ইসলামে মানবাধিকার

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Slide1

ইসলামে মানবাধিকার

মুহাম্মদ সালাউদ্দিন

মুহাম্মাদ আবুত তাওয়াম, বিকম (অনার্স), এমকম এম এম
মুহাম্মদ আবু নুসরত হেলালী, এম.এ. এম.এম.


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

পেশ কালাম

মুহতারাম সালাহুদ্দীন সাহেব, সম্পাদক ‘দৈনিক জাসারাত’ করাচী, তাঁর এই গ্রন্থে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এতটা পূর্ণাঙ্গ, বিস্তারিত ও তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন যে, সম্ভবত ইতিপূর্বে কেউ এই বিষয়ের উপর এইরূপ তথ্যবহুল আলোচনা করেননি। গ্রন্থখানির অধ্যয়ন এই বিষয়ের হৃদয়ঙ্গম করার জন্য ইনশাআল্লাহ অনেক উপকারী হবে। গ্রন্থখানি আরবী ও ইংরেজীসহ অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হলে কতইনা ভালো হতো।

সম্মানিত গ্রন্থকারকে ইতিপূর্বেও তাঁর মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছিল এবং এই গ্রন্থ রচনাকালেও তাঁকে জননিরাপত্তা আইনে বন্দী করা হয়। এই অবস্থায় তাঁর গ্রন্থখানির প্রকাশ বুদ্ধিভিত্তিক দিক হতে উপকারী হওয়া ছাড়াও উপদেশ গ্রহণের উপকরণও হবে। যে ব্যক্তিই একদিকে এই বইখানি দেখবে এবং অন্যদিকে লেখককে তাঁর মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত দেখবে তখন সে নিজেই অনুভব করবে যে, ইসলামে ন্যায়বিচারের নীতিমালা এবং পৃথিবীভর ন্যায়বিচারের স্বীকৃত নীতিমাল কি, পক্ষান্তরে আমাদের দেশে কি জুলুম করা হচ্ছে।

আবুল আলা মওদূদী
লাহোর
২৭ অক্টোবর, ১৯৭২ ইং।

অনুবাদকের কথা

আলহামদুলিল্লাহ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য নিবেদিত। সালাত ও সালাম আমাদের প্রিয় নবী এবং তাঁর পরিবার পরিজন ও সাহাবীগণের উপর। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিচারে তার স্থার সকল সৃষ্টির উর্ধ্বে। সমাজবদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষের যেমন কতিপয় অধিকার প্রাপ্য আছে, তেমনি অপরের প্রতি তাঁর কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। একের জন্য যা দায়িত্ব ও কর্তব্য অন্যের জন্য তা অধিকাররূপে স্বীকৃত। আলোচ্য গ্রন্থে এ দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কেই আলোকপাত করা হয়েছে।
আদর্শ ও জীবন বিধান যতই উন্নত, ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবানুগ হোক, সমাজে তা কার্য্কর করার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত তারা যদি নিঃস্বার্থবান, উদার, যোগ্য ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী না হয়ে বরং স্বার্থলোভী, চরিত্রহীন, অযোগ্য, পক্ষপাতদুষ্ট ও স্বৈরাচারী হয় তবে জনগণ অবশ্যই অধিকার বঞ্চিত হবে। অতএব এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের বিশেষতঃ মুসলিম শাসকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক। বান্দার অধিকার সম্পর্কে তাদেরকে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।
উমার ইবনে আবদুল আযীয(রহ) তাঁর গভর্ণরগণকে এক রাষ্ট্রীয় ফরমানে বলেন, জনগণের প্রতি ন্যায়বিচার কর এবং তাঁদের অধিকার পৌছে দাও, তবেই তারা সংশোধনের পথে ফিরে আসবে। শাস্তির দন্ড কার্য্কর করে জনগণের বিদ্রোহ সাময়িকভাবে দমন করা যেতে পারে কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা।
ইসলামে মানবাধিকার সম্পর্কে বাংলা ভাষায় এটাই প্রথম গ্রন্থ। এর দ্বারা পাঠকগণ উপকৃত হলে আমাদের শ্রম স্বার্থক হবে। মহান আল্লাহ আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কবুল করুন।

মহান আল্লাহর নামে
যিনি আমাকে এই গ্রন্থ রচনায় যোগ্যতা দান করেছেন
এবং
আল্লাহর কোটি কোটি অধিকার বঞ্চিত ও নির্যাতিত বান্দাগণের জন্য যারা স্বৈরাচারী ও একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থার যাঁতাকল থেকে মুক্তিলাভের এবং সম্মানজনক জীবন যাপনের রাস্তা তালাশ করছেন।
-গ্রন্থকার।

يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُم بُرْهَانٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا [٤:١٧٤]فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا [٤:١٧٥]
-হে মানুষ! তোমার প্রভুর পক্ষ হতে তোমাদের নিকট প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের জন্য উজ্জ্বল আলো নাযিল করেছি যা তোমাদের সুস্পষ্ট পথ দেখায়। অতএব যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করবে তিনি তাদেরকে নিজের দয়া ও অনুগ্রহের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন এবং সঠিক পথে তাঁর দিকে পরিচালিত করবেন। (সূরা নিসাঃ ১৭৪-৫)।
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ [٦:٧٩]
-নিশ্চিত আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি পৌত্তলিকদের অন্তর্ভূক্ত নই। (সূরা আনআমঃ ৭৯)।

ভূমিকা

১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে রুশো বলেছিলেন, “মানুষ স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও সে আজ সর্বত্র শৃঙ্খলে বন্দী।”
এর প্রায় দুইশত বছর পর ১৯৪৭ খৃ. আমেরিকার হার্ভার্ড্ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাকলোয়েন চার্লস সমসাময়িক কালের মানুষের দুরবস্থা সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, “আমার মতে ইতিহাসের কোনো যুগেই কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের পক্ষ হতে এত কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়নি, প্রশাসনের সামনে বিচার বিভাগ কখনও এতটা অসহায়ত্ব বোধ করেনি, এই বিপদ অনুভব করা এবং তার প্রতিকারের ব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্বে কখনও চিন্তা করার এতটা তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয়নি-যতটা আজ দেখা দিয়েছে” (Mcllwain Chareles, Howard, “Constitutionalism”, Great Seal Books, New York, B 1947, P 140)।
পুনশ্চ মাত্র ২৩ বছর পর ১৯৭০ খৃ. মানুষের মৌলিক অধিকার যেসব বিপদের সম্মুখীন তার মূল্যায়ন করতে গিয়ে রবার্ট ডেবী তাঁর দুশ্চিন্তার কথা নিম্নোক্ত বাক্যে প্রকাশ করেনঃ
“প্রায় দুইশত বছর পূর্বেকার এক বৈপ্লবিক সংঘাতের কথা, যা আজকের দ্বন্দ্ব সংঘাতের চেয়ে ভিন্নতর কিছু ছিলনা, উল্লেখ করে টমাস পেইন নিজের সমসাময়িক লোকদের অন্ধ চোখগুলোকে একটি তিক্ত সত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “ স্বাধীনতা পৃথিবীর আনাচে কানাচে থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এই পলাতককে ধর এবং মানবতার জন্য সময়মতো একটি আশ্রয়স্থল নির্মাণ কর। আজ হাজারো বেদনাপূর্ণ কথা, হাজারো প্রচার ও ঘোষণাপত্রের পরও স্বাধীনতা এখনও রূপকথার পাখি। আমেরিকাই হোক অথবা রাশিয়া, পর্তুগাল, এঙ্গোলা, ইংল্যান্ড, রোডেশিয়া বা বোস্টনই হোক কোথাও তার নাম নিশানাও নাই” (Deway, Robert E, Freedom, The Macmillon Company, 1970, P. 347)।
মানুষের বঞ্চনার ও ভাগ্য বিড়ম্বনার এই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমরা যখন মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘ কমিশনের এবং অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ, পত্র-পত্রিকা ও পুস্তক-পুস্তিকার সরবরাহকৃত তখ্যবালী, বিভিন্ন দেশে সংঘটিত ঘটনাবলী এবং এই বিষয়ের উপর সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন করি তখন এই তিক্ত ও অনস্বীকার্য্ সত্য উত্থিত হয়ে সামনে আসে যে, ফরাসী বিপ্লব, ইংল্যান্ডের একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের অবসান এবং সংসদীয় ব্যবস্থার প্রাধান্য, আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা, আমেরিকার সংবিধানে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভূক্তি, ইউরোপ-আমেরিকায় মৌলিক অধিকারের পক্ষে সুশৃঙ্খল আন্দোলনসমূহ, রাশিয়ার রক্তাক্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র সত্ত্বেও আজকের মানুষও রুশোর যুগের মানুষের মত সর্বত্র পরাধীনতা শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং পূর্বে প্রফেসর ম্যাকলোয়েন মানুষের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ হতে যে বিপদের আশংকা করেছিলেন তা কেবল মারাত্মক আকারই ধারণ করেনি, বরং যতই দিন যাচ্ছে তা আরও অধিক মারাত্মক হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশেরও অধিক জনবসতি সমাজতন্ত্রের একনায়কত্ববাদী ব্যবস্থার নিগড়ে বন্দী, যেখানে মানুষের মূল্য ও মর্যাদা একটি প্রাণহীন হাতুড়ি ও কাস্তের মত উৎপাদনের একটি উপাদানের চেয়ে বেশি নয়। তার নিকট হতে কথা বলার, লেখনী, বক্তৃতা, বিবৃতি, জনসমাবেশ, সংগঠন এবং মতবাদ ও বিশ্বাসের যাবতীয় স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন সে রাষ্ট্রের একজন বেতনভুক্ত কর্মচারী মাত্র এবং তার অধিকারসমূহ সংরক্ষণের জন্য আইনসভা ও বিচার বিভাগের নামে যেসব সংস্থা কায়েম করা হয়েছে তা রাষ্ট্র নামক তার প্রভুর শাসক গোষ্ঠীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সংবাদপত্র ও সংবাদসংস্থা, রাজনৈতিক মঞ্চ, সর্বপ্রকার প্রচার মাধ্যম, সাহিত্যিক, কবি ও বুদ্ধিজীবি সবই তার মুঠোর মধ্যে। ব্যক্তি দলীয় শৃংখলের শক্ত নিগড়ে বন্দী। তার অবাধ্য হওয়ার চিন্তাটুকুই তার অস্তিত্বকে প্রকম্পিত করার জন্য যথেষ্ট। মোটকথা এই সমাজে ব্যক্তির মাথা গোঁজার কোনো আশ্রয় নেই।
এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তৃত জনবসতি নিয়ে গঠিত দেশসমূহের অবস্থা আরও হৃদয়বিদারক। এদিক থেকেও তাদের দুঃখ দুর্দশা আরও মর্মান্তিক যে, এসব দেশের জনগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক যুগের শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এবং বিদেশী প্রভুদের গোলামীর জোয়াল নিজেদের কাঁধ থেকে নিক্ষেপ করার জন্য জানমালের সীমাহীন কোরবানি স্বীকার করে স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ লাভ করেছিল, কিন্তু স্বাধীনতার সূর্য্য তখনও পূর্ণ আলোকে উদ্ভাসিত না হতেই তাদের মাথার উপর একনায়কত্বের দৈত্য চেপে বসতে লাগল এবং দেখতে দেখতে তা এক এক করে তাদের নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারগুলো গ্রাস করতে লাগল। লাল ও সাদা সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের এজেন্টদের মাধ্যমে তাদের ঘাড়ে চেপে বসল এবং তারা নিজেদের স্বার্থের হেফাজত ও তা আদায়ের জন্য তথাকথিত লৌহমানবদের হাত এতটা শক্তিশালী করে যে, তাদের স্টীমরোলারের চাপে সদ্যপ্রসূত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান মৃত্যুর দ্বারে পৌছে গেল। আইনের প্রয়োগ ছেলেখেলায় পরিণত হল, আইনের শাসন চিরবিদায় নিল, আইনসভা, বিচারবিভাগ, তথ্যমাধ্যম, রাজনৈতিক তৎপরতা, প্রচারমাধ্যম সবই প্রশাসনের মর্জির অনুগত হয়ে গেল। সমাজতান্ত্রিক দর্শন যেহেতু শাসকগোষ্ঠীকে সীমাহীন ক্ষমতা দান করে দেশের সবকিছুর হর্তাকর্তা বানিয়ে দেয় তাই তা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার সমস্ত স্বাধীন দেশগুলোর ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীর মুখরোচক শ্লোগানে পরিণত হল।
তারা ভাত কাপড় বাসস্থানের ব্যবস্থা করার শ্লোগান এবং বাইরের আগ্রাসন প্রতিহতকরণ, দেশীয় শত্রুর মূলোৎপাটন, বাইরের এজেন্টদের চক্রান্ত নস্যাৎ করতে এবং পুঁজিপতি, ভূ-স্বামী ও গণদুশমনদের নিশ্চিহ্ন করার নামে একদিকে নিজেদের ক্ষমতার পরিসর বৃদ্ধি করতে থাকে এবং অপরদিকে সশস্ত্র পুলিশ, বিভিন্ন ধরনের সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানসমূহ, নির্যাতনের আধুনিক সরঞ্জামাদি, কলাকৌশল ও নিজেদের প্রোপাগান্ডা প্রচারের উপায়সমূহের প্রসার ঘটাতে থাকে। তারা মৌলিক অধিকারের রক্ষাকবচ আইন পরিষদ, বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নেতৃবৃন্দের শক্তি ও প্রভাব খর্ব করতে এবং আইনের গোটা কাঠামোকে বশীভূত করতে থাকে। দেশের ভাগ্যাহত জনগণকে সামরিক শাসন, জরুরী অবস্থা ঘোষণা, নিবর্তনমূলক আইন প্রবর্তন এবং আগামী দিনের রহিত, বাতিল এবং নিত্য নতুন সংশোধনের শিকার সংবিধানের শৃংখলে এমনভাবে বন্দী করে নেয়া হয়েছে যে, মৌলিক অধিকারের পরিভাষাই তাদের জন্য অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দেশে এই নাটকীয় অভিনয়- নাটকীয় দৃশ্য ও সংলাপের আকারে বারবার অভিনীত হচ্ছে এবং এখন পর্য্নত এর যবনিকাপাত হয়নি।
বৃটেন, আমেরিকা এবং ফ্রান্সের মত কয়েকটি দেশের সীমিত জনগোষ্ঠী বাহ্যত সুখে সম্পদে আছে মনে হলেও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে তাদের অবস্থাও ঈর্ষা করার মত নয়। এসব দেশের বুদ্ধিজীবি-সমাজ প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা এবং আইন পরিষদ ও বিচার বিভাগের প্রভাব অব্যাহতভাবে ক্ষুণ্ন হওয়া সম্পর্কে গভীর উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছেন। আর. ডেবী এসব দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেনঃ
“যে স্বাধীনতা ও অধিকারকে শিল্প সমৃদ্ধ সমাজের সূচনা ও তার প্রাথমিক স্তরসমূহে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হত এবং যেগুলো ঐ সমাজকে উন্নত স্তর পর্য্ন্ত পৌছাতে সাহায্য করেছিল –এখন তা ঐতিহ্যগত যৌক্তিকতা ও অর্থবহতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিবেকের স্বাধীনতা- বিভিন্ন মতবাদ ও দর্শনের সমালোচনার মাধ্যমে সেগুলোর ক্রমবিকাশ ও সংরক্ষণে প্রভূত সাহায্য করে। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্তুবাদী ও তাত্ত্বিক সভ্যতাকে একটি অধিক গঠনমূলক ও যুক্তিপূর্ণ সভ্যতায় রূপান্তর করাই ছিল এই সমালোচনার উদ্দেশ্য। কিন্তু স্বাধীনভাবে ব্যক্তিগত মতবিনিময়ের পরিবর্তে ঐসব অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য যখন সংস্থাসমূহ অস্তিত্ব লাভ করে তখন গোটা সমাজের যে পরিণতি হল-ঐ স্বাধীনতা ও অধিকারেরও সেই পরিণতি হল (যা ঐ সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল)। পরিণতিই যেন উদ্দেশ্যকে নির্বাপিত করে দিল।(ঐ ৩২২ পৃ.)।
সি.ডি. কারনিশ একই সত্যের প্রকাশ নিম্নোক্ত বাক্যে করেছেনঃ “পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের দেশগুলোর সর্বশেষ মূ্ল্যায়ণ করলে পরিষ্কার জানা যায় যে, উভয়ের মধ্যে দূর্লংঘ ব্যবধান রয়েছে, স্বাধীন ও পরাধীন দেশগুলোর নামমাত্র শ্রেণীবিভাগ বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে সমর্থন করা যায়না। উভয় ব্যবস্থার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আমলাতান্ত্রিক সৃষ্ট জটিলতা ও বিচ্ছিন্নতা দেখা যেতে পারে এবং সমস্ত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারণ শ্রমিক শ্রেণী, নির্বাক ভোক্তা ও শক্তিশালী প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূর্লংঘ ব্যবধানও দেখা যেতে পারে। বর্তমান শ্রমিক সমাজ এবং আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে জীবনযাত্রার মান সেই পুরাতন চিত্র তুলে ধরেছে যে, স্বাধীনতা অসম্ভব। যে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাধীনতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন না হয়ে পারেনা। এর অস্তিত্ব সমাজতান্ত্রিক ও অসমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে সমানভাবে বিপদে জর্জরিত এবং ব্যক্তিগত সামাজিক গ্রুপসমূহ ও সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজকে এর প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। (Kerning C.D. Marxism Communism and Western Society, Herder & Herder, New York 1972, Vol 4, P. 32).
একই লেখক আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের অসহায়ত্বের চিত্র অংকন করতে গিয়ে বলেন, “একজন নাগরিক যে উদার ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা পেতে পারে তাও সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে পারেনা। শিক্ষার সুযোগ সুবিধা সকলের জন্য সমান নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চিন্তাপ্রসূত হওয়ার পরিবর্তে আবেগপ্রসূত ও আদর্শিক বিকৃতির প্রভাবাধীনে হয়ে থাকে, অধিকাংশ সময় সিদ্ধান্তের পেছনে স্বার্থ লুকায়িত থাকে, সুস্পষ্টভাবে বিকল্প সিদ্ধান্তের নির্দেশ করা হয়না এবং প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তালাবদ্ধ রুমে হয়ে থাকে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য সর্বত্র প্রতিটি ব্যক্তির রুজি রোজগারের পলিসি গ্রহণ করা হলেও যেখানের সমস্যা সেখানেই থেকে যায়। রাষ্ট্র ও সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ, অর্থনীতি ও উল্লেখযোগ্য সমস্ত প্রতিষ্ঠানের উপর আমলাতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে জনসাধারণ সরকারী বিষয়াদিতে অংশগ্রহণ ও মত প্রকাশ থেকে বঞ্চিত ও অসহায় হয়ে পড়েছে” (ঐ, পৃ. ৩২)।
মৌলিক অধিকারসমূহের হেফাজতের কথা বলতে গিয়ে সি.ডি. কারনিগ আমাদের বলেন, “ আজ এই মৌলিক অধিকারসমূহের কোনো সুনিশ্চিত আইনগত মর্যাদা নেই। স্বয়ং অধিকারসমূহ সম্পর্কে বলা যায় যে, এর অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট দেশ নির্ধারণ করে থাকে, যেমন কোনো দেশে নাগরিকদের মর্যাদা। এ কারণে প্রতিটি দেশের মৌলিক অধিকারসমূহের দফাসমূহ ভিন্নতর। সিদ্ধান্তকারী গুরুত্ব এই কথার উপর দেওয়া হয় যে, মৌলিক অধিকারসমূহ কিভাবে সংবিধানের আওতাভুক্ত করা হল। তা কি জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সম্পূর্ণ উর্ধ্বে থাকবে, নাকি তাতে রাষ্ট্রের(ও তার আইন পরিষদের) হস্তক্ষেপ চলবে।(ঐ, পৃ. ৫৭)।
ডক্টর ক্যানেথ এ ম্যাগিল জনগণের উপর কার্য্যকর নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে ভারসাম্যপ্রিয় গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করেননা। তিনি বলেন, “ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উভয় ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। নীতি নির্ধারকদের অধিক ক্ষমতা দান করে উপরোক্ত দুই ব্যবস্থায় নামমাত্র গণতন্ত্রের চর্চা পূর্ণ হতে পারে যাতে তারা নীতি বাস্তবায়নকারীদের উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে পারে।”(Megill Kennith A, The New Democratic Society, The Free Press, New York 1970, F. 104)।
এই ব্যাপারটি কেবল কর্মচারীদের উপর নিয়ন্ত্রণ পর্য্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়, গোটা সমাজই তার নিয়ন্ত্রণভুক্ত। পাশ্চাত্য জগত প্রশাসন বিভাগকে আইন কানুনের গন্ডীর বন্ধনে রাখার জন্য সমালোচনা ও পরামর্শ এবং আইন প্রনয়ণের মৌলিক দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার জন্য আইন পরিষদ ও আইনের শাসন বহাল রাখার জন্য বিচার বিভাগ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল তার সবই প্রশাসন বিভাগের নিকট পরাজিত হয়ে নিজ নিজ প্রভাব প্রতিপত্তি হারাতে বসেছে। সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান আইন পরিষদের নিয়ন্ত্রণ থেকে কার্য্যত প্রশাসনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন নিজের মর্জিমতো সিদ্ধান্তের উপর বিচার বিভাগের সীলমোহর লাগানোর জন্য সে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেনা। বিচার বিভাগ তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে সে তার ক্ষমতা খর্ব করে নিজের সিদ্ধান্ত কার্য্যকর করার পথ সমতল করে নেয়।
সিডি কারনিগ এ অবস্থার উপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, “আমাদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সংস্থা-সরকারী যন্ত্র ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিভাগের উপর (যার গুরুত্ব অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছে) গণতান্ত্রিক প্রকৃতির কার্য্যকর নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য অপর্যাপ্ত ও অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ের বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপরও আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপ ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে এবং এর নিয়ন্ত্রণ অংশীদার ও সদস্যগণের হাত থেকে চলে গেছে। সাথে সাথে একথাও মনে রাখতে হবে যে, মনোবিজ্ঞানের উন্নতির ফলশ্রুতিতে মনমানসিকতাকে নিজের মর্জিমাফিক ঢালাই করার জন্য নিত্য নতুন পন্থা ও সাধারণ প্রচার মাধ্যম, সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের কৌশলগত শক্তিকে সরকারগুলো এবং প্রাইভেট সংস্থা নিজ নিজ উদ্দেশ্যে সমানভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে।”
ড. কেনেথ এ ম্যাগিন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারসমূহ এবং জনগণের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে দুনিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর কয়েকটি শব্দে অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ স্টালিনের অনুসারীগণ এবং নিয়ন্ত্রিক গণতন্ত্র প্রিয় যুবকরা জনগণের শাসনের বুনিয়াদী ঐতিহ্য শেষ করে দিয়ে গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলগুলোর শাসনে পরিণত করেছে। এই শাসন বহুদলীয় ব্যবস্থার অনুকরণেই হোক অথবা একদলীয় ব্যবস্থার আকারে-জনগণের স্থান পার্টি দখল করে নিয়েছে, আবার পার্টির মধ্যেও সেসব লোক যাদের দলের উপর কার্য্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের উপরোক্ত পর্যালোচনা এ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যে, ব্যক্তির সম্মান, মর্যাদা ও পজিশন সম্পর্কে আগ্রহ পোষণকারী লোকেরা দুনিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট, ব্যাকুল ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। পাশ্চাত্যে আজ এই প্রশ্ন গভীর আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে যে, একচ্ছত্র রাজতন্ত্রকে তো নির্বাচিত সংসদ ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বশীভূত করা হয়েছিল, কিন্তু নির্বাচিত সংসদের গর্ভ থেকে যে একচ্ছত্র শাসন ব্যবস্থা জন্মলাভ করেছে তাকে কিভাবে বশীভুত করা যায়? এই যে প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রশাসন ব্যবস্থার উপর কার্য্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য অস্তিত্ব দান করা হয়েছিল সেগুলোকে শেষ পর্য্যন্ত একনায়ককেন্ত্রিক ক্ষমতা ছাড়া আর কিই বা বাকী থাকে? ফরাসী চিন্তাবিদ বার্টান্ড ডি. জোভেনিল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কঠিন বিপদ সম্পর্কে এভাবে সতর্ক করেছেনঃ “যে কোনো প্রকার ক্ষমতা কোনো এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত করাটা অত্যন্ত বিপদজনক। এই ক্ষমতা জনসাধারণের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহারের খুবই সম্ভাবনা রয়েছে।”(Bertrand De Jouvenel, Soveriegnty, Cambridge University Press, London 1957, P. 94).
প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা যে পরিমাণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং আরো দ্রুত যেভাবে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে তা প্রতিহত করার উপায় কি? আইনসভা, স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক দলের আকারে যেসব উপায় বিদ্যমান ছিল তা সবই প্রশাসনের অধীনস্থ হয়ে পড়েছে, এগুলোকে নতুন জীবন দেয়ার জন্য এবং প্রশাসন বিভাগের গ্রাস হতে মুক্ত করার মত শক্তি কোথায় পাওয়া যাবে? যে শাসন বিভাগ স্বীয় কর্মক্ষেত্র বর্ধিত করতে করতে নাগরিকদের শয়নকক্ষ পর্য্যন্ত পৌছে গেছে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ, নিবীর্য্করণ ও সন্তানসংখ্যা নির্ধারণের মত বিষয়েও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের পারিবারিক জীবনের একান্ত গোপনীয় এলাকা পর্য্যন্ত স্বীয় নিয়ন্ত্রণভুক্ত করে ফেলেছে-তাকে পূর্বের সীমিত পরিসরে ধাক্কা মেরে ফিরিয়ে আনা যাবে কিভাবে? এই সেই জটিল গ্রন্থি যার জট পাকাচ্ছেন পাশ্চাত্যের পন্ডিতগণ, প্রাচ্যের পন্ডিতগণের দ্বারা নয়। মনে হয় যেন মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার উন্নতি ঐখানে পৌছে থেমে গেছে। কারণ তার উর্বর মস্তিষ্ক জীবনের প্রতিটি শাখায় নিজের জৌলুস দেখাচ্ছে, কিন্তু কার্লমার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক মতবাদের পর প্রায় দেড়শত বছর ধরে পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ এই ময়দানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি। রাজনৈতিক জীবনের নতুন সংগঠন সম্পর্কে তাদের পক্ষ হতে কোনো মতবাদ সামনে আসতে পারেনি। এই সুদীর্ঘকালে তারা আমাদের যে রাজনৈতিক সাহিত্য উপহার দিয়েছেন তা হয় বর্তমান ব্যবস্থার সমর্থনে অথবা তার সমালোচনায় লেখা হয়েছে। রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের কোনো নতুন পরিকল্পনা, নতুন কাঠামো, কোনো নতুন দর্শন বা মতবাদ তারা পেশ করতে সক্ষম হননি। মজার কথা এই যে, তারা বর্তমানের প্রতিও অসন্তুষ্ট।
এই হতবুদ্ধিকর অবস্থার মূল্যায়ন যখন আমরা ইসলামের আলোকে করে থাকি তখন এর আসল ও বুনিয়াদী একটি কারণই দৃষ্টিগোচর হয়। তা এই যে, মানুষ তার প্রতিটি রাজনৈতিক পরীক্ষায় অনবরত একটি ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে। সে সর্বোচ্চ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সত্তাকে চিনতে পারেনি এবং আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতিকে নিজের প্রকৃত সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের মতোই কোনো এক ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তিকে সর্বময় কর্তৃত্বের উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত করে মানুষের মাঝে শাসক ও শাসিতে দুইটি শ্রেণী সৃষ্টি করেছে। সে রাজার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের স্বাদ আস্বাদন করার পর এই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সংসদের নিকট হস্তান্তর করে। সংসদ তার নৈপূণ্য প্রদর্শনপূর্বক তাকে সংবিধানের সীমা ও শর্তের আওতায় বন্দী করে আয়ত্বে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু সংসদ ও প্রশাসন পরস্পর গাঁটছড়া বেঁধে সংবিধানকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল এবং রাস্তার পাথর যখন সরে গেল বা পিছলে গেল তখন প্রশাসন সুযোগমত প্রশাসন ও বিচারবিভাগ কে অধীনস্থ করে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখল করে নিল। মোটকথা এই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এ হাত হতে ঐ হাতে স্থানান্তরিত হতে থাকে, কিন্তু শাসক ও শাসিতের মধ্যকার মৌলিক সম্পর্ক দূরীভূত হতে পারল না।
ইসলামের নিকট মুক্তির একমাত্র পথ এই যে, মানুষ এদিক ওদিকের সমস্ত পথ পরিহার করে সরাসরি বিশ্বস্রষ্টাকে নিজেদের সর্বময় ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী স্বীকার করে নেবে এবং মানুষের উপর থেকে মানুষের কর্তৃত্বকে সমূলে উৎপাটন করে ফেলে দেবে, আল্লাহ নির্ধারিত অধিকারসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং রাজনীতিসহ জীবনের সার্বিক ব্যাপারে তাঁর বিধানেরই অনুসরণ করবে। কুরআন মজীদ মুক্তির এই পথের নাম দিয়েছে “সিরাতুল মোস্তাকীম” এবং “সাওয়াউস সাবীল।” এই সাওয়াউস সাবীলের ব্যাখ্যা মাওলানা মওদূদী(রহ) এর মুখে শুনুনঃ
‘সাওয়াউস সাবীল’ ‘মধ্যম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজপথ।’ এর অন্তর্নিহিত পূর্ণাঙ্গ ভাবধারা উপলব্ধি করার জন্য নিম্নলিখিত কথাগুলি বিশেষভাবে অনুধাবন করা আবশ্যক।
প্রথম কথা এই যে, মানুষ তার নিজ সত্তার দিক দিয়ে একটি ছোট জগত, তার মধ্যে অসংখ্য শক্তি, যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা বিদ্যমান। তার আছে বাসনা, কামনা-লালসা, ভাবাবেগ ও ঝোঁক প্রবণতা। দেহ ও মনের আছে অসংখ্য দাবী, আত্মা, প্রাণ ও স্বভাবে আছে অসংখ্য জিজ্ঞাসা। এই সকল ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্মিলনে যে সমাজ জীবন গড়ে উঠে, তাও অসীম ও অসংখ্য জটিল সম্পর্ক সম্বন্ধের সমন্বয়ে গঠিত। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ লাভের সঙ্গে সঙ্গে এর জটিলতা ও সূক্ষ্মতা অধিক বৃদ্ধি পায়। এতদ্ব্যতীত দুনিয়ায় যে জীবন সামগ্রী মানুষের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে তা ব্যবহার করা এবং মানবীয় সংস্কৃতিতে তা প্রয়োগ করার প্রশ্নও ব্যক্তিগত ও সামগ্রিকভাবে অসংখ্য শাখা প্রশাখার সমস্যা সৃষ্টি করে।
মানুষ নিজের দুর্বলতার কারণে এই গোটা জীবন ক্ষেত্রের উপর একই সময় পূর্ণ সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারেনা। তাই মানুষ নিজের জন্য জীবনের কোনো পথ নিজেই রচনা করতে পারেনা, যাতে তার অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি সামর্থের সাথে পূর্ণ ইনসাফ করা হবে, তার সমস্ত কামনা বাসনার সঠিক হক পুরোপুরি আদায় করা হবে, তার যাবতীয় ঝোঁক প্রবণতা ও আবেগ উচ্ছাসে পূর্ণ ভারসাম্য স্থাপিত হবে, তার আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যাবতীয় দাবী যথাযথরূপে পূর্ণ হবে, তার সামগ্রিক জীবনের সমস্ত সমস্যার দিকে পুরোপুরি লক্ষ্য করা হবে ও সেই সবের এক সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান করা এবং বাস্তব জিনিসগুলিকেও ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে সুবিচার, ইনসাফ ও সত্য দৃষ্টি সহকারে ব্যবহার করা হবে। বস্তুত মানুষ নিজেই যখন নিজের পথ-প্রদর্শক ও আইনপ্রণেতা হয়ে বসে, তখন নিগূঢ় সত্যের অসংখ্য দিকের মধ্য হতে কোন একটি দিক, জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের মধ্য হতে কোন একটি প্রয়োজন, সমাধানযোগ্য কোন একটি সমস্যা, তার মগজের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে বসে যে, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় সে অপরাপর দিক, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলির সাথে সুস্পষ্ট নাইনসাফী করা শুরু করে। এরূপে কোন মত জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার ফলে জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সামঞ্জস্যহীনতার এক চরম পর্যায়ের দিকে বাঁকাভাবে তা চলতে শুরু করে। তারপর এই বক্রগতি যখন শেষসীমায় পৌছে মানুষের জন্য সহ্যাতীত হয়ে যায় তখন জীবনের যেসব দিক-প্রয়োজন ও সমস্যার সাথে ইতিপূর্বে অবিচার করা হয়েছে, তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাদের প্রতিও ইনসাফ করার জন্য জোর দাবী জানাতে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইনসাফ হয়না। কেননা পূর্বানুরূপ সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতি আবার শুরু হয়ে যায়। পূর্বে যে সবের উপর অবিচার করা হয়েছে, সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতির ফলে যেসব ভাবধারাকে দাবিয়ে ও দমিয়ে রাখা হয়েছে তাই আবার লোকদের মগজের উপর প্রচন্ড আধিপত্য বিস্তার করে বসে এবং তাকে নিজের বিশেষ দাবি অনুযায়ী বিশেষ একটি দিকে গতিবান করে তুলতে চেষ্টা করে। তখন অন্যান্য দিক, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলির সাথে পূর্বানুরূপ আবার নাইনসাফী শুরু হয়ে যায়। এর ফলে মানুষের জীবন কখনো সঠিক ও সোজা পথে নির্লিপ্তভাবে চলার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনা। সামুদ্রিক তরঙ্গের ঘাত প্রতিঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হওয়াই হয় তার একমাত্র ভাগ্যলিপি। মানুষ নিজের জন্য যত পথ ও পন্থাই রচনা করেছে তা সবই বাঁকা, উঁচুনিচু সমন্বিত। ভুল দিক হতে গতি শুরু হয় এবং ভুল দিকে গিয়েই তা সমাপ্তি লাভ করে এবং সেখান থেকে আবার অন্য কোন ভুল দিকে ঘুরে যায়।
এইসব অসংখ্য বাঁকা ও ভ্রান্ত পথের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এমন একটি পথ একান্তই আবশ্যক যাতে মানুষের সমস্ত শক্তি ও বাসনার প্রতি, সমস্ত ভালবাসা ও ঝোঁক প্রবণতার প্রতি, তার রূহ ও দেহের সমস্ত দাবি দাওয়ার প্রতি ও জীবনের সমগ্র বাসনার প্রতি পূর্ণ ইনসাফ করা হবে; যাতে কোন প্রকার বক্রতা, বিশেষ কোন দিকের প্রতি অযথা গুরুত্ব আরোপ ও অপর দিকগুলির প্রতি অবিচার ও জুলুম করা হবেনা। বস্তুত মানব জীবনের সুষ্ঠ ও সুন্দর বিকাশ এবং এর সাফল্য ও সার্থকতা লাভের জন্য তা একান্তই জরুরী। মানুষের মূল প্রকৃতিই এ পথের সন্ধানে উন্মুখ, বিভিন্ন বাঁকা টেরা পথ হতে বারবার বিদ্রোহ ঘোষণা করার মূল কারণ এই যে, মানব প্রকৃতি এই সঠিক ও ঋজু পথের সন্ধানেই পাগলপারা হয়ে ছুটে। কিন্তু মানুষ নিজেই এই রাজপথ জানতে ও চিনতে পারেনা, কেবল খোদা এই দিকে মানুষকে পথনির্দেশ দান করতে পারেন। ঠিক এই উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন, মানুষকে এই সঠিক নির্ভূল রাজপথের দিকে পরিচালিত করাই হচ্ছে তাঁর একমাত্র কাজ। কুরআন এই পথকে ‘সাওয়াউস-সাবীল’ ও ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলে অভিহিত করছে। দুনিয়ার এই জীবন হতে শুরু করে পরকালের দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবন পর্য্যন্ত অসংখ্য বাঁকা টেরা পথের মাঝখান দিয়ে তা সরল রেখার মত ঋজু হয়ে চলে গিয়েছে। তাই এই পথে যে চলবে, সে এখানে নির্ভুল পথে পথিক এবং পরকালে পূর্ণ স্বার্থক ও সাফল্যমন্ডিত হবে। আর যে এই পথ হারাবে সে এখানেও বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও ভুল পথের যাত্রী; আর পরকালে তাকে অনিবার্য্যরূপে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। কেননা জীবনের সমস্ত বাঁকা টেরা পথই জাহান্নামে গিয়ে শেষ হয়েছে। বর্তমান কালের কোন কোন অজ্ঞ দার্শনিক মানব জীবনকে ক্রমাগতভাবে একটি সীমান্ত হতে বিপরীত দিকের সীমান্ত পর্য্যন্ত ধাক্কা খেতে দেখে এই ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, দ্বান্ধিক কার্য্যক্রম(Dialectical Process) মানবজীবনের ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক পন্থা, স্বভাবসম্মত পন্থা। তারা নিজেদের নির্বুদ্ধিতার জন্য বুঝে নিয়েছেন যে, প্র্রথমে এক চরমপন্থী দাবী(Thesis) তাকে এক দিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে, এর জওয়াবে অপর একটি অনুরূপ চরমপন্থী দাবী(Antithesis) তাকে বিপরীত দিকের শেষ সীমান্তে নিয়ে পৌছাবে, তারপর উভয়ের সংমিশ্রণে জীবন-বিকাশের(Synthesis)পথ বের হবে। এটাই হচ্ছে মানুষের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র পথ।
অথচ প্রকৃতপক্ষে এটা ক্রমবিকাশ লাভের কোন পথ নয়, হতভাগার গলাধাক্কা খাওয়ামাত্র। বরং মানবজীবনের সঠিক বিকাশের পথে তা বারবার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেকটি চরমপন্থী দাবী জীবনকে তার কোন একটি দিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং তাকে কঠিনভাবে টেনে নিয়ে যায়। এইভাবে যখন ‘সাওয়াউস সাবিল’ হতে তা বহু দূরে চলে যায়, তখন স্বয়ং জীবনেরই অপরাপর কতগুলি নিগূঢ় তত্ত্ব যার প্রতি আজ পর্য্যন্ত অবিচার করা হচ্ছিল তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে দেয় এবং বিদ্রোহ একটি প্রতিবাদীর রূপ ধারণ করে তাকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। ফলে ‘সাওয়াউস সাবিল’ ‘সত্য সঠিক রাজপথ’ নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উক্ত পরস্পর সাংঘর্ষিক দাবীসমূহের মধ্যে সন্ধি ও সমঝোতা হতে শুরু হয়। এই সংমিশ্রণের ফলে মানুষ জীবনের পক্ষে বিশেষ উপকারী ও কল্যাণকর জিনিসসমূহ অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু সেখানে যখন ‘সাওয়াউস সাবীলের’ চিহ্ন ও নিদর্শন প্রদর্শনকারী আলো বর্তমান থাকেনা, আর না থাকে এর উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার মত ঈমান, তখন সে প্রতিবাদী জীবনকে সে স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়না, বরং পূর্ণ শক্তিতে তাকে দ্বিতীয় দিকের শেষ পর্যায় পর্য্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। ফলে জীবনের অন্য ধরনের কিছু নিগুঢ় তত্ত্ব উপেক্ষিত হতে শুরু হয় ও অপর একটি বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এই দৃষ্টিহীন দার্শনিকদের পর্য্যন্ত কুরআনের আলোকচ্ছটা যদি বিচ্ছুরিত হতে পারত এবং তারা যদি সাওয়াউস সাবীল প্রত্যক্ষ করতে পারতেন তবে জানতে পারতেন যে, মানুষের জন্য এ সাওয়াউস সাবীলই হচ্ছে ক্রমবিকাশের সঠিক পথ। বক্র পথে এক সীমান্ত হতে অপর সীমান্ত পর্য্যন্ত ধাক্কা খেয়ে ফেরা মানুষের জন্য কোনক্রমেই কল্যাণের পথ হতে পারেনা।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা মায়েদার ৩৫ নং টীকা)।
মানুষ শত শত বছর ধরে ধারণা-অনুমান, কল্পনা ও মতবাদের যেসব ভ্রান্তির মধ্যে ধাক্কা খেয়ে দিগ্বিদিক ঘুরপাক খাচ্ছে তারা যদি তা হতে বের হয়ে সাওয়াউস সাবীলের দিকে ফিরে আসত এবং ঘোষণা করে দিত যে, “শাসন ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয়” তবে সে সমস্ত শৃঙ্খল মুহুর্তের মধ্যে কেটে ফেলতে পারত যা দিয়ে তার স্বগোত্রীয়রা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দী করে রেখেছে। এটাই অত্র গন্থের পয়গাম এবং এটাই মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিভু।
আমার পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার এবং আমি এজন্য আল্লাহ তাআলার যে পরিমাণ কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করি তা কমই হবে যে, এ গ্রন্থ রচনায় আমি দেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবিদের সাহায্য-সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভে সক্ষম হয়েছি। জনাব আলতাফ গাওহার গ্রন্থখানি রচনায় শুধু অনুপ্রেরণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি আমাকে তাঁর মায়কাস এসোসিয়েটস প্রতিষ্ঠানের তথ্য গবেষনা বিভাগের সাথে সংযুক্ত করে আর্থিক আনুকূল্যেরও ব্যবস্থা করে দেন। আলোচ্য বিষয়ের ব্যাপকতা, গুরুত্ব এবং নিজের জ্ঞানের দৈন্যতা ও পুঁজির অভাবের কথা চিন্তা করে আমি বারবার পশ্চাদপসরণের পথ খুঁজছিলাম আর তিনি অনবরত পিছু ধাওয়া করে আমাকে এ কাজে ব্যস্ত রেখেছেন। পদে পদে তিনি আমার সাহস যুগিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে উপকৃত করেছেন।বিশিষ্ট আইনজ্ঞ জনাব খালিদ ইসহাক –যিনি নিজের সরল প্রকৃতি, ভদ্রতা, উদারতা, অগাধ জ্ঞান ও মৌলিক অধিকার অর্জন ও তা সংরক্ষণের আন্দোলন প্রচেষ্টায় স্মরণীয় অবদানের কারণে নিজেই একটি গ্রন্থের বিষয়বস্তু হয়ে আছেন- তিনি শুধু আমার সাহায্যকারী ও পথপ্রদর্শকই ছিলেননা, বরং নিজের বিরাট পাঠ্যাগার ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে প্রয়োজনীয় পুস্তকাদি অন্বেষণের শ্রম থেকেও আমাকে বাঁচিয়েছেন।গ্রন্থখানি তাঁর পাঠাগারে বসেই রচিত এবং তিনি এর রচনাকার্য্য সমাপ্তির ব্যাপারে অসীম আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি নিজের মূল্যবান সময়ের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট পুস্তক নির্বাচন, তার অনুসন্ধান, মতবিনিময় এবং বিভিন্ন অধ্যায় সম্পর্কে আলোচনায় ব্যয় করেন।
বর্তমান যুগের মহান চিন্তাবিদ ও ইসলামের মুখপাত্র মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী(রহ) নিজের শত ব্যস্ততা এবং স্বাস্থ্যের অবনতি সত্ত্বেও পান্ডুলিপিখানা পাঠ করে এবং ‘পেশ কালাম’ লিখে দিয়ে আমার কাজের মূল্য ও মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং আমাকে তাঁর স্নেহ ও ভালবাসায় সিক্ত করেছেন। মাওলানা মুহতারামের একটি পরোক্ষ অনুগ্রহ এই যে, তাঁর সুবিখ্যাত তাফসীর ‘‘তাফহীমুল কুরআন’’ আমাকে ইসলামের প্রাণশক্তি সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছে। এই গ্রন্থে উদ্ধৃত অধিকাংশ আয়াতের তরজমাও তাফহীমুল কুরআন থেকেই নেয়া হয়েছে।
পাকিস্তান আন্দোলনের স্বনামধন্য রাহবার এবং আইন সম্পর্কিত বিষয় সম্বন্ধে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদ এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য মাওলানা জাফর আহমাদ আনসারীও নিজের অসুস্থতা ও চরম ব্যস্ততা সত্ত্বেও গ্রন্থের গোটা পান্ডুলিপি অধ্যয়ন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেন। মাওলানার অনুগ্রহ এবং গ্রন্থের প্রতি আগ্রহের অনুমান এই ঘটনা থেকেও করা যায় যে, তিনি রাত জেগে কোন কোন অধ্যায় অধ্যয়ন করেছেন। প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক এবং ফাড়ান পত্রিকার সম্পাদক জনাব মাহেরুল কাদেরী ভাষাগত ও বাচনভঙ্গির দিকে লক্ষ্য রেখে পান্ডুলিপিখানা পাঠ করেছেন এবং নিজের সন্তোষ প্রকাশ করে আমার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাবেক এটর্নি জেনারেল জনাব শরীফউদ্দীন পীরজাদাও পান্ডুলিপির কোন কোন অংশ পাঠ করে নিজের সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ইসলামিক রিসার্চ একাডেমীর পরিচালক সাইয়েদ মুনাওয়ার হাসান সাহেব, খালিদ ইসহাক সাহেবের পাঠাগারের আরবী ও ইসলামিয়াত বিভাগের ইনচার্জ জনাব তাহের আল মক্কী এবং করাচীর দৈনিক জাসারাতের নিউজ এডিটর জনাব কাশাশ সিদ্দিকীর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। তাঁরা পর্যায়ক্রমে আমাকে পুস্তাকাদি সংগ্রহ, আরবী কিতাব থেকে সাহায্য গ্রহণ এবং উদ্ধৃতিসমূহের তরজমা করে দিয়ে এবং প্রুফ রিডিং এ আমার সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের সকলকে মহান পুরস্কারে ভূষিত করুন এবং এ কাজে তাদের নিস্বার্থ সহযোগিতার বরকতে আমার প্রচেষ্টা কবুল করুন।
অবস্থার নাজুকতা দেখুন। ‘মৌলিক অধিকার’ বিষয়ের উপর প্রথমবারের মত লেখার খেয়াল আসে ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সেই সময়ে যখন আমাকে সমস্ত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যিন্দানখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আর আজ তার শেষ লাইনও যিন্দানখানার লৌহযবনিকার অন্তরালে বসে লিখছি যখন আমি সমস্ত মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এবং দেশের ‘কর্ণধারগণ’ আমাকে ডি.পি.আর. এর লৌহশৃঙ্খল পরিয়ে রেখেছেন। পাঠকগণের কাছে আমার আবেদন এই যে, গ্রন্থখানিতে কোনো ভুলত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে তা আমার অযোগ্যতা ও জ্ঞানের দৈন্যতার কারণেই হয়েছে মনে করবেন এবং সে সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবেন। তাদের নিকট আমার আরও আবেদন এই যে, তারা যেন দোয়া করেন যাতে এই গ্রন্থখানি আমার পার্থিব সম্মান লাভের উপায় হয় এবং পরকালীন মুক্তির উপকরণ হয়।
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَوَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَوَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
“তারা যা আরোপ করে তা হতে তোমার প্রতিপালক পবিত্র ও মহান, যিনি সমস্ত সম্মানের অধিকারী। শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলগণের উপর। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”(আস সাফফাতঃ ১৮০-১৮২)।
২৭ রমযানুল মুবারক, ১৩৯৬ হিজরী মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬ খৃ. (কেন্দ্রীয় কারাগার, করাচী)।

মৌলিক মানবাধিকারের অর্থ

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। তার জাতিগত প্রকৃতিই তাকে স্বজাতির সাথে মিলেমিশে একত্রে বসবাসে বাধ্য করে। সে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্য্ন্ত অসংখ্য ব্যক্তির সেবা, মনোনিবেশ, সাহায্য ও আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী। শুধু নিজের লালন-পালন, অন্ন, বাসস্থান, পোশাক পরিচ্ছদ ও শিক্ষা দীক্ষার প্রয়োজনেই নয়, বরং নিজের প্রকৃতিগত যোগ্যতার লালনও ক্রমবিকাশ এবং তার বাস্তব প্রকাশের জন্যও সে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে বাধ্য। যে সামাজিক সম্পর্ক তার চারপাশে সম্পর্ক ও বন্ধনের একটি প্রশস্ত ও দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরী করে তা পরিবার, বংশ, পাড়া, শহর, দেশ এবং সামগ্রিকভাবে গোটা মানব গোষ্ঠী পর্য্ন্ত বিস্তৃত সম্পর্কের এই ছোটবড় পরিসরে তার অধিকার ও দায়িত্বও নির্ধারণ করে। মা-বাবা-সন্তান, ছাত্র-শিক্ষক, শাসক-কর্মচারী, ক্রেতা-বিক্রেতা, রাজা-প্রজার অসংখ্য পর্যায়ে তার উপর কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয় এবং এর বিপরীতে সে কিছু নির্দিষ্ট অধিকার প্রাপ্ত হয়।
এসব অধিকারের মধ্যে কতগুলো শুধু নৈতিক প্রকৃতির। যেমন বড়দের প্রাপ্য সম্মান, ছোটোদের প্রাপ্য আদর-স্নেহ, অসহায়ের অধিকার সাহায্যপ্রাপ্তি, মেহমানের অধিকার আপ্যায়নলাভ ইত্যাদি। আর কতগুলো আইনগত প্রকৃতির। যেমন মালিকানার অধিকার, মজুরীপ্রাপ্তির অধিকার, মোহরপ্রাপ্তির অধিকার, প্রতিশোধ ও প্রতিদানের অধিকার ইত্যাদি। এগুলো এমন অধিকার যার সাথে কোনো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে এবং দেশের আইনও এই স্বার্থ স্বীকার করে নিয়ে বিচার বিভাগের মাধ্যমে তা অর্জনের ব্যবস্থা করে দেয়। এগুলোকে আইনগত অধিকার(Legal Rights) অথবা ইতিবাচক অধিকার(Positive Rights) বলা হয়। ব্যক্তির অধিকারের আরেকটি পরিমন্ডল সরকারের সাথে সম্পর্কিত। এই পরিমন্ডলে ব্যাপক ক্ষমতা ও বিস্তৃত উপায়-উপকরণের অধিকারী সরকারের বিপরীত ব্যক্তিকে যে সকল অধিকার দেওয়া হয় তাকে আমরা মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) বলি। এসব অধিকারের জন্য মৌলিক মানবাধিকার(Basic Human Rights) এবং মানুষের জন্মগত অধিকার(Birth Rights of Man) পরিভাষাসমূহও ব্যবহৃত হয়। এসব অধিকারের গ্যারান্টি দেশের সাধারণ আইনের পরিবর্তে সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে ব্যবহৃত হয়। এগুলোকে মৌলিক অধিকার এজন্য বলা হয় যে, রাষেট্রর কোনো শাখাই তা প্রশাসনিক হোক বা আইন পরিষদ-এর বিরুদ্ধাচরণ করতে পারেনা। এই অধিকার কোনো ব্যক্তি নাগরিক হিসেবে নয়, বরং বিশ্ব মানবগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে লাভ করে থাকে। এগুলো বর্ণ, গোত্র, এলাকা, ভাষা এবং অন্যান্য সকল প্রকারের স্বাতন্ত্র্যের উর্ধে্ব এবং মানুষ কেবল মানুষ হওয়ার কারণে তা লাভ করে। এটা কোনো সরকারের মঞ্জুরীকৃত বা চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় বরং মানুষ প্রকৃতিগতভাবে লাভ করেছে এবং তা তার অস্তিত্বের অপরিহার্য্ অংশ। কোনো রাষ্ট্র তা স্বীকার করে নিতে বা বাস্তবায়ন করা হতে পশ্চাদপদ হলে তাকে প্রকৃতিপদত্ত অধিকারসমূহ আত্মসাৎ করার অভিযোগে অপরাধী মনে করা হয়। কারণ এসব অধিকার অবিচ্ছেদ্য ও অপরিবর্তনীয়। সরকারের তা বাতিল করার তো প্রশ্নই আসেনা, তাতে সংশোধন, সীমিতকরণ অথবা কোনো ওজরবশত তা সাময়িকভাবে স্থগিত করারও অধিকার তার নেই। অবশ্য স্বয়ং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী অর্থাৎ জনগণ তাকে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট সীমা ও শর্তের অধীনে এই এখতিয়ার দিলে তা স্বতন্ত্র কথা। এই সুযোগও কেবল পাশ্চাত্যের সংবিধানসমূহে রাখা হয়েছে। ইসলামী সংবিধান কোনো ব্যক্তি, সংস্থা, বরং সামগ্রিকভাবে গোটা উম্মাহকেও এই ক্ষমতা দেয়নি যে, সে মৌলিক অধিকারসমূহকে কোনো অবস্থায় রহিত, সীমিত বা স্থগিত করতে পারে।
ইউরোপে মৌলিক অধিকার পরিভাষা চালু হয়েছে তিনশো সাড়ে তিনশো বছরের বেশি হয়নি। এটা মূলত প্রকৃতিগত অধিকারসমূহের সেই প্রাচীন মতবাদেরই অপর নাম যার সর্বপ্রথম গ্রীক চিন্তাবিদ জেনো পেশ করেছিলেন। এরপর রোমের বিখ্যাত আইনবিদ সিসেরো আইনের ও সংবিধানের ভাষায় তা আরো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। ফ্রিডম্যান বলেন, “ একজন নাগরিকের সুনির্দিষ্ট অধিকারসমূহের উপর ভিত্তিশীল সমাজের ধারণা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ধারণা যা প্রথমত মধ্যযুগের সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয়ত সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের আধুনিক রাষ্ট্রের একনায়কতন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ উথ্থিত হয়েছে। এর সুস্পষ্ট প্রকাশ Locke এর ফ্রান্সের আইন দর্শনের মানবাধিকার ঘোষণায় এবং আমেরিকার সংবিধানে হয়েছে।”(W. Friedmann, “Legal Theory”, Sterers Saw, London 1967, P 392).
গায়েয ইযিজিওফোর মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন, “মানবীয় অথবা মৌলিক অধিকার হলো সেইসব অধিকারের আধুনিক নাম যাকে ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার বলা হয় এবং তার সংজ্ঞা এই হতে পারে যে, সেইসব নৈতিক অধিকার যা প্রত্যেক ব্যক্তি প্রতিটি স্থানে এবং সার্বক্ষণিকভাবে এই কারণে পেয়ে থাকে যে, সে অন্যান্য সকল সৃষ্টির তুলনায় বোধশক্তি সম্পন্ন ও নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী হওয়ায় উত্তম ও উন্নত। ন্যায়বিচারকে পদদলিত করা ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তিকে এসব অধিকার হতে বঞ্চিত করা যায়না।(Gaiues Ezejiofor, Protection of Human Rights under the Law, Butterworths, London 1964, p.3)।
মৌলিক অধিকারের ধরন ও বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করতে গিয়ে বিচারপতি জ্যাকসন বলেন, “কোনো ব্যক্তির জীবন, মালিকানার স্বাধীনতা, বক্তৃতা বিবৃতি ও লেখনীর স্বাধীনতা, ইবাদত-বন্দেগী ও সমাবেশের স্বাধীনতা এবং অনুরূপ অন্যান্য অধিকার জনমত যাচাইয়ের জন্য দেয়া যায়না। তার নির্ভরযোগ্যতা নির্বাচনসমূহের ফলাফলের উপর কখনও ভিত্তিশীল নয়। (A.K. Brohoi, Quotation in United Nations and Human Rights, Karachi 1968, P 313).
মৌলিক অধিকারের ধারণার মূলত দুটি দিক রয়েছে। এর একটি দিক নৈতিক যার ভিত্তিতে সমাজে মানুষের একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থান থাকা উচিত। সে মানুষ হিসেবে সম্মানের পাত্র এবং সমাজের অন্যান্য লোকের মত তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সরকারের জন্যও অপরিহার্য্। যে ব্যক্তিই কোনো কর্তৃত্ববলে তার সাথে ব্যবহার করে তার একথা ভুললে চলবেনা যে, সে একজন মানুষ এবং মানবীয় সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে সে কেবলমাত্র কোনো ক্ষমতাবলে অথবা পদাধিকারবলে অন্যদের তুলনায় বিশেষ কোনো মর্যাদার অধিকারী নয়। মৌলিক অধিকারের দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে আইনগত। তদনুযায়ী এসব অধিকার আইনগতভাবে স্বীকার করে নেয়া উচিত এবং দেশের উচ্চতর আইনে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। বাস্তবে তা বলবৎ করার ক্ষেত্রে এর তিনটি দিক রয়েছে।
১. মৌলিক অধিকারসমূহ মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতি দেয় এবং আইনগত ও প্রশাসনিক কার্য্ক্রমের জন্য পথ প্রদর্শনের নীতিমালা সরবরাহ করে।
২. এসব অধিকার মানুষকে জুলুম অত্যাচার ও শক্তি প্রয়োগের কবল হতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। অধিকারের অলংঘনীয় সীমারেখা তাকে আইনগত, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ হতে রক্ষা করে। কারণ এসব অধিকারের ক্ষেত্রে আইনের জন্য সুস্পষ্ট ধারাসমূহ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
৩. মৌলিক অধিকারসমূহ এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব দান করে যা অন্যান্য সকল ব্যক্তির ও শাসকগোষ্ঠীর মোকাবিলায় এসব অধিকার বাস্তবায়নের গ্যারান্টি দান করে, অর্থাৎ বিচার বিভাগ।
দেশের আইন ব্যবস্থায় মৌলিক অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশ্য হলো-রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার গন্ডি নির্দিষ্ট করা এবং তাকে বিচার বিভাগের সাহায্যে আইনগত সীমারেখা ও রক্ষাকবচসমূহের অনুগত বানানো, যাতে শাসক শ্রেণী নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহ আত্মসাৎ করে একনায়কত্বের পথ অবলম্বন করতে না পারে। এসব অধিকার দাবীর আসল অভিপ্রায় হলো-মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও গাম্ভীর্য্ কে একনায়কতন্ত্র, নির্মম স্বৈরতন্ত্র, নির্মম সাম্যবাদের প্রভাব হতে হেফাজতের ব্যবস্থা করা, সসম্মানে জীবন যাপনের গ্যারান্টি দেওয়া, তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার উন্মেষ ঘটানো, এই যোগ্যতার দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং চিন্তু ও স্বাধীনতার এমন এক পরিমন্ডলের ব্যবস্থা করা যা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যান্য ব্যক্তির হস্তক্ষেপ হতে নিরাপদ থাকবে।
ইউরোপের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মৌলিক অধিকারের পরিভাষার উন্মেষ ঘটে। হাজার বছরের গৃহযুদ্ধ, রাজাদের একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরাচার, ভূ-স্বামীদের জুলুম নির্যাতন, ব্যক্তিগত জীবনের উপর গীর্জার অসহনীয় হস্তক্ষেপ, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মতভেদের কারণে সংঘটিত দাঙ্গা, জাতীয়তাবাদ এবং তার সৃষ্ট আঞ্চলিক ক্ষমতা বৃদ্ধির লালসা ইউরোপে যেভাবে মানুষের ব্যক্তিগত সম্মানকে আহত করেছে, তার জানমাল ও ইজ্জত আব্রু পদদলিত করেছে এবং স্বৈরাচারী জালিম সরকারের সামনে জনগণকে সম্পূর্ণ অসহায় ও অক্ষম করে ফেলেছিল-তা মানবতার প্রতি সহমর্মিতা অনুভবকারী লোকদের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দেয় এবং তারা চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হন যে, মানুষকে অসম্মান ও অপমান হতে উদ্ধার এবং তার সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কি পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং স্বৈরাচারী রাজন্যবর্গ ও একনায়কতন্ত্রীদেরকে মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পথ কিভাবে দেখানো যায়। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃতিগত অধিকারসমূহের মতবাদ বাস্তব রূপলাভের স্তরে পৌছতে পৌছতে মৌলিক অধিকারের রূপ ধারণ করে এবং সমগ্র ইউরোপে ব্যক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকারসমূহের আইনগত হেফাজতের আন্দোলন দিনের পর দিন জোরদার হতে থাকে। ঔপনিবেশিক আমলের অত্যাচার, আবার দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ও আনবিক বোমার ব্যবহারের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে যখন নরকে পরিণত করা হয়েছিল এবং তার লেলিহান শিখা গোটা মানবজগতকে নিজের গহবরে নিয়ে নিল তখন ইউরোপে গুঞ্জরিত ‘মৌলিক অধিকারের’ আওয়াজ এক বিশ্বব্যাপী দাবীতে পরিণত হল-যার ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘ সনদ এবং মানবাধিকার সনদ অস্তিত্ব লাভ করে। স্বৈরাচার ও দমননীতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে উক্ত পরিভাষার ধ্বনিও পৃথিবীর আনাচে কানাচে পৌছে যায়।
ইউরোপে মৌলিক অধিকারের ধারণা যে প্রেক্ষাপটে উন্মেষ লাভ করে ইসলামের মৌলিক অধিকারের প্রেক্ষাপট তদ্রূপ নয়। তাই তা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এর বিস্তারিত বিবরণ আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে পেশ করবো।

মৌলিক অধিকারের ইতিহাস

ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের যে ধারণা দিয়েছে এবং এসব অধিকার চিহ্নিত করে তার হেফাজতের যে ব্যবস্থা দিয়েছে তার উপর বক্তব্য রাখার আগে পাশ্চাত্য কর্তৃক রচিত মানবাধিকারের ইতিহাস, এসব অধিকারের উৎস সম্পর্কে পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের সরবরাহকৃত রক্ষাকবচসমূহের সর্বপ্রথম আমাদের মূল্যায়ণ করে দেখা উচিত যে, আজ স্বয়ং পাশ্চাত্যে এবং তার অনুসারী অন্যান্য দেশে মানুষ কি পরিমাণে জানমালের নিরাপত্তা, ন্যায় ইনসাফের প্রতিষ্ঠা, মান সম্মানের হেফাজত, চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা লাভ করেছে। এই মৌলিক অধিকার কতটা অবিচ্ছেদ্য এবং গত তিন চারশো বছর ধরে এসব অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম অব্যাহত ছিল তা মানুষকে নিরাপদে, শান্তিতে ও সম্মানের সাথে জীবনযাপনের কতটা সুযোগ দান করেছে।
পাশ্চাত্যের পন্ডিতগণ মৌলিক মানবাধিকারের ধারণার বিবর্তনশীল ইতিহাসের সূচনা করেন খৃ.পূ. পঞ্চম শতকের গ্রীস হতে; অতঃপর খৃষ্ঠীয় পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তার সূত্র যোগ করে এক লাফে খৃস্টীয় একাদশ শতকে প্রবেশ করেন। খৃ. ষষ্ঠ হতে দশম শতক পর্য্ন্তকার পাঁচশো বছরের দীর্ঘ যুগ তাদের রচিত ইতিহাসের পাতা হতে অদৃশ্য। কেন? সম্ভবত এজন্য যে, তা ছিল ইসলামের যুগ।
গ্রীক দার্শনিকগণ নিঃসন্দেহে আইনের রাজত্ব ও ন্যায় ইনসাফের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত পান্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন। কিন্তু তাদের লেখায় আমরা মানবীয় সমতার কোনো ধারণা পাচ্ছিনা। তারা হিন্দুস্তানের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ(সরকারী কর্মচারী) ও নমশূদ্র ইত্যাদি শ্রেণীর ন্যায় মানবজাতিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেন এবং মনুশাস্ত্রের মত তাদের এখানেও চারটি শ্রেণী বিদ্যমান। প্লেটো(খৃ.পূ. ৪২৭-৩৪৭) তাঁর প্রজাতন্ত্র (Republic) গ্রন্থে শাসন কর্তৃত্ব শুধুমাত্র দার্শনিকগণকে দান করেন এবং সমাজের অবশিষ্ট লোকদের কৃষক, সৈনিক, দাস ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। তিনি বলেন, “নাগরিকগণ! তোমরা অবশ্যই পরস্পর ভাই, কিন্তু খোদা তোমাদের বিভিন্ন অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের মধ্যে কতকের রাজত্ব করার যোগ্যতা আছে এবং তাদেরকে খোদা তাআলা সোনা দিয়ে তৈরি করেছেন। কতককে রূপা দিয়ে তৈরি করেছেন এবং তারা পূর্বোক্তদের সাহায্যকারী, তারপর আছে কৃষক ও হস্তশিল্পী যাদের তিনি পিতল ও লোহা দিয়ে তৈরি করেছেন।”(Morris Stockhammer, Plato Dictionary, Philosophical Library, New York 1903, p. 32).
এখন প্লেটোর ন্যায়বিচারের দর্শন নিরীক্ষণ করুনঃ “আমি ঘোষণা করছি যে, ন্যায়বিচার শক্তিমানদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীর সর্বত্র ন্যায়বিচারের মাত্র একটিই মূলনীতি রয়েছে এবং তা হচ্ছে ঐ শক্তিমানদের স্বার্থ।”(ঐ, পৃ. 141)।
ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা আরো বিশদভাবে শুনুনঃ “ন্যায়বিচার এমন একটি বিষয় যা বন্ধুদের প্রতিপালন করে এবং শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করে।”(ঐ, পৃ. ১৩৪)।
প্লেটোর মতে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দোষ এই যে, তাতে সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। “গণতন্ত্র বিভেদের জন্মদানকারী প্রকৃতির একটি সরকার যা বিশৃঙ্খলা ও বাড়াবাড়িতে পরিপূর্ণ এবং সমান ও অসমান লোকদের মাঝে সমতা বিধানের চেষ্টা করে।”(ঐ, পৃ. ৫৬)।
আইনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে প্লেটো সাহেব বলেনঃ “আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে-তার চর্চা ও ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টি বিধান।”(ঐ, পৃ. ১৪৯)।
প্লেটো ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সাম্যের প্রবক্তা নন। তিনি প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষের জন্য পৃথক পৃথক আইনের সমর্থক। ক্রীতদাসদের সম্পর্কে তিনি তাঁর আইনগ্রন্থে লিখেছেন, “ক্রীতদাসদের সেই শাস্তিই পাওয়া উচিত যার তারা যোগ্য। তাদেরকে স্বাধীন নাগরিকের মত শুধু তিরস্কার ও ভৎসর্ণা করেই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। অনথায় তাদের মনমানসিকতা খারাপ হয়ে যাবে। (ঐ, পৃ. ২৩৮)।
তিনি নারী পুরুষের মাঝেও সমতার সমর্থক নন। তিনি বলেন, “সৎকাজের ব্যাপারে নারীদের প্রকৃতি পুরুষদের তুলনায় হীনতর।”(ঐ, পৃ. ২৮০)।
প্লেটোর মত তাঁর শিষ্য এরিস্টটলও (খৃ.পূ. ৩৮৪-৩২২) শ্রেণী বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থার প্রবক্তা। তিনিও সাম্যনীতির দর্শনে ভয় পান। তিনি নিজের ‘রাজনীতি’(Politics)শীর্ষক গ্রন্থে গণতন্ত্রকে নিকৃষ্টতম পদ্ধতির সরকার আখ্যায়িত করে লিখেছেনঃ “গণতন্ত্র এমন একটি সরকার ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা থাকে নীচ, দরিদ্র ও বোকা লোকদের হাতে। এটা হচ্ছে সেই সর্বশেষ নিকৃষ্টতম সরকার ব্যবস্থা যা প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার বানিয়ে দেয়।”(Thomas P. Keirman, Aristotle Dictionary, Philosophical Library, New York 1962, P. 288).
এরিস্টোটলের ন্যায়বিচার সম্পর্কীয় ধারণাও প্রায় প্লেটোর অনুরূপ। তিনি বলেনঃ “ন্যায়বিচার হচ্ছে সেই গুণ যার ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী এবং আইন অনুযায়ী অধিকার লাভ করে।”(ঐ, পৃ. ৩১২)।
এখানে মর্যাদার শর্ত যোগ করে তিনি ন্যায়বিচার হতে সমতার মূলোৎপাটন করেছেন। দাসত্ব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি আরো অধিক স্পষ্টঃ “কিছু লোক স্বভাবতই স্বাধীন জন্মগ্রহণ করেছে এবং কিছু লোক গোলাম হিসেবে। শেষোক্তদের ক্ষেত্রে সংখ্যাধিক্য উপকারীও এবং ন্যায়সংগতও।”(ঐ, পৃ. ৩১২)।
তিনি স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত লোকদের এ অধিকার দেন যে, তারা এই অসংখ্য গোলাম নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিয়ে তাদেরকে কাজে নিয়োগ করবে এবং তাদের খাদ্য বস্ত্রের যোগান দিবে। ‘রাজনীতি’ গ্রন্থেই তিনি লিখেছেন, “বুদ্ধিমান ও প্রশস্ত হৃদয়ের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের এই অধিকার রয়েছে যে, তারা ক্রীতদাসদিগকে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিবে, তাদের কর্মে নিয়োগ করবে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দিবে।”(ঐ, পৃ. ৩৬৪)।
গোলামদের উপরই শুধু সম্ভ্রান্তদের এই অধিকার সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের উপরও তাদের মালিকানা রয়েছে। এরস্টোটল বলেনঃ “গরীব লোকেরা জন্মগতভাবেই ধনীদের গোলাম। সেও, তার স্ত্রীও, তার সন্তানরাও।”(ঐ, পৃ. ১৮৫)।
এরিস্টোটল ক্রীতদাসদের নাগরিক অধিকার দিতে প্রস্তুত নন। তার প্রদত্ত ‘নাগরিক’ এর সংজ্ঞা অনুযায়ী শুধু বাসস্থানের ভিত্তিতেই কোনো ব্যক্তি নাগরিক হয়ে যায়না। এই নীতি স্বীকার করে নিলে গোলাম ও স্বাধীন ব্যক্তি মর্যাদার দিক হতে সমান হয়ে যাবে। নাগরিক কেবল সেই ব্যক্তি যে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় কার্য্ক্রমের অংশগ্রহণ করে। আবার স্বাধীনও সেই ব্যক্তি যার পিতৃকূল ও মাতুল উভয়ই সম্ভ্রান্ত। “নাগরিক সেই ব্যক্তি যে পিতামাত উভয়ের দিক হতে নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে, না শুধু মায়ের দিক থেকে, অথবা পিতার দিক থেকে।”(ঐ, পৃ. ২০৭)।
মানুষ ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে এরিস্টোটল ও প্লেটোর এসব দৃষ্টিভঙ্গি হতে অনুমান করা যায় যে, ইউরোপের পথনির্দেশনার উৎস গ্রীসে মৌলিক মানবাধিকারের কি অবস্থা হয়ে থাকবে। রবার্ট এ ডেবি গ্রীকদের চিন্তাধারা ও মতবাদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেনঃ “তিন লাখ ক্রীতদাস এবং নব্বই হাজার নামমাত্র স্বাধীন নাগরিকের শহরে বসে প্লেটো কত মাহাত্মপূর্ণ ও অভিযোগপূর্ণ বাক্যে ‘স্বাধীনতার’ গুণ গেয়েছেন। (Dewery R.E., Freedom, The Macillan Co. London 1970, P. 347).
গ্রীসে ক্রীতদাসদের মর্যাদা বাকশক্তিহীন জীবের অধিক কিছু ছিলনা। তারা মানুষ হিসেবে গণ্য হতোনা। তারা যাবতীয় অধিকার হতে ছিল সম্পূর্ণ বঞ্চিত। মনীবের সেবাই ছিল তাদের একমাত্র কাজ। এই করুণ অবস্থার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সোচ্চার হন দার্শনিক যেনোর শিষ্যগণ। এই চিন্তাগোষ্ঠীর স্থপতি যেনো(Zeno)মানবীয় সাম্যের উপর জোর দেন এবং প্রাকৃতিক আইনের মতবাদ পেশ করেন। এই মতবাদ অনুযায়ী “প্রাকৃতিক বিধান হচ্ছে চিরন্তন। তার প্রয়োগ কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপরেই নয়, বরং প্রতিটি মানুষের উপর হয়ে থাকে। এটা নিরপেক্ষ আইনের তুলনায় উচ্চতর এবং ন্যায় ইনসাফের সেই সব মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যাকে ‘চেতনার চোখ’ দিয়ে সুস্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে। এই আইনের অধীনে অর্জিত প্রাকৃতিক অধিকারসমূহ কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের বিশেষ নাগরিকদের পর্য্ন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোনো স্থানে বসবাসকারী মানুষ কেবল মানুষ ও বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ হওয়ার ভিত্তিতে তা লাভ করে থাকে।” (Cranston M., Human Rights Today, London 1964, P.9).
যেনোর চিন্তাগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক অধিকারের মতবাদ রোমের চিন্তাবিদ ও আইন প্রণেতাগণকে বহুল প্রভাবিত করে এবং তারা নিজেদের আইন ও রাজনীতির দর্শনে, ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সমতা’র উপর অসাধারণ জোর দেন। পাশ্চাত্যবাসীগণ এটাকে যেনোর অনুসারীবর্গেরই প্রভাবের ফল বলে সাব্যস্ত করেন। কিন্তু বাস্তব ঘটনা তার বিপরীত। এটা ছিল ধর্মের দানকৃত চেতনা এবং তার শিক্ষার ফলশ্রুতি।
রোমের সুপ্রসিদ্ধ আইনবিদ সিসেরো-যিনি ছিলেন খৃস্টধর্মের অনুসারী-তিনি প্রাকৃতিক বিধানের মতবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ “এই বিধান সামগ্রিকভাবে প্রয়োগযোগ্য। এতে কখনও পরিবর্তন আসেনা। তা সর্বদা কায়েম থাকার উপযোগী। তার পরিবর্তন করা অপরাধ। এর কোনো অংশ রহিত করার চেষ্টা করার অনুমতি দেয়া যায়না। তাকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দেয়া সম্ভব নয়। সিনেট অথবা জনসাধারণের দ্বারা আমরা তার আনুগত্য হতে মুক্ত হতে পারিনা। রোম ও এথেন্সে পৃথক আইন হবে অথবা আজ ও কাল পৃথক হতে পারে, কিন্তু একটি স্থায়ী ও পরিবর্তনের অযোগ্য আইনই সব জাতি ও সব যুগের জন্য বৈধ ও কার্য্কর হতে পারে।”(Gouis Ezejiofor, Protection of Human Rights Under the Law, London 1964, p.4)।
তিনি নিজের চিন্তাধারার মূল উৎসের দিকে ইশারা করতে গিয়ে বলেনঃ “সকল জাতি ও সব যুগ একটি চিরস্থায়ী ও রচিত করার অযোগ্য বিধানের অনুসারী হবে। আল্লাহ ই সকল মানুষের জন্য সমান ও অভিন্ন, তিনিই তাদের প্রভু ও সম্রাট। তিনিই ঐ বিধানের প্রস্তাব করেন, আলোচনায় আনেন ও কার্য্কর করেন। এটা সেই বিধান যার অনুগত্য না করলে মানুষ স্বীয় প্রভুর বিরুদ্ধাচারী হয়ে যায় এবং যাকে মানব স্বভাব গ্রহণ না করলে তার কারণে কঠোর শাস্তি ভোগ করে। যদি সে তা থেকে রক্ষা পেয়েও যায় তবে মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী তাকে অন্য কোনো শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।”(A.K. Brohi, Fundamental Law of Pakistan, Karachi 1958, P.733)।
সিসেরো ও তার সমসাময়িক আইন প্রণেতাগণ নিজেদের রচিত বিধানে ব্যক্তি মালিকানার অধিকারকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছেন। ফলে তাতে একদিকে ব্যক্তির গুরুত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়েছে এবং অপরদিকে মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞার জন্য একটি ভিত্তি সরবরাহ হল। মৌলিক অধিকার আন্দোলন এর আসল সূচনা হয় ১১শ শতকে বৃটেনে-যেখানে ১০৩৭ সালে রাজা দ্বিতীয় কনরাড একটি ফরমান জারি করে পার্লামেন্ট এর ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেন। এই ফরমানের পরে পার্লামেন্ট তার ক্ষমতার পরিসর বৃদ্ধির চেষ্টা শুরু করে। ১১৮৮ খৃ. রাজা ৯ম আলফেনসোর দ্বারা অন্যায়ভাবে আটকের নীতিমালা পাস করিয়ে নেয়া হয়। ১২১৫ সালের ১৫ জুন ম্যাগনাকার্টা জারী হয় যাকে ওয়েলটার ‘স্বাধীনতার সনদ’ আখ্যায়িতে করেন। সন্দেহ নেই যে, বৃটেনে ম্যাগনাকারটা ছিল মৌলিক অধিকারসমূহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী দলীল। কিন্তু তার অর্থ অনেক পরে বের করা হয়েছে। তৎকালে এটা ছিল রাজন্যবর্গ(Barons)ও রাজা জন এর মধ্যকার একটি চুক্তিপত্র স্বরূপ-যার মাধ্যমে রাজন্যবর্গের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছিল, জনগণের অধিকারের সাথে এর সম্পর্ক ছিলনা। হেনরী মারশ বলেনঃ “বিরাট বিরাট ভূ-স্বামীদের একটি ঘোষণাপত্র ছাড়া তার আর কোনো মর্যাদা ছিলনা।”(Henry Marsh, Documents of Liberty, David & Charls, New Town Abbot, England 1971, P.51)।
১৩৫৫ খৃ. বৃটিশ পার্লামেন্ট ম্যাগনাকার্টার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে আইনগত সমাধান অন্বেষণের বিধান মঞ্জুর করে-যার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে বিচার বিভাগীয় কার্য্যক্রম ব্যতীত জায়গা-সম্পত্তি হতে বেদখল অথবা গ্রেফতার করা যেতনা এবং তাকে মৃত্যুদন্ডও দেয়া যেতনা।
১৪শ শতক হতে ১৬শ শতক পর্য্যন্ত ইউরোপে মেকিয়াভেলির দর্শনের জয়জয়কার ছিল, যিনি স্বৈরতন্ত্রের হাত শক্ত করেছিলেন, রাজাদের শক্তি যুগিয়েছিলেন এবং ক্ষমতা দখলকে জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত করেন। ১৭শ শতকে মানুষের প্রকৃতিগত অধিকারের মতবাদ পুনরায় পূর্ণ শক্তিতে উত্থিত হয়। ১৬৬৯ খৃ. বৃটিশ পার্লামেন্ট অন্যায় আটকাদেশের বিধান মঞ্জুর করে যার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। ১৬৮৪ খৃ. বিপ্লবী বাহিনী বৃটিশ পার্লামেন্ট এর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির কর্তৃত্বের সীমা নির্ধারণ করে দেয়। ১৬৮৯ খৃ. পার্লামেন্ট বৃটেনের সাংবিধানিক ইতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দলীল ‘অধিকার আইন’(Bill of Rights)মঞ্জুর করে। লর্ড একটোনের ভাষায়ঃ“এটি ইংরেজ জাতির মহত্ত্বম অবদান”।এই বিলকে বৃ্টেনে স্বাধীনতা আন্দোলনের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ এর সাহায্যে মৌলিক অধিকারসমূহ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। ১৬৯০ সালে জন লক ১৬৮৮-৮৯ সালের বিপ্লবের বৈধতার সমর্থনে Treaties on Civil Government গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে তিনি সামাজিক চুক্তির মতবাদ পেশ করেন এবং ব্যক্তির অধিকারসমূহের সমর্থনে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করেন। ১৭৬২ খৃ. খ্যাতিমান ফরাসী দার্শনিক রুশো(১৭১২-৭৮) ‘সামাজিক চুক্তি’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যার মধ্যে হবস ও লক এর পেশকৃত সামাজিক চুক্তির একটি নতুন দৃষ্টিকোণ হতে মূল্যায়ণ করা হয়। তিনি হবস এর ‘সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ’ এবং লক এর ‘গণতন্ত্রের’ মধ্যে ঐক্যের সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তার মতবাদ কেবল ফরাসী বিপ্লবের পথই সমতল করেনি, বরং গোটা ইউরোপের রাজনৈতিক চিন্তাধারার উপরও গভীর প্রভাব ফেলে এবং সরকার কর্তৃক ব্যক্তির অধিকার স্বীকার করিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৭৭৬ সালের ১২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ভার্জিনিয়া হতে জর্জ ম্যাশন রচিত অধিকার সনদপত্র ঘোষিত হল, যার মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা এবং আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। ১৭৭৬ সালের ১২ই জুলাই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। এর খসড়া তৈরি করেছিলেন টমাস জেফারসন এবং এর অনেক মূলনীতি ইংরেজ চিন্তাবিদগণ বিশেষ করে জন লক-এর মতবাদের উপর ভিত্তিশীল ছিল। এই ঘোষণাপত্রের প্রারম্ভে প্রাকৃতিক বিধানের বরাতে বলা হয়েছে যে, “সকল মানুষ সমান সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদেরকে তাদের স্রষ্টা অভিন্ন অধিকার দান করেছেন-যার মধ্যে জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সুখের সন্ধান করার অধিকারসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”
১৭৮৯ খৃ. আমেরিকার কংগ্রেস আইন কার্য্কর করার তিন বছর পর তাতে এমন দশটি সংশোধনী মঞ্জুর করে যা ‘অধিকার আইন’ নামে প্রসিদ্ধ। একই বছর ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ ‘মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র’ অনুমোদন করে। ১৭৯২ সালে টমাস পেইন তার বিখ্যাত পুস্তিকা The Rights of Man প্রকাশ করেন, যা পাশ্চাত্যবাসীর চিন্তার উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং মানবাধিকার সংরক্ষণের আন্দোলনকে আরো সামনে এগিয়ে দেয়। ১৯শ ও ২০শ শতকে বিভিন্ন দেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকারসমূহের সংযোজন একটি সাধারণ প্রথায় পরিণত হয়। ১৮৬৮ খৃ. আমেরিকার সংবিধানে চতূর্দশ সংশোধনী অনুমোদন করা হয়, যাতে বলা হয়েছে যে, আমেরিকার কোনো অঙ্গরাজ্যই আইনগত নীতিমালার অনুসরণ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন, স্বাধীনতা, মালিকানা হতে বঞ্চিত করতে পারবেনা এবং তাকে আইনের পক্ষপাতহীন নিরাপত্তা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেনা।
১ম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানী সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানে মৌলিক অধিকারসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪০ খৃ. প্রখ্যাত সাহিত্যিক এইচ.জি.ওয়েলস. তাঁর New World Order গ্রন্থে মানবাধিকারের একটি সনদপত্র ঘোষণার পরামর্শ পেশ করেন। ১৯৪১ সালের জানুয়ারীতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট কংগ্রেসের নিকট চারটি স্বাধীনতার সমর্থন করার জন্য আবেদন করেন। ১৯৪১ মাসের আগস্ট মাসে আটলান্টিক ঘোষণায় দস্তখত করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল চার্চিলের ভাষায় “মানবাধিকারের ঘোষণার সাথে সাথে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি।”
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর লিখিত সংবিধানে মৌলিক অধিকারের সংযোজন আরো সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে। ফ্রান্স তার ১৯৪৬ সালের সংবিধানে ১৭৮৯ সালের মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র শামিল করে। একই বছর জাপান মৌলিক অধিকারকে সংবিধানের অংশে পরিণত করে। ১৯৪৭ সালে ইটালী তার সংবিধানে মানবাধিকারের গ্যারান্টি দান করে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকারের পক্ষে পরিচালিত চেষ্টা সাধনার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্য্ন্ত ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ‘মানবাধিকার সনদ’ ঘোষিত হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত অধিকারসমূহ অথবা মানুষের চিন্তায় উত্থিত হতে পারে এমন অধিকারসমূহ শামিল করা হয়। সাধারণ পরিষদে মতামত যাচাইয়ের সময় এই ঘোষণার অনুকূলে ৪৮ ভোট পড়ে। ৮টি দেশ মতামত যাচাইয়ে অংশগ্রহণ করেনি যার মধ্যে রাশিয়াও ছিল। এই ঘোষণাপত্র কতটা কার্য্কর হচ্ছে তা মূল্যায়নের জন্য এবং তার সংরক্ষণ অথবা নতুন অধিকারসমূহ চিহ্নিত করার জন্য প্রস্তাব পেশের উদ্দেশ্যে মানবাধিকার কমিশন নামে একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করা হয়।
মৌলিক অধিকারের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের পর এখন আমরা বিষয়টির তাত্ত্বিক ও বাস্তব দিকসমূহের মূল্যায়ন করে দেখব যে, পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের অধিকারের ধারণার এবং এসব অধিকারের উৎস কি? এসব অধিকার দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করায় অথবা একটি বিশ্ব মানবাধিকার সনদ রচনা ও মঞ্জুর করায় বাস্তবে কি এসব অধিকার সংরক্ষণের সন্তোষজনক গ্যারান্টি সরবরাহ করা হয়েছে? দেশের সংবিধান ও বিশ্ব মানবাধিকার সনদ কি ব্যক্তিকে একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের নখরদন্ত হতে মুছে দিতে ও স্বৈরতন্ত্রের চাকার নিষ্পেষণ হতে রক্ষা করতে কোনো কার্য্কর নিরাপত্তার উপায় প্রমাণিত হয়েছে? বিশ শতকের মানুষেরা বাস্তবিকই কি দ্বাদশ অথবা ষোড়শ শতকের গোলাম ও নির্যাতিত মানুষগুলোর চেয়ে অধিক নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করছে?

অধিকারের পাশ্চাত্য ধারণা

মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি মূলত এ জগতে মানুষের মর্যাদা, তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্কের ধরন এবং স্বয়ং এ বিশ্বজগতের সৃষ্টি এবং তার সূচনা ও পরিণতির তাৎপর্য্ কে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার সাথে সংশ্লিষ্ট। মানুষের অধিকারগুলো কি? উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর ততক্ষণ পর্য্ন্ত সম্ভব নয় যতোক্ষণ পর্য্ন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌছা যাবেনা যে, পৃথিবীতে শেষ পর্য্ন্ত মানুষের মর্যাদা কি? অর্থাৎ অধিকারের প্রশ্ন মর্যাদার সাথে সংশ্লিষ্ট। মানুষের মর্যাদা অবগত না হয়ে বা এ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌছে আমরা তার অধিকারগুলো চিহ্নিত করতে পারিনা।
মানব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধানের পথনির্দেশ আমরা কেবল ওহীভিত্তিক ধর্মগুলো হতে পেতে পারতাম। কারণ আমাদের নিকট জ্ঞানের অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় বর্তমান ছিলনা। কিন্তু মানুষ যখন ওহীর মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞানকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির সহায়তায় এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করে তখন এখান হতেই ধারণা-অনুমান ও কল্পনার ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়ার এবং অজ্ঞতার মরিচীকায় হোঁচটের পর হোঁচট খাওয়ার সূচনা হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর ইন্দ্রিয়ের উপর ভিত্তিশীল অভিজ্ঞতা ও পর্য্যবেক্ষণের আওতার অনেক দূরে ছিল। লিখিত ইতিহাস-যা এই পৃথিবীতে মানব জীবনের সূচনার লাখো বছর পরে অস্তিত্ত্ব লাভ করেছে-এসব সত্য পর্য্ন্ত পৌছতে নিজের রেকর্ডে কোনো তথ্য পেশ করতে অক্ষম ছিল। এই গভীর অন্ধকারে ওহীর আলো হতে বঞ্চিত এবং সত্যের সাথে অপরিচিত জ্ঞান যখন ফিকির-ফন্দী ও চাতুরীর দ্বারা জীবনের জটিল সমস্যাগুলোর জট খুলতে চেষ্টা করে তখন সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন মুহুর্তটি সামনে এলো যে, কোথা থেকে আলোচনার সূচনা করা যায়? জ্ঞান-বুদ্ধির সামনে যেহেতু গ্রহণযোগ্য স্বতঃসিদ্ধসমূহ ছিলনা যেগুলির ভিত্তিতে তারা যুক্তিপ্রমাণ দাঁড় করাতে পারত, তাই বাধ্য হয়ে তাদেরকে সূচনাবিন্দু হিসেবে স্বকগোলকল্পিত থিসিস, আদর্শ ও তত্ত্ব কায়েম করে তার উপর আলোচনার ভিত্তি রাখতে হয়। বুদ্ধিতো এভাবে একটি অনির্ভরযোগ্য বিশ্বাস ও কল্পনার উপর ভিত্তিশীল আলোচনার পথ অবলম্বন করে নিজের সমস্যা দূর করলো, কিন্তু সে মানবজাতির সামনে উদ্ভূত সমস্যাবলীর কোনো সন্তোষজনক সমাধান খুঁজে বের করায় সাফল্য লাভ করতে পারল না। তার পেশকৃত অস্পষ্টতা, অসংলগ্নতা, স্ববিরোধিতা এবং গুরুতর চিন্তা ও মতবাদের বোঝা এই সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলল। আর এভাবে মানবতা অজ্ঞতা আর নির্বুদ্ধিতার আবর্তে ফেঁসে যেতে থাকে। কুরআন মজীদ জ্ঞান বুদ্ধির এই দৈন্যদশার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেঃ
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ [٦:١١٦]
“আর(হে মুহাম্মাদ) যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যূত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরণ করে। তারা কেবল অনুমানভিত্তিক কথা বলে।”(সূরা ৬, আনআম: আয়াত ১১৬)।
قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا ۖ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ [٦:١٤٨]
“(তাদের) বল, তোমাদের নিকট কি কোনো জ্ঞান আছে? থাকলে তা আমাদের সামনে পেশ কর। তোমরা শুধু কল্পনারই অনুসরণ কর এবং শুধু মিথ্যাই বল।”(আনআমঃ ১৪৮)।
জ্ঞানের পরিভ্রমণ যেহেতু অজ্ঞতার অন্ধকারে শুরু হয়েছিল তাই তার কল্পিত প্লটসমূহের ভিত্তি নেই। তা অনুমানে সামনে অগ্রসর হয় এবং সমাধানের প্রচেষ্টায় নিত্য নতুন জটিলতার সৃষ্টি করতে থাকে। সে মানবজাতির মৌলিক অধিকারসমূহের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলে সে ক্ষেত্রেও তাকে অনুমিতি ও মতবাদের আশ্রয় নিতে হয়। মৌলিক অধিকারসমূহের ব্যাপারে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন দেখা দেয় তা এই যে, এসব অধিকারের শেষ পর্য্ন্ত বৈধতা কি? কিসের ভিত্তিতে মানুষের জন্য কতিপয় অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হবে আর স্বীকার করে নেওয়া হলেও তা কোন্ কর্তৃপক্ষের নির্দেশের প্রেক্ষিতে? এসব অধিকার শেষ পর্য্ন্ত কার কাছ হতে প্রদত্ত?
জ্ঞান বুদ্ধি বহুত চিন্তা ভাবনার পর উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর এই খুঁজে নেয় যে, স্বয়ং প্রকৃতি মানুষকে কতিপয় অধিকার প্রদান করেছে তাই তা স্বীকার করে নেওয়া উচিত। এই মতবাদকে ‘প্রকৃতি প্রদত্ত অধিকারের মতবাদ’ নাম দেওয়া যায়। এর বিরুদ্ধে আপত্তি উঠল যে, এই পরিভাষা অস্পষ্ট, সুস্পষ্ট নয়। স্বয়ং ‘প্রকৃতি’ শব্দের আজ পর্য্ন্ত কোনো সুস্পষ্ট ও সর্বসম্মত অর্থ পেশ করা সম্ভব হয়নি। তাই প্রাকৃতিক অধিকারসমূহ কিভাবে নির্ধারিত হবে? সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এই ছিল যে, এসব অধিকারের আইনগত মর্যাদা কি? অধিকারের ধারণা তো সমাজে তার অনুমোদনের দ্বারাই করা যেতে পারে। সমাজের অনুমোদন ব্যতীত আবার অধিকারের প্রশ্ন কেমন?
তখন এসব অধিকারের আইনগত মর্যাদাদানের জন্য এবং সমাজের অনুমোদন লাভের জন্য ‘সামাজিক চুক্তি’ মতবাদ আবিষ্কার করা হল এবং দাবী করা হল যে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্ব যেহেতু এই চুক্তির ফলশ্রুতি তাই শাসন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও নাগরিকদের অধিকারের আসল উৎস এটাই। অধিকারের জন্য একটি আইনগত বৈধতা সরবরাহের প্রয়োজন এভাবে পূরণ করা হল। কিন্তু এই চুক্তির ঐতিহাসিক মর্যাদা কি? জে.ডব্লিউ.গফ এর মুখে শুনুনঃ “ব্লাকস্টোন ও পেলী হতে মেইন ও তার অনুসারীদের পর্য্ন্ত গোটা ঐতিহাসিক চিন্তাগোষ্ঠীর বক্তব্য হল এবং আজ তা সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য্য যে, এটা এক ঐতিহাসিক সত্য যে, রাষ্ট্রসমূহ ও সরকারসমূহ স্বেচ্ছায় কোনো চুক্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করেনি, বরং প্রাকৃতিকভাবে একটি বংশ বা গোত্রের আকারে প্রাথমিকভাবে দলবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”(J.W. Gough, The Social Contract, Clarendon Press, Oxford 1967, P.4)।
প্রফেসর ইলিয়াস বলেনঃ “সামাজিক চুক্তি মতবাদ কি পুরোটাই অনৈতিহাসিক? এটা কি সম্পূর্ণই কল্পকাহিনী? এটা কি সামগ্রিকভাবে ভিত্তিহীন এবং শুধু তাত্ত্বিক? এসব প্রশ্নের সবসময় ইতিবাচক উত্তর দেওয়া হয়েছে এবং আজ পর্য্ন্ত কেউ বলেনি য, ‘না’। এই গোটা মতবাদ যখন আরো বিস্ময়কর রূপ ধারণ করে যখন বলা হয়, এটা তো ততই পুরাতন যত পুরাতন ধারণা-অনুমান ও কল্পনাবিলাস। তাই অনৈতিহাসিক হওয়া সত্ত্বেও এর নিজস্ব ইতিহাস আছে। অনৈতিহাসিক বলতে আমরা বুঝাতে চাচ্ছি যে, মানবজাতির গোটা রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা এমন কোনো একটি ঘটনা অথবা এমন একটি উদাহরণও পাচ্ছিনা যেখানে রাষ্ট্র গঠনের জন্য সামাজিক চুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছিল।(Ilyas Ahmad, The Social Contract and the Islamic State, Urdu Publishing House, Allahabad 1944, p1)।
প্রশ্ন হচ্ছে-যে মতবাদ এতটা ভিত্তিহীন, যার অবস্থা একটি কল্পকাহিনীর অধিক নয় এবং স্বয়ং পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ যাকে সর্বসম্মতভাবে অনৈতিহাসিক সাব্যস্ত করেছেন তাকে এতটা গুরুত্ব কেন দেওয়া হলো এবং তার ভিত্তির উপর অধিকারের ধারণার গোটা ইমারত কেন নির্মাণ হল? এর কারণ স্বয়ং পাশ্চাত্যবাসীদের মুখেই শোনা যাকঃ “এই মতবাদ ১৬শ ও ১৭শ শতকে ঠিক সেই সময়ে আত্মপ্রকাশ করে যখন রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যার জন্য এরূপ একটি মতবাদের প্রয়োজন হয়েছিল।(Gaius Ezejiofor, Protection of Human Rights under the Law, London 1964, p.3)।
এই চুক্তিটি আসলে নিজ মতবাদকে বৈধতা প্রদানের অথবা আইনগত ভিত্তি সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে ‘আবিষ্কার’ করা হয়েছে। জে ডব্লউ গফ এ চুক্তির আসল গুরুত্ব সম্পর্কে লিখেছেনঃ “এই মতবাদ অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক পরিণামফলের বাহক। সামাজিক চুক্রি শর্তাবলী অথবা তার মিথ্যা বা সত্য হওয়ার প্রশ্নের থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই মূলনীতি যাকে চুক্তির সমর্থকগণ উন্নত করার ও বহাল রাখার জন্য চেষ্টা চরিত্র করছেন।”(জে.ডব্লউ গফ, পূ.গ্র. পৃ.৬)।
“সামাজিরক চুক্তির পরিভাষাকে যদি বহাল রাখতেই হয় তবে তার সর্বোত্তম পন্থা হবে এই যে, তাকে চুক্তিতে পেশকৃত ধারণা অনুযায়ী রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার সাথে সংশ্লিষ্ট মতবাদের একটি শব্দসংক্ষেপ মনে করতে হবে।”(ঐ, পৃ. ২৪৮)।
“একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ‘সামাজিক চুক্তি’কে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তার আধুনিক পতাকাবাহীগণ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজেদের এই দাবী পর্য্ন্ত সীমাবদ্ধ করে নিয়েছেন যে, এই চুক্তি হল রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি। এই দাবীও কয়েকটি আকার ধারণ করেছে। কেন্ট এর মতে এই দেওয়া যেতে পারে যে, ‘চুক্তিটি যেন ঐতিহাসেক দিক হতে কাল্পনিক, কিন্তু বুদ্ধির ধারণা হতে তা বৈধ। এর অর্থ আমাদের মতে এই যে, রাজনৈতিক অধিকার ও কর্তব্যসমূহ বিধিবদ্ধ ও সুসংবদ্ধ হওয়া উচিত।”(ঐ, পৃ. ২৪৪)।
উল্লেখিত উদ্ধৃতিসমূহ হতে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সামাজিক চুক্তিকে একটি কাল্পনিক মতবাদ মনে করা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যবাসী তা প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত নয় কেন। তারা এটা ত্যাগ করলে অধিকার ও কর্তব্যসমূহকে বিধিবদ্ধ করার সমর্থনে কোনো জিনিস তাদের নিকট অবশিষ্ট থাকেনা। এই অসহায় অবস্থার কথা সামনে রেখে স্যার আরনেস্ট বারকার সামাজিক চুক্তির সমর্থনে লিখেছেনঃ “এই মতবাদের সমর্থনে আজো অনেক কিছু বলা যায়। রাষ্ট্র-যা সমাজ হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি আইনানুগ সংস্থা যা মৌলিকভাবে চুক্তির ‘অনুমিতি’র উপরই প্রতিষ্ঠিত।”(ঐ, পৃ. ২৫০)।
এই চুক্তির আবিষ্কারের ফলে মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার বৈধতা তো সরবরাহ হলো, কিন্তু এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসে উপস্থিত হয়। সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ কে? রাষ্ট্র না জনগণ? অধিকার ও ক্ষমতার দিক দিয়ে এদের মধ্যে সর্বময় কর্তৃত্ব কে পাবে?
সামাজিক চুক্তিকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে উপরোক্ত প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ যুগের দাবী ও বিশেষ প্রয়োজন সামনে রেখে হবস এর উদ্দেশ্য ছিল-স্টুয়ার্ট রাজাদের একচ্ছত্র শাসনের জন্য আইনগত বৈধতা সরবরাহ করা। অতএব তিনি সামাজিক চুক্তির পূর্বেকার বিশ্বের অবস্থার চিত্র নিজের প্রয়োজন মাফিক অংকন করেন। তিনি শাসকদেরকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সাব্যস্ত করে সমস্ত কর্তৃত্ব তাদের হাতে তুলে দেন এবং অসহায় ও ক্ষমতাহীন জনগণের জন্য বিনাবাক্য ব্যয়ে ও নিঃশর্তভাবে এসব শাসকের আনুগত্য বাধ্যতামূলক করে দেন।
১৬৮৮ খৃ. গৌরবময় বিপ্লব যখন একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে দিলো এবং অধিকার বিলের মাধ্যমে পার্লামেন্ট ও জনগণের অধিকার ও ক্ষমতা কিছুটা বর্ধিত হলে জন লক নতুন পরিস্থিতির বৈধতার জন্য এই সামাজিক চুক্তির একটি নতুন ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়োজন অনুভব করেন। অতএব তার কল্পনা বিশ্ব পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ভিন্নতর চিত্র পেশ করে, যার মধ্যে মানবজাতির জীবন ‘একাকী, দারিদ্র্যপীড়িত, মানবেতর, পশুসুলভ ও সংক্ষিপ্ত’ ছিলনা, বরং হবস এর দাবীর বিপরীতে তা ছিল নিরাপদ, সুখ-সমৃদ্ধির, পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার যুগ। তখন মানুষ স্বাধীনতা ও সাম্যের নীতিমালার উপর বড়ই সুখের ও আনন্দময় জীবনযাপন করছিল। লক এই প্রেক্ষাপটসহ সামাজিক চুক্তির নতুন ব্যাখ্যায় সর্বোচ্চ ক্ষমতা বাদশাহ ও জনগণের মধ্যে বন্টন করে দেন এবং জনগণকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেন তাদের সম্মতি ব্যতিরেকে কোনো রাজাই শাসন ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে না।
ফরাসী চিন্তাবিদ রুশোর যুগ আসতে আসতে যেহেতু রাজা ও জনগণের মধ্যে অধিকার ও ক্ষমতার দ্বন্ধ নিজেদের ক্রমোন্নতির পর্যায়সমূহ অতিক্রম করে এক সিদ্ধান্তকর স্তরে প্রবেশ করেছিল, তাই গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে বলিষ্টতা দানের জন্য এবং একনায়কতন্ত্রী রাজত্বের সর্বশেষ আঘাত হানার জন্য সামাজিক চুক্তির আবারও একটি নতুন ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়োজন হয়ে পড়ল। তাই রুশো তার যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা এবং নতুন দাবীসমূহ সামনে রেখে বিশ্ব পরিস্থিতির বড়ই আকর্ষণীয় দৃশ্য তুলে ধরলেন এবং সামাজিক চুক্তির এমন ব্যাখ্যা দিলেন যা সর্বময় ক্ষমতার রাজমুকুট রাজার মাথা হতে তুলে নিয়ে জনগণের মাথায় স্থাপন করে।
সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারীর প্রশ্নটি যেহেতু রাষ্ট্র ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহের নির্ণয়ের সাথে সম্পর্কিত তাই হবল, লক এবং রুশো ছাড়াও অপরাপর সকল রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, আইনবিদগণও এ সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে Grotius, Bodin, Austin, Bentham, Laski, T.H. Green এবং Dicey বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের সকলের সম্মিলিত চিন্তার ফলাফলের পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রফেসার ইলিয়াস আহমেদ বলেনঃ “রাজনৈতিক দর্শনে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে দ্বারে দ্বারে হুমড়ি খেতে দেখা যাচ্ছে। কখনও তা এক ব্যক্তি হতে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং কখনও অসংখ্য ব্যক্তির হাতে, কখনও ব্যক্তির হাত হতে সমাজের হাতে, কখনও সংখ্যাগুরুদের কাছ হতে সংখ্যালঘুদের কাছে, কখনও সংখ্যালঘুদের কাছ হতে সংখ্যাগুরুদের কাছে, কখনও প্রশাসন হতে আইন পরিষদের কাছে, কখনও আইন পরিষদ হতে বিচার বিভাগের কাছে এবং অবশেষে সমাজের নিকট হতে পুনরায় রাষ্ট্রের অখন্ড দর্শনের দিকে।” (ইলিয়াস আহমাদ, Sovereignty-Islamic & Modern, The Allies Book Corporation, Karachi)।
প্রাকৃতিক অধিকার মতবাদ থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের এই আলোচনা পর্য্ন্ত অধ্যয়ন করলে যে সত্য প্রতিভাত হয় তা এই যে, পাশ্চাত্যের সমস্ত কাজ ধারণা অনুমান এবং তার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত মতবাদের সহায়তায় চলছে। পাশ্চাত্যে যেহেতু মানুষের যথার্থ মূল্যায়ন ও মর্যাদা সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার ধারণা বিদ্যমান নেই, তাই তার জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত মৌলিক বিষয়ে চিন্তাগত জটিলতা লক্ষ্য করা যায়। অন্যান্য বিষয়ের মত মৌলিক অধিকারসমূহ নির্ধারণের বিষয়টিও ঐ ত্রুটিপূর্ণ চিন্তাদর্শনের শিকার।
পাশ্চাত্য অধিকারসমূহ কোনো স্থায়ী মূল্য ও মর্যাদার বাহক নয়। তাদের কোনো স্থায়ী ও বিশ্বজনীন উৎস ও মানদন্ড ও নাই। সমস্ত উৎস হয় কাল্পনিক, অন্যায় আটকাদেশ আইন, ম্যাগনাকার্টা, অধিকার বিল, ফ্রান্সের মানবাধিকার সনদ এবং আমেরিকার আইনের দশটি সংশোধনীর মত দলীলের বান্ডিল, যার ধরন আঞ্চলিক এবং যা বৃটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি। এখানে মৌলিক অধিকারের ধারণা মানব চেতনার ক্রমোন্নতির সাথে সাথে উত্থিত হয় এবং এসব অধিকার জনসাধারণ ও বাদশাহ বা শাসকদের মধ্যে ক্ষমতা বন্টনের দীর্ঘ সংঘাতকালে অস্তিত্ব লাভকারী চুক্তিসমূহ, পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তসমূহ, ঘোষণাপত্র এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদগণের পেশকৃত মতবাদের পেট থেকে একে একে জন্ম নিয়েছে। এই সংঘাত যতই ভয়ংকর হতে থাকে অধিকারের পরিসরও ততই প্রশস্ত হতে থাকে। আজ যেগুলোকে মৌলিক অধিকার বলা হচ্ছে তা গতকাল পর্য্ন্ত মৌলিক অধিকার ছিলনা, আর যদিই বা ছিল তবে একটি আকাংখার পর্যায়ে ছিল, যার পেছনে কোনো বলবৎকারী শক্তি ছিলনা। এসব অধিকার তখনই অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে যখন দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান তা মেনে নিয়েছে বৈধতার সনদ সরবরাহ করে।
এখন অধিকারের পাশ্চাত্য ধারণার আরেকটি দিক মূল্যায়ন করে দেখা যাক। পাশ্চাত্যবাসীরা যদিও নিজেদেরকে গোটা মানবজাতির জন্য পতাকাবাহী মনে করে কিন্তু তাদের কার্য্কলাপ এর বিপরীত। তাদের অধিকারের ধারণা তাদের জাতীয়তাবাদী মতবাদ ও গোত্রীয় স্বাতন্ত্র্যের উপর ভিত্তিশীল। তারা নিজস্ব সম্প্রদায় বা শ্বেতাঙ্গদের জন্য যেসব মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি চায়, অপরাপর সম্প্রদায় ও গোত্রকে সেসব অধিকারের হকদার মনে করেনা। ফ্রান্সের মানবাধিকার সনদকে যখন ১৯৭১ সালের আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তখন সাথে সাথে একথাও পরিষ্কার বলে দেয়া হয় যে, “যদিও উপনিবেশগুলো এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় ফ্রান্সের অধিকারভুক্ত দেশগুলো ফরাসী রাষ্ট্রের একটি অংশ কিন্তু এই আইন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেনা।”(Vyshinsky, Andrie Y., The Law of the Soviet State, The Macmillan Co., New York 1948, P. 555)।
এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যে সনদকে মানবাধিকার সনদ বলা হচ্ছে তা মূলত ফরাসী জনগণের অধিকারের সনদ। অপর কোনো জাতির এমনকি স্বয়ং ফরাসী দখলভুক্ত দেশসমূহের অধিবাসী অফরাসী জনগণের এসব অধিকার দাবীর কোনো সুযোগ নেই। অতএব রুশোর স্বদেশীরা আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দখলীকৃত এলাকায় এসব অধিকার দাবীকারী জনগণের সাথে যেরূপ পাষন্ডের মত বর্বর আচরণ করছে তা বর্তমান কালের ইতিহাসের এক কৃষ্ঞতম অধ্যায় হয়ে আছে।
বৃটেনেরও এই একই অবস্থা। তার অলিখিত সংবিধানে বৃটিশ জনগণের যে সকল অধিকার স্বীকৃত তা ইংরেজ মনিবগণ নিজেদের উপনিবেশসমূহে স্বয়ং তাদেরই রচিত বিধানে অন্তর্ভুক্ত হতে দেয়নি। তাদের ম্যাগনাকারটা, তাদের অন্যায় আটকাদেশ বিরোধী আইন এবং তাদের অধিকার আইন ছিল তাদের জন্য সীমিত। অতএব তাদের ঐগুলোকেও মানবাধিকারের সনদ হিসেবে স্বীকার করাটা সম্পূর্ণ ভুল। এসব দলীলের মাধ্যমে প্রাপ্তব্য অধিকার শুধু বৃটেনের নাগরিকদের পর্য্ন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। অন্য কোনো জাতি স্বয়ং বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীর নিকট এসব অধিকার দাবী করলে তাকে বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত করে জুলুম-নির্যাতন ও বর্বরতার শিকারে পরিণত করা হয়েছে। আজও দক্ষিণ আফ্রিকার কালো চামড়ার অধিবাসী এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের শাসিত সাদা চামড়ার অধিবাসীদের সাথে যে আচরণ করা হচ্ছে তা মানবাধিকার সম্পর্কে ইংরেজদের দ্বিমুখীপনার জ্বলন্ত প্রমাণ।
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যখন বর্ণবৈষম্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ সাব্যস্ত করার জন্য একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে তখন তার চারজন বিরোধীর মধ্যে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পর্তুগালের সাথে বৃটেনও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আমেরিকার অবস্থা বৃটেন ও ফ্রান্স হতে ভিন্নতর নয়। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ঐ মহাদেশের মূল বাসিন্দা রেড ইন্ডিয়ানদের গোটা সম্প্রদায়কেই দুনিয়ার বুক হতে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। নিজেদের নতুন বিশ্ব গড়ার ও তার উন্নতি সাধনের জন্য তারা আফ্রিকা মহাদেশের কৃষাঙ্গ অধিবাসীদের পশুর মত ধরে নিয়ে নিজেদের দাসে পরিণত করে এবং জাহাজ বোঝাই করে আমেরিকায় নিয়ে যায়। এসব গোলাম যথারীতি ক্রয় বিক্রয় হতো। আফ্রিকার যে উপকূল হতে তাদের জাহাজ বোঝাই করা হতো তার নামই হয়ে গেছে দাস উপকূল(Slave Coast)। এই আমদানীকৃত গোলামদের যে বংশধর এখনো অবশিষ্ট রয়ে গেছে তারা আজ পর্য্ন্ত সমান অধিকার লাভ করতে পারেনি। তারা যখনই আমেরিকার সংবিধানে প্রদত্ত ‘মানবাধিকার’ এর উল্লেখপূর্বক নিজেদের জন্য এসব অধিকার কার্য্কর করার দাবী জানিয়েছে তখনই তাদের অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে। এই বাস্তব চিত্র সম্পর্কে রবার্ট ডেবির ভৎসর্ণাপূর্ণ বাক্য লক্ষ্যণীয়ঃ “পাঁচ লাখ গোলাম এবং হাজার হাজার আমদানীকৃত শ্বেতাঙ্গ সেবকদের কলোনীতে বসে গোলামদের এক ধনবাদ মনিব টমাস জেফারসন কত বাহাড়ম্বর সহকারে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার স্মৃতিচারণ করেছেন।”(R.E. Dewey, Freedom, P. 347)।
এই অভ্যন্তরীণ বর্ণবৈষম্যের কথা বাদ দিয়ে এখন বহির্বিশ্বে আমেরিকার ভূমিকার মূল্যায়ন করলে আরও ভয়ঙ্কর দৃশ্য সামনে আসে। হিরোশিমা, নাগাসাকি, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র আমেরিকার হাতে ‘মৌলিক মানবাধিকার’ পদদলিত করার হৃদয়বিদারক কাহিনীর বর্ণনা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে।
এখন পাশ্চাত্যের মানবাধিকারের চতূর্থ পতাকাবাহী কম্যুনিস্ট রাশিয়ার ভূমিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাক। এটা সেই সমাজতন্ত্রের দোলনা-মার্কিন ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও যেকোনো প্রকারের আধিপত্যবাদ হতে মুক্তিদানের পতাকা নিয়ে যার উত্থান হয়েছিল এবং যা মানবজাতিকে নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও প্রকৃত স্বাধীনতার সুখ আস্বাদন করানোর তরী বসিয়েছিল। প্রথম বারের মত সে যখন ক্ষমতাসীন হওয়ার সুযোগ পেল তখন তার রঙিন ঊষা পৌনে দুই কোটি মানুষের লাশের সুউচ্চ পাহাড়ের পর্দা ভেদ করে উদিত হল এবং তার আলোকরশ্মি পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়লে হাঙ্গেরী, পূর্ব জার্মানী, পোল্যান্ড, চেকোশ্লাভাকিয়া, দখলকৃত তুর্কিস্থান এবং সেসব এলাকায় রক্তের নদী প্রবাহিত হল যেখানে কমিউনিজম অনুপ্রবেশের সুযোগ পেল। রুশ সমাজতান্ত্রিক ও দার্শনিক প্রফেসর পিটিরিমি সরনিক রুশ বিপ্লবে মানুষের জীবননাশের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ
“১৯১৮-২২ সালের বিপ্লবে সরাসরি সংঘর্ষে প্রায় ৬ লাখ লোক প্রাণ হারায়। প্রতি বছর গড়ে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়। গৃহযুদ্ধে নিহত ও পরোক্ষ আক্রমণে নিহতদের যোগ করা হলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় এক কোটি পঞ্চাশ লাখ হতে এক কোটি সত্তর লাখ।” (Soronik Pitirim A, The Crisis of Our Age, E.P. Duttan & Co., New York 1951, p. 229)।
লাল বিপ্লবের খুনী চেহারা দেখে যেসব লোক জীবন বাঁচানোর জন্য দেশ হতে পলায়ন করে তাদের যথারীতি সত্যিকার সংখ্যা বিশ লাখ।(Encyclo Britannica, 15th Ed., Vol 16, P. 71)।
এসব ঘটনা হতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, পাশ্চাত্য দেশসমূহের অধিকারের ধারণা মানবীয় নয়, বরং গোত্রীয়, আঞ্চলিক, জাতীয়তাবাদী ও তাত্ত্বিক গোঁড়ামীর দোষে দুষ্ট। তারা নিজেদের জন্য যেসব অধিকার অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করে তাকে অন্যদের পর্য্ন্ত বিস্তারিত করাতো দূরে কথা-অন্যরা যাতে এসব অধিকার অর্জন করতে না পারে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে।

অধিকারের সমাজতান্ত্রিক ধারণা

অধিকারের পাশ্চাত্য ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করার সাথে সাথে অধিকারের সমাজতান্ত্রিক ধারণা সম্পর্কেও কিছুটা আলোচনার অবতারণা করা সঙ্গত মনে হয়। কার্লমার্ক্স ও লেনিনের পেশকৃত মতবাদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের আসল উৎস ইতিহাসের দ্বান্ধিক সংঘাত। এসব অধিকার প্রকৃতি প্রদত্ত নয়, বরং ঐ সংঘাতের ফলে সৃষ্ট। তা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের ভূমিকা পালন করতে করতে অবশেষে কমিউনিজমের শ্রেণীহীন সমাজে পৌছে শেষ হয়ে যাবে। তারা সর্বপ্রথম বুর্জোয়া শ্রেণীকে সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থা খতম করার জন্য এবং পুঁজিবাদী সমাজ কায়েমে সহায়তা করে। পরবর্তী পর্যায়ে এদেরকে শ্রমিকরা নিজেদের শ্রেণী সংগ্রামে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এখন তা সমাজতন্ত্রের অধীনে মেহনতি মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে এবং শেষ পর্য্ন্ত পূর্ণ স্বাধীনতা ও সাম্যের লক্ষ্যে স্বয়ং কমিউনিজমে(সাম্যবাদে)পরিণত হবে।
উপরোক্ত দর্শন অনুযায়ী এসব অধিকারের না প্রকৃতির সাথে কোনো সম্পর্ক আছে, না সেগুলো মানুষের সত্তার অপরিহার্য্য অংশ, আর না তা অবিচ্ছেদ্য। এর কোনো বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব নাই। তা দেশের সাধারণ আইনের একটি অংশ। এসব অধিকার নির্দিষ্টকরণের এখতিয়ার কেবল ক্ষমতাসীন দলেরই রয়েছে যা দেশের সাধারণ মেহনতী মানুষের স্বার্থের সংরক্ষক এবং তাদের আকাঙ্খা পূরণের একমাত্র মাধ্যম। মেহনতি মানুষের স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ সীমা পর্য্ন্তই শুধু মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এই মৌল নীতিমালা ব্যতীত অন্য কিছুর বরাতে এসব অধিকার দাবী সম্পূর্ণ বেআইনী। শ্রমজীবি মানুষের সামাজিক স্বার্থ সমস্ত মৌলিক অধিকারের সীমা নির্দেশ করার একমাত্র ভিত্তি এবং এই স্বার্থ নির্ধারণ করে কমিউনিস্ট পার্টি। কারণ এটাই শ্রমিকদের প্রগতিশীল ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিন একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন। তার সম্পর্কে আশা করা যায় যে, সে মেহনতি মানুষের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং তাদের সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার জন্য সংগতিপূর্ণ আইন রচনা করবে, যার মধ্যে মৌলিক অধিকারসমূহ নির্ধারণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। ওয়াই ভেসিনেস্কি অ্যান্ড্রে রাশিয়ার আইন দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ
“রুশ আইন সে আচরণবিধির সমষ্টি যা শ্রমিক শ্রেণীর সার্বভৌমত্ব এবং তাদের ব্যক্ত উদ্দেশ্য দ্বারা আইনগত কাঠামো লাভ করে। এসব বিধানের কার্যকর প্রয়োগের গ্যারান্টি সমাজতান্ত্রিক সরকারের পূর্ণ একনায়কতন্ত্রী সরবরাহ করে এবং তাদের উদ্দেশ্য (ক) সেই সম্পর্ক ও ব্যবস্থাপনার প্রতিপালন, প্রতিরক্ষা ও উন্নতি সাধন যা শ্রমিকদের জন্য উপকারী ও পছন্দনীয় এবং (খ) অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, জীবনধারা ও মানবীয় চেতনার দ্বারা পুঁজিবাদ ও তার অবশিষ্ট প্রভাবের পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত উৎখাত করা, যাতে কমিউনিস্ট সমাজ কাঠামো নির্মাণ করা যায়।”(Vyshinsky Andrie Y., The Law of the Soviet State, 1948, P. 74)।
রুশ সংবিধানের ভাষ্যকার গ্রেগরিয়ান ও ডলগোপোলরি মৌলিক অধিকারের নিম্নোক্ত সংজ্ঞা পেশ করেনঃ “রুশ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য মূলত সোভিয়েত সরকারের সমাজতান্ত্রিক প্রাণসত্তার প্রকাশমাত্র।”(Grigorian L. & Dolgopolory, Fundamentals of Soviet State Law, Progressive Publishers, Moskow 1971, P. 1950)
আসলে রাশিয়ায় ব্যক্তির উপর সরকারের পূর্ণ প্রাধান্য রয়েছে। সে তার জন্য যে অধিকার নির্ধারণ করে দিবে সেটাই কেবল তার অধিকার এবং তার রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের সাধারণ আওতা বহির্ভুত নয়।
অধিকারের এই তত্ত্ব পাশ্চাত্য দেশসমূহের মৌলিক অধিকার তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত, বরং তার একেবারেই পরিপন্থী। পশ্চিমা দেশগুলোতে এসব অধিকারের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের হস্তক্ষপ হতে রক্ষা করে। এজন্য সেখানে এসব অধিকারকে রাষ্ট্র কর্তৃক রচিত সাধারণ আইনের উর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। এগুলোকে দেশের আইনের অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের এখতিয়ারকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং মৌলিক অধিকারসমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিচার বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়।
পক্ষান্তরে রাশিয়া ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশে এসব অধিকারের কি মর্যাদা তা সি.ডি. কারনিগ এর মুখে শুনুনঃ “মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত ও বাস্তবায়িত আইনের মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করে। প্রাকৃতিক আইনের ভিত্তিতে তার কোনো বৈধতা এখানে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এভাবে রাষ্ট্রের বিপরীতে নাগরিকদের কার্য্কর হেফাজতের গ্যারান্টি এখানে অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। কারণ কি পরিমাণ হেফাজতের ব্যবস্থা করা হবে তা স্বয়ং রাষ্ট্রের মর্জির উপর নির্ভরশীল। পাশ্চাত্য ধারণা অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তি এসব অধিকার লাভের যোগ্য। কারণ একটি জীবন্ত চেতনা সম্পন্ন ও সম্মানযোগ্য সত্তা হিসেবে তার একটা স্বাধীনতা রয়েছে। পক্ষান্তরে কমিউনিস্ট মতবাদ অনুযায়ী ব্যক্তি হিসেবে মানুষের মূল্য ও মর্যাদা আপেক্ষিক। তার স্থান সমাজের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত হয়। মৌলিক অধিকার কোনো মানুষের জন্য নয়, বরং তা সামগ্রিকভাবে মানবজাতির জন্য।
যুগোশ্লাভিয়া ছাড়া সমস্ত কমিউনিস্ট রাজ্যের বিচারালয়সমূহ খুবই সীমিত আইনগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে এবং তথায় মানবাধিকারের সংরক্ষণের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাও নেই। পাবলিক প্রসিকউটরের মাধ্যমে নাগরিক অধিকারের হেফাজতের ব্যবস্থা প্রতারণা মাত্র। কারণ এই পাবলিক প্রসিকিউটরের কোনো স্বাধীন এখতিয়ার নাই, সে সরকারের হুকুমের দাস মাত্র।(Kerning CD, Marxism Communism & Western Society, P.63)।
রুশ সংবিধানে নাগরিকদের যেসব মৌলিক অধিকারের উল্লেখ আছে তা নিম্নরূপঃ (১) কর্মের অধিকার (২) বিশ্রামের অধিকার (৩)বার্ধক্য, রোগ-ব্যাধি অথবা অক্ষমতার ক্ষেত্রে বৈষয়িক প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অধিকার (৪) শিক্ষার অধিকার (৫) নারী-পুরুষের মধ্যে সমতার অধিকার (৬)গোত্র ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল রুশ নাগরিকদের মধ্যে সমতার অধিকার (৭) বিবেকের স্বাধীনতা (৮) বক্তৃতা-বিবৃতি, সংবাদপত্র, সভা-সমিতি ও বিক্ষোভ মিছিলের অধিকার (৯) সামাজিক সংগঠন ও সংস্থাসমূহে অংশগ্রহণের অধিকার (১০) ব্যক্তি ও পরিবার, পত্র বিনিময় ও লেখার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার অধিকার এবং (১১) আশ্রয় লাভের অধিকার।
এসব অধিকারের সাথে সাথে রুশ সংবিধানে দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা নিম্নরূপঃ
১. সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, আইনের আনুগত্য, শ্রমের সংগঠনের প্রতি নজর, সামাজিক দায় দায়িত্ব সম্পর্কে যুক্তিসংগত দৃষ্টিভঙ্গী, সমাজতান্ত্রিক সামাজিক মূলনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
২. সমাজতান্ত্রিক মালিকানা ব্যবস্থার হেফাজত এবং তা সুদৃঢ়করণ।
৩. বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং মাতৃভূমির প্রতিরক্ষা। রুশ সংবিধানে অধিকারের তালিকায় দল গঠনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত নেই। তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে Vyshinsky বলেন, “নাগরিকদের স্বাধীনতা দিতে গিয়ে সোভিয়েত সরকার শ্রমিকদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। আর এটা স্বাভাবিক কথা যে, এই স্বাধীনতার মধ্যে তারা রাজনৈতিক দলসমূহের স্বাধীনতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনা। রাশিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে শ্রমিকদের কমিউনিস্ট পার্টির উপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে সেখানে এই স্বাধীনতা কেবল ফ্যাসিস্টদের এজেন্টদের এবং বাইরের গোয়েন্দাদেরই দাবী হতে পারে, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য শ্রমিকদের যাবতীয় স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করা এবং তাদের ঘাড়ে পূর্ণবার পুঁজিবাদের জোয়াল চাপিয়ে দেওয়া।”(Vyshinsky, পূ.গ্র. পৃ. ৬১৭)।
রাশিয়া এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে একদলীয় ব্যবস্থা, রাজ্যের সমস্ত উপায়-উপকরণ ও সংস্থাসমূহের উপর ক্ষমতাসীন দলের একক আধিপত্য, মৌলিক অধিকারের কোনো নৈতিক ও আদিভৌতিক ধারণার অনুপস্থিতি, রাষ্ট্রকেই অধিকারসমূহ নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা দান এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে এসব অধিকার আদায় ও বাস্তবায়নের কোনো গ্যারান্টি ব্যবস্থা না থাকার কারণে তাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নামেমাত্র অধিকারগুলোও সম্পূর্ণ অর্থহীন থেকে গেছে। এখানে কোনো নাগরিক সংবিধানে প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিকট কোনো দাবী উত্থাপন করতে পারেনা। কারণ এই দাবীর শুনানির জন্য না কোনো আদালতের অস্তিত্ত্ব আছে আর না রাষ্ট্রকে বিবাদী বানানো যেতে পারে। কেননা স্বয়ং রাষ্ট্রই তো অধিকারের আসল উৎস, তা যেটাকে অধিকার সাব্যস্ত করবে সেটাই হবে অধিকার এবং যেটাকে অধিকার হিসেবে স্বীকার করবেনা অথবা স্বীকার করার পর বাতিল, সীমিত বা স্থগিত করবে সেই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিয়োগ দায়েরের অবকাশ কিভাবে অবশিষ্ট থাকতে পারে? এখানে রাষ্ট্রের মর্জির অপর নাম অধিকার, এই মর্জির সীমার বাইরে স্বয়ং অধিকারের নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই।
অধিকারের এই সমাজতান্ত্রিক ধারণাও মূলত মানুষ সম্পর্কে সমাজতান্ত্রিক ধারণার উপর নির্ভরশীল। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদগণের জীবনদর্শন নিরেট বস্তুবাদী। তাদের মতে এই বিশ্বচরাচরের অন্যান্য জড় পদার্থের ন্যায় মানুষও একটি জড় জীব। তার মূল্য ও মর্যাদা তার সৃজনশীল যোগ্যতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। যেভাবে মেশিনের একটি অংশ তার কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনী যোগ্যতার প্রদর্শনীর জন্য বিদ্যুৎ, পানি, তৈল, উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনের মুখাপেক্ষী, তেমনি মানুষও তার সৃজনশীল যোগ্যতার উন্নতি ও তার বাস্তব প্রদর্শনীর জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতার মুখাপেক্ষী। এই পৃষ্ঠপোষকতা কেবল এমন একটি সমাজ ব্যবস্থায়ই সহজলভ্য হতে পারে যেখানে সমাজের সকল সদস্য উৎপাদনশীল ব্যক্তি হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে থাকবে এবং একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তাদের সকলের জন্য ভাত, কাপড়, বাসস্থান এবং জীবনের অন্যান্য জৈবিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করে থাকবে।
উৎপাদনের উপকরণের চেয়ে অধিক কোনো মর্যাদা মানুষের নাই। ধর্ম, চরিত্র, নৈতিকতা, আত্মা, ঈমান, আখেরাত এবং এই ধরনের অন্য সব পরিভাষা সাধারণ মানুষগুলোকে শোষণের জন্য পুঁজিপতি ও তাদের এজেন্টদের অধিকার। লেনিনের কথাঃ “আমরা এমন চরিত্র নৈতিকতার বিরোধী যেগুলোর ভিত্তি পুঁজিপতিরা খোদায়ী বিধানের উপর স্থাপন করেছে। আমরা এমন সব নৈতিক মূল্যবোধ প্রত্যাখ্যান করি যার ভিত্তি মানবীয় এবং শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গীর উর্ধ্বে। আমরা বলি যে, এটা একটা ধোঁকা মাত্র এবং এর মাধ্যমে কৃষক ও শ্রমিকদেরকে ভূস্বামী ও পুঁজিপতিদের স্বার্থে নির্বোধ বানানো হয়। আমরা ঘোষণা করি যে, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ গরীবদের শ্রেনী সংগ্রামের অনুসারী। আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের উৎস হচ্ছে গরীব জনগণের শ্রেণী সংগ্রামের স্বার্থে। তাই আমরা বলি যে, এমন কোনো নৈতিক মূল্যবোধ বর্তমান নেই যা মানব সমাজের আওতার বাইরে থাকতে পারে।” (Marxs & Engels, Selected Correspondence, Progressive Publishers, Moscow 1965, P 423)।
সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অনুযায়ী মানুষ কেবলমাত্র পেট সর্বস্ব জড় পদার্থের সমষ্টি এবং অর্থনৈতিক কার্য্ক্রম ও চেষ্টা তদবীরই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সমাজে মানুষের যখন এই মর্যাদা নির্ধারিত হয়ে গেল তখন একটু চিন্তা করে দেখুন যে, ভাত-কাপড়-বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যতীত তার আর কি অধিকার প্রাপ্য থাকতে পারে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যদি কেবলমাত্র এসব জৈবিক অধিকারের গ্যারান্টি দেয় এবং নৈতিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তিশীল অন্য কোনো অধিকার স্বীকার না করে তবে এটা তাদের জীবনদর্শনের একটা যৌক্তিক পরিণতি। তারা যতক্ষণ পর্য্ন্ত মানুষ সম্পর্কে নিজেদের জীবনদর্শনের পরিবর্তন না করবে ততক্ষণ তাদের কাছে মৌলিক অধিকারের সীমা সম্প্রসারিত করার আশা করা যায়না।

মৌলিক অধিকারের রক্ষাকবচ

অধিকারের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ধারণার পর্যালোচনা করার পর আমরা এখন দেখব যে, মৌলিক অধিকারসমূহ কার্য্কর করার জন্য উল্লেখিত দেশসমূহ যে রক্ষাব্যবস্থা চয়ন করেছে তা ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের জুলুম নির্যাতন থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা কার্য্যকর ও সফল প্রমাণিত হয়েছে।
পাশ্চাত্যের আইন ব্যবস্থায় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংবিধানকে এসব অধিকার এর সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তার বাস্তব প্রয়োগের একমাত্র পন্থা এই বলা হয় যে, এসব অধিকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য বানাতে হবে। এই অবস্থা বাহ্যত খুবই শক্তিশালী দৃষ্টিগোচর হয় এবং কোনো কোনো পাশ্চাত্য দেশে বিশেষতঃ বৃটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্সে তা পূর্ণ সৌন্দর্য্য সহকারে কার্য্করও হচ্ছে। দুনিয়ার প্রায় সবগুলো দেশে ঐ সাংবিধানিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে এবং জনগণ তাদের মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে সংবিধানের পবিত্রতম আইনগত দলীলকে নিজেদের একমাত্র আশ্রয় মনে করে। কিন্তু আমরা যখন বিভিন্ন দেশের সংবিধানের মূল্যায়ন করি এবং ঐসব দেশে সংঘটিত ঘটনাবলী অধ্যয়ন করি তখন এই সত্য উদ্ভাসিত হয়ে সামনে আসে যে, যে সংবিধানকে মৌলিক অধিকারের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ মনে করা হচ্ছে স্বয়ং তা-ই রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপদ নয়। আমেরিকা ও বৃটেনের লিখিত বা অলিখিত সংবিধানের আলোচনায় পরে আসছি। আপনি পৃথিবীর যে কোনো সংবিধান খুলে দেখুন-এর অভ্যন্তরভাগে ‘সাংবিধানিক সংশোধন’ নামে একটি পূর্ণ অনুচ্ছেদ দেখতে পাবেন-যার আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্টতার দাবীতে এবং কার্য্প্রণালীর মাধ্যমে সংবিধানে উদ্দেশ্য অনুযায়ী সংশোধন করার এবং তাকে নিজেদের আকাঙ্খা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেলে সাজানোর পূর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়। এভাবে উপরোক্ত সংবিধান যা সাধারণতঃ কোনো সংখ্যাগরিষ্ট দলের দ্বারা বা প্রভাবাধীনে প্রণীত হয় তা সংশ্লিষ্ট দলকে একনায়কতন্ত্রের ধারায় রাজত্ব করার জন্য লাগামহীন ও সীমাহীন ক্ষমতার লাইসেন্স দেয়। এমনিতেই সংবিধান প্রণয়নের প্রাথমিক স্তরেই সংবিধান সুদৃঢ় করার সকল বন্ধন ঢিলা করার ব্যবস্থা করা হয়।
ডরোথি এই অবস্থার মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেনঃ“সংবিধানসমূহ রাজনীতিজ্ঞদের দ্বারা রচিত হয়ে থাকে, যারা স্বীয় দলের দৃষ্টিভঙ্গী ও ঝোঁকপ্রবণতার প্রতি বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করতে বাধ্য এবং কখনও কখনও মিশ্র সরকারের প্রয়োজনসমূহ ও সুবিধার দিকটিও এতে বিবেচনায় রাখা হয়।”(Dorothy Pickles, Democracy, Mathuen & Co., London 1970, P. 101)।
সাংবিধানিক সরকারের বুনিয়াদী দর্শন এই যে, শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতার গন্ডি নির্দেশ করে তাদেরকে ক্ষমতার আনুগত্য করতে বাধ্য করতে হবে। তারা যদি নিজেদের ধার্য্কৃত ক্ষমতার গন্ডি অতিক্রম করে তবে বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে এরূপ করা হতে বিরত রাখা হবে। কিন্তু আমরা দেখছি যে, বাস্তব অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। যে বিচার বিভাগের উপর শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জিম্মাধারী অর্পণ করা হয়েছে তাকেই শাসক গোষ্ঠী ও রাজনীতিজ্ঞদের রচিত সংবিধান ও তাদের প্রদত্ত ক্ষমতার অধীনে থেকে কাজ করতে হয়। তার নিজস্ব ক্ষমতার উৎস কি?- সেই সংবিধান যার প্রণয়নে তার নিজস্ব কোনো ভূমিকা থাকেনা এবং যা প্রতিনিয়ত শাসক গোষ্ঠীর হাতে সংশোধন, রহিতকরণ, সীমিতকরণ ও স্থগিতকরণের শিকার হতে থাকে। ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্বের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ ছাড়া যে সংবিধানের নিজ অস্তিত্বের অন্য কোনো উদ্দেশ্য নাই তা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মর্জিমাফিক এখতিয়ার অর্জন করে থাকে। কোনো ধারার সংশোধন, নতুন ধারার সংযোজন, কোনো ধারা বাতিল, জরুরী অবস্থা ঘোষণা এবং এর অধীনে অর্জিত ক্ষমতার প্রয়োগ, মৌলিক অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ধারার স্থগিত এবং নতুন বিধানের অতীত হতে কার্য্যকর ধারার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের জন্য কার্য্প্রণালীর পন্থা বের করে নেয়। বিচারবিভাগ-যার এখতিয়ারসমূহ সংবিধানে কৃত সংশোধন ও রহিতকরণের মাধ্যমে সদা পরিবর্তিত হতে থাকে-তা শাসক গোষ্ঠীর যথেচ্ছ কার্য্কলাপের পথে বাধার সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। কারণ তার উপর আইন পরিষদের প্রাধান্য স্বীকৃত এবং এই বিচার বিভাগের উপর ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্টতার দোহাই পেরে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছে। পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট সরকার বনাম যিয়াউর রহমানের মামলায় আদালতের এখতিয়ারের পরিমন্ডলের ব্যাখ্যা প্রদান করে তার রায়ে বলেছেঃ “একথা যেখানে যথার্থ যে, বিচার বিভাগীয় এখতিয়ারসমূহ বিলোপ করা যায়না-সেখানে এটাও এক বাস্তব সত্য যে, যেসব লোকের উপর সুবিচার ও ইনসাফ কায়েমের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তাদের এখতিয়ারের গন্ডি আইনত সংবিধানেই সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। অতএব হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্টের এখতিয়ারসমূহের সীমা নির্দেশ করা সংবিধানেরই দায়িত্ব। অনুরূপভাবে কোন্ প্রকারের মোকদ্দমার ফয়সালা হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্টের পরিবর্তে ট্রাইবুনালে হবে তার ব্যাখ্যাও সংবিধানই দিতে পারে। এখতিয়ারসমূহের মধ্যে এই প্রকার সীমা নির্দেশের উপর কোনো আপত্তি তোলা যায়না। সত্য কথা এই যে, উপরোক্ত প্রকারের সীমা নির্দেশ বর্তমান না থাকলে বিচ্ছিন্নতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। কারণ এর ফলে কেউই অবহিত থাকবে না যে, তার ক্ষমতা ও এখতিয়ারের গন্ডী কত দূর।”(PLD 1973, Supreme Court, P. 49 State Vs. Ziaur Rahman, P. 62)।
উপরোক্ত বক্তব্য হতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, এই সীমা নির্দেশ আইন প্রণেতাগণের, অন্য কথায় শাসক গোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত। তাই বিচার বিভাগ সেইসব এখতিয়ার মোতাবেক কাজ করতে বাধ্য যা শাসক গোষ্ঠী তাকে দান করে। এটা সেই তিক্ত সত্যেরই পরিণতি যে, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর যেসব কার্য্যক্রম সংবিধানের প্রাণশক্তিকে ও তার মৌলিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে দিয়েছে তা অবিকল সংবিধান মোতাবেক সাব্যস্ত হয়ে থাকে। কারণ নিজস্ব কার্য্যক্রম বৈধ করার জন্য তারা সংবিধান সংশোধন করে আইনগত বৈধতা সৃষ্টি করে নেয় এবং এভাবে গতকাল পর্য্ন্ত যেসব পদক্ষেপ ছিল অবৈধ ও আইনবিরোধী তা আজ কেবল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বৈধ ও আইনসিদ্ধ হয়ে গেল। এই সংশোধন বা পরিবর্তনের পথে কোথাও কোনো নৈতিক মূল্যবোধ অথবা ন্যায়বিচারের কোনো নীতিমালা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনা। বিচার বিভাগ কেবল প্রণীত আইনের অনুগত, কোনো নৈতিক মূল্যবোধের নয়। অতএব পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট বিগ্রেডিয়ার(অব.) এফ.বি. আলী ও কর্ণেল(অব.) আবদুল আলীম আফরীদির মোকদ্দমার রায় দিতে গিয়ে লিখেছেঃ “একথাও বলা হয়েছে যে, অর্ডিন্যান্স(অধ্যাদেশ)আইনের মর্যাদাই পেতে পারে না। কারণ নাগরিকদের কোনো কারণ ব্যতিরেকেই কোর্টের শুনানীর অধিকার হতে বঞ্চিত করাই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু এই সাধারণ মূলনীতি গ্রহণ করা যায়না। ১৯২২ সালের আইনে এর সংজ্ঞা দেওয়া নাই। অতএব সাধারণভাবে স্বীকৃত অর্থের আলোকে আইন বলতে প্রণীত আইন বুঝায়। অর্থাৎ আইন জারিকারীর ইচ্ছা ও আকাংখার প্রথাসিদ্ধ ঘোষণা। আইনের রূপ ধারণ করার জন্য অনুকূল আইনের প্রমাণ থাকা অথবা নৈতিকতার উপর ভিত্তিশীল হওয়া প্রয়োজন-এরূপ কোনো শর্ত বিদ্যমান নেই। বিচারালয়সমূহ এ ধরনের কোনো উন্নত নৈতিক মূলনীতির কারণে আইনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না, আর না আইনের দার্শনিক মতবাদের ভিত্তিতে বিচারালয়সমূহ কার্য্ক্রম পরিচালনা করতে পারে-যেমন আদালত ইতোপূর্বে আসমা জিলানীর মোকদ্দমায় সবিস্তারে আলোচনা করেছে। এসব কারণের ভিত্তিতে মাননীয় প্রধান বিচারপতি, যিনি মূল সিদ্ধান্ত লিখেছেন, এটা গ্রহণ করতে অপারগ যে, যেসব অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে যুক্তিপ্রমাণ পেশ করা হয়েছে সেসব অধ্যাদেশ আইন ছিল না এবং তাই ছিল মৌলিক অধিকার নং-১ এর পরিপন্থী।”(PLD 1975, Supreme Court, P. 506, Re. State Vs. F.B. Ali & Others, P. 527-28)।
এখন যেখানে প্রণীত আইনের এই প্রাধান্য রয়েছে এবং স্বয়ং আইন আইনদাতার ইচ্ছা ও মর্জির প্রথাসিদ্ধ ঘোষণা মাত্র, সেখানে বিচারালয়সমূহ নাগরিকদের শুধু এতটুকুই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে যতটুকু নিরাপত্তা দেওয়ার অনুমতি তাদেরকে প্রচলিত সংবিধান এবং শাসকগোষ্ঠীর জারিকৃত আইন দিয়েছে। এইসব বিধান বৈধ বা অবৈধ হওয়ার ফয়সালা কিভাবে করা যাবে? এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আসমা জিলানীর মামলায় সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামিদুর রহমান তাঁর রায়ে বলেন, “আইনের কোনো সংজ্ঞা যদি অত্যাবশ্যকীয় হয়ই তবে বিচারকদের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, তাদেরকে শুধু এতটুকুই দেখতে হবে যে, যে আইন কার্য্কর করার দাবী তার নিকট করা হচ্ছে তা এমন কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের রচিত যারা আইনত আইন প্রণয়নের অধিকারী এবং তা আইন যন্ত্রের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য। আমার মতে এই সংজ্ঞার মধ্যে আইনের বৈধতা ও তার কার্য্কারিতা উভয়ই এসে যায়”। (PLD 1972, Supreme Court, P. 139, Re. Asma Jilani Vs. Govt. of Punjab & Others, P. 159)।
সংবিধান রচনায় ও আইন প্রণয়নে শাসক শ্রেণীর প্রাধান্য থাকায় এবং তাদেরই হাতে বিচারালয়ের এখতিয়ার ও শুনানীর সময় নির্দিষ্ট হওয়ার দ্বারা একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সংবিধান ও আইন প্রণয়নকারীদের উপর আইনের সংরক্ষকদের(বিচার বিভাগের) প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণ বাস্তবিকপক্ষে কতটুকু শক্তিশালী। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে মৌলিক অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ধারাগুলির যে করুণ পরিণতি হয়েছিল তা এসব অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অক্ষমতা ও অসহায়ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। বাংলাদেশে শেখ মুজিব একদলীয় স্বৈরশাসন কায়েম করেন, বিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে জেলে ঢুকান, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেন, জাতীয় পরিষদকে রাবার স্টাম্পে পরিণত করেন এবং বিচার বিভাগকে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ার হতে বঞ্চিত করে মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎ করার ক্ষেত্রে তাকে শক্তিহীন করে দেন। তার এসব কার্য্যক্রম সংবিধান মোতাবেক সাব্যস্ত হল।
ভারতে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভের শাস্তি হতে রেহাই পাওয়ার জন্য বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে চাইলে সংসদে ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ সংবিধান সংশোধন করে তার আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করে দেন। আদালতের শুনানীর এখতিয়ার ছিনিয়ে নেওয়া হয়, বিরোধী দলগুলোর উপর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়, ইন্দিরার নির্বাচনী প্রতিপক্ষ ও হাইকোর্টের মামলায় জয়লাভকারী পক্ষ রাজনারায়ণ ও তার সমমনা সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে জেলে নিক্ষেপ করা হয়, জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে সমস্ত মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয় এবং এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্চকারী সংবাদপত্রগুলোর কন্ঠরোধ করে মৃত্যুর ঘাটে পৌছে দেওয়া হয়। এসব কিছু ঘটে যাওয়ার পর মিসেস ইন্দিরার উকিল মি. এ. কে. সেন দেশের সর্বোচ্চ কিন্তু ক্ষমতা বঞ্চিত আদালত সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেনঃ “স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারণা কল্পনাপ্রসূত এবং তাকে আইনের মৌলিক অংশ বলা যায়না। নির্বাচন অবাধ ও স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে রায় দেওয়ার অধিকার বিচার বিভাগের নাই”।(Kering,পূ. গ্র.,পৃ. ৫৮)।
এই পুরা খেলাটাই সংবিধানের অধীনে এবং তার প্রদত্ত এখতিয়ার অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু সংশোধিত সংবিধানের অধীনে রায় প্রদানে বাধ্য ছিল তাই সে ইন্দিরা গান্ধীকে সেই সমস্ত অপরাধ হতে বেকসুর খালাস প্রদান করে-ইতিপূর্বে হাইকোর্টে অসংশোধিত সংবিধানের অধীনে তাকে যেসব অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত এবং শাস্তিও দিয়েছিল।
পাকিস্তানে-যেখানে ৪র্থ সংবিধান বলবৎ রয়েছে-সংবিধান বলবৎ করার সাথে সাথে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে একটি অধ্যাদেশ জারী করে পুনরায় ৪র্থ ও ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে সীমিত করে দেওয়া হয়। জরুরী অবস্থা ঘোষণা, অধ্যাদেশ জারী এবং সংবিধানের সংশোধনও যেহেতু স্বয়ং সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত এখতিয়ারেরই অধীনে ছিল তাই এসব কাজই সংবিধান অনুযায়ী সাব্যস্ত হয়েছে। আর এগুলোর সংবিধান মোতাবেক হওয়ার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, শাসক গোষ্ঠীকে অন্তত আইন ও বিচার বিভাগের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হচ্ছেনা।
এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশের অবস্থাও তদ্রুপ, যেখানে সংবিধান মৌলিক অধিকারের সংরক্ষক হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর একনায়কত্বের সংরক্ষক, তাদের নির্যাতনমূলক পদক্ষেপের পৃষ্ঠপোষক এবং তা তাদের জন্য সীমাহীন কর্তৃত্ব লাভের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থার পর্যালোচনা করতে গিয়ে সি.ভি. কারনিগ বলেনঃ “বিশ শতকে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্নে এতদূর বলা যায় যে, স্বয়ং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ এ প্রসঙ্গে নিজেদের অনির্ভরযোগ্য প্রমাণ করেছেন। সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অহরহ কেবল মৌলিক অধিকারসমূহই পরিবর্তন করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং গোটা সংবিধানকেই পরিবর্তন করে ছেড়েছে।” (Kering,পূ. গ্র.,পৃ. ৫৮)।
পৃথিবীর যে কোনো সংবিধান সংশোধনের বাধাহীন সুযোগ দেওয়ার সাথে সাথে ‘জরুরী অবস্থা’ শিরোনামের অধীনে শাসক শ্রেণীকে যে কর্তৃত্ব দান করে তা অবশিষ্ট অভাব পূর্ণ করে দেয়। জরুরী অবস্থার জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকা জরুরী নয়, শাসক শ্রেণী নিজেদের বিবেচনা ও পরিণামদর্শিতার ভিত্তিতে যখন ইচ্ছা তা ঘোষণা করতে পারে এবং তা ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে সংবিধান তাদেরকে নিজেদের বাধ্যবাধকতা থেকে একেবারে স্বাধীন ছেড়ে দেয়। তারা সংবিধান বর্তমান থাকতে সামরিক আইন জারি করতে পারে, বিচার বিভাগকে সার্বিক এখতিয়ার থেকে এবং জনগণকে সকল মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত করতে পারে। দেশের সংবিধান ও আইন কোথাও তাদের হাত টেনে ধরতে পারেনা।
সংবিধানের এসব ত্রুটি এবং শাসক গোষ্ঠীর সামনে তার অসহায়ত্বের তুলনায় স্বয়ং তার অস্তিত্ত্বের প্রশ্নটি আরো করুণ। আমাদের আগামী দিনের পর্য্যবেক্ষণ এবং আমাদের পাকিস্তানীদের তিক্ত অভিজ্ঞতা এই যে, সরকারের পরিবর্তন, অন্তর্বিপ্লব, সামরিক বিদ্রোহ, বৈদেশিক আক্রমণ এবং রাজনৈতিক দলসমূহের অপরিণামদর্শী তীব্র মতবিরোধ ইত্যাদি সংবিধানকে উলটপালট করে রেখে দেয়। প্রত্যেক বিদায় গ্রহণকারীর সাথে তার বলবৎকৃত সংবিধানও কলংকচিহ্ন রেখে যায় এবং প্রত্যেক আগমনকারী সংবিধানের একটি নতুন খসড়াসহ আত্মপ্রকাশ করে। এই শেষোক্ত ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীও সংবিধানকে সেই একইরূপ আইনগত মর্যাদা দান করে যা তাদের পূর্বোক্ত ক্ষমতাসীনরা স্বীয় শাসনামলে দান করেছিল। আসমা জিলানীর মামলার রায়ে আন্তর্জাতিক আইনের বরাত দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সম্মানিত প্রধান বিচারপতি লিখেছেনঃ “আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বিপ্লবী সরকার এবং নতুন সংবিধান-রাষ্ট্রের একটি আইনানুগ সরকার ও বৈধ সংবিধান। এজন্য একটি বিজয়ী বিপ্লব অথবা একটি সফল বিদ্রোহ সংবিধানে সরকার পরিবর্তনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পন্থা”।(PLD, পৃ. ১৫৩-৫৪)।
সরেজমিনের বাস্তব সাক্ষ্য এবং এই আন্তর্জাতিক আইন হতে অনুমান করা যায় যে, সংবিধানের সার্বিকভাবে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা হওয়া সত্ত্বেও তা কতটা দুর্বল, অনিশ্চিত, অস্থায়ী ও ক্ষণভঙ্গুর আইনগত দলীল। সংবিধানেরই স্থায়িত্বের যেখানে নিজস্ব কোনো গ্যারান্টি বর্তমান নাই সেখানে আমরা সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে তার উপর কিভাবে ভরসা করতে পারি। যে সংবিধান অব্যাহতভাবে সংশোধনের শিকার তা কিভাবে অপরিবর্তনীয় ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারের সংরক্ষক হতে পারে?
এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মৌলিক অধিকারসমূহ অবিচ্ছেদ্য হওয়ার দাবী সঠিক নয়। এসব অধিকার নির্বাচন এবং তার বাস্তবায়নের একমাত্র মাধ্যম হল সংবিধান। সংবিধান ব্যতীত এসব অধিকারের কোনো আইনগত ভিত্তি অবশিষ্ট থাকেনা। আর সংবিধান এমন একটি কাঠের পুতুল যার লাগাম সরকারের মুষ্টিবদ্ধ, কখনও তা সংশোধনের শিকার হয়, কখনও বাতিল, কখনও সংযোজন, কখনও কিছু অংশ স্থগিত করা হয় এবং কখনো সরকারের পতনের সাথে সাথে স্বয়ং তারও পতন হয়। এই বিচিত্র অবস্থার মধ্যে মৌলিক অধিকারসমূহ কখনও সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ লাভ করে, কখনও সীমিত হয়, কখনও স্থগিত হয় এবং কখনও বাতিলকৃত সংবিধানে সাথে স্বয়ং বাতিল হয়ে যায়। সৌভাগ্যক্রমে কোনো দেশের জনগণ যদি বা তা অর্জনে সক্ষম হয়েও যায় তবে নানারূপ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ফাঁদে আটকা পড়ে তা প্রভাবহীন ও অকার্য্কর হয়ে যায়। নীতিগতভাবে আইনের উর্ধ্বে হলেও তার বাস্তবায়ন সর্বদা ‘আইন অনুযায়ী’ হয়ে থাকে এবং সংবিধানের মধ্যেই তাকে ‘যদি, কিন্তু, এই শর্তে যে, যদি না’ এবং এ ধরনের অন্যান্য বিভক্তি ও উপসর্গ যোগ করে আইনের অধীন করে দেওয়া হয় এবং এই আইন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মর্জি মোতাবেক ব্যবহৃত হয়। সি.ডি. কারনীগ বলেনঃ “মৌলিক অধিকারের শিকড় যদিও আধুনিক সংবিধানসমূহের খসড়ায় প্রোথিত থাকে কিন্তু তা সর্বদা ‘আইন অনুযায়ী ব্যাখ্যা’র শিকার হয়, অথচ স্বীয় প্রাণশক্তির দিক থেকে এটাকে হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে এবং অলংঘনীয় মনে করা হয়।”(Kering,পূ. গ্র.,পৃ. ৫৬)।
যেসব মৌলিক অধিকারকে অবিচ্ছেদ্য, অলংঘনীয় ও হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে সাব্যস্ত করা হয় কোনো জেলা প্রশাসকের জারীকৃত ১৪৪ ধারা তাকে স্থগিত করে দেয়। আইনের বাধ্যবাধকতার কি চমৎকারীত্ব! এই অবস্থায় সংবিধান দুর্লভ নাগরিকদের কোনোরূপ উপকার করতে অক্ষম।
সংবিধানের এই অসহায়ত্ব ও তার অস্থায়ীত্ব হতে পরিষ্কার জানা যায় যে, তা ‘মৌলিক অধিকারে’র কোনো নির্ভরযোগ্য সংরক্ষক নয় এবং তার প্রদত্ত গ্যারান্টির ভিত্তিতে এসব অধিকারকে অলংঘনীয় মনে করার কোনো অবকাশ নেই।
পৃথিবীর সংবিধানের কার্য্কারিতার বাস্তব ও সাধারণ চিত্র তুলে ধরার পর এখন বৃটেন ও আমেরিকার সেইসব সংবিধানের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যাক যাকে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ নমুনা মনে করা হয় এবং বাহ্যত তা কার্য্কর করার ধরণটাও বেশ সন্তোষজনক দৃষ্টিগোচর হয়।
বৃটেনে মূলত কোনো লিখিত সংবিধান কার্য্কর নাই। তাই সেখানে অন্যান্য দেশের মত মৌলিক অধিকারের আইনগত রক্ষাব্যবস্থা নেই। বৃটিশ পার্লামেন্ট হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তার আইন প্রণয়নের ক্ষমতার উপর কোনো কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপিত নেই। দেশের কোনো বিচারালয় না তার অনুমোদিত কোনো আইন বাতিল করতে পারে আর না তা বলবৎ করার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। তথায় মৌলিক অধিকারের সংরক্ষক হচ্ছে দেশের সাধারণ আইন এবং তা অর্জনের জন্য সাধারণ বিচারালয়সমূহেরই শরণাপন্ন হওয়া যায়। কিন্তু লিখিত সংবিধান না থাকা সত্ত্বেও বৃটেনের নাগরিকরা মৌলিক অধিকারের বেলায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নাগরিকদের চেয়ে ভাল অবস্থায় আছে। তাই জেনিংস অত্যন্ত গর্বের সাথে বলেনঃ “বৃটেনে কোনো অধিকার আইন নেই। আমরা শুধু আইন অনুযায়ী স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করি। আমাদের ধারণা এবং যার উপর আমাদের অটল বিশ্বাস রয়েছে যে, আমাদের কাজ এমন যে কোনো দেশের তুলনায় উত্তমরূপে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে অধিকার আইন অথবা কোনো মানবাধিকার সনদ বিদ্যমান রয়েছ।(Jennings, Sir IVor, Approach to Self Government, Oxford, London, p. 20)।
কিন্তু এই সন্তোষ প্রকাশে ধীরে ধীরে ভাটা পড়ে যাচ্ছে এবং বৃটেনের আইনজ্ঞগণ মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটি লিখিত সংবিধানের প্রয়োজনীয়তার কথা গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। টমাস পেইন সর্বপ্রথম এই প্রয়োজনীয়তার কথা অনুভব করেছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে তাঁর ‘মানবাধিকার’ শীর্ষক গ্রন্থে অত্যন্ত বিদ্রুপাত্মক সুরে লিখেছেনঃ “ উচ্চ স্বর বৃটিশ সংবিধান সম্পূর্ণত প্রতারণামাত্র। এর মূলত কোনো অস্তিত্ব নেই। একজন সদস্য বলে উঠেন, সংবিধান এই, অপরজন বলে উঠেন- না, ওটা নয়, এটা সংবিধান। আজ তা এক জিনিস, কাল তা অন্য জিনিস। এই সম্পর্কে আলোচনা অব্যাহত রাখলে শেষ পর্য্ন্ত প্রমাণিত হয় যে, এর কোথাও নামগন্ধও নেই।”(Fennesy R.R., “Burk, Paine and the rights of Man’’, Martiness Nijhaoff Hague 1965, p 179)।
বৃটেনের স্বনামধন্য পত্রিকায় Economist এর ১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর সংখ্যায় মৌলিক অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট এক জরিপ রিপোর্ট লিখেছেঃ “আজ হতে বিশ বছর আগে এই দাবী বড়ই দৃষ্টিগোচত হতো যে, মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে বৃটেন সর্বোত্তম।” এর সমর্থক আজও এ প্রমাণ পেশ করতে পারে যে, গর্ভপাত, তালাক এবং সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্কার আইন অনুমোদন করার সময় নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট উত্তম রেকর্ড স্থাপন করেছে। কিন্তু এখন রক্ষণশীলগণ মালিকানা অধিকার সীমিতকরণ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহের সদস্যপদের আরোপিত বিধিনিষেধের দৃষ্টান্ত পেশ করবে। আবার লেবার পার্টির সমর্থকগণ রক্ষণশীল দলের অনুমোদিত অতীতে কার্য্যকর দেশত্যাগ আইন, বিশেষ অধিকার ও হরতালের অধিকারের উপর তাদের শিল্প সম্পর্ক আইনের আরোপকৃত বিধিনিষেধের দৃষ্টান্ত পেশ করবে। উপরন্তু অন্য কিছু দিকও বর্তমান রয়েছে যার মধ্যে দেশের আইন, আন্তর্জাতিক আইন, বরং মানবাধিকারের সাধারণ নীতিমালা সংক্রান্ত ইউরোপীয় কনোনেশনের সাথেও সংঘর্ষপূর্ণ। এর একটি উদাহরণতো সন্ত্রাস নিবর্তনমূলক আইনের অধীনে সন্দেহভাজন লোকদের আটকাদেশের এখতিয়ার। পার্লামেন্ট এই বিধান ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে অনুমোদন করে।”(পৃ. ২৪)।
এই রিপোর্ট অনুযায়ী পার্লামেন্ট এর উদারপন্থী সদস্য Allen Beith সংসদে একটি বিল পেশ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, এই রূঢ় বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যে, বৃটেন ২৫ বছর পূর্বে মানবাধিকার সংক্রান্ত ইউরোপীয় কনোনেশনের যে দলীলে স্বাক্ষর করেছিল তা আজ পর্য্যন্ত বৃটিশ আইনের অংশে পরিণত হতে পারেনি।
বৃটেনে পার্লামেন্ট ও রাজার মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতের পরিণতি এই দাঁড়ালো যে, সে দেশে রাজাকে তো সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার স্থলে পার্লামেন্ট একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসেছে। কেননা তার আইন প্রণয়ন ক্ষমতার উপর কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপিত নেই। সংবিধানের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের এখতিয়ারের সীমা নির্দেশ করা। আজ এই দিকটি সম্পর্কেই সর্বাধিক দুশ্চিন্তা প্রকাশ করা হচ্ছে। Economist পত্রিকা বৃটেনের মৌলিক অধিকারের বিষয়টির মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছে যে, “একটি অধিকার আইন অনুমোদন করা যেতে পারে এবং তার সংরক্ষণের জন্য জুডিশিয়াল আদালতও কায়েম করা যেতে পারে-যার কোনো বিধানকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ঘোষণা করার এখতিয়ারও থাকবে। কিন্তু আসল সমস্যা তো এই যে, উক্ত এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও পার্লামেন্ট যদি কোনো বিধান বহির্ভুত আইন মঞ্জুর করে তবে বেচারা আদালত কি করতে পারবে? সে কি পার্লামেন্ট এর বিরুদ্ধে নিজের রায় কার্য্কর করতে পারবে? সে সর্বাধিক কোন বিধানকে বেআইনী ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু পার্লামেন্ট এর সর্বময় প্রাধান্যের মজবুত ঐতিহ্যের কঠিন দেহের দেবতাকে ধ্বংস করা সহজ নয়।”(পৃ. ২৫)।
পর্যালোচক অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, “কোনো সন্তোষজনক অধিকার আইনের(Bill of Rights) প্রবর্তন-রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং বিশেষত নির্বাচন ব্যবস্থা, তার মাধ্যমে উত্থিত শত্রুতামূলক জোটবদ্ধতার প্রভাব এবং সরকার ও পার্লামেন্ট এর পারস্পরিক সম্পর্কের উপর প্রতিফলিত প্রভাবের পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। অন্য কথায়, কোন অধিকার আইনের পূর্বে একটি আইনগত দলীলের প্রয়োজন রয়েছে।”(পৃ. ২৫)।
ঐ রিপোর্টে জনমতের সাধারণ ঝোঁকের প্রতি আলোকপাত করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, ১৯৭০ দশকের শুরু হতে অধিকার আইনের দাবী ক্রমশ জোরদার হতে থাকে এবং ১৯৭৪ সাল হতে তা আরো অধিক জোরদার হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন অন্যান্য সরকারী বিভাগের সাথে শলা পরামর্শ করছে যে, বৃটেনে এ ধরনের আইন বলবৎযোগ্য ও পছন্দনীয় হবে কি?
বৃটেনকে যেহেতু গণতন্ত্রের সুতিকাগার মনে করা হয় এবং আমার পাকিস্তানীরাসহ পৃথিবীর অনেক দেশ-যেখানে সংসদীয় সরকারের প্রচলন রয়েছে-তার অনুকরণ করে থাকে, তাই অধিকার আইন দাবীর এই আন্দোলনে শরীকদারদের মতামতের উপরও একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা সমীচীন হবে। এর ফলে আমরা অনুমান করতে পারব যে, স্বয়ং বৃটেনবাসী এখন তাদের সংবিধান সম্পর্কে কি বলে।
প্রসিদ্ধ আইনজ্ঞ D.W. Hanson মৌলিক অধিকারের মহাসনদ ম্যাগনাকার্টার বরাতে পার্লামেন্ট এর প্রাধান্যের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেনঃ “আইনের দৃষ্টিকোণ হতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই যে, Barrons তার বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতাকে সাধারণ আইনের মূলনীতির আওতায় অর্পণ না করে বরং একটি রাজনৈতিক পন্থা অনুসরণ করেন, যার ফলে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরে লর্ডস ও সাধারণ সদস্যদের মাঝে রাজনৈতিক সমঝোতা অস্তিত্ব লাভ করে। এ কারণেই দ্বৈত রাজতন্ত্রের সমস্যা সমাধানের জন্য, যা সপ্তদশ শতকে জোরেশোরে উত্থিত হয়েছিল, আইনের প্রাধান্যের পরিবর্তে পার্লামেন্টের প্রাধান্যের মতবাদ গ্রহণ করা হল।” (D.W. Hanson, From Kingdom to Common-Wealth, Princeton, London 1970, p. 190)
পার্লামেন্টের এই প্রাধান্য মৌলিক অধিকারকে সাংবিধানিক পৃষ্ঠপোষকতা হতে বঞ্চিত করে কেবলমাত্র প্রথার (Customs)অনুগ্রহের উপর ছেড়ে দিয়েছে। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, প্রাক্তন বিচারক এবং বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধান প্রফেসর হুড ফিলিপস বলেনঃ “সাধারণ অর্থে বৃটিশ সংবিধানে মৌলিক অধিকারের কোনো অস্তিত্ব নাই। ব্যক্তি স্বাধীনতার সাথে সংশ্লিষ্ট মূলনীতিকে পার্লামেন্ট একটি সাধারণ আইনের মাধ্যমে পরিবর্তন করতে পারে এবং যেসব অধিকারকে বহু সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে পার্লামেন্ট সেসব অধিকার কতটা সীমিত বা রহিত করতে পারবে তার কোন আইনগত সীমা নির্ধারিত নাই।”(Phillis O Hood, Reform of the Constitution, London 1970, p. 120)।
তিনি এই প্রসঙ্গে পার্লামেন্টের কার্য্ক্রমের দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেন, ১ম মহাযু্দ্ধকালে Defence of the realm Act এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধ কালে Emergency Powers Defence Act(১৯৩৫ সালে বলবৎ) অনুমোদন করে পার্লামেন্ট সরকারকে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও জীবিকার সার্বিক দিক পরিবেষ্টন করার মত ব্যাপক এখতিয়ার দান করে-যার কোনো নজীর সংসদীয় ইতিহাসে বিরল। অতপর ১৯৪০ সালে আরো একটি আইন পাশ হয় যার উপর পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে আলোচনা ও বাকবিতন্ডা এবং রাজকীয় অনুমোদনের সমস্ত স্তর একই দিনে সমাপ্ত হয়। এই আইনের সাহায্যে নাগরিকদের জানমাল এবং সেবা রাজার নিকট সমর্পণ করে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯২০ সালে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজকালীন সরকারকে জরুরী ক্ষমতা দানের জন্য একটি আইন পাশ করা হয় যার অধীনে আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও গোলযোগ চলাকালীন জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে নাগরিক স্বাধীনত স্থগিত করা হয়। বন্দর-শ্রমিক এবং পরিবহন ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীদের হরতাল ডাকাকালীন এই আইন কয়েকবার প্রয়োগ করা হয়েছে।
প্রফেসর ফিলিপস পার্লামেন্টের প্রাধান্যের জন্য অনমনীয়তা এবং লিখিত সংবিধানের অস্বীকৃতির আসল কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ “রাজনৈতিক খেলায় এটি ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল উভয়ের জন্য উপকারী। আজ এর মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী, কাল তা বিরোধী দলীয় নেতার হাতে চলে যাবে। অথচ এ সম্পর্কে নাগরিকগণ হয় সংশ্লিষ্টহীন অথবা অনবহিত থেকে যাবে।”(ঐ, পৃ. ১৪৪)।
তিনি বৃটিশ সংবিধানের ব্যাপক মূল্যায়নের পর এই সিদ্ধান্তে পৌছেনঃ “এই দেশের জন্য একটি লিখিত সংবিধান প্রয়োজন। যার মধ্যে বিচার বিভাগের প্রাধান্য স্বীকৃত হবে। আমরা দেখেছি যে, আইন প্রণয়নের এখতিয়ারের কোনো সীমা নেই। পার্লামেন্ট এর সার্বিক তৎপরতা কার্য্ত সরকারই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সরকারের ক্ষমতার সময়কাল বেশ দীর্ঘ। এমন একটি উচ্চতর পরিষদের গঠন অত্যাবশ্যক যার খসড়া আইন প্রত্যাখ্যান করার অথবা কিছু কাল প্রতিহত করে রাখার এখতিয়ার থাকবে। আইন ও তার কার্য্কর গুরুত্বপূর্ণ শাখা অনিশ্চিত, ১৯৪৯ সালে জারীকৃত পার্লামেন্ট এ্যাক্টের মর্যাদা সংশয়পূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সীমাহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়ার কর্মপ্রণালী সুসংবদ্ধ করা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং বিচারকদের চাকরীর সাথে সংশ্লিষ্ট বিধানের উন্নতি সাধন করতে হবে এবং একটি নতুন মৌলিক অধিকার আইনের বিদ্যমানতা সময়ের দাবী।”(ঐ, পৃ. ১৪৪)।
স্যার ল্যাসলি স্কারম্যান নামক একজন বৃটিশ বিচারপতি নিজ দেশে মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের যবনিকা ছিন্ন করতে গিয়ে লিখেছেনঃ “বৃটিশ আইনের মানবাধিকারের কোনো পূর্ণাঙ্গ সংহিতা বর্তমান থাকলে – উত্তর আয়ারল্যান্ডে তল্লাশী ও অনুসন্ধানের যে নির্যাতনমূলক পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে-আপনার মতে কি তা সম্ভব ছিল?”(Scarman Sir Leslie, English Law- The New Dimensions, Stevens & Sons, London 1974, p. 18).
তিনি অধিকার আইন দাবী করতে গিয়ে বলেন, “যদি আমাদের আন্তর্জাতিক দায়িত্বানুযায়ী মানবাধিকারের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয় তবে সাধারণ আইন হতে সরে গিয়ে আমাদেরকে অন্য কিছু উপায়-উপকরণ অনুসন্ধান করতে হবে। যে আইন ব্যবস্থা আইন পরিষদের অনুগ্রহের পাত্র হয়ে টিকে থাকে এবং যেখানে স্বয়ং এই আইন পরিষদও কয়েকটি ব্যতিক্রমিক অবস্থা ছাড়া প্রশাসনের দয়ার পাত্র-তা মৌলিক অধিকারের নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য পৃষ্ঠপোষক হতে পারেনা এবং এই কারণে কেবল আইন প্রণয়নই কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেনা। যে জিনিসটি প্রয়োজন- তা হলো ‘কোনো বিধান’ আইন প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করুক। মৌলিক অধিকার আন্দোলন যা এখন একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ই নয়, বরং আন্তর্জাতিক যিম্মাদারীর বিষয়ে পরিণত হয়েছে, আমাদের সংবিধানের ভারসাম্যহীনতাকে সম্পূর্ণরূপে উলঙ্গ করে তুলে ধরে এবং একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করে। এখন সমসাময়িক সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন কার্য্ সম্পাদনকারী সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে কোনরূপ রহিতকরণ, সংশোধন ও স্থগিতকরণ হতে নিরাপদ থাকবে এমন একটি অধিকার আইনের অবর্তমানে মৌলিক অধিকার সব সময়ই বিপদের সম্মুখীন হতে থাকবে।”(ঐ, পৃ. ৬৯)।
জে.জে. ক্রেইক হেন্ডারসন পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেনঃ “বৃটেনে কোন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী পার্লামেন্টের কথা বলার পরিবর্তে একথা বলা অধিক যুক্তিসঙ্গত হবে যে, এখানে একটি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কেবিনেট(মন্ত্রী পরিষদ) রয়েছে, যা উচ্চতর আইন পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের উপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার প্রয়োগ করে থাকে।”(Henderson J.J. Craik, Parliament-A Survey, George Allen & Unwin, London 1965, p. 89)।
তিনি মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে বর্তমান রক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করতে গিয়ে লিখেছেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর যদি নির্ভর করা যেত যে, সে সংবিধানের সৌন্দর্য্ ও ঐতিহ্যের প্রতি পুরোপুরি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং সব সময় বুদ্ধিমত্তকে কাজে লাগাবে তাহলে আর সুদৃঢ় প্রশাসন এবং সমস্ত ক্ষমতাশক্তি অর্পণকারী নমনীয় সংবিধানের চেয়ে উত্তম কোনো জিনিস হতে পারেনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কেউই এই বিষয়টিকে নিশ্চিত মনে করেনা। তাই কিছু গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক।(ঐ, পৃ. ৯৮)।
মৌলিক অধিকারের আইনগত রক্ষাব্যবস্থার জন্য বৃটেনে আজ যে আন্দোলন চলছে তার ভবিষ্যদ্বাণী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর চার্লস হাওয়ার্ড ম্যাকলুইন ১৯৪৭ সালেই করেছিলেন।
তিনি বলেনঃ “ঐতিহ্যের নেতিবাচক প্রভাব যখন হতেই দুর্বল হচ্ছে একনায়কতন্ত্রের বিপদ ততই নিকটতর হচ্ছে। সেই সময় আর বেশি দূরে নয় যখন সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ঐতিহ্যের স্থান আইনকে গ্রহণ করতে হবে। তাহলে অতীতে যে সম্মান ও নিরাপত্তা সহজলভ্য ছিল তা অর্জিত হতে পারে। আইনের আকারে পার্লামেন্ট এর আজ যে সার্বভৌমত্ব রয়েছে তা সাধারণ নিয়মে পরিণত হলে এক ভয়ংকর একনায়কতন্ত্রের উত্থান ঘটবে।”(Mcllwail Charls Howard, Constitutionalism, p. 21)
আজ বৃটেনবাসী এই একনায়কত্বের সুস্পষ্ট উত্থান অনুভব করছে। তাই তারা লিখিত সংবিধান ও অধিকার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে এই একনায়কতন্ত্রের পথ বন্ধ করা যায় এবং তাকে বিচার বিভাগের অধীনে এনে কাবু করা যায়। এ এক অদ্ভূত ব্যাপার যে, কেবলমাত্র বৃটেনে নয়, বরং তার সমস্ত উপনিবেশ-কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কোথাও মৌলিক অধিকারের কোনো আইনগত গ্যারান্টি নাই। কানাডায় ১৯৬০ সালে একটি অধিকার আইন অনুমোদিত হয়েছে, কিন্তু তা পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নের এখতিয়ারের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনা। তাতে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, কোন আইন এর পরিপন্থী হলেও বিচারালয় তার বাস্তবায়ন প্রতিহত করতে পারবেনা। কানাডার বিচারপতি বোরা লাসকিন নিম্নোক্ত বাক্যে এর ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
“অধিকার আইন শুধুমাত্র আইনমন্ত্রীর পথ প্রদর্শনের জন্য যাতে তিনি আইন প্রণয়নের সময় তা সামনে রাখতে পারেন।”(Phillips O Hood, পূ.গ্র. পৃ. ১৪৩)।
প্রধানমন্ত্রী Lester Pearson অধিকার আইনকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী Trudeau ১৯৬৯ সালে তা অনুমোদন করিয়েছিলেন কিন্তু তার অবস্থা ১৯৬০ সালের মতই থেকে যায়। ১৯৬৩ সালে নিউজিল্যান্ডের এটর্নি জেনারেল JR Hanan অধিকার আইন মঞ্জুর করানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু পার্লামেন্ট তা প্রত্যাখ্যান করে। অস্ট্রেলিয়ার অবস্থাও তাই।
বৃটেন ও তার উপনিবেশগুলোর নাগরিকগণ মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে পার্লামেন্টের দয়ার পাত্র। তাদের একমাত্র আশ্রয় ঐতিহ্য ও প্রথার(Traditions & Customs) প্রতি সম্মান প্রদর্শন। সন্দেহ নাই যে, এসব ঐতিহ্যের শিকড় খুবই গভীরে প্রোথিত এবং কোন সরকার তা উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাতে পারেনা। কিন্তু পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ও বিচার বিভাগের ক্ষমতাহীনতার কারণে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের কোন আইনগত গ্যারান্টি বিদ্যমান নাই। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক উইলিয়াম ডগলাস এর ভাষায়ঃ “বৃটিশ আইন মূলত আত্মনিয়ন্ত্রণ এর সেই ঐতিহ্যের নাম যার ভিত্তিতে পার্লামেন্টের সদস্যগণ ও বৃটিশ শাসকগণ কার্য্ক্রম পরিচালনা করে আসছেন।(Willium Douglas O., বুন্য়াদী ইনসানী হুকুক কা মাসলা (উদূ অনু.), লাহোর ১৯৬৫ খৃ., পৃ. ১১৬)।
কিন্তু বৃটেনের বিচারকগণ, আইনজ্ঞগণ ও সাধারণ নাগরিকগণ এখণ শুধুমাত্র ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ এর এই ঐতিহ্যকে মৌলিক অধিকারের কোন নির্ভরযোগ্য রক্ষক মনে করেন না। কারণ এ ঐতিহ্য এসব অধিকার স্থগিত, বাতিল বা সীমিত হওয়াকে প্রতিহত করতে পারেনা। পার্লামেন্ট ইচ্ছে করলেই এগুলি শেষ করে দিতে পারে এবং এই অবস্থায় কোথাও এর প্রতিকারের আবেদন করা যায়না।
বৃটেনের পরে এখন আমেরিকার সংবিধানের মূল্যায়ন করে দেখা যাক। উক্ত সংবিধানকে এই দিক হতে পৃথিবীর দৃষ্টান্তমূলক গণতান্ত্রিক সংবিধান মনে করা হয় যে, এতে বিচার বিভাগকে মৌলিক অধিকারের রক্ষক বানানো হয়েছে এবং তার আইন পরিষদের উপর প্রাধান্য রয়েছে। তা কংগ্রেসের মঞ্জুরকৃত আইনকে সংবিধানের পরিপন্থী সাব্যস্ত করে বাতিল করে দিতে পারে এবং তার বাস্তবায়ন প্রতিহত করতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগের এ সার্বভৌমত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র অথবা বহিরাক্রমণের ক্ষেত্রে শাসন বিভাগ ও কংগ্রেস(আমেরিকার পার্লামেন্ট) ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। সংবিধানের ১ নম্বর ধারার ৯ নম্বর সেকশানের ২ নং উপধারার অধীনে দেশে সামরিক আইন জারী করা যেতে পারে, মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যেতে পারে এবং বিচারালায়সমূহের রিট আবেদনের শুনানির এখতিয়ার প্রত্যাহার করা যেতে পারে। উইলগি এই ধারার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেনঃ “যুদ্ধাবস্থা চলাকালীন, আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র অথবা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজকালীন অবস্থায় সামরিক আইন জারী করা হলে হাইকোর্টে রিট আবেদনের অধিকার এবং নাগরিক অধিকারের অন্যান্য সব গ্যারান্টি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে।”(Willoughby W, Principles of the Constitutional Law of the United States, Baker voorthis & co., New York 1983, p. 677)
কংগ্রেস ১৯৫৪ সালে সংরক্ষণ আইন মঞ্জুর করে। এর অধীনে কোন কোন অবস্থায় যে কোন ব্যক্তিকে স্বয়ং নিজের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিতে বাধ্য না করার সেই অধিকার হতে বঞ্চিত করা যায়-সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে শর্তহীনভাবে যার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই বছর গণসমাবেশ ও দল গঠনের স্বাধীনতার আইনগত গ্যারান্টি থাকা সত্ত্বেও আমেরিকায় কমিউনিষ্ট পার্টির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল এবং বিচার বিভাগের সার্বভৌমত্ব শাসন বিভাগের এই সিদ্ধান্তকে বেআইনী সাব্যস্ত করে পার্টিকে বহাল করার ব্যাপারে কোনরূপ সাহায্য করতে পারেনি।
প্রফেসর ম্যাকলুইন আমেরিকার সংবিধানে মৌলিক অধিকারের রক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনা করে বলেনঃ “মানুষের যেসব অধিকার আমাদের নিকট অত্যন্ত প্রিয়-যেমন, চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অপরাধীদের একতরফা আটকাদেশ এবং নির্যাতনমূলক ও বেআইনী আচরণ হতে হেফাজত ইত্যাদি সমস্ত কিছু বিভিন্নরূপ বিপদে আক্রান্ত। যখনই রাষ্ট্রীয় সুবিধার দাবী সামনে আসে তখনই এসব কিছু বিপদগ্রস্ত হতে দেখা যায়। আমি প্রায়ই অনুভব করছি যে, আমরা এখন এসব অধিকার হতে হাত গুটিয়ে নেওয়ার এবং বিপদসমূহ উপেক্ষা করার বিশেষ বিপদের সম্মুখীন।”(Macllwain, পূ.গ্র. পৃ. ১৪০)।
এসব তথ্য হতে পরিষ্কার জানা যায় যে, আমেরিকাতেও মৌলিক অধিকার অবিচ্ছেদ্য নয়। আমেরিকা ও বৃটেনে কিছু সন্তোষজনক পরিস্থিতি দৃষ্টিগোচর হওয়ার আসল কারণসমূহ কি তা ডরোথির মুখে শুনুন। “সরকারের নিরাপত্তার একক ও সর্বশেষ পন্থা-সাংবিধানিক ব্যবস্থা দীর্ঘকাল যাবত সংবিধান অনুযায়ী কার্য্কর রয়েছে এবং পরিস্থিতি সব সময় তার অনুমতি দেয়না। বহিরাক্রমণ, যুদ্ধে পরাজয় এবং ক্ষতিকার তীব্র রাজনৈতিক মতবিরোধ ইত্যাদি সাংবিধানিক সরকারের উন্নতিকে বহু কঠিন বরং অসম্ভব করে তোলে। আমেরিকা ও বৃটেন উভয়ে এ দিক হতে বেশ সৌভাগ্যশালী যে, উভয় দেশ দীর্ঘকাল ধরে বহিরাক্রমণ হতে তুলনামূলক নিরাপদ রহিয়াছে এবং আভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা হতেও দেশ উভয় রাষ্ট্র মুক্তি লাভ করেছে।”(Dorothy Pickles, পূ.গ্র. পৃ. ১১৩)।
উপরোক্ত কথার অর্থ এই যে, আমেরিকা ও বৃটেনে মৌলিক অধিকারের হেফাজত তাদের সংবিধান ও ঐতিহ্যের পরিবর্তে অধিকতর সেই অনুকূল পরিস্থিতির কাছে ঋণী যা এই উভয় রাষ্ট্রে সহজলভ্য হয়েছে। যদি এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং উভয় দেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বৈদেশিক আক্রমণ অথবা আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও অস্থিতিশীলতার শিকার হয়ে পড়ে তবে তাদের সংবিধান ও ঐতিহ্য তাদের নাগরিকদের কোনরূপ সাহায্য করতে সক্ষম হবে না। এই উভয় দেশের সংবিধানের স্থিতিশীলতা তাদের বিশেষ পরিস্থিতি এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার উপর নির্ভরশীল। তাই যেসব দেশ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে তাদের সংবিধান নকল করেছে তারা কোনরূপ লাভবান হওয়ার পরিবর্তে বরং সংকটেই পতিত হয়েছে।
লর্ড এমিরি এর স্বীকারোক্তি করে বলেনঃ “ যেসব সংবিধান বৃটিশ সংবিধানের শুধু বাহ্যিক কাঠামো গ্রহণ করেছে তাদের অকার্য্কর হওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি একনায়কতন্তের উত্থান এবং একদলীয় ব্যবস্থা চেপে বসার আকারে প্রকাশিত হয়েছে।”(Amery L.S., Thoughts on the Constitution, Oxford 1956, p. 18)।
ফ্রান্সের একজন সংসদ সদস্যকে বৃটিশ সংবিধান অনুসরণ হতে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে Burke তাঁর চিঠিতে লিখেছেনঃ “ আমি বৃটিশ সংবিধানের প্রশংসা করলে এবং তা অধ্যয়নের পরামর্শ দিলে তার অর্থ এই নয় যে, তার বাহ্যিক অবয়ব এবং তার আওতায় কৃত ইতিবাচক ব্যবস্থাপনাসমূহ আপনার জন্য অথবা দুনিয়ার অন্য কোন দেশের জন্য অনুসরণীয় নমুনা বনে যাবে এবং আপনি তার হুবহু নকল করতে বসে যাবেন।”(Amery, পূ.গ্র., পৃ. ১৯)।
উপরোক্ত আলোচনার পর আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি যে, বৃটেন এবং আমেরিকার সংবিধানেও মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য হওয়ার গ্যারান্টি নেই। এর সাহায্যে যদি এসব দেশের নাগরিকগণের কিছু উপকারও হয়ে থাকে তবে তা তাদের পর্য্ন্তই সীমিত। অন্য কোন দেশ নিজেদের এখানে তাদের সংবিধানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইলে তার পরিণতি একনায়কতন্ত্রের আকারে প্রকাশ পাবে।
সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ সম্পর্কে আমরা আগেই বলে এসেছি যে, সেখানে অর্থনৈতিক অধিকার ব্যতীত অন্য কোনরূপ অধিকারের অস্তিত্ব নেই এবং সংবিধানে অন্য যেসব অধিকারের উল্লেখ আছে তা বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জন করার মত নয়। তাই সেখানে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের মূলত কোন প্রশ্নই উঠে না। সমাজতান্ত্রিক সরকার নিজেই অধিকার নির্ধারণ করে থাকে এবং সে-ই তার বাস্তবায়নের সীমা নির্দেশ করে। যেন সে “নিজেই কুম্ভ, নিজেই কুম্ভকার এবং নিজেই কুম্ভকর্দ”। এর বাইরে না আছে কোন অধিকার না অধিকার কার্য্করকারী কর্তৃপক্ষ।
গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সংবিধানের উপরোক্ত পর্যালোচনা এই সত্যকে প্রতীয়মান করে তোলে যে, সংবিধান মৌলিক অধিকার হেফাজতের কোন শক্তিশালী গ্যারান্টি নয়। আমাদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ সাক্ষ্য দেয় যে, মৌলিক অধিকার নির্ধারণ ও তার বাস্তব প্রয়োগের জন্য আমরা কেবলমাত্র লিখিত সংবিধানের উপর নির্ভর করতে পারি না। এসব সংবিধানের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ত্রুটি এই যে, তার পেছনে কোন কার্যকরী শক্তি বর্তমান নাই যা শাসক গোষ্ঠীকে তার আরোপিত সীমারেখার অনুসারী বানাতে পারে এবং যা মৌলিক অধিকার হেফাজতের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে পারে।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র

জাতীয় পর্যায়ে মৌলিক অধিকার সংরক্ষনে সংবিধানের ব্যর্থতার পর এখন দেখা যাক এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা স্বীয় উদ্দেশ্যের দিক হতে কতটা সফল হয়।
সম্মিলিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট যে মহাসনদ ঘোষণা করেছিল তা যেন এই ক্ষেত্রে ছিল মানবীয় প্রচেষ্টার সর্বোচ্চ উত্থান। ৩০ দফা সম্বলিত এই মহাসনদ। নিম্নে তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হল।
মুখবন্ধ
যেহেতু মানব পরিবারের সকল সদস্যের সহজাত মর্যাদা ও সম অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহের স্বীকৃতি বিশ্বে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শান্তির ভিত্তি;
যেহেতু মানবিক অধিকারসমূহের প্রতি অবজ্ঞা ও ঘৃণা মানবজাতির বিবেকের পক্ষে অপমানজনক বর্বরোচিত কার্যকলাপে পরিণতি লাভ করেছে এবং সাধারণ মানুষের সর্বোচ্চ আশা আকাংখার প্রতীক হিসেবে এমন একটি পৃথিবীর সূচনা ঘোষিত হয়েছে যেখানে মানুষ বাক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং ভয় ও অভাব হতে নিষ্কৃতি ভোগ করবে;
যেহেতু চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে মানুষকে অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে বাধ্য না করা হলে মানবিক অধিকারসমূহ অবশ্যই আইনের শাসনের দ্বারা সংরক্ষিত করা উচিত;
যেহেতু জাতিসমূহের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়তা করা আবশ্যক;
যেহেতু জাতিসংঘভুক্ত জনগণ সনদের মাধ্যমে মৌল মানবিক অধিকারসমূহ, মানুষের মর্যাদা ও মূল্য এবং নারী ও পুরুষের সম-অধিকারের প্রতি আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং সামাজিক অগ্রগতি ও ব্যাপকতর স্বাধীনতায় উন্নততর জীবনমান প্রতিষ্ঠাকল্পে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ;
যেহেতু সদস্য রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘের সহযোগিতায় মানবিক অধিকার ও মৌল স্বাধীকারসমূহের প্রতি সার্বজনীন শ্রদ্ধা ও মান্যতা বৃদ্ধি অর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ;
যেহেতু সকল অধিকার ও স্বাধীকারের ব্যাপারে একটি সাধারণ সমঝোতা উক্ত অঙ্গীকার সম্পূর্ণরূপে আদায় করার জন্য সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ;
এক্ষণে, তাই সাধারণ পরিষদ সকল জাতি ও জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির একটি সাধারণ মানদন্ড হিসেবে জারি করছে এই মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র
এই লক্ষ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি ও সমাজের প্রত্যেক অঙ্গ মানবিক অধিকারসমূহের এই সার্বজনীন ঘোষণাপত্রটিকে সর্বদা স্মরণ রেখে শিক্ষাদান ও জ্ঞান প্রসারের মাধ্যমে এ সকল অধিকার ও স্বাধীকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রগতিশীল ব্যবস্থাদির দ্বারা সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জনগণ ও তাদের অধীনস্থ অঞ্চলসমূহের অধিবাসীবৃন্দ উভয়ের মধ্যে ঐগুলির সার্বজনীন ও কার্য্কর স্বীকৃতি ও মান্যতা অর্জনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাবে।
ধারা-১
বন্ধনহীন অবস্থায় এবং সম-মর্যাদা ও অধিকারাদি নিয়ে সকল মানুষই জন্মগ্রহণ করে। বুদ্ধি ও বিবেক তাদের অর্পণ করা হয়েছে এবং ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে তাদের একে অন্যের প্রতি আচরণ করা উচিত।
ধারা-২
যে কোন প্রকার পার্থক্য যথা জাতি, গোত্র, বর্ণ, নারী-পুরুষ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্য মতবাদ, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, সম্পত্তি, জন্ম বা অন্য মর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকেই ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সকল অধিকার ও স্বাধিকারে স্বত্ববান।
অধিকন্তু, কোন ব্যক্তি যে দেশ বা অঞ্চলের অধিবাসী, তা স্বাধীণ, অছিভুক্ত এলাকা, অস্বায়ত্তশাসিত বা অন্য যে কোন প্রকার সীমিত সার্বভৌমত্বের মধ্যে থাকুক না কেন, তার রাজনৈতিক, সীমানাগত ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার ভিত্তিতে কোন পার্থক্য করা চলবে না।
ধারা-৩
প্রত্যেকেরই জীবন ধারণ, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে।
ধারা-৪
কাউকে দাস হিসেবে বা দাসত্বে রাখা চলবে না; সকল প্রকার দাসপ্রথা ও দাস-ব্যবসা নিষিদ্ধ থাকবে।
ধারা-৫
কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা চলবে না।
ধারা-৬
আইনের সমক্ষে প্রত্যেকেরই সর্বত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার রয়েছে।
ধারা-৭
আইনের কাছে সকলেই সমান এবং কোনরূপ বৈষম্য ব্যতিরেকে সকলেরই আইনের দ্বারা সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। এই ঘোষণাপত্র লংঘনকারী কোনরূপ বৈষম্য বা এই ধরনের বৈষম্যের কোন উস্কানির বিরুদ্ধে সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার সকলেরই রয়েছে।
ধারা-৮
যে কার্যাদির ফলে শাসনতন্ত্র বা আইন কর্তৃক প্রদত্ত মৌলিক অধিকারসমূহ লঙ্ঘিত হয় সে সবের জন্য উপযুক্ত জাতীয় বিচার আদালতের মারফত কার্য্কর প্রতিকার লাভের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে।
ধারা-৯
কাউকেই খেয়াল খুশীমত গ্রেফতার, আটক বা নির্বাসন করা যাবে না।
ধারা-১০
প্রত্যেকেরই তার অধিকার ও দায়িত্বসমূহ এবং তার বিরুদ্ধে আনীত যে কোন ফৌজদারী অভিযোগ নিরূপণের জন্য পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার-আদালতে ন্যায্যভাবে ও প্রকাশ্যে শুনানী লাভের অধিকার রয়েছে।
ধারা-১১ ক. যে কেউ কোন দন্ডযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এমন গণ-আদালত কর্তৃক আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্য্ন্ত নির্দোষ বলে বিবেচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
খ. কাউকেই কোন কাজ বা ত্রুটির জন্য দন্ডযোগ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা চলবে না যদি সংঘটনকালে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দন্ডযোগ্য অপরাধ গণ্য না হয়ে থাকে। আবার দন্ডযোগ্য অপরাধ সংঘটনকালে যতটুকু শাস্তি প্রযোজ্য ছিল তার চেয়ে অধিক শাস্তি প্রয়োগ করা চলবে না।
ধারা-১২
কাউকে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি বা চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়ালখুশীমত হস্তক্ষেপ অথবা সম্মান ও সুনামের উপর আক্রমণ করা চলবে না।
ধারা-১৩
ক. প্রত্যেক রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে চলাচল ও বসতি স্থাপনের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে।
খ. প্রত্যেকেরই নিজ দেশসহ যে কোন দেশ ছেড়ে যাওয়ার ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার রয়েছে।
ধারা-১৪
ক. নির্যাতন এড়ানোর জন্য প্রত্যেকেরই অপর দেশসমূহে আশ্রয় প্রার্থনা ও ভোগ করার অধিকার রয়েছে।
খ. অরাজনৈতিক অপরাধসমূহ অথবা জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও মূলনীতি বিরোধী কার্য্কলাপ হতে সত্যিকারভাবে উদ্ভূত নির্যাতনের ক্ষেত্রে এই অধিকার প্রার্থনা করা নাও যেতে পারে।
ধারা-১৫
ক. প্রত্যেকেরই একটি জাতীয়তার অধিকার রয়েছে।
খ. কাউকেই যথেচ্ছভাবে তার জাতীয়তা থেকে বঞ্চিত করা অথবা তাকে তার জাতীয়তা পরিবর্তনের অধিকার অস্বীকার করা চলবে না।
ধারা-১৬
ক. পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ ও নারীদের জাতিগত, জাতীয়তা অথবা ধর্মের কারণে কোন সীমাবদ্ধতা ব্যতিরেকে বিবাহ করা ও পরিবার গঠনের অধিকার রয়েছে। বিবাহের ব্যাপারে, বিবাহিত অবস্থায় এবং বিবাহ-বিচ্ছেদকালে তাদের সম-অধিকার রয়েছে।
খ. কেবল বিবাহ ইচ্ছুক পাত্র-পাত্রীর অবাধ ও পূর্ণ সম্মতির দ্বারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে।
গ. পরিবার হচ্ছে সমাজের স্বাভাবিক ও মৌলিক একক গোষ্ঠী; সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক এর সংরক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
ধারা-১৭
ক. প্রত্যেকেরেই একাকী এবং অপরের সহযোগীতায় সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার রয়েছে।
খ. কাউকেই তার সম্পত্তি হতে খেয়ালখুশীমত বঞ্চিত করা চলবে না।
ধারা-১৮
প্রত্যেকেরই চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। নিজ ধর্ম অথবা বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতা এবং একাই অথবা অপরের সাথে যোগসাজশে ও প্রকাশ্যে বা গোপনে নিজ ধর্ম বা বিশ্বাস শিক্ষাদান, প্রচার, উপাসনা ও পালনের মাধ্যমে প্রকাশ করা এই স্বাধীনতা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
ধারা-১৯
প্রত্যেকেরই মতামতের ও মতামত প্রকাশের স্বাধীকার রয়েছে; বিনা হস্তক্ষেপে মতামত পোষণ এবং যে কোন উপায়াদির মাধ্যমে ও রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষ তথ্য ও মতামত সন্ধান, গ্রহণ ও জ্ঞাত করার স্বাধীনতা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
ধারা-২০
ক. প্রত্যেকেরই শান্তিপূর্ণভাবে সম্মিলিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
খ. কাউকেই কোন সংঘভুক্ত হতে বাধ্য করা যাবে না।
ধারা-২১
ক. প্রত্যক্ষভাবে অথবা অবাধে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ দেশের সরকারে অংশগ্রহণের অধিকার সকলেরই রয়েছে।
খ. প্রত্যেকেরই নিজ দেশের সরকারী চাকুরীতে সমান সুযোগ লাভের অধিকার রয়েছে।
গ. জনগণের ইচ্ছাই সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি হবে; এই ইচ্ছা সার্বজনীন এবং সমান ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নৈমিত্তিকভাবে এবং প্রকৃত নির্বাচন দ্বারা ব্যক্ত হবে; গোপন ব্যালট অথবা অনুরূপ অবাধ ভোটদান পদ্ধতিতে এরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ধারা-২২
সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেকেরই সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে; প্রত্যেকেই জাতীয় প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সংগঠন ও সম্পদ অনুসারে তার মর্যাদা ও অবাধে ব্যক্তিত্ব বিকাশে অপরিহার্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারসমূহ আদায় করার জন্য স্বত্ববান।
ধারা-২৩
ক. প্রত্যেকেরই কাজ করার, অবাধে চাকুরী নির্বাচনের, কাজের জন্য ন্যায্য ও অনুকূল অবস্থা লাভের এবং বেকারত্ব হতে রক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
খ. প্রত্যেকেরই কোন বৈষম্য ব্যতিরেকে সমান কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
গ. প্রত্যেক কর্মীর তার নিজের এবং পরিবারের মানবিক মর্যাদা রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম এমন ন্যায্য ও অনুকূল পারিশ্রমিক এবং প্রয়োজনবোধে সেইসঙ্গে সামাজিক সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থাদি সংযোজিত লাভের অধিকার রয়েছে।
ঘ. প্রত্যেকেরই নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন ও এতে যোগদানের অধিকার রয়েছে।
ধারা-২৪
প্রত্যেকেরই বিশ্রাম ও অবসর বিনোদনের অধিকার রয়েছে। কাজের সময়ের যুক্তিসংগত সীমা এবং বেতনসহ নৈমিত্তিক ছুটি এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
ধারা-২৫
ক. নিজ ও নিজ পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য পর্যাপ্ত জীবনমানের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবামূলক কার্যাদির সুযোগ এবং বেকারত্ব, পীড়া, অক্ষমতা, বৈধব্য, বার্ধক্য অথবা অনিবার্য কারণে জীবন যাপনে অন্যান্য অপারগতার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
খ. মাতৃত্ব ও শৈশব অবস্থায় প্রত্যেকে বিশেষ যত্ন ও সহায়তা লাভের অধিকারী। বৈবাহিক বন্ধনের ফলে বা বৈবাহিক বন্ধনের বাইরের জন্ম হোক না কেন, সকল শিশুই অভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ করবে।
ধারা-২৬
ক. প্রত্যেকেরই শিক্ষালাভের অধিকার রয়েছে। অন্ততঃপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ের শিক্ষা অবৈতনিক হবে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে। কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণভাবে লভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সকলের জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে।
খ. ব্যক্তিত্ত্বের পূর্ণ বিকাশ এবং মানবিক অধিকার ও মৌলিক স্বাধিকারসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা পরিচালিত হবে। সমঝোতা, সহিষ্ঞুতা ও সকল জাতি, বর্ণ ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধুত্ব উন্নয়ন এবং শান্তি রক্ষার্থে জাতিসংঘের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করবে।
গ. যে প্রকার শিক্ষা তাদের সন্তানদের দেওয়া হবে তা পূর্ব হতে বেছে নেওয়ার অধিকার পিতামাতার রয়েছে।
ধারা-২৭
ক. প্রত্যেকেরই গোষ্ঠীগত সাংস্কৃতিক জীবনে অবাধে অংশগ্রহণ, শিল্পকলা চর্চা করা এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও তার সুফলসমূহের অংশীদার হওয়ার অধিকার রয়েছে।
খ. প্রত্যেকেরই বিজ্ঞান, সাহিত্য অথবা শিল্পকলা ভিত্তিক সৃজনশীল কাজ হতে উদ্ভূত নৈতিক ও বৈষয়িক স্বার্থসমূহ রক্ষণের অধিকার রয়েছে।
ধারা-২৮
প্রত্যেকেরই এমন একটি সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য স্বত্ববান যেখানে এই ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত অধিকার ও স্বাধীনতাসমূহ পূর্ণভাবে আদায় করা যেতে পারে।
ধারা-২৯
ক. প্রত্যেকেরই সমাজের প্রতি কর্তব্যাদি রয়েছে কেবল যার অন্তর্গত হয়েই তার ব্যক্তিত্ত্বের অবাধ ও পূর্ণ বিকাশ সম্ভব।
খ. স্বীয় অধিকার ও স্বাধীনতাসমূহ প্রয়োগকালে প্রত্যেকেরই শুধু ঐ ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে যা কেবল অপরের অধিকার ও স্বাধীনতাসমূহের যথার্থ স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নৈতিকতা, গণশৃংখলা এবং সাধারণ কল্যাণের ন্যায্য প্রয়োজনসমূহ মিটানোর উদ্দেশ্যে আইনের দ্বারা নিরূপিত হয়।
গ. এই সকল অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগকালে কোন ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও মূলনীতি লংঘন করা চলবে না।
ধারা-৩০
এই ঘোষণায় উল্লেখিত কোন বিষয়কে এরূপভাবে ব্যাখ্যা করা চলবে না যাতে মনে হয় যে, এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত কোন অধিকার বা স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কোন রাষ্ট্র, দল বা ব্যক্তি বিশেষের আত্মনিয়োগের অধিকার রয়েছে। (সনদের বাংলা অনুবাদ জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র ঢাকা-এর সৌজন্যে প্রাপ্ত)।
এই সনদে যেসব অধিকার ও স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেগুলোকে পরে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি সূচীতে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারসমূহ এবং অপরটিতে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারসমূহ একত্র করা হয়। সাধারণ পরিষদ ১৯৬৬ সালে এই দুটি চুক্তিপত্র অনুমোদন করে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উপর ছেড়ে দেয় যে, যে সব রাষ্ট্র স্বেচ্ছামূলকভাবে এসব অধিকার স্বীকার করে তারা এই দুটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এক্ষেত্রে আরও কিছু কাজ করেছে। তা ১৯৫৯ সালে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে এবং ১৯৬৩ সালে বর্ণবৈষম্য বিলোপের জন্য একটি ঘোষণা জারি করে। সাধারণ পরিষদ ১৯৪৮ সালে গণহত্যার বিলোপ সাধনের জন্য, ১৯৫১ সালে উদ্বাস্তুদের নিরাপত্তার জন্য, ১৯৫২ সালে নারীদের রাজনৈতিক অধিকারের জন্য, ১৯৫৭ সালে বিবাহিত নারীদের জন্য, ১৯৬১ সালে দাসত্ব প্রথার উচ্ছেদ ও বিলোপ সাধনের জন্য এবং ১৯৬৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের সমালোচনার জন্য বিভিন্ন চুক্তিপত্র ও প্রস্তাব পাস করে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা(ILO), ইউনেসকো(UNESCO), আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু সংস্থা(IRO) এবং উদ্বাস্তু হাই কমিশনও নিজ নিজ কর্মপরিসরে মানবাধিকারের চিহ্নিতকরণ ও তার হেফাজতের জন্য উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
কিন্তু মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র এবং জাতিসংঘ ও তার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের এই গৌরবজনক প্রচেষ্টার ফল কি পাওয়া গেছে? বাস্তবিকই এই ঘোষণাপত্র কি মানবজাতিকে নির্যাতন, উৎপীড়ন, দমন, স্বৈরাচার, একনায়কত্ব ও ফ্যাসিবাদের হিংস্র ছোবল হতে মুক্তিদান করে স্বাধীন পরিবেশে নিঃশ্বাস নেওয়ার ও নিজেদের অধিকার ভোগের সুযোগ করে দিতে পেরেছে? এই ঘোষণাপত্রের বাস্তব অবস্থা এবং জাতিসংঘের অসহায় অবস্থার কথা স্বয়ং পাশ্চাত্য চিন্তাবিদ ও আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞের মুখেই শুনুনঃ
মানবাধিকার কমিশন ১৯৪৭ খৃস্টাব্দে ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিবেদন করে যার মধ্যে পূর্বেকার চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া হয়েছে। তাতে এই সাধারণ নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে যে, “কমিশন স্বীকার করে যে, মানবাধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিযোগসমূহের ক্ষেত্রে কোন প্রকারের কার্যক্রম গ্রহণের এখতিয়ার তার নেই।”(Gaius Ezejiofor, Protection of Human Rights under the Law, 1964, p. 80)।
অর্থাৎ ঘোষণাপত্র প্রচার করার এক বছরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এর কোন আইনগত মর্যাদা থাকবে না। কোন সদস্য রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় এই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে চাইলে করতে পারে অথবা ইচ্ছা করলে ময়লার ঝুড়িতেও নিক্ষেপ করতে পারে। হ্যান্স কেলসনের নিম্নোক্ত পর্যালোচনা দেখুনঃ
“নিরেট আইনগত দৃষ্টিকোণ হতে দেখলে-ঘোষণাপত্রের দফাগুলো কোনও সদস্য রাষ্ট্রের উপর তা মেনে নিতে এবং ঘোষণাপত্রের খসড়া অথবা তার উপক্রমণিকায় উল্লেখিত মানবাধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। ঘোষণাপত্রের ভাষার এমন কোন ব্যাখ্যা সম্ভব নয় যা হতে এই অর্থ বের করা যেতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্র নিজ দেশের নাগরিকগণকে মানবাধিকার ও স্বাধীনতা দিতে আইনত বাধ্য।”(Hans Kelson, The Law of United Nations, London 1950, P. 29)।
ঘোষণাপত্র রাষ্ট্রসমূহের স্বেচ্ছাচারিতার মুখোশ উন্মোচনের জন্য এক ব্যক্তিকে কি কি জিনিস দিয়েছে সে সম্পর্কে কার্ল মেনহেইম লিখেছেনঃ “ঘোষণাপত্র কোন ব্যক্তিকে এই আইনগত অধিকার দেয়নি যে, সে ঘোষণাপত্রে অধিকারসমূহ ও স্বাধীনতার মধ্যে কোন একটি হতে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালত বা সর্বোচ্চ ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী প্রতিষ্ঠান-আন্তর্জাতিক জাস্টিস আদালতে আপিল দায়ের করতে পারবে। উক্ত আদালতের আইনের ২৪ নং দফায় পরিষ্কার ভাষায় লেখা আছে যে, আদালতের সামনে কেবল রাষ্ট্রই একটি পক্ষ হিসাবে উপস্থিত হতে পারে।”(Karl Mannheim, Diagnosis of our Time, London 1947, P. 15)।
ঘোষণাপত্রে যেসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের উল্লেখ আছে তার আসল তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে ডক্টর রাফায়েল বলেনঃ “ এই নামমাত্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার কোন আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করেনা। এগুলো এমন অধিকার যার সম্পর্ক রয়েছে কোন জিনিস দেওয়ার সাথে। যেমন বুদ্ধিভিত্তির আমদানী, শিক্ষা ও সামাজিক সেবা ইত্যাদি। কিন্তু কোন্ ব্যক্তিকে বলা হয়েছে যে, সে এসব জিনিসের ব্যবস্থা করে দেবে? এই কর্তব্য অবশেষে কার সাথে সংশ্লিষ্ট? জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার রচয়িতাগণ বলেন যে, “প্রত্যেক ব্যক্তি সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার লাভ করবে”, তার অর্থ কি এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি বিশ্বজনীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু উপহার দেওয়া উচিত যার দ্বারা প্রয়োজনবোধে উপকৃত হওয়া যাবে? বাস্তবিকই যদি তার এই অর্থ হয়ে থাকে তবে ঐ চুক্তিপত্রের খসড়ায় যে উদ্দেশ্যে ঘোষণাপত্র জারি করা-ঐ প্রকারের ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কোন দফা নেই কেন? আর যদি ঐরূপ ব্যবস্থার অস্তিত্ব না থাকে তাহলে এ আবার কেমন দায়িত্ব ও কার অধিকার? মানুষের উপর এমন দায়িত্ব আরোপ করা যা পালন করার কোন সুয়োগই না থাকে তাহলে তা তো নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছুই নয়। তথাপি তা অতটা স্বৈরাচারী নয় যতটা এই নির্বুদ্ধিতা যে, জনগণকে এমন সব অধিকার দান করা হবে যা থেকে তারা কোনক্রমেই উপকৃত হতে পারে না।”(Raphael D.D., Political Theory and the Rights of Man, Indiana University Press, Bloomington 1967, P. 96)।
এসব অধিকার সম্পর্কে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আইনজ্ঞ এ.কে. ব্রোহী বলেন, “অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের সনদপত্রে প্রদত্ত অধিকারসমূহ মূলত ঐ পরিভাষার স্বীকৃত অর্থের আলোকে অধিকারই নয়। এতো কেবল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পলিসিসমূহের মূলনীতি মাত্র এবং তা হতে ঘটনাক্রমে একথাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কমিশনকে একটির পরিবর্তে দুটি পৃথক চুক্তিনামা কেন রচনা করতে হয়েছে।” (Brohi, A.K., United Nations and The Human Rights, 1968, P.44)।
তিনি একথা বলে পৃথিবীর দুই মতাদর্শগত শিবিরের দিকে ইংগিত করেছেন-যা কেবল পরস্পর বিরোধী পলিসিরই অনুসারী নয়, বরং অধিকার সম্পর্কেও সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে।
ঘোষণাপত্রের বাস্তব অবস্থা এবং জাতিসংঘের অসহায়ত্বের চিত্র দেখে নেওয়ার পর এখন পাশ্চাত্যেরই একজন চিন্তাবিদের নিকট হতে ভবিষ্যত সম্ভাবনার হতাশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতার কথাও শুনে রাখুনঃ
“উল্লেখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে এই দাবী করা যায় না যে, জাতিসংঘের আওতায় মানবাধিকারের আইনগত নিরাপত্তার কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যত আছে। এই সংস্থা এমন সব রাষ্ট্রগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত যারা গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে সর্ম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ধারণা পোষণ করে। পাশ্চাত্য দেশসমূহের মতে কতিপয় অধিকার ও স্বাধীনতা সভ্য সমাজের জন্য মৌলিক মনে করা হয়। তাদের দাবী এই যে, প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তিসমূহ ঐসব অধিকারের মাধ্যমে শক্তিশালী ও মজবুত হয়। অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের ধারণা এই যে, কোন অধিকার ও স্বাধীনতাই মৌলিক নয়। সমস্ত অধিকারের উৎস হচ্ছে রাষ্ট্র এবং সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজের স্বার্থে এসব অধিকার ও স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার এখতিয়ার তার রয়েছে। পক্ষান্তরে আরো একটি রাষ্ট্রগোষ্ঠী রয়েছে যাদের বলা হয় উন্নয়নশীল দেশ যার উদ্দেশ্য দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধন। এসব রাষ্ট্রের মতে নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধাস্বরূপ। এসব মতবিরোধের কারণে, এটা কোন আশ্চর্যের কথা নয় যে, জাতিসংঘ মানবাধিকারের ময়দানে উত্তম ফল দেখাতে পারেনি এবং ভবিষ্যতে দেখাতে পারবে এমন আশা করাও বাস্তববাদী চিন্তাধারার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।”(Gaius Ezejiofor, পূ.গ্র. পৃ. ১৩৬)।
মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের অধ্যয়ন এবং তৎসম্পর্কিত পর্যালোচনায় এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবজাতির সমষ্টিগত প্রচেষ্টাও তার জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবন যাপনের কোন গ্যারান্টি দিতে পারেনি। তারা আগেও নিজ নিজ দেশে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বৈরাচারের যতটা শিকার ছিল আজও তদ্রুপ রয়ে গেছে। বরং সরকারের কার্যক্ষেত্রের পরিসীমার প্রসার এবং তার এখতিয়ারের ক্রমবৃদ্ধি মৌলিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন করে তুলেছে। মানবাধিকারের সনদ একটি চিত্তাকর্ষক দলীলের অতিরিক্ত কিছু নয়। এর মধ্যে অধিকারসমূহের একটি তালিকা ঠিকই সন্নিবেশ করা হয়েছে, কিন্তু এর কোন অধিকার কার্যকর করার মত শক্তি এর পেছনে নেই। তা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উপর আইনগত বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদেরকে মৌলিক অধিকার আত্মসাৎ হতে বিরত রাখার না কোন ব্যবস্থা করেছে, আর না কোন ব্যক্তিকে অধিকার বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনরূপ আইগত প্রতিকার প্রার্থনার সুযোগ করে দিতে পেরেছে। এভাবে মানবাধিকারের হেফাজতের বেলায় উক্ত সনদ সম্পূর্ণ অকৃতকার্য ও অনির্ভরযোগ্য দলীলে পরিণত হয়েছে। তা থেকে সর্বাধিক উপকার এতটুকুই পাওয়া গেছে যে, তা মানবাধিকারের একটি মানদন্ড প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বকে নিজেদের অধিকার রক্ষার ক্রমবিকাশমান অনুভূতি ও চেতনা দান করেছে, সমাজে ব্যক্তির গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে এবং তার সাহায্যে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলো নিজেদের আইন কানুন রচনার সময় মৌলিক অধিকারের প্রথাগত অধ্যায়টি অনায়াসে সংযোজন করে নিচ্ছে।
উল্লেখিত ঘোষণাপত্রের মর্যাদা সম্পূর্ণ নৈতিক। আইনগত দৃষ্টিকোণ হতে তার কোন ওজন ও মর্যাদা নেই। মৌলিক অধিকারের রক্ষক হিসেবে উক্ত সনদপত্রের শক্তি ও গুরুত্ব এই বাস্তব সত্য হতে অনুমান করা যায় যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বন্দীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্ব মানবাধিকার কমিশন(Amnesty International) নামক আন্তর্জাতিক সংগঠনের ১৯৭৫-৭৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্মিলিত জাতিসংঘের ১৪২টি সদস্য দেশের মধ্যে ১১৩ টি দেশে মৌলিক অধিকার চরমভাবে পদদলিত হয়েছে এবং শক্তির অপব্যবহার, অবৈধ ধড়পাকড়, রাজনৈতিক আটক, নির্যাতন নিষ্পেষণ, মৃত্যুদন্ডের ঘটনা, প্রচার মাধ্যমের উপর বিধিনিষেধ আরোপ, বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস, স্বৈরাচারী আইন জারি এবং মৌলিক অধিকারসমূহ বাতিল বা স্থগিত করার পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুঃখজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যর্থতার কারণসমূহ

মানবজাতির মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে জাতীয় সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মহাসনদের ব্যর্থতার মূল্যায়ন করার পর এখন আমরা এই মৌলিক প্রশ্নে আসছি যে, শেষ পর্যন্ত মানবজাতি নিজেদের অধিকার সংরক্ষণে কোন সন্তোষজনক ব্যবস্থা নির্ধারণে এখন পর্যন্ত কেন সফল হতে পারেনি এবং এ প্রসঙ্গে তাদের চিন্তাধারা এবং দৃষ্টিভঙ্গীর অকৃতকার্যতা এবং বুদ্ধিবৃত্তি ও চেতনা শক্তির ব্যর্থতার মূল কারণসমূহ কি?
উপরোক্ত প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ জবাব আমরা কুরআন মজীদে পেয়ে যাচ্ছি। কুরআনে হাকীম আমাদের বলে দিচ্ছে যে, এই সমস্ত অপ্রীতিকর অবস্থার কারণ মাত্র একটি। তোমরা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সত্তার স্থান ও মর্যাদার পরিবর্তন করে দিয়েছ এবং যেসব মনগড়া প্রভুদের নিজেদের আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে নিয়েছ তারাই আজ তোমাদের ঘাড় মটকাচ্ছে এবং তোমাদের অধিকারসমূহ পদদলিত করছে। কুরআন বলে যে, মানবজাতির সর্বপ্রথম চুক্তি তাদের সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি এবং এই বিশ্বজগতের প্রকৃত শাহেনশাহ ও শাসকের সাথে হয়েছিল এবং এই চুক্তির আলোকে আল্লাহ তাআলাকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মেনে নিয়ে প্রত্যেকের নিকট হতে এ শপথ গ্রহণ করা হয়েছিল যে, তাঁকে ছাড়া আর কাউকে আইনদাতা ও প্রতিপালক হিসেবে মান্য করা যাবে না এবং তাঁর সত্তা, গুণাবলী অথবা ক্ষমতায় কাউকে অংশীদারও সাব্যস্ত করা যাবে না। এই শপথ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ মানবজাতিকে নিজের প্রতিনিধি(খলীফা)নিয়োগ করে এবং একটি জীবন ব্যবস্থা দান করে স্বীয় রাজ্যে প্রেরণ করেন, যেখানে তাদের সমস্ত ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত বিষয় ঐ জীবন ব্যবস্থা অনুযায়ী এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীর পক্ষ হতে সময়ে সময়ে নিজের নবীগণ, আসমানী কিতাবসমূহ ও সহীফার মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্দেশনার অধীনে পরিচালনা করার ছিল।
এই চুক্তিতে-বার বার যার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যা ক্রমাগত নবায়িতও হয়ে আসছিল এবং যা আখেরী জামানার নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ আকারে নাযিল করে এবং যে কোন প্রকারের বিকৃতি হতে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করে কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথ প্রদর্শনের স্থায়ী ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তিপত্রে সর্বময় কর্তৃত্বের মালিকের অধিকার ও এখতিয়ার, তাঁর রাজত্বের সীমারেখা, তাঁর সাথে মানুষের সম্পর্কের ধরন, পৃথিবীতে মানুষের মর্যাদা, তার জীবনের উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্য লাভের উপায়-উপকরণ, সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি, মানুষ ও মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের কর্মক্ষেত্র, খোদায়ী রাজত্বে তাঁর বান্দাদের সামগ্রিক বিষয়ে তত্ত্বাবধানকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমারেখা, ব্যক্তির মৌলিক অধিকার, আনুগত্যের সীমা ও শর্তাবলী এবং আখিরাতে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারীর সামনে ব্যক্তির প্রতিটি কাজের জবাবদিহির পর আমলনামা অনুযায়ী পুরস্কার অথবা শাস্তিলাভের এমন সুস্পষ্ট বক্তব্য পেশ করা হয়েছে যে, তার আলোকে জীবনের সঠিক পথ পরিষ্কার ও উদ্ভাসিত হয়ে তোমাদের সামনে এসে গেছে। এখন যে কোন ব্যক্তি এ পথ অবলম্বন করবে-যাকে কুরআন মাজীদ সিরাতুল মুস্তাকিম(সরল ও সুদৃঢ় পথ) ও সাওয়াউস-সাবীল(সমতল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজপথ) নামে নামকরণ করেছে-সে এই পার্থিব জগতেও সাফল্য লাভ করবে এবং আখেরাতেও কৃতকার্য হয়ে জান্নাতের চিরসুখ লাভে সক্ষম হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এই রাস্তা ত্যাগ করে নিজের কল্পনাপ্রসূত অন্য কোন পথ বের করতে চাইবে, সে দুনিয়া ও আখেরাতে উভয় স্থানে ব্যর্থ ও অকৃতকার্য হয়ে দোযখের অনন্ত শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে।
সমস্ত কুরআন মাজীদ এই সিরাতুল মুস্তাকীম ও সাওয়াউস সাবীল সুনির্দিষ্ট করার জন্য নাযিল হয়েছে এবং তাওরাত, জাবূর ও ইনজীলও জীবনের এই রাজপথ আলোকিত করে তোলার জন্যই নাযিল হয়েছিল। আদি পিতা হযরত আদম(আ) হতে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ(সা) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলগণও একটিমাত্র পয়গাম নিয়েই আসতে থাকেনঃ হে আল্লাহর বান্দাগণ! বান্দাদেরকে নিজেদের প্রভু বানিওনা, তোমরা কেবলমাত্র একজন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সত্তার সীমাহীন, চিরস্থায়ী, সামগ্রিক এবং সৃষ্টিলোকের প্রতিটি অণুর উপর পরিব্যাপ্ত কর্তৃত্বের অধীনে জীবন যাপন করছ, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন প্রতিপালক, কোন একচ্ছত্র শাসক ও অধিপতি, কোন মালিক-মোখতার এবং কোন রিযিকদাতা নেই। কুরআন মজীদে এক একজন নবীর কার্যক্রম পাঠ করলে দেখা যায় তাদের মিশন ছিল একটিই। তা হচ্ছেঃ নিজ নিজ যুগের শাদ্দাদ, ফেরাউন ও নমরুদের সার্বভৌমত্বের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে এবং আল্লাহর বান্দাদের তাদের দাসত্বের কবল হতে মুক্ত করে আহকামুল হাকিমীন(রাজাধিরাজ) এর সাথে তাদের দাসত্বের সম্পর্ক স্থাপন।
সর্বময় কৃতিত্বের অধিকারী এই একক সত্তার সাথে কৃত চুক্তির আনুগত্য এবং তার বিদ্রোহী হওয়ার পরিণতিতে মানব জীবনের উপর যে ব্যাপক ও সামগ্রিক প্রভাব প্রতিফলিত হয় তার বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পূর্বে দেখা যাক যে, সেই সর্বপ্রথম প্রতিশ্রুতি কি ছিল যা আল্লাত তাআলা তাঁর বান্দাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছিলেন।
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَا ۛ أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَافِلِينَ [٧:١٧٢]
أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِن قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِّن بَعْدِهِمْ ۖ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ [٧:١٧٣]
“স্মরণ কর! তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের বংশধর বের করেন এবং তাদের নিকট হতে নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করেনঃ আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলল, নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী রইলাম। এই স্বীকারোক্তি গ্রহণ এইজন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বলঃ আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আমাদের পূর্বে শেরেক করেছে, আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর। তবে কি পথভ্রষ্টদের কৃতকর্মের জন্য তুমি আমাদের ধ্বংস করবে”। (সূরা আরাফ: আয়াত ১৭২-১৭৩)।
পৃথিবীতে মানবজীবনের সূচনার পূর্বে গৃহীত এই প্রতিশ্রুতিতে নিম্নোক্ত দফাগুলি খুবই সুস্পষ্টঃ
১. আল্লাহ তাআলাকে নিজের একমাত্র প্রভু হিসেবে মানার স্বীকৃতি।
২. আদিকাল হতে অনাদিকাল পর্যন্ত জন্মগ্রহণকারী সকল মানুষের নিকট হতে পৃথক পৃথকভাবে আল্লাহর সাথে বিশ্বস্ততার শপথ এবং এই শপথের অনুকূলে স্বয়ং তাদের সাক্ষ্য।
৩. শেরেক তথা অন্য কাউকে খোদা মানা বা আল্লাহর সাথে শরীক বানানো হতে বিরত থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার।
৪. বাপ-দাদা পূর্ব পুরুষদের আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপকে ওজর হিসেবে পেশ করে শেরেকের দায় দায়িত্ব হতে রক্ষা পাওয়ার সুযোগের অবসান।
৫. কিয়ামাতের দিন নিজের পার্থিব জীবনের প্রতিটি কাজের জবাবদিহি।
সর্বপ্রথম এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণের পর আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে তা বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন, যাতে তারা হেদায়াতের পথ ত্যাগ করে পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত না হয় এবং নিজেদের ঘাড়ে অন্য কারো গোলামীর পিঞ্জির পেঁচিয়ে অপমান ও অধঃপতনের অতল গহবরে পতিত না হয়। মানুষের কাছ হতে সামগ্রিকভাবে যে প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়েছিল তার নবায়ন ও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য আদিষ্ট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের নিকট হতে আবার পৃথক পৃথক প্রতিশ্রুতিও নেওয়া হয়। অথচ তাঁরা মানুষ হিসেবে সর্বপ্রথম গৃহীত প্রতিশ্রুতিতেও শরীক ছিলেন, কিন্তু তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ পদ এবং এই পদের অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক ও পরিচালক’ তাঁদের নিকট হতে স্বতন্ত্রভাবে আনুগত্যের শপথ নেন।
“স্মরণ কর যখন আল্লাহ নবীগণের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেনঃ আজ আমি তোমাদের কিতাব ও হেকমত যা কিছু দান করেছি-কাল যদি অন্য কোন রাসূল তোমাদের নিকট রক্ষিত শিক্ষার সত্যতা প্রতিপাদন করে তোমাদের কাছে আসে তবে তোমরা তার উপর ঈমান আনবে এবং তার সাহায্য করবে। একথা বলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে? তারা বলল, হ্যা আমরা স্বীকার করলাম। তিনি বললেন, তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম। এরপর যারা(নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে) ফিরে যাবে তারাই ফাসেক।”(সূরা আল ইমরানঃ ৮১-৮২)।
খেলাফত ও নব্যূয়তের পদের অনবরত নবায়ন হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা এক একজন নবী পাঠিয়ে তাঁর মাধ্যমে সমসাময়িক কালের উম্মাতকে নতুন করে ঐ প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন।
“হে নবী! স্মরণ কর সেই প্রতিশ্রুতির কথা যা আমরা সকল নবীর নিকট হতে গ্রহণ করেছিলাম, তোমার নিকট হতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মরিয়ম-পুত্র ঈসার নিকট হতেও, তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছিলাম সুদৃঢ় অঙ্গীকার। যাতে সত্যবাদী লোকদের নিকট(তাদের প্রতিপালক) তাদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আর তিনি কাফেরদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন”।(সূরা আল আহযাবঃ ৭-৮)।
নবীগণের নিকট হতে তিনি শুধু এই অঙ্গীকারই গ্রহণ করেননি যে, তাঁরা আল্লাহ তাআলাকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী মানবেন এবং অন্য কারো দাসত্ব গ্রহণ করবেন না, বরং তাঁদের নিকট হতে এই প্রতিশ্রুতিও গ্রহণ করেন যে, তাঁরা পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন, তাঁর বান্দাগণকে সেইসব বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকদের কবল হতেও মুক্ত করবেন যারা বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করে এবং আল্লাহর রাজত্বে নিজেদের স্বৈরশাসন কায়েম করে তাঁর প্রজাদের নিজেদের প্রজায় এবং তাঁর বান্দাদের নিজেদের গোলামে পরিণত করে তাঁদেরকে গোলামীর শৃংখলে বন্দী করে নিয়েছিল এবং তাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত আজাদী হতে বঞ্চিত করে নিজেদের অনুগত বানানোর চেষ্টা করেছে। নবীগণকে তাদের মিশন সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে কুরআন মজীদ বলছেঃ “আল্লাহ তোমাদের জন্য সেই দ্বীন বিধিবদ্ধ করেছেন যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা আমরা ওহী করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই বলে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে মতভেদ কর না।”(সূরা শূরাঃ ১৩)।
এই নবীগণ যেসব জাতির পথ প্রদর্শনের জন্য আদিষ্ট ছিলেন সেসব জাতির নিকট হতেও আল্লাহ তাআলা আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের কথা ও স্বীকারোক্তি স্মরণ করিয়ে দিলেন। বনী ঈসরাইলকে সম্বোধন করে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ বনী ইসরাঈলের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি নিলেন এবং তাদের মধ্য হতে বারজন নেতা নিযুক্ত করেছিলাম, আর আল্লাহ বলেছিলেনঃ আমি তোমাদের সংগেই আছি। তোমরা যদি নামায কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলগণের উপর ঈমান আন ও তাদের সম্মান কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তবে তোমাদের গুনাহ অবশ্যই মাফ করে দেব এবং নিশ্চয়ই তোমাদের জান্নাতে দাখিল করব যার পাদদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এরপরও কেউ কুফরী করলে সে সরল পথ হারাবে।”(সূরা মাইদাঃ ১২)।
একই প্রতিশ্রুতি অন্যত্র এভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছেঃ “স্মরণ কর যখন আমরা ইসরাঈল সন্তানদের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম ও গরীবদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে ভদ্রতা সহকারে কথা বলবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিবে। কিন্তু অল্পসংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। যখন তোমাদের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলাম যে, তোমরা পরস্পর রক্তপাত করবে না এবং আপনজনদের দেশ হতে বহিষ্কার করবে না, অতঃপর তোমরা তা স্বীকার করেছিলে এবং এই বিষয়ে তোমরাই সাক্ষী”।(সূরা বাকারাঃ ৮৩-৮৪)।
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাকে নিজেদের প্রভু হিসেবে মানার স্বীকারোক্তিই নয়, বরং নবীগণের মাধ্যমে প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান অনুসরণেরও প্রতিশ্রুতি লওয়া হয়েছিল। এসব আয়াত হতে আরো জানা যায় যে, আমিব্য়ায়ে কেরাম একই দাওয়াত নিয়ে আবির্ভুত হতে থাকেন। এই নামায, রোযা, যাকাত, আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়, পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম ও দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার, সত্যভাষণ, মানুষের জীবনের মর্যাদাবোধ এবং লোকদের অত্যাচার নির্যাতনের শিকারে পরিণত করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ কেবলমাত্র মুহাম্মাদ(সা) এর উম্মাতকেই দেওয়া হয়নি, পূর্বেকার উম্মাতগণকেই এই উপদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং আল্লাহ তাআলা মানব সমাজকে নৈতিক ভিত্তির উপর গড়ে তোলার জন্য সর্বদা একই জীবন ব্যবস্থার অনুসরণের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। বনী ইসরাঈলকে সূরা বাকারা ৬৩ ও ৯৫, আল ইমরান ১৮৭ এবং নিসা ১৫৪-৫৫ আয়াতসমূহেও আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এখন হযরত ঈসা(আ) এর উম্মাত সম্পর্কে নিম্নোক্ত বাণীসমূহ প্রণিধানযোগ্যঃ
“অনুরূপভাবে আমরা সেই সব লোকের নিকট হতেও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছি যারা বলেছিল, আমরা নাসারা(খৃস্টান)। কিন্তু তাদেরকেও যে শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার বিরাট অংশ তারা ভুলে গেছে”।(সূরা মাইদা: ১৪)।
পূর্বকালের উম্মাতগণের নিকট হতে নেওয়া প্রতিশ্রুতি, এসব উম্মাতের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং তাদের ধ্বংসাত্মক পরিণতির বিবরণ শুনানোর পর কুরআন মাজীদ আখেরী জামানার নবীর উম্মাতকে সম্বোধন করে বলেঃ
“আল্লাহ তাআলা তোমাদের (মুসলমানদের) যে নিআমত(দীন) দান করেছেন তা স্মরণ রাখ এবং তিনি তোমাদের নিকট হতে যে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন তা ভুলে যেও না। অর্থাৎ তোমাদের এই কথা যে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম এবং আল্লাহকে ভয় কর। অন্তরসমূহে যা কিছু আছে তা আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।”(সূরা মাইদাঃ৭)।
প্রত্যেক উম্মাতকে পৃথক পৃথকভাবে তাদের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে সর্বপ্রথম প্রতিশ্রুতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে গোটা মানব গোষ্ঠীকে সম্বোধন করে বলেনঃ
“হে মানব সন্তান! আমি কি তোমাদের নির্দেশ দিইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব কর না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন; আর আমারই দাসত্ব কর, এটাই সরল পথ।” (সূরা ইয়াসীনঃ ৬০-৬১)।
মানবজাতিকে তাদের প্রতিশ্রুতির জিম্মাদারির অনুভূতি জাগ্রত করার সাথে সাথে কুরআন মাজীদ প্রতিশ্রুতির অনুসরণ ও তার বিরুদ্ধাচরণের পরিণতিও সুস্পষ্ট করে সামনে তুলে ধরেছে, যাতে মানুষ এই ভুলের শিকার না হয় যে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য তাদের গ্রেফতার করা হবে না এবং এই উদাসীনতায় লিপ্ত না হয় যে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে তারা আর কি পাবে। আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি পালনকারীদের মহান পুরস্কারের সুসংবাদ এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের মর্মন্তুদ শাস্তির দুঃসংবাদ শুনিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে নিজ বান্দাদের সঙ্গে স্বয়ং একটি সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হচ্ছেন। “হ্যাঁ, যে ব্যক্তিই নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং নোংরামি হতে দূরে থাকবে সে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হবে। কারণ মুত্তাকীগণকে আল্লাহ পছন্দ করেন। আর যারা আল্লাহর পথে কৃত প্রতিশ্রুতি ও নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে-আখেরাতে তাদের কোন অংশ নাই।”(সূরা আল ইমরানঃ ৭৬-৭৭)।
“যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পরে তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক আল্লাহ অক্ষুণ্ন রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”(সূরা বাকারাঃ ২৮)।
এই একই কথা সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে সূরা রাদের ২৫ নং আয়াতেও বলা হয়েছে। প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীর মর্যাদার পার্থক্য এবং তাদের সাথে নিজের ভিন্নরূপ আচরণের কারণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
“তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ ব্যক্তি কি এক সমান হতে পারে? কেবল বিবেকবান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। তাদের নীতি এই যে, তারা আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না।”(সূরা রা’দঃ ১৯-২০)।
কুরআন পাকের আয়াত থেকে প্রতিভাত হয় যে, হযরত আদম(আ) হতে মানব গোষ্ঠীর সর্বশেষ সদস্য পর্যন্ত একে একে আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তি প্রথম প্রতিশ্রুতি এবং তারপর প্রত্যেক নবীর মাধ্যমে উক্ত প্রতিশ্রুতির নবায়নের অধীনে নিজের স্রষ্টা ও মালিকের সাথে এই চুক্তিতে আবদ্ধ যে, তিনি ছাড়া আর কাউকে তারা নিজেদের রব ও প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণ করবে না, তিনি ছাড়া আর কারো সামনে আনুগত্যের মস্তক অবনত করবে না, তিনি ছাড়া আর কাউকে একচ্ছত্র অধিপতি ও শাসক হিসেবে স্বীকার করবে না এবং এই একচ্ছত্র অধিপতির পক্ষ হতে আম্বিায়ায়ে কেরামের মাধ্যমে যে পথ-নির্দেশ ও আইন-বিধান তারা লাভ করতে থেকেছে এবং এখন নবীগণের শেষ ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মাদ(সা) এর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রাপ্ত হয়েছে এবং যা কিয়ামত পর্যন্ত সুরক্ষিত করে দেওয়া হয়েছে- সেই অনুযায়ী তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নির্মাণ ও পুনর্গঠন করবে। তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যদি খোদায়ী দাবী করে তবে তার দাবী তার মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে এবং তাদের সাথে ঠিক সেরূপ ব্যবহার করা হবে যেরূপ ব্যবহার বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকদের সাথে করা হয়ে থাকে। সে নিজেও আল্লাহর আনুগত্য করবে এবং অন্যদেরও তাঁর আনুগত্য কবুলের দাওয়াত দেবে। জীবনের কোন ব্যাপারেই সে তার প্রতিপালক, তাঁর প্রেরিত নবী-রসূল এবং তাদের আইনের আনুগত্যকারী সমসাময়িক কর্তৃত্ব সম্পন্ন লোকদের ছাড়া আর কারো কথা মানবে না এবং শেরেক হতে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে।
আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত প্রথম প্রতিশ্রুতি এবং তার নবায়নকারী চুক্তিসমূহের বিশ্লেষণের পর এখন দেখা যাক যে, আল্লাহ তাআলাকে একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে মেনে নেওয়ার অথবা তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতা অস্বীকার করার কি পরিণতি মানবজীবনে দেখা দেয় এবং শুধুমাত্র এই একটি মাত্র সিদ্ধান্তের দ্বারা সত্য মিথ্যার দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে পেতে কোথায় গিয়ে পৌছে এবং আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের মহান পদে সমাসীন মানুষ- যারা নিজেদের স্রষ্টার পর এই পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্তা- নিজেদের মহত্ব ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে অধ:পতনের কোন অতল ও অন্ধকার গহবরে পতিত হয়।
আল্লাহ তায়ালার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতির অধীনে কেবলমাত্র তাঁকে একচ্ছত্র অধিপতি হিসাবে মেনে নিলে এবং তাঁর ইবাদত-বন্দেগী ও দাসত্বের চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে নিম্নোক্ত ফলাফলসমূহ সরাসরি আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়।
১. রাষ্ট্র কোন সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষ ও তার স্রষ্টার মধ্যে অনুষ্ঠিত চুক্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করেছে।
২. এই চুক্তির আলোকে রব কেবল একজনই অবশিষ্ট তাঁর বান্দা।
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
অর্থ: “বস্তুত সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যই নয়” ( সূরা ইউসুফ : ৪০)।
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ
অর্থ: সাবধান! সৃষ্টি তাঁরই এবং হুকুম ও চলবে তাঁর”। (সূরা আরাফ- আয়াত: ৫৪ )।
৩. তাঁর ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বে কোন অংশীদার নাই এবং তাঁর কোন সমকক্ষও নাই।
وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ
অর্থ: “বাদশাহীর ব্যাপারে তাঁর কোন শরীক নাই” ( বনী ইসরাঈল- ১১১)।
وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا
অর্থ: তিনি তাঁর রাজ্য শাসনে কাউকেও শরীক করেন না- সূরা কাহফ: ২৬।
وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ
-আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকে ইলাহ ডেকনা, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই- সূরা কাসাস : ৮৮।
৪. এই শাসন কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী এবং সর্ব ব্যাপক। এই বিশ্ব জাহানের একটি অণুও তাঁর কর্তৃত্বের বাইরে নয়।
لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَىٰ [٢٠:٦]
অর্থ: যা আছে আকাশ মন্ডলীতে, পৃথিবীতে, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থানে ও ভূখন্ডে এসব কিছুর মালিকানাই তাঁর (সূরা ত্বাহা : ৬)।
وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُونَ [٣٠:٢٦]
অর্থ: আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর। সকলেই তাঁর আজ্ঞাবহ। সূরা রূম: ২৬।
৫. আমাদের এই পৃথিবী এবং এর বাইরের গোটা বিশ্বজগত একই রাজ্য একই রাজত্ব।
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ [٦٧:١]
অর্থ: মহা মান্বিত তিনি- সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর করায়ত্ব। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। সূরা মুলক : ১ ।
وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ
অর্থ: তাঁর রাজত্ব আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীময় পরিব্যপ্ত। সূরা বাকারা: ২৫৫।
৬. মানুষ এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং এই হিসাবে সে স্রষ্টার পর এই বিশ্বের সর্বাপেক্ষা মহান ও সম্মানিত সত্তা।
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ
অর্থ: তিনিই এই দুনিয়ায় তোমাদেরকে প্রতিনিধি করেছেন- সূরা আনআম: ১৬৫।
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا [١٧:٧٠]
অর্থ: আমরা আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি এবং তাদের স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তর রিযিক দান করেছি এবং আমরা যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর এদেরকে শ্রেষ্টত্ব ‍দান করেছি।- সূরা বনী ইসরাঈল: ৭০।
৭. একক কর্তৃত্ব ও একক রাজত্বে যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে মানবতার অখন্ডতা। সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী একই শাসকের প্রজা এবং একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে সকল মানুষ সমান। বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও আঞ্চলিক সমস্ত পার্থক্য ও ‍সমস্ত স্বাতন্ত্র্য ভিত্তিহীন।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا
অর্থ: হে মানব জাতি! আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরষ্পরের সাথে পরিচিত হত পার- সূরা হুজুরাত: ১৩।
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
অর্থ: আল্লাহর কাছে দ্বীন তো শুধুমাত্র ইসলাম। – সূরা আল ইমরান : ১৯।
এটা কেবল মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সা: এর পেশকৃত দীন নয়, বরং সকল আম্বিয়া কেরাম একই দীনের দাওয়াত দিতে থাকেন এবং তাঁরা সকলে ছিলেন মুসলমান।
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ [٢:١٣٦]
অর্থ: তোমরা (মুসলমানগণ) বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহতে এবং যা নাযিল হয়েছে আমাদের নিকট, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরদের প্রতি এবং যা তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে দেওয়া হয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিনা এবং আমরা তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)- সূরা বাকারা : ১৩৬।
৯. একই জীবনবিধান- মানব জাতির জন্য ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দিক থেকে একই আচরণবিধি গঠনের জন্য মজবুত ও গভীর ভিত্তি সমূহ সরবরাহ করেছে। প্রকৃতগত যোগ্যতার পার্থক্য, ঝোঁক-প্রবণতা ও রুচির পার্থক্য, দায়িত্ব ও কর্তব্যের বৈচিত্র সত্ত্বেও ‍উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের ঐক্য এবং আচরণ বিধি গঠনের মৌলিক অনুভূতি ও কার্যকারণের ঐক্য মানুষকে চিন্তা ও কর্মের দিক থেকে একই রং -এ রঞ্জিত করেছে, আল্লাহ তায়ালা যার নামকরণ করেছেন ‘সিবগাতুল্লাহ’।
صِبْغَةَ اللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ [٢:١٣٨]
অর্থ: আল্লাহর রং ধারণ কর, তাঁর রং- এর চেয়ে উত্তম রং আর কার হতে পারে। আর আমরা তাঁরই ইবাদতকারী- সূরা বাকারা: ১৩৮।
১০. মানবজাতির এই জীবন বিধান উন্নততর নৈতিক ও আত্মিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্টিত। তাই তা স্বার্থের সংঘাত, শ্রেণীবৈষম্যের অস্তিত্ব এবং ব্যক্তিক ও সামষ্টিক জীবনে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ খতম করে দিয়ে সমস্ত মানুষের মধ্যে পূর্ণ মানসিক ঐক্য ও বাস্তব সহযোগিতার মজবুত সম্পর্ক গড়ে তোলে- যা ছিনতাই, লুটতরাজ, শোষণ এবং লোভ লালসার শিকড় কেটে দিয়ে মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক সহমর্মিতা ও নি:স্বার্থতার প্রাণশক্তি জাগরিত করে। এভাবে তা বৈষয়িক স্বার্থের উপর ভিত্তিশীল শ্রেণীগুলোর সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা খতম করে একটি শ্রেণীহীন সমাজ অস্তিত্বে আনয়ন করে। নৈতিকতা হচ্ছে এই জীবন ব্যবস্থার প্রাণ ও ভিত্তি প্রস্তর। কুরআন মজীদ এই নৈতিকতাকে মহানবী সা: এর সর্বশ্রেষ্ট গুণবৈশিষ্ট্য ঘোষণা করেছে।
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ [٦٨:٤]
অর্থ: তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্টিত। সূরা: কালাম: ৪।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
অর্থ: তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। সূরা আহযাব : ২১।
১১. এই জীবন ব্যবস্থায় মানবজাতির জন্য প্রতিযোগিতার একটি ময়দানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে চেষ্টা সাধনার আগ্রহ এবং অন্যদের অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হয়ে যাওয়ার স্বভাবসুলভ আকাংখা মানুষকে তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার স্ফূরণ এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধনে সাহায্য প্রদান করতে পারে। কিন্তু প্রতিযোগিতার এই আগ্রহকে বৈষয়িক উপকরণ লাভ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লালসা পূরণের এমন সব উত্তেজক বিষয় থেকে পবিত্র করা হয়েছে যা মানুষকে মানুষের শত্রুতে পরিণত করে তাকে পশুত্বের নীচ পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। এখানে প্রতিযোগিতা হচ্ছে ‘তাকওয়ার’, অর্থাৎ আত্মার পবিত্রতা ও উচ্চতর নৈতিকতা, মন-মগজের পূর্ণ একাগ্রতা এবং ব্যক্তিত্বের পূর্ণ সমর্পণের সাথে আল্লাহর বিধানের আনুগত্য। এখানে বড়ত্বের অর্থ এই নয় যে, কোন ব্যক্তির তার প্রতিপক্ষের তুলনায় অধিক সম্পদের অধিকারী হয়ে যাওয়া, সুউচ্চ ও সুপ্রশস্ত অট্টালিকায় বসবাস করা এবং সেইসব জীবনোপকরণের মালিক হওয়া যা থেকে লাখো মানুষ বঞ্চিত। বরং আসল বড়ত্ব হচ্ছে- নিজের উত্তম কার্যকলাপ ও আনুগত্যের উৎকৃষ্ট রেকর্ডের ভিত্তিতে আল্লাহর দরবারে সম্মানের পাত্র বিবেচিত হওয়া এবং অন্যদের তুলনায় উত্তম প্রতিদান ও পুরষ্কারের অধিকারী হওয়া।
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
অর্থ: মূলত: তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক পরহেযগার। – সূরা হুজুরাত : ১৩।
এটাই হলো আল্লাহ তাআলার প্রতিষ্ঠিত মর্যাদার মাপকাঠি। মানব সমাজে এখন অপরদের উপর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হলে ‍তা কেবল সৎকাজ ও পরহেজগারীর ময়দানে অগ্রবর্তী হওয়ার মাধ্যমে। সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অন্য মাপকাঠির আল্লাহ তাআলারকাছে কোন গুরুত্ব নেই।
১২. আল্লাহর নির্ধারিত জীবন বিধান নামেমাত্র সুন্দর নৈতিক মূলনীতির কোন প্রাণহীন সংকলন নয়। তার বাস্তবায়নের জন্য এর পশ্চাতে একটি মজবুত ও শক্তিশালী সংস্থা রয়েছে এবং এই বাস্তবায়নকারী শক্তি এর আসল প্রাণ।
মহান আল্লাহর বাণী:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ [٩٩:٧]وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ [٩٩:٨]
অর্থ: ক্বেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে। – সূরা যিলযাল: ৭,৮।
إِنَّا أَنذَرْنَاكُمْ عَذَابًا قَرِيبًا يَوْمَ يَنظُرُ الْمَرْءُ مَا قَدَّمَتْ يَدَاهُ
অর্থ: আমরা তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছি, সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম চাক্ষুস দেখতে পাবে এবং কাফেররা বলবে, হায়! আমি যদি মাটি হতাম। – সূরা নাবা : ৪০।
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
অর্থ: আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমাদের তাঁর নিকটই ফিরে যেতে হবে। -সূরা বাকারা: ১৫৬।
আখেরাতের জবাবদিহির এই অনুভূতি মানব জীবনে দায়িত্ববোধের উপাদান প্রবিষ্ট করে তাকে লাগামহীন হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং সে নিজের প্রবৃত্তির ইংগিতে পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে নিজের প্রতিটি কাজে তার মালিকের সন্তোষ এবং তাঁর সামনে নিজের সৌভাগ্য ও কৃতকার্যতার খেয়াল রাখে।
১৩. আল্লাহ তাআলার রাজ্যে পূর্ণরূপে আইনের রাজত্ব বিদ্যমান। বান্দার কাজ শুধু এই আইনের আনুগত্য করা এবং প্রতিনিধি (খলীফা) হিসাবে তা বাস্তবায়ন করা। তাদের মধ্যে কারও, এমনকি কোন নবীরও আল্লাহর বিধানে কোনরূপ সংশোধন ও রহিতকরণ অথবা হ্রাসবৃদ্ধির অধিকার নেই। এর আনুগত্য করা যেমন একজন সাধারণ মানুষের জন্য অপরিহার্য, অনুরূপভাবে আল্লাহর নবীও তার অনুসরণ করতে বাধ্য। আইনের শাসনের এই ধারণা আল্লাহর দীন ব্যতীত আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ
অর্থ: আমরা তোমার নিকট এই গ্রন্থ সত্য সহকারে নাযিল করেছি, যাতে তুমি লোকদের মাঝে সেই সত্য জ্ঞান অনুসারে ফায়সালা করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে দান করেছেন- সূরা নিসা : ১০৫।
قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي ۖ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ ۖ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
অর্থ: হে মুহাম্মাদ! বল, নিজের পক্ষ থেকে তাতে কোনরূপ পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল সেই ওহীর অনুসরণ করি যা আমার উপর নাযিল করা হয়। আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ করলে এব ভয়ংকর এক দিনের শাস্তির ভয় আমার রয়েছে। – সূরা ইউনুস : ১৫।
১৪. আল্লাহ তাআলার চিরস্থায়ী, হস্তান্তর অযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় একচ্ছত্র ক্ষমতার অনুরূপ তাঁর পক্ষ থেকে নির্ধারিত মানুষের মৌলিক অধিকার সমূহও স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। তার পরিবর্তন বা বাতিলকরণের অধিকার কারো নেই। এই নিরাপদ ও সুনিশ্চিত অধিকার সমূহ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক শক্তিশালী সম্পর্ক কায়েম করে এবং পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবর্তে উভয়কে পরষ্পরের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক বানিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলার আইনসমূহ ভবিষ্যতে পরিবর্তন হওয়ার নয়। তিনি যেসব ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনতা দান করেছেন তাতে অন্য কারো হস্তক্ষেপের এখতিয়ার নাই এবং যেসব ব্যাপারে সুষ্পষ্ট বিধান দিয়েছেন সে ক্ষেত্রে অপর কারো আইন প্রণয়নের অধিকার নাই।
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۚ لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ
অর্থ: তোমার প্রতিপালকের কথা সততা ও ন্যায় ইনসাফের দিক থেকে পূর্ণাংগ, তাঁর বিধানের কোন পরিবর্তন নাই। -সূরা আনআম : ১১৫।
لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ
অর্থ: আল্লাহর তৈরী কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না। এটা সম্পূর্ণ সত্য সঠিক দীন। – সূরা রূম : ৩০।
وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
অর্থ: তুমি আল্লাহর নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না। সূরা আহযাব : ৬২।
وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ
অর্থ: আল্লাহর বাণী (বিধান) পরিবর্তনের অধিকার কারো নেই। -সূরা আনআম :৩৪।
আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান একটি স্থায়ী সংবিধানের মর্যাদা রাখে। যার কোন একটি ধারাও কিয়ামত পর্যন্ত পরিবর্তন হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত স্থায়ী ‍চুক্তির এসব পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করলে আপনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্দেগীর শপথ গ্রহণ করে মানব জাতির প্রতি বিরাট করুণা করেছেন। এই অংগীকার মূলত মানবজাতির স্বাধীনতার মহাসনদ, যার মাধ্যমে মানুষের উপর থেকে মানুষের প্রভূত্ব খতম করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যে মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন:
وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ
অর্থ: তিনি তোমাদের চমতকার আকৃতি দান করেছেন- (৪০ : ৬৪)
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ [٩٥:٤]
অর্থ: আমরা তো মানুষকে ‍সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছি- (৯৫ : ৪)
যাকে জ্ঞান ভান্ডার দান করা হয়েছে।
وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا
অর্থ: এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন-( ২ : ৩১)।
যার সেবার জন্য সৃষ্টিলোকের সবকিছু নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ وَالْفُلْكَ تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ
অর্থ: তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই এবং তাঁর নির্দেশে সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহও ( ২২: ৬৫) এবং যার মধ্যে নিজের রূহ থেকে ফুঁকে দিয়ে ফেরেশতাদের সিজদা লাভের পাত্র বানানো হয়েছে।
وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ
অর্থ: এবং তাতে যখন আমার রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হবে- (১৫: ২৯)।
সেই মানুষ স্বয়ং নিজের মত মানুষের অথবা নিজের সেবায় নিয়োজিত অন্যান্য সৃষ্টির সামনে সিজদাবনত হবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত মহত্ব ও মর্যাদাকে জলাঞ্জলি দিয়ে অপমান ও অধ:পতনের অতল গহবরে নিমজ্জিত হবে- এটা আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয়। তিনি মানুষকে স্বয়ং তার স্বার্থে এ কথা পুন:পুন স্মরণ করিয়ে দেন যে, তৌহিদের আকীদায়ই রয়েছে তোমাদের জন্য সম্মান ও মর্যাদা এবং সম্ভ্রম, মাহাত্ম্য, গাম্ভীর্য ও গৌরব। তোমরা তা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হলে ধ্বংস ও বিপর্যয় অনিবার্য। তাই কুরআন মজীদ দুটি বিষয়ের উপর বিশেষ জোর দিয়েছে: (এক) আল্লাহর একত্ব এবং (দুই) মানুষের বন্দেগীর ধরণ। সে এই মৌলিক সম্পর্ককে বিভিন্ন স্টাইলে বর্ণনা করেছে এবং মানুষকে অন্য কোন মানুষের সামনে অথবা কোন জিনিসের সামনে সিজদাবনত হতে নিষেধ করেছে।
কুরআন বলে:
১. তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ডাক তারা তোমাদের মতই বান্দা- সূরা আরাফ : ১৯৪।
২. তিনিই আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক, সার্বভৌমত্ব তাঁরই। তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদের ডাক তারা তো খেজুর বীচির ‍আবরণের (তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তুরও) মালিক নয়। – সূরা ফাতির : ১৩।
৩. আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যদি দুজন ইলাহ হত তবে উভয়ের ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হয়ে যেত। -সূরা আম্বিয়া : ২২।
৪. তাঁর সাথে অপর কোন ইলাহ নাই, যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের উপর আধিপত্য বিস্তার করত।- সূরা মুমিনুন : ৯১।
৫. বল ( হে মুহাম্মাদ) তাদের বক্তব্য অনুযায়ী যদি তাঁর সাথে আরও ইলাহ থাকত তবে তারা আরশের মালিকের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপয় অন্বেষণ করত। – সূরা বনী ইসরাঈল: ৪২।
৬. আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তির মালিক অনেকজন – যারা পরষ্পর শত্রু ভাবাপন্ন এবং অপর এক ব্যক্তির মালিক একজন। এই দুই জনের অবস্থা কি সমান। – সূরা যুমার : ২৯।
প্রভূত্বের দাবীদারদের আসল চেহারা তুলে ধরার জন্য এবং মানব বিবেককে এগুলোর প্রভাবমুক্ত করার উদ্দেশ্য কুরআন পাকের নিম্নোক্ত বক্তব্য অনুধাবনযোগ্য।
“হে মানুষ! একটি উপমা দেওয়া হচ্ছে, মনোযোগ সহকারে তা শোন। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাক তারা তো কখনও একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এই উদ্দেশ্যে তারা সকলে একত্র হলেও। আর মাছি তাদের নিকট থেকে যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তবে তাও তারা এদের নিকট থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম নয়। অন্বেষক ও অন্বেষিত কতই না দূর্বল। – সূরা হজ্জ্ব : ৭৩।
এখন বলুন, আল্লাহর গোলামদের পৃথিবীর কোন বড় থেকে বৃহত্তর শক্তি কি নিজেদের গোলাম বানাতে পারে? আছে কি এমন কোন সার্বভৌম শক্তি যে তাদের মাথা নিজের সামনে অবনত করার জন্য বাধ্য করতে পারে?
(উর্দূ শের ***)
একটি সিজদা যাকে মনে কর বোঝা
অথচ তা দিয়ে অসংখ্য প্রভু
অমান্য করা সোজা। – ইকবাল।
আল্লাহ তাআলাকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হিসাবে স্বীকার করে নেওয়ার এই যৌক্তিক পরিণতি এবং তা থেকে অস্তিত্ব লাভকারী মানব সমাজের একটি মোটামুটি চিত্র দেখে নেওয়ার পর এখন সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী আল্রাহকে না মানার কারণে এবং তাঁর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি লংঘন করার ক্ষেত্রে যে পরিণতি ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং আজ আমাদের দৃষ্টির সামনে সুষ্পষ্টভাবে যা প্রতিভাত হচ্ছে তার মূল্যায়ন করে দেখুন।
১. মানুষ আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার সাথে সাথে এই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা নিজেদের অধিকার সমূহের, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব লাভের ও শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার বৈধতার সার্টিফিকেট পাবে কোথায়? কোন্ সংবিধানের বরাতে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার সম্পর্ক নিধারিত হবে? এই প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে তাকে প্রকৃত চুক্তির স্থলে সামাজিক চুক্তির নামে একটি কাল্পনিক চুক্তি দাঁড় করাতে হয়।
২. আসল চুক্তি মানুষের নিকট থেকে নিজেদের স্রষ্টা ও মালিককে প্রভূ হিসাবে মেনে নেওয়ার শপথ নিয়েছিল। মনগড়া চুক্তি তাদেরকে নিজেদেরই মত মানুষের সামনে মাথা নত হতে বাধ্য করে এবং এভাবে মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্বের সূচনা হয়।
৩. আসল চুক্তি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কেবল একজন মাত্র সত্তাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মনগড়া চুক্তি হাজারো সর্বময় ক্ষমতার মালিক অস্তিত্বে আনয়ন করে যাদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারীর সমস্ত অধিকার ও এখতিয়ার অর্পণ করা হয় এবং এক খোদার দাসত্বের পরিবর্তে মানুষকে নিজেদের মনগড়া প্রভূদের দাসত্বের জিঞ্জির গলায় ঝুলাতে হয়েছে।
৪. কর্তৃত্বের ঐক্য রাষ্ট্রীয় ঐক্যের জন্ম দিয়েছিল। এখন কর্তৃত্বের সংখ্যাধিক্য দুনিয়াকে হাজারো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্টে বিভক্ত করে মানবতার ঐক্যকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে।
৫. আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী সর্বব্যাপী। এখন সাময়িক ও সীমিত কর্তৃত্বের অধিকারী অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং এরা যখন নিজ নিজ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ও নিজেদের রাজ্যসীমা বর্ধিত করার জন্য হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করল তখন থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলার সূচনা হল। মানুষের মনগড়া এই প্রভূরা পরষ্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ল। তাদের উক্ত সংঘাত, ক্ষমতার লালসা, বিলাসিতা ও শোষণ মানব জগতের শান্তি ও নিরাপত্তা বিনাশ করছে।
৬. মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে এই দুনিয়ায় মর্যাদা ও মাহাত্মের উচ্চতম স্থানে অধিষ্টিত ছিল এবং সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু এখন সে তারই মত মানুষের প্রভুত্বের অধীনে সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীবে পরিণত হয়েছে। তার কানাকড়িও মূল্য নাই, কোন সর্বময় ক্ষমতার মালিক তাকে হিংস্র জন্তুর কবলে নিক্ষেপ করে তামাশা উপভোগ করছে, কেউ তাকে আগুনের লেলিহান শিখায় নিক্ষেপ করে বহুৎসব করছে, কেউ তাকে গ্যাস চেম্বারের ইন্ধন বানিয়েছে, কেউ তার কাঁধে কলুর ঘানির জোয়াল চাপিয়েছে, কেউ তার ঘাড়ের উপর নিজের ক্ষমতার মসনদ স্থাপন করে তাকে ভারবাহী পশুতে পরিণত করেছে, কেউ তার গলায় কুকুরের শিকল বেঁধে ভেড়া-বকরীর মত হাটে-বাজারে নিয়ে তাকে বিক্রি করেছে, কেউ তার মাথায় আণবিক বোমা নিক্ষেপ করেছে, কেউ মহাসাগরের অথৈ জলে ডুবিয়ে দিয়েছে এবং আজও তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে যে, তাদের মধ্যে কে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার আদম সন্তান ধবংস করতে সক্ষম। মোট কথা এসব কৃত্রিম প্রভুরা মানবজাতির জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলেছে, তাদের হাতে না তাদের জীবন নিরাপদ, না তাদের সম্পদ, না মান সম্মান। তারা এমন এক শাস্তিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে যা থেকে মুক্তি লাভের পথ তাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।
৭. আল্লাহ তাআলা ‍মানুষকে মর্যাদাগত দিক থেকে সমান ঘোষণা করেছেন। এখন বর্ণ, গোত্র, ভাষা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অন্যান্য বৈশিষ্টের উপর ভিত্তিশীল দলবদ্ধতা তাকে বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত করে দিয়েছে এবং তার জাতীয় স্বার্থের ব্যাপ্তি ও সংরক্ষণ চিন্তা যথারীতি একটি মতবাদের রূপ ধারণ করে জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছে, যা ক্ষুদ্র ও দূর্বল জাতিগুলোকে শক্তিমান জাতিসমূহের গোলামে পরিণত করেছে।
এই জাতীয়তাবাদের জরায়ু থেকে হিটলারের নাজিবাদ, মুসোলিনীর ফ্যাসীবাদ এবং আমেরিকা ও বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদের দৈত্য জন্মলাভ করে এবং ‍তাদের বিজয় ও আধিপত্য প্রথমে গোটা দুনিয়াকে উপনিবেশিক ব্যবস্থার শৃঙ্খলে বন্দী করে এবং তারপর স্বার্থের সংঘাত তাকে পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।
৮. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে গোটা মানবজাতিকে একই জীবন বিধান দান করা হয়েছিল। এখন মানুষ নিজের জীবন বিধান নিজেই রচনা করতে বসে গেছে। ফতে নিত্য নতুন পরষ্পর বিপরীত ও গুরুতর দর্শন ও মতবাদ আত্মপ্রকাশ করে, কিন্তু তার মধ্যে কোনটিই গোটা মানবজাতির জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ তার উপর বিষে স্বার্থ, বিশেষ ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অবস্থা, বিশেষ পরিবেশ এবং সবচেয়ে অগ্রসর হয়ে সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ছাপ বিদ্যমান ছিল। এসব দর্শন ও মতবাদের আধিক্য মানব বিবেককে এতটা বিভ্রান্ত করে যে, জীবন-সহজ পথ তাদের দৃষ্টি থেকে উবে গেছে।
প্লেটো ও হেগেলের আদর্শবাদ, জনস্টুয়ার্টমিলের ব্যক্তিবাদ, বেনথামের উপযোগবাদ এবং কার্ল মার্কসের সাম্যবাদ থেকে নিয়ে গডউইন ও ক্রোপটকিনের নৈরাজ্যবাদ পর্যন্ত স্থান-কালের গন্ডিতে আবদ্ধ হাজারো মতবাদ এবং সেগুলোর ‍হাজারো রকম ব্যাখ্যার স্তুপ মানুষকে বাকশক্তিহীন করে দিয়েছে এবং তাকে বিভিন্নরূপ মানসিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বন্দী করে কেবল অন্যদের থেকে বিছিন্নই করে দেয়নি, বরং পরষ্পর শত্রু বানিয়ে দিয়েছে।
৯. মানব রচিত জীবন ব্যবস্থা যেহেতু কোন অভিন্ন উদ্দেশ্য ও নৈতিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তিশীল ছিল না, তাই চরিত্র ও আচরণের ঐক্যেরও কোন সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকল না। প্রত্যেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষমতাসীন সরকার নিজ নিজ রাষ্ট্রে নিজ জাতীয় স্বার্থ পূরণের জন্য একজ বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অধীন নাগরিকদের সে আচরণের ছাঁচে ঢালল যে, তারা নিজ দেশের জন্য তো উত্তম নাগরিক প্রমাণিত হয়, কিন্তু দেশের সীমার বাইরে অবশিষ্ট মানব জগতের জন্য ডাকাত, দস্যু, হন্তা ও গুন্ডার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এভাবে মানব জাতির মাঝে বিশ্বভ্রাতৃত্বের কোন ভিত্তি অবশিষ্ট থাকল না। সকলে একে অপরের জানমাল, ইজ্জত-আব্রু, দেশ-জাতি, দেশীয় উপায়-উপকরণ এবং রাষ্ট্র ‍ও সরকারের দুশমন হয়ে গেল। আক্বীদা-বিশ্বাস, চিন্তা চেতনা, উদ্দেশ্য-লক্ষ্য, মানসিক ঝোঁক প্রবণতা এবং আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার কেন্দ্রীয় অনৈক্য তাদের সকলকে পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে গোটা মানব দুনিয়াকে বিরোধ, মতভেদ, মানসিক চাপ, ও শত্রুতার লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে দিয়েছে।
১০. আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা উন্নততর নৈতিক শিক্ষার উপর ভিত্তিশীল ছিল। খোদাদ্রোহী মানুষ নৈতিকতাকে তাকে তুলে রেখে দিয়ে বস্তুগত স্বার্থকে তার ভিত্তি বানায় এই স্বার্থপূজা একই দেশে বসবাসকারী জনগণকে পরষ্পরের শত্রুতে পরিণত করেছে। তাদের মধ্যে নি:স্বার্থপরতা,সহানুভূতি, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতার পরিবর্তে স্বার্থপরতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার ঝেঁকপ্রবণতা স্থান করে নেয়। ঐ স্বার্থপরতা একদিকে শত্রুতামূলক লুটপাট এবং অন্যদিকে সুসংগঠিত প্রতিরক্ষার জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর জন্ম দেয় এবং তারপর এই শ্রেণীসমূহের ঠান্ডা ও উত্তাপ লড়াই মানুষকে মানুষের রক্ত পিপাসু বানিয়ে জগতের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনাশ করে দেয়। এই শ্রেণী সংগ্রাম যথারীতি একটি দর্শন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং এই দর্শনের আলোকে বিরোধী শ্রেণীর লোকদের জীবন সংহার একটি ছোয়াবের কাজে পরিণত হয়েছে এবং এই শ্রেণী সংগ্রামে নিহত হওয়া শহীদের মর্যাদা (!) হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১১. আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থার আলোকে প্রতিযোগিতার আসল ময়দান ছিল ‘তাকওয়া’ । কিন্তু এখন বিলাস ব্যসনের উপকরণের প্রাচুর্য লাভের এবং প্রবৃত্তির লালসা পূরণ ও বর্ধিত করার উপায় -উপকরণ অর্জনের চেষ্টা সাধনা তাকওয়ার স্থান দখল করে নিয়েছে। প্রতিযোগিতার এই ময়দান প্রতিটি মানুষকে নিজের নফসের গোলাম বানিয়ে দিয়ে তাকে অযাচিত সম্পদ লাভের মাতলামিতে নিমজ্জিত করেছে। হারাম-হালাল ও বৈধ-অবৈধের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে এবং বড়ত্বের মানদন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে- অন্যের তুলনায় কোন ব্যক্তির নিকট এই দুনিয়ায় আরাম আয়েশের জীবপন যাপনের জন্য কি পরিমাণ সম্পদের প্রাচুর্য বর্তমান আছে। এই চিন্তাধারা মানুষকে স্বার্থপরতা ও প্রবৃত্তিপূজার রাস্তায় তুলে তাকে সমাজের অপরাপর সদস্যের জন্য একটি নেকড়ে বাঘে পরিণত করেছে।
১২. মানবরচিত সমস্ত জীবন ব্যবস্থার একটি সাধারণ দূর্বলতা এই যে, তাদের নৈতিক মূলনীতির পেছনে কোন কার্যকর শক্তি নাই। তারা প্রথমত নৈতিক মূল্যবোধের সেই গুরুত্বই দেয় না- ওহী ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থায় তার য গুরুত্ব রয়েছে। সভ্য সামাজিক জীবনের জন্য যদিও কিছু নৈতিক মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে কিন্তু তা সম্পূর্ণ নিস্প্রাণ ও নির্জীব প্রমাণিত হয়েছে। কারণ এসব মূলনীতি মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার মত কোন শক্তি বর্তমান ছিল না। আখেরাতের বিশ্বাস বর্জন মানুষকে দায়িত্বহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে ফেলেছে। তারা কেবল এই পার্থিব জীবনকেই সবকিছু মনে করে নিয়েছে এবং নিজেদের কার্যাবলী সম্পর্কে কোনরূপ জবাবদিহির অনুভূতিশূন্য হয়ে বলগাহীন হয়ে গেছে। সামাজিক জীবনে “সকলের স্বার্থে” তারা যদিও কিছু নৈতিক মূল্যবোধের অনুসারী, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনকে তারা নিজেদের এসব মূল্যবোধের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে করে এবং এই পরিমন্ডলে ‍তাদের জীবন পশুর পর্যায়ে নেমে এসেছে।
১৩. আল্লাহর রাজত্বে ছিল আইনের শাসন, মানুষের কায়েম করা রাজত্বে “শাসকের মর্জি” আইনের মর্যাদা লাভ করে। প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী সত্তার মর্জির প্রকাশ একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী সংবিধানের আকারে ঘটেছে, যার প্রয়োগ ছিল সামগ্রিক এবং স্থান-কালের বন্ধনের উর্ধ্বে। কিন্তু মানুষের নিজস্ব আবিষ্কৃত সর্বময় কর্তার মর্জির কোন স্থায়িত্ব নাই। তা ক্ষণে এই, ক্ষণে অন্য কিছু। তার প্রয়োগ একটি নির্দিষ্ট কাল ও নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে কালের পরিক্রমায় সংশোধন হেতে থাকে এবং সর্বময় কর্তার পরিবর্তনের সাথে সাথে বার বার পরিবর্তন হতে থাকে। তাই মানব রচিত জীবন বিধানে “আইনের রাজত্বের” ধারণা একটি প্রতারণা মাত্র।
১৪. আল্রাহ প্রদত্ত মৌলিক অধিকার সমূহ ছিল স্থায়ী ও পরিবর্তনের অযোগ্য। কিন্তু মানব রচিত সংবিধানের অস্থায়িত্ব আল্লাহ প্রদত্ত মৌলিক অধিকার সমূহকেও অস্থায়ী বানিয়ে দিয়েছে এবং তাকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মাঝে একটি স্থায়ী বিবাদ ও দ্বন্দ্বের বিষয়ে পরিণত করে রেখে দিয়েছে। এখন এসব অধিকার প্রাণান্তকর সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জন করা যায়, কিন্তু কোন স্বৈরাচারীর এক ‌আঘাতেই তা কাঁচের চুরির ন্যায় চোখের পলকে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই হল সেই মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পরিণতি যা প্রকৃত ক্ষমতার মালিকের সাথে দাসত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে এবং নিজেদের মত মানুষকে সর্বময় ক্ষমতার ‍মালিক বানানোর অপরাধে এই দুনিয়ায় ‍তাদের ভোগ করতে হচ্ছে। তারা আল্লাহর বিধানের আনুগত্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এবং তাঁর রাজত্বে নিজেদের মর্জিমত স্বাধীন জীবন যাপনের জন্য নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সে কি কাংখিত স্বাধীনতা লাভ করতে এবং একচ্ছত্র অধিপতি হতে পেরেছে? নিজের মর্জি মাফিক জীবন যাপনের সুযোগ কি পেয়েছে? বরং বিপরীত ফল এই দাঁড়িয়েছে যে, সে এক আল্লাহকে ত্যাগ করে নিজের মতই মানুষের মাথায় একচ্ছত্র অধিপতির রাজমুকুট স্থাপন করতে, তার সামনে নিজের মস্তক অবনত করতে, তার অনুকূলে নিজের সমস্ত স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার ত্যাগ করতে, খেলাফতের পদের সাথে সংশ্লিষ্ট উচ্চতর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য থেকে হাত গুটিয়ে নিতে এবং নিজের জান-মাল, ইজ্জত -আবরু, উপায়-উপকরণ, মানসিক ও দৈহিক শক্তি সমূহ অসহায়ভাবে তার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রভুদের দাসত্ব করতে গিয়ে সে নিকৃষ্ট পরাধীনতা, অসম্মান, অপমান, হতাশা ও নিরাশা ব্যতীত আর কিছুই লাভ করতে পারেনি।
মানুষের আবিষ্কৃত এই প্রভুদের মধ্যে এমন কে আছে যে,
(আরবী***)
অর্থ: কে আছে আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী- (৪১ : ১৫)। এবং
(আরবী***)
আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক-(৭৯: ২৪)। এর শ্লোগান দিয়ে ࢨিজের এবং অন্য সকলের উপর নির্যাতনের স্টীমরোলার চালায়নি এবং নিজের তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট বাসনা পূরণার্থে হাজারো পরিবার বিরাণ করেনি?
সত্য কথা এই যে, মানুষকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার হিসাবে সৃষ্টিই করা হয়নি। তার কাজ হল দাসত্ব, প্রভুত্ব নয়। তার স্রষ্টা তার দাসত্বের বৈশিষ্ট্য তার মেজাজ ও স্বভাবের মধ্যে গচ্ছিত রেখে দিয়েছেন।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ [٥١:٥٦]
অর্থ: আমি জিন-ইনসানকে কেবলমাত্র আমার দাসত্বের জন্যই সৃষ্টি করেছি- ( আয যারিয়াত : ৫৬)।
এখানে দাসত্ব ( ইবাদত) অর্থ কেবলমাত্র নামায-রোযা, তাসবীহ-তাহলীলই নয়, বরং এই ধরণের ইবাদতের সাথে সাথে তার মধ্যে এই অর্থও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে যে, মানুষ ও জিনকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো পূজা-উপাসনা, আনুগত্য-অনুসরণ ও প্রার্থনার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। তাদের কাজ- অন্য কারো সামনে অবনত হওয়া, অপর কারো নির্দেশ মান্য করা, ভয় করা, অন্য কারো রচিত বিধানের আনুগত্য করা, অন্য কাউকে নিজের ভাগ্যের নির্মাতা বা বিপর্যয়কারী মনে করা এবং কারো হুজুরে দোয়ার জন্য হাত প্রসারিত করে দেওয়া নয়। জীবনের সার্বিক ব্যাপারে কেবলমাত্র এক আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য ও অনুবর্তন এবং তাঁর বিধান বাস্তবায়ন করার নামই ইবাদত।
মানুষকে মনমস্তিষ্কের সার্বিক যোগ্যতা ও দৈহিক শক্তি এক আল্লাহর ইবাদতের দাবীসমূহ পূরণের জন্য দেওয়া হয়েছে। ইবাদতের এই বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করা স্বয়ং মানুষের নিজের সত্তা ও নিজের স্বভাব-প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নামান্তর। এর অবশ্যম্ভাবী ফল এই দাঁড়ায় যে, সে নিজেই খোদায়ী দাবী করে বসে অথবা কোন কৃত্রিম খোদার সামনে নিজের মাথা নত করে দেয়। মানুষ যখনই বিদ্রোহের এই পথে পা বাড়ায় তখনই সে অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলা যেহেতু গোটা মানবজাতিকে একই প্রকৃতিতে তৈরী করেছেন, তাই কতেকের দন্ডমুন্ডের কর্তা বনে যাওয়া এবং কতেকের দাসানুদাস বনে যাওয়া উভয়ই প্রকৃতি বিরোধী। দন্ডমুন্ডের কর্তা রাজা বাদশা বা একনায়ক হিসাবে কোন ব্যক্তিই হোক অথবা পার্লামেন্টের আকারে নির্বাচিত সদস্যদের সমষ্টিই হোক অথবা কোন একটি রাষ্ট্রের নাগরিকগণই হোক অথবা সামগ্রিকভাবে গোটা দুনিয়ার জনগণই হোক, যে কোন অবস্থায় অন্যায়-অত্যাচারের প্রাদুর্ভাব ঘটবেই। কারণ মানুষের সার্বভৌমত্ব যে কোন ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আকারে এমন এক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীকে অস্তিত্বে আনয়ন করে যা প্রকৃত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীর বিকল্প হতে পারে না এবং এটাই ‘পৃথিবীর বুকে বিপর্যয় সৃষ্টির’ ( ফাসাদ ফিল আরদে) মূল শিকড়।
উক্ত বিপর্যয়ের কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা তো স্বয়ং অস্তিত্বমান সত্তা। নিজের অবিলীয়মান মর্যাদা, নিজের সৃষ্টি ক্ষমতা, নিজের সুশৃঙ্খল প্রতিপালন ব্যবস্থা এবং নিজের অন্যান্য সীমাহীন দৃষ্টান্তহীন গুণাবলীর কারণে সর্বময় ক্ষমতার মালিক, তাঁর কর্তৃত্ব কারো দয়ার দান নয়, বরং তাঁর সত্তারই অংশ। তিনি স্বয়ং কোন জিনিসের বা কোন আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী নন। তিনি কারও নিকট থেকে কিছু নেন না এবং তাঁর রাজত্ব সৃষ্টির প্রতিটি বিন্দু পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারীর পদ কেবল তাঁর জন্য শোভা পায়। কিন্তু তিনি ব্যতীত যে কেউ নিজের সার্বভৌমত্ব ও রাজত্বের দাবী নিয়ে উত্থিত হয় সে উপরোক্ত কোন গুণেরই বাহক নয়, সে তার ক্ষমতা-যোগ্যতা, জ্ঞানবুদ্ধি আবেগ অনুভূতি, প্রয়োজন, কামনা-বাসনা ও ইচ্ছা- আকাংখার প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার দিক থেকে সাধারণ মানুষেরই অনুরূপ। এখন প্রশ্ন হল, সে এই সীমাবদ্ধতা ও মানবিক দূর্বলতা সত্বেও অন্যদের উপর নিজের প্রাধান্য কিভাবে বিস্তার করতে পারে, নিজের শাসন-কর্তৃত্বের প্রকাশ কিভাবে করতে পারে এবং তাদেরকে নিজের আনুগত্য ও পরাধীনতার নাগপাশে কিভাবে বন্দী করতে পারে? এর মাত্র একটি পথই আছে এবং তা এই যে, নিজেকে বড় বানানোর জন্য সে নিজের কর্তৃত্বাধীনে বসবাসকারী জনগণের নিকট থেকেই রাজত্বের কর্তৃত্ব, অধিকার, আনুকূল্য,ধনসম্পদ, ঐশ্বর্য এবং নিজের জীবনের নিরাপত্তা থেকে নিয়ে ক্ষমতার সিংহাসনের নিরাপত্তা পর্যন্ত প্রয়োজন পূর্ণকারী উপায়-উপকরণ পর্যায়ক্রমে নিজের কব্জায় নিয়ে নেয়, অত:পর এই ক্ষমতা এখতিয়ারও উপায় উপাদান সুসংগঠিত করে আরও অধিক ক্ষমতা ও উপায় উপকরণ অর্জনে ব্যবহার করে। এরপর যখন দেশী উপায় উপাদান তার কামনা বাসনা ও প্রয়োজন পূরণের জন্য পর্যাপ্ত না হয় তখন প্রতিবেশীদের ঘাড়ে সওয়ার হয়, তাদের মানবীয় ও বৈষয়িক উপায় উপকরণ কুক্ষিগত করে এবং এভাবে নিজের ক্ষমতার পরিসর বিস্তৃত করার অব্যাহত সংঘাতে লিপ্ত হয়। এই পথে যে শক্তি তার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় সেগুলোকে সর্বশক্তি নিয়োগ করে নির্মূল করে অথবা নিজে ধ্বংস হয়। এছাড়া তার অন্য কোন পথ থাকে না। কেননা কুরআন মজীদের পেশকৃত উদাহরণ মোতাবেক সে নিজে তো একটি মাছি বানাতে অথবা তার কব্জা থেকে কোন জিনিসমুক্ত করতে পর্যন্ত সক্ষম নয়। তার সমস্ত রাজ ব্যবসা চলে অন্যের থেকে ছিনিয়ে নেয়া ক্ষমতা ও উপায়-উপকরণের সাহায্যে। এই ক্ষমতা ও উপায়-উপকরণ যে অনুপাতে শোষিত হয়ে তার কব্জায় এসে যায় সেই হারে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা, তার প্রভাব প্রতিপত্তি, তার রাজ প্রাসাদের প্রশস্ততা ও উচ্চতা , তার উপায়-উপাদানের প্রাচুর্য ও তার ক্ষমতার পরিসর বর্ধিত হতে থাকে এবং ঠিক সেই অনুপাতে তার ক্ষমতার জিঞ্জিরে বন্দী মানুষ নিজেদের স্বাধীনতা, অধিকার, উপার্জনের উপায় উপকরণ এবং নিজেদের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এই প্রকৃতির রাজত্ব জেঁকে বসে আছে। দুনিয়ার পরাশক্তিগুলোর বিশ্ব রাজনীতিও এই পদ্ধতিতেই চলছে। মানুষ যখন এবং যেখানে আল্লাহর বন্দেগী থেকে মুক্ত হয়ে নিজের রাজত্ব চালিয়েছে তার পরিণাম ফল একই হয়েছে-অত্যাচার, অবিরত অত্যাচার। অত্যাচার ছাড়া মানুষের সার্বভৌমত্বের কোন কল্পনাই করা যায় না।
এই রোগের চিকিৎসা না মানব রচিত কোন সংবিধানের মাধ্যমে সম্ভব আর না মানবীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার উপর ভিত্তিশীল কোনও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব। এই রোগ থেকে মুক্তি একটি মাত্র পথই আছে। তা হল, মানুষ সরাসরি আল্লাহর সার্বভৌমত্তের অধিকার স্বীকার করে নিয়ে নিজের বন্দেগীর মর্যাদায় ফিরে আসবে। সে না খোদা হওয়ার চেষ্ঠা করবে, আর না অন্যকে খোদা হয়ে নিজেদের উপর চেপে বসার সুযোগ দেবে।

মৌলিক অধিকারের ইসলামী ধারণা

পূর্বোক্ত অধ্যায়ে আল্লাহ তাআলার সার্বভৌমত্ব, আল্লাহর সাথে মানুষের ইবাদত বন্দেগীর চুক্তি, দুনিয়াতে মানুষের খেলাফতের দায়িত্ব, আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থার অনুসরণ, আখেরাতে যাবতীয় কাজের জবাবদিহি এবং কাজকর্ম অনুযায়ী চিরস্থায়ী শান্তি অথবা শাস্তির আলোচনা থেকে ইসলামের মৌলিক অধিকারের ধারণা অনেকটা সুষ্পষ্ট হয়ে গেছে। তথাপি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য এখন আমরা ঐতিহাসিক আইনগত ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর মূল্যায়ন করব।

ঐতিহাসিক দিক

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই পৃথিবীতে মানব-জাতির অস্তিত্ব যত প্রাচীন, ইসলামে মৌলিক অধিকারের ধারণাও তত প্রাচীন। মানুষের স্রষ্টা ও মালিক যেভাবে তার দৈহিক জীবনের জন্য আলো, বাতাস, পানি, খাদ্য সহ অন্যান্য অসংখ্য প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করেছেন, অনুরূপভাবে তার সামাজিক জীবন পরিচালনার জন্য একটি জীবন ব্যবস্থাও দান করেছিলেন তার জীবনের সুচনাকালেই। কুরআন মজীদ এই সত্যেরই সুষ্পষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করে যে, মানুষকে এই দুনিয়ায় পাঠানো এবং খেলাফতের পদে সমাসীন করার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা তাকে অধিকার ও কর্তব্যের চেতনাশক্তি দান করেছিলেন এবং জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করার সাথে সাথে জীবনের সৌজন্যবোধ ও আচরণবিধিও শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই পৃথিবীতে পদার্পণকারী প্রথম মানব তাঁর জীবনের সূচনা অজ্ঞতার অন্ধকারে নয়, জ্ঞানের আলোতেই শুরু করেছিলেন।
(আরবী***)
অর্থ: এবং আল্লাহ আদমকে সব জিনিসের নাম শিখিয়ে দেন- সূরা বাকারা : ৩১।
এখানে কুল্লাহা শব্দ সম্পর্কে চিন্তা করুন। উক্ত শব্দ থেকে জানা যায়- এই জ্ঞান আংশিক ছিল না, বরং ছিল পূর্ণাঙ্গ। মানুষকে এই দুনিয়ায় যেসব জিনিসের সম্মুখীন হওয়ার ছিল তার সব কিছুর নাম তাঁকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নাম শিখিয়ে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, কেবল জিনিস সমূহের নাম শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বরং তার প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য, উপকারিতা, ক্ষতি, ব্যবহারের পন্থা এবং তার সাথে মানুষের সম্পর্কের ধরণও পূর্ণরূপে জ্ঞাত করা হয়েছিল। জীবনের ক্রমোন্নতির সাথে সাথে মানুষ তার মৌলিক জ্ঞান ও গবেষণা-অনুসন্ধানের গঠন প্রকৃতির সাহায্যে জিনিসসমূহের জ্ঞানের পরিসর ব্যাপক ও প্রশস্ত করতে থাকে এবং এই প্রক্রিয়া এখনও পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মাওলানা মওদুদী মরহুম উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন:
“কোন বস্তুর নামের সাহায্যে মানুষ তার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে থাকে, এটাই মানুষের জ্ঞান লাভের পদ্ধতি। কাজেই মানুষের সমস্ত তথ্যজ্ঞান মূলত বস্তুর নামের সাথে জড়িত। তাই আদম আ: কে সমস্ত নাম শিখিয়ে দেওয়ার অর্থই ছিল-তাঁকে সমস্ত জিনিসের জ্ঞান দান করা হয়েছিল”। ( তাফহীমুল কুরআন, বাংলা অনুবাদ: আব্দুল মান্নান তালিব, খন্ড : ১, পৃষ্ঠা: ৬৩, টীকা: ৪২)।
বিভিন্ন জিনিসের ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার ও কর্তব্য কি তার পূর্ণ চেতনাও অপরিহার্যরূপে উক্ত জ্ঞানের মধ্যে শামিল ছিল। অতএব হযরত আদম আ: এর জীবনেই যখন অধিকারের প্রথম সমস্যা সৃষ্টি হল তখন সাথেই সাথেই এই সত্যও সুষ্পষ্ট হয়ে গেল যে, মানুষ কেবল নিজের ধারণা – অনুমান অথবা সংজ্ঞার ভিত্তিতে নয়, বরং আল্লাহ নির্ধারিত বিধানের কারণে এই অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের চেতনা সম্পন্ন ছিল। কাবীল যখন আল্লাহর দরবারে নিজের কোরবানী কবুল না হওয়ার পর হাবীলকে হত্যার হুমকী দিল তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন:
“তুমি যদি আমাকে হত্যা করতে হাত উঠাও তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে হাত উঠাব না। আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার ও তোমার গুনাহ তুমিই বহন কর এবং দোযখের বাসিন্দা হও। এটাই যালিমদের প্রতিদান” (সূরা মায়িদা : ২৯)।
উপরোক্ত আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, মানব জীবনের সম্মান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা যে হেদায়েত দান করেছিলেন-হাবীলের সে সম্পর্কে জ্ঞান ছিল। সে জানত যে, এটা ছিল গুনাহর কাজ এবং এই অপরাধে অপরাধীকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। সে কেবল খোদাভীতির কারণে নিজের জান দিয়ে দিল, কিন্তু ভাইর প্রতি প্রতিশোধের হাত উঠানো ঠিক মনে করেনি।
হযরত আদম আ: কে আল্লাহ, আল্লাহর বান্দাহ এবং আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টি সম্পর্কে অধিকার ও কর্তব্য সম্বলিত যে বিধান দেওয়া হয়েছিল তা মানব জীবনের ক্রমোন্নতির বিভিন্ন পর্যায়ে সময়ের দাবী ও চাহিদা অনুযায়ী বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় আইন কানুন সহ হযরত আদম আ: থেকে হযরত মুহাম্মাদ সা: পর্যন্ত আবির্ভূত নবীগণের মাধ্যমে মানবজাতি তার সঠিক পথ লাভের জন্য অব্যাহতভাবে পেতে থাকে। মানুষের সম্পর্কের পরিসর যত বিস্তৃত হতে থাকে তাকে সুশৃঙ্খল করার বিধানও নাযিল হতে থাকে। অবশেষে মহানবী মুহাম্মাদ সা: পর্যন্ত পৌঁছে মানব জাতির শিক্ষা প্রশিক্ষণের এই প্রক্রিয়া পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং ঘোষণা করা হয়:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ: আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম- (মাইদা: ৩)।
এই যে দীন হযরত মুহাম্মাদ সা: পর্যন্ত এসে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে তার সূচনা কোথা থেকে হয়েছে? ‍তার ইতিহাস স্বয়ং কুরআন থেকে জেনে জেনে নিন:
“আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরকে আল্লাহ বিশ্ববাসীর উপর প্রাধান্য দিয়ে (রিসালাতের পদের জন্য) মনোনীত করেছেন। এরা একে অপরের বংশধর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ- )আলে ইমরান: ৩৩, ৩৪)।
হযরত আদম আ: থেকে মানব জাতির পথ প্রদর্শনের যে ধারা শুরু হয়েছিল তা কোনরূপ বিচ্ছিন্নতা ব্যতিরেকে একের পর এক নবীগণের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে অব্যাহত থাকে। কুরআন মজীদ আমাদের বলে দিচ্ছে যে, কথা শুধু এতটুকুই নয় যে, ঐশী শিক্ষা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত ছিল, বরং তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ সত্য এই যে, সকল নবী রসূল কোনরূপ পার্থক্য ব্যতীত মানব জাতিকে একই দীন কবুলের আহবান জানান। তাদের মিশন ছিল একই, তাঁরা একই জীবন ব্যবস্থার পতাকাবাহী ছিলেন এবং এই জীবন ব্যবস্থা তাদের প্রণীত ছিল না, বরং তাদেরকে রিসালাতের পদে সমাসীনকারী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রদত্ত।
“তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন নুহকে, আর যা আমরা ওহী করেছি তোমার নিকট এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে-এই বলে যে, তোমরা দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে মতভেদ কর না”। (সূরা শূরা :১৩)।
এই দীন শুধুমাত্র আকীদা-বিশ্বাসের সংশোধন পর্যন্তই সীমিত ছিলনা, বরং আকীদা বিশ্বাস থেকে নিয়ে জীবনের সার্বিক বিষয়ের সংশোধন পর্যন্ত বিস্তারিত ছিল এবং তাতে জীবনের প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে ব্যাপক পথ নির্দেশ বর্তমান ছিল।
وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِن كُلِّ شَيْءٍ مَّوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِّكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأْمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا ۚ
অর্থ: আমরা মূসাকে জীবনের সব বিষয়ে উপদেশ এবং প্রতিটি দিক সম্পর্কে ষ্পষ্ট নির্দেশ ফলকে লিখে দিয়েছিলাম এবং তাকে বলে দিয়েছিলাম, এগুলো শক্ত হাতে ধারণ কর এবং তোমার জাতিকে তার সর্বোত্তম তাৎপর্য গ্রহণের নির্দেশ দাও”- (সূরা আরাফ: ১৪৫)।
এখন খাঁটি অধিকার ও কর্তব্যের ভাষায় শুনুন যে, এই দীন এবং তার বিস্তারিত হেদায়েত কি ছিল?
“স্মরণ কর যখন আমরা ইসরাঈল সন্তানদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করবে না, মাতা- পিতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম ও গরীবদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দিবে, কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে। যখন আমরা তোমাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, তোমরা পরষ্পরের রক্তপাত করবে না এবং আপনজনদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করবে না”- সূরা বাকারা: ৮৩, ৮৪।
এই সূরা এক ব্যক্তির আসমান থেকে নিয়ে জমীন পর্যন্ত বিস্তৃত সমস্ত বিষয় সম্পর্কে ঐশী বিধান ও দিক নির্দেশনার প্রতি ইশারা করে বলা হয়েছে:
“যেসব লোক আল্রাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভংগ করে যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়-তাদের জন্য রয়েছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টি আবাস”- সূরা রাদ : ২৫)।
এই সম্বন্ধ ও সম্পর্কের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মাওলানা মওদূদী রহ: তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গন্থে লিখেছেন:
“অর্থাৎ যেসব সম্পর্ক সম্বন্ধ স্থায়ী, শক্তিশালী, সুপ্রতিষ্টিত ও সুদৃঢ় করার উপর মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত কল্যাণ নির্ভরশীল এবং আল্লাহ তাআলা যেগুলোকে ত্রুটিমুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন-এরা তার উপর কুঠারাঘাত হানে। বস্তুত এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থ ও ভাব প্রকাশ করে। মানুষের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক চরিত্রের জগত-যা দুই ব্যক্তির পারষ্পরিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে বিশাল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আচর ব্যবহার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আছে-তা সবই এই একটি বাক্যের অন্তর্ভুক্ত। সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ কেবলমাত্র মানবীয় সম্পর্ক ছিন্ন করাই নয়, বরং সঠিক ও বৈধ সম্পর্ক ছাড়া অন্য যত প্রকারের সম্পর্ক কায়েম করা হবে তার সবই এর অন্তর্ভূক্ত হবে। কারণ ভ্রান্ত ও অবৈধ সম্পর্কের পরিণতি ও সম্পর্কচ্ছেদের পরিণতি একই। অর্থাৎ এর পরিণতিতে মানুষের পারষ্পরিক সম্পর্ক খারাপ হয় এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়”- তাফহীমুল কুরআন, বাংলা অনুবাদ: খন্ড ১, পৃ: ৫৮, টীকা ৩২।
কুরআন পাকের পেশকৃত মানবাধিকারের এই ইতিহাস থেকে সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিতহয় যে, ইসলামে মৌলিক অধিকারের ধারণা সর্বপ্রথম মানুষের সৃষ্টির দিন থেকেই বিদ্যমান। তা থেকে আরও জানা যায় যে, এসব অধিকারের উৎস কি? তা মানুষ ও তার স্বকপোল কল্পিত রাষ্ট্রের শাসক গোষ্টীর পারষ্পরিক দ্বন্ধ সংঘাত এবং তাদের মাঝে কৃত চুক্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করেনি, আর না কোন দার্শনিক রাজনীতিজ্ঞ অথবা আইনজ্ঞের গভীর চিন্তা প্রসূত, বরং স্বীয় সৃষ্টিকূলের জন্য তাদের স্রষ্টার এবং স্বীয় প্রজাদের জন্য তাদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল।রাহ তাআলা কর্তৃক প্রদত্ত। তা মানুষের সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য তা মানব সৃষ্টির সাথে সাথে নির্ধারিত হয়ে গেছে। এসব অধিকারের সর্বশেষ এবং বিস্তারিত বিবরণ মহানবী সা: এর আনীত শরীআতে প্রদত্ত হয়েছে। এসব অধিকার স্থান কালের সীমার উর্ধ্বে। মানুষ যদি পৃথিবী থেকে উড়ে গিয়ে চাঁদে বসতি স্থাপন করে তবে তথায়ও এসব অধিকারের ধরণের মধ্যে কোন পরিবর্তন হবে না, স্থান কালের পরিবর্তনে যেমন মানুষের দৈহিক গঠন এবং তার প্রকৃতিগত প্রয়োজন সমূহের মধ্যে কোন পরিবর্তন হয় না তদ্রুপ অধিকার ও কর্তব্যের স্থায়ী বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোন পরিবর্তন সূচীতও হয় না। এসব অধিকার পরিবর্তন অযোগ্য এবং একান্তই অবিচ্ছেদ্য রাষ্ট্রের কাজ অধিকার নির্ধারণ নয়, বরং নির্ধারিত অধিকারের বাস্তবায়ন।
পাশ্চাত্যবাসীগণের দাবী এই যে, মৌলিক অধিকারের ইতিহাস মাত্র তিন-চারশো বছরের পুরাতন। তারা ‌এই সময়কালে নিজেদের এখানে প্রাণান্তকর সংগ্রাম ও চেষ্ঠা সাধনার মাধ্যমে যা কিছু অর্জন করেছে তার দ্বারা আজও গোটা দুনিয়া উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু কুরআন মজীদ আমাদের সামনে যে ইতিহাস পেশ করছে তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রথম মানব যেদিন এই পৃথিবীতে পদার্পণ করেছেন সেদিন থেকে মৌলিক অধিকার তাঁর চেতনা ও অনুভূতির অংশ হয়ে আছে। এসব অধিকার নির্ধারণ ও অর্জন তাঁন নিজের অবদান নয়, বরং স্বয়ং একচ্ছত্র অধিপতি পর্যায়ক্রমে তাকে দান করেছেন। আজ পৃথিবীর যেখানেই এসব অধিকারের প্রতিধ্বনি শোনা যায় সেখানে ঐশী শিক্ষার আলোকরশ্মির দ্বারাই মৌলিক অধিকারের চেতনা জাগ্রত হয়েছে।
নরম্যান কাজিনস -এর “উই ট্রাস্ট ইন গড” (নিউ ইয়র্ক, ১৯৫৮ খৃ. সংস্করণ) শীর্ষক গ্রন্থে আমেরিকান সংবিধানের রচয়িতাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, বেনজামিন ফ্রাংকলিন, জর্জ ওয়াশিংটন, জন এডামস, টমাস জেফেরশন, জেমস মেডিশন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, স্যামুয়েল এডাম, জন জে ও টমাস পেইন সকলেই খৃষ্টবাদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাদের চিন্তাধারার উপর তাদের বিশ্বাসের গভীর প্রভাব ছিল। জেমস মেডিশন ‘অধিকার’ – এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন:
“এখানে এক ব্যক্তির যে অধিকারই রয়েছে তা মূলত অপর ব্যক্তিগণের উপর খোদার পক্ষ থেকে আরোপিত হওয়ার মত কর্তব্য”- (পৃ: ১৭)।
অনুরূপভাবে বৃটেন ও ফ্রান্সের সংবিধানও যদি ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে অধ্যয়ন করা হয় তবে সেখানেও মৌলিক অধিকারের আসল উ‍ত্স ধর্মীয় শিক্ষা এবং বিশেষত ইউরোপের উপর ইসলামের গভীর প্রভাবের মধ্যে পাওয়া যায়।
কুরআন মজীদের পেশকৃত ইতিহাসের আয়নায় দেখা হলে প্রাকৃতিক অধিকার ও জন্মগত অধিকারের পরিভাষা ব্যবহারের অধিকার কেবল ইসলামেরই রয়েছে। কারণ এসব পরিভাষা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের অধিকার সম্পর্কিত ধারণায় যে অষ্পষ্টতা বিদ্যমান রয়েছে তা এখানে বর্তমান নাই। ইসলাম এই প্রশ্নের সুষ্পষ্ট জবাব দেয় যে, এসব অধিকার কে নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে প্রাকৃতিক অধিকারের মতবাদের পতাকাবাহীগণ বেনথাম ও অপরাপর আপত্তিকারীগণের এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেনি যে, প্রকৃতি বলতে কি বুঝা যায়? এই অধিকার নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ কে? অন্য কথায় এর পেছনে কি অনুমোদন আছে? ইসলাম অধিকারের প্রাকৃতিক দিক ও জন্মগত দিক সুষ্পষ্টভাবে পেশ করে উল্লেখিত ধরণের কোনো আপত্তির অবকাশ রাখেনি।

আইনগত দিক

এখন এসব অধিকারের আইনগত দিকের মূল্যায়ন করা যাক। এই প্রসঙ্গে একটি সাধারণ ভুল এই করা হয় যে, আমরা পাশ্চাত্যের পেশকৃত মৌলিক অধিকারের ধারণাকে মাপকাঠি হিসাবে সামনে রাখছি। অত:পর কুরআন ও হাদীস থেকে বেছে বেছে এমন সব অধিকারের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয় যা উল্লেখিত মানদন্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ হয় এবং যা তার কার্যকর করার সীমিত গন্ডির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরূপ চিন্তাধারার অবশ্যাম্ভাবী পরিণতি দাঁড়ায় এই যে, ইসলামের অধিকার ধারণা পাশ্চাত্যের অধিকার ধারণার অনুগামী হয়ে গৌণ বিবেচিত হয় এবং তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য পূর্ণরূপে উদ্বাসিত হতে পারে না।
পাশ্চাত্যের মৌলিক অধিকারের পরিসর শুধুমাত্র ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সীমিত। সেখানে ঐসব অধিকারকে মৌলিক অধিকার সাব্যস্ত করা হয় যা রাষ্ট্রের প্রশস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিপরীতে একজন সাধারণ নাগরিক লাভ করে থাকে। এগুলোর মর্যাদা প্রতিরক্ষামূলক ও আত্মরক্ষামূলক এবং তার মৌলিক উদ্দেশ্য ক্ষমতাহীন নাগরিকদেরকে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের অন্যায় অত্যাচার থেকে নিরাপদ রাখা। যে সংবিধানে এসব অধিকার অন্তর্ভূক্ত করা হয় তাতে নাগরিক ও রাষ্ট্রকে দুটি পৃথক পক্ষ দৃষ্টিগোচর হয়। সংবিধানকে তাদের মাঝে একজন সমঝোতাকারী বলে মনে হয় যার মধ্যে এক পক্ষের জন্য স্বীকৃত এখতিয়ারসমূহের এবং অপরপক্ষের জন্য স্বীকৃত অধিকার সমূহের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
পক্ষান্তরে ইসলামের সাধারণ নাগরিক ও তাদের রাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠী পরষ্পর প্রতিপক্ষ নয়, না ‍নাগরিকদের অধিকার সমূহ শাসকগোষ্ঠীর স্বীকৃত আর না শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও এখতিয়ার সমূহ নাগরিকদের মঞ্জুরকৃত। তাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্মতি ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে রচিত এমন কোন আইনগ্রন্থও নাই যার মধ্যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী অধিকার ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই উভয় পক্ষই একই মর্যাদায় নিজেদের রব ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর সাথে সাথে একটি অবশ্য পালনীয় চুক্তিতে আবদ্ধ। আল্লাহর খলীফা হিসাবে তাদের সকলের পদমর্যাদাও সমান। কারণ খেলাফত কোন বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নয়, বরং সমষ্টিগতভাবে ( মিন হাইছিল জামাআতি) গোটা মুসলিম উম্মাহর উপর অর্পণ করা হয়েছে।
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেনই, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের (মুমিনীন ও সালেহীনদের” ( সূরা নূর : ৫৫)।
উপরোক্ত আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, খেলাফতের প্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃত্ব সমষ্টিগতভাবে সমস্ত মুসলমানকে দেওয়া হয়েছে। এই কারণেই হযরত আবু বাকার সিদ্দীক রা: নিজেকে ‘আল্লাহর খলীফা’ খলীফাতুল্লাহ উপাধি গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলেন। কারণ খেলাফত মূলত গোটা উম্মতকে দান করা হয়েছিল, তাদের বিশেষ কোন ব্যক্তিকে নয়। তাদের খেলাফতের অবস্থা এই ছিল যে, মুসলমানগণ নিজেদের মর্জি মোতাবেক তাদের খেলাফতের কর্তৃত্ব তাঁর উপর সোপর্দ করেন। খেলাফতের এই বৈশিষ্ট্যের দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত উমার ফারূক রা: ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি গ্রহণ পছন্দ করেন এবং উক্ত পরিভাষা পরের খলীফায়ে রাশেদগণের উপাধি হিসাবে প্রচলিত থাকে।
মুসলমানদের আমীর এবং তার ইমারতের চতু:সীমায় বসবাসকারী নাগরিকগণ নিজ নিজ কর্মপরিসরে আল্রাহ নির্ধারিত সীমার আনুগত্য করতে বাধ্য। তাদের কর্তৃত্ব ও অধিকার পারষ্পরিকভাবে স্থিরীকৃত নয়, বরং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকার মহান আল্লাহর স্থিরীকৃত। তারা উভয়ে কুরআন ও সুন্নাহর এমন এক পরিবর্তন অযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় সংবিধানের অধীনে জীবন যাপন করতে বাধ্য যার কোন একটি দফাও তাদের মধ্যে নগণ্য ও উপেক্ষণীয় নয়। তাদের অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে কোন সংঘর্ষ নাই। এটা এমন দুটি পরষ্পর সংযুক্ত সীমা যার রেখা সমূহ কোথাও একে বেকে ছিন্ন করে না।
এই প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিক অধিকারের পরিসর অনেক ব্যাপক। দুনিয়ার সাধারণ সংবিধানগুলোর মত তা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের পারষ্পরিক সম্পর্ক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। কুরআনিক সংবিধানের প্রয়োগ ক্ষেত্র মানুষের গোটা জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত। কুরআন মজীদ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যেই নয়, আকীদা বিশ্বাস, ইবাদত বন্দেগী, চরিত্র নৈতিকতা, সমাজ সভ্যতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, যুদ্ধ ও সন্ধি এবং জীবনের অপরাপর শাখায় পরিব্যপ্ত অসংখ্য বিষয় এমনভাবে সুসংগঠিত করে দিয়েছে যে, রাষ্ট্রের জন্য আইন প্রণয়নের খুব সীমিত সুযোগই আছে। আর এই সীমিত সুযোগের মধ্যেও স্বাধীনভাবে আইন প্রণয়ণের অনুমতি নাই, বরং এই শর্ত আরোপ করা হয়েছে যে, প্রতিটি আইন কুরআন হাদীসের বিধান ও তার প্রাণসত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এখন আল্লাহর বিধান ও তাঁর রসুলের সুন্নাহ মানুষের জন্য যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছে তা সংবিধানের অংশ হওয়ায়, রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতার ‌উর্ধ্বে হওয়ায় এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য হওয়ার কারণে কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়াই সবগুলোই মৌলিক অধিকার হিসাবে গণ্য। এসব অধিকারের মধ্যে শুধুমাত্র জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান সম্ভ্রমের নিরাপত্তা, মালিকানার নিরাপত্তা, ন্যায় বিচার লাভ, সমতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার মত বিষয়গুলোই অন্তর্ভূক্ত নয়, বরং একটি নবজাত শিশুর দুধপানের সময়সীমা থেকে নিয়ে একজন নারীর মোহরের অধিকার পর্যন্ত সমস্ত অধিকার অন্তর্ভূক্ত-যা আল্লাহ ও তাঁর রসুল নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং যার মধ্যে কোনরূপ সংশোধনী আনয়নের এখতিয়ার কারো নেই। কুআন মজীদ মানুষের আইন প্রণয়ন ক্ষমতার উপর আরোপ হওয়ার মত বিধিনিষেধের জন্য “হুদুদুল্লাহ” ( আল্লাহ নির্ধারিত সীমা) পরিভাষা ব্যবহার করেছে। এই বাধ্যবাধকতা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের উপর সমানভাবে আরোপিত হয়। আল্লাহ তাআলা যেসব জিনিস ‍হালাল সাব্যস্ত করে তা থেকে উপকৃত হওয়ার অধিকার দিয়েছেন সেগুলোকে এখন কেউই হারাম সাব্যস্ত করতে পারবে না, এমনকি ইসলামী রাষ্ট্র বা গোটা জাতি একত্র হয়েও তা হারাম করতে পারবে না। এমনকি কোন ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের জন্যও তা হারাম করতে পারে না। এসব সীমারেখার আনুগত্য করা সম্পর্কে কুরআন পাকের নিম্নোক্ত হেদায়াতবাণী দেখা যেতে পারে। সূরা বাকারায় রোযা সম্পর্কিত বিধান সমূহ উল্লেখের পর বলা হয়েছে:
“এগুলো আল্রাহ নির্ধারিত সীমা, তার ধারে কাছেও যাবে না”-আয়াত নং-১৮৭।
ঈমানদার সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য সমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন: “আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাবর্তনকারী (তওবাকারী) ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, রোযা পালনকারী, রূকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের নির্দেশ দানকারী, অসৎকাজে নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী”- সূরা তওবা :১১২।
কুরআন মজীদ অতীব সুষ্পষ্ট বাক্যে বলে দিয়েছে যে, যেসব বিষয়ে আল্লাহর বিধান রয়েছে- সেই ক্ষেত্রে মানুষের আইন প্রণয়নের কোন এখতিয়ার নাই, হালাল হারাম ও জায়েয- নাজায়েয নির্ধারণের কোন অধিকারও তার নাই। তার কাজ কেবল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধান অনুসরণ করা।
“তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট যা নাযিল করা হয়েছে-তোমরা তার অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না”- সূরা- আরাফ :৩।
“আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা ফয়সালা করে না তারাই কাফের… যালেম… ফাসেক”- সূরা মায়িদা: ৪৪,৪৫,৪৭)।
হে মুমিনগণ আল্লাহ তোমাদের জন্য যেসব উৎকৃষ্ট জিনিস হালাল করেছেন তা তোমরা হারাম কর না এবং সীমা লংঘন কর না”- সূরা মায়িদা : ৮৭)।
“বল (হে নবী) তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দিয়েছেন তোমা যে তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ? বল, আল্লাহ কি তোমাদের এরূপ অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?”- সূরা ইউনুস: ৫৯।
“তোমাদের জিহবা এই যে মিথ্যা বিধান দেয়-এটা হালাল, এটা হারাম; এভাবে বিধান দিয়ে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ কর না”- সূরা নাহল : ১১৬।
আল্লাহ তায়ালা কেবল সাধারণ লোকদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতার উপরই বিধি নিষেধ আরোপ করেননি, বরং যেসব ব্যাপারে আল্লাহর বিধান বর্তমান আছে তার মধ্যে মহানবী সা: কেও নিজের মর্জি মত কোনরূপ সংশোধন আনয়নের অধিকার দান করেন নি।
“বল ( হে মুহাম্মাদ!) নিজের পক্ষ থেকে এই কিতাবে পরিবর্তন আনয়নের অধিকার আমার নেই। আমার প্রতি যা ওহী হয়- আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। যদি আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্যাচরেণ করি তবে আমার আশংকা রয়েছে এক ভয়ংকর দিবসের শাস্তির শিকার হওয়ার”- সূরা ইউনুস: ১৫।
অতএব মহানবী সা: নিজের কোন কোন স্ত্রীর মনোতুষ্টির জন্য মধু না খাওয়ার শপথ করলে আল্লাহ তাআলা এজন্য তাঁর সমালোচনা করেন:
“হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যে জিনিস হালাল করেছেন তুমি তা হারাম করছ কেন? ( তা কি এ জন্য যে,) তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছ”- সূরা তাহরীম: ১১।
মহানবী সা: সাধারণ মুসলমানদের জন্য মধু হারাম করেননি। কারণ আল্লাহ পাকের হালালকৃত জিনিস হারাম করার কথা তো রসুলুল্লাহ সা: এর কল্পনায়ও আসতে পারে না। তিনি তা কেবল নিজের জন্যই নিষিদ্ধ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কার্যক্রম যেহেতু মুসলমানদের জন্য দলীল হওয়ার যোগ্য ছিল, তাই অনতিবিলম্বে তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হল, আল্লাহ পাক যে জিনিস ‍হালাল সাব্যস্ত করেছেন তা আপনার নিজের জন্য হারাম করার এখতিয়ারও আপনার নেই।
একদিকে তো আল্লাহ তাআলার বিধান সম্পর্কে মহানবী সা: এর এখতিয়ারের ছিল এই অবস্থা, কিন্তু অপরদিকে কুরআন মজীদ একথাও সুষ্পষ্ট করে দেয় যে, যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি আল্লাহর বিধান বর্তমান নেই অথবা তাঁর বিধানের ব্যাখ্যাদানের প্রয়োজন রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে আল্লাহর রসুলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তাঁর মর্যাদা আল্লাহর বিধানেরই অনুরূপ। আল্লাহর রসূল যেহেতু এই দুনিয়াতে তাঁর রাজনৈতিক ও আইনগত সার্বভৌমত্বের প্রকাশক, তাই ভাষ্যকর ও আইন প্রণেতা হিসাবে তাঁর মর্যাদা নিম্নোক্ত আয়াত এভাবে নির্ধারণ করেছে:
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ۖ
অর্থ: “যে ব্যক্তি রসুলের আনুগত্য করে- সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল” (সূরা নিসা: ৮০)
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
অর্থ: রসূল তোমাদের যা কিছু দেয় তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদের বিরত থাকতে বলে তা বর্জন কর”-(সূরা হাশর: ৭)।
আল্লাহর কুরআন ও রসুলের সুন্নাহর এই মর্যাদা ও অবস্থানের প্রতি দৃষ্টি রেখে ইসলামী রাষ্ট্রে কুরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তিশীল সংবিধানের অধীনে মানুষের মৌলিক অধিকারের তালিকা প্রণয়ন করলে তাতে আল্লাহ ও তাঁর রসূল প্রদত্ত যাবতীয় অধিকার অন্তর্ভূক্ত হবে, তা জীবনের যে শাখার সাথেই সংশ্লিষ্ট হোক।
মৌলিক অধিকার( ফান্ডামেন্টাল রাইটস) ও আইনগত অধিকার (লিগ্যাল রাইটস) এর মধ্যে এছাড়া আর কি পার্থক্য হতে পারে যে, মৌলিক অধিকার বাতিলও করা যায় না এবং রহিতও করা যায় না। তা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের সাধারণ এখতিয়ারের আওতা বহির্ভূত। তা স্বয়ং সংবিধানে প্রদত্ত অস্বাভাবিক কর্মপন্থা ব্যতীত অন্য কোন পন্থায় সীমিত বা স্থগিত করা যায় না। তা (মৌলিক অধিকার) রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতার উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে এবং রাষ্ট্রের বিপরীতে নাগরিকগণকে নিরাপত্তা দান করে। কুরআন-সুন্নাহ প্রদত্ত এসব অধিকার বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জন করা যায় এবং তার সাহায্যে প্রশাসন বিভাগকে অন্যায় অত্যাচার থেকে বিরত রাখা যায়। পক্ষান্তরে আইনগত অধিকার আইন প্রণয়নের সাধারণ সীমার আওতাভূক্ত এবং রাষ্ট্র যখন ইচ্ছা স্বীয় আইন প্রণয়ন ক্ষমতার মাধ্যমে তাতে সংশোধন আনতে পারে, হ্রাসবৃদ্ধি করতে পারে, অথবা বাতিল করতে পারে।
মৌলিক অধিকার ও আইনগত অধিকারের মধ্যকার এই ‍পার্থক্য হৃদয়ঙ্গম করে চিন্তা করুন যে, কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত এমন প্রতিটি অধিকার- যা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতার আওতা বহির্ভূত, যা বিচার বিভাগের সাহায্যে অর্জনযোগ্য এবং যার সম্পর্কে স্বয়ং কুরআন ও সুন্নাহ রাষ্ট্রকে এমন কোন অস্বাভাবিক ক্ষমতা দান করেনি যার আশ্রয় নিয়ে সে বিশেষ অথবা জরুরী অবস্থার বাহানা দিয়ে উক্ত অধিকার বাতিল, সীমিত অথবা স্থগিত করতে পারে- তা কিসের ভিত্তিতে মৌলিক অধিকারের তালিকা বহির্ভূত রাখা যেতে পারে? শুধু এ জন্য যে, পাশ্চাত্য কেবলমাত্র ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্কের সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকার সমূহকে মৌলিক অধিকার গণ্য করে।এই যুক্তি তো পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের জন্য দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু স্বয়ং মৌলিক অধিকারের প্রচলিত আইনতগত পরিভাষা ও তার তাৎপর্যের আলোকে এর কি ওজন আছে? যে অধিকার স্থির ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে সম্পন্ন, রাষ্ট্র যা পরিবর্তন বা বাতিল করতে সক্ষম নয়, যা বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জন করা যায়-তা আইনের যে কোনও ব্যাখ্যা অনুযায়ী অবশ্যই একটি মৌলিক অধিকার সাব্যস্ত হবে।
কোন দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাকে যদি তালাক দেওয়া হয় তবে কুরআন মজীদ শিশু, তালাকপ্রাপ্তা নারী ও তালাকদাতা পুরুষের মধ্যে অধিকার ও কর্তব্যের নিম্নোক্ত ব্যবস্থা নির্ধারণ করে:
“যে পিতা তার সন্তানের দুধপানের সময়কাল পূর্ণ করতে চায়- সে ক্ষেত্রে মায়েরা পুরো ‍দুই বছর নিজেদের সন্তানদের দুধ পান করাবে। এ অবস্থায় সন্তানের পিতাকে যথারীতি মায়েদের আহার ও পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কারো উপর তার সামর্থের অধিক বোঝা চাপানো উচিত নয়। কোন মাকে এজন্য কষ্ট দেওয়া যাবে না যে সন্তানটি তার। আবার কোন পিতাকেও এ জন্য কষ্ট দেওয়া যাবে না যে, এটা তারই সন্তান। দুধ দানকারীনীর এ অধিকার যেমন সন্তানের পিতার উপর আছে-তেমনি আছে তার ওয়ারিসদের উপরও। কিন্তু উভয় পক্ষ যদি পারষ্পরিক সম্মতি ও পরামর্শক্রমে দুধপান ছাড়াতে চায় তবে এতে তাদের কারো অন্যায় হবে না। আর তোমরা নিজেদের সন্তানদের অপর কোন স্ত্রীলোকের দুধ পান করাতে চাইলে তাতেও কোন দোষ নেই, অবশ্য যা কিছু মূল্য নির্ধারিত হবে তা যদি নিয়মিত আদায় কর”- সূরা বাকারা: ২৩৩।
উপরোক্ত আয়াতে এক নবজাতক শিশু, তারা মা ও তার পিতার জন্য যেসব অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে তা সবই মৌলিক অধিকারের আওতায় আসে। কারণ তা রাষ্ট্রের সংবিধানের একটি অংশ, মহান আল্লাহর হুকুমে নির্ধারিত, বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য এবং রাষ্ট্র সংবিধান লংঘন করে এ বিষয়ে স্বতন্ত্র কোন আইন রচনা করতে পারে না। কুরআন মজীদ একটি শিশুর জন্য দুধ পানের যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে রাষ্ট্র বা সরকারের তার মধ্যে এক দিনেরও হ্রাসবৃদ্ধি করার এখতিয়ার নাই। নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে ইসলামী রাষ্ট্রে শিশুর মর্যাদা সম্পর্কে অনুমান করা যায়:
জুহায়না গোত্রের শাখা গামের গোত্রের একটি স্ত্রী লোক মহানবী সা: এর নিকট উপস্থিত হয়ে চারবার যেনার স্বীকারোক্তি করল এবং জানাল যে, সে এর ফলে গর্ভবতী হয়েছে। প্রথমবারের স্বীকারোক্তি শুনে রসুলুল্লাহ সা: তাঁকে বলেন- “ফিরে যা এবং আল্লাহর নিকট তওবা কর, ক্ষমা প্রার্থনা কর। কিন্তু সে বলল, হে আল্লাহর রসুল! আপনি কি আমাকেও মায়েযের ন্যায় ফিরিয়ে দিতে চান? আমি তো যেনার কারণে গর্ভবতী হয়েছি। তিনি বললেন: আচ্ছা তুমি যদি নাই মান তবে ফিরে যা সন্তান প্রসবের পর এসো। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর সে শিশু সহ তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, এখন আমাকে পাক পবিত্র করুন। তিনি বললেন: ফিরে যাও, শিশু দুধ ছাড়ার পর এসো। দুধ ছাড়ার পর সে শিশু সহ আবার এলো এবং সাথে এক টুকরা রুটিও আনলো। তাঁর সামনে শিশুর হাতে রুটি দিয়ে সে বলল, হে আল্রাহর রসূল! এই শিশু এখন দুধ ছেড়েছে, দেখুন সে রুটি খাচ্ছে। মহানবী সা: শিশুর লালন পালনের ভার এক ব্যক্তির উপর অর্পণ করলেন এবং তাকে রজম ( পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করার নির্দেশ দিলেন-(তাফহীমুল কুরআন, বাংলা অনু: ৯ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১২৩, ১৯৭৮ ‍সালের সংস্করণ)।
পূর্বোক্ত ঘটনা থেকে জানা যায় যে, মহানবী সা: প্রথমত জীবনের নিরাপত্তার খাতিরে এবং দ্বিতীয়বার দুধপান কাল পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে শাস্তি কার্যকরণ স্থগিত রাখেন। অত:পর তিনি যখন শিশুকে রুটি খেতে দেখে আশ্বস্ত হন যে, তার জীবন রক্ষার জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজন নাই তখন শাস্তির দন্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এই ঘটনায় দুটি মৌলিক অধিকার প্রভাবিত হত: (এক) জীবনের নিরাপত্তা, (দুই) দুধপানের নির্দিষ্ট সময়সীমার পূর্ণতা। মহানবী সা: এই দুটি অধিকারের দিকে লক্ষ্য রেখে যেনার মত মারাত্মক অপরাধের শাস্তি সাময়িকভাবে মুলতবী করে সুষ্পষ্ট করে দিলেন যে, ইসলামে সাধারণ নাগরিক তো কোথায় মায়ের পেটে বর্ধিত শিশু এবং দুধপানরত শিশুর অধিকারেরও কত গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। রসুলুল্লাহ সা: এর সিদ্ধান্ত একটি আইনগত নজির এবং এখন একই ধরণের ঘটনায় ইসলামী রাষ্ট্রের ভিন্নরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার নাই। তার আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রসুলুল্লাহ সা: এর উপরোক্ত সিদ্ধান্তের অনুগত থাকতে বাধ্য এবং এই বাধ্যবাধকতা শিশুর জন্মের অধিকার ও দুধপানের অধিকারকে পর্যন্ত মৌলিক অধিকারের তালিকাভূক্ত করেছে।
মহানবী সা: এর বিচারালয়ের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আরও একটি অধিকার নির্দিষ্ট হয়। তা এই যে, অবৈধ সম্পর্কের পরিণতিতে জন্মগ্রহণকারী শিশুকে সম্পূর্ণ নির্দোষ মনে করতে হবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র তার পিতা মাতাকে মৃত্যুদন্ড দিলে তার লালন পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। শিশু জন্মের অধিকার ও দুধপানের অধিকার সহ লালন পালনের অধিকারও লাভ করে এবং তাকে ঘৃণার চোখে দেখা যাবে না, বরং সমাজে সে অন্যান্য শিশুর মত সমান মর্যাদার অধিকারী হবে।
এখন আরও একটি অধিকারের প্রতি লক্ষ্য করুন যাকে নৈতিক অধিকারের আওতাভূক্ত করা হয়, কিন্তু তাও মূলত মৌলিক অধিকার, আল্লাহ ও তাঁর রসুল তাকে এই অধিকার দিয়েছেন। মহান আল্লাহর বাণী:
“পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তোমাদের নিকট যদি তাদের কোন একজন অথবা উভয়ে বৃদ্ধাবস্থায় থাকে তবে তুমি তাদেরকে উহ! পর্যন্ত বলবে না, তাদের ভৎসনা করবে না, বরং তাদের সাথে বিশেষ মর্যাদা সহকারে কথা বলবে এবং বিনয় ও নম্রতা সহকারে তাদের সাথে বিশেষ মর্যাদা সহকারে তাদের সামনে নত হয়ে থাকবে; আর এই দোয়া করতে থাকবে: হে প্রভু! তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, যেমন করে তারা স্নেহ বাৎসল্য সহকারে আমার বাল্যকালে লালন-পালন করেছেন” বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪।
উপরোক্ত আয়াতের ভিত্তিতে মহানবী সা: এর বিচারালয় থেকে দেওয়া দুটি সিদ্ধান্তের নজীর লক্ষনীয়:
১. এক ব্যক্তি মহানবী সা: এর দরবারে নিজ মাতা পিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, তার পিতা তার ধনসম্পদ ভোগ করছে। তিনি বলেন: তুমি এবং তোমার সম্পদ উভয়ের মালিক তোমার পিতা। অত:পর তিনি লোকটির পিতাকে নির্দেশ দেন, তুমি তার মাল কাজে লাগাও এবং সে যদি তাতে অসম্মত হয় তবে আমাকে জানাবে। আমি তার বিরুদ্ধে তোমাকে সাহায্য করব”- (আদালতে নববী কে ফায়সেল, আবদুল্লাহ কুরতবী, আদবিস্তান, লাহোর সং, ১৯৫৬খ্রি:, পৃ: ২৯০।
২. এক ব্যক্তি রসুলুল্লাহ সা: এর নিকট আবেদন করল, হে আল্লাহর রসুল! আমার পিতা আমার নিকট সম্পদ চাচ্ছেন। তিনি বলেন: তাকে দাও। সে বলল, তিনি চান যে, আমি মালিকানা ত্যাগ করি। তিনি নির্দেশ দিলেন: তুমি তার অনুকূলে মালিকানা ত্যাগ কর। হাদীসের রাবী বলেন, মহানবী সা: এই ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন: নিজ পিতা মাতার অবাধ্যাচরণ কর না। তারা যদি তোমার নিকট এরূপ দাবী করে যে, তুমি দুনিয়া ছেড়ে চলে যাও, তবে তুমি ‍তাদের জন্য তাই কর” ( ঐ, পৃ: ২৯০)।
আল্লাহ তাআলার নির্দেশ এবং মহানবী সা: এর বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তের আলোকে ফকীহগণ পিতা মাতার অধিকার ও এখতিয়ার সমূহের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এগুলো কেবল নৈতিক উপদেশই নয়, বরং মৌলিক অধিকারও-যা কোন রাষ্ট্র বা সরকার নিজের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাবলে পরিবর্তন করতে পারে না। সে সন্তানকে পিতামাতার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা থেকে দায়মুক্ত করে দিতে পারে না।
এখন মোহরের বিষয়টি দেখুন। নিজ স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার এই যে, স্বামী বিবাহের চুক্তিপত্র মোতাবেক স্ত্রীর মোহর পরিশোধ করতে বাধ্য। স্ত্রীর এই অধিকার স্বয়ং কুরআন মজীদ নির্ধারণ করেছে।
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا [٤:٤]
অর্থ: “আর তোমরা নারীদের মোহর স্বত: প্রবৃত্ত হয়ে ( ফরজ মনে করে) পরিশোধ কর। অবশ্য সন্তুষ্ট মনে তারা মোহরের কিছু অংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দে ভোগ করবে”- সূরা নিসা: ৪)
দাম্পত্য জীবনের যে স্বাদ তোমরা তাদের থেকে আস্বাদন কর তার বিনিময়ে তাদের মোহর বাধ্যতামূলকভাবে পরিশোধ কর”- সূরা নিসা: ২৪)।
কুরআন মজীদ মোহরকে নারীদের এমন এক অধিকার সাব্যস্ত করেছে, যা পরিশোধ করা স্বামীর একান্ত কর্তব্য। অবশ্য স্ত্রী স্বেচ্ছায় এই দাবী ত্যাগ করলে স্বতন্ত্র কথা। ইসলামী রাষ্ট্রের অবশ্য এই এখতিয়ার নাই যে, সে কোনরূপ আইন প্রণয়ের মাধ্যমে নারীদের উক্ত অধিকার রহিত বা সীমিত করতে পারে। অতএব হযরত উমার ফারূক রা: যখন তাঁর খেলাফতকালে নারীদের মোহরের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে তা সীমিত করতে চাইলেন এবং ভাষণদানকালে বললেন: “নারীদের মোহরের পরিমাণ চল্লিশ উকিয়া রূপার অধিক ধার্য কর না- সে যত বড় সম্পদশালী লোকের কন্যাই হোক না কেন। যে অধিক মোহর দেবে আমি তার থেকে বাইতুল মালের জন্য অধিক অর্থ আদায় করব।”
তখন নারীদের কাতার থেকে দীর্ঘদেহী এক মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলেন- “ আপনার এই অধিকার নাই”। জিজ্ঞেস করা হল, তা কিভাবে? মহিলা বলেন, তা এজন্য যে, মহান আল্লাহ বলেন:
وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا ۚ أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
“আর তোমরা যদি তাদের কাউকে প্রচুর সম্পদও দিয়ে থাক তবে তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপাচারের মাধ্যমে তা গ্রহণ করবে?” (সূরা নিসা: ২০)।
এই উত্তর শুনে হযরত উমার ফারূক রা: বলেন, মহিলা যথার্থই বলেছেন, পুরুষ লোকটিই ভুল করেছে” (তানতাবী, উমার ইবনুল খাত্তাব, লাহোর ১৯৭১ খ্রি: পৃ: ৫৩১)।
অতএব সাথে সাথেই তিনি নিজের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। আইনের সাহায্যে তিনি যে অধিকার সীমিত করতে চাচ্ছিলেন, কুরআনের বিধান সামনে আসতেই তা থেকে বিরত থাকেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামী রাষ্ট্রে নারীর মোহর লাভের অধিকার মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তা রহিত, সীমিত বা স্থগিত করার কোন এখতিয়ার রাষ্ট্রের নাই।
অনুরূপভাবে কিসাব, রক্তপণ, খোরপোষ, উত্তরাধিকার, ওসিয়াত, বিবাহ ও তালাক এবং তাযীর ( দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি) ও মুহারিবাত ( যুদ্ধ) এর সাথে সংশ্লিষ্ট সেই সব অধিকারকে মৌলিক গণ্য করা হবে যা আল্লাহর কিতাব ও রসুলুল্লাহ সা: এর সুন্নাতের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। শুধু এতটুকুই নয় যে, তার মধ্যে রদবদল করার এখতিয়ার ইসলামী রাষ্ট্রের নাই, বরং সে মহান আল্রাহর নির্দেশের ভিত্তিতে তা কার্যকর করতে বাধ্য। এখানে ঐসব অধিকারের মর্ম কেবল নিরাপত্তামূলক ( ডিফেনসিভ) ও আত্মরক্ষামূলকই ( প্রটেকটিভ) নয়, বরং ইতিবাচক ( পসেটিভ) এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই যে, সে তার যাবতীয় ক্ষমতা ও উপায়-উপকরণ কাজে লাগিয়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
শরীআত যেসব ব্যাপারে কোন আইনবিধান নির্ধারিত করেনি কেবল সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করবে। যেমন বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্র্ ইসলামের আইন প্রণয়নের নীতিমালা অনুযায়ী-নির্বাচন, সংসদের কার্যপ্রণালী, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বানিজ্য, লেনদেন, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন রেলওয়ে, বিদ্যুত, পরিবহন, গ্যাস ও পানি সরবরাহ, গৃহনির্মাণ,শিক্ষা ব্যবস্থা, শিল্প ও কারিগরি, মজুরী ও বেতন, সরকারী কর্মচারী, শ্রমিক ও কৃষকদের কল্যাণ প্রচেষ্ঠা এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধান রচনা করতে পারে। এসব আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত অধিকার সমূহকে আইনগত অধিকার ( লিগ্যাল রাইটস) বলা হবে। এসব বিধান স্থান কাল পাত্রভেদে এবং পরিবেশ পরিস্থিতির ধরণ অনুযায়ী রচনা করতে হবে। এই বিধান বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রূপ হবে এবং তার দ্বারা বিভিন্নরূপ অধিকার নির্ধারিত হবে। যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশে নাগরিকত্ব লাভের অধিকার পরষ্পর থেকে ভিন্ন রূপ হতে পারে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিধান স্থায়ী ও বিশ্বজনীন, স্থান কালের সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে, অবিচ্ছিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য, রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে। পৃথিবীর যে এলাকায়ই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে সে এসব বিধান হুবহু কার্যকর করতে বাধ্য। তাই এসব অধিকার “মৌলিক অধিকারের” তালিকাভূক্ত হবে।
এখানে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তোলা যায় এবং তা এই যে, মৌলিক অধিকারের এই ব্যাখ্যা কেবল মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যেসব লোক- আল্লাহ, কুরআন, আখেরাত ইত্যাদি বিশ্বাস করে না তারা এই ব্যাখ্যা কিভাবে গ্রহণ করতে পারে? এই অবস্থায় তাদের মৌলিক অধিকারের তালিকা কিরূপ হবে? ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের এবং মুসলমানদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে কি কোনরূপ পার্থক্য হবে?
এই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমাদের উত্তমরূপে জানা দরকার যে, ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের অবস্থা ( পজিশন) কিরূপ হবে? ইসলামী রাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের মত কোন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নয়। এখানে কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের, বর্ণের ভাষাভাষীর বা আঞ্চলিক গোষ্টীর রাজত্ব নয়, এটা একটা আদর্শিক রাষ্ট্র। এর সর্বময় ক্ষমতার নিরংকুশ অধিকারী ও আইনদাতা হলেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ। তিনি কুরআন পাকের সুষ্পষ্ট বিধান ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বলে দিয়েছেন যে, এই পৃথিবীর বুকে তাঁর কি ধরণের মানব সমাজ কাম্য। তিনি তাঁর রসুলের মাধ্যমে নিজের সার্ব ভৌমত্বের একটি বাস্তব নমুনাও আমাদের সামনে পেশ করেছেন। মুসলমানদের রাজত্ব যাকে পরিভাষাগতভাবে ‘খেলাফত’ বলা হয় তা একটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারীর বিধান অনুযায়ী ও তাঁর নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থান করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালনা করতে আদিষ্ট। এই রাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্বিবিধ মর্যাদা রয়েছে। একটি হল মানুষ হিসাবে এবং অপরটি হল মুসলিম ও অমুসলিম হিসাবে। তাদের প্রথম মর্যাদা সৃষ্টিগতভাবেই নির্ধারিত এবং দ্বিতীয় মর্যাদা তাদের স্বেচ্ছায় ঈমান আনা বা না আনার ভিত্তিতে। প্রথমোক্ত মর্যাদার ভিত্তিতে সকল মানুষ সমান, বংশ-বর্ণ-গোত্র-ভাষা ও ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল পার্থক্য ভিত্তিহীন। আল্লাহর নিকট এগুলোর স্বতন্ত্র কোন মর্যাদা নাই। মহান আল্লাহর বাণী:
(আরবী***)
অর্থ: “তিনি তোমাদের একই জান থেকে সৃষ্টি করেছেন” (যুমার: ৬)। সূরা নিসার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে: “হে মানুষ! তোমরা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরে একটি জীবন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দুজন থেকে অসংখ্য নর নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।”
অপর এক স্থানে বলা হয়েছে: “ এই যে তোমাদের জাতি তা তো একই জাতি এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক, অতএব আমার ইবাদত কর” -সূরা যুমার: ৯২।
আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতে গোটা মানবজাতি একই উম্মত। তিনি যেহেতু মুসলিম অমুসলিম সকলের স্রষ্টা, মালিক ও রিযিকদাতা, তাই তিনি নিজের মানবীয় সৃষ্টির জন্য যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছেন সে ব্যাপারে সকলে সমান মর্যাদার অধিকারী। তিনি অমুসলিমদের জান মাল ও ইজ্জত আব্রুর হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। সৃষ্টিগত দিক থেকে সমতা বিধানের পর এখন আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে তাদের কর্মধারা ও চিন্তাধারার ভিত্তিতে যার জন্য স্বয়ং মানুষই দায়ী-দুইভাগে বিভক্ত ঘোষণা করেছেন:
“সূচনায় সমস্ত মানুষ ছিল একই জাতিভূক্ত (অত:পর এই অবস্থা অটুট থাকল না এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হল)। অত:পর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন”- সূরা বাকারা : ২১৩।
“প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ ছিল একই জাতিভূক্ত, পরে তারা মতভেদ সৃষ্টি করে” – সূরা ইউনুস: ১৯।
মানবগোষ্ঠীর বিভক্তির কারণ তাদের অবাধ্যাচার ও বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ। তারা আল্লাহর দেওয়া জীবন বিধান ত্যাগ করে নিজেরা মনগড়া মত ও পথ গড়ে তোলে এবং তার ভিত্তিতে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে এক জাতিকে হাজারো জাতিতে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। মানবজাতিকে পুনরায় একতার বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায় কেরামের মাধ্যমে নিজের হেদায়াতবাণী প্রেরণ করেন। কিন্তু মানুষ নিজের দূর্ভাগ্যবশত: ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। আল্লাহ তাআলার সেই হেদায়েতের বাণী আজও কুরআন মজীদের আকারে মানব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং এক জাতিতে পরিণত হওয়ার আহবান জানাচ্ছে। কুরআন কোন বিশেষ জাতি বা এলাকার জন্য নয়, বরং গোটা মানবজাতির পথ প্রদর্শনের জন্য নাযিল হয়েছে। একইভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘রহমাতুল-লিল-মুসলিমীন’ ( মুসলমানদের জন্য করুণাস্বরূপ) হিসাবে নয়, বরং ‘রহমাতুল-লিল- আলামীন’ ( বিশ্ববাসীর প্রতি করুণার আধার) করে পাঠানো হয়েছে। কুরআন মজীদ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমানদারদের জন্য যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছে তা মূলত গোটা মানব জাতির জন্য। কুরআনের দাওয়াত এই যে, প্রতিটি মানুষ আল্লাহর অনুগত দাস হয়ে এসব অধিকার লাভের যোগ্য হয়ে যাক এবং তাকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীতে সম্মানজনক জীবন যাপন করুক। মুসলমান কোন বিশেষ বংশ বা জাতির নাম নয়, ঈমানদার জনগোষ্ঠীর নাম। তাই পৃথিবীর যে কোন এলাকায় বসবাসকারী এবং যে কোন বর্ণ বা গোত্রের ‍সাথে সম্পর্কিত মানুষ যখনই কলেমা তাইয়েবা পাঠ করে নিজের মুসলিম হওয়ার ঘোষণা দেয় তখনই ইসলামের গন্ডিতে প্রবেশ করে মুসলমানদের সমান অধিকার লাভ করে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের জন্য নির্ধারণ করেছেন।
এখন যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং কুরআনকে নিজের জীবন বিধান ও দেশের সংবিধান হিসাবে গ্রহণ করেছে তার মর্যাদা এবং যে গ্রহণ করেনি তার মর্যাদা সম্পূর্ণ সমান হওয়া বিবেক-বুদ্ধির সুষ্পষ্ট পরিপন্থী। আমেরিকা, বৃটেন, রাশিয়া বা অন্য কোন দেশের সংবিধানের আনুগত্য করার শপথ গ্রহণকারী এবং তা প্রকাশ্যে অমান্যকারীর মর্যাদা কি এক হতে পারে? এভাবে প্রকাশ্যে সংবিধান অমান্যকারীকে তো সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাসের অনুমতিই দেওয়া হয় না এবং তাকে বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত করে ফাঁসি দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। তাহলে ইসলামী রাষ্ট্রের নিকট এই আশা কেন করা হবে যে, যে ব্যক্তি তার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সত্তাকে “সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী” হিসাবে স্বীকৃতি দেয় না এবং তার সংবিধানকে নিজের সংবিধান হিসাবে গ্রহণ করে না- এরূপ ব্যক্তিকে তা মান্যকারীদের কাতারে অন্তর্ভূক্ত করে সমান মর্যাদা দিতে হবে? শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর কোন্ আইনগত বা নৈতিক ব্যবস্থা তার গ্রহণকারী ও প্রত্যাখানকারীকে সমান মর্যাদা দান করে? এই জটিলতা মূলত: ইসলামকে একটি ‘ধর্ম’ মনে করার এবং রাষ্ট্রীয় বিষয় সমূহের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক না থাকার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তাধারা থেকে সৃষ্ট। কিন্তু আল্লাহ তাআলাকে ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক এবং কুরআন ও সুন্নাহকে তার সংবিধান মেনে নেওয়ার পর এই দ্ব্যর্থবোধক প্রশ্নেরে কোন অবকাশ থাকে না যে, ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিম ও অমুসলিমগণ সমান মর্যাদার অধিকারী নয় কেন? আল্লাহকে মান্যকারী এবং তাঁকে বা তাঁর নিরংকুশ সার্বভৌমত্ব অস্বীকারকারীকে এক সমান মনে করা হয় না কেন?
ইসলামের এই দিকটি সমালোচিত হওয়ার পরিবর্তে প্রশংসিত হওয়ার যোগ্য যে, সে তার রাষ্ট্রীয় সীমার মধ্যে আল্লাহদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকদের কেবল নিরাপদে বসবাসেরই সুযোগ দেয় না, বরং তাদেরকে মানবীয় অধিকারের বেলায় মুসলমানদের সমান মর্যাদা দান করে। তাদের মধ্যে পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, মুসলমানগণকে আল্লাহ তাআলার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেওয়ার ভিত্তিতে তার বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে, পক্ষান্তরে অমুসলিমগণ তাঁর এই সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না নেওয়ার কারণে তাদেরকে তার বাস্তবায়নের জিম্মাদারীতে অংশীদার বানানো হয়নি। তারা আল্লাহর উপর ঈমান আনলে সরাসরি এই জিম্মাদারীর সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার উপযুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তারা যতক্ষণ ঈমান না আনবে ততক্ষণ তাদেরকে সেই নিরংকুশ সার্বভৌমত্বের মালিক কি করে নিজের বিধান ও পথ নির্দেশ বাস্তবায়নের জিম্মাদারীতে শরীক করতে পারেন?
(আরবী***)
অর্থ: “তবে কি যে ব্যক্তি মুমিন হয়েছে- সে পাপাচারীর ন্যায়? এরা সমান নয়”-সূরা সাজদা: ১৮।
অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ!তোমাদের আপনজন ব্যতীত অপর কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কর না, তারা তোমাদের অনিষ্ট সাধণে ত্রুটি করবে না। যা তোমাদের বিপদে ফেলে তাই তারা কামনা করে”- সূরা আল ইমরান: ২৮)।
একই উপদেশ অত্যন্ত তাকিদ সহকারে পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পিতাগণ ও ভাইগন যদি ঈমান অপেক্ষা কুফরকে অগ্রাধিকার দেয় তবে তাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ কর না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে তারাই যালেম”- সূরা তওবা: ২৩।
স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে এই পার্থক্য রেখা টেনেছেন। এর কারণ মুসলমানদের কোন গোত্রগত, ভৌগোলিক, জাতীয় বা ধর্মীয় গোষ্ঠীবদ্ধতা নয়। আল্লাহ তাআলার প্রকৃত ইচ্ছাই তাই। বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে পৃথিবীতে এই উদ্দেশ্যে নিয়োগ করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর বাণী প্রতিটি মানুষের নিকট পৌঁছে দেবে এবং তারা ইসলামের গন্ডিতে প্রবেশ করে যে কোন প্রকারের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করবে এবং ঈমানদারদের জন্য নির্ধারিত যাবতীয় অধিকারে সমভাবে অংশীদার হবে পাশ্চাত্যবাসীদের মত ‍তাদের চিন্তাধারা এরূপ নয় যে, জগতবাসী তাদের ধর্ম তো গ্রহণ করবে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক বিজয় ও আধিপত্যে অংশীদার হতে পারবে না। অমুসলিমদের সম্পর্কে মুসলমানদের চিন্তাধারার একটি দৃষ্টান্ত দেখুন। রবীআ ইবনে আমের রা: কাদেসিয়ার যুদ্ধের পূর্বে পারস্য বীর রুস্তম ও তার সভাসদদের সম্বোধন করে বলেন:
“আল্লাহ তাআলা আমাদের এই উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন যে, তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আমরা তাঁর বান্দাদের যাবতীয় প্রকারের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে লিপ্ত করব, পার্থিব জগতের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থেকে মুক্ত করে পারলৌকিক জীবনের বিশালতায় পৌঁছিয়ে দেব এবং ধর্মীয় নির্যাতন ও বাড়াবাড়ি থেকে শৃঙ্খলমুক্ত করে ইসলামের ন্যায়-ইনসাফের ছায়াতলে নিয়ে আসব” ( সায়্যিদ ‍কুতুব শহীদ, জাদাহ ওয়া ‍মানযিল, উর্দু অনু: লাহোর ১৯৭১ খৃ: পৃ: ৩৯৭।
এই দাওয়াত সত্তেও কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের কুফরীর উপর অবিচল ‍থাকে তবে সে নিজেই ইসলামী রাষ্ট্রে একজন জিম্মী হিসাবে বসবাসের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। ইসলামী রাষ্ট্র তাকে ভীতি প্রদর্শন করে বা জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে পারে না। কারণ এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের নির্দেশ হল: লা ইকরাহা ফিদ দীন। অর্থ: ধর্মে কোন জোর জবরদস্তি নাই। কিন্তু সাথে সাথে সে উপরে উল্লিখিত কুরআনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে মুসলমানদের সমান মর্যাদাও দিতে পারে না। কুরআন ও হাদীসে তাদের জন্য মানুষ হিসাবে এবং জিম্মী হিসাবে যেসব অধিকার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ও তার বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। এখানে কারো ভ্রান্তির শিকার হওয়া উচিত নয় যে, জিম্মীদেরকে মুসলমানদের তুলনায় কোন নিম্নতর বা দ্বিতীয় স্তরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথমত ‘জিম্মী’ শব্দটি সম্পর্কে চিন্তা করে দেখতে হবে। এই পরিভাষা দ্বারা সেইসব লোকদের বুঝানো হয়েছে যাদের জানমাল, ইজ্জত-আব্রু এবং অন্যান্য সকল অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব মুসলমানরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র এমনিতেই প্রত্যেক নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বশীল, কিন্তু অমুসলিমদের জন্য উপরোক্ত ধরণের একটি পরিভাষা ব্যবহার করে-যার মধ্যে স্বয়ং জিম্মাদারীর উপাদান বিদ্যমান রয়েছে- তাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্বের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তা কেবল পৃথিবীকে দেখানোর জন্য করা হয়নি বরং তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিধান মূলত তাই। এই মাত্র আপনাদের দৃষ্টির সামনে দিয়ে সেই আয়াত অতিক্রম করেছে যাতে মুসলমানদের কাফেরদের থেকে পৃথক থাকতে এবং তাদেরকে নিজেদের অন্তরঙ্গ বন্ধু না বানাতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু এখন চিত্রের অপর পিঠ দেখুন। ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে সকলের সাথে সমান ব্যবহারের নির্দেশ দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
“হে মুমিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় নীতির উপর অবিচল থাক এবং ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হও। কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন কখনও সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না কর, সুবিচার করবে, তা তাকওয়ার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং আল্লাহকে ভয় করবে, তোমরা যা কিছু কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল”- সূরা মায়িদা: ৮।
“হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের ধারক হও এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষী হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা মাতা ও আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে যায়, আর পক্ষদ্বয় ধনী কিংবা গরীব যাই হোক- তাদের সকলের অপেক্ষা আল্লাহর এই অধিকার অনেক বেশী যে, তোমরা তাঁর দিকেই অধিক লক্ষ্য রাখবে। অতএব নিজেদের নফসের খাহেশের বশর্বর্তী হয়ে ন্যায় বিচার থেকে বিরত থেক না” সূরা নিসা: ১৩৫।
আনসারদের বানূ যাফার গোত্রের তো’মা নামক এক ব্যক্তি এক আনসারীর লৌহ বর্ম চুরি করে। অত:পর শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জ্য সে তা এক ইহুদীর নিকট গচ্ছিত রেখে তার উপর চুরির অপবাদ আরো করে। গোত্রের লোকেরাও তাকে বাঁচানোর জন্য একবাক্যে ইহুদীর উপর চুরির অপবাদ আরোপ করে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট তোমার ঈমানদার হওয়া এবং ইহুদীর মুশরিক হওয়ার ভিত্তিতে তার সাফাই গ্রহণ না করে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে। সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ইহুদীর বিরুদ্ধে মামলার রায় প্রদানের পূর্ব মুহুর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁর রসুলের উপর ওহী নাযিল করেন এবং ঘটনার মূল রহস্য তাঁর সামনে তুলে ধরা হল। আল্লাহ তাআলা নিরপরাধ ইহুদীর উপর মিথ্যা অভিযোগ আরোপকারী মুসলমানকে কঠোর সতর্কবাণী শুনিয়ে বলেন:
“ হে নবী! আমরা এই কিতাব পূর্ণ সত্যতা সহকারে তোমার উপর নাযিল করেছি- যেন আল্লাহ তোমাকে যে সত্য পথ দেখিয়েছেন তদনুসারে লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পার। তুমি প্রতারক ও দূর্নীতিবাজদের সমর্থনে বিতর্ককারী হবে না।
তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াময়।
যারা নিজেদের সাথে প্রতারণ করে তুমি তাদের সাহায্য কর না। আল্লাহ প্রতারক ও পাপিষ্ঠদের পছন্দ করেন না। এরা মানুষের নিকট থেকে নিজেদের অপকর্ম লুকাতে পারে, কিন্তু আল্রাহর নিকট থেকে গোপন করতে পারে না। তিনি তো ঠিক সেই সময়ও তাদের সাথে থাকেন যখন তারা রাতের বেলা গোপনে আল্লাহর মর্জির বিরুদ্ধে পরামর্শ করে থাকে। এদের সমস্ত কাজই আল্লাহর আওতাধীন। হাঁ তোমরা এসব অপরাধীর পক্ষ সমর্থনে পার্থিব জীবনে তো খুব ঝগড়া করে নিলে, কিন্তু কিয়ামতের দিন এদের পক্ষে কে ঝগড়া করবে? সেখানে তাদের কে উকীল হবে?
কেউ যদি কোন পাপকাজ করে বসে অথবা নিজের উপর জুলুম করে এবং তারপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে সে আল্লাহকে ক্ষমাকারী ও অনুগ্রহকারী পাবে।
কিন্তু যে ব্যক্তি পাপকাজ করবে- তার এই পাপকাজ তার জন্যই বিপদ হবে। আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি প্রজ্ঞাময়।
আর যে ব্যক্তি নিজে অন্যায় বা পাপকাজ করে কোন নিরপরাধ ব্যক্তির উপর দোষ চাপায় সে মিথ্যা অপবাদ ও ‍পাপের বোঝা বহন করে।
হে নবী! তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তাদের একদল ভুল ধারণায় নিমজ্জিত করার ফয়সালা করেই ফেলেছিল, যদিও আসলে তারা নিজেদের ব্যতীত অপর কাউকে পথভ্রষ্ট করতে পারত না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং তোমাকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা তোমার জানা ছিল না। তোমার উপর রয়েছে আল্লাহর মহা অনুগ্রহ” (সূরা নিসা: ১০৫-১১৩)।
বক্তব্যের ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং সামনে অগ্রসর হয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে, লোকেরা সংগোপনে যে কানা ঘুষা করে তার অধিকাংশই কল্যাণকর কথা নয়, বরং ক্ষতিকর কথাই বলা হয়। উপরোক্ত আয়াত থেকে অনুমান করুন। একজন নিরপরাধ মানুষকে -সে মুসলিম বা অমুসলিম যাই হোক অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করা এবং তাকে যে অপরাধ সে করেনি তার শাস্তি দেওয়া আল্লাহর নিকট কত মারাত্মক অপরাধ এবং তিনি ওহী নাযিল করে কিভাবে এক মুসলমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে এক ইহুদীকে নিরপরাধ ঘোষণা করলেন। এখন দেখুন আল্লাহর রসুল এই জিম্মীদের ব্যাপারে কি বলেন। তিনি বলেন:
“সাবধান! যে ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ লোকদের উপর জুলুম করবে অথবা তাদের অধিকার খর্ব করবে অথবা তাদের উপর বোঝা ঢালবে অথবা তাদের অসম্মতিতে তাদের নিকট থেকে কিছু আদায় করবে-কিয়ামতের দিন এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমি নিজেই বাদী হব”- আবু ‍দাউদ, কিতাবুল জিহাদ।
অথচ এরূপ কথা তিনি মুসলিম নির্যাতিতের ক্ষেত্রে বলেননি যে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে তার অনুকূলে আরজি পেশ করবেন। কিন্তু জিম্মীর ব্যাপারে বলা হচ্ছে যে, মুসলমানরা তাদের উপর হস্তক্ষেপ করলে আমি তাদের পক্ষে আরজি পেশ করব। এখন চিন্তা করুন যাদের উকীল হবেন স্বয়ং নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তাদের উপর কোন জুলুম করার চিন্তাও করা যায় কি?
হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা:-র খেলাফতকালে মুসলমানদের দূর্নাম গেয়ে ব্যঙ্গ কবিতা পাঠকারী এক নারীর দাঁত উপড়ে ফেলা হয়। তিনি এ কথা জানতে পেরে গভর্ণর মুহাজির ইবনে উমায়্যাকে লিখে পাঠান: “আমি জানতে পেরেছি যে, মুসলমানদের দূর্ণাম করে যে নারী ব্যঙ্গ কবিতা আবৃত্তি করে বেড়াত তার সামনের পাটির দাঁত তোমরা উপড়ে ফেলেছ। এই নারী যদি মুসলমান হয়ে থাকে তবে তার জন্য ভৎসনা ও তিরষ্কারই যথেষ্ট ছিল, তাকে নির্যাতনের চেয়ে হাল্কা শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। আর যদি সে জিম্মী হয়ে থাকে তবে এ ক্ষেত্রে তার শিরক এর মত মহাপাপ যখন বরদাশত করা হচ্ছে-সেখানে মুসলমানদের দূর্ণাম আর কি ! আমি যদি এ ব্যাপারে পূর্বাহ্নে তোমাদের সতর্ক করে থাকতাম তবে তোমাদের ঐ শাস্তির প্রতিফল ভোগ করতে হত” ( ড: মুহাম্মাদ হামীদুল্লাহ, সিয়াসী ওয়াসীকাজাত, লাহোর ১৯৬০ খৃ:, পৃ: ২১৭।
দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ফারুক রা: অন্তিম শয্যায়ও জিম্মীদের সাথে সদাচরণ সম্পর্কে চিন্তা করেছেন। আততায়ীর তরবারীর আঘাতে চরমভাবে আহত হয়ে দূর্বল ও শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন এবং এই সংকটকালে তিনি জিম্মীদের সম্পর্কে অসিয়াত করছেন:
“আমার পরে যিনি খলীফা হবেন আমি তাঁকে এই মর্মে অসিয়াত করছি যে, রসুলুল্লাহ সা: যেসব লোককে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাদের সাথে কৃত চুক্তি মেনে চলতে হবে, তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের উপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপানো ‍যাবে না” ( আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, উর্দু অনু: করাচী ১৯৬৬ খৃ: পৃ: ৩৮৭)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেই নয়, বানু উমায়্যা, বানু আব্বাস, এবং তৎপরবর্তী মুসলিম শাসকগণের যুগেও অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের জানমাল ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা ভোগ করে আসছিল। এ কথার স্বীকৃতি দিয়ে প্রসিদ্ধ প্রাচ্যবিদ মন্টগোমারী ওয়াট লিখেছেন: “অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে ইসলামী রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে উত্তম আচরণ করেছে। তাদের সাথে সদাচরণ ছিল মুসলমানদের জন্য মহত্ব ও মর্যাদার বিষয়। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে জিম্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল সরকারের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রত্যেক অমুসলিম সংখ্যালঘু নাগরিক ‍চুক্তি অনুযায়ী মাল অথবা নগদ অর্থের আকারে বার্ষিক জিযইয়া বাইতুল মালে জমা করত। এছাড়া তাদেরকে মাথাপিছু করও পরিশোধ করতে হত। এর পরিবর্তে তারা বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা লাভ করত এবং তারা মুসলমানদের মতই আভ্যন্তরীণ অপরাধ থেকেও নিরাপদ থাকার সুযোগ লাভ করত। যেসব প্রদেশে জিম্মীদের বসবাস ছিল সেখানে তাদের থেকে জিযইয়া আদায় করা এবং মুসলমান ও জিম্মীদের মধ্যেকার বিবাদ মীমাংসা করা ছিল শাসকের অন্যতম দায়িত্ব। প্রত্যেক সংখ্যালঘু নিজ নিজ ব্যক্তিগত ও আভ্যন্তরীণ বিষয়ে ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ নির্ধারিত জিযইয়া ও ট্যাক্স আদায় এবং তাদের মধ্যে তাদের ধর্মীয বিধান কার্যকর করা সহ সমস্ত আভ্যন্তরীণ বিষয়ে দায়িত্বশীল ছিল” (Montgomery Watt W. The Majesty that was Islam, Sidwick & Jackson, London 1974, P. 47.
একই লেখক সামনে অগ্রসর হয়ে নিজের পাঠকদের বলছেন, “রসুলুল্লাহ সা: এর যুগে যেসব চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তার সবগুলোতেই পরিষ্কার ভাষায় এই নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় যে, প্রত্যেক জিম্মী সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারবে এবং এই স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও অটুট থাকে। খৃস্টানদের গির্জা এবং ইহুদীদের মন্দিরও নিরাপদ ছিল। পরে এই ধারণাও ব্যক্ত করা হয়েছিল যে, তাদেরকে নিজ নিজ ‍উপাসনালয় নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু জিম্মীদের ক্ষেত্রে এ ধরণের অন্যান্য নতুন বিধান অনুযায়ী কখনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি”- ( ঐ লেখক, ঐ গ্রন্থ)।
এই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মীদের অবস্থা। তাদের অধিকার সমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধান ও নজীর সমূহের বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে। এখানে শুধু এতটুকু বলাই উদ্দেশ্য ছিল যে, জিম্মীদের ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্রের চিন্তাধারা কি।
এখন মুসলিম ও অমুসলিমদের সমমর্যাদা সম্পর্কে বলা যায়। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদের সিদ্ধান্ত এই যে, ঈমান আনয়নকারী ও ঈমান প্রত্যাখানকারী সমান হতে পারে না। তাদের মধ্যে মানবতার সম্পর্ক অভিন্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে তাদের মর্যাদা সমান হতে পারে। মানুষ হিসাবে মুসলমানরা যেসব অধিকার লাভ করে, অমুসলিমরাও তা লাভ করে থাকে। তাছাড়া এই অর্থেও তাদের উভয়ের মর্যাদা সমান যে, আল্লাহ ও তাঁর রসুল মুসলিম-অমুসলিম উভয়ের অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মুসলমানদের অধিকার যেভাবে অবিচ্ছেদ্য এবং হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে, ঠিক সেভাবে অমুসলিমদের অধিকারও অবিচ্ছেদ্য এবং হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে। রাষ্ট্র যদি মুসলমানদের কোন অধিকারের হ্রাস বৃদ্ধি করতে না পারে তবে অমুসলিমদের কুরআন ও সুন্নাহর বিধান ও খেলাফতে রাশেদার দৃষ্টান্ত পেশ করে বিচার বিভাগের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার অর্জন করতে পারে, তবে অমুসলিমরাও ঐসব উৎসের বরাত দিয়ে নিজেদের অধিকার অর্জন করতে পারে, তবে অমুসলিমরাও ঐসব উতসের বরাত নিজেদের অধিকার অর্জন করতে পারে।
ফাতেমী রাজবংশের রাজত্বকালে কতিপয় সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিনাই এলাকার খৃস্টান পাদ্রীদের ও ইহুদীদের মালিকানায় হস্তক্ষেপ করতে চাইলে এবং তাদের উপর কিছু কর আরোপ করলে তারা রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে পূর্বেকার চুক্তিপত্রের কপিসমূহ পেশ করে আব্দুল মজীদ আল ‍হাফেজের উযীর বাহরাম এবং জাফরের উযীর আল আব্বাস ও তালাইর নিকট থেকে নিজেদের অনুকুলে ডিক্রি লাভ করে। উক্ত চুক্তিপত্রে শাসকদের প্রতি নির্দেশ ছিল যে, তারা পূর্বেকার চুক্তিপত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং খেলাফতে রাশেদার যুগে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। সাথে সাথে এই নির্দেশও জারি করা হল যে, নতুনভাবে আরোপিত সকল প্রকারের কর প্রত্যাহার করতে হবে এবং খৃস্টান ও ইহুদীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করতে হবে ( Stem SM. Fatimid Decrees, Faber and Faber, London 1964).
এই ধরণের নজীর আব্বাসী রাজবংশের আমলে এবং তাদের পরবর্তী যুগসমূহেও পাওয়া যায় যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রের অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে মুসলিম, অমুসলিম সকলেই সমানভাবে নিরাপত্তা লাভ করত এবং এই নিরাপত্তার ব্যবস্থা সেই মহান সত্তা কর্তৃক প্রদত্ত যাঁর অস্তিত্ব বা সর্বময় কর্তৃত্ব অমুসলিমরা স্বীকার করে না। আইনের দৃষ্টিতে সমান হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম ও অমুসলিম ‍নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে অবশ্যই একটা পার্থক্য আছে এবং সেই পার্থক্য হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক অধিকারের। এর কারণ কোন স্বতন্ত্র ব্যবহার অর্থ ধর্মীয় গোঁড়ামী নয় বরং ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী সত্তার সাথে বিশ্বস্ততার সম্পর্কের ধরণের বিভিন্নতাই এর কারণ। ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা আল্লাহ তাআলার সার্বভৌমত্ব এবং কিতাব ও সুন্নাহর সংবিধানের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, তা অমুসলিমরা সমর্থন করে না এবং তার প্রতি পূর্ণ বিশস্ত থাকার শপথও তারা করে না যা মুসলমানরা করে থাকে। যেহেতু মুসলমানরা ঈমান এনে এই অঙ্গীকার করে যে, তারা আল্লাহর যমীনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কায়েম করবে এবং তিনি ছাড়া অপর কারো সার্বভৌমত্ব কায়েম করবে এবং তিনি ছাড়া অপর কারো সার্বভৌমত্ব কেবল প্রত্যাখানই করবে না, বরং জীবনবাজি রেখে তা নির্মূল করবে, এজন্যই তারা আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃত্বের ( ডেলিগেটেড পাওয়ার) অধিকারী হয়ে যায়। মানব জাতির মধ্যে যে ব্যক্তিই এই ধরণের অঙ্গীকার করে সে সরাসরি এই কর্তৃত্বে অংশীদার হওয়ার অধিকার লাভ করে। কিন্তু যে ব্যক্তি এই দায়িত্ব মাথায় নিতে প্রস্তুত নয় এবং মূলতই আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রবক্তা নয় তাকে কোন্ অধিকারের ভিত্তিতে এই কর্তৃত্বে অংশীদার করা হবে?
কোন কর্তৃপক্ষ কি এমন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিকট নিজেদের কর্তৃত্ব অর্পণ করতে পারে যে বা যারা ‍তাদের অস্তিত্ব বা কর্তৃত্বই স্বীকার করে না? মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে এই মৌলিক পার্থক্য সত্ত্বেও ইসলাম অমুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করেনি। অবশ্য তাদেরকে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বা নীতি নির্ধারণী পদের জন্য অযোগ্য সাব্যস্ত করেছে যাতে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তারা সংবিধানের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ করতে পারে না এবং তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শর্তাবলীতে পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হয় না। তাদের এই অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিক অধিকার সমূহকে তিনটি পরিমন্ডলে বিভক্ত করতে হয়:
১. মুসলিম ও অমুসলিমদের অভিন্ন বা সাধারণ অধিকারসমূহ।
২. মুসলমানদের আপেক্ষিক বা অতিরিক্ত অধিকার সমূহ।
৩. অমুসলিমদের আপেক্ষিক বা অতিরিক্ত অধিকার সমূহ।
এর মধ্যে প্রথমোক্ত অধিকার সমূহের তালিকা দীর্ঘতর হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা অধিকারের ক্ষেত্রে মানুষের সৃষ্টিগত অবস্থার উপরই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। অবশিষ্ট দুই ধরণের অধিকারের তালিকায় এমন কতিপয় অধিকার অন্তর্ভূক্ত হবে তা মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যেকার পার্থক্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নৈতিক দিক

ইসলামে মৌলিক অধিকারের ইতিহাস ও তার আইনগত অবস্থার পর্যালোচনা করার পর এখন এসব অধিকারের নৈতিক দিকের পর্যালোচনা করে দেখা যাক। আমরা আইনগত অধিকার বলতে কেবল সেই সব অধিকার বুঝি যা মানব রচিত আইনের অধীনে আসে, যা প্রশাসন বিভাগের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য। যেমন জানমালের নিরাপত্তা এবং সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি। কিন্তু যেসব অধিকার প্রশাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতার গন্ডির বাইরে এবং যেগুলো বলবৎ করার দায়িত্ব মানুষের বিবেক ও সংজ্ঞার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তার সবগুলোই নৈতিক অধিকার। যেমন রুগীর সেবা শুশ্রুষা, সাহায্যের মুখাপেক্ষী লোকদের সাহায্য-সহযোগিতাদান, মেহমানদের আদর-যত্ন, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার ইত্যাদি। আইনগত অধিকার বাস্তবায়নের পেছনে রাষ্ট্রীয় শক্তি বিদ্যমান থাকে, কিন্তু নৈতিক অধিকারের বাস্তবায়ন মানুষের আভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর নির্ভরশীল। ইমাম গাযালী রহ: নৈতিকতার সংজ্ঞায় বলেন: “চরিত্র বা নৈতিকতা মানুষের আভ্যন্তরীণ বা আন্তরিক অবস্থার নাম”- (মাওলানা হিফজুর রহমান, আখলাক আওর ফালসাফায়ে আখলাক, দিল্লী ১৯৬৪ খৃ. পৃ. ৪৪০, ইয়াহ উলুমিদ দীন এর বরাতে, ৩ খ. পৃ. ৫৬।
মানুষের এই আভ্যন্তরীণ অবস্থা যেহেতু পর্যবেক্ষণের আওতা বহির্ভুত এবং ইন্দ্রিয় জ্ঞান ও বোধ শক্তির ক্ষমতা বহির্ভুত, তাই আইন তাকে নিজের কর্মক্ষেত্রের মধ্যে শামিল করেনি। আইন প্রণয়ন এবং আইনের বাস্তবায়নের পরিধি মানুষের কেবল বাহ্যিক ও পর্যবেক্ষণযোগ্য কার্যকলাপের সীমায় এসে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এসব কার্যকলাপের আভ্যন্তরণী অনুপ্রেরণাদায়ী শক্তি এবং এক ব্যক্তির মানসিক জীবনের গঠন ও নির্মাণে অংশগ্রহণকারী চিন্তা চেতনা, আকীদা বিশ্বাস ও ঝোঁক প্রবণতার সাথে আইনের কোন সম্পর্ক নেই। এগুলো হলো নৈতিকতার আলোচ্য বিষয় এবং এই পরিমন্ডলের আওতায় আসার মত মানবাধিকারসমূহ নির্ধারণও আইন প্রণেতাদের কাজ নয়, নৈতিকতার প্রশিক্ষকদের কাজ। মাওলানা হিফজুর রহমান আইনগত পরিমন্ডল ও নৈতিক পরিমন্ডলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন:
“মানব রচিত বা নিরপেক্ষ আইনের প্রয়োগ কেবল ‘বাহ্যিক কর্মের’ উপর হয়ে থাকে, কিন্তু নৈতিক আইন কার্য ও তার কারণ উভয়ের উপর দৃষ্টি নিবন্ধ রাখে এবং তা উভয়ের উপর প্রযোজ্য হয়। এমনকি কোন কোন কার্যকলাপ বাহ্যিক দিক থেকে কল্যাণকর পরিণতির বাহক মনে হলেও নৈতিক বিধান তাকে এজন্য অমঙ্গলজনক বলে যে, তার কারণ ও পরিণতি অত্যন্ত নিকৃষ্ট। মানব রচিত বিধান বাহ্যিক শক্তিবলে ‍কার্যকর হয়, অর্থাত শাসকগোষ্ঠী, সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগ, জেল ও আধুনিক সংষ্কারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। কিন্তু নৈতিক বিধান মানুষের আভ্যন্তরীণ শক্তি অর্থাৎ “সংজ্ঞা” বলবত করে থাকে। নিরপেক্ষ আইন মানুষকে কেবল সেইসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের জন্যই দায়িত্বশীল বানায় যেগুলোর উপর সমাজ-সমষ্টির স্থায়িত্ব অধিকতর নির্ভরশীল। যেমন জানমালের নিরাপত্তা, মান সম্মানের হেফাজত ইত্যাদি। কিন্তু নৈতিক বিধান মানুষকে “দায়িত্ব-কর্তব্য” ও “যোগ্যতা” উভয়ের জন্য একযোগে দায়িত্বশীল সাব্যস্ত করে। কার্যকলাপ সত উদ্দেশ্য প্রণোদিত হওয়ার জন্য এবং তাকে উন্নতির সর্বশেষ ধাপে উন্নীত হওয়ার চেষ্ঠায় ব্রতী হওয়ার জন্য অভ্যস্ত করে তোলাই নৈতিক বিধানের লক্ষ্য” – (ঐ, পৃষ্ঠা. ২১৬)।
আমাদের ফকীহ্গন আইন ও নৈতিকতার মধ্যে বিরাজমান এই পার্থক্যের দিকে লক্ষ্য রেখে ইসলামেও অধিকার সমূহের আইনগত ও নৈতিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্যরেখা টেনেছেন। আল্লামা সাইয়্যেদ সুলায়মান নদবী ‘আল্লাহর অধিকার’ ( হুকুকুল্লাহ) এবং ‘বান্দার অধিকারের’ (হুকুকুল ইবাদ) বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: “স্রষ্টা এবং সৃষ্টি অথবা আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে যে সংযোগ সম্বন্ধ রয়েছে তার সম্পর্ক যদি কেবলমাত্র মানসিক শক্তি ও আন্তরিক অবস্থার সাথে সাথে আমাদের দেহ ও জীবন এবং ধন সম্পদের সাথেও হয়ে থাকে তবে তার নামই ‘ইবাদত’। মানুষের পরষ্পরের সাথে এবং মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টির মাঝে যে সংযোগ-সম্বন্ধ রয়েছে তার ভিত্তিতে আমাদের উপর যেসব বিধান আরোপিত হয় তা যদি শুধুমাত্র আ‌ইনগত হয়ে থাকে তবে তার নাম মুআমালা বা লেনদেন ও আচার ব্যবহার। আর যদি তা আইনগত না হয়ে থাকে বরং আধ্যাত্মিক উপদেশ, আদান-প্রদান ও হেদায়েতের পর্যাভূক্ত হয়ে থাকে তবে তার নাম আখলাক বা নৈতিকতা”- ( সাইয়েদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন নবী, আজমগড় ১৯৩২ খৃ. ৪ খ. পৃ. ৩১৬।
আইনগত ও নৈতিক অধিকারের এই শ্রেণীবিভাগ আমরা ফিকহ এর গ্রন্থাবলীতে পেয়ে থাকি। কিন্তু তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করা হয় অথবা তাকে মূল প্রসঙ্গ থেকে কর্তন করে অন্য কোন শিরোনামের অধীনে স্থাপন করা হয় এবং এভাবে ইসলামে আইনগত ও নৈতিক অধিকারের মধ্যে যে পারষ্পরিক সম্পর্ক রয়েছে তা পুরাপুরি প্রতীয়মান হতে পারে না।
দুনিয়ার আইনের সাধারণ নীতিমালা ও নৈতিকতার নীতিমালা অনুযায়ী এই শ্রেণী বিভাগ তো ঠিকই আছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার সর্বময় ক্ষমতা এবং মানুষের প্রতিনিধিত্বের (খেলাফত) মর্যাদাকে সামনে রাখলে ইসলামে এই শ্রেণী বিভাগের ধরণ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। এখানে নৈতিক ও আইনগত অধিকার একই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীর নির্দেশে নির্ধারিত হয়। তাই এর মধ্যে একটি আইন রচনাকারী কর্তৃপক্ষের জারীকৃত আইন এবং নৈতিকতার একজন শিক্ষকের পেশকৃত নৈতিক নীতিমালাগত পার্থক্য নেই। তা কার্যকরযোগ্য এবং বলবৎ হওয়ার ভিত্তিতেও পরষ্পর পৃথক নয়। একজন মুসলমান তার প্রতিপালকের সাথে কৃত অংগীকারের অধীনে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পূর্ণ আনুগত্য করতে বাধ্য।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ [٦:١٦٢]
অর্থ: বল, আমার নামায, আমার যাবতীয় ইবাদত অনুষ্ঠান, আমার জীবন আমার মৃত্যু সবই আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য”- সূরা আনআম: ১৬২।
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
অর্থ: “আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ তাদেরকে জান্নাত দানের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন”- সূরা তওবা: ১১১।
উপরোক্ত বক্তব্য ও স্বীকারোক্তির পর কোন মুসলমানের জন্য আল্লাহ নির্ধারিত অধিকার সমূহের কতককে আইনগত এবং কতককে নৈতিক অধিকার মনে করে সে সম্পর্কে ভিন্নতর দৃষ্টিভংগি গ্রহণ করার সুযোগ কিভাবে অবশিষ্ট থাকতে পারে? তার কাছে তো কুরআন মজীদের প্রতিটি বিধান আইনের মর্যাদা রাখে। সে আল্লাহ তাআলার প্রতিটি নির্দেশ এক সমান দায়িত্বানুভূতি নিয়ে কার্যে পরিণত করে। তার জন্য কেবল আইনগত অধিকার সমূহই দেয় (Due) ও অবশ্য পালনীয় (Binding) নয়, বরং নৈতিকতার অধীনে আগত সমস্ত অধিকারও একইভাবে দেয় ও অবশ্য পালনীয়। মানবরচিত নৈতিক ব্যবস্থা উত্তম ও অধমের একটি মাপকাঠি কায়েম করার সীমা পর্যন্ত পৌঁছে শেষ হয়ে যায় এবং তার বাস্তবায়নের দায়িত্ব মানুষের বিবেকের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এই বাস্তবায়ন হয় স্বেচ্ছামূলক (Voluntary)কোন পর্যায়েই তা জবাবদিহিযোগ্য (Accountable) নয়। তা হয়ত সর্বাধিক সামাজিক চাপ(Social presure) প্রয়োগ করে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করলে বিচার বিভাগীয় শুনানীর (Congnizable) বা শাস্তিযোগ্য (Punishable) অবশ্যই নয়। ইসলামেও কি নৈতিক অধিকার সমূহের এই একই অবস্থা? এ কথা পরিষ্কার যে, উক্ত প্রশ্নের জওয়াব হবে নেতিবাচক। মুসলমানদের তো আইন ও নৈতিকতার মধ্যকার স্বাতন্ত্র সত্বেও প্রতিটি জিনিসের কড়ায় গন্ডায় হিসাব দিতে হবে।
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ [٩٩:٧]
وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ [٩٩:٨]
অর্থ: “কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে সে তা দেখতে পাবে”- সূরা যিলযাল :৭,৮।
অবস্থা যখন এই তখন ফকীহগণ অধিকার সমূহকে নৈতিক ও আইনগত ভিত্তির উপর শ্রেণী বিভাগ করেন কেন? তারা কিসের ভিত্তিতে এই স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন?
ইসলামে এই পার্থক্যের তাৎপর্য কেবল এতটুকু যে, ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক মুসলমান তার প্রতিপালকের প্রতিটি নির্দেশ পালনে বাধ্য এবং এই বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ আইনগত প্রকৃতির। কারণ তাকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী মহান আল্লাহর সামনে নিজের সমস্ত কার্যাবলীর জন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং এই কার্যকলাপের ভিত্তিতে তাঁর আদালতে প্রতিদান ও শাস্তির ফয়সালা হয়ে থাকে। সে তথায় এই ওজর পেশ করতে পারবে না যে, অন্তর নিজের সত্তা ও নিজের এখতিয়ার সমূহের সীমা পর্যন্ত সে আল্লাহ নির্ধারিত বিধানসমূহ পালনে ও অধিকার সমূহ আদায়ে অপারগ ছিল। অবশ্য একজন নেতা বা শাসককে আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র সেইসব অধিকার কার্যকর করার জন্য দায়িত্বশীল বানিয়েছেন যেগুলো সে নিজের সীমিত জ্ঞানবুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ের উপর ভিত্তিশীল উপলদ্ধি ও পর্যবেক্ষণের সীমা পর্যন্তই কার্যকর করতে পারে। এগুলো হল সেই সব অধিকার যাকে ইসলামে “আইনগত” বলা হয়। নৈতিক ও আইনগত অধিকারের এই শ্রেণী বিভাগ যেন রাষ্ট্রের এখতিয়ারের দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়েছে, কোন ব্যক্তির যিম্মাদারী ও জবাবদিহির দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। কোন ব্যক্তির জন্য সমস্ত অধিকারই তো আইনগত মর্যাদা সম্পন্ন। কিন্তু একজন শাসকের ক্ষমতা বা এখতিয়ার এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমারেখার দিক থেকে তা আইনগত ও নৈতিক-এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যায়। অন্তত যেসব অধিকারকে আল্লাহ তাআলা মানব সমাজের ভারসাম্যপূর্ণ, ইনসাফপূর্ণ, নিরাপত্তাপূর্ণ, সংগতিশীল ও পবিত্র বানানোর জন্য অপরিহার্য সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোকে তিনি নিজের প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে কার্যকর করার উপযোগী বানিয়ে দিয়েছেন এবং এই প্রসঙ্গে তাকে প্রয়োজনীয় বিধান ও এখতিয়ারও দেওয়া হয়েছে। যেসব অধিকারকে তিনি সমাজকে উন্নততর নৈতিক ভিত্তিসমূহের উপর নির্মাণ এবং এই উদ্দেশ্যের জন্য সমাজের সদস্যদের আচরণ ও চরিত্রকে সর্বোত্তমরূপে গঠনের জন্য জরুরী মনে করেছেন সেগুলোর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল স্বয়ং প্রত্যেক ব্যক্তিকে সাব্যস্ত করেছেন এবং তার হিসাব নিকাশ লওয়ার ব্যাপারটি সরাসরি নিজের হাতে রেখেছেন। এখন আইনগত অধিকার সমূহ বাস্তবায়নের সীমা পর্যন্ত তো ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়কে মিলিতভাবে সর্বশক্তিমান আল্রাহর উচ্চতর আদালতে জবাবদিহি করতে হবে, কিন্তু যেসব অধিকার রাষ্ট্রের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে সেগুলো সম্পর্কেও ব্যক্তিকে একইভাবে জবাবদিহি করতে হবে এবং তার ক্ষেত্রে আইনগত ও নৈতিক অধিকারের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যেমন ব্যক্তি ও প্রতিনিধিমূলক ক্ষমতাসীনের পারষ্পরিক সম্পর্কের গন্ডি পর্যন্ত অধিকারসমূহ তার বাহ্যিক প্রকাশ ও বাস্তবায়নের ভিত্তিতে আইনগত ও নৈতিক দুই পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহ ও বান্দার পারষ্পরিক সম্পর্কের গন্ডিতে এই শ্রেণী বিভাগ শেষ হয়ে যায় এবং সমস্ত অধিকার আইনগত বৈশিষ্ট্য লাভ করে। আল্লাহ তাআলা আইনগত অধিকার সমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেগুলোকে রাষ্ট্রের এখতিয়ারাধীনে সোপর্দ করেছেন, যাতে কোন ব্যক্তি নিজ দায়িত্বে এসব অধিকার আদায় না করলে রাষ্ট্র-বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের সহায়তায় তা শক্তিবলে কার্যকর করতে পারে এবং কোন ব্যক্তির প্রাপ্য অধিকার যেন আত্মসাত অথবা আহত হতে না দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু এই দায়িত্ব শুধু বাহ্যিক কর্মতৎপরতার সীমা পর্যন্তই পালন করতে পারে তাই তাকে নৈতিক অধিকারসমূহের বাস্তব প্রয়োগের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তির উপর এই দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় বহাল রয়েছে, তাকে সামান্যতম নৈতিক অধিকারের বাস্তবায়নের দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। কোন বিবদমান ব্যাপারে রাষ্ট্র পক্ষদ্বয়ের মধ্যে ইনসাফ কায়েমের জন্য নিজের কোন সরাসরি জ্ঞানের পরিবর্তে বাদী ও বিবাদীর প্রদত্ত বিবরণ, স্বাক্ষীগণের সাক্ষ্য এবং পুলিশের রিপোর্টের উপর নির্ভর করতে ‍বাধ্য। তার অবগত হওয়ার সমস্ত মাধ্যম শুধুমাত্র বাহ্যিক কার্যকলাপ পর্যন্তই বেষ্টন করতে পারে। মানুষের আভ্যন্তরীণ জগত পর্যন্ত তার পৌঁছার শক্তি নাই। অতএব এসব মানবিক দূর্বলতার দিকে লক্ষ্য রেখে মানবীয় রাষ্ট্রকে শুধুমাত্র বাহ্যিক তৎপরতার সাথে সংশ্লিষ্ট আইনগত অধিকার সমূহের বাস্তবায়নের জন্য জিম্মাদার বানানো হয়েছে এবং এসব অধিকারের বেলায়ও সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ইনসাফ লাভের বিষয়টি আল্লাহ তাআলা নিজেরই আদালতের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। কারণ কোন বিষয়ে প্রকৃত তথ্যের গভীরে পৌঁছতে না পারার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে এবং তার ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও সৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হওয়া সত্ত্বেও পক্ষদ্বয়ের প্রতি সুবিচার নাও হতে পারে। মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে অধিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ব্যক্তি স্বয়ং মহান নবী সা: বলেন:
“আমি একজন মানুষ, আমার সামনে যেসব লোক বিবাদ মীমাংসার জন্য উপস্থিত হয়, তাদের এক পক্ষের অপর পক্ষের তুলনায় অধিক বাকপটু হওয়াটা বিচিত্র নয় এবং আমি তার অনুকূলে রায় প্রদান করব এবং মনে করব এটাই সঠিক। অতএব যে ব্যক্তিকে আমি এভাবে তার ভাইয়ের অংশ দেব সে যেন তা থেকে কিছুই গ্রহণ না করে। কারণ তার জানা উচিত, আমি তাকে দোযখের একটি টুকরা দিচ্ছি” (আদালতে নববীকে ফায়সেলে, পৃ. ২১৭।
মহান আল্লাহর বাণী:
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ [٣٠:٧]
অর্থ: “মানুষ পার্থিব জীবনের কেবল বাহ্যিক দিকেরই জ্ঞান রাখে এবং আখেরাত সম্পর্কে তারা অলসতার শিকার” (সূরা রূম: ৭)।
হযরত উমার রা: মানবীয় রাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্রের সীমা নির্দেশ করতে গিয়ে বলেন, “রিসালাত যুগে তোমাদেরকে ওহীর সাহায্যে অভিযুক্ত করা হত। কোন ব্যক্তি কিছু গোপন করলে তা ওহীর মাধ্যমে ফাঁস করে দেওয়া হত এবং কেউ প্রকৃত ঘটনার বিপরীত বর্ণনা দিলে তাকেও পাকড়াও করা হত। তোমাদের উত্তম চরিত্রের প্রকাশ ঘটানো উচিত। আল্লাহ পাক অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত। যে কেউ পংকিলতা ও নিকৃষ্টতার প্রকাশ ঘটাবে এবং দাবী করবে যে, তার অন্তরজগত পরিষ্কার আছে- আমরা তার কথায় বিশ্বাস করব না। আর যে ব্যক্তি সত্য কথা প্রকাশ করবে আমরা তাকে ভালোই মনে করব” ( উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ: ২৮৪।
অপর এক ভাষণে তিনি এই সত্য নিম্নোক্ত বাক্যে প্রকাশ করেন:
“শোন! কুরআন পড়লে কেবল আল্লাহর নিকট পুরষ্কার লাভের আশায় পড় এবং নিজের কাজ কর্মের মাধ্যমে তা অর্জনেরই সংকল্প কর। যখন ওহী নাযিল হত তখন আমরা পুরষ্কার লাভের উপায় জেনে নিতাম। কারণ মহানবী সা: আমাদের মাঝে বর্তমান ছিলেন। এখন ওহীর আগমনের ধারা বন্ধ হয়ে গেছে এবং রসুল সা: দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। এখন আমি তোমাদের সেইসব কথার মাধ্যমে চিনতে পারব যা আমি বলেছি। শোন! যে কেউ ন্যায়ের প্রকাশ ঘটাবে আমরা তাকে ন্যায় মনে করব এবং তার প্রশংসা করব। আর যে কেউ অন্যায়ের প্রকাশ ঘটাবে আমরা তার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা রাখব এবং তাকে অপছন্দ করব” ( ঐ, পৃ: ২৮৬)।
অর্থাত আমরা যেগুলোকে আইনগত অধিকার বলি সেগুলোও অবগতির মাত্রা অনুযায়ীই কার্যকর হতে পারে। তার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহ তাআলার আদালতেই হবে। এ জন্যই যেসব অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ইন্দ্রিয়ের উর্ধ্বের জ্ঞান ও অন্তরলোকের পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন সেগুলোকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই মানুষের সীমিত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বাইরে রেখেছেন এবং মানুষকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়িত্বশীল বানিয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপারটি নিজের হাতে রেখেছেন। কেননা যে গোপন ও অদৃশ্য বিষয় পর্যন্ত মানুষের দৃষ্টি পৌঁছতে পারে না তা আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। এর কোন অন্তর্নিহিত তত্ব তাঁর সামনে লুকায়িত নেই। তিনি তাঁর পূর্ণ ও নির্ভুল জ্ঞানের সাহায্যে সমস্ত অধিকারের ঠিক ঠিক ফয়সালা করবেন এবং তাঁর আদালতে নৈতিক ও আইনগত কোনরূপ স্বাতন্ত্র অবশিষ্ট থাকবে না। মহান আল্লাহর বাণী:
أَوَلَا يَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ [٢:٧٧]
অর্থ: “তারা কি জানে না যে, যা তারা গোপন রাখে অথবা প্রকাশ করে তা নিশ্চয়ই আল্লাহ জানেন” (সূরা বাকারা: ৭৭)।
وَلَا يَكْتُمُونَ اللَّهَ حَدِيثًا
অর্থ: “তারা আল্লাহ থেকে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না” (সূরা নিসা: ৪২)।
(আরবী***)
অর্থ: আল্লাহ সবকিছুর সম্যক প্রত্যক্ষদর্শী( সূরা হজ্জ: ১৭)।
إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
অর্থ: অন্তরে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ( সূরা আল ইমরান: ১১৯)।
আল্লাহ তাআলার নিকট যেহেতু মানুষের নিয়াত, কামনা বাসনা, ইচ্ছা-সংকল্প, চিন্তা চেতনা, আক্বীদা-বিশ্বাস মোট কথা কোন জিনিসই লুকায়িত নয়, মানুষের ভিতর ও বাহির তাঁর সামনে সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত, তাই তাঁর আদালতে কোন অধিকার কেবলমাত্র “নৈতিক অধিকার” ই নয়, বরং সমস্ত অধিকার সম্পূর্ণতই “আইনগত প্রতিকার প্রার্থনার যাবতীয় প্রসিদ্ধ পন্থা অনুযায়ী হবে। তিনি ক্ষতিগ্রস্থদের ফরিয়াদ শ্রবণ করবে।
“যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে- কি অপরাধে তাকে খুন করা হয়েছিল” ( সূরা তাকবীর: ৮,৯)।
কিরামান কাতিবীনের সংগৃহীত বিবরণ সমূহের মূল্যায়ন করা হবে।
“সম্মানিত লেখকদ্বয়, তারা জানে তোমরা যা কর” (সূরা ইনফিতার: ১১)।
যে জমীনের বুকে এসব কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে তার সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হবে।
“সেই দিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে” (সূরা যিলযাল:৪)।
অপরাধীর নিজের মুখ ও হাত-পায়ের স্বাক্ষ্যও গ্রহণ করা হবে।
“সেদিন তাদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিবে তাদের মুখ, তাদের হাত ও তাদের পা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে” ( সূরা নূর: ২৪)।
এভাবে আল্লাহ তাআলা নবীগণও অন্যান্যের জবানবন্দী গ্রহণ করে প্রমাণ করে দেবেন যে, সত্য তাদের নিকটে পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
“নবীগণকে এবং অন্যান্য স্বাক্ষীগণকে উপস্থিত করা হবে”(সূরা যুমার: ৬৯)।
অবশেষ অপরাধী স্বয়ং স্বীকারোক্তি করবে যে, সত্যিই সে সংশ্লিষ্ট অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল।
“তারা বলবে, অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল, আমরা তাদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই নাযিল করেননি” (সূরা মুলক: ৯)।
অতএব তিনি স্বাক্ষ্য -প্রমাণ সম্পূর্ণ করার পর নিজের রায় ঘোষণা করবেন।
“লোকদের মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে। অবশেষে অপরাধী স্বয়ং স্বীকারোক্তি করবে যে, সত্যিই সে সংশ্লিষ্ট অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল।
“তারা বলবে, অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল, আমরা তাদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই নাযিল করেননি” (সূরা মুলক: ৯)।
অতএব তিনি সাক্ষ্য প্রমাণ সম্পূর্ণ করার পর নিজের রায় ঘোষণা করবেন।
“লোকদের মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে এবং তাদের উপর যুলুম করা হবে না। প্রত্যেকের কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে” (সূরা যুমার: ৬৯,৭০)।
এখন বলুন, যে অধিকারসমূহের বিষয় এই সুমহান ও সর্বশেষ আদালতে আইনের সমস্ত প্রসিদ্ধ শর্তাবলী অনুযায়ী এইভাবে শুনানির আওতায় আসবে, সেগুলোকে আমরা কিসের ভিত্তিতে “নৈতিক অধিকার” বলতে পারি? আরও লক্ষ্য করুন যে, তথায় কি কি ধরণের নৈতিক অধিকার শুনানীর আওতায় আসবে? কুরআন মজীদের নির্দেশ:
وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا [٤:٨٦]
“তোমাদের যখন সালাম দেওয়া হয় তখন তোমরাও তা অপেক্ষা উত্তম শব্দে সালামের উত্তর দাও, অথবা (অন্তত) তার অনুরূপ উত্তর দাও। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী” (সূরা নিসা: ৮৬)।
উপরোক্ত আয়াতের শেষাংশ থেকে পরিষ্কার জানা যাচ্ছে, এটা কেবল নৈতিক উপদেশই নয়, বরং একটি নির্দেশ, একটি আইনগত নীতিমালা এবং স্বয়ং মহান আল্লাহর আদালতে এজন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পার্থিব জগতের কোন বিচারালয়ের জন্য এটা নির্ধারণ করা কঠিন ব্যাপার যে, সালামের জওয়াব যথাযোগ্যভাবে দেওয়া হয়েছে কি না। তাই তাকে এই নৈতিক অধিকার বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর বিচারালয়ে স্বয়ং মুখ ও হাত স্বাক্ষী দিবে যে, সালামের উত্তর সঠিক পন্থায় দেওয়া হয়েছে কি না এবং অন্তরও সাক্ষী দেবে যে, এ সময় নিষ্ঠাপূর্ণ আবেগ বর্তমান ছিল, না ঠাট্টা-বিদ্রুপ ঘৃণা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার মালিন্যে মনটা পূর্ণ ছিল?
এখন অধিকার সমূহের কিছুটা বিস্তারিত তালিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাক।
“হে মুহাম্মাদ! তাদের বল, এসো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন তা তোমাদের পড়ে শুনাই।”
১. তোমরা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না।
২. পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।
৩. দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা নিজেদের সন্তানদের হত্যা কর না, আমরা তোমাদেরও রিযিক দান করি এবং তাদেরও।
৪. প্রকাশ্যে হোক অথবা গোপনে অশ্লীল আচরণের নিকটেও যাবে না।
৫. আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করবে না। তোমাদের তিনি এই নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝে শুনে কাজ কর।
৬. ইয়াতীম বয়:প্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া তার সম্পদের নিকটবর্তী হবে না এবং
৭. পরিমাপ ও ওজন ন্যায়সংগতভাবে পূর্ণরূপে দেবে। আমরা কারও উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপাইও না।
৮. যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য কথা বলবে তা আপনজনদের সম্পর্কে হলেও।
৯. এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অংগীকার পূর্ণ করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিনে যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।
১০. অনন্তর তাঁর নির্দেশ এই যে, এটাই আমার সরল পথ, সুতরাং এর অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না। করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা সাবধান হও” (সূরা আন আম: ১৫১-১৫৩)।
এই সমস্ত আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার আদালতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এই আদালতের এখতিয়ারের পরিমন্ডল ও শুনানীর ব্যাপকতা সম্পর্কে সূরা যিলযাল এ পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে:
“কেউ অণু পরিমাণ সৎ কাজ করলে তা সে দেখতে পাবে। কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে সে তাও দেখতে পাবে”- ( যিল যাল : ৭-৮)।
উপরোক্ত আয়াত সমূহে শিরক, পিতা মাতার সাথে ব্যবহার, সন্তান হত্যা, নির্লজ্জতা, জীবনের নিরাপত্তা, ইয়াতীমের সম্পদ, ওজন-পরিমাপে বিশ্বস্ততা, সত্যকথন, আল্লাহর সাথে ইবাদাতের অংগীকার এবং তাঁর নির্ধারিত সরল পথে চলা সম্পর্কিত সার্বিক উপদেশ বক্তব্যের একই ধারায় এবং সমান জোরের সাথে অব্যাহত রয়েছে।
এখানে সর্ব প্রথম আল্লাহর অধিকারের কথা বলা হয়েছে এবং তা হল- তাঁর সাথে কোন কিছু শরীক কর না। শিরক এমন এক জঘন্য অপরাধ যা চূড়ান্তভাবেই ক্ষমার অযোগ্য। এ সম্পর্কে স্বয়ং কুরআনের ফয়সালা এই যে-
“আল্লাহ তাঁর সাথে শরীর করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে এক ভয়ংকর পাপ করে”- সূরা নিসা: ৪৮)।
সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এই অধিকার বাস্তবায়নে দুনিয়ার বিচারালয় ও রাষ্ট্র শুধুমাত্র বাহ্যিক কার্যকলাপের সীমা পর্যন্তই নিজের শক্তি ব্যবহার করতে পারে। অতএব হযরত উমার রা: যখন জানতে পারলেন মহানবী সা: যে গাছটির ছায়ায় বসে বাইআতে রিদওয়ানের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন, লোকেরা তার নিচে এসে নামায পড়ছে, তখন তিনি বিষয়টির মধ্যে শিরকের গন্ধ অনুভব করলেন এবং গাছটি শিকড় সহ উপড়ে ফেলে দিয়ে বলেন:
“হে লোকেরা! আমি তোমাদের দেখছি যে, তোমরা উযযার পূজায় লেগে গেছ। শোন! আজ থেকে আমি যেন শুনতে না পাই যে, কোনও ব্যক্তি এখানে এসে নামাযে মশগুল হচ্ছে। কারও সম্পর্কে এরূপ জানতে পারলে আমি তাকে হত্যা করাব, যেমন ধর্মত্যাগীদের হত্যা করা হয়”- ( উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ: ৪০৭।
কিন্তু যেখানে যে অবস্থা নাই এবং লাত, উযযা ও মানাত অন্তরের মধ্যে লুকিয়ে বসে আছে সেখানে শিরকের দরজা কে বন্ধ করবে? যদি তা বন্ধ করা কোন সরকারের জন্য সম্ভব না হয় তবে কি আল্লাহ তাআলার এই অধিকার কেবলমাত্র একটি “নৈতিক অধিকার” সাব্যস্ত হয়ে কোন “আইনগত অধিকারের” তুলনায় দ্বিতীয় পর্যায়ের অধিকার গণ্য হবে? কখনও নয়। এটা তো মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে অনুষ্ঠিত অংগীকারের আলোকে সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রথম অধিকার যা প্রত্যেক মানুষের উপর আরোপিত। আর অবশিষ্ট সমস্ত আইনগত ও নৈতিক অধিকার সমূহ ঐ একটি মাত্র অধিকার স্বীকার করে নেওয়া বা না নেওয়ার উপর নির্ভরশীল। এটাতো সেই অধিকার যা আদায় না করার অপরাধে আল্লাহ তাআলা শাস্তি দেওয়ার জন্য আখেরাতেরও অপেক্ষা করেননি, বরং এই দুনিয়ায় অনেক জাতিকে এমন কঠোর শাস্তি দিয়েছেন যা অন্যদের জন্য উপদেশ গ্রহণের বিষয় হয়ে আছে।
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ ۚ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ [٣٠:٤٢]
অর্থ: “বল, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণতি কি হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক”- (সূরা রূম : ৪২)।
অর্থাৎ যখন জাতিসমূহ সামগ্রিকভাবে শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং আম্বিয়ায় কেরামের কথায় কর্ণপাত করেনি, যাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে শিরক থেকে বিরত রাখার জন্য এবং তাদের মধ্যে ‍আল্লাহর বিধান কার্যকর করার জন্য আদিষ্ট ছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা বিষয়টি সরাসরি নিজের ‍হাতে নিয়ে নেন এবং আযাব নাযিল করে পৃথিবীর বুক থেকে তাদের অস্তিত্ব বিলীন করে দেন।
এই অধিকারের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন যেহেতু মানুষ ও তাদের প্রতিষ্ঠিত বড় থেকে বৃহত্তর প্রশাসনিক অথবা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারের বাইরে, তাই তা নিজের বাহ্যিক প্রদর্শনীর সীমা পর্যন্ত তো আইনগত অধিকারই সাব্যস্ত হবে। কিন্তু আকীদা-বিশ্বাস ও ঈমানের বাতেনী প্রকৃতির দিক থেকে মানব সমাজে একটি নৈতিক অধিকারই সাব্যস্ত হবে। অবশ্য আল্লাহর দরবারে এটা সর্বপ্রধান আইনগত অধিকারই সাব্যস্ত হবে যে সম্পর্কে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। কোন মুসলমানের এটাকে শুধুমাত্র “নৈতিক অধিকার” মনে করার কোন সুযোগ নাই।
এতো গেল শিরকের ব্যাপার। আল্লাহর রসুল সা: আমাদের বলেন যে, ইসলামে প্রতিটি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর এবং বড় থেকে বৃহত্তর অধিকারের এই একই মর্যাদা। মহানবী সা: বলেন:
“হে আয়িশা! নিজেকে বিশেষত সেই সব গুনাহ থেকে রক্ষার চেষ্ঠা কর যেগুলোকে তুচ্ছ ও সাধারণ মনে করা হয়। কারণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এগুলোর জন্যও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে”(ইবনে মাজা, দারিমী, বায়হাকীর শুআবুল ঈমান, রাবী হযরত আয়েশা)।
মানুষ যেসব জিনিসকে তুচ্ছ মনে করে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না তার একটি উদাহরণ স্বয়ং কুরআন মজীদে দেখুন:
“তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ যে আখেরাতের শাস্তি ও পুরষ্কার মিথ্যা মনে করে? সে তো ঐ ব্যক্তি যে এতীমকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্থদের খাদ্যদানে উৎসাহিত করে না। অতএব দূর্ভোগ সেই নামাযীদের জন্য যারা নিজেদের নামাযে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে এবং গৃহস্থালীর নিত্য প্রয়োজনীয় ছোটখাট জিনিস প্রদানে বিরত থাকে”- (সূরা মাউন)।
এতীমদের সাথে দূর্ব্যবহার, মিসকীনদের আহার না দেওয়া এসবই নৈতিক প্রকৃতির অপরাধ। কিন্তু দেখুন, এই অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিদের আখেরাতের ধ্বংসাত্মক শাস্তির ভয় দেখানো হচ্ছে যে, এসব বিষয়কে তুচ্ছ মনে কর না। এর উপর তোমাদের ধ্বংস, মুক্তি ও আরাম আয়েশ নির্ভরশীল। আরও একটি উদাহরণ দেখুন:
“আর তোমরা সকলে আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কাউকে শরীক কর না, পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর। নিকটাত্মীয়, এতীম ও অভাবগ্রস্থদের প্রতি সদয় ব্যবহার কর এবং প্রতিবেশী আত্মীয়দের প্রতি, অনাত্মীয় প্রতিবেশীর প্রতি, একত্রে চলার সাথীর প্রতি, পরিভ্রাজকের প্রতি এবং তোমাদের অধীনস্থ দাস দাসীদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন কর। নিশ্চিত জানিও আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে কখনও পছন্দ করেন না যে নিজ ধারণায় অহংকারী ও গর্বিত। সেই সব লোককেও তিনি পছন্দ করেন না যারা নিজেরা কার্পণ্য করে এবং অন্যদেরও কার্পণ্যের পরামর্শ দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দান করেছেন তা লুকিয়ে রাখে। এরূপ অকৃতজ্ঞ লোকদের জন্য আমরা অপমানকর শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি। আর সেইসব লোককেও আল্লাহ পছন্দ করেন না যারা নিজেদের ধন সম্পদ শুধু প্রদর্শনীর জন্য ব্যয় করে, আর আসলে তারা না আল্লাহর উপর ঈমান রাখে আর না আখেরাতের উপর। শয়তান যার সংগী হয়েছে তার ভাগ্যে খুব খারাপ সংগীই জুটেছে। তাদের উপর কি বিপদ ঘটত যদি তারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান আনত এবং আল্লাহ যা কিছু দান করেছেন তা থেকে খরচ করত? আল্লাহ তাদের ভালোভাবে ‍জানেন। আল্লাহ কারও প্রতি বিন্দু পরিমাণ যুলুম করেন না। কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে আল্লাহ তা দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে মহা পুরষ্কার দান করেন। আমরা যখন প্রত্যেক উম্মাত থেকে একজন করে সাক্ষী হাযির করব এবং তোমাকে (হে মোহাম্মাদ) তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব তখন কি অবস্থা হবে? যারা কুফরী করেছে এবং রসুলের কথা মানেনি তারা সেদিন কামনা করবে, যদি তারা মাটির সাথে মিশে যেত! আর তারা আল্লাহর নিকট কোন কথাই গোপন করতে পারবে না” সূরা নিসা: ৩৬-৪২।
উপরোক্ত আয়াতগুলো “নৈতিক অধিকারের” সাথে সংশ্লিষ্ট, “কিন্তু আল্লাহ কারও উপর যুলম করেন না” থেকে শেষ আয়াত পর্যন্তকার বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করে দেখুন যে, এগুলো এমন সব অধিকার যে সম্পর্কে যথারীতি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যার জন্য পুরষ্কার অথবা শাস্তি দেওয়া হবে। এ সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে এবং যখন কোন কথা গোপন থাকবে না তখন সিদ্ধান্ত প্রদান করা হবে।
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে সরাসরি বান্দাদের সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাতে যেসব অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে কোনটিকে আইনগত এবং কোনটিকে নৈতিক অধিকার ‍সাব্যস্ত করার কোন অবকাশ নেই। সর্বময় ক্ষমতার মালিক আল্লাহ তাআলার ব্যক্ত অভিপ্রায় (Expressed will) হওয়ার কারণে এসব অধিকার আইনগত পর্যায়ের। আমরা কিসের ভিত্তিতে বলতে পারি যে, মহান আল্লাহ প্রদত্ত অমুক অধিকার তো আইনগত, কিন্তু অমুক অধিকার নৈতিক?
এই শ্রেণী বিভাগের জন্য বৈধতার কি কারণ আমাদের কাছে আছে? সর্বাধিক আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, এসব অধিকার রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের উর্ধ্বে, কিন্তু তা কি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর হস্তক্ষেপেরও উর্ধ্বে? যদি না হয় তবে আমরা তদনুযায়ী কাজ করা বা না করার ব্যাপারে কিভাবে স্বাধীন হতে পারি? স্বাধীনতা যখন অবশিষ্ট থাকল না এবং বিষয়টি বিবেক ও প্রজ্ঞা থেকেও অগ্রসর হয়ে তার অপরিহার্য অনুসরণ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে তখন তা কিভাবে নৈতিক অধিকার সাব্যস্ত হতে পারে? এতো সম্পূর্ণই আইনগত অধিকার। শুধুমাত্র এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা অচল হওয়ায় সেগুলো মহান আল্লাহর নির্দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য সূচীত হয় না। আমরা এই দুনিয়ায় যদি মানবীয় বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসন ব্যবস্থার হাত থেকে রেহাই পেয়েও যাই তবুও মহান আল্লাহর আদালতে এ সম্পর্কে জবাবদিহি থেকে কিভাবে বাঁচতে পারি?
মানব জাতির মধ্যে যেসব মহান ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা নবুয়তের পদে সমাসীন করেন তাঁরা যেহেতু সীমিত জ্ঞান ও এখতিয়ারের অধিকারী মানুষের প্রভুত্বের অধীন নন,বরং সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন, তাই তাদের সাথে এই জগতেই নৈতিক অধিকারের বেলায়ও আইনগত অধিকার কার্যকর করার পন্থাসমূহ অবলম্বন করা যায়। মহানবী সা:, যিনি নিজ প্রভুর দৃষ্টিতে নৈতিকতার উচ্চতম পর্যায়ে আসীন ছিলেন ( ওয়া ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন ‍আজীম) যখন তিনি এক বৈঠকে মক্কার নেতৃস্থানীয় লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন তখন এক অন্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা:-র আগমন এবং তাঁর সম্বোধনে অনিহা প্রকাশ করলেও সাথে সাথে তাঁকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে মহান আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন: “সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ তার নিকট অন্ধ লোকটি এসেছে। তুমি কেমন করে জানবে- সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত, অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে উপদেশ তার উপকারে আসত। পক্ষান্তরে যে ভ্রুক্ষেপ করেনা তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছ। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটে এল, আর সে সশংকচিত্ত, তুমি তাকে অবজ্ঞা করলে”- সূরা আবাসা: ১-১০।
স্বীয় রসুলের সাথে মহান আল্লাহর যেহেতু ওহীর মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ ছিল, তাই একটি নৈতিক অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য এই জগতেই জিজ্ঞাসাবাদের পন্থা অবলম্বন করা হয়। কিন্তু সাধারণ লোকদের ব্যাপার তা থেকে স্বতন্ত্র। তারা এখানে যেহেতু প্রতিনিধিত্বমূলক সার্বভৌমত্বের অধীন যাকে সীমিত জ্ঞান ও সামান্য তথ্যাভিজ্ঞ হওয়ার কারণে শুধুমাত্র আইনগত অধিকার সমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সকল মানুষ যখন কোন মধ্যবর্তী সম্পর্ক ছাড়াই সরাসরি নিজেদের প্রভুর সমীপে উপস্থিত হবে, তখন সেখানে নৈতিক ও আইনগত অধিকারের মধ্যেকার পার্থক্য খতম হয়ে যাবে এবং প্রতিটি অধিকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইসলামে নৈতিকতার গুরুত্ব কতখানি এবং যেসব অধিকারকে আমরা “নৈতিক” বলি সেগুলোর নৈতিক অধিকারের সাধারণ পরিভাষা থেকে কতটা ভিন্নতর অর্থ রয়েছে এবং সর্বশেষ আদালতে পৌঁছে কিভাবে আইনগত অধিকার ও নৈতিক অধিকার পরষ্পর একাকার হয়ে একই বৈশিষ্ট্য লাভ করে।
আখেরাতে অধিকার সমূহের এই বৈশিষ্ট্য ধারণের কথা মনের মধ্যে গেঁথে রাখলে মানুষের মধ্যে উন্নততর নৈতিক আচরণের স্ফুরণ ঘটতে পারে এবং সে বাইরের কোন শক্তির চাপের কারণে নয়, বরং নিজ বিবেকের আভ্যন্তরীণ চাপ ও দায়িত্বানুভূতির অধীনে আল্লাহ তাআলার প্রতিটি হুকুমের আনুগত্য করবে বিনা বাক্যব্যয়ে এবং মানসিক প্রস্তুতি ও খোদার ভয় সহকারে এবং সে এসব বিধানকে নৈতিক ও আইনগত পরিপমন্ডলে বিভিক্ত করে না। এই শ্রেণী বিভাগ তো মূলত রাষ্ট্রের এখতিয়ার সমূহের সীমা নির্দেশের উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে, ব্যক্তিকে কোন্ কোন্ বিষয়ে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ আনুগত্য থেকে কিছুটা রেহাই পাবে তা নির্ধারণের উদ্দেশ্য নয়। কুরআনের বিধান সমূহে আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, আচার-ব্যবহার এবং নৈতিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট উপদেশ সমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বক্তব্যের একই ধারায় এমনভাবে সুসংবদ্ধ পাওয়া যায় যে, তাতে আচার আচরণের বাহ্যিক ও গোপন দিকগুলোর কোন পার্থক্য করার অবকাশ লক্ষ্য করা যায় না। কুরআন মজীদ মানুষকে “বাহ্যিক মানুষ” ও “অদৃশ্য মানুষ” এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করে নয়, বরং তাকে এমন এক পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে সম্বোধন করে যার দৈহিক, মানসিক,অনুভূতিগত ও আধ্যাত্মিক জীবন একটি সুসংবদ্ধ অবিভাজ্য একক। এজন্য বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর”(সূরা বাকারা: ২০৮)।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মাওলানা সাইয়্যেদ মওদুদী লিখেছেন: অর্থাৎ কোন রকম ব্যতিক্রম ও সংরক্ষণ ছাড়াই নিজেদের পরিপূর্ণ জীবনকে ইসলামের অধীন করে দাও। তোমাদের চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, মতবাদ, জ্ঞান বিজ্ঞান, রীতিনীতি, কাজকর্ম, আচার-ব্যবহার এবং তোমাদের সমগ্র প্রচেষ্টা ও কর্মের পরিসরকে পুরোপুরি ইসলামের অধীনে আন। তোমরা জীবনের কিছু অংশে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলবে আর কিছু অংশ ইসলামী অনুশাসনের বাইরে রাখবে- তা যেন না হয়”- (তাফহীমুল কুরআন, বাংলা অনু: ১ম খন্ড, পৃ: ১৮০, টীকা: ২২৬)।
গোটা মানবজাতির পরিপূর্ণ আনুগত্য আল্লাহর কাম্য। এই আনুগত্য যতটা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের কল্যাণের এবং মানব সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিন্নতার প্রতিরোধের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছিল তার ব্যবস্থা আইন-কানুন ও রাষ্ট্রের কার্যকর শক্তির মাধ্যমে করা হয়েছে। কিন্তু আখেরাতে মানুষের মুক্তি এবং চিরস্থায়ী শান্তির ফয়সালা যে আইনের ভিত্তিতে হবে তা “নৈতিক বিধান”-ই। কারণ আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী ও আমলের ফযীলাত সবই উপরোক্ত আইনের অধীনে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ইসলামে “আইনগত অধিকারের” উপর “নৈতিক বিধান ও অধিকারের” প্রাধান্য স্বীকৃত। কেননা আল্লাহ পাকের বিচারালয়ের আইন ব্যবস্থায় মূলত নৈতিক দিকের সামান্য ও অগ্রাধিকার থাকবে। তথ্যায় নৈতিক বিধানের মাধ্যমেই আমাদের ঈমান-আক্বীদা ও আমাদের ইবাদত বন্দেগীর ধরণ এবং আমাদের বাহ্যিক কার্যক্রমের অন্তর্নিহিত অবস্থা নির্ধারিত হবে। কোন ব্যক্তির মোনাফিক হওয়া সত্ত্বেও নিজের বাহ্যিকে আচরণের ভিত্তিতে মুসলমান গণ্য হওয়ার এবং মুসলমানদের নিকট থেকে ইসলাম প্রদত্ত অধিকার সমূহ আদায় করে নেওয়ার পুরোপুরি সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর আদালতে তাঁর ফয়সালা বাহ্যিক দিকের ভিত্তিতে নয়, বরং অন্তর্নিহিত দিকের ভিত্তিতে হবে এবং কুরআন পাকের নিম্নোক্ত সুষ্পষ্ট সিদ্ধান্ত মোতাবেক হবে:
إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুনাফিকদের ও কাফেরদের জাহান্নামের মধ্যে একত্রে সমাবেশ করবেন” (সূরা নিসা: ১৪০)।
আর জাহান্নামেও তাদের বাসস্থান হবে একেবারে সর্বনিম্ন ও নিকৃষ্ট স্তরে।
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا [٤:١٤٥]
অর্থ: “নিশ্চিত জান যে, মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে স্থান পাবে এবং তুমি তাদের কোন সাহায্যকারী পাবে না”- (সূরা নিসা: ১৪৫)।
এটা সেই সব লোকের পরিণতি যারা পৃথিবীতে নামায পড়ত, রোযাও রাখত, হজ্জও করত, জিহাদেও অংশগ্রহণ করত এবং আল্লাহর যিকিরে মশগুলও দৃস্টিগোচর হত। কিন্তু তাদের অন্তরের অবস্থা কি ছিল?
“এই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করছে, অথচ আল্লাহই তাদের ধোঁকায় নিক্ষেপ করে রেখেছেন। তারা নামায পড়তে উঠলে তাও আলস্য সহকারে, শুধু লোকদের দেখানোর উদ্দেশ্যে উঠত এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করত। কুফর ও ঈমানের মাঝখানে দোদুল্যমান তাদের অবস্থা, না পূর্ণরূপে এদিকে আর না পূর্ণরূপে ওদিকে” (সূরা নিসা: ১৪৩)।
এই মুনাফিকরা তাদের আভ্যন্তরীণ অবস্থার ভিত্তিতে, যা সম্পূর্ণত নৈতিক প্রকৃতির, আল্লাহ পাকের আদালতের কঠোরতম শাস্তি ভোগ করবে এবং তাদের বাহ্যিক কার্যকলাপ, যার দরুণ তারা এই জগতে মুসলমানদের প্রদত্ত সমস্ত অধিকার ভোগ করছে, সেখানে তাদের কোন কাজে আসবে না। অথছ এই পার্থিব জগতে তাদের বাহ্যিক কার্যকলাপের কারণেই আল্লাহর রসুল পর্যন্ত তাদের কাফের ঘোষণার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি মোনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে পর্যন্ত তিনি তার বাহ্যিক কার্যকলাপের ভিত্তিতে মুসলমানদের কাতারে শামিল হতে বাধা দিতেন না।
সমগ্র কুরআন মজীদ এবং বিশেষত কিয়ামত ও আখেরাত সম্পর্কিত আয়াত সমূহে আল্লাহ তাআলা মানুষের বাহ্যিক ও লোকচক্ষুর অন্তরালের জীবনকে নিজের সিদ্ধান্তের আসল ভিত্তি সাব্যস্ত করেছেন। এ থেকে সুষ্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমরা এখানে যাকে “নৈতিকতা” বলি তার উপরই আমাদের মুক্তিলাভ নির্ভরশীল। ওখানে শুধু কার্যকলাপ নয়, বরং “সৎকার্য” আমাদের আসল পুঁজি হবে। আর এই “সত” শর্তটি যা এখানে সম্পূর্ণরূপে একটি নৈতিক ব্যাপার, তা ওখানে একান্তভাবেই আইনগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে আইনের উপর নৈতিকতার প্রাধান্য মহানবী সা: এর সেই হাদীস থেকেও অনুমান করা যায় যাতে তিনি তাঁর পৃথিবীতে আগমনের উদ্দেশ্য এবং নিজের সমস্ত দাওয়াত ও তাবলীগের মূল লক্ষ্যই বলেছেন: চরিত্র ও নৈতিকতার পূর্ণতা সাধন। রসুলে খোদা সা: বলেন:
(আরবী***)
অর্থ: “উত্তম চরিত্র-নৈতিকতার পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি” (মুসনাদে আহমাদ) বায়হাকী, ইবনে সাদ)।
আর তা হচ্ছে সেই নৈতিকতা যার পেছনে আখেরাতে জবাবদিহির দায়িত্বানুভূতির মজবুত ক্রিয়াশীল শক্তি বিদ্যমান রয়েছে।
মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী মরহুম ইসলামে আইন ও নৈতিকতার মধ্যেকার এই সম্পর্কের ব্যাখ্যায় বলেন: “ইসলামের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রশস্ত দৃষ্টিতে দেখলে তার নৈতিক হেদায়াতও মূলত আইনগত বিধান। কারণ এজন্য আখেরাতে প্রতিদান ও শাস্তির ব্যবস্থা হবে, একজন মুসলমানের জীবনে যার মৌলিক গুরুত্ব রয়েছে। এই আখেরাত বিশ্বাসই সেই জিনিস যা কেবল নৈতিকতাকে আইনের মর্যাদাই দেয়নি, বরং পরিভাষায় যাকে আইন বলা হয় তারও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। কুরআন মজীদের বাচনভঙ্গি সম্পর্কে আপনি চিন্তা করলে দেখতে পাবেন যে, তার প্রতিটি আইনগত ও নৈতিক নির্দেশের সাথে আল্লাহর ভয় ও আখেরাত চিন্তার বিষয় যুক্ত রয়েছে” (মুফতী শফী, ইসলাম কা নিযামে তাকসীমে দাওলাত, পৃ: ৪২)।

সমস্ত অধিকার আল্লাহর

আইনগত ও নৈতিক অধিকারের পারষ্পরিক সংযোগ ও সম্পর্ক অনুধাবন করার পর এখন আমরা একটি ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক অধিকার সমূহের মূল্যায়ন করব। আমাদের ফকীহগণ অধিকার সমূহকে আরও একভাবে শ্রেণী বিভাগ করেছেন: আল্লাহর অধিকার সমূহ ( হুকুকুল্লাহ) এবং বান্দার অধিকার সমূহ ( হুকুকুল ইবাদ)। এই শ্রেণী বিভাগ অনুযায়ী আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী, যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি “আল্লাহর অধিকার” এবং মানুষের উপর মানুষের যেসব অধিকার রয়েছে তা ‘বান্দার অধিকার’। যেমন জানমালের হেফাজত, ওয়ারিসগণের স্বত্ব, স্ত্রীর মোহর ও ভরণপোষণ ইত্যাদি। কতগুলো অধিকার যৌথ। যেমন, যাকাত আর্থিক ইবাদত হিসাবে তা আল্লাহরও অধিকার এবং যেসব লোককে যাকাতের প্রাপক ঘোষণা করা হয়েছে সেই দিক থেকে বান্দারও অধিকার। অনুরূপভাবে কোরবানী- তা আল্লাহর নামে প্রদত্ত প্রাণীজ নজরানা হিসাবে আল্লাহর অধিকার এবং গোশত ও চামড়ার প্রাপকদের দিকে বান্দারও অধিকার। কিন্তু যেভাবে আল্লাহ তাআলার আদালতে একজন মুসলমানের জীবনের আইনগত ও নৈতিক পার্থক্য লুপ্ত হয়ে সমস্ত অধিকার আইনগত অধিকারে পরিণত হয়, ঠিক সেভাবে আল্লাহর অধিকার ও বান্দার অধিকারের পার্থক্যও সর্ব মূল্যায়নে পৌঁছে খতম হয়ে যায় এবং সমস্ত অধিকার আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হয়। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অধিকার উচ্চতর মর্যাদা লাভ করে, দুনিয়ার কোনও আইন ব্যবস্থায় বা নৈতিক ব্যবস্থায় তার এই মর্যাদা নাই।
আল্লাহর অধিকার ও বান্দার অধিকারের এই শ্রেণী বিভাগ আসলে কেবল মাত্র এসব অধিকার আদায়ের দিক নির্দেশনার জন্য করা হয়েছে। অর্থাত যেসব অধিকার আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য তা তো “আল্লাহর অধিকারের” তালিকায় আসে, আর যেসব অধিকার বান্দার প্রাপ্য তা “বান্দার অধিকারের” তালিকাভূক্ত হয়। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সম্পর্কে চিন্তা করুন যে, অবশেষে বান্দার অধিকারের আইনগত ও নৈতিক মর্যাদা কি এবং এর বৈধতাই বা কি আছে? মানুষ কি তার কোন ব্যক্তিগত যোগ্যতার কারণে এসব অধিকারের প্রাপক হয়েছে অথবা কোন দাবী, চেষ্ঠা সাধনা অথবা মঞ্জুর হওয়া দাবীনামার কারণে এসব অধিকার লাভ করেছে? তাদের অধিকার সমূহ কি কোন সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে, রাষ্ট্র ও জনগণের ঐক্যমতে সম্পাদিত কোন চুক্তির ভিত্তিতে, মানব রচিত কোন সংবিধানের সাহায্যে অথবা মানব জাতির পরষ্পরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত কোন সমঝোতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট হয়েছে? যদি তা না হয় তবে তার অধিকার সমূহের ভিত্তি কি? এ কথা সুষ্পষ্ট যে, এর ভিত্তি কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। তিনিই প্রত্যেক হকদারের হক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং এই হকদারদের মধ্যে অগ্রাধিকারের বিষয়টিও তিনিই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যাকাত সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
“এই সাদাকাত সমূহ ( যাকাত) মূলত ফকীর-মিসকীনদের জন্য, আর ‍তাদের সাদাকা (যাকাত) সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত, তাদের জন্য যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য, সেই সঙ্গে তা গলদেশের মুক্তিদানে এবং ঋণে ভারাক্রান্তদের সাহায্যের জন্য, আল্লাহর পথে এবং পথিক-মুসাফিরদের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য। তা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরয, আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং তিনি সুবিজ্ঞ ও সুবিবেচক” ( সূরা তওবা: ৬০)।
এখানে যাকাত প্রাপকদের নির্দিষ্ট করার সাথে সাথে তাদের মধ্যে অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করা হয়েছে এবং শেষে বলা হয়েছে যে, এসব অধিকার আল্লাহর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেউ যদি এই ফরয পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করে তবে তার জানা উচিত যে, তার কোন গতিবিধিই আল্লাহ পাকের দৃষ্টির অগোচরে নয়। অনুরূপভাবে মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে ওয়ারিসগণের অংশ নির্ধারণ করে দেওয়ার পর ইরশাদ হচ্ছে:
فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا
“এই অংশ আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ নিশ্চিতরূপেই সমস্ত তত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল এবং সমস্ত কল্যাণ ও মঙ্গলময় ব্যবস্থা জানেন” (সূরা নিসা: ১১)।
উপরোক্ত আয়াতের পরে অন্যান্য ওয়ারিসের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রসঙ্গটি নিম্নোক্ত আয়াতে শেষ করা হয়েছে:
وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ
“বস্তুত এটা আল্লাহ তাআলারই নির্দেশ এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও পরম ধৈর্য্যশীল” (সূরা নিসা: ১২)
কোন সব মহিলার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক জায়েয এবং কোন সব মহিলার সাথে জায়েয নয়- সেই সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান দেওয়ার পর বলা হয়েছে:
(আরবীঁ***)
“এটা আল্লাহর বিধান যা মেনে চলা তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে” (সূরা নিসা: ২৪)।
তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর অধিকার সমূহ নির্ধারণের পর মহান আল্লাহ বলেন:
وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
“ বস্তুত এটা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা, তা লংঘন কর না। যারা আল্লাহ নির্ধারিত সীমা লংঘন করে তারাই যালেম” (সূরা বাকারা: ২২৯)।
আমানত ও ন্যায় বিচার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“মুসলমানগণ! আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন-যাবতীয় আমানত তার প্রকৃত মালিকের নিকট সোপর্দ করতে। আর তোমরা যখন লোকদের মধ্যে (কোন বিষয়ে) ফয়সালা করবে তখন ইনসাফের সাথে করবে” ( সূরা নিসা: ৫৮)।
ধনী লোকদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার ঘোষণা করে বলা হয়েছে:
(আরবীঁ***)
“তাদের সম্পদে গরীব ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে: (সূরা যারিয়াত: ১৯)।
মোটকথা আল্লাহর হক ও বান্দার হকের মধ্যে থেকে কোনও একটি হক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীস সমূহ অধ্যয়ন করলে পরিষ্কার অনুভব করা যায় যে, প্রতিটি হক (অধিকার) কেবল আল্লাহ তাআলার নির্দেশের ভিত্তিতে হক হিসাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং তাঁর পক্ষ থেকেই এই হক পৌঁছে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা অধিকার সমূহ কেবল নির্ধারণই করেননি, বরং প্রত্যেক হকদারের স্থানে স্বয়ং নিজের সত্তাকে রেখেছেন, যাতে যে কোন ব্যক্তির উপর সংশ্লিষ্ট ফরয আরোপিত হলে সে যেন অনুভব করে যে, সে এই অধিকার কোন ব্যক্তিকে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআলাকে দিচ্ছে। ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবীঁ***)
“তোমরা তাঁর উৎপাদন খাও যখন তা ফল ধারণ করবে এবং তাঁর হক প্রদান কর যখন এসবের ফল আহরণ করবে” ( সূরা আনআম: ১৪১)।
এখানে লক্ষ্য করুন, উৎপাদিত ফসলে নিজের বান্দাদের অংশ পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা এই অংশকে নিজের সত্তার সাথে সংযুক্ত করে এই কথা বুঝিয়ে দেন যে, তোমরা যা কিছু আমার বান্দাদের দেবে তা হবে মূলত আমার অধিকার। তা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিদান প্রদানেও তিনি নিজের জিম্মায় নিয়ে ঘোষণা করেছেন:
فَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [٣٠:٣٨]
“অতএব ( হে ঈমানদার লোকেরা) আত্মীয়কে তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছিয়ে ‍দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরদেরও দাও (তাদের অধিকার)। এটা উত্তম পন্থা সেই লোকদের জন্য যারা আল্লাহর সন্তোষ চায়। আর তারাই কল্যাণ লাভে সক্ষম হবে” (সূরা রূম: ৩৮)।
অর্থাৎ আপনি আল্লাহর হক আদায় করুন বা বান্দার হক তার অভিপ্রায় একই এবং তা হল আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর সন্তোষ ‍লাভ এবং আখেরাতে পুরষ্কার লাভের মাধ্যমে চিরস্থায়ী কৃতকার্যতা ও শান্তি লাভ। এক মুসলমান যদি তার অপর মুসলিম ভাইকে নিষ্ঠা ও মহব্বত সহকারে সালামও করে তবে এর দ্বারা কোন স্বার্থ লাভ তার অভিপ্রায় হতে পারে না, বরং আল্লাহ তাআলার একটি নির্দেশ পালনের মাধ্যমে স্বয়ং তাঁর সন্তোষ লাভই উদ্দেশ্য। সে যখন সম্পদের যাকাত পরিশোধ করে অথবা দান-খয়রাত করে তখনও তার দৃষ্টির সামনে এই একই উদ্দেশ্য বিরাজ করে। যাকাতের সামগ্রিক ব্যবস্থায় তার তো এটা জানাই থাকে না যে, তার দেওয়া অর্থের দ্বারা আল্লাহর কোন বান্দার উপকার হবে। সে তো কেবল আল্লাহর অধিকার মনে করে তা ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে অর্পণ করে এবং সে তা আল্লাহর অভাবী বান্দাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। হুকুকুল্লাহ ( আল্লাহর অধিকার সমূহ) ও হুকুকুল ইবাদ ( বান্দাদের অধিকার সমূহ) এর মধ্যে এটা হল সেই সম্পর্ক যার ভিত্তিতে আবু বাকর রা: যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন।
যেসব গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল তারা অন্য সব ব্যাপারে ইসলামের অনুসারী ছিল। তারা নামায পড়ত, আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করত। রসুলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালাতের উপর তাদের ঈমান ছিল, শুধুমাত্র নিজেদের সম্পদে আল্লাহর বান্দাদের হক আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। এই ব্যাপারে অসংখ্য সাহাবী এবং স্বয়ং হযরত উমার রা:-র মত প্রবীণ, দৃঢ়চিত্ত ও দীনের মেজাজ অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম সাহাবীর পর্যন্ত এই মত ছিল যে, “আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনয়নকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মোটেই উচিত হবে না, বরং তাদেরকে সাথে নিয়ে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়া উচিত”। এই বিষয়ে হযরত আবু বাকার রা: ও উমার রা: এর মধ্যে যে বাক্য বিনিময় হয়েছিল তা থেকে এই সত্য প্রতীয়মান হয় যে, হযরত আবু বাকর রা:-র মতে আল্লাহর হক ও বান্দার হকের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না, কিন্তু হযরত উমার রা: এর মধ্যে পার্থক্য করছিলেন এবং পরিশেষে নিজের মত প্রত্যাহার করেন। হযরত আবু বাকর রা: সাহাবীদের সাথে পরামর্শ শেষে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন: “আল্লাহর শপথ! যাকাত প্রত্যাখ্যানকারীরা যদি আমাকে একটি রশি দিতেও অস্বীকার করে যা তারা রসুলুল্লাহ সা: এর যুগে প্রদান করত, তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব”।
যে হযরত উমার রা: আনহুর মতে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর মনে হচ্ছিল তিনিও উপরোক্ত বক্তব্য শুনার পর অনেকটা উত্তেজিত হয়ে সামনে অগ্রসর হলে বলেন:
“আমরা এসব লোকের বিরুদ্ধে কিভাবে অস্ত্রধারণ করতে পারি যেখানে রসুলুল্লাহ সা: সুষ্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: লোকেরা যতক্ষণ কালিমা তায়্যিবা না বলবে ততক্ষণ আমাকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি মুখে উপরোক্ত বাক্য উচ্চারণ করবে তার জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব মুসলমানদের উপর বর্তাবে তবে তার উপর যে অধিকার প্রাপ্য হবে তা অবশ্যই তার নিকট থেকে আদায় করা হবে। কিন্তু তার নিয়াতের বিচার স্বয়ং আল্লাহ করবেন”।
কিন্তু হযরত আবু বাকর রা: তাঁর যুক্তিতে আশ্বস্ত হতে পারেন নি এবং তিনি বলেন, “আল্লাহর শপথ! আমি নামায ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্যকারীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব। কারণ যাকাত হচ্ছে সম্পদের প্রাপ্য এবং রসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের দায়িত্বে যেসব অধিকার বর্তাবে তা সর্বাবস্থায় তাদের নিকট থেকে আদায় করে নেওয়া হবে”।
হযরত উমার রা: বলতেন: “এই জওয়াব শুনে আমার মনে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাল যে, যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ তাআলা আবু বাকর রা: এর বক্ষ প্রশস্ত করে দিয়েছেন এবং সত্য কথা তাই যা আবু বাকর রা: বলেছেন: ( মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, আবু বাকর, উর্দু অনু: লাহোর ১৯৭৩ খৃ. পৃ. ১৩৫)।
এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর হুকুমে বান্দাদের যেসব অধিকার নির্ধারিত হয়েছে ইসলামে তার মর্যাদা কি এবং কিভাবে তা আল্লাহর অধিকারের অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের সমতুল্য। মহান আল্লাহর বাণী:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
“সেই খোদাকে ভয় কর যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরষ্পরের নিকট থেকে নিজ নিজ অধিকার দাবী কর এবং আত্মীয় সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাক। নিশ্চিত জানিও, আল্লাহ তোমাদের উপর কড়া দৃষ্টি রাখছেন” (সূরা নিসা: ১)
উপরোক্ত আয়াতের পরপরই ইয়াতীম, নারী, পুরুষ, গরীব-মিসকীন, ওয়ারিস এবং আল্লাহর অন্যান্য বান্দাদের অধিকার সমূহের দীর্ঘ আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু সুচনাতেই বলে দেওয়া হয়েছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহর দোহাই দিয়ে নিজ নিজ অধিকার লাভ করেছে, এসব অধিকারের ব্যাপারে তিনিই তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক, তাকে ভয় কর এবং প্রাপকের অধিকার সঠিকভাবে পৌঁছে দাও, অন্যথায় আখেরাতে কঠোরভাবে গ্রেফতার করা হবে।
করযে হাসানা (যে ঋণের কোন উদ্বৃত্ত বিনিময় নেই) দান করে ঠেকায় পড়া আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য করতে হবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই কর্য বান্দার পরিবর্তে নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন এবং সাথে সাথে এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তা কয়েকগুণ বর্ধিত করে ফেরত দেবেন এবং এই উসিলায় গুনাহও মাফ করে দেবেন।
(আরবী**)
“তোমরা যদি আল্লাহকে উত্তম ঋণ (করযে হাসানা) দান কর তবে তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন”- (সূরা তাগাবুন: ১৭)।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
(আরবী**)
“তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ ( করযে হাসান) দাও” ( সূরা মুযযাম্মিল: ২০)।
অনুরূপভাবে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয়ের ব্যাপারে লক্ষ্য করুন। কোন দুস্থ বান্দাকে আর্থিক সাহায্য প্রদানকে “ফী সাবীলিল্লাহ” (আল্লাহর পথে) ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা নিজেকে এর প্রাপক সাব্যস্ত করেন এবং সাহায্য দানকারীর সাথে উত্তম ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেন।
“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করে তার কথা বলে বেড়ায় না এবং কষ্ট দেয় না তাদের প্রতিদান তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দু:খিত হবে না”- (সূরা বাকারা: ২৬২)।
এই একই কথা সূরা হাদীদের ১০ ও ১৮ নং আয়াতে, সূরা বাকারার ২৭২ নং আয়াতে এবং আরও অনেক আয়াতে পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে অপর কোন ব্যক্তির সাথে মৌখিক অথবা লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় তবে এ প্রতিশ্রুতি স্বয়ং আল্লাহর সাথেই অনুষ্ঠিত বলে গণ্য হয় এবং উভয় পক্ষের চুক্তির শর্তাবলী হেফাজতের ক্ষেত্রে তাদের আচরণের আল্লাহ তাআলা পর্যবেক্ষক হয়ে যান।
(আরবী**)
“এবং তোমরা আল্লাহকে তোমাদের যামিন করে শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ কর না। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন: (সূরা নাহল: ৯১)।
অনুরূপভাবে রসুলুল্লাহ সা: এর হাতে বাইআত ( আনুগত্যের শপথ) গ্রহণকে আল্লাহ তাআলা তার নিজের হাতে বাইআত হওয়া ঘোষণা করেছেন।
(আরবী**)
“যারা তোমার হাতে বাইআত হয়েছে তারা মূলত আল্লাহর কাছে বাইআত হয়েছে। তাদের হাতের উপর ছিল আল্লাহর হাত”। ( সূরা ফাতহ: ১০)।
মুফাসসির সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: বলেন, “কোন ব্যক্তি যখনই দান খয়রাত ও যাকাত প্রদান করে, তা প্রাপকের হাতে পৌঁছার পূর্বেই আল্লাহর হাতে পৌঁছে যায় এবং তিনি তা প্রাপকের হাতে রাখেন। অত:পর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন। সূরা তওবা: ১০৪।
(আরবী***)
“তারা কি জানেনা যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং দান খয়রাত গ্রহণ করেন” ( ইবনে কাসীর, দুররুল মানছুর)।
এসব আয়াত অধ্যয়নে জানা যায় যে, আল্লাহর অধিকারই হোক বা বান্দার অধিকার, প্রতিটি অধিকার স্বীয় সত্তার সাথে সম্পৃক্ত করে আল্লাহ তাআলা তাকে এতটা উচ্চতর নৈতিক ও আইনগত মর্যাদা দান করেছেন যে, কোন মুসলমানের জন্য তাতে ফরযিয়াত ও গুরুত্বের দিক থেকে কোন পার্থক্য অবশিষ্ট থাকে না। যেখানেই কোন অধিকার পৌঁছে দেওয়া কারও জন্য বাধ্যতামূলক সেখানেই তা পৌঁছে দেওয়ার সময় তার সাথে স্বয়ং মহান আল্লাহর সত্তা উপস্থিত থাকেন। এই প্রসঙ্গে হাদীসসমূহও দেখা যেতে পারে।
আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রসুল সা: বলেন: “কিয়ামতের দিন মহামহিম আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি রুগ্ন ছিলাম, তুমি আমার সেবা শুশ্রুষা করনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি কি করে আপনার সেবা শুশ্রুষা করতে পারি? আপনি তো বিশ্বলোকের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা রোগাক্রান্ত হয়েছিল? কিন্তু তুমি তার সেবা করনি। তুমি কি জানতে না যে, তার সেবা করলে তুমি আমাকে তার কাছেই পেতে? মহান আল্লাহ বলবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম এবং তোমার নিকট খাবার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি। আদম সন্তান বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি কি করে আপনাকে আহার করাতে পারি, অথচ আপনি হচ্ছেন গোটা সৃষ্টিলোকের রিযিকদাতা। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা খাবার চেয়েছিল? কিন্তু তুমি তাকে খাবার দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তাকে আহার করালে তুমি ঐ খাবার আমার নিকট পেতে? হে আদম সন্তান! আমি তোমার নিকট পানি চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পান করাওনি। সে বলবে, হে প্রভু! আমি আপনাকে কিভাবে পান করাতে পারি, অথচ আপনি হচ্ছেন গোটা সৃষ্টিকূলের প্রতিপালক? মহান আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক পিপাসার্ত বান্দা তোমার নিকট পানি চেয়েছিল, কিন্তু তুমি ‍তাকে পান করাওনি। তুমি যদি তাকে পান করাতে তবে সে পানি তুমি আমার কাছে পেতে” ( মুসলিম)।
যাকাত দেওয়া, ধার দেওয়া ও দান-খয়রাত করা, ক্ষুধার্তদের আহার করানো, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো এবং কারও সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এসবই বান্দার অধিকার। কিন্তু লক্ষ্যনীয় যে, প্রত্যেক হকদারের সাথে নিজের সত্তাকে সম্পৃক্ত করে আল্লাহ তাআলা কিভাবে সেগুলো নিজের অধিকারের আওতাভূক্ত করেছেন। প্রসিদ্ধ ফকীহ আল্লামা শাতিবী রহ: বলেছেন:
“অধিকার দুই প্রকারের: আল্লাহর অধিকার ও বান্দাদের অধিকার। যেগুলো বান্দার অধিকার সেগুলোর মধ্যে আল্লাহর অধিকারও লক্ষ্য করা যায়। আর যেসব অধিকার আমরা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করি সেগুলোর সমস্ত কল্যাণ ও উপকারিতা বান্দাগণই লাভ করে থাকে” (শাতিবী, আল-মুত্তয়াফিকাত, কায়রো সংস্করণ, ৩ খন্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৭)।
আমরা আরও অগ্রসর হয়ে বলতে পারি যে, সমস্ত অধিকার তো আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য এবং এসবই ইবাদত বন্দেগীর আওতায় এসে যায়। অবশ্য এর সমস্ত উপকারিতা (Benefits) বান্দারাই লাভ করে থাকে। মানুষ আল্লাহর ‍অধিকার সমূহ পূরণ করে নিজেই লাভবান হয়। কারণ মানুষ আল্লাহর কোন উপকার করতে সক্ষম নয়। অন্য কথায় মহান আল্লাহর সত্তা মানুষের নিকট থেকে উপকার লাভের নয়। সে আল্লাহ পাকের যে ইবাদত করে তার মাধ্যমে সে নিজের আত্মার পরিশুদ্ধি, চরিত্র গঠন এবং মনুষ্যত্বের পূর্ণতা বিধানের আকারে নিজেই লাভবান হয় এবং সে মানুষের অধিকার পৌঁছে দিয়ে দ্বিবিধ উপায়ে উপকৃত হয়। সে অন্যের অধিকার পৌঁছিয়ে দিয়ে উন্নত চরিত্রের বাহক হওয়ার কারণে মান মর্যাদা এবং বিবেক ও অন্তরের প্রশান্তি লাভ করে, আবার আখেরাতের সাফল্য লাভ করে। অপরদিকে অধিকার আদায়কারী নিজের অধিকার লাভ করে সুখে- শান্তিতে জীবন যাপন করে, সমাজে পারষ্পরিক নিষ্ঠা ভালোবাসা, নি:স্বার্থপরতা ও সহানুভূতির সুদৃঢ় সম্পর্ক উত্তরোত্তর সবল হয় এবং এভাবে গোটা মানব সমাজ শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের আবাসে পরিণত হয়।
এখন পরিশেষে এটাও লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে অধিকার সমূহের অগ্রাধিকার নির্ধারণের সাথে সাথে নিজের পরকালীন আদালতে এসব অধিকারের কি প্রাধান্য রেখেছেন। হযরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত হাদীসে রসুলুল্লাহ সা: বলেন:
“কিয়ামতের দিন আমলনামার তিনটি বিভাগ হবে। একাশেংর হিসাব আল্লাহপাক কড়ায় গন্ডায় নেবেন, একটি শব্দও বাদ দেবেন না, দ্বিতীয় অংশের বিচারে তিনি কোন পরওয়া করবেন না এবং তৃতীয় অংশের কোন কিছুই তিনি মাফ করবেন না। যে অংশের তিল পরিমাণও তিনি ক্ষমা করবেন না তা হচ্ছে শিরক (পৌত্তলিকতা)। যে অংশের বিচার অনুষ্ঠানে তিনি কৃতসংকল্প হবেন তা হচ্ছে যুলুম, যা মানুষ নিজের উপর করেছে এবং যা স্বয়ং সেই বান্দা ও তার প্রতিপালকের মধ্যেকার বিষয় ( যেমন সে নামায পড়েনি, রোযা রাখেনি ইত্যাদি)। আল্লাহ ইচ্ছা করলে কারও এ ধরণের অপরাধ ক্ষমাও করতে পারেন। কিন্তু যে অংশের একটি ক্ষুদ্রতম অংশও বাদ দেওয়া হবে না তা হচ্ছে যুলুমের অপরাধ, যা এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির উপর করেছে। নির্যাতিত ব্যক্তি ততক্ষণ ক্ষমা না করবে আল্লাহ পাক ততক্ষণ তা ক্ষমা করবেন না” (মুহাম্মাদ ইবনে সুলায়মান আল মাগরিবী, জুমউল ফাওয়াইদ, ২ খন্ড, পৃ.২৫৭, লায়ালপুর সংষ্করণ, মুসনাদে বাযযায এর বরাতে)।
উক্ত হাদীস মুসনাদে আহমাদ ও মুসতাদরাক হাকেম- এও হযরত আয়েশা রা:-র সূত্রে বর্ণিত আছে। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফিকহ গ্রন্থ আল হিদায়ায় হজ্জ সম্পর্কিত অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে:
“হজ্জ তখনই ফরয হয় যখন কোন ব্যক্তির নিকট হজ্জের পূর্ণ সফরকালীন সময়ের জন্য পরিবার-পরিজনের ব্যয়ভার বহনের মত সম্পদ তার হাতে থাকে। কারণ:
(আরবী***)
“বান্দাদের অধিকার অগ্রগণ্য আল্লাহর অধিকারের তুলনায়, আর এই অগ্রাধিকার আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক”। ( আল-মারগীনানী, আল-হিদায়া, করাচী সংষ্করণ, কিতাবুল হজ্জ, ১ খ. পৃ. ২৩৩)।
এখন প্রশ্ন হল, আল্লাহ পাক নিজের অধিকারের উপর বান্দাদের অধিকারের কেন প্রাধান্য দিলেন। তার কারণ এই যে, বান্দাহ আল্লাহর অধিকার আদায় না করলে তাতে তাঁর কোন ক্ষতি নেই, ক্ষতি বান্দারই। কিন্তু সে যখন অপর বান্দার কোন অধিকার আদায় না করে তখন সে তার একটি স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এতে বাস্তবিকই তার ক্ষতি হয় এবং এটাই হচ্ছে সেই যুলুম যা আল্লাহর নিকট ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, যতক্ষণ ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষ ‍তাকে ক্ষমা করে দিতে সম্মত না হবে আল্লাহ তার অপরাধের শাস্তি মওকুফ করবেন না।
এ হচ্ছে ইসলামে অধিকারের ইতিহাস এবং এর আইনগত ও নৈতিক মর্যাদা। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে অধিকারের এই ধারণা মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে অন্তর্নিহিত হয়ে গেছে এবং তারা আল্লাহ নির্ধারিত অধিকারকে আইনগত ও নৈতিক এবং আল্লাহর অধিকার ও বান্দার অধিকার ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত করে কতগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ এবং কতগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সাব্যস্ত করে নিয়েছে যার দৃষ্টান্ত প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে পাওয়া যায় না। আনুগত্যের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের চরিত্রে আচরণের এক অতুলনীয় ঐক্য লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি সম্পর্কে যতটা চিন্তা করতেন ঠিক তদ্রুপ চিন্তাই করতেন ওজন পরিমাপে বিশ্বস্ততা, কথা ও ওয়াদা রক্ষা করা, সাহায্যের মুখাপেক্ষী ভাইদের সহযোগিতা এবং জীবনের অন্যান্য ব্যাপারে। তাদের ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন খানায় বিভক্ত ছিল না, বরং ছিল পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের উজ্জল নমুনা। ইমাম শাতিবী আনুগত্যের এই প্রাণশক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন:
“মুসতাহাব, সুন্নাত, ফরয, এবং মাকরূহ ও ‍হারামের যে শ্রেণী বিভাগ রয়েছে, আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও অন্তরাত্মার পরিশুদ্ধির দিক থেকে এই শ্রেণীবিভাগের কোন গুরুত্ব নাই। কারণ আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মিক পরিশুদ্ধি, এই ব্যাপারে যা সহায়ক সেটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ, তা ফরযই হোক অথবা মুসতাহাব। আর যে জিনিস ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায় তা নিষিদ্ধ, চাই তা হারামই হোক অথবা মাকরূহ”। ( আল-মাওয়াফিকাত, পৃ.২৪১।
আল্লাহর একত্বে ঈমানের প্রাণশক্তি এই যে, “প্রতিটি কাজ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় এবং একান্তই আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে করতে হবে”। অধিকার সমূহের ক্ষেত্রেও এই একই নীতি ক্রিয়াশীল রয়েছে, তদনুযায়ী প্রতিটি “অধিকার” নির্ধারণ, কার্যকরণ ও ফলাফলের প্রতিটি স্তরে আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পৃক্ত।

ইসলামে মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টিসমূহ

মৌলিক অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ এবং তা অর্জনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য ইসলাম যেসব গ্যারান্টি দিয়ে সে সম্পর্কে পূর্বের পৃষ্ঠাগুলোতে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু এই পৃথক শিরোনামের অধীনে কেবল তার সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্তিই যথেষ্ট নয়, বরং এই প্রসঙ্গে অন্য সব কার্যকারণও একত্র করে দেখা সমীচীন যে, ইসলামী রাষ্ট্রে মানুষের মৌলিক অধিকার সমূহ ক্ষমতাসীনদের হস্তক্ষেপ এবং তাদের অব্যাহত অনুপ্রবেশ থেকে কিভাবে নিরাপদ থাকে।
আজ বিশ্ব মানবতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসব অধিকার নির্ধারণ, এর আকর্ষনীয় তালিকা প্রণয়ন, দেশের সংবিধানে এসবের অন্তর্ভূক্তি, আন্তর্জাতিক সনদ ও ঘোষণাপত্র জারীকরণ এবং “মানবাধিকার দিবস পালন” ইত্যাদি নয়, বরং প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, যেসব অধিকারকে মানবাধিকার হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে এবং স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে সেগুলোকে সমকালীন শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা আত্মসাত এবং পদদলিত হওয়া থেকে কিভাবে রক্ষা করা যায়।
ইসলাম তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই বাস্তব দিকটির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে এবং মানবাধিকার রক্ষাকল্পে এমন কার্যকরী ও সুদৃঢ় রক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে- যা একদিকে শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে একনায়কত্ব ও ফ্যাসীবাদের জীবাণু লালনের সুযোগ এবং তাদেরকে অন্যায়-অত্যাচার, কঠোরতা ও বল প্রয়োগের রাস্তায় ধাবিত করার কারণ ও উপায়-উপকরণের মুলোৎপাটন করে। অন্যদিকে তা সাধারণ নাগরিকদেরকে মানবীয় ক্ষমতায় প্রভাবিত হওয়া, ভীত সন্ত্রস্ত হওয়া এবং তাদের মোকাবিলায় নিজেদের অসহায়ত্ব ও অক্ষমতার মত নেতিবাচক অনুভূতি থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, উদ্যম-উৎসাহ, বীরত্ব ও নির্ভীকতার মত চমৎকার বৈশিষ্ট্যাবলীর উন্মেষ ঘটিয়ে এমন এক জবরদস্ত প্রতিরোধ শক্তি পয়দা করে দেয় যে, তার উপর কোন ব্যক্তির একনায়ক সুলভ শাসন চাপিয়ে দেওয়ার কোন সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না।
পবিত্র কুরআন একটি ক্ষুদ্র আয়াতে একনায়কত্বের চরিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরতে গিয়ে আসল কারণ কি এবং সে তার প্রভুত্ব বিস্তারে কিভাবে সফল হয় তা বর্ণনা করেছে। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে একনায়কত্বের নিকৃষ্টতম নমুনা হিসেবে আমাদের সামনে পেশ করেছেন এবং তার নিকৃষ্ট ‍কার্যকলাপ এক এক করে তুলে ধরেছেন। তন্মধ্যে একটি বরং সবগুলোর মূল হচ্ছে এই যে:
(আরবী***)
অর্থ: “সে তার সম্প্রদায়কে হালকা ভাবলো” ( সূরা যুখরুফ:৫৪)।
অর্থাত ফেরাউন তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিজের তুলনায় নিকৃষ্ট মর্যাদাহীন ও দূর্বল মনে করেছিল এবং তার এই অহমিকাপূর্ণ চিন্তাধারাই ছিল তার খোদায়ী দাবী, ফ্যাসীবাদী মনোভাব ও একনায়কত্বের মূল কারণ। এর পরপরই ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “অতএব তারা (তার সম্প্রদায়) তার অধীনতা মেনে নিল। মূলত তারা ছিল এক ফাসেক সম্প্রদায়” (সূরা যুখরুফ: ৫৪)।
এটাই ছিল প্রকৃত কারণ যার ভিত্তিতে ফেরাউনের একনায়কত্বের রাজত্ব চলছিল। তার অপরাধ তো এই ছিল যে, সে তার সম্প্রদায়কে হালকা ও দূর্বল ভেবে তাদের উপর সর্ব প্রকার নির্যাতন চালাচ্ছিল এবং তাদেরকে নিজের সামনে অধপাত ও লাঞ্ছনায় নিমজ্জিত দেখে তার আত্মম্বরিতায় প্রশান্তি খুঁজে পেত। ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “তাদের মধ্যে একটি দলকে সে হীনবল করেছিল” ( সূরা কাসাস: ৪)।
কিন্তু সেই সম্প্রদায়ের লোকেরা আল্লাহর কাছেও কম ঘৃণার যোগ্য ছিল না, যারা ফেরাউনের খোদায়ীর সামনে মাথা নত করছিল এবং সন্তুষ্টচিত্তে এই অপমান ও লাঞ্ছনাকে মেনে নিয়েছিল। পবিত্র কুরআন এই অপরাধে লিপ্ত সম্প্রদায়কে ফাসেক ঘোষণা করেছে, অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘনকারী। আল্লাহ তাআলার প্রতিষ্ঠিত সীমারেখার মধ্যে প্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সীমা হচ্ছে: “তাকে ছাড়া অন্য কাউকে নিজেদের উপাস্য ও বিধানদাতা স্বীকার কর না”। যে সম্প্রদায় এহেন জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হবে তাদেরকে ফেরাউন সম্প্রদায়ের অনুরূপ পরিণতির শিকার হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের অপমান ও লাঞ্ছনার এই দূর্ভোগ থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁর দেওয়া জীবন বিধানে একদিকে একনায়কত্বের মূলোৎপাটন করার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা রেখেছেন এবং অপর দিকে সাধারণ লোকদের একনায়কত্বের জাল ছিন্ন করার মনোবল দান করেছেন। এই প্রসঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেসব রক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আমরা সেগুলোকে চার ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

ক. সার্বভৌমত্বের ধারণার পরিশুদ্ধি,

খ. নেতৃত্বের পরিশুদ্ধি,
গ. কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সীমানির্দেশ,
ঘ. নেতৃত্বের পর্যালোচনা ( বা জবাবদিহি)।
ক. সার্ব ভৌমত্বের ধারণার পরিশুদ্ধি:

ক. সার্বভৌমত্বের ধারণার পরিশুদ্ধি

১. সার্বভৌমত্বের ধারণা

সার্বভৌমত্বের ধারণার পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলাম তার সংস্কার কর্মসূচীর সূচনা করেছে। “আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র তোমাদের সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, রিযিকদাতা ও পালনকর্তাই নন, বরং তিনি তোমাদের শাসক ও বিধানদাতাও বটে”। কুরআনের এই ঘোষণার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে মানবীয় সার্বভৌমত্বের মূলোচ্ছেদ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলাকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মেনে নেওয়ার তাৎপর্য এই যে, মানুষের মধ্যে শাসক ও শাসিতের শ্রেণী বিভাগ চিরতরে খতম হয়ে গেল। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে উচ্চতম পদে অধিষ্টিত শাসনকর্তা পর্যন্ত সকলেই সমান মর্যাদার অধিকারী হিসাবে স্বীকৃত হল। মানুষ তার মতই অন্য যে কোন মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করল এবং যারা তাদের রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের পৃষ্ঠপোষক হলেন তারা আহকামুল হাকেমীন-রাজাধিরাজ আল্লাহর সামনে জবাবদিহি এবং আখেরাতের শাস্তির ভয়ে পরাভূত হয়ে নিজেদের আনুগত্য করানোর পরিবর্তে স্বয়ং কুরআন ও সুন্নাতের পথের অনুসারী হল। সার্বভৌমত্বের এই ধারণার অধীনে না থাকবে কোন মানুষের পক্ষে একনায়কত্বের পথে পা বাড়ানোর কোন সম্ভাবনা, আর না নাগরিকদের ঘাড় এতটা নরম হতে পারে যে, তারা কোন একনায়কের সামনে আনগত্যের মস্তক অবনত করে দিবে। না পারবে কোন শাসক কিংবা নেতা সাধারণের অধিকার আত্মসাতের ধারণা করতে আর না জাতি কাউকে এসব অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দিতে পারে- যা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ তাদের দান করেছেন।
সার্বভৌমত্বের এই ধারণা মানুষের অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। এটা সেই সার্বভৌমত্বের ধারণার বিস্ময়কর বহি:প্রকাশ যা প্রথম খলীফা হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: তার খিলাফতের বায়আত অনুষ্ঠানের পর সর্বপ্রথম ভাষণে বলেছিলেন:
“তোমাদের মধ্যকার দূর্বল ব্যক্তি আমার নিকট শক্তিশালী, যতক্ষণ না আমি তার প্রাপ্য দেওয়াতে পারি। ‍আর তোমাদের মধ্যকার সবল ব্যক্তি আমার নিকটে দূর্বল যতক্ষণ না তার থেকে তার নিকট প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে পারি” ( মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কল, আবু বাকর রা:, উর্দু অনু: লাহোর ১৯৭৩ খৃ:, পৃ. ৮৬)।
এতো ছিল মানবাধিকারের বিষয়। এর যথার্থ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বানুভূতি তাঁকে তাঁর সোয়া দুই বছরের খিলাফতকালে “ক্ষমতা ও আরাম আয়েশের স্বাদ” কতটা আস্বাদন করার সুযোগ দিয়েছিল! এই প্রসঙ্গে মৃত্যুশয্যায় অত্যন্ত বিষন্ন ভঙ্গীতে তিনি বলেন:
“হায়! যদি আমি বনু সায়েদার দিন খিলাফতের দায়িত্বভার উমার রা: অথবা আবু উবায়দার উপর অর্পণ করতাম। তাদের মধ্যে কেউ যদি শাসক হত আর আমি তার উযীর হতাম” ( ঐ, পৃ. ৪৫৪)।
তার অন্তিম উপদেশের মধ্যে অন্যান্য বিষয় ছাড়াও নিম্নোক্ত পথনির্দেশনাও অন্তর্ভূক্ত ছিল:
“আমি আমার খিলাফতকালে বায়তুল মাল থেকে যে ভাতা গ্রহণ করেছি তা ফেরত দিবে এবং এই উদ্দেশ্যে আমার অমুক জমি বিক্রি করে তা থেকে লব্ধ অর্থ বায়তুল মালে জমা দিবে” ( ঐ, পৃ. ৪৫৫)
সুতরাং তার অন্তিম উপদেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হযরত উমার রা: ভূমিখন্ড বিক্রি করে তার মূল্য বাবদ প্রাপ্ত অর্থ বায়তুল মালে জমা করিয়ে দেন। হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: তাঁর দাফন-কাফন সম্পর্কে অসীয়ত করলেন যে, তাঁকে যেন সেই দুই প্রস্থ কাপড়ে কাফন পরানো হয় যা তিনি সাধারণত পরিধান করতেন। কেননা “ নতুন বস্ত্র পরিধানের উপযুক্ত হকদার হল জীবিত ব্যক্তি” ( ঐ, পৃ. ৪৫৭)।
যেখানে মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এই দৃঢ় সংকল্প ও দায়িত্বানুভূতি এবং স্বয়ং নিজের অধিকারের বেলায় ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কোরবানীর এই আবেগ-অনুভূতি কার্যকর রয়েছে সেখানে স্বৈরাচারী এক নায়কত্বের সুযোগ কোথায়!
দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমার রা: খিলাফতের আসনে অধিষ্টিত হওয়ার পর উদ্বোধনী ভাষণে বলেন:
“আমি যদি জানতাম যে, খিলাফতের এই গুরু দায়িত্ব বহন করার মত আমি ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি আছে তাহলে এই পদ গ্রহণ করার চাইতে আমার শিরচ্ছেদ করাকে অধিক শ্রেয় মনে করতাম” (তানতাবী, উমার ইবনুল খাত্তাব, উর্দু অনু: আব্দুস সামাদ সারিম, লাহোর ১৯৭১ খৃ. পৃ. ৭০)।
এতো ছিল “ক্ষমতা লাভের আকাংখার” বিষয়। এবার অধিকার পূরণের ব্যাপারটি লক্ষণীয়:
“হে লোক সকল! আমি তোমাদের যাবতীয় বিষয়ের প্রতিনিধিত্বমূলক উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হয়েছি। কিন্তু তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, এখন আমার কঠোরতা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। অবশ্য যালিম ও অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে তা পূর্ববত শক্তিশালী থাকবে। তবে যারা ন্যায়পরায়ণ ও পরহেযগার তাদের প্রতি আমি অত্যন্ত কোমল ও বিনয়ী। কাউকে আমি কারো উপর অত্যাচার করতে দেব না যতক্ষণ না আমি তার এক গন্ডদেশ ভূপাতিত করে অন্য গন্ডদেশে আমার পা রাখব। অবশেষে সে সত্য ন্যায়ের সামনে মাথা নত করে দেবে। এই কঠোরতা সত্ত্বেও আমি আমার গন্ডদেশ বিশুদ্ধচিত্ত ও ন্যায়পরায়ন লোকদের জন্য ভূলুণ্ঠিত করব” ( ঐ, পৃ. ৭৪)।
পরিশেষে ক্ষমতার কল্যাণ সবিস্তারে লক্ষ্যণীয়! শাহাদাতের সময় খলীফা তাঁর পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আব্দুল্লাহ! আমার উপর কত ঋণ আছে দেখতো”। হিসাব করে দেখা গেল তাঁর ঋণের পরিমাণ প্রায় আশি হাজার দিরহাম। তিনি বললেন, “যদি উমারের পারিবারিক সম্পদ দ্বারা তা পরিশোধ করতে পার তাহলে পরিশোধ করে দেবে, অন্যথায় আদী গোত্রের নিকট আবেদন করবে। এতেও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশদের নিকট আবেদন করবে। এদের ছাড়া অন্য কারো নিকট চাইবে না”।
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা: বললেন, “বায়তুল মাল থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করে দাও না কেন?
হযরত উমার রা: বললেন, আল্লাহ পানাহ! আমার মৃত্যুর পর তোমরা ও তোমাদের বন্ধুরা যেন এ কথা বলতে না পারে যে, আমরা নিজেদের অংশ উমারের জন্য ছেড়ে দিয়েছি। তোমরা এভাবে আমার উপর বোঝা চাপাবে এবং এমন বিপদে নিক্ষেপ করবে যে, আল্লাহ যদি নিষ্কৃতি দেন তবেই মুক্তি পাব” ( ঐ, পৃ. ৫৫৬)।
এই গৌরবময় কীর্তিকলাপের মূল উপাদান কি ছিল? এতো ছিল সেই আখেরাত বিশ্বাস ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে জবাবদিহির অনুভূতি। শেষ নি:শ্বাসের মুহুর্ত, অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং ভয়ে আতংকে থরথর করে কাঁপছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: শান্তনা দিলে তিনি বলেন, “আল্লাহর শপথ! যদি আমার কাছে পৃথিবীপূর্ণ স্বর্ণ থাকতো তাহলে আল্লাহর শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পূর্বেই তা উৎসর্গ করে দিতাম। (ঐ, পৃ. ৫৫২)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: তাঁর খিলাফতকালে প্রশংসা করলে তদুত্তরে তিনি বলেন, “আপনি কি আমার খিলাফত ও নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করছেন? আমি রসুলুল্লাহ সা: এর পবিত্র সাহচর্যে থাকাকালে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। হযরত আবু বাকর রা: এর সাথে থাকাকালে তাঁর ওফাত পর্যন্ত তাঁর অনুগত ছিলাম। তোমাদের এই খিলাফত ও নেতৃত্ব সম্পর্কে আমি আশংকাবোধ করছি” (ঐ. পৃ. ৫৫৪)।
এতো ছিল সেই আচরণ যা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের উপর ঈমানের ভিত্তিতে গড়ে উঠে এবং শাসকবর্গকে মানবতার জন্য অভিশাপের পরিবর্তে দয়া ও অনুগ্রহের উৎস করে পরিপূর্ণভাবে একনায়কত্বের দ্বার চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়।

২. আমানতের ধারণা

ইসলামী রাষ্ট্রে মানবাধিকারের দ্বিতীয় বড় হেফাজতকারী হচ্ছে সরকা। সরকার সম্বন্ধে ইসলামের ধারণা এই যে, তা একটি আমানত এবং এর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি (প্রেসিডেন্ট/ প্রধানমন্ত্রী) হলে আমীন, অর্থাৎ আমানতদার। আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার এই কথা ও স্বীকারোক্তির পরে নিম্নোক্ত বাণী:
(আরবী***)
অর্থ: হে রসূল! বলুন, আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে নিবেদিত” (সূরা আনআম: ৬২) এবং
( আরবী***)
“আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ খরিদ করেছেন জান্নাতের বিনিময়ে” ( সূরা তাওবা :১১১) দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুসলমানের প্রতিটি জিনিস আল্লাহ প্রদত্ত একটি পবিত্র আমানত হিসাবে পরিগণিত। আর সে তার স্বাধীন ইচ্ছাও বল্গাহীন এখতিয়ারের সাহায্যে নয়, বরং প্রকৃত মালিকের মর্জি এবং তাঁর দেয়া পথনির্দেশ মাফিক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়ে গিয়েছে। এটা হচ্ছে সেই আমানতের ধারণার অনিবার্য পরিণতি যে, কোন ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তির উপর যুলুম -নির্যাতন করে তখন আল্লাহ তাআলা তাকে “নফসের খেয়ানতের” অপরাধী সাব্যস্ত করেন। সুতরাং বনী যাফর গোত্রের তু’মা ইবনে উবাইরিক্ব যখন এক ইহুদীর উপর বর্ম চুরির মিথ্যা অপবাদ আরোপ করল তখন মহানবী সা: কে সম্বোধন করে নাযিল হল:
“যারা নিজেদের প্রতারিত করে তাদের অনুকূলে বাদ-বিসম্বাদ কর না” (সূরা নিসা: ১০৭)।
বান্দা যে জীবন তার প্রভুর হাতে বিক্রি করেছে সে যদি তার অপব্যাবহার করে তাহলে সে যেন আমানতের খেয়ানত করল। নফসের আমানতের দাবী এই যে, বান্দা সদা সত্য কথা বলবে এবং ন্যায়পরায়ণতার পথ অবলম্বন করবে। মিথ্যাচার, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির দ্বারা অন্য কারো ক্ষতি হয় না, বরং এই অপরাধে অপরাধীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কেননা সে তার প্রকৃত মালিকের দৃষ্টিতে খেয়ানতকারী প্রতারক হিসাবে গণ্য হয় এবং তাঁর আদালতে কঠিন শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হয়। যুলুমের এই বাস্তব পরিণতির প্রতি ইশারা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
(আরবী***)
অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে” ( সূরা তালাক:১)।
অর্থাৎ যালিমের যুলুমের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হয় সে নিজেই। তার যুলুমের দ্বারা অন্য কারো ক্ষতি হোক বা না হোক, তা তার নিজের ধ্বংসের অনিবার্য কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমানতের এই ধারণার প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক ব্যক্তির উপরই আমানতের পরিমাণ মাফিক দায়িত্ব ও জবাবদিহি অর্পিত হয়। যার কাছে যে পরিমাণ ধন -দৌলত, অর্থকড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, উপায়-উপকরণ এবং ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বর্তমান আছে তাকে ঐ অনুপাতে তার প্রভুর ‍সামনে আপন কৃতকর্মের জবাবদিহি করতে হবে। খোলাফায়ে রাশেদীন রা: ও সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে আমানতের এই ধারণার পরিপূর্ণ অনুভূতি ও চেতনা বিদ্যমান ছিল। এ জন্যই তাঁরা কোন দায়িত্বপূর্ণ পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে পেছনে থাকতেন এবং যখন জাতির দাবী কিংবা শাসকের নির্দেশে তারা কোন পদে সমাসীন হতে তখন তার কর্তব্য পুরোপুরি আদায় করতেন। তাদের মধ্যে জবাবদিহির ভয় এতটা ছিল যে, সমাজে তাদের চাইতে অধিকতর খোদাভীরু আর কাউকে পাওয়া যেত না।
হযরত আবু বাকর রা: বলেছেন: “যিনি শাসক হবেন তাকে সর্বাপেক্ষা কঠিন হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। তিনি সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তির ভয়ে শংকিত থাকবেন। আর যে ব্যক্তি শাসক নয় তাকে সহজতর হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। তার সহজতর হিসাবের ভয় থাকবে। কেননা মুসলমানদের উপর যুলুম নির্যাতনের সর্বাপেক্ষা বেশী সুযোগ ঘটে শাসকদের বেলায় এবং যারা মুসলমানদের উপর যুলুম করে তারা প্রকারান্তরে আল্লাহর সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে” ( ঐ, খন্ড, হাদীস ২৫১২)
হযরত উমার ফারুক রা:-র মধ্যে যখন আমানতের দায়িত্বানুভূতি কঠিনভাবে জাগ্রত হত তখন তিনি যমীন থেকে মাটি উঠিয়ে তা মুঠোর মধ্যে ঘর্ষণ করে বলতেন, “হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম, বরং যদি কিছুই না হতাম। হায়! আমার জননী যদি আমাকে প্রসবই না করতেন”। ( ঐ, ৬ খন্ড, বাব ফাদাইল আল ফারুক)।
হযরত আবু বাকর রা: হযরত উসমান রা: ও হযরত আলী রা:-র অবস্থাও তদ্রুপ ছিল। একবার হযরত উমার ইবনে আব্দুল আযীয রহ: সারা রাত জায়নামাযে বসে কাঁদতে থাকেন। সকালবেলা তাঁর স্ত্রী এই অস্বাভাবিক দুশ্চিন্তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন: “আমি নিজেকে এই উম্মাতের সাদা কালো সকলের যিম্মাদার হিসেবে পেলাম। ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসহায় পথিক, নি:স্ব ভিখারী, অভাবী দারিদ্র ক্লিষ্ট মানুষ, মযলুম ও নির্যাতিত বন্দী এবং এই পর্যায়ের অবহেলিত মানুষের কথা এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ে গেল। আমি অনুভব করলাম যে, আল্লাহ তাআলা এদের সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং হযরত মুহাম্মাদ সা: এদের পক্ষে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করবেন। আমার ভয় হচ্ছে যে, আল্রাহর সামনে আমার কোন জোর খাটবে না এবং মহানবী সা: কে কোন যুক্তি বলেই আমি আশ্বস্ত করতে পারব না। এ কারণে আমার মন কেঁপে উঠেছে এবং নিজের সম্পর্কে আমি বড়ই শংকিত‘( ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খিরাজ, উর্দু অনু: করাচী, ১৯৬৬ খৃ. পৃ: ১৪০।
একজন মুসলামনের জন্য এমনিতেই তার জান মাল এবং তার কর্তৃত্বাধীন প্রতিটি জিনিস আল্লাহর আমানত, কিন্তু খেলাফত ও রাজকার্যের ক্ষেত্রে তো বিশেষ করে “আমানত” শব্দটি একটি রাজনৈতিক পরিভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। হযরত আবু যার গিফারী রা: একবার আকাংখা ব্যক্ত করলেন, আমাকে কোন এলাকার আমীর (শাসক) নিয়োগ করা হোক। তখন মহানবী সা: ইরশাদ করেন: “তুমি তো দূর্বল প্রকৃতির মানুষ এবং প্রশাসন একটি আমানত। কিয়ামতের দিন তা লজ্জা ও অপমানের কারণ হবে। তবে যে ব্যক্তি এর যোগ্যতা রাখে এবং ‍তা গ্রহণ করে এতদ সম্পর্কিত সমস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করতে পারে তার জন্য কোন লজ্জা ও অনুতাপের আশংকা নেই” ( ঐ, পৃষ্ঠা: ১২০)।
অনুরূপভাবে তিনি অন্যত্র বলেছেন: “যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোন বিষয়ে এমন ব্যক্তিকে গভর্ণর বা শাসক নিয়োগ করল যার তুলনায় অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ও উত্তম মুসলমান বর্তমানে রয়েছে তাহলে সে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল” ( ইমাম ইবনে তাইমিয়া, সিয়াসাতে শারীআ, উর্দূ অনু. পৃ. ৮৫, কালাম কোম্পানী, করাচী)।
অপর হাদীসে রসুলে করীম সা: ইরশাদ করেন: “যখন আমানত ধ্বংস হতে দেখবে তখন তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। আরয করা হল, ইয়া রসুলুল্লাহ! আমানত ধ্বংসের অর্থ কি? তিনি বলেন: যখন নেতৃত্ব ও রাষ্ঠ্রীয় ক্ষমতা অযোগ্যদের উপর অর্পণ করা হবে তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা করবে” ( হযরত আবু হুরায়রা রা: সনদে বুখারী)।
আমানতের এই ধারণা মানবাধিকার রক্ষা এবং এগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং অধিকার খর্ব করার পথে একটি বিরাট প্রতিবন্ধক ( Deterent).

৩. দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রাধান্য:

ইসলাম তার চিন্তা ও কর্মের ব্যবস্থায় অধিকার অর্জনের পরিবর্তে ফরয অর্থাৎ অপরিহার্য কর্তব্য সম্পাদনের প্রতি ‍অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। প্রকৃতপক্ষে অধিকারের প্রসঙ্গটি কর্তব্যের তুলনায় মর্যাদার মাপকাঠিতে দ্বিতীয় স্তরের। অপরিহার্য কর্তব্য সঠিকভাবে পালিত হলে অধিকারের প্রশ্ন উঠতেই পারে না। যখনই ফরয কার্য সম্পাদন স্থগিত হয় তখনই অধিকারের প্রশ্ন উঠে। যার উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হয় সে দানকারীর ( Giver) পর্যায়ভুক্ত এবং যার অধিকার প্রাপ্য হয় সে আদায়কারীর (Recepient) পর্যায়ভূক্ত। এখন যদি ফরয (দায়িত্ব ও কর্তব্য) যথাযথভাবে পালিত হতে থাকে তবে অধিকার আদায়ের দাবী ( Claim) উত্থাপনের প্রয়োজনই হয় না।
পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেহেতু রাষ্ট্র স্বয়ং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, তাই সে নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী। যাবতীয় ক্ষমতা, এখতিয়ার ও কর্তৃত্বের মালিক সে নিজেই। সে (রাষ্ট্র) কোথাও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের আকারে একই বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত, আবার কোথাও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের (Division of power) আওতায় আমেরিকার ন্যায় রাষ্ট্রসমূহে আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু যাই হোক নিরংকুশ এখতিয়ার (Final authority) রাষ্ট্রের হাতেই রয়ে গেছে। এই অবস্থার যৌক্তিক পরিণতি এই দাড়িয়েছে যে, নাগরিকদের ভূমিকা আত্মরক্ষামূলক হয়ে গেছে। তাদের নিরাপত্তার চিন্তা সেখানে অধিকারকে অস্বাভাবিক গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আর দায়িত্ব ও কর্তব্যের উপর এ জন্য তাগিদ করা হয়নি যে, কে তা আদায় করিয়ে নেবে? এমন কোন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী কেউ আছে কি যে রাষ্ট্রকে কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে পারে? রাষ্ট্র যদি কোন অধিকার হরণ করে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সর্বশক্তি নিয়োগ করে বড়জোর বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস কিংবা সীমিত করার শক্তি থেকে বঞ্চিত এবং নিজের যাবতীয় এখতিয়ার সর্বশক্তিমান আল্লাহর বিধান ও তাঁর নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী ব্যবহার ও প্রয়োগ করতে বাধ্য, তাই এখানে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের উপর সার্বিকভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
কুরআনুল করীম মানব সম্প্রদায়কে, বিভিন্ন জাতিকে, নবী রসুলগণকে, ব্যক্তিগণকে, কাফের, মুশরিক ও মুমিনদের যেখানে সেখানে সম্বোধন করেছে সেখানেই তাদেরকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এবং এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ভিত্তিতেই দুনিয়া ও আখেরাতের কৃতকার্যতা ও উন্নতি লাভের অঙ্গীকার করেছে। সমগ্র কুরআনের প্রথম আয়াত থেকে সর্বশেষ আয়াত পর্যন্ত কোথাও অধিকারের প্রাপকদের সম্বোধন করে এই পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়নি যে, উঠো, ঐক্যবদ্ধ হও, গোষ্ঠীবদ্ধ হও, সংঘবদ্ধ হও এবং আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ো, নিজেদের অধিকার আদায় কর। এই ধরণের উৎসাহ প্রদানের কোন প্রয়োজন এজন্য নেই যে, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অবহেলাকারীদের ক্ষমতাচ্যূত করা, তাদের পতনের ব্যবস্থা করা এবং তাদের উপর ধ্বংসাত্মক শাস্তি অবতীর্ণ করা, পৃথিবীতে তাদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা, ইতিহাসের পাতা থেকে নাম নিশানা মুছে ফেলা, এবং আখেরাতে জাহান্নামের প্রজ্জলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করার কাজটি খোদ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর দায়িত্বে রেখেছেন। উপরন্তু এই উৎসাহ প্রদানের আবশ্যকতা এজন্যও নাই যে, আল্লাহর প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র বা সরকার প্রকৃতপক্ষে হকদারদের অভিভাবক ও পৃষ্ঠাপোষক সরকার। তার আসল কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শক্তি কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা এবং হকদারদের অধিকার পৌঁছে দেওয়া। যাকাতদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা:-র যুদ্ধ ঘোষণা ইসলামী রাষ্ট্রের সেই মেজাজ ও ভূমিকারই প্রতিচ্ছবি। তাঁর নিকট যাকাতের হকদারগণ না কোন দাবী তুলেছিল যে, আমাদের প্রাপ্য আমাদের দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, আর না এই প্রসঙ্গে তার সামনে কোন ব্যক্তিগত কিংবা সমষ্টিগত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। তিনি তো আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে এই কাজের জন্য আদিষ্ট ছিলেন যে, যার উপর কোন দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তাবে তাকে তা পালনে বাধ্য করতে হবে এবং আল্লাহ যার অধিকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তা তার কাছে পৌঁছাতে হবে।
আজ যাকাতের আটজন হকদারের মধ্যে কারো এই আইনগত অধিকার নেই যে, সে আদালতে কোন যাকাতদাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে তার সম্পদ থেকে নিজের অংশ আদায় করে নিবে। হকদারগণ তাদের দাবী কেবল সরকারের নিকট পেশ করতে পারে। এখন এটা তো সরকারের দায়িত্ব যে, সে বায়তুল মালের যাকাত খাত থেকে তাদের হক পূরণ করবে কিংবা বিত্তবান লোকদের থেকে যাকাত আদায় করে হকদারদের পৌঁছিয়ে দেবে।এক্ষেত্রে সরকারই হকদারদের তরফথেকে প্রকৃত দাবীদার এবং তার ‍যাবতীয় শক্তিই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন কিংবা অধিকার আদায়ের মাধ্যম।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ: সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন: “বিলায়াত ও ইমারতের ( প্রশাসনের) প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টির সেবা ও সংশোধন। মানুষ দীন ত্যাগ করলে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হবে এবং তাদেরকে প্রদত্ত জাগতিক নিয়ামত ও সুযোগ-সুবিধা তাদের জন্য মোটেই উপকারী ও কল্যাণকর প্রমাণিত হবে না। দুনিয়া থেকে তারা প্রকৃত প্রাপকদের মধ্যে বন্টন করা, দ্বিতীয়ত, যারা বাড়াবাড়ি করে এবং অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা” ( ঐ, পৃ. ১০৯)।
এভাবে দেখার বিষয় এই যে, যে সমাজে ইবাদত বন্দেগী, ওয়াজ- নসীহত, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, প্রচার মাধ্যম, এবং সরকারের বিভিন্ন এজেন্সী, প্রতিষ্ঠান, ও তার যাবতীয় এখতিয়ার ও উপায় উপকরণের সমিলিত শক্তি একত্র হয়ে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আভ্যন্তরীণ ও বাইরের চাপ প্রয়োগ করছে সেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি কি পরিমাণ উত্থিত হতে পারে?

৪. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ঐক্য

ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব লাভের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে:
“আমরা এদেরকে (মুমিনদেরকে) পৃথিবীতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে” ( সূরা হজ্জ ৪১)
মুসলিম উম্মাহর আবির্ভাবের মূখ্য উদ্দেশ্যও তাই। ইরশাদ হচ্ছে:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
অর্থ: “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির (সংশোধন ও পথ নির্দেশ দানের জন্য) তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দান কর, অসৎ কার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ” ( সূরা আল ইমরান: ১১০)
মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবন এবং তাদের রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্দেশ্য একই। আর তা হচ্ছে- নিজেও ভালো কাজ করবে এবং অন্যদেরও তা করাবে, অসৎ কাজ থেকে নিজেও বিরত থাকবে এবং অন্যদেরও বিরত রাখার চেষ্ঠা করবে। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের উদ্দেশ্য এক হওয়ার তাৎপর্য এই যে, একজন সাধারণ মুসলমান হোক কিংবা তাদের শাসক হোক, সবাই একই পথের পথিক এবং একই মনযিলের মুসাফির। সকলের গন্তব্যস্থল এক। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতা ও সামর্থ্য মোতাবেক একই কাজ সম্পাদনে নিয়োজিত আছে। কেউ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করলে সে তা সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যয় করছে। কারো শুধু দেহ প্রাণ ছাড়া আর কিছু না থাকলে সে সম্পদ নিয়েই স্বীয় উদ্দেশ্য পূরণের জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়।
যেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের এই ঐক্য বিদ্যমান সেখানে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে কলহ বিবাদ হবে কিসের জন্য? ইসলামে রাষ্ট্রপতির শাসকের মর্যাদা নয়, বরং তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবকের, নেতা ও প্রজাগণের সম্পর্ক শাসক ও শাসিতের নয়, বরং পারষ্পরিক সহযোগিতাকারীর। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“মুমিন নর নারী একে অপরের বন্ধু; তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে” ( সূরা তওবা: ৭১)।
এখন কোন শাসকের সীমাতিরিক্ত ক্ষমতালিপ্সা কলহ বিবাদ ও সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি করলেও সাধারণ নাগরিকদের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে: “সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তোমরা পরষ্পরের সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না” ( সূরা মাইদা: ২)
শাসক পাপাচার ও বাড়াবাড়ির দিকে অগ্রসর হলেই উম্মাত অসহযোগিতার ( Non-Cooperation) বৈধ অধিকার লাভ করবে এবং সে আনুগত্যের অধিকার হারিয়ে ফেলবে।
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের এই ঐক্য শাসন কর্তৃত্বের ধারণাকে সাম্য ও ভাতৃত্বের ভাবধারায় পরিবর্তিত করে দেয়। শাসকের পদস্খলনের শাস্তি “শাসকের আনুগত্যের অধিকার হারানো” মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের একটা অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

৫. ব্যক্তির মর্যাদা

মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি মূলত: মনুষ্যত্বের মর্যাদার বিষয়। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ প্রায়ই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং নিজের ক্ষমতা, এখতিয়ার ও উপায় উপকরণের প্রাচুর্যের প্রদর্শনীয় দেখে এই ভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন যে, তিনি যেন কোন অতি মানবীয় সত্তা এবং এমন কতগুলো উচ্চতর বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দরুন তিনি নিরংকুশ ক্ষমতা ও শাসন দন্ডের অধিকারী হয়েছেন এবং অন্যদের কাজ হচ্ছে কেবল তারই আনুগত্য করে যাওয়া। এই চিন্তাধারা যথারীতি মতবাদ ও দর্শনের রূপ ধারণ করেছে। এই চিন্তাধারাই মানবীয় রাষ্ট্রের সূচনার জন্য “ঐশ্বরিক উতপত্তি মতবাদ” (Theory of Divine Origin)রচনা করেছে। এই চিন্তাধারা থেকেই রাজা-বাদশাদের ক্ষমতা-এখতিয়ারের জন্য রাজার ঐশ্বরিক অধিকার (Divine Rights of Kings)এর পরিভাষা গড়ে তোলা হয়। এই ভ্রান্ত মতবাদই রাজার জন্য “আলমপানাহ” (জগতের আশ্রয়) ‘যিলুল্লাহ’ ( আল্লাহর প্রতিচ্ছায়া)-এর মত শেরেকী উপাধিসমূহ আবিষ্কার করিয়েছে এবং শাসক গোষ্ঠীকে আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত দূত বানিয়ে সাধারণ মানুষকে অপমান ও অবমাননার সুযোগ এনে দেয়। এই ঐশ্বরিক অধিকার এবং আল্লাহর প্রতিচ্ছায়া মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাড়ায় এবং এই বিপদ থেকে নাজাত লাভের জন্য তাকে মৌলিক অধিকারের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে।
ইসলাম মানবতার মর্যাদার উপর অস্বাভাবিক গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং এই বিশ্ব চরাচরে আল্লাহর পরেই তাকে সর্বাধিক সম্মানিত ও মর্যাদাশীল ঘোষণা করেছে। আদি পিতা হযরত আদম আ: এর সৃষ্টির ঘটনায় পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এই মাটির পুতুলের মধ্যে নিজের রূহ প্রাণ সঞ্চার করেন এবং তাকে ফেরেশতাদের দ্বারা সিজদা করিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা সকলে তার সামনে সিজদাবনত হবে” ( সূরা হিজর: ২৯)।
উক্ত আয়াত থেকে এ কথাও সুষ্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ তাআলা কুন (হও) শব্দের নির্দেশ দ্বারা যেসব ‍মাখলুক সৃষ্টি করেছেন মানুষ তাদের মধ্যে শামিল নয়, বরং সে সর্বশক্তিমান আল্লাহর এক স্বতন্ত্র ও বিশেষ সৃষ্টি। তাকে অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টির তুলনায় উত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করা হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “আমরা মানুষকে (দৈহিক ও মানসিক দিক দিয়ে) সুন্দরতম ‍কাঠামোয় সৃষ্টি করেছি” (সূরা তীন : ৪)
শুধু তাই নয়, বরং তাকে সম্মান ও মর্যাদা দান করা হয়েছে এবং জগতের সমস্ত নিয়ামতরাজি ও শক্তিসমূহ তার নিয়ন্ত্রণাধীন এনে তার সেবায় নিয়োজিত করা হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “আমরা আদম সন্তানদের মর্যাদাদান করেছি, জলে স্থলে তাদেরকে চলাচলের
বাহন দিয়েছি; তাদেরকে পবিত্র বস্তুর রিযিক দান করেছি এবং আমার অসংখ্য সৃষ্টির উপর তাদেরকে উল্লেখযোগ্য শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি” ( সূরা বনী ‌ইসরাঈল : ২০)
এই মহত্ত ও মর্যাদা শুধুমাত্র মানুষ হিসাবেই সে লাভ করেছে।
এতে সাদা -কালো, আরব -অনারব, প্রাচ্য-প্রতীচ্য, উঁচু-নিচুর কোন ভেদাভেদ নেই। কেননা একই আত্মা থেকে সকলের সৃষ্টি। মহানবী সা: মানুষের এই মহত্ত্ব ও মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করে তাওয়াফকালীন পবিত্র কাবা ঘরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন:
“কতই না পবিত্র তুমি! তোমার পরিবেশ কতই না মনোমুগ্ধকর, কত মহান তুমি এবং কতই না মহান তোমার মর্যাদা। যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, একজন মুসলমানের জান-মাল ও রক্তের মর্যাদা আল্লাহর নিকটে তোমার চাইতেও বেশি” (ইবনে মাজা, হাদীস নং ৩৯৩২,মুসনাদে আহমাদ)।
এতো ছিল মানব জাতির মর্যাদার একটি দিক। এবার দেখুন কুরআনুল করীম মানুষের অহংকার, দম্ভ ও গর্বের অপশক্তি নির্মূল করার জন্য, বিশেষ করে ক্ষমতা, এখতিয়ার ও উপায় উপকরণের অধিকারী ব্যক্তিবর্গের সৎপথে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য তাদেরকে নিজেদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে কিরূপ বাচনভঙ্গীতে সজাগ করে দিচ্ছে:
“মানুষের ভেবে দেখা উচিত কি থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে! তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে স্ববেগে নির্গত পানি থেকে, তা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও পাঁজরের অস্থির মধ্য থেকে” (সূরা তরিক : ৫-৭)
“আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে, তারপর শুক্র থেকে, অত:পর জমাট রক্তবিন্দু থেকে, অত:পর পূর্ণাকৃতি কিংবা অপূর্ণাকৃতি গোশ পিন্ড থেকে, তোমাদের সামনে আমাদের বাস্তব সত্য তুলে ধরার জন্য আমরা তা বর্ণনা করছি” (সূরা হজ্জ :৫)।
“হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করল- যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অত:পর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসামঞ্জস্য করেছেন, যে আকৃতিতে চেয়েছেন তিনি তোমাকে গঠন করেছেন” ( সূরা ইনফিতার : ৬-৮)
মানব সৃষ্টির এই রহস্য উন্মোচন করার সাথে সাথে তাকে একথাও বলা হয়েছে যে,
“জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, অত:পর তোমাদেরকে আমাদের নিকটই ফিরে আসতে হবে”( সূরা আনকাবুত: ৫৭)
“তোমরা যেখানেই থাক মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করলেও” (সূরা নিসা: ৭৮)।
অর্থাত নিজেদের যাবতীয় মর্যাদা ও মহত্ব সত্ত্বেও এই ‍মানুষের না আছে তার জীবনের উপর নিজের কোন এখতিয়ার,আর না আছে মৃত্যুর উপর কোন আধিপত্য। অতএব গর্ব ও অহংকারের আর কি আছে?
কুরআন মজীদের বহু আয়াত এবং মহানবী সা: এর অসংখ্য হাদীসের সাহায্যে মানুষ চিন্তা চেতনার মর্মমূলে এই দুটো বাস্তবতাকে (জীবন ও মরণ) সুকৌশলে বদ্ধমূল করে দেওয়া হয়েছে- যেন সে তার স্বজাতিকে মর্যাদাদানে মনোযোগী হয়, আনন্দচিত্তে তাদের অধিকার আদায় করে, অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি থেকে দূরে থাকে এবং স্বয়ং নিজের সম্পর্কে কোন ভ্রান্তির শিকার না হয়।
এ হলো সেই মৌলিক চিন্তাধারা যা রাষ্ট্র দর্শনের পরিচ্ছন্নতার লক্ষ্যে ইসলাম মানুষের মানসপটে অংকিত করেছে এবং ‍রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে কাউকে নিজের গোলামে পরিণত করার আকাংখা অথবা কারো গোলামে পরিণত হওয়ার রুগ্ন প্রবণতা থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহর বিশ্বজনীন সার্বভৌমত্বের করুণাসিক্ত ছায়ায়সাম্য ও ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে সম্মানজনক জীবন যাপনের পথ দেখিয়েছে। এখন রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের বাস্তব বিষয় সম্পর্কে ইসলামের পথ নির্দেশ ও কর্মপন্থার মূল্যায়ন করে দেখা যাক।

খ. নেতৃত্বের পরিশুদ্ধি

ইসলামী রাষ্ট্রে একনায়কত্ব ও ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে মুসলমানদেরকে সরকার গঠনের সর্ব প্রথম ধাপেই যথাসাধ্য সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দান করা হয়েছে এবং আমীর (প্রশাসক) নির্বাচনের ক্ষেত্রে দু‘টি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে ভ্রষ্ট ও অযোগ্য ব্যক্তিকে নেতৃত্বের আসন পর্যন্ত পৌঁছার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এর প্রথম মূলনীতি এই যে, যে ব্যক্তি পদপ্রার্থী ও ক্ষমতা লাভের আকাঙ্খী হবে তার মধ্যে উচ্চতর গুণাবলী ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সে উক্ত পদের জন্য অনুপযুক্ত। কেননা ক࣍ষমতালিপ্সা তার অসৎ সংকল্পের সব চাইতে বড় প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
(আরবী***)
অর্থ: “সেই আখেরাতের আবাস আমরা ঐসব লোকদের যারা এই পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক নয়” ( সূরা কাসাস : ৮৩)।
নবী করীম সা: ইরশাদ করেন: “আল্লাহর শপথ! আমরা সরকারের এই পদ এমন কোন ব্যক্তিকে দেই না যে তার প্রত্যাশী বা এই পদের জন্য লালায়িত”। (বুখারী, মুসলিম)
“আমাদের নিকট তোমাদের সেই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা বড় অবিশ্বস্ত যে স্বয়ং (শাসকের পদ) প্রার্থনা করে” ( আবু দাউদ)
একবার মহানবী সা: নেতৃত্বের পদ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসিত হয়ে হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: কে বলেন: “হে আবু বাকর! ব্যক্তি নেতৃত্বের অভিলাসী নয় সেই এর উপযুক্ত। এটা সেই ব্যক্তির জন্য উপযোগী নয় যে এর জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নেতৃত্ব তো তার জন্য এর থেকে দূরে থাকার চেষ্ঠা করে, তার জন্য নয় যে, তা ঝাপটে ধরে। নেতৃত্বের পদ তার জন্য যাকে বলা হয়- এটা তোমার প্রাপ্য। তার জন্য নয় যে বলে, এটা তো আমার প্রাপ্য”। ( সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী,ইসলামী রিয়াসত,লাহোর ১৯৬৭ খৃ. পৃ.৩৭৭)।
দ্বিতীয় মূলনীতি এই যে, নিজেদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচন করা। এই “সর্বোত্তম”-এর মানদন্ডও সুষ্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- যাতে এর মধ্যে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, আত্মীয়তা, আঞ্চলিক, গোষ্ঠীগত, ভাষাগত ও বংশগত পক্ষপাতিত্ব অথবা যাকে নির্বাচন করতে যাওয়া হচ্ছে তার ব্যক্তিত্বের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য যথা তার সুন্দর অবয়ব, সুদর্শন চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদের ধরন, সুবিন্যস্ত কেশ, জ্বালাময়ী বক্তৃতা, জাদুকরী লেখনী অথবা অনুরূপ অন্যান্য গুণাবলীর পরিবর্তে তার ভূমিকা ও কার্যকলাপের পরীক্ষা -নিরীক্ষা ও যাচাই করতে হবে। নির্বাচনের এই মাপকাঠি সামনে রেখেই মহানবী সা: ইরশাদ করেন:
“তোমরা শোন এবং আনুগত্য কর- যদিও কোন নিগ্রো ক্রীতদাসকে তোমাদের আমীর নির্বাচন করা হয়-যতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করে” (বুখারী, হযরত আনাস রা: কর্তৃক বর্ণিত)।
পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত নির্বাচনের সময় এই মাপকাঠিই হযরত উমার ফারুক রা: -র সামনে ছিল। তিনি খিলাফতের পদ সম্পর্কিত বিষয়টি মজলিসে শূরায় পেশ করতে গিয়ে বলেন:
“আবু হুযায়ফা রা:-র ক্রীতদাস সালেম জীবিত থাকলে খলীফা বানানোর জন্য আমি তার নামই প্রস্তাব করতাম। সালেম রা: সম্পর্কে যদি আল্লাহ পরওয়ারদিগার আমাকে জিজ্ঞেস করতেন তবে আমি বলে দিতাম, আমি আপনার রসুলের নিকট শুনেছিলাম, সালেম রা: আল্লাহকে অতিশয় ভালোবাসেন” (উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৫৬০)।
খলীফা নির্বাচন পূর্বে হযরত মুগীরা ইবনে শো’বা রা: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা: -র নাম প্রস্তাব করলে তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন:
“আল্লাহ তোমাকে সুপথে পরিচালিত করুন। আল্লাহর শপথ! আমি কখনো এরূপ খেয়াল করিনি। তোমাদের ব্যাপারে আমার কোন আকর্ষণ নাই। সরকার প্রধানের পদটি আমি কোনরূপ প্রশংসাযোগ্য জিনিস হিসাবে পাইনি যে, আমার পরিবারের জন্য তার আকাংখা করব। শাসন কর্তৃত্ব যদি কোন উত্তম বস্তু হয়ে থাকে তাহলে আমরা তা পেয়ে গেছি। আর যদি তা নিকৃষ্ট হয়ে থাকে তাহলে উমার- পরিবারের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে (উমারকে) উম্মতে মুহাম্মাদী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমি নিজেকে খুবই কষ্ট দিয়েছি এবং আমার পরিবার-পরিজনকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রেখেছি। এজন্যও যে যদি আমি কোনরূপ শাস্তি বা পুরষ্কার লাভ ছাড়াই নিষ্কৃতি পেয়ে যাই তবে আমি বড়ই ভাগ্যবান” (ঐ, পৃ. ৫৬১)।
মহানবী সা: এর হাদীস ও হযরত উমার ফারুক রা:-র বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উম্মতের জন্য তিনিই সর্বোত্তম শাসক যিনি আল্লাহর কিতাব অর্থাৎ কুরআনের বিধান বাস্তবায়নের বুদ্ধিবৃত্তিক, মানসিক এবং সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতার অধিকারী এবং যার ভূমিকা ও কার্যকলাপ আল্লাহ-প্রেমের প্রতিচ্ছবি, যার চরিত্রে আল্লাহ ও তাঁর রসুলেল কাংখিত গুণাবলী পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান।

১. তাকওয়া

এই পর্যায়ে আল্লাহ তাআলার বাণী:
(আরবী***)
অর্থ: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে সর্বাপেক্ষা বড় মুত্তাকী” (সূরা হুজুরাত:১৩)
(আরবী***)
অর্থ: “আমরা কি মুত্তাকীদেরকে পাপিষ্ঠদের মত করব? ( সূরা সাদ :২৮)

২. যোগ্যতা

যে পদের জন্য কোন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হচ্ছে সেই পদের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তার থাকতে হবে।
(আরবী***)
অর্থ: “আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন-আমানত (দায়িত্বপূর্ণ পদ) তার যোগ্য ব্যক্তিদের নিকট অর্পণ করতে“ (সূরা নিসা: ৫৮)।
এই প্রসঙ্গে সেই সব হাদীস ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যেখানে মহানবী সা: বলেছেন যে, অযোগ্য পাত্রে আমানত সোপর্দ কর না। আরও এই যে, উত্তম ও যোগ্যতর মুসলিম ব্যক্তির বর্তমানে অযোগ্য ব্যক্তিকে গভর্ণর কিংবা প্রশাসক নিযুক্ত করা আল্লাহ ও তাঁর রসুল সা:-এর সাথে প্রতারণার শামিল।

৩. আদল

এই যোগ্যতার মধ্যে সর্বাপেক্ষা কাংখিত গুণটি হচ্ছে আদল বা ন্যায়পরায়নতা। সূরা নিসার পূর্বোক্ত আয়াতের প্রথমাংশে এই ন্যায়পরায়নতার কথাই বলা হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়নতার সাথে করবে” (সূরা নিসা :৫৮)।
يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
অর্থ: “ হে দাউদ! আমরা তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়পরায়নতার সাথে রাজত্ব কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ কর না। কেননা তা (প্রবৃত্তির অনুসরণ) তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে” (সূরা সাদ: ২৬)
মহানবী সা: ইরশাদ করেন: “কিয়ামতের দিন লোকদের মধ্যে ন্যায়পরায়ন শাসকই আমার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় এবং আমার সবচাইতে নিকটে উপবেশনকারী হবে। পক্ষান্তরে কিয়ামতের দিন সব চাইতে ঘৃণিত এবং সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তিতে পতিত হবে অত্যাচারী শাসক(কিতাবুল খিরাজ, পৃ. ১১৯)।
মহান খলীফা হযরত উমার ফারুক রা: তাঁর প্রশাসকবৃন্দকে কর্মস্থলে পাঠানোর সময় এই উপদেশ দিতেন: “আমি তোমাদেরকে স্বৈরাচারী ও যালিম শাসকরূপে নয়, বরং নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসাবে পাঠাচ্ছি। মুসলমানদের নির্যাতন করে লাঞ্ছিত করবে না; অযথা প্রশংসা করেও তাদের বিপদে ফেলবে না। তাদের অধিকার হরণ করে তাদের প্রতি যুলুম করবে না। মুসলমানদের আরাম আয়েশ ও সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য সম্ভাব্য সকল প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে” (ঐ , পৃ. ৩৬৭)।

৪. বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা

উলিল আমর (শাসক) এমন ব্যক্তি হবেন যিনি বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান ইত্যাদি গুণের অধিকারী।
“হে রসুল! বল, যারা জ্ঞানে সমৃদ্ধ, আর যারা জ্ঞান বঞ্চিত তারা কি সমান হতে পারে” (সূরা যুমার: ৯)?
(আরবী***)
অর্থ: “তোমাদের সম্পদ, যা আল্লাহ তোমাদের অস্তিত্ব রক্ষার উপকরণ বানিয়েছেন, তা নির্বোধ লোকদের হাতে ন্যস্ত কর না” ( সূরা নিসা: ৫)।
সার্বিকভাবে মুসলমানদের উলিল-আমর ( সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ, নির্দেশদাতা) কে কিরূপ হওয়া উচিত তা হযরত আবু বাকর রা: ও হযরত উমার রা:-র মুখে শোনা যাক। হযরত উমার রা: কে খলীফা মনোনয়নের সময় হযরত আবু বাকর রা: নসীহত করে:
(আরবী***)
অর্থ: “হে উমার! প্রথম যে জিনিস সম্পর্কে তোমাকে সতর্ক থাকার নসীহত করছি তা হচ্ছে তোমার নিজের নফস। প্রত্যেক নফসেরই কিছু কিছু চাহিদা থাকে এবং যখন তুমি তার এই চাহিদা পূর্ণকরে দিবে তখন সে আরেকটি চাহিদা পূরণের জেদ করবে। দেখ, রসুলুল্লাহ সা: এর সাহাবীদের মধ্যে সেইসব লোক সম্পর্কে সতর্ক থাকবে যাদের ভুঁড়ি বেড়ে গেছে, দৃষ্টিশক্তিকে লালসা-বাসনা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে এবং এদের প্রত্যেকের শুধু নিজ নিজ ব্যক্তিগত স্বার্থই প্রিয়। তাদের মধ্য কারো পদস্খলন ঘটলে তারা সবাই অস্থির ও পেরেশান হয়ࣇ পড়ে। খবরদার! তুমি এদের দলভূক্ত হয়ো না যেন। ভালোভাবে বুঝে নাও, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আল্লাহকে ভয় করবে ততক্ষণ এরাও তোমার জন্য সোজা হয়ে থাকবে। এই হচ্ছে তোমার প্রতি আমার অন্তিম উপদেশ এবং তোমার কাছে আমার সালাম রইল” ( ঐ, পৃ.১২৬)।
হযরত উমার ফারুক রা: তাঁর পরবর্তী খলিফার জন্য যে দীর্ঘ অসিয়তনামা লিখিয়েছিলেন তাতে নিম্নোক্ত উপদেশ সমূহ উল্লেখ আছে।
১. তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি), ২. সৎ কাজের প্রতি মনোযোগ এবং অন্যায় পশ্চাদপসরণ ৩. যিম্মীদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের উপরই কেবল কর ধার্য করা এবং তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ব্যবহার, ৪. বেদুঈনদের মধ্যেকার ধনবান লোকদের সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করে তাদের মধ্যেকার গরীবদের মাঝে বিতরণ, ৫. প্রজাসাধারণদের সাথে ন্যায়বিচার এবং তাদের প্রয়োজন পূরণের যিম্মাদারী গ্রহণ, ৬. দেশের সীমান্ত রক্ষা, ৭. বিত্তবানদেরকে বিত্তহীনদের উপরে প্রাধান্য না দেওয়া, ৮. আল্লাহর নির্দেশ ও অনুশাসনের বাস্তবায়নে কঠোরতা এবং তাঁর নির্দেশ অবমাননাকারীদের অবমাননা করা, ৯. সবাইকে নিজের সমান মর্যাদাদান, ১০, অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কারো ব্যক্তিত্ব ও তিরষ্কারের পরোয়া না করা, ১১. গণীমতের সম্পদের সকলকে সমান অংশ দেওয়া এবং নিজকে বঞ্চিত রাখা, ১২. যিম্মীদের উপর না নিজে যুলুম করবে, ১৩. যিম্মীদের উপর না নিজে জুলুম করবে, না অপরকে অনুমতি দিবে, ১৩. আখেরাতের আকাঙ্খী এবং দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি, ১৪. নফসের প্রাধান্য থেকে নিরাপদ থাকা, ১৫. সত্য ন্যায়ের খাতিরে সর্ব প্রকার বাধা বিপত্তির মোকাবিলা করা, ১৬. মুসলিম উম্মাহর প্রতি অনুগ্রহ করা, ১৭, বড়দের প্রতি সম্মান করা ও ছোটদের স্নেহ করা এবং আলেমদের সম্মান করা, ১৮. কাউকে প্রহার এবং অপদস্থ না করা, ১৯. সরকারী অনুদান থেকে মুসলমানদের বঞ্ছিত না করা, ২০. সেনাবাহিনীকে সীমান্ত অঞ্চলে ফেলে না রাখা, আল্লাহ না করুন, এতে বংশ বিস্তার নিপাত হয়ে যেতে পারে, ২১. ধনীদের মধ্যে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে না থাকতে দেওয়া, ২২. গরীবদের জন্য নিজের দরজা সব সময় খোলা রাখা, অন্যথায় সবলেরা দুর্বলদের গ্রাস করে ফেলবে” (উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৩১২)।
হযরত উমার ফারুক রা: খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার পরে হযরত আলী রা: তাঁকে নিম্নোক্ত পরামর্শ দেন: “আপনি যদি আপনার বন্ধু ( হযরত আবু বাকর রা:) নিকটে পৌঁছতে চান তাহলে নিজের জামায় তালি লাগান, লুঙ্গী উঁচু করে পরুন, আপন জুতায় নিজেই ফিতা বাঁধুন, মোজায় জোড়া লাগান, আশা-আকাংখা কম করুন এবং কখনও উদর পূর্তি করে পানাহার করবেন না” (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১৩৫)।
হযরত উমার রা: তাঁর গোটা খিলাফতকালে এই পরামর্শ অনুসরণ করে গেছেন।
নেতা নির্বাচনের এই হচ্ছে ইসলাম অনুমোদিত মাপকাঠি এবং তাদের প্রয়োজনীয় গুণাবলী। মুসলিম উম্মাহ যদি এই মাপকাঠি অনুযায়ী তাদের নেতৃবৃন্দ ও শাসক নির্বাচন করে এবং তারাও যদি এই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হন তাহলে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে পারষ্পরিক কল্যাণকামিতা ও সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি হবে না।

গ. ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য স্থাপন

নেতা (শাসক) নির্বাচনের কঠিন শর্তাবলী আরোপ করার পর ইসলাম শাসকের পদে আসীন হওয়া মাত্র ক্ষমতার ব্যবহারে ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ ( Check & Balance) এমনভাবে আরোপ করেছে যে, সে না পারে শাসকোচিত আচরণ গ্রহণ করতে, আর না আছে তার শান-শওকত ও জাঁক-জমক প্রদর্শনের উপায়-উপকরণ অবলম্বণের সুযোগ। তার ক্ষমতা ও এখতিয়ারের সীমা ও শর্তাবলী লক্ষ্য করুন।

১. প্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃত্ব

ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার প্রধান তার পদাধিকার বলে দ্বৈত-প্রতিনিধিত্বমূলক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। একদিকে তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী আল্রাহ রব্বুল আলামীনের নির্দেশ অনুশাসন কার্যত জারী করার দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি। অপরপক্ষে তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রকৃত প্রতিনিধিবর্গ অথবা খলীফাদের (মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা) নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে তাদেরও প্রতিনিধি। যেহেতু ব্যক্তি হিসাবে প্রত্যেক মুসলমানকে খিলাফতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তার ইচ্ছার স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে বেছে নিয়ে তার উপর নিজেদের দায়িত্বভার অর্পণ করে তাই তিনি তাদের সকলের প্রতিনিধি। এই দ্বৈত প্রতিনিধিত্বের অর্থ এই যে, রাষ্ট্র প্রধান তার কর্মকান্ডের জন্য একদিকে আল্লাহর কাছে এবং অন্যদিকে আল্লাহর বান্দাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তার এই দ্বৈত অবস্থান তার নিজের ইচ্ছা ও এখতিয়ারের ক্ষেত্র বহুলাংশে সীমিত করে দেয়। এটাই হচ্ছে সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা বড় বাধ্যকতা যা শাসকের এখতিয়ারের উপর ইসলামী শরীআত আরোপ করেছে।

২. স্থায়ী সংবিধান

ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের বড় ধরণের রক্ষাকবচ হচ্ছে সেই স্থায়ী ও চিরন্তন সংবিধান যা কুরআন ও সুন্নাহর আকারে আমাদের সামনে বর্তমান এবং যা (কোরআন ও সুন্নাহ) অধিকার ও কর্তব্যের সংশোধন ও বাতিলের অযোগ্য একটি নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে। মহান রব্বুল আলামীন শাসকের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার উপর বাধ্যবাধকতা এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য আনুগত্যের শর্ত নিরূপণ করে নির্দেশ দিয়েছেন:
(আরবী***)
অর্থ: “তোমাদের প্রতিপালকের তরফ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ কর এবং তাকে ব্যতীত অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না” (সূরা আ’রাফ: ৩)।
যারা এই আদেশের চুল পরিমাণ লংঘন করবে তাদের সম্পর্কে এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে:
(আরবী***)
অর্থ: “আল্লাহ যা নাযিল করেছেন (অর্থাৎ কুরআন) তদনুযায়ী যারা মীমাংসা করে না তারা কাফের… তারা যালেম… তারা ফাসেক (সত্য ত্যাগী)” (সূরা মায়িদা: ৪৪-৪৭)।
এখানে যে আইনের অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না, বরং একটি পবিত্র আমানত হিসাবে তা প্রত্যেক শাসকের নিকট হস্তান্তরিত হয়। এই কারণেই আল্লাহ অধিকার সমূহ কখনো সীমিত, স্থগিত, কিংবা রহিত হয় না, তা স্থায়ী ও অটুট এবং সরকারের হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ।

৩. চিরন্তন শাসনের স্বরূপ

এই সংবিধান শুধুমাত্র শব্দ সম্ভারের লিখিত আকৃতিতে এবং সেগুলোর সমন্বয়ে গঠিত পুস্তকের আকারেই সংরক্ষিত নয়, বরং তা নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথনির্দেশ দানের জন্য একটি স্থায়ী অনুসরণযোগ্য নমুনাও আমাদের ‍সামনে উপস্থাপন করে এবং মহানবী সা: এর পবিত্র সত্তায় দৈহিক রূপ লাভ করে নিজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এমন পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে যে, কারোর পক্ষে এর শব্দাবলী নিয়ে তামাশা করার, নিজের খাহেশ মাফিক অর্থ বের করার এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিত্য নতুন পথ আবিষ্কারের কোন সুযোগ থাকে না। সেই সর্বশক্তিমান প্রভু যিনি নিজের নির্দেশ ব্যতিরেকে অন্য কারো অনুসরণ না করার কঠোর ‍তাকিদ দিয়েছেন- তিনি তাঁর রসুল সা: সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
(আরবী***)
অর্থ: “আমরা রসুল এই উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশে তার আনুগত্য করা হবে” (সূরা নিসা: ৬৪)।
আর এই আনুগত্যও জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগে নয়,বরং পরিপূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি এবং আন্তরিক আকর্ষণ সহকারে হতে হবে।
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا [٤:٦٥]
অর্থ: “কিন্তু না তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর সোপর্দ না করবে, অত:পর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে না এবং সর্বান্ত:করণে তা মেনে না নেয়”(সূরা নিসা:৬৫)।
এই নির্দেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সবার জন্য নেতৃত্ব, পথ নির্দেশ ও রাজত্ব করার মূল উৎস হচ্ছে মহানবী সা: এর পবিত্রতম ব্যক্তিত্ব। জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে ‍তার কর্ম পন্থা হবে করুআনের এই উপদেশের বাস্তব নমুনা।
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
অর্থ: “রসুল তোমাদের যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ শাস্তিদানে বড়ই কঠোর। (সূরা হাশর: ৭)।
(আরবী***)
অর্থ: “প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ” (সূরা আহযাব:২১)।
রসুলে করীম সা: এর রাজত্বের বাস্তব নমুনা বর্তমান থাকাতে পৃথিবীর কোন ইসলামী রাষ্ট্রতা যে গোলার্ধেই অবস্থিত হোক, কোনক্রমেই এই বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারে না যে, কোন বিষয়ে মহানবী সা: এর বক্তব্য অথবা কাজ কি ছিল এবং কুরআনের কোন্ নির্দেশের তিনি কি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার এই স্থায়ী নমুনা ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক সরকার প্রধানকে মহানবী সা: এর অনুসরণ করতে বাধ্যগত করে দেয়। আর এই বাধ্যবাধকতাই ক্ষমতা ও এখতিয়ারের সীমা অতিক্রমের রাস্তা বন্ধ করে যুলুম -নির্যাতন ও বাড়াবাড়ির যে কোন সুযোগ খতম করে দেয়।

৪. বিচার বিভাগের প্রাধান্য

কুরআন-সুন্নাহর বিধান চিরন্তন হওয়ার তাৎপর্য এই যে, ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ ও আইন প্রণয়নকারী সংস্থা উভয়ের উপর বিচার বিভাগের প্রাধান্য বিদ্যমান। শাসন বিভাগ কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না এবং আইন বিভাগ (সংসদ) কুরআন-সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যহীন কোন আইন প্রণয়ন করতে পারে না। বিচার বিভাগ সাধারণ নাগরিকের অধিকার সমূহের হেফাজতকারী। সে নাগরিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক আইনকে অকেজো ঘোষণা করে তাকে কার্যকর করতে বাধা দিতে পারে এবং শাসন বিভাগের জারীকৃত বিধান অকার্যকর গণ্য করে নাগরিকদের মজবুত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে।

৫. আনুগত্যের সীমা

ইসলামী রাষ্ট্রে রাষ্ট্র প্রধানের আনুগত্য শর্তহীন নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ। এই পর্যায়ে স্বয়ং সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিম্নোক্ত নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রসুলের এবং তাদের যারা তোমাদের মধ্যে কর্তৃত্বের অধিকারী। কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে তা আল্লাহ ও রসুলের নিকট রুজু কর” (সূরা নিসা: ৫৯)।
এই আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রে আনুগত্যের যে শর্তাবলী ও সীমারেখা নিরূপিত হয়েছে তা নিম্নরূপ:
১. প্রকৃত আনুগত্য করতে হবে আল্লাহর এবং এই আনুগত্য রসূল সহ সমস্ত মুসলমানের উপর ফরয।
২. অতপর আনুগত্য করতে হবে রসুল সা: এর এবং প্রকৃতপক্ষে এটা কোন আলাদা আনুগত্য নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্যেরই এক বাস্তব রূপ। রসুল সা: এর আনুগত্য ব্যতিরেকে আল্লাহর আনুগত্য করার কোন পথ আমাদের জন্য নেই। তাই কুরআনুল করীমের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে:
“যে ব্যক্তি রসুলের আনুগত্যের ন্যায় এই দ্বিতীয় আনুগত্যের উঁচু-নিচ, সাধারণ নাগরিক ও সরকার প্রধান নির্বিশেষে সমস্ত মুসলমানের উপর ফরয।
৩. অত:পর আনুগত্য হচ্ছে সাহেবে আমর অর্থাৎ শাসনকর্তার প্রতি। কিন্তু এই আনুগত্য উপরোক্ত দুই সত্তার (আল্লাহ ও রসুলের) আনুগত্যের ন্যায় শর্তহীন নয়, বরং তা একটা মৌলিক শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। তা হচ্ছে: স্বয়ং শাসনকর্তাও সাধারণ নাগরিকদের সাথে প্রথমোক্ত দুই সত্তার আনুগত্যের ব্যাপারে সমানভাবে অংশীদার।
৪. শাসনকর্তা ও সাধারণ মুসলমানের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আল্লাহর কিতাব ও রসুল সা: এর সুন্নাহ মোতাবেক মীমাংসা করতে হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানের এই মৌলিক দফার সঙ্গেই মুসলমানদের এই সুষ্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা কোন নফসের দাস, বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, স্বৈরাচারী যালিম এবং ‘আমর বিল মারুফ ও নাহী আনিল মুনকার’ ( সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর পরিপন্থী কাজে লিপ্ত ব্যক্তির আনুগত্য কখনো করবে না। এই পর্যায়ে কুরআনুল করীমের কতিপয় আয়াত দ্রষ্টব্য।
“তুমি এমন ব্যক্তির আনুগত্য কর না যার অন্তরকে আমার যিকির থেকে গাফিল করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে” (সূরা কাহফ :২৮)।
“এবং তোমরা সীমা লংঘনকারীদের আনুগত্য কর না- যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং শান্তি স্থাপন করে না” ( সূরা শুআরা: ১৫১-১৫২)।
“তাদের মধ্যে যে পাপিষ্ট অথবা কাফের তার আনুগত্য কর না” ( সূরা দাহর: ২৪)।
“এবং অণুসরণ কর না তার যে কথায় কথায় শপথ করে, যে চরমভাবে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, যে কল্যাণের কাজে বাধা দেয়, যে সীমা লংঘনকারী, পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাব, তদুপরি কুখ্যাত, সে ধন সম্পদ ও সন্তান সন্তুতিতে সমৃদ্ধশালী। তার কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে শোনানো হলে সে বলে, এতো সেকালের রূপকথা মাত্র” (সূরা ‍কালাম: ১০-১৫)।
রসূলে করীম সা:এর হাদীস সমূহ এই প্রসঙ্গে আনুগত্যের নীতিমালার বিস্তারিত ও সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে। এর প্রতিটি দিক সম্পর্কে রয়েছে বর্ণনা, যাতে কোন প্রকার অষ্পষ্টতা ও জটিলতা অবশিষ্ট নেই। মহানবী সা: ইরশাদ করেন:
“নাফরমানী ও অবাধ্যতামূলক নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের উপর শাসকের আনুগত্য করা অপরিহার্য, চাই তা তাদের পছন্দ হোক কিংবা অপছন্দ হোক। তাদের অন্যায় নির্দেশ প্রদান করলে তখন তার কথা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না” ( বুখারী, মুসলিম)।
আমীর যখনই প্রথম দুই প্রকার আনুগত্য থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মন মত কাজ করবে তখনই তার আনুগত্য পাওয়ার অধিকার রহিত হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় মুসলমানদেরকে প্রকাশ্যভাবে তার আনুগত্যের পরিবর্তে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এভাবে প্রকাশ্যে তাকে প্রত্যাখ্যান করা তাদের অপরিহার্য কর্তব্য। এই পর্যায়ে মহা নবী সা: এর ষ্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে:
“পাপ কাজে কোন আনুগত্য নেই। কেবলমাত্র সত কাজেই আনুগত্য” (বুখারী, মুসলিম)।
সেই ব্যক্তির জন্য কোন আনুগত্য নেই যে, আল্লাহর নাফরমান” ( আবু দাউদ, নাসাঈ)
“স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই” (বুখারী, মুসলিম)।
আনুগত্য পাওয়ার অধিকার বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে- শাসকের এখন আর নির্দেশ দানের অধিকার নেই। তার যাবতীয় এখতিয়ার রহিত হয়ে গেল। তার কোন আদেশেরই এখন আর আইনগত মর্যাদা নাই। তাকে অপসারিত করে অপর কাউকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার এখতিয়ার মুসলমানদের রয়েছে। সে যদি বিদ্রোহ ও অবাধ্যতায় এতটা অগ্রসর হয়ে যায় যে, নামায পড়া ছেড়ে দিয়েছে তবে তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করারও অনুমতি রয়েছে।
“তোমাদের উপর এমন লোকও শাসনকার্য পরিচালনা করবে যাদের কতক কাজ তোমরা ভালো দেখবে এবং কতক মন্দ। যারা তাদের মন্দ কাজের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করবে তারা দায়িত্বমুক্ত এবং যারা সেগুলো অপছন্দ করবে তারাও রেহাই পাবে। কিন্তু যেসব লোক তাতে সন্তুষ্ট এবং তার অনুসরণ করবে তারা অপরাধী হিসাবে গণ্য। সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন, হে আল্লাহর রসুল! যখন এমন শাসকের উদ্ভব হবে তখন আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করব না? তিনি বললেন: না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নামায কায়েম করবে” (মুসলিম)।
হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: খিলাফতের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে এই আনুগত্যের সীমারেখা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁর ভাষণে বলেন: “যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করব ততক্ষণ তোমরা আমার আনুগত্য করবে। কিন্তু আমার থেকে এমন কোন আচরণ যদি প্রকাশ পায় যাতে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নাফরমানী হয় তখন আমার আনুগত্য করা তোমাদের উপর জরুরী নয়”(আবু বাকর, পৃ.৮৬)।
হযরত উমার ফারুক রা: এক সমাবেশে ভাষণদানকালে বলেন, “শাসকের সর্বপ্রধান কর্তব্য হচ্ছে, জনসাধারণ আল্লাহর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছে কি না তার প্রতি লক্ষ্য রাখা। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নির্দেশ পালনের আদেশ দেই এবং সে সব বিষয় থেকে বিরত রাখব যা থেকে আল্লাহ বিরত থাকতে বলেছেন। আমি চাই আল্লাহর নির্দেশ দূরের ও কাছের সকলে মেনে চলুক” (উমার ইবনুল খাত্তাব, ২৯৩)।
হযরত ফারুকে আযমের খিলাফতকালে ইরাক বিজয়ের পরে অনেক লোক ‘কুরআনে আহলে কিতাব নারীদের বিবাহ করার অনুমোদনের’ অধীনে খৃস্টান মেয়েদের বিবাহ করে। হযরত উমার রা: হুযায়ফা ইবনুল য়ামান রা: কে লিখে পাঠান, আমি এটা পছন্দ করি না। জবাবে তিনি (হুযায়ফা) লিখে পাঠান, এটা কি আপনার ব্যক্তিগত মত, না শরীআতের নির্দেশ? উমার রা: লিখলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত মত। হুযায়ফা রা: লিখে জানান, আপনার ব্যক্তিগত মতের আনুগত্য করা আমার জন্য জরুরী নয়” (শিবলী নোমানী, আল ফারুক, করাচী ১৯৭০, পৃ. ৫১২)।
হযরত আলী রা: এক ভাষণে বলেছিলেন:
“আল্লাহর আনুগত্য করা অবস্থায় আমি তোমাদের যে নির্দেশ দেই তা পালন করা তোমাদের উপর ফরয, চাই তা তোমাদের পছন্দের হোক বা না হোক। আল্লাহর অবাধ্য অবস্থায় কোন নির্দেশ দিলে পাপ কাজে আমার কোন আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধুমাত্র ভালো কাজে, আনুগত্য শুধুমাত্র ভালো কাজে, আনুগত্য শুধুমাত্র ভালো কাজে” (কানযুল উম্মাল, ৫ খ. হাদীস নং ২৫৮৭)।
উলিল আমরের (শাসনের কর্তৃপক্ষের) এই শর্ত সাপেক্ষ আনুগত্যের দরুন আল্লাহ ও রসুলের নির্ধারিত অধিকারসমূহের উপর হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার তাদের নেই। তাদের আনুগত্য সেই সময় পর্যন্ত অপরিহার্য যতক্ষণ তারা এই অধিকার সমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং এর পরিপন্থী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করবে। শাসক এই নীতি লংঘন করলে জাতি তার আনুগত্য থেকে মুক্ত হয়ে যাবে এবং তাকে খিলাফতের আসন থেকে অপসারণের অধিকারী হবে। আনুগত্যের এই শর্তাবলী ও সীমারেখা শাসক শ্রেণীর মুকাবিলায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের এক মজবুত গ্যারান্টি দান করে।

৬. পারষ্পরিক পরামর্শের বাধ্যবাধকতা

উলুল আমরের (শাসন কর্তৃপক্ষের) উপর আরোপিত আরেকটি বাধ্যবাধকতা এই যে, তারা উম্মতের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণের ( আহলুর রায়) সাথে পরামর্শ ব্যতিরেকে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে না। তারা যেভাবে মুসলমানদের পারষ্পরিক পরামর্শ ও সম্মতিতে নির্বাচিত হন ঠিক তেমনিভাবে কুরআনুল করীমের নিম্নোক্ত নির্দেশের আওতায় শাসনকার্যও পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে বাধ্য।
“মুসলমানদের কার্যাবলী পারষ্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়”(সূরা শূরা: ৩৮)।
এই পারষ্পরিক পরামর্শ থেকে আল্লাহর রসুলকেও ব্যতিক্রম করা হয়নি। মহানবী সা: কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
“(হে রসুল!) কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)।
রসুলুল্লাহ সা: স্বয়ং নির্দেশদাতা ( শাসক) ছিলেন। তিনি সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ লাভ করতেন। তাই তিনি কারো সাথে পরামর্শ করতে বাধ্য ছিলেন না। কিন্তু তাঁকে যেহেতু পরবর্তীকালের শাসকদের জন্য নমুনা হতে হবে তাই তাঁর মারফতে পারষ্পরিক পরামর্শ গ্রহণের ঐতিহ্য কায়েম করা হয়েছে। তিনি প্রায়ই ছোট বড় ব্যাপারে সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করতেন। এই সুন্নাত স্বয়ং আল্লাহ তাআলার এতটা পছন্দনীয় ছিল যে, কোন কোন বিষয়ে আল্লাহ তাআলা রসুল সা: কে পথ নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে সাহাবায়ে কিরামের অভিমতের অপেক্ষা করতেন এবং তাদের মধ্যে কারো মত পছন্দনীয় হলে ওহী নাযিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সাহাবীর সম্মান ও হিম্মত বাড়িয়ে দিতেন এবং তাঁর মতের অনুকূলে অনুমোদন দিতেন। সুতরাং বদর যুদ্ধের বন্দীদের বিষয়, মুনাফিকের জানাযা প্রসঙ্গ, পর্দা, মাদক দ্রব্যের অবৈধতা, মাকামে ইবরাহীমকে মুসাল্লা ( নামাজের স্থান) বানানো এবং বিশ্রামকালীন বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশের নিষিদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে হযরত উমার রা:-র অভিমত অনুসারে আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছে। একবার রসুলে করীম সা: হযরত আবু বাকর রা: ও হযরত উমার রা: কে সম্বোধন করে বলেছিলেন:“কোন সমস্যা সমাধানে তোমরা দুইজন ঐক্যমতে পৌঁছলে আমি তাতে মতানৈক্য করব না” (মুসনাদে আহমাদ)
হযরত আলী রা: বলেন, “আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রসুল! আপনার পরে যদি এমন কোন সমস্যার উদ্ভব হয় যে সম্পর্কে কুরআনুল করীমে কিছু নাযিল হয়নি এবং আপনার থেকেও কোন কিছু শুনা যায় নি? তিনি বলেন: আমার উম্মাতের ইবাদতগুযার লোকদের একত্র কর এবং তাদের পারষ্পরিক পরামর্শের জন্য বিষয়টি উত্থাপন কর। কোন এক ব্যক্তির মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর না” ( মওদুদী, ইসলামী রিয়াসত, পৃষ্ঠা. ৩৭৩)।
এই পরামর্শের গুরুত্ব ও তার প্রাণশক্তি সম্পর্কে রসুলে করীম ‍সা: ইরশাদ করেন: “যে ব্যক্তি তার ভাইকে এমন কাজের পরামর্শ দেয়, যে সম্পর্কে সে জানে যে, সঠিক কথা এর বিপরীতে আছে- তবে সে প্রকৃতপক্ষে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল” ( আবু দাউদ)।
কুরআন মজীদের সুষ্পষ্ট নির্দেশ ও রসুল সা: এর সুন্নাতের পরে মুসলমানদের কোন আমীর পরামর্শ ব্যতিরেকে এক কদমও অগ্রসর হতে পারে না।
পরামর্শের এই বাধ্যবাধকতা একনায়কত্বের পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং রাজনৈতিক জীবনে গণতান্ত্রিক প্রাণসত্তার উন্মেষ ঘটায়। এখানে আরও একটি মৌলিক বিষয় স্মরণে রাখা দরকার। ইসলামী ব্যবস্থায় শূরা বা পরামর্শ পরিষদের নীতিমালা সংখ্যাগরিষ্টের মতের উপর নয়, বরং সঠিক সিদ্ধান্তের উপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাত যে মত কুরআন ও সুন্নাতের নিকটতর হবে কেবল তাই গ্রহণযোগ্য হবে এবং ইজমা কিংবা সংখ্যাগরিষ্টের মতের কোন ওজন বা গুরুত্ব নেই।
হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: যাকাত দানে অস্বীকারকারীদের বিষয়ে প্রবীণ সাহাবীদের পরামর্শ নেন। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার পক্ষেই অধিকাংশের মত ছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেন নি। কেননা তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন যে, কুরআনের মর্মানুসারে জিহাদ ঘোষণার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। পরিশেষে সকলেই তাঁর সাথে একমত হয়ে জিহাদে শরীক হয়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত উমার রা: ইরাক ও সিরিয়ার বিজিত অঞ্চলসমূহের ভূমি মুজাহিদদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়ার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্টের দাবীর বিরোধিতা করেন। হযরত বিলাল রা: ও হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা: প্রমুখ সাহাবী অত্র ভূমি বন্টন করে দেওয়ার জন্য বারংবার চাপ সৃষ্টি করছিলেন। সমস্যা নিরসনের জন্য অধিবেশন ডাকা হল। অবশেষে হযরত উমার রা: সূরা হাশর এর আয়াত থেকে নিজের অভিমতের সপক্ষে দলীল ‍উপস্থাপন করে নিজের রায়কে মানিয়ে নেন।
এসব নজির দ্বারা একথাও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, শাসকের উচ্চতর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা থাকা সত্তেও শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অবহিতি ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যতক্ষণ তার সঠিক সিদ্ধান্তের উপর সকলের অথবা সংখ্যাগরিষ্টের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত না হয়।
উলুল আমর (শাসনকর্তা) ও মজলিসে শুরার পারষ্পরিক সম্পর্ককে হযরত উমার রা: এই ভূমি বন্টন সম্পর্কিত সমস্যার সমাধানের জন্য আহুত অধিবেশনে নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করেন:
“আমি আপনাদের শুধু এজন্য কষ্ট দিচ্ছি যে, আমার কাঁধে আপনাদের বিষয়ে যে গুরুদায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছে তা পালনে আপনারা আমার হাত শক্তিশালী করবেন। আমি তো আপনাদের মতই একজন মানুষ। আজ আপনাদেরকে অধিকার নির্ধারণ করতে হবে। কেউ কেউ আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন, আবার কেউ বা ঐক্যমত। আমি চাই না যে, আপনারা সর্বাবস্থায় আমার সিদ্ধান্তই কবুল করবেন। আপনাদের কাছে রয়েছে আল্রাহর কিতাব যা সত্য কথা বলে। আল্লাহর শপথ! আমি ‍কাজে পরিণত করার উদ্দেশ্য যদি কোন কথা বলি তাহলে তাতে সত্যের অনুসরণ ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই” (কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১৬১)।
সেই হযরত উমার ফারুক রা:-র বাণী: “পরামর্শ ব্যতিরেকে খিলাফত চলতে পারে না” ( কানযুল উম্মাল, ৫ খ, হাদীস ২৩৫৪)।
তিনি পারষ্পরিক পরামর্শের উপর জোর দিতে গিয়ে এতদূর পর্যন্ত বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে পরামর্শ ব্যতিরেকে নিজের অথবা অন্য কারো নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাবে তোমাদের জন্য তাকে হত্যা না করা বৈধ নয়” (ঐ, ৫ খ, হাদীস ২৫৭৭)।
হযরত উসমান রা:-র শাহাদাতের পরে কতিপয় লোক হযরত আলী রা:-কে খলীফা মনোনীত করতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের এই ব্যাপারে কোন এখতিয়ার নেই। এটা করার অধিকার রয়েছে শুরার সদস্যবৃন্দের’ এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের। আহলে শূরা ও আহলে বদর যাকে খলীফা বানাতে চাইবেন তিনিই খলীফা হবেন। সুতরাং আমরা একত্র হব এবং এই ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে দেখব” ( ইবনে কুতাইবা, আল-ইমামা ওয়াস সিয়াসা, ১ খ, পৃ. ৪১)।
হযরত আবু মুসা আশআরী রা: এই পরামর্শকেই খিলাফত ও রাজতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “ইমারত ( অর্থাত খিলাফত)হচ্ছে পরামর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর তলোয়ারের জোরে যা হাসিল করা তাই রাজতন্ত্র” ( তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৪ খ, পৃ. ১১৩)।
এই পারষ্পরিক পরামর্শের নীতি সংশ্লিষ্ট সকলের অভিমত প্রকাশের পরিপূর্ণ অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে যাদের অধিকার ও স্বার্থ আলোচনাধীন। এই পরামর্শকে শুধুমাত্র শূরার (সংসদ) নির্বাচিত সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি,বরং একজন সাধারণ নাগরিকও কুরআন সুন্নাহর দলীল পেশ করে শূরা ও রাষ্ট্র প্রধানের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারে। একজন বৃদ্ধ মহিলা নিজের এই অধিকার ব্যবহার করে হযরত উমার ফারুক রা: কে মোহরের পরিমাণ সীমিত করার ভুল সিদ্ধান্তের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এবং তিনি তৎক্ষণাৎ তার নির্দেশ প্রত্যাহার করেন।

৭. উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকারের বাধ্যবাধকতা

শাসনকর্তার উপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা এই যে, তিনি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং অধিকারের প্রাধান্যের ক্ষেত্রে কোন রদবদল করতে পারেন না।
কেননা এই রদবদল আমানতের ধারণার পরিপন্থী। তিনি শরীআতের বিধান মোতাবেক কিংবা শূরার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত খাতসমূহেই বায়তুল মালে রক্ষিত সম্পদ ব্যবহার করতে বাধ্য। এতে তার ব্যক্তিগত প্রাপ্য কতটুকু তাও শূরার সিদ্ধান্ত অনুসারে নিরূপিত হবে। প্রথম খলীফার মনোনয়নের পরে তাঁর জীবিকা নির্বাহের প্রশ্ন উঠে। তিনি বাজারে কাপড় বিক্রি করার জন্য কাপড়ের থান কাঁধে করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় হযরত উমার রা: এসে তাঁকে বায়তুল মালের তত্ত্বাবধায়ক হযরত আবু উবায়দা রা:-র নিকট নিয়ে এলেন। তিনি (উমার) বেতন নির্ধারণের নীতিমালা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:
“আমরা আপনার জন্য একজন সাধারণ মুহাজিরের স্বাভাবিক আয়ের পরিমাণ সামনে রেখে একটা ভাতা নির্ধারণ করেছি। তার পরিমাণ ‍তাদের সর্বাপেক্ষা বিত্তবানের সমানও হবে না এবং তাদের সর্বাপেক্ষা দরিদ্র ব্যক্তিরও সমান হবে না” ( কানযুল উম্মাল, ৫খ. হাদী ২২৮০)।
খলীফাতুর রসুল হযরত আবু বাকর রা:-র জন্য এই ভাতার পরিমাণ নির্ধারিত হল বার্ষিক চার হাজার দিরহাম। মৃত্যু শয্যায় তিনি গ্রহণকৃত সমস্ত বেতন ভাতাদি বায়তুল মালে ফেরত দেবার ব্যবস্থা করে যান এবং তা ফেরত দেওয়াও হয়। হযরত উমার রা: বায়তুল মালে খলীফার প্রাপ্য বর্ণনা প্রসঙ্গে পরিষ্কার বলেন: এক জোড়া গ্রীষ্মকালীন পোশাক, একজোড়া শীতকালীন পোশাক এবং কুরায়শদের মধ্যবিত্ত এক ব্যক্তির জীবিকার সমান বেতন ভাতাদি আমার পরিবারের জন্য বৈধ। এছাড়া আল্লাহর সম্পদ থেকে কোন কিছুই আমার জন্য হালাল নয়। অত:পর আমি একজন সাধারণ মুসলমান” ( ইবনে কাছীর,আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭খ. পৃ. ১৩৪)।
তিনি বায়তুল মালের যিম্মাদারী প্রসঙ্গে এই মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করেন, “আমি এই সম্পদের ব্যাপারে তিনটি বিষয় ছাড়া অন্য কিছুই সঠিক মনে করি না। ১) ন্যায়সঙ্গতভাবে গ্রহণ করতে হবে, ২) ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রদান করতে হবে, ৩) অন্যায়ভাবে ব্যয় হওয়া থেকে একে রক্ষা করতে হবে। তোমাদের সাথে আমার সম্পর্ক ইয়াতীমের সাথে তার অভিভাবকের সম্পর্কের মতই। আমি অভাবী না হলে তা থেকে কিছুই গ্রহণ করব না। যদি অভাবী হই তাহলে ন্যায়সঙ্গত পন্থায় ভোগ করব” (শিবলী নোমানী, আল-ফারুক,কিতাবুল খারাজের বরাতে)।
হযরত আলী রা: ও শায়খানের (হযরত আবু বাকর রা: ও হযরত উমার রা: সমপরিমাণ বেতন ভাতাদি গ্রহণ করতেন এবং অতিশয় অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা গোড়াতেই আলোচনা করেছি। এর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করা।
(আরবী***)
অর্থ: “তোমরা দীন কায়েম কর এবং এতে মতভেদ কর না” (সূরা শূরা:১৩)।
ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বিক শক্তি এবং তার প্রতিটি নাগরিকের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে:
(আরবী***)
“দীন সামগ্রিকভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হবে” (সূরা আনফাল:৩৯)।
শাসনকর্তা এই উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য কোন উদ্দেশ্য তার সামনে রাখতে পারেন না। নবী করীম সা: তাঁর স্থলাভিষিক্তদের এবং সমগ্র মুসলমানকে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দীনে এমন কোন কথা আবিষ্কার করবে যা তার মূলের সাথে সম্পর্কহীন তার সে কথা প্রত্যাখ্যাত” (মিশকাত: বাবুল ইতিসাম বিল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ)।
“যে ব্যক্তি কোন বিদআত উদ্ভাবনকারীকে সম্মান দেখা সে যেন ইসলামকে ধ্বংস করতে সাহায্য করল” ( মিশকাত বাবুল ইতিসাম বিল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ)।
এই হচ্ছে সেসব বাধ্যবাধকতা যা ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকের কর্তৃত্ব ও এখতিয়ারের উপর আরোপ করা হয়েছে। প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতার সাথে সাথে কুরআন, ‍সুন্নাহ, শূরা, শর্তযুক্ত আনুগত্য এবং উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকারের বাধ্যবাধকতার মজবুত শৃঙ্খলে আবদ্ধ একজন শাসক মৌলিক অধিকার খর্ব করার প্রয়াস চালাতে পারে- এমন ধারণা কেউ করতে পারে কি?

ঘ. নেতৃত্বের জবাবদিহি

সরকারের ধারণা, নেতৃত্বের পবিত্রতা এবং ক্ষমতা সীমিতকরণের সাথে সাথে ইসলাম রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির জবাবদিহির প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। জবাবদিহির উপায় উপকরণ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এবার জবাবদিহির (Accountability) বিষয়টি মূর্তিতে পুনর্বার ঝালাই করা যাক। তাতে জানা যাবে যে, ইসলাম রাষ্ট্র ও সরকারের উপর একজন সাধারণ নাগরিককে কতটা কর্ত্রিত্ব দান করেছে এবং একে প্রকৃত অর্থে ইসলামী জামহুরিয়া বা ইসলামী সাধারণতন্ত্র বানিয়েছে।

১. আখেরাতের জবাবদিহি

শাসকের উপর নির্ধারিত সর্বপ্রথম জবাবদিহির বিষয় হচ্ছে পরকালের ভয়। এই ভয় সর্বদা তার মন মগজ ও স্নায়ুমন্ডলীতে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করে রাখে। মহাজ্ঞানী, সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ, সব কিছুর প্রত্যক্ষকারী, সর্বত্র বিরাজমান মহান সত্তা আল্লাহ রব্বুল আলামীন আখেরাতে তার নিকট থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব নিকাশ গ্রহণ করবেন। দুনিয়াতেও তিনি বান্দার অতি নিকটে অবস্থান করছেন। এই রব্বুল আলামীন তাকে বলে দিচ্ছেন: “যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের কোন ভয় নেই, এবং তারা দু:খিতও হবে না। যারা তা প্রত্যখ্যান করে এবং আমার নিদর্শন সমূহ অস্বীকার করে তারাই দোযখী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে” (সূরা বাকারা: ৩৮-৩৯)।

“আকাশ মন্ডলীর ও পৃথিবীর সকলকেই দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হতে হবে বান্দারূপে” (সূরা মারইয়াম:৯৩)।
রসুলে করীম সা: এর বাণী: “তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষক ও পৃষ্ঠপোষক। আর তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ (স্বামী) তার পরিবার পরিজনের কর্তা। তাকে তার পরিবার পরিজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘর সংসার এবং সন্তানের রক্ষক। তাকেও সন্তান সন্তুতি সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে” ( হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা:-র বর্ণনায় বুখারী, মুসলিম)।
“কোন ব্যক্তি মুসলমানদের সামষ্টিক কর্মকান্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে তাতে প্রতারণা ও ‍জালিয়াতি করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন” (বুখারী, মুসলিম)।
“কোন ব্যক্তি মুসলিম জনগণের সর্ববিধ কার্যের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করার পর তাদের উন্নতি ও কল্যাণের ব্যবস্থা করে না এবং তাদের কাজকর্মের আঞ্জাম দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে এমনভাবে নিয়োজিত করে না, যেভাবে সে আপন কর্মে নিয়োজিত থাকে-আল্লাহ তাকে ‍উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন” ( তাবরানী, কিতাবুল খারাজ)।
আখেরাতের জবাবদিহির এই অনুভূতি এমন এক আভ্যন্তরীণ নিয়ামক শক্তি যা সর্বোতভাবে মানুষের সাথেই লেগে থাকে। নির্জনে ও প্রকাশ্যে কোথাও সে তার নাগাল ছাড়ে না এবং সর্বক্ষণ তার প্রকৃতি ও স্বভাবে আত্মসমালোচনার কাজ জাগ্রত রাখে। এই আভ্যন্তরীণ জবাবদিহির ধারণার বর্তমানে যদি কোন বাহ্যিক জবাবদিহি পয়দা নও হয় তবুও মানুষের পথভ্রষ্ট হওয়া এবং যুলুম ও অন্যায়ের পথে চলার কোন সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকে না। এই জবাবদিহির অনুভূতির অনিবার্য ফল এই ছিল যে, হযরত আবু বাকর রা:-র খিলাফতকালে হযরত উমার ফারুক রা: প্রধান বিচারপতির আসনে দুই বছর নিয়োজিত ছিলেন। অথচ তাঁর আদালতে একটি মোকদ্দমাও দায়ের করা হয়নি। কেননা সরকার প্রধানসহ সমাজের প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিই তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব এমন নিখুঁতভাবে পালন করেছিলেন যার ফলে কোথাও অধিকার সম্পর্কে কোন অভিযোগ উঠেনি।

২. আদালতের মাধ্যমে জবাবদিহি

ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্র প্রধানের আদালতের নিকট জবাবদিহি থেকে বাঁচার কোন রক্ষাকবচ নেই। একজন সাধারণ নাগরিকের মতই তাকে আদালতে তলব করা যাবে এবং একজন সাধারণ নাগরিক তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের করতে পারে।
“একবার খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার রা: এবং হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা:-র মাঝে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। হযরত উবাই রা: মদীনায় কাযী (বিচারক) হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা:-র আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত থেকে হযরত উমার রা: কে হাজির হওয়ার সমন জারী করা হল। তিনি যথাসময়ে হাজির হলেন। কিন্তু বাদী বিবাদী কারো কাছেই সাক্ষী ছিলনা। আইন অনুসারে আদালতের সামনে হযরত উমার রা:-র শপথ করার কথা। হযরত উবাই রা: দেখলেন, হযরত উমার রা: শপথ করতে প্রস্তুত, এখন তিনি তার অভিযোগ তুলে নেন” (সারাখসী, আল মাবসূত, মিসর ১৩৩১ হি. ২২ খ. পৃ. ৭৪)।
হযরত আলী রা: বাজারে এক খৃস্টানকে তার বর্মখানি বিক্রি করতে দেখলে তিনি তাকে বলেন, এ বর্মটি আমার। খৃস্টান অস্বীকার করায় তিনি কাযী শুরাইহ রা: এর আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। কাযী সাহেব হযরত আলী রা: র নিকট সাক্ষী তলব করেন। তিনি তা পেশ করতে অপারগ হন। কাজেই খৃস্টান ব্যক্তির পক্ষেই মামলার রায় দেওয়া হল। হযরত আলী রা: স্বয়ং এই রায় গ্রহণ করে বলেন, “শুরাইহ! তুমি সঠিক রায় দিয়েছ।” মামলার রায় শুনে খৃস্টান ব্যক্তি হতবাক হয়ে গেল। বাস্পরূদ্ধ কন্ঠে সে বলল, এতো পয়গম্বর সূলভ ন্যায় বিচার। আমীরুল মোমিনীনকেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় এবং তাঁকে নিজের বিপক্ষে রায় শুনতে হয়। প্রকৃতপক্ষে বর্মটি আমীরুল মুমিনীনেরই। এটা তার উটের পিঠ থেকে পড়ে গিয়েছিল। আমি তা উঠিয়ে নিয়েছিলাম” ( ইবনে আসাকির, তাহযীব তারীখ, দামিশক ১৩৪৯ হি. ৬খ. পৃ. ৩০৬)।
উমাইয়া শাসনামলেও আদালতের এই মর্যাদা অক্ষুন্ন ছিল। উতবী বলেন, আমি মদীনার কাযী মুহাম্মাদ ইবনে ইমরানের নিকট বসা ছিলাম। এমন সময়ে খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান উপদেষ্ঠা নিজের সাথে ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদকে নিয়ে আগমন করেন এবং বললেন, আমীরুল মুমিনীন তার ও ইবরাহীমের মধ্যকার সংঘটিত এক বিবাদে আমাকে উকীল নিযুক্ত করে আপনার আদালতে পাঠিয়েছেন। কাযী সাহেব বলেন, খলীফা আপনাকে উকীল নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন তার প্রমাণ পেশ করুন। তিনি বলেন, আপনি ভাবছেন, আমি ভুল বলছি? কাযী সাহেব বিনম্রভাবে বলেন, কথাতো এটা নয়, কথা হচ্ছে আইনের।যতক্ষণ সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া না ‍যাবে ততক্ষণ বিচার মীমাংসা করা যাবে না। তিনি ফিরে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে খলীফা হিশামকে অবহিত করেন। খলীফা স্বয়ং আদালতে হাজির হন এবং মামলার বিবরণী শুনানীর পর কাযী খলীফার বিপক্ষে রায় ঘোষণা করেন” (মাহদী মুহাম্মাদ মুরীদ, আল ইবহাসুস সিয়াসিয়া, তিতুয়ান ১৯৫১ খৃ. পৃ. ১৩২)।
“এই কাযী মুহাম্মাদ ইবনে ইমরানের আদালত থেকে খলীফা আবু জাফর আল মানসুরের নামে আরেকটি মামলার সমনজারি করা হয়েছিল। কতিপয় উপ মালিক তাদের অধিকার প্রসঙ্গে মামলা দায়ের করেছিল। কাযী সাহেব সমনে উল্লেখ করেছিলেন যে, হয় এসব লোকের অধিকার তাদের ফিরিয়ে দিন নতুবা আদালতের সামনে হাজির হোন। মসজিদে নববী সংলগ্ন আদালতের উন্মুক্ত চত্বরে খলীফা হাযির হলেন। মামলার শুনানীর পরে কাযী উট মালিকদের পক্ষে এবং খলীফার বিপক্ষে আদালতে রায় ঘোষণা করেন”(ঐ, পৃ.১৩২)
এসব উপমা দ্বারা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে একজন সাধারণ নাগরিক মামলা দায়ের করে সরকারের সর্বোচ্চ পদপর্যাদার অধিকারীকে অপরাধীর কাঠগড়ার দাঁড় করিয়ে নিজের অধিকার আদায় করতে পারে। সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিকেও তলব করার আদালতের এই এখতিয়ার শাসন বিভাগের উপর তাকে এতটা শক্তিশালী করে দিয়েছে যে, কেবলমাত্র আদালতে তলবের ‘ভয়’ই একটি কার্যকর মুহতাসিবের (সংশোধকের) ভূমিকা পালন করতে পারে এবং নাগরিকদের অধিকার বিপদগ্রস্থ হয় না।

৩. শূরার ( পরামর্শ সভা) মাধ্যমে জবাবদিহি

শূরার গুরুত্ব এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে। এখানে কেবল তার জবাবদিহি মূলক দিকটির আলোচনা উদ্দেশ্য। কোন বিষয়ে শাসক শূরার কাছে পরামর্শ চাইলে শূরা সদস্যদের শুধু ব্যক্তিগত অভিমত দেওয়াই তাদের কাজ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের তত্বাবধান করাও তাদের মূল কাজ। তারা জাতির মগজও এবং চক্ষুও। তাদের সতর্ক দৃষ্টি শাসনকর্তাকে সীমালংঘন থেকে এবং বায়তুল মালের (জাতীয় সম্পদ) আত্মসাৎ থেকে বিরত রাখতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক বিশেষ করে মুসলমানদের দায়িত্ব বরং আল্লাহ প্রদত্ত কর্তব্য এই যে, তারা সত্য কথা বলবে, কল্যাণের বিস্তার ঘটাবে, অসত কাজের প্রতিরোধ করবে এবং নিজের সমাজ দেহকে ন্যায়নিষ্ঠা ও ইনসাফের উপর কায়েম রাখার জন্য সম্ভাব্য সকল প্রচেষ্ঠা চালাবে। তবে এই ফরযটি সর্বাপেক্ষা গুরুতরভাবে শূরা সদস্যদের উপর বর্তায়। কেননা তাদের তো এই কাজের জন্যই নির্বাচন করা হয়ে থাকে। মুসলমানদের সামগ্রিক ব্যাপারে দেখাশোনা প্রসঙ্গে বিশেষভাবে তারা আল্লাহ ও রাসূলের নিম্নোক্ত নির্দেশে সম্বোধিত:
“সতকর্মে ও খোদাভীতিমূলক কাজে তোমরা পরষ্পরকে সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনমূলক কাজে একে অন্যের সাহায্য করবে না” (সূরা মায়িদা:২)
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল” (সূরা আহযাব: ৭০)।
“মুমিন নারী পুরুষ পরষ্পরের বন্ধু! তারা সতকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কার্য থেকে বিরত রাখে” (সূরা তওবা: ৭১)।
মহানবী সা: ইরশাদ করেন:
“তোমাদের কেউ যদি মন্দকাজ হতে দেখে সে যেন তা হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগে) বন্ধ করে। যদি হাতের দ্বারা (সরাসরি) বাধা দেওয়া সম্ভব না হয় তবে মুখের ভাষায় বাধা দেবে। এও যদি সম্ভব না হয় তবে সে যেন মনে মনে পরিকল্পনা করে এবং বিরত রাখার ইচ্ছা পোষণ করে। আর এ হচ্ছে ঈমানের দূর্বলতম স্তর” (মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ)।
“অত্যাচারী শাসকের সম্মুখে ন্যায়বাক্য (সত্য কথা) বলাই সর্বোত্তম জিহাদ” ( আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)।
“আমার পরে এমন কতিপয় (যালেম) শাসকের উদ্ভব হবে- যারা তাদের মিথ্যা কার্যকলাপে সহায়তা করবে এবং যুলুম নির্যাতনে তাদের মদদ যোগাবে, তারা আমার নয়, আমিও তাদের নই” (ইবনে মাজা)।
এক হিসাবে শাসনকর্তার উপরে শূরার কর্তৃত্ব রয়েছে। শাসনকর্তা শূরার পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য। কিন্তু তলব করলেই কেবল শূরার সদস্যবৃন্দ পরামর্শ দেবেন তা নয়, বরং প্রয়োজন অনুভব করলেই তারা শাসনকর্তাকে পরামর্শ দিতে পারেন। আবার যখন চাইবেন বাধা দিতেও পারেন। জনসমক্ষে তার সমালোচনা করতে পারেন। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে শাসকের পক্ষে কোন বিষয়েই মনগড়া কিছু করার অবকাশ নেই এবং কারো অধিকার খর্ব করা কিংবা কোন হকদারকে নিজের রোষানলে ‍আনারও অধিকার নেই।

৪. জনগণের কাছে জবাবদিহি

শাসনকর্তা ও শূরার সদস্যবৃন্দের নির্বাচনের পর ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকগণ রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকান্ডের ভার তাদের উপর নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে খোদ হাত গুটিয়ে নেবে- এই অবকাশ ইসলামী রাষ্ট্র দর্শনে নেই। এমনকি পরবর্তীতে নির্বাচন পর্যন্ত তারা যাচেছ তাই করতে থাকবে এই সুযোগও নেই। রাষ্ট্র যেহেতু সেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাপেক্ষা কার্যকর ও পর্যাপ্ত উপায় উপকরণ সম্বলিত শক্তি যার জন্য উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের জানমাল কোরবানী করেছে, তাই তারা তার রক্ষণাবেক্ষণ ও উদ্দেশ্য অর্জনের দিক দিয়ে ‍তার কর্মতৎপরতার মূল্যায়নের দায়িত্ব থেকে মুহুর্তের জন্য গাফিল থাকতে পারে না। তাদের কেবল অন্ন বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যাপারই নয়, বরং ইকামতে দীনের বিষয়টি তার চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম সমাজের প্রত্যেক সদস্য না তার মালিকানাধীন সীমিত উপকরণ সমূহ নিজের আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে অপচয় করে আত্মসাৎকারী দুষ্কৃতিকারী হতে পারে,আর না সে অন্যকে এমন কাজের অনুমতিও দিতে পারে যে, সে মুসলমানদের জাতীয় সম্পদ ও উপায়-উপকরণ খেল তামাশা ও বিলাসিতার ক্ষেত্রে ইচ্ছা মাফিক খরচ করে অর্পিত আমানতের খেয়ানত করতে থাকবে। জনগণের সম্পদের হেফাজতের ব্যাপারে দায়িত্বশীলতার অনুভূতি উজ্জীবিতকারী একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।
একবার হযরত উমার ফারুক রা: কোন এক মজলিসে ভাষন দিচ্ছিলেন। অনাড়ম্বর ও সাদাসিধা গোছের এই মানুষটির পরনে ছিল দুটো চাদর। হযরত সালমান ফারসী বলে উঠলেন, “হে সমবেত সুধী মন্ডলী! মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আল্লাহর রহমত আপনাদের উপর বর্ষিত হোক। তিনি প্রতিবাদী কন্ঠে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার আপনার ভাষণ শুনব না, আল্লাহর শপথ, আমরা আপনার ভাষণ শুনব না। হযরত উমার রা: কোমল কন্ঠে বললেন, হে আবু আবদুল্লাহ! কেন, কি হয়েছে? অভিযোগ আসলো, প্রথমে বলুন, প্রত্যেকের অংশে একটি করে য়ামানী চাদর জুটেছিল। আর আপনি দুটো চাদর পরিধান করে এখানে কি করে তাশরীফ আনলেন? হযরত উমার রা: তাঁর পুত্রের সাক্ষ্য প্রদান করিয়ে উপস্থিত জনতাকে শান্ত করলেন। আসলে একটি চাদর তাঁর পুত্র তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। এবারে হযরত সালমান ফারসী রা: বললেন, হাঁ, এখন আপনার বক্তব্য পেশ করুন। আমরা শুনব এবং অনুসরণ করব” ( উমার ইবনুল খাত্তাব) পৃ. ৩১২)।
একই ভাবে হযরত উমার ফারুক রা: একবার জাতির সমালোচনা শক্তির মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, হে লোক সকল! আমি যদি কোন ব্যাপারে শিথিলতা দেখাই তাহলে তোমরা কি করবে? এ কথা শোনামাত্র হযরত বিশর ইবনে সা’দ দাড়িয়ে যান এবং খাপ থেকে তলোয়ার কোষমুক্ত করে বলেন, “আমরা আপনার গর্দান উড়িয়ে দেব”। হযরত উমার রা: ধমক দিয়ে বলেন, “আমার উদ্দেশ্যে তুমি এমন কথা উচ্চারণ করতে পারলে! তিনি বলেন, জি, হাঁ, আপনার উদ্দেশ্যেই। হযরত উমার ফারুক রা: অত্যন্ত খুশী হয়ে বলেন, আল্লাহর জন্য সব প্রশংসা ( আলহামদুলিল্লাহ), জাতির মধ্যে এমন ব্যক্তিত্ব রয়েছে যারা বাঁকা পথে চললে আমাকে সোজা করতে সক্ষম” ( আল ফারুক, পৃ. ৫১১)।
হযরত উসমান রা: ও হযরত আলী রা:-র ও এই কর্মনীতি ছিল। হযরত উসমান রা: -র প্রতি তো সমালোচনার তীরবৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকে, কিন্তু তিনি উৎকোচ ( নাউযুবিল্লাহ) কিংবা ক্ষমতা প্রয়োগ করে কারও কন্ঠ রোধ করার চেষ্ঠা করেন নি। হযরত আলী রা:-কে খারিজীরা কত গালিগালাজ করেছে, এমনকি ‍সামনাসামনি তাঁকে হত্যারও হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তার প্রতিবাদ না করে বরং বলেন, মৌখিক বিরোধিতা এমন মারাত্মক অন্যায় নয় যার কারণে তাদের উপর হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে’ ( আল মাবসূত, ১০ খ. পৃ.১৩৫)।
জবাবদিহির এই নানাবিধ উপায় উপকরণ সাথে সাথে একথাও খেয়াল রাখা উচিত যে, ইসলাম জবাবদিহির সীমারেখাকে শুধুমাত্র সরকারী কার্যক্রমের মধ্যেই সীমিত রাখেনি, বরং ব্যক্তিগত কর্মকান্ডকেও এতে শামিল করে দিয়েছে। ভালমন্দ ও ন্যায় অন্যায় সম্পর্কে ইসলামের মৌলনীতি হচ্ছে: যে জিনিসটি সমগ্র জনতার জন্য মন্দ তা ব্যক্তি বিশেষের জন্যও মন্দ। অপকর্ম প্রকাশ্যভাবে করলেও যেমন অপরাধ গোপনে করলেও তা অপরাধ হিসাবে গন্য। অপরাধ অপরাধই। জনসমক্ষে মদ্যপান, জুয়াখেলা ইত্যাদি পুলিশী হস্তক্ষেপযোগ্য অপরাধ হলে, কোন হোটেলের সংরক্ষিত কক্ষে কিংবা কোন ক্লাবের রুদ্ধদার কক্ষে অথবা স্বয়ং আপন ঘরের নিভৃত কোণে বসে এই অপকর্ম করলে তাও পুলিশী হস্তক্ষেপযোগ্য অপরাধ বিবেচিত হবে। শরীআতের বিধান যেহেতু মানব জীবনকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত এই দুই ভাগে ভাগ করে নিজেকে কোন একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে বরং সম্পূর্ণ জীবনে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে।, তাই সে ব্যক্তিগত জীবনকে জবাবদিহির গন্ডি থেকে বের করে আত্মপূজার হাতে ধ্বংস হওয়ার খোলা অনুমতি দেয় নাই। এই মৌলনীতির ভিত্তিতে নবী করীম সা: খুলাফায়ে রাশেদীন এবং সাহাবায়ে কিরামের জীবন উন্মুক্ত পুস্তিকার মত বিশেষ ও সাধারণ সকলের সামনে সর্বত্র বিরাজমান ছিল।
ইসলামী সমাজের বুনিয়াদী দৃষ্টিভঙ্গী শাসন কর্তৃপক্ষের মর্যাদা, তার নির্বাচনের শর্তাবলী, তার এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা, তার আনুগত্যের সীমা এবং তার জবাবদিহির এসব উপায়-উপকরণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে অনুধাবন করা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ভিত কত মজবুত, সুদৃঢ় কার্যকর। যে মানব সম্প্রদায়ে এবং পৃথিবীর যে অঞ্চলে এসব গ্যারান্টি সহজলভ্য হবে তারা শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ‍সুখ্ স্বাচ্ছন্দের কতটা অতুলনীয় নিআমতের অধিকারী হয় তা ভেবে দেখার বিষয়।

ইসলামী ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর প্রতিষ্ঠিত ছিল?

ইসলামে মৌলিক অধিকারের এসব গ্যারান্টির পর্যালোচনা করতে গিয়ে যে কোন পাঠকের মনে এ কথা স্বাভাবিকভাবেই উদয় হতে পারে যে, এতটা মজবুত ও সর্বাত্মক গ্যারান্টি বিদ্যমান থাকতে এই দু:খজনক পরিস্থিতির প্রাদুর্ভাব কিভাবে হল যার ফলে ইসলামের এই অতুলনীয় ইনসাফভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা খিলাফতে রাশেদা তিরিশ বছরের বেশী সময় টিকতে পারল না।
এই সংক্ষিপ্ত কালের পরেই গণতন্ত্রের প্রাণ শক্তি শেষ হয়ে গেল। রাজতন্ত্রে সদর্পে তার আসন গেড়ে বসল, খলীফা নির্বাচনে জাতির কোন কার্যকর ভূমিকা থাকল না। বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র নির্বাচিত খিলাফতের স্থান দখল করে নিল। বায়তুল মাল আর মুসলমানদের আমানত থাকল না। তা শাসক শ্রেণীর ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হল। সংসদীয় ব্যবস্থা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চিরতরে খতম হয়ে গেল। গোত্রপ্রীতি ও আঞ্চলিকতার উন্মেষ ঘটল। হত্যাযজ্ঞ, খুনখারাবি এবং অন্যায় অত্যাচারের যাবতীয় পন্থা প্রকটিত হল- যা দুনিয়ার অন্য কোন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় থাকা সম্ভব ছিল। বানু উমাইয়া বানু আব্বাস, ও ততপরবর্তী মুসলিম শাসনামলে অহরহ এরূপ অসংখ্য ঘটনা ঘটতে লাগল যাকে নিছক যুলুম ছাড়া আর কোন নামে আখ্যায়িত করা যায় না। পরিশেষে এই দু:খজনক পরিবর্তনের কি ব্যাখ্যা
দেওয়া যেতে পারে? এই পরিবর্তন দ্বারা কি এটাই প্রমাণিত হয় না যে, ইসলাম শুধুমাত্র তিরিশ বছর কার্যকর থাকতে পেরেছিল, তারপর তা ব্যর্থ হয়ে গেছে?
আপাত: দৃষ্টিতে এই প্রশ্নটি খুবই যুক্তিসঙ্গত এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর আলোকে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু এটা মূলত: একটা ভুল বুঝাবুঝির উপর ভিত্তিশীল। যারা ইসলাম ও মুসলমানদের কর্মপন্থাকে একই জিনিস মনে করে তাদের মধ্যে এই ধরণের প্রশ্ন উত্থিত হয়। অথচ সত্য কথা এই যে, ইসলাম স্বয়ং একটা পৃথক সত্তার নাম। এর নীতিমালা ও আইন কানুন স্বস্থানে দলীল। মুসলমানদের কার্যকলপ ইসলামের মানদন্ড নয়, বরং তাদের কর্মপন্থাকেও ইসলামের কষ্টিপাথরে যাচাই করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে যে, সে কোন স্তরের মুসলমান এবং নিজের মুসলমান হওয়ার ‍দাবীতে কতটা সত্যবাদী। দুনিয়ার অন্যান্য জাতির সাথে মুসলমানদের তুলনা করা ঠিক নয়। তাদের পজিশন সঠিকভাবে উপলদ্ধি করলে মুসলমানদের কার্যকলাপকে ইসলামের ঘাড়ে চাপানোর কোন সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না।
পৃথিবীর অন্যান্য জাতি নিজ নিজ রাষ্ট্রে স্বয়ং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তাই তাদের রাজা-বাদশাদের জারীকৃত ফরমান, জাতীয় সংসদের প্রণীত আইন, শাসক গোষ্ঠীর জারীকৃত বিধান এবং আদালতের কৃত মীমাংসাকে সনদ ও দলীলরূপে গণ্য করা হয়। আমরা যেমন শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত আলোচনায় সবিস্তারে বিশ্লেষণ করে এসেছি যে, তাদের কাছে কার্যত: শাসকের অভিপ্রায়ের অপর নাম আইন; আইন স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত কোন জিনিস নয় এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এর অস্তিত্ব নেই। বলতে গেলে আইন তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার গোলাম। প্রচলিত আইন তাদের গথিপথে বাধা দিলে তারা তাকে রহিত করে কিংবা তদস্থলে সংশোধনী এনে অন্য আইন তৈরী করে নিজের পথ পরিষ্কার করে নেয়। পরে এই সংশোধিত অথবা নতুন আইনই দলীলের মর্যাদা পায়। পূর্বের আইন তিরোহিত অথবা অচল হয়ে যায়। আদালতেও এই আইনের কোন মর্যাদা অবশিষ্ট থাকে না। এখন থেকে নতুন আইনের বরাত দেওয়া হয়। অন্য কোন আইন প্রবর্তন না করা পর্যন্ত এই আইন বহাল থাকে। আইন প্রণয়নের এই তৎপরতা কেবল পুরো আইন ব্যবস্থাকেই অব্যাহত সংশোধন, রহিতকরণ, সীমিতকরণ ও মুলতবীকরণের চক্করে ব্যতিব্যস্ত রাখে না, বরং আইনকে কার্যকর ও অকার্যকর হওয়ার সনদও প্রদান করে এবং এই সার্বিক ততপরতায় কোন পর্যায়ই আইন প্রণয়নকারী আইন ভঙ্গকারী বিবেচিত হয় না। আদালত তাদের বাতিলকৃত আইন এক পাশে রেখে দেয় এবং তার জারীকৃত নতুন আইনের আওতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করতে থাকে।
পক্ষান্তরে ইসলামে না আছে কোন মুসলিম প্রশাসকের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, আর না আছে সামগ্রিকভাবে গোটা জাতির। তাদের আইন প্রণয়নের এখতিয়ার কুরআন-সুন্নাহর অনুশাসন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, ইসলামের পরিপন্থী আইন প্রবর্তন করেছে কিংবা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের হেদায়েতেরে বিপরীত আদর্শ প্রতিষ্ঠার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে তারা বিশ্বাসঘাতক, বিদ্রোহী ও আইন ভঙ্গকারী হিসাবে অভিহিত হয়েছে। তারা অন্যদের তুলনায় মুসলমানদের কাছে ঘৃণার পাত্র এবং প্রকৃতপক্ষে মুসলমানরা তাদের সাথে এই ধরণের আচরণই করে আসছেন। তাদের প্রবর্তিত আইন ও অধ্যাদেশ কখনই ইসলামী বিধি বিধানের অংশ হিসাবে বিবেচিত হয়নি। তাদের রচিত এই আইন কখনও দলীল হিসেবে স্বীকৃত হয়নি।
তাদের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব শরীআতের বিধানকে অণূ পরিমাণও পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়নি। কারণ এই আইন নিজের স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে সক্ষম এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে এর অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম। মুসলমানরা শুধুমাত্র শরীআতের বিধানের অনুসারী শাসকবর্গের সিদ্ধান্তকে নজীর হিসাবে নিয়েছে। তারা বানু উমাইয়ার মধ্যে কেবলমাত্র হযরত উমার ইবনে আব্দুল আযীয রহ: এর নির্দেশমালা ও মীমাংসা সমূহকে দলীল হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং বানু আব্বাসের কোন শাসককে এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত বলে স্বীকার করেন নি। মোঘল শাসকদের মধ্যে শুধুমাত্র বাদশাহ আওরংগযেব আলমগীরের পৃষ্ঠপোষকতায় সংকলিত “ফতোয়ায়ে আলমগীরী”-কে ফিকহের (আইনের) নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তার পূর্ববর্তী মহান পুরুষ আকবরের প্রবর্তিত দীনে ইলাহীকে তার যুগে রহিত করে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হয়। ইসলামের চৌদ্দশত বছরব্যাপী ইতিহাসে রাজা-বাদশাহও একনায়কদের রচিত আইন কানুনকে কখনো শাসনতান্ত্রিক মর্যাদাসম্পন্ন মনে করা হয়নি। অর্থাৎ জনগণের কাছে তাদের সৃষ্টি আইন শাসনতান্ত্রিক বিধান হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা রহ. ইমাম মালিক রহ. ইমাম শাফিঈ রহ. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ এর মত খেজুর পাতার মাদুরে উপবেশনকারীদের কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে রচিত আইন সংকলন গ্রন্থসমূহ সার্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তাদের প্রণীত ফিকহগুলো আইনের মর্যাদা পেয়েছে এবং আজও সারা বিশ্বের মুসলমান প্রধানত এই চার মাযহাবের অনুসারী। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ উপমহাদেশে এই আইন (ফিকহ শাস্ত্র) আদালতের কানুন হিসাবে পরিগণিত ছিল এবং ব্রিটিশদের রাজত্বকালেও মুসলমানদের ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে এই ফিকহ কার্যকর ছিল। মোট কথা ইতিহাসের কোন যুগেই শরীআতী আইন মুহুর্তের জন্যও রহিত কিংবা স্থগিত হয়নি। স্বয়ং বাদশাহ ছিলেন এই আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাদের সত্তা অর্থাৎ ব্যক্তিগত অভিমত কখনো আইনের উৎস হিসাবে মর্যাদা পায়নি। তাদের মধ্যে কেউ সম্রাট আকবরের ন্যায় শরীআতী আইনের মুকাবিলায় কোন “দীনে ইলাহী” আবিষ্কার করার এবং তা বল প্রয়োগে বাস্তবায়নের চেষ্ঠা করে শেষাবধি কৃতকার্য হতে পারেনি। তার (আকবরের) রচিত আইন তার মৃত্যুর সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করে। মুসলিম মিল্লাত একে কখনো শরীআতী আইনের সাথে যোগ করার অনুমতি দেয়নি।
খিলাফতে রাশেদার পরে প্রশাসনিক কাঠামোতে নি:সন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি খিলাফত ও আমানত বিদায় নিল। প্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃত্ব ব্যক্তিগত (রাজতান্ত্রিক) কর্তৃত্বে পরিণত হল। অত:পর অন্যায়-অবিচার ও যুলুম নির্যাতনের সেই সুদীর্ঘ ধারার সূচনা হল যা ইতিহাসের কোন ছাত্রের দৃষ্টির অন্তরালে নয়। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কিভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে যে, ইসলাম ব্যর্থ হয়েছে? ইতিহাসের রেকর্ড ইসলামের ব্যর্থতার নয়, বরং মুসলমানদের কোন গোষ্ঠীর আপত্তিকর বা লজ্জাকর কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত ইসলামের ব্যর্থতা কিভাবে সাব্যস্ত করা যেতে পারে? আর এর দ্বারা কিভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের যে গ্যারান্টি প্রদান করেছে ‍তা তিরিশ বছর পরে অকার্যকর হয়ে গেছে? পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম বিশ্বাস, মতবাদ, দৃষ্টিভঙ্গী, নীতিমালা, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের প্রভাবশীল বা প্রভাবহীন হওয়া মূলত: ঈমান ও আকীদার দৃঢ়তা ও তদনুযায়ী কাজ করার বাধ্যবাধকতার উপর নির্ভরশীল। এটা কোন ব্যবস্থা ও মতবাদের প্রভাব ও ফলাফলকে বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত। মজবুত আকীদার মজবুতী ও বাস্তব কর্মের বাধ্যবাধকতার এই মৌলিক শর্ত পূরণ ব্যতিরেকে কোন ব্যবস্থা অথবা জীবনের মূলনীতি নিজের প্রভাবের প্রদর্শনী করতে পারে না। সত্য নিষ্ঠা সর্বোতভাবে জীবনের কেটি সর্বোত্তম নীতি। কিন্তু বাস্তবে সত্য কথন ব্যতিরেকে আমরা কি এর উপকারিতা ও কল্যাণ লাভ করতে পারি? যদি তা না হয় তাহলে- মিথ্যার প্রসার এবং অধিকাংশের সত্য বিমুখ হওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা কি ঠিক হবে যে, সততার নীতি অকার্যকর ও প্রভাবহীন হয়ে গেছে, কেননা সংখ্যাগরিষ্ট জনতাকে সে তার অনুসারী রাখতে অপারগ হয়ে পড়েছে? আর তাই বলে কি আমরা সত্যকে ত্যাগ করার পরামর্শ দেব যে, মানব গোষ্ঠীর অধিকাংশই এর অনুসরণ করছে না? অথবা সত্য ত্যাগীরা কি তিরষ্কারযোগ্য ও অপরাধী ‍সাব্যস্ত হবে না? প্রত্যেক হুশিয়ার ও সচেতন ব্যক্তি এই সংখ্যাগরিষ্টদের কি এই পরামর্শই প্রদান করবে না যে, বাহ্যত: মিথ্যা প্রভাবশালী প্রতীয়মান হলেও তা ত্যাগ করতে এবং সত্যকে গ্রহণ করে তাকে প্রভাবশালী বানাতে হবে?
মানুষের ঈমান এবং তার সচেতন সংকল্প ও কার্যক্রমই মূলত: নীতিমাল ও মতাদর্শকে প্রভাবশালী করার হাতিয়ার। এই ঈমান ও কর্মের মহামূল্যবান সম্পদ ব্যতিরেকে যে কোন নীতি ও মতাদর্শের শব্দ সম্ভারের সমষ্টি ছাড়া আর কোন মূল্য নেই। বৃটেনের অলিখিত সংবিধানকে একটি দৃষ্টান্তমূলক গণতান্ত্রিক সংবিধান মনে করা হয়। কিন্তু এই সংবিধানের শব্দ সম্ভারে কি স্বয়ং এই শক্তি ও প্রভাব আছে যে, তা আফ্রিকা অথবা এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত করলে অনুরূপভাবে কার্যকর, উপকারী ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হবে, যেমনটি বৃটেনে ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে? যদি তাই না হয় তবে ব্যর্থতার দায় দায়িত্ব কার কাঁধে চাপবে? সংবিধানের, না সেই জাতির ঘাড়ে চাপবে যারা নিজেদের কার্যকলাপ দ্বারা একে ব্যর্থ করে দিয়েছে?
কোন জীবন দর্শনের ব্যর্থতা ও তদনুযায়ী কার্যক্রম সম্পাদনে ব্যর্থতা দুটি পৃথক জিনিস যাকে পরষ্পরের সাথে একাকার করে ফেলা সমীচীন নয়। আমরা কোন ব্যবস্থার ব্যর্থতা শুধুমাত্র তখনই বলতে পারি যখন নিম্নের প্রশ্নগুলোর কোন একটির ইতিবাচক জবাব দেখতে পাব:
১. অভিজ্ঞতা কি একে ত্রুটিপূর্ণ ও অকেজো প্রমাণ করেছে?
২. মানুষের উন্নততর জ্ঞান ও চেতনা কি এর পেশকৃত নীতিমালা আবিষ্কার করতে পেরেছে?
৪. ইতিহাসের সুদীর্ঘ পরিক্রমা কি একে বাতিল্ এবং ব্যবহারের অনুপযোগী প্রমাণ করতে পেরেছে?
৫. এর অবয়ব কি এতটা বিকৃত হয়ে গেছে যে, বর্তমানে সঠিক ও ভুলকে পরষ্পর বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়?
ইসলামের ক্ষেত্রে উপরোক্ত কোন প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দেওয়া যেতে পারে না। ইসলাম অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার দ্বারা পৃথিবীর অন্যান্য জীবন ব্যবস্থার উপর নিজের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইসলামের বিপরীতে নতুন বা পুরাতন এমন কোন্ জীবন দর্শন আছে যা নিজের কার্যকারিতার তিরিশ বছর সময়সীমায় ন্যায় ইনসাফ, সাম্য ও কল্যাণের এমন মহান বিপ্লব সাধন করতে পেরেছে? এই বৈশিষ্ট্য কেবল ইসলামেরই রয়েছে যা দীর্ঘ ত্রিশ বছর ব্যাপী নিজেদের প্রাণশক্তি ও শিক্ষা ব্যবস্থা সহ কেবল প্রতিষ্ঠিতই থাকেনি, বরং নিজের পরিপূর্ণতার শীর্ষে উন্নীত হয়েছে। দুনিয়ার কোন জীবন দর্শনই যমীনের বুকে স্বীয় আদর্শসহ এক মুহুর্তের জন্য কার্যকর হতে পারেনি। কোন জীবন দর্শনের বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তিরিশ বছর সময়কাল কিছু কম নয়। এই পরীক্ষাকালীন সময়ে ইসলামের কোন্ নীতিমালাটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে? কোন দোষ বা ত্রুটি ধরা পড়ে থাকলে সেটা কি? বাস্তবে ‍মানুষ কি এর চাইতে কোন উন্নত জীবন দর্শন আবিষ্কার করতে পেরেছে? আমরা এই পুস্তকে ইসলাম ও অন্যান্য জীবন দর্শনের মূল্যায়ন করে দেখিয়াছি যে, মানবিক জ্ঞান এ পর্যন্ত যা কিছু পেশ করতে পেরেছে ইসলামের তুলনায় তার অবস্থান কোথায়? ইসলামকে স্বয়ং তার আরোপিত শর্তাবলী মোতাবেক কার্যকর করা হয়েছে তখনই মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় খিলাফতে রাশেদার সামগ্রিক সৌন্দর্য পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে এবং ইসলাম তার আসল চেহারার সমুজ্জল হয়েছে। খিলাফতে রাশেদার পরে মুসলমানদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে নিকৃষ্টতার সূত্রপাত হয়েছিল আমরা ইতিপূর্বে তার উল্লেখ করেছি। কিন্তু সর্বপ্রকার বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় সত্ত্বেও খিলাফতে রাশেদার প্রায় ষাট বছর পরে যখন হযরত উমার ইবন আবদুল আযীয রহ: সিংহাসনে অধিষ্টিত হন এবং তিনি ‍রাজতন্ত্রের সব নিদর্শনের মুলোতৎপাটন করে ইসলামকে তা আসল প্রাণশক্তি সহ পুনরুজ্জীবিত করার দৃঢ় সংকল্প করলেন তখন গোটা সমাজের চেহারা পাল্টে গেল। ইসলামী বিপ্লব তার পূর্ণ দ্বীপ্তি সহ সম্পূর্ণ নতুনভাবে উজ্জীবিত হল এবং খিলাফতে রাশেদার যুগ ফিরে এল। এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম ব্যর্থ হয়ে যায়নি, বরং মুসলমানরা এবং বিশেষ করে তাদের শাসকগোষ্ঠী তদনুযায়ী জীবন যাপন করতে আলস্য ও উদাসীনতার শিকার হয়ে পড়েছিল। তিনি দীর্ঘ ষাট বছর পর সংষ্কারের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলেন এবং ইসলামকে পরীক্ষা করলে পূর্ববৎ খাঁটি, বলিষ্ট এবং ফলাফলের দিক থেকে কার্যকর প্রমাণিত হল, যেমন খিলাফতে রাশেদার ‍আমলে প্রমাণিত হয়েছিল। দীর্ঘ তের শত বছর পরে সায়্যিদ আহমাদ শহীদ রহ: যখন পেশোয়ারে নিজের স্বল্পস্থায়ী ইসলামী রাষ্ট্রে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন তখনও তা (ইসলাম) নিজের সার্বিক ব্যাপকতা ও পরিপূর্ণতাসহ বাস্তব রূপ লাভ করল এবং এর কোন বিধান অপ্রচলিত ও অকেজো প্রমাণিত হয়নি।
ইসলাম প্রসঙ্গে এরূপ ধারণা করা সংগত নয় যে, তার শিক্ষা বিকৃত হয়ে গেছে এবং সঠিক ও ভ্রান্তকে পৃথক করা সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআন তার প্রতি অক্ষরের বিশুদ্ধতাসহ সংরক্ষিত আছে। হযরত নবী করীম সা: এর পবিত্র জীবনের প্রতিটি ঘটনা, তার প্রতিটি কথা ও কাজ এমনভাবে সংরক্ষিত আছে যে, পৃথিবীর অন্য কোন ব্যক্তিত্বের এমন ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ অবস্থার বিবরণ বর্তমান নেই। খিলাফতে রাশেদার শাসনকাল দর্শণের ন্যায় ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান রয়েছে।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আজ পর্যন্ত ইসলামী আইনের সংকলনের যত কাজ হয়েছে তা কোনরূপ হ্রাসবৃদ্ধি ছাড়াই সংরক্ষিত আছে। তাছাড়া জীবনের প্রতিটি শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বর্তমান যুগের যাবতীয় সমস্যার সবিস্তার সমাধান ইসলামী সাহিত্যে বিদ্যমান আছে। কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে ইসলামের পথ নির্দেশ জানতে চাইলে তাকে উক্ত বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে কোন অসুবিধা হবে না। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং তার নীতিমালা ও আইনকানুন আজও আমাদের সামনে সম্পূর্ণ সুষ্পষ্ট আকারে বিদ্যমান রয়েছে। এর কোন অংশ বিকৃত এবং কোন দিক অষ্পষ্ট হয়ে যায়নি। যাকে আমরা ইসলাম বলে জানি তা যে কোন দোষ ত্রুটিমুক্ত রূপেই সুদীর্ঘ চৌদ্দশত বছর ধরে অব্যাহতভাবে ইতিহাসের রাজপথ বেয়ে আমাদের সাথে সাথেই চলে আসছে। এই সুদীর্ঘ সফরে মুসলমানরা কখনো ইসলামের অতি কাছাকাছি অবস্থান করেছিল আবার কখনো দূরে সরে পড়েছে। কিন্তু কখনো এরূপ হয়নি যে, ইসলাম মাত্র তিরিশ বছর টিকে ছিল। তবে বাস্তবিকপক্ষে এতটুকু বলা যায় যে, মুসলমানরা মনে প্রাণে একাগ্রতার সাথে তিরিশ বছর ইসলামের অনুসারে করেছে। পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি প্রবেশ করতে থাকে এবং অধ:পতনের নানা রাস্তা খুলে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল এই বিচ্যুতির ফলে ইসলামের বিশুদ্ধতায় কি প্রভাব পড়েছে? কি কারণে তা অকার্যকর প্রমাণিত হল? মুসলমানদের ইতিহাসে কোন রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের বিদ্যমান থাকায় কি আজ সঠিক ইসলাম অনুযায়ী পথ চলতে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে? আমরা কি ওজর পেশের অধিকার রাখি যে, আমাদের ইতিহাসে ‍হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ও হাসান ইবনে সাব্বাহর ন্যায় লোক মাঝখানে এসে পড়ায় খেলাফতে রাশেদার সেই পারষ্পরিক সম্পর্কের সাথে আমীর-ওমরা ও রাজা-বাদশাহদের কার্যকলাপের কি সম্পর্ক আছে? মুসলমানরা তাদের সঙ্গে কখনো মানসিক পথ প্রদর্শনের সম্পর্ক স্থাপন করেনি। একজন সাধারণ মুসলমান তো তাদের নামও জানে না, তাদের জারীকৃত বিধান ও অধ্যাদেশ সমূহ আলোচনার যোগ্য মনে করে নি, কিংবা কোন প্রসঙ্গে তা বরাত হিসাবে উল্লেখেরও যোগ্য মনে করেনি। মুসলমানদের শিশুরা পর্যন্ত খুলাফায়ে রাশেদীন, প্রবীণ সাহাবায়ে কিরাম রা:, চার মাযহাবের চার ইমাম- আবু হানীফা রহ., মালিক রহ. শাফিঈ রহ. আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ইমাম বুখারী রহ. ইমাম ইবনে তায়মিয়া রহ. ইমাম গাযালী রহ. ‍শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. সহ অন্যান্য মুসলিম চিন্তা নায়কদের নাম সম্পর্কে ভালো করেই অবগত। কেননা এইসব ব্যক্তিত্ব নবীযুগ থেকে আজ পর্যন্তকার ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানদের তাদের ধর্মীয় উত্তরাধিকার স্থানান্তর করতে এবং ইসলামের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সাথে গভীর সম্পর্ক রাখেন। তাদের বদৌলতে ইসলামের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক এক মুহুর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন হয়নি, আর না ইসলাম সমকালীন সমস্যার সমাধান পেশ করা থেকে পশ্চাৎপদ হয়েছে। সে তো প্রতিটি যুগেই মুসলমানদের জীবনের সামগ্রিক ব্যাপারে পরিপূর্ণভাবে পথ নির্দেশ দান করে সামনে অগ্রসর হচ্ছে।
আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে “ইসলাম তিরিশ বছরের অধিক চলতে পারেনি” এই অভিযোগের মূল্যায়ন করা যাক। এই আপত্তি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার সীমা পর্যন্ত এবং তাও আবার আংশিকভাবে ঠিক। কিন্তু মুসলমানদের সাধারণ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন হামেশা ইসলামের অনুগতই ছিল। তাদের নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক,শিক্ষাগত, পারিবারিক,সাংস্কৃতিক ও বিচার বিভাগীয়….. জীবনে ইসলামের আইনই বলবৎ থাকে। তাদের রাজনৈতিক জীবনও ইসলাম থেকে একেবারে সম্পর্কহীন ছিল না।
ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতি কখনো এমনভাবে পৃথক হয়নি যেভাবে ইউরোপে চার্চ ও রাষ্ট্র পরষ্পর আলাদা হয়ে গেছে। ইউরোপে চার্চের প্রাধান্য লোপ পেলে রাষ্ট্র ধর্মকে সামষ্টিক জীবন থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্বাসিত করে তাকে ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত সীমিত করে দিয়েছে। তখন থেকে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ধর্মীয় অনুশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকল না। ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের দর্শন একে ধর্মের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিয়েছে।
পক্ষান্তরে ঔপনিবেশিক যুগের পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানদের পুরো ইতিহাস খুঁজলেও এমন একটি উদাহরণ পাওয়া যাবে না যেখানে কোন বাদশাহ কিংবা শাসনকর্তা ইসলামী বিধানকে পূর্ণরূপে অকেজো করে স্বয়ং নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত আইন বাস্তবায়ন করে থাকবে। মুসলিম রাজা-বাদশাহ্গণ ইসলামী আইনের বিপরীত আচরণ অবশ্যি করেছেন, কিন্তু আইনকে মসজিদ ও মাদরাসার দায়িত্বে অর্পণ করে তারা তা থেকে কখনো সম্পর্কহীন হননি। ইসলামী আইনই ছিল তাদের রাষ্ট্রীয় আইন এবং জীবনের সর্বস্তরে বিচার বিভাগীয় মীমাংসা শরীআত মোতাবেক সম্পন্ন হত। এই রাজা-বাদশাহদের সকলেই অত্যাচারী, স্বৈরাচারী ও বিলাস ব্যসনে আসক্ত ছিলেন না। এঁদের মধ্যে নাসিরুদ্দীন মাহমূদ এবং আওরঙ্গযেব আলমগীরের নামও উল্লেখযোগ্য। তাঁরা রাজকোষকে নিজেদের জন্য হারাম মনে করতেন এবং বৈধ উপায়ে জীবিকার্জনের জন্য নিজ হাতে টুপি সেলাই ও কুরআন শরীফ নকল করতেন।
তাদের অধিকাংশই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং আল্লাহ ও সৃষ্টির কাছে জবাবদিহির ভয়ে ভীত। তাদের কার্যকলাপে ইসলামের গভীর প্রভাব বিদ্যমান ছিল। নি:সন্দেহে তারা সমসাময়িক অমুসলিম শাসকদের চাইতে শ্রেষ্ঠতর ছিলেন। যেহেতু আমরা তাদেরকে খিলাফতে রাশেদার মানদন্ডে যাচাই করে ‍থাকি তাই তারা আমাদের দৃষ্টিতে উত্তীর্ণ হন না। কিন্তু সমসাময়িক অমুসলিম শাসকবর্গ ও তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে এঁদের ও এঁদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার তুলনা করলে তাদের পজিশন একেবারেই বদলে যায়।
উপরোক্ত আলোচনায় সুষ্পষ্টভাবে প্রতিভাত হচ্ছে যে, “ইসলাম তিরিশ বছরের বেশি টিকে থাকেনি” এরূপ অভিযোগ ঠিক নয়। অবশ্য এতটুকু বলা যেতে পারে যে, ত্রিশ বছর পরে মুসলিম উম্মাহ ইসলামকে তাদের বাস্তব জীবনে খিলাফতে রাশেদার সমতলে বহাল রাখতে পারেনি। কিন্তু আমরা অভিযোগকারীদের সামনে আমাদের এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, আজ যদি ইসলামকে তার প্রকৃত অবয়বে বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা হয় তাহলে তাতে বাঁধা কিসের? স্বয়ং ইসলাম, না ক্ষমতালোভী ব্যক্তিবর্গের অসৎ উদ্দেশ্য?
পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদ এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত মুসলমানদের পক্ষ থেকে ইসলামের ব্যর্থতা সম্পর্কে আরো একটি আপত্তি উত্থাপন করা হয় যে, প্রথম যুগে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচার বিভাগীয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ গড়ে উঠেনি অথবা তা এতটা পূর্ণাঙ্গ কাঠামো লাভ করতে পারেনি যে, তার উপর ভিত্তি করে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কোন সুষ্পষ্ট কাঠামো সামনে আসতে পারে। ইসলামী সমাজ তার গঠনের দিক থেকে গোত্রীয় প্রকৃতির তুলনামূলক উন্নত সমাজ ছিল যেখানে গোত্রীয় নেতার স্থলে খলীফা কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভ করেছিলেন। ব্যক্তিগত ধরণের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দেশের কর্তৃত্ব এক ব্যক্তির হাতে ছিল যিনি মসজিদের বারান্দায় বসে রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকান্ড আঞ্জাম দিতেন, গণীমতের মাল বণ্টন করতেন, প্রাদেশিক গর্ভণর ও সামরিক কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারী করতেন, তাদের রিপোর্টসমূহ সংগ্রহ করতেন এবং তাদের চিঠিপত্রের জবাব লিখিয়ে দিতেন, তাদের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা করে দিতেন, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ লোকদের অভিযোগ সমূহ শুনতেন এবং তাদের দূর্দশা লাঘব করতেন, তাদের পারষ্পরিক ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা করতেন,আইন বিষয়ক সমস্যার ক্ষেত্রে তাদের পথ নির্দেশ দিতেন। সাধারণ লোকেরা সরাসরি খলীফার কাছে যেতে পারত। তাই তারা তাদের ছোট বড় সমস্যা নিয়ে খলীফার দরবারে হাযির হত এবং তিনি তাদের সুষ্ঠু সমাধান দিতেন। এমনিভাবে খলীফার ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভ করে। ক্ষমতা বণ্টনের পরিবর্তে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার এই কার্য স্বায়ত্বশাসিত ও আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব তিরোহিত করে দেয়। খুলাফায়ে রাশেদীন যেহেতু অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, নির্মল চরিত্র, পবিত্র, নিরপেক্ষ ও আল্লাহ ভীতিতে পরিশোভিত রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন তাই তাদের শাসনামলে সমস্ত কর্মকান্ড যথার্থভাবে চলছিল। কিন্তু তাদের পরবর্তীতে যখন শাসকবর্গের মধ্যে সেই নি:স্বার্থপরতা, উন্নত চরিত্র ও পবিত্রতা বাকী থাকেনি তখন এ ব্যবস্থা- যা সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পারেনি, অতি দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হল এবং তাতে নানা ধরণের ত্রুটি অনুপ্রবেশ করল। এমন অভিযোগ উত্থাপন অজ্ঞতার চাইতে পক্ষপাতিত্বের উপরই অধিক ভিত্তিশীল। আর উক্ত অভিযোগের আসল ক্রিয়াশীল শক্তি হচ্ছে পাশ্চাত্যের এই আকাংখা যে, মানবাধিকারের ধারণা, মানবাধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং গণতন্ত্রের দর্শণের মত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রতিষ্ঠাতা যেন তারাই হতে পারে। অন্যথায় প্রকৃত সত্য এই যে, খিলাফতে রাশেদা বিশেষ করে হযরত উমার ফারুক রা: এর আমলে ইসলামী রাষ্ট্রের বুনিয়াদসমূহ সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো লাভ করে এবং উমাইয়া ও আব্বাসী রাজবংশের শাসনামলে এই প্রতিষ্ঠানসমূহ আরও বিস্তার লাভ করে।

ইসলাম প্রদত্ত মৌলিক অধিকার

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের যেসব মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে প্রথমে আমরা সেই সব অধিকার প্রসংগে আলোচনা করব যা আকীদা বিশ্বাস ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী নির্বিশেষে মানুষ হিসাবে সমস্ত নাগরিককে সমভাবে দেয়া হয়েছে। এরপরে মুসলিম ও অমুসলিমদের বিশেষ অধিকার সমূহের মূল্যায়ন করব।

১. জীবনের নিরাপত্তা

ইসলাম মানবজীবনকে একান্তই সম্মানের বস্তু হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং একটি মানুষের জীবন সংহারকে সমগ্র মানবগোষ্ঠীর হত্যার সমতুল্য সাব্যস্ত করে জীবনের নিরাপত্তার গুরুত্বের প্রতি যতটা জোর দিয়েছে তার নজীর পৃথিবীর কোন ধর্মীয়, নৈতিক কিংবা আইন শাস্ত্রীয় সাহিত্যে কোথাও মিলে না। মহান আল্লাহর বাণী:
أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
অর্থ: “নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল” (সূরা মায়িদা:৩২)
সূরা বনী ইসরাঈলে ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা কর না” (সূরা বনী ইসরাঈল:৩৩)।
ইসলামী আইন ‘কতল বিল হাক্ব’ (সংগত কারণে হত্যা) ছয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে:
১. ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার অপরাধীকে তার অপরাধের প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করা ( কিসাস)।
২. জিহাদের ময়দানে সত্য দীনের পথে প্রতিবন্ধকতা ‍সৃষ্টিকারীদের হত্যা করা।
৩. ইসলামের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পতনের চেষ্টায় লিপ্তদের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা।
৪. বিবাহিত নারী-পুরুষকে ব্যভিচারের অপরাধে হত্যা কর।
৫. ধর্মত্যাগের অপরাধে হত্যা করা।
৬. ডাকাত অর্থাৎ রাজপথে রাহাজানি ইত্যাদি অপরাধের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা।
এই ছয়টি কারণ ছাড়া অন্য কোন কারণে মানুষের প্রাণের মর্যাদা বিনষ্ট হয় না।
কুরআনুল করীমের সূরা আনআমের ১৫২ নং আয়াত, বাকারার ১৭৮ ও ১৭৯ নং আয়াত এবং সূরা ফুরকানের ৬৮ নং আয়াতে এতদসম্পর্কিত নির্দেশ রয়েছে। মহান আল্লাহ ‘হত্যা’ কে এমন গুরুতর ও জঘন্য অপরাধ সাব্যস্ত করেছেন যে, এই অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ইহকালে কিসাসের শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও আখেরাতে জাহান্নামী হবে। উপরন্তু সে মহান আল্লাহর গযব ও চরম অভিসম্পাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا [٤:٩٣]
অর্থ: “এবং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, যেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার প্রতি আল্লাহর গযব ও অভিসম্পাত এবং তিনি তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন” ( সূরা নিসা:৯৩)।
কুরআন মজীদে দূর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদের হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
(আরবী***)
অর্থ: “দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না। আমিই তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করি এবং বিশেষত তাদেরও ( সূরা আনআম:১৫১)।
অনুরূপ উপদেশ সূরা বনী ইসরাঈলের ৩১ নং আয়াত ও সূরা আনআমের ১৪০ নং আয়াতেও দেওয়া হয়েছে। জাহিলী যুগে আরব দেশে কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়ার অমানুষিক প্রথা প্রচলিত ছিল। এই জঘন্য অপকর্মের জন্য পরকালের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ইংগিত দিয়ে অত্যন্ত ভয়ংকার বাচনভঙ্গীতে ইরশাদ হচ্ছে:
(আরবী***)
অর্থ: “যখন জীবন্ত প্রোথিত কণ্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল” (সূরা তাকবীর:৮-৯)।
আল্লাহ তাআলা কেবল অপরকে হত্যা করাই নিষিদ্ধ করেননি, বরং তিনি মানুষকে নিজের জীবন ধ্বংস না করারও নির্দেশ দিয়েছেন এবং এভাবে আত্মহত্যার পথও বন্ধ করে দিয়েছেন।
(আরবী***)
অর্থ: “তোমরা আত্মহত্যা কর না” (সূরা নিসা: ২৯)।
জীবনের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনের এইসব সুষ্পষ্ট বিধানের পর এখন নবী করীম সা: এর বাণী সমূহ ও তাঁর কল্যাণময় যুগের কতিপয় ঘটনা লক্ষণীয়। বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
“হে লোক সকল! তোমাদের জানমাল ও ইজ্জত আবরুর উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের উপর হারাম করা হল। তোমাদের আজকের এই দিন, এই (জিলহজ্জ) মাস এবং এই শহর (মক্কাশরীফ) যেমন পবিত্র ও সম্মানিত, অনুরূপভাবে উপরোক্ত জিনিসগুলোও সম্মানিত ও পবিত্র। সাবধান! আমার তোমরা পরষ্পরের হন্তা হয়ে কাফেরদের দলভূক্ত হয়ে যেও না যেন” (বুখারী, আবু দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ)
অত:পর তিনি তাঁর এই নসীহত কার্যকর করতে গিয়ে সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বলেন:
“জাহিলী যুগের যাবতীয় হত্যা রহিত হল। প্রথম যে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ আমি রহিত করলাম তা হচ্ছে আমার বংশের রবীআ ইবনুল হারিস এর দুগ্ধপোষ্য শিশু হত্যার প্রতিশোধ, যাকে হুযাইল গোত্রের লোকেরা হত্যা করেছিল। আজ আমি তা ক্ষমা করে দিলাম’ ( বুখারী, আবু দাউদ, নাসাঈ, ও মুসনাদে আহমাদ)।
মহানবী সা: একবার বলেছিলেন:
“কোন মুসলিম ব্যক্তির নিহত হওয়ার তুলনায় সমগ্র পৃথিবীর পতন আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ব্যাপার” (মুসলিম)।
কেবল মুসলমানের জীবনই সম্মানিত নয়; আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার জীবনই সম্মানিত। কোন মুসলমানের হাতে অন্যায়ভাবে কোন যিম্মী নিহত হলে সেই মুসলমানের জন্য জান্নাত হারাম। এই পর্যায়ে নবী করীম সা : বলেন: “যে ব্যক্তি কোন যিম্মীকে হত্যা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন” (নাসাঈ)।
“যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ কোন অমুসলিমকে হত্যা করল সে কখনো জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না” ( বুখারী)।
একবার কোন এক যুদ্ধে মুশরিকদের কতিপয় শিশু আক্রমণের পাল্লায় নিহত হয়। এতে মহানবী সা: অত্যন্ত মর্মাহত হন। কোন কোন সাহাবী আরয করলেন, এরা তো মুশরিকদের সন্তান। তিনি বলেন: “মুশরিক শিশুরাও তোমাদের চাইতে উত্তম। সাবধান! শিশুদের হত্যা কর না, সাবধান! শিশুদের হত্যা কর না। প্রতিটি জীবন আল্লাহর নির্ধারিত ফিতরতে ( সৎ স্বভাব নিয়ে) জন্মগ্রহণ করে থাকে” (মুসনাদে আহমাদ)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: খেকে বর্ণিত আছে যে, নববী যুগে এক ব্যক্তির মৃত দেহ পাওয়া গেল, কিন্তু হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া গেল না। মহানবী সা: চরম অসন্তোষ অবস্থায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন: “হে লোক সকল! ব্যাপার কি, আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকতে মানুষ নিহত হচ্ছে এবং তার হত্যাকারীর পরিচয় মিলছে না! একজন মানুষকে হত্যা করার জন্য আসমান জমীনের সমগ্র সৃষ্টিও যদি একত্র হয়ে যায় তবুও আল্লাহ এদের সকলকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না” (তাবারানী)।
কোন এক যুদ্ধে একটি স্ত্রীলোক নিহত হয়। মহানবী সা: তার লাশ দেখে বলেন, আহ! তোমরা এ কি কাজ করলে? সে তো যোদ্ধাদের মধ্যে শামিল ছিল না। যাও সেনাপতি খালিদকে বলে দাও যে, নারী, শিশু ও দূর্বলদের হত্যা কর না”( আবু উবায়েদ, কিতাবুল আমওয়াল, অনু: আবদুর রহমান তাহের, ইসলামাবাদ ১৯৬৯ খৃ. ১ম খ. পৃ. ১৫৮)।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার নজীরবিহীন ঘটনা থেকে আমরা যথার্থই অনুমান করতে পারি যে, মানুষের প্রাণের মূল্য এবং এতদসংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামের অনুসৃত কর্মপন্থা ছিল কত উন্নত। তখনও কাফেররা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছি, মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তাদের সাথে একটি হামলাকারী দেশের সৈন্যদের মত আচরণ দেখানো হয়েছিল।
বদরের যুদ্ধবন্ধী কাফেরদের সম্পর্কে হযরত আবু বাকর সিদ্দীক রা: মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। পক্ষান্তরে হযরত উমার রা: এদের হত্যার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। হযরত উমার রা:-র রায়ের অনুকূলে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হল:
“দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরকালের কল্যাণ, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ সে জন্য তোমাদের প্রতি মহাশান্তি আপতিত হত” ( আনফাল: ৬৭-৬৮)।
মক্কা বিজয়ের পর কাফেরদের অবস্থার আমূল পরিবর্তন সূচিত হল। তাদের রাজত্ব খতম হয়ে গেল। পরিসমাপ্তি ঘটালো তাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকারও। সর্বোপরি তারা বিজিত অঞ্চলের অধিবাসীদের ন্যায় ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে সাধারণ নাগরিকে পরিণত হল এবং মহান আল্লাহর অভিপ্রায় অনুসারে নতশিরে বশ্যতা স্বীকার করল।
(আরবী***)
অর্থ: “যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে স্বহস্তে জিয্য়া দেয়” ( সূরা তওবা:২৯)।
তাই মহানবী সা: আল্লাহর পক্ষ থেকে মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে মক্কা বিজয়পূর্ব পরিপূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যুদ্ধাবস্থায়ই নিজ রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তার অসাধারণ ব্যবস্থা অবলম্বন করেন।
মক্কা ছিল মহানবী সা: এর প্রাণের শত্রু এবং ইসলামের ঘোর বিরোধীদের আড্ডা। এখানে সেইসব লোক বাস করত যারা প্রতি পদে তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত, তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের নানাভাবে কষ্ট দিত, তাঁকে আবু তালিব গিরিসংকটে দীর্ঘ তিনটি বছর অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তাঁকে হত্যা জঘন্য ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল এবং তিনি মাতৃভূমির মায়া বিসর্জন দিয়ে সুদূর মদীনায় পৌঁছলে সেখানেও তাঁকে শান্তিতে বসবাস করতে দেয়নি। তারা মদীনার উপরে বারংবার হামলা চালিয়েছিল। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে তারা রসূলে করীম সা: এর নিবেদিত প্রাণ অনেক ‍সাহাবীকে শহীদ করেছিল এবং স্বয়ং তাঁকেও আহত করেছিল। যে সব সাহাবী মক্কা থেকে হিজরত করে ইয়ামান, সিরিয়া, আবিসিনিয়া ও নজদ এ আশ্রয় নিয়েছিলেন ওরা সেখানেও তাদের পেছনে লেগে থাকে। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রসুল সা: এর চাচা হযরত হামযা রা:-র হত্যকারী ওয়াহশী, তাঁর বক্ষ বিদারণ করে কলিজা চর্বণকারী হিন্দ, ইকরামা ইবনে আবু জাহল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, কাব ইবনে যুহায়র এবং এদের মত অসংখ্য ইসলাম দুশমন শহরে বর্তমান ছিল। মহানবী সা: আজ এদের এক একটি অপকর্মের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নিতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রাণভিক্ষা দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত ফরমান জারী করেন:
১. যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে তাদের হত্যা করবে না;
২. যে ব্যক্তি কাবা ঘরের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না;
৩. যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না;
৪. যে ব্যক্তি নিজের বাড়ীতে বসে থাকবে তাকে হত্যা করবে না;
৫. যে ব্যক্তি হাকীম ইবনে হিযামের বাড়িতে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না;
৬. পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া করবে না;
৭. আহত ব্যক্তিকে হত্যা করবে না।
মক্কা বিজয়ের পরে কাবার প্রাঙ্গণে জমায়েত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন:
“তোমরা কি জান আজ আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব?”
জনসমুদ্র থেকে সমস্বরে ধ্বনিত হল, “আপনি একজন সম্ভ্রান্ত ভাই এবং সম্ভ্রান্ত ভাইয়ের সন্তান।” মহানবী সা: জবাবে বলেন: “আজ তোমাদের উপর আমার কোন প্রতিশোধ স্পৃহা নেই, যাও তোমরা সবাই মুক্ত স্বাধীন” (কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মনসুরপুরী, রহমাতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ১১৮)।
মক্কা মুআযযমায় তিনি ক্ষমা ও অনুগ্রহের যে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন পরবর্তীকালে তা ইসলামের যুদ্ধনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, মিসর এবং রোমের যত অঞ্চল বিজিত হয়েছে সেগুলোতেও জয়লাভের পরে অনুরূপভাবে খুন-খারাবী ও রক্তপাত পরিহার করা হয়েছিল। হযরত আবু বাকর রা: হযরত উমার রা: হযরত উসমান রা: এবং হযরত আলী রা: তাদের সেনাধ্যক্ষ ও প্রাদেশিক গভর্ণরদেরকে এই প্রসঙ্গে যেসব নির্দেশনা ও ফরমান জারী করেছিলেন সেগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবেই অনুমিত হয় যে, এসব বিজয়ের উপর মক্কা বিজয়ের ‍সাধারণ ক্ষমার কার্যকরী প্রভাব বিদ্যমান ছিল।
জীবনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে- কখন থেকে এর প্রয়োগ হবে? পৃথিবীর সাধারণ আইনে ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকে প্রাণের নিরাপত্তার অধিকার কার্যকর হয়। কিন্তু আল্লাহর আইনে মাতৃ উদরে গর্ভ সঞ্চার হওয়ার পর থেকেই প্রাণের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই কারণে মহানবী সা: গামেদ গোত্রের এক নারীকে ব্যভিচারের সুষ্পষ্ট স্বীকারোক্তি স্বত্বেও হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন নি। কেননা সে ‍তার জবানবন্দীতে নিজেকে গর্ভবতী ব্যক্ত করে। অত:পর সন্তান প্রসব ও দুগ্ধ পানের সময় সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাকে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি কার্যকর করলে অন্যায়ভাবে সন্তানের প্রাণ নাশের আশংকা ছিল। ইসলামী আইন বিশারদগণ সন্তান গর্ভধারণের ১২০ দিনের মাথায় প্রাণের নিরাপত্তার অধিকার ধার্য করেছেন। কেননা এই সময়সীমায় গর্ভ সঞ্চার গোশত পিন্ডে রূপান্তরিত হয়ে মানুষের আকৃতি ধারণ করতে শুরু করে এবং তার উপর “মানু” পরিভাষা প্রযোজ্য হয়। আমাদের ফকীহগণের এই অভিমত শত সহস্র বছর পর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও স্বীকার করে নিয়েছে। আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট রো বনাম ওয়েড এর বিখ্যাত মামলায় আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যের বরাতে রায় দিয়েছে যে, মাতৃগর্ভে “মানব অস্তিত্ব” কে গর্ভ ধারণের তিন মাস পরে আইনত: স্বীকার করে নিতে হবে ( আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টের প্রতিবেদন, অক্টোবর ১৯৭২ খৃ, নিউইয়র্ক ১৯৭৪ খৃ, পৃ. ১৪৭)।

২. মালিকানার নিরাপত্তা

ইসলামী রাষ্ট্রে হালাল উপায়ে অর্জিত ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা স্বীকৃত। তবে এক্ষেত্রে শরীআত নির্ধারিত সমস্ত অধিকার ও কর্তব্য যেমন যাকাত, দান-খয়রাত, মাতাপিতা, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন, ভাই বোন ও অন্যান্য নিকট আত্মীয়ের লালন পালন ও যত্নের ব্যয়ভার ও দায়িত্ব বহন করতে হবে, উত্তরাধিকার স্বত্ব ক্রয় বিক্রয়ের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, প্রশাসন ব্যবস্থা, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান সমূহ, জরুরী অবস্থা, যেমন যুদ্ধ বিগ্রহ, দূর্ভিক্ষ, প্লাবন, ভূমিকম্প, মহামারী ইত্যাদি খাতের ব্যয়ভার বহনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক ধার্যকৃত স্থায়ী ও সামরিক প্রকৃতির কর পরিশোধ করতে হবে। অধিকন্তু এই সম্পদ হারাম ও অবৈধ খাতসমূহে ব্যয় করা যাবে না। এসব শর্তাধীনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে সম্পদের মালিকানা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং সম্পদের সংশ্লিষ্ট মালিক নিম্নোক্ত অধিকার সমূহ ভোগ করবে:
ক) ভোগ ব্যবহারের অধিকার;
খ) অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ করার অধিকার;
গ) সম্পদের ‍মালিকানা হস্তান্তরের অধিকার এবং
ঘ) মালিকানা স্বত্ব রক্ষার অধিকার।
এ প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমের স্পষ্ট নির্দেশ:
(আরবী***)
“তোমরা পরষ্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কর না” (সূরা বাকারা: ১৮৮)।
সরকার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি সামগ্রিক স্বার্থে নিজের ‍হাতে নিয়ে নেওয়া ( হুকুম দখলের) প্রয়োজন মনে করলে মালিকের সম্মতিতে উপযুক্ত মূল্য প্রদান সাপেক্ষে তা গ্রহণ করতে পারবে। মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণের জন্য মহানবী সা: য