ইসলামে মানবাধিকার

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইসলাম প্রদত্ত মৌলিক অধিকার

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের যেসব মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে প্রথমে আমরা সেই সব অধিকার প্রসংগে আলোচনা করব যা আকীদা বিশ্বাস ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী নির্বিশেষে মানুষ হিসাবে সমস্ত নাগরিককে সমভাবে দেয়া হয়েছে। এরপরে মুসলিম ও অমুসলিমদের বিশেষ অধিকার সমূহের মূল্যায়ন করব।

১. জীবনের নিরাপত্তা

ইসলাম মানবজীবনকে একান্তই সম্মানের বস্তু হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং একটি মানুষের জীবন সংহারকে সমগ্র মানবগোষ্ঠীর হত্যার সমতুল্য সাব্যস্ত করে জীবনের নিরাপত্তার গুরুত্বের প্রতি যতটা জোর দিয়েছে তার নজীর পৃথিবীর কোন ধর্মীয়, নৈতিক কিংবা আইন শাস্ত্রীয় সাহিত্যে কোথাও মিলে না। মহান আল্লাহর বাণী:
أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
অর্থ: “নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল” (সূরা মায়িদা:৩২)
সূরা বনী ইসরাঈলে ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা কর না” (সূরা বনী ইসরাঈল:৩৩)।
ইসলামী আইন ‘কতল বিল হাক্ব’ (সংগত কারণে হত্যা) ছয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে:
১. ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার অপরাধীকে তার অপরাধের প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করা ( কিসাস)।
২. জিহাদের ময়দানে সত্য দীনের পথে প্রতিবন্ধকতা ‍সৃষ্টিকারীদের হত্যা করা।
৩. ইসলামের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পতনের চেষ্টায় লিপ্তদের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা।
৪. বিবাহিত নারী-পুরুষকে ব্যভিচারের অপরাধে হত্যা কর।
৫. ধর্মত্যাগের অপরাধে হত্যা করা।
৬. ডাকাত অর্থাৎ রাজপথে রাহাজানি ইত্যাদি অপরাধের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা।
এই ছয়টি কারণ ছাড়া অন্য কোন কারণে মানুষের প্রাণের মর্যাদা বিনষ্ট হয় না।
কুরআনুল করীমের সূরা আনআমের ১৫২ নং আয়াত, বাকারার ১৭৮ ও ১৭৯ নং আয়াত এবং সূরা ফুরকানের ৬৮ নং আয়াতে এতদসম্পর্কিত নির্দেশ রয়েছে। মহান আল্লাহ ‘হত্যা’ কে এমন গুরুতর ও জঘন্য অপরাধ সাব্যস্ত করেছেন যে, এই অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ইহকালে কিসাসের শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও আখেরাতে জাহান্নামী হবে। উপরন্তু সে মহান আল্লাহর গযব ও চরম অভিসম্পাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا [٤:٩٣]
অর্থ: “এবং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, যেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার প্রতি আল্লাহর গযব ও অভিসম্পাত এবং তিনি তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন” ( সূরা নিসা:৯৩)।
কুরআন মজীদে দূর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদের হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না। আমিই তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করি এবং বিশেষত তাদেরও ( সূরা আনআম:১৫১)।
অনুরূপ উপদেশ সূরা বনী ইসরাঈলের ৩১ নং আয়াত ও সূরা আনআমের ১৪০ নং আয়াতেও দেওয়া হয়েছে। জাহিলী যুগে আরব দেশে কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়ার অমানুষিক প্রথা প্রচলিত ছিল। এই জঘন্য অপকর্মের জন্য পরকালের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ইংগিত দিয়ে অত্যন্ত ভয়ংকার বাচনভঙ্গীতে ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “যখন জীবন্ত প্রোথিত কণ্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল” (সূরা তাকবীর:৮-৯)।
আল্লাহ তাআলা কেবল অপরকে হত্যা করাই নিষিদ্ধ করেননি, বরং তিনি মানুষকে নিজের জীবন ধ্বংস না করারও নির্দেশ দিয়েছেন এবং এভাবে আত্মহত্যার পথও বন্ধ করে দিয়েছেন।
(আরবী***)
অর্থ: “তোমরা আত্মহত্যা কর না” (সূরা নিসা: ২৯)।
জীবনের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনের এইসব সুষ্পষ্ট বিধানের পর এখন নবী করীম সা: এর বাণী সমূহ ও তাঁর কল্যাণময় যুগের কতিপয় ঘটনা লক্ষণীয়। বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
“হে লোক সকল! তোমাদের জানমাল ও ইজ্জত আবরুর উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের উপর হারাম করা হল। তোমাদের আজকের এই দিন, এই (জিলহজ্জ) মাস এবং এই শহর (মক্কাশরীফ) যেমন পবিত্র ও সম্মানিত, অনুরূপভাবে উপরোক্ত জিনিসগুলোও সম্মানিত ও পবিত্র। সাবধান! আমার তোমরা পরষ্পরের হন্তা হয়ে কাফেরদের দলভূক্ত হয়ে যেও না যেন” (বুখারী, আবু দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ)
অত:পর তিনি তাঁর এই নসীহত কার্যকর করতে গিয়ে সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বলেন:
“জাহিলী যুগের যাবতীয় হত্যা রহিত হল। প্রথম যে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ আমি রহিত করলাম তা হচ্ছে আমার বংশের রবীআ ইবনুল হারিস এর দুগ্ধপোষ্য শিশু হত্যার প্রতিশোধ, যাকে হুযাইল গোত্রের লোকেরা হত্যা করেছিল। আজ আমি তা ক্ষমা করে দিলাম’ ( বুখারী, আবু দাউদ, নাসাঈ, ও মুসনাদে আহমাদ)।
মহানবী সা: একবার বলেছিলেন:
“কোন মুসলিম ব্যক্তির নিহত হওয়ার তুলনায় সমগ্র পৃথিবীর পতন আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ব্যাপার” (মুসলিম)।
কেবল মুসলমানের জীবনই সম্মানিত নয়; আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার জীবনই সম্মানিত। কোন মুসলমানের হাতে অন্যায়ভাবে কোন যিম্মী নিহত হলে সেই মুসলমানের জন্য জান্নাত হারাম। এই পর্যায়ে নবী করীম সা : বলেন: “যে ব্যক্তি কোন যিম্মীকে হত্যা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন” (নাসাঈ)।
“যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ কোন অমুসলিমকে হত্যা করল সে কখনো জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না” ( বুখারী)।
একবার কোন এক যুদ্ধে মুশরিকদের কতিপয় শিশু আক্রমণের পাল্লায় নিহত হয়। এতে মহানবী সা: অত্যন্ত মর্মাহত হন। কোন কোন সাহাবী আরয করলেন, এরা তো মুশরিকদের সন্তান। তিনি বলেন: “মুশরিক শিশুরাও তোমাদের চাইতে উত্তম। সাবধান! শিশুদের হত্যা কর না, সাবধান! শিশুদের হত্যা কর না। প্রতিটি জীবন আল্লাহর নির্ধারিত ফিতরতে ( সৎ স্বভাব নিয়ে) জন্মগ্রহণ করে থাকে” (মুসনাদে আহমাদ)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: খেকে বর্ণিত আছে যে, নববী যুগে এক ব্যক্তির মৃত দেহ পাওয়া গেল, কিন্তু হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া গেল না। মহানবী সা: চরম অসন্তোষ অবস্থায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন: “হে লোক সকল! ব্যাপার কি, আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকতে মানুষ নিহত হচ্ছে এবং তার হত্যাকারীর পরিচয় মিলছে না! একজন মানুষকে হত্যা করার জন্য আসমান জমীনের সমগ্র সৃষ্টিও যদি একত্র হয়ে যায় তবুও আল্লাহ এদের সকলকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না” (তাবারানী)।
কোন এক যুদ্ধে একটি স্ত্রীলোক নিহত হয়। মহানবী সা: তার লাশ দেখে বলেন, আহ! তোমরা এ কি কাজ করলে? সে তো যোদ্ধাদের মধ্যে শামিল ছিল না। যাও সেনাপতি খালিদকে বলে দাও যে, নারী, শিশু ও দূর্বলদের হত্যা কর না”( আবু উবায়েদ, কিতাবুল আমওয়াল, অনু: আবদুর রহমান তাহের, ইসলামাবাদ ১৯৬৯ খৃ. ১ম খ. পৃ. ১৫৮)।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার নজীরবিহীন ঘটনা থেকে আমরা যথার্থই অনুমান করতে পারি যে, মানুষের প্রাণের মূল্য এবং এতদসংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামের অনুসৃত কর্মপন্থা ছিল কত উন্নত। তখনও কাফেররা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছি, মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তাদের সাথে একটি হামলাকারী দেশের সৈন্যদের মত আচরণ দেখানো হয়েছিল।
বদরের যুদ্ধবন্ধী কাফেরদের সম্পর্কে হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। পক্ষান্তরে হযরত উমার রা: এদের হত্যার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। হযরত উমার রা:-র রায়ের অনুকূলে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হল:
“দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরকালের কল্যাণ, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ সে জন্য তোমাদের প্রতি মহাশান্তি আপতিত হত” ( আনফাল: ৬৭-৬৮)।
মক্কা বিজয়ের পর কাফেরদের অবস্থার আমূল পরিবর্তন সূচিত হল। তাদের রাজত্ব খতম হয়ে গেল। পরিসমাপ্তি ঘটালো তাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকারও। সর্বোপরি তারা বিজিত অঞ্চলের অধিবাসীদের ন্যায় ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে সাধারণ নাগরিকে পরিণত হল এবং মহান আল্লাহর অভিপ্রায় অনুসারে নতশিরে বশ্যতা স্বীকার করল।
(আরবী***)
অর্থ: “যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে স্বহস্তে জিয্য়া দেয়” ( সূরা তওবা:২৯)।
তাই মহানবী সা: আল্লাহর পক্ষ থেকে মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে মক্কা বিজয়পূর্ব পরিপূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যুদ্ধাবস্থায়ই নিজ রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তার অসাধারণ ব্যবস্থা অবলম্বন করেন।
মক্কা ছিল মহানবী সা: এর প্রাণের শত্রু এবং ইসলামের ঘোর বিরোধীদের আড্ডা। এখানে সেইসব লোক বাস করত যারা প্রতি পদে তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত, তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের নানাভাবে কষ্ট দিত, তাঁকে আবু তালিব গিরিসংকটে দীর্ঘ তিনটি বছর অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তাঁকে হত্যা জঘন্য ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল এবং তিনি মাতৃভূমির মায়া বিসর্জন দিয়ে সুদূর মদীনায় পৌঁছলে সেখানেও তাঁকে শান্তিতে বসবাস করতে দেয়নি। তারা মদীনার উপরে বারংবার হামলা চালিয়েছিল। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে তারা রসূলে করীম সা: এর নিবেদিত প্রাণ অনেক ‍সাহাবীকে শহীদ করেছিল এবং স্বয়ং তাঁকেও আহত করেছিল। যে সব সাহাবী মক্কা থেকে হিজরত করে ইয়ামান, সিরিয়া, আবিসিনিয়া ও নজদ এ আশ্রয় নিয়েছিলেন ওরা সেখানেও তাদের পেছনে লেগে থাকে। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রসুল সা: এর চাচা হযরত হামযা রা:-র হত্যকারী ওয়াহশী, তাঁর বক্ষ বিদারণ করে কলিজা চর্বণকারী হিন্দ, ইকরামা ইবনে আবু জাহল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, কাব ইবনে যুহায়র এবং এদের মত অসংখ্য ইসলাম দুশমন শহরে বর্তমান ছিল। মহানবী সা: আজ এদের এক একটি অপকর্মের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নিতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রাণভিক্ষা দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত ফরমান জারী করেন:
১. যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে তাদের হত্যা করবে না;
২. যে ব্যক্তি কাবা ঘরের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না;
৩. যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না;
৪. যে ব্যক্তি নিজের বাড়ীতে বসে থাকবে তাকে হত্যা করবে না;
৫. যে ব্যক্তি হাকীম ইবনে হিযামের বাড়িতে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না;
৬. পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া করবে না;
৭. আহত ব্যক্তিকে হত্যা করবে না।
মক্কা বিজয়ের পরে কাবার প্রাঙ্গণে জমায়েত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন:
“তোমরা কি জান আজ আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব?”
জনসমুদ্র থেকে সমস্বরে ধ্বনিত হল, “আপনি একজন সম্ভ্রান্ত ভাই এবং সম্ভ্রান্ত ভাইয়ের সন্তান।” মহানবী সা: জবাবে বলেন: “আজ তোমাদের উপর আমার কোন প্রতিশোধ স্পৃহা নেই, যাও তোমরা সবাই মুক্ত স্বাধীন” (কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মনসুরপুরী, রহমাতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ১১৮)।
মক্কা মুআযযমায় তিনি ক্ষমা ও অনুগ্রহের যে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন পরবর্তীকালে তা ইসলামের যুদ্ধনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, মিসর এবং রোমের যত অঞ্চল বিজিত হয়েছে সেগুলোতেও জয়লাভের পরে অনুরূপভাবে খুন-খারাবী ও রক্তপাত পরিহার করা হয়েছিল। হযরত আবু বাকর রা: হযরত উমার রা: হযরত উসমান রা: এবং হযরত আলী রা: তাদের সেনাধ্যক্ষ ও প্রাদেশিক গভর্ণরদেরকে এই প্রসঙ্গে যেসব নির্দেশনা ও ফরমান জারী করেছিলেন সেগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবেই অনুমিত হয় যে, এসব বিজয়ের উপর মক্কা বিজয়ের ‍সাধারণ ক্ষমার কার্যকরী প্রভাব বিদ্যমান ছিল।
জীবনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে- কখন থেকে এর প্রয়োগ হবে? পৃথিবীর সাধারণ আইনে ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকে প্রাণের নিরাপত্তার অধিকার কার্যকর হয়। কিন্তু আল্লাহর আইনে মাতৃ উদরে গর্ভ সঞ্চার হওয়ার পর থেকেই প্রাণের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই কারণে মহানবী সা: গামেদ গোত্রের এক নারীকে ব্যভিচারের সুষ্পষ্ট স্বীকারোক্তি স্বত্বেও হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন নি। কেননা সে ‍তার জবানবন্দীতে নিজেকে গর্ভবতী ব্যক্ত করে। অত:পর সন্তান প্রসব ও দুগ্ধ পানের সময় সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাকে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি কার্যকর করলে অন্যায়ভাবে সন্তানের প্রাণ নাশের আশংকা ছিল। ইসলামী আইন বিশারদগণ সন্তান গর্ভধারণের ১২০ দিনের মাথায় প্রাণের নিরাপত্তার অধিকার ধার্য করেছেন। কেননা এই সময়সীমায় গর্ভ সঞ্চার গোশত পিন্ডে রূপান্তরিত হয়ে মানুষের আকৃতি ধারণ করতে শুরু করে এবং তার উপর “মানু” পরিভাষা প্রযোজ্য হয়। আমাদের ফকীহগণের এই অভিমত শত সহস্র বছর পর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও স্বীকার করে নিয়েছে। আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট রো বনাম ওয়েড এর বিখ্যাত মামলায় আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যের বরাতে রায় দিয়েছে যে, মাতৃগর্ভে “মানব অস্তিত্ব” কে গর্ভ ধারণের তিন মাস পরে আইনত: স্বীকার করে নিতে হবে ( আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টের প্রতিবেদন, অক্টোবর ১৯৭২ খৃ, নিউইয়র্ক ১৯৭৪ খৃ, পৃ. ১৪৭)।

২. মালিকানার নিরাপত্তা

ইসলামী রাষ্ট্রে হালাল উপায়ে অর্জিত ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা স্বীকৃত। তবে এক্ষেত্রে শরীআত নির্ধারিত সমস্ত অধিকার ও কর্তব্য যেমন যাকাত, দান-খয়রাত, মাতাপিতা, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন, ভাই বোন ও অন্যান্য নিকট আত্মীয়ের লালন পালন ও যত্নের ব্যয়ভার ও দায়িত্ব বহন করতে হবে, উত্তরাধিকার স্বত্ব ক্রয় বিক্রয়ের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, প্রশাসন ব্যবস্থা, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান সমূহ, জরুরী অবস্থা, যেমন যুদ্ধ বিগ্রহ, দূর্ভিক্ষ, প্লাবন, ভূমিকম্প, মহামারী ইত্যাদি খাতের ব্যয়ভার বহনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক ধার্যকৃত স্থায়ী ও সামরিক প্রকৃতির কর পরিশোধ করতে হবে। অধিকন্তু এই সম্পদ হারাম ও অবৈধ খাতসমূহে ব্যয় করা যাবে না। এসব শর্তাধীনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে সম্পদের মালিকানা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং সম্পদের সংশ্লিষ্ট মালিক নিম্নোক্ত অধিকার সমূহ ভোগ করবে:
ক) ভোগ ব্যবহারের অধিকার;
খ) অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ করার অধিকার;
গ) সম্পদের ‍মালিকানা হস্তান্তরের অধিকার এবং
ঘ) মালিকানা স্বত্ব রক্ষার অধিকার।
এ প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমের স্পষ্ট নির্দেশ:
(আরবী***)
“তোমরা পরষ্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কর না” (সূরা বাকারা: ১৮৮)।
সরকার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি সামগ্রিক স্বার্থে নিজের ‍হাতে নিয়ে নেওয়া ( হুকুম দখলের) প্রয়োজন মনে করলে মালিকের সম্মতিতে উপযুক্ত মূল্য প্রদান সাপেক্ষে তা গ্রহণ করতে পারবে। মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণের জন্য মহানবী সা: যে স্থানটি নির্বাচন করলেন তা ছিল দুই ইয়াতিম বালকের মালিকানাধীন। তারা তাদের মালিকানাধীন ভূমি খন্ডটি বিনামূল্যে মসজিদের জন্য দান করতে চেয়েছিল। কিন্তু মহানবী সা: অনুমানপূর্বক মূল্য নির্ধারণ করালেন এবং তৎকালীন বাজারদর অনুযায়ী তা পরিশোধ করে ভূমি খন্ডটি গ্রহণ করেন” (মাহাসিন ইনসানিয়াত, পৃ.২২৪)।
হুনায়ন যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নিকট থেকে কয়েকটি বর্ম গ্রহণ করেন। সে যখন বলল, (আরবী***) এটা কি বলপূর্বক নেওয়া হল?
বিনিময়ে মূল্য ব্যতিরেকেই নেওয়ার অভিপ্রায়ে? তিনি বললেন, (আরবী***) “না, ধার, স্বরূপ গ্রহণ করলাম।” এর কোন একটি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে( আমীন আহসান ইসলাহী, ইসলামী রিয়াসত, ১৯৫০ খৃ, সংখ্যা ৪, পৃ. ১৩)।
কাযী আবু ইউসুফ রহ. তাঁর রচিত কিতাবুল খারাজ গ্রন্থে বর্ণনা করেন: “রাষ্ট্র নায়ক (ইমাম) কোন প্রতিষ্ঠিত আইনগত অধিকার ছাড়া কোন ব্যক্তির মালিকানা থেকে তার কোন বস্তু নিতে পারে না” ( ঐ, পৃ. ১৩)।
বিদায় হজ্জ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে রসুলে করীম সা: প্রাণের মর্যাদার সাথে সাথে ধন সম্পদের মর্যাদা সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন তা ইতিপূর্বে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মালিকানা স্বত্ব রক্ষার অধিকারের গুরুত্ব নিম্নের হাদীস থেকে অনুমান করা যেতে পারে।
“যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ” (বুখারী)।

৩. মান-ইজ্জতের নিরাপত্তা

প্রত্যেক নাগরিকের ইজ্জত আবরুর হেফাজতের গ্যারন্টি দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিদায় হজ্জের ভাষণে রসুলে করীম সা: জান মালের নিরাপত্তার সাথে সাথে ইজ্জত আবরুর মর্যাদা রক্ষারও নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“হে ঈমানদারগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় উপহাসকারিণী অপেক্ষা সে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ কর না এবং তোমরা একে অপরের মন্দ নামে ডেক না” ( সূরা হুজুরাত: ১১)।
(আরবী***)
“তোমরা একে অপরের অনুপস্থিতিতে নিন্দা কর না” ( সূরা হুজুরাত:১২)।
এই আয়াতে বলা হয়েছে:
“তোমরা বহুবিধ অনুমান থেকে দূরে থাক, কারণ অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ” ( সূরা হুজুরাত:১২)।
পারষ্পরিক বাক্য বিনিময়ে অশ্লীলভাষী হতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
(আরবী***)
“অশ্লীলভাষী হওয়া আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে যার উপর যুলুম করা হয়েছে” (সূরা নিসা:১৪৮)।
এই আয়াতে একদিকে যেমন অসদাচরণের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, অন্যদিকে জালিমের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠে প্রতিবাদী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “হে রসূল!) মুমিনদের বল, তারা যেন নিজেদের চক্ষু সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে” (সূরা নূর: ৩০)।
(আরবী***)
অর্থ: “ এবং (হে নবী) মুমিন মহিলাদের বল, তারা যেন নিজেদের চক্ষু সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে ( সতীত্ব রক্ষা করে)” (সূরা নূর: ৩১)।
লক্ষ্য করুন, উল্লিখিত আয়াতসমূহে সরাসরি মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে কিছু বলা হয়নি, বরং রসূলে করীম সা: এর মাধ্যমে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর তাৎপর্য হচ্ছে যেখানে মুসলমানরা ব্যক্তিগতভাবে এগুলোর উপর আমল করবে সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রও এসবের পৃষ্ঠপোষকতা করবে। আর যেখানে এর বিরুদ্ধাচরণ হতে থাকবে সেখানে এর প্রভাব প্রতিহত করবে। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, নাগরিকদের মান মর্যাদা রক্ষার পরিপূর্ণ সতর্ক ব্যবস্থা অবলম্বন করা এবং অশ্লীলতার বিস্তার রোধ করাও ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মহানবী সা: তাঁর অসংখ্য হাদীসে মানুষকে অহেতুক মারপিট করতে এবং অবমাননা ও অপমান করতে নিষেধ করেছেন। একবার তিনি বলেন: “মুসলমানদের পৃষ্ঠদেশ সম্মানিত ( তাকে মারধর করা যাবে না)। তবে সে যদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে থাকে ( তবে শাস্তি দেওয়া যাবে)। বিনা কারণে কোন মুসলমানকে মারলে আল্লাহ তার ( মারধরকারীর) উপর ভয়ানক অসন্তুষ্ট হন” ( তাবারানী)।
“কোন ব্যক্তি কোন মুসলমানকে অপমানিত, লাঞ্ছিত অথবা সম্মানহানি হতে দেখেও যদি তার সাহায্য না করে তাহলে আল্লাহ যেন এমন জায়গায় তার সাহায্য ত্যাগ করবেন যেখানে সে নিজে আল্লাহর সাহায্যপ্রার্থী হবে। আর যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইকে অপমানিত অথবা বেইজ্জতী হতে দেখে এবং লাঞ্ছিত ও হেয় হতে দেখে তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে আল্লাহ তাকে এমন স্থানে সাহায্য করবেন যেখানে সে আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী হবে” ( আবু দাউদ)।
অপর হাদীসে রসুলে করীম সা: বলেন: “যে ব্যক্তি অন্য কোন লোকের মানহানি করে অথবা অন্য কোন প্রকার জুলুম করে তবে সেদিন আসার পূর্বেই তার ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত-যেদিন তার না থাকবে ধন সম্পদ, আর না অন্য কিছু। অবশ্য তার নেক আমল সমূহ তার থেকে কেড়ে নেওয়া হবে সেই জুলুমের পরিমাণ অনুসারে। আল্লাহ না করুন যদি তার কোন নেক আমল না থাকে তখন মজলুম ব্যক্তির মন্দ কাজগুলো তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হবে” (বুখারী)।
কারো মানহানিকে রসূলে করীম সা: সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট অত্যাচার বলে অভিহিত করেছেন। “কোন মুসলমানের উপর অন্যায়ভাবে হামলা করা জঘন্যতম অত্যাচার” ( আবু দাউদ)।
হযরত উমার ফারুক রা: শাসকগণকে বিদায়ের প্রাক্কালে নিম্নোক্ত উপদেশ দিতেন: “আমি তোমাদেরকে জালিম ও অত্যাচারী হিসাবে নয়, বরং ইমাম ও সত্য পথের দিশারী হিসাবে নিয়োগদান করে পাঠাচ্ছি। সাবধান! মুসলমানদের মারপিট করে তাদের অপমানিত করবে না” ( আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, উর্দু অনু: পৃ. ৩৬৭)।
মান মর্যাদার ব্যাপারে ইসলামী নীতিমালা হচ্ছে এই : সমাজের প্রত্যেক সদস্য সম্মানিত তার পদ, স্থান ও বিত্তবৈভব যাই হোক না কেন। অর্থাৎ ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে কারও মানহানির অভিযোগ উত্থাপন করতে হলে এ কথা বলার কোন প্রয়োজন যে, এই ব্যক্তি সম্মানিত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির অপমানকারীর অপমানসূচক কার্য দ্বারা সত্যিকারভাবেই তার মানহানি হয়েছে। এই সাম্যনীতির আলোকে হযরত উমার ফারুক রা: তাঁর খিলাফতের সময় মিসরের গভর্ণর হযরত আমর ইবনুল আস রা:-র পুত্র মুহাম্মাদ ইবনে আমর একজন মিসরীর সাথে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঘটনাক্রমে মিসরীয় ঘোড়া তার ঘোড়ার চাইতে অগ্রগামী হওয়ায় সে তাকে মারপিট করে এবং সাথে সাথে এও বলে, “এই চাবুকের আঘাত সহ্য কর। ব্যাটা! বুঝতে পারছিস, আমি শরীফ ঘরের সন্তান।” হযরত উমার রা: পিতাপুত্র উভয়কে মদীনায় তলব করেন এবং মিসরীর হাতে চাবুক দিয়ে বলেন, আমর ইবনুল আসের মাথার খুলির উপরও দোররা লাগাও। কেননা আল্লাহর শপথ! সে তার পিতার রাজত্বের অহমিকায় তোমাকে মেরেছিল” ( উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১৮৭)।
হযরত উমার রা:-র আমলে মান-সম্মানের হেফাজতের সাথে সংশ্লিষ্ট হত্যার দুটো ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু তিনি উভয় ঘটনার ক্ষেত্রেই কিসাস রহিত করেন এবং হত্যাকারীকে কোন শাস্তি দেননি। এক ঘটনায় বনী হুযায়লের কোন এক ব্যক্তি তার মেহমানের কন্যার উপর হস্তক্ষেপ করলে সে তার উপর পাথর নিক্ষেপ করে। ফলে তার কলিজা ফেটে যায়। তিনি (উমার) রায় দিলেন যে, এটা আল্লাহর খুন। এর কোন দিয়াত (ক্ষতিপূরণ) হতে পারে না ( ঐ, পৃ. ২৪২)।
অপর ঘটনাটি এই যে, দুই যুবক পরষ্পর ভাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একজন জিহাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল এবং অপরজন সে তার পরিবার-পরিজনের তদারকির জন্য নিযুক্ত করল। এক রাতে সে তার ভাই-এর স্ত্রীর সাথে এক ইহুদিকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পেল এবং মন্দ কাজ প্রতিহত করার জোশে তাকে হত্যা করে তার বিবস্ত্র লাশ রাস্তার উপর রেখে দিল। পরদিন অতি প্রত্যুষে ইহুদীরা হযরত উমারের এজলাশে অভিযোগ দায়ের করল। তিনি সেই যুবকের জবানবন্দী শুনে বললেন, আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন। তিনি ইহূদীর রক্ত মূল্যহীন বলে রায় দিলেন ( ঐ, পৃ. ২৩৭)।
বসরার গভর্ণর হযরত মুগীরা ইবনে শোবা রা:-র উপর ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ আরোপের অভিযোগে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে হযরত উমার রা: শাস্তির রায় দান করেন এবং তদনুযায়ী তাদের বেত্রাঘাত করা হয় (ঐ, পৃ. ২৩৬)।
হযরত আবু মূসা আশআরী রা: গনীমতের মাল বেশী দাবী করার অপরাধে এক ব্যক্তিকে বিশটি চাবুক মারিয়েছিলেন এবং তার মাথা ন্যাড়া করিয়েছিলেন। সে ব্যক্তি সরাসরি মদীনায় চলে আসে। হযরত উমার রা:-র দরবারে তার মানহানির অভিযোগ উত্থাপন করলে তিনি লিখিত নির্দেশ পাঠালেন:“আপনি যদি এই কাজ জনগণের সম্মুখেই করে থাকেন তাহলে আপনাকে শপথ করে বলছি যে, অনুরূপভাবে জনতার সম্মুখে বসে তার প্রতিদান করুন।” লোকেরা ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য তাকে অনেক বুঝালো কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করল না। পরিশেষে আবু মূসা ( রা:) সর্বসাধারণের সামনে প্রতিদান দেওয়ার জন্য বসে যান। তখন সে আকাশপানে মুখ তুলে বলল, হে আল্লাহ! আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম-(ঐ, পৃ. ১৮৫)।
মান -সম্মান সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের অনুভূতি কি তা সূরা নূর এর সেই কয়টি আয়াত থেকে সঠিকভাবে অনুমান করা যায়, যাতে মুমিন জননী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা:-র উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপের নিন্দাবাদ করে আল্লাহ তাঁর সতীত্বের সাক্ষ্য দান করেছেন। উপরন্তু তিনি মুসলমানদের মিথ্যা অপবাদ রটানো ও আপত্তিকর অভিযোগ থেকে বেঁচে থাকার জোর তাকীদ দিয়েছেন। এই আয়াতগুলোর তরজমা পেশ করা হচ্ছে:
“যারা এই অপবাদ রটনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল। একে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না, বরং এতো তোমাদের জন্য কল্যাণকর। ওদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে ওদের কৃতকর্মের পরিণতি। ওদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। এ কথা শোনার পরে মুমিন পুরুষ ও নারীরা কেন নিজেদের বিষয়ে সৎ ধারণা পোষণ করেনি এবং বলেনি, এতো সুষ্পষ্ট অপবাদ। তারা এ ব্যাপারে কেন চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি সে কারণে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমরা যাতে লিপ্ত ছিলে তার ফলে কঠিন শাস্তি তোমাদের স্পর্শ করত।
যখন তোমরা মুখে মুখে এই কথা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন বিষয় মুখে ‍উচ্চারণ করছিলে যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং তোমরা একে তুচ্ছ গণ্য করেছিলে, যদিও আল্লাহর নিকটে তা ছিল গুরুতর বিষয় এবং তোমরা যখন তা শুনছিলে তখন কেন বললে না, এ বিষয়ের চর্চা করা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র, মহান! এতো একটি গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি সত্যিই মুমিন হয়ে থাক তাহলে কখনো অনুরূপ আচরণ কর না। মহান আল্লাহ তাঁর আয়াত সমূহ সুষ্পষ্টভাবে তোমাদের জন্য বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসারের সংকল্প করে তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্মন্তদ শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন যা তোমরা জান না” (সূরা নূর:১১-১৯)।
কুরআনুল করীমে এমনিতেই প্রত্যেক ব্যক্তির মান মর্যাদা সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে কিন্তু সম্ভ্রান্ত মহিলাদের সম্মান ও সতীত্ব রক্ষাকল্পে আরও অসাধারণ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়েছে। সূরা নূরে ইরশাদ হচ্ছে:
“যারা সতী সাধ্বী, সরলমনা ও ঈমানদার মহিলার প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের মুখ, তাদের হাত ও তাদের চরণযুগল তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে- সেদিন আল্লাহ তাদের প্রাপ্য প্রতিফল পুরাপুরি দেবেন এবং তারা জানতে পারবে আল্লাই সত্য, ষ্পষ্ট প্রকাশক” (সূরা নূর: ২৩-২৫)।
এতো অনিবার্য সত্য যে, মুসলমানদের ইতিহাসে অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, বলপ্রয়োগ ও কঠোরতা প্রদর্শণের বহু সংখ্যক উপাখ্যান ও কাহিনী গ্রন্থের কোনটিতে এনন কোন ঘটনা পরিদৃষ্ট হয় না যে, কোন শাসক তার প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করার জন্য তাদের কন্যা-জায়া-মা-বোনদের ইজ্জত-আবরু লুন্ঠন করেছে।

৪. ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তা

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের পারিবারিক জীবনের পরিপূর্ণ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে, আর ঘরের চার দেওয়ালকে একটা সুরক্ষিত দূর্গের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারোর নেই।
এই পর্যায়ে কুরআনুল করীমের নির্দেশ:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের বাড়ী ব্যতীত অন্যের বাড়ীতে বাড়ির মালিকের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদের সালাম ‍না দিয়ে প্রবেশ কর না। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর ব্যবস্থা, হয়ত তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে। যদি তোমরা বাড়িতে কাউকে না পাও তাহলে তাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ তোমাদের অনুমতি না দেওয়া হয়। যদি তোমাদের বলা হয়, ফিরে যাও, তবে তোমরা ফিরে যাবে। এটাই তোমাদের উত্তম এবং তোমাদের সৎকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত” (সূরা নূর: ২৭-২৮)।
খোদ নবী করীম সা: বাড়ীতে প্রবেশের সময় আওয়াজ দিয়ে কিংবা দরজা খটখটিয়ে প্রবেশ করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন, যাতে মা, বোন এবং কন্যাদের প্রতি এমন অবস্থায় দৃষ্টি না যা মানুষকে নৈতিকতা বিরোধীদের কাতারে নামিয়ে ফেলতে পারে। যে বাড়িতে লোক বসতি নেই সেই স্থান এই কঠোর নির্দেশের আওতাবহির্ভূত। ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
যে বাড়িতে কেউ বসবাস করেনা তাতে তোমাদের প্রবেশে কোন পাপ নেই এবং যেখানে তোমাদের উপকার রয়েছে” (সূরা নূর:২৯)।
অফিস আদালত, সরকারী আশ্রয় কেন্দ্র, হোটেল, সরাইখানা, অতিথিশালা, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ইত্যাদি এই সব স্থানের আওতায় পড়ে। মুসলমানদেরকে অনুমতি ব্যতিরেকে অন্যের ঘরে প্রবেশ না করার নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে একথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন অন্যের অন্দরমহলে ঘন ঘন প্রবেশ না করে। ঘরে আসার অনুমতির তাৎপর্য এই নয় যে, ব্যস ধর্ণা দিয়ে সেখানে বসেই থাকবে এবং গৃহস্বামীকে তার ঘরে ইচ্ছামাফিক ও পরিকল্পনা অনুযায়ী সময় কাটানোর সুযোগ দেবে না। ইরশাদ হচ্ছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَن يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَىٰ طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِينَ إِنَاهُ وَلَٰكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের অনুমতি না দেওয়া হলে তোমরা খাদ্যদ্রব্য তৈরীর জন্য অপেক্ষা না করে খাওয়ার জন্য নবীর ঘরে প্রবেশ করবে না। তবে তোমাদের ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ কর এবং খাওয়া- দাওয়া শেষ করে চলে যাবে। তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড় না” ( সূরা আহযাব:৫৩)।
অন্যের বাড়িতে প্রবেশ করে শুধুমাত্র প্রয়োজনমাফিক সময় কাটানো প্রসংগে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে যদি ঘরের দরজায় দাড়িয়ে থেকে তা চেয়ে নিতে হবে।
(আরবী***)
অর্থ: “সহধর্মীনীদের নিকট থেকে কোন বস্তু গ্রহণ করলে পদার আড়াল থেকে চেয়ে নাও” ( সূরা আহযাব:৫৩)।
অনুরুপভাবে ঘরের অভ্যন্তরে উঁকি মেরে তাকানো নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী সা: বলেন: কেউ কারো ঘরের অভ্যন্তর ভাগে উঁকি মেরে তাকালে তার চক্ষু ক্ষতবিক্ষত করে দাও। এর কোন বিচার নেই। তিনি অন্যের চিঠিপত্র পড়া কিংবা পড়ার সময় সেদিকে গভীর মনোযোগ সহকারে তাকাতে নিষেধ করেছেন।
কুরআনুল করীম একজন নাগরিকের বাড়ি বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপদ করার সাথে সাথে মুসলমানদের এভাবেও তাকীদ করেছে যে, একজন মুসলিম অপর মুসলিমের গোপনীয়তা ফাঁস করবে না, ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য উদঘাটন করবে না এবং অন্যের ছিদ্রান্বেষণে ব্যাপৃত থাকবে না।
(আরবী***)
অর্থ: “এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কর না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা কর না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা একে ঘৃণাই করবে” (সূরা হুজুররাত: ১২)।
মানুষ গোপন বিষয়ের অন্বেষণ দ্বারা অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে থাকে। অত:পর তার দোষত্রুটি ও দূর্বলতা তার জ্ঞানে ধরা পড়লে সে তা অন্যের কাছে বলাবলি করে আনন্দ উপভোগ করে। এভাবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বদনাম ও অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কুরআনুল করীম ছিদ্রান্বেষণ ও পরনিন্দা (গীবত)-কে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
রসুলে করীম সা: একবার বলেছিলেন: “তোমরা যদি মানুষের গোপনীয় বিষয়াদি উদঘাটনে লেগে যাও তবে তোমরা ‍তাকে বিগড়ে দেবে কিংবা অন্তত বিগড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছে দেবে” (আবু দাউদ)।
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন: “যে ব্যক্তি অন্যের দোষত্রুটি দেখে তা গোপন রাখলো সে যেন একজন জীবন্ত সমাহিত ব্যক্তিকে রক্ষা করল” ( আবু দাউদ, নাসাঈ)।
মহানবী সা: শাসকবর্গকে বিশেষভাবে গুপ্তচরবৃত্তি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন: “শাসনকর্তা যখন নাগরিকদের সন্দেহের কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করে তখন সে তাদের বিরূপমনা দেখতে পাবে” ( আবু দাউদ)।
ইসলামী রাষ্ট্রে শাসকের (আমীর) হস্তক্ষেপ করার সীমারেখা কি এবং এই হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপত্তা লাভের ক্ষেত্রে একজন নাগরিকের অধিকার কতটা প্রশস্ত তা হযরত উমার ফারুক রা:-র একটি ঘটনা থেকে অনুমান করা যায়।
একদা রাত্রিবেলা হযরত উমার রা: নাগরিকদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য বের হলেন। তিনি আচানক এক ব্যক্তির ঘরে গানের শব্দ শুনতে পান। তাঁর সন্দেহ হলে তিনি দেওয়ালের উপর আরোহণ করে দেখলেন যে, ওখানে সুরা মজুদ আছে, তার সাথে আছে এক নারী। তিনি সজোরে বললেন, হে আল্লাহর দুশমন! তুই কি মনে করেছিস যে, তুই নাফরমানী করতে থাকবি; আর আল্লাহ তা ফাঁস করে দেবেন না? লোকটি উত্তর দিল, হে আমীরুল মুমিনীন! ব্যস্ত হবেন না, আমি যদি একটি অপরাধ করে থাকি তবে আপনি করেছেন তিনটি অপরাধ! আল্লাহ গোপনীয় বিষয়াদি অন্বেষণ করতে নিষেধ করেছেন। আর ‍আপনি সেই কাজটি করে ফেলেছেন। আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন সদর দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে, আর আপনি প্রবেশ করেছেন দেওয়াল টপকে। আল্লাহ আদেশ করেছেন, নিজের বাড়ি ব্যতীত অন্যের বাড়িতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করতে, আর আপনি অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করেছেন।” এ কথা শুনে হযরত উমার রা: তাঁর ভুল স্বীকার করলেন এবং গৃহকর্তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। অবশ্য তার নিকট থেকে সৎপথ অবলম্বনের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন (মাকারিমুল আখলাক এর বরাতে তাফহীমুল কুরআন, পঞ্চম খন্ড, পৃ. ৮৯)।
হযরত উমার ফারুক রা:-র খিলাফতকালের আরেকটি ঘটনা। এক যুবতী শরীআতের শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আত্মহত্যার চেষ্ঠা করেছিল। কিন্তু সেবার তার জীবন রক্ষা পেল। পরে সে কৃত অপরাধের জন্য খাঁটিভাবে তওবা করল। অনন্তর এক ব্যক্তি তাকে বিবাহ করার জন্য পয়গাম পাঠালো। সে তার অপকর্ম সম্পর্কে জানত না। অভিভাবক হযরত উমার রা: -র কাছে আরজ করলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি কি সেই ঘটনাটি বলে দেব? তিনি বললেন, “মহান আল্লাহ যে বিষয়টি গোপন রেখেছেন তুমি কি তা ফাঁস করে দিতে চাচ্ছ? আল্লাহর শপথ! তুমি কারো কাছে এ কথা ফাঁস করে দিলে আমি তোমাকে সমুচিত শিক্ষা দেব। একজন সতী সাধ্বী নারীর ন্যায় তার শাদীর ব্যবস্থা কর” (ঐ, পৃ.২৪৬)।
এ হচ্ছে ইসলামে পারিবারিক জীবনের নিরাপত্তা ও পবিত্রতা। যে ব্যক্তি ইসলামের এই বিধান এবং এর পথ নির্দেশ অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনায় বাধ্য সে কি করে গোয়েন্দা তৎপরতার জাল বিস্তার করতে পারে? পারে কি প্রত্যেক নাগরিকের পেছনে গুপ্তচর নিয়োগ করতে? মানুষের ঘরে ও অফিস আদালতে গোপনীয় বিষয়াদি সংগ্রহের যন্ত্রপাতি স্থাপন করে রাথতে পারে কিভাবে? অথবা এগুলোর ফটোকপি করতে কিংবা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের চিত্র সংগ্রহ করতে বা গোপন আড্ডাখানার ছবি তুলতে? সর্বোপরি একজন পারে কি তার প্রতিপক্ষকে ব্লাকমেইল করার জন্য অন্যান্য বৈজ্ঞানিক উপকরণাদির ব্যবহারকে ‍হালাল মনে করতে?

৫.ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সংরক্ষণ

ইসলামী রাষ্ট্রে কোন নাগরিকের অপরাধ প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আটক করা যায় না। শুধু মাত্র সন্দেহ ও অনুমান বশত: লোকদের গ্রেফতার করা কিংবা আদালতের বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা ব্যতিরেকে কাউকে কারারুদ্ধ করা ইসলামে আইনসিদ্ধ নয়। বর্তমানে নজরবন্দী শিরোনামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যা কিছু হচ্ছে ইসলামী আইনে কস্মিনকালেও তার কোন অবকাশ নেই। কুরআনুল করীমের সুষ্পষ্ট নির্দেশ, আল্রাহ তাঁর বান্দাকে যে স্বাধীনতা দিয়েছেন; কোন সাধারণ শাসক তো দূরের কথা খোদ আল্লাহর রসুলও তা খর্ব করতে পারেন না। ইরশাদ হচ্ছে:
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُؤْتِيَهُ اللَّهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِّي مِن دُونِ اللَّهِ وَلَٰكِن كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنتُمْ تَدْرُسُونَ [٣:٧٩]
অর্থ: “আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে কিতাব, হিকমত, (বিচক্ষণতা) ও নবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে: “আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা আমার বান্দা হয়ে যায়”। এরূপ বলা তার পক্ষে শোভনীয় নয়। বরং সে বলবে, “তোমরা রাব্বানী (খোদার গোলাম) হয়ে যাও”-যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষাদান কর এবং যেহেতু তোমরা অধ্যয়ন কর” (সূরা আল ইমরান:৭৯)।
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا
অর্থ: আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মীমাংসাকারী তালাশ করব? অখচ তিনি বিস্তারিত বর্ণনা সহ তোমাদের নিকট কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, (সূরা আনআম:১১৪)।
(আরবী***)
অর্থ: তাদের কি এমন কতক দেবতা আছে যারা তাদের জন্য বিধান দিয়েছে এমন দীনের যার অনুমতি আল্লাহ দেননি” (সূরা শূরা: ২১)।
এতদসম্পর্কিত বিষয়ে ইসলামের চিন্তাধারা এই যে, যতদূর সম্ভব শাস্তি পরিহার করতে হবে এবং কারণ সমূহ ও সাক্ষ্য প্রমাণ শাস্তির জন্য নয়, বরং মুক্তির জন্য অনুসন্ধান করতে হবে।
রসূলে করীম সা: এর ভাষ্য হচ্ছে: “যতদূর সম্ভব মুসলমান (নাগরিক)-কে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দাও, সুযোগ থাকলে তাকে ছেড়ে দাও। অপরাধীকে ভুলবশত ক্ষমা করে দেওয়া ভুলবশত শাস্তি দেওয়ার চেয়ে উত্তম” ( তিরমিযী, আবওয়াবুল হুদুদ, নং ২)
“বাঁচানোর কোন পথ পাওয়া গেলে মানুষকে শাস্তি থেকে মুক্তি ‍দাও” ( ইবনে মাজা)।
হযরত মায়েয ইবনে মালিকের ঘটনায় মহানবী সা: এর চিন্তাধারার উজ্জ্বল নিদর্শন আমরা দেখতে পাই। একবার সে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার পর খোদ মহানবী সা: এর খিদমতে হাজির হল। সে আরয করল, “হে আল্লাহর রসূল! আমি যেনা করেছি, আমাকে পবিত্র করুন ( যথাযোগ্য শাস্তি দিন)। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- কিভাবে রসূল সা: তাকে শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়ার পথ অনুসন্ধান করেছিলেন। প্রথমে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেন, “যাও এখান থেকে, তওবা-ইসতিগফার কর”। সে সামনে ঘুরে এসে পুনরায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করল। এবারও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বারে সে ঐ একই কথা পুনরুক্তি করল। এবারেও মহানবী সা: মুখ ফিরিয়ে নিলেন। হযরত আবু বাকর রা: তাকে ধমক দিয়ে বললেন, দেখ চতুর্থবার স্বীকার করলে মহানবী সা: তোমাকে প্রস্তরাঘাতে শাস্তি দিবেন। কিন্তু সে তার কথায় কর্ণপাত না করে ঐ কথার পুনরাবৃত্তি করল। এবারে মহানবী সা: তার প্রতি লক্ষ্য করে বলেন, “সম্ভবত তুমি চুম্বন করেছিলে অথবা আলিঙ্গন করেছিলে অথবা তোমার উপর কূদৃষ্টি নিক্ষো করা হয়েছিল।” সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি কি তার সাথে যৌন সম্ভোগ করেছ? সে বলল, জি হাঁ। অত:পর তিনি পুনরায় তিনি জানতে চাইলেন, তুমি কি তার সাথে সহবাস করেছে? সে বলল, হাঁ। এভাবে অতিরিক্ত তিনটি প্রশ্ন করলে সে প্রত্যেকবারেই হাঁ সূচক জবাব দেয়। পরিশেষে তিনি প্রশ্ন করলেন, তুমি কি জান যেনা কাকে বলে? সে বলল, হাঁ। আমি তার সাথে হারাম উপায়ে সে কর্মটি করেছি যা একজন স্বামী হালাল উপায়ে তার স্ত্রীর সাথে করে থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহ করেছ? সে বলল, হাঁ। তিনি বললেন, তুমি সুরা পান করনি তো? সে বলল, না। এক ব্যক্তি উঠে তার মুখের ঘ্রাণ নিল এবং মদ্যপান না করার সত্যতা প্রমাণ করল। অত:পর তিনি তার গ্রামবাসীদের থেকে জবানবন্দী নিলেন, এ লোকটি পাগল নয়তো? তারা বলল, আমরা তার মন মগজে কোন বৈকল্য লক্ষ্য করিনি। মহানবী সা: হাযযাল ইবনে নুআইম রা: কে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি তো মায়েয ইবনে মালিকের লালন পালন করেছিলে এবং আমার এখানে মাগফিরাতের দুআর পরামর্শ দিতে। হায় যদি তার গোপনীয়তাকে ঢেকে দিতে পারতে তাহলে তোমার জন্য অতিশয় মঙ্গল হত।”
অত:পর মহানবী সা: মায়েযের মৃত্যুদন্ডের চূড়ান্ত রায় দিলেন। তাকে শহরের বাইরে নিয়ে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হল। প্রস্তর নিক্ষেপণ শুরু হলে মায়েয পলায়ন করতে উদ্যত হয় এবং বলে, লোকজন! তোমরা আমাকে রসূলে করীম সা: এর নিকট নিয়ে চল। আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে প্রতারিত করেছে। তারা আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল এই বলে যে, রসূলে করীম সা: আমাকে হত্যার আদেশ দিবেন না। কিন্তু প্রস্তর নিক্ষেপকারীরা তাকে হত্যা করেই ফেললো। ব্যাপারটি মহানবী সা: কে অবহিত করা হলে তিনি বলেছিলেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে না কেন? আমার নিকট নিয়ে আসলে হয়ত সে তওবা করত এবং আল্রাহ তার তওবা কবুল করতেন ( তাফহীমুল কুরআন, তৃতীয় খন্ড, পৃ. ৩৩৫)।
এই ঘটনায় প্রতিটি প্রশ্ন থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, মহানবী সা: মায়েযকে মৃত্যুদন্ড থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সকল প্রকার কোশেশ করেছেন। তার জবানবন্দী ও তার গ্রামবাসীদের সাক্ষ্যদানের বেলায় তিনি এমন কোন কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন যার দরুন তার জীবন বাঁচানো যেতে পারে। তিনি সুরাপানের নেশা অথবা মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণও অনুসন্ধান করেছিলেন। কিন্তু মুক্তির কোন উপায় না পেয়ে চূড়ান্ত রায় দেন। অত:পর তা কার্যকর হওয়াতে তিনি ব্যথিত হন। এই ঘটনা থেকে একথাও সুষ্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বিচার মীমাংসা করার সময়, বিশেষ করে কাউকে শাস্তি দেওয়ার প্রাক্কালে বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য কত বেশী পরিমাণে গভীর অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন।
নবী করীম সা: এর যুগ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়কার বহু ঘটনা এই সত্যের নিদর্শন হিসাবে ভাস্বর হয়ে আছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রে কোন নাগরিককে যথারীতি মামলা পরিচালনা এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া ব্যতিরেকে বন্দী রাখা যায় না।
“একবার তিনি মসজিদে নববীতে ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষণ চলাকালে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, “হে আল্লাহর রসূল! আমার এক প্রতিবেশীকে কোন অপরাধে বন্দী করা হয়েছে? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল। তিনি ভাষণ দিতেই থাকেন। এবারেও তিনি লোকটির প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। তৃতীয় লোকটি দাঁড়িয়ে তার প্রশ্নটি পুনর্ব্যক্ত করল। তিনি নির্দেশ দিলেন, তার প্রতিবেশীকে ছেড়ে দাও” ( আবু দাউদ, কিতাবুল কুদাত)।
রসূলে করীম সা: এর দুইবার নীরব থাকার কারণ ছিল এই যে, শহরের প্রধান পুলিশ অফিসার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গ্রেপ্তারকৃত লোকটির কোন অপরাধ থাকলে তিনি দাঁড়িয়ে তা বর্ণনা করতেন। কিন্তু তার নীরবতার দরুন মহানবী সা: বুঝতে পারলেন যে, লোকটাকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাই তিনি তাকে মুক্তির নির্দেশ দিলেন।
হযরত উমার রা:-র জামানায় ইরাক থেকে এক ব্যক্তি তার খিদমতে হাযির হয়ে আরজ করল, “হে আমীরুল মুমিনীন! আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে আপনার দরবারে ‍হাযির হয়েছি যার না আছে আগা, না আছে গোড়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তা আবার কি? সে বলল, আমাদের দেশে মিথ্যা সাক্ষ্যদানের বেসাতি চলছে। হযরত উমার রা: অবাক বিস্ময়ে বললেন, “কি বল, এই জিনিস আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।” সে বলল, হাঁ। তিনি বললেন, তুমি নিশ্চিত থাক, আল্লাহর শপথ! ইসলামী রাষ্ট্রে কাউকে বিনা বিচারে আটক করা যায় না” (মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, সাক্ষীর শর্ত অধ্যায়)।
হযরত উমার রা:-র সময়কার সেই ঘটনাটি তো ইতিপূর্বেই আলোচিত হয়েছে যাতে তিনি মিসরের গভর্ণর আমর ইবনুল আস রা: এবং তাঁর পুত্র মুহাম্মাদকে মদীনায় তলব করে জনতার সামনেই মোকদ্দমার বিবরণ শ্রবণ করেন। তিনি নির্যাতিত মিসরীর হাতে মুহাম্মাদ ইবনে আমরকে চাবুক ‍লাগিয়েছেন এবং হযরত আমর ইবনুল আস রা: কেও অপমান করার অনুমতি দিয়েছিলেন। কেননা তিনি গভর্ণর হওয়াতে তাঁর ছেলে একজন নাগরিককে প্রহার করার দু:সাহস পেয়েছিল। কিন্তু ফরিয়াদী আরজ করল, “হে আমীরুল মুমিনীন! আমি আমার প্রতিশোধ প্রত্যাহার করলাম। আমার অন্তর শীতল হয়েছে। আমাকে যে প্রহার করেছিল তাকে আমি প্রহার করেছি।”
সে সময় হযরত উমার রা: হযরত আমর ইবনুল আস রা: কে সম্বোধন করে
এই ঐতিহাসিক বাক্যটি বলেন, “হে আমর! তোমরা কবে থেকে মানুষকে দাস বানিয়ে নিলে? তাদের জননীরা তো তাদেরকে স্বাধীন প্রসব করেছে” (তানতাবী, উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১৮৭)।
উপরোক্ত উদাহরণ থেকে দিবালোকের মত ষ্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ইসলামে উপযুক্ত বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে কোন সরকার কোন নাগরিককে শাস্তি দিতে পারে না, আর পারে না তাকে বন্দী করে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করতে। কুরআনুল করীমের পরিষ্কার নির্দেশ:
(আরবী***)
অর্থ: “তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়নতার সাথে তা করবে” (সূরা নিসা: ৫৮)।
মুসলমানের জন্য এই সাধারণ নির্দেশের সাথে সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম কর্ণধার (রাষ্ট্রপতি) নবী করীম সা: কে বিশেষভাবে ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “তোমাদের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি” ( সূরা শূরা: ১৫)।
প্রথমোক্ত আয়াতের শব্দাবলী ষ্পষ্টই ঘোষণা দিচ্ছে যে, মনগড়া কোন সিদ্ধান্তের নাম ইনসাফ নয়। এর নিজস্ব একটা মাপকাঠি, একটি সুপরিচিত দৃষ্টিভঙ্গী এবং একটি সুনির্দিষ্ট আইন বিধান রয়েছে। তাই বিচারের রায় অবশ্যই “আইনের সুপ্রসিদ্ধ কার্যক্রমের যাবতীয় শর্তের উপর পরিপূর্ণভাবে উৎরে যেতে হবে। এই ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্রের আদালতের বিধিবিধান স্বয়ং মহানবী সা: এর একটি বিচারকার্য থেকে প্রতিভাত হচ্ছে।
মক্কা বিজয়ের পূর্বেকার ঘটনা। মহানবী সা: মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই অভিযানে বিজয়লাভের জন্য তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল-ঠিক সময়ের পূর্বে কাফেররা যেন এই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে না পারে। এই পর্বে হাতিব ইবনে আবু বালতাআ নামে একজন সাহাবী তার পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য এক বৃদ্ধা মহিলার হাতে কুরায়শ নেতৃবৃন্দের কাছে গোপনে একটি চিঠি পাঠান। এতে রসূল করীম সা: এর যুদ্ধ প্রস্তুতির কথা উল্লেখ ছিল। মহানবী সা: বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়ে তৎক্ষণাৎ হযরত আলী রা: ও হযরত যুবায়ের রা: কে সেই বৃদ্ধার পশ্চাদ্ধাবন করতে পাঠান। তাঁরা পত্রটি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। তা খুলে পাঠ করা হল। এতে কুরায়শদের জন্য এই গোপন তথ্য পরিবেশন করা হয়েছিল যে, রসূলে করীম সা: তাদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। হাতিবকে তলব করে প্রকাশ্য আদালতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির করা হল। সে অত্যন্ত লজ্জানম্রভাবে বিনীত কন্ঠে আরজ করল, ইয়া রসুলুল্লাহ! আমি কাফের ও মুরতাদ কোনটাই হইনি। বিশ্বাসঘাতকতার উদ্দেশ্যে আমি এ কাজ করিনি। আমার সন্তানেরা মক্কায় রয়েছে। সেখানে আমার সহায়তাকারী কোন গোত্র নেই। পত্রটি আমি কেবলমাত্র এ জন্যেই লিখেছি যে, কুরায়শরা আমার অনুগ্রহ স্বীকার করে অন্তত: আমার পরিবারবর্গের প্রতি অন্যায় আচরণ করবে না।
স্পষ্টত: এটা ছিল প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপার। এই পত্র কুরায়শদের হস্তগত হলে মুসলমানদের এই যুদ্ধের গোটা পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যেত। সময়ের প্রেক্ষাপটে অপরাধের গুরুত্ব অনুধাবন করে ফারুকে আযম হযরত উমার রা: ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রসূল! আমাকে অনুমতি দিন, এই বিশ্বাসঘাতকের গর্দান উড়িয়ে দেই।” কিন্তু রহমাতুললিল আলামীন দয়া ও করুণার মূর্ত প্রতীক মহানবী সা: বড়ই কোমল কন্ঠে বললেন, “উমার! হাতিব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং সে তার কৃতকর্মের যে কারণ বর্ণনা করেছে তা ঘটনার সাথে সম্পূর্ণ সত্য।” হযরত উমার রা: এই জবাব শুনে তপ্ত হৃদয়ে কেঁদে ফেলেন এবং এই বলে বসে পড়লেন, আল্লাহ এবং তাঁর রসুলই সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞাত।”
হাতিবের এই মুক্তি একদিকে মানব প্রাণের মর্যাদা, অপরদিকে মারাত্মক অপরাধের প্রকাশ্য আদালতে শুনানী ও অপরাধীর সাফাই-এর সুযোগদানের নজীরবিহীন উদাহরণ। পৃথিবীর কোন সরকার না এই ধরণের অপরাধীকে কখনো প্রকাশ্য আদালতে হাজির করত আর না কোন আদালত এরূপ মারাত্মক অপরাধ ও ‍অপরাধীকে তার নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর পর মৃত্যুদন্ডের চাইতে কম শাস্তি দিত। কিন্তু মহানবী সা: হাতিবের অতীতে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং তার বর্ণনার সত্যতা বিবেচনা করে মৃত্যুদন্ড তো দূরের কথা কোন সাধারণ শাস্তিও দেননি। তার পদস্খলনের কারণে সাধারণ মুসলমানের দৃষ্টিতে তার যে অপমান হল তাকেই তিনি যথেষ্ট শাস্তি মনে করলেন। কুরআনুল করীমের সূরা আল মুমতাহিনায় এই ঘটনার বর্ণনা এসেছে। ( বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. তাফহীমুল কুরআন, ৫ম খন্ড, পৃ. ৪২২)।
হযরত আলী রা:-র খিলাফতকালে খারিজীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি কখনো তাঁর বিরোধিতা করার অপরাধে কোন খারিজীকে গ্রেফতার করে জেলখানায় আবদ্ধ করেন ন। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি পরম ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করেন এবং এই নীতির উপর অবিচল থাকেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত খলীফা তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারেন না।
আলী ইবনে আরতাতা নামে হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয রহ: এর একজন কর্মচারী ছিল। একবার তিনি খলীফার কাছে লিখেন, “আমাদের এখানে এমন কিছু লোক আছে যাদেরকে কিছুটা শাস্তি না দেয়া পর্যন্ত অবশ্য দেয় খারাজ (কর) পরিশোধ করে না। সুতরাং এ বিষয়ে আপনার অনুমতি চাওয়া হচ্ছে। তিনি জবাবে লিখেন:
“আমি হতবাক হয়েছি যে, তুমি মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমার অনুমতি চাচ্ছ। মনে হয় যেন আমি তোমাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারব,কিংবা আমার সম্মতি তোমাকে আল্লাহর গযব থেকে রেহাই দেবে। আমার পত্র প্রাপ্তির সাথে সাথে এই নীতি অবলম্বন করবে যে, যে ব্যক্তি তার উপর ধার্যকৃত কর সহজে দিয়ে দিবে তার থেকে তা গ্রহণ কর এবং যে দিতে চায় না তার থেকে হলফ (শপথ) নিয়ে ছেড়ে দাও। আল্লাহর শপথ! মানুষের নিজের পাপের বোঝা নিয়ে আল্লাহর ‍সামনে উপস্থিত হওয়া; কাউকে শাস্তি দেওয়ার অপরাধ নিয়ে আল্রাহর সামনে হাজির হওয়ার চাইতে আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়” (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ৩৭৭)।
আব্বাসী আমলের প্রধান বিচারপতি কাযী আবু ইউসুফ রহ: আটকাদেশ (ডিটেনশান) সম্পর্কে বলেন: “কেউ কোন লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই তার ভিত্তিতে তাকে জেল-হাজতে চালান দেওয়া জায়েযও নয় এবং জায়েয হওয়ার কোন অবকাশও নেই। রসূলে করীম ‍সা: শুধুমাত্র অভিযোগের উপর ভিত্তি করে কাউকে গ্রেফতার করতেন না। এমন অবস্থার সৃষ্টি হলে বাদী-বিবাদী উভয়কে হাযির হওয়ার নির্দেশ দিতে হবে। বাদী কাছে কোন সংগত প্রমাণ থাকলে তার পক্ষে রায় দিতে হবে নতুবা বিবাদীর নিকট থেকে জামানত নিয়ে তাকে ছেড়ে দিতে হবে। যদি এরপরে বাদী কোন প্রমাণ পেশ করতে পারে তাহলে তো বেশ অন্যথায় বিবাদীর সাথে বিরূপ ব্যবহার করা যাবে না-(আমীন আহসান ইসলাহী, ইসলামী রিয়াসাত, পৃ. ২৩)।
ইসলামের এই বিধান অবস্থা ও পরিস্থিতির বাধ্যগত নয়। জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে এগুলো স্থগিত করা যায় না। তা সর্বাবস্থায় কার্যকর থাকবে। তাই ইসলামী রাষ্ট্রে অন্যায়ভাবে নাগরিকগণ আটক হওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।

About মুহাম্মদ সালাহুদ্দীন