেই ভ্রান্ত। একথা সুস্পষ্ট যে, মহান আল্লাহ পৃথিবীতে যেসব উপায় উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, তা সৃষ্টিজগৎ ও মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ করার জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। সৌভাগ্যক্রমে তোমার হাতে যদি কিছু অধিক সম্পদ এসে গিয়ে থাকে, তবে জেনে রেখো এটা অপরের অংশই তোমার হাতে এসেছে। তুমি কেন তা জমিয়ে জমিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছো? তোমার চারপাশে তাকাও, দেখবে যারা জীবিকা সংগ্রহ করতে অক্ষম, কিংবা যারা তাদের জীবিকা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, অথবা যারা নিজেদের প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে কম পেয়েছে, মনে করবে এরাই হলো সেই সব লোক যাদের জীবিকার অংশ তোমার হাতে এসে গেছে। তারা আহরণ করতে পারেনি; সুতরাং ‍তুমি নিজেই তা তাদের কাছে পৌছে দিও। এটাই হচ্ছে সঠিক কর্মনীতি। এর পরিবর্তে তুমি যদি সে সম্পদকে আরো অধিক সম্পদ লাভের কাজে ব্যবহার কর তবে তা হবে এক চরম ভ্রান্তি। কেননা এগুলোর সাহায্যে তুমি আরো যতো সম্পদই সংগ্রহ করবে তাতো তোমার প্রয়োজনের চাইতে আরো অনেক বেশীই হবে। সুতরাং সম্পদের পর সম্পদ লাভ করে সেগুলোর মাধ্যমে তোমার বিকৃত লোভ লালসা আর কামনা বাসনা চরিতার্ঞ করা ছাড়া কল্যাণকর আর কি হতে পারে! তুমি তোমার সময়, শ্র, এবং যোগ্যতার যতোটা অংশ প্রয়োজনীয় জীবিকা লাভের কাজে ব্যয় কর, মূলত ততোটুকুই কেবল এগুলোর সঠিক ও যুক্তিসংগত প্রয়োগ। কিন্তু প্রয়োনের অতিরিক্স সম্পদ লাভের জন্যে সেগুলোকে কাজে লাগালে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, তুমি একটি অর্থনৈতিক পশু, বরং অর্থ উপার্জনের একটি মেশিন ছাড়া আর কিছু নও। অথচ তোমার সময়, শ্রম এবং মানসিক ও দৈহিক যোগ্যতা অর্থ উপার্জনের কাজে প্রয়োগ করা ছাড়াও আরো অনিক মহান ও উত্তম প্রয়োগক্ষেত্র রয়েছে। সুতরাং বিবেক বুদ্ধি ও স্বভাব প্রকৃতির দিক থেকে এ নীতি একেবারই ভ্রান্, যা শয়তান তার শিষ্যদের শিক্ষা দিয়েছে। তাছাড়া এই নীতিকে বাস্তবায়িত করার জন্যে যে কর্মপন্থা তৈরী করা হয়েছে সেটা এতোই অভিশপ্ত এর পরিণাম ফল এতোই ভয়াবহ যে, তা কল্পনা করাও কষ্টকর।
প্রয়োজনের অধিক অর্থসম্পদকে আরো অধিক অর্থসম্পদ কবজা করার কাজে দুইভাবে বিনিয়োগ করা যায়ঃ
এক. সুদের ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করা;
দুই. ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্প কারখানায় বিনিয়োগ করা।
ধরনগতদিক থেকে উভয় পদ্ধতির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য অবশ্যি আছে। কিন্তু উভয় পদ্ধতির সমন্বিত কর্মের অনিবার্য পরিণতিতে সমাজ দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
একটি শ্রেণী হলো তারা, যারা নিজেদের প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী অর্থসম্পদরে মালিক হয় এবং সে সম্পদকে আরো বেশী সম্পদ আহরণের কাজে অর্থাৎ সম্পদের পাহাড় গড়ার কাজে বিনিয়োগ করে। এ শ্রেণীর লোকেরা সংখ্যার কম হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় শ্রেণীটি হলো তারা, যারা নিজেদের প্রকৃত প্রয়োজনের সমান বা তার চেয়ে কম অর্থসম্পদের অধিকারী হয়, কিংবা একেবারে বঞ্চিত হয়ে থাকে। এই শ্রেণীকি সংখ্যায় প্রথমোক্ত শ্রেণীর তুলনায় অনেক বেশী হয়।
উভয় শ্রেণীর স্বার্থ সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী, পরস্পর বিরোধী এবং সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, বরং উভয় শ্রেণীর স্বার্থ মাঝে সম্পর্ক হয়ে থাকে সংঘাতময়, দ্বন্দ্বমুখর এবং প্রতিবাদী। এভাবেই প্রকৃতি মানুষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যে সুস্থ ও সম্মতিপূর্ণ বিনিময় নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তা সংঘাত ও শত্রুতামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতার [Antagoinstic Compitiion] উপর ভিত্তিশীল হয়ে পড়ে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক [Antagoinstic Compitiion] অর্থব্যবস্থা

অতঃপর এ সংঘাতময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতোই বাড়তে থাকে, ততোই ধনীকে শ্রেণীর সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে এবং দরিদ্র শ্রেণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতের প্রকৃতিই এমন যে, এতে বিত্তশালীরা তাদের সম্পদের জোরে কম বিত্তের মালিকদের কাছ থেকে সম্পদ চুষে নেয় এবং তাদেরকে নিঃস্ব ও দরিদ্রদের দলে ঠেলে দেয়। এভাবে দিন দিন বিশ্বের অর্থসম্পদ স্বল্প থেকে স্বল্পতর সংখ্যক লোকের হাতে কুক্ষিগত হতে থাকে এবং অধিত থেকে অধিক লোক দিন দিন নিঃস্ব ও দরিদ্র হয়ে যায় কিংবা ধনীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে এ সংঘাতের সূচনা হয় স্বল্প পরিসরে। অতঃপর এর পরিধি বাড়তে বাড়তে দেশ হতে দেশে এবং জাতি হতে জাতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ক্রমে গোটা বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলে। এ প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয় না; এরপরও ‘আরও চাই আরও চাই’ বলে যেন চিৎকার করতে থাকে। যে প্রক্রিয়ায় এ বৈষম্য সংঘটিত হয়, তা হলো, কোনো একটি দেশের কিছুলোকের হাতে যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থসম্পদ থাকে তখন তারা উদ্বৃত্ত অর্থসম্পদকে লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করে এবং এই অর্থ প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনের কাজে ব্যয় হতে থাকে। এখন তাদের বিনিয়োগকৃত পুঁজি লাভসমেত উঠে আসাটা নির্ভর করে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী সে দেশের ভেতরে বিক্রয় হওয়ার উপর। কিন্তু বাস্তবে এমনটি সর্বদা হয়না এবং মূলত তা হতে পারেও না। কারণ যাদের হাতে প্রয়োজহনের চেয়ে কম সম্পদ রয়েছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা তো ক্ষীণই হয়ে থাকে। তাই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা সরকারী জিনিস ক্রয় করতে পারে না। অপরদিকে যাদের কাছে অতিরিক্ত সম্পদ থাকে তারা তাদের আয়ের একটি বিরাট অংশ অধিক মুনাফা অর্জন করার কাজে বিনিয়োগ করে। তাই তারা নিজেদের সাকুল্য মূলধন পণ্য ক্রয়ের জন্যে ব্যয় করেনা। ফলে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর একটি বিরাট অংশ অনিবার্যভাবে অবিক্রিত থেকে যায়। অন্য কথায় এর অর্থ হলো, ধনীদের বিনিয়োগকৃত অর্থের একটি অংশ অনাদায়ী থেকে যায়। এই অর্থ দেশের শিল্পের [INDUSTRY] নিকট ঋণ হিসেবে পাওনা থাকে। এ হচ্ছে একটি মাত্র আবর্তনের অবস্থা। এভাবে যতোবারই পুঁজি আবর্তিত হয় ততোবারই পূঁজিপতিরা তাদের লব্ধ আয়ের একটি অংশ আবার লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করবে এবং প্রত্যেক আবর্তনেই অনাদায়ী অর্থের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। এভাবে দেশীয় শিল্পের কাছে এ ধরনের ঋণ দ্বিগুণ, চারগুণ, হাজারগুণ বৃদ্ধি পায় যা স্বয়ং সেই রাষ্ট্রের পক্ষেও কখনো আদায় করা সম্ভব হয়না। এ প্রক্রিয়ায় একেকটি দেশ দেউলিয়াত্বের চরম বিপদে নিপতিত হয়। এ অবস্থা থেকে বাঁচার একটিই মাত্র উপায় থাকে। তা হলো, দেশের মধ্যে অবিক্রিত থেকে যাওয়া সমস্ত দ্রব্যসামগ্রী বহিবিশ্বে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ এমন দেশের সন্ধান করা যার ঘাড়ে নিজের দেউলিয়াত্ব চাপিয়ে দেয়া যায়।
এভাবেই এ সংঘাতময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ময়দানে পদার্পণ করে। একথা স্পষ্ট যে, কেবল একটি মাত্র দেশই শয়তানী অর্থনীতি অনুসারে পরিচালিত হয়ানা, বরঞ্চ বিশ্বের অসংখ্য দেশে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রত্যেক দেশই নিজেকে দেউলিয়াপনা থেকে বাঁচানোর জন্যে, অন্য কথায় নিজের দেউলিয়াত্ব অপর কোনো দেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার জন্যে বাধ্য হয়ে পড়েছে। এভাবেই আরম্ভ হয় আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা কয়েকটি রূপ ধারণ করে।
প্রথমত, প্রত্যেক দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয়ের জন্যে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। প্রত্যেকেই স্বল্পতম ব্যয়ে অধিক পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করে। তাই শ্রমিক কর্মচারীদের অত্যন্ত কম পারিশ্রমিক দেয়া হয়। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কারবারে সাধারণ জনগণ এতোটা কম আয় লাভ করে, যা দিয়ে তাদের প্রকৃত প্রয়োজনও পূরণ হয়না।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক দেশ নিজের পরিসীমা ও নিজ প্রভাব বলয়ের অধীন দেশসমূহের অপর দেশের পণ্য-সামগ্রী আমদানীর উপর বিধিনিশেষ আরোপ করে। নিজের আয়ত্তাধীন সব ধরনের কাঁচামালের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যাতে অপর কোনো দেশ তা হস্তগত করতে না পারে। এর ফলে শুরু হয় আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বসংঘাত যার পরিণতিতে বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা।
তৃতীয়ত, যেসব দেশ অপর দেশ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া দেউলিয়াত্বের বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনা, তাদের উপর অসংখ্য লুটেরার দল হিংস্র স্বাপদের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরা সে দেশে কেবল নিজ দেশের উদ্বত্ত পণ্য বিক্রি করে তাই নয় বরং নিজ দেশে যেসব ধনসম্পদ লাভজনক কাজে খাটানোর সুযোগ নেই, তাও অধিক মুনাফা লুটার উদ্দেশ্যে সেসব দেশে বিনিয়োগ করে। শেষ পর্যন্ত এসব দেশেও সেই একই সমস্যা সৃষ্টি হয়, যা প্রথমত নিজ দেশে অর্থ বিনিয়োগকারী দেশগুলোতে সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থ তারা এসব দেশে বিনিয়োগ করে তা পুরাটা উদ্ধার হয়ে আসেনা। আবার এ বিনিয়োগ থেকে যে পরিমাণ আয়ই হাতে আসে তার একটা বড় অংশ তারা অধিকতর লাভজনক কাজে বিনিয়েগ করে। শেষ পর্যন্ত দেশগুলোর ঘাড়ে ঋণের বোঝা এতোটা বৃদ্ধি পায়, যা গোটা দেশকে নগদ দামে বিক্রি করেও শেষ পর্যন্ত গোটা বিশ্ব দেউলিয়া হয়ে পড়বে। তখন এই দেউলিয়াত্বের বোঝা চাপিয়ে দেবার মতো কোনো দেশই আর বিশ্বর বুকে অবশিষ্ট থাকবেনা। এমনকি শেষ পর্যন্ত অর্থ বিনিয়োগ এবং উদ্বৃত্ত পণ্য চালানের জন্যে বুধ, বৃহস্পতি কিংবা মংগলগ্রহে ছুটোছুটি করতে হবে বাজারের সন্ধানে।

আরো কতিপয় ব্যবস্থা

এই সর্বগ্রাসী দ্বন্দ্বসংঘাতে ব্যাংক মালিক, আড়তদার, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের ক্ষুদ্র একটি দল গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক উপায় উপকরণ এমনভাবে করায়ত্ব করে বসে আছে যে, তাদের মোকাবিলায় সমগ্র বিশ্বের মানবজাতি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় কোনো ব্যক্তির পক্ষে তার দৈহিক শ্রম ও মনমস্তিষ্কের যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতভাবে উপার্জনের কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আল্লাহর এ রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা জীবনসামগ্রী থেকে নিজের অংশ সংগ্রহ করা তার জন্যে একেবারেই দুষ্কর। ছোট ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র শিল্পের মালিক এবং সাধারণ কৃষিজীবীদের পক্ষে পরিশ্রম করে প্রয়োজন মেটানোর মতো উপার্জন করার কোনো সুযোগ আজ আর অবশিষ্ট নেই। অর্থনৈতিক জগতের এ অধিপতিদের গোলাম, চাকর এবং মজুর হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। ওদিকে শিল্পপতি, পুঁজি-মালিক ও ব্যবসায়ীরা অপেক্ষাকৃত স্বল্প জীবিকার বিনিময়ে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সকল শক্তি ও যোগ্যতা প্রতিভা এবং গোটা সময় ক্রয় করে নিচ্ছে। ফলে গোটা মানবজাতি এখন নিছক একটি অর্থনৈতিক পশুতে পরিণত হয়ে গেছে। ফলে গোটা মানবজাতি এখন নিছক একটি অর্থনৈতিক পশুতে পরিণত হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সংগ্রামের চাপে পড়ে নিজের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎর্ষ সাধন করা, ক্ষুধা নিবারণের চেয়ে উচ্চতর কোনো উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্যারোপ করা এবং জীবিকার সন্ধান ছাড়া অন্য কোন মহত্তর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত শক্তিকে বিকাশিত করা খুব কম লোকের পক্ষেই সম্ভব হয়। প্রকৃতপক্ষে, এ শয়তানী ব্যবস্থার দারুন অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাত এতোই কঠিন রূপ ধারণ করেছে যে, জীবনের অন্যসব দিক ও বিভাগ একেবারেই মুহ্যমান ও অকেজো হয়ে পড়েছে।
মানুষের আরো দুর্ভোগ্য যে, বিশ্বের নৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং আইন প্রণয়ন নীতিও এই শয়তানী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাবে চরমভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত সকল দেশে নীতিশাস্ত্রের শিক্ষকবৃন্দ মিতব্যয়িতা ও ব্যয় সংকোচনের উপর বিশেষ গুরুত্বাররোপ করেছেন যা আয় হবে তার পুরোটা ব্যয় করাকে বোকামী এবং নৈতিক ত্রুটি বলে মনে করা হচ্ছে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে এ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, স্বীয় আয়ের কিচু না কিছু অংশ বাঁচিয়ে তা ব্যাংকে জমা রাখতে হবে, কিংবা বীমা পলিসি ক্রয় অথবা কোন কোম্পানীর শেয়ার কিনতে হবে। বস্তুত মানবতার জন্যে যা ধ্বংসকর ও মারাত্মক, নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিতে তাকেই আজ সত্য ও সৌন্দর্যের মাপকাঠি বানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রশক্তির কথা আর কি বলবো? বাস্তবে রাজনীতি ও রাষ্ট্রশক্তি পুরোপুরিই শয়তানী ব্যবস্থার করায়ত্ত হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে যুল্‌ম ও শোষণ থেকে মানবতাকে রক্ষা করাই ছিল রাষ্ট্রশক্তির দায়িত্ব; কিন্তু আজ স্বয়ং রাষ্ট্রশক্তিই যুল্‌ম ও শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। চতুর্দিকে শয়তানের দোসররাই নিরংকুশভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে আছে।
একইভাবে বিশ্বের আইনকানুনও এ শয়তানী ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছে। এসব আইন কার্যত মানুষকে পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী বানিয়ে দিয়েছে। ফলে মানুষ যেভাবে পারে সমাজস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যথেচ্ছ চেষ্টা করছে। উপার্জনের ক্ষেত্রে বৈধঅবৈধ বাছবিচার প্রায় তিরোহিত হয়ে গেছে। অন্য লোকের সম্পদ শোষণ ও লুণ্ঠন করা কিংবা অন্যকে ধ্বংস করে নিজে অর্থশালী হবার সকল উপায় পন্থাকে আজ আইনের দৃষ্টিতে বৈধ করা হয়েছে। মদ ‍উৎপাদন এবং মদের ব্যবসা, চরিত্রহীনতার আখড়া তৈরী করা, কামোদ্দীপক ফিল্ম বানানো, অশ্লীল ফিচার ও প্রবন্ধ লেখা, যৌন উত্তেজনামূলক ছবি প্রকাশ করা, জুয়ার আড্ডা বসানো, সুদী প্রতিষ্ঠান কায়েম করা, জুয়ার নিত্য নতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করা, মোটকথা মানবতাকে ধ্বংসকারী যা কিছু করা হোক না কেন, এর কোনোটাই আইন বিরোধী নয়। আইন এসব করার শুধু যে অনুমতি দেয় তাই নয়; বরং এসব করার অধিকার সংরক্ষণের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। অতঃপর এসব উপায়ে অর্জিত ধনসম্পদ যখন কারো কাছে জমা হয়, তখন তার মৃত্যুর পরও যাতে উক্ত সম্পদ সেখানেই কুক্ষিগত থাকে, আইন তারও ব্যবস্থা করে দেয়।
এজন্যে আইনের জ্যেষ্ঠ পুত্রের উত্তরাধিকার প্রথা [Rule of primogeniture], কোনো কোনো ক্ষেত্রে পালকপুত্র গ্রহণের বিধান এবং যৌথপরিবার প্রথার {Joint family system}ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব আইনের উদ্দেশ্য হলো, ধনভান্ডারের মালিক একটি অজগরের মৃত্যু হলে, আর একটি অজগরকে তার জায়গায় বসিয়ে দেয়া। আর দুর্ভাগ্যবশত সেই অজগর যদি কোনো বাচ্চা রেখে না যায়, তবে অন্যের একটি বাচ্চা ধার করে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয়, যাত সঞ্চিত ধনভান্ডার সমাজে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
এসব কারণে আজ গোটা মানবজাতির জন্যে সৃষ্টি হয়েছে এক বিরাট জটিল ও দুরূহ সমস্যা। আল্লাহ এ দুনিয়ায় প্রতিটি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনসামগ্রীর ব্যবস্থা কিভাবে করা যায়, আর প্রতিটি মানুষের সামর্থ্য, যোগ্যতা ও প্রতিবা অনুযায়ী উন্নতি লাভ এবং স্বীয় ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করার সুযোগ করে দেয়ার উপায়ই বা কি হতে পারে তার ব্যবস্থা করাই আজ মূল বিষয়।

সমাজতন্ত্রের প্রস্তাবিত সমাধান

সমাজতন্ত্র অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের একটি রূপ পরিকল্পনা পেশ করেছে। সমাজতন্ত্রের মতে অর্থসম্পদ ও উৎপাদনের যাবতীয় উপায় উপকরণ ব্যক্তির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে জাতীয় মালিকানায় অর্পণ এবং ব্যক্তিদের মধ্যে প্রয়েঅজনীয় জীবনসামগ্রী বন্টন করার দায়িত্ব সমাজ সংগঠনের উপর ন্যস্ত করাই অর্থনৈতিক সমস্যার যথার্থ সমাধান। বাহ্য দৃষ্টিতে এ সমাধান খুবই যুক্তিসংগত বলে মনে হয়। কিন্তু এর বাস্তব কর্যকারিতার উপর যতোই গভীর দৃষ্টি ফেলবেন, ততোই এর ত্রুটিসমূহ আপনার কাছে উন্মুক্ত হতে থাকবে। শেষ পর্যন্তহ আপনি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, যে রোগের চিকিৎসার জন্যে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, আসলে সেই রোগটির চেয়ে এ ব্যবস্থা অধিক মারাত্মক।

নতুন শ্রেণী

একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট, উৎপাদনের উপায় উপকরণের ব্যবহার এবং উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী বন্টনের ব্যবস্থ তত্ত্বগত দিক থেকে [Theoretically] যতোই গোটা সমাজের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলা হোকনা কেন, বাস্তবে তা একটি ক্ষুদ্র নির্বাহ সংস্থার [Executive] উপরই একান্তভাবে নির্ভর করতে হবে। প্রথমত এ ক্ষুদ্র দলটি সমাজের [Community] দ্বারাই নির্বাচিত হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু যাবতীয় অর্থনৈতিক উপায় উপকরণ যখন তাদের করায়ত্ব হয়ে পড়বে এবং তাদের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে জীবিকা বন্টন করার কাজ শুরু হবে, তখন অবশ্যই সমাজের প্রতিটি অধিবাসী তাদের মুষ্টিতে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় বন্দী হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় দেশে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পাবেনা। তাদেরকে ক্ষমতার মসনদ থেকে হটাতে পারে, এমন সংগঠিত কোনো শক্তিই তাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ পাবেনা। কোনো ব্যক্তির উপর থেকে তাদের কৃপাদৃষ্টি উঠে গেলে সেই হতভাগার পক্ষে এই বিশাল পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার মত উপায় উপকরণ পাওয়ার কোনো অধিকারই থাকবে না। কেননা দেশের সমস্ত ধনসম্পদ ও উপায় উপকরণ তো সেই ক্ষুদ্র দলটিরই নিরংকুশ কর্তৃত্বাধীনে আবদ্ধ। তাদের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বা তা অমান্য করে ধর্মঘট করার দুঃসাহস দেখানো কোনো শ্রমিক মজুরের পক্ষে সম্ভব হবেনা। কারণ সেখানে কলকারখানা এবং ক্ষেত খামারের মালিক থাকবে একটিই- একাধিক নয়; কাজেই একজনের কারখানায় অসুবিধা হলে আরেক মালিকের কারখানায় গিয়ে চাকুরী করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারেনা। সেখানে সারা দেশের কলকারখনা ও ক্ষেত খামারের মালিক তো কেবল তো সেই একটি মাত্র ক্ষুদ্র দল। সে আবার রাষ্ট্র-ক্ষমতারও মালিক। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার জনসমর্থন লাভের সম্ভাবনা থাকবেনা। এভাবে এই অর্থনৈতিক রূপ পরিকল্পনাটির ‍চূড়ান্ত পরিণতি এই দাঁড়াবে যে, সকল ছোট বড় পুঁজিপতি, সকল কলকারখানার মালিক এবং সকল ক্ষেত খামারের অধিকারীদের খতম করে একমাত্র বড় পুঁজিপতি, একমাত্র বৃহৎ কারখানা মালিক ও একমা্রত বিরাট মজিদার সারা দেশের উপর একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে জেঁকে বসবে। বস্তুত এ বিরাট শক্তিধর দলটি একই সাথে ‘জার’ ও ‘কাইজারের’ ভূমিকায়ঢ অবতীর্ণ হবে।

নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা

এরূপ শক্তি ও প্রভুত্ব এবঙ এ ধরনের নিরংকুশ কর্তৃত্ব এমন এক জিনিস, যার নেশায় মত্ত হয়ে মানুষ শোষক, অত্যাচারী ও নিপীড়ক না হয়ে পারে না। বিশেষ করে এ ধরনের কর্তৃত্বের অধিকারীরা যদি আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তাঁর সম্মুখে একদিন নিজেদের কার্যকলাপের জবাবদিহী করার ধারণা বিশ্বাসী না হয়, তাহলে তাদের নিপীড়নের আর কোনো সীমা পরিসীমাই থাকে না। তা সত্ত্বেও যদি ধরে নেয়া হয় যে, এরূপ সর্বময় ক্ষমতা করায়ত্ত করার পর এই ক্ষুদ্র দলটি সীমালংঘন করবেনা এবং ‍সু্বিচারের সাথেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে, তথাপিও এ ধরনের একটি ব্যবস্থার অধনে ব্যক্তির পক্ষে তার ব্যক্তিত্ব সর্বাংগীন বিকশিত করার কোনো সুযোগ থাকতে পারেনা। ব্যক্তিত্বকে উন্নতি ও ক্রমবিকাশ দান করার জন্যে মানুষের প্রয়োজন স্বাধীনতা। প্রয়োজন কিছু উপায় উপকরণের অধিকারী হওয়ার যাতে সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছা মাফিক তার ব্যবহার ও প্রয়োগ করতে পারে এবং সেগুলোকে নিজের ঝোঁক প্রবণতা অনুযায়ী কাজে লাগিয়ে নিজের সুপ্ত যোগ্যতা ও প্রতিভাকে বিকশিত করে তুলতে পারে কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর কোনো সম্ভাবনা নেই। সেখানে উপায় উপকরণ ব্যক্তির আয়ত্তে থাকেনা, থাকে সমাজের নির্বাহী সংস্থার হাতে। আর সেই নির্বাহী সংস্থা সমাজস্বার্থের যে ধারণা পোষণ করে সে অনুযায়ীই সেসব উপায় উপকরণকে ব্যবহার এবং প্রয়োগ করে। ব্যক্তি যদি সেই উপায় উপকরণের দ্বারা উপকৃত হতে চায়, তবে তাকে সেই সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ীই কাজ করতে হবে; শুধু তাই নয়, বরঞ্চ তাদের প্রস্তাবিত সামাজিক স্বার্থে কাজ করার উপযোগীরূপে গড়ে তোলার জন্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে তাদের হাতে সোপর্দ করতে হবে, যাতে করে তারা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদে গড়ে তুলতে পারে। এ ব্যবস্থা কার্যত সমাজের সকল মানুষকে মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যক্তির হাতে এমনভাবে সমর্পণ করে দেয়, যেনো মানুষগুলো নিষ্প্রাণ জড়পদার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যক্তি সমাজের মানুষগুলোকে নিজেদের নীল নকশার ছাঁচে এমনভাবে ঢেলে সাজায় যেমনভাবে চর্মকার চামড়া কেচে জুতো তৈরী করে এবং কর্মকার লোহা গলিয়ে লৌহসামগ্রী তৈরী করে থাকে।

ব্যক্তিত্বের বলি

মানব সমাজ ও সভ্যতার জন্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা অত্যন্ত মারাত্মক। যদি ধরেও নেয়া হয় যে, এ ব্যবস্থার অধীনে প্রয়োজনীয় জীবনসামগ্রী সুবিচারের সাথেই বন্টন করা হবে, তবু এর উপকারিতা এর ক্ষতির তুলনায় একেবারেই নগণ্য। মানুষ বিভিন্নমুখী শক্তিসামর্থ্য ও যোগ্যতা প্রতিভা নিয়ে তুলনায় একেবারেই নগণ্য। মানুষ বিভিন্নমুখী শক্তিসামর্থ্য ও যোগ্যতা প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে; সেগুলো পূর্ণরূপে বিকশিত হওয়া এবং সম্মিলিত সমাজ জীবনে সে অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের সুযোগ লাভ করার মধ্যেই সমাজ সভ্যতার সর্বাংগীন উন্নতি নির্ভরশীল। কিন্তু এসব সুযোগ সুবিধা লাভ করা এমন ব্যবস্থার অধীনে কখনো সম্ভব হতে পারেনা, যেখানে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঁচামালের মত ঢেলে কাঠছাঁট করে গড়ে তোলা হয়। কতিপয় ব্যক্তি, তা তারা যতোই যোগ্য এবং সদিচ্ছাসম্পন্ন হোকনা কেন, কোনো অবস্থাতেই তাদের জ্ঞান ও দৃষ্টি এতোটা সর্ব্যাপী হতে পারেনা ,যে লক্ষ্য কোটি মানুষের জন্মগত যোগ্যতা প্রতিভা এবং তাদের স্বভাগত ঝোঁক প্রবণতার সঠিক পরিমাপ করা এবং যেগুলোকে বিকশিত করে তোলার যথার্থ পন্থা নির্ণয় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। এটা একেবারেই অসম্ভব। এক্ষেত্রে তারা নিছক বিজ্ঞানের দিক থেকেও ভুল করতে পারে। আর সমাজের স্বার্থ এবং সামাজিক প্রয়োজন সম্পর্কে তাদের মানসিকতায় মানব-পরিকল্পনার যে পোকা কিলবিল করছে সেদিক থেকেও তারা তাদের অধীনস্থ গোটা ভূখন্ডের মানুষকে তাদের সেই ছাঁচেই ঢেলে সাজাতে চাইবে। এতে সমাজের যাবতীয় বৈচিত্র সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে এক প্রাণহীন সাদৃশ্য রূপান্তরিত হবে। এর ফলে বন্ধ হয়ো যাবে সমাজের স্বাভাবিক উন্নতি ও ক্রমবিকাশ আর আরম্ভ হবে এক ধরনের সম্পূর্ণ কৃত্রিম স্থবিরতা। এতে মানুষের আভ্যন্তরীণ শক্তি সামর্থ্য ও যোগ্যতার প্রতিভাসমূহ থেৎলে যাবে। অবশেষে দেখা দেবে এক মারাত্মক সামাজিক ও নৈতিক অধপতন। মানুষ তো আর বাগানের ঘাস কিংবা গুল্মলতা নয় যে, একজন মালি তাকে কাটছাঁট করে সাজিয়ে রাখবে, আর মালির পরিকল্পনা অনুযায়ীই সে বড় হবে কিংবা ছোট হবে! প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বতন্ত্র ক্রমোন্নতি লাভ করে তার নিজস্ব স্বাভাবিক গতিতে। এই স্বাভাবিক গতিকে হরণ করে কেউ তাকে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী চালাতে চাইলে তা ক্রমোন্নতি লাভ করতে পারেনা। বরঞ্চ এমতাবস্থায় সে হয় বিদ্রোহ করবে আর না হয় শুষ্ক মৃতপ্রায় হয়ে থাকবে।
সমাজতন্ত্র অর্থননৈতিক সমস্যাকে মানব জীবনের মূল সমস্যা ধরে নিয়ে গোটা মানব জীবনকে ঘানির গরুর মতো এর চারপাশের ঘুরাতে চায়। মুলত এটা সমাজতন্ত্রের মৌলিক ভ্রান্তি। জীবনের কোনো একটি সমস্যার ক্ষেত্রেও সমাজতন্ত্রের দৃষ্টি স্বচ্ছ ও বাস্তবধর্মী নয়। বরঞ্চ সমাজতন্ত্র জীবনের সকল সমস্যাকে কেবল অর্থনীতির সংগীন চশমা দিয়েই দেখে থাকে। ধর্ম নৈতিকতা ইতিহাস বিজ্ঞান সমাজ বিজ্ঞান মোটকথা নিজের পরিসীমার মধ্যে প্রতিটি দিক ও বিভাগকে সংকীর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দেখা হয়। এ একরোখা ও একদেশদর্শী গোঁড়ামীপূর্ণ দৃষ্টিভংগির কারণেই সমাজতন্ত্রের আওতায় মানব জীবনের গোটা ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট ও পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে।

ফ্যাসিবাদের সমাধান

সুতরাং পরিষ্কার হলো যে, সমাজতান্ত্রিক মতবাদ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার কোনো সঠিক স্বাভাবিক সমাধান নয়। বরঞ্চ এ এক অস্বাভাবিক কৃত্রিম সমাধান। এর প্র্রতিকূলে আরেকটি সমাধান পেশ করেছে ফ্যসিবাদ এবং জাতীয় সমাজতন্ত্র। এ মতবাদের দৃষ্টিতে জীবিকার উপকরণসমূহের উপর ব্যক্তির মালিকানা বহাল থাকবে তবে সমাজস্বার্থের খাতিরে তা রাষ্ট্রের মজবুত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বাস্তবে এ ব্যবস্থার ফলাফল সমাজতন্ত্রের ফলাফল থেকে মোটেই ভিন্ন কিছু নয়। এ মতবাদও সমাজতন্ত্রের মতোই ব্যক্তিকে সমাজস্বার্থের কাছে বিলীন করে দেয় আর তা ব্যক্তিত্বের স্বাধীন বিকাশের কোনো সুযোগই অবশিষ্ট রাখেনা। তাছাড়া যে রাষ্ট্র ব্যক্তি মালিকানা ও অধিকারকে নিজ অধিকারে কুক্ষিগত করে রাখে সেতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতোই নিপীড়ক, অত্যাচারী ও বল প্রয়োগকারী হতে বাধ্য। একটি দেশের সকল ধনসম্পদ, ব্যবসা বাণিজ্য ও যাবতীয় উপায় উপকরণ নিজ কর্তৃত্বের অধীনে করায়ত্ত করে রাখা এবং নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী সকল মানুষকে কাজ করতে বাধ্য করার জন্যে প্রয়োজন নিরংকুশ ক্ষশতা ও শক্তির। আর যে রাষ্ট্র এরূপ নিরংকুষ ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী হয়, তার হাতে দেশের সমগ্র অধিবাসীর সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়া এবং শাসকদের গোলামে পরিণত হওয়া নিশ্চিত ব্যাপার।

ইসলামের সমাধান

এবার আমি আপনাদের সামনে অর্থনৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রে ইসলাম যে সমাধান দিয়েছে তা পেশ করতে চাই।

ইসলামের মূলনীতি

ইসলাম মানব জীবনের সকল সমস্যার ক্ষেত্রে তিনটি নীতি গ্রহণ করেছে। এক. ইসলাম মানব জীবনের স্বাভাবিক নিয়মনীতিগুলোকে যতাযথভাবে অক্ষুণ্ণ রাখতে চায় এবং যেখানে স্বাভাবিক পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটে, সেখানেই ইসলাম তার মোড় ঘুরিয়ে স্বাভাবিক পথের উপর এনে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়।
দুই. ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজ ব্যবস্থায় কেবল বাহ্যিকভাবে কিচু নিয়ম বিধি চালু করে দেয়াই যথেষ্ট নয়। বরঞ্চ ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে নৈতিক চরিত্র গঠন ও মন মানসিকতার সংশোধনের উপর। কারণ এভাবেই মানব প্রবৃত্তির যাবতীয় খারাপ ও মন্দ ভাবধারা শিকড় কেটে দেয়া সম্ভব। বস্তুত এটি ইসলামে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি। ইসলামের সমাজ সংশোধন ও সংস্কার প্রচেষ্টার ভিত্তি এর উপরই প্রতিষ্ঠিত।
তিন. ইসলামের তৃতীয় মূলনীতি হলো, রাষ্ট্রীয় শক্তি ও আইনের প্রয়োগ কেবলমাত্র সর্বশেষ ও নিরুপায় মুহূর্তেই করা যাবে, তার পূর্বে নয়। ইসলামী শরীয়তের গোটা ব্যবস্তার মধ্যেই এই মূলনীতিটির নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়।
শয়তারে কুচক্রে পড়ে মানুষ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব অস্বাভাবিক পন্থা অবলম্বন করেছে সেগুলো সুষ্ঠু সমাধানের জন্য ইসলাম কেবলমাত্র নৈতিক সংশোধনের এবং যতোটা সম্ভব রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও আইন প্রয়োগ না করার প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। ‘জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা সাধনায় মানুষ স্বাধীন থাকবে’; ‘স্বীয় শ্রম-মেহনতের মাধ্যমে মানুষ যা উপার্জন করবে তার উপর তার স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে’ এবং ‘মানুষের মধ্যে তাদের যোগ্যতা ও অবস্থার প্রেক্ষিতে পার্থক্য ও তারতম্য করা হবে’ প্রভৃতি দৃষ্টিভংগিকে ইসলাম ততোক্ষণ পর্যন্ত স্বীকৃত প্রদান করে, যতোক্ষণ এগুলো স্বাভাবিকতার মধ্যে অবস্থান করবে। তাছাড়া ইসলাম এগুলোর উপর এমনসব বিধি নিষেদও আরোপ করে, যা সেগুলোকে স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করা এবং নিপীড়ন ও অবিচারের হাতিয়ারে পরিণত হওয়অ থেকে বিরত রাখে।

সম্পদ উপার্জন নীতি

প্রথমে জীবিকা বা সম্পদ উপার্জনের প্রশ্নটিই ধরা যাক। ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক অধিকারকে স্বীকার করে যে, সে নিজের স্বভাব প্রকৃতির ঝোঁ প্রবণতা এবং সামর্থ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিজেই জীবন সামগ্রীর সন্ধান করবে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে তার জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে নৈতিক চরিত্র বিনষ্টকারী কিংবা সমাজ ব্যবস্থা বিকৃতকারী কোনো উপায় পন্থা অবলম্বন করার অধিকার দেয়নি। ইসলাম জীবিকা উপার্জনের উপায় পন্থার ক্ষেত্রে হালাল হারামের পার্থক্য সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ইসলাম বেছে বেছে ক্ষতিকর উপায় পন্থাকে হারাম করেছে। ইসলামী বিধান মতে মদ এবং যাবতীয় মাদকদ্রব্য কেবল হারাম নয়, বরঞ্চ এগুলোর উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় এবং সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। যিনা ব্যভিচার, নাজগান এবং এ ধরনের অন্যান্য উপায় পন্থাকেও অর্থোপার্জনের বৈধ পন্থা বলে ইসলাম স্বীকার করেনা। উপার্জনের এমনসব উপায় পন্থাকেও ইসলাম অবৈধ ঘোষণা করেছে, যেগুলোতে একজনের লাভ বা স্বার্থসিদ্ধি নির্ভর করে অন্যদের কিংবা সমাজের ক্ষতি ও স্বার্থহানির উপর। ঘুষ, চুরি, জুয়া, ঠকবাজি ও প্রতারণামূলক ব্যবসা, মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মওজুদ করে রাখা, উপার্জনের উপায় উপকরণের উপর এক বা কতিপয় ব্যক্তির একচ্ছত্র অধিকার কায়েম করা যাতে অন্যদের উপার্জনের চেষ্টা সাধনার পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে প্রভৃতি ধরনের উপায় পন্থা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাছা ইসলাম বেছে বেছে সেসব ব্যবসায় বাণিজ্য ও কায়কারবারকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যেগুলো ধরণগত দিক থেকেই বিবাগ [Litigation] সৃষ্টিকারী, কিংবা যেগুলোর লাভ লোকসান নির্ভর করে সম্পূর্ণরূপে ভাগ্য বা ঘটনাচক্রের উপর অথবা যেগুলোতে উভয় পক্ষের স্বার্থ ও অধিকার নির্দিষ্ট করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ব্যবসা বাণিজ্য সংক্রান্ত বিধিবিধান অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, বর্তমানে যেসব পন্থায় মানুষ লক্ষপতি কোটিপতি হচ্ছে, তন্মধ্যে অধিকাংশ পন্থাই এমন, যেগুলোর উপর ইসলাম কঠোর আইনগত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ইসলাম উপার্জনের যেসব উপায় পন্থা বৈধ ঘোষণা করে, সেগুলোর পরিসীমার মধ্যে অবস্থান করে কাজ করলে সীমাহীন সম্পদ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।

ইসলামের স্বত্বাধিকার নীতি

কোনো ব্যক্তি বৈধ উপায়ে যে ধন সম্পদ উপার্জন করে তার উপর ইসলাম ব্যক্তির স্বাত্বাধিকার অবশ্যই স্বীকার করে; কিন্তু উপার্জিত ধনসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলাম ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেয় নাই। বরঞ্চ তার উপর বিভিন্নভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। একথা সবারই জানা যে, ‍উপার্জিত ধন সম্পদ ব্যবহার করার তিনটিই মাত্র পন্থা আছে। সেগেো হলোঃ
এক. খরচ বা ব্যয় করা,
দুই. লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করা এবং
তিন. মওজুদ করা।
সম্পদ ব্যবহারের এই তিনটি পন্থার উপর ইসলাম যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবার আমি সংক্ষেপে গেুলো তুলে ধরছিঃ

১. ইসলামে ব্যায়নীতি

ব্যয়ের যেসবচ পন্থা পদ্ধতি নৈতিক চরিত্রকে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত করে কিংবা যেগুলোর দ্বারা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ইসলামে তা সবই নিষিদ্ধ। কেউ জুয়া খেলে নিজের অর্থ সম্পদ উড়াতে পারেনা। মদ্যপান ও ব্যভিচার করার অনুমতি ইসলামে নেই। গান, বাদ্য, নৃত্য এবং বাজে আনন্দ বিহার প্রভৃতিতে কেউ নিজের অর্থকড়ি খরচ করতে পারে না। কোন পুরুষ রেশমের পোশাক এবং সোনার অলংকার ব্যবহার করতে পারবেনা। চিত্র এঁকে দেয়াল সজ্জিত করতে পারবেনা। মোটকথা, ইসলাম ব্যয়ের এমনসব দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে যার মাধ্যমে মানুষ তার প্রবৃত্তির লালসা চরিতার্থ করার কাজে অর্থ ব্যয় করে।
অন্যদিকে ইসলাম অর্থ ব্যয়ের সেইসব পন্থা পদ্ধতিকে বৈধ রেখেছে, যার দ্বারা মানুষ মধ্য ধরনের পবিত্র পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করতে পারে। এভাবে ব্যয় করার পর কিচু উদ্বৃত্ত থাকলে ইসলাম তা পুণ্য ও সৎকাজে, জনকল্যাণের কাজে এবং সেইসব লোকদের সাহায্যার্থে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছে যারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করার মতো জীবিকা অর্জনের অসমর্থ। ইসলামে দৃষ্টিতে সর্বোত্তম কর্মনীতি হলো, মানুষ হালাল পথে যা কিছু উপার্জন করবে, তা তার বৈধ ও যুক্তিসংগত প্রয়োজন পূরণার্থে ব্যয় করবে। এরপরও যা কিছু উদ্বৃত্ত থাকবে তার অভাবগ্রস্তদের দান করবে যাতে তারা তাদের অপরিহার্য প্রয়োজনে তা খরচ করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে ইসলাম মহত্তম চরিত্রের মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করেছে এবং একটি মহান আদর্শ হিসেবে এর প্রতি অত্যধিক ‍গুরুত্বারোপ করেছে। সমাজে যখনই ইসলামী নৈতিকতা বিজয়ী হবে, তখন সমাজ জীবনে সেইসব লোকদের সর্বাধিক সম্মনের চোখে দেখা হবে যারা ন্যায় পথে এং সৎপথে তা ব্যয় করে। পক্ষান্তরে যারা অর্থসম্পদ সঞ্চয় ও মওজুদ করে পুঞ্জিভূত করে রাখার চেষ্টা করে, কিংবা উপার্জিত সম্পদের উদ্বৃত্ত অংশকে আরও সম্পদ লাভের কাছে খাটায়- সমাজে তাদের কোনো মর্যাদা ও সম্মান দেয়া হবে না।

২. অর্থপূজার মূলোচ্ছেদ

কেবল নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে এবং সমাজের নৈতিক প্রভাবও অনুশাসনের দ্বারা অস্বাভাবিক লোভ ও লালসাগ্রস্ত লোকদের অপরাধ প্রবণতা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব নাও হতে পারে। এতোসবের পরও সমাজে এমন লোক অবশিষ্ট থাকতে পারে যারা নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্স অর্থসম্পদকে আরো অধিক অর্থোপার্জনের কাজে বিনিয়েঅগ করতে প্রয়াস পাবে। তাই ইসলাম মানুষের এ প্রবণতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং প্রয়োজনের অধিক অর্থসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতিপয় আইনগত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
উদ্বৃত্ত অর্থসম্পদ ‍সুদের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করাকে ইসলামী আইনে অকাট্যভাবে হারাম করে দেয়অ হয়েছে। আপনি যদি কাউকেও নিজের অর্থসম্পদ ঋণ প্রদান করে থাকেন তাহলে, ঋণগ্রহীতা ঋণের অর্থ নিজের প্রয়োজন মেটানো জন্যে ব্যয় করুক অথবা জীবিকা উপার্জনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করুক সর্বাবস্থায়ই আপনি কেবল আপনার মূল অর্থ ফেরত পাবারিই অধিকার রাখেন, মূরে চেয়ে বেশী নয়। এমনিভাবে ইসলাম যুল্‌ম ও শোষণমুলক পুঁজিবাদী কর্মনীতির ভিত্তিমূল চূর্ণ করে দিয়েছে এবং সেই বড় হাতিয়ারটিকে সম্পূর্ণ ভোতা করে দিয়েছে যার মাধ্যমে পুঁজির মালিক শুধু তার পুঁজি খাটিয়ে সমাজের সমস্ত অর্থসম্পদ শুষে নিয়ে নিজের কর্য়ত্ত করার সুযোগ পায়।
কিন্তযু উদ্বৃত্ত অর্থসম্পদের নিজের ব্যবসা, শিল্প, কারিগরী কিংবা অন্যন্য কায়কারবার বিনিয়েগ করা, অথবা অন্যদের কারবারে লাভ লোকসান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে খাটানোর প্রক্রিয়াকে ইসলাম বৈধ ঘোষণা করেছে। আর এ প্রক্রিয়ায় প্রয়োনাতিরিক্ত যে সম্পদ লোকদের হাতে জমা হবে, তার মন্দ প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করার জন্যও ইসলাম আরও কিছু ব্যবস্থা প্রদান করেছে।

৩. সম্পদ বন্টন ও জননিরাপত্তা

ইসলাম প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থসম্পদ সঞ্চয় ও মওজুদ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইসলামের দাবী হলো, তোমার কাছে যা কিছু অর্থসম্পদ আছে, তা হয় নিজের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ে ব্যয় কর, না হয় কোনো বৈধ কারবারে বিনিয়োগ কর, অথবা অন্যদের দান করে দাও, যাতে তারা তা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করতে পারে। ইসলাম চায় এভাবে সমস্ত অর্থসম্পদ সমাজের মধ্যে অবিরাম আবর্তিত হতে থাকুক। কিন্তু যারা এ কাজ করবেনা, বরঞ্চ অর্থসম্পদ জমা করতে থাকবে, তাদেরকে প্রতিবচর আইন অনুযায়ী সঞ্চিত অর্থ থেকে বার্ষিক ২.৫% ভাগ হারে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এ অর্থ সেইসব লোকের সাহায্যার্থ ব্যয় করা হবে, যারা জীবিকা উপার্জনের সংগ্রামে অংশ নেবার যোগ্য নয়, কিংবা অংশ নেয়ার পরও নিজের প্রয়োজন মেটাবার মতো উপার্জন থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে। ইসলামী পরিভাষায় এ ব্যবস্থার নাম হলো যাকাত। ইসলাম যাকাত আদায় ও বন্টনের যে ব্যবস্থ দিয়েছে তা হলো, যাকাত আদায় করে জনগণের যৌথ কোষাগারে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মালে জমা করা হবে। কোষাগার সেই সমস্ত লোকের প্রয়োজন পূলণের যিম্মাদার হবে, যারাই সাহায্যের মুখাপেক্ষী হবে। মূলতঃ যাকাত সামাজিক বীমার সর্বোত্তম ব্যবস্থা। সামাজিক সাহায্য সহযোগিতার সুশৃংখল ব্যবস্থাপনার অভাবে যেসব অনিষ্ট ও বিপর্য সৃষ্টি হয়, বায়তুল মালের ব্যবস্থা সেগুলোর মূলোচ্ছেদ করে দেয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে জিনিস মানুষকে সম্পদ সঞ্চয় এবং লাভজনক কাজে বিনিয়েঅগ করতে বাধ্য করে এবং যার ফলে জীবনবীমা প্রভৃতি প্রয়োজন দেখা দেয়, তা হলো সেখানে প্রতিটি মানুষের জীবন কেবল নিজের উপায় উপাদানের উপরই নির্ভরশীল। সে ব্যবস্থায় কিচু সঞ্চয় না করলে বৃদ্ধ অবস্থায় না খেয়ে মরতে হয়। সন্তান সন্তরি জন্যে কিচু না রেখে গেলে তারা ‍দুয়অরে দুয়ারে ভিক্ষা করেও এক টুকরা রুটি জাটাতে পারেনা। কিছু সঞ্চয় না রেখে রোগাক্রান্ত হলে বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়। এ ব্যবস্থায় যদি সঞ্চয় না থাকে আর হঠাৎ যদি ঘর পুড়ে যায়, ব্যবসা লাটে উঠে, কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় নিপতিত হয়, তাহলে আশ্রয় বা সাহায্য পাওয়া বা নির্ভর করার কোনো আশায় থাকে না।
একইভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমজীবী মানুষ পুঁজিপতিদের ক্রীতাসে পরিণত হতে বাধ্য হয় এবং শ্রমিকরা পুঁজিপতিদের আরোপিত যাবতীয় অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হয়, এর কারণও এটাই য, পুঁজিপতি শ্রমের বিনিময়ে যে মজুরী দেয় তা মেনে না নিলে শ্রমিকদের বিবস্ত্র থাকতে হবে আর অনাহারে ধুকে ধুকে মরতে হবে। পুঁজিপতির ‘দান’ থেকে মুখ ফিরালে শ্রমিকের জন্যে দু’বেলার অন্ন জুটানো সম্ভব হবে না।
আধুনিক কালের মানব জাতির ঘাড়ে চেপে বসে আছে পুঁজিবাদের আরো এক দুষ্ট অভিশাপ। একদিকে দারিদ্র আর ক্ষুধার জ্বালায় ধুকে ধুকে মরছে লক্ষ কোটি দরিদ্র অনাহারী মানুষ, আর অপরদিকে জমির অঢেল উৎপন্ন ফসল আর কারখানার উৎপাদিত বিপুল পণ্যসামগ্রীর ভাণ্ডার স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু দরিদ্র লোকদের পক্ষে তা ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না, ক্রয় করার ক্ষমতা তাদের নেই। এমনকি লক্ষ লক্ষ মন গম সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, অথচ অনাহারী মানুষের ভাগ্যে একুঠো খাবর জুটছেনা। এ অভিশাপের প্রধান কারণ এই যে, সাহায্যের মুখাপেক্ষী মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছাবার মতো কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই। যদি এই দরিদ্র লোকদের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা ‍সৃষ্টি করা হতো, তবে শিল্প, বাণিজ্য এবং কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে মানুষের দক্ষতা ও নৈপূণ্য আরো অধিক বিকশিত হতো।
ইসলাম যাকাত এবং বায়তুলমালের মাধ্যমে এ ধরনের সকল অনিষ্টের মূলোচ্ছেদ করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমাল প্রতিটি মুহূর্ত একজন সাহায্যকারী বন্ধুর মতো প্রত্যেক মানুষের পাশে অবস্থান করে। ভবিষ্যতের চিন্তায় চিন্তিত হবার কোনো কারণ নেই। প্রয়েঅজন হলে যে কোনো লোক বায়তুল মালে গিয়ে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাংক ডিপোজিট এবং বীমা পলিসির আর কি প্রয়োজন থাকতে পারে? হতে পারে আপনি শিশুসন্তান রেখে ইহকাল ত্যাগ করছেন। কিন্তু দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আপনি নিশ্চিন্তে পরপারে পাড়ি জমান। আপনার পরে আপনার সন্তানদের সকল দায়িত্ব বহন করবে বায়তুলমাল। রোগগ্রস্ততা, বৃদ্ধাবস্থা, আসমানী এবং যমীনী বিপদ, মোটকথা, বর্বাবস্থায় বায়তুলমাল আপনার সার্বক্ষণিক সাহায্যকারী. যার উপর নির্দ্বিধায় নির্ভর করতে পারেন। পুঁজিপতির যে কোনো অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে আপনাকে তার কাজ করতে বাধ্য হতে হবে না। বায়তুলমালের বর্তমানে আপনার ক্ষুধার্ত থাকা, বিবস্ত্র থাকা এবং নিরুপায় হবার কোনো ভয় নাই। তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমাল এমনব্যক্তিকেই প্রয়োজনীয় জীবনসামগ্রী ক্রয় করার যোগ্য বানিয়ে দেয়, যারা অর্থ উপার্জনের সম্পূর্ণ অযোগ্য, কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে কম উপার্জন করে থাকে। এভাবেই পণ্য উৎপাদন ও বন্টনের মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই কোনো দেশের দেউলিয়াত্বকে অন্যদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার জন্যে পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ানো এবং অবশেষে গ্রহলোক পর্যন্ত দৌড়াবার কোনো প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবেনা।
কিছু কিছু ব্যক্তির হাতে পুঞ্জিভূত হয়ে পড়া অর্থসম্পদ সমাজে ছড়িয়ে দেবার জন্যে ইসলাম যাকাত ছাড়াও অন্য যে পন্থা অবলম্বন করেছে, তা হলো উত্তরাধিকার আইন। ইসলাম ছাড়া অন্যান্য আইনের প্রবণতা হলো, কোন ব্যক্তি সারাজীবন ধরে যতো অর্থসম্পদ পুঞ্জিভূত করেছে, তার মৃত্যুর পরও তাকে একইভাবে পুঞ্জিভূত রোখা। পক্ষান্তরে ইসলাম, কোনো ব্যক্তি সারাজীবন গুণে গুণে যে অর্থসম্পদ পুঞ্জিভূত করেছে, তার মৃত্যুর পর তা অন্যদের মধ্যে বিলি বন্টন করে দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। ইসলামী আইনে পুত্র কন্যা, বাবা মা, স্ত্রী, ভাইবোন- এরা সবাই এক ব্যক্তির উত্তরাধিকার এবং তার রেখে যাওয়া সম্পদ একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম বিধি অনুযায়ী এদের মধ্যে বণ্টিত হওয়া জরুরী। কোনো নিকটাত্মীয় বর্তমান না থাকলে দূর আত্মীয়ের সন্ধান করা হবে এবং সম্পদ তাদের মধ্যে বিলি করা হবে। নিকটের বা দূরের কোনো আত্মীয় যদি বর্তমান না থাকে তবে পালকপুত্র গ্রহণ করে তাকে সম্পদের একচ্ছত্র মালিক বানিয়ে দেবার অধিকার ইসলাম কাউকে প্রদান করে না। কেউ যদি কাছের বা দূরের কোনো আত্মীয় না রেখে মারা যায়, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজই তার সমস্ত সম্পদের উত্তরাধিকারী। তার পুঞ্জিভূত করে রেখে যাওয়া সমস্ত অর্থসম্পদ জাতীয় কোষাগার বায়তুলমালে জমা করা হবে। এভাবে কোনো ব্যক্তি যদি বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থম্পদও পুঞ্জিভূত করে, তার মুত্যুর পর দুই তিন পুরুষ সময়কালের মধ্যেই তা বহু ছোট ছোট ভাগে খন্ড বিখন্ড ও বিভক্ত হয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। এমনি করে সম্পদের প্রতিটি পুঞ্জিভূত ভাণ্ডার বিস্তৃত ও বিকেন্দ্রীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে ঘরে ঘরে।

ভাববার বিষয়

অর্থব্যবস্থার অতি ক্ষুদ্র একটি চিত্র এখানে আমি উপস্থাপন করলাম। এর উপর আপনার চিন্তাভাবনা করে দেখুন। শয়তানের ভ্রান্ত শিক্ষার ফলে ব্যক্তিমালিকানায় যেসব অনিষ্ট দেখা দেয় ইসলামী অর্থব্যবস্থা কি তা সবই বিদূরিত করে দেয়না? তাহলে সমাজতান্ত্রিক সতবাদ, কিংবা ফ্যাসিবাদী অর্থনীতি, কিংবা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক মতবাদ গ্রহণ করে অর্থব্যবস্থার এমন কৃত্রিম প্রক্রিয়া অবলম্বন করার কোনো প্রয়োজন আছে কি? বিশেষ করে যেসব ব্যবস্থা কোনো একটি অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম তো নয়ই, বরঞ্চ তদস্থলে সৃষ্টি করে আরো অসংখ্য বিপর্যয়। এখানে আমি পুরো ইসলামী অর্থব্যবস্থার কথা আলোচনা করিনি। ভূমি ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক বিরোধের [Trade Disputes] মীমাংসা এবং শিল্প ও কৃষির জন্যে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী পুঁজি সংগ্রহ সরবরাহের যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যেতে পারে এবং যার পূর্ণ অবকাশ ইসলামে রয়েছে তার পূর্ণাংগ রূপরেখা এ স্বল্প পরিসরে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ইসলাম যেভাবে আমদানী রফতানী শুল্ক এবং দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পণ্যের চলাচলের উপর শুল্কের কড়াকড়ি শিথিল করে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর অবাধ চলাচল ও বিনিময়ের পথ ‍উন্মুক্ত করেছে, সে বিষয়েও আমি এ নিবন্ধে আলোচনা করতে পারিনি। এগুলোর চেয়ে একটি বড় বিষয় এখানে বলার সুযোগ পাইনি। তা হলো রাষ্ট্র পরিচালনা, সিভিল সার্ভেস এবং সামরিক খাতে যথাসম্ভব ব্যয় সংকোচন করে এবং আদালতের স্পম্প ডিউটি প্রথার মূলোচ্ছেদ করে ইসলাম সমাজের ঘাড় থেকে বিরাট অর্থনৈতিক বোঝা হালকা করে দিয়েছে। করলব্ধ আয়কে মাথাভারী প্রশাসনিক খাতে ব্যয় করার পরিবর্তে সমাজের কল্যাণ ও সুখ শান্তির কাজে ব্যয় করার বিরাট সুযোগ ইসলাম করে দিয়েছে। এগুলোর ফলে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানব সমাজের জন্যে পরিণত হয় এক বিরাট রহমত ও আশীর্বাদে। অন্ধ বিদ্বেষ পরিহার করে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অজ্ঞতাপূর্ণ সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগি এবং পৃথিবীব্যপী প্রতিষ্ঠিত ইসলাম বিরোধী শাসন ব্যবস্থার তীব্র প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে যদি স্বাধীন বিবেক বিবেচনার দৃষ্টিতে ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে অধ্যয়ন করা হয়, তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস একজন বিবেকবান ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকেও এমন পাওয়া যাবেনা, যিনি মানুষের অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্যে এ ব্যবস্থাকে অধিকতর উপকারী, বিশুদ্ধ ও যুক্তিসংগত বলে স্বীকার করবেন না। কিন্তু কারো মন মগজে যদি এরূপ কোনো ভ্রান্তধারণা জন্ম নেয় যে, ইসলামের গোটা বিশ্বাসগত, নৈতিক চরিত্রগত এবং সমাজ ব্যবস্থাগত কাঠামোর মধ্য থেকে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে সাফল্যের সাথে পরিচালনা করা যেতে পারে, তবে আমি নিবেদন করবো, দয়া করে এই ভ্রান্ত ধারণা মনমগজ থেকে ধুয়ে ‍মুঝে বের করে ফেলুন। ইসলামের অর্থনীতি এর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, আইন ও বিচার বিভাগীয় এবং সামাজিক ও পারিবারিক ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এসবগুলোর ভিত্তি ইসলামের নৈতিক ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই নৈতিক ব্যবস্থাও আবার স্বয়ংক্রিয় নয়। বরঞ্চ তা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এক সর্বজ্ঞানী সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর সম্মুখে জবাবদিহী রার দৃঢ় বিশ্বাসের উপর। মৃত্যুর পর আখিরাতে আল্লাহর আদালতে পার্থিব জীবনের সমস্ত কার্যকলাপ বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা হবে এবং এই বিচার অনুযায়ী শাস্তি অথবা পুরস্কার লাভের উপর দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করতে হবে। স্বীকার করে নিতে হবে মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে নৈতিক ও আইনগত যে বিধি ব্যবস্থা পৌঁছে দিয়েছেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার একটি অংশ, তা পরিপূর্ণরূপে আল্লাহরই হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই আকীদা বিশ্বাস, নৈতিক ব্যবস্থা এবং পূর্ণাংগ জীবন যাপন পদ্ধতিকে হুবহু গ্রহণ না করলে শুধুমাত্র ইসলামের অর্থব্যবস্থা তার সঠিক স্পিরিট অনুযায়ী একদিনও চলতে পারবেনা এবং তা দ্বারা সত্যিকার কোনো কল্যাণ লাভ করা সম্ভব হবেনা।

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ কুরআনের অর্থনৈতিক নির্দেশনা

১. মৌলিক তত্ত্ব

মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতি সম্পর্কে একেবারে প্রাথমিক ও মৌলিক কথা হলা যে, মহান আল্লাহই মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির সমুদয় উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে সেগুলোকে এমনভাবে এবং এমন প্রাকৃতিক বিধানের উপর সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে সেগুলো মানুষের জন্যে উপকারী ও কল্যাণবহ হয়েছে। তিনিই মানুষকে এসব থেকে ফায়দা লাভের সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সেগুলো ব্যয় ব্যবহার করার ক্ষমতা দান করেছেন। এই প্রকৃত সত্যকথা ও মৌলিক তত্ত্বকে আল কুরআন অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে বারবার উল্লেখ করেছেঃ
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
“তিনিই যমীনকে তোমাদের জন্যে বাধ্যগত ও বশীভূত করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এর প্রশস্তহতার উপর চলাচল কর এবং আহার কর তাঁর প্রদত্ত জীবিকা থেকে। আর (জেনে রেখো) তোমাদের পুনরায় জীবিত হয়ে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে।” [আল ‍মুলকঃ১৫]
وَهُوَ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْهَارًا وَمِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ جَعَلَ فِيهَا زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ
“আর তিনিই যমীনকে বিস্তৃত করে দিয়েছেন, তাতে পাহাড় বানিয়েছেন আর প্রবাহিত করে দিয়েছেন সমুদ্র ও নদ নদী। আর তিনি ‍সৃষ্টি করেছেন সব ধরনের ফল ফলাদি দুই দুই প্রকার।” [আর রা’দঃ ৩]
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনি তোমাদের জন্যে সেই সবই সৃষ্টি করেছেন, যা পৃথিবীতে রয়েছে।” [আল বাকারাঃ ২৯]
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْفُلْكَ لِتَجْرِيَ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْأَنْهَارَ () وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَائِبَيْنِ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ() وَآتَاكُمْ مِنْ كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ
“তিনিই আল্লাহ, যিনি আকামণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী, আর আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন পানি। অতপর এরই সাহায্যে তোমাদের জীবিকার জন্যে সৃষ্টি করেছেন নানারকম ফলফলাদি। নৌযানকে তিনি তোমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন, যাতে করে তাঁরই নির্দেশ তা সমুদ্রে চলাচল করে। তিনি সমুদ্রকেও তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। তিনি সূর্য-চাঁদকেও তোমাদেরই কল্যাণার্থে একটি নিয়মের অধীনে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন, সেভাবেই তারা আবর্তিত হচ্ছে। আমি তোমাদের স্বার্থেই রাত দিনকে একটি বিধানেনর অধীন করে দিয়েছি। আর তোমরা যা কিছু চেয়েছো[“অর্থাৎ যা কিছুর তোমরা মুখাপেক্ষী এবং বর্তমানে তোমরা যা কিচু চাও। অতীতের চাওয়অ না চাওয়াতে কিছু যায় আসেনা।” বায়দাবী, আনোয়অরুত তানযীল ৩য় খণ্ড ১৬১ পৃষ্ঠা। মুস্তফা আলবাবী, মিশর ১৩৩০ হিঃ (১০১২ ইং)।] তা সবই তোমাদের দিয়েছি। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহরাজি গুণকে চাইলে গুণতে পারবেনা।” [সূরা ইব্রাহীমঃ৩২-৩৪]
وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ قَلِيلًا مَا تَشْكُرُونَ
“আমরা পৃথিবীতে তোমাদের কর্তৃত্ব দান করেছি এবং সেখানেই তোমাদের জন্যে জীবনের উপকরণ সৃষ্টি করে দিয়েছি।” [আল আ’রাফঃ ১০]
أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَحْرُثُونَ (63) أَأَنْتُمْ تَزْرَعُونَهُ أَمْ نَحْنُ الزَّارِعُونَ
“তোমরা কি তোমাদের কৃষি খামারের ব্যাপারে চিন্তা করে দেখেছো? এই যে তোমরা বীজ বপন কর, তা থেকে [গাছ ও ফসল] তোমরা উৎপাদন কর, নাকি আমি?” [আল ওয়াকিয়াঃ৬৩-৬৪]

২. বৈধ অবৈধের সীমা নির্ধারণের অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহর

এই মৌলিক তত্ত্বের ভিত্তিতে কুরআন মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত উপায় উপকরণসমূহ উপার্জন ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী হবার অধিকার রাখেনা। তাছাড়া নিজের খেয়াল খুশী মতো হালাল হারাম এবং বৈধ অবৈধের সীমা নির্ধারণ করার বৈধ অধিকারও তার নেই। বরঞ্চ তার জন্যে সীমা নির্ধারণ করবার একচ্ছত্র অধিকারী কেবলমাত্র আল্লাহ। আরবের প্রাচীন মাদ্‌ইয়ান জাতি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে লাগামহীন উপার্জন ও ব্যয় করার দাবিদার ছিলো। তাদের এ দৃষ্টিভংগির জন্যে কুরআনে তাদের তিরষ্কার করা হয়েছেঃ
قَالُوا يَا شُعَيْبُ أَصَلَاتُكَ تَأْمُرُكَ أَنْ نَتْرُكَ مَا يَعْبُدُ آبَاؤُنَا أَوْ أَنْ نَفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَاءُ إِنَّكَ لَأَنْتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ
“তারা বললোঃ হে শুয়াইব! তোমার নামায কি তোমারেক এই নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পুরুষানুক্রমে পূজা করে আসা মা’বুদদের আমরা পরিত্যাগ করবো, কিংবা আমাদের অর্থসম্পদের বিষয়ে আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো যা কিচু করতে চাই, তা করতে পারবোনা?” [সূরা হুদঃ৮৭]
নিজের খেয়াল খুশীমতো কোনো জিনিসকে হারাম এবং কোনো জিনিসকে হালাল বলাকে কুরআন ‘মিথ্যাকথা’ বলে ঘোষণা করেঃ
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ
“আর তোমরা তোমাদের মুখের কথা দিয়ে মিথ্যা হুকুম জারি করোনা যে, এটা হালাল আর ওটা হারাম।” [ এ আয়াত নিজের খেয়ালখুশী মতো হারাম হালালের ফয়সালা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। [বায়দাবী ৩য় খন্ড ১৯৩ পৃষ্ঠা]।
আল্লামা আলূসী তাঁর বিখ্যাত তাফসীর রূহুল মুয়ানীতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ “এ আয়াতের সারকথা হলো, য জিনিস হালাল বা হারাম হবার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোনো হুকুমই পৌছেনি, তোমরা সেটাকে হালাল বা হারাম কিছুই বলবেনা। এমনটি করলে তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপকারী বলে গণ্য হবে। কেননা আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই হালাল হারাম নির্ণয়ের মাণদণ্ড নয়।”
[রুহুল মুয়ানী ১৪শ খন্ড ২২৬ পৃষ্ঠা মুনীরিয়া মু্দ্রণালয়, মিশর, ১৩৪৫ হিঃ]] [আন নহলঃ ১১৬] কুরআন এরূপ নির্দেশ জারি করার অধিকার আল্লাহ এবং [তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে] তাঁর রাসূলের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেঃ
يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ
“হে [রাসূল] তাদেরকে ভালো ও কল্যাণের নির্দেশ দেয় আর মন্দ ও অকল্যাণ থেকে বিরত রাখে। তাদের জন্যে পবিত্র জিনিসে হালাল এবং অপবিত্র নোংরা জিনিসকে হারাম করে। আর তাদের জন্যে পবিত্র জিনিসকে হালাল এবং অপবিত্র নোংরা জিনিসকে হারাম করে। আর তাদের উপর থেকে সেব বোঝা নামিয়ে দেয় যেগুলো তাদের উপর চাপানো ছিলো এবং সেসব বন্ধন খুলে দেয় যেগুলোর দ্বারা তারা বন্দী ছিলো।” [আল আ’রাফঃ ১৫৭]

৩. আল্লাহ-নির্ধারিত সীমার ভেতরে ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি

কুরআন আল্লাহ তা’আলার সার্বভৌম মালিকানার অধীনে এবং তাঁর আরোপিত সীমারেখার ভেতরে ব্যক্তিমালিকানাকে স্বীকার করেঃ
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
“তোমরা অবৈধ পন্থায় একে অপরের অর্থসম্পদ ভোগ-ভক্ষণ করোনা। তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে তোমাদের মাঝে লেনদেন ও ব্যবসা বাণিজ্য হতে পারে।” [সূরা নিসাঃ২৯]
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন আর অবৈধ করে দিয়েছেন সুদকে।”
وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ
“তোমরা যদি সুদ নেয়া য়েতে ফিরে আস [তওবা কর] তবে নিজেদের মূলধন ফেরত নেবার অধিকার তোমাদের রয়েছে।” [আল বাকারাঃ২৭৯]
إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ
“যখন তোমরা পরস্পরের মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যে লেনদেনের [ঋণ দেয়া নেয়ার] ফয়সালা করবে, তখন তার দলিল দস্তাবিজ লিখে নিও।” [আল বাকারাঃ ২৮২]
وَإِنْ كُنْتُمْ عَلَى سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَانٌ مَقْبُوضَةٌ
“যদি তোমরা ভ্রমণরত থাক আর [ঋণ লেনদেনের দলিল দস্বাবিক লেখার জন্যে] কোনো লেখক না পাও, তবে সাথে সাথে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় এমন বস্তু বন্ধক রেখে কার্য সম্পদান কর।” [আল বাকারাঃ ২৮৩]
لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ
“পিতামাত ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত অর্থসম্পদে পুরুষের অংশ রয়েছে। মহিলাদেরও অংশ রয়েছে পিতামাতা এবং নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া অর্থসম্পদে।” [আন নিসাঃ ৭]
لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا
“অনুমতি না নেয়া পর্যন্ত নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যদের ঘরে প্রবেশ করোনা।” [আন নূরঃ ২৭]
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَالِكُون
“ওরা কি দেখেনা, আমরা তাদের জন্যে নিজের হাতে বানানো জিনিসগুলোর মধ্যে গৃহপালিত পশুও সৃষ্টি করেছি, আর তারা সেগুলোর মালিক হয়েছে?” [সূরা ইয়াসীনঃ ৭১}
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
“পুরুষ চোর এবং নারী চোর উভয়ের হাত কেটে দাও।” [আল মায়িদাঃ ৩৮]
وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
“ফসল কাটার দিন [জমির উৎপাদন থেকে] আল্লাহর অধিকার পরিশোধ কর।” [আল আনআমঃ ১৪১]
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً
“হে নবী! তাদের অর্থসম্পদ থেকে যাকাত আদায় কর।” [আত তওবাঃ ১০৩]
وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا
“আর এতীমদের অর্থসম্পদ তাদের হাতে অর্পণ কর। এবং তাদের অর্থসম্পদ নিজের অর্থসম্পদের সাথে মিশ্রণ করে ভক্ষণ করোনা।” [আন নিসাঃ ২]
أُحِلَّ لَكُمْ مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ
“এই [নিষেধ করা মহিলাদের] ছাড়া আর যতো মেয়ে মানুষ রয়েছে, তাদেরকে নিজেদের অর্থসম্পদরে বিনিময়ে হাসিল করা তোমাদের জন্যে বৈধ করে দেয়া হয়েছে, যদি তোমরা তাদেরকে বিয়ের দুর্গে সুরক্ষিত কর এবং অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন না কর।” [আন নিসাঃ ২৪]
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
“আর সন্তুষ্টচিত্তে স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর পরিশোধ করে দাও।” [আন নিসাঃ ৪]
وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا
“[বিয়ের সময়] স্ত্রীকে অঢেল অর্থসম্পদ দিয়ে থাকলেও [তালাক দেয়ার সময়] তা থেকে কিছুই ফেরত নেবেনা।” [আন নিসাঃ ২০]
) مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ
“যারা নিজেদের অর্থসম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের এই ব্যয়ের উপমা হলো এমন, যেমন একটি বীজ বপন করা হলো এবং তার থেকে বের হলো সাতটি ছড়া।” [আল বাকারাঃ ২৬১]
وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ
“আর তোমরা জিহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের অর্থসম্পদ ও জানপ্রাণ দিয়ে।” [আস সফঃ ১১]
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
“আর তাদের অর্থসম্পদে অধিকার রয়েছে প্রার্থী [সাহায্যপ্রার্তী] ও বঞ্চিতদের।” [সূরা যারীয়াতঃ ১৯]
উল্লেখিত নির্দেশ ও উপদেশসমূহের একটিও ব্যক্তিমালিকানাবিহীন অবস্থায় ধারণা পর্যন্ত করা যেতে পারেনা। কুরআন এমন এক অপরিহার্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পেশ করে, যা সার্বিক পর্যায়ে ব্যক্তির মালিকানাধিকারের উপর প্রতিষ্ঠিত। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী [Consumer goods] এবং উৎপদান মাধ্যম [Means of Production] –এর মধ্যে বিভক্তি টেনে কেবলমাত্র প্রথমোক্তটি পর্যন্ত ব্যক্তিমালিকানাকে সীমীত রাখা এবং শেষোক্তটি পর্যন্ত জাতীয়করণ করার ধারণা করার কোনো সুযোগ এতে নাই। একইভাবে এতে শ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থমসম্পদ [Earned Income] এবং বিনা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থসম্পদ [Unearned Income]-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়না। যেমন, একথা সবারই জানা যে, কোনো ব্যক্তি বাবা মা, সন্তান সন্ততি, স্বামী বা স্ত্রী কিংবা ভাইবোন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে অর্থসম্পদ লাভ করে তা তার শ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ নয়, আর যাকে যাকাত দেয়া হয়, তার জন্যেও তার প্রাপ্ত যাকাতের অর্থ শ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ নয়। তাছাড়া এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে এমন ধারণারও নাম গন্ধ পাওয়া যায়না যে, তা কেবল একটি অস্থায়ী সময়কালের জন্যে। আর প্রকৃত উদ্দেশ্য এমন একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়া, যেখানে পৌঁছে ব্যক্তিমালিকানা খতম করে জাতীয় মালিকানা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটাই যদি প্রকত উদ্দেশ্য হতো, তবে অবশ্যি কুরআন তা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিতো এবং সে ব্যবস্থা সম্পর্কে উপদেশ ও নির্দেশাবলী পদান করতো। আল কুরআনের সূরা আ’রাফের—{আরবী****************} “যমীন আল্লাহর” [আয়াতঃ ১২১২৮] আয়াত থেকে ‘ব্যক্তিগত মালিকানা বাতিল এবং জাতীয় মালিকানা স্বীকৃত’ –এরূপ অর্থ উত্থাপন করার কোন অবকাশ নেই। কুরআন তো একথাও বলেঃ
لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছুই আছে সব আল্লাহর।” [আলবাকারাঃ ২৮৪]
এর থেকে এরূপ অর্থ বের করা যেতে পারেনা যে, পৃথিবী ও আকাশের কোনো কিছুতেই ব্যক্তিমালিকানা থাকবেনা এবং টেনে হিঁচড়ে এ অর্থও বের করা যেতে পারেনা যে, সবকিছুই জাতীয় মালিকানায় থাকবে। আল্লাহর মালিকানা যদি মানব মালিকানার অস্বীকৃতি হয়ে থকে, তবে তা অবশ্যি ব্যক্তিমালিকানা এবং জাতীয় মালিকানা উভয়টার জন্যেই অস্বীকৃতবোধ হতে হবে। সূরা হামীম আস্ সাজদারঃ
وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ
“আর তিনি তাতে পূর্ণ চারদিনে প্রার্থীদের প্রত্যেকের প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী সঞ্চিত করে রেখেছেন” [আয়াতঃ ১০]। এই আয়াতটি থেকেও এরূপ যুক্তি গ্রহণ করা কিছুতেই সঠিক নয় যে, “কুরআন পৃথিবীর সমুদয় খাদ্য উপকরণকে সকল মানুষের জন্যে সমবন্টন করতে চায়, আর এ সাম্য জাতীয় মালিকানা ছাড়া প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সুতরাং জাতীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করাই কুরআনের লক্ষ্য।” আয়াতটির অনুবাদ যতি এমনটি ধরেও নেয়া হয় যে: “আল্লাহ পৃথিবীতে খাদ্য উপকরণসমূহ চারদিনে একটি পরিমাণ মতো রেখে দিয়েছেন, যা সব প্রার্থীর জন্যে সমান সমান,” [এরূপ অনুবাদ মোটেও সঠিক নয়। আয়াতটির মূল শব্দগুলো হলো এরূপঃ (আরবী***************)
আল্লামা যমখশরী, বায়দাবী, রাযী, আলূসী এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এখা (আরবী****************) শব্দের সম্পর্কে (*************) শব্দের সাথে স্থাপন করেছেন এবং এর অর্থ করেছেনঃ পূর্ণ চারদিনে আল্লাহ তা’আলা এ কাজ করেছেন। যেসব মুফাসসির (আরবী****০ শব্দের সম্পর্ক (আরবী********) শব্দের সাথে স্থাপন করেছেন তারা এর অর্থ করেছেনঃ “সব প্রার্থীর জন্যে সরবরাহ করেছেন” অথবা “সব প্রার্থীর প্রার্থনা অনুযায়ী।” অধিক ব্যখ্যার জন্যে দ্রষ্টব্যঃ তাফহীমুল কুরআন, সূরা হামীম আস সাজদা, টীকাঃ ১২।]
সেক্ষেত্রেও “সব প্রার্থী” দ্বারা শুধু মানুষ অর্থ করা সঠিক হতে পারেনা। মানুষ ছাড়া সেইসব প্রাণীও প্রার্থ যাদের জীবিকার উপকরণ আল্লাহ তা’আলা এই পৃথিবীতেই রেখে দিয়েছেন। এ আয়াতের দৃষ্টিতে সব প্রার্থীর অংশ যদি সমান সমানই হয়, তবে এই সাম্যের অধিকার কেবলমাত্র মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট হবার কোনো দলীল নেই। এমনি করে কুরআনের যেসব আয়াতে দুঃস্থদের জীবিকা পৌঁছানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, সেসব আয়াত দ্বারাও এ যু্ক্তি গ্রহণকরা যেতে পারেনা যে, এ উদ্দেশ্যে কুরআন জাতীয় মালিকানার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কুরআন যেখানে এই প্রয়োজনের কথা উল্লেখ কছে, সেখানেই তা পূরণ করার জন্যে একটিই মাত্র প্রক্রিয়ার কথা বলে দিয়েছে। তা হলো, সমাজে সচ্ছল ব্যক্তিরা নিজেদের দরিদ্র আত্মীয় স্বজন, এতীম, মিসকীন এবং অন্যান্য বঞ্চিত ও অসচ্ছল লোকদের জন্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেরাও ব্যক্তিগতভাবে উঁদার প্রাণে ব্যয় করবে আর রাষ্ট্রও তাদের অর্থসম্পদ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ আদায় করে এ কাজে ব্যয় করবে। উল্লেখিত উদ্দেশ্য পূরণের জন্যে এই বাস্তব কর্মপন্থা অবলম্বন করা ছাড়া অপর কোনো পন্থা পদ্ধতর ধারণাটুক পর্যন্ত কুরআনে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
সন্দেহ নেই, কোনো বিশেষ জিনিসকে ব্যক্তিগত পরিচালনা পরিবর্তে জাতীয় পরিচালনায় নেয়ার প্রয়োজন অনুভূত হলে কুরআনের কোনো নির্দেশ প্রতিবন্ধকও নয়। তবে ব্যক্তিমালিকানার সম্পূর্ণ অস্বীকৃত এবং জাতীয় মালিকানার দৃষ্টিভংগিকে একটি দর্শন ও ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা—কুরআন মানুষের জন্যে যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দিয়েছে, তার সাথে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর কুরআন মানব সমাজের জন্যে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে, তার দৃষ্টিতে কোনো জিনিসকে ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে জাতীয় মালিকানায় নেয়া প্রয়োজন বলে সিদ্ধান্ত নেয়া কোনো দল বা পার্টির কাজ নয়। বরঞ্চ জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত সদস্যদের একটি মজলিসে শূরাই কেবল এরূপ সিদ্ধন্ত নিতে পারে। [কুরআনের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তারিত রূপ অবগত হবার জন্যে আমার প্রণীত ‘খেলাফত ও রাজতন্ত্র’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় দ্রষ্টব্য।]

৪. অর্থনৈতিক সাম্যের অস্বাভাবিক ধারণা

মহান আল্লাহ্র সৃষ্ট প্রকৃতির একটি অপরিহার্য দিক হিসেবেই কুরআন এ সত্যকে উপস্থাপন করেছ যে, অন্য সব জিনিসের মতোই মানুষের মাঝে জীবিকা এবং জীবনোপকরণের সমতা অর্তমান। বিভিন্ন সমাজব্যবস্থার কৃত্রিম অসাম্য নয়, িএই প্রাকৃতিক অসাম্য কুরআন মহান আল্লাহর কৌশলগত বিবেচনা এবং তাঁর বন্টন ব্যবস্থা [Dispensation] ফলশ্রুতি বলে আখ্যায়িত করে। তাঁর গোটা স্কীমের মধ্যে কোথাও এমন ধারণার চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া যায় না যে, এই অসাম্যকে নির্মূল করে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা তাঁর কাম্য, যেখানে সবাই সাম্যের ভিত্তিতে জীবিকার উপায় উপকরণ লাভ করবে। এ ব্যাপারে কুরআনের ভাষণঃ وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ
“তিনি আল্লাহ্ই , যিনি পৃথিবীতে তোমাদের খলিফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হলো, তোমাদের তিনি যা কিছুই দিয়েছেন, এভাবে তাম মাধ্যমে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করবেন।” [আল আন’আনমঃ ১৬৫]
انْظُرْ كَيْفَ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَلَلْآخِرَةُ أَكْبَرُ دَرَجَاتٍ وَأَكْبَرُ تَفْضِيلًا
“চেয়ে দেখো, আমরা কিভাবে কিছূ লোককে অপর কিছু লোকের উপর মর্যাদা দান করেছি। আর পরকাল তো শ্রেণী মর্যাদার পর্থক্যের দিক থেকে আরো অনেক বড়।” [বনী ইসরাঈলঃ ২১]
أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَتَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّا وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
“ওরা কি তোমার প্রভুর অনুগ্রহ [নবুওয়ত]-কে বন্টন করতে চায়? পার্থিব জীবনে আমরা তাদের মাঝে তাদের জীবিকা বন্টন করে দিয়েছি। তাদের কিচু লোককে অপর কিছু লোকের উপর মর্যাদা দান করেছি। এটা এজন্য করেছি যাতে তাদের কিছু লোক অপর লোকদের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে। আর তোমার মনিবের রহমত [অর্থাৎ নবুয়ত] তো তাদের পুঞ্জিভূত অর্থসম্পদ থেকে উত্তম।”[যে ঘটনার প্রেক্ষিতে কথাটি বলা হয়েছে, তা হলোঃ মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধবাদীরা বলতো, মক্কা এবং তায়েফের কোনো বড় সরদারকে কেন নবী বানানো হলোনা। আল্লাহ যদি নবী পাঠানের দরকারই হয়ে থাকে, তবে সেজন্যে মুহাম্মদকে (সা) মনোনীত করার কী কারণ থাতে পারে?] [সূরা যুখরুফঃ ৩২]
إِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ إِنَّهُ كَانَ بِعِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا
“মূলত, তোমার মালিক যার জন্যে ইচ্ছা জীবিকা প্রশস্ত করে দেন, আর যাকে ইচআ মাপাঝোপা দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর দাসদের সব খবর রাখেন এবং তাদের সকল অবস্থার উপর দৃষ্টি রাখেন।” [বনী ইসরাঈলঃ ৩০]
لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর চাবিকাঠি তাঁরই মুষ্টিবদ্ধে। তিনি যাকে ইচ্ছা জীবিকা প্রশস্ত করে দেন আর যাকে ইচ্ছা মাপাঝোপা প্রদান করেন। তিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞঅনের মালিক।” [আশ শূরাঃ ১২]
وَيَقُولُونَ مَتَى هَذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
“হে নবী, বলে দাওঃ আমার মনিব তাঁর দাসদের যাকে চান জীবিকা প্রশস্ত করে দেন আর যাকে চান মাপাঝোপা করে দেন।” [আস সাবাঃ ৩৯]
কুরআন এই প্রাকৃতিক অসাম্যকে ঠাণ্ডা মাথায় মেনে নেয়ার জন্যে মানুষকে উপদেশ দিয়েছ। আল্লাহ অন্যদেরকে যে মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেছেন, তার জন্যে ইর্ষান্বিত না হবারও পরামর্শ দিয়েছেনঃ
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
“তোমাদের একজনের চেয়ে আরেকজনকে আল্লাহ যা কিছু বেশী দিয়েছেন, তোমরা তার জন্যে লোভ করোনা। যা পুরুষের উপার্জন করেছে, সে অনুযায়ী তাদের অংশ রয়েছে আর যা নারীরা উপার্জন করেছে, সে অনুযায়ী তাদের অংশ নির্দিষ্ট। আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্যে প্রার্থনা কর। অবশ্যি আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞান রাখেন।” [আন নিসাঃ ৩২]
وَاللَّهُ فَضَّلَ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ فِي الرِّزْقِ فَمَا الَّذِينَ فُضِّلُوا بِرَادِّي رِزْقِهِمْ عَلَى مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَهُمْ فِيهِ سَوَاءٌ أَفَبِنِعْمَةِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ
“আল্লাহ তোমাদের কিছু লোককে অপর কিছু লোকের তুলনায় অধিক জীবিকা দিয়েছেন। যাদেরকে বেশী দেয়া হয়েছে তারা তাদেরই এই জীবিকা এই ভয়ে তাদের অধীনস্থ ভৃত্যদের প্রতি প্রত্যাবর্তন করাতে চায়না যে, এই জীবিকার ক্ষেত্রে তারা উভয়ই সমান সমান অংশীদার হয়ে যাবে। তাহলে এটা কি আল্লাহর অনুগ্রহই অস্বীকার করছে।” [আন নহলঃ ৭১]
ضَرَبَ لَكُمْ مَثَلًا مِنْ أَنْفُسِكُمْ هَلْ لَكُمْ مِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِنْ شُرَكَاءَ فِي مَا رَزَقْنَاكُمْ فَأَنْتُمْ فِيهِ سَوَاءٌ تَخَافُونَهُمْ كَخِيفَتِكُمْ أَنْفُسَكُمْ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
“আল্লাহ তোমাদের নিজেদের (অবস্থা) থেকে তোমাদের জন্যে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তোমাদের মালিকানাধীন ভৃত্যদের মাঝে এমন ভৃত্যও কি আছে যারা— আমি তোমারেদ যে জীবিকা দিয়েছি তাতে তোমাদের সমান অংশীদার হবে? আর তোমরা কি তাদেরকে সেরকম ভয় করবে, যেমন ভয় কর নিজেদের সমমানের লোকদের? আমরা এভাবেই বুদ্ধি বিবেক রাখে এমন লোকদের জন্যে নিদর্শনসমূহ পরিষ্কার করে বর্ণনা করি।” [আর রূমঃ ২৮]
শেষোক্ত আয়াত দুটির শব্দাবলী থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় এবং যে প্রেক্ষিতে কথা বলা হয়েছে, তা থেকেও একথা স্পষ্ট যে, এখানে অর্থনৈতিক অসাম্যকে নিন্দা করা এবং তা নির্মূল করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করার শিক্ষা দেয়া হয়নি। বরঞ্চ প্রকৃত ব্যাপা হলো, মানুষের মধ্যে যে শিরক পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে দলীল হিসেবেই দৃষ্টান্তগুলো পেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ যুক্তি পেশ করা হযেছে যে, তোমরা যখন আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকার মধ্যেই তোমাদের ভৃত্যদেরকে নিজেদের সমান অংশীদার বানাতে প্রস্তুত নও, তখন আল্লাহ সম্পর্কে এ ধারণা কেমন করে পোষণ কর যে, তাঁর সৃষ্টি তাঁর খোদায়ীতে অংশীদার হতে পারে? [সূরা আন নহলের ৭১ থেকে ৭৬ এবং সূরা আর রূমের ২০ থেকে ৩৫ আয়াত অধ্যয়ন করলে এ কথাগুলো পূর্ণরূপে স্পষ্ট হবে। উভয় আয়াতেই আলোচ্য বিষয় হলো শিরক বাতিল এব তাওহীদকে সঠিক প্রমাণিত করা। উভয়স্থানের ব্যাখ্যার জন্যে দ্রষ্টব্য তাফহীমুল কুরআন মূল দ্বিতীয় খন্ড ৫৫৪ থেকে ৫৫৮ পৃষ্ঠা এবং মূল তৃতীয় খন্ড ৭৪২ থেকে ৭৫৬ পৃষ্ঠা।]

৫. বৈরাগ্যনীতির পরিবর্তে মধ্যপন্থা এবং বিধিনিষেধ

কুরআন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বারবার এ সত্য বর্ণনা করছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের ভোগ ব্যবহারের জন্যেই পৃথিবীতে তাঁর যাবতীয় নিয়ামত সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ ইচ্ছা কখনো এ নয় এবং এমনটি হতে পারেনা যে, মানুষ এসব নিয়ামত পরিত্যাগ করে বৈরাগ্যনীতি অবলম্বন করবে। তবে তিনি যা চান, তা হলো, মানুষ পবিত্র এবং অপবিত্রের মধ্যে পার্থক্য করবে। বৈধ এবং অবৈধ পন্থার মধ্যে পরখ করবে। ভোগ ব্যবহার এবং লাভস্বার্থ কেবল হালাল ও পবিত্র পর্যন্ত সীমিত রাখবে এবং এক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থার সীমা অতিক্রম করবে না।
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনিই সেসবই তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, যা পৃথিবীতে রয়েছে।” [আল বাকারাঃ ২৯]
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
“হে নবী, ওদের জিজ্ঞেস কর, আল্লাহ সেসব সৌন্দর্য কে হারাম করেছে, যা তিনি তাঁর বান্দাহদের জন্যে বের করেছেন আর জীবিকার পবিত্র জিনিস সমূহকে?” [আল আরাফঃ ৩২]
وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنْتُمْ بِهِ مُؤْمِنُونَ
“আল্লাহ যেসব হালাল ও পবিত্র জীবিকা তোমাদের দিয়েছেন তা থেকে খাও। আর সেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষা কর যাঁর প্রতি তোমরা ঈমান এনেছো।” [আল মায়িদাঃ ৮৮]
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ
“হে মানুষ পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র তা খাও আর শয়তানে পদাংক অনুসরণ করোনা। কারন, সেতো তোমাদের সুস্টষ্ট শত্রু।” [আল বাকারাঃ ১৬৮]
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“আহার কর। পান কর। সীমালংঘন করোনা। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” [আল আ’রাফঃ ৩১]
وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا
“আর বৈরাগ্য [সংসার ত্যাগ ও বাস্তব জীবন থেকে পলায়ন] নীতি তারা [অর্থাৎ ঈসা ইবনে মরিয়মের (আ) অনুসারীরা] নিজেরাই উদ্ভাবন করে নিয়েছে। এটা আমি তাদের প্রতি লিখৈ দিইনি। আমি তো লিখে দিয়েছিলাম কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসন্ধান। কিন্তু তারা সে কর্তব্য যথার্থভাবে পালন করেনি।” [আল হাদীদঃ ২৭]

৬. অর্থসম্পদ উপার্জনে হারাম হালাল বিবেচনা করা

এ উদ্দেশ্যে কুরআন বিধিনিষেধ আরোপ করে বলে দিয়েছে, অর্থসম্পদ শুধুমাত্র বৈধ পন্থায় অর্জন করতে হবে, আর অবৈধ পন্থা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا “হে লোকেরা, যারা ঈমান এনেছো! তোমরা নিজেদের মধ্যে অন্যায়াবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করোনা। তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে তিজারত [এখানে কুরআনে —-তিজারাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ আদান প্রদানের ভিত্তিতে দ্রব্যসামগ্রী এবং সেবা বিনিময় করা [দ্রষ্টব্যঃ জাস্সাসঃ আহকামুল কুরআন, ২য় খণ্ড ২১০ পৃষ্ঠা, আলবাহীয়া সংস্করণ মিশর ১৩৪৭ হিজরী। ইবনুল আরবীঃ আহকামুল কুরআন প্রথম খণ্ড ১৭০ পৃষ্ঠা, আস সায়াদা সংস্কারণ মিশর ১৩৩১ হিজরী]
‘পারস্পরিক সন্তুষ্টি’র শর্তারোপ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, এ বিনিময়ে কোনো প্রকার দমনপীড়ন, ধোঁকা প্রতারণা কিংবা ছলচাতুরী থাকবেনা, যা অপর পক্ষের গোচরীভূত হলে যে অসন্তুষ্ট হবে।]করতে পারো। আর নিজেকে নিজে [কিংবা পরস্পরকে] তোমরা হত্যা করোনা। আল্লাহ অবশ্যি তোমাদের প্রতি কৃপাময়।” [আন নিসাঃ ২৯]

৭. অর্থসম্পদ উপার্জনের অবৈধ পন্থা

রাসূলে করীমের (সা) হাদীসে এবং ফকীহ্গণ কর্তৃক ফিকাহ গ্রন্থাবলীতে অর্থোপার্জনের অন্যায় অবৈধ পন্থাসমূহের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু কিচু কিছু অন্যায় অবৈধ পন্থার কথা কুরআনেও সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছেঃ
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
[ক] “তোমরা নিজেদের পরস্পরের অর্থসম্পদ অন্যায় অবৈধভাবে ভক্ষণ করোনা। আর জেনে বুঝে অপরাধমূলক পন্থায় অপরের সম্পদের কিচু অংশ ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে তা শাসকদের কাছে উপস্থাপন করোনা। [ শাকসদের সামনে উপস্থাপন করা মানে অপরের অর্থসম্পদের মিথ্যা মালিকনা দাবী করে শাসকদের দ্বারস্থ হওয়াও হতে পারে, আবার শাসকদের ঘুষ দিয়ে অন্যদের মালিকানাধীন অর্থসম্পদ অধিকারমূলকভাবে কবজা করে নেয়াও হতে পারে। [আলূসীঃ সূহুল মুয়ানী, ২য় খণ্ড, ৬০ পৃষ্ঠা।] [আল বাকারাঃ ১৮৮]
فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ
[খ] “তোমাদের কেউ যদি অপরের উপর আস্থা স্থাপন করে তার দায়িত্বে কোনো আমানত রাখে, তবে যার উপর আস্থা স্থাপন করা হযেছে, সে যেন আস্থাস্থাপনকারীর আমানত ফেরত দেয় এবং নিজের মনিব আল্লাহ্র অনসন্তুষ্টি থেকে যেন আত্মরক্ষা করে।” [আল বাকারাঃ ২৮৩]
وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ
[গ] “আর যে আত্মসাত [জনগণের অর্থসম্পদরে খিয়ানত] করবে, কিয়ামতের দিন সে অবশ্যি এ আত্মসাতসহ হাযির হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তি সেখানে তার কৃতকর্মের পরিপূর্ণ প্রতিফল প্রদান করা হবে।” [আলে ইমরানঃ ১৬১]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
[ঘ] “চোর পুরুষ এবং চোর নারী উভয়ের হাত কেটে দাও।” [আল মায়িদাঃ ৩৮]
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا ……………..
!যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং পৃথিবীতে বিপর্য ঘটায়[অর্থাৎ সেসব লোক, যারা ডাকাতি রাহাজানির মতো অপরাধ করে বেড়ায়।]তাদের দণ্ড হলো তাদের হত্যা করে ফেলা কিংবা শূলে চড়ানো…।” [আল মায়িদাঃ ৩৩]
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
[ঙ] “যারা অন্যায়ভাবে এতীমের অর্থসম্পদ ভক্ষণ করে তারা মূলত নিজেরেদ পেটে আগুন ভর্তি করে। অচিরেই তারা জাহান্নমে নিক্ষিপ্ত হবে।” [আন নিসাঃ ১০]
إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ () وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انْتَثَرَتْ () وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ
[চ] “ধ্বংস সেইসব ঠকবাজদের জন্যে, যারা অপর লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করবার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, কিন্তু তাদের ওজন বা পরিমাপ করে দেবার সময় কম দিয়ে থাকে।” [আল মুতাফফিফীনঃ ১-৩]
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
[ছ] “যারা চায় যে, ঈমানদার লোকদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটুক, তাদের জন্যে পৃথিবীর জীনে এবং পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” [আন নূরঃ ১৯]
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ
“এমন কিছু লোকও আছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্যে মনভুলানো কথা ক্রয় করে নানে…. এমন লোকদের জন্যে অপমানকর শাস্তি রয়েছে। [এখানে মনভুলানো কথা মানে গানবাদ্য, গল্পগুজব ও এমনসব খেলাধুলা যা মনুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে। [ইবনে জরীর আত-তাবারীঃ জামেউল বয়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ২১শ খন্ড, ৩৯-৪১ পৃষ্ঠা আল আমেরীয়া সংস্করণ, মিশর, ১৩২৮ হিজরী।]] [সূরা লুকমানঃ ৬]
وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
[জ] “বৈষয়িক স্বার্থে নিজেদের দাসীদেরকে বেশ্যাবৃত্তির জন্যে বাধ্য করোনা, যখন তারা নিজেরা এরূপ কাজ থেকে আত্মরক্ষা করতে চায়।” [ এ আয়াতের প্রকৃত লক্ষ্য পতিতাবৃত্তির উচ্ছে। দাসীর কথা উল্লেখ করার কারণ হলো, প্রাচীন আরবে দাসীদের দিয়েই পতিতাবৃত্তির [Prostitution] ব্যবসা চালানো হতো। লোকেরা তাদের যুবতী সুন্দরী দাসীদেরকে গেলিতে বসিয়ে দিতো এবং তাদের উপার্জন ভক্ষণ করতো। [ইবনে জরীর তাবারী ১৮শ খণ্ড, ৫৫-৫৮, ১০৩-১০৪ পৃষ্ঠা। তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ৩য় খণ্ড ২৮৮-২৮৯ পৃষ্ঠা, মুস্তফা মুহাম্মদ সংস্করণ মিশর ১৮৪৪ ইং। ইবনে আবদুল বারঃ আল ইসতিয়াবঃ ২য় খণ্ড, ৭৬২ পৃষ্ঠা, দায়েরাতুল মা’আরেফ, সংস্করণ হায়দারাবাদ ১৩৩৭ হিজরী।] [আন নূরঃ ৩৩]
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“ব্যভিচারের কাছেও যেয়োনা। এ এক চরম অশ্লীলতা আর নোংরা নিকৃষ্ট পথ।” [বনী ইসরাঈলঃ ৩২]
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ
ব্যভিচারী পুরুষ এবং ব্যভিচারী নারী- তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে কশাঘাত কর।” [ জিনাকে অপরাধ বলে ঘোষণা করার সাথে সাথে ইসলাম জিনার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থকেও হারাম করে দিযেছে। নবী করীম (সা) এ উপার্জনকে নিকৃষ্ট ধরনের উপার্জন বলে আখ্যায়িত করেছন। দ্রষ্টব্যঃ বুখারীঃ ৩৪ অধ্যায় ১১৩ অনুচ্ছেদ, ৩৭ অধ্যায় ২০ অনুচ্ছেদ, ৬৮ অধ্যায় ৫ অনুচ্ছেদ, ৭৬ অধ্যায় ৪৬ অনুচ্ছেদ, ৭৭ অধ্যরয় ৯৬ অনুচ্ছেদ। মুসলিমঃ ২২ অধ্যায় হাদীসের ক্রমিক সংখ্যা৩৯-৪১। আবু দাউদঃ ২২ অধ্যায় ৩৯-৬৩ অনুচ্ছেদ। তিরমিযীঃ ৯ অধ্যায় ৩৭ অনুচ্ছেদ, ১২ অধ্যায় ৪৬ অনুচ্ছেদ, ২৬ অধ্যায় ২৩ অনুচ্ছেদ। নাসায়ীঃ ৪২ অধ্যায় ৫ অনুচ্ছেদ, ৪৪ অধ্যায় ৯০ অনুচ্ছেদ। ইবনে মাজাহঃ ১২ অধ্যায় ৯ অনুচ্ছেদ।] [আন নূরঃ ২]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
[ঝ] “হে মুমিনরা! মদ, জুয়া, আসতানা ও পাশা এসবই নোংরা শয়তানী কাজ। অতএব তোমরা এসব পরিত্যাগ কর।” [কুরআনে যেসব জিনিস নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, সেগুলোর উৎপাদন এবং ব্যবসাও নিষিদ্ধ। কেননা, কোনো জিনিস নিষিদ্ধ হবার দাবিই হলো, সে জিনিস দ্বারা কোনোভাবেই লাভবান হওয়া যাবেন। [আল জাস্‌সাস্: আহকামুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড ২১২ পৃষ্ঠা।] [আল মায়িদাঃ ৯০]
أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
[ঞ] “আল্লাহ ব্যবসায়কে বৈধ করেছেন আর সুদকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।” [এ থেকে বুঝা গেলো, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি মূলধনের উপর যে মুনাফা অর্জন করবে, কিংবা যৌথ ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অংশহারে যে মুনাফা অংশীদারদের মধ্যে বন্টন করা হবে তা বৈধ। কিন্তু ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতা যদি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে মূলের চেয়ে কিছু বেশী আদায় করে, তবে তা হারাম। এটাকে আল্লাহ তা’আলা ব্যবসায়িক মুনাফার মতো বৈধ মুনাফা বলে ঘোষণা করেননি।]
[আল বাকারা:২৭৫]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ () فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ () وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
“হে লোকেরা, যারা ঈমান এনেছে! আল্লাহকে ভয় কর আর তোমাদের যে সুদ অনাদায়ী রয়ে গেছে, তা পরিত্যাগ কর যদি তোমরা [সত্যি] মুমিন হয়ে থাকো। আর তা যগি না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ কর। আর এখনো তওবা কর; তবে তোমরা মূলধন ফিরিয়ে নেবার অধিকার লাভ করবে। না তোমরা যুল্ম করবে, আর না তোমাদের প্রতি যুল্ম করা হবে। আর তোমাদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণকারী যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি মাফ করে দাও, তবে এটাই হবে তোমাদের জন্যে উত্তম, যদি তোমরা বুঝ।” আয়াতের শব্দাবলী থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ নির্দেশ ঋণের সাথে সম্পর্কিত। ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে মূলের অধিক কিছু নেয়ার শর্তারোপ করলে তা হবে সুদ। এই জিনিসটি সুদ হবার ক্ষেত্রে পরিমাণের কমবেশী কিংবা কোনো বিশেষ কাজ করার জন্যে গ্রহণ করা দ্বারা কোনো পার্থক্য হয়া। আজকাল যারা সুদ হারাম হওয়াকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নেয়া ঋণের ক্ষেত্রে সীমিত করার চেষ্টা করে আর ব্যবসয়িক ঋণের সুদ এবং ব্যাংকের সুদ বৈধ বলে, তাদের এককথার পক্ষে কুরআন, হাদীস ও ফিকাহর কোথাও কোনো দলীল নেই।] [আল বাকারাঃ ২৭৮-২৮০]
এভাকে কুরআন অর্থসম্পদ লাভের যেসব উপায় পন্থাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা নিম্নরূপঃ
১. কারো অর্থসম্পদ তার ইচ্ছা ও বিনিময় ছাড়া গ্রহণ করা, কিংবা বিনিময় দিয়ে ও রাজি করিয়ে অথবা বিনিময় ছাড়া রাজি করিয় নেয়া। এমনভাবে রাজি করিয়ে নেয়া, যে রাজি করানো পিছে থাকে দমন পীড়ন এবং চাপ প্রয়োগ।
২. ঘুষ।
৩. জবরদখল, লুণ্ঠন ও আত্মসাত।
৪. খিয়ানত, চাই তা ব্যক্তির অর্থসম্পদ হোক, কিংবা জনগণের অর্থসম্পদ।
৫. চুরি, ডাকাতি।
৬. এতীমের অর্থসম্পদের বল্গাহীন ভোগ ব্যবহার।
৭. মাপ ও ওজনে কমবেশী করা।
৮. অশ্লীলতা প্রসারকারী উপায় উপকরণের ব্যবসা।
৯. গান বাজনার পেশা।
১০. পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচার।
১১. মদ উৎপাদন, তার ব্যবসা ও পরিবহণ।
১২. জুয়া এবং এমনসব উপায় পন্থা, যেসবের মাধ্যমে কিছু লোকের অর্থ অন্যদের হাতে কেবলমাত্র ভাগ্য বা ঘটনাচক্রের মাধ্যমে চলে যায়।
১৩. মূর্তি তৈরী, মূর্তির ক্রয় বিক্রয় এবং মন্দিরের সেবা।
১৪. ভাগ্য গণনা ও শকুন বিদ্যা প্রভৃতির ব্যবসা।
১৫. সুদ, পরিমাণ বেশী হোক কিংবা কম; ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণ নেয়া হয়ে থাকুক কিংবা ব্যবসা, শিল্প বা কৃষি কাজের জন্য ঋণ নেয়া হোক সর্বাবস্থায় সুদ নিষিদ্ধ।

৮. কার্পণ্য ও পুঞ্জিভূত করার উপর নিষেধাজ্ঞা

অর্থসম্পদ লাভের ভ্রান্ত উপায় পন্থা নিষিদ্ধ করার সাথে সাথে কুরআন বৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থসম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখাকেও তীব্রভাবে নিন্দা করেছে। কুরআন বলছে কার্পণ্য এক জঘন্য মন্দ কাজঃ
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ () الَّذِي جَمَعَ مَالًا وَعَدَّدَهُ () يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ () كَلَّا لَيُنْبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ
“ধ্বংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে, যে মানুষের দোষ প্রচার করে এবং গালাগাল করে। যে সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছে এবং গুণে গুণে রেখেছে। সে মনে করে তার অর্থসম্পদ চিরদিন তার কাছে থাকবে। কখনো নয়। সে তো চূর্ণবিচূর্ণকারী স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে।” [আল হুমাযা: ১-৪]
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
“সেইসব লোকদের কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও, যারা সোনারূপা পুঞ্জিভূত করে রাখে, অথচ তা আল্লাহর পথে খরচ করেনা।” [আত-তাওবা:৩৪]
وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“যারা মনের সংকীর্ণতা [বা মনের কার্পণ্য] থেকে মুক্ত থেকেছে, তারাই সফলকাম হবে।” [আত তাগাবুন: ১৬]
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যারা আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহের ক্ষেত্রে কার্পণ্য করে, তারা যনো মনে না করে যে, এটা তাদের পক্ষে ভাল। না, বরঞ্চ এটা তাদের পক্ষে অত্যন্ত খারাপ। তারা কৃপণতা ক’রে যা কিছু সঞ্চয় করেছে, কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলার রশি হয়ে দাঁড়াবে।” [এ কথাটি কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভংগিতে বর্ণিত হয়েছে। উহাররণ স্বরূপ দ্রষ্টব্যঃ সূরা মুহাম্মদঃ ৩৮, আল হাদীদ: ২৪, আনকাবূত: ৩৪, মায়ারিজ: ২১, মুদ্দাসসির: ৪৫, আল ফাজর: ১৫-২০, আল লাইল: ১১, আল মাউন: ১, ২, ৩, ৭।] [আলে ইমরান: ১৮-]

৯. অর্থপূজা ও লোভ লালসার নিন্দা

এ প্রসংগে কুরআন আমাদের এ শিক্ষাও দেয় যে, অর্থপূজা, বৈষয়িক অর্থসম্পদের প্রতি আসক্তি এবং প্রাচুর্যের কার ণে গর্ব অহংকার মানুষের পথভ্রষ্টতা এবং অবশেষে তার ধ্বংসের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়ঃ
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ () حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ () كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ
“তোমাদেরকে অধিক অধিক অর্থস্পদ সঞ্চিত করার চিন্তা চরমভাবে নিমগ্ন করে রেখেছে। কবরে পা দেয়া পর্যন্ত এ চিন্তায় তোমরা বিভোর থাক। কখনো নয়, অতি শীঘ্রি তোমরা জানতে পারবে।” [আত তাকাসুরঃ ১-৩]
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ بَطِرَتْ مَعِيشَتَهَا فَتِلْكَ مَسَاكِنُهُمْ لَمْ تُسْكَنْ مِنْ بَعْدِهِمْ إِلَّا قَلِيلًا وَكُنَّا نَحْنُ الْوَارِثِينَ
“এমন বহু জনপদকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি, যার অধিবাসীরা নিজেদের জীবিকার গর্বে অহংকারী হয়ে পড়েছিল। এখন দেখ, তাদের বসতবাটিগুলো বিরান হয়ে পড়ে আছে। তাদের পরে খুব কম লোকই সেখানে বসবাস করেছে। শেষ পর্যন্ত আমিই তাদের উত্তরাধিকারী হয়েছি।” [আল কাসাস: ৫৮]
وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ () وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ
“আমরা যে জনপদেই কোনো সতর্ককারী পাঠিয়েছি, সেখানকার সম্পদশালী লোকেরা বলেছেঃ তোমরা যে বাণী নিয়ে প্রেরিত হয়েছো আমরা তা মানিনা। তারা আরো বলেছেঃ আমরা তোমারেদ চেয়ে অধিক অর্থসম্পদ ও সন্তান সন্ততির অধিকারী এবং আমরা কখনো শস্তি ভোগ করবোনা।” [আস সাবা: ৩৪-৩৫]

১০. অপব্যয়ের নিন্দা

কুরআন মজীদ বৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থসম্পদ অবৈধ কাজে উড়িয়ে দেয়া, কিংবা বিলাসিতা, আমোদ প্রমোদ ও আনন্দ উপভোগে ব্যয় করা এবং দিন দিন জীবন যাপনের মান বাড়ানোর একমাত্র ধান্দায় বল্গাহীন অর্থ ব্যয় করাকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেঃ
وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“অর্থ ব্যয়ে সীমালংঘন করোনা। আল্লাহ অবপ্যয়কারীদের পছন্দ করেননা।” [আল আন’আম: ১৪১]
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا () إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
“অপব্যয় করোনা। অপব্যয়কারীরা শয়তানদের ভাই। আর শয়তান তার মনিবের চরম অকৃতজ্ঞ।” [বনী ইসরাঈল: ২৬-২৭]
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“পানাহার কর, কিন্তু সীমালংঘন করোনা। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেননা।” [আল আ’রাফ: ৩১]
কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের সঠিক কর্মনীতি হলো এই যে, সে নিজের জন্যে এবং নিজের পরিবার পরিজনের জন্যে ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে। তার অর্থসম্পদের উপর তার নিজের এবং তার সাথে যারা সম্পর্কিত তাদের অধিকার রয়েছে। এই অধিকার প্রদান করতেই অন্যান্যদের বঞ্চিত করে সব অর্থসম্পদ উজাড় করে দেয়াও যাবেনা।:
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا
“আর নিজের হাতকে [কৃপণতা করে] গলায় বেঁধে রেখোনা, আবার সম্পূর্ণ প্রসারিতও করে দিওনা। এমনটি করলে তোমরা তিরষ্কৃত হবে এবং খালি হাতে বসে পড়বে।” [বনী ইসরাঈল: ২৯]
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
“[এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারাই] যারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে সীমালংঘনও করেনা, আবার কৃপণতাও করেনা, বরঞ্চ তারা উভয় চরম পন্থার মধ্যবর্তী অবস্থান করে।” [আল ফুরকান: ৬৭]
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ
“আল্লাহ তোমাকে যে অর্থসম্পদ দান করেছেন, তার মাধ্যমে পরকালের ঘর অন্বেষণ কর। তবে তোমার পার্থিব অংশের কথাও ভুলে যেয়োনা। আর [আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি] অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। [অর্থসম্পদ দ্বারা] পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করোনা।” [আল কাসাস:৭৭]

১১. অর্থ ব্যয়ের সঠিক খাত

যুক্তিসংগত সীমার মধ্যে থেকে নিজের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পর বৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থসম্পদের যে অংশ হাতে অবশিষ্ট থাকবে, তা যেসব খাতে ব্যয় করা উচিত সেগুলো হলো:
وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ
“লোকেরা তোমার কাছে জানতে চায়, তারা [আল্লাহর পথে] কি [পরিমাণ] খরচ করবে? তুমি বলো: যা তোমারেদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত।” [আল বাকারাঃ ২১৯]
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ……..
“তোমরা পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরালে, তা কিন্তু প্রকৃত পুণ্যের কাজ নয়। বরং প্রকৃত নেক কাজ হলো, মানুষ ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, পরকালের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আল কিতাবের প্রতি, নবীদের প্রতি; আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় অর্থসম্পদ ব্যয় করবে আত্মীয়দের জন্যে, এতীমদের জন্যে, মিসকীনদের ও পথিকদের জন্যে, সাহায্যপ্রার্থীদের জন্যে এবং মানুষকে গোলামীর চিঞ্জির থেকে মুক্ত করার জন্যে….;.।” [আল বাকারা: ১৭৭]
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
“তোমরা কখনো পুণ্যের মর্যাদা লাভ করতে পারবেনা, যতোক্ষণ না তোমরা নিজেদের পছন্দনীয় জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। আর তোমরা যা কিছুই ব্যয় কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ণ জ্ঞাত।” [আলে ইমরান: ৯২]
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا () الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا () وَالَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَنْ يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا
“আল্লাহর দাসত্ব কর। তাঁর সাথে কাউকেও শরীক করোনা। দয়া ও সহানুভূতিমূলক আচরণ কর পিতামাতার সাথে, আত্মীয় স্বজনের সাথে, এতীমদের সাথে, মিসকীনদের সাথে, আত্মীয় প্রতিবেশীদের সাথে, অনাত্মীয় প্রতিবেশীদের সাথে, সাথী বন্ধুদের সাথে, পথিকদের সাথে এবং তোমাদের অধীনস্থ ভৃত্যদের সাথে। মূলত আল্লাহ গর্ব ও অহংকারী লোকদের ভালবাসেন না, যারা নিজেরা কার্পণ্য করে, অন্যদেরকেও কৃপণতার শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দান করেছেন তা লুকিয়ে রাখে। এরূপ অকৃতজ্ঞ লোকদের জন্যে আমরা অপমানকর শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি। আর [ঐ লোকদেরও আল্লাহ পছন্দ করেননা।] যারা কেবল লোক দেখানো উদ্দেশ্যে নিজেদেরও আল্লাহর পছন্দ করেননা।] যারা কেবল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে।” [আন নিসাঃ ৩৬-৩৮]
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
“আল্লাহর পথে বিশেষভাবে অর্থসাহায্যের অধিকারী হলো সেইসব দুঃস্থ লোক, যারা আল্লাহর কাজে এমনভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে যে, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবিকা উপার্জনের জন্যে তারা কোনো প্রকার চেষ্টা সাধনা করার সুযোগ পায়না [রাসূলুল্লাহর (সা) সময় এর দ্বারা বুঝা হতো সেই চারশ’ স্বেচ্ছাসেবী সাহাবীকে, যারা আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিজেদের ঘরবাড়ী ত্যাগ করে মদীনায় এসে উপস্থিত হন এবং দীনের জ্ঞান লাভ, দীন প্রচার, দীনের শিক্ষা দান এবং রাসূলুল্লাহ (সা) যখন জিহাদের যে দায়িত্বে পাঠাতে চন, তা যেন পাঠাতে পারেন, সেজন্যে নিজেদেরকে সার্বক্ষণিক সমর্পণ রাখেন। এসব কাজে নিজেদের পূরো সময় নিয়োগ করার কারণে তারা নিজেদের জীবিকার জন্যে চেষ্টা সাধনা করার সুযোগ পেতেন না। [যমখশরীঃ আল কাশশাফ, ১ম খণ্ড, ১’২৬ পৃষ্ঠা, আল বাহীয়া সংস্কররণ, মিশর ১৩৪০ হিজরী]। একই ভাবে বর্তমানকালেও যেসব লোক নিজেদের পূরো সময় দীনের জ্ঞান লাভ, শিক্ষাদান, দীনের প্রচার এবং সমাজের অন্যান্য কল্যাণমূলক কাজে নিয়োগ করে এবং ব্যক্তিগত আয় রোজগারের দিকে দৃষ্টিপাত করার সুযোগ পায়না, তারাও এ আয়াতে উল্লেখিত কথিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত।]তাদের ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধের কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদের সচ্ছল অবস্থার লোক মনে করে। চেহারা দেখলেই তুমি তাদের চিনতে পারবে। তারা কারো কাছে গিয়ে কিছু চায়না। তাদের কল্যাণে তোমরা যা কিছুই ব্যয় করবে, আল্লাহ তা জ্ঞাত থাকবেন।” [আল বাকারা: ২৭৩]
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا () إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا
“[আর সৎলোকেরা] আল্লাহর ভালবাসায় খাবার খাওয়অয় মিসকীন, এতীম এবং বন্দীদের, আর বলে: আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই তোমাদের আহার করাচ্ছি। তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রকার বিনিময় বা কৃতজ্ঞতা লাভের আমরা আকাঙ্ক্ষী নই।” [আদ দাহর: ৮-৯]
وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ () لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
“আর সেইসব লোকেরাই [জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি পাবে], যাদের অর্থসম্পদে সাহায্যপ্রার্থী এবং বঞ্চিত লোকদের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে [অর্থাৎ নিজেদের অর্থস্পদে তারা এইসব লোকের জন্যে নিয়মমাফিক একটি অংশ নির্দিষ্ট করে রাখে।]” [আল মায়ারিজ: ২৪-২৫]
وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا وَآتُوهُمْ مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ
“তোমাদের ক্রীতদাসদের মধ্যে যারা [ফিদইয়া প্রদান করে মুক্তি অর্জনের জন্যে] চুক্তি সম্পদান করতে চায়, তোমরা তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হও যদি তাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ আছে বলে তোমরা মনে কর। আর [ফিদইয়া পরিশোধের জন্যে] তাদেরকে আল্লাহর সেই অর্থসম্পদ থেকে দান কর, যা তিনি তোমাদের দান করেছেন।” [আন নূর: ৩৩]
এইসব খাতে ব্যয় করাকে কুরআন কেবল একটি মৌলিক নেক কাজ বলেই ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে একথাও বলে দিয়েছে যে, এমনটি না করলে সামগ্রিকভাবে সমাজের ধ্বংস অনিবার্য:
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
“আল্লাহর পথে ব্যয় কর আর নিজেদের হাতেই নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা। মানুষের প্রতি অনুগ্রহ-ইহসান কর। আল্লহ অনুগ্রকারীদের ভালবাসেন।” [আল বাকারা: ১৯৫]

১২. আর্থিক কাফফারা

আল্লাহর পথে সাধারণ ও স্বেচ্ছামূলক দান ছাড়াও কুরআন মজীদ কিছু কিচু গুনাহ ও দোষত্রুটির ক্ষতি পূরণের জন্যে আর্থিক কাফফারাও নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেমন, যে ব্যক্তি কসম খেয়ে তা ভংগ করে তার জন্যে নির্দেশ হলো:
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ
“তার কাফফারা [প্রায়শ্চিত্ত] হলো, দশজন মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো, যেমন মধ্যম ধরনের খাবার খাওয়াও তোমরা নিজেদের পরিবার পরিজনক; কিংবা তাদেরকে পরিধেয় দান করা; অথবা একজন দাস মুক্ত করা। কিন্তু যে এমনটি করতে পারবেনা সে তিন দিন রোযা রাখবে।” [আল মায়িদা: ৮৯]
এমনি করে যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে (মা বোনের তুলনা করে) নিজের জন্যে হারাম করে নেবে এবং পুনরায় তাকে স্ত্রীত্বে গ্রহণ করতে চাইবে, তার জন্যে বিধান হলো:
وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ () فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“একজন আরেকজনকে স্পর্শ করার পূর্বে [স্বামী] একজন দাস মুক্ত করবে, তা সম্ভব না হলে অনবরত দুইমাস রোযা রাখবে.,.. তাও সম্ভব না হলে ষাটজন মিসকীনকে কাবার খাওয়াবে।” [মুজাদালা: ৩-৪]
হজ্জের ক্ষেত্রেও কিছু কিছু ত্রুটি বিচ্যুতির জন্যে অনুরূপ কাফফারার বিধান দেয়া হয়েছে [দেখুন, আল বাকারা: ১৯৬, আল মায়িদা: ৯৫]। রোযার ক্ষেত্রেও এ ধরনের কাফফারা নির্ধারণ করা হয়েছে। [আল বাকারা: ১৮৪]।

১৩. দান কবুল হবার আবশ্যিক শর্তাবলী

এযাবত যেসব দানের কথা বলা হলো, সেগুলো কেবল তখনই ‘আল্লাহর পথে ব্যয়’ বলে কবুল হবে, যখন দানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার স্বার্থ উদ্ধারের চিন্তা থাকবেনা, আত্মপ্রচার ও প্রদর্শনেচ্ছা থাকবেনা, খোঁটা দেয়া এবং কষ্ট দেয়ার চেষ্ট থাকবেনা এবং ছাঁটাই বাছাই করে মন্দ ও নিকৃষ্ট ধরনের মাল দেয়া হবেনা। বরঞ্চ দানের সময় মন মগজে আল্লাহর ভালবাসা ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা না থাকলেই সে দান কবুল হবে আশা করা যায়।
وَالَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَنْ يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا
“[আর আল্লাহ ঐ লোকদের পছন্দ করেন না] যারা লোক দেখানোর জন্যে নিজেদের অর্থসম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখেনা। বস্তুতঃ শয়তান যার সাথী হলো, সে অত্যন্ত নিকৃষ্ট সাথীই লাভ করলো।” [আন নিসা: ৩৮]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
“হে ঈমান গ্রহণকারীরা! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে ঐ ব্যক্তির মতো নিজেদের দানসমূহকে বিনষ্ট করোনা, যে লোক দেখাবার জন্যে স্বীয় অর্থ ব্যয় করে এবংয় আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখেনা।” [আল বাকারা: ২৬৪]
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنْفَقُوا مَنًّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ () قَوْلٌ مَعْرُوفٌ وَمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِنْ صَدَقَةٍ يَتْبَعُهَا أَذًى وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের অর্থসম্পদ দান করে এবং দানের পর খোঁটা ও কষ্ট দেয়না, তাদের মালিকের কাছে তাদের জন্যে রয়েছে পুরষ্কার, তাছাড়া তাদের কোনো ভয় এবং দুশ্চিন্তা থাকবেনা। একটি ভালো কথা আর ক্ষমাসুন্দর ব্যবহার, সেই দানের চেয়ে উত্তম, যার অনুগামী হয় কষ্টদান। মূলত আল্লাহ মুখাপেক্ষিতাহীন পরম সহিষ্ণু।” [আল বাকারাঃ ২৬২-২৬৩]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ وَلَسْتُمْ بِآخِذِيهِ إِلَّا أَنْ تُغْمِضُوا فِيهِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ
“হে ঈমান গ্রহণকারী লোকেরা! আল্লাহর পথে ব্যয় কর সেই উত্তম অর্থসম্পদ যা তোমরা উপার্জন করেছো এবং যা আমরা তোমাদের জন্যে যমীন থেকে উৎপন্ন করে দিয়েছি। বেছে বেছে তা থেকে মন্দটা আল্লাহর পথে দিওনা। কারণ এমনটি যদি তোমাদেরকে কেউ দেয়, তবে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা ছাড়া তোমরাও তা গ্রহণ করবেনা। জেনে রেখো, আল্লাহ মুখাপেক্ষিতামুক্ত এবং প্রশংসিত গুণাবলীর অধিকারী।” [আল বাকারা: ২৬৭]
إِنْ تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِنْ تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَيُكَفِّرُ عَنْكُمْ مِنْ سَيِّئَاتِكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
“তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর, তাও ভালো। আর যদি গোপনে দরিদ্রদের দাও, তাবে তা অধিকতর ভালো। এমনটি করলে, তোমাদের বহু পাপ মুছে দেয়া হবে। তোমরা যা-ই কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।” [আল বাকারা: ২৭১]

১৪. আল্লাহর পথে অর্থব্যয়ের বাস্তব গুরুত্ব

আল্লাহর পথের ব্যয়কে কুরআন কখনো ইনফাক, কখনো ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ, কখনা সাদাকা, আবার কখনো যাকাত শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে। এটা কেবল একটা নেক ও কল্যাণকর কাজই নয়, বরঞ্চ একটি ইবাদত এবং ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ ঈমান, নামায, যাকা, রোযা ও হজ্জের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ। কুরআনে সাইত্রিশ বার এটাকে নামাযের সংগে উল্লেখ করে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলা হয়েছে, এ দুটি জিনিসই ইসলামের অপরিহর্য বিধান এবং মুক্তির মানদণ্ড। [উদাহরণ স্বরূপ কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো দ্রষ্টব্য: আল বাকারা: ৩, ৪৩, ৮৩, ১১০, ১৭৭, ২৭৭। আন নিসা: ৭৭, ১৬২। আল মায়িদা: ১২, ৫৫ । আল আনফাল: ৩। আত তাওবা: ৫, ১১, ১৮, ৭১। আর রা’দ: ২২। ইব্রাহীম : ৩১। মরিয়ম: ৩১, ৫৫। আম্বিয়া: ৭৩। আল হজ্জ: ৩৫, ৪১, ৭৮। আল মু’মিনূন: ২। আন নূর: ৩৭, ৫৬। আন নমল: ৩। লুকমান: ৪। আল আহযাব: ৩৩। ফাতির: ৩৯। আশ শূরা: ৩৮। আল মুজাদালা: ১৩। আল মায়ারিজ: ২৩। আল মুয্যামমিল: ২০। আল মুদ্দাস্সির: ৪৩। আল বাইয়্যেনা: ৫। আল মাউন: ৫।] কুরআন বলে, যাকাত সব সময়ই ইসলামের স্তম্ভ ছিলোঃ
وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ
“আর আমরা তাদেরকে [অর্থাৎ ইব্রাহীম, লূত, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ)-বে] নেতা বানিয়েছি। তারা আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী মানুষকে সঠিক পথ দেখতো। তাদের কাছে আমরা নির্দেশ পাঠিয়েছিলাম কল্যাণমূলক কাজ করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত দান করার। আর তারা ছিলো আমাদের অনুগত।” [আল আম্বিয়া: ৭৩]
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
“আহলে কিতাবকে এছাড়া আর কোনো নির্দেশই দেয়া হয়নি যে, তোমরা একনিষ্ঠভাবে দীনকে আল্লাহর জন্যে একমুখী করে তাঁর দাসত্ব কর, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর। এটাই সঠিক দীন।” [আল বাইয়্যেনা: ৫]
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا () وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا
“আর এ কিতাবে ইসমাঈলের কথা স্মরণ কর। সে ছিলো ওয়াদা পালনে সত্যবাদী, আর ছিলো একজন রাসূল, একজন নবী। সে তার সাথে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিল সালাতে এবং যাকাতের; আর আল্লাহর কাছে সে ছিলো অত্যন্ত পছন্দনীয়।” [মরিয়ম: ৫৪-৫৫]
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ ……….وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِنْكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُونَ
“সেই সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন আমরা বনী ইসরাঈল থেকে শপথ নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অপর কারো দাসত্ব করবেনা…… আর সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত পরিশোধ করবে।” [আল বাকারা: ৮৩]
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا () وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
“সে [ঈসা ইবনে মরিয়ম] বললো: আমি আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এং নবী বানিয়েছেন; আর আমি যতোদিন জীবিক থাকি ততোদিন আমাকে সালাত কায়েমের এবং যাকাত পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।” [মরিয়ম: ৩০-৩১]
একইভাবে যাকাত মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষাদান কর্মসূচীতেও দীন ইসলামের একটি স্তম্ভ। কোনো ব্যক্তির মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হবার জন্যে যেমন ঈমান এবং নামায অপরিহার্য:
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ
“[আল্লাহ তোমারেদ জন্যে] তোমারেদ পিতা ইব্রাহীমের তরীকা ধার্য করে দিয়েছেন। তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম।….. অতএবং সালাত কায়েম কর, যাকাত দিয়ে দাও এবং আল্লাহর রশি শক্ত করে ধর।” [আল হজ্জ: ৭৮]
ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ () الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ
“এটি আল্লাহর কিতাব। এতে কোনো শোবা সন্দেহ নেই। মুত্তাকীদের পর্থ প্রদর্শনকারী, যারা গায়েবে বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে এবং আমরা যে জীবিকা তাদের দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।” [আল বাকারা: ২-৩]
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ ……. (2) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (3) أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
“মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর কথা আলোচিত হলে তাদের অন্তর কেঁপে উঠে… যারা সালাত কায়েম করে এবং আমারেদ প্রদত্ত জীবিকা থেকে ব্যয় করে। এরাই সত্যিকারের মুমিন।” [আনফাল: ২-৪]
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ
“তোমারেদ প্রকৃত বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেইসব লোক, যারা ঈমান এনেছে, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং তারা আল্লাহর সামনে সদা মাথা নত করে আছে।” [আল মায়িদা: ৫৫]
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
“অতএব যদি [মুশরিকরা তাদের শিরক থেকে] তওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত পরিশোধ করে, তবে তারা তোমাদের দীনি ভাই।” [আত তাওবা: ১১]
যাকাত যে কেবল সমাজ কল্যাণের জন্যেই প্রয়োজন তা নয়, বরঞ্চ দাতাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি, নৈতিক সংশোধন এবং তাদের সাফল্য ও মুক্তির জন্যেও দরকার। এটা কোনো ট্যাক্স নয়, বরং সালাতে মতোই একটি ইবাদত। মানুষের আত্মসংশোধনের জন্যে কুরআন যেসব বিধিবদ্ধ আইন দিয়েছে, যাকাত তার একটি অপরিহার্য অংগ:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“[হে নবী] তাদের অর্থসম্পদ থেকে একটি সাদাকা উূল করে তারেদকে পবিত্র কর এবং তাদের মধ্যে প্রশংসনীয় গুণাবলী বিকশিত কর আর তাদের জন্যে কল্যাণের দোয়া কর। তোমার দোয়া অবশ্যি সান্ত্বনার কারণ হবে।” [তাওবা: ১০৩]
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
“তোমরা কিছুতেই কল্যাণ লাভ করতে পারবেনা, যতোক্ষণ না নিজেদের প্রিয়বস্তু ব্যয় করবে।” [আলে ইমরান: ৯২]
وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“দান কর। এতে তোমাদের নিজেদের জন্যেই কল্যাণ রয়েছে। আর যারা মনের সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি পেলো, এমন লোকেরাই সাফল্য লাভ করবে।” [আত তাগাবুন: ১৬]

১৫. আবশ্যিক যাকাত ও তার ব্যাখ্যা

কুরআন শিক্ষা ও নির্দেশনার দ্বারা সমাজের লোকদের মধ্যে আল্লাহর পথে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দানের একটি সাধারণ প্রাণস্পন্দন সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ রাসূলুল্লাহকে (সা) এ নির্দেশও প্রদান করেছে যে, তুমি এই দানের একটি ন্যূনতম সীমা পরিমাণ নির্ধারণ করে ফরয হিসেবে সেটা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আদায় ও বন্টনের ব্যবস্থা করঃ
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً
“[হে নবী] তাদের অর্থসম্পদ থেকে একটি সাদাকা উসূল কর।” [আত তওবা : ১০৩]
“একটি সাদাকা” শব্দ দ্বারা এই ইংগিতই প্রদান করা হয়েছিলো যে, লোকেরা সাধারণভাবে ব্যক্তিগত পর্যযায়ে যেসব সাদাকা দিয়ে থাকে, এটা সেসব সাদাকার মতো নয়, বরঞ্চ সেগুলোর বাইরে একটি বিশেষ পরিমাণের সাদাকা তাদের উপর ফরয করে দেয়ার নির্দেশ। আর এর পরিমাণ নির্ধারণ করার দায়িত্বও রাসূলুল্লাহর (সা) উপরই ন্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং এই নির্দেশ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন ধরনের মালিকানার উপর একটি ন্যূনতম সীমা পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন, যার চেয়ে কম পরিমাণের উপর যাকাত ধার্য হবেনা। অতঃপর নির্দিষ্ট পরিমাণ বা তার চেয়ে অধিক মালিকানার উপর অর্থসম্পদের প্রকারভেদে যাকাতের পরিমাণ নিম্নরূপ নির্ধারণ করা হয়।[আশ শওকারীঃ নায়লূল আওতার, ৪র্থ খণ্ড, ৯৮-১২৬ পৃষ্ঠা, মুস্তফা আল বাবী মিশর ১৩৪৭ হিঃ।]
১. সোনা, রূপা এবং নগদ মুদ্রা আকারে যে অর্থসম্পদ জমা হবে, [পরবর্তীতে ইজমার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কা হয় যে, বাণিজ্যিক স্পদেও বার্ষিক ২.৫% হিসেবে যাকাত ধার্য করতে হবে। আশ শওকানী : ৪র্থ খণ্ড ১১৭ পৃষ্ঠা। বাণিজ্যিক যাকাতের এই মুলনীতি সেইসব কলকারখানার উপরও আরোপিত হবে, যেগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন করে।] তার যাকাত বার্ষিক ২.৫% ভাগ।
২. জমির উৎপাদিত ফসলের উশর ১০%ভাগ, যদি প্রাকৃতিক বর্ষণের দারা ফসল উৎপাদিত হয়।
৩. আর কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত হলে ৫% ভাগ ফসল উশর হিসেবে দিতে হবে।
৪. ব্যক্তিমালিকানাধীন খনিজ৮ সম্পদ েএবং প্রোথিত সম্পদের ২০% ভাগ যাকাত ধার্য হবে;
৫. যেসব গৃহপালিত পশু বংশবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পালন করা হয়, সেগুলোর যাকাত দিতে হবে। ভেড়া, চাগল, গাভী, উট প্রভৃতি পমুর ক্ষেত্রে যাকাতের নিসাব ও পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্যে ফিকাহ্র গ্রন্থাবলী দেখা যেতে পারে।
যাকাতের এই পরিমাণ আল্লাহর নির্দেশে নবী করীম (সা) ঠিক সেইভাবে ধার্য [ফরয] করে দিয়েছেন, যেভাবে তিনি তাঁর নির্দেশে নামাযের রাকা’আত সংখ্যা ধার্য [ফরয] করে দিয়েছেন। দীনি দায়িত্ব ও গুরুত্বের দিক থেকে এতদুভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সালাত ও যাকাত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কুরআন মজীদ ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যের মধ্যে গণ্য করেছে:
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ
“[এই মুমিনরা, যাদেরকে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে, তারা এমন লোক] তাদেরকে যদি আমরা পৃথিবীতে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করি, তবে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং কল্যাণের নির্দেশ দেবে আর অন্যায় অকল্যাণ থেকে ফিরিয়ে রাখবে।” [আল হজ্জ: ৪১]
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ ………() وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
“তোমাদের মাঝে যারা ঈমান এনেছে এবং কল্যাণকর কাজ করেছে, আল্লাহ তাদের সাথে এই ওয়াদা করেছেন যে, তিনি অবশ্যি তাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা বানাবেন।….. তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও আর রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে করে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়।” [আন নূর: ৫৫-৫৬]
উপরে যে আয়াতগুলো উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, ফরয যাকাত আদায় ও বন্টন করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত: কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র যদি বর্তমান না থাকে এবং মুসলিম সরকারও যদি এ ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করে তবু মুসলমানদের উপর থেকে ফরয রহিত হয়ে যায়না, ঠিক যেমনি রহিত হয়ে যায়না সালাত আদায়ের ফরযিয়াত। কোনো আদায়কারী ও বন্টনকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া না গেলে প্রত্যেকজ ‘সাহেবে নিসাব’ মুসলমানদের নিজেকেই নিজের অর্থসম্পদ থেকে যাকাত বের করে বন্টন করে দিতে হবে।

১৬. মালে গনীমতের এক পঞ্চমাংশ

ফরয যাকাত আরোপের মাধ্যমে যে তহবিল সংগ্রহ হয়, কুরআন তার সাথে আরো একটি আয় সংযোজন করেছে। তা হলো, মালে গনীমতের [Spoils of war] একটি অংশ। কুরআন আইন করে দিয়েছে যে, যুদ্ধে সৈন্যরা যে গনীমতের মাল লাভ করবে, তা কোনো সৈনিকই ব্যক্তিগতভাবে লুটে নিতে পারবেন না। বরঞ্চ য কিছুই পাওয়া যাবে তার সবই কমাণ্ডারের কাছে জমা দিতে হবে। কমাণ্ডার মোট জমাকৃত সম্পদকে পাঁচ ভাগ করে চার ভাগ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করে দেবেন। আর এক পঞ্চমাংশ পৃথক রেখে তা রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দেবেন:
اعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ
“জেনে রেখো, তোমরা যে গনীমতই লাভ কর, তার এক পঞ্চমাংশ থাকবে আল্লাহ, রাসূল, আত্মীয়স্বজন, [রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তিনি গনীমতের এক পঞ্চমাংশ নিজের এবং নিজের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজন পূরণের জন্যে গ্রহণ করতেন। কেননা যাকাতের তাঁর এবং তাঁর আত্মীয় স্বজনদের কোনো অংশ ছিলনা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর রাসূল ও তাঁর আত্মীয়স্বজনের অংশ কাকে দেয়া হবে সে বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। কেউ কেউ মত দেন, রাসূল এ অংশটি পেতেন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। সুতরাং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর খলীফা ও খলীফার আত্মীয়স্বজন হবে এর অধিকারী। অন্য কিছু লোকের মত হলো রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর পর তাঁর আত্মীয়স্বজনই হবেন এর অধিাকারী। অবশেষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় যে, রাসুল (সা) এবং তাঁর আত্মীয়স্বজন যে অংশ পেতেন, এখন থেকে তা রাষ্ট্রীয় সামরিক খাতে ব্যয় হবে। [আল জাস্‌সাস: ৩য় খণ্ড, ৭৫- ৭৭ পৃষ্ঠা।] এতীম ও মুসাফিরদের জন্যে।”

১৭. যাকাত ব্যয়ের খাত

উপরোক্ত দটি [যাকাত ও গনীমত] উৎস থেকে যে অর্থসম্পদ সংগৃহীত হতো, কুরআনের ‍দৃষ্টিতে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের [Public Exchequer] কোনো অংশ নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের লক্ষ্য তো যাকাতদাতা সহ সকল জনগণের সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান। তাই কুরআন যাকাত তহবিলের ব্যয়ের খাত নিম্নরূপ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“এই সাদাকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো ফকীরদের [ [এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই ফকীর, যে প্রয়োজনের কম জীবিকা লাভ করার কারণে সাহায্যের মুখাপেক্ষী। [লিসানুল আর: ৫ম খণ্ড, ৬০-৬১ পৃষ্ঠা, বৈরুত ১৯৫৬ ইং]] জন্যে, মিসকীনদের [উমর (রা) বলেছেন, মিসকীন সেই ব্যক্তি যে উপার্জন করতে পারেনা, কিংবা উপার্জন করার সুযোগ পায়না। [জাস্‌সাস : ৩য় খণ্ড, ১৫১ পৃষ্ঠা]। এই সংজ্ঞার আলোকে সেইসব গরীব শিশু যারা এখনো উপার্জনের যোগ্য হয়নি, সেইসব বিকলাংগ ও বৃদ্ধ যারা উপার্জন করার যোগ্য নয় এবং সেইসব বেকার ও রোগী যারা সাময়িকভাবে উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত— তারাই মিসকীন। জন্যে, সাদাকা আদায়-বন্টন বিভাগের কর্মচারীদের জন্যে, তাদের জন্যে যাদের মন আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য হবে, [রাসূলুল্লাহ (সা) যুগে মন আকৃষ্ট করার জন্যে তিন ধরনের লোককে অর্থদান করা হতো: [১] যেসব ইসলাম বিরোধী ব্যক্তি দুর্বল মুসলমানদের কষ্ট দিতো, কিংবা ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর শত্রুতা করতো। অর্থদান করে তাদের নম্র আচরণে রাজী করা হতো। [২] যারা শক্তি প্রয়োগ করে নিজ বংশ গোত্রের লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিতো, অর্থদান করে তাদেরকে এ আচরণ থেকে নিবৃত্ত করা হতো, [৩] যেসব নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করতো, তাদের আর্থিক সাহায্য করা হতো, যাতে করে তাদের হতাশা দূর হয় এবং নিশ্চিন্তে মুসলিম দলের সাথে অবস্থান করে। [জাস্‌সাস ৩য় খন্ড ১৫২]] দাস মুক্তির জন্যে, [ সেইসব মুসলমানও এর অন্তর্ভুক্ত, বিভিন্ন যুদ্ধে শত্রুরা যাদেরকে বন্দী করে দাস বানিয়ে নেয় এবং সেইসব অমুসলিমও এর অন্তর্ভুক্ত যারা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়ে ফিদইয়া দিয়ে মুক্তি লাভের চেষ্টা করে। তাছাড়া সেইসব দাসও এর অন্তর্ভুক্ত যারা পূর্ব থেকেই দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ ছিলো।] ঋণে নিমজ্জিতদের সাহায্যের জন্যে, আল্লাহর পথে [আল্লাহর পথ মানে জিহাদ ও হ্জ্জ। স্বেচ্ছাসেবী মুজাহিদ যদি নিজ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের মতো প্রভৃতি খরচের জন্যে ব্যক্তির অর্থ যথেষ্ট হতে পারেনা। একই ভাবে হজ্জের সফরেও যদি কারো পাথেয় শেষ হয়ে যায়, তবে তিনিও যাকাত লাভের অধিকারী। [জাস্‌সাস : ৩য় খন্ড, ১৫৬-১৫৭ পৃষ্ঠা। নায়লুল আওতার : ৪র্থ খণ্ড, ১৪৪-১৪৬ পৃষ্ঠা]।] এবং পথিকদের সাহায্যের জন্যে [ পথিক যদি তার বাড়ীতে ধনী ব্যক্তিও হয়ে থাকেন, কিন্তু ভ্রমণকালে যদি সাহায্যের মুখাপেক্ষ হয়ে পড়েন, তবে তিনি যাকাত পাওয়ার অধিকারী হন। [আল জাস্‌সাস: ৩য় খণ্ড, ১৫৭ পৃষ্ঠা]।] এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি ফরয।” [আত তাওবা: ৬০]

১৮. উত্তরাধিকার আইন

কোনো পুরুষ বা মহিলার মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যাপারে কুরআনের বিধান হলো, এ সম্পত্তি তার পিতামাতা, সন্তানসন্ততি এবং তার স্ত্রী বা স্বামীর মধ্যে নির্ধারত নিয়মানুযায়ী বন্টিত হবে। পিতামাতা এবং সন্তানসন্ততি না থাকলে তার সহোদনর এবং বৈমাতৃক ও বৈপিতৃক ভাইভোনদের অংশ দিতে হবে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান সূরা নিসায় আলোচিত হয়েছে। [নবী করীম (সা) এ আইনের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, তার দৃষ্টিতে নিকটতম আত্মীয়স্বজন বর্তমান না থাকলে কিছুটা দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়রা উত্তরাধিকার লাভ করবে, সেরকম কেউ না থাকলে পরবর্তী পর্যায়ের লোকরা পাবে যারা অনাত্মীয়দের তুলনয় তার আত্মীয়। কিন্তু যদি কোনো ধরনের আত্ময়িই বর্তমান না থাকে, তখন তার পূরো সম্পত্তি ইসলামী রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হবে। [নায়লূল আওতার : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৪৭-৫৬]।] [দেখুন, আয়াত : ৭-১২, ১৭৬]। দীর্ঘ হবার ভয়ে এখানে সে আলোচনা উদ্ধৃত করলাম না।
এ ব্যাপারে কুরআনের মূলনীতি হলো, কোনো ব্যক্তির জীবদ্দশায় যে অর্থসম্পদ তার মালিকানাভুক্ত হয়েছে, তার মৃত্যুর পর তা আর কেন্দ্রীভূত থাকতে দেয়া যাবেনা। বরঞ্চ তার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। এই মূলনীতি বড় পুত্রের বা জৈষ্ঠত্বে উত্তরাধিকার প্রথা [Primo geniture], যৌথ পারিবারিক সম্পত্তি [Joint Family System] প্রথা এবং অনুরূপ অন্যান্য প্রধার সম্পূর্ণ বিপরীত, যেসব প্রথার মূল লক্ষ্য হলো, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তার পুঞ্জিভূত সম্পত্তি কেন্দ্রীভূত রাখা।
এমনি করে কুরআন পালকপুত্র গ্রহণের প্রথাকেও অস্বীকার করেছে। কুরআন আইন করে দিয়েছে যে, সত্যিকার আত্মীয়রাই কেবল উত্তরাধিকার লাভ করবে। কোনো পর মানুষকে পুত্র বানিয়ে কৃত্রিম উপায়ে উত্তরাধিকারী বানানো যাবেনা:
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ذَلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ
“আল্লাহই তোমাদের মুখডাকা [পালক] পুত্রদের তোমাদের পুত্র বানাননি। এটেতো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।” [আল আহযাব : ৪]
أُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ
“আল্লাহর কিতাবে আত্মীয়রাই পরস্পরের অধিকতর হকদার। ” [আল আহযাব : ৬]
কিন্তু প্রকৃত উত্তরাধিকারী আত্মীয়দের অধিকার পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করার পর কুরআন তাদেরকে উপদেশ দিয়েছে, উত্তরাধিকার বন্টনের সময় ওয়ারিশ নয় এমন আত্মীয়রা উপস্থিত হলে তাদেরকেও যেনো সন্তুষ্টচিত্তে কিছু না কিছু প্রদান করা হয়:
وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُو الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا () وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللَّهَ
“[উত্তরাধিকার] বন্টনের সময় যখন আত্মীয়, এতীম ও মিসকীন ব্যক্তিরা উপস্থি হবে, তখন তা থেকে তাদেরকেও কিছু দেবে এবং তাদের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলবে। একথা চিন্তা করে লোকদের ভয় করা উচিত যে, তারা নিজেরাও যদি অসহায় সন্তান রেখে চলে যায়, তবে মৃত্যুর সময় এই সন্তানতের জন্যে কতইনা আশংকা তাদেরকে পীড়িত করে। সুতরাং তারা যেনো আল্লাহকে ভয় করে।” [আন নিসা: ৮-৯]

১৯. অসীয়তের বিধান

কুরআন মজীদ উত্তরাধিকার আিইন নির্ধারণ করার সাথে সাথে মানুষকে উপদেশ দিয়েছে, তারা যেনো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে নিজেদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অসীয়ত করে:
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
“যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় এবং ‍সে অর্থসম্পত্তি রেখে যেতে থাকে, তখন বাবা মা ও আত্মীয়স্বজনের জন্যে বৈধ পন্থায় অসীয়ত করাটাকে তোমাদের জন্যে লিখে দেয়া হয়েছে। এটি মুক্তাকীদের উপর একটি অধিকার।” [আল বাকারা: ১৮০]
এ নির্দেশের উদ্দেশ্য ব্যাপক। একদিকে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি বিশেষভাবে স্বীয় পিতামাতার সাথে উত্তম আচরণের জন্যে নিজ সন্তানদের অসীয়ত করে যাবে। কেননা তাদের বৃদ্ধ দাদা দাদীকে খেদমতের আশা তাদের থেকে খুব কমিই করা যায়। অপরদিকে তার পরিবার যারা আইনগতভাবে উত্তরাধিকার লাভ করবেনা, সে যদি তাদেরকে সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত মনে করে তবে নিজ পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে তাদেরকে অংশ দেয়ার জন্যে অসীয়ত করে যাবে। তাছাড়া কোনো ব্যক্তি যখন মৃত্যুর সময় প্রচুর অর্থ সম্পদ রেখে যেতে থাকে, তখন তার পক্ষে জনকল্যাণমূলক কাজেও অসীয়ত করে যাওয়াও বৈধ। কেননা অসীয়তের অনুমতি কেবল পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের জন্যে সীমাবদ্ধ করাটা উপরোক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য নয়। [নায়লুল আওতার : ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩২-৩৩ পৃষ্ঠা। এক্ষেত্রে নবী করীমের (সা) ব্যাখ্যা থেকে কুরআনের বক্তব্যের যে উদ্দেশ্য জানা যায়, তা হলো, নিজেদের আত্মীয়স্বজনকে দরিদ্র ও পরমুখাপেক্ষী রেখে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা পছন্দনীয় নয়। নায়লূলা আওতার গ্রন্থে বুযখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থাবলীর সূত্রে নবী করীমের (সা) যে বাণী উদ্ধৃত হয়েছে তা হলো: “তোমাদের উত্তরাধিকারীদেরকে সুহালে রেখে যাওয়াটা, মুখাপেক্ষী ও পরের কাছে হাত পাততে হবে- এমন অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।”
অসীয়ত ও উত্তরাধিকারের এ আইন থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ব্যক্তিগত মালিকানার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যাপারে ইসলামের স্কীম হলো, অবশ্যি দুই তৃতীয়াংশ উত্তরাধিকার আইনে ভিত্তিতে বন্টন করতে হবে। আর এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুমুখী ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিতে হবে, যাতে করে সে তা যে কোনো উদ্দেশ্য ব্যয় করার জন্যে অসীয়ত করে যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, তা বৈধ পন্থায় হতে হবে। অর্থাৎ যে কাজের জন্যে অসীয়ত করে যাবে সে কাজটি বৈধ হতে হবে এবং তাতে কারো অধিকারও ক্ষুণ্ণ হতে পারবেনা। [অসীয়তের আইনের ব্যাখ্যা প্রসংগে নবী করীম (সা) অসীয়তের অধিকারের উপর তিনটি শর্তারোপ করেছেন। এক. নিজের পুরো সম্পদের এক তৃতীয়াংশের মধ্যে অসীয়তের অধিকার প্রয়োগ করা যাবে। দুই. যারা আইনগত ভাবে উত্তরাধিকা লাভ করবে, তাদের কারো জন্যে অন ওয়ারিশদের অনুমতি ছাড়া অসীয়ত করা যাবেনা। তিন. কোনো ওয়ারিশকে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার কিংবা তার অংশ কম করার অসীয়ত করা যাবেনা। [নায়লুল আওতার : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩১-৩৫।]

২০. অজ্ঞ ও নির্বোধের স্বার্থ সংরক্ষণ

অজ্ঞ, বোকা ও নির্বোধ হবার কারণে যারা নিজেদের মালিকানাধীন অর্থসম্পত্তি সঠিক ব্যয় ব্যবহার জানেনা বরং সম্পদ খোয়াতে থাকে, কিংবা নিশ্চিতভাবে আশংকা হয় যে, তারা তাদের সম্পদ খুইয়ে ফেলবৈ, তাদের ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশনা হলো, তাদের মালিকানা তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবেনা। বরঞ্চ তাদের সহায় সম্পদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অভিভাবক কিংবা বিচারকের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তাদের হাতে কেবল তখনই সোপর্দ করা যাবে, যখন আশ্বস্ত হওয়া যাবে যে, তারা নিজেরাই নিজ নিজ বিষয়াদির দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়ার উপযুক্ত হয়েছে:
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا () وَابْتَلُوا الْيَتَامَى حَتَّى إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
“তোমরা তোমারেদর সেই অর্থসম্পদ, যা আল্লাহ তোমাদের পরিচালনার উপায় বানিয়েছেন, অজ্ঞ নির্বোধ লোকদের হাতে ‍তুলে দিওনা। অবশ্য তা থেকে তাদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করো এবং তাদের সাথে উত্তম ও বিবেকসম্মত কথা বলো। আর এতীমদের পরীক্ষা করতে থাকো যতোদিন না তারা বিয়ের বয়সে উপনীত হয়। অতঃপর যখন তাদের মধ্যে সঠিক বিবেক বুদ্ধি সৃষ্টি হয়েছে বলে লক্ষ্য করবে, তখন তাদের অর্থসম্পদ তাদের দায়িত্বে ছেড়ে দাও।” [আন নিসা: ৫-৬]
এ আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তা হলো, ব্যক্তিমালিকানাধীন অর্থসম্পত্তিতে সেইসব ব্যক্তিদেরই স্বত্ব স্বীকৃত যারা আইনগতভাবে স্বত্বাধিকার লাভ করে। কিন্তু সে অর্থসম্পত্তি সম্পূর্ণরূপেই তাদের নয়। বরং তার সাথে জাতীয় ও সামাজিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। সে কারণেই কুরআন ‘তাদের সেই অর্থসম্পদ’ না বলে ‘তোমাদের সেই অর্থসম্পদ’ বলেছে। এ দৃষ্টিভংগির ভিত্তিতেই কুরআন অভিভাবক ও বিচারকদের এ অধিকার প্রদান করেছে যে, তারা যেখানেই ব্যক্তিমালিকানাধীন অর্থসম্পদরে অপব্যবহার দ্বারা সমাজের সামগ্রিক ক্ষতি দেখবেন, কিংবা ক্ষতি হবার যক্তিসংগত আশংকা করবেন, সেখানেই ব্যক্তির স্বত্বাধিকার ও স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে তার ব্যয় ব্যবহারের অধিকার নিজের হাতে তুলে নেবেন। [ইবনুল আরাবীঃ আহকামুল কুরআন : ১ম খন্ড ১৩৩ পৃঃ। ইবনে কাসীর : তাফসীরুল কুরআন : ১ম খণ্ড ৪২৫ পৃষ্ঠা। আল জাসসাস: আহকামুল কুরআন: ২য় খন্ড ৭২-৭৩ পৃঃ।]

২১. জাতীয় মালিকানায় সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণ

যেসব দ্রব্যসামগ্রী, অর্থসম্পদ এবং আয় আমদানী রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকবে, সেগুলোর ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশ হলো, সেগুলো ব্যয় ও ভোগ ব্যবহার কেবল অর্থশালী শ্রেণীর স্বার্থে হতে পারবেনা, বরঞ্চ সাধারণ জনগণের স্বার্থে হতে হবে, বিশেষ করে, সেগুরো মাধ্যমে দুর্বল শ্রেণীর কল্যাণের প্রতি সার্বিক গুরুত্ব দিতে হবে।
مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ…… لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ…… وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ…. وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ
“আল্লাহ এই জনপদের লোকদের থেকে যা কিছুই তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা আল্লাহর জন্যে, রাসূলের জন্যে, [এর অর্থ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়। এ উৎস থেকেই নবী করীম (সা) এবং তাঁর খলীফাগণ নিজেদের ভাতা গ্রহণ করতেন এবং সরকারী কর্মচারীদের [যাকাত বিভাগে কর্মচারীদের বাদে] বেতন প্রদান করতেন। যাকাত বিভাগের কর্মচারীদের বেতন যাকাতের অর্থ থেকেই দেয়া হতো।] [তাঁর] আত্মীয়স্বজনের জন্যে, [এর ব্যাখ্যার জন্যে এ অধ্যায়ের ২১ নম্বর টীকা দেখুন।] এতীমদের জন্যে এবং মিসকীন ও পথিকদে জন্যে। [ এ বিধান এজন্যে দেয়া হলো] যাতে করে তা কেবল তোমাদের মধ্যকার ধনীদের মধ্যেই আর্তিত হতে না থাকে। …… তাছাড়া সেইসব দরিদ্র মুহাজিরদের জন্যেও যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও বিষয় সম্পত্তি থেকে বিতাড়িত ও বহিষ্কৃত হয়ে এসেছে। …. আর তাতে সেই আনসারদেরও অধিকার রয়েছে, যারা মুহাজিরদের আগমনের পূল্ব থেকেই ঈমান এনে দারুল ইসলামে বসবাস করছে।…. তাছাড়া পরবর্তীতে আসা লোকদের অধিকারও তাতে রয়েছে।” [আল হাশস: ৭-১০]

২২. করারোপের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি

করারোপের ক্ষেত্রে কুরআনের যে মূলনীতির প্রতি পথনির্দেশনা দান করে তা হলো, করের বোঝা কেবল সেইসব লোকদের ঘাড়ে চাপবে, যারা প্রয়োজনের অতিরিক্স ধনসম্পদের মালিক। তাছাড়া তাদের অর্থসম্পদের সেই অংশের উপরই কেবল কর চাপাতে হবে, প্রয়োজন সেরে যা উদ্বৃত্ত থাকে।
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ
“তারা তোমার কাছে জানতে চায়, তারা কি ব্যয় করবে? তুমি বলো: যা তোমাদের প্রয়োজন সেরে উদ্বৃত্ত থাকে।” [আন নিসা: ২১৯]

ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

কুরআনের এই ২২ দফা নির্দেশনায় মানুষের অর্থনৈতিক জীবরে জন্যে যে স্কীম প্রণয়ন করা হয়েছে, তার বুনিয়াদী নীতিমালা ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:
[১] এই স্কীম এমন প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে একদিকে যেমন সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক যাল্ম এবং বল্গাহীন লাভ ও দখরদারী নীতির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, অপরদিকে তেমনি সমাজের উত্তম নৈতিক গুণাবলী বিকশিত হবার সুযোগ লাভ করে। কুরআন এমন কোনো সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়না, যেখানে ব্যক্তিগতভাবে কেউ কারো কল্যাণ সাধন করতে সক্ষম হবেনা, যেখানে ব্যক্তির প্রতিটি কল্যাণ সমাজ ব্যবস্থা এ করণে চায়না যে এরূপ ক্ষেত্রে সমাজের নৈতিক গুণাবল বিকশিত হবার কোনো সুযোগ থাকেনা।
পক্ষান্তরে কুরআন এমন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সাথে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও স্বার্থহীন দানশীলতা, সহানুভূতি ও দয়া অনুগ্রহের আচরণ করবে, যার ফলে তাদের মাঝে পারস্পরিক প্রীতি ও ভালবাসার প্রসার ঘটার সুযোগ হবে। এ উদ্দেশ্যে কুরআন মানুষের মধ্যে ঈমান সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ বানাবার পন্থার উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। এর পরও যদি কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে যায় তাহলে সেসব ত্রুটি দূর করার জন্যে ইসলাম সেইসব বল প্রয়োগমূলক আইনের আশ্রয় নেয় যা সামাজিক সাফল্যের জন্যেঅপিহার্য। [দফা নম্বর: ৮-১৩ এবং ১৫-১৯]
[২] এই স্কীমে অর্থনৈতিক মূল্যবোধকে নৈতিক মূল্যবোধ থেকে পৃথক রাখা হয়নি। বরং উভয় নীতিকে ওতপ্রোতভাবে জাড়িত করে দেয়া হয়েছে। এখানে অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান করা হয়নি। বরঞ্চ সেই পূর্ণাংগ জীবন ব্যবস্থার ইমারত কাঠামোর মধ্যে সমাধান করা হয়েছে, ইসলাম যার ভিত স্থাপন করেছে পরিপূর্ণরূপে খোদার দাসত্ব ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে, নৈতিক দর্শন ও বিশ্বাসের উপর। [দফা: ১, ২, ৪, ৫]
[৩] এই স্কীমে পৃথিবীর অর্থনৈতিক উপায় উপকরণকে গোটা মানব জাতির উপর মহান আল্লাহর সাধারণ দান ও অনুগ্রহ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই এর লক্ষ্য হলো, ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা জাতীয় আধিপত্যের পরিবর্তে আল্লাহর দুনিয়ার সকল মানুষকে জীবিকা উপার্জনের জন্যে যতোটা সম্ভব উন্মুক্ত সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। [দফা: ৫]
[৪] এই স্কীমে ব্যক্তিমালিকানার অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা বল্গাহীন নয়। ব্যক্তির ব্যক্তিগত মালকানাধিকারের উপর অপরাপর ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করার সাথে সাথে এই স্কীমে প্রত্যেক ব্যক্তির অর্থসম্পদ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, অভাবী, হতভাগা মানুষ এবং সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজের অধিকারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব অধিকারে মধ্যে কিছু কিছু আইনগতভাবে কার্যকর, আবার কিছু কিছু বুঝ ও উপলব্ধি সৃষ্টি এবং নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। [দফা: ৩, ৫, ৭-১৫, ১৭, ১৯. ২০]।
[৫] এই পরিকল্পনার দৃষ্টিতে মানব জীবরে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো, লোকেরা তা নিজ নিজ স্বাধীন চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে পরিচালনা এবং বিকশিত করবে। কিন্তু এই স্বাধীন চেষ্টা সাধনাও আবার বিধিবন্ধনহীন রাখা হয়নি। বরঞ্চ সমাজের এবং স্বয়ং সেই ব্যক্রিদের নৈতিক, তামদ্দুনিক ও অর্থনৈতক কল্যাণের জন্যে কিচু সীমারেখা দ্বারা চেষ্টা সাধনাকে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। [দফা: ৬. ৭,. ১৫, ২২]।
[৬] এতে নারী পুরুষ উভয়কে তাদের নিজ নিজ উপার্জিত, উত্তারিধার সূত্রে অর্জিত এবং অন্যান্য বৈধ পন্থায় প্রাপ্ত অর্থসম্পদের সমান স্বত্তাধিকারী ঘোষণা করা হয়েছে। উভয়কে নিজ নিজ অধিকারবুক্ত অর্থসম্পদ থেকে সমানভাবে উপকৃত হবার অধিকার দেয়া হয়েছে। [দফা : ৩, ৪. ১৮]।
[৭] এ স্কীমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যে একদিকে মানুষকে কৃপণতা ও বৈরাগ্য ত্যাগ করে আল্লাহর নিয়ামতের ভোগ ব্যবহারের জন্যে উৎসাহিত করা হয়েছে, অপরদিকে তাদেরকে অপব্যয়, বাহুল্য খরচ এবং বিলাসিত থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। [৫, ৮-১০]
[৮] অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে এতে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থসম্পদের প্রবাহ যেনো ভ্রান্ত ও অবৈধ উপায়ে কোনো বিশেষ দিকে প্রবাহিত হতে না থাকে এবং বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থসম্পদও যেনো কোনো একস্থা পুঞ্জিভূযত হয়ে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এই স্কীমে অর্থসম্পদের বেশী বেশী ব্যবহার ও আবর্তেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর এই আবর্তন থেকে বিশেষভাবে সেইসব লোকেরাই অংশ পাবে, যারা কোনো না কোনো কারণে নিজেদের ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে। [দফা : ৬-১০,. ১২-১৫, ১৭-১৯, ২১]।
[৯] এই স্কীম অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে আইন ও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের উপর অধিক নির্ভরশীর নয়। কতিপয় অপরিহার্য দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দেবার পর অবশিষ্ট সমস্ত প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন ব্যক্তির মানসিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ এবং সমাজ সংশোধনের মাধ্যমে করা হয় যাতে স্বাধীন চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে অর্থনীতির যৌক্তিক দাবীসমূহ অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে। [দফা: ৫-২২]
[১] সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষের মধ্যে শ্রেণীগত সংঘাত সৃষ্টি করার পরিবর্তে ও ব্যবস্থা সংঘাতের কার্যকারসমূহকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতার স্পিরিট সৃষ্টি করে দেয়। [দফা: ৪, ৬-১১, ১২, ১৫-১৭, ২১, ২২]
এসব বৈশিষ্ট্য ও নীতিমালা যেভাবে নবী করীম (সা) এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ বাস্তবে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় কার্যকর করা হয়েছিল, তা থেকে বিধান ও দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা আরো অনেক ব্যবস্থায় কার্যকর করা হয়েছিল, তা থেকে বিধান ও দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা আরো অনেক বিস্তারিত রূপরেখা জানতে পারি। কিন্তু সে আলোচনা বর্তমান আলোচ্য বিষয় বহির্খভূত। সে সম্পর্কে হাদী, ফিকা, ইতিহাস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে ব্যাপক তথ্যাদি মওজুদ রয়েছে। বিশদভাবে জানার জন্যে সেসব গ্রন্থাবলী অধ্যায়ন করা যেতে পারে।

গ্রন্থসূত্র

কুরআনে হাকীম।
বায়দাবী: আনোয়ারুত তানযীল। সংস্করণ: মুস্তফা আলবাবী হালবী, মিশর ১৩৩০ হিঃ ৯১৯১২)।
আলূসী: রূহুল মুয়ানী: সংস্করণ : ইদারাতুত তবায়াতূল মুনীরীয়া, মিশর ১৩৪৫ হিঃ।
আল জাসসাস: আহকামুল কুরআন। আল বাহীয়া সংস্করণ, মিশর ১৩৪৭ হিঃ
ইবনুল আরাবী : আহকামুল কুরআন: আস সায়অদা সংস্করণ, মিশর ১৩৩১ হিঃ।
ইবনে জরীর: জামেউল বয়ান। আল আমীরীয়া সংস্করণ, মিশর ১৩২৮ হিঃ।
ইবনে কাসীর: তাফসীরুল কুরআনিল আযীম। সংস্করণ: মুস্তফা মুহাম্মত, মিশর ১৯৪৭ ইং।
আয যমখশরী: আল কাশশাফ। আল বাহীয়া সংস্করণ, মিশর ১৩৪৩ হিঃ।
আল বুখারী: সহীহ
মুসলিম : সহীত
আবু দাউদ: সুনান।]
তিরমিযী : সুনান।
নাসায়ী: সুনান।
ইবনে মাজাহ: সুনানে মুস্তফা।
আশ শওকানী : নায়লুল আওতার। সংস্করণ: দায়িরাতুল মা’আরিফ, হায়দারাবাদ, ১৩৩৭ হিঃ।
ইবনে আবদুল বার: আল ইসতীয়াব। সংস্করণ: ঐ।
ইবনে মনয়ূব”: লিসানুল আরব, বৈরুত ১৯৫৬ ইং।

তৃতীয় অধ্যায়ঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও পুঁজিবাদের মধ্যে পার্থক্য

পুঁজিবাদ ও কমিউনিজমের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ইসলাম যে ভরসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক মতাদর্শ অবলম্বন করেছ তার ভিত্তিতে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগড়ে তোলার জন্য ইসলাম নৈতিক শক্তি ও আইন- এ উভয়ের সাহাড্য নিয়েছে। নৈতিক শিক্ষার সাহায্যে ইসলাম সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির মন মানসকে এ ব্যবস্থার স্বতস্ফূর্ত আনুগত্য করার জন্য তৈরী করে। অন্যদিকে আইনের বলে মানুষের উপর এমন সব বিধি নিষেধ আরোপ করে যার ফলে মানুষ এ ব্যবস্থার চৌহদ্দীর মধ্যে নিজেদেরকে আটকে রাখতে বাধ্য হয় এবং এর সুদৃঘ প্রাচীর ভেদ করে যেতে পারেনা। এ নৈতিক বিধি বিধান ও আইনসমূহ হচ্ছে ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূল স্তম্ভ। নৈতিকতা, আইন এবং ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করার জন্য এসবের বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

এক: উপার্জনে বৈধ অবৈধের পার্থক্য

এ প্রসঙ্গে প্রথম কথা হচ্ছে, ইসলাম এর অনুসারীদেরকে অর্থ উপার্জন করার অবাধ সুযোগ দেয় না; বরং উপার্জনের পন্থা ও উপায়ের ক্ষেত্রে সামাজিক স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে বৈধ ও অবৈধতরা পার্থক্য সৃষ্টি করে। এ পার্থক্যের একটা মূলনীতি রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, ধন উপার্জনের যেসব পন্থা ও উপায় অবলম্বিত হলে এক ব্যক্তির লাভ ও অন্য ব্যক্তির বা ব্যক্তিবর্গের ক্ষতি হয় তা সবই অবৈধ। অন্যদিকে যেসব উপায় অবলম্বন করলে ধন-উপার্জন প্রচেষ্টার সাথে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিই তার ন্যায়সংগত সুফল ভোগ করতে পারে তা সবই বৈধ। এ মূলনীতিটি কুরআন মজীদে নিম্নোক্তভাবে নিবৃত হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا () وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ عُدْوَانًا وَظُلْمًا فَسَوْفَ نُصْلِيهِ نَارًا
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের ধনসম্পদ অবৈধ উপায়ে ভক্ষণ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতি অনুযায়ী ব্যবসায়িক লেন-দেন করতে পারো। আর তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে (অথবা পরস্পর পরস্পরকে) ধ্বংস করোনা। আল্লাহ তোমাদের অবস্থার প্রতি করুণাশীল। যে ব্যক্তি সীমা অতিক্রম ক’রে যুল্ম সহকারে এরূপ করবে তাকে আমি অগ্নির মধ্যে নিক্ষেপ করবো।” [আন নিসা: ২৯-৩০]
এ আয়াতে পারস্পরিক লেন দেনকে ব্যবসা বলা হয়েছে। পারস্পরিক সম্মাতিকে এর সাথে শর্ত হিসাবে সংযুক্ত করে এমন সব লেন-দেন অবৈধ গণ্য করা হয়েছে যার মধ্যে চাপ সৃষ্টি ও প্রতরণার কোনো উপকরণ থাকে অথবা এমন কোনো চালবাজিী থাকে যা দ্বিতীয় পক্ষ জানতে পালে এ লেনস দেনে নিজের সম্মতি প্রকাশে কোনোদিনই প্রস্তুত হবে না। এর পর আরো জোর দেয়ার জন্য বলা হয়েছে “তোমরা পরস্পরকে ধ্বংস করোনা।” এর দু’টি অর্থ হতে পারে। এ দু’টি অর্থই এখানে প্রযোজ্য। একটি অর্থ হচ্ছে, তোমরা একে অন্যকে ধ্বংস করোনা এং দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে, তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, যে ব্যক্তি নিজের লাভের জন্য অন্যের সর্বনাশ করে সে যেন রক্তপাণ করে এবং পরিণামে সে এভাবে নিজের ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করে।
এ নীতিগত নির্দেশ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অর্থ উপার্জনের নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলোকে হারাম গণ্য করা হয়েছেঃ
উৎকোচ (আল বাকারা ১৮৮ আয়াত)
ব্যক্তি, সমষ্টি নির্বিশেষে সবার আত্মসাত (আল বাকারা ২৮৩ ও আলে ইমরা ন ১৬১ আয়াত)
চুরি (আল মায়িতা ৩৮ আয়াত)
এতীমের অর্থ অন্যায়বাবে তসরূপ (আন নিসা ১০ আয়াত); ওজনে কম করা (আল মুতাফ্ফিফীন ৩ আয়াত)
চারিত্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী উপকরণসমূহের ব্যবসা (আন নূর ১৯ আয়াত)
জুয়া ও এমন সব উপায় উপকরণ যেগুলোর মাধ্যমে নিছক ঘটনাচক্রে ও ভাগ্যক্রমে একদল লোকের সম্পদ অন্য একদল লোকের হস্তান্তরিক হয় (আল মায়িদা ৯০ আয়অত)
মূর্তি গড়, মূর্তি বিক্রয় ও মূর্তি উপাসনালয়ের সেবা (আল মায়িদা ৯০ আয়াত)
ভাগ্য গণনা ও জ্যোতিষির ব্যবসা (আল মায়িতা ৯০ আয়াত)
সুদ খাওয়া (আল বাকারা ২৭৫, ২৭৮ থেকে ২৮০ এবং আলে ইমান ১৩০ আয়াত)

দুই: ধন সঞ্চয়ের নিষেধাজ্ঞা

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হচ্ছে যে, বৈধ উপায়ে যে ধন উপার্জন করা হবে তা পুঞ্জীভীত ক’রে রাখা যাবে না। কারণ এর ফলে ধনের আবর্তন বন্ধ হয়ে যায় এবং ধন বন্টনের ভারসাম্য বিনষট হয়। যে ব্যক্তি ধন সঞ্চয় করে রাশিকৃত ও পুঞ্জীভূত করে রাখে সে নিজে যে কেবল মারাত্মক নৈতিক রোগে আক্রান্ত হয় তাই নয় বরং মূলত সে সমগ্র মানব সমাজের বিরুদ্ধে একটি জঘন্যতম অপরাধ করে। এর ফল তার নিজের জন্যও খারাপ হয়। এজন্য কুরআন কার্পণ্য এবং কারুনের ন্যায় সম্পদ কুক্ষিগত ও পুঞ্জীভূত করে রাখার বিরোধিত করেছে কঠোরভাবে। কুরআন বলে
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ
“যারা আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহে কৃপণতা করে, তারা যেন একথা মনে না করে যে, তাদের এ কাজ তাদের জন্য মঙ্গলজনক; বরং প্রকৃতপক্ষে এটা তাদের জন্য ক্ষতিকর।” [আলে ইমরান : ১৮০]
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
‘যারা স্বর্ণ রৌপ্য সঞ্চয় করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকেজ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও।’ [আত তাওবা: ৩৪]
এই ঘোষণা পুঁজিবাদের ভিত্তি-তে আঘাত হানে। উদ্বৃত্ত অর্থ জমা করে রাখা এবং জমাকৃত অর্থ আরো অধিক অর্থ সংগ্রহে খাটানো- এটিই হচ্ছে পুঁজিবাদের মূলকথা। কিন্তু ইসলাম আদতে প্রয়োজনের অতিরিক্স অর্থ জমা করে রাখা পছন্দ করেনা।

তিন : অর্থ ব্যয় করার নির্দেশ

সঞ্চয় করার পরিবর্তে ইসলাম অর্থ ব্যয় করার শিক্ষা দেয়। কিন্তু ব্যয় করার অর্থ বিলাসিতা ও আয়েম আরামের জীবন যাপন করে দু-হাতে অ্থ লুটানো নয়; বরং ব্যয় করার ক্ষেত্রে ‘আল্লাহর পথে’র শর্ত আরোপ করে। অর্থাৎ সমাজের কোনো ব্যক্তির নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে সমাজের জন্য কল্যাণমূলক কাজে তা ব্যয় করতে হবে। এটিই হবে আল্লাহর পথে ব্যয়।
وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ
“তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে যে, তারা কী ব্যয় করবে? তাদেরকে বলে দাও, যা তোমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত (তাই ব্যয় কর)।” [আল বাকারা: ২১৯]
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ
“আর সদ্ব্যবহার কর নিজের মা বাপ, আত্মীয়স্বজন, অভাবী মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, নিজের মোলাকাতি বন্ধুবর্গ, মুসাফির ও মালকনাধীন দাসদাসেীদের সাথে।” [আন নিসা: ৩৬]
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
“তাদের অর্থসম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার আছে।” [আয যারিয়াত আয়াত: ১৯]
এখানে এসে ইসলাম ও পুঁজিবাদের দৃষ্টিকোণ সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়।
বিত্তবান মনে করে, অর্থ ব্যয় করলে অর্থ কমে যাবে না বরং এতে বরকত হবে ও বৃদ্ধি হবে।
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَغْفِرَةً مِنْهُ وَفَضْلًا
“শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং কার্পণ্যের ন্যায় লজ্জাকর কাজের হুকুম দেয়; কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট মাগফিরাত ও অতিরিক্স দানের ওয়াদা করেন।” [আল বাকারা: ২৬৮]
বিত্তবান মনে করে কোনো কিছু ব্যয় করা হলে তা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ইসলাম বলে, না, তা নষ্ট হয়ে যায়নি বরং তার সর্বোত্তম লাভ তোমাদের নিকট ফিরে আসবে।
وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
“সৎ কাজে তোমরা যা কিচু ব্যয় করবে তা তোমরা পুরোপুরি ফেরত পাবে এবং তোমাদের উপর কোনোক্রমেই যুল্ করা হবেনা।” [আল বাকারা: ২৭২]
وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَنْ تَبُورَ () لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُمْ مِنْ فَضْلِهِ
“যারা আমার প্রদত্ত রিযিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে তারা এমন একটি ব্যবসয়ের আশা রাখে, যাতে কোনক্রমেই লোকসানের সম্ভাবনা নেই। আল্লাহ তাদেরকে এর বিনিময়ে পুরোপুরি ফল প্রদান করবেন বরং মেহেরবানী করে তাদেরকে আরো বেশী দান করবেন।” [ফাতির: ২৯-৩০]
বিত্তবান মনে করে, সম্পদ আহরণ করে সুদী ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে সম্পগদ বেড়ে যায়। কিন্তু ইসলাম বলে, না, সুদের মাধ্যমে বরং সম্পদ কমে যায়। সৎকাজে অর্থ বিনিয়োগ করলেই সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
‘আল্লাহ সুদ নির্মূল করেন এবং দান-সাদকাকে প্রতিপারণ ও ক্রমবৃদ্ধি দান করেন।’ [আল বাকারা: ২৭৬]
وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ
“তোমরা এই যে সুদ দাও মানুষের ধনসম্পদ বৃদ্ধির আশায়, জেনে রাখ, আল্লাহর নিকট তা কখনো বৃদ্ধি লাভ করেনা। তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাকাত বাবদ যে অর্থ দান করে থাক একমাত্র তার মধ্যেই ক্রমবৃদ্ধি হয়ে থাকে।” [আর রূম : ৩৯]
পুঁজিবাদের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এটি আর একটি নতুন মতবাদ। ব্যয় করলে অর্থ বেড়ে যাবে এবং ব্যয়িত অর্থ নষ্ট হবে না তাই নয় বরং কিছুটা অতিরিক্স লাভ ও কল্যাণসহ পূর্ণমাত্রায় ফিরে আসবে; অন্যদিকে সুদী ব্যবসা অর্থ বৃদ্ধির পরিবর্তে অর্থ হ্রাস ও লোকসানের সূচনা করবে এবং যাকাত ও সাদকার মাধ্যমে অর্থ হ্রাসের পরিবর্তে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে- এ মতবাদটি আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভূত ও বিস্ময়কর মনে হবে। শ্রোতা মনে করে সম্ভবত এগুলো নিছক আখেরাতের সওয়াবের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার। নিঃসন্দেহে আখেরাতের সওয়াবের সাথে এসব কথার সম্পর্ক রয়েছে এবং ইসলারেম দৃষ্টিতে এটিই আসল গুরুত্বের অধিকারী। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, এ দুনিয়াতেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এ মতাদর্শ একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ধন সঞ্চয় করে সূদী ব্যবসায় নিয়োগ করার অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ চতুর্দিক থেকে ধন আহরিত হয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে চলে আসবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়-ক্ষমাত প্রতিদিন কমে যেতে থাকবে। কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা সর্বত্র মন্দভাব দেখা দেবে। জাতীয় অর্থনৈতিক জীবন ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌছে যাবে। অবশেষে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে যার ফলে পুঁজিপতিরাও নিজেদের সীমায় পৌছে যাবে। অবশেষে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে যার ফলে পুঁজিপতিরাও নিজেদের সঞ্চিত ধনসম্পদ অর্থ উৎপাদনের কাজে লাগাবার সুযোগ পাবেনা।[রাসূলে করীম (সা) নিম্নোক্ত হাদীসটিতে একথার প্রতিই ইংগিত করেছেন: (আরবী**************)
অর্থাৎ “সুদের পরিমাণ যত বেশী হোক না কেন অবশেষে তা কম হতে বাধ্য।”]
বিপরীত পক্ষে অর্থসম্পদ ব্যয় করলে এবং যাকাত ও সাদকা দান করলে জাতির সকল ব্যক্তির হাতে এ সম্পদ ছড়িয়ে পড়ে, পত্যেক ব্যক্তি যথেষ্ট ক্রয়- ক্ষমতার অধিকারী হয়, শিল্পোৎপাদন বেড়ে যায়, সবুজ ক্ষেতগুলো শস্যে ভরে ওঠে, ব্যবসা বাণিজ্যে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। এতে হয়তো কেউ লাখপতি-কোটিপতি হয় না কিন্তু সবার অবস্থা সচ্ছল হয় এবং পরিবার হয় সমৃদ্ধশালী। এ শুভ পরিণামসম্পন্ন অর্থনৈতিক মতাদর্শটির সত্যতা যাচাই করতে হলে আমেরিকার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। [এ গ্রন্থ প্রণয়নের সময় আমেরিকায় যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দাভাব দেখা দিয়েছিল সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে।] সুদ ভিত্তিক অর্থব্যবস্থার কারণে সেখানে ধন বন্টনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে এবং শিল্প ও বাণিজ্যের মন্দাভাব জাতির অর্থনৈতিক জীবনকে ধ্বংসের প্রান্তসীমায় পৌঁছে দিয়েছে। এর তুলনায় ইসলামী যুগের প্রথম দিকের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যখন সেখানে পূর্ণাংগরূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয় তখন মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যার ফলে লোকেরা যাকাত গ্রহীতা খুঁজে বেড়াতো কিন্তু কোথাও তাদের সন্ধান পাওয়া যেত না। এমন একজন লোকের সন্ধান পাওয়া যেতোনা, যে নিজেই যাকাত দেয়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করেনি। এ দুটি অবস্থাকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে আল্লাহ সুদকে কিভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং সাদকাকে ক্রমোন্নতি ও ক্রমবৃদ্ধি দান করেন তা দ্ব্যর্থহীনভাবে উপলব্ধি সম্ভব হবে।
ইসলাম পূঁজিবাদী মানসিকতা থেকে সম্পূরণ ভিন্নতর এক মানসিকতা সৃষ্টি করে। পুঁজিপতি একথা কল্পনাই করতে পারেনা যে, সুদ ছাড়া এক ব্যক্তি অর্থসম্পদের আরেক ব্যক্তিকে কেমন কর দিতে পারে। সে অর্থ ঋণ দিয়ে তার বিনিময়ে কেবল সুদই আদায় করেনা, বরং নিজের মূলধন ও তার সুদ আদায় করার জন্য ঋণগ্রহীতার বস্ত্র ও গৃহের আসবাবপত্রদি পর্যন্ত ক্রোক করে নেয়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, অভাবীকে কেবল ঋণ দিলেই হবে না, বরং তার আর্থিক অনটন যদি বেশী থাকে তাহলে তার নিকট কড়া তাকাদা করা যাবেনা, এমনকি, ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা না থাকলে তাকে মাফ করে দিতে হবে।
وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
“ঋণ গ্রহীতা যদি অত্যধিক অনটন পীড়িত হয়, তাহলে তার অবস্থা সচ্ছল না হওয়া পর্যন্ত তাকে সুযোগ দাও; আর যদি তাকে মাফ করে দাও তাহলে তা হবে তোমার জন্য উত্তম। যদি তোমরা কিছু জ্ঞান রাখতে, তাহলে এর কল্যাণকারিতা উপলব্ধি করতে পারতে।” [আল বাকারা: ২৮০]
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পারস্পরিক সাহায্যের অর্থ হচ্ছে এই যে, প্রথমে পারস্পরিক সাহাড্য সমিতির তহবিলে অর্থ জমা কর আপনাকে এ সদস্য হতে হবে, তারপর আপনার যদি কখনো অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে সমিতির বাজারে প্রচলিত সাধারণ সুদের হারের তুলনায় কিছু কম হারে আপনাকে সুদী ঋণ দেবে। যদি আপনার কাছে অর্থ না থাকে তাহলে পারস্পরিক সাহায্য সমিতি থেকে আপনি কোনোই সাহায্য পাবেন না। বিপরীত পক্ষে ইসলাম যে পারস্পরিক সাহায্যের পরিকল্পনা দিয়েছে তা হচ্ছে এই সামর্থবান লোকেরা প্রয়োজনের সময় তাদের কম সামর্থবান ভাইদেরকে কেবল ঋণই দেবে না বরং তাদের ঋণ আদায় করার ব্যাপারেও সামর্থ অনযায়ী তাদেরকে সাহায্য করবে। তাই ‘আলগারেমীনা’ অর্থাৎ ঋণগ্রস্তদের ঋণ আদায় করে দেয়াকেও যাকাতের অন্যতম ব্যয়ের খাত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
পুঁজিপতি কখনো সৎকাজে কোনো অ্থ ব্যয় করলে নেহায়েত লোক দেখানোর উদ্দেশ্যেই তা করে থাকে। কারণ এ সংকীর্ণচেতা ব্যক্তি মনে করে যে, অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে কমপক্ষে সুনাম ও সুখ্যাতি তার অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু ইসলাম বলে, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করা উচিত নয় এবং প্রকাশ্যে বা গোপনে যা-ই ব্যয় করা হোক না কেন, সত্বর কোনো না কোন আকারে এর প্রতিদান পাওয়া যাবে-এ ধরনের কোনো উদ্দেশ্যও যেন এর পিছনে না থাকে। বরং কাজের পরিণতির প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। এ দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত যতদূর দৃষ্টি প্রসারিত করা যাবে সর্বত্রই দেখা যাবে, এ ব্যয়িত অর্থ সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং একের পর এক তা মুনাফা দিয়েই চলছে। “যে ব্যক্তি লোক দেখাবার উদ্দেশ্যে নিজের অর্থ ব্যয় করে, তার এ কাজকে এমন একটি প্রস্তরখণ্ডের সাথে তুলনা করা যেতে পারে যার উপর ছিল মাটির অস্তরণ, সে এ মাটির মধ্যে বীজ বপন করেছিল কিন্তু পানির একটি প্রবাহ আসলো এবং সমস্ত মাটি ধুয়ে নিয়ে চলে গেলো। আর যে ব্যক্তি নিজের নিয়ত ঠিক রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করে, তার এ কাজকে এমন একটি উৎকৃষ্ট জমির সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে একটি উদ্যান রচনা করা হয়েছে, বৃষ্টি হলে সেখানে দ্বিগুণ ফল উৎপন্ন হয়, আর বৃষ্টি না হলে নিছক ছোটখাট একটি স্রোতধারা তার জন্য যথেষ্ট।” [বাকারা: ৩৬]
إِنْ تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِنْ تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
“যদি প্রকাশ্যে সাদকা দাও তাও ভালো; কিন্তু যদি গোপনে দাও এবং দরিদ্রদের নিকট পৌঁছিয়ে দাও, তাহলে এটিই উত্তম হবে।” [আল বাকারা: ২৭১]
পুঁজিপতি যদি কখনো সৎকাজে কোনো অর্থ ব্যয় করে তাহলে তার পিছনে তার আবেগ ও সদিচ্ছা থাকে না; বরং অনিচ্ছাকৃতভাবেই তা করে থাকে এবং এজন্য সে সবচেয়ে নিকৃষ্টমানের সম্পদ ব্যয় করে; তারপর নিজের শাণিত বাক্য-বাণে বিদ্ধ করে অর্থগ্রহীতার অর্ধেক প্রাণ বের করে নেয়। বিপরীতপক্ষে ইসলাম সবচেয়ে ভালো সম্পদ ব্যয় করা এবং এজন্য নিজের অনুগ্রহ প্রকাশ না করা, এমনকি প্রতিতানে কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এ আশাও পোষণ না করার শিক্ষা দেয়।
أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ
“তোমরা যা কিছু উপার্জন করেছো, আর যা কিচু আমি জমি থেকে তোমাদের জহন্য বের করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় কর; আর বাছাই করে নিকৃষ্টতর বস্তু ব্যয় করোনা।” [আল বাকারা: ২৬৭]
لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى
“অনুগ্রহ প্রকাশ করে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের সাদকাসমূহ ধ্বংস করো না।” [আল বাকারা: ২৬৪]
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا () إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورً
“আর তারা আল্লাহর প্রতি ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মিসকীন এতীম ও কয়েদীকে আহার করায় এবং বলে, আমরা তোমারেদ খাওয়াচ্ছি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, (এজন্য) আমরা তোমাদের নিকট থেকে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রত্যাশী নই।” [আদ দাহর: ৮-৯]
নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দুটি মানসিকতার মধ্যে যে বিপুল ব্যবধান রয়েছে সে প্রশ্ন না হয় বাদই দিলাম। নিছক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও দু’টি মতাদর্শের মধ্যে ইসলামই হচ্ছে অধিক শক্তিশালী এবং সুদূরপ্রসারী ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর নির্ভুল। অতঃপর কল্যাণ ও ক্ষতি প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে আমি ইসলামের যে আদর্শ তুলে ধরেছি সেসব সামনে রেখে, ইসলাম কোনো অবস্থায় সুদী কারবারকে বৈধ গণ্য করতে পারে- এ কথা চিন্তা করার কোনো অবকাশ আছে কি?

চার: যাকাত

ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলাম যে দৃষ্টিভংগি পেশ করেছে তার সারমর্ম হচ্ছে এই যে, ধন একস্থানে পুঞ্জীভূত ও কুক্ষিগত হয়ে থাক পারবে না; ইসলামী সমাজের যে কয়জন লোক তাদের উতচ্চতর যোগ্যতা ও সৌভাগ্যের কারণে নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্স ধনসম্পদ আহরণ করবে, ইসলাম চায় তারা যেন এই সম্পদ পুঞ্জীভূত করে না রাখে, বরং এগুলো ব্যয় করে এবং এমন সব খঅতে ব্যয় করে যেখান থেকে ধনের আবর্তনের ফলে সমাজের স্বল্পবিত্তের লোকেরাও যথেষ্ট অংশ লাভ করতে সক্ষম হবে। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম একদিকে উন্নত নৈতিক শিক্ষা প্রদান, উৎসাহ দান ও ভীতি প্রদর্শনের শক্তিশালী অস্ত্র প্রয়োগ করে দানশীলতা ও যথার্থ পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার প্রবণতা সৃষ্টি করে। যাতে লোকেরা নিজেদের মনের স্বাভাবিক ইচ্ছা আকাংখা অনুযায়ী ধনসম্পদ সঞ্চয় করাকে খারাপ জানবে এবং তা ব্যয় করতে উৎসাহী আগ্রহী হবে। অন্যদিকে ইসলাম এমনসব আইন প্রণয়ন করে, যার ফলে বাদান্যতার এ শিক্ষা সত্ত্বেও নিজেদের অসৎ মনোবৃত্তির কারণে যেসব লোক সম্পদ আহরণ ও পুঞ্জীভূত করে রাখতে অভ্যস্ত হয় অথবা যাদের নিকট কোনো না কোনোভাবে সম্পদ সঞ্চিত হয়ে যায় তাদের সম্পদ থেকে সমাজের কল্যাণ ও উন্নতি বিধানার্থে কমপক্ষে একটি অংশ অবশ্যই কেটে নেয়া হবে। একেই যাকাত বলা হয়। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এ যাকাতকে অত্যধিক গুরুত্ব দান করা হয়েছে, এমনকি একে ইসলামের একটি মূলস্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নামাযের পরে এ যাকাতের উপরই সবেচেয়ে বেশী জোর দেয়া হয়েছে এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি অর্থসম্পদ সঞ্চয় করে, যাকাত না দেয়া পর্যন্ত তার ঐ সম্পদ হালাল হতে পারে না।
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
“(হে নবী!) তাদের ধনসম্পদ থেকে একটি সাদকা গ্রহণ কর, যা ঐ ধনসম্পদকে পাক পবিত্র ও হালাল করে দেবে।” [আত তাওবা: ১০৩]
এখানে ‘একটি সাদকা’ শব্দটি থেকে সাদকার একটি বিশেষ পরিমাণ বুঝা যায়। এ সঙ্গে রাসূলে করীম (সা)-কে এটি আদায় করার নির্দেশ দেয়ার ফলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সাধারণ স্বেচ্ছাপ্রদত্ত সাদকা থেকে আলাদা এটি একটি ওয়াজিব ও ফরয সাদকা অর্থাৎ যাকাত এবং বিত্তশালী লোকদের নিকট থেকে এ সাদকা অবশ্যই আদায় করতে হবে। কাজেই এ নির্দেশ অনুযায়ী রাসূলে করীম (সা) বিভিন্ন প্রকার সম্পদের জন্য নিসাবের (যে সর্বনিম্ন পরিমাণের উর্ধে যাকাত অপরিহার্য) একটি পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। অতঃপর নিসাব পরিমাণ বা তদূর্ধ বিভিন্ন প্রকার সম্পদের উপর যাকাতের বিভিন্ন হার নির্ধারণ করেছেন। সোনা, রূপা ও নগদ টাকা পয়সার উপর শতকরা আড়াই ভাগ এবং কৃষি উৎপাদনের উপর সেচ ব্যবস্থার আওতাধীন জমি হলে শতকরা ৫ভাগ ও সেচ ব্যবস্থার আওতা বহির্ভূত জমি হলে শতকরা ১০ ভাগ, ব্যবসায়িক পণ্যের উপর শতকরা আড়াই ভাগ, খনিজ দ্রব্যাদি (নিজস্ব মালিকানাধীন) ও গুপ্তধনের উপর শতকরা ২০ ভাগ যাকাত ধার্য করেছেন। এভাবে ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত গবাদি পশু প্রভৃতি চতুষ্পদ প্রাণীর উপর বিভিন্ন হারে যাকাত ধার্য করেছেন।
আয়াতের শেষ শব্দটি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বিত্তশালী ব্যক্তির নিকট যে অর্থসম্পদ সঞ্চিত হয় ইসলামের দৃষ্টিতে তা অপবিত্র এবং তার মালিক তা থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে একটি বিশেষ পরিমাণ আল্লাহর পথে ব্যয় না করা পর্যন্ত তা পবিত্র হতে পারেনা। ‘আল্লাহর পথে’ শব্দটির অর্থ কি? আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর অর্থসম্পদের প্রয়োজন নেই, তিনি অভাবীও নন। কাজেই তাঁর ‘পথ’ বলে একথাই বুঝানো হয়েছে যে, বিত্তশালীদের সম্পদ ব্যয় করে জাতির দরিদ্র ও অভাবী লোকদেরকে সচ্ছল করার চেষ্টা করতে হবে এবং এমনসব কল্যাণমুলক কাজে এ সম্পদ নিয়োগ করতে হবে যা থেকে সমগ্র লাভবান হবে।
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“মূলত সাদকা-যাকাত হচ্ছে ফকির [ফকির এমন সব লোকদের বলা হয় যারা নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে কম রোজগার করার কারণে অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। (লিসানুল আরব)] মিসকীনদের [মিসকীনদের সংজ্ঞা বর্ণনা করে হযরত উমর (রা) বলেছেন: যারা অর্থ উপার্জন করতে পারে না অথবা অর্থ উপার্জনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে যে দরিদ্র শিশু এখনো অর্থ উপার্জনের যোগ্যতা রাখে না এবং যেসব বেকার ও রুগ্নব্যক্তি সাময়িকভাবে উপার্জনের যোগ্যতা বঞ্চিত— তারা সবা ই মিসকীন।] জন্য এবং তাদের জন্য যাদেরকে সাদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করা হয, তাদের জন্য যাদের হৃদয়কে শক্তিশালী করার প্রয়োজন হয়, [এ দলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এমনসব নওমুসলিম যারা কুফর থেকে ইসলামে প্রবেশ করার কারণে সংকট জর্জরিত হয়েছে।]
লোকদেরকে বন্দীত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য, ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করার জন্য, আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য এবং মুসাফিরদের [মুসাফির ব্যক্তির গৃহে সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও সফর অবস্থায় অর্থ সংকটে পড়লে অবশ্যিই সে যাকাত গ্রহণের হকদার।]
জন্য।” [আত তাওবা: ৬০]
এটিই মুসলমানদের কো-অপারেটিভ সোসাইটি, তারেদ ইনসিউরেন্স কোম্পানী এবং প্রতিভেন্ট ফান্ড। এখান থেকেই মুসলিম সমাজের বেকারদেরকে সাহায্য করা হয়। তাদের অক্ষম, বিকলাংগ, রুগ্ন, এতীম, বিধবা ও কর্মহীনদেরকে এ ব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রতিপালন করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, এ ব্যবস্থা মুসলমানদেরকে ভবিষ্যত অন্য সংস্থানের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে। এর সহজ নীতি হচ্ছে, আজ এক ব্যক্তি বিত্তবান কাজেই সে অন্যকে সাহায্য করবে, আগামীকাল যখন সে অভাবী হয়ে পড়বে তখন অন্যেরা তাকে সাহায্য করবে, আগামীকাল যখন সে অভাবী হয়ে পড়বে তখন অন্যেরা তাকে সাহায্য করবে। দরিদ্র হয়ে পড়লে আমার অবস্থ কি হবে. একথা চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। মরে গেলে স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের কি অবস্থা হবে? কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার কবলে পড়লে, পীড়িত হয়ে পড়লে, ঘরবাড়ীতে আগুন লেগে গেলে, বন্যাকবলিত হয়ে পড়লে, দেউলিয়া হয়ে গেলে তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে এবং এসব বিপদের হাত থেকে উদ্ধারের কি উপায় হবে—এসব চিন্তা করার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। সফল অবস্থায় টাকা পয়সা শেষ হয়ে গেলে জীবিকা নির্বাহের কি উপায় হবে? একমাত্র যাকাত ব্যবস্থাই এ সমস্ত চিন্তা থেকে মানুষকে চিরন্তন মুক্তি দান করে। এক্ষেত্রে ইসলামী সমাজের একজন সদস্যের কাজ কেবল এতটুকুই থাকে যে, সে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থসম্পদের একটি অংশ আল্লাহর ইনসিউরেন্স কোম্পানীতে জমা দিয়ে বীমা করে নেবে। প্রকৃতপক্ষে এ সময় এ অর্থের তার কোনো প্রয়োজন নেই। এ অর্ত এখন যাদের প্রকৃত প্রয়োজন তাদের কাজে লাগবে। কাল যখন তার বা তার সন্তান সন্তদের প্রয়োজন দেখা দেবে তখন কেবল তার নিজের প্রদত্ত সম্পদই নয় বরং তার চেয়ে অনেক বেশী সম্পদ ফেরত পাবে।
এখানে আবার দেখা যায়, পুঁজিবাদ এবং ইসলামের নীতি ও পদ্ধতির মধ্যে পরিপূর্ণ বৈপরীত্য। পুঁজিবাদের দাবি হচ্ছে, অর্থ সঞ্চয় করতে হবে এং তার পরিমাণ বাড়াবার জন্য সুদ নিতে হবে। যার ফলে এ নালা দিয়ে গড়িয়ে আশেপাশের লোকরেদ সবার টাকা পয়সা এ পুকুরে এসে পড়বে। বিপরীতপক্ষে ইসলাম নির্দেশ দেয়,. প্রথমত টাকা পয়সা জমা করে বা আটকে রাখা যাবে না; আর যদি কখনো জমা হয়ে যায়, তাহলে এ পুকুর থেকে নালা কেটে দিতে হবে যাতে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষেত্রগুলোতে পানি পৌঁছে যায় এবং আশেপাশের জমি তরতাজা হয়ে সবুজে শ্যমল ভরে ওঠে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধন আবদ্ধ ও জমাটব্ধ থাকে; কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থায় ত মুক্ত, স্বাধীন ও অবাধ গতিশীল। পুঁজিবাদের পুকুর থেকে পানি নিতে হলে প্রথমে আপনর পানি সেখানেই অবশ্যই থাক হবে, নয় তো এক কাতরা পানি আপনি সেখান পেতে পারেন না। কিন্তু ইসলামী অর্থব্যবস্থার পুকুরের নিয়ম হচ্ছে যে, যার নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি থাকবে সে তার বাড়তি পানি ঐ পুকুরে ঢেলে দিয়ে যাবে, আর যার পানির প্রয়োজন হবে সে ওখান থেকে পানি নিয়ে যাবে। বলাবাহুল্য, মৌলিকত্ব ও স্বভাগ প্রকৃতির দিক দিয়ে এ দু’টি পদ্ধতি পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি অর্থব্যবস্থায় এ দুই বিপরীতধর্মী মতাদর্শকে একত্রিত করা কোনোক্রমেই সম্ভবপর নয়। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ ধরনের বিপরীতধর্মী মতাদর্শের একত্র সমাবেশের কথা কল্পনাই করতে পারেনা।

পাঁচ: মীরাসী আইন

নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজনে অর্থ ব্যয়, আল্লাহর পথে ব্যয় ও যাকাত আদায় করার পরও যে অর্থসম্পদ কোনো একহাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে তাকে বিকেন্দ্রীভূত করার জন্য ইসলাম আর একটি পন্থা অবলম্বন করেছে। একে বলা হয় মীরাসী আইন। এ আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি অর্থসম্পদ রেখে মৃত্যুবরণ করবে তা যতো কম বা বেশী হোক না কেন, তা কেটে টুকরো টুকরো করা হবে এবং নিকট ও দূরের সকল আত্মীয়ের মধ্যে ক্রমানুসারে বন্টন করা হবে। যদি এমন কোনো ব্যক্তি থাকে, যার কোনো ওয়ারিশ নেই, তাহলে তাকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করার অধিকার দেয়ার পরিবর্তে, তার সম্পদ মুসলমানদের বায়তুলমালে জমা করে দিতে হবে। তাহলে সমগ্র জাতি এ থেকে লাভবান হতে পারবে। মীরাস বন্টনের এ আইনের অস্তিত্ব একমাত্র ইসলামেই দেখা যায়, অন্য কোনো অর্থব্যবস্থায় এর অস্তিত্ব নেই। অন্যান্য অর্থব্যবস্থা এ ব্যাপারে যে নীতি নির্ধারণ করেছে তা এক ব্যক্তি যে অর্থ সঞ্চিত করে রেখে যায়, তার মৃত্যুর পর তা এক বা একাধিক ব্যক্তির নিকট কেন্দ্রীভূত রাখতে চায়।[জ্যেষ্ঠ পুত্রের উত্তরাধিকার (Primogeniture) এবং একান্নবর্তী পরিবার (Joint Family System) প্রথা এ নীতির উপরই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ইসলাম সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার পরিবর্তে বিকেন্দ্রীকরণেল পক্ষপাতি, এর ফলে অর্থের আবর্তন সহজতর হয়।

ছয়: গনীমতলব্ধ ও সম্পদ ও বিজিত সম্পত্তি বন্টন

এ ক্ষেত্রেও ইসলাম একই দৃষ্টিভংগির অধিকারী। যুদ্ধে সেনাবাহিনী যে গনীমতের অর্থ (শত্রুপক্ষের পরিত্যক্ত সম্পদ) হস্তগত করে, সে সম্পর্কে ইসলাম একটি বিশিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছে। এ অর্থসম্পদ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়। চারভাবে সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করা হয় এবং অবশিষ্ট একভাগ সাধারণ জাতীয় কল্যাণমূলত কাজে ব্যবহার করার জন্য রেখে দেয়া হয়।
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ
“জেনে রেখো, গনীমত হিসেবে তোমরা যা কিছু হস্তগত কর, তার এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, রাসূলের নিকটাত্মীয়, এতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য।” [আনফাল: ৪১]
আল্লাহ ও রাসূলের অংশ বলতে এমন অংশকে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের আওতাধীন ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্বাধীন দেয়া হয়েছে।
যাকাতে রাসূলের নিকটাত্মীয়দের কোনো অংশ ছিল না বলে এখানে তাদের অংশ রাখা হয়েছে।
অতঃপর এতে আরো তিন শ্রেণীর অংশ বিশেষভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। জাতির এতীম শিশুদের শিক্ষঅ দীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং তাদেরকে জীবন সংগ্রামে অংশ নেয়ার যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য এতে তাদের অংশ রাখা হয়েছে। মিসকীনদের অংশ রাখা হয়েছে- বিধবা মহিলা, বিকলাঙ্গ, অক্ষম, রুগ্ন ও অভাবী প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত। আর রাখা হয়েছে ইবনুস সাবীর অর্থাৎ মুসাফিরকে আপ্যায়ন করা প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। এ সঙ্গে যাকা, সাদকা ও যুদ্ধলব্ধ গনীমতের সম্পদেও তার অংশ রেখেছে। এ ব্যবস্থার কারণে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, ভ্রমণ-পর্যটন, শিক্ষা-অধ্যয়ন, প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনাবলী পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষনের জন্য যাতায়াত সহজতর হয়েছে।
যুদ্ধের ফলে ইসলামী রাষ্ট্র যেসব সম্পদ সম্পত্তির মালিক হয় ইসলাম সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্বাধীন রাখার বিধান দিয়েছে।
مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ……. لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ…. وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ….. وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ
“জনপদের অধিবাসীদের নিকট থেকে আল্লাহ ‘ফায়’ (বিনাযুদ্ধে শত্রুপক্ষের যেসব সম্পদ হস্তগত হয়) হিসেবে যা কিছু দান করেছেন তা আল্লাহ, তাঁর রাসূল, রাসূলের নিকটাত্মীয়, এতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য, যাতে এগুলো কেবলমাত্র তোমাদের ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।….. আর এর মধ্যে অভাবী মুহাজিরদেরও অংশ রয়েছে, যাদেরকে নিজেদের ঘর-বাড়ী ও সহায় সম্পদ থেকে বেদখল করে নির্বাসিত করা হয়েছে।…. আর তাদের অংশ রয়েছে যারা মুহাজিরদের আসার আগে মদীনায় ঈমান এনেছিল।… আর তাদের পরে ভবিষ্যতে আগমনকারী বংশদরদেরও অংশ রয়েছে।” [আল হাশর: ৭-১০]
এ আয়াতগুলোতে কেবলমাত্র ‘ফায়লব্ধ’ অর্ধের ব্যয়ক্ষেত্রগুলোর বিশদ বর্ণনা করা হয়নি; বরং এইসঙ্গে যে উদ্দেশ্যে ইসলাম ফায়লব্ধ অর্থসম্পদ বন্টন তথা সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা করেছে সেদিকেও সুস্পষ্ট ইংগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ (আরবী********)
“অর্থসম্পদ যেন কেবলমাত্র তোমাদের ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’” কুরআন মজীদ ছোট একটি বাক্যের মধ্যে যে বিষয়বস্তু বর্ণনা করেছে সেটিই হচ্ছে সমগ্র ইসলামী অর্থব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর।

সাত: মিতব্যয়িতার নির্দেশ

ইসলাম একদিকে ধনসম্পদ সমগ্র দেশবাসীর মধ্যে আবর্তন করা ও ধনীদের সম্পদ থেকে নির্ধনদের অংশ লাভ করার ব্যবস্থা করেছে, অন্যদিকে প্রত্যেক ব্যক্তিকে অর্থ ও সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হবার নির্দেশ দিয়েছে। এভাবে অর্থনৈতিক উপায় উপকরণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি কখনো প্রান্তিকতার আশ্রয় নিয়ে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করবে না। এক্ষেত্রে কুরআনে মৌলিক শিক্ষা হচ্ছে:
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا
“আর নিজের হাত না একেবারে গলায় বেঁধে রাখবে, আর না একেবারে তাকে খুলে দিবে, যার ফলে পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বসে থাকার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়।” [বনী ইসরাঈল : ২৯]
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
“আর আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারা যখন ব্যয় করে, অপব্যয় করে না, আবার কার্পণ্যও করেনা, বরং এ দুটির মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করে।” [আল ফুরকান: ৬৭]
এ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজের আর্থিক সঙ্গতির মধ্যে থেকেই অর্থ ব্যয় করে। তার অর্থব্যয় যেন কখনো এমন পর্যায়ে না পৌঁছায়, যার ফলে তা তার আয়ের অংককে ছাড়িয়ে যায় এবং নিজের আজেবাজে খরচের জন্য তাকে অন্যের দ্বারে হাত পাততে হয়, অথবা অন্যের উপার্জনে ভাগ বসাতে হয় এবং যথার্থ প্রয়োজন ছাড়াই অন্যের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। অতঃপর গায়ের জোরে সে ঋণদাতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে ফিরবে অথবা ঋণ পরিশোধ করার জন্য নিজের সব রকমের অর্থনৈতিক উপকরণ ব্যবহার করে অবশেষে ফতুর হয়ে ফকীর ও মিসকীনদের খাতায় নিজের নাম লেখাবে। আবার সে যেন নিজের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের তুলনায় অনেক কম খরচ করার মতো কার্পণ্যও না দেখায়। নিজের আয় ও অর্থনৈতিক উপায় উপকরণের সীমার মধ্যে থেকে ব্যয় করার অর্থ এ নয় যে, সে ভালো আয় উপার্জন করলে নিজের সব টাকা পয়সা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত আয়েশ আরাম ও ভোগ বিলাসিতায় উড়িয়ে দেবে, আর অন্যদিকে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেীরা চরম সংকটের মধ্যে দিন যাপন করবে। এ ধরনের স্বার্থান্ধ ব্যয়বাহুল্যকে ইসলাম অপচয় বলে গন্য করেছে।
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا () إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
“নিজের নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার পৌঁছে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরদেরকেও তাদের অধিকার দান কর। বাজে খরচ করো না। যারা অযথা ও বাজে খরচ করে তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রব – প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ—নাফরমান।” [বনী ইসরাঈল: ২৬-২৭]
ইসলাম এক্ষেত্রে কেবলমাত্র নৈতিক শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এসঙ্গে কার্পণ্য ও অমিতব্যয়িতার চূড়ান্ত অবস্থা প্রতিরোধের জন্য আইনও প্রণয়ন করেছে। ধন বন্টনের ভারসাম্য বিনষ্টকারী সকল পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। জুয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে। মদ্যপান ও ব্যভিচারের পথ রোধ করেছে। অনর্থক ফুর্তিবাজী, তামাশা ও কৌতুকের এমন ব্যয়বহুল অভ্যাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, যেগুলোর অনিবার্য পরিণতি অর্থ ও সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সঙ্গীতের স্বাভাবিক প্রবণতাকে এমন পর্যায়ে উপনীত হতে দেয়নি যেখানে সঙ্গীতপ্রিয়তা ও সঙ্গীতের মধ্যে ঐকান্তিক মগ্নতা মানুষের মধ্যে বহুবিধ নৈতিক ও আত্মিক ত্রুটি সৃষ্টির সাথে সাথে তার অর্থনৈতিক জীবনেও বিপর্যয় ও বিশৃংখলা সৃষ্টির কারণ হয়। সৌন্দর্য পিপাসার স্বাভাবিক প্রবণতাকেও একটি সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। বহু মূল্যবান পরিচ্ছদ, হীরাও মণি-মাণিক্যের অলংকার, সোনা ও রূপার তৈজসপত্রাদি, চিত্র ও ভাস্কর মূর্তি সম্পর্কে রাসূলে করীম (সা)-এর যে নির্দেশাবলী বিধৃত হযেছে, তার মধ্যে বহুতর কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এসব কল্যাণের মধ্যে একট মহত্তর কল্যাণ হচ্ছে এই যে, যে ধনসম্পদ বহুসংখ্যক দরিদ্র ও অভাবী ভাইদের জীবনের নিম্নতম অপরিহার্য প্রয়োজনাদি পূর্ণ করতে পারে এবং তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করে দিতে পারে, তাকে নিছক নিজের দেহ ও গৃহসজ্জায় ব্যয় করা সৌন্দর্যপ্রীতি নয়, বরং নিকৃষ্ট পর্যায়ের হৃদয়হীনতা ও স্বার্থপরতার পরিচায়ক।
মোটকথা ইসলাম একদিকে নৈতিক শিক্ষা ও অন্যদিকে সুনির্দিষ্ট আইন কানুনের মাধ্যমে মানুষকে সহজ-সরল-অনাড়ম্বর জীবন যাপনের নির্দেশ দেয়। এ অনাড়ম্বর জীবনে মানুষের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার সীমানা কোনোক্রমেই এতটা ব্যাপকতর হয়ে পড়বে এবং নিজের স্বাভাবিক সীমার বাইরে গিয়ে তাকে অন্যের উপার্জনে ভাগ বসাতে হবে অথবা যাবতীয় অর্থসম্পদ নিজেই ভোগ করবে এবং নিজের অপারগ ভাএদর সাহায্য করবে না, যারা মধ্যম মানের কম উপার্জন করে থাকে।

চতুর্থ অধ্যায়ঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি ও লক্ষ্য

[আধুনিক বিশ্বের খ্যাতনামা মনিষী ও চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মুদূদী ১৯৬৬ সালের ১৭ই ডিসেম্বর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত এক সেমিনারে ইসলামের অর্থব্যবস্থার উপর এক সারগর্ভ ভাষণ প্রদান করেন। এ পুস্তিকাটি তারই হুবহু বাংলা অনুবাদ।]
আমাকে বিশেষ কয়েকটি প্রশ্নের উপর আলোকপাত করার জন্য আহবান জানানো হয়েছে। আলোচনার পূর্বাহ্নেই আমি প্রশ্ন ক’টি আপনাদের শনিয়ে দিচ্ছি। তাতে আমার আলোচনর পরিসর সম্পর্কে আপনারা কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারবেন।
প্রশ্নগুলো হচ্ছে:
এক : ইসলাম কি কোনো অর্থনৈতিক বিধান রচনা করেছে? করে থাকলে তার খসড়া পেশ করুন। উপরন্তু ভূমি, শ্রম, পুঁজি ও সংগণ ও খসড়ায় কোন্ ধরনের মর্যাদা লাভ করেছে?
দুই : যাকাত ও সাদকার অর্থ কি অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে ব্যয় করা যেতে পারে?
তিন : আমরা কি সুদহীন অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করতে পারি?
চার :

ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যে কোন্ ধরনের পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান?
এ প্রশ্নগুলোর প্রত্যেকটি বিস্তরিত আলোচনার জন্য বিরাট গ্রন্থের প্রয়োজন। কিন্তু সময় সংক্ষেপ হেতু এবং বিশেষ করে, আজকের আলোচনা সভায় উচ্চশিক্ষিত সমাজের নিকট আমার বক্তব্য উপস্থাপনার কারণে, এ প্রশ্নগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনাই আমি যথেষ্ট মনে করছি।

ইসলামী অর্থব্যবস্থার ধরন

প্রথম প্রশ্নের দু’টি অংশ রয়েছে। এক: ইসলাম কি কোনো অর্থনৈতিক বিধান রচনা করেছে? করে থাকেল তার খসড়া পেশ করুন। দুই: খসড়ায় ভূমি, শ্রম, পুঁজি ও সংগঠন কোণ্ ধরনের মর্যাদা লাভ করেছে? প্রশ্নের প্রথমাংশের বজাবে বলা যায়, ইলাম অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক বিধান রচনা করেছে। তবে, ইসলাম প্রতি যুগের উপযোগী এমন একটি বিস্তারিক অর্থনৈতিক বিধান রচনা করেছ যেখানে অর্থনৈতিক বিধানের যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ের বিস্তারিত সমাধান দেয়া হয়েছে, এ অর্থে তা একটি অর্থনৈতিক বিধান নয়। বরং এ অর্থ হচ্ছে, ইসলাম আমাদেরকে এমন কিছু মূলনীতি দিয়েছে, যার ভিত্তিতে আমরা নিজেরািই প্রতি যুগের উপযোগী একটি অর্থনৈতিক বিধান রচনা করতে পারে। কুরআন ও হাদীস গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে ইসলামের একটি রীতি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে এই যে, ইসলাম জীবনের প্রতিটি বিভাগের একটি চৌহদ্দী নির্ধারণ করে দেয় এবং আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, এই চতুঃসীমার মধ্যে থেকে তোমরা নিজেদের জীবনের এ বিভাগটি গড়ে তোল। এর বাইরে তোমরা যেতে পারোনা। তবে এই চতুঃসীমার মধ্যে থেকে তোমরা নিজেদের অবস্থা, প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে বিস্তরিত বিধান রচনা করতে পারো। ইসলাম এভাবেই ব্যক্তিগত জীবনক্ষেত্র থেকে শুরু করে সভ্যতা সংস্কৃতির সকল বিভাগে মানুষকে পথনির্দেশ দিয়েছে। পথনির্দেশের এই একই পদ্ধতি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অবলম্বিত হয়েছে। এখানেও ইসলাম আমাদেরকে কতিপয় মূলনীতি ও চতুঃসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে অবস্থান করে আমাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামো বিনির্মাণে অগ্রসর হতে হবে এবং প্রত্যেক যুগ-সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে এ সম্পর্কিত যাবতীয় বিস্তারিত খুঁটিনাটি বিধান রচনা কাজ চালাতে হবে। অতীতে এভাবেই এ কাজ সম্পাদিত হয়ে এসেছে।
ইসলামী ফিকাহ গ্রন্থগুলি আলোচনা করলে দেখা যাবে, আমাদের ফকীহগণ এই চতুঃসীমার মধ্যে অবস্থান করেই স্ব স্ব যুগের বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি অর্থনৈতিক বিধান রচনা করেছিলেন। ফকীহগণ যে অর্থনৈতিক বিধান রচনা করেন, তা ইসলামের মূলনীতি থেকেই গৃহীত এবং ইসলাম নির্ধারিত চতুঃসীমার মধ্যে তার অবস্থান। সেসব খুঁটিনাটি বিধানগুলির যে অংশ আমাদের বর্তমান প্রয়োজন পূর্ণ করে, তা আমরা হুবহু গ্রহণ করে নেব; আর এ ছাড়া বর্তমানে আমাদের সামনে যেসব নতুন প্রয়োজন ও সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলির জন্য আমরা নতুন বিধান রচনা করতে পারি। তবে সেসব বিধান অবশ্যি ইসলাম প্রদত্ত মূলনীতি থেকে গৃহীত হতে হবে এবং ইসলাম নির্ধারিত চতুঃসীমার (Four Comers) মধ্যে সেগুলিকে অবস্থান করতে হবে।

ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌল উদ্দেশ্য

ইসলামের একটি অর্থনৈতিক বিধান রয়েছৈ। এ কথার অর্থ এখন সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে ইসলাম আমাদেরকে যে মূলনীতি দিয়েছে তা বর্ণনা করার পূর্বেই আমি ইসলামী অর্থব্যবস্থার উদ্দেশ্যাবলী (Objectives) আলোচনা করতে চাই। এ উদ্দেশ্যাবলী সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে, ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি অনুধাবন করা, অবস্থা ও প্রয়োজনের সাথে সেগুলির সামঞ্জস্য বিধান করা এবং ইসলামী অর্থব্যবস্থার যথার্থ প্রাণসত্তা অনুযায়ী বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিধান রচনা করা সম্ভব নয়। এখানে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতিসমূহ পেশ করা হলোঃ

ক. ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ

অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষের স্বাধীনতা সংরক্ষণের উপর প্রাথমিক গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং মানব জাতির কল্যাণার্থে যতটুকু অপরিহার্য কেবলমাত্র ততটুকু বিধি নিষেধই তার উপর আরোপ করেছ। ইসলাম মানুষের স্বাধীনতার উপর অনেক বেশী গুরুত্ব দান করেছে। এর কারণ হচ্ছে, ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। এখানে সমষ্টিগত জবাবদিহির কোনো ধারণাই নেই। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য ব্যক্তিগত জবাবদিহির কোনো ধারণাই নেই। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়ী এবং ব্যক্তিগতভাবেই তার নিজের কাজের জবাব দিতে হবে। এ জবাবাদিহির জন্য মানুষের নিজস্ব ঝোঁকপ্রবণতা, যোগ্যতা ও নিজের ব্যক্তিগত নির্বাচন অনুযায়ী তার ব্যক্তিসত্তার উন্নয়নের সর্বাধিক সুযোগ থাকতে হবে। এজন্য ইসলাম ব্যক্তির নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাথে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। যেখানে ব্যক্তি-মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়, সেখানে তার নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাও বিলুপ্ত হয়। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়, যে ব্যক্তি নিজের অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের মুখাপেক্ষী, সে নিজস্ব কোনো স্বাধীন চিন্তা পোষণ করলেও তা কার্যকর করার স্বাধীনতা তার থাকে না। এ কারণে ইসলাম অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদেরকে যে নীতি দান করে, তর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে সর্বাধিক স্বাধীনতা দান করা হয় এবং কেবলমাত্র যথার্থ মানবিক কল্যাণের স্বার্থে যেটুকু অপরিহার্য, সে পরিমাণ বিধি নিষেধই তার উপর আরোপ করা হয়। এজন্য ইসলাম রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণমানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী, জনগণ নিজেদের ইচ্ছামত এ সরকার পরিবর্তন করতে পারবে। জনগণের ইচ্ছা বা তাদের আস্থাভাজন প্রতিনিধিদের পরামর্শ অনুযায়ী সরকারের ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। এ ব্যবস্থার সমালোচনা বা এ সম্পর্ক মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা জনগণের থাকবে। সরকার কোনো ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হবেনা; বরং কুরআন ও সুন্নাহর উচ্চতর আইন ও বিধান তার জন্য ক্ষমতার যে সীমা নির্দেশ করেছে, তার মধ্যে অবস্থান করেই সে কাজ করে যাবে। উপরন্তু ইসলামে আল্লাহর পক্ষ থেকে জনগণকে স্থায়ীভাবে মৌলিক মানবধিকার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এগুলি অপহরণ করার অধিকার কারোর নেই। ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ ও ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন রোধকারী কোনো প্রকার নির্যাতন ও একনায়কত্বমূলক ব্যবস্থা যাতে তার উপর চেপে বসতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই এসব ব্যবস্থাপনা গৃহীত হয়েছে।

খ. নৈতিক ও বৈষয়িক উন্নতির সাঞ্জস্য

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ইসলাম মানুষের নৈতিক বিকাশ ও অগ্রগতিকে মৌলিক গুরুত্ব দান করে। এ উদ্দেশ্যে সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তি যাতে স্বাধীনভাবে সৎকর্ম করার সর্বাধিক সুযোগ লাভ করে, তার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। এভাবে মানুষের জীবনে দয়া, প্রেম, বদান্যতা, সহানুভূতি, পরোপকার ও অন্যান্য নৈতিক গুণাবলী বিশেষভাবে স্থান লাভ করে। তাই অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম কেবলমা্রত আইন ও সংবিধানের উপর নির্ভর করেনা। বরং এ ব্যাপারে ঈমান, ইবাদত, শিক্ষা ও নৈতিক অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষের আভ্যন্তরীণ ও মানসিক সংস্কার সাধন, তার রুচি ও চিন্তাপদ্ধতির পরিবর্তন এবং তার মধ্যে এমন শক্তিশালী নৈতিক অনুভূতি সৃষ্টি করার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে যার সাহায্যে সে নিজে ইনসাফ ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে সক্ষম হয়। এ সমস্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করার পরও কার্যসিদ্ধি না হলে, মুসলমানদের সমাজের অবশ্যই এতটুকুট প্রাণশক্তি থাকতে হবে যার ফলে সামাজিক চাপের মুখে মানুষকে ইসলামী বিধি বিধানের অনুগত রাখা সম্ভব হয়। এ ব্যবস্থা যথষ্ট প্রমাণিত না হলে, ইসলাম আইনের শক্তি ব্যবহার করে। এভাবে অবশেষে শক্তির সাহায্যে ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হয়। যে সমাজ ব্যবস্থা ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কেবলমাত্র আইনের শক্তির উপর নির্ভরশীল হয় এবং মানুষকে আক্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে স্বেচ্ছায় ন্যায়ের পথে চলার শক্তি তিরোহিত করে দেয়, ইসলাম সে ব্যবস্থাকে ভ্রান্ত ও ত্রুটিপূর্ণ মনে করে।

গ. সহযোগিতা, সামঞ্জস্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা

তৃতীয় কথা হচ্ছে, ইসলাম মানবিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের ধারক এবং নৈরাজ্য, দলাদলি ও সংঘর্ষের বিরোধী। তাই ইসলাম মানব সমাজকে শ্রেণীতে বিভক্ত করেনা এবং প্রকৃতিগতভাবে মানব সমাজে বিরাজিত শ্রেণীগুলিকে শ্রেণীসংগ্রামের পরিবর্তে সহানুভূতি ও সহযোগিতার পথে পরিচালিত করে। মানব সমাজ বিশ্লেষণ করলে এতে দু’ধরনের শ্রেণী দেখা যাবে। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট নির্যাতনমূলক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অবৈধ ও অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে এক ধরনের শ্রেণীর জন্ম দেয়; অতঃপর বলপূর্বক তাকে প্রতিষ্ঠিত রাখে। যেমন, ব্রাহ্মণ্যবাদ, জমিদারী ব্যবস্থা বা পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে। ইসলাম নিজে এই ধরনের শ্রেণীর জন্ম দেয়না। এবং এগুলি টিকিয়ে রাখার পক্ষপাতীও ইসলাম নয়। বরং সামাজিক সংস্কার ও আইনগত পদ্ধতি অবলম্বন করে এগুলির বিলোপ সাধন করাই ইসলামের লক্ষ্য। প্রকৃতিগতভাবে মানবিক যোগ্যতা ও অবস্থার পার্থক্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় এক ধরনের শ্রেণীর উদ্ভব হয় এবং স্বাভাবিক পদ্ধতিতে তা পরিবর্তিত হতে থাকে। ইসলাম বলপূর্বক এই ধরনের শ্রেণীগুলির বিলোপ সাধন করেনা এবং এগুলিকে স্থায়ী শ্রেণীরূপ দানও করেনা বা এদের পরস্পরকে শ্রেণীসংগ্রামেও লিপ্ত করেনা। বরং ইসলামের নৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যমে এদের মধ্যে ইনসাফপূর্ণ ও ন্যায়ানুগ সহযোগিতা সৃষ্টি করে; তাদেরকে মাধ্যমে এদের মধ্যে ইনসাফপূর্ণ ও ন্যায়ানুগ সহযোগিতা সৃষ্টি করে; তাদেরকে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরস্পরের সাহায্যকারী ও সহযোগী বানায় এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা ক’রে এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যার ফলে এ শ্রেণীগুলি স্বাভাবিকভাবেই একাত্ম পরিবর্তিত হতে থাকে।

ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি

এ তিনটি বিষয় দৃষ্টি সমক্ষে রাখার পরই এই অর্থনৈতিক মূলনীতির যথার্থ উপলব্ধি সম্ভবপর হবে। ইসলামী অর্থব্যবস্থার মৌল উদ্দেশ্যাবলী বর্ণনার পর এবার আমি এর মূলনীতিগুলি তুলে ধরবো।

ক. ব্যক্তিমালিকানা ও তার সীমারেখা

ইসলাম কতিপয় বিশেষ সীমারেখার মধ্যে ব্যক্তিমালিকানর স্বীকৃতি দেয়। ব্যক্তিমালিকানার ব্যাপারে উৎপাদন-উপকরণসমূহ ও নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদির মধ্যে অথবা শ্রমার্জিত আয় ও বিনাশ্রম প্রাপ্ত আয়ের মধ্যে কোনো প্রকার পার্থক্য করেনা। ইসলাম মানুষকে মালিকানর সাধারণ অধিকার দান করে; তবে তাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ইসলামে এমন কোনো ধারণা নেই যার ভিত্তিতে উৎপাদন-উপকরণসমূহ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মধ্যে পার্থ্যক্য সৃষ্টি করে উৎপাদন উপকরণসমূহকে ব্যক্তিমালিকানার আওতা বহির্ভূত এবং নিছক নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিকে এর আতওাভুক্ত করা যেতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে এক ব্যস্তি যেমন বস্ত্র, পাত্র ও গৃহের আসবাবপত্রের অধিকারী হতে পারে; অনুরূপভাবে সে জমি, মেশিন ও কারখানারও মালিকানা লাভ করতে পারে। এভাবে এক ব্যক্তি যেমন নিজের প্রত্যক্ষ শ্রমার্জিত অর্থসম্পদের বৈধ অধিকারী হয়, তেমনি সে নিজের পিতা, মাতা, স্ত্রী বা স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তিরও মালিক হতে পারে এবং অংশীদারিত্বের নীতির ভিত্তিতে সে এমন উপার্জনেরও অংশীদার হতে পারে, যা তার মূলধন খাটিয়ে অন্য এক ব্যক্তি নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করছে। ইসলাম উৎপাদন-উপকরণসমূহের মালিকানা বা নিত্য ব্যহার্য দ্রব্যাদির মালিকানা অথবা শ্রমার্জিত বা বিনাশ্রমে লব্ধ অর্থের মালিকানার মধ্যে পার্থক্য করেনা, বরং ইসলামে পার্থক্যের ভিত্তি হচ্ছে অর্থোপার্জনের উপায়সমূহের () বৈধতা বা অবৈধতা অথবা অর্থ ব্যবহারে হারাম বা হালাল পদ্ধতি। ইসলাম সমগ্র অর্থনৈতিক জীবনের নীলনকশা এমনভাবে তৈরী করেছে যাতে মানুষ কতিপয় সীমরারেখার মধ্যে অবস্থঅন করে স্বাধীনভাবে অর্থোপার্জন করতে পারে। ইতিপূর্বেই আমি বলেছি, ইসলামরে দৃষ্টিতে মানুষের স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম এবং এ স্বাধীনতার ভিত্তিতেই সে মানবতার বিকাশ ও উন্নতির সগ্র প্রাসাদ নির্মাণ করে। মানুষের এ স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য অর্থনৈতিক উপায় উপকরণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার অধিকার দান অপরিহার্য। মানুষের ব্যক্তিমালিকানা অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে অর্থনীতির সমগ্র উপায় উপকরণের উপর সামষ্টিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করলে অনিবার্যভাবেই মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার বিলুপ্ত হয়ে যায়। কারণ এ অবস্থা সৃষ্টি হবার পর, যে প্রতিষ্ঠানটি সমগ্র রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উপায় উপকরণসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে, সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মচারীতে পরিণত হয়।

খ. সমবন্টন নয়, ইনসাফপূর্ণ বন্টন

সম্পদের সমবন্টনের (Equal distribution) পরিবর্তে ইনসাফপূর্ণ বন্টন (Equitable distribution) ইসলামী অর্থব্যবস্থার আরেকটি মূলনীতি। অর্থোপার্জনের উপায় উপাকরণসমূহ সমস্ত মানুষের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করে দেয়া ইসলামের লক্ষ্য নয়। কুরআন মজীদ অধ্যয়ন করলে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে যে, আল্লাহর এই দুনিয়ায় কোথাও সমবন্টন নীতি কার্যকর নেই।
সমবন্টন মূলত অপ্রাকৃতিক ও অস্বাভাবিক। সকল মানুষের স্মৃতিশক্তি কি সমান? সব মানুষের কি সমান সৌন্দর্য, শক্তি যোগ্যতা-সম্পন্ন? একই ধরনের পরিবেশে ও অবস্থায় কি সকল মানুষের জন্ম হয়? দুনিয়ায় কাজ করার জন্য সবাই কি একই ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হয়। এসব ব্যাপার সাম্য না থাকলে নিছক উৎপাদন-উপকরণসমূহ ও অর্থ বন্টনের ক্ষেত্রে সাম্যের অর্থ কি? কার্যত এরূপ সাম্য সম্ভব নয় এবং কৃত্রিমভাবে এর প্রচেষ্টা চললে অনিবার্যভাবে তা ব্যর্থ হবে; উপরন্তু এর পরিণামেও দেখা দেবে মারাত্মক পরিণতি। এজন্যেই ইসলাম অর্থনৈতিক উপায় উপকরণাদি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুফলসমূহ সম-বন্টনের কথা বলেনা। বরং ইসলাম ইনসাফপূর্ণ বন্টনের দাবীদার। এ ইনসাফের জন্য ইসলাম কতিপয় নীতি নির্ধারণ করেছে।
এ প্রসঙ্গে প্রথম নীতি হচ্ছে, সম্পদ আহরণের উপকরণাদির মধ্যে ইসলাম হালাল ও হারামের পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে। একদিকে ইসলাম ব্যক্তিকে স্বাধীন ও অবাধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্থোপার্জনের অধিকার দান করে ও উপার্জিত সমুদয় সম্পদের উপর তার মালিকানা স্বীকার করে এবং অন্যদিকে অর্থোপার্জনের পদ্ধতিসমূহে হালাল ও হারামের সীমা নির্ধারণ করে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী যে কোনো ব্যক্তি হালাল পদ্ধতিতে অর্থোপার্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা রাখে। এজন্য সে নিজের ইচ্ছামত অর্থোপার্জনের যে কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে এবং যে কোনো পরিমাণ অরথ উপার্জনও করতে পারে। সে তার এই উপার্জিত অরেথর বৈধ মালিক বলে স্বীকৃত হবে। তার এই বৈধ মালিকানা সীমিত করা বা তার থেকে এর অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই। তবে হারাম পদ্ধতিতে একটি পয়সাও উপার্জন করার অধিকার তার নেই। হারাম পদ্ধতি অবলম্বন থেকে তাকে বলপূর্বক বিরত রাখা হবে। এ পদ্ধতিতে উপার্জিত অর্থের সে বৈধ মালক বলে স্বীকৃত হবে না। তার অপরাধের পর্যায়ানুসারে তাকে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা তার ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করার শাস্তি দেয়া যেতে পারে এবং এই অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থাও অবলম্বিত হবে।
ইসলামে যেসব পদ্ধতি ও উপায় উপকরণকে হারাম গণ্য করা হয়েছে সেগুলি হচ্ছে- আত্মসাৎ, ঘুষ, পরদ্রব্য গ্রাস, সরকারী কোষাগার থেকে আত্মসাৎ, চুরি, পরিমাণে কম করা, চারিত্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ব্যবসা, বেশ্যাবৃত্তি, মদ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের শিল্প ও ব্যবসা, সুদ, জুয়া, ধাপ্পাবাজী এবং ব্যবসায়ের এমন সব পদ্ধতি যেখানে প্রতারণা ও চাপ প্রয়োগের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালিত হয় অথবা যেগুলির মাধ্যমে কলহ, বিশৃংখলা ও বিভেদ সৃষ্টির পথ প্রশস্ত হয় এবং যেগুলি ইনসাফ, ন্যায়নীত ও গণস্বার্থ বিরোধী। ইসলাম আইন প্রয়োগ করে এসব পদ্ধতি ও উপায় উপকরণ ব্যবহার করার পথ রোধ করে। এ ছাড়াও ইসলাম মজুতদারী (Hoarding) নিষিদ্ধ গণ্য করে এবং যে ইজারাদারী কোনো প্রকার ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়াই অর্থ ও অর্থ উৎপাদনের উপকরণসমূহ থেকে সাধারণ লোকদের উপকৃত হবার সুযোগ ছিনিয়ে নেয়- তার পথও রুদ্ধ করে।
এ পদ্ধতি ও উপায় উপকরণগুলি বাদ দিয়ে বৈধ উপায়ে মানুষ যে সম্পদ অর্জন করে, তা হালাল উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। এ হালাল সম্পদ সে নিজে ভোগ করতে পারে; উপহার, দান বা অন্যবিধ পদ্ধতিতে অন্যের নিকট স্থানান্তরও করতে পারে; এমনকি, অধিক সম্পদ আহরণের জন্যও ব্যবহার করতে পারে এবং নিজের উত্তরাধিকারীদের জন্য মীরাস হিসেবেও রেখে যেতে পারে। এই বৈধ উপার্জনের উপর এমন কোনো বিধি নিষেধ আরোপিত নেই, যার সাহায্যে কোনো এক পর্যায়ে পৌছে তাকে আরো উপার্জন থেকে বিরত রাখা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তি হালাল উপার্জনের মাধ্যমে কোটিপতি হয়ে গেলে ইসলাম তার পথে প্রতিবন্ধক হবে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সে ইচ্ছামত উন্নতি লাভ করতে পারে, তবে এ উন্নতি তাকে বৈধ উপায়ে লাভ করতে হবে। অবশ্যি বৈধ উপায়ে কোটিপতি হওয়া সহজসাধ্য নয়, এটা বিরল ঘটনা। কোনো অসাধারণ ব্যক্তিত্ব কখনো কখনো আল্লাহর এ অনুগ্রহ লাভ করতে পারে। নচেৎ বৈধ উপায় অবলম্বন করে কোটিপতি হবার অবকাশ কমই থাকে। কিন্তু ইসলাম কাউকে বেঁধে রাখেনা। হালাল উপায়ে সে যত অধিক সম্পদ চায় আহরণ করতে পারে। তার পথে কোনো বাধা নেই। কারণ অনর্থক বাধা নিষেধ ও প্রতিবন্ধকতার কারণে কর্মপ্রেরণা (Incentive) খতম হয়ে যায়।
এভাবে বৈধ ও হালাল উপায়ে যে সম্পদ অর্জিত হয় ইসলামে তার ব্যবহারের উপরও বিধি নিষেধ করা হয়েছে।
প্রথমত, এ সম্পদ মানুষ নিজের জন্য ব্যয়ঢ করতে পারে। এ ব্যয়কে ইসলাম এমনভাবে সংযত করে যার ফলে তা মানুষেল নিজের চরিত্র ও সমাজের জন্য কোনোক্রমেই ক্ষতিকর হতে পারে না। সে মদপান করতে পারবে না। ব্যভিচার করতে পারবেনা। জুয়াবাজীতে নিজের সম্পদ উড়িয়ে দিতে পারবেনা। নৈতিকতা বিরোধী পন্থায় বিলাসব্যসনে ব্যয় করতে পারবে না। সোনা রূপার পাত্র ব্যবহার করতে পারবেনা। এমনকি বসবাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জাঁকজমকের আশ্রয় নিলে তার উপর অবশ্যি বিধি নিষেধ আরোপ করা হবে।
দ্বিতীয়ত, এ সম্পদের কমবেশী কোনো অংশ মানুষ মওজুদ করে রাখতে পারে। কিন্তু ইসলাম এ প্রবণতা পছন্দ করেনা। ইসলাম মানুষের অতিরিক্ত সম্পদ মজুত রাখার পরিবর্তে বৈধ পদ্ধতিতে তাকে আবর্তিত করতে চায়। একটি বিশেষ আইন অনযায়ী ইসলাম সঞ্চিত সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করে। ফলে এর একটা বিশেষ আইন অনুযায়ী ইসলাম এ সঞ্চিত সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করে। ফলে এর একটা অংশ বঞ্চিত শ্রেণীর স্বার্থে ও সামিষ্টিক কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে। কুরআন মজীদে যেসব কাজকে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে, মানুষের সম্পদ মওজুদ করার প্রচেষ্টা তন্মধ্যে অন্যতম। কুরআন বলে: ‘যারা সোনা ও রূপা জমা করে তাদের সংরক্ষিত সোনা ও রূপা জাহান্নামে তাদের দাগ দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হবে।” এর কারণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা মানুষের উপকারের জন্য অর্থসম্পদ সৃষ্ট করেছেন; কাজেই একে আটকে রেখে মানুষের উপকারের পথ রুদ্ধ করার অধিকার কারো নেই। বৈধ ও হালাল উপায়ে অর্থসম্পদ উপার্জন করুন, নিজের প্রয়োজনে তা ব্যয় করুন; অতঃপর অবশিষ্ট যা থাকে বৈধ পদ্ধতিতে আবর্তন করাতে থাকুন।
এজন্য ইসলাম মজুতদারী উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মজুতদারীর অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলতভাবে নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি বাজারে সরবরাহ করে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। ইসলামী আইন এ ধরনের কাজকে হারাম গণ্য করে। কেো ঘোরপ্যাঁচে না গিয়ে সোজাসোজি ব্যবসা চালাতে হবে। ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রয়যোগ্য পণ্য থাকলে এবং বাজারে তার চাহিদা থাকলে, তা বিক্রয় করতে অস্বীকার করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। জেনে বুঝে নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদির অভাব সৃষ্টি করার জন্য তা বিক্রয়ের অসম্মাতি জ্ঞাপন করা অন্যায়। এটা মানুষকে ব্যবসায়ী নয় ডাকাতে পরিণত করে।
এ কারণে ইসলাম অস্বাভাবিক ধরনের ইজারাদারীরও বিরোধী। কারণ এ ধরনের ইজারাদারী সাধারণ মানুষের পক্ষে অর্থোপার্জনের উপায় উপকরণাদি ব্যবহারের পথে বাধার সৃষ্টি করে। ইসলাম অর্থোপার্জনে বিশেস বিশেষ সুযোগ সুবিধা ও উপায় উপকরণ কতিপয় ব্যক্তি, বংশ বা শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং এক্ষেত্রে অন্যদের অগ্রসর হবার পথ রোধ করারেক কোনোক্রমেই বৈধ গণ্য করেনা। সমষ্টিগত স্বার্থে যে ইজারাদারী একান্ত অপরিহার্য দাড়ায় একমাত্র এই ধরনের ইজারাদারী বৈধতা ইসলামে স্বীকৃত। অন্যথায় নীতিগতভাবে ইসলাম অবাধ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং সবাইকে নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাবার সমান সুযোগ দেয়ার পক্ষপাতী।
অতিরিক্ত অর্থসম্পদ ব্যবহার করে যদি কোনো ব্যক্তি আরও হালাল অর্থ উপার্জন করতে চায়, তাহলে তাকে অর্থোপার্জরে জন্য ইসলাম নির্ধারিত হালাল পদ্ধততেই তা করতে হবে। আমি ইতিপূর্বে অর্থোপার্জনে যেসব হারাম পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছি, সেগুলি অবলম্বন করা যাবে না কোনোক্রমেই।

গ. ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকার

অতঃপর ইসলাম ব্যক্তির সম্পদের উপর সমষ্টির অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে এবং এজন্য বিভিন্ন অবলম্বন করে। কুরআন মজীদে নিকট-আত্মীয়দের অধিকার বর্ণনা করা হয়েছে। এ অর্থ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির উপার্জিত অর্থের উপর সে ছাড়াও তার আত্মীয় স্বজনের অধিকার দেয়া হয়েছে। সমাজের কোনা ব্যক্তি যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের অধিকারী হয় এবং তার আত্মীয়দের কেউ প্রয়োজনের চেয়ে কম সম্পদ উপার্জন করে, তাহলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সে আত্মীয়কে সাহায্য করা তার সামাজিক দায়িত্ব। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির উপর দায়িত্ব বর্তায়। কোনো জাতির অন্তর্ভুক্ত এক একটি পরিবার যদি নিজেদের এ দায়িত্ব অনুভব করে এবং সামগ্রিকভাবে জাতির অধিকাংশ পরিবর যদি নিজেদের এ দায়িত্ব অনুভব করে এবং সামগ্রিকভাবে জাতির অধিকাংশ পরিবারকে সহায়তা দানের ব্যবস্থা করে, তাহলে বাইরের সাহায্যের মুখাপেক্ষী পরিবারের সংখ্যা হয়তো অতি অল্পই থেকে যাবে। এজন্যই কুরআন মজীদে বান্দার হকের মধ্যে সর্বপ্রথম মা, বাপ ও আত্মীয়স্বজনের হকে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুরূপভাবে কুরআন ব্যক্তির সম্পদের উপর তার প্রতিবেশীদের অধিকারও প্রদান করেছে। এর অর্থ হচ্ছে, প্রত্যেক পাড়ায়, মহল্লায়, অলিগলিতে তুলনামুলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের উচিৎ সংশ্লিষ্ট পাড়া, মহল্লা ও গলির অসচ্ছল লোকদেরকে সহায়তা দান করা।
এই দ্বিবিধ দায়িত্বের পর কুরআন মজীদে সাহায্যের মুখাপেক্ষী বা সাহায্যপ্রার্থীকে নিজের সামর্থানুযায়ী সাহায্য করার জন্য প্রত্যেক সচ্ছল ব্যক্তির উপর দায়িত্ব অর্পণ করে।
(মানুষের ধনসম্পদে প্রার্থীত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।) যে ব্যক্তি আপনার নিকট সাহায্য সহায়তা প্রার্থনা করে সে হচ্ছে প্রার্থী। সে দ্বারে দ্বারে ভিখ, মেগে বেড়ায় এবং ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে তাকে প্রারথ বলা যায়না। বরং যথার্থ প্রার্থ এমন ব্যক্তিকে বলা যেতে পারে, যে সত্যিকার অভাবী এবং তার অভাব পূরণের জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়। অবশ্যি সে যথর্থ অভাবী কিনা এ ব্যপারে নিজের সল প্রকার সন্দেহ নিরসনের জন্য তার অবস্থা জানার অধিকার আপনার রয়েছে। কিন্তু সে যথার্থ অভাবী একথা আপনি যখন জানতে পারেন এবং তাকে সাহায্য দেয়ার মত প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদও যদি আপনর থকে, তাহলে জেনে রাখুন আপনার ধনসম্পদে তার অধিকার রয়ে গেছে। আর বঞ্চিত বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝায় যে আপনার নিকট সাহায চাইবে আসে না; কিন্তু সে নিজের জীবিকা সংস্থান করতে পারে না একথা আপনি জানেন। আপনার অর্থসম্পদে এহেন ব্যক্তিরও অধিকার রয়েছে।
এ অধিকারগুলো ছাড়াও ইসলাম মুসলমানদেরকে আল্লাহর পথে দান করার সাধারণ নির্দেশ দিয়ে তাদের অর্থস্পদে সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকারও কায়েম করেছে। এর অর্থ হচ্ছে, মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভূতিশীল ও মানব-দরদী হতে হবে।
স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা পরিহর করে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিটি সৎকাজে এবং ইসলাম ও সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য অর্থ ব্যয় করতে হবে। এটি একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী নৈতিক শক্তি। ইসলাম শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে এবং ইসলামী সমাজে সামষ্টিক পরিবেশের সাহায্যে প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে এ নৈতিক বল সৃষ্টি করতে চায়। এভাবে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই হৃদয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছায় মানুষ সমাজকল্যাণে সায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে।

ঘ. যাকাত

এই স্বেচ্ছাপ্রণদিত দানের পর ইসলাম আর একটি দানকে অপরিহার্য করে দিয়েছে। সেটি হচ্ছে যাকাত। সঞ্চিত ও সংরক্ষিত অর্থ, ব্যবসার পণ্য, বিভিন্ন ধরনের ব্যবা, কৃষিজাত দ্রব্য ও গবাদি পশুর উপর যাকাত ধার্য করা হয়। এই যাকাতলব্ধ অর্থের সাহায্যে অর্থের সাহায্যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনগ্রসর লোকদের সহায়তা দান করা হয়। এই দু’ধরনের ব্যয়কে নফল নামাও ও ফলয নামাযের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। নফল নাময যত ইচ্ছা পড়তে পারেন। ইচ্ছামত আত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারেন। যত বেশী আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চান, তত বেশী নামায পড়ুন। তবে ফরয নামায অবশ্যি পড়তে হবে। আল্লাহর পথে ব্যয় করা ব্যাপারটিও এই একই পর্যয়ভুক্ত। এক প্রকার ব্যয় নফল শ্রেণীভুক্ত- নিজরে ইচ্ছামত তা করতে পারেন। কিন্তু অন্যপ্রকার ব্যয় ফরযের অন্তর্ভুক্ত। একটি বিশেষ পরিমাণের অধিক অর্থের মালিক হলে এ ব্যয় করা আপনার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
যাকাত কোনো ট্যাক্স নয়। এ ব্যাপারে কোনো প্রকার ভুল ধাণা থাকা উচিত নয়। আসলে এটি একটি ইবাদত এবং নামাযের ন্যায় ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। যাকাত ও ট্যাক্সের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ট্যাক্স মানুষের উপর জোরপূর্বক বসানো হয়। তাই মানুষ তাকে সানন্দে গ্রহণ করে নেবে এমন কোনো কথা নেই। ট্যাক্স ধার্যকারীদের কোনো ভক্ত-অনুরক্ত হয় না। তাদের কাজের সত্যতার উপর কেউ ঈমান আনে না। তাদের চাপানো এই বোঝাকে সবাই জোরপূর্বক আদায়কৃত জরিমানা মনে করে। এই ট্যাক্সের উপর তারা নাসিকা কুঞ্চন করে। এর হাত নিষ্কৃতি লাবের জন্য তারা হাজারো বাহানা তালাশ করে। ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু এর ফলে তাদের ঈমানের মধ্যে কোনো প্রকার পার্থক্য সূচিত হয় না। এ ছাড়াও এ দু’য়ের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য রয়েছে, তা হচ্ছে এই যে, ট্যাক্সের সাহায্যের এমনসব ব্যয় নির্বাহ করা হয় যা থেকে ট্যাক্সদাতা নিজেও লাভবান হয়। ট্যক্সের পিচনে যে মৌলিক চিন্তা কার্যকর রয়েছে তা হচ্ছে, আপনি যেসব সযোগ সুবিধার প্রয়োজন বোধ করেন এবং সরকারের মাধ্যমে যেগুলো লাভ করার ইচ্ছা পোষণ করেন, সেগুলো লাভ করার জন্য আপনার আর্থিক সামর্থানুযায়ী সরকারকে চাঁদা দিন। এ ট্যাক্স আসলে প্রার্থিতা সামষ্টিক সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে আপনার নিকট থেকে আইনের বলে গৃহীত এক ধরনের চাঁদার শামিল- এ সুযোগ সুবিধার দ্বারা সামাজের অন্যদের ন্যায় আপনিও লাভবান হন। বিপরীত পক্ষে যাকাত সুবিধার দ্বারা একটি ইবাদত মাত্র। মানুষের কোনো পার্লামেন্ট বা আইন পরিষদ যাকাত ধার্য করেনি বরং আল্লাহ নিজের ঈমান সংরক্ষণ করতে চায়, সে কখনো যাকাত ফাঁকি দেয়া বা তর থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টা করতে পারে না। বরং তার নিকট থেকে হিসেবে নেয়া এবং যাকাত আদায় করার জন্য বাইরের কোনো শক্তি না থাকলেও সে নিজের মন ও ঈমানের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিজের সম্পদের যথার্থ হিসেব করে এবং তার যাকাত বের করে দেয়। উপরন্তু যেসব সামাজিক প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার সাথে আপনার স্বার্থ বিজড়িত এবং যেগুলি দ্বারা আপনি নিজও লাভবান হন, সেগুলো পূর্ণ করার জন্য যাকাত গ্রহণ করা হয় না, বরং এমনসব লোকের জন্য এ যাকাত গ্রহণ করা হয়, যারা কোনো কোনো ভাবে অর্থবন্টন ব্যবস্থায় নিজেদের অংশ পায়নি বা পূর্ণরূপে পায়নি এবং কোনো কারণে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়েছে। এভাবে দেখা যায় প্রকৃতি, মূলনীতি, মৌল প্রাণসত্তা ও আকার আকৃতির দিক দিয়ে যাকাত ট্যাক্স থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। দেশের পথ-ঘাট ও রেললাইন নির্মাণ, খাল খনন এবং আইন ও শাসন বিভাগ পরিচালনার জন্য এ অর্থ ব্যবহার করা হয় না। বরং কতিপয় বিশেষ হকদারের হক আদায় করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবাদত হিসেবে একে ফরয করা হয়েছে। এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাতের প্রতিদান লাভ ছাড়া এর থেকে আপনি দুনিয়ার আর কোনো প্রকার লাভবান হতে পারবেন না।
অনেকে এ ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, ইসলামের যাকাত ও খারাজ ছাড়া কোনো প্রকার ট্যাক্স নেই। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন: ‘ধনসম্পদে যাকাত ছাড়াও আর একটি হক রয়েছে।’ আসলে ইসলামী শরীয়ত যে ট্যাক্সগুলোকে অবৈধ গণ্য করেছে সেগুলো হচ্ছে কাইসার ও কিসরা এবং রাজা বাদশাহ ও আমীর উপরাহগণ কর্তৃক ধার্যকৃত ট্যাক্স, যেগুলোকে তাতরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে নিয়েছিল এবং জনগণের সম্মুখে তার আয় ব্যয়ের হিসাব পেশ করা নিজেদের দায়িত্ব মনে করতো না। তবে পরামর্শ ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত সরকার জনগণের ইচ্ছা ও পরামর্শক্রমে যেসব ট্যাক্স ধার্য করে এবং এ খাতে সংগৃহীত সমুদয় অর্থ সর্বসাধাণের উদ্দেশ্যে গঠিত সরকারী তহবিলে জমা রাখে, জনগণের পরামর্শানুযায়ী তা ব্যয় করে এবং সরকার জনগণের সম্মুখে তার হিসেব দয়ের ব্যাপারে শরীয়ত অবশ্যি কোনো বিধি নিষেধ আরোপ করেনি। ইসলামী রাষ্ট্রু প্রতিষ্ঠা পূর্বে সমাজে যদি কোনো প্রকার অস্বাভাবিক রকমের অর্থনৈতিক পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে গিয়ে থাকে অথবা একদল লোক হারাম পদ্ধতিতে সম্পদের পাহাড় গড়ে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে ইসলামী সরকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পরিবর্তে ট্যাক্স বসিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য সৃষ্টি এবং অন্যান্য ইসলামী আইন প্রয়োগ করে শাসকগণকে এমনসব একনায়কত্বূমূলত ক্ষমতা দান করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যেসব ক্ষমতা লাভ করার পর কোনো এক পর্যায়ে তাদের কে নিয়ন্ত্রিত করা আর সম্ভ হয় না। ফলে এর যুলমের পরিবর্তে তার চেয়ে ভয়াবহ যুল্মের প্রতিষ্ঠা হয়।

ঙ. উত্তরাধিকার আইন

এ ছাড়াও ইসলামে একটি উত্তরাধিকার আইনও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি কমবেশী যে পরিমাণ সম্পদ সম্পত্তি রেখে মারা যাক না কেন একটি নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী তাকে বিস্তৃততর ক্ষেত্রে ছড়িযে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। সর্বপ্রথম পিতামাতা, স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরো সম্মাত্তির অধিারী হয়, অতঃপর ভাইবোনেরা হয় উত্তরাধিকারী এবং তাদের পর হয় নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজন। যদি কোনো ব্যক্তি মারা যায় এবং তার কোনো পর্যায়ের কোনো উত্তরাধিকারী না পাওয়া যায়, তাহলে সমগ্র জাতিই তার উত্তরাধিকারী হবে এবং তার সম্পত্তি বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের জন্য ইসলাম উল্লিখিত মূলনীতি ও চতুঃসীমা নির্ধারণ করেছে। এ চতুঃসীমার মধ্যে পুর্বোল্লেখিত মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতে আপনার নিজেদের জন্য ইচ্ছামত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারেন। যুগসম্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতি যুগে একে বিস্তারিত রূপ দান আমাদের নিজেদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের যে দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে এবং যে বিষয়গুলো অবশ্যি মেনে চলতে হবে তা হচ্ছে, আমরা অবশ্যি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ন্যায় একটি লাগামহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি না। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের ন্যায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমগ্র উপায় উপকারণকে সমষ্টি, তথা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনতে পারি না। আমাদেরকে একটি চতুঃসীমার মধ্যে অবস্থান করে এমন একটি স্বাধীন ও মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে- যেখানে মানুষের নৈতিক উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত থাকবে, সমষ্টির কল্যাণ সাধনের জন্য মানুষকে আইনের গিড়ে বাঁধবার প্রয়োজন অতি অল্পই অনুভূত হবে, যেখানে ভ্রান্ত পদ্ধতিতে অস্বাভাবিক শ্রেণী বিভাগের অবকাশ থাকবে না এবং স্বাভাবিক শ্রেণীগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিবর্তে সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত হবে। অর্থ উৎপাদনের যেসব উপায় উপকরণকে ইসলাম গণ্য করেছে, এ ব্যবস্থায় সেসবই হারাম বিবেচিত হবে এবং যেগুলোকে ইসলাম বৈধ গণ্য করেছে একমাত্র সেগুলোই বৈধ থাকবে। বৈধ পদ্ধতিতে অর্জিত সমুদয় সম্পদরে উপর ব্যক্তির ইসলাম প্রদত্ত মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকার স্বীকৃত হবে। সম্পদের উপর অবশ্যি যাকাত ধার্য করা হবে এবং যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী তাদের নিকট থেকে অপরিহার্যরূপে যাকাত আদায় করা হবে। এছাড়া উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মীরাস বন্টন করা হবে। সীমারেখার মধ্যে ব্যক্তিকে অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা ও প্রতিযোগিতা চালাবার পূর্ণ সুযোগ দান করা হবে এবং তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা হবে। এ স্বাধীন ও অবাধ প্রতিযোগিতা প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে মানুষ নিজেই যদি ইনসাফ ও ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে আইন সেখানে অনর্থক মাথা ঘামানো প্রয়োজন বোধ করববে না। কিন্তু যদি তারা ইনসাফ ও ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকে অথবা বৈধ সীমারেখা অতিক্রম করে এবং অস্বাভাবিক ধরনের মজুতদারী প্রভৃতির পথ প্রশস্ত করতে থাকে, তাহলে তাদের মৌলিক অধিকারসমূহ হরণ করা ও স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য নয় বরং নিছক ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং সীমাতিক্রম করার প্রবণতা রোধ করার জন্য আইন অবশ্যি কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
এ পর্যন্ত আলোচনায় প্রথম প্রশ্নের প্রথমাংশের জবাব শেষ হয়েছে। এবার প্রশ্নের দ্বিতীয়াংশের আলোচনায় আসুন। এখানে বলা হয়ছে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চমি, শ্রম, পুঁজি ও সংগঠন কোন্ ধরনের মর্যাদা লাভ করেছে?

শ্রম, পুঁজি ও সংগঠনের মর্যাদা

এ বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান লাভ করার জন্য আমি আপনাদেরকে ইসলামী ফিকাহশাস্ত্রের বর্ণিত মুযারিয়াত (ভাগচাষ) ও মুদারিবাত (অংশীদার ভিত্তিক ব্যবসা) সংক্রান্ত আইনগুলো পাঠ করার পরামর্ষ দিতে চাই। আধুনিক অর্থনৈতিতে এবং অর্থনীতি সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহে জমি, শ্রম, পুঁজি ও সংগঠনকে যে ধরনের অর্থনৈতিক উপকরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে ইসলামী ফিকাহর পুরাতন গ্রন্থসমূহে ঠিক সেভাবে সেগুলো বিবৃত হয়নি এবং সেসব বিষয়ের উপর পৃথক পৃথক গ্রণ্থও রচিত হয়নি। ইসলামী ফিকাহর বিভিন্ন অধ্যায়ে এসব বিষয়ে আলাচিত হয়েছে, কিন্তু এগুলোর পরিভাষা বর্ণনাভংগি আধুনিক অর্থনীতির পরিভাষা ও বর্ণনাভংগি থেকে আলাদা। তবে যে ব্যক্তি পরিভাষা ও বর্ণনাভংগির দাস নয়, বরং অর্থনীতির আসল বিষয়বস্তু ও সমস্যাবলী সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী, সে অতি সহজেই ইসলামী ফিকাহর অর্থনৈতিক আলোচনার ধারা অনুধাবন করতে সক্ষম হবে। ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রে মুযারিয়াত ও মুদারিবাত সম্পর্কে যেসব বিধান লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা পর্যালোচনা করলে জমি, শ্রম, পুঁচি ও সংগঠন সম্পর্কিত ইসলামের দৃষ্টিভংগি পুরোপুরি সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। মুযারিবাত বলতে এমন এক ধরনের কৃষিব্যবস্থা বুঝায় যেখানে এক ব্যক্তি জমির মালিক এবং অন্য এক ব্যক্তি তাতে চাষাবাদ করে। এ জমির ফসল থেকে উভয়েই অংশ লাভ করে। আর মুদারিবাত বলতে এমন এক ধরনের ব্যবসাকে বুঝায় যেখানে এক ব্যক্তির পুঁজি নিয়ে অন্য ব্যক্তি ব্যবসা চালায় এবং কারবারের মুনাফায় উভয়েই অংশীদারি হয়। লেনদেনের এ সকল ক্ষেত্রে ইসলাম যেভাবে জমি ও পুঁজির মালিক এবং চাষী ও উদ্যোক্তার অধিকার স্বীকার করেছে তা থেকে পুঁজি ও এর সঙ্গে মানুষ নিজের যে শ্রম ও সাংগঠনিক যোগ্যতা যুক্ত করে এ সবই উৎপাদনের উপাদনরূপে স্বীকৃত। এসব উপাদন তাদের কর্মক্ষমতার মাধ্যমে মুনাফায় নিজেদের অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করে। প্রাথমিক অবস্থায় ইসলাম এসব বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে অংশীদারিত্বের সম্পর্কের ব্যাপারটি প্রচলিত রীতির উপর ছেড়ে দেয়। কারণ প্রচলিত পদ্ধতিতে মানুষ নিজেরাই যদি নিজেদের মধ্যে ইনসাফ করে সেখানে আইনের হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন থাকে না। কিন্তু যদি কোনো ব্যাপারে ইনসাফ না হয়, তাহলে অবশ্যি ইনসাফের সীমা নির্ধারণ করা আইনের দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হবে। যেমন মনে করুন, আমি একজন জমির মালিক এবং আমি আমার জমি একজন কৃষককে বর্গা দিলাম বা আমার জমিতে এক কৃষককে পারশ্রমিকের বিনিময়ে কৃষিকাকে নিযুক্ত করলাম অথবা কাউকে জমি ঠিকে দিলাম। এসব ক্ষেত্রে যদি প্রচলিত রীতি অনুসারে ন্যায়নিষ্ঠার সাথে শর্তাবলী স্থিরীকৃত হয়, তাহলে এক্ষেত্রে আইনের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। তবে যদি এখানে কোনো বেইনসাফী হয়, তাহলে অবশ্যি সেক্ষেত্রে আইনে র হস্কক্ষেপ অপরিহার্য হবে। দেশের সংবিধানে এ উদ্দেশ্যে কৃষি সংক্রান্ত ধারা সন্নিবেশ করা যেতে পারে। ভাগাচাষী, ভূমি শ্রমিক বা ভূমি মালিক কারো স্বার্থ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। অনুরূপভাবে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে যতক্ষণ পুঁজির মালিক এবং ব্যবসায়ে পরিশ্রমকারী ও সংগঠনকারীর মধ্যে ন্যায়নীতি সহকারে ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদিত হতে থাকবে এবং কেউ কারোর হক মারার চেষ্টা করবে না বা কারের উপর অত্যাচার করবে না, ততক্ষণ আইন সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না। তবে এসব ব্যাপারে কোনো পক্ষ যদি কোনো প্রকার বেইনসাফী করে, তাহলে সেক্ষেত্রে আেইন কেবল হস্তক্ষেপ করারই অধিকারী হবে না, বরং পুঁজি, শ্রম ও সংগঠন সবাই যাতে ব্যবসায়ের মুনাফার ন্যয়ানুগ অংশ লাভ করতে পারে সেজন্য ইনসাফপূর্ণ বিধি বিধান প্রণয়ন তার দায়িত্ব বিবেচিত হবে।

যাকাত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

দ্বিতীয় প্রশ্নে বলা হয়েছে, যাকাত ও সাদকাকে অর্থনৈতিক কল্যাণ ও উন্নয়নে ব্যবহার করা যায় কিনা। এ প্রশ্নের জবচাবে বলা যায়, যাকাত ও সাদকার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধন করা। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি কথা গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে, তা হচ্ছে, অর্থনৈতিক কল্যাণ ও উন্নয়ন বলতে যদি সারাদেশ ও সমগ্র জাতির কল্যাণ ও উন্নয়ন বুঝানো হয়, তাহলে এ উদ্দেশ্য যাকাত ও সাদকার ব্যবহার বৈধন নয়। যাকাতের ব্যবাহর সম্পর্কে আমি ইতিপূর্বেই আলোচনা করেছি। সমাজের কোনো ব্যক্তি যাতে তার মৌলিক মানবিক প্রয়োজন- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না থাকে, যাকাত মূলত সেদিকেই ‍দৃষ্টি রাখবে। এছাড়া যাকাতের সাহায্যে আমরা সমাজের এমন এক শ্রেণীর অর্থনৈতিক প্রয়োজন মিটাতে পারি যারা অর্থোপার্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাবার যোগ্যতা রাখে না। এতীম শিশু, বৃদ্ধ, পঙ্গু, অক্ষম বা সাময়িকভাবে বেকার অথবা সুযোগ ও উপায় উপকরণের স্বল্পতা হেতু যারা অর্থোপার্জনের চেষ্টা করতে পারছে না এবং সামান্য সাহায্য সহায়তা লাভ করলে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে বা যারা ঘটনাক্রমে কোনো ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হযেছে- এ ধরনের লোকদের সাহায্য সহায়তা দান করার জন্য যাকাত ধার্য করা হয়েছে। আর সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নেসর জন্য যাকাত চাড়া অন্যান্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা

তৃতীয় প্রশ্নে বলা হয়েছৈ, আমরা কি সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে পারি। এর জবাবে বলা যায়, অবশ্যি করতে পারি। ইতিপূর্বে কয়েকশ’ বছর পর্যন্ত এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর আজ যদি আপনি অন্যের অন্ধ অনুসৃতি ত্যাগ করে যথার্থই এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংকল্প নেন, তাহলে তা আদৌ কোনো কঠিন কাজ নয়। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আধুনিক বিশ্বের ন্যায় সুদের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছিল। ইসলাম এ ব্যবস্থঅর পরিবর্তন সাধন করে এবং সুদকে হারাম করে দেয়। প্রথম আরবে সুদ হারাম হয়, অতঃপর যেখানেই ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানেই সুদ হারাম হতে থাকে। সমগ্র অর্থনীতি ‍সুদ ছাড়াই চলতে থাকে। শত শত বছর ধরে এ ব্যবস্থা দুনিয়ার বুকে পরিচালিত হয়েছে এবং বর্তমানেও এর জীবনীশক্তির অভাবের কোনো কারণ দেখা যায় না। যদি আমাদের মধ্যে ইজতিহাদের শক্তি থাকে এবং আমরা ঈানী শক্তিতে বলীয়ান হই ও ইইসঙ্গে যে বস্তুকে আল্লাহ হারাম গণ্য করেছেন তাকে হারাম করার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে পারি, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা আজ সুদের বিলোপ সাধন করে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে পারি। আমার ‘সুদ’ গ্রন্থে আমি এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো জিটিলতা নেই বলে আমি সেখানে দেখিয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। পুঁজি নিয়ে যারা কারবারে খাটাচ্ছে ও পরিশ্রম করছে এবং সাংগঠনিক তৎপরতা ও কার্যাদি চালিয়ে যাচ্ছে তারা মুনাফা অর্জন সফল হোক বা না হোক সেদিকে দৃষ্টি না রেখে, ঋণের আকার কারবারে পুঁজি লগ্নি করা এবং নির্ধারিত হারে মুনাফা অর্জন করার কোনো অধিকার নেই। সুদের আসল অনিষ্টকারিতা হচ্ছে যে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজের পুঁজি শিল্প-কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অথবা কৃষিফার্মে ঋণ আকারে লগ্নি করে এবং পূর্বাহ্নেই এর ‍উপরে নির্দিষ্ট হারেত মুনাফা স্থিরকৃত করে নেয়। পুঁজি লগ্নি কারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কারবারে লাভ হয়েছে। বা লোকসান হয়েছে অথবা কি পরিমাণ লাভ বা লোকসান হয়েছে তার কোনো পরোয়াই করে না। সে কেবল বছরে বঝছরে বা মাসে মাসে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা আদায় করেই যাবে এবং এই সঙ্গে আসল ফিরে পাওয়ারও অধিাকারী হবে। এ যুল্‌ম আমারেদকে খতম করতে হবে। বিশ্বের কেউ সুদের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেনি। এ বৈধতার কোনো কারণ পেশ করা যেতে পারে না। পক্ষান্তরে ইসলামের নীত হচ্ছে যে, আপনি ঋণ দেন, তাহলে ঋণের আকারেই তা দিতে হবে। এক্ষেত্রে কেবলমাত্র নিজের ঋণবাবদ প্রদত্ত অর্থ ফেরত নেয়ার অধিকর আপনারে থাকবে। আর যদি আপনি মুনাফা অর্জন করতে চান, তাহলে সোজাসুজি আপনাকে কারবারে অংশীদার হতে হবে এবং সেভাবেই চুক্তি করতে হবে। নিজের পুঁজি কৃষি, শিল্প, ব্যবসা যেখানেই লাগতে চান, এ শর্তে লাগন যে, তা থেকে যে মুনাফা অর্জিত হবে তা আপনি এবং উদ্যোক্তা ‍উভয়ে পূর্বনির্ধারিত হারে ভা করে নেবেন। এটি ইনসাফ ও ন্যায়নীতির দাবী এবং এভাবে অর্থনৈতিক জীবনের সমৃদ্ধি সম্ভব। সুদী পদ্ধতি খতম করে এ পদ্ধতি প্রচলনের পথে বাধা কোথায়? বর্তমানে যে পুঁজি ঋণ আকারে খাটানো হয়, তা অংশীদারী নীতির ভিত্তিতে খাটাইলে হবে। সুদের হিসেবের পরিবর্তে মুনাফার হিসেবে কষতে হবে, এ ব্যাপারে কোনো কঠিন সমস্যা দেখা যায় না। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই। আমরা অন্ধ অনুসৃতিতেই অভ্যস্ত। পূর্ব থেকে যা চলে আসছে, চোখ কান বন্ধ করে তা চালিয়ো যেতেই আমরা চাই। ইজতিহাদ করে ইসলামের মুলনীতির ভিত্তিতে কোনো সসমঞ্জস, বৈধ ও ইনসাফপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে আমরা প্রস্তুত নই। বেচারা আলেম ওলামাদের নিন্দা করা হয় যে, তারা তাকলীদ তথা অন্ধ অনুসরণ করে- ইজতিহাদে প্রবৃত্ত নয়। অথচ তারা নিজেরাই (পশ্চাত্য চিন্তার) অন্ধ অনুসরণ কবরে চলছে, ইজতিহাদে তারাও উদ্যোগী নয়। আমাদের রোগ এ মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত না হলে বহু পূর্বেই এ সমস্যার সমাধান হতো।

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার সম্পর্ক

শেষ প্রশ্নে বলা হয়েছে, ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যে কোনো পর্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে? এ জবাবে বলা যায়, এ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক একটি গাছের শিকড়, কাণ্ড, শাখা প্রশাখা ও পত্রের মধ্যকার সম্পর্কের ন্যায়; আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমানের ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। নৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্টি এখান থেকেই। ইবাদত বা প্রচলিত অর্থে ধর্মীয় ব্যবস্থাও এখন থেকেই সৃষ্টি হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল ব্যবস্থার উৎসও এখানেই। এগুলো সবই একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যদি আপনি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনে থাকেন এবং কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে স্বীকার করে থাকেন, তাহলে অনিবার্যভাবে ইসলাম প্রদত্ত নৈতিক আদর্শ ও নীতি অবলম্বন করতে হবে, ইসলাম প্রদত্ত নীতির ভিত্তিতে অর্থনীতির সমগ্র ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে হবে। যে আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আপনি নামায পড়েন, সেই একই আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আপনাকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। যে দীনের বিধি-বিধান আপনার রোযা ও হজ্জ্ব নিয়ন্ত্রণ করে সে একই দীনের বিধি-বিধথান আপনার আদালত ও বাজারের জীবনও নিয়ন্ত্রিত করবে। ইসলামে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাগুলো পৃথক এককের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এগুলো এবই ব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগ ও শাখা মাত্র। এগুলো একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত এবং প্রত্যেকটি অন্যটির সাহায্যে শক্তিশারী। যেখানে তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের প্রতি ঈমানের অস্তিত্ব নেই এবং এ উৎস থেকে উৎসারিত নৈতিক বৃত্তি অনুপস্থিত, সেখানে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কোনোদিন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং কোনোক্রমে প্রতিষ্ঠিত করলেও তা টিকে থাকতে পারে না। অনুরূপভাবে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে একই কথা। আল্লাহ, রাসুল, আখেরাত ও কুরআনের প্রতি ঈমান না থাকলে এ ব্যবস্থা চলতে পারে না। কারণ ইসলাম যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা দান করেছে, তার ভিত্তি হচ্ছে; আল্লাহ বার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন শাসক, রাসূল তাঁর প্রতিনিধি, কুরআন তাঁর অবশ্য পালনীয় ফলমান এবং আমাদেরকে একদিন সর্বশক্তিমান আল্লাহর সম্মুখে আমাদের কাজের জবাবদিহি করতে হবে। ইসলামে ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যবস্থঅর সাথে সম্পর্কহীন কোনো পৃথক এককের অধিকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থঅর অস্তিত্ব রয়েছে বা ইসলামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যবস্থা থেকে সম্পর্কহীন থাকতে পারে, এ ধারণা সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত। যে ব্যক্তি ইসলামকে জেনে বুঝে গ্রহণ করেছে, সে কখনো এ ধারণা পোষণ করতে পারে না যে, মুসলমান থাকা অবস্থায়ই তার রাজনীতি, অর্থনীতি বা তার জীবনের কোনো বিভাদ তার ধর্ম থেকে আলাদা থাকতে পারে। সে জানে রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন আদালতের ক্ষেত্রে ইসলাম থেকে আলাদ থেকে বা ইসলাম চাড়া অন্য কোকনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে কেবলমাত্র ‘ধর্মীয়’ ব্যাপারে ইসলামের আনুগত্য করার নাম ইসলামী জীবন হতে পারে না।

পঞ্চম অধ্যায়ঃ কুরআনের আলোকে অর্থনৈতিক জীবনের কতিপয় মৌলিক নীতিমালা

[আমরা এ গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষযের সাথে সম্পৃক্ত তাহফহীমুল কুরআনের অনেকগুলো টীকা সংযুক্ত করে দিয়েছৈ। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়ে এমন কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ টীকা তাফহীমুল কুরআনে রয়েছে, যেগুলো নির্দিষ্ট কোনো অধ্যায়ে স্থান পায়নি। সেগুলো আলোচনার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে কোনো কোনো স্থানে প্রয়োজনমত সামান্য বিয়োজন কিংবা দুয়েক বাক্য সংযোজন করা হয়েছে।]

১. ইসলামী সমাজের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য

[[তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নহল, টীকা ৮৮-৮৯।]
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
“আল্লাহ আদল, ইহসান এবং সেলায়ে রেহমীর নির্দেশ দিচ্ছেন। আর ফহসা, মুনকার ও বাগী থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, যেনো তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।” [আন নহল: ৯০]
এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে এমন তিনটি জিনিরে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেগুলোর উপর গোটা মানব সমাজে পরিশুদ্ধি ও সার্থকতা নির্ভরশীল।
এর মধ্যে পয়লা নির্দেশ হলো ‘আদল’ [সুবিচার]। দুটি স্বতন্ত্র সত্যের সমন্বয়ে আদল গঠিত। এক. মানুষের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও সাদৃশ্য প্রতিষ্ঠা করা। দুই. প্রত্যেককে যথাযথভাবে তার অধিকার প্রদান করা। আমাদের ভাষায় সাধারণত ‘আদল’-এর অর্থ করা হয় ইনসাফ করা। কিন্তু অনেক সময় ইনসাফ শব্দটি ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করে। এ থেকে এ ধারণার সৃষ্টি হতে পারে যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে তাদের অধিকার বন্টিত হতে হবে অর্ধেক অর্ধেক বা সমান সমান ভিত্তিতে। এ থেকেই ‘আদল’ মানে ধরে নেয়া হয়েছে সমবন্টন। অথচ সমবন্টন ব্যবস্তা স্বাভাবিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃতপক্ষে আদল যে জিনিসের দাবি করা হচ্ছে, ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য, সমামন সমান নয়। কোনো কোনো দিক থেকে আদল সমাজে লোকদের মধ্যে অবশ্যই সমতা দাবি করে, যেমন নাগরিক অধিকার। কিন্তু আবার কোনো কোনো দিক থেকে ‘সমতা’ আদলের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেমন পিতা-মাতা ও সন্তানের মাঝে সামাজিক ও নৈতিক সম্পর্ক এবং উন্নত ধরনের সেবা প্রদানকারী ও নিম্নমানের সেবা প্রদানকারীদেরকে সমান সমান বেতন দেয়া। তাই আল্লাহ তায়ালা এখানে যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা হলো, অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে সমতা বিধান করা নয়া, বরঞ্চ ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য রক্ষা করা। আর এই নির্দেশের দাবি হলো, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নৈতিক, সম্পর্কগত, অর্থনৈতিক, আইনগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার পূর্ণ ঈমানদারীর সাথে যথাযথভাবে প্রদান করতে হবে।
দ্বিতীয় নির্দেশ হলো ‘ইহসান’। ইহসান মানে সুন্দর ব্যবহার, হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ, চমৎকার আচরণ, পারস্পরিক ঔদার্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, অপরকে তার অধিকারের চেয়ে বেশী দেয়া এবং নিজের অধিকারের চেয়ে কম পেয়েও সন্তুষ্ট থাকা। বসতুত ইহসান আদলের চেয়ে বেশী কিছু বুঝায়। সামাজিক জীবনে তাই ইহসানের গুরুত্ব আদলের চেয়েও বেশী। আদল যদি হয় সামাজিক জীবনের ভিত, তবে ইহসান হলো সমাজের কারুকাজ। আদল যদি সমাজকে অসন্তোষ ও তিক্ততা থেকে রক্ষা করে, তবে ইহসান তাতে সন্তোষ ও মাধুর্য এনে দেয়। কোনো সমাজের প্রত্যেক সদস্য হরহামেশা মেপেমেপে নিজের অধিকার নির্ণয় ও আদায় করে; আর অপরের অধিকার কতোটা রযেছে তা খতিয়ে নির্ধারণ করে এবং কেবল ততোটুকুই দিযে দেয়। এ ধরনের একটি কাটখোট্টা সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘাত ঘটেনা বটে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সে সমাজ প্রেম ভালবাসা, কৃতজ্ঞতা, মাহাত্ম্য উদারতা, ত্যাগ ও কুরবানী, নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা এবং অপরের কল্যাণ কামনার মতো মহোত্তম বৈশিষ্ট্যসমূহ হতে বঞ্চিত থেকে যায়। অথচ এই গুণ বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে ব্যক্তিজীবনে সজীবতা ও মাধুর্য সৃষ্টির এবং সমাজ জীবনে সৌন্দর্য সুষমান বিকাশের উপাদান।
তিন নম্বর নির্দেশটি হলো ‘সেলায়ে রেহমী’। এ হচ্ছে আত্মীয়দের প্রতি ইহসান করার একটি খাস পন্থা। এর অর্থ কেবল এই নয় যে, কোনো ব্যক্তি তার আত্মীয়স্বজনের সাথে শুধু ভাল ব্যবহার করবে, তাদের সুখে দুখে শরীক হবে এবং বৈধ সীমার মধ্যে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করবে। বরং সেই সাথে এটাও এর অর্থ যে, প্রত্যেক সামর্থবান ব্যক্তি তার ধনসম্পদে নিজের ও নিজের সন্তান সন্ততির অধিকার প্রদানের সাথে সাথে স্বীয় আত্মীয় স্বজনের অধিকারও স্বীকার করে নেবে। আল্লাহর বিধান প্রত্যেক খান্দানের সচ্ছল ব্যক্তিকেএ ব্যাপারে দায়িত্বশীর বানিযেছে যে, সে তার খান্দানের লোকদেরকে অন্নহীন বস্ত্রহহীন থাকতে দেবেনা। খোদায়ী শরীয়তের দৃষ্টিতে মানব সমাজে এর চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো অবস্থা হতে পারেনা যে, সেখানে পরিবারের এক ব্যক্তি সম্পদের প্রাচুর্যে আরাম আয়েশে কাল কাটাবে, আর সে পরিবারেরই অপর কোনো সদস্য ভাত কাপড়ের অভাবে দুর্ভোগ পোহাবে। মূলত ইসলাম পরিবারকে সমাজ সংগঠনের অতিগুরুত্বপূর্ণ অংগ মনে করে। এক্ষেত্রে ইসলাম এই নীতি ঘোষণা করেছে যে, প্রত্যেক পরিবারের দরিদ্রদের পয়লা অধিকার বর্তায় সেই পরিবারেরই সচ্ছল লোকদের উপর । এরপর তার অধিকার বর্তায় অন্যদের উপর। এ কথাটিই নবী করীম (সা) তাঁ বিভিন্ন বাণীতে সুস্পষ্টভাবে বলে গেছেন। বিভিন্ন হাদীস থেকে পরিষ্কারভাবে জানা যায়, যে কোনো ব্যক্তির উপর সর্বপ্রথম অধিকার বর্তায় তার মাতাপিতা, স্ত্রী, সন্তান সন্ততি এবং ভাই বোনের। অতঃপর তার সেইসব লোকদের অধিাকর বর্তায় যারা পরবর্তী পর্যায়ের নিকটজন। এভাবে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য নিকটতর লোকের অধিকার বর্তায়।
এই নীতির ভিত্তিতে হযরত উমর ফারুক (রা) এক এতীম শিশুর চাচাতো ভাইদের বাধ্য করেছিলেন সে এতীমের লালন পালনৈর দায়িত্ব গ্রহণ করতে। অপর একটি এতীমের ব্যাপারে ফায়সালা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, তার কোনো দুল সম্পর্কীয় আত্মীয় বর্তামান থাকলেও এর লালন পালনের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত করতাম। যে সমাজে প্রত্যেক সদস্য (UNIT) এমননি করে নিজ আত্মীয়স্বজনের দায়িত্ব গ্রহণ করে, সেখানে কতো সুন্দর অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, সামাজিক সুসম্পর্ক ও মাধুর্য এবং নৈতিক পবিত্রতা ও শ্রেষ্টত্ব গড়ে উঠতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
উপরে আলোচিত তিনটি কল্যাণকর কাজের প্রতিকূলে আল্লাহ তায়ালা তিনটি মন্দ কাজ থেকে বিরত থাক বলেছেন। এই মন্দু কাজগুলো ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে এবং সামাজিকভাবে গোটা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রথমেই নিষেধ করা হয়েছে ‘ফাহ্শা’ কাজ থেকে। ফাহ্শা বলতে যাবতীয় অনর্থক, অশ্লীল ও লজ্জাকর কাজকে বুঝায়। এমন প্রতিটি মন্দ কাজই ফাহশা, যা প্রকৃতিগতভাবেই মন্দ, লজ্জাকর এবং কুশ্রী। যেমন, কৃপণতা, ব্যভিচার, নগ্নতা ও উলংগপনা, সমকামিতা, নিষিদ্ধ নারীদের বিয়ে করা, চুরি ডাকাতি, মদ্যপা, ভিক্ষাবৃত্তি গালাগাল এবং অশ্লীল কথাবার্ত বলা ইত্যাদি। একইভাবে প্রকাশ্যে, ঘোষণা দিয়ে মন্দ কাজে লিপ্ত হওয়া এবং মন্দ কাজ ছড়িয়ে দেয়াও ফাহ্শার অন্তর্ভুক্ত। যেমন, মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা করা, অপবাদ দেয়া, গোপন অপরাধসমূহের প্রচার করা, অসৎ কর্মে সুড়সুড়ি দানকারী গল্প,নাটক ও ফিল্ম, নারীদের সাজগোজ প্রদর্শন করে প্রকাশ্যে চলাফেরা, নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা, মঞ্চে উঠে নারীদের নাচগান করা এবং বিভিন্ন শারীরিক ভংগিমা প্রদর্শন করা ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত যে কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে, তা হলো মুনকার। এমন প্রতিটি মন্দ কাজই মুনকার, যাকে মানুষ স্বভাবগতভাবে মন্দ বলে জানে, সব সময় যাকে মন্দ বলে আসছে এবং আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তে যেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
তৃতীয় নিষিধ্ধ কাজ হলো ‘বাগী’। এর অর্থ হচ্ছে নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং অন্যদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা, চাই সে অধিকার স্রষ্টার হোক কিংবা সৃষ্টির।
এসব হচ্ছে এমন মৌলিক গুণবৈশিষ্ট্য যার উপর ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা ব্যক্তি এবঙ রাষ্ট্র উভয়েরই দায়িত্ব। এই নির্দেশসমূহ পালন এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা ও রাখার জন্যে নৈতিক ও আইনগত সকল শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।

২. নৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির ইসলামী পদ্ধতি

[তাফহীমুল কুরআন, সূরা আর রূম, টীকা ৫৭]
فَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“অতএব [হে মুমিনরা], আত্মীয়কে তার অধিকার দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকে [তাদের অধিকার]। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, তাদের জন্যে এটাই উত্তম পন্থা। আর এসব লোকেরাই কল্যাণ ও সফলতার অধিকারী হবে।” [সূরা আর রূম: ৩৮]
এ আয়াতে আত্মীয়, মিসকীন ও মুসাফিরকে ভিক্ষা দিতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে তাদেরকে যা দিতে হবে, তা তাদের অধিকার। তাদেরকে অধিকার মনে করেই তাদের দাও। দেবার সময় তোমার কোণেও যেনো এরূপ কোনো চিন্তার উদয় না হয় যে, তুমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করছো, তুমি একজন মহামানব, দানবীর; আর সে হীন নগণ্য এবং তোমার দান খেয়েই সে জীবন ধারণ করে। বরঞ্চ তোমার মনের গভীরে একথা বদ্ধমূল করে নিতে হবে যে, ধনমালের প্রকৃত মালিক তোমাকে অধিক সম্পদ দিয়েছেন. এই অধিক সম্পদের মধ্যে কমওয়ালাদের অধিকার রয়েছে। তোমাকে পরীক্ষা করার জন্যেই এই অধিক সম্পদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ দেখতে চান, তুমি তাদের অধিকার উপলব্ধি করছো কিনা এবং তা পৌঁছে দিচ্ছো কিনা?
আল্লাহর এ বাণীর প্রকৃত মর্ম যিনি উপলব্ধি করতে পারবেন, তিনি অবশ্যি অনুভব করবেন যে, কুরআন মজীদ মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির যে পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নের জন্যে স্বধীন সমাজ ও একটি স্বাধীন অর্থনীতি বর্তমান থাকা একান্ত অপরিহার্য। এমন কোনো সামাজিক ব্যবস্থায় এই পদ্ধতি কার্যকর করা কিছুতেই সম্ভব নয়া, যেখানে ব্যক্তিমালিকানার অধিকার রহিত করা হয়, সকল উপায় উপকরণ জাতীয়করণ করা হয় এবং জনগণের মধ্যে জীবিকা বন্টনের যাবতীয় কাজ সরকারী ব্যবস্থাপনায় আঞ্জাম দেয়া হয়। এমন ব্যবস্থায় ব্যক্তি নিজের উপর অপরের অধিকার বুঝতে ও আদায় করতে পারেনা এবং কেউ কারো কাছ থেকে কিছু গ্রহণ ও তার জন্যে কল্যাণ কামনা করতে পারেনা। একইভাবে কমিউনিজমের উপস্থাপিত সমাজব্যবস্থাও কুরআনী স্কীমের সম্পূর্ণ বিপরীত। অথচ একে ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ এবং ‘কুরআনী প্রতিপালন ব্যবস্থা’ এত্যাদি প্রাতারণামূলন নাম দিয়ে কিছু লোক আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে ধোকায় ফেলতে চাইছে এবং এই ব্যবস্থাকে জোরপূর্বক কুরআনের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যবস্থার সাথে কুরআনী দৃষ্টিভংগির দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। এ ব্যবস্থা কুরআনী দৃষ্টিভংগির সম্পূর্ণ খেলাফ। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত নৈতিকতার লালন ও চারিত্রিক উন্নতি সাধনের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। কুরআনের স্কীম তো কেবল সে সমাজেই বাস্তবায়িত হতে পারে যেখানে সমাজের মানুষ ব্যক্তিগতভাবে কিছু না কিছু সহায় সম্পদের মালিক হবে; নিজ মালিকানাধীন সহায় সম্পদের ব্যয় ব্যহারের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা লাভ করবে এবং নিজের ইচ্ছা আগ্রহ অনুযায়ী আল্লাহ ও তাঁর বান্দাহদের অধিকার নিষ্ঠার সাথে আদায় করতে পারে। এই ধরনের সমাজের ক্ষেত্রে িআশা করা যেতে পারে যে, একদিকে সেখানে মানুষের মধ্যে পরস্পরে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং তা প্রদান করার মতো মহান গুণাবলী সৃষ্টি হবে। অপরদিকে সম্পর্কে সচেতনতা এবং তা প্রদান করার মতো মহান গুণাবলী সৃষ্টি হবে। অপরদিকে যেসব লোকের সাথে এই কল্যাণমূলত আচরণ করা হবে, তাদের অন্তরেও এই কল্যাণকারী লোকদের প্রতি হৃদ্যতা, কৃতজ্ঞতা, ভালবাসা, আন্তরিকতা এবং অনুগ্রহ করার পবিত্র মনোভাব সৃষ্টি ও লালিত হবে। এভাবেই শেষ পর্যন্ত এমন একটি আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে অন্যায়ের প্রতিরোধ আর ন্যায়ের প্রতিপালন কোনো ক্ষমতাধরের ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হবেনা। বরঞ্চ লোকেরা নিজ থেকেই অন্তরের পবিত্রতা ও সদিচ্ছা কারণে স্বেচ্ছায় এসব দায়িত্ব পালণ করে যাবে।

৩. জীবিকার ধারণা এবং ব্যয়ের দৃষ্টিভংগি

وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى
“পার্থিব জীবনে সেইসব জাঁকজমকের প্রতি বিন্দুমাত্র দৃষ্টিও দিয়োনা, যা আমি লোকদের মধ্য থেকে বিভিন্ন জনকে দিয়ে রেখেছি। এগুলো তো তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলার জন্য দিয়েছি। আসলে তোমার রবের দেওয়া হালাল জীবিকাই উত্তম এবং স্থায়ী।” [সূরা তোয়াহা: ১৩১]
আমরা এখানে ‘রিযক’ শব্দের অনুবাদ করেছি ‘হালাল জীবিকা’। কারণ, আল্লাহ তায়ালঅ কোথাও হারাম ধনমালকে ‘রিযকে রব’ বা ‘রবের দেওয়া জীবিকা’ বলেননি। আল্লাহ তায়ালার এব বাণীর মর্ম হলো, ফাসিক ফাজির লোকেরা অবৈধ পন্থায় সম্পদ সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে নিজেদের জীবনে যে বাহ্যিক চাকচিক্য সৃষ্টি করে, তাকে ঈর্ষা ও লোভের দৃষ্টিতে দেখা তোমার ও তোমার সাথী ঈমানদার লোকদের কাজ নয়। বৈধ পন্থায় তোমরা যে পবিত্র জীবিকা উপার্জন কর, তা পরিমাণের দিক থেকে যতো কমই হোকনা কেন, সত্যপন্থী ও ঈমানদার ব্যক্তিদের জন্যে তা-ই উত্তম ও কল্যাণকর। আর এর মধ্যেই সেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা ইহজগত থেকে নিয়ে পরজগত পর্যন্ত বিস্তৃত ও স্থায়ী হবে।[তাফহীমুল কুরআন, সূরা তোয়াহা, টীকা: ১১৩]
وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“আল্লাহ যাকে চান অগণিত দান করেন।” [আন নূর: ৩৮]
وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ
“আফসোস আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা জীবিকার প্রশস্ততার দান করেন আর যাকে ইচ্ছা পরিমিত মাত্রায় দিয়ে থাকেন।” [আল কাসাস: ৮২]
অর্থাৎ জীবিকার প্রশস্ততা এবং সংকীর্ণতা যেটাই হোক না কেন, তা আল্লাহর ইচ্ছায়ই হয়ে থাকে। আর আল্লাহর ইচ্ছঅর পেছনে থাকে কল্যাণ ও মঙ্গল। কাউকে অধিক জীবিকা দানে অনিবার্য অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ তার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং সম্পদ দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করছেন। অনেক সময় এমন হয় যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সাংঘাতিক অপছন্দনীয়, কিন্তু আল্লাহ তাকে বিপুল ধনসম্পদ দান করে যাচ্ছেন। অবশেষে এই ধনসম্পদই তার উপর আল্লাহর আযাব নিয়ে আসে। পক্ষান্তরে কাউকেও যদি পরিমিত দান করা হয়ে থাকে, তবে তার অনিবার্য অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তায়ালা তার উপর অসন্তু্ট এবং স্বল্প রিযিক দিয়ে আল্লাহ তাকে সাজা দিচ্ছেন। আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়া সত্ত্বেও নেক লোকের উপর জীবিকার সংকীর্ণতা চেপে থাকতে পারে। অনেক সময় আল্লাহর রহমত হিসেবেও তাঁদের জীবিকা এরূপ সংকীর্ণ করা হতে পারে। সম্পদ দান সংক্রান্ত আল্লাহর এই নীতি অনুধাবনে ব্যর্থ হবার কারণেই বহু লোক আল্লাহর অভিশাপে নিপাতিত লোকদের প্রাচুর্যের প্রতি লোভ ও ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।[তাফহীমুল কুরআন, সূলা আল কাসাস, টীকা: ১০১]
الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ
“যাদের অবস্থা এমন যে, আল্লাহর কথা শুনতেই তাদের অন্তরে কেঁপে উঠে, তাদের উপর যে বিপদ আসে, তাতে তারা সবর অবলম্বন করে, সালাত কায়েম করে, আর আমরা যে জীবিকা তাদের দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় কর।” [আল হজ্জ: ৩৫]
পূর্বেই একথা বলে এসেছি যে, আল্লাহ তায়ালা কখনো হারাম এবং অপবিত্র ধনসম্পদকে তাঁর দেয়া জীবিকা বলেননি। তাই এই আয়াতের অর্থ হবেচ, যে পবিত্র জীবিকা আমরা তাদের দান করেছি, অথবা যে হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা তাদের করে দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। ব্যয় শব্দ দ্বারাও এখানে সব ধরনের ব্যয়কে বুঝানো হয়নি। এখানে ব্যয়ের অর্থ হলো, নিজের এবং নিজ পরিবার পরিজনের বৈধ প্রয়োজন পূরণ করা; আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা, কনকল্যাণকর কাজে অংশ নেয়া এবং আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার কাজে আর্থিক কুরবানী করা। বাহুল্য ব্যয়, বিলাসিতা ও জাঁকজমকের জন্যে ব্যয় এবং লোক দেখানো ব্যয় সেই ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়, কুরআন যাকে ‘ইনফাক’ বলেছে; বরং এ ধরনের ব্যয়কে তো কুরআন অপব্যয় বলে আখ্যায়িত করেছে। অনুরূপভাবে কৃপণতা ও সংকীর্ণ মন নিয়ে যে ব্যয়ের দ্বারা নিজের অবস্থা ও মর্যাদা অনুযায়ী প্রয়োজন পূরণ করা হয়না এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর সৃষ্টির সেবা ও সাহায্যেও এগিয়ে আসা হয়না- এসব ব্যয়কে আর যাই হোক, কুরআনে বর্ণিত ‘ইনফাক’ নামে অভিহিত করা যায় না। বরং আল কুরআন একে কৃপণতা এবং মনের সংকীর্ণতা বলে অভিহিত করেছে।[তাফহীমুল কুরআন, সূলা আল হজ্জ, টীকা: ৬৬]

৪. ব্যয়ের মূলনীতি

وَمِنَ الْأَنْعَامِ حَمُولَةً وَفَرْشًا كُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ
“যেসব জিনিস থেকে খাও যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করোনা, কেননা সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।” [সূরা আল আনআম: ১৪২]
এখানে আল্লাহ তায়ালা তিনটি কথা বলেছেন। কে. মানুষ যেসব ক্ষেত খামার, বাগবাগিচা এবং জীবজন্তুর অধিকারী তা সবই আল্লাহর দান। এই দান করার ক্ষেত্রে অপর কারো কোনো অংশ নেই। সুতরাং দানের কৃতজ্ঞতা পাবার ক্ষেত্রেও অপর কারো কোনো অংশ থাকতে পারেনা। দুই. যেহেতু এসব জিনিস আল্লাহরই দান, সেহেতু এগুলির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কেবল আল্লাহর দেয়া আইন কানুন এবং নিয়ম কানুন এবং নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার কোনো অধিকার অপর কারো থাকতে পারেনা। আল্লাহ্ ছাড়া অপর কারো সামনে দানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ নজরানা পেশ করা বিলকুল সীমালংঘন । আর এটাই শয়তানের পদাংশ অনুসরণ। তিন. আল্লাহ তায়ালা যেসব হালাল জিনিস মানুষের পানাহার ও ভোগ ব্যবহারের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, অনর্থক সেগুলোকে হরাম করে বৈধ নয়। মানুষ নিজের ধারণা কল্পনার ভিত্তিতে আল্লাহর দেয়া জীবিকা ও নিয়ামতসমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেসব বিধি নিষেধ আরোপ করে নিয়েছে তা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সাংঘর্ষিক। [তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনআম. টীকা: ১১৮]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ () وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنْتُمْ بِهِ مُؤْمِنُونَ
“হে ঈমানদার লোকেরা। আল্লাহ তোমাদের জন্যে যেসব পবিত্র জিনিস হালাল করেছেন, সেগুলিকে তোমরা হারাম করোনা এবং সীমালংঘন করোনা, আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের সাংঘাতিক অপছন্দ করেন। আর আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল পবিত্র জীবিকা দান করেছেন, তা থেকে পানাহার কর এবং সেই মহান আল্লাহর হুকুম অমান্য করা থেকে নিজেকে সংরক্ষণ কর, যার প্রতি তোমরা ঈমান এনেছো।” [সূরা আল মায়িদা: ৮৭-৮৮]
এখানে দুটি কথা বলা হয়েছৈ। এক. মানুষ যেন হালাল হারাম নির্ধারণ করার অধিকার নিজের হাতে তুলে না নেয়। প্রকৃতপক্ষে সেটাই হালাল, যা আল্লাহ হালাল করেছেন। আর হারামও কেবল সেটাই, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। নিজেদের ইচ্ছেমতো কোনো হালালকে যদি হারাম করা হয় তবে আল্লাহর আইন পালনকারী হবার পরিবর্তে নফসের আইন পালনকারী বলে সাব্যস্ত হতে হবে।
দুই. খৃস্টান পাদ্রী, হিন্দু সন্নাসী, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং প্রাচ্যের সূফীদের মতো বৈরাগ্য অবলম্বন এবং ভোগ ব্যবহার পরিহারের পন্থা অবলম্বন করা যাবেনা। ধর্মীয় মানসিকতা সম্পন্ন সরল প্রকৃতির কিছু লোকদের মধ্যে সব সময়ই এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে যে, তাঁরা দেগ ও আত্মার অধিকার প্রদান করাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক মনে করেছেন। তাদের ধারণা নিজেকে নিজে কষ্টে নিমজ্জিত করা নিজের আত্মাকে পার্থিব ভোগ ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করা এবং পার্থিব জীবনোপকরণ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা নেকীর কাজ এবং এ পদ্ধতি অবলম্বন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যেও অনুরূপ মানসিকতার দুয়েকজন ছিলেন। একবার নবী করীম (সা) জানতে পারলেন, কয়েকজন সাহাবী এই বলে শপথ করেছেন যে, তারা সারাজীবন [প্রতিনি] রোযা রাখবেন, রাত্রে কখনো বিছানায় শোবেন না, বরং সারারাত বিনিদ্র জেগে ইবাদত করে কাটাবেন, কখনো গোশ্ত খাবেন না এং নারীদের সংস্পর্শে যাবেন না। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা) একটি ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন: “আমাকে এরূপ করার হুকুম দেয়া হয়নি। তোমাদের উপর আত্মারও অধিকার আছে। সুতরাং কোনো কোনো দিন রোযা রাখবে এবং কোনো কোনো দিন পানাহার করবে। রাত জেগে ইবাদতও করবে আবার ঘুমাবেও। আমাকে দেখ! আমি রাত্রে ঘুমাই। আবার নামাযেও দাঁড়াই। কোনো দিন রোযা রাখি আবার কোনো দিন রোযা ছেড়ে দিই। গোশ্তও খাই, ঘিও খাই, সুতরাং যে আমার অনুসৃত নিয়ম পন্থা অপছন্দ করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” অতঃপর তিনি বললেন: “এই লোকদের কি হয়েছে? কেন এরা নিজেদের জন্য নারী, উত্তম খাদ্য, সুগন্ধি, ঘুম এবং পার্থিব ভোগ ব্যবহার হারাম করে নিয়েছে? আমি তোমাদের পাদ্রী এবং সন্যাসী হবার শিক্ষা দিইনি! আমার আনীত দীনের মধ্যে নারী এবং গোশ্ত পরিহার কারার বিধান নেই। ঘরেরর কোনায় নির্জনবাসের কোনো নিয়ম নেই। আত্ময়িন্ত্রণের জন্যে এখানকার বিধান হলো রোযা রাখা। বৈরাগ্যবাদের পরিবর্তে এখানে কল্যাণ লাভের পথ হলো জিহাদ। আল্লাহর আনুগত্য দাসত্ব কর! তাঁর সাথে কাউকেও শরীক করোনা। হজ্জ এবং উমরা পালন কর। সালাত কায়েম কর। যাকাত পরিশোধ কর এবং রমযানের রোযা রাখ। তোমাদের পূর্বেকার যেসব লোক ধ্বংস হয়েছে, তারা এ কারণে ধ্বংস হযেছে যে, তারা কঠোর ব্যবহার করেছেন। গীর্জা ও খানকায় যা ঘটেছে তা তাদেরই ধ্বংসাবশেষ।”
এ প্রসংগে আরেকটি হাদীস থেকে জানা যায় নবী করীম (সা) জনৈক সাহাবী সম্পর্কে জানতে পারলেন যে, তিনি দীর্ঘদিন তার স্ত্রীর নিকট যাননি। দিনরাত ইাদতের মশগুল থাকেন। তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে রাসূল (সা) তাঁকে নির্দেশ দিলেন, এখনই তোমার স্ত্রীর কাছে যাও। সাহাবী বললেন, আমি রোযা রেখেছি। তিনি বললেন: রোযা ভেংগে ফেলো এবং যাও।
হযরত উমরের খিলাফতকালে এক মহিলা এসে অভিযোগ করলো: “আমার স্বামী প্রতিদিন রোযা রাখেন এবং সারারাত ইবাদত করেন। আমার সাথে কোন স্ংস্পর্শ রাখেন না।” হযরত উমরা (রা) বিখ্যাত তাবেয়ী কায়াব ইবনে সাওরুল আয্দীকে তাদের মামলা শুনার জন্যে নিযুক্ত করলেন তিন এই ফয়সালা প্রদান করেন যে, এই মহিলার স্বামী একাধারে তিন রাত যতো ইচ্ছা ইবাদত করতে পারে। কিন্তু চতুর্থ রাতে তাকে অবশ্যি তার স্ত্রীর কাছে আসতে হবে। এটা স্ত্রীর অধিকার।[তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল মায়িদা. টীকা: ১০৪]
এই আয়াতে ‘সীমালংঘন করা’ কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক। হালালকে হারাম করা এবং আল্লাহ তায়ালা যেসব জিনিসকে পবিত্র বলেছেন, সেগুলোকে অপবিত্র জিনিসের মতো পরিহার করাও এক প্রকার সীমালংঘন। পবিত্র জিনিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপব্যয় এবং বাহু্ল্য ব্যয়ও এক প্রকার সীমালংঘন। তাছাড়া হালালের সীমা অতিক্রম করে হারামের সীমায় প্রবেশ করাও আরেক প্রকার সীমালংঘন। এই তিন ধরনের সীমালংঘনই আল্লাহর অপছন্দনীয়। [তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল মায়িদা. টীকা: ১০৫]

৫. মিতব্যয়ের মূলনীতি

وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا () وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
“যারা খরচ করার সময় বাহুল্যৗ খরচ করেনা, আবার কৃপণতাও করেনা, বরঞ্চ তাদের ব্যয় এই প্রান্তিকতার মধ্যবর্তী হয়ে থাকে। তারা আল্লাহ ছাড়া অপর কোনো ইলাহকে ডাকেনা। আল্লাহর হারাম করা কোনো প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেনা। ব্যভিচারে লিপ্ত হয়না। যে-ই এ অপরাধের কাজ করবে, সে অবশ্যি তার অপরাধের প্রতিফল লাভ করবে।” [সূরা আল ফুরকান : ৬৭-৬৮]
অর্থাৎ তারা এমন নয় যে, বিলাসিতা, জুয়া খেলা, মদ্যপান, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, মেলা মীনাবাজার এবং বিয়েশাদীদে অঢেল অর্থ ব্যয় করবে এবং নিজের অবস্থার চেয়ে অধিকা জৌলুস দেখানোর জন্যে খানাপিনা, ঘরবাড়ী, পোশাক আশক, সাজসজ্জা ও বেশভুষায় দুই হাতে অর্থ লুটাবে। পক্ষান্তরে তারা এমনও নয় , অর্থপূজারী ব্যক্তির মতো পাই পাই করে অর্থকড়ি ধনদৌলত সংগ্রহ করবে; অথচ নিজেও খাবেনা, সামর্তানুযায়ী সন্তান সন্ততির প্রয়োজনও পূরণ করবেনা এবং আন্তরিকতার সাথে কোনো কল্যাণমূলক কাজেও ব্যয় করবেনা। তৎকালীণ আরবদেশে এই দুই ধরনের লোকই ছিলো। একদিকে ছিলো সেইসব লো যারা লাগামহীনভাবে অর্থকড়ি ব্যয় করতো। এরা অর্থকড়ি ব্যয় করতো নিজেদের ভোগ বিলাসিতার জন্যে, সমাজে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার এবং স্বীয় বদান্যতা ও ধনদৌলতের ডঙ্কা বাজানোর জন্যে। অপরদিকে ছিলো সেইসব কৃপণ লোক, যাদের কৃপণতা খ্যাতি অর্জন করেছিল। খুব কম লোকই ছিলো, যারা মিতব্যয়িতার নীতি অবলম্বন কতো। এই গুটিকয়েক মিতব্যয়ী ব্যীক্তর মধ্যেও রাসূলে করীম (সা) এবং তাঁর সাথীরাই ছিলেন সর্বাধক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
এ প্রসংগে অপব্যয় ও কৃপণতার সংজ্ঞা জেনে নেয়া দরকার।
ইসলামের দৃষ্টিতে তিনটি জিনিসকে অপব্যয় বলা হয়ঃ
এক. অবৈধ কাজে অর্থসম্পদ ব্যয করা, তা একটি পয়সাও হোকনা কেন।
দুই. বৈধ কাজে খরচ করতে গিয়ে সীমালংঘন করা, চাই তা সামর্থ্যের চেয়ে অধিক খরচ করা হোক, কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধনসম্পদ নিজের ভোগবিলাস ও জাঁকজমকের জন্যে ব্যয় করা হোক।
তিন. ভালো কাজে ব্যয় করা, কিন্তু তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য নয়, বরঞ্চ লোক দেখানো ও আত্মপ্রচারের জন্যে করা।
অপরদিকে দুটি জিনসকে কৃপণতা বলা হয়:
এক. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজের ও সন্তান সন্ততির প্রয়োজন পূরণ না করা এবং
দুই. ভাল, ন্যায় ও কল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় না করা।
এই দুই প্রান্তিকতার মধ্যবর্তী অবস্থাই হলো মিতব্যয়। আর এটাই হলো অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামে নির্দেশিত পন্থা। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা) বলেছেন: (আরবী********************)
“জীবিকার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই বিজ্ঞতার পরিচায়ক।” [আতমদ ও তাবরানী: আবু দারদা]

৬. অর্থনৈতিক সুবিচর

قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ قَدْ جَاءَتْكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
“[শুয়াইব] বললো: হে আমার জাতির ভাইয়েরা! আল্লাহর দাসত্ব কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নাই। তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ ও পথনির্দেশনা এসেছে। সুতরাং ওজন ও পরিমাপ পূর্ণ করে দাও। লোকদের দ্রব্য সামগ্রীতে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করোনা। সংস্কার সংশোধনের পর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। এতেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত আছে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।” [সূরা আ’রাফ : ৮৫]
وَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ لَئِنِ اتَّبَعْتُمْ شُعَيْبًا إِنَّكُمْ إِذًا لَخَاسِرُونَ
“তার জাতির সেসব নেতা, যারা তার আহ্বানে সাড়া দিতে অস্বীকার করলো, নিজেরা নিজেরা বলাবলি করলো। : শুয়াইবের আহ্বানে সাড়া দিলে তোমরা অবশ্যি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” [নূরা আ’রাফ : ৯০]
প্রথম আয়াত থেকে জানা যায় যে, হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের জাতির মধ্যে দুটি বিরাট অন্যায় অপরাধের কাজ বর্তমান ছিলো। এর একটি হলো শিরক; আর অপরটি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি। শুয়াইব আলাইহিস সালামের জাতির নেতারা তাঁর আহ্বানের যে জবাব দিয়েছে, তাকে ছোট করে ভাব ঠিক হবেনা। বরঞ্চ তাদের বক্তব্যে ভেবে দেখার মতো বিষয় রয়েছে। মাদইয়ানের সর্দার লীডাররা মূলত একথাই বলছিল এবং জাতির লোকদের বুঝাচ্ছিল যে, শুয়াইব যে সততা ও বিশ্বস্ততার আহাবান জানাচ্ছে এবং নৈতিকতা ও সুবিচারের যেসব সুদৃঢ় নীতিমালা অনুসরণ করতে বলছে সেগুলো মেনে নিলে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। সত্য ও সততার নীতি অনুসরণ করলে এবং খাঁটি ও অকৃত্রিম লেনদেন করলে কেমন করে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য চলতে পারে? তাছাড়া আমআ যে বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে বড় দুটি রাজপথের চৌমাথায় বাস করছি এবং মিশর ও ইরাকের মতো বিশাল সভ্য সুসংগঠিত ও উন্নত সম্রাজ্যের সীমানায় অধিবাস করছি সে হিসেবে আমরা যদি বাণিজ্য কাফেলাসমূহকে উৎপীড়ন করা বন্ধ করে দিই এবং শান্তিপ্রিং ভালো মানুষ হযে বসি, তবেতো বর্তমান ভৌগেলিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে আমরা যেসব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করছি, সেগুলো সব খতম হয়ে যাবে এবং আশেপাশের জাতিসমূহের উপর আমাদের যে প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তা আর অবশিষ্ট থাকবেনা। এ ধরনের চিন্তা ও আচরণ কেবল শুয়াইব আলাইহিস সালামের জাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরঞ্চ সকল যুগের বিকৃত মন ও চরিত্রের লোকেরাই সত্য, সততা ও সুবিচারের নীতিকে এরকমই বিপদজনক বলে মনে করেছে। প্রত্যেক যুগের বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ধর্মীয় কার্যক্রম মিথ্যা, অসততা এবং অর্থনৈতিকতা ছাড়া চলতে পারেনা। সর্বত্রই সত্যের দাওয়াতের বিরুদ্ধে যেসব বড় বড় অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তন্মধ্যে এটাও একটি যে, বিশ্বের প্রচলিত পথ ও পন্থা থেকে বেরিয়ে এসে যদি এই দাওয়াতের অনুসরণ করা হয় তবে তো জাতি ধ্বংস হযে যাবে।[ তাফহীমুল কুরআন: সূরা আ’রাফ : টীকা: ৭০ ও ৭৪]

দ্বিতীয় খন্ডঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থার কতিপয় দিক

এ খণ্ডে আছে
৬ ভূমির মালিকানা
৭ সুদ
৮ যাকাতের তাৎপর্য এবং গুরুত্ব
৯ ইসলাম সামাজিক সুবিচার
১০ শ্রম, বীমা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ
১১ অর্থনৈতিক পুনর্ববিন্যাস ও তার মূলনীতি

ষষ্ঠ অধ্যায়ঃ ভূমির মালিকানা

[ভূমির মালিকানা সমস্যা আধুনিককালের বড় বড় সমস্যাগুলোর অন্যতম। এর উপর এতো বেশী আলোচনা, পর্যালোচনা, গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে যে, এখন মতভেদের স্তূপের নীচে প্রকৃত সত্য চাপা পড়ে গেছে। এ স্পর্কে চিন্তা গবেষণার সঠিক সমকোণ এখন স্পর্শকাতর। হয়ে রয়েছে । একদিকে কিছু লোক সমর্থন করে পুঁজিবাদী ব্যক্তিমালানাকে। অপরদিক অন্য কিছু লোক সমর্থন করে বিপরীত প্রান্তে অবস্থিত জাতীয় মালিাকানার সমাজতান্ত্রিরক ধারণাকে। ব্যক্তি মালিকানার সমর্থকদের জমিদারী ও জায়গীরদারীর বিরোধী, তারা এ প্রথার সংস্কারের জন্যে বিকল্প হিসেবে জাতীয় মালিকানা ছাড়া অন্য কিছু লোকের পক্ষে ইসলামের মালিকানা সংক্রান্ত ধারণা অনুধাবন করাই কঠিন হ য়ে পড়েছে। এ বিষয়ে শ্রদ্ধাস্পদ গ্র্থকার বিস্তারিত লিখেছেন। আমরা তাঁর লেখা থেকে কিছু অংশ নতুনভাবে বিন্যাস করে এ গ্রন্থ সংকলিত করে দিয়েছি যাত এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভংগি পাঠকদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ইসলামের মালিকানা ব্যবস্থার উপর চিন্তা করতে হবে ইসলামী জীবন ববস্থা ও ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে, অন্য কোনো ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে নয়।
এ প্রসংগে আরেকটি কথা সামনে রাখতে হবে। তা হলো, ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ববস্থা ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে এবং একটি বিশেষ আকৃতি দান করেছে। এক্ষেত্রে যেসব বিকৃতি ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা মূলতপুঁজিবাদী ববস্থারই অন্তর্নিহিত ভাবধারা, মৌল উদ্দেশ্য এবং রূপ-আকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিকতার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ প্রসংগে চিন্তা করার সময় ‘ব্যক্তিমালিকানা’ এবং ‘পুঁজিবাদী ব্যবসত্থার অধীনে এর বিকৃত রূপ’-এর মাঝে সৃষ্ট সেই ভ্রান্ত জটিলতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে, সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিকরা যার মধ্যে লোকদের নিমজ্জিত কতে চায়।–[সংকলক]

১. কুরআন এবং ব্যক্তিমালিকানা

সর্বপ্রথম আমি এ মুলনীতি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, যখন কোনো প্রচলিত প্রতার ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করা হয়, তখন তাকে সবসময়ই সম্মতি ও বৈধতার সমর্থক বলে ধরে নেয়া হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি কোনো এলাকার লোকেরা জনসাধারণের চলাচলে জন্য কোনো জমির উপর দিয়ে পথ বানিয়ে নেয় এবং সেখান দিয়ে যাতয়াত নিষিদ্ধ বলে কোনো নোটিশ লাগানো না হয়, তাহলে এর অরথ হবে ঐ পথে যাতায়াতের অনুমতি আছে। এই বৈধতার জন্য নতুনভাবে কোনো ইতিবাচক অনুমতির প্রয়োজন হয় না। কারণ যে পথে যাতায়াত নিষিদ্ধ না হওয়াটাই অনুমতির অর্থ সৃষ্টি করছে। ভূমির মালিকানার ব্যাপারটাও ঠিক তাই। ইসলঅরেম পূর্বে হাজার হাজার বছর ধরে দুনিয়ায় এ প্রথা জারি ছিল। কুরআন তা নিষিদ্ধ করেনি, তা রহিত করার জন্য কোনো স্পষ্ট নির্দেশও দেয়নি, এর পরিবর্তে তা নিষিদ্ধ করেনি, তা রহিত করার জন্য কোনো ইশারা ইঙ্গিতে কোথাও এর সমালোচনাও করেনি। এর অর্থ এই যে, আল্লাহ তা‘আলা এই পুরাতন রেওয়াজকে বৈধ রেখেছেন। এই অর্থ গ্রহণ করেই মুসলমানগণ কুরআন নাযিল হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভূমিকে সেভাবেই ব্যক্তিমালিকানায় রাখছে যেভাবে ইতিপূর্বে তা ব্যক্তিমালিকানয় ছিল। এখন যদি কেউ এটা নাজায়েয হওয়ার দাবী করে, তবে তাকে এর পক্ষে দলীল পেশ করতে হবে- আমার কাছে সে এর প্রমাণ পারেনা।
কিন্তু কথা শুধু এতটুকুই নয় যে, কুরআন প্রাচীন প্রথাকে রহিত করেনি, বরং আপনি যদি গভীরভাবে কুরআন অধ্যয়ন করেন, তবে জানতে পারবেন যে, কুরআন এ প্রথাকে ইবিাচকভাবেই বৈধ হিসেবে সমর্থন করেছে এবং এরই ভিত্তিতে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে হুকুম দিয়েছে। দেখুন! ভূমির সাথে মানুষের দুটি উদ্দেশ্য জড়িত; হয় ‘চাষাবাদ’ অথবা ’বসবাস’। এ দুটি উদ্দেশ্যে কুরআন জমির ব্যক্তি মালিকানা স্বীকার করে।
সূরা আন’আমে বলা হয়েছে-
كُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
“এর ফলমূল থেকে খাও যখন তা ফলে এবং এর ফসল কাটার সময় তাঁর (আল্লাহর) হক আদায় কর।”
এখানে আল্লাহর হক আদায় করার অর্থ দান-খয়রাত ও যাবাক প্রদান। প্রকাশ থাকে যে, ভূমির উপর সামাজিক মালিকানা হলে যাকাত দেয়া বা নেয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ হুকুম তো কেবল তখনই দেয়া যেতে পারে যখন কিছু লোক ভূমির মালিক হবে এবং তারা এর উৎপাদন থেকে আল্লাহর হক পৃথক করে ভূমিহীন নিঃস্বদের মধ্যে বিতরণ করে দেবে। এখন বলুন- যাকাতের নির্দেশ জারি করে কুরআন ভূমির ব্যক্তিমালিকানার প্রাচীন প্রথার প্রত্যয়ন করেছে কিনা? অন্য আর এক আয়াত থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ
“হে ঈমানদারগণ! নিজেদের পবিত্র উপার্জন থেকে খরচ কর এবং সেইসব জিনিস থেকে যা আমি জমি থেকে তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেছি।” [বাকারা: ২৬৭]
জমির উৎপাদন থেকে খরচ করার যে হুকুম এখানে দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে সকলেই একমত যে, তা হলো যাকাদ ও দান-খয়রাত। যারা উৎপাদিত জিনিসের মালিক হেবে তাদেরকেই এ হুকুম পালন করতে হবে। আর এ দান তাদের জন্য করতে হবে যারা সহায় সম্পত্তির মালিক নয়। বস্তুত দানখয়রাত কার প্রাপ্য কুরআনে তাও বলে দেয়া হয়েছে।
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ
“এটা অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, তারা দেশময় ঘোরাফেরা কতে পারে না।” [বাকারা: ২৭৩]
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ
“যাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত প্রাপ্য।” [তওবা: ৬০]
এখন দ্বিতীয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে সূরা নূরে বলা হয়েছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا …. فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের বাড়ী ছাড়া অন্যের বাড়ীতে বিনানুমতিতে প্রবেশ করো না। আর প্রবেশ করেই বাড়ির মালিককে সালাম করবে….. যদি সেখানে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত ভিতরে প্রবেশ করো না।” [নূর : ২৭-২৮]
এ আয়াত থেকে বুঝা গেলো যে, কুরআন মজীদ বসবাসের জন্যেও ভূমির ব্যক্তিগত দখল ও মালিকানার স্বীকৃতি দান করে িএবং মালিকের এই অধিকার স্বীকার করে যে, তার অনুমতি ছাড়া কেউ তার দখলীভুক্ত এলাকায় পা রাখতে পারবে না।
এখন হাদীস সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। যদি সামগ্রিকভাবে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাদীস এবঙ তাঁর যুগের কর্যক্রম ও খেলাফতে রাশেদার যুগের কার্যক্রম এবং নবী করীম (সা) এ নিকটবর্তীকালের ইমামগণ, কুরআন, হাদীস ও সাহাবাদের বাণীর উপরে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখা যায় যে, ভূমির মালিকানার ব্যাপারে তার ইসলামের আইন কিভাবে বুঝেছিলেন, তাহলে এ সম্পর্কে মোটেই সন্দেহের অবকাশ থাকবে না যে, ইসলাম শুধু ব্যক্তিমালিকানাই জায়েয রাখে না, বরং ইসলাম ব্যক্তিমালিকানার কোনো নির্দিষ্ট সীমাও নির্ধারণ করে না। এবং জমির মালিককে এই অধিকার দেয় যে, যে ভূমি কোনো ব্যক্ত নিজে চাষাবাদ করতে পারবে না, তা অপরকে মুজারায়ায় (ভাগচাষে) অথবা কিরায়ায় (নগদ অর্থের বিনিময়ে) চাষাবাদ করতে দিতে পারবে। এখন আসুন এ বিষয়ে আমরা ইসলামী আইনের মুল উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে দেখি।

২. রাসূল (সা) ও খেলাফতে রাশেদার যুগের দৃষ্টান্ত

রাসূলে করীম (সা) এবং খেলাফতের রাশেদার যুগে ভুমি ব্যবস্থাপনা কোন পদ্ধতিতে করা হয়েছিল তা বুঝার জন্য মনে রাখতে হবে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্বাধীনে আসা ভূমি চারটি বৃহৎ ভাগে বিভক্ত ছিলঃ
(১) যে ভূমির মালিক ইসলাম কবুল করেছিল।
(২) যে ভূমির মালকি নিজেদের ধর্মেই বহাল থেকে যায়, কিন্তু একটি চুক্তির মাধ্যমে নিজেকে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন করে দেয়।
(৩) যে ভূমির মালিক যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে।
(৪) যে ভূমি কারো মালিকানায় ছিল না।
এসব ব্যাপারে রাসূল (সা) ও তাঁর খলিপাগণ কি কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা আমরা পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করবো।

প্রথম প্রকারে ভূমির মালিকানা বিধান

প্রথম প্রকারের ভূমির মালিকানার ব্যাপারে রাসূলে করীম (সা) যে নীতিমালা অনুসরণ করেছেন তা হলোঃ
(আরবী*************)
“মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে নিজের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ করে নেয়।”
(আরবী*******)
“ইসলাম গ্রহণ করার সময় মানুষ যে সম্পদের মালিক ছিল তা তারই মালিকানায় থাকবে।”
এ নীতিমালা স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হত। অকৃষিজ ও কৃষিজ উভয় জমির বেলায় একইরূপ নীতি অনুসরণ করা হতহ। হাদীস ও আছারের গোটা সংগ্রহ এ কথার সাক্ষী যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আরবের কোথাও ইসলাম গ্রহণ কারীদের সম্পদের মালিকানার ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলেননি। ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে যে লোক যে জমির মালিক ছিল, ইসলাম ছিল, ইসলাম গ্রহণ কারার পর তাকে সেই জমির মালিক রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ইমাম আবু ইউসুফ (রা) ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেনঃ
“যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করবে তাদের রক্ত (হত্যা করা) হারাম। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তাঁরা যে সম্পদরে মালিক ছিল তা তাদেরই থাকবে। এভাবে তাদের ভূমি তাদের মালিকানায়ই থাকবে। আর এ ভূমিকে ‘উশরী’ ভূমি বলে অভিহিত করা হবে। এর নজীর হলে মদীনা। মদীনাবাসী রাসূলে করীম (সা)-এ হাতে ইসলাম কবুল করেন এবং তারা তাদের ভূমিরও মালিক থাকেন। এ ভূমির উপর ‘উশর’ ধার্য করা হয়েছিল। তায়েফ ও বাহরাইনের লোকদের ব্যাপারেও এই ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়েছে। যেসব বেদুঈন ইসলাম কবুল করেছে তাদেরকেও নিজ নিজ কূপ ও এলাকার মালিক হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে। তাদের জমি ‘উশরী’। তা থেকে তাদেরকে বেদখল করা যাবে না। এ জমিকে তারা বিক্রি করতে পারবে এবং তাদের উত্তরাধিকারীগণ এর সকল অধিকার ভোগ করতে পারবে। অনুরূপভাবে কোনো এলাকার অধিবাসীগণ ইসলাম কবুল করলে তারা তাদের সম্পদের মালিক থাকবে।” (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ৩৫)
ইসলামের অর্থনীতি বিষয়ক আইনের আরেক বিশেষজ্ঞ ইমাম আবু ওবায়েদ আল কাসেম ইবনে সাল্লাম লিখেনঃ
“হযরত রাসূলে করীম (সা) এবং তাঁর খলীফাদের নিকট হতে য ‘আছার’ আমাদের পর্যন্ত পৌছেছে, তা ভূমির ব্যাপারে তিন ধরনের বিধান বহন করে এনেছে। এক প্রকার বিধান হলো, ওইসব ভূমি সম্পর্কে যার মালিকগণ ইসলাম কবুল করে। ইসলাম গ্রহণের সময় তারা যে ভূমির মালিক ছিল তা তাদেরই মালিকানায় থাকবে। এসব ভূমিকে ‘উশরী’ ভূমি বলে অভিহিত করা হবে। ‘উশর’ ছাড়া এসব ভূমির উপর আর কোনোরূপ কর আরোপিত হবে না।” [কিতাবুল আমওয়অল, পৃঃ ৫৫]
সামনে এগিয়ে তিনি আরও লিখেছেনঃ
“যে এলাকার অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা নিজেদের জমির মালিক থাকবে। যেমন মদীনা, তায়েফ, ইয়েমেন ও বাহরাইন। এভাবে মক্কাও, যদি মক্কা অস্ত্রবলে জয় করা হয়েছে, কিন্তু রাসূলে করীম (সা) মক্কাবাসীদের প্রতি দয়া করেছেন এবং তাদের জীবনের উপর হস্তক্ষেপ করেননি এবং তাদের সম্পদকে গনীমতের মাল হিসেবে ঘোষণা দেননি। অতএব ধনসম্পদ যখন তাদের মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হলো তখন তারা পরে মুসলমান হয়ে গেলো। তাদের মালিকানার ব্যাপারে সেই হুকুমই থাকলো যা অন্যান্য ইসলাম গ্রহণকারীদের মালিকানা সম্পর্কেত ছিল। আর তাদের জমি ‘উশরী’ জমি হিসেবে পরিগণিত হলো।” (ঐ, পৃষ্ঠা ৫১২)
আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (র) যাদুল মাআদে লিখেছেন:
“রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নীতি এই ছিল যে, ইসলাম গ্রহণকালে যে ব্যক্তি যে সম্পদের মালিক ছিল তা তারই মালিকানায় থাকবে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তা কিভাবে তার দখলে এসেছে তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয়নি, বরং তা তার হাতে সেভাবেই থাকতে দেয়া হয়েছে যেভাবে আগে থেকে চলে আসছিল।” [২য় খণ্ড, পৃঃ ৯৬]
এটা এমন এক মৌলনীতি যাতে ব্যতিক্রমের একটি উদাহরণও রাসূলুল্লাহ (সা) ও খেলাফতে রাশেদার যুগে পাওয়া যায় না। ইসলাম এর অনুসারীদের অর্থনৈতিক জীবনে যেসব সংশোধনই জারি করেছে তা করেছে ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু আগে থেকেই যে মালিকানা লোকদের দখলে ছিল তা বিলোপ করা হয়নি।

দ্বিতীয় প্রকারের ভূমির মালিকানা বিধান

দ্বিতীয় প্রকারের লোক ছিল তারা, যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি; কিন্তু সন্ধির মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত হয়ে বসবাস করাকে মেনে নিয়েছে। এদের ব্যাপাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) যে নীতি নির্ধারণ করেন তা এই যে, যেসব শর্তের ভিত্তিতে তাদের সাথে সন্ধি হয়েছে কোনোরূপ রদবদল ছাড়াই তা পূর্ণ করতে হবে। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন:
(আরবী******************)
যদি কোনো জাতির সাথে তোমাদের যুদ্ধ বাধে এবং তারা ধন সম্পদের বিনিময়ে তোমাদের নিকট তাদের নিজের ও সন্তনের জীবন রক্ষা করতে তৈরী হয়ে যায় এবং তোমরা তাদের সাথে সন্ধি কর, তাহলে সন্ধিচুক্তির চেয়ে বেশী কিছু তোমরা তাদের নিকট আদায় করো না। কারণ তা তোমাদের জন্য জাযেয হবে না।”
(আরবী***************)
“সাবধান! যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিদ্ধ যিম্মির যুল্‌ম করবে অথবা ‍চুক্তি অনুসারে তার যে অধিকার আছে তা ক্ষুণ্ণ করবে, অথবা তার উপর তার সামর্থ্যের বেশী বোঝা আরোপ করবে অথবা সম্মাতি ছাড়া তার থেকে কোনো বস্তু আদায় করবে- কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে ফরিয়াত জানাবো।” [আবু দাউদ]
এ নীতিমালা অনুযায়ী নাজরান, আয়লা, আযরুআত, হিজনসহ অন্যান্য যেসব এলাকা ও গোত্রের সাথে সন্ধি করা হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সা) সেসব এলাকা ও গোত্রের জায়গা জমি, ধসম্পদ, শিল্প কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদির উপর এলাকাবাসী গোত্রের লোকদের মালিকানা পূর্ববৎ বহাল রাখেন এবং তাদের নিকট থেকে চুক্তি মোতাবিক শুধু জিযিয়া ও খাজনা আদায় করেই ক্ষান্ত হন। খেলাফকে রাশেদাও এ নীতির উপরই আমল করেছেন। ইরাক, সিরিয়া, আল জাযিরা, মিসল, আরমেনিয়া, মোটকথা, যেখানে যেখানে শহর বা জনপদের লোকেরা সন্ধির ভিত্তিতে নিজেদেরকে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন করে দিয়েছে, তাদের যথারীতি তাদের দখলেই রাখা হয়েছে এবং যে মালের বিনিময়ে সন্ধি হয়েছে তা ব্যতীত তাদের কাছ থেকে আর কিছুই আদায় করা হয়নি। হযরত উমর (রা)-এর সময়ে সার্বিক কল্যাণ চিন্তা করে নাজরানের অধিবাসীসেরকে আরবের অভ্যন্তর থেকে সিরিয়া ও ইরাকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু তাদের যার কাছে নাজরানের যে পরিমাণ কৃষিজ ও বসবাসযোগ্য ভূমি ছিল তার বিনিময়ে অন্যত্র শুধু ওই পরিমাণ ভূমিই তাদেরকে দেয়া হয়নি, বরং হযরত উমরা (রা) সিরিয়া ও ইরাকের গভর্ণরদের সাধারণ নির্দেশ লিখে পাঠান যে, “তারা যে যে এলাকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করবে সেখানে (আরবী********) তাদেরকে প্রশস্ত মানে উর্বব জমি দিয়ে দাও।” [কিতাবুল আমওয়াল, আবু উবায়েত, পৃ. ১৮৯]
এই মূলনীতির ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সময়ে ও খেলাফতে রাশেদার কালেও কোনো ব্যতিক্রম করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। ইসলামের ফিকাহবিদদের এটাও সর্বসম্মত রায়। ইমাম আবু ইউসুফ (রা) তাঁর কিতাবুল খারাজে’ এটাকে আইনের একটি দফা হিসেবে এভাবে বিধৃত করেছেন:
“অমুসলিমদের মধ্যে যে জাতির সাথে ইমামের এ শর্তে সন্ধি স্থাপিত হয় যে, তারা ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত থাকবে এবং কর প্রদান করবে তাহলে তারা যিম্মী। তাদের ভূমি খারাজের (কর) অন্তর্ভুক্ত ভূমি। যে শর্তে সন্ধি হয়েছে তাদের নিকট হতে ঠিক তাই নেয়া হবে।তাদের সাথে অঙ্গীকার পুরা করতে হবে। শর্তের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা যাবে না।” [পৃ. ৩৫]

তৃতীয় প্রকারের ভূমির মালিকানা বিধান

যেসব লোক শেষ সময় পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করবে এবং অস্ত্রের মুখে পরাজিত হবে তাদের সম্পদের ব্যাপারে রাসূলে করীম (সা) ও খেলাফতে রাশেদার সময়ে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন কর্মপন্থা গৃহীত হয়েছে:
এক- প্রথম কর্মপন্থা নবী করীম (সা) মক্কা বিজয়কালে গ্রহণ করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর (আরবী*******) ( আজ তোমাদের উপর কোনোরূপ প্রতিশোধ য়ো হবে না)। এ মর্মে সাধারণ ক্ষমা ঘোসণার মাধ্যমে বিজিতদের জানমালের পূর্ণ যথারীতি মালিক থেকে যায়। আর ইসলাম গ্রহণ করার পর তাদের এসব জমি ‘উশরী ভূমি’ হিসেবে পরিগণিত হয়।
দুই- দ্বিতীয় কর্মপন্থা খায়বারে অবলম্বন করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিজিত ভূমির সাবেক মালিকদের মালিকানা বিলুপ্ত করা হয়েছে। অতঃপর এর এক অংশ নিয়ে নেয়া হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সা্) জন্য। বাকী জমি খায়বারের যুদ্ধে যারা ইসলামী সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন তাদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে। এ বন্টিত ভূমি যাদের ভাগে পড়ে তারাই এর মালিক গণ্য হন। এ ভূমিতে ‘উশর’ ধার্য হয়। [কিতাবুল আমওয়াল, আবু উবায়েদ, পৃঃ ৫১৩]
তিন- তৃতীয় কর্মপন্থা সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের পর হযরত উমর ফারুক (রা) অবলম্বন করেছিলেন। তিনি বিজিত এলাকার জমি বিজয়ী সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করার পরিবর্তে এসব ভূমিকে মুসলমানের সামষ্টিক মালিকানাভুক্তি করেন; আর এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মুসলমানদের তরফ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে নিজের হাতে নিয়ে নেন। তিনি এসব এলাকার অধিবাসীদেরকে আগের মত তাদের ভূমির মালিক হিসেবে বহাল রাখেন। তাদের যিম্মী ঘোষণা করে তাদের জিযিয়া ও খারাজ (কর) ধার্য করেন এবং জিযিয়া ও খারাজ সাধারণ মুসলমানদের জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যয়ের ঘোষণা দেন। কেননা, মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারাই ছিল বিজিত এলাকসমূহের মালিক।
এ শেষ পদ্ধতিতে দৃশ্যত ‘সমষ্টিগত মালিকানা’ ধারণার ইংগিত পাওয়া যায়। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা যেভাবে চূড়ান্ত হয়েছিল, তার বিস্তারিত দিকের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে পরিষ্কার বুঝা ‍যায় যে, এ সমষ্টিগত মালিকানার সাথে সমাজতান্ত্রিক মতবাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। আসল কথা হলো মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের বিরাট এলাকা বিজিত হওয়ার পর হযরত যুবাযের (রা) ও হযরত বিলাল (রা) এবং তাঁদের সমমনা ব্যক্তিগণ গোটা এলাকার সমস্ত ভূমি ও বিষয় সম্পত্তি খায়বারের ভূমির মত বিজয়ী সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করার জন্য হযরত উমর (রা) এর নিকট দাবী পেশ করেন। হযরত উমর (রা) তাদের এ দাবী মঞ্জুর করেননি। হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত মু’আয বিন জাবাল (রা)-এর মত প্রবীন সাহাবীগণ এ ব্যাপারে হযরত উমর (রা) কে সমর্থন করেন। এ দাবী মঞ্জুর না করার কারণ উল্লেখিত সাহাবীগণের বক্তব্য হতে বুঝা যায়। হযরত মু‘আজ (রা) বলেন:
“আপনি যদি তা বন্টন করে দেন তাহলে আল্লাহর কসম তার এমন ফল হবে যা আপনি কখনও পসন্দ করবেন না। বিরাট বিরাট ও মূল্যবান ভূমিখণ্ড সৈনিকদের মধ্যে বন্টিত হয়ে যাবে। এরপর এসব সৈনিকদের মৃত্যুর পর কারো ওয়ারিস হবে কোনো নারী এং কারো ওয়ারিস হবে কোনো শিশু। পরে যারা ইসলামী রাষ্ট্রের হাতে অবশিষ্ট থাকবে না। অতএব আপনি এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করুন যাতে আজকের লোকদের জন্যও সুযোগ থাকে এবং ভবিষ্যতের লোকদের জন্যও সুযোগ থাকে।”
হযরত আলী (রা) বলেন:
“দেশের কৃষিভূমি তার স্বঅবস্থায় থাকতে দিন যাতে তা সকল মুসলমানের অর্থনৈতক শক্তির উৎস হতে পারে।”
হযরত উমর (লা) বলেন:
“এটা কিভাবে হতে পারে যে, আমি তোমাদের মধ্যে জমি ভাগ করে দেবো, আর পরর্তী বংশধরগণের জন্য এতে কোনো অংশ থাকবে না।” অবশেষে ভবিষ্যৎ বংশধরগণের জন্য কি থাকবে?…… তোমরা কি চাও, ভবিষ্যত বংশধরদর জন্য কিছুই না থাকুক? আর আমার আরো আশংকা হচ্ছে যে, আমি যদি তোমাদের মধ্যে ভাগ করে দিই তাহলে তোমরা পানি নিয়ে পরস্পর বিবাদের লিপ্ত হবে।”
এর ভিত্তিতে যে ফয়সালা করা হয়েছিল তা ছিল এই যে, জমি তার সাবেক মালিকদের হাতেই থাকতি দিতে হবে, তাদের যিম্মী ঘোষণা করে তাদের উপর জিযিয়া ও খারায (কর) ধার্য করতে হবে এবং খারাজ মুসলমানদের সাধারণ কল্যাণের কাজে খরচ করতে হবে। এ ফয়সালার খবর হযরত উমর (রা) তাঁর ইরাকের গভর্ণর হযরত সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা)- এর নিকট যে ভাষায় পাঠিয়েছিলেন তা নীচে উল্লেখ করা হলো: (আরবী*****************)
“যুদ্ধ চলাকালে গনীমত হিসেবে সৈনিকরা যেসব অস্থাবর সম্পদ জমা করেছে এবং সৈনিকদের মধ্যে জমা হয়েছে, এসব মাল তুমি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের মধ্যে ভাগ করে দাও। কিন্তু নদী, নালা, জায়গা জমি যেসব লোকের কাছেই থাকতে দাও- যারা তাতে চাষাবাদ করত। তাহলে মুসলমানদের বেতনের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। নতুবা যদি এসবও আমরা বর্তমান লোকদের মধ্যে বন্টন করে দিই, তাহলে পরবর্তী বংশধরদের জন্য আর কিছুই থাকবে না। [গোটা আলোচনার জন্য দেখুন কিতাবুল খারাজ পৃঃ ২০-২১ এবং কিতাবুল আমওয়াল, পৃঃ ৫৭-৬৩।]
এ নতুন বন্দোবস্ত দানের বুনিয়াদী মতবাদ তো এই ছিলো যে, ভূমির মালিক হবে সকল মুসলমান এবং সাবেক মালিক আসল অবস্থঅন হবে কৃষক হিসেবে। আর ইসলামী রাষ্ট্র মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের সাথে লেনদেন করবে। [এই মতবাদরে ব্যাখ্যা নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে পাওয়া যায় যে, একবার উতবা বিন ফারকাদ (রা) হযরত উমার (রা) এর সাথে সাক্ষাত করতে এস বললেন, আমি ফোরাতের কিনারে এক খণ্ড জমি খরিদ করেছি। হযরত উমার (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কার কাছ থেকে? উতবা (রা) বললেন, এর মালিকের কাছ থেকে। উমার (রা) তখন মুহাজির ও আনসারদের দিকে ফিরে বললেন, এর মালিক তো এখানে বসা আছেন। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ৭৪)। হযরত আলী (লা)-এর একটি কথাও এই মত সমর্থন করে। এরাকের পুরানো জমিদারদের একজন এসে তাঁর সামনে ইসলাম কবুল করার ঘোষণা দিলে তিনি বললেন, এখন তোমার ‍উপর থেকে জিযিয়া বিলুপ্ত হয়ে গেলো। কিন্তু তোমার জমি খারাজী জমি হিসেবেই থাকবে। কেননা তা আমাদের। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃঃ ৮০)। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যিম্মী ঘোষণার পর সাবেক মালিকদের যে অধিকার দেয়া হয়েছিল তা মালিকানার অধিকার থেকে কিছুমাত্র ভিন্ন ছিল না। সেসব ভূমি তাদের দখলে থাকবে যা আগে তাদের দখলে ছিল। এদের উপর মুসলমান বা রাষ্ট্রের তরফ থেকে খারাজ (কর) ছাড়া আর কিছু ধার্য করা হয়নি। জমির উপর তাদের বেচা-কেনা, বন্ধক দেয়া এবং ওয়ারিশী স্বত্বের সমস্ত অধিকার আগের মতই বহাল ছিল। এ ব্যাপারটিকে ইমাম আবু ইউসুফ (রা) একটি আইনের ধারাকে আকারে এভাবে বলেছেন:
“যে দেশ রাষ্ট্রপ্রধান অস্ত্রবলে জয় করেন সেই এলাকার ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে তা বিজয়ী সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করে দিতে পারেন। এ অবস্থায় তা ‘উশরী’ জমি হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তিনি বন্টন করা সমীচীন মনে না করেন এবং জমি এর পূর্বতন মালিকদের হাতে রেখে দেয়াই ভল মনে করেন, যেমন হযরত উমর (রা) ইরাকে করেছেন, তাহলে তিনি তা-ও করতে পারেন। এ অবস্থায় তা হবে ‘খারাজী’ জমি। খারাজ আরোপিত হওয়ার পর তা দখলভোগীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার অধিকার কারো থাকবে না, এর মালিক তারাই হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে তারা একে অপরের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে, পারবে বেচাকেনা করতে; তাদের উপর খারাজ ধার্য করা হবে এবং তাদের সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা তাদের উপর চাপানো যাবে ন।” (কতাবুল খারাজ, পৃঃ ৩৫, ৩৬)

চতুর্থ প্রকারের ভূমির মালিকানার বিধান

উপরে বর্ণিত তিনটি শ্রেণী তো ছিল সেইসব ভূমি সম্পর্কে যা প্রথম থেকেই বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের মালিকানায় ছিল। আলোচনায় দেখা যায় যে, ইসলামী ব্যবস্থা কায়েম হওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ভূমির সাবেক মালিকানাই স্বীকার করে নেয়া হয়েছে; আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এতে কিছুটা রদবদল করা হয়েছে। কিন্তু একথা স্পষ্ট যে, এ রদবদল কেবল মালিকানার ব্যাপারেই করা হয়েছে, মালিকানা ব্যবস্থার মধ্যে হবে যে, মালিকানাহীন জমির ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর খলীফাগণ কি কর্মপন্থা অবলম্বন করেছেন।
দেখা যায় যে, এই শ্রেণীর ভূমি দুটি বড় ভাগে বিভক্ত ছিলঃ
এক- ‘মাওয়অত’ অর্থাৎ অনাবাদী ভূমি। ‘আদিউল আবাদ’ (যে জমির মালিক মরে গেছে) বা যার কোনো মালিকই ছিল না, অথবা যে ভূমি ঝোপ ধাড়, কাদা মাটির ফাঁক এবং প্লাবনের নীচে পড়ে গেছে তা-ই হচ্ছে মাওয়াত।
দুই- ‘খালসা’ ভূমি খাস জমি। যার উপর সরকারী মালিকান ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েক প্রকার ভূমি শামিল; প্রথমত, যে ভূমির মালিকগণ স্বেচ্ছায় মালিকানা স্বত্ব ত্যাগ ক’রে তা রাষ্ট্রের অধীন ছেড়ে দিয়েছে যাতে রাষ্ট্র যেভাবে ইচ্ছা তা ব্যবহার করতে পারে।[ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণনায় আছে—রাসূলে করীম (সা) মদীনায় আগমন করলে আনসারগণ যেসব জমিতে সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি পৌঁছানের যেতো না, সেসব জমি রাসূল (রা)- কে দিয়ে দিলেন যেন তিনি যেভাবে খুশী তা ব্যবহার করেন। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃঃ ২৮২)।] দ্বিতীয়ত, ইসলামী রাষ্ট্র যে জমি থেকে মালিককে বেদখল করে খাস জমি ঘোসষণা করেছে। যেমন মদীনার চার পাশে বনি নজিরের জমি। তৃতীয়ত, বিজিত এলাকর যে জমি খাস জমি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। যেমন ইরাকে পারস্য সম্রাট ও তার পরিবারের অধিকারভুক্ত ভূমি অথা যেসব জমির মালিক যুদ্ধে মারা গেছে বা পালিয়ে গেছে; হযরত উমর (রা) এ ধরনের জমিকে ‘খালিসা’ (খাস জমি) ঘোষণা করেছেন।[ইমাম আবু ইউসুফ ও আবু উবায়েদ এই শ্রেণীল ভূমি দশ প্রকার বলে নিজ নিজ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।]
এ দু’শ্রেণীর জমির মালিকানা বিধান সম্পর্কে আমি ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্ণনা করবো।

চাষাবাদের ভিত্তিতে মালিকানার অধিকার

মাওয়াত-এর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রাচীন রীতিই বহাল রাখন যার ভিত্তিতে দুনিয়ার জমির মালিকানার সূচনা হয়েছে। মানুষ যখন এ ভূমন্ডলে বসবাস শুরু করে তখন থেকেই এ নিয়ম চলে আসছে যে, যেখানে যে আছে, সে জায়গা তার। আর, কোনো জমি যে ব্যক্তি যে কোনো প্রকারের ব্যবহারের উপযোগী করেছে তা কাজে লাগাবার অধকার তারই বেশল। প্রকৃতরি সকল অবদানের উপর মানুষের মালিকানার অধিকাররের এটাই হলো বুনিয়াদী নীতি। রাসূলে করীম (সা) বিভিন্ন সময়ে নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে এ কথারই সমর্থন করেছেন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে: (আরবী***************)
“হযরত আয়েশা (রা) বলেলেছেন, রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি মালিকানাহীন কোনো জমি আবাদযোগ্য করে, সে ব্যক্তিই সে জায়গার হকদার। উরওয়া বিন যাবায়ের বলেছেন, হযরত উমরা (রা) তাঁর খেলাফতকালে এর উপরই আমল করেছেন।” (বুখারী, আহমাদ, নাসাঈ)
(আরবী**********)
“জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছন : যে ব্যক্তি মৃত (অনাবাদী) ভূমি জীবিত (আবাদযোগ্য) করেছে, সে জমি তার।” (তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ, ইবনে হ্বিাবন)
(আরবী****************)
“সামুরা বিন জুনদুব (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলে করীম (রা) ইরশাদ করেছন: যে ব্যক্তি কোনো অনাবাদী ভূমির উপর নিজের সীমারেখা টেনে নেয় সে ভূমি তার।” (আবু দাউদ)।
(আরবী*******)
“আসমার বিন মাদুররিস (রা) হতে বর্ণিত। নবী করীম (রা) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এমন কোনো কূপ পায় যা এর আগে কোনো মুসলিমের দখলে আসেনি, সে কূপ তার।” (আবু দাউদ)।
(আরবী****************)
“উরওয়া বিন যুবায়ের (তাবেঈ) বলেছেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, রাসূলুল্লাহ (সা) ঘোষণা দিয়েছেন, জমি আল্লাহর, আর বান্দারাও আল্লাহর। যে ব্যক্তি কোনো পতিত জমি আবাদ করে, সে ব্যক্তিই সে জমির হকদার। যেসব প্রবীণ ব্যক্তির মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের কথা এসে পৌঁছেছে, তাদের মাধ্যমেই (অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম) রাসূল (সা)-এর নিকট হতে এ নীতি আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।” (আবু দাউদ)।
এই প্রকৃতির নীতিমালা পুনর্বহাল করার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য দুটি বিধান নির্দিষ্ট করেনছেন। একটি হলো, যে ব্যক্তি অন্যের মালিকানার জমি চাষাবাদ করে, এ চাষাবাদের কারণে সে জমির মালিকানার হকদার বলে দাবী করতে পারবে না। দ্বিতীয় হলো, যে ব্যক্তি অযথা কোনো ভূমির চৌহদ্দি টেনে বা নিশান টাঙ্গিয়ে ভূমিকে নিজের মালিকানায় আটকিয়ে রাখে, এতে কোনো প্রকার চাষাবাদ করে না, তিন বছর পর তার মালিকানার অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। প্রথম বিধানকে তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন: (আরবী*********)
“হযরত সাঈদ বিন যায়েদ (রা) বলেছেন, রাসূল করীম (সা) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি অনাবাদী জমি জীবিত (আবাদযোগ্য ) করেছে সে জমি তার। আর অপরের জমিতে নাজায়েয পদ্ধতি আবাদকারীর জন্য কোনো কিছু নেই।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমাদ)
দ্বিতীয় বিধানের উৎস হলো নিম্নবর্ণিত হাদীস: (আরবী************************)
“তাউস তাবেঈ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন: মালিকবিহীন পতিত জমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলৈর (সা), এরপর তা তোমাদের জন্য। অতএব যে কেউ পতিত জমি আবাদযোগ্য করবে, তা তার। তিন বছর পর্যন্ত অনাবাদী ফেলে রাখার পর মালিকের এতে কোনো হক থাকে না।” (আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ)।
(আরবী*******************)
“হযরত সালেম বিন আবদুল্লাহ (রা)বর্ণনা করেছেন, হযরত উমর (রা) মিম্বারে উঠে এক ভাষণে বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো পতিত অনাবাদী জমিকে চাষাবাদযোগ্য করে সে জমি তার। কিন্তু অনাহুতভাবে যারা জমি আটকে রাখে, তিন বছর পর এতে তার কোনো অধিকার থাকবে না। সে সময় কেউ কেউ কোনো চাষাবাদ না করে এমনিতেই জমি আটকিয়ে রাখতো; এ কারণে এ ঘোষণা দেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।” (আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ)
এ ব্যাপারে ফকীহগণ একমত। মতভেদ যদি থাকে তবে আছে এ ব্যাপারে যে, আবাদযোগ্য করার দ্বারাই কি কোনো ব্যক্তি পতিত মালিক হয়ে যায়? অথবা মালিকানা প্রমাণের জন্য সরকার থেকে অনুমতি প্রয়োজন? এ ব্যাপারে ইমাম আবু (র) রাষ্ট্রের অনুমতি প্রয়োজন মনে করেছেন। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ (র). ইমাম মুহাম্মদ (র), ইমাম শাফেঈ (র) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (র) প্রমুখের মত হলো যে, এ সম্পর্কে হাদীস একেবারেই সুস্পষ্ট। তাই আবাদকারীর মালিকানার অধিকারের জন্য রাষ্ট্রের নিকট হতে অনুমতি নেবার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেয়া হক অনুযায়ী আবাদকারী এ জমির মালিক হয়ে যাবে। এরপর ব্যাপারটা যখন রাষ্ট্রের নিকট পেশ হবে তখন এ কাজ হবে আবাদকারীর হককে মেনে নেয়া। আর যদি এ নিয়ে কলহ বাধে তাহলে রাষ্ট্র তার হকই বলবৎ রাখবে। ইমাম মালিক (র) জনবসতির নিকটবর্তী জমি ও দূরবর্তী অনাবাদী জমির মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাঁর মতে প্রথম প্রকারের জমি এ নির্দেশের আওতাধীন নয়। আর দ্বিতীয় প্রকারের জমির জন্য অনুমোদন শর্ত নয়। শুধু আবাদ করার মাধ্যমেই আবাদকারী এ মালিক হয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে হযরত উমর (রা) ও হযরত উমর বিন আবদুল আযীয (র)-এর কর্মনীত এই ছিল : “যদি কোনো ব্যক্তি কোনো জমি পরিত্যক্ত মনে করে আবাদ করে নেয় এবং এর পর কেউ এসে এর মালিকানা দাবী করে বসে, তবে শেষোক্ত ব্যক্তিকে এখতিয়ার দেয়া হবে যে, হয় সে আবাদ করার জন্য প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক দিয়ে জমি নিজে নিয়ে নেবে, অথবা জমির মূল্য নিয়ে মালিকানার অধিকার ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করবে। [বিস্তারিত অবগত হবার জন্য িইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজ’ পৃঃ ৩৬ ৩৭এবং আবু উবায়েদের ‘কিতাবুল আমওয়াল’ পৃঃ ২৮৫-২৮৯ দেখুন। কানযুল উম্মালে শায়খ আলী মোত্তাকী এ বিষয়ের উপর বর্ণিত সব হাদীস এক স্থানে জমা করেছেন। যারা এ বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা অবগত হতে চান, উল্লিখিত কিতাবের ২য় খন্ড এহইয়ায়ে মাওয়াত অধ্যায় দেখে নিন।]

সরকার কর্তৃক দানকৃত জমি

অতপর ‘মাওয়াত’ (পতিত) ও খালিসা (খাস) উভয় প্রকারের ভূমি থেকে প্রচুর পরিমাণ জমি রাসূলে করীম (সা) নিজে মানুষকে দান করেছেন এবং তাঁর পর খোলাফায়ে রাশেদীনও হামো এ ধরনের দান করতেন। এসব দানের অনেক দৃষ্টান্ত হাদীসের গ্রন্থাবলীতে বিদ্যমান আছে। কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে উদ্ধৃত করা হলো:
(১) উরওয়াহ বিন যুবায়ের (রা) বর্ণা করেছন, হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে ও হযরত উমর (রা)-কে কিছু জমি দান করেছিলেন। হযরত উসমান (রা)-এর সময়ে হযরত যুবায়ের (রা) উমারের ওয়ারিসগণ থেকে তাদের অংশের জমি খরিদ করে নিয়েছিলেন। আর এ খরিদকে মজবুত করার জন্য হযরত উসমান (রা)-এর নিকট তিনি হাজির হলেন এবং বললেন, হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা) সাক্ষ্য দিচ্ছেন, রাসূলে করীম (সা) এ জমিগুলো আমাকে ও হযরত উমর (রা) বিন খাত্তাবকে দান করেছিলেন। অতঃপর আমি উর (রা)-এর বংশধরদের নিকট হতে তাঁর অংশ খরিদ করে নিয়েছি। একথা শুনে হযরত উসমান (রা) বললেন, ‘আবদুর রহমান সত্য সাক্ষ্য দেবার মতো লোক। সে সাক্ষ্য তার পক্ষে হোক অথবা বিপক্ষে। (মুসনাদে ইমাম আহমদ)।
(২) আলকামা বিন ওয়ায়েল তাঁর পিতা হযরত ওয়ায়েল বিন হুজার (লা) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁক হাদরামাউতে এক খন্ড জমি দান করেছিলেন। (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
(৩) হযরত আবু বকর (লা)-এর কন্যা হযরত আসমা (রা) বলেছেন, রাসূলে রীম (সা) তাঁর স্বামী যুবায়েরকে খায়বারে এক খন্ড জমি দান করেছিলেন। এতে খেজুর গাছসহ অন্যান্য গাছপালাও ছিল। তাছাড়া উরওয়া বিন যুবায়ের বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলে করীম (সা) তাকে বনী নযীবের জমি থেকে এক খন্ড খেজুর বাগান দান করেছিলেন। আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বর্ণনা করেছেন যে, জমির একটি বড় খন্ড রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত যুবায়েরকে দান করেছিলেন। এ দান ছিল এত বড় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বললেন, ‘ঘোড়া দৌড়াতে থাক। যেখানে গিয়ে তোমার ঘোড় থেমে যাবে ততদূর পর্যন্ত সব জমি তোমাকে দিয়ে দেয়া হবে। তাই তিনি ঘোড়া দৌড়ালেন। এক জায়গায় গিয়ে ঘোড়া থামলে তিনি তার হাতের চাবুক সামনে নিক্ষেপ করলেন। তখন রাসূল (সা) বললেন, বেশ, চাবুক যেখানে গিয়ে পড়েছে সেখান পর্যন্ত ভূমি তাকে দিয়ে দেয়া হোক’ (বুখারী, আহমদ, আবু দাউদ, আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজ, আবু উবায়েদের কিতাবুল আমওয়অল।)
(৪) হযরত উমর বিন দীনার বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আগমেনর পর হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) উভয়কে ভূমি দান করেছিলেন। (কিতাবুল খারাজ, ইমাম আবু ইউসুফ)।
(৫) হযরত আবু রাফে’ (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) তাঁর খান্দানের লোকজনের একটি জমি দান করেছিলেন, কিন্তু তারা তা আবাদযোগ্য করতে পারেননি। হযরত উমর (রা) তাঁর খিলাফতকালে সে জমি আট হাজার দীনার মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। (কিতাবুল খারাজ)।
(৬) ইবনে সিরীন হতে বর্ণিত, নবী করীম (সা) আনসার সম্প্রদায়ের এক জয়তুতন ব্যবসায়ীকে এক খন্ড জমি দান করেছিলেন। ভূমি খন্ডটির দেখাশুনার জন্য তিনি প্রায়ই বাইরে যেতেন। ফিরে এসে শুনতে পেতেন যে, তিনি বাইরে যাবার পর মহানবী (সা)-এর উপর উতটুকু কুরআন নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এই হুকুম জারি করেছেন, এতে তাঁর মনে দুঃখ হতো। অবশেষেএকদিন তিনি রাসূলে করীম (সা) এর নিকট উপস্থি হয়ে আরোচ করলেন, এ জমি আমার আর আপনান মধ্যে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জমিটি আপনি আমার কাছ থেকে নিয়ে নিন। সুতরাং তাঁর কাছ থেকে জমি ফেরত নেয়া হলো। এর পর হযরত যুবায়ের (রা) জমিটির জন্য আবেদন করলে রাসূল (সা) তা তাঁকে দিয়ে দিলেন। (কিতাবুল আমওয়াল)
(৭) হযরত বিলাল বিন হারেস মুযানী (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে আকীকের সমস্ত জমি দান করে দিযৈছিলেন। (কিতাবুর আমওয়াল)
(হযরত আদী বিন হাতিম (রা) বর্ণা করেছেন।, রাসূলুল্লাহ (সা) ফোরাত বিন হাইয়ান আজালীকে ইয়ামার এক খন্ড জমি দান করেছিলেন। (কিতাবুল আমওয়াল)
(৯) আরবের বিখ্যাত চিকিৎসক হারিস বিন কালদাহর ছেলে নাফে’ হযরত উমর (লা)-এর নিকট বসরা এলাকার এমন একটি জরি জন্য আবেদন জানালেন যা খারাজমুক্ত ভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিল না, আবর ‍মুসলমানদের কোনো স্বার্থের সাথেও সম্পৃক্ত ছিল না। তিনি বললেন, আমি এ ভূমিতে ঘোড়ার জন্য ঘাসের চাষাবাদ করবো। হযরত উমর (রা) বসরার গভর্ণর আবু মূসা (রা)-এর নিকট ফরমান লিখে জানালেন, যদি নাফে’র বর্ণনা ঠিক হয় তাহলে জমিটি তাকে দিয়ে দেয়া হোক। (কিতাবুল আমওয়াল)
(১০) মূসা বিন তালহা (র) বলেছেন, হযরত উসমান (রা) তাঁর খিলাফতকালে যুবায়ের (লা) বিন আওয়াম, সাআদ (রা), ইবনে আবু ওয়াক্কাস, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (া), উসমা (লা) বিন যায়েদ (লা), খাব্বাব বিন আরাত (রা), আম্মার বিন ইয়াসির এবং সা’দ নি মালিককে জমি দান করেছিলেন। (কিতাবুল খঅরাজ, কিতাবুল আমওয়াল)
(১১) আবদুল্লাহ বিন হাসান (র) বর্ণনা করেছেন, হযরত আলী (রা) আবেদন জানালেন হযরত (রা) তাঁকে ইয়াম্বু’র এলাকা দান করেছিলেন। (কানযুল উম্মাল)।
(১২) ইমামা আবু ইউসুফ (র) বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র হতে বর্ণনা করেছেন, পারস্যের শাসক কিসরা ও তার বংশধরগণের যেসব জমি অনাবাদী পতিত ছিল অথবা যে জমির মালিক পালিয়ে গিয়েছিল সেব জমিকে ‘খালসা’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। যাকে তিনি জমি দান করতেন এসব জমি হতেই দান করতেন। (কিতাবুল খারাজ)

ভূমি দান করার শরয়ী বিধান

ভূমি প্রদানের এ রীত শুধু রাজকীয় এনাম ও বখশিশ ধরনেরই ছিল না বরং এর কিছু নীতিমালা ছিল যা আমরা হাদীসের গ্রন্থাবলীতে পাই। এ নীতিমালাগুলো হচ্ছে:
১। কোনো ব্যক্তি ভূমি লাভ করে তা কোনো কাজে না লাগালে এই দান বাতিল গণ্য হবে। দৃষ্টান্তরূপ ইমাম আবু ইউসুফ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ‘মুযাইনা’ ও ‘জুহাইনার’ লোকেরা উমর (রা) এর খিলাফতকালে তাঁর নিকট দাবী নিয়ে এলো। যহরত উমর (রা) বললেন, “এ জমি যদি আমার অথবা আবু বকর (রা)-এ দান হতো তাহলে আমি এ দান বাতিল করে দিতাম। কিন্তু এ দান তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর। অতএব আমি অপরাগ। অবশ্য পদ্ধতি হলো এই: (আরবী************)
“যার কোনো ভূমি থাকবে। আর তিন বছর পর্যন্ত সে তা অনাবাদী ফেলে রাখবে এরপর যদি কেউ তা আবাদ করে নেয় তাহেল সে-ই এ ভূমির হকদার।”
২। যে দান সঠিকভাবে ব্যবহৃদ হয় না সেই দানে ব্যপারে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। নজীর হিসেবে আবু উবাযেদ তঁর কিতাবুল আমওয়ালে এবং ইয়াহ্‌ইয়া বিন আদাদ তঁর খারাজ গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বিলাল বিন হারিস মুযানীকে গোটা আকীক উপত্যকা দান করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার একটা বড় অংশ আবাদ করতে পারেননি। এ অবস্থঅ দেখে হযরত উমর (রা) তাঁর খিলাফতকালে তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এ জমি তোমাকে এজন্য দান করেননি যে, তুমি নিজেও তা ব্যবহার করবে না, আর অন্যদেরকেও তা ব্যবহার করতে দিবে না। এখন তুমি শুধু এতটুকু জমি রাখ যতটুকু ব্যবহার করতে পারবে। বাকী জমি আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমি এগুলোকে মুসলমানদের মধ্য বিতরণ করে দেই। বিলাল নি হারিস (রা) তাতে অসম্মত হলেন। হযরত উমর (রা) তাঁকে আবার বললেন। অবশেষে যতটুকু জমি তাঁর চাষের আওতায় ছিল ততটুকু রেখে বাকী জমি তাঁর থেকে ফেরত নিয়ে অন্যান্য মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।
৩। রাষ্ট্র শুধু ‘মাওয়াত’ (পতিত) এবং ‘খালিসা’ (খাস) জমি থেকেই দান করতে পারে। অন্যথায় এক ব্যক্তির ভূমির ছিনিয়ে নিয়ে অপর ব্যক্তিকে দান করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই অথবা মূল মালিকদের মাথার উপর অনাহুত আর এক ব্যক্তিকে জায়গীরদার বা জমিদার হিসেবে বসিয়ে দিয়ে এবং তাকে মালিকানা অধিকার দান করে তার অধীনে মূল মালিকদেরকে চাষাবাদ কারী হিসেবে গণ্য করার অধিকারও নেই।
৪। রাষ্ট্র শুধু তাদেরই জমি দান করতে পারে যারা সত্যিকার অর্থে জনসাধারণের সামষ্টিক কল্যাণের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য খেদমত আঞ্জাম দিয়ে থাকে। অথবা যার সাথে এ ধরনের কোনো সেবামূলত কাজ সংশ্লিষ্ট রয়েছে অথবা যাকে দান করা কোনো না কোনোভাবে জনস্বার্থের জন্য সমীচীন মনে করা হবে। এখন রইলো ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে ওইসব রাজকীয় দান যা খোদামোদ প্রিয় ও তোষামোদকরীদেরকে দেয়া হয়, অথবা ওইসব দান যা অত্যাচারী ও উৎপীড়নকরা জনস্বার্থ বিরোধী কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য দান করে থাকে। এসব দান কোনো অবস্থাতেই বৈধ দানের পর্যায়ে আসতে পারে না।]

জমিদারীর শরয়ী নীতি

শোষোক্ত দুটি মূল নীতির ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর খেলাফতে রাশেদা কর্তৃক অনুসৃত কর্মপদ্ধতি। ইমাম আবু ইউসুফ (র) তাঁর কিতাবুল খারাজে বিষয়টি এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন:
“ন্যায় পরায়ন শাসকের অধিকার আছে, যে সম্পদের কোনো মালিক নেই এবং যার কোনো উত্তরাধিকারও নেই, এমন সম্পদ তিনি এমন লোককে দান বা ‍উপঢৌকন হিসেবে দিতে পারেন, ইসলারে খেদমতে যার অবদান আছে। সত্য দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রশাসন যে ব্যক্তিকে কোনো ভূখণ্ড দান করবেন তা ফেরত নেবার অধিকার কারো নেই। কিন্তু কোনো ভূমি কোনো শাসক কারো থেকে ছিনিয়ে এনে অন্যকে দান করলে তা হবে এক জনের জিনিস আত্মাসাৎ করে অন্যকে দান করার শামিল।”
এরপর তিনি আবার লিখেছেন:
“অতিএব শাসক যে ধরনের ভূমি দান করতে পারেন বলে আমি উল্লেখ করেছি, তার থেকে যে ভূমিই ইরাক, আরব. আল জিবাল ও অন্যান্য এলাকায় ন্যায়পরায়ণ ও সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত শাসক কাউকে দান করে থাকেন, পরবর্তী খলীফাগণের পক্ষে তাদের থেকে সে জমি ফিরিয়ে আনা অথবা তাদের দখল থেকে তা বের করে আনা, যে ভূমি এতদিন তাদের গখলে ছিল, হালাল নয়; চাই তারা এ সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হোক অথবা ওয়ারিস থেকে কিনে থাকুক।”
অবশেষে অধ্যায়টি সমাপ্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন:
“অতএব এসব ‍দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ (সা) নিজেও জমি দান করেছেন এবং তাঁর খলীফাগণও দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যাকেই জমি দান করেছেন, তার মধ্যে কল্যাণ নিহিত ছিল দেখেই দান করেছন। যেমন কোনো নওমুসলিমের মন জয় করা অথবা জমি আবাদযোগ্য করা। এভাবে খোলাফতে রাশেদাও যাকে জমি দান করেছেন, ইসলামে তার কোনো না কোনো উত্তম খেদমত দেখে অথবা ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলায় তা কোনো না কোনো কাজে আসবে মনে করেই করেছেন অথবা এতে কল্যাণ নিহিত আছে বলে করেছেন।” (কিতাবুল খারাজ ৩২-৩৫পৃ. )
শরীয়তের দৃষ্টকোণ থেকে জায়গীরদারীর মূল অবস্থঅন কি? একজন শাসক কি পরিমাণ জায়গীর দিতে পারেন ও বিলোপ করতে পারেন: আব্বসী খলীফা হারুনুর রশীিদের এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকৃতপক্ষে ইমাম আবু ইউসুফ দিয়েছেন। ইমাম সাহের এ জবাবের সারমর্ম হলো—রাষ্ট্রের তরফ থেকে ভূমি দান করা তো স্বস্থানে একটি বৈধ কাজ। কিন্ত সকল ভূমি দানকারল এক রকম নয়, আবার সকল ভূমি গ্রহণকারীও এক সমান নয়। এক রকম দান ন্যায় পরায়ণ, দীনদার, সত্যপথের পথিক ও আল্লাহভীরু শাসকগণ করে থাকেন। তারা ইনসাফের দৃষ্টিতে দীন ও মিল্লাতের সঠিক খাদেমদেরকে কল্যাণকামী। এমন উদ্দেশ্যে দান করেন যার ফলাপল সামষ্টিকভাবে দেশ ও জাতিই ভোগ করে থাকে। আর তারা এমন সম্পদ থেকে দান করে থাকেন যার থেকে দান করা তাঁর জন্য বৈধ। দ্বিতীয় প্রকার দান হলা- যা অত্যাচারী, স্বৈরাচারী ও স্বার্থপূজারী শাসকগণ অসৎ উদ্দেশ্যে অসৎ লোকদের দান করে থাকে। তারা অন্ধভাবে এমন সম্পদ থেকে দান করে যা দেয়ার অধিকার তাদের নেই। এ দুটি দুই বিপরীত ধরনের দান। আর এ দুই প্রকার দানের হুকুম একরকম নয়। প্রথম দান বৈধ। এ দানকে বহাল রাখাই ইনসাফের দাব। আর দ্বিতীয় প্রকারের দান অবৈধ এবং ইনসাফের দাবী হলো তা বাতিল করা। যে ব্যক্তি এই ‍উভয় দানকে একই পাল্লায় ওজন করে সে বড়ই যালেম।

মালিকানা অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

এসব সাক্ষ্য ও নজির সেই গোটা সমায়ের কার্যক্রমের নমুনা পেশ করে যখন কুরআনের মূল উদ্দেশ্য স্বয়ং কুরআন বাহক মাহনবী (সা) এবং তাঁর সরাসরি ছাত্রগণ নিজেদের কথা ও কাজে প্রতিফলিত করেছিলেন। এই নমুনা অবলোকন করার পর কারো পক্ষে এই সন্দেহ প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র অবকাশ থাকে না যে, ভূমিকে ব্যক্তিমালিকানা হতে বের করে সামষ্টিক মালিকানায় নিয়ে আসাই ছিল ইসলামের মূলনীতি, বরং এ সম্পূর্ণ বিপরীত এই নমুনা থেকে এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে জমি থেকে লাভবান হওয়ার স্বাভাবিক ও সঠিক পন্থা কেবল এই যে, তা জনগণের ব্যক্তিমালিকানায় থাকবে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা) অধিকাংশ সময়ে শুধু সাবেক মালিকানাকেই বহাল রাখেননি বরং যেসব অবস্থায় তিনি সাবেক মালিকানা বাতিল ঘোষণা করেছেন সেখানেও আবার নতুনভাবে ব্যক্তিমালিকানা সৃষ্টি করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য মালিকানাহীন ভূমির উপরে নতুন মালিকানা প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিয়েছেন এবং সরকারী মালিকানাধীন ভূমি জনগণের মধ্যে বন্টন করে তাদেরকে মালিকানা ব্যবস্থাকে শুধুমাত্র একটি অনুপেক্ষণীয় নিকৃষ্ট পন্থা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়নি, বরং একটি সঠিক নীতি হিসেবেই এ ব্যবস্থাকে বহাল রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্যও এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) মালিকানা অধিকারের মর্যাদা সম্পর্কে যেসব হুকুম দিয়েছেন সেগুলো এ কথার অতিরিক্ত প্রমাণ। বিভিন্ন রবাতে ইমাম মুসলিম (র) এই রিওয়ায়াত উল্লেখ করেছেন েযে, হযরত উমর (রা)-এর ভগ্নিপতি সাঈদ বিন যায়েদ (রা)-এ বিরুদ্ধে এক মহিলা মারওয়ান বিন হাকামের সময়ে দাবী উত্থাপন করেছেন যে, তিনি তার জমির একটি অংশ জবরদখর করে নিয়েছেন। জবাবে সাঈদ (রা) মারওয়ানের আদালতে যে বিবৃত দিয়েছিলেন তা এই যে, “আমি তার জমি কিভাবে ছিনিয়ে নিতে পারি! যেখানে আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুবারক জবানে বলতে শুনেছিঃ (আরবী*******************)
‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও দখল করে নেবে (কিয়ামতের দিন) সাত তবক জমি তার হার বানিয়ে তা ঘাড়ে লটকিয়ে দেয়া হবে।”
ইমাম মুসলিম (র) হযরত আবু হুরাইরা (রা) ও আয়েশা (রা)-এর সূত্রেও এই ইকই বিষয়বস্তু সম্পর্কিত হাদীস বর্ণনা করেছেন –(মুসলিম, কিতাবুল মুসাকাত ও য়অল মুজারা্আ, বাবু তাহরিীমিয যুলমি ওয়া গাসাবিল আরদি)। ইমাম আবু দাউদ, নাসাঈ ও তিরমিযী বিভিন্ন সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন, “কোন অধিকার ছাড়া (মালিকের অনুমতি না নিয়ে) অন্যের জমি চাষাবাদকারীর কোনো প্রাপ্য নেই।”
রাফে’ বিন খাদীজ (রা) বর্ণনা করেছেন: (আরবী********************)
“কোন ব্যক্তি অন্যের জমি তার অনুমতি ছাড়া চাষাবাদ করলেন ঐ ক্ষেতের ফসল উপর তার কোনো অধিকার থাকতে পারে না অবশ্য তার (চাষাবাদের) খরচ তাকে দিয়ে দিতে হবে।”
(ইবনু মাজাহ, তিরমিযী)
উরওয়া বিন যুবায়ের (রা)-এ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এই মর্মে একটিচ মোকদ্দমা দায়ের করা হলো যে, এক ব্যক্তি এক আনসারীর জমিতে খেজুর গাছ লাগিয়েছে। এ মোকাদ্দমার রায়ে রাসূলূল্লাহ (সা) ফায়সালা দিলেন- এসব খেজুর গাছ উপড়িয়ে ফে দেয়া হবে এবং জমি মূল মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হবে। (আবু দাউদ)
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এসব নির্দেশ কিসের সাক্ষ্য দেয়? এ কথার অর্থ কি এই যে, ভূমির ব্যক্তি মালিকানা কোনো ক্ষতিকর জিনিস চিল যার মূলোৎপাটন করাই ছিল ইসলামের উদ্দেশ্য? আর, অনুপেক্ষণীয় মনে করে বাধ হয়ে ব্যক্তিমালিকানাকে সহ্য করা হয়েছে? অথবা তা এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, এটা ছিল সম্পূর্ণ একটি বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার যার প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে?

৩. ইসলাম ব্যবস্থা এবং একক মালিকানা

ব্যাপারটি এখন ভিন্ন দিক থেকেও দেখা দরকার। ইসলামের বিধানসমূহ পরস্পর বিপরীত বা সংঘর্ষশীল নয়। ইসলামের হেদায়াত ও আইন-কানুনের প্রতিটি জিনিস এর সার্বিক ব্যবস্থার সাথে এমন সুসামঞ্জস্যশীল যে, এক বিভাগের আইন অন্যান্য বিভাগের আইন কানুনের সাথে খাপ খেয়ে যায়। এটা হলো এমন এক সৌন্দর্য – যাকে আল্লাহ তায়ালা, এ দীন যে তাঁরই থেকে আসা, তার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ সাব্যস্ত করেছেন। আমরা যদি তাঁরই তরফ থেকে আসা, তার একটা সুস্পষ্ট প্রমাণ সাব্যস্ত করেছেন। আমরা যদি মেনে নেই যে, শরীয়তে ভাগচাষ নাজায়েয, এবং শরীয়াত প্রণয়নকারী জমির মালিকানাকে নিজে চাষাবাদ করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে চান এবং নিজের কাছে বিদ্যমান চাষাবাদের অতিরিক্স জমি হয় কাউকে বিনামূল্যে দিয়ে দিবে অথবা বেকার ফেলে রাখবে, তবে সামান্য চিন্তা করলেই একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এ হুকুম ইসলামের অন্যান্য মূলনীতি ও আইন কানুনের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয় এবং একে ইসলামী ব্যবস্থায় ঠিকভাবে স্থাপনের জন্য ইসলামী ব্যবস্থার মধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে সংশোধন আনয়ন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বৈপরীত্যের কিছু স্পষ্ট নমুনা দেখুনঃ
(১) ইসলামী ব্যবস্থার মালিকানার অধিকার শুধুমাত্র শক্তিান পুরুষ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়, নারী, শিশু. রুগ্ন এবং বৃদ্ধরাও এ অধিকার প্রাপ্ত হয়। ভাগচাষ যদি নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তাদের সকলের জন্য কৃষি মালিকানা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।
(২) ইসলামের উত্তরাদিকার আইনের আলোকে একজন মানুষের মৃত্যুর পর যেভাবে তার সম্পদ অনেক লোকের বন্টিত হয়, ঠিক সেভাবে কোনো কোনো সময় অনেক মৃত ব্যক্তির সম্পদও এক ব্যক্তির নিকট জমা হয়ে যেতে পারে। এখন এটা কত আশ্চর্যের কথা যে, ইসলামের উত্তরাদিকার আইন তো এক ব্যক্তিকে শত সহস্র একর জমির মালিক বানিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানা যদি নিজে চাষাবাদ করা পর্যন্ত সীমিত হয় তাহলে এই আইন শত সহস্র একজ জমির মালিকের জন্য এই নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি ছাড়া বাকী সব জমির মালিকানা হতে লাভবান হওয়াকে হারাম করে দেয়।(৩) ক্রয়-বিক্রয়ের ইসলামী আইন যে কোনো ধরনের জিনিসের ক্ষেত্রে মানুষের উপর এরূপ বিধিনিষেধ আরোপ করেনি যে, সে সর্বাধিক একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই তা খরিদ করতে পারবে এবং এই সীমার বেশী খরিদ করার অধিকার তার নেই। বেচা-কেনার এই সীমাহীন অধিকার যেমন সকল বৈধ জিনিসের ব্যাপারে আছে- তেমনি জমির ব্যাপারেও সে অধিকার মানুষের রয়েছে। কিন্তু একথা অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হয় যে, দেওয়ানী আইন অনুযায়ী এক ব্যক্তি তো তার ইচ্ছামত যে কোনো পরিমাণ জমি ক্রয় করতে পারবে, কিন্তু কৃষি আইনানুযায়ী সে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশী ভূমির মালিকানার ফল ভোগ করার অধিকার পাবে না।
(৪) ইসলাম কোনো প্রকার মালিকানার উপরই পরিমাপ ও পরিমাণগত দিক থেকে কোনো সীমা নির্ধারণ করেনি। বৈধ জিনিসের মালিকানার ক্ষেত্রে যখন এর সংশ্লিষ্ট শরয়ী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালিত হতে থাকে তখন তা অধিক পরিমাণে রাখা যায়। টাকা-পয়সা, জীব-জন্তু, ব্যবহারের জিনিসপত্র, বাড়ীঘর, যানবাহন, মোটকথা মোনো জিনিসের ব্যাপারেই আইনত মালিকানার পরিমাণের উপর কোনো সীমাবদ্ধ নেই। তাহলে শেষ পর্যন্ত শুধু কৃষি সম্পদের এমন কী বিশেষত্ব রযেছে যার এই একটি মাত্র ক্ষেত্রে শরীয়তের মনোভাব হবে ব্যক্তিমালিকানাকে পরিমাণের দিক থেকে সীমিত করা, অথবা লাভবান হওয়াকে সুযোগ সুবিধা ছিনিয়ে নিয়ে একটি বিশেষ সীমার অধিক মালিকানাকে ব্যক্তির জন্য অকেজো করে দেয়া।[ এখানে ভাল করে বুঝে নিতে হবে যে, ইসলামের মৌলিক বিধান তো তাই যা আমি উপরে বর্ণনা করেছি। অবশ্য কোন বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যদি জমির বর্বোচ্চ মালিকানার সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন অনুভূত হয়, তাহলে সেই অবস্থা বিরাজমান থাকা পর্যন্ত সাময়িকভাবে তা করা যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের কোন সিদ্ধান্তের কারণে ইসলামের মৌল বিধানে কোন স্থায়ী পরিবর্তন হতে পারে না। সামনে অগ্রসর হয়ে এ বিষয়ের উপর আমি বিস্তারিত আলোচনা করবো।
(৫) জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ইসলাম দয়ামায়া ও দানশীলতাকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় হক আদায় করার পর আর কোনো ব্যাপারেই আমরা দেখি না যে, ইসলাম ইহসান ও দানশীলতাকে মানুষের উপর অবশ্যকরণীয় করেছে। উদাহরণস্বরূপ যে ব্যক্তি যাকাত পরিশোধ করে তাকে ইসলাম তার প্রয়োজনের অতিরিক্স টাকা পয়সা গরীপ দুঃখীদের দান করার জন্য উৎসাহিত করে; কিন্তু এ দান খয়রাতকে তার উপর ফরয করে না এবং এ কথাও বলে না যে, অভাবীদের ঋণ হিসেবে অথবা মুজারাবাতের ভিত্তিতে টাকা পয়সা দিয়ে তার ব্যবসায়ে শরীক হওয়া হারাম, বরং দান শুধু দানের আকারেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। এমনিভাবে কোনো ব্যক্তির প্রয়োজনের অতিরিক্ত ‘বাড়ী’ থাকলে অথবা এমন একটি বড় বাড়ী যদি থাকে যাতে তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গা আছে তাহলে এ ধরনের অতিরিক্ত বাড়ী ও বাড়ীর অতিরিক্ত জায়গা, যাদের বাড়ীঘর নেই তাদেরকে নিস্বার্থভাবে ব্যবহার কতে দেয়াকে ইসলাম খুবই উৎসাহিত করে। কিন্তু অনিবার্যভাবেই তা বিনামূল্যৈ দিয়ে দিতে হবে এবং বাড়ীভাড়া দেয়া হারাম এমন কথা ইসলাম বলেনি। তদ্রুপ অতিরিক্ত কাপড় চোপড়, থালা বাসন, যানবাহন ইত্যাদির ব্যাপারেও এই একই কথা। এসব জিনিস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দানশীলতার মনোভাব নিয় নিস্বর্থভাবে দিয়ে দেয়াকে অবশ্যই পছন্দ করা হয়েছে, কিন্তু তা ফরয করে দেয়া এবং বিক্রি করা ও ভাড়ায় দেয়া হারাম করা হয়নি। এখন কৃষিজাত জমির ব্যাপারে এমন কী ঘটলো যার কারণে এ ব্যাপারে ইসলাম এর এই সাধারণ মৌল নীতিকে পরিহার করে এর উৎপাদনের উপর যাকাত আদায় করার পরও তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি অবশ্যম্ভাবী রেো অপরকে বিনামূল্যৈৗ দিয়ে দিতে বাধ্য করতে এবং অংশীদারী অথবা মুজারাবাতের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো কারবার অবশ্যই করতে পারবে না?
(৬) ইসলামী আইন ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প কারখানা ও অর্থনৈতিক কারবারের প্রতিটি বিভাগে মানুষকে অবাধ অনুমতি দিয়েছে যে, সে লাভ-লোকসানে অংশীদারিতত্বের নীতি অনুযায়ী অপরের সাথে কাজ কারবার করতে পারবে। এক ব্যক্তি অন্যকে নিজের টাকা পয়সা দিয়ে ঠিক করে নিতে পারে যে, সে এই টাকা দিয়ে কারাবার করবে; যদি লাভ হয়, তাহলে এর অর্ধেক অথবা এক চতুর্থাংশের মালিক অর্থ সরবরাহকারী হবে। এক বীক্ত কাউকে নিজের পুঁজি কোনো দালানকোঠা রূপে, কিংবা কোনো মেশিন কি ইঞ্জিন হিসেবে, কোনো মোট অথবা নৌকা বা জাহারূপে দিতে পারে এবং বলতৈ পারে যে, তুমি এগুলো কাজে লাগাও। এতে যা লাভ হবে তার এতে অংশ আমাকে দিবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি নিজের পুঁজি জমির আকারে অন্যকে দিয়ে কোনো সংগত কারণে এ কথা বলতে পারে না যে, এতে যে ফসল উৎপন্ন হবে তার এক-তৃতীয়াংশ অথবা এক চতুর্থাংশ বা অর্থেক অংশের মালিক আমি হবো।

৪. কৃষি জমির সীমা নির্ধারণ

প্রশ্ন: জনৈক স্থানীয় আলিম দুটি প্রশ্ন করেছেন। মেহেরবানী করে প্রশ্ন দুটির জবাব দেবেন।
(১) কৃষি সংস্কার প্রসংগে জায়গীর ফেরত নেবার ব্যাপারে নির্দিষ্ট সীমার অতিরিক্ত নেবার পক্ষে দলীল পেশ করুন। বিশেষ করে, যেখানে হযরত যুবায়ের রাযিআল্লাহ আনহুকে রাসূলুল্লা (সা) চাবুক নিক্ষেপের মাধ্যমে নির্দেশিত সমগ্র এলাকার জমি দিয়েছিলেন।
(২) কৃষকদের উচ্ছেদের ব্যাপারে তো একথা সুস্পষ্ট যে, ফসল ফলার আগে তাদেরকে বেদখল করা যাবে না। কিন্তু এছাড়া তাদেরকে জমি থেকে বেদেখল করার কোনো কারণ দেখি না। যদি অন্য কোনো পথ থাকে তাহলে দলীল সহকারে পেশ করবেন।
একজন প্রশ্ন করেছেন, কুরআন পড়ে জানা যায়, দুনিয়ার সৃষ্টবস্তুগুলো থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির উপকৃত হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সাধারণের উপকারার্থে জমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে সোপর্দ করে দিলে তা কুর্আনের উদ্দেশ্যের যথার্থ বাস্তবায়ন বলে মনে হয়।
জবাব: প্রথম প্রশ্নটি ব্যাপারে নীতিগত ভাবে একথা জেনে রাখা উচিত যে, এক ব্যক্তি জমি কিনে বা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা লাভ যেভাবে জমির ওপর মালিকানস্বত্ব ঠিক তেমনভাবে কায়েম হয়ে যায় না। জায়গীরের ব্যাপারে সরকার সব সময় পুনর্ববিবেচনা করার অধিকা রাখে। কোনো দান অসংগত বিবেচিত হলেই সরকার তা বাতল করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারী পদক্ষেপ সংশোধনের উর্ধ্বে নয়।
হাদীস ও আছার গ্রন্থগুলো এর কয়েকটি নজির পাওয়া যায়। আবইয়ায ইবনে হাম্মাল মাযনীকে (রা) নবী (সা) মারিব এলাকায় এমন একটি জমি দিয়েছিলেন যেখানে খেতে লবন বের করা হতো। পরে লোকেরা যখন রাসূলুল্লাহকে সেখানে একটি বিরাট লবনের খনির অস্তিত্বের সন্ধান দিলো, তখন তিনি এ ধরনের জমি ব্যক্তিমালিকানয় দেয়া সামাজিক স্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনা করে পূর্বের আদেশ বাতিল করে দেন। এ থেকে কেবল একথাই জানা যায় না যে, সরকারী দান সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, বরং এই সংগে একথাও জানা যায় যে, কাউকে সংগত সীমার বেশী দেয়া সামিষ্টিক স্বার্থ বিরোধী, আর এই পর্যায়ে কাউকে কিছু দান করা হয়ে থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। আর একটি রিওয়ায়েত থেকেও একই কথা জানা যায়। তাতে বলা হযেছে, হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা) হযরত তালহা (রা)-কে একটি জমি দান করার ফরমান লিখে দেন। কিন্তু এই ফলমানে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন: (আরবী***************************)
এতগুলো জমি একা তোমাকে দেয়া হবে অন্য সবাইকে বঞ্চিত করে? (দেখুন কিতাবুল আমওয়াল লি আবী উবাইদ, পৃঃ ২৭৫-৭৬)
হযরত যুবায়ের (রা) প্রসংগে বলা যায়, যে নবী করীম (রা) তাকে জমি দেন, তখন বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদী পড়ে ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে তখনই এই জমি গুলো আবাদ করার সমস্যা ছিল মুখ্য। তাই সে আমলে তিনি এই সব অনাবাদী জমির বিরাট বিরাট খন্ড লোকদের দিয়েছিলেন।
জমি বেদখল করার ব্যাপারে সরকার এমন ধরনের আইন প্রণয়ন করার অধিকার রাখে যার মাধ্যমে একথা নিশ্চিত করে দেয়া যায় যে, যুক্তিংগত কারণ ছাড়া মালিক কখনো কোনো কৃষককে বেদখল করতে পারবে না। এটা নাজায়েয হবার দলীল কি? যদি কোনো ‘নাস’ [আলাহ ও রাসূলের (সা) নির্দশ]-এর বিরোধী না হয়, তাহলে এ অনুমতি ইমামের সেইসব ইখতিয়ারের আওতাভুক্ত হয়ে যায়, যা তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান করা হয়েছে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে, লোকদের মধ্যে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি কায়েম করা এবং সামষ্টিক ফিতনার পথরোধ করার জন্য বর্তমানে আমাদের দেশের জনগণের বৃহত্তর অংশের জীবন ধারণ যেখানে একমাত্র জমির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে মালিকদেরকে এত অবাধ ও ব্যাপক ক্ষমতা দান করার কোনোক্রমেই জনস্বার্থেল অনুকূল নয়, যার ফলে তারা নিজেদের খেয়ালখুশী মতো যে কোনো কৃষককে সংগত কারণ ছাড়াই যে কোনো সময় জমি থেকৈ বেদখল করতে পারে। এর অর্থ দাঁড়াবে, কোনো কৃষক যে কোনো সময় জমি থেকে বেদখল করতে পারে। এর অর্থ দাঁড়াবে, কোনো কৃষক কখনো কোথাও নিশ্চিন্তে বসতে পারবে না। এভাবে লাখো লাখো কৃষিজীবি মানুষের জীবন সবসময় দোদুল্যমান ও ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে।
কুরআন অধ্যয়নের পর অদ্ভুত ফলশ্রুতি আপনি পেশ করেছেন। কুরআন থেকে বের করেছেন মালিকানা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে সোপর্দ করে দিতে হবে। আমি খুবেই খূশী হতাম যদি জানতে পারতাম কুরআনের কোন কোন আয়াত থেকে এগুলা বের হয়েছে। আপনি আমার মাসআলায়ে মিলকিয়াতে যমীন’ বইটর প্রথম দুটি অধ্যায় সেই আলিম সাহেবের সামনি রাখুন, যাতে তিনি সেখানে যে প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেছে, তার পুনরাবৃত্তি না করেন। সেই প্রশ্নগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে চাইলে, অন্তত সেখানে তার জবাব দেয়া হযেছে, তার সাথে কোন্ কোন্ ব্যাপারে তিনি একমত নন, তা জানিয়ে দিতে পারেন। এভাবে আমার ও তাঁর অনেকটা সময় অপচয়ের হাত থেকে বঁচবে। [তরজমানুল কুরআন, জুন-১৯৫১।]

৫. বর্গাচাষ পদ্ধতি এবং ইসলামের সুবিচার নীতি

[জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে : তরজামানুল কুরআন, অক্টোবর ১৯৫০ ইং।]
জওয়াবঃ (১) উৎপন্ন ফসল থেকে জমি মালিক ও ভাগচাষী আনুপাতিক হারে অংশ বন্টন করে নেবেন ভাগের এ পদ্ধতিটি নীতিগতভাবে ঠিক। যেমন ধরুন মলিকের ২/৫ এবং চাষীর ৫/৩ অংশ। কিন্তু এ ব্যাপারে ইনসাফের তাগিতে অবশ্যই প্রত্যেক চাষীকে এমন পরিমাণ জমি দিতে হবে যাতে তার মানবিক প্রয়োজন পূর্ণ হয়। উপরন্তু আনুপাতিক অংশ নির্ধারণ করার সময় প্রচলিত ধারা প্রতি নজর না দিয়ে, ইনসাফের প্রতি নজর রেখে দেখতে হবে, ফসল উৎপাদনে জমির মালিকও চাষীর যথার্থ অংশ (Contribution) কতটুকু? এ ব্যাপারে কোনো বিশ্বজনীন আইন কানুন বানানো সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেক এলাকার কৃষির অবস্থা এক রকম নয়। তবে আপাত-দৃষ্টিতে মনে হয়, জমির মালিক যদি কেবল জমি দিয়ে থাকেন এবং হাল, বীজ ও মেহনত সব যদি হয় চাষীর, তাহলে এ অবস্থায় ২/৫ ও ৩/৫ ভাগটা ইনসাফভিত্তিক হবে না। যাই হোক, জমি মালিকরা নিজেদের ব্যাপারটিকে কেবল শরীয়তের বিধান সংশোধন করে নেবেন, তা যথেষ্ট নয়; বরং তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে খোলা মনে, যথার্থ ইনসাফ কায়েম করার উদ্দেশ্য।
(২) অবশ্যই জমির মালিকের তদারক করার অধিকার আছে। মালিক দেখতে পারেন ফসল ভাগ করার পূর্বে চাষী সম্মিলিত অংশ থেকে অবৈধভাবে কিঠু গ্রাস করে ফেলছে কিনা; অথবা কৃষ হিসেবে সে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কিনা। কিন্তু এই তদারকী ব্যবস্থঅ এত বেশী অগ্রসর না হওয়া উচিত, যার ফলে চাষী কেবলমাত্র কর্মচারী বা মজুরে পরিণত হয়ে যায় এবং মালিকের তদারকী কর্মচারীরা পূরোপুরি নিজেদের হুকুম অনুযায়ী তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। নীতিগিতভাবে একচাষী মালিকের কর্মচারী বা মজুর নয়; বরং কারবারের ভাগীদার। আর একথা মেনে নিয়েই তার সাথে ব্যবহার করা উচিত। চাষীদের পক্ষ থেকে আমি যেসব অভিযোগ পেয়েছি, তার মধ্যে এ অভিযোগও আছে যে, জমিদার ও তার কর্মচারীরা হরহামেশা তাদের মাথার ওপর সওয়ার হয়ে থাকে এবং তাদের প্রত্যেকটি কাজে হস্তক্ষেপ করে। এ পদ্ধতির সংশোধনই আমার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।

৬. অধিকারভূক্ত সম্পদ ব্যয়ের সীমা

“আর তোমাদের যে ধন সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন ধারণের মাধ্যমে পরিণত করেছেন, তা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়োনা তবে তাদের খাওয়অ পরার ব্যবস্থা কর এবং সদুপদেশ দাও। *****৮
আর এতীমদের পরীক্ষা করতে থাক, যতদিন না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছে যায়। ***৯ তারপর যদি তোমরা তাদের মধ্যে যোগ্যতার সন্ধান পাও, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের হাতে সোপর্দ করে দাও। ***১০ তারা বড় হয়ে নিজেদের অধিকার দাবী করবে, এ ভয়ে কখনো ইনাসফের সীমানা অতিক্রম করে তাদের সম্পদ তাড়াতাড়ি অবলম্ন করে (অর্থাৎ অর্থ গ্রহণ না করে) আর যে গরীব হবে সে যেন প্রচলিত পদ্ধতিতে খায়। ****১১ তারপর তাদের সম্পদ যখন তাদের হাতে সোপর্দ করতে যাবেব তখন তাতে লোকদেরকে সাক্ষী বানাও। আর হিসাব নেবার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”
৮. এ আয়াতটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে একটি পরিপূর্ণ বিধান দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে: অর্থ জীবন যাপনের একটি মাধ্যম। যে কোনো অবস্থায়ই তা ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে তমদ্দুনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এবং শেষ পর্যন্ত নৈতিক ব্যবস্থাকেও ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। কোনো ব্যক্তির নিজের সম্পদের ওপর তার মালিকানা অধিকার থাকে ঠিকই। কিন্তু তা এতো বেশী সীমাহীন নয় যে, যদি সে ঐ সমস্ত অধিকার সঠিকভাবে ব্যবহার করার যোগ্যতা না রাখে এবং তার ত্রুটিপূর্ন ব্যবহারের কারণে সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয় তারপরও তার কাছ থেকে ঐ অধিকার হরণ করা যাবে না। মানুষের জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চহিদা অবিশ্য পূর্ণ হতে হবে। তবে মালিকানা অধিকারে অবাধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যি এ বিধিনিধে আরোপিত হওয়া উচিত যে, এ ব্যবহার নৈতিক ও তমদ্দুনিক জীবন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সুস্পষ্টভাবে হতে পারবে না। এ বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক সমপদ-সম্পত্তির মালিককে ক্ষুদ্র পরিসরে এদিকে অবশ্যি নজর রাখতে হবে যে, নিজের সম্পদ সে যার হাতে সোপর্দ করছে সে তা ব্যবহারেরর যোগ্যতা রাখে কিনা। আর বৃহত্তর পরিসরে এটা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে যে, যারা নিজেদের সম্পদ ব্যবহারের যোগ্যতা রাখে না অথবা যারা অসৎ পথে নিজেদের ধন সম্পদ ব্যবহার করছে, তাদের ধন সম্পত্তি সে নিজের পরিচালনাধীনে নিয়ে নেবে এবং তাদের জীবন নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেবে।
৯. অর্থাৎ যখন তারা বালেগ হতে থাকে তখন তাদের বুদ্ধি-জ্ঞঅন কি পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে তা দেখতে হবে এবং তারা নিজেদের বিষয়াদি আপন দায়িত্বে পরিচালনা করার যোগ্যতা কতটুকু অর্জন করেছে সে দিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর রাখতে হবে।
১০. ধন সম্পদ তাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য দুটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে, সাবালকত্ব আর দ্বিতীয়টি যোগ্যতা অর্থাৎ অর্থসম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করার যোগ্যতা। প্রথম শর্তটির ব্যাপারে ‍ উম্মাতের ফকীহগণ একমত। দ্বিতীয় শর্তটির ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির মত হচ্ছে এই যে, সাবালক হবার পরও যদি এতীমের মধ্যে ‘যোগ্যতা’ না পাওয়া যায়, তাহলে তার অভিভাবককে সর্বাধিক আরো সাত বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর ‘যোগ্যতা’ পাওয়া যাক বা না যাক সর্বাবস্থায় এতীমকে ধনসম্পদের দায়িত্ব দিয়ে দিতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম শাফেঈ রাহেমাহুমুল্লাহর মতে ধনসম্পদ এতীমের হাতে সোপর্দ করার জন্য অবশ্যি ‘যোগ্যতা’ একটি অপরিহার্য শর্ত। সম্ভবত এঁদের মতে এ ব্যাপারে শরীয়তের বিষয় সমূহের ফয়সালাকারী কাযীর শরণাপন্ন হওয়াই অধিকতর যক্তিযুক্ত। যদি কাযীর সামনে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সংশ্লিষ্ট এতীমের মধ্যে যোগ্যতা পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে তার বিষয় সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য তিনি নিজেএ কোনো ভালো ব্যবস্থা করবেন। [তাফহীমুল কুরআন: সূরা আন নিসা, আয়াত ৫-৬, টীকা ৮-১০।]

সপ্তম অধ্যায়ঃ সুদ

[এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় মাওলানা একটি বড় গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। তাতে যুক্তি, ইতিহাস এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ সমস্যার সকল প্রয়োজনীয় দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ‍সুদ অর্থনৈতিক সুবিধা ও ফায়দা লাভের নিকৃষ্টতম হাতিয়ার। এ গ্রন্থে বাণিজ্যিক সুদ ও অবাণিজ্যিক সুদের মধ্যে পার্থক্য করার ভ্রান্ত দৃষ্টিভংগিকেও পূর্ণরূপে খন্ডন করা হয়েছে, সুদবিহীন অর্থনীতির ছাত্রদের জন্যে এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা অত্যন্ত জরুরী। এ অধ্যায়ে আমরা সুদ গ্রন্থটি থেকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ এবং তাফহীমুল কুরআন ও রাসায়েল মাসায়েল থেকে প্রয়োজনীয় আলোচনা উপাস্থপন করছি। কিন্তু সুদ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য মূল গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা জরুরী –সংকলক]।

১. সুদ সম্পর্কে ইসলামের বিধান

[সুদ গ্রন্থ থেকে গৃহীত।]

এবার কুরআন ও হাদীসের আলোকে সুদের পর্যালোচনা করতে চাই। সুদ কি? এর সীমানা কি? সুদ হারাম হবার যেসব বিধান ইসলাম দিয়েছে সেগুলো কোন্ কোন্ ব্যাপারে ও কোন্ কোন্‌ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? সুদের বিলোপ সাধন করে মানব জীবনের অর্থনৈতিক বিষয়াবলীকে ইসলাম কিভাবে পরিচালনা করতে চায়? এগুলোই হবে আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়বস্তু।

রিবার অর্থ

কুরআন মজীদে সুদের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূলে আছে আরবী ভাষায় (আরবী**)ি তিনটি হরফ। এর অর্থের মধ্যে বেশী, বৃদ্ধি, বিকাশ, চড়া প্রভৃতি ভাব নিহিত। যেমন, (আরবী****) (রাবা) অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া ও বেশী হওয়া।
(আরবী ****) অর্থ সে টিলায় চড়লো। (আরবী*****) অর্থ সে ছাতুর মধ্যে পানি ঢাললো এবং ছাতু ফুলে উঠলো। (আরবী*****) অর্থ সে অমুকের কোলে লালিত পালিত হয়েছে। (আরবী****) অর্থ জিনিসটি বৃদ্ধি করেছে। (আরবী****) (রাবওয়াতুন) অর্থ উচ্চতা। (আরবী*****) অর্থ এমন স্থান বা জমি যা ধরাপৃষ্ঠ থেকে উঁচু। কুরআন মজীদে এ শব্দটির মূল থেকে নির্গত শব্দাবলী যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে সেখানেই বৃদ্ধি, উচ্চতা ও বিকাশ অর্থ পাওয়া যায়। যেমন:
فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ
যখন আমি তার ওপ র পানি বর্ষণ করলাম তখন তা সবুজ শ্যামল হয়ে উঠলো এবং শস্য ও ফল দান করতে লাগলো। -আল হজ্জ: ৫
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং সাদকাকে বৃদ্ধি দান করেন। (আল-বাকারা : ২৭৬
فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَابِيًا
যে ফেনপুঞ্জ উপরে উঠে এসেছিল বন্য তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। (আবু রা’আদ: ১৭)
সে তাদেরকে আরো শক্ত করে ধরলো। -আ-হাক্কাহ: ১০
أَنْ تَكُونَ أُمَّةٌ هِيَ أَرْبَى مِنْ أُمَّةٍ
যাতে এক জাতি অন্য জাতি থেকে অগ্রসর হয়ে যায়। -আন নাহল: ৯২
আমি মরিয়ম ও ঈসাকে একটি উচ্চস্থানে আশ্রয় দান করলাম। -আল মুমিনুন: ৫
এ ধাতু থেকেই রিবা (আরবী******) শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ধন বৃদ্ধি হওয়া এবং আসল থেকে বেড়ে যাওয়া। কুরআনেও এ অর্থটি সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
যেমন বলা হয়েছে: (আরবী*****************)
আর লোকদের নিকট তোমাদের যা কিছু সুদ অবশিষ্ট (পাওনা ) রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও আর যদি তোমরা তওবা করে নাও তাহলে তোমাদের মূলধনটাই (অর্থাৎ প্রদত্ত আসল অর্থ) ফেরত পাবার অধিকার তোমাদের আছে। -আল বাকারা: ৩৮
আরবী****************
যে সুদ তোমরা দিয়েছো এ উদ্দেশ্য যে, মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর নিকট তার সাহায্যে ধন বৃদ্ধি হয় না। -আর-রূম: ৩৯
এই আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্ট হযে গেছে যে, আসর অর্থের উপর যা কিচু বাড়তি হবে তা ‘রিবা’ আখ্যা পাবে। কিন্তু কুরান মজীদ ঢালাওভাবে সব রকমের বৃদ্ধিকে হারাম গণ্য করেছে এবং এ বৃদ্ধিকে ‘রিবা’ নাম করণ করেছে। ইসলামপূর্ব যুগে আরবী ভাষায় এ বিশেষ পর্যায়ের লেনদেনটিকে একই নামে অভিহিত করা হতো। কিন্তু তৎকালে লোকেরা ‘রিবা’-কে ব্যবসায়ের ন্যায় বৈধ মনে করতো যেমন আধুনিক জাহেলিয়াতে মনে করা হয়। ইসলাম এসে জানিয়ে দিলে যে, ব্যবসায়ের ফলে মূলধনের যে বৃদ্ধি হয় তা ‘রিবা’র মাধ্যমে বৃদ্ধি থেকে আলাদা। প্রথম ধরনের বৃদ্ধিটি হালাল এবং দ্বিতীয় ধরনের বৃদ্ধিটি হারাম। (আরবী************)
সুদখোরদের এহেন পরিণতি হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলেছে, ব্যবসা রিাব (সুদ) সদৃশ; অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং রিবাকে হারাম গণ্য করেছেন। (আল বাকারা: ২৭৫)
যেহেতু রিবা ছিল একটি বিশেষ ধরনের বৃদ্ধির নাম এবং তা সর্বজন পরিচিত ও প্রসিদ্ধ ছিল তাই কুরআন মজীদে এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। কুরআন এ ব্যাপারে কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করেছ যে, আল্লাহ রিবাকে হারাম গণ্য করেছেন, কাজেই তোমরা এটি পরিহার কর।

জাহেলী যুগের রিবা

জাহেলী যুগের যে সমস্ত লেন-দেনের ক্ষেত্রে ‘রিবা’ শব্দটি ব্যবহার হতো হাদীসে তার বিভিন্ন বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে।
কাতাদাহ বলেন, জাহেলী যুগের রিবা ছিল নিম্নরূপ: এক ব্যক্তি অন্যজনের হাতে কোনো জিনিস বিক্রি করতে এবং মূল্য আদায় করার জন্য তাকে নির্দিষ্ট সময় দিতো। এ সময় অতিক্রান্তের পর যদি সে মূল্য আদায় না করতো, তাহলে তাকে আরো সময় দিতো এবং মূল্য বাড়িয়ে দিতো।
মুজাহিদ বলেন, জাহেলী যুগের রিবা ছিল নিম্ন রূপ। এক ব্যক্তি অন্যের নিকট থেকে ঋণ গ্রণ করে তাকে বলতো, যদি তুমি আমাকে অমুক দিন থেকে অমুক দিন পর্যন্ত সময় দাও তাহলে আমি তোমাকে এ পরিমান বেশী দেবো। (ইবনে জরীর, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৬২)
আবু বকর জাস্সাস তাঁর নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বলেন, জাহেলী যুগে লোকের ঋণ গ্রহণ করার সময় ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হতো। তাতে বলা হতো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আসল মূলধন থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বেশী অর্থ ঋণগ্রহীতাকে আদায় করতে হবে। (আহকামুল কুরনান, ১ম খন্ড)
এ ব্যাপারে ইমাম রাযীর অনুসন্ধান হচ্ছে, জাহেলী যুগে লোকদের মধ্যে একটি বিশেষ নিয়ম প্রচলিত ছিল। তারা এক ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ দিতো এবং তার নিকট থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমান সুদ আদায় করতো। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে ঋণগ্রহীতার নিকট আসল মূলধন চাওয়া হতো। যদি সে আদায় করতে না পারতো তাহলে আরো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে অবকাশ দেয়া হতো এবং সুদ বাড়িয়ে দেয়া হতো। (তাফসীর কবীর, ২য় খন্ড, ৩৫২ পৃ:)
তদানিন্তন আরবে প্রচলিত এ ধরনের লেন-দেনকে আরববাসীরা নিজেদের ভাষায় ‘রিবা’ নাম দিয়েছিল এবং কুরআন মজীদ একেই হারাম ঘোষণা করেছিল। [এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য এ গ্রন্থের পরিশিষ্ট দেখুন।]

ব্যবসা ও রিবার মধ্যে নীতিগত পার্থক্য

ব্যবসা ও রিবার মধ্যে নীতিগত পার্থক্য কি? রিবার বৈশিষ্ট কি. যে কারণে তার চেহারা ব্যবসায়ের থেকে ভিন্ন প্রকার দেখায় এবং ইসলাম কেনইবা তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে- এ ব্যাপারগুলো এবার গভীরাবে চিন্তা করুন।
ব্যবসা বলতে বুঝায়, সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা দু’টি পক্ষ আছে। বিক্রেতা একটি বস্তু বিক্রির জন্য পেশ করে। ক্রেতা ও বিক্রেতা মিলে এ বস্তুটির একটি মূল্য স্থির করে। এ মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা বস্তুটি কিনে নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে বিক্রেতা নিজে পরিশ্রম করে ও অর্থ ব্যয় করে ঐ বস্তুটি তৈরী করেছে অথবা সে কোথাও থেকে বস্তুটি কিনে এনেছে- এ দুটোর যে কেনো একটি অবস্থা অবশ্যি সৃষ্টি হয়। এ উভয় অবস্থায়ই সে বস্তুটি কেনা বা সংগ্রহ করার ব্যাপারে নিজের যে মূলধন খাটিয়েছে তার সাথে নিজের পরিশ্রমের অধিকার সংযুক্ত করে এবং এটিই তার মুনাফা।
অন্যদিকে রিবা বলতে বুঝায়, এক ব্যক্তি নিজের মূলধন অন্য একজনকে ঋণ দেয়। এ সংগে শর্ত আরোপ করে যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণগ্রহীতাকে মূলধনের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বেশী অর্থ আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে মূলধনের বিনিময়ে মূলধন এবং নির্দিষ্ট সময়ের অবকাশের বিনময়ে বাড়তি অর্থ লাভ করা হয়- পূর্বাহ্নে একটি শর্ত হিসেবে যেটিকে নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। এ বাড়তি অর্থের নাম সুদ বা রিবা। এটি কোনো বিশেষ অর্থ বস্তুর বিনিময় নয়, বরং নিছক অবকাশের বিনিময়। যদি ব্যবসাযের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারিত হবার পর ক্রেতার নিকট শর্ত পেশ করা হয় যে, মূল্য আদায় করতে (মনে করুন) একমাস দেরী হলে মূল্য একটি নির্দিষ্ট হরে বেড়ে যাবে, তাহলে এ বৃদ্ধি সুদের পর্য়ায়ভুক্ত হবে।
কাজেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধেল শর্ত সাপেক্ষে মূলধনের উপর যে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়তি অর্থ গ্রহণ করা হয় তাকই সুদ বলা হয়। সুদের সংজ্ঞা এভাবেই নিরূপিত হয়। তিনটি অংশের একত্র সংযোজনই সুদের উদ্ভব। এক. মূলধন বৃদ্ধি। দুই. সময়ের অনুপাতে বৃদ্ধিল সীমা নির্ধারণ। তিন. এগুলোকে শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা। ঋণ সংক্রান্ত য কোনো লেনদেনের মধ্যে এ তিনটি অংশ পাওয়া গেলে তা সুদী লেনদেনে পরিণত হয়। কোনো সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক কাজে লাগানো অথবা কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য এ ঋণ গৃহীত হোক এবং ঋণগ্রহীতর দরিদ্র বা ধনী যাই হোক না কেন তাতে এর আসল চরিত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য সূচিত হয় না।
ব্যবসা ও সূদের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য হচ্ছে নিম্নরূপ:
এক : ব্যবসায়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মুনাফার বিনিময় হয় সমান পর্যাযে। কারণ ক্রেতা বিক্রেতার নিকট থেকে যে বস্তুটি ক্রয় করে তা থেকে লাভবান হয়। অন্যদিকে বিক্রেতা ঐ বস্তুটি ক্রেতার জন্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে যে পরিশ্রম, বুদ্ধি ও সময় ব্যয় করে তার পারিশ্রমিকই সে লাভ করে। বিপরীত পক্ষে সুদী লেনদেন সমান পর্যায়ে মুনাফা বিনিময় হয় না। সুদগ্রহীতা ধনের একটি নির্ধারিত পরিমাণ লাভ করে, যা তার জন্যে অবশ্যি লাভজনক হয়। কিন্তু সুদদাতা কেবলমাত্র সাময়িক অবকাশ লাভ করে, এর লাভজনক হবার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঋণগ্রহীতার ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ঋণ গ্রহণ করে থাকলে সাময়িক অবকাশ তার জন্য লাভজন হয় না বরং নিশ্চিত ক্ষতিকর হয়। আর ব্যবসা, শিল্প, কারিগরী বা কৃষিত খাটাবার উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রণ করে থাকলে অবকাশ তার জন্য একদিকে যেমন লাভের সম্ভাবনা নিয়ে দেখা দেয়, তেমনি অন্যদিকে ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়েও উপস্থিত হয়। কিন্তু ব্যবসাযে লাভ লোকসান যাই হোক না কেন ঋণদাতা সর্বাবস্থায় তা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা লাভ করে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, সদী কারবার এক পক্ষের লাভ ও অন্য পক্ষের লোকসান হয় অথবা এক পক্ষের নিশ্চিত ও নির্দিষ্ট লাভ এবং অন্যপক্ষের অনিশ্চিত ও অনির্ধারিত লাভ হয়।
দুই : ব্যবসায়ে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে যত বেশী মুনাফা অর্জন করুক না কেন মাত্র একবারই সে তা অর্জন করে। কিন্তু সুদী কারবারে মূলধন দানকারী অনবরত নিজের ধনের বিনিময়ে মুনাফা অর্জন করতে থাকে এবং সময় অতিক্রান্তের সাথে সাথে এ মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যেতে থাকে। তার ধন থেকে ঋণগ্রহীতা যতই লাভবান হোক না কেন তা এটি বিশে সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু এ মূলধনের বিনিময়ে ঋণদাতা যে মুনাফা অর্জন করে তার কোনো সীমা নেই। তার এ সীমাহীন মুনাফা তার সমস্ত উপার্জন, সমস্ত উপায় উপকরণ ও ধনদৌলত এবং তার যাবতীয় প্রয়োজনকে ছাপিয়ে যাবার পরও শেষ নাও হতে পারে।
তিন : ব্যবসায়ে পণ্য ও তর মূল্যের বিনিময় হবার সাথে সাথেই কারবার শেষ হয়ে যায়। এর পরে তা ক্রেতা কোনো পণ্য বা বস্তু বিক্রেতাকে ফেরত দেয় না। কিন্তু সুদী কারবারে ঋণগ্রহীতর মূলধন গ্রহণ করার পর তা ব্যয় করে ফেলে; অতপর এ ব্যয়িত বস্তু, পুনর্বার সংগ্রহ করে, তার সাথে সুদের বাড়তি অংশ সংযুক্ত করে, তাকে ফেরত পাঠাতে হয়।
চর : ব্যবসা, শিল্প, কৃষি ও কারিগরীতে মানুষ পরিশ্রম করে ও বুদ্দি খাটিযে তার ফল লাভ করে। কিন্তু সুদী কারবারে সে নিছক নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন খাটিযে কোনো প্রকার পরিশ্রম না করে, চিন্তা ও বুদ্ধি শক্তি ব্যবহার না করে, অন্যের উপার্জনের সিংহভাগ দখল করে বসে। পারিভাষিক অর্থে যাকে অংশীদার বলা হয়, যে ব্যক্তি লাভ-লোকসান উভয়তেই অংশীদার থাকে এবং লাভের আনুপাতিক হারে তা থেকৈ অংশ নেয়, সে তেমন ধরনের অংশীদার নয়; বরং সে হয় এমন একজন অংশীদার, যে লাভ-লোকসান এবং আনুপাতিক হারের পরোয়া না করে, নিজের নির্ধারিত ও শর্তাবদ্ধ মুনাফার দাবীদার হয়।

রিবা হারাম হবার কারণ

এসব কারণে আল্লাহ ব্যবসা হালাল ও সুদ হারাম করেছেন। এ কারণগুলো ছাড়া সুদ হারাম হবার আরো অনেক কারণ আছে, ইতিপূর্বে আরা সেগুলো আলোচনা করেছি। সুদ কার্পণ্য, স্বার্থন্ধতা, হৃদয়হীনতা, নিষ্ঠুরতা ও অর্থগৃধ্মতার অসৎ গুণাবলী মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে। বিভিন্ন জাতির মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করে। মানুষের সধ্যকার সহানুভূতি ও পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক ছিন্ন করে। মানুষের মধ্যকার সহানুভূতি ও পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগির সম্পর্ক ছিন্ন করে। মানুষেল মধ্যে ধন সঞ্চয় করে নিছক নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। সমাজে ধনের অবাধ গতি ও আবর্তনে বাধা দেয়; বরং ধনের আবর্তনের গতি ঘুরিয়ে বিত্তহীনদের থেকে বিত্তবানদের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তার কাণ সমগ্র দেশবাসীর ধন সমাজে একটি শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। এর ফলে সমগ্র সমাজ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। অর্থনীত বিশেষজ্ঞগণের নিকট এ ব্যাপারটি মোটেই প্রচ্ছন্ন নেই। সুদের এ সকল প্রভাব অনস্বীকার্য। কাজেই এ সত্যটিও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, যে কাঠামোর ভিত্তিতে ইসলাম মানুষের নৈতিক প্রশিক্ষণ, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সুসংহত করা ও তার অর্থনৈতিক প্রশিক্ষণ, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সুসংহক করা ও তার অর্থনৈতিক জীবন সংগঠিত করতে চায় সুদ তার প্রতিটি অংশের পূর্ণ পরিপন্থী। নগন্যতম সুদী কারবার ও তার আজপত সর্বাধিক নিষ্কুলুষ অবস্থাও িইসলামের সমগ্র কাঠামো নষ্ট করে দেয়। এ কারণেই আল্লাহ কুরআন মজীদে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সুদ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
(আরবী****************)
আল্লাহকে ভয় কর আর লোকদে নিকট তোমাদের সুদ পাওনা বাকী রয়ে গেছে সেগুলো ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমান রেখে থাক। আর যদি তোমরা এমনটি না কর, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধেল ঘোষণা গ্রহণ কর। -আল বাকারা

সুদ হারামের ব্যাপারে কঠোর নীতি

কুরআন মজীদে বহুবিধ গুনাহের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হযেছে এবং সেগুলোর জন্য কঠোর শাস্তি ও ভীতি প্রদর্শন করাও হয়েছে। কিন্তু সুদের ন্যায় এতো কঠোর ভঅষায় অন্য কোনো গুনাহের প্রতি নিষেধাজ্ঞঅ আরোপিদ গয়নি।[ এক হাদীসে বলা হয়েছে, সুদের গুনাহ নিজের মায়ের সাথে যিনা করার চাইতেও সত্তর গুণ বেশী। (ইবনে মাজাহ)] এজন্য ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বত্র ‍সুদ বন্ধ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) চরম প্রচেষ্টা চালান। তিনি নাজরানের খৃস্টানদের সাথে যে চুক্তি করেন তাতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখে পাঠান, যদি তোমরা সুদী কারবার কর, তাহলে তোমাদের সাথে চুক্তি ভেঙ্গে যাবে এবং আমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। বনু মগীরার সুদী লেনদেন আরবে প্রসিদ্ধ ছিল। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সমস্ত পাওনা সুদ বাতিল করে দেন এবং মক্কায় তাঁর নিযুক্ত তহশীলদারদেরকে লিখে পাঠান, যদি তারা (বনু মগীরা) সুদ গ্রহণ করা ন্ধ না করে তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ কর। রাসূলে করীম (সা)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা) ও একজন বড় মহাজন ছিলেন। বিদায় হজ্জে রাসূলে করীম (সা) ঘোষণা দিলেন : জাহেলী যুগের সমস্ত বাতিল করে দেয়া হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস (রা)-এর সুদ বাতিল করলাম। তিনি এতদূরও বললেন, সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের চক্তিপত্র লেখক এবং এর ওপর সাক্ষ্যদতা সবার ওপর আল্লাহর লানত!
এসব বিধানের উদ্দেশ্য কি ছিল? নিছক একটি বিশেষ ধরনেসর সুদ অর্থা (মহাজনী সুদ) বন্ধ করে দিয়ে বাদবাকী সব রকমের সুদ চালু রাখা ও বিধানগুলোর উদ্দেশ্য ছিল না বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল,. পুঁজিবাদী নৈতিকতা ও চরিত্র, পুঁজিবাদী মানসিকতা, পুঁজিাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবসথঅ এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করে এমন একটি ব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থঅর পূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে থাকবে কর্পণ্যের পরিবর্তে বদান্যতা, স্বার্থান্ধতার পরিবর্তে সহানুভূতি ও পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা , সুদের পরিবর্তে যাকাত এবং ব্যাংকের পরিবর্তে থাকবে জাতীয় বায়তুলমাল। এ ক্ষেত্রে এমন অবস্থার সৃষ্টিই হবে না যার ফলে কোঅপারেটিভ সোসাইটি, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী ও প্রভিডেন্ট ফান্ড প্রভৃতির প্রয়োজন দেখা দেয় এবং সর্বশেষ কমিউনিজমের প্রকৃতি বিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

২. সুদের প্রয়োজন : একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা

এযাবত আমরা বিষয়টি সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশনা পেশ করেছি। এবার বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর উপর কিছু আলোচনা করবো।

সুদ কি যুক্তিসম্মত

সুদ কি যথার্থিই একটি যুক্তিসংগত বিষয়? কোনো ব্যক্তি ঋণ বাবদ প্রদত্ত অর্থের উপর সুদ দাবী করলে তাকে কি বুদ্ধিসম্মত বলা যেতে পারে এবং তার দাবীটি কি ন্যায়সংগত বলে বিবেচিত হবার যোগ্য? কোনো ব্যক্তি একজনের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করলে সে ঋণ বাবদ গৃহীত আসল অর্থ ফেরত দেবার সাথে সাথে তাকে কিছু সুদও প্রদান করবে, এটা কি ইনসাফের দাবী? সর্বপ্রথম এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা হওয়া উচিত। এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা হয়ে গেলে আমাদের আলোচনার অর্থেক বিষয় আপনাআপনি মীমাংসিত হয়ে যাবে। কারণ সুদ একটি যুক্তিসংগত বিষয় বলে বিবেচিত হলে, সুদ হারাম হবার ব্যাপারটি নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে। আর যদি বুদ্ধি ও ইনসাফের দৃষ্টিতে সুদ যুক্তিসংগত প্রমাণিত না হয়,, তাহলে মানব সমাজে এ অযৌক্তিক বিষয়টিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন কোথায় এ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

ক. ঝুঁকি ও ত্যাগের বিনিময়

এ প্রশ্নের জবাবে আমরা সর্বপ্রথম যে যক্তিটির সম্মুখীণ হই তা হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজের সঞ্চিত ধনসম্পদ অন্যকে ঋণ দেয় সে বিপদ বরণ করে, ত্যাগ স্বীকার করে, নিজের প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে অন্যেল হাতে সোপর্দ করে। ঋণগ্রহীতা নিজের কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ঋণ গহণ করলে তাকে অবশ্যি ঐ সম্পদের ভাড়া আদায় করা ‍উচিত। যেমন বাড়ী, গাড়ী আসবাবপত্রের বাড়া আদায় করা হয়ে থাকে। ঋণদাতা নিজের শ্রমোপার্জিত অর্থ নিজে ব্যবহার না করে তাকে প্রদান করে যে ঝুঁকি বরণ করে নিয়েছে িএ ভাড়া তার বিনিময় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। আর ঋণগ্রহীতা এ অর্থে কোনো মুনাফা সৃষ্টিকারী কাজে খাটাবার জ্য গ্রহণ করে থাকলে ঋণদাতা অবশ্যি তার নিকট সুদ দাবী করার অধিকার রাখবে। ঋণগ্রগীদা যেখানে অন্যের অর্থ থেকে লাভবান হচ্ছে, সেখানে ঋণদাতা ঐ লাভের ন্যায্য অংশ পাবে না কেন? ঋণদাতা নিজের অর্থ অন্যের হাতে সোপর্দ করার ব্যাপারে বিপদ বরণ করে নেয় এবংয় ত্যাগ স্বীকার করে একথা সত্য; কিন্তু এ বিপদ বরণ ও ত্যাগ স্বীকারের মূল্য হিসেবে বছরে ছ’মাসে বা মাসে শতকরা পাঁচ বা দশ ভাগ আদায় করার যৌক্তিকতা কোথায়? বিপদ বরণ করে নেয়ার কারণে সে যক্তিসংগতভাবে যে অধিকার লাভ করে তা হচ্ছে, সে ঋণগ্রহীতর নিকট থেকে কোন জিনিস বন্ধকস্বরূর রেখে দিতে পারে অথবা জামানত তলব করতে পারে। এসব কিছুতে সম্মত না হলে তার আদতে বিপদ বরণ না করা এবং ঋণদানে অস্বীকার করা উচিত। কিন্তু বিপদ কোনো ব্যবসার পণ্য নয়, যার কোনো মূল্য দান করা যেতে পারে বা কোনো গৃহ, আসবাবপত্র ও যানবাহন নয়, যার কোনো ভাড়া আদায় করা যেতে পারে। অবশ্য ত্যাগ স্বীকারের ব্যাপারে বলা যেতে পারে যে, ব্যবসাযে পরিণত না হওয়া পর্যন্তই তা ত্যাগ বলে গণ্য হতে পারে। ত্যাগ স্বীকারের উদ্দেশ্য থাকলে যথার্থ ত্যাগ স্বীকারই করা উচিত এবং এ নৈতিক কাজটির নৈতিক লাভের উপরই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। আর যদি বিনিময় ও পারিশ্রমিকের প্রশ্ন তোলা হয় তাহলে ত্যাগের কথা না উঠানোই সংগত; বরং সরাসরি ব্যবসায়িক ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে অবশ্যেই তকে জানাতে হবে যে ঋণের ব্যাপারে আসল অর্থের বাইরে মাসিক বা বার্ষিক সে যে আর একটি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে, তার অধিকারী সে হলো কিসের ভিত্তিতে?
এটা কি তার ক্ষতিপূরণ? কিন্তু সে ঋণ বাবদ যে অর্থ দিয়েছে তা ছিল তার প্রয়োজনের অতিরিক্স। সে নিজেও এ অর্থটি ব্যবহার করছিল না। কাজেই এখানে আসলে কোনো ক্ষতি হয়নি এবং এ ঋণদানের জন্য কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ লাভের অধিকারীও সে হতে পারে না।
এটা কি ভাড়া বাবদ প্রাপ্য অর্থ? কিন্তু ভাড়া এমন সব জিনিসের হয়ে থাকে যেগুলোকে ভাড়াটের উপযোগী ও তার জন্য ব্যবহারযোগ্য করার জন্য মানুষ নিজের সময়, অর্থ ও শ্রম নিয়োজিত করে। ভাড়াটের ব্যবহারের কারণে সেগুলো নষ্ট হয়, ভেঙ্গে চুরে যায়, যার ফলে সেগুলোর মূল্য কমে যেতে থাকে। ব্যবহার্য দ্রব্যাদি যেমন, আসবাবপত্র, গৃহ ও যানবাহনের ক্ষেত্রে একথা যথার্থ এবং এ বস্তুগুলোর ভাড়া আদায় করাও যুক্তিসংগত; কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে একথা যথার্থ এবং এ বস্তুগুলোর ভাড়া আদায় করাও যুক্তিসংগত; কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে এ সংজ্ঞা যথার্থ নয়, যেমন গম, ফুল ইত্যাদি এবং টাকা পয়সাও এই একই গোত্রভুক্ত। কারণ টাকা পয়সা নিছক বস্তু ও সেবা ক্রয় করার একটি মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই এসব বস্তুর ভাড়ার প্রসঙ্গ অর্থহীন।
কোনো ঋণদাতা বাড়জোর এতটুকু বলতে পারে: আমার নিজের অর্থ থেকে আমি অন্যকে লাভবান হবার সুযোগ দিচ্ছি, কাজেই এ লাভে আমারও অংশ রয়েছে। এটা অবশ্যি যুক্তিসংগত কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে অভাবী ও বুভুক্ষু ব্যক্তি নিজের অভূক্ত সন্তানদের পেটে দুমুঠো আহার যোগাবার জন্য আপনার নিকট থেকে ৫০ টাকা হওলাত নিয়েছে, সে কি সত্যিই ঐ টাক থেকে এমনভাবে ‘লাভবান’ হচ্ছে, যার ফলে আপনি তা থেকে নিজের অংশ হিসেবে মাসে মাসে শতকরা ২ টাকা বা ৫ টাকা হারে পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন? লাভবান সে অবশ্যি হচ্ছে এবং তাকে এ সুযোগটি নিঃসন্দেহে আপনিই দিয়েছেন: ন্তিু বুদ্ধি বিবেক, ইনসাফ, অর্থনীতি বিজ্ঞান, ব্যবসা নীতি- কিসের দৃষ্টিতে এ লাভ বা লাভবান হবার সযোগকে এমন পর্যায়ে আনা যেতে পারে,. যার ফলে আপনি তার একটি আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন? ঋণগ্রহীতার বিপদ যতই কঠিন হবে এ মূল্যও ততই বাড়তে থাকবে; তার বিপদকাল যত দীর্ঘ হতে থাকবে আপনার প্রদত্ত এ লাভবান হবার সুযোগের মূল্যও তত মাস ও বার্ষিক হারে থাকবে আপনার প্রদত্ত এ লাভবান হবার সুযোগের মূল্যও তত মাস যত বার্ষিক হারে বাড়তে থাকবে? একজন অভাবী ও বিপদগ্রস্তকে নিজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থাদান করার মতো বিরাট হৃদয়বত্তার অদিকারী যদি আপনি না হয়ে থাকেন, তাহল আপনার ঐ অর্থ তার নিকট থেকে ফেরত পাবার ব্যাপারে সর্বপ্রকারে নিশ্চিন্ত হয়ে নিন, তারপরিই তাকে অর্থ ঋ দিন। এটাই আপনার জন্য যুক্তিসঙ্গত পন্থঅ। আর যদি ঋণ দিতেও আপনার মন সায় না দেয়, তাহলে তাকে কোনো প্রকার সাহায্য করবেন না, এও একটা যুক্তিসঙ্গত কথা। কিন্তু কোনো ব্যক্তির বিপদ-দুঃখ-কষ্ট আপনার জন্য মুনাফা সংগ্রহের সুযোগরূপে গণ্য হবে এবং অভূক্ত পেট ও মুত্যুপথযাত্রী রোধী আপনার জন্য অর্থ খাটাবার () ক্ষেত্র বিবেচিত হবে; উপরন্তু মানুষের বিপদ বাড়ার সংগে সংগে আপনার লাভেল সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে থাকবে, এটা কোন ধরনের যুক্তিসংগত ব্যবসা।
‘লাভবান হওয়ার সুযোগ দেয়াৎ যদি কোনো অবস্থায় যদি কোনো অবস্থায় কোনো আর্থিক মূল্যের অধিকারী হয় তাহলে তা কেবলমাত্র এমন এক অবস্থায় হতে পারে যখন অর্থ গ্রহণকারী তা কোনো ব্যবসায়ে খাটায়। এ অবস্থায় অর্থদানকারী একথা বলার অধিকার রাখে যে, তার অর্থ থেকে অন্য ব্যক্তি যে লাভ কুড়াচ্ছে তার মধ্যে তার ন্যায্য অংশ রয়েছে এবং এ অংশ তার পাওয়া উচিত। কিন্তু বলাবাহুল্য পুঁজি একাকী কোনো মুনাফার সৃষ্টির যোগ্যতা রাখে না। মানুষের শ্রম ও যোগ্যতা তার সাথে যুক্ত হলে তবেই সেই মুনাফা দানের যোগ্যতা অর্জন করে। আবার মানুষের শ্রম ও যোগ্যতা তার সাথে যুক্ত হবার সাথে সাথেই সে মুনাফা দান করতে শুরু করে না; বরং মুনাফা দানের জন্য তার একটি মেয়াদের প্রয়োজন হয়। উপরন্তু তার মুনাফা দান নিশ্চিতও নয়- সেখানে ক্ষতি ও দেউলিয়া হবার আশংকাও থাকে। আর লাভজনক হবার ক্ষেত্রে কোন সময় কি পরিমাণ মুনাফা দেবে তা পূর্বাহ্নে সম্ভব হয়না এক্ষেত্রে মানুষের শ্রম ও যোগ্যতা যখন পর্যন্ত ঐ অর্থের ধারে কাছেও পৌছাতে পারেনি তখন থেকেই কেমন করে অর্থদানকারীর মুনাফা শুরু হযে যেতে পারে? উপরন্তু মুনাফার হার ও পরিমাণেই বা কেমন করে নির্দিষ্ট করা যেতে পারে, যখন পুঁজির সাথে মুনাফা সৃষ্টি হবে তাও জানা নেই?
যে ব্যক্তি নিজের অতিরিক্ত সঞ্চিত অর্থ কোনো মুনাফা সৃষ্টিকারী কাজে লাগাতে চায় তার শ্রম বিনিয়োগকারীদের সাথে অংশীদার হবার পরিবর্তে তাকে একশো টাকা ঋণ দিযে থাকি এবং তকে বলি, যেহেতু তুমি এ অর্থ থেকে লাভবান হবে, তাই আমার টাকা হারে মুনাফা দিতে থাকবে, এটা কোন ধরনের যুক্তসঙ্গত পদ্ধতি হতে পারে? প্রশ্ন হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ পুঁজির পিছনে পরিশ্রম খাটিতে তা থেকে মুনাফা অর্জিত হতে শুরু না হয়, ততক্ষণ সেখানে কোন ধরনের সঞ্চিত মুনাফা থাকে যা থেকে আমি নিজের অংশ দাবী করার অধিকার রাখি? যদি ঐ ব্যক্তি তার ব্যবসায়ে লাভের পরিবর্তে ক্ষতির সম্মুখীণ হয় তাহলে কোন্ বিবেক ও ইনসাফের প্রেক্ষিতে আমি তার নিকট থেকে মাসিক মুনাফা আদায় করার অধিকার রাখতে পারি? যদি তার মুনায়া মাসিক এক টাকার চেয়ে কম হয় তাহের আমর মাসিক এক টাকা আদায় করার কি অধিকার আছে? আর তার সমগ্র মুনাফাই যতি হয় একটা তাহললে এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সারা মাস নিজের সময়, শ্রম, যোগ্যতা, বুদ্ধি, সাম্থ্য ও নিজের ব্যক্তিগত পুঁজি সবকিছু খাটালো, সে কিছুই পেলো না; অথচ আমি কেবলমাত্র একশো টাকা তাকে দিয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম; কিন্তু মুনাফার সবটুকু আমি লুটেপুটে নিয়ে গেলাম, এটা কোন্ ধরনের ইনসাফ? কলুর বলদও যুদি সারাদিন ঘানি টানে তাহলে কলুর নিকট কমপক্ষে সে নিজের আহার চাইবার দাবী রাখে, কিন্তু এ সুদীঋণ মানুষকে এমন এক বলদে পরিণত করে, যে কলুর জন্য সারা দিন ঘানি টানবে, কিন্তু আহার তাকে বাইরে কোথাও থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া যায় যে, কোনো ব্যবসায়ী ব্যক্তির মুনাফা ঐ নির্ধারিত অর্থের চেয়ে বেশী হয়, যা ঋণদাতা সুদের আকারে তার ঘারে চাপিয়ে দেয়, তাহলেও বুদ্ধিবৃত্তি, ইনসাফ, ব্যবসা নীতি অর্থনৈতিক রীতিনীতি কোনোকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে একথা যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করা যেতে পারে না যে, যারা আসল উৎপাদনকারী, যারা সমাজের প্রয়োজনীয় বস্তু প্রস্তুত ও সংগ্রহ করার জন্য নিজেদের সময় ব্যয় করে, পরিশ্রম করে, মস্কিষ্ক পরিচালনা করে এবং নিজেদের শরীর ও মস্কিষ্কের সমুদয় শক্তি ব্যবহার করে, তাদের সবার লাভ সংশয়যুক্ত ও অনির্দিষ্ট থেকে যাবে, কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের অতিরিক্ত সঞ্চিত অর্থ ঋণ দিয়েছে, একমাত্র তার লাভ নিশ্চিত ও নির্ধারিত হবে। তাদের সবার জন্য ক্ষতির আশংকা রয়েছে, কিন্তু তার জন্য রয়েছে লাভের গ্যারান্টি। সবার লাভের হার বাজারের দামের সাথে উঠানামা করে, কিন্তু সে একাই এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যে নিজের জন্য লাভের যে অংক নির্ধারিণ করে নিয়েছে, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তা কোনো প্রকার রদবদল ছাড়াই যথানিয়মে পেয়ে যেতে থাকে।[এখানে অবশ্যি আপত্তি উত্থাপন করা যেতে পারে যে, তাহলে টাকার বিনিময়ে জমি বর্গা দেয়াকে কেমন করে বৈধ গণ্য করা যায়? তার অবস্থাও সুদের সমপর্যায়ভুক্ত। কন্তিু এ আপত্তি আসলে তাদের বিরুদ্দে উত্থাপিক হয় যারা আগাম টাকা নির্ধারিত করে জমি বর্গা দেয়। যেমন বিঘাপ্রতি ২০ টাকা বা একর প্রতি ৫০ টাকা হিসেবে নির্ধারিত করে নেয়াকে যারা বৈধ গণ্য করে তাদের বিরুদ্ধে এ আপত্তি উত্থাপন করা যেতে পারে। আমি এ নীতির সমর্থক নই। আমি নিজেও এসে সুদের সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে করি। কাজেই এ আপত্তির জবাব দেয়া আমার দায়িত্ব নয়। এ ব্যপারে আমার নীতি হচ্ছে জমির মালিক ও কৃষকের মধ্যে ভাগচাষের সম্পর্কই যথার্থ। অর্থাৎ উৎপন্ন শস্যেল কত অংশ কৃষকের ও কত অংশ জমি মালিকের সে ব্যাপারে উভযের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হবে। সৌথ কারবারের অংশীদারীত্বের সাথে এর সাদৃশ্য ব্যাপার রয়েছে। এ ধরনটিকে আমি বৈধ মনে করি। আর জমির ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে যে অবস্থাটিকে আমি বৈধ মনে করি, আমার ‘মাসয়ালায়ে মিলকিয়াতে যমীন’ গ্রন্থে তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি। তার বিরুদ্ধে এ আপত্তি উত্থাপিত হয় না।]

খ. সহযোগিতর বিনিময়

এ সমালোনা থেকে একটি কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ সদকে যুক্তিসঙ্গত বস্তু গণ্য করার জন্য প্রথম পর্যায়ে যেসব যুক্তিকে যথেষ্ট মনে করা হয় একটু গভীরভঅবে চিন্তা করলে সেগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য যে ঋণ গ্রহণ করা হয় তার উপর সুদ আরোপ করার স্বপক্ষে কোনো বুদ্ধিসম্মত যুক্তিই থাকতে পারে না। এমনকি, সুদের সমর্থকগণও এ দুর্বল মামলাটির ব্যাপারে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। তবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যে ঋণ গ্রহণ করা হয়, তার ব্যাপারেও সুদ সমর্থকদের সম্মুখে এ জটিল প্রশ্ন দেখা দেয় যে, এ সুদকে মূলত কোন বস্তুতর মূল্য মনে করা হচ্ছে? ঋণদাতা নিজের অর্থের সাথে ঋণগ্রহীতাকে এমন কী বাস্তব সত্ত্মূলক (Substential) জিনিস দেয় যার একটি আর্থিক ঐ মূল্যও থাকে এবং মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে ঐ মূল্য লাভ করার অধিকারী হয়? এ জিনিসটি চিহ্নিত করার জন্য সুদ সমর্থকগণকে যথেষ্ট বেকায়দায় পড়তে হয়েছে।
একদল লে, সে জিনিসটি হচ্ছে ‘লাভবান হবার সুযোগ।’ কিন্তু উপরের পর্যালোচা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, এ ‘সুযোগ’ কোনো নির্দিষ্ট, নিশ্চিত ও নিত্যকার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূ্ল্যের স্বত্ব সৃষ্টি করে না; বরং এটি এমন এক অবস্থায় আনুপাতিক লাভের স্বত্ব দান করে, যখন প্রকতপক্ষে ঋণ গ্রহণকারী লাভের মুখ দেখে।
দ্বিতীয় দল সামান্য হেরফের করে বলে, সে জিনিসটি হচ্ছে ‘অবকাশ’। ঋণদাতা নিজের অর্থেল সাথে এ ‘অবকাশ’ ব্যবহারের জন্য ঋণগ্রহীতাকে দান করে। এ অবকাশেরে এ অবকাশেল একটি মূল্য রয়েছে এবং এটি দীর্ঘ ও দীর্ঘতর হবার সাথে সাথে এর মূল্যও বেড়ে থাকে। কোনো ব্যক্তি যেদিন থেকে অর্থ নিয়ে কাজে লাগায়, সেদিন শুরু করে যেদিন ঐ অর্থের সাহায্যে প্রস্তুত দ্রব্য বাজারে পৌঁছে যায় এবং মূল্য আন ঐ দিন পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ব্যবসায়ীর নিকট অতীব মূল্যবন। সে যদি এ অবকাশ না পায় এবং মাঝপথেই তার নিকট থেকে অর্থ ফেরত নেয়া হয়, তাহলে আদতে তার ব্যবসা চলতে পারে না। কাজেই যেড ব্যক্তি অর্থ ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ে খাটাচ্ছে, তার নিকট এ সময়টি অবশ্যি একটি মূল্য রাখে এবং সে এ মূল্য থেকে লাভবান হচ্ছে। কাজেই অর্থদানকারী এ লাভের অংশ পাবে না কেন? আবার এ সময়ের কমবেশীর কারণে ঋণগ্রহীতার লাভের সম্ভাবনাও কমবেশী হতে থাকে। কাজে সময়ের দীর্ঘতা ও স্বল্পতার ভিত্তিতে ঋণদাতা এর মূল্য নির্ধারণ করবে না কেন?
কিন্তু এখানেও আবার ঐ একই প্রশ্ন দেখা দেয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অর্থদাতার নিকট থেকে ব্যবাসায় খাটাবার জন্য অর্থ নিচ্ছে, সে নিশ্চিতরূপে ব্যবসায় লাভ করবে. ক্ষতি হবে না- একথা সে কেমন করে জানলো? উপরন্তু তার লাভেও নিশ্চিতরূপে শতকরা একটি নির্দিষ্ট হারেত হতে থাকবে; কাজেই তা থেকে অর্থাদানকারীকে অবশ্যিই শতকরা একটি নির্দিষ্ট হারে অংশ আদায় করা উচিত- একথাই বা সে জানলো কেমন করে? এ ছাড়া যে সময়ে সে ঋণগ্রহীতাকে নিজের অর্থ ব্যবাহরের অবকাশ দিচ্ছে ঐ সময় প্রতি বছর ও প্রতিমাসে নিশ্চিতরূপে একটি বিশেষ পরিমান মুনাফা অর্জিতহবে, কাজেই এর একটি নির্দিষ্ট বা মাসিক মূল্য স্থিরীকৃত হওয়া উচিত- এ হিসেবে জানার জন্য কোন্ ধরনের যন্ত্রই বা তার নিকট আছে, তা আমাদের অবশ্যই জানা উচিত? সুদ সমর্থকদের নিকট এ প্রশ্নগুলো কোনো সঠিক ও সংগত জবাব নেই। কাজেই আবার সে আগের কথায়ই ফিরে আসতে হয়। অর্থাৎ ব্যবসায়িক ব্যাপারে যদি কোনো জিনিস যুক্তিসঙ্গত হয়ে থাকে, তাহলে তা হচ্ছে একমাত্র লাভ ও লোকসানের ভিত্তিতে অশীদারীত্ব, নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট হারে যে সুদ চাপিয়ে দেয়া হয় তা নয়।

গ. লাভে অংশীদারিত্ব

আর একদল বলে, মুনাফা অর্জন হচ্ছে অর্থেল নিজস্ব গুণ। কাজেই কোনো ব্যক্তি যখন অন্যের সংগৃহীত অর্থ ব্যবাহার করে, তখন ঐ অর্থই এমন অধিকার সৃষ্টি করে, যার ফলে অর্থদাতা সুদ চাইতে পারে এবং ‍ঋণগ্রহীতা তা আদায় করতে বাধ্য। প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদন ও সংগ্রহে সাহয্য করার শক্তি অর্থের রয়েছে। অর্থের সাহায্যে যে পরিমাণ দ্রব্য উৎপন্ন হয়, তার সাহায্য ব্যিতিরেকেসে পরিমাণ উৎপন্ন হতে পারে না। অর্থের সাহায্যে উন্নত ধরনের দ্রব্যাদি বেশী পরিমাণে তৈরী হয় এবং তা অধিক মূল্যে বাজারে ভালো দামে বিক্রিও হয় না। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, মুনাফা অর্জনের গুণ লাভের অধিকার সৃষ্টি করে।
কিন্তু অর্থ মুনাফা দানের নিজস্ব গুণে গুণান্বিত প্রথমত এ দাবীটিই দ্ব্যর্থহীনভাবে তার মধ্যে এ শক্তি সৃষ্টি হয়। কেবল তখনই একথা বলা যেতে পারে যে, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি যেহেতু অর্থ ব্যবহার করে মুনাফা অর্জন করছে, কাজেই এ মুনাফা থেকে অর্থদাতাকে অংশ দেয়া উচিত। কিন্তু যে ব্যক্তি রোগীল চিকিৎসা বা মৃতের কাফন দাফনের জন্য ঋণ গ্রহণ করে, তার এ অর্থ অর্থ কোন ধরনের অর্থনৈতিক মুল্য ‍সৃষ্টি করে, যা থেকে ঋণদাতা অংশ গ্রহণ করতে পারে?
উপরন্তু মুনাফাজনক কাজে যে অর্থ লাগানো হয়, তা সবক্ষেত্রেই নিশ্চিতরূপে অধিক মূল্য দান করে না। কাজেই মুনাফাদান অর্থের নিজস্ব গুন- এ দাবী অর্থহীন। অনেক সময় কোনো কাজে বেশী অর্থ লাগানো হয়, কিন্তু এর ফলে মুনাফা বাড়ায় পরিবর্তে কমে যায়। এমনকি, অবশেষে তাতে লোকসান দেখা দেয়। আজকাল কিছুদিন পর পর ব্যবসা জগতে যে অচলাবস্থার (Crisis) সৃষ্টি হচ্ছে এর কারণস্বরূপ একথাই বলা যায় যে, পুঁজিপতিরা নিজেদের ব্যবসায়ে যখন অজস্র অর্থ ঢেলে দিতে থাকে এবং উৎপাদন বেড়ে যেতে থাকে, তখন দ্রব্যের দাম কমতে থাকে, ফলে উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে দাম এতো কমে যেতে থাকে যে, পুঁজি বিনিয়োগ কোনো প্রকার লাভের সম্ভাবনা থাকে না।
এ ছাড়াও পুঁজির মধ্যে মুনাফাদানের কোন শক্তি যদি থেকে থাকে, তাহলে তা বাস্ববরূপ লাভ করার জন্য আরো কয়েকটি জিনিসের উপর নির্ভরশীল হয়। যেমন, পুঁজি ব্যবহারকারীদের পরশ্রম যোগ্যতা, মেধা ও অভিজ্ঞতা ব্যবহারকালীন অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার আনুকূল্য এবং সমকালীন বিপ আপদ থেকে নিরাপত্তা লাভ। এ বিষয়গুলো এবং এ ধরনের আরো বুহ বিষয় মুনাফাদানের পূর্বশর্ত। এগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি শর্ত না পাওয়া গেলে অনেক সময় পুঁজির সমস্ত মুনাফাদানের ক্ষমতাই শেষ হয়ে যায়; বরং উল্টো লোকসানও দেখা দেয়। কিন্তু সুদী ব্যবসায়ে পুঁজি দানকারী ব্যক্তি এসম শর্ত পূর্ণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করে না এবং একথাও স্বীকার করে না যে, ঐ শর্তগুলোর কোনোটির অনুপস্থিতির কারণে তার পুঁজি মুনাফাদানে অক্ষম হলে, সে সুদ গ্রহণ করবে না। সে বরং উলটো দাবী করে, তর পুঁজি ব্যবহার করলেই সে একটি নির্দিষ্ট হাসে সুদ লাভের অধিকারী হবে তার পুঁজি বাস্তবে কোনো প্রকার মুনাফা লাভে সক্ষম হোক বা না হোক, তার এ অধিকারে কোনো পার্থক্য সূচিত হবে না।
অবশেষে যদি একথাও মেনেও নেয়া যায় যে, পুঁজির মধ্যে মুনুফা দান করার ক্ষমতা রয়েছে, যার ভিত্তিতে পুঁজি দানকারী মুনাফা অংশীদার হবার অধিকার লাভ করে, তাহলেও প্রশ্ন দেখা দেয়, আপনার নিকট এমন কোনো হিসেব আছে যার ভিত্তিতে আপনি বর্তমানে পুঁজির মুনাফাদন করার ক্ষমতা নির্দিষ্ট করতে পারেন এবং যারা বিনিয়োগ করে সেই ভিত্তিতে তাদের সুদের হার নির্ধারিত করতে পারেন? আর বর্তমান সময়ের জন্য কোনো হিসেবের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করা সম্ভবপর বলে যদি মেনে নেয়া হয়, তাহলেও আমরা একথা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম যে, ১৯৪৯ সালে পুঁজিপতি কোনো ব্যবসা সংস্থাকে ১০ বছর মেয়াদে এবং অন্য একটি সংস্থাকে ২০ বছর মেয়াদে তৎকালীন প্রচলিত হারে সুদীঋণ দিয়েছিলেন, তিনি কিসের ভিত্তিতে একথা জানতে পেরেছিলেন যে পরবর্তী ১০ ও ২০ বছরের এবং অন্য একটি সংস্থার সাথে বিশ বছরের চুক্তি করে তাদের নিকট থেকে ১৯৪৯ সালের হার অনুযায়ী নিজের পুঁজির সম্ভাব্য মুনাফার অংশ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন, তাকে আমরা কোন্ যুক্তির ভিত্তিতে এ অধিকার দান করবো?

ঘ. সময়ের বিনিময়

সর্বশেষ ব্যাখ্যায় একটু বেশী বুদ্ধি প্রয়োগ করা হয়েছে। এর সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে: মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দূরে ও ভবিষ্যতের লাভ ও আনন্দের উপর নিকটের উপস্থিত লাভ, আনন্দ, স্বাদ ও তৃপ্তিকে অগ্রাধিকার দান করে। ভবিষ্যত যতই দূলবর্তী হয় তার লাভ ও স্বাদ ততই সংশয়পূর্ণ হয় এবং সে অনুপাতে মানুষের দৃষ্টিতে তার মূল্যও কমে যায়। এ নিকটবর্তীয় অগ্রাধিকার ও দূরবর্তী পিছিয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন:
এক : ভবিষ্যত অন্ধকারের গর্ভে জীবন অনিশ্চিত। কাজেই ভবিষ্যতের লাভ সংশয়পূর্ণ। এর কোনো চিত্রও মানুষের চিন্তাজগতে সুস্পষ্ট নয়। বিপরীতপক্ষে আজকের নগদ লাভ নিশ্চিত। মানুষ স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষও করছে।
দুই : যে ব্যক্তি বর্তমানে কোনো বিষয়ের অভাব অনুভব করছে বর্তমানে তা পূর্ণ হওয়া, ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে পূর্ণ হওয়ার চেয়ে, অনেক বেশী মূল্যবান বিবেচিত হবে, যখন হয়তো সে ঐ বিষয়ের অভাব অনুভব করবে না বা হয়তো অনুভব করতেও পারে।
তিন: যে অর্থ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে তা কার্যত প্রয়োজনীয় ও কার্যোপযোগী। এ প্রেক্ষিতে তা ঐ অর্থের উপর অগ্রাধিকার রাখে যা আগামীতে কোনো সময়ে অর্জিত হবে।
এসব কারণে আজকের নগদ লাভ ভবিষ্যতের অনিশ্চিত লাভের উপর অগ্রাধিকার রাখে। কাজেই যে ব্যক্তি আজ কিছু অর্থ ঋণ নিচ্ছে, তা অনিবার্যূপে, আগামীকাল সে ঋণদাতাকে যে অর্থ আদায় করবে, তার চেয়ে বেশী মূল্য পাবার অধিকারী। এ বাড়তি মূল্যটুকুই হচ্ছে সুদ। ঋণ দেবার সময় ঋণদাতা তাকে অর্থ দিয়েছিল, আদায় করার সময় বাড়তি মূল্যস্বরূপ ঐ সুদ আসল অর্থের মিশে, তার সমান মূল্যে পৌছিয়ে দেয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ এ বিষয়টিকে নিম্নোক্তরূপে অনুধাবন করা যায় : এক ব্যক্তি মহাজনের নিকট গিয়ে একশো টাকা ঋণ চাইলো। মহাজন তার সাথে চুক্তি করলো যে, আজ সে যে ১০০ টাকা দিচ্ছে, এক বছর পর এর পরিবর্তে তাকে ১০৩ টাকা দিতে হবে। এ ব্যাপারে আসল বর্তমানের ১০০ টাকার বিনিময় মূল্য হচ্ছে ভবিষ্যতের ১০৩ টাকা। বর্তমানের অর্থ ও ভবিষ্যতে অর্থের মনস্তাত্বিক (অর্থনৈতিক নয়) মূল্যের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যযায় তা বাড়তি ৩ টাকার সমান। যতক্ষণ পর্যন্ত এ ৩ টাকা এক বছর পর আদায়কৃত ১০০ টাকার সাতে যুক্ত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মূল্য ঋ প্রদান কালে ঋণদাতা প্রদত্ত ১০০ টাকার সমান হবে না।
যে সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তা সহকারে এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তার তারীফ না করে পারা যায় না। কিন্তু এখানে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মনস্তাত্বিক মূল্যের যে পার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে, তা আসলে একটি বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
সত্যিই কি মানব প্রকৃতি বর্তমানকে ভবিষ্যতের তুলনায় বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান মনে করে? তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে অধিকাংশ লোক তাদের সকল উপার্জন আজই ব্যয় করা সংগত মনে করে না কেন? বরং তার একটি অংশ ভবিষতের জন্য সঞ্চয় করা পছন্দ করে কেন? সম্ভবত শতকরা একজন লোকও আপনি পাবেন না, যে ভবিষ্যতের চিন্তা শিকোয় তুলে রেখে বর্তমানের আয়েশ-আরাম ও স্বাদ-আহলাদ পূরণ করার জন্য সমুদয় অর্থ দু’হাতে খরচ করাকে অগ্রাধিকার দেবে। অন্ততপক্ষে শতকরা ৯৯ জন লোকের অবস্থা এই যে, তারা আজকের প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে আগামীকালের জন্য কিছু না কিছু সঞ্চয় কর রাখতে চায়। কারণ ভবিষ্যতে যেসব ঘটনা সংঘটিত হবে এবং মানুষকে যেসব প্রয়োজনের সম্মুখীন হতে হবে, তন্মধ্যে অনেক সম্ভাব্য ঘটনা ও প্রয়োজনের কাল্পনিক চিত্র মানুষের মানুষের মানস চোখে ভাসত থাকে। বর্তমানে যে যে প্রয়োজন মিটিয়ে চলছে ও যে অবসথার সাথে কোনো না কোনোক্রমে বুঝছে সেগুলোর চেয়ে ঐ সম্ভাব্য ঘটনা ও প্রয়োজনগুলো তার নিকট অনেক বেশী বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। উপরন্তু বর্তমানেও মানুষ যেসব প্রচেষ্টা ও সাধনা চালিয়ে যাচ্ছে এগুলোরও উদ্দেশ্য তার নিজের উন্নততর ও অধিকতর ভালো ভবিষ্যত ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে? মানুষ আগমী দিনে ভালোভাবে জীবন যাপন করার উদ্দেশ্যেই তো আজ শ্রম মেহনত করে যাচ্ছে। এমন কোনো নিরেট বোকার সন্ধান পাওয়াও কষ্টকর হবে, যে নিজের ভবিষ্যতকে শ্রীহীন করার বিনিময়ে নিজের বর্তমানকে সুখী সমৃদ্ধিশালী করা পছন্দ করবে। মুর্খতা অজ্ঞতার কারণে মানুষ এমনটি করতে পারে অথবা কোনো সাময়িক ইচ্ছা কামনার আবেগে অভিভূত হয়ে এহেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভবপর; কিন্তু ভেবে-চিন্তে, বিচার-বিবেচনা করে কেউ এ কাজ করতে পারে না, অন্তত একে নির্ভুল ও যুক্তিসংগত বিবেচনা করতে পারে না।
মানুষ বর্তমানের নিশ্চয়তার বিনিময় ভবিষ্যতের ক্ষতি বরদাশত করে নেয়, কিছুক্ষণের জন্য এ দাবীর যথার্থতা স্বীকার করে নিলেও, এ দাবীর ভিত্তিতে যে কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা কোনোক্রমেই যথার্থ প্রমাণিত হয় না। ঋণ গ্রহণকালে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহতার মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তাতে বর্তমানের ১০০ টাকার দাম এক বছর পরের ১০৩ টাকার সমান ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু আজ একবছর পর ঋণগ্রহীতা যখন ঋণ আদায় করতে গেলো তখন প্রকৃত অবস্থা কোন্‌ পর্য়ায়ে পৌঁছেছে? এখন বর্তমানের ১০৩ টাকার অতীতের ১০০ টাকার সমান হয়ে গেছে। আর যদি প্রথম বছর ‍ঋণগ্রহী ঋণ আদায় করতে সক্ষম না হয় তাহলে দ্বিতীয় বছরের শেষে দু’বছর আগের ১০০ টাকার দাম বর্তমানের ১০৬ টাকার সমান হয়ে যাবে। প্রকতপক্ষে অর্থের মূল্য ও মান নিরূপণের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এ অনুপাত কি যথার্থ ও নির্ভুল? সত্যিই কি অতীত যতই পুরাতন হতে থাকে বর্তমানের তুলনায় তার দাম তহতই বাড়তে থাকে? সত্যিই কি অতীতের প্রয়োজনহুলোর পূর্ণতা এতবেশী মূল্যবান যার ফলে দীর্ঘকাল পূর্বে আপনি যে অর্থ পেয়েছিলেন এবং যা খরচ করার পর বিস্মৃত গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তা কালের প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে বর্তমানের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তা কালের প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে বর্তমানের অর্থের চেয়ে বেশী মূল্যবান হয়ে যাচ্ছে; এমনকি, একশো টাকা খরচ করার পর যদি পঞ্চাশ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়ে থাকে তাহের বর্তমানে তার দাম হবে আড়াইশো টাকার সমান?

সুদের হারের যৌক্তিকতা

বুদ্ধি ও ন্যায়নীতির দিক থেকে সুদকে বৈধ ও সংগত প্রমাণ করার জন্য সর্বসাকু্যে উপরোক্ত যুক্তিগুলোই পেশ করা হয়। আমাদের ইতিপূর্বেকার আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, যুক্তির সাথে এ নাপাক বস্তুটির কোনো দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। সুদ দেয়া-নেয়ার স্বপক্ষে কোনো শক্তিশালী যুক্তিও পেশ করা যেতে পারে না। অথচ অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে এমনিতর একটি অযৌক্তিক বস্তুকে পাশ্চাত্যের পাণ্ডিত প্রবর ও চিন্তাশীলগণ সম্পূর্ণ স্বীকৃত ও সুস্পষ্ট বস্তু হিসেবে গণ্য করে নিয়েছেন এবং সুদের যৌক্তিকতাকে যেন একটি স্থিরকৃত সর্বজনস্বীকৃত সত্য মনে করে সমস্ত আলোচনা সুদের ‘ন্যায়সঙ্গত’ হার নির্ধারণের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করেছেন। আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যে সুদ সম্পর্কিত আলোচনার কোথাও সুদ দেয়া-নেয়ার যৌক্তিকতা ও অযৌক্তিকতার প্রসংগ দেখা যাবে না; বরং ‘সুদের অমুক হারটি অযৌক্তিক ও সীমাতিরিক্ত’ কাজেই তা আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য এবং অমুক হারটি ‘ন্যায়সঙ্গত’ কাজেই তা গ্রহণযোগ্য, এ বিতর্কের মধ্যেই সমস্ত আলোচনা আবর্তিত।
কিন্তু সত্যিই কি সুদের কোনো ন্যায়সঙ্গত হার আছে? যে বস্তুটির নিজের ন্যায়সঙ্গত হবার কোনো প্রমাণ নেই, তার হার যক্তিসঙ্গত, না অযৌক্তিক, এ প্রসঙ্গ অবতারণার অবকাশ কোথায়? কিছুক্ষণের জন্য আমরা এ আলোচনা না হয় স্থগিতিই রাখলাম। এ প্রশ্ন বাদ দিয়ে আমরা মাত্র এতটুকু জানতে চাই, সুদের স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত হার কোন্টি? কোনো হারের ন্যায়সঙ্গত ও অন্যায় হবার মাপকাঠি কি? সত্যিই কি বিশ্বজোড়া সুদী ব্যবসায়ে কোনো যুক্তিসঙ্গত (Rational) ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করা হচ্ছে?
এ পশ্নের ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধানস চালিয়ে আমরা আবিষ্কার করেছি দুনিয়ার ‘ন্যায়সঙ্গত সুদের হার’ নামক কোনো জিনিসের অস্তিত্বই কোনোদিন ছিল না। বিভিন্ন হারকে বিভিন্ন যুগে ন্যায়সঙ্গত গণ্য করা হয়েছে এবং পরে আবার সেগুলোকেই অন্যায় ও অসংগত ঘোষণা করা হয়েছে। বরং একই যুগে বিভিন্ন স্থানের ন্যায়সঙ্গত হারের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ হিন্দু অর্থনীতিবিদ কোটিল্যের বর্ণনা অনুযায়ী প্রাচীন হিন্দুযগে বছরে শতকরা ১৫ থেকে ৬০ ভাগ সুদ ন্যায়সঙ্গত মনে করা হতো এবং বিপদাশংকা অত্যাদিখ হলে এ হার আরও বাড়ানো যেতো। অষ্টাদশ শককের শেষার্ধে ও ঊনবিংশ শতরে প্রথমার্ধে ভারতীয় ভারতীয় করদ রাজ্যগেো একদিকে নিজেদের দেশীয় মহাজনবৃন্দ ও অন্যদিকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সরকারে সাথে যে আর্থিক লেন-দেন করতো তাতে সাধারণত বার্ষিক শতকরা ৪৮ ভাগ সুদের হারের প্রচলন ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে (১৯১৪-১৮) ভরত সরকার বার্ষিক শতকরা সাড়ে ৬ ভাগ সুদের ভিত্তিতে যুদ্ধঋণ লাভ করেছিল। ১৯২০ ও ১৯৩০ এর মধ্যবর্তী সময়ে সমবায় সমিতিগিুলোর সাধারণ সুদের হার শতকরা ১২ থেকে ১৫ ভাগ। ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর আমলে দেশের আদালতগুলো বার্ষিক শতকরা ৯ ভাগের কাছাকাছি সুদকে ন্যায়সঙ্গত গণ্য করেছিল্ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছকাছি সময়ে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ডিসকাউন রেট বার্ষিক শতকরা ৩ ভাগ নির্ধারিত হয়েছিল এবং সমগ্র যুদ্ধকালে এ হার বর্তমান চিল; বরং শতকরা পৌনে তিন ভাগ সুদেও ভারত সরকার ঋণ লাভ করেছিল।
এ তো গেলো আমাদের এ উপমাহাদেশের অবস্থা। ইউরোপের দিকে তাকালে সেখানেও প্রায় একই ধরনের চিত্র যাবে। ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যাণ্ডে শতকরা ১০ ভাগ সুদের হার সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত গণ্য করা হয়েছিল। ১৯২০ সালের কাছাকাছি সময়ের ইউরোপের অনেক সেন্ট্রাল ব্যাংক শতকরা ৮/৯ ভাগ সুদ নির্ধারণ করতো। এ আমলে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জেরন (LEAGUE OF NATIONS) মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যে ঋণ লাভ করেছিল, তার হারও ছিল অনুরূপ। কিন্তু আজ আমেরিকা ও ইউরোপের কোনো ব্যক্তির নিকট সুদের হারের কথা বললে সে চিৎকার করে বলতে থাকবে, এট সুদ নয়, লুটতরাজ। আজ যে দিকে তাকান শতকরা আড়াই ও তিন ভাগ সুদের পসরা দেখতে পাবেন। শতকরা চার ভাগ হচ্ছে আজকের সর্বোচ্চ হার। আবার কোনো কোনো অবস্থায় ১ ও ১/২ বা ১/৪ ভাগ সুদও দেখা যায়। কিন্তু অন্যদিকে দরিদ্র জনসাধারণকে সুদী ঋণদানকারী মহাজনদের জন্য ইংল্যাণ্ড ১৯২৭ সালে মানি লেন্ডারস এ্যক্টের মাধ্যমে শতকরা ৪৮ ভাগ সুদ বৈধ গণ্য করেছে। আমেরিকার আদালতগুলো সুদখোর মহাজনদের জন্য বার্ষিক শতকরা ৩০ থেকে ৬০ ভাগ সুদ গ্রহণ করার অনুমতি দান করেছ। এখন আপনি বলুন, ৩০ থেকে ৬০ ভাগ সুদ গ্রহণ করার অনুমতি দান করেছ। এখন আপনি নিজেই বলুন, এর মধ্যে কোন হারটি স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত?
আর একটু অগ্রসর হয়ে আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, সত্যিই কি সুদের কোনো স্বাভাবিক ও ন্যায়সংগত হার হতে পারে? এ প্রশ্নটি পর্যালোচনা করলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে, সুদের হার কেবলমাত্র এমন অবস্থায় সঙ্গতভাবে নির্ধারিত হতে পারে, যখন ঋণগ্রহীতা তার ঋণলব্ধ অর্থ থেকে যে মুনাফা অর্জন করে তার মূল্য নির্ধারিত থাকতো (বা করা যেতো)। যেমন এক বছর ১০০ টাকা ব্যবহার করলে তা থেকে ২৫ টাকা মুনাফা লাভ করা যায়, একথা যদি নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় যে, যে ব্যক্তির অর্থা সারা বছর ব্যবহার করে এ মুনাফা অর্জিত হলো, সে এ মুনাফা কোনোদিন নির্ধারিত হয়নি এবং হতেও পারে না। উপরন্তু বাজারে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে কখনো ঋণগ্রহীতা ঋণলব্ধ অর্থ থেকে কি পরিমাণ মুনাফা লাভ করছে; এমনকি, কোনো মুনাফা লাভ করছে কিনা, সেদিকে দৃষ্টি রাখা হয় না। এক্ষেত্রে কার্যত যা কিছু হয় তা হচ্ছে, মহাজনী ব্যবসায়ের ঋণগ্রহীতর অলসতার প্রেক্ষিতে ঋণের মূল্য নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক সুদের বাজারে ভিন্নতার ভিত্তিতে সুদের হারের উঠানামা হতে থাকে। বুদ্ধি, যুক্তি ও ন্যায়নীতির সাথে এর দূরতম সম্পর্কও থাকে না।

সুদের এ হর নির্ধারণের ভিত্তি

মহাজনী ব্যবসায়ের একজন মহাজন সাধারণত দেখে, যে ব্যক্তি ঋণ নিতে এসেছে, সে কত গরীব ঋণ না পেলে তার দুঃখ ও দুর্দশা কি পরিমাণ বাড়বে? সাধারণত এসবের ভিত্তিতে সে তার সুদের হার পেশ করে। যদি সে কম গরীব হয়, কম টাকা চায় এবং তাকে বাহ্যত বেশী পেরেশন ও চিন্তাকুল না দেখায় তাহলে তার সুদের হার হবে কম। বিপরীতপকেষ ঋণপ্রার্থী যতই দুর্দশাগ্রস্ত ও বেশী অভাবী হবে, ততই তার সুদের হার বাড়তে থাকবে। এমনকি কোনো অর্থাহারে অনাহারে দিন যাপনকারী ব্যক্তির পুত্র যদি কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর্যায়ে উপনীত হয়, তাহলে তার জন্য সুদরে হার শতকরা চার-পাঁচশো পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়অ মোটেও অস্বাভাবিক বা বিস্ময়কর নয়। এ অবস্থায় সুদের ‘স্বাভাবিক’ হার প্রায়ই এ ধরনের হয়ে থাকে। এর একট চরমতম দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে ১৯৪৭ সালের অমৃতসর স্টেশনের একটি ঘটনায়। সে বছর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভীতিপ্রদ দিনগুলোতে একদা অমৃতসর স্টেশনে জনৈক শিখ একজন মুসলমানের নিকট থেকে এক গ্লাস পানির ‘স্বাভাবিক’ মূল্য হিসেবে শরনার্থীদের ট্রেন থেকে নীচে নেমে কোনো মুসলমানের পক্ষে পানি আহরণ করা সম্ভবপর ছিল না।
মহাজনী ব্যবসা ছাড়া অর্থনীতি অন্যান্য বাজারে সুদের হার নির্ধারণ ও তা কমবেশী করার ব্যাপারে যেসব ভিত্তির আশ্রয় নেয়া হয় সেগুলো সম্পর্কে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ দুটি ভিন্ন মতের অনুসারী।
একদল বলেন, চাহদা ও সরবরবাহের নীতিই হচ্ছে এর ভিত্তি। যখন অর্থ বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম হয় ও ঋণ দেয়ার মতো অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন সুদর হার নেমে যায়। এভাবে সুদের হার অনেক বেশী কমে গেলে লোকেরা একে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে এবং বেশী সংখ্যক লোক ঋণ নিতে এগিয়ে আবে। অতঃপর যখন অর্থের চাহিদা বাড়তে থাকে এবং ঋণ দেয়ার মতো অর্থের পরিমাণ কমে যেতে থাকে, তখন সুদের হার বাড়তে থাকে অবশেষে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যার ফলে ঋণ গ্রহণের চাহিজদা খতম হয়ে যায়।
এর অর্থ কি? পুঁজিপতি সোজাসুজি ও যুক্তিসংগত পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসায়ে অংশীদার হয় না এব তার যথার্থ মুনাফার ন্যায়সঙ্গত অংশ গ্রহণেও রাজী হয় না। বিপরীতপক্ষে সে এক্ষেত্রে আন্দাজ-অনুমান করে দেখে, এব্যবায়ে ব্যবসায়ী কি পরিমাণ মুনাফা অর্জন করবে, সে প্রেক্ষিতে স নিজের সুদ নির্ধারণ করে এবং মনে করে এ নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ তার পাওয়া উচিত। অ্যদিকে ব্যবাসায়ীও আন্দাজ-অনুমান করে দেখে যে, পুঁজিপতির নিকট থেকে সে যে অর্থ নিচ্ছে, তা থেকে সর্বাধিক কি পরিমাণ মুনাফা লাভ করা সম্ভ হবে, কাজেই সে প্রেক্ষিতে সে একটি বিশিষ্ট পরিমাণের অধিক সুদকে অসংগত মনে করে। উভয় পক্ষিই আন্দাজ-অনুমানের (SPECULATION) ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। পুঁজিপতি হামেশা ব্যবসায়ে মুনাফার অংশ বেশী করেই ধরে, আর ব্যাবসায়ী লাভের সাথে সাথে লোকসানের আশংকাও সামনে রাখে। এ করণে উভয়ের মধ্যে একটি চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব বিরাজ করে। ব্যবসায়ী যখন মুনাফা লাভের আশায় পুঁজি বিনিয়োগ করতে চায়, পুঁজিপতি তখন নিজের পুঁজির দাম বাড়াতে থাকে। এভাবে দাম বাড়াতে বাড়াতে অবশেষে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যখন এ ধরনের চড়া সুদে অর্থ ঋণ নিয়ে কোনো ব্যবসায় খাটালে তাতে কোনো প্রকারেই মুনাফার সম্ভাবনা থাকে না। এ পর্যায়ে পুঁজিবিনিয়োগের পথ বন্ধ তয়ে যায় এবং অর্থনৈতিকৈউন্নতির গতিধারায় অকস্মাৎ ভাড়া পড়ে। অতঃপর যখন সমগ্র ব্যবসায় খাটালে তাতে কোনো প্রকারেই মুনাফার সম্ভাবনা থাকে না। এ পর্যায়ে পুঁজি বিনিয়োগের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক উন্নতির গতিধারায় অকস্মাৎ ভাড়া পড়ে। অতঃপর যখন সমগ্র ব্যবসাজগত পরিপূর্ণ মন্দাভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং পুঁজিপতির নিজের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করতে থাকে,তখন সে সুদের হর এতদূর কমিয়ে দেয়, যার ফলে ঐ হারে অর্থ বিনিয়োগে ব্যবসায়ী লাভের আশা করে। এ সময় শিল্প-বাণিজ্যের বাজারে পুনর্বার অর্থ সমাগম হতে থাকে। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, পুঁজি ও ব্যবসায়ের মধ্যে যদি ন্যায়ঙ্গত শর্তে অংশীদারীত্বমূলক সহযোগতিা প্রতিষ্টিত হতো, তাহলে দুনিয়িার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি সুসমঞ্জস্য পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো। কিন্তু আইন যখন পুঁজিপতির জন্য সুদের ভিত্তিতে ঋণদান করার পথ প্রশস্ত করলো, তখন পুঁজি ও ব্যবসায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে জুয়াড়ি মনোবৃত্তির অনুপ্রবেশ ঘটলো এবং এমন জুয়াড়ি পদ্ধতিতে সুদের হার উটানামা করতে থাকলো, যার ফলে সারা দুনিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা চিরস্থায়ী অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো।
দ্বিতীয় দলটি নিম্নোক্তভাবে সুদের হারে যৌক্তিকতা প্রদর্শন করে। তাদের বক্তব্য হলো: পুঁজিপতি যখন পুঁজি কাজে লাগানো অধিক পছন্দ করে, তখঝন সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, আবার যখন তার এ ইচ্ছায় ভাড়া পড়ে, তখন সুদের হর ক যায়। তবে পুঁজিপতি নগত অর্থ তার নিজের কাছে রাখাকে অগ্রাধিকার দেয় কেন? এর জবাবে তারা বিভিন্ন কারণ দর্শায়। নিজের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনের খাতে কিছু অর্থ রাখার প্রয়োজন হয়। আবার আকস্মিক প্রয়োজন ও অপ্রত্যাশিত অবস্থার মোকাবিলা করার জন্যও কিছু অর্থ সংরক্ষিত রাখতে হয়। যেমন, ব্যক্তিগত ব্যাপারে কোনো অস্বাভাবিক খরচ অথচা হঠাৎ সুবিধাজনক সওদার সৃষ্টিট হওয়া। এ দু’টি কারণ ছাড়া তৃতীয় একটি এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এই যে ভবিষ্যতে কোনোদিন যখন দাম কমবে বা সুদরে হার চড়ে যাবে, তখন এ সুযোগ থেকে লাভবান হবার জন্য পুঁজিপতি তার নিকট যথেষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা সঞ্চিত রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কারণে অর্থেকে নিজের ব্যবহার উপযোগী রাখার জন্য পুঁজিপতরি মনে যে আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক হয়, তা কি বাড়ে কমে? সুদের হার উঠানামা করার সময় কি তার প্রভাব সুস্পষ্ট হয়? এর জবাবে তারা বলে: অবশ্যি বেড়ে যায়, ফলে পুঁজিপতি সুদের হার বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যবসায়ে পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। আবার কখনো এ আকাংখা কমে যায়, তখন পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ করে যেতে থাকে। আবার কখনো এ আকাংখা কমে যায়, তখন পুঁজিপতি সুদের হার কমিয়ে দেয়, ফলে শিল্প-বাণিজ্যে পুঁজি বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্যে লোকেরা বেশী করে ঋণ নিতে থাকে।
এ মনোহর যুক্তি ও ব্যাখ্যাটির অন্তরালে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যাবে, ঘরোয়া প্রয়োজন বা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রয়োজন, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক সব ধরনের অবস্থায় পুঁজিপতি নিজের জন্য যে পরিমাণ পুঁজিকে ব্যবহার উপযোগী রাখতে চায়, তার পরিমাণ হতে পারে, বড় জোর, শতকরা পাঁচভাগ । কাজেই প্রথম কারণ দু’টিকে অযথা গুরুত্ব দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। পুঁজিপতি যে কারণে নিজের শতকরা ৯৫ ভাগ পুঁজিকে কখনো সিন্দুকে ভরে রাখে, আবর কখনো ঋণ দেয়ার জন ্য বাজারে ছাড়ে তা অবশ্যি তৃতীয় একটি কারণ। এ করণটির ডিবশ্লেষণ করলে যে সত্য বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে, পুঁজিপতির নিজর দেশ ও জাতির অব্স্থাকে অত্যন্ত স্বার্থগৃধূতার দৃষ্টিতে অবলোকন করতে থাকে। এ সময় নিজের স্বার্থ চরিতার্থতার কিছু লক্ষণ তার সম্মুখে পরিস্ফুট হয়ে উঠলে তার ভিত্তিতে সে এমন সব অস্ত্র নিজের কাছে সর্বদা প্রস্তুত রাখতে চায়, যেগুলোর সাহায্যে সমাজের বিভিন্ন সংকট, সমস্যা ও বিপদ-আপদকে ব্যবহার করে সেগুলো থেকে অবৈধ সবিধা ভোগ করা যায় এবং সমাজের উদ্বেগ-আকুলতা বৃদ্ধি করে নিজের সমৃদ্ধি ও স্বচ্ছলতা বাড়ানো সম্ভব হয়। এজন্য জীবন জুয়ায় একটা বড় রকমের দাঁও মারার উদ্দেশ্যে সে পুঁজি নিজের জন্য আটক রাখে এবং সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রে অর্থের প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ করে দেয় এবং সমাজের জন্য ডেকে আনে এক মহাবিপদ, যাকে ‘মন্দা’ () বলা হয়ে থাকে। অতঃপর যখন সে দেখে, এ পথে তার পক্ষে হারাম উপায়ে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা সম্ভব তা সে করে ফেলেছে এবং এভাবে অর্থ উপার্জন করা তার পক্ষে আর কোনোক্রমেই সম্ভব নয়; বরং এখন তার ক্ষতিকর পালা শুরু হযে যাবে, তখন তার নীচ মনের অভ্যন্তরে ‘অর্থকে নিজের জন্য ব্যবহার উপযোগী করাখার ইচাছা’ নিস্বেজ হয়ে পড়ে এবং কম সুদের লোভ দেখিয়ে সে ব্যবসায়ীদের তার নিকট রক্ষিত অর্থসম্পদ কাজে লাগাবর জন্য ব্যাপকভাবে আহ্বান জানায়।
আধুনিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ সুদের হারের এ দুটি কারণই দুর্শিয়ে থাকেন। অবশ্য স্ব স্ব পরিমন্ডলে এ দু’টি কারণ যথার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এর মধ্যে যে কারণটিই যথার্থ হোক না কেন, তা থেকে সুদের ‘ন্যায়সঙ্গত’ ও ‘স্বাভাবিক’ ‘হার নির্ধারিত হয় বা হতে পারে কেমন করে? এক্ষেত্রে হয় আমাদেরকে বুদ্ধি, জ্ঞান, ন্যায়ানুগতা ও স্বাভাবিকতার অর্থ ও ধারণা বদলাতে হবে, নতুবা একথা মেনে নিতে হবে যে, সুদ জিনিসটি নিজেই যে ধরনের অন্যায়, তার হারও তার চেয়ে বেশী অন্যায় ও অসংগত কারণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় ও ওঠা-নামা করে।

সুদের অর্থনৈতিক ‘লাভ ও তার প্রয়োজন’

সুদ সমর্থকগণ সুদকে একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন এবং ধারণা করেছেন যে, এর সাহায্য ব্যতিরেকে আমরা অনেক কিছ