আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Presentation1 - Copy

আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম (র)


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

পূর্ব কথা

 রাষ্ট্র ও সরকার মানব জীবনের দুটি অপরিহার্য বিষয়। দুনিয়ায় মানুষের স্থিতি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্যে রাষ্ট্র ও সরকারের অস্তিত্ব একান্তই আবশ্যক। অন্তত মানুষের সমাজব্দ্ধ জীবন যে রাষ্ট্র ও সরকার ছাড়া চলতে পারে না, এ বিষয়ে প্রাচীন ও আধুনিক কালের মনীষীগন প্রায় সকলেই একমত। তবে কোন্  ধরনের রাষ্ট্র ও সরকার মানুষের জন্যে সত্যিকারভাবে কল্যাণকর, সে বিষয়ে মনীষীদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। এই মদভেদ মানবজাতিকে শুধু নানা বর্ণ, গোত্র ও শ্রেণীতেই বিভক্ত করেনি, তাকে এক নিরন্তর সংগ্রামের মাঝেও ঠেলে দিয়েছে। এই সংগ্রামের ফলে সমাজ ও সভ্যতা বারবার ওলট-পালট হয়েছে, মানুষের জীবনে অন্তহীন দুঃখ-দুর্দশা নেমে এসেছে। মানব জাতির গোটা ইতিহাস এ সত্যেরই অকাট্য সাক্ষ্য বহন করেছে। রাষ্ট্র ও সরকার যেখানে মানুষের প্রয়োজনে অস্তিত্ব লাভ করেছে, সেখানে রাষ্ট্র ও সরকারের যুপকাষ্ঠেই মানবতাকে বারবার বলি দেয়া হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্র ও সরকারের অস্তিত্ব বহুতর ক্ষেত্রেই মানুষের জন্যে আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ রূপে দেখা দিয়েছে। ইসলাম মানুষের জন্যে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র জীবন-ব্যবস্থা। রাষ্ট্র ও সরকার এ জীবন-ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য্ অংশ। ইসলামের প্রধান উৎস আল-কুরআন মানুষকে শুধু কতিপয় নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনের জন্যেও দিয়েছে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা। এই দিক নির্দেশনাতেই স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠেছে দেশ-কাল-নির্বিশেষে মানুষের জন্যে কল্যাণকর এবং গতিশীল রাষ্ট্র ও সরকারের এক অনবদ্য চিত্র। ইসলাম নির্দেশিত এই রাষ্ট্র ও সরকার কোন অবাস্তব কল্পনা-বিলাস নয়, বিশ্ববাসী এর বাস্তব নমুনা প্রত্যক্ষ করেছে সুদীর্ঘকাল ধরে। প্রকৃতপক্ষে এই রাষ্ট্র ও সরকারই যে মানব জাতির জন্যে অফুরন্ত আশীর্বাদ বয়ে আনতে সক্ষম, ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তারও সাক্ষ্য-প্রমান লিপিবদ্ধ রয়েছে স্বর্ণাক্ষরে। বর্তমান শতকের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হযরত আল্লামা মোহাম্মাদ আব্দুর রহীম (রহ) ইসলামের নির্দেশিত এই রাষ্ট্র ও সরকারেরই এক সুবিস্তৃত চিত্র এঁকেছেন তাঁর আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তিনি ইসলামের রাষ্ট্র ও সরকার বিষয়ক ধ্যান-ধারণাকে উপস্থাপন করেছেন  প্রধানতঃ কুরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াত ও বক্তব্যের আলোকে। এর ফলে কুরআনের বিষয়-ভিত্তিক তফসীর রচনার ক্ষেত্রেও একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। তবে এই গ্রন্থে স্বীয় বক্তব্য  উপস্থাপনে গ্রন্থাকার শুধু কুরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াতসমুহই উদ্ধৃত করেননি, সেসবের ব্যাখ্যায় মযহাব নির্বিশেষে প্রাচিন ও আধুনিক কালের বিশিষ্ট মুফাসসিরদের অভিমতসমূহও তিনি উল্লেখ করেছেন অত্যন্ত কুশলতার সাথে । এর ফলে ইসলামের রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে সকল মযহাবের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি অভিন্ন চিত্র ফুঠে উঠেছে এই গ্রন্থে। এই সবৃহৎ গ্রন্থটি ১৯৮৫ সালে রচিত হলেও এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালের ১লা অক্টোবর গ্রন্থাকারের স্মৃতি বার্ষিকিতে। গ্রন্থটি পাঠক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত হয় এবং অত্যল্পকালের মধ্যেই এর সমুদয় কপি নিঃশেষ হয়ে যায়। বর্তমানে মুদ্রণ সামগ্রির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির মাঝে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ  প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে এর অঙ্গসজ্জা ও মুদ্রণ পারিপাট্যও বহুলাংশে উন্নত হচ্ছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, গ্রন্থটির এই সংস্করণ পাঠক মহলে অধিকতর সমাদর লাভ করবে। মহান আল্লাহ্ গ্রন্থাকারের এই অনন্য খেদমতের বদৌলতে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদৌসে স্থান দিন, এটাই আমাদের সনুনয় প্রার্থনা।

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

ঢাকাঃ আগষ্ট ১৯৯৫ চেয়ারম্যান

 মাওলানা আবদুর রহিম ফাউন্ডেশন

গ্রন্থকার পরিচিতি

মাওলানা মোহাম্মদ আবদুর রহিম (রহ্) বর্তমান শতকের এক অনন্যসাধারণ ইসলামী প্রতিভা। এ শতকে যে কজন খ্যাতনামা মনীষী ইসলামী জীবন ব্যবস্থা কায়েমের জিহাদে নেতৃত্ব দানের পাশাপাশি লেখনীর সাহায্যে ইসলামকে একটি কালজয়ী জীবন দর্শন রূপে তুলে ধরতে পেরেছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। এই ক্ষণজন্মা পুরুষ বাংলা ১৩২৫ সনের ৮ ফাল্গুন, (ইংরেজী ১৯১৮ সালের ২ মার্চ) সোমবার বর্তমান পিরোজপুর জিলার কাউখালি থানার অন্তর্গত  শিয়ালকাঠি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ১৯৩৮ সনে তিনি শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম এবং  ১৯৪৪০ ও ১৯৪২ সনে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে যথাক্রমে ফাযিল ও কামিল ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানগর্ভ রচনাবলী পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সন পর্যন্ত তিনি কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে উচ্চতর গবেষণায় নিরত থাকেন। ১৯৪৬ সালে তিনি এই ভূখন্ডে ইসলামি জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহন করেন এবং অত্যল্প কালের  মধ্যেই একজন দক্ষ সংগঠক রুপে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে মওলানা মোহাম্মদ আবদুর রহিম (রহ্) শুধু পথিকৃতই ছিলেন না, ইসলামী জীবন দর্শনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ সম্পরকে এ পর্যন্ত তার ৬০ টিরও বেশি অতুলনীয় গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ‘ইসলামি রাজনীতির ভূমিকা’,‘ইসলামের অর্থনীতি’, ‘মহাসত্যের সন্ধানে’, ‘বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব’, ‘আজকের চিন্তাধারা’, ‘পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি’, ‘কমিউনিজম ও ইসলাম’, ‘সুন্নাত ও বিদয়াত’, ‘নারী’, ‘ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন’, ‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন’, ‘আল-কুরআনের আলোকে উন্নত জীবনের আদর্শ’, ‘আল-কুরআনের আলোকে শিরক ও তওহীদ’, ‘আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার’, ‘বিজ্ঞান ও জীবন বিধান’, ‘ইসলাম ও মানবাধিকার’, ‘ইকবালের রাজনৈতিক চিন্তাধারা’, ‘আল-কুরআনের আলোকে নবুয়্যাত ও রিসালাত’, ‘ইসলামী শরীয়াতের উৎস’, ‘অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম’ ইত্যাকার গ্রন্থ দেশের সুধীমহলে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছে। এছাড়া অপ্রকাশিত রয়েছে তাঁর অনেক মূল্যবান পাণ্ডুলিপি।

মৌলিক ও গবেষণামূলক রচনার পাশাপাশি বিশ্বের খ্যাতনামা ইসলামী মনীষীদের রচনাবলী বাংলায় অনুবাদ করার ব্যাপারেও তাঁর কোন জুড়ি নেই। এসব অনুবাদের মধ্যে রয়েছে মওলানা মওদুদী (রহঃ)-এর বিখ্যাত তফসীর ‘তাফহীমুল কুরআন’, আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভী কৃত ‘ইসলামের যাকাত বিধান’ (দুই খন্ড) ও ‘ইসলামে হালাল-হারামের বিধান’, মুহাম্মদ কুতুবের ‘বিংশ শতাব্দীর জাহিলিয়াত’ এবং ইমাম আবু বকর আল-জাসসাসের ঐতিহাসিক তফসীর ‘আহ্কামুল কুরআন’। তাঁর অনূদিত গ্রন্থের সংখ্যাও ৬০টির ঊর্ধ্বে।

মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ) ১৯৭৭ সনে মক্কায় অনুষ্টিত প্রথম বিশ্ব ইসলামী শিক্ষা সম্মেলন ও রাবেতা আলমে ইসলামীর সম্মেলন, ১৯৭৮ সনে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ইসলামী দাওয়াত সম্মেলন, একই বছর করাচীতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ইসলামী মহাসম্মেলন, ১৯৮০ সনে কলম্বোতে অনুষ্টিত আন্তঃপার্লামেন্টারী সম্মেলন এবং ১৯৮২ সনে তেহরানে অনুষ্ঠিত ইসলামী বিপ্লবের তৃতীয় বার্ষিকী উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে

এই যুগস্রষ্টা মনীষী বাংলা ১৩৯৪ সনের ১৪ আশ্বিন (ইংরেজী ১৯৮৭ সনের ১ অক্টেবর) বৃহস্পতিবার এই নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রাথমিক আলোচনা

[রাষ্ট্র ও সরকার তথা প্রশাসন ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রয়োজনীয়তা- রাসূলে কারীম (স) ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম প্রতিষ্টাতা- ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসূলে করীম (স)- এর তৎপরতা- রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসলামেরই ঐকান্তিক দাবি-রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের কারণ- রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে চারটি মত- কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের রূপরেখা- অত্যাচারী সরকার- সরকারের প্রতি জনগণের কর্তব্য।]

………………

রাষ্ট্র ও সরকারের তথা প্রশাসন ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রয়োজনীয়তা

বর্তমান সময় দুনিয়ার মুসলমানদের মনে-মগজে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কামনা-বাসনা প্রবল হয়ে উঠেছে। যে দেশেই মুসলমান বাস করে, তারা যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা ও ইসলামী প্রশাসন ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রাণ-মন দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সেজন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ তাঁদের নিকট অপরিহার্য বিবেচিত হয়েছে, সে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তাঁরা  বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হচ্ছে না।

বস্তুত সাধারণভাবে মানব জীবনে এবঙ বিশেষভাবে মুসলিম সমাজে একটি রাষ্ট্র- তথা প্রশাসনিক ব্যবস্থার সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে কোন প্রশ্নই উঠতে পারেনা। এ প্রয়োজনীয়তা বোধ কেবল আধুনিক কালেরই সৃষ্ট নয়, প্রাচীনতম কাল থেকেই এর প্রয়োজনীয়তা সর্বস্তরের মানুষের নিকট তীব্রভাবে অনুভূত। প্রাচীন ইতিহাসের দার্শনিক চিন্তাবিদগণও এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ও গভীর চিন্তা, বিবেচনা ও আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন।

এ্যারিষ্টটল প্রাচীনকালের একজন উল্লেখযোগ্য দার্শনিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেছেনঃ

 রাষ্ট্র একটি স্বভাবগত কার্যক্রম। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক। যে মানুষ সমাজ-বহির্ভূত জীবন যাপন করে, যার জীবন কোন নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীন নয়- নিঃসন্দেহে বলা যায়, সে হয় মানবেতর জীব, না হয় মানব-প্রজাতি ঊর্ধ্ব কোন সত্তা, যার মধ্যে মানবীয় প্রকৃতির কোন অস্তিত্ব নেই। [রাজনীতি]

প্লেটোও প্রাচীন প্রখ্যাত দার্শনিকদের একজন। তিনি মনে করেনঃ

রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনতা ব্যতিরেকে উন্নত মানের জীবন লাভ করা কোন ব্যক্তির পক্ষে অকল্পনীয়। কেননা মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে রাজনীতি- তথা রাষ্ট্রীয় তৎপরতার দিকে। মানুষ তার এ স্বাভাবিক প্রবণতা থেকে কখনো মুক্ত হতে পারে না।[গণপ্রজাতন্ত্র]

ইতিহাস-দার্শনিক আল্লামা ইবনে খালদূন মানব-সমাজের অপরিহার্য প্রয়োজনের দৃষ্টিতেই রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অকাট্য যুক্তির ভিত্তিতে  প্রমাণিত করেছেন। আর এই দৃষ্টিতেই তিনি দার্শনিক পরিভাষায় বলেছেনঃ  ‌‌‌‘মানুষ স্বভাবতই সামাজীক’। শেষ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্র ও সরকার উদ্ভাবনের পক্ষে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। [ইবনে খালদুনের ইতিহাসের ভূমিকা]

একালের চিন্তাবিদগণও এ ব্যাপারে কোন উপেক্ষাই প্রদর্শন করেননি।

সারওয়াত বদাভী লিখেছেনঃ

রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রথম কাঠামোই হচ্ছে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। বরং সমাজের প্রত্যেক রাজনৈতিক সংগঠন-সংস্থাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অপরিহার্য করে তোলে। অনেকে তো রাজনীতির বাস্তবতা রাষ্ট্রীয় চিন্তায় খুঁজে বেড়িয়েছেন এবং রাষ্ট্র ব্যতিত সামষ্টিক রাজনীতির কোন পরিচয় মেনে নিতে তাঁরা প্রস্তুত নন। [ আন নাজমুস সিয়াসিয়াহ]

ইসলাম অকাট্য দলীলের ভিত্তিত মানব জীবনে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা বাধ্যতামূলক বলে পেশ করেছেন। স্বয়ং রাসূলে করীম (স)- এর জীবন বৃত্তান্তে সেই প্রয়োজনীয়তাকে অত্যধিক প্রকট করে তুলেছে। রাসূলে করীম (স)-এর জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই এ ব্যাপারের যাবতীয় শোবাহ্-সন্দেহ মতই  উবে যেতে বাধ্য হয়।

রাসূলে করীম (স) ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা

রাসূলে করীম (স)-এর জীবনেতিহাস অধ্যয়ন করলেই জানতে পারা যায়, তিনি মদীনায় উপস্থিত হয়েই একটি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্র পরিচালকের ন্যায় তিনি যাবতীয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। তিনি যুদ্ধকালে একটি সুসংবদ্ধ সৈন্যবাহিনী গঠন করেছেন। বিভিন্ন গোত্রপতি বা রাষ্ট্র-প্রধানদের সাথে নানা ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত করেছেন। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুষ্ঠুরূপে গড়ে তুলেছেন ও পরিচালনা করেছেন। সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এক-একটি সুসংগঠিত সমাজ পরিচালনার জন্য যা যা করা অপরিহার্য, তিনি তার প্রত্যেকটি কাজই সুষ্ঠুরূপে আঞ্জাম দিয়ছেন। বিচার বিভাগ সুসংগঠিত করে তার সুষ্ঠু পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নির্মিত মসজিদই ছিল এই সমস্ত কাজের কেন্দ্রস্থান। রাষ্ট্র-প্রধান হিসেবে তিনি যাবতীয় দায়িত্ব এই মসজিদেই পালন করেছেন। রাষ্টীয় ফরমান জারি করেছেন। বিভিন্ন গোত্র প্রধান ও রাষ্ট্র-প্রধানের নিকট রাষ্ট্রীয় পত্রাদিও প্রেরণ করেছেন। সে পত্রাদি যেমন আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট পাঠিয়েছেন, তেমনি তার বাইরের ব্যক্তিদের নিকটও।

তিনি যে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করেছিলেন, তিনি নিজেই সে রাষ্ট্রটি ক্রমাগতভাবে দশটি বছর পর্যন্ত পরিচালনা করেছ্নে। তাঁর অন্তর্ধানের পরও শুধু টিকে থাকে তা-ই নয়, ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয় ও পর্যায়ে পর্যায়ে উত্তরোত্তর উন্নতি-অগ্রগতিও লাভ করে-প্রবল শক্তি ও ক্ষমতাও অর্জন করে। ফলে তার রূপায়ণ সম্পূর্ণতা পায়-যদিো তার নিজের হাতেই তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণতা লাভ করেছিল।

রাসূলে করীম (স)-এর জীবনেতিহাস বিশ্লেষণ করলেই জানতে পারা যায়, তিনি নবুয়্যত লাভ করার পরই একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্টা ও সরকার গঠনের জন্য চেষ্টানুবর্তী হয়েছিলেন। কার্যত তিনি তা করেছিলেনও। তবে তা দুটি পর্যায়ে সুসম্পন্ন হয়। তার প্রথম পয়ায় ছিল মক্কায় এবং দ্বিতীয় পর্যায় মদীনা তাইয়্যেবায়।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসুৱেল করিম (স)- এর তৎপরতা

মক্কায় নবু্য়্যাত লাভের পরবর্তীকালে তাঁর দাওয়াত প্রকাশ্যভাবে লোকদের নিকট পৌছাবার জন্য আদিষ্ট না হওয়া কালে –বলা যায়-একটি গোপন দল গড়ে তুলেছিলেন (অনেকেই হয়ত এ ব্যাখ্যা পছন্দ করবেন না)। তখন তিনি তাঁর উপস্থাপিত আদর্শের ভিত্তিতে আদর্শবাদী ব্যক্তি গঠনের কাজ সমাধা করেছেন। সেই পর্যায়ে ঈমান গ্রহণকারী লোকদের পরস্পরে গভীর যোগাযোগ ও অত্যন্ত প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। অত্যন্ত গোপনে তাদের পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ ও ইসলামী জ্ঞান  শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। আরকাম (রা)-এর ঘরই ছিল সেই সময়ের গোপন মিলনকেন্দ্র। পড়ে তাঁর প্রতি যখন [আরবি………] ‘‌তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে তা তুমি চতুর্দিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে দাও’, নাযিল হল, তখন তিনি  বিভিন্ন গোত্র প্রধান ও মক্কায় বাইরে থেকে আগত বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সরদারকে আহবান জানালেন দ্বীন ইসলাম গ্রহন করার জন্যএবং তার গঠিত দলে শামিল হয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি ঘোষিত আল্লাহর হুকুমাত কায়েম করার লক্ষ্যে নানা দিক থেকে মক্কায় আসা কোন কোন প্রতিনিধি দলের বায়’আত গ্রহন করলেন এবং তাঁর  এই মহান লক্ষ্যে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসার আহবান জানালেন। এভাবে আকাবা’র প্রথম ও দ্বিতীয় ‘বায়’আত’সম্পন্ন হয়।[আরবি………] পরে তিনি মদীনায় হিজরাত করতে গেলেন। সেখানে স্বাধীন-উন্মুক্ত পরিবেশে ইসলামী সমাজ রাষ্ট্রব্যবস্থা ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রথমে তিনি মুজাহির ও আনসার-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন। তা-ই ছিল ইসলামী সমাজ-সংস্থার প্রথম প্রতিষ্ঠা। আর মসজিদ কায়েম করলেন মুসলিম উম্মতের একত্রিত হওয়ার কেন্দ্র হিসেবে। এই মসজিদে যেমন জামা’আতের সাথে সালাত কায়েম করা হতো, তেমনি ইসলমী সমাজ রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেয়া হত।

এতদ্ব্যতীত তিনি একিট ইসলামী রাষ্টের পক্ষে  করণীয় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজও সম্পন্ন করেন। এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি বড় বড় কাজের উল্লেক করা যাচ্ছেঃ

১. তিনি তাঁর সাহাবী ও মদীনায় বসবাসকারি ইয়াহুদী প্রভৃতি গোত্র বা জনগোষ্ঠীর সাথে এত্বের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ইতিহাসে তা-ই ইসলামী হুকুমতের ‘প্রথম লিখিত সংবিধান’ নামে পরিচিত ও খ্যাত। (এ সংবিধানের ধারাসমূহ পরে উল্লেক করা হবে।)

২. তিনি এ মসজিদ থেকেই সেনাবাহিনী ও সামরিক গোষ্ঠী উপদ্ধীপের বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করেছেন। তিনি মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ কারার সিদ্ধন্ত করেছেন এবং কার্যত তা করেছেনও। তিনি রোমনদের বিরুদ্ধে লরাই করেছেন। শত্রুদের ভীত-সস্ত্রস্ত করার নান পন্থা অবলম্বন করেছেন। ঐতিহাসিকগণের হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে যে, রাসুল করীম (স) তাঁর মদীনায় জিন্দেগীর দশটি বছরে আশিটি যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।

৩.মদীনায় স্থিতি লাভ এবং মক্কার দিক থেকে আক্রমণের ভয় তিরোহিত হলে উপদ্ধীপের বাইরের দিকে লক্ষ্য নিবদ্ধ করেছেন। যে যে,এলাকায় দাওয়াত তখন পর্যন্ত পৌছেনি, সেই সা এলকায় দ্ধীনের তওহীদী দাওয়াত পৌছাবার ব্যবস্থা করলে। এমন পদক্ষেপ গ্রহন করলেন, যার ফলে নিকট দূরের সকল লোকের নিকট এই দাওয়াত পৌছে যায়। তিনি বিভিন্ন গোত্রপতি, রাষ্ট্রপ্রধান ও শাসকদের নিকট সরাসরি পত্র পাঠিয়ে তওহীদী দাওয়াত কবুলের বলিষ্ঠ আহবান জানালেন।তাঁর এ প্রতিষ্ঠিত হুকুমাতে ইলাহীয়ার অধীন শামিল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিলেন। তিনি পত্র পাঠালে রোমান সম্রাট কাইজারের নিকট। মিসরের কিবতী প্রধান মুকাউকাসের নিকট। হাবশার বাদশাহ নাজাশীর নিকট। এ ছাড়া সিরিয়া ও ইয়ামনের বড় বড় নেতা ও রাজন্যবর্গের নিকট, গোত্রপতি ও রাজা-বাদশাহদের নিকটও অনুরূপ পত্র পাঠালেন। তাদের অনেকের সাথে চুক্তি সম্পাদিত হলো, সামরিক ও রাজনৈতিক মৈত্রী স্থাপিত হলো, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়ীক আদান প্রধানের ব্যবস্থা সাব্যস্ত করা হলো।

আজাদ ও আম্মানের রাজার নামে লিখত পত্রে তিনি যা লিখেছিলেন, তা এখানে উদ্ধৃত কারা হচ্ছেঃ[ আরাবি লেখা….]

মহা দয়াময় ও অসীম করুণাশীল আল্লাহর নামে। শান্তি বর্ষিত হোক তার উপর, যে ইসলামের হেদায়েতকে অনুসরণ করেছে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে ইসলামের আহবান অনুযায়ী আহবান করছি। তোমরা দু ‘জন ইসলাম কবুল কর, তাহলে দু ‘জনই রক্ষা পেয়ে যাবে। আমি সমগ্র মানবতার প্রতি আল্লাহর রাসুল. যেন আমি সব জীবনধারী মানুষকেই পরকাল সম্পর্কে সতর্ক করতে পারি এবং কাফিরদে সম্পর্কে চুড়ান্ত কথা তাদের উপর বাস্তবায়িত হয়। তোমরা দু ‘জন যদি ইসলামকে স্বীকার করে নাও তাহলে আমিই তোমাদেরকে ক্ষমতাসীন করে দেব, আর তোমরা যদি ইসলামকে মেনে নিতেই অস্বীকার কর, তাহলে তোমাদের দু জনের রাজত্ব তোমাদের হাত থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আর আমার অশ্ব তোমাদের দু ‘জনার আঙ্গিনায় উপস্থিত হবে ও দখল করে নেবে এবং তোমাদের দু ‘জনার দেশের উপর আমার নবুয়্যাত প্রকাশিত, বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে [ আরবি টীকা]

আরব উপদ্ধীপেরই এক অঞ্চলের শাসক রাফা ‘আত ইবনে জায়দ আল-জ্বজামীকে লিখিত পত্রে এইরূপ লেখা হয়েছিলঃ[ আরবি লেখা…….]

বিছমিল্লাহহির রাহমানির রাহীম, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ (স) পক্ষ থেকে রাফা  ‘আ ইবনে জায়দের প্রতি! আমি সেই ব্যাক্তি, যাকে সাধারণভাবে তার সমস্ত জনগণের প্রতি প্রেরিত হয়েছে, তাদের প্রতিও যারা তাদের মধ্যে শামিল হবে। তিনি তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন। লোকদের মধ্যে থেকে যারই সে দায়াত কবুল করবে, সে আল্লাহ দল ও রাসূলের দলের মধ্যে গণ্য হবে। আর যে তা গ্রহণ করতে পশ্চাদপদ হবে, তার জন্য মাত্র দুই মাসের নিরাপত্তা। [ আরবী টীকা]

 নাজরান-এর বিশপের  নিকট প্রেরিত পত্রে লিখিত হয়েছিলঃ [ আরবী…………]

ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের আল্লাহর নামে- আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের নিকট থেকে নাজরানের বিশপের নিকট এই পত্র প্রেরিত হল। তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ কর। আমি আল্লাহর হামদ করছি তোমাদের নিকট, যিনি ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ইলাহ্। অতঃপর, আমি বান্দাদের দাসত্ব পরিহার করে আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার জন্য তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি। তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি বান্দাদের বন্ধুত্ব-কতৃত্ব-পৃষ্ঠপোষকতা পরিহার করে আল্লাহর বন্ধুত্ব-কতৃত্ব-পৃষ্টপোষকতা মেনে নেয়ার জন্য। তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে তোমাদেরকে জিযিয়া দিতে রাযী হতে হবে। আর তা দিতেও অস্বীকার করলে আমি তোমাদেরকে যুদ্ধের আগাম জানান দিচ্ছি….শান্তি….।

৪. রাসূলে করীম (স) রাষ্ট্রীয় দূত ো রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের ও বড় বড় রাজন্যবর্গের নিকট পাঠিয়েছেন। এ পর্যায়ে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেনঃ এভাবে দূত পাঠানো ও চিঠিপত্র প্রেরণ তদানীন্তন সময়ের প্রেক্ষিতে এক সম্পূর্ণ অভিনব কূটনৈতিক কার্যক্রম ছিল। বরং সত্য কথা হচ্ছে ইসলামই এ ক্ষেত্রে এরূপ কার্যক্রম সর্বপ্রথম শুরু করেছে।

রাসূলে করীম (স) বিচারপতি নিয়োজিত করেছিলেন, বিভিন্ন এলাকায় শাসক নিয়েঅগ করেছিলেন। তিনি তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক ও পলিসিগত কার্যসূচীও প্রদান করেছিলেন। তাদেরকে ইসলামী বিধান ও আইন-কানুনের ব্যাপক শিক্ষাদান করছিলেন। ইসলাম উপস্থাপিত নৈতিক আদর্শ ও রীতিনীতি সম্পর্কে-যা কুরআনের মৌল শিক্ষা- তাদেরকে পূর্ণ মাত্রায় অবহিত করেছিলেন। যাকাত ও অন্যান্য সরকারী করসমূহ আদায় করা ও তা পাওয়ার যোগ্য অধিকারী লোকদের মধ্যে যথাযথ বন্টনের নিয়মাদি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করে তুলেছিলেন। এক কথায় যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজ নিজ দায়িত্বে বসিয়েছিলেন। লোকদের মধ্যে বিবাদ মীমাংসার, তাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধানের এবং জুলুম ও সীমালঙ্ঘনমূলক কার্যক্রমের বিচার পদ্ধতি শিক্ষাদান করেছিলেন।

এ পর্যায়ে চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, আধুনিক কালের রাষ্ট্রনেতা ও শাসক-কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠানগতভাবে যে যে কাজ করতে হয়, নবী করীম স. সেই সব কাজই করেছেন। কিন্তু তা তিনি করেছেন নিজের ইচ্ছা মত নয়, বরং আল্লাহ তাআলার হেদায়েত ও নির্দেশ অনুযায়ী। তিনি যেমন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করতেন, প্রয়োজনে পদচ্যূতও করতেন। বিভিন্ন লোকদের নিকট পত্র প্রেরণো করতেন। চুক্তি স্বাক্ষর করতেন। রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ইসলামী কল্যাণের দৃষ্টিতে, সামষ্টিক কল্যাণের জন্য এবং রাষ্ট্রশক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

কুরআন মজীদের সূরা আল-আনফাল, আত-তাওবা ও সূরা মুহাম্মদ গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করলেই লক্ষ্য করা যায়, তাতে ইসলামী হুকুমাতের রাজনৈতিক কর্মধারা ও কার্যসূচী, দায়িত্ব, কর্তব্য ইত্যাদির মৌল নীতিসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে। সূরা আল-মায়েদায়ও এ পর্যায়ের বহু বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। অনৈসলামী সমাজ-সমষ্টির সাথে কার্যক্রমের নীতি, জিহাদ, প্রতিরক্ষা ও ইসলামী ঐক্য একত্ব রক্ষার যাবতীয় বিধান বলে দেয়া হয়েছে। কেননা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্টিত ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য এসব বিধান একান্ত অপরিহার্য। কুরআন মজীদে ইসলামী রাষ্ট্র সংক্রান্ত সকল প্রয়োজনীয় বিধান দেয়া হয়েছে, কুরআনের একনিষ্ঠ কোন পাঠকই অস্বীকার করতে পারবেন না। এ থেকে প্রমানিত হয় যে, রাসূল করীম (স)-ই হচ্ছে প্রথম ইসলামী হুকুমাতের প্রতিষ্টাতা। আর তিনি যে রাষ্ট্র ও হুকুমাতের ব্যবস্থা কার্যকর করেছিলেন তা যেমন সর্বোত্তম, তেমনি তা-ই দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

একালে রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনেক রূপান্তর ঘটেছে, তার মূল কান্ড থেকে অনেক নতুন শাখা-প্রশাখাও উদ্ভাবিত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্টান সম্পূর্ণ নতুন গড়ে উঠেছে। কিন্তু রাসূলে করীম সা. প্রতিষ্টিত সরকারযন্ত্র ও প্রতিষ্টান আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই প্রতিভূ, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সেই সময়ের প্রয়োজনের দৃষ্টিতে কোন ক্ষেত্রেই একবিন্দু কমতি ছিলনা তাতে।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসলামেরই ঐকান্তিক দাবি

এই সব কথা নবী জীবন-চরিত ছাড়াও সীরাতে ইবনে হিশাম, তারীখে তাবারী, জজরীর তারীখুল কামিল, সূফীদের আল-ইরশাদ ও আরবেলীর কাশফুল গুম্মাহ প্রভৃতি প্রাচীন ও আধুনিক কালে লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ থেকে নিঃসন্দেহে জানা যায়।

এছাড়া মূল দ্বীন-ইসলামের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করলেও জানা যায় যে, ইসলামের মৌল বিধান ও নিয়ম-পদ্ধতি এই ধরনেরই এক পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। অন্যথায় তা কখনই বাস্তবায়িত হতে পারে না। দুটি দিক দিয়ে তার বিবেচনা করা চলেঃ

প্রথমঃ ইসলাম কুরআন-সুন্নাতের অকাট্য্ দলীলের ভিত্তিতে ইসলামের অনুসারী ও বিশ্বাসীদের ঐক্য ও একাত্মতা একান্তই অপরিহার্য বলে ঘোষণা করেছে। তাদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, পরস্পর সম্পর্কহীন ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়া ও পরস্পর মতপার্থক্যে লিপ্ত হওয়ার থেকে অত্যন্ত বলিষ্ঠতা সহকারে নিষেধ করেছে। ফলে ইসলাম সম্পর্কে একথা সকলেরই জানা হয়ে আছে যে, ইসলামের ভিত্তি দুটি কালেমার উপর প্রতিষ্ঠিতঃ তওহীদের কালেমা (ঐক্যের বাণী) ও কালেমা’র তওহীদ (বানীর একতা)। কুরআন মজীদ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেঃ [ আরবী……………….]

জেনে রাখবে, এটাই আমার সুদৃঢ় ঋজু পথ। অতএব তোমরা সকলে এ পথ অনুসরণ করেই চলতে থাক। নানা পথ (তোমাদের সম্মুখে উন্মুক্ত; কিন্তু) তোমরা তা অনুসরণ করো না। করতে গেলে সে পথসমূহ তোমাদেরকে এই সঠিক দৃঢ় পথকে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথ-ই অনুসরণ করবার নির্দেশ দিয়েছেন এই আশায় যে, তোমরা সেই বিভিন্ন পথ থেকে বাঁচতে পারবে।

বলেছেনঃ [আরবী………………]

তোমরা সকলে মিলিত হয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধর আল্লাহর রজ্জু এবং তোমরা পরস্পর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হবে না। আর তোমরা সকেল তোমাদের প্রতি আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, তোমরা যখর পরস্পরের শত্রু ছিলে তখন আল্লাহ-ই তোমদের দিনগুলিকে পরস্পর মিলিত ও প্রীতিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। ফলে তোমরা তাঁরই মহা অনুগ্রহে পরস্পর ভাই হয়ে গিয়েছিলে।

বলেছেনঃ [আরবী…………….]

আর আল্লাহই তাদের দিলসমূহের মধ্যে বন্ধুত্ব-প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। হে নবী! তুমি যুদ দুনিয়ার সব কিছু ব্যয়ও কর, তবু তাদের দিলসমূহের মধ্যে সেই মিল ও প্রীতি সৃষ্টি করতে পারবেনা, কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে সেই প্রীতি-বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বস্তুত তিনিই সর্বজয়ী মহাশক্তিমান সুবিজ্ঞানী।

এসব আয়াতে দুটি কথা স্টষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে। একটি এই যে, মুসলমানরা পূর্বে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ ও প্রীতি-বন্ধুত্ব সম্পন্ন ছিলনা, আল্লাহ তা’আলাই তা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহ তা’আলার সর্বশেষ অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আল্লাহ মুসলমানদের দিলে এই প্রেম-প্রীতি বন্ধুত্ব জাগিয়ে দিয়েছেন তাঁর বিধানের ভিত্তিতে। এই বিধানের প্রতি সকলের গভীর ঈমান গ্রহণের ফলেই তা সম্ভবপর হয়েছে। তা কোন বস্তুগত জিনিসের বা অর্থ সম্পদ ব্যয়ের ফলে হয়নি। সারা দুনিয়ার সকল সম্পদ ব্যয় করেও নবী সা. নিজে তা সৃষ্টি করতে পারতেন না। আল্লাহর সে বিধান হচ্ছে তওহীদের বিধান। আর তা-ই ইসলামের সারকথা-তা-ই ইসলামের চরম লক্ষ্য।

এক কথায় ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে মুসলিম উম্মতের ঐক্য ও একাত্মতা।

এ কথারই ব্যাখ্যা করে নবী করীম স. নিজের ভাষায় বলেছেনঃ [আরবী……………]

একজন মু’মিনের সাথে অপর মু’মিনের সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সীসাঢালা সূদৃঢ় প্রাচীরের মত। একজন অপর জনকে শক্ত ও দৃঢ় করে।

মুসলমানদের এ ঐক্যবদ্ধ সামষ্টিক জীবন দুর্গের ন্যায় সুরক্ষিত রাখা আবশ্যক। সেই দিকে লক্ষ্য রেখে রাসূলে করীম স. বলেছেনঃ [আরবী……….]

তোমরা যখন এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ, তখন যদি কোন লোক তোমাদের অসিকে চূর্ণ করতে কিংবা তোমদের সংঘবদ্ধতাকে ছিন্ন ভিন্ন করতে চেষ্টিত হয়, তাহলে তোমরা সকলে মিলে তাকে হত্যা কর।

কুরআন ও হাদীস ইসলামের এই মৌল উৎস উম্মতে মুসলিমার যে ঐক্য ও একাত্মতা বলিষ্ঠ তাকীদ করছে, নিজেদের মধ্যে পূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধতা ও গভীর একাত্মতা সৃষ্টি করার জোর তাকীদ জানাচ্ছে, কোনক্রমেই প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ও একাত্মতা চূর্ণ  করতে বা চূর্ণ করার সুযোগ দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি কোন লোক সেই ঐক্য কে চূর্ণ করার চেষ্টা করলে তাকে সকলে মিলে হত্যা করতে পর্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তা বাস্তবে কি করে সম্ভব হতে পারে? সকলেই স্বীকার করবেন যে, তা সম্ভব হতেপারে কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে। অন্যথায় এ কাজ কখনই বাস্তবে সম্ভব হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব বিভিন্ন লোকের মধ্যে মতের ঐক্য সৃষ্টি করা ইসলামী আদর্শ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ইসলামী রাষ্ট্রই পারে সকল নাগরিকের সমান মানের কল্যাণ বিধানের মাধ্যমে তাদের মধ্যৈ পরম একাত্মতা সৃষ্টি করতে, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করতে, বিভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্নতাকারীকে ঐক্যের দিকে ফিরিয়ে আনতে ও পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্টিত করতে।

মোটকথা, রাষ্ট্রই হচ্ছে ঐক্য সৃষ্টিকারী, ঐক্য রক্ষাকারী, ঐক্য বিরোধী তৎপরতা প্রতিরোধকারী, পারস্পরিক মতবিরোধ ও পার্থ্যক্য বিদূরণকারী।

দ্বিতীয়ঃ নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায্যা প্রাপ্য পর্যায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ইসলামের আইন-বিধানসমূহ অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করলেও বোঝা যায় যে, এ সবের প্রকৃতিই একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার দাবিদার।

ইসলাম জিহাদের আহবান জানিয়েছে, প্রতিরক্ষার পূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট বলিষ্ঠ নির্দেষ দিয়েছে, হদ্দসমূহ কার্যকর করার হুকুম দিয়েছে, অপরাধের শাস্তি বিধান করেছে ো তা প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োগ করার হুকুম দিয়েছে অপরাধীদের উপর, মজলুমের প্রতি ইনসাফ করার আহবান জানিয়েছে, জালিমকে প্রতিরোধ করতে বলেছে এবং অর্থ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিধানও উপস্থাপিত করেছে।

এ সবের প্রতি লক্ষ্য দিলে এতে আর কোনই সংশয় থাতে পারে না যে, আল্লাহ তা’আলা এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে বলেছেন, যা এই সব আইন-বিধান-নির্দেশ পুরাপুরি ও যথাযথভাবে কার্যকর করবে।

কেননা ইসলাম তো অন্তঃসারশূণ্য দোয়া-তাবিজ বা দাবি-দাওয়ার ধর্ম নয়। বিউগল বাজানো বা নিছক ব্যক্তিগতভাবে পালনীয় কতগুলি সওয়াব কামাই করার বিধান নয়। ব্যক্তির ব্যক্তিগতভাবেই নিজের ঘরে বা উপাসনালয়ে পালন করার কোন ধর্ম নয়। ইসলাম তো এক পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, অধিকার প্রতিষ্টার বিধান-সে অধিকার ব্যক্তির যেমন, তেমনি সমষ্টিরও। তা ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ। এই পর্যায়ে যে সব আইন-কানুন ও বিধি-বিধান এসেছে, তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এ সবের রচয়িতা ও নাযিলকারী মহান আল্লাহ তাঁর ও তাঁর বিধানের প্রতি ঈমানদার লোকদের জন্য এ সবের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সক্ষম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্টার নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু এ ধরনের আইন বিধান দেয়া ও তার বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় রাষ্ট্র। তাই রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশ না দেয়া খুবই হাস্যকর ব্যাপার, যা আল্লাহ সম্পর্কে প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কাউকে গাছ কাটতে বলা অথচ গাছ কাটার জন্য একমাত্র হাতিয়ার কুঠার না দেয়ার মত বোকামী দুনিয়ার মানুষ করলেও করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে তা ভাবাও যায়না।

বস্তুত সৃষ্টিলোকের জীবন ও স্থিতি যে কয়টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে, আদেশ ও নিষেধ হচ্ছে তন্মধ্যে প্রধান বিষয়। আদেশ, যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী………]

হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আহবানের সাড়া দাও যখন তোমাদেরকে তোমাদের জীবনদায়িনী বিষয়ের দিকে ডাকবেন।

এ আহবান তো আল্লাহ ও রাসূলের আদেশ ও নিষেধের পর্যবসিত।

বলেছেনঃ [আরবী……..]

হে বুদ্ধিমান লোকেরা! কিসাসে তোমাদের জীবন নিহিত।

এ আয়াতে ভালো কাজের আদেশ হত্যাকারীর কিসাস প্রতিবিম্বিত, যা জীবনের উৎস।

এসব আয়াত দ্বারা যদি আল্লাহর আদেশ-নিষেধই জীবনের উৎস প্রমাণিত হয়, তাহলে জনগণের জন্য এমন একজন সর্বজনমান্য ইমামের প্রয়োজন, যে এই আদেশ ও নিষেধের বিধান বাস্তবে কার্যকর করবে, ‘হদ্দ’ সমূহ কায়েম করবে, শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, জাতীয় সম্পদ জনগণের মধ্যে বন্টন করবে। এমন কাজেই জনগণের কল্যাণ নিহিত। আর যাবতীয় ক্ষতিকর জিনিস ও কাজ থেকে লোকদের বিরত রাখবে। এ কারণে ‘আমর বিল মারূফ’ মানব সমসাজের স্থিতির অন্যতম উপায় সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা এসব না হলে কোন লোকই দুষ্কৃতি থেকে বিরত হবে না। বিপর্যয় বন্ধ হবে না। ব্যবস্থাপনাসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর তাহলে জনগণের ধ্বংস হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়বে। ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকাম যে বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যেই বিধিবদ্ধ হয়েছে, তা চিন্তা করলেই একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

 রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা প্রমাাণে ইসলাম উপস্থাপিত অকাট্য দলীলসমূহ যে কত, তা গুণে শেষ করা যাবে না। সহজেই বোঝা যায়, একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও তার একজন পরিচালক ব্যতীত কোন জনসমষ্টিই চলতে পারে না-বাঁচতে পারে না। বিশেষ করে দ্বীন-ইসলামের আইন-বিধানসমূহ একটি রাষ্ট্র ছাড়া কিছুতেই এবং কোনক্রমেই বাস্তবায়িত হতে পারে না। মহান স্রষ্টা তা খুব ভালোভাবেই জানতেন বলেই মানব সমাজে রাষ্ট্রের ব্যবস্থা করেছেন এবং সে রাষ্ট্রের সুষ্ঠুরূপে চলবার জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধানও দিয়েছেন। ফলে সে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ লোকদের জীবন পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি সে নজসমষ্টির উপর শত্রর আক্রমণকে প্রতিহত করা, ওদেরকে বৈদেশিক বিজাতীয় শক্তির গোলামী থেকে রক্ষা করাও সম্ভবপর হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব এত বেশী যে, রাসূলে করীম সা.-এর হাদীসে একটি জনসমষ্টির কল্যাণ ও অকল্যাণ-সুষ্ঠুতা ও বিপর্যয় একান্তভাবে নির্ভরশীল বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী………..]

আমার উম্মতের মধ্যে দুটি শ্রেণী এমন যে, তারা ঠিক হলে গোটা উম্মত ঠিক হয়ে যাবে আর তারাই বিপর্যস্ত হলে গোটা উম্মত বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। জিজ্ঞাসা করা হলোঃ তারা কারা হে রাসূল! বললেনঃ তারা ফিকহবিদ ও প্রশাসকবৃন্দ। [আরবী টীকা]

বস্তুত মানুষের বিশেষ করে সামষ্টিক জীবনে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা বিবেক-বুদ্ধি ও শরীয়াত উভয়ের দৃষ্টিতেই অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ঐতিহাসিক বিচারেও মানব সমাজের বিকাশে কোন একটি সময় অতীতে ছিল না …ভবিষ্যতেও থাকতে পারে না যখন রাষ্ট্র ও সরকারের কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না বা হবে না। কাজেই তার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আরও দীর্ঘ ও বিস্তারিত কোন আলোচনার আবশ্যকতা আছে বলে মনে হয় না।

রাষ্ট্র ও সরকারের এ গুরুত্ব প্র প্রয়োজনীয়তাই ইসলামের মনীষীবৃন্দের উপর কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় যে, তাঁরা তার রূপরেখা, কার্যপদ্ধতি, নিয়মনীত বিশেষত বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করে লোকদের সম্মুখে উপস্থাপিত করবেন এবং কাল ও সময়ের প্রতিটি অধ্যায়ে তা সেই সব রূপরেখা, পদ্ধতি-নিয়ম-নীত ও বিশেষত্ব-বৈশিষ্ট্য সহকারে প্রতিষ্ঠিতি করার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালাবেন।

রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ

এতদসত্ত্বেও দু’ধরনের লোক সমাজ-জীবনে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছে। এক, যারা নীতিগতভাবেই রাষ্ট্র-সরকারের পক্ষপাতী নয়। এরা হচ্ছে কার্লকার্ক্স ও তার মতের লোকেরা।

দুই, যারা নিছক মনস্তাত্ত্বিক কারণে তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে না। এরা আবার তিন ভাগে বিভক্ত।

বস্তুত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা মূলত কোন মতবিরোধের বিষয় ছিল না – এ ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টিরও কোন কারণ ছিল না। কেননা পূর্বে যেমন দেখিয়েছি ও প্রমাণ করেছি, মানব জীবনের প্রকৃত সৌভাগ্য, সভ্যতার অগ্রগতি স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা এরই উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু লোক- সংখ্যায় তার যত কম-ই হোক- রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে একটা বিভীষিকা মনে করে। তার অস্তিত্বকেই ভয় পায় ও তার প্রয়োজনীয়তা মেনে নিতে রাযী হয় না। কেউ কেউ আবার এ-ও বলতে চায় যে, হ্যাঁ, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে; তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে মাত্র। সর্বসময়ে নয়, স্থানীয়ভাবেও নয়। চিরন্তনও নয়।

রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয়তার চারটি মত

এ মতের লোক চার ভাগে বিভক্ত।

প্রথম ভাগের লোক, কার্লমার্ক্স ও তার অনুসারীরা। তাদের মধ্যে রাষ্ট্র সরকারের প্রয়োজনীয়তা শুধু ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষন সমাজে শ্রেণী-দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম চলতে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর মধ্যকার অর্থনৈতিক সমস্যাবলী দূরীভূত হয়ে যাবে- প্রকৃত কমিউনিজম যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন কোন রাষ্ট্র বা সরকারের প্রয়োজন নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে এ মতের কোন যৌক্তিকতাই নেই।

কেননা রাষ্ট্র ও সরকারের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা কতগুলি বস্তুগত সমস্যা ও কার্যকারণের উপরই নির্ভরশীল নয়। নিছক অর্থনৈতিক কারণেই তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতব্য নয়। শ্রেণীগত পার্থক্য দ্বন্দ্ব ও বিরোধ নিঃশেষ করার জন্যই তার প্রয়োজনীয়তা, এমন কথাও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। শ্রেণী-দ্বন্দ্ব নিঃশেষ হয়ে গেলেই রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে, এ কথার সমর্থনে অকাট্য কোন যুক্তিই পেশ করা যেতে পারে না। এসব বস্তুগত কারণ ছাড়াও নৈতিক ও স্বাভাবিক ভাবধারাগত এমন অনেক কারণই আছে, যা মানব-সমষ্টির জন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠাকে একান্তই অপরিহার্য করে তোলে। দ্বিতীয় ভাগের লোক হচ্ছে তারা, যারা প্রাচীনকালীন নৈরাজ্য ও শাসনহীন অবস্থাকেই পছন্দ কারে নিজেদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে। কেউ তাদের উপর শাসনকার্য চালাক, তাদের তৎপরতা ও কাজকর্মের উপর কোনরূপ বিধি-নিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হোক, তা তারা আদৌ পছন্দ করে  না। শুধু তাই নয়, তা তারা রীতিমত ভয় পায়। কেননা তাতে পাকরাও হওয়ার কারণ ঘটে, নানা প্রকারের শাস্তি ও দণ্ড ভোগ করতে বাধ্য হওয়ার মত অবস্থাও দেখা দিতে পারে। এ কারণে তারা রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধতা কারে, যেমন তাদের মনে যখন যা করার ইচ্ছা জাগবে তাই করার তারা অবাধ ও নিবির্ঘ্ন সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। কেউ যেন তাদের নিকট কোন কাজের জন্য কৈফিয়ত চাইতে না পারে, কেউ তাদেরকে কোন কাজের জন্য শাস্তি দিতে না পারে। তারা নিজেদের ইচ্ছা মত বা কল্যাণ চিন্তায় যা-ই করবে বা করতে চাইবে, তার পথে যেন কোন প্রতিবন্ধকতা দেখা না দেয়। তাদের জোর-প্রয়োগ ও ছিনতাই কাজ কেউ বাধা দিতে না পারে।তৃতীয় হচ্ছে সেই জনগোষ্ঠী, য়ারা রাষ্ট্র- সরকারের নিকট থেকে কেবল শাসন ও শোষন, রুঢ়তা, নির্যাতন-নিষ্পষণ, স্বৈরতান্ত্রিকতা ও শক্তিমানদের পক্ষপাতিত্বই দেখতে পেয়েছে চিরকাল। যা সকল কালের দুর্বলদের উপর চরম অত্যাচারই চালিয়েছে, তাদের- মৌলিক মানবিক অধিকারও হরণ করেছে, তাদের তাজা-তপ্ত রক্ত নির্মমভাবে শুষেঁ নিয়েছে, তাদের কল্যাণের সকল পথ ও উপয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের মানবিক মর্যাদাটুকুকেও পদদলিত ও ধুলি-লুণ্ঠিত করেছে।

এসব লোকের সম্মুকে রাষ্ট্র ও সরকারের নাম উচ্চারণ করলেই তারা সেই বিভীষিকায় সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে উঠে, বিচার ও শাসনের নাম সেই  অন্ধকারাচ্ছন্ন ও নির্যাতনে ভরপুর কারাগারের কথা স্নরণ করে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে, যা তারা সর্বত্র দাঁরিয়ে থাকতে ও তাদেরকে গ্রাস করার-জন্য মুখ ব্যাবদান করে থাকতে দেখতে পায়। এ কারণে তারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা সরকার-প্রশাসনকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। তার নাম শুনতে ও তারা প্রস্তুত নয়। তা না থাকলে নতুন করে প্রতিষ্টিত হোক,তা তারা চায় না,বরং সবচাইতে বেশি আতংকিত হয়ে উঠে। জুলুম,স্বৈরতন্ত্র ও নির্মমতা কোন্ মানুষ-ই বা পছন্দ করতে পারে!

তবে সে সাথে এই কথাও সত্য যে, এই লোকদেরকে যদি ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের মানবিক কল্যাণময় আদর্শের কথা,জনগণের অব্যাহত খেদমতের কথা সাধারন মানুষের প্রয়োজনপূর্ণ ন্যায়পরতা সরকারে পুরিপূরণ করার,নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মধ্যে ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার কথা যখন বলা হবে তখন এই লোকেরা হয়তো এমন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্টার পক্ষে রায় দেবে এবং সেজন্য চেষ্টা-সাধনা ও সংগ্রাম করতে কিছু মাত্র নিস্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারেনা। চতুর্থ হচ্ছে সেসব লোক, যারা নিরংকুশ ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষপাতী, যারা সে স্বাধীনতা কোন সীমার মধ্যে সীমাবদ্ব হোক, কোন প্রশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও সংকোচিত হোক, তা চায় না। এরা মনে করে রাস্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ব্যক্তি-স্বাধনিতা-এ দুটি পরস্পর বিরোধী –একটি ক্ষেত্র। এ দুটি কখনোই একত্রিত হতে পারে না। কেননা রাষ্ট্র ও সরকার ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত ও সংকোচিত করবে, তাতে তাদের কোনই সন্দেহ নেই।

স্পষ্ট মনে হচ্ছে, মানুষের উপযোগী ব্যক্তি-স্বাধীনতা-মানুষের জন্য যা একান্তই প্রয়োজন-আর বন্য স্বাধীনতা

এ দুটিকে  এই  লোকেরা এক করে দেখেছে। এই দুটির মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্যের কথা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।

বন্য স্বাধীনতা বলতে বোঝায় যেখানে কোন বিবেকেসম্মত নিয়ম-নীতিরও নিয়ন্ত্রন থাকবে না। সকলের অধিকার রক্ষার রক্ষার জন্য কোন আইনের বালাই থাকবে না। মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য কোন সীমাই চিহ্নিত হবে না। বনে-জঙ্গলে যেমন পশুকুল যা ইচ্ছা তাই করে-করতে পারে, যার শক্তি অন্যদের তুলনায় বেশী, তারাই কর্তৃত্ব স্বীকৃত, অন্য কথায় might is right- এর নীতি, যার আক্রমণের ক্ষমতা বেশী, যে অন্যদের অপেক্ষা বেশী জোরে হুংকার চালাতে পারে, দাপট দেখাতে পারে, রোষ ও আক্রোশ প্রকাশ করতে পারে, অন্যান্য সবাই তার ভয়েতেই কম্পমান।

কিন্তু এ স্বাধীনতা বনে-জঙ্গলে থাকলও-সেখানে শোভা পেলেও-মানব সমাজে তা কখনই শোভন হতে পারে না-বাঞ্ছনীয়ও নয়। মানুষের জন্য যে স্বাধীনতা কাম্য তা অবশ্যই আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সে জন্য সচেতনভাবে গৃহীত কিছু নিয়ম-নীতি থাকতে হবে। এমন কিছু মৌল মূল্যমান (values) থাকতে হবে, যা মানুষের মধ্যে নিহিত স্বাভাবিক শক্তি ও প্রতিভার বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি সাধন করবে। মানবীয় গুণ-গরিমা পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হবে ও নির্ভুল কল্যাণময় দিকে পরিচালিত হবে। সম্ভাব্য সম্পূর্ণতা কোন দিকেই কারোর নাগালের বাইরে থাকবে না। এরূপ এক স্বাধীনতা বিবেকসম্মত ও যুক্তিসম্মত নিয়ম-নীতি ভিত্তিক হওয়া ছাড়া পাওয়ার কল্পনাও করা যায় না। অন্য কথায়, মানুষের জন্য নির্ভুল ও শোভন স্বধীনতা তাই পারে, যার দুরু ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে নিহত স্বাভাবিক যোগ্যতা কর্মক্ষমতা বিকাশ লাভের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও আনুকূল্য পাবে। তাহলেই তা স্বাভাবিকতার পর্যায় থেকে বাস্তবাতার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত তা পূর্ণত্বের মাত্রায় পৌছে যাওয়ার সম্ভাব্য  পথ নির্দেশ লাভ করতে পারবে।

কিন্তু এই বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি লাভ অরাজক পরিবেশে পাওয়া যেতে পারে না। সেজন্য কিছু শর্ত ও প্রবৃদ্ধি লাভ অরাজক পরিবেশে পাওয়া যেতে পারে না। সেজন্য কিছু শর্ত ও সীমা একান্তই অপরিহার্য। উপযুক্ত কতিপয় নিয়ম-নীতিই সেই শর্তে ও সীমা একান্তই অপরিহার্য। উপযুক্ত কতিপয় নিয়ম-নীতিই সেই শর্তের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। তার বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি নিষিদ্ধ করবে বা তার পথ বন্ধ করে দেবে, এমন কথা তো নয়।

প্রকৃত ও শোভন ব্যক্তি-স্বাধীনতা হচ্ছে, মানুষ একটি বিশ্বাস গ্রহণ করবে, তার কর্মের মাধ্যমে সে বিশ্বাসকে বাস্তবায়িত করার অবাধ সুযোগ পাবে। তাও হবে তখন যখন ব্যক্তি অজ্ঞাত-মুর্খতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে নির্ভল জ্ঞান ও সমঝ্-বুঝের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশের মধ্যে এসে যেতে পারবে। তাও হবে তখন যখন ব্যক্তি অজ্ঞাত-মুর্খতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে নির্ভুল জ্ঞান ও সমঝ্-বু্ঝের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশের মধ্যে এসে যেতে পারবে। তাহলেই সে স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে একদিকে স্বীয় বিশ্বাসকে সত্যতা, যথার্থতা ও একনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবে, আর সেই সাথে তার স্বভাবগত কর্মপ্রতিভা ও দক্ষতাকে বিকশিত ও প্রবৃদ্ধ করতে সমর্থ হবে। আর মানুষ যে এভাবেই পূর্ণত্ব অর্জন করতে পারে, পারে জীবনের সাথর্কতা লাভ করতে, তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না। বস্তুত মানুষের  জন্য এই স্বাধীনতাই কাম্য।

তবে মানব সমাজের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, অন্ধ জাতীয়কাবোধ প্রসূত রাষ্ট্র সরকার উপরে বর্ণিত শোভন স্বাধীনতাকে পর্যুদস্ত করে। যুক্তিসঙ্গত ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে কঠিনভাবে আষ্টেপৃষ্ট বেঁধে রাখে।কিন্তু ইসলাম উপস্থাপিত রাষ্ট্র- সরকার কখনই তা করে না। ইসলামী সরকার বা তার প্রশাসাক জনগণের উপর কেবলমাত্র সে সব আদেশ-নিষেধই কারযত করে, যা মানুষ ও বিশ্বলোকের মহান স্রষ্টা মানুষর সাবির্ক কল্যাণের দৃষ্টিতেই নাযিল করেছেন। সে সরকার বা প্রশাসক নিজ ইচ্ছামত কোন কাজের আদেশও করে না,কোন কাজ করতে নিষেধাজ্ঞাও জারি করে না। করার অধিকার সেখানে কাউকেই দেয়া হয় না। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সামগ্রিকভাবে গোটা মানবতার জন্যই কল্যাণকর, তা যে মানুষের পূর্ণত্ব বিধান করে, মানুষেরস স্বভাব নিহত প্রতিভা ও কর্মক্ষমতাকে বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি দান করে, মানুষের জন্য সার্বিকভাবে যাবতীয় অকল্যাণ ও ক্ষতির প্রতিরোধ করে ও মানুষকে উত্তরোত্ত উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, তাতে কারোর কি একবিন্দু সংশয় থাকতে পারে?

বস্তুত, ইসলামের মানুষের জন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উদাত্ত কন্ঠে প্রকাশ করেছে, কিন্তু সে রাষ্ট্র ও সরকার নিশ্চয়ই তা নয় যার কিছুটা আভাষ এই মাত্র দেয়া হল। ইসলামের উপস্থাপিত রাষ্ট্র ও সরকারের কিছু রূপরেখা কুরআন মজীদের আয়াতের ভিত্তিতে এখানে পেশ করা হচ্ছে।

কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের রূপরেখা

কুরআনের ঘোষণানুযায়ী ইসলামী প্রশাসক কেবল জনসমষ্টির লাগামের ধারকই হয় না-লাগাম ধরে যেমন ইচ্ছামত অশ্ব বা উট চালানো হয়, প্রশাসক মানুষকে সেদিকেই চালিয়ে নেবে। নিজ ইচ্ছামত প্রদত্ত আদেশ-নিষেধ মানতে মানুষকে বাধ্য করবে, স্বীয় নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিতকরণ ও প্রভাত্বের লালসা চরিতার্থ করবে, তা কখনই হতে পারে না। সে তো হবে অত্যন্ত কঠিন দায়িত্বশীল, দুর্বহ কর্তব্য বোঝা নিজের মাথায় ধারণকারী। কুরআন বলেছেঃ(আরবি)

ইসলামী রাষ্টের কর্তা ও প্রশাসক যাদেরকে আমরা বানাই, তারা সালাত ব্যবস্থা কায়েম করে, যাকাত আদায় বন্টনের ব্যবস্থা কার্যকর করে, কেবল মাত্র ভাল ও কল্যাণকর কাজের আদেশ করে ও যাবতীয় অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর কাজ করতে নিষেধ করে।

এ আয়াতটি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তা ও কর্মচারীদের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব হচ্ছেঃ

১. সালাত কায়েম করা-ব্যপকভাবে সালাত আদায়ের মাধ্যমে গোটা সমাজকে সর্বকল্যাণের আঁধার মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দেয়া।

২. যাকাত আদায় ও বন্টনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এরই ভিত্তিতে সমাজ-সমষ্টির জৈবিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ ও সুসংবদ্ধকরণের কাজ করবে।

৩. কল্যাণময় কার্যাবলীর প্রকাশ ও প্রচার ও সামষ্টির কল্যাণের প্রতিষ্ঠা।

৪.সকল প্রকারের অকল্যাণকর, ক্ষতিকর, অনিষ্টকারি, বিপর্যয় ও বিকৃতি উদ্ভাবক কার্যাবলী নিষিদ্ধকরণ, জুলুম, নিপীড়ন, শোষণ ও মিথ্যার অপনোদন করা। শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করা।

এইরূপ একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে সর্বমানুষের স্বভাবসম্মত যোগ্যতা-প্রতিভার স্ফূরণ, বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি বিধানের সহায়তাকারি, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকারী, চিন্তা-বিশ্বাস ও জ্ঞানগত শক্তি-দক্ষতার প্রাচুর্য দানকারী- সামাজিক, রাজনৈক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক-সকল পর্যায়ে সম্ভাব্য সকল উৎকৃষ্ঠ ও উন্নতি বিধানকারী, সে ব্যাপারে কারোর একবিন্দু সন্দেহ থাকতে পারে কি?

ইসলাম যদি এইরূপ একটি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহব্বান জানিয়ে থাকে, তাহলে সেজন্য ভয় পাওয়ার কোন কারণ আছে কি? এরূপ একটি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ব্যতীত মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সাধন যে আদৌ সম্ভব নয়, মানুষের প্রকৃত ও ন্যায্য অধিকারসমূহ পেয়ে জীবন ধন্য করার একমাত্র উপায় যে এইরূপ একটি রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠিত করা, তা অস্বীকার করার সাধ্য কার আছে?

ইসলামী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা হতে পারে সেই ব্যক্তির, যার মধ্যে এই তিনটি গুণ অবশ্যম্ভাবীরূপে বর্তমান রয়েছেঃ

-তাকওয়া পরহেযগারী, যা তাকে আল্লাহর না-ফরমানী থেকে বিরত রাখবে;

এমন ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা, যা তার উদ্রিক্ত ক্রোধ ও রোষ-অসন্তোষকে দমন ও নিয়ন্ত্রন করবে;

-এমন দয়ার্দ্র নেতৃত্ব গুণ, যা তাকে সাধারণ মানুষের জন্য পিতৃতুল্য স্নেহ-বাৎসল্য সদা আপ্লুত করে রাখবে।

সন্দেহ নেই অতীব উত্তম জিনিস হচ্ছে সে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কতৃত্ব, যা একজন গ্রহণ করবে তার যোগ্যতা দক্ষতার ভিত্তিতে । আর তা অত্যন্ত খারাপ জিনিস হচ্ছে তার যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে। আর তা অত্যন্ত খারাপ জিনিস হচ্ছে তার জন্য, যে তা গ্রহণ করবে তার কোন যোগ্যতা ও অধিকার ব্যতিরেকে। কিয়ামতের দিন তা তার জন্য লজ্জা ও অনুতাপেরই কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

মূলত রাষ্টীয় নেতৃত্ব একটি অতি বড় আমানতের ব্যাপার। তবে কিয়ামতের দিন তাই-ই বড় অনুতাপ ও লজ্জার কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি সে দায়িত্ব পূর্ণ যোগ্যতা ও একনিষ্ঠতা সহকারে পালন করে তাহলে ভিন্ন কথা।

“একজন ন্যায়বাদী সুবিচারক রাষ্ট্রনেতার সাধারণ মানুষের কল্যাণে একদিন কাজ করা একজন ইবাদতকারীর একশত বছর ইবাদত করার সম্মান।

তুমি যখন কোন কঠিন দায়িত্বপূর্ণ কাজের সম্মুখীন হবে, তখন বেশী বেশী করে আল্লাহর স্মরণ কর। তুমি যখন জাতীয় সম্পদ বন্টন করবে, তখনও আল্লাহকে মুহূর্তের জন্যও ভুলে যেও না। আর যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, কোন বিচার্য বিষয়ে রায় দেবে, তখন অবশ্যই তোমার রব্বকে স্মরণ করবে। [ কিতাবুল আমওয়াল; হাফেজ আবু উবাইদ সালাম ইবনুল কাসেম রচিত থেকে এসব হাদীস গৃহীত : পৃঃ ১০]

রাসূলে করীম (স) এইসব-এবং এ ধরনের আরও বহু জ্ঞানপূর্ণ কথা দ্বারা তাঁর সাহাবীগণকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তিনি এই শিক্ষাও দিয়েছেনঃ

রাসূলে করীম (স) এইসব- এবং এ ধরনের আরও বহু জ্ঞনপূর্ণ কথা দ্ধারা তাঁর সাহাবীগণকে শিক্ষা ও প্রশিক্ণ দিয়েছেন। তিনি এই শিক্ষাও দিয়েছেনঃ

তোমাদের প্রত্যেকেই রাখালের ন্যায় দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে ও জবাবদিহি করতে বাধ্য করা হবে। জনগণের শাসনকার্যের দায়িত্বশলি জগণের উপর রাখালের ন্যায় দায়িত্বশীল, তাকে তাদের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। প্রত্যেক ব্যাক্তিই তার পরিবারবর্গ সম্পর্কে দায়িত্বশীল ।তাকেও তাদের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘর সংসারের জন্য  ও তার সন্তানের জন্য দায়িত্বশীল। তাকেও সে বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে।….তোমরা সকলেই মনে রাখবে, তোমরা প্রত্যেই এবং সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে- এবং সকলকে-ই সেজন্য জবাবদিহি করতে হবে। [ কিতাবুল আমওয়াল; হাফেজ আবু উবাইদ সালাম ইবনুল কাসেম রচিত থেকে এসব হাদীস গৃহীত : পৃঃ ১০]

হয়রত আলী (রা) ইলামী প্রশসকেন গুণ- পরিচিতি পর্যায়ে বলেছেনঃ

জনগণের উপর শাসকের অধিকার এবং  শাসকের উপর জনগণের অধিকারসমূহ মহান আল্লাহ  তা‘আলা নিজেই ধার্য  ও সুচিহ্নিত করে দিয়েছেন। প্রত্যেকেরই কর্তব্য রয়েছে অপর প্রত্যেকের জন্য একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থা হিসেবে এবং তা তাদেরই কল্যাণের জন্য।  তাদের দ্বীনের সম্মান ও শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে। বস্তুত জনগণের কল্যাণ হতে পারে না শাসকদের কল্যাণ ব্যতীত; শাসকদেরও কল্যাণ হতে পারে না জনগণের দৃঢ় স্থিতি ব্যতীত। জনগণ যদি শাসকের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করে, শাসকও যদি জনগণের অধীকার যথাযথ রক্ষা করে, তাহলে সকলেরই অধিকার পারস্পরিকভাবে আদায় হয়ে যায়। দ্বীনের পথ ও পন্থাসমূহ যথাযথ কার্যকর হয়। সুবিচার ও ন্যায়পরতার দন্ড যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রকট হতে পারে।  তার উপর ভিত্তি করে সুষ্ঠু নিয়ম-নীতিসমূহ সুচারুরূপে চালু হতে পারে। তার ফলে গোটা সময়ই কল্যাণময় হয়ে উঠবে। রাষ্ট্র ও সরকারের স্থিতি জনগণের কাম্য হবে। শত্রুদের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যাবে। জনগণের নিকট শাসক যদি জনগণের ব্যাপারে ভুল নীতি গ্রহণ করে বসে, তাহলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে। অত্যাচার ও নির্যাতনের কারণসমূহ প্রকট হয়ে পড়বে। দ্বীন পালনে চরম দুর্নীতি ও নীতি লংঘনমূলক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। চিরন্তন কল্যাণময় আদর্শ পদদলিত হবে। তখন মানুষ নফসের খাহেশ অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ-হুকুম-আহকাম অকার্যকর হয়ে পড়বে। তখন মানুষের মধ্যে অশান্তি বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। তখন কোন পরম সত্য বাতিল হয়ে গেলেও লোকেরা খারাপ মনে করবে না। কোন বড় বাতিল কাজ দেখেও মানুষ সতর্ক সক্রিয় হয়ে উঠবে না। এরূপ  অবস্থায় নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা অপদস্ত ও অপমানিত হবে, সমাজের চরিত্রহীন দুষ্কৃতিপরায়ণ ব্যক্তিরা সম্মান ও শক্তির অধিকারী হয়ে বসবে। তখন আল্লাহর বান্দাগণের পক্ষে আল্লাহর আদেশ পালন দুষ্কর হয়ে পড়বে। [ আরবী টীকা]

হযরত আলী রা. তাঁর অপর এক ভাষণে শাসক ও শাসিতের মধকার মিলিত অধিকারসমূহের কথা বলে প্রকাশ করেছেনঃ [আরবী………………………]

এ দৃষ্টিতে অধিকারের দিক দিয়ে শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে আইনের সম্মুখে সকলেই সমান ও সম্পূর্ণভাবে অভিন্ন। সামাজিক ও প্রতিফলপূর্ণ সমস্ত কাজের দায়িত্ব জনগণের অধিকারসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা- জনগণের মধ্যেরই একজন ব্যক্তির মত, জনগণও তেমনি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করা। এভাবে রাসূলে করীম সা.-এর এই প্রখ্যাত কথাটির বাস্তবতা সম্ভবপর হয়ঃ [ আরবী……….]

সত্যের সমীপে সমস্ত মানুষ সর্বতোভাবে সমান।

চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (র) যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁবুতে বসে নিজের জুতায় তালি লাগাচ্ছিলেন। তিনি তখন হযরত ইবনে আব্বাস (র)-কে জিজ্ঞেস করলেন- বলতে পারেনম, এই জুতার কি মূল্য? তিনি বললেনঃ এর কোন মূল্য নেই। তখন হযরত আলী (র) বললেনঃ [আরবী……….]

আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, তোমাদের এই রাষ্ট্রীয় তায়িত্বের তুলনায় এই জুতাই আমার নিকট অধিকতর প্রিয়। তবে আমি যদি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে ও বাতিলকে প্রতিরোধ করতে পারি, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা।

বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্র দর্শনের দৃষ্টিতে শাসকের দিল জনগণের প্রতি দয়ালু ও অনুকম্পা সমৃদ্ধ হতে হবে। তাদের প্রতি সব সময় কল্যাণকামী হতে হবে। হিংস্র জন্তু যেমন তার শিকার নিয়ে খেলা করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে চিড়ে-ফেঁড়ে খেয়ে ফেলে, শাসকদের কখনই সে রকম হওয়া উচিত নয়।

এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমার মূল আলোচ্য বিষয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে বলতে চাই, রাষ্ট্র ও সরকার- বিশেষ করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টার কথা শুনে যারা ভয় পায়, তারা আসলে ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের কল্যাণমুখী ও সুবিচার প্রতিষ্ঠাকামী ভাবধারা ও লক্ষ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। এ-ও হতে পারেযে, যারা নীতিহীন আদর্শ বিবর্জিত উচ্ছৃংখল জীবন যাপনের পক্ষপাতী, তারা জেনে বুঝে ইচ্ছা করেই এ ধরণের রাষ্ট্র ও সরকারের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধতা করে।

ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার কেবল দেশবাসী মুসলিমদের জন্যই ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ব্যবস্থা করে না, বিধর্মীদের প্রতিও তার ন্যায়নিষ্ঠা ও সুবিচারের একবিন্দু ব্যতিক্রম হয় না। ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষই এই রাষ্ট্রের অধীন পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা সহকারে নির্বিঘ্ন জীবন যাপন করার সুযোগ পেতে পারে। ধর্ম ও মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে অধিকার আদায়ে কোন তারতম্যকে একবিন্দু স্থান দেয়া হয় না। এই পর্যায়ে ইসলামী শাসন প্রশাসনের ইতিহাসই অকাট্য প্রমাণ। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকেরা যে ধরনের শাসন-প্রশাসনের অধীন জীবন যাপন করছিল, তা থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যেই তারা ইসলামী প্রশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ইসলামী প্রশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ইসলামের বিজয়ের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। মুসলমানদের নেতৃত্বের অধীনতা তারা নিজেরাই সাগ্রহে গ্রহণ করেছে। কেননা তারা মুসলিম শাসকদের হৃদয় মনে নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য যে দয়া অকুকম্পার নিশ্চিত সন্ধান পেয়েছে, তা তাদের বর্তমান শাসকদের নিকট কখনই পায়নি, কোন দিন তা পাবে বলেও তাদের মনে কোন আশাবাদ ছিল না।

এই পর্যায়ে প্রমাণ হিসেবে ‘মদীনার সনদ’ নামে বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধানের উল্লেখ করতে চাই। নবী করীম (স) মদীনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার পর মুসলিম ও অমুসলিম-ইয়াহুদি ইত্যাদির সাথে এক রাষ্ট্রের অধীণ বসবাসের জন্য একটি দলীল তৈরী করেন। তাতে সংশ্লিষ্ট সকলেরই ন্যায়সঙ্গত অধিকারের কথা স্পষ্ট ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন। এই দলীলের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখানে তুলে দেয়া হচ্ছেঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম- ইহা আল্লাহর রাসূল নবী মুহাম্মদ (স) ও (হুরাইরা বংশের) মু’মিন-মুসলিম এবং মদীনাবাসীদের মধ্যে এক লিখিত চুক্তি। যারা তাদের সাথে পরে মিলিত হয়েছে ও তাদের সাথে মিলিত হয়ে জিহাদ করেছে তারা এর মধ্যে শামিল ও গণ্য। এরা অন্যান্য মানুষ থেকে পৃথক এক উম্মত।

এরপর ইসলামী কবীলাসমূহের এবঙ নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব এবং দুর্বলের সহায়তা ও সুবিচার ইনসাফ ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার উল্লেখের পর এমন কতগুলি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে যা সর্বসাধারণ মুসলিমের সাথে সংশ্লিষ্ট। অতঃপর লিখিত হয়েছেঃ

মু’মিন মু’মিনের সাথে কত বন্ধুত্ব ভঙ্গ করবেনা, কারোর সাথে কৃত চুক্তির বিরুদ্ধতা করবে না। মু’মিন মুত্তাকীগণ ঐক্যবদ্ধ- তাদেরই কারোর সন্তানের বিরুদ্ধে হলেও…….. ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে যে লোক আমাদের অনুসরণ করবে, তাকে সাহায্য করা হবে, কোনরূপ জুলুমের শিকার তারা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে অন্যদেরও সাহায্য সহযোগিতা করা হবে না।

বনু আওফ-এর ইয়াহুদীরা মু’মিনদের সাথে এক উম্মত। ইয়াহুদীরা তাদের ধর্ম পালন করবে, মুসলমানরা পালন করবে তাদের দ্বীন। প্রত্যেকে নিজ নিজ চুক্তিবদ্ধ লোকদের সাথে চুক্তি রক্ষার জন্য তারাই দায়ী হবে। তবে কেউ জুলুম করলে ও অপরাধ করলে সে নিজেকে- নিজের পরিবারবর্গকেই বিপদে ফেলবে।

ইয়াহুদিদের ব্যয়াদি তারা নিজেরাই বহন করবে, মুসলমানদের ব্যয় মুসলমানরাই বহন করবে। এই সন্ধিপত্রে স্বাক্ষরকারী কোন পক্ষের বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধ করলে তাদের পারস্পরিক সাহায্যদান অবশ্য কর্তব্য হবে। আর তাদের পরস্পরে হবে কল্যাণ কামনা, উপদেশ দান, পারস্পরিক উপকার সাধন- কোনরূপ পাপ বা অপরাধ ব্যতীত। [আরবী টীকা]

মদীনায় স্বাক্ষরিত এই সনদের সারকথাঃ

১. মুসলমানদের বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের এক ও অভিন্ন উম্মতে পরিণত করা হয়েছে।

২. দিয়ত ও রক্তমূল্যের ব্যাপারে কুরাইশ বংশের মুহাজিরদিগকে তাদের চিরন্তন রীতি-নীতি ও অভ্যাসের উপর বহাল রাখার ঘোষণা হয়েছে, অবশ্য পরে ‘হদ্দ’ ও দিয়তকে একটি বিশেষ ধরনের ফরয করে দেয়ার ফলে তা নাকচ হয়ে যায়।

৩. মুহাজিরদের কোন লোক মুশরিকদের হাতে বন্দী হলে তার জন্য বিনিময় মূল্য নিয়ে তাকে তাদের নিকট থেকে মুক্ত করনের দায়িত্ব মুহাজিরদেরই বহন করতে হবে।

৪. সমগ্র জনগোষ্ঠী ও গোত্র ইনসাফপূর্ণ ও প্রচলিন নীতিতে বন্দী বিনিময় মূল্য দেয়ার দায়িত্বশীলতা ঘোষিত হয়েছে।

৫. যেসব গোত্রের নাম সনদে লিখিত হয়েছে, তাদেরকে তাদের নিজস্ব আদত-অভ্যাসের উপর বহাল রাখা হয়েছে। প্রত্যেক গোষ্ঠীই তার সাহায্যকারীর বিনিময় মূল্য দিতে বাধ্য হবে।

৬. বিনিময় মূল্য আদায় করার দরুন যে মু’মিন ব্যক্তি ঋণে ভারাক্রান্ত হবে, তার সাহায্যে সকল মু’মিনকে এগিয়ে আসতে হবে।

৭. বিদ্রোহ, জুলুম সকল ক্ষেত্রে ও ব্যাপারেই অস্বীকার করা এবঙ যে তা করবে তাকে প্রতিরোধ করা- কারোর নিজের বংশধর হলেও। তারা এর ব্যতিক্রম করলে তারা সকলেই সেজন্য দায়ী হবে।

৮. মু’মিন কাফিরকে হত্যা করলে তার কোন প্রতিশোধ নেয়া যাবে না, তবে শুধু দিয়ত বা রক্তমূল্যই করা হবে।

৯. মুসলমানরা নিকটবর্তী যাকেই চাইবে মজুরির বিনিময়ে কাজে নিযুক্ত করতে পারবে।

১০. কুরাইশ মুশরিকদের কোন ধন-মাল কিংবা রক্তমূল্য দেয়ার কোন অনুমতিই নেই।

১১. কোন মু’মিনের বিনা কারণে হত্যাকারীকে দণ্ডিত হতে হবে। তবে নিহতের অভিভাবক-উত্তরাধিকারীরা দিয়ত গ্রহণ করে দাবি ছেড়ে দিতে রাযী হলে সে দিয়ত অবশ্যই গ্রহণীয় হবে।

১২ ইসলামে নতুন নীতি প্রবর্তন বা সংযোগকারীদের সাহায্য করা কিছুতেই ক্ষমা করা হবে না। তাদের অবশ্যই প্রতিরোধ করা হবে।

১৩. মুসলমানদের পরস্পরে কিংবা মুসলমান ও ইয়াহুদীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব- ঝগড়া-বিবাদ ও সমস্যাসমূহ নবী করীম (স) নিজেই মীমাংসা করবেন।

১৪. ইয়াহুদীরা নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা পর্যায়ের সাধারণ অধিকারসমূহ লাভ করবে। তবে এই যে, তারা মুসলমানদের সহযোগীতা করবে, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করবে না।

১৫. প্রতিবেশীর সাথে আপন জনের মতই আচরণ করতে হবে। কোনরূপ ক্ষতি বা পাপাচরণ করতে পারবে না। মদীনা চুক্তির কতিপয় বড় বড় ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখানে উদ্ধৃত করা হলো। [আরবী টীকা]

রাসূলে করীম (স)-এর জীবনে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন বসবাসকারী অমুসলিমদের প্রতি সদাচারণ প্রদর্শনেরই এটা নিয়ম ছিল না। কেবল তাঁর জীবন-কালের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পরও ইসলামী রাষ্ট্রে এরূপ সদাচারই কার্যকর হয়েছে, এটা ইসলামী রাষ্ট্রের নীতি।

ইসলামী রাষ্ট্রে শাসক ও শাসিতের মধ্যে পূর্ণ সমতা ও পার্থক্যহীনতা চিরকালই রক্ষিত হয়েছে। সকল ক্ষেত্রেই তা হয়েছে। সকল ক্ষেত্রেই তা হয়েছে, কোন বিশেষ ক্ষেত্রে নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বিচার বিভাগের কথা অনায়াসেই উল্লেখ করা যায়।

হযরত আলী (র)-র খিলাফত কালের ঘটনা। তাঁর নিজের বর্মটি হারিয়ে যায় এবং পরে তা একজন খৃষ্টানের নিকট দেখতে পাওয়া যায়। সে রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক মাত্র। তিনি ইচ্ছা করলে নিজে বা অন্য লোকদের দ্বারা সেটি সহজেই নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি তা করেন নি। তিনি নিজে একজন বিচারকের নিকট উপস্থিত হলেন নিজের দাবি পেশ করার উদ্দেশ্যে। এই বিচারক ছিলেন শুরাইহ্। মামলা দয়ের করার পর বিচার কক্ষে বিচারকের সম্মুখে বাদী ও বিবাদী উভয়ই উপস্থিত হয়। বাদী হযরত আলী (র) বললেনঃ বিবাদীর নিকট যে বর্মটি রয়েছে ওটি আসলে আমার। আমি তা বিক্রয় করিনি, তাকে দানও করিনি।

বিচারক বিবাদীকে তার বক্তব্য বলার জন্য আদেশ করলেন। বিবাদী বললঃ না, বর্ম আমার। তবে আমীরুল মু’মিনীন মিথ্যাবাদী, তাও বলবনা। এই সময় বিচারপতি হযরত আলী (র) সহাস্যে জবাব দিলেন, না, আমার নিকট কোন সাক্ষ্য বা প্রমাণ নেই।

অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, সাক্ষী হিসেবে তিনি তাঁর ক্রীতদাস কুম্বরকে পেশ করেছিলেন। কিন্তু মনিবের পক্ষে তারই ক্রীতদাসের সাক্ষ্য সুবিচারের নীতিতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিচারপতি সে সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেন এবং শেষ পর্যন্ত বিচারক রায় দেন যে, এই বর্মটি খৃষ্টান ব্যক্তিরই।

অতঃপর লোকটি বর্মটি গ্রহণ করে চলে যেতে লাগল। হযরত আলী (র) নীরবে শুধু তাকিয়ে থাকলেন। কিন্তু লোকটি কয়েক পা চলে গিয়ে আবার ফিরে এসে বললঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এ-ই নবী রাসূল গণের বিচার পদ্ধতি। আমীরুল মু’মিনীন আমাকে বিচারকের নিকট নিয়ে চলুন। তিনি পুনরায় বিচার করবেন।

অতঃপর বললঃ আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, এ বর্মটি আমীরুল মু’মিনীনেরই। আমি পূর্বে মিথ্যা বলেছি।

ইসলামের এ দৃষ্টান্তহীন ন্যায়বিচার দেখে লোকটি পরবর্তীকালে ইসলাম কবুল করে এবঙ একজন দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। [আরবী টীকা]

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক (র)-এর খিলাফতকালে এক ইয়াহুদি হযরত আলী (র)-র সাথে বিবাদ করে খলীফাতুল মুসলিমীনের দরবারে মামলা দায়ের করল।

খলীফার দরবারে বাদী-বিবাদী দু’জনই উপস্থিত। হযরত উমর ফারুক (র) বললেন, ‘হে আবুল হাসান! আপনি উঠে আপনার অপর পক্ষের পাশে সমান মর্যাদার স্থান গ্রহণ করুন’।

এ কথা শুনে হযরত আলী (র)-র হয়ত আপমানিত বোধ হলো, মুখাবয়বে তার চিহ্ন প্রকট হয়ে দেখা দিল। তখন খলীফাতুল মুসলিমীন বললেনঃ ‘হে আবুল হাসান (আলী), আপনাকে আপনার বিপক্ষ ইয়াহুদী ব্যক্তির পাশে স্থান নিতে বলায় আপনার হয়ত খুব খারাপ লেগেছে। তখন হযরত আলী (র) বললেনঃ না, না, তা কখ্খনই নয়। আমার খারাপ লেগেছে শুধু এতটুকু যে, আপনি আমাকে আমার নিজের নাম ধরে না ডেকে আমার উপনাম আবুল হাসান বলে সম্বোধন করেছেন। এ ব্যাপারে আপনি আমার ও আমার বিরুদ্ধ পক্ষ সমান মর্যাদায় রাখেন নি, পূর্ণ সমতা রক্ষা করেননি। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিম ও অমুসলিম-ইয়াহুদী-খৃষ্টান ইত্যাদি সকলেই সস্পূর্ণভাবে সমান ও অভিন্ন। [ আরবী টীকা]

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক (র) একদা এক বৃদ্ধ অন্ধ ব্যক্তিকে লোকদের নিকট ভিক্ষা চাইতে দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ লোকটি কে? বলা হলো, একজন খৃষ্টান ব্যক্তি। তিনি বললেনঃ ‘লোকটির যৌবন ও কর্মক্ষমতার কালে তো তাকে কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু সে যখন বৃদ্ধ ও অক্ষম হয়ে পড়েছে, তখন তাকে ভিক্ষা করে রুজী রোজগার করার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে! এটা আদৌ সুবিচার নীতি হতে পারে না। বায়তুলমাল থেকে তার যাবতীয় রুজির ব্যবস্থা করা হোক’।

একটি বর্ণনায় হযরত আলী (র)-র খিলাফতকালেও এই রকম একটি ঘটনার ও খলীফার পক্ষ থেকে লোকটির জন্য অনুরূপ ব্যবস্থা করার কথা বর্ণিত হয়েছে।

এই পর্যয়ে নীতি ও আদর্শের দিক দিয়ে সর্বপ্রথম কুরআনের বিধান উল্লেক্য। কুরআন মজীদ অমুসলিমদের বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করার এবং তাদের প্রতি পূর্ণ সহৃদয়তা ও সুবিচার রক্ষা করার অনুমতি এবং নির্দেশ দিয়েছে। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের আয়াত হচ্ছেঃ [আরবী……………..]

যেসব লোক দ্বীনের ব্যাপারে তোমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বহিষ্কৃতও করেনি, তাদের সাথে তোমরা কল্যাণময় ব্যবহার করবে ও সুবিচার নীতি কার্যকর করবে- তা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে বিন্দুমাত্রও নিষেধ করছেন না। তোমাদেরকে নিষেধ করছেন সেসব লোকদের ক্ষেত্রে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বহিষ্কৃত করেছে ও তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করবার জন্য শক্তি প্রদর্শন করেছে, প্রস্তুতি নিয়েছে, তাদের সাথে তোমরা কোনরূপ বন্ধুত্ব পোষণ করবে না। বস্তুত যারাই এই ধরনের লোকদের সাথে কোনরূপ বন্ধুত্ব পোষণ করবে, তারাই জালিম লোক।

এ আয়াত অনুযায়ী মুসলমাদের প্রকৃত শত্রু তারা, যারা দ্বীনের ব্যাপারে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করেছে, মুসলমানদের তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত করেছে অথবা বহিষ্কৃত করার জন্য রীতিমত পাঁয়তারা করেছে, দাপট দেখিয়েছে ও প্রস্তুতি নিয়েছে! অতএব এই শত্র ভাবাপন্ন লোকদের সাথে মুসলমানরা কোনরূপ বন্ধুত্ব করতে পারে না। এইরূপ লোক –যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ কারণে যুদ্ধ করেছে ও নানাভাবে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, ক্ষতি করতে চেয়েছে, তারা কখনই মুসলমানদের বন্ধু গণ্য হতে পারে না, তাদের সাথে কোন মুসলমান একবিন্দু বন্ধুত্ব পোষণ করবে, তারা জালিম বলে গণ্য হবে। অতএব তাদের সাথে মুসলমানদের কোনরূপ শুভ আচরণ বা কোনরূপ ন্যায়বিচার করার কোন প্রশ্নই উঠনে পারে না।

পক্ষান্তরে যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দ্বীনের ব্যাপার নিয়ে যুদ্ধ করেনি, তাদের ঘর-বাড়ী থেকে তাদের বহিষ্কৃতও করেনি, তারা প্রকাশ্য শত্রু রূপে চিহ্নিত হবে না। অতএব তাদের প্রতি শুভ আচরণ গ্রহণ করা –সর্বোপরি পূর্ণ মাত্রার সুবিচার করা কিছুমাত্র নিষিদ্ধ নয়। বস্তুত অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের  আচার-আচরণ কি হবে, তার জন্য একটি সুষ্ঠু ও চিরস্থায়ী মানদণ্ড এ আয়াতটি আমাদের সম্মুখে পেশ করেছে। আর সে মানদণ্ড হচ্ছে, যারাই মুসলমানদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে। আর যারা মুসলমানদের সাথে শত্রুতার আচরণ করবে, তারা মুসলমানদের শত্রুরূপে চিহ্নিত হবে।

এই আয়াতটির বক্তব্যের পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যায় নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটিতে!

ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী…………..]

হে ঈমানদার ব্যক্তিগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদের ছাড়া অন্য কারোর সাথেই আন্তরিক গোপন বন্ধুত্ব গ্রহণ বা পোষন করবে না। তারা তোমাদের অসুবিধা-বিপদ কালের সুযোগ নিতে বিন্দুমাত্রও ত্রুটি করবে না। যাতে তোমাদের ক্ষতি বা বিপদ হতে পারে, তা-ই ওদের কাম্য। তাদের মনের প্রতিহিংসা ও শত্রুতা তাদের মুখ থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। আর যা তাদের মনে এখনও অপ্রকাশিত –প্রচ্ছন্ন রয়ে গেছে, তা তো তার চাইতেও অনেক বড়, তীব্রতর।

আমরা তোমাদেরকে সুম্পষ্ট হেদায়েত দিলাম। তোমরা বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে তা বুঝতে পারলে (কখনই এ হেদায়েতের বিপরীত আচরণ গ্রহণ করবে না)।

অর্থাৎ যে সব লোক মুসলমানদের সাথে শত্রুতা করে, মুসলমানদেরকে নানাভাবে কষ্ট দেয়, নির্যাতন করে এবং মুসলমানদেরকে  কষ্ট দেয়ার লক্ষ্যে মুশরিকদের সাথে সহযোগিতা করে, কুরআন মজীদ তাদের প্রতি কোনরূপ দয়া-দাক্ষিণ্যের আচরণ করতে, তাদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব করতে এবঙ তাদের প্রতি সুবিচার করতে নির্দেশ দেয়নি। বরঙ তা করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসের পৃষ্ঠার উপর দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যাবে, ইসলামের হুকুমানের ন্যায়পরতা, সুবিচার ও নিরপেক্ষতাই অমুসলিম খৃষ্টান ও ইয়াহুদী ইত্যাদি জাতি ইসলামী হুকুমাতের অধীন জীবন যাপন করাকে তাদের স্বধর্মীয় শাসকদের অধীন জীবন-যাপন করার তুলনায় অধিক অগ্রাধিকার দিয়েছিল। কেননা তারা নিজেদের চোক্ষেই ইসলাম ও মুসলিম সমাজের পরম দয়াশীলতা ও নিরপেক্ষ সুবিচার দেখতে পেয়েছিল। তাদের স্বধর্মীয় শাসকদের অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে তারা ইসলামী হুকুমাতের অধীনে বসবাস করা অধিক নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ বলে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করত।

প্রখ্যাত ও প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থ ‘ফুতুহুল-বুলদান’ লেখক বালাযুরী এই পর্যায়ে লিখেছেনঃ [আরবী………..]

হিরাক্লিয়াস যখন মুসলমানদের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করল ও ‘ইয়ারমুক’ নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পৌঁছল, তখন মুসলমানরা ইতিপূর্বে দখল করা ‘হিমস’–এর অধিবাসীদের নিকট থেকে গৃহীত ‘খারাজ’ ফিরিয়ে দিলেন। বললেনঃ এক্ষণে আমরা তোমাদের সাহায্য করতে ও তোমাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব প্রলন করতে পারছি না। এখন তোমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ কর।

এই কথা শুনে ‘হিমস’-এর অধিবাসী অমুসলিমরা বললেনঃ [আরবী…………..]

পূর্বে আমাদের স্বধর্মীয় লোকদের শাসনাধীন যে ভাবে নির্যাতিত হচ্ছিলাম তার তুলনায় তোমাদের শাসন-কর্তৃত্বের অধীন থাকা আমাদের নিকট অধিক শ্রেয় ও প্রিয়। আমরা তোমাদের সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে হিরাক্লিয়াসের মুকাবিলা করব এবং ‘হিমস’ যাতে সে দখল করতে না পারে তার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

এই সময় ইয়াহুদীরাও দাড়িয়ে বললঃ [আরবী………..]

তওরাতের নামে কসম খেয়ে বলছি, হিরাক্লিয়াস কখখনই হিমস নগরে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষন না তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে পরাজিত হই। অতঃপর তারা নগর-প্রাচীর-দ্বারসমূহ বন্ধ করে দেয় ও তার পাহারাদারী করতে শুরু করে। [ আরবী টীকা]

ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের সাথে সন্ধিক্রমে যে সব নগর মুসলমানদের দখলে আসে সেখানকার অধিবাসীরাও ঠিক এই নীতিতেই কাজ করেছে। তারা মনে করত –বলতোও যে, রোমানরা বিজয়ী হলে আমরা আবার আবহমানকাল থেকে চলে আসা নির্যাতন-নিষ্পেষণের মধ্যে পড়ে যাব। মুসলমানদের একজন লোক বেঁচে থাকতেও আমরা সে অবস্থা ফিরে আসতে দেব না।

পরে আল্লাহ যখন কাটিরদের পরাজিত করলেন ও মুসলমানদের বিজয়ী করলেন, তারা অমুসলমানদের শহর-নগরসমূহে কোনরূপ যুদ্ধ বা রক্তপাত ব্যতীতই দখল করে নিয়েছিলেন এবঙ অধিবাসীরা রীতিমত ‘খারাজ’ দিতে শুরু করে। [আরবী টীকা]

ইসলাম ও মুসলমানদের বিজয় ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এত বেশী, যা গুণেও শেষ করা যাবে না।

খৃষ্টানরা যখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে মুসলমানদের অংশীদার হয়েছিল, তখনকার ইসলামের ইতিহাসে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের উদারতা এক বিস্ময়কর পর্যায় পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিল। ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্র অমুসলিমদের প্রতি যে কত উদার তা সে সব ঘটনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

ইসলামের বিচারনীতি ও ইসলামে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার পর্যায়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।

অত্যাচারী সরকার

‘গভর্নমেন্ট’ বা সরকার-এর নাম শুনলেই কিছু লোকের চোখের সম্মুখে অত্যাচারী সরকার ও শাসকদের ভয়াবহ ও বীভৎস চেহারা ভেসে উঠতে পারে, তা কিছুমাত্র বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। কেননা বিশেষ করে প্রাচ্য দেশীয় নগরিকগণ সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক শাসকদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন-নিষ্পেষণ নিতান্ত অসহায়ভাবে ভোগ করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত। ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়’ কথাটিতে যা বোঝায়, এক্ষেত্রেও তা পুরাপুরি প্রযোজ্য। কেননা তারা অসহায় নাগরিকদের প্রতি কোনরূপ দয়া অনুগ্রহ দেখাতে দেখতে পায়নি, তারা দেখেছে কিভাবে সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলোকে দুর্বল পেয়ে তাদের উপর অমানবিকভাবে পীড়ন চালানো হয়েছে, তাদের দেহের শেষ রক্তবিন্দুও শুষে নিয়েছে। লুটে নিয়েছে তাদের ঘর-বাড়ি, ভাঙ্গা-চোড়া হাড়ি-পাতিলও। তাদের উপর দাপট চালাবার জন্য তারা তাদেরই মত অন্যান্য শক্তিধর অত্যাচারী লোকদের সাথে মৈত্রী গড়ে তুলেছে, যেন এই নিপীড়িত অসহায় লোকগুলি কারোর নিকট ফরিয়াদও না জানাতে পারে।

 কিন্তু ইসলাম এই ধরনের কোন অত্যাচারী নির্মম সরকার কখনই গঠন করেনি। বরং ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত সরকার তো সর্বোত্তম, সর্বাধিক মানবতাবাদী ও সর্বাধিক কল্যাণকামী হয়ে থাকে, ইতিহাসে তা-ই হয়েছে। সে সরকার সর্বক্ষণ জনগণের পক্ষে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত রয়েছে, জনগণকে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত রাখতে চেষ্টারত হয়েছে। সর্বোপরি, মহান আল্লাহর দেয়া সুবিচারক আইনসমূহই জনগণের উপর জারি করেছে, নিজেদের মনগড়াভাবে রচিত আইন নয়।

বস্তুত এ ধরনের সরকার ও প্রশাসনের একটি মাত্র লক্ষ্যই হতে পারে। আর তা হচ্ছে জনগণের নিঃস্বার্থ খেদমত, জনগণের অধিকারসমূহ যথাযথ আদায় করা, তাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা, তাদের ইজ্জত-আবরুর হেফাযত করা, তাদের সৌভাগ্য রচনা করা। ফলে এ ধরনের সরকার ও প্রশাসনের ভিত্তি কেবল যমীনের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয় না, হয় জনগনের হৃদয় ফলকের উপর। আর তার শিক্ড় জনগণের মাংসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ও রক্তের সাথে মিলে-মিশে একাকার হয়ে যায়।

আসলে কেবলমাত্র ইসলামই পারে একটি ন্যায়নিষ্ঠ সুবিচারকারী ও নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য কল্যাণকর একটি সরকার গঠন করতে। মিসরের শাসনকর্তা মালিক আশতারকে লক্ষ্য করে চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা) লিখেছেনঃ

প্রয়োজনশীল লোকদের জন্য তুমি একটা সময় নির্দিষ্ট রাখবে, যেন তারা তোমাকে পুরোপুরি পায়। তুমি তাদের নিয়ে সাধারণ ও খোলা বৈঠক করবে। তখন তুমি তোমার স্রষ্টা আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হয়ে থাকবে। তোমার সৈন্যবাহিনীকে তখন তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। তোমরা পাহারাদার পুলিশ ইত্যাদিকেও দূরে সরিয়ে দেবে, যেন তারা তোমার সাথে প্রাণখোলা কথা-বার্তা বলতে পারে এবং এই কথা-বলায় কোনরূপ বাধাগ্রস্ত না হয়। [আরবী টীকা]

ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়বাদী সুবিচারক শাসক হচ্ছে সে, যে জনগণের সুখে সুখী ও জনগণের দুঃখে দুঃখিত হয়। সে কখনই সুরক্ষিত দুর্ভেদ্য পাহারা প্রাচীর বেষ্টিত হয়ে থাকবে না। জনগণ রসাতলে ভেসে যাবে আর সে সুখের নিদ্রায় অচেতন হয়ে থাকবে, তা অন্তত ইসলামী শাসক সম্পর্কে  চিন্তাই করা যায় না।

অথবা সে নিজের সুখ-শান্তি-উর্ধ্বগতি (Promotion) নিয়েই চিন্তামগ্ন হয়ে থাকবে, জনগণের কল্যাণের চিন্তা করবে না, তাও অকল্পনীয়।

ইসলাম রাষ্ট্রের পরিচালক বা কোন পর্যায়ের প্রশাসক হওয়ার জন্য যেসব শর্ত আরোপ করেছে, যেসব দায়িত্ব ও কঠিন কর্তব্যের কথা বলেছে, আধুনিক কালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তা চিন্তাও করতে পারে না। তাকে তার যাবতীয় কাজে-কর্মে ইসলামী আইন-বিধানকে অনুসরণ করে চলতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। কোন একটি ক্ষেত্রে বা কোন একটি মুহুর্তেও তাকে জনগণের ব্যাপারে গাফিল হতে দেয় না ইসলাম। বরং প্রতিটি মুহুর্তে তাকে এ কাজেই অতিবাহিত করতে হবে। তা করলেই ইসলামের দৃষ্টিতে সে যোগ্য শাসক বিবেচিত হতে পারবে। পক্ষান্তরে যে শাসক স্বীয় গদি রক্ষার চিন্তায় দিন-রাত মশগুল থাকে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন দূর করার জন্য কোন চিন্তা-ভাবনা করে না, কোন বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে না, ইসলামের দৃষ্টিতে সে কোন পর্যায়েরই শাসক হতে পারে না।

সরকারের প্রতি জনগণের কর্তব্য

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামী সরকার ও প্রশাসন জনগণের সর্বাত্মক কল্যাণ সাধনের কঠিন দায়িত্বে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকেই নিযুক্ত হয়ে থাকে এবং এসব দায়িত্ব পালনে তা একান্তই বাধ্য। মানবতাকে পূর্ণত্বের উচ্চতম শিখরে পৌছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই তাকে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। অতএব এরূপ একটি ইসলামী সরকার ও প্রশাসন গড়ে তোলা মুসলিম উম্মতের জন্য একান্তই কর্তব্য। এরূপ একটি সরকার গঠনের ব্যাপারে কোনরূপ মতপার্থক্যের সৃষ্টি না করা, তা গড়ে তোলার পর তার সাথে সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার প্রতি কোনরূপ বিশ্বাসঘাতকতা না করা জনগণের সেই কর্তব্যেরই অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী…………]

হে মুসলমানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধানই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যার হুকুম তিনি নূহকে দিয়েছিলেন, আর যা –হে নবী! এখন তোমার প্রতি ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি, আর যার হেদায়েত আমরা ইবরাহীম-মূসা-ঈসাকে দিয়েছিলাম এই তাকীদ সহকারে যে, এই দ্বীনকে তোমরা কায়েম কর এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যেও না।

এ আয়াত স্পষ্ট করে বলেছে যে, দ্বীন কায়েমের কাজকে বিধিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে [আরবী টীকা]

অন্য কথায়ঃ দ্বীনকে কায়েম –প্রতিষ্ঠিত রাখো অর্থাৎ স্থায়ী, ধারাবাহিক –অব্যাহত সুরক্ষিত দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত রাখো অর্থাৎ স্থায়ী, ধারাবাহিক –অব্যাহত সুরক্ষিত দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত, কোনরূপ মতপার্থক্য নেই, কোন অস্থিরতা নেই। [আরবী টীকা]

বস্তুত এ আয়াতটিতে দ্বীন কায়েম করার যে নির্দেশ নবী-রাসূলগণকে দেয়া হয়েছে, তা শুধু দ্বীনের কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক বিধানের প্রচার দ্বারাই পালিত হয় না, সে জন্য দ্বীন-ইসলামকে চিন্তা-বিশ্বাস মতবাদ-মতাদর্শ, সংস্কৃতি-সভ্যতা, আইন-শাসন রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্টিত ও কার্যকর করারই নির্দেশ রয়েছে এবং সেভাবেই তা পালন করতে হবে।– (তাফহীমুল কুরআন, আবুল ‘আলা মওদুদী, ৫ম খণ্ড পৃঃ ৪৯২)

এরূপ একটি সরকার গড়ে তোলা, প্রতিষ্টিত করা যেমন কর্তব্য, তেমনিভাবে রক্ষা করা ও তার কল্যান বিধানে সক্রিয় তৎপরতা অবলম্বন মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। কেননা উপরোদ্ধৃত আয়াতে (আরবী…) এর একটি অর্থ যেমন দ্বীন কায়েম কর, তেমনি তার অপর একটি অর্থ হচ্ছে ‘দ্বীন কায়েম রাখো’। অর্থাৎ যেখানে তা কায়েম নেই সেখানে তাকে কায়েম ও প্রতিষ্ঠা রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।

একটি হাদীসের বর্ণনায় রাসূলে করীম (স)- এর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছেঃ

[আরবী…] দ্বীন হচ্ছে ঐকান্তিক ও নিঃস্বার্থ কল্যাণ কামনা।

জিজ্ঞাসা করা হলোঃ কল্যাণ কামনা কার জন্য হে রাসূল? বললেনঃ

তা আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, রাষ্ট্রনেতাগণের জন্য এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য। -(কিতাবুল আওছাল; পৃঃ ৯)

হযরত আলী (র) বলেছেনঃ [আরবী………………]

রাষ্ট্রনেতার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আলঐলাহর নায়িল করা বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা, তার নিকট সোপর্দ করা আমানতের হক আদায় করা। রাষ্ট্রনেতা যদি তা করে তাহলে তার কথা শোনা, তার আনুগত্য করা এবং সে আহবান করলে তাতে সাড়া দেয়া জনগণের কর্তব্য।

বস্তুত ইসলামী হুকুমাত যদি তার দায়িত্বসমূহ ইসলামী বিধান অনুযায়ী পালন করে এবং মুসলিম জনগণ যুদ সরকারের প্রতি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে তথায় সুবিচার ও ন্যায়পরত পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হবে, শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজিত হবে, সার্বিক কল্যাণের প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে, সমগ্র দেশে সৌভাগ্য ও উন্নতি উৎকর্ষ ক্রমবৃদ্ধিমান হবে। আর তা-তো মানুষের কাম্য অতি স্বাভাবিকভাবে।

দুনিয়ার  বিভিন্ন ধরনের সাময়িক বিপ্লব কিংবা অস্ত্রশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোন দেশের কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং তারপরই নিজেকে দেশের কর্তৃত্বের ধারক ও জনগণের রাজা বা বাদশাহ বলে ঘোষণা দেয়, তখন সে সেই দেশের রাজা বা নিরংকুশ বাদশাহ হয়ে বসেছে বলে প্রতিপন্ন হয়। তখন তার বিরুদ্ধতাকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে কঠিন-কঠোর শাস্তি দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। সে কেবল নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয় না, সে সর্বসাধারণকে জানিয়ে দেয় যে, অতঃপর দেশে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চলতে থাকবে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানরাই এই রাজক্ষমতার অধিকারী হবে।

 

বিভিন্ন ধরনের সরকার পদ্ধতি

[রাজতন্ত্র-কুরআনের রাজতান্ত্রিক পদ্ধতি-স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের মারাত্মক পরিণতি- বড় লোকদের শাসন-ধনী লোকদের শাসন- গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা।]

………………………………………………………………………………………………………………………..

দুনিয়ার বিভিন্ন ধরনের সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। তন্মধ্য থেকে কয়েকটির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে উদ্ধৃত যাচ্ছেঃ

১. রাজতন্ত্র

কোন এক ব্যক্তি যখন সামরিক বিপ্লব কিংবা অস্ত্রশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোন দেশের কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং তারপরই নিজেকে দেশের সর্বময় কর্তৃত্বের ধারক ও জনগণের রাজা বা বাদশাহ বলে ঘোষনা দেয়,তখন সেই দেশের রাজা বা নিরংকুশ বাদশাহ হয়ে বসেছে বলে প্রতিপন্ন হয়। তখন তার বিরুদ্ধতাকারী প্রত্যেক ব্যবক্তিকে কঠিন-কঠোর শাস্তি দিতেও কুন্ঠিত হয় না। সে কেবল নিজেকে বাদশাহ ঘোষনা করেই ক্ষান্ত হয় না সে সর্বসাধারণকে জানিয়ে দেয় যে, অতঃপর দেশে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চলতে থাকবে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানরাই এই রাজক্ষমতার অধিকারী  হবে, বংশানুক্রমিকভাবে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তা-ই চলতে থাকবে।

এসব রাজা বাদশাহ ক্ষমতার তুঙ্গে পৌছে যায় এবং ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে নিজেক যিল্লুল্লাহ ‘বা আল্লাহর ছায়া’ নামে অভিহিত করতেও সংকোচ বোধ করে না। অন্য কথায় সে ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে একক ভাবে আসীন হয় ও নিরংকুশভাবে তা কার্যকর কারার অবাধ সুযোগ পায় বলে নিজেকে ঠিক আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত ধারন করে। রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাসমূহে ইতিহাসের প্রায় সকল অধ্যায়েই এই রূপ দেখা গেছে।

ব্স্তুত রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ব্যক্তি- শাসনেরই একটি বিশেষ রূপ। সেই ব্যক্তিই হয় তথায় সর্বেসর্বা। রাজা বা বাদশাহ তথায় সার্বভৌমত্বর ধারক,শক্তি ওক্ষমতার একমাত্র উৎস। রাষ্ট্র ও রাজ্য পরিচালনার নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ সে নিজ দায়িত্বেই করে থাকে। দেশের শাসন ও বিচর ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সে নিজেই দেয়। অবশ্য এসব ব্যাপারে তার সন্তানরাও কোন কোন সময় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করে থাকে। উত্তরাধিকারসূত্রে তারাই হয় বিরাট রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের বিভিন্ন দিকের কতৃত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। এক কথায়, এ গোটা শাসন ব্যবস্থাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত এবং স্বৈরতান্ত্র্রিক।

এইরূপ শাসন ব্যবস্থা বাদশাহ বা রাজাকে নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী বানায় বিধায় তা যেমন স্বৈরতান্ত্রিক, তেমনি অহংকারমূলক। স্বৈরতান্ত্রিক হওয়ার দরুন এই ব্যবস্থাধীন সাধারণ মানুষের কোন মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয় না –থাকেও না। আর অহংকারমূলক হওয়ার কারণে রাজপরিবার সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, রাজপরিবারের ব্যক্তিরা অন্য সকল অপেক্ষা অধিক শরাফাতের অধিকারী বিবেচিত হয়। আর তাদের ছাড়া অন্যান্য মানুষ হীন, নীচ ও পশুবৎ গণ্য হয়। আর এর পরিণাম বাহ্যিক ভাবে দেশের যতই চাকচিক্য বৃদ্ধি পাক, অন্তঃসলিলা ফল্লুধারার লোক চক্ষুর ব্যাপক বিপর্যয় সমগ্র দেশটিকে গ্রাস করে নেয়।

ঠিক এই কারণে কারণে কুরআন মজীদে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের লোকদের অগ্রাধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী……………..]

এই পরকালের শান্তির ঘর তো সেই লোকদের জন্য বানাব, যারা এই দুনিয়ায় সর্বোচ্চতা –সর্বশ্রেষ্ঠত্ব  দখল করার জন্য ইচ্ছুক বা সচেষ্ট নয় এবং যারা কোনরূপ বিপর্যয় সৃষ্টিরও পক্ষপাতী নয়।

কুরআনে রাজতান্ত্রিক বাদশাহী পদ্ধতি

কুরআনুল করীমের দৃষ্টিতে মুলুকিয়াত –রাজতন্ত্র বা বাদশাহী শাসন পদ্ধতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বেল স্বভাবতই ব্যাপক ও মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। তথায় ব্যক্তির ইচ্ছাকে সমগ্র জনগণের উপর শক্তিবলে চাপিয়ে দেয়া হয়। লোকেরা তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হলে তাদেরকে তা মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। ব্যক্তির কামনা-বাসনা-লালসা চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় সম্পদকে বে-হিসেব ব্যয় ও প্রয়োগ করা হয়। কেননা দেশের সকল নৈসর্গিক সম্পদ ও শক্তির একচ্ছত্র মালিক হয়ে থাকে সেই রাজা বা বাদশাহ। এ ব্যাপারে কারোরই কোন আপত্তি জানাবার অধিকার থাকতে পারেনা। তার সমালোচনা করা, দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ানো বা সেজন্য কোনরূপ কটূক্তি করতে যাওয়াও নিজের জন্য ধ্বংস ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে রাজতান্ত্রিক তথা বাদশাহী শাসন ব্যবস্থায় এর ব্যতিক্রম কুত্রাপি দেখা যায়নি। কুরআন মজীদ এ সত্যই ঘোষণা করেছে অত্যন্ত বলিষ্ঠ দৃঢ় ভাষায়। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী……………]

স্বৈরতান্ত্রিক ও রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনবসতির উপর কতৃত্ব লাভ করে তখন তারা সেই জনবসতিটিকে ধ্বংস করে এবং তার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে বানায় সর্বাধিক লাঞ্চিত-অপমানিত। তাদের এইরূপ কাজ চিরন্তন।

আল্লাহর কালামে উদ্ধৃত এ কথাটি মানব জীবনে কার্যকর ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সাথে পূর্ণ মাত্রায় সামঞ্জস্যশীল। ইতিহাসে এর ব্যতিক্রম কখনই দেখা যায়নি, ভবিষ্যতেও দেখা যাবে না। আজকের পৃথিবীর বাস্তব অবস্থা এই ঘোষণার পরম সত্যতা ও বাস্তবতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে।

সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ তাঁর তাফসীরে এ আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ স্বৈরতান্ত্রিক শাসক শক্তির প্রকৃতিই হচ্ছে এই যে, তা যে দেশেই প্রতিষ্ঠা পায়, সে দেশেই ব্যাপক বিপর্যয় প্রচণ্ড করে তোলে। সে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। সে দেশের মান-মর্যাদা পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে। সে দেশের প্রতিরক্ষা শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। সেখানকার সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে। কেননা এই ব্যক্তিরাই হয়ে থাকে সে দেশের প্রকৃতই প্রতিরোধ শক্তি। বস্তুত এটাই হচ্ছে এই শাসক শক্তির স্থায়ী চরিত্র। এর ব্যতিক্রম কখনই হতে পারে না।– [ আরবী টীকা…….]

বস্তুত কুরআন মজীদ বিভিন্ন প্রসঙ্গে রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসকদের মানবতা বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তারা সাধারণ মানুষের উপর নিজেদের শান-শওকত ও শক্তির দাপট চালায়, জনগণের ধন-সম্পদ নির্মম ও নির্লজ্জভাবে লুটে-পুটে নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তারা না কোন নিয়মনীতি মেনে চলে, না কোন সীমায় গিয়ে থেকে যেতে রাযী হয়। দুর্বল অক্ষম ও মিসকীন লোকদের সামান্য-সামান্য সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নিতেও তারা কুণ্ঠিত হয় না। নিপীড়িত জনগণের মর্মবিদারী ফরিয়াদ তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না।

কুরআনে অন্য একটি প্রসঙ্গে একজন স্বৈরশাসকের চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, একজন দরিদ্র ব্যক্তি নিজের নৌকায় লোক পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করত। এক সময় এই আশঙ্কা প্রবল হয়ে দেখা দিল যে, বাদশাহ স্বৈরশাসক তার সেই নৌ পর্যন্ত কেড়ে নেবে।

প্রসঙ্গটি হযরত খিজির ও হযরত মূসা (আ) –এর জ্ঞানান্বেষণ মূলক সফর কাহিনী। হযরত খিজির একটি নৌকায় নদী পার হয়ে ওপারে পৌছে সেই নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। তার কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেনঃ [আরবী…………..]

সেই নৌকাটির ব্যাপার এই ছিল যে, সেটি ছিল কয়েকজন গরীব ব্যক্তির মালিকানা, এই নৌকাটিকে কেন্দ্র করে তারা নদীতে শ্রম-মজুরী করত। আমি সেটিকে দোষযুক্ত করে দিতে চেয়েছিলাম কেননা তাদের অঞ্চলে একজন রাজা –স্বৈর শাসক –রয়েছে, যে প্রতিটি নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নেয়।

যে নৌকাটির কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে, কুরআনের কথানুযায়ী সেটি ছিল কয়েকজন মিসকীন দরিদ্র ব্যক্তির জীবিকার্জনের মাধ্যম বা উপায়। এই নৌকাটিতে চড়েই তারা নদী-পথে নিজেদের শ্রম বিনিয়োগ করতে পারছিল। নৌকাটি ব্যতীত তাদের শ্রম করার কোন উপায় ছিল না। সেই নৌকাটি কেড়ে নেয়া কোন ন্যায়পরায়ণ আদর্শবাদী –ইসলামী প্রশাসকের কাজ হতে পারে না। কিন্তু তথাকার বাদশাহ তাই কেড়ে নিত! অন্য কথায়, দরিদ্র জনগণের জীবিকা নির্বাহের উপায়সমূহ করায়ত্ত করে তাদেরকে শ্রম করে উপার্জন করার উপায় থেকে বঞ্চিত করে দিয়ে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে মরে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেয়াই রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসকদের নীতি এবং চরিত্র। অর্থাৎ স্বৈর শাসন শুধু রাজনৈতিক শক্তিকে করায়ত্ব করা নয়, অর্থনৈতিক শক্তি ও উপায়গুলিকেও নিজের একক দখলে নিয়ে আসা। রাজতন্ত্র, বাদশাহী –তথা যে কোন প্রকারের সম্মান ঠিক এই কারণেই আল্লাহ প্রদত্ত আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

মিসরের ফিরআউনী শাসনের ইতিহাসেও এই অবস্থারই বাস্তব চিত্র লক্ষ্য করা যায়। ফিরাউন দেশের আপামর জনগণের উপর নিরংকুশ শাসন চাপিয়ে সারাদেশের যাবতীয় ধন-মালের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসার ঘোষণা দিয়েছিল।

ফিরাউন উদাত্ত কণ্ঠে প্রচার করেছিলঃ [আরবী…………]

হে জনগণ! সমগ্র মিসরের রাজনৈতিক কতৃত্ব কি আমার করায়ত্ত নয়? আর এই নদী সমুদ্র কি আমারই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রবাহমান নয়? …. তোমরা কি এসব দেখতে পাও না, লক্ষ্য কর না?

এই নিরংকুশ –রাজতন্ত্র –স্বৈর শাসন আল্লাহর দেয়া বিধান পালন করে না, কোন বিশেষ ও স্থির রীতি-নীতিরও অনুসারী নয়, বরং তা এক ব্যক্তির স্বাধীন বিমুক্ত ইচ্ছার অন্ধ অনুসারী, তাই সেই ব্যক্তির ইচ্ছা কামনা-বাসনা চরিতার্থ করাই হয় সে শাসনের একমাত্র লক্ষ্য। সারাদেশের যাবতীয় ধন-সম্পদ ও সম্পদ-উৎপাদনের উৎস সবকিছুরই নিরংকুশ মালিক হয়ে বসা এবং তার প্রকৃতি ও স্বভাব। সাধারণ মানুষের দখলে কোথাও কিছু থাকলেও তা কোন না কোন সময়ে কেড়ে নেয়াই তার নীতি।

রাজতন্ত্র –বাদশাহী ও স্বৈর শাসনের এ-ই যখন স্বভাব, তখন শরীয়াতের বিধানের কথা তো অনেক দূরের, সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি কি করে তা সমর্থন করতে পারে? কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ এইরূপ শাসন ব্যবস্থার হাতে কি করে সপে দেয়া যেতে পারে? এসব স্বার্থপর অহংকারী শাসন-ব্যবস্থা কোনক্রমেই সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। ওরা মানুষের জীবন, ইজ্জত-আব্রু ও রুটি-রুজি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে থাকবে আর সাধারণ মানুষ তা চুপচাপ সহ্য করে যাবে –এটাই বা ধারণা করা যেতে পারে কিভাবে?

রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈর শাসনে ব্যক্তির ইচ্ছা সমষ্টির উপর বিজয়ী ও প্রবল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। তা হয়ে দাঁড়ায় কোটি কোটি মানুষের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, সেখানে সকল মানবিক মর্যাদা, মূল্যমান পদদলিত হয় অতীতের এবং বর্তমান সময়ের সকল রাজা-বাদশাহ-স্বৈর শাসনের এ-ই হচ্ছে অভিন্ন রূপ।

 আল্লামা তাবাতাবায়ী তাঁর প্রখ্যাত তাফসীর আল-মীযান-এ এ পর্যায়ে লিখেছেনঃ সমাজ সমষ্টির উপর কার কর্তৃত্ব চলবে, এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে, ইসলামী সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা রাজতান্ত্রিক-বাদশাহী-স্বৈর শাসন পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সর্বধিক দিয়ে ভিন্নতর। রাজতান্ত্রিক-স্বৈর শাসন পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সর্বদিক দিয়ে ভিন্নতর। রাজতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য আল্লাহর দেয়া সম্পদ ও সম্পত্তি কেবল সিংহাসনাসীন ব্যক্তির নির্দিষ্ট করা হয়, তারই ভোগ-সম্ভোগের ইন্ধন বানানো হয় সকল মানুষকে তা থেকে বঞ্চিত করে। সমস্ত মানুষ হয় তার দাসানুদাস, আর সে তাদের নিয়ে যা ইচ্ছা হয় নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে সে তা-ই করে যায়। নিজ ইচ্ছামত তাদের উপর শাসন চালায়। তা পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বিরাট ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, কোন একটি দিক দিয়েও এ দু’য়ের মাঝে একবিন্দু সাদৃশ্য নেই।

পাশ্চাত্যের এসব সমাজ ব্যবস্থায় স্থুল ও বস্তুগত ভোগ-সম্ভোগকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েচে। তার ফলে এক শ্রেণীর লোকেরা অধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ ও বেশীর ভাগ লোকের নিকৃষ্ট গোলাম ও অধিকার বঞ্চিত হয়ে থাকা একান্তই অনিবার্য হয়ে পড়ে।

এ কথা কাল্পনিক নয়, ঐতিহাসিকভাবে সত্য। দূর অতীতের ইতিহাসে যেমন এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু থাকার কথা উল্লিখিত হয়েছে, নিকট অতীতের –বরং বর্তমান দুনিয়ার অবস্থা –ইতিহাসেও এ ধরনের শাসন ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত কিছুমাত্র বিরল নয়।

মিসরীয় ইতিহাসের ফিরাউনি শাসন, রোমান ইতিহাসে কাইজারের শাসন এবং পারস্য ইতিহাসের কিসরা শাসন তো এমন ঐতিহাসিক ব্যাপার, যা অস্বীকার করা কোন শিক্ষিত লোকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই শাসন-ব্যবস্থাসমূহে শাসক নিজে ইচ্ছা ও খাহেশ অনুযায়ী শাসনকার্য চালিয়েছে। কেননা এ সব-কয়টি শাসনই ছিল নিরংকুশ কর্তৃত্বের শাসন। তরবারির জোরেই এই শাসন ব্যবস্থাসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠার দিন থেকে যত কাল-ই তা অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তরবারিই তার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাধারণ মানুষ ছিল চরমভাবে অসহায়, মানবিক অধিকার থেকেও নির্মমভাবে বঞ্চিত, দাসানুদাস। রাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের তা ছিল নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত। এসব শাসন কিভাবে মানুষের অধিকার হরণ হরেছে, কিভাবে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে তাদের জোরপূর্বক

বহিষ্কৃত করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে, তাদের জমি-ক্ষেত থেকে তাদের উৎখাত করেছে, এমন এক স্থানে নির্বাসিত করেছে, যেখানে ঘাস ও পানির নাম চিহ্ন-ও নেই, যেখানে জীবন সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং চরম প্রাণান্তকর অবস্থায় পড়ে থাকতে –হাজার হাজার নয় –লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাধ্য করেছে, সে সবের মর্মবিধারী কাহিনী বিশ্ব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এখন জ্বলজ্বল করছে।

মোটকথা, রাজকীয় শাসন মূলত ও কার্যত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন আর স্বৈতান্ত্রিক শাসনের নির্মম ও মানবতা-বিরোধী কার্যকলাপের বিবরণ দেয়া খুব একটা সহজসাধ্য –কাজ নয়। স্বৈর শাসনের মারাত্মক বিপর্যয় সত্যিই অবর্ণনীয়।

অবশ্য কুরআন মজীদে এ পর্যায়ের শাসন ব্যবস্থার যেসব কাহিনী উদ্ধৃত হয়েছে, তা আমরা এখানে সহজেই উল্লেখ করতে পারি।

স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের মারাত্মক পরিণতি

কুরআন মজীদে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পর্যায়ে ফিরাউনী শাসনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ফিরাউনকে একজন গর্বিত, অহংকারী ‘মাথা উঁচুকারী’‘সীমালংঘনকারী’, ‘বাড়াবাড়িকারী’ শাসকরূপে চিহ্নিত করেছেন। বলেছে, সে নিজেকে অন্যান্য সকল মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, উন্নত ও উত্তম বলে দাবি করছে। সকলের ইচ্ছার উপর তার ইচ্ছা বিজয়ী, প্রধান ও প্রভাবশালী বলে ঘোষণা করছে। বলা হয়েছেঃ [আরবী…………]

অতঃপর অব্স্থা এই হলো যে, ফিরাউনের বিপুল লো্কজনের মধ্য থেকে মাত্র কতিপয় যুবক ছাড়া মূসার প্রতি আর কেউ-ই ঈমান আনল না। তার কারণই ছিল ফিরাউন ও স্বয়ং নিজ জাতির কর্তৃত্বশালী লোকদের ভয়। ভয় ছিল এই যে, ফিরাউন তাদেরকে আযাবে নিমজ্জিত করবে। আর ফিরাউন তো দুনিয়ায় শক্তিমান ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর সে ছিল সকল সীমালংঘনকারী লোকদের একজন। [আরবী……………]

অতঃপর আমরা মূসা ও তার ভাই হারুনকে আমাদের নির্দশনাদি ও সুস্পষ্ট দলীল সহকারে ফিরাউন ও তার দল-বলের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তখন তারা অহংকার-গর্ব প্রকাশ করল। আর আসলে তারা নিজদিগকে সর্বোচ্চ স্থানীয় মনে করত। [আরবী…..]

আমরা বনি ইসরাইলদের অত্যন্ত অপমানকর আযাব থেকে নিশ্চিতভাবেই মুক্তি দিয়েছিলাম। সে আযাব দিচ্ছিল ফিরাউন। আর সে ছিল সীমা-লংঘনকারী উচ্চাভিমানী ব্যক্তি।

ফিরাউন সম্পর্কে পর পর উদ্ধৃত এ চারটি আয়াতে ফিরাউনের একটি চিত্র স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে –ফিরাউন ছিল বড় অহংকারী। নিজেকে ও নিজেদের দলবলকে সে সর্বোচ্চ স্থানীয় ও অন্যান্য সকল মানুষের উপর প্রবল পরাক্রান্ত ও সর্বাধিক প্রভাব ও কর্তৃত্বসম্পন্ন জ্ঞান করত। ফলে সে তার শাসনাধীন –বিশেষ করে অসহায় বনি ইসরাইলীদের কঠিন অপমানকর আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করে অসহায় বনি ইসরাইলীদের কঠিন অপমানকর আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করে দিয়েছিল। আল্লাহ তা’আলা তাদের মুক্তিদানের উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা ও তাঁর ভাই হারুন (আ)-কে ফিরাউন ও তার দলবলের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তারা এতই অহংকারী-গৌরবী ছিল যে, তারা হযরত মূসা ও হারুনের দাওয়াত মেনে নিতে রাযী হয়নি। মানবেই বা কি করে; তারা তো নিজেদেরকে অন্যসব মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ও উচ্চ স্থানীয় মনে করে। তারা যেমন অপর কারোর কোন যুক্তিসঙ্গত কথা মেনে নিতে রাযী হতে পারে না, তেমনি তারা অন্যান্য সাধারণ মানুষের উপর নির্মম অত্যাচার চালাতে অবশ্যই উদ্যোগী হবে। তাদের অপমানকর আযবে মানুষ হবে অকথ্যভাবে নিপীড়িত, সারাদেশে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দেয়া এরূপ অবস্থায় নিতান্তই অপরিহার্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ফিরাউনের মনোভাব ছিল নিঃসন্দেহে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, ওরূপ মনোভাবেরই ফসল হচ্ছে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন। যেখানেই শাসকদের মধ্যে ওরূপ মনো্ভাবের জন্ম হয়েছে, সেখানেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। কুরআন মজীদে এ পর্যায়ে আরও বলা হয়েছেঃ [আরবী………..]

বনি ইসরালদের আমরা সমুদ্র অতিক্রম করালাম। তখন ফিরাউন তার সৈন্যবাহিনী তাদের অনুসরণে সমুদ্রে নেমে পড়ল। তারা বাড়াবাড়ি ও জুলুমের উদ্দেশ্যেই তা করেছিল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউন যখন ডুবে যেতে লাগল, তখন বললঃ আমি বিশ্বাস করি যে, বনি ইসরাইলীরা যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে সে ব্যতীত ইলাহ্ আর কেউ নেই। আমি অনুগত লোকদের একজন। তখন বলা হলোঃ তুমি এখন ঈমান আনছো, অথচ এর পূর্ব পর্যন্ত তুমি আল্লাহর নাফরমানী করছিলে, আর তুমি ছিলে একজন বিপর্যয়কারী ব্যক্তি। ফিরাউন তো মিসরের লোকদের দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। সেছিল বড় অহংকারী। জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকারটুকু পযর্ন্ত হরণ করে নিয়েছিল। তার উপর দিয়ে যেমন কারোর কথা চলতো না, তেমনি তার উপর কথা বলার সাহসও করোর ছিল না।

ফিরাউন হযরত মূসা ও হারুনের তওহীদী দাওয়াত কবুল করেনি, বনি ইসরাইলীদের মুক্তিদানের দাবিও মেনে নিতে রাযী হয়নি। তার কারণ কি? কুরআনে বলা হয়েছেঃ[ আরবী টীকা……….]

ওরা অহংকার দেখালে। ওরা ছিলই উচ্চতর স্থান দখলকারী লোক। ওরা বলেছিলঃ আমরা কি আমাদেরই মত দুইজন লোকের কথা মেনে নেবে, অথচ ওদের লোকেরাই আমাদের অধীন দাসানুদাস? হযরত মূসা ও হারুন ( আ) নিজেদেরকে আল্লার রাসূল রুপেই ফিরাউনের নিকট পেশ করেছিলেন এবং একদিকে ফিরাউনকে আল্লহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়ত দিয়েছিলেন আর অপর দিকে বনি ইসরাইলীদের মুক্তি দানের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে এর কোন একটি কথাও মেনে নেয়নি। না মানর কারণ হিসেবে উদ্ধৃতি আয়াতটিতে তিনটি কথা বলা হয়েছে। একটিওঃ ফিরাউন ও তার সঙ্গী-সাথীরা নিজেদেরকে সর্বোচ্চ স্থানীয় মনে কারার অংকারে লিপ্ত ছিল। দ্বিতয়, তারা তাদেরই মত মানুষ মূসা ও হারুনকে আল্লাহ প্রেরিত বিশ্বাস করতে রাযী হতে পারেনি। আর তৃতীয় হচ্ছে, তারা বনি ইসরাইলীদের-যারা মূসা ও হারুনের বংশের লোক ছিল-দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। বনি ইসরাইলীদের দাসানুদাস বানিয়ে রাখার উপরই হযরত মূসা ও হারুন আপত্তি জানিয়েছিলেন  ও তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। জবাবে ফিরাউন বলেছিলঃ [ আরবী টীকা…………..]

আমার কি তোমাকে বাচ্চা বয়েসে লালন-পালন করেনি? এবং তুমি কি আমাদের মধ্যে তোমার বয়সের কতিপয় বছর- কাল অবস্থান কর নি? এ কথার জাবাবে মূসা (আ) বলেছিলেনঃ [আরবী টীকা………………]

হ্যাঁ, এটা তো একটা নিয়ামত ছিল। আর তুমি আমার  উপর সেই অনুগ্রহের দোহাই দিচ্ছ এবং এটাকে কারণ বানিয়ে তুমি বনি ইসরাইলদের দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছ। অর্থাৎ মূসার বাল্যকালে ফিরাউনের ঘরে লালিত-পালিত হওয়া ও তাদের মধ্যে তাঁর বয়সের কয়েকটি বছর অবস্থান কারার ব্যাপারটি ছিল আল্লাহর একটি নিয়ামত- একটি বিশেষ ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা দেখিয়ে মূসার প্রতি ফিরাউনের অনুগ্রহ প্রদর্সন যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। আর এই কারণ দেখিয়ে বনি ইসরাইলীদের দাসানুদান বানিয়ে রাখারও কোন যুক্তি থাকতে পারে না। অর্থাৎ স্বৈর শাসক তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বর্ষণকে দাঁর করাতে চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তির কষ্টিপাথরে তা কিছুতেই উত্তীর্ণ হতে বা যুক্তিসঙ্গত বলে প্রামাণিত হতে পানে না। আসলে ফিরাউন ছিল চরম অংকারী উচ্ছৃঙ্খল সীমালংঘনকারী ও স্বৈরতান্ত্রক। সে কারোর উপদেশ-নসীহত শুনতে প্রস্তুত হয় না, কারোর একবিন্দু বিরূপ সমালোচনা বরদাশত করতে রাযী হতে পারা না। তখন তার নিকৃষ্টতম কার্যাবলীকে সে সুন্দর ও কল্যাণময় কাজ হিসেবে জনগণের সম্মুখে পেশ করে ও সেই সব কাজের দোহাই দিয়ে স্বীয় স্বৈর শাসনের যৌক্তিকতা ও বৈধতা প্রমাণ করার জন্য নিষ্ফল চেষ্ট করে। কুরআনের এ আয়াতদ্বয়ে সেই কথা বলা হয়েছেঃ [আরবী টীকা…………….]

ফিরাউন বললঃ হে হামাম, আমার জন্য একটি উচ্চ ইমারত নির্মাণ কর, যেন আমি ঊধর্বলোকের পথসমূহ পর্যন্ত পৌছাতে পারি আকাশমণ্ডলের পথসমূহ এবং মূসার খোদাকে চোখ দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি। ই মূসা তো আমার কাজে মিথ্যাবাদী মনে হয়। এভাবে ফিরাউনের জন্য তার দব আমল চাকচিক্যময় বানিয়ে দেয়া হলো এবং তাকে সঠিক পথ থেকে বিরত রাখা হলো। ফিরাউনের সমম্ত চালবাজি তার নিজের ধ্বংসেই ব্যবহৃত হলো।বস্তুত স্বৈরতন্ত্রী শাসন নিজের মতকেই চূড়ান্ত মনে করে। তার বিশ্বাস-জনগনেরও উচিত তার মতকেই চূরান্ত বলে মেনে নেয়া। সে যা চিন্তা করে যৌক্তিকতা সকলেরই মাথা পেতে নেয়া কর্তব্য। সে মত ও চিন্তা বাস্তবিকই যুক্তিভিত্তিক ও সুবিবেচনাপ্রসূত কিনা, তা জনগণের বিচার্য বিষয় নয়। স্বৈর শাসক যখন বলে দিয়েছে, তখন আর সে বিষয়ে জনগণের কিছু বলার বা ভাববার কি থাকতে পারে। স্বৈর শাসকের কথাই হবে আইন, জনগণ তা অকুণ্ঠিত মনে ও ইচ্ছা-বাসনার নিকট সকলেরই আত্মসমর্পণ করা কর্তব্য। হযরত মূসা (আ) লোকদের সম্বোধন করে ফিরাউনের স্বৈর শাসনের প্রেক্ষিতে বলেছিলেনঃ[ আরবী টীকা…………………]

হে আমার জনগণ। আজ তোমরাই কাদশাহী ও কর্তৃত্বের অধিকারী, পৃথিবীতে তোমরাই বিজয়ী-প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আল্লাহর আযাব যদি এসেই পড়ে, তাহলে তখন কে আমাদের সাহায্য করবে ( তা ভেবে দেখচ কি)?

অর্থাৎ তোমাদের  এই স্বৈর শাসন ও বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আল্লাহর আযাব আসার কারণ। সে আযাব যদি এসে ই-পড়ে, তাহলে তা ঠেকানো এবং জনগণকে সে আযাব থেকে রক্ষা করা এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে না। ফিরাউন হযরত মূসার একথা শুনে জবাবে বললঃ[ আরবী টীকা………..] আমি তো তোমাদেরকে সেই মত-ই দেব, যা আমার দৃষ্টিতে সমীচীন। আর আমি সেই পথই তোমাদেরকে দেখাব, যা ( আমার দৃষ্টিতে) সত্য ও সঠিক। অর্থাৎ স্বৈর শাসকের মত জনগণের মত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর এবং সে মতকেই সকলের উপর চাপিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। সে যে পথকেই সত্য ও সঠিক মনে করবে, তাকে অন্যরা সত্য ও সঠিক মনে না করলেও-তা আল্লাহ এবং রাসুলের দেখানো পথের বিপরীত হলেও সেই পথে সকলকে চলতে বাদ্য করাই নীতি। ফলে স্বৈর শাসক গোটা সমাজের বিপুল জনতাকে দুর্বল পেয়ে তাদের অপমান করতে একবিন্দু কুণ্ঠিত হয় না। যেমন ফিরাউন মিসরের জনগণকে অপমানিত করেছিল বলে কুরাআনে বলেছেঃ [আরবী টীকা…….]

ফিরাউন তার অধীন বসবাসকারী জনগণকে নির্বোধ বানিয়ে তাদেরকে গুমরাহীর দিকে পরিচালিত করেছিল। আর সেই জনগণও তাকে মেনে নিয়েছিল। মেনে নিয়েছিল এজন্যে যে, তারা নিজেরাই ছিল আল্লাহর সীমালংঘনকারী লোক। স্বৈর শাসিত জনতা বাস্তবিকই নির্বোধ হয়ে যায়। তারা স্বাধীন বিমুক্ত চিন্তা- বিবেচনা শক্তিও হারিয়ে ফেলে। স্বৈর শাসনের অধীন চিন্তার  অবকাশ থাকে না বলেই এরূপ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তখন স্বৈরতন্ত্রী শাসন জনগণকে নিজের দাসানুদাসে পরিণত করে নেয়। তখন সে চায়, জনগণ অন্ধের মত তার অনুসরণ করুক, নিজেদের স্বাধীন চিন্তা-বিবেচনা তুলে রেখে নিতান্ত অক্ষমের ন্যায় তাকে মেনে চলুক। তার কার্যকলাপে কেউ ‘টু’ শব্দটি না করুক। অন্য কথায়, স্বৈরতন্ত্রী শাসক চায়, মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে যেমন তাঁর দাসত্ব করা ও তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলা স্বীয় কর্তব্য বলে মনে করে, ঠিক সেই রকমই তাঁর দাসত্ব করুক, তার কথা অকপটে মেনে নিক। স্বৈর শাসক কখনই পছন্দ বা বরদাশত করতে পারে না যে, মানুষ তার অধীন থেকে অন্য কারোর- এমন কি আল্লাহর- দাসত্ব করুক, আল্লাহর বিধান পালন করুক। তার পথে সে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতেও কুণ্ঠিত হয় না। যদি কেউ সব বাধা অতিক্রম করে এক আল্লাহর দাসত্ব করে, তাহলে তখন সে তাদেরকে অমানুষিক অত্যাচারে জর্জরিত করে। তাকে কারাগারে বন্ধী করে। তথায় যত রকমে পীড়ন দেয়া সম্ভব তাই দিয়ে তার উপর নিপীড়ন চালায়। কুরআন মজীদ ফিরাউনের এ ধরনের কার্যকলাপের বিবরণ উপস্হাপিত করেছে। একটি আয়াতঃ[আরবি টিকা………..]

ফিরাউন বললঃ হে জনগণ! আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউ ইলাহ আছে বলে আমি জানি-ই  না।

এভাবে স্বৈরতন্ত্রী শাসক শেষে পর্যন্ত নিজেকেই জনগণের সর্বময় কর্তা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী শাসক রূপে জনগণকে মেনে নেয়ার আহবান জানায়। যেমন ফিরাউন জানিয়েছিলঃ [আরবি……..]

ফিরাউন জনগণকে একত্রিত করে ভাষণ দিল। বললঃ আমি-ই হচ্ছি তোমাদের সর্বোচ্চ রব্ব।

সে আল্লাহর রাসূল হযরত মূসা (আ)-কে পর্যন্ত ধমক দিল। বললঃ [আরবি টিকা……..]

হে মূসা!  তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ‘ইলাহ’ রূপে গ্রহণ কর, তাহলে আমি তোমাকে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দী করে দেব।

এই স্বৈরাচারির ক্রোধের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন সে দেখতে পায় যে, তার-ই অধীন, তারই শাসিত দুর্বল-অক্ষম-দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা তার পরিবর্তে অন্য্ কাউকে ‘ইলাহ’ বা ‘রব্ব’ মেনে নিয়েছে এবং তাঁরই সমীপে নিজেকে সমর্পিত করে দিয়েছে এবং তাঁরই আনুগত্য করে সম্পূর্ণ ভিন্নতর জীবন ধারা গ্রহণ করে চলেছে। তখন সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তার উপর নির্যতন-নিষ্পেষণের স্টীম রোলার চালাতে শুরু করে। এ সময় স্বৈর শাসকের মুখ থেকে তার যে মনোভাব প্রকাশিত হয়, কুরআনের ভাষায় তা-ই ছিল ফিরাউনের কথা। সে বলেছিলঃ [আরবি টিকা………..]

তোমরা তার (মূসা’র) প্রতি ঈমান আনলে আমার দেয়ার আগেই? বোঝা গেল, সেই তোমাদের সেই বড় ব্যক্তিটি,যে তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছে। ঠিক আছে, এখন আমি তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং খেজুর গাছের উপর তোমাদেরকে শূলে বসাব, তাহলেই তোমরা বুঝতে পারবে, আমাদের দু “জনার মধ্যে আযাব দেয়ার দিক দিয়ে কে অধিক কঠোর ও নির্মম এবং কে অধিক টিকে থাকতে সক্ষম। স্বৈর শাসক জনগণকে উপদেশ ও সমঝ-বুঝ দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার সামাজিক পদ্ধতি অবলম্বনের ধারা ধারে না, তার প্রয়োজনও মনে করেনা। সে কারোর সাথে মত বিনিময় বা একজনের মতের মূলে নিহিত যুক্তিধারা বুঝতে ও প্রস্তুত নয়। হযরত মূসা ও হারুন (আ)-এর তওহিদী দাওয়াতের মর্ম বুঝতে না পেরে তারা নিজেরা যেমন ক্ষমতালোভী, তাদেঁরকেও তেমনি মনে করে তাদেঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল এই বলেঃ [আরবী টিকা……..]

তোমরা কি আমার নিকট এ উদ্দেশ্যেই এসেছ যে, আমরা যে আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা ধর্মমত ও কাজকর্ম অনুসরণ করে চলেছি তা থেকে তোমরা আমাদেরকে ভ্ন্নি দিকে ফিরিয়ে নেবে? আর দেশে সকল প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব-প্রাধান্য-কর্তৃত্ব কেবল তোমাদের দু “জনারই প্রতিষ্ঠিত হবে?…. না, আমরা তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী হতে পারেছি না। নবী-রাসুলগণের তওহীদী দাওয়াতের মুকাবিলা করার জন্য বাতিলপন্থী ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন লোকেরা চিরদিনই এই ধরনের কথা বলেছে। ফিরাউন ও তার রাজন্যবর্গ যেমন মূসা ও হারুন (আ)-কে বলেছিল। তাদের এই কথা থেকে শোনামাত্র এই শ্রেণীর লোকদের মনে ভয় জেগে উঠে যে, আসলে ওরা আমাদের চলমান জীবনধারা, চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়। তার কারণ এই যে, ওরা হয় তওহীদী দাওয়াতের মর্ম বুঝতে পারে না অথবা তা বুঝতেই চায় না কিংবা ওরা শক্তি ও ক্ষমতার নেশায় এতই বুঁদ হয়ে থাকে যে, সামান্য ব্যতিক্রমধর্মী কথা শুনলেই ওদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ভাবে, এই বুঝি গেল আমাদের বাপ-দাদার নিকট থেকে পাওয়া ধর্ম, এই বুঝি উৎখাত হতে হলো বহুকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা থেকে। এই কারণে তারা খুব দ্রুত জনগণের মনস্তাত্ত্বিক ‘অপারেশন’ করতে শুরু করে দেয়। এই তওহীদী  দাওয়াত দাতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করে জনমনে ঘৃণা ও বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। তারা জনগণকে ভয় পাইয়ে দেয় এই বলে যে, আমি ক্ষমতায় আছি বলে তোমরা সুখে আছ। ওরা যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে তোমরা গোল্লায় যাবে, বাপ-দাদার ধর্ম নষ্ট হবে এবং তোমাদেরকে কঠিন দুর্দশার মধ্যে ফেলে দেব। কাজেই ওদের কথা কখনই শুনবে না, ওদের দিকে ভ্রূক্ষেপই করবে না।

আসলে এ সব-ই হচ্ছে স্বৈর শাসকের মারাত্মক ধোঁকাবাজি। তখন জনগণকে ভুল বোঝানো ও প্রতারিত করা ছাড়া ওদের উপায়ও কিছু থাকে না। ফিরাউন এই ধোঁকাবাজির ধুম্রজাল সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা (আ)-কে লক্ষ্য করে বললঃ [আরবী………………….]

হে মূসা! তুমি কি এ উদ্দেশ্যেই আমাদের কাছে এসেছ যে, তুমি তোমার যাদুবিদ্যার জোরে আমাদের আমাদের দেশ-ঘর-বাড়ি-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি থেকে বহিষ্কৃত ও উৎখাত করবে?

অপর আয়াতে কথাটি এইঃ [আরবী………………..]

আসলে এ দুজন (মূসা ও হারুণ) মস্তবড় যাদুকর। ওরা দুজনই তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে উৎখাত করার মতলবে আছে।

স্বৈর শাসনের অধীন জনগণের যে চরম মাত্রার দুর্দশা ও দুরবস্থা হয়, তাকে স্বৈরতন্ত্রীরা খুবই উত্তম-উজ্জ্বল-সুন্দর প্রমাণ করতে প্রাণ-পণে চেষ্টা করে। তারা লোকদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, আসলে তোমাদের বর্তমান জীবন-ধারা ও রীতি-ই অতীব উত্তম। কিন্তু ওরা তা খতম করে দিতে বদ্ধ পরিকর। ফিরাউন ও তার দল-বলের ভাষায় কথাটি এইঃ [আরবী…………………]

এই দুই যাদুকর তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে উৎখাত করতে চায় তাদের যাদুবিদ্যার জোরে এবং তোমাদের সর্বোন্নত মানের আদর্শ জীবন-ধারা ও পদ্ধতিকে বিনষ্ট করতে বদ্ধপরিকর।

স্বৈর শাসকরা অনেক সময় নিজেদের নিরংকুশ কর্তৃত্বের সিংহাসনকে রক্ষা করার লক্ষ্যে শেষ অস্ত্র হিসেবে নিজেদের বড় ধার্মিক, আল্লাহ-ভীরু, রাসূল-প্রেমিক ও মানব দরদী রূপী মিথ্যামিথ্যি পেশ করতেও লজ্জা পায় না। অথচ তাদের আসল উদ্দেশ্য হয় নিজেদেরকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাসীন রেখে দ্বীন-ধর্মকে সমূলে উৎপাটিত করা। আর যারা প্রকৃতই কোন কল্যাণকর বিধান নিয়ে মানুষের নিকট উপস্থিত হয়, তাদেরকেই স্বার্থপর অসদুদ্দেশ্যপরায়ণ এবঙ মানুষের জন্য বিপদজ্জনক রূপে চিহ্নিত করতে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালায়। হযরত মূসা (আ) যখন ফিরাউনের নিকট এক আল্লাহর বন্দেগী কবুলের দাওয়াত দিলেন, তখনই ফিরাউন বলে উঠলঃ [আরবী………………….]

আমাকে ছাড়ো তো। আমি এ মূসাকে হত্যা করে ফেলি! রক্ষা পাওয়ার জন্য সে তার আল্লাহকে ডাকুক না! (দেখা যাবে, সে কেমন করে আমার হাত থেকে তাকে ক্ষা করতে পারে!) আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এই লোকটি তোমাদের আবহমান কাল থেকে অনুসৃত তোমদের জীবন-বিধিকে বদলে দেবে অথবা দেশে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে।

স্বৈর শাসক যখন মনে করে, জনগণের ধর্মীয় ভাবধারা অত্যন্ত প্রবল, ধর্মের কথা শুনলে যখন বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়, তখন সে জনগণের সম্মুখে নিজেকে একজন বড় ধার্মিক, সত্য পথের পথিক ও সত্য পথ-প্রদর্শক রূপে পেশ করে। কুরআনে ফিরাউনের কথায় উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছেঃ [আরবী……………….]

আমি তো তোমাদেরকে তা-ই বলি, যা আমি সর্বোত্তম মনে করি। আর আমি নির্ভুল ও সত্য পথেরই সন্ধান দেই।

স্বৈরতান্ত্রিক-সেচ্ছাচারী শাসকরা স্বীয় ক্ষমতার ‘ময়ুর সিংহাসন’ অক্ষুণ্ণ ও স্থায়ী করে রাখার জন্য সুসংবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে থাকে। তার একটি ভাগে থাকে সমাজের সেবস লোক, যারা চূড়ান্ত পর্যায়ের বড় লোক, যারা ‘Elite’ বলে পরিচিত, যারা ধন-বল জন-বল ও বুদ্ধি-কৌশলের বলে সমাজের শীর্ষস্থানে আসীন হয়ে রয়েছে এবং সে সব কারণে চরম মাত্রার অহংকারী, দাম্ভিক! আর দ্বিতীয় ভাগে থাকে সেসব লোক, যারা দরিদ্র, দুর্বল, অক্ষম, অসহায়, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত, জীবন-ধারায় পশুর চাইতেও নিম্ন পর্যায়ে গণ্য। এজন্য সমাজকে নির্দিষ্টভাবে কেবল দুটি ভাগেই বিভক্ত করা হয় তা-ই নয়, প্রয়োজনবোধে ও অবস্থার অনুপাতে শত শত খণ্ডে বিভক্ত করতেও দ্ধিধা বোধ করে না। তখন স্বৈরশাসক সেই অল্প সংখ্যক বড় লোকদের সহায়তা নিয়ে বিপুল সংখ্যক ‘ছোট লোক’দের উপর স্বৈর শাসনের স্টীম রোলার চালাতে থাকে। ঐক্যবদ্ধতাকে খান খান করে দিয়ে জনতার মাথা তুলে দাঁড়াবার ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে অবলুপ্ত করে দেয়। স্বৈর শাসকের এই নীতিকেই ইংরেজীতে বলা হয় Divide and Rule। আল্লাহ তা’আলা ফিরাউন সম্পর্কে ঠিক এ কথা-ই বলেছেনঃ [আরবী টীকা…………..]

ফিরাউন দেশে বিজয়ী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসেছে এবং দেশের জনগণকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে দিয়েছে।

এইরূপ স্বৈর শাসক নিজেকে গোটা দেশের একচ্ছত্র মালিক ও মনিব বলে মনে করে। দেশের সব নৈসর্গিক ও মানবিক সম্পদের নিরংকুশ মালিকানা দাবি করে। ফিরাউনও তাই করেছিল। সে ঘোষণা দিয়েছিলঃ [আরবী…….]

হে দেশের জনগণ! এই মিসর দেশের একচ্ছত্র মালিক কি আমি-ই নই? এই খাল-বিল-নদী-সমুদ্র কি আমার-ই নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বাধীন প্রবাহিত হচ্ছে না? …তোমরা কি দেখতে পাও না, লক্ষ্য করো না?

এভাবে স্বৈর শাসক যখন নিজেকে সকল প্রকার বিরুদ্ধতা-প্রতিরোধ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে করতে শুরু করে, যখন দেখতে পায় প্রতিবাদী সমালোচক কণ্ঠস্বর স্তদ্ধ হয়ে গেছে, সকল মানুষ তারই অধীনতা স্বীকার করে তাকে পুরাপুরিভাবে মেনে নেয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখন সে নিজেকে আইনদাতা-বিধানদাতারূপে ঘোষণা করে এবং জানিয়ে দেয় যে, কেবল তারই ঘোষিত নীতি ও তারই জারি করা আইন মানতে হবে। অন্যথায় কঠিন দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। তখন সে নিজ ইচ্ছা ও খাহেশে কোন জিনিসকে হালাল ঘোষণা করে আবার কোন জিনিসকে করে হারাম। অথচ আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে এরূপ করার কোন অধিকারই এ দুনিয়ার কারোরই থাতে পারে না।

আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী…………]

তোমাদেরকে মুখে যেমন আসে মিথ্যামিথ্যি বলতে থেকো না যে, এটা হালাল আর এটা হারাম। কেননা তাতে মিথ্যামিথ্যি ভাবে স্বরচিত বিধানকে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়ার অপরাধে তোমরা অপরাদী হয়ে পড়বে।

স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এতই মারাত্মক নেশার সত যে, যে-লোকই এরূপ শাসন চালাতে শুরু করবে, সে নিজেকে সাকটি দেশের একচ্ছত্র মালিক মুখতার ঘোষণা দিয়ে ও নিজ ইচ্ছামত আইন-বিধান রচনা করে জনগণের উপর জারি করেই ক্ষান্ত হয় না, শেষ পর্যন্ত সে নিজেকে জনগণের জীবন-মরণেরও একমাত্র কর্তা রূপে পেশ করে। অথচ কোটি কোটি বছরের ইতিহাস নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, মানুষ এই দুনিয়ায় ক্ষমতার অনেক দাপট দেখিয়েছে বটে; কিন্তু নিজেকে মানুষের জীবন-মরণের নিরংকুশ কর্তা প্রমাণ করা কখনই সম্ভব হয়নি। কোন মানুষ বা জীবকে জীবন দেয়াও সম্ভব হয়নি, কারোর মৃত্যুর চূড়ান্ত ফয়সালা করাও কারো সাধ্যে কুলায়নি। (যদিও মানুষ জীবন ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াতে পারে)। জীবন ও মরণের মালিক হওয়ার এই স্বৈরতান্ত্রিক আহমিকতা দেখিয়েছে ফিরাউনের-ই মত –ফিরাউনেরও বহু পূর্বে আর একজন স্বৈর শাসক, যার নাম নমরূদ। কুরআন মজীদে তার সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছেঃ [আরবী……………]

তুমি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা চিন্তা করনি, যে ব্যক্তি ইবরাহীমের সাথে তর্ক করেছিল এই নিয়ে যে, তার রব্ব কে? এবং সে কর্ত করেছিল এই কারণে যে, আল্লাহই তাকে বাদশাহী দিয়েছিলেন। ইবরাহীম যখন বলল, আমার রব্ব তিনিই যিনি জীবন ও মৃত্যু দানকারী। সে তখন বললঃ আমিই তো জীবন দেই ও মৃত্যু ঘটাই।

বস্তুত এরূপ স্বৈরশাসন মানব জীবনে কত যে লাঞ্ছনা, দুঃখ, অশান্তি সৃষ্টির প্রত্যক্ষ কারণ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বিশ্বমানবের ইতিহাস এই পর্যায়ের দুঃখময় কাহিনীতে ভরপুর হয়ে রয়েছে। মানুষকে এক কঠিন আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, যা সহ্য করার কোন সাধ্যই মানুষের হতে পারে না। ‘গর্তকর্তারা’ কিছু সংখ্যক আল্লাহর অনুগত মানুষকে যে কঠিন আযাব দিয়েছিল, তা প্রাচীনকালীন ইতিহাস পাঠক মাত্রেরই জানা থাকার কথা। কুরআন মজীদে তাদের এই কীর্তিকলাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওরা ছিল অত্যাচারী স্বৈরতান্ত্রিক শাসক। ওরা জোর করে জনগণকে নিজেদের শিরকী বিশ্বাস গ্রহণে বাধ্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু লোকেরা তা গ্রহণ করতে যখন প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করল, তখন তাদের জন্য বড় বড় ও গভীর গর্ত খুদলো। তাতে প্রচণ্ড অগ্নিকুন্ড জ্বালালো এবং সে সব লোককে তার মধ্যে জীবন্ত নিক্ষেপ করল। কেবল তাদেরকেই নয়, সেই সাথে তাদের স্ত্রী-পুত্র ও বাচ্চা-কাচ্চাদেরও তার মধ্যে ফেলে দিল। ইতিহাসে স্বৈরতন্ত্রীরা মানুষকে যত আযাব দিয়েছে বলে উল্লিখিত হয়েছে, এটা ছিল তার মধ্যে একটি নির্মমতম ঘটনা। এজন্য কুরআন মজীদ তার বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছে। বলেছেঃ [আরবী……………….]

ধ্বংস হয়েছে গর্তকর্তারা। (সেই গর্তকর্তারা) যারা জ্বালিয়েছিল দাউ-দাউ করে জ্বলা ইন্ধনের আগুণ। -যখন তারা সেই গর্তের মুখে উপবিষ্ট ছিল। আর তারা ঈমানদার লোকদের সাথে যে ব্যবহারটা করছিল, তা তারা প্রত্যক্ষ করেছিল। এই ঈমানদার লোকদের সাথে তাদের শক্রতার একমাত্র কারণ এই ছিল যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও স্ব- প্রমংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। প্রথম কথামঃ ধ্বংস হয়েছে গর্তকর্তারা অর্থ, যারা গর্ত খুড়ে অগ্নিকুণ্ডলি  বানিয়ে সেই দাউ-করা আগুনের মধ্যে ঈমানদার লোকদেরকে জীবন্ত নিক্ষেপ করেছিল, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। তারা আল্লাহর আযাব পাওয়ার যোগ্য প্রমাণিত হয়েছে।

ঈমানদার লোকদেরকে জ্বলন্ত দাউ দাউ করা অগ্নি গহবরে নিক্ষেপ করার ঘটনা হাদীসেও উল্লিখিত হয়েছে। তাতে মনে হয়, দুনিয়ার ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা বহুবার সংঘটিত হয়েছে। মওলানা সাইয়্যেদ আ’লা মওদূদী এই কাহিনীর উপর ঐতিহাসিক প্রামাণ্য ও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ পর্যায়ের বহু কয়টি ঘটনার মধ্য থেকে একটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ এখানে করা যাচ্ছে। ইয়েমন শাসক যু-নাওয়াস দক্ষিণ আরবের নাজরান দখল করে ও তথাকার সাইয়্যেদ হারিসা সুরিয়ানী( Arethas)-কে হত্যা করে। তারা স্ত্রী রুমা’র চোখের সামনেই তারা দুই ক্যনাকে হ্যা করে তাদের রক্ত পান করতে তাকে  বাধ্য করল। শেষ পর্যন্ত তাকেও হত্যা করল। বিশপ পলের অস্থি কবর থেকে বের করে ভস্ম করা হলো এবং আগুন ভর্তি গর্তসমূহে নারী-পুরুষ, শিশু,বৃদ্ধা পাদ্রী,পূজারী সকলকেই নিক্ষেপ করল। নিহতের সংখ্যা মোট ২০ থেকে ৪০ হাজার দাঁড়িয়েছিল। ৫২৩ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।[তাফসীর মাজমাউল বায়ান, দুররে মনসুর।]

হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে গর্তকর্তাদের এই ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে যে, একজন বাদশাহ মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে নিজ ঔরষজাত কন্যার উপর (অথবা আপন ভগ্নীর উপর) বলাৎ করে। পরে তার উপর প্রশ্ন জাগে যে, অতঃপর যে দুর্নাম হবে তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় কি? কন্যা (বা ভগ্নী) পরামর্শ দিল যে, জনগনের এক মহাসম্মেলন আহবান করে এ কথা ঘোষণা করে দেয়া হোক যে, আপন কন্যা (বা বোন) বিয়ে করা আমার মতে সম্পূর্ণ বৈধ এবং এ কথা মেনে নিতে সকলকে বাধ্য করতে হবে। বাদশাহ তাই করল। কিন্তূ তার এই মত জনতার কেউ-ই গ্রহণ করতে রাজী হল না। তখন সে গর্ত খুড়ে তার মধ্যে কাষ্ঠের স্তুপ করে আগুন ধরিয়ে দিল এবং তার মত গ্রহণ করতে রাযী নয়-এমন সব মানুষকে ততে নিক্ষেপ করল।[তাফহিমুল কুরআন, সূরা আল-বুরুজ]

এ সব বিবরন থেকে অকাট্যভাবে প্রমানিত হয় যে, স্বৈর শাসকরা পশুত্বের নিম্ন পর্যায়ে পৌছাতে ও তা সকলকে অকপটে মেনে নিতে বাধ্য করতেও লজ্জা বোধ করে না। সকর প্রকার হারাম কাজ সে স্বীয় খাহেশ পূরণের জন্য করে এবং তা করতে বা তা করা হারাম নয় বলে মেনে নিতে বাধ্য করতে সচেষ্ট হয়ে থাকে। আর কেউ যদি স্বীয় সঠিক ঈমানের কারণে তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে তার উপর অত্যাচারের পাহাড় ভাঙ্গতেও কুণ্ঠিত হয় না। কুরআন মজীদ ফিরাউন ও অন্যান্য স্বৈর শাসকদের যেসব চরিত্র ও কার্যকলাপের উল্লেক করেছেন তা কেবল সেই বিশেষ ব্যক্তিদেরই নয়, সকল স্বৈর শাসকেরই এই চরিত্র ও কার্যকলাপ। এই স্বৈর শাসন পদ্ধতিই শাসকের মধ্যে এরূপ চরিত্র সৃষ্টি করে ও অনুরূপ কার্যকলাপ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ স্বৈর শাসনের আসল পরিচিতি হচ্ছে নিরংকুশ কর্তৃত্বের রাজতন্ত্র বাদশাহী বা অস্ত্র বলে দখল করা ক্ষমতা। তা যেমন আল্লাহর বিধান মেনে চলে না, তেমনি কোনরূপ মানবিকতারও ধার ধারে না। এক ব্যক্তিই হয়ে থাকে কোটি কোটি মানুষের উপর নিরংকোশ কর্তৃত্বের একচ্ছত্র অধিকারী। কুরআনে বিশেষভাবে ফিরাউন ও নমরূদের কথা বলা হয়েছে এজন্য যে, এরা দু’জন হচ্ছে মানবেতিহাসে স্বৈরতন্ত্রী শাসকের জীবন্ত প্রতীক।

তবে স্বৈরতন্ত্রের বিপর্যয় পরিমাণ ও পরিস্থিতির (quantity and quality)  দিক দিয়ে যথেষ্ট পার্থক্য হয়ে থাকে। এ পার্থক্য হয় ব্যক্তির যোগ্যতা ও মন-মানসিকতার মাত্রা-পার্থক্যের কারণে। এ দিক ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে, আর কতিপয় দিক দিয়ে তা হরণ করে না, রক্ষা করে। আবার কোন কোন স্বৈরতন্ত্রী প্রত্যেকটি নাগরিকের সমস্ত অধিকারই হরণ করে নেয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা বলতে কিছুই থাকতে দেয়া হয় না। এক্ষেত্রে সে সাধারণ সীমা পর্যন্ত লংঘন করে যায়। জনগণের  মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা সমস্ত ধন-সম্পদও নিঃশেষ লুটেপুটে নিয়ে যায়। আর শেষ পর্যন্ত সে শুধু রাজ্য সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসতেই রাযী হয় না, সেই সাথে সরা দেশের কোটি কোটি মানুষের যাবতিয় ধন-সম্পদের –এমন সেই লোকদেরও নিরংকুশ মালিক হয়ে বসার অহমিকতা বোধ করতে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্বৈরতন্ত্র কতটা প্রচন্ড হতে পারে, তা অনুমান করলেও রোমাঞ্চিত হতে হয়। এই সময় এ ধরনের স্বৈরতন্ত্রী মানুষের আল্লাহ হয়ে বসে আর মানুষের উপর চলে স্বৈচ্ছাচারিতাজনিত সীমাহীন বর্বরতা।  সে মানুষের খোদা হয়ে সকলকে একমাত্র তারই দাসত্ব করতে বাধ্য করে।

এইরূপ একটি শাসন ব্যবস্থার সাথে ইসলামের যে দূরতম সম্পর্ক-ও থাকতে পারে না, তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নাজিবাদ,ফ্যাসীবাদ ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদ প্রভৃতি শাসন ব্যবস্থার সাথে তার পুরাপুরি সমঞ্জস্য পাওয়া যায়। বলা যায়, প্রাচীনকালীন নমরূদী ফিরাউনী শাসনের এগুলিই হচ্ছে অতি আধুনিক সংস্করণ। অন্য কথায়, এই সব কয়টি শাসন ব্যবস্থাই আল্লাহদ্রোহী শাসন ব্যবস্থা, আল্লাহর আল্লাহত্বকে অস্বীকার করে জনগণের উপর নিজেকে আল্লাহ বানিয়ে বসার শাসন ব্যবস্থা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে উল্লিখিত কতিপয় বাদশাহী ব্যবস্থা সম্পর্কেও আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করছি। কেননা পূর্ববর্তী আলোচনা পাঠান্তে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বাদশাহী ব্যবস্থা যদি ইসলাম পরিপন্থী স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হবে, তাহলে কুরআনের কোন কোন নবী ও অ-নবীকে বাদশাহ বানানো ও তাকে ইসলামী মনে করার কথা বলা হলো কেমন করে?…..তা কি ইসলাম সম্মত?

বস্তুত ইসরাইলীদের ইতিহাসে বহু বাদশাহের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং সে বাদশাহী আল্লাহ দিয়েছেন বলে তিনি নিজেই তাঁর কালেমে-কুরআনে দাবি করেনছেন। এই বাদশাহীগুলি কি ধরনের এবং তা আল্লাহ দিয়েছেন কেমন করে? এর জবাবে বলা যায়, আল্লাহ তা ‘আলার দেয়া রাজত্ব-বাদশাহী এ সব রাজত্ব-বাদশাহী থেকে চরিত্র-বৈশষ্ট্য ও রীতি-নীতি সর্ব দিক দিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কেননা আল্লাহর দেয়া বাদশাহী হয় নবুয়্যাতের সাথে জাড়িত, না হয় বিশেষ অবস্থায় আল্লার এক বিশেষ দান। তাতে ফিরাউনিয়ত হতে পারে না,গর্ব-অহংকার-অহমিকতা, আল্লাহদ্রোহিতা ও মানব জীবনে কোনরূপ বিপর্যয় সৃষ্টির কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ রাজতন্ত্র নয়, এ বাদশহী প্রকৃতই বাদশাহী নয়,বরং তা হচ্ছে নবুয়্যাতের দায়িত্ব পালন এবং পরিভাষার দিক দিয়ে তা আল্লাহর মহান খিলাফত। তা সম্পূর্ণরূপে ও সর্বতোভাবে আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে চলে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা হযরত দাউদ(আ)-কে সম্বোধন করে বলেছেনঃ [আরবী………]

হে দাউদ। আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছি। অতএব তুমি লোকদের উপর শাসন চালাও-লোকদের পরস্পরের মধ্যে বিচার র্কায সম্পাদন কর পরম সত্য নীতি অবলম্বন ও ইনসাফ সহকারে। আর নিজের স্বেচ্ছাচারিতাকে অনুসরন করো না। তা হলে তোমারা এই স্বেচ্ছাচারিকই তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করে দেবে। এ আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর দেয়া শাসন ক্ষমতা খিলাফত নামে অভিহিত। যাকে এই শাসন ক্ষমতা দেয়া হয়, সে আল্লাহর খলীফা। এ খিলাফতী শাসন ব্যবস্থায় লোকদের উপর শাসনকার্য পরিচালিত হয় পরম সত্য নীতি আদর্শ –আল্লাহর দেয়া বিধান-অনুযায়ী। এখানে বাদশাহর ব্যক্তিগত খামখেয়লী, স্বেচ্ছাচারিতা ও খাহেশ অনুসরণের একবিন্দু অবকাশ থাকতে পারে না। যদি তা হয়,তাহলে সে বাদশাহী আল্লাহর সমর্থন হারিয়ে ফেলবে। তখনই তা হবে চরম স্বৈরতন্ত্র, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। হযরত মুহাম্মাদ (স)- ও মদীনায় প্রতিষ্ঠত রাষ্ট্রে প্রধান ছিলেন। তাকেঁও অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছিলেনঃ [আরবী…………….]

এবং শাসন কার্য পরিচালনা করে লোকদের মধ্যে আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী এবং লোকদের কামনা বসনা কে অনুসরণ করো না। এ শাসনকার্য মূলত কোন ব্যক্তির শাসন নয়, স্বেচ্ছাচারিতও চলে না তাতে। বরং তা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর বিধান-ভিত্তিক। অতএব এ শাসন কখনই স্বৈরতন্ত্রী হয় না। বনি ইসরাইলীদের মধ্যে  এরূপ বাদশাহী গড়ে তোলা হয়েছিল এবং তা ও অনুরূপ শাসন ব্যবস্থা ছিল। ফলে তা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক নয়। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ [আরবী……….]

মূসা যখন তার জরগণকে ডেকে বললঃ হে জনগণ! তোমার স্মরণ কর তোমাদের প্রতি আল্রাহর দেয়া সেই নিয়ামতের কথা, যার ফলে তিনি তোমাদের নবী বানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন। এই বাদশাহগণ আসলে নবী- রাসুল। যেমন হযরত ইউসুফ, হযরত দাউদ, হযরতসুলাইমান (আ) তাঁদের সম্পর্কেই কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ তাদেরকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহহের ফলে যা কিছু দান করেছেন, তা দেখে এ লোদের প্রতি তাঁর হিংসা পোষণ করে?…… বস্তুত আমরা তো ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদেরকে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, আমরা তাদেরকে বিরাট রাজত্বও দিয়েছি।-[এই রাজত্ব বলতে বস্তুগত ও আদর্শগত উভয় পর্যায়ের ব্যাপারাদির উপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বোঝায়। তাতে নবুয়্যাত, নেতৃত্ব ও ধন-সম্পদ –সব কিছুর মালিকত্ব সামিল রয়েছে। এর পূর্ববর্তী আয়াতের দৃষ্টিতে এর অর্থ তা-ই বোঝা যায়।]

হযরত ইউসুফ ও দাউদ (আ) যে হযরত ইবরাহীমের বংশধর ছিলেন, তা সর্বজনজ্ঞাত। আর তাঁরাই ছিলেন বনি ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় নবী-রাসূল। এক পর্যায়ে বনি ইসরাইলের জন্য একজন বাদশাহ্ নিয়োগ করেন একজন অ-নবী ব্যক্তিকে। করিআন মজীদেই বলা হয়েছেঃ [আরবী………….]

তাদের নবী তাদেরকে ডেকে বললঃ বস্তুতই আল্লাহ তালূতকে তোমাদের জন্য বাদশাহ বানিয়ে পাঠিয়েছেন। লোকেরা বললঃ সে কি করে আমাদের বাদশাহ  হতে পারে, তার তুলনায় আমরাই বরং বাদশাহীর বেশী অধিকার। তাকে তো বিপুল ধন-মালও দেয়া হয়নি। নবী বললঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকেই তোমাদের উপর বাদশাহ বাছাই করে নিয়োগ করেছেন এবং তাকে ইলম ও দেহের দিক দিয়ে বিপুলতা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার বাদশাহী দান করেন। আল্লাহ তো বিপুল-বিশাল.সর্বজ্ঞ।

তালূত নবী ছিলেন না বটে; তবে তার সঙ্গে ছিলেন একজন নবী। আর সে ব্যক্তিও কোন সীমালংঘনকারী ব্যক্তি ছিল না। সে আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাধীন লালন ও প্রশিক্ষণ লাভ করে ছিল। উপরোদ্ধৃত আয়াতের শেষ ভাগে তা-ই বলা হয়েছে।

সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ বনি-ইসরাইলের বাদশাহী প্রাপ্তিতে তাদের অগ্রাধিকার লাভের কথা বলে তাদের প্রকৃত মনোবৃত্তিই প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের একজন বাদশাহ হবে, যার পতাকাতলে মিলিত হয়ে তারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তারা তা বলেই দিয়েছে যে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত। নবীর নিকট তারা একজন বাদশাহের দাবিও জানিয়েছিল। সেই অনুযায়ী নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের খবর দিলেন যে, আল্লাহ তালূতকে বাদশাহ রূপে নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু তারা আল্লাহর এ বাছাই ও নিয়ো ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। বলে, তালূত কি করে বাদশাহ হতে পারে; ওর তো ধন-মালের বিপুলতাই নেই, আমরাই বরং বাদশাহী পাওয়ার বেশী অধিকারী, বিশেষ করে বংশানুক্রমিকতার দৃষ্টিতে, উত্তরাধিকার নীতির ভিত্তিতে। ও তো বাদশাহদের বংশের সন্তান নয়। এ হচ্ছে বাদশাহ সংক্রান্ত ধারণার অনিবার্য পরিণতি। বনি ইসরাইলের বংশীয় গৌরব ও বিদ্ধেষের কথা কে না জানে?

নবী তাদের এই দুই ভিত্তিক দাবিকে অগ্রাহ্য করলেন। তিনি বাদশাহ হওয়ার জন্য বিপুল ধন-মালের মালিক হওয়ার ভিত্তিকেও মানলেন না, মানলেন না বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের দোহাই। এ দুটিকে অস্বীকার করে বাদশাহীর জন্য প্রয়োজনীয় গুণকে ভিত্তিরূপে ঘোষণা করলেন। সে ভিত্তি হচ্ছে ইলম ও সুস্বাস্থ্য। এ দুটি দিক নিয়ে সে-ই বাদশাহ হওয়ার অধিক উপযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে। বললেনঃ [আরবী………..]

নিঃসন্দেহে আল্লাহই তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে ইলম ও স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে আধিক্য দিয়েছেন। [আরবী টীকা….]

তালূতের বাদশাহ হওয়ার অকাট্য প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর মনোনয়ন। কিন্তু আল্লাহ তাকে মনোনীত করলেন কেন? তার কারণ হচ্ছে, সে রাজা-বাদমাহর বংশধর বা বেশী ধন-মালের মালিক না হলেও সে ইলম ও সুস্বাস্থ্যের –দৈহিক ক্ষমতার –দিক দিয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ইলম হচ্ছে মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য আর রাষ্ট্র পরিচালনা ও যুদ্ধ-জিহাদ চালাবার কঠিন অবিশ্রান্ত কষ্ট স্বীকারের জন্য স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা শুধু সাহায্যকারী-ই নয়, অপরিহার্য শর্ত।

প্রমানিত হলো যে, তালূতের বাদশাহ হওয়অর অধিকার দ্বীন সম্পর্কিত ইলমের কারণে এবং দৈহিক শক্তি-সামর্থ্যের কারণে। বংশের দরুন নয়। [আরবী টীকা…….]

সেই সাথে এ কথাও বলা যায় যে, কুরআন যেরাজতন্ত্র বা বাদশাহীকে হারাম করেছে, তা হচ্ছে জনগণের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্বসম্পন্ন রাজতন্ত্র বা বাদশাহী। নবী-রাসূলগণ যে বাদশাহী পেয়েছিলেন, তা সে রকমের নয়। তা নিছক জনগণের ব্যাপারাদির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী। এখানে নিরংকুশতার কোন অবকাশ নেই।

তা সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতাসীনতাকে ‘শাসক’ ও মালিক বা বাদশাহ নামে অভিহিত করার কারণ কি? মনে হয় শাসন-প্রশাসনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পরিচিত ও প্রচলিত শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে, যেন কথা জনগণের বোধগম্য হয়। কেননা বিশ্ব ইতিহাসের যে যে অধ্যায়ের এই সব কাহিনী, তখন বলতে গেলে দুনিয়ার সর্বত্রই এই বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ও বাদমাহী অথবা ক্ষমতা দখল ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি প্রচলিত ও জনগণের নিকট পরিচিত ছিল না। যদিও আল্লাহ তা’আলা নবী-রাসূলগণকে বা কোন অ-নবীকে প্রচলিত ধরনের রাজা বা বাদশাহ বানান নি, তার বিপরীত আল্লাহর বিধান অসুসরণ করে প্রশাসক হিসেবেই তাদের নিযুক্ত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাদের জন্যও প্রচলিত পরিভাষাই ব্যবহার করা জরুরী হয়ে পড়েছিল, যদিও এ দু’ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে নীতি-আদর্শ ও আচার-আচরণের দিক দিয়ে আসমান-যমীনের পার্থক্য রয়েছে।

উপরন্তু আল্লাহ যে অষ্প সংখ্যক ‘বাদশাহ’ বা ‘শাসক’ নামে অভিহিত করেছেন, তাদের শাসন-প্রশাসন আমাদের এখানে আলোচ্য রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈরতন্ত্র থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্নতর। কেননা আল্লাহ তাঁর নবীগণের মধ্য থেকে যে নেক বান্দাকে বাদশাহ বানিয়েছিলেন বলে কুরআনের আলোচ্য আয়াতসমূহে বলা হয়েছে, তা কখনও শক্তি প্রয়োগ, জবরদস্তি সহকারে ও গায়ের জোরে জনগণের মালিক-মুখতার হয়ে বসার নীতিতে অর্জিত হয়নি। অথচ দুনিয়ার প্রায় সব রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও নিরংকুশ শাসককর্তার মূলে এ জিনিসই ছিল প্রধান হাতিয়ার।

এ দুই ধরনের বাদশাহী ও শাসনকর্তার মধ্যকার পার্থক্য আরও দুটি দিক দিয়ে দেখানো যেতে পারেঃ

প্রথম, নবী-রাসূলগণ শাসক-প্রশাসক হলেও তারা ছিলৈন মা’সুম এবং মহান পবিত্র গুণের অধিকারী। দুনিয়ার অন্যান্য রাজা-বাদশাহ-স্বৈরতন্ত্রীরা সে রূপ ছিল না, হতেও পারে না।

 দ্বিতীয়, নবী-রাসূলগণ যে রাজত্ব-বাদশাহী পেয়েছিলেন মূলত তা মহান আল্লাহর দান বিশেষ। তারা তা কখনই ক্ষমতাবলে শক্তি প্রয়োগে অর্জন করেননি। শক্তি বলে তা প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে রাজত্ব লাভ তো আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিদের চিরন্তনী চরিত্র।

এ দুটি দিক বাদ দিয়ে যে রাজতন্ত্র ও বাদশাহী, তা-ই হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র। তা অনিবার্যভাবে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ ঘটাবে এবং শাসকরাই নমরূদ ফিরাউন হয়ে বসতে পারে। ইতিহাস তা-ই প্রমাণ করে।

কোন কোন নবী-রাসূলকে আল্লাহ তা’আলা ‘মালিক’–বাদশাহ নামে অবিহিত করেছেন বটে; কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সাধারণভাবে রাজা-বাদশাহরা অহংকারী, প্রতাপান্বিত ও স্বৈরতন্ত্রী হলেও কুরআন নাযিল হওয়ার সময় নবী-রাসূলগণকে ‘বাদশাহ’ ইত্যাদি বলার দরুণ তাদেরকে সে ধরনের রাজা-বাদশাহরূপে কেউ-ই মনে করতে পারেনি। কারো-ই মনে রাজা-বাদশাহদের সম্পর্কিত খারাপ ধারণা নবী-রাসূল সম্পর্কিত খারাপ ধারণা নবী-রাসূল সম্পর্কে জেগে উঠেনি আর আজও তা কখনই মনে হয় না।

আর এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা তালূতকেও মালিক-বাদশাহ নামে অভিহিত করতে দ্বিধা করেন নি। উদাত্ত কণ্ঠে তিনি বলেছেনঃ [আরবী………..]

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তালূতকে একজন বাদশাহ করেই তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।

আর বনী ইসরাইলীদের প্রতি এই বলে অনুগ্রহ দেখিয়েছেন যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে নবী বানিয়েছেন, রাজা-বাদশাহ বানিয়েছেন। আর এটা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলারই একটি অতি বড় নিয়ামত বিশেষ। বলেছেনঃ [আরবী………….]

স্মরণ কর তোমাদের প্রতি আল্লাহর সেই নিয়ামতকে যে তিনি তোমদের মধ্যে নবীও বানিয়েছেন, তোমদেরকে রাজা-বাদশাহও বানিয়েছেন।

ইবরাহীমী বংশধরদের কিতাব হিকমাত এবং বিরাট রাজ্য-রাজত্ব দেয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। (আন-নিসাঃ ৫৪) শেষ পর্যন্ত হযরত দাউদ (আ)-এর এ কথাটিরও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট রাজত্ব মালিকত্ব চেয়েছিলেন, যা তার পর আর কারোর ভাগ্যে জুটবে না। [আরবী……………..]

হে আমার পরওয়ারদিগার, আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজত্ব দাও, যা আমার পরে আর কারোর জন্যই বাঞ্ছনীয় হবে না।

মোটকথা, আল্লাহর দেয়া ও আল্লাহর নিকট থেকে চেয়ে পাওয়া এসব রাজত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের রাজত্ব বাদশাহী –যার পেছনে আল্লাহর অনুমতি বা সমর্থন নেই –ইসলামে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। বিশেষত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজত্ব, মালিকত্ব ও বাদশাহী।

তার কারণ, এই ধরনের রাজত্ব বাদশাহীতে ব্যাপক বিপর্যয়, জনগণের হক বিনষ্ট, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়অ এবং সুবিচার-ন্যায়পরতা-নিরপেক্ষ ইনসাফ পদদলিত হওয়া একান্তই অপরিহার্য। মানুষের ইতিহাসের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তার অকাট্য প্রমাণ।

প্রখ্যাত ইতিহাস-দার্শনিক আল্লামা ইবে খালদূন তার গ্রন্থের ভূমিকা অংশে লিখেছেনঃ

কোন জাতি বা কোন গোত্রের বিশেষ একটি পরিবারে বা ঘরে রাজত্ব যখন স্থিতি ভাল করে, সমস্ত বিজয়ী জাতির মধ্যে যখন তা এককভাবে দেশের ও রাজত্বের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসে এবং অন্যান্য পরিবারগুলিকে পেছনে ফেলে দেয়, পরে রাজত্ব ক্রমাগতবাবে একই বংশের লোকদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়ে চলতে থাকে, তখন বাদশাহের বেশীর ভাগ রাজন্য ও পরিষদবর্গের পক্ষ থেকে বাদশাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাব জেগে উঠে। আর সরকার পরিচালন ক্ষমতা সে পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়। আর তার মূলে প্রায়ই এই কারণ হয় যে, বংশের কোন অযোগ্য কিংবা কম বয়সের বালক নিজের পিতার জীবদ্দশা থেকেই প্রিন্স বা পরবর্তী বাদশাহ নিযুক্ত হয়। কিংবা তা মৃত্যুর পর আপনজনের চেষ্টা-সহযোগীতার বলে রাজসিংহাসনে আরোহণ করে। যখন অনুভব করা যায় যে, রাজত্বের নতুন উত্তরাধিকারী স্বীয় অল্প বয়স্কতা বা অযোগ্যতার কারণে শাসনকার্য চালাতে অক্ষম, তখন তার অভিভাবক রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ধারণ করে –সে তার পিতার উজীর বা পরিষদ হোক বা গোত্রেরই কোন ব্যক্তি। দেশ শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিজ হাতে নিয়ে রাজত্ব চালাতে থাকে। তখন অল্প বয়স্ক বাদশাহকে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি থেকে অনেক দূরে রেখে সুখ-সম্ভোগ, বিলাস-ব্যসন ও আনন্দ স্ফুর্তির মধ্যে ডুবিয়া রেখে দেয়। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদির প্রতি তাাকে চোখ তুলে তাকাতেও দেয় না। ফলে দেশ ও রাষ্ট্রের একচ্ছত্র স্বাধীন মালিক সে-ই হয়ে যায়। অতঃপর বাদশাহী –সাম্রাজ্যকতার গন্ধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তখন তার মনে এই খেয়অল জাগে যে, ‘শাহান শাহী’র অর্থ উপহার উপঢৌকন, সম্মান-প্রদর্শন ও উপাধি বিতরণ করা ও স্ত্রীলোকদের নিয়ে ঘরের চার প্রাচীরের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করা মাত্র। আর দেশের শাসন-শৃঙ্খলা, তার সমস্যাবলীর সমাধান, তার আইন-কানুন জারী করা, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি দেখা-শুনা করা, দেশের সামরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা বা তার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা, সীমান্তসমূহের ব্যবস্থাপনা –ইত্যাদি বাদশাহের মতে উজীর-নাজীর বা মন্ত্রীমণ্ডলের কাজ। এজন্য এ সব ব্যাপারই সে উজীরের উপর ন্যস্ত করে দেয়। এভাবেই বাদশাহ’র একটা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা দাড়িয়ে যায়। পরে তা তার পুত্র দৌহিত্রদের মদ্যে চলতে থাকে। ………দুনিয়ার বিভিন্ন বংশের রাজত্বের ইতিহাসে তা-ই দেখা যায়।………….

কখনও এমনও হয় যে, ক্ষমতাহীন বাদশাহ খাবে গাফলত থেকে জেগে উঠে নিজের অবস্থার যথার্থ পর্যালোচনা করে। আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে হারানো ক্ষমতা ও স্বাধীনতা পুনরায় করায়ত্ব করে নেয় এবং স্বাধীন ক্ষমতার মালিক হয়ে কর্তৃত্বশীলরা বিদ্রোহীদের মস্তক চূর্ণ করে দেয়। কখনও তরবারির দ্বারা তাদের হত্যা করে। আবার কখনও তাদেরকে তাদের দখল করা ক্ষমতা বা পদ থেকে বিচ্যুত করে……. –[মুকাদ্দমাঃইবনে খালদুন]

সারকথা হচ্ছে, নিরংকুশ রাজতান্ত্রিক বা বাদশাহী ও উত্তরাধিকার মূলত শাসন ব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়।

২. বড় লোকদের শাসন

সমাজের বড় লোকদের হাতে যখন শাসনযন্ত্র সমর্পিত হয়, তখন এক ভিন্ন ধরনের শাসন-অবস্থা দেখা দেয়। বলা হয়, যেহেতু তারা শিক্ষা, জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধন-সম্পদের মালিকানা বা বংশীয় আভিজাত্যের অন্যান্যদের অপেক্ষা অনেক উঁচু, শ্রেষ্ঠ, তাই তাদের হাতে শাসনকার্য সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হতে পারবে। এরূপ শাসন ব্যবস্থাকে আধুনিক ভাষায় বলা হয়, ‘এ্যারিস্টোক্র্যসী’ বা বড় লোকদের –অভিজাত লোকদের শাসন।

কিন্তু এ শাসন-ব্যবস্থার মূলে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এর যৌক্তিকতা কোথাও খুজেঁ পাওয়া যাবে না। এক শ্রেণীর লোক সর্বসাধারণের তুলনায় অধিক শিক্ষিত, অধিক সংস্কৃতিবান, অধিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন বা অধিক উশ্বর্যশালী হলেই যে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দিক দিয়েও অধিক যোগ্যতা, দূরদৃষ্টি ও ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন হবে, তা বলা যায় না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিস। তা ওসব দিক দিয়ে অগ্রসর লোকদের মধ্যেই পাওয়া যাবে অন্যত্র পাওয়া যাবে না, এ কথার কোন যুক্তি নেই। কাজেই অভিজাত শ্রেণীর বা ভদ্র লোকদের শাসন বাস্তবিকই ভিত্তিহীন ব্যাপার। অনেকে এসব দিক দিয়ে ‘বড় লোক’ হওয়ার দাবি করা সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা গেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা চরম অযোগ্যতা, অপদার্থতার প্রমাণ দিয়েছে। ইতিহাসের পৃষ্টায় তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে।

৩. ধনী লোকদের শাসন

অনেক সমাজের অধিক ঐশ্বর্যশালী লোকেরা নিজেদের ধনশীলতার দোহাই দিয়ে বা তার উপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের দাবি করে এবং সরকারযন্ত্র দখল করে বসে। এইরূপ শাসনব্যবস্থাকে ঐশ্বর্যশালীদের শাসন বলা হয়।

এই শ্রেণীর লোকদের ধারণা, যেহেতু সমাজের মধ্যে তারাই ধনী ও ঐশ্বর্যশালী, সারাদেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি তাদেরই মুঠের মধ্যে। অতএব দেশ শাসনের ক্ষেত্রে একচেটিয়া অগ্রাধিকার তাদেরই থাকতে পারে।

কিন্তু ধনশালী হওয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়ার কোন লক্ষণ বা প্রমাণ নেই।

এছাড়া ধনীদের ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার এবং অন্যান্য লক্ষ্য কোটি মানুষের দরিদ্র হওয়ার ব্যাপারটিও প্রশ্নাতীত তো নয়-ই, বরং এ নিয়ে অতি সহজেই প্রশ্ন তোলা যেতে পারে যে, তারা অন্যদের অপেক্ষা অধিক ধন-সম্পদের মালিক হয়ে বসলো কিভাবে? নিশ্চয়ই অন্যদের অপেক্ষা অধিক ধন-সম্পদের মালিক হয়ে বসলো কিভাবে? নিশ্চয়ই অন্যদের শোষণ করে, অন্যদের ন্যায্য হক্ থেকে বঞ্চিত করেই তাদের পক্ষে অধিক ধন-সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভবপর হয়েছে। এসব অসদুপায়ের আশ্রয় না নিলে তারা কখনই এত বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক হতে পারতো না। প্রশ্ন হচ্ছে ধন-সম্পদের আহরণে –আয়ত্তকরণেরই যদি তারা শোষণ-বঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তারা যে যোগ্যতা সহকারে রাষ্ট্র চালাতে পারবে, জনগণের অধিকার ইনসাফ সহকারে আদায় করতে পারবে, তা কি করে আশা করা যেতে পারে?

আসল কথা, কারোর অভিজাত বংশে জন্মগ্রহণ বা কারোর অধিক ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এর সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার আদৌ সম্পর্ক নেই। এই জন্যই ইসলামের এ সবের দোহাই দিয়ে কারোর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা বা দাবি সমর্থনীয় নয়। কেননা এসব শাসন শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারি শাসনে পরিণত হওয়া অবধারিত। যদিও অনেক সময় এই শ্রেণীর লোকেরা তথাকথিত গণতান্ত্রিকতারও আশ্রয় নিয়ে থাকে।

৪. গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে এক কথায় ‘জনগণের শাসন’, জনগণের উপর, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, ‘শাসন’ বলা হয়। ইংরেজীতে তা হচ্ছেঃ Government of the people by the people and for the people.

বাহ্যত এ শাসন ব্যবস্থা পূর্বোল্লিখিত শাসন ব্যবস্থা থেকে ভিন্নতর। কেননা এ শাসন ব্যবস্থা জনগণের সমর্থন, রায় বা ভোটের উপর নির্ভরশীল। জনগণের ভোটেই এ শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠে এবং জনগণের মর্জী মাফিক শাসনকার্য চালিয়ে যায়। বলা হয়, জনগণের মর্জীর বিপরীত কাজ করলে কিংবা জনগণের সমর্থন হারালে এ শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে। অতঃপর সেই জনগণের সমর্থন নিয়ে আর একটি সরকার গড়ে উঠে।

এই শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রধান কিংবা শাসক দল জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়। পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ সে রাষ্ট্র প্রধান বা শাসক দলের পক্ষে রায় না দিলে  সে সরকারের পতন ঘটবে এবং যার বা যে দলের পক্ষে রায় দেবে, তার বা সে দলের করকার গঠিত হবে।

গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থার দুটি ধরণ পৃথিবীতে চালু আছে। একটি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি। আর অপরটি পার্লামেন্টারী বা সংসদীয় পদ্ধতি। প্রথমটিতে প্রেসিডেন্ট সরাসরি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হয়। আর শেষেরটিতে পার্লামেন্ট সদস্যগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন ও পরিচালন করে। প্রথমটিতে প্রেসিডেন্ট-ই ক্ষমতার ধারক, আর দ্বিতীয়টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল –দলের নেতা –প্রধান মন্ত্রীই ক্ষমতার ধারক হয়ে থাকে।

প্রথমটিতে পার্লামেন্ট সদস্য সরাসরি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হলেও মূল ক্ষমতার মালিক হতে পারে না। মূল ক্ষমতার মালিক হতে পারে না। মূল ক্ষমতার ধারক প্রেসিডেন্টের মর্জী-ই পার্লামেন্টে প্রধান ভূমিকা পালন করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মাধ্যমেই সে মর্জী কার্যকর হয়। আর দ্বিতীয়টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা –প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে উপস্থিত থেকে জনগণের মর্জীর প্রতিফলন ঘটায়।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কার্যত মানুষের নিরংকুশ শাসন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভায়ায় সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) মানুষেরই করায়ত্ত, মানুষের হাতেই ব্যবহৃত। এ সার্বভৌমত্বের বলেই মানুষ মানুষের উপর নিরংকুশ ক্ষতমা ও কর্তৃত্বের অধিকারী –খোদা –হয়ে বসে।

কিন্তু কোন মানুষ কি সার্বভৌম হতে পারে? রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে মানুষ এই সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে সাধারণ মানুষকে দাসানুদাসের জীবন যাপনে বাধ্য করে। এ দিক দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পূর্বে আলোচিত অন্যান্য বাতিল শাসন ব্যবস্থার মতই নিপীড়নমূলক। মৌলিকতার দিক দিয়ে এ সবের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

তবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা একটা মারাত্মক ধরনের ধোকা ও প্রতারণার শাসন। রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে জনগণ জানে এবং তারা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক –মেনে নিতে বাধ্য হয় যে, এ শাসন ব্যবস্থায় তাদের যেমন কোন ক্ষমতা নেই, তেমনি নেই কোন অধিকারও। এক দিক দিয়ে এটা একটা নৈরাশ্যজনক অবস্থা।

এই নৈরাশ্যজনক অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার উদ্দেশ্যেই পাশ্চাত্যে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রবর্তন হয়েছে। তাদে বলা হয়েছে, জনগণ-ই ক্ষমতার উৎস। জনগণের রায় ও সমর্থনেই একটি শাসন-ব্যবস্থা গড়ে উঠতে ও শাসন কার্য চালানো যেতে পারে। তাতে জনগণ বিপুলভাবে আশান্বিত হয়ে উঠে।

কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্রের নামে জনগণ কঠিনভাবে প্রতারিত হতে বাধ্য হয়। জনগণ ভোট দেয়ার অধিকারী হয় বটে, কিন্তু কেই ভোট দান ক্ষমতা তারা নিজেদের ইচ্ছা ও বিশ্বাস অনুযায়ী প্রয়োগ করতে পারে না। ভোট দান কেবল মাত্র নির্ধারিত ভোট প্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রার্থীদের মধ্য থেকেই কাউকে-না কাউকে ভোট দিতে হবে। তাদের বাইরে কাউকে ভোট দেয়ার কোন অবকাশ নেই। এমনকি প্রার্থীদের মধ্যে কাউকে ভোটদাতার পছন্দ না হলেও তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে ভোট দিতে হবে। ভোট দানের স্বাধীনতা এখানে ক্ষুণ্ণ হয়ে যায়।

ভোট প্রার্থীরা সাধারণত কোন না কোন দলের মনোনীত হয়ে থাকে। ব্যক্তি হিসেবে কোন প্রার্থীকে পছন্দ হলেও তার দলকেও পছন্দ এবং সমর্থন করার বাধ্যবোধকতা অনিবার্য হয়ে পড়ে। অথবা বল পছন্দ হলে আর ব্যক্তি প্রার্থীকে পছন্দ করতে না পারলেও ভোট তাকেই দিতে হবে। এভাবে দলীয় প্রভাবের দোহাই দিয়ে কত ‘কলা গাছ’ যে ভোট পেয়ে বিরাট বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।

প্রার্থীদের ভোট প্রার্থনাও নির্ভেজাল নয়। প্রত্যেক প্রার্থী নিজের বা স্বীয় দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের দোহাই দিয়ে ভোট পেতে চায়। সে জন্য ক্যানভাসার বাহিনী ময়দানে নামিয়ে দেয়া হয়। বিপুল মৌখিক প্রচারণার সাথে পান-সিগারেট-চায়ের প্রবাহ চলে। সাধারণ অ-সচেতন জনমত কোন প্রার্থীর প্রচারণার ব্যাপকতা-চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়ে, অথবা নগদ অর্ত পেয়ে বা পাওয়ার লোভে পড়ে ভোট দিতে বাধ্য হয়। আর ভোটটা দিয়ে দেয়ার পর তার আর কোন ক্ষমতাই থাকে না। তখন ভোট প্রাপ্ত ব্যক্তিই জনগণের দোহাই দিয়ে একান্ত নিজস্ব মত প্রকাশ ও প্রচার করতে থাকে। ভোট দাতা জনগণ তাদের প্রকৃত মতের বিপরীত কথা সেই ভোট প্রাপ্ত ব্যক্তির মুখে শুনে বা তার কাজ কর্ম দেখে স্তদ্ধ নির্বাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। তার প্রতিবাদ করার বা তার সাথে সম্পর্কহীতনার কথা বলা বা বলে প্রমাণিত করার কোন উপায়-ই তার থাকে না। ভোট ফিরিয়ে নেয়ার (Re call) কথা বলা হলেও তার বাস্তবতা সম্পূর্ণ অসম্ভব। ফলে জনগণের অসহায়ত্ত অত্যন্ত করুণ হয়ে উঠে।

বলা হয়, গণতান্ত্রিক শাসনেই জনমতের প্রতিফলন ঘটে। জনগণের মত-ই তাদের নির্বাচিত ব্যক্তিদের পার্লামেন্ট সদস্য বা প্রেসিডেন্টের মুখে ধ্বনিত হচ্ছে। এ কথাটি যে কতখানি অসত্য ও ভিত্তিহীন, তা যে-কোন তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই বাস্তবে পরিলক্ষিত হয়।

বলা হয়, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। হ্যাঁ তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের শাসন নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত ব্যক্তিদের শাসন। প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে এক ব্যক্তির নিরংকুশ শাসন এবং পার্লামেন্টারী পদ্ধতি মুষ্টিমেয় নির্বাচিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশী সংখ্যক সদস্যদের –তাদের দলীয় নেতার ‘প্রধান মন্ত্রীর’ নিরংকুশ শাসন। কেননা দলীয় প্রধানই প্রধান মন্ত্রী, সংসদ নেতা। জাতির অল্প সংখ্যক লোক দ্বারাই শাসিত হয় দেশের কোটি কোটি মানুষ। তাদের রচিত আইন-ই হয় দেশের আইন (Law of the land)। তাই মানতে বাধ্য হয় গোটা জনগণ। আর মানুষ মানব রচিত আইন দ্ধারা শাসিত। ইসলামের দৃষ্টিতে তা-ই হচ্ছে রাজনৈতিক ও আইনগত শিরক। আইন পাস করার সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের লোকেরা জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থটাই বড় করে দেখে থাকে অতি স্বাভাবিকভাবে।-[Professor Robert Dahi said : Democracy is neither rule by the majority nor ruled by a minority. but ruled by minorities. Thus the making of governmental decision is not a majestic march of great majorities united on certain matters of basic policy. It is the steady appeasement of reiatively small (pressure) groups. Preface to Democratic theory; p: 146] এটাই গণতন্ত্রের আসল রূপ।

একটি বিশ্লেষণে গণতান্ত্রিক শাসন বেশীর ভাগ জনগণের মতের শাসন নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের ভোটেই বিজয়ী প্রার্থী নির্বাচিত বলে ঘোষিত হয়। মনে করা যায়, একটি ভোট এলাকায় ৫ জন প্রার্থী। বিজয়ী ব্যক্তি তুলনামূলকভাবে একটি ভোট বেশী পেলেই নির্বাচিত ঘোষিত হচ্ছে অথচ তার প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা পরাজিত প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট সমষ্টির তুলনায় অনেক কম হয়ে থাকে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠের (Majority) দোহাই দিয়ে সংখ্যা লঘিষ্ঠ লোকদের নির্বাচিত ব্যক্তিই দেশ শাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার সুযোগ পেয়ে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটদাতাগণ সমর্থন না দিয়েও কম সংখ্যক লোকদের ভোট প্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্বাচিত মেনে নিতে বাধ্য হয়।

ফলে মানুষকে প্রকাশ্যে যা বলা হয়, তা তাদেরকে দেয়া হয় না, যা পাওয়ার জন্য তারা আশাবাদী হয়ে উঠে, তা থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত হয়। এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার বলা হয়। বলা হয়, রাজতান্ত্রিক, উত্তরাধিকার ভিত্তিক বাদশাহী বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে নিষ্কৃতি লাভের এক মাত্র পথ হচ্ছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকার ও শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু উপরের বিশ্লেষণে আমরা দেখিয়েছি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রেসিডেন্সিয়াল হোক পার্লামেন্টারী পদ্ধতির, উভয় ক্ষেত্রে দলীয় নেতার ভূমিকা সর্বাধিক বলিষ্ঠ এবং বিজয়ী সে প্রেসিডেন্ট হোক বা প্রধানমন্ত্রী এবং এক ব্যক্তির শাসনই হয়ে থাকে, যদিও দোহাই দেয়া হয় বহু লোকের -জনগণের। তাই বাস্তব গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে কোন পার্থক্য খুজেঁ পাওয়া যাবে না।

 শুধু তা-ই নয়, গণতান্ত্রিক শাসন গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে-দিয়েই কার্যত ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়ে যায় দলীয় নেতার মর্জীতে। কেননা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দলীয় নেতার নেতৃত্ব নিরংকুশতার দিক দিয়ে যখন কিছুটা ব্যাহত হতে থাকে, তখন নেতা তা বরদাশত করতে প্রস্তুত হয় না। তখন গণতন্ত্রের খালাসটা খুলে ফেলে পূর্ণমাত্রার স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে দেয়। আর তখনও জাতির বা গণতন্ত্রের দোহাই দিতে মুখের পানি একটুও শুকিয়েঁ যায় না। -[১৯৭৩-৭৪ সনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংবিধান নিমেষের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধানে পরিণত হওয়া তার বাস্তব প্রমাণ।]

গণতন্ত্র যেহেতু ‘সেকিউলার’ -ধর্ম নিরপেক্ষতা বা কার্যত ধর্মহীন। তাই ভোটদাতা থেকে ভোটপ্রার্থী পর্যন্ত এবং প্রেসিডেন্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত কোন পর্যায়ের নির্বাচনে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোন নীতি বা ধর্মীয় আদর্শের অনুসরণের একবিন্দু বাধ্যবাধকতা থাকে না। সেই কারণে ধর্মহীন চরিত্রহীন ব্যক্তি ধার্মিক সেজে, জনগণের দুশমন ব্যক্তিও জনদরদী সেজে জনগণের সমর্থন আদায় করতে কোনরূপ অসুবিধার সম্মুখীন হয় না। ফলে তাদের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মাত্র, এ দুয়ের মাঝে কোন পার্থক্যই তারা দেখতে পায় না।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এইসব কয়টি শাসন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাই সম্পূর্ণরূপে বাতিল, অগ্রহণযোগ্য। মানবতার পক্ষে চরমভাবে মারাত্মক। মানুষের মানবিক মর্যাদা হরণকারী, অধিকার বঞ্চনাকারী, মনুষ্যত্ব ধ্বংসকারী। তাই তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। যে কোন দিক দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হলে এ সব কয়টি শাসন ব্যবস্থার তুলনায় ইসলামী শাসন ব্যবস্থাই সর্বোত্তম; প্রকৃতপক্ষেই মানব কল্যাণকামী, মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাকারী এবং সমগ্র বিশ্বলোক ব্যবস্থার সাথে পূর্ণ মাত্রায় সামঞ্জস্যশীল শাসনব্যবস্থা।

আমাদের পরবর্তী আলোচনা ‘ইসলামী শাসন পদ্ধতি’ তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করবে।

 

ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা

[পূর্ববর্তী আলোচনার সারনির্যাস -ইসলামী হুকুমাতের বিশেষত্ব -সার্বভৌমত্ব কার? সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন -সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব -দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন -শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা -হুকুমাত ছাড়া আমানত আদায় করা সম্ভব নয় -শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে খিলাফত -সরকার সংগঠনে সামষ্টিক দায়িত্ব -দার্শনিকদের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি -কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি-বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে সরকার গঠন -নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম সমাজ -জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল। প্রশাসনিক ক্ষমতা -সার্বভৌমত্ব -প্রশাসনের নিকট আমানত।]

…………………………………………………………………………………………………………………………..

পূর্ববর্তী আলোচনার সারনির্যাস

১.কুরআন ও হাদীসের অকাট্য দলীল বাদ দিলেও মানুষের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি একটি দেশের শাসন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অপরিহার্যতা একান্তভাবে অনুবভ করে। সেজন্য প্রবলভাবে তাকীদ জানায়। কেননা এইরূপ রাষ্ট্র না হলে যেমন একটি সুষ্ঠ সামাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি সমাজের লোকদের মধ্যে সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠা, প্রত্যেকটি নাগরিকের মানবিক মর্যদা ও অধীকার রক্ষা করা কোন প্রকারেই সম্বব নয়। সম্বব নয় জনগনের স্বাধীনতা রক্ষা ও সকল প্রকার বিজাতীয় বা বৈদেশিক আগ্রাসন থেকে নিরাপত্তা দান করা। এরূপ একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর না হলে  চরম অপরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা, লুট-পাট ও মারামারি রক্তা-রক্তি দেখা দেয়া অনিবার্য হয়ে পরবে।

২. বিশেষত মুসলিম জনগণক একাট রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করতে বাধ্য। আল্লাহর তুরআন ও রাসূলের সুন্নাত স্পষ্ট ও উদাত্ত কন্ঠে সেজন্য আদেশ দিয়েছে, যা মেনে চলতে তারা সকলেই বাধ্য। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান- আদেশ ও নিষেধসমূহ  বাস্তবায়িত করার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান একান্তই অপরিহার্য। মানুষের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে পালন ও অনুসরণের জন্য আল্লাহ ও রাসুলের দেয়া বিধান কার্যকর ও বাস্তবায়িত হতে পারে না একটি রাষ্ট্র ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্যতিরেকে।

৩. দ্বীন ইসলামের প্রতিষ্ঠা, নির্বিঘ্নে জনগণের দ্বীন পালন ও সকল প্রকার ভয়-ভীতি প্রতিবন্ধকতা মুক্ত আদর্শিক জীবন যাপনের সুযোগ লাভের জন্যই একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা -সরকার কায়েম করা অপরিহার্য।

৪. ইসলামী প্রশাসন -সরকার -রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, অভিজাত লোকদের বা ধনী লোকদের শাসন ব্যবস্থা নয়। তা তথাকথিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কায়েম হওয়া সরকার-ও নয় -যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশসমূহে চালু রয়েছে এবং তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহে যা প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া হচ্ছে বা যার দিন-রাত দোহাই দেয়া হচ্ছে।

এই সব কয়টি কথার বিশ্লেষণ পূর্ববর্তী আলোচনায় বিস্তারিতভাবে করা হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে যে, মানুষ কল্পিত সব কয়টি শাসন ব্যবস্থাই বাতিল। এক্ষণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে সর্বোত্তম শাসন ব্যবস্থা -ইসলামী শাসন ব্যবস্থা -কি, কি তার পরিচয়?

ইসলামী হুকুমাত বা শাসন-ব্যবস্থার রূপরেকা কি, এ পর্যায়ে প্রাচীনকালীন মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট থেকে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে কিছু পাওয়া গেছে এমন দাবি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যে দু’চারখানি গ্রন্থ এ পর্যায়ে পাওয়া গেছে, তার কোন একটিতেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত ও সহজবোধ্যভাবে কিছুই লেখা হয়নি। মোটামোটিভাবে কয়েকটি কথা লিখে-ই দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে হয়। কুরআন ও সুন্নাতে প্রায় সব মৌলিক বিষয়াদি আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও মনীষীদের লেখনীপ্রসূত গ্রন্থাদিতে তার বিস্তারিত আলোচনা না থাকা আমাদের -বিশেষ করে এই পর্যায়ের -দীনতাই প্রমান করে। -[প্রাচীন মনীষীদের মধ্যে কেবলমাত্র আল-মা-ওয়ার্দী লিখিত গ্রন্থ ‘আল-আহকামুল সুলতানিয়া’ এরই উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু তাতেও প্রশাসন পদ্ধতি পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। -গ্রন্থকার।]

প্রাচীন মনীষীদের লিখিত গ্রন্থাদিতে ইসলামী হুকুমাতের প্রকৃত রূপরেকা বিস্তারিত ও স্পষ্ট আলোচিত না হওয়ার মূলে কতকগুলি বাস্তব ও ঐতিহাসিক কারণ নিহিত রয়েছে বলে মনে হয়। কারণগুলি নিম্নরূপঃ

১. ‘খিলাফতে রাশেদা’র পর -গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু হওয়ার সময় -মুসলিম জাহানে কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম না হওয়া -কায়েম না থাকা। রাষ্ট্র-শাসনে প্রকৃত ইসলামী আদর্শ অনুসরণ না করা ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকার দরুণ -অত্যাচারী গায়ের ইসলামী হুকুমাতের সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। ফলে ‘কুরআন-সুন্না’র মৌলনীতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা সম্বলিত গ্রন্থ রচনা অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছিল।

এ সময়ে মুসলমানদের শাসন ব্যবস্থা ‘খিলাফত’ নামে অভিহিত করা হলেও তা প্রকৃত ‘খিলাফত’ ছিল না। মুসলমানের শাসন চললেও ইসলামের শাসন চলেনি। ইসলামী শাসনের জরুরী শর্তাবলী সে শাসনে ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

২. রাসূলে করীম (স) ও ‘খিলাফতে রাশেদা’র আমলথেকে অনেক রূরে সরে যাওয়ার দরুন কুরআন-সুন্নায় ব্যবহৃত যে সব পরিভাষা নির্ভুলভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের সঠিক রূপরেখা প্রকাশ করে, তার যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন হয়ে যায়। প্রথম যুগে তা বুঝতে পারা যতটা সহজ ছিল, পরবর্তী যুগে তা আর সহজ থাকে না।

৩. ইএ আমলের ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনের রূপরেখা তো জানা যায়; কিন্তু ইসলামী শাসনের রূপরেখা বোঝার জন্য তা কিছুমাত্র সহায়ক নয়। বরং তা নির্ভুল ধারণা (Conception) লাভের পথে বড় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। মুসলিম ইতিহাস ও ইসলামের ইতিহাস তাতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে।

বলা বাহুল্য, আমরা ইসলামী জ্ঞান-গবেষণার প্রাথমিক যুগের মনীষীদের মহান অবদানের কথা অস্বীকার করছি না। তাঁরা ইসলামী চিন্তার প্রণয়ন, তার সমর্থন সংরক্ষণ, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও তাতে গভীরতা ব্যাপকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। তা না হলে আজকের দিনে আমরা ইসলাম সম্পর্কে কোন জ্ঞানই লাভ করতে পারতান না, তার কোন মাধ্যমও পেতাম না, তা অকপটে স্বীকার করতে হবে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও একথাও বলতে আমরা বাধ্য যে, তাঁদের জ্ঞান-গবেষণা আজকের দিনের প্রয়োজন পূরণ করতে পুরাপুরিভাবে সমর্থন হচ্ছে না। এজন্য আজ নতুনভাবে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ইসলামের মৌল উৎস কুরআন ও সুন্নাতকে ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় বিষয় চিন্তা-গবেষণা চালানো অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে আমরা সেই কাজে-ই প্রবৃত্ত হচ্ছি।

আজকের দিনে মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট প্রকৃত ইসলামী হুকুমাতের রূপরেখা অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে গেছে। বহু মুসলিম দেশের শাসকরা ইসলামী পদ্ধতির সরকার না হওয়া সত্ত্বেও এবং নিছক মুসলকাম নামধারী ব্যক্তিদের রাজতান্ত্রিক বাদশাহী ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হয়েও নিজেদের ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হওয়ার দাবি করছে। আর এই ধরনের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র প্রধানদের ঐক্য সংস্থাকে ‘ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন’ এবং এসব রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সংস্থাকে ‘ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন’ নামে অভিহিত করছে। শুধু তা-ই নয়, এ সব সম্মেলন অনুষ্ঠানকালে তাদের সকল প্রকার কার্যকলাপকেই ইসলামী বলে চালিয়ে দিচ্ছে, যদিও কুরআন-সুন্নাহ নিঃসৃত ইসলামের সাথে তার দূরতম সম্পর্কও নেই।

এখানেই শেষ নয়। ইসলামের প্রকৃত তত্ত্ব ও রূপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানহীন মুসলিম রাজনীতিকরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে ইসলামী রাজনীতি, নিজেদের কায়েম করা বা পরিচালিত রাষ্ট্রকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নামে অভিহিত করতে লজ্জা পান না। পাশ্চাত্যের আল্লাহ অস্বীকারকারী ধর্মহীন গনতন্ত্রকে ‘ইসলামী’ ও ইসলামী হুকুমাত কায়েমের একমাত্র উপায় বলে প্রচার করছে। এসব কারণে বর্তমানে প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে যাওয়া এবং অ-ইসলামীকে ইসলামী মনে করা কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।

এই জাতীয় বিভ্রান্তির দিনে সর্বগ্রাসী জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক প্রত্যক্ষ গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা। তা-ই আমাদের একমাত্র অবলম্বন।

ইসলামী হুকুমাতের বিশেষত্ব

কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী হুকুমাতের কয়েকটি বিশেষত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এই বিশেষত্বসমূহ ইসলামী হুকুমাতকে অন্যান্য ধরনের হুকুমান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিভাত করে। বর্তমানে যে সব রাষ্ট্র সম্পূর্ণ মিথ্যামিথ্যিভাবে ইসলামী হুকুমাত না হয়েও ইসলামের পতাকা উড়ায় দুনিয়ার মানুষকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে, সেগুলোও যে আসলে আদৌ ইসলামী নয়, তা এ বৈশিষ্ট্যগুলির ভিত্তিতেই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়ে যায়।

বস্তুত ইসলামী হুকুমাতের প্রথম ভিত্তি হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। আর দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে, আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ-ই আইনের একমাত্র উৎস।

যে সরকারে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নিরংকুশভাবে গৃহীত নয় বরং আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারোর -জনগণের, কোন ব্যক্তির, কোন বংশের বা কোন শ্রেণীর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত, তা কখনই ইসলামী সরকার হতে পারে না।

আল্লাহর শুধু সার্বভৌমত্ব স্বীকার করলেই হবে না, আল্লাহর একক আইনকেও পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে হবে। আল্লাহ কালাম কুরআন মজীদ এবং কুরআনের বাহক রাসূলের সুন্নাতকে আইনের উৎস -তারই আইনকে দেশের আইনরূপে স্বীকৃতি দিতে ও জারি করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকারকারী রাষ্ট্র বা সরকারও ‘ইসলামী’ পরিচিতি লাভ করতে পারে না। কেননা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বাস্তবতা তো আল্লাহর আইন পালনের মাধ্যমেই সম্ভব। আল্লাহর আইন পালনে অনীহা দেখালে আল্লাহর স্বার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়।

বস্তুত ইসলামী ও অ-ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে এ দুটি ভিত্তিতেই পার্থক্য হয়ে থাখে। এ পার্থক্য একটি শানিত তীক্ষ্ণ মানদণ্ড। এই মানদণ্ডে ওজন করলে বর্তমানকালের বহু ইসলামী হুকুমাত হওয়ার দাবিদার রাষ্ট্র ও সরকারও সম্পূর্ণ ‘গায়র ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার’ বলে প্রমাণিত হবে।

সার্বভৌমত্ব কার?

‘আল-কুরআনের আলোকে শিরক ও তওহীদ’ গ্রন্থে আমরা কুরআন ভিত্তিক আলোচনায় দেখিয়েছি যে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। সার্বভৌমত্বের যে সংজ্ঞা ও পরিচিতি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দেয়া হয়েছে, সে দৃষ্টিতেও সার্বভৌম আর কেউ নেই, কেউ হতেই পারে না।

কুরআনের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর, সার্বভৌম আল্লাহ ছাড়া আর কেউ-ই নয়; তাঁর মুকাবিলায় মানুষের স্থান ও মর্যাদা শুধু সেই সার্বভৌম আল্লাহর দাসত্ব করা, একান্ত অনুগত দাস হয়ে জীবন যাপন করা। তিনিই মানুষের দাসত্ব-ব্যবস্থা নাযিল করেছেন তাঁরই মনোনিত সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স)-এর মাধ্যমে। রাসূল (স) আল্লাহর আইন বিধান অনুসরণ ও কার্যকরকরণের মাধ্যমেই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বাস্তবায়িত করেছেন। এই বাস্তবায়ন পদ্ধতি-ই হচ্ছে রাসূলে সুন্নাত। কুরআন মজীদের বহু সংখ্যক আয়াতে এ কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় বলা হয়েছে। এখানে কতিপয় আয়াত আমরা পুনরায় উদ্ধৃত করছিঃ [আরবী……….]

চূড়ান্ত হুকুম দেয়ার -সার্বভৌমত্বের -অধিকার কারোরই নেই, আছে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। তিনি পরম সত্য কথা বলেন, আর তিনি-ই হচ্ছেন সর্বোত্তম ফয়সালাকারী। [আরবী………………………………..]

তোমরা জেনে রাখবে, সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনিই হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।

আল্লাহ তা’আলা প্রাকৃতিক জগতের একমাত্র স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রণকারী ও পরিচালক। এখানেই শেষ নয়। বরং তিনি মানব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধান দাতাও। মৌলিকভাবে এ অধিকারও কেবলমাত্র আল্লাহরই জন্য সংরক্ষিত। -[পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র বিজ্ঞানীগণও ইসলামী রাষ্ট্রের এই বিশেষত্বকে অকপটে স্বীকার করেছেন। এ পর্যয়ে সাক্ষ্য হিসেবে আমরা এখানে মাত্র একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর উক্তিই উদ্ধৃত করছি। তিনি হচ্ছেন David de santillana.

 তিনি বলেছেনঃ

Islam is the direct government of Allah, the rule of God. Whose eyes are upon his people. The principle of unity and order which in other societies is called civitas, polis state, in Islam is personified by Allah: Allah is the name of the supreme power acting in the common interest. Thus the public treasury is the treasury of Allah, the army is the army of Allah, and even the Public functionaries are the employees of Allah. (Santillana ‘law and society’ the legacy of Islam’ ed. Thomas walker Arnold Coxoprd the Etaroandon Press 1931) P. 286]

কেননা এই সৃষ্টি তাঁর, এর উপর হুকুম চালাবার অধিকারও একমাত্র তাঁরই হতে পারে! তাই রয়েছেও। তবে তিনি নিজেই যদি কাউকে তাঁর দেয়া শিক্ষা ও বিধানের ভিত্তিতে হুকুম দেয়ার অনুমতি দেন, তবে সেই অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিও ‘হুকুম’ দিতে পারবে। তবে তার জন্য দুটি শর্ত! একটি, মূলত সার্বভৌমত্ব ও হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর -একথা তাকে অকপটে ও নিঃশর্তে মেনে নিতে হবে এবং তা ঘোষণা করতে হবে। আর দ্বিতীয় এই যে, তার হুকুম দেয়ার প্রাপ্ত ক্ষমতা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। হুকুম দেয়ার তার নিজের কোন মৌলিক অধিকার নেই -একথা যেমন তাকে মানতে হবে, সেই সাথে আল্লাহ নির্ধারিত সীমা লংঘন করে মানুষের উপর নিজের হুকুম চালাবার কোন অধিকারই তার নেই, একথাও তাকে মানতে হবে। কেননা এই উভয় ব্যাপারে আল্লাহর অধিকার নিরংকুশ, অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

আল্লাহর পরে হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহই দিয়েছেন তাঁর নিজ মনোনীত নবী-রাসূলগণকে! কুরআনে এ পর্যায়ের বহু আয়াত রয়েছে। একটি আয়াতে হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী……….]

হে দাউদ, আমরা তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে পরম সত্যতা সহকারে হুকুম চালাও।

এ আয়াতের প্রথম কথা, হযরত দাউদ (আ) নিজে সার্বভৌম নন, তিনি সার্বভৌমের খলীফা, প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত এবং তাঁরই নিয়োজিত। আয়াতে তাকে লোকদের মধ্যে হুকুম চালাবার নির্দেশ আল্লাহই দিয়েছেন। কিন্তু তা নিরংকুশ নয়। সে জন্য দুটি শর্ত স্পষ্ট। একটি, তিনি নিজেকে আল্লাহর নিয়োজিত খলীফা মনে করবেন, খলীফা হিসেবেই হুকুম চালাবেন, সার্বভৌম হিসেবে হয়। আর দ্বিতীয়, তিনি নিজ ইচ্ছা ও খাহেশ অনুযায়ী হুকুম চালাতে পারবেন না, তা চালাতে হবে পরম সত্যতা সহকারে। ‘আল-হক’ শব্দটির অর্থ প্রায় তাফসীর লেখক-ই বলেছেন ‘আল-আদল’ সুবিচার ও ন্যায়পরায়নতা, যা কেবলমাত্র আল্লাহর বিধানভিত্তিক বিচার ও শাসনকার্যেই সম্ভব। মানুষের ইচ্ছামত হুকুম দেয়া বা বিচার করায় সুবিচার ও ইনসাফ হতে পারে না. একথা উপরোদ্ধৃত আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেনঃ [আরবী……..]

এবং তুমি নিজের ইচ্ছা-বাসনা-খাহেশকে অনুসরণ করে হুকুম দিও না, ফায়সালা করো না। যদি তা-ই কর তাহলে তোমার এই ইচ্ছা-বাসনা কামনা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করে দেবে।

আর আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হওয়ার অর্থ জুলুম করা, সুবিচার না করা।

কেননা মানুষের ইচ্ছা-বাসনা-কামনা কখনই বির্ভুল হতে পারে না -নির্ভুল হতে পারে কেবল মাত্র আল্লাহর বিধান। মানুষ আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে নিজ ইচ্ছা বাসনা-কামনা অনুযায়ী হুকুম দিয়ে -বিচার করলে নিজেকেই আল্লাহর আসনে আসীন বানানো হয়। তখন সে আল্লাহর বান্দা থাকে না, নিজের বান্দা হয়ে যায়। এ কথা যেমন সাধারণ মানুষ -মুসলমানদের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি নবী-রাসূলগণও যেহেতু মানুষ, তাদের বেলায়ও সত্য।

নবী-রাসূলগণের বেলায়ও উক্ত কথা সত্য, তার প্রমান উক্ত সূরা’র ২২-২৩ আয়াতে উল্লেখ করা একটি মামলার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ নিজেই প্যেশ করেছেন। দুইজন বিবদমান ব্যক্তি হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করেছিল এবং বলেছিলঃ [আরবী………………]

আপনি আমাদের দুইজনের মধ্যে পরম সত্যতা-সুবিচার-ন্যায়পরায়নতা সহকারে ফয়সালা করে দিন, বাড়াবাড়ি বা জুলুম করবেন না এবং আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখাবেন।

কিন্তু হযরত দাউদ (আ) রায় হিসেবে যা বলেছিলেন তিনি নিজেই তা বলতে বলতেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কথাটি ঠিক হয়নি। [আরবী……………..]

তাই তার রব্ব-এর নিকট মাগফিরাত চাইল, সিজদায় পড়ে গেল এবং রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করল।

লক্ষণীয় যে, বিচার প্রার্থীরা বিচার চেয়েছিল পূর্ণ ন্যায়পরতা ও ইনসাফ সহকারে। আর নবীর পক্ষেও যে বাড়াবাড়ি-সীমালঙ্ঘন-অবিচার করা অসম্ভব নয়, তা বুঝতে পেরে -মনে এই বিশ্বাস রেখেই তারা বলেছিলেনঃ অবিচার ও বাড়াবাড়ি করবেন না। আর আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখাবেন। ভারসাম্যপূর্ণ পথ তো ভারসাম্যপূর্ণ -পক্ষপাতহীণ, তা বিচারের মাধ্যমেই দেখানো সম্ভব। আর তারই দাবি তারা জানিয়েছিল।

এ আলোচনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, নবী আল্লাহর খলীফা, হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর নিজের ইচ্ছা-বাসনা-কামনা অনুযায়ী হুকুম করার, রায় দেয়ার কোন অধিকার তাঁর ছিল না। এ অধিকার কারোরই থাকতে পারে না।

আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী-রাসূলগণকে যে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে লোকদের মধ্যে হুকুম চালাবার অধিকার দিয়েছেন, তা যেমন পূর্ববর্তী আয়াত ও আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি একটি আয়াতে সাধারণভাবেই এই অধিকার দেয়ার কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ [আরবী……………..]

আমরা তওরাত নাযিল করেছি, তাতে ছিল হেদায়েত ও আলো, সমস্ত নবী যারা মুসলিম ছিল -তদানুযায়ী হুকুম চালাবে -ফয়সালা করবে…..

এ আয়াতে মূলত হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর, একথা চূড়ান্তভাবে মনে করিয়েই আল্লাহ তওরাত নাযিল করেছেন। বলেছেনঃ সেই তওরাত অনুযায়ী নবীগণ হুকুম চালাবেন। তবে সেজন্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদেরকে সর্বপ্রথম আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নিকট আত্মসমর্পিত হতে হবে, তারপরই আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী হুকুম চালাবার অধিকার জন্মাবে নবী-রাসূলগণের, তার পূর্বে নয়।

নবী-রাসূলগণের, তার পূর্বে নয়।

নবী-রাসূলগণ ছাড়া সাধারণ লোকেরাও লোকদের উপর হুকুম চালাতে পারে। তার জন্যও শর্ত রয়েছে যে, তাদের সুবিচার নীতির অনুসারী হতে হবে। সুবিচার নীতির অনুসারী হওয়ার অর্থ যে আল্লাহর বিধান পালনকারী ও আল্লাহর বিধান-ভিত্তিক হুকুমদাতা সুবিচারক হওয়া, তা পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আল্লাহর কথা হচ্ছেঃ [আরবী…………….]

তোমাদের মধ্য থেকে কেবল তারাই হুকুম চালাবে, যারা সুবিচার নীতির অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের-ধারাক ও অনুসারী। এ কারণে আল্লাহ নিজেকে সকল হুকুমদাতা-সকল বিচারকের তুলনায় অধিক উচ্চমানের হুকুমদাতা-সর্বোচ্চ বিচারক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। বলেছেনঃ [আরবী………]

আল্লাহ কি সকল হুকুমদাতা-বিচারকের তুলনায় অধিক ভালো হুকুমদাতা-বিচারক নন? আল্লাহর হুকম দান মৌলিক, অন্যদের হুকম দান আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ভিত্তিক। আল্লাহর বিচার সর্বাধিক নিরপেক্ষ, অন্যদের বিচার আল্লাহর বিধানের ভিত্তি গ্রহণের মুখাপেক্ষী। আল্লাহর কথাঃ [আবরী…….]

তিনি-ই সর্বোত্তম হুকমদাতা, বিচারক এই পর্যায়েরই। আল্লাহা মানুষের জন্য বিধান নাযিল করছেন , কিন্তু সেই বিধান মানব সমাজের দৈনন্দিন জীবনের যাবতয়ী ব্যবপারে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করা আল্লাহর কাজ নয়। সেজন্য তিনি প্রথম দিন থেকেই মানুষের নিকট নবী-রাসুল পাঠবার ব্যবস্থা করেছেন। নবী-রাসূলগণের কাজ হচ্চে, একদিকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার সাধারণ ও ব্যাপক আহবান জানানো এবং অপরদিকে আল্লাহর নাজিল করা অধিকার দান করেছেন। নবী-রাসূলগণ এ উদ্দেশ্য আল্লাহ কর্তৃক নিয়োজিত। কাজেই আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে নবী-রাসূলগণ যখন কোন হুকুম করেন, তখন তা সেইসব লোকের জন্য অবশ্য পালনীয় হয়ে যায়, যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূবেই ঈমান এনেছে। তাই আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী ………]

আল্রাহর এবঙ তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে আদেশ করেন-চুরান্ত ফয়সালা করে দেন, তখন কোন মু ‘মিন পুরুষ স্ত্রী জন্য তাদের ব্যাপারে সংক্রান্ত এই হুকুম বা ফয়সালা মেনে নেয়া-না নেয়ার কোন ইখতিয়ারই থকতে পারে না। যদি কেউ আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের অমান্য করে, তাহেলে সে সুস্পষ্ট গুমরাহীন মধ্যে পড়ে গেল। নবী-রাসূলগণের যেমন আল্লাহর সার্বভৌমত্ব  ভিত্তিক হুকম দেওয়ার অধিকার আছে-আল্লাহ-ই দিয়েছেন,অনুরুপভাবে নবী-রাসুলগণের অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের মধ্য থেকে বাছই করে নেয়া সমাষ্টিক দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও হুকুম করার, বিচার-ফয়সলা করার অধিকার রয়েছে-আল্লাহ নিজেই এ অধিকার দিয়েছেন। তবে তা কোন অবস্থায়ই স্বতঃস্ফূর্ত বা নিঃশর্ত নয়,তা একান্তভাবে আল্লাহ ও রাসূল প্রদ্ত্ত এবং আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের শর্তাধীন। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী…….]

হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে সামষ্টিকি দায়িত্বসম্পন্ন ব্যবক্তিদেরও। এ আয়াতে সর্বপ্রথম নির্দেশ হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যের, তারপর রাসূলের আনুগত্যের তারা সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদের।

আদেশটি যেহেতু স্বয়ং আল্লাহর, তাই তিনি একক ও মৌলিকভাবে আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী হয়েও রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, কেননা আল্লাহর আনুগত্য বাস্তবায়িত হতে পারে না রাসুলের আনুগত্য না করলে। রাসুলের আনুগত্য করলে আল্লাহরও আনুগত্য বাস্তবভাবে হওয়া সম্ভব। তাই আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তব উপায়ই হচ্ছে রাসূলের আনুগত্য করা। যেমন আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ [আরবি…………….]

যে-লোক রাসূলের আনুগত্য করল, সে কার্যত আল্লাহরই আনুগত্য করল।

কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য করার স্পষ্ট শব্দগত নির্দেশ(আরবী) বলে কেবল রাসূল সম্পর্কেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারপরে সামষ্টিক দায়িত্ব-সম্পন্ন ব্যবক্তিদের আনুগত্য করার নির্দেশের বেলায় সেই(আরবী) শব্দর উল্লেখ নেই?… স্পষ্ট বোঝা যায়, রাসূলের আনুগত্য করা করা মৌলিকভাবেই প্রয়োজনে। অন্যথায় আল্লাহর আনুগত্য হতে পারে না। অতঃপর মানুষের নিকট আনুগত্য পাওয়ার ও চাওয়ার মৌলিক অধিকার আর কারোরই নেই। সে আনুগত্য অবশ্যই শর্তাধীন হবে। অর্থাৎ রাসুলের অনুপস্থিতিতে মানব সমাজের নিকট আনুগত্য চাওয়া ও পাওয়ার অধীকার কেবলমাত্র সেই সব সমাষ্টিক তায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিদের, যারা নিজেরা আল্লাহর ও তাঁরা রাসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহর বিধান ও রাসুলের বাস্তব  অনুসরণ-সুন্নাত অনুযায়ী হুকম দেবে। যারা তা করবে না, তাদের কোন অধীকারই থাকতে পারে না মানুষের নিকট অনুগত্য চাওয়ার ও পাওয়ার। এই ব্যাখ্যার বাস্তব রূপ আমরা পাই রাসূল করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম জনগণ কর্তৃক খলীফায়ে রাসূল হিসাবে নির্বচিত হযরত আবূ ব্কর ছিদ্দীক (রা)-এর প্রথম নীতি নির্ধারণী ভাষণে। তাঁর সেই নাতিদীর্ঘ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেনঃ [আরবী………]

আমি ভালো করলে তোমরা আমার সাহায্য করবে। আর মন্দ করলে তোমরা আমাকে ঠিক করে দেবে। তোমরা আমার আনুগত্য করবে যতক্ষণ আমি নিজে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করতে থাকবে। আর আমিই যদি নাফরমানী করি তাহলে তোমরা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নও।

রাসূলে করীম (স)-এর নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ মসজিদে নববীতে উপস্থিত থেকে প্রথম খলীফার  এই ভাষণ শুনেছিলেন। রাসুলে করীম  (স)-এর অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের সরকার বা প্রশাসন ব্যবস্থা কি হবে তার স্পষ্ট নীতি নির্দেশ এই ভাষণে ধ্বনিত হয়েছে এবং তা সকল সাহাবী কর্তৃক সমর্থিতও হয়েছে।

বস্তুত রাষ্ট্র ও প্রশাসনে নাগরিকদের আনুগত্যই হচ্ছে মূল ভিত্তি। যেখানে এই আনুগত্য নেই সেখানে ভৌগোলিক এলাক ও জনতা ইত্যাদির উপস্থিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে একটি রাষ্ট্র ও সরকার গড়ে উঠতে ও চলতে পারে না। হযরত আবূ বকর (রা)- সেই আনুগহত্য কথা-ই বলেছেন, চেয়েছেন, তবে তা নিরংকুশ যেমন নয়, তেমনি নিঃশর্তও নয়।

নিরংকুশ নয় বলেই তিনি বলেছিলেনঃ আমি ভাল কাজ করলে তোমরা আমার সাহায্য করবে। আর মন্দ কাজ করলে তোমরা আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেবে।

বোঝা যাচ্ছে, ইসলামী বিধানে নাগরিকদের শুধু অন্ধ-নির্বাক আনুগত্য করে যাওয়াই কাজ নয়। সরকার ও সরকার চালক ভাল করেছ কি মন্দ করেছে সে দিকে তীক্ষ্ণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখাও তাদের কর্তব্য। শুধু  আনুগত্য করে যাওয়াই নয়-সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে সরকারী দায়িত্ব পালনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য। তবে জেন্য শর্ত হচ্ছে সরকারের ‘ভাল করা। সরকার ভাল কাজ করলেই এই সহযোগিতা করা যাবে, ভাল কাজ করলেই সরকার জনগণের নিকট সহযোগিতা চাইতে পারে। আর সেই ভাল কাজে জনগন সরকারের সাথা সর্বাত্নক সহযোগিতা করতে একান্তই বাধ্য। এই সহযোগিতা ছাড়া কোন সরকার চলতে পারে না। তাই সরকার-সরকার প্রধানকেই জনগণের নিকট এই সহযোগিতা চাইতে হবে এবং জনগণ যাতে সরকারের কাজে সগযোগিতা করতে পারে তার উপায় ও সুযোগ সরকারকেই বের করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার কোন বহির্দেশীয় বা বহির্জগতের ব্যাপার নয়। সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই যে রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পন্ন হয়. তা-ই হচ্ছে সলামী রাষ্ট্র ও সরকার। আর এ জন্যই ইসলাম নাগরিকদের গঠনমূলক সমালোচনা করার পাশ্চত্য ধর্মহীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় শুধু অধিকারই দেয়নি বরং তা করা প্রত্যেকটি নাগরিকের দ্বীনী কর্তব্য বলেও ঘোষিত হয়েছে। প্রথম খলীফার শেষ কথা ছিলঃ তোমরা আমার আনুগত্য করে চলবে, যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করি। আর আমি-ই যদি আল্লাহ ও রাসূলের নাফরমানী করি, তা হলে তোমরা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নও, আমিও তোমাদের নিকট আনুগত্য চাওয়ার কোন অধিকার রাখি না।

এই শর্তাধীন আনুগত্যই ইসলামের তাওহীদী আকীদার সংরক্ষক। এই আনুগত্য নীতিই রাসূল পরবর্তী কালে ইসলামী সরকার গঠনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে নির্ধারিত করে দিয়েছে। তার সারকথা হচ্ছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রাসূলের চূড়ান্ত নেতৃত্ব স্বীকার করা এবং আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত ভিত্তিক শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন

কুরআন, সুন্নাতে রাসূল ও প্রাথমিক কালের মুসলিম উম্মতের ইতিহাস স্পষ্টভাবে পথ-নির্দেশ করে যে, মুসলিম উম্মত তাদের শাসক, প্রশাসক ও নেতা নির্বাচন করবে। অবশ্য তা তারা করবে ইসলামী নিয়ম-কানুন অনুযায়ী ও ইসলাম নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে। মুসলিম উম্মতের এই শাসক ও নেতা নির্বাচনের অধিকারই ইসলামী সরকারের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। আর এ নির্বাচন পদ্ধতিই ইসলামী হুকুমাতকে দুনিয়ায় প্রচলিত গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য সরকার পদ্ধতিসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।

এ পর্যায়ের দলীলঃ ১. কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে যে, মানুষ এই যমীনে আল্লাহর খলীফা। খলীফা হওয়ার ব্যাপারে মানুষে মানুষে কোন তারতম্য বা পার্থক্য নেই। সকল সম্পূর্ণ সমান ও পার্থক্যহীনভাবেই আল্লাহর খলীফা। মানুষের এই খিলাফত দুনিয়ায় শেষ পর্যন্ত এক চিরন্তন সত্য হিসেবেই স্বীকৃত এবং ঘোষিত। কিয়ামত পর্যন্ত তাতে কোন পরিবর্তনই সূচিত হবে না।

কুরআন মজীদে মানব সৃষ্টির ইতিহাস উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, মানুষ যখন সৃষ্টি হয় নি সেই সময় মানব সৃষ্টির সংকল্প প্রকাশ করে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা দিয়েছিলেনঃ [আরবী…………….]

আমি পৃথিবীতে খলীফা বানাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।

আল্লাহর ঘোষিত এই খিলাফত ব্যক্তি বিশেষের জন্য বা কোন মানুষের জন্য ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট করা হয় নি। বরং অতঃপর তিনি যে ‘আদমকে’ সৃষ্টি করলেন, তার সমস্ত বংশধর –সমস্ত মানুষই খলীফা রূপে চিহ্নিত হয়েছিল। কেননা আল্লাহর এই ঘোষণা শ্রবণ করে ফেরেশতাগণ ‘খলীফা’ সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেনঃ [আরবী……..]

হে আল্লাহ, তুমি দুনিয়ায় এমন এক মাখলুক বানাবে, যা তথায় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে এবং রক্তের বন্যা প্রবাহিত করবে?

ফেরেশতাদের এ আশঙ্কা নিশ্চয় প্রথম সৃষ্ট ব্যক্তি আদমের ব্যাপারে ছিল না, তা ছিল সেই আদমের বংশধরদের ব্যাপারে। অর্থাৎ ফেরেশতাদের আশঙ্কা ছিল, সমগ্র বিশ্বলোকের প্রতিটি বস্তু ও অণু-পরমাণু যখন ইচ্ছাসম্পন্ন সৃষ্টির অবকাশ কোথায়? তাহলে তো তারা এমন-এমন কাজ করতে থাকবে, যার ফলে এই দুনিয়ার শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেয়া এবং রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়া একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়বে। স্মরণীয় যে, আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাদের এই আশঙ্কা বোধকে প্রতিবাদ করেন নি, অমূলক বলে উড়িয়েও দেন নি।

এ থেকে ম্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহর ‘খলীফা’ বানানোর ঘোষণাটি কোন বিশেষ ব্যক্তির জন্য ছিল না, ছিল সমগ্র মানব বংশের জন্য, মানব বংশের প্রতিটি সন্তানের জন্য। প্রতিটি মানুষ-ই-সে পুরুষ হোক বা নারী –আল্লাহর খলীফা। কেননা –ফেরেশতাদের আশাংকা নিশ্চয়ই ব্যক্তি আদম সম্পর্কে ছিল না, ছিল সমগ্র আদম সন্তানের ব্যাপারে. সমস্ত মানুষের ব্যাপারে। অতএব প্রত্যেকটি মানুষেরই আল্লাহর ‘খলীফা’ হওয়া অনিবার্যভাবে সুনিশ্চিত।

এ পর্যায়ের আরও কতিপয় আয়াত থেকে এই কথায়ই সম্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়। একটি আয়াতঃ [আরবী……]

সেই আল্লাহ-ই তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন।

এ আয়াতে একবচনে ‘খলীফা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি; বরং বহুবচনের শব্দ [আরবী……] ‘খলীফাগণ’ ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকে তো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, পৃতিবীতে আল্লাহর খলীফা একজন নয় –কোন এক ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিগতভাবে কেউ আল্লহর খলীফঅ নয়। বরং প্রত্যেকটি মানুষই আল্লাহর খলীফা। এই মানুষগণই আল্লাহর খলীফাগণ।

আর একটি আয়াতঃ [আরবী…………..]

কে সেই মহান সত্তা, যিনি ব্যাকুল ও বিপন্ন-অস্থির ব্যক্তির দোয়া শুনেন যখন সে তাকে ডাকে এবং কে তার কষ্ট ও বিপদ দূর করেন, (আর কে তিনি) যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীত খলীফা নিযুক্ত করেন? …আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ আছে কি?

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে যে, বিপন্ন মানুষের দোয়া শুনেন একমাত্র আল্লাহ এবং তাদের বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট কেবলমাত্র তিনি-ই দূর করেন। তিনি ছাড়া এ কাজ করার আর কেউ কোথাও নেই। এ-ই হচ্ছে কুরআন উপস্থাটিত প্রকৃত তওহীদী আকীদা। এই তওহীদী আকীদারই অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে, আল্লাহই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছেন। এ দুনিয়ায় মানুষ যা-ই করবে, তা যদি আল্লাহর খলীফা হিসেবে করে, তা হলেই সে তা করার অধিকারী হবে। অন্যথায় তা করার কোন অধিকারই তার থাকতে পারে না। এই খলীফা হওয়ার অধিকার সর্বজনীন –সকল মানুষের ক্ষেত্রে একেবারে সাধারণ।

বলা বাহুল্য, মানুষের এ ‘খিলাফত’ পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টির সমষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে নয়। পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে মানুষকে খলীফা বলা হয়ে থাকলে কথাটি এভাবে বলার কোন প্রয়োজন ছিল না।

সে কথার ধরনই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। যেমন এ দিক দিয়েও মানুষকে ‘খলীফা’ হয়েছে কোন কোন আয়াতে। যেমন এই আয়ানটিতেঃ [আরবী………..]

অতঃপর তোমাদেরকেই পৃথিবীতে তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি বানালাম। উপরোদ্ধৃত আয়াতসমূহের কারকথা হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টিকূলের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান বানিয়েছেন, তাকে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা বানিয়েছেন। ফলে মানুষ সমগ্র সৃষ্টিকূলের উপর এক বিশিষ্ট সৃষ্টিরূপে গণ্য হতে পারছে। এ মর্যাদা এই অসংখ্য সৃষ্টিকূলের মধ্যে আর কারোরই নেই। আর মানুষ যেহেতু দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা, এজন্যই আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে সিজদা করার জন্য। এই সিজদা আসলে মানুষের অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকারের প্রতীক। এ দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা হিসেবে মানুষ যা-ই করবে, ফেরেশতারা তাতে মানুষের আনুকূল্য করবে, সহযোগীতা করবে, সিজদা তারই নিঃশব্দ স্বীকৃতি মাত্র। সেই সাথে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বেরও স্বীকৃতি।

দুনিয়ায় মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলে ঘোষণার ফলে দুটি কথা অনিবার্য হয়ে পড়ে।

১. মানুষ আল্লাহর খলীফা –আল্লাহর মহান নাম ও উচ্চতর পবিত্র গুণাবলীর বাস্তব রূপায়ণে।

মানুষ আল্লাহর খলীফা, সে তার অস্তিত্ব দ্বারাই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ ও প্রকাশ করছে। মানুষ এ দুনিয়ায় নানা জিনিস উদ্ভাবন করবে, নানা শিল্প কর্ম তৈয়ার করবে, আবিস্কার করবে, নবোদ্ভাবন করবে, দিন-রাত কাজ করবে এবং এই সব করে মানুষ তার দুঃখকে হালকা করবে, অনুর্বরকে উর্বর করবে, বিরান স্থানকে আবাদ করবে, স্থলভাগকে জলভাগে ও জলভাগকে স্থলভাগে পরিণত করবে। গাছ-পালা রোপণ করবে, শ্যামল শোভামণ্ডিত বাগান রচনা করবে, পশু পালন করবে, তার বংশ বৃদ্ধি করবে। সে সবের মধ্যে কেউ ছোট হবে, কেউ বড় হবে। কোনটি গৃহপালিত হবে, আবার কোনটি বন্যই থেকে যাবে। এই সকল প্রকারের প্রজাতি দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে, তাকে নিজের কাজে ব্যবহার করবে ঠিক যেমন প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক শক্তিসমূহ এবং অন্যান্য যাবতীয় সৃষ্টিকূলকে মানুষ নিজের ইচ্ছামত নানা কাজে ব্যবহার করছে।

যে আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য একটা বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন [আরবী……..] তিনিই এইসব কিছু দিয়ে মানুষকে ধন্য করেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন, যেন মানুষ আল্লাহর সুন্নাতকে এখানে কার্যকর করে। তাঁর সৃষ্টি কুশলতাকে উদ্ভাসিত করে তোলে, তাঁর হিকমতের তত্ত্ব-রহস্যকে উদঘাটিত করে, তাঁর বিধানের সার্বিক কল্যাণ মানুষ গ্রহণ করে। বস্তুত এ দুনিয়ায় আল্লাহর অসীম-বিস্ময়কর ‘শক্তির ও ব্যাপক-গভীর-সূক্ষ্ম জ্ঞানের বাস্তব নিদর্শনই হচ্ছে নামুষ। মানুষকে তিনি সর্বোত্তম মানে ও কাঠামোয় সৃষ্টি করেছেনঃ [আরবী………..]

আর মানুষ তো এই সব দিক দিয়েই পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা।

প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক ব্যাপারাদির ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর খলীফা, তাই পৃথিবীকে আবাদ করা, আবর্জনা-জঞ্জাল মুক্ত করা, এখানে বসবাসের বিপদ সংকুলতা দূর করার দায়িত্ব মানুষের উপরই অর্পিত। আর এ দুনিয়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেই আল্লাহর লক্ষ্যকে বাস্তাবায়িত করবে মানুষ।

যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী…………]

সেই আল্লাহই তোমাদেরকে যমীন থেকে পয়দা করেছেন এবং এখানেই তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আল্লাহ তা’আলাই স্থান –যমীন ও পশুকুলেরও রব্ব। অতএব আল্লাহর খলীফা এই মানুষই সেই সম্পর্কিত যাবতীয় কাজের দায়িত্বশীল। হযরত আলী (রা) তাই বলেছেনঃ [আরবী…………..]

তোমরাই দুনিয়ার স্থান ও পশুকূলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

সারকথা, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রাকৃতিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহর দেয়া শক্তি ও ক্ষমতার বলে আল্লাহ সুবহানুহু’র প্রতিনিধি।

২. সেই সাথে মানুষ এ দুনিয়ার মানুষের সামষ্টিক ব্যাপাদাদিতে নেতৃত্ব ও প্রশাসকত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর খলীফা।

অর্থাৎ দুনিয়ায় মানুষের আল্লাহর খলীফা হওয়অর ব্যাপারটি শুধু উপরে উল্লিখিত ব্যাপারসমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ দেশ শাসন ও জনগণকে নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা। কেননা মানুষ যখন দুনিয়ার স্থানসমূহের ব্যবস্থাপনা, জন্তু-জানোয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ ও যাবতীয় ব্যাপারাদি সূচারুরূপে সম্পাদনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল –কিয়ামতের দিন এইসব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। তখন মানুষ তাদের নিজেদের ব্যাপারেও জিজ্ঞাসিত হবে অনিবার্যভাবে। মানুষের ব্যক্তিজীভন, সমাজ, রাষ্ট্র সরকার-প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও বিচার ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত না হয়ে পারে না। আর জিজ্ঞাসিত হওয়অর অর্থ হচ্ছে, এসব ব্যাপারে তাদের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে। অতএব এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান তাদের কর্তব্য। আর এ কর্তব্যের কারণেই তারা এ ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা।

এসব ক্ষেত্রে মানুষের খিলাফতের দায়িত্ব পালিত হতে হবে আল্লাহর দেয়া বিধানের ভিত্তিতে। নিজেদের ইচ্ছামত এ দায়িত্ব পালন করার কোন অধিকার মানুষের থাকতে পারে না। ফলে মানুষের প্রশাসনিকতা আল্লাহর খলিফা হিসেবেই কার্যকর হবে এবং আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে এই প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পাদিত হলেই বাস্তবায়িত হতে পারবে এই যমীনে আল্লাহর খিলাফত। মানুষ আল্লাহর খলীফা হিসেবেই প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্বের অধিকারী হবে, যদিও আসল ও প্রকৃত সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণরূপে ও একান্তভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট, যাতে মানুষের কোন অংশ আদপেই নেই।

তাই বলা যায়, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রশাননিক কতৃত্ব সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে কেবলমাত্র আল্লাহর খলীফা হিসেবে আল্লাহর প্রতিনিধি রূপে, নিজস্ব ভাবে নয়।

এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী সাধারণভাবে সমস্ত মানুষ। কিন্তু সমস্ত মানুষের পক্ষে এ কর্তৃত্ব চালানো সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ একসাথে কখনই সম্ভব হতে পারে না। সেজন্য মানুসের মধ্য থেকেই কতিপয় লোককে বাছাই করে নিতে হবে ও তাদেরকে সুযোগ দিতে হবে এই কর্তৃত্ব পালন ও সার্বভৌমত্ব কার্যত প্রয়োগ করার জন্য। আর এখানেই নির্বাচনের প্রশ্ন।

সকল মানুষ একসাথে প্রয়োজনীয় সার্বভৌমত্ব –প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে না। তা করার জন্য নির্দিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তির নিযুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত হওয়অ বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই এক বা একাধিক ব্যক্তি কে বা কারা? তাদের সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করা ও কার্যে নিয়োজিত করা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?

তার একটি মাত্র উপায়ই আছে এবং সে উপায় হচ্ছে নির্বাচন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা সমানভাবে প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েও তারা সকলে একই সময় কার্যত তা করতে পারে না বলে তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে বাছাই করে তাদেরকে এ কাজের দায়িত্ব দেবে, সেই সাথে বাস্তব সমর্থন ও সহযোগীতা দিয়ে তাদেরকে প্রাপ্ত দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে পালন করার অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ করে দেবে।

এই পর্যায়ে দুটি মৌলিক কথা অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে। প্রথম এই যে, জনগণ নিজেদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক লোককে বাছাই করবে সেই কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জন্য, যা মূলত তাদের সকলের, কেবল সেই ব্যক্তিদেরই নয়, যাদেরকে বাছাই করা হয়েছে ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অতএব এই বাছাই কার্যটি নিঃশর্ত ও পক্ষপাতহীনভাবে সম্পাদিত হতে হবে। অর্থাৎ তারা তাদের নিজেদের সুস্থ অনাবিল বিবেচনায় যাকে বা যাদেরকেই অধিক যোগ্য মনে করবে অর্পিতব্য দায়িত্ব পালনের দিক দিয়ে কেবল তাদেরকেই বাছাই করবে। সে জন্য না নিকটাত্মীয়তার কোন শর্ত থাকবে, না নগদ কোন স্বার্থ লাভের প্রশ্ন উঠবে। উপরন্তু এ ভাবে বাছাই করার পর নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সুযোগ ও সহযোগীতাও দেবে। কেননা তারা যে কাজ করছে, তা তাদের একান্ত নিজস্ব কোন কাজ নয়, তা সকল মানুষের কাজ। কাজেই সে কাজে সকলেরই আন্তরিক সদিচ্ছা ও সহযোগীতা থাকা আবশ্যক।

আর দ্বিতীয় এই –যে বা যারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হলো, সে কখনই মনে করবে না যে, প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কেবল মাত্র তাদেরই, অন্য কারোরই নয়। বরং মনে করবে, এ কর্তৃত্ব সকলেরই। তবে সকলে তা একসাথে করতে পারবে না। বরং মনে করবে, এ কর্তৃত্ব সকলেরই। তবে সকলে তা একসাথে করতে পারবে না বলেই সকলের পক্ষ থেকেই এই দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছে। তারা এ কাজ ‘নিজেদের কাজ মনে করে করবে না, করবে সকলের কাজ মনে করে। অতএব এই ‘ক্ষমতা’ লাভের সুযোগে তারা কোন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করার দিকে মনোযোগ দেবে না, সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকবে এই সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের জন্য। উপরন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর খলীফা হওয়া সত্ত্বেও সামষ্টিক খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণ তাদের নিজস্ব খিলাফতের একটা অংশ তাদেরকে দিয়েছে। এ জন্য তাদেরও খলীফা। এ ভাবে এক দিকে আল্লাহর খলীফা হওয়অর সাথে সাথে মানুষেরও খলীফা হওয়ার কারণে তারা যেমন আল্লাহর নিকট দায়ী –জবাবদিহি করতে বাধ্য –তেমনি জনগণের নিকটও দায়ী, তাদের নিকটো জবাবদিহি করতে বাধ্য। এ উভয় দিকে জবাবদিহি দায়িত্ববোধের তীব্রতায় এই নির্বাচিত ব্যক্তিরা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক হতে পারে না। বরং তারা এ দুনিয়ায় যেমন জনগণের নিকট দায়ী হওয়ার কারণে জনগণের স্বাধীন সমালোচনার সম্মুখীন হতে বাধ্য, তেমনি কিয়ামতের দিন খিলাফতের দিন আল্লাহর নিকট কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে আল্লাহর ও জনগণের খিলাফতের দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন না করলে। এ ভয়ে তাকে বা তাদেরকে সদা কম্পমান হয়ে তাকতে হবে।

এমনকি, জনগণ যে সব গুণের অগ্রবর্তিতা দেখে ও যে –সব দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে বা তাদেরকে নির্বাচিত করেছে –নির্বাচিত হওয়ার পর সেই গুণ হারিয়ে ফেললে ও সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের দেয়া খিলাফতের অংশ ফিরিয়ে নিতেও পারবে। কেননা খিলাফতের এই অংশ দান বিশেষ গুণের শর্তে ও বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যই ছিল। তা-ই যখন না বা দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হয়ে গেল, তখন জনগণের দেয়া খিলাফতের অংশ দখল করে থাকার তার বা তাদের কোন অধিকারই থাকতে পারে না।

সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব

সার্বভৌমত্ব মূলত একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু মানব সমাজে এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ হতে পারে মানুষের দ্বারাই। তা করার পন্থা স্বয়ং সার্বভৌম আল্লাহ তা’আলাই নিরূপন করে দিয়েছেন এ ভাবে যে, তিনি নিজেই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা রূপে নিযুক্ত করেছেন। আল্লাহর খিলাফত –প্রতিনিধিত্ব  -করার দায়িত্ব তিনি নিজেই মানুষের উপর অর্পন করেছেন। এই খিলাফতের অধিকার ও মর্যাদা প্রত্যেকটি মানুষের অভিন্ন। সকল মানুষ একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই খিলাফতের দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রয়োগ করবে। এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব মানুষের নিকট এক মহান আমানত হিসেবে গচ্ছিত। কিন্তু কার্যত সকল মানুষ একত্রিত হয়েও এক সাথে এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে না বলেই সকলের পক্ষ থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি তা প্রয়োগ করবে।

এই কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থার একান্তভাবেই প্রয়োজনঃ

প্রথমত গোটা মানব সমাজকে এক ও অভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিক হতে হবে, যারা প্রদত্ত খিলাফত প্রয়োগ করে এই পৃথিবীতে ঐক্যবদ্ধ খলীফাসমষ্টি রূপে গণ্য হবে। তারা অন্যান্য সকল প্রকারের সম্পর্ক ছিন্ন করে নেবে এবং সমগ্র বিশ্বলোক ও তার মধ্যকার সব কিছুর একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রকরূপে সেই ‘এক’কেই স্বীকার করবে।

এই গভীর ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব কুরআন বোঝাতে চেয়েছে একটি দৃষ্টান্তমূলক কথা দ্বারা। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী…………]

 আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এক ব্যক্তি তো সে, যার মালিকানায় বহু সংখ্যক বাঁকা স্বভাবের মনিব শরীক হয়ে আছে, যারা প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে টানে। আর অপর ব্যক্তি পুরাপুরিভাবে একই মনিবের জন্য নির্দিষ্ট। …..এই দুইজনের অবস্থা কি একই রকমের হতে পারে?

এ দৃষ্টান্ত থেকে মু’মিন ও কাফির –এক আল্লাহর অনুগত ও বহু আল্লাহতে বিশ্বাসী মুশরিকের অবস্থা এবং এ দুয়ের মধ্যকার আসমান-যমীনের পার্থক্য স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে গেছে।

এক আল্লাহতে বিশ্বাসী ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্ধী। তার মনিব সেই এক আল্লাহ-ই। আর মুশরিক –কাফির ব্যক্তি বহু সংখ্যক, বিভিন্ন সাংঘর্ষিক মর্জী ও ইচ্ছার দাসত্ব করতে হয় তাকে। একই সময় প্রত্যেক মনিবই তাকে তার কাজ করতে বলে। ফলে এই ক্রীতদাস একই সময় বহু মনিবের নির্দেশ পালনের দায়িত্বের নিষ্পেষণে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত, জর্জরিত ও দিশেহারা হয়ে যেতে বাধ্য হয়। একটি মানব সমাজ-সমষ্টির ব্যাপারও একই দৃষ্টিতে বিবেচ্য। তা যদি এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হয়, এক আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ত মেনে চলাই হবে তার নীতি ও আদর্শ। সেই সমাজ-সমষ্টি উপরোক্ত দৃষ্টান্তের সেই ক্রীতদাসের ন্যায় হবে, যার মনিব মাত্র একজন। পক্ষান্তরে তা যদি কাফির বা মুশরিক হয়, তাহলে একক সার্বভৌমত্ব মেনে চলা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং বিভিন্ন সার্বভৌম শক্তি সেই সমাজের উপর কর্তৃত্ব করবে, যেমন কুরআনী দৃষ্টান্তে বহু সংখ্যক সার্বভৌম শক্তির টানাটানি চলবে, যেমন একটি লাশ নিয়ে টানাটানি ও কামড়া-কামড়ি করে বহু সংখ্যক কুকুর।

হযরত ইউসুফ (আ) এই একক সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেনঃ [আরবী…………]

বিভিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহু সংখ্যক রব্ব-সার্বভৌম উত্তম, না মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ সার্বভৌম হিসেবে উত্তম?

দ্বিতীয়ত, সেই সমাজ-সমষ্টিকে এক আল্লাহর জন্য খালেস দাসত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে, সমাজের লোকদের পারস্পরিক সম্পর্কও সেই অনুযায়ী গড়ে উঠতে হবে এবং অন্যান্য অসংখ্য তাগুতী শক্তির সার্বভৌমত্বের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যে সব শক্তির নাম করা হয় সার্বভৌম হিসেবে, সেগুলি তো নিছক নাম মাত্র। সে নামগুলি হয় তোমরা রেখেছ, না হয় তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখে নিয়েছে। বলা হয়েছেঃ [আরবী…………]

এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর যার দাসত্ব তোমরা কর (সার্বভৌম মনে করে), সেগুলি নিছক কতকগুলি নাম মাত্র (সেই নামগুলির অন্তরালে ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছুরই অস্তিত্ব নেই)। এই নাম তোমরা আর তোমাদের বাপ-দাদারা রেখে নিয়েছে।

বস্তুত বহু সংখ্যক সার্বভৌমের দাসত্ব থেকে মানবকূলকে কুক্তি দিয়ে একমাত্র আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের অধীন ও অনুসারী বানাবার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে সর্বশেষ নবী রাসূল রূপে পাঠিয়েছেন। তাই মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের সার্বভৌমত্ব স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করতে হবে। একক সার্বভৌম আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তিকে একক চুক্তিরূপে মানতে হবে। অ-খোদা শক্তি ও ব্যক্তির আনুগত্য খতম করে দিয়ে এক আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। এবং এক আল্লাহর কর্তৃত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের কর্তৃত্ব থেকে বিদ্রোহ করতে হবে, উৎপাটিত করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এক আল্লাহর সার্বভৌম-ভিত্তিক সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসন-ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, সমগ্র সামাজিক সামগ্রিক সম্পর্ক-সম্বন্ধের ক্ষেত্র থেকে পার্থক্য প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার নীতি নির্মূল করে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের প্রাণস্পর্শী পবিত্র ভাবধারাকে মূর্ত ও প্রবল করে তুলতে হবে। এখানে আল্লাহই হবেন একমাত্র সার্বভৌম, কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ রূপে একমাত্র আল্লাহর। আর সমগ্র মানুষ সর্বতোভাবে সমান, অভিন্ন সেই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে। আর এই সমস্ত মানুষই পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা বিশ্ব ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে, মানব জীভন সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার ব্যাপারে। এখানে মান-মর্যাদা ও মৌলিক স্বাভাবিক অধিকারও সমস্ত মানুষের এক ও অভিন্ন, ঠিক যেমন চিরুনীর কাঁটাগুলি হয়ে থাকে।

এরূপ অবস্থায়ই মানব সমষ্টি পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে রত থাকবে, তা এই গুণ-পরিচিতি সহকারে আল্লাহর খলীফা হওয়ার ভূমিকা পালন করবে। এই রূপ এক মানব সমষ্টি সম্পর্কে একথা ভাবা যায় না যে, তা স্বেচ্ছাচারিতার সাথে শাসনকার্য চালাতে কিংবা আল্লাহর সম্মতিহীন ইজতিহাদের বলে আইন-কানুন রচনা করবে। কেননা তা আল্লাহর খলীফা হওয়ার প্রকৃতির সাথে একবিন্দু সঙ্গতিসম্পন্ন হয়।

এ দিক দিয়ে কুরআনী ইসলামী আদর্শনুসারী মানব সমষ্টি পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজ-সংস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়ে থাকে।

কেননা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসারী সমাজ নিজেই নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী। এই কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে তা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসনকার্য চালায় না। ফলে তা কারোর পরিচালনায় ও আইন প্রণয়নে কোন স্থায়ী আদর্শ ও মানদণ্ড মেনে চলতেও বাধ্য নয়। সেখানে জাতির জনগণ আইন-বিধান হিসেবে গ্রহণ করতে যা’তেই একমত হবে, তা যদি তার মান-মর্যাদা পরিপন্থি হয়ও এবং তা যদি সেই সমাজেরই কোন একটা অংশের কল্যাণ-বিরোধী হয়ও তবু তা গ্রহণ ও কার্যকর করতে কোন বাধা থাকে না।

আল্লাহর খলীফা রূপে গঠিত ও প্রতিষ্টিত সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্নতর প্রকৃতি ও ভাবধারার হয়ে থাকে। তার শাসন-প্রশাসন স্বাধীন ও নিরংকুশ হয় না কখনই। তা এক দায়িত্বসম্পন্ন –জবাবদিহি করতে বাধ্য সমাজ। সে সমাজ-সংস্থাকে সর্বক্ষেত্রে সত্য ও ইনসাফকে অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, জুলুম-শোষণকে নির্মূল করতে হয়< আল্লাহদ্রোহীতাকে প্রতিরোধ করতে হয়। তার প্রতিটি কাজ করতে হয় মহান আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করার তীব্র দায়িত্ব বোধ সহকারে। এ দৃষ্টিতে বলা যায় –ইসলামী হুকুমাত উম্মতের উপর উম্মতের শাসন আল্লাহর খিলাফত হিসেব অর্থাৎ দেশ শাসন ও পরিচালনায় মুসলিম উম্মত স্বীয় ইচ্ছা ও কামনা-বাসনাকেই বাস্তবায়িত করবে না, বরং মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণ ও আল্লাহর ঘোষিত সীমা সমূহের মধ্যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কার্যকর হবে।

দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন

আল্লাহ তা’আলা হযরত দাউদ (আ)-কে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তাঁরই দেয়া বিধান অনুযায়ী শাসন-প্রশাসনের কাজ সুসম্পন্ন করেই এই খিলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি পূর্ণ সত্যতা, সততা ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরতা সহকারে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে আল্লাহর ঘোষণাঃ [আরবী………]

হে দাউদ! আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি জনগণের মধ্যে পরম সত্যতা-সততা-ন্যায়পরতা সহকারে শাসন-কার্য পরিচালনা কর।

আদম (আ)-কে লক্ষ্য করে ‘খলীফা’ বানাবার ঘোষণা এবং হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে বলা এই ‘খলীফা’ মূলত একই –এ দুয়ের মধ্যে মৌলিকভাবে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এখানে হযরত দাউদ (আ)-কে ব্যক্তিগতভাবে খলীফা বানাবার কথা বলা হয়েছে। আর হযরত আদমের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সমস্ত আদম বংশধরদের খলীফা বানাবার সংকল্প ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) খিলাফতের প্রথমোক্ত দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থ করেছেন এভাবেঃ ‘সে দুনিয়ায় ফসল উৎপাদনে, ফল বের করণে ও খাল-নদী তৈরী করার ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে’।

আর দ্বিতীয়, উক্ত দিকে ইঙ্গিত করে তার তাফসীর করেছেন এই বলেঃ সৃষ্টিকূলের উপর শাসন-প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে। আর খলীফা হবেন আদম ও তাঁর সন্তানদের মধ্যে যারাই স্থলাভিষিক্ত হবে। – [আরবী টীকা]

শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা-হুকুমাত-ছাড় আমানত আদায় করা সম্ভব নয়

কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা’আলা ‘আমানত’ গ্রহণের জন্য সমস্ত জিনিসের নিকট প্রস্তাব পেশ করেছেন –আসমান যমীন ইত্যাদিকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলেছেন। কিন্তু সবকিছুই তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। এ পর্যায়ে আল্লাহর কথা হচ্ছেঃ [আরবী………]

আমরা এই আমানতকে আকাশমণ্ডল, যমীন ও পাহাড়-পর্বতের সম্মুখে পেশ করেছি। কিন্তু ওরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে, ওরা ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ তা নিজের স্কন্ধে তুলে নিয়েছে। বস্তুত মানুষ যে জালিম ও জাহিল তাতে সন্দেহ নেই। আমানতের এই দুর্বহ বোঝা গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণাম হলো, আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ স্ত্রীলোক ও মুশরিক পুরুষ-স্ত্রীলোকদের শাস্তি দেবেন ও মু’মিন পুরুষ-স্ত্রীলোকদের তওবা কবুল করবেন। বস্তুত আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল এবং অশেষ দয়াবান।

আয়াতটিতে যে আমানতের কথা বলা হয়েছৈ, সে ‘আমানত’ বলে কি বুঝিয়েছে? ইমাম কুরতুবী ও অন্যান্য মুফাসসির বলেছেনঃ ‘তা হচ্ছে সাধারণভাবে দ্বীণ পালনের যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য’। এ পর্যয়ে যত কথা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে এই মতই অধিক সহীহ। [আরবী টীকা…..] আল্লামা তাবরিযী লিখেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষের যে সব হুকুম-আহকাম, কর্তব্য ও সীমাসমূহ নাযিল করেছেন, তা সবই আমানত এবং এ আমানত রক্ষার দায়িত্ব মানুষ গ্রহণ করেছে। [আরবী টীকা…..]

আর একথা তো নিঃসন্দেহ যে, মানুষ এই আমানত গ্রহণ করেছিল তা যথাযথভাবে পালন ও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে। তাই এ কথায়ও কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না যে, আল্লাহর নাযিল করা হুকুম-আহকাম –আইন-বিধান, কর্তব্য ও সীমাসমূহ মানব জীবনে কার্যকর করা এমন একটি হুকুমত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া কখনই সম্ভব হতে পারে না, যা মূলত আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, যা হড়ে তুলবে মু’মিন উম্মত এই মনোভাব সহকারে যে, এইরূপ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীন আল্লাহর আনুগত্য ভিত্তিক জীবন যাপন করা সম্ভব, অন্য কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থার অধীন তা সম্ভবপর নয়।

দ্বিতীয় আয়াতটি [আরবী…………….] ‘যেন আল্লাহ আযাব দেন’……..

উল্লিখিত আমানতের নিগূঢ় সত্য কথা উদঘাটিত ও প্রকাশিত করছে। বোঝা যাচ্ছে যে, ‘আমানত’ ধারণকারী মানুষ মু’মিন, মুশরিক ও মুনাফিক –এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। মানুষকে এইরূপ বিভক্তকরণ কেবল সত্য আকীদা গ্রহণ ও দ্বীন পালনের দৃষ্টিতেই সম্ভব হতে পারে! এ দৃষ্টিতে মু’মিন সে, যে দ্বীন পালন ও কায়েম করবে। এ ক্ষেত্রে যারা শিরক-এ লিপ্ত হবে, তারা মুশরিক হবে। তারা কিছুটা দ্বীন পালন করলেও দ্বীন-বিরোধী কার্যকলাপই বেশী করবে। আর মুনাফিক বলে চিহ্নিত হবে সেইসব লোক, যারা দ্বীনের প্রতি ঈমানদার বলে বাহ্যত দাবি ও প্রচার করবে কিন্তু আসলে ও প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের প্রতি তারা ঈমানদারও নয়, নয় তারা দ্বীন পালনকারীও।

প্রথম আয়াতের শেষাংশে মানুষকে ‘যালুম’ ও ‘জাহল’ বলা হয়েছে তো এই কারণে যে, মানুষ সামষ্টিকভাবে এই আমানত বহন করার দায়িত্ব গ্রহণ করেও তারা তাতে খিয়ানত করেছে, কার্যত আমানতের দায়িত্ব বহন করেনি। ফলে মানুষ মু’মিন, মুশরিক ও মুনাফিক –এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মু’মিন হয়েছে তারা, যারা ওয়অদা অনুযায়ী কাজ করেছে –কার্যত দ্বীন পালনের দায়িত্ব বহন করেছে। মুনাফিক হয়েছে তারা, যারা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত বাইরে প্রকাশ করেছে কেননা তারা অন্তর দিয়ে দ্বীনের প্রতি ঈমান না এনেও নিজেদেরকে ঈমানদার বলে যাহির করেছে। আর মুশরিক হয়েছে তারা, যারা এক আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক-আন্তরিক ঈমান গ্রহণ করতে পারেনি –অন্যান্য শক্তির প্রতিও ঈমান এনেছে এবং কার্যত এক আল্লাহর দেয়া বিধান পালন করেনি। কিছুটা আল্লাহর বিধান আর কিছুটা মানুষের মনগড়া বিধান পালন করেছে। কার্যত নফসের খায়েশাতেরই অনুসরণ করেছে।

শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে খিলাফত

পূর্ববর্তী দীর্ঘ আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মানুষ এ পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা। এ খিলাফত কার্যথ শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে বাস্তবায়িত হবে।

পূর্বোল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে খিলাফতের এই তাৎপর্যই প্রতিভাত হচ্ছে শাসনকার্যের এই নেতৃত্ব থেকে মৌলিকভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্নতর, যা সাধারণত দুনিয়ার আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিরা, রাজা-বাদশাহ স্বৈরতন্ত্রীরা দিয়ে থাকে। এ সব লোক যুগের পর যুগ ধরে জনগণের উপর নির্মম স্বৈর শাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে কুরআনে উপস্থাপিত খিলাফতের –শাসককার্য পরিচালনায় নেতৃত্বদানের দূরতম কোন সম্পর্কই নেই। ওদের এ স্বৈর শাসন যদিও আল্লাহর নামেই দুর্বল-অক্ষম অসহায় মানবকুলের উপর চালানো হচ্ছে। কিন্তু আসলে ওরা নিজেরাই নিজেদেরকে মানুষের উপর আল্লাহর আসনে সবাচ্ছে, মানুষের উপর প্রভুত্ব করে যাচ্ছে।

উপরন্তু খিলাফতের শাসনকার্য ও ওদের স্বৈর শাসন যেমন কোন দিক দিয়েই এক নয়, তেমনি একটি সমাজ-সমষ্টির জন্য আল্লাহর নিকট থেকে সার্বভৌমত্ব প্রদানও অভিন্ন নয়। একটি সমাজ-সমষ্টির জন্য আল্লাহর দেয়অ সার্বভৌমত্ব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব মাত্র। আল্লাহর খিলাফত আল্লাহর শাসন-নীতিরই বাস্তবায়ন মাত্র। শাসকের স্বেচ্ছাচারিতা করার একবিন্দু অবকাশ সেখানে নেই।

খিলাফতে আল্লাহই হচ্ছেন সার্বভৌমত্বের একক অধিকারী, মানুষের নিকট যে কর্তৃত্বটুকু আসে, আল্লাহ-ই হচ্ছেন তার একমাত্র উৎস। আর আল্লাহর বিধান শরীয়াত-ই তথায় একমাত্র শাসন ব্যবস্থা। শরীয়াত মানুষকে যতটা সীমাবদ্ধ দেয়, মানুষকে তথায় ততটা সীমার মধ্যে থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দান করতে হয়। সে শরীয়াতকে ইচ্ছামত পরিবর্তন বা ব্যাখ্যা দানের কোন অধিকারই মানুষের থাকতে পারে না।

এই কারণে খিলাফতের শাসন ব্যবস্থায় মানুষ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করে আল্লাহর নিকট অক্ষরে অক্ষরে জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতি সহকারে। কেননা এখানে কোন মানুষই নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী হয় না। গোটা সমাজ-সমষ্টিও নয়। আল্লাহর অর্পিত আমানত রক্ষা এবং সে জন্য তাঁরই নিকট জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতিতে প্রতি মুহুর্তেই কম্পমান হয়ে থাকা একান্তই অপরিহার্য গুণ।

সরকার সংগঠনের সামষ্টিক দায়িত্ব

পূর্বোদ্ধৃত আয়াতসমূহ অনিবার্যভাবে প্রমাণ করছে যে, আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী মুসলিম উম্মতের কর্তব্য হচ্ছে –ইসলামী আইন-কানুনের পরিমণ্ডলে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখানে এ দায়িত্ব যেমন গোটা মুসলিম উম্মতের উপরে চাপিয়ে বসানোর এবং তাদের ইচ্ছা-মর্জী-অনুমতি ব্যতিরেকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে বসার।

বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পূর্বে একটি প্রশ্নের সুম্পষ্ট জবাব নির্ধারিত আবশ্যক। প্রশ্নটি হচ্ছেঃ

বাহ্যিক পটভূমিতে সমাজ-সমষ্টির কোন অস্তিত্ব আছে কি, যা ব্যক্তির অস্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র ও বাস্তব? কিংবা তা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির একাত্ম হওয়অর কোন আপেক্ষিক বা কল্পিত রূপ মাত্র?

দার্শনিকদের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি

দার্শনিকরা মনে করেন, বাহ্যিক পটভূমিতে সমাজ-সমষ্টির কোন অস্তিত্ব নেই। বাহ্যত আছে শুধু ব্যক্তিগণ। এই ব্যক্তিগণের একজনের সাথে আর একজনের মিলিত হওয়া থেকে লব্ধ রূপ ব্যতীয় সমাজ-সমষ্টি বলতে কিছুই নেই।

এই দার্শনিকদের বাইরে সমাজ-বিদ্যা পারদর্শিগণ এই ধারণা পোষণ করেন যে, সমাজ-সমষ্টির একটা বাহ্যিক অস্তিত্ব অবশ্য আছে। এই অস্তিত্ব স্বতন্ত্র এবং বাস্তব। এ কারণেই তো ব্যক্তিগণের পরস্পরের মধ্যে একটা সামাজিক সম্পর্ক বর্তশান থাকে, ব্যক্তিগণের অধিকার নির্ধারিত থাকে এবং সে সমাজের থাকে কতগুলি সুস্পষ্ট আইন-বিধান ও নিয়ম-ধারা।

সত্যি কথা এই যে, এই উভয় মত পরস্পর বিরোধী হলেও সত্য ও নির্ভুল। তা এজন্য যে, দার্শনিকগণ বস্তু বা বিষয়সমূহের নিরেট স্পর্শযোগ্য বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। অথচ ব্যক্তির সত্তাগত বাস্তবতার বাইরে প্রকৃতি জগতের পটভূমিতে বাস্তব হিসেবে তা পায় না। এ কারণে ব্যক্তিগণের অস্তিত্বের বাইরে সমাজ-সমষ্টির একটা বাস্তব অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোন উপায় দেখতে পান না।

পাঁচজন ব্যক্তি যখন একটি টেবিলের চতুস্পার্শ্বে গোল হয়ে বসে, তখন দার্শনিক এই পাঁচজনের একত্র সমাবেশ লব্ধ সামষ্টিক রূপকে কোন স্বতন্ত্র ও বিশেষ সত্তা –যা এই পাঁচজনের বাইরে ষষ্ঠ হতে পারে –গণ্য করেন না।

কিন্তু অধিকারের দৃষ্টিকোণে প্রকট হয়ে উঠে যে, মানব-সমষ্টি আকারে যত ক্ষুদ্রই হোক, একটি সুপরিচিত বাস্তবতার অধিকারী। প্রচলিত ধারায় এই দৃষ্টিকোণই সর্বাধিক পরিচিত। সেই সমষ্টির এমন কতগুলি অবশ্য পূরণীয় অধিকার রয়েছে, যা ব্যক্তির জন্য নেই। অথবা এখানকার ব্যক্তির এমন কতগুলি কর্তব্য, অধিকার ও দায়-দায়িত্ব রয়েছে, যেমন রয়েছে সমষ্টির জন্য। বর্তমান দুনিয়ার সংস্কৃতিবান জাতিসমূহ সমাজকে এই দৃষ্টিকোণ দিয়েই দেখে থাকে। তাই সমাজের একটা স্বতন্ত্র সত্তা তাদের নিকট প্রকট ও স্বীকৃত। তার একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার আবশ্যকতাও এবং বিশেষ কিছু অধিকার ও কর্তব্যও নির্ধারণ করে।

কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি

ইসলামের দৃষ্টিকোণে ব্যক্তি ও সমষ্টির অধিকার বিবেচনা করা হলে উভয়েরই নিজ ক্ষেত্রে ও পরিবেশে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার না করে কোন উপায় থাকে না। উভয়েরই স্বাতন্ত্র্য, অধিকার ও সমান-সমান দায়িত্ব-কর্তব্য অবশ্যই মেনে নিতে হয়।

কুরআনুল করীম এ অধিকারের দৃষ্টিতে সমাজরে উপর দৃষ্টিপাত করে। তা সমাজের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব, জীবন ও পুনরুজ্জীবন, নির্দিষ্ট সময়কাল এবং অগ্রবর্তিতা ও পশ্চাদপদতা প্রভৃতি সবই রয়েছে বলে স্বীকার করে, যেমন এসব হয়ে থাকে ব্যক্তির ক্ষেত্রেও।

এ কারণে ব্যক্তির প্রতিকূলে সমাজ-সমষ্টির বাস্তব অবস্থান অস্তিত্ব যথোপযুক্তভাবে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের আয়াতসমূহ আমাদেরকে স্পষ্ট পথ-নির্দেশ করে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী………………….]

প্রত্যেকটি জনসমষ্টির জন্য নির্দিষ্ট একটা সময়কাল রয়েছে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়কাল যখন নিঃশেষ হয়ে আসবে, তখন একটা মুহুর্ত বিলম্বেও যাবে না, আগেও আসবে না। [আরবী…………………]

প্রথ্যেকটি উম্মতকে ডাকা হবে এই বলে যে, এস ও নিজ নিজ আমল নামা দেখে নাও। [আরবী……………..]

আমরা একনিভাবেই প্রতিটি মানব মণ্ডলীর জন্য তাদের কার্যকলাপকে চাকচিক্য করে দিয়েছি। [আরবী…………..]

তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক ন্যায়বাদী সত্যপন্থীও রয়েছে। [আরবী……..]

এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা সত্য সঠিক পথে স্থিরভাবে দাড়িঁয়ে আছে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে। [আরবী…………………………..]

প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই তাদের রাসূলের উপর হামলা চালিয়েছে, যেন তারা তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তারা সকলেই বাতিলের হাতিয়ার সমূহের দ্বারা দ্বীনকে নীচা দেখাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি তাদের পাকড়াও করেছি। পরে দেখ, আমার দেয়া শাস্তি কত কঠিন ও কঠোর ছিল! [আরবী……………………]

প্রত্যেক উম্মত –জনসমষ্টির জন্য একজন রাসূল রয়েছে। অতঃপর যখন কোন উম্মতের নিকট তার রাসূল এসে পৌছেঁছে, তখন পূর্ণ ইনসাফ সহকারে তাদের মধ্যকার ফয়সালা চুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

এ আয়াতসমূহ সম্পষ্ট ও উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, ব্যক্তিগণের সামষ্টিকতা সমাজ ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে সমাজের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। আর সে সমাজের একটা সময়কাল রয়েছে, কিতাব রয়েছে, চেতনা রয়েছে, সমঝ-বুঝ আছে, আনুগত্য ও অনানুগত্য –গুনাহ নাফরমানী ও পুণাশীলতা রয়েছে এবং সামষ্টিকভাবে অনেক বিষয়ে ফয়সালাও হয়ে থাকে।– [তাফসীরুল মিজান]

এ সব আয়অতের প্রেক্ষিতে একথাও প্রকট হয়ে উঠে যে, কুরআন জনসমষ্টির –উম্মতের ইতিহাসকে ততটাই গুরুত্ব দিয়েছে, যতটা দিয়েছে ব্যক্তির কাহিনীর উপর। বরং সত্যি কথা এই যে, পূর্বে ইতিহাসে প্রধানত ব্যক্তিরাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তখনকার ইতিহাস রাজা-বাদশাহ ও বড় বড় দিগ্বিজয়ী রাজ্য স্থাপনকারী ব্যক্তিদেরই কাহিনীতে পূর্ণ ছিল। তাতে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিহাস গুরুত্ব ও স্বীকৃতি লাভ করেছে কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার পর। তাই উত্তরকালে আল-মাসউদী ও ইবনে খালদূনের ন্যায় ব্যক্তিবর্গ মানব জাতির ও জনসমষ্টির খ্যাতনামা ইতিহাসবেত্তা রূপে আবির্ভূত হতে পেরেছেন। ফলে পরবর্তীকালে ব্যক্তিদের কাহিনীর স্থানে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিবৃত্তই হয় ইতিহাসের প্রধান উপজীব্য। বস্তুত ইসলামে সমাজ-সমষ্টির উপর যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলেই এরূপ হওয়া সম্ভব হয়েছিল। সমাজ-সমষ্টির ইতিহাসের প্রতি এরূপ গুরুত্ব দুনিয়ার অপর কোন ধর্ম বিধান বা সামষ্টিক রীতিতে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ব্যক্তির চরিত্র গঠন ও মানুষোপযোগী প্রশিক্ষণ কেবল সমাজ-সমষ্টির মধ্যেই সম্ভব। এ কারণে ব্যক্তির পূর্ণত্ব বিধানের জন্যই সমাজ-সমষ্টির অপরিহার্য প্রয়োজন। মানব-চরিত্র ও ভাবধারার সাংঘর্ষিক বৈচিত্র ও বিভিন্নতা সমাজ-পরিবেশের মধ্যেই মেরুকৃত ও একাকার হতে পারে কোন-না-কোন মাত্রায়। আর অন্যান্য দৃষ্টিতে ব্যক্তি ছাড়া ‘ব্যক্তি’র ধারণা করাও কঠিন।

এই কারণেই ইসলামের সালাত, হজ্জ, জিহাদ ও অর্থ ব্যয় প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানই সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। আর এইগুলির সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন সম্ভব করার জন্যই ইসলামী হুকুমান একান্ত অপরিহার্য। এই হুকুমাতই কার্যত ইসলামের বিধানকে বাস্তবায়িত করে, আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহকে রক্ষা করে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে সর্বাত্মক কল্যাণের দিকে আহবান –‘আমর বিল মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার’-এর দায়িত্ব এই সরকারই যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এই সবের ফলে যে সৌভাগ্যপূর্ণ ও পবিত্র ভাবধারা সম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠে, তা-ই ব্যক্তিদের নৈতিক উন্নয়ন সাধন করে। আর তাই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান উপায়। আর এ সব কারণেই ইসলামী সমাজ দুনিয়ার অন্যান্য সমাজ-সমষ্টি থেকে অধিক উন্নত ও সর্বাধিক কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে।

ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির জন্য কতগুলি কর্তব্য অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে। যেমন পাঁচ ওয়অক্ত সালাত, এক মাস কালীন সিয়াম, পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও এই ধরনের অন্যান্য বহু কাজ ব্যক্তিকে অবশ্যই করতে হবে। অনুরূপভাবে ইসলামী সমাজের জন্য বহু কয়টি দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারিত হয়েছে, যেগুলি সামাজিকভাবেই কাজে পরিণত করতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোন টাল-বাহানা বা গড়িমসি করা চলবে না।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ ইসলামী সমাজ-সমষ্টিকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ [আরবী………………………]

মেয়েলোক চোর ও পুরুষলোক চোর –উভয়ের হাতসমূহ কেটে দাও তাদের উভয়ের দুষ্কৃতির শাস্তিস্বরূপ, আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষা দান হিসেবে। আর আল্লাহ প্রবল শক্তি সম্পন্ন সুবিবেচক।

ব্যভিচারী নারী-পুরুষ সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেনঃ [আরবী……………………]

ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ এদের প্রত্যেককে একশ’টি করে দোররা মার এবং তাদের প্রতি দয়াশীলতা আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তোমাদেরকে যেন বাধাগ্রস্থ করতে না পারে –যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হও এবং এই দুইজনকে দেয়া শাস্তি যেন মু’মিনদের কিছু সংখ্যক লোক প্রত্যক্ষ করে।

অনুরূপভাবে ইসলামী দেশ ও রাজ্যের সীমানা সংরক্ষণ ও বহিরাক্রমণ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে ধৈর্য ও পাহারাদারির সাথে।

ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী………………………………]

হে ঈমানদার লোকগণ, ধৈর্য অবলম্বন কর, বাতিল পন্থীদের প্রতিরোধে দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা প্রদর্শন কর, ইসলামী রাজ্য সংরক্ষণে সর্বদা প্রস্তুত থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক।আশা আছে, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।

অপর এক আয়াতে রাষ্ট্রদ্রোহী আল্লাহদ্রোহীদের মুকাবিলায় যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন শেষ পর্যন্ত তারা দমিত হয়ে সত্য দ্বীতের আনুগত্য করতে বাধ্য হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহীতা, আল্লাহদ্রোহীতা ও সর্ব প্রকারের সীমালঙ্ঘনমূলক কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত হয়। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী……………………….]

আর ঈমানদার লোকদের মধ্য থেকে দুটি দল যদি পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের মধ্যে সন্ধি করে দাও। পরে যদি তাদের মধ্য থেকে কোন এক পক্ষ অন্য পক্ষের প্রতি বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনমূলক আচরণ করে তাহলে এই সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই কর যতক্ষণ না সে পক্ষটি আল্লাহর বিধান পালনের দিকে ফিরে আসচে। অতঃপর সে পক্ষ ফিরে এলে তাদের মাঝে সুবিচার সহকারে

মীমাংসা-মিল-মিশ করিয়ে দাও। আর সব সময়ই সুবিচার নীতি অনুসরণ করে চলতে থাক। কেননা আল্লাহ সুবিচার কারীদের পছন্দ করেন –ভালবাসেন।

বস্তুত উদ্ধৃত আয়াতসমূহে আল্লাহ তা’আলা মু’মিন লোক সমষ্টিকে সম্বোধন করেছেন, কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। অতএব এই সম্বোধনের পর যে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, তা সেই ঈমানদার লোক-সমষ্টির প্রতি এবং তা পালন করতে হবে সেই লোক-সমষ্টিকে সমষ্টিগতভাবে –কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। এ পর্যায়ের আরও কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ [আরবী…………]

এবং তোমরা আল্লাহর পথে বিনিয়োগ কর

[আরবী……………………………………………]

তোমাদের মধ্য থেকে অবশ্যই এক জন-সমষ্টি বের হয়ে আসতে হবে, যারা সার্বিক কল্যাণের দিকে সতত আহবান জানাতে থাকবে এবং ভালো-শরীয়াতসম্মত কাজের আদেশ করতে ও অন্যায়-মন্দ তথা শরীয়াতবিরোধী কাজ করতে নিষেধ করতে থাকবে। [আরবী…………………..]

এবং তোমরা তাঁর পথে জিহাদ কর। [আরবী……………………………]

এবং তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে জিহাদ কর যেমনটা জিহাদ তাঁর ব্যাপারে করা কর্তব্য।

[আরবী…………………………..]

এবং কিসাসে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত।

[আরবী…………………………………]

এবং তোমরা আল্লাহর জন্য স্বাক্ষ্য দাড় করো।

[আরবী……………………………….]

এবং তোমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জু ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।

[আরবী…………………………………….]

এ কয়টি এবং এ ধরনের আরও বহু সংখ্যক আয়াত থেকে স্পষ্ট-অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম মূলতই এক সামষ্টিক জীবন বিধান। আল্লাহ তা সামষ্টিক আদর্শরূপে মু’মিন সমষ্টির উপরই পালন করা কর্তব্য করে দিয়েছেন; ঠিক যেমন বহু ব্যক্তিগত কাজের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে ব্যক্তিগণের উপর অর্পণ করেছেন। দ্বীন কায়েম করার দায়িত্ব মুসলিম লোক-সমষ্টিই পালন করতে পারে। তাদের সমন্বয়ে যে সমাজ-সমষ্ঠি গড়ে উঠে, আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যকের জন্য এখানে কোন বিশেষত্ব নেই, নেই কোন তারতম্য।

সমষ্টিকে সম্বোধন করার দরুন অর্পিত দায়িত্ব পালন সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আরোপিত কর্তব্য-দায়িত্ব সেই ব্যক্তিগকেই ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে হবে।

এই ব্যক্তিগণের সমন্বয়েই সমষ্টি গড়ে উঠে। ব্যক্তিগণের উপর অর্পিত কর্তব্য দায়িত্ব ব্যক্তিগণকে সরাসরি ফরয হিসেবেই পালন করতে হবে। আর সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যক্তির ভূমিকা হচ্ছে সমষ্টির একজন হিসেবে এবং তা ফরযে কিফায়া। সমষ্টির কোন এক ব্যক্তি যদি তা পালন করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিরই পালন করা হয়ে যাবে। কিন্তু কোন এক ব্যক্তিও যদি তা পালন না করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিই সেজন্য দায়ী হবে। কেননা সে হুকুম পালন করার দায়িত্ব সমাজ-সমষ্টির উপরই অর্পিত হয়েছিল।

সমাজ-সমষ্টির উপর কর্তব্য পালনের দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে সেই সব কাজের, যা সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই পালন করা সম্ভব, ব্যক্তিগতভাবে কোন ব্যক্তির পক্ষে তা পালন করা সম্ভব নয়। সেই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করার জন্য সমাজ তার মধ্য থেকে এক বা কতিপয় লোককে নিযুক্ত করতে পারে। সেই নিযুক্ত এক বা একাধিক লোক সে দায়িত্ব পালন তখনই করতে পারে, যদি তা করার কতৃত্ব (Authority) সমাজ-সমষ্টিই দেয়। এভাবেই সমাজ-সমষ্টির দায়িত্ব পালনের জন্য সমাজ সমর্থিত একটি সরকার –তথা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা ইসলামের কর্ম সম্পাদনের স্থায়ী নিয়ম। এ সংস্থাই ইসলামী আদর্শভিত্তিক সামাজিক নিয়ম-শৃংখলা বাস্তবায়িথ করবে এবং সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য সমাজ সমর্থিত একটি সরকার –তথা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা ইসলামের কর্ম সম্পাদনের স্থায়ী নিয়ম। এ সংস্থাই ইসলামী আদর্শভিত্তিক সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বাস্তবায়িত করবে এবং সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব কর্তব্যসমূহও যথাযথভাবে পালন করবে। সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য এটাই হচ্ছে একমাত্র কার্যকর পন্থা। সমাজ-সমষ্টির কল্যাণ ও তার সার্বিক উন্নয়ন সাধন এরূপ একটি সংস্থা গড়ে তোলা ছাড়া কোন ক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। এরূপ একটি সংস্থা কার্যকর না থাকলে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন চরম অরাজকতা উচ্ছৃঙ্খলতা প্রবল হয়ে উঠা অনিবার্য, তেমনি বৈদেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব থেকে যাবে, আর এর কোন একটিও ইসলামের কাম্য নয়। বরং ইসলাম তীব্রভাবে এই অবস্থাকে প্রতিরোধ করতে বলে।

এ দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা থেকে আরমা এই তত্ত্ব উদ্ধার করতে পারে যে, জন-সমষ্টিই হচ্ছে প্রশাসনিক ক্ষমতার উৎস। অবশ্য নিরংকুম উৎস নয়। তা উৎস শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ ও ইসলামী আইন-কানুন জারিকরণের আওতায়। ইসলামে জনগণই সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা, প্রমাসক নিয়োগ ও নির্বাচনের জন্য দায়িত্বশীল। জনগণকে কল্যাণের দিকে পরিচালনায় নেতৃত্ব দান এ সংস্থার পক্ষেই সম্ভব। এ সংস্থাই আল্লাহর শরীয়াতী বিধানকে সামষ্টিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করবে। কেননা আল্লাহর সম্বোধনসমূহে এই সমাজ-সমষ্টি –জনগণ-ই-সম্বোধিত। কিন্তু তারা সকলে ব্যক্তিগতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে না বলেই তাদের সকলের পক্ষ থেকে কে বা কারা এ দায়িত্ব পালন করবে, তা নির্ধারণ করা তাদেরই কর্তব্য। কুরআনের আয়াত তুলে যেমন দেখানো হয়েছে; চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীকে দোররা মারা, সীমালংঘনকারীকে সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য করা, আগ্রাসন প্রতিরোধ করা ও দ্বীনী নিয়ম-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা –প্রভৃতির আদেশ কি মুসলিম সমষ্টির উপর কর্তব্য করা হয়নি।

তাহলে স্পষ্ট হলো যে, ইসলামের ইসলামী সমাজ-সমষ্টির গুরুত্ব স্বীকৃত। সেই সজাম-সমষ্টিরই কর্তব্য এমন এক সরকার –প্রশাসনিক সংস্থা –গড়ে তোলা, যা সেই সমাজ-সমষ্টির পক্ষ থেকে তার অর্পিত ক্ষমতা বলে এই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করবে। কেননা ইসলাম এই কর্তব্যসমূহকে সামষ্টিক কর্তব্য রূপেই ফরয করেছেন এবং এই কাজগুলি করা কেবলমাত্র একটি সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই সম্ভবপর।

বস্তু একটি সরকার প্রশাসনত-সংস্থা –যা জীবনের বিভিন্ন দিকের গুরুত্বপূর্ন ও অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব-কর্তব্য সমূহ তার প্রাতিষ্টানিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাদির মাধ্যমে সুসম্পন্ন করবে, একান্তভাবে দায়িত্ব সহকারে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনসমূহ যথাযথভাবে কার্যকর করবে –ব্যতীত না ইসলামী জীবন চলতে পারে, না ইসলামী সমাজ।

ইসলাম তার সামষ্টিক নিয়ম-বিধান ও আইন-কানুন কার্যকর করতে চাইবে অথচ সে কাজ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য যন্ত্র কাঠামো সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে চাইবে না, আবার জনগণের অধিকার রক্ষার, সম্পর্ক সংরক্ষণের ও জনগণের দাবিসমূহ আদায়ের বড় বড় ওয়াদা প্রতিশ্রুতি দেবে, তা কি কল্পনা করা যায়?

ইসলামের দৃষ্টিতে উম্মত –মুসলিম জনগণ –এভাবেই প্রশাসনিক কর্তৃত্বের উৎস। প্রশাসনিক দায়িত্বশীল নির্বাচন এজন্যই মুসলিম উম্মতের অধিকার ও কর্তব্য –কর্তব্য ও অধিকার।

বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে সরকার গঠন

ইসলামী শরীয়াতে মানুষের সহজ-সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি করআন, সুন্নাত ও ইজমা’র পরে একটি অন্যতম উৎসরূপে স্বীকৃত। যেসব ক্ষেত্রে এই বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবকাশ রয়েছে, সেখানে তা শরীয়াতের ইমামগণ ব্যাপকভাবে ও গুরুত্ব সহকারে প্রয়োগ করেছেন। এখানে এই দৃষ্টিতে আমাদের বক্তব্যঃ

সুস্থ সহজ বিবেক-বুদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করছে যে, জগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা একান্তই কর্তব্য। কেননা তা না হলে মানুষের জীবনে কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করাই সম্ভব নয়। আর মানব-সমাজের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা যে একান্তই কর্তব্য, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই।

মানুষের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা স্থাপন, তার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ও স্বয়ং মানব-জীবনের সংরক্ষণ ও স্থিতির জন্যই আবশ্যক। সেজন্য চেষ্টা-সাধনা ও কষ্ট স্বীকরা সাধারণভাবে সমস্ত মানুষের জন্যই কর্তব্য। কেননা মানুষ এইরূপ একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ-পরিবেশেই নিশ্চিত ও নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে, পারে তার কাম্য কল্যাণ ও উৎকর্ষ উন্নতি অর্জন করতে।

এ কারণে আমরা দেখতে পাই, দুনিয়অয় এমন বহু জাতি রয়েছে যারা কোন দ্বীন বা শরীয়অতের অনুসারী না হলেও তারা নিজেদের সামাজিক শৃঙ্খলা দৃঢ়তার সাথে স্থাপন করেছে।

এ দৃষ্টিতে আমরা সহজেই বলতে পারি যে, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যে একান্তই প্রয়োজন, তা-ও সর্বতোভাবে অনস্বীকার্য। এমন একটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক সমাজে অবশ্যই থাকতে হবে, যা সেই সমাজের জনগণের সার্বিক সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দিনরাত একান্তভাবে নিয়োজিত ও কর্মরত থাকবে। শুধু তাই নয়, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান, সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিও থাকতে হবে, যার মধ্যে এই দায়িত্বশীলতার জন্য জবাবদিহির তীব্র অনুভূতিও থাকতে হবে। এ কারণে মানব-সমাজের ইতিহাসে এমন কোন অধ্যায়ের সন্ধান পাওয়া যায় না, সেখানে এইরূপ দায়িত্বশীল বলতে কেউ কোথাও নেই। সভা ও আধুনিক সমাজের তো কোন প্রশ্নই উঠে না। প্রাচীন আদিম অসভ্য বর্বর সমাজেও এইরূপ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা দেখি সমাজ প্রধান বা গোত্র সরদারকে। গোটা সমাজ বা গোত্র যেমন তার নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে,তেমনি সেই সমাজ ও গোত্রের –কবীলার –সার্বিক সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য তাকেই কাজ করতে হয়, সে কাজ যথাযথরূপে সম্পন্ন হলো কি না, সেজন্য তাকে সেই সমাজ বা গোত্রের জনগণের নিকট জবাবদিহিও করতে হয়।

বৃহত্তর ও আধুনিক সম্প্রসারিত জীবন-প্রেক্ষিতে এই দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বই আত্মপ্রকাশ করেছে সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা রূপে। এইরূপ একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও তার সদা কার্যকরতা ব্যতীত কোন সমাজের অস্তিত্বেই কল্পনা করা যায় ন। ইসলাম তাই এরূপ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করার উপর যথেষ্ট তাকীদ পেশ করেছে। এরূপ একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন জীবনই মানুষের জন্য সম্ভব লে ইসলাম বিশ্বাস করে। এরূপ একটি জীবনেই সম্ভব ইসলামী আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও পালন-অনুসরণ। এরূপ একটি জীবনেই আশা করা যায়, মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ। এক কথায় মানুষের সার্বিক কল্যাণ এরূপ একটি সংস্থাধীন জীবন ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।

নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম জীবন

নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম-মুসলিম সমাজ-একটি নতুন সরকার-সংস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য প্রয়োজনের কথা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। কেননা নবী করীম (স) জীবদ্দশায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন প্রশাসক ছিলেন, আইনের মাধ্যম ছিলেন, প্রধান বিচারপতি ছিলেন, আদর্শিক নেতা ও পরিচালক ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করলে তার স্থলাভিষিক্ত একটি সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া মুসলিম জনগণের জীবন চলতেই পারে না। তাই অনতিবিলম্বে-এমনটি রাসূলে করীম (স) এর কাফন দাফনেরও পূর্বে এ কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রশাসক, প্রশাসন-পরিচালন সংরক্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় কাজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দানকারী একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সর্ববাদীসম্মতভাবেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মুসলমানদের প্রথম খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।

সাহাবায়ে কিরাম (র)-এর এই কর্মপদ্ধতিতে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর কাফন-দাফনের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাকে কার্যকর করা।

জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল (আল্লাহর খলীফা ও আমানতদার হিসেবে)

ইসলামী ফিকহ’র একটি মৌল-নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল।-[এই পর্যায়ে কোন কোন মহল রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হিসেবে প্রচার করেঃ (আরবী টীকাতে***********) ‘মানুষ তার ধন-মালের উপর কর্তৃত্বশীল’। কিন্তু এর সনদ কিরূপ এবং সিহাহ সিত্তার কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে কি না, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না। -গ্রন্থকার]বস্তুত মানুষ যখন তার ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল, তখন অনিবার্যভাবে তার নিজের জন্যও দায়িত্বশীল হবে। তাহলে কোন ধন-মালের উপর তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই অন্য কারোর থাকতে পারে না। আর অন্য কেউ যদি কারোর ধন-মালের উপর কর্তৃত্ব করতে না-ই পারে তাহলে কারোর নিজ সত্তা ও ব্যক্তিত্বের উপর অন্য লোকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠত করার কোন অধিকার যে দিতে পারে না, তা আরও বলিষ্ঠভাবে বলা যায়। কোন লোক কারোর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না, কারোর অনুমতি ব্যতীত তার শক্তি সামর্থ্য ও মান মর্যদার উপর কেউ কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে –কেউ নিজের মর্জী চালাবে, তা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। -এ হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে একদিকের কথা।

আর অপর দিকের কথা হচ্ছে, কোনরূপ সামাজিক সামষ্টিক সংস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে অন্য লোকদের স্বভাব ও শরীয়াতসম্মত অধিকার, আযাদী ও ধন-মালের উপর হস্তক্ষেপ-নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

এ-দুটি কাজ পরস্পর বিরোধী। অথচ এই পরস্পর কাজ দুটি একত্রিত করা না গেলে কোন সামাজিক সামষ্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনই এবঙ কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আর এই উদ্দেশ্যেই সরকার –তথা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হবে জনগণের ধন-মালের ও স্বাধীনতার উপর তাদেরই অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে। আর সে হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া যেতে পারে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নির্বাচনে জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে। এই ভোটদান কার্যত প্রমাণ করছে যে, সে তার ধন-মাল ও স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্য কাউকে দেয়ার এই পন্থা ও নীতিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং সে একজনকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে সেই কাজ করার জন্য অনুমতি প্রদান করছে।

আরো স্পষ্ট কথায় বললে হয়, মানব সমাজে যে প্রশাসন ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তাতে অবশ্যই জনগণের ধন-মাল ও চিন্তা-বিশ্বাসের উপর একটা কর্তৃত্ব অবশ্যই চালাতে হয়। সে ব্যবস্থার শুধু বিভিন্ন প্রকারের কর আদায় করা ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র কাজ হবে না। তা সে সবের উপর নানা রূপ বাধ্য বাধকতাও আরোপ করবে, তাতে তার স্বাধীনতাকে অনেকটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হবে, সম্পর্ক ভিন্নভাবে স্থাপন করা হবে, যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে এবং সাধারণ লোকদেরকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করা হবে। এ ধরনের আরও যেসব কাজ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তা সবই করা হবে। এরূপ একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা ও শরীয়াতের তাকীদ অনুযায়ী একান্তই কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সেজন্য একটি শক্তিসম্পন্ন সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো কায়েম করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকতে পারে না। যদিও তা ইসলাম মানুষকে তার নিজের ও তার ধন-মালের উপর যে কর্তৃত্ব দিয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এই সাংঘর্ষিকতা বিদূরিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, জনগণকে আল্লাহর খলীফা ধরে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের খিলাফতী-অধিকার স্বীকার করে জনগণের মর্জী ও সমর্থন-অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা। এই সংস্থা যেসব কাজই করবে, তাতে জনগণের সমর্থন ও অনুমোদন আছে বলেই মনে করা যাবে এবং এভাবে তা সামষ্টিকভাবে আল্লাহর খিলাফতের বাস্ব রূপ পরিগ্রহ করবে।

প্রশাসনিক ক্ষমতা -সার্বভৌমত্ব -প্রশাসকের নিকট আমানত

পূর্বোদ্ধৃত বিস্তারিত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, একটি সরকার গঠন ও সেজন্য সর্বোচ্চ প্রশাসক নির্বাচন জনগণের একটা সামষ্টিক অধিকার। জনগণই একজন সর্বোচ্চ প্রশাসক নিযুক্ত করবে নিজেদের মর্জীমত এবং যখন ইচ্ছা হবে তা সেই জনগণই তার নিকট থেকে কেড়ে নেবে। এই কথার তাৎপর্য হচ্ছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা -প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব -সর্বোচ্চ প্রশাসকের দেয়া একটি আমানত। জনগণই এ আমানত তার নিকট রাখে কিন্তু সে আমানতের খিয়ানত করে প্রশাসন যদি জনগণের প্রতিই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে সেই জনগণই তার নিকট থেকে এ আমানত কেড়ে নেবার অধিকার রাখে।

এই কথা কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী****************]

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানত সমূহ -দায়িত্বপূর্ণ কাজের পদসমূহ -সে সবের যোগ্য লোকদেরকে দাও। আর (পারস্পরিক বিবাদ কালে) তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে, তখন (আল্লাহর আদেশ এই) যে, তোমরা অবশ্যই সুবিচার করবে। আল্লাহ বস্তুতই সর্বশ্রোতা, সর্বদর্শী।

তিনি আরও বলেছেনঃ [আরবী********************]

হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদেরও। পরে তোমরা যদি কোন বিষয়ে পারস্পরিক মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে সে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। (কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মীমাংসা করে নাও) যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। জেনে রাখো, এই নীতিই সর্বোত্তম, সর্বাধিক কল্যাণময় এবং পরিণতির দিক দিয়ে অতীব ভালো

বস্তুত প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ব্যাপার। এটা গড়ে তোলার অধিকার ঈমানদার জনগণের নিকট পবিত্র আমানত। এ আমানত নিশ্চয়ই সেই লোকদের নিকট সমর্পণ করতে হবে যারা তা যথাযথভাবে পালন করবে ও আমানতের হক আদায় করার যোগ্যতার অধিকারী। যারা সে যোগ্যতার অধিকারী নয়, তাদের নিকট এ আমানত কখনই অর্পণ করা উচিত নয়। আর যোগ্য ও অধিকারী মনে করে আমানত অর্পনের পর তা যথাযথ আদায় করতে অযোগ্যতার -দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দিলে জনগণই সে আমানত ফিরিয়ে নেবে।

ঈমানদার লোকেরা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলবে, সংস্থার প্রধানের আনুগত্যও করবে। কিন্তু সে আনুগত্য কখনই শর্তহীন হবে না। নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে শুধু আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসূলের। তা ছাড়া অন্যদের আনুগত্য করতে হবে এই শর্তে যে, ১. সে বা তারা নিজে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে চলবে। ২. তারা জনগণকে এমন কাজের আনুগত্য করার নির্দেশ দেবে যা করলে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য হয়ে যায় এবং ৩. এমন কোন কাজের হুকুম দিবে না, যা করলে আল্লাহ ও রাসূলের নাফরমানী হয়।

প্রথমোল্লিখিত আয়াতে ‘তোমাদেরকে আদেশ করেছেন’ বলে প্রশাসকদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। কেননা এরপরই ‘তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে’ বলে তাদের প্রতিই হুকুম জারি করা হয়েছে। কাজেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায় যে, এখানে ‘আমানত’ বলে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে। এর পরই আনুগত্যের আদেশ দেয়ায়ও সেই হুকুমাত -প্রশাসনিক কর্তৃত্বকেই নির্দেশ করা হয়েছে। কাজেই ‘আমানত’ বলতে হুকুমান -তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

দ্বিতীয়োক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, এই আমানতের আসল অধিকারী হচ্ছে ঈমানদার জনগণ। অতএব হুকুমাত বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সেই জনগণের নিকট থেকেই পেতে হবে। জনগণকে এ আমানত স্বীয় আল্লাহ তা’আলাইদিয়েছেন যদিও সে ‘হুকুমাত’ মূলত আল্লাহর। কেননা হুকুমাতের জন্য যে সার্বভৌমত্ব অপরিহার্য, তা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই হতে পারে না। মানুষের নিকট শুধু প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব দু’ধরনের। একটি প্রকৃত ও মৌলিক যা একান্তভাবে আল্লাহর। আর দ্বিতীয় অধীন, প্রদত্ত, অর্পিত। এ দুটি সার্বভৌমত্ব ইসলামী হুকুমাতে একসাথে কাজ করে। এ দুটির মধ্যে কখনই বিরোধ বাঁধে না। কাজেই আমানতের ধারক হচ্ছে মুসলিম জনগণ। আর সে আমানতের সার্বভৌমত্বের আসল মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তা’আলা।

চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা) তাঁর একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলেছিলেনঃ

[আরবী******************************]

তোমার কাজ ও কর্তৃত্ব তোমার জন্য কোন স্বাদের খাদ্য নয়। বরং তা তোমার ঘাড়ের উপর একটি ভারী আমানত। তোমার উপরস্থের জন্য তুমি প্রহরার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি। তুমি এই প্রহরার কাজে কোনরূপ অন্যায় করতে পার না।

তিনি আরও বলেছেনঃ

[আরবী**********************************]

হে জনগণ! তোমাদের এই রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কিছু করার অধিকার কেবল তারই হতে পারে যাকে তোমরা নিযুক্ত করবে। আর খলীফা হিসেবে আমার কোন ক্ষমতা নেই। আছে শুধু এই যে, তোমাদের যে মাল সম্পদ আমার নিকট রয়েছেত, তার চাবিগুলি আমার নিকট রক্ষিত।

হযরত আলী (রা)-র আর একটি উক্তিঃ

[আরবী***************************************]

ইমাম ও রাষ্ট্র নায়কের অধিকার হচ্ছে এতটুকু মাত্র যে, সে আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে শাসনকার্য চালাবে। সে যদি তা করে, তাহলে জনগণের উপর তার এই অধিকার হবে যে, তারা তার কথা শুনবে ও তার আনুগত্য করবে এবং যখন ডাকবে তখন তারা সে ডাকে সাড়া দেবে।

এ আয়াসমূহ এবং অন্যান্য উক্তি গভীরভাবে চিন্তা-বিবেচনা করলে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যায়, শাসক-প্রশাসক নির্বাচন করা মুসলিম উম্মতের অধিকার ও কর্তব্য। অবশ্য তা করতে হবে শরীয়াতের স্থায়ী নিয়ম বিধান অনুযায়ী। অন্তত সরকার যে মুসলিম উম্মতের ইচ্ছা ও মর্জীর ভিত্তিতে গঠিত হতে হবে, তাতে আর কোনই সন্দেহ নেই।

তবে শাসক-প্রশাসক নির্বাচনের এ অধিকার পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থার মত নিশ্চয়ই নয়, তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতি সম্পন্ন, ভিন্নতর লক্ষ্য সমৃদ্ধ। ইসলামে শাসক নির্বাচন করা হয় বিশেষ কতগুলি গুণের ভিত্তিতে, বিশেষ কতগুলি শর্তের অধীন। এগুলির উল্লেখ পরে করা হবে। কিন্তু পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই ধরনের অবশ্য পালনীয় কোন শর্ত নেই, নেই বিশেষ কোন গুণের অধিকারী হওয়ার অনিবার্য শর্ত।

তাছাড়া পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থায় শাসক জনগণের অধীণ হয়ে থাকে। কল্যাণ ও সত্যের অনুসারী হতে হয় না। কেননা তথায় জনগণই ভোটের একমাত্র অধিকারী। তাই নির্বাচিত শাসককে সেই জনগণের অনুসরণ করে চলতে হয় সব সময়, অন্যথায় পরবর্তী নির্বাচনে তার নির্বাচিত হওয়ার আশা করা ও সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যের অনুসরণের পরিবর্তে ন্যায়ভাবে হোক, কি অন্যায়ভাব, ভোটদাতাদের সন্তুষ্ট করার কাজেই তাকে চব্বিশ ঘন্টা চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়।

এর ফলে তাকে জনগণের বিচিত্র ধরনের কামনা-বাসনার চরিতার্থতা করতে হয় ও তাদের অধীণ হয়ে থাকতে হয়। কোন সময়ই সে নিরপেক্ষ সত্যের অনুসরণ করে চলার সাহস পায় না।

পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ নিজেদের ভোট প্রয়োগ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা ও চরিত্রের দিক দিয়ে কে ভোট পাওয়ার যোগ্য, সেই বিচার-বিবেচনা তারা সাধারণত করে না। ফলে সমাজের সর্বোত্তম আদর্শবাদী ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না। আর তার পরিণামে কোন দিনই আদর্শবাদী চরিত্রের ন্যায় ও সত্যের একান্ত অনুসারী সরকার গঠিত হতে পারে না। অতএব এইরূপ নির্বাচনে সাধারণত সমাজের অত্যাচারী লোকেরই শাসক হয়ে বসার সম্ভাবনা কোনক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। এই দিকের লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মতকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী**********************]

তোমরা এই জালিমদের প্রতি ঝুকে পড়ো না। নতুবা তোমরা জাহান্নামের আওতার মধ্যে পড়ে যাবে। তখন তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন বন্ধু পৃষ্ঠপোষক পাবে না যে তোমাদেরকে আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করতে পারে, কোন দিক থেকে কোন সাহায্যও তোমরা পাবে না।

 

ইসলামী হুকুমাতের শাসক-প্রশাসকের গুণাবলী

[ইসলামী নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের গুরুত্ব –জরুরী গুণাবলীঃ ঈমান, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ উত্তমভাবে পালনের যোগ্যতা প্রতিভা, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তার সর্বাগ্রসর, ন্যায়পরতা, নিরপেক্ষতা ও সুবিচার, পুরুষ হওয়া, আইন জ্ঞানে দক্ষতা পারদর্শিথা, স্বাধীনতা, জন্মসূত্রে পবিত্রতা –মানবিক ও উন্নতমানের চরিত্র।]

………………………………………………………………………………………………………………………

ইসলামে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের গুরুত্ব

মুসলিম উম্মতের জীবনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ও বিপদজ্জনক ব্যাপাদিতে সুষ্ঠু সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপরই জনগণের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য একান্তভাবে নির্ভর করে। এই কারণে ইসলামের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের ব্যাপারটি সর্বাদিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফয়সালাকারী বিষয়। তাই মুসলিম সমাজকে তাদের সামষ্টিক দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে পালনের জন্য একজন শাসক-প্রশাসক নিযুক্ত করা একান্তই কর্তব্য। এই উদ্দেশ্রে প্রত্যেক মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর একজন ‘ইমাম’ বা রাষ্ট্রনায়ক নিযুক্ত করা শরীয়াত ও সাহাবায়ে কিরামের আমল ‘ওয়াজিব’ (ফরয) প্রমাণ করেছে। রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সর্বপ্রথম কাজ হিসেবে সাহাবায়ে কিরাম (রা) হযরত আবু বকর সিদ্দিক (র)-কে খলীফা নির্বাচিত করে এই কাজের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে।

এই কারণে মুসলিম উম্মার ইতিহাসে এমন কোন সময় বা যুগ অতিবাহিত হয়নি, যখন তাদের ইমান বা সর্বোচ্চ শাসক কেউ ছিল না। আল্লামা জুরজানী এই প্রেক্ষিতেই দাবি করেছেনঃ [আরবী**********************]

‘ইমাম’ বা রাষ্ট্রনায়ক নিয়োগ মুসলমানদের কল্যাণ সাধনের পূর্ণতম ব্যবস্থা এবং দ্বীন-ইসলামের সর্বোচ্চ লক্ষ্যের সর্বাধিক মাত্রার বাস্তবায়ণ।

আল্লামা নসফী আহলিস্-সুন্নাত-ওয়াল-জামায়াতের আকীদা হিসেবে লিখেছেনঃ [আরবী*******************************]

মুসলিম জনগোষ্ঠির জন্য একজন ইমাম –রাষ্ট্রনায়ক –অবশ্যই থাকতে হবে –থাকা অপরিহার্য। সে আইন কানুনসমূহ কার্যকর করবে, শরীয়অত নির্দিষ্ট শাস্তিসমূহ জারি করযে, বিপদ-আপদের সকল দিক বন্ধ করবে, সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত ও সদা-প্রস্তুত করে রাখবে শত্রুর আগ্রাসন বন্ধের লক্ষ্যে। লোকদের নিকট থেকে যাকাত সাদাকাত ইত্যাদি গ্রহণ ও বন্টন করবে, বিদ্রোহী দুষ্কৃতিকারী, চোর-ঘুষখোর ও ডাকাত-ছিনতাইকারীদের কঠিন শাসনে দমন করবে। জুম’আ ও ঈদের নামাযসমূহ কায়েম ও তাতে ইমামতি করবে, লোকদের অধিকার প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য গ্রহণ করবে (বিচার বিভাগ চালু করবে)। অভিভাবকহীন দুর্বল অক্ষম বালক-বালিকাদের বিবাহের ব্যবস্থা করবে, জাতীয় সম্পদ জনগণের মধ্যে বন্টন করবে। আর এই ধরনের বহু কাজই সে আঞ্জাম দেবে, যা কোন ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে আঞ্জাম দিতে পারে না। [আরবী টীকা************]

ইমাম-রাষ্ট্রপ্রদানদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের এই তালিকাই স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, মুসলিম উম্মতের সুষ্ঠু জীবনের জন্য যেমন রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একজন ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানের। অন্যথায় এই জরুরী কার্যসমূহ কখনই আঞ্জাম পেতে পারে না। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী আঞ্জাম দেয়ার জন্য নিযুক্ত রাষ্ট্রপ্রধান সেই ব্যক্তিই হতে পারে, যার মধ্যে জরুরী গুণাবলী পুরামাত্রায় অবশ্যই বর্তমান থাকবে। রাষ্ট্রপ্রধানের সেই গুণাবলী থাকা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য জরুরী শর্ত। সেই শর্তানুযায়ী গুণাবলী সম্পন্ন রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য জরুরী শর্ত। সেই শর্তানুযায়ী গুণাবলী সম্পন্ন রাষ্ট্রপ্রধান না হলে জাতীয় নেতৃত্ব সম্পূর্ণ রূপে বিপথগামী হওয়া, ইনসাফ ও ন্যায়পরতার সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে। আর তারই পরিণতি গোটা উম্মতের চরম গুমরাহী, ব্যাপক অকল্যাণ ও মারাত্মক ক্ষতি সাধিক হওয়অ অবধারিত হয়ে পড়বে। তখন রাষ্ট্রনেতা গোটা উম্মতের চরম গুমরাহীর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং কিয়ামতের দিন মুসলিম উম্মত এই ধরণের রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ করবে এই বলেঃ [আরবী*********************************]

হে পরওয়ারদিগার, এই লোকেরাই আমাদেরকে দ্বীন-ইসলাম থেকে গুমরাহ করেছিল। অতএব তুমি এদেরকে জাহান্নামের দ্বিগুণ আযাবে নিক্ষেপ কর।

বলবেঃ [আরবী************************************]

হে আমাদের রব্ব, আমরা আমাদের সরদার, বড় বড় নেতাদের অনুসরণ করেছিলাম। ফলে ওরা আমাদেরকে আসল পথ থেকে বিভ্রান্ত করেছে। হে আমাদের রব্ব তুমি আজ ওদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও। আর ওদের উপর বড় রকমের অভিশাপ বর্ষণ কর।

দুটি আয়াত দুইটি ভিন্ন ভ্ন্নি সূরা ও ভিন্ন ভ্ন্নি প্রেক্ষিতের হলেও মূল বক্তব্য অভিন্ন। আর তা হচ্ছে গুমরাহ, নেতৃত্বের মারাত্মক কুফল। রাষ্ট্রনেতা যদি ইসলামী আদর্শবাদী ও ইসলামের বাস্তব অনুসারী না হয়। তা যদি হয় ইসলাম বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী ও ইসলাম পরিপন্থী চরিত্রে ভূষিত, তাহলে তার অধীনে ইসলামী ও চরিত্রবান জীবন-যাপন করা কখনই সম্ভবপর হতে পারে না। তার পরিণতি হচ্ছে অধীনস্থ জনগণের চরম গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতা। এর কুফল যে সর্বগ্রাসী ও মারাত্মক, তার বড় প্রমাণ, এই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আল্লাহর প্রতি ঈমানদার লোকেরা কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট প্রচণ্ড অভিযোগ পেশ করবে। বলবে, হে আল্লাহ! আমরা তো তোমার বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতে প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু এই নেতা বা নেতারা আমাদের তার সুযোগই দেয়নি, ওরা আমাদেরকে গুমরাহ করেছে, ভিন্নতর পথে চলতে বাধ্য করেছে।

জরুরী গুণাবলী

এই কারণে কুরআনের দৃষ্টিতে সকল পর্যায়ের নেতৃত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পেশ করেছে, তাতে বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের জণ্য কতগুলি জরুরী গুণের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সেই গুণসমূহ যার মধ্যে পাওয়া যাবে, ইসলামী রাষ্ট্রের নেতা বা প্রধান তাকেই বানানো যেতে পারে। এখানে কতিপয় উচ্চতর গুণের উল্লেখ করে তার ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করছি।

১. ঈমান

দ্বীন ইসলামের প্রতি গভীর দৃঢ় ও পূর্ণাঙ্গ ঈমান হচ্ছে সর্বপ্রথম জরুরী গুণ। মহান আল্লাহ্ তা’আলা এই দ্বীন মানুষের সার্বিক জীবনের জন্য সর্বশেষ নবী-রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স)-এর মাধ্যমে নাযিল করেছেন। তা-ই হচ্ছে মানুষের একমাত্র পূর্ণঙ্গ জীবন বিধান। ব্যক্তি-জীবন ও সামষ্টিক-রাষ্ট্রীয় জীবন -জীবনের ও রাষ্ট্রের সকল দিক ও বিভাগ এই বিধান অনুযায়ী গড়ে তুলতে হবে। আর রাষ্ট্রপ্রধানকে তার পূর্ণ শক্তি দিয়ে এই বিধানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে। দ্বীন-ইসলামই সর্বোত্তম নির্ভুল, মানব জীবনের যাবতীয় সমস্যার একমাত্র সমাধানকারী ও সর্বাধিক কল্যাণ দানকারী বিধানরূপে ঐকান্তিক ঈমান থাকতে হবে। আর এক কথায় এক একক ও অনন্য আল্লাহর প্রতি ঈমান, আল্লাহর শরীয়াতের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস।

এই শর্তের কারণে কোন কাফির ব্যক্তি মুসলিম জনগণের নেতৃত্ব ও প্রশাসকত্ব লাভ করতে পারে না। বিবেক-বুদ্ধির দিক দিয়েও এই ঈমানের শর্ত হওয়া জরুরী বিবেচিত হবে। কেননা ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শবাদী -আদর্শভিত্তিক -আদর্শ অনুসারী রাষ্ট্র। যে লোক সে আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী নয়, তার দ্বারা সে আদর্শের অনুসরণ ও বাস্তবায়ন কখনই সম্ভবপর হতে পারে না। এজন্য ইসলামী জীবন-বিধানের প্রতি যথার্থ বিশ্বাসী নয় -এমন কোন ব্যক্তির মুসলিম জনগণের শাসক হওয়ার যোগ্যতা নেই, অধিকারও নেই। তাই আল্লাহ্ তা’আলা ঘোষণা করেছেনঃ [আরবী******************************]

আল্লাহ তা’আলা মু’মিন লোকদের উপর কাফির লোকদের কর্তৃত্ব করার কোন পথ-ই রাখেন নি।

২. রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ উত্তমভাবে পালনের যোগ্যতা, প্রতিভা

প্রশাসনিক কর্তব্য ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সূচারুরূপে পালনের জন্য তার স্বভাবগত যোগ্যতা একান্তই অপরিহার্য। নেতৃত্ব দান ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জন্য মৌলিক শর্ত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মানের যোগ্যতা। কেননা মানুষের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শাসকদের অযোগ্যতা ও অনুপযুক্ততা বিশ্ব জাতিসমূহের -বিশেষ করে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যাপক ও মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে চরম দুর্গতি ও দুর্ভোগ।

প্রশাসকের এই গুণ থাকার শর্তটির গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। তা প্রমাণের জন্য কোন দলীল পেশ করার প্রয়োজন পড়ে না। নেতৃত্ব স্বতঃই এ শর্তের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে। রাসূলে করীম (স) নিজে এ শর্তের প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ [আরবী****************************************]

সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান কেবল মাত্র পুরুষদের পক্ষেই সম্ভব। তার জন্যও তিনটি শর্ত রয়েছেঃ এমন সততা-ন্যায়পরতা-আল্লাহ পরস্তি যা তাকে আল্লাহর নাফরমানীর কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং ধের্যস্থৈর্য, যেন তদ্ধারা সে স্বীয় ক্রোধ দমন করতে পারে। যাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে তাদের উপর উত্তম নেতৃত্ব দান, যেন তারা সবাই তার সন্তান-তুল্য হয়ে যায়।

ইসলমা তো এই শর্তও করেছে যে, প্রশাসককে প্রতিষ্টান পরিচালনায় অন্যদের তুলনায় অধিক যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে।

হযরত আলী (র) বলেছেনঃ

লোকদের উপর নেতৃত্ব দানের অধিক অধিকারী হবে সেই ব্যক্তি, যে তাদের সকলের তুলনায় অধিক দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও অধিক শক্তিশালী হবে। আল্লাহর বিধান সম্পর্কে অন্যদের অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ও বিদ্বান, কেউ গণ্ডগোল করলে তাদে অভিযুক্ত করবে, তাতে দমিত না হলে তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম গ্রহণ করবে।-[আরবী টীকা***********************]

৩. রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তায় সর্বাগ্রসর

নিছক প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও উত্তম নেতৃত্বের গুণাবলীই ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তায় নেতাকে অন্যান্য সকলের তুলনায় অনেক বেশী অগ্রসর হতে হবে! তাহলেই তার পক্ষে জনগণের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে অধিক বেশী জ্ঞানী হয়ে কাজ করা সম্ভব হবে। মানুষের অভাব-অনটন ও প্রয়োজন সম্পর্কে বেশী অবহিতি লাভ তার পক্ষে সহজ হবে। ফলে কোন জাতীয় বিষয়ে তার মত ভুল হবে না, কোন সিদ্ধান্ত ভ্রান্তিপূর্ণ হবে না। তার কোন বিষয়ে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কম থাকবে। আর ইসলামী সমাজ তখন অতীব উন্নতমানের নেতৃত্ব পেয়ে অধিকতর ধন্য হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবে।

এই সব কারণে মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ প্রশাসন সম্পর্কে একথা নির্দিষ্ট হয়ে আছে যে, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অতীব উন্নতমানের হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাহলেই তার পক্ষে মুসলিম উম্মতকে সঠিক ও নির্ভুল নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হবে এবং কালের অগ্রগতির সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করে জনগণকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাওয়া সহজতর হবে।

এজন্য তাকে সাম্প্রতিককালের আন্তর্জাতিক রাজনৈকিত অবস্থা ও উত্থান পতন পর্যায়ে উচ্চতর জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। তাহলেই তার পক্ষে জিন জাতিকে আন্তর্জাতিক ঘাত-প্রতিঘাতের ক্ষতি রক্ষা করা সম্ভবপর হবে। কেননা বর্তমান দুনিয়ায় যে কোন সময়ের প্রেক্ষিতে কোন দেশ বা সমাজই অন্য নিরপেক্ষ হয়ে থাকতে পারে না। চতুর্দিকের সার্বিক অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখেই প্রত্যেকটি জাতি জনগোষ্ঠিকে নিজস্ব লক্ষ্য পথে চলতে হয়। অজানা-অচেনা পথে চলা যেমন মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসতে পারে, তেমনি সেই চলায় গতিশীলতার সৃষ্টি করা কখনই সম্ভব হয় না। আর রাষ্ট্র পরিচালনা বাস্তবিকই কোন ছেলেখেলা নয়, নয় হাস্য কৌতুকের ব্যাপার। না জেনে না বুঝে না দেখে চলতে গেলে রূঢ় বাস্তবতার কঠিন আঘাতে গোটা জাতির চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া কখনই আশংকামুক্ত হতে পারে না।

৪. ন্যায়পরতা, নিরপেক্ষতা ও সুবিচার

রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনেতাকে অপর যে গুণে অধিক গুণান্বিত হতে হবে, তা হচ্ছে সুবিচার, ন্যায়পরতা ও নিরপেক্ষতার গুণ। অবশ্য সর্বপ্রকার গুনাহ ও নাফরমানী থেকে তো তাকে দূরে থাকতেই হবে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সুবিচার ও ন্যায়পরতা উচ্চতর মহত্তর গুণের অধিকারী না হলে তার পক্ষে স্বীয় দায়িত্ব পূর্ণ সততার সাথে পালন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি জনগণের সত্যিকার অর্থে কোন কল্যাণ সাধনও অসম্ভব। বস্তুত সুবিচার ন্যায়পরতা এক মানসিক অবস্থা বিশেষ। তা ব্যক্তিকে সর্বপ্রকারের গুনাহ থেকে যেমন দূরে রাখে তেমনি জাতীয় পর্যায়ের কার্যাবলীতে খিয়ানত, বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যা-প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ ও জুলুম শোষণ নির্যাতনমূলক কার্যক্রম থেকেও মুক্ত ও পবিত্র থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।

অতএব কোন ফাসিক -আল্লাহর বিধান পালনকারী ব্যক্তিকে মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ -শুধু সর্বোচ্চ নয় -কোন পর্যায়ের শাসকরূপে নিয়োগ করা ইসলামের মানব কল্যাণমূলক আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সূরা হুদ এর পূর্বোদ্ধুত ১১৩ আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা যে জালিম লোকদের প্রতি ঝুঁকে পড়তে -আনুগত্য স্বীকার করতে -স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন তা এই কারণে। তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ [আরবী*********************]

যে লোকের দিল আল্লাহর স্মরণশূন্য -আল্লাহর আনুগত্যমূলক ভাবধারাহীন -এবং স্বীয় বন্ধন-নিয়ন্ত্রনহীন কামনা-বাসনার অধিকারী, আর এ কারণে যার কাজকর্ম বাড়াবাড়িপূর্ণ তুমি তার অনুসরণ কখনই করবে না।

এরূপ চরিত্রের লোকদের আনুগত্য-অধীনতা-অনুসরণ যে চরম গুমরাহীর কারণ, তাতেও কোন সন্দেহ নেই। কিয়ামতের দিন এরূপ লোকদের অনুসরণকারীরা আল্লাহর নিকট যে ফরিয়াদ করবে, তার উল্লেখ করে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ [আরবী***********************]

দ্বীন-ইসলাম অমান্যকারী -কাফির -লোকেরা (কিয়ামতের দিন) বলবেঃ হে আমাদের পরওয়ারদিগার! আমরা তো দুনিয়ায় আমাদের সরদার, নেতা ও আমাদের অপেক্ষা পড় লোকরেই আনুগত্য করে চলেছি। ফলে তারা আমাদেরকে (তোমার আনুগত্যের) পথ থেকে গুমরাহ করে নিয়েছে।

সাধারণভাবে সকাজে যেসব লোক কর্তা, নেতা ও মাতব্বর-সরদার হয়ে তাকে, নির্বিচারে ও অন্ধভাবে তাদের আনুগত্য স্বীকার করাই এই গুমরাহীর মূলীভূত কারণ।

তারা বলবেঃ তা না করে আমরা যদি সর্বাবস্থায় কেবল আল্লাহর ও রাসূলেরই আনুগত্য করতাম, তাহলে আজকে -কিয়ামতের দিন -জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে ও তথায় চিরদিন অবস্থানের ঘোষণা শুণতে বাধ্য হতাম না। [আরবী**************]

তারা বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম, আনুগত্য করতাম রাসূলের!

কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করা তাদের পক্ষে সম্বব হয়নি শুধু গুমরাহ সরদার-মাতব্বর-নেতৃস্থানীয় ও বড় বড় লোকদের আনুগত্য স্বীকার করার কারণে। কিয়ামতের দিন তারা তাদের দুনিয়ায় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়বে এবং আল্লাহর নিকট নিজেদের এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য তাদের অনুসৃত এই নেতাদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করে বলবেঃ [আরবী*****************************]

হে পরওয়ারদিগার! তুমি ওদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও এবং ওদের উপর বড় ধরনের অভিশাপ বর্ষন কর।

এসব আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে একথা সুস্পষ্ট ও অকাট্য যে, ফাসিক-ফাজির-আল্লাহদ্রোহী-আল্লাহর নাফরমান পাপী-পথভ্রষ্ট লোকদের তারা সামাজিকতার দিক দিয়ে যত বড় প্রভাবশালী ও ধনশালীই হোক -নেতৃত্ব ও কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে বা থাকলে তা সম্পূর্ণরূপে উৎখান তরা মুসলিম উম্মতের দ্বীনী ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

মোটকথা, আল্লাহর ভয়ে ভীত নয়, তাঁর শরীয়াতের আনুগত নয় -এমন কোন ব্যক্তির নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব মুসলিম উম্মতের কখনই মেনে নেয়া ও বরদাশত করা উচিত নয়।

মুসলিম জনগণের নেতা এমন ব্যক্তি কখনই হতে পারে না যেঃ

১. কৃপণ -কেননা সে তো তার যাবতীয় ধন-সম্পদ পেটুকের মত খেয়ে শেষ করবে।

২. মূর্খ -কেননা সে তার মূর্খতার দ্বারা সমস্ত মানুষকে গুমরাহ করবে।

৩. নির্দয়-অত্যাচারী -কেননা সে তার নির্দয়তা ও অত্যাচারে জনগণকে জর্জরিত ও অতিষ্ঠ করে তুলবে।

৪. অন্য রাষ্ট্রের ভিন্নতর আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট -কেননা এরূপ ব্যক্তি কোন সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা লাভ করলে সে সমাজের স্বাধীনতা বিদেশী শক্তির নিকট বিক্রয় করে দেবে। স্বাধীন জাতিকে পরাধীন বানিয়ে দেবে।

৫. ঘুষখোর-দূর্নীতিপরায়ণ -এরূপ চরিত্রের লোক শাসক-প্রশাসক হলে সে বিচার কার্যে ও দেশ শাসনে জনগণের অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে আদায় করতে পারবে না। আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহ যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারবে না।

৬. রাসূলের সুন্নাতকে অমান্য-উপেক্ষাকারী -কেননা এরূপ ব্যক্তি জনগণকে কখনই কল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।

এই কারণে মুসলিম উম্মতের নেতা ও প্রশাসককে অবশ্যই আত্ম-সংযমশীল, ইসলামী শিক্ষায় পূর্ণ শিক্ষিত এবং পূর্ণ মাত্রায় ইসলামী চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে। ইসলামের বিধান কার্যত অনুসরণকারী ও বাস্তবভাবে প্রবর্তনকারী হতে হবে। নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী*************************]

সুবিচারক ন্যায়বাদী শাসকের অধীন একটি দিন চল্লিশ দিনের বৃষ্টিপাতের কল্যাণের চেয়েও অধিক উত্তম এবং পৃথিবীতে আল্লাহ নির্ধারিত একটি শাস্তি কার্যকর হওয়া এক বছরের নফল ইবাদতের তুলনায় অধিক পরিশুদ্ধতা সৃষ্টিকারী।

তিনি আরও বলেছেনঃ [আরবী********************]

কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় ও আসন গ্রহণের দিক দিয়ে তাঁর সর্বাধিক নিকটবর্তী ব্যক্তি হবে সুবিচারক নেতা ও শাসক এবং সেদিন আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণ্য ও আসন গ্রহণের দিক দিয়ে অধিক দূরবর্তী হবে অন্যায়কারী-অত্যাচারী নেতা বা শাসক।

তাঁর এই হাদীসটিও স্মরণীয়ঃ [আরবী*****************]

কিয়ামতের দিন সুবিচারকারী ন্যায়বাদী শাসকরা আল্লাহ রহমানের ডান দিকে নূর-এর উচ্চাসনে আসীন হবে -আল্লাহর দুটি দিক-ই ডান -তারা সেই লোক, যারা তাদের শাসন কার্যে ও বিচার-আচারে তাদের জনগণ ও বন্ধুদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করবে।

এই শেষোক্ত হাদীসটি যদিও বিচারকার্যে সম্পর্কীয়, তবু তা সাধারণ অর্থে দেশ শাসন ও নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। কেননা এই কাজটি বিচার বিভাগীয় কাজের মূর হোতা এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ দায়িত্ব যে ধরনের লোকের হাতে থাকবে, তার প্রশাসনের অধীন বিচার বিভাগীয় কার্যও সেই ধরনেরই হবে, তা নিঃসন্দেহে-ই বলা যায়। এই কারণে সর্বোচ্চ প্রশাসকের মধ্যে এই গুণ সর্বাধিক মাত্রায় থাকা সবকিছুর তুলনায় অনেক বেশী প্রয়োজন।

 নামাযের ইমামতির ক্ষেত্রেও এই ন্যায়পরতা ও সুবিচারের শর্ত আরোপ করা হয়েছে, অথচ নামায ইসলামী জীবন-বিধানের একটি কাজ মাত্র -যদিও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ -নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত। তাই গোটা ইসলামী দেশের বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনগণের সর্বোচ্চ শাসককে সবচেয়ে বেশী ন্যায়বাদী, নিরপেক্ষ, সুবিচারক ও ইসলামী আদর্শের অবিচল অনুসারী হওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কেননা গোটা উম্মতের জীবন-মরণের মূল চাবি-কাঠি তার হাতেই নিবদ্ধ।

৫. পুরুষ হওয়া

মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ শাসক-প্রশাসককে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে। ইসলামী জীবন-বিধানে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ এক জরুরী শর্ত। ইসলাম এ শর্ত আরোপ করে নারীদের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার কিছুমাত্র লাঘব করেনি, নারীর প্রতি প্রকাশ করেনি কোন হীনতা বা ছোটত্ব। নারীর স্বভাবগত যোগ্যতা ভাবধারা ও অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নারীদের প্রকৃতিগত বিশেষত্বই এ পার্থক্য সৃষ্টির মৌল কারণ। রাষ্ট্রপ্রধান বা মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ শাসককে যেসব কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়, দূরূহ সামষ্টিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে হয়, বহু লোককে কর্মে নিযুক্ত করতে হয়, কাজ আদায় করতে হয়, বহু দেশী-বিদেশীদের সাথে কথোপকথন চালাতে হয় -তা করার জন্য যে স্বভাবগত দক্ষতা, যোগ্যতা ও সর্বাবস্থায় প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন তা নারীর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।

কেননা একথা সর্বজনস্বীকৃতব্য যে, নারী পুরুষ অপেক্ষা অধিক স্নেহপ্রবণ, বিনম্র হৃদয়, আবেগ-সংবেদনশীলতার মূর্ত প্রতীক। কঠিনতা-কঠোরতা ও অনমণীয়তা তার প্রকৃতি-পরিপন্থী। এই কারণে ইসরাম নারীকে সকল প্রকারের কঠিন-কঠোর পরিশ্রমের কাজ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। কেননা ইসলামের স্থায়ী শাশ্বত নিয়মই হচ্ছে কারোর উপর এমন কাজের দায়িত্ব না চাপানো, যা করা তার পক্ষে স্বভাবতই কঠিন বা দুষ্কর ও কষ্টদায়ক কিংবা সাধ্যের অতীন। এ ধরনের কাজের দায়িত্ব এ কারণেই কেবল পুরুসদের উপর অর্পণ করা হয়েছে। কেননা এ ধরনের কাজের যোগ্যতা কেবল পুরুষদেরই থাকা সম্ভব। পুরুষরা জন্মগতভাবেই শক্তি-সামর্থ্য সম্পন্ন, দুর্দান্ত ও দুর্ধর্ষ। সামষ্টিক নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কঠিন দায়িত্ব পালন নারীদের অপেক্ষা পুরুষদেরই সাধ্যায়ত্ব।

নারীদের স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল কাজ হচ্ছে মাতৃত্ব। সন্তান গর্ভে ধারণ, সন্তান প্রসব, লালন-পালন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুরূহ ও কষ্টসাধ্য কাজ। এ কাজ যে অবিচল ধৈর্য-সহ্য শক্তি ও অসীম-গভীর স্নেহ ও মায়া মমতার প্রয়োজন, তা পুরুষের তুলনায় নারীদেরই রয়েছে অনেক বেশী মাত্রায়। এই কারণেই  এ কাজ কেবল নারীদের। এ কাজে পুরুষদের কোন অংশ নেই। নারী-পুরুষের প্রকৃতি ও স্বভাবগত পার্থক্য অনুসারেই বিশাস জীবন-ক্ষেত্রের এই কর্ম বন্টন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মানব বংশের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য নারীকেই প্রধান ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। পুরুষের ভূমিকা গুরুত্বহীন না হলেও তা পরোক্ষ এবং বাহ্যিক পর্যায়ের। পুরুষ বীজ বপন করেই খালাস। সে বীজ ধারণ, সংরক্ষণ, লালন, অংকুরের বিকাশ সাধন ও পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপী একটি মহীরুপ সৃষ্টির সমস্ত কাজ নারীকেই করতে হয়। আর তা করার জন্য যে দৈহিক প্রস্তুতি একান্তই অপরিহার্য, তা নারীদেহেই বিরাজিত তার জন্ম মুহুর্ত থেকেই। এর কোন একটি কাজ করার দৈহিক প্রস্তুতি পুরুষের নেই। কেননা প্রকৃতিগতভাবেই এ কাজ পুরুষের নয়, এ কাজ একমাত্র নারীর-ই করণীয়।

কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে নারী অত্যন্ত তীব্র অনুভূতিসম্পন্ন ও সংবেদনশীল মানুষ। এইজন্য অলংকার ও প্রসাধন সামগ্রী নারীদের জন্য, পুরুষদের জন্য নয়। তাই ঝগড়া-বিবাদ, বিতর্ক ও যুদ্ধ-বিগ্রহে অগ্রবর্তী ভূমিকা পুরুষকেই পালন করতে হয়, নারী এ ক্ষেত্রে শুধু অক্ষমই নয়, ব্যর্থ-ও। তাই কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ [আরবী******************************]

নারীরা তো সেই মানুষ, যারা অলংকারে প্রতিপালিত হয়। আর তারা তর্ক-বিতর্কে-দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষের সাথে মুকাবিলা করায় নিজেদের বক্তব্য পূর্ণমাত্রায় স্পষ্ট করে বলত অক্ষম। -[মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা সন্তান সাব্যস্ত করত। তারই প্রতিবাদে কুরআনে এই কথাটি বলা হয়েছে যে, এ তো খুব ভালো বন্টন -তোমরা নিজেদের জন্য পুত্র সন্তান সাব্যস্ত কর আর আল্লাহর ভাগে ফেল কন্যা সন্তান, যাদের অবস্থা এই…………….।]

অলংকার ও সৌন্দর্য-উপকরণাদির প্রতি নারীদের স্বাভাবিক ঝোঁক প্রবণতা। তারা বাক-বিতণ্ডা ও শক্তির প্রতিযোগিতায় অনগ্রসর।

কুরআনে ঘোষিত নীতিতে এ স্বাভাবিক অবস্থারই প্রতিফলন। প্রতিপক্ষের সাধারণত প্রবল ও দুর্ধর্ষই হয়ে থাকে, তা যে কোন ক্ষেত্রেই হোক। রাষ্ট্রীয় ও সামষ্টিক পর্যায়ের প্রতিপক্ষের দুর্ধর্ষতা প্রশ্নাতীত। অথচ নারী সমাজ স্বভাবতই এই ক্ষেত্রে অক্ষমতার পরিচয় দিয়ে থাকে তাদের প্রকৃতিগত অক্ষমতার কারণেই। পক্ষান্তরে পুরুষরা তাদের স্বাভাবিক পৌরুষের কারণে এ ক্ষেত্রে খুবই পারঙ্গম। এ কারণে ইসলাম বিচারকার্য, বিবাদ-মীমাংসা ও বাক-বিতণ্ডার কোন দায়িত্ব নারীর উপর অর্পণ করেনি। কেননা এ কাজটি-ই নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যায়ের। এ ক্ষেত্রে যে বিপরীত দিকের চাপ অনিবার্য তার প্রতিরোধ নারীর সাধ্যাতীত। তবে ব্যতিক্রম কখনই নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে না।

হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর সারা রাষ্ট্রীয় জীবনে এই পর্যায়ের কোন দায়িত্ব কখনই কোন নারীর উপর অর্পণ করেন নি, কোন কোন নারীর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে কিছু না কিছু মাত্রার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও। শুধু তাই নয়, সমগ্র মুসলিম শাসন আমলে উমাইয়্যা-আব্বাসীয়-মোগল তুর্কী-ওসমানীয় বা আন্দালুসিয়ার শাসনের ইতিহাসে এর ব্যতিক্রম কোথাও দেখা যাবে না। যদিও খিলাফতে রাশেদার পরে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ পুরাপুরি ও যথাযথভাবে অনুসৃত হয়নি। -[ নারী বিচার বিভাগে নিযুক্ত হতে ও বিচারকার্য সম্পাদন করতে পারে কিনা, এ বিষয়ে ইসলামী মনীষীগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত ফিকহবিদ ইবনে কুদামা তাঁর ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বা দেশ শাসনের দায়িত্ব পালনে নারী যোগ্য নয়। নবী করীম (স)-এর শাসনামলে, খুলাফায়ে রাশেদীন বা পরবর্তী যুগে কোন নারীকে এই ধরনের কাজে নিযুক্ত করা হয়নি। শায়খ তুসী বলেছেন, নারী বিচারকার্যে নিযুক্ত পেতে পারে না। ইমাম শাফিঈরও সেই মত। ইমাম আবু হানিফা (র) বলেছেন, যেসব ব্যাপারে নারী সাক্ষী হতে পারে, সে সব ব্যাপারে বিচারকও হতে পারে। তা হদূ ও কিসাস ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। ইবনে জরীর তাবারীও এই মতই লিখেছেন। কেননা নারীও ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী হতে পারে। আর বিচারকার্যে তারই প্রয়োজন বেশী।]

রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ [আরবী************************]

যে জনগোষ্ঠীর প্রধান কর্ত্রী হচ্ছে নারী, তারা কখনই কল্যাণ পেতে পারে না।

এই বর্ণনাটির আর একটি ভাষা হচ্ছেঃ [আরবী****************]

যে জনগোষ্ঠী কখনই কল্যাণ লাভ করতে পারে না, যারা একজন নারীকে নিজেদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সম্পন্ন বানিয়েছে।

বর্ণনাটির অপর একটি ভাষা হচ্ছেঃ [আরবী**************************]

যে জনগণ তাদের সামষ্টিক দায়িত্ব কোন মেয়েলোকের নিকট সোপর্দ করেছে, তারা কোনক্রমেই সাফল্য লাভ করতে পারে না।

হযরত আবূ হুরাইরা (র) থেকে এ পর্যায়ের যে বর্ণনাটি উদ্ধৃত হয়েছে, তার ভাষা এইঃ [আরবী*********************************]

তোমাদের সামষ্টিক কার্যাবলীর কর্তৃত্ব যখন তোমাদের মধ্যকার অধিক দুষ্ট ও খারাপ লোকদের হাতে চলে যাবে, তোমাদের সমাজের ধনীরা যখন হবে কৃপণ এবং তোমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কর্তৃত্ব নারীদের নিকট ন্যস্ত হবে, তখন পৃথিবীর উপরিভাগের তুলনায় অভ্যন্তর ভাগই তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর হবে (জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় হবে)।

এসব কারণে নারীদের জন্য আযান ও নামাজের ইকামতও বলা জরুরী করা হয়নি। নারীদের জন্য ইসলাম যে সম্মান ও মর্যাদা নির্দিষ্ট করেছে, তাতে এসব কাজের দায়িত্ব তাদের জন্য সঙ্গতিসম্পন্ন হতে পারে না। বস্তুত ইসলামের পরিবার সংস্থায় সার্বিক নেতৃত্ব যেমন পুরুষের, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও তেমনি পুরুষদেরই অগ্রবর্তিতা। এসব নীতি কুরআনের এ আয়াতেরই পরিণতিঃ [আরবী**************************]

৬. আইন-জ্ঞানে দক্ষতা, পারদর্শিতা

ইসলামী হুকামাত যেহেতু আল্লাহর আইন-বিধান ভিত্তিক, জনগণের উপর আল্লাহর আিইন কার্যকর করণেরই অপর নাম, তাই রাষ্ট্রপ্রধান ও সর্বোচ্চ শাসককে অবশ্যই ইসলামী আইন-বিধানে যথেষ্ট মাত্রায় দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী, স্বৈরতান্ত্রিক ও জালিম হওয়ার আশংকা শতকরা এক’শ ভাগ। কেননা আল্লাহর দেয়া আইন যখন তার জানা থাকবে না, তখন সে নিজে ইচ্ছুক হলেও তার পক্ষে আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কার্যাবলীতে শরীয়াতের অনুসরণ করা কার্যত তার পক্ষে সম্ভব হবে না। তখন সে নিজ ইচ্ছামত সবকিছু করতে শুরু করবে। তখন সে হয়ত নিজের মনমত কোন নীতি নির্ধারণ করে ইসলামী আইনের নাম দিয়ে তা-ই চালাতে থাকবে। এইরূপ অবস্থায় রাষ্ট্র ও মুসলিম জনগণ -উভয়ের মারাত্মক অবস্থা দেখা দেয়া অবধারিত।

৭. স্বাধীনতা

মুসলিম উম্মার নেতৃত্ব অবশ্যই এমন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা যেতে পারে না, যার গ্রীবা দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী। তাকে অবশ্যই মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। তাহলেই সে সকল মানুষকে দাসত্বের লাঞ্ছিত শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার দয়িত্ব যথার্থভাবে পালন করতে সক্ষম হবে।

বর্তমান জগতে প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা মূলত স্বাধীন মানুষকে মানুষের দাসানুদাস বানাবারই ব্যবস্থা। এ পর্যায়ে পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতন্ত আর কমিউনিজম-সমাজতন্ত্র অভিন্ন ভূমিকাই পালন করেছে। এসব রাষ্ট্র ব্যবস্থা দুনিয়ার যেখানে যেখানেই প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর -তা বৃটিশ বা আমেরিকান সমাজে হোক; কিংবা চীনা ও রাশিয়া এবং সে সবের পক্ষপুটে আশ্রিত সমাজেই হোক; সর্বত্রই মানুষ মানুষের দাস। এসব দেশের শাসন ব্যবস্থা শুধু নিজ দেশের কোটি কোটি নিরীহ স্বাধীন মানুষকে দাসানুদাস বানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিবেশী স্বাধীন সমাজের মানুষের উপর এই দাসত্বের অভিশাপ চাপিয়ে দিতে একবিন্দু কুণ্ঠিত হয় না। সত্যি কথা হচ্ছে, এসব সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সমাজ মানবতার মুক্তির জন্য গালভরা বুলি যতই চলে ও প্রচার করে বেড়াক না কেন, শ্লোগানে ভুলিয়ে-ভালিয়ে স্বাধীন মানুষকে স্বৈর শাসনের জগদ্দল পাথরের তলায় ফেলে নির্মমভাবে নিষ্পেষিত করাই হচ্ছে এসব দেশ ও সমাজের বৈদেশিক নীতি। এ নীতি দুর্বল জাতিসমূহকে রাজনৈতিক  দাসত্ব শৃঙ্খলেই বন্দী করে না, সেই সাথে -আর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিকভাবে তা সম্ভব না হলে -অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্ধী করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও মানবিক আদর্মসমূহের মধ্যে একমাত্র ইসলাম-ই বিশ্বমানবতার মুক্তিসনদ হয়ে এসেছে মহান আল্লাহর নিকট থেকে ইসলামের মৌলিক ও প্রাথমিক ঘোষণাই হচ্ছে -মানুষ মুক্ত ও স্বাধীন, মানুষ তারই মত অন্য মানুষের -এই বিশ্ব প্রকৃতির কোন কিছুরই দাসত্ব মেনে নিতে পারে না। সব কিছুর সকল প্রকারের দাসত্বকে স্পষ্ট ও প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করে একমাত্র মহান বিশ্বস্রষ্ট্রা আল্লাহর দাসত্ব কবুল করবে, কেবলমাত্র তাঁরই ঐকান্তিক দাস ও গোলাম হয়ে জীবন-যাপন করবে। বস্তুত যে লোক তা করতে সক্ষম হবে তার পক্ষেই সম্ভব হবে অন্য সব কিছুর গোলামী থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তিলাভ করা। আর যে তা পারবে না, তাকে কত শক্তির দাসত্ব করতে হবে, তার কোন ইয়ত্তাই নেই। কুরআন মজীদে বিশ্বমানবতার জন্য এই মুক্তির বাণী উদাত্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে। বলা হয়েছেঃ [আরবী********************************]

হে কিতাবধারী লোকেরা! তোমরা সকলে এমন একটি মহাবাণী গ্রহণে এগিয়ে এসো, যা আমাদের ও তোমারেদ মাঝে অভিন্নভাবে সত্য ও গ্রহণীয়। আর তা হচ্ছে, আমরা কেউ-ই এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই দাসত্ব স্বীকার করব না, তাঁর সাথে কিছুকেই শরীক বানাব না এবং সেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমরা পরস্পরকেও রব্ব-প্রভু সার্বভৌম-সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী -মেনে নেব না।

ইসলাম বাহক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) দুনিয়ায় এসেছিলেন-ই বিশ্বমানবতাকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে। হযরত আলী (র)-র এ উক্তিটি এ পর্যয়ে স্মরণীয়ঃ [আরবী*******************************]

আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মদ (স)-কে বলেছিলেন এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি তাঁর বান্দাগণকে তাঁর বান্দাগণের ইবাদাত-দাসত্ব থেকে মুক্ত করে তাঁর (আল্লাহর) দাসত্ব করার দিকে নিয়ে আসবেন, তাঁর বান্দাগণের সাথে কৃত চুক্তি-প্রতিশ্রুতির বাধ্যবাধকতা থেকে তাঁর (আল্লাহর) চুক্তি পালনের দিকে এবং তাঁর বান্দাগণের আনুগত্য থেকে মুক্ত করে তাঁর (আল্লাহর) আনুগত্য-অধীনতার দিকে নিয়ে আসবেন।

যাবতীয় অ-খোদা শক্তির দাসত্ব-আনুগত্যের বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য ইসলামের এ আহবান নির্বিশেষে সমস্ত বিশ্বমানবতার প্রতি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছে এবং কেবলমাত্র ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার জন্য সকলকে তাকীদ করা হয়েছে। মানবতাকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার এ ব্যাপারটি কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি এ মহান উদ্দেশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা না করার জন্য কুরআন মুসলিম জন শক্তিকে তিরস্কার করেছে। প্রশ্ন তুলেছেঃ [আরবী************************************]

তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছ না কেন? অথচ অবস্থা হচ্ছে এই যে, পুরুষ-নারী-শিশু -এই দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা ফরিয়াদ করছে যে, হে আমাদের পরওয়ারদিগার, এই জালিমদের দেশ থেকে আমাদেরকে মুক্তি দাও।

অন্য কথায়, মজলুম মানবতার মুক্তির জন্য যুদ্ধ ঘোষণা আল্লাহর পথে কৃত যুদ্ধ এবং তা করা প্রত্যেক মুসলিম শক্তিরই কর্তব্য। এই কর্তব্য পালন না করলে আল্লাহর নিকট তিরস্কৃত হওয়া অবধারিত। এ আয়াতে মজলুম লোকদের মুক্তিদানের জন্য যুদ্ধ করার আহবান জানানো হয়েছে এজন্য যে, তারা মানুষকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী। আর এজন্যই তারা মজলুম। জালিমরা এই দুর্বল লোকদেরকে দাসানুদাস বানিয়ে তাদের উপর নির্মমভাবে অত্যাচার ও জুলুম চালাচ্ছে।

মোটকথা, ইসলাম মানুষের দাসত্ব বরদাশত করতে প্রস্তুত নয়। দুনিয়ার যেখানেই মানুষ মানুষের দাস হয়ে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে, ইসলমী শক্তির কর্তব্য হচ্ছে, তাদের সার্বিক মুক্তির জন্য প্রয়োজন হলে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হবে। মানবতাকে যারা নিজেদের অধীন বানিয়ে নিতান্তই গোলামের ন্যায় জীবন যাপন করতে বাধ্য করছে, তারাই ইসলামের দুশমন। কেননা তারা স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ। কাজেই তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হবে যতক্ষণ না তারা অস্ত্র সংবরণ করছে, পরাজয় বরণ করছে এবং দাস মানুষদেরকে মুক্ত ও স্বাধীন করে দিচ্ছে। -[ পরাজিত শত্রুপক্ষের যেসব লোক যুদ্ধবন্দী হয়ে ইসলামী শক্তির হাতে আসবে, তাদের সম্পর্কে ইসলামের নীতি ভিন্নতর প্রসঙ্গে আলোচিতব্য।]

এ আলোচনা থেকে একথাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, যে লোক দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী -গোলাম, তার পক্ষে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। সে তো মজলুম, অসহায়। তার নিজের মুক্তি সাধনই তার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।

৮. জন্মসূত্রে পবিত্রতা

ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে অবশ্যই ‘হালাল জাদাহ’ -পবিত্রজাত হতে হবে। এরূপ শর্ত করার মূলে কতিপয় স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান হচ্ছে ব্যভিচারের পথ বন্ধ করা। কেননা অবৈধ জন্মের ব্যক্তি তার সন্তানদের চিরন্তন ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করবে -অন্তত নৈতিকতার দিক দিয়ে। ব্যভিচার প্রসূত ব্যক্তিদের যদি মুসলিম উম্মার উচ্চতর নেতৃত্বের আসনে আসীন হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে গোটা উম্মতের পক্ষেই লজ্জার কারভণভ হয়ে দাড়াবে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মুখে মাথা উঁচু করে দাড়ানো সেই জনগোষ্ঠীর পক্ষ সম্ভব হবে না। বিশেষ করে সে জনগোষ্ঠী বিশ্ববাসীর সম্মুখে মুসলিম পরিচিতি লাভ থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে। কেননা যে ইসলাম ব্যভিচারকে একটি অতি বড় (কবীরা) গুনাহ বলে দুনিয়াবাসীর নিকট ঘোষণা করছে এবং বিশ্ব জনগণকে তা থেকে বিরত থাকার আহবান জানাচ্ছে, সেই ইসলামে বিশ্বাসী হওয়ার দাবিদার উম্মতের প্রধান ব্যক্তিই হচ্ছে ব্যভিচারের ফসল। আর সেই জনগঘ মুসলিম হয়েও সেই ব্যক্তির অধীনতা ও নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে, তারই নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বস্তুত এর চাইতে লজ্জাকর ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।

ব্যভিচারপ্রসূত ব্যক্তি হচ্ছে হারাম পথে যৌন উত্তেজনা চরিতার্থ করার জন্য নিষ্কাশিত শুক্রকীটের ফসল। এর মনস্তাত্ত্বিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া তার নিজের মনস্তত্ত্বে ও চরিত্রে প্রতিফলিত হওয়া খুবই সম্ভব। তার নিজের পক্ষেও যৌন উত্তেজনার বলগাহারা অশ্বের দাপটে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়।

ব্যভিচার প্রসূত ব্যক্তির পিতা-মাতা উভয়ই স্বাভাবিকতার আইন লঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি বেপরোয়াভাবে ভঙ্গ করেছে। এর অনুভূতি তাদের মন-মানসিকতাকে বিপর্যস্ত করে দিয়ে থাকতে পারে। তার তীব্র কুপ্রভাব শুক্রকীটের মাধ্যমে স্বভাবগত উত্তরাধিকার নিয়মে তার নিজের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে। আর সেও জন্মগত দোষের কারণে আইন লঙ্ঘনকারী ও চুক্তি ভঙ্গকারী হয়ে গড়ে উঠে থাকতে পারে। পিতা-মাতার বা তাদের একজনের স্বাভাব প্রকৃতি ও চরিত্র সন্তানের মধ্যে সংক্রমিত হওয়া এমন এক বৈজ্ঞানিক সত্য, যা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারে না। অতএব এইরূপ ব্যক্তির হাতে মুসলিম উম্মতের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের লাগাম কখনই সপে দেয়া যায় না।

মানবিক ও উন্নতমাতের চরিত্র

এসব ব্যক্তিগত গুণ ছাড়াও ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে অবশ্যই উন্নত মানের মানবিক ও ইসলমী চারিত্রিক গুণে ভুষিত হতে হবে। কুরআন মজীদে এই গুণসমূহের সমন্বিত গুণ -তাকওয়ার -কথা বলা হয়েছেঃ [আরবী*************************]

আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক সম্মানিত (সম্মানার্হ) ব্যক্তি সে, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়া সম্পন্ন।

এছাড়া হাদীসের দৃষ্টিতে কোন ব্যক্তিকেই উচ্চতর পদের জন্য প্রার্থী হওয়া ও ক্ষমতা লাভের জন্য লোভ করা, লালায়িত হওয়া ও নিজস্বভাবে চেষ্টা চালানোও স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কেননা তাতে ব্যক্তির কোন সদিচ্ছার পরিচয় পাওয়া যায় না, মনে হয়, সে উচ্চ পদ বা ক্ষমতা লাভ করে নিশ্চয়ই নিজস্ব কোন বৈষয়িক স্বার্থ উদ্ধার করতে বা কোন অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চায়। বিশেষ করে -পূর্বেই যেমন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি -এই উচ্চতর পদ ও ক্ষমতা মূলত একটি আমানত। এ আমানত যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বসাধারণের প্রতি, তেমনি সর্বসাধারণ থেকে বিশেষ ব্যক্তির প্রতি। তাই যে-লোক নিজ থেকে তা পাওয়ার জন্য উদ্যোগী ও সচেষ্ট হবে, সে নিজেকে ক্ষমতালোভী হিসেবে চিত্রিত করবে। আর ইসলামী সমাজে ক্ষমতা লোভীর কোন স্থান -কোন মর্যাদা থাকতে পারে না। বরং তা করে সে স্বীয় অযোগ্যতারই প্রমাণ উপস্থিত করে। তাই রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী***************************]

আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি এই দায়িত্বপূর্ণ কাজে এমন কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ করব না, যে তা পাওয়ার জন্য প্রার্থী হবে, অথবা এমন কাউকেও নয়, যে তা পাওয়ার জন্য লালায়িত হবে।

হাদীসটি হযরত আবূ মূসা আল-আশ’আরী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবেই দেখতে পেয়েছিলেনঃ তাঁরই চাচার বংশের দুই ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাদের একজন বললঃ [আরবী*************************]

হে রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যে বিরাট কাজের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন তার মধ্যের কোন কোন কাজে আমাদেরকে নিযুক্ত করুন।

অপরজনও অনুরূপ দাবি-ই পেশ করল। বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ [আরবী***********************************]

হে আবদুর রহমান ইবনে সামুরাতা! তুমি নেতৃত্ব-কতৃত্ব পেতে চেও না। কেননা তা পেতে চাওয়া ছাড়াই যদি তোমাকে তা দেয়া হয়, তাহলে সে দায়িত্ব পালনে তোমাদে সাহায্য করা হবে। আর চাওয়ার পর যদি দেয়া হয়, তাহলে তোমাকে সেই কাজে অসহায় করে ছেড়ে দেয়া হবে।

হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স) বলেছেনঃ [আরবী*******************]

তোমরা হয়ত দায়িত্ব-কতৃত্বশীল পদ পাওয়ার জন্য লালায়িত হবে। আর তা-ই কিয়ামতের দিন তোমাদের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে দেখা দেবে।

যে-লোক বাস্তবিকই এই কঠিন দায়িত্ব পালনে অক্ষম, দুর্বল, তাকে তা গ্রহণ করতে নিষেধ করাই শ্রেয়। হযরত আবূ যর গিফারী (রা)-কে লক্ষ্য করে যখন তিনি বলেছিলেনঃ আমাকে কোন পদে নিযুক্ত করবেন না? রাসূলে করীম (স) এই কারণেই বলেছিলেনঃ [আরবী******************************]

হে আবূ যর, তুমি দুর্বল ব্যক্তি, আর একাজ এক গুরুত্বপূর্ণ আমানত বিশেষ। এ কারণে তা তোমার জন্য কিয়ামতের দিন লজ্জা ও অপমান-লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য যে তা গ্রহণ করে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে, তার জন্য তা হবে না।

একটি হাদীসে রাসূলে কলীম (স)-এর উক্তিঃ [আরবী************************]

যে রাষ্ট্রনেতা দুর্বল, দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে অক্ষম, সে যদি এতদসত্ত্বেও রাষ্ট্রনেতা হয়েই থাকে তবে সে অভিশপ্ত।

ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের নির্বাচন, দায়িত্ব ও ক্ষমতা

[ রাষ্টপ্রধানকে নির্বাচিত হতে হবে -পদপ্রার্থী খিয়ানতকারী -মুসলিম জনগণ রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করবে -রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক, ক্ষমতা-ইখতিয়ার ও অধিকার -ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য -রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য -রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার।]

………………………………………………………………………………………………………………………

রাষ্ট্রপ্রধানকে নির্বাচিত হতে হবে

ইসলমী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে। কোন লোক নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়ে নিলে বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার দাবি করলেই কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারে না, তাকে রাষ্ট্রপ্রধান বলে মেনে নেয়া যেতে পারে না। মসজিদের নিযুক্ত ইমাম -যার প্রতি নামাযীগণ আস্থা রেখে তারই ইমামতিতে নিয়মিত নামায পড়ে আসছে -কে গায়ের জোরে সরিয়ে দিয়ে কেউ ইমাম হয়ে দাড়ালে তার এ ইমামত জায়েয নয়, জায়েয নয় তার ইমামতিতে নামায পড়া। ঠিক তেমনি জনমতের ভিত্তিতে ও সমর্থনে কর্মরত কোন রাষ্ট্রপ্রধানকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বা জোরের বলে সরিয়ে দিয়ে কেউ যদি রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে বসে, তাহলে তার এই রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া যেমন সম্পূর্ণ হারাম, তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নেয়া ও তার শাসনকে সমর্থন জানানোও ঠিক তেমনই হারাম।

রাসূলে করীম (স)-এর পর চারজন খলীফা -খুলাফায়ে রাশেদুন -জনগণের মতের ও সমর্থনের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপ্রধান -খলীফা -নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাদের একজনও এই পদের দাবিদার ছিলেন না, পদ পাওয়ার জন্য চেষ্টাকারী ছিলেন না, তার কামনা-বাসনাও তাদের মনে কখনও জাগেনি। সেই সময়ের ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগগত অবস্থার প্রেক্ষিতে যতটা সম্ভব ছিল জনগণের মত ও সমর্থন-ই ছিল খলীফা নির্বাচনের প্রধান উপায়।

পদপ্রার্থী খিয়ানতকারী

কেননা রাষ্ট্রপ্রধান সমগ্র জনগণের সামষ্টিক কাজের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল, জাতীয় ধন-সম্পদের উপর কর্তৃত্ব চালানোর অধিকারী। কোন লোককে এই পদে অধিষ্ঠিত হতে হলে তা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব, যার প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে। আসলে এটা শাসক ও শাসিত -আমানতদার ও আমানত অর্পণকারীদের মধ্যকার একটি চুক্তির ব্যাপার। এ চুক্তি উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফুর্ত ইচ্ছা, আগ্রহ ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সম্পাদিত হতে পারে। যার প্রতি পূর্বহ্নে এই ইচ্ছা, আগ্রহ ও আস্থা পাওয়া যায়নি বা জানা যায়নি, আছে বলে প্রকাশ হয়নি, তার কোন অধিকার থাকতে পারে না একমাত্র নিজের ইচ্ছায় এই পদ দখল করে বসার। এ জন্যই রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী**********************]

তোমাদের মধ্য থেকে যে লোক এই দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার জন্য নিজ থেকে আগ্রহী হবে -পেতে চাইবে, চেষ্টা করবে, সে আমাদের মতে তেমাদের মধ্যকার সবচেয়ে খিয়ানতকারী ব্যক্তি।

এর অর্থ, প্রথমত সে এই পদ চেয়েই খিয়ানতকারীর অপরাধে অপরাধী হয়েছে। আর দ্বিতীয়, সে যেভাবে স্ব-ইচ্ছায়-স্বচেষ্টায় এই পদ দখল করেছে, তাতে সে এই বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ আমানতের হক্ আদায় করতে, রাষ্ট্র পরিচালন পরিচালন ও জাতীয় অর্থ-সম্পদ ব্যয়-ব্যবহারে জনগণের বিশ্বাস রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। সে জাতীয় শক্তি ও সম্পদে বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করবেই। তার নিজস্বভাবে প্রার্থী হওয়াই তার অকাট্য প্রমাণ। স্পষ্ট মনে হচ্ছে, সে এ পদের কঠিন ও গুরুদায়িত্বের কথা অনুভবই করতে পারেনি। সে এটাকে নেহাত ছেলে-খেলা মনে করেছে। অতএব খলীফা-রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্তিতে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত রায়ই হতে হবে প্রধান অবলম্বন।

আর এই জনমতের ভিত্তিতে যখন একজন নির্বাচিত হচ্ছে, জনগণ তার নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদহীন জীবন যাপন করছে, তখন জোরপূর্বক তাকে পদচ্যুত করে যে লোক ক্ষমতা কেড়ে নেয় একমাত্র নিজস্ব পরিকল্পনার ভিত্তিতে, ইসলামের দৃষ্টিতে সে ডাকাত, পরস্বাপরহরণকারী, ছিনতাইকারী, ক্ষমতা লোভী, নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। এরূপ অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলিম জনগণের কর্তব্যের কথা রাসূলে করীম (স) বলেছেন এ ভাষায়ঃ [আরবী********************************]

তোমরা যখন কোন ব্যক্তির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ, তখন যদি কেউ তোমদের নিকট সেই নেতৃত্ব দখল করার উদ্দেশ্যে আসে এবং সে তোমাদের শক্তিকে প্রতিহত করতে চায় ও তোমাদের ঐক্যবদ্ধ সমাজকে ছিন্ন ভিন্ন করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে তোমরা তাকে হত্যা কর।

মুসলিম জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্বান ও জ্ঞানী (the greatest among the men of learning in the world of Islam) ইবনে সীনা (৯৮০-১০৩৭) লিখেছেনঃ

The legislature must then decree in his law that if someone secedes and lays claim to the Caliphate by virtue of power or wealth. Then it become the duty of every citizen to fight and kill him. If the citizen are incapable of doing so. Then they disobey God and commit an act of unbelief

(Ibn Sena, Healing Metaphysics in Learner and Mahdi op cit pp 104-105 and The political Economy of the Islamic State p-18-19)

বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান -মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার যোগ্য কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি, যার মনোভাব হবে প্রথম নির্বাচিত খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (র)-এর মনোভাবের মত। রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর তিনি খলীফা নির্বাচিত হয়ে যে ভাষণসমূহ দিয়েছিলেন, তন্মধ্যে একটি ভাষণে তিনি তা অকপটে ব্যক্ত করেছিলেন। বলেছিলেনঃ [আরবী*************************************]

হে জনগণ! তোমরা যদি ধারণা করে থাক যে, আমি নিজ আগ্রহের ভিত্তিতে তোমাদের এই খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, অথবা ইচ্ছা করে, নিজেকে তোমাদের ও অন্যান্য সব মুসলমানদের উপর প্রাধান্য প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, তাহলে মনে রাখবে, এ কথা কিছুমাত্র সত্য নয়। যার হাতে আমার প্রাণ-জীবন, সেই আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি তা নিজ আগ্রহে গ্রহণ করিনি, নিজেকে তোমাদের বা কোন একজন মুসলমানের তুলনায় বড় মনে করে -বড় করে তোলার উদ্দেশ্যে তা গ্রহণ করিনি। আমি কখখনই তা পাওয়ার লোভ করিনি -না কোন দিনে, না রাতে। এজন্য আল্লাহর নিকটও কখনও প্রার্থনা করিনি, না গোপনে, না প্রকাশ্যে। আসলে একটা অনেক বড় বোঝা বহনের জন্য আমাকে বাধ্য করা হচ্ছে। যা বহন করার কোন সাধ্যই আমার নেই। তবে একমাত্র ভরসা আল্লাহ যদি সাহায্য করেন। আমি বরং মনে মনে কামনা করছি, এ দায়িত্ব রাসূলে করীম (স)-এর অপর কোন সাহাবীর উপর অর্পিত হোক, তিনি এ কাজে ন্যায়পরতা অবলম্বন করবেন। তাহলে এই খিলাফত তোমাদের নিকটই ফেরত যাবে, তখন আমার হাতে করা এই বায়’আত তোমাদের উপর বাধ্যতাপূর্ণ থাকবে না। তোমরা তা তখন তোমাদের পছন্দ করা কোন লোকের উপর অর্পণ করবে। আর আমি তোমাদের মধ্যেরই একজন সাধারণ মানুষ হয়েই থাকব।

তিনি রাসূলে করীম (স)-এর মিম্বারের উপর দাড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেনঃ [আরবী***************]

তোমাদের মধ্যে আমার খিলাফত অপছন্দ করে এমন কেউ আছে কি?……….

থাকলে আমি তার সাথে কথা বলে তা দূর করতে চেষ্টা করব।

পর পর তিনবার এই কথাটি বললেন।

তখন হযরত আলী (র)-ও দাড়িয়ে বললেনঃ [আরবী********************************]

না, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমরা আপনাকে এ দায়িত্ব থেকে সরে যেতে দেব না, কাউকে তা করতেও দেব না। স্বয়ং রাসূলে করীম (স)-ই আপনাকে অগ্রবর্তী করেছেন। আপনাকে পেছনে ফেলতে পারে এমন কে কোথায় আছে?

মুসলিম জনগণ রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচন করবে

বস্তুত এ-ই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের মৌলিক দর্শন। মুসলিম জনগণই তাকে নিজেদের সন্তুষ্টি  ও স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা-উদ্যোগের ভিত্তিতে নিয়োগ করবে। এ ছাড়া কারোর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার বা নিয়োগের অপর কোন পন্থা থাকতে পারে না। এই পন্থা ছাড়া অপর কোন ভাবে -উপায়ে বা পন্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আসীন হওয়ার কোন অধিকারই কারোর থাকতে পার না। কেননা আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মতের কার্য সম্পাদনের স্থায়ী-নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছেনঃ

[আরবী********************************]

মুসলিম জনগণের তাৎপর্য হচ্ছে, মুসলিম জনগণের জাতীয় ও সামষ্টিক ব্যাপারাদি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়ে থাকে।

আয়াতটির তাৎপর্য হচ্ছে, মুসলিম জনগণের জাতীয় ও সামষ্টিক কোন কাজ-ই কোন এক ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন হয় না। কোন এক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও কল্পনার ভিত্তিতে কোন নীতি-আদর্শ, পন্থা বা দফা -যা-ই নির্ধারণ করুক, তা মুসলিম জনগণ মানতে বাধ্য নয়। কেননা তারা তো সেই লোক যারা রাব্বুল আলামীনের আহবানে সাড়া দিয়ে তাঁরই অধীনতা মেনে নিয়েছে। আর সেই আল্লাহরই অধীনতা -আনুগত্য স্বীকার করে তারা সালাত কায়েম করে (আয়াতটির প্রথম অংশ)। কাজেই আল্লাহ যেসব সামষ্টিক ব্যাপারে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন বিধান দেন নি, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই তাদের উপর অর্পণ করেছেন -সে সব ব্যাপারে মুসলিম জনগণ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, যাতে মুসলিম জনগণের সুচিন্তিত ও স্বতঃস্ফূর্ত মতের প্রতিফলন ঘটবে। আর তাদের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ যে তাদের সামষ্টিক কার্যাবলীর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তাতে কারোরই একবিন্দু সন্দেহ থাকতে পারে না। অতএব সে কাজ জনমতের ভিত্তিতেই সুসম্পন্ন হতে হবে।

রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে জনমতের অংশ গ্রহণ কুরআনী বিধান অনুযায়ী অপরিহার্য স্বৈরতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্টব্যবস্থার সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্যের এ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই কারণে নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেনঃ [আরবী******************************]

মুসলিম জনগণের সাথে পরামর্শ না করে তাদের মত জেনে না নিয়ে কেউ কাউকে নেতা হিসেবে বায়’আত করলে বা মেনে নিলে তা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু বাস্তবে তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?…….. এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, একটি দেশের পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ-নারী -সকল নাগরিকই হবে ভোটদাতা। সারাটি দেশ হবে একটি মাত্র নির্বাচনী এলাকা (Constituency)। নির্দিষ্ট দিনে প্রত্যেক ভোটদাতা নিজ ইচ্ছা ও পছন্দমত কাজের গুরুত্ব ও দায়িত্বের বিরাটত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতি সহকারে -ভোট প্রদান করবে। কেউ প্রার্থী নেই, কোন ক্যানভাসার নেই। ভোটের জন্য কারোর প্রলোভন বা ভয়-ভীতির সম্মূখীন হতে হবে না কোন ভোটদাতাকে! এর ফলে সারা দেশে যার পক্ষে সর্বাধিক ভোট পড়বে, সে-ই রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হলো বলে ঘোষিত হবে।

কোন দেশে বিশেষ অবস্থার কারণে এইরূপ হওয়া সম্ভব মনে না করা হলে প্রথমে জাতীয় সংসদের পার্লামেন্টের নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নির্বাচিত করে তাদের ভোটে দুই বা ততোধিক নামের একটা প্যানেল তৈরী করা যেতে পারে এবং তারই মধ্য থেকে একজনকে ভোট দেয়ার অবাধ সযোগ সর্বসাধারণ ভোট দাতাদের দেয়া যেতে পারে। এ ভাবে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনেও জনমতের  প্রতিফলন হবে বলে তাকে ইসলামসম্মত মনে করায় কোনই অসূবিধা থাকতে পারে না। বিশেষ করে যখন তা ইসলামের সুস্পষ্ট মানদন্ডের ভিত্তিতে এবং আল্লাহর নিকট জবাবদিহির অনুভূতি সহকারে ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে করা হবে।

রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক, ক্ষমতা-ইখতিয়ার ও অধিকার

ইসলামরে আনুগত্য স্বীকারের প্রতীক স্বরূপ হাতে হাত দিয়ে বায় ‘আত গ্রহণের রীতি প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হয়ে এসেছে। স্বয়ং রাসূল করীম (স) ই এই পদ্ধতি চালু করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বায় ‘আত অনুষ্ঠিত হয় মক্কায় হিজরতের পূর্বে মদীনার কতিপয় আনসার দ্বীন-ইসলাম কবুল করলে এই বায় ‘আত অনুষ্ঠিত হয়। তা বায় ‘আতে আকাবা’ বা আকাবা ‘র বায় ‘আত নামে পরিচিত। মিনা অঞ্চলের একটি নির্জন পর্বত গুহায় গভীর রাতে একান্ত গোপনে এ কাজটি করা হয়। সে বা’আত হয়েছিল আনন্দ-খুশী দর্বলতা-অবসন্নতা অভাব-অনটন ও সচ্ছলতা-উভয় প্রকারের অবস্থায়ই রাসূলে করীমের আনুগত্য করার এবং দ্বীনের জন্য অর্থ ব্যয় করা, ভালো কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজ না করা-করতে নিষেধ করা এবং আল্লাহর-আল্লাহর দ্বীন রক্ষা ও প্রচার-প্রতিষ্ঠায় সকল প্রকারের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে বুক উচু করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উপর। আনসারগণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ দায়িত্বের বোঝা নিজেদের স্বন্ধে গ্রহণ করেছিলেন।

রাসূলে করীম (স)- কে দ্বীন-প্রতিষ্ঠার কঠিন সংগ্রামে সাহায্য সহযোগিতা করা এবং নিজেদের ও আপন স্ত্রী-পরিজনের ন্যায় তাকেও রক্ষণাবেক্ষণ করার এ বায়’আত-ই ইসলামে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রথম ভিত্তি রচনা করেছিল। অতঃপর খুলাফায়ে রাশেদুনের ক্ষেত্রে এই বায়’আতকে পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছে। এ বায়’আতের পরই রাষ্ট্রপ্রধান তার দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হয়েছে এবং জনগণের জন্য তার আনুগত্য করা সর্বাধিক কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে।

রাষ্ট্রীয় আনুগত্য স্বীকারের জন্য হাতে হাত দিয়ে এই বায়’আত করা একটি সুন্নত হিসেবে গণ্য হলেও তা কোন চিরন্তন আদর্শ বা পদ্ধতি রূপে অনুসৃত হবে, শরীয়তের দৃষ্টিতে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আধুনিক কালে ব্যালটের মাধ্যমেও এ বায়’আতের কাজ সুসম্পন্ন হতে পারে এবং সর্বাধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হতে পারে।

পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব দ্বিবিধঃ ইসলাম কায়েম ও কার্যকর করা এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ইসলামের আদর্শ ও রীতি-নীতি অনুযায়ী আঞ্জাম দেয়া। অবশ্য রাষ্ট্রপ্রধানকে শু’রার পরামর্শ গ্রহণ এবং মজলিসে শু’রার সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা ওহী গ্রহণকারী স্বয়ং নবী করীম (স) কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।[আরবি………………..]

তোমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি পারস্পরেক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলে তোমাদের জীবন মৃত্যূর তুলনায় শ্রেয়।

রাসূলে করীম (স)- এর প্রতি এই নির্দেশ যে আয়াতটিতে দেয়া হয়েছে, তার শুরুতে বলা হয়েছেঃ তুমি আল্লাহর রহমতে অত্যন্ত নরম দিল। তুমি যদি রুঢ়-কর্কশ পাষাণ-রিদয় হতে তাহলে লোকেরা তোমার চারপাশে থেকে সরে যেত। অতএব তুমি তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা কর। অতঃপর বলা হয়েছেঃ আর জাতীয়-সামষ্টিক ব্যাপারাদিতে তাদের সাথে পরামর্শ কর। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে-সমাজের লোকদের সাথে সামষ্টিকভাবে পরামর্শ করা ইসলামী সমাজের একটা বিশেষত্ব। এ বিশেষত্ব না থাকলে ইসলামী সমাজ হতে পারে না। অতএব ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ করতে হবে,জনমত জানতে হবে এবং সম্মুখবর্তী সামষ্টিক ব্যাপারে জনগণ নির্বাচিত মজলিসে শু’রা যে বিষয়ে পরামর্শ দেবে,রাষ্ট্রপ্রধান তা অগ্রাহ্য করতে পারবে না।

এই পর্যায়ে দু’টি মত স্পষ্ট। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ [আরবি…………………]

তুমি যখন কোন কাজ করার সংকল্প গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভরতা গ্রহণ করে সে কাজটি করে ফেল।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকল্প করা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণককি পরামর্শ গ্রহণ বা শু’রার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে হবে কিংবা শু’রার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র না করেই নিদ্ধান্ত বা সংকল্প গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্র প্রধানের রয়েছে?

কিছু সংখ্যক মনীষীর মত-শু’রার সিদ্ধান্ত ছাড়াও রাষ্ট্রপ্রধানের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা ও কল্যাণ চিন্তার ভিত্তিতে একান্ত নিজস্বভাবে সংকল্প ও পদক্ষেপ  গ্রহণের অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান শু’রার পরামর্শ বা সিদ্ধান্তের অধীন নয় এবং সে তা মেনে নিতে একান্তভাবে বাধ্যও নয়। এমন নয় যে, শু’রার সিদ্ধান্তের সামান্য বিরুদ্ধতা করারও তার ইখতিয়ার থাকবে না। সে পরামর্শ নেবে; কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্ত ও সংকল্প গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্রপ্রধানের এবং তার এটা কর্তব্যও।

কিন্তু এ মতের একটি মারাত্বক দিক হচ্ছে, এরূপ ইখতিয়ার ও অধিকার থাকলে রাষ্ট্রপ্রধানের স্বৈরতান্ত্রিক ভূমিকা অবলম্বন অনিবার্য পরিণতি কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র-দর্শনে এই ভূমিকা অবলম্বনের কোন অবকাশ নেই।

তাই অন্যান্য মনীষীদের মত হচ্ছে, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যত পদক্ষেপ গ্রহণ রাষ্ট্রপ্রধানেরই কাজ এবং দায়ীত্ব। তবে তাকে তা করতে হবে মজলিসে শু’রার পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে, তা বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে নীয়।

ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কর্তব্য

ইসলামী রাষ্ট্র রাষ্ট্রের সমস্ত জনগণের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে। জনগণের বৈষয়িক জীবনকে সুষ্ঠুরূপে পরিচালনার এবং তাদের পরকালীন জীবনে মুক্তি ও সাফল্যের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব হিসেবে দু’টি কথার উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছে,দ্বীন-ইসলামকে পূর্ণরূপে কার্যকর ও সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা। ইসলামের আইন বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ইসলামের রীতি-নীতি অনুযায়ি গোটা রাষ্ট্রকে পরিচালিত করা। এক কথায় বলা যায় দ্বীন-ইসলামকে বাস্তবায়িত করাই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কারণে ফিকাহবিদগণ ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন এই ভাষায়ঃ[আরবি…………..]

ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় ব্যাপারের দিকে সাধারণ নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব।

আর রাষ্ট্রপ্রধানের পনিচিতিস্বরূপ বলা হয়েছেঃ [আরবি…………………………]

দ্বীন কায়েম করা ও মুসলিম মিল্লাতের আদর্শ ও মান রক্ষা করার কাজে রাসূলের প্রতিনিধিত্ব করা-এ কারণেই তার অনূসরণ করা সমগ্র উম্মতের কর্তব্য।

আল্লামা মাওয়ার্দী ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ [আরবি……………………..]

দ্বীনের পাহারাদারী, সংরক্ষণ ও দুনিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনে নবুয়্যাতের প্রতিনিধিত্ব করার উদ্দেশ্যেই তা প্রুতষ্ঠিত।

আর আল্লামা ইবনে খালদূন সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ [ আরবি…………………………]

জনগণের পরকালীন ও বৈষয়িক কল্যাণ-যার পরিণতি সেই পরকাল-শরীয়াতের দাবি অনুযায়ী-সাধনের সর্বাত্নক দায়িত্ব গ্রহণ। কেননা শরীয়াত দাতার দৃষ্টিতে দুনিয়ার সমস্ত অবস্থা প্রকৃত পক্ষেই পরকালের কল্যাণের দৃষ্টিতে সম্পন্ন হতে হবে। তাই তা হচ্ছে দ্বীনের সংরক্ষণ ও দ্বীণের সাহায্যে বিশ্বব্যবস্থা সংগঠন ও পরিচালনে শরীয়াতদাতার প্রতিনিধিত্ব। ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য যেমন বিরাট তেমনি মহান। তাই দুইটি কারণে রাষ্ট্রপ্রধান তার এই পদের অযোগ্য প্রমাণিত হয়।

একটি তার ব্যক্তিগত সততা-বিশ্বস্ততা ক্ষুন্ন হওয়া। আর দ্বিতীয়টি, তার দৈহিক বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গত ত্রুটি ও অক্ষমতা।

ব্যক্তিগত সততা ও বিশ্বস্তা ক্ষুন্ন হওয়ার অর্থ রাষ্ট্রপ্রধানের ‘ফাসিক’–শরীয়াতের সীমালংঘনকারী প্রমাণিত হওয়া। এর দু’টি দিক। একটি লালসা-কামনা চরিতার্থ করা। আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক তার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের উদ্রেক।

প্রথমটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গজনিত ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট। আর তা হচ্ছে তার কোন হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া, শরীয়াতে ঘৃণিত-নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হয়ে পড়া। যৌন-লালসার দ্বারা চালিত হয়ে কোন জঘন্য কাজ করা।  যেমন যিনা-ব্যাভিচার, মদ্যপান, সীমাতিরিক্ত ক্রোধ। এ চরিত্রগত দোষ থাকলে তার পক্ষে ইসলামী রাষ্টের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর এই ধরনের অপরাধ করলে সে যেমন নিজেকে উক্ত পদের সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণ করে, তেমনি সেই উচ্চতর পদটিরও করে চরম অপমান।

দ্বিতীয় প্রকারের সীমালংঘনমূলক কাজের সম্পর্ক আকীদা-বিশ্বাসের সাথে। আকীদা-বিশ্বাসে ‘ফিসক’ দেখা দিলে তা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা শরীয়াত লংঘনের মতই অপরাধ। অতঃপর সে রাষ্ট্রপ্রধান পদে নিযুক্ত থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে। কেননা আকীদায় ‘ফিসক’ দেখা দিলে তা কুফর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব নয়।

এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে হযরত উবাদাতা উবাদাতা ইবনুস্ মাসিত (রা) বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী………………….)

আমরা রাসূলে করীম (স)-এর নিকট বায়’আত করেছি, আমাদের আনন্দ অসুন্তুষ্টি, কঠিনতা বিপদ ও সুবিধা এ আমাদের স্বর্থ –সর্বাবস্থায়ই আমরা শুনব ও মানব –অনুগত থাকব। আর দায়িত্বশীলের সাথে কোন ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করব না। তবে এমন কুফরি যদি দেখতে পাই যা স্পষ্ট ও প্রকাশ্য –সর্বজনবিদিত এবঙ যা’র কুফর হোয়ার একাট্য দলীল আল্লাহর নিকট থেকে থাকবে, তাহলে শুনা ও মানা –আনুগত্যের উক্ত শপথ কার্যকর নয়।

রাষ্ট্রপ্রধানের এ রূপ চারিত্রিক পতনের দরুন তাকে পদচ্যুত করা কিংবা তার আনুগত্য করতে অস্বীকার করার অধিকার মুসলিম জনগণের সংরক্ষিত বলে বহু ফিকহবিদ মত প্রকাশ করেছেন।

দৈহিক আঙ্গিক ক্রটি ও অক্ষমতা পর্যায়ে ইন্দ্রিয়নিচয়ের অক্ষমতাও গণ্য। দায়িত্ব পালনে আঙ্গিক অসামর্থ বা পংগুত্ব এ পদের পথে মারাত্মক ধরনের বাধা। (ঐ)

ইসলামী ফিকহবিদ মনীষীদের ব্যাখ্যানুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব এ কর্তব্য নিম্নরূপ;

১. দ্বীন-ইসলাম সংরক্ষণ মুসলিম উম্মতের আদর্শ ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, সময়োপযোগী ব্যাখ্যা সহকারে;

২. বিবদমান পক্ষমূহের উপর আল্লাহর আইন কার্যকরকরণ, ঝগড়া বিবাদ ইসলামী আইন অনুযায়ী মীমাংসা করার ব্যবস্থাকরণ;

৩. প্রত্যেকটি নাগরিকের বৈধ দখলী স্বত্ব জবরদখল বা বেআইনী দখল থেকে রক্ষা করা, উদ্ধার করা, যেন প্রত্যেকে নিজ দখলের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে, তারা কোন বেআইনী বাধা-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হয় ও নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন সকলের পক্ষেই সম্ভব হয়। এক কথায় শান্তি-শৃঙ্খলা (Law and order) স্থাপন ও সংরক্ষণ;

৪. শরীয়াত ঘোষিত ‘হদ্দ’ ও ‘কিসাস’ কার্যকরকরণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করা, যেন আল্লাহর হারাম ঘোষিত কোন কাজ হতে না পারে, সকলের অধিকার সকল প্রকারের আঘাত ও লুটতরাজ থেকে পূর্ণরূপে রক্ষা পেতে পারে। কোন লোকই স্বীয় ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। (দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন –দুর্বলকে শক্তিশালী করা ও সবলদের সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করা –সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা ও অধিকারে প্রতিষ্ঠিত করাও এর মধ্যে পণ্য);

৬. ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা। অবশ্য প্রথমে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দান ও জিযিয়ার বিনিময়ে বশ্যতা স্বীকারের প্রস্তাব পেশের পর সবশেষ উপায় হিসেবে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী শরীয়াতের এটাই স্থায়ী বিধান;

৭. কর, খাজনা ও অন্যান্য সরকারী পাওনা সঠিকরূপে আদায় করার ব্যবস্থা করা। তা শরীয়াতের স্থায়ী নীতি অনুযায়ী হতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোনরূপ নির্দয়তার প্রশয় দেয়া চলবে না;

৮. বায়তুলমাল সংরক্ষণ। তা থেকে যাকে যা দেয়ার তার পরিমাণ নির্ধারণ ও যথাযথ দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা, তাতে বাড়াবাড়ি না করা, অপচয় না করা, আর পাওনা পরিমাণেও হ্রাস-বৃদ্ধি না করা, যথাসময়ে দিয়ে দেয়া –বিলম্ব না করা;

৯. দয়িত্বশীল কর্মচারী নিয়োগ করা, তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়া, তাদের নিকট থেকে কাজ বুঝে নেয়া –তাদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা;

১০. সমস্ত জাতীয় ও সামষ্টিক ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হওয়া, পরিস্থিতি অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও তদানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, যেমন সার্বিকভাবে গোটা উম্মত রক্ষা পায় এবং মিল্লাত সংরক্ষিত থাকে।

আল্লামা আল-গাররা তাঁর ‘আল-আহকামুস্ সুলতানীয়া’ গ্রন্থের ১১ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা মাওয়ার্দী তাঁর ‘আল-আহকামুস্-সুলতানীয়া’ গ্রন্থের ১৫ পৃষ্ঠায় এই কথাগুলি উদ্বৃত করেছেন। আমি মনে করি, মনীষীগণ এর কোন একটি কথাও কল্পনা করে লিখেন নি; বরং কুরআন মজীদের আয়াত থেকেই তা নিঃসৃত। এ পর্যায়ের দু’টি আয়াত আমি এখানে উদ্বৃত করছিঃ

(আরবী……………………)

তোমাদের মধ্য থেকে যারাই ঈমান আনবে ও ইমান অনুযায়ী নেক আমল করবে, তাদের জন্য আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে খলীফা –রাষ্ট্র পরিচালক –বানাবেন যেমন করে তাদের পূর্ববর্তীদের তিনি খলীফা বানিয়েছিলেন এবং যেন তাদের জন্য তাঁর পছন্দ করা দ্বীনকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাদের ভয়-ভীতি-আশঙ্কার কেবলমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করবে, তাঁর সাথে একবিন্দু জিনিসকেও শরীক করবে না।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, আল্লাহর খিলাফত –ইসলামী রাষ্ট্রের মৌল উদ্দেশ্যই হচ্ছে দ্বীন ইসলামকে সুদৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত করা, দ্বীনকে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত করা, দ্বীনের মান-মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং সেখানকার জনগণের জীবনকে সকল প্রকারের ভয়-ভীত ও বিপদ আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে স্বাধীন নির্বিঘ্ন জীবন যাপনের নির্ভরযোগ্য সুযোগ করে দেয়া। বস্তুত দুনিয়ার প্রত্যেক দেমের আপামর জনগণের তা-ই তো কাম্য এবং তা সবকিছুই পূর্ণ মাত্রায় বাস্তবায়িত হতে পারে কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানই এইসব কাজ করার জন্য প্রধান দায়িত্বশীল।

আর দ্বিতীয় আয়াতঃ

(আরবী…………………)

এবং তোমরা শত্রুপক্ষের মুকাবিলা করার লক্ষ্যে যথাসাধ্য শক্তি ও যানবাহন সংগ্রহ ও প্রস্তুত কর। তদ্দারাতোমরা আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করবে –তোমাদের নিজেদের শত্রুদেরও। এদের ছাড়া আরও অনেক শত্রু আছে যাদের তোমরাজান না, আল্লাহ তাদের জানেন।

উভয় আয়াতে বলা কথা ও কাজ যদিও সামষ্টিকভাবে মুসলিম উম্মতের জন্য কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানই যেহেতু মুসলিম উম্মতের প্রতিনিধি, সকলের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল, তাই রাষ্ট্রপ্রধানকেই এ কাজসমূহ করতে হবে।

কুরআনের ঘোষণাহলো

(আরবী………………..)

রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী……………..)

‘ইমাম’ রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী……………..)

রাষ্ট্রপ্রধান মিথ্যাবাদী বা কাফির হলে তার আনুগত্য করা যাবে না।

কুরআনের নির্দেশঃ

(আরবী…………)

রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার

রাষ্ট্রপ্রধান তার উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করলে তার দুইটি প্রধান অধিকার অবশ্য স্বীকৃতব্য হয়ে পড়েঃ একটি জনগণের উপর তার অধিকার এবং দ্বিতীয়টি, জনগণের ধান-মালে তার অধিকার। বলাবাহুল্য, এ অধিকার ব্যক্তিগতভাবে নয়, কেবলমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বসমূহ পালনার্থে।

১. জনগণের উপর রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার হচ্ছে, জনগণ তাকে মান্য করবে, তার আনুগত্য স্বীকার করবে। এ অধিকার নিশ্চয়ই নিরংকুশ ও শর্তহীন নয়। এ অধিকার তার নিজের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা এবং আল্লাহ ও রাসূলের আইন-বিধানের সীমার মধ্যে থকে তাকে মেনে চলতে জনগণকে বলার মধ্য সীমিত। এর বাইরে কারোরই কোন আনুগত্য থাকতে পারে না।

২.রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার গৃহীত নীতি বা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিরোধ হওয়া সম্ভব। জনগণ তার সাথে মতবিরোধ করতে পারে, করার অধিকার স্বয়ং আল্লাহই তাদেরকে দিয়েছেন। এ অধিকার হরণ করে নেয়ার কোন অধিকার রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার –কারোরই নেই এবঙ মতবিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসা হতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের ইচ্ছানুযায়ী নয়, বরং মতবিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসা হতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের ইচ্ছানুযায়ী নয়, বরং তা হবে আল্লাহ ও রাসূল অর্থা….. কুরআন ও সুন্নাতের ভিত্তিতে, যা মেনে নিতে উভয় পক্ষ সমানভাবে বাধ্য। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের আনুগত্যের সীমা রাসূলে করীম (স) নির্ধারিত করে দিয়েছেন। বলেছেনঃ

(আরবী…………)

সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাফরমানী করে কারোরই আনুগত্য করা যায়না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর আনুগত্য করা যেতে পারে ততক্ষণ এবং সেসব কাজে, যতক্ষণ এবং যেসব কাজে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নাফরমানী হবে না।

ইসলামী হুকুমাতের বিভিন্ন বিভাগ

[তিনটি বিভাগ –আইন প্রণয়ন বিভাগ –মসলিসে শু’রা –শু’রা সদস্যদের যোগ্যতার মান –নির্বাহী বিভাগ –নির্বাহী বিভাগ –নির্বাহঅ সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব –আমর বিল মা’রুফ ও নিহী আনিল মুনকার নির্বাহী সংস্থারই দায়িত্ব –সরকার সংস্থারদায়িত্ব –রাসূলে করীম (স)-এর যুগের প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ –প্রশাসনিক দায়িত্ব নিযুক্ত লোকদের জরুরী গুণাবলী –বিচার বিভাগ –জনগণের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ সৃষ্টির কাণ –বিচার বিভাগের লক্ষ্য অর্জনের পন্থা –বিচারকের যোগ্যতা-কর্মক্ষমতা ও বিচার কার্যের উপযুক্ততা –অর্থনৈতিকও রাজনৈতিকভাবে বিচারকের স্বাতস্ত্র্য ও স্বাধীনতা –বিচার-নীতির পূর্ণ সংরক্ষণ –সাক্ষ্যদান।

———————————————————————————————————–

তিনটি বিভাগ

দুনিয়ার সাধারণ সরকার সমূহের ন্যায় ইসলামী হুকুমতেও তিনটি প্রধান বিভাগ রয়েছে। এই তিনটি বিভাগের ভারসাম্যপূর্ণ সক্রিয়তা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই গড়ে উঠ একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার ব্যবস্থা।

এ তিনটি বিভাগেরই প্রত্যেকটির একটি নিজস্ব দায়দায়িত্ব, ক্ষমতা ও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

সাধারণত দাবি করা হয়, একটি সরকার ব্যবস্থা এরূপ তিনটি ভাগে বিভক্ত করার কাজটি আধুনিক পাশ্চাত্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উদ্ভাবন ও অবদান। কিন্তু ঐতিহাসিক ও বাস্তবতার বিচারে এ দাবি সম্পূর্ণ মূল্যহীন। কেননা আধুনিক পাশ্চাত্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান বড়জোর বিগত শতাব্দীর ব্যাপার। কিন্তু দেড় হাজার বছর পূর্বে ইসলাম ইসলামী হুজুমতের সেই প্রথম প্রতিষ্ঠালগ্নেই রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীকে এই তিনটি বিভাগে বিভক্ত করেছে। কুরআন মজীদ ও রাসূলের সুন্নাতেই এ বিভক্তি স্পষ্টভাবে বিধৃত।

আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ যে সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে, দেড় হাজার বছর পূর্বে প্রথম প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রও প্রায় সেই সব দায়িত্বই পালন করেছে। অবশ্য বলা যেতে পারে, তার প্রেক্ষিত ভিন্নতর ছিল এবঙ তার আয়তনও ছিল সীতিম। রাষ্ট্রসমূহকে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার জন্য দায়িত্ব ও জবাবদিহির ভিক্তি যেমন অপরিহার্য, তেমনি তার কার্যকারতার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রাথিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য।

প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (স)-কে এই বিভক্তির প্রতি লক্ষ্য রেখেই কাজ করতে হয়েছে তার সমগ্র রাষ্ট্রীয় জীবনে।যদিও তার স্বতন্ত্র নামকরণ করা হয়নি এবং সেজন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রাসাদে ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরও খোলা হয়নি।

ইসলামী রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যাবলীকে অবশ্যই নিম্নলিখিত তিনটি ভাগে ভাগ করে নিতে হবেঃ

১. আইন বিভাগ

২. নির্বাহী বিভাগ এবং

৩. বিচার বিভাগ

অতঃপর এর প্রত্যেকটি বিভাগ পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা যাচ্ছে।

আইন-প্রণয়ন বিভাগ

পূর্বেই চূড়ান্তভাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, ইসলামে আইনদাতা (Law-giver) হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা। সে আইন তাঁরই মনোনীত প্রতিনিধি রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিল হয়েছে। তিনি যে আইন নিজে পালন করেছেন, জনগণকে শুনিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন ও প্রচার করেছেন, প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, আল্লাহর নির্দেশ, অনুমতি ও শিক্ষানুযায়ী উপবিধি (By-laws) তৈয়ার করেছেন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তা কার্যকর করেছেন, জনগণের উপর জারি করেছেন। কাজেই ইসলামে আইন প্রণয়নের (Legislation) কোন ধারণা নেই। রাসূলে করীম (স) এর যুগে বা কোন অবকাশ নেই। যার প্রয়োজন আছে, তা হচ্ছে, আল্লাহর দেয়া আইন-আদেশকে রাসূলে করীম (স) প্রদত্ত ব্যাখ্যা এবং খুলাফায়ে রাশেদুনের আমলে তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম  অধ্যয়ন, অনুবাধন, অনুসরণ ও কার্যকরণ –সমসাময়িক সমাজ পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে।

পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আল্লাহ বা রাসূলের কোন অস্তিত্ব বা কার্যকরতা স্বীকৃত নয়। তাতে মানুষই মানুষের জন্য আইন রচনা করে। তথায় আইন রচনার জন্য যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, তা পার্লামেন্ট (Parliament) নামে পরিচিত। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আল্লাহর দেয়া আইন পর্যায়ে মানুষের যতটুকু এবং যা কিছু করণীয়, তা করবার জন্য একটি সংস্থা অবশ্যই গঠিত হবে। ইসলামী পরিভাষা হিসেবে কাজের প্রকৃতির দৃষ্টিতে তার নাম ‘মজলিসে শু’রা’ হওয়াই বাঞ্চনীয়।

কেননা ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিকভাবে কোন আইন প্রণয়নের কাজ নেই। আছে রাসূলে করীম (স)-এর সুন্নাতের আলোকে আল্লাহর আইনসমূহকে সন্ধান করা, ধারাবদ্ধ (Codify বা Codification) করা এবং আইন কার্যককরণের পদ্ধতি ও প্রেক্ষিত রচনা করা। বলা যায়, ইসলামী আইনের কার্যকর হওয়ার চারটি পর্যায়ঃ

১. আইন রচনা –আল্লাহর কাজ;

২. আইন সন্ধান, ধারাবদ্ধকরণ ও প্রেক্ষিত নির্ধারণ –মসলিসে শু’রার কাজ;

৩. আইন কার্যকরকরণ (নির্বাহী পর্যায়ের আইন) –নির্বাহী কর্মকর্তার; এবং

৪. আইনের ভিত্তিতে পারস্পরিক নিষ্পত্তি ও অপরাধীকে দন্ডদান –বিচার বিভাগের কাজ।

কুরআন মজীদের আয়াত ও রাসূলে করীম (স) –এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এ পর্যায়ে আমাদের আলোচ্য মজলিসে শু’রা।

মজলিসে শুরা

কুরআনের ঘোষণানুযায়ী সমগ্র জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়  গুরুত্বপূর্ণ  ব্যাপারাদিতে পরামর্শ দেয়ার, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের সমস্ত দায়িত্ব মসলিশে শু’রাকেই বহন করতে হবে। অতএব রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন ও নিয়োগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ‘মজলিশে শু’রা’ গঠন। আর এই মজলিস যে মুসলিম জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোট দানের মাধ্যমেই গঠন করতে হবে –মজলিসে শু’রা গঠনের অপেক্ষা উত্তম পন্থা আর কিচু হতে পারে না –তা অনস্বীকার্য। যদিও শু’রার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পরামর্শদানের দায়িত্ব ও অধিকার দেশের প্রত্যেকটি বয়স্ক নাগরিকেরই। কিন্তু সকলে একত্রিত হয়েই তো আর শু’রার দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তাই সকলের স্বাধীন-স্বতঃস্ফূর্ত ভোট দানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সঙখ্যক সদস্য সারা দেশ থেকে নির্বাচিত করতে হবে। আর তা করা হলেই আইন নির্ধারণ ও ধারাবদ্ধকরণে জনমতের প্রতিফলন সঙঘটিত হওয়া সম্ভবপর হবে। জনগণ যেহেতু স্বাধীন ও স্বেচ্ছামূলক অধিকারের ভিত্তিতে ইসলামী আদর্শে উত্তীর্ণ ব্যক্তিকেই সর্বাধিক সংখ্যক ভোট দিয়ে মসলিসে শু’রার সদস্য নির্বাচন করবে তাই আশা করা যায় যে, একদিকে নির্বাচিত সদস্যরা মসলিসে জনমতেরই প্রকাশ ঘটাবে এবং অপরদিকে নির্বাচকমন্ডলী তাদের নির্বাচিত শু’রা সদস্যের মতামতের সাথে একাত্ম থাকবে। উপরন্তু তারা নিজেরা যদি কোন বিশেষ বিষয় শু’রার আলোচ্য সূচীর অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজনীয় মনে করে, তাহলে তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে তা খুব সহজেই করতে পারবে।

শুরা সদস্যদের যোগ্যতার মান

অবশ্য ইসলাম মু’রা সদস্য হওয়ার যোগ্যতার একটা মান নির্দিষ্ট করে দিয়েছে এবং শু’রা সদস্যদের নির্বাচকমন্ডলীকে নির্বাচনকালে সেই মানকে রক্ষা করেই তাদের ভোট প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, আঞ্চলিকতা বা অন্য কোন বস্তুগত বা বৈষয়িক দিককে কোন রূপ গুরুত্ব দেয়া মজলিসে শু’রা গঠনের মহান উদ্দেশ্য ক্ষুন্ণ ও বিনষ্ট করারই শামিল।শু’রা সদস্য নির্বাচনে ইসলামের ঈমানী ও নৈতিক মান ছাড়াও জাতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নের দিকটিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। এ ব্যাপারে কোনরূপ উপেক্ষা প্রদর্শন জাতীয় লক্ষ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

কুরআনের আলোকে মজলিসে শু’রার সদস্যদের অবশ্যই ইসলামী জীবন বিধান ও আইন-কানুন সম্পর্কে পূর্ণ অবিহিত হতে হবে। জনগণের প্রতি আন্তরিক নিষ্ঠাবান কল্যাণকামী হতে হবে। বিশ্বস্ত, আল্লাহর নিকট জবাবদিহির তীব্র অনুভূতি সম্পন্ন, আমানতদার ও দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। অন্যথায় তাদের দ্বারা জাতীয় আদর্শ যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি ক্ষুণ্ন হবে সার্বিক কল্যাণ এবং সারা দেশে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার এবং জাতি ও রাষ্ট্রের কঠিন বিপদে পড়ে যাওয়াও কিছুমাত্র অসম্ভব নয়।

কুরআনের দৃষ্টিতে বেতন বা মজুরীর বিনিময়ে শ্রমিক বা কর্মচারীকে কাজে লাগাতে গেলে সেই মজুরী কর্মচারীকেও শক্তি ও কর্মক্ষমতা সম্পন্ন এবং সর্বোপরি বিশ্বস্ত হওয়া কুরআনের দৃষ্টিতে কাম্য। তাই কুরআনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী………………)

তুমি যাকে কোন কাজে মজুরীর বিনিময়ে নিযুক্ত করবে, তার শক্তিশালী ও যোগ্যতা সম্পন্ন এবং অতীব বিশ্বস্ত আমানতদার হওয়াই সর্বোত্তম।

কাজেই রাষ্ট্রপ্রধানের ন্যায় মজলিসে শু’রার সদস্যেরও অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ও বিশ্বস্ত হওয়াই ইসলামের দৃষ্টিতে কাম্য।

সবচেয়ে বড় কথা, মজলিসে শু’রার উপর অর্পিত দায়িত্ব হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ইসলামী আইন বের করা ও ধারা হিসেবে সজ্জিত করা। এজন্য শু’রা সদস্যদের –অন্তর তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সঙখ্যক সদস্যদের যে কুরআন-সুন্নাহ পারদর্শী হতে হবে তাতে কোনই সন্দেহের অবকাশ নেই। এ পর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছেঃ

(আরবী………….)

তোমরা নিজেরা যদি না-ই জানো, তাহলে যারা জানে, তাদের নিকট জিজ্ঞাসা কর।

অর্থাৎ যারা জ্ঞানে না তারা যারা জানে তাদের নিকট জিজ্ঞাসা করে নেবে। এই ‘যারা জানে’ বলতে পূর্ববর্তী আহলি কিতাবের আলিমদের বোঝানো হয়েছে মনে করা যেতে পারে। তবে তা আয়াতটির নাযিল হওয়ার প্রেক্ষিতের দৃষ্টিতেই মাত্র। কিন্তু কুরআনের কোন আয়াতেই যেমন তার নাযিল হওয়ার প্রেক্ষিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে না, তেমনি এ আয়াতটিও। তাই এ নির্দেশ সাধারণভাবে একটি স্থায়ী বিধান হিসেবেই গ্রহণীয়।

মজিলেস শু’রা মর্যাদাই হচ্ছে এই যে, তার নিকট যাবতীয় বিষয়ে ইসলামী আইন চাওয়া হচ্ছে। তাকে নিযুক্তই করা হয়েছে জাতীয়, সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদিতে ইসলামী আইন দেয়ার জন্য। আর ইসলামী আইনের একমাত্র উৰস যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ, তাই শু’রার সদস্যদেরকে কুরআন ও সুন্নাহতে মৌলিকভাবে ইজতিহাদী যোগ্যতা সম্পন্ন জ্ঞানী হতে হবে। অন্যথায় তাদের দ্বারা দায়িত্ব পালন কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আয়াতের ‘আহলিয্-যিকর’ অর্থ ‘আহলিল ইলম’–কুরআন সুন্নাহর ইলম এর অধিকারী।

এই পর্যায়ে নিম্নোব্ধৃত আয়াতটিও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ইরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী………….)

লোকদের নিকট শান্তি বা ভীতির কোন খবর এলেই তারা তা চতুর্দিকে প্রচার করে দেয়। অথচ বিষয়টি যদি রাসূল ও দায়িত্বশীলদের নিকট পৌছিয়েঁ দিত, তাহলে যারা তার নিগূঢ় তত্ত্ব বের করার কাজে নিয়োজিত তারা তার মর্ম জেনে নিত। আর আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া যদি তোমাদের উপর না হতো, তাহলে তোমরা অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত আর সবাই শয়তাদের অনুসরণ করতে।

আয়াতটি যদিও মদীনার সমাজে মুনাফিকদের শত্রুতামূলক কর্মতৎপরতার প্রেক্ষিতে এবং তাদের কাজের দোষ বলা হয়েছে। কিন্তু আয়াতটির মোটামুটি বক্তব্যের মধ্যেই আমাদের আলোচ্য বিষয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব নিহিত রয়েছে।

তা হচ্ছে, মুসলিম সমাজের সম্মুখে শাস্তি বা সুখের কোন খবর এলেই তা নিজ থেকে প্রচার করতে শুরু করে না দিয়ে বরং বিষয়টি রাসূলে করীম (স) ও তাঁর নিয়োজিত বিভিন্ন ব্যক্তির কারোর নিকট পৌছিয়েঁ দেয়াই কর্তব্য। তাহলে সেই খবরের মধ্যে নিহিত সূক্ষ্ম তত্ত্ব তাঁরা বের করতে সক্ষম হতেন।

আয়াতে ব্যবহৃত (আরবী………..) থেকেই (আরবী………) শব্দটি এসেছে এবং তার অর্থ গবেষণা করে নিগূঢ় তত্ত্ব বের করা। ইসলামী আইন জানার জন্য এই ‘ইস্তিনবাত’–নিগূঢ় তত্ত্ব বের করার পদ্ধতি গ্রহণ অপরিহার্য। আর তা সম্ভব কেবলমাত্র সেই লোকদের পক্ষে, যারা ইসলামী জ্ঞান-গবেষণায় বিশেষ পারদর্শী, যার কুরআন-হাদীস-রাসূলে করীম (স)-এর জীবনের ঘটনাবলীর উত্থান-পতন, চড়াই-উতরাই ও আবর্তন-রিবর্তন সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী এবং যারা আইনের প্রকৃতি ও প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিফহাল। রাসূলে করীম (স) কুরআন ও সুন্নাতের শিক্ষাদানের মাধ্যমে এ কাজের যোগ্যতা সম্পন্ন বিপুল সংখ্যক লোক তৈরী করেছিলেন। রাসূলে করীম (স)-এর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন দিকে এবং কাফিরদের সাথে যুদ্ধের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন যথেষ্ট সঙখ্যক লোক থাকতে হবে, যারা কুরআন-সুন্নাহ্ সামনে নিয়ে গভীর সূক্ষ্ম গবেষণা চালিয়ে প্রয়োজনীয আইন বের (আরবী…………) করতে সক্ষম।

সাইয়েদ কুতুব শহীদ এই আয়াতাংশের তাফসীর লিখেছেনঃ

(আরবী…………..)

অন্যথায় নিত্য পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় নিত্যনব সংঘটিত ঘটনা ও ব্যাপারাদিতে ইসলামসম্মত আইন ধারাবদ্ধ করা মজলিসে শু’রার পক্ষে সম্ভব হবে না।

এ কারণে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে অন্তত কিছু সংখ্যক লোককে উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য বের হয়ে আসবার –প্রয়োজন হলে বিদেশে গমন করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। বলেছেনঃ

(আরবী……………………)

জনগণের মধ্যের প্রত্যেকটি গোষ্ঠী থেকে কিছু সংখ্যক লোক কেন বের হয়ে যায় না দ্বীন সম্পর্কে গভীর সূক্ষ্ম জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে এবং এই উদ্দেশ্যে যে, তারা ফিরে এসে তাদরকে সতর্ক করবে? তাহলে আশা করা যায় যে, তারা সতর্ক হবে।

জনগণকে দ্বীনি বিষয়াদি দিয়ে সাবধান করার জন্য দ্বীন সম্পর্কে গভীর সূক্ষ্ম জ্ঞান প্রথমেই অর্জন করতে হবে। তাহলেই তারা এই সাবধান করা কাজটি যোগ্যতা সহকারে করতে পারবে এবং তাদের এ সাবধান বাণী শুনে জনগণ হেদায়েত লাভ করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

মজলিসে শু’রাকে যেহেতু কুরআন-সুন্নাহর আইন বের করতে হবে ও তার ভিত্তিতে গোটা দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে, তাই কুরআন-সুন্নাহতে বিশেষ পারদর্শিতা সম্পন্ন লোক তাতে অবশ্যই থাকতে হবে। সুনানে আবু দাউদ-এ এই হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী…………..)

তোমরা কুরআন সুন্নাহতে পারবর্দী মু’মিন লোকদের একত্রিত কর। অতঃপর তাদের সমন্বয়ে শু’রা গঠন কর। তবে তাদের কোন একজনের মতের ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত করে ফেলবে না।

একজনের মতে সিদ্ধান্ত করে ফেলতে নিষেধ করার অর্থ, প্রত্যেকটি বিষয়ে শু’রার অধিবেশনে বিস্তারিতভাবে আলোচন-পর্যালোচনা করে –প্রত্যেক সদস্যকে তাতে অংশ গ্রহণ ও মত প্রকাশের –ভিন্নমতের –সমালোচনা করার ও তার ক্রটি দেখাবার অবাধ সুযোগ দেয়ার পর এমনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যা, সর্ববাদীসম্মত –অন্ততঃ বেশী সংখ্যক লোকের মতের ভিত্তিক হবে।

নির্বাহী বিভাগ (Executive)

মজলিসে শু’রা বা পার্লামেন্ট ধারাবদ্ধ আইন পাস হয়ে যাওয়ার পর আধুনিক নিয়মে তাতে রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর হতে হয়। তা না হওয়া পর্যন্ত কোন আইন ‘আইন’ নাম অভিহিত ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনা মাধ্যমে কার্যকর হতে পারে না। রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাক্ষর হওয়ার পরই নির্বাহী কর্মকর্তাদের দ্বারা সারাদেশে তা কার্যকর হবে। তাই নির্বাহী বিভাগ বা আইন-প্রয়োগকারী “অথোরিটি”(Authority) আধুনিক কালের প্রত্যেকটি সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি অপরিহার্য এবং সম্ভবত সবচাইতে বেশী গুরুত্বসম্পন্ন বিভাগ।

আধুনিক কালের প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার হলে প্রেসিডেন্ট ও তার মন্ত্রীসভা (Cabinet), আর পার্লামেন্টারী পদ্ধতির সরকার হলে প্রধান মন্ত্রী ও তার মন্ত্রীদের সমন্বয়েই এ নির্বাহী যন্ত্র গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে প্রাদেশিক কর্মকর্তা আর ‘ইউনিটারী সরকার’ হলে বিভাগীয ও জিলা –প্রভৃতি প্রশাসনিক বিভাগসমূহের কর্মকর্তারা নির্বাহী সরকার যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ। আর বাস্তবতার দৃষ্টিতে এ সরকারই হয়ে থাকে একটি দেশের শাসক ও প্রশাসক।

নির্বাহী সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব

বস্তুত আল্লাহর কুরআন ও রাসূলে করীম (স)-এর সুন্নাত মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক ও ব্যবহারিক জীবনে বাস্তবভাবে প্রয়োগ ও অনুসরণের জন্য। মজিলসে শু’রা যে চিন্তা-গবেষণা –‘ইস্তিনবাত’ করে, পারস্পরিক আলোচনা পর্যালোচনা করে যে আইনসমূহ ধারাবদ্ধ করে দিয়েছে, তারও চরম লক্ষ্য তাই। এই কারণে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রয়োগ ক্ষমতার অধিকারী একটা যন্ত্র এই আইনসমূহ যথাযথভাবে কার্যকরকরণের জন্য অবশ্যই দায়িত্ব থাকতে হবে। অন্যথায় সব কিচুই নিস্ফল ও অর্থহীন।

আইনকে অন্ধ নির্বিচার রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে শুধু জারি করাই তো একমাত্র কাজ নয়, ইসলামের দিক দিয়ে আসল লক্ষ্য হচ্ছে, সে আইনের ভিত্তিতে ব্যক্তি সমাজ ও পরিবার গঠন এবং লালন। সে জন্য পূর্ণ সতর্কতা, সহনশীলতা, দৈর্য ও ক্ষমাশীলতার সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা একান্ত প্রয়োজন। তাহলেই সেই আদর্শ ব্যক্তি, আদর্শ পরিবার ও আদর্শ সমাজ গড়ে উঠতে পারে, যা গড়ার জন্য দুনিয়ায় ইসলামের আগমন। এরূপ গঠনমূলক কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করাবার জন্যই আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন মজীদে ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী………..)

সমস্ত মানুষ নিঃসন্দেহে চরম ধ্বংস ও বিরাট ক্ষতির মধ্যে নিপতিত। তা থেকে রক্ষা পেতে পারে কেবল তরাই, যারা ঈমান এনেছে, নেক আমল করেছে, পরম সত্য ও কল্যাণের উপদেশ ও পরামর্শ একজন অপরজনকে দিয়েছে এবং দ্বীন পালনে দৈর্য ধারণের জন্য পরস্পরকে উৎসাহিত করেছে।

বস্তুত ইসলাম যেমন ব্যক্তির অন্তর দিয়ে ঈমান আনার ব্যাপার, তেমনি ব্যক্তির নিজের জীবনে ও কমের্ তা পালন করার ব্যাপার। কিন্তু ইসলাম শুধু এতটুকু-ও নয় –তা প্রশাসনিক আইন-ও। অতএব তা সরকারের প্রশাসনিক যন্ত্রের বলে অবশ্যই কার্যকর হতে হবে। আর এ কাজের জন্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। আল্লাহর আইন জারি ও যথাযথভাবে কার্যকরকরণে কোনরূপ অনীহা উপেক্ষা বা দুর্বলতা দেখাবার অধিকার কারোরই থাকতে পারে না। বরং এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক যন্ত্রকে অত্যন্ত শক্ত ও অনমনীয় হতে হবে। কুরআন মজীদে এই শক্তিকেই ‘লৌহ’ (Iron) বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী…………)

নিঃসন্দেহে আমরা আমাদের রাসূলগণকে পাঠিয়েছি অকাট্য দলীল প্রমাণ সহকারে এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও মানদন্ড নাযিল করেছি, যেন জনগণ ইনসাফের উপর প্রতিষ্টিত হতে পারে। আর নাযিল করেছি লৌহ। তাতে বিপুল শক্তি যেমন নিহিত, তেমনি জনগণের জন্য অশেষ কল্যাণও।

আয়াতে ‘আল-হাদীদ’‘লৌহ’ বলে প্রশাসনিক শক্তিকেই বুঝিয়েছে, যার কাজ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব –আইনকে মানদন্ডের ভারসাম্য সহকারে জারি করা। এ আইন জারি করার শক্তি যেমন ‘লৌহ’-এর ন্যায় অনমনীয়, তেমনি তা জারির ক্ষেত্রে বাস্তবভাবে সেই অনমনীযতা অবশ্যই অবলম্বনীয়। এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা দেকানো কুরআনের ভাষায় প্রশাসনিক শক্তিকে ‘লৌহ’ বলার পক্ষে চরম অবমাননাকর। ‘লৌহ’ স্বভাবতই অমোঘ। তাই তাকেই এ ব্যাপারে সেই অমোঘতাই রক্ষা করতে হবে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা গোটা রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে। জনগনের মনে রাষ্ট্র শক্তির প্রতি আনুগত্যমূরক ভাবদারা নিঃশেষ করে দেয়। এ কারণে আল্লাহর আইন জারি ও কার্যকরকরণের একবিন্দু নম্রতা, দুর্বলতা কিংবা দয়া-সহানুভূতি প্রদর্শন তো দূরের কথা –তার উদ্রেক হওয়াও কুরআনের স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ। ব্যভিচারীদ্বয়ের দন্ড কার্যকর প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী…………)

সেই দুইজনকে আল্লাহর আইনের দন্ড দানের ব্যাপারে তোমাদেরকে যেন কোনরূপ দয়া-অনুগ্রহ পেয়ে না বসে –যদিও তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হও।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, প্রশাসনিক শক্তিকে আল্লাহর আইন জারি করতে হবে এবং আল্লাহর আইন জারি ও কার্যকরকরণে কোন রূপ দয়া প্রদর্শন করা যাবে না, দয়ার উদ্রেক হওয়া ঈমানের পরিপন্থী। দয়া দেখানো হলে প্রমাণিত হবে যে, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান নেই। কেননা তা থাকলে এক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন বা এ ব্যাপারে তাদের ম নে কোনরূপ দয়ার উদ্রেক হওয়াও সম্ভব হতো না।

প্রশাসনিক কর্মদক্ষতার প্রতীক ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (স)। তিনি যেমন আল্লাহর আইন কার্যকরকরণের কোনরূপ দুর্বলতা দেখান নি, তেমনি সে ক্ষেত্রে তিনি কোনরূপ সুপারিশ গ্রহণ করতেও স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করেছেন। শুধু অস্বীকার নয়, আল্লাহর আইন জারি করার ব্যাপারে সুপারিশের কথা শুনে তীব্র ভাষায় তার প্রতিবাদ করেছেন।

মাখজুমী বংশের একটি মেয়েলোক চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হয়। রাসূলে করীম (স)-এর অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি উসামা ইবনে জায়দ (রা) –তাঁর নিকট দন্ডদানের ব্যাপারে সুপারিশ করার ইচ্ছা করেছিলেন। নবী করীম (স) তাঁর কথা শুনে অত্যন্ত ধমকের সুরে বললেনঃ

(আরবী…………..)

আল্লাহ ঘোষিত একটি দন্ড কার্যকরকরণের ক্ষেত্রে তুমি সুপারিশ করছ?

অতঃপর তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দান প্রসঙ্গে বললেনঃ

(আরবী…………..)

হে জনগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা ধ্বংস হয়ে গেছে শুধু এই কারণে যে, তাদের মধ্য থেকে কোন অভিজাত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে তারা অব্যাহতি দিত। আর কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার উপর দন্ড কার্যকর করত।

আল্লাহর নির্দেশঃ

(আরবী…………)

তোমাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোক অবশ্য অবশ্যই এই কাজে নিযুক্ত ও রত থাকতে হবে, যারা সব সময় কল্যাণের দিকে আহবান জানাবেন, শরীয়াতসম্মত কাজ করার আদেশ করতে ও শরীয়াত পরিপন্থী কাজ থেকে লোকদেরকে বিরত রাখতে থাকবে।

বস্তুত এ আয়াতে যে কাজের কথা বলা হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সংস্থার দাযিত্বই হচ্ছে সেই কাজ করা। শরীয়াতসম্মত কাজের আদেশ ও শরীয়াত পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব সরকারের এ বিভাগ-ই পালন করবে।

আল্লাহর আইন-বিধান প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই সমাজের উপর কার্যকর করতে হবে। ‘হদ্দ’ সমূহ জারি করতে হবে। এ কাজ যেমন একান্ত জরুরী, তেমনি তা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই –নির্বাহী শক্তির সাহায্যেই আঞ্জাম দিতে হবে। এ কাজের দায়িত্ব তো আর সাধারণ মানুষের উপর ছেড়ে দেয়া যায় না, সাধারণ মানুষকে কোন প্রকারেই সুযোগ দেয়া যায় না আইন হাতে লওয়ার। অন্যথায় চরম অরাজকতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দেয়া অবধারিত। মানুষের উপর নির্বিচার জুলুম হওয়া, মানুষের মর্যাদা বিনষ্ট হওয়া এবং মানুষের মানবিক অধিকারও হরণ হওয়া নিশ্চিত। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও নির্বাহী সংস্থা এ জন্যই একটি অপরিহাযর্ বিভাগ। এই বিভাগটিই হবে এ কাজের একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তৃত্বশীল।

বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার, ইসলামের রাষ্ট্রীয় বিধানে এই ব্যবস্থা একেবারে শুরু থেকে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও পশ্চাত্যের কোন স্বঘোষিত কোন প্রাচ্যবিদ (Orientals) হওয়ার দাবিদার ইসলামের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলবার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে যে, ইসলাম শুধু ওয়ায-নসীহতের বিধান দেয়, তাতে প্রশাসনিক নির্বাহী সংস্থা (Executive) বলতে কিছু নেই। আর সেই কারণে ইসলাম রাষ্ট্রীয় বিধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমরা বলব, এহেন স্বঘোষিত প্রাচ্যবিদ ইসলামী জীবন বিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ ও মূর্খ। তারা যদি সরাসরি কুরআন ও সুন্নাত অধ্যয়ন করত, তাহলে তাদের মনে একটা মারাত্মক ভুল ধারণার সৃষ্টি হতে পারত না এবং ইসলামের বিরুদ্ধে এরূপ মিথ্যা অভিযোগ তোলা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হতো না। আমাদের স্পষ্ট দাবিই হচ্ছে, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র ব্যবস্থা –তার প্রয়োজনীয সব সংস্থা অবকাটামো পুরাপুরিভাবে উপস্থাপিত করেছে, তার কোথাও একবিন্দু ফাঁক নেই।

ইসলামে স্পষ্টভাবেই প্রশাসনিক সংস্থা –নির্বাহী ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও আইন নির্ধারক মজলিসে শু’রা –আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান উপস্থাপিত এ তিনটি বিভাগই পুরাপুরি বর্তমান। কেননা ইসলামী আদর্শ তো সর্বতোভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার বিধান। আর তা এ বিভাগসমূহের সক্রিয়তার মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। ইসলাম বিশ্বমানবতার জন্য যে কল্যাণ নিয়ে এসেছে, তা এসব বিভাগ ও সংস্থার পূর্ণাঙ্গ কার্যকরতার মাধ্যমেই তো জনগণের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে।

উপরন্তু কুরআন মজীদের উপরোদ্ধৃত আয়াতে যে ‘আল্-তাকুম-মিনকুম উম্মাতুন’‘তোমাদের মধ্যে এমন লোক সমষ্টি অবশ্যই থাকতে হবে’ বলে যে ‘আমর বিল মা’রূফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’–ন্যায় ও আইনসম্মত কার্যাবলীর কার্যকর করা ও আইন বিরোধী কার্যবলী করতে ও হতে না দেয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে, তা তো এই প্রশাসনিক সংস্থার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হতে পারে।

আমর বিল মারূফনিহী আনিল মুনকার নির্বাহী সংস্থারই দায়িত্ব

সূক্ষ্ম দৃষ্টিমান ব্যক্তিবর্গ অবশ্যই দেখবেন এবং স্বীকার করবেন যে, ‘আমর বিল’মা’রূফ’ ও ‘নিহী’ আনিল মুনকার’-এর নিয়মাবলী, তার সমস্যা ও শর্তসমূহ পূরণের জন্য একটি সংস্থা অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। এই সংস্থাই হচ্ছে কার্যত ইসলামী রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ (Executive Department)। ইসলামের আইনসমূহ বলবৎ করা, প্রয়োগ করা (Enforced)- এর জন্য দাযিত্বশীল। আইন বিভাগ কর্তৃক সাব্যস্ত করা আইন ও বিচার বিভাগের রায়সমূহ যথাযথভাবে কার্যকর করা এই সংস্থাটি ব্যতীত কখনই সম্ভব হতে পারে না। আর তা হতে না পারলে দ্বীন-ইসলামের গোটা ব্যবস্থাই অর্থহীন, নিষ্ফল, অকার্যকর এবং অবাস্তব। তাই ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজে আল্লাহর আইনসমূহ কার্যকর করার পূর্ণ দায়িত্ব এ বিভাগটির উপর অর্পিত।

বস্তুত এ দায়িত্বটি মূলত ইসলাম কর্তৃক উদ্ভাবিত ও প্রবর্তিত। এ এক অভিনব ও মৌলিক ব্যবস্থা। ইসলাম পূর্বকালীন মানব রচিত বিধান-ব্যবস্থায় এর কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। জনগণের মধ্যে কল্যাণের ও ভালো ভালো কাজের ব্যাপক প্রচলন করার দাযিত্ব ইসলাম জনগণের উপর অর্পণ করেছে। মানুষকে সমস্ত প্রকারের আইন-বিরোধী অন্যায় ও পাপের কাজ থেকে বিরত রাখার কাজ-ও সেই-জনগণকেই আঞ্জাম দিতে হবে। সমাজে কি হচ্ছে –ভালো কি মন্দা, ক্ষতিকর কি কল্যাণকর, আইন পালন কিংবা আইন লংঘন –সে দিকে জনগণকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জনগণ এ ব্যাপারে নির্বাক-নিষ্ক্রিয় ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে কিছুতেই থাকতে পারে না।

দ্বীন-ইসলাম এই বিষয়টিকে সমাজ-দর্শন পর্যায়ে পণ্য করে তারই ভিত্তিতে এ দায়িত্বের কথা বলেছে। ইসলামের সমাজ-দর্শন হচ্ছে –মানুষ সমাজেরই একটি অংশ ও অঙ্গ। সমাজ বিচ্ছিন্ন মানব জীবন অকল্পনীয়। একই পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের পরিণতি অভিন্ন হতে বাধ্য। সমাজের কোথাও যদি কল্যাণ কিছু থাকে, তবে সে কল্যাণ গোটা সমাজেই পরিব্যাপ্ত হবে। কল্যাণকারী সেই এক ব্যক্তির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না। পক্ষান্তরে সমাজে যদি মন্দ থাকে, তা হলে সমাজের একটি ব্যক্তিও সে মন্দ ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা পেতে পারে না, তার প্রবাব সেই মন্দকারী পর্যন্ত সীমিত হয়ে থাকতে পারে না। এ কারণে সমাজের ব্যক্তিগণের মন-মানসিকতা ও আচরণ চরিত্র অভিন্ন হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে একান্তই বাঞ্চনীয়। গোটা জনসমষ্টির সামগ্রিক কল্যাণের জন্যই ব্যক্তিদের থাকতে হবে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা।

নবী করীম (স) এই ব্যাপারটির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং তিনি এ বিষয়ের সূক্ষ জটিলতাকে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, একটি সমাজের লোক স মুদ্রগামী এক জাহাজের আরোহীদের মত। এই জাহাজ যদি কোন বিপদে পড়ে তা হলে সে বিপদ কোন একজন আরোহীর জন্যই হবে না, জাহাজের সমস্ত আরোহীর জন্যই হবে সে বিপদ। এই অবস্থায় আরোহীদের কোন একজনকে যদি সেই জাহাজের তলদেশ ছিদ্র করার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে গোটা জাহাজই ডুবে যাবে। নিমজ্জিত হবে সমস্ত আরোহী। একই সমাজের লোকদের অভিন্ন পরিণতির এ এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।

সমাজের কোন ব্যক্তি যদি সঙক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে তাহলে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোর কোন অধিকারই তার থাকা উচিত নয়। কেননা তাহলে সমাজের অন্যান্য মানুষেরও সেই রোগে আক্রান্ত হওয়ার অনেক বেশী আশঙ্কা। কাজেই সমাজ-সমষ্টির সার্বিক কল্যাণের দৃষ্টিতেও তার গতিবিধকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত করতে হবে, তাকে অন্য লোকদের সংস্পর্শ হতে অবশ্যই দূরে রাখতে হবে।

এ সব দৃষ্টান্তের আলোকে ‘আমর বিল’মা’রূপ ও নিহী আনিল মুনকার’ কথাটির গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় এবং তার গুরুত্ব অনস্বীকার্য হয়ে উঠে। অতএব সমাজে বেশী বেশী কল্যাণের ব্যাপক প্রসারতা বিধান এবঙ বেশী বেশী অন্যায় প্রতিরোধের শক্তিশালী ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। দ্বীন-ইসলামের কার্যকরতা ও আল্লাহ্ অর্পিত দায়িত্ব পালনের অব্যাহত ধারাবাহিকতার জন্য ‘আমর বিল মা’রূফ ও নিহী আনিল মুনকার’-এর দায়িত্বশীল সংস্থার অপরিহার্যতা একান্তই অনস্বীকার্য।

এই কারণে কুরআন মজীদ ও সুন্নাতে রাসূলে এ বিষয়ের উপর খুব বেশী গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। অবশ্য একটি আয়াত এর বিপরীত ধারণার সৃষ্টি হওয়ার কারণ হতে পারত –যদি সঙ্গে সঙ্গেই তার ভুল ব্যাখ্যার পথ বন্ধ করে দেয়া না হতো। আয়াতটি এইঃ

(আরবী………………..)

হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা নিজেদেরই কথা চিন্তু কর, অপর কেউ যদি পথভ্রষ্ট হয়ও তা হলে তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না যদি তোমরা নিজেরা হেদায়েত প্রাপ্ত হয়ে তাকতে পার। তোমাদের সকলকেই আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন তোমরা দুনিয়ায় কি কি কাজ করছিলে।

আয়াতটির বাহ্যিক অর্থ এই হয় যে, ব্যক্তি নিজে যদি ইসলামের উপর অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে ‘আমর বিল মা’রূফ ও নিহী আনিল মুনকার’ করার কোন দায়িত্বই তার উপর থাকবে না, সে সেই দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকবে। তা না করলে তাকে পাকড়াও করা হবে না, তাকে সেজন্য জবাবদিহিও করতে হবে না।

কিন্তু এ অর্থ ঠিক নয়। আল্লাহর বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং তা যে আল্লাহর মূল বক্তব্যের বিপরীত তা হাদীস থেকেই নিঃসন্দেহে জানা যায়। তাই প্রসঙ্গত বলা যায়, কুরআনের নির্ভুল ব্যাখ্যা হাদীসের আলোকেই পেতে হবে। হাদীসকে বাদ দিয়ে কুরআনের সঠিক-নির্ভুল তাফসীর করা বা জানা সম্ভব নয়।

আবূ দাউদ ও তিরমিযী প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ভাষণ প্রসঙ্গে বললেনঃ ‘তোমরা কুরআনের এ আয়াতটি পাট কর’; কিন্তু তার অর্থ মূল ব্কতব্যের বিপরীত গ্রহন কর। আমি রাসূলে করীম (স)-কে বলতে শুনেছিঃ

(আরবী…………)

লোকেরা যখন জালিমকে জুলুম করতে দেখে, তখন যদি তারা সেই জারিমকে না ধরে ও জুলুম থেকে বিরত না রাখে, তাহলে খুবই আশঙ্কা রয়েছে, আল্লাহ্ তাঁর নিকট থেকে পাঠানো আযাবে তাদের সকলকেই গ্রাস করবেন।

আবূ ঈসা তিরমিযী এ হাদীসটি উদ্ধৃত করে লিখেছেনঃ

(আরবী………..)

এ হাদীসটি সনদের দিক দিয়ে উত্তম ও সহীহ।১

(আরবী……………..)

উক্ত আয়াতের তাফসীরে সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। সে আলোচনার সারনির্যাস আমরা এখানে তুলে দিচ্ছিঃ

এ আয়াতটি মুসলিম উম্মত ও অমুসলিম কাফির সমাজের মধ্যে দায়িত্বশীলতার দিক দিয়ে পার্থক্য রচনাকারী। সেই সাথে মুসলিম জনগণের পরস্পরের প্রতি কল্যাণ কামনা ও অসীয়ত-নসীহতের দায়-দায়িত্বের কথা ঘোষণাকারী। কেননা তারা সকলে মিলে এক অভিন্ন উম্মত।

আয়াতের প্রথম অংশের বক্তব্য হচ্ছে, মুসলমানরা অন্যদের থেকে ভিন্নতর এক জনসমষ্টি। তারা নিজেরা পরস্পরের প্রতি কঠিন দায়িত্বশীল। অতএব তোমরা নিজেরা নিজেদের সকলের সম্পর্কে অবশ্য চিন্তু-ভাবনা করতে বাধ্য তোমাদের সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে হবে, পরস্পরের প্রতি যে কর্তব্য রয়েছে তা পালন করতে হবে। অবশ্য অন্যরা –মুসলিম সমাজ বহির্ভূত লোকেরা –যদি পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, আর তোমরা হেদায়েতের পথে অবিচল থাক, তাহলে তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না। অন্য লোকদের গুমরাহীর কোন শাস্তি তোমাদের ভোগ করতে হবে না –যদি তোমরা নিজেরা ঠিক থাক। এদের সাথে তোমাদের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না, হতে পারে না কোনরূপ বন্ধুত্ব।

এ অর্থে মুসলিম উম্মত ও অন্যান্য মুসলিম জাতিসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের রূপ নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম উম্মত হিজবুল্লাহ –আল্লাহর দল, আর অন্যরা শয়তানের দল। এ দুয়ের মাঝে আকীদা বিশ্বাসের দিক দিয়ে কোনই একাত্মতা ও অভিন্নতা হতে পারে না।

এর অর্থ হল মুসলিম উম্মতের সদস্যদের পরস্পরের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হতে হবে, পরস্পরের প্রতি কঠিন দায়িত্বও পালন করতে হবে। কিন্তু তাই বলে বিশ্বমানবকে আল্লাহ ও আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহবান জানানোর কঠিন দায়িত্ব তেকে মুসলিম উম্মত কখনই নিষ্কৃতি পেতে পারে না। তাকে প্রথমত কোথাও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্টিত করতে হবে এবং অতঃপর নির্বিশেষে সমস্ত মানবতাকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহবান জানাতে হবে। সর্বাত্মকভাবে চেস্টা চালাতে হবে তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমানদার বানানোর জন্য। এ জন্য তারা আল্লাহর পক্ষ থেকেই দায়িত্বশীর এবং তা না করলে তাদেরকে আল্লাহর নিকট কঠিনভাবে জবাবদিহি করতে হবে। অন্য কথায়, মুসলিম উম্মতকে প্রথমে নিজেদের মধ্যে ‘আমল বিল মা’রূফ ও নিহী আনিল মুনকার’-এর দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে সমগ্র বিশ্বমানবতার প্রতি। প্রথম পালনীয় কাজ হচ্ছে ‘আমর বিল-মা’রূফ’–আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা, আল্লাহর শরীয়াতকে প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সাহায্যে কার্যকর করা। আর ‘নিহী আনিল মুনকার’ হচ্ছে জাহিলিয়াতকে নির্মূল করা, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও আইন-বিধান অমান্য করাকে প্রতিরুদ্ধ করা। কেননা জাহিলিয়াতের শাসন তাগুতের শাসন, আল্লাহর শাসনের পক্ষে অতি বড় চ্যালেঞ্জ, আল্লাহর আইন-বিধান লংঘনের ক্ষমার অযোগ্য দৃষ্টতা। মুসলিম উম্মত প্রথমত নিজেদের জন্য দায়িত্বশীল, তার পরে দায়িত্বশীর গোটা বিশ্বমানবতার জন্য।

কাজেই উক্ত আয়াত থেকে একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, মুসলিম উম্মত বুঝি ‘আমল বিল মা’রূপ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর জন্য দায়িত্বশীল নয়। এ কথা কেউ মনে করলে তা হবে আয়াতের আসল ব্কতব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ গ্রহণ। আর শুধু হেদায়েত প্রাপ্ত হলেই বুঝি মুসলিম উম্মত রেহাই পেয়ে যাবে, তাকে ইসলামী শরীয়াতকে রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করতে হবে না –এমন ধারণা গ্রহণ-ও এ আয়াতের সম্পূর্ণ বিপরীত তাৎপর্য গ্রহণ।

মোটকথা, এ আয়াত ব্যক্তিকে অন্যায়-অস্ত্য, জুলুমের প্রতিরোধ করার দাযিত্ব থেকে বিন্দুমাত্র মুক্তি দেয়নি, তাগূতী শাসন-প্রশাসন উৎখাত করে আল্লাহর শাসন ও খিলাফতের প্রশাসন কায়েম করার কর্তব্য থেকে নিষ্কৃতি দেয়নি। কেননা তাগূতী মাসন আল্লাহর ‘ইলাহ’ হওয়াকেই অস্বীকার করে, আল্লাহর সার্বভৌমত্বকেই চ্যালেঞ্জ করে মানুষকে আল্লাহর শরীয়াতের পরিবর্তে নিজের আইন-আদেশের দাসানুদাস বানায়। এ এমন একটা ‘মুনকার’, যা কোন ঈমানদার ব্যক্তিই বরদাশত করতে পারে না, বরদাশত করা উচিত নয়। এরূপ অবস্থায় গোটা উম্মত যদি হেদায়েত প্রাপ্ত হয়ও তবু তাদের এ হেদায়েত প্রাপ্তি কোন কাজেই আসবে না।

আল্লাহ্ তা’আলার শোকর, উপরোক্ত আয়াতের ভুল অর্থ গ্রহণের কারণে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছিল, তা প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) রাসূলে করীম (স)-এর স্পষ্ট হাদীসের ভিত্তিতেই নস্যাৎ করে দিয়েছেন এবং আয়াতের যথার্থ অর্থ জনগণকে জানিয়ে দিয়েছেন। আমাদের একালের কোন কোন দুর্বলমনা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি এ আয়াতকে ভুল মতের দলিল হিসেবে পেশ করে জনগণকে ‘আমর বিল মা’রূফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’ এর দাযিত্ববিমুখ বানিয়ে দিতে চেয়েছে, তাদের এ অপচেষ্টাও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে।

না, কখনই তা হতে পারে না। আল্লাহর এই দ্বীন ‘জিহাদ’ ব্যতীত কখনই কায়েম হতে পারে না। মুসলিম সমাজ কখনই সংশোধনপ্রাপ্ত হতে পারে না অন্যায়ের প্রতিরোধ ও ন্যায়ের বাস্তব প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে। এই দ্বীনের জন্য একদল লোককে অবশ্যই এ কাজে নিয়োজিত থাকতে হবে। তারা মানুষকে অন্যায় পথ থেকে বিরত রাখবে। প্রথমে ওয়ায-নসীহতের সাহায্যে। আর তা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সাহায্যে। তাহলেই মানুষ মানুষের নিকৃষ্ট গোলামী থেকে মুক্তি পেতে পারবে। পারবে একান্তভাবে মহান আল্লাহর বান্দা হয়ে জীবন যাপন করতে। আল্লাহর যমীনে আল্লাহর রাজত্ব কায়েম করতে। এজন্য আল্লাহর সার্বভৌমত্ব যারা কেড়ে নিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে, সে সার্বভৌমত্বকে কেড়ে আনতে হবে, সর্বত্র জারি করতে হবে কেবল মাত্র আল্লাহর প্রভুত্ব, কার্যকর করে তুলতে হবে একমাত্র আল্লাহর আইন।

‘আমর বিল মা’রুফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ প্রথমে প্রচার ও সমঝ-বুঝ পর্যায়েই করতে হবে একথা ঠিক। কিন্তু তা ব্যর্থ হলে সে জন্য শক্তির প্রয়োগ করতে হবে নির্দ্বিধায়।১

(আরবী……………..)

অবশ্য এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, অন্যরা কি করে না করে-সে চিন্তার পূর্বে নিজে হেদায়েতের পথে আছে কিনা সেই চিন্তা প্রত্যেক ব্যক্তিকে সর্বাগ্রে করতে হবে। কেননা ব্যক্তি নিজেই যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত না হলো, তাহলে অন্যদের হেদায়েত প্রাপ্ত হওয়া না হওয়ার চিন্তা করার কোন অধিকারই তার থাকতে পারে না। আর সংশোধনের কাজ সর্বপ্রথম নিজেকে দিয়েই শুরু করতে হবে, তার পরই অন্যদের হেদায়েতের প্রশ্ন উঠে।

হযরত আলী (রঃ)-এর এ কথাটি এই প্রেক্ষিতে খুবই যথার্থঃ

(আরবী………..)

যে লোক নিজেকে লোকদের নেতার স্থানে প্রতিষ্টিত করবে, তার কর্তব্য, অপরকে শিক্ষাদানের পূর্বে সে যেন নিজেকে শিক্ষাদানের কাজ শুরু করে এবং তার মুখের কথা-বক্তৃতা দ্বারা লোকদেরকে সদাচার শিক্ষাদানের পূর্বে সে যেন নিজের আচরণ ও চরিত্র দ্বারা লোকদের শিক্ষাদান করে। বস্তুত যে লোক নিজের শিক্ষক, নিজেকে সদাচারের শিক্ষাদাতা, অন্য লোকদেরকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দেয়ার দিক দিয়ে সে-ই বেশী অগ্রাধিকার পাওয়ার অধিকারী।

এক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রয়োজনীয় হচ্ছে কুরআনের সেই আয়াত, যা তিনি মদীনার ইয়াহুদীদের প্রতি নাযিল করেছিলেন। তা হচ্ছেৱ

(আরবী……………..)

তোমরা লোকদেরকে ‘বির’ সর্বপ্রকারের শুভ কাজের আদেশ কর, অথচ তোমরা এদিক দিয়ে নিজেদেরকে ভুলে যাও?

আল্লামা আ-লূসী লিখেছেনঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণনানুযায়ী আয়াতটি মদীনার ইয়াহুদী আরিমদের আচরণ সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। তারা গোপনে গোপনে লোকদেরকে বলত মুহাম্মদ (স)-কে মেনে নিতে, তাঁকে অনুসরণ করতে। কিন্তু তারা নিজেরা তাঁকে মানতও না, অনুসরণও করত না অথবা তারা সাধারণ মানুষকে দান-সাদকা করতে উপদেশ দিত, কিন্তু তারা নিজেরা তা করত না। আল্লামা সুদ্দী বলেছেনঃ তারা লোকদেরকে আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য নসীহত করত, আল্লাহর নাফরমানী করতে নিষেধ করত, কিন্তু তারা আল্লাহর আনুগত্য না করে তাঁর নাফরমানী-ই করত বেশী বেশী করে।

তাদের এই বৈপরীত্যপূর্ণ চরিত্র ও আচার-আচরণের উপরই এইকঠোর শাসনমূরক ও আপত্তি জ্ঞাপক প্রশ্ন। তার অর্থ অন্যদেরকে ভালো ভালো ও পূণ্যময় কাজ করতে বলা ও উপদেশ দেয়া –নিজেদের তার কিছুই না করা একটা ঘৃণ্য নির্লজ্জতা, একটা অতিবড় জঘন্য অপরাধ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ‘বির’ সর্বপ্রকারের শুভ কাজ করার উপদেশ দেয়া ও লোকদেরকে সে কাজে অনুপ্রাণিত করা নিঃসন্দেহে অতীব উত্তম কাজ বরং কর্তব্য। কিন্তু আপত্তির বিষয় হলো এই দিক দিয়ে নিজেকে ভুলে যাওয়া –নিজে সেই কাজসমূহ না করাটাই আপত্তির বিষয়।

 (আরবী……………..)

বস্তুত যে সমাজ নৈতিকতার দিক দিয়ে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেছে, বিকৃতি ও বিপথগামিতা মানুষকে পেয়ে বসেছে, সেই সমাজে যদি সংশোধনমূলক কার্যক্রম করার সংকল্প গ্রহন করা হয়, তাহলে নিজেকে দিয়েই সে কাজের সূচনা করতে হবে। সেই মুহূর্তে অন্যরা কে কি করতে তা দেখা চলবে না। কেননা তা দেখতে গেলে কারোর পক্ষেই সম্ভব হবে না নিজেকে পর্যন্ত সংশোধন কা। তখন অন্ততঃ কোন ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে এই কথা বলার কোন অধিকার থাকতে পারে না –গোটা সমাজই যখন বেঈমানীতে ডুবে গেছে, তখন একা আমার পক্ষে ঈমানদারী রক্ষা করা কি করে সম্ভব হতে পারে? এরূপ মানসিকতাই আল্লাহর নিকট আপত্তির কারণ। কথাটি আরও খোলাসা করার জন্য রাসূলে করীম (স)-এর সেই প্রখ্যাত হাদীসটিও এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, যার ভাষা হচ্ছে এইঃ

(আরবী………..)

ইসলাম নেহায়েতই অপরিচিত অসহায় অবস্থায সূচিত হয়েছিল। খুব শীগগীরই ইসলাম সেই অবস্থায় ফিরে যাবে। তবে তখনকার সেই ‘গুরাবা’ অপরিচিত লোকদের জন্য সুসংবাদ, ধন্যবাদ।

এই কথা মুনে সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেনঃ

(আরবী………….)

‘গুরাবা’ বলে আপনি কোন্ লোকদেরকে বুঝিয়েছেন হে আল্লাহর রাসূল?

জবাবে বললেনঃ

(আরবী……….)

তারা হচ্ছে সেই লোক, যারা জনগণ যখন আমার সুন্নাত থেকে বিচ্যুত হয় তখন সংশোধনমূলক কাজ করে।

আল্লাহর পথে জিহাদের তুলনায়ও এই ‘আমর বিল মা’রূফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ অনেক সময় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় বরং এটাই হচ্ছে জিহাদের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। আর রাসূলে করীম (স)- এর কথাঃ

(আরবী………..)

অত্যাচারী শাসকের সম্মুখে স্পষ্ট সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ।

ও তো সেই প্রাথমিক পর্যায়ের ‘আমর বিল মা’রূফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজই।

হযরত আলী (রা)-র কথাঃ

(আরবী……………)

সমস্ত রকমের নেক ও শুভ কাজও আল্লাহর পথে জিহাদ ‘আমর বিল মা’রূফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’- কাজের তুলনায় মহাসমুদ্র থেকে এক ফোটা পানি গ্রহণের সমান।

কেনা ‘আমর বিল মা’রূফ’ ও ‘নিহী আনিল মুনকার’- কাজটি মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। তা ব্যক্তিগতভাবে করা হোক, কি সামষ্টিকভাবে। আর ‘জিহাদ’ (প্রচলিত অর্থে) হচ্ছে বৈদেশিক আগ্রাসনের প্রতিরোধ। প্রথমটি দ্বিতীয়টির আগেই সম্পন্ন হওয়া বাঞ্চনীয়। কেননা যে সমাজ অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে ভাঙ্গন ও বিপর্যয়ের মধ্যে, তার পক্ষে বহিঃশত্রুর মুকাবিলা করা সম্ভব হয় না।

কাজেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা জুলুমের প্রতিরোধ করার কাজ সর্বপ্রথম মুসলমানদের নিজেদের মধ্যেই ব্যাপকভাবে কার্যকর হতে হবে। কুরআন মজীদের একটি আয়াত এ কথাটি আরও স্পষ্ট করে বলেছে। আয়াতটি এইঃ

(আরবী………..)

আল্লাহ এই কিতাবে তোমাদেরকে পূর্বেই এই হুকুম দিয়েছেন যে, তোমরা যেখানেই আল্লাহর আয়াতের বিরুদ্ধে কুফরির কথা বলতে এবং তার প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে শুনবে, সেখানে (তাদের সাথে) তোমরা অদৌ বসবে না –যতক্ষণ না তারা অন্য কোন কথায লিপ্ত হয়। তোমরাও যদি তাই কর, তাহলে তোমরাও তাদের মতই হবে। নিশ্চয়ই জানবে, আল্লাহ্ মুনাফিক ও কাফিরদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।

এ আয়াত স্পষ্ট করে বলছে, আল্লাহর কালাম, কালামের কোন আয়াত –আল্লাহর কোন হুজুম-বিধানের বিরুদ্ধতা করা বা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা আল্লাহদ্রোহী কাফিরদেরই কাজ, একবিন্দু ঈমান যার মধ্যে আছে, তার পক্ষে এ কাজ করা তো দূরের কথা, তা করতে দেখলে বা শুনতে পেলে যারা তা করে তাদের সাথে একত্রে বসা বা সম্পর্ক রক্ষা করাও সম্ভব হতে পারে না। করা –ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেউ যদি তা করে তাহলে বুঝতে হবে, তার ঈমান নেই, সে-ও সেই কাফিরদের মতই হয়ে গেছে।

সাধারণত লক্ষ করা যায়, কোন একজন লোকই হয়ত ইসলাম বা কুরআনের কোন স্পষ্ট নির্দেশের বিরুদ্ধতা, কিংবা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল, আর তার চারপাশের অন্যান্য লোক তা শুনে চুপ চাপ থাকল কোন প্রতিবাদ করল না। এইরূপ জঘন্য কথা শুনে হজম করে ফেলল, তা হলে তার মধ্যে ঈমানের একবিন্দুও আছে, তার কোন প্রমাণই পাওয়া যেতে পারে না।

হযরত আলী (রা) বলেছেন, কুরআন মজীদে হযরত সালেহর মু’জিজা হিসেবে যে উষ্ট্রীকে দেয়া হয়েছিল, আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা এই উষ্ট্রীর উপর কোনরূপ অত্যাচার করবে না। অত্যাচার করা হয়েছিল, কিন্তু সকলে করেনি, করেছিল মাত্র এক ব্যক্তি, আর অন্যরা তাতে একমত ছিল। তাই আল্লাহ্ যে আযাব দিয়েছিলেন, তা কেবল সেই এক ব্যক্তির উপরই নয়, সমস্ত মানুষই সে আযাবে ধ্বঙস হয়ে গিয়েছিল।

বস্তুত সমাজে দুস্কৃতি ও অনাচার সকলেই হয়ত করে না, করে মুষ্টিমেয় লোক। কিন্তু তার পরিণামে যে আযাব আসে, তা থেকে কেউ-ই রেহাই পায় না। কেননা সেই অন্যান্য সকল লোক –যারা নিজেরা অনাচার করেনি বটে, কিন্তু কতিপয় লোকের অনাচারকে তারা নীরবে সহ্য করেছে বলেই এই পরিণতি তাদেরও ভাগ্যলিপি হয়েছে।

তাই সমাজের লোকদের সামষ্টিক কল্যাণের জন্য ব্যক্তিগত পরহেযগারী কিছু মাত্র রক্ষাকবচ হতে পারে না। সমাজকেও সকল প্রকার অন্যায় অনাচার থেকে রক্ষা করতে চেস্টা চালিয়ে যেতে হবে।

তবে আমাদের এ পর্যায়ের আলোচ্য বিষয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে বলতে হচ্ছে, ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’- এর দায়িত্ব পালনের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রে নির্বাহী দায়িত্বশীল একটি বিভাগ অবশ্যই থাকতে হবে। এ বিভাগের প্রধান দায়িত্বই হবে এই কাজ করা। তা যেমন ব্যক্তিগণের মধ্যে করতে হবে, তেমনি করতে হবে সামাজিক-সামষ্টিকভাবেই এ কাজ করতে হবে। প্রথমোক্ত কাজের ইঙ্গিত পাওয়া যায় ও আয়াত কয়টি থেকেঃ

(আরবী………………)

মু’মিন পুরুষ মেয়েলোক পরস্পরের কল্যাণকামী –অভিভাবক। তারা ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করে, তারা সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এরা সেই লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই রহমত করবেন। আর আল্লাহ তো সর্বজয়ী-মহাবিজ্ঞানী।

(আরবী……………..)

তারা তওবাকারী-ইবাদতকারী-হামদকারী, যমীনে পরিভ্রমণকারী, রুকু’কারী-সিজদাকারী, ভালো কাজের আদেশকারী, মন্দা কাজ থেকে নিষেধকারী, আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষাকারী –হে নবী! তুমি এই মু’মিন বান্দাগণকে সুসংবাদ দাও।

(আরবী……………)

তোমরাই হচ্ছ সর্বোত্তম জনগোষ্ঠী। তোমাদেরকে জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে। তোমরাই ভালো কাজের আদেশ কর ও মন্দ কাজ থেকে লোকদের বিরত রাখ আর তোমরা সব সময়ই আল্লঅহর প্রতি ঈমান রক্ষা করে চল।

এ তিনটিই এবং এ ধরনের আরও অন্যান্য আয়াতে মুসলিম সমষ্টিকে সাধারণভাবেই সম্বোধন করে অন্যান্য কাজের সাথে সাথে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’- এর কাজ করার কথা বলা হয়েছে। স্পষ্ট মনে হচ্ছে, এ কাজ ইসলামী সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি –প্রত্যেক নারী ও পুরুষকেই করতে হবে।

এ ছাড়া অপর কিছু আয়াতে মুসলিম সমাজ সমষ্টিকে সন্বোধন করেছে। তা থেকে নিঃসন্দেহে মনে হয়, এ দায়িত্ব মুসলমানদের মধ্য থেকেই একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর উপর অর্পণ করা হয়েছে, যাদের উম্মত বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ

(আরবী…………..)

হে মুসলিমগণ তোমাদের মধ্য থেকে একটা জনগোষ্ঠী –কতিপয় ঐক্যবদ্ধ মানুষ –এমন অবশ্যই বের হয়ে আসতে ও নিয়োজিত থাকতেই হবে, যারা সার্বিক কল্যাণের দিকে আহবান জানাতে থাকবে এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করার জন্য সর্বক্ষণ নিযুক্ত থাকবে। বস্তুত এরাই হচ্ছে সফলকাম।

আয়াতে একটি উন্মতকে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করার কাজে নিয়োজিত থাকার কথা বলা হয়েছে। আর ‘উম্মত’ বলতে তো এমন কিছু লোক সমষ্টি বোঝায়, যারা আকীদা-বিম্বাসে এবং চিন্ত ও কর্মে অভিন্ন। কোন কোন আয়াতে মাত্র এক ব্যক্তিকেও ‘উম্মত’–জনসমষ্টি –ছিল। ছিল আল্লাহর আদেশানুগত, একমুখী, আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ। সে কখনই মুশরিকদের মধ্যের কেউ ছিল না।

এ আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আ) এক ব্যক্তিকেই ‘উম্মত’ বলা হয়েছে। বোঝানো হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে, যিদি বিপুল কল্যাণের মিল-কেন্দ্র। ইবনে ওহাব ও ইবনুল কাসেম ইমাম মালিক (রা) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) একদা বলেছেনঃ

উপস্থিত একজন বলেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা তো হযরত ইবরাহীম (আ)-কে এই শব্দে অভিহিত করেছেন (যে শব্দে আপনি হযরত মায়াযকে অভিহিত করলেন)? জবাবে তিনি বলেনঃ

(আরবী……………..)

উম্মত তো সে-ই যে লোকদেরকে মহাকল্যাণের জ্ঞান শিক্ষা দেয়। আর ‘কানেত’ অর্থ হচ্ছে অনুগত।

(আরবী টীকা……………)

ইমাম জা’ফর সাদেক (র) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলঃ ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করা সমস্ত উম্মতের প্রতি ওয়াজিব? বললেনঃ না।…কেননা তা এমন ব্যক্তির কাজ, যে শক্তিশালী, সকলেই মানে এবং ‘মা’রূফ’ও ‘মুনকার’ সম্পর্কে যথার্থ আলিম। কোন দুর্বল ব্যক্তির জন্য একাজ নয়।

(আরবী টীকা…………..)

বস্তুত ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজটি কোন ছেলেখেলা নয়। নেহাত দাওয়াতখুর, ওয়ায নসিহত ও পীর-মুরীদীর ব্যাপারও নয়, তা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজের জন্য রাষ্ট্রশক্টির সমর্থন ও সহযোগিতা একান্ত অপরিহার্য। আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

(আরবী***********)

তারা সেই লোক, যাদেরকে আমরা যদি পৃথিবীতে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করি তাহলে তারা ‘সালাত’ কায়েম করবে, যাকাত আদায় ও বন্টন করবে এবং ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করবে। অবশ্য সর্ব বিষয়ের শেস পরিণতি তো আল্লাহরই জন্য।

এ আয়াত স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ যথার্থভাবে করার জন্য শক্তি-সামর্থ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তির প্রয়োজন, যা কেবল রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠাপোষকতা ও সমর্থনের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে। আয়াতের শুরুর শব্দটিতে রাষ্ট্রের প্রধান নায়ক বুঝিয়েছে। আর পরবর্তী শব্দসমূহ রাষ্ট্রপ্রধানের অধীন সরকারী শাসন-প্রশাসক ও কর্মচারীদের বুঝিয়েছে, যাদের হাতে নির্বাহী শক্তি (Executive power) থাকে। অন্যথায় শুধু মৌখিক ওয়ায-নসীহতই হতে পারে, কোন ‘আমর’–আদেশ এবং কোন ‘নিহী’–নিষেধ বাস্তবভাবে কার্যকর ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আর তা কার্যকর ও বাস্তবায়িত না হলে পারলে তা নিতান্তই ব্যর্থ ও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু তাই বলে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান অপেক্ষায় ফেলে রাখতে হবে এবং যদ্দিন ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম না হচ্ছে তদ্দিন তা করা হবে না, এমন ধারণা পোষণও ঠিক নয়। সত্য কথা হচ্ছে, এ কাজ করতেই হবে। ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হওয়ার পর এ কাজ করতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে। আর ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা-পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া না গেলেও –এমন কি তার প্রবল বিরুদ্ধতা থাকলেও তা উপেক্ষা করেই এই কাজ করতে হবে। করতে হবে সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্যে, যা প্রতিষ্টিত হওয়ার পর এই কাজ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবেই করবে। আর তা কায়েম না হওয়া পর্যন্ত তা কায়েম করার লক্ষ্যেই তা করতে হবে, করে যেতে হবে এবং সকল বাঁধা প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করেই তা করতে থাকতে হবে। করতে হবে সকল সময়, সকল অবস্থায়। তখন এই কাজ মৌখিক দাওয়াত হিসেবেই করতে হবে। এই মৌলিক দাওয়াতকে দু পর্যায়ে ভাগ করা যায়ঃ

প্রথম পর্যায়ে এ কাজ করবে এমন প্রত্যেক মুসলামনই, যার ইসলামের বুনিয়াদী ও জরুরী বিষয়াদি –তার হালাল ও হারাম সম্পর্কে মৌলিক ও মোটামুটি ইলম রয়েছে। এ কাজ হবে ব্যক্তিগতভাবেই।

আর দ্বিতীয পর্যায়ে তা হবে দলবদ্ধভাবে। এই দল হতে হবে এমন সব লোকের সমন্বয়ে যারা দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে গভীর ও ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেছে, এজন্য সময় শ্রম নিয়োগ করেছে। তারা দ্বীন সম্পর্কে কেবল মোটামুটিভাবেই জানবে না, বরং তার বিস্তারিত ও খুটিনাটি বিষয়েও ভালভাবে ও গভীর সূক্ষ্মভাবে জানবে। এ কথাই আল্লাহর এ আয়াতটি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেঃ

(আরবী****************)

ঈমানদার লোকদের সকলেরই বের হয়ে পড়া জরুরী ছিল না। কিন্তু এরূপ কেন হলো না যে, তাদের প্রত্যেক জনগোষ্ঠী থেকে কিছু সংখ্যক লোক বের হয়ে আসত ও দ্বীন সম্পর্কে গভীর সূক্ষ্ম জ্ঞান লাভ করত এবং তাদের নিকট ফিরে এসে নিজ নিজ এলাকার লোকজনকে পরকালের ব্যাপারে সতর্ক করে তুলবে, তাতে আশা করা যায়, তারা হয়ত সতর্ক হয়ে যাবে।

‘ইলম’ অর্জনের জন্য বেরিয়ে পড়া যে ওয়াজিব, এ আয়াতটি তারই দলীল। মদীনা থেকে দূরে দূরে অবস্থানকারী লোকেরা এক সাথে নিজেদের ঘরবাড়ী ত্যাগ করে সকলেই রাসূলের নিকট দ্বীন শিক্ষা লাভের জন্য চলে যাবে, তা আল্লাহর পছন্দ নয়। শুধু তাই-ই নয়, বাস্তবে তা অনেক সময় সম্ভবও হয় না। তাই আল্লাহ বললেন, সকলেই নয়, প্রত্যেক এলাকার লোকজনের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যাক লোক রাসূলে করীম (স)-এর নিকট গিয়ে অবস্থান করতে পাররে এবং তাঁর নিকট থেকে দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করতে পারে। জ্ঞান অর্জন শেষ হলে তারা নিজেদের লোকজনের নিকট ফিরে এসে তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষা দান করবে।

কি শিক্ষা লাভের জন্য তারা বেরিয়ে পড়বে? কুরআন বলেছেঃ (আরবী************) দ্বীন সম্পর্কে ‘তাফাক্কহ্ –(আরবী*************) লাভ করার জন্য। এই ‘তাফাক্কহ্ বলতে কি বোঝায়? শব্দটি ‘ফিক হুন’–(আরবী**************) থেকে নির্গত। এর অর্থঃ সমঝ বুঝ, গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টি এবং তৎলব্ধ দৃঢ় প্রত্যয়, যা জনগণকে সতর্ক করার জন্য –অন্য কথায় দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে লোকদের মধ্যে চিন্তা বিবেচনা বিচার-বুদ্ধি ও সমঝ-বুঝ সৃষ্টি করে তাদেরকে পরকালীন দুঃখময় পরিণতি থেকে বাঁচার জন্য এখন-ই –এই দুনিয়ায় সতর্ক জীবন যাপনের জন্য প্রস্তুত করা। আর সেজন্য এ কাজ যারা করবে তাদের নিজেদেরকেই সর্বাগ্রে এই গুণ ও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় তারা তাদের জন্য প্রস্তাবিত দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে না।

এই ইলম অর্জন করার গুরুত্ব বোঝাবার জন্য রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ

(আরবী*************)

ইলম সন্ধান –ইলম লাভ করতে চাওয়া –সেজন্য চেষ্টা ও সাধনা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্যই ফরয।

এই কাজের ফযীলত পর্যায়ে রাসূলে করীম (স) থেকে বর্ণিত বহু সঙখ্যক সহীহ্ হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেনঃ

বনি-ইসরাঈল বংশে ব্যক্তি ছিল। একজন ছিল দ্বীনের আলিম, সে ফরয নামায পড়ে বসে যেত ও লোকদেরকে দ্বীনের কল্যাণের শিক্ষা দান করত। আর অপর জন ফরয নামায পড়া ছাড়া দিনের বেলা নফল রোযা রাখত, রাতে না ঘুমিয়ে নফল ইবাদত করত।–হে রাসূল, আপনি বলুন, এই দুই জনার মধ্যে কোন্ জন অতি ভালো?

জবাবে রাসূলে করীম (স) বললেনঃ

(আরবী*************)

যে আলিম ফরয নামায রীতিমত আদায় করে লোকদিগকে দ্বীনের কল্যাণ শিক্ষা দানের জন্য বসে যায়, সে সেই ইবাদাতকারী ব্যক্তির তুলনায় অনেক ভালো, যে দিনে নফল রোযা রাখে ও রাতে ইবাদাত করে –এই ভালো ঠিক তেমনি, যেমন তোমাদের একজন সাধারণ ব্যক্তির তুলনায় আমি ভাল।

অপর এক হাদীসের প্রথম অংশ হচ্ছেঃ

(আরবী*********)

আল্লাহ্ যাকে কল্যাণ দিতে চান, তাকে দ্বীনের সমঝ-বুঝ ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী বানান।

এই দীর্ঘ আলোচনা (আরবী টীকা***************) থেকে গৃহীত।

‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজটিকে এ ভাবে দু’ভাগে ভাগ করা যায় যে, এ কাজ মোটামুটি সহজ, সেজন্য খুব বেশী প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না। খুব শক্তি-সামর্থ বা যোগ্যতারও তেমন আবশ্যকতা থাকে না। কেননা এ পর্যায়ের কাজ এতটুকু যে, মুখে বলতে হবে, লোকদের হৃদয়কে উদ্বুদ্ধ করতে ও তা পালন করার জন্য প্রত্তুত করতে চাইতে হবে।

আর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ যথেষ্ট প্রস্তুতি শক্তি-সামর্থ্য ও কর্তৃত্ব প্রতিপত্তির উপর নির্ভরশীল।

প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পর্কে হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ

(আরবী******************)

দিল্ ও মুখ দিয়ে অন্যায় ও পাপের প্রতিবাদ করার কাজকে যে লোক ত্যাগ করল, সে জীবিত লোকদের সমাজে এক মৃত মানুষ।

এ পর্যায়ের কাজ করা প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির পক্ষেই অতিব সহজ। কেননা মুখ দিল ও চেহারাকে অতিক্রম করে না। এ কাজ শাসক-শাসিত, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষের পক্ষে করাই সম্ভব এবং সহজ।

আর দ্বিতীয় পর্যায়ের ‘আমল বিল মারূফ’‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ করা ফরয রূপে পণ্য। তা দ্বীন কায়েমের সহায়ক এবং পথ-ঘাটে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং জালিমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করার পথ উন্মুক্ত করে। সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ও স্থিতির জন্য তা অপরিহার্য এবং শত্রুর প্রতিরোধ –তার উপর দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের একমাত্র পথ। আর তা শক্তি, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি ভিন্ন হতে পারে না।

আল্লাহ্ তা’আলা হযরত লুকমান (আ)-এর তাঁর পূত্রের প্রতি নসীহত প্রসংঙ্গে অন্যান্য কথার সঙ্গে এ কথাটিরও উল্লেখ করেছেনঃ

(আরবী*******************)

ভালো কাজের আদেশ কর এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ কর। আর তোমার উপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ কর। মনে রেখো, এ নিশ্চয়ই অত্যন্ত উচুঁদরের সাহসিকতা ও বীরত্বের কাজ।

‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর নির্দেশের পরই ধৈর্য অবলম্বন করতে বলা হয়েছে সেই বিপদে, যা তোমার উপর ঘনিয়ে আসবে। এ থেকে বোঝ যায়, এ কাজটাই এমন যে, এর ফলে এই কাজ যারাই করবে তাদের উপর বিপদ ঘনিয়ে আসা যেমন কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়, তেমনি নয় কিচু মাত্র অসম্ভাবও। অন্যথায় এখানে ধৈর্য ধারনের নির্দেশ দেয়ার কোন সঙ্গতি থাকে না।

‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ যে অত্যন্ত বড়, অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সে জন্য বিরাট সাহসিকতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন তা ও থেকেই বোঝা যায়।

আবুল আব্বাস আল-মুবরাদ বলেছেনঃবনী-ইসরাইলীদের নিকট নবী এলেন তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়ার জন্য। কিন্তু লোকেরা নবীগণকে হত্যা করলে পরে তাদের মধ্য থেকেই কিছু সংখ্যক মু’মিন লোক দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁরা লোকদেরকে ইসলাম পালনের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাদেরকেও লোকেরা হত্যা করল। তাদের সম্পর্কে কুরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছেঃ

(আরবী****************)

যারা আল্লাহর আয়াত অমান্য করে, নবীগণকে অন্যায়-অকারণ হত্যা করে, এমনি তাদের পর জনগণের মধ্য থেকে যারা উঠে ইনসাফ ও সুবিচার করতে বলে তাদেরকেও হত্যা করে, এই লোকদেরকে কঠিন পীড়াদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। এই লোকেরা হচ্ছে এমন, যাদের (নেক) আমল ইহকাল পরকাল সর্বত্রই সম্পূর্ণ নিষ্ফল ও নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তাদের সাহায্যকারী কেউ-ই কোথাও নেই।

এ আয়াতদ্বয় স্পষ্ট করে বলছে যে, বনি ইসরাইলের লোকেরা অকারণ ও নিতান্ত অন্যায়ভাবে কেবল নবী-রাসূলগণকেই হত্যা করেনি; নবী বা রাসূলের পর তাঁদের উম্মতের মধ্য থেকে যারাই ইনসাফ সুবিচারের আহবান জানানো ও প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্ঠা চালানোর জন্য উঠেছেন, তাঁদেরকেও তারা হত্যা করেছে।

নবী-রাসূলগণের কাজ আল্লাহর বন্দেগী কবুল করার আহবান জানানো। যারা এই আহবানকে অগ্রাহ্য করবে তারা কাফির। বনু-ইসরাইলীদের মধ্যকার এই কাফিররা দ্বীন, ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার আহবানকারী কাউকেই ক্ষমা করেনি, সহ্য করেনি। তাদেরকে দুনিয়া থেকেই চিরদিনের তরে বিদায় করে দিয়েছে তাদেরকে হত্যা করে। এই নবী-রাসূল ও তাঁদের পরে যারা উঠেছেন, তারা যে কাজ করতেন, তা ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ ছাড়া তো আর কিছু নয়। কিন্তু এই কাজের জন্যও তাদেরকে শক্ত প্রতিরোধ, আক্রমণ-প্রতি-আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়েছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই অপরাধে (?) জীবনটাকে পর্যন্ত অকাতরে বিলিয়ে দিতে হয়েছে।

স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজটির প্রথম পর্যায় খুবই সহজ, নির্বিঘ্ন ও বিপদহীন। কিন্তু এ কাজ যখন তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করে, সমালোচনা তীব্র ও তীক্ন হয়ে উঠে, যখন শক্তি প্রয়োগে ইসলামের দুশমনদের নির্মূল করার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়, ঠিক তখনই হয় ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজটির চূড়ান্ত স্তর।

হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) একটি ভয়াবহ ও করুণ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন –নবী করীম (স) বলেছেনঃ

বনি ইসরাইলীরা দিনের প্রথম ভাগে মাত্র এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে তেতাল্লিশ জন নবীকে হত্যা করেছিল। তারপর বনি ইসরাইলের দাসদের মধ্য থেকে একশ’বারোজন ব্যক্তি মাথা তুলে দাঁড়াল এবং তারা ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করতে লাগল। কিন্তু বনি ইসরাইলীরা সেই দিনের শেষ প্রহরেই সেই সমস্ত লোককে হত্যা করেছিল। উপরোদ্ধৃত আয়াতে তাদের কথাই বলা হয়েছে।

এই সব কথাই (আরবী টীকা*********************) থেকে উদ্ধৃত।

কাজে ই ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজটি কিছুমাত্র সহজ-সরল ও জটিলতা, বাধা-প্রতিবন্ধকতাহীন নয়। এ কাজ শুরু করলে যারা তা পছন্দ করে না –তা হোক তা চায় না তারা বাধা দেবেই। যদি বাধা না দেয় আর সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নতার সাথে এ কাজ চলছে বলে দেখা যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে বুঝতে হবে, সমস্ত মানুষই তা গ্রহণ করেছে। এ কাজের সাথে তাদের কোন বিরোধই নেই। ফলে বিঘ্ন সৃষ্টির কোন কারণ ছিল না। আর জনগণ সকলেই যদি তা গ্রহণ না করে ও তার বিরুদ্ধতা না করে তাহলে দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে জনাবে যে, যা হচ্ছে তা আর যা-ই হোক, কুরআন উপস্থাপিত ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ নয়। তা অন্য কিছু।

বস্তুত ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই করণীয়। কিন্তু যদ্দিন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তা করা যাচ্ছে না –অন্য কথায় ইসলামী হুকুম কায়েম হয়ে সে দায়িত্ব পালন শুরু করে না দিচ্ছে, তদ্দিনও এ কাজ করতে হবে। এমনভাবে করতে হবে যেন শেষ পর্যন্ত সে কাজ রাষ্ট্রীয়বাবেই সম্পন্ন হতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থায় এই কাজ কঠিন বাধার সম্মুখীন হতে পারে। সেজন্য জীবন ও প্রাণ দেয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। শুধু প্রয়োজন হতে পারে তাই নয়, ইসলামী হুকুমত এমনই এক বিষ্ময়কর প্রকৃতি সমৃদ্ধ ব্যবস্থা যা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য চেষ্টাকারীদের রক্ত প্রবাহিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করতে প্রস্তুত লোকদের দ্বারাই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হতে পারে। আর তা হয়ে গেলে তখন এ কাজটির দায়িত্ব প্রধানত প্রশাসনিক ও নির্বাহী শক্তি বা বিভাগের হাতে থাকবে বটে কিন্তু প্রতি মুহূর্তের, দিন-রাতের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ও ব্যাপারে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ ব্যক্তিগণের দ্বারা একান্তই ব্যক্তিগতভাবে ও সমাজের দ্বারা দলবদ্ধভাবেই আঞ্জাম পেতে হবে। কেননা এটা সর্বজনীন দ্বীনী ফরয। এ ফরয প্রত্যেক ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে তো অবশ্যই পালন করতে হবে। সমষ্টিগত বা রাষ্ট্রীয়ভাবে তা পালিত হওয়ার প্রশ্ন তো অনেক পরে। তার স্তর ও পর্যায়ও এবং চূড়ান্ত। তখন রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতাও নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে প্রধানত পালিত হবে।

এই ক্রমিক পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের কথা ও তার মাত্রা একটি প্রখ্যাত ও প্রায় মানসম্মত হাদীসে স্পষ্ট করে উদ্ধৃত হয়েছে। নবী করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ

(আরবী******************)

তোমাদের মধ্যের কেউ যখন কোন অন্যায় ও শরীয়াত পরিপন্থী কাজ হতে দেখবে, তখন হস্ত দ্বারা –শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে (ও ক্রমিক নিয়মে) তা পরিবর্তন করতে চেষ্টা করা তার কর্তব্য। তা করতে সমর্থ না হলে মুখ দিয়ে তার বিরুদ্ধে বলতে (বা ভাষা-সাহিত্য প্রয়োগে লিখতে) হবে। আর তা করতেও অসমর্থ হলে দিল দিয়ে তার প্রতিবাদ করতে হবে (কিংবা তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে হবে ও তার বিনাশ কামনা করতে থাকতে হবে)।

স্মরণ রাখতে হবে, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন, ইসসাফ কায়েম, শত্রুর উপর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ –সর্বোপরি জালিমকে তার জুলুম থেকে বিরত রাখা, কাউকে দ্বীনে সীমালংঘন করতে না দেয়া, মুসলিম জনগণের মধ্যে পূর্ণ ইনসাফ সহকারে বায়তুলমালের সম্পদ বণ্টন, যাকাত-সাদাকাত আদায় ও ব্যায় –এক কথায় অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বিধান ব্যক্তিগত বা নিছক মৌখিকভাবে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করার দ্বারা সম্পন্ন হতেই পারে না, তা সম্পন্ন করতে হবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। রাষ্ট্রশক্তির অমোঘতা ও অপ্রতিরোধ্যতার দ্বারা। কেননা সেজন্য প্রশাসনিক শক্তি ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতেই হবে। আর তা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্রের ব্যবস্থাধীনেই কার্যকর হওয়া সম্ভব।

হযরত আমীর মু’আবিয়া (রা)-র পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব যখন ইয়াযীদের হাতে এলো, তখন এই দীর্ঘ আলোচিত ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর কাজ বিপর্যস্ত হয়ে যাবে মনে করেই হযরত ইমাম হুসাইন (রা) তার বিরুদ্ধে প্রায় এককভাবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতিরোধ শক্তি যখন নিঃশেষ হয়ে আসছিল, তখন আল্লাহর নিকট দোয়া করেছিলেন এই ভাষায়ঃ

(আরবী***************)

হে আমাদের মহান আল্লাহ! এই যা কিছু হয়েছে তা ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতা করার জন্য ছিল না। চূর্ণ-বিভক্ত জিনিসের কোন একটি অংশ অর্জনেরও ছিল না কোন আকাঙ্কা। আসলে লক্ষ্য ছিল তোমার দ্বীনের নিদর্শনসমূহ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করা, তোমার জমীনের শাসন-শৃঙ্খলার অবস্থা সংশোধন ও উন্নয়ন প্রকাশমান করা, যেন তোমার মজলুম বান্দাগণ শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে পারে এবং তোমার শরীযাতের ‘হদ্দ’সমূহ –যা বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ ও অকেজো করে রাখা হয়েছে –পুনঃ কার্যকর করা।

বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগ (Executive) সদা কার্যকর না থাকলে মজলুম মানুষেরা নিরাপত্তা পেতে পারে না, বেকার করে রাখা আল্লাহর ‘হদ্দ’ ও দন্ডসমূহ কার্যকর ও বাস্তবায়িত হতে পারে না। সমাজে সাধারণ সংস্কারমূলক কার্যাদি সুসম্পন্ন হতে পারে না। আল্লাহর আইন বিধান –আদেশ নিষেধসমূহ কার্যকর হতে পারে না। কুরআনের ঘোষণানুযায়ী এই বিভাগটিই হচ্ছে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ বিভাগ। এই বিভাগটি অবশ্যই সরকারী পর্যায়ে সরকারী শক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এ কাজ কোন ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে সম্পাদন করতে পারে না।

এই নির্বাহী বিভাগও নিছক মুখের কথা দ্বারা বা শুধু ওয়ায-নসীহতের মাধ্যমে এ কাজ করতে পারে না। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ একান্তই অপরিহার্য। এ বিভাগটিই হবে সেজন্য দায়িত্বশীল। নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটি থেকেও আমরা এ তত্ত্ব জানতে পারিঃ

(আরবী************)

তোমরা দেখতে পাও, এদের (ইয়াহুদী সমাজের) অনেক লোক-ই গুনাহ্, জুলুম, রাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে-কর্মে প্রবল প্রতিযোগিতা ও চেষ্টা-সাধনা করে যাচ্ছে। এরা নির্ভয়ে হারাম খাচ্ছে। বস্তুত এরা যা কিছু করে, তা অত্যন্ত খারাপ।

এদের মধ্যকার আলিম ও পীর-পূরোহিতগণ তাদেরকে এসব পাপের কথা ও কাজ হারাম মাল ভক্ষণ থেকে কেন বিরত রাখছে না। …………… এরা যা কিছু কাজকর্ম করছে, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত খারাপ।

কুরআন মজীদের এই ঘোষণাটি ঐতিহাসিকভাবে এতই সত্য যে, ইতিহাসের সাক্ষ্য ও কুরআনে উল্লিখিত ঘটনাবলীর সামঞ্জস্য দেখে বিপুলভাবে বিষ্মিত হতে হয়। কুরআন মজীদে উল্লিখিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতে নিঃসন্দেহে লক্ষ্য করা যায় না, সমাজের লোকেরা যখনই আল্লাহর নাফরমানী কাজে লিপ্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যকার সাধারণ সুস্থ বুদ্ধির লোকেরা, আলিম ও পন্ডিত লোকেরা এবং  সর্বোপরি শাসন কর্তৃপক্ষ জনগণকে সেই নাফরমানীর কাজ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেনি, লোকদেরকে বোঝায় নি কিংবা বাধা দেয়নি –জনগণ সেই নাফরমানীর কাজে ক্রমাগত এগিয়ে গিয়েছে ও গভীর ভাবে পাপ-পংকে নিপতিত হয়ে হাবুডুবু খেতে থেকেছে, তখনই সেই সমাজের উপর আল্লাহর কঠিন আযাব এসেছে এবং সে আযাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে।

মোটকথা, কুরআন ও সুন্নাতে রাসূল (স) থেকে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজের দুইটি প্রকার বা পর্যায় প্রমাণিত হয়। একটি প্রত্যেক কর্তব্য পর্যায়ের আর অপরটি ক্ষমতাসীন প্রশাসনিক সংস্থার। এই দুই পর্যায়ের আয়াত ও হাদীসের মূল বক্তব্য সমস্ত সমাজ-সমষ্টির উপর এই দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পক্ষে, আর অনেকগুলি আয়াত ও হাদীসের বক্তব্য একটি বিশেষ সংস্থার উপর এই দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পক্ষে। প্রথমোক্ত আয়াত ও হাদীসের কথা হচ্ছে, এ দায়িত্ব সমাজের প্রত্যেক ব্যাক্তিকেই পালন করতে হবে। অর্থাৎ সকলকেই সে কাজ করতে হবে। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের আয়াত ও হাদীস প্রমাণ করে যে, এ দায়িত্ব সমষ্টিকে পালন করতে হবে তাদের পক্ষ তেকে নিয়োজিত এক জনসমষ্টি বা সংস্থাকে, যার পশ্চাতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন থাকবে।

প্রশ্ন হতে পারে, কুরআনে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ এর আদেশ এসেছে, প্রথমটির উদ্দেশ্য লোকদেরকে ভালো কাজ করতে বলা এবং দ্বিতীয়টির অর্থ লোকদেরকে উপদেশ দেয়া যে, তোমরা শরীয়াত বিরোধী কাজ করো না, কিন্তু তাতে শরীয়াতের আইন কার্যকর করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বলে তো মনে হয় না। আর তা না হলে হত্যাকারীকে হত্যাপরাধের দন্ড দান কিংবা ব্যভিচারীকে দোররা মারা বা পাথর মেরে হত্যা করা –প্রভৃতি কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়িত হবে কি ভাবে?

এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ করার যে আদেশ শরীয়াতের দলীলে উদ্ধৃত হয়েছে, তার মধ্যেই কুরআন সুন্নাহর উক্ত আইন কার্যকর করার নির্দেশ ও ক্ষমতা দান রয়েছ্ কেননা ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর অর্থ হচ্ছে, মানুষকে শরীয়াতের খেলাফ কাজ তেকে কার্যত বিরত রাখা –যেন ‘মুনকার’ পর্যায়ের কোন কাজ-ই হতে না পারে। আর তা সম্ভব, যদি হত্যাকারী ও ব্যভিচারীকে কার্যত শরীয়াতের দন্ডে দন্ডিত করা হয়। কুরআনের আয়াতঃ

(আরবী***************)

হত্যাকারীকে হত্যা করা যদিও আরও একটি প্রাণের সংহারকরণ, কিন্তু তা-ই সর্ব মানুষের জন্য পুনরুজ্জীবন –জীবনের নিরাপত্তার ভিত্তি। কিসাস (আরবী**********) এর তা-ই লক্ষ্য। এই কারণেই আরবী ভাষায় একটি বচন প্রচলিত ছিলঃ (আরবী*************) ‘হত্যা হত্যার প্রতিরোধক।‘

মোদ্দা কথা, শরীয়াতের ‘হদ্দ’–নির্দিষ্ট শাস্তিসমূহ কার্যকরকরণ যদিও একটি প্রাণের জন্য নেতিবাচক অবস্থা (Negation) কিন্তু তা-ই সমষ্টির জীবনের জন্য ইতিবাচক।

এই ব্যবস্থা ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’-এর দুইটি প্রকার নির্ধারণ করে এবং সামষ্টিক পর্যায়ে ‘আমর’ ও ‘নিহী’র দায়িত্বশীলের জন্য এমন কতিপয় জরুরী শর্তের উল্লেখ করা হয়েছে, যা ব্যাক্তিগতভাবে এই দায়িত্ব পালনকারীর জন্য করা হয়নি।

বস্তুত শরীয়াত কার্যকরকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলতা। ইসলামী সমাজের প্রাথমিক দায়িত্বশীলেরা তা নিজেরা পালন করতেন তার কল্যাণের সাধারণত্ব ও সওয়াবের বিপুলতার কারণে। আর তাঁরা ‘মা’রূফ’-এর আদেশ করতেন যখন তা পরিত্যক্ত হতে দেখতে পেতেন এবং ‘নিহী আনিল মুনকার’ করতেন যখন দেকা যেত যে, সমাজ ক্ষেত্রে মুনকার ব্যাপক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনকল্যাণই হতো তার মূল চালিকা। এ পর্যায়েই আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*************)

লোকদের গোপন পরামর্শে প্রায়ই কোন কল্যাণ নিহিত থাকে না। অবশ্য গোপনে কেউ যদি অপর কাউকে দান-খয়রাতের উপদেশ দেয় কিংবা ভাল কাজের জন্য অথবা লোকদের পরস্পরের কাজ-কর্মের সংশোধন সূচিত করার লক্ষ্যে কাউকে কিছু বলে, তাহলে তা নিশ্চয়ই খুবই উত্তম কাজ। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে-কেউ এই কাজ করবে, তাকে আমরা বড় শুভ প্রতিফল দিব।

এ আয়াতে (আরবী********) অর্থঃ ততোধিক লোকের গোপন কথা-বার্তা বা পরামর্শ করা। অন্যান্য তাফসীরকারের মতে (আরবী**********) হচ্ছেঃ

(আরবী**********)

বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন বা মাত্র দুই জনের পারস্পরিক কথা-বার্তা বলা –তা গোপনে হোক বা প্রকাশ্য।

এই কথাবার্তা বা পরামর্শ কোন দান বা অর্থনৈতিক কর্তব্য পালনের জন্য হোক বা কি কোন ভাল ও মঙ্গলময় কাজের জন্য হোক অথবা জনগণের পরস্পরের মধ্যে কল্যাণ বিধানের জন্য হোক তাতে অবশ্যই সার্বিক কল্যাণ চিহিত। অবশ্য তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হতে হবে।

রাষ্ট্রপ্রধান বা তার নিকট থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি জনগণের সাধারণ অবস্থা পর্যবেক্ষণ, তাদের সমস্যার সমাধান করা, তাদের বিপদ-আপদ দূর করা, তাদের সার্বিক কল্যাণের ব্যবস্থা করা –তাদের খাদ্য-পানীয়, বাসস্থান ও পথ-ঘাট উন্নয়ন বা তাদেরকে ভালো ভালো কাজে উদ্বুদ্ধকরণ এবং সকল প্রকারের অন্যায় ও পাপের কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা অবশ্যই করণীয়।

এ কাজের দায়িত্বশীলকে অবশ্যই মুসলিম, স্বাধীন (ক্রীতদাস নয়), পূর্ণবয়স্ক, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী ও সুবিচারকারী-ন্যায়বাদী হতে হবে।

(আরবী টীকা***********)

কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এ কাজ করার জন্য এসব শর্তের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

এসব শর্ত ও যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তাই ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজের দুইটি প্রকারে ও পর্যায়ে বিভক্ত করে দেয় সুস্পষ্টভাবে। আর তা হচ্ছেঃ ব্যক্তিগত পর্যায় ও সমষ্টিগত পর্যায়। প্রথমটি প্রত্যেকটি মুসলমানের কর্তব্য আর দ্বিতীয়টি সরকারী ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থার দাযিত্ব। ইসলামী সমাজে এ দুটি পর্যায়ের কাজই সর্বক্ষণ চালু থাকা একান্তই আবশ্যক।

সরকার সংস্থার দায়িত্ব

সামষ্টিক ও সরকারী পর্যায়ে ‘অমর বিল মা’রূফ’ এ ‘নিহী আনিল মুনকার’ কাজের দায়িত্ব ও ব্যবস্থাকে আরবী ভাষায় এক শব্দে বলা হয় (আরবী**********) অর্থাৎ নির্বাহী কর্তৃত্ব। এই পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের জন্য হযরত আলী (রা) ‘খলীফাতুল মুসলিমীন’ হিসেবে তাঁর অধীন নিযুক্ত জনৈক প্রশাসককে লিখেছিলেনঃ

(আরবী********)

তোমার অন্যতম কর্তব্য ও দায়িত্ব হচ্ছে নিজেকে রক্ষা করা এবং জনগণের অবস্থার উপর সজাগ-সতর্ক দৃষ্টি রাখা। এজন্য তোমাকে প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে হবে। জেনে রাখবে, এ কাজের ফলে তুমি আল্লাহর নিকট থেকে যে সওয়াব পাবে, তা থেকে অনেক উত্তম, যা তুমি জনগণের নিকট থেকে পাবে।

এই পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে –নফল কাজ হিসেবে –এই দায়িত্ব পালনকরী এবং সরকার নিয়োজিত সংস্থার দায়িত্ব পালনকারীর মধ্যে কয়েকটি দিক দিয়ে পার্থক্য করা যেতে পারে। যেমনঃ

১. সরকার নিয়োজিত ব্যক্তি বা সংস্থার কর্তব্যই হলো এই কাজ করা। এটা রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব হিসেবেই পালনীয়। তাদের ছাড়া অন্যদের পক্ষে এ কাজ ‘ফরযে কিফায়া’ পর্যায়ের।

২. সরকার নিয়োজিত ব্যক্তি বা সংস্থাকে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনেই সার্বক্ষণিকভাবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হবে। সে কাজ ছাড়া অপর কোন কাজে নিয়োজিত হওয়া বা সময় কিংবা কর্মশক্তি ব্যয় করার কোন অধিকার তার থাকতে পারে না। কিন্তু অন্যান্য লোকদের পক্ষে এ কাজ ছাড়াও অন্যান্য কাজে অংশ গ্রহণে কোন বাধা নেই। কেননা তাদের জন্য তা ‘নফল’ পর্যায়ের।

৩. যে কাজকে বাধাদান তার কর্তব্য, সে কাজের প্রতি তার থাকতে হবে পরম শত্রুতা। সেজন্য প্রয়োজনমত শক্তি প্রয়োগও তার কর্তব্যভুক্ত। অন্যান্যদের জন্য তা নয়।

৪. সরকার নিয়োজিত ব্যক্তি বা সংস্থাকে এই কাজের জন্য যখনই এবং যেখান থেকেই ডাক আসবে তাতে মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব না করেই সাড়া দিতে হবে। অন্যান্যদের জন্য তা কর্তব্যভুক্ত নয়।

৫. তার অধিকার রয়েছে ‘মুনকার’ দমনের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্যকারী নিয়োগ করার। কেননা তাকে তো কেবল এই কাজের জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে এবং যে-কোন ভাবে তাকে তা সম্পন্ন করতেই হবে। আর সেজন্য তাকে অবশ্যই শক্তিসম্পন্ন ও পরাক্রমশালী হতে হবে। অন্যন্যদের জন্য ততটা করা জরুরী নয়।

৬. প্রকাশ্যভাবে ‘মুনকার’ কাজ সংঘটিত হয়ে থাকলে তাতে ‘তা’জীর’ করা –উপস্থিত ভাবে শাস্তি দান –করার অধিকার রয়েছে। তবে তাতে সীমালংঘনের কোন অধিকার তার নেই। কিন্তু অন্যান্য লোকদের পক্ষে ‘তা’জীর’ বা শাস্তিদানের –অন্য কথায় আইন হাতে লওয়ার কোন সুযোগ বা অধিকার থাকতে পারে না।

৭. সরকার নিয়োজিত ব্যক্তি বা সংস্থার বেতন-ভাতা বায়তুলমাল থেকে দিতে হবে। নফল কাজ হিসেবে যারা এই কাজ করবে, বায়তুলমাল থেকে তাদেরকে বেতন-ভাতা দেবার কোন ব্যবস্থা থাকতে পারে না।

সরকার নিয়োজিত ব্যক্তি বা সংস্থা এবং নফল কাজ হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে এই কর্তব্য পালনকারীর মধ্যে মোটামুটি এ-ই হচ্ছে পার্থক্যের বিভিন্ন দিক।

(আরবী***********)

উপরে এই কথাগুলি কুরআন ও সুন্নাহ ঘোষিত বিধানের আলোকে-নিঃসৃত। আর ও সবই সাধারণভাবে সর্ব মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে বিধিবদ্ধ। ইসলামী রাষ্ট্রনীতির মধ্যে এগুলি নিবিড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবে অন্তর্ভুক্ত। এই প্রেক্ষিতে একথাও স্পষ্ট যে, সরকারী সংস্থার কাজ নিছক ‘ওয়ায’নসীহতের সাহায্যে ‘মুনকার’ প্রতিরোধ করা নয়, তাদের কর্তব্য, ওয়ায-নসীহতের পর্যায় অতিক্রম করে প্রয়োজনমত শক্তি নিয়োজিত করা। কেননা এ ছাড়া সামষ্টিকভাবে শান্তি শৃঙ্খলা (Law and order) স্থাপিত ও রক্ষিত হতে পারে না, পারে না জনগণের জান-মাল-ইযযত আবরু’র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রের এটাই হচ্ছে অন্যতম প্রধান কাজ। শরীয়াত বিরোধী কাজকে কার্যত দমন ও প্রতিরোধ করা না হলে ‘ইসলামী হুকুমাত’ কায়েম করাই অর্থহীন ও নিষ্ফল চেষ্টা-প্রচেষ্ঠা মাত্র।

এই সংস্থার কার্যাবলীর একটি তালিকা এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে নমুনাস্বরূপ এ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা দেয়ার জন্য মাত্রঃ

১. যাবতীয় হারাম যন্ত্রপাতি, মদ্যপান, জুয়াখেলা, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, যিনা-ব্যভিচার, দর্ষণ ইত্যাদির ব্যাপারে ব্যাপক সতর্ক দৃষ্টি রাখা, যেন এই ধরনের কোন কাজ সমাজে হতেই না পারে। এই কাজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভুক্ত।

২. ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম-যিম্মী-নাগরিকদের সাধারণ সার্বিক অবস্থা এবং সেই সাথে তাদের কর্মতৎপরতার প্রতি তীক্ন সজাগ দৃষ্টি রাখা! তাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক দিয়ে কোনরূপ অসুবিধা সৃষ্টি হতে না পারে, কোনরূপ অবিচার-জুলুম, অধিকার হরণ বা বঞ্চনা ঘটতে না পারে –সেই সাথে তারা কোনরূপ রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হতে না পারে, সে বিষয়ে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন। এই ব্যাপারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই।

৩. সাধারণ জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে সতর্কতা রাখা। কোনরূপ সংক্রামক রোগ বা মহামারী দেখা দিলে অবিলম্বে তা প্রতিরোধেরব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই কাজ।

৪. ব্যবসায়-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেন-দেনের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখা, যেন নিষিদ্ধ পন্থায় এসব কাজ হতে না পারে। সুদ-ঘুষের কোন কাজ হতে না পারে, সে দিকে লক্ষ্য রাখা। এ কাজ অর্থ মন্ত্রণালয়েরও অধীন থাকবে।

৫. সামাজিক ও নৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনরূপ বিপর্যয় দেখা দিতে না পারে –পূর্ব থেকেই সে ব্যাপারে সজাগতা অবলম্বন এবং কোথাও পারস্পরিক ঝগড়া-ফাসাদ ও বিবাদ-সিবম্বাদ দেকা দিলে অনতিবিলম্বে প্রতিরোধমূরক পদক্ষেপ গ্রহণ, যেন বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটতে না পারে। এটি স্বরাষ্ট্র পর্যায়ের কাজ হলেও সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতি রক্ষার গুরুত্বের কারণে একটি স্বতন্ত্র মান্ত্রণালয় গড়ে তোলা যেতে পারে।

৬. জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির –বিশ্লেষণ করে ধাক্য-পানীয়-দ্রব্যাদি-পরিধেয় বস্ত্রাদির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কোনরূপ অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে না পড়ে, সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ –কোন দিকে একবিন্দু অসুবিধা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গেই তা দূর করা। এটা খাদ্য বিভাগের দায়িত্বভুক্ত। খাদ্যদ্রব্যের ভেজাল মিশ্রণকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা একান্তই কর্তব্য।

৭. যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সর্বতোভাবে নির্বিঘ্ন ও বাধা-প্রতিবন্ধকতা মুক্ত রাখা, যেন জনগণের যাতায়াত, সংবাদ আদান-প্রদান –প্রেরণ- গ্রহণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কোনরূপ বিঘ্নতার সৃষ্টি হতে না পারে, পণ্যদ্রব্যের আমদানি-রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ আগমন-নির্গমনে কোন অসুবিধা না হয়, তাও লক্ষ্য করতে হবে। বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের কোন দুর্নীতি বা ঠকবাজি চলতে দেয়া যাবে না।

৮. পরিমাপ যন্ত্র, নিক্তি, দাড়িপাল্লা, গজ-ফিতা, লিটার-মিটারের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চালু করতে হবে। এসব ক্ষেত্রেও যাতে করে শরীয়াতের সীমা-লঙ্ঘিত হতে না পারে, তা অবশ্যই তীক্ন দৃষ্টিতে ও সদা কার্যকর নীতেতে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

৯. শ্রমজীবীদের প্রতি মালিক বা মনিব পক্ষ থেকে কোনরূপ অবিচার, জুলুম বা পীড়ন না হয়, তা বিশেষ গরুত্ব সহকারে লক্ষ্য রাখতে হবে। শ্রমজীবীদের মধ্যে কোনরূপ শ্রেণী-পার্থক্য করা চলতে পারে না। পেশাজীবীদের কার্যে বিঘ্ন না ঘটে, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অবভাব বা দুষ্প্রাপ্যতা দেখা না দেয়, তাতে কোনরূপ একচেটিয়া কর্তৃত্ব বা মজুদকরণ (Hoardings) না চলে তা গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।

১০. শিক্ষাক্ষেত্রে কোন অচলাবস্থা দেখা না দেয়, শিক্ষকদের, ইমাম-মুয়াযযিনদের বেতন-ভাতায় অসুবিধা না ঘটে, ছাত্র শিক্ষকদের পারস্পরিক সম্পর্কের পতন না ঘটে, শিক্ষক ও ইমামগণের স্বকাজের যোগ্যতা-অযোগ্যতা যথার্থভাবে যাচাই-পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে থাকে, তার উপরও কড়া নজর রাখতে হবে।

১১. শিশু, বালক, স্ত্রীলোকদের অযত্ন, লালন-পালন-হিফাযতে কোনরূপ অসুবিধা দেকা দেয়া, কোনরূপ নীতিহীনতার অনুপ্রবেশ, অশিক্ষা-কু-শিক্ষার প্রচলন হওয়া ইত্যাদি ক্ষতিকর দিকগুলির প্রতি তীক্ন দৃষ্টি রাখতে ও তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।

১২. সর্বোপরি গোটা সমাজ ও লোক সমষ্টির সার্বিকভাবে ইসলামী আদর্শ পালন ও অনুসরণে কোনরূপ বক্রতা না আসে, জনগণ জাতীয় আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত না হয়, কোন একজন মানুষও ন্যায্য ও সুবিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকতে বাধ্য না হয়, ন্যায়পরতা ও ইনসাফ সর্বাধিক গুরুত্ব পায় –সে ব্যাপারে পূর্ণ সজাগ থাকতে হবে। ইসলামী আইন ভঙ্গকারীরা সঙ্গে সঙ্গে বাধাগ্রস্থ হয় –এক্ষেত্রে কোনরূপ পৌন-পুনিকতার সুযোগ না ঘটে তার সুষ্ঠু ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। অপরাধীকে উপস্থিত শাস্তি দিয়ে সর্বপ্রকারের অনাচার প্রতিরোধ করতে হবে। এই বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির অবশ্যই বিশেষ যোগ্যতা ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের অধিকারী হতে হবে। এ পর্যায়ে ইতিহাস দার্শনিক আল্লামা ইবনে খালদুন যা লিখেছেন, তার সারনির্যাস হচ্ছেঃ

‘আল-হাসবা’ হিসাব-নিকাশ গ্রহণ বা পর্যবেক্ষণ বিভাগের কাজকর্মও একটা দ্বীনী মন্ত্রণা বা বিভাগ রূপে গণ্য হয়। আর তা দ্বীনের তাবলীগেরই একটি শাখা ছিল। এই কাজের জন্য যোগ্য লোক বাছাই করার দায়িত্ব খলীফাতুল মুসলিমীন-এরই ছিল। সে যাকে পছন্দ করত, এই কাজে নিযুক্ত করত। পরে সে স্বীয় সাহায্যকারী যোগাড় করে নিত। লোকদের খারাপ কার্যকলাপ ও দুষ্কৃতির উপর কড়া নজর রাখত, খোঁজ-খবর নিত। এ ধরনের কাজের খোঁজ পেলে জরুরী প্রশাসনিক –শান্তিদান ও শিক্ষাদানের –পদক্ষেপ গ্রহণ করত। প্রত্যেকটি ব্যাপারে লোকদেরকে বাধ্য করত, যেন তারা সাধারণ শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার মত কোন কাজ না করে। যেমন পথ-ঘাটে ভিড় সৃষ্টি না করা, যানবাহনে ও ভারবাহী পশুর উপর অবাঞ্চনীয় দুর্বহ বোঝা না চাপানো, যেমন ঘর-বাড়ী ধ্বসে পড়ার আশংকা, তা সে সবের মালিকরা নিজেরাই যেন ধ্বসিয়ে দেয়, যেন হঠাৰ করে ধ্বসে গিয়ে পথের লোকদের বিপদে না ফেলে। পাঠশালা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত শিক্ষকরা বালক-বালিকা ও শিক্ষার্থীদের উপর প্রয়োজনাতিরিক্ত মারপিট না করে। মোটকথা, এই ধরনের কাজকর্মের দায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়ের কাজ হতো। এই মন্ত্রণালয় অপেক্ষায় থাকতো না যে, এই ধরনের কাজকর্মের দায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়ের কাজ হতো। এই মন্ত্রণালয় অপেক্ষায় থাকতো না যে, এই ধরনের ঘটনাগুলি মামলা হিসেবে তাদের নিকট আসবে, তার পরে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, বরং তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এই ধরনের ব্যাপারাদির দেখাশুনা করত। এদিকে তারা কড়া দৃষ্টি রাখত। যা কিচুই তারা জানতে পারত, সে জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করত। সকল প্রকারের দাবি-দাওয়া শ্রবণ করার কোন দায়িত্ব তাদের ছিল না। বরং তাদের অর্থনৈতিক লেনদেন ও ব্যবসায়-ময়দানে যেসব ভুল ও দুর্নীতির কাজকর্ম হতো –যেমন োজনে –মাপে বেঈমানী ও চালবাজি করা, তা বন্ধ করা এই বিবাগের দায়িত্বভুক্ত ছিল। প্রাপ্য দিতে অস্বীকারকারী ও লুট-পাটকারীদের নিকট থেকে ঋণ আদায় করা ও আত্মসাৎ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া এই বিবাগের কাজ ছিল। এসব কাজ এমন, যাতে কোনরূপ সাক্ষ্য-সাবুদের প্রয়োজন পড়ে না। বিশেষ ধরনের কোন ‘রায়’ জানাবারও দরকার হয় না। সাধারণভাবে সংঘটিতব্য ও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারাদিই তাদের উপর সোপর্দ করা হতো এবং অতি সহজেই সিদ্ধান্ত ও করণীয় নির্ধারণ করা যেত। বিচার বিভাগের সাথে এ সবের কোন সম্পর্ক থাকত না। এসব কাজ সাধারণ প্রশাসনিকতার আওতার মধ্যে পড়ে।‘….. ফলে এই বিভাগের কর্মকর্তারা বিচার বিভাগীয কাজেরই সম্পূরক বা সহায়তাকারী হতো।

মুকাদ্দমা ইবনে খালদন (ম ৮০৮ হিঃ) পৃঃ ২২৫-২২৬।

সরকারী পর্যবেক্ষক-প্রশাসনিক সংস্থার যেসব দায়িত্বের কথা আল্লামা ইবনে খালদূন বলেছেন, তা প্রায় সবই সংস্কার-সংশোধন কাজ এবং সে জন্য ব্যাপক প্রশাসনিক ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনার একান্তই প্রয়োজন। বর্তমান কালে এই ব্যাপক কাজ যথাযথ আঞ্জাম দেয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ মন্ত্রণালয় গড়ে তোলা হয়ে থাকে। বর্তমান কালে এই কাজ যেমন ব্যাপক ও বিশাল, তেমনি যথেষ্ট মাত্রায় জটিলও। ইসলামী যুগে এজন্য তেমন ব্যাপক কোন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হতো না, হয় নাই। তখন কিছু সংখ্যক লোককে এই দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলেই এবং তাদের সামান্য তৎপরতায়ই লক্ষ্য অর্জিত হতে পারত। কেননা মানুষের মধ্যে আদর্শবাদিতা ও ঈমান প্রবল ও তরতাজা ছিল বলে সব দিকের পুঞ্জীভূত সব ক্লেদ-কালিমা ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে দিত। সরকারী ‘ইহতিহাস’ বা ‘আল-হাসবা’ বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেমন সেই ঈমান ও আদর্শবাদে শিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত ছিলেন, তেমনি জনগণও ছিল সে আদর্শের প্রতি পূর্ণ ঈমানদার ও উদ্বুদ্ধ। হযরত উমর (রা) খলীফাতুল মুসলিমীন হিসেবেই লোকদের সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ

(আরবী*************)

হে জনগণ! আমি তোমাদের নিকট যেসব কর্মচারী প্রেরণ করি, তা এজন্য নয় যে, তারা তোমাদের মারধোর করবে কিংবা তোমাদের ধন-মাল লুটে-পুটে নেবে। বরং আমি তাদেরকে তোমাদের উপর নিয়োগ করে পাঠাই  এই উদ্দেশ্যে যে, তারা তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন –তোমাদের যাবতীয় রীতি-নীতি শিক্ষাদান করবে। তা সত্ত্বেও কোন কর্মচারী যদি উপরোক্ত ধরনের কোন সামান্য কাজও করে, তাহলে তা যেন আমার নিকট অবশ্যই পৌঁছানো হয়। যাঁর হাতে উমরের প্রাণ আমি তাঁরই কসম খেয়ে বলছি, আমি তার বিচার অবশ্যই করব।

অপর একটি বর্ণনায় তাঁর এই ভাষণের ভাষা এইরূপ উদ্ধৃত হয়েছেঃ

(আরবী**********)

হে জনগণ! আমি আমার কর্মচারীদের তোমাদের উপর এজন্য নিযুক্ত করিনি যে, তারা তোমাদের উপর বিপদ টেনে আনবে কিংবা তোমাদের ধন-মাল জোরপূর্বক কেড়ে নেবে। বরং আমি তাদের এজন্য নিযুক্ত করেছি যে, তারা তোমাদের উপর বিপদ টেনে আনবে কিংবা তোমাদের ধন-মাল জোরপূর্বক কেড়ে নেবে। বরং আমি তাদের এজন্য নিযুক্ত করেছি যে, তারা তোমাদের মধ্যকার বিবাদ-বিসম্বাদ বা ঝগড়া-ফাসাদ প্রতিরোধ করতে এবং সরকারী ধন ভাণ্ডার থেকে তোমাদের প্রাপ্য তোমাদের মধ্যে বন্টন করে দেবে। সে লোকেরা এ ছাড়া অন্য কিছু করে থাকলে দাঁড়িয়ে তার বর্ণনা দাও।

(আরবী টীকা***********)

হযরত আলী (রা) খলীফাতুল মুসলিমীন হিসেবে তাঁর নিযুক্ত মিসরের শাসনকর্তা মালিক আশতার নখয়ীকে বলেছিলেনঃ

(আরবী***********)

তোমার পরামর্শদাতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে খারাপ হচ্ছে তারা, যারা তোমার পূর্বে খারাপ লোকদের পরামর্শদাতা ও সহকারী ছিল এবং অন্যায় ও পাপের কাজে তাদের সাথে শরীক হয়েছিল। অতএব তাদের সঙ্গে তোমার কোন বন্ধুত্বের  সম্পর্ক কখ্খনই হতে পারে না। কেননা তারা হচ্ছে অপরাধীদের সাহায্যকারী এবং জালিমদের ভাই।

(আরবী টীকা**********)

এই সব ঘোষণা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব পালনে পরামর্শ ও সহযোগিতা দান, সাধারণ শান্তি-শৃঙ্খলার সংরক্ষণ, আইন কার্যকরকরণ –সর্বোপরি জনগণকে সব সময়ই দ্বীন-ইসলামের আইন-বিধান ও নিয়ম-নীতি শিক্ষাদানের জন্য সহকারী ও কর্মচারী নিযুক্ত করতে হবে। তারা সরাসরিভাবে জনগণের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে, তাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবন ও কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবে এবং যে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী বিবেচিত হবে, তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করবে ও দেশের প্রধান দায়িত্বশীল –রাষ্ট্রপ্রধান –কে অবহিত করবে।

এই পর্যায়ে কুরআন-মজীদে উদ্ধৃত হয়েছে, হযরত মূসা (আ) মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেনঃ

(আরবী****************)

আর আমার জন্য আমার নিজের পরিবারের মধ্য থেকে একজন সহকর্মী নির্দিষ্ট করে দাও। অর্থাৎ হারুন, যে আমার ভাই (তাকে)। তার সাহায্যে আমার হস্ত মজবুত করে দাও এবং আমার কাজে তাকে শরীক বানিয়ে দাও।

আল্লাহ তা’আলা হযরত মূসা (আ)-র এই দোয়া কবুল করেছিলেন। তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ

(আরবী*****************)

এবং আমরা নিশ্চিতভাবেই মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার সাথে তার ভাই হারুনকে ‘অজীর’ বানিয়ে দিয়েছিল।

হযরত মূসা (আ)-র দোয়ায় এবং আল্লাহর নিজের ঘোষণার –উভয় আয়াতেই (আরবী*********) ‘অজীর’ শব্দটির ব্যবহার খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। (আরবী******) শব্দটি (আরবী*****) থেকে নির্গত। এর অর্থ, বোঝা। আর (আরবী**********) অর্থ উপদেষ্ঠা, সর্বোচ্চ ক্ষমতাশীলের সাহায্যকারী প্রশাসনিক বোঝা ও দায়দায়িত্ব বহনকারী, তার সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকতাকারী। (আরবী টীকা**********) নবী করীম (স) নব্যয়্যাত লাভের পর একটি ভাষণে বলেছিলেনঃ আরবের কোন যুবকই সেই লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেনি, যা আমি নিয়ে এসেছি। তোমাদের মধ্যে এমন কে কে আছে, যে এই পদের গুরুদায়িত্ব পালনে আমার ওয়াজীর হতে প্রস্তুত রয়েছে? (আরবী টীকা*******) বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রনীতিতে রাসূলে করীম (স)-এর এই দাবিই অঅমাদের জন্য আইনের ভিত্তি। হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)-ই সর্ব প্রথম নবী করীম (স)-এর ‘ওয়াজীর’ হিসেবে মক্কায় তাঁর সব দায়িত্ব পালনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। (আরবী টীকা************)

রাষ্ট্রের –যে কোন কাজের –সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলের যে সাহায্যকারী, পৃষ্ঠপোষক এবং তার পক্ষ থেকে আইন কার্যকরকরণ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী লোক নিযুক্ত করা একান্তই প্রয়োজন, তা এ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে। ইসলাম এ প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছে। নবী করীম (স) ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল হিসেবে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কাজের অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির উপর অর্পণ করেছেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশাসনিক এলাকার বিভিন্ন অংশে দায়িত্বশীল নিয়োগ করেছেন। তবে তাঁর এই নিয়োগকৃত লোকেরা তাঁর ‘ওয়াজীর’ নামে অভিহিত হতেন না, আসলে তারা কেউ গভর্ণর (আরবী*********) বা কেউ কর্মচারী (আরবী*********) রূপে নিযুক্ত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে। তাঁর সময়ের উপযোগী প্রশাসনিক সংস্থাই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এ সব লোকের সমন্বয়ে। উত্তরকালে এলাকার সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরুত্ব বৃদ্ধির সাথে এই প্রশাসনিক সংস্থার সমৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ সংঘটিত হয়েছে।

রাসূলে করীম (স)-এর যুগে প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ

রাসূলে করীম (স) যখনই কোন সাহাবীকে কোন অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্বশীল নিযুক্ত করে পাঠাতেন, তখনই তাকে প্রকৃত ইসলামী আদর্শানুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন। এই পর্যায়ের কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রশিক্ষণমূলক ভাষণের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ

হে মুয়ায! তুমি লোকদেরকে আল্লাহর কিতাব –কুরআন-শিক্ষা দান করবে। তাদেরকে অতীব উত্তম ও পবিত্র নৈতিক চরিত্র ও আদব-কায়দা শেখাবে। লোকদেরকে তাদের বাসগৃহে অবস্থান করতে দেবে –যে ভালো লোক তাকেও এবং যে মন্দ লোক তাকেও। আর তাদের মধ্যে আল্লাহর বিধান কার্যকর করবে, তাঁর আদেশ ও নিষেধসমূহ বাস্তবায়িত করবে, তা অনুসরণে তাদেরকে বাধ্য করবে। তাদের কাজকর্মে কোনরূপ অসুবিধার সৃষ্টি করবে না, কারোর ধন-মালের ব্যাপারেও কাউকে কাতর করে তুলবে না। কেননা তা তোমার কর্তৃত্বের অধীন নয়। সে ধন-মালও তোমার নয়। তাদের রেখে যাওয়া আমানত তাদের নিকট ফিরিয়ে দেবে, তার পরিমাণ কত হোক কি বেশী। জনগণের প্রতি দয়ার্দ্রতা, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাশীলতা দেখাবে –অবশ্য সত্যের দাবিকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করে নয়। কেননা তা হলে লোকেরা অভিযোগ তুলবে যে, তুমি আল্লাহর হককে পরিহার করেছ। যেসব ব্যাপারে তুমি ভয় করবে যে, তোমার কর্মচারীর দোষক্রটির বোঝা তোমার উপর আসবে, সেসব ব্যাপারে আগেই তাদের সতর্ক করে দেবে। অন্যথায় সব দোষ তোমার উপরই চাপানো হবে। জাহিলিয়াতের সমস্ত নিয়ম-নীতি, প্রথান-প্রচলন ও আনুষ্ঠিানিকতা বন্ধ করে দেবে, চালু রাখবে শুধু তা যা ইসলাম প্রবর্তন বা সমর্থন করেছে।

ইসলামের প্রত্যেকটি কাজ ও ব্যপারকে প্রকাশমান প্রকট ও বিজয়ী করে তুলবে –তা ক্ষুদ্র হোক, কি বৃহৎ। তবে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করবে সালাত কায়েমের ব্যাপারে। কেননা দ্বীন কবুল করার পর তা-ই হচ্ছে ইসলামের শির। লোকদেরকে তুমি নসীহত করবে আল্লাহর নামে –তাদের স্মরণ করিয়ে দেবে আল্লাহ ও পরকালকে। লোকদেরকে উপদেশ দান করতেই থাকবে, কেননা তা-ই মানুষকে আমল করার জন্য উদ্বুদ্ধকরণের বড় হাতিয়ার, যে আমল আল্লাহ খুবই পছন্দ করেন। এছাড়া জনগণের মধ্যে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ দানের দায়িত্বশীল লোকদেরকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাঠিয়ে দেবে তুমি দাসত্ব করবে একমাত্র আল্লাহর –তারঁই নিকট ফিরে যেতে হবে। আর এ সব কাজে তুমি কোন উৎপীড়কের উৎপীড়নকে বিন্দুমাত্র ভয় করবে না।

আমি নিজে তোমাকে অসীয়ত করছি আল্লাহকে ভয় করে চলার ও সত্য কথা বলার, ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণের, আমানত ফিরিয়ে দেয়ার, খিয়ানত –আত্মসাৎ ও বিশ্বাস ভঙ্গ পরিহার করার, নম্র কথা বলার, সালাম দেয়ার, প্রতিবেশীর রক্ষণাবেক্ষণের, ইয়াতীমের প্রতি দয়া-অনুকম্পা প্রদর্শনের, নেক আমলের, কামনা-বাসনা খাটো করার, পরকালকে অধিক ভালোবাসার, বিচার-দিনের হিসাব-নিকাশকে বেশী ভয় করার, সর্বাবস্থায় ঈমান রক্ষা করার, কুরআন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করার, ক্রোধ হজম করার ও খিদমতের বাহু সকলের জন্য বিছিয়ে দেয়ার।

কোন মুসলিমকে গালাগাল করা থেকেও দূরে থাকবে। কোন ন্যায়বাদী ও সুবিচারকারী রাষ্ট্রীয় নেতাকে অমান্য করা কিংবা সত্যবাদীকে অসত্যবাদী মনে করার কাজ কখনই করবে না। মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী বলে মানবে না। প্রতি মুহূর্তই তুমি তোমার রব্বকে স্মরণ করবে, যখনই কোন গুনাহ হবে, সেজন্য তাঁর নিকট নতুন করে তওবা করবে। গোপনীয় গোপন রাখবে, প্রকাশ্যকে প্রকাশ্যভাবেই করবে।

হে মুয়ায কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তোমার সাথে আমার আর কখনই সাক্ষাৎ হবে না এই কথা যদি আমি মনে না করতাম তাহলে তোমাকে এই দীর্ঘ ‘অসীয়ত’ করতাম না, সংক্ষিপ্ত কথা বলেই ছেড়ে দিতাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সম্ভবত এ দিনুয়ায় তোমার সাথে আর কখনই আমার সাক্ষাৎ হবে না……….

শেষ কথা হিসেবে তুমি জানবে হে মুয়ায! তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়, যার সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে ঠিক সেইরূপ’ অবস্থায়, যেরূপ সে আমার নিকট থেকে বলে গিয়েছিল।

(আরবী টীকা**************)

এমনিভাবে রাসূলে করীম (স) হযরত আমর ইবনুল আ’স (রা)-কে বনুল হারিস গোত্রের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। তাদেরকে দ্বীন-ইসলামের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে, রাসূলের সুন্নাত ও ইসলামের বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ব নিদর্শনাদি শিক্ষাদানের জন্য। সেই সাথে যাকাত আদায়করণও তাঁর কর্তব্যভূক্ত ছিল। এই উদ্দেশ্যে তিনি তাকেঁ একখানি ‘লিপি’ তৈয়ার করিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে তাকেঁ নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং তাঁর ফরমানও লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন। সে ‘লিপি’ নামা ছিল এইঃ

মহান আল্লাহর নামে –যিদি অতীব দয়াবান ও অশেষ অনুগ্রহশীল ‘এটা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা পত্র’।

হে ঈমানদারগণ, তোমরা চুক্তিসমূহ যথাযথ পূর্ণ কর। মুহাম্মদ আল্লাহর নবী –রাসূল –আমর ইবনে হাজমকে ইয়ামের প্রেরণকালে তার জন্য লিখিত চুক্পিত্র।

তিনি তাঁর সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার নির্দেশ দিলেন। কেননা আল্লাজহ তো তাদের সঙ্গে রয়েছেন, যারা তাকেঁ ভয় করে চলে। আর যারা সকল কাজে সর্বোচ্চ মানের কল্যাণ ও দয়াশীলতা অবলম্বন করে।

তিনি তাকেঁ নির্দেশ দিলেনঃ তিনি যেন গ্রহণ করেন সত্যের ভিত্তিতে –যেমন স্বয়ং আল্লাহ তাকেঁ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যেন জনগণকে পরম কল্যাণের সুসংবাদ দেন এবং তা অবলম্বনের আদেশ করেন। তিনি যেন লোকদেরকে কুরআন শিক্ষা দেন, তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তত্ত্ব অনুধাবন করান, তার ব্যবহারিক আইন-কানুন জানান। পবিত্র অবস্থা ছাড়া কুরআন স্পর্শ করতে তিনি যেন লোকদেরকে নিষেধ করেন। যে কল্যাণ জনগণের জন্য এবং যা জনগণের কর্তব্য, তা সবই যেন তিনি তাদেরকে জানান। সত্য দ্বীনের ব্যাপারে তিনি যেন লোকদের সাথে নম্রতা রক্ষা করেন, আর জুলুম প্রতিরোধে তিনি সর্বাধিক কঠোরতা অবলম্বন করেন। কেননা আল্লাহ জুলুমকে তীব্রভাবে ঘৃণা ও অপছন্দ করেন। তা করতে তিনি নিষেধ করেছেন। বলেছেনঃ

(আরবী****************)

জেনে রাখো, জালিমদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।

তিনি যেন লোকদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন, জান্নাত পাওয়ার উপযোগী আমল করতে উদ্বুদ্ধ করেন। লোকদেরকে যেন জাহান্নামের ভয় দেখান। জাহান্নামে যাওয়ার কাজ করতে নিষেধ করেন। তিনি যেন লোকদেরকে নতুন করে দ্বীন-ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন, অবহিত করেন। এ ছাড়া আল্লাহ আর যা যা করতে বলেছেন, তা-ও যেন জানিয়ে দেন আর বড় হজ্জই হচ্ছে বড় হজ্জ, উমরা হচ্ছে ছোট হজ্জ্ব।

(আরবী টীকা**********)

উদ্ধৃত দুইটি নিয়োগপত্র থেকে নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, রাসূলে করীম (স) তাঁর সাহাবীগণের মধ্যে যে লোককে –প্রয়োজনীয় কার্যসমূহের মধ্যে –যে কাজের যোগ্য মনে করতেন, তাকেঁ সেই কাজে নিযুক্ত করতেন, সেই কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব-ও দিতেন। আর শুধু নিয়োগপত্র দিয়েই তাকেঁ পাঠিয়ে দিতেন না, তাকেঁ কাজ সম্পর্কে পূর্ণ প্রশিক্ষণও দিতেন। তাঁর কাজের প্রকৃতি কি, কি মনোভাব নিয়ে কাজ আঞ্জাম দিতে হবে, কি নিয়ম-নীতি তাকেঁ মেনে চলতে হবে, জনগণের সাথে তাঁকে কিরূপ আচরণ গ্রহণ করতে হবে, সব কথা-ই তিনি তাঁকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন।  আর এ ভাবেই তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সমগ্র ইসলামী রাজ্যে একটি সুসংবদ্ধ প্রমাসনিক কাটামো গড়ে তুলেছিরেন।

তিনি ডাক যোগাযোগ রক্ষার জন্যও দায়িত্বশীল কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন এবং তাদের জন্যও তিনি তাদের কাজের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন। তখনকার সময় চিঠি-পত্রের আদান প্রদান সাধারণত সরকারী পর্যয়েই হতো এবং লোক মারফত সে পত্রাদি প্রেরণ করা হতো। এই কারণে তিনি এ পর্যায়ে নির্দেশ দিয়েছিলেনঃ

(আরবী*************)

তোমরা যখন আমার নিকট কোন পত্রবাহক পাঠাবে, তখন তোমরা অবশ্যই ভালো চেহারার ও ভালো নামের ব্যক্তিকে পাঠাবে।

-(আরবী টীকা*************)

আর যে লোককে কোন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পত্র দিয়ে কোথাও পাঠাতেন, তখন তাকে উপদেশ দিতেনঃ

তুমি যখন তাদের দেশে যাবে,তখন রাত্রি কালে তথায় করবে না। বরং সকাল বেলায় প্রবেশ করবে। উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জন করে প্রবেশ করবে।তার পূর্ব দু ‘রাকয়ত নামায পড়ে নেবে। আর আল্লাহর নিকট সাফল্য ও শুভ গ্রহণের জন্য দোয়া করে নেবে সে জন্য পূর্ব মাত্রায় চেষ্টাও করবে। আর আমার পত্র ডান হাতে নিয়ে তাদের ডান হাতে তুলে দেবে [আরব টীকা………]

তিনি পাহারাদারও নিযুক্ত করতেন। বিশেষ করে রাত্রিকালে সন্দেহভাজন লোকজন দেখা গেলে তাদের উপর নজর রাখার জন্য বিশেষ লোক নিযুক্ত করতেন। পাহারাদার হিসেবে হযরত সায়াদা ইবনে আবূ ওয়াক্কাস (রা)-এর নাম উল্লেখ্য। অনেক অনেক অস্বাভাবিক সময়েও তাঁর জন্য পাহারাদার নিযুক্ত থাকত। উল্রেখ্য করা হয়েছে যে, হযরত সায়দা ইবনে মুয়ায (রা) বদর যুদ্ধ কালে তাঁর পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।[আরবী টিকা……….]

তখন হাটে-বাজারে পণ্য দ্রব্য বহন করে নিয়ে আসা লোকদের নিকট থেকে সস্তায় পণ্য ক্রয়ের জন্য বাজার থেকে দূরে পথের পার্শ্বে লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকত এবং পণ্য বহনকারীরা পথিপার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকা এই লোকদের নিকটই পণ্য বিক্রয় করে দিত। ফলে মূল বাজারের পণ্যের আমদানি পর্যন্ত পরিমাণে হতো না। রাসূলে করীম (স) এই কাজ করতে নিষেধের হুকুম দেয়ার জন্য হযরত সাঈদ ইবনে সঈদ আল-আস (রা)-কে নিযুক্ত করেছিলেন [আরবী টিকা……….]

রাসুল করীম (স)-এর রাষ্ট্রীয় পত্রাদি লেখার জন্য বিশেষ বিশেষ লোক নিযুক্ত ছিল। কোন রাজা-বাদশাহ, শাসনকর্তা, দলপতি বা কবীলা-প্রধানের নিকট তিনি যেসব পত্রাদি প্রেরণ করতেন, এই কাজে নিযুক্ত লোকেরা তা লিখত ও রাসূলে করীম (স)-এর মোহর লাগিয়ে তা প্রেরণ করত। যাদের প্রতি এ সব পত্র প্রেরণ করা হতো, তারা ভিবিন্ন ভাষাভাষী হতো বলে ভিবিন্ন ভাষাবিজ্ঞ লোকদের নিয়োগ করেছিলে। আধুনিক সরকারী ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিতে তা ছিল একটি ছোট-খাটো সচিবালয় [আরবী টিকা……..]

এ ভাবে রাসুলে করীম (স)- তাঁর রাষ্ট্রীয় কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য বহু সংখ্যক সাহায্যকারী কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। যোগ্যতা অনুযায়ী এক-একজন বা একাধিক লোকের উপর এক-একটি কাজের দায়িত্ব অর্পিত হতো। আর এই সকালের সমম্বয়েই তখনকার সময় ও প্রয়োজন উপযোগী এক পূর্ণ মাত্রায় কার্যকর ও বাস্তবায়িত করাই ছিল এ সবের চরম লক্ষ।

প্রশাসনিক দায়িত্ব নিযুক্ত লোকদের জরুরি গুণাবলী  

বস্তুত প্রশাসনিক বিভাগ-ই রাষ্ট্রের প্রকৃত আদর্শ, রীতি-নীতি ও সিদ্ধান্তসমূহ  কার্যকর করার প্রধান হাতিয়ার। এই বিভাগের পূর্ণ দক্ষতা ও কার্যকরতার উপর শধু যে রাষ্ট্রীয় আদর্শের যর্থাথ বাস্তবায়ন নির্ভরশীল তা-ই নয়, রাষ্ট্রের সাফল্য স্থিতিও এরই উপর নির্ভর করে। কেননা জনগণের সাথে এই বিভাগের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। জনগণের যাবতীয় সমস্যার সমাধান, প্রয়োজন পূরণ যেমন এই বিভাগের দায়িত্ব, তেমনি জনগণকে সঠিক পথে পরিচালন, আদর্শের দিক দিয়ে তাদের মধ্যে কোন বিচ্যুতি লংঘন-উপেক্ষা দেখা গেলে তা থেকে তাদের বিরত রাখা ও তাদের সংশোধন ইত্যাদি যাবতিয় কাজ প্রশাসনিক বিভাগের আঞ্জাম দিতে হয়। গোটা দেশের সাধারণ শান্তি-শৃঙ্খলা(law and order)রক্ষা করা ও জনগণের অধিকার আদায় করা এই বিভাগেরই কর্তব্যভুক্ত।

এই বিভাগের যাবতীয় কাজ যথার্থভাবে আঞ্জাম পাওয়া এই বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিশেষ গুণের উপর নির্ভরশীল। সেই গুণ না থাকলে তারা যেমন অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে না, তেমনি জনগণের পক্ষে ও একবিন্দু শান্তি. নিরাপত্তা ও অধিকার পাওয়া সম্ভবপর হতে পারে না।

এইখানে কতিপয় প্রয়োজনীয় গুণের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ

১. দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞতাঃ যে লোককে যে কাজে নিযুক্ত করা হবে বা যে লোকের উপর যে কাজের দায়িত্ব অর্পিত হবে, সেই কাজটি নিখুঁতভাবে করার যোগ্যতাই যদি তার না থাকে, তাহলে সবকিছুই নিষ্ফল হয়ে যাওয়া অবধারিত। কুরআন মজিদ এই দিকে যে গুরুত্ব আরোপ করেছে, তা আল্লাহর এই নির্দেশ থেকেই স্পষ্ট হয়ঃ [আরবী লেখা……]

তোমরা নিজের না জানলে জ্ঞানবান লোকদের নিকট জিজ্ঞাসা কর। এ নির্দেশে প্রত্যেকটি ব্যাপারে দক্ষ-অভিজ্ঞ লোকদের নিকট থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয় জ্ঞান গ্রহণের উৎসাহ দেয়া হয়েছে। কেননা নিজের জানা থাকলে তো সে তার উপর অর্পিত কাজ করতে সক্ষম হবে না। এই কারণেই নবী করীম (স)-ইরশাদ করেছেনঃ[ আরবী লেখা…………..]

কোন কাজের প্রধানত্ব কেবলমাত্র সেই ব্যাক্তির জন্যই শোভন, যে তার যোগ্যতা রাখে।[আরবী টিকা………]

তিনি আরও বলেছেনঃ [আরবী…………] যে লোক না জেনে-শুনে কাজ সে সে কাজটিকেই অনেক বেশী বিনষ্ট করে দেবে তার তুলনায় যে সে কাজের যোগ্যতা রাখে। মূলত যে কা যার জানা নেই বা যা কারার যার যোগ্যতা ও দক্ষতা নেই,তার উপর সেই কাজের দায়িত্ব অর্পণ সেই কাজটিকেই বিনষ্ট ও বিপর্যস্ত করার নামান্তর। সেই কাজটির পরিণতি খারাপ হওয়ার নিশ্চিত ব্যবস্থা মাত্র। সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারেও  এ কথার যৌক্তিকতা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তাহলে সমষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ র্কাযাবলীর ক্ষেত্রে অযোগ্য লোককে নিয়োগ ও দায়িত্বভার অর্পণ কতখানি মারাত্মক ও সমষ্টিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করে ও যুক্তি দিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। এ কারণেই এই বচনটির গুরুত্ব অবশ্যই স্বীকৃতব্যঃ [আরবী লেখা……]

যোগ্য স্থানে যোগ্য লোক নিয়োগই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। আর যোগ্য স্থানে অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ চরম নির্বুদ্ধিতা ছারা আর কিছু নয়।

২. বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতাঃ কর্মের যোগ্যতা-দক্ষতার পর প্রয়োজনীয় বিশেষ গুন হচ্ছে বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা, সরকারী দায়িত্বশীলের আমানতনদার হওয়া। কেননা সরকারী পর্যায়ে যত অসুবিধা ও জন-জবিনে যত দঃখ্ দুর্দশা ও অবিচারের কারণ ঘটে, তার বেশীর ভাগই হয় দায়িত্বশীল কর্মকর্ত ও কর্মচারীদের অবিশ্বস্ততা, অ-নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে-আমানতে খিয়ানত করার কারণে। তাদের মধ্যে উক্ত গুণ না থাকার দরুন কত সরকারী চিন্তা-ভাবনা পরিকল্পনা যে ব্যর্থ হয়ে যায়, আদর্শ বিচ্যুতি ঘটে কত এবং  তার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া জনগণের উপর যে কত শোষণ নির্যাতনের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে, তা লিখে শেষ করা যায় না। এ কারণেই কুরআন মজীদ সকল প্রকারের কল্যাণের জন্য কেবলমাত্র যোগ্য ও বিশ্বত্ব কর্মচারীর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বেলেছনঃ [আরবী লেখা………….]

তোমার জন্য সর্বোত্তম কর্মচারী হতে পারে সেই ব্যক্তি, যে দক্ষ-শক্তিমান, ব্শ্বিস্ত। মনে করা যেতে পারে,কথাটি বলেছিলেন হযরত মূসা (আ) মাদইয়ান উপস্থিত যে দুইজন যুবতী বোনের জন্তুগুলিকে জনাকীর্ণ কূপ থেকে পানি খাইয়ে দিয়েছিলন, তাদেরই একজন তাঁদের বৃদ্ধ পিতাকে লক্ষ করে। তাঁরা তাঁকে ঘরের কাজকর্ম ও ছাগল চরানোর কাজে ‘মজুর’ হিসদের ঘরে রেখে দিয়ে চেয়েছিলেন। কুরআনে এর উল্লেখ আদৌ তাৎপর্যহীন নয়।

ঘর-গৃহস্থালী ও ছাগল চরানোর কাজে লোককে যদি দক্ষ, শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত হতে হয়- যা একটি বিশষে পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে-তাহলে জাতীয়, সমাষ্টক ও রাষ্ট্রীয় কাজে যোদ্যতাসম্পন্ন দক্ষ ও বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য লোক নিয়োগের গুরুত্ব যে কত বেশী, তা না বললেও চলে।

৩. দুনিয়া-বিমুখতা ও সততা-সচ্চরিত্রতাঃ দুনিয়া বিমুখ [ আরবী***** ] বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যে বৈষয়িক সুখ-শান্তি অন্যায়ভাবে লাভ করার প্রতি আগ্রহী নয়, যে লোক অল্প পেলেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়।

সরকারী ও প্রসাশনীক দায়িত্বে এই গুণের লোকদের নিয়োগ করা হলে সরকার যন্ত্রে কোনরূপ ঘুণ প্রবেশ করতে পারে না। সে লোক পদাধিকারের সুযোগে দুর্নীতির মাধ্যমে যেমন অর্থপার্জন করতে সচেস্ট হবে না, তেমনি কোন অন্যায় সুযোগ গ্রহন থেকেও পূর্ণ সতর্কতার সাথে দূরে সরে থাকবে। তার দ্বারা যেমন সরকারের কোনরূপ ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না, তেমনি জনগণের অধিকার হরণ বা তাদেরকে জ্বালা-যন্ত্রণা দেয়ার-তাদের অধিকার হরণের মত কোন কাজ হওয়ার সম্ভাবনাওনিঃশেষ হোয় যাবে। সে উপস্থিত স্বার্থের জন্য কিছুমাত্র কাতর হবে না, দর্নীতির আশ্রয় দিয়ে জনগণের পকেটেও হাত দেবেনা। এ পর্যায়ে গযরদ আলী (রা)-র এ কথাটির গুরুত্ব অবশ্যই স্বীকার্যঃ [আরবি………]

ন্যায়বাদী রাষ্ট্র নেতাদের জন্য আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন যে, তারা যেন জনগণের দুর্বলতার অনুপাতে তাদের জীবিকার পরিমান নির্ধারন করে।

তাহলে তারা তাদের দারিদ্রের সুযোগে কোন অন্যায় কাজ করে বসবে না। শুধু তা-ই নয়, সরকারী-দায়ীত্বশীল লোকদের উচ্চতর ও পবিত্রতর নৈতিক চরিত্রের গুণে ভূষিত হওয়াও আবশ্যক। দুনিয়ার প্রতি লোভহীনতা কোন নেতিবাচক গুণ নয়। বরং তা হওয়া উচিত পুরামাত্রায় ইতিবাচক। তার মধ্যে ধৈর্য-স্থৈর্য ও সহনশীলতাও থাকতে হবে। পুরোপরি ইসলামী আদর্শবাদে উদ্বুদ্ধ  হওয়ার কারণেই হতে হবে এইসব মহৎ গুণের অধিকারী।

অন্যথায় জনগণ যেমন তাদের প্রতি একবিন্দু আস্থাশীল হবে না, তেমনি তারাও কোন কাজে জনগণের একবিন্দু সহযোগিতা পাবে না। আর সেই সহযোগিতা না হলে গোটা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও যৌক্তিই অর্থহীন হয়ে যাবে।

বিচার বিভাগ

বিচার কার্য ও জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসাকরণ দ্বীন-ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সাধাণরভাবে সমস্ত মানব সমাজেই তা মানবতার সেবায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কেননা এ কার্যটি সুষ্ঠরূপে সুসমাপন্ন হওয়ার উপরই গোটা সমাজের নিরাপত্তা, সমাজের লোকদের মনে শান্তি স্বস্তি ও নিশ্চিন্ততা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে। বস্তুত যে সমাজে বিচার নেই জনগণের ফরিয়াদ পেশ করার কোন স্থান নেই এবং তার প্রতিকার করারও কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই, তা বন্য সমাজ হতে পারে, পাশবিক সমাজ হতে পারে, তা কখনই মানুষের বাসোপযোগী সমাজ হতে পারে না। মানুষের জন্য শুধু বিচার নয়, সুবিচারের প্রয়োজন। ফরিয়াদ পেশ করার একটা স্থান থাকাই যথেষ্ট নয়, তা মনোযোগ সহকারে ও অনুকম্পাপূর্ণ অন্তর নিয়ে শুনবার এবং তার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও ইনসাফপূর্ণ প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকাও একান্তই আবশ্যক। অন্যথায় মানুষের জীবন মানবোপযোগী জীবন হওয়ার ও সে সমাজ মানুষের মানবীয় মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া কোন ক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। এই দৃষ্টিতে বিশ্বের সমাজসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হলে একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে যে, ইসলামী সমাজ দুনিয়ার সমাজসমূহের মধ্যে যেমন বৈশিষ্টপূর্ণ, তেমনি তুলনাহীন। ইসলামী সমাজে শুধু বিচার নেই, আছে সর্বতোভাবে ন্যায়সঙ্গত নিরপক্ষ ও আদর্শভিত্তিক সুবিচার। এ সুবিচার ও ইনসাফ ইসলামী সমাজে মানুষকে দেয় পূর্ণ মানবীয় মর্যাদা নিয়ে বসবাস করার নির্বিঘ্ন সুযোগ। নিয়ে আসে পূর্ণ শান্তি ও শৃঙ্খলা, প্রতিষ্ঠিত করে স্থিতিশীলতা, প্রত্যেকটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করে তার মানবীয় অধিকার ও মর্যাদা, মানবিক ও মৌলিক অধিকার, তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। পরিণামে গোটা সমাজই হয় সর্বদিক দিয়ে পুরোপুরিভাবে ভারসম্যপূর্ণ। বিচারের সাথে সুবিচারের সম্পর্ক গভীর ও ওতপ্রোত।বিচার যদি শুধু বিচার না পরিপূর্ণ সুবিচার হয়, তাহলেই সমগ্র সমাজ হতে পারে ন্যায়পরতায় পরিপূর্ণ। সমাজকে ভরে দিতে পারে অভিনব শান্তি-শৃঙ্খলা,সাহসিকতা ও কর্মোদ্দী পনায়। মানুষ তখন তার নিজের প্রান-মান, ধন-মাল ও ইযযত-আবরুর  দিক দিয়ে হতে পারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। আর তার ফলে গোটা রাষ্ট্রই হতে পারে সমৃদ্ধিশালী ও কল্যণময়। কিন্তু তা-ই যদি বিচারের নামে চলে  জুলুম-শোসণ-নির্যাতন. সুবিচার বলতে কোথাও কিছু খঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে চতুর্দিক অরজকতা উচ্ছঙ্খলতা, মারামারি, অপহরণ-ছিনতাই, হত্যা নারী হরণ বলাৎকার ও চুরি-ডাকাতি-লুণ্ঠন দেখা দেয়া অবধারিত । সমগ্র সমাজটাই হয় চারমভাবে বিপর্যস্ত। মানুষ তখন বেঁচে থেকে শান্তি পায় না। শান্তির জন্য যমীনের তলায় আশ্রয় নেবার জন্য মানুষ হয়ে উঠে উদগ্রীব। আর তারা ফলে রাষ্ট্র তার সমস্ত মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। শাসনকার্য সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত ও বিঘ্নিত হয়ে পড়ে, সার্বভৌমত্ব হয়ে পড়ে বিপন্ন। আর শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ধ্বসই হয় পড়ে ললট লেখন।

মোটকথা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ন্যায়পরতা ও সুবিচার। ন্যায়পরতা ও সুবিচারহীন রাষ্ট্র ‘ইসলামী’ নামে অভিহিত হতে পারে না। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতেও তা ‘রাষ্ট্র’ নামে পরিচিতি হওয়ার যোগ্য নয়। এক সাথে বসবাসকারী ব্যক্তিগণের উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় প্রধানত নাগরিকদেরকে রাষ্টের স্বীকৃত আদর্শের অনুসারী বানবার লখ্যে এবং তাদের  মধ্যে স্বভাবতই যেসব মতপার্থক্য, দ্বদ্ধ-সংঘর্ষ ও ঝগড়া বিবাদের সৃষ্টি হয়, তা দুর কর-তার মীমাংসা করে, জনমতকে একই আদর্শিক খাতে প্রবাহিত করে,সর্ব দিক দিয়ে মি-মিশ, আন্তরিকতা- সম্প্রীতি বহাল করে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে চালিত করার উদ্দেশ্যে। সম্মুখের দিকে চলার পতে সব বাধা-প্রতিবন্ধকতাকে দূর করা। আর তার-ই জন্য প্রয়োজন সমগ্র দেশে নিরপেক্ষ সুবিচার ও ন্যায়পরাতার পূণ্য প্রতিষ্ঠা। এই কাজটির জন্যই বিচার বিভাগ অপরিহার্য।

জনগণের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ সৃষ্টির কারণ

ব্যক্তিগণের একত্র সমাবেস, সমম্বয় ও সংযোজনের পরিণতিই সমাজ এবং এই সমাজের জন্য রাষ্ট্র। ব্যক্তিগণের মন-মেজাজ,চিন্তা-ভাবনা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, স্বার্থ ও স্বাতন্ত্র অনেক সময় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের সৃর্ষের সৃষ্টি করে। এতে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। মানুষের ইতিহাস এর অকাট্য সাক্ষী। এ অবস্থা নিত্যনৈমিত্তিক। প্রধানত দু’টি কারণেই তা দেখা দিয়ে থাকেঃ

১. ব্যক্তির স্বার্থপরতা-স্বার্থান্ধতা। ধন-মাল, অধিকার ও মর্যাদা লাভের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগণের মধ্যে যে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা, তা-ই এই দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের মৌল কারণ। আর তা-ও ঘটে তখন,  যখন ব্যক্তিগণ সামষ্টিক আদর্শ, লক্ষ্য ও আদর্শিক মানবিকতাকে ভুলে যায়। ফলে ব্যক্তিগণ নিজের স্বার্থ লাভ করেই নিরস্ত থাকে না, অন্যদের স্বার্থের উপর হস্তক্ষেপ করতেও দ্বিধা করে না। মানুষ মানসিকভাবে এমন এক পর্যায়েও পৌঁছে যায়, যখন নিজের স্বার্থ উদ্ধার হোক, আর নাই হোক, অন্যদের স্বার্থ বিনষ্ট করাই হয় তার প্রধান কাজ। ব্যক্তি তখন হারিয়ে ফেলে তার ঈমান, নৈতিকতা, লজ্জা-শরম। মানুষ তখন মানবাকৃতির হিংস্র পশুতেই পরিণত হয়ে যায়।

২. ব্যক্তিগণের স্বার্থের বৈপরীত্য বা সংঘাত নয়, অনকে সময় সত্য ও স্বর্থ নির্ধারণেই চরম মতবৈষম্যের সৃষ্ট হয়। এ ব্যাপারটিকেও ‘অস্বাভাবিক’ বলা যায় না। কেননা ব্যক্তি যেমন এক স্বতন্ত্র সত্তা, তার মন-মেজাজ, চিন্তা-ভাবনায়ও সেই স্বাতন্ত্র্য ও পার্থক্য হওয়া খুবই স্বাভাবিক। প্রত্যেকেই একটা স্বতন্ত্র ধারণা পোষণ করে, যার সাথে অন্যান্য ব্যক্তিদের ধারণা সমঞ্জস্য  সম্পন্ন হবে, তা জোর করে বলা যায় না। আর তার ফলে মত পার্থক্যই সংঘর্ষের সৃষ্টি করে। একজনের নিকট যা সত্য, অন্যজন তাকেই মনে করে সম্পূর্ণ মিথ্যা। একজনের মতের চরম পরাজয়রূপ চিহ্নিত হয়ে।

এমন পরিস্থিতি দেখা দেয়াও অস্বাভাবিক নয় -ইতিহাসে বহুবার দেখা দিয়েছে, যখন উভয় পক্ষই পূর্ণমাত্রার তাকওয়া পরহেযগারীর প্রতীক, উভয়েরই মনোভাব সম্পূর্ণ নির্মল, নির্দোষ! কিন্তু প্রকৃত মত কোথায় নিহিত, তা নির্ধারণে অক্ষম হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের সৃষ্টি করে। আর তা-ই গোটা রাষ্ট্রের জন্য হুকমি হয়ে দাড়ায়, সর্বগ্রাসী ও সর্বধ্বংসী বিপদ টেনে আনে। তখন দুই পক্ষের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বলে উঠে। এর পরিণামে কত মানুষের যে রক্ত প্রবাহিত হয়েছে, তার কোন ইয়ত্তা নেই।

ঠিক এই কারণে কুরআন মজীদ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ উপস্থাপিত করেছে। তার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী আদর্শ রাষ্ট্র কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সে রাষ্ট্রের অধীন যেমন একটি শক্তিশালী আদর্শ রাষ্ট্র কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সে রাষ্ট্রের অধীন যেমন একটি শক্তিশালী আদর্শ রাষ্ট্র কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সে রাষ্ট্রের অধীন যেমন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ রয়েছে, তেমনি একটি পূর্ণাঙ্গ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচার বিভাগ গড়ে তোলারও তাকীদ রয়েছে। এ পর্যায়ে আমি সর্বপ্রথম উল্লেখ করব সূরা ‘আল-হাদীস’-এর আয়াতঃ

[আরবী………………………………………]

আমরা আমাদের রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি (বাইয়্যেনাত) সহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও মানদণ্ড যেন লোকেরা ইনসাফ ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং লৌহও নাযিল করেছি। তাতে রয়েছে বিরাট-অমোঘ শক্তি এবং জনগণের জন্য বিপুল কল্যাণ। এ কাজ রাসূলগণের সাহায্যে এগিয়ে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা বড়ই শক্তিমান, মহা পরাক্রমশালী দুর্জয়।

ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী কৃত এ আয়াতের তাফসীরকে সম্মুখে রাখলে বলা যায়, আল্লাহ তা’আলা এ আয়অতটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, রাষ্ট্র প্রশাসন ও বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বলে দিয়েছেন।

ইসলামের বাহক ও প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন আল্লাহর রাসূলগণ। রাসূলগণকে তিনি কেন পাঠিয়েছেন, কিকি সামগ্রী দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং কি উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাঠিয়েছেন, তা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় ও ভঙ্গীতে এ আয়াতে বলা হয়েছে।

শুরুতে বলা হয়েছে, রাসূলগণকে ‘বাইয়্যেনাত’ (সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি) দিয়ে পাঠিয়েছেন। তাফসীর বিশেষজ্ঞগণের মতে তার অর্থঃ প্রকাশ্য মু’জিযা এবং অকাট্য দলীল প্রমাণ। অথমা এমন সব বলিষ্ঠ ও শক্তিদৃপ্ত কার্যাবলী, যা মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করার এবং অ-আল্লাহ থেকে বিমুখ বা ভিন্নমুখী হওয়ার আহবান জানায়। যদিও ইমান রাযীর মতে প্রথম অর্থটিই অধিক সহীহ্। কেননা তাদের আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হওয়ার বাস্তব প্রমাণই হচ্ছে মু’জিযা ও অকাট্য দলীল।

তার পরে বালা হয়েছে, রাসূলগণকে তিনি কিতাব ও মীযান দিয়েছেন। কিতাব বলতে নিশ্চয়ই জাবুর, তাওরাত, ইনজীল ও ফুরকান (কুরআন) বুঝিয়েছেন। যেমন তিনি তাঁর সর্বশেষ রাসূল (স)-কে দিয়েছেন কুরআন মজীদ।

কিন্তু ‘মিযান’ (আরবী…….) অর্থ কি? আভিধানিকরা এর শব্দার্থ বলেছেনঃ তুলাদণ্ড, দাড়ি-পাল্লা; যা দিয়ে কোন জিনিস ঠিক ঠিকভাবে ওজন করা হয়। আর পরোক্ষ অর্থ হচ্ছে ন্যায়বিচার, সুবিচারের নীতি ও আইন। কুরআন মজীদে এ পর্যায়ের  আভিধানিকরা এর শব্দার্থ বলেছেনঃ তুলাদণ্ড, দাড়ি-পাল্লা; যা দিয়ে কোন জিনিস ঠিক ঠিকভাবে ওজন করা হয়। আর পরোক্ষ অর্থ হচ্ছে ন্যায়বিচার, সুবিচারের নীতি ও আইন। কুরআন মজীদে এ পর্যায়ের আরও দুটি আয়াত রয়েছে। একটিঃ [আরবী…………………]

পরোক্ষ অর্থ হচ্ছে ন্যায়বিচার, সুবিচারের নীতি ও আইন।  কুরআন মজীদে এ পর্যায়ের আরও দুটি আয়াত রয়েছে। একটিঃ [আরবী…………………………..]

আল্লাহ তো তিনিই যিনি পরম সত্যতা সহকারে কিতাব ও ‘মিযান’ নাযিল করেছেন। আর দ্বিতীয়টিঃ [আরবী…………….]

এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে আল-কিতাব, আল-মীযান ও আল-হাদীস (লৌহ) -এই তিনটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কি? কয়েকটি দিক দিয়েই বিষয়টি বিবেচ্য। প্রথম, শরীয়াত পালনের বাধ্যবাধকতা আরোপ দুইটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীলঃ একটি, যা করা বাঞ্ছণীয় তা করা এবং দ্বিতীয়, যা না করা বা ত্যাগ করা বাঞ্ছনীয় তা না করা বা ত্যাগ করা। প্রথমটি স্বতঃই লক্ষ্য। কেননা ত্যাগ করাই যদি স্বতঃই লক্ষ্য হতো, তা কারোরই সৃষ্টি না হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। সেই অনাদি কালেই তো -যখন সৃষ্টি করা হচ্ছিল -তা অর্জিত ছিল। আর যা করা বাঞ্ছনীয় তা করা নফসের সাথে সংশ্লিষ্ট হলে তা হবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শরীর বা দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট হলে তা হবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ। আল্লাহর কিতাবই মনোলোকের সেই সব কাজ করার পথ দেখায়, হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়, সন্দেহ-সংশয় দূর করে অকাট্য বলিষ্ঠ যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা আর ‘মিযান’ দৈহিক বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা করণীয় কাজ বলে দেয়। সৃষ্টিকুলের পারস্পরিক কার্যাদিই হচ্ছে বড় বড় ও কষ্ট সাপেক্ষ শরীয়াতের বিধান। এ ক্ষেত্রে আল-মীযানই ন্যায়বিচার ও জুলুম-এর মধ্যে পার্থক্য করে দেয়, কোনটা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি আর কোনটা ত্রুটিপূর্ণ, তা নির্দেশ করে। আর লৌহের মধ্যে রয়েছে কঠিন কঠোর শক্তি। যে কাজ অবাঞ্ছনীয় তা থেকে মানুষকে বিরত রাখে। মোটকথা, আল-কিতাব মতাদর্শ ও তত্ত্বগত শক্তি বোঝায়, আল-মীযান কর্মগত শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে। আর মন ও আত্মা -অন্য কথায় নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পর্যায়ের কল্যাণেই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং তার প্রতি লক্ষ্য আরোপ করা সর্বাধিক প্রয়োজন, তার পরের স্থান হচ্ছে দৈহিক কাজের আর তার পরই বাঞ্ছনীয় নয় এমন কাজ বা ব্যাপারাদির প্রতিরোধের প্রশ্ন উঠে (প্রথম পর্যায়ের দুইটি ইতিবাচক এবং তৃতীয়টি নেতিবাচক) -এই দিকে লক্ষ্য রেখেই বিষয় তিনটির উল্লেখ সেই পরস্পরায় করা হয়েছে (অর্থাৎ প্রথমে আল-কিতাব, তারপরে আল-মীযান এবং শেষে আল-হাদীস এর উল্লেখ হয়েছে)। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিবেচ্য ব্যাপার, হয় সৃষ্টিকর্তার সাথে সংশ্লিষ্ট হবে -যার পথ এই আল কিতাব দেখায় -অথবা হবে সৃষ্টির সাথে। সৃষ্টির সাথে হলে তা দু ভাগে বিভক্ত হবে। বন্ধু-বান্ধব ও সমপর্যায়ের লোক হলে তাদের সাথে পূর্ণ সমতা রক্ষা করে কাজ করতে হবে এবং সেজন্য আল-মীযান -তুলাদণ্ড দরকার। আর তা শত্রুদের সাথে হলে সেজন্য প্রয়েঅজন তরবারী -যা লৌহ দ্বারা নির্মাণ করতে হয়।

তৃতীয় পর্যায়ে বিবেচ্য, জনগণ তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম, যারা অগ্রবর্তী তাদের সাথে আল-কিতাব অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তারা ইনসাফ করবে, সকল প্রকার শোবাহ সন্দেহ পরিহার করে চলবে। দ্বিতীয়, মধ্যম ধরনের লোক, তারা নিজেরাও ইনসাফ করবে, তাদের উপরও ইনসাফ কার্যকর করা হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন আল-মীযান তৃতীয় হবে জালিম লোক। তাদের উপর ইনসাফ কার্যকর করতে হবে। তাদের নিকট থেকে ইনসাফ পাওয়ার কোন আশা করা যায় না। তাই তাদের দমন