মক্কার পথ

জিহাদ

এক

আমি যখন নবীর মসজিদ থেকে বের হচ্ছি তখন একিট হাত বন্দী করলো আমার একটি হাত; আমি মাথা ঘুররিয়ে সেনুসি নেতা সিদি মুহাম্মদ আজজুবাইয়ের সদয় প্রবীণ চোখের মুকাবিলা হলাম।

-‘বাবা, তোমাকে দীর্ঘ ক’মাস  পরে দেখে কতো যে খুশী হয়েছি! নবীর এই আশিসপূত নগরীতে তোমার পদক্ষেপের উপর আল্লাহর আশিসপুত বর্ষিত হোক।.. .

মসজিদ থেকে প্রধান বাজারে দিকে যে নুড়ি বিছানো রাস্তাটি গিয়েছে আমরা ধীরে ধীরে হাতে হাত ধরে হাঁটি সেই পথে। উত্তর আফ্রিকার আরব এবং বারবারেরা মাথায় পাগাড়সহ যে চৌগা পরে সেই চৌগা পরা সিদি মুহাম্মদ মদীনায় একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। এখানে তিনি বাস করছে কয়েক বছর ধরে। আমরা যখন আগাচ্ছি তখন বহু মানুষই আমাদের পথে থামাচ্ছে তাঁকে অভিবাদন জানানোর জন্য । এই অভিবাদন কেবল তাঁর সত্তর বছর বয়সের প্রতি তাযিমের জন্য, লিবিয়ার বীরোচিত আযাদী সংগ্রামের একজন নেতা হিসাবে তাঁর খ্যাতির জন্যও।

-‘বাবা আমি তোমাকে জানাতে চাই, সৈয়দ আহমদ মদীনায় রয়েছে। তাঁর স্বাস্থ্য ভাল যাচ্ছে না। তোমাকে দেখলে তিনি খুবই খুশি হবেন। তুমি কতদিন থাকবে এখানে?’

-‘কেবল আসছে পরশু পর্যন্ত,’ আমি জবাব দিই, ‘কিন্তু সৈয়দ আহমদকে না দেখে আমি নিশ্চয় যাবো না। চলুন, আমরা এখুনি তাঁর কাছে যাই।

-গোটা আরব এমন কোনো লাক নেই যাকে আমি সৈয়দ আহমদের চেয়ে বেশি  ভালোবাসিঃ কারণ, তিনি যে রকম সম্পূর্ণভাবে, যে-রকম নিঃস্বার্থভাবে একটি আদর্শের জন্য নিজেকে কুরবান করেছেন সে রকম কুরবান করেছে এমন কোনো মানুষই খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তিনি একজন পণ্ডিত এবং যোদ্ধা। তিনি তাঁর গোটা জীবনকে নিয়োজিত করেছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মিক পুনরুজ্জীবনের জন্য এবং তাঁর রাজনৈতিক আযাদীর সংগ্রামে-কারণ তিনি ভালোই জানেন, এর একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কতো স্পষ্টই না আমার মনে পড়ছে বহু বছর আগে মক্কার সৈয়দ আহমদের সাথে আমার প্রথম মুলাকাতের কথা.. .

পবিত্র নগরীর উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আবু কুবাইস পাহাড়- বহু প্রাচীন উপকথাও ইতিকথার কেন্দ্র। এছাড়া , যেখানে মুকুটের মতো রয়েছে দুটি নিচু মীনার সম্বলিত একটি ছোট্ট চুনকাম করা মসজিদ, সেখান থেকি নীচের দিকে তাকালে একটি চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে মক্কা উপত্যকার, যার ঠিক তলদেশেই রয়েছে বর্গাকার কা’বার মসজিদ এবং বার্ণাঢ্য, ইতস্তত ছড়ানো রংগশালার মতো ঘরবাড়ি, যা সকল দিকে পাহাড়ের নগন্ন শিলাময় ঢালু বেয়ে যেনো উঠে আসছে উপরের দিকে। আবু কুরাইস পাহাড়ের চূড়ার নীচেই রয়েছে এক সারি পাতুরে দালান, যা সংকীর্ণ সমতল খাঁজ থেকে ঝুলছে এক গুচ্ছ ঈগলে নীড়ের মতোঃ সেনুসি ভ্রাতৃ-সংঘের মক্কী কেন্দ্র।  এখানে যে  বৃদ্ধ লোকটির সাথে আমি মুলাকাত করি, তাঁর নাম সারা মুসলিম জগতে মহশুরঃ মহান সেনুসি সৈয়দ আহমদঃ িএখানে তিনি একজন নির্বাসিত ব্যক্তি। দীর্ঘ ৩০ বছরের সংগ্রাম এবং কৃষ্ণসাগর ও ইয়েমেনের পর্বতগুলির মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর সাত বছর ছুটাছুটির পর সাইরেনিকায় তাঁর নিজের ফিরে আসার সকল পথ দেওয়া হয়েছে বন্ধ করে। আর কোনো নামই উত্তর আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসকদের অতো বিনিদ্র রজনীর কারণ ছিলো না । এমন কি, উনিশ শতকের আলজিরিয়ার মহান আবদুল কাদিরের নামও নয়, কিংবা মরোক্কোর আবদুল করিমের নাম পর্যন্ত নয়, যিনি ফরাসী শাসকদের বুকের ভেতরে একটা প্রচন্ড কাঁটার মতো ছিলেন অধিকতরো সাম্পতিক-কালে। এই নামগুলি মুসলমানদের কাছে যতো অবিস্মরণীয় হোক, এঁদের কেবল রাজনৈতিক তাৎপর্যই ছিলো। কিন্তু সৈয়দ আহমদের নেতৃত্ব এবং তাঁর তরীকা বহু বছর ধরে কাজ করেছে একটা বিপুল আধ্যাত্মিক শক্তি হিসাবে।

তাঁর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন আমার জাভার বন্ধু হাজী অজোস সালিম। ইন্দোনেশিয়াতে রাজনৈতিক আযাদীর জন্য যে লড়াই  চলছিলো তাতে একজন নেতার মর্যাদা ছিরো হাজী সালিমের। তিনি মক্কায় এসেছিলেন হজ্জ করতে। সৈয়দ আহমদ যখন শুনরেন আমি সম্প্রতি ইসলাম কুবল করেছি তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নরম যবানে বললেনঃ

-‘আমার তরুণ ভাই, তোমাকে খোশ আমদেদ তোমার ভাইদের মধ্যে.. .।’

ধর্ম এবং আযাদীরজন্য আপোসহীন যোদ্ধা, যিনি আগিয়ে চলেছেন বার্ধক্যের দিকে, তাঁর সুন্দর ভ্রূ-জোড়ার উপর খোদিত দেখতে পেরাম দুঃখ –যন্ত্রণার ছাপ। সামান্য সাদা দাড়ি এবং যন্ত্র্যণা-চিহ্ণিত গভীর রেখার মধ্যে ইন্দ্রিয়গতভাবে সুচতুর মুখের অধিকারী সাঈদ আহমদের মুখমণ্ডল ছিলো ক্লান্ত। চোখের পাতা একান্তভাবেই ঝুলে আ ছে চোখের উপর, যার জন্য মনে হয় চোখ দুটি যেনো ঘুমে ঢুলছে। তাঁর কণ্ঠস্বরের ধ্বনিও দুঃখ- বেদনায় একই রমক মোলায়েম ও ভারাক্রান্ত। কিন্তু কখনো কখনো তার মধ্যে হঠাৎ উদ্দীপনা জেগে ওঠে; তখন চোখ দুটি তাঁর হয়ে ওঠে জ্বলজ্বললে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয় প্রসাদগুণ, সংগীতের কম্পন এবং তাঁর সাদা চৌগার ভাঁজের ভেতর থেকে উর্ধ্বে উত্থিত হয় একটি বাহু, ঈগলের ডানার মতো!

তিনি এমন একটি ভাবাদর্শ , এমন একটি মিশনের উত্তরধিকারী যা কার্যে পরিণত হলে হয়তো বা আধুনিক ইসলামে একটি পুনরুজ্জীবন ঘটতোঃ বয়সের এবং অসুস্থতা সত্ত্বেও এবং তাঁর জীবননের উদ্দেশ্য বানচাল হলেও উত্তর আফ্রিকার এই মহান বীর তাঁর উজ্বল দীপ্তি হারাননি। তাঁর ছিলো সেই অধিকার হতাশ না হও্য়ার। তিনি জানতেন, ইসলামের সত্যিকার মর্মানুযায়ী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের আকাংখা-যা সেনুসি আন্দোলনের লক্ষ্য মুসলিম জাতিগুলির হৃদয় থেকে কখনো তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

.. ..                .. ..                  .. ..

সাঈদ আহমদের দাদা ছিলেন মাহন আলজিরীয় পণ্ডিত মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সেনুসি,(উপনামটি বানু সেনুস গোত্র থেকে গৃহীত, যে গোত্রে জন্ম হয়েছিলো তাঁর) যিনি এই শতকের প্রথমার্ধে স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ইসলামী ভ্রাতৃসমাজের যা একদিন সত্যিকার এক ইসলামী কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেবে। বহু বছর  বহু আরব দেশে ঘুরে বেড়ানো ও পড়াশোনার পর  মুহাম্মদ ইবনে আলী সেনুসি তরীকার প্রথম ‘জাভিয়া’ বা মোকাম স্থাপন করেন মক্কায় আবু কুবাইস পাহাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হেজাজের বেদুঈনদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক অনুসারী পেয়ে যান। অবশ্য তিনি মক্কায় বসে থাকলেন না, তিনি ফিরে গেলেন উত্তর আফ্রিকায়, শেষ পর্যন্ত সাইরেনিকা ও মিসরের মধ্যবর্তী মরুভূমিতে অবস্থিত যাগবু নামক এক মরূদ্যানে, স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। ওখান থেকেই তাঁর বাণী বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো সারা লিবিয়াতে এবং লিবিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে। তিনি যখন ১৮৫৯ সালে ইন্তেকাল করেন, তখন সেনুসিদের (এই তরীকার সকল লোকই এই নামে পরিচিতি হয়ে ওঠে) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক বিশাল রাষ্ট্র-ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে শুরু করে বিষুব অঞ্চলের আফ্রিকার গভীরে এবং আলজিরীয় সাহারার তুয়ারেগ নামক অঞ্চল অবধি।

অবশ্য ‘স্টেট’ বা রাষ্ট শব্দটি দ্বারা এই অনুপম সৃষ্টির নিখুঁত বর্ণনা হয় না, কারণ মহান সেনুসি কখনো তাঁর নিজের জন্য কিংবা তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ব্যক্তিগত শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাননি; তাঁর লক্ষ্য ছিলো ইসলামের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি সাংগঠনিক বুনিয়াদ তৈরি করা। তাঁর এই লক্ষ্যের স্বার্থেই তিনি ঐ এলাকায় চিরাচরিত গোত্রীয় কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্য কিছুই করলেন না। এমনকি, লিবিয়ার উপর তুর্কী সুলতানাতের নামমাত্র প্রভুত্বকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করেননি-তুর্কীর সুলতানকেই তিনি ইসলামের খলীফা বলে মেনে নিতে থাকেন- তিনি তাঁর সমস্ত প্রয়াস নিয়োজিত করলেন বেদুঈনদের ইসলামের মূল শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে, যা থেকে ওরা দূরে সরে গিয়েছিলো অতীতে, এবং তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সেই উপলব্ধি আনতে যা ছিলো কুরআনের লক্ষ্য, কিন্তু বহু তকের গোত্রীয় দ্বন্ধ সংঘর্ষের ফলে লোপ পেয়েছিলো বহুলাংশে। উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র যে বিপুল সংখ্য জাভিয়া গড়ে উঠলো সেনুসিয়া সেগুলি থেকে তাদের বাণী বহন করে নিয়ে গেলো বৃহত্তম অঞ্চলের গোত্রগুলির কাছে এবং কয়েক যুগের মধ্যেই প্রায় এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনে দিলো আরব ও বারবার, উভয়ের মধ্যে। ধীরে ধীরে অতীতের আন্তগোত্রীয় অরাজকতার অবসান ঘটলো এবং মরুভূমির এককালের উচ্ছৃংখল যোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়ে ‍উঠলো পারস্পরিক সহায্যের আন্তরিকতায়, এতোকাল তাদের নিকট যা অপরিচিত। জাভিয়াগুলিতে তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পেলো-কেবল ইসলামী শিক্ষা নয়, বহু ব্যবহারিক শিল্প এবং হাতের কাজেও , যা আগে নিন্দার চোখে দেখতো যুদ্ধবাজ যাযাবরেরা। শত শত বছর ধরে যেসব এলাকা ছিলো বন্ধ্যা সেসব অঞ্চলে আরো বেশি এবং আরো উন্নত ধরনের কুয়া খনন করতে ওদের উৎসাহিত করা হলো, আর সেনুসি পরিচালনায় ধূসর মরুভূমির বুকে সমৃদ্ধশালী বসতি গড়ে ‍উঠতে লাগলো, দূরে দূরে, একেকটি বিন্দুর মতো। তেজারতিকে  উৎসাহ দেওয়া হলো এবং সেনুসি ব্যবস্থার ফলে যে শান্তি-শৃংখলা এলো তার ফলে সে-সব অঞ্চলেও সফর সম্ভব হলো  যেখানে অতীতে কোনো কাফেলার পক্ষেই আগানো ছিলো অসম্ভব লুণ্ঠিত  না  হয়ে। সংক্ষেপে, এই তরীকার প্রভাব সভ্যতা এবং প্রগতির জন্য এক প্রচণ্ড প্রেরণা হয়ে দাঁড়ালো; অন্যদিকে, ওদের অনঢ় ধর্মনিষ্ঠা, পৃথিবীর এ অংশের লোকদের অতীতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে এই নতুন সমাজের নৈতিক মানকে তা থেকে উন্নীত করলো অনেক উপরে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ, গোত্র এবং গোত্রের সর্দারেরা স্বেচ্ছায় মেনে নিলো মহান সেনুসির রূহানী নেতৃত্ব; এমনকি, লিবিয়ার উপকূলভাগের শহরগুলির তুর্কী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত দেকতে পেলো, এ তরীকার নৈতিক নেতৃত্বের ফলে তাদের পক্ষে এককালের ‘দুর্ধর্ষ ’বেদুঈন গোত্রগুলির সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অনেক বেশি সহজ হয়েছে।

এভাবে, একদিকে যেমন এ তরীকা তার প্রয়াসকে কেন্দ্রীভূত করলো স্থানীয় লোকদের পরিচালনা-ক্ষমতা থেকে আলাদা করা প্রায অসম্ভব হয়ে ‍উঠলো। সেনুসি তরীকার এই ক্ষমতার ভিত্তি ছিলো ধর্মীয় ব্যাপারে সরল বেদুঈন এবং উত্তর আফ্রিকার তুয়ারেগদেব কিছুকাল আগেকার বন্ধ্যা অনুষ্ঠান-সর্বস্বতা থেকে মুক্ত করে তাদের জাগ্রত করার সামর্থ্য, ইসলামের মর্মবাণীর সাথে সত্যিকার সংগতি রেখে জীবন-যাপন করবার বাসনায় ওদের অন্তর কানায় কানায় ভরে দেবার ক্ষমতা এবং ওদের মধ্যে, ওরা সকলেই যে আযাদী, মানবিক মর্যাদা ও ভ্রাতৃত্বের জন্য কাজ করছে এ ‍উপলব্ধি সৃষ্টির কৃতিত্ব। রাসূলের সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের কোথাও এমন ব্যাপক আকারের কোনো আন্দোলন আর দেখা যায়নি, যা এই সেনুসি আন্দোলনের মতো ইসলামী জীবন পদ্ধতির এতোটা নিকট, এতোটা কাছাকাছি পৌছেছিলো!

এই শান্তিপূর্ণ যুগ উনিশ শতকের শেষ কোয়ার্টারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো যখন ফ্রান্স দক্ষিণদিকে আগাতে শুরু করলো আলজিরিয়া থেকে বিষুব আফ্রিকার দিকে, আর ধাপে ধাপে দখল করতে লাগলো সেসব অঞ্চল , যা আগে স্বাধীন ছিলো এ তরীকার নেতৃত্বে। ওদের এই আযাদী  রক্ষা করতে গিয়ে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার পুত্র এবং উত্তরাধিকারী মুহাম্মদ আল মাহাদী তরবারী ধারণ  করতে বাধ্য হন- তাঁর পক্ষে সে তরবারী আর কখনো সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সংগ্রাম ছিলো সত্যিকার ইসলামী ‘জিহাদ’, আত্মরক্ষার জন্য এক যুদ্ধ, যার বর্ণনা করা হয়েছে কুরআনে এভাবেঃ

আল্লাহর পথে তোমরা সংগ্রাম করো তাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করে তোমাদের বিরুদ্ধে; কিন্তু তোমরা নিজেরা হয়ো না আগ্রাসনকারী, কারণ নিশ্চয় আল্লাহ আগ্রাসনকারীদের পছন্দ করেন না.. . যুদ্ধ করো তাদের বিরুদ্ধে যতক্ষণ না অত্যাচার নির্মূল হয়েছে এবং সকল মানুষ অবাধে আল্লাহর ইবাদত করতে পারছে। কিন্তু ওরা যদি বিরত হয়, বন্ধ করতে হবে সকল শত্রুতা.. .।

কিনতু ফরাসীরা ক্ষান্ত হয়নি। ওরা ওদের বেয়নটের মাথায় ত্রিবর্ণ রঞ্জিত ঝাণ্ডা বহন করে নিয়ে গেরো গভীর হতে আরো গভীরে-মুসলিম দেশগুলির ভেতরে।

মুহাম্মদ আল মাহদী যখন ইন্তেকাল করলেন ১৯০২ সালে, তখন তাঁর ভাতিজা সৈয়দ আহমদ তাঁর স্থলে এই তরীকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। উনিশ বছর বয়স থেকে , তাঁর চাচার জীবৎকালে এবং পরে যখন তিনি নিজেই হলেন মহান সেনুসি, একটানা যুদ্ধ করে চললেন, এখন যাকে ফরাসী বিষুব আফ্রিকা বলা হয়, সে অঞ্চরে, ফরাসী অনুপ্রবেশে বিরুদ্ধে। ইতালীয়ানরা যখন ১৯১১ সানে ত্রিপলীতানিয়া এবং সাইরেনিকা অবরোধ করে তখন তাঁকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয় দুই ফ্রন্টে। এই নতুন এবং অধিকতরো চাপ তাঁকে তাঁর প্রধান মনোযোগ উত্তর দিকে ফেরাতে বাধ্য করলো। তুর্কীদের সংগে পাশাপাশি এবং পরে তুর্কী কর্তৃক লিবিয়া পরিত্যক্ত হলে একাই সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর সেনুসি মুজাহিদীন –এই নামেই এই যোদ্ধরা অভিহিত কতো নিজেদেরকে-সাফল্যের সংগে যুদ্ধ পরিচালনা করেন হানাদারদের বিরুদ্ধে-ইতালীয়রা, তাদরে উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র আর বিপুলতরো সংখ্যা সত্ত্বেও মাত্র ‍উপকূলের কয়েকটি শহরেই কোনো রকমে তাদের পা রাখতে সক্ষম হলো!

ব্রিটিশ শক্তি তখন মজবু হয়ে আসন গেড়েছে মিসরে! উত্তর আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগে ইতালীয়দের ক্ষমতা বিস্তার করতে দেখে ওরা পষ্টতই তেমনটি উদ্বিগ্ন ছিলো না। এ সব কারনে, সে সময় ব্রিটিশ শক্তি সেনুসিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলো না। এই নিরপেক্ষ মনোভাব সেনুসি তরীকার জন্য ছিলো পরম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘মুজাহিদীনে’র সমস্ত রসদ আসতো মিসর থেকে, যেখানে প্রায় গোটা জনগোষ্ঠীয় ছিলো তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এটা খুবই সম্ভাব্য মনে হয় যে, ব্রিটেনের এই নিরপেক্ষতার ফলে শেষ পর্যন্ত সেনুসিয়া সাইরেনিকা থেকে ইতালীয়দের সম্পূর্ণভাবে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম  হতো। কিন্তু ১৯১৫ সনে তুরস্ক মহাযুদ্ধে জার্মানীর পক্ষে অংশ গ্রহণ করে এবং ইসলামের খলীফা হিসাবে উসমানী সুলতান মহান সেনুসিকে আহবান জানালেন মিসরের ব্রিটিশ শক্তির উপর আক্রমণ চালিয়ে তুর্কীদের সাহয্যে করতে। যেহেতু ব্রিটশ সরকার মিসরে তাদের অধিকারে পশ্চাৎভাগের নিরাপত্তার জন্য অন্য সকল সময়ের চাইতে স্বভাবতই অধিকতর ব্যগ্র ছিরো সে কারণে তারা সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার জন্য অনুরোধ করে। এই নিরপেক্ষতার বিনিময়ে ওরা প্রস্তুত ছিলো লিবিয়ার সেনুসি তরীকাকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে- এমনকি, পশ্চিমাঞ্চলে মরুভূমির কিছু সংখ্যক মিসরীয় ওযেসিসও সেনুসিদের হাতে ছেড়ে দিতে ওরা তৈরি ছিলো।

সৈয়দ আহমদ যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তাহলে কাণ্ডজ্ঞান যার নির্দেশ দেয় দ্ব্যর্থহীনভাবে, তিনি কেবল তারই অনুসরণ করতেন। তুরস্কের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো আনুগত্য ছিলো না; কারণ এই তুরস্কই কয়েক বছর আগে লিবিয়াকে লিখে দিয়ে দিয়েছিলো ইতালীর হাতে, যার জন্য একা সানুসিকেই দাঁড়াতে হলো ইতালীর বিরুদ্ধে লড়বার জন্য। ব্রিটিশ শক্তি সানুসির বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কোনো কাজই করেনি, বরং তাদের সুযোগ দিয়েছিলো মিসর থেকে রসদ পাবার, আর মিসরই ছিলো তাদের রসদ পাওয়অর একমাত্র উপায়। অধিকিন্তু বার্লিনের মন্ত্রণালয় উসমানী সুলতান যে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন তা নিশ্চয় কুরআনে লিপিবদ্ধ শর্তাবলী পুরণ করেনি। আত্মরক্ষার্থে ‍যুদ্ধ করছিলো না তুর্কীরা, বরং ওরা এক অমুসলিম শক্তির সাথে আগ্রাসনী যুদ্ধে হাত মিলিয়েছিলো। তাই ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনা সমভাবে মহান সেনুসিকে, কেবল একটি মাত্র পদক্ষেপেরই দিকে আঙুলি নির্দেশ করেঃ যে  যুদ্ধ তাঁর নিজের যুদ্ধ নয় তা থেকে দূরে সরে থাকা। সবচেয়ে প্রভাবশালী সেনুসি নেতাদের কয়েকজন-আমার বন্ধু তিনি সিদি মুহাম্মদ আজজুবাই ছিলেন তাঁদের একজন –সৈয়দ আহমদকে নিরপেক্ষ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের দুর্বল খলীফাকে রক্ষা করার অত্যুচ্চ অথচ অবাস্তব আকাংখাই প্রবল হয়ে দাঁড়ালো যুক্তির নির্দেশের উপর এবং তাঁকে একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে করলো প্ররোচিত। তিনি নিজেকে তুর্কীর পক্ষে বলে ঘোষণা করেন এবং পশ্চিমের মরুভূমিতে ব্রিটিশ শক্তিকে আক্রমণ করে বসেন।

বিবেকের এই দ্বন্ধ এবং ঘটনাক্রমে তার পরিণতি সৈয়দ আহমদের বেলায় অধিকতরো করুণ হয়ে উঠলো-কারণ তাঁর ক্ষেত্রে, এ কেবল ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের প্রশ্ন ছিলো না, বরং এতে করে সম্ভবত অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হলো তাঁর সমগ্র জীবনের এবং তাঁর আগের দুই পুরুষের, সকল সেনুসির জীবনের মহৎ লক্ষ্যটিরই। আমি তাঁকে জানি বলেই আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ  নেই, তাঁর এ কাজের পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা ছিলো চূড়ান্তভাবেই স্বার্থলেশশূন্য-মুসলিম জাহানের সংহতি রক্ষাকরার বাসনাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু এ ব্যাপারেও আমার সন্দেহ সমান্যই যে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর পক্ষে এর চেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কখনো সম্ভব ছিলো না। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে তিনি কুরবানী দিয়েছিলেন সেনুসি তরীকার গোটা ভবিষ্যৎকেই-সে সময়ে তা পুরাপুরি ‍উপলব্ধি না করে।

তা থেকেই তিনি বাধ্য হলেন তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধে চালিয়ে  যেতে। উত্তরে ইতালয়দের বিরুদ্ধে, দক্ষিণ-পশ্চিমে ফরসীদরে বিরুদ্ধে এবং পূর্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। শুরুর দিকে তিনি কিছু কিছু সাফল্য অর্জন করেন। সুয়েজ খাল অভিমুখে জার্মান-তুর্কীর অগ্রাভিযানে কোণঠাসা হয়ে ব্রিটিশ শক্তি পশ্চিমের মরুভূমির ওয়েসিসগুলি থেকে সরে পড়লে সৈয়দ আহমদ সংগে সংগেই সেগুলি দখল করে নেন। মুহাম্মদ আজ্জুবাইর নেতৃত্বে (যিনি তাঁর প্রজ্ঞঅবশত এত তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এই চেষ্টার) ‍উটের উপর সওয়ার ধাবমান ফৌজের বিভিন্ন ব্যুহ ঢুকে পড়লো কায়রের একেবারে আশেপাশে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই যুদ্ধের গতি বদলে গেলো আকস্মিকভাবেঃ জার্মান-তুর্কী বাহিনীর ক্ষিপ্র অগ্রাভিযান  ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে দেওয়া হলো সিনাই উপত্যকায় এবং অগ্রাভিযান রূপ নিলো পশ্চাদ-অপসরণে। কিছু পরেই পশ্চিমের মরুভুমিতে ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণ করে সেনুসি ফৌজকে, সীমান্ত অঞ্চলের মরূদ্যান এবং কূপগুলি দখল করে নেই, আর এমনিভাবে মুজাহিদীনে’র রসদ পবার একমাত্র পথটিকে দেয় কেটে। সাইারেনিকার অভ্যন্তরভাগ একা সক্ষম ছিলো না জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত জনগোষ্ঠীকে রসদ যুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে, আর যে স্বল্প কটি জার্মান ও অস্ট্রীয় সাবমেরিন অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ এনে পৌছালো, তারাও নামমাত্র সাহায্যের বেশি কিছু নিয়ে এলো না।

১৯১৭ সনে সৈয়দ আহমদ তাঁর তুর্কী উপদেষ্টাদের পরামর্শে সাবমেরিন করে ইস্তাম্বুল যান অধিকতরো কার্যকরী সাহায্য-সমর্থনের ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু রওনা করার আগেই সইরেনিকায় তিনি তরীকার নেতৃত্ব দিয়ে যান তাঁর চাচাতো ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ আল ইদরিসকে। *[১৯৫২ সাল থেকে লিবিয়ার বাদশাহ] প্রকৃতির দিক দিয়ে সৈয়দ আহমদের চেয়ে অধিকতরো আপোসকামী ইদরিস কাল বিলম্ব না করেই ব্রিটিশ এবং ইতালীয়দের সাথে সন্ধি করার প্রয়াস পান। ব্রিটিশেরা তো শুরু থেকেই সেনুসিদের সংগে এই সংঘর্ষ না-পছন্দ করেছে।কাজেই ওরা দ্বিধা না করে সন্ধি করতে ইতালী সরকার সৈয়দ ইদরিসকে ‘সেনুসিদের আমীর’ বলে সরকারীভাবে স্বীকৃতি দান করে। ইদরিস ১৯২২ সন পর্যন্ত সাইরেনিকার অভ্যন্তরভাগে এক টলটলায়মান আধা-স্বাধীনতা বজায় রাকতে সক্ষম হন। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো, ইতালীয়রা আসলে তাদের চুক্তি মেনে চলতে চায়নি, বরং গোটা দেশটিকেই ওদের শাসনের আওতায় আনার জন্য বদ্ধপরিকর, তখন সৈয়দ ইদরিস তার প্রতিবাদে ১৯২৩ ইংরেজির শুরুর দিকে মিসর ত্যাগ করেন-একজন বিশ্বস্ত , বহুদিনের অনুসরারী উমর আল মুখতারের হাতে সেনুসিদের নেতৃত্ব তুলে দিয়ে। এর পরেই ঘটে প্রত্যাশিত সন্ধি-ভংঘ এবং সাইরেনিকার যুদ্ধ আবার ‍শুরু হয়ে যায়।

এদিকে তুরস্কে সৈয়দ আহমদ হতাশার পর হতাশার সম্মুখীন হতে লাগলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিলো, তাঁর ‍উদ্দেশ্য হাসিলের সাথে সাথে তিনি সাইরেনিকায় ফিরে আসবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য কখনো হাসিল হলো না, কারণ তিনি যেই ইস্তাম্বুল ঢুকলেন, অমনি বিচিত্র-সব ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো, যার ফলে তিনি তাঁর প্রত্যাবর্তন স্থগিত রাখতে বাধ্য হলেন হপ্তার পর হপ্তা, মাসের পর মাস।তাঁর কাছে এ প্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠলোঃ সুলতানকে যারা ঘিরে আছে তারা সত্যি চায় না যে, সেনুসিরা সফল হোক, বিজয়ী হোক। তুর্কীদের এ আশংকা বরাবরকার-পাছে নবজাগ্রত আরবেরা মুসলিম জাহানে আবার তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে! সেনুসিদের বিজয়ে অনিবার্যভাবেই ঘোষিত হবে এ জাতীয় আর পুনর্জাগরণের কথা এবং মহান সেনুসিকে-তুরস্কেও যাঁর খ্যাতি অনেকটা রূপকথার মতোই-করে তুলবে খিলাফতের সন্দেহাতীত উত্তরাধিকারী। তাঁর নিজের যে এ ধরনের কেনো ‍উচ্চাকংখাই নেই তাতেও তুরস্কের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারীদের-সন্দেহ দূর হলো না- এবং যদিও তাঁর মর্যাদার উপযোগী পরম সম্মান এবং সকল সম্মানই তাঁকে দেওয়া হলো তবু বিনয়ের সংগে অথচ কার্যকরীভাবেই তুরস্কে আটক করা হরো সৈয়দ আহমদকে। ১৯১৮ সনে উসমানী খিলাফত ভেঙে পড়লে এবং তারপর মিত্র শক্তি ইস্তাম্বুল দখল করে নিলে তাঁর অলীক আসার মৃত্যু –ঘন্টা বেজে উঠলো এবং যুগপৎ তাঁর জন্য সাইরেনিকার সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।

কিন্তু মুসলিম সংহতির জন্য উদ্দাম প্রেরণা সৈয়দ আহমদকে নিস্ক্রিয় থাকতে দিলো না। মিত্র শক্তি যখন ইস্তাম্বুল অবতরণ করছে তখন তিনি সীমান্ত পার হয়ে গিয়ে পৌছুলেন এশিয়া মাইনরে কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য.. . তখনো তিনি কেবল মোস্তফা কামাল নামে পরিচিত-যিনি সবেমাত্র তুর্কী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছেন আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরে।

মনে রাখতে হবে, শুরুতে কামালের তুর্কীর বরীরেচিত সংগ্রামে ছিলো ইসলামী সংগ্রামেরই লক্ষণ, আর সেই ভয়ংকর দিনগুলিতে কেবলমাত্র ধর্মীয় উদ্দীপনাই তুর্কী জাতিকে দিয়েছিলো বহু গুনে প্রবল গ্রীক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সামর্থ্য, যে গ্রীক শক্তিকে মিত্র শক্তি মদদ যুগিয়েছিলো তাদরে সমস্ত সাহায্য-সম্ভার দিয়ে।

তুর্কীরা লক্ষ্য হাসিলের স্বার্থে সৈয়দ আহমদ তাঁর মহৎ রূহানী ও নৈতিক ক্ষমতা নিয়োজিত করে অবিশ্রান্তভাবে ছুটাছুটি করতে লাগলেন আনাতোলিয়ার বিভিন্ন শহরে এবং গাঁয়ে; আর ডাক দিলেন জনসাধারণকে ‘গাজী’ বা ‘ধর্মের’ রক্ষক মোস্তফা কামালকে সমর্থন করতে। আনাতোলিয়ার সরল চাষীদের মধ্যে কামালী আন্দোলনের সাফল্যে মহান সেনুসির এ প্রয়াসের এবং তাঁর সংগে, তার নামের দীপ্তি ঔজ্জ্বল্যের অবদান অপরিমেয়; কারণ এ সব সলল চাষীর কাছে জাতীয়বাদী স্লোগানের কোন অর্থই ছিলো না; অথচ ওরা যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে এসেছে ইসলামের জন্য তাদের জান কুরবান করা তাদের জন্য এক গৌরবের বিষয়।

কিন্তু মহান সেনুসি এখানেও আবার তাঁর বিচারে ভুল করে বসলেন-অবশ্য তুর্কী জনসাধারণের ক্ষেত্রে নয়, কারণ ওদের ধর্মীয় উদ্দীপনাই ওদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে ওদের করেছিলো বিজয়ী। সেনুসি ভুল করলেন, তুর্কী জনগোষ্ঠীর নেতার মতলব সম্পর্কে। কারণ ‘গাজী’র বিজয় অর্জনের সংগে সংগে তাঁর কাছে পষ্ট হয়ে উঠলোঃ তাঁর আসল  মতলব এবং তাঁর জাতির মধ্যে  যে প্রত্যাশা  সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দুয়ের মধ্যে তফাত বিপুল। আতাতুর্ক পুনরুজ্জীবিত এবং নতুন  জীবনী-শক্তিতে সঞ্জীবিত ইসলামের উপর তাঁর সমাজ-বিপ্লবের ভিত্তি-এমনকি, আতাতুর্কের দৃষ্টিকোণের বিচারেও –অনাবশ্যকভাবে। কারণ তিনি সহজেই পারতেন তাঁর জাতির প্রচন্ড ধর্মীয় উৎসাহকে সংহত করে প্রগতিমুখী একটি সক্রিয় উদ্যেগ সৃষ্টির  জন্য কাজে লাগতে। এজন্য, যা কিছু ওদের সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছে আর ওদের করে ‍তুলেছে এক মহৎ জাতি, সে-সব থেকে ওদের সমূলে উৎপাটিত না করেই তিনি তা করতে পারতেন।

আতাতুর্কের ইসলাম-বিরোধী বিভিন্ন সংস্কারে চরম হতাশ হয়ে সৈয়দ আহমদ তুরস্কে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং অবশেষে ১৯২৩ সনে চলে গেলেন দামেশকে-সেখানে আতাতুর্কের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ পলিসির বিরোধী হলেও –তিনি আবার মুসলিম সংহতির লক্ষ্যে তুরস্কের সংগে মিলিত হবার জন্য সিরীয়দের বোঝাবার চেষ্টা করেন। স্বভাবতই ফরাসী ম্যান্ডেটরী সরকার তাঁকে চরম অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করেন। ১৯২৪ সনের দিকে তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা যখন জানতে পারলেন তাঁর গ্রেফতারী আসন্ন, তখন তিনি একটি মোটর গাড়িতে করে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পৌছুলেন গিয়ে নযদ সীমান্তে আর সেখান থেকে রওয়ানা হলেন মক্কা, যেখানে আন্তরিকতার সংগে তাঁকে গ্রহণ করলেন বাদশা ইবনে সউদ।

দুই

-‘আর ‘মুজাহিদীনে’র কাজকর্ম কেমন চলছে, হে সিদি মুহাম্মদ’? আমি জিজ্ঞাস করি, কারণ প্রায় এক বছর হলো আমি কোনো খবর পাচ্ছি না সাইরেনিকা থেকে।

সিদি মুহাম্মদ আজ্জুবাই-এর গোল সাদা দাড়ি শোভিত মুখখানা কালো হয়ে ওঠেঃ ‘খবর ভালো নয় বাবা। যুদ্ধ শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগে।‘ মুজাহিদীন’ ভেঙে পড়েছে। ওদের শেষ বুলেটও খরচ হয়ে গেছে। এখন আমাদের হতভাগা জাত এবং ওদের  ‍উৎপীড়কদের কহরের মাঝখানে আছে কেবল আল্লাহর রহমত.. .

-‘আর সাইয়িদ ইদরিসের খবর কি?’

-‘সাইয়িদ ইদরিস? দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেন সিদি মুহাম্মদ, সাইয়িদ ইদরিস এখনো আছেন মিসরে, নির্বল প্রতীক্ষারত  -কিসের প্রতীক্ষা-খুবই একজন ভাল মানুষ তিনি, আল্লাহ তাঁকে রহম করুন, তবে তিনি যোদ্ধ নন। তিনি বাস করতেন তাঁর বই-পুস্তকের মধ্যে-তলোয়ার খুব খাপ খায় না তাঁর হাতে.. .

-‘কিন্তু উমর আল –মুখতার-তিনি নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণ করেন নি? তিনি কি মিসর চলে গিয়েছিলেন?’

সিদি মুহাম্মদ তাঁর পথেল উপর থেম যান এবং বিস্ময়ে পলকহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকানঃ ‘উমর .. .? তাহলে এ .. . ও তুমি শোনো নি?’

-‘কী শুনিনি ‘

-‘বেটা, তিনি বলেন মোলায়েমভাবে, ‘সিদি উমর, আল্লাহ তাঁর উপর রহমত করুন, প্রায় এক বছর হলো মারা গেছেন তিনি.. .।

উমর আল-মুখতার মারা গেছেন .. . সােইরেনিকার সেই সিংহপুরুষ যাঁর সত্তর বছরে অধিক বয়স শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর দেশের আযাদীর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বাধ্য হতে পারেনি.. . তিনি মৃত.. . সুদীর্ঘ দশটি বছর .. . ভয়ংকর দশটি বছর তিনি ছিলেন তাঁর জাতির প্রতিরোধ শক্তির প্রাণ, তার রূহ যে-সব বাধা-বিঘ্ন জয়ের আশা নেই সে-সবের বিরুদ্ধে, তাঁর ফৌজের চাইতে দশ গুণ বেশি ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে .. . যে ইতালীয় ফৌজ আধুনিকতম অস্ত্রশস্ত্রে সাঁজোয়া গাড়ি, উড়োজাহাজ এবং কামানে সজ্জিত-যখন উমর এবং তাঁর অর্ধ-উপবাসী মুজাহিদীনে’র কিছুই  ছিলো না রাইফেল এবং কয়েকটি ঘোড়া ছাড়া, যা নিয়ে তাঁকে এমন এক দেশে লড়তে হয়েছে একটি বেপরোয়া গেরিলা যুদ্ধ যে দেশ পরিণত হয়েছিলো একটি বিশাল বন্দী শিবিরে.. .।

আমার স্বর আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে যখন আমি বলিঃ ‘সাইরেনিকা থেকে আমার ফিরে আসার পর গত দেড় বছর ধরে আমি প্রতি মুহূর্তেই জেনেছি তাঁর এবং তাঁর সমর্থকদের ধ্বংস নিশ্চিত। তাঁর মুজাহিদীনে’র মধ্যে যারা বেঁচে ছিলো তাদের নিয়ে মিসরের ভেতরে সরে পড়ার জন্য আমি তাঁকে কত করেই না বুঝিয়েছিলাম যাতে করে তিনি তাঁর কওমের লোকজনের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারেন.. .আর কী শান্তভাবেই না তিনি তাঁকে বোঝানোর জন্য আমার এই চেষ্টাকে ঠেকিয়েছিলেন, একথা চূড়ান্তভাবে জেনেও যে মৃত্যু, আর কিছু নয়, মৃত্যু তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে সাইরেনিকায়। আর এখন, শত যুদ্ধের পর সেই বহু প্রতীক্ষিত মৃত্যু তাঁকে শেষ পর্যন্ত কব্জা করেছে .. . কিন্তু বলুন কখন পতন ঘটলো তাঁর?’

মুহাম্মদ আজ্জুবাই আস্তে করে তাঁর মাথা নাড়েন এবং আমরা যখন বাজারের চিপা রাস্তা থেকে বের হলাম আল-মানাখার খোলা অন্ধকার চকে, তিনি আমাকে বললেনঃ

-‘যুদ্ধে ওঁর মৃত্যু হয়নি, তিনি যখন হন এবং জীবিত অবস্থায় বন্দী হন এবং তারপরই তাঁকে ইতালীয়রা হত্যা করে. . ওরা তাঁকে একজন সাধারণ চোরের মতো ফাঁসি দেয়.. .।

-‘কিন্তু কী করে ওরা তা করতে পারে, আমি বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করি। গ্রাৎসিয়ানিও তো এ ধরনের ভয়ংকর কাজ করতে সাহস পেতো না!

-কিন্তু সে-ই তা করেছে, সে-ই তা করেছে, তিনি জবাব দেন বিদ্রুপ মেশানো হাসির সংগে। জেনারেল গ্রাৎসিয়ানি নিজেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারার আদেশ দেয়।সিদি উমর এবং তাঁর বিশ পঁশিচ জন সংগী ছিলেন ইতালী অধিকৃত এলাকার অনেক ভেতরে, যখন তাঁরা স্থির করেন তাঁরা রসূলের সহাবা সিদি রফির মাযারে গিয়ে য়িয়ারত করবেন। মাযারটি ছিলো কাছেই। কোনো না কোনোভঅবে ইতালীয়রা তাঁর উপস্থিতির কথা জানতে পায় এবং বহু লোক দিয়ে উপত্যকার দু’দিকই বন্ধ করে দেয়। পালিয়ে বাঁচার আর কোনো পথ ছিলো না। সিদি উমর এবং মুজাহিদীন আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করেন, শেষ পর্যন্ত তিনি আর তাঁর দুই সংগী বেঁচে রইলেন। অবশেষে তিনি  যে ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন, শত্রুর গুলীতে সে ঘোড়াটি মারা যায় এবং ঘোড়াটি পড়ে যাওয়ার সংগে সংগে তিনিও মাটিতে গড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বৃদ্ধ সিংহ তখনো রাইফেল বাগিয়ে গুলি চালিয়ে যেতে  থাকেন। এক সময় একটি বুলেট এসে তাঁর একটি হাত চুরমার করে দেয়; তখন তিনি অন্য হাত দিয়ে গুলি করতে থাকে, কিন্তু এক সময় গুলিও ফুারিয়ে গেলো। তখন ওরা তাঁকে ধরে ফেলে এবং তাঁকে বেঁধে সুলূকে নিয়ে যায়। ওখানে তাঁকে নিয়ে হাজির করা হয় জেনারেল গ্রাৎসিয়ানির সম্মুখে। সে তাঁকে জিজ্ঞাস করেঃ তুমি কী বলবে যদি ইতালী সরকার তার মহৎ করুণ বশে তোমাকে বেঁচে থাকবার অনুমতি দেয়? ‘তুমি কি ওয়াদা করতে রাজী আছো তুমি তোমার জীবনের বাকি বছরগুলো শান্তিপূর্ণভাবে কাটাবে?’ কিন্তু সিদি উমর জবাব দিলেনঃ ‘তোমার লোকসকল আর তোমার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে ক্ষান্ত দেবো না যতক্ষণ না তোমরা দেশ ত্যাগ করছো অথবা আমি আমি আমার জীবন থেকে বিদায় নিয়েছি। মানুষের অন্তরে যা আছে, যিনি তা জানেন, তাঁর নামে কসম করে আমি তোমাকে বলছি, যদি এই মুহূর্তে আমার হাত দুটি বাঁধা না থাকতো, আমি আমার খালি হাত নিয়ে তোমার সংগে লড়তাম যদিও আমি বৃদ্ধ এবং বিধ্বস্ত.. .।

এতে জেনারের গ্রাৎসিয়ানি হো হো করে হেসে ওঠে এবং সুলুকের বাজারের মধ্যে সিদি উমরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করার হুকুম দেয়। ওরা সে হুকুম কার্যকরী করে। আর বিভিন্ন তাঁবুতে যে-সব হাজার হাজার মুসলিম নর-নারীকে কয়েদ করে রাখা হয়েচিলো তাদের গরু-ভেড়ার পালের মতো একত্র করে হাঁকিয়ে নিয়ে এসে ফাঁসি-কাষ্ঠে তাদের নেতার মৃত্যু দেখেতে বাধ্য করে.. .।[ইতালীয়দের এই বীরোচিত কর্মটি ঘটেছিলো ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ ইংরেজি]

 

তিন

তখন হাত ধরাধরি করে মুহাম্মদ আজ্জুবাই আর আমি চলেছি সেনুসি ‘জাভিয়া’ তথা ধর্মীয় আস্তানার দিকে। বিশাল চকের উপর অন্ধকার ছড়িয়ে আছে। বাজারের হট্টগোল আমরা ফেলে এসেছি পেছনে। আমাদের স্যান্ডেলের নীচে বলু দেবে যাচ্ছে। এখানে ওখানে দেখা যাচ্ছে ভারবাহী উটের একেকটি দল বিশ্রাম করছে; দূরে চকের বাহির্ভাগে এক সারি ঘর-বাড়ি অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মেঘাচ্ছন্ন রাতের আকাশের পটভূমিকায়। এ দৃশ্য আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় সুদূরের একটি অরণ্যের প্রান্তভাগের কথা, সাইরেনিকার মালভূমি অঞ্চলের সেই সব জোনিপার অরণ্যের কথা, যেখানে আমি প্রথম সিদি উমর আল মুখতারের সাক্ষাৎ পেয়েছিলামঃ এবং সেই নিষ্ফল সফরের স্মৃতি আমার বুকের ভেতর উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে অন্ধকার, বিপদ এবং মৃত্যুর সমস্ত করুণ রসসহ। আমি দেকতে পাই-একটি ছো্ট্ট নিবু নিবু আগুনের উপর নুয়ে পড়া সিদি উমরের গম্ভীর বিষণ্ণ মুখ এবং শুনতে পাই তাঁর ভাঙা ভাঙা, গম্ভীর কণ্ঠস্বরঃ আমাদের ধর্ম এবং আমদের আযাদীর জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে যতোক্ষণ না আমরা হানাদারদের তাড়িয়ে দিতে পেরেচি অথবা আমরা নিজেরা মৃত্যুবরণ করেছি.. . আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই.. .।’

.. .                  .. .                      .. .

এ ছিলো এক অদ্ভুদ মিশন, যা আমাকে সাইরেনিকায় নিয়ে আসে ১৯৩১ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে। কয়েক মাস আগে-সঠিকভাবে বলতে গেলে ১৯৩০-এর শরৎকালে-মহান সেনুসি মদীনায় এসেছিলেন। আমি তাঁর এবং মুহাম্মদ আজ্জুবাই-এর সহবতে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাই মুজাহিদীনের মারাত্মক সংকটের কথা আলোচনা করে, যারা উমর আল-মুখতারের নেতৃত্বে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলো সাইরেনিকায়। স্পষ্ট বোঝা গেলো, ওরা যদি বহির্বিশ্ব থেকে দ্রুত এবং কার্যকরী মদদ না পায়, ওরা আর বেশি দিন টিকে থাকতে সক্ষম হবে না।

সাইরেনিকার পরিস্থিতি ছিলো মোটামুটি এইরূপঃ উপকূলের সব ক’টি শহর এবং জবল আখদার যাকে বলা হয় মধ্য সাইরেনিকার ‘সবুজ পর্বতমালা’- তার উত্তর অঞ্চলের কয়েকটি স্থান রয়েছে ইতালীয়দের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। এসব সুরক্ষিত স্থানের ফাঁকে যেসব জায়গা রয়েছে সেখানে নিরবিচ্ছন্নভাবে টহল দিয়ে চলেছে সাঁজোয়া গাড়ি এবং বেশ কিছু সংখ্যক পদাতিক ফৌজ, যাদের বেশির ভাগই হচ্ছে ইরিত্রিয় ‘আশকারী’ বা লস্কর ওদের সমর্থনে এক স্কোয়াড্রন বিমান ঘন-ঘন উড়ছে আকাশে, গ্রাম্যঞ্চলের উপর দিয়ে। বেদুঈন (যাদের নিয়ে গঠিত ছিলো সেনুসি প্রতিরোধ বাহিনীর মূল শক্তি) পক্ষে সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর নযর না পড়ে এবং আকাশ হতে বিমান হামলার শিকার না হয়ে চলাফেরা মোটেই সম্ভব ছিলো না। প্রায়ই এরকম ঘটতো যে, একটি সন্ধানী বিমান হয়তো বেতারযোগে নিকটতম পোষ্টে বার্তা পাঠিয়েছে কোনো বেদুঈন কবিলার তাঁবুর অস্তিত্ব সম্পর্কে, বিমানের মেশিনগান যখন ওদের ছত্রভংগ হতে দিচ্ছে না, তখন কয়েকটি সাঁজোয়া গাড়ি ছুটে এলো সোজাসুজি তাঁবু, উট এবং মানুষের মধ্য দিয়ে-আওতার মধ্যে যা পেলো নারী, পুরুষ, ছেলেমেয়ে, জীব-জানোয়ার সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করতে করতে-এবং যে ক’টি মানুষ আর জীবজন্তু বেঁচে রইলো তাদের গরু-ভেড়ার পারের মতো এক জায়গায় জমা করে তাড়িয়ে নেওয়া হলো উত্তর-দিকে, কাঁটাতরের বৃহৎ বেষ্টনীর মধ্যে, যা ইতালীয়রা স্থাপন করেছে উপকূলভাগে। সে সময়ে, ১৯৩০-এর শেষের দিকে প্রায় ৮০ হাজার বেদুঈন আর তার সংগে কয়েক লাখ গরু-ভেড়া উটকে ওরা অতোটুকু জায়গার মধ্যে এন পশুর পালের মতো জমা করে, যে জায়গায় ঐ সংখ্যার সিকি ভাগরেও রসদ ছিলো না। ফলে মানুষ এবং জীব-জানোয়ারের মৃত্যুহার হলো ভয়াবহ। অধিকিন্তু,ইতলীয়রা সমুদ্র-উপকূল থেকে দক্ষিণের জাগবুবের দিকে মিসর সীমান্ত বরাবর এটি কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক গড়ে তুলছিলো, বীর মাঘারিবা কাবিলা তাদের অজেয় সর্দার আল –আতয়বিস –এর নেতৃত্বে-যিনি ছিলেন উমর আল মুখতারের দক্ষিণ হস্ত- তখনো অবিচলিতভাবে বাধা দিয়ে যাচ্ছে শত্রুকে সাইরেনিকার পশ্চিম উপকূলের নিকটে। কিন্তু বেশির ভাগ কবিলাই ইতালীয়দের বিপুলতরো সংখ্যা এবং উন্নততরো অস্ত্রশস্ত্রের কাছে ইতিমধ্যে হার মেনেছে। আরো দক্ষিণে অনেক ভেতর ভাগে নব্বই বছর বয়স্ক আবু কারাইমের নেতৃত্বে জুবইয়া কবিলা তখনো মরণ পণ জিহাদ করে চলেছে-তাদের কবিলার কেন্দ্র জালু মরুদ্যান হাতছাড়া হওয়ার পরও। অভ্যন্তরভাগে বেদুঈনেরা বিপুল সংখ্যায় মারা যাচ্ছিলো অনাহারে এবং রোগ ব্যাধিতে।

সিদি উমরের পক্ষে যুদ্ধে জন্য একবারে যে সৈন্য সমাবেশ সম্ভব ছিলো তা বড়জোর সংখ্যায় এক হাজারের কিছু বেশি হতে। অবশ্য লোকের অভাবই এর কারণ নয়। মুজাহিদীন যে ধরণের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো তাতে যোদ্ধাদের বড় দল করে কাজ করা সুবিধাজনক  ছিলো না। বরং এ ধরণের যুদ্ধ নির্ভর করতো আঘাত করতে সক্ষম ছোট্ট দলের ক্ষীপ্রতা ও গতিশীলতার উপর যা হঠাৎ শূণ্য থেকে আর্বিভূত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে একটি  ইতালীয় ব্যূহ অথবা দূরবর্তী ঘাঁটির উপর-এর অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেবে। তারপর কোনো চিহ্ণ না রেখেই সাইরেনিকার মালভূমি ঘন জুনিপার অরণ্যে এবং শুকিয়ে যাওয়া নদীর উঁচু নীচু ভঙ্গুঁর ‍উপত্যকায় গায়েব হয়ে যাবে। যতো দুঃসাহসীই হোক না কেন, জীবন মৃত্যুকে যতোই পায়ের ভৃত্য মনে করুক না কেন, এ ধরনের ছোট ছোট দলের পক্ষে যে, জনসংখ্যা আর অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে প্রায় অপরিসীম সম্পদের অধিকারী দুশমনের উপর নিশ্চিত জায়লাভ কখনো সম্ভব নয়,  তা ছিলে সুস্পষ্ট। কাজেই, প্রশ্নটি ছিলো , কী করে মুজাহিদীনের শক্তি বৃদ্ধি করা যায়, যাতে করে ওরা হানাদারদের উপর বিচ্ছিন্ন আক্রমণ চালিয়ে ওদের কেবল ক্ষতিগ্রস্থ করতেই সক্ষম হবে না, বরং দুশমন যে সব অবস্থানে আসন গেড়েছে মজবুত ভাবে, সেগুলিওে কেড়ে নিতে সক্ষম হবে, পারবে নতুন আক্রমনের মুকাবিলায় সে অবস্থানগুলিকে নিজের অধিকারে রাখতে।

সেনুসি শক্তিকে এভাবে বাড়াতে হলে তা নির্ভর করছিলো কয়েকটি বিষয়ের উপরঃ মিসর থেকে নিয়মিতভাবে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য যাতে আসতে পারে  তার ব্যবস্থা; বিমান এবং সাঁজোয়া গাড়ির মারত্মক ধ্বংসলীলার মুকাবিলা করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র বিশেষ করে, ট্যাংক বিধ্বংসী রাইফেল এবং ভারী কামান; এ ধরনের  অস্ত্র ব্যবহারের জন্য কারিগরী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকজন এবং মুজাহিদীন’কে এসব ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ, এবং সর্বশেষে সাইরেনিকার বিভিন্ন মুজাহিদীন দলের মধ্যে নির্ভরযোগ্য বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আর মিসরীয় এলাকার অভ্যন্তরে গোপন সরবরাহ –ডিপো!

প্রায় এক হ্প্তা, সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা, মহান সেনুসি সিদি মুহাম্মদ এবং আমি এক সংগে বসে পরামর্শ্ করি- কী করা যায়। সিদি মুহাম্মদ বললেন-কখনো কখনো সাইরেনিকায় মুজাহিদীনের কিছু শক্তি বৃদ্ধি করলেও তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁর বিশ্বাস, লিবীয় মরুভূমির অনেক দক্ষিণে কুফ্রা মরুদ্যানটিকে ভবিষ্যতের সকল যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তুলতে হবে আবার। কারণ কুফ্রা এখনো ইতালীয় সৈন্যবাহিনীর নাগালের অনেক দূরে রয়েছে। উপরন্তু সাইয়িদ আহমদের নেতৃত্বে সেনুসি তরীকার হেড কোয়ার্টর ছিলো এই কুফা। কুফা মিশরীয় মরুদ্যান বাহরিয়া এবং ফারাফ্রা অভিমুখি সরাসরি, যদিও দীর্ঘ এবং দুস্তর, মরু কাফেলার পথের উপর অবস্থিত এবং সে কারণে, দেশের অন্য যে-কোন স্থানের চাইতে এ স্থানে অনেক বেশি কার্যকরভাবে রসদের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাছাড়া, মিসরের বিভিন্ন ক্যাম্পে যে বহু হাজার সাইরেনীয় মুহাজির বাস করছে, তাদের জন্যও এটিকে করা যেতে পারে নতুন করে সমাবেশের কেন্দ্র। আর  এভাবে তা হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলে সিদি উমরের গেরিলা বাহিনীর জন্য জনশক্তির একটি নিয়মিত সংরক্ষণাগার। ঠিক মতো সুশিক্ষিত হলে এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হলে ‍কুফ্রা নিচু উড়ে যাওয়া বিমান থেকে কামানের আক্রমণ ঠেকাতে পারবে। অন্য দিকে খুব উচু থেকে বোমা বর্ষণ করলে এতো দূর দূর ব্যবধানে অবস্থিত তাঁবুগুলির সত্যিকার বিপদের আশংকা সামান্যই থাকবে।

মহান সেনুসি বললেনঃ এভাবে সংগ্রামের পদ্ধতি নতুন  করে গড়ে তোলা সম্ভব হলে তিনি নিজে কুফায় ফিরে যাবেন ভাবী সকল অপারেশন সেখান থেকে পরিচালনা করার জন্য ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সংগে নতুন করে সদ্ভাব স্থাপন করা সাইয়িদ আহমদের জন্য জরুর। বলা বহুল্য, ১৯১৫ সনে ব্রিটিশ শক্তির উপর আক্রমণ করে সাইয়িদ আহমদ ব্রিটিশ সরকারকে একবারে অযথাই অতি ঘোর শত্রুতে পরিণত করেছিলেন। সম্পর্কের এ ধরনের উন্নতি হয়তো অসম্ভব নয়, কারণ ইতালীর সম্প্রসারণবাদী মেজাজে ব্রিটেন খুব খুশী ছিলো না। বিশেষ করে, যখন মুসোলিনী ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দুনিয়াকে জানাচ্ছেন ভূমধ্যসাগরের উভয় তীরে ‘রোমান সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ তার অভিপ্রায় এবং লোভাতুর দৃষ্টিতে তিনি যখন  তাকাচ্ছেন মিসরে দিকেও। সেনুসিদের ভাগ্য সম্বন্ধে আমার এই গভীর আগ্রহের কারণ একটি ন্যায়সংগত লক্ষ্য হাসিলের জন্য চরম বীরত্বের প্রতি আমার প্রদ্ধাই কেবল নয়, আমি আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম সেনুসিদের বিজয় গোটা আরব জগতের উপর যে সাম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তাই নিয়ে। অনেক মুসলমানের মতোই আমিও বুহ বছর ধরে আামর আশা স্থাপন করেছিলাম ইবনে সউদের উপর, ইসলামী পুর্জাগরণের একজন সম্ভাব্য নেতা হিসাবে। কিন্তু এখন যখন সে আশা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে গোটা মুসলিম জাহানে আমি কেবল একটি আন্দোলনই দেখতে পেলাম যা আন্তুরিকভাবে প্রায়াস চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামী সমাজের আদর্শের বাস্তব রূপায়নের জন্যঃ আর সে আন্দোলন হচ্ছে সেনুসি আন্দোলন, বেঁচে থাকর জন্য এ মুহূর্তে মরণপণ জিহাদে লিপ্ত।

এবং সাইয়িদ আহমদ জানতেন, সেনুসি আন্দোলনের লক্ষ্যের সাথে আমার আবেগ অনুভূতি খুবই নিবিড়-গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। তাই তিনি মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকালেন এবং সোজা আমার চোখের উপর চোখ রেলে বললেনঃ

-হে মুহাম্মদ, তুমি কি আমাদের তরফ থেকে যেতো পারো সাইরেনিকা এবং দেখে আসতে পারো মুজাহিদীনে’র জন্য কী করা যায়? হয়তো আমার লোকদের চাইতে স্বচ্ছতরো দৃষ্টিতো তুমিই সক্ষম হবে সব কিছু দেখতে..

আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ি নিঃশব্দে, যদিও আমার উপর তাঁর আস্থা সম্পর্কে আমি ছিলাম সজাগ। তাই, তাঁর পরামর্শে পুরাপুরি বিস্মিত হইনি। তবু, এতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো। এমন বৃহৎ একটি এ্যাডভেঞ্চারের সম্ভাবনা আমাকে এতোটা বিহ্বল করে তুললো, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তারো চাইতে বেশি যা আমাকে রোমাঞ্চিত করে তুললো তা এই ভাবনা যে, যে-আদর্শের জন্য নিজেদের কুরবান করেছে বহু মানুষ, তারৈই জন্য আমিও হয়তো কিছু করতে সক্ষম হবো!

সাইয়িদ আহমদ তাঁর মাথার উপর একটি তকের দিকে হাত বাড়ালেন এবং রেশমী কাপড়ে মোড়া একখন্ড কুরআন হাতে নিলেন। সেইটিকে তাঁর হাঁটুর উপর রেখে তিনি আমার ডান হাত তঁর দুই হাতের মধ্যে নিয়ে তা রাখলেন কুরআনের উপরঃ

‘শপথ করো মুহাম্মদ, তাঁর নামে যিনি জানেন মানুষের অন্তরে যা কিছু আছে-তুমি সব সময়ই ‘মুজাহিদীনে’র বিশ্বাস রক্ষা করবে.. .।’

আমি শপথ নিলাম –এবং আমি কী শপথ গ্রহণ করলাম, সে বিষযে আমার জীবনে কখনো ঐ মুহূর্তের চাইতে বেশি নিশ্চিত ছিলাম না।

সাইয়িদ আহমদ আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করলেন তার জন্য চূড়ান্ত গোপনীয়তা ছিলো অপরিহার্য; যেহেতু মহান সেনুসির সংগে আমার সম্পর্ক ছিলো সুপরিজ্ঞাত এবং সে সম্পর্ক জেদ্দায় যেসব কূটনৈতিক দূতাবাস ছিলো তাদের নযর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। সে কারণে, প্রাকাশ্যে মিসর অভিমুখে যাত্রা করে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া আক্কেলমন্দের কাজ হতো না। ফয়সাল আদ-দাবীশের বিদ্রোহের পেছনে যে ষড়যন্ত্র সম্প্রতি আমি উদঘাটন করেছি, তা ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিতে আমার মর্যাদা নিশ্চয় বাড়ায়নি। বরং খুবই সম্ভব যে, আমি যে মুহূর্তে মিসরের মাটিতে পা রাখবো তখন থেকেই ওরা আমার গিতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নযর রাখবে। তাই আমরা স্থির করলাম, আমার মিসর যাওয়ার কথাও গোপন  রাখা হবে। আমি আরবের পালতোলা জাহাজের কোনো না কোনো একটিতে চড়ে পাড়ি দেবো লোহিত সাগর এবং পাসর্পোট আর ভিসা ছাড়াই লকিয়ে উজান মিসরের কোন এক নির্জন স্থানে নেমে পড়বো। মিসরে আমি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবো একজন শহরে হেজাযীর ছদ্মবেশে, কারণ তেজারতির উদ্দেশ্যে অথবা সম্ভাব্য হজ্জ্ব যাত্রীর সন্ধানে ওখানে মক্কা মদীনা থেকে  যে বহু সংখ্যক লোক যায় মিসরে বিভিন্ন শহর এবং গ্রামেরলোকেরা তাদের সব সময়ে দেখে আর আমি যেহেতু অতি স্বছন্দে হেজাবী-উপ-ভাষায় কথা বলতে পারি, সে করণে এ দুটি পবিত্র নগরীর একটির বাসিন্দা হিসাবে আমি সব জায়গায়েই অনায়অসে নিজেকে চালিয়ে নিতে পারবো।

ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ করার জন্য কয়েক হপ্তার প্রস্তুতির প্রয়োজন হলো। এই প্রস্তুতির মধ্যে ছিলো সাইরেনিকায় সিদি উমরের সংগে এবং তৎসহ মিসরে যাঁদের সংগে সেনুসিদের সম্পর্ক রয়েছে তাঁদের সাথে গোপন পত্র বিনিময়ের ব্যবস্থা। এবং এভাবে ১৯৩১ সনের জানুয়ারির প্রথম হপ্তায়ই য়ায়েদ এবং আমি হেজাযের বন্দর-শহর ইয়ানবু ত্যাগ করে উপকূলের এমন একটি অংশে গিয়ে পৌছুলাম যেখানে মানুষের গতিবিধি ছিলো বরল। আসমানে চাঁদ ছিলো না, কৃষ্ণপক্ষের রাত, আসমান রাস্তার উপর দিয়ে স্যান্ডেল পায়ে হাঁটা ছিলো খুবই কষ্টকর। একবার যখন আমি হোঁচট খেলাম তখন আমার হেজাযী কাপ্তানের নীচে গোঁজা লুপার পিস্তলের বাটের আঘাত লাগলো আমার পাঁজরে এবং এর ফলে, আমি যে –দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়েছি তার ভয়ংকর প্রকৃতি আমার মনে প্রত্যক্ষ হয়ে ‍উঠলো।

এখানে আমি চলছি এক নির্দিষ্ট স্থানের দিকে, এক অপরিচিত আরব নাবিকের সংগে, যে আমাকে তার পালতোলা ডিঙিতে করে সমুদ্দুর পার কের গোপনে মিসরীয় উপকূলের কোথাও নামিয়ে দেবে। আমার কাছে এমন কোনো কাগজপত্রই ছিলো না আমার পরিচয় ব্যক্ত করে দিতে পারে। কাজেই আমি যদি মিসরে ধরাও পড়ি, প্রমাণ করা সহজ হবে না, আমি কে! কিন্তু আমার সামনে যে বিপদ রয়েছে তার তুলনায় মিসরের কোনো জেলে কয়েক  হপ্তা কাটানোর বিপদও আমার জন্য কিছুই ছিলো না। ইতালীয় পাহারাদর-বিমান যাতে দেখতে না পায় সেভাবে এবং সম্ভবত সাঁজোয়া গাড়ির টহলদারের দৃষ্টি এড়িয়ে আমাকে পশ্চিমের গোটা মরুভূমিটি প্রস্থে পাড়ি দিতে হবে এবং পৌছুতে হবে অমন একটি দেশের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে তরবারীর ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা কেউ জানে না। আমি এ কাজ কেন করছি? প্রশ্ন করি নিজেকে।

যদিও বিপদ আমার কাছে অপরিচিত নয়, কেবল একটা  রোমাঞ্চের প্রত্যাশায় আমি কখনো তা চাইনি। যখন আমি কোনো বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়েছি, প্রত্যেকবারই তার মূলে ছিলো জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাত এক আন্তর-দোলার (Urge)প্রতি সাড়া, যা আমার নিজের জীবনের সংগে ছিলো অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্কিত। তাহলে, আমার এই বর্তমান উদ্যোগটির তাৎপর্য কী? আমি কি সত্যি বিশ্বাস করি আমার হস্তক্ষেপ ‘মুজাহিীনে’র পক্ষে ফিরিয়ে দেবে স্রোত? আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হলোঃ কিন্তু আমার অন্তরের গহনে আমি জানি, একটি অবাস্তব কল্পনা-সর্বস্ব মিশন নিয়ে আমি বের হয়েছি। তা হলে, আল্লাহর শপথ, এভাবে কি আমি আমার জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি যা আগে কখনো করিনি এবং সামনে প্রতিশ্রুতি যখন এত সামান্র?

কিন্তু প্রশ্নটি সচেতনভাবে গঠিত হওয়ার আগেই তার জবাব আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যখন আমি ইসলামের সাথে পরিচিত হয়ে উঠি এবং ইসলামকে আমার জীবন-বিধান হিসাবে গ্রহণ করি-আমার মনে হয়েছিলো-আমার সমস্ত জিজ্ঞাসা এবং সমস্ত সন্ধান সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে খুবই ধীরে ধীরে আমি সজাগ হয়ে উঠলাম যে, এখানেই শেষ নয়ঃ কারণ নিজের বাধ্যতা মুলক বলে কোনো জীবন-বিধান গ্রহণ , অন্ততপক্ষে আমর কাচে তা সমমতের মানুষদের মধ্যে অনুসরনের একটি বাসনার সংগে অবিচ্ছেদ্যভাবে বিজড়িত। কেবলমাত্র একটা ব্যক্তিগত অর্থে তা অনুসরণ করা নয়, বরং আমার কাছে ইসলাম ছিলো একটি পথ, লক্ষ্য নয় এবং উমর আল – মুখতারের বেপরোয়অ গেরিলারা তাদের জীবন আর রক্ত দিয়ে সংগ্রাম করে চলেছে সেই পথে চলার স্বাধীনতার জন্য, ঠিক যেমনটি করেছিলেন বীর সহাবারা তেরো’শ বছর আগে। ফল যতো অনিশ্চিতই হোক, তাদরে এই কঠোর এবং ঘোর সংগ্রামে তাদের সাহায্য করা আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবেই অপরিহার্য ছিলো , সালাতের মতোই.. .

এবং তার পরেই দেখা গেলো উপকূলভাগ। যে-সব ছোটো মৃদু ঢেউ আঘাত করছে তীরে নূড়ি পাথরের উপর সেই ঢেউগুলির মোলায়েম স্ফীতির উপর দোল খাচ্ছে দাঁড়ের নৌকা, যা আমাদের নিয়ে যাবে দূরে, অন্ধকারে নোঙর করা জাহাজে। অপেক্ষমান নৌকায় যখন নিঃসংগ দাঁড়টানা লোকটি দাঁড়ালো আমি তখন যায়েদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলিঃ

-‘ভায়া যায়েদ, তুমি কি জানো আমরা এমন এক দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়েছি যা আদ –দাবিশের সম্মিলিত সকল ‘ইখওয়ানে’র চাইতেও তোমার এবং আমার জন্য অধিকতরো খতরনাক প্রমানিত হতে পারে? তোমার কি মদীনার শান্তি এবং তোমার বন্ধু-বান্ধবের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না?’

‘-চাচা, আপনার পথই আমার পথ,’ যায়েদ জবাব দেয়, আপনি নিজেই কি আমাকে বলেননি যে, যে পানির স্রোত নেই তা হয়ে ওঠে বাসি এবং দূষিত? চলুন আমরা আগিয়ে যাই-আর পানি যেনো চলতে চলতে হয়ে ওঠে পরিষ্কার.. .

জাহাজটি হচ্ছে সেই সব বড় বিদঘুটে পালতোলা কিশতী’র একটি যা আরবের উপকূলে ঘেঁষে চলাচল করেঃ সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই জাহাজ, শুঁটকি আর সমুদ্র-শৈবালের গন্ধে ভরপুর। কিশতীটির পশ্চাৎভাগে রয়েছে একটি উঁচু পাটাতান, ল্যাটিন পদ্ধতিতে পাল খাটানোর জন্য দুটি মাস্তুল, আর দুই মাস্তুলের মাঝখানে রয়েছে একটি বড়ো, নীচু সিলিংবিশিষ্ট কেবিন। জাহাজের ‘রইস’ বা চালক হচ্ছেন মস্কটের এক বয়োবৃদ্ধ অভিজ্ঞ আরব। বহু রঙের এক মস্ত বড় পাগড়ীর তল থেকে ছেটো ছোটো তসবীর দানার মতো দুটি চোখ আমার দিকে অর্ধ নিমিলিত দৃষ্টিতে তাকালো, তাতে দেকলাম সতর্ক অভিব্যক্তি, যাতে বাঙময হয়ে উঠেছে অবৈধ কাজের ঝুঁকি নেয়া এবং অবৈধ অভিযানে কাটানো বহু বছর-আর তার কোমরে গোঁজা বাঁকা রূপার আবরণে ঢাকা ডেগারটি কেবল অলংকার বলে মনে হলো না।

-‘মারহাবা, হয়া মারহাবা, হে বন্ধুরা’, সে চিৎকার করে খোশ আমদেদ জানায় আমরা জাহাজে পা দেবার সাথে সাথে, ‘এ নিশ্চয় এক শুভ মুহূর্ত!

কতোবারই না ও, আমি মনে মনে ভাবি, একইভাবে সে আন্তরিক খোশ আমদেদ জানিয়েছে গরীব ‘হাজীদের’, যাদের সে গোপনে লুকিয়ে জাহাজে তুলেছে মিসরে, আর ওদের কল্যাণ সম্পর্কে নতুন কের কোনো চিন্তা না করেই নামিয়ে দিয়েছে হেজাযের উপকূলে-যাতে করে ওরা ফাঁকি দিতে পারে মোটা হজ্জ্ব ট্যাক্স, যা সৌদী সরকার আল্লাহর ঘরে যারা হজ্জ্ব করতে যায় তাদের উপর ধার্য করেছে! আর কতোবারই না সে ঠিক এই কথাগুলিই বলেছে দাস-ব্যবসায়ীদের, যারা ইসলামী আইন সম্পূর্ণ ভংগ করে, কোনো না কোনো হতভাগা হাবশীকে বন্দীকরেছে ইয়েমেনের দাস-বিক্রির হাটে বিক্রি করার জন্য! কিন্তু তা সত্ত্বেও –আমি নিজেকে সান্তুনা দিই, -আমাদের এই ‘রইস’ যে  অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তার পটভূমি যতোই আপত্তিকর হোক না কেন, তা আমাদের অবশ্যি কাজে লাগবে। কারণ লোহিত সাগর পরিক্রমণ করে এর রাস্তা সম্পর্কে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে খুব কম নাবিকেরই তা আছে। আর এ কারণে আমাদের সে এক নিরাপদ উপকূলে নামিয়ে দিতে সক্ষম হবে, এ বিষয়ে নির্ভর করা যায় তার উপর।

.. .             .. .            .. .             .. .

আর সত্যই ঐ নৌকায় ওঠার চার রাত পার আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো আবার একটি ছোট্ট দাঁড়ের নৌকায় করে, উজান মিসরের উপকূলে, বন্দর কুসায়েরের ‍উত্তরে। আমরা বিস্ময়ে অবাক হই, কেননা ‘রইস’ আমাদের সমুদ্দুর পার করে দেওয়ার জন্য কোন ভাড়া নিতে রাজী হলো না। ‘কারণ, ‘দাঁত বের করে হেসে হেসে সে বলে, ‘আমার মুনিব আমার পাওনা শোধ করে দিয়েছেন! আল্লাহ আপনার সহায় হোন।

আমি যেমনটি আশা করেছিলাম, কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করে বন্দর কুসাযেরে চলাফেরা করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়নি, কারণ হিজাযী পোশাকে লোকজনকে দেখতে এ শহরের লোকেরা অভ্যস্ত। আমাদের উপস্থিতির পরদিন সকালে নীল নদের তীরবর্তী আস-সিয়ূতগামী একটি নড়বড়ে বাসে আমাদের জন্য আসন বুক করি-আর, একদিকে ভয়ানক মোটা একটি স্ত্রীলোক, যে তার বিশাল কোলের উপর এক ঝুঁড়ি  মোরগ নিয়ে বসেছে, অন্যদিকে এক বৃদ্ধ ‘কৃষক’, যে- আমাদের  পোমাক দেখেই,  দশ বছর আগে যে সে ‘হজ্জ্ব’ করেছিলো, তারই স্মৃতিচারণ শুরু করে- এ দুজনের চাপের মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে যায়েদ আর আমি আমাদের আফ্রিকী সফরের প্রথম পর্যায় শুরু করি।

আমি সবসময় মনে করেছি, গোপন এবং বিপজ্জনক কাজের ঝুঁকি যে-ই  নেয় তারই উপলব্ধি অনিবার্য যে, যার সংগেই তার সাক্ষাৎ হচ্ছে, তারই সন্দেহের পাত্র সে এবং তার ছদ্মবেশ ধরা পড়ে যেতে পারে সহজেই। কিন্তু আশ্চর্য, এই মুহূর্তে আমার মনে সে ভাবনা নেই! আরবে আমি আমার জীববনের যে বছরগুলি কাটিয়েছি, সে সময়ের মধ্যে এর অধিবাসীদের জীবনে আমি অতোটা পুরাপুরি প্রবেশ করেছি যে, কেমন করে যেনো কখনো আমার মনেই হতো না যে আমি নিজে ওদেরিই একজন ছাড়া অন্য কেউ! এবং যদিও আমি মক্কা ও মদীনার লোকদের বিশেষ ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির শরীক কখনো হইনি, এই মুহুর্তে আমি আমার মালুমের ভূমিকার সাথে নিজেকে এমন সম্পূর্ণ অভ্যস্ত বলে উপলব্ধি করি যে, আমি কাল বিলম্ব না করেই আরো কজন যাত্রীর সাথে ‘হজ্বে’র ফযিলত সম্পর্খে প্রায় পেশাদার এক আলোচনায় জড়িয়ে পড়ি। যায়েদ এই খেলায় অংশ নেয় প্রচন্ড উৎসাহের সাথে আর এভাবে আমাদের সফরের কয়েকটি ঘন্টা কেটে যায় প্রাণবন্ত আলোচনায়।

আস—সিয়ূতে গিয়ে আমর ট্রেনে চাপি এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌছুই ছোট্ট একটি শহর বনি সুয়েফে। ওখান থেকে আমরা সোজা চলে যাই আমাদের সেনুসি বন্ধু ইসমাঈল আধ-ধিবির ঘরে। তিনি একজন বেঁটে-খাটো, মজবুত হাসি-খুশি লোক, কথা বলেন উজান মিসরের সুরেলা আরবী ভাষায়। তিনি কেবল সাধারণ এক কাপড় ব্যবসায়ী  বলে শহরের উল্লেখযোগ্য লোকদের মদ্যে তিনি গণ্য ছিলেন না; কিন্তু সেনুসি তরীকার প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে বহুবার, আর সাইয়িদ আহমদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অনুরাগ তাঁকে করেছে দ্বিগুণ বিশ্বাসভাজন। তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে বটে; তবু তিনি তাঁর এক নওকরকে জাগিয়ে আমাদরে খাবার তৈরি করার জন্য বললেন এবং যখন আমরা খাবারের জন্য অপেক্ষা করছি, সেই অবসরে তিনি যে –যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন সেগুলি সম্পর্কে এক একটি করে বলতে থাকেন।

প্রথমত, সাইয়িদ আহমদের পয়গাম পাওয়ার সংগে সংগেই তিনি মিসরের রাজপরিবারের এক মশহুর ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করেন। বহু বছর ধরে এই লোকটি ছিলেন সেনুসি আদর্শের এক প্রবল এবং সক্রিয় সমর্থক। এই শাহযাদাকে আমার মিশনের উদ্দেশ্য পুরাপুরি অবহিত করা হলো। তিনি সহজেই রাজী হয়ে যান আমার হাতে প্রয়োজনীয় টাকা-কড়ি দেবার জন্য। সাইরেনিকার সীমান্ত আমাদের মরু-সফরের উদ্দেশ্য সওয়ারী েএবং দুটি বিশ্বস্ত রাহনুমার ব্যবস্থাও তিনি করলেন। আমাদের মেজবান আমাদের জানালেনঃ এই মুহূর্তে ওঁরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বনি সুয়েফের বাইরে কোনো এক খেজুর বাগিচায়।

আমি আর যায়েদ এখন আমাদের হিজাযী পোশাক খুলে ফেলি। কারণ এ পোশাক পশ্চিমী মরুপথগুলিতে বেজায় ঔৎসুক্য সৃষ্টি করেতে পারে। এই পোশাকের জায়গায় আমাদের দেওয়া হলো উত্তর আফ্রিকার কাটিংয়ের সুতী ট্রাউজার এবং আঁট-সাঁট জামার আর তার সাথে দেওয়া হলো পশমের তৈরী এক প্রকার জোব্বা’-মাথা-ঢাকা আবরণসহ-যা সাধারণ লোকেরা পরে পশ্চিম মিসর এবং লিবিয়ায়। তাঁর বাড়ির ভিটার নিচ থেকে ইসমাঈল বার করলেন ইতালীয় ধরনের দুটি ছোটোখাটো বন্দুক যা ঘোড় –সওয়ার সিপাইদের জন্য উপযোগী ‘কারণ, ‘মুজাহিদীনের মধ্যে এ ধরনের রাইফেলের জন্য নতুন করে গুলী বারুদ সংগ্রহ করা তোমাদের জন্য হবে সহজতরো।”

পরের রাতেই আমরা আমাদের মেজবানের পথনির্দেশ মতো বার হয়ে পড়ি শহর ছেড়ে। আমাদের সাথে যে দুজন রাহনুমা দেওয়া হলো, দেখা গেলো ওরা মিসরের আওলাদ আলী গোত্রের বেদুঈন, যাদের মধ্যে রয়েছে সেনুসির অনেক সমর্থক। ওদের মধ্যে একজনের নাম আবদুল্লাহ, এক সজীবন প্রাণবন্ত তরুণ, যে এক বছর আগে সাইরেনিকার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। আমরা ওখানে কী আশা করতে পারি সে বিষয়ে আমাদের প্রচুর খোঁজ-খবার দেওয়া তার পক্ষে ছিলো সহজ। অপরজনের নাম আমি আমি ভুলে গেছি। ও ছিলো হালকা –পাতলা, বিমর্ষ, কথা বলতো ক্বচিৎ। তবে সে –ও তার চেয়ে অধিক সুদর্শন আবদুল্লাহর চাইতে কম বিশ্বাস ভাজন ছিলো না। ওদের সাথে যে চারটি উট ছিলো –বিশারিন জাতের শক্ত সমর্থ দ্রুতগামী সেই উষ্ট্রীগুলি-স্পষ্টতই বেছে নেওয়া হয়েছিলো সেগুলির গুণের জন্য। ওদের পিঠে যে জীন চাপানো হলো, তা আরবে যে ধরনের জীন ব্যবহারে আমি অভ্যস্ত, তা থেকে খুব আলাদা নয়। আমাদের দ্রুত কোথাও বেশীক্ষণের জন্য না থেমে, চলতে হবে বলে আমাদের পথের সর্বত্র রান্না করা খাবার পাওয়ার প্রশ্ন উঠেনি। ফলে, আমাদের রসদ ছিলো সাদাসিধা ধরনরঃ বড়ো একটি বস্তা-বোঝাই খেজুর, আরেকটি ছোটা বস্তা, মোটা গমের ময়দায় তৈরি মিষ্টি আর কেজুর দিয়ে  বস্তাটি এভাবে ঠেঁসে ভরা যে, তা ফেটে যায় আর কি! আর ছিলো তিনটি উটের সাথে বাঁধা চামড়ার মশক।

দুপুর রাতের সামান্য আগেই ইসমাঈল আমাদের আলিংগন করে এবং আমদের এই অভিযানে আল্লাহর রহমত কামনা করে। আমি দেখতে পেলাম ইসমাঈল খুবই বিচলিত। আবদুল্লাকে নেতা করে আমরা পামকুঞ্জ পেছনে ফেলে বের হয়ে পড়ি এবং কিছুক্ষণের মধ্যে উজ্জ্বল চাঁদের আলোতে দ্রুত কদম তালে কংকরময় মরুপ্রান্তরের উপর দিয়ে আমরা আগিয়ে চলি উত্তর-পশ্চিমদিকে।

মিসরীয় সীমান্ত প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকদের মুকাবিলা এড়িয়ে চলা ছিলো আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। আমরা জানতাম, ওদের মোটরগাড়ি আর উট সওয়ার কনষ্টেবলেরা পশ্চিমের মরুভূমির এই অঞ্চলে চহল দিতে পারে। এজন্য যে প্রধান প্রধান পথ ধরে কাফেলা চলে আমরা সেগুলি থেকে যতোদূর সম্ভব দূরে থাকবার জন্য যত্নবান হই। কিন্তু বাহরিয় আর নীলা উপত্যকার মদ্যে সুদূর উত্তর অঞ্চল পর্যন্ত যে –সব যানবাহন চলাফেরা করে, সেগুলি যেহেতু ফাইয়ুম হয়েই যায় সে কারণে বড় রকমের কোনো বিপদের ঝুকি এতে ছিলো না।

পয়লা রাতে আমরা অতিক্রম করি ত্রিশ মাইল পথ এবং  দিনের বেলা আমরা ঝাউ গাছের এক জংগলে অবস্থান কির। পরের রাতে এবং তার পরের রাতগুলিতে আমরা আরো অনেক বেশি পথ অতিক্রম করি, যার ফলে, চতুর্থ দিনে ফজরের সময় আমরা সেই গভীর  নিচু জায়গাটির কিনারে গিয়ে পৌছুই, যেখানে রয়েছে বাহরিয়্যা মরুদ্যান।

আমরা মরুদ্যানের বাইরে কিছু বড়ো বড়ো শিলার আড়ালে তাঁবু খাটাই। মরুদ্যানটিতে রয়েছে পৃথক পৃথক কয়েকটি  বসতি এবং খামার, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে বাভিতি নামক গ্রাম। আমরা যখন তাঁবু খাটাচ্ছিলাম, তখন আবদুল্লাহ পায়ে হেঁটে খাড়া নিচু শিলার খাদ বেয়ে নেমে গেলো পামগাছের ছায়ায় ঢাকা নিচু জায়গাটিতে-বাভিতিতে আমাদের যোগাযোগের লোকটিকে খুঁজে বের করার জন্য সন্ধ্যার আগে তার পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা শিলার ছায়ায় ঘুমানোর জন্য শুয়ৈ পড়িঃ রাতভর উট হাঁকিয়ে চলার শারীরিক কষ্ট আর শীতের পর কতো আরামদায়ক কতো সুখকর এই  বিশ্রাম! তা সত্ত্বেও আমার খুব বেশি ঘুম হলো না, কারণ নানারকম আইডিয়া আমার মনকে দখল করে বসেছিলো।

আমাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে আমার মনে হলো, বনি সুয়েফ এবং বাহয়্যিার মধ্যে একটি স্থায়ী যোগাযোগের সূত্র রক্ষা করা খুব কঠিন হবে না। আমার দৃঢ় প্রত্যয় হলো, যতোচিত সাবধানতা অবলম্বন করলে এই দুই স্থানের মধ্যে বড়ো বড়ো কাফেলাও চলাফেরা করতে পারবে, করো নযরে না পড়ে। বাভিতিতে সীমানত্ প্রশাসনের চেক পোষ্ট থাকা সত্ত্বেও (আমরা আমাদের লুকানো জায়াগ থেকে মরুভূমির উপর দিয়ে দেকতে পাচ্ছিলাম এই চেক পোষ্টের ইমারতগুলি) বাহরিয়্যার দক্ষিণে অধিকতরো যোগাযোগবিহীন কোনো গ্রামে গোপন বেতার যন্ত্র স্থাপন সম্ভব হতে পারে। এ বিষয়ে কয়েক ঘন্টা পরে আবদুল্লাহ এবং তার সংগে আগত  আমাদের যোগাযোগের লোক, বৃদ্ধ বার্বারটি আমাকে নতুন করে  আশ্বাস দেয়। দেখা গেলো, এই মরুদ্যানটির উপর সরকার মোটামুটি খুবই শিথিল একটা কর্তৃত্ব খাটিয়ে থাকে এবং তারো চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এখানকার বাসিন্দারা বিপুল সংখ্যায় সেনুসি তরীখার অনুসারী।

উটের পিঠে প্রাণান্তকর পাঁচটি রাতঃ প্রথমে শিলা, কংকর ও উঁচুনিচু মাটির উপর দিয়ে এবং পরে সমতল বালিয়াড়ির উপর দিয়ে, বসতিশূন্য সিতরা মরুদ্যান এবং তার প্রাণহীন গাঢ় নীল হ্রদ ছাড়িয়ে, যার কিনার ঘিরে রয়েছে নল-খাগড়া এবং  আরণ্যকে পামের ঝোপ-ঝাড়; সমতল থেকে নিচু আজ এলাকার উপর দিয়ে, যেখানে রয়েছে বিসম্য়কর অসমতল কড়িমাটির শিলা, যা চাঁদের আলো পড়ে একটি ভৌতিক অজাগতিক চেহারা লাভ করেছে এবং পঞ্চম রাতের মেষদিকে আমার চোখের সামনে প্রথম ভেসে উঠলো সীবা মরুদ্যানের ছবি।

বহু বছর ধরে আমার সযত্নে লালিত বাসনাগুলির একটি ছিলো এই সুদূর মরুদ্যানটি একবার দেখার, যা ছিলো এককালে একটি এমন** মন্দিরের পীঠস্থান এবং প্রাচীর বিশ্বের সর্বত্র মশহুর এক দৈবজ্ঞের লীলাভূমি। কিন্তু যে কারণেই হোক, আমার সেই বাসনা আগে কখনো সফল হয়নি। আর আজ, উষার উদয়কালে সেই মরুদ্যান প্রসারতি রয়েছে আমার সম্মুখেঃ একটি নিঃসংগ পাহাড়কে ঘিরে আছে বিস্তীর্ণ পাথ-বীথি; আর, সেইপাহাড়টিতে শহরের ঘরবাড়িগুলি-যাদের ভিত্তি রয়েছে শিলার গভীরে নিহিত গুহানিবাসেরেই মতো- স্তরের পর স্তর উঠে গেছে উপরের দিকে, পাহাড়টির সমতল শীর্ষদেশের উপর দণ্ডায়মান একটি উচু কৌণিক মীনার অভিমুখে; এ এমন একটি ভেঙে পড়া গাঁথুনির অদ্ভুদ জগাখিচুড়ি যা মানুষ কেবল স্বপ্নই দেখে থাকে.. . একটি প্রবল বাসনা আমাকে পেয়ে বসেঃ এর রহস্যজনক প্রচীর ভেদ করে এর মধ্যে ঢুকে পড়ি এবং সেই সব অলিগুলিতে ঘুরে বেড়াই যা ফিরাউনদের আমল প্রত্যক্ষ করেছে; আর সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখি যেখানে লিডিয়া রাজা ক্রীসাসকে দৈবজ্ঞ শুনিয়েছিলেন তাঁর বিনাশের ভবিষ্যৎবাণী আর  ম্যাসিডোনিয়অর আলেকজাণ্ডারকে সংবাদ দিয়েছিলেন তাঁর বিশ্ববিজযের।

কিন্তু এবরও আমার এই বাসনা অপূর্ণই থেকে গোলো। যদিও এতো নিকটে, তবু সীবা শহরটি আমার জন্য বদ্ধই থেকে যাবে-যেখানে অপরিচিত বা বিদেশী লোক কখনো আসে না। কারণ যে-কোনো নতুন লোক এলেই সে সংগে সংগে নযরে পড়ে যাবে সবার। বহির্জগতের সংস্পর্শ থেকে এতো  দূরের কোনো স্থান ভিজিট করা সত্যি বোকামীর কাজ হবে। কারণ, লিবিয়ার প্রায় সীমান্তে অবস্থিত বলে মিসরের সীমান্ত প্রশাসন এর উপর সবচেয়ে কড়া নযর রাখে। আর এতেও সন্দেহ নেই যে, ইতালীর বেতনভোগী গুপ্তচরে এ জা’গাটি  পূর্ণ। এজন্য এ সফরে সীবা দর্শন আমার কিসমতে নেই। দুঃখের সাথে আমি নিজেকে সান্তনা দিয়ে সীবার চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলি।

আমরা িএকটি প্রশস্ত বৃত্ত পথে শহরের কিনার ঘুরে শেষ পর্যন্ত এক আরণ্যক পাক-ঝোপের নীচে তাঁবু খাটাই। আমাদের ইচ্ছা ছিলো না যে, সীমান্তের এতো কাছে যে সময়টুকু অপেক্ষা করা নেহাতই প্রয়োজন, তার বেশি আমরা এখানে অবস্থান করি। এজন্য আবদুল্লাহ বিশ্রাম না করেই দ্রুত উট হাঁকিয়ে ছুটে গেল নিকটবর্তী পল্লীটিতে একটি লোককে খোঁজার জন্য, যার উপর সাইয়িদ আহমদ দায়িত্ব দিয়েছিলেন সীমান্ত পার হয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে। কয়েক ঘন্টা পর সে ফিরে এলো দুজন নতুন রাহনুমাকে নিয়ে, আর আনলো চারটি টাটকা নবীন উট, যা আমাদের বহন করে নিয়ে যাবে সামনের দিকে। এই রাহনুমারা হচ্ছে জাবল আখদারের বারাসা বেদুঈন কবিলার লোক; এর উমর আল-মুখতারের নিজস্ব লোক। বিশেষ করে তিনি ওদের পাঠিয়েছেন ইতালীর অধিকৃত জাগবুব ও জালু নামক দুটি মরুদ্যানের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাটুকুর মধ্যে দিয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে সাইরেনিকার মালভূমি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওখানেই উমরের দেখা করতে হবে আমাকে।

আবদুল্লাহ এবং তার বন্ধু মিসরে তাদরে গাঁয়ের বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়। খলিল ও আবুদর রহমান-এই দুই মজাহিদিনের পথ নির্দেশে আমরা যাত্রা করি আমাদে হপ্তা দীর্ঘ পথেপ্রায় পানিশূন্য মরু-স্তেপ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে, যা ধীরে ধীরে উচু হয়ে উঠে গেছে জাবল আখদারের দিকে। আমি জীবনে যতো মরু সফর করেছি তার মধ্যে এটিই ছিলো সবচেয়ে কঠিন; যদিও সতর্কতার সাথে দিনের বেলা আত্মগোপন করলে এবং কেবল রাতর বেলা পথ চললে ইতালীয় পাহারাদরদের নযরে পড়ার আশংকা খুব বেশি ছিলো না। তবু দূরে দূরে অবস্থিত ইঁদারাগুলি এড়িয়ে চলার আবশ্যকতা এ দীর্ঘ সফরকে একটা দুঃপ্ন করে তোলে। কেবল একবারই আমরা ওয়াদি আল-ম্রার একটি পরিত্যক্ত ইঁদারা থেকে আমাদের উটগুলিকে পানি খাওয়াতে পারলাম এবং আমাদের মশকগুলি আবার ভরে নিতে সক্ষম হলাম। আর এতেই আমরা প্রায় ভেঙে পড়ি।

যে-সময়ে ইঁদারাটিতে পৌছুতে পারবো বলে আমরা আশা করেছিলাম, সেকানে পৌছুই তার পরে। আসলে, আমরা যখন আপনাদের জানোয়ারগুলির জন্য পানিতুলতে শুরু করি, তখন পূব আসমনে সূর্যের আভাস দেখা দিচ্ছে আর যখন আমরা তা শেষ করলাম, তখন সূর্য গিয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম আসমানে দিগন্তের উপরে। খলিলের কথামতো আমাদের এখনো পুরা দুঘন্টা কাটাতে হবে। সেই নিচু পাথুরে জায়গাটিতে পৌছুতে, যা হবে দিনের বেলা আমাদের লুকানোর স্থান। কিন্তু আমরা যেই আমাদের সফর শুরু করেছি, অমনি একটি উড়োজাহাজের অশুভ গুন-গুন আওয়াজ মরুভূমির নীরবতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়ঃ েএবং কয়েক মিনিট পরেই একটি ছোট্ট একক পাইলট-চালিত উড়োজাহাজ আমাদের মাথার উপর দেখা দেয় এবং সোজা নিচে নেমে ক্রমে নিচু হয়ে আসা চক্রের আকারে ঘুরতে থাকে। গা ঢাকা দেবার কোনো জায়গায় ছিলো না। তাই,  উট থেকে লাফিয়ে নেমে আমরা ছিটকে পড়ি, আর ঠিক  সেই মুহুতেৃ পাইলট তার কামান থেকে গুলী শুরু করে।

-‘শুয়ে পড়ো, মাটির উপর শুয়ে পড়ো, আমি চীৎকার করে উঠি- ‘একটুও নড়ো না- মরার মতো পড়ে থাকো।

কিন্তু খলিল, মুজাহিদীনের সাথে তার বহু বছরের জীবনে এ ধরনের মুকাবিলার অভিজ্ঞতা নিশ্চয় বহু বার তার হয়েছে, মরার ভান করে সে পড়ে থাকলো না। সে একটি পাথরের উপর মাথা রেখে চিত হয়ে শুয়ে পড়লো এবং উচু করে তুলে ধরা একটি হাঁটুর ভরে তার রাইফেল ফেলে অগ্রসরমান ‍উড়োজাহাজটির উপর গুলি করতে শুরু করলো, এলোপাতাড়ি নয়, প্রত্যেকবারই গুলি ছোঁড়ার আগে সতর্কতা সঙে লক্ষ্য স্থির করে, যেনো কোনো নির্দিষ্ট টার্গেট গুলী করার প্র্যাকটিস করছে। এ ছিলো ভয়ানক এক দুঃসাহসিক কাজ। কারণ উড়োজাহাজটি ফ্লাট ডাইভ মেরে সোজা ‍ছুটে  আসছিলো তার দিকে, বালুর উপর বুলেট ছুঁড়তে ছুঁড়তে। কিন্তু খলিলের গুলি নিশ্চয়ই উড়োজাহাজটিতে লেগেছিলো। কারণ, মুহূর্তের জন্য পালট খেয়ে উড়োজাহাজটি তার নাক আকাশমখো করে দ্রুত উপরে ঊঠে গেলো। পাইলটটি হয়তো ভেবেছিলো, নিজের নিরাপত্তার বিনিময়ে চারজন লোককে গুলী করা লাভজনক হবে না। সে দুএকবার আমাদের উপর ঘুরে তারপর পুব মুখে জাগবুবের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

-ঐ ইতালিয়ন কুত্তার বাচ্চারা কাপুরুষ বুজদীল, আমরা যখন আবার জমায়েত হচ্ছি, তখন খলিল শান্তভাবে বলে,ওরা হত্যা  করতে চায়- কিন্তু নিজের চামাড়ায় আঁচড় লাগুক তা চায় না।

আমরা কেউই যখম হইনি। কিন্তু আব্দুর রহমানের উটটি মরে গেলো। তার গদি এবং থলে আমরা যাযেদের উটের পিঠে চাপিয়ে দেই এবং এখন থেকে সে যায়েদের পেছনে হালকা গদিতে বসে চলতে থাকে।

তিন দিন পর আমরা জাবল আখদারের জুনিপর বনাঞ্চলে প্রবেশ করি এবং যে-ঘোড়াগুলিকে আমাদের জন্য একদল মুজাহিদীনের হিফাযতে এক গোপন জায়গায় রাখা হয়েছিলো, সেগলির সাথে কৃতজ্ঞতার সাথে আমরা ক্লান্ত উটগুলিকে বদল করি। এখন থেকে মরুভূমি আমাদের পেছনে থাকবে। আমরা েএকটি পাহাড়ি শিলাময় মালভূমির উপর দিয়ে আমাদের ঘোড়া ছুটাই। মালভুমি অসংখ্য শুকনা স্রোত পথ দ্বারা জালের মতো চিহ্নিত আর একানে রয়েছে জুনিপার তরুরাজি, যা কোনো কোনো জায়গায় প্রায়  অভেদ্র জংগল হয়ে আছে। ইতালীর অধিকৃত অঞ্চলের মধ্যে এই পথচিহ্নহীন বনাঞ্চলটি হচ্ছে ‍মুজহিদীনের শিকারের জায়গা।

….             ..        ..               ..     ..

আরো চার রাতের সফর আমাদরে নিয়ে পৌছালো ওয়াদি-আত-তাআবান নামক এক স্থানে। খুব সঠিকভাবেই জাগাটির নাম রাখা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে, ‘শ্রান্ত ক্লান্ত জনের উপত্যকা’। এখানেই উমর –আল-মুখতারের সংগে আমাদের মুলাকাত করার কথা। গভীর অরণ্যে ঢাকা একিট খাদের মধ্যে নিজেদের নিরাপদে লুকিয়ে আমরা আমাদের ঘোড়াগুলিকে একটি শিলার আড়ালে সামনের দুপায় রশির বেড়ি পরিয়ে জাবল- আখদারের সিংহের আগমনের অপেক্ষায় থাকি। আজকের রাতটা  বড়ো ঠাণ্ডা, নক্ষত্রহীন আর মর্মর ধ্বনি তোলার নীরবতায় ভারাক্রান্ত!

সিদি উমর আসতে আরো কয়েক ঘন্টা লাগবে; আর রাতটা যেহেতু গাঢ় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, আমাদরে দু্ই বরাসা বন্ধু দেখলো, এই সময়ের মধ্যে কয়েক মাইল পুবে বু-সফাইয়ার ইঁদারাগুলি থেকে আমদের মশকগুলি আবার ভর্তি করে না নেওয়ার কোন যু্ক্তিসংগত কারণ নেই! সত্যি, বু-সফাইয়া থেকে মাইলেরও কম দূরে রয়েছে একটি সুরক্ষিত ইতালীয় চৌকি-

-‘কিন্তু’ খলিল বলে, ‘ঐ খেকী কুত্তারা অমন ঘুটঘুটে আঁধার রাতে তাদের দেওয়ালের বাইরে আসতে হিম্মত করবে না।’

এভাবে. যায়েদকে সংগে নিয়ে খলিল দুটি খালি মশকসহ ঘোড়ায় চড়ে রওনা দেয়। শিলাময় পথের উপর দিয়ে চলতে গিয়ে যাতে কোনো আওয়াজ না হয়, সেজন্য ওরা ছেঁড়া কাপড় পেঁছিয়ে ওদের ঘোড়ার খুর বেঁধে দেয়। ওরা দুজন অন্ধকারে হারিয়ে গেলে,আমি আর  আবদুর রহমান নিজেদের গরম করার জন্য ঘেঁষাঘেষি করে নিচু শিলায় হেলান দিয়ে বসি। আগুন জ্বলানো হবে খুবই বিপজ্জনক।

ঘন্টাখানেকের পর জুনিপার গাছগুলির মধ্যে কয়েকটি শাখা মর্মর করে উঠলো এবং পাথরের উপর একটি স্যাণ্ডেরের মোলায়েম শব্দ হলো। মুহূর্তেই সতর্ক আমার সংগী রাইফেল হাতে সোজা দাঁড়িয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য এবং অন্ধকারের দিকে তাকায় তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে। একটি নিচু গলার ডাক- যা শিয়ালের কান্নার চেয়ে অন্যরকম নয়-ভেসে এলে জংগলের মধ্যে থেকে। আর আবুদর রহমান মুখের সম্মুখে হাত দুটিকে পেয়ালার মতো করে একই ধরনের ধ্বনি দিয়ে তার জবাব দেয়। আমাদের সামনে ‍দুটি মানুষের মূর্তি দেখা দিলো। ওরা ছিলো পায়দল এবং রাইফেলধারী। আরো কাছে আসার পর ওদের একজন বললোঃ ‘আল্লাহর পথ’- এবং তার উত্তরে আবদুর রহমন বলেঃ ‘লা হাওলা ওয়ালা কু’ওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’-আল্লাহ ছাড়া কোন ক্ষমতা নেই, কোনো শক্তি নেই কারো’ যা আমার কাছে এক সাংকেতিক শব্দ বলেই মনে হলো।

এই দুজন নতুন আগন্তুকের মদ্যে দুজনেরই পরণে ছিলো লিবীয় বদ্দুদের চাদর,টোটাফাঁটা জার্দ। ওদের একজন আবদুর রহমানকে চিনে বলে মনে হলো। কারণ আবুদর রহমন তার দুহাত ধরে আন্তরিকতার সাথে তাকে সম্বর্ধনা জানায়। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো দুই মুজাহিদীন পরপর আমার হাত ধরে একইভাবে। ওদের একজন বলেঃ ফি আমানিল্লাহ। আল্লাহ আপনার সহায় হোন, সিদি উমর আসছেন।

আমরা উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সম্ভবত মিনিট দশেক পরে আবার জুনিপার ঝোঁপের মধ্যে পাতার সরসর শব্দ.. . তারপর ছায়ার ভেতর থেকে বের হয়ে আসে আরো তিনটি মানুষ তিন দিক থেকে এবং উদ্যত রাইফেল তোলে এসে পড়ে একেবারে আমদের উপর।ওরা যখন বুঝতে পারলো, ওরা আমাদেরই মুলাকাতের ইন্তেজারিতে ছিলো, সংগে সংগেই ওরা আবার ছড়িয়ে পড়লো ঝোঁপের ভেতর বিভিন্ন দিক। স্পষ্টত ওরা ওদের নেতার নিরাপত্তার উপর সতর্ক নযর রাখার জন্যই এভাবে ঝোঁপের ভেতর নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

আর তারপর তিনি এলেন.. . এলেন একটি ছোট্ট ঘোড়ার সওয়ার হয়ে, যার খুর ‍ছিলো কাপড় দিয়ে মোড়ানো। তাঁর দুপাশে দুজন করে লোক এলো হেঁটে হেঁটে, আর তাঁর পেছনে পেছনে এলো আরো কয়েকজন। আমরা যে শিলাগুলিতে ঠেস দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, তিনি যখন তার পাশে এসে পৌছুলেন, তখন তাঁর লোকদের একজন তাঁকে ঘোড়া থেকে নামাতে সাহায্য করলো আর আমি দেখতে পেলাম, তাঁর চলতে কষ্ট হচ্ছে (পরে আমি জানতে পেরেছিলাম, মাত্র দশদিন আগে হঠাৎ আক্রমণে তিনি যখম হয়েছিলেন); উদীয়মান চাঁদের আলোতে আমি তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিঅঃ একজন মাঝারি সাইজের লোক, মজবুত যাঁর হাড্ডিঃ খাটো, বরফের মতো সাদা দাড়ি তাঁর গভীর রেখা-চিহ্নিত মুখমণ্ডলের ফ্রেমের কাজ করছে। চোখ দুটি তাদরে কোটরের গভীরে লুকানো; চোখের চারপাশে যে ভাঁজ পড়েছে, তাতে আন্দাজ করা যায়, ভিন্ন অবস্থায় তাঁর চোখ দুটি হয়তো সহজেই হাসিতে স্ফুরিত হতো। কিন্তু এখন আর তাঁর এ চোখে কিছুই নেই, অন্ধকার যন্ত্রণা আর হিম্মত ছাড়া।

-খোশ আমদেদ বৎস, -এবং তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর চোখ দুটি আমাকে আমার পা থেকে মাথা তক দেখছিলো, তীক্ষ্মভাবে, যেনো আমাকে যাচাই করা হচ্ছে-এমন মানুষের চোখ, বিপদ যার নিত্যসাথী!

তাঁর লোকদের একজন একটি কম্বল বিছিয়ে দিলো যমিনের উপর আর সিদি উমর তাঁর শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে সেখানেই বসে পড়লেন। আবদুর রহমান ‍নুয়ে তাঁর হাত চুমু খায় এবং সর্দারের ইজাযত নিয়ে মাথার উপর ঝুলে থাকা শিলার কভারের নীচে সামান্য আগুন ধরাবার জন্য বসে পড়ে। সে আগুনের নিষ্প্রভ দীপ্তিতে সিদি উমর পড়লেন চিঠিখানা, যা আমি সাইয়িদ আহমদের কাছ থেকে সংগে করে এনেছি। চিঠিটি তিনি যত্নের সংগে পড়েন, তারপর সেটি ভাঁজ করে কিছুক্ষণের জন্য রাখেন তাঁর মাথার উপর, শ্রদ্ধা ও ভক্তির এমন একটা ভংগির সাথে, যা বলতে গেলে, আরব দেশে কখনো দেখা যায় না, দেখা যায় উত্তর আফ্রিকায়, প্রায়ই। আর তারপর স্মিত হাসির সংগে তিনি আমার দিকে মুখ ফিরানঃ

-‘সাইয়িদ আহমদ, আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন, তোমার সম্পর্কে অনেক ভাল কথা বলেছেন। তুমি আমাদের সাহায্য করতে চাও। কিন্তু আমি জানি না, সর্বশক্তিমান করুণাময় আল্লাহ ছাড়া আর কোত্থেকে মদদ আসতে পারে! বলতে কি, আমরা আমাদের জন্য বরাদ্দ সময়ের প্রায় শেষ কিনারে এসে পড়েছি!’

-‘কিন্তু এই পরিকল্পনা যা সাইয়িদ আহমদ উদ্ভাব করেছেন’- আমি মাঝপথে প্রশ্ন করি-‘সেটি কি একটি নতুন সূচনা হতে পারে না? যদি নিয়মিত সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায় এবং ভবিষ্যত অভিযানের জন্য কুফরাকে কেন্দ্র করা যায়, তা’হলে কি ইতালীয়দের প্রতিহত করা সম্ভব হবে না?’

সিদি উমর যে স্মিত হাস্যের সাথে আমাকে জবাব দিলেন, তেমন তিক্ত ও অসহায় হাসি আমি জীবনে কখনো দেখিনিঃ কুফরা.. .? আমরা হারিয়েছি। প্রায় পনেরো দিন আগেই তা ইতালীয়রা দখল করে নিয়েছে.. .।’

খবরটি আমাকে স্তম্ভিত করে দেয়। অতীতের এই সব কটি মাস আমি আর সাইয়িদ আহমদ এই ধারনার উপরই আমাদের পরিকল্পনা তৈরি করে চলেছিলাম যে, দৃঢ় প্রতিরোধের জন্য কুফরাই হতে পারে নতুন করে সমাবেশের কেন্দ্র। এখন,  কুফরা যখন হাতছাড়া হয়ে গেছে সেনুসিদের জন্য জাবল আখদারের নিপীড়িত মালভুমি ছাড়া আর কিছুই নেই।–কিছুই নেই নিশ্চিতভাবে ক্রমশঃ এঁটে আনা ইতালীয় দখলের অভিশাপ ছাড়া, স্থানের পর স্থান হারানো, মন্থর এবং অনিবার্যভাবে গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু মুহূর্তের জন্যও চাপ শিথিল না হয়ে!

-‘কুফরার পতন হলো কেমন করে?’

একটি ক্লান্ত ভংগিতে সিদি উমর তাঁর লোকদের একজনকে আরো কাছে আসতে ইংগিত করেনঃ এই লোকটি আপনাকে বলবে সে কাহিনী.. . কুফরা থেকে যে কটি লোক পালিয়ে বেঁচেছে, ও তাদেরই একজন। মাত্র গতকাল এসেছে।

কুফরার লোকটি আমার সামনেই তার পাছার উপর বসে পড়ে এবং তার ছেঁড়া জোড়া তালি দেয়া ‘বার্নাসটি’ তার চারদিকে টেনে জড়ো করে। সে কথা বলে আস্তে আস্তে, গলার আওয়াজে আবেগের কোন কাঁপন না তুলে, কিন্তু যে-সব বালা মুসিবত সে দেখেছে, তার দৃঢ় মুখমন্ডলে, তা প্রতিবিম্বিত হয়েছে বলে মনে হলো।

-ওরা আমাদের উপর হামলা করে তিন দিক থেকে তিনটি ব্যুহ রচনা করে বহু সাঁজোয়া গাড়ি আর ভারী কামান নিয়ে। ওদের উড়োজাহজগুলি একেবারে নিচুতে নেমে আসে এবং বোমা ফেলে বাড়ি-ঘরের উপর, মসজিদের উপর এবং খেজুর বাগিচার উপর। হাতিয়ার বহন করতে পারে এমন পুরুষের সংখ্যা আামদের মধ্যে ছিলো কয়েক’শ। এদের বাদ দিয়ে যারা বাকী রইলো, তারা হচ্ছে স্ত্রী লোক, ছেলে মেয়ে এবং যয়ীফের দল। আমরা লড়ি একের পর এক প্রত্যেকটি ঘর বাঁচাবার জন্য। আমাদের তুলনায় ওরা ছিলো অনেক বেশি শক্তিশালী। আখেরে কেবল আল-হাওয়ারী গ্রামটি রইলো আমাদের দখলে। ওদের সাঁজোয়া গাড়ির মুকাবিলায় আমাদের রাইফেলগুলি হয়ে পড়লো অকেজো এবং ওরা আমাদের পরাভূত করে ফেললো। আমরা মাত্র কজন বেঁচে যাই। আমি আত্মগোপন করি পাম-বাগিচায় একটি সুযোগের প্রতীক্ষায়, যাতে আমি ইতালী ব্যুহের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে পড়তে পারি। আর সারারাত আমি শুনলাম স্ত্রীলোকের যন্ত্রণাকাতর চীৎকার, কারণ ওদের উপর বলাৎকার করেছিলো ইতালীয় সৈন্যরা আর ইরিত্রীয় ‘আশকারীরা’। পরদিন, এক বুড়ি  আমার জন্য  কিছু পানি আর রুটি নিয়ে এলো, আমি যেখানে লুকিয়েছিলাম, সেখানে। সে আমাকে বললোঃ যে-সব লোক বেঁচে আছে, ইতালীয় জেনারেল তাদের সবাইকে সাইয়িদ মুহাম্মদ আল-মাহদীর কবরের কাছে জড়ো করে এবং তাদের চোখের সামনেই একখন্ড কুরআন ছিড়ে  টুকরা টুকরা করে মাটির উপর নিক্ষেপ করে এবং তাদের উপর নিজের বুট রেখে চীৎকার করে ওঠেঃ ‘তোদের বদ্দু নবী এখন তোদের সাহায্য করুক না, যদি তার ক্ষমতা থাকে’। এরপর সে হুকুম দেয় মরূদ্যানের সব পামগাছ কেটে  ফেলতে, ইঁদারাগুলিকে ধ্বংস রে দিতে এবং সাইয়িদ আহমদের গ্রন্থগারের সব কিতাব জ্বালিয়ে দিতে। পরদিন সে আদেশ করে-আমাদের কিছু মুরুব্বিজন ও ‍উলামাকে তোলা  হবে একটি উড়োজাহাজে-এবং ওঁদের অনেক উপরে উড়োজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হলো মাটির উপর-চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মৃত্যু বরণ করার জন্য.. . তারপরের রাতও আমি সারা বেলা আমার লুকানোর স্থান থেকে শুনতে পাই স্ত্রীলোকদের চীৎকার, আর সেপাইদরে অট্টহাসি আর রাইফেলের শব্দ.. .। শেষে আমি সেই অন্ধকার রাতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ি মরুভূমিতে। আর একটি ছোটো উট পেয়ে তারই উপর সওয়ার হয়ে ‍উধাও হই.. .’

কুফরার লোকটি তার ভয়ংকর কাহিনী শেষ করলে সিদি উমর তাকে সস্নেহে মেলায়েমভাবে নিজের কাছে টেনে নিয়ে পুনরাবৃত্তি করেন, ‘কাজেই বৎস, দেকতে পাচ্ছে আমরা সত্যই আমাদের বরাদ্দ সময়ের কিনারে এসে পড়েছি’। এবং যেনো আমার চোখেল অব্যক্ত প্রশ্নে জবাবেরই আরো বললেনঃ ‘আমরা লড়ছি, যেহেতু আমরা লড়তে বাধ্য আমদের ধর্ম এবং আমাদের আযাদীর জন্য, যতোক্ষণ না আমরা হানাদারদের কোলে ঢলে পড়েছি।অন্য কোনো বিকল্প  নেই আমাদের জন্য-‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’-‘আমরা আল্লাহরই এবং তাঁরই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন।’ আমরা আমাদের স্ত্রীলোক আর বালক-বালিকাদের পাঠিয়ে দিয়েছি মিসর, যেনো আল্লাহ যখন আমাদের মৃত্যু চান, তখন ওদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা করতে না হয়।’

চাপা গুঞ্জন ধ্বনি অন্ধকার আসমানের কোনো জায়গায় ধীরে ধীরে শ্রুতিগোচর হয়ে ওঠে যেনো, সজ্ঞান চিন্তা ছাড়াই সিদি উমরের লোকদের একজন অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বালু ছিটাচ্ছে আগুনের উপর। জ্যোছনা-আলোকিত মেঘের পটভূমিকায় একটা অস্পষ্ট আকার ছাড়া অপর কিছুই মনে হলো না উড়োজাহাজটিকে; বেশ নিচু দিয়ে, আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো পুব দিকে এবং তার ইঞ্জিনের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো।

-‘কিন্তু সিদি উমর,’ আমি বলি-‘এখন যখন একটি পথ খোলা রয়েছে আপনার জন্য এবং আপনার মুজাহিদীনে’র জন্য-মিসরে সরে পড়াই কি বেহতর নয়? কারণ, মিসরে সাইরেনিকা থেকে আগত বহু মুহাজিরকে জমায়েত করা এবং একটা অধিকতরো কার্যকর ফৌজ গড়ে তোলা সম্ভব হতেও পারে। এখানকার সংগ্রাম কিছুকালের জন্য স্থগিত করাখাই উচিত, যাতে করে লোকেরা তাদের শক্তি কিছুটা ফিরে পেতে পারে.. . আমি জানি, মিসরে ব্রিটিশ শক্তি-তাদের দুপাশে শক্তিশালী  ইতালীয় ফৌজের অবস্থান রয়েছে-এই চিন্তায় খুব সুখী হতে পারেনি। আল্লাহ জানেন, আপনারা যদি ওদের বোঝাতে পারেন যে, আপনারা ওদের দুশমন মনে করেন না, তাহলে ওরা হয় তো আপনাদের প্রস্তুতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না. ..।

-না বাপ, এ আর সম্ভব নয়, অনেক বেশি দেরী হয়ে গেছে। তুমি যা বলেছো তা সম্ভব ছিলো আজ  থেকে পনেরো –ষোলো বছর আগে, সাইয়িদ আহমদ তুর্কীকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশদের উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে। তুর্কী অবশ্য আমাদের সাহায্য করেনি.. .। অনেক দেরী হয়ে গেছে; এখন আর তা সম্ভ নয়। আমাদের ভাগ্যকে সহজতরো করার জন্য ব্রিটেন আর তার কড়ে আঙুলও তুলবে না; আর ইতালীয়রা তো আমাদের নির্মূল করার জন্যই বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যতে প্রতিরোধের সকল সম্ভাবনা চুরমার করে দিতে ওরা কসম খেয়েছে। আমি আর আমার অনুসারীরা যদি েএখন মিসর যাই, আমরা আর কখনো ফিরে আসতে পারবো না।  আর তুমিই বলো, কী করে আমরা আমাদের লোকজনকে ত্যাগ করতে পারি এবং নেতৃত্বহীন অবস্থায় রেখে চলে যেতে পারি-আল্লাহর দুশমনের দ্বারা ধ্বংস হওয়ার জন্য?

-সাইয়িদ ইদরীস কী বলেন? তিনিও কি  আপনার মত পোষণ করেন, সিদি উমর?

-সাইয়িদ ইদরীস হচ্ছেন এক মহৎ পিতার সুবোধ পুত্র, একজন ভালো মানুষ।

কিন্তু এ ধরনের একটি সংগ্রাম বরদাশত করার কলিজা আল্লাহ তাঁকে দেননি.. .

সিদি উমরের কণ্ঠস্বরে নৈরাশ্য ছিলো না-ছিলো গভীর আগ্রহ, যখন তিনি এভাবে তাঁর দীর্ঘ আযাদী সংগ্রামের অনিবার্য পরিণাম  সম্পর্কে আমার সংগে আলাপ করছিলেনঃ তিনি জানতেন, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই অপেক্ষা করছে না তাঁর জন্য। মৃত্যুভয় তাঁর নেই, মৃত্যু তিনি চাননি। কিন্তু মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টাও তিনি করেননি এবং আমি নিশ্চিত যে, কী ধরনের মৃত্যু যে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, তা-ও যদি তিনি জানতেন, তবু তা এড়াবার চেষ্টা তিনি করতেনা না। মনে হলো, তিনি তাঁর শরীর এবং মনের প্রতিটি অণুপরমাণুতে সচেতন যে, প্রত্যেক মানুষিই তার পরিণাম বহন করে চলেছে নিজের সংগে-সে যেখানেই যাক এবং যে কাজই করুক।

একটি মৃদু চাঞ্চল্য শ্রুতিগোচর হয়ে ওঠে ঝোঁপটির মধ্যে, এতো মৃদু যে স্বাভাবিক অবস্থায় অবস্থায় তা টের পাওয়া যেতো না; কিন্তু তখনকার অবস্থা মোটেই স্বাভাবিক ছিলো না। অপ্রত্যাশিত এলাকা থেকে যে-কোন রকম বিপদের আশংকায় আমার কান দুটি খাড়া রেখে স্পষ্ট  বুঝতে পারলাম, চুপি চুপি পদচারণা আকস্মিকভাবে থেমে গেছে এবং কয়েক মিনিট পরেই আাবর শুরু হলো তার অস্পষ্ট ধ্বনি। ঝোঁপটি ফাঁক হয়ে গেলো আর তার মধ্যে থেকে বের হয়ে এলো দুজন যায়েদ এবং খলিল। তাদের সংগে দুজন সাস্ত্রী। তারা যে ঘোড়া কটি টেনে টেনে নিয়ে এসেছে,  সেগুলির পিঠে চাপানো হয়েছে বোঝাই মশক। এমনভাবে মশকগুলি পানিতে ভর্ভি করা হয়েছে যে, সেগুলি ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। সিদি উমরকে দেখে খলিল ছুটে আগিয়ে গেলো নেতাকে চুমু খাওয়ার জন্য, যখন আমি পরিচয় করিয়ে দিই যায়েদকে। সিদি উমর তাঁর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখরের যায়েদের কৃচ্ছ্রতাপূর্ণ মুখমন্ডল আর বাহুল্য-বর্জিত শরীরের উপর, স্পষ্ট অনুমোদনের সাথে। যায়েদের কাঁদের উপর তিনি হাত রেখে বললেনঃ

-‘আমার পিতৃপুরুষের দেশ থেকে আগত হে ভাই, তোমাকে খোশ আমদেদ। তুমি কোন আরব গোত্রের লোক?’-এবং যায়েদ যখন বলরো তার কওমের নাম শাম্মার, উমর স্মিত হাসির সাথে মাথা নেড়ে বললেনঃ  ওহো, তুমি তাহলে সেই হাতিম আত তাইর কওমের লোক, মানুষের মধ্যে যিনি ছিলেন সবচেয়ে মহানুভব.. .।(প্রাগ-ইসলামিক যুগের এই আরব যোদ্ধা ও কবি তাঁর মহানুভবতা ও বদান্যতার জন্য মশহুর তাঁর নাম এখন এই গুনের সমার্থক হয়ে উ েঠছে, যে গুণটির প্রতি আরবেরা দিয়ে থাকে পরম গুরুত্ব যায়েদ শাম্মার গোত্রের লোক শা্মারেরা হাতিমের কওম-তাই থেকে উদ্ভুদ বলে ওরা দাবী করে)

সিদি উমরের একজন লোক একটি টুকরা কাপকেড় বাঁধা কিছু খেজুর আমাদের সামনে রাখলেন তিনি নিজে এ সামান্য খাবারে আমাদের আমণ্ত্রণ জানালেন। আমরা খেয়ে ওঠার পর প্রবীণ যোদ্ধা দাঁড়িয়ে গেলেনঃ

-‘ভায়েরা, এখন এখান থেকে সরে পড়ার সময়। আমরা বু-স্ফাইয়ার ইতালীয় চৌকির একেবারেই কাছে রয়েছি। সূর্যোদয় পর্যন্ত এখানে থাকা হবে বিপজ্জনক।’

আমরা আমাদের ভাঙাচোরা ক্যাম্প গুছিয়ে ফেলি এবং সওয়ার হয়ে সিদি উমরকে অনুসরণ করি। আমাদের পেছনে চলে তাঁর বাকী লোকেরা পায়ে হেঁটে। যেই আমরা খাদ থেকে বের হয়ে হয়েছি, আমি দেখতে পেলাম সিদি উমরের দলটি-যা ধারণা করেছিলা, তার থেকে অনেক বড়োঃ এক এক করে কালো ছায়ামূর্তি টিলার আড়াল থেকে, গাছের পেছন থেকে তীরের মতো ছুটে এসে আমাদের  সারিতে যোগ দিলো-যখন আরো কয়েকজন লোককে ডানে –বামে দূরে রাখা হয়েছে পাহাড়া দেয়ার জন্য। কোনো সাধারণ পর্যবেক্ষকের পক্ষেই ধারণা করা সম্ভব হতো না যে, আমাদরে চারপাশে প্রায় ত্রিশ জন লোক রয়েছে; কারণ ওদের প্রত্যেকেই আগাচ্ছে নীরবে, রেড ইণ্ডিয়ান গুপ্তচরের মতো।

সূর্যোদয়ের আগে আমরা পৌঁছুই উমর আল—মুখতারের নিজস্ব দাওআর বা গেরিলা বাহিনীতে প্রধান তাঁবুতে। তখন দুশর কিছু লোক নিয়ে গঠিত ছিলো এ বাহিনী। তাঁবু ফেলা হয়েছে এক গভীর সংকীর্ণ গিরিখাদের মধ্যে আর উপরে ঝুলে থাকা শিখাগুলির উপর জ্বলছে ছোটো ছোটো আগুন। কয়েকজন লোক ঘুমাচ্ছে মাটির উপর। অন্যেরা , সুবহে সাদের ধূসরতায় যাদের মনে হচ্ছে কতকগুলি অস্পষ্ট ছায়ার মতো-তাঁবুর নানা রকম দায়িত্বে ব্যস্তঃ ওরা ওদের অস্ত্রশস্ত্র সাফ করছে, পানি আনছে, খাবার রান্না করছে অথবা এখানে ওখানে গাছের সংগে যে অল্প কটি ঘোড়াকে বেঁধে রাখা হয়েছে সেগুলির পরিচর্যা করচে। প্রায় সকলেরই পরণে রয়েছে ছেঁড়া জোড়া তালি দেয়া কাপড়। তখন কিংবা তার পরে, এই পূরা দলটিতে একিট সম্পূর্ণ জার্দ (কম্বলের মতো পশমী চাদর, যা মিসর এবং লিবিয়ার লোকেরা পরে) অথবা বার্নাস ( মাথা ঢাকা এক ধরনের পোশাক, যা উত্তর আফ্রিকার আরবও পরে) আমি দেখিনি। অনেকের গায়ে রয়েছে ব্যণ্ডেজ, যা দুশমনের সাথে ওদের সাম্প্রতিক মুকাবিলার সাক্ষ্য বহন করছে। বিস্ময়ের সংগে দুটি স্ত্রী লোককে আমি দেখতে পাই এই তাঁবুতেঃ একজন বৃদ্ধা, অপরজন তরুণী। ওরা একটি আগুনের পাশে বসে বসে মোটা ভোতা সূঁচ দিয়ে তন্ময় হয়ে মেরামত করছে একটি ছেড়া জীন।

-‘আমাদের এই দুটি বোন, আমরা যেখানেই যাই, আমাদের সংগে যায়’, -আমার নির্বাক বিস্ময়ের জবাব দেন সিদি উমর জানান,-‘ওরা আমাদের স্ত্রীলোকদের সংগে মিসরে আশ্রয় নিতে রাযী হয়নি; ওরা হচ্ছে মা-বেটি। ওদের পরিবারের সব ক’টি পুরুষই মারা গেছে সংগ্রামে।’

দুদিন এবং এক রাত ধরে-যখন তাঁবু উঠিয়ে নেয়া হচ্ছিলো মালভূমির খাদ এবং জংগলের ভেতরের আরেক জায়গায়-সিদি উমর এবং আমি, মুজাহিদীনের জন্য নিয়মিত রসদ কী করে সরবরাহ করা যায়, তার প্রত্যেকটি সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং আলাপ-আলোচনা করি। ছিটেফোঁটা রসদ তখনো আসছিলো মিসর থেকে। মনে হলো ইতালীয়দের সংগে তাঁর সন্ধি-চু্ক্তির সময়ে, ব্রিটেনের সংগে যে মুহূর্তে সাইয়িদ ইদরীস একটি বোঝাপড়ায় আসেন, তখন থেকেই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মিসরের অভ্যন্তরে সেনুসি তৎপরতাকে নতুন করে কিছুটা সহনশীলাতার সংগে দেখতে ইচ্ছুক ছিলো-অবশ্য যতোক্ষণ তা সীমিত থাকে স্থানীয় গতিবিধির মধ্যে; বিশেষ করে, যোদ্ধাদের যেসব ছোটো ছোটো দল ইতালীয় ব্যুহ ভেদ করে সমুদ্দুরের উপকূলে নিকটতম মিসরীয় শহর সেলুমে আসতো তাদের গনীমত বিক্রি করার জন্য, যার বেশির ভাগিই ছিলো ইতালীয় খচ্চর, তাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যের বিনিময়ে সেই দলগুলির প্রতি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, সরকারীভাবে লক্ষ্য রাখতো না। আসলে মুজাহিদীনের জন্য এ ধরনের অভিযান ছিলো চরম বিপজ্জনক এবং এ জাতীয় অভিযান প্রয়াই সম্ভব হতো না, বিশেষ করে েএ কারণে যে ইতালীয়রা খুব দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া তুলেছিলো মিসরের সীমান্ত বরাবর। সিদি উমর আমার সংগে একমত হন, একমাত্র বিকল্প হতে পারে, যে পথে আমি এসেছি সেই পথটিকে একটি রসদ সরবরাহের পথ হিসাবে ব্যবহার করা এবং মিসরের মরূদ্যান বাহরিয়্যা,ফারাফ্রা ও সীবায় গোপন ডিপো স্থাপন করা। কিন্তু এই পরিকল্পনা দীর্ঘ দিন ইতালীয়দের সতর্ক নযর এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবে কিনা, এ বিষয়ে তিনি ছিলেন খুবই সন্দিহান।

[উমরের আশংকা যে খুবই বাস্তবভিত্তিক ছিলো, তা প্রমাণিত হলো। কয়েক মাস পর এ ধরনের সরবরাহ নিয়ে একটি কাফেলা সত্যি মুজাহিদীনের নিকট পৌঁছেছিলো; কিন্তু কাফেলাটি যখন জাগবুব এবং জালুর মধ্যবর্তী ফাঁকটুকুর মধ্য দিয়ে আগাচ্ছিলো তখনি তা ইতালীয়দের নযরে পড়ে যায়। এর পরপরই দুটি মরূদ্যান থেকে সমান দূরে, মরূদ্যান দুটির ঠিক মাঝখানে বির তারফাবিতে ইতালীয়রা একটি মজবুত চেকপোষ্ট স্থাপন করে; আর প্রায় নিরবিচ্ছিন্ন বিমান পাহারার সংগে এই চেকপোষ্টটি নতুন করে এ ধরনের অভিযানকে চরম বিপজ্জনক করে তোলো।]

এখন আমার ফেরার চিন্তা। আমি আমার এই পশ্চিমমুখী সফরে যে দীর্ঘ কষ্টকর পথ অনুসরণ করছি আমার সেই পথে ফিরে যেতে খুব উৎসাহ বোধ করছিলাম না। তাই সিদি উমরকে জিজ্ঞাস করি, এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত কোনো পথ পাওয়া যেতে পারে কি না। তিনি বললেন, একটি পথ আছে বটে, তবে তা বিপদসংকুলঃ কাঁটা তার ভেদ করে সেলুমে পৌছুনো। তখন সেলুম থেকে ময়দা আনার জন্য একদল মুজাহীদীন এ ধরনের একটি অভিযানে বের হতে প্রস্তুত ছিলো; আমি চাইলে ওদের সংগে যোগ দিতে পারি। আমি তাই করবো বলে সিদ্ধান্ত নিই।

যায়েদ এবং আমি উমর আল-মুখতারের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিই। আর কখনো তাঁর দেখা হবে না আমার সংগেঃ আট মাসেরও কম সময় পরে ইতালীয়রা উমরকে বন্দী করে এবং ফাঁসি দেয়.. .

উঁচু –নিচু ভূভাগের উপর দিয়ে এবং পূর্ব জাবল আখদারের জুনিপার অরণ্যের মধ্যে দিয়ে কেবল রাতে রাতে প্রায় এক হপ্তা চলার পর আমাদের বিশ জনের এই দলটি মিসর-সাইরেনিকার সীমান্ত সেই স্থানটিতে পৌছুলো, যেখানটায় কাঁটা তার ভেদ করে ঢুকে পড়বো বলে পরিকল্পনা করেছিলাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে নির্বাচন করা হয়নি এ স্থানটি। সীমান্তের বেশিরভাগ জায়গার উপর দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হলেও তখনো সে বেড়া সম্পূর্ণ পূরা হয়নি। কেনো কোনো জায়গায়, যেমন এইখানে, কেবল মাত্র কাঁটা তারের বেড়া রয়েছে আট ফুট ‍উঁচু এবং চার ফুট চওড়া অথচ এর মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে কাঁটাতারের বেড়ার তিনটি পৃথক পৃথক সারি, যা পাকা ভিতের উপর পোঁতা খুটির সংগে মোটা ভারী তারের প্যাঁচ কষে বাঁধা হয়েছে। আমরা যে জায়গাটি পছন্দ করেছি, তা থেকে সুরক্ষিত এই চৌকিটি ছিলো আধ মাইলের মতো দূরে। চৌকিটিতে সাঁজোয়া গাড়ি রয়েছে বলেও আমরা জানতাম। কিন্তু এ ছিলো দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি গ্রহণ-হয় এই সেক্টর না হয় অন্য একটি সেক্টর-যা হয়তো কম সুরক্ষিত হতে পারে, অথচ যেখানে থাকতে পারে ডবল বা তিন লাইন কাঁটা তারের বেড়া।

মিসরীয় এলাকায় কয়েক মাইল ভেতরে সেনুসি তরীকার সমর্থকরা যাত্রী ও মালবাহী জানোয়ার নিয়ে আমাদের সাথে দেখা করবে, এ ব্যবস্থা করা হয়েছে পূর্বাহ্নেই। কাজেই আমাদের ঘোড়াগুলিকে বিপদে ফেলার কেনো প্রয়োজন হবে না। কয়েকজন ‘মুজাহিদীনে’র দায়িত্বে আমরা সেই ঘোড়াগুলিকে ফেরত পাঠিয়ে দিই আর যায়েদ এবং আমি সহ বাকী কসকলে মাঝরাতের কিছু আগে পায়ে হেঁটে তারের নিকট পৌছুই অন্ধকারেই ছিলো আমাদের আবরণ। কারণ ইতালীয়রা সমস্ত গাছপালা এবং ঝোঁপঝাড় কেটে সাফ করে ফেলেছিলো।

উত্তরে এবং দক্ষিণ কয়েকশ গজ ব্যবধানে পাহারাদার মোতাযেন করে আমদের ছয়জন লোক তার কাটার যন্ত্রে এবং ইতালীয় মজুরদের উপর ইতিপূর্বে হামলা চালিয়ে যেসব পুরু চামড়ার  দস্তানা কব্জা করেছিলো সেগুলি সজ্জিত হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আগাতে থাকে। ওরা যখন আগাচ্ছিলো, তখন আমারা আমাদের রাইফেল নিয়ে ওদের কভারিং দিচ্ছিলাম। এ এক উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত। মৃদুতম শব্দের জন্য উৎকর্ণ আমি। শুনছি কেবল অগ্রসরমান দেহগুলির ভারে চাপ খাওয়অ নুড়ির শব্দ আর কখনো কখনো নিশাচার পাখির ডাক। তারপরে এলো কাঁটা তারে প্রথম দাঁত বসানো তার-কাটা কাচির কচকচ শব্দ। মনে হলো, একটা বিস্ফোরণ ঘটালো আমার কানের ভেতরে আর তারপরই ধাতব তন্তু কর্তনের মৃদুতরো আলাদা ধ্বনি.. . খশ্ খশ্ খশ্ .. . ঘষে ঘষে কেটে , কাঁটা তারের গভীর থেকে গভীরে.. .।

আরেকবার পাখির ডাক ধ্বনি হলো রাতের আসমানেঃ কিন্তু এবার আর তা পাখি নয়, একটি সংকেতঃ এই সংতে আসছে উত্তরদিকে আমরা যে পাহারাদার রেখেছি, তাদেরই একজনের কাছ থেকে-আসন্ন বিপদের সংকেত.. . এবং ঠিক একই মুহুর্তে আমা শুনতে পাই মোটরের গুঞ্জন ধ্বনি যা আসছে আমাদের দিকে। একটি সন্ধানী আলো তীর্যকভাবে বিচ্ছুরিত হয় আকাশে। একটিমাত্র লোকের মতো আমরা নিজের নিক্ষেপ করি যমিনের উপর, কেবল তার কাঁটায় নিয়োজিত লোকগুলি ছাড়া;ওরা তখন মরিয়া হয়ে তাড়াহুড়া করে ওদের কাজ করে চলেছে। এখন আর ওরা চুপি চুপি কাজ করার কথা ভাবছে না। বরং ভূতে পাওয়া মানুষের মতো কাঁচি দিয়ে কেটে চলেছে আর রাইফেলের বাটের আঘাতে আলগা করে দিচ্ছে কর্তিত কাঁটা তার। কয়েক সেকেন্ড পর একটি রাইফেলের আওয়াজ শোনা যায়ঃ আমাদের উত্তরদিকে প্রহরীর সংকেত। সাঁজোয়া গাড়ির চালক নিশ্চয় তাকে দেখে ফেলেছে, কারণ সন্ধান আলোর রশ্মি সহসাত ধাবিত হয় নিচ দিকে আর আমরা মেশিন গানের গুলির অশুভ শব্দ শুনতে পাই। ইঞ্জিনের গর্জন বাড়তে থাকে এবং তার কালো ছায়া শরীর আমাদের উপর দিয়ে চলে যায়, আর তার হেডলাইটের আলো সোজা এসে পড়ে যমিনে। আমাদের উপর এরপরে মেশিনগানের গুলির এক বিস্ফোরণ হলো। স্পষ্টতই, কামান চলাক তাক করেছিলো অনেক উপরের দিকে। আমি আমাদের মাথার ‍উপর দিয়ে ছুটে যাওয়অ বুলেচের শা-শা শন-শন শব্দ ‍শুনতে পাই। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে আমরা তার জবাব দিই আমাদের রাইফেল দিয়ে।

-‘সার্চ লাইট! সার্চ লাইট।’ কেউ একজন চীৎকার করে ওঠে- সার্চ লাইটটিকে তাক করে গুলী ছোড়ো’ এবং কয়েক মুহূর্তেই সার্চ লাইটটি নিভে গেলো। সন্দেহ নেই যে, আমাদের অব্যর্থ লক্ষ্য রাইফেলধারীদের বুলেট লেগে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেছে সার্চ লাইটটি। সাঁজোয়া গাড়িটি থেমে যায়। কিন্তু তার মেশিনগান অন্ধের মতো গুলী করে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের সম্মুখে উত্থিত এক চীৎকার আমাদের জানিয়ে দিলো ,কাঁটা তারের বেড়া কেটে ঢুকে পড়ার পথ তৈরি হয়ে গেছে এবং আমরা একজন একজন করে সেই সংকীণর্ উন্মুক্ত পথটি দিয়ে গা মুচড়িযে মুচড়িয়ে নিজেদের নিয়ে যাই বেড়ার ওপাশে আর তাতে কাঁটা তারে লেগে আমাদের গায়ের কাপড় এবং চামড়া ছিড়ে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। এরপর শুনতে পেলাম ছুটে আসা মানুষের শব্দ-এবং আরো দুটি জার্দ পরা মূর্তি কাঁটা তারের বেড়ার সেই ফাঁকে ঝাপিয়ে পড়ে। আমাদের সংগীরা আমাদের সংগে মিলিত হচ্ছে আবার। বোঝা গেলো, ইতালীয়রা গাড়ির মায়া ছেড়ে আমাদের সংগে সামনাসামনি মুকাবিলা করতে অনিচ্ছুক..  আর তারপর, আমরা এসে দাঁড়ালাম মিসরের মাটিতে, অথবা এ-ও বলা যায়ঃ আমরা দৌড়াতে থাকলাম, পাথরের আড়ালে, বালুর স্তূপ ও বিচ্ছিন্ন ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে গা বাঁচিয়ে-কারণ আমাদের পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে, থেকে থেকে গুলী চালাচ্ছিলো ওরা।

যখন ভোর বেলা, তখন আমরা মিসরীয় এলাকার ভেতর ঢুকে পড়েছি। আমরা এখন বিপদমুক্ত। আমাদের বিশজনের মত লোকের মধ্যে পাঁচ জনকে আমরা হারিয়েছি। সম্ভবত ওরা মারা গেছে; আর চারজন হয়েছে যখম, তবে খুবদ মারাত্মক নয়।

-‘আল্লাহ আমাদের প্রতি রহম করেছেন’। আহত মুজাহিদীনের মধ্যে একজন বলে-কাঁটা তারের বেড়া পার হতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা আমাদের অর্ধেক লোককে হারিয়ে বসি; কিন্তু আল্লাহ মহান, কেউই মরে না, যার মৃত্যু আল্লাহ চান না.. . পবিত্র কুরআন কি বলেনি?.. . যাঁরা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না; কারণ তারা জিন্দা, জীবিত.. .?’

দুপপ্তা পর ফিরতি পথে মারসা মাতরুহ এবং আলোকজান্দ্রিয়া হয়ে আমারা পৌছুলাম উজান মিসর এবং সেখানে পূর্ব ব্যবস্থা মতো নৌকায় করে ইয়ানবো হায়ে আমি আর যায়েদ আবার ফিরে এলাম মদীনায়। গোটা অভিযানটির জন্যই লাগলো দুমাস.. . মনে হলো না হিজায থেকে আমাদের অনুপস্থিতি আদৌ কেউ লক্ষ্য করেছে.. .।

.. .   ..                     ..                .. .         ..

আমি যখন মদীনায় সেই কদীম সেনুসি আস্তানার চৌকাটে সিদি মুহা্ম্মদ আজ জুবাইর-এর সংগে পা রাখি,  তখন মৃত্যু আর হতাশার সেই সব অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি আমার চেতনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে আর জুনিপার গাছের গন্ধ, মাথার উপর  দিয়ে ছুটে যাওয়া বুলেটের শব্দে আমার হৃদপিণ্ডের ধড়াস ধড়াস। আর আশা নেই, ভরসা নেই এমন এক অভিযানের যন্ত্রণা আবার জেগে ওঠে আমার বুকের ভেতর; তারপর ধীরে ধীরে মুছে যায় আমার সাইরেনিক অভিযানের স্মৃতি। বেঁচে থাকে কেবল তার বেদনা!

চার

আবার আমি দাঁড়াই মহান সেনুসির সামনে এবং সেই বৃদ্ধ যোদ্ধার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাই। আবার আমি সেই হাতটিতে চুমু খাই, যা অতো দীঘৃকাল তলোয়ার  ধারণ করেছে যে এখন আর তলোয়ার বহনের সামর্থ্য তার নেই।

-আল্লাহ তোমাকে রহম করুন, বাবা, তুমি আরাম করে বসো.. . এক বছরের বেশি হলো আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিলো, আর এই বছরের সাথে সাথে আমাদেরও  আশা নিঃশেষ হয়েছে। কিন্তু তা’রীফ আল্লাহর তিনি যা ইচ্ছা করেন.. .।

নিশ্চয় বছরটি ছিলো সাইয়িদ আহমদের জন্য দুঃখময়। তাঁর মুখের রেখাগুলি আরো গভীর হয়েছে আর তাঁর গলার আওয়াজ খুবই নিচু হয়ে পড়েছে যা আগে কোনদিন তেমন ছিলো না। যয়ীঅ ঈগল মুষড়ে পড়েছেন। জড়োসড়ো হয়ে বসেছেন গালিচার উপর। তাঁর সাদা বার্নাস তাঁর শরীরে আঁটসাট করে বাঁধা-যেনো শরীরটাকে গরম করার জন্যই, আর  তিনি অনন্ত শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছেন নির্বাক, নিশ্চুপ।

-‘আমরা যদি কেবল  উমর আল-মুখতারকে বাঁচাতে পারতাম’, ‘তিনি ফিসফিস করে বলেন, ‘আমরা যদি সময় থাকতে পালিয়ে মিসর চলে আসার জন্য তাঁকে কেবল রাযী করাতে পারতাম.. .’

-‘কেউই পারতো না সিদি উমরকে বাঁচাতে’, আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিই, ‘তিনি নিজেই তাঁকে বাঁচাতে চাননি।  বিজয়ী হতে না পারলে তাঁর মৃত্যু হোক, তা’ই তিনি চেয়েছিলেন, যখন তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিই, তখনি তা আমি বুঝেছিলাম হে সিদি আহমদ!’

সাইয়িদ আহমদ সাজোরে তাঁর মাথা নাড়েন,-হ্যাঁ, আমিও তা জানতাম,.. . আমিও তা.. . জানতাম কিন্তু জানতে পেরেছিলাম খুব দেরীতে। মাঝে মাঝে আমার মনেহয়, সতেরো বছর আগে ইস্তাম্বুল থেকে যে আহবান এসেচিলো, তাতে সাড়া দেয়া আমার ভুল হয়েছে.. . আর তা কি, সম্ভবত কেবল উমরেরেই নয়, বরঞ্চ সকল সেনুসিরই মৃত্যুর শরু ছিলো না?

এ প্রশ্নের কোনো জবাব আমার কাছে নেই। কারণ, হামেশাই আমার মনে হয়েছে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অযথা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য সাইয়িদ আহমদের সিদ্ধান্ত ছিলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভূল।

-‘কিন্তু’, সাইয়িদ আহমদ আবার বলেন, ইসলামের খলীফা যখন আমার কাছে মদদ চাইলেন, তখন অন্য সিদ্ধান্তই আমার পক্ষে কি ক’রে সম্ভব ছিলো? আমি কি ঠিক করেছিলাম, না নির্বোধের মত কাজ করেছি? কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারে, মানুষ যখন তার বিবেকের ডাকে সাড়া দেয়, তখন সে কি ঠিক করলো , না ভূল করলো?’

-সত্যিই কে তা বলতে পারে?’

মহান সেনুসির মাথা দুলতে থাকে ডানি বাঁয়ে, যন্ত্রণায়-বিমূঢ়তায়। ঝুলে পড়া চোখের পাতার পেছনে চোখ দুটি ঢাকা আর আকস্মিক এক নিশ্চয়তার সাথে আমি বুঝতে পারলাম, এ চোখ আশার শিখায় আর ঝলসে উঠবে না কখনো।[সাইয়িদ আহমদ মদীনায় ইন্তেকাল করেন পর বৎসর(১৯৩৩)]


 

About মুহাম্মদ আসাদ