ইসলামী অর্থনীতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

সপ্তম অধ্যায়ঃ সুদ

[এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় মাওলানা একটি বড় গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। তাতে যুক্তি, ইতিহাস এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ সমস্যার সকল প্রয়োজনীয় দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ‍সুদ অর্থনৈতিক সুবিধা ও ফায়দা লাভের নিকৃষ্টতম হাতিয়ার। এ গ্রন্থে বাণিজ্যিক সুদ ও অবাণিজ্যিক সুদের মধ্যে পার্থক্য করার ভ্রান্ত দৃষ্টিভংগিকেও পূর্ণরূপে খন্ডন করা হয়েছে, সুদবিহীন অর্থনীতির ছাত্রদের জন্যে এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা অত্যন্ত জরুরী। এ অধ্যায়ে আমরা সুদ গ্রন্থটি থেকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ এবং তাফহীমুল কুরআন ও রাসায়েল মাসায়েল থেকে প্রয়োজনীয় আলোচনা উপাস্থপন করছি। কিন্তু সুদ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য মূল গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা জরুরী –সংকলক]।

১. সুদ সম্পর্কে ইসলামের বিধান

[সুদ গ্রন্থ থেকে গৃহীত।]

এবার কুরআন ও হাদীসের আলোকে সুদের পর্যালোচনা করতে চাই। সুদ কি? এর সীমানা কি? সুদ হারাম হবার যেসব বিধান ইসলাম দিয়েছে সেগুলো কোন্ কোন্ ব্যাপারে ও কোন্ কোন্‌ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? সুদের বিলোপ সাধন করে মানব জীবনের অর্থনৈতিক বিষয়াবলীকে ইসলাম কিভাবে পরিচালনা করতে চায়? এগুলোই হবে আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়বস্তু।

রিবার অর্থ

কুরআন মজীদে সুদের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূলে আছে আরবী ভাষায় (আরবী**)ি তিনটি হরফ। এর অর্থের মধ্যে বেশী, বৃদ্ধি, বিকাশ, চড়া প্রভৃতি ভাব নিহিত। যেমন, (আরবী****) (রাবা) অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া ও বেশী হওয়া।
(আরবী ****) অর্থ সে টিলায় চড়লো। (আরবী*****) অর্থ সে ছাতুর মধ্যে পানি ঢাললো এবং ছাতু ফুলে উঠলো। (আরবী*****) অর্থ সে অমুকের কোলে লালিত পালিত হয়েছে। (আরবী****) অর্থ জিনিসটি বৃদ্ধি করেছে। (আরবী****) (রাবওয়াতুন) অর্থ উচ্চতা। (আরবী*****) অর্থ এমন স্থান বা জমি যা ধরাপৃষ্ঠ থেকে উঁচু। কুরআন মজীদে এ শব্দটির মূল থেকে নির্গত শব্দাবলী যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে সেখানেই বৃদ্ধি, উচ্চতা ও বিকাশ অর্থ পাওয়া যায়। যেমন:
فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ
যখন আমি তার ওপ র পানি বর্ষণ করলাম তখন তা সবুজ শ্যামল হয়ে উঠলো এবং শস্য ও ফল দান করতে লাগলো। -আল হজ্জ: ৫
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং সাদকাকে বৃদ্ধি দান করেন। (আল-বাকারা : ২৭৬
فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَابِيًا
যে ফেনপুঞ্জ উপরে উঠে এসেছিল বন্য তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। (আবু রা’আদ: ১৭)
সে তাদেরকে আরো শক্ত করে ধরলো। -আ-হাক্কাহ: ১০
أَنْ تَكُونَ أُمَّةٌ هِيَ أَرْبَى مِنْ أُمَّةٍ
যাতে এক জাতি অন্য জাতি থেকে অগ্রসর হয়ে যায়। -আন নাহল: ৯২
আমি মরিয়ম ও ঈসাকে একটি উচ্চস্থানে আশ্রয় দান করলাম। -আল মুমিনুন: ৫
এ ধাতু থেকেই রিবা (আরবী******) শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ধন বৃদ্ধি হওয়া এবং আসল থেকে বেড়ে যাওয়া। কুরআনেও এ অর্থটি সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
যেমন বলা হয়েছে: (আরবী*****************)
আর লোকদের নিকট তোমাদের যা কিছু সুদ অবশিষ্ট (পাওনা ) রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও আর যদি তোমরা তওবা করে নাও তাহলে তোমাদের মূলধনটাই (অর্থাৎ প্রদত্ত আসল অর্থ) ফেরত পাবার অধিকার তোমাদের আছে। -আল বাকারা: ৩৮
আরবী****************
যে সুদ তোমরা দিয়েছো এ উদ্দেশ্য যে, মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর নিকট তার সাহায্যে ধন বৃদ্ধি হয় না। -আর-রূম: ৩৯
এই আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্ট হযে গেছে যে, আসর অর্থের উপর যা কিচু বাড়তি হবে তা ‘রিবা’ আখ্যা পাবে। কিন্তু কুরান মজীদ ঢালাওভাবে সব রকমের বৃদ্ধিকে হারাম গণ্য করেছে এবং এ বৃদ্ধিকে ‘রিবা’ নাম করণ করেছে। ইসলামপূর্ব যুগে আরবী ভাষায় এ বিশেষ পর্যায়ের লেনদেনটিকে একই নামে অভিহিত করা হতো। কিন্তু তৎকালে লোকেরা ‘রিবা’-কে ব্যবসায়ের ন্যায় বৈধ মনে করতো যেমন আধুনিক জাহেলিয়াতে মনে করা হয়। ইসলাম এসে জানিয়ে দিলে যে, ব্যবসায়ের ফলে মূলধনের যে বৃদ্ধি হয় তা ‘রিবা’র মাধ্যমে বৃদ্ধি থেকে আলাদা। প্রথম ধরনের বৃদ্ধিটি হালাল এবং দ্বিতীয় ধরনের বৃদ্ধিটি হারাম। (আরবী************)
সুদখোরদের এহেন পরিণতি হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলেছে, ব্যবসা রিাব (সুদ) সদৃশ; অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং রিবাকে হারাম গণ্য করেছেন। (আল বাকারা: ২৭৫)
যেহেতু রিবা ছিল একটি বিশেষ ধরনের বৃদ্ধির নাম এবং তা সর্বজন পরিচিত ও প্রসিদ্ধ ছিল তাই কুরআন মজীদে এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। কুরআন এ ব্যাপারে কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করেছ যে, আল্লাহ রিবাকে হারাম গণ্য করেছেন, কাজেই তোমরা এটি পরিহার কর।

জাহেলী যুগের রিবা

জাহেলী যুগের যে সমস্ত লেন-দেনের ক্ষেত্রে ‘রিবা’ শব্দটি ব্যবহার হতো হাদীসে তার বিভিন্ন বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে।
কাতাদাহ বলেন, জাহেলী যুগের রিবা ছিল নিম্নরূপ: এক ব্যক্তি অন্যজনের হাতে কোনো জিনিস বিক্রি করতে এবং মূল্য আদায় করার জন্য তাকে নির্দিষ্ট সময় দিতো। এ সময় অতিক্রান্তের পর যদি সে মূল্য আদায় না করতো, তাহলে তাকে আরো সময় দিতো এবং মূল্য বাড়িয়ে দিতো।
মুজাহিদ বলেন, জাহেলী যুগের রিবা ছিল নিম্ন রূপ। এক ব্যক্তি অন্যের নিকট থেকে ঋণ গ্রণ করে তাকে বলতো, যদি তুমি আমাকে অমুক দিন থেকে অমুক দিন পর্যন্ত সময় দাও তাহলে আমি তোমাকে এ পরিমান বেশী দেবো। (ইবনে জরীর, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৬২)
আবু বকর জাস্সাস তাঁর নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বলেন, জাহেলী যুগে লোকের ঋণ গ্রহণ করার সময় ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হতো। তাতে বলা হতো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আসল মূলধন থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বেশী অর্থ ঋণগ্রহীতাকে আদায় করতে হবে। (আহকামুল কুরনান, ১ম খন্ড)
এ ব্যাপারে ইমাম রাযীর অনুসন্ধান হচ্ছে, জাহেলী যুগে লোকদের মধ্যে একটি বিশেষ নিয়ম প্রচলিত ছিল। তারা এক ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ দিতো এবং তার নিকট থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমান সুদ আদায় করতো। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে ঋণগ্রহীতার নিকট আসল মূলধন চাওয়া হতো। যদি সে আদায় করতে না পারতো তাহলে আরো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে অবকাশ দেয়া হতো এবং সুদ বাড়িয়ে দেয়া হতো। (তাফসীর কবীর, ২য় খন্ড, ৩৫২ পৃ:)
তদানিন্তন আরবে প্রচলিত এ ধরনের লেন-দেনকে আরববাসীরা নিজেদের ভাষায় ‘রিবা’ নাম দিয়েছিল এবং কুরআন মজীদ একেই হারাম ঘোষণা করেছিল। [এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য এ গ্রন্থের পরিশিষ্ট দেখুন।]

ব্যবসা ও রিবার মধ্যে নীতিগত পার্থক্য

ব্যবসা ও রিবার মধ্যে নীতিগত পার্থক্য কি? রিবার বৈশিষ্ট কি. যে কারণে তার চেহারা ব্যবসায়ের থেকে ভিন্ন প্রকার দেখায় এবং ইসলাম কেনইবা তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে- এ ব্যাপারগুলো এবার গভীরাবে চিন্তা করুন।
ব্যবসা বলতে বুঝায়, সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা দু’টি পক্ষ আছে। বিক্রেতা একটি বস্তু বিক্রির জন্য পেশ করে। ক্রেতা ও বিক্রেতা মিলে এ বস্তুটির একটি মূল্য স্থির করে। এ মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা বস্তুটি কিনে নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে বিক্রেতা নিজে পরিশ্রম করে ও অর্থ ব্যয় করে ঐ বস্তুটি তৈরী করেছে অথবা সে কোথাও থেকে বস্তুটি কিনে এনেছে- এ দুটোর যে কেনো একটি অবস্থা অবশ্যি সৃষ্টি হয়। এ উভয় অবস্থায়ই সে বস্তুটি কেনা বা সংগ্রহ করার ব্যাপারে নিজের যে মূলধন খাটিয়েছে তার সাথে নিজের পরিশ্রমের অধিকার সংযুক্ত করে এবং এটিই তার মুনাফা।
অন্যদিকে রিবা বলতে বুঝায়, এক ব্যক্তি নিজের মূলধন অন্য একজনকে ঋণ দেয়। এ সংগে শর্ত আরোপ করে যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণগ্রহীতাকে মূলধনের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বেশী অর্থ আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে মূলধনের বিনিময়ে মূলধন এবং নির্দিষ্ট সময়ের অবকাশের বিনময়ে বাড়তি অর্থ লাভ করা হয়- পূর্বাহ্নে একটি শর্ত হিসেবে যেটিকে নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। এ বাড়তি অর্থের নাম সুদ বা রিবা। এটি কোনো বিশেষ অর্থ বস্তুর বিনিময় নয়, বরং নিছক অবকাশের বিনিময়। যদি ব্যবসাযের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারিত হবার পর ক্রেতার নিকট শর্ত পেশ করা হয় যে, মূল্য আদায় করতে (মনে করুন) একমাস দেরী হলে মূল্য একটি নির্দিষ্ট হরে বেড়ে যাবে, তাহলে এ বৃদ্ধি সুদের পর্য়ায়ভুক্ত হবে।
কাজেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধেল শর্ত সাপেক্ষে মূলধনের উপর যে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়তি অর্থ গ্রহণ করা হয় তাকই সুদ বলা হয়। সুদের সংজ্ঞা এভাবেই নিরূপিত হয়। তিনটি অংশের একত্র সংযোজনই সুদের উদ্ভব। এক. মূলধন বৃদ্ধি। দুই. সময়ের অনুপাতে বৃদ্ধিল সীমা নির্ধারণ। তিন. এগুলোকে শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা। ঋণ সংক্রান্ত য কোনো লেনদেনের মধ্যে এ তিনটি অংশ পাওয়া গেলে তা সুদী লেনদেনে পরিণত হয়। কোনো সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক কাজে লাগানো অথবা কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য এ ঋণ গৃহীত হোক এবং ঋণগ্রহীতর দরিদ্র বা ধনী যাই হোক না কেন তাতে এর আসল চরিত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য সূচিত হয় না।
ব্যবসা ও সূদের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য হচ্ছে নিম্নরূপ:
এক : ব্যবসায়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মুনাফার বিনিময় হয় সমান পর্যাযে। কারণ ক্রেতা বিক্রেতার নিকট থেকে যে বস্তুটি ক্রয় করে তা থেকে লাভবান হয়। অন্যদিকে বিক্রেতা ঐ বস্তুটি ক্রেতার জন্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে যে পরিশ্রম, বুদ্ধি ও সময় ব্যয় করে তার পারিশ্রমিকই সে লাভ করে। বিপরীত পক্ষে সুদী লেনদেন সমান পর্যায়ে মুনাফা বিনিময় হয় না। সুদগ্রহীতা ধনের একটি নির্ধারিত পরিমাণ লাভ করে, যা তার জন্যে অবশ্যি লাভজনক হয়। কিন্তু সুদদাতা কেবলমাত্র সাময়িক অবকাশ লাভ করে, এর লাভজনক হবার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঋণগ্রহীতার ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ঋণ গ্রহণ করে থাকলে সাময়িক অবকাশ তার জন্য লাভজন হয় না বরং নিশ্চিত ক্ষতিকর হয়। আর ব্যবসা, শিল্প, কারিগরী বা কৃষিত খাটাবার উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রণ করে থাকলে অবকাশ তার জন্য একদিকে যেমন লাভের সম্ভাবনা নিয়ে দেখা দেয়, তেমনি অন্যদিকে ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়েও উপস্থিত হয়। কিন্তু ব্যবসাযে লাভ লোকসান যাই হোক না কেন ঋণদাতা সর্বাবস্থায় তা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা লাভ করে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, সদী কারবার এক পক্ষের লাভ ও অন্য পক্ষের লোকসান হয় অথবা এক পক্ষের নিশ্চিত ও নির্দিষ্ট লাভ এবং অন্যপক্ষের অনিশ্চিত ও অনির্ধারিত লাভ হয়।
দুই : ব্যবসায়ে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে যত বেশী মুনাফা অর্জন করুক না কেন মাত্র একবারই সে তা অর্জন করে। কিন্তু সুদী কারবারে মূলধন দানকারী অনবরত নিজের ধনের বিনিময়ে মুনাফা অর্জন করতে থাকে এবং সময় অতিক্রান্তের সাথে সাথে এ মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যেতে থাকে। তার ধন থেকে ঋণগ্রহীতা যতই লাভবান হোক না কেন তা এটি বিশে সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু এ মূলধনের বিনিময়ে ঋণদাতা যে মুনাফা অর্জন করে তার কোনো সীমা নেই। তার এ সীমাহীন মুনাফা তার সমস্ত উপার্জন, সমস্ত উপায় উপকরণ ও ধনদৌলত এবং তার যাবতীয় প্রয়োজনকে ছাপিয়ে যাবার পরও শেষ নাও হতে পারে।
তিন : ব্যবসায়ে পণ্য ও তর মূল্যের বিনিময় হবার সাথে সাথেই কারবার শেষ হয়ে যায়। এর পরে তা ক্রেতা কোনো পণ্য বা বস্তু বিক্রেতাকে ফেরত দেয় না। কিন্তু সুদী কারবারে ঋণগ্রহীতর মূলধন গ্রহণ করার পর তা ব্যয় করে ফেলে; অতপর এ ব্যয়িত বস্তু, পুনর্বার সংগ্রহ করে, তার সাথে সুদের বাড়তি অংশ সংযুক্ত করে, তাকে ফেরত পাঠাতে হয়।
চর : ব্যবসা, শিল্প, কৃষি ও কারিগরীতে মানুষ পরিশ্রম করে ও বুদ্দি খাটিযে তার ফল লাভ করে। কিন্তু সুদী কারবারে সে নিছক নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন খাটিযে কোনো প্রকার পরিশ্রম না করে, চিন্তা ও বুদ্ধি শক্তি ব্যবহার না করে, অন্যের উপার্জনের সিংহভাগ দখল করে বসে। পারিভাষিক অর্থে যাকে অংশীদার বলা হয়, যে ব্যক্তি লাভ-লোকসান উভয়তেই অংশীদার থাকে এবং লাভের আনুপাতিক হারে তা থেকৈ অংশ নেয়, সে তেমন ধরনের অংশীদার নয়; বরং সে হয় এমন একজন অংশীদার, যে লাভ-লোকসান এবং আনুপাতিক হারের পরোয়া না করে, নিজের নির্ধারিত ও শর্তাবদ্ধ মুনাফার দাবীদার হয়।

রিবা হারাম হবার কারণ

এসব কারণে আল্লাহ ব্যবসা হালাল ও সুদ হারাম করেছেন। এ কারণগুলো ছাড়া সুদ হারাম হবার আরো অনেক কারণ আছে, ইতিপূর্বে আরা সেগুলো আলোচনা করেছি। সুদ কার্পণ্য, স্বার্থন্ধতা, হৃদয়হীনতা, নিষ্ঠুরতা ও অর্থগৃধ্মতার অসৎ গুণাবলী মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে। বিভিন্ন জাতির মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করে। মানুষের সধ্যকার সহানুভূতি ও পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক ছিন্ন করে। মানুষের মধ্যকার সহানুভূতি ও পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগির সম্পর্ক ছিন্ন করে। মানুষেল মধ্যে ধন সঞ্চয় করে নিছক নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। সমাজে ধনের অবাধ গতি ও আবর্তনে বাধা দেয়; বরং ধনের আবর্তনের গতি ঘুরিয়ে বিত্তহীনদের থেকে বিত্তবানদের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তার কাণ সমগ্র দেশবাসীর ধন সমাজে একটি শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। এর ফলে সমগ্র সমাজ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। অর্থনীত বিশেষজ্ঞগণের নিকট এ ব্যাপারটি মোটেই প্রচ্ছন্ন নেই। সুদের এ সকল প্রভাব অনস্বীকার্য। কাজেই এ সত্যটিও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, যে কাঠামোর ভিত্তিতে ইসলাম মানুষের নৈতিক প্রশিক্ষণ, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সুসংহত করা ও তার অর্থনৈতিক প্রশিক্ষণ, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সুসংহক করা ও তার অর্থনৈতিক জীবন সংগঠিত করতে চায় সুদ তার প্রতিটি অংশের পূর্ণ পরিপন্থী। নগন্যতম সুদী কারবার ও তার আজপত সর্বাধিক নিষ্কুলুষ অবস্থাও িইসলামের সমগ্র কাঠামো নষ্ট করে দেয়। এ কারণেই আল্লাহ কুরআন মজীদে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সুদ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
(আরবী****************)
আল্লাহকে ভয় কর আর লোকদে নিকট তোমাদের সুদ পাওনা বাকী রয়ে গেছে সেগুলো ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমান রেখে থাক। আর যদি তোমরা এমনটি না কর, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধেল ঘোষণা গ্রহণ কর। -আল বাকারা

সুদ হারামের ব্যাপারে কঠোর নীতি

কুরআন মজীদে বহুবিধ গুনাহের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হযেছে এবং সেগুলোর জন্য কঠোর শাস্তি ও ভীতি প্রদর্শন করাও হয়েছে। কিন্তু সুদের ন্যায় এতো কঠোর ভঅষায় অন্য কোনো গুনাহের প্রতি নিষেধাজ্ঞঅ আরোপিদ গয়নি।[ এক হাদীসে বলা হয়েছে, সুদের গুনাহ নিজের মায়ের সাথে যিনা করার চাইতেও সত্তর গুণ বেশী। (ইবনে মাজাহ)] এজন্য ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বত্র ‍সুদ বন্ধ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) চরম প্রচেষ্টা চালান। তিনি নাজরানের খৃস্টানদের সাথে যে চুক্তি করেন তাতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখে পাঠান, যদি তোমরা সুদী কারবার কর, তাহলে তোমাদের সাথে চুক্তি ভেঙ্গে যাবে এবং আমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। বনু মগীরার সুদী লেনদেন আরবে প্রসিদ্ধ ছিল। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সমস্ত পাওনা সুদ বাতিল করে দেন এবং মক্কায় তাঁর নিযুক্ত তহশীলদারদেরকে লিখে পাঠান, যদি তারা (বনু মগীরা) সুদ গ্রহণ করা ন্ধ না করে তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ কর। রাসূলে করীম (সা)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা) ও একজন বড় মহাজন ছিলেন। বিদায় হজ্জে রাসূলে করীম (সা) ঘোষণা দিলেন : জাহেলী যুগের সমস্ত বাতিল করে দেয়া হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস (রা)-এর সুদ বাতিল করলাম। তিনি এতদূরও বললেন, সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের চক্তিপত্র লেখক এবং এর ওপর সাক্ষ্যদতা সবার ওপর আল্লাহর লানত!
এসব বিধানের উদ্দেশ্য কি ছিল? নিছক একটি বিশেষ ধরনেসর সুদ অর্থা (মহাজনী সুদ) বন্ধ করে দিয়ে বাদবাকী সব রকমের সুদ চালু রাখা ও বিধানগুলোর উদ্দেশ্য ছিল না বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল,. পুঁজিবাদী নৈতিকতা ও চরিত্র, পুঁজিবাদী মানসিকতা, পুঁজিাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবসথঅ এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করে এমন একটি ব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থঅর পূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে থাকবে কর্পণ্যের পরিবর্তে বদান্যতা, স্বার্থান্ধতার পরিবর্তে সহানুভূতি ও পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা , সুদের পরিবর্তে যাকাত এবং ব্যাংকের পরিবর্তে থাকবে জাতীয় বায়তুলমাল। এ ক্ষেত্রে এমন অবস্থার সৃষ্টিই হবে না যার ফলে কোঅপারেটিভ সোসাইটি, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী ও প্রভিডেন্ট ফান্ড প্রভৃতির প্রয়োজন দেখা দেয় এবং সর্বশেষ কমিউনিজমের প্রকৃতি বিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

২. সুদের প্রয়োজন : একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা

এযাবত আমরা বিষয়টি সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশনা পেশ করেছি। এবার বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর উপর কিছু আলোচনা করবো।

সুদ কি যুক্তিসম্মত

সুদ কি যথার্থিই একটি যুক্তিসংগত বিষয়? কোনো ব্যক্তি ঋণ বাবদ প্রদত্ত অর্থের উপর সুদ দাবী করলে তাকে কি বুদ্ধিসম্মত বলা যেতে পারে এবং তার দাবীটি কি ন্যায়সংগত বলে বিবেচিত হবার যোগ্য? কোনো ব্যক্তি একজনের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করলে সে ঋণ বাবদ গৃহীত আসল অর্থ ফেরত দেবার সাথে সাথে তাকে কিছু সুদও প্রদান করবে, এটা কি ইনসাফের দাবী? সর্বপ্রথম এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা হওয়া উচিত। এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা হয়ে গেলে আমাদের আলোচনার অর্থেক বিষয় আপনাআপনি মীমাংসিত হয়ে যাবে। কারণ সুদ একটি যুক্তিসংগত বিষয় বলে বিবেচিত হলে, সুদ হারাম হবার ব্যাপারটি নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে। আর যদি বুদ্ধি ও ইনসাফের দৃষ্টিতে সুদ যুক্তিসংগত প্রমাণিত না হয়,, তাহলে মানব সমাজে এ অযৌক্তিক বিষয়টিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন কোথায় এ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

ক. ঝুঁকি ও ত্যাগের বিনিময়

এ প্রশ্নের জবাবে আমরা সর্বপ্রথম যে যক্তিটির সম্মুখীণ হই তা হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজের সঞ্চিত ধনসম্পদ অন্যকে ঋণ দেয় সে বিপদ বরণ করে, ত্যাগ স্বীকার করে, নিজের প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে অন্যেল হাতে সোপর্দ করে। ঋণগ্রহীতা নিজের কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ঋণ গহণ করলে তাকে অবশ্যি ঐ সম্পদের ভাড়া আদায় করা ‍উচিত। যেমন বাড়ী, গাড়ী আসবাবপত্রের বাড়া আদায় করা হয়ে থাকে। ঋণদাতা নিজের শ্রমোপার্জিত অর্থ নিজে ব্যবহার না করে তাকে প্রদান করে যে ঝুঁকি বরণ করে নিয়েছে িএ ভাড়া তার বিনিময় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। আর ঋণগ্রহীতা এ অর্থে কোনো মুনাফা সৃষ্টিকারী কাজে খাটাবার জ্য গ্রহণ করে থাকলে ঋণদাতা অবশ্যি তার নিকট সুদ দাবী করার অধিকার রাখবে। ঋণগ্রগীদা যেখানে অন্যের অর্থ থেকে লাভবান হচ্ছে, সেখানে ঋণদাতা ঐ লাভের ন্যায্য অংশ পাবে না কেন? ঋণদাতা নিজের অর্থ অন্যের হাতে সোপর্দ করার ব্যাপারে বিপদ বরণ করে নেয় এবংয় ত্যাগ স্বীকার করে একথা সত্য; কিন্তু এ বিপদ বরণ ও ত্যাগ স্বীকারের মূল্য হিসেবে বছরে ছ’মাসে বা মাসে শতকরা পাঁচ বা দশ ভাগ আদায় করার যৌক্তিকতা কোথায়? বিপদ বরণ করে নেয়ার কারণে সে যক্তিসংগতভাবে যে অধিকার লাভ করে তা হচ্ছে, সে ঋণগ্রহীতর নিকট থেকে কোন জিনিস বন্ধকস্বরূর রেখে দিতে পারে অথবা জামানত তলব করতে পারে। এসব কিছুতে সম্মত না হলে তার আদতে বিপদ বরণ না করা এবং ঋণদানে অস্বীকার করা উচিত। কিন্তু বিপদ কোনো ব্যবসার পণ্য নয়, যার কোনো মূল্য দান করা যেতে পারে বা কোনো গৃহ, আসবাবপত্র ও যানবাহন নয়, যার কোনো ভাড়া আদায় করা যেতে পারে। অবশ্য ত্যাগ স্বীকারের ব্যাপারে বলা যেতে পারে যে, ব্যবসাযে পরিণত না হওয়া পর্যন্তই তা ত্যাগ বলে গণ্য হতে পারে। ত্যাগ স্বীকারের উদ্দেশ্য থাকলে যথার্থ ত্যাগ স্বীকারই করা উচিত এবং এ নৈতিক কাজটির নৈতিক লাভের উপরই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। আর যদি বিনিময় ও পারিশ্রমিকের প্রশ্ন তোলা হয় তাহলে ত্যাগের কথা না উঠানোই সংগত; বরং সরাসরি ব্যবসায়িক ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে অবশ্যেই তকে জানাতে হবে যে ঋণের ব্যাপারে আসল অর্থের বাইরে মাসিক বা বার্ষিক সে যে আর একটি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে, তার অধিকারী সে হলো কিসের ভিত্তিতে?
এটা কি তার ক্ষতিপূরণ? কিন্তু সে ঋণ বাবদ যে অর্থ দিয়েছে তা ছিল তার প্রয়োজনের অতিরিক্স। সে নিজেও এ অর্থটি ব্যবহার করছিল না। কাজেই এখানে আসলে কোনো ক্ষতি হয়নি এবং এ ঋণদানের জন্য কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ লাভের অধিকারীও সে হতে পারে না।
এটা কি ভাড়া বাবদ প্রাপ্য অর্থ? কিন্তু ভাড়া এমন সব জিনিসের হয়ে থাকে যেগুলোকে ভাড়াটের উপযোগী ও তার জন্য ব্যবহারযোগ্য করার জন্য মানুষ নিজের সময়, অর্থ ও শ্রম নিয়োজিত করে। ভাড়াটের ব্যবহারের কারণে সেগুলো নষ্ট হয়, ভেঙ্গে চুরে যায়, যার ফলে সেগুলোর মূল্য কমে যেতে থাকে। ব্যবহার্য দ্রব্যাদি যেমন, আসবাবপত্র, গৃহ ও যানবাহনের ক্ষেত্রে একথা যথার্থ এবং এ বস্তুগুলোর ভাড়া আদায় করাও যুক্তিসংগত; কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে একথা যথার্থ এবং এ বস্তুগুলোর ভাড়া আদায় করাও যুক্তিসংগত; কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে এ সংজ্ঞা যথার্থ নয়, যেমন গম, ফুল ইত্যাদি এবং টাকা পয়সাও এই একই গোত্রভুক্ত। কারণ টাকা পয়সা নিছক বস্তু ও সেবা ক্রয় করার একটি মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই এসব বস্তুর ভাড়ার প্রসঙ্গ অর্থহীন।
কোনো ঋণদাতা বাড়জোর এতটুকু বলতে পারে: আমার নিজের অর্থ থেকে আমি অন্যকে লাভবান হবার সুযোগ দিচ্ছি, কাজেই এ লাভে আমারও অংশ রয়েছে। এটা অবশ্যি যুক্তিসংগত কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে অভাবী ও বুভুক্ষু ব্যক্তি নিজের অভূক্ত সন্তানদের পেটে দুমুঠো আহার যোগাবার জন্য আপনার নিকট থেকে ৫০ টাকা হওলাত নিয়েছে, সে কি সত্যিই ঐ টাক থেকে এমনভাবে ‘লাভবান’ হচ্ছে, যার ফলে আপনি তা থেকে নিজের অংশ হিসেবে মাসে মাসে শতকরা ২ টাকা বা ৫ টাকা হারে পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন? লাভবান সে অবশ্যি হচ্ছে এবং তাকে এ সুযোগটি নিঃসন্দেহে আপনিই দিয়েছেন: ন্তিু বুদ্ধি বিবেক, ইনসাফ, অর্থনীতি বিজ্ঞান, ব্যবসা নীতি- কিসের দৃষ্টিতে এ লাভ বা লাভবান হবার সযোগকে এমন পর্যায়ে আনা যেতে পারে,. যার ফলে আপনি তার একটি আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন? ঋণগ্রহীতার বিপদ যতই কঠিন হবে এ মূল্যও ততই বাড়তে থাকবে; তার বিপদকাল যত দীর্ঘ হতে থাকবে আপনার প্রদত্ত এ লাভবান হবার সুযোগের মূল্যও তত মাস ও বার্ষিক হারে থাকবে আপনার প্রদত্ত এ লাভবান হবার সুযোগের মূল্যও তত মাস যত বার্ষিক হারে বাড়তে থাকবে? একজন অভাবী ও বিপদগ্রস্তকে নিজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থাদান করার মতো বিরাট হৃদয়বত্তার অদিকারী যদি আপনি না হয়ে থাকেন, তাহল আপনার ঐ অর্থ তার নিকট থেকে ফেরত পাবার ব্যাপারে সর্বপ্রকারে নিশ্চিন্ত হয়ে নিন, তারপরিই তাকে অর্থ ঋ দিন। এটাই আপনার জন্য যুক্তিসঙ্গত পন্থঅ। আর যদি ঋণ দিতেও আপনার মন সায় না দেয়, তাহলে তাকে কোনো প্রকার সাহায্য করবেন না, এও একটা যুক্তিসঙ্গত কথা। কিন্তু কোনো ব্যক্তির বিপদ-দুঃখ-কষ্ট আপনার জন্য মুনাফা সংগ্রহের সুযোগরূপে গণ্য হবে এবং অভূক্ত পেট ও মুত্যুপথযাত্রী রোধী আপনার জন্য অর্থ খাটাবার () ক্ষেত্র বিবেচিত হবে; উপরন্তু মানুষের বিপদ বাড়ার সংগে সংগে আপনার লাভেল সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে থাকবে, এটা কোন ধরনের যুক্তিসংগত ব্যবসা।
‘লাভবান হওয়ার সুযোগ দেয়াৎ যদি কোনো অবস্থায় যদি কোনো অবস্থায় কোনো আর্থিক মূল্যের অধিকারী হয় তাহলে তা কেবলমাত্র এমন এক অবস্থায় হতে পারে যখন অর্থ গ্রহণকারী তা কোনো ব্যবসায়ে খাটায়। এ অবস্থায় অর্থদানকারী একথা বলার অধিকার রাখে যে, তার অর্থ থেকে অন্য ব্যক্তি যে লাভ কুড়াচ্ছে তার মধ্যে তার ন্যায্য অংশ রয়েছে এবং এ অংশ তার পাওয়া উচিত। কিন্তু বলাবাহুল্য পুঁজি একাকী কোনো মুনাফার সৃষ্টির যোগ্যতা রাখে না। মানুষের শ্রম ও যোগ্যতা তার সাথে যুক্ত হলে তবেই সেই মুনাফা দানের যোগ্যতা অর্জন করে। আবার মানুষের শ্রম ও যোগ্যতা তার সাথে যুক্ত হবার সাথে সাথেই সে মুনাফা দান করতে শুরু করে না; বরং মুনাফা দানের জন্য তার একটি মেয়াদের প্রয়োজন হয়। উপরন্তু তার মুনাফা দান নিশ্চিতও নয়- সেখানে ক্ষতি ও দেউলিয়া হবার আশংকাও থাকে। আর লাভজনক হবার ক্ষেত্রে কোন সময় কি পরিমাণ মুনাফা দেবে তা পূর্বাহ্নে সম্ভব হয়না এক্ষেত্রে মানুষের শ্রম ও যোগ্যতা যখন পর্যন্ত ঐ অর্থের ধারে কাছেও পৌছাতে পারেনি তখন থেকেই কেমন করে অর্থদানকারীর মুনাফা শুরু হযে যেতে পারে? উপরন্তু মুনাফার হার ও পরিমাণেই বা কেমন করে নির্দিষ্ট করা যেতে পারে, যখন পুঁজির সাথে মুনাফা সৃষ্টি হবে তাও জানা নেই?
যে ব্যক্তি নিজের অতিরিক্ত সঞ্চিত অর্থ কোনো মুনাফা সৃষ্টিকারী কাজে লাগাতে চায় তার শ্রম বিনিয়োগকারীদের সাথে অংশীদার হবার পরিবর্তে তাকে একশো টাকা ঋণ দিযে থাকি এবং তকে বলি, যেহেতু তুমি এ অর্থ থেকে লাভবান হবে, তাই আমার টাকা হারে মুনাফা দিতে থাকবে, এটা কোন ধরনের যুক্তসঙ্গত পদ্ধতি হতে পারে? প্রশ্ন হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ পুঁজির পিছনে পরিশ্রম খাটিতে তা থেকে মুনাফা অর্জিত হতে শুরু না হয়, ততক্ষণ সেখানে কোন ধরনের সঞ্চিত মুনাফা থাকে যা থেকে আমি নিজের অংশ দাবী করার অধিকার রাখি? যদি ঐ ব্যক্তি তার ব্যবসায়ে লাভের পরিবর্তে ক্ষতির সম্মুখীণ হয় তাহলে কোন্ বিবেক ও ইনসাফের প্রেক্ষিতে আমি তার নিকট থেকে মাসিক মুনাফা আদায় করার অধিকার রাখতে পারি? যদি তার মুনায়া মাসিক এক টাকার চেয়ে কম হয় তাহের আমর মাসিক এক টাকা আদায় করার কি অধিকার আছে? আর তার সমগ্র মুনাফাই যতি হয় একটা তাহললে এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সারা মাস নিজের সময়, শ্রম, যোগ্যতা, বুদ্ধি, সাম্থ্য ও নিজের ব্যক্তিগত পুঁজি সবকিছু খাটালো, সে কিছুই পেলো না; অথচ আমি কেবলমাত্র একশো টাকা তাকে দিয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম; কিন্তু মুনাফার সবটুকু আমি লুটেপুটে নিয়ে গেলাম, এটা কোন্ ধরনের ইনসাফ? কলুর বলদও যুদি সারাদিন ঘানি টানে তাহলে কলুর নিকট কমপক্ষে সে নিজের আহার চাইবার দাবী রাখে, কিন্তু এ সুদীঋণ মানুষকে এমন এক বলদে পরিণত করে, যে কলুর জন্য সারা দিন ঘানি টানবে, কিন্তু আহার তাকে বাইরে কোথাও থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া যায় যে, কোনো ব্যবসায়ী ব্যক্তির মুনাফা ঐ নির্ধারিত অর্থের চেয়ে বেশী হয়, যা ঋণদাতা সুদের আকারে তার ঘারে চাপিয়ে দেয়, তাহলেও বুদ্ধিবৃত্তি, ইনসাফ, ব্যবসা নীতি অর্থনৈতিক রীতিনীতি কোনোকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে একথা যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করা যেতে পারে না যে, যারা আসল উৎপাদনকারী, যারা সমাজের প্রয়োজনীয় বস্তু প্রস্তুত ও সংগ্রহ করার জন্য নিজেদের সময় ব্যয় করে, পরিশ্রম করে, মস্কিষ্ক পরিচালনা করে এবং নিজেদের শরীর ও মস্কিষ্কের সমুদয় শক্তি ব্যবহার করে, তাদের সবার লাভ সংশয়যুক্ত ও অনির্দিষ্ট থেকে যাবে, কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের অতিরিক্ত সঞ্চিত অর্থ ঋণ দিয়েছে, একমাত্র তার লাভ নিশ্চিত ও নির্ধারিত হবে। তাদের সবার জন্য ক্ষতির আশংকা রয়েছে, কিন্তু তার জন্য রয়েছে লাভের গ্যারান্টি। সবার লাভের হার বাজারের দামের সাথে উঠানামা করে, কিন্তু সে একাই এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যে নিজের জন্য লাভের যে অংক নির্ধারিণ করে নিয়েছে, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তা কোনো প্রকার রদবদল ছাড়াই যথানিয়মে পেয়ে যেতে থাকে।[এখানে অবশ্যি আপত্তি উত্থাপন করা যেতে পারে যে, তাহলে টাকার বিনিময়ে জমি বর্গা দেয়াকে কেমন করে বৈধ গণ্য করা যায়? তার অবস্থাও সুদের সমপর্যায়ভুক্ত। কন্তিু এ আপত্তি আসলে তাদের বিরুদ্দে উত্থাপিক হয় যারা আগাম টাকা নির্ধারিত করে জমি বর্গা দেয়। যেমন বিঘাপ্রতি ২০ টাকা বা একর প্রতি ৫০ টাকা হিসেবে নির্ধারিত করে নেয়াকে যারা বৈধ গণ্য করে তাদের বিরুদ্ধে এ আপত্তি উত্থাপন করা যেতে পারে। আমি এ নীতির সমর্থক নই। আমি নিজেও এসে সুদের সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে করি। কাজেই এ আপত্তির জবাব দেয়া আমার দায়িত্ব নয়। এ ব্যপারে আমার নীতি হচ্ছে জমির মালিক ও কৃষকের মধ্যে ভাগচাষের সম্পর্কই যথার্থ। অর্থাৎ উৎপন্ন শস্যেল কত অংশ কৃষকের ও কত অংশ জমি মালিকের সে ব্যাপারে উভযের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হবে। সৌথ কারবারের অংশীদারীত্বের সাথে এর সাদৃশ্য ব্যাপার রয়েছে। এ ধরনটিকে আমি বৈধ মনে করি। আর জমির ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে যে অবস্থাটিকে আমি বৈধ মনে করি, আমার ‘মাসয়ালায়ে মিলকিয়াতে যমীন’ গ্রন্থে তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি। তার বিরুদ্ধে এ আপত্তি উত্থাপিত হয় না।]

খ. সহযোগিতর বিনিময়

এ সমালোনা থেকে একটি কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ সদকে যুক্তিসঙ্গত বস্তু গণ্য করার জন্য প্রথম পর্যায়ে যেসব যুক্তিকে যথেষ্ট মনে করা হয় একটু গভীরভঅবে চিন্তা করলে সেগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য যে ঋণ গ্রহণ করা হয় তার উপর সুদ আরোপ করার স্বপক্ষে কোনো বুদ্ধিসম্মত যুক্তিই থাকতে পারে না। এমনকি, সুদের সমর্থকগণও এ দুর্বল মামলাটির ব্যাপারে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। তবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যে ঋণ গ্রহণ করা হয়, তার ব্যাপারেও সুদ সমর্থকদের সম্মুখে এ জটিল প্রশ্ন দেখা দেয় যে, এ সুদকে মূলত কোন বস্তুতর মূল্য মনে করা হচ্ছে? ঋণদাতা নিজের অর্থের সাথে ঋণগ্রহীতাকে এমন কী বাস্তব সত্ত্মূলক (Substential) জিনিস দেয় যার একটি আর্থিক ঐ মূল্যও থাকে এবং মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে ঐ মূল্য লাভ করার অধিকারী হয়? এ জিনিসটি চিহ্নিত করার জন্য সুদ সমর্থকগণকে যথেষ্ট বেকায়দায় পড়তে হয়েছে।
একদল লে, সে জিনিসটি হচ্ছে ‘লাভবান হবার সুযোগ।’ কিন্তু উপরের পর্যালোচা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, এ ‘সুযোগ’ কোনো নির্দিষ্ট, নিশ্চিত ও নিত্যকার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূ্ল্যের স্বত্ব সৃষ্টি করে না; বরং এটি এমন এক অবস্থায় আনুপাতিক লাভের স্বত্ব দান করে, যখন প্রকতপক্ষে ঋণ গ্রহণকারী লাভের মুখ দেখে।
দ্বিতীয় দল সামান্য হেরফের করে বলে, সে জিনিসটি হচ্ছে ‘অবকাশ’। ঋণদাতা নিজের অর্থেল সাথে এ ‘অবকাশ’ ব্যবহারের জন্য ঋণগ্রহীতাকে দান করে। এ অবকাশেরে এ অবকাশেল একটি মূল্য রয়েছে এবং এটি দীর্ঘ ও দীর্ঘতর হবার সাথে সাথে এর মূল্যও বেড়ে থাকে। কোনো ব্যক্তি যেদিন থেকে অর্থ নিয়ে কাজে লাগায়, সেদিন শুরু করে যেদিন ঐ অর্থের সাহায্যে প্রস্তুত দ্রব্য বাজারে পৌঁছে যায় এবং মূল্য আন ঐ দিন পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ব্যবসায়ীর নিকট অতীব মূল্যবন। সে যদি এ অবকাশ না পায় এবং মাঝপথেই তার নিকট থেকে অর্থ ফেরত নেয়া হয়, তাহলে আদতে তার ব্যবসা চলতে পারে না। কাজেই যেড ব্যক্তি অর্থ ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ে খাটাচ্ছে, তার নিকট এ সময়টি অবশ্যি একটি মূল্য রাখে এবং সে এ মূল্য থেকে লাভবান হচ্ছে। কাজেই অর্থদানকারী এ লাভের অংশ পাবে না কেন? আবার এ সময়ের কমবেশীর কারণে ঋণগ্রহীতার লাভের সম্ভাবনাও কমবেশী হতে থাকে। কাজে সময়ের দীর্ঘতা ও স্বল্পতার ভিত্তিতে ঋণদাতা এর মূল্য নির্ধারণ করবে না কেন?
কিন্তু এখানেও আবার ঐ একই প্রশ্ন দেখা দেয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অর্থদাতার নিকট থেকে ব্যবাসায় খাটাবার জন্য অর্থ নিচ্ছে, সে নিশ্চিতরূপে ব্যবসায় লাভ করবে. ক্ষতি হবে না- একথা সে কেমন করে জানলো? উপরন্তু তার লাভেও নিশ্চিতরূপে শতকরা একটি নির্দিষ্ট হারেত হতে থাকবে; কাজেই তা থেকে অর্থাদানকারীকে অবশ্যিই শতকরা একটি নির্দিষ্ট হারে অংশ আদায় করা উচিত- একথাই বা সে জানলো কেমন করে? এ ছাড়া যে সময়ে সে ঋণগ্রহীতাকে নিজের অর্থ ব্যবাহরের অবকাশ দিচ্ছে ঐ সময় প্রতি বছর ও প্রতিমাসে নিশ্চিতরূপে একটি বিশেষ পরিমান মুনাফা অর্জিতহবে, কাজেই এর একটি নির্দিষ্ট বা মাসিক মূল্য স্থিরীকৃত হওয়া উচিত- এ হিসেবে জানার জন্য কোন্ ধরনের যন্ত্রই বা তার নিকট আছে, তা আমাদের অবশ্যই জানা উচিত? সুদ সমর্থকদের নিকট এ প্রশ্নগুলো কোনো সঠিক ও সংগত জবাব নেই। কাজেই আবার সে আগের কথায়ই ফিরে আসতে হয়। অর্থাৎ ব্যবসায়িক ব্যাপারে যদি কোনো জিনিস যুক্তিসঙ্গত হয়ে থাকে, তাহলে তা হচ্ছে একমাত্র লাভ ও লোকসানের ভিত্তিতে অশীদারীত্ব, নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট হারে যে সুদ চাপিয়ে দেয়া হয় তা নয়।

গ. লাভে অংশীদারিত্ব

আর একদল বলে, মুনাফা অর্জন হচ্ছে অর্থেল নিজস্ব গুণ। কাজেই কোনো ব্যক্তি যখন অন্যের সংগৃহীত অর্থ ব্যবাহার করে, তখন ঐ অর্থই এমন অধিকার সৃষ্টি করে, যার ফলে অর্থদাতা সুদ চাইতে পারে এবং ‍ঋণগ্রহীতা তা আদায় করতে বাধ্য। প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদন ও সংগ্রহে সাহয্য করার শক্তি অর্থের রয়েছে। অর্থের সাহায্যে যে পরিমাণ দ্রব্য উৎপন্ন হয়, তার সাহায্য ব্যিতিরেকেসে পরিমাণ উৎপন্ন হতে পারে না। অর্থের সাহায্যে উন্নত ধরনের দ্রব্যাদি বেশী পরিমাণে তৈরী হয় এবং তা অধিক মূল্যে বাজারে ভালো দামে বিক্রিও হয় না। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, মুনাফা অর্জনের গুণ লাভের অধিকার সৃষ্টি করে।
কিন্তু অর্থ মুনাফা দানের নিজস্ব গুণে গুণান্বিত প্রথমত এ দাবীটিই দ্ব্যর্থহীনভাবে তার মধ্যে এ শক্তি সৃষ্টি হয়। কেবল তখনই একথা বলা যেতে পারে যে, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি যেহেতু অর্থ ব্যবহার করে মুনাফা অর্জন করছে, কাজেই এ মুনাফা থেকে অর্থদাতাকে অংশ দেয়া উচিত। কিন্তু যে ব্যক্তি রোগীল চিকিৎসা বা মৃতের কাফন দাফনের জন্য ঋণ গ্রহণ করে, তার এ অর্থ অর্থ কোন ধরনের অর্থনৈতিক মুল্য ‍সৃষ্টি করে, যা থেকে ঋণদাতা অংশ গ্রহণ করতে পারে?
উপরন্তু মুনাফাজনক কাজে যে অর্থ লাগানো হয়, তা সবক্ষেত্রেই নিশ্চিতরূপে অধিক মূল্য দান করে না। কাজেই মুনাফাদান অর্থের নিজস্ব গুন- এ দাবী অর্থহীন। অনেক সময় কোনো কাজে বেশী অর্থ লাগানো হয়, কিন্তু এর ফলে মুনাফা বাড়ায় পরিবর্তে কমে যায়। এমনকি, অবশেষে তাতে লোকসান দেখা দেয়। আজকাল কিছুদিন পর পর ব্যবসা জগতে যে অচলাবস্থার (Crisis) সৃষ্টি হচ্ছে এর কারণস্বরূপ একথাই বলা যায় যে, পুঁজিপতিরা নিজেদের ব্যবসায়ে যখন অজস্র অর্থ ঢেলে দিতে থাকে এবং উৎপাদন বেড়ে যেতে থাকে, তখন দ্রব্যের দাম কমতে থাকে, ফলে উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে দাম এতো কমে যেতে থাকে যে, পুঁজি বিনিয়োগ কোনো প্রকার লাভের সম্ভাবনা থাকে না।
এ ছাড়াও পুঁজির মধ্যে মুনাফাদানের কোন শক্তি যদি থেকে থাকে, তাহলে তা বাস্ববরূপ লাভ করার জন্য আরো কয়েকটি জিনিসের উপর নির্ভরশীল হয়। যেমন, পুঁজি ব্যবহারকারীদের পরশ্রম যোগ্যতা, মেধা ও অভিজ্ঞতা ব্যবহারকালীন অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার আনুকূল্য এবং সমকালীন বিপ আপদ থেকে নিরাপত্তা লাভ। এ বিষয়গুলো এবং এ ধরনের আরো বুহ বিষয় মুনাফাদানের পূর্বশর্ত। এগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি শর্ত না পাওয়া গেলে অনেক সময় পুঁজির সমস্ত মুনাফাদানের ক্ষমতাই শেষ হয়ে যায়; বরং উল্টো লোকসানও দেখা দেয়। কিন্তু সুদী ব্যবসায়ে পুঁজি দানকারী ব্যক্তি এসম শর্ত পূর্ণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করে না এবং একথাও স্বীকার করে না যে, ঐ শর্তগুলোর কোনোটির অনুপস্থিতির কারণে তার পুঁজি মুনাফাদানে অক্ষম হলে, সে সুদ গ্রহণ করবে না। সে বরং উলটো দাবী করে, তর পুঁজি ব্যবহার করলেই সে একটি নির্দিষ্ট হাসে সুদ লাভের অধিকারী হবে তার পুঁজি বাস্তবে কোনো প্রকার মুনাফা লাভে সক্ষম হোক বা না হোক, তার এ অধিকারে কোনো পার্থক্য সূচিত হবে না।
অবশেষে যদি একথাও মেনেও নেয়া যায় যে, পুঁজির মধ্যে মুনুফা দান করার ক্ষমতা রয়েছে, যার ভিত্তিতে পুঁজি দানকারী মুনাফা অংশীদার হবার অধিকার লাভ করে, তাহলেও প্রশ্ন দেখা দেয়, আপনার নিকট এমন কোনো হিসেব আছে যার ভিত্তিতে আপনি বর্তমানে পুঁজির মুনাফাদন করার ক্ষমতা নির্দিষ্ট করতে পারেন এবং যারা বিনিয়োগ করে সেই ভিত্তিতে তাদের সুদের হার নির্ধারিত করতে পারেন? আর বর্তমান সময়ের জন্য কোনো হিসেবের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করা সম্ভবপর বলে যদি মেনে নেয়া হয়, তাহলেও আমরা একথা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম যে, ১৯৪৯ সালে পুঁজিপতি কোনো ব্যবসা সংস্থাকে ১০ বছর মেয়াদে এবং অন্য একটি সংস্থাকে ২০ বছর মেয়াদে তৎকালীন প্রচলিত হারে সুদীঋণ দিয়েছিলেন, তিনি কিসের ভিত্তিতে একথা জানতে পেরেছিলেন যে পরবর্তী ১০ ও ২০ বছরের এবং অন্য একটি সংস্থার সাথে বিশ বছরের চুক্তি করে তাদের নিকট থেকে ১৯৪৯ সালের হার অনুযায়ী নিজের পুঁজির সম্ভাব্য মুনাফার অংশ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন, তাকে আমরা কোন্ যুক্তির ভিত্তিতে এ অধিকার দান করবো?

ঘ. সময়ের বিনিময়

সর্বশেষ ব্যাখ্যায় একটু বেশী বুদ্ধি প্রয়োগ করা হয়েছে। এর সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে: মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দূরে ও ভবিষ্যতের লাভ ও আনন্দের উপর নিকটের উপস্থিত লাভ, আনন্দ, স্বাদ ও তৃপ্তিকে অগ্রাধিকার দান করে। ভবিষ্যত যতই দূলবর্তী হয় তার লাভ ও স্বাদ ততই সংশয়পূর্ণ হয় এবং সে অনুপাতে মানুষের দৃষ্টিতে তার মূল্যও কমে যায়। এ নিকটবর্তীয় অগ্রাধিকার ও দূরবর্তী পিছিয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন:
এক : ভবিষ্যত অন্ধকারের গর্ভে জীবন অনিশ্চিত। কাজেই ভবিষ্যতের লাভ সংশয়পূর্ণ। এর কোনো চিত্রও মানুষের চিন্তাজগতে সুস্পষ্ট নয়। বিপরীতপক্ষে আজকের নগদ লাভ নিশ্চিত। মানুষ স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষও করছে।
দুই : যে ব্যক্তি বর্তমানে কোনো বিষয়ের অভাব অনুভব করছে বর্তমানে তা পূর্ণ হওয়া, ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে পূর্ণ হওয়ার চেয়ে, অনেক বেশী মূল্যবান বিবেচিত হবে, যখন হয়তো সে ঐ বিষয়ের অভাব অনুভব করবে না বা হয়তো অনুভব করতেও পারে।
তিন: যে অর্থ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে তা কার্যত প্রয়োজনীয় ও কার্যোপযোগী। এ প্রেক্ষিতে তা ঐ অর্থের উপর অগ্রাধিকার রাখে যা আগামীতে কোনো সময়ে অর্জিত হবে।
এসব কারণে আজকের নগদ লাভ ভবিষ্যতের অনিশ্চিত লাভের উপর অগ্রাধিকার রাখে। কাজেই যে ব্যক্তি আজ কিছু অর্থ ঋণ নিচ্ছে, তা অনিবার্যূপে, আগামীকাল সে ঋণদাতাকে যে অর্থ আদায় করবে, তার চেয়ে বেশী মূল্য পাবার অধিকারী। এ বাড়তি মূল্যটুকুই হচ্ছে সুদ। ঋণ দেবার সময় ঋণদাতা তাকে অর্থ দিয়েছিল, আদায় করার সময় বাড়তি মূল্যস্বরূপ ঐ সুদ আসল অর্থের মিশে, তার সমান মূল্যে পৌছিয়ে দেয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ এ বিষয়টিকে নিম্নোক্তরূপে অনুধাবন করা যায় : এক ব্যক্তি মহাজনের নিকট গিয়ে একশো টাকা ঋণ চাইলো। মহাজন তার সাথে চুক্তি করলো যে, আজ সে যে ১০০ টাকা দিচ্ছে, এক বছর পর এর পরিবর্তে তাকে ১০৩ টাকা দিতে হবে। এ ব্যাপারে আসল বর্তমানের ১০০ টাকার বিনিময় মূল্য হচ্ছে ভবিষ্যতের ১০৩ টাকা। বর্তমানের অর্থ ও ভবিষ্যতে অর্থের মনস্তাত্বিক (অর্থনৈতিক নয়) মূল্যের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যযায় তা বাড়তি ৩ টাকার সমান। যতক্ষণ পর্যন্ত এ ৩ টাকা এক বছর পর আদায়কৃত ১০০ টাকার সাতে যুক্ত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মূল্য ঋ প্রদান কালে ঋণদাতা প্রদত্ত ১০০ টাকার সমান হবে না।
যে সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তা সহকারে এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তার তারীফ না করে পারা যায় না। কিন্তু এখানে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মনস্তাত্বিক মূল্যের যে পার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে, তা আসলে একটি বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
সত্যিই কি মানব প্রকৃতি বর্তমানকে ভবিষ্যতের তুলনায় বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান মনে করে? তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে অধিকাংশ লোক তাদের সকল উপার্জন আজই ব্যয় করা সংগত মনে করে না কেন? বরং তার একটি অংশ ভবিষতের জন্য সঞ্চয় করা পছন্দ করে কেন? সম্ভবত শতকরা একজন লোকও আপনি পাবেন না, যে ভবিষ্যতের চিন্তা শিকোয় তুলে রেখে বর্তমানের আয়েশ-আরাম ও স্বাদ-আহলাদ পূরণ করার জন্য সমুদয় অর্থ দু’হাতে খরচ করাকে অগ্রাধিকার দেবে। অন্ততপক্ষে শতকরা ৯৯ জন লোকের অবস্থা এই যে, তারা আজকের প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে আগামীকালের জন্য কিছু না কিছু সঞ্চয় কর রাখতে চায়। কারণ ভবিষ্যতে যেসব ঘটনা সংঘটিত হবে এবং মানুষকে যেসব প্রয়োজনের সম্মুখীন হতে হবে, তন্মধ্যে অনেক সম্ভাব্য ঘটনা ও প্রয়োজনের কাল্পনিক চিত্র মানুষের মানুষের মানস চোখে ভাসত থাকে। বর্তমানে যে যে প্রয়োজন মিটিয়ে চলছে ও যে অবসথার সাথে কোনো না কোনোক্রমে বুঝছে সেগুলোর চেয়ে ঐ সম্ভাব্য ঘটনা ও প্রয়োজনগুলো তার নিকট অনেক বেশী বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। উপরন্তু বর্তমানেও মানুষ যেসব প্রচেষ্টা ও সাধনা চালিয়ে যাচ্ছে এগুলোরও উদ্দেশ্য তার নিজের উন্নততর ও অধিকতর ভালো ভবিষ্যত ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে? মানুষ আগমী দিনে ভালোভাবে জীবন যাপন করার উদ্দেশ্যেই তো আজ শ্রম মেহনত করে যাচ্ছে। এমন কোনো নিরেট বোকার সন্ধান পাওয়াও কষ্টকর হবে, যে নিজের ভবিষ্যতকে শ্রীহীন করার বিনিময়ে নিজের বর্তমানকে সুখী সমৃদ্ধিশালী করা পছন্দ করবে। মুর্খতা অজ্ঞতার কারণে মানুষ এমনটি করতে পারে অথবা কোনো সাময়িক ইচ্ছা কামনার আবেগে অভিভূত হয়ে এহেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভবপর; কিন্তু ভেবে-চিন্তে, বিচার-বিবেচনা করে কেউ এ কাজ করতে পারে না, অন্তত একে নির্ভুল ও যুক্তিসংগত বিবেচনা করতে পারে না।
মানুষ বর্তমানের নিশ্চয়তার বিনিময় ভবিষ্যতের ক্ষতি বরদাশত করে নেয়, কিছুক্ষণের জন্য এ দাবীর যথার্থতা স্বীকার করে নিলেও, এ দাবীর ভিত্তিতে যে কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা কোনোক্রমেই যথার্থ প্রমাণিত হয় না। ঋণ গ্রহণকালে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহতার মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তাতে বর্তমানের ১০০ টাকার দাম এক বছর পরের ১০৩ টাকার সমান ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু আজ একবছর পর ঋণগ্রহীতা যখন ঋণ আদায় করতে গেলো তখন প্রকৃত অবস্থা কোন্‌ পর্য়ায়ে পৌঁছেছে? এখন বর্তমানের ১০৩ টাকার অতীতের ১০০ টাকার সমান হয়ে গেছে। আর যদি প্রথম বছর ‍ঋণগ্রহী ঋণ আদায় করতে সক্ষম না হয় তাহলে দ্বিতীয় বছরের শেষে দু’বছর আগের ১০০ টাকার দাম বর্তমানের ১০৬ টাকার সমান হয়ে যাবে। প্রকতপক্ষে অর্থের মূল্য ও মান নিরূপণের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এ অনুপাত কি যথার্থ ও নির্ভুল? সত্যিই কি অতীত যতই পুরাতন হতে থাকে বর্তমানের তুলনায় তার দাম তহতই বাড়তে থাকে? সত্যিই কি অতীতের প্রয়োজনহুলোর পূর্ণতা এতবেশী মূল্যবান যার ফলে দীর্ঘকাল পূর্বে আপনি যে অর্থ পেয়েছিলেন এবং যা খরচ করার পর বিস্মৃত গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তা কালের প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে বর্তমানের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তা কালের প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে বর্তমানের অর্থের চেয়ে বেশী মূল্যবান হয়ে যাচ্ছে; এমনকি, একশো টাকা খরচ করার পর যদি পঞ্চাশ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়ে থাকে তাহের বর্তমানে তার দাম হবে আড়াইশো টাকার সমান?

সুদের হারের যৌক্তিকতা

বুদ্ধি ও ন্যায়নীতির দিক থেকে সুদকে বৈধ ও সংগত প্রমাণ করার জন্য সর্বসাকু্যে উপরোক্ত যুক্তিগুলোই পেশ করা হয়। আমাদের ইতিপূর্বেকার আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, যুক্তির সাথে এ নাপাক বস্তুটির কোনো দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। সুদ দেয়া-নেয়ার স্বপক্ষে কোনো শক্তিশালী যুক্তিও পেশ করা যেতে পারে না। অথচ অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে এমনিতর একটি অযৌক্তিক বস্তুকে পাশ্চাত্যের পাণ্ডিত প্রবর ও চিন্তাশীলগণ সম্পূর্ণ স্বীকৃত ও সুস্পষ্ট বস্তু হিসেবে গণ্য করে নিয়েছেন এবং সুদের যৌক্তিকতাকে যেন একটি স্থিরকৃত সর্বজনস্বীকৃত সত্য মনে করে সমস্ত আলোচনা সুদের ‘ন্যায়সঙ্গত’ হার নির্ধারণের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করেছেন। আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যে সুদ সম্পর্কিত আলোচনার কোথাও সুদ দেয়া-নেয়ার যৌক্তিকতা ও অযৌক্তিকতার প্রসংগ দেখা যাবে না; বরং ‘সুদের অমুক হারটি অযৌক্তিক ও সীমাতিরিক্ত’ কাজেই তা আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য এবং অমুক হারটি ‘ন্যায়সঙ্গত’ কাজেই তা গ্রহণযোগ্য, এ বিতর্কের মধ্যেই সমস্ত আলোচনা আবর্তিত।
কিন্তু সত্যিই কি সুদের কোনো ন্যায়সঙ্গত হার আছে? যে বস্তুটির নিজের ন্যায়সঙ্গত হবার কোনো প্রমাণ নেই, তার হার যক্তিসঙ্গত, না অযৌক্তিক, এ প্রসঙ্গ অবতারণার অবকাশ কোথায়? কিছুক্ষণের জন্য আমরা এ আলোচনা না হয় স্থগিতিই রাখলাম। এ প্রশ্ন বাদ দিয়ে আমরা মাত্র এতটুকু জানতে চাই, সুদের স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত হার কোন্টি? কোনো হারের ন্যায়সঙ্গত ও অন্যায় হবার মাপকাঠি কি? সত্যিই কি বিশ্বজোড়া সুদী ব্যবসায়ে কোনো যুক্তিসঙ্গত (Rational) ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করা হচ্ছে?
এ পশ্নের ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধানস চালিয়ে আমরা আবিষ্কার করেছি দুনিয়ার ‘ন্যায়সঙ্গত সুদের হার’ নামক কোনো জিনিসের অস্তিত্বই কোনোদিন ছিল না। বিভিন্ন হারকে বিভিন্ন যুগে ন্যায়সঙ্গত গণ্য করা হয়েছে এবং পরে আবার সেগুলোকেই অন্যায় ও অসংগত ঘোষণা করা হয়েছে। বরং একই যুগে বিভিন্ন স্থানের ন্যায়সঙ্গত হারের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ হিন্দু অর্থনীতিবিদ কোটিল্যের বর্ণনা অনুযায়ী প্রাচীন হিন্দুযগে বছরে শতকরা ১৫ থেকে ৬০ ভাগ সুদ ন্যায়সঙ্গত মনে করা হতো এবং বিপদাশংকা অত্যাদিখ হলে এ হার আরও বাড়ানো যেতো। অষ্টাদশ শককের শেষার্ধে ও ঊনবিংশ শতরে প্রথমার্ধে ভারতীয় ভারতীয় করদ রাজ্যগেো একদিকে নিজেদের দেশীয় মহাজনবৃন্দ ও অন্যদিকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সরকারে সাথে যে আর্থিক লেন-দেন করতো তাতে সাধারণত বার্ষিক শতকরা ৪৮ ভাগ সুদের হারের প্রচলন ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে (১৯১৪-১৮) ভরত সরকার বার্ষিক শতকরা সাড়ে ৬ ভাগ সুদের ভিত্তিতে যুদ্ধঋণ লাভ করেছিল। ১৯২০ ও ১৯৩০ এর মধ্যবর্তী সময়ে সমবায় সমিতিগিুলোর সাধারণ সুদের হার শতকরা ১২ থেকে ১৫ ভাগ। ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর আমলে দেশের আদালতগুলো বার্ষিক শতকরা ৯ ভাগের কাছাকাছি সুদকে ন্যায়সঙ্গত গণ্য করেছিল্ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছকাছি সময়ে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ডিসকাউন রেট বার্ষিক শতকরা ৩ ভাগ নির্ধারিত হয়েছিল এবং সমগ্র যুদ্ধকালে এ হার বর্তমান চিল; বরং শতকরা পৌনে তিন ভাগ সুদেও ভারত সরকার ঋণ লাভ করেছিল।
এ তো গেলো আমাদের এ উপমাহাদেশের অবস্থা। ইউরোপের দিকে তাকালে সেখানেও প্রায় একই ধরনের চিত্র যাবে। ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যাণ্ডে শতকরা ১০ ভাগ সুদের হার সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত গণ্য করা হয়েছিল। ১৯২০ সালের কাছাকাছি সময়ের ইউরোপের অনেক সেন্ট্রাল ব্যাংক শতকরা ৮/৯ ভাগ সুদ নির্ধারণ করতো। এ আমলে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জেরন (LEAGUE OF NATIONS) মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যে ঋণ লাভ করেছিল, তার হারও ছিল অনুরূপ। কিন্তু আজ আমেরিকা ও ইউরোপের কোনো ব্যক্তির নিকট সুদের হারের কথা বললে সে চিৎকার করে বলতে থাকবে, এট সুদ নয়, লুটতরাজ। আজ যে দিকে তাকান শতকরা আড়াই ও তিন ভাগ সুদের পসরা দেখতে পাবেন। শতকরা চার ভাগ হচ্ছে আজকের সর্বোচ্চ হার। আবার কোনো কোনো অবস্থায় ১ ও ১/২ বা ১/৪ ভাগ সুদও দেখা যায়। কিন্তু অন্যদিকে দরিদ্র জনসাধারণকে সুদী ঋণদানকারী মহাজনদের জন্য ইংল্যাণ্ড ১৯২৭ সালে মানি লেন্ডারস এ্যক্টের মাধ্যমে শতকরা ৪৮ ভাগ সুদ বৈধ গণ্য করেছে। আমেরিকার আদালতগুলো সুদখোর মহাজনদের জন্য বার্ষিক শতকরা ৩০ থেকে ৬০ ভাগ সুদ গ্রহণ করার অনুমতি দান করেছ। এখন আপনি বলুন, ৩০ থেকে ৬০ ভাগ সুদ গ্রহণ করার অনুমতি দান করেছ। এখন আপনি নিজেই বলুন, এর মধ্যে কোন হারটি স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত?
আর একটু অগ্রসর হয়ে আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, সত্যিই কি সুদের কোনো স্বাভাবিক ও ন্যায়সংগত হার হতে পারে? এ প্রশ্নটি পর্যালোচনা করলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে, সুদের হার কেবলমাত্র এমন অবস্থায় সঙ্গতভাবে নির্ধারিত হতে পারে, যখন ঋণগ্রহীতা তার ঋণলব্ধ অর্থ থেকে যে মুনাফা অর্জন করে তার মূল্য নির্ধারিত থাকতো (বা করা যেতো)। যেমন এক বছর ১০০ টাকা ব্যবহার করলে তা থেকে ২৫ টাকা মুনাফা লাভ করা যায়, একথা যদি নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় যে, যে ব্যক্তির অর্থা সারা বছর ব্যবহার করে এ মুনাফা অর্জিত হলো, সে এ মুনাফা কোনোদিন নির্ধারিত হয়নি এবং হতেও পারে না। উপরন্তু বাজারে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে কখনো ঋণগ্রহীতা ঋণলব্ধ অর্থ থেকে কি পরিমাণ মুনাফা লাভ করছে; এমনকি, কোনো মুনাফা লাভ করছে কিনা, সেদিকে দৃষ্টি রাখা হয় না। এক্ষেত্রে কার্যত যা কিছু হয় তা হচ্ছে, মহাজনী ব্যবসায়ের ঋণগ্রহীতর অলসতার প্রেক্ষিতে ঋণের মূল্য নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক সুদের বাজারে ভিন্নতার ভিত্তিতে সুদের হারের উঠানামা হতে থাকে। বুদ্ধি, যুক্তি ও ন্যায়নীতির সাথে এর দূরতম সম্পর্কও থাকে না।

সুদের এ হর নির্ধারণের ভিত্তি

মহাজনী ব্যবসায়ের একজন মহাজন সাধারণত দেখে, যে ব্যক্তি ঋণ নিতে এসেছে, সে কত গরীব ঋণ না পেলে তার দুঃখ ও দুর্দশা কি পরিমাণ বাড়বে? সাধারণত এসবের ভিত্তিতে সে তার সুদের হার পেশ করে। যদি সে কম গরীব হয়, কম টাকা চায় এবং তাকে বাহ্যত বেশী পেরেশন ও চিন্তাকুল না দেখায় তাহলে তার সুদের হার হবে কম। বিপরীতপকেষ ঋণপ্রার্থী যতই দুর্দশাগ্রস্ত ও বেশী অভাবী হবে, ততই তার সুদের হার বাড়তে থাকবে। এমনকি কোনো অর্থাহারে অনাহারে দিন যাপনকারী ব্যক্তির পুত্র যদি কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর্যায়ে উপনীত হয়, তাহলে তার জন্য সুদরে হার শতকরা চার-পাঁচশো পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়অ মোটেও অস্বাভাবিক বা বিস্ময়কর নয়। এ অবস্থায় সুদের ‘স্বাভাবিক’ হার প্রায়ই এ ধরনের হয়ে থাকে। এর একট চরমতম দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে ১৯৪৭ সালের অমৃতসর স্টেশনের একটি ঘটনায়। সে বছর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভীতিপ্রদ দিনগুলোতে একদা অমৃতসর স্টেশনে জনৈক শিখ একজন মুসলমানের নিকট থেকে এক গ্লাস পানির ‘স্বাভাবিক’ মূল্য হিসেবে শরনার্থীদের ট্রেন থেকে নীচে নেমে কোনো মুসলমানের পক্ষে পানি আহরণ করা সম্ভবপর ছিল না।
মহাজনী ব্যবসা ছাড়া অর্থনীতি অন্যান্য বাজারে সুদের হার নির্ধারণ ও তা কমবেশী করার ব্যাপারে যেসব ভিত্তির আশ্রয় নেয়া হয় সেগুলো সম্পর্কে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ দুটি ভিন্ন মতের অনুসারী।
একদল বলেন, চাহদা ও সরবরবাহের নীতিই হচ্ছে এর ভিত্তি। যখন অর্থ বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম হয় ও ঋণ দেয়ার মতো অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন সুদর হার নেমে যায়। এভাবে সুদের হার অনেক বেশী কমে গেলে লোকেরা একে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে এবং বেশী সংখ্যক লোক ঋণ নিতে এগিয়ে আবে। অতঃপর যখন অর্থের চাহিদা বাড়তে থাকে এবং ঋণ দেয়ার মতো অর্থের পরিমাণ কমে যেতে থাকে, তখন সুদের হার বাড়তে থাকে অবশেষে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যার ফলে ঋণ গ্রহণের চাহিজদা খতম হয়ে যায়।
এর অর্থ কি? পুঁজিপতি সোজাসুজি ও যুক্তিসংগত পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসায়ে অংশীদার হয় না এব তার যথার্থ মুনাফার ন্যায়সঙ্গত অংশ গ্রহণেও রাজী হয় না। বিপরীতপক্ষে সে এক্ষেত্রে আন্দাজ-অনুমান করে দেখে, এব্যবায়ে ব্যবসায়ী কি পরিমাণ মুনাফা অর্জন করবে, সে প্রেক্ষিতে স নিজের সুদ নির্ধারণ করে এবং মনে করে এ নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ তার পাওয়া উচিত। অ্যদিকে ব্যবাসায়ীও আন্দাজ-অনুমান করে দেখে যে, পুঁজিপতির নিকট থেকে সে যে অর্থ নিচ্ছে, তা থেকে সর্বাধিক কি পরিমাণ মুনাফা লাভ করা সম্ভ হবে, কাজেই সে প্রেক্ষিতে সে একটি বিশিষ্ট পরিমাণের অধিক সুদকে অসংগত মনে করে। উভয় পক্ষিই আন্দাজ-অনুমানের (SPECULATION) ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। পুঁজিপতি হামেশা ব্যবসায়ে মুনাফার অংশ বেশী করেই ধরে, আর ব্যাবসায়ী লাভের সাথে সাথে লোকসানের আশংকাও সামনে রাখে। এ করণে উভয়ের মধ্যে একটি চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব বিরাজ করে। ব্যবসায়ী যখন মুনাফা লাভের আশায় পুঁজি বিনিয়োগ করতে চায়, পুঁজিপতি তখন নিজের পুঁজির দাম বাড়াতে থাকে। এভাবে দাম বাড়াতে বাড়াতে অবশেষে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যখন এ ধরনের চড়া সুদে অর্থ ঋণ নিয়ে কোনো ব্যবসায় খাটালে তাতে কোনো প্রকারেই মুনাফার সম্ভাবনা থাকে না। এ পর্যায়ে পুঁজিবিনিয়োগের পথ বন্ধ তয়ে যায় এবং অর্থনৈতিকৈউন্নতির গতিধারায় অকস্মাৎ ভাড়া পড়ে। অতঃপর যখন সমগ্র ব্যবসায় খাটালে তাতে কোনো প্রকারেই মুনাফার সম্ভাবনা থাকে না। এ পর্যায়ে পুঁজি বিনিয়োগের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক উন্নতির গতিধারায় অকস্মাৎ ভাড়া পড়ে। অতঃপর যখন সমগ্র ব্যবসাজগত পরিপূর্ণ মন্দাভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং পুঁজিপতির নিজের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করতে থাকে,তখন সে সুদের হর এতদূর কমিয়ে দেয়, যার ফলে ঐ হারে অর্থ বিনিয়োগে ব্যবসায়ী লাভের আশা করে। এ সময় শিল্প-বাণিজ্যের বাজারে পুনর্বার অর্থ সমাগম হতে থাকে। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, পুঁজি ও ব্যবসায়ের মধ্যে যদি ন্যায়ঙ্গত শর্তে অংশীদারীত্বমূলক সহযোগতিা প্রতিষ্টিত হতো, তাহলে দুনিয়িার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি সুসমঞ্জস্য পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো। কিন্তু আইন যখন পুঁজিপতির জন্য সুদের ভিত্তিতে ঋণদান করার পথ প্রশস্ত করলো, তখন পুঁজি ও ব্যবসায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে জুয়াড়ি মনোবৃত্তির অনুপ্রবেশ ঘটলো এবং এমন জুয়াড়ি পদ্ধতিতে সুদের হার উটানামা করতে থাকলো, যার ফলে সারা দুনিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা চিরস্থায়ী অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো।
দ্বিতীয় দলটি নিম্নোক্তভাবে সুদের হারে যৌক্তিকতা প্রদর্শন করে। তাদের বক্তব্য হলো: পুঁজিপতি যখন পুঁজি কাজে লাগানো অধিক পছন্দ করে, তখঝন সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, আবার যখন তার এ ইচ্ছায় ভাড়া পড়ে, তখন সুদের হর ক যায়। তবে পুঁজিপতি নগত অর্থ তার নিজের কাছে রাখাকে অগ্রাধিকার দেয় কেন? এর জবাবে তারা বিভিন্ন কারণ দর্শায়। নিজের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনের খাতে কিছু অর্থ রাখার প্রয়োজন হয়। আবার আকস্মিক প্রয়োজন ও অপ্রত্যাশিত অবস্থার মোকাবিলা করার জন্যও কিছু অর্থ সংরক্ষিত রাখতে হয়। যেমন, ব্যক্তিগত ব্যাপারে কোনো অস্বাভাবিক খরচ অথচা হঠাৎ সুবিধাজনক সওদার সৃষ্টিট হওয়া। এ দু’টি কারণ ছাড়া তৃতীয় একটি এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এই যে ভবিষ্যতে কোনোদিন যখন দাম কমবে বা সুদরে হার চড়ে যাবে, তখন এ সুযোগ থেকে লাভবান হবার জন্য পুঁজিপতি তার নিকট যথেষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা সঞ্চিত রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কারণে অর্থেকে নিজের ব্যবহার উপযোগী রাখার জন্য পুঁজিপতরি মনে যে আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক হয়, তা কি বাড়ে কমে? সুদের হার উঠানামা করার সময় কি তার প্রভাব সুস্পষ্ট হয়? এর জবাবে তারা বলে: অবশ্যি বেড়ে যায়, ফলে পুঁজিপতি সুদের হার বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যবসায়ে পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। আবার কখনো এ আকাংখা কমে যায়, তখন পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ করে যেতে থাকে। আবার কখনো এ আকাংখা কমে যায়, তখন পুঁজিপতি সুদের হার কমিয়ে দেয়, ফলে শিল্প-বাণিজ্যে পুঁজি বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্যে লোকেরা বেশী করে ঋণ নিতে থাকে।
এ মনোহর যুক্তি ও ব্যাখ্যাটির অন্তরালে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যাবে, ঘরোয়া প্রয়োজন বা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রয়োজন, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক সব ধরনের অবস্থায় পুঁজিপতি নিজের জন্য যে পরিমাণ পুঁজিকে ব্যবহার উপযোগী রাখতে চায়, তার পরিমাণ হতে পারে, বড় জোর, শতকরা পাঁচভাগ । কাজেই প্রথম কারণ দু’টিকে অযথা গুরুত্ব দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। পুঁজিপতি যে কারণে নিজের শতকরা ৯৫ ভাগ পুঁজিকে কখনো সিন্দুকে ভরে রাখে, আবর কখনো ঋণ দেয়ার জন ্য বাজারে ছাড়ে তা অবশ্যি তৃতীয় একটি কারণ। এ করণটির ডিবশ্লেষণ করলে যে সত্য বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে, পুঁজিপতির নিজর দেশ ও জাতির অব্স্থাকে অত্যন্ত স্বার্থগৃধূতার দৃষ্টিতে অবলোকন করতে থাকে। এ সময় নিজের স্বার্থ চরিতার্থতার কিছু লক্ষণ তার সম্মুখে পরিস্ফুট হয়ে উঠলে তার ভিত্তিতে সে এমন সব অস্ত্র নিজের কাছে সর্বদা প্রস্তুত রাখতে চায়, যেগুলোর সাহায্যে সমাজের বিভিন্ন সংকট, সমস্যা ও বিপদ-আপদকে ব্যবহার করে সেগুলো থেকে অবৈধ সবিধা ভোগ করা যায় এবং সমাজের উদ্বেগ-আকুলতা বৃদ্ধি করে নিজের সমৃদ্ধি ও স্বচ্ছলতা বাড়ানো সম্ভব হয়। এজন্য জীবন জুয়ায় একটা বড় রকমের দাঁও মারার উদ্দেশ্যে সে পুঁজি নিজের জন্য আটক রাখে এবং সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রে অর্থের প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ করে দেয় এবং সমাজের জন্য ডেকে আনে এক মহাবিপদ, যাকে ‘মন্দা’ () বলা হয়ে থাকে। অতঃপর যখন সে দেখে, এ পথে তার পক্ষে হারাম উপায়ে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা সম্ভব তা সে করে ফেলেছে এবং এভাবে অর্থ উপার্জন করা তার পক্ষে আর কোনোক্রমেই সম্ভব নয়; বরং এখন তার ক্ষতিকর পালা শুরু হযে যাবে, তখন তার নীচ মনের অভ্যন্তরে ‘অর্থকে নিজের জন্য ব্যবহার উপযোগী করাখার ইচাছা’ নিস্বেজ হয়ে পড়ে এবং কম সুদের লোভ দেখিয়ে সে ব্যবসায়ীদের তার নিকট রক্ষিত অর্থসম্পদ কাজে লাগাবর জন্য ব্যাপকভাবে আহ্বান জানায়।
আধুনিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ সুদের হারের এ দুটি কারণই দুর্শিয়ে থাকেন। অবশ্য স্ব স্ব পরিমন্ডলে এ দু’টি কারণ যথার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এর মধ্যে যে কারণটিই যথার্থ হোক না কেন, তা থেকে সুদের ‘ন্যায়সঙ্গত’ ও ‘স্বাভাবিক’ ‘হার নির্ধারিত হয় বা হতে পারে কেমন করে? এক্ষেত্রে হয় আমাদেরকে বুদ্ধি, জ্ঞান, ন্যায়ানুগতা ও স্বাভাবিকতার অর্থ ও ধারণা বদলাতে হবে, নতুবা একথা মেনে নিতে হবে যে, সুদ জিনিসটি নিজেই যে ধরনের অন্যায়, তার হারও তার চেয়ে বেশী অন্যায় ও অসংগত কারণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় ও ওঠা-নামা করে।

সুদের অর্থনৈতিক ‘লাভ ও তার প্রয়োজন’

সুদ সমর্থকগণ সুদকে একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন এবং ধারণা করেছেন যে, এর সাহায্য ব্যতিরেকে আমরা অনেক কিছু অর্থনৈতিক লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবো। এ দাবীর সমর্থনে যেসব যুক্তি পেশ করা হয়, সেগুলোর সারাংশ নীচে প্রদত্ত হলো:
এক : অর্থনীতির সমস্ত কাজ কারবার পুঁজি সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল। আর নিজেদের প্রয়োজন ও আশা আকাংখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং আয়ের সমগ্র অংশকে নিজেদের জন্য ব্যয় না করে এর কিছু অংশ সঞ্চয় করা ছাড়া এ পুঁজি সংগ্রহ সম্ভব পর নয়। পুঁজি সংগ্রহের এ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি তার ইচ্ছা-বাসনা ত্যাগ ও আত্মসংযমের কোনো প্রতিদান না পায়, তাহলে সে নিজের প্রয়োজন অপূর্ণ রাখতে ও সম্পদের স্বল্প ব্যবহার করতে উদ্যোগী হবে কেন? এ সুদই তার সেই প্রতিদান। এরই আশায় বুক বেঁধে মানুষ অর্থ বাঁচাতে ও সঞ্চয় করতে প্রবৃত্ত হয়। কাজেই এ সুদকে হারাম গণ্য করা হলে আসলে উদ্বৃত্ত অর্থ সংরক্ষণের পথই ‍রুদ্ধ হয়ে যাবে। অথচ এটিই হচ্ছে পুজি সংগ্রহ ও সরবরাহের আসল মাধ্যম।
দুই: সকল মানুষের জন্য নিজের সঞ্চিত সম্পদ সুদের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে খাটাবার পথ উন্মুক্ত থাকাই হচ্ছে অর্থনৈতিক কায়-কারবারে দিকে পুঁজি প্রবাহিত হওয়ার সহজতম উপায়। এভাবে সদের লোভেই তারা অর্থ সঞ্চয় করতে থাকে, আবার সুদের লালসাই তাদেরকে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ, অযথা জমা না রেখে, উৎপাদনশীল করার জন্য ব্যবসায়ীর হাতে সোপর্দ করে, একটি নির্ধারিত হার অনুযায়ী সুদ আদায় করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ দুয়ারটি বন্ধ করার অর্থ হবে, কেবলমাত্র পুঁজি সঞ্চয়ের েএকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা শক্তিরই বিলুপ্তি নয়, বরং সামান্য যা কিছু সংগৃহীতক হবে তাও ব্যবসায়ে খাটানো যাবে না।
তিন : সুদ কেবল পুঁজি সংগ্রহে করে একে ব্যবসায়ের দিকে টেনে আনে না, বরং তার অলাভজনক ও অনুপকারী ব্যবহারেরও পথরোধ করে। আর সুদের হার এমন একটি বস্তু যা সর্বোত্তম পদ্ধতিতে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিভিন্ন প্রস্তাবিত ব্যবসায়ের মধ্য থেকে সবচেয়ে লাভজনক ও মুনাফাদায়ক ব্যবসায়ে পুঁজি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে। এছাড়া দ্বিতীয় এমন কোনো ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া যায়নি, যা বিভিন্ন কার্যকর পরিকল্পনার মধ্য থেকে লাভজনক পরিকল্পনাকে অলাভজনক থেকে এবং অধিক লাভজনককে কম লাভজনক থেকে আলাদ করে অধিক লাভজনকের দিকে পুঁজিকে পরিচালিত করতে পারে। কাজেই সুদের বিলোপ সাধনের ফলে প্রথমত লোকদের অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে পুঁজি ব্যবহার করতে দেখা যাবে, অতঃপর লাভক্ষতির বাছবিচার না করে লঅভজনক অলাভজনক সব রকম বিনিয়োগ করতে থাকবে।
চার: ঋণ মানুষের জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজনের অংগীভূত। ব্যক্তির নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে এ প্রয়োজন দেখা দেয়, ব্যবাসায়ী প্রায়ই এর মুখাপেক্ষী থাকে এবং সরকারী কাজকর্মও এর সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। নিছক দান খায়রাত হিসেবে এত ব্যাপকভাবে ও বিপুলাকারে ঋণ সরবরাহ করা কেমন করে সম্ভব? যদি পুঁজিপতিদেরকে সুদের লোভ দেখানে না হয় এবং মূলধনের সাথে সাথে সুদটাও তারা নিয়মিতভাবে পেতে থাকবে, এ নিশ্চয়তা তাদেরকে দান না করা হয়, তাহলে তারা খুব কমই ঋণ পেতে থাকবে, এ নিশ্চয়তা তাদেরকে দান না করা হয়, তাহলে তারা খুব কমই ঋণ দিতে উদ্বুদ্ধ হবে। এভাবে ঋণ দেয়া বন্ধ হয়ে গেলে সমগ্র অর্থনৈতিক জীবনের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এক দরিদ্র ব্যক্তি নিজের দুঃসময়ে মহাজনের নিকট থেকে ঋণ লাভ করে। এক্ষেত্রে সুদের লোভ না থাকে তার আত্মীয়ের লাশ বিনা কাফন দাফনে পড়ে থাকবে এবং কেউ তার দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করবে না। এক ব্যবসায়ী নিজের দৈন্য ও সংকটকালে প্রয়োজনের সাথেসাথেই সুদে ঋণ লাভ করে এবং এভাবে তার কাজ চলতে থাকে। এ দুয়ারটি বন্ধ হয়ে গেলে কতবার যে সে দেউলিয়া হবে তা কল্পনাই করা যায় না। রাষ্ট্রের ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। সুদী ঋণের সাহায্যেই রাষ্ট্রের প্রয়োজন পূর্ণ হয়। অন্যথায় প্রতিদিন তাকে কোটি কোটি টাকা ঋণ দান করবে এমন দাতা হাতেম কোথায় পাওয়া যাবে?

সুদ কি যথার্থ প্রয়োজনীয় ও উপকারী?

এবার আমরা উপরোল্লিখিত ‘লাভ’ ও ‘প্রয়োজনগুলে’ বিশ্লেষণ করে দেখবো, এগুলো যথার্থই লাভ ও প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত কিনা অথবা নিছক শয়তানী প্রতারণা।
এ ব্যাপারে প্রথম ভুল ধারণা হচ্ছে, অর্থনৈতিক জীবনের জন্য ব্যক্তির স্বল্প ব্যয় ও অর্থ সঞ্চয়কে একটি প্রয়োজনীয় ও লাভজন বিষয় মনে করা হয়েছে। অথচ আসল ব্যাপার রযেছে। মানুষের একটি দল সমষ্টিগতভাবে জীবন যাপরের যেসব উপকরণ তৈরী করতে থাকবে তা অতি দ্রুত বিক্রী হতে থাকবে, এ ফলে পণ্য উৎপাদন ও বাজরের চাহিদা পূরণের কাজ চক্রাকারে ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুততার সাথে চলতে থাকবে। এভাবেই অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি আসতে পারে। এ অবস্থা কেবল তখনই সৃষ্টি হতে পারে যকন লোকেরা সাধারণভাবে অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা ও কর্মরত অবস্থায় যে পরিমাণ ধনসম্পদ তাদের অংশে আসে তা ব্যায় করতে অভ্যস্ত হয় এবং এতটা প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী হয়, যার ফলে তাদের নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্স সম্পদ জমা হয়ে গেলে দলের অপেক্ষাকৃত কম ভাগ্যবান লোকদের নিকট তা হস্তান্তর করে, ফলে তারাও অনায়াসে প্রচুর পরিমাণে নিজেদের জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত পক্ষে এখানে যা শিখানো হচ্ছে তা হচ্ছে এই যে, যার নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ পৌঁছে গেছে তাকে কৃপণতা অবলম্বন করতে হবে (যাকে আত্মসংযম ও ইচ্ছা বাসনার কোরবানী প্রভৃতি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে), নিজের সংগত প্রয়োজনের একটা বড় অংশ পূর্ণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে বেশী শেী করে অর্থ সঞ্চয় করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আসলে েএর ফলে একটি বড় রকমের ক্ষতি হবে। তা হচ্ছে এই যে, বর্তমানে বাজারে যে পণ্য মওজুদ রয়েছে তার একটি বড় অংশ অবিক্রীত থেকে যাবে। কারণ যাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই ক্রয়-ক্ষমতা কম ছিল তারা অক্ষমতার কারণে অনেক পণ্য কিনতে পারেনি; আর যারা প্রয়োজন পরিমাণ পণ্য কিনতে পারতো তারা সক্ষমতা সত্ত্বেও উৎপাদতি পণ্যের একটা বড় অংশ ক্রয় করেনি। আবার যাদের নিকট প্রয়োজনের চেয়ে বেশী ক্রয় ক্ষমতা পৌছে দিগয়েছিল তারা তা অন্যের নিকট হস্তান্তর করার পরিবর্তে নিজের নিকট আটক রেখেছিল। এখন যদি প্রতিটি অর্থনৈতিক আবর্তনের ক্ষেত্রে এ ধাা অব্যাহত থাকে এবং প্রয়োজন পরিমাণ ও প্রয়োজনের অধিক পরিমাণ ক্রয় ক্ষমতার অধিকারী নিজেদের এ ক্ষমতার বৃহত্তর অংশ উৎপাদিত পণ্য ক্রয়ে ব্যবহার না করে এবং কম ক্রয় ক্ষমতার অধিকরীদেরকেও না দেয়, বরং একে আটক করে সঞ্চয় করতে থাকে, তাহলে এর পলে প্রতিহটি আবর্তনে দলের অর্থনৈতিক উৎপাদনের বিরাট অংশ অবক্রীত যেতে থাকবে। পণ্যের চাহিদা কম হবার কারণে উপার্জনও কমে যাবে। ব্যবাসায়ে পণ্যের চাহিদা আরো বেশি কমে যেতে থাকবে। এভাবে ব্যক্তির অর্থ সঞ্চয় প্রবণতা বহু ব্যক্তির অর্থ সঞ্চয় প্রবণতা বহু ব্যক্তির অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে পরিণত হবে। অবশেষে এ অবস্থা ঐ অর্থ সঞ্চয়কারীদের সঞ্চয়কারীদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। কারণ যে অর্থের সাহায্যে উৎপন্ন দ্রব্যাদি কেনার পরিবর্তে সে তাকে যক্ষের ধনের মতো আগলিয়ে রেখেছে এবং তিলে তিলে বাড়িয়ে চলছে পণ্যদ্রব্য তৈরী করার জন্য, অবশেষে ঐ পণ্য দ্রব্য তৈরী হলে তা কিনবে কে?
এ বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করলে বুঝা যাবে, যেসব কারণে ব্যক্তি নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় না করে সঞ্চয়ঢ করে রাখতে উদ্যোগী হয়ে সে কারণগুলো দূর করাই হচ্ছে আসলে অর্থনৈতিক প্রয়োজন সমগ্র সমাজের অর্থনৈতিক কল্যাণার্থে এক এমন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যার পলে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের দুঃসময়ে আর্থক সাহায্য লাভ করতে পারে; অন্যদিকে সঞ্চিত অর্থের উপর যাকাত আরোপ করতে হবে, এর ফলে মানুষের মধ্যে অর্থ জমা করার প্রবণতা কমে যাবে। এর পরও যে অর্থসম্পদ সঞ্চিত হতে থাকবে তা থেকে অবশ্যি অর্থের আবর্তেনে যারা কম অংশ পেয়েছে তাদেরকে একটি অংশ দিতে হবে। কিন্তু এর বিপরীতপক্ষে এখানে সুদের লোভ দেখিয়ে মানুষের প্রকৃতিগত কার্পণ্যকে ‍উসাকানী দেয়া হচ্ছে এবং যারা কৃপণ নয় তাদেরকেও অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে সঞ্চয়ের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।
অতপর এ ভুল পদ্ধতিতে সামষ্টিক স্বার্থেল বিরুদ্ধে যে পুঁজি একত্রিত হয় তাকে অর্থ উৎপাদনকারী কারবারে র দিকে আনা হলেও সুদের ভিতিএত আনা হয়। সামষ্টিক স্বার্থের উপর এটি দ্বিতীয় দফা অত্যাচার। এ সঞ্চিত অর্থ যদি এমন এক শর্তে ব্যবসায়ে খাটানো হতো যেখানে অর্জিত মুনাফার হার অনুযায়ী পুঁজিপতিও তার অংশ লাভ করতো তাহলেও কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু এ সঞ্চিত অর্থ এমন এক শর্তে বাজারে ছাড়া হচ্ছে যার ফলে ব্যবসায়ে লাভ হোক বা না হোক এবং কম মুনাফা হোক বা বেশী মুনাফা, তাতে পুঁজিপতির কিছু আসে যায় না, সে তার নির্ধারিত হার অনুযায়ী মুনাফা অবশ্যি পেতে থাকবে। এভাবে সামষ্টিক অর্থব্যবস্থাকে দু’দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। একদিকে টাকা উপার্জন করে তা ব্যায় না করা ও জমা করে রাখার ক্ষতি এবং অন্যদিকে যে টাকা জমা করে রাখা হয়েছিল তা সামষ্টিক অর্থ-ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হলেও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে শামিল না হয়ে ঋণ আকারে সমগ্র সমাজের শিল্প ও ব্যবসাযের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এবং প্রচলিত আইন তাকে নিশ্চিত মুনাফার জামানত দান করেছে। এ ভ্রান্ত ব্যবস্থাপনা এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যার ফলে সমাজের বিপুল সংখ্যক লোক তাদের ক্রয় ক্ষমা, সামগ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যাদি ক্রয়ের কাজে ব্যবহার করার পরিবর্তে তা সঞ্চিত কর ক্রমান্বচয়ে সুদ ভিত্তিক ঋণের আকারে সমাজের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে চলছে। এ পরিস্থিতি সমাজকে মহা সংকটের সম্মুখীন করেছে। প্রতি মুহূর্তে তার সুদ ও ঋণের বোঝা বেড়ে যাচেছ। যেক্ষেত্রে বজারে তার উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম, ক্রেতার সংখ্যা কম, লাখ লাখ কোটি কোটি লোক নিজেদের অক্ষমতা ও অর্থ না থাকার দরুণ তা কিনতে পারছে না এবং হাজার হাজার লোকজ নিজেদের ক্রয়ক্ষমতাকে বেশী সুদে ঋণ দেয়ার জন্য সঞ্চিত রেখে তা কেনার ব্যাপারে হাত গুটিযে নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে এ বর্ধিত ঋণ ও সুদ সে কিভাবে পরিশোধ করবে?
সুদের উপকারিতা ও লাভজনক দিক সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,এর চাপ ব্যবসায়ী পুঁজির যত্রতহত্র অযথা ও অলাভজন ব্যবহার না কর অধিকতর লাভজনক কাজে তা ব্যবহার করে। বলা হয়ে থাকে, ‍সুদের হার অলৌকিক ক্ষমতার সাহায্যে নীরবে ব্যবসাযের পথ নির্দেশ করার মহাদয়িত্ব পালন করে এবং এরই বদৌলতে পুঁজি এ চলার সম্ভাব্য সকল পথের মধ্যে থেকে ছাঁটাই-বাছাই করে সবচাইতে লাভজনজ ব্যবসাযে নিজেকে নিয়োজিত করে। কিন্ত এ সুন্দর কথার পর্দা সরিয়ে ভিতরে উঁকি দিলে এর আসল উদ্দেশ্য ধরা পড়ে যা। প্রকৃতপক্ষে সুদের প্রথম কৃতিত্ব হচ্ছে এই যে, এর বদৌলতে ‘উপকার’ ও ‘লাভ’ এর সমস্ত ব্যাখ্যাই পরিত্যক্ত হয়ে এবং ঐ শব্দগুলোর কেবল একটি মাত্র অ্থই রয়ে গেছে, তা হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক উপকার’ ও ‘বস্তুগত লাভ’। এভবে পুঁজি বিরাট একাগ্রতা লাভে সক্ষম হয়েছে। প্রথমে অর্থনৈতিক লাভ ছাড়া অন্য ধরনের লাভের পথেও পুঁজির আনাগনা হতো। কিন্তু এখন তার লক্ষ্য একটি মাত্র পথের দিকে। অর্থাৎ যে পথে অর্থনৈতিক লাভ ও সুবিধা নিশ্চিত, একমাত্র সে পথেই তার গতি নিযন্ত্রিত। অতঃপর তার দ্বিতীয় কৃতিত্ব হচ্ছে এই যে, সমাজেরে লাভ বা স্বার্থোদ্ধার নয় বরং কেবলমাত্র পুঁজিপতির লাভ ও সীমিত স্বার্থোদ্ধারকেই সে পুঁজির লাভজনক ব্যবহারের মানদন্ডে পরিণত করেছে। পুঁজির হার স্থির কর দেয় যে, পুঁজি এমন একটি কাজে ব্যবহৃত হবে যা পুঁজিপতিকে বার্ষক শতকরা ৬ বা এ চেয়ে বেশী হারে মুনাফা দিতে সক্ষম। এর চেয়ে কম মুনাফাদানকারী কোনো কাজে পুঁজি খাটানোর কোনো যৌক্তিতাই নেই। এখন মনে করুন, পুঁজির সামনে দু’টো পরিকল্পা পেশ করা হলো। একটা পরিকল্পনা হলো এমন কতকগুলো আবাসি গৃহ নির্মাণের, যেগুলো আরামদায়ত হবার সাথে সাথে গরীব লোকের কম ভরায় নিতে পারে। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি হলো একটি বিরাট জাঁকালো প্রেক্ষাগৃত নির্মাণেল। প্রথম পরিকল্পনাটি শতকরা ৬ ভাগের কম মুনাফাদানের আশা দেয়, আর দ্বিতীয়টি দেয় এর চেয়ে বেশী। অন্য কোনো অবস্থায় অজ্ঞতাবশত প্রথম পরিকল্পনাটির দিকে পুঁজির প্রবাহিত হবার সম্ভাবনা ছিল বা অন্ততঃপক্ষে এ দুটোর মধ্যে কোনটার দিকে সে ঝুঁকবে তা নিয়ে তাকে যথেষ্ট সংশয় দোলায় দুলতে হতো। কিন্তু সুদের হারের এমনি মাহাত্ম্য যে, এর নির্দেশে পুঁজি কোনো প্রকার দ্বিধা না করে সুড়সুড় করে দ্বিতীয় পরিকল্পনাটির দিক অগ্রসর হয় এবং প্রথম পরিকল্পনাটিকে নির্দয়ভাবে পিছনে নিক্ষেপ করে। তার দিকে একবার ফিরেও তাকায় না। উপরন্তু সুদের হার ব্যবসায়ীকে এমনভাবে বাধ্য করে যার ফ সে নিজের মুনাফাকে সব সময় পুঁজিপতি নির্ধারিত মুনাফার সীমারেখা থেকে উচ্চে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। এজন্য সে যে কোনো নৈতিকতা বিরোধী পদ্ধতি অবলম্বন করতে কুণ্ঠিত হয় না। যেমন, নে করুন এক ব্যক্তি একটি চলচ্চিত্র কোম্পানী গঠন করালো। এ কোম্পানীতে সে যে পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করেছে তার সুদের হার হচ্ছে বছরে শতকরা ৬ ভাগ। এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যি এমন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে যার ফলে তার লাভের হার শতকরা ৬ ভাগে চেয়ে বেশী হয়। নৈতিক পবিত্রতার অধিকারী ও তত্ত্ব-জ্ঞান সমৃদ্ধ কোনো চিত্র নির্মাণে যদি তার এ উদ্দেশ্য সফল না হয়, তাহলে অবশ্যি সে উলংগ ও অশ্লীল চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হবে এবং এমনভাবে এর বিজ্ঞাপন ছড়াতে ও প্রপাগান্ডা কেরতে থাকবে যার ফলে মানুষ আবেগে ফেটে পড়বে এব যৌন উত্তেজনার প্রবল স্রোত প্রবাহিতহ হয়ে হাজার হাজার লাখো লাখো মানুষ প্রেক্ষাগৃহর দিকে ছুটবে।
সুদের সাহায্য ছাড়া যেসব লাব ও উপকার সাধিত হওয়ার কোনো উপায় নেই সেগুলোর আসল চেহারা উপরে বিবৃতি হলো। এখন সুদের সাহায্য ছাড়া যেসব প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই সেগুলোর কিছু বিশ্লেষণ আমরা করতে চাই। নিঃসন্দেহে ঋণ মানুষের জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের নিজের ব্যক্তিগত অভাব পূরণে ঋণের প্রয়োজন হয়; আবর শিল্প, ব্যবসায়, কৃষি প্রভৃতি অর্থনৈতিক কাজ কারবারও সব সময় এর প্রয়োজন দেখা দেয় এবং রাষ্ট্রসহ সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান এর মুখাপেক্ষী থাকে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও একথা ঠিক নয় যে, সুদ ছাড়া ঋণ সংগ্রহ করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আসলে সুদকে আইনসংগত গণ্য করার কারণে ব্যক্তি থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পর্যন্ত সকল পর্যায়ের সুদ ছাড়া এক পয়সাও ঋণ ইসলাম নির্দেশিত নৈতিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করলে আজেই দেখা যাবে ব্যক্তিগত অভাব, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক প্রয়োজনের সকল ক্ষেত্রে সুদুবিহীন ঋণ পাওয়া যাচ্ছে; বরং অনেক ক্ষেত্রে দাও পাওয়া যাবে। ইসলাম কর্যত এর প্রমাণ পেশ করেছে। শত শত বছর ধরে মুসলমান সমাজ সুদ ছাড়াই উত্তম পদ্ধতিতে নিজেদের যাবতীয় অর্থনৈতিক কাজ-কারবার চালিয়ে এসেছে। সুদ-ব্যবসাথা লাঞ্ছিত আজকের এ ঘৃণিত যুগের পূর্বে মুসলমান সমাজ কোনোদিন কল্পনাই করতে পারতো না যে, সুদবিহীন ঋণ লাভ করা কোনোক্রমেই সম্ভব না হওয়ার কারণে কোনো মুসলমানের লাশ কাফন –দাফন করা সম্ভব হয়নি; বা ব্যবাসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী কর্জে হাসানা না পাওয়ার কারণ মুসলমানদের শিল্প-বাণিজ্য ‍কৃষি দুর্দশাগ্রস্ত হয়েছে অথবা মুসলমানরা তাদের সরকারকে সুদবিহীন ঋণ দিতে রাজী না হওয়ায় কোনো মসলিম সরকার জনকল্যাণমূলক কাজে বা জিহাদে অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হয়নি। কাজেই ‘কর্জে হাসানার’ পরিকল্পনা কার্যকর হবার যোগ্য নয় এবং ঋণৈর সমগ্র প্রাসাদটিই সুদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, এ দাবী কোনো প্রকার যুক্তি ভিত্তিক নয়। আমরা নিজেদের শত শত বছরের কার্যধারার মাধ্যমে একে ভ্রান্ত প্রমাণ করে এসেছি।

 ৩. সুদের বিপর্যয়

(আরবী********)
“কাজেই যে ব্যক্তর কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌঁছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুখোরী থেকে সে বিরত হয়, সেক্ষেত্রে যা কিছু খেয়েছে তা তো খেয়ে ফেলেছেই এবং এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে। আর এই নির্দেশের পরও যে বক্তি আবর এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত ও বিকশিত করেন। আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞ দুষ্কৃতিকারীকে পছন্দ করেন না।”
একথা বলা হয়নি যে, যা কিছু সে খেয়ে ফেলেছে, আল্লাঞ, তা মাফ করে দেবেন, বরং বলা হয়েছে তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাতে থাকছে। এই বাজ্য থেকে জানা যায়, “যা কিছ সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই” বাক্যের অর্থ এ নয় যে, যা কিছু ইতিপূর্বে খেয়ে ফেলেছে তা মাফ করে দেয়া হয়েছে; বরং এখানে শুধুমাত্র আইনগত সুবিধার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ইতিপূর্বে যে সুদ খেয়ে ফেলেছে আইনগতভাবে তা ফেরত দেয়ার দাবী করা হবে না। কারণ তা ফেরত দেয়ার দাবী করা হলে মামলা মোকাদ্দমার এমন একটা ধারাবাহিকতা চক্র শুরু হয়ে যাবে যা আর শেষ হবে না। তবে সুদী কারবারের মাধ্যমে যে ব্যক্তি অর্থসম্পদ সংগ্রহ করেছে নৈতিক দিক দিয়ে তার অপবিত্রতা পূর্ববৎ প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যদি তার মনে যথার্থিই আল্লাহর ভীতি স্থান লাভ করে থাকে এবঙ এসলাম গ্রহণ করার পর তার অর্থনৈতিক ও নৈতিক দৃষ্টিভংগি যদি সত্যিই পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সে নিজেই এই হারাম পথে উপার্জিত ধনসম্পদ নিজের জন্য ব্যয় রা থেকে বিরত থাকবে এবং যাদের অর্থসম্পদ তার কাছে আছে তাদের সন্ধান লাভ করার জন্য নিজস্ব পর্যায়ে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকবে।হকদারদে সন্ধান পাবার পর তাদের হক ফিরিয়ে দেবে। আর যেসব হকদারের সন্ধান পাবে না তাদের সম্পদগুলো সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার ব্যবস্থা করবে। এই কার্যক্রম তাকে আল্লাহ শাস্তি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে। তবে যে ব্যক্তি তার পূর্বেকার সুদলব্ধ অর্থ যথারীতি ভোগ করতে থাকে, সে যদি তার এই হারাম খাওয়অর শাস্তি লাভ করেই যায়, তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
এই আয়অতে এমন একট অকাট্য সত্যের ঘোষণা দেয়অ হযেছে, যা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে যেমন সত্য তেমনি অরথনৈতিক ও তমদ্দুনিক দিক দিয়েও সত্য। যদিও আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায়, সুদের মাধ্যমে অর্থ বৃদ্ধি হচ্ছে এবং দান খয়রাতের মাধ্যমে অর্থসম্পদ কমে যাচ্ছে, তবুও আসল ব্যাপার এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর প্রাকৃতিক বিধান হচ্ছে এই যে, সুদ নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও তমুদ্দনিক দিক দিয়েও সত্য। যদিও আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায়, সুদের মাধ্যমে অর্থ বৃদ্ধি হচ্ছে এবং দান খয়রাতের মাধ্যমে অর্থসম্পদ কমে যাচ্ছে, তবুও আসল ব্যাপর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর প্রাকৃতির বিধান হচ্ছে যে, সুদ নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও তমুদ্দুনিক উন্নতির কেবল প্রতিবন্ধকতাই নয়, বরং অবনতির সহায়ক। বিপরীতপক্ষে দান খয়রাতের (কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ) মাধ্যমে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বৃত্তি এবং তমদ্দুন ও অর্থনীতিহ সবকিছুই উন্নতি ও বিকাশ লাভ করে।
নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয় বিচার করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সুদ আসলে স্বার্থপরতা, কৃপণতা, সংকীর্ণতা, নির্মমতা ইত্যাকার অসৎ গুণাবলীর ফল এবং এই গুণগুলোই সে মানুষের মধ্যে বিকশিত করে। অন্যদিকে দানশীলতা, হানুভূতি, উদারতা ও মহানুভবতা ইত্যাদি গুণাবলীই দান খয়রাতের জন্ম দেয় আর নিয়মিত দান খায়রাত করতে থাকলে এই গুণগুলি মানুষের মধ্যে লালিত ও বিকশিত হতে থাকে।এমন আছে যে, এই উভয় ধরনের নৈতিক গুণাবলীর মধ্য থেকে প্রথমগুলিকে নিকৃষ্ট ও শেষেরগুলিকে উৎকৃষ্ট বলবে না?
তমদ্দুনিক দিক দিয় বিচার করলে প্রত্যেক ব্যক্তি নিঃসন্দেহে একথা বুঝতে সক্ষম হবে যে, যে সমাজের লোকেরা পরস্পররের সাথে স্বার্থবাদী আচরণ করে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লাভ ছাড়া নিস্বার্থভাবে অন্যের কোনো কাজ করে না, একজনের প্রয়োজন ও অভাবকে অন্যজন নিজের মুনাফা লুণ্ঠনের সুযোগ মনে করে তা থেকে পুরোপুরি লাভবান হয় এবং ধনীদের স্বার্থ সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে, সে সমাজ কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। সে সমাজের লোকদের মধ্যে পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্কের পরিবর্তে হিংসা, বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা ও অনাগ্রহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তার বিভিন্ন অংশ হামেশা বিশৃংখলা ও নৈরাজ্যের দিকে এগিযে যাবে। অন্যান্য কারণগুলো যদি এই অবস্থার সহায়ক হয়ে দাঁড়ায় তাহলে এহেন সমাজের বিভিন্ন অংশের পরস্পরের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে যাওয়াটাও মোটেই কঠিন ব্যাপার নয়। অন্যদিকে সে সমাজের সামষ্টিক ব্যবস্থাপনা পরস্পরের প্রতি সাহায্য সহানুভূতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, যার সদস্যরা পরস্পরের সাথে ঔদার্যপূর্ণ আচরণ করে, যেখানে প্রত্যেক ব্রীক্ত অন্যের প্রয়োজন ও অভাবের সময় আন্তরিকতার সাথে ও প্রশস্ত মনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং একজন সমর্থ ও সক্ষম ব্যক্তি তার কেজন অক্ষম ও অসমর্থ ভাইতে সাহায্য অথবা কমপক্ষে ন্যায়সংগত সহায়তার নীতি অবলম্বন করে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই পারস্পরিত প্রীতি, কল্যাণকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনে সমাজের অংশগুলি একটি অন্যটির সাথে সংযুক্ত ও সম্পর্কিত থাকবে। সেখানে আভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিরোধ ও সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার কোনো সুযোগই পাবে না। পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও সাহায্র সহযোগিতর কারণে সেখানে উন্নতির গতিধারা প্রথম ধরনের সমাজের তুলনায় অনেক বেশী দ্রুত হবে।
এবার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিচার করা যাক। অর্থনীতির বিচার সুদী লেন দেন দুই ধরনের হয়। এক. অভাবীরা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যয়ভার বহন করার জন্য বাধ হয়ে ঋণ গ্রহণ করে। দুই. পেশাদার লোকেরা নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প, কারিগরী, কৃষি ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করার জন্য ঋণ গ্রহণ করে। এ মধ্যে প্রথম ধরনের ঋণটি সম্পর্কে সবাই জানে, এর ওপর সুদ আদায় করার পদ্ধতি মারাত্মক ধ্বংসকর। দুনিয়ায় এমন কোনো দেশ নেই যেখানে মহাজনরা ও মহাজনী সংস্থাগুলো এই পদ্ধতিতে গরীপ শ্রমিক, মজুর, কৃষক ও স্বল্প আয়ের লোকদের রক্ত চুষে চলছে না। সুদের কারণে এই ধরনের ঋণ আদায় করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, বরং অনেক সময় অসম্ভবহয়ে পড়ে। তারপর এক ঋণ আদায় করার জন্য দ্বিতীয় ঋণ এবং তারপর তৃতীয় ঋণ, এভাবে ঋণের পর ঋণ নিতে থাকে। ঋণের মূল অংকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী সুদ আদায় করার পরও মূল অংক যেখানকার সেখানেই থেকে যায়। শ্রমিকদের আয়ের বৃহত্তম অংশ মহাজনের পেটে যায়। তার নিজের মাথায় ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ দিনান্তে তার নিজের ও সন্তান পরিজনের পেটের আহার যোগাতে সক্ষম হয় না। এ অবস্থায় কাজের প্রতি শ্রমিক ও কর্মচারীদের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে এবং একদিন তা শূন্যের পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। কারণ তাদের মেহনতের ফল যদি অন্যেরা নিয়ে যেতে থাকে তাহলে তারা কোনোদিন মন দিয়ে ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে পারে না। তারপর সুদীঋণের জালে আদদ্ধ লোকরা সর্বক্ষণ এমন দুর্ভাবনা ও পেরেশানি মধ্যে জীবন কাটায় এবং অভাবের কারণে তাদের জন্য সঠিক খাদ্য ও চিকিৎ]সা এমনই দুর্লভ হয়ে পড়ে, যার ফলে তাদের স্বাস্থ্য কখনো ভালো থাকে না। প্রায়ই তারা রোগ-পীড়ায় জর্জরিত থাকে। এভাবে সদী ঋণের নীটি ফল এই দাঁড়ায়ঃ গুটিকয়েক লোক লাখো লোকের রক্তচোষারা ও নিষ্কৃতি পায় না। কারণ, তাদের স্বার্থগৃধনুতা সাধারণ দরিদ্র শ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ধনিক সমাজের বিরুদ্ধে তাদের মনে ক্ষোভ , ঘৃণা ও ক্রোধ লালিত হতে থাকে। তারপর একদিন কোনো বিপ্লরে তরংগাভিঘাতে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে। তখন এই যালেম ধনিক সমাজকে তাদের অর্থসম্পদের সাথে প্রাণ সম্পদও বিসর্জন দিতে হয়।
আর দ্বিতীয় ধরনের সুদীঋণ সম্পর্কে বলা যায়, ব্যবসায়ে খাটাবর জন্য একটি নির্দিষ্ট সুদের হারে এই ঋণ গ্রহণ করার ফলে যে অসংখ্য ক্ষতি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে বিবৃত করছি।
এক. যে কাজটি প্রচলিত সুদের হারের সমান লাভ উৎপাদনে সক্ষম নয়, তা দেশ ও জাতির জন্য যতই প্রয়োজনীয় ও উপকারী হোক না কেন, তাতে খাটাবার জন্য অর্থ পাওয়া যায় না। আবর দেশের যাবতীয় অর্থনৈতিক উপকরণ একযোগে এমন সব কাজের দিকে দৌড়ে আসে, যেগুলি বাজারে প্রচলিত সুদের হারের সমান বা তার চেয়ে বেশী লাভ উৎপাদন করতে পারে, সামগ্রিক দিক দিয়ে তাদের প্রয়োজন বা উপকারী ক্ষমতা অনেক কম অথবা একেবারে শূন্যের কোঠায় থাকলেও।
দুই . ব্যবসা, শিল্প বা কৃষি সংক্রান্ত যেসব কাজের জন্য সুদে টাকা পাওয়া যায়, তাদের কোনো একটিতেও এ ধরনের কোনো গ্যারান্টি নেই যে, সব সময় সব অবস্থায় তার মুনাফা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ,যেমন শতকরা পাঁচ, ছয় বা দশ অথবা তার ওপরে থাকবে এবং নীচে কখনো নামবে না। মুনাফার এই হারের গ্যারান্টি তো দূরের কথা, সেখানে নিশ্চিত্য মুনাফা হবে, কখনো লোকসান হবে না, এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজেই যে ব্যবসায়ে এমন ধরনের পুঁজি খাটানো হয়, যাতে পুঁজিপতিকে একটি নির্ধারিত হার অনুযায়ী মুনাফা দেয়ার নিশ্চয়তা দান করা থাকে, তা কখনো ক্ষতি ও আশাংকামুক্ত হতে পারে না।
তিন. যেহেতু মূল ঋণদাতা ব্যবসায়ের লাভ লোকানে অংশীদার হয় না, কেবলমাত্র মুনাফার অংশীদার হয় এবং তাও আবার একটি নির্দিষ্ট হারে মুনাফার নিশ্চয়তা দেয়ার ভিত্তিতে মূলধন দেয়, তাই ব্যবসায়ের ভালো-মন্দের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ থাকে না। সে চরম স্বার্থপরতা সহকারে কেবলমাত্র নিজের মুনাফার ওপর নজর রাখে। যখনই বাজারে সামান্য মন্দভাব দেখা দেয়ার আশংকা হয়, তখনই সে সবার আগে নিজের টাকাটা টেনে নেয়ার চিন্তা করে। এভাবে কখনো নিছক তার স্বার্থপরতা সুলভ আশংকার কারণে সত্যি সত্যিই বাজারে মন্দাবাব সৃষ্টি হয়। কখনো অন্য কেবানো করণে বাজারে মন্দাভাব সৃষ্টি হয়ে গেলে পুঁজিপতরি স্বার্থপরতা তাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে চূড়ান্ত ধ্বংসের সূচনা করে।
সুদের এ তিনটি ক্ষতি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। অর্থনীতির সাথে সামান্যতম সম্পৃক্তি রাখে এমন কোনো ব্যক্তির এগুলো অস্বীকার করতে পাবেন না। এরপর একথা মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই যে, যথার্থই সুদ অর্থনৈতিক সম্পদ বাড়ায় না, বরং কমায়।
এবার দান খয়রাতের অর্থনৈতিক প্রভাব ও ফলাফলের কথায় আসা যাক। সমাজের সচ্ছল লোকেরা যদি নিজেদের অবস্থা ও মর্যাদা অনুসারে নিঃসংকোচে নিজের ও নিজের পরিবার পরজনদে জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেয়, এরপর তাদের কাঝে যে পরিমাণ টাকা উদ্বৃত্ত থাকে তা গরীবের মধ্যে বিলি করে দেয়, যাতে তারাও নিজেদের প্রয়োজনের জিনিসপত্র কিনতে পারে, তারপরও যে টাকা বাড়তি থেকে যায় তা ব্যবসায়ীদের বিনা সুদে ঋণ দেয় অথবা অংশীদারী নীতির ভিত্তিতে তাদের সাথে লাভ-লোকসানে শরীক হয়ে যায় অথবা সমাম ও সমিষ্টির সেবায় বিনিয়োগ করার জন্য সরকারের হাতে সোপর্দ করে দেয়, তাহলে এহেন সমাজে শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ইত্যাদি চরম উন্নতি লাভ করবে, সমাজের সাধারণ লোকদের সচ্ছলতা বেড়ে যেতে থাকবে এবং সুদী অর্থব্যবস্থা ভিত্তিক সমাজের তুলনায় সেখানে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, একথা কেউ সামান্য চিন্তাভাবনা করলে সহজেই বুঝতে পারবে ।
সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তার মৌলিক প্রয়োজনের চেয়ে বেশী অংশ পেয়েছে, একমাত্র সেই ব্যক্তিই সুদে টাকা খাটাতে পারে। কোনো ব্যক্তি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই যে অংশটা পায় কুরআনের পরিভাষায় একে বলা হয় আল্লাহর দান। আর আল্লাহর এই দানের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পদ্ধতি হচ্ছে, আল্লাহ যেভাবে বান্দাকে দান করেছেন বান্দাও ঠিক সেভাবেই আল্লাহর অন্য বান্দাদেরকে তা দান করবে। [মূল : তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল বাকারা, আয়াত ২৭৫-২৭৬, টীকা ৩১৯-৩২০]

৪. সুদমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণ

বর্তমান যুগের একটি উন্নতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক প্রয়োজন পূরণে সক্ষম এমন একটি সুদবিহীন অর্থ-ব্যবস্থা বাস্তবে গড়ে তোলা সম্ভ কিনা, এ প্রশ্নটিই এখন আমাদের আলোচ্য বিষয়।

কয়েকটি বিভ্রান্তি

এ ব্যাপারে বরং বাস্তব সংশোধনের প্রত্যেকটি ব্যাপার যেসব বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন মানুষেল মনকে আলোড়িত করে এ প্রসঙ্গে আলোচনার পূর্বে সেগুলোর জবাব দেয়া প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে প্র্রথম ও প্রধান বিভ্রান্তিটি থেকেই আমরা আমাদের পুর্বোল্লেখিত প্রশ্নটি দেখা দিয়েছে। এ বইতে আামাদের ইতপূর্বেকার যুক্তিভিত্তিক আলোচনায় সুদের ভ্রান্তি ও ক্ষতিকারক দিকটি সুস্পষ্ট করা হয়েছে। অন্যদিকে কুরআন ও হাদীরে উদ্ধুতি থেকে একথা প্রমাণ করা হয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সব রকমের সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। এ দুটো কথা স্বীকার করে নেয়ার পর- “সুদ ছাড়া অর্থনৈতিক কাজ করবার পরিচালনা করা কি সম্ভব?” “সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা কি বাস্তবে গড়ে তোলা যায়?” –এ জাতীয় প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর। এ থেকে তো পরোক্ষভাবে একথা বলারই চেষ্টা করা হয় যে, খোদার খোদায়র ভূল হওয়ার একটি অনিবার্য ব্যাপার এবং এতে এমন সত্যও আছে, যা কার্যকর ও বাস্তবয়িত হওয়া সম্ভবপর নয়। এভাবে আসলে প্রকৃতি ও তার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করা হয়। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা এমন একটি পচনশী বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি যেখানে আমাদের অনেক প্রকৃত প্রয়োজনকে জুড়ে দেয়া হয়েছে ভুল ও দুষ্কর্মের সাথে এবং অনেক কল্যাণের দরজা জেনে বুঝেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথবা এর চেয়েও আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে আমরা এর এ অর্থ গ্রহণ করতে পারি যে, প্রকৃতির বক্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যার ফলে প্রকৃতির নিজেরে বিধান যাকে ভুল বেল, তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায়, তা কল্যাণকর, অপরিহার্য ও কার্যকর হয এবং তার বিধান যাকে নির্ভুল বলে, তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় তা অকল্যাণকর ও অকার্যকর হয়।
সত্যিই কি আমরা নিজেদের বুদ্ধি, জ্ঞান ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে প্রকৃতির স্বভাব ও মেজাজ সম্পর্কে এ ধরনের কুধারণা সৃষ্টির কোনো অবকাশ পাই? প্রকৃতি ভাঙার সহায়ক ও গড়ার শত্রু, একথা কি সত্য? একথা সত্য হলে বস্তুরে ভালো ও মন্দ, কল্যাণকর ও অকল্যাণকর এবং ভুল ও নির্ভুলের সব আলোচনা শিকেয় তুলে দিতে হবে। সোজা কথঅয় আমাদের জন্য আর কোনো আশার আলো থাকে না। কিন্তু আমাদের এবং এ বিশ্ব জগতের প্রকৃতি ডদি এ কুধারণার শিকার হতে না চায়, তাহলে আমাদের অবশ্যি এ বিশেষ চিন্তা পদ্ধতি পরিহার করতে হবে যে, “অমুক বস্তুটি খারাপ হলেও তার সাহায্যেই কার্যোদ্ধঅর হয়” এবং অমুক বস্তুটি সত্য ও ন্যায়সঙ্গত হলেও তা কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়।”
আসলে দুনিয়ায় যে পদ্ধতি একবার প্রচলিত হযে যায় মানুষের যাবতীয় কাজ কারবার লেনদেন তার সাথে জড়িত হযে পড়ে এবং ঐ পদ্ধতি পরিবর্তন করে অন্য পদ্ধতি প্রচলন করা কঠিন বলে মনে হতে থাকে। ভালো মন্দ, ভুল নির্ভুল যাই হোক না কেন প্রত্যেকটি প্রচলিত পদ্ধতির এই একই অবস্থা। প্রচলিত পদ্ধতিটি প্রচলিত বলেই সহজ মনে হয়। অন্যদিকে অপ্রচলিত পদ্ধতিটি অপ্রচলিত এবং প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে তাকে প্রচলিত করতে হবে বলেই তা কঠিন মনে হয়। কিন্তু অবুঝ লোকেরা এটা না বুঝে মনে করে, প্রচলিত ভুলতাটাই সহজ ও স্বাভাবিক, মানুষের যাবতীয় কাজ কারবার এরই ভিত্তিতে সহজে জলতে পারে এবং এ ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে দ্বিতীয় বিভ্রান্তিটি হচ্ছে, পরিবর্তন কঠিন হবার আসল কারণগুলো লোকেরা বুঝে না। ফলে তারা পরিবর্তনের পরিকল্পনা অবাস্তব ও কার্যকর যোগ্য নয় বলে উড়িয়ে দেয়। প্রচলিত কোনো ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে অবাস্তব ও কার্যকরযোগ্য নয় বলে উড়িয়ে দেয়া আসলে মানবিক প্রচেষ্টাবলীর সম্ভাবনাসমূহ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণেরই ফল, এ ‍দুনিয়ারই কোনো কোনো এলাকয় ব্যক্তিগত মালিকানা খতম করে রাষ্ট্রীয় মালিকান কায়েম করার ন্যায় চরম বিপ্লবাত্মক পরিকল্পনাও কার্যকর করা হয়েছে। কাজেই এক্ষেত্রে সুদ রহিত করে যাকাতের সংগঠন কায়েম করার ন্যায় ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভ নয়- একথা বলা কোনাক্রমেই শাভা পায় না। তবে একথা ঠিক, প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করে নতুন ব্যবস্থায় জীবন গড়ে তোলা রহীম করীরেম ন্যায় যে কোনো সাধারণ লোকের কাজ নয়। এ কাজ কেবল তারাই করতে পারে যাদের মধ্যে দুটো শর্ত পাওয়া যায়”
এক : যারা যথার্থই পুরাতন ব্যবস্থা পরিহার করেছে এবং যে পরিকল্পনা অনুযায়ী জীবনের সমগ্র ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধন করার লক্ষ্য গৃহীত হয়েছে, তার উপর আন্তরিকভাবে বিশ্বাস স্থাপন করেছে।
দুই: যারা অনুকরণ প্রবৃত্তির পরিবর্তে ইজতিহাদী প্রবৃত্তির অধিকারী। যারা নিছক প্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তিটুকুর অধিকারী নয়, যা পুরাতন ব্যবস্থাকে তার পূর্বের পরিচালকদের ন্যায় দক্ষতা সহকারে পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট, বরং এমন বিশেষ পর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী যা বিধ্বস্ত পথরেখাগুলো পরিহার করে নতুন পথরেখা তৈরী করার জন্য প্রয়োজন।
এ দুটো শর্ত যাদের মধ্যে পাওয়া যায় তারা কমিউনিজম, নাৎসীবাদ, ফ্যাসীবাদের ন্যায় চরম বিপ্লবাত্মক মতবাদগু
লোর একদেশদর্শী পরিকল্পনা-সমূহও কার্যকর করতে পারে। আর যাদের মধ্যে এই শর্ত দুটো পাওয়া যায় না তারা ইসলামের একান্ত ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনাও কার্যকর করতে পারে না।
এ ব্যাপারে আরো একটি ছোটখাটো বিভ্রান্তির অপনোদন হওয়া উচিত। গঠনমূলক সমালোচনা ও সংস্কারমূলক পরিকল্পনার জবাবে যখন কাজের নীল নকশা চাওয়া হয় তখন অবস্থা দেখে মনে হয় যেন কাগজের পিঠেই পরিকল্পনা সীমাবদধ এবং লোকেরা খাতার পাতাকেই কাজের ক্ষেত্র বলে মনে করে। অথচ কাজের আসল ক্ষেত্র হচ্ছে জমিন। কাগজের সাহায্যে প্রচলিত ব্যবস্থার গলদ, ক্ষতি ও অকল্যাণসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরা এবং এর স্থলে যে ব্যবস্থঅ আমরা কার্যকর করতে চাই তার যৌক্তিকতা বলিষ্ঠভাবে সপ্রমাণ করা। এরপর কাজের সাথে যেসব বিষয়ের সম্পর্ক, কাগজের পিঠ সেগুলো সম্পর্কে বড়জোর এতটুকুন করা যেতে পারে যে, পুরনো ব্যবস্থার ভুল পদ্ধতিগুলো কিভাবে নির্মূল করা যেতে পারে, এবং সে স্থলে নতুন পরিকল্পনাগুলো কিভাবে কার্যকর করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে মানুষের সামনে একটা সাধারণ চিন্তা ও ধারণা তুলে ধরা। তবে এ ব্যাপারটির বিস্তারিত রূপ কি হবে, এর ছোটখাটো ‍ও খুঁটিনাটি পর্যায়গুলো কি হবে এবং প্রত্যেক পর্যন্ত ‍উদ্ভূত সমস্যাবলী সমাধানের উপায় কি হবে- এসব বিষয় কোনো ব্যক্তি পূর্বাহ্নে অবহিত হতে পারে না এবং এ প্রশ্নগুলোর জবাব দেয়াও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান ব্যবস্থার ভ্রান্তি সম্পর্কে যদি আপনি সম্পূর্ণ নিঃসংশয় হয়ে থাকেন এবঙ মনে করে থাকেন যে, সংশোধনের প্রস্তাব যথার্থই ন্যাংসঙ্গত তাহলে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আসুন এবং এমন সব লোকের হাতে কাজের দায়িত্বভার অর্পণ করুন যারা ঈমানী শক্তি ও ইজতিহাদী বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী। তারপর বাস্তব ক্ষেত্রে যেখানে যে সমস্যা দেখা দেবে সেখানেই তার সমাধানও হয়ে যাবে। যে কাজ কার্যক্ষেত্রে হাতে কলমে করার মতো তা কাগজের পিঠে আঁচড় কেটে কেমন করে করা যেতে পারে?
এবিস্তারিত আলোচনার পর একথা বলার কোনো প্রয়োজন থাকে না যে, এ অধ্যাযে আমি যা কিছু পেশ করবো তা সুদবিহীন অর্থনীতির কোনো বিস্তারিত রূপরেখা হবে না, বরং তা হবে সুদকে সামগ্রিক অর্থনীতি থেকে রহিত করার বাস্তব কাঠামো কি হতে পারে এং সুদ রহিত করার চিন্তা উদয়ের সাথে সাথে, আপাতদৃষ্টিতে মানুষের সামনে যেসব বড় বড় সমস্য দেখা দেয় সেগুলো কিভাবে সমাধান করা যেতে পারে, তার একটা সাধারণ চিন্তা।

সংস্কারের পথে প্রথম পদক্ষেপ

আগের অধ্যায়গুলোর সুদ সম্পর্কে যে বিস্তরিত আলোচনা করা হয়েছে, তা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সুদের প্রচলন আইনগতভাবে বৈধ হবার কারণেই সামগ্রিক অর্থনীতি ও অর্থনীতিক ব্যবস্থায় যাবতীয় গলদ ও অনিষ্টকারিতা সৃষ্টি হয়েছে। সুদের দুয়ার উন্মুক্ত থাকার পর কোনো ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ‘কর্জে হাসান’ বা সুদমুক্ত ঋণ দেবে কেন? সে একজন ব্যবাসায়ীর সাথে লঅভ লোকসানের শরীক হতে যাবে কেন? সে তার জাতির প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য আন্তরিক সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে যাবে কোন্‌ স্বার্থে? কেনই বা সে নিজরে সঞ্চিত পুঁজি মহাজন ও পুঁজিপতির নিকট সোপর্দ করবে না- যেখান থেকে ঘরে বসে বসেই সে একটি নির্দিষ্ট মুনাফা লাভের আশা রাখে? মানুষের অসৎ প্রবৃত্তি ও প্রবণতাগুলোকে উদ্দীপিত ও উগ্র করার পথ ‍উন্মুক্ত করে দেবার পর নিছক বক্তৃতা, উপদেশ ও নৈতিক আবেদনের মাধ্যমে সেসবের অগ্রগতি ও অনিষ্টকারিতা বন্ধ করার আশা করা যেতে পারে না আবার এখানে কেবল একটি অসৎ প্রবণতাকে অবাধ স্বাধীনতা দেয়ার মধ্যেই ব্যাপারটি সীমাবদ্ধ নয়। বরংএর থেকেও প্রবণতারকে অবাধ স্বাথীনতা দেয়ার মধ্যেই ব্যাপারটি সীমাব্ধ নয়। বরং এর থেকেও অগ্রসর হয়ে আমাদের প্রচলিত আইন তার সাহায্যকারীর দায়িত্ব নিয়েছে এবং আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার স্বয়ং এই অসৎ প্রবণতাটির ভিত্তিতে সমগ্র অর্থব্যবস্থা পরিচালনা করেছে। এ অবস্থায় কিছু আংশিক পরিবর্তন ও ছোটখাটো সংশোধনের মাধ্যমে এর যাবতীয় অনিষ্টকারিতার গতিরোধ কেম করে সম্ভবপর হতে পারে? একটিমাত্র পথেই ইর গতিরোধ করা যেতে পারে, তা হচ্ছে, যে পথে অনিষ্টকারিতা আসছে প্রথমে সে পথটিই বন্ধ করতে হবে।
যারা মনে করে প্রথমে একটি সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা তৈরী হয়ে যাবে, তারপর সুদ আপনাআপনি বন্ধ হযে যাবে অথবা আইন করে বন্ধ করা হবে, তারা আসলে ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দিতে চায়। যতদিন আইনগত ভাবে সুদের প্রচলন থাকবে, দেশের আদালতগুলো সুদী চুক্তিপত্রের স্বীকৃতি দিয়ে বলপূর্বক সেগুলো প্রবর্তন করবে এবং পুঁজিপতদের জন্য সুদের লোভ দেখিয়ে- প্রতি গৃহ থেকে অর্থ সঞ্চিত করা, অতঃপর সুদের ভিত্তিতে তা ব্যবাসায়ে খাটাবার পথ উন্মুক্ত থাকবে, ততদিন কোনো সুদবিহীন অর্থব্যবস্থার অস্তিত্ব লাভ ও অগ্রগতি কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কাজেই সুদ রহিত হবার ব্যাপারটি যদি প্রথমে একটি অর্থব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত হবার যোগ্যতা অর্জন করার শর্ত সাপেক্ষ হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বো যেতে পারে যে, কিয়ামত পর্যন্ত সুদ রহিত হবার কোনো উপায়ই দেখা দেবে না। এ কাজ করতে গেলে প্রথম পদক্ষেপেই আইনগতভাবে সুদ রহিত করতে হবে। অতঃপর স্বতঃস্ফূর্তভাবে সুদবিহীন অর্থভ্যবস্থার সৃষ্টি হয়ে যাবে এবং যেহেতু আবশ্যকতা আবিষ্কারের জননী সেহেতু স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর জন্য সবদিকে ও সবক্ষেত্রে অগ্রসর হবার ও ছড়িয়ে পড়ার পথ প্রশস্ত হতে থাকবে।
মানব প্রকৃতির যেসব অসৎ প্রবণতা সুদের জন্ম দিযেছে সেগুলো এত গভীরে প্রবেশ করে আছে এবং তাদের দাবী এতই শক্তিশালী যে অসম্পূর্ণ ও খাপছাড়া কার্যক্রম এবং সাদামাটা কৌশল অবলম্বন করে কোনো সমাজ থেকে এ আপদটি দুর করা সম্ভব হয় না। এজন্য ইসলাম যেসব কৌশল ও উপায় অবলম্বন করার প্ররামর্শ দিয়েছে সেব পুরোপুরি অবলম্বন করতে হবে এবং যে ধরনের তৎপরতা সহকারে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম মুখর হতে বলেছে সে ধনের তৎপরতা অবলম্বন করতে হবে। ইসলাম সুদী ব্যবসায়ের কেবলমাত্র নৈতিক নিন্দাবাদ করেই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং এই সাথে একদিকে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী তাকে হারাম গণ্য করে তার বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং অন্যদিকে যেখানে ইসলামের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে দেশীয় আইনের সাহায্য তাকে নিষিদ্ধ করে, সকল সুদের চুক্তি বাতিল করে, সুদ দেয়া নেয়া, সুদের দলিল লেখা ও তাতে সাক্ষী হওয়াকে ফৌজদারী অপরাধ ও পুলিশের হস্তক্ষেপযোগ্য গণ্য করে এবং কোথাও সামান্য শাস্তি মাধ্যমে এ কারবার বন্ধ না হলে অপরাধীকে হত্যা ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাও শাস্তি দেয়। তৃতীয় দিকে ইসলাম যাকাতকে ফরয তথা অবশ্যিপালনীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য করে এবঙ সরকারী পরিচালনাধীনে তা উসূল ও বন্টনের ব্যবস্থা করে একটি নতুন অর্থব্যবস্থার ভিত গড়ে তোলে। এসব উপায় অবলম্বন করার সাথে সে শিক্ষা, অনুশীলন ও প্রচার প্রপাগান্ডার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের চিন্তা ও কর্মের সংশোধনও করে। এর ফলে তাদের মনের সুদখোরী প্রবণতা, স্তিমিত হয়ে যায় এবং এর পরিবর্তে এমনসম প্রবণতা ও গুণাবলী সে স্থান অধিকার করে, যেগুলোর মাধ্যমে সমাজের অভ্যন্তরে সহানুভূতি ও বদান্যতাপূরণ সহযোগিতার প্রবণতা অন্তঃসলিলা ফাল্গুণধারার ন্যায় প্রবাহিত থাকে।

সুদ রহিত করার সুফল

যথার্থ গুরুত্ব ও আনিরিকতা সহকারে সুদকে রহিত করতে চাইলে এ পথে এবং এভাবেই সবকিছু করতে হবে। সুদকে আইনগতভাবে রহিত করে দিলে এবঙ এই সাথে যাকাত উসূল ও বন্টনের সামগ্রিক ব্যবস্থা গৃহীত হলে, ধন সংগৃহীত হবার বর্তমান বিপর্যয়মূলক অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে একটি সঠিক, সুস্থ ও কল্যাণকর অবস্থার সৃষ্টি হবে।
বর্তমান অবস্থার নিম্নোক্তভাবে ধন সংগৃহীত হয়: আমাদের সমাজ ব্যবস্থা প্রত্যেক মানুষের স্বভাবজাত কার্পণ্য ও ধন সঞ্চয় প্রবণতা কে কৃত্রিম উপায়ে চরম পর্যায়ে বাড়িয়ে দেয়। অতপর ভীতি ও লোভের অস্ত্র ব্যবহার করে তাদের আযের স্বল্পতম অংশ ব্যয় ও সর্বাধিক অংশ সঞ্চয় করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাদেরকে এই বলে ভয় দেখায় যে, যদি তোমরা এখন সঞ্চয় না কর তাহলে দুর্দিনে সমগ্র সমাজে তোমাদের সাহায্যকারী কেউ থাকবে না, তখন এ সঞ্চিত ধন তোমাদের কাজে লাগাবে। তাদেরকে এই বলে লোভ দেখায় যে, ধন সঞ্চয় করলে এর বিনিময়ে তোমরা সুদ পাবে। এ ‍দ্বিমুখী আন্দোলনের মুখে সমাজের প্রায় সকল ব্যক্তিই, যারা নিজেদের প্রয়োজনের চাইতে সামান্য পরিমাণ বেশী আয় করে, ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় বাড়াতে ভীষণভাবে উদ্যোগী হয়ে ওঠে। ফলে বাজারে পণ্যদ্রব্যাদির বিক্রয় ও চাহিদা সম্ভাব্য পরিমাণ থেকে অনেক কমে যায়। পণ্যদ্রব্যের আমদানী যে পরিমাণ কমে যায় শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির সম্ভখাবনাও ঠিক সেই পরিমাণে কমে যায় এবং ধন ও পুঁজি সংগৃহীত হবার সুযোগও কমে যেতে থাকে। এভাবে কয়েক ব্যক্তির সঞ্চয় বেড়ে যাবার কারণে সামগ্রিক ধনের পরিমাণ কমে যায়। এক ব্যক্তি এমন পদ্ধতিতে নিজের সঞ্চিত ধনের পরিমাণ কমে যায়। এক ব্যক্তি এমন পদ্ধতিতে নিজের সঞ্চিত ধনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে যার ফলে হাজার হাজার লোকের ধন উপার্জনের যোগ্যতাই খতম হয়ে যায়, এক্ষেত্রে তাদের সঞ্চয়ের প্রশ্নই ওঠে না।
বিপরীতপক্ষে যখন সুদ রহিত করা হবে এবং যাকাত সংগঠন কায়েম করে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিকে এই মর্মে নিশ্চয়তা দান করা হবে যে, দুর্দিনে তার সাহায্যের যথাযোগ্য ববস্থা রয়েছে, তখন কার্পণ্য ও ধন সঞ্চয়ের প্রকৃতিবিরোধী কারণ, প্রবণতা ও উদ্যম খতম হয়ে যাবে। লোকেরা নিজেরা মক্তহস্তে ব্যয় করবে এবং অভাবীদেরকে যাকাতের মাধ্যমে দান করে তাদের ক্রয়ক্ষমতা এমন পর্যাযে পৌঁছাবে যার ফলে তারা অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হবে। ফলে শিল্প বাণিজ্য বেড়ে যাবে, কাজ কর্ম ও উপার্জন বেড়ে যাবে এবং আয় বেড়ে যাবে। এ পরিবেশে শিল্প ও ব্যবসায়ের নিজস্ব মুনাফা এত বেশী বেড়ে যাবে যার ফলে আজকের ন্যায় তাদের বাইরের পুঁজির এত বেশী মুখাপেক্ষী হতে হবে না। উপরন্তু তারা যে পরিমাণ পুঁজির অভাব অনুভব করবে বর্তমান অবস্থার তুলনায় তা অনেক বেশী সহজে সংগ্রহীত হতে পারবে। কারণ যখন সঞ্চযের কাজ পুরোপুরি বন্দ হয়ে যাবে না, যেমন কেউ কেউ মনে করে থাকেন। বরং তখনো কিছু সংখ্যক লোক নিজেদের জন্মগত স্বভাবসিদ্ধ কারণে অর্থ সঞ্চয় করে যেতে থাকবে। আবার অনেক লোক বরং বেশীর ভাগ লোক আয়বৃদ্ধি ও সমাজের সাধারণ সমৃদ্ধির কারণে উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় করতে বাধ্য হবে তখন ও সঞ্চয়ের পেছনে কোনো প্রকার কার্পণ্য, লোভ বা ভয় কার্যকর থাকবে না, বরং তার একমাত্র কারণ হবে এই যে, লোকেরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করবে। ইসলামের বিভিন্ন বৈধ ব্যয়ক্ষেত্রে মুক্তহস্তে ব্যয় করার পরও তাদের নিকট বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত থাকবে। এ উদ্বৃত্ত অর্থ গ্রহণ করার মতো কোনো অভাবী লোকও থাকবে না। কাজেই এ অবস্থায় তারা এগুলো ঘরে ফেলে রাখবে এবং ভালো ও উপযু্ক্ত শর্তে নিজেদের রাষ্ট্রয়ী প্রয়োজন ও প্রকল্পে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে এং প্রতিবেশী দেশেও বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত হবে।
এর দ্বিতীয় সুফল এই দেখা দেবে যে, সঞ্চিত ধন জমাজবদ্ধ হবার পরিবর্তে আবর্তিত হতে থাকবে এবং অর্থনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অনবরত সাহায্য পৌছাতে থাকবে। বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যবসায়ের পুঁজি বিনিয়োগের পেছনে একমাত্র সিুদের লোভেই কার্যকর থাকে। কিন্তু এ জিনিসটিই আবার এর পুঞ্জিভূত হবার কারণেও পরিণত হয়। কারণ ধন সাধারণত সুদের হার অধিক হবার অপেক্ষায় বসে থাকে। উপরন্তু এ জিনিসটিই আবার ধনের প্রকৃতি ও মেজাজকে কারবারের প্রকৃতি ও মেজাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যখন কারবার পুঁজির চাহিদা পেশ করে, তখন পুঁজি অসম্মতি প্রকাশ করে, আর বিপরীত অবস্থায় পুঁজি কারবারে পেছনে দৌড়াতে থাকে এবং নিম্নতম শর্তে যে কোনো ভালো মন্দ কাজে লাগতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু যখন আইনগতভাবে সুদের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে, বরং উল্টো যাবতীয় সঞ্চিত ধনের উপর বছরে শতকরা আড়াই ভাগ হিসেবে যাকাত আদায় করা হবে, তখন ধনের এ অপ্রকৃতিস্থতার অবসান ঘটবে। সে নিজেই পুঞ্জিভূতও অলস থাকার পরিবর্তে কোনো যুক্তিসঙ্গত শর্তে দ্রুত কোনো কোনো কারবারে লাগার ইচ্ছা প্রকাশ করবে।
এর তৃতীয় সুফলটি হবে এই যে, ব্যবাসায়য়িক অর্থ ঋণ বাবত অর্থ উভয়ের খাত সম্পূর্ণ আলাদ হয়ে যাবে। বর্তমান ব্যবস্থঅয় পুঁজির অধিকাংশ, বরং প্রায় সমগ্র অংশই সংগৃহীত হয় ঋণে আকারে। অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো মুনাফাজনক কাজের জন্যে বা অমুনাফাজনক কাজের জন্যে অথবা কোনো সাময়িক প্রয়োজনে বা দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্যে অর্থ গ্রহণ করুক না কেন, সর্বাবস্থায়ই একটি নির্ধারিত সুদভিত্তিক ঋণের শর্তেই তা লাভ করা সম্ভব হয়। কিন্তু সুদ নিষিদ্ধ হযে যাবার পর ঋণের খাত কেবলমাত্র অমুনাফাজনক কাজ বা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নিছক সাময়িক প্রয়োজনের জন্যে নির্দিষ্ট থাকবে। এ অবস্থায় কর্জে হাসানার নীতির ভিত্তিতে এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। আর অন্যান্য খাতে, যেমন শিল্প বাণিজ্য প্রভৃতি বা সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের লাভজনক প্রকল্পগুলোতে ঋণের পরিবর্তে বা মুযাবারাত বা লাভভিত্তিক অংশীদারিত্বের (PROFIT SHARING) ভিত্তিতে পুঁজি বিনিয়োগ করা হবে।
সুদবিহীন অর্থব্যবস্থায় এ দুটো বিভাগ কিভাবে কাজ করবে, এখন আমি সংক্ষেপে এ আলোচনা করবো।

সুদবিহীন অর্থব্যবস্থায় ঋণ সংগ্রহের উপায়

প্রথমে ঋণের ব্যাপারে আসা যাক। কারণ লোকেরা সবচেয়ে বেশী ভয় করছে যে, সুদ নিষিধ্ধ হয়ে গেলে ঋণ পাওয়া যাবে না। কাজেই আমরা প্রথমে একথা প্রমাণ করবো যে, এই অপবিত্র প্রতিবন্ধকতাটি (সুদ) দূল হয়ে যাবার পর ঋণ লাভের পথ কেবল অনিরুদ্ধ থাকবে না, বরং বর্তমানের তুলনায় তা অধিকতর সহজ ও ‍উন্নততর হবে।

ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ

বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণের একটিই মাত্র পথ আছে। সে পথটি হচ্ছে, ‍দরিদ্র ব্যক্তি পুঁজিপতি ও মহাজনের নিকট থেকে এবং সম্পদশালী ব্যক্তি ব্যাংক থেকে সুদীঋণ গ্রহণ করতে পারে। এ অবস্থায় তারা যে কোনো উদ্দেশ্যে যে কোনো পরিমাণ ঋণ পেতে পারে। তবে মহাজন ও ব্যাংকারকে নিয়মিত সুদ আদায় ও আসল প্রত্যার্পণের গ্যারান্টি দিতে হবে। সে কোনো পাপ কজ করার জন্যে, কোনো অপ্রয়োজনীয় কাজে অথবা বিপুল ব্যয়ের জন্যে বা যথার্থই কোনো প্রয়োজন পূরণের ঋদ্দশ্যে ঋণ নিয় থাক না কেন। বিপরীতপক্ষে কোনো ব্যক্তির গৃহে যদি অর্থভাবে কোনো মৃতের দাফন ও কাফনও আটকে থাকে, তাহলেও পুঁজিপতি ও ব্যাংকারকে নিয়মিত সুদ আদায় ও আসল প্রত্যার্পণেল নিশ্চয়তা বিধান না করা পর্যন্ত সে কোথাও থেকেও একটি পয়সা ঋণ লাভ করতে পারবে না। উপরন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় দরিদ্রের বিপদ ও ধনীর পুত্রদের বখাটেপনা উভয়টাই পুঁজিপতিদের আয়ের উত্তম সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এক্ষেত্রে স্বার্থপরতার সাথে সাথে এমন চরম হৃদয়হীনতার পরিচয় দেয়া হয় যার ফলে সুদী ঋণের জালে আটকা পড়া ব্যক্তি সুদ পরিশোধ বা আসল প্রত্যার্পণেল ব্যাপারে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। যার কাছ থেকে সুদ ও আসল আদায় করার দাবী জানানো হচ্ছে, সে প্রকৃতপক্ষে কোন্‌ বিপদের মধ্যে অবস্থান করছে, তা তলিয়ে দেখার মতো মানসিকতা কারোর নেই। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণ লাভ করার জন্যে বর্তমান ব্যবস্থা যে সুযোগ সুবিধা দান করেছে, এ হচ্ছে তার আসল রূপ। এবার ইসলাম সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা ও যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে কিভাবে এ প্রয়োজন পূর্ণ করার ব্যবস্থা করবে তা অনুধাবন করা যাক।
প্রথমত এ ব্যবস্থায় অমিতব্যয়িতা ও পাপবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে ঋণ গ্রহণের দুয়ার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কারণ এখানে সুদের লোভে অপ্রয়োজনীয় ঋণ দানকারীর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। এ অবস্থায় ঋণ সম্পর্কিত যাবতীয় লেনদেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেবলমাত্র সঙ্গত প্রয়োজনে মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ অর্থ গ্রহণ সঙ্গত হবে, কেবল সেই পরিমাণই দেয়া-নেয়া হবে।
উপরন্তু এ ব্যবস্থায় যেহেতু ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে ঋণদাতার কোনো প্রকার লাভ বা সুবিধা গ্রহণের অবকাশ থাকবে না, তাই ঋণ বাবদ গৃহীত অর্থ প্রত্যার্পণের পথও অধিকতর সহজ হবে। সর্বনিম্ন আয়ের অধিকারী লোকেরাও ছোট ছোট কিস্তিতে অতি সহজে ও দ্রুত ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হবে। যে ব্যক্তি কোনো জমি, গৃহ বা সহায় সম্পত্তি বন্ধক রাখবে, তার এ বন্ধকী সম্পত্তি ছাড়িয়ে নেয়া অধিকতর সহজ ও দ্রুত হবে। কারণ তার সম্পত্তি খাতে লব্ধ আয় সুদের খাতে জমা না হয়ে ঋণ বাবদ গৃহীত অর্খ পরিশোধের খাতে জমা হবে। এভাবে অতি দ্রুত ও সহজে তার ঋণ পরিশোধ হয়ে যাবে। এতোগুলো সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যদি ঘটনাক্রমে কারোর ঋণ পরিশোধ সম্ভব না হয়, তাহেল রাষ্ট্রের বায়তুলমাল তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং বায়তুলমাল থেকে ‍ঋণ পরিশোধ করে দেয়া হবে। এমনকি, কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি নিজের কোনো সহায় সম্পত্তি না রেখেই মারা যায়, তাহলেও ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব বায়তুলমালের উপর বর্তাবে। এসব কারণে সচ্ছল ও ধনী লোকদের জন্যে নিজের অভাবী প্রতিবেশীকে সাহায্য করা বর্তমান ব্যবস্থার ন্যায় এতটা কঠিন ও বিরক্তিকর ঠেকবে না।
এরপরও কোনো ব্যক্তি তার পাড় প্রতিবেশীদের নিকট থেকে ঋণ লাভে সক্ষম না হলে বায়তুলমালের দুয়ার তার জন্যে অবশ্যি খোলা থাকবে। সেখান থেকে সে সহজে ঋণ লাভ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বায়তুলমালের সাহায্য গ্রহণ করা যেতে পারে সর্বশেষ উপায় হিসেবে। ইসলারেম দৃষ্টিতে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পরস্পরকে ঋণ দেয়া ইসলামী সমাজে ব্যক্তিবর্গের জন্যে অপরিহার্য কর্তরূপে চিহ্নিত। কোনো সমাজের ব্যক্তিবর্গের নিজেদের এ ধরনের নৈতিক দায়িত্বসমূহ নিজেরাই উপলব্ধি করা ও তা পালন করতে উদ্যোগী হওয়া সংশ্লিষ্ট সমাজের সুস্থতারই লক্ষণ। যদি দেখা যায়, কোনো গ্রাম, পল্লী বা জনবসতির কোনো অধিবাসী তার প্রতিবেশীদের নিকট থেকে ঋণ পাচ্ছে না বলে বাধ্য হয়ে বায়তুলমালের শরণাপন্ন হয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে সেখানকার নৈতিক পরিবেশ বিকৃত হয়ে গেছে। কাজেই এ ধরনের কোনো ঘটনা বায়তুলমালে পৌঁছার পর কেবলমাত্র ঋণ গ্রহণেচ্ছু ব্যক্তির প্রয়োজন পূর্ণ করলেই চলবৈ না, বরং সাথে সাথেই নৈতিক স্বাস্থ্য সংরক্ষণ বিভাগকে এ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং কাল বিলম্ব না করে ঐ জরাগ্রস্ত জনবসতিকে রোগমুক্ত করার প্রতি নজর দিতে হবে, যেখানকার অধিবাসীরা প্রয়োজনের সময় তাদের এক প্রতিবেশী ভাইকে কোনো প্রকার সাহায্য করতে সক্ষম হয়নি। এ ধরনের কোনো ঘটনার একটি সৎ ও সুস্থ নৈতিক ব্যবস্থায় এমন আলোড়ন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, যেমন একটি বস্তুবাদী ব্যবস্থায় কলেরা বা মহামারীর ঘটনা অস্থিরতা ও আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণ সংগ্রহ করার জন্যে ইসরামী ব্যবস্থায় আর একটি পদ্ধতি অবলম্বিত হতে পারে। তা হচ্ছে, সকল ব্যাবসায়ী কোম্পানী ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্যে যেসব আইনগত অধিকার নির্ধারিত থাকবে, অপরিহার্য প্রয়োজনের সময় তাদের ঋণ দেয়ার অধিকারটিও তার অন্তর্ভুক্ত হবে। উপরন্তু সরকার নিজেও নিজের উপর এ দায়িত্বটি চাপিয়ে নেবেন এবং উন্মুক্ত হৃদয়ে তাদের এ অধিকার আদায়ের চেষ্টাও করবেন। এ ব্যাপারটির কেবল নৈতিক চরিত্রটিই মুখ্য নয়, বরং এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চরিত্রও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিজের কর্মচারী ও শ্রমিকদের জন্যে সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করলে কেবলমাত্র যে একটি নেকী অর্জিত হবেচ তা নয়, বরং যেসব কারণে কর্মচারীরা দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, দুরবস্থা, শারীরিক কষ্ট ও বস্তুগত ক্ষতি ও ধ্বংসের সম্মুখীন হয় সেগুলোর মধ্য থেকে একটি বড় কারণষ দূরীভীত হবে। এসব বিপদ থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে পারলে তারা নিশ্চিন্ত হবে। এর ফলে তাদের কর্মক্ষমতা বেড়ে যাবে। তাদের নিশ্চিন্ততা তাদেরকে অনিষ্টকর ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী জীবন দর্শন থেকেও বাঁচাবে। স্থুল দৃষ্টিতে হয়তো এর ফল কিছুই নাও দেখা যেতে পারে; কিন্তু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিচার করলে যে কেউ অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারবে যে, সামগ্রিকভাবে কেবল সমগ্র সমাজই নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক পুঁজিমালিক ও কারখানা মালিক এবং প্রত্যেকটি অর্থণৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ লাভবান হবে তা সুদের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান হবে, যা আজকের বস্তুবাদী ব্যবস্থায় নিছক নির্বুদ্ধিতাজনিত সংকীর্ণমনস্কতার কারণে গহণ করা হয়ে থাকে।

বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ

এরপর ব্যবসায়ীদের নিত্যকার প্রয়োজন মেটাবার জন্যে যেসব ঋণের প্রয়োজন হয় তার আলোচনায় আসা যাক। বর্তমানে এ উদ্দেশ্যে ব্যায়ক থেকে সরাসরি স্বল্পমেয়াদী ঋণ (SORT TERMS LOAB) নেয়া হয় অথবা হুন্ডী (BILLS OF EXCHANGE) ভাঙ্গানো হয়। [ইসলামী ফিকাহর এ বস্তুটির জন্য ‘সাফাতাজ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। এটি একটি পারিভাষিক শব্দ। এর পদ্ধীত হচ্ছে, যেসব ব্যবসায়ী পরস্পরের মধ্যে লেনদেন করে এবং ব্যাংকের সাথেও কারবার করে তারা নগদ অর্থ আদায় না করেও বিপুল পরিমাণ পণ্য পরস্পর থেকে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে এবং এক মাস দু’মাস বা চার মাসের জন্যে দ্বিতীয় পক্ষতে হুন্ডিলিখে দেয়। যদি দ্বিতীয় পক্ষ নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, তাহল অপেক্ষা করে এবং যথাসময়ে ঋণ আদায় হয়ে যায়।] উভয় অবস্থায় ব্যাংক তার উপর সামান্য পরিমাণ সুদ নিয়ে থাকে। এটি ব্যাবসায়ের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন যাকে বাদ দিয়ে আজ কোনে কাজই চলতে পারে না। তাই ব্যবসায়ীরা সুদ রহিত করার কথা শুনে সর্বপ্রথম যে দুশ্চিন্তা কবলিত হয়, তা হচ্ছে এ অবস্থায় নিত্যকার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ঋণ পাবে কোথা থেকে? সুদের লোভ না দেখালে ব্যাংক ঋণ দেবে কেন আর হুন্ডিই বা ভাঙ্গিয়ে দেবে কেন?
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে ব্যাংক সকল আমানত (DEPOSIT) বিনা সুদেই জমা থাকে এবং যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যবাসায়ীরাও তাদের লাখ লাখ টাকা বিনা সুদেই জমা রাখে সে ব্যাংক তাদেরকে বিনা সুদে ঋণ দেবে না কেন এবং তাদের হুন্ডিই বা ভাঙ্গিয়ে দেবে না কেন? সে যদি সোজা পথে এতে সম্মত না হয়, তাহলে ব্যবসা আইনের সাহায্যে তার নিজের গ্রাহকদেরকে (CUSTOMERS) এ সুবিধা দেবার জন্যে তাকে বাধ্য করা হবে। এটি তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।
আসলে এ কাজের জন্য কেবলমা্রত ব্যবসায়ীদের নিজেদের গচ্ছিত রাখা অর্থই যথেষ্ট হতে পারে। তবুও প্রয়োজন হলে অন্য খাত থেকেও ব্যাংক এজন কিছু অর্থ ব্যবহার করতে পারে। মোটকাথা নীতিগতভাবে এ কথা স্বীকার করে নিতেই হবে যে, যে ব্যক্তি সুদ নিচ্ছে না, সে ‍সুদ দেবে না। তা ছাড়া নিত্যকার প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বিনা সুদে ঋণ পেতে থাকা সামগ্রিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের জন্যে লাভজনকও বটে।
তবে এ লেনদেনের বিনিমযে সুদ না পেলে ব্যাংক তার খরচপত্র চালাবে কিভাবে? এ পশ্নের জবাবে বলা যায়, চলতি হিসেবের (CURRENT ACCOUNT) সমস্ত অর্থ যেক্ষেত্রে ব্যাংকের নিকট বিনা সুদে জমা থাকবে, সেক্ষেত্রে ঐ অর্থের একটা অংশ বিনা সুদে দেয়অ মোটেই ক্ষতিকর হবে না। কারণ এ অবস্থায় হিসেব-নিকেশে ও খাতাপত্র ঘাঁটাঘাটির জন্যে ব্যাংককে যে সামান্য খরচপত্র বহন করতে হবে তা তার নিকট যে পরিমাণ অর্থ জমা হবে তা থেকে গৃহীত লাভের তুলনায় বহুলাংশে কম। তবুও যদি ধরে নেয়া যায় যে, এ পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব নয়, তাহলে ব্যাংক নিজের পক্ষ থেকে এ ধরনের কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে তার সকল ব্যবাসায়ী গ্রহকদের নিকট থেকে মাসিক বা ষান্মসিক ফী আদায় করতে পারে, যা দিয়ে তার খরচ পত্র চালানো সম্ভব। সুদের পরিবর্তে এ ফী হবে তাদের জন্যে অনেক সস্তা। কাজেই তারা সানন্দে এটা আদায় করে দেবে।
[কিন্তু মেয়াদ কালের মধ্যে যদি তার অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাহলে সে ঐ হুন্ডিটি ব্যাঙকে জমা দেয়, যে ব্যাংকের সাথে তাদের উভয়ের লেনদেন আছে। ব্যাংক থেকে অর্থ উঠিয়ে সে নিজের কাজ সমাধা করে। একে হুন্ডি ভাঙ্গানো বলা হয়।]

সরকারের অলাভজনক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে

ঋণের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতটি সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। সরকারকে সাময়িক দুর্ঘটনার জন্যে, কখনো অমুনাফাজনক রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে, আবার কখনো যুদ্ধের জন্যে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। বর্তমান অর্থ-ব্যবস্থায় এসব উদ্দেশ্যে প্রায় সবক্ষেত্রে ঋণ এবং তাও আবার সুদীঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ইসলামী অর্থব্যবস্থায় এর সম্পূর্ণ উল্টোটাই করা সম্ভব হবে। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করার সাথে সাথেই দেশের জনসাধারণ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের অর্থ ও সম্পদরাশি চাঁদাস্বরূপে এনে সরকারের তহবিলে জমা করে দেবে। কারণ সুদ রহিত করে যাকাত পদ্ধতির প্রচলনের কারণে তারা অর্থনৈতিক দিক দিয়েং এত বেশী সমৃদ্ধি ও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে যাবে যে, নিজেদের উদ্বৃত্তের একটি অংশ সরকারকে দান করার ব্যাপারে তারা মোটেই ইতস্তত করবে না। এরপরও প্রয়োজন পরিমাণ অর্থ না পাওয়া গেলে সরকার ঋণ চাইবে এবং লোকেরা ব্যাপকহারে সরকারকে সুদমুক্ত ঋণ দেবে। কিন্তু এতেও যদি প্রয়োজন পূর্ণ না হয়, তাহলে নিজের কাজ সমাধা করার জন্যে ইসলামী রাষ্ট্র নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে।
এক: যাকাত ও খুমুসের (যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের নিকট থেকে সংগৃহীত মালের গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) অর্থ ব্যবহার করবে।
দুই: সরকারী নির্দেশের মাধ্যমে সকল ব্যাংক থেকে তাদের আমানতলব্ধ অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করবে। এভাবে জবরদস্তি ঋণ গ্রহণ করার অধিকার অবশ্যি সরকারের আছে, যেমন প্রয়োজনের সময় সরকার জনগণকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাদলে ভর্তি করা (CONSCRIPTIONS) এবং তাদের বাড়ী, গাড়ী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস জোরপূর্বক লাভ করার (REQUISITION) অধিকার রাখে।
তিন: সর্বশেষ উপায় হিসেবে নিজের প্রয়োজন অনুপাতে নোট ছাপিয়েও সরকার কাজ চালাতে পারে। এটি আসলে জনগণের নিকট থেকে ‍ঋণ গ্রহণেরই নামন্তর হবে। তবে এটি অবশ্যি সর্বশেষ উপায়। যাবতীয় উপায় ও পথ বন্ধ হয়ে গেলে অগত্যা এ পথ অবলম্বন করা যেতে পারে। কারণ এ পথে ক্ষতির ফিরিস্ত দীর্ঘতর।

আন্তর্জাতিক প্রয়োজনে ‍ঋণ গ্রহণ

আন্তর্জতিক ঋণের ক্ষেত্রে একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, বর্তমান সুদভিত্তিক অর্থনীতির দুনিয়ায় নিজেদের জাতীয় প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কোথাও থেকে আমরা বিনা সুদে ঋণ পাবো না। এক্ষেত্রে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে, যাতে বাইরে থেকে আমাদের কোনো ঋণ গ্রহণ করতে না হয়। অন্তত ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ না রা উচিত, যতক্ষণ না আমা নিজেদের প্রতিবেশীদেরকে বিনা সুদে ঋণ দিয়ে দুনিয়ার সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। আর ঋণ দেয়ার ব্যাপারে বলা যেতে পারে, ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি তারপর সম্ভবত কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি একথা স্বীকার করতে ইতস্তত করবেন না যে, একবার যদি আমরা সাহস করে নিজেদের দেশে সুদমুক্ত ও যাকাতভিত্তিক সুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্টায় সক্ষম হই তাহলে নিঃসন্দেহে অতি অল্পদিনের মধ্যে আমারেদ আর্থিক অবস্থা এতই সচ্ছল হবে এবং আমরা এতই সমৃদ্ধিশালী হয়ে উছবো, যার ফলে আমাদের কেবল বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজনই হবে না তা নয় বরয় চারপাশের অভাবী দেশগুলো বিনা সুদে ঋণ দিতেও আমরা সক্ষম হবো। যেদিন আমরা দুনিয়ার আদর্শ স্থাপন করতে সক্ষম হবো, সেদিনটি আধুনিক যুগের ইতিহাসে কেবল অর্থনৈতিক দিক দিয়েই নয় বরং রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দিক দিয়েও হবে এটি বৈপ্লবিত দিন। সেদিন অন্য জাতির সাথে আমাদরে সমস্ত লেনদেন হবে সুদবিহীন অর্থব্যবস্থার ভিত্তিতে। এমনকি, সম্ভবত অন্যান্য দেশও একের পর এক নিজেদের মধ্যে সুদ না নেয়ার জন্য চুক্তি সম্পাদন করতে থাকবে। এমনও হতে পারে, বিশ্বজনমত সুদখোরীর বিরুদ্ধে একবাজ্যে ঘৃণা প্রকাশ করবে, যেমন ১৯৪৫ সালের ব্রিটেন উডসের ব্যাপারে ইংল্যান্ডের জনগণ করেছিল। এটা নিছক কোনো আকশকুসুম কল্পনা নয়, বরং আজো দুনিয়ার চিন্তাশীল লোকদের মতে আন্তর্জাতিক ঋণের উপর সুদ চাপিয়ে দেয়ার কারণে ‍দুনিয়ায় রাজনীতি ও অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রে অত্যন্ত মন্দ ও ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। এ পথ পরিহার করে সমৃদ্ধিশালী দেশগুলো যদি নিজেদের উদ্বৃত্ত অর্থ অনুন্নত ও দুর্দশাগ্রস্ত দেশগুলোকে আত্মনির্ভরশীল করার জন্যে ব্যয় করে এবং এজন্যে আন্তরিক ও সহানুভূতি পূর্ণ প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে এ দ্বিবিধ সুফল পাওয়া যাবে। রাজনৈতিক ও তমদ্দুনিক দিক দিয়ে আন্তর্জাতিক তিক্ততা বৃদ্ধি পাবর পরিবর্তে প্রীতি ও বন্ধুত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক দিকে দিয়ে একটি দুর্দশাগ্রস্ত ও দেউলিয়অ দেশের রক্ত শোষণ করার তুলনায় একটি ধনী দেশের সাথে ব্যবসা করা অনেক বেশী লাভজনক প্রমাণিত হবে। চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এ জ্ঞান ও বুদ্ধি বিবেচনার কথা চিন্তা করেচেন এবং যাদের বলার ক্ষমতা আচে তারা বলেও যাচ্ছেন। কিন্তু কেবল চিন্তা ও বলাতেই কাজ হবে না। এজন্য এমন একটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন জাতির প্রয়োজন, যে প্রথমে নিজের ঘরে সুদের অস্তিত্ব বিলোপ করে দেবে, অতঃপর সামনে অগ্রসর হবে আন্তর্জাতিক লেনদেনকেও অভিশাপের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নিজের প্রচেষ্টা শুরু করবে।

লাভজনক কাজে পুঁজি বিনিয়োগ

ঋণের পর আর একটি বিষয়ের পর্যালোচনা প্রয়োজন। সে বিষয়টি হচ্ছে, আমাদের অভিপ্রেত অর্থব্যবস্থায় ব্যবসায়িক অর্থনীতির স্বরূপ কি দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে আমি পূর্বেই কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছি। তা হচ্ছে, সুদ রহিত করার কারণে, লোকদের জন্যে পরিশ্রম ও ঝুঁকি উভটিকে এড়িয়ে,নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট মুনাফার গ্যারান্টি সহকারে কোনো কাজে নিজেদের পুঁজি বিনিয়োগ করার পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে যাকাত প্রবর্তনের কারণে তাদের জন্যে নিজেদের ধন সম্পদ কোনো কাজে না লাগিয়ে সিন্দুকে আবদ্ধ রাখা এবং যক্ষের ন্যায় তা আগলে বসে থাকায়ও পথ বন্ধ হয়ে যাবে। উপরন্তু একটি যথার্থ ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার বর্তমান থাকার কারণে লোকদের বিলাসিতা ও অমিতব্যয়িতার কোনো সুযোগ থাকবে না। তাদের উদ্বৃত্ত আয় তারা এভাবে নষ্ট করতে পারবে না। অতঃপর যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত আয় করে তাদেরকে অবশ্যি নিম্নোক্ত তিনটি পথের মধ্য থেকে যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে।
এক : যদি সে আরো বেশী অর্থ উপার্জনের প্রত্যাশী না হয় তাহলে তার আয়ের উদ্বৃত্তাংশ কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োগ করবে। এজ্য সে নিজে কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ঐ অর্থ ওয়াকফ করবে, অথবা জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাঁদা দেবে, বা কোনো প্রকার স্বার্থোদ্ধারের প্রত্যাশা না করে, ইসলামী সরকারের হাতে তুলে দেবে। ইসলামী সরকার উন্নয়নমূলক বা জনবেসা ও জাতীয় চরিত্র পুনর্গঠনের কাজে তা ব্যায় করবে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রের পরিচালক ও প্রশাসকগণের আমানতকারী, বিশ্বস্ততা ও বুদ্ধিমত্তার উপর যদি জনগণের আস্থা থাবে, তাহলে শেষোক্ত পন্থাটিকে অবশ্যি অগ্রাধিকার দিতে হবে। এভাবে সমাজ সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যে সরকার ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনা চেষ্টায় ও বিনা অর্থব্যয়ে হামেশা বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ লাভ করতে থাকবে। এজন্য তাদের কোনো সুদ বা মুনাফা পরিশোধ তো দূরের কথা আসল পরিশোধ করার জন্যেও জনগণের ঘাড়ে ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দিতে হবে না।
দুই : সে আরো বেশী অর্থ উপার্জনের প্রত্যাশী নয়, ঠিকই, কিন্তু নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ নিজের জন্যে সংরক্ষিত রাখতে চায়, এ অবস্থায় তার অর্থে সে ব্যাংকে আমানত রাখবে। ব্যাংক তা আমানত রাখার পরিবর্তে নিজের উপর ঋণ হিসেবে গণ্য করবে। ব্যাংক তার গচ্ছিত অর্থ যকন সে চাইবে বা চুক্তিতে উল্লেখিত সময়ে ফেরত দেয়ার জামানত দেবে। এই সাথে ঋণ হিসেবে গৃহীত এ অর্থ ব্যবসাযে খাটিয়ে তা থেকে মুনাফা অর্জন করার অধিকারও ব্যাংকের থাকবে। এ মুনাফা কোনো অংশ অবশ্যি আমানতকারীদের দিতে হবে না, বরং তা পুরোপুরি ব্যাংকের নিজস্ব সম্পত্তি হবে। ইমম আবু হানীফার (র) ব্যবসা মূলত এ ইসলামী নীতর ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। তাঁর আমানতদারী, বিশ্বস্ততা ও অস্বাভাবিক ও সুনামের কারণে লোকেরা নিজেদের অর্থের নিরাপত্তা বিধানের জন্যে তা তাঁর নিকট জমা রাখতো। ইমাম সাহেব এ অর্থ আমানত হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে ঋণ হিসে গ্রহণ করতেন েএবং তা নিজের ব্যবসায়ে খাটাতেন। তাঁর ফার্মে পাঁচ কোট দিরহাম পরিমাণ অর্থ এভাবেই অন্য লোকদের ঋণ বাবদ রক্ষিত অর্থ হিসেবে ছিল। ইসলামের নীতি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি কারো নিকট কিছু আমানত রাখলে আমানত রক্ষাকারী তা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু আমানত নষ্ট হয়ে গেলে তার উপর কোনো খেসারতও আরোপিত হয় না।
বিপরীতপক্ষে ঐ অর্থ যদি ঋণ হিসেবে দেয়া হয় তাহলে ঋণগ্রহীতা তা ব্যবহার করার ও তা থেকে লাভবান হবার অধিকার রাখে এবং যথাসময়ে ঋণ আদায় করার দায়িত্বও তার উপর আরোপিত হয়। এ নিয়ম অনুসারে আজো ব্যাংক পরিচালিত হতে পারে।
তিন : যদি সে নিজের উদ্বৃত্ত অর্থ কোনো মুনাফা অর্জনকারী কাজে খাটাতে চায়, তাহলে তা করার একটিমাত্র পথ আছে। তা হচ্ছে, তার উদ্বৃত্ত অর্থ মুযারাবাত (অর্থাৎ লাভ ও লোকসানে সমানভাবে অংশগহণ) ভিত্তিতে মুনাফাজনক কাজে খাটানো সরকার বা ব্যাংক যে কোনটির তত্ত্ববধানে এ কাজ বা ব্যবসা চলতে পারে।
সে নিজে যদি এ অর্থ খাটাতে চায়, তাহলে তাকে কোনো ব্যবসায়য়ে অংশগ্রহণের শর্তাবলী স্থির করতে হবে। সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে লাভ ও লোকসান কি হারে বন্টিত হবে আইনগতভাবে তা নির্ধারণ করতে হবে। এভাবেই যৌথ মূলধনভিত্তিক কোম্পানীতে (JOINT STOCK COMPANY) অংশগ্রহণেও এর একটিমাত্র পথ রয়েছে, অর্থাৎ সোজাসুজি সেখানে কোম্পানীর শেয়ার কিনত হবে। বণ্ড, ডিবেঞ্চার ও এ ধরনের অন্যান্য বস্তু- যেগুলোর ক্রেতা কোম্পানী থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেতে থাকে- সেগুলোর আসলে কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
সরকারের মাধ্যমে অর্থ খাটাতে চাইলে তাকে সরকারের কোনো মুনাফাজনক স্কীম অংশীদার হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ মনে করুন, সরকার কোনো পানি-বিদ্যুৎ পরিকল্পনা কার্যকর করতে চায়। সরকার তার এ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে জনগণকে তাতে অংশগ্রহণের জন্যে আহ্বান জানাবে। যেসব লোক, প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক এতে পুঁজি সরবরাহ করবে তারা সরকারের সাথে এতে লব্ধ মুনাফার অংশ পেতে থাকবে। লোকসান হলে তার অংশও পুঁজির আনুপাতিক হার অনুযায়ী সরকার ও অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে বন্টিত হবে। একটি ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সরকার ক্রামান্বত লোকদের অংশ নিজে নেয়ার অধিকারওসরকারী মালিকানাধীন এসে যাবে।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থার ন্যায় এ ব্যবস্থায়ও সবচেয়ে বাস্তবানুগ ও উপযোগী হবে তৃতীয় পথটি। অর্থাৎ লোকেরা ব্যাংকের মাধ্যমে নিজেদের পুঁজি মুনাফাজনক কাজে বিনিয়োগ করবে। তাই এ সম্পর্কে আমি একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই। এর ফলে ‍সুদ রহিত করার পর ব্যাংকিং-এর কারবার কিভাবে চলবে এবং মুনাফা প্রত্যাশী লোকেরা তা থেকে কিভাবে লাভবান হবে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।

ব্যাংকিং এর ইসলামী পদ্ধতি

ইতিপূর্বে আমি ব্যাংকিং সম্পর্কে যে আলোচনা করেছি তাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ- একথা বলা আমার উদ্দেশ্য ছিল না এবং উদ্দেশ্যও হতেও পারে না। আসলে ব্যাংকিংও আধুনিক সভ্যতা লালিত বহুবিধ বস্তুর মধ্যে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী বস্তু। এর মধ্যে কেবলমাত্র একটি অনিষ্টকর শয়তানী বস্তুর অনুপ্রবেশের কারণে এ সমগ্র ব্যবস্থাটিই পুঁজিগন্ধময় হয়ে উঠেছে। এতদসত্ত্বেও এ ব্যবস্থাটি বর্তমান যুগে বৈধ পথে মানবতার বহুবিধ সেবা করে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এর উপকারিতা ও অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। যেমন, অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো ও তা আদায়ের ব্যবস্থা করা, বিদেশের সাথে লেনদেনের সুযোগ সুবিধা দান করা, মূল্যবান বস্তু সংরক্ষণ করা, ঋণপত্র () ট্রাভেলারস চেক, ড্রাফট প্রভৃতি জারী করা, কোম্পানীর অংশ বিক্রির ব্যবস্থা করা এবং বহুবিধ এজেন্সী সার্ভিস চালূ করা, যার ফলে ব্যাংকে সামান্যতম কমিশন দেয়ার ব্যবস্থা করে আজকের যুগের একজন অতি ব্যস্ত ব্যক্তি বহু রকমের ঝামেলা থেকে মুক্তি পায়। এসব কাজ অবশ্যি অব্যাহত থাকতে হবে এং এজন্য একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থাকবতে হবে। ‍উপরন্তু সমাজের উদ্বৃত্ত অর্থসম্পদ চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকার পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় রক্ষণাগারে (RESERVOIR) সঞ্চিত থাকা এবঙ সেখান থেকে জীবনের সবক্ষেত্রে, সর্বত্র সব সময় সহজভাবে পৌঁছে যাওয়া ব্যবসা, শিল্প, কৃষি এবং তমদ্দুন ও অর্থনীতির জন্যে অত্যন্ত কল্যাণকর ও আজকের অবস্থার প্রেক্ষিতে একান্ত অপরিহার্য বিবেচিত হবে। এই সাথে সাধারন লোকদের জন্যেও এটাই সহজতম ব্যবস্থা বলে মনে হয়। তাদের প্রয়োজন পূর্ণ হবার পরও যে সামান্য পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত থাকবে তাকে কোনো মুনাফাজনক কাজে খাটাবার জন্যে তারা নিজেরা পৃথক পৃথকভাবে সুযোগ অনুসন্ধান করার পরিবর্তে এসব অর্থ একটি কেন্দ্রীয় বান্ডারে জমা করে দেবে এবঙ সেখানে একটি সন্তোষজনক পদ্ধতিত সামগ্রিকভাবে তাদের সবার অর্থ কাজে লাগানো এবং তা থেকে লব্ধ মুনাফা যথাযথভাবে বন্টন করার ব্যবস্থা হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, একনাগাড়ে এবং স্থায়ীভাবে অর্থনৈতিক কাজে ব্যপৃত থকার কারণে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ও কর্মীবৃন্দ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে জড়িত অন্যান্য কর্মীরা লাভ করতে সক্ষম হয় না। এ দক্ষতাপূর্ণ সূক্ষ্মদর্শিতা অবশ্যি একটি মূল্যবান সম্পদ। যদি তা নিছক পুঁজিপতির স্বার্থসিদ্ধির অস্ত্রে পরিণত না হযে ব্যবসায়ীদের সাহায্য সহযোগিতায় ব্যবহৃত হয় তাহলে তা অত্যন্ত উপকারী ও কল্যাণকর প্রমাণিত হতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং-এর এসব কল্যা ও সুফলকে বিশ্ব মানবতার জন্যে অকল্যাণ, অন্যায়, অনিষ্ট ও বিপর্যয়ে পরিণত করছে যে বস্তুটি তা হচ্ছে সুদ। আর একটি অনিষ্টকর বস্তু এর সাথে মিশে এ বিপর্যয় ও অনিষ্টকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। তা হচ্ছে, সুদের চুম্বক আকর্ষণে যেসব পুঁজি বিভিন্ন স্থান থেকে এসে ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত হয়, তা কার্যত কতিপয় স্বার্থ-শিকারী পুঁজিপতির সম্পদেপরিণত হয়ে যায় এবং তারা অত্যন্ত গর্হিত মানবতাবৈরী ও সমাজ বিরোধী পদ্ধতিতে সেগুলো ব্যবহার করে। ব্যাংকিংকে এ দুটো দোষ থেকে মুক্ত করতে পারলে তা একটি পবিত্র কাজে পরিণত হয়ে যাবে এবং মানব সমাজ ও সভ্যতার জন্যে বর্তমান অবস্থার তুলনায় অনেক বেশী উপকারী ও কল্যাণকর হবে। সুদখোরীর পরিবর্তে এ পবিত্র পদ্দতিটি যদি পুঁজিপতি ও সুখোর মহাজনদর জন্যেও আর্থিক দিক দিযে অধিকতর লাভজনক প্রমাণিত হয় তাহলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।
যারা মনে করে সুদ রহিত হবার পর ব্যাংকের অর্থ সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে, তারা বিরাট ভুলের শিকারে পরিণত হয়েছে। তারা মনে করে সুদ পাবার আশা যখন নেই তখন লোকেরা তাদের আয়ের উদ্বৃত্তাংশ ব্যাংকে জমা রাখবে কেন? অথচ তখন সুদ না পেলে কি হবে, মুনাফা পাবার আশা তো থাকবে। আর যেহেতু মুনাফার অংশ অনির্ধারিত ও সীমাহীন থাকবে তাই সাধারণ সুদের হারের তুলনায় কম মুনাফা পাবার সম্ভাবনা যে পরিমাণ থাকবে, ঠিক সে পরিমাণ সম্ভাবনা থাকবে বেশী এবং যথেষ্ট মোটা অংকের মুনাফা পাবার। এইসাথে ব্যাংক তার সাধারণ কাজগুলোও করে যাবে, যেগুলোর জন্যে বর্তমানে লোকেরা এর শরণাপন্ন হয়ে থাকে। কাজেই নিশ্চিত বলা যায় যে, বর্তমানে যে পরিমাণ ধন ব্যাংকের নিকট আমানত রাখা হয়, সুদ রহিত হবার পরও একই পরিমাণ ধন আমানত রাখা হবে। বরং সে সময় সব রকম ব্যবসায়ের ব্যাপক প্রসারের কারণে মানুষের কাজ-কারবার বেড়ে যাবে, আয়ও আরো বেড়ে যাবে। কাজেই বর্তমান অবস্থার তুলনায় আরো অনেক বেশী পরিমাণ আয়ের উদ্বৃত্তাংশ ব্যাংকে জমা হবে।
এ পুঁজির যে পরিমাণ অংশ কারেন্ট একাউন্ট বা চলতি হিসেবের খাতায় জমা হবে, তাকে ব্যাংক কোনো মুনাফাজনক কাজে লাগতে পারবে না, যেমন বর্তমানেও পারে না। তাই এ পুঁজি মূলত দুটো বড় ড় কাজে ব্যবহৃত হবে। এক. প্রতিদিনকার নগদ লেনদেন এবং দুই. ব্যবসায়ীদেরকে বিনা সুদে স্বল্পমেয়াদী ঋণ দান এবঙ বিনা সুদে হুন্ডি ভাঙ্গানো।
ব্যাংকে যেসব দীর্ধমেয়াদী আমানত রাকা হবে, তা অবশ্যি দু’ধরনেরই হবে। এক ধরনের আমানতের মালিকের উদ্দেশ্য কেবল নিজের অর্থের সংরক্ষণ। এ ধরনের লোকদের অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে ব্যাংক নিজেই ব্যবসায়ের বিনিয়োগ করবে, যেমন ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় ধরনের মালিকেরা তাদের অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসায়ে খাটাতে চায়। তাদের অর্থ আমানত হিসেবে রাখার পরিবর্তে ব্যাংক-কে তাদের সাথে একটি সাধারণ অংশীদারীত্বের চুক্তিনামা সম্পাদন করতে হবে। অতঃপর ব্যাংক এ পুঁজিকে তার অন্যান্য পুঁজিসহ ‘মুযারাবাত’ (লাভ-লোকসানে সমভাবে অংশগ্রহণ ভিত্তিক) নীতির ভিত্তিতে ব্যবসায়ে, শিল্প প্রকল্পে, কৃষি ফার্মে বেসরকারী ও সরকারের বিবিন্ন মুনাফাজনক কাজে খাটাতে পারবে। এর থেকে সামগ্রিকভাবে দুটো ব্যবসায়ের স্বার্থের সাথে একাকার হয়ে যাবে। কাজেই ব্যবসায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পুঁজি তার পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকবে এবং যেসব কারণে বর্তমান দুনিয়ার সুদ ভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি ও চড়ামূল্যের উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি হয় তা প্রায় সবেই খতম হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, পুঁজিপতির অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টি ও ব্যবসায়ীর ব্যবসায়িক ও শৈল্পিক বিচক্ষণতা, যা বর্তামন বিশ্বে পারস্পরিক সংঘর্ষ ও বিরোধ মত্ত রয়েছে; সে সময় অবশ্যি পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলবে এবং তাতে সবারই উপকার হবে। অতপর এ পদধতিতে ব্যাংক যে মুনাফা অ্জন করবে, তা দিয়ে নিজের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা নির্দিষ্ট অনুপাতে নিজের অংশীদার ও আমানতদারীদের মধ্যে বন্টন করবে। এ ব্যাপারে পার্থ্যক্য কেবল এতটুমুন হবে যে, বর্তমান অবস্থায় অংশীদারদে মধ্যে মুনাফা () বন্টন হয় এবং আমানতদারীদেরকে ‍সুদ দেয়া হয়, আর তখন উভয়কেই মুনাফার অংশ দেয়া হবে। বর্তমন অবস্থায় অশীদারদের মধ্যে মুনাফা (DIVIDENDS) বন্টন হয় েএবং আমানতকারীদেরকে ‍সুদ দেয়া হয়, আর তখন উভয়কেই মুনাফার অংশ দেয়া হবে। বর্তমানে আমানতকারীরা একটি নির্ধারিত হারে সুদ পেয়ে থাকে, আর তখন কোনো নির্দিষ্ট হার থাকবে না। বরং কম বেশী যে পরিমান মুনাফা অর্জিত হবে সব একই অনুপাতে বন্টিত হবে। বর্তমানে যে পরিমাণ লোকসান ও দেইলিয়া হবার ভয় রয়েছে তখন তা-ই থাকবে। বর্তমানে বিপদ এবং এর মোকাবিলায় সীমাহীণ মুনাফার সম্ভাবনা উভয়টিই কেবলমাত্র ব্যাংকের অংশীদারের জন্যে নির্দিষ্ট। কিন্তু তখন এ দুটো সম্ভাবনা আমানতকারী ও অংশীদার উভয়ের জন্যে সমভাবে বর্তমান থাকবে।
ব্যাংকিং পদ্ধতির আর একটি ক্ষতি নিরসনের জন্যে আমাদেরকে বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। মুনাফার আকর্ষণে যে অর্থ ব্যাংকে সঞ্চিত হয়, তার সুসংবদ্ধ শক্তির কর্তৃত্ব কার্যত মাত্র গুটিকয়েক ব্যাংকারের হাতে চলে যায়। এ ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার জন্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং (CENTRAL BANKING) এর সকল কাজ বায়তুলমাল বা স্টেট ব্যাংকের হাতে সোপর্দ করতে হবে। অন্যদিকে আইনের মাধ্যমে সকল প্রাবইভেট ব্যাংকের উপর সরকারী দখল ও কর্তৃত্ব এমনভাবে সুদৃঢ় করতে হবে যার ফলে ব্যাংকাররা নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তির অপ্রিয় ব্যাবহারের ক্ষমাত হারিয়ে ফেলে।
সুদবিহীন অর্থনীতির যে সংক্ষিপ্ত নকশাটি আমি পেশ করলাম, তা পর্যালোচনা হবার পর সুদ রহিত করে সুদমুক্ত অর্থনীতির ভিতিএত কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোরার ব্যাপারটি আদৌ বাস্তবানুগ নয়, একথা বলার কোনো অবকাশ থাকে না।

৫. অমুসলিম দেশ থেকে অর্থনৈতিক ও শিল্পঋণ গ্রহণ

[তরজমানুল কুরআন: নভেম্বর ১৯৬১ ইং।]
প্রশ্ন : বর্তমান যুগে যখন এক দেশ অন্য দেশের সংগে সম্পর্ক ছেদ করে উন্নতি করতে পারেনা, তখন কোনো ইসলামী রাষ্ট্র বিদেশের সাথে সম্পর্কিত আর্থিক, সামরিক বাহিনীর জন্য টেকনিক্যাল সাহায্য সামগ্রী অথবা আন্তর্জাতিক ব্যাংক থেকে সুদের হারে ঋণ গ্রহণ করাকে কি একেবারেই হারাম সাব্যস্ত করবে। তা ছাড়াও বস্তুগত, শিল্প, কৃষি ও বৈজ্ঞানিক উন্নতি উত্যাদি ক্ষেত্রে যে বিরাট ব্যবাধান গড়ে উঠেছে পাশ্চাত্যের উন্নত (ADVANCED) দেশসমূহ এবং মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে, ইসলামী দেশগুলির মধ্যে অথবা এই আনবিক যুগে HAVES FMA HAVES NOT দের মধ্যে, যে ব্যবধান গড়ে উঠেছে তা কি করে দূর করা যাবে?
অধিকন্তু দেশের অভ্যন্তরও কি সকল ব্যাংকিং এবং ইনসুরেন্স (ব্যাংক ও বীমা) ব্যবস্থাকে বন্ধ করে দেয়ার হুকুম দেয়া হবে? সুদ, সেলামী, মুনাফা, লাভ, সুনাম (GOODWILL) এবং বেচাকেনার দালালী ও কমিশনের জন্য ইজতিহাদ করে কোনো পথ কি বের করা যেতে পারে? ইসলামী দেশগুলি সুদ, মুনাফা, লাভ ইত্যাদির ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে কোনো অবস্থায় ঋণের আদন প্রদান করতে পারে কি?
জবাব : কোনো সময়ই ইসলামী দেশগুলি অমুসলিম দেশের সাথে সম্পর্কেচ্ছেদের পলিসি গ্রহণ করেনি, আজও করবে না। কিন্তু ঋণের অর্থ ঋণ চেয়ে বাড়ানো নয়, তাও আবার তাদের প্রদত্ত শর্তের ভিত্তিতে। এ ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে আজকের যুযগের হীনমনা লোকেরাই। কোনো দেশে ইসলাম সরকার কায়েম থাকলে বস্তুত উন্নতির পূর্বে সে করকার নিজ জাতির নৈতিক চরিত্রর সংশোধনের চেষ্টা করবে। নৈতিক অবস্থার সংশোধন বলতে বুঝায়, দেশের চরিত্রের সংশোধনের চেষ্টা করবে। নৈতিক অবস্থার সংশোধন বলতে বুঝায়, দেশের শাসক, শাসনযন্ত্র পরিচালনা কর্মচারীবৃন্দ এবঙ জনগণ ইমানদার (বিশ্বস্ত) হবে। অধিকার আদায়ের কথা চিন্তা করার পূর্বে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য পালণে ব্রতী ও সচেতন হতে হবে এবং সবার সামনে একট উন্নত মাহন লক্ষ্য থাকবে যার জন্য জান-মাল, সময়-শ্রম এবং যোগ্যতা সবকিছু কুরবানী করার জন্য তারা তৈরী থাকবে। উপরন্তু শাসকবর্গ জনগণের উপর এবং গোটা জাতি শাসকবর্গের উপর আস্থাশীল থাকবে এবং তারা বুঝবে যে, তাদের শাসকরা তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন। এ অবস্থা একবার পয়দা হয়ে গেলে কোনো জাতির পক্ষে বিদেশ থেকে সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণের অবস্থা্ট সৃষ্টি হতে পারেনা। দেশের মধ্যে ধার্যকৃত ট্যাক্সের শতকরা একশত ভাগই আদায় হবে এবং তার পুরোটাই জাতির উন্নতির কাজে ব্যয়িত হবে, আদায় করার সময়ও কোনো অসততা হবে না এবং জাতির উন্নতির কাজে ব্যয়িত হবে, আদায় করার সময়ও কোনো অসততা হবে না এবং ব্যয় করার সময়ও অন্য পথে ব্যয় হবে না। এরপরও ঋণের প্রয়োজন হলে গোটা জাতি পুঁজির এক বড় অংশ স্বেচ্ছায় চাঁদা আকারে, একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুদবিহীন ঋণ আকারে এবং এক অংশ লাভক্ষতির ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব গ্রহণ আকারে যোগাড় কর দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। আমার অনুমান, দেশে যদি ইসলামী মুলনীতির ভিত্তিতে লেনদেনের অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা হয়, তাহলে সম্ভবত খুব শীঘ্রেই দেশ অন্যদের থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরিবর্তে ঋণ দানের যোগ্যতা অর্জন করবে।
ধরে নেয়া যাক, কোনো অবস্থায় সুদের শর্তে বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণ যদি অপরিহার্যেই হয়ে দাড়ায়, অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন পূরণ করা যদি একান্তই দরকার হয়ে পড়ে এবং এর জন্য দেশের মধ্য থেকে কোনো পুঁজির ব্যবস্থাও না হয়, তাহলে সে অবস্থায় বিদেশ থেকে সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু তবু দেশের অভ্যন্তরে সুদের লেনদেন জায়েয হওয়ার কোনো পথ নেই। দেশের মধ্রে সুদর লেনদেন বন্ধ করা যেতে পারে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থা () সুদ ছাড়া চালানো যায়। আমার প্রণীত ‘সুদ’ বইটিতে আমি এটা প্রমাণ করেছি যে, ব্যাংক ব্যবস্থা সুদ ব্যতীত লভ্যাংশের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেও চালানো যেতে পারে। একইভাবে বীমা ব্যবস্থাও এমন সংস্কার করা যেতে পারে, যার দ্বারঅ অনৈসলামী ব্যবস্থা গ্রহণ না করেও বীমার সকল উপকার হাসিল করা যেতে পারে। দালালী, মুনাফা, সেলামী, কমিশন অথবা সুনাম (GOODWILL) ইত্যাদির পৃথক পৃথক শরয়ী মর্যাদা রয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হলে তখন অবস্থা পর্যালোচনা করে, হয় সাবে অবস্থাকে বহাল রাখা হবে, অথবা জরুরী সংশোধণ করা হবে। (তরজমানুল কুরআন, খন্ড ৫৭, সংখ্যা ২, নভেম্বর ১৯৬১ ইং)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.