ইসলামী অর্থনীতি


Warning: Division by zero in /home/icsbook/public_html/wp-content/plugins/page-links-single-page-option/addons/scrolling-pagination/scrolling-pagination-functions.php on line 47

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

১৭….৯৪ পৃষ্ঠা
১২৫….১৭৩ পৃষ্ঠা
২২৯….২৫১ পৃষ্ঠা
২৭৫….২৮৪ পৃষ্ঠা
২৯৯….৩১৪ পৃষ্ঠা
আবদুল মান্নান তালিব
৯৫….১২৪ পৃষ্ঠা
১৭৪….২২৮ পৃষ্ঠা
২৫২….২৭৪ পৃষ্ঠা
৩১৫….৩২৮ পৃষ্ঠা
আব্বাস আলী খান
২৮৫….২৯৮ পৃষ্ঠা

গ্রন্থকারের কথা

এ গ্রন্থটি আমার সেসব রচনা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধের সংকরণ যেগুলি আমি বিগত ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর কালে বিভিন্ন সুযোগ ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ইসলামী অর্থনীতির মূলনীত ও বিধিমালার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং আধুনিক মানুষের জীবন সমস্যার ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ সম্পর্কে লিখে এসেছি। লেখাগুলো যথাসময়ে প্রকাশও হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এ লেখাগুলোকে একত্রিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছি। এ প্রয়োজন এজন্যে অনুভব করেছি যে, এর ফলে একদিকে সাধারণ পাঠকদের সামনে ইসলামী অর্থনীতির পূর্ণাংগ রূপরেখা এসে যাবে, অপরদিকে ইসলাম ও অর্থনীতি বিষয়ক ছাত্রদের জন্যেও এটি একটি পাঠ্য এবং সহায়ক গ্রন্থের কাজ দেবে। কিন্তু বহুমূখী ব্যস্ততার কারণে আজ পর্যন্ত এ কাজে হাত দেয়ার সযোগ পাইনি। আমি প্রফেসর খুরশী আহমদের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিক মনোযোগের সাথে সেই লেখাগুলোর সমন্বয়ে এমন একটি চমৎকার গ্রন্থ সংকলন করেছেন যে, আমার মনে হয় আমি নিজেও এর চেয়ে সুন্দরভাবে গ্রন্থখানি সংকলন করতে পারতামনা।
সংকলনের পর গোটা গ্রন্থটির উপর আমি নজর বুলিয়ে দিয়েছি, প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজনও করেছি। আমি আশা করি, খুরশীদ সাহেব যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ পরিশ্রম করেছেন, সে ক্ষেত্রে গ্রন্থটি অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হবে।
আবুল আ’লা
লাহোর
১৪ যিলহজ্জ ১৩৮৮ হিঃ
৩ মার্চ ১৯৬৯ ইং

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র বিরাজ করছে চরম অশান্তি ও অস্থিরতা। এই অস্থিরতার পেছনে যেসব শক্তির হাত রয়েছে এবং যেসব কারণে এ অশান্তির আগুন দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে, সেসবের মধ্যে অর্থনৈতিক কারণসমূহের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। অবশ্য অর্থনৈতিক উপাদানসমূহের এ ভূমিকার থাকার কারণ এ নয় যে, মানব জীবনে অর্থনৈতিক উপকরণসমূহের সিদ্ধান্তকর কোনে মর্যাদা রয়েছে; বরহ্চ তা এ কারণে যে, মানুষ অর্থনৈতিক কারণকে সেই মর্যাদা দিয়ে বসেছে, প্রকৃতিগতভাবে যে মর্যাদা তার নেই। তাই বিকৃতির কার্যকারণ অন্বেষণ এবং তার প্রতিকারের চেষ্টা সাধনা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ ও জটিল করে চলেছে। প্রথম দিকে মানুষের ধারণা ছিল, জীবিকার উপায় উপকরণের স্বল্পতাই মূল সমস্যা এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই যাবতীয় বিকৃতি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু উৎপাদন যখন শতগুণ বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজারগুণ বৃদ্ধি পেলো, তখনো সমস্যা ও বিকৃতি একই রকম থেকে গেলো। এরপর মানুষ উৎপাদনের অর্থনীতি (Economics of Production) থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বন্টনের অর্থনীতি (Economics of distribution) এর দিকে মনোযোগ দিলো এবং নিজেদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনা সেদিকেই নিবদ্ধ করলো। কিন্তু শত বছর যাবত সম্পদ বন্টন ও পুনর্বন্টনের (Redistribution of wealth ) এর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এখনো বিশ্ব ঠিক ঐ জায়গাতেই অবস্থান করছে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা (Scarcity) ব্যষ্টিক অর্থনীতির (Micro Economics) জন্ম দেয়। কিন্তু সর্বনাশা ব্যবসাচক্র (Trade cycle) এবং মন্দা এই ব্যবস্থর বাস্তব কার্যকারিতার প্রক্রিয়াকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে। এর ফলে সৃষ্টনতুন অবস্থা সামষ্টিক অর্থনীতির (Macro Economics) পথ সুগম করে দেয়। কিন্তু এ নতুন ব্যবস্থায় সম্পদের যে প্রাচুর্য (Affluence of wealth) দেখা দিয়েছে এবং তা নিজের সাথে যে সমস্যা বয়ে এনেছে, তার কারণে এ প্রাচুর্য স্বয়ং মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অর্থনীতির ছাত্ররা পুনরায় একটি নতুন অর্থনীনৈতিক ব্যবস্থার সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেছে। এ হচ্ছে একটি দুষ্টচক্র (Vicious circle) যার মধ্যে মানুষ বৃথা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং প্রতিটি আবর্তনে যার অবস্থা হলো এ প্রবাদ বাক্যর মতঃ
“রশির জট খুলে চলেছি দিবানিশি
আগা পাছার নেইকো খোঁজ!”
আজ আমরা মানব জাতিকে তাদের ধ্যান ধারণা ও মৌলিক দৃষ্টিভংগি পুনঃপরীক্ষা নিরীক্ষা ও পুনর্বিবেচনা কারা জন্যে আহবান জানাচ্ছি। চলার পথে উদ্ভূত জটিলতার কারণে আসল ক্ষতি ও অনিষ্ট সৃষ্টি হয়নি; বরঞ্চ অনিষ্ট ও ধ্বংসের মূল কারণ নিহিত রয়েছে সেই দৃষ্টিভংগি ও লক্ষ্যের মধ্যে যাকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করা হয়েছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান ও কর্ম প্রক্রিয়ার সূচনাতেই রযেছে ভ্রান্তি। তাই সূচনাবিন্দুই পুনর্বিবেচনার দাবী রাখ। মানুষ নিজের সঠিক পরিচয় ও প্রকৃত মর্যাদাকে উপেক্ষা করে তার চিন্তা দর্শনের ইমারত নির্মাণ করতে যাওয়ার কারণেই এই চরম ব্যর্থতার গ্লানি বইয়ে চলেছে।
আমাদের হাতের এই গ্রন্থটি মূলত অর্থনীতি বিজ্ঞানের (Economic Science) গ্রন্থ নয়। বরঞ্চ, এতে অর্থনৈতিক দর্শনের (Eocnomics Philosophy) রাজপথ প্রদর্শিত হয়েছে। এতে সেই মৌলিক বিষয়সমূহের আলোচনা করা হয়েছে, অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা সাধারণত যেগুলো সম্পর্কে চিন্তা না করেই সামনে অগ্রসর হন। এসব মৌলিক বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা থাকার কারণে সামনে অগ্রসর হতে গিয়ে প্রতিটি কদমে হোঁচট খাচ্ছেন, ধাক্কা খাচ্ছেন। গবেষক ও পথ প্রদর্শকদের উচিত এ দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ময়দানে এর বাস্তবায়ন করা। এতে লক্ষ্য অর্জন সহজতর হবে। অর্থনৈতিক চিন্তা দর্শনের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন, তার সূচনাবিন্দু হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করা উচিত। এ হিসেবে এ গ্রন্থটিকে আমরা অর্থনৈতিক দিকদর্শনে এ প্রশস্ত রাজপথ আখ্যা দিতে পারি।
মাওলানা সাইয়েদ আুল আ’লা মওদীদী একালের সর্বাধিক খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ। বিগত চল্লিশ বছরে তিনি ইসলামী সমাজ দর্শন ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি দিক ও বিভাগ সম্পর্কে কমবেশী কথা বলেছেন। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে আধুনিক কালের সমস্যাবলী ও জটিলতারকে সামনে রেখে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় কোনো প্রকার কমবেশী না করে হুবহু তা তুলে ধরেছেন। আসল সিদ্ধান্ত তো ভবিষ্যতই করবে, তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, শ্রদ্ধেয় মাওলানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো, তিনি ইসলামকে একটি পূর্ণাংগ দার্শনিক ও বাস্তব জীবন ব্যবস্থা এবং দীন দুনিয়ার কল্যাণধর্মী এক বিশ্বজনীন সংস্কার আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, বিগত চল্লিশ বছরের অবিরাম চেষ্টা সাধনার দ্বারা তিনি স্বীয় বিরোধীদের কাছ থেকে পর্যন্ত এ স্বীকৃতি আদায় করেছেন যে, জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের জন্যে ইসলাম তার নিজস্ব দৃষ্টিভংগির আলোকে মৌলিক পথ নির্দেশনা দন করেছেন। আর মুসলমান ব্যক্তি হিসেবে এবং জাতগতভাবে কেবল তখনই ইসলামের দাবী পূর্ণ করতে পারে, যখন সে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এসব পথনির্দেশের পূর্ণ অনুসরণ করবে।
এটা স্বাভাবিক কথা, যে মহান ব্যক্তিত্ব এই বিরাচ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন তিনি কেমন করে অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয়ে নীরব থাকতে পারেন? তাইতো দেখি, মাওলানা তাঁরা তরজামানুল কুরআন পত্রিকা প্রকাশনার প্রথম বছরই [১৯৩৩ ইং] “সুদ” ও “জন্ম নিয়ন্ত্রণের” বিরুদ্ধে জিহাধ শুরু করেছেন। এযাবত অর্থনীতি বিষয়ে তার গবেষণা, লেখা ও কথা বলা অব্যাহত রয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়ে এ পর্যন্ত তাঁর চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হলো, সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং, ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ, ভূমির মালিকানা বিধান এবং ইসলাম ও জন্মনিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়াও এ বিষয়ে মাওলানার বহু প্রবন্ধ, পুস্তিকা এবং বক্তৃতা রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই চারটি গ্রন্থের স্বতন্ত্র গুরুত্বতো অবশ্যই আছে এবং এগুলো ইনশাল্লাহ নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে যাবে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মাওলানার সকল লেখা সামনে রেখে একটি পূর্ণাংগ গ্রন্থ সংকলনের প্রয়োজনীয়তা আমি দীর্ঘদিন থেকে অনুভব করে আসছিলাম। এমন একটি গ্রন্থ, যাতে সকল মৌলিক অর্থনৈতিক বিষয়ে একই সাথে মাওলানর দৃষ্টিভংগিও জানা যাবে এবং অর্থনীতির ছাত্ররা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকও এক নজরে দেখতে পাবে। ফুল যতো সুন্দরই হোক নার তা বাগানময় যতো হাসিই ফুটাক, সেগুলো ফুলদানীতে সাজাবার মত একটি পুষ্পগুচ্ছে কেবল তখনই পরিণত হতে পারে, যখন মালি বাগান থেকে বেছে বেছে নির্বাচিত ফুলের সমন্বয়ে একটি গুচ্ছ তৈরী করবে।
এ কাজের প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন থেকেই উপলব্ধি করছিলাম। একটি রূপরেখাও তৈরী করে রেখেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এতোদিন এ কাজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি। ইতমধ্যে করাচী বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স ক্লাশের জন্যে ‘ইলামী অর্থনীতির’ একটি পত্র (Paper) সিলেবাসভুক্ত করেছে। তাছাড়া ‘দানশাগহে পাঞ্জাব’ও মাস্টার্ব-এ ইসলামী অর্থনীতি পড়ানো আরম্ভ করেছে। এ পদক্ষেপ নিতে দেরী হয়ে গেছে অনেক। কিন্তু এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা দেশ বিভাগের পরপরই যদি এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন, তবে হয়তো একটি শাস্ত্র হিসেবে ইসলামী অর্থনীতির উপর এতো দিনে অনেক মূল্যবান গ্রন্থাবলী রচিত হয়ে গেতো। যা হোক, এ পদক্ষেপকে আমরা আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। এ পদক্ষেপই আমাকে ত্বরিত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর শদ্ধেয় মাওলানার সকল গুরুত্বপূর্ণ রচনা একত্র সংকলন করে এ গ্রন্থ তৈরী করেছি, যাতে এক নজরে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণাংগ রূপরেখা পাওয়া সম্ভব হয়।
গ্রন্থটিকে দুই অংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম অংশে স্থান পেয়েছে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসমূহের পর্যলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়ানা এতে অর্থনীতি বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভংগিও তুলে ধরা হয়েছে পূর্ণাংগরূপে। বিস্তারিত বিশ্লেষণের সাথে সাথে পেশ করা হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহ প্রদর্শিত অপরিহার্য নীতিমালা। এ খন্ডটি আমাদের ভবিষ্যত কর্মীদের জন্যে মাইল ফলকৈর কাজ করবে। এখন প্রয়োজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন; এসব আদর্শ ও নীতিমালার আলোকে অর্থনীতির ভাষায় গবেষণা ও আলোচনা করা। এ রচনাগুলোর মর্যাদা আলোর মিনারের মতো। কিন্তু এ আলো স্বয়ং পথিক নয়; পথিকদের পথ-প্রদর্শক মাত্র। এ নির্দেশনার আলোকে অর্থনীতির ছাত্রদের সেই পথের সন্ধন করে নিতে হবে যার দিকে তা নির্দেশনা দান করছে। এটি একটি প্রদীপ। এ থেকে হাজারো নতুন প্রদীপ জ্বালাতে হবে। সুগম করতে হবে অন্যদের জন্যে চলার ও অনসরণ করার পথ। শ্রদ্ধেয় মাওলানা পথ চিহ্নিত করেছেন এখন মুসলিম অর্থনীতিবিদদের দায়িত্ব সম্মুখে অগ্রসর হওয়া এবং যুগোপযোগী পথ তৈরী করা।
গ্রন্থটির দ্বিতীয় খন্ডে স্থান পেয়েছে শ্রদ্ধেয় মাওলানার সেইসব রচনা, একদিকে যেগুলোর সম্পর্ক অর্থনৈতিক দর্শনের প্রয়োগের (Application) সাথে। এখানে এ প্রসংগে ইসলামী অর্থব্যবস্থার কেবল কয়েকটি দিক সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। তবে এতে কয়েকটি আলোচনা এমনও আছে, যেগুলো আমাদের সামনে অর্থনীতির বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে চিন্তা ও গবেষণার পথ ‍উন্মুক্ত করতে সহায়ক হবে। এ প্রবন্ধগুলো একদিকে কয়েকটি মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিষ্কার নির্দেশনা দান করছে; যেমন, ভূমির মালিকানা, সুদ, যাকাত এবং সামাজিক সুবিচার। অপরদিকে এ প্রবন্ধগুলো অর্থনীতির ছাত্রদের অংগুলি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলামের মৌলিক ধ্যান ধারণা এবং এর মৌলিক অ্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে বিশেষ বিশেষ জিজ্ঞাসা ও সমস্যার অধ্যয়ন কিভাবে করতে হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তথাকথিত প্রগতিশীল ভাঁড় ও অপরের অন্ধ অনুসারীদের মোকাবিলায় প্রকৃত সৃষ্টিধর্মী ও ইজতিহাদী রীতি কী? এটা চিন্তার স্বাধীনতার এক বিরাট কদাকার ধারণা যে, স্বাধীনতা ও ইজতিহাদ হলো স্বধর্মের শিক্ষাকে পরিবর্তন করা এবং পাশ্চাত্যের প্রতিটি ধ্যান ধারণার অন্ধ অনুকরণ করার নাম। এটা ‘চিন্তার স্বাধীনতা’ নয়, ‘মানসিক দাসতব’। চিন্তার প্রকৃত স্বাধীনতা হলো, আমরা নিরপেক্ষ মন এবং সমালোচনার দৃষ্টি নিয়ে সকল আধুনিক মতবাদ অধ্যয়ন করবো এবং “যা সঠিক তা গ্রহণ কর, যা ভ্রান্ত তা পরিত্যাগ কর” –এই নীতির অনুসরণ করবো। আমরা আমাদের মন মানসিকতার দুয়ার এমনভাবে বন্ধ করে দেবোনা যে, কোনো কল্যাণকর জ্ঞান থেকে উপকৃত হবো না। আবার নিজেদের মন মানসিকতার উপর অন্যদের প্রভাবও এতোটা গ্রহণ করবো না যে, দেখার সময় তাদের চোখে দেখবো, চিন্তার সময় তাদের মন দিয়ে চিন্তা করবো এবং বলার সময় তাদের মুখ দিয়ে বলবো।
গ্রন্থটির দ্বিতীয় অংশ মূলত এ ধরনের বিনির্মাণ ও সৃষ্টিধর্মী দৃষ্টিভংগির মুখপত্র। অর্থনীতির ছাত্ররা এ থেকে জানতে পারবে যে, বিশেষ বিশেষ ধরনের বিষয় ও সমস্যা সম্পর্কে কি পদ্ধতিতে চিন্তা-গবেষণা করতে হয়। এ খণ্ডটি মূলত একটি আদর্শ নমুনা। ভবিস্যতে যারা এ ময়দানে কাজ করবেন, তাঁদের অসংখ্য নতুন নতুন বিষয়ে কাজ করতে হবে। আমার বিশ্বাস তাঁদের চলার পথে এ সংকলনটি পথপ্রদর্শকের কাজ দেবে। শাস্ত্রীয় পরিভাষায় মাওলানা মওদূদী একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ [Economist] নন। কিন্তু তাঁর স্থান এর চেয়েও অনেক উর্ধ্বে। কোনো একটি নির্দিষ্ট শাস্ত্রের মানদন্ডে তিনি বিচার্য নন। তিনি এমন একজন চিন্তাবিদ যিনি ধর্মতত্ত্ব (Theology) থেকে শুরু করে প্রায় সকল সমাজ বিজ্ঞানের (Social Science) ময়দানে কেবল সিদ্ধান্তকর কথাই বলেননি, বরঞ্চ সেই সাথে ইসলামী দৃষ্টিভংগির আলোকে সেগুলোর কেন্দ্রীয় বিষয়বর্তুর (Central Core) নবনির্মাণ কাজের নীল নকশাও এঁকে দিয়েছেন। তাঁর অর্থনীতি বিষয়ক রচনাবলীর এ সংকলনটি অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই কাজই আঞ্জাম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ের উপর কাজ করা সেইসব মনীষীদের দায়িত্ব যাঁরা ইসলামের প্রতি অটুট বিশ্বাস রাখেন, সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সঠিক দৃষ্টিভংগি পোষণ করেন এবং যারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রায়োগিত দক্ষতার (Technical Competence) অধিকারী। আমাদের মতে এ গ্রন্থটিতে সাধারণ পাঠদের জন্যেও অনেক মূল্যবান উপকরণ রয়েছে; আর অর্থনীতির ছাত্র এবং আগামী দিনের ইসলামী অর্থনীতিবিদদের জন্যে রয়েছে দিকনির্দেশনা। আমার বিশ্বাস, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে পঠন পাঠনের ক্ষেত্রে এ গ্রন্থটি বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
গ্রন্থটি সংকলন সংক্রান্ত একটি কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন বোধ করছি। তা হোলো, এতে শ্রদ্ধেয় মাওলানার প্রবন্ধ এবং বক্তৃতা চাড়াও তাফহীমীল কুরআন থেকে সেই সব অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলোর বিষয়বর্তু অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত। একই ভাবে রাসায়েল মাসায়েল-এর সেইসব প্রশ্নের জবাবও এখানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে, যেগুলোকে আমাদের আলোচনার পরম্পরার সাথে সম্বন্ধযুক্ত মনে করেছি। এছাড়া ‘ভূমির মালিকানা বিধা’ এবং ‘সুদ’ গ্রন্থ থেকে প্রাসংগিক আলোচনাসমূহ গ্রহণ করে তা সংক্ষিপ্ত আকারে সংযোজন করেছি। কিন্তু এ গ্রন্থে সেসব বিষয়ের সূচী বিন্যাস করেছি আমাদের প্রয়োজনে। মনে রাখতে হবে এ গ্রন্থে সংকলিত অংশগুলো মূল গ্রন্থসমূহের বিকল্প (Substitute) হতে পারেনা। অবশ্য এ গ্রন্থে সংকলিত হয়ে একটি সীমা পর্যন্ত সেগুলো আমাদের প্রয়োজন পূরণ করছে। বিস্তারিত জানার জন্য আমরা সম্মানিত পাঠকদের মূল গ্রন্থ পাঠ করার অনুরোধ করবো।
এ গ্রন্থের উপকরণসমূহ নেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে। এগুলো লেখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। লেখার সময় গ্রন্থকারের সামনে ছিলো বিভিন্ন ধরনের পাঠক। এই সবগুলো লেখাকে একত্রিত করা এবং সেগুলোকে প্রাসংগিকভাবে বিন্যস্ত করা বড় কঠিন কাজ। আমার সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছি যাতে বক্তব্যের প্রাসংগিকতা ছিন্ন না হয়। তা সত্ত্বেও সম্মানিক পাঠকদের নিকট আমার নিবেদন, তাঁরা যেন গ্রন্থটি পাঠের সময় সংকলকের সেইসব সীমাবদ্ধতাকে সামনে রাখেন, এ ধরনের কাজে অপরিহার্যভাবে যেগুলোর সম্মুখীন হতে হয়। এ ধরনের সংকলনের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে আমি আশা করি এ গ্রন্থে যেসব বিষয়ে পুনরাবৃত্তি এসেছে তা প্রয়োজনীয় এবং সেগুলো আলোচ্য বিষয় অনুধাবনে কাজে লাগবে। গ্রন্থের প্রথম অংশে এরূপ পুনরাবৃত্তি একটু বেশী। আর সেখানে এমনটি হওয়া জরুরীও ছিলো। ইনশাল্লাহ এ পুনরাবৃত্তি উপকারেই আসবে।
পরিশেষে একটি ব্যক্তিগত কৈফিয়ত পেশ করছি। এ গ্রন্থ সংকলনের বেশীরভাগ কাজ ১৯৬৮ ইসায়ী সালের আগস্ট মাসের মধ্যেই স্পন্ন করেছিলাম। কেবল কয়েক সপ্তাহের কাজই বাকী ছিলো। এরি মধ্যে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্যে আমাকে ইংল্যাণ্ডে যেতে হয়। আকাশ ভ্রমণের সমস্যাবলীর মধ্যে একটি সমস্যা হলো, মানুষ তার প্রয়োজনের সব জিনিস সাথে নিতে পারেনা। আমি আশা করছিলাম, আমার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবো এবং কাজটি সম্পন্ন করতে পারবো। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। পাণ্ডুলিপি হাতে পৌঁছে ডিসেম্বর মাসে। তাছাড়া এখানে আসার পর তিন চার মাস অন্য কাজের চাপে এতোটা ব্যস্ত ছিলাম যে, গ্রন্থটি সম্পন্ন করতি আরো বিলম্ব হলো।
খুরশীদ আহমদ
লিস্টার, ইংল্যাণ্ড
২ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ ঈসায়ী
১৪ যুলকা’দা ১৩৮৮ হিজরী

সবকথার গোড়ার কথা

[১৯৪৮ সালের ২ মার্চ রেডিও পাকিস্তান [লাহোর] ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিষয়ে গ্রন্থকারের যে কথিকা প্রচার করেছিল, বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের কারণে এখানে সেটিকে ‘সব কথার গোড়ার কথা’ শিরোনামে সংকলন করা হলো।– সংকলক।]
% | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | সম্পুর্ণ বই এক পেজে »

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.