ইসলামী অর্থনীতি


Warning: Division by zero in /home/icsbook/public_html/wp-content/plugins/page-links-single-page-option/addons/scrolling-pagination/scrolling-pagination-functions.php on line 47

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সুবিচার ও সততার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যে ইসলাম কতিপয় মূলনীতি ও সীমা চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দিয়েছে। সম্পদের উৎপাদন, ব্যবহার ও বিনিয়োগের গোটা ব্যবস্থা এই সীমারেখার মধ্যে আবর্তিত হতে হবে। অবশ্য উৎপাদন ও বিনিয়োগ বিপণনের পন্থা পদ্ধতি কিরূপ হবে সে ব্যাপারে ইসলামের কোনো বক্তব্য নেই। কারণ সময় ও সভ্যতার উত্থান পতনের সাথে সাথে এসব পন্থা পদ্ধতি নির্ণিত ও পরিবর্তি হয়ে থাকে। বস্তুত, মানুষের অবসথা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে এগুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ইসলামের দাবী শুধু এতটুকু যে, সকল যুগ ও পরিবেশে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যাবলী ও রূপই ধারণ করুক না কেন তাতে ইসলামের নির্দিষ্ট নীতিমালা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং নির্ধারিত সীমারেখা অবশ্যি অনুবর্তন করতে হবে।
ইসলামের বিঘোষিত দৃষ্টিভংগি হলো, এ বিশ্বজগৎ এবং এর যাবতীয় সম্পদ মহান আল্লাহ গোটা মানব জাতির কল্যাণের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাই পৃথিবীর বুক থেকে স্বীয় জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা করার অধিকার প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যেতে পারেনা। এক্ষেত্রে একজন অন্যজনের উপর অগ্রিধিকারও পেতে পারেনা। কোনো ব্যক্তি, বংশ, জাতি বা শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের উপর এমন কোনো বিধিনিষেধও আরোপ করা যেতে পারেনা যার ফলে তারা জীবিকার উপকরণের মধ্য থেকে কোনো কোনো উপকরণ ব্যবহারে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে অথবা কোনো বিশেষ পেশা গ্রহণের দরজা তাদের জন্যে বন্ধ থাকবে। একই ভাবে আইনত এমন কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করাও বৈধ হতে পারেনা যার করণে জীবিকার উপকরণসূহ বিশেষ কোনো শ্রেণী, বংশ, জাতি বা পরিবারের একচেটিয়া ইজারায় পরিণত হয়ে যাবে। আল্লাহর সৃষ্ট এই বিশ্বে তাঁরই দেয়া জীবিকার উপকরণসমূহের মধ্য থেকে নিজের অংশ লাভের চেষ্টা করার প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান। এ অধিকার লাভের সুযোগ সবার জন্যে সমভাবে উন্মুক্ত থাকতে হবে।
আল্লাহর দেয়া যেসব সম্পদ উৎপাদন করা কিংবা কার্যোপযোগী বানানোর ক্ষেত্রে কারো শ্রম বা যোগ্যতার বিনিয়োগ করতে হয়না তা সকল মানুষের জন্যে সাধারণবাবে বৈধ। নিজের প্রয়োজন অনুপাতে তা থেকে উকৃত হবার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে। নদী নালা ও সমুদ্রের পানি, বনের কাঠ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় উদগত ও লালিত গাছের ফল ফসল, স্বজাত ঘাস ও চারা, বায়ু, পানি, বিজন নের পশু, যমীনের উপর ভেসে উঠা খনিজ পদার্থ ইত্যাদি ধরনের সম্পদের উপর কারো একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। এগুলোর উপর এমন কোনো বিধিনিষেধও আরোপ করা যেতে পারেনা যার ফলে আল্লাহর বান্দারা কিছু ব্যয় করা ছাড়াই তা থেকে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে বাধাগ্রস্ত হবে। তবে হ্যাঁ, যারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব সম্পদের ব্যাপক ব্যবহার করতে চাই, েতাদের উপর করারোপ করা যেতে পারে।
আল্লাহ তা’আল্ মানুষের কল্যাণের জন্যে যেসব জিনিস সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো অনুৎপাদনশীল ও পতিত ফেলে রাখা উচিত নয়। ‘হয় নিজে সেগুলো দ্বারা লাভবান হও, অথবা অন্যরা যাতে উপকৃত হতে পারে সেজন্যে ছেড়ে দাও।’ এই মূলনীতির ভিত্তিতে ইসলামী শরীয়ত ফয়সালা দিয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি সরকার প্রদত্ত জমি তিন বছরের বেশী পতিত ফেলে লাকতে পারবেনা। যদি সে নিজে সে জমিতে খামার বা নির্মাণ কাজ না করে, কিংবা অন্য কোনো কাজে তা ব্যবহার না করে, তবে তিন বছর অতিক্রান্ত হবার পর তা পরিত্যক্ত ভূমি বলে গণ্য হবে এবং অপর কেউ তা কাজে লাগালে তাকে সেখান থেকে উৎখাত করা যাবে না। জমি তিন বছর পতিত ফেলে রাখলে সে জমি ফেরত নিয়ে নেবার অধিকার লাভ করবে এবং অপর কাউকে তা ব্যবহার করার জন্যে প্রদান করতে পারবে।
কেউ যদি সরাসরি প্রকৃতরি ভাণ্ডার থেকে কোনো জনিস সংগ্রহ বা আহরণ করে এবং নিজের শ্রম ও যোগ্যতা খাটিয়ে একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে, তবে সে-ই হবে সে জিনিসের মালিক। যেমন, যে পতিত জমির উপর এখনো কারো মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কেউ যদি তা অধিগ্রহণ করে এবং কোনো লাভজনক কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে, তবে তাকে সে জমি থেকে বেদখল করা যেতে পারেনা। বস্তুত ইসলামের দৃষ্টিভংগি অনুযায়ী পৃথিবীতে স্বত্বাধিকারের সূচনা হয়েছে নিম্নরূপে: প্রথমে যখন পৃথিবীতে মানুষের বসবা আরম্ভ হয়, তখন সকল জিনিস সকল মানুষের জন্যে সমানভাবে বৈধ ছিলো। অতঃপর যে ব্যক্তি যে বৈধ জিনিস নিজের মালিকানায় গ্রহণ করে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় তাকে ব্যবহার উপযোগী করে নিয়েছে, সে-ই হয়েছে সে সম্পদের মালক। অর্থাৎ সে জিনিসের ব্যবহার কেবল তার নিজের জন্যে নির্দিষ্ট করা হযেছে এবং অপরকে ব্যবহার করতে দেয়ার ক্ষেত্রে সে বিনিময় গ্রহণ করবার অধিকার লাভ করেছে। এ হলো মানুষের গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বাভাকি ভিত্তি। এ ভিত্তি এর নিজ স্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকা অপরিহর্য।
শরীয়তসম্মত বৈধ পন্থায় পৃথিবীতে সে স্বত্বাধিকার অর্জিত হয়, তা অবশ্যই সম্মানযোগ্য। এ ব্যাপারে মতভেদ থাকলে তা কেবল এতটুকু থাকতে পারে যে, মালিকানা অর্জন আইনগতভাবে বিশুদ্ধ হয়েছে কিনা! আইনগতভাবে যেসব মালিকানা অবৈধ, সেগুলো অবশ্যি খতম করতে হবে। কিন্তু শরীয়তসম্মত বৈধ মালিকানা হরণ করার অধিকার কোনো সরকার বা আইন পরিষদের নেই। এমনকি, কোনো মালিকের শরীয়তসম্মত অধিকারের কমবেশী করবার অধিকারও কাউকে দেয়া হয়নি। সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা কায়েম করা যেতে পারেনা, যা জনগণের শরীয়ত প্রদত্থ অধিকারকে পদদলিত করে। সমষ্টির কল্যাণে ব্যক্তির মালিকানার উপর স্বয়ং শরিয়ত যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তাতে হ্রাস করা যতো বড় অন্যায় সংযোজন করার ঠিক ততো বড় যুলুম। ব্যক্তির শরীয়ত প্রদত্ত অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তা থেকে শরীয়ত নির্ধারিত সমষ্টিক অধিকার আদায় করা ইসলামী সরকারের অন্যতম কর্তব্য।
আল্লাহ তা’আলা তার দান ও অনগ্রহসমূহ বন্টনের ক্ষেত্রে সাম্যনীতি গ্রহণ করেননি। বরঞচ নিজের মহাপ্রজ্ঞার ভিত্তিতে কিছু মানুষকে অপর কিছু মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সৌন্দর্য, সুন্দর কণ্ঠস্বর, সুস্থতা, দৈহিক শক্তি, মেধা, জন্মগত পরিবেশ এবং অরুরূপ অপরাপর জিনিস সব মানুষকে সমভাবে প্রদান করা হয়নি। অরূপভাবে জীবিকার ব্যাপারেও এই একই কথা প্রযোজ্য। মানুষের মধ্যে জীবিকার তারতম্য হওয়অ আল্লাহ্‌র সৃষ্ট প্রকৃতিরই দাবী। সুতরাং মানুষের মধ্যে কৃত্রিম অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যে যতো কর্মকৌশলই গ্রহণ করা হোকনা কেন, ইসলামের দৃষ্টিতে, লক্ষ্যে ও মূলনীতির দিক থেকে তা সবই ভ্রান্ত। ইলাম যে সাম্যের সমর্থক, তা জীবিকার ক্ষেত্রে নয় বরঞ্চ জীবিকা লাভের প্রচেষ্টা ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধার সাম্য। ইসলাম চায়, সমাজে এমন কোনো আইনগত ও প্রথাগত প্রতিবন্ধকতা অবশিষ্ট না থাকুক, যার কারণে কোনো ব্যক্তি নিজের শক্তিসামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ উপার্জনের চেষ্টা সাধনার পথে বাধার সম্মুখীন হবে। অপরদিকে কোনো শ্রেণী, বংশ বা পরিবারের জন্মগত সৌভাগ্যকে আইনের দ্বারা স্থায়ী করার মতো বৈষম্যমূলক নীতিও ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ দুটি পন্থা মানুষে মানুষে স্বাভাবিক প্রকৃতিগত বৈষম্যের স্থলে মানব সমাজে একটি জবরদস্তিমূলক কৃত্রিম বৈষম্যের সৃষ্টি করে। তাই ইসলাম এসব প্রথা ও আইনকে নির্মূল করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এমন একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে যেখানে প্রতিটি মানুষের জন্যে জীবিকা উপার্জনের সুযোগ সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু যারা জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে চেষ্টা করার মাধ্যম এবং ফলাফল লাভের ব্যাপারে সব মানুষকে জবরদস্তিমূলক একই সমতলে নিয়ে আসতে চায়, ইসলাম তাদের সাথে একমাত্র নয়। কেননা তারা প্রাকৃতিক অসাম্যকে কৃত্রিম সাম্যে রূপান্তরিত করার অসাধ্য সাধন করতে চায়। বস্তুত প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ব্যবস্থা তো কেবল সেটাই হতে পারে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি অর্থ উপার্জনের প্রচেষ্টা ক্ষেত্রে, ঠিক সেই স্থঅন এবং পরিবেশ থেকে যাত্রা শুরু করবে, যেখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে সৃষ্টি করেছেন। যে মটরগাড়ী নিয়ে জন্ম নিয়েছে, সে মটরগাড়ী নিয়ে যাত্রা শুরু করবে, যে কেবল দুই পা নিয়ে এসেছে সে পদদলে চলতে আরম্ভ করবে, আর যে খোড়া হয়ে জন্ম নিয়েছে তাকে খোড়া অবসথায়ই যাত্রা শুরু করতে দিতে হবে। সমএজ এমন আইন প্রথা কোনো অবস্থাতেই চালু হওয়অ এবং চালু থাকা উচিত নয়, যপর ফলে মটরগাড়ী নিয়ে জন্ম নেয়া ব্যক্তি অযোগ্য হওয়অ সত্ত্বেও কেবল আইন ও প্রথার বলে চিরদিনই মটরগাড়ীর মালিক থাকবে এবং পংগু হয়ে জন্ম নেয়া লোকেরা আইন প্রথার বাধা ডিঙ্গিয়ে কোনোদিনই মটর গাড়ীর মালিক হতে পারবেনা। অপরপক্ষে সমাজে এমন ব্যবস্থা থাকাও কিছুতেই সমীচীন নয় যে, সকল মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে একই স্থান এবং পরিবেশ থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে এবং সমগ্র পথে সকলকে একই সাথে গ্রথিত থাকতে হবে। বরঞ্চ সমাজের আইন ও প্রথাগত ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত এবং সাধারণভাবে এই সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকা আবশ্যক যাতে, কোন ব্যক্তি পংগু অবস্থায় যাত্রা শুরু করা সত্ত্বেও যদি মটর গাড়ী লাভ করার মত শ্রম, যোগ্যতা প্রতিভা তার থাকে তাহলে অবশ্যই যেন সে মটরগাড়ীর মালিক হতে পারে। অপরদিকে কেউ মটরগাড়ী দিয়ে যাত্রা শুরু করেও যদি নিজের অযোগ্যতার কারণে মটরগাড়ী হারিয়ে ফেলে, তবে তার সে অযোগ্যতার ফলও তার পাওয়অ উচিত।
ইসলাম কেবল এতটুকুই চায়না যে, সমাজ জীবনে কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত এবং অবাধ থাকবে; বরঞ্চ সেইসাথে এটাও চায় যে, এ ময়দানে প্রযোগীগণ পরস্পরের প্রতি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হবার পরিবর্তে সহমর্মী ও সগযোগী হবে। ইসলাম একদিকে নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে অক্ষম ও পিছে পড়ে থাকা মানুষের আশ্রয় প্রদানের মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায়; অপরদিকে সমাজে এমন একটি শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তুলতে চায় যে অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাহায্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যেসব লোকের জীবিকা উপার্জনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা থাকবে না, তারা এই সংস্থা থেকে নিজেদের অংশ পাবে; যারা দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বে, এই সংস্থ তাদের উঠিয়ে এনে আবার চলার যোগ্য করে দেবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্যে যাদের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, এই সংস্থা থেকে তারা সাহায্য সহযোগিতা লাভ করবে। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম আইনগতভাবে দেশের গোটা সঞ্চিত সম্পদ থেকে বার্ষিক ২.৫% ভাগ এবং গোটা বাণিজ্যিক পুঁজি থেকে বার্ষিক ২.৫% ভাগ যাকাত সংগ্রহ করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। সমস্ত উশরী জমির উৎপন্ন ফসল থেকে ১০% ভাগ কিংবা ৫% ভাগ উশর এবং কেনো কোনো খনিজ সম্পদের উৎপাদন ২০% ভাগ যাকাত উসুল করতে বলেছে। এছাড়া গৃহপালিত পশুর উপরও বার্ষিক যাকাত আদায় করবে বলেছে। এই গোটা সম্পদ সামগ্রী ইসলাম গরীব, এতীম, বৃদ্ধ, অক্ষম, উপার্জনহীন, রাগী এবং সব ধরনের অভাবী ও দরিদ্রের সাহায্যার্থে ব্যবহার করতে বলেছে। এটা এমন একটা সামাজিক বীমা, যার বর্তমানে ইসলামী সমাজে কোনো ব্যক্তি জীবন যাপনে অপরিহার্য সামগ্রী থেকে কখনো বঞ্চিত থাকতে পারেনা। কোনো শ্রমজীবী মানুষকে অভুক্ত থাকার ভয়ে কারখানা মালিক বা জমিদারের যেকোনো অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হতে হবেনা। আর উপার্জনের প্রতিযোগিতায় নামার জন্যে ন্যূনতম যে শক্তি সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য, কোনো ব্যক্তির অবস্থাই তার চেয়ে নীচে নেমে যাবেনা।
ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এমন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাতে ব্যক্রি ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে, আর সামাজিক স্বার্থের জন্যেও তার স্বাধীনতা কোন ক্ষতির কারণ না হয়; বরং অবশ্যি কল্যাণবহ হয়। ইসলাম এমন কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাঠামো সমর্থন করেনা, যা ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা ও স্বাধীনতাকে বিলীন করে দিয়ে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। কোনো দেশের সমুদয় উৎপাদনের উপকরণকে জাতীয়করণ করার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো, দেশের সবগুলো মানুষকে সামাজিক স্বার্থের কঠোর নিগড়ে আবদ্ধ করা। এমতাবস্থায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জন্যে যেমন রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা প্রয়োজন তেমনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বড় বেশী দরকার। আমরা যদি ব্যক্তিত্বের মূলোৎপাটন করতে না চাই, তাহলে আমাদের সামাজিক জীবনে প্রতিটি মানুষের জন্যে এ সযোগ অবশ্যি বর্তমান রাখতে হবে, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বাধীনভাবে নিজের জীবিকা উপার্জন করে নিজের মন মানসিকতার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারে এবং নিজের মানসিক ও নৈতিক তথা সমুদয় যোগ্যতাকে নিজের ঝোঁঁকপ্রবণতা অনুযায়ী বিকশিত করতে পারে। পরে মুষ্টিবদ্ধে রেশনের খাদ্য যতো প্রচুরই হোকনা কেন, তা মানুষের জন্যে তৃপ্তিদায়ক হতে পারেনা। কেননা, তাতে মনের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশে যে ক্ষতি হয়, কেবল মেদবহুল দেহ তা পূরণ করতে পারে না।
ইসলাম এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থাকে সমর্থন করেনা; অরুরূপভাবে এমন সমাজ ব্যবস্থাকেও ইসলাম সমর্থন করেনা, যা ব্যক্তিকে সামাজিক ও অর্থনৈাতিক ক্ষেত্রে লাগামহীন স্বাধীনতা প্রদান করে এবং নিজের অবাধ কামনা বাসনা ও স্বার্থের জন্যে সমাজকে যথেচ্ছ ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ করে দেয়। এ দুটি প্রান্তিক ব্যবস্থার মাঝখানে ইসলাম যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে তা হলো- প্রথমত, সমাজের স্বার্থে ব্যক্তির উপর কিছু দায় দায়িত্ব এবং সীমারেখা আরোপ করা হবে। অতঃপর তার নিজের কর্মক্ষেত্রে তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে। ইসলাম নির্দেশিত এ সীমারেখা এবং দায় দায়িত্বের বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই; এখানে কেবল একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র পেশ করা হচ্ছে।
প্রথমত জীবিকা উপার্জনের বিষয়টিই আলোচনা করা যাক। এক্ষেত্রে ইসলাম যতোটা ‍সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বৈধ অবৈধের পার্থক্য করেছে, বিশ্বের অন্য কোনো ব্যবস্থা তা করেনি। ইসলাম বেছে বেছে উপার্জনের সেই সকল উপায় ‍উপকরণ বা মাধ্যমকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যেগুলোর দ্বারা এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে বা সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজকে নৈতিক ও বস্তুগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে স্বীয় স্বার্থ হাসিল করার সুযোগ পায়। মদ এবং মাদকদ্রব্য তৈরী ও বিক্রয় করা, বেশ্যাবৃত্তি, গান বাজনা ও নৃত্যগীতের পেমা, জুয়া, প্রতিজ্ঞাপত্র [এক প্রকার জুয়া], লটারী, সুদ; অনমান, প্রতারণা এবং এমন ব্যবসা যাতে এক পক্ষের লাভ নিশ্চিত এবঙ অপর পক্ষের লাভ অনিশ্চিত; মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্যে মজুতদারী এবং অনুরূপ অন্যান্য কায়কারবার যা সমাজের জন্যে অনিষ্টকর, ইসলামী আইনে তা সবই দ্ব্যর্থহীনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বস্তুত ইসলামের অর্থনৈতিক আইনকানুন পর্যালোচনা করলে উপার্জনের অবৈধ পন্থাপদ্ধতির এক বিরাট তালিকা পাওয়া যাবে। এ তালিকার মধ্যে এমন পন্থাপদ্ধতিও আছে যেগুলো প্রয়োগ করে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ কোটিপতি হচ্ছে; কিন্তু ইসলাম এসব পন্থাপদ্ধতিকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ইসলাম কেবল সেইসব পন্থায়ই মানুষকে উপার্জনের স্বাধীনতা প্রদান করেছে, যেগুলোর মাধ্যমে সে অন্য লোকরেদ প্রকৃত ও কল্যাণকর কোনো সেবা করে সুবিচারের সাথে পারিশ্রমিক লাভ করতে পারে।
ইসলামী বৈধ উপায়ে উপার্জিত সম্পদের উপর ব্যক্তির স্বত্তাধিকার স্বীকার করে। কিন্তু এ অধিকারও নিয়ন্ত্রণহীন নয়। এক্ষেত্রে ইসলাম ব্যক্তিকে তার বৈধ উপার্জন বৈধ উপায়ে ও বৈধ পথে ব্যয় করতে বাধ্য করে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে ব্যক্তি সদাসিধে ও পূত-পবিত্র জীবনযাপন আবশ্যি করতে পারবে কিন্তু বিলাসিতার জন্যে অর্থ উড়াবার সুযোগ তার থাকবে না । জাঁকজমক প্রদর্শন করে এতোটা সীমাতিক্রম করারও সুযোগ পাবেনা, যার ফলে অন্যদের উপর তার প্রভুত্বের চাকা জেঁকে বসতে পারে। অপব্যয়ের অনেকগুলো খাতকে তো ইসলামী আইন সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। আর কোনো কোনো খাতকে যদিও সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু বাজে ও অন্যায় ব্যয় থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্যে নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা ইসলামী রাষ্ট্রকে দেয়া হয়েছে।
বৈধ ও ‍যুক্তিসংগত আয়-ব্যয়ের পর ব্যক্তির হাতে যে অর্থসম্পদ উদ্বৃত্ত থাকবে, তা সে সঞ্চয়ও করতে পারে এবং অধিক আয় উপার্জনের কাজে বিনিয়োগও করতে পারে। কিন্তু এ দুটি অধিকারের উপর কিছু বিধিনিশেষ আরোচ করা হয়েছে। সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে তাকে নিসাবের অতিরিক্ত সম্পদের জন্যে বার্ষিক শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত প্রদান করতে হবে; আর বিনিয়োগ করতে চাইলে কেবল বৈধ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। বৈধ বিনিয়োগ সরাসরি নিজেও করতে পারে; আবার ইচ্ছা করলে অপরকে নিজের পুঁজি টাকা, জমি, যন্ত্রপাতি এবং সাজসরঞ্জাম ইত্যাদি আকারে প্রদান করে লাভ লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসাও করতে পারে। এ উভয় পন্থায়ই বৈধ। এইসব সীমরারেখার মধ্যে অবস্থান করে কেউ যদি কোটিপতিও হয় তাতে ইসলামের দৃষ্টিতে আপত্তির কিছু নেই। বরঞ্চ এটা তার প্রতি আল্লাহর অনুগ্র বলে বিবেচিত হবে। তবে সমাজের স্বার্থে ইসলাম এরূপ ক্ষেত্রে দুটি শর্ত আরোপ করেছে; একটি হলো, উক্ত কোটিপতিকে তার ব্যবসার যাবতীয় সম্পদের যাকাত এবং কৃষি উৎপাদনের উশর প্রদান করতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, সে তার ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প কারখানা এবং ক্ষেত খামারে যেসব লোকের সাথে অংশীদারিত্বের কিংবা পারিশ্রমিকের ভিত্তি কর্মসম্পাদন করবে, তাদের সকলের সাথে আবশ্যি সুবিচারমূলক আচরণ করতে হবে। সে স্বয়ং যদি এ সুবিচার না করে, তবে ইসলামী রাষ্ট্র তাকে সুবিচারের জন্যে বাধ্য করবে।
এসব বৈধ সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করে ব্যক্তি যে সম্পদের মালিক হবে, ইসলাম তাও দীর্ঘদিন ধরে জমা করে রাখার অনুমতি দেয়নি; বরঞ্চ উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় তা বন্টন করে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এক্ষেত্রে ইসলামী আইনের লক্ষ্য বিশ্বের অন্য সকল আইনের চেয়ে ভিন্নতর। অন্যান্য আইন চেষ্টা করে একবার যে সম্পদ অর্জিত হয়েছে, তা যেনো পুরুষানুক্রমে চিরদিন বহাল থাকে। পক্ষান্তরে ইসলামী আইন অনুযায়ী ব্যক্তি সারাজীবনে যে সম্পদ সঞ্চয় করেছে, তার মৃত্যুর সাথে সাথে তা তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দিতে হয়। নিকটাত্মীয় না থাকলে অংশ অনুপাতে দূরের আত্মীয়রা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর দূরের কোনো আত্মীয়ও যদি না থাকে তাহলে গোটা মুসলিম সমাজ তার উত্তরাধিকার লাভ করবে। এই আইন বিরাট বিরাট সঞ্চিত পুঁজি এবং জমিদারীকে বেশীদিন টিকে থাকতে দেয়না। উল্লিখিত সকল বিধিনিষেধ সত্ত্বেও কারো সম্পদের আধিক্যের কারণে যদি সমাজে কোনো বিকৃতি সৃষ্টি হয়ও, তবে এই শেষ আঘাতই তা নির্মূল করে দেবে।

% | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | সম্পুর্ণ বই এক পেজে »

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.