ইসলামে মানবাধিকার

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

পরিশিষ্ট

বিদায় হজ্জের ভাষণ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা ও গুণগান করছি এবং তাঁর নিকটই সাহায্য ও ক্ষমা চাচ্ছি। তাঁর কাছে তওবা করছি। তাঁরই আঁচলে নিজেদের প্রবৃত্তির কদর্যতা এবং মন্দকাজ থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আল্রাহ যাকে সুপথে পরিচালিত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর যাকে তিনি পথহারা করে তাকে কেউ পথের অনুসন্ধান দিতে পারে না এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সা: তাঁর বান্দা ও রসূল।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি এবং তাঁরই আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছি এবং কল্যাণকর কথা দ্বারা আমি আমার ভাষণ শুরু করছি।
হে জনমন্ডলী! শ্রবণ কর, আমি তোমাদের পরিষ্কার করেই বলছি। কেননা সম্ভবত এই বছর পরে হয়ত আর আমি তোমাদের সাথে মিলিত হতে পারব না।
হে মানব! তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক, তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির তৈরী। তোমাদের মধ্যকার সর্বাধিক মুত্তাকী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত, তাকওয়া ব্যতীত কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। অন্ধকার যুগের যাবতীয় কুসংস্কার আমার পদতলে তিরোহিত, সমস্ত নিদর্শন ও অহংকারের বস্তু খতম করা হল। কেবলমাত্র কাবা ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান এবং হাজীদের পানি পান করানোর পদ অবশিষ্ট থাকবে। ইচ্ছাকৃত হত্যার প্রতিশোধ কিসাস ( হত্যার বদলে হত্যা)। ইচ্ছাকৃত হত্যার দৃষ্টান্ত হচ্ছে- লাঠি অথবা পাথরের আঘাতে হত্যা করা। এর দিয়াত (রক্তপণ) একশত উট নির্ধারিত। কেউ এর চাইতে বেশি দাবী করলে সে অন্ধকার যুগের অন্তর্ভূক্ত সাব্যস্ত হবে।
হে কুরায়শ নেতৃবৃন্দ! এমন যেন না হয় যে, তোমরা আল্লাহর সামনে তোমাদের ঘাড়ে দুনিয়ার পাপের বোঝা নিয়ে হাযির হও অথচ অন্যান্য লোকেরা আখেরাতের পাথেয় নিয়ে হাযির হবে। যদি তাই হয় তবে আমি আল্লাহর সমীপে তোমাদের কোন কাজে আসব না।
হে কুরাইশগণ! ‍আল্লাহ তোমাদের মিথ্যা অহংকার ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন এবং পূর্বপুরুষদের কীর্তিকলাপ নিয়ে গৌরব করার কোন অবকাশ তোমাদের জন্য রাখেননি। হে মানব সমাজ! তোমাদের রক্ত (জীবন), তোমাদের ধনসম্পদ তোমাদের জন্য পবিত্র যতক্ষণ না কিয়ামত দিবসে তোমরা আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে- যেভাবে এই দিনের, এই মাসের সম্মান তোমাদের কাছে স্বীকৃত। অচিরেই তোমরা আল্লাহর সামনে হাযির হবে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।
হে জনমন্ডলী! দেখ আমার পরে তোমরা যেন পথভ্রষ্ট হয়ে না যাও এভাবে যে, তোমরা পরষ্পরের হত্যায় মেতে উঠবে। আমি সত্য পৌঁছিয়ে দিয়েছি। অতএব কারো কাছে আমানত রাখা হলে তাকে মনে রাখতে হবে যে, মালিককে সেই আমান পৌঁছিয়ে দিতে হবে।
সমস্ত সূদী কারবার আজ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল অবশ্য তোমরা মূলধন ফেরত পাবে। এতে অন্যের কোন ক্ষতি নেই, নেই তোমাদেরও।
আল্লাহ এই কথা চূড়ান্ত করে দিয়েছেন যে, সুদের আদান প্রদানের কোন অবকাশ নেই। হযরত আব্বাস ( ইবনে আবদুল মুত্তালিব) এর সুদের পাওনা আমি বাতিল করে দিলাম।
অন্ধকার যুগের সমস্ত হত্যার প্রতিশোধ রহিত হল। আর (আমার খান্দানের) প্রথম প্রতিশোধ যা আমি ক্ষমা করছি তা হল রবীআ ইবনে হারিসের দুগ্ধপোষ্য শিশু হত্যার প্রতিশোধ। বনু হুযায়ল তাকে হত্যা করেছিল।
হে লোকসকল! আল্লাহ মীরাছের ক্ষেত্রে সকল ওয়ারিশের অংশ স্বতন্ত্রভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই ওয়ারিশের জন্য অসীয়ত করা জায়েয নয়।
স্মরণ রাখ, সন্তান যার বিছানায় ভূমিষ্ঠ হবে তার সাথেই তার বংশ সাব্যস্ত হবে। যার ক্ষেত্রে যেনার অপরাধ প্রমাণিত হবে তার শাস্তি প্রস্তর আঘাতে হত্যা ।
সাবধান! কেউ তার বংশ পরিবর্তন করলে কিংবা কোন গোলাম তার মনিবকে বাদ দিয়ে অন্য কারো সাথে নিজের সম্পর্ক স্থাপন করলে তার উপর আল্লাহর ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত। কিয়ামত দিবসে তার কোন বিনিময় গ্রহণযোগ্য হবে না।
ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ধারে গৃহীত বস্তু ফেরত দিতে হবে। উপহারের বিনিময়ে উপহার দিতে হবে। কেউ কোন ব্যক্তির জামিন হলে তার থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। মনে রেখ, এখন থেকে ‍অপরাধী নিজেই তার অপরাধের জন্য দায়ী থাকবে। পিতার বদলে পুত্রকে এবং পুত্রের বদলে পিতাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।
হে জনমন্ডলী! শয়তান এ ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে যে, এই আরব উপদ্বীপে সে আর পূজা পাবে না। তবে তোমাদের পরষ্পরের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিতে সে নিরাশ হয়নি। সুতরাং তোমরা তার কবল থেকে দীন ও ঈমানকে রক্ষা কর। হে মানুষ! নাসী ( মাসকে সস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া) কুফরীতে আরও কিছু বর্ধিত করে দেয়। এতে কাফেররা গোমরাহীতে পতিত হয়।
হে ভাতৃমন্ডলী! তোমাদের প্রতি তোমাদের স্ত্রীদের যেরূপ অধিকার রয়েছে সেরূপ তাদের প্রতিও তোমাদের কতকগুলো অধিকার রয়েছে। স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা যেন তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে না আনে যাদের তোমরা পসন্দ কর না এবং প্রকাশ্য অপকর্মে লিপ্ত হবে না। যদি তারা এরূপ করে তখন আল্লাহর পক্ষ থেকেই অনুমতি আছে যে, তোমরা তাদেরকে নি:সঙ্গ বিছানায় ছেড়ে দিবে এবং হালকাভাবে প্রহার করবে। অত:পর তারা যদি বিরত থাকে তাহলে সামর্থ অনুসারে তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করা তোমাদের দায়িত্ব।
নারীদের সম্পর্কে তোমরা আল্রাহকে ভয় কর। তাদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ কর, কেননা তারা তোমাদের নিয়ন্ত্রণে এবং নিজেরা নিজেদের জন্য কিছুই করতে পারে না। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ। তাঁর নামেই তারা তোমাদের জন্য হালাল হয়েছে। কোন নারী তার স্বামীর ধন সম্পদ থেকে কিছুমাত্র তার অনুমতি ব্যতিরেকে কাউকে দিতে পারবে না।
হে মানবজাতি! আমার কথা ভালো করে বুঝে নাও। আমি আমার তাবলীগী দায়িত্ব পালন করেছি। তোমাদের নিকট এমন বস্তু রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাক তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্রাহর কিতাবও তাঁর রসুলের সুন্নাহ। তোমরা ধর্মে বাড়াবাড়ি পরিহার করবে। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা বাড়াবাড়ির ফলে ধ্বংস হয়েছে।
হে জনমন্ডলী! আমার কথা শোন এবং অনুধাবন কর, এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। তাই তার ভাইয়ের অনুমতি ব্যতিরেকে তার কোন কিছু গ্রহণ করা জায়েয নয়, হাঁ, তবে খুশী মনে দিলে সে তো ভালোই। নিজের ও অন্যের উপর সীমালংঘন কর না।
হাঁ, দাসদের কথা! তোমরা তাদের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। তোমরা যা খাবে তাদেরকে থাই খেতে দেবে, তোমরা যা পরবে তাদেরকে তাই পরতে দেবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তারা যদি এমন কোন অন্যায় করে বসে যা তোমরা ক্ষমা করতে চাও না তাহলে তাদের বিক্রি করে দাও, শাস্তি দিও না।
হে লোকসকল! আমার পরে কোন নবী নাই, আর না তোমাদের পরে কোন উম্মত। মনোযোগ দিয়ে শোন, আপন প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাক। পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় কর, রমযানের রোযা রাখবে, ধন সম্পদের নির্ধারিত যাকত খুশী মনে পরিশোধ কর, ‍বায়তুল্লাহর হজ্জ আদায় কর। শাসকের ‍‌আনুগত্য কর, এভাবে আপন প্রভূর জান্নাতে প্রবেশ কর।
হে শ্রোতামন্ডলী! শোন এবং আনুগত্য কর, যদিও কোন কাফ্রী ক্রীতদাসকে তোমাদের শাসক নিযুক্ত করা হয় যে তোমাদের উপর আল্রাহর কুরআন অনুসারে ‍শাসনকার্য পরিচালনা করে।
হে লোকসকল! হজ্জ সম্পর্কিত মাসয়ালা আমার নিকট থেকে জেনে নাও। মনে হয় এরপরে আর আমার হজ্জ করার সুযোগ হবে না। ভালো করে শোন, তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত আছ তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দেবে। হতে পারে, অনুপস্থিতরা আমার পয়গাম উপস্থিতদের চাইতে অধিকতর হেফাজত করবে।
আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করেছি? সমবেত জনসমুদ্র থেকে উত্তর এলো, “হাঁ, নিশ্চয়ই!” অত:পর রসুলুল্লাহ সা: বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক।” কিয়ামত দিবসে আমার সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা তখন কি জবাব দেবে?
সমস্বরে সবাই বললেন, “আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি আমানত পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন, রিসালাত, নবুওয়াত ও নসীহতের হক আদায় করেছেন।”
এবার নবী করীম ‍সা: ‍তাঁর শাহাদত অংগুলী তিনবার আকাশের পানে উত্তোলন করলেন এবং উপস্থিত জনস্রোতের দিকে ঝুঁকিয়ে দিলেন। অবশেষে বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক! হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক।”

গ্রন্থপঞ্জী

এই পুস্তকের প্রতিটি অধ্যায়ে গ্রন্থসূত্র উল্রেখ করা হয়েছে তা ছাড়াও অন্যান্য যেসব পুস্তকের সাহায্য নেওয়া হয়েছে তার তালিকা নিম্নে দেওয়া হল।
১. তাফহীমুল কুরআন: মাওলানা সায়্যিদ আবুল আলা মওদুদী, ইদারা-ই তরজমানুল কুরআন, লাহোর ১৯৭৪ খৃ.।
২. মাআলিমুল কুরআন: মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সিদ্দীকী কান্দালুবী, ইদারা-ই তালীমাতে কুরআন, শিয়ালকোট ১৯৭৪ খৃ.।
৩. ইনতিখাবে হাদীস: মাওলানা আবদুল গাফফার হাসান, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লি: লাহোর।
৪. মাআরিফুল হাদীস: মাওলানা মুহাম্মাদ মানযুর নোমানী, মাকতাবা-ই রশীদিয়া, সাহিওয়াল।
৫. রাহে আমল: মাওলানা জলীল আহসান নদবী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লি: লাহোর, ১৯৭২ খৃ.।
৬. ইসলামী তাহযীব আওর উসকে মাবাদী, সায়্যিদ আবুল আলা মওদুদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লি:, লাহোর ১৯৭৩ খৃ.।
৭. ইসলামী নিযামে যিন্দেগী আওর উসকে বুনিয়াদী তাসাওউরাত, সায়্যিদ আবুল আলা মওদুদী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লি:, লাহোর ১৯৭৩ খৃ.।
৮. ইসলাম মে আদলে ইজতিমাঈ, সায়্যিদ কুতুব শহীদ, অনু. ডক্টর মুহাম্মাদ নাজাতুল্লাহ সিদ্দীকী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লি:, লাহোর ১৯৭১ খৃ.।
৯. ইসলাম কে মাআশী নযরিয়ে, ডক্টর মুহাম্মাদ ইউসুফ উদ্দীন, মাকতাবায়ে ইবরাহীমিয়া, হায়দরাবাদ, দাক্ষিণাত্য ১৯৫০ খৃ.।
১০. ইনসানী দুনিয়া পর মুসলমানুও কে উরূজ ওয়া যাওয়াল কা আছর, মাওলানা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদবী, মজলিসে তাহকীকাত ওয়া নাশরিয়াতে ইসলাম, নদওয়াতুল ওলামা, লাখনৌ ১৯৬৭ খৃ.।
১১. জাদাহ ও মানযিল, সায়্যিদ কুতুব শহীদ, অনু. খলীল আহমাদ হামেলী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লি:, লাহোর ১৯৭২ খৃ.।
১২. আহদে নববী মে নিযামে হুকুমরানী, ডক্টর মুহাম্মাদ হামীদুল্লাহ, মাকতাবায়ে ইবরাহীমিয়া, হায়দরাবাদ, দাক্ষিণাত্য, ২য় সংস্করণ।
১৩. মুসলমানুও কা নিযামে মামলাকাত, ডক্টর হাসান ইবরাহীম হাসান ওয়া আলী ইবরাহীম হাসান মিসরী, অনু. মৌলভী মুহাম্মাদ আলীমুল্লাহ সিদ্দীকী, নওয়াতুল মুসান্নিফিন, দিল্লী ১৯৪৭ খৃ.।
১৪. মুসলমানুও কে সিয়াসী আফকার, প্রফেসর রশীদ আহমাদ, ইদারাহ ছাফাকাতে ইসলামিয়া, লাহোর ১৯৬১ খৃ.।
১৫. মাহাসিনে ইনসানিয়াত, নাঈম সিদ্দিকী, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লিমিটেড, লাহোর ১৯৭২ খৃ.।
—: তাম্মাত বিল খাইর :—

— সমাপ্ত —

About মুহাম্মদ সালাহুদ্দীন