আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইসলামী রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি

ইসলামী- ই সুষ্ঠু বৈদেশিক নীতি নিধারণ করেছে- আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতির প্রতি মর্যদা দান, যুদ্ধের কারণ ও ইসলামী নীতি- ইসলাম ও বিশ্বশান্তি- যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের নীতি-ইসলামী সমাজে  দাসদের অবস্থান- সীমালঙ্গনকারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিবন্দকতা সৃষ্টি- যুদ্ধাস্ত্র সীমিতকর-ইসলামের কুটনৈতিক সতর্কতা-সংরক্ষণতা- একক ও পারস্পরিক ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি- সামরিক ঋণ-চুক্তি-রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নকরণ- বিজিত ওলাকায় ইসলামের নীতি।

ইসলাম-ই সুষ্ট বৈদেশিক নীতি নিধারণ করেছে

পাশ্চত্যের কোন কোন লেখক এ কথা লেখার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন যে আধুনিক পাশ্চত্য দেশগুলিই নিকি সর্বপ্রথম আন্তরজাতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছে এবং এজন্য সস্পষ্ট নীতি প্রতিষ্টিত করেছ। তাদের দাবি হচ্ছে, বর্তমান পাশ্চত্য সভ্যতা উদয়ের পূর্বে দুনিয়ার রাষ্ট্রসমুহের মধ্যে কোন যোগাযোগ বা সম্পর্ক গড়ে । উঠেনি।

কিন্তু তাদের ও দাবি সম্পর্ণ ভিত্তিহীন এবং তার সাথে প্রকৃত সত্যের বিন্দুমাত্র সম্পর্কও নেই। মানব ইতিহাসের সাথে যাঁরা বিন্দুমত্র পরিচিতি রাখেন তাঁরা ভাল করেই জানন যে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্মের বহু পূর্ব থেকেই দুনিয়ার জাতিসমূহের পরস্পরে সুস্পষ্ট যোগযোগ ছিল। এজন্য তাদের মধ্যে কতিপয় নিয়ম নীতিও নির্ধারিত হয়েছেল। সেগুলির ভিত্তিই তাদের মধ্যে সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রয়োজনানুরূপ রক্ষিত হত। আর দুনিয়ায় ইসলামের আগমন ও বিশ্বনবী ( স )- র নেতৃত্ব মদীনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ার পর এই  বৈদেশিক সস্পর্কের নীতি অধিকতর সুষ্ঠ-ভিত্তর উপর দাড়াঁবার সুযোগ পেয়েছিল এবং এজন্য উত্তম ও কল্যাণময় নিয়ম- কানুনও রচিত হয়েছেল।

আমরা এখানে ইসলাম প্রবর্তিত বৈদেশিক নীতির বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছি। কেননা সেজন্য ব্যাপক অধ্যয়ন, তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ এবং নবী করীম ( স ) এবং তাঁর পরে অন্ততঃ খুলাফায়ে রাশেদুন বিভিন্ন জাতির সাথে যেসব চুক্তি করেছেলিন সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার  প্রয়োজন। কিন্ত এই প্রসঙ্গে তা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না এই গ্রন্হটির অবয়ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যায়ার ভয়ে। আসলে শুধু এ বিষয়ের উপর একখানি বৃহদাকার গ্রন্হের প্রয়োজন। তাই আমরা এখানে ইসলাম প্রবতির্ত বৈদেশিক নীতি শুধু  কুরআনভিত্তিক আলোচনা পেশ করতেই চেষ্টত হব।  এর ফলে সম্মানিত পাঠকবৃন্দের নিকট একথা সস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, ইসলামী হুকুমত প্রথম প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই ব্যাপক কর্মনীতি ও যোগাযোগ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যা কোন রাষ্ট্রের জন্য জরুরী এবং দুনিয়ার জাতি ও জনগোষ্ঠির বৈদেশিক যোগাযোগ রক্ষার জন্য জরুরী।

এসব কর্মনীতি ও পদ্ধতি মৌলনীতি সমন্বিত। পরিবতির্তত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় খুটিঁনাটি সেসব মৌলনীতির ভিত্তিতেই দেবেন, পরে তারই ভিত্তিতে সময়োপযোগি খটিঁনাটি নিয়ম- বিধি রচনা করবেন শরীয়াতভিজ্ঞ মনীষিণ।

এখনে আমরা ইসলামের বৈদেশিক ও পররাষ্টীয় পর্যায়ের মৌলনীতি সমূহের রূপখো উল্লেখ করছি।

 

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ওয়াদা- প্রতিশ্রুতির প্রতি মর্যদা দান

চুক্তি ও ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বা পূরণ করা ( আরবী**********) মানব প্রকৃতি নিহিত দাবি। মানুষ তার ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রাথামিক পাঠশালায়-ই তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করে, এমনকি বয়স্করা যদি কখনও কোন ধরনের ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে পরিবারের অল্প বয়স্করাই তার প্রতিবাদ করে উঠে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম ( স )- এর কথা বলে বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত করছি।

তিনি ইরশাদ করেছেনঃ

[আরবী***************************]

তোমরা বালক- বালিকাদের ভালবাসবে, তাদের প্রতি স্নেহ ও মমতা রাখবে। আর যদি কখনও তাদের নিকট কোন কিছুর ওয়াদা কর, তাহলে তা তাদের জন্য অবশ্যই পূরণ করবে।

তাছাড়া সামষ্টিক জীবনের স্থিতিস্থাপকতার জন্য যে- কোন পর্যায়ের পারস্পরিক ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অত্যন্ত শর্ত। পারস্পরিক বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসপরায়ণতা এই জীবনের মৌলিক ভিত্তি। ওয়াদা প্রতিশ্রুতি পূরণ ব্যতীত এই ভিত্তি রক্ষা পেতে পারে না। তাই আল্লাহ তা ‘আলা হুকুম করে দিয়েছেনঃ

[আরবী********************************]

তোমরা পারস্পরিক ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি সমূহ পূর্ণ কর। কেননা এই ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কিয়ামতরে দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর মু’ মিনদের গুণ- পরিচিতি পর্যায়ে বলা হয়েছেঃ

[আরবী***********************]

এবং কল্যাণপ্রাপ্ত হচ্ছে সেই সব মুমিন লোক, যারা তাদের আমাতন সমূহ এবং তাদের ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি পূর্ণ সতর্কতার সাথে রক্ষা করে।

কুরআন মজীদে ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি পূরণকারীদের প্রসংসা ব্যাপদেশে বলা হয়েছেঃ

[আরবী********************]

কেবল বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। তারা তো সেই লোক, যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা- প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এবং চুক্তি কখনই ভঙ্গ করে না।

আর এর বিপরীত যারা ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের মন্দ বলা হয়েছে।ইরশাদ হয়েছেঃ

[আরবী**************************]

আর যারা আল্লাহর ওয়াদা পাকা-পোকত ও সুদৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহর যার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার আদেশ করেছেন, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের উপর লা ‘নত বর্ষিত: আর তদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত খারাপ বসবাস স্থান।

একটি আয়াতে ওয়াদা ভঙ্গকারীকে সেই নারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে নিজ হতে সূতা পরিপক্ক করার পর নিজেই তা কেটে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে। বলা হয়েছেঃ

[আরবী****************************]

তোমরা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ কর যখন তোমারা তাঁর সথে কোন ওয়াদা শক্ত করে বেঁধে নিয়েছ এবং নিজেদের কিরা- কসম পাকা পোক্তভাবে করার পর তা ভঙ্গ করো না, যখন তোমরা আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ তোমাদের সব কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। তোমাদের অবস্থা যেন সেই নারীর মত না হয়, যে নিজেই কঠিন পরিশ্রম করে সূতা কেটেছে পরে সে নিজেই তা টুকরা টুকরা করে ফেলেছে। -[ এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স) থেকে বহু হাদীস বর্ণিত ও উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে ভিন্নতর বর্ণনা সূত্রে প্রাপ্ত কতিপয় সাদীস সেই সুত্রের ভাষা অনুযায়ী তুলে দিচ্ছিঃ

(আরবী******************************)

(ক) যে লোক আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার, সে যেন ওয়াদা করলে তা পূরণ করে।

(আরবী*****************)

(খ) কাল কিয়ামতের দিন আমার অতি নিকটবর্তী হবে সেই লোক, যে তোমাদের মধ্যে কথার দিক দিয়ে অতীব সত্যবাদী, আমানতের খুব বেশী আদায়কারী এবং ওয়াদা খুব বেশী পূরণকারী।

(আরবী****************)

(গ) মু’মিনের কর্তব্য হচ্ছে ওয়াদা পূরণ করা ও তাতে সততা-সত্যবাদিতা রক্ষা করা। ]

 

যুদ্ধের কারণ ও ইসলামের নীতি

দূর অতীত কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে যেসব যুদ্ধ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, তার মূলে তিনটি কারণই প্রধানঃ

১। সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে অঞ্চলের পর অঞ্চল দখল করে স্বাধীন মানুষকে অধীন বানানো;

২। অন্যদের দেশের উপর আক্রমন চালিয়ে সেই দেশে অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা বা সেই দেশকে সন্ধিসূত্রে বন্দী করে নিজ দেশের বেকার ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য সেই দেশে অবস্থান গ্রহণের ও উপার্জনের অবাধ সুযোগ করে দেয়া; এবং

৩। নিজের দেশের শিল্পজাত পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের বাজার সৃষ্টি করা এবং নিজ দেশের মূলধন সেই দেশে অবাধ ও নির্বিঘ্ন বিনিয়োগের সুযোগ করার লক্ষ্যে পরদেশ দখল করা কিংবা নিজ দেশের শিল্পোৎপাদনের, প্রতিষ্ঠিত কল-কারখানা চালু রাখা ও বেকার সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজে লাভ করার জন্যও বিদেশের উপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালানো ও দখল করে নেয়া হয়।

কিন্তু এর কোন একটি উদ্দেশ্যেও পরদেশ আক্রমণের অনুমতি কুরআন মজীদে দেয়া হয়নি। এমন একটি আয়াত সমগ্র কুরআনে সন্ধান করেও পাওয়া যাবে না, যাতে এই ধরনের কোন প্রয়োজনে কোন দেশ দখল করার আদেশ করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসেও এই উদ্দেশ্যে পরদেশ আক্রমণের কোন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যেতে পারে না।

অনুরূপভাবে যেসব দেশের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একতরফাভাবে ও অতর্কিতে শুরু করারও কোন অনুমতি কুরআনে নেই।

বলা হয়েছেঃ [আরবী******************************************]

তারা তো এটাই চায় যে, তারা নিজেরা যেমন কাফির হয়েছে, তোমরাও তেমনিভাবে কাফির হয়ে যাও যেন তোমরা তাদের সমান হয়ে যেতে পার। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক রূপে গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর পথে হিজরাত করে আসবে। তারা যদি হিজরাত করে না আসে, তাহলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু –পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী রূপে গ্রহণ করবে না। অবশ্য সেসব মুনাফিক এ কথার অন্তর্ভুক্ত হয়, যাদের সাথে তোমাদের কোনরূপ চুক্তি রয়েছে তাদের মধ্যে গিয়ে যদি তারা মিলিত হয়। সেই মুনাফিকরাও এই কথার মধ্যে শামিল নয়, যারা তোমাদের নিকট আসে বটে; কিন্তু তোমাদের বিরুদ্ধে বা তাদের লেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠিত। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে তোমাদের উপর বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে দিতেন, তখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। এক্ষণে তারা যদি তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসম্পর্ক হয়ে যায় ও তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে এবং তোমাদের নিকট সন্ধির প্রস্তাব পেশ করে, তখন তাদের উপর আক্রমণ করার তোমাদের জন্য আল্লাহ্ কোন পথ করে দেননি। আর এক ধরনের মুনাফিক তোমরা পাবে, যারা তোমাদের নিকট থেকেও; নিরাপত্তা পেতে চায় এবং নিজ জাতির পক্ষ থেকেও; কিন্তু যখনই ফিতনা সৃষ্টির সুযোগ পাবে, তাতেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। এ ধরনের লোক তাদের মুকাবিলা করা থেকে যদি বিরত না থাকে, তোমাদের নিকট সন্ধি-শান্তির প্রস্তাব না দেয় এবং নিজেদের হস্ত তোমাদের উপর আক্রমণ করা থেকে বিরত না রাখে, তাহলে ওদেরকে যেখানেই ধরবে হত্যা করবে। এদের উপর আক্রমণ চালানোর কর্তৃত্ব ও অধীকার তোমাদেরকে সুস্পষ্ট করে দিলাম।

ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী’র তাফসীর অনুযায়ী আমাদের আলোচনা প্রেক্ষিতে উদ্ধৃত আয়াতটির সার বক্তব্য হচ্ছেঃ

১. মুশরিক, মুনাফিক ও সুপরিচিত ধর্মহীন-আল্লাহদ্রোহী লোকদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন জায়েয নয়।

২. বিশেষ করে হিজরাতের পর –অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও যে লোক ইসলাম কবুল করবে না ও হিজরাত করে ইসলামী রাষ্ট্রে আসবে না, তাদেরকেও মুসলমানদের বন্ধু বা মিত্র মনে করা যায় না। কেননা সেরূপ অবস্থায় হিজরাতই হচ্ছে ইসলাম গ্রহণের বাস্তব প্রমাণ। তাই অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ [আরবী****************************]

যারা হিজরাত করে আসেনি, তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই।

৩. তারা যদি হিজরাত না করে, বরং নিজেদের স্থানেই অবিচল হয়ে থাকে ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরে, তাহলে তাদের পাকড়াও কর যেখানেই পাও এবং হত্যা কর। এরূপ অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে কাউকেই বন্ধু রূপে গ্রহণ করবে না। ওদের কাউকে তোমাদের সাহায্যকারীও মনে করবে না।

৪. তবে যে লোকদের সাথে তোমাদের ‘যুদ্ধ নয়’ বা অন্য কোন ধরনের চুক্তি রয়েছে, হিজরাত থেকে বিরত থাকা মুসলমানরা যদি তাদের সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে তারাও সেই চুক্তির মধ্যে শামিল বলে গণ্য হবে। কেননা এটা অসম্ভব নয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে হিজরাত করে আসতে চাইলেও হয়ত কোনরূপ বাধা-প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ লোকদের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।

৫. যারা চুক্তিবদ্ধ লোকদের সাথে মিলিত হবে কিংবা যারা মুসলমান তথা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সন্ধি করতে ইচ্ছুক নয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন পথই আল্লাহ ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলমানদের জন্য খোলা রাখেননি।

৬. ‘যুদ্ধ নয়’ বা অন্য কোন ধরনের চুক্তি থাকলে চুক্তিবদ্ধ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না।

৭. যারা মুসলমানদের নিকট উপস্থিন হয়ে নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে প্রদর্শন করে, কিন্তু তাদের নিকট থেকে চলে গিয়ে মুসলমাদের বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই কোন-না-কোন ক্ষতিকর বা বিপর্যয়ের কাজে লিপ্ত হয়, তাদের সম্পর্কেও আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে, তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে পাকড়াও করতে হবে এবং হত্যা করতে হবে। কেননা প্রকাশ্য মুনাফিকী করছে ও মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করছে, যেহেতু তারা বাস্তবভাবেই প্রমাণ করেছে যে, ওরা মুসলমানদের সাথে শত্রুতা পরিহার করেনি। -[আরবী টীকা***********]

বস্তুত ওয়াদা খেলাফী ও চুক্তিভঙ্গ করা দ্বীনী ভাবধারাশূন্য লোকদের পরিচিতি। যে তা করে সে এই অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপিত করে যে, তার মধ্যে দ্বীনদারী বলতে বাস্তবিকই কিছু নেই। -[নবী করীম (স) বলেছেনঃ (আরবী******) যে লোক ওয়াদা পূরণ করে না, তার দ্বীন বা ধর্ম বলতে কিছুই নেই।]

এমন কি যে মুশরিকদের ঈমানদার লোকদের কঠোর শত্রু বলে ঘোষণা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ [আরবী******************************]

ইয়াহুদ ও মুশরিক লোক দিগকেই তুমি মু’মিনদের সবচাইতে বেশী কঠিন ও কঠোর শত্রু রূপে পাবে।

সেই মুশরিকদের সাথে কৃত ওয়াদা-চুক্তি রক্ষা করার জন্য তাকীদ করা হয়েছেঃ [আরবী*****************************************]

তোমরা যে মুশরিকদের সাথে চুক্তি করেছ, পরে তারা যদি সেই চুক্তির কিছুই ভঙ্গ না করে থাকে, তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকেই সাহায্য-ও না করে থাকে, তাহলে তাদের সাথে করা ওয়াদা-চুক্তিকে তার মেয়াদ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর।

তা সত্ত্বেও এই মুশরিকরা যদি তাদের করা কসম ভঙ্গ করে ও মুসলমানদের সাথে করা ওয়াদার বিরুদ্ধতা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। বলা হয়েছেঃ [আরবী*************************]

ওরা যদি তাদের ওয়াদা করার পর কিরা-কসম ভঙ্গ করে ও তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে গালমন্দ বলে, তাহলে তখন কুফরির এই সরদারদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর। ওদের কিরা-কসমের কোন মূল্য নেই –তাহলে হয়ত ওরা ওয়াদা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকবে।

নবী করীম (স) কাফিরদের সাথে করা চুক্তি রক্ষায় দৃষ্টান্তহীন অবদান রেখেছেন। সেই চুক্তির একটা ধারায় লিখিত হয়েছিলঃ ‘মক্কার কোন লোক মদীনায় পালিয়ে গেলে ও ইসলাম কবুল করলেও তাকে মুশরিকদের নিকট মক্কার ফেরত পাঠাতে হবে।

কোন কোন বর্ণনামতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই –[আবার অপর একটি বর্ণনানুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর মদীনায় ফিরে আসার পর] আবূ বুচাইর নামক মক্কারত ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হলো। সে মক্কায় ইসলাম কবুল করলে মুশরিকরা তাকে লৌহ-শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিল। পরে কোনভাবে সুযোগ পেয়ে সেই শৃঙ্খল পরা অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে সে রাসূলে করীম (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হলো। তখন সেই লোক বললঃ

ইয়া রাসূল! আপনি কি আমাদের মুশরিকদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন? জবাবে নবী করীম (স) বললেনঃ [আরবী******************************]

হে আবূ চুবাই। সন্ধিক অনুযায়ী তোমাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। অতএব তুমি যাও। আল্লাহ তোমার জন্য এবং তোমার মত দুর্বল অবস্থায় পতিত লোকদের জন্য নিশ্চয়ই কোন সুযোগ এবং মুক্তির কোন পথ বের করে দেবেন। -[আরবী********************]

আবূ জান্দালের ঘটনা আরও মর্মস্পর্শী। ঠিক সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার মুহুর্তে আবূ জান্দাল জিঞ্জির বন্দী অবস্থায় সন্ধিস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। কুরাইশ সরদার সুহাইল তাকে চপেটাঘাত করে। এই মুহুর্তে চৌদ্দশ’ কোষ মুক্ত কৃপাণ তার মস্তকে পড়তে কোন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু না, ইসলাম অশান্তি চায় না, সন্ধিশর্তের খেলাফ করারও অনুমতি দেয় না। -[আরবী টীকা*************]

এবং বাস্তবিকই আল্লাহ তা’আলা কিছু দিনের মধ্যেই তাদের জন্য মুশরিকদের কবল থেকে মুক্তিলাভের বিরাট সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তার বিস্তারিত বিবরণ পঠিতব্য।

সেই দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী*************************]

আর যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু হিজরাত করে দারুল-ইসলামে আসেনি, তাদের অভিভাবক হওয়ার কোন দায়িত্ব তোমাদের উপর বর্তে না, যতক্ষণ না তারা হিজরাত করে আসছে। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে তারা যদি তোমাদের নিকট সাহায্য চায়, তাহলে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তা-ও এমন কোন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে পারবে না, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। বস্তুত তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখছেন।

এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ইসলামের দৃষ্টিতে বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃত চুক্তি রক্ষা করা সর্বোপরি কর্তব্য। এমনকি কাফির-মুশরিকদের নির্যাতনাধীন নিপীড়িত মুসলিমদের সাহায্যার্থেও সেই চুক্তির বিরুদ্ধে কাজ করা যাবে না –সেই চুক্তি যে ধরনেরই হোক না কেন।

 

ইসলাম ও বিশ্বশান্তি

‘শান্তি’ কথাটি খুবই লোভনীয়, তা শুনবার জন্য মানুষ সব সময়ই উৎকর্ণ হয়ে থাকে। কেননা মানুষ স্বভাবতই শান্তির পক্ষপাতী, অশান্তির বিরুদ্ধে। মানুষ অন্তর দিয়ে কামনা করে, সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, একবিন্দু অশান্তিও যেন কোথাও না থাকে, অশান্তির কারণ যেন কখনই না ঘটে। দুনিয়ার মানুষ শান্তির জন্য পাগল। আর দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিবর্গ নিত্য নতুন শানিত মারণাস্ত্র নির্মাণে জাতীয় সম্পদের বেশীর ভাগ ব্যয় করছে। নিজেদের রক্ত-পিপাসা চরিতার্থ করার কুমতলবে কৌশলের পর কৌশল আঁটছে। তাদের পারস্পরিক চ্যালেঞ্জ শুনে বিশ্বমানবতা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।

কিন্তু মানুষ ভয়ে যতই কাঁপুক, শান্তির কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, শুধু তাই নয়, শান্তি যেন ক্রমশ কঠিন থেকেও কঠিনতর হয়ে উঠছে। বৃহৎ শক্তিবর্গ যেমন করে মারণাস্ত্র নির্মাণে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে, তাতে যে কোন মুহুর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়া অবধারিত মনে হয়। কেননা বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গের সাম্রাজ্যবাদী চণ্ডল নীতির ফলে দুনিয়ার বিভিন্ন দিকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে এবং বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, তবু তার মীমাংসা বা সমাপ্তি হচ্ছে না। তাতে মনে হয় –তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বশান্তির কোন সম্ভাবনাই লক্ষ্য করা যাবে না।

অপরদিকে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যাতে বেঁধে না যায়, সে জন্য চেষ্টারও কোন অভাব নেই। এজন্য বড় বড় সভা-সম্মেলন হচ্ছে, দাবির প্রচণ্ডতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মিছিল-বিক্ষোভ হচ্ছে। কেননা বিশ্বের মানুষ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য আদৌ প্রস্তুত নয়। একথা সকলেরই জানা আছে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি সত্যিই শুরু হয়, তাহলে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।

কিন্তু এতসব সত্ত্বেও বিশ্বযুদ্ধের আশংকা বিন্দুমাত্র কমছে না। কেননা প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অশান্তির কঠিন কারণসমূহ বিদূরণ কার্যত সম্ভব হয়ে উঠছে না। কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি বৃহৎ শক্তিবর্গের কর্ণকূহরে প্রবেশ করছে না, মারণাস্ত্র নির্মাণের প্রস্তুতি বন্ধ হচ্ছে না, পরস্পরে হুমকি প্রতি হুমকি দেয়াও চলছে অবিরাম।

এই প্রেক্ষিতে একথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলি একটা বিশ্ব রক্তপাত ছাড়া বোধ হয় থামবে না, যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রতি মুহুর্ত বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, যখন প্রকৃত যুদ্ধ ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।

 তার কারণও রয়েছে। কেননা বর্তমান দুনিয়ার পরাশক্তিসমূহের নিকট মারণাস্ত্র ছাড়া মানবিক আদর্শের কিছুই নেই, যা তারা গ্রহণ করে নিজেরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে, আর অপরাপর শক্তিগুলিকেও যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবে।

সত্যি কথা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্ব মনুষ্যত্ব বিবর্জিত। মানবিকতা বলতে কোন কিছুই কুত্রাপি দেখা যাচ্ছেনা। ফলে পাশবিকতার ও পশ্বাচারই মানুষের আকৃতিতে নৃত্য করছে সমগ্র বিশ্বের নাট্যমঞ্চে। পুঁজিবাদী –তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশ হোক আর সমাজতান্ত্রির স্বৈরতন্ত্র হোক মানবিক আদর্শের হাতিয়ার কারোর নিকট নেই।

তাই একথা বলার সময় উপস্থিত হয়েছে যে, একমাত্র ইসলাম-ই পারে বর্তমান যুদ্ধ-ঝঞ্ঝা প্রকম্পিত বিশ্বকে শান্তির সন্ধান দিতে। বিশ্বশান্তির জন্য যে মানবিক আদর্শের প্রয়োজন, তা কেবল ইসলামেই রয়েছে।

তার বড় প্রমাণ, ‘ইসলাম’ শব্দটিই নির্গত হয়েছে ‘সালামুন (আরবী******) ধাতু থেকে, যার আর এক অর্থ সন্ধি, সমৃদ্ধি। এই শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকেই কুরআন আহবান জানিয়েছে ঈমানদার লোকদেরকে। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী******************************]

হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা সম্পূর্ণরূপে ইসলামে –সন্ধি, সমৃদ্ধিতে –প্রবেশ কর।

আর আজকের শত্রুও যদি সন্ধি ও সন্ধির পরিণতিতে সমৃদ্ধির জন্য আগ্রহান্বিত হয়, তা তার সাথে সন্ধির হাত মিলাতে দ্বিধা করা যাবে না। বলা হয়েছেঃ [আরবী**************************]

শত্রুও যদি শান্তি ও সন্ধি-সমৃদ্ধির জন্য আগ্রহী হয়, তাহলে তুমিও তার জন্য আগ্রহী হও।

কুরআনের চিরন্তন আহবান হচ্ছে শান্তি রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। এমন কি, পারিবারিক ক্ষুদ্র সংকীর্ণ পরিবেশেও শান্তি-সমৃদ্ধির ব্যবস্থা ইসলামই উপস্থাপিত করেছে। কেননা তাই হচ্ছে বৃহত্তর পরিবেশের প্রাথমিক স্তর। বলা হয়েছেঃ [আরবীঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ]

সন্ধি-সমৃদ্ধি-ই সর্বোত্তম ও সর্বাধিক কল্যাণের বাহক।

ইসলাম সব মু’মিন পুরুষ-নারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে কোনরূপ বিরোধ বা বিবাদ দেখা দিলে তা দূর করে অবিলম্বে সন্ধি কায়েম করে সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। বলা হয়েছেঃ [আরবী**************************************]

মু’মিনরা সব পরস্পর ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের এই ভাইদের মধ্যে সর্বদা সন্ধি-সমৃদ্ধি স্থাপন করতে থাক।

আর মুসলমানদের দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ ও যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায়, তাহলে গোটা মুসলিম সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে –তাদের মধ্যে অনতিবিলম্বে মীমাংসা করে দেয়া এবং প্রয়োজন হলে সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে সম্মিলিত হয়ে যুদ্ধ করা, তাকে মীমাংসা মেনে নিতে বাধ্য করা। বলা হয়েছেঃ [আরবী***************************************]

মু’মিনদের দুটি পক্ষ যদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে হে মুসলিমগণ! তোমরা সেই পক্ষদ্বয়ের মাঝে সন্ধি করে দাও। পরে যদি এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর সীমালংঘন ও আগ্রাসন করে বসে, তাহলে তোমরা সকলে সম্মিলিতভাবে সেই পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না সেই পক্ষ আল্লাহর ফয়সালা –মীমাংসার দিকে ফিলে আসে। যদি ফিরে আসে তাহলে তখন উভয় পক্ষের মাঝে ন্যায়পরতা সহকারে মীমাংসা ও সন্ধি করে দাও। আর তোমরা সকল ক্ষেত্রে সুবিচার ও ন্যায়পরতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। কেননা আল্লাহ ন্যায়পরতা ও সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।

ইসলামের এসব আদেশ ও বিধানের চরম লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি রক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষ পরম শান্তি নিরাপত্তা সহকারে জীবন-যাপন করতে পারে। ইসলামের এই লক্ষ্য যেমন মুসলিম জনগণের মধ্যে, তেমনি সমগ্র মানব সমাজের মধ্যেও নিবন্ধ। তাই আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবীঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ]

অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তোমাদের ও যাদের সাথে আজ তোমরা শত্রুতার সৃষ্টি করে ফেলেছ তাদের মধ্যে ভালোবাসার সঞ্চার করে দেবে। আল্লাহ তো বড়ই শক্তিমান, তিনি অতীব ক্ষমাশীল, দয়াবান।

বস্তুতই ইসলাম মানব জীবনের সকল দিকে ও ক্ষেত্রেই শান্তি স্থাপনে পক্ষে সচেষ্ট।

নবী করীম (স) আল্লাহর এই বিধানকে বাস্তবে অনুসরণ করেছেন এবং সমস্ত কাজ আল্লাহর দেখিয়ে দেয়া পন্থা ও পদ্ধতিতে আঞ্জাম দিয়েছেন।

মক্কা বিজয়কালে তিনি যে পরম মানবতাবাদী অবদান রেখেছেন, তা চিরকালের ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি সেদিন হযরত সায়াদ ইবনে উবাদা (রা)-র হাতে পতাকা দিয়েছিলেন। তিনি সেই পতাকা নিয়ে যখন অগ্রসর হলেন, আবূ সুফিয়ানকে দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সম্বোধন করে বললেনঃ [আরবী***************************]

হে আবূ সুফিয়ান! আজকের দিন লড়াই জাবাইর দিন, আজকের দিন সমস্ত হারাম হালাল হওয়ার দিন আজ আল্লাহ কুরাইশদেরকে লাঞ্ছিত করেছেন।

একথা শুনতে পেয়েই নবী করীম (স) বলে উঠলেনঃ [আরবী********************************]

না, আজকের দিন ক্ষমা ও দয়ার দিন। আজ-ই আল্লাহ কুরাইশদের সম্মানিত করেছেন। -[ আরবী টীকা*****************]

এ তো অনেক পরবর্তী সময়ের কথা। তার পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধি মক্কার কুরাইশদের সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। হুদায়বিয়ার এই সন্ধির ইতিহাস ও দলীল-দস্তাবেজ ইসলামের শান্তি প্রয়াসের উজ্জ্বল অকাট্য দলীল। তাতে কুরাইশদের দাবি অনুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর নামের পর ‘রাসূলুল্লাহ’ লেখাও বাদ দিয়েছিলেন। -[আরবী টীকা*****************]

 

যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের নীতি

প্রাচীন কালের ন্যায় আধুনিক কালের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারটি অত্যন্ত নাজুক ও মর্মস্পর্শী। আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক রাজনীতির দিক দিয়ে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবন্দীদের কতকগুলি বিশেষ অধিকার প্রখ্যাত ‘জেনেভা কনভেশনে’ স্বীকৃত হয়েছে এই সেদিন। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছে চৌদ্দশ বছর পূর্বে। আর সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য জরুরী আইন-বিধানও উপস্থাপিত করেছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধবন্দী দুই প্রকারেরঃ

যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চলাকালে যারা আত্মসমর্পণ করেনি; কিন্তু তারা বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছে, এদের ব্যাপারে সরকারের ইখতিয়ার রয়েছে, তাদের হত্যা করতে পারে। বিপরীত দিক দিয়ে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা যেতে পারে, যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এরা এক ধরনের যুদ্ধবন্দী।

অপর ধরনের যুদ্ধবন্দী তারা, যারা যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হবে। এদেরকে হত্যা করা যাবে না। এ ধরনের বন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো, সরকার হয় নিছক অনুগ্রহের বশবর্তী হয়ে মুক্ত করে দেবে, না হয় বিনিময় গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে। এর কোনটি সম্ভব না হলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখা হবে। এই সময় তারা ইসলাম কবুল করলেও তাদের এই দাস-অবস্থা পরিবর্তিত হবে না। ফিকহবিদদের অধিকাংশই এই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের ঘোষণা হচ্ছেঃ [আরবী******************************************]

কোন নবীর নিকট বন্দী পড়ে থাকা শোভন নয় –যতক্ষণ না সে যমীনে শত্রুবাহিনীকে নিঃশেষ ও খুব বেশী করে রক্তপাত করবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্ত চাও, অথচ আল্লাহর লক্ষ্য হচ্ছে পরকাল। আর আল্লাহ সর্বজয়ী সুবিজ্ঞানী।

আয়াতের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, পৃথিবীতে ইসলামের দুশমনদের রক্তপাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পৃথিবীতে ইসলামের কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করাই নবীর দায়িত্ব, যেন মুশরিক ও কাফিরদের ঔদ্ধতের মস্তক চূর্ণ হয়, ধুলায় লুষ্ঠিত হয় এবং দুর্বল ও শক্তিহীণ হয়ে যায়। বন্দীদের প্রথম প্রকারের সাথে এ কথার মিল রয়েছে এবং অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ [আরবী*************************]

অতএব এই লোকদেরকে যদি তোমরা যুদ্ধের ময়দানে ধরে ফেলতে পার, তাহলে তাদের এমনভাবে বিধ্বস্ত করবে যে, অপর যেসব লোক তাদের মত আচরণ করবে, তারা যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।

মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গকারীদের সম্পর্কে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এতে নবী করীম (স)-এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে যে, ইসলামী বাহীনি যখন ময়দানে কাফির-মুশরিকদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাতে জয় লাভ করবে, তাদেরকে ধরে ফেলতে পারবে, তখন তাদের উপর ওয়াদা ভঙ্গের চূড়ান্ত ধরনের প্রতিশোধ নিতে হবে, তাদের ক্ষেত্রে নির্মম শাস্তি কার্যকর করতে হবে। তাদের উপর এমন প্রভাব ফেলতে হবে, যেন তা দেখে অন্যান্য লোকেরা শিক্ষা গ্রহণ করে, রীতিমত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, ভয়ে থর-থর করে কাঁপে এবং চুক্তিভঙ্গ করার দুঃসাহস যেন কেউ না করতে পারে। তারা যেন নিরুপায় ও অক্ষম হয়ে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে আসার ইচ্ছা চিরতরে ত্যাগ করে ও স্থান ত্যাগ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। উদ্ধৃত আয়াতটি এই প্রথম প্রকারের বন্দীদের সম্পর্কে কথা বলছে। যেহেতু যুদ্ধ চলাকালে –যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে, তাই তাদেরকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে হবে।

আল্লাহর কথাঃ [আরবী**********************]

তাদের এমন কঠিন শাস্তি দেবে যে, পিচনের লোকেরা ভয় পেয়ে পিছু হটতে ও সম্মুখ-সমর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

সেই সাথে আল্লাহর এই কথাটিও পঠনীয়ঃ [আরবী*********************************]

অতএব এই কাফিরদের সাথে যখন তোমাদের সম্মুখ-সংঘর্ষ সংঘটিত হবে, তখন প্রথম কাজ-ই হলো গর্দানসমূহ কর্তন করা। এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোবাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর (তোমাদের ইখতিয়ার রয়েছে যে,) অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্তমূল্য গ্রহণের চুক্তি করবে –যতক্ষণ না যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করে।

মনে হয়, ‘যুদ্ধ যতক্ষণ না অস্ত্র সংবরণ করে’ কথাটি ‘গর্দান মারা –কর্তন করা’ কাজের শেষ মুহুর্ত অর্থাৎ হত্যা ও শাস্তিদানের কাজটি করতে হবে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে। অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে আটককৃত লোকদের হত্যা করার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট সময় হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতঃপর এ কাজ আর চলতে পারে না।

আর যাদেরকে যুদ্ধ শেষ হওয়া ও অস্ত্র সংবরণের পর বন্দী করা হবে, তাদের সম্পর্কে কুরআনের ফয়সালা হচ্ছেঃ [আরবী************************************************]

এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্ত বিনিময়ে ছেড়ে দেবে।

এ আয়াত ইসলামী সরকারকে ইখতিয়ার দিচ্ছে, বিনামূল্যে বিনা বিনিময়ে ছেড়ে দেবে, না হয় বন্দী বিনিময় করবে কিংবা নগদ মূল্য গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে।

তবে উক্ত পন্থা দু’টির কোন একটি করাও সম্ভব না হলে তখন তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে।

এখানে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছেঃ

প্রথম –যুদ্ধ চলাকালে ধৃত বন্দীদের হত্যা করা একটা বিশেষ অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ সময় বা কালের সাথে নয়। বরং এ সিদ্ধান্ত চিরকালের কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর এবং শাশ্বত, যদিও তা একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বিধান দেয়া হয়েছে, সেই রূপ অবস্থা যখন এবং যেখানেই দেখা দেবে তখন এই নির্দেশ পালনীয় হবে। অনুরূপ অবস্থার বন্দীদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকে এরূপ অবস্থা বারবার দেখা দিয়েছে এবং তখন তা-ই করা হয়েছে, যার নির্দেশ উক্ত আয়াতে দেয়া হয়েছে। সেকালে এই বন্দীদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের সংরক্ষণ করা নানা কারণেই অসম্ভব ছিল, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথায়ও কোন সন্দেহ নেই যে, এই সব যুদ্ধরত অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারত।

এই প্রেক্ষিতেই কুরআনের এ সিদ্ধান্ত বিবেচ্য ও বিচার্য। তবে বর্তমান কালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলিমগণ যখন শক্তিশালী ও উক্ত রূপ অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হওয়া ও তাদের সংরক্ষণ খুব একটি দুঃসাধ্য না হওয়ার প্রেক্ষিতে –বিশেষ করে তাদের হত্য করায় মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের দুর্বল হয়ে পড়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই –তখনও কি এই সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হবে?

হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত কুরআনী ফিকহবিদ আল্লামা আল-জাসসাস এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে লিখেছেনঃ

কুরআনের উপরোক্ত বিধান দেয়া হয়েছিল যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম আর মুশরিক কাফির শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। এরূপ অবস্থায় মুশরিকদের রক্তপাত করা ও হত্যাকাণ্ডের দ্বারা তাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার পর যারা থেকে যাবে তাদের বাঁচিয়ে রাখা জায়েয। তাই উক্ত হুকুমটি তখনকার জন্য কার্যকর, যখন সেই অবস্থা দেখা দেবে যে অবস্থা প্রাথমিক কালের মুসলমানদের ছিল। -[আরবী টীকা*******]

দুইট শত্রু বাহিনী যখন পরস্পরের সম্মুখ-সমরে অবতীর্ণ হবে, তখন শত্রু হত্যা ও নিধন কাজে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা আমাদের কর্তব্য। তাদেরকে বন্দী করতে চেষ্টা না করাই উচিত। কেননা তাতে আমাদের দুর্বলতাই প্রমাণিত হবে। আর ওরা আমাদের উপর অগ্রবর্তিতাই পেয়ে যাবে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা যখন শত্রুদের হত্যা কার্য সম্পন্ন করে ফেলব –ও ওদের হত্যা ও জখম করব, তখন ওদের উপর আমাদের অগ্রবর্তিতা প্রতিষ্টিত হবে। সেই শেষ মুহুর্তে যাদের ধরা হবে তাদেরকেই বন্দী বানানো হবে। -[আরবী টীকা*****************]

দ্বিতীয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধৃত শত্রুসৈন্যদের ব্যাপারে তিনটির যে কোন একটি পন্থা গ্রহণ করার রাষ্ট্র-সরকারের ইখতিয়ার রয়েছে –তন্মধ্যে তাদেরকে দাস বানাবার-ও ইখতিয়ার, এই পর্যায়ে খাটিকটা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

দাস বানানোর মূলে প্রধান কারণ এই যে, কোনরূপ বিনিময় ব্যতীতই কিংবা বিনিময়ের ভিত্তিতে তাদেরকে ছেড়ে দিলে পুনর্বার তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো –ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে বসা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। এই আশংকা একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রচনা করে। এছাড়া বর্তমান দুনিয়ার রেওয়াজ অনুরূপ কাঁটা তারের বেড়া রচনা করে তার মধ্যে আটকে রাখাও সব সময় সহজ বা সম্ভব হয় না। তখন বন্দীদেরকে দাস বানিয়ে নাগরিকদের মালিকানায় সঁপে দিয়ে ‘হজম’ (absorb) করে ফেলা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকে না।

উপরন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই বন্দীদেরকে হত্যা করার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। এরূপ অবস্থায় দাস বানিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না।

বরং এই পন্থা গ্রহণে একটি বিরাট মানবিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা এভাবে যে, এই বন্দীদেরকে যখন বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের মালিকত্বে –অভিভাবকত্বে –ছড়িয়ে দেয়া হবে, তখন তারা মুসলমানদের নিকট-সংস্পর্শে সাহচর্যে আসবার, তাদের মানবিক সহানুভূতি ও দায়িত্ব সচেতনতা সঞ্জত লালন-পালন পেয়ে তারা মুক্ত-স্বাধীন জীবন যাপনেরই স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। তখন তারা ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের ইসলামী চরিত্র অনুধাবন ও গ্রহণ করার বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে।

এরূপ অবস্থায় বন্দীদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা ইসলামী রাষ্ট্র সরকারকে তিনটির যে-কোন একটি পন্থা গ্রহণের ইখতিয়ার দিয়েছেন, যেন বাস্তব অবস্থা প্রেক্ষিতে উত্তম বিবেচিত পন্থা গ্রহণ সম্ভবপর হয় –এ যেমন মহান আল্লাহর একটি অতি বড় মেহেরবানী, তেমনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত –তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না।

 

ইসলামী সমাজে দাসদের অবস্থান

এ কথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলামী সমাজে এই দাসদের অবস্থান অন্যান্য অনৈসলামী সমাজে ‘স্বাধীন’ নামে পরিচিত নাগরিকদের তুলনায় কিছু মাত্র খারাপ নয়। কেননা যুদ্ধবন্দী –দাসদের ব্যাপারে ইসলামের একটা বিশেষ মানবিক নীতি রয়েছে। ইসলাম এই বন্দীদের প্রতি মানবিক মর্যাদা দেয়ার তাকীদ করেছে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। সেই সাথে তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন মমত্ববোধ ও শুভ আচরণ গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী***************]

তোমরা বন্দীদের প্রতি কল্যাণময় আচরণ গ্রহণ করবে। –[আরবী টীকা**************************]

খায়বর যুদ্ধশেষে হযরত বিলাল (রা) দুইজন নারীকে ধরে ইয়াহুদী পুরুষ নিহতদের স্তূপের নিকট নিয়ে গেলেন তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে। নিহতদের স্তূপ দেখে একটি মেয়ে ভয়ে-আতংকে চিৎকার করে উঠল এবং নিজের মাথায় মাটি মেখে বিলাট করতে শুরু করে দিল। পরে দুজনকেই বাঁচিয়ে দেয়া হয়। তাদের একজ হচ্ছেন উম্মুল মু’মিনীন হযরত সফীয়া বিনতে হাই ইবনে আখতাব (রা)।

রাসূলে করীম (স) মহিলা দুইজনের পাকড়াওকারী হযরত বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ [আরবী********************]

হে বিলাল! তুমি যখন মহিলা দুইজনকে তাদের পুরুষদের বধ্য ভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলে, তখন দয়া-মায়া বলতে কি তোমার অন্তরে কিছুই ছিল না?

বন্দীদের রীতিমত খাবার ও পানীয় দেয়ার জন্য নবী করীম (স) বিশেষভাবে তাকীদ করেছেন। বলেছেনঃ [আরবী**************]

বন্দীদের পানাহারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বন্দীকারীদের উপর অর্পিত।

ইসলাম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রেও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির হাত-পা-নাক-কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে অত্যন্ত জোরের সাথে নিষেধ করেছে। এজন্য কুরআনে হেদায়েত দেয়া হয়েছেঃ [আরবী*************************]

আর তোমরা যদি প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে শুধু ততটুকুই গ্রহণ করবে, যতখানি তোমার উপর অত্যাচার করা হয়েছে। আর যদি ধৈর্য ধারণ করতে পার তাহলে নিঃসন্দেহে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অতীব কল্যাণ রয়েছে।

হে মুহাম্মদ! ধৈর্য সহকারে কাজ করতে থাক –আর তোমাদের এই ধৈর্যও আল্লাহরই দেয়া তওফীকের ফল –এই লোকদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হবে না এবং তাদের অবলম্বিত কৌশল-ষড়যন্ত্রের দরুন তোমার দিল ভারাক্রান্ত করো না। -[ওহুদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-র লাশ পেট ছেড়া ও কলিজাশূণ্য অবস্থায় দেখতে পেতে রাসূলে করীম (স)-এর মনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষিতে এই আয়ান : তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন]

 

সীমালঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি

ইসলামে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও অন্যতম পন্থা। ইসলামী অবস্থার প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনবোধে এই পন্থার আশ্রয় নিতে পারে। তবে সেজন্য সামরিক লক্ষ্য সুস্পষ্টরূপে থাকা জরুরী শর্ত। অর্থাৎ কৌশলগত লক্ষ্যের বেষ্টনীতে শত্রুর সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা উদ্দেশ্যেই তা করা যেতে পারে। ইসলাম এই কৌলশটি প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় কেবলমাত্র সীমালঙ্ঘনকারী ও আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে। সাধারণ ও নিরপরাধ লোকদেরকে কোনরূপ অসুবিধায় ফেলার কোন অধিকার ইসলাম কাউকেই দেয় না।

আর এটাই নবী করীম (স)-এর এক অশ্বারোহী বাহিনী সুমামাতা ইবনে আসাল নামক এক ইমামা অধিবাসীকে বন্দী করে। রাসূলে করীম (স) তার সাথে শুভ আচরণ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। পরে সে ইসলাম কবুল করে। পরে মক্কায় উমরা করার জন্য চলে যায়। তখন মক্কার কুরাইশরা তাকে আটক করে এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তি বললঃ লোকটিকে ছেড়ে দাও। কেননা তেমরা কুরাইশরা নিজেদের জীবিকার জন্য ইমামা যাতায়াত করতে বাধ্য হও। পরে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। অতঃপর লোকটি ইমামা উপস্থিত হয়ে মক্কার উপর অর্থনৈতিক বয়কট চালু করে দেয় এবং মক্কায় কোন জিনিসই যাতে না পৌঁছায়, তার শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে মক্কার অধিবাসীরা ভীষণ সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তখন মক্কার লোকেরা রাসূলে করীম (স)-কে পত্র লিখে এই মর্মেঃ

আপনি তো রক্ত সম্পর্কের হক আদায়ের উপর খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অথচ আপনিই তাদের সাথে রক্তসম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আপনি আপনার পৈতৃক বংশের লোকদের তরবারী দ্বারা হত্যা করেছেন। আর বাচ্চাদের হত্যা করিয়েছেন ক্ষুধায় কাতর করে।

এই পত্র পেয়ে নবী করীম (স) সুমামা (রা)-কে নির্দেশ দিলেন তাঁর আরোপিত প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করার। -[আরবী টীকা**************]

শত্রুর বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি শত্রুকে দমন করার একটা কৌশল হওয়া এবং ইসলামে তা অবৈধ না হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন নিছক এই কারণে যে, তদ্দরুন সাধারণ নিরাপরাধ মানুষ কষ্ট পাচ্ছিল।

যুদ্ধাস্ত্র সীমিতকরণ

বর্তমান সময়ের দুনিয়ার প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ বন্ধকরণ কিংবা সীমিতকরণ পর্যায়ে যথেষ্ট চেষ্টা-প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুনিয়ার শান্তিকামী চিন্তাবিদ মনীষীগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও প্রচার করে আসছেন! কিন্তু এ কথায় কোনই সন্দেহ নেই যে, এর কোন কিছুই সাফল্যমণ্ডিত হয়নি। বিশেষ করে দুনিয়ার বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গ মুখে অস্ত্র সংবরণের কথা যত বলে, তার তুলনায় অনেক বেশী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করছে। তদ্দারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করছে যেমন, তেমনি দুনিয়ার বাজারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যাপকভাবে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বলা যায়, বর্তমান দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা সবচাইতে বড় পণ্য হচ্ছে মানুষ মারার অস্ত্র। সারাটি দুনিয়ায় অস্ত্রের কালোবাজারী চলছে। আর দুনিয়ার যেসব বড় বড় দেশ অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের জন্য বড় বড় কথা বলে, আন্তর্জাতিক সভা-সম্মেলন করে মানবদরদী বক্তৃতা-ভাষণ দিচ্ছে, তারাই এই মারণাস্ত্রের কালোবাজারীতে তীব্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওরা মানুষের প্রতি দরদ দেখাবার ভান করে মানুষ মারার হাতিয়ার দেশে দেশে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে সেসব দেশের শাসক-বিরোধী নির্যাতিত জনতার রক্তের বন্যা প্রবাহিত করার লক্ষ্যে।

একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তা হচ্ছে, মানুষ স্বভাবতই আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রবণ।প্রত্যেকেই চায়, অন্য সকলের উপর তার কর্তৃত্ব হোক, সকলেই তার কর্তৃত্ব মেনে চলুক। আর এজন্য লক্ষ্যার্জনের উপায় নিত্য নব ও উন্নত মানের অ-সরল-অস্বাভাবিক (Sophisticated) অস্ত্র উদ্ভাবনের মূলে এই কারণ নিহিত বললে কিছু মাত্র অতুক্তি হবে না।

কাজেই অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের কোন আন্দোলন সফল হওয়ার প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর।

ঠিক এই কারণে ইসলাম অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। তবে ইসলামের অবদান হচ্ছে, অস্ত্র নির্মাণের লক্ষ্যে বদলে দিয়েছে এবং অস্ত্রের ব্যবহার নৈতিক নিয়ম-নীতি ও বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে চায়।

ইসলাম শুধু অস্ত্র নির্মাণ বা তার ব্যবহারই নয়, বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বা রক্তপাতের লক্ষ্য ও ক্ষেত্র হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন জিনিস পেশ করেছে। ব্যক্তিগত বা জাতিগত আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কেননা শুধু মানুষকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করার পরিণতিই নিয়ে আসে। তার পরিবর্তে ইসলাম মানুষকে একটি অনন্য সাধারণ আদর্শ দিয়েছে এবং মানুষের উপর নিজের বা নিজের জাতির নয়, একমাত্র আল্লাহর নিরংকুশ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার আহবান জানিয়েছে।

এভাবে অস্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্যই পরিবর্তিত হয়ে এবং সেই লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে শক্তি অর্জন ও অস্ত্র নির্মাণ, সংগ্রহ একান্ত জরুরী বলে ঘোষণা করেছে।

এক কথায় ইসলাম বৈষয়িক কোন জিনিসের পরিবর্তে ঈমান-কারীদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের এ লড়াই এবং অস্ত্রের ব্যবহার পাশবিকতার পরিবর্তে সম্পূর্ণ মানবিকতাবাদী, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে দয়া-ভালোবাসা ও সংশোধনী দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরভাস্বর।

ইসলামের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার ক্ষেত্র বিশেষে অপরিহার্য। বৈষয়িকতা –তথা আল্লাহদ্রোহীতামূলম জীবন-বিধানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেই তথায় আল্লাহ-বিশ্বাসী ও খোদানুগত জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তাই কুরআনের নির্দেশ হচ্ছেঃ [আরবী*******************]

এবং তোমরা যতদূর তোমাদের পক্ষে বেশী শক্তি ও সদা সজ্জিত বাঁধা অশ্ববাহিনী সংগ্রহ ও প্রস্তুত করে রাখ। উহার সাহায্যে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখবে –এছাড়া আরও দুশমন রয়েছে, যাদের তেমারা জানো না, আল্লাহই তাদেরকে জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরা মাত্রার শুভ ফল তোমাদেরকে আদায় করে দেয়া হবে। তোমাদের উপর কখনই জুলুম করা হবে না।

আয়াতটি থেকে স্পষ্ট জানা যায়, আল্লাহ নিজেই মুসলিমদের শক্তি ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন;কিন্তু তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে মুসলমানদের ও আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা, যেন তারা আল্লাহর দ্বীনের সাথে এবং সেই দ্বীনের ধারক মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করার মত সাহসও না পায়; বরং তারা আল্লাহ ও মুসলিমদের ভয়ে সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। অন্য কথায় সর্বত্র যেমন আল্লাহর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে এংব আল্লাহর রাষ্ট্র্রীয় সার্বভৌমত্বের এক মাত্র পক্ষপাতী মুসলিমদের প্রাধান্য স্থাপিত থাকে। আর এই শক্তি ও যুদ্ধের সরঞ্জার সংগ্রহে যে ধন-সম্পদ নিয়োজিত ও ব্যয়িত হবে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।

স্পষ্ট কথা, শক্তি ও অস্ত্র সংগ্রহের মূল লক্ষ্যই হলো প্রধানত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও কাফেরী শক্তিকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা।

 

ইসলামে কূটনৈতিক সতর্কতা-সংরক্ষণতা

ইসলামের একটা নিজস্ব সমর-নীতি ও সমর-কৌশল (Strategy) রয়েছে। শান্তি ও সন্ধির সময়ের জন্যও রয়েছে অনুসরণীয় বিশেষ নীতি ও আদর্শ। কূটনৈতিক রীতি-নীতি ও পদ্ধতি এই পর্যায়ে গণ্য।

ইসলামে কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, রাষ্ট্রদূত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের একটা বিশেষ স্থান ও মর্যাদা রয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে একটা বিশেষ সতর্কতা ও সংরক্ষণতা। তার দৃষ্টান্ত কুত্রাটি লক্ষ্য করা যাবে না।

ইসলামী রাষ্ট্রে বিদেশী রাষ্ট্রের কুটনীতিকদের পক্ষে এই রাষ্ট্রের আদর্শের পরিপন্থী মত প্রকাশেরও অধিকার রয়েছে। তা করলে তদ্দরুন তাকে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে না। তার কোন ক্ষতি সাধিত হবে না ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলিম জনগণের হাতে।

এখানে আমরা এই পর্যায়ের একটি মাত্র ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পেশ করছি। মিথ্যা নবুয়্যাতের দাবিদার মুসায়লামা ইবদনে হুবাইব রাসূলে করীম (স)-এর নিকট লিখিত এক পত্র সহ দুইজন প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। তাতে লিখিত ছিলঃ

আমি নবুয়্যাতের ব্যাপারে আপনার সাথে শরীক। তাই অর্ধেক দেশ আমার, আর অপর অর্ধেক কুরাইশদের জন্য। কিন্তু কুরাইশরা সীমালংঘনকারী লোক।

এই পত্রের বাহকদ্বয়কে রাসূলে করীম (স) জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘তোমরা দুইজন কি বল’? বললঃ আমাদেরও বক্তব্য তাই, যা এই পত্রে রয়েছে।

তখন নবী করীম (স) মুসায়লামাকে যে পত্র লিখেছিলেন, তা এইঃ [আরবী***********************]

মহান দয়ময় মেহেরবান আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের নিকট থেকে মিথ্যাবাদী মুসায়লামার নিকট প্রেরিত এই পত্র। শান্তি তার প্রতি, যে আল্লাহর নিকট থেকে আসা হেদায়েতের বিধান মেনে নেবে ও অনুসরণ করে চলবে। অতঃপর বক্তব্য এই যে, এই পৃথিবীর মালিক তো আল্লাহ। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর শুভ পরিণতি কেবলমাত্র মুত্তাকী লেকাদের জন্য। -[আরবী টীকা*************]

নবী করীম (স) মুসায়লামা প্রেরিত দূতদ্বয়ের প্রতি যে আচরণ গ্রহণ করলেন তা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে লক্ষণীয়। তারা দ্বীন-ইসলামের মূল আকীদার পরিপন্থী মত প্রকাশ করেছিল; কিন্তু রাসূলে করীম (স) সেজন্য তাদের প্রতি কোন আক্রমণাত্মক বা প্রতিশোধমূলক আচরণ গ্রহণ করেননি।

আর স্বয়ং মুসায়লামাকে রাসূলে করীম (স) যে জবাব লিখে পাঠিয়েছেন, তা আরও অধিক গুরুত্বের অধিকারী। দুইখানি পত্রের বক্তব্যের মধ্যে তুলনা করলেই উভয়ের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যের আসল রহস্য উদঘাটিত হতে পারে। রাসূলে করীম (স) প্রেরিত পত্র থেকে নবুয়্যাতের পবিত্র ভাবধারার সৌরভ মন-মগজকে আলোড়িত করে। তাতে নিহিত প্রকৃত নিষ্ঠা, নিঃস্বার্থপরতা, মহান আল্লাহর নিরংকুশ সার্বভৌমত্ব মালিকত্বের অপূর্ব এবং অত্যন্ত বলিষ্ঠ প্রকাশ। আর অপর চিঠিটির ভাষাহীন স্বার্থপরতা, লোভ, অহংকার ও আত্মন্তরিকতায় প্রকট।

 

একক ও পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি

রাষ্ট্রের বৈদেশীক নীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতির সাথে পারস্পরিক চুক্তিকে দুভাগে বিভক্ত করা যায়ঃ

১. এক- পক্ষীয় ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি।

২. দ্বি-পক্ষীয় চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি।

এক পক্ষীয় ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি ওয়াদা-প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে অন্যন্ত সরল ও সহজ রূপ। একটি রাষ্ট্রীয় বা সার্বভৌম শক্তি কতগুলি নিদির্ষ্ট ব্যাপারে প্রাথমিক পযার্য়ে অপর একটি সার্বভৌম শক্তি বা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করে। তা স্বীকার করে নেয় যে, তাকে স্বীকৃতি (Recognition) দিচ্ছে, তার সাথে শক্তিপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে আগ্রহী, তার উপর কোনরূপ আগ্রাসন না করার ওয়াদা করছে, তার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারাদিতে কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ইসলামে এরুপ চুক্তি প্রতিশ্রুতির দৃষ্টান্ত রয়েছে।

নবী করীম (স) তাবুক যুদ্ধ গমনকালে রোমান সাম্রাজ্যের সন্নিহিত এলাকায় পৌছে গিয়েছেলেন। অতঃপর তাবুক উপস্থিত হলে আইলা অধিপতি ইয়াহ না ইবনে রুবা তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে রাসূলে করীম (স)- এর সাথে সন্ধি করল। নবী করীম (স) তাকে একটি লিখিত দলিল দিলেন। তাতে নিম্নোদ্ধৃত কথাগুলি লিখিত ছিলঃ

[আরবী টীকা*****************]

পরম দয়াময় দয়লু আল্লাহর নামে। এটা নিরাপত্তা পত্র- আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল নবী মুহাম্মদের পক্ষ থেকে ইয়াহ না ইবন রু ‘বা ও ইয়ামন অধিবাসীদের জন্য। স্থল ও জলভাগে তাদের জাহাজ-নৌকা ও অন্যান্য যানবাহন চলবে, ওদের জন্য আল্লাহর  যিম্মা রয়েছে নবী মুহাম্মদের যিম্মা। আর সিরিয়া, ইয়মন ও সমুদ্র এলাকার এবং তাদের সঙ্গী- সাথে লোকগণও এই যিম্মাদারীর অন্তর্ভুক্ত। কেউ যদি তাদের মধ্য থেকে কোন দুর্ঘটনা ঘটায় তাহলে ধন- মাল তাদের জীবন-প্রাণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না: তা উত্তম- উৎকৃষ্ট বিবেচিত হবে, সেখানেই চলাচল করতে নিষেধ করা কারোর জন্য হালাল হবে না, এমনিভাবে স্থল ও জলপথে যেখানেই তারা উপস্থিত হবে, তাদের চলাচলে কোনরূপ বাধা দেয়া চলবে না।[আরবী******]

নবী করীম (স) এই লিখিত চুক্তিপত্রে উক্ত লোকদরে জন্য সর্বাবস্থা ও সর্বক্ষণের জন্য পূর্ণ নিরাপত্ত দিলেন। তাদের বেঁচে থাকার ও জীবন যাপনের পূর্ণ অধিকার স্বীকার করে নিলেন। তাদের নিকট থেকে কোন জবাবী প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি গ্রহণ না করেই তিনি তাদের চলাচলের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে দিলেন।

আর পারস্পরিক বা দ্বি-পাক্ষিক চুক্তিবদ্ধ হয় এবং নিজের জন্য বাধ্যতামূল করে নেয়। যেমন উভয় পক্ষ একই ওয়াদা করল যে, তদের কোন পক্ষই অপর পক্ষের জন্য কোন অসুবিধার সৃষ্টি করবে না, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না প্রভৃতি। কখনও এও হয়ে যে, উভয় পক্ষ-ই কতিপয় বিষয়ে ইতিবাচক কাজরে প্রতিশ্রুতি দেয়।যেমন, পারস্পরিক ব্যবসা ও পণ্যের আমাদানী-রফতানি করা,সাংস্কৃতিক চুক্তি- উভয় দেশ সাংস্কৃতিক বিনিময় করবে ইত্যাদি। ইসলামী রাজনীতিতে এই উভয় ধরনরে চুক্তির দৃষ্টান্ত রয়েছে।

প্রথম ধরনের চুক্তির দৃষ্টান্ত হচ্ছে বনু জুমরা‘র ঘটনা।

নবী করীম (স) যখন ‘আরওয়া’ যুদ্ধে ‘বিমান’ উপস্থিত হলেন কুরাইশ ও কিনানা পুত্র আবাদ মনাফ পুত্র বকর-পুত্র বনু জুমরার সাথে মুকাবিলা করার উদ্দেশ্যে, এই সময় বনৃ জুমরা রাসূলে করীম (স)- এর প্রতি সৌজন্যমূলক আচরণ (mockness gentleness) ও বিনয় প্রদর্শন করে। আর তার প্রতি সৌজন্য ও বিনয়মূলক আচরণ দেখিয়েছিল মখশী ইবন আমরা আজ- জুমারী। আর সে ছিল তাখনকার সময় তাদের প্রধান। পরে রাসূলে করীম (স) যখন বদর যুদ্ধে উপস্থিত হয়ে আবু সুফিয়ানের অপেক্ষা করছিলেন তার জন্য করা ওয়াদার কারণে, তখণ মখশী ইবন আমরা জুমারী-যে বিদান যুদ্ধে বনু-জুমরার প্রতি নম্রতা ও বিনয় দেখিয়েছিল- এসে বললঃ ‘হে মুহাম্মদ! আপনি কিএই পানির স্থানে কুরাইশদের সাথে মুকাবিলা করার উদ্দেশ্যে এসেছেন? তখন নবী করীম (স) বললেনঃ

হ্যাঁ, হে বনু জুমরার সরদার? তা সত্ত্বেও তুমি চইলে তোমার ও আমাদের মধ্যে যে চুক্তি রয়েছে তা তোমার নিকট প্রত্যাহার করে দিতে পারি। অতঃপর আমরা পরস্পর যুদ্ধ করব। তারপর আল্লাহর আমাদের যে ফয়সালাই করে দেন….।

[আরবী টীকা*****************]

হুদায়বিয়ার সন্ধিতেও অনুরূপ অবস্থাই দেখা দিয়েছিল।

আর ইতিবাচক বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তিরি দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে উল্লেখ্য হচ্ছে, হুদায়বিয়ায় নবী করীম ( স) ও খুজায়া ‘র মধ্যে অনুষ্ঠিত সন্ধিচুক্তি। সে চুক্তির একটি ধারায় লিখিত হয়েছিলঃ ‘যে লোক যা গোত্র মুহাম্মদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে চাইবে, সে তাই হবে। আর যারা কুরাইশদের সাথে চুক্তি করতে প্রস্তু হবে, তারা তাই করবে। এই শর্তের ভিত্তিতে খুজায়া রাসূলে করীম (স)- এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। সে চুত্তিটি আধুনিক কালের প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি ‘র মতই ছিল।

রাসূলে করীম (স)- এর জীবনের ঘটনাবলী থেকে জানা যায় যে, চুক্তি প্রত্যাহারের কাজ কখনও প্রত্যক্ষ ও সরাসরিভাবে সম্পন্ন হতো এবং কখনও তা হতো অপ্রত্যক্ষভাবে।

উত্তরকালে কুরাইশরা যখন বনু কিনানা ‘র সাথে অপ্রত্যক্ষভাবে অস্ত্র সাহায্য দানে অগ্রসর হলো, তখন নবী করীম (স) এই কাজকে চুক্তি ভঙ্গরূপে গণ্য করেছিলেন। পরে কুরাইশ ও বনু বকর গোত্রদ্বয় যখন খাজাযা’র উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাতে তাদের খুব বেশী ক্ষতি সাধিত হলো। নবী করীম (স) এর সাথে তাদের যে চুক্তি ছিল তার বিরুদ্ধ কাজ করল। তখন তিনি তাদের এই কাজকে হুদায়বিয়ায় অনুষ্ঠিত চুক্তির বিরুদ্ধতা ও চুক্তিভঙ্গ গণ্য করলেন। আর তারপরই নবী করীম (স) মক্কা বিজয়-অভিযানে গমন করেন।

[আরবী টীকা*****************]

এইসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যে, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ইলামের একটা বিশেষ নীতি ও আদর্শ রয়েছে। শরীয়াতের উৎসারিত।

 

সামরিক ঋণচুক্তি

যুদ্ধাবস্থায় ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য রাষ্ট্রের নিকট থেকে নগদ অর্থ বা প্রয়োজনীয় অস্ত্র- শস্ত্র ঋণ বা ধারস্বরূপ গ্রহণ করতে পারে। নবী করীম (স) নিজেও তাই করেছেন। নাজরানের খৃষ্টানদের সাথে গৃহীত সন্ধিচুক্তিতেই তাদের উপর জিযিয়া ধার্য হওয়ার এবং সেই সাথে ত্রিশটি বর্ম, ত্রিশটি অশ্ব ও ত্রিশটি উট দেয়ার শর্ত করে নিয়েছিলেন। তাতে এ-ও লিখিত হয়েছিলঃ

আমার প্রতিনিধিবর্গ যে অশ্ব ধার বাবদ গ্রহণ করবে,তারাই সেজন্য জামিন হবে। তারাই তা ফেরত দিবে। এর বদলে নজরান ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর প্রতিবেশিত্ব ও আল্লাহর রাসূল নবী মুহাম্মদ (স)- এর যিম্মা লাভ করবে তাদের নিজেদের উপর, তাদের মিল্লাতের উপর,তাদের এলাকার উপর,তাদের ধন-মালের উপর,তাদের উপস্থিত ও অনুপস্থিত সকলের জন্য।

[আরবী টীকা*****************]

 

রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নকরণ

অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তিকরণ নিজেরদের কল্যাণের দৃষ্টিতে যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে সম্পূর্ণ বৈধ, তেমনি অপর পক্ষের সেই চুক্তির স্পষ্ট লংঘন ও শক্রতামূল আচরণ গ্রহণেন ফলে গোটা চুক্তিটির প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক-কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নকরণের বৈধতা অবশ্যই বৈধ হবে। হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং তার পরিণতি- ই তার জাজ্জল্যমান প্রমাণ।

তবে চুক্তি প্রত্যাহার ও সম্পর্ক ছ্ন্নিকরণের কাজটি অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত কারণে

ও মানবিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। বস্তুত স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তসমূহ যখন অপর পক্ষ দ্বারা লংঘিত হবে, তখন সেই চুক্তিকে বহাল মনে করা এবং তাকে প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে প্রত্যাহার না কর ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। তাই উক্ত রূপ অবস্থায় চুক্তি প্রত্যাহৃত হওয়ার কথা জানিয়া দেয়া ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আল্লাহ তা ‘আলা ইরশাদ করেছেনঃ

[আরবী টীকা*****************]

যাদের সাথে তুমি সন্ধিচুক্তি করেছ, পরে তারা প্রত্যেকটি সুযোগেই তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহকে একবিন্দু ভয় পায় না……………

কখনও কোন জাতি-জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তোমরা চুক্তিভঙ্গের ভয় পাও তাহলে তাদের সেই ওয়াদা-চুক্তিকে প্রকাশ্যভাবে তাদের মুখের উপর প্রত্যাহার কর। কেননা আল্লাহ বিশ্বাসঘাতক- চুক্তিভঙ্গকারীদের আদৌ ভালোবাসেন না- পছন্দ করেন না।

 

বিজিত এলাকায় ইসলামের নীতি

দুর অতীত কাল থেকে এই রীতি চলে এসেছে যে, যখন কোন জাতি অপর জাতি ও রাষ্ট্রের উপর বিজয় লাভ করে ও তা দখল করে নেয়, তখন বিজয়ীরা

বিজিত এলাকায় না করে এমন কোন অপকর্ম-অত্যাচার, নিপীড়ন, লুণ্ঠন নারী ধর্ষণ, অপমান- নেই কুরআন মজীদে সেই দিকে ইঙ্গিত করেই হয়েছেঃ

[আরবী*************************]

রাজা-বাদশাহ সাম্রাজ্যবাদীরা যখন কোন দেশ দখল করে বিজয়ী হয়ে তথয়া প্রবেশ করে, তখন সেই দেশ ও জনবসাতিটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ বিপর্যস্ত ও ধ্বংস করে দেয় এবং তথাকার সম্মনিত ব্যক্তিদেরকে করে লাঞ্ছিত অপমানিত!……….ওরা সকলেই এবং সব সময়ই তা-ই করে।

রাজা-বাদশাহ ও দেশ  বিজয়ীদের এই মানবতা-বিরোধী কার্যকলাপের ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনি অত্যন্ত মর্মাস্তিক। আলেকজান্ডার মকদুনী (দিগ্রেট) যখন পারস্যে প্রবেশ কারেছেল, তথাকার দুর্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ধুলিসাৎ করে দিল, হাজার-হাজার  বছর ধরে জ্বলা অগ্নিঘর ধ্বংস করল, পুজারীদেরর হত্যা করল, তাদের বই-পুস্তক-গ্রন্থাদি ভস্মীভূত করে দিল। শেষে পারস্য রাষ্ট্রের উপর নিজের শাসক নিযুক্ত করে ভারত অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেল। এখানে উপস্থিত এখানকার রাজাদের হত্যা করল, শহর-নগর ধ্বংস করল, মূর্তিঘর-মন্দিরসমুহে বরবাদ করে দিল এবং তাদরে ধর্মগ্রন্থ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহামূল্য গ্রন্থদি জ্বালিয়ে দিল। তার পর এখান থেকে চীন যাত্রা করল।

[আরবী*************************]

এ ছাড়া তাতার ও মোগলরা ইরান-ইরাক যুদ্ধে কি ধ্বংসলীলার সৃষ্টি করেছে, নিরীহ মানুষকে হত্যা করে উষ্ণ রক্তের বন্যা প্রবাহিত করেছে, তা ইতিহাস পাঠক মাত্রেরই জানা আছে। তারা এ সব করেছে এই  বিশ্বাস নিয়ে যে এরূপ কারার তাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কেননা  দেশের পর দেশ- জনপদের পর জনপদ দখল কের সর্বত্র নিজেদের প্রভুত্বে পতাকা উড্ডীন করা তাদেরই জন্য শোভন । এজন্য তারা যদি ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করে তবে তা আর যা-ই হোক, তাদের জন্য কিছুমাত্র দোষের নয়।

উত্তরকালে মানবধিকারবাদীরা দেশ জয়ের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় অনেক নিয়েম-নীতি রচনা করেছে। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করার ও তা মেনে চলার মত অবসর বা মনোভাব বোধ হয় কারোরই নেই।

এ কালের মানব রক্তলোলুপ সম্রাজ্য শক্তিগুলি একদিকে জাতিসংঘ (united naticns) গঠন করে মানবতার দরদ ভারাক্রস্ত ও মানবীয় স্বাধীনতার উন্নতমানের নীতিকথা প্রচার করেছে, আর সেই সময়ই তারা নিজেরাই নিরীহ মজলুম-নিরস্ত্র-দুর্বল মানুষেরউপর স্টীম রোলার চালাচ্ছে, নিষ্পেষিত করে দিচ্ছে মানুষ-পশু-ঘর-বাড়ি-সভ্যতা-সংস্কৃতি কেন্দ্র, বিমানে বোমা নিক্ষেপ করে ভস্ম করে দিচ্ছে শহর-নগর। এদের মধ্যে সামান্য-সাধারণ মানবিকতা তো দূরের কথা, একবিন্দু লজ্জা-শরমও নেই। ওরা পশুই নয়, পশুর বাইতেও নিকৃষ্ট জীব, হিংস্র সাপদের চাইতেও নিমর্ম।

কিন্তু ইসলামের যুদ্ধনীতির ন্যায় দেশ-জয়ের নীতি উন্নত মানবিকতা ও যৌক্তিকতায় চির উদ্ভাসিত। হ্যাঁ, ইসলামী রাষ্ট্রও যুদ্ধ করেছে। তদানীন্তন বিশ্বের দুই পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্য ও রোমান সাম্রাজ্য দখল করেছে। কিন্তু দুনিয়ার বিজয়ীরা সাধারণত যা করে বলে ইতিহাসে বিধৃত, তার একবিন্দু একটি কথা পরিমাণ করেছে বলে কেউ দাবি করতে পারে কি?

করেনি বলেই বিভিন্ন অমুসলিম বসতি-জনপদের লোকেরা ইসলামী বাহিনীকে তাদের শহর-নগর দখল করে নেয়ার জন্য আকুল আহবান জানিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে তার সমধর্মী হওয়া সত্ত্বেও নগর প্রাচীরে দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে ও সাধারণ জনতা ইসলামী বাহিনীর অকল্পনীয় সাহায্য সহযোগিতা করেছে এবং বিজয়ী ইসলামী বাহিনী যখন নগরে প্রবেশ করেছে, তখন সেখানকার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সাদর সম্বর্ধনা জানিয়েছে। এ পর্যায়ের অসঙখ্য কাহিনী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। এ পর্যায়ে একটি কথার উল্লেখ-ই যথেষ্ট। নবী করীম (স) এবং খুলাফায়ে রাশেদূন যখন কোন বসতি দখলের উদ্দেশ্যে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছেন, তখন অত্যন্ত তাকীদ সহকারে হেদায়েত দিয়েছেন; বেসামরিক জনগণ বিশেষ করে নারী বালক-বালিকা, বৃদ্ধ, ধার্মিক পাদরী পূরোহিত, ধর্মস্থান মন্দির, গির্জা, ফসলের বৃক্ষ, ক্ষেতে-খামার ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করবে। এর কোন কিছুই ধ্বংস করা যাবে না। জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে শুধু খাদ্যের প্রয়োজন হলে যবেহ করা যাবে, পাইকারীভাবে ও বিনা প্রয়োজনে তা-ও হত্যা করা যাবে না।

এই দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তি ও সনদ হিসেবে আমরা কুরআন ও সুন্নাত-রাসূলে করীম (স)-এর কর্মনীতির উল্লেখ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছি। দুনিয়ার যে কোন এলাকার বা যে কোন সময়ের ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য তাই বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয় আদর্শ।

আসলে দুনিয়ার যে কোন সময়ের যে কোন স্থানেই ইসলামী রাষ্ট্র গোটা মানবতার অভিভাবক। মানবতাকে রক্ষা করা, দাসত্ব-শৃঙ্খল ও দারিদ্র্য লাঞ্চনা থেকে মুক্ত রাই তার প্রধান দায়িত্ব। অতীতের যে কোন ইসলামী হুকুমত এই দায়িত্ব পালন করেছে, পালন করবে এ যুগে আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম হওয়া ইসলামী রাষ্ট্রও। বিশ্বমানবতার একমাত্র বন্ধু হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র। তাই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার জিহাদ করা মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য।

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম