ইসলামী অর্থনীতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অষ্টম অধ্যায়ঃ যাকাতের তাৎপর্য এবং গুরুত্ব

১. যাকাতের তাৎপর্য এবং গুরুত্ব

নামাযের পর ইসলামের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো যাকাত। ইবাদতের বেলায় সাধারণত নামাযের পর রোযার নাম নেয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষ নামাযর পরই রোযর স্থান করে করে আসছে। কিন্তু আমরা কুরআন মজীদ থেকে জানতে পারি, ইসলামে নামযের পর সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব হলো যাকাতের । এ দটি হলো ইসলামের অট্টালিকার প্রধান স্তম্ভ। এ দুটি ভেংগে পড়লে ইসলামের অট্টালিকা প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়।

যাকাতের অর্থ

‘যাকাত’ অর্থ পবিত্রতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা; নিজের অর্থসম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অভাবী ও মিসকীনদের জন্যে বের করে দেয়াকে যাকাত বলা হয়। এ কাজটাকে যাকাত বলার করণ হলো, এভাবে যাকাতদাতার অর্থসম্পদ এবং তার নিজের আত্মা পবিত্র ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া অর্থসম্পদ থেকে আল্লাহর বান্দাদের অধিকার বের করে দেয়না, তার অর্থসম্পদ অপবিত্র থেকে যায়। সেই পথে তার আত্মা থেকে যায় অপবিত্র। কেননা, আল্লাহ যে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, এজন্য তার অন্তরে বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতা নাই। তার আত্মা এতোট ছোট, স্বার্থপর এবং অর্থপিচাশ যে, সেই মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেও তার আত্মা কুণ্ঠিত হয়, যিনি আসল প্রয়োজনের চাইতে অধিক ধনসম্পদ দিয়ে তার প্রতি বিরাট অনুগ্রহ করেছেন। এমন এক ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনো নেক কাজ করতে পারে এবং নিজের দীন ও ঈমানের খাতিরে কোনো প্রকার ত্যাগ ও কুরবানী করতে পারে, কিছুতেই এমন আশা করা যায়না। তাই, এমন ব্যক্তির আত্মাও নাপাক আর তার সঞ্চিত অর্থসম্পদও নাপাক।

যাকাত নবীগণের সুন্নত

সেই প্রাচীন যামানা থেকেই সকল নবীর উম্মতের উপর নামায ও যাকাত ফরয ছিলো। কোনো নবীর কালেই দীন ইসলাম এই দুইটি ফরয থেকে মুক্ত ছিলনা। সাইয়েদুনা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বংশের নবীদের কথা উল্লেখ করার পর আল্লাহ তা’আলা বলেন: ( আরবী**************************)
‘আমি তাদেরকে জনগণের নেতা বানিয়েছি। তারা আমার হুকুম মোতাবিক করার, সালাত কায়েম করার আর যাকাত পরিশোধ করার। তারা ছিলো মূলত আমার একান্ত অনুগামী বাধ্যগত।”
সাইয়েদুনা ইসমাঈল আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলা হয়েছে: (আরবী*******************)
“সে তার স্বজনদেরকে সালাত এবং যাকাতের নির্দেশ দিতো। আর তার মালিকের কাছে সে ছিলো বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।” [সূরা মরিয়ম : ৫৫]
মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর কওমের জন্যে এই বলে দোয়া করেছিলেন, হে প্রভু, আমাদেরকে এই দুনিয়ার কল্যাণও দান কর আর পরকালের কল্যাণও দান কর। এর জবাবে আল্লাহ তা’আলা কি বলেছিলেন তা আপনারা জানেন? তিনি বলেছিলেন: (আরবী***********)
“আমি যাকে চাইবো, আমার আযাবে নিক্ষেপ করবো। তবে সকল জিনিসের উপর আমার রহমত পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। আমি এই রহমতের অধিকার কেবল তাদের জন্যেই লিখে রাখবো, যারা আমাকে ভয় করবে, যাকাত পরিশোধ করবে আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনবে।” [আল আ’রাফ: ১৫৬]
মুহাম্মদ রাসূলুল্লঅহর (সা) পূর্ববর্তী নবীদের মধ্যে ঈসা আলাইহিস সালামই ছিরেন শেষ নবী। আল্লাহ তাঁকেও নামাযের সাথে সাথে যাকাতেরও নির্দেশ প্রদান করেন: আরবী************************
“আমি যেখানেই থাকিনা কেন, আল্লাহ আমাকে বরকত দান করেছেন। আর আমি যতোদিন বেঁচে থাকবো, ততোদিন আমাকে সালাত আদায় এবং যাকাত প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছেন।” [সূরা মরিয়ম: ৩১]
এ থেকে জানা গেলো, প্রথম থেকেই প্রত্যেক নবীর যামানায় দীন ইসলঅম নামায এবং যাকাতের এই দুই বড় খুঁটির উপরপ্রতিষ্ঠিত ছিলো। আল্লাহর প্রতি ঈমানওয়ালঅ কোনো উম্মতকে এই দুটি ফরয থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, এমন কখনো হয়নি।
এবার দেখুন, রাসূলে করীমের (সা) শরীয়তের এই দু’টি ফরয কিভাবে পরস্পর যুক্ত হয়ে একাকার হয়ে আছে। কুরআন মজীদ খুললেই প্রথমে যে আয়াত কয়টি আপনার চোখে পড়ে সেগুলি কী? সেগুলো হলো: (আরবী***************)
“এই কুরআন আল্লাহর কিতাব। এতে কোনো প্রকার সন্দেহ সংশয় নেই। এ কিতাব সেইসব পরহেযগার লোকদেরকে জীবন যাপনের সঠিক পথ বলে দেয়, যারা গায়েবে ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমরা তাদেরেকে যে জীবিকা দিয়েছি, তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে।” [সূরা আল বাকারা: ২-৩]
এরপরই ঘোষণা দেয়া হয়েছে : (আরবী*************)
এরপরই লোকেরাই তদের প্রভুর দেয়অ হিদায়াত লাভ করেছে আর এই লোকদের জন্যেই রয়েছে সাফল্য।” [আল-বাকারা: ৫]
অর্থাৎ যাদের মধ্যে ঈমান নেই, যারা সালাত কায়েম করেনা এবঙ যাকাত দেয়া না, তারা হিদায়াতও লাভ করেনি আর তাদের ভাগ্যে সফলতাও জুটবে না।
এরপর এই সূরার সামনের দিকে গেলে দেখবেন কয়েক পৃষ্ঠা পরই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে: (আরবী******************)
“সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু কর (অর্থাৎ জামায়াতের সাথে সালাত আদায় কর)। [আল বাকারা: ৪৩]
সূরা তাওবায় আল্লাহ তা‘আলা কাফির ও মুশরিকদের সংগে যুদ্ধ করবার নির্দেশ দিয়েছেন। ধারাবাহিকভাবে কয়েক রুকু পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যাপারেই হিদায়াত দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: (আরবী ********************)
“তারা যদি কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করে (অর্থাৎ ফিরে আসে), ঈমান আনে এবং সালাত কায়েমকরে ও যাকাত প্রদান করে, তবে তারা তোমাদের দীনী ভাই হয়ে যাবে।” [আত তাওবা : ১]
অর্থাৎ শুধুমাত্র কুফর আর শিরক থেকে তাওবা করা এবং ঈমান ঘোষণা দেয়াই যথেষ্ট নয় বরং তাওবা ও ঈমানের প্রমাণ দিতে হবে। আর সহ্যিই তারা কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করেছে এবং ঈমান এনেছে বলে তখনই প্রমাণিত হতে পারে, যখন তারা রীতিমতো সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। সুতরাং তারা যদি এই দু’টি বাস্তব কর্মের মাধ্যমে ঈমানের প্রমাণ দেয়, তবেই তারা তোমারেদ দীনী ভাই। অন্যথায় তাদেরকে .দীনী ভাই মনে করো না এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও বন্ধ করো না।

২. সামাজিক জীবনে যাকাতের স্থান

যাকাত এবং সাদাকা বুঝাবার জন্যে কুরআন মজীদের বিভিন্নস্থানে ‘ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ ‘আল্লাহর পথে খরচ করা।’ কোনো কোনো স্থানে একথাও বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছুই খরচ কর,তা আল্লাহর ‘কর্জ হাসানা’ হিসেবে গ্রহণ করেন। এ যেনো তোমরা আল্লাহকে ঋণ প্রদান করছো আর আল্লাহ তোমাদের কাছে ঋণী হয়ে থাকছেন। বহু স্থানে একথাও বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছুই প্রদান করবে, তার প্রতিদান দেয়ার দায়িত্ব আল্লাহর। তিন্তু তিনি প্রতিদন কেবল সেই পরিমাণ প্রদান করবেন না যা তোমরা তাঁর পথে খরচ করেছো, বরং তার চেয়ে অনেক বেশী প্রদান করবেন। এবার বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন।
চিন্তা করে দেখুন, আসমান ও যমীনের মালিক কি আপনার মুখাপেক্ষী? (নাউযুবিল্লাহ)। সেই পবিত্র সত্তার কি আপনার নিকট থেকে ঋণ নেয়ার প্রয়োজন আছে? সেই রাজাধিারাজ, সীমানহীন ধনভান্ডারের মালিক কি তাঁর নিজের প্রয়োজনে আপনার নিকট কিছু ধার চন? মায়াযাল্লাহ, কখনো নয়। আপনারা তো তার দানে জীবন যাপন করছেন। তঁর জীবিকা ভোগ করছেন আপনাদের প্রত্যেক ধনী গরীবের কাছে যা কিছু আছে সব তাঁরই দান। আপনাদের নিজেদের কিছুই নেই। আপনাদের দরিদ্রতম ব্যক্তি থেকে নিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী পর্যন্ত সকলেই তাঁর দয়া অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর নেই এবং থাকতে পারে না। আসলে এটাও আপনাদের প্রতি তাঁর বিরাট দয়া ও মহানুভবতা। তিনি আপনাদের নিজেদেরে কাজে, আপনাদেই উপকার ও কল্যাণার্থে ব্যয় করতে বলেন। এই ব্যয়কে তিনি তাঁর নিজের পথের ব্যয় বলেন। তিনি বলেন, এর দ্বারা আমি তোমাদের কাছে ঋণী হই। এর প্রতিদান প্রদান করা আমার কর্তব্য। তোমরা তোমাদের সমাজের অভাবী এবং মিসকীনদের দান কর। সেই গরীবরা এর প্রতিদান আমি দেবো। তোমরা তোমাদের অভাবী আত্মীয় স্বজনকে দান কর। এর বিনিময় তাদের কাছে চেয়োনা। এর বিনিময় আমিই তোমাদের দেবো। তোমরা তোমাদের এতিম, বিধবা, অক্ষম, মুসাফির এবং বিপদগ্রস্ত ভাইদের যা কিছুই দেবে, তা আমার ‘হিসাবে’ আমার নামে লিখে রেখো। এগুলো তাদের কাছে ফেরকত চেয়োনা। এগুলো ফেরত দেবার দায়িত্ব আমার। তোমাদের দেনা আমি পরিশোধ করবো। তোমরা তোমাদের দুর্দগশাগ্রস্ত ভাইদেরকে ধার দাও। তাদের কাছ থেকে সুদ নিওনা। দান ফেরত চেয়ে তাদেরকে লজ্জিত করোনা, বেকায়দায় ফেলোনা। তারা দান ফেরত দিতে না পারলে তাদেরকে লজ্জিত করোনা, বেকায়দায় ফেলোনা। তারা দান ফেরত দিতে না পারলে তাদেরকে সিভিল জেলে পাঠাবেনা। তাদের ঘরদোর, কাপিড় চোপড় এবং হাড়িপাতিল ক্রোক করোনা। তাদের সন্তান সন্ততিকে ঘর থেকে বের করে দিওনা। তোমাদের ধার পরিশোধ করার দায়িত্ব তাদের নয়, এ দায়িত্ব আমি নিলাম। তারা যদি ‘আসল’ শোধ করে দেয়, তবে ‍সুদ পরিশোধ করবো আমি। আর তারা যদি ‘আসল’ও শোধ করতে না পারে, তবে আমি ‘সুদ আসল’ দুটোই পরিশোধ করবো। এভাবে নিজেদের সমাজকল্যাণমূলক কাজে এবং সমাজের মানুষের উপকার ও সাহায্যার্থে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তা থেকে যদিও তোমরাই লাভবান হবে, কিন্তু তা পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আমি এর পাই-কড়ি পুরো মুনাফাসহ তোমাদেরকে ফেরত দেবো।
আপনারা জানেন মানুষ প্রকৃতিগতভাবে যালিম এবং জাহিল (আররবী******) হয়ে থাকে। মানুষেল দৃষ্টি খুবই সংকীর্ণ। বেশী দূর পর্যন্ত নযর যায়না। তার আত্মা খুবই ছোট হয়ে থাকে। তাতে বেশী বড় এবং উঁচু ধারণা খুব কমই খাপ খেয়ে থাকে। মানুষ খুবই স্বার্থপর। কিন্তু নিজের স্বার্থেলও কোনো প্রশস্ত ধারণা তার মগজে উদয় হয় না। মানুষ অত্যন্ত তাড়াহুড়াকারী। (আরবী**********) (মুনাষকে তাড়াহুড়াকারী সৃষ্টি করা হয়েছে)। সে প্রতিটি কাজের ফল এবং ফায়দা খুব তাড়াতাড়ি দেখতে চায়। সে সেই ফলাফলকেই ফলাফল এবং সেই ফায়দাকেই ফায়দা মনে করে যেটাকে সে নিজে ফলালফল ও ফায়দা বলে ধারণা করে এবং অবিলম্বে দেখতে পায়। সুদূরপ্রসারী ফলাফল পর্যন্ত তার দৃষ্টি সম্প্রসারিত হয়না। বড় আকারের যে কল্যাণ ও ফায়দা অর্জিত হয়, যেসব কল্যাণ সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে, মানুষ তা খুব কমই অনুভব করতে পারে, এমনকি, অনেক সময় অনুভব পর্যন্ত করতে পারেনা। এগুলো হলো মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতা। এই দুর্বলতার ফলে মানুষ সবকিছুতে কেবল নিজের স্বার্থ দেখে থাকে। আবার সেই স্বার্থও খুবই ক্ষুদ্র আকারের, দ্রুত অর্জিত এবং তার নিজের মনমতো হওয়া চাই। সে বলে, আমি যা কিছু উপার্জন করেছি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে যা কিছু পেয়েছি, তা আমার; অপর কারো তাতে অংশ নেই। আমার এ অর্থসম্পদ কেবল আমরই ইচ্ছেমতো, এবং আমারই আরাম আয়েশ ও সুখ সুবিধা বাড়তে হবে। অথবা অন্তত আমার নামধাম বাড়তে হবে, খ্যাতি অর্জিত হতে হবে, সম্মান বৃদ্ধি পেতে হবে, উপাধি লাভ করতে হবে, উচ্চাসন লাভ করতে হবে, মানুষকে আমার সামনে নত হত হব এবং লোকমুখে সর্বত্র আমার নাম ছড়িয়ে পড়তে হবে। এর কোনোটিই আমি যদি লাভ করতে না পারি, তবে কেন আমি টাকা খরচ করবো? আমার পা যদি কোনো এতীম না খেয়ে মরে, কোনো নিঃস্ব অভুক্ত থাকে, তাতে আমার কি? তাদের আহর যোগাবার দায়িত্ব আমি নেবো কেন? এ দায়িত্ব ছিল তার বাপের। তাই উচিত ছিল সন্তানদের জন্যে কিছু রেখে যাওয়া, কিংবা জীবনবীমা করে যাওয়অ। আমার প্রতিবেশী কোনো বধবার যদি ‍দুঃখে দিন কাটে, তাতে আমার কি? তার জন্যে চিন্তা করে যাওয়া উচিত ছিল তার স্বামীর। কোনো প্রবাসী যদি নিঃসম্বল হয়ে পড়ে, তবে তাতে আমার কি যায় আসে? সে পুরো পাথেয় যোগাড় না করে বোকার মতো কেন ঘর থেকে বের হয়েছে? কেউ যদি দুরবস্থায় পড়ে থাকে, পড়ৃকগে। তাকেও আল্লাহ তা’আলা আমর মতো হাত পা দিযেছেন। উপার্জন করে নিজের প্রয়োজন মেটাবার দায়িত্ব তার। আমি কেন তাকে সাহায্য করবো? আমি দিলে তাকে ঋণ দেবো এবং আসলের সাথে সুদও আদায় করে নেবো। কেননা আমার টাকা তো আর বিনাশ্রমে উপার্জিত হয়নি। আমি যদি আমার টাকা দিয়ে বাড়ী তৈরী করি, গাড়ি কিনি, কিংবা কোনো লাভজনক কাজে খাটাই, তাতে আমার কিছুনা কিছু লাভ আসবে। সেও তো আমার টাকা দিয়ে কোনো না কোনোভাবে লাভবান হবে। তবে কেন আমি সেই লাভের অংশ আদায় করবনা?
এ ধরনের স্বার্থপর মানসিকতার কারণে ধনশালী ব্যক্তি তার ধনস্তূপের উপর বিষধর সাপের মতো ফণা তুলে বসে থাকে। আর খরচ যদি করেও, তবে নিজের স্বার্থেই করে। যেখানে সে নিজের স্বার্থ দেখবেনা, সেখানে তার পকেট থেকে একটি পয়সাও বের হবেনা। কোনো গরবীকে যদি সে সাহায্য করেও, সেটা কিন্তু সাহায্য নয়; বরং এর মাধ্যমে আসলে সে তাকে লূট করে নেয়। এবং যে পরিমাণ দেয়, তার চেয়ে অনেক বেশী উসূল করে নেয়। কোনো মিসকীনকে যদি কিছু দেয়, তবে তাকে নিজের অনুগ্রহের উসীলায় আধমরা করে ছাড়ে এবং তাকে এতোটা অপমানিত লাঞ্ছিত ও নাজেহাল করে ছাড়ে যে, তার মান ইজ্জতকে সম্পূর্ণ ধূলিস্যাত করে দেয়। তার মধ্যে সামান্য আত্মসম্মান বোধটুকুও অবশিষ্ট থকাতে দেয়না। জাতীয় কোনো সেবামূলক কাজে অংশ নেবার আগেই সে দেখে নেয়, তাতে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ কী পরিমাণ অর্জিত হবে? যেসব কাজে তার ব্যক্তিগত কোনো লাভ দেখবেনা, সেগুলো সব তার সাহায্য থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবে।
এরূপ নিকৃষ্ট মানসিকতর পরিণতি কি দাঁড়ায়? এর অশুভ পরিণডিত কেবল সমাজ সংকীর্ণ দৃষ্টি ও অজ্ঞতার কারণে এটাকে নিজের জন্যে লাভজনক মনে করছে। মানুষের মধ্যে যখন এ ধরনের মানসিকতা কাজ করে, তখন একদিকে জাতির যাবতীয় সম্পদ গুটিকতক লোকের হাতে এসে পুঞ্জিভূত হয়ে পড়ে। সম্পদশালী লোকেরা অর্থের জোরে জোঁকের মতো চুষে চুষে সম্পদের পাহাড় গড়তে থাকে। গরীবদের অবস্থা দিন দিন খারাপ থেকে আরো খরাপ হতে থাকে। যে সমাজে দারিদ্র সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, সে সমাজ হাজারো রকমের অন্যায় এবং বিকৃতিতে নিমোজ্জিত হয়ে পড়ে। তার দৈহিক কাঠামো ভেংগেপড়ে। তার মধ্যে রোগব্যধি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সে সমাজে কাজ করা এবং সম্পদ উপার্জন করার শক্তি কমে যেতে থাকে। ‍মূর্খতা ও নিরক্ষরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে সমাজের লোকেরা নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্যে অপরাধমূলক কাজ করতেথাকে। শেষ পর্যন্ত হাইজ্যাক, লুটতরাজ, এবং চুরি ডাকাতির মতো নিকৃষ্ট অপরাধেও তারা নিমজ্জিত হয়। তখন সে সমাজে এক সাধারণ ও সর্বব্যাপী অশান্তি দেখা দেয়। অর্থশীলদেরকে হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়। লুটতরাজ ও বিভিন্ন রকম সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়। শেষ পর্যন্ত তারা এমনভাবে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যে, পৃথিবীতে তাদের চিহ্নটুকুও আর অবশিষ্ট থাকেনা।
একটু গভীলভাবে চিন্তা করলেই আপনারা বুঝতে পারবেন যে, আসল আমরা যে সমাজে বাস করি, তার কল্যাণ ও ‍উন্নতির সাথেই আমাদে কর‌্যাণ ও উন্নতি জড়িত। আপনি যদি আপনার অর্থসম্পদ থেকে আপনার ভাইদের সাহায্য করেন, তবে তা আবর্তিত হয়ে বহুকাল কল্যাণ সাথে নিয়ে আপনার কাছেই ফিরে আসবে। কিন্তু আপনি যদি সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে তা নিজের কাঝেই জমা করে রাখেন কিংবা কেবল নিজের ব্যক্তিস্বার্থেই ব্রয় করেনস, তবে শেষ পর্যন্ত তা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে বাধ্য। যেমন ধরুন, আপনি যদি এতীম শিশুকে প্রতপালন করেন এবং তাকে পড়ালেখা শিখিয়ে সমাজের একজন উপার্জনক্ষম সদস্যে পরিণত করে দেন, তবে আসলে আপনি সমাজের সম্পদই বৃদ্ধি করলেন। আর সমাজের সম্পদ যখন বৃদ্ধি পাবে, তখন সমাজের একজন সদস্য হিসেবে আপনিও তার অংশ লাভ করেছেন, যাকে আপনি সাহায্য করেছিলেন তা হয়তো আপনি হিসেব করে মলাতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে বলেন যে, আমি তাকে সাহায্য করবো কেন? তার পাপের উচিত ছিল তার জন্যে কিছু রেখে যাওয়া; তবে তো সে ভবঘুরের মতো টো টো করে ঘুরে বেড়াবে। বেকার অকর্মণ্য হয়ে পড়বে। নিজের শ্রম খাটিয়ে সমাজের সম্পদ ‍বৃদ্ধি করবার যোগ্যতাই তার মধ্যে সৃষ্টি হবেনা। বরং সে যদি অপরাধপ্রবণ হয়ে আপনার সমাজের একজন সদস্যকে অকর্মণ্য, ভবঘুরে এবং অপরাধপ্রবণ বানিয়ে ফেলেন তারই ক্ষতি করেননি, নিজেরও ক্ষতি করলেন।
এই একটি উদাহরণ সামনে রেখে আপনি নিজের ‍দৃষ্টিকে আরো প্রশস্ত ও প্রসারিত করে দেখুন। বুঝতে পারবেন, যে ব্যক্তি নিঃস্বর্থভাবে সমাজের কল্যাণের জন্যে অর্থ ব্যয় করেন বহ্যিক দৃষ্টিতে তার পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু বের হয়ে এসে সে টাকা বৃদ্ধি পেতে থাকে, ফল ফলাতে থাকে, এমনকি শেষ পর্যন্ত অসংখ্য লাভ এবং সুফল নিয়ে সেই পকেটে এসেই ঢুকে পড়ে, যেখান থেকে সে বের হয়েছিলো।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি স্বার্থপরতা এবং সংকীর্ণতা দৃষ্টি বশবর্তী হয়ে অর্থকড়ি নিজের পকেটেই চেপে ধরে এবং সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেনা, বাহ্যিকভাবে সে নিজের টাকা রক্ষা করে বটে কিংবা সুদ খেয়ে তা বৃদ্ধি করে ঠিকই, কিন্তু আসলে সে নিজের বোকামীর কারণে নিজের অর্থকে ক্ষয় করে এবং নিজ হাতে নিজের ধ্বংসের সওদা করে। এ রহসটিকেই আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদে এভাবে পেশ করেছেন: (আরব*ি*******************)
“আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন আর সাদাকাকে দান করেন প্রবৃদ্ধি।” [আল বাকারা ২৭৬]
(আরবী****************)
“সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মানুষের সম্পদে তোমরা যে সুদ দাও, আল্লাহর নিকট কিন্তু তাতে সম্পদ কিছুমাত্র বৃদ্ধি পায়না। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমরা যে যাকাত বের করে দাও, তা বহগুণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।” [আর রূম : ৩৯]
কিন্তু এই রহস্য উপলব্ধি করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষের সংকীর্ণ চোখে দেখতে পায়। আর তাদের হিসাবের খাতা অনুযায়ী যে টাক বাড়ছে, তাও তারা দেখতে পায় যে, হ্যাঁ বাড়ছে। কিন্তু তাদের হাত থেকে যে টাকা বের হয়ে যায় তা কোথায় বাড়ছে, কিভাবে বাড়ছে, কি পরিমাণ বাড়ছে এবং তার মুনাফা কবে নাগাত তাদের কাছে ফিরে আসবে- তাতো দেখতে পায় না। এক্ষেত্রে তারা মনে করে যে, আমার হাত থেকে এই পরিমাণ টাকা বেরিয়ে গিয়েছে এবং তা চিরদিনের জন্যে বেরিয়ে গেছে।
মুনাষ তার বুদ্ধি ও প্রচেষ্টা দিয়ে আজ পর্যন্ত এই মূর্খতার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারেনি। গোটা বিশ্বের একই অবস্থা। একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী বিশ্ব। সেখনকার যাবতীয় কাজই পরিচিালিত হয় সুদের ভিত্তিতে। সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও দিনদিন তাদের দুঃখকষ্ট এবং হতাশা বেড়েই চলেছে। অপরদিকে তৈরী হয়েছে এমন একদল লোক যাদের মনে পুঁজিবতিদের বিরুদ্ধে রোষের আগুন দাও দাও করে জ্বলছৈ। তারা পুঁজিপতিদের ধনাগার লুন্ঠন করার সাথে সাথে মানুষের সমাজ সভ্যতার কাঠামোকেও বিচূর্ণ করে দিতে উদ্যত।
মহবিজ্ঞ মহাজ্ঞানী আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে মানুষের এই জটিল সমস্যার সমাধান পেশ করে দিয়েছেন। এই জটিল সমস্যার তালা খুলবার চাবি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং পরকালের প্রতি ঈমান। মানুষ যদি সত্যিই মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং যমীনৈ ও আসমানের সমস্ত ধনভান্ডারের প্রকৃত মলিক যে আল্লাহ- সেকথা ভালভাবে জেনে বুঝে নেয়। সে যদি জেনে নেয় যে, মানুষের যাবতীয় কাজের ব্যবস্থাপনার চাবিকাঠি স্বয়ং আল্লাহ তা’আলার মুষ্টিবধ্ধে নিবদ্ধ, তাঁর কাছে প্রতিটি অনু পরমাণুর পর্যন্ত হিসাব নিকাশ রয়েছে এবং মানুষ পরকালে তাঁর ভালমন্দ কাজের পুরস্কার কিংবা শাস্তি, সঠিক ও সুবিজচারমূলক হিসাব অনুযায়ী লাভ করবে, তাহলে নিজের সংকীর্ণ দৃষ্টির উপর নির্ভর করার পরিবর্তে আল্লাহর উপর নির্ভর করে নিজের অর্থসম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করা সহজ হতো।
এরূপ ঈমানের সাথে সে যা কিছুই ব্যয় করবে তা মূলত আল্লাহকেই প্রদান করবে। তার হিসাব কিতাবও আল্লাহর খাতায় লেখা হবে। পৃথিবীতে তার এই দানের খবর কেউ জানুক বা না জানুক, মহান আল্লাহ অবশ্য তা অবগত থাকেন। পৃথিবীতে কেউ তার অনুগ্রহের স্বীকৃতি দিক বা না দিক, আল্লাহ্‌ তা’আলা যখন তাঁর পথে দানের জন্যে বিনিময় ও পুরস্কার দেয়ার ওয়াদা করেছেন, তখন সে অবশ্যি এর বিনিময় লাভ করবে এবং তা সে পরে উভয় জগতেই।
মহান আল্লাহ তাঁর শরীয়তে এ নিয়ম কার্যকর করেছেন যে, তিনি প্রথমে নেকী ও কল্যাণমূলক কাজের সাধারণ নির্দেশ দিয়ে দেন যাতে করে নিজেরা সাধারণভাবে উত্তম পন্থাকে অবলম্বন করে। অতপর সেই নেকী ও কল্যাণের কজ যথারীতি পালন করার জন্যে একটি বিশেষ পন্থাও নির্ধারণ করে দেন।
যাকাতের বিষয়টিও ঠিক এরকম। এ ক্ষেত্রেও একটি রয়েছে সাধারণ নির্দেশ, আরেকটি বিশেষ নির্দেশ। একদিকে বলা হয়েছে, কৃপণতা ও সংকীর্ণ মনষ্কতা থেকে মুক্ত থাক। কারণ এটাই যাবতীয় অন্যায় ও বিকৃতির মূল। তোমাদের নৈতিক চরিত্রে আল্লাহর রং ধারণ কর। কারণ প্রতিটি মুহূর্তে তিনি তার সীমাহীন অগণিত সৃষ্টির প্রতি অফুরন্ত দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষণ করছেন। অথচ তাঁর উপর কারো কোনো অধিকার কিংবা দাবি নেই। যা কিছু পারো আল্লাহর পথে ব্যয় কর। নিজের প্রয়োজন সেরে যতোটা পারো উদ্বৃত্ত রাখ এবং তা দ্বারা আল্লাহর অন্যান্য অভাবী বান্দাদের প্রয়োজন পূরণ কর। দীনের খিদমত এবং আল্লাহর কালেমা বিজয়ী করবার জন্যে জানমাল দিয়ে অপ্রাণ চেষ্টা করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয়োনা। যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে অর্থসম্পদের ভালবাসাকে আল্লাহর ভালবাসার জন্যে কুরবানী করে দাও। -এ হরো আল্লাহর পথে দানের সাধারণ নির্দেশ।
কিন্তু এই সাথে বিশেষ নির্দেশও দিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমার কাছে এই পরিমাণ অর্থসম্পদ জমা হলে, তা খেকে কমপক্ষে অবশ্যি এই পরিমাণ আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। তোমাদের ফল ফসল এই পরিমাণ উৎপাদিত হলে তা থেকে কমপক্ষে অবশ্যি এতোটা অংশ আল্লাহর পথে দিয়ে দিয়ে দাও। নামাযের ক্ষেত্রে যেমন কয়েক রাকা নামায ফরয করার অর্থ এই নয় যে, কেবল এই কয় রাকাত নামায পড়ার সময়ই আল্লাহকে স্মরণ করবে আর বাকী সময় তাঁকে ভুলে থাকবে। একইভাবে অর্থসম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করা হলো, তার অর্থ এই নয় যে, যাদের কাছে এর চেয়ে কম অর্থ আছে তারা গুটিয়ে বসে থাকবে। এর অর্থ এটাও নয় যে, ধনীদের উপর যে পরিমাণ যাকাত ফরয করা হয়েছে, তারা কেবল সেই পরিমাণই আল্লাহর পথে ব্যয় করবে এবং এর পরে কোনো অভাবী লোক এলে তাকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেবে, কিংবা দীনের কোনো কিদমত করবার সুযোগ এলে বলে দেবে যে, আমি তো যাকাত দিয়ে দিয়েছি, এখন আর আমার কাছ থেকে এক পয়সাও আশা করবেন না। যাকাত ফরয করার অর্থ কখনো এটা নয়। বরঞ্চ তার আসল অর্থ হলো ধনীদেরকে কমপক্ষে এই পরিমাণ অর্থসম্পদ আল্লাহর পথে অবশ্যি ব্যয় করতে হবে এবং এরপরও প্রত্যেকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।

৩. যাকাত দানের নির্দেশ

আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদে যাকাত সম্পর্কে তিনটি জায়গায় পৃথক পৃথক ফরমান জারি করেছেন:
১। সূরা বাকারায় নির্দেশ দিয়েছেন।: (আরবী*****************)
“হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা যেসব পবিত্র অর্থসম্পদ উপার্জন করেছো এবং তোমাদের জন্যে আমরা জমি থেকে যে ফসল উৎপদান করে দিয়েছি, তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় কর।” [আয়াত : ২৬৭]
২। সূরা আনআমে বলা হয়েছে, যেহেতু আমরা যমীনে তোমাদের জন্যে বাগবাগিচা সৃষ্টি করে দিয়েছি এবং ফসলাদি উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছি, সুতরাং: (আরবী***********)
“তার উৎপাদিত ফল ফসল তোমরা খাও আর ফসল কাটার দিন তা থেকে আল্লাহর অধিকার বের করে দাও।” [আয়াত: ১৪১]
এ দুটি আয়াতে জমির উৎপাদিত ফল ফসলের যাকাত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হানাফী ফকীহদের মতে স্বজাত উদ্ভিদ যেমন কাঠ, ঘাস ছাড়া বাকী সকল প্রকার শস্য, তরিতরকারী এবং ফল মূল থেকে আল্লাহর অধিকার (যাকাত) বের করে দিতে হবে। হাদীসে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক বর্ষণের ফলে যে ফসল উৎপাদিত হয়, তাতে আল্লাহর অধিকার (যাকাত) এক দশমাংশ। আর সেচ বা কৃত্রিম উপায়ে পানি দেয়ার মাধ্যমে যে ফসল উৎপাদিত হয় তাতে আল্লাহর অধিকার বিশ ভাগের একভাগ। ফসল কাটার সাথে সাথেই আল্লাহর অংশ পরিশোধ করা ওয়াজিব।
৩। অতপর সূরা তাওবায় বলা হয়েছে: (আরবী*******************)
“আর যারা সোনারূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করেনা, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। সেই দিনের আযাবের সংবাদ তাদের জানিয়ে দাও, যেদিন তাদের এসব সোনারূপা আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তাদের কপাল ও পাঁজরে দাগ দেয়া হবে। তখন তাদের বলা হবে, এই হলো সেই অর্থসম্পদ, যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা করে রেখেছিলে। এখন নিজেদের সঞ্চয়ের স্বাদ ভোগ কর।” [আয়াত : ৩৪-৩৫]
(আরবী****************)
“সাদাকা [যাকাত] হলো ফকীরদের জন্যে, মিসকীনদের জন্যে এবং সেইসব লোকদের জন্যে যারা যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীম, যেইসব লোকদের জন্যে যাদের মনজয় করা প্রয়োজন, গলদেশ মুক্ত করার জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরয। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী মহাবিজ্ঞ।” [আয়াত : ৬০]
এরপর আল্লাহ বলেন: (আরবী***************)
“তাদের অর্থসম্পদ থেকে যাকাত উসূল করে তাদেরকে পবিত্র পরিছন্ন কর।” [আয়াত : ১০৩]
এই তিনটি আয়াত থেকে জানা গেলো, যে অর্থসম্পদ সঞ্চয় ও বৃদ্ধি করা এবং তা থেকে আল্লাহর পথে খরচ করা হয়না।, তা নাপাক-অপবিত্র। আর তা পবিত্র করার একটি উপায় রয়েছে; সেটা হলো তা থেকে আল্লাহর অধিকার বের করে তাঁর বান্দাদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। হাদীসে বলা হয়েছে, সোনা রূপা সঞ্চয়কারীদের যখন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দেয়া হয়, তকন মুসলমানরা ভয়ে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কেননা আয়াতটির অর্থ তো হলো, একটি পয়সাও নিজের কাছে জমা রেখোনা। সব খরচ করে ফেলো। অবশেষে সকলের পক্ষ থেকে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলেকরীমের (সা) কাছে এসে জনগণের ব্যাকুলতার কথা জানালেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন, আল্লাহ তো এই জন্যে তোমাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যেনো অবশিষ্ট সম্পদ তোমাদের জন্যে পবিত্র হয়ে যায়। আবু সায়ীদ কুদরী (রা) থেকেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: তুমি যখন তোমার অর্থসম্পদ থেকে যাকাত বের করে দিলে, তখর তোমার উপর যে কর্তব্য (ওয়াজিব) বর্তিয়েছিল, তা তুমি আদায় করে দিলে।
রৌপ্যের নিসাব দুইশতহ দিরহাম অর্থাৎ প্রায় ৫২১/২ তোলা। স্বর্ণের নিসাব ৭১/২ তোলা। নিসাব ৫টি উটণ ছাগলর নিসাব ৪০ টি ছাগল। গরুর নিসাব ৩০ টি গরু। ব্যাবসায়ের সম্পদের নিসাব ৫২১/২ তোরা রূপার সমান অর্থসম্পদ।
যে ব্যক্তির কাছে উপরোক্ত পরিমাণ কোনো সম্পদ বর্তমান থাকবে, বছরে শেষে তার চল্লিষ ভাগের একভাগ তাকে যাকাত দিতে হবে। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী স্বর্ণ রোপৗ পৃথক পৃথকভাবে যদি কারো কাছে নিসাব পরিমাণ না থাকে, তবে উভয়টা একত্র করলে যদি কোনো একটির নিসাব পরিমাণ মূল্য হয়, তবে সেগুলো যাকাত দিতে হবে।
সোনা রূপা কারো কাছে অলংকারেও থাকে, তবে উমর (রা) এবং ইবনে মাসউদের (রা) মতে তার যাকাত দিতে হবে। ইমাম আবু হানীফারও এই মত। হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করীম (সা) দুইজন মহিলার হাতে সোনার চুড়ি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি এগুলোর যাকাত দিয়েছ? একজন বললো: জ্বী না দিইনি। নবী করীম (সা) বললেন: তবে কি তুমি এর বদলে কিয়ামতের দিন আগুনের চুড়ি পরা পছন্দ করবে? উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার কাছে সোনার পাঁয়জোর [এক প্রকার পদালংকার] ছিলো। আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি ‘সঞ্চয়’ এর অন্তর্ভুক্ত হবে? তিনি বললেন: যদি এতে সোনার পরিমাণ যাকাতের নিসাব পরিমাণ হয় এবং তা যাকা আদায় করা হয়ে থাকে, তবে তা ‘সঞ্চয়’-এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। এই হাদীস দুইটি থেকে জানা গেলো সোনা রূপা যদি অলংকার আকারেও থাকে, তবু তার যাকাত প্রদান করা ঠিক তেমনি ফরয, যেমন ফরয নগদ অর্থসম্পদের যাকাত দেয়া। অবশ্য হীরা জহরত এবং মনিমুক্তার যাকাত নেই।

৪. যাকাত ব্যয়ের খাত

[তাফহীমুল কুরআন, সূরা তাওবা, টীকা ৬১-৬৮ থেকে গৃহীত।]
কুরআন মজীদে যাকাত পাওয়র যোগ্য আট ধরনের হকদারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা তাওবার ষাট আয়াতে তাদের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সূরা তাওবার ষাট আয়াতে তাদের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে নিম্নরূপ: (আরবী***************)
“এই সাদাকা (যাকাত) মূলত ফকীর মিসকীনদের জন্যে। আর সেইসব লোকদের জন্যে যারা সাদাকা সংক্রান্ত কর্মে নিযুক্ত হয়েছৈ। তাছাড়া ঐসব লোকদের জন্যে যাদের মনজয় করা উদ্দেশ্য। এছাড়া গরদান মুক্ত করা, ঋণগ্রস্তদের সাহায্য করা, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অপরিহার্য বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত তাওবা, আয়াত: ৬০]
এ আয়াতে যাকাতের খাত বর্ণনা করা হযেছে। সমাজের যেসব লোকদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী এখানে সবিস্তারে তাদের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। এ অর্থ দ্বারা অন্য যেসব কাজ করা যেতে পারে সেগুলোও স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে। এভাবে এ আয়াত মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পলিসির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছে। এখানে যেসব খাতের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
১. ফকীর : ফকীর মানে এমন প্রতিটি লোক, যে স্বীয় জীবিকার ব্যাপারে অপরের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। এ শব্দটি সাধারণভাবে সকল মুখাপেক্ষী লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শারীরিক বৈকল্যের কারণে হোক, অথবা এমন ব্যক্তি, কোনো কারণে যে সাময়িকভাবে সাহায্যেল মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে, তবে সাহায্য সহযোগিতা পেলে পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে-এ ধরনের সকল মুখাপেক্ষী লোকের জন্যে ফকীর শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন এতীম, বিধবা, বেকার এবং এমন লোক যারা সাময়িকভাবে দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে।
২. মিসকীন: যাদের মধ্যে অভাব, দীনতা এবং ভাগ্যাহত অবস্থা পাওয়া যায় এমন সব লোকই মিসকীন। এদের থেকে সাধারণ মুখাপেক্ষী লোকদের তুলনায় অধিকতর শোচনীয় অবস্থার লোকেরাই মিসকীন। নবী করীম (সা) এ শব্দটির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষভাবে এমন লোকদের সাহায্য লাভের অধিকারী গণ্য করেছেন, যারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপায় উপকরণ লাভ করতে পারছেনা এবং ঘোরতর শোচনীয় অবস্থায় নিমজ্জিত আছে। কিন্তু আত্মসম্মানবোধের কারণে তারা কারো কাছে হাত পাততেও পারছেনা তাদের বাহ্যিক পজিশনও এমন নয় যে, অভাবী নে করে লোকেরা তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবে। হাদীসে মিসকীনের পরিচয় এভাবে দেয়া হয়েছে: (আরবী****************)
“মিসকীন হলো সে, যে নিজের প্রয়োজন মেটাবার মতো অর্থসম্পদ পায়না, তাকে যে সাহয্য করতে হবে তাও বুঝা যায় না এবং প্রকশ্যে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে চাইতেও পারেনা।”
আসলে এরা হলে সম্ভ্রান্ত মানুষ, তবে গরীব অসচ্ছল সমাজের সৎ লোকদের কর্তব্য নিজেদের আশে পাশে এ ধরনের যেসব লোক আছেন তাদের খোঁজ খবর নেয়া।
৩. আমেলীন : অর্থাৎ সেই সব লোক যারা যাকাত সংগ্রহ করা, সংগৃহীত সম্পদ হিফাযত করা, সেগুলোর হিসাব কিতাব সংরক্ষণ করা এবং তা ব্যয় বন্টন করার জাকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত কর্মচারী। এসব কর্মচারী নিজেরা ফকীল মিসকীন না হলেও যাকাতের খাত থেকেই তাদের বেতন ভাতা দেয়া হবে। যাকাত সংগ্রহ এবং বন্টন করা যে ইসলামী সরকারের অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য তা আলোচ্য আয়াত এবং সূরা তাওবার নিম্নোক্ত আয়াতের শব্দাবলী থেকে সুস্পষ্ট ভাবেই প্রমাণিত: (আরবী********)
“তাদের অর্থসম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) উসূল কর।” (আয়াত- ১০৩)
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নবী আকরাম (রা) নিজেরদ জন্যে এবং নিজ বংশের (বনি হাশিম) জন্যে যাকাতের অর্থসম্পদ গ্রহণ করা হারাম ঘোষা করে দিয়েছেন। তিনি নিজে বিনা পরিশ্রমিকেই সবসময় যাকাত আদায় ও বন্টনের কাজ করেছেন। বনি হাশিমের অন্য সকলের জন্যেও তিনি এই একই বিধান চালূ করেন। তিনি তাদের বলে দেন, তারা যদি বিনা পারিশ্রমিকে যাকাত আদায়-বন্টনের কাজ করে, তবে সেটা তাদের জন্যে জায়েয । কিন্তু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে যাকাত বিভাগের কোনো কাজ করা তাদের জন্যে বৈধ নয়। তাঁর বংশের কোনো ব্যক্তি যদি ‘সাহেবে নিসাব’ হয় তবে যাকাত প্রদান করা তার উপর ফরয। কিন্তু যে যদি গরী, আভাবী, ঋণগ্রস্ত এবং মুসাফিরও হয়, তবু তার জন্যে যাকাত গ্রহণ করা বৈধ নয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় নিযে মতভেদ রযেছে। তা হলো বনি হাশিমের প্রদান করা যাকাত বনি হাশিমের কোনো ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারবে কিনা? ইমাম আবু ইউসুফের মতে পারবে। কিন্তু অধিকাংশ ফকীহ তা-ও বৈধ নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন।
৪. মুয়াল্লিফাতুল কুলূব : ‘তালিফে কলব’ মানে মনজয় করা। ‘মুয়াল্লিফাতুল কুলূব’ মানে সেই সব লোক যাদের মনজয় করা উদ্দেশ্যে। মন জয় করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করার যে নির্দেশ এখানে দেয়া হয়েছে তার উদ্দেশ্য হলো, যেসব লোক ইসলামের বিরোধিতায় তৎপর, তবে অর্থ দিয়ে বিরোধিতা থেকে নিবৃত্ত করা যেতে পারে; কিংবা কাফেরদের দলের এমন লোক যাদেরকে অর্থ দিলে দল ভেংগে এসে মুসলিমদের সাহায্যকজারী হতে পারে; অথবা এমন লোক যারা সবেমাত্র ইসলামে প্রবেশ করেছে তবে তাদের পূর্বের শত্রুত কিংবা দুর্বলতা দেখে আশংকা হয় যে অর্থ দিয়ে বশীভূত না করলে তারা আবর কুফরীতে ফিরে যেতে পারে- এ ধরনের লোকদের স্থায়ী ভাতা, বৃত্তি বিংবা সাময়িকভাবে অর্থপ্রদান করে ইসলামের সমর্থক ও সাহায্যকারী বা অনুগত কিংবা অক্ষতিকর শত্রুতে পরিণত করা। গনীমতের মাল এবং অন্যান্য উপায়ে অর্জিত অর্থসম্পদ থেকেও এ খাতে ব্যয় করা যেতে পারে এবং প্রয়োজনে যাকাতরে তহবিল থেকেও এ খাতে ব্যয় করা যায়। এ ধরনের লোকদের যাকাত পেতে ফকীর, মিসকীণ বা মুসাফির হবার শর্তহ নেই। বরঞ্চ তারা ধনী সম্পদশালী হওয়া সতেত্ত্বেও তাদের জন্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা সম্পূর্ণ বৈধ।
এতে কোনো মতভেদ নেই যে, নবী করীম (সা)-এর যামানায় বহু লোককে ‘মনজয়’ করার জন্যে ভাতা প্রদান এবং অর্থদান করা হতো। কিন্তু মতভেদ দেখা দিয়েছে এই ব্যাপারে যে, নবী করীম (সা)-এর পরেও এই খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে কিনা? ইমাম আবু হানীফা এবং তাঁর সাথীদের মত হলো, আবু বকর এবং উমর রাদিয়াল্লহু আনহুমার খিলাফতকালে এই খাত রহিত করে দেযা হয়। অতএব ‘মুয়াল্লিফাতুল কুলূব’ খাতে অর্থ ব্যয় করা জায়েয নয়। ইমাম শাফেঈর মতে ফাসিক মুসলমান ‘মনজয়’ করার জন্যে যাকাতের অর্থ দেয়া যেতে পারে, কিন্তু কাফিরদের দেয়া যেতে পারেনা। অপরাপর ফকীহদের মতে, প্রয়োজন দেখা দিলে ‘মুয়াল্লিফাতুল কুলূব’ খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা সব সময়িই জায়েয।
নিজেদের মতের সপক্ষে হানাফীদের দলীল হলো একটি ঘটনা। তা হলো, নবী করীমের (সা) ইনতেকালের পরে উয়াইনা ইবনে হিস্ন এবং আকরা ইবনে হারিস খলীফা আবু বকর (রা)-এর কাছে এসে একখন্ড জমি দাবি করে।তিনি তাদের দানপত্র লিখে দেন। তারা দানপত্রকে মজবুত করার জন্যে সাক্ষী হিসেবে অন্যান্য সাহাবীর স্বাকষল পেতে চায়। ফলে স্বাক্ষর সংগ্রহ হয়ে গেলো। কিন্তু তারা যখন সাক্ষী হযরত উমরের স্বাক্ষর নিতে গেলা, তিনি দানপত্রটি পড়ে তাদের সামনেই তা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন এবং তাদের বললেন: “নবী করীম (সা) ‘তালীফ কলব’-এর জন্যে তোমাদের অনেক কিছু দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সে সময়টি ছিলো ইসলামের দুর্বল অবস্থার সময়। এখন আল্লাহ তা’য়ালা ইসলামকে তোমাদের মত লোকদের সাহায্য থেকে মুখাপেক্ষীহীন করে দিয়েছেন।”
এ ঘটনার পর তারা আবু বকরের (রা) কাছে ফিরে এসে অভিযোগ করলো এবং তাঁকে টিটকারী দিয়ে বললো: ‘খলীফা কি আপনি না উমরঃ’ কিন্তু হযরত আবু বকর নিজেও এর কোনো প্রতিবাদ করেননি। আর সাহাবীদের একজনও উমরের (রা) এই মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেননি। এটাই হানাফীদের দলীল। তারা বললেন, মুসলমানরা যখন সংখ্যায় বিপুল হয়ে গেলা এবং মজবুতভাবে নিজেদের পায়ে দাড়াবার যোগ্য হলো, তখন যেসব কারণে ‘তালীফে কলব’ এর জন্যে অংশ ধর্য করা হয়েছিল, সেসব কারণ আর বাকী রইলো না। সুতরাং সাহাবীদের ইজমার ভিত্তিতেই ‘তালীফে কলব’ এর খাত রহিত হয়ে গেছে।
ইমাম শাফেয়ীর যুক্তি হলো, ‘মনজয়’ করার উদ্দেশ্যে কাফিরদের যাকাত দেয়া রাসূলুল্লাহর (স) আমল থেকে প্রমাণিত নয়। হাদীসে যতো ঘটনারই উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে জানা যায়, তিনি মন জয় কারার উদ্দেশ্যে কাফিরদের দান করেছন গনীমতের মাল থেকে, যাকাতের মাল থেকে নয়।
আমাদের মতে, ‘মুয়াল্লিফাতুল কুলূব’-এর অংশ কিয়ামত পর্যন্ত রহিত হয়ে যাবার পক্ষে কোনো দলীল প্রমাণ নেই। হযরত উমর (রা) যা কিছু বলেছিলেন তা যথার্থই ছিলো। ইসলামী রাষ্ট্র যদি ‘মনজয়’ করার জন্যে অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন মনে না করে, তবে বাধ্যতামূলকভাবে তা ব্যয় করার জন্য কেউ ফরয করে দেয়নি। কিন্তু কখনো যদি এ খাতে অর্থ ব্যয় করার জরুরত দেখা যেদয়, তবে আল্লাহ তা’আলা সে অবকাশ রেখে দিয়েছেন। এ খাত অবশিষ্ট থাকা জরুরীও বটে। হযরত উমর এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা) যে বিষয়ে একমত হয়েছিলেন, তা কেবল এতোটুকু যে, তাঁরা তাঁদের সময়ে এ খাতে ব্যয় করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কিন্তু তাঁদের সেই মতেক্যৈর কারণে কিয়ামত পর্যন্ত এ খাতটি রহিত হয়েছে বলে ধারণা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। কারণ, কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দীনী কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই কুরআন এই খাতে ব্যয়ে বিধান দেয়া হয়েছে।
এবার ইমাম শাফেঈর মতটি বিশ্লেষণ করে দেয়অ যাক। তাঁর মত একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সঠিক মনে হয়। তা হলো সরকারের হাতে অন্যান্য খাতে যথেষ্ট অর্থ মওজুদ থাকবে, তখন মন জয় করার উদ্দেশ্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা ঠিক নয়। কিন্তু যখন এই খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করার জরুরত দেখা দেবে, তখন যাকাতের টাকা ফাসিকদের দেয়া যাবে আর কাফিরদে দেয়া যাবেনা, এরূপ পার্থক্য করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কেননা কুরআন মজীদ এই খাতে ঈমানের কারণে ব্যয় করার নির্দেশ দেয়নি বরং নির্দেশ দেয়নি বরং নির্দেশ দিয়েছে ইসলামের স্বার্থে ব্যয় করার এবং মন জয় করার। আর এমন লোকদেরই দিতে বলা হয়ছে, কেবল অর্থ দিয়েই যাদের মন জয় করা যায়। কুরআনের বিধান অনুযায়ী ইসলামী সরকার যেখানেই এই প্রয়োজন এবং এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করবেন সেখানেই যাকাতের অর্থ এই খাতে ব্যয় করার অধিকার রাখবেন। নবী করীম (সা) এ খাত থেকে যদি কাফিরদের জন্যে ব্যয় না করে থাকেন, তবে তা করেছেন অন্যান্য খাতে প্রচুর অর্থস্পদ মওজুদ থাকার কারণে। নতুবা এই যাকাতের অর্থ থেকে যদি কাফিরদেরকে অর্থদান করা তার দৃষ্টিতে বৈধ না-ই হতো, তবে তিনি অবশ্যি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে যেতেন।
৫. ফীর রিকাব: অর্থাৎ গলদেশ মুক্ত করার কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। ‘গলদেশ মুক্ত করার’ অর্থ মানুষকে দাসত্বের জিঞ্জির থেকে মুক্ত করা। এর দুইটি পথ রয়েছে। একটি পন্থা হলো এই যে, কোনো দাস যদি তার মনিবের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে থাকে যে, আমি আপনাকে এই পরিমাণ অর্থ দান করলে আপনি আমাকে মুক্ত করে দেবেন, তবে তার মুক্তির মূল্য পরিশোধের জন্যে তাকে সাহায্য করা। দ্বিতীয় পন্থা হলো, নিজেই যাকাতের অর্থ দিয়ে দাস ক্রয় করে মুক্ত করে দেয়া
এ দুটি পন্থার মধ্যে প্রথমটির ব্যাপারে সকল ফকীহই একমত। কিন্তু দ্বিতীয় পন্থাটি হযরত আলী, সায়ীদ ইবনে যাবায়ের, লাইস, সাওরী, ইব্রাহীম নখরী, শা’বী, মুহাম্মদ ইবনে সীরীন এবং হানাফী ও শাফেয়ীগণ অবৈধ মনে করেন। পক্ষান্তরে ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী, মালিকম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং আবু সওর বৈধ বলে মনে করেন।
৬. গারেমীন:ধ অর্থাৎ ঋণগ্রস্ত লোক। তারা এমন ঋণগ্রস্ত যে, নিজের অর্থসম্পদ দিয়ে নিজের ঋণ পরিশোধ করে দিলে আর নিসাব পরিমাণ অর্থ নিজের কাছে থাকেনা। এমন ব্যক্তি উপার্জনশীল হোক, সাধারণভাবে ফকীর বলে পরিচিত হোক, কিংবা হোক ধনী বলে পরিচিত, সর্বাবস্থায় তাকে যাকাতেহর খাত থেকে সাহায্য করা যেতে পারে। তবে কিছু সংখক ফকীহর মতে যে ব্যক্তি অসৎ কাজে এবং বাহুল্য ব্যয় করে নিজের অর্থকড়ি উড়িয়ে দিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তওবা না করা পর্যন্ত তাকে সাহয্য করা যাবেনা।
৭. ফী সাবীলিল্লাহ: অর্থাৎ আল্লাহর পথে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। ‘আল্লাহর পথে’ কথাটি সাধারণ অর্থবোধক। আল্লাহর পথে বলতে এমন সকল নেক কাজই বুঝায়, যাতে আল্লাহ তা’আলা সন্তুষ্ট হন। এ কারণে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন যে, এ নির্দেশের আলোকে যাকাতে অর্থ সব ধরনের সৎকাজেই ব্যয় করা যেতে পারে। কিন্তু সঠিক কথা হলো এবং পূর্বতন ইমামদের অধিকাংশেরই মত হলো এখানে ‘আল্লাহর পথের অর্থ ‘আল্লাহর পথে জিহাদ’। অর্থাৎ চেষ্টা সংগ্রাম যার উদ্দেশ্য কুফরী সমাজ ব্যবস্থাকে নির্মূল করে তদস্থলে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই আন্দোলন সংগ্রামে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের সফর খরচের জন্যে, যানবাহনের জন্যে এবং অস্ত্রশস্ত্র, সাজ সরঞ্জাম ও উপায় উপকরণ সংগ্রহ করার জন্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। যে লোকেরা নিজেরা সচ্ছল হলও এবং প্রয়োজন পূরণের জন্যে সাহায্যের প্রয়োজন না হলেও যাকাত গ্রহণ করতে তাদের কোনো দোষ নেই। অনুরূপ যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের সমস্ত শ্রম এবং সময় সাময়িক বা স্থায়ীভাবে এ কাজে নিয়োগ করে তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্যেও যাকাতের অর্থ থেকে এককালীন বা নিয়মিত সাহায্য দেয়া যেতে পারে।
এখানে আরেকটি কথা বিশেষভাবে বুঝে নেয়া দরকার । তা হলো, অতীত ইমামগণ প্রায়শই এক্ষেত্রে ‘গাজওয়অ’ শব্দ ব্যবাহার করেছেন, যা সশস্ত্র যুদ্ধের সমার্থক। এ কারণে লোকেরা এই ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয় যে, যাকাত ব্যয়ে ফী সাবীলিল্লাহর যে খাত রয়েছে, তা কেব সশস্ত্র যুদ্ধের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ‘জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ’ সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়েও ব্যাপকতর। ‘জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ বলতে এমন সকল চেষ্টা সাধনা ও সংগ্রামকেই বুঝায়, যা কুফরীকে পরাভূত করে আল্লাহর বাণীকে বিজয়ী করা এবং তাঁর দীনকে পূর্ণাংগ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে উত্থিত হয়। চাই তা দাওয়াত ও তাবলীগের প্রাথমিক অবস্থায় থাকুক, কিংবা সশস্ত্র লড়াইযের চূড়ান্ত অধ্যায়ে, তাতে কিছু যায় আসে না।
৮. মুসাফির: মুসাফির নিজের ঘরে ধনী হলেও সফরকালে যদি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়, তবে যাকাতে খাত থেক তাকে সাহায্য করা যাবে। এক্ষেত্রে কোনো কোনো ফকীহ এ শর্তারোপ করেছেন যে, কেবল ঐ মুসাফিরের জন্যেই এ নির্দেশটি প্রযোজ্য হবে, য কোনো পাপ কাজের জন্যে সফরে বের হয়নি। অবশ্য কুরআন এবং হাদীসে এ ধরনের কোনো শর্ত বর্তমানে নেই। তাছাড়া দীনের আদর্শিক শিক্ষা থেকেও আমরা জানতে পারে যে, কেউ সাহায্যের মুখাপেক্ষী হলে তাকে সাহায্য করার ব্যাপারে তার পাপী বা গুনাহগার হওয়াটা কোনোরূপ বাধা নয়। বরঞ্চ সত্যকথা পাপী, গুনাহগার এবং নৈতিক অধঃপতিত ব্যক্তিদের সংশোধন করার একটি বড় উপায় হলো বিপদের সময় তাদের সাহায্য করা, আশ্রয় প্রদান করা এবং উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাদের আতহ্মাকে পবিত্র কিরার চেষ্টা করা।
এই যে আট ধরনের [এ অংশটুকু গৃহীত হয়েছে ‘খুতবাত’ গ্রন্থ থেকে।] লোকের কথা বলা হলো, তাদের মধ্যে কাকেকোন্‌ অবস্থায় যাকাত দেয়া উচিত আর কোন্‌ অবস্থায় উচিত নয়- তার একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে পেশ করা যাচ্ছে।
১. কোনো ব্যক্তি নিজের পিতা কিংবা পুত্রকে যাকাত দিতে পারবেনা। স্বামী তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাত দিতে পারবে না। এ ব্যাপারে ফকীহগণ একমত। কোনো কোনো ফকীহ বলেছেন, এমন নিকট আত্মীয়কেও যাকাত দেয়া উচিত নয়, যাদের ব্যয়ভার বহন করা তোমার উপর ওয়াজিব, কিংবা এমন এমন লোকদেরকে যারা শরয়ী ‍দিক থেকে তোমার ওয়ারিশ। তবে দূরের আত্মীয়রা যাকাত পাবার হকদার, বরং অন্য লোকদের তুলনায় অধিক হকদার। পক্ষান্তরে ইমাম আওযয়ী বলেছেন, যাকাত বের করে কেবল নিজের নিকটাত্মীয়দের খুঁজতে থেকোনা।
২. যাকাত কেবল মুসলমানদের হক অমুসলিমরা যাকাত পাবেনা। হাদীসে যাকাতের পরিচয় দেয়া হয়েছে এভাবে:
“যাকাত তোমারেদ ধনীদের কাছ থেকে আদায় করা হবে এবং তোমারেদ গরীবদের মাঝে বন্টন করা হবে।”
তবে অমুসলিমদেরকে সাধারণ দান খায়রাত অবশ্যি দেয়া যাবে। বরঞ্চ সাধারণ দান খয়রাতের ক্ষেত্রে কেবল মুসলমানকে দিতে হবে অমুসলিম সাহায্যের মুখাপেক্ষীকে দেয়া যাবেনা, এমন তামতম্য করা উচিত নয়।
৩.ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মদ বলেছেন, প্রতিটি অঞ্চলের যাকাত সেই এলাকার দরিদ্রদের মধ্যেই হওয়া উচিত। এক অঞ্চলের যাকাত অন্য অঞ্চলে পাঠানো ঠিক নয়। তবে, যে অঞ্চলের যাকাত, সেই এলাকায় যদি যাকাত লাভের যোগ্য লোক না থাকে কিংবা অন্য এলাকয় যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন প্লাবন, ‍দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি দেখা দেয় এবং দূরের ও কাছের এলাকা থেকে সাহায্য পাঠানো জরুরী হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে এক এলাকর যাকাত অন্য এলাকায় পাঠাতে দোষ নেই। ইমাম মালিক এবং সুফিয়ান সাওরীও প্রায় অনুরূপ মতই দিয়েছেন। তবে এর অর্থ এই নয়, যে এক অঞ্চলের যাকাত অন্য অঞ্চলে পাঠানো নাজায়েয।
৪. কারো কারো মতে, যে ব্যক্তির কাছে দু’বেলার খাবার সামগ্রী আছে, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা উচিত নয়। কেউ কেউ বলেছেন, যার কাছে দশ টাকা আছে, আবার অপর কেউ কেউ বলেছেন, যার কাছে সাড়ে বার টাকা আছে, তার পক্ষে যাকাত নেয়া উচিত নয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (র) এবং সকল হানাফী ইমামদের মতে, যার কাছে পঞ্চাশ টাকার কম অর্থ আছে, সে যাকাত গ্রহণ করতে পারে। এ পঞ্চাশ টাকার মধ্যে ঘরের আসবাব পত্র,ঘোড়া (যানবাহন) এবং চাকর-বাকর অন্তর্ভুক্ত হবে না। অর্থাৎ এসব সামগ্রী থাকা সত্ত্বেও যার কাছে পঞ্চাশ টাকার কম অর্থ আছে, সে যাকাত লাভের অধিকার রাখে। এক্ষেত্রে একটি জিনিস হলো আইন এবং আরেকটি জিনিস হলো মর্যাদার স্তর। এ দুটি জিনিসের পার্থক্য আছে।
মর্যাদার স্তর হলো এই যে, নবী করীম (সা) বলেছেন: “যার কাছে সকাল ও সন্ধ্যার খাবার সামগ্রী আছে, সে যদি মানুষের কাছে চাওয়ার জন্যে হাত পাতে, তবে সে নিজের জন্যে আগুন জমা করে।” অপর একটি হাদীসে নবী করীম (সা) বলেছেন, “মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করাকে আমি অধিকতর পছন্দ করি।” তৃতীয় একটি হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যার কাছে খাবার আছে, অথবা যে ব্যক্তি উপার্জন করার সামর্থ্য রাখে, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা অনুচিত।’ এগুলো হলো মর্যাদাবোধের কথা। আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন লোকদের জন্যেই এগুলো উপদেশ। এগুলো আইন নয়।
বাকী থাকলো আইনের কথা। কোনো ব্যক্তি কখন যাকাত গ্রহণ করার অধিকার রাখে, এ ব্যাপারে একটি সীমা বলে দেয়া জরুরী। এ ব্যাপারেও হাদীস থেকেই নির্দেশিকা পাওয়া যায়। নবী করীম (সা) বলেছেন: (আরবী********)
“ঘোড়ার চড়ে এলেও ভিক্ষার্থী ভিক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে।”
একব্যক্তি এসে নবী করীম (সা) কে জিজ্ঞেস করলো, আমার কাছে দশ টাকা থাকবেল আমি কি মিসকীন বলে গণ্য হবো?
তিনি বললেন: হ্যাঁ।
একবার দু’ব্যক্তি এসে নবী করীম (সা)-এর নিকট যাকাত চাইলো। তিনি কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন: তোমরা নিতে চাইলে আমি দেবো, তবে যাকাতের মালে ধনী এবং উপার্জনক্ষম লোকদের অংশ নেই।
এসব হাদীস থেকে জানা গেলো, যার কাছে নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণ অর্থসম্পদ আছে, সে ফকীর বলে গণ্য হবে এবং তাকে যাকাত দেয়া যেতে পারে।
এখানে আমি যাকাতে জরুরী বিধি বিধান বর্ণনা করলাম। এ প্রসংগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যা মুসলমানরা বর্তমানে ভুলেই গিয়েছেন। তা হলো, ইসলামের সব কাজই সাংগঠনিক ও সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। ইসলাম ব্যক্তিতান্ত্রিকতাকে সমর্থন করেনা। আপনি মসজিদ থেকে দূরে অবস্থান করা অবস্থায় একাকী নামায পড়লে নাময হয়ে যাবে বটে, তবে শরীয়তের দাবি তো হলো আপনি যেনো জামায়াতের সাথে নামায পড়েন।
একইভাবে মুসলমানদের রাষ্ট্রিয় ও দলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না থাকলে ব্যক্তিগতভাবে যাকাত বের করে ব্যয় করাও জায়েয। তবে প্রচেষ্টা তো এই থাকা উচিত যে, যাকাত একটি কেন্দ্রীয়স্থানে জমা করা হবে এবং সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট নিয়েমে তা ব্যয় করা হবে। এ বিষয়টির প্রতিটি কুরআন মজীদ ইংগিত করেছে নিম্নোক্ত আয়াতে :
(আরবী*********)
(তাদেরকে পবিত্র পরিশুদ্ধ করবার জন্যে তাদের অর্থসম্পদ থেকে সাদাকা [যাকাত] আদায় কর)
এখানে আল্লাহ তা‘আলা নবী করীম (সা) কে যাকাত উসূল করবার নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে ব্যক্তিগতভাবে নিজ যাকাত বের করে তা ব্যয় করতে বলেননি। তাছাড়া যাকাত বিভাগের কর্মচারীদের অধিকার যাকাতের খাত থেকে নির্ধারণ করা দ্বারাও একথা পরিষ্কার হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তা উসূল ও ব্যয় করবেন। নবী করীম (সা) বলেছেন :
(আরবী***************)
“আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমি যেনো তোমাদের ধনীদের কাছে যাকাত উসূল করি এবং তোমাদের গরীবদের মাঝে তা বন্টন করি।“
নবী করীম (সা) এবং খুলাফায়ে রাশেদীন এই পন্থায়ই যাকাত উসূল ও বন্টন করতেন। ইসলামী রাষ্ট্রের কর্মচারীরা যাকাত উসূল করে এক জায়গায় জমা করতেন এবং নিয়ম মাফিক বন্টনের ব্যবস্থা করতেন।
বর্তমানে যেহেতু আমাদের দেশে ইসলামী রাষ্ট্র নেই এবং ইসলামী সরকারের মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ করে বন্টন করার ব্যবস্থাও নেই, সে কারণে আপনারা ব্যক্তিগতভাবে হিসেব করে নিজেদের যাকাত বের করে তা শরীয়ত নির্ধারিত খাতে ব্যয় করতে পারেন। তাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত উসূল ও বন্টন করার উদ্দেশ্যে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম করা সকল মুসলমানের অবশ্যবর্তব্য। কারণ এছাড়া যাকাত ফরয করার উপকারিতা পূর্ণরূপে লাভ করা সম্ভব নয়।

৫. যাকাতের মৌলিক বিধান

প্রশ্নমালা [তরজমানুল কুরআন মহররম ১৩৭০ হিজরী, নভেম্বর ১৯৫০ ই, সংখ্যা থেকে গৃহীত। (সংকলক)
(১) যাকাতের তাত্পর্য কি?
(২) কার উপর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব? এ ব্যাপারে মহিলা, অপ্রাপ্তবয়স্ক, কয়েদী, মুসাফির, পাগল ওপ্রবাসীরা কোন পর্যায়ভুক্ত, বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করবেন।
(৩) যাকাত আদায়ের অপরিহর্যতার জন্যে কত বছর বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রাপ্তবয়স্ক মনে করা উচিত?
(৪) যাকাত আদায়ের অপরিহার্যতার ব্যাপারে মেয়েদের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য অলংকারাদি কোন পর্যায়ভুক্ত?
(৫) কোম্পানীকে যাকাত আদায় করা উচিত, নাকি প্রত্যেক অংশীদারকে নিজেদের অংশ অনুযায়ী পৃথক পৃথকভাবে যাকাত আদায় করতে হবে?
(৬) কারখানা ও অন্যান্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের উপর যাকাত ওয়াজিব হবার সীমা বর্ণনা করুন।
(৭) যেসব কোম্পানীর শেয়ার স্থানান্তরযোগ্য, যাকাত নির্ধারণ করার সময় তাদের মধ্যে কার উপর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব হবে- শেয়ার ক্রয়কারীর উপর না বিক্রয়কারীর উপর?
(৮) কোন কোন আসবাব পত্র ও বস্তুর উপর এবং বর্তমান সমাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোন অবস্থায় যাকাত ওয়াজিব হয়? বিশেষ করে নিম্নলিখিত বস্তুগুলি সম্পর্কে অথবা এদের সৃষ্ট অবস্থায় কোন পদক্ষেপ গৃহীত হবে?
ক. নগদ টাকা, সোনা, রূপা, অলংকার ও মূল্যবান পাথর।
খ. ধাতুর মুদ্রা (স্বর্ণখচিত, রৌপ্যখচিত ও অন্যান্য ধাতুখচিত মুদ্রা এর অন্তর্ভূক্ত) এবং কাগজের মুদ্রা।
গ. ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত, ব্যাংক অথবা অন্যস্থানে রক্ষিত বস্তুসমূহ, অন্য কোথাও থেকে গৃহীত ঋণ, বন্ধকী সম্পত্তি ও বিবাদমূলক সম্পত্তি এবং এমন সম্পত্তি যার বিরুদ্ধে নালিশ করা হয়েছে।
ঘ. উপহার, পুরস্কার।
ঙ. বীমার পলিসি এবং প্রবিডেন্ট ফান্ডের অর্থ।
চ. গবাদি পশু, দুধ, দই, ছানা প্রভৃতি, উত্পন্ন কৃষিজাত দ্রবাদি, তরিতরকারি, ফল ও ফুলসহ।
ছ. খনিজ দ্রব্য।
জ. আহরিক গুপ্তধন।
ঝ. প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ।
ঞ. বনের বা গৃহপালিত মৌমাছির মধু।
ট. মাছ, মোতি ও পানির অন্যান্য বস্তু।
ঠ. পেট্রোল।
ড. আমদানী-রফতানী।
(৯) রাসূলুল্লাহর (সা) আমলে যেসব বস্তুর উপর যাকাত ওয়াজিব ছিল খোলাফায়ে রাশিদীন তার মধ্যে কোনো বস্তুর নাম বৃদ্ধি করেছিলেন কি? কোনো বৃদ্ধি বা পরিবর্তন হয়ে থাকলে কোন নীতির ভিত্তিতে তা হয়েছিল?
(১০) নিকেলের মুদ্রা ও সোনা রূপা ছাড়া প্রচলিত অন্যান্য ধাতুর মুদ্রার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে কি? যে সকল মুদ্রার প্রচলন নেই অথবা যেগুলি নষ্ট হয়ে গেছে বা সরকার প্রচলন রহিত করেছেন অথবা যেগুলি বিদেশের মুদ্রা, সেগুলির যাকাত দিতে হবে কিনা?
(১১) প্রকাশ্য ও গোপন সম্পদের সংজ্ঞা কি? এ ব্যাপারে ব্যাংকে সংগৃহীত অর্থ কোন পর্যায়ভু্ক্ত?
(১২) যাকাত গ্রহণের ব্যাপারে বর্ধনশীল সম্পদের সংজ্ঞা বর্ণনা করুন। কেবলমাত্র উত্পাদনশীল সম্পদের উপরই কি যাকাত ওয়াজিব?
(১৩) যেসব গৃহ, অলংকার ও অন্যান্য বস্তু ভাড়া দেয়া হয়, সেগুলি এবং টেকসী ও মোটর প্রভৃতির উপর যাকাত নির্ধারণ করার পদ্ধতি কি হওয়া উচিত?
(১৪) কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন কোন পশুর উপর যাকাত ওয়াজিব হবে? এ ব্যাপারে মহিষ, মুরগী ও অন্যান্য গৃহপালিত এবং শখ করে পালা পশুসমূহ কোন পর্যায়ভুক্ত? এদের যাকাত কি নগদ টাকায় দিতে হবে অথবা পশু দিতে হবে? কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন বিভিন্ন পশু কত সংখ্যায় ও কোন অবস্থায় পৌছলে এর উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়া উচিত?
(১৫) যেসব বস্তুর উপর যাকাত ওয়াজিব হয় তাদের যাকাতের হার কি?
(১৬) খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে নগদ টাকা, মুদ্রা, গবাদি পশু, ব্যবসায়িক সম্পদ ও কৃষি উত্পাদনের উপর যাকাতের হারের মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে? যদি পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে সনদসহ বিস্তারিত কারণ বর্ণনা করুন।
(১৭) নগদ টাকার ক্ষেত্রে যদি দুশো রৌপ্যখচিত দিরহাম ও বিশ স্বর্ণখচিত মিসকালের উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে থাকে, তাহলে তা কতটি দেশীয় টাকার সমান হবে? তরিতরকারীর ব্যাপারে ‘সা’ ও ‘ওয়াসাক’ দেশের বিভিন্ন এলাকা ও প্রদেশের কোন কোন প্রচলিত ওজনের সমান হবে?
(১৮) বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিসাবের (কমপক্ষে যে পরিমাণ অর্থসম্পদের উপর যাকাত হয়) এবং যাকাতের হারের মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধিত হতে পারে কি? এ ব্যাপারে যুক্তি প্রমাণ সহকারে আপনার চিন্তা পেশ করুন।
(১৯) কি পরিমান সময় অতিক্রান্ত হবার পর বিভিন্ন বন্তুর উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে যায়?
(২০) এক বছরে যদি একাধিক ফসল হয়, তাহলে বছরে কেবল একবার যাকাত আদায় করা উচিত নাকি প্রত্যেক ফসলের যাকাত আদায় করতে হবে?
(২১) চন্দ্রবর্ষের হিসাবে যাকাত আদায় করা উচিত কিংবা সৌর বর্ষের হিসাবে যাকাত নির্ধারণ ও আদায়ের জন্যে কোনো মাস নির্দিষ্ট করা উচিত কি না?
(২২) যাকাতের টাকা কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যয়িত হওয়া উচিত?
(২৩) কুরআন মজীদে যাকাতের যে ব্যয়ক্ষেত্র উল্লিখিত হয়েছে তার সীমারেখা বর্ণনা করুন। বিশেষ করে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ পরিভাষাটির অর্থ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন।
(২৪) যাকাতের অর্থের একটি অংশ কুরআনে বর্ণিত যাকাতরে ব্যয়ক্ষেত্র সমূহের প্রত্যেকটিতে ব্যয় করার জন্যে প্রথক করে রাখা কি অপরিহার্য? অথবা যাকাতের সমদয় অর্থ কুরআনে বর্ণিত সব ব্যয়ক্ষেত্রে ব্যয় করার পরিবর্তে কোনো একটিতে বা কয়েকটিতে ব্যয় করা যেতে পারে?
(২৫) যাকাত গ্রহণকারী প্রতিটি শ্রেণীর মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি কোন অবস্থায় যাকাত গ্রহণ করার অধিকারী হয়, দেশে বিভিন্ন এলাকায় বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাইয়েদ ও বনী হাশিমের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গ কি পরিমাণ যাকাত গ্রহণের অধিকার হতে পারে- তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন।
(২৬) যাকাত কি কবল ব্যক্তিকে দিতে হবে অথবা প্রতিষ্ঠানকেও (যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এতীমখানা, দরিত্র সেবা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি) দেয়া যেতে পারে?
(২৭) যাকাতের অর্থ থেকে গরীব, মিসকীন, বিধবা এবং পঙ্গু ও বার্ধক্যের জন্যে যারা রোযগার করতে অসমর্থ, তাদেরকে সারা জীবন পেনশন দেয়া যেতে পারে কি?
(২৮) যাকাতকে জনসেবা কাজে- যেমন মসজিদ, হাসপাতাল, রাস্থাঘাট, পুল, কুয়া, পুকুর প্রভৃতি খনন, নির্মান বা মেরামতের কাজে লাগানো যেতে পারে কিনা, যার ফলে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই উপকৃত হতে পারে?
(২৯) যাকাতের টাকা কোনো ব্যক্তিকে ‘কর্জে হাসানা’ অথবা সুদহীন ঋণ হিসেবে দেয়া যেতে পারে কি?
(৩০) যে এলাকা থেকে যাকাত আদায় করা হয়, সেখানেই তা ব্যয় করা কি অপরিহার্য? অথবা সে এলাকার বাইরে বা দেশের বাইরে দুর্বল মনকে সবল করার জন্যে, ভূমিকম্প, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যগ কবলিত ব্যক্তিদেরকে সাহায্য দানের জন্যে ব্যয় করা যাবে কি? এ ব্যাপারে আপনার মতে এলাকার সংজ্ঞা কি?
(৩১) কোনো মৃত ব্যক্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে যাকাত আদায় করার পদ্ধতি কি হওয়া উচিত?
(৩২) লোকেরা যাতে যাকাত আদায়ের ব্যাপারে কোনো বাহানার আশ্রয় গ্রহণ করতে না পারে এজন্য কি কি সতর্কমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা যেতে পারে?
(৩৩) যাকাত আদায় ও এর ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের হাতে থাকা উচিত, না প্রদেশের হাতে? কেন্দ্র যদি যাকাত আদায় করে, তাহলে তাতে প্রদেশগুলোর অংশ নির্ধারণ করার জন্যে কি নীতি অবলম্বিত হবে?
(৩৪) আপনার মতে যাকাত ব্যবস্থা পরিচালনার সর্বোত্তম পদ্ধতি কি? যাকাত জমা করার জন্যে কি পৃথক পৃথক বিভাগ কায়েম করা দরকার অথবা বর্তমান সরকারী বিভাগসমূহের মাধ্যেমে এ কাজ নেয়া যাবে?
(৩৫) যাকাতকে কি কখনো সরকারী ট্যাক্স গণ্য করা হয়েছে? অথবা এটি এমন একটি ট্যাক্স যার ব্যবস্থাপনা ও আদায় করার দায়িত্বই কেবল সরকারের উপর বর্তায়?
(৩৬) রাসূলুল্লাহ (সা) বা খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে জনস্বার্থমূলক কাজের জন্যে সরকারী পর্যায়ে যাকাত ছাড়া অন্য কোনো ট্যাক্স আদায় করা হয়েছে কি? যদি আদায় করা হয়ে থাকে তাহলে তা কি ট্যাক্স ছিল?
(৩৭) মুসলিম দেশসমূহ যাকাতের ব্যবস্থাপনা ও আদায়ের কি পদ্ধতি ছিল এবং বর্তমানে কি পদ্ধতি আছে?
(৩৮) যাকাত আদায় ও ব্যয় করার ব্যবস্থা কি একমাত্র রাষ্ট্রের কর্তৃত্বাধীন থাকবে? অথবা এজন্যে কোনো কমিটি নিযুক্ত করে সরকার ও জনগণের যুক্ত পরিচালনাধীনে তা সক্রিয় থাকবে?
(৩৯) যাকাত সংগ্রহ করার জন্যে যেসব কর্মচারী নিযুক্ত করা হবে, তাদের বেতন, এলাইন্স, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও চাকরির শর্তাবলী কি হওয়া উচিত?
জবাব [প্রত্যেকটি জবাব পাঠ করার সময় সংশ্লিষ্ট প্রশ্নটিকে সম্মুখ রাখবেন]
(১) যাকাতের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও বৃদ্ধি। এই গুণ দুটির পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী পরিভাষায় যাকাত এমন একটি ইবাদতকে বলা হয় যা প্রত্যেক ‘সাহেবে নিসাব’ মুসলমানের উপর এই উদ্দেশ্য ফরয করা হয়েছে যে, আল্লাহ ও বান্দার হক আদায় করে তার অর্থসম্পদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে এবং তার নিজের অন্ত:করণ ও তার সমাজ কার্পন্য, স্বার্থান্ধতা, হিংসা ,বিদ্বেষ প্রভৃতি অসৎ প্রবণতা থেকে মুক্ত হবে; অন্যদিকে তার মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা, ঔদার্য্য, কল্যাণ কামনা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাহনুভূতির গুণাবলী বৃদ্ধিলাভ করবে।
ফকীহগণ যাকাতের বিভিন্ন সংজ্ঞা পেশ করেছেন :
(আরবী******************)
অর্থাৎ ‘অর্থসম্পদের মধ্য থেকে এ অধিকারটি দান করা ওয়াজিব (আল মুগান্না লি ইবনে কুদামা, ২য় খন্ড, পৃ: ৪৩৩)
(আরবী*************)
“নিসাব থেকে একটি অংশ কোনো অভাবী ও তার সমপর্যায়ের ব্যক্তিকে দান করা। যেসব করণে শরীয়ত কাউকে যাকাত দিতে অস্বীকার করে সেসব কারণ যেন তার মধ্যে বিদ্যমান না থাকে।” (নাইলুল আওতার: ৪র্থ খন্ড, পৃ: ৯৮)
(আরবী***********)
“একটি বিশেষ অর্থসম্পদকে বিশেষ শর্তানুযায়ী তার মালিককে দান করা।” (আল-ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবাআ: ১ম খন্ড, ৫৯০ পৃ:)
(২) বুদ্ধিমান ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমার নারী-পুরুষ যদি সাহেবে নিসাব হয়, তাহলে তাদের উপর যাকাত দান করা ওয়াজিব এবং এর আদায়ের ব্যাপারে তারা নিজেরাই দায়িত্বশীল।
অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে মতবিরোধ আছে। একটি মত হচ্ছে এই যে, এতীমের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে এতীম বালেগ হবার পর যখন তার অভিভাবক তার সমুদয় অর্থসম্পদ তাকে সোপর্দ করবে, তখন তাকে যাকাতের বিষয়েও বিস্তারিতভাবে জানাবে, অতপর যে কয় বছর সে এতীম অবস্থায় ছিল সে কয় বছরের যাকাত পুরোপুরি আদায় করার দয়িত্ব হবে তার নিজের। তৃতীয় মতটি হচ্ছে, এতীমের অর্থ সম্পদ যদি কোনো ব্যবসায়ে খাটানো হয় এবং তার থেকে লাভ আসতে থাকে, তাহলে অভিভাবক তার যাকাত আদায় করতে পারে, অন্যথায় করতে পারে না। চতুর্থ মত হচ্ছে, এতীমের অর্থসম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব এবং তা আদায় করার দায়িত্ব হচ্ছে তার অভিভাবকের। আমাদের মতে এই চতুর্থ মতটিই অধিক নির্ভূল। হদীসে উক্ত হয়েছে :
(আরবী***********)
“সাবধান! যে ব্যক্তি এমন কোনো এতীমের অভিভাবক, যে অর্থসম্পদের অধিকারী, তার উচিত তার অর্থসম্পদ কোনো ব্যবসায় খাটানো এবং সেগুলি এমনভাবে ফেলে রাখা উচিত নয় যার ফলে তা সম্পূর্ণরূপে যাকাতের উদরে প্রবেশ করে।” (তিরমিযী, দারা কুতনী, বায়হাকী, কিতাবুল আমওয়াল লি আবি উবায়েদ)
ইমাম শাফেঈ এরই সমার্থক মুরসাল [যে হাদীসের সনদ সর্বশেষ ব্যক্তি অর্থাৎ সাহাবীর নাম বাদ পরেছে এবং তাবেঈ নিজেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর নাম করে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাকে মূরসাল হদীস বলা হয়। -(অনুবাদক)] হাদীস এবং তাবারানী ও আবু উবায়েদ একটি মারুফু [যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত পৌছেছে অর্থাৎ যা নি:সন্দেহে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস বলে সাব্যস্থ হয়েছে, তাকে মারফু হাদীস বলা হয়।– (অনুবাদক)] হাদীস উধৃত করেছেন। সাহাবী ও তাবেঈগণের বিভিন্ন কথা ও কর্ম এ কথাটিরই সমর্থক। হযরত উমর (রা), হযরত আলী (রা), হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) এবং মুজাহিদ, আতা, হাসান, ইবনে ইয়াযীদ, মালিক ইবনে আনাস ও যুহরী প্রমুখ তাবেঈগণের নিকট থেকে একথা উধৃত হয়েছে।
বুদ্ধিভ্রষ্ট লোকদের ব্যাপারে উপরোল্লিখিত চার ধরণের মতবিরোধ আছে। এক্ষেত্রেও আমাদের নিকট নির্ভুল ও গ্রহনযোগ্য মত হচ্ছে এই যে, পাগলের অর্থসম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব এবং তা আদায় করার দায়িত্ব তার অভিভাবকের উপর বর্তায়। ইবনে মালিক ও ইবনে শিহাব যুহরী এই মতকে ব্যাখ্যা করেছেন।
কয়েদীর উপরেও যাকাত ওয়াজিব। যে ব্যক্তি তার অবর্তমানে তার ব্যবসা বা অর্থসম্পদের অভিভাবক হবে, সে তার পক্ষে থেকে অন্যান্য অপরিহার্য কার্য সম্পাদন করার ন্যায় যাকাতটিও আদায় করবে। ইবনে কুদামা এ সম্পর্কে তাঁর কিতাব ‘আল মুগান্নায়’ লিখেছেন :
“অর্থসম্পদের অধিকারী যদি কারারুদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তার উপর থেকে যাকাত রহিত হবে না। কারাবাস ও তার অর্থসম্পদের মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করলে বা না করলেও এ ব্যাপারে কোনো পার্থক্য সুচিত হবে না, কারন আইনত সে নিজের অর্থসম্পদ ব্যবহারের অধিকারী। আর বেচা-কেনা, দান, ইখতিয়ারনামা সবকিছুই আইনত বৈধ।”(২য় খন্ড, পৃ: ৪২৬)
মুসাফিরের উপরও যাকাত ওয়াজিব। এতে সন্দেহ নেই যে, মুসাফির হিসেবে সে নিজেও যাকাত গ্রহণের অধিকারী। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, ‘সাহেবে নিসাব’ (যে পরিমাণ অর্থ থাকলে যাকাত ওয়াজিব হয়, সে পরিমাণ অর্থের অধিকারী) হওয়া সত্ত্বেও তার উপর থেকে যাকাত রহিত হবে। সফর তাকে যাকাত গ্রহনের হকদান করে এবং বিত্তশালিতা তার উপর যাকাত ফরয করে।
এদেশের মুসলমান অধিবাসী যদি বিদেশে অবস্থান করে এবং দেশে তার সম্পত্তি বা ব্যবসায়ে নিয়োজিত অর্থ নিসাব পরিমাণ মওজুদ থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। কোনো মুসলমান দেশের মুসলমান অধিবাসী যদি এদেশে অবস্থান করে এবং এখানে তার নিকট নিসাব পরিমান অর্থসম্পদ থাকে, তাহলে তার নিকট থেকেও যাকাত আদায় করা হবে। কিন্তু যদি কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রের মুসলমান এদেশে অবস্থান করে, তাহলে তাকে যাকাত দিতে বাধ্য করা যেতে পারে না। তবে সে স্বেচ্ছায় দিতে চাইলে দিতে পারে। কারণ তার আইনগত মর্যাদা রাষ্ট্রের অমুসলিম প্রজাদের থেকে ভিন্নতর নয়।
(আরবী****************)
(৩) যাকাত আদায়ের অপরিহার্যতার জন্যে বয়সের কোনো শর্ত নেই। কোনো এতীম প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তার তরফ থেকে তার অভিভাবককে যাকাত আদায় করতে হবে। আর প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর যখন সে নিজেই নিজের অর্থসম্পদ ব্যবহারের যোগ্য হবে, তখন নিজের যাকাত আদায় করার দায়িত্ব তার নিজের উপর বর্তাবে।
(৪) অলংকারাদির যাকাতের ব্যাপারে একাধিক মত আছে। একটি মত হচ্ছে এই যে, অলংকারাদির উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। অলংকারাদি অন্যকে ধার দেয়াই তার যাকাতের সমপর্যায়ভুক্ত। এটি হচ্ছে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব, কাতাদা ও শা‘বীর উক্তি। দ্বিতীয় মত হচ্ছে এই যে, সারা জীবনে একবার যাকাত দেয়াই অলংকারাদির জন্য যথেষ্ট। তৃতীয় মত হচ্ছে, যে অলংকারাদি মেয়েরা হামেশা পরিধান করে থাকে, তার উপর যাকাত নেই। কিন্তু যে গুলি অধিকাংশ সময় উঠিয়ে রাখা হয় সেগুলির উপর যাকাত ওয়াজিব। চতুর্থ মত হচ্ছে এই যে, সব রকমের অলংকারাদির উপর যাকাত ওয়াজিব। আমরা এই শেষোক্ত মতটিকেই নির্ভুল মনে করি। প্রথমত, যেসব হাদীসে অলংকারাদির উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলির শব্দ ব্যাপক। যেমন: রূপর মধ্যে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত এবং পাঁচ উকিয়া থেকে কম হলে তার উপর যাকাত নেই।“
আবার বিভিন্ন হাদীস ও সাহাবাগণের কথা ও কর্মে একথা পরিস্ফুট হয়েছে যে, অলংকারাদির উপর যাকাত ওয়াজিব। আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী শক্তিশালী সনদের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহর (সা) খেদমতে হাযির হলেন। তার সাথে তার এক মেয়ে ছিল। মেয়েটির হাতে সোনার কংকন ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে জিজ্ঞার করলেন: তুমি এর যাকাত দিয়ে থাকো? মহিলা নেতিবাচক জবাব দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন :
“কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে এর বদলে আগুনের কংকন পরিধান করাবেন, এটাই কি তুমি পছন্দ করো?“
উপরক্তু মায়াত্তা, আবু দাউদ ও দারা কুতনীতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর এ উক্তি উধৃত হয়েছে যে, যে অলংকারের যাকাত তুমি আদায় করে দিয়েছ, তা আর খনিজ দ্রব্যের অন্তর্ভুক্তি থাকেনি। ইবনে হাজাম মুহাল্লায় বর্ণনা করেছেন, হযরত উমর (রা) তাঁর গবর্নর হযরত আবু মুসা আশয়ারীকে (রা) যে ফরমান পাঠান তাতে নির্দেশ দেন : মুসলমান মহিলাদের তাদের অলংকারাদির যাকাত সম্পর্কে ফৎওয়া জিজ্ঞাস করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, তা দুশো দিরহাম পর্যায়ে পৌছে গেলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে যায়।‘ এই বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যশীল উক্ত করেছেন হযরত ইবনে আব্বাস (রা), আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) ও হযরত আয়েশা (রা) প্রমুখ সাহাবাগণ, সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, আতা, মুজাহিদ, ইবনে সিরিন ও যুহরী প্রমুখ তাবেঈগণ এবং সুফিয়ান সাওরী, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ প্রমুখ ফিকাহ শাস্ত্রের ইমামগণ।
(৫) কোম্পানী সম্পর্কে আমাদের মত হচ্ছে এই যে, যে অংশীদারের অংশ নিসাবের চেয়ে কম অথবা যে ব্যক্তি এক বছরের কম সময়ের জন্যে অংশের মালিক ছিল, তাদেরকে বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সকল অংশীদারের যাকাত একসংগে কোম্পানী থেকে আদায় করা উচিত। এর ফলে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বিষয়টি সহজ হয় এবং এ পদ্ধতির মধ্যে এমন কোনো বিষয় নেই, যা শরীয়তের নীতিগুলোর মধ্য থেকে কোনটির পরিপন্থী হতে পারে। আমাদের এমত ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ এবং অন্যান্য একাধিক ফকীহগণের মতের অনসারী। (বেদায়াতুল মুজতাহিদ, ১ম খন্ড, পৃ: ২২৫)
(৬) কারখানার যন্ত্রপাতির উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। কেবল বছরের শেষভাগে যে কাঁচামাল বা শিল্পদ্রব্য কারখানায় থাকবে, তার দাম ও নগদ অর্থের যাকাত ওয়াজিব হবে। অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীদের আসবাবপত্র, স্টেশনারী দোকান বা গৃহ এবং এই ধরণের অন্যান্য বস্তুর যাকাত ওয়াজিব হবে না। কেবল বছরের শেষে তাদের দোকানে যে মালপত্র থাকবে, তার দাম ও তাদের তহবিল সঞ্চিত নগদ অর্থের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। [যেসব ব্যবসা এ ধরনের নয় এবং তাদের যাকাতের হিসাব যদি এভাবে না লাগানো যায় (যেমন সংবাদপত্র ব্যবসা)। তাহলে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী বার্ষিক আয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ সব ব্যবসায়ে নিয়োজিত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে এবং তার উপর যাকাত দিতে হবে] এ ব্যাপারে মূলনীতি হচ্ছে এই যে, কোনো ব্যবসায়ে যেসব বস্তু ও যন্ত্রাপাতিকে উত্পাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়, সেগুলির উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।
হাদীসে বলা হয়েছে- “ওয়া লাইসা ফিল ইবিলিল আওয়ামিলে সাদাকাহ“ অর্থাৎ ‘যেসব উটের দ্বারা পানি সেচার কাজ করা হয়, সেগুলির উপর যাকাত নেই’- (কিতাবুল আমওয়াল)। কারণ তাদের কার্যক্রমের ফলে জমিতে যে ফসল উত্পন্ন হয়, তা থেকেই তার যাকাত আদায় করে নেয়া হয়। এর উপর ‘কিয়াস‘ করে ফকীহগন অন্যান্য যাবতীয় উত্পাদনযন্ত্রেকে যাকাতমুক্ত গন্য করেছেন।
(৭) কোম্পানী যেসব বিক্রয়যোগ্য অংশ বছরের মধ্যভাগ বিক্রীত হয়, তার ক্রেতা বা বিক্রেতা করোর উপর ঐ বছর যাকাত ওয়াজিব হবে না। কারণ তাদের দু‘জনের করোর মালিকানার পুরো এক বছর অতিবহিত হয়নি।
(৮) শরীয়তে নিম্নলিখিত বস্তুগুলির যাকাত ওয়াজিব। ফসল কাটার পর ফসলের উপর, বছরের প্রথমে ও শেষে নিসাব পরিমাণ বা তার চেয়ে অধিক পরিমাণে মওজুদ সোনা ও রূপার উপর, সোনা ও রূপার স্থলাভিষিক্ত নগদ টাকার উপর, বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পালিত বছরের প্রথমে ও শেষে নিসাব পরিমাণ বর্তমান গবাদি পশুর উপর, বছরের প্রথেমে ও শেষে নিসাব পরিমাণ মওজুদ ব্যবসায়িক পন্যের উপর, খনিজদ্রব্য ও গুপ্তধনের উপর।
(ক) নগদ টাকা,সোনা, রূপা ও অলংকারাদির উপর যাকাত ওয়াজিব। অলংকারের যাকাতের ক্ষেত্রে কেবল তার মধ্যে মওজুদ সোনা ও রূপার ওজন নির্ভরযোগ্য হবে। মণি-মুক্তা বা মূল্যবান পাথর অলংকারের গায়ে বসানো থাক বা পৃথক থাক তার উপর কোনো যাকাত নেই। তবে যদি কেউ মূল্যবান পাথরের ব্যবসা করে, তাহলে অন্যান্য পণ্যদ্রব্যের ন্যায় তার উপরও অর্থাৎ তার মূল্যের উপর শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত ওয়াজিব হবে। ‘আল ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবাআয়‘ লিখিত হয়েছে : “ব্যবসায়ে খাটানো না হলে মোতি, ইয়াকুত ও অন্যান্য মূল্যবান পাথরের উপর যাকাত নেই। এ ব্যাপারে সকল মযহাব একমত।“ (১ম খন্ড, পৃ: ৫৯৫)
(খ) ধাতব মুদ্রা ও কাগজের মুদ্রার উপর যাকাত ওয়াজিব। কারণ এসবের মূল্য সৃষ্টিতে ধাতু বা কাগজের কোনো ভুমিকা নেই বরং আইনের সাহায্যে তাদের মধ্যে যে ক্রয়মূল্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার কারণেই তাদের দাম এবং এজন্য তারা সোনা ও রূপার স্থালাভিষিক্ত এবং তাদেরকে নি:সংকোচে সোনা ও রূপার দ্বারা বদল করা যেতে পারে। এ জন্যে ইমাম আবু হানীফা (র), মালিক (র) ও শাফেঈ (র) প্রমুখ তিনজন শ্রেষ্ঠ ইমামের মযহাব হচ্ছে এই যে, এগুলির উপর যাকাত ওয়াজিব। (১ম খন্ড, পৃ: ৬০৫)
(গ) ব্যাংকে যেসব আমানত রক্ষিত আছে, সেগুলির উপর যাকাত ওয়াজিব। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি রেজিস্টার্ড হয়ে থাকে এবং সরকার তাদের হিসাব পত্র যাচাই করতে পারে, তাহলে সেখানে রক্ষিত আমানতও ব্যাংকের সমপর্যায়ভুক্ত হবে। আর যদি সেগুলি রেজিস্টার্ড না হয়ে থাকে এবং তাদের হিসাব পত্র যাচাই করাও সরকারের পক্ষে সম্ভব না হয়, তাহলে সেখানে রক্ষিত আমানত গুপ্ত ধনের পর্যায়ভুক্ত হবে অর্থাৎ সেগুলির যাকাত আদায় করার দায়িত্ব সরকারের উপর বর্তায় না। তাদের মালিকরা নিজেরাই সেগুলির যাকাত আদায় করবে।
ঋণ যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গৃহীত হয়ে থাকে এবং তা খরচও হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তার উপর যাতাক নেই। আর যদি ঋণগহীতা পুরো একবছর ঋণ নিয়ে রাখে এবং নিসাব পরিমাণ হয়ে থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। আর ব্যবসায়ে খাটানো হলে তা ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়ী পুঁজি রূপে গণ্য হবে এবং ব্যবসা সংক্রান্ত যাকাত আদায় করার সময় তার এই ঋণকে বাদ দেয়া হবে না।
প্রদত্ত ঋণ যদি সহজে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। কোনো কোনো ফকীহর মতে বছরে বছরে এদের যাকাত আদায় করতে হবে। এটি হচ্ছে হযরত উসমান (রা), ইবনে উমর (রা) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা), তাউস, ইবরাহীম নাখয়ী ও হাসান বসরীর মত। আবার অনেকের মতে ঐঋণ আদায় হবার পর বিগত সব বছরের যাকাত একসাথে আদায় করতে হবে। এটি হচ্ছে হযরত আলী (রা), আবু সওর, সুফিয়ান সাওরী ও হানাফী ইমামগণের মত। আর যদি এ ঋণ ফেরত পাওয়া সন্দেহযুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে ঐ অর্থ যখন ফেরত পাওয়া যাবে কেবল তখনই তার মাত্র এক বছরের যাকাত আদায় করতে হবে, এ মতটিই আমাদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য। এটি হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয, হাসান, লাইস, আওযাঈ ও ইমাম মালিকের মত। এতে ধনের মালিক ও বায়তুলমাল উভয়ের সাথে ইনসাফ করা হয়।
বন্ধকী সম্পত্তি যার আয়ত্তাধীন থাকবে তার নিকট থেকে এর যাকাত আদায় করা হবে। যেমন বন্ধকী যমীন যদি মহাজনের আয়ত্তাধীন থাকে, তাহলে মহাজনের নিকট থেকেই তার উশর আদায় করা হবে।
বিবাদকালে বিবাদমূলক সম্পত্তি যে ব্যক্তির আয়াত্তাধীনে থাকে, তার নিকট থেকে তার যাকাত আদায় করা হবে। আর মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পর যে ব্যক্তির সপক্ষে মীমাংসা হবে যাকাত দানের দায়িত্ব তার উপর বর্তাবে। নালিশকৃত সম্পত্তির যাকাতের ব্যাপারটিও একই রূপ। এ সম্পত্তি কার্যত যতদিন যার আয়ত্তাধীন থাকে, ততদিন তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। কারণ বে ব্যক্তি যে বস্তু থেকে ফায়দা হাসিল করবে তার যাবতীয় দায় তাকেই পরিশোধ করতে হবে।
(ঘ) উপহার, উপঢৌকন ও পরস্কার যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে বছর অতিক্রম হবার পর, যে ব্যক্তিকে তা দান করা হয়েছিল তার কাছ থেকে যাকাত আদায় করা হবে।
(ঙ) বীমা ও প্রাভিডেন্ট ফন্ড যদি বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে তা যখন ফেরত পাওয়া যাবে কেবল তখন এর উপর মাত্র এক বছরের যাকাত আদায় করতে হবে। আর যদি তা স্বেচ্ছাধীন হয়, তাহলে, আমাদের মতে, প্রতি বছরের শেষে কোনো ব্যক্তির নামে বীমা কোম্পানীতে প্রভিডেন্ট ফান্ডে যে টাকা জমা হয়, তার যাকাত আদায় করতে হবে। কারণ যদিও সে এ টাকা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে লাভ করতে সক্ষম নয়, তবুও যেহেতু সে নিজের অর্থকে স্বেচ্ছায় এ অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, তাই তার যাকাত থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
(চ) দুগ্ধ উত্পাদন কেন্দ্রের (ডায়েরী ফার্ম) পশু পণ্য-উত্পাদকের পর্যায়ভুক্ত। তাই এগুলির উপর যাকাত নেই। তাবে ডেয়ারী ফার্মের উত্পন্ন দ্রব্যের উপর, অন্যান্য কারখানার উত্পন্ন দ্রব্যের ন্যায় যাকাত নির্ধারিত হবে।
কৃষি দ্রব্যের মধ্যে যেগুলি গুদামজাত করার যোগ্য, সেগুলির উপর উশর অথবা উশরের অর্ধাংশ ওয়াজিব। শুকনা ফল, খোরমা প্রভৃতি যেসব ফল গুদামজাত করা যায়, সেগুলির উপরও অনুরূপ যাকাত ওয়াজিব। যেসব জমিতে বৃষ্টির পানিতে ফসল উত্পন্ন হয়, সেগুলির উপর উশর ওয়াজিব এবং যেসব জমিতে কৃত্রিম উপায়ে পানি সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয় সেগুলির ফসলের উপর উশরের অর্ধাংশ ওয়াজিব।
শাক-সবজি, তরিতরকারী, ফুল, ফল প্রভৃতি যেগুলি গুদামজাত করা যায় না, সেগুলির উপর অবশ্যি উশর ওয়াজিব নয়, কিন্তু কৃষিক যদি সেগুলি বাজারে বিক্রয় করে, তাহলে নিসাব পরিমাণ পৌছালে তার উপর ব্যবসায়িক যাকাত ওয়াজিব হবে। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ে যে নিসাব সেই নিসাবই নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ ঐ ব্যবসায়ে নিয়োগকৃত বছরের শুরুতে ও শেষে দুশো দিরহাম বা তার চেয়ে অধিক হতে হবে।
(ছ) খনিজ দ্রব্যের ব্যাপারে আমাদের মতে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতই সর্বোত্তম। অর্থাৎ ধাতব, তরল (যেমন পেট্রোল, পারদ প্রভৃতি) বা ধন (যেমন গন্ধক, কয়লা প্রভৃতি) যে কোনো প্রকারের বস্তু জমি থেকে বের হয় তার মূল্য যদি নিসাব পরিমাণে পৌছে এবং তা যদি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হয়, তাহলে তার উপর শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত ওয়াজিব। হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের (র) শাসনামলে এ মতই কার্যকর ছিল (আল মুগান্না লি ইবনে কুদামা, ২য় খন্ড পৃ: ৫৮১)
(জ) লব্ধ গুপ্তধনের ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে : ওয়া ফির রিকাযিল খুমস অর্ধাৎ গুপ্তধন থেকে এক-পঞ্চমাংশ (শতকরা ২০ ভাগ) যাকাত আদায় করতে হবে।
(ঝ) প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ নিজের ঘরে যেসব মূল্যবান বস্তু রেখে যায় সেগুলির উপর যাকাত ওয়াজব নয় তবে যদি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে সেগুলি রাখা হয়, তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।
(ঞ) মধুর একটি পরিমাণ যাকাত হিসেবে গৃহীত হবে অথবা অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্যের উপর যেমন যাকাত নির্ধারিত হয় মধু ব্যবসায়ের উপরও তেমনি যাকাত নির্ধারিত হবে। তবে এ ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে। হানফীদের মতে, মধুর পরিমাণ যাকাত হিসেবে গৃহীতি হবে। ইমাম আহমদ, ইসহাক ইবনে রাহওয়ায়হ, উমর ইবনে আবদুল আযীয, ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাস এই মতের প্রবক্তা। ইমাম শাফেঈর একটি বাণীও এই মতের সমর্থনে পাওয়া যায়। বিপরীতপক্ষে ইমাম মালিক ও সুফিয়ান সাওরী বলেন, ‘মধুর পরিমাণের উপর যাকাত নেই। এটিই ইমাম শাফেঈর মশহুর মত বলে পরিচিত। ইমাম বুখারী বলেন : “মধুর যাকাতের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস নেই।”আমাদের মতে মধুর ব্যবসায়ের উপর যাকাত নির্ধারণ করাই উত্তম।
(ট) মাছের পরিমাণের উপর যাকাত নেই, বরং অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্যে ন্যায় মাছের ব্যবসায়ের উপর যাকাত ওয়াজিব।
মণি-মুক্তা এবং অন্যান্য যেসব বস্তু সমুদ্র থেকে উত্তোলিত হয়, আমাদের মতে সেগুলির ব্যাপারে খনিজ দ্রব্যের পথ অনুসৃত হওয়া উচিত। এটি ইমাম মালিকের মত এবং হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের শাসনামলে এটিকেই কার্যকর করা হয়েছে। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃ: ৩৪৯, কিতাবুল মুগান্না লি ইবনে কুদামা, ২য় খন্ড পৃ: ৫৮৪)
(ঠ) পেট্রোলের ব্যাপারে খনিজদ্রব্য প্রসংগে যা বর্ণিত হয়েছে তাই প্রযোজ্য।
(ড) রফতানীর উপর কোনো যাকাত নেই। আমদানীর উপর হযরত উমরের (রা) আমলে যে কর আদায় করা হতো, তা যাকাতের পর্যায়ভুক্ত ছিল না। তা ছিল নিছক প্রতিবেশী দেশসমূহ ইসলামী রাষ্ট্র থেকে আমদানীকৃত দ্রব্যের উপর নিজেদের দেশে যে কর আদায় করতো কেবল তার বিরুদ্ধে জবাবী ব্যবস্থা।
(৯) খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে রাসূলুল্লাহর (সা) আমলের যাকাতের দ্রব্যসমূহের তালিকায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা হয়নি, বরং সেখানে যাকাতের দ্রব্যাদির তালিকায় এমন কতিপয় বস্তুর নাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল যেগুলিকে রাসলুল্লাহর (সা) নির্ধারিত যাকাতের দ্রব্যাদির উপর ‘কিয়াস’ করা যেতে পারতো। যেমন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয মহিষকে গরুর উপর কিয়াস করেন এবং গরুর উপর রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত যাকাত মহিষের উপরও নির্ধারণ করেন।
(১০) সব রকমের মুদ্রার উপর যাকাত ওয়াজিব। উপরে ৮ম নম্বরের খ দফায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। যেসব মুদ্রার প্রচলন নেই বা যেগুলি নষ্ট হয়ে গেছে অথবা যেগুলি সরকার ফেরত নিয়েছে, সেগুলিতে যদি সোনা রূপা থাকে, তাহলে সেগুলির মধ্যে যে পরিমাণ সোনা রূপা আছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই সেগুলির উপর যাকাত নির্ধারিত হবে।
অন্য দেশের মুদ্রা যদি আমাদের দেশের মুদ্রার সাথে সহজে বদল করা সম্ভব হয়, তাহলে তা নগদ অর্থের পর্যায়ভুক্ত হবে। আর যদি বদল করা সম্ভব না হয়, তাহলে যখন তার মধ্যে নিসাব পরিমাণ সোনা ও রূপা মওজুদ থাকবে কেবল তখনই তার উপর যাকাত নির্ধারণ হবে।
(১১) সরকারী কর্মচারীবৃন্দ যে সম্পদ পর্যবেক্ষণ ও নির্ধারণ করতে পারে, তাকে বলা হয় প্রকাশ্য সম্পদ এবং সরকারী কর্মচারীদের পক্ষে যে সম্পদ পর্যবেক্ষণ ও নির্ধারণ করা সম্ভবপর হয়না, তা হচ্ছে গোপন সম্পদ। ব্যাংক সঞ্চিত অর্থ প্রকাশ্য সম্পদের পর্যায়ভুক্ত।
(১২) যে সম্পদ প্রকৃতিগতভাবে বৃদ্ধি লাভের যোগ্যতা রাখে অথবা প্রচেষ্টা ও কর্মের দ্বারা যাকে বৃদ্ধি করা যেতে পারে, তা বর্ধনশীল সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। এই সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব সম্পদ বর্ধনশীল কেবল সেগুলোর উপর যাকাত নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সঞ্চিত অর্থের মালিক তার বৃদ্ধি রোধ করেছে তাই এর উপর যাকাত নির্ধারিত হয়েছে।
(১৩) যেসব বস্তু ভাড়ায় খাটানো হয়, প্রচলিত নিয়মানুসারে তাদের লাভ থেকে তাদের অর্থ নির্ধারিত করা হবে এবং তাথেকে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত গৃহীত হবে। লাইস ইবনে সাআদ বলেন, “যে সমস্ত উট ভাড়ায় খাটানো হতো আমি মদীনায় তাদের তাদের থেকে যাকাত নিতে দেখেছি।(কিতাবুল আমওয়াল, পৃ: ৩৭৬)
(১৪) গবাদি পশু (উট, মহিষ, ছাগল এবং এগুলির সমপর্যায়ভুক্ত পশু) যদি বংশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পালন করা হয় এবং তাদের সংখ্যা নিসাব পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশী হয়, তাহলে শরীয়ত গবাদি পশুর জন্যে যে যাকাত নির্ধারণ করেছে, (এর বিস্তারিত বিবরণ জানার জন্যে পড়ুন মাওলানা সাইয়েদ সুলায়মান নদভীর সীরাতুন নবী, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৫৬-১৬৭), তার উপরও সেই একই পরিমাণ যাকাত নির্ধারিত হবে। আর যদি সেগুলি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে সংগৃহীত হয়ে থাকে, তাহলে তার উপর ব্যবসায়ের যাকাত নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ যদি তাদের মূল্য নিসাব পরিমাণ (দুশো দিরহাম) বা তার চেয়ে বেশী হয়, তাহলে তা থেকে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত গৃহীত হবে। আর যদি তাদেরকে কৃষি বা যানবাহনের কাজে লাগানো হয় বা কোনো ব্যক্তি যদি নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্যে তাদেরকে পালন করে, তাহলে তাদের সংখ্যা যত বেশী হোক না কেন, তাদের উপর কোনো যাকাত নেই।
যদি শখ করে মুরগী ও অন্যান্য পশু পালন করা হলে, তাহলে তার উপর যাকাত নেই। আর যদি সেগুলি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়, তাহলে তার উপর ব্যবসায়ের যাকাত নির্ধারিত হবে। আর যদি ডিম বিক্রি করার জন্য মুরগী প্রতিপালন কেন্দ্র (পোল্ট্রি) কায়েম করা হয়, তাহলে তা পূর্বোক্ত ডেয়ারী ফার্ম ও অন্যান্য কারখানার পর্যায়ভুক্ত হবে।
গবাদি পশুর যাকাত বাবদ নগদ টাকা নেয়া যেতে পারে এবং গবাদি পশুও নেয়া যেতে পারে। হযরত আলী (রা) এ ফতওয়া দিয়েছেন। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃ: ৩৬৮)
(১৫) যেসব বস্তুর উপর যাকাত ওয়াজিব সেসবের যাকাতের হার নিম্নরূপ :
কৃষি উত্পাদন : বৃষ্টির পানিতে চাষাবাদ হলে শতকরা ১০ভাগ এবং কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে হলে শতকরা ৫ভাগ।
নগত টাকা ও সোনা রূপা : শতকরা আড়াই ভাগ।
ব্যবসায়িক পণ্য : শতকরা আড়াই ভাগ।
গবাদিপশু : উপরের বর্ণনা অনুযায়ী সীরাতুন নবীর ৫ম খন্ডের নকশা দেখে নিন।
খনিজ দ্রব্য : শতকরা আড়াই ভাগ।
গুপ্তধন : শতকরা ২০ ভাগ।
কারখানার দ্রবাদি : শতকরা আড়াই ভাগ।
(১৬) খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত নিসাব ও যাকাতের হারের মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন সাধন করা হয়নি। বর্তমানেও এর কোনো প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। আমাদের মতে রাসূলুল্লাহর (সা) পর তাঁর নির্ধারিত হার পরিবর্তন করার অধিকার কারোর নেই।
(১৭) নগদ অর্থ, রূপা, ব্যবসায়িক পন্য, খনিজদ্রব্য, গুপ্ত ধন ও কারখানার দ্রব্যাদির নিসাব হচ্ছে দুশো দিরহাম। মাওলানা আবদুল হাই ফিরিংগী মহলের অনুসন্ধান মতে দুশো দিরহামের রূপা আমাদের দেশের প্রচলিত ওজনের হিসাব অনুযায়ী ৩৬ তোলা ৫ মাশা ৪ রতি হয়। কন্তিু সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা সর্বাদিক প্রসিদ্ধ ওজন।
মাওলানা আবদুল হাই সাহেবের অনুসন্ধান অনুযায়ী ২০ টি স্বর্ণ খচিত মিসকাল ৫ তোলা ২ মাশা ৪ রতি সোনার সমান। তবে সাড়ে ৭ তোলা সোনাই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ওজন।
আবু উবায়েদ লিখিত কিতাবুল আমওয়ালে যে হিসাব দেখানো হয়েছে, সে পরিপ্রেক্ষিতে ১০ দিরহামের ওজন ৭ স্বর্ণখচিত মিসকালের সমান।
(১৮) এর জবাব ১৬ নম্বরে দেয়া হয়েছে। তবে সোনার নিসাব পরিবর্তন সম্ভব। কারণ ২০ মিসকালের কথা যে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তার সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
(১৯) খনিজ দ্রব্য, গুপ্তধন ও কৃষি উত্পাদন ছাড়া বাকী যাবতীয় দ্রব্যের যাকাতের জন্য শর্ত হচ্ছে এই যে, তা নিসাব পরিমাণ বা তার চেয়ে অধিক পরিমান থাকতে হবে এবং তা পূর্ণ একটি বছর থাকতে হবে। খনিজ দ্রব্য ও গুপ্তধনের এক বছর অতিবাহিত হবার শর্ত নেই। অন্যদিকে ফসল কাটার সাথে সাথেই কৃষি উত্পাদনের উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে যায়। বছরে দুবার বা তার চেয়ে অধিকবার ফসল হলেও প্রতিবারেই ফসল কাটর পর যাকাত দিতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে : আতু হাক্কাহু ইয়াওমা হিসাদিহ।
(২০) এর জবাব ১৯ নম্বরে দেয়া হয়েছে।
(২১) যেহেতু আজকাল যাবতীয় ব্যাপারে এবং হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সৌর বছর ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই যাকাতের ব্যাপারেও সৌর বছর ব্যবহারে ক্ষতি নাই। চন্দ্র বছরের হিসাবে যাকাত দান করা ওয়াজিব হবার বিষয়টি কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত নয়। যাকাত আদায় করার জন্যে কোনো বিশেষ মাস নির্ধারণ করা হয়নি। সরকার যে তারিখ থেকে যাকাত আদায় করার ব্যবস্থা করবে, সে তারিখ থেকেই বর্ষ শুরু করা যেতে পারে।
(২২) ও (২৩) কুরআন মজীদে যাকাতের ৮টি ব্যয়ক্ষেত্র বর্ণনা করা হয়েছে যথা: গরীব, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারীবৃন্দ, দুর্বলচিত্ত ব্যক্তি, গোলাম মুক্তি, ঋণ গ্রস্ত, আল্লাহর পথে জিহাদ কারী ও মুসাফির।
গরীব অর্থ হচ্ছে, নিজের জীবন ধারণের জন্যে যে ব্যক্তি অন্যের মুখাপেক্ষী হয়। এ শব্দটি সকল প্রকার অভাবীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। বার্ধক্য বা অংগ-প্রত্যংগের কোনো প্রকার ত্রুটির কারনে যারা স্থায়ীভাবে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয় অথবা কোনো সাময়িক কারণে আপাতত সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয় এবং কিছুটা সাহায্য লাভ করে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে এমন প্রত্যেকটি লোক এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন এতীম ছেলেমেয়ে, বিধবা মহিলা, বেকার ও উপার্জনক্ষম এবং কোনো সাময়িক দর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিবর্গ।
মিসকীন শব্দের ব্যাখ্যা হাদীসে এভাবে দান করা হয়েছে : “যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন পরিমাণ সামগ্রী লাভ করে না, মানষ তাক সাহায্য করে বলে বুঝা যায় না এবং মানুষের সামনে হাতও পাতে না।“ এ প্রেক্ষিতে মিসকীন এমন এক ভদ্র ও শরীফ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে নিজের রোযী-রোযগারের জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করে কিন্তু নিজের প্রয়োজন পরিমাণ রোযী আহরণে সক্ষম হয় না। তাকে উপার্জনরত দেখে লোকেরা তাকে সাহায্য করে না। অন্যদিকে নিজের শরাফতের কারণে সে কারও কাছে হাতও পাততে পারে না।
যাকাত আদায়কারী কর্মচারী বলতে তাদেরকে বুঝায়, যারা যাকাত উসূল, বন্টন ও তার হিসাব-নিকাশে নিযুক্ত থাকে। তারা নিসাবের মালিক হোক বা না হোক সর্বাবস্থায়ই তারা যাকাতের অর্থ থেকে পারিশ্রমিক লাভ করবে।
দুর্বলচিত্ত ব্যক্তি হচ্ছে তারা, যাদেরকে ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধিতা থেকে বিরত রাখা অথবা এই স্বার্থে খেদমতে নিয়োজিত করাই উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্য অর্থ দিয়ে তাদের মনতুষ্টি করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এরা কাফিরও হতে পারে আবার এমন মুসলমানও হতে পারে যাদের ইসলাম তাদেরকে ইসলামী স্বার্থের খেদমতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে যথেষ্ট হয়না। উপরন্তু এরা ইসলামী রাষ্টের বাসিন্দাও হতে পারে, আবার অন্য কোনো দেশের বাসিন্দাও হতে পারে। এ ধরনের লোকেরা নিসাবের মালিক হলেও ইসলামী রাষ্ট্র প্রয়োজন বোধ করলে তাদেরকে যাকাত দিতে পারে। আমরা এ ব্যাপারে এক মত নই যে, দুর্বচিত্ত (মুয়াল্লিফাতুল কুলুব) ব্যক্তিদের অংশ চিরতরে মুলতবী হয়ে গেছে। হযরত উমর (রা) এ ব্যাপারে যে মত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা কেবল তাঁর নিজের যামানার জন্যে ছিল, পরবর্তী সকল যামানার জন্যে তিনি এ প্রতিষ্ঠা করেননি।
গোলাম মুক্তির অর্থ এই যে, গোলামকে মুক্ত করার জন্যে যাকাত দেয়া। যদি কোনো যুগে গোলাম না থাকে, তাহলে তখন এ খাতটি মুলতবী থাকবে।
ঋণগ্রস্ত বলতে এমনসব ঋণীদের বুঝানো হয়েছে, যারা নিজেদের সম্পুর্ণ ঋণ আদায় করে দেবার পর তাদের নিকট নিসাব পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। তারা উপার্জনকারীও হতে পারে আবার বেরোযগারও হতে পারে।
আল্লাহর পথে জিহাদ অর্থ হচ্ছে তরবারী, কলম, কথা বা হাত-পা এর সাহায্যে আল্লাহর পথে শ্রম ও প্রচেষ্টা চালানো। পূর্ববর্তী আলেমগনের একজনও একে জনসেবার অর্থে ব্যবহার করেননি। তারা সবাই এর অর্থকে আল্লাহর দীন কায়েম করা, তার প্রচার প্রসার ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্যে প্রচেষ্টা চালানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
মুসাফির তার স্বদেশে ধনীও হতে পারে, কিন্তু সফর অবস্থায় যদি সে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়, তাহলে যাকাতের মাধ্যমে সাহায্য করা যেতে পারে।
(২৪) যাকাতের টাকা কুরআন নির্ধারিত প্রত্যেকটি ব্যয়ক্ষেত্রে একই সঙ্গে ব্যয় করা অপরিহর্য নয়। সরকার প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যে যে ব্যয়ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সংগত মনে করে ব্যয় করতে পারে। এমন কি প্রয়োজন দেখা দিলে একই ব্যয়ক্ষেত্রে সব অর্থও ব্যয় করা যেতে পারে।
(২৫) যাকাতের হকদারদের মধ্য থেকে গরীব ও মিসকীনরা যদি নিসাবের মালিক না হয়, তাহলে তারা যাকাত নিতে পারে। যাকাত বিভাগ কর্মরত কর্মচারী ও মুয়াল্লিফতুল কুলুবগণকে নিসাবের মালিক হওয়া সত্ত্বেও যাকাত দেয়া যেতে পারে। গোলাম নিছক গোলাম হওয়ার করণেই তার মুক্তির জন্যে যাকাতের টাকা ব্যয় করা যেতে পারে। ঋণগ্রস্ত যদি তার ঋণ আদায় করার পর নিসাবের মালিক না থাক, তাহলে যাকাত নিতে পারে। আল্লাহর পথে জিহাদকারীরা যদি নিসাবের মালিক হয়, তাহলেও সফর অবস্থায় এ খাত থেকে অর্থ সাহায্য করা যেতে পারে। মুসাফির সফর অবস্থায় সাহায্যের মুখাপেক্ষী হলেও কেবল যাকাত গ্রহণ করতে পারে।
বনি হাশিমেদের জন্যে যাকাত গ্রহণ করা হারাম। কিন্তু বর্তমানে এদেশে কে বনি হাশিম আর কে বনি হাশিম নয় এ পার্থক্য করা বেশ কঠিন ব্যাপার। কাজেই সরকার প্রত্যেক অভাবীকেই যাকাত দেবে। কিন্তু গ্রহীতা নিজে বনি হাশিম হওয়া সম্পর্কে যদি নিশ্চিত হয়, তাহলে যাকাত গ্রহণ না করা হবে তার নিজের কর্তব্য।
(২৬) রাষ্ট্রের ধনাগারে যাকাত সংগৃহীত হবার পর রাষ্ট্র তা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দান করতে পারে এবং রাষ্ট্র নিজেও সেই অর্থে যাকাতের ব্যয়ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও কায়েম করতে পারে।
(২৭) যারা স্থায়ী বা সাময়িকভাবে যাকাতের মুখাপেক্ষী তাদেরকে স্থায়ী বা সাময়িকভাবে মাসোহারা দেয়া যেতে পারে।
(২৮) আল্লাহর পথে, যাকাত দেবার খাতটি জনসেবা’র সমার্থক গণ্য করার মতো ব্যাপক নয়।
(২৯) যাকাতের অর্থ থেকে ”কার্জ হাসানা” দেয়ার কোনো বাধা নেই। বরং বর্তমান অবস্থায় অভাবীদেরকে কার্জে হাসানা দেয়ার জন্যে বায়তুলমালে একটি খাত নির্দিষ্ট করা আমাদের মতে অতি উত্তম কাজ।
(৩০) সাধারণ অবস্থায় যে এলাকার যাকাত সেই এলাকার অভাবীদের মধ্যে বন্টন করাই বিধেয়। হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের আমলে একবার রায় শহরের যাকাত কুফায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি আবার তাকে রায় শহরে ফেরত পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃ: ৫৯০) তবে অন্য কোনো এলাকায় যদি যাকাতের অত্যাধিক প্রয়োজন থাকে, তাহলে নিজ এলাকায় বন্টন করার পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে অথবা যেখানে প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম, সেখান থেকে যাকাতের অর্থ পূর্বোক্ত স্থানে পাঠানো যেতে পারে। আর তা হবে সহানুভূতি ও তালীফে কুলুবের উদাহরণ। তবে এ ব্যাপারে দেশের অভাবীরা যেন বঞ্চিত না থেকে যায় সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। এলাকার অর্থ হচ্ছে প্রশাসনিক সার্কেল। জেলা, বিভাগ ও প্রদেশ তিনটিই এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দেশের তুলনায় এলাকা বললে প্রদেশ বুঝাবে, প্রদেশের তুলনায় বিভাগ বুঝাবে এবং বিভাগের তুলনায় জেলা বুঝাবে।
(৩১) মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে সর্বপ্রথম তার ঋণ আদায় করা হবে, যা সে অন্যের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলো। অতপর তার যাকাতের যে অংশ বাকি আছে তা আদায় করা হবে। তারপর তার অসীয়ত পূর্ণ করা হবে এবং সর্বশেষ যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে তা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টিত হবে। মালিকের মৃত্যুর কারনে তার সম্পদের যাকাত খতম হয়ে যাবে না। সে অসীয়ত না করে গেলেও তার সম্পদ থেকে তা আদায় করা হবে। আতা, যুহরী, কাতাদা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মুহাম্মদ, ইসহাক ইবনে রাহওয়ায়হ ও আবু সাওর প্রায় এই একই ধরণের মত পোষন করেন। কোনো কোনো ফকিহ মত প্রকাশ করেছেন যে, মৃত ব্যক্তি যদি যাকাত আদায় করার জন্য অসীয়ত করে গিয়ে থাকে, তাহলে তার সম্পদ থেকে তা আদায় করা হবে, অন্যথায় আদায় করা হবে না। কিন্তু আমাদের মতে এটি কেবল গুপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে যথার্থ হতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে হতে পারে মালিক তার যাকাত আদায় করে দিয়েছে, অন্যরা তার খবর রাখে না। কিন্তু প্রকাশ্য সম্পদের যাকাত আদায় করার ব্যবস্থা যখন সরকার নিজেই করছে, তখন আর কোন সম্ভাবনা নেই। তাই যাকাতের অর্থ ঐ ব্যক্তির যিম্মায় ঋণরূপে গণ্য হবে। প্রথমে তার সম্পদ থেকে ব্যক্তির ঋণ আদায় করা হবে, অতপর আল্লাহ ও জামায়াতের ঋণ।
(৩২) যাকাত থেকে নিস্কৃতি লাভের জন্যে বাহানাবাজি করার পথ রোধ করার জন্যে তিনটি উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। এক. রাষ্ট্র পরিচালনার ভার এমন লোকদের হাতে ন্যস্ত করতে হবে যারা হবে ইমানদার, যারা উত্কচ গ্রহণ করবে না, যারা যাকাত আদায় ও বন্টনের ব্যাপারে পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেবে না এবং যারা যাকাতের খাতে আদায়কৃত অর্থের বৃহদাংশ নিজেদের বেতন ও এলাউন্সে ব্যয় করবে না। যাকাত আদায়কারীরা যদি বিশ্বস্ত ও ইমানদার হয়, তাহলে জনগন তাদের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারবে যে, তাদের যাকাত সঠিক পদ্ধতিতে আদায় এবং যথার্থ ক্ষেত্রে ব্যয় করা হবে। কাজেই যাকাত আদায় থেকে বাঁচবার জন্যে তারা বাহানাবাজি করার চেষ্টা করবে না।
দুই. সমাজ চরিত্রের সংস্কার সাধন করতে হবে। জনগনের চরিত্র ও কর্মজীবনকে আল্লাহর মহব্বত ও তাঁর ভীতির ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। সরকারের কাজ কেবল দেশের প্রশাসনিক বিষয়াবলী ও দেশরক্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং জনগণেকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব তাক গ্রহন করতে হবে।
তিন. যাকাত থেকে নিস্কৃতি লাভের সাধারণ ও সম্ভাব্য উপায়সমূহের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে। যেমন কোনো ব্যক্তি যদি, তার যেসব সম্পদের উপর যাকাত নির্ধারিত হতে পারে, সেগুলির একটি অস্বাভাবিক পরিমাণ বছর শেষ হবার পূর্বেই নিজের কোনো আত্মিয়ের নামে লিখে দেয় বা তার নিকট হস্তান্তরিত করে তাহলে তার উপর মকদ্দমা চালাতে হবে এবং যাকাত থেকে বাচাঁবার জন্যে সে যে এভাবে সম্পদ হস্তান্তর করেনি এর প্রমাণ পেশ করার ভার তার উপর দিতে হবে।
(৩৩) আমাদের মতে যাকাত আদায় ও বন্টন ব্যবস্থা প্রদেশের পরিচালনাধীন থাকা উচিত এবং কেন্দ্রকে এ ব্যাপারে এতটুকু ক্ষমতা দান করা উচিত যার ফলে সে এক প্রদেশের প্রয়োজনাতিরিক্ত যাকাত অন্য এক প্রদেশে প্রেরণ করতে পারে, যেখানকার যাকাত স্থানীয় স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক প্রয়োজন পূর্ণ করতে সক্ষম নয়। উপরুন্ত কেন্দ্রের এ ক্ষমতা থাকা উচিত যে, যাকাতের টাকা থেকে যদি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান কায়েম করা বা এমন কিছু কাজ করার প্রয়োজন দেখা দেয় যা দেশের ভেতরে ও বাইরে ‘আল্লাহর পথে জিহাদ‘ করার সাথে সংশ্লিষ্ট অথবা দেশের বাইরে কোনো স্বাভাবিক বিপদ সাহায্য পাঠাবার প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সে প্রদেশসমূহের নিকট থেকে যেন তাদের যাকাতের একটি অংশ তলব করতে পারে।
(৩৪) আমাদের মতে যাকাত আদায় করার জন্যে কোনো পৃথক বিভাগ কয়েম করার প্রয়োজন নেই। অন্যান্য যাবতীয় ট্যাক্স আদায় করার জন্যে যে সকল বিভাগ পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত আছে, সেগুলির মাধ্যমেই যাকাত আদায় করা উচিত। যেমন ফসল ও গবাদি পশুর যাকাত জমির খাজনাদি আদায় সংক্রান্ত বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে, ব্যবসাজাত পণ্যের যাকাত আয়কর বিভাগের মাধ্যমে আদায় করা যেতে পারে, কারখানার যাকাত এক্সসাইজ বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে এবং এভাবে যাকাতের অন্যান্য বিভাগগুলিকেও সরকারী কর বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট করা যেতে পারে। সরকারী অর্থ-দফতরের অধীনে যাকাতের সংরক্ষণ এবং এর হিসাব একাউন্টেন্ট জেনারেলের বিভাগের অধীনে পরিচালিত হতে পারে।
আমাদের সুপারিশ অনুযায়ী যাকাতকে যদি প্রদেশের কর্তৃত্বাধীন করা হয় এবং যাকাত আদায় সংক্রান্ত কোনো বিভাগের কাজ যদি কোনো কেন্দ্রীয় দফতরের অধীন করা হয়, তাহলে একটি পারস্পরিক চক্তির মাধ্যমে যাকাত আদায় সংক্রান্ত ঐ বিভাগের যাবতীয় বীয়ভার প্রদেশের উপর ন্যস্ত করা যেতে পারে।
তবে যাকাত বন্টন এবং যাকাতের বিভিন্ন ব্যয়ক্ষেত্রে যাকাতের অর্থ ব্যয় করার জন্যে একটি পৃথক বিভাগ কয়েম করা অপরিহর্য। এ বিভাগটিকে ওয়াকফ সম্পত্তি ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের তত্ত্বাবধানকারী দফতরের অধীনস্থ করা যেতে পারে।
(৩৫) একথা পরিস্কারভাবে জেনে রাখা উচিত যে, যাকাত কোনো ট্যাক্স নয়, বরং একটি ‘আর্থিক ইবাদত‘। মৌলিক চিন্তা ও নৈতিক প্রাণশক্তির দিক দিয়ে ট্যাক্স ও ইবাদতের মদ্যে আসমান ও যমীনের পার্থক্য বিদ্যমান। সরকারী কর্মচারী ও যাকাতদাতাদের মদ্যে যদি ইবাদতের পরিবর্তে ট্যাক্সের মানসিকতা সৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে এর ফলে যাকাত যেসব নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ফায়দা হাসিল করা আসল উদ্দেশ্য, সেগুলি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যাবে এবং সামগ্রিক ফায়দাসমূহও বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যাকাত আদায় ও বন্টন করার ভার রাষ্ট্রের হাতে সোপর্দ করার অর্থ এ নয় যে, এটি একটি সরকারী ট্যাক্স। বরং মুসলমানদের সকল সামগ্রিক ইবাদতে শৃংখলা আনয়ন করা ইসলামী রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব, এজন্যই এ ইবাদতটির ব্যবস্থাপনাও সরকারের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। যাকাত আদায় ও বন্টন করার ন্যায় নামায কায়েম ও হজ্জ পরিচালনাও ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
(৩৬) হাদীস এ মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে যে, “মানুষের অর্থসম্পদে যাকাত ছাড়া অন্যান্য হকও আছে।“ এই নীতিগত বিধানের উপস্থিতিতে ইসলামী রাষ্ট্র যাকাত ছাড়া অন্য কোনো ট্যাক্স লাগাতে পারে কিনা তেমন কোনো প্রশ্নই সৃষ্টি হতে পারে না। উপরন্তু কারআনে যখন যাকাতের জন্যে মাত্র কয়েকটি ব্যয়ক্ষেত্র নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে, তখন এথেকে অনিবার্যভাবে একথাই প্রমাণিত হয় যে, এই কটি মাত্র ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারের উপর যেসব দায়িত্ব অর্পিত হয় সেগুলি সম্পদন করার জন্যে সরকার জনগণের উপর অন্যান্য ট্যাক্স লাগাতে পারে। উপরন্তু কুরআনে েএই নীতিগত বিধানও দেয়া হয়েছে যে, “ইয়াসআলুনাকা মাযা ইউনফিকুন, কুলিল আফওয়া।“ অর্থাৎ “তারা তোমার (রাসূলুল্লাহর) নিকট জিজ্ঞাস করে, আমরা কি খরচ করবো? তাদেরকে বলো, তোমাদের উদ্বৃত্তাংশ।“আফওয়া বা উদ্বৃত্তাংশ হচ্ছে ঋডমভমধড SURPLUS এর সমার্থক। এখানে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে যে, ‘আফওয়া‘ হচ্ছে ট্যাক্সের যথার্থ স্থান। উপরন্তু খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে যাকাত ছাড়া অন্যান্য ট্যাক্স লাগনো হয়েছে এর বহু নজীর আছে। যেমন হযরত উমরের (রা) আমলে আমদানী কর নির্ধারিত হয় এবং একে যাকাতের মধ্যে নয় বরং ফায়‘ (রাষ্ট্রের সাধারণ আয়) এর মধ্য গণ্য করা হয়। এ ছাড়াও শরীয়তের এমন কোনো নির্দেশ নেই যাথেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে যে, রাষ্ট্র সামগ্রিক প্রয়োজনের খাতিরে অন্য কোনো ট্যাক্স লাগাতে পারবে না। বরং এক্ষেত্রে নীতি হচ্ছে এই যে, যে বস্তুকে নিষিদ্ধ করা হয়নি সেটি হচ্ছে মোবাহ। যাতদূর আমরা জানি ফকীহগণের মধ্যেও একমাত্র যিহাক ইবনে মাযাহিমস নামক জনৈক অপ্রসিদ্ধ ফকীহ ছাড়া একজনও একথা বলেননি যে, ‘নাসাখাতিয যাকাতু কুল্লা হাক্কিন ফিল মাল।“ (যাকাত অর্থসম্পদের বাকি সমস্ত হক নাচক করে দিয়েছে) যিহাকের এই মত কে কোনো উল্লেখযোগ্য ফকীহই সমর্থন জানাননি। (আল মুহাল্লা লি ইবনে হাযম, ২য় খন্ড পৃ: ১৫৮)
(৩৭) ইসলামের প্রথম যুগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তহসীলদার নিযুক্ত ছিল। তারা প্রকাশ্য ধনসম্পদ যেসব স্থানে থাকতো, সেখানে গিয়ে নিজেরাই তার যাকাত আদায় করে আনতেন। যাকাত জমা করার জন্য কোনো পৃথক অর্থ-দফতর থাকতো না, বরং রাষ্ট্রের সাধারণ অর্থ-দফতরেই তা জমা হতো। তবে এর হিসাব পৃথক থাকতো। রাষ্ট্রের যে সকল কর্মচারী অন্যান্য সরকারী কার্যসমূহ আঞ্জাম দিতেন তারাই যাকাতও বন্টন করতেন। যাকাত বন্টন করার জন্য কোনো পৃথক বিভাগ ছিল বলে আমরা জানি না। কিন্তু এ সকল প্রশাসনিক ক্ষেত্রে, আমরা বর্তমান অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী, যেভাবে সংগত মনে করি সেভাবে বাস্তব কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করতে পারি।
বর্তমান মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মধ্যে কেউ যাকাত আদায় ও বন্টন করার জন্যে যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে বলে আমরা জানিনা।
(৩৮) আমাদের মতে ইসলামী রাষ্ট্রকেই যাকাত আদায় ও বন্টনের কাজ করা উচিত।
(৩৯) যাকাত আদায় ও বন্টনকার্য রত কর্মচারীদের বেতন, এলাউন্স, পেনশন ও কাজের শর্তসমূহ অন্যান্য সরকারী কর্মচারীদের থেকে পৃথক হওয়া উচিত নয়। অবশ্যি সকল সরকারী কর্মচারীর বেতনের ব্যাপারে সরকারী কর্মপদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হওয়া উচিত। বেতনের ব্যাপারে বর্তমান অসামঞ্জস্য ও বিপুল ব্যবধান অপরিবর্তিত থাকলে যথাযথভাবে যাকাত আদায় ও বন্টন সম্ভব হবে না।
(তরজমাতুল কুরআন, নভেম্বর, ১৯৫০)

৬. যাকাতের নিসাব ও হার কি পরিবর্তন করা যেতে পারে?

[রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খন্ড থেকে গৃহীত]
প্রশ্ন : যাকাত সম্পর্কে এক ব্যক্তি বলেন যে, অবস্থা ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে এর হারের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নিজের যামানার পরিপ্রেক্ষিতে শতকরা আড়াই ভাগকে সংগত মনে করেছিলেন। বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র চাইলে অবস্থানুযায়ী এ হার বাড়াতে বা কমাতে পারে। তার যুক্তি ছিল- কুরআনে যাকাত সম্পর্কে বহু আলোচনা করা হয়েছে, কিন্তু কোথাও এর হারের কথা উল্লেখ করা হয়নি। যদি কোনো বিশেষ হার অপরিহার্য হতো, তাহলে অবশ্যি তা উল্লেখ করা হতো। বিপরীতপক্ষ আমার দাবি ছিল : রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ চিরন্তন, তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধনের অধিকার আমাদের নেই। তাবে তার যুক্তি সম্পর্কে বলা যায়, ভবিষ্যতে তিনি বলবেন যে, নামাযের রাকআতের মধ্যে পরিবর্তন করা দরকার এবং নামায পড়ার পদ্ধতিও বদলানো উচিত, কারণ তার নিকট অবস্থা ও কালের তাগিদটাই বড় কথা। তাহলে তো রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ আর নির্দেশ থাকবে না, বরং খেলার পুতুলে পরিণত হবে। দ্বিতীয়ত আমি বলেছিলাম : ইসলামী রাষ্ট্রের অত্যধিক প্রয়োজন দেখা দিলে- ‘ইন্না ফীল মালে হাককান সেওয়ায যাকাত“ হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় অর্থ আদায় করতে পারে। যাকাতের হার চিরন্তন হবার ব্যাপারে এই হাদীসটি থেকে পরোক্ষ ইংগিত পাওয়া যায়। যাকাতের হার যদি পরিবর্তিত হতে পারতো, তাহলে এ হাদীসটির প্রয়োজন কি ছিল? কিন্তু এরপরও তিনি নিজের দাবিতে অটল। মেহেরবানী করে আপানি এ ব্যাপারে আলোকপাত করুন।
জবাব : যাকাতের ব্যাপারে আপনার যুক্তি যথার্থ। রাসূলুল্লাহর (সা) নির্ধারিত সীমা ও হারের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করার অধিকার আমাদের নেই। এ দুয়ারটি একবার উন্মুক্ত হয়ে গেলে কেবল এই যাকাতের নিসাব ও হারের উপরই আঘাত আসবে না, বরং নামায, রোযা, হজ্জ, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার আইন প্রভৃতি বহু বিষয়ের পরিবর্তন-পরিবর্ধন শুরু হয়ে যাবে এবং সর্বত্র এর গতি হবে অপ্রতিরোধ্য। উপরন্তু এ দুয়ারটি উন্মুক্ত করার পর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যে যে ভারসাম্য কয়েম করেছেন, তা খতম হয়ে যাবে। অতপর ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে রেষারেষি শুরু হয়ে যাবে। ব্যক্তি চাইবে নিসাব ও হারের মধ্যে তার স্বার্থানুকূল্যে পরিবর্তন, অন্যদিকে সমাজও চাইবে তার স্বার্থানুকূল্যে পরিবর্তন। নির্বাচনের সময় এ বিষয়টি একটি সমস্যার রূপ পরিগ্রহ করবে। নিসাব কমিয়ে ও হার বাড়িয়ে যদি কোনো আইন প্রণীত হয়, তাহলে এর মাধ্যমে যে সকল ব্যক্তির স্বার্থহানি হবে তারা ইবাদতের সত্যিকার প্রাণশক্তি অনুযায়ী যথার্থ আন্তরিকতা ও আনন্দ সহকারে তা দান করবে না, বরং ট্যাক্সের ন্যায় জোর জবরদস্তি মনে করেই দান করবে এবং টালবাহানা ও পলায়নের পথ খুঁজে বেড়াবে। বর্তমানে যেমন প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম মনে করে শির নত করে দেয় এবং ইবাদতের আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে সানন্দে যাকাত পরিশোধ করে; পার্লামেন্টে সংখ্যাধিক্যের মাধ্যমে যথেচ্ছাভাবে নিসাব ও হার নির্ধারিত হলে, তেমনটি আর কোনোক্রমই সম্ভব হবে না।
(তরজমাতুল কুরআন, জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী, ১৯৫১)

৭. কোম্পানীর শেয়ারে যাকাত

প্রশ্ন : কোনো অংশীদারী কারবার, যেমন কোম্পানী শেয়ারসমূহের যাকাত সংক্রান্ত বিষয়টি বুঝতে পারছিনা। শেয়ার নিজে তো কোন মূল্যবান বস্তু নয়। একটি কাগজের টুকরা মাত্র। [শেয়ার সম্পর্কে প্রশ্নকর্তা অনেক ভুল পেশ করেছেন। কাগজের টুকরা না শেয়ার হয় আর না আসল গুরুত্বের দাবী করতে হবে। বরং এটা দলীল, যা একথা প্রামাণ করেযে, অমুক ব্যক্তি এরই সুবাদে অমুক করাবারে অংশীদার। যদি দুজন লোক একটি দোকানে সমান সমান শরীক হয় এবং তারা নিজেদের শরীকানার উপর কোনো দলীল লিখে রাখে, তাহলে দলীল তাদের আসল শেয়ার শরীক হবে না, বরং দলীল তাদের অংশীদারিত্ব প্রামাণ করবে। অনেক শেয়ারের সম্মিলিত কারবারের এই একই অবস্থা। একথাও ভুল যে, “শেয়ার নিজে কোনো মূল্যবান বস্তু নয়।“ কেননা শেয়ার মানে হলো পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো একটি কারবার এবং এর পুজি ও কারবারের সাথে সম্পর্কিত মাল সম্পত্তির মালিকানার অধিকারে শরীক হওয়া। শেয়ারের মূল্য হেয়ালি বস্তু নয়, বরং একটি ধ্রুব সত্য তথ্য ]। শুধুমাত্র এই দলীয় দ্বারা অংশীদার কোম্পানী মাল সমান ও অংশীদারী বিষয় সম্পত্তিতে শামিল হয়ে, নিজের শেয়ারের পরিমাণ অনুসারে মালিক বা অংশীদার হিসেবে পরিগণিত হয়।
দেখতে হবে, কোম্পানী সম্পত্তি কি এবং কোন ধরণের। যদি কোম্পানীর বিষয় সম্পত্তি অট্রালিকা, জমি ও মেশিনপত্র সম্বলিত হয়, তাবে অংশীদারের অংশীদারিত্ব এগুলোর উপরই ধার্য হবে। এমতবস্থায় আপনার বিকৃত নীতি অনুযায়ী যাকাত দিতে হবে না। অংশীদারের অংশে পুঁজি তো অবশ্যই আছি। কিন্তু তা মোট পুঁজির অংশ মাত্র যা অস্থাবর সম্পত্তির আকারে সামষ্টিকভাবে কোম্পানী লাভ করেছে। তারপরও অংশীদারের অংশের উপর যাকাত ধার্য হবে কেন?
জবাব : কোম্পানীর যে অংশীদারের অংশের মূল্য নিসাব পরিমাণ হয়, তার সম্পর্কে একথা বুঝাতে হবে যে, সে নিসাব পরিমাণের মালিক। এবার সে যদি নিজের অর্থ কোম্পানীর কারবারে বিনিয়োগ করে, তবে তার থেকে তার পুজির হরে ব্যক্তগতভাবে যাকাত নেয়া যাবে না। বরং কোম্পানী থেকে ব্যবসায়ক যাকাতের নিয়মানুযায়ী যাকাতের উপযুক্ত ঘোষিত সকল অংশীদারের যাকাত একত্রে নিতে হবে। কোম্পানীর যাকাত হিসেবের সময় মেশিন, জায়গা, আসবাবপত্র ইত্যাদি উত্পাদন উপকরণ বাদ দিতে হবে। অন্যান্য সম্পদ, যা ব্যবসায়ের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত এবং কোম্পানীর কোষাগারে বছরান্তে মওজুদ অর্থ ইত্যাদির উপর যাকাত দিতে হবে। যদি কোম্পানীর কারবার এ ধরনের না হয়, তবে কোম্পানীর বার্ষিক আয় হিসেবে তার আর্থিক মান নির্নয় করতে হবে এবং তার উপর যাকাত ধার্য করতে হবে। (তরজমাতুল কুরআন, রবিউল আওয়াল, রবিউসসানী, ১৩৭০ হি: জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, ১৯৫০ইং)
প্রশ্ন : এ পর্যন্ত ব্যবসায়ের শেয়ার যাকাত সম্পর্কে আপনার যেসব লেখা আমার নজরে পড়েছে সেখানে যেন একটি ইসলামী রাষ্ট্র অথবা কমপক্ষে যাকাত আদায়ের জন্য একটি কেন্দীয় ব্যবস্থাপনা পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে বলে মনে করা হয়েছে। এখন সেখানে যেন সমস্যা কেবল এতটুকু যে, যাকাত কোন পর্যায়ে ও কার থেকে আদায় করা হবে? যতদিন কোন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কায়েম হচ্ছে না তাতদিন শেয়ারের যাকাত গ্রহণ করার জন্যে কি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে?
আমি নিজের শেয়ারকে অর্থের প্রতিবদল হিসেবে কিয়াস করে তার মূল্য যে পরিমাণ অর্থ হয় তা থেকে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত আদায় করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু শেয়ারের বার্ষিক আয়কর বাদ দিয়ে তা থেকে যা পাই তা পুরোপুরি তার যাকাতে ব্যয় হয়ে যায়। এ ব্যবস্থা তো একেবারেই অসন্তোষজনক।
উত্তর : ব্যবসায়ের শেয়ারের যাকাত এমন কোনো নীতির ভিত্তিতে আদায় করা যাবে না যার ফলে একথা মনে হয় যে, শেয়ারের অর্থ আপনার কাছে জমা আছে এবং আপনি জমা টাকার যাকাত আদায় করে চলেছেন। বরং ব্যবসা পণ্যের যাকাত আদায়ের যে নীতি নির্ধারিত রয়েছে তার ভিত্তিতে এরও যাকাত আদায় করতে হবে। সে নীতিটি হচ্ছে, ব্যবসা শুরু করার দিন থেকে এক বছর অতিক্রান্ত হবার পর দেখতে হবে মওজুদ পণ্য ( ) কি পরিমাণ আছে। তার মূল্য কত। আর হাতে নগদ ( ) কত টাকা আছে। উভয়ের সমষ্টির উপর শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে। এ নীতির ভিত্তিতে একটি কোম্পানী বা বিভিন্ন কোম্পানীর মধ্যে আপনার যে শেয়ারগুলো রয়েছে বর্তমান বাজারদর হিসেবে তার মূল্য হত দেখতে হবে। বছরের মাঝখানে এক ব্যক্তি তার শেয়ার বা শেয়ারগুলো যতবারই বিক্রি করুক না কোন তাতে কিছু যায় আসে না। আপনি কোম্পানীর প্রথম শেয়ারটি যখন কেনেন তখন থেকেই বছর গণনা করা হবে এবং বছরের শেষে আপনার শেয়ারের বাজার দার ( ) যা হবে তার প্রেক্ষিতে যাকাত নির্ধারণ করা হবে। এই সংগে আপনার কাছে নগদ কত টাকা আছে তাও দেখা হবে। উভয়ের সমষ্টির উপর শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে। তবে একথা স্বতন্ত্র যে, ট্যাক্স প্রাদানের পর আপনার লাভের অর্থের পরিমাণ এত কমে যায় যে, তা থেকে যাকাত আদায় করলে হাতে আর কিছু থাকে না। এ অবস্থার কোনো সুরাহা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি তো এমন একটি রাষ্ট্রের অধীনে থাকার শাস্তি যে রাষ্ট্র ট্যাক্স আদায় করার সময় যাকাতের প্রতি কোনো নজরই দেয় না। এ শাস্তি আমাদের অবশ্যি ততদিন পর্যন্ত ভোগ করা উচিত যতদিন না আমরা এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা বদলে দেই যার অধীনে আমরা বাস করে আসছি।
প্রশ্ন : বাণিজ্যিক শেয়ারের যাকাত সম্পর্কে ১৯৬২ সালের জুলাই এবং ১৯৫০ সালের নভেম্বরের তরজমাতুল কুরআনে প্রকাশিত আপনার লেখা এ মুহুর্তে আমার সামনে রয়েছে।
ইসলামী আইনের মূলনীতির আলোকে যৌথ কারবারে বিনিযোগকৃত মূলধনের যাকাত একবার মাত্র আদায় করতে হয়। এই মূলনীতির আলোকে আপনার নভেম্বর ৫০-এর লেখা অনুসারে যদি কোম্পানীর কাছ থেকে একত্রে যাকাত আদায় করা হয়, তাহলে সেই কোম্পানীর অংশীদারদের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য বাণিজ্যিক শেয়ারের যাকাত আলাদাভাবে আদায় করা উচিত নয়। এ কথাটাও লক্ষনীয় যে, “যে অংশীদার যাকাতযোগ্য পরিমাণের চেয়ে কম শেয়ারের অধিকারী অথবা যে অংশীদার এক এক বছরের চেয়ে কম সময়ব্যাপী স্বীয় শেয়ারের মালিক থাকে……“ তাকে বাদ দিয়ে কোম্পানীর কাছ থেকে শেয়ার বাবদ যাকাত আদায় করতে হবে। যে অংশীদার কোনো কোম্পানীতে যাকাতযোগ্য পরিমাণের চেয়ে কম শেয়ারের অধিকারী, সে নিজে যাকাত যোগ্য অর্থের অধিকারী কি না, সেটা জানা প্রায়ই দুরূহ হয়ে থাকে।
এ সমস্যার আর একটি দিক বিবেচনা সাপেক্ষ। অংশীদারদের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য শেয়ারের উপর ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায় করা এবং কোম্পানীর শেয়ারের উপর সমষ্টিগতভাবে যাকাত আদায় করার অর্থনৈতিক ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের হবে। এমন হতে পারে যে, কোম্পানী বার্ষিক যাকাতের অর্থকে স্বীয় করতে সচেষ্ট হবে। কেননা সমগ্র যাকাত লভ্যাংশ থেকেই দেওয়া সব সময় সম্ভব হবে, এটা নিশ্চিত নয়। অনুরূপভাবে, যাকাত দেওয়ার পরও অংশীদারদেরকে লভ্যাংশ বাবদ কিছু দেওয়া যাবে- একথা জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু অংশীদারদের কাছে থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যাকাত নেওয়া হলে তা দ্বারা পণ্যমূল্যের উপর এ ধরনের প্রভাব পড়ে না।
তরজমাতুল কুরআনের একই সংখ্যায় ২২ পৃষ্ঠায় ভাড়া দেওয়া জিনিসেকে যাকাতযোগ্য বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। এ মত যদি সঠিক হয়, তাহলে ভাড়ায় চালানো ট্যক্সি, ট্রাক ও বাসের সামগ্রিক মূল্যমানের উপরও এই বিধি কার্যকর হওয়া উচিত। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি একাধিক বাড়ি ও দোকানের মালিক এবং সেগুলোর ভাড়া পায়, তার কাছ থেকে বাড়ী ও দোকানসমূহের সামগ্রিক মূল্যের শতকরা আড়াই ভাগ ট্যাক্স দেওয়া উচিত। এই দু্টো ক্ষেত্রে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে আমার দুটো কারণে, সংশয় রয়েছে। প্রথমত, পূর্বতন মনীষীদের থেকে শুরু করে এযাবত কেউ ভাড়া দেওয়া ঘরবাড়ীর সমগ্র মূল্যমানের উপর যাকাত জরুরী হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বা তদনুযায়ী কাজ করেছেন, এমন কথা শুনিনি। দ্বিতীয়ত, “কিতাবুল আমওয়াল” গ্রন্থের ৩৭৬ পৃষ্ঠায় লাইস বিন সা‘দের বরাতে যে হাদীস আপনি উদ্ধৃত করেছেন, তাকে প্রমাণ হিসেবে তুলি ধার এখানে সঠিক হলে মনে হয় না। ভাড়ার উট ভাড়ায় খাটানোর কারণে যাকাত দেওয়া জরুরী হয় তা নয়, বরং শুধুমাত্র উট হওয়ার কারণেই তা যাকাতযোগ্য। আশা করি সমস্যাটির উপর আরো কিছু আলোকপাত করে এ খটকা দূর করবেন।
জবাব : যাকাত সম্পর্কে নভেম্বর, ৫০-এর তরজমানে যে লেখা ছাপা হয়েছে তা সরকারের প্রশ্নপত্রের জবাব ছিল। সে জবাব দেওয়া হয়েছিল এরূপ ধারণার ভিত্তিতে যে, সরকারী পর্যায়ে কোম্পানীর যাকাত আদায় করা হবে। পক্ষান্তরে জুলাই, ৬২-এর তরজুমানে একটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছিল এরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে যে, কোম্পানীকে যাকাত দিতে হবে না, বরং অংশীদারদেরকে নিজ নিজ যাকাত আপন উদ্যোগে দিতে হবে। এই পার্থক্যটা নজরে রেখে উভয় জবাব পড়ে দেখুন। কোম্পানী যখন যাকাত দিয়ে দেবে তখন এক একজন অংশীদারের আলাদা আলাদাভাবে যাকাত দেওয়ার আর প্রশ্নই ওঠে না। তবে অংশীদাররা ব্যক্তিগতভাবে যাকাতযোগ্য অর্থের অধিকারী কিনা, সেটা অনুসন্ধান করা কোম্পনীর পক্ষে দু:সাধ্য। এটা অংশীদারদেরই দায়িত্ব যে, তারা কোম্পানীকে নিজের যাকাতযোগ্য সম্পদের মালিক না হওয়ার কথা জানাবে, যাতে তাদের শেয়ার যাকাত হিসাবে ধরা না হয়।
যাকাত আদায় করা যদি সরকারের ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত হয়, তাহলে যাকাত আদায়কারীর একথা অজানা থাকা সম্ভব নয় যে, কোম্পানী স্বীয় যাকাত বাবদ প্রদেয় অর্থকে বাণ্যিজ্যিক ব্যয়ের অংশ গণ্য করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। সরকারী উদ্যোগে এ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। কিন্তু যদি সরকারী ব্যবস্থাপনা থেকে না থাকে তাহলে এরূপ ক্ষেত্রে শুধু সেই কোম্পানী স্বত:স্ফূর্তভাবে যাকাত দেবে, যার পরিচালকদের কিছু না কিছু ইসলামী চেতনা বিদ্যমান। এরূপ লোকেরা একহাতে যাকাত দিয়ে অন্য হতে তা ফেরত নেওয়ার ফন্দি আঁটবে বলে মনে হয় না। আর যদি বা তারা এমন করে তবে পরবর্তী বছর তাদের উপর আরো বেশী যাকাত ধার্য হবে। পুনরায় যদি মূল্য বৃদ্ধি করে তাবে যাকাত আবারও বৃদ্ধি পাবে। এভাবে শেষ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করা আর সম্ভব হবে না।
ভাড়ায় খাটানো সম্পদের ব্যাপারে যা লেখা হয়েছিল তা ছিল সংক্ষিপ্ত। তাই বিষয়টা পরিস্কার হয়নি। আমার বক্তব্য এই যে, যারা আসবাবপত্র বা মোটরগাড়ী বা এ ধরনের অন্যান্য জিনিস ভাড়ায় খাটানোর ব্যবসা করে তাদের ব্যবসায়ের মূল্যমান সে ব্যবসায়ে লব্ধ মুনাফার অনুপাতে নিরূপণ করা হবে। তার অর্থ এ নয় যে, এই ভাড়ায় খাটানো আসবাবপত্র বা মোটর গাড়ীর মূল্যের উপর যাকাত ধার্য্য হয় না। অর্থাৎ একটা কারবারে যে মুনাফা অর্জিত হয়, তার ভিত্তিতে স্থির করা হবে যে, এ পরিমাণ মুনাফা অর্জনকারী কারবারের মূল্যবান কি নিরূপিত হওয়া উচিত। আর ভাড়া দেওয়া বাড়ী সম্পর্কে আমারও এজন্য সংশয় রয়েছে যে, অতীতের ফিকাহবিদগণের পক্ষ থেকে এসবের উপর যাকাত ধার্য করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়না।
ভাড়ায় খাটা উটের উপর যাকাত ধার্য না হওয়ার কারণ আমি যা বলেছি তাই। অর্থাৎ অর্থোপার্জনের উপকরণ বা প্রাণীর উপর যাকাত আরোপিত হয় না, যেমন হালের বলদ বা পরিবহণের প্রাণী। এগুলোর উপর বিধিবদ্ধ পশুর যাকাত আরোপিত হবে না। অনুরূপভাবে ডেয়ারী ফার্মের পশুর উপর যাকাত আরোপিত হবে না। কেননা এগুলোর দ্বারা যে পণ্য উত্পাদিত হয়, তার উপর যাকাত আরোপিত হওয়ার মাধ্যমেই এগুলোর যাকাত আদায় হয়ে যায়। ভাড়ায় খাটানো উটও অর্থোপার্জনের উপকরণ পদবাচ্য। তাই পশুর যাকাতের বিধির আওতায় অথবা মূল্য নির্ধারণপূর্বক এদের যাকাত আরোপিত হবে না। বরং এই ভাড়ায় খাটানোর ব্যবসায়ের যে বাজারমূল্য নিরূপিত হবে তার উপর যাকাত আরোপিত হবে।
(তরজমানুল কুরআন, ফেব্রুয়ারী ১৯৬৩)

৮. শ্রম ও অর্থের অংশীদারী অবস্থায় যাকাত

প্রশ্ন : দুজনে মিলে অংশীদারী ভিত্তিতে কারবার শুরু করলো। প্রথম শরীক পুঁজি দিল এবং শ্রমও দিল। দ্বিতীয় শুধুমাত্র শ্রমের ভিত্তিতে অংশীদার। মানাফা বন্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো যে, মোট মুনাফার তিনটি ভাগ হবে। একভাগ মূলধনের। বাদবাকি দুভাগ দুশরীকের। এরূপ ব্যবসায়ের যাকাত সংক্রান্ত বিষয়ে দুটি প্রশ্নের উদয় হয়। এর জবাব দান করে নিশ্চিন্ত করবেন:
(ক) যদি ব্যবসায়ের সর্বমোট পুঁজি থেকে এক জায়গায় যাকাত বের করা হয়, তাবে দ্বিতীয় শরীকের পক্ষ থেকে এ আপত্তি উঠে যে, ব্যবসায়ের পুঁজি কেবলমাত্র পুজিঁ, মালিকের মালিকানাধীন। পুজি বিনিময়ে পুজিমালিক ভিন্নভাবে মুনাফাও পেয়ে থাকে। সুতরাং পুজির যাকাত পুজিমালিককেই দিতে হবে। দ্বিতীয় শরীকের এ আপত্তি যুক্তিসংগত কি?
(খ) ব্যবসায়ে লাভ-লাকসান উভয়েরই সম্ভাবনা থাকে। যাকাত লাভ-লাকসান নয় বরং পুঁজির সাথে সম্পর্কিত। ব্যবসায়ে লোকসান হলেও মওজুদ পুজির উপর যাকাত দিতে হবে। লোকসানের অবস্থায় যদি কারবার থেকে যাকাত বের করা হয়, তবে দ্বিতীয় শরীকের অংশের যাকাতের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ তার আগামী বছরের মুনাফা থেকে বের করা হবে, যদি আগামী বছরেও তাকে যাকাতের অর্থ এক-তৃতীয়াংশ দিতে হয়। এমতবস্থায় দ্বিতীয় শরীকের উপর পটা আর যাকাত হিসেবে রইলো না। বরং পুজিমালিকের পুজির যাকাতের এক অংশ আদায় করা ট্যাক্স হয়ে যায়। এ পদ্ধতি যাকাতের আসল উদ্দেশ্যর পরিপন্থী নয় কি?
জবাব : আপনার উভয় প্রশ্নের জবাব নিম্নে প্রদান করা হলো :
(ক) দ্বিতীয় শরীকের এ আপত্তি ঠিক নয়। যাকাত শুধুমাত্র সেই মূলধনের উপর ধার্য হয় না যে মূলধন দিয়ে কারবারের সূচনা হয়েছিলো। বরং কারবারের সকল অর্থসম্পদের উপর যাকাত ধার্য হয়। সঠিক পদ্ধতি হলো, গোটা কারবার থেকে প্রথমত যাকাত বের করতে হবে। তারপর পারস্পারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উভয়ের মধ্যে মুনাফা বন্টন করতে হবে।
(খ) ব্যবসায়িক সম্পদের যাকাতের পদ্ধতি হলো, কোনো তিজারতী মাল যদি নিসাব পরিমাণের অতিরিক্ত হয় তাহলে তা থেকে যাকাত বের করতে হবে। এবার যে ব্যক্তি শুধুমাত্র শ্রমের বিনিময়ে শরীক, তার এ শ্রম ব্যবসা সৃষ্টিতে অবশ্যই কিছু না কিছু অংশ নিয়েছে। কারবারের এই অর্থ সম্পদ শুধুমাত্র প্রাথমিক মূলধনের ফল নয়। এজন্য যাকাতের দুঅংশ পুজি মালিকের আদায় করতে হবে আর এক অংশ আদায় করবে শ্রম বিনিয়োগকারী। (তরজমানুল কুরআন, রবিউসসানী, ১৩৭২ হি: জানুয়ারী, ১৯৫৩)

৯. খনিজ সম্পদে যাকাতের নিসাব

[তরজমানুল কুরআন : রজব ১৩৬৫, জুন ১৯৪৬]
প্রশ্ন : সকল ফিকাহের গ্রন্থ উল্লেখ হয়েছে যে, রৌপ্যের যাকাতের নিসাব দুশত দিরহাম অর্থাৎ ৫২১/২ তোলা এবং সোনার নিসাব ২০ দিরহাম অর্থাৎ ৭১/২ তোলা। আলেমগণ বলেছেন, যদি কারো নিকট সোনা রূপা দুটোই থাকে এবং তা নিসাবের চেয়ে কম পরিমান থাকে তবে এমতবস্থায় সোনার মূল্য রূপার সংগে মিলিয়ে কিংবা রূপার মূল্য সোনার সংগে মিলিয়ে (এ দুটোর মধ্যে যেটা অভাবগ্রস্তদের জন্যে কল্যানকর হয়) সমন্বিত পরিমাণ দেখতে হবে। – এ পর্যন্তকার কথা তো পরিস্কার। কিন্তু তারা আবার একথাও বলেন, যদি কেবল রূপা হয়, তাবে রূপার নিসাব ধরা হবে, আর যদি কেবল সোনা হয়, তাবে সোনার নিসাবেই হিসাবের ভিত্তি ধরা হবে। এমনটি হলে তো একথা জরুরী হয়ে পড়ে যে, যদি কারো নিকট ষাট টাকা থাকে তবে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। কিন্তু যার নিকট ৬ তোলা সোনা থাকে সে যাকাত প্রদান থেকে মুক্ত। অথচ সম্পদাশালী হবার দিক থেকে বিচার করলে তো বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ৫০০টাকার মালিক। কিন্তু আলেমদের ফতোয়া প্রথম ব্যক্তির উপর যাকাত ধার্য করে আর দ্বিতীয় ব্যক্তিকে যাকাত থেকে মুক্ত রাখে। অথচ কম সম্পদের মালিক থেকে যাকাত আদায় করা আর অধিক সম্পদের মালিককে রেহাই দেয়া বড় বিস্ময়কর ব্যাপার।
আমি আমার নিজের চিন্তাভাবনায় এটাই বুঝি যে, আজকাল সোনা-রূপার মূল্যের মধ্যে যে তারতম্য বিরাজ করছে, পূর্বকালে সেটা ছিল না। আজকাল ৭৫:১ কিংবা ৮০:১ এর তারতম্য বিদ্যমান। নবী করিম (সা) এর যুগে প্রায় ৭:১ এর তারতম্য ছিলো। এই মূল্যের ভিত্তিতে যাকাত ফরয করা হয়েছে এবং ১৪০ মিসকাল রৌপ্যের মূল্য ২০ মিসকাল (৭১/২ তোলা) সোনার মূল্যের মূল্যেরই সমান ছিলো। তাই এ পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ কখনো এটা হতে পারে না যে, কায়ামত পর্যন্ত সোনার যাকাতের নিসাব ৭১/২ তোলাই নির্দিষ্ট থাকবে। বরং ৫২১/২ তোলা রৌপ্যের মূল্যে পরিমাণ সোনা হলেই তা যাকাতের নিসাব হবে। অর্থাৎ যার নিকট সোনা আছে সে তার মূল্য যাচাই করে দেখবে। তা যদি ৫২১/২তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমান হয়ে যায় কিংবা তার চেয়ে বেশী মূল্যের হয় তবে তাকে যাকাত প্রদান করতে হবে।
কোনো ফিকাহর কিতাবে আমার এ ধারণার সমর্থন নেই। আর বর্তমান যুগের আলেমগণও এ মত মেনে নিতে আজী নন। এ মতের যেটিকে আপনি অগ্রাধিকার দেবেন সেটাই আমার সান্তুনার কারণ হবে।
জবাব : এ পর্যন্ত তো আপনার ধারণা যথার্থ যে, নবী করীম (সা) এর যুগে সোনা-রূপার মূল্যগত পার্থক্য কেবল ততোটাই ছিলো যতোটা নিসাব এর পরিমাণ থেকে জানা যায়। অর্থাৎ ৫২১/২ তোলা রৌপ্যের মূল্য ছিলো ৭১/২ তোলা সোনার সমান। কিন্তু আপনার এ ধারণার সাথে আমি এক মত হতে পারছিনা যে, বর্তমানে সোনা-রৌপার মূল্যগত যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে, সেজন্যে সোনার নিসাব পরিবর্তন করে কেবল রৌপ্যের মূল্যের ভিত্তিতেই নিসাব ধার্য করতে হবে। এ মতের সাথে একমত না হতে পারার কারণ সমূহ হচ্ছে :
(১) এ ফয়সালা করা বড়ই কঠিন যে, মানদন্ড সোনাকে ধরা হবে, না রূপাকে? সোনার নিসাব রূপার মূল্যের ভিত্তিতে কম বেশী করা হবে? এর মধ্যে থেকে যে কোনোটিকেই ভিত্তি বা মানদন্ড ধরা হোক না কেন, তা হবে শরীয়ত রিরোধী কাজ। কেননা শরীয়ত প্রণেতা তো দুটো জিনিসের বিধান পৃথক পৃথক বর্ণনা করেছেন। তিনি আকারে ইংগিতেও এমন কোনো কথা বলেননি যার থেকে এ অর্থ বের করা যেতে পারে যে, সোনা-রূপার মধ্যে কোনো একটিকে অপরটির জন্য মানদন্ড বা ভিত্তি নির্ধারণ করা যেতে পারে।
(২) কেবল মাত্র দরিদ্রের কল্যাণ হওয়াটা এমন কোনো আকাট্য ও প্রামাণ্য মানদন্ড নয়, যার উপর আস্থা স্থাপন করে শরীয়ত প্রণেতার এক সুস্পষ্ট নির্দেশকে সংশোধন করার দু:সাহস করা যেতে পার।
(৩) ভবিষ্যতে সোনা –রূপার মূল্যগত আরো পার্থক্য ও তারতম্য হতে থাকবে। যদি এগুলোর যাকাতের নিসাব পৃথক পৃথকভাবে নির্ধারিত না থাকে এবং একটার নিসাবকে আরেকটার ভবিষ্যতে পরিবর্তনশীল মূল্যের উপর নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, তবে এই স্থয়ী পরিবর্তনশীলতার কারণে শরীয়তের একটি সুনির্দিষ্ট বিধান কার্যকর থাকবে না। এতে সাধারণ মানুষকে শরীয়তের বিধান পালনে বাস্তব ক্ষেত্রে ঝঞ্ঝাটা পোহাতে হবে।
(৪) সোনা-রূপার নিসাব নির্ধারণে আপনি যে সমস্যা পেশ করছেন, সেই একই সমস্যা বিরাজ করছে ছাগল, উট, গরু, মহিষ, এবং ঘোড়ার নিসাব নির্ধারণে। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে এগুলোর মধ্যে বিরাট তারতম্য সৃষ্টি হয়ে আসছে। এগুলোর ব্যাপারেও এ ফয়সালা করা কষ্টকর যে, এর কোনটিকে মূল ও মানদন্ড ধরে অন্যসবগুলোর নিসাব সেই মোতাবিক পরিবর্তন করতে থাকতে হবে।
এসব কারণে যাকাত প্রদানের ব্যাপারে স্বয়ং শরীয়ত প্রণেতা যে নিসাব নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং যে পরিমাণ এবং সংখ্যার ভিত্তিতে যাকাত ধার্য করেছেন সেটাকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করে হুবহু ঠিক রাখাই উচিত।

১০. যাকাত ও ট্যাক্সের মধ্যে পার্থক্য

প্রশ্ন : আজকের এই স্বাধীন নাগরিক সভ্যতার যুগেও গরীব ও মিসকীনদের জন্য ধনী ও সচ্ছল লোকদের কাছ থেকে জোরপুর্বক যাকাত আদায় করা কি সমীচীন হবে, যখন তারা অন্য বহু রকমের ট্যাক্স ছাড়া আয়করও দিয়ে থাকে?
জবাব : যাকাত সম্পর্কে সর্বপ্রথম একথা হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজন যে, এটা কোনো ট্যাক্স নয়, বরং একটা ইবাদত এবং ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ, ঠিক নামায, রোযা ও হজ্জ যেমন ইসলামের এক একটা স্তম্ভ। কুরআনকে খোলা চোখ নিয়ে যে ব্যক্তি পড়েছে সে দেখতে পায় যে, কুরআনে সাধারণভাবে নামায ও যাকাতকে একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যাকাতকে ইসলামের একটি স্তম্ভ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সর্বযুগে সকল নবী যাকাতকে ইসলামের অংশরূপে মানতেন। কাজেই একে ট্যাক্স বা কর মনে করা এবং এর সাথে ট্যাক্সের মত আচরণ করা সর্বপ্রথম মৌলিক ভ্রান্তি। একটি ইসলামী সরকার যেমন স্বীয় কর্মচারীদের কাছ থেকে অফিস সংক্রান্ত কাজ এবং অন্যান্য কাজ আদায় করে বলতে পারে না যে, এখন আর নামায পড়ার দরকার নেই। কেননা তোমরা সরকারী কর্তব্য পালন করেছো। অনুরূপভাবে সরকারের এ কথাও বলার অধিকার নেই যে, যাকাত আর দিতে হবে না। কেননা ট্যাক্স আদায় করা হয়েছে। সরকারী কর্মচারীরা সময়মত নামজ পড়তে পারে এমনভাবে অফিসের কাজের সময় নির্ধারণ করা ইসলামী সরকারের কর্তব্য। অনুরূপভাবে তাকে যাকাত দেয়ার অবকাশ সৃষ্টির জন্য কর আরোপ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করতে হবে।
তাছাড়া একথাও জানা দরকার যে, বর্তমান কারসমূহের মধ্যে কোনো করই সেইসব খাতে ও সেই পদ্ধতিতে ব্যয়িত হয় না যার জন্য যাকাত ফরয করা হয়েছে এবং যেভাবে তা বন্টন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
(তারজমানুল কুরআন, ডিসেম্বর ১৯৬১)

১১. যাকাতের পরও কি আয়কর আরোপ করা বৈধ?

[তরজমাতুন কুরআন : সেপ্টেম্বর ১৯৫৪]
প্রশ্ন : ইসলাম কি যাকাত উসূল করার সাথে সাথে আয়কর আলোপ করারও অনুমতি দেয়?
জবাব : জি হ্যাঁ, ইসলামী রাষ্ট্রে এ দুটিই এক সাথে জায়েয হতে পারে। যাকাতের ব্যয়খাত পুরোপুরি নির্ধারিত। সূরা তওবায় এগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। ঠিক তেমনি এর নিসাব (অর্থাৎ সর্বনিম্ন যে পরিমান সম্পদের উপর যাকাত আরোপিত হয়) এবং হারও রাসূলুল্লাহ (সা) নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এসব ব্যাপারে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন জায়েয নয়। বলাবহুল্য এরপর রাষ্ট্র অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজন বোধ করলে দেশবাসীর নিকট থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য গ্রহন করতে পার। এ সাহায্য গ্রহণ যদি বলপূর্বক হয়, তাহলে তা ট্যাক্সে পরিণত হবে। যদি স্বেচ্ছামূলক হয়, তাহলে তা পরিণত হয় চাঁদায়। আর যদি ফেরত শর্ত থাকে, তাহলে হয় ঋণ। যাকাত ও অন্যান্য ট্যাক্স পরস্পরের পরিপূরক হতে পারেনা এবং এদের একটি অন্যটিকে বাতিলও করতে পারেনা।
এ হচ্ছে এ প্রশ্নটির নীতিগত জবাব। কিন্তু এইসংগে আমি আপনাকে এতটুকু নিশ্চয়তা দান করতে পারি যে, আমাদের দেশে একটি যথার্থ ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গেলে এবং বিশ্বস্ততা ও আমানতদরীর সাথে যাবতীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হতে থাকলে, আজকের মতো এতরকম কর আরোপের প্রয়োজন থাকবেনা। বর্তমান যুগে ট্যাক্সের ব্যাপারে যতো রকম দুর্নীতি ও জালিয়াতি হয়, তা সবই আপনি জানেন। একদিকে যে উদ্দেশ্যে ট্যাক্স লাগানো হয় তার বড়জোর শতকরা দশভাগ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একে ব্যয় করা হয়। আবার অন্যদিকে ট্যাক্স থেকে নিস্কৃতি লাভের (EVASION) একটা সাধারণ প্রবণতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। কাজেই ব্যবস্থা যদি গলদমুক্ত হয়ে যেতে পারে, তাহলে বর্তমান প্রচলিত ট্যাক্সের একচতুর্থাংশই যথেষ্ট বিবেচিত হবে এবং এর কল্যাণকারিতাও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.