আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা

[পূর্ববর্তী আলোচনার সারনির্যাস -ইসলামী হুকুমাতের বিশেষত্ব -সার্বভৌমত্ব কার? সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন -সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব -দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন -শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা -হুকুমাত ছাড়া আমানত আদায় করা সম্ভব নয় -শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে খিলাফত -সরকার সংগঠনে সামষ্টিক দায়িত্ব -দার্শনিকদের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি -কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি-বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে সরকার গঠন -নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম সমাজ -জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল। প্রশাসনিক ক্ষমতা -সার্বভৌমত্ব -প্রশাসনের নিকট আমানত।]

…………………………………………………………………………………………………………………………..

পূর্ববর্তী আলোচনার সারনির্যাস

১.কুরআন ও হাদীসের অকাট্য দলীল বাদ দিলেও মানুষের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি একটি দেশের শাসন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অপরিহার্যতা একান্তভাবে অনুবভ করে। সেজন্য প্রবলভাবে তাকীদ জানায়। কেননা এইরূপ রাষ্ট্র না হলে যেমন একটি সুষ্ঠ সামাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি সমাজের লোকদের মধ্যে সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠা, প্রত্যেকটি নাগরিকের মানবিক মর্যদা ও অধীকার রক্ষা করা কোন প্রকারেই সম্বব নয়। সম্বব নয় জনগনের স্বাধীনতা রক্ষা ও সকল প্রকার বিজাতীয় বা বৈদেশিক আগ্রাসন থেকে নিরাপত্তা দান করা। এরূপ একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর না হলে  চরম অপরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা, লুট-পাট ও মারামারি রক্তা-রক্তি দেখা দেয়া অনিবার্য হয়ে পরবে।

২. বিশেষত মুসলিম জনগণক একাট রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করতে বাধ্য। আল্লাহর তুরআন ও রাসূলের সুন্নাত স্পষ্ট ও উদাত্ত কন্ঠে সেজন্য আদেশ দিয়েছে, যা মেনে চলতে তারা সকলেই বাধ্য। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান- আদেশ ও নিষেধসমূহ  বাস্তবায়িত করার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান একান্তই অপরিহার্য। মানুষের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে পালন ও অনুসরণের জন্য আল্লাহ ও রাসুলের দেয়া বিধান কার্যকর ও বাস্তবায়িত হতে পারে না একটি রাষ্ট্র ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্যতিরেকে।

৩. দ্বীন ইসলামের প্রতিষ্ঠা, নির্বিঘ্নে জনগণের দ্বীন পালন ও সকল প্রকার ভয়-ভীতি প্রতিবন্ধকতা মুক্ত আদর্শিক জীবন যাপনের সুযোগ লাভের জন্যই একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা -সরকার কায়েম করা অপরিহার্য।

৪. ইসলামী প্রশাসন -সরকার -রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, অভিজাত লোকদের বা ধনী লোকদের শাসন ব্যবস্থা নয়। তা তথাকথিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কায়েম হওয়া সরকার-ও নয় -যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশসমূহে চালু রয়েছে এবং তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহে যা প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া হচ্ছে বা যার দিন-রাত দোহাই দেয়া হচ্ছে।

এই সব কয়টি কথার বিশ্লেষণ পূর্ববর্তী আলোচনায় বিস্তারিতভাবে করা হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে যে, মানুষ কল্পিত সব কয়টি শাসন ব্যবস্থাই বাতিল। এক্ষণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে সর্বোত্তম শাসন ব্যবস্থা -ইসলামী শাসন ব্যবস্থা -কি, কি তার পরিচয়?

ইসলামী হুকুমাত বা শাসন-ব্যবস্থার রূপরেকা কি, এ পর্যায়ে প্রাচীনকালীন মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট থেকে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে কিছু পাওয়া গেছে এমন দাবি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যে দু’চারখানি গ্রন্থ এ পর্যায়ে পাওয়া গেছে, তার কোন একটিতেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত ও সহজবোধ্যভাবে কিছুই লেখা হয়নি। মোটামোটিভাবে কয়েকটি কথা লিখে-ই দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে হয়। কুরআন ও সুন্নাতে প্রায় সব মৌলিক বিষয়াদি আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও মনীষীদের লেখনীপ্রসূত গ্রন্থাদিতে তার বিস্তারিত আলোচনা না থাকা আমাদের -বিশেষ করে এই পর্যায়ের -দীনতাই প্রমান করে। -[প্রাচীন মনীষীদের মধ্যে কেবলমাত্র আল-মা-ওয়ার্দী লিখিত গ্রন্থ ‘আল-আহকামুল সুলতানিয়া’ এরই উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু তাতেও প্রশাসন পদ্ধতি পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। -গ্রন্থকার।]

প্রাচীন মনীষীদের লিখিত গ্রন্থাদিতে ইসলামী হুকুমাতের প্রকৃত রূপরেকা বিস্তারিত ও স্পষ্ট আলোচিত না হওয়ার মূলে কতকগুলি বাস্তব ও ঐতিহাসিক কারণ নিহিত রয়েছে বলে মনে হয়। কারণগুলি নিম্নরূপঃ

১. ‘খিলাফতে রাশেদা’র পর -গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু হওয়ার সময় -মুসলিম জাহানে কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম না হওয়া -কায়েম না থাকা। রাষ্ট্র-শাসনে প্রকৃত ইসলামী আদর্শ অনুসরণ না করা ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকার দরুণ -অত্যাচারী গায়ের ইসলামী হুকুমাতের সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। ফলে ‘কুরআন-সুন্না’র মৌলনীতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা সম্বলিত গ্রন্থ রচনা অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছিল।

এ সময়ে মুসলমানদের শাসন ব্যবস্থা ‘খিলাফত’ নামে অভিহিত করা হলেও তা প্রকৃত ‘খিলাফত’ ছিল না। মুসলমানের শাসন চললেও ইসলামের শাসন চলেনি। ইসলামী শাসনের জরুরী শর্তাবলী সে শাসনে ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

২. রাসূলে করীম (স) ও ‘খিলাফতে রাশেদা’র আমলথেকে অনেক রূরে সরে যাওয়ার দরুন কুরআন-সুন্নায় ব্যবহৃত যে সব পরিভাষা নির্ভুলভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের সঠিক রূপরেখা প্রকাশ করে, তার যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন হয়ে যায়। প্রথম যুগে তা বুঝতে পারা যতটা সহজ ছিল, পরবর্তী যুগে তা আর সহজ থাকে না।

৩. ইএ আমলের ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনের রূপরেখা তো জানা যায়; কিন্তু ইসলামী শাসনের রূপরেখা বোঝার জন্য তা কিছুমাত্র সহায়ক নয়। বরং তা নির্ভুল ধারণা (Conception) লাভের পথে বড় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। মুসলিম ইতিহাস ও ইসলামের ইতিহাস তাতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে।

বলা বাহুল্য, আমরা ইসলামী জ্ঞান-গবেষণার প্রাথমিক যুগের মনীষীদের মহান অবদানের কথা অস্বীকার করছি না। তাঁরা ইসলামী চিন্তার প্রণয়ন, তার সমর্থন সংরক্ষণ, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও তাতে গভীরতা ব্যাপকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। তা না হলে আজকের দিনে আমরা ইসলাম সম্পর্কে কোন জ্ঞানই লাভ করতে পারতান না, তার কোন মাধ্যমও পেতাম না, তা অকপটে স্বীকার করতে হবে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও একথাও বলতে আমরা বাধ্য যে, তাঁদের জ্ঞান-গবেষণা আজকের দিনের প্রয়োজন পূরণ করতে পুরাপুরিভাবে সমর্থন হচ্ছে না। এজন্য আজ নতুনভাবে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ইসলামের মৌল উৎস কুরআন ও সুন্নাতকে ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় বিষয় চিন্তা-গবেষণা চালানো অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে আমরা সেই কাজে-ই প্রবৃত্ত হচ্ছি।

আজকের দিনে মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট প্রকৃত ইসলামী হুকুমাতের রূপরেখা অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে গেছে। বহু মুসলিম দেশের শাসকরা ইসলামী পদ্ধতির সরকার না হওয়া সত্ত্বেও এবং নিছক মুসলকাম নামধারী ব্যক্তিদের রাজতান্ত্রিক বাদশাহী ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হয়েও নিজেদের ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হওয়ার দাবি করছে। আর এই ধরনের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র প্রধানদের ঐক্য সংস্থাকে ‘ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন’ এবং এসব রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সংস্থাকে ‘ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন’ নামে অভিহিত করছে। শুধু তা-ই নয়, এ সব সম্মেলন অনুষ্ঠানকালে তাদের সকল প্রকার কার্যকলাপকেই ইসলামী বলে চালিয়ে দিচ্ছে, যদিও কুরআন-সুন্নাহ নিঃসৃত ইসলামের সাথে তার দূরতম সম্পর্কও নেই।

এখানেই শেষ নয়। ইসলামের প্রকৃত তত্ত্ব ও রূপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানহীন মুসলিম রাজনীতিকরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে ইসলামী রাজনীতি, নিজেদের কায়েম করা বা পরিচালিত রাষ্ট্রকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নামে অভিহিত করতে লজ্জা পান না। পাশ্চাত্যের আল্লাহ অস্বীকারকারী ধর্মহীন গনতন্ত্রকে ‘ইসলামী’ ও ইসলামী হুকুমাত কায়েমের একমাত্র উপায় বলে প্রচার করছে। এসব কারণে বর্তমানে প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা অস্পষ্ট ও ম্লান হয়ে যাওয়া এবং অ-ইসলামীকে ইসলামী মনে করা কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।

এই জাতীয় বিভ্রান্তির দিনে সর্বগ্রাসী জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক প্রত্যক্ষ গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা। তা-ই আমাদের একমাত্র অবলম্বন।

ইসলামী হুকুমাতের বিশেষত্ব

কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী হুকুমাতের কয়েকটি বিশেষত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এই বিশেষত্বসমূহ ইসলামী হুকুমাতকে অন্যান্য ধরনের হুকুমান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিভাত করে। বর্তমানে যে সব রাষ্ট্র সম্পূর্ণ মিথ্যামিথ্যিভাবে ইসলামী হুকুমাত না হয়েও ইসলামের পতাকা উড়ায় দুনিয়ার মানুষকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে, সেগুলোও যে আসলে আদৌ ইসলামী নয়, তা এ বৈশিষ্ট্যগুলির ভিত্তিতেই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়ে যায়।

বস্তুত ইসলামী হুকুমাতের প্রথম ভিত্তি হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। আর দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে, আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ-ই আইনের একমাত্র উৎস।

যে সরকারে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নিরংকুশভাবে গৃহীত নয় বরং আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারোর -জনগণের, কোন ব্যক্তির, কোন বংশের বা কোন শ্রেণীর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত, তা কখনই ইসলামী সরকার হতে পারে না।

আল্লাহর শুধু সার্বভৌমত্ব স্বীকার করলেই হবে না, আল্লাহর একক আইনকেও পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে হবে। আল্লাহ কালাম কুরআন মজীদ এবং কুরআনের বাহক রাসূলের সুন্নাতকে আইনের উৎস -তারই আইনকে দেশের আইনরূপে স্বীকৃতি দিতে ও জারি করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকারকারী রাষ্ট্র বা সরকারও ‘ইসলামী’ পরিচিতি লাভ করতে পারে না। কেননা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বাস্তবতা তো আল্লাহর আইন পালনের মাধ্যমেই সম্ভব। আল্লাহর আইন পালনে অনীহা দেখালে আল্লাহর স্বার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়।

বস্তুত ইসলামী ও অ-ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে এ দুটি ভিত্তিতেই পার্থক্য হয়ে থাখে। এ পার্থক্য একটি শানিত তীক্ষ্ণ মানদণ্ড। এই মানদণ্ডে ওজন করলে বর্তমানকালের বহু ইসলামী হুকুমাত হওয়ার দাবিদার রাষ্ট্র ও সরকারও সম্পূর্ণ ‘গায়র ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার’ বলে প্রমাণিত হবে।

সার্বভৌমত্ব কার?

‘আল-কুরআনের আলোকে শিরক ও তওহীদ’ গ্রন্থে আমরা কুরআন ভিত্তিক আলোচনায় দেখিয়েছি যে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। সার্বভৌমত্বের যে সংজ্ঞা ও পরিচিতি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দেয়া হয়েছে, সে দৃষ্টিতেও সার্বভৌম আর কেউ নেই, কেউ হতেই পারে না।

কুরআনের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর, সার্বভৌম আল্লাহ ছাড়া আর কেউ-ই নয়; তাঁর মুকাবিলায় মানুষের স্থান ও মর্যাদা শুধু সেই সার্বভৌম আল্লাহর দাসত্ব করা, একান্ত অনুগত দাস হয়ে জীবন যাপন করা। তিনিই মানুষের দাসত্ব-ব্যবস্থা নাযিল করেছেন তাঁরই মনোনিত সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স)-এর মাধ্যমে। রাসূল (স) আল্লাহর আইন বিধান অনুসরণ ও কার্যকরকরণের মাধ্যমেই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বাস্তবায়িত করেছেন। এই বাস্তবায়ন পদ্ধতি-ই হচ্ছে রাসূলে সুন্নাত। কুরআন মজীদের বহু সংখ্যক আয়াতে এ কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় বলা হয়েছে। এখানে কতিপয় আয়াত আমরা পুনরায় উদ্ধৃত করছিঃ [আরবী……….]

চূড়ান্ত হুকুম দেয়ার -সার্বভৌমত্বের -অধিকার কারোরই নেই, আছে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। তিনি পরম সত্য কথা বলেন, আর তিনি-ই হচ্ছেন সর্বোত্তম ফয়সালাকারী। [আরবী………………………………..]

তোমরা জেনে রাখবে, সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনিই হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।

আল্লাহ তা’আলা প্রাকৃতিক জগতের একমাত্র স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রণকারী ও পরিচালক। এখানেই শেষ নয়। বরং তিনি মানব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধান দাতাও। মৌলিকভাবে এ অধিকারও কেবলমাত্র আল্লাহরই জন্য সংরক্ষিত। -[পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র বিজ্ঞানীগণও ইসলামী রাষ্ট্রের এই বিশেষত্বকে অকপটে স্বীকার করেছেন। এ পর্যয়ে সাক্ষ্য হিসেবে আমরা এখানে মাত্র একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর উক্তিই উদ্ধৃত করছি। তিনি হচ্ছেন David de santillana.

 তিনি বলেছেনঃ

Islam is the direct government of Allah, the rule of God. Whose eyes are upon his people. The principle of unity and order which in other societies is called civitas, polis state, in Islam is personified by Allah: Allah is the name of the supreme power acting in the common interest. Thus the public treasury is the treasury of Allah, the army is the army of Allah, and even the Public functionaries are the employees of Allah. (Santillana ‘law and society’ the legacy of Islam’ ed. Thomas walker Arnold Coxoprd the Etaroandon Press 1931) P. 286]

কেননা এই সৃষ্টি তাঁর, এর উপর হুকুম চালাবার অধিকারও একমাত্র তাঁরই হতে পারে! তাই রয়েছেও। তবে তিনি নিজেই যদি কাউকে তাঁর দেয়া শিক্ষা ও বিধানের ভিত্তিতে হুকুম দেয়ার অনুমতি দেন, তবে সেই অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিও ‘হুকুম’ দিতে পারবে। তবে তার জন্য দুটি শর্ত! একটি, মূলত সার্বভৌমত্ব ও হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর -একথা তাকে অকপটে ও নিঃশর্তে মেনে নিতে হবে এবং তা ঘোষণা করতে হবে। আর দ্বিতীয় এই যে, তার হুকুম দেয়ার প্রাপ্ত ক্ষমতা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। হুকুম দেয়ার তার নিজের কোন মৌলিক অধিকার নেই -একথা যেমন তাকে মানতে হবে, সেই সাথে আল্লাহ নির্ধারিত সীমা লংঘন করে মানুষের উপর নিজের হুকুম চালাবার কোন অধিকারই তার নেই, একথাও তাকে মানতে হবে। কেননা এই উভয় ব্যাপারে আল্লাহর অধিকার নিরংকুশ, অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

আল্লাহর পরে হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহই দিয়েছেন তাঁর নিজ মনোনীত নবী-রাসূলগণকে! কুরআনে এ পর্যায়ের বহু আয়াত রয়েছে। একটি আয়াতে হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী……….]

হে দাউদ, আমরা তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে পরম সত্যতা সহকারে হুকুম চালাও।

এ আয়াতের প্রথম কথা, হযরত দাউদ (আ) নিজে সার্বভৌম নন, তিনি সার্বভৌমের খলীফা, প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত এবং তাঁরই নিয়োজিত। আয়াতে তাকে লোকদের মধ্যে হুকুম চালাবার নির্দেশ আল্লাহই দিয়েছেন। কিন্তু তা নিরংকুশ নয়। সে জন্য দুটি শর্ত স্পষ্ট। একটি, তিনি নিজেকে আল্লাহর নিয়োজিত খলীফা মনে করবেন, খলীফা হিসেবেই হুকুম চালাবেন, সার্বভৌম হিসেবে হয়। আর দ্বিতীয়, তিনি নিজ ইচ্ছা ও খাহেশ অনুযায়ী হুকুম চালাতে পারবেন না, তা চালাতে হবে পরম সত্যতা সহকারে। ‘আল-হক’ শব্দটির অর্থ প্রায় তাফসীর লেখক-ই বলেছেন ‘আল-আদল’ সুবিচার ও ন্যায়পরায়নতা, যা কেবলমাত্র আল্লাহর বিধানভিত্তিক বিচার ও শাসনকার্যেই সম্ভব। মানুষের ইচ্ছামত হুকুম দেয়া বা বিচার করায় সুবিচার ও ইনসাফ হতে পারে না. একথা উপরোদ্ধৃত আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেনঃ [আরবী……..]

এবং তুমি নিজের ইচ্ছা-বাসনা-খাহেশকে অনুসরণ করে হুকুম দিও না, ফায়সালা করো না। যদি তা-ই কর তাহলে তোমার এই ইচ্ছা-বাসনা কামনা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করে দেবে।

আর আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হওয়ার অর্থ জুলুম করা, সুবিচার না করা।

কেননা মানুষের ইচ্ছা-বাসনা-কামনা কখনই বির্ভুল হতে পারে না -নির্ভুল হতে পারে কেবল মাত্র আল্লাহর বিধান। মানুষ আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে নিজ ইচ্ছা বাসনা-কামনা অনুযায়ী হুকুম দিয়ে -বিচার করলে নিজেকেই আল্লাহর আসনে আসীন বানানো হয়। তখন সে আল্লাহর বান্দা থাকে না, নিজের বান্দা হয়ে যায়। এ কথা যেমন সাধারণ মানুষ -মুসলমানদের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি নবী-রাসূলগণও যেহেতু মানুষ, তাদের বেলায়ও সত্য।

নবী-রাসূলগণের বেলায়ও উক্ত কথা সত্য, তার প্রমান উক্ত সূরা’র ২২-২৩ আয়াতে উল্লেখ করা একটি মামলার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ নিজেই প্যেশ করেছেন। দুইজন বিবদমান ব্যক্তি হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করেছিল এবং বলেছিলঃ [আরবী………………]

আপনি আমাদের দুইজনের মধ্যে পরম সত্যতা-সুবিচার-ন্যায়পরায়নতা সহকারে ফয়সালা করে দিন, বাড়াবাড়ি বা জুলুম করবেন না এবং আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখাবেন।

কিন্তু হযরত দাউদ (আ) রায় হিসেবে যা বলেছিলেন তিনি নিজেই তা বলতে বলতেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কথাটি ঠিক হয়নি। [আরবী……………..]

তাই তার রব্ব-এর নিকট মাগফিরাত চাইল, সিজদায় পড়ে গেল এবং রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করল।

লক্ষণীয় যে, বিচার প্রার্থীরা বিচার চেয়েছিল পূর্ণ ন্যায়পরতা ও ইনসাফ সহকারে। আর নবীর পক্ষেও যে বাড়াবাড়ি-সীমালঙ্ঘন-অবিচার করা অসম্ভব নয়, তা বুঝতে পেরে -মনে এই বিশ্বাস রেখেই তারা বলেছিলেনঃ অবিচার ও বাড়াবাড়ি করবেন না। আর আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখাবেন। ভারসাম্যপূর্ণ পথ তো ভারসাম্যপূর্ণ -পক্ষপাতহীণ, তা বিচারের মাধ্যমেই দেখানো সম্ভব। আর তারই দাবি তারা জানিয়েছিল।

এ আলোচনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, নবী আল্লাহর খলীফা, হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর নিজের ইচ্ছা-বাসনা-কামনা অনুযায়ী হুকুম করার, রায় দেয়ার কোন অধিকার তাঁর ছিল না। এ অধিকার কারোরই থাকতে পারে না।

আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী-রাসূলগণকে যে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে লোকদের মধ্যে হুকুম চালাবার অধিকার দিয়েছেন, তা যেমন পূর্ববর্তী আয়াত ও আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি একটি আয়াতে সাধারণভাবেই এই অধিকার দেয়ার কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ [আরবী……………..]

আমরা তওরাত নাযিল করেছি, তাতে ছিল হেদায়েত ও আলো, সমস্ত নবী যারা মুসলিম ছিল -তদানুযায়ী হুকুম চালাবে -ফয়সালা করবে…..

এ আয়াতে মূলত হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর, একথা চূড়ান্তভাবে মনে করিয়েই আল্লাহ তওরাত নাযিল করেছেন। বলেছেনঃ সেই তওরাত অনুযায়ী নবীগণ হুকুম চালাবেন। তবে সেজন্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদেরকে সর্বপ্রথম আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নিকট আত্মসমর্পিত হতে হবে, তারপরই আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী হুকুম চালাবার অধিকার জন্মাবে নবী-রাসূলগণের, তার পূর্বে নয়।

নবী-রাসূলগণের, তার পূর্বে নয়।

নবী-রাসূলগণ ছাড়া সাধারণ লোকেরাও লোকদের উপর হুকুম চালাতে পারে। তার জন্যও শর্ত রয়েছে যে, তাদের সুবিচার নীতির অনুসারী হতে হবে। সুবিচার নীতির অনুসারী হওয়ার অর্থ যে আল্লাহর বিধান পালনকারী ও আল্লাহর বিধান-ভিত্তিক হুকুমদাতা সুবিচারক হওয়া, তা পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আল্লাহর কথা হচ্ছেঃ [আরবী…………….]

তোমাদের মধ্য থেকে কেবল তারাই হুকুম চালাবে, যারা সুবিচার নীতির অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের-ধারাক ও অনুসারী। এ কারণে আল্লাহ নিজেকে সকল হুকুমদাতা-সকল বিচারকের তুলনায় অধিক উচ্চমানের হুকুমদাতা-সর্বোচ্চ বিচারক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। বলেছেনঃ [আরবী………]

আল্লাহ কি সকল হুকুমদাতা-বিচারকের তুলনায় অধিক ভালো হুকুমদাতা-বিচারক নন? আল্লাহর হুকম দান মৌলিক, অন্যদের হুকম দান আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ভিত্তিক। আল্লাহর বিচার সর্বাধিক নিরপেক্ষ, অন্যদের বিচার আল্লাহর বিধানের ভিত্তি গ্রহণের মুখাপেক্ষী। আল্লাহর কথাঃ [আবরী…….]

তিনি-ই সর্বোত্তম হুকমদাতা, বিচারক এই পর্যায়েরই। আল্লাহা মানুষের জন্য বিধান নাযিল করছেন , কিন্তু সেই বিধান মানব সমাজের দৈনন্দিন জীবনের যাবতয়ী ব্যবপারে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করা আল্লাহর কাজ নয়। সেজন্য তিনি প্রথম দিন থেকেই মানুষের নিকট নবী-রাসুল পাঠবার ব্যবস্থা করেছেন। নবী-রাসূলগণের কাজ হচ্চে, একদিকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার সাধারণ ও ব্যাপক আহবান জানানো এবং অপরদিকে আল্লাহর নাজিল করা অধিকার দান করেছেন। নবী-রাসূলগণ এ উদ্দেশ্য আল্লাহ কর্তৃক নিয়োজিত। কাজেই আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে নবী-রাসূলগণ যখন কোন হুকুম করেন, তখন তা সেইসব লোকের জন্য অবশ্য পালনীয় হয়ে যায়, যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূবেই ঈমান এনেছে। তাই আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী ………]

আল্রাহর এবঙ তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে আদেশ করেন-চুরান্ত ফয়সালা করে দেন, তখন কোন মু ‘মিন পুরুষ স্ত্রী জন্য তাদের ব্যাপারে সংক্রান্ত এই হুকুম বা ফয়সালা মেনে নেয়া-না নেয়ার কোন ইখতিয়ারই থকতে পারে না। যদি কেউ আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের অমান্য করে, তাহেলে সে সুস্পষ্ট গুমরাহীন মধ্যে পড়ে গেল। নবী-রাসূলগণের যেমন আল্লাহর সার্বভৌমত্ব  ভিত্তিক হুকম দেওয়ার অধিকার আছে-আল্লাহ-ই দিয়েছেন,অনুরুপভাবে নবী-রাসুলগণের অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের মধ্য থেকে বাছই করে নেয়া সমাষ্টিক দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও হুকুম করার, বিচার-ফয়সলা করার অধিকার রয়েছে-আল্লাহ নিজেই এ অধিকার দিয়েছেন। তবে তা কোন অবস্থায়ই স্বতঃস্ফূর্ত বা নিঃশর্ত নয়,তা একান্তভাবে আল্লাহ ও রাসূল প্রদ্ত্ত এবং আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের শর্তাধীন। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী…….]

হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে সামষ্টিকি দায়িত্বসম্পন্ন ব্যবক্তিদেরও। এ আয়াতে সর্বপ্রথম নির্দেশ হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যের, তারপর রাসূলের আনুগত্যের তারা সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদের।

আদেশটি যেহেতু স্বয়ং আল্লাহর, তাই তিনি একক ও মৌলিকভাবে আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী হয়েও রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, কেননা আল্লাহর আনুগত্য বাস্তবায়িত হতে পারে না রাসুলের আনুগত্য না করলে। রাসুলের আনুগত্য করলে আল্লাহরও আনুগত্য বাস্তবভাবে হওয়া সম্ভব। তাই আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তব উপায়ই হচ্ছে রাসূলের আনুগত্য করা। যেমন আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ [আরবি…………….]

যে-লোক রাসূলের আনুগত্য করল, সে কার্যত আল্লাহরই আনুগত্য করল।

কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য করার স্পষ্ট শব্দগত নির্দেশ(আরবী) বলে কেবল রাসূল সম্পর্কেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারপরে সামষ্টিক দায়িত্ব-সম্পন্ন ব্যবক্তিদের আনুগত্য করার নির্দেশের বেলায় সেই(আরবী) শব্দর উল্লেখ নেই?… স্পষ্ট বোঝা যায়, রাসূলের আনুগত্য করা করা মৌলিকভাবেই প্রয়োজনে। অন্যথায় আল্লাহর আনুগত্য হতে পারে না। অতঃপর মানুষের নিকট আনুগত্য পাওয়ার ও চাওয়ার মৌলিক অধিকার আর কারোরই নেই। সে আনুগত্য অবশ্যই শর্তাধীন হবে। অর্থাৎ রাসুলের অনুপস্থিতিতে মানব সমাজের নিকট আনুগত্য চাওয়া ও পাওয়ার অধীকার কেবলমাত্র সেই সব সমাষ্টিক তায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিদের, যারা নিজেরা আল্লাহর ও তাঁরা রাসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহর বিধান ও রাসুলের বাস্তব  অনুসরণ-সুন্নাত অনুযায়ী হুকম দেবে। যারা তা করবে না, তাদের কোন অধীকারই থাকতে পারে না মানুষের নিকট অনুগত্য চাওয়ার ও পাওয়ার। এই ব্যাখ্যার বাস্তব রূপ আমরা পাই রাসূল করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম জনগণ কর্তৃক খলীফায়ে রাসূল হিসাবে নির্বচিত হযরত আবূ ব্কর ছিদ্দীক (রা)-এর প্রথম নীতি নির্ধারণী ভাষণে। তাঁর সেই নাতিদীর্ঘ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেনঃ [আরবী………]

আমি ভালো করলে তোমরা আমার সাহায্য করবে। আর মন্দ করলে তোমরা আমাকে ঠিক করে দেবে। তোমরা আমার আনুগত্য করবে যতক্ষণ আমি নিজে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করতে থাকবে। আর আমিই যদি নাফরমানী করি তাহলে তোমরা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নও।

রাসূলে করীম (স)-এর নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ মসজিদে নববীতে উপস্থিত থেকে প্রথম খলীফার  এই ভাষণ শুনেছিলেন। রাসুলে করীম  (স)-এর অনুপস্থিতিতে মুসলমানদের সরকার বা প্রশাসন ব্যবস্থা কি হবে তার স্পষ্ট নীতি নির্দেশ এই ভাষণে ধ্বনিত হয়েছে এবং তা সকল সাহাবী কর্তৃক সমর্থিতও হয়েছে।

বস্তুত রাষ্ট্র ও প্রশাসনে নাগরিকদের আনুগত্যই হচ্ছে মূল ভিত্তি। যেখানে এই আনুগত্য নেই সেখানে ভৌগোলিক এলাক ও জনতা ইত্যাদির উপস্থিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে একটি রাষ্ট্র ও সরকার গড়ে উঠতে ও চলতে পারে না। হযরত আবূ বকর (রা)- সেই আনুগহত্য কথা-ই বলেছেন, চেয়েছেন, তবে তা নিরংকুশ যেমন নয়, তেমনি নিঃশর্তও নয়।

নিরংকুশ নয় বলেই তিনি বলেছিলেনঃ আমি ভাল কাজ করলে তোমরা আমার সাহায্য করবে। আর মন্দ কাজ করলে তোমরা আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেবে।

বোঝা যাচ্ছে, ইসলামী বিধানে নাগরিকদের শুধু অন্ধ-নির্বাক আনুগত্য করে যাওয়াই কাজ নয়। সরকার ও সরকার চালক ভাল করেছ কি মন্দ করেছে সে দিকে তীক্ষ্ণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখাও তাদের কর্তব্য। শুধু  আনুগত্য করে যাওয়াই নয়-সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে সরকারী দায়িত্ব পালনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য। তবে জেন্য শর্ত হচ্ছে সরকারের ‘ভাল করা। সরকার ভাল কাজ করলেই এই সহযোগিতা করা যাবে, ভাল কাজ করলেই সরকার জনগণের নিকট সহযোগিতা চাইতে পারে। আর সেই ভাল কাজে জনগন সরকারের সাথা সর্বাত্নক সহযোগিতা করতে একান্তই বাধ্য। এই সহযোগিতা ছাড়া কোন সরকার চলতে পারে না। তাই সরকার-সরকার প্রধানকেই জনগণের নিকট এই সহযোগিতা চাইতে হবে এবং জনগণ যাতে সরকারের কাজে সগযোগিতা করতে পারে তার উপায় ও সুযোগ সরকারকেই বের করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার কোন বহির্দেশীয় বা বহির্জগতের ব্যাপার নয়। সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই যে রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পন্ন হয়. তা-ই হচ্ছে সলামী রাষ্ট্র ও সরকার। আর এ জন্যই ইসলাম নাগরিকদের গঠনমূলক সমালোচনা করার পাশ্চত্য ধর্মহীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় শুধু অধিকারই দেয়নি বরং তা করা প্রত্যেকটি নাগরিকের দ্বীনী কর্তব্য বলেও ঘোষিত হয়েছে। প্রথম খলীফার শেষ কথা ছিলঃ তোমরা আমার আনুগত্য করে চলবে, যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করি। আর আমি-ই যদি আল্লাহ ও রাসূলের নাফরমানী করি, তা হলে তোমরা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নও, আমিও তোমাদের নিকট আনুগত্য চাওয়ার কোন অধিকার রাখি না।

এই শর্তাধীন আনুগত্যই ইসলামের তাওহীদী আকীদার সংরক্ষক। এই আনুগত্য নীতিই রাসূল পরবর্তী কালে ইসলামী সরকার গঠনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে নির্ধারিত করে দিয়েছে। তার সারকথা হচ্ছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রাসূলের চূড়ান্ত নেতৃত্ব স্বীকার করা এবং আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত ভিত্তিক শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন

কুরআন, সুন্নাতে রাসূল ও প্রাথমিক কালের মুসলিম উম্মতের ইতিহাস স্পষ্টভাবে পথ-নির্দেশ করে যে, মুসলিম উম্মত তাদের শাসক, প্রশাসক ও নেতা নির্বাচন করবে। অবশ্য তা তারা করবে ইসলামী নিয়ম-কানুন অনুযায়ী ও ইসলাম নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে। মুসলিম উম্মতের এই শাসক ও নেতা নির্বাচনের অধিকারই ইসলামী সরকারের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। আর এ নির্বাচন পদ্ধতিই ইসলামী হুকুমাতকে দুনিয়ায় প্রচলিত গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য সরকার পদ্ধতিসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।

এ পর্যায়ের দলীলঃ ১. কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে যে, মানুষ এই যমীনে আল্লাহর খলীফা। খলীফা হওয়ার ব্যাপারে মানুষে মানুষে কোন তারতম্য বা পার্থক্য নেই। সকল সম্পূর্ণ সমান ও পার্থক্যহীনভাবেই আল্লাহর খলীফা। মানুষের এই খিলাফত দুনিয়ায় শেষ পর্যন্ত এক চিরন্তন সত্য হিসেবেই স্বীকৃত এবং ঘোষিত। কিয়ামত পর্যন্ত তাতে কোন পরিবর্তনই সূচিত হবে না।

কুরআন মজীদে মানব সৃষ্টির ইতিহাস উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, মানুষ যখন সৃষ্টি হয় নি সেই সময় মানব সৃষ্টির সংকল্প প্রকাশ করে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা দিয়েছিলেনঃ [আরবী…………….]

আমি পৃথিবীতে খলীফা বানাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।

আল্লাহর ঘোষিত এই খিলাফত ব্যক্তি বিশেষের জন্য বা কোন মানুষের জন্য ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট করা হয় নি। বরং অতঃপর তিনি যে ‘আদমকে’ সৃষ্টি করলেন, তার সমস্ত বংশধর –সমস্ত মানুষই খলীফা রূপে চিহ্নিত হয়েছিল। কেননা আল্লাহর এই ঘোষণা শ্রবণ করে ফেরেশতাগণ ‘খলীফা’ সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেনঃ [আরবী……..]

হে আল্লাহ, তুমি দুনিয়ায় এমন এক মাখলুক বানাবে, যা তথায় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে এবং রক্তের বন্যা প্রবাহিত করবে?

ফেরেশতাদের এ আশঙ্কা নিশ্চয় প্রথম সৃষ্ট ব্যক্তি আদমের ব্যাপারে ছিল না, তা ছিল সেই আদমের বংশধরদের ব্যাপারে। অর্থাৎ ফেরেশতাদের আশঙ্কা ছিল, সমগ্র বিশ্বলোকের প্রতিটি বস্তু ও অণু-পরমাণু যখন ইচ্ছাসম্পন্ন সৃষ্টির অবকাশ কোথায়? তাহলে তো তারা এমন-এমন কাজ করতে থাকবে, যার ফলে এই দুনিয়ার শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেয়া এবং রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়া একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়বে। স্মরণীয় যে, আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাদের এই আশঙ্কা বোধকে প্রতিবাদ করেন নি, অমূলক বলে উড়িয়েও দেন নি।

এ থেকে ম্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহর ‘খলীফা’ বানানোর ঘোষণাটি কোন বিশেষ ব্যক্তির জন্য ছিল না, ছিল সমগ্র মানব বংশের জন্য, মানব বংশের প্রতিটি সন্তানের জন্য। প্রতিটি মানুষ-ই-সে পুরুষ হোক বা নারী –আল্লাহর খলীফা। কেননা –ফেরেশতাদের আশাংকা নিশ্চয়ই ব্যক্তি আদম সম্পর্কে ছিল না, ছিল সমগ্র আদম সন্তানের ব্যাপারে. সমস্ত মানুষের ব্যাপারে। অতএব প্রত্যেকটি মানুষেরই আল্লাহর ‘খলীফা’ হওয়া অনিবার্যভাবে সুনিশ্চিত।

এ পর্যায়ের আরও কতিপয় আয়াত থেকে এই কথায়ই সম্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়। একটি আয়াতঃ [আরবী……]

সেই আল্লাহ-ই তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন।

এ আয়াতে একবচনে ‘খলীফা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি; বরং বহুবচনের শব্দ [আরবী……] ‘খলীফাগণ’ ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকে তো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, পৃতিবীতে আল্লাহর খলীফা একজন নয় –কোন এক ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিগতভাবে কেউ আল্লহর খলীফঅ নয়। বরং প্রত্যেকটি মানুষই আল্লাহর খলীফা। এই মানুষগণই আল্লাহর খলীফাগণ।

আর একটি আয়াতঃ [আরবী…………..]

কে সেই মহান সত্তা, যিনি ব্যাকুল ও বিপন্ন-অস্থির ব্যক্তির দোয়া শুনেন যখন সে তাকে ডাকে এবং কে তার কষ্ট ও বিপদ দূর করেন, (আর কে তিনি) যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীত খলীফা নিযুক্ত করেন? …আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ আছে কি?

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে যে, বিপন্ন মানুষের দোয়া শুনেন একমাত্র আল্লাহ এবং তাদের বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট কেবলমাত্র তিনি-ই দূর করেন। তিনি ছাড়া এ কাজ করার আর কেউ কোথাও নেই। এ-ই হচ্ছে কুরআন উপস্থাটিত প্রকৃত তওহীদী আকীদা। এই তওহীদী আকীদারই অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে, আল্লাহই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছেন। এ দুনিয়ায় মানুষ যা-ই করবে, তা যদি আল্লাহর খলীফা হিসেবে করে, তা হলেই সে তা করার অধিকারী হবে। অন্যথায় তা করার কোন অধিকারই তার থাকতে পারে না। এই খলীফা হওয়ার অধিকার সর্বজনীন –সকল মানুষের ক্ষেত্রে একেবারে সাধারণ।

বলা বাহুল্য, মানুষের এ ‘খিলাফত’ পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টির সমষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে নয়। পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে মানুষকে খলীফা বলা হয়ে থাকলে কথাটি এভাবে বলার কোন প্রয়োজন ছিল না।

সে কথার ধরনই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। যেমন এ দিক দিয়েও মানুষকে ‘খলীফা’ হয়েছে কোন কোন আয়াতে। যেমন এই আয়ানটিতেঃ [আরবী………..]

অতঃপর তোমাদেরকেই পৃথিবীতে তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি বানালাম। উপরোদ্ধৃত আয়াতসমূহের কারকথা হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টিকূলের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান বানিয়েছেন, তাকে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা বানিয়েছেন। ফলে মানুষ সমগ্র সৃষ্টিকূলের উপর এক বিশিষ্ট সৃষ্টিরূপে গণ্য হতে পারছে। এ মর্যাদা এই অসংখ্য সৃষ্টিকূলের মধ্যে আর কারোরই নেই। আর মানুষ যেহেতু দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা, এজন্যই আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে সিজদা করার জন্য। এই সিজদা আসলে মানুষের অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকারের প্রতীক। এ দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা হিসেবে মানুষ যা-ই করবে, ফেরেশতারা তাতে মানুষের আনুকূল্য করবে, সহযোগীতা করবে, সিজদা তারই নিঃশব্দ স্বীকৃতি মাত্র। সেই সাথে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বেরও স্বীকৃতি।

দুনিয়ায় মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলে ঘোষণার ফলে দুটি কথা অনিবার্য হয়ে পড়ে।

১. মানুষ আল্লাহর খলীফা –আল্লাহর মহান নাম ও উচ্চতর পবিত্র গুণাবলীর বাস্তব রূপায়ণে।

মানুষ আল্লাহর খলীফা, সে তার অস্তিত্ব দ্বারাই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ ও প্রকাশ করছে। মানুষ এ দুনিয়ায় নানা জিনিস উদ্ভাবন করবে, নানা শিল্প কর্ম তৈয়ার করবে, আবিস্কার করবে, নবোদ্ভাবন করবে, দিন-রাত কাজ করবে এবং এই সব করে মানুষ তার দুঃখকে হালকা করবে, অনুর্বরকে উর্বর করবে, বিরান স্থানকে আবাদ করবে, স্থলভাগকে জলভাগে ও জলভাগকে স্থলভাগে পরিণত করবে। গাছ-পালা রোপণ করবে, শ্যামল শোভামণ্ডিত বাগান রচনা করবে, পশু পালন করবে, তার বংশ বৃদ্ধি করবে। সে সবের মধ্যে কেউ ছোট হবে, কেউ বড় হবে। কোনটি গৃহপালিত হবে, আবার কোনটি বন্যই থেকে যাবে। এই সকল প্রকারের প্রজাতি দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে, তাকে নিজের কাজে ব্যবহার করবে ঠিক যেমন প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক শক্তিসমূহ এবং অন্যান্য যাবতীয় সৃষ্টিকূলকে মানুষ নিজের ইচ্ছামত নানা কাজে ব্যবহার করছে।

যে আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য একটা বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন [আরবী……..] তিনিই এইসব কিছু দিয়ে মানুষকে ধন্য করেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন, যেন মানুষ আল্লাহর সুন্নাতকে এখানে কার্যকর করে। তাঁর সৃষ্টি কুশলতাকে উদ্ভাসিত করে তোলে, তাঁর হিকমতের তত্ত্ব-রহস্যকে উদঘাটিত করে, তাঁর বিধানের সার্বিক কল্যাণ মানুষ গ্রহণ করে। বস্তুত এ দুনিয়ায় আল্লাহর অসীম-বিস্ময়কর ‘শক্তির ও ব্যাপক-গভীর-সূক্ষ্ম জ্ঞানের বাস্তব নিদর্শনই হচ্ছে নামুষ। মানুষকে তিনি সর্বোত্তম মানে ও কাঠামোয় সৃষ্টি করেছেনঃ [আরবী………..]

আর মানুষ তো এই সব দিক দিয়েই পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা।

প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক ব্যাপারাদির ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর খলীফা, তাই পৃথিবীকে আবাদ করা, আবর্জনা-জঞ্জাল মুক্ত করা, এখানে বসবাসের বিপদ সংকুলতা দূর করার দায়িত্ব মানুষের উপরই অর্পিত। আর এ দুনিয়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেই আল্লাহর লক্ষ্যকে বাস্তাবায়িত করবে মানুষ।

যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ [আরবী…………]

সেই আল্লাহই তোমাদেরকে যমীন থেকে পয়দা করেছেন এবং এখানেই তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আল্লাহ তা’আলাই স্থান –যমীন ও পশুকুলেরও রব্ব। অতএব আল্লাহর খলীফা এই মানুষই সেই সম্পর্কিত যাবতীয় কাজের দায়িত্বশীল। হযরত আলী (রা) তাই বলেছেনঃ [আরবী…………..]

তোমরাই দুনিয়ার স্থান ও পশুকূলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

সারকথা, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রাকৃতিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহর দেয়া শক্তি ও ক্ষমতার বলে আল্লাহ সুবহানুহু’র প্রতিনিধি।

২. সেই সাথে মানুষ এ দুনিয়ার মানুষের সামষ্টিক ব্যাপাদাদিতে নেতৃত্ব ও প্রশাসকত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর খলীফা।

অর্থাৎ দুনিয়ায় মানুষের আল্লাহর খলীফা হওয়অর ব্যাপারটি শুধু উপরে উল্লিখিত ব্যাপারসমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ দেশ শাসন ও জনগণকে নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা। কেননা মানুষ যখন দুনিয়ার স্থানসমূহের ব্যবস্থাপনা, জন্তু-জানোয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ ও যাবতীয় ব্যাপারাদি সূচারুরূপে সম্পাদনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল –কিয়ামতের দিন এইসব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। তখন মানুষ তাদের নিজেদের ব্যাপারেও জিজ্ঞাসিত হবে অনিবার্যভাবে। মানুষের ব্যক্তিজীভন, সমাজ, রাষ্ট্র সরকার-প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও বিচার ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত না হয়ে পারে না। আর জিজ্ঞাসিত হওয়অর অর্থ হচ্ছে, এসব ব্যাপারে তাদের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে। অতএব এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান তাদের কর্তব্য। আর এ কর্তব্যের কারণেই তারা এ ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা।

এসব ক্ষেত্রে মানুষের খিলাফতের দায়িত্ব পালিত হতে হবে আল্লাহর দেয়া বিধানের ভিত্তিতে। নিজেদের ইচ্ছামত এ দায়িত্ব পালন করার কোন অধিকার মানুষের থাকতে পারে না। ফলে মানুষের প্রশাসনিকতা আল্লাহর খলিফা হিসেবেই কার্যকর হবে এবং আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে এই প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পাদিত হলেই বাস্তবায়িত হতে পারবে এই যমীনে আল্লাহর খিলাফত। মানুষ আল্লাহর খলীফা হিসেবেই প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্বের অধিকারী হবে, যদিও আসল ও প্রকৃত সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণরূপে ও একান্তভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট, যাতে মানুষের কোন অংশ আদপেই নেই।

তাই বলা যায়, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রশাননিক কতৃত্ব সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে কেবলমাত্র আল্লাহর খলীফা হিসেবে আল্লাহর প্রতিনিধি রূপে, নিজস্ব ভাবে নয়।

এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী সাধারণভাবে সমস্ত মানুষ। কিন্তু সমস্ত মানুষের পক্ষে এ কর্তৃত্ব চালানো সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ একসাথে কখনই সম্ভব হতে পারে না। সেজন্য মানুসের মধ্য থেকেই কতিপয় লোককে বাছাই করে নিতে হবে ও তাদেরকে সুযোগ দিতে হবে এই কর্তৃত্ব পালন ও সার্বভৌমত্ব কার্যত প্রয়োগ করার জন্য। আর এখানেই নির্বাচনের প্রশ্ন।

সকল মানুষ একসাথে প্রয়োজনীয় সার্বভৌমত্ব –প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে না। তা করার জন্য নির্দিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তির নিযুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত হওয়অ বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই এক বা একাধিক ব্যক্তি কে বা কারা? তাদের সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করা ও কার্যে নিয়োজিত করা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?

তার একটি মাত্র উপায়ই আছে এবং সে উপায় হচ্ছে নির্বাচন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা সমানভাবে প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েও তারা সকলে একই সময় কার্যত তা করতে পারে না বলে তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে বাছাই করে তাদেরকে এ কাজের দায়িত্ব দেবে, সেই সাথে বাস্তব সমর্থন ও সহযোগীতা দিয়ে তাদেরকে প্রাপ্ত দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে পালন করার অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ করে দেবে।

এই পর্যায়ে দুটি মৌলিক কথা অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে। প্রথম এই যে, জনগণ নিজেদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক লোককে বাছাই করবে সেই কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জন্য, যা মূলত তাদের সকলের, কেবল সেই ব্যক্তিদেরই নয়, যাদেরকে বাছাই করা হয়েছে ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অতএব এই বাছাই কার্যটি নিঃশর্ত ও পক্ষপাতহীনভাবে সম্পাদিত হতে হবে। অর্থাৎ তারা তাদের নিজেদের সুস্থ অনাবিল বিবেচনায় যাকে বা যাদেরকেই অধিক যোগ্য মনে করবে অর্পিতব্য দায়িত্ব পালনের দিক দিয়ে কেবল তাদেরকেই বাছাই করবে। সে জন্য না নিকটাত্মীয়তার কোন শর্ত থাকবে, না নগদ কোন স্বার্থ লাভের প্রশ্ন উঠবে। উপরন্তু এ ভাবে বাছাই করার পর নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সুযোগ ও সহযোগীতাও দেবে। কেননা তারা যে কাজ করছে, তা তাদের একান্ত নিজস্ব কোন কাজ নয়, তা সকল মানুষের কাজ। কাজেই সে কাজে সকলেরই আন্তরিক সদিচ্ছা ও সহযোগীতা থাকা আবশ্যক।

আর দ্বিতীয় এই –যে বা যারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হলো, সে কখনই মনে করবে না যে, প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কেবল মাত্র তাদেরই, অন্য কারোরই নয়। বরং মনে করবে, এ কর্তৃত্ব সকলেরই। তবে সকলে তা একসাথে করতে পারবে না। বরং মনে করবে, এ কর্তৃত্ব সকলেরই। তবে সকলে তা একসাথে করতে পারবে না বলেই সকলের পক্ষ থেকেই এই দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছে। তারা এ কাজ ‘নিজেদের কাজ মনে করে করবে না, করবে সকলের কাজ মনে করে। অতএব এই ‘ক্ষমতা’ লাভের সুযোগে তারা কোন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করার দিকে মনোযোগ দেবে না, সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকবে এই সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের জন্য। উপরন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর খলীফা হওয়া সত্ত্বেও সামষ্টিক খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণ তাদের নিজস্ব খিলাফতের একটা অংশ তাদেরকে দিয়েছে। এ জন্য তাদেরও খলীফা। এ ভাবে এক দিকে আল্লাহর খলীফা হওয়অর সাথে সাথে মানুষেরও খলীফা হওয়ার কারণে তারা যেমন আল্লাহর নিকট দায়ী –জবাবদিহি করতে বাধ্য –তেমনি জনগণের নিকটও দায়ী, তাদের নিকটো জবাবদিহি করতে বাধ্য। এ উভয় দিকে জবাবদিহি দায়িত্ববোধের তীব্রতায় এই নির্বাচিত ব্যক্তিরা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক হতে পারে না। বরং তারা এ দুনিয়ায় যেমন জনগণের নিকট দায়ী হওয়ার কারণে জনগণের স্বাধীন সমালোচনার সম্মুখীন হতে বাধ্য, তেমনি কিয়ামতের দিন খিলাফতের দিন আল্লাহর নিকট কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে আল্লাহর ও জনগণের খিলাফতের দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন না করলে। এ ভয়ে তাকে বা তাদেরকে সদা কম্পমান হয়ে তাকতে হবে।

এমনকি, জনগণ যে সব গুণের অগ্রবর্তিতা দেখে ও যে –সব দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে বা তাদেরকে নির্বাচিত করেছে –নির্বাচিত হওয়ার পর সেই গুণ হারিয়ে ফেললে ও সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের দেয়া খিলাফতের অংশ ফিরিয়ে নিতেও পারবে। কেননা খিলাফতের এই অংশ দান বিশেষ গুণের শর্তে ও বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যই ছিল। তা-ই যখন না বা দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হয়ে গেল, তখন জনগণের দেয়া খিলাফতের অংশ দখল করে থাকার তার বা তাদের কোন অধিকারই থাকতে পারে না।

সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব

সার্বভৌমত্ব মূলত একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু মানব সমাজে এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ হতে পারে মানুষের দ্বারাই। তা করার পন্থা স্বয়ং সার্বভৌম আল্লাহ তা’আলাই নিরূপন করে দিয়েছেন এ ভাবে যে, তিনি নিজেই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা রূপে নিযুক্ত করেছেন। আল্লাহর খিলাফত –প্রতিনিধিত্ব  -করার দায়িত্ব তিনি নিজেই মানুষের উপর অর্পন করেছেন। এই খিলাফতের অধিকার ও মর্যাদা প্রত্যেকটি মানুষের অভিন্ন। সকল মানুষ একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই খিলাফতের দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রয়োগ করবে। এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব মানুষের নিকট এক মহান আমানত হিসেবে গচ্ছিত। কিন্তু কার্যত সকল মানুষ একত্রিত হয়েও এক সাথে এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে না বলেই সকলের পক্ষ থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি তা প্রয়োগ করবে।

এই কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থার একান্তভাবেই প্রয়োজনঃ

প্রথমত গোটা মানব সমাজকে এক ও অভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিক হতে হবে, যারা প্রদত্ত খিলাফত প্রয়োগ করে এই পৃথিবীতে ঐক্যবদ্ধ খলীফাসমষ্টি রূপে গণ্য হবে। তারা অন্যান্য সকল প্রকারের সম্পর্ক ছিন্ন করে নেবে এবং সমগ্র বিশ্বলোক ও তার মধ্যকার সব কিছুর একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রকরূপে সেই ‘এক’কেই স্বীকার করবে।

এই গভীর ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব কুরআন বোঝাতে চেয়েছে একটি দৃষ্টান্তমূলক কথা দ্বারা। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী…………]

 আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এক ব্যক্তি তো সে, যার মালিকানায় বহু সংখ্যক বাঁকা স্বভাবের মনিব শরীক হয়ে আছে, যারা প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে টানে। আর অপর ব্যক্তি পুরাপুরিভাবে একই মনিবের জন্য নির্দিষ্ট। …..এই দুইজনের অবস্থা কি একই রকমের হতে পারে?

এ দৃষ্টান্ত থেকে মু’মিন ও কাফির –এক আল্লাহর অনুগত ও বহু আল্লাহতে বিশ্বাসী মুশরিকের অবস্থা এবং এ দুয়ের মধ্যকার আসমান-যমীনের পার্থক্য স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে গেছে।

এক আল্লাহতে বিশ্বাসী ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্ধী। তার মনিব সেই এক আল্লাহ-ই। আর মুশরিক –কাফির ব্যক্তি বহু সংখ্যক, বিভিন্ন সাংঘর্ষিক মর্জী ও ইচ্ছার দাসত্ব করতে হয় তাকে। একই সময় প্রত্যেক মনিবই তাকে তার কাজ করতে বলে। ফলে এই ক্রীতদাস একই সময় বহু মনিবের নির্দেশ পালনের দায়িত্বের নিষ্পেষণে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত, জর্জরিত ও দিশেহারা হয়ে যেতে বাধ্য হয়। একটি মানব সমাজ-সমষ্টির ব্যাপারও একই দৃষ্টিতে বিবেচ্য। তা যদি এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হয়, এক আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ত মেনে চলাই হবে তার নীতি ও আদর্শ। সেই সমাজ-সমষ্টি উপরোক্ত দৃষ্টান্তের সেই ক্রীতদাসের ন্যায় হবে, যার মনিব মাত্র একজন। পক্ষান্তরে তা যদি কাফির বা মুশরিক হয়, তাহলে একক সার্বভৌমত্ব মেনে চলা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং বিভিন্ন সার্বভৌম শক্তি সেই সমাজের উপর কর্তৃত্ব করবে, যেমন কুরআনী দৃষ্টান্তে বহু সংখ্যক সার্বভৌম শক্তির টানাটানি চলবে, যেমন একটি লাশ নিয়ে টানাটানি ও কামড়া-কামড়ি করে বহু সংখ্যক কুকুর।

হযরত ইউসুফ (আ) এই একক সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেনঃ [আরবী…………]

বিভিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহু সংখ্যক রব্ব-সার্বভৌম উত্তম, না মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ সার্বভৌম হিসেবে উত্তম?

দ্বিতীয়ত, সেই সমাজ-সমষ্টিকে এক আল্লাহর জন্য খালেস দাসত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে, সমাজের লোকদের পারস্পরিক সম্পর্কও সেই অনুযায়ী গড়ে উঠতে হবে এবং অন্যান্য অসংখ্য তাগুতী শক্তির সার্বভৌমত্বের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যে সব শক্তির নাম করা হয় সার্বভৌম হিসেবে, সেগুলি তো নিছক নাম মাত্র। সে নামগুলি হয় তোমরা রেখেছ, না হয় তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখে নিয়েছে। বলা হয়েছেঃ [আরবী…………]

এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর যার দাসত্ব তোমরা কর (সার্বভৌম মনে করে), সেগুলি নিছক কতকগুলি নাম মাত্র (সেই নামগুলির অন্তরালে ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছুরই অস্তিত্ব নেই)। এই নাম তোমরা আর তোমাদের বাপ-দাদারা রেখে নিয়েছে।

বস্তুত বহু সংখ্যক সার্বভৌমের দাসত্ব থেকে মানবকূলকে কুক্তি দিয়ে একমাত্র আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের অধীন ও অনুসারী বানাবার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে সর্বশেষ নবী রাসূল রূপে পাঠিয়েছেন। তাই মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের সার্বভৌমত্ব স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করতে হবে। একক সার্বভৌম আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তিকে একক চুক্তিরূপে মানতে হবে। অ-খোদা শক্তি ও ব্যক্তির আনুগত্য খতম করে দিয়ে এক আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। এবং এক আল্লাহর কর্তৃত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের কর্তৃত্ব থেকে বিদ্রোহ করতে হবে, উৎপাটিত করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এক আল্লাহর সার্বভৌম-ভিত্তিক সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসন-ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, সমগ্র সামাজিক সামগ্রিক সম্পর্ক-সম্বন্ধের ক্ষেত্র থেকে পার্থক্য প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার নীতি নির্মূল করে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের প্রাণস্পর্শী পবিত্র ভাবধারাকে মূর্ত ও প্রবল করে তুলতে হবে। এখানে আল্লাহই হবেন একমাত্র সার্বভৌম, কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ রূপে একমাত্র আল্লাহর। আর সমগ্র মানুষ সর্বতোভাবে সমান, অভিন্ন সেই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে। আর এই সমস্ত মানুষই পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা বিশ্ব ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে, মানব জীভন সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার ব্যাপারে। এখানে মান-মর্যাদা ও মৌলিক স্বাভাবিক অধিকারও সমস্ত মানুষের এক ও অভিন্ন, ঠিক যেমন চিরুনীর কাঁটাগুলি হয়ে থাকে।

এরূপ অবস্থায়ই মানব সমষ্টি পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে রত থাকবে, তা এই গুণ-পরিচিতি সহকারে আল্লাহর খলীফা হওয়ার ভূমিকা পালন করবে। এই রূপ এক মানব সমষ্টি সম্পর্কে একথা ভাবা যায় না যে, তা স্বেচ্ছাচারিতার সাথে শাসনকার্য চালাতে কিংবা আল্লাহর সম্মতিহীন ইজতিহাদের বলে আইন-কানুন রচনা করবে। কেননা তা আল্লাহর খলীফা হওয়ার প্রকৃতির সাথে একবিন্দু সঙ্গতিসম্পন্ন হয়।

এ দিক দিয়ে কুরআনী ইসলামী আদর্শনুসারী মানব সমষ্টি পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজ-সংস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়ে থাকে।

কেননা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসারী সমাজ নিজেই নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী। এই কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে তা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসনকার্য চালায় না। ফলে তা কারোর পরিচালনায় ও আইন প্রণয়নে কোন স্থায়ী আদর্শ ও মানদণ্ড মেনে চলতেও বাধ্য নয়। সেখানে জাতির জনগণ আইন-বিধান হিসেবে গ্রহণ করতে যা’তেই একমত হবে, তা যদি তার মান-মর্যাদা পরিপন্থি হয়ও এবং তা যদি সেই সমাজেরই কোন একটা অংশের কল্যাণ-বিরোধী হয়ও তবু তা গ্রহণ ও কার্যকর করতে কোন বাধা থাকে না।

আল্লাহর খলীফা রূপে গঠিত ও প্রতিষ্টিত সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্নতর প্রকৃতি ও ভাবধারার হয়ে থাকে। তার শাসন-প্রশাসন স্বাধীন ও নিরংকুশ হয় না কখনই। তা এক দায়িত্বসম্পন্ন –জবাবদিহি করতে বাধ্য সমাজ। সে সমাজ-সংস্থাকে সর্বক্ষেত্রে সত্য ও ইনসাফকে অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, জুলুম-শোষণকে নির্মূল করতে হয়< আল্লাহদ্রোহীতাকে প্রতিরোধ করতে হয়। তার প্রতিটি কাজ করতে হয় মহান আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করার তীব্র দায়িত্ব বোধ সহকারে। এ দৃষ্টিতে বলা যায় –ইসলামী হুকুমাত উম্মতের উপর উম্মতের শাসন আল্লাহর খিলাফত হিসেব অর্থাৎ দেশ শাসন ও পরিচালনায় মুসলিম উম্মত স্বীয় ইচ্ছা ও কামনা-বাসনাকেই বাস্তবায়িত করবে না, বরং মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণ ও আল্লাহর ঘোষিত সীমা সমূহের মধ্যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কার্যকর হবে।

দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন

আল্লাহ তা’আলা হযরত দাউদ (আ)-কে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তাঁরই দেয়া বিধান অনুযায়ী শাসন-প্রশাসনের কাজ সুসম্পন্ন করেই এই খিলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি পূর্ণ সত্যতা, সততা ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরতা সহকারে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে আল্লাহর ঘোষণাঃ [আরবী………]

হে দাউদ! আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি জনগণের মধ্যে পরম সত্যতা-সততা-ন্যায়পরতা সহকারে শাসন-কার্য পরিচালনা কর।

আদম (আ)-কে লক্ষ্য করে ‘খলীফা’ বানাবার ঘোষণা এবং হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে বলা এই ‘খলীফা’ মূলত একই –এ দুয়ের মধ্যে মৌলিকভাবে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এখানে হযরত দাউদ (আ)-কে ব্যক্তিগতভাবে খলীফা বানাবার কথা বলা হয়েছে। আর হযরত আদমের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সমস্ত আদম বংশধরদের খলীফা বানাবার সংকল্প ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) খিলাফতের প্রথমোক্ত দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থ করেছেন এভাবেঃ ‘সে দুনিয়ায় ফসল উৎপাদনে, ফল বের করণে ও খাল-নদী তৈরী করার ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে’।

আর দ্বিতীয়, উক্ত দিকে ইঙ্গিত করে তার তাফসীর করেছেন এই বলেঃ সৃষ্টিকূলের উপর শাসন-প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে। আর খলীফা হবেন আদম ও তাঁর সন্তানদের মধ্যে যারাই স্থলাভিষিক্ত হবে। – [আরবী টীকা]

শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা-হুকুমাত-ছাড় আমানত আদায় করা সম্ভব নয়

কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা’আলা ‘আমানত’ গ্রহণের জন্য সমস্ত জিনিসের নিকট প্রস্তাব পেশ করেছেন –আসমান যমীন ইত্যাদিকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলেছেন। কিন্তু সবকিছুই তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। এ পর্যায়ে আল্লাহর কথা হচ্ছেঃ [আরবী………]

আমরা এই আমানতকে আকাশমণ্ডল, যমীন ও পাহাড়-পর্বতের সম্মুখে পেশ করেছি। কিন্তু ওরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে, ওরা ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ তা নিজের স্কন্ধে তুলে নিয়েছে। বস্তুত মানুষ যে জালিম ও জাহিল তাতে সন্দেহ নেই। আমানতের এই দুর্বহ বোঝা গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণাম হলো, আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ স্ত্রীলোক ও মুশরিক পুরুষ-স্ত্রীলোকদের শাস্তি দেবেন ও মু’মিন পুরুষ-স্ত্রীলোকদের তওবা কবুল করবেন। বস্তুত আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল এবং অশেষ দয়াবান।

আয়াতটিতে যে আমানতের কথা বলা হয়েছৈ, সে ‘আমানত’ বলে কি বুঝিয়েছে? ইমাম কুরতুবী ও অন্যান্য মুফাসসির বলেছেনঃ ‘তা হচ্ছে সাধারণভাবে দ্বীণ পালনের যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য’। এ পর্যয়ে যত কথা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে এই মতই অধিক সহীহ। [আরবী টীকা…..] আল্লামা তাবরিযী লিখেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষের যে সব হুকুম-আহকাম, কর্তব্য ও সীমাসমূহ নাযিল করেছেন, তা সবই আমানত এবং এ আমানত রক্ষার দায়িত্ব মানুষ গ্রহণ করেছে। [আরবী টীকা…..]

আর একথা তো নিঃসন্দেহ যে, মানুষ এই আমানত গ্রহণ করেছিল তা যথাযথভাবে পালন ও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে। তাই এ কথায়ও কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না যে, আল্লাহর নাযিল করা হুকুম-আহকাম –আইন-বিধান, কর্তব্য ও সীমাসমূহ মানব জীবনে কার্যকর করা এমন একটি হুকুমত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া কখনই সম্ভব হতে পারে না, যা মূলত আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, যা হড়ে তুলবে মু’মিন উম্মত এই মনোভাব সহকারে যে, এইরূপ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীন আল্লাহর আনুগত্য ভিত্তিক জীবন যাপন করা সম্ভব, অন্য কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থার অধীন তা সম্ভবপর নয়।

দ্বিতীয় আয়াতটি [আরবী…………….] ‘যেন আল্লাহ আযাব দেন’……..

উল্লিখিত আমানতের নিগূঢ় সত্য কথা উদঘাটিত ও প্রকাশিত করছে। বোঝা যাচ্ছে যে, ‘আমানত’ ধারণকারী মানুষ মু’মিন, মুশরিক ও মুনাফিক –এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। মানুষকে এইরূপ বিভক্তকরণ কেবল সত্য আকীদা গ্রহণ ও দ্বীন পালনের দৃষ্টিতেই সম্ভব হতে পারে! এ দৃষ্টিতে মু’মিন সে, যে দ্বীন পালন ও কায়েম করবে। এ ক্ষেত্রে যারা শিরক-এ লিপ্ত হবে, তারা মুশরিক হবে। তারা কিছুটা দ্বীন পালন করলেও দ্বীন-বিরোধী কার্যকলাপই বেশী করবে। আর মুনাফিক বলে চিহ্নিত হবে সেইসব লোক, যারা দ্বীনের প্রতি ঈমানদার বলে বাহ্যত দাবি ও প্রচার করবে কিন্তু আসলে ও প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের প্রতি তারা ঈমানদারও নয়, নয় তারা দ্বীন পালনকারীও।

প্রথম আয়াতের শেষাংশে মানুষকে ‘যালুম’ ও ‘জাহল’ বলা হয়েছে তো এই কারণে যে, মানুষ সামষ্টিকভাবে এই আমানত বহন করার দায়িত্ব গ্রহণ করেও তারা তাতে খিয়ানত করেছে, কার্যত আমানতের দায়িত্ব বহন করেনি। ফলে মানুষ মু’মিন, মুশরিক ও মুনাফিক –এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মু’মিন হয়েছে তারা, যারা ওয়অদা অনুযায়ী কাজ করেছে –কার্যত দ্বীন পালনের দায়িত্ব বহন করেছে। মুনাফিক হয়েছে তারা, যারা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত বাইরে প্রকাশ করেছে কেননা তারা অন্তর দিয়ে দ্বীনের প্রতি ঈমান না এনেও নিজেদেরকে ঈমানদার বলে যাহির করেছে। আর মুশরিক হয়েছে তারা, যারা এক আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক-আন্তরিক ঈমান গ্রহণ করতে পারেনি –অন্যান্য শক্তির প্রতিও ঈমান এনেছে এবং কার্যত এক আল্লাহর দেয়া বিধান পালন করেনি। কিছুটা আল্লাহর বিধান আর কিছুটা মানুষের মনগড়া বিধান পালন করেছে। কার্যত নফসের খায়েশাতেরই অনুসরণ করেছে।

শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে খিলাফত

পূর্ববর্তী দীর্ঘ আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মানুষ এ পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা। এ খিলাফত কার্যথ শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে বাস্তবায়িত হবে।

পূর্বোল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে খিলাফতের এই তাৎপর্যই প্রতিভাত হচ্ছে শাসনকার্যের এই নেতৃত্ব থেকে মৌলিকভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্নতর, যা সাধারণত দুনিয়ার আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিরা, রাজা-বাদশাহ স্বৈরতন্ত্রীরা দিয়ে থাকে। এ সব লোক যুগের পর যুগ ধরে জনগণের উপর নির্মম স্বৈর শাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে কুরআনে উপস্থাপিত খিলাফতের –শাসককার্য পরিচালনায় নেতৃত্বদানের দূরতম কোন সম্পর্কই নেই। ওদের এ স্বৈর শাসন যদিও আল্লাহর নামেই দুর্বল-অক্ষম অসহায় মানবকুলের উপর চালানো হচ্ছে। কিন্তু আসলে ওরা নিজেরাই নিজেদেরকে মানুষের উপর আল্লাহর আসনে সবাচ্ছে, মানুষের উপর প্রভুত্ব করে যাচ্ছে।

উপরন্তু খিলাফতের শাসনকার্য ও ওদের স্বৈর শাসন যেমন কোন দিক দিয়েই এক নয়, তেমনি একটি সমাজ-সমষ্টির জন্য আল্লাহর নিকট থেকে সার্বভৌমত্ব প্রদানও অভিন্ন নয়। একটি সমাজ-সমষ্টির জন্য আল্লাহর দেয়অ সার্বভৌমত্ব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব মাত্র। আল্লাহর খিলাফত আল্লাহর শাসন-নীতিরই বাস্তবায়ন মাত্র। শাসকের স্বেচ্ছাচারিতা করার একবিন্দু অবকাশ সেখানে নেই।

খিলাফতে আল্লাহই হচ্ছেন সার্বভৌমত্বের একক অধিকারী, মানুষের নিকট যে কর্তৃত্বটুকু আসে, আল্লাহ-ই হচ্ছেন তার একমাত্র উৎস। আর আল্লাহর বিধান শরীয়াত-ই তথায় একমাত্র শাসন ব্যবস্থা। শরীয়াত মানুষকে যতটা সীমাবদ্ধ দেয়, মানুষকে তথায় ততটা সীমার মধ্যে থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দান করতে হয়। সে শরীয়াতকে ইচ্ছামত পরিবর্তন বা ব্যাখ্যা দানের কোন অধিকারই মানুষের থাকতে পারে না।

এই কারণে খিলাফতের শাসন ব্যবস্থায় মানুষ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করে আল্লাহর নিকট অক্ষরে অক্ষরে জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতি সহকারে। কেননা এখানে কোন মানুষই নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী হয় না। গোটা সমাজ-সমষ্টিও নয়। আল্লাহর অর্পিত আমানত রক্ষা এবং সে জন্য তাঁরই নিকট জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতিতে প্রতি মুহুর্তেই কম্পমান হয়ে থাকা একান্তই অপরিহার্য গুণ।

সরকার সংগঠনের সামষ্টিক দায়িত্ব

পূর্বোদ্ধৃত আয়াতসমূহ অনিবার্যভাবে প্রমাণ করছে যে, আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী মুসলিম উম্মতের কর্তব্য হচ্ছে –ইসলামী আইন-কানুনের পরিমণ্ডলে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখানে এ দায়িত্ব যেমন গোটা মুসলিম উম্মতের উপরে চাপিয়ে বসানোর এবং তাদের ইচ্ছা-মর্জী-অনুমতি ব্যতিরেকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে বসার।

বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পূর্বে একটি প্রশ্নের সুম্পষ্ট জবাব নির্ধারিত আবশ্যক। প্রশ্নটি হচ্ছেঃ

বাহ্যিক পটভূমিতে সমাজ-সমষ্টির কোন অস্তিত্ব আছে কি, যা ব্যক্তির অস্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র ও বাস্তব? কিংবা তা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির একাত্ম হওয়অর কোন আপেক্ষিক বা কল্পিত রূপ মাত্র?

দার্শনিকদের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি

দার্শনিকরা মনে করেন, বাহ্যিক পটভূমিতে সমাজ-সমষ্টির কোন অস্তিত্ব নেই। বাহ্যত আছে শুধু ব্যক্তিগণ। এই ব্যক্তিগণের একজনের সাথে আর একজনের মিলিত হওয়া থেকে লব্ধ রূপ ব্যতীয় সমাজ-সমষ্টি বলতে কিছুই নেই।

এই দার্শনিকদের বাইরে সমাজ-বিদ্যা পারদর্শিগণ এই ধারণা পোষণ করেন যে, সমাজ-সমষ্টির একটা বাহ্যিক অস্তিত্ব অবশ্য আছে। এই অস্তিত্ব স্বতন্ত্র এবং বাস্তব। এ কারণেই তো ব্যক্তিগণের পরস্পরের মধ্যে একটা সামাজিক সম্পর্ক বর্তশান থাকে, ব্যক্তিগণের অধিকার নির্ধারিত থাকে এবং সে সমাজের থাকে কতগুলি সুস্পষ্ট আইন-বিধান ও নিয়ম-ধারা।

সত্যি কথা এই যে, এই উভয় মত পরস্পর বিরোধী হলেও সত্য ও নির্ভুল। তা এজন্য যে, দার্শনিকগণ বস্তু বা বিষয়সমূহের নিরেট স্পর্শযোগ্য বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। অথচ ব্যক্তির সত্তাগত বাস্তবতার বাইরে প্রকৃতি জগতের পটভূমিতে বাস্তব হিসেবে তা পায় না। এ কারণে ব্যক্তিগণের অস্তিত্বের বাইরে সমাজ-সমষ্টির একটা বাস্তব অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোন উপায় দেখতে পান না।

পাঁচজন ব্যক্তি যখন একটি টেবিলের চতুস্পার্শ্বে গোল হয়ে বসে, তখন দার্শনিক এই পাঁচজনের একত্র সমাবেশ লব্ধ সামষ্টিক রূপকে কোন স্বতন্ত্র ও বিশেষ সত্তা –যা এই পাঁচজনের বাইরে ষষ্ঠ হতে পারে –গণ্য করেন না।

কিন্তু অধিকারের দৃষ্টিকোণে প্রকট হয়ে উঠে যে, মানব-সমষ্টি আকারে যত ক্ষুদ্রই হোক, একটি সুপরিচিত বাস্তবতার অধিকারী। প্রচলিত ধারায় এই দৃষ্টিকোণই সর্বাধিক পরিচিত। সেই সমষ্টির এমন কতগুলি অবশ্য পূরণীয় অধিকার রয়েছে, যা ব্যক্তির জন্য নেই। অথবা এখানকার ব্যক্তির এমন কতগুলি কর্তব্য, অধিকার ও দায়-দায়িত্ব রয়েছে, যেমন রয়েছে সমষ্টির জন্য। বর্তমান দুনিয়ার সংস্কৃতিবান জাতিসমূহ সমাজকে এই দৃষ্টিকোণ দিয়েই দেখে থাকে। তাই সমাজের একটা স্বতন্ত্র সত্তা তাদের নিকট প্রকট ও স্বীকৃত। তার একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার আবশ্যকতাও এবং বিশেষ কিছু অধিকার ও কর্তব্যও নির্ধারণ করে।

কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজ-সমষ্টি

ইসলামের দৃষ্টিকোণে ব্যক্তি ও সমষ্টির অধিকার বিবেচনা করা হলে উভয়েরই নিজ ক্ষেত্রে ও পরিবেশে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার না করে কোন উপায় থাকে না। উভয়েরই স্বাতন্ত্র্য, অধিকার ও সমান-সমান দায়িত্ব-কর্তব্য অবশ্যই মেনে নিতে হয়।

কুরআনুল করীম এ অধিকারের দৃষ্টিতে সমাজরে উপর দৃষ্টিপাত করে। তা সমাজের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব, জীবন ও পুনরুজ্জীবন, নির্দিষ্ট সময়কাল এবং অগ্রবর্তিতা ও পশ্চাদপদতা প্রভৃতি সবই রয়েছে বলে স্বীকার করে, যেমন এসব হয়ে থাকে ব্যক্তির ক্ষেত্রেও।

এ কারণে ব্যক্তির প্রতিকূলে সমাজ-সমষ্টির বাস্তব অবস্থান অস্তিত্ব যথোপযুক্তভাবে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের আয়াতসমূহ আমাদেরকে স্পষ্ট পথ-নির্দেশ করে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী………………….]

প্রত্যেকটি জনসমষ্টির জন্য নির্দিষ্ট একটা সময়কাল রয়েছে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়কাল যখন নিঃশেষ হয়ে আসবে, তখন একটা মুহুর্ত বিলম্বেও যাবে না, আগেও আসবে না। [আরবী…………………]

প্রথ্যেকটি উম্মতকে ডাকা হবে এই বলে যে, এস ও নিজ নিজ আমল নামা দেখে নাও। [আরবী……………..]

আমরা একনিভাবেই প্রতিটি মানব মণ্ডলীর জন্য তাদের কার্যকলাপকে চাকচিক্য করে দিয়েছি। [আরবী…………..]

তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক ন্যায়বাদী সত্যপন্থীও রয়েছে। [আরবী……..]

এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা সত্য সঠিক পথে স্থিরভাবে দাড়িঁয়ে আছে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে। [আরবী…………………………..]

প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই তাদের রাসূলের উপর হামলা চালিয়েছে, যেন তারা তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তারা সকলেই বাতিলের হাতিয়ার সমূহের দ্বারা দ্বীনকে নীচা দেখাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি তাদের পাকড়াও করেছি। পরে দেখ, আমার দেয়া শাস্তি কত কঠিন ও কঠোর ছিল! [আরবী……………………]

প্রত্যেক উম্মত –জনসমষ্টির জন্য একজন রাসূল রয়েছে। অতঃপর যখন কোন উম্মতের নিকট তার রাসূল এসে পৌছেঁছে, তখন পূর্ণ ইনসাফ সহকারে তাদের মধ্যকার ফয়সালা চুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

এ আয়াতসমূহ সম্পষ্ট ও উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, ব্যক্তিগণের সামষ্টিকতা সমাজ ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে সমাজের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। আর সে সমাজের একটা সময়কাল রয়েছে, কিতাব রয়েছে, চেতনা রয়েছে, সমঝ-বুঝ আছে, আনুগত্য ও অনানুগত্য –গুনাহ নাফরমানী ও পুণাশীলতা রয়েছে এবং সামষ্টিকভাবে অনেক বিষয়ে ফয়সালাও হয়ে থাকে।– [তাফসীরুল মিজান]

এ সব আয়অতের প্রেক্ষিতে একথাও প্রকট হয়ে উঠে যে, কুরআন জনসমষ্টির –উম্মতের ইতিহাসকে ততটাই গুরুত্ব দিয়েছে, যতটা দিয়েছে ব্যক্তির কাহিনীর উপর। বরং সত্যি কথা এই যে, পূর্বে ইতিহাসে প্রধানত ব্যক্তিরাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তখনকার ইতিহাস রাজা-বাদশাহ ও বড় বড় দিগ্বিজয়ী রাজ্য স্থাপনকারী ব্যক্তিদেরই কাহিনীতে পূর্ণ ছিল। তাতে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিহাস গুরুত্ব ও স্বীকৃতি লাভ করেছে কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার পর। তাই উত্তরকালে আল-মাসউদী ও ইবনে খালদূনের ন্যায় ব্যক্তিবর্গ মানব জাতির ও জনসমষ্টির খ্যাতনামা ইতিহাসবেত্তা রূপে আবির্ভূত হতে পেরেছেন। ফলে পরবর্তীকালে ব্যক্তিদের কাহিনীর স্থানে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিবৃত্তই হয় ইতিহাসের প্রধান উপজীব্য। বস্তুত ইসলামে সমাজ-সমষ্টির উপর যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলেই এরূপ হওয়া সম্ভব হয়েছিল। সমাজ-সমষ্টির ইতিহাসের প্রতি এরূপ গুরুত্ব দুনিয়ার অপর কোন ধর্ম বিধান বা সামষ্টিক রীতিতে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ব্যক্তির চরিত্র গঠন ও মানুষোপযোগী প্রশিক্ষণ কেবল সমাজ-সমষ্টির মধ্যেই সম্ভব। এ কারণে ব্যক্তির পূর্ণত্ব বিধানের জন্যই সমাজ-সমষ্টির অপরিহার্য প্রয়োজন। মানব-চরিত্র ও ভাবধারার সাংঘর্ষিক বৈচিত্র ও বিভিন্নতা সমাজ-পরিবেশের মধ্যেই মেরুকৃত ও একাকার হতে পারে কোন-না-কোন মাত্রায়। আর অন্যান্য দৃষ্টিতে ব্যক্তি ছাড়া ‘ব্যক্তি’র ধারণা করাও কঠিন।

এই কারণেই ইসলামের সালাত, হজ্জ, জিহাদ ও অর্থ ব্যয় প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানই সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। আর এইগুলির সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন সম্ভব করার জন্যই ইসলামী হুকুমান একান্ত অপরিহার্য। এই হুকুমাতই কার্যত ইসলামের বিধানকে বাস্তবায়িত করে, আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহকে রক্ষা করে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে সর্বাত্মক কল্যাণের দিকে আহবান –‘আমর বিল মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার’-এর দায়িত্ব এই সরকারই যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এই সবের ফলে যে সৌভাগ্যপূর্ণ ও পবিত্র ভাবধারা সম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠে, তা-ই ব্যক্তিদের নৈতিক উন্নয়ন সাধন করে। আর তাই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান উপায়। আর এ সব কারণেই ইসলামী সমাজ দুনিয়ার অন্যান্য সমাজ-সমষ্টি থেকে অধিক উন্নত ও সর্বাধিক কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে।

ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির জন্য কতগুলি কর্তব্য অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে। যেমন পাঁচ ওয়অক্ত সালাত, এক মাস কালীন সিয়াম, পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও এই ধরনের অন্যান্য বহু কাজ ব্যক্তিকে অবশ্যই করতে হবে। অনুরূপভাবে ইসলামী সমাজের জন্য বহু কয়টি দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারিত হয়েছে, যেগুলি সামাজিকভাবেই কাজে পরিণত করতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোন টাল-বাহানা বা গড়িমসি করা চলবে না।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ ইসলামী সমাজ-সমষ্টিকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ [আরবী………………………]

মেয়েলোক চোর ও পুরুষলোক চোর –উভয়ের হাতসমূহ কেটে দাও তাদের উভয়ের দুষ্কৃতির শাস্তিস্বরূপ, আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষা দান হিসেবে। আর আল্লাহ প্রবল শক্তি সম্পন্ন সুবিবেচক।

ব্যভিচারী নারী-পুরুষ সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেনঃ [আরবী……………………]

ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ এদের প্রত্যেককে একশ’টি করে দোররা মার এবং তাদের প্রতি দয়াশীলতা আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তোমাদেরকে যেন বাধাগ্রস্থ করতে না পারে –যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হও এবং এই দুইজনকে দেয়া শাস্তি যেন মু’মিনদের কিছু সংখ্যক লোক প্রত্যক্ষ করে।

অনুরূপভাবে ইসলামী দেশ ও রাজ্যের সীমানা সংরক্ষণ ও বহিরাক্রমণ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে ধৈর্য ও পাহারাদারির সাথে।

ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী………………………………]

হে ঈমানদার লোকগণ, ধৈর্য অবলম্বন কর, বাতিল পন্থীদের প্রতিরোধে দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা প্রদর্শন কর, ইসলামী রাজ্য সংরক্ষণে সর্বদা প্রস্তুত থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক।আশা আছে, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।

অপর এক আয়াতে রাষ্ট্রদ্রোহী আল্লাহদ্রোহীদের মুকাবিলায় যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন শেষ পর্যন্ত তারা দমিত হয়ে সত্য দ্বীতের আনুগত্য করতে বাধ্য হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহীতা, আল্লাহদ্রোহীতা ও সর্ব প্রকারের সীমালঙ্ঘনমূলক কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত হয়। ইরশাদ হয়েছেঃ [আরবী……………………….]

আর ঈমানদার লোকদের মধ্য থেকে দুটি দল যদি পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের মধ্যে সন্ধি করে দাও। পরে যদি তাদের মধ্য থেকে কোন এক পক্ষ অন্য পক্ষের প্রতি বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনমূলক আচরণ করে তাহলে এই সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই কর যতক্ষণ না সে পক্ষটি আল্লাহর বিধান পালনের দিকে ফিরে আসচে। অতঃপর সে পক্ষ ফিরে এলে তাদের মাঝে সুবিচার সহকারে

মীমাংসা-মিল-মিশ করিয়ে দাও। আর সব সময়ই সুবিচার নীতি অনুসরণ করে চলতে থাক। কেননা আল্লাহ সুবিচার কারীদের পছন্দ করেন –ভালবাসেন।

বস্তুত উদ্ধৃত আয়াতসমূহে আল্লাহ তা’আলা মু’মিন লোক সমষ্টিকে সম্বোধন করেছেন, কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। অতএব এই সম্বোধনের পর যে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, তা সেই ঈমানদার লোক-সমষ্টির প্রতি এবং তা পালন করতে হবে সেই লোক-সমষ্টিকে সমষ্টিগতভাবে –কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। এ পর্যায়ের আরও কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ [আরবী…………]

এবং তোমরা আল্লাহর পথে বিনিয়োগ কর

[আরবী……………………………………………]

তোমাদের মধ্য থেকে অবশ্যই এক জন-সমষ্টি বের হয়ে আসতে হবে, যারা সার্বিক কল্যাণের দিকে সতত আহবান জানাতে থাকবে এবং ভালো-শরীয়াতসম্মত কাজের আদেশ করতে ও অন্যায়-মন্দ তথা শরীয়াতবিরোধী কাজ করতে নিষেধ করতে থাকবে। [আরবী…………………..]

এবং তোমরা তাঁর পথে জিহাদ কর। [আরবী……………………………]

এবং তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে জিহাদ কর যেমনটা জিহাদ তাঁর ব্যাপারে করা কর্তব্য।

[আরবী…………………………..]

এবং কিসাসে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত।

[আরবী…………………………………]

এবং তোমরা আল্লাহর জন্য স্বাক্ষ্য দাড় করো।

[আরবী……………………………….]

এবং তোমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জু ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।

[আরবী…………………………………….]

এ কয়টি এবং এ ধরনের আরও বহু সংখ্যক আয়াত থেকে স্পষ্ট-অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম মূলতই এক সামষ্টিক জীবন বিধান। আল্লাহ তা সামষ্টিক আদর্শরূপে মু’মিন সমষ্টির উপরই পালন করা কর্তব্য করে দিয়েছেন; ঠিক যেমন বহু ব্যক্তিগত কাজের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে ব্যক্তিগণের উপর অর্পণ করেছেন। দ্বীন কায়েম করার দায়িত্ব মুসলিম লোক-সমষ্টিই পালন করতে পারে। তাদের সমন্বয়ে যে সমাজ-সমষ্ঠি গড়ে উঠে, আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যকের জন্য এখানে কোন বিশেষত্ব নেই, নেই কোন তারতম্য।

সমষ্টিকে সম্বোধন করার দরুন অর্পিত দায়িত্ব পালন সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আরোপিত কর্তব্য-দায়িত্ব সেই ব্যক্তিগকেই ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে হবে।

এই ব্যক্তিগণের সমন্বয়েই সমষ্টি গড়ে উঠে। ব্যক্তিগণের উপর অর্পিত কর্তব্য দায়িত্ব ব্যক্তিগণকে সরাসরি ফরয হিসেবেই পালন করতে হবে। আর সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যক্তির ভূমিকা হচ্ছে সমষ্টির একজন হিসেবে এবং তা ফরযে কিফায়া। সমষ্টির কোন এক ব্যক্তি যদি তা পালন করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিরই পালন করা হয়ে যাবে। কিন্তু কোন এক ব্যক্তিও যদি তা পালন না করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিই সেজন্য দায়ী হবে। কেননা সে হুকুম পালন করার দায়িত্ব সমাজ-সমষ্টির উপরই অর্পিত হয়েছিল।

সমাজ-সমষ্টির উপর কর্তব্য পালনের দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে সেই সব কাজের, যা সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই পালন করা সম্ভব, ব্যক্তিগতভাবে কোন ব্যক্তির পক্ষে তা পালন করা সম্ভব নয়। সেই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করার জন্য সমাজ তার মধ্য থেকে এক বা কতিপয় লোককে নিযুক্ত করতে পারে। সেই নিযুক্ত এক বা একাধিক লোক সে দায়িত্ব পালন তখনই করতে পারে, যদি তা করার কতৃত্ব (Authority) সমাজ-সমষ্টিই দেয়। এভাবেই সমাজ-সমষ্টির দায়িত্ব পালনের জন্য সমাজ সমর্থিত একটি সরকার –তথা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা ইসলামের কর্ম সম্পাদনের স্থায়ী নিয়ম। এ সংস্থাই ইসলামী আদর্শভিত্তিক সামাজিক নিয়ম-শৃংখলা বাস্তবায়িথ করবে এবং সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য সমাজ সমর্থিত একটি সরকার –তথা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা ইসলামের কর্ম সম্পাদনের স্থায়ী নিয়ম। এ সংস্থাই ইসলামী আদর্শভিত্তিক সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বাস্তবায়িত করবে এবং সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব কর্তব্যসমূহও যথাযথভাবে পালন করবে। সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য এটাই হচ্ছে একমাত্র কার্যকর পন্থা। সমাজ-সমষ্টির কল্যাণ ও তার সার্বিক উন্নয়ন সাধন এরূপ একটি সংস্থা গড়ে তোলা ছাড়া কোন ক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। এরূপ একটি সংস্থা কার্যকর না থাকলে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন চরম অরাজকতা উচ্ছৃঙ্খলতা প্রবল হয়ে উঠা অনিবার্য, তেমনি বৈদেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব থেকে যাবে, আর এর কোন একটিও ইসলামের কাম্য নয়। বরং ইসলাম তীব্রভাবে এই অবস্থাকে প্রতিরোধ করতে বলে।

এ দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা থেকে আরমা এই তত্ত্ব উদ্ধার করতে পারে যে, জন-সমষ্টিই হচ্ছে প্রশাসনিক ক্ষমতার উৎস। অবশ্য নিরংকুম উৎস নয়। তা উৎস শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ ও ইসলামী আইন-কানুন জারিকরণের আওতায়। ইসলামে জনগণই সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা, প্রমাসক নিয়োগ ও নির্বাচনের জন্য দায়িত্বশীল। জনগণকে কল্যাণের দিকে পরিচালনায় নেতৃত্ব দান এ সংস্থার পক্ষেই সম্ভব। এ সংস্থাই আল্লাহর শরীয়াতী বিধানকে সামষ্টিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করবে। কেননা আল্লাহর সম্বোধনসমূহে এই সমাজ-সমষ্টি –জনগণ-ই-সম্বোধিত। কিন্তু তারা সকলে ব্যক্তিগতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে না বলেই তাদের সকলের পক্ষ থেকে কে বা কারা এ দায়িত্ব পালন করবে, তা নির্ধারণ করা তাদেরই কর্তব্য। কুরআনের আয়াত তুলে যেমন দেখানো হয়েছে; চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীকে দোররা মারা, সীমালংঘনকারীকে সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য করা, আগ্রাসন প্রতিরোধ করা ও দ্বীনী নিয়ম-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা –প্রভৃতির আদেশ কি মুসলিম সমষ্টির উপর কর্তব্য করা হয়নি।

তাহলে স্পষ্ট হলো যে, ইসলামের ইসলামী সমাজ-সমষ্টির গুরুত্ব স্বীকৃত। সেই সজাম-সমষ্টিরই কর্তব্য এমন এক সরকার –প্রশাসনিক সংস্থা –গড়ে তোলা, যা সেই সমাজ-সমষ্টির পক্ষ থেকে তার অর্পিত ক্ষমতা বলে এই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করবে। কেননা ইসলাম এই কর্তব্যসমূহকে সামষ্টিক কর্তব্য রূপেই ফরয করেছেন এবং এই কাজগুলি করা কেবলমাত্র একটি সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই সম্ভবপর।

বস্তু একটি সরকার প্রশাসনত-সংস্থা –যা জীবনের বিভিন্ন দিকের গুরুত্বপূর্ন ও অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব-কর্তব্য সমূহ তার প্রাতিষ্টানিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাদির মাধ্যমে সুসম্পন্ন করবে, একান্তভাবে দায়িত্ব সহকারে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনসমূহ যথাযথভাবে কার্যকর করবে –ব্যতীত না ইসলামী জীবন চলতে পারে, না ইসলামী সমাজ।

ইসলাম তার সামষ্টিক নিয়ম-বিধান ও আইন-কানুন কার্যকর করতে চাইবে অথচ সে কাজ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য যন্ত্র কাঠামো সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে চাইবে না, আবার জনগণের অধিকার রক্ষার, সম্পর্ক সংরক্ষণের ও জনগণের দাবিসমূহ আদায়ের বড় বড় ওয়াদা প্রতিশ্রুতি দেবে, তা কি কল্পনা করা যায়?

ইসলামের দৃষ্টিতে উম্মত –মুসলিম জনগণ –এভাবেই প্রশাসনিক কর্তৃত্বের উৎস। প্রশাসনিক দায়িত্বশীল নির্বাচন এজন্যই মুসলিম উম্মতের অধিকার ও কর্তব্য –কর্তব্য ও অধিকার।

বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে সরকার গঠন

ইসলামী শরীয়াতে মানুষের সহজ-সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি করআন, সুন্নাত ও ইজমা’র পরে একটি অন্যতম উৎসরূপে স্বীকৃত। যেসব ক্ষেত্রে এই বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবকাশ রয়েছে, সেখানে তা শরীয়াতের ইমামগণ ব্যাপকভাবে ও গুরুত্ব সহকারে প্রয়োগ করেছেন। এখানে এই দৃষ্টিতে আমাদের বক্তব্যঃ

সুস্থ সহজ বিবেক-বুদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করছে যে, জগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা একান্তই কর্তব্য। কেননা তা না হলে মানুষের জীবনে কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করাই সম্ভব নয়। আর মানব-সমাজের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা যে একান্তই কর্তব্য, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই।

মানুষের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা স্থাপন, তার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ও স্বয়ং মানব-জীবনের সংরক্ষণ ও স্থিতির জন্যই আবশ্যক। সেজন্য চেষ্টা-সাধনা ও কষ্ট স্বীকরা সাধারণভাবে সমস্ত মানুষের জন্যই কর্তব্য। কেননা মানুষ এইরূপ একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ-পরিবেশেই নিশ্চিত ও নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে, পারে তার কাম্য কল্যাণ ও উৎকর্ষ উন্নতি অর্জন করতে।

এ কারণে আমরা দেখতে পাই, দুনিয়অয় এমন বহু জাতি রয়েছে যারা কোন দ্বীন বা শরীয়অতের অনুসারী না হলেও তারা নিজেদের সামাজিক শৃঙ্খলা দৃঢ়তার সাথে স্থাপন করেছে।

এ দৃষ্টিতে আমরা সহজেই বলতে পারি যে, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যে একান্তই প্রয়োজন, তা-ও সর্বতোভাবে অনস্বীকার্য। এমন একটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক সমাজে অবশ্যই থাকতে হবে, যা সেই সমাজের জনগণের সার্বিক সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দিনরাত একান্তভাবে নিয়োজিত ও কর্মরত থাকবে। শুধু তাই নয়, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান, সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিও থাকতে হবে, যার মধ্যে এই দায়িত্বশীলতার জন্য জবাবদিহির তীব্র অনুভূতিও থাকতে হবে। এ কারণে মানব-সমাজের ইতিহাসে এমন কোন অধ্যায়ের সন্ধান পাওয়া যায় না, সেখানে এইরূপ দায়িত্বশীল বলতে কেউ কোথাও নেই। সভা ও আধুনিক সমাজের তো কোন প্রশ্নই উঠে না। প্রাচীন আদিম অসভ্য বর্বর সমাজেও এইরূপ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা দেখি সমাজ প্রধান বা গোত্র সরদারকে। গোটা সমাজ বা গোত্র যেমন তার নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে,তেমনি সেই সমাজ ও গোত্রের –কবীলার –সার্বিক সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য তাকেই কাজ করতে হয়, সে কাজ যথাযথরূপে সম্পন্ন হলো কি না, সেজন্য তাকে সেই সমাজ বা গোত্রের জনগণের নিকট জবাবদিহিও করতে হয়।

বৃহত্তর ও আধুনিক সম্প্রসারিত জীবন-প্রেক্ষিতে এই দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বই আত্মপ্রকাশ করেছে সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা রূপে। এইরূপ একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও তার সদা কার্যকরতা ব্যতীত কোন সমাজের অস্তিত্বেই কল্পনা করা যায় ন। ইসলাম তাই এরূপ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করার উপর যথেষ্ট তাকীদ পেশ করেছে। এরূপ একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন জীবনই মানুষের জন্য সম্ভব লে ইসলাম বিশ্বাস করে। এরূপ একটি জীবনেই সম্ভব ইসলামী আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও পালন-অনুসরণ। এরূপ একটি জীবনেই আশা করা যায়, মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ। এক কথায় মানুষের সার্বিক কল্যাণ এরূপ একটি সংস্থাধীন জীবন ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।

নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম জীবন

নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম-মুসলিম সমাজ-একটি নতুন সরকার-সংস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য প্রয়োজনের কথা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। কেননা নবী করীম (স) জীবদ্দশায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন প্রশাসক ছিলেন, আইনের মাধ্যম ছিলেন, প্রধান বিচারপতি ছিলেন, আদর্শিক নেতা ও পরিচালক ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করলে তার স্থলাভিষিক্ত একটি সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া মুসলিম জনগণের জীবন চলতেই পারে না। তাই অনতিবিলম্বে-এমনটি রাসূলে করীম (স) এর কাফন দাফনেরও পূর্বে এ কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রশাসক, প্রশাসন-পরিচালন সংরক্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় কাজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দানকারী একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সর্ববাদীসম্মতভাবেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মুসলমানদের প্রথম খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।

সাহাবায়ে কিরাম (র)-এর এই কর্মপদ্ধতিতে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর কাফন-দাফনের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাকে কার্যকর করা।

জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল (আল্লাহর খলীফা ও আমানতদার হিসেবে)

ইসলামী ফিকহ’র একটি মৌল-নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল।-[এই পর্যায়ে কোন কোন মহল রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হিসেবে প্রচার করেঃ (আরবী টীকাতে***********) ‘মানুষ তার ধন-মালের উপর কর্তৃত্বশীল’। কিন্তু এর সনদ কিরূপ এবং সিহাহ সিত্তার কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে কি না, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না। -গ্রন্থকার]বস্তুত মানুষ যখন তার ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল, তখন অনিবার্যভাবে তার নিজের জন্যও দায়িত্বশীল হবে। তাহলে কোন ধন-মালের উপর তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই অন্য কারোর থাকতে পারে না। আর অন্য কেউ যদি কারোর ধন-মালের উপর কর্তৃত্ব করতে না-ই পারে তাহলে কারোর নিজ সত্তা ও ব্যক্তিত্বের উপর অন্য লোকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠত করার কোন অধিকার যে দিতে পারে না, তা আরও বলিষ্ঠভাবে বলা যায়। কোন লোক কারোর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না, কারোর অনুমতি ব্যতীত তার শক্তি সামর্থ্য ও মান মর্যদার উপর কেউ কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে –কেউ নিজের মর্জী চালাবে, তা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। -এ হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে একদিকের কথা।

আর অপর দিকের কথা হচ্ছে, কোনরূপ সামাজিক সামষ্টিক সংস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে অন্য লোকদের স্বভাব ও শরীয়াতসম্মত অধিকার, আযাদী ও ধন-মালের উপর হস্তক্ষেপ-নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

এ-দুটি কাজ পরস্পর বিরোধী। অথচ এই পরস্পর কাজ দুটি একত্রিত করা না গেলে কোন সামাজিক সামষ্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনই এবঙ কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আর এই উদ্দেশ্যেই সরকার –তথা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হবে জনগণের ধন-মালের ও স্বাধীনতার উপর তাদেরই অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে। আর সে হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া যেতে পারে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নির্বাচনে জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে। এই ভোটদান কার্যত প্রমাণ করছে যে, সে তার ধন-মাল ও স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্য কাউকে দেয়ার এই পন্থা ও নীতিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং সে একজনকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে সেই কাজ করার জন্য অনুমতি প্রদান করছে।

আরো স্পষ্ট কথায় বললে হয়, মানব সমাজে যে প্রশাসন ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তাতে অবশ্যই জনগণের ধন-মাল ও চিন্তা-বিশ্বাসের উপর একটা কর্তৃত্ব অবশ্যই চালাতে হয়। সে ব্যবস্থার শুধু বিভিন্ন প্রকারের কর আদায় করা ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র কাজ হবে না। তা সে সবের উপর নানা রূপ বাধ্য বাধকতাও আরোপ করবে, তাতে তার স্বাধীনতাকে অনেকটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হবে, সম্পর্ক ভিন্নভাবে স্থাপন করা হবে, যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে এবং সাধারণ লোকদেরকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করা হবে। এ ধরনের আরও যেসব কাজ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তা সবই করা হবে। এরূপ একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা ও শরীয়াতের তাকীদ অনুযায়ী একান্তই কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সেজন্য একটি শক্তিসম্পন্ন সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো কায়েম করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকতে পারে না। যদিও তা ইসলাম মানুষকে তার নিজের ও তার ধন-মালের উপর যে কর্তৃত্ব দিয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এই সাংঘর্ষিকতা বিদূরিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, জনগণকে আল্লাহর খলীফা ধরে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের খিলাফতী-অধিকার স্বীকার করে জনগণের মর্জী ও সমর্থন-অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা। এই সংস্থা যেসব কাজই করবে, তাতে জনগণের সমর্থন ও অনুমোদন আছে বলেই মনে করা যাবে এবং এভাবে তা সামষ্টিকভাবে আল্লাহর খিলাফতের বাস্ব রূপ পরিগ্রহ করবে।

প্রশাসনিক ক্ষমতা -সার্বভৌমত্ব -প্রশাসকের নিকট আমানত

পূর্বোদ্ধৃত বিস্তারিত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, একটি সরকার গঠন ও সেজন্য সর্বোচ্চ প্রশাসক নির্বাচন জনগণের একটা সামষ্টিক অধিকার। জনগণই একজন সর্বোচ্চ প্রশাসক নিযুক্ত করবে নিজেদের মর্জীমত এবং যখন ইচ্ছা হবে তা সেই জনগণই তার নিকট থেকে কেড়ে নেবে। এই কথার তাৎপর্য হচ্ছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা -প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব -সর্বোচ্চ প্রশাসকের দেয়া একটি আমানত। জনগণই এ আমানত তার নিকট রাখে কিন্তু সে আমানতের খিয়ানত করে প্রশাসন যদি জনগণের প্রতিই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে সেই জনগণই তার নিকট থেকে এ আমানত কেড়ে নেবার অধিকার রাখে।

এই কথা কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী****************]

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানত সমূহ -দায়িত্বপূর্ণ কাজের পদসমূহ -সে সবের যোগ্য লোকদেরকে দাও। আর (পারস্পরিক বিবাদ কালে) তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে, তখন (আল্লাহর আদেশ এই) যে, তোমরা অবশ্যই সুবিচার করবে। আল্লাহ বস্তুতই সর্বশ্রোতা, সর্বদর্শী।

তিনি আরও বলেছেনঃ [আরবী********************]

হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদেরও। পরে তোমরা যদি কোন বিষয়ে পারস্পরিক মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে সে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। (কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মীমাংসা করে নাও) যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। জেনে রাখো, এই নীতিই সর্বোত্তম, সর্বাধিক কল্যাণময় এবং পরিণতির দিক দিয়ে অতীব ভালো

বস্তুত প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ব্যাপার। এটা গড়ে তোলার অধিকার ঈমানদার জনগণের নিকট পবিত্র আমানত। এ আমানত নিশ্চয়ই সেই লোকদের নিকট সমর্পণ করতে হবে যারা তা যথাযথভাবে পালন করবে ও আমানতের হক আদায় করার যোগ্যতার অধিকারী। যারা সে যোগ্যতার অধিকারী নয়, তাদের নিকট এ আমানত কখনই অর্পণ করা উচিত নয়। আর যোগ্য ও অধিকারী মনে করে আমানত অর্পনের পর তা যথাযথ আদায় করতে অযোগ্যতার -দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দিলে জনগণই সে আমানত ফিরিয়ে নেবে।

ঈমানদার লোকেরা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলবে, সংস্থার প্রধানের আনুগত্যও করবে। কিন্তু সে আনুগত্য কখনই শর্তহীন হবে না। নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে শুধু আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসূলের। তা ছাড়া অন্যদের আনুগত্য করতে হবে এই শর্তে যে, ১. সে বা তারা নিজে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে চলবে। ২. তারা জনগণকে এমন কাজের আনুগত্য করার নির্দেশ দেবে যা করলে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য হয়ে যায় এবং ৩. এমন কোন কাজের হুকুম দিবে না, যা করলে আল্লাহ ও রাসূলের নাফরমানী হয়।

প্রথমোল্লিখিত আয়াতে ‘তোমাদেরকে আদেশ করেছেন’ বলে প্রশাসকদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। কেননা এরপরই ‘তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে’ বলে তাদের প্রতিই হুকুম জারি করা হয়েছে। কাজেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায় যে, এখানে ‘আমানত’ বলে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে। এর পরই আনুগত্যের আদেশ দেয়ায়ও সেই হুকুমাত -প্রশাসনিক কর্তৃত্বকেই নির্দেশ করা হয়েছে। কাজেই ‘আমানত’ বলতে হুকুমান -তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

দ্বিতীয়োক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, এই আমানতের আসল অধিকারী হচ্ছে ঈমানদার জনগণ। অতএব হুকুমাত বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সেই জনগণের নিকট থেকেই পেতে হবে। জনগণকে এ আমানত স্বীয় আল্লাহ তা’আলাইদিয়েছেন যদিও সে ‘হুকুমাত’ মূলত আল্লাহর। কেননা হুকুমাতের জন্য যে সার্বভৌমত্ব অপরিহার্য, তা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই হতে পারে না। মানুষের নিকট শুধু প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব দু’ধরনের। একটি প্রকৃত ও মৌলিক যা একান্তভাবে আল্লাহর। আর দ্বিতীয় অধীন, প্রদত্ত, অর্পিত। এ দুটি সার্বভৌমত্ব ইসলামী হুকুমাতে একসাথে কাজ করে। এ দুটির মধ্যে কখনই বিরোধ বাঁধে না। কাজেই আমানতের ধারক হচ্ছে মুসলিম জনগণ। আর সে আমানতের সার্বভৌমত্বের আসল মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তা’আলা।

চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা) তাঁর একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলেছিলেনঃ

[আরবী******************************]

তোমার কাজ ও কর্তৃত্ব তোমার জন্য কোন স্বাদের খাদ্য নয়। বরং তা তোমার ঘাড়ের উপর একটি ভারী আমানত। তোমার উপরস্থের জন্য তুমি প্রহরার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি। তুমি এই প্রহরার কাজে কোনরূপ অন্যায় করতে পার না।

তিনি আরও বলেছেনঃ

[আরবী**********************************]

হে জনগণ! তোমাদের এই রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কিছু করার অধিকার কেবল তারই হতে পারে যাকে তোমরা নিযুক্ত করবে। আর খলীফা হিসেবে আমার কোন ক্ষমতা নেই। আছে শুধু এই যে, তোমাদের যে মাল সম্পদ আমার নিকট রয়েছেত, তার চাবিগুলি আমার নিকট রক্ষিত।

হযরত আলী (রা)-র আর একটি উক্তিঃ

[আরবী***************************************]

ইমাম ও রাষ্ট্র নায়কের অধিকার হচ্ছে এতটুকু মাত্র যে, সে আল্লাহর নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে শাসনকার্য চালাবে। সে যদি তা করে, তাহলে জনগণের উপর তার এই অধিকার হবে যে, তারা তার কথা শুনবে ও তার আনুগত্য করবে এবং যখন ডাকবে তখন তারা সে ডাকে সাড়া দেবে।

এ আয়াসমূহ এবং অন্যান্য উক্তি গভীরভাবে চিন্তা-বিবেচনা করলে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যায়, শাসক-প্রশাসক নির্বাচন করা মুসলিম উম্মতের অধিকার ও কর্তব্য। অবশ্য তা করতে হবে শরীয়াতের স্থায়ী নিয়ম বিধান অনুযায়ী। অন্তত সরকার যে মুসলিম উম্মতের ইচ্ছা ও মর্জীর ভিত্তিতে গঠিত হতে হবে, তাতে আর কোনই সন্দেহ নেই।

তবে শাসক-প্রশাসক নির্বাচনের এ অধিকার পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থার মত নিশ্চয়ই নয়, তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতি সম্পন্ন, ভিন্নতর লক্ষ্য সমৃদ্ধ। ইসলামে শাসক নির্বাচন করা হয় বিশেষ কতগুলি গুণের ভিত্তিতে, বিশেষ কতগুলি শর্তের অধীন। এগুলির উল্লেখ পরে করা হবে। কিন্তু পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই ধরনের অবশ্য পালনীয় কোন শর্ত নেই, নেই বিশেষ কোন গুণের অধিকারী হওয়ার অনিবার্য শর্ত।

তাছাড়া পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থায় শাসক জনগণের অধীণ হয়ে থাকে। কল্যাণ ও সত্যের অনুসারী হতে হয় না। কেননা তথায় জনগণই ভোটের একমাত্র অধিকারী। তাই নির্বাচিত শাসককে সেই জনগণের অনুসরণ করে চলতে হয় সব সময়, অন্যথায় পরবর্তী নির্বাচনে তার নির্বাচিত হওয়ার আশা করা ও সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যের অনুসরণের পরিবর্তে ন্যায়ভাবে হোক, কি অন্যায়ভাব, ভোটদাতাদের সন্তুষ্ট করার কাজেই তাকে চব্বিশ ঘন্টা চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়।

এর ফলে তাকে জনগণের বিচিত্র ধরনের কামনা-বাসনার চরিতার্থতা করতে হয় ও তাদের অধীণ হয়ে থাকতে হয়। কোন সময়ই সে নিরপেক্ষ সত্যের অনুসরণ করে চলার সাহস পায় না।

পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ নিজেদের ভোট প্রয়োগ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা ও চরিত্রের দিক দিয়ে কে ভোট পাওয়ার যোগ্য, সেই বিচার-বিবেচনা তারা সাধারণত করে না। ফলে সমাজের সর্বোত্তম আদর্শবাদী ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না। আর তার পরিণামে কোন দিনই আদর্শবাদী চরিত্রের ন্যায় ও সত্যের একান্ত অনুসারী সরকার গঠিত হতে পারে না। অতএব এইরূপ নির্বাচনে সাধারণত সমাজের অত্যাচারী লোকেরই শাসক হয়ে বসার সম্ভাবনা কোনক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। এই দিকের লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মতকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেনঃ [আরবী**********************]

তোমরা এই জালিমদের প্রতি ঝুকে পড়ো না। নতুবা তোমরা জাহান্নামের আওতার মধ্যে পড়ে যাবে। তখন তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন বন্ধু পৃষ্ঠপোষক পাবে না যে তোমাদেরকে আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করতে পারে, কোন দিক থেকে কোন সাহায্যও তোমরা পাবে না।

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম