মক্কার পথ

পথের শেষ

এক

অনেক রাতে আমরা মদীনা ত্যাগ করি পূব দিকের পথ ধরে, যে পথে রসূলুল্লাহ তার বিদায় হ্জ্ব করতে মক্কা গিয়েছিলেন, তাঁর ইন্তেকালের কয়েক মাস আগে।

রাতের বাকি সময় চলেতে থাকি ঘনিয়ে আসা ভোরের মধ্য দিয়ে। আমরা আমাদের উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলতে থাকি; ফজরের সালাতের জন্য কিছুক্ষণ থেমে আমরা দিবসে প্রবেশ করি; ধূসর এবং মেঘাচ্ছন্ন দিবস। দুপুরের আগে বৃষ্টি শুরু হয় এবং দেকতে দেখতে পেলাম এবং স্থির করলাম তাদেরই একটি কালো তাঁবুতে আশ্রয় নেবো।

তাঁবুটি ছোট্ট। হারবের বদ্দুরের তাঁবু এটি। ওরা আমাদের দেখে স্বাগত জানায় উচ্চৈঃস্বরে, ‘হে মুসাফিরেরা, আল্লাহ আপনাদের হায়াত দারাজ করুন। খোশ আমদেদ!’ আমি ‘শাইখে’র তাবুতে ছাগ-পশমের মাদুরের উপর আমার কম্বল বিছিয়ে দিই আর শাইখের জরু, এই এলাকায় প্রায় সকল বদ্দু আওরতের মতোই যাঁর মুখ অনাবৃত, তাঁর সোয়ামীর সুন্দর স্বগত সম্ভাষণরি পুনরাবৃত্তি করেন। নির্ঘুম রাতের পর দ্রুত নিদ নেমে এলো আমার উপর, তাঁবুর ছাদের উপর বৃষ্টি পতনের মৃদংগ ধ্বনির মধ্যে। কয়েক ঘন্টা পর আমি যখন ঘুম থেতে জেগে উঠলাম, তখনো বৃষ্টির মৃদংগ  বাজছে। আমাকে ঢেকে আছে রাতের অন্ধকার-ও হো, তা তো নয়-এ তো রাত নয়, কেবল তাঁবুর গাঢ় কালো চাঁদোয়অ; আর এর গন্ধ ভেজা পশমের গন্ধেরই মতো। আমি আমার বাহু দুটি প্রসারিত করি, আমার হাত গিয়ে লাগে আমার পেছনে মাটির উপর রাখা উটের একটি জীনের উপর। তার পুরানো কাঠের মসৃণতা স্পর্শ করতে চমৎকার লাগে। আঙুল দিয়ে এর উপর খেলা করা কী আনন্দদায়ক, যতক্ষণ না জীনের সম্মুখের উচুভাগ পর্যন্ত আঙুলগুলি গিয়ে মিশেছে লোহার মতো শক্ত ধারলো উটের অন্ত্রের সংগে-যা দিযে জীনটিকে সেলাই করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁবুতে আমি ছাড়া আর কেউই নেই।

কিছুক্ষণ পর আমি উঠে পড়ি এবং তাঁবুর খোলা অংশটিতে পা রাখি। বৃষ্টি যেন পিটিয়ে পিটিয়ে গর্ত খুঁড়ছে বালির ভেতর.. .লাখে লাখে ছোট গর্ত, যা এই মুহূর্তে দেখা দিচ্ছে এবং হঠাৎ মিলিয়ে যাচ্ছে নতুন গর্তের স্থান করে দেওয়ার জন্য-এবং ঘুরে, আমার ডানদিকে, নীল ধূসর গ্রানাইট শিলাখণ্ডের উপর স্প্রে করে ছড়িয়ে দিচ্ছে পানি, আমি কাউকেই দেখছি না, কারণ, দিনের এই সময়টিতে নিশ্চয় ওরা বের হয়ে পড়েছে তাদের উটের খবরদারী করতে;ড় নিচে অধিত্যকায়, আকাসিয়া গাছে কাছে অনেকগুলি কালে  তাঁবু নিশ্চুপ হয়ে আছে বৃষ্টি-ঝরা বিকালের নীরবতায়। ওদেরই একটি থেকে একটি ধূসর ধুম্রকুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উঠেছে উপরের দিকে.. . সান্ধ্য খাবারের সংকে। ধোঁয়অটা এতোই পাতলা এভং এতোই ক্ষীণ যে, বৃষ্টির মুকাবিলায় ঠেরে ওঠার ক্ষমতাই তার নেই.. . এবং তা লতিয়ে ‍উঠছে কিনার ঘেঁষে, অসহায়ভাবে কাঁপতে কাঁপতে, প্রবল বাতাসে রমনীর কেশপাশের মতো। রূপালী ধূসর পানির ফিতার চলমান পর্দার অন্তরালে টিলাগুলি যেনো আন্দোলিত হচ্ছে; বাতাস বুনো আকাসিয়া গাছ আর স্যাঁতস্যাঁতে তাঁবুর পশমের গন্ধে ভারাক্রান্ত  আছে।

ধীরে ধীরে পানি ছিটানো এবং ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি থেমে যায় এবং সান্ধ্য সূর্যের রশ্মির নিচে মেঘপুঞ্জ টুকরা হয়ে পালাতে শুরু করে। আমি  নিচু কএকটি গ্রানাইট শিলাখণ্ডের দিকে আগিয়ে যাই। এ পাথরটির উপর এমন একটি গর্ত রয়েছে যা খাঞ্চার মতো বড়ো, যাতে আমোদ উৎসবের দিন মেহমানদের পুরা ভেড়ার রোষ্ট এবং ভাত পরিবেশন করা হয়। এখন একটি বৃষ্টির পানিতে ভর্তি। আমি যখন আমার বাহু দুটি এর ভেতর রাখি, পানি আমার কুনই পর্যন্ত পৌছোয়, মৃদুষ্ণ, বিস্ময়কররূপে আদুরে পরশ এবং আমি যখন পানির ভেতর আমার বাহু দুটি নাড়ি, মনে হলো আমার ত্বক যেনো পানি খাচ্ছে! একটি তাঁবু থেকে বের হয়ে আসে একটি নারী, মাথার উপর একটি বড় তামার পাত্র নিয়ে-বোঝাই যাচ্ছে, বৃষ্টির ফলে বহু পাথর ও শিলাখণ্ডের গর্তে যে পানি জমেছে, তারিই একটি থেকে সে তার পাত্রটি ভরে নেবার জন্য বের হয়েছে। ও তার বাহু দুটি কখনো প্রসারিত করছে সামনের দিকে, কখনো পাশে কখনো উর্ধ্বে, তার লাল প্রশস্ত জামার কিনার দুহাতে পাখার মতো ধরে এবং মৃদু দুলতে দুলতে সে আগাতে থাকে। শিলার উপর থেকে যখন পানি ধীরে ধীরে নিচের দিকে প্রবাহিত হয় তখন পানি যেমন দুলতে থাকে, তেমনি দুলে দুলে চলছে রমণী। আমি মনে মনে বলিঃ এ রমণী পানির মতোই সুন্দর.. . আমি দূর থেকে শুনতে পাই প্রত্যাবর্তনমুখী উটের ডাকঃ আর এই যে ওরা দেখা দিচ্ছে টিলার আড়াল থেকে একটি ছড়িয়ে পড়া দলের মতো, গাম্ভীর্যের সংগে শিথিল চরণ ফেলতে ফেলতে চলছে  রাখালেরা-ওদের চালিয়ে নিয়ে আসে উপত্যকার ভেতরে, তীক্ষ্ম ছোট্ট ডাক হাঁকের সাহায্যে, তারপর তারা উচ্চারণ করে একটি বিশেষ শব্দ ‘গ-র-র.. .গ-র-র.. .’জানোয়ারগুলি যেনো হাঁটু ভেংগে বসে পড়ে; আর দেখা যায়, অনেকগুলি উট তাদের বাদামী রঙের পিঠ মাটির দিকে নমিত করছে তরংগিত ছন্দে। সন্ধ্যা যখন ঘনিায়ে আসছে লোকেরা ওদের উটের সামনের পা দুটিতে বেড়ি পরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নিজ নিজ তাঁবুতে। আর, এখানে এসেছে রাত তার কোমল অন্ধকার আর স্নিগ্ধ শীতলাত নিয়ে। বেশির ভাগ তাঁবুর সামনেই জ্বর আগুন; রান্নার পাত্র আর কড়াইয়ের টুঙটাঙ শব্দ আর রমণীদের হাসির আওয়াজ মিশে যায় পুরুষদের আকস্মিক ডাক-হাঁক ও তাদের টুকরা বিচ্ছিন্ন কথার সাথে, যা বাতাসে ভর করে ভেসে আসে আমার কাছে। উটের পরে ফিরে এসেছে ভেড়া-ছাগল; ওরাও কিছুক্ষণ ডাকে এবং কখনো কখনো কুকুর চীৎকার করে ওঠে, যেমনটি ওরা চীৎকার করে প্রতি রাতেই, আরবের প্রতিটি তাঁবুতে।

যায়েদকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কোনো একটি তাঁবুতে সে শুয়ে পড়েছে। আমি ধীরে ধীরে হেঁটে আরাম করে শোয়া উটগুলির দিকে যাই। ওরা ওদের মস্তবড় শরীর দিয়ে ওদের নিজেদের জন্য বালুর মদ্যে খুঁড়েছে গর্ত এবং আরাম করে শুয়ে আছে। কোনো কোনোটি জাবর কাটছে, আর অন্যেরা ওদের লম্বা গলা প্রসারিত করে দিয়েছে যমিনের উপর। কোনো কোনোটি মাথঅ উঁচু করে নাকের ভেতর দিয়ে শব্দ করে, যখন আমি পাশ দিয়ে যাই এবং খেলাচ্ছলে স্থূল কুঁজে হাত দিয়ে ধরি। একটি তরুণ উট ছানা তার মায়ের পাশে নিবিড়ভাবে গা ঘেঁষে পড়ে আছে। আমার হাতের স্পর্শে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে যায়, যখন তার মা মাথা ‍ঘুরিয়ে আমর দিকে তাকায় এবং বিরাট  হা করে মোলায়েম ডাক ছাড়ে। আমি দুই বাহু দিয়ে উট ছানাটির গলা জাড়িয়ে ধরি এবং তাকে চেপে ধরে আমার মুখ গুঁজে দিই তার পিছের গরম লোমের মধ্যেঃ আর হঠাৎ সে নীরব , নিথর দাঁড়িয়ে যায়-মনে হলো তার সব ভয় যেনো চলে গেছে। কচি জন্তু-দেহের উত্তাপ আমার মুখ এবং বুক ভেদ করে প্রবেশ করে-আমি টের পাই, আমার হাতের তালুর নীচে রক্ত উত্থাল-পাতাল করছে ওর ঘাড়ের শিরায় আর আমার রক্তের স্পন্দনের সংগে তা মিশে গেছে- এবং আমার মধ্যে জাগ্রত করে এক সর্বপ্লাবী অনুভূতি-খোদ জীবনের সংগে নিবিড় সান্নিধ্যের অনুভূতি, জীবনের মাঝে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বিসর্জনের এক আকুতির উপলব্ধি।

দুই

আমরা উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলেছি আর ওদের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের পথের যেখানেই শেষ তারই নিকটতরো সান্নিধ্যে নিয়ে আসে আমাদের। এভাবে সূর্যকরোজ্জ্বল স্তেপ-ভূমির মধ্যে দিয়ে আমরা দিনের পর দিন চলতে থাকি। রাতের বেলা নক্ষত্রের নিচে আমরা ঘুম যাই এবং ভোরের স্নিগ্ধ শীতলাতয় আমরা জেগে উঠি-আর ধীরে ধীরে আমি  আমার পথের শেষ প্রান্তের দিকে আগাতে থাকি।

কোনদিনই এ পথ ছাড়া আর কোনো পথ ছিলো না আমার জন্যঃ যদি ও বহু বছর তা আমি জানতাম না। এ আমাকে ডাক দিয়েছিরো মক্কা সম্বন্ধে আমার মন সচেতন হয়ে ওঠার বহু আগেই-এক প্রবল কন্ঠস্বরেঃ‘ আমার রাজ্য এই পৃথিবীতে, আমর রাজ্য ভাবী জগতেওঃ আমার রাজ্য  অপেক্ষায় রয়েছে মানুষের দেহ এবং আত্মা ও দুয়েরই এবং মানুষ যা কিছু চিন্তা করে, অনুভব করে, এবং করে, – তার ব্যবসা বাণিজ্য, তার ইবাদত বন্দেগী, তার শয়নকক্ষ, তার রাজনীতি সমস্ত কিছুর উপর এ রাজ্য সম্প্রসারিত। আমর রাজ্যের শেষ নেই, সীমা নেই।’ এবং যখন  কয়েক বছর পরে, আমার নিকট এসব পরিষ্কার হয়ে উঠলো, আমি জানতে পারলাম আমার স্থান কোথায়ঃ আমি জানতে পারলাম আমার জন্মের পর থেকেই ইসলামী ভ্রাতৃত্ব আমার ইন্তেজারে রয়েছে এবং আমি ইসলাম কবুর করলাম। আমার প্রথম যৌবনের সেই যে বাসন-ধ্যান ধারণার একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ আমার চাই, একটি ভ্রাতৃ-সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে চাই আমি, এতোদিনে শেষপর্যন্ত তা পূরণ হলো।

খুবই আশ্চর্যের বিষয়-হয়তো তাতো আশ্চর্যনক নয়, যদি কেউ বিবেচনা করে ইসলামের লক্ষ্য কী-মুসলমানদের মধ্যে মুসলমান হিসাবে আমার প্রথম অভিজ্ঞতাই হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের.. .।

১৯২৭ সনের জানুয়ারির প্রথম দিনগুলিতে আমি আবার বের হয়ে পড়ি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে। এবার আমার সংগে ছিলো এলসা আর তার কচি ছেলে, আর এবারই আমি অনুভব করলাম, এটাই হবে আমার শেষ যাত্রা।

কয়েকদিন ধরে আমরা সমুদ্র সফর কির ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে, সমুদ্র ও আকাশের এক ঝিকিমিকি বৃত্তের ভেতর দিয়ে।–কখনো আমাদের অভ্যর্থনা জানায় সুদূর উপকূল এবং আমাদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত ছুটে চলা জাহাজের ধুঁয়া; ইউরোপ হারিয়ে গেছে আমাদের অনেক অনেক পেছনে এবং আমি তার কথা প্রায় ভূলেই গিয়েছি।

প্রায়ই আমি আমাদের কেবিন-ডেকের আরাম-আয়েমের মধ্যে থেকে বেরহয়ে নিচে যাই জাহাজের সবচেয়ে কম ভাড়ার জীর্ণ স্থানটিতে, যেখানে রয়েছে লোহার তৈরি বাঙ্ক স্তরে স্তরে। জাহাজটি যাচ্ছিলো দূরপ্রাচ্যে তাই ডেক-যাত্রীদের বেশির ভাগই ছিলো চীনা, ছোট ছোট কারিগর ব্যবসায়ী, যারা বহু বছর ইউরোপে কঠিন পরিশ্রমের পর ফিরে যাচ্ছে স্বদেশে। তাছাড়া রয়েছে ইয়েমেনী আরবদের একটি ছোট্ট দল, যারা জাহাজে উঠেছে মার্সাই বন্দরে। দেশে ফিরছে ওরাও। পাশ্চাত্য বন্দরগুলির শব্দগন্ধ এখানে জড়িয়ে রয়েছে ওদের সংগে। ওরা এখনো বাস করছে দিন শেষের অন্তরাগের মধ্যে, যখন ওদের বাদামী হাত ইংরেজ, মার্কিন ও ওলন্দাজ জাহাজে কয়লা মারতো বেলচা দিয়ে; ওরা এখনো অদ্ভূত বিদেশী নগর বন্দরের কথা আলাপ করছে-নিউইয়র্ক, বুয়েনস আইরীজ, হেমবুর্গ। উজ্জ্বল অজানার হঠাৎ বাসনায় তাড়িয়ে হয়ে একদিন ওরা এডেন বন্দরে স্টোকার ও কয়লার স্টীমার [জাহাজের চুল্লিতে কয়লা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত হোক] হিসাবে নিজেদের ভাড়াই বিকিয়ে দিয়েছিলো। ওরা ওদের পরিচিত জগত থেকে বের হয়ে পড়েছিলো পৃথিবীর ধারণাতীত বিস্ময়কর বৈচিত্রের আলিংগনে ওরা বেড়ে ছাড়িয়ে  যাবে নিজেদেরঃ কিন্তু জাহাজ কিছুক্ষণ পরেই ভিড়বে এডেন বন্দরে আর ওদের জীবনের এই দিনগুলি হারিয়ে যাবে অতীতের মধ্যে। ওরা পশ্চিমের হ্যাটের বদলে নেবে পাগড়ী অথবা ‘কুফিয়া’, বিগত দিনকে বাঁচিয়ে রাখবে কেবল স্মৃতি হিসাবে এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত প্রত্যেকটি মানুষ ফিরে  যাবে ইয়েমেনে, তার গাঁযের বাড়িতে। ওরা যেমনটি একদিন ঘর থেকে বের হয়ে পড়েছিলো, ঘরে কি ঠিক সেই মানুষ হিসাবেই ফিরবে, না বদলে যাওয়া মানুষরূপে? পাশ্চাত্য জগত কি ওদের আত্মাকে কব্জা করে ফেলেছে-নাকি কেবল ওদর ইন্দ্রিয়গুলিরই উপর হাত বুলিয়েছে?

এই লোকগুলির সমস্যা আমার মনে ঘনীভূত হয়ে বৃহত্তরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি সমস্যার রূপ নিলো।

আমি চিন্তা করে বুঝতে পারি, আজকের মতো অতীতে কখনো একে অপরের এতো নিবিড় সান্নি্ধ্যে আসেনি ইসলাম এবং পাশ্চাত্য জগত। এই নৈকট্য একটি সংগ্রাম-দৃষ্টিগোচর এবং দৃষ্টির অগোচার-দুই-ই। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চাপে বহু মুসরিম নারী এবং পুরুষের আত্মা ক্রমেই কুঁকড়ে যাচ্ছে।

জীবন মানের উন্নতি হওয়া উচিত মানুষের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে উন্নত করার ‍উপায়-ওদের ইতিপূর্বেকার এই বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতি হয়ে ওরা নিজেদের চালিত হতে দিচ্ছে ভিন্ন পথে। ওরা প্রগতি নামক সেই পৌত্তলিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে যে পূজায় পাশ্চাত্য জগত নিজেদের সমর্পণ করেছিলো, ঘটনার পশ্চাদভূমিতে কোনো এক স্থানে কেবল একটি সুরেলা টুঙটাঙ ধ্বনিতে ধর্মকে রূপান্তরিত করার পরে, আর এ কারণে, এসব মুসলিম নর-নারী ধীরে ধীরে নিজেদের ছোটো করে ফেলেছে, বড়ো করছে নাঃ কারণ সকল সাংস্কৃতিক অনুকরণই সৃজনশীলতার বিরোধী বলে যে কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীকে তা অনিবার্যভাবেই হেয় করে তোলে.. .

কথা এ নয় যে, পশ্চিমা জগতের কাছ থেকে মুসলমানদের খুব বেশি শেখার নেই, বিশেষ করে কারিগরি ক্ষেত্রে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা এবং পদ্ধতি অর্জন করা প্রকৃতপক্ষে অনুকরণ নয়ঃ আর খাস করে সে জাতির পক্ষে সে নিশ্চয় নয়, যার ধর্মই তাকে দেয় জ্ঞান অনুসন্ধানের নির্দেশ, যেখানেই তা পাওয়া যাক। বিজ্ঞান পাশ্চাত্যের নয়, প্রাচ্যেরও নয়; কারণ সকল বৈজ্ঞানিক আবি**য়াই হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিগত প্রয়াসের অন্তহীন এক শৃংখলের মধ্যে কতকগুলি আঙটা মাত্র,  যে যে প্রয়াস বেষ্টন করে সমগ্র মানবজাতিকে। প্রত্যেক বিজ্ঞানীই তাঁর পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীরা তা তাঁর নিজের জাতির হোক বা ভিন্ন জাতিরিই হোক, যে বুনিয়াদ স্থাপন করে গেছেন, তারই উপর নির্মাণ করেন ইমারত। আর নির্মাণের এই প্রক্রিয়া, সংশোধন ও উন্নয়ন চলতে থাকে মানুষ থেকে মানুষ, যুগ থেকে যুগান্তরে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়-যে কারনে, কোনো বিশেষ যুগ বা সভ্যতার বৈজ্ঞানিক সাফল্যকেই কখনো সেই যুগ বা সভ্যতারই নিজস্ব কীর্তি বলে গণ্য করা য়ায় না। সময়ের একেক পর্যায়ৈ অন্যান্য জাতির চাইতে অধিকতরো প্রাণবন্ত উদ্যমশীল একেকটি জাত বিজ্ঞানের সাধারণ ভাণ্ডারে অধিকতরো অবদান রাকতে সক্ষম হয়ে থাকেঃ কিন্তু শেষপর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় সকলেই অংশগ্রহণ করে এবং সংগতভাবেই। এমন একসময় ছিলো, যখন মুসলমানদের সভ্যতা ছিলো ইউরোপের সভ্যতা হতে অনেক বেশি বীর্যবান। এই সভ্যতা ইউরোপে চালান দেয় বৈপ্লবিক ধরনের বহু কারিগরি উদ্ভাবনের কল এবং তার চেয়ে  বেশিঃ সেই ‘বৈজ্ঞঅনিক পদ্ধতি’র নিজস্ব মৌলিক নীতিগুলি, যার উপর গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতা। তা সত্ত্বেও রসায়নশাস্ত্রকে যাবির িইবনে হাইয়ানের মৌলিক আবিস্কার আরবীয় বিজ্ঞান বানিয়ে  ফেলেনি; অথবা বীজগণিত এবং ত্রিকোণমিতিকেও মুসলিম বিজ্ঞান বলা যায় না, যদিও এর একটি উদ্ভাবিত হয়েছিল আল-খারিজমী কর্তৃক এবং অন্যটির উদ্ভাবক ছিলেন আল-বাত্তানি, আর ওঁদের দুজনই ছিলেন মুসলমান-ঠিক যেমন আমরা ‘ইংরেজ মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব’ বলে ‍কোন কিছুর উল্লেখ করতে পারিনা, যদিও যে লোকটি এই তত্ত্বটির রূপ দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন একজন ইংরেজ। এ ধরনের সকল কৃতিত্বই হচ্ছে মানবজাতির সাধারণ সম্পদ। তাই, মুসলমানরা যদি বিজ্ঞান এবং কারিগরিশাস্ত্রে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা অবশ্যি তাদের গ্রহণ করা উচিত, তাহলে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করার জন্য মানুষের মধ্যে যে বিবর্তনধর্মী বৃত্তি কাজ করে, ওরা কেবল অন্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করার জন্য মানুষের মধ্যে যে বিবর্তনধর্মী বৃত্তি কাজ করে, ওরা কেবল তারই অনুসরণ করবে-তার বেশি নয়।

কিন্তু ওরা যদি পাশ্চাত্য জীবনের বহিরংগ, তার রীতিনীতি, আচার আচরণ ও সামাজিক ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করে-যা করার প্রয়োজন মোটেই ওদের নেই-তাহলে ওরা কখনো লাভবান হবে না। কারণ এক্ষেত্রে, পাশ্চাত্য তাদের যা দিতে পারে তা তাদের নিজের সংস্কৃতি যা দিয়েছে এবং যার প্রতি তাদের নিজ ধর্ম-বিশ্বাসও পথ নির্দেশ করে, কোনোমতেই তা থেকে এ উৎকৃষষ্টতরো হবে না। মুসলমানরা যদি তাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখে এবং প্রগতিকে গ্রহণ করে উপায় হিসাবে, লক্ষ্য হিসাবে নয়, তাহলে তারা যে কেবল তাদের নিজের অন্তরের স্বধীনতাই বজায় রাখতে পারবে, তা নয়; হয়তো জীবনের মধুরতা হারিয়ে যাওয়া গোপন রহস্যটুকুও তারা তুলে দিতে সক্ষম হবে পশ্চিমের মানুষের হাতে.. .।

.. .           .. .          .. .             .. .           ..

জাহাযের ইয়েমেনীদের মধ্যে একজন হালকা-পাতলা বেঁটে-খাটো লোক, যার নাক ঈগলের ঠোঁটের মতো, আর মুখমণ্ডল এতো প্রগাঢ় যে, মনে হলো যেনো তা জ্বলছে: কিন্তু তার অংগভংগি খবই শান্ত এবং পরিমিত। সে যখন শুনতে পেলো আমি একজন নও-মুসলিম, সে আমার প্রতি এক বিশেষ প্রীতি দেখাতে শুরু করলো। ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা ‍দুজন ডেকের উপরে এক সংগে বসে কাটাই যখন সে আমাকে ইয়েমেনে তার পাহাড়ী গাঁয়ের কথা বলে চলে। তাঁর নাম মুহাম্মদ সালিহ।

এক সন্ধ্যায় আমি নিচে নেমে ডেকে তার সংগে দেখা করি। তার এক বন্ধু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে আছে লোহার বাংকের উপর। আমাকে বলা হলো, জাহাজের ডাক্তার নেমে ডেকে আসার প্রায়োজন বোধ করবে না মোটেই। লোকটি ভুগছে ম্যালেরিয়ায়। এজন্য আমি তাকে কুইনিন দিই। আমি যখন ওকে নিয়ে ব্যস্ত আছি, তখন অন্য ইয়েমেনীরা কোণায় জমা হয় ক্ষুদ্রাকৃতি মুহাম্মদ সারিহর চারপাশে। ওরা তীর্যক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় এবং মুহাম্মদ সালিহ ফিস ফিস করে যে পরামর্শ দিচ্ছে, তা গ্রহণ করে। শেষতক ওদের মধ্যে একজন আগিয়ে আসে। লোকটির দেহ দীর্ঘ, মুখের রঙ জলপাই-বাদমী আর চোখ দুটি তপ্ত কালো। সে আমাকে অফার করে একগাদা দলানো-মোচড়ানো  ফরাসী নোটঃ

-‘আমরা নিজেদের মধ্যে থেকে েএগুলি যোগাড় করেছি। দুঃখের বিষয়, পরিমাণে খুব বেশি নয়। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন আর এই অর্থ গ্রহণ করুন।’

আমি চমকে উঠে পিছনে দাঁড়াই এবং ওদের বুঝিয়ে বলি, ওদের দোস্তকে আমি ওষুধ দিয়েছি, টাকার জন্য নয়।

-‘না, না, আমরা াত জানি; তা সত্ত্বেও দয়া করে এ টাকা গ্রহণ করুন। কোনো কিছুর মুল্য হিসাবে এ আমরা শোধ করছি না- এ অর্থ হচ্ছে একটি সওগাত, একটি উপহার আপনার ভাইদের কাঝ থেকে। আমরা আপনাকে পেয়ে খুবই সুখী আর এজন্যই আপনাকে এ টাকা দিচ্ছি। আপনি একজন মুসলমান এবং আমাদের ভাই। এমনকি, আমাদের থেকেও আপনি শ্রেষ্ঠ।কারণ আমরা জন্মেছি মুসলমান হিসাবে, আমাদের পিতারা ছিলেন মুসলমান এবং আমদের দাদারাও; কিনউত আপনি ইসলামকে উপলব্ধি করেছেন আপনার নিজের অন্তর দিয়ে.. . ভাই, এই অর্থ গ্রহণ করুন রসূলুল্লাহর খাতিরে ‘

কিন্তু আমি তখনো আমার ইউরোপীয় রীতি-নীতির নিগড়ে বন্দী; নিজের সমর্থনে আমি বলি, “এক রুগ্ন বন্ধুর একটু খিদমতের বদলে কোনো উপহার গ্রহণ আমার পক্ষে সম্ভব নয়।.. . তা াড়া, আমার কাছে টাকাকড়ি রয়েছে যথেষ্ট। আমার চাইতে এর প্রয়োজন তোমাদের নিশ্চয় বেশি। তা সত্ত্বেও, তোমরা যদি এ টাকা দান করতে ইচ্ছা করো পোর্ট সৈয়দ গিয়ে গরীবদের দিয়ে দিও।”

-‘না’, আবার বলে ইয়েমেনী লোকটি, আপনি এ টাকা নিন আমাদের কাঝ থেকে-এবং আপনি যদি তা রাখতে চান, আপনি নিজের হাতেই দিয়ে দিন গরীবদের।’

এবং ওরা যখন আমার উপর পীড়পীড়ি করছে এবং আমার প্রত্যাখ্যানে বিচরিত হয়ে ওরা যখন করুণ এবং নীরব হয়ে গেরো, অকস্মাৎ আমি বুঝতে পাররামঃ আমি যেখান থেকে এসেছি, মানুষ সেখোনে ‘আমার’ এবং ‘তোমার’ মধ্যে প্রাচীর গড়ে তুলতে অভ্যস্তঃ কিন্তু এই সমাজ এমন একটি সমাজ-এর মধ্যে নেই কোনো প্রাচীর.. .

-‘টাকাটা আমাকে দাও ভাইয়েরা, আমি গ্রহণ করছি-আর ধন্যবাদ তোমাদের।’

তিন

‘-আসছে কাল, ‘ইনশাআল্লাহ’, আমরা থাকবো মক্কায়। ‍তুমি যে আগুন জ্বালচো যায়েদ, এটিই হবে সর্বশেষ; আমাদের সফর শেষ হয়ে আসছে!

-কিন্তু নিশ্চয় চাচা, আবার ধরাতে হবে আগুন এবং আপনার আর আমার সামনে সবসময়ই থাকবে আরেকিট সফর।

-‘হতে পারে সে রকম, হে যায়েদ, আমার ভাই! কিন্তু কেমন করে যেনো আমি অনুভব করছি, এদেশে আর হবে না সেই সব সফর। আমি এতো দীর্ঘদিন আরবদেশে ঘূরে বেড়িয়েছি যে, এ আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে এবং আমার আশংকা, আমি যদি এখন বের হয়ে না পড়ি, আর কখনো পারবো না বের .. . হতেঃ কিন্তু যায়েদ আমাকে চলে যেতেই হবে। তোমার কি সেই প্রবাদটি মনে নেই, যদি পরিষ্কার থাকতে হয়, পানিকে চলতেই হবে, বয়ে যেতে হবে! আমি আমার তারুণ্য থাকতে  থাকতেই দেখতে চাই, আমাদরে মুসলমান ভাইয়েরা কিভাবে জীবন-যাপন করছে দুনিয়ার অন্যান্য অংশে-ভারত, চীনে, জাভায়.. .।

-‘কিন্তু চাচাজন, যায়েদ জবাব দেয় সবিস্ময় আতংকে-নিশ্চয় আরব দেশের প্রতি আপনার প্রেম নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

-না যায়েদ, আমি চিরদিন যেমন ভালোবেসে এসেছি, তেমনি একে ভালোবসি; বরং বলা যায় তার চাইতে হয়তো বেশি ভালোবাসি। এতো বেশি ভারোবাসি যে, আমি ভাবতেও কষ্ট পাই, ভবিষ্যতে এর জন্য কী অপেক্ষা করছে! আমি শুনতে পেলাম, বাদশা নাকি তাঁর দেশকে ফিরিংগীদের জন্য খুলে দেবার পরিকল্পনা করেছেন, যাতে করে ওদের কাছ থেকে তাঁর অর্থাগম হতে পারে! তিনি ওদের আলহাসায় তেলের জন্য এবং হিজাযে সোনারজন্য মাটি খুঁড়ে অনুসন্ধান চালাবার অনুমতি দেবেন এবং কেবল আল্লাহই জানেন, এর পরিণাম কী হবে বেদুঈনদের জন্য! এদেশ আর কখনো থাকবে না এরকম.. .

মরুভূমির রাতের নিশ্চুপ নীরবতার মধ্যে থেকে ওঠে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে চলা উটের পদধ্বনি। এক এককী উট-সওয়ার অন্ধকার থেকে আমাদের ক্যাম্প-ফায়ারের আলোতে ছুটে আসে জীনের ঝালর উড়িয়ে, ‘আবায়া’ তরংগায়িত করে; হঠাৎ সে তার উটটিকে থামিয়ে দেয় এবং উটটি কখন হাঁটু গেড়ে নিচু হবে, তার জন্য অপেক্ষা না করেই সে লাফিয়ে নেমে পড়ে জীনের উপর থেকে। সংক্ষিপ্ত ‘আসসালামু আলাইকুম’- ‘আপনার প্রতি শান্তি হোক’- এক কথা বলে আর কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই সে  জানোয়ারটির পিঠ থেকে জীন খুলে নামাতে শুরু করে দেয়, জীনের সঙে বাঁধা থলেগুরি ছুঁড়ে মারে ক্যাম্প-ফায়ারের নিকটে আর তারপর বসে পড়ে মাটির উপর-তখনো নিশ্চুপ, মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে।

-‘আল্লাহ আপনাকে হায়াত দিন, হে আবু সাইয়িদ,’ যায়েদ বলে। কারণ বোঝা গেলো, নবাগত লোকটিকে সে চেনে। কিন্তু লোকটি তখনো নির্বাক। সে কারণে যায়েদ তার মুখ ফিরালো আমার দিকে এবং বললো,‘ এ হচ্ছে ইবনে সউদের ‘রাজাজিলদের একজন-শয়তান!

বিষণ্ণ আবু সাইয়িদের গায়ের রং ভীষণ কালো;তার মোটা ঠোঁট এবং একটি সিঁথি কেটে সযত্নে দুই পাটে বিভক্ত তার কোঁকড়ানো চুল-তার কোমরবন্ধে গোঁজা ডেগারটি খুব সম্ভব বাদশার দেয়া উপহার, সোনার খাপে ঢাকা, আর তার সওয়ারীটি হচ্ছে একটি চমৎকার মধু-রঙ উষ্ট্রী-উত্তরাঞ্চলের উটের বংশজাত। তার অংগ-প্রত্যংগগুলি চিকন-চাকন বহুল্যবর্জিত-মাথাটি সংকীর্ণ, কাঁধ আর পাছা দুটি শক্তিমস্ত, বলবান।

-‘তোমার কী হয়েছে আবু সাইয়িদ, তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে কথা বলছো না কেন? তোমার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে নাকি!’

‘নূরা’.. .  ফিস ফিস করে উচ্চারণ করে আবু সাইয়িদ এবং কিছুক্ষণ পর গরম কফি যখন ওর জিভের জড়তা ঘুচিয়ে দেয়, সে আমাদের বলতে শুরু করালো নূরা সম্পর্কেঃ নযদের আর্রাস শহরের একটি বালিকার নূরা (সে মেয়েটির পিতার নামও উল্লেখ করে; আর দেখা গেলো, আমি তাকে খুব ভালো করেই চিনি)। অন্য মেয়েদের সাথে নূরা যখন পানি তুলছিলো, তখন আবু সাইয়িদ তার প্রতি পুশিদা লক্ষ্য করে বাগিচার দেওয়ালের উপর দিয়ে, ‘এবং আমি টের পেলাম, যেনো একটি জ্বলন্ত কয়লা পড়েছে আমার হৃৎপিণ্ডের ভেতর। আমি ওকে ভালোবাসি, কিন্তু ওর  বাপ, ওই কুত্তা ওর মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে দেবে না আমার কাছে-ভিক্ষুক!-এবং বলে যে, নুরা নাকি আমাকে ভয় করে! আমি ওর দেনমোহর হিসাবে অনেক টাকা অফার করেছিলাম, আমার এক খণ্ড জামিও; কিন্তু সবসময়ই সে আমাকে প্রত্যাখান করে এবং আখেরে, ওকে শাদি দিয়ে দেয় ওর চাচাতো ভাইয়ের সাথে। আল্লাহর লানৎপড়ুক ওর উপর; আর নুরার উপর!’

তার মজবুত, গাঢ় কালো মুখের একদিক আলোকি হয়ে ওঠে ক্যাম্প-ফায়ারের আলোতে এবং তার মুখের উপর যে ছায়া নৃত্য করছে তা যেনো এক যন্ত্রণার জাহান্নামের ছায়া। বেশিক্ষণ বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে; অস্থিরতায় অধীর হয়ে সে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। মুহুর্তের জন্য সে তার হাত দুটিকে ন্যস্ত রাখে জীনের উপর, আগুনের কাছে আবার ফিরে আসে এবং হঠাৎ ছুটে  বের হয়ে পড়ে শূন্য রত্রির অন্ধকারে। আমরা শুনতে পাই, সে আমাদের তাঁবু খাটানোর জায়গার চারপাশে বৃহৎ বৃত্ত করে দৌড়াচ্ছে আর চীৎকার করছে- চীৎকার করছেঃ

-‘নূরার আগুন আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে! আমার বুকের ভেতর নূরার আগুন জ্বলছে’- এবং আবার সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছেঃ ‘নূরা, নূরা!’

আবার সে আগিয়ে আসে ক্যাম্প-ফায়ারের দিকে এবং তার চারিদিকে বৃত্ত করে দৌড়াতে থাকে আর তার সাথে পত পত করে উড়তে থাকে তার ‘কাফতান’, যেনো চঞ্চল নৃত্যপরা আগুনের আলো এবং অন্ধকারে একটি ভৌতিক নিশাচার পাখি।

ও কি পাগল? আমার তা মনে হলো না। কিন্তু এও হতে পারে যে, ওর অন্তরের গহন অন্ধকার গহ্বর থেকে জেগে উঠে ছে আদিম পূর্বপুরুষের স্মৃতির সংগে সে সম্পর্কিত মানসিক আবেগ-আফ্রিকার অরণ্যের পূর্বপুরুষাগত স্মৃতি-সেই সব মানুষের স্মৃতি, যারা বাস করতো ভূত-প্রেত এবং অতিপ্রাকৃত রহস্যের মধ্যে-তখনো সেই সময়ের খুবই ঘনিষ্ট নৈকট্যে, যখন চৈতন্যের দিব্য স্ফুলিংগ জানোয়ারকে পরিণত করেছিলো মানুষে; আর সেই স্ফুলিংগ এখনো শক্তিশালী নয় যে , তা লাগামছাড়া প্রবৃত্তিগুলিকে এক সংগে বাঁধতে পারে এবং সেগুলিকে রূপান্তরিত করতে পারে একটি উচ্ছতরো ভাবাবেগে.. . মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, আমি যেনো সত্যি আমার সম্মুখে দেখতে পাচিছ আবু সাইয়িদের হৃদপিণ্ডখঅনি, রক্ত আর মাংসের একটি দলা জ্বলছে বাসনার আগুনে,যেনো সত্যিকার আগুন জ্বলছে, আর কেনো যেনো আমার মনে হলো এ তো খুবই স্বাভাবিক যে, এমনি ভয়ংকরভাবেই সে কাঁদবে, কাঁদবে আর দৌড়াবে বৃত্তের পর বৃত্ত তৈরি করে, একে উন্মাদের মতো, যতক্ষণ না পায়ে বেড়ি দেয়া উটগুলি তাদের গা তুলছে আতংকিত হয়ে তিন পায়ের উপর.. .।

তারপর ও ফিরে  আসে আমাদের নিকট এবং দপ করে মাটির উপর বসে পড়ে। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের দৃশ্যে যায়েদের মুখে যে বিরক্তি ফুঠে উঠলো তা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। কারণ, একজন খাস আরবে শরীফ মেজাজের কাছে অমন লাগাম ছেঁড়া ভাবাবেগের চেয়ে ঘৃণ্য আর কিছুই নেই। কিন্তু যায়েদের মহৎ হৃদয় অল্পক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে নেয়। সে আবু সাইয়িদের আস্তিন ধরে সাজোরে টান দেয় এবং আবু সাইয়িধ যখন মাথা তুলে যায়েদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তকাচ্ছে, যায়েদ তাকে নম্রভাবে টেনে নিয়ে এলো নিজের সান্নিধ্যেঃ

-‘ওহে আবু সাইয়িদ, তুমি এভাবে নিজেকে ভুলে যেতে পারছে কেমন করে? আবু সাইয়িদ, তুমি তো একজন যোদ্ধ.. . তুমি অনেক মানুষকে মেরেছে এবং প্রায়ই তুমি মানুষের হাতে মরতে মরতে বেঁচে গেছো! আর এখন কি না তুমি এক আওরাতের আঘাতে কূপোকাত? দুনিয়াতে নূরা ছাড়াও রয়েছে অন্য আওরাত.. . ওহে  আবু সাইয়িদ,যোদ্ধ, নির্বোধ.. .’

আফ্রিকীটি যখন কাৎরাচ্ছে আস্তে আস্তে এবং দুহাত দিয়ে তার মুখ ঢেকে দিচ্ছে তখনো যায়েদ বলে চলেঃ

-‘খামুশ, হে আবু সাইয়িদ.. . মুখ তুলে চাওঃ তুমি আসমানের আলোকিত পথটি দেখতে পাচ্ছো?’

আবু সাইয়িদ সবিস্ময়ে আকাশের দিকে তাকায় আর  আমি নিজের অজ্ঞাতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যায়েদের তর্জনী অনুসরণ করি আর আমার চোখ ফিরাই পাণ্ডুর অসমান পথটির দিকে-যা আকাশের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত পর্যন্ত। আপনারা এটিকে বলবেন ছায়াপথ; কিন্তু বদ্দুরা তাদের মরুসূলভ প্রজ্ঞার মাধ্যমে জানে, এ আর কিছু নয়- এ হচ্ছে  সেই মেষের পথ যা ইবরাহীমের নিকট পাঠানো হয়েছিলো, যখন তিনি আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্যবশে এবং তাঁর অন্তরের নৈরাশ্যে ছুরি তুলে ধরেছিলেন তাঁর প্রথম-জাত পুত্রকে কুরবানী করার জন্য। সেই মেষের পথটিই আকাশে দৃশ্যমান রয়ে গেছে চিরকালের জন্য-রহমত ও করুণার প্রতীক- একমানব হৃদয়ের যন্ত্রণা উপশমের জন্য নিস্কৃতি প্রেরণ করা হয়েছিলো, তারই স্মৃতি হিসাবে, আর এ কারণেই, তা তাদের জন্যও একটি সান্তনা যারা আসবে পরে, ভবিষ্যতেঃ তাদের জন্য, যারা মরুভূমিতে একাকী অথবা দিশাহারা, আর তাদের জন্য যারা পথ চলে নিজ জীবনের মরু প্রান্তরের মধ্য দিয়ে কেঁদে কেঁদে নিঃসংগ পরিত্যাক্ত অবস্থায় টলতে টলতে , হোঁচট খেতে খেতে!

আর, যায়েদ আকাশের দিকেতার হাত তুলে কথা বলতে থাকে গাম্ভীর্যের সংগে কোনো রকম অহংকার  না করেই, যেমনটি কেবল একজন আরব-ই পারেঃ

-এটি হচ্ছে সেই মেষের পথ যা আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীমের নিকট, যখন তিনি কুরবানী করতে যাচ্ছিলেন তাঁর প্রথম সন্তানকে। এভাবেই আ্ল্লা দয়া প্রদর্শন করেছিলেন তাঁর বান্দাকে.. . তুমি কি মনে করো আল্লাহ তোমাকে ভুলে যাচ্ছেন? যায়েদের মর্মস্পর্শী কথায় আবু সাইয়িদের কালো মুখখানা শিশু-সুলভ বিস্ময়ে নমনীয় হয়ে ওঠে এবং তাতে ফুাটে ওঠে অধিকতরো স্থৈর্যের অভিব্যক্তি এবং –ছাত্র যেমন উস্তাদকে অনুসরণ করে তেমনি মনেোগের সাথে সে তাকায় আকাশের দিকে আর চেষ্টা করে সেখানে, তার নৈরাশ্যে একটি ফয়সালা খুঁজে পাওয়া র জন্য.. .।

চার

ইবরাহীম  এবং  তাঁর বেহেশতী মেষঃ এ জাতীয় চিত্রকল্প অতিসহজেই আসে এদেশের মানুষের মনে। সেই প্রচীন গোষ্ঠীপতির স্মৃতি আমাদের মধ্যে এতো স্পষ্ট ও জীবন্ত যে, তা পাশ্চাত্যের খৃষ্টানের মধ্যে এই স্মৃতি যতোটা জীবন্ত, তার চাইতে অনেক বেশি। খৃষ্টানেরা আর যা-ই হোক, তাদের ধর্মীয় চিত্রকল্পের জন্য প্রথমেই নির্ভর করে তৌরাতের উপর; এমনকি, ইহুদীদের চাইতেও এ স্মৃতি অনেক অনেক বেশি উজ্জ্বল ও জীবন্ত আরবদের কাছে, যদিও তৌরাত হচ্ছে ইহুদীদের দৃষ্টিতে মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রথম ও শেষ কথা। হযরত ইবরাহীমের আধ্যাত্মিক উপস্থিথি প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হয় আরবে, ঠিক যেমনটি হয় গোটা মুসলিম বিশ্বে, কেবল মুসলিম ছেলেদের ঘন ঘন তাঁর নামে (তাঁর আরবী রূপ ইবরাহীম রূপে) নামকরনে নয়, বরং ক্রমাগত ঘুরে আসে আল –কুরআন এবং মুসলমানদের দৈনিক সালাতে; উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে প্রথম সচেতন প্রচারক হিসাবে গোষ্ঠীপতির ভূমিকার স্মরণেওঃ যার মধ্যে মেলে প্রতি বছর মক্কায় হজ্জ করার উপর ইসলাম কেনো অমন বিপুল গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তার ব্যাখ্যা। যে  মক্কার সঙে আদিকাল থেকেই নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে হযরত ইবরাহীমের কাহিনী। পাশ্চাত্যের বহু লোক যেমন ভুল করে মনে করে থাকে-হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক ইহুদী ধর্মের কিসসা-কহিনীর উপাদান ‘ধার’ করার চেষ্টাই যেনো ইবরাহীমকে নিয়ে আসে মুসলিম চিন্তার কক্ষপথে, কারণ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, ইসলামের অভ্যুদয়ের  অনেক আগেই ব্যক্তি হিসাবে হযরত ইবরাহীমের কথা সুপরিজ্ঞাত ছিলো আরবদের কাছে। আল কুরআনে এই গোষ্ঠীপতি সম্পর্খে প্রত্যেকটি উল্রেখ এমন শব্দ বিন্যাসের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ হয়েছে য, মুহাম্মদ (সা)-এর আমলের বহু-বহু যুগ আগেও যে তিনি আরব মনের সম্মুখে জীবন্ত ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ থাকে না। তাঁর নাম এবং তাঁর জীবেনের রূপরেখা সবসময় উল্লিখিত হয় কেনো ভূমিকা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই, যা এমন এক ব্যাপার, যার সাতে আল-কুরআনের একেবারে প্রথমদিকের শ্রোতারাও নিশ্চয় পরিচিত ছিলেন।  বস্তুত ইসলাম –পূর্বকালেও আরবদের নসবনামায় ইবরাহীমের একটি বিশিষ্ট স্থান দেখা যায় হাজরোর পুত্র ইসমাঈলের মাধ্যমে উত্তর অঞ্চলের আরব-গোষ্ঠীর জনক হিসাবে, য গোষ্ঠীটি আজ গোটা আরব-জাতির অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত।

আর এই গোষ্ঠীরই অন্তর্ভূক্ত ছিলো মুহাম্মদের গোত্র কুরাইশ।তৌরাতে ইসমাঈল এবং তাঁর মায়ের কহিনীর শুরুই কেবল উল্লিখিত হয়েছে। কারণ এ কাহিনীর পরবর্তী পরিণতির সাথে হিব্রু জাতির ভাগ্যের প্রত্যক্ষ কেনো যোগ নেই, আর হিব্রু জাতিরি বক্তব্য রয়েছে এ বিষয়ে।

এই ঐতিহ্য অনুসারে, আজ যেখানে মক্কা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে হাজেরা এবং ইসমাঈলকে রেখে চলে গিয়েছিলেন ইবরাহীম। এ কাহিনী যেভাবে চলে আসছে তা কোনো দিক দিয়েই অসম্ভব নয়, িযদি আমরা মনে করি যে, উট-সওয়ার কোনো যাযাবরের কাছে তিরিশ কিংবা তার বেশি দিনের সফর মোটেও অস্বাভাবিক ছিলো না, এবং অস্বাভাবিক নয়। যা-ই হোক, আরব ঐতিহ্য বলে, ইবরাহীম হাজেরা এবং তাঁদের শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন এই উপত্যকাতেই-আরবের সূর্যের নীচে নগ্ন এবং উষার শিলা-গঠিত পাহাড়ের মধ্যকার এই গিরিখাতের মধ্যে, যার উপর দিয়ে বয়ে যায় লেলিহান আগুনের শিখার মতো মরুবায়ু, যে স্থান এড়িয়ে চলে শিকারী পাখিরাও! এমনকি আজো যখন ঘরবাড়ি, রাস্তা এবং বহু ভাষী ও বহু জাতির মানুষের মক্কা উপত্যকার পূর্ণ, তখনো চারপাশে যে নীরব নিথর পার্বত্য ঢাল রয়েছে, তার মদ্যে থেকে মরুভূমির নির্জনতা চীৎকার করতে থাকে, আর কাবার সম্মুখে হজ্বযাত্রী যে বিপুল সংখ্যক নর-নারী সিজদায় লুটিয়ে পড়ে তাদের উপর শূন্যে ভেসে বেড়ায় সুদীর্ঘ অতীতকালের বহু হাজার বচরের অশরিরী উপস্থিতি যাতে নিরবিচ্ছিন্ন িএবং প্রাণলেশহীন নীরবতা ঝুলে আছে শূন্য ‍উপত্যকার উপর।

সেই মিসরীয় রমনী দ্বিতীয় স্ত্রী বিবি হাজেরা নৈরাশ্য  ও হাতশার পক্ষে এ ছিলো একিট উপযুক্ত পরিবেশ, যিনি তাঁর স্বামীর প্রথমা ঔরসে জন্ম দিয়েছিলেন িএক পুত্র –সন্তানের, আর একারণে তাঁর স্বামীর প্রথমা স্ত্রীর অতোটা বিদ্বেষের কারণ হয়ে উঠেছিলেন যে, তাঁকে এবং তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে দিতে হয়েছিলো নির্বাসন। গোষ্ঠীপতি হযরত ইবরাহীম মনে নিশ্চয় কষ্ট পেয়েছিলেন যখন তাঁর অনমনীয় স্ত্রীর মন পাবার জন্য তাঁকে এ কাজ করতে হয়েছিলো। কিন্তু আমাদ্রে মনে রাখতে হবে, তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয় পাত্র যে, তিনি এ নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতেন, আল্লাহর রহমতের কোন সীমা নোই। তৌরাতের সৃজন বিষয়ক খণ্ডে আমরা জানতে পাই, আল্লাহ তাঁকে সান্তনা দিয়েছিলেন এভাবেঃ এই শিশু এবং তোমার এই স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে তোমার যেনো কষ্ট না হয়.. . তাঁর পুত্র থেকে আমি উত্থান ঘটাবো এক জাতির, কারণ সে তোমার সন্তান। এবং এভাবে, হযরত ইবরাহীম সেই রোরুদ্যমানা রমণী এবং তাঁর পুত্রকে এই উপত্যকায় রেখে চলে গেছেন; ওদের দিয়ে গেলেন একটি মশক এবং খেজুর-ভর্তি একটি চামড়া, আর তিনি নিজে চলে গেলেন উত্তরদিকি মাদাঈন হয়ে কেনান দেশে।

সেই উপত্যকায় ছিলো একটিমাত্র বুনো সরহা গাছ। তারই ছায়ায় শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন হাজেরা। তাঁকে ঘিরে সাঁতরে চলা ঢেউ-খেলানো গরম বালু এবং শিলা-গঠিত ঢিলার ঢালের উপ র চোখ ঝলসানো আলো ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। কী চমৎকার ছিলো সে গাছের ছায়া.. . কিন্তু এই নীরবতা-এক ভয়ঙ্কর নীরবতা, যার মধ্যে শোনা যায় না কোনো জীবিত প্রাণীর নিশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত! দিন বিদায় নিচ্ছে, ধীরে ধীরে হাজেরা ভাবলেন, যদিন কেবল কোনো প্রাণীও আসতো এখানে-একটি পাখি, একটি জন্তু, হ্যাঁ.. . এমন কি, শিকারী পশুঃ ওহো, কী আনন্দেরই না হতো! কিন্তু কিছুই এলো না রাত ছাড়া, রাত এলো মরু –রাত্রির স্বস্তি নিয়ে, যেনো অন্ধকার ও আকাশের এক ছাদ-শীতলতা ছড়িয়ে, যা তার নৈরাশ্যের তিক্ততাকে দেয় হালকা করে। নতুন সাহস সঞ্চারিত কহয় হাজেরার বুকের ভেতর। তিনি তাঁর শিশুপুত্রকে কয়েকটি খেজুর খাওয়ান এবং দুজনই পানি খান মশক থেকে।

রাত শেষ হয় এবং আরেকটি দিন এবং পরে আরেকটি রাত। কিন্তু তিসরা রোজ যখন এলো তার আগুনে নিশ্বাস নিয়ে তখন আর মশকে পানি নেই এক ফোঁটাও এবং সমস্ত শক্তিকে ছাপিয়ে উঠলো হতাশা এবং আশা হয়ে দাঁড়ালো একটা ভাঙা পাত্রের মতো। আর শিশুটি যখন বৃথাই কাঁদতে লাগলো পানির জন্য, ক্রমেই দুর্বলতরো হয়ে আসা কন্ঠে হাজেরা চীৎকার করে উঠলেন আল্লাহর উদ্দেশ্যে। শিশুর কষ্টে উদভ্রান্ত হয়ে দুহাত উর্ধ্বে তুলে দৌড়াতে লাগলেন উপত্যকার ভেতর দিয়ে এদিক ওদিক, আর তাঁর এই হতাশার স্মরনেই মক্কায় এখন যাঁরা হজ্জ্ব করতে আসেন, সাতবার দৌড়ান এ দুটি পাহাড়ের মধ্যে- একদিন হাজের যেমন আর্ত চীৎকার করেছিলেন তেমনি চীৎকার করতে করেত,‘হে দয়াময়, হে করুণাময়, কে আমাদের প্রতি দয়া করতে, যদি না দয়া করো তুমি?’

এবং তখনই এলো জবাবঃ আর দেখো, একটি পানির ফোয়ারা উৎসারিত হয়েছে আর বইতে শুরু করছে বালির উপর দিয়ে! হাজেরা উল্লাসে চীৎকার করে উঠলেন এবং শিশুর মুখ চেপে ধরলেন সেই মহামূল্য তরল পদার্থটিতে, যাতে করে সে পান করতে পারে এবং তিনিও তাঁর সাথে পান করলেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে, প্রার্থনার ভঙ্গিতে ‘জুম্মি জুম্মি’ বলতে-এমন একটি শব্দ যার কোনো অর্থ নেই, কেবল, জমি ফুঁড়ে উৎসারিত পানির শব্দের অনুকরণে যেনো বলতে চাইছেন-‘উৎসরিত হও, উৎসরিত হও’। পাছে না পানি ‍ফুরিয়ে যায় এবং যমিনের নীচে হারিয়ে যায়, এজন্য হাজরো সে উৎসের চারপাশে বালি জমিয়ে জমিয়ে একটি ছোট্ট দেয়াল তৈরি করেন, যার ফলে পানির প্রবাহ তেমে গেলো এবং হয়ে উঠলো কুয়া। তখন থেকেই তা পরিচিতি হয়ে আসছে জমজম কূপ নামে এবং আজে টিকে আছে।

ওরা দুজন এখন তৃষ্ণার কবল থেকে রক্ষা পেয়েছেন এবং খেজুরের চললো আরো  বেশ কিছুদিন। কয়েকদিন পর একদল বদ্দু যারা তাদের পরিবার পরিজন আর পশুপালনসহ দক্ষিণ আরতে তাদের স্বদেশ ত্যাগ করে এসেছে এবং খুঁজছে নতুন চারণ ক্ষেত্র, ঘটনাক্রমে যাচ্ছিলো এই উপত্যকার প্রবেশ পথ হয়ে। ওরা যখন দেখলো, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি চক্রাকারে ঘুরছে এর উপর ওরা সিদ্ধান্তে এরো, এখানে নিশ্চয় পানি আছে। ওদেরই কোনো কোনো লোক উট হাঁকিয়ে ছুটলো উপত্যকার ভেতরে, দেখবার জন্য ওখানে কী আছে এবং দেকতে পেলো এক শিশু নিয়ে একাকী এক রমণী বসে আছে কানায় কানায় পানিতে ভর্তি এক কুয়ার কিনারে। লোকগুলি ছিলো স্বভাবের দিক দিয়ে  শান্ত। তাই ওরা অনুমতি চায় হাজেরার কাছে তাঁর উপত্যকায় বসতি স্থাপনের জন্য হাজেরা তা মনযুর করেন একটি শর্তেঃ জমজম কুয়াটি ইসমাঈল এবং তাঁর বংশধরদের সম্পদ হয়ে থাকবে চিরকাল।

আর ইবরাহীমের বেলায়-ইতিবৃত্ত  বলে-কিছুকাল পরে তিনি ফিরে আসেন সে উপত্যকায় এবং আল্লাহর ওয়াদা মতো তিনি এসে জীবিত পান হাজেরা এবং তাঁর পুত্রকে। তখনে থেকে তিনি প্রায়ই আসতে থাকেন ওঁদের নিকট এবং তাঁর চোখের সামনেই ইসমাঈল হয়ে উঠলেন যৌবনে উপনীত এক পুরুষ এবং বিয়ে করেন দক্ষিণ আরবীয় কওমের এক বালিকাকে। কয়েক বছর পর গোষ্ঠীপতি ইবরাহীম স্বপ্নে নির্দেশ পান তাঁর প্রভুর উদ্দেশ্যে জমজম কুয়ার কাছে একটি ‘ইবাদতগাহ’ নির্মানের। এরপর তিনি তাঁর পুত্রের সাহায্যে নিয়ে নির্মাণ করেন মক্কায় যে ‘ইবাদত গৃহটি’ আজো বিদ্যমান এবং কা’বা নামে পরিচিত, তারই প্রথম মডেল বা নমুনাটি। এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত সর্বপ্রথম গৃহ বলে যা গণ্য হবে ভবিষ্যতে, সেই ঘর তৈরির জন্য ওঁরা যখন পাথর কাটছেন, তখন ইবরাহীম তাঁর মুখ আকাশের দিকে তোলেন এবং আবেগ-বিহবল কণ্ঠে বলে উঠেনঃ ‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’ “তোমার জন্য আমি প্রস্তুত হে আল্লাহ তোমার জন্য আমি তৈরি। আর এজন্যই মুসলমানর মক্কায় এক আল্লাহর জন্য স্থগিত প্রথম ইবাদতগৃহে হজ্ব করতে গিয়ে যখন পবিত্র নগরীর নিকটবর্তী হয়, তখন ওরা তোলে একই ধ্বনি,‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’

পাঁচ

লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

আমি মক্কায় আমার পাঁচবার হজ্জ্বে কতোবার শুনেছি এই ধ্বনি। মনে হলো এখনো আমি তা শুনতে পাচ্ছি যখন শুয়ে আছি আগুনের পাশে, যায়েদ এবং আবু সাইয়িদের কাছে।

আমি আমার চোখ বুঁজি এবং চাঁদ ও সিতারা অন্তর্হিত হয় আমার সমুখ থেকে। আমি আমার মুখের উপর রাখি আমার বাহু এবং আগুনের আলোও এখন আর ভেদ করতে পারে না আমার চোখের পাতা। মরুভূমির সকল শব্দ ও ধ্বনি তলিয়ে গেলো। আমি আর কিছুই শুনতে পাই না আমার মনে ‘লাব্বায়েক’ ধ্বনি এবং কানে রক্তের অস্ফুট গুঞ্জন ও স্পন্দন ছাড়া। রক্ত অস্ফুট ধ্বনি তুলছে, ধুক ধুক করছে, আছড়ে পড়ছে জাহাজের খোলে আছড়ে-পড়া সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো,  আর ইঞ্জিনের ধড়ফড়ানির মতো। আমি শুনতে পাই  ইঞ্জিনের ধড়ফড়ানি, অনুভব করি আমার নিচে জাহাজের তক্তার কাঁপুনি এবং নাকে পাই জাহাজের ধুঁয়া ও তেলের গন্ধ এবং শুনি সেই ধ্বনি ‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’ যেমন তা ধ্বনিত হয়েছিলো শত শত কণ্ঠে, সেই জাহাজে যা আমাকে বহন করে এনেছিলো ছবছর আগে আমার পয়লা হ্জ্ব-যাত্রায়, মিসর থেকে আরবে একটি সাগরের উপর, যার নাম লোহিত সাগর এবং কেউই জানে না, কেনো এ নাম হয়েছে এ সাগরের। কারণ আমরা জাহাজে করে চলছিলাম সুয়েজ খারের মধ্য দিয়ে, যার ডান পাশে পড়ে আফ্রিকার কয়েকটি পাহাড় আর বাঁদিকে রয়েছে সিনাই উপত্যকার গিরিশ্রেণী, দুই নগ্ন, অনাবৃত, শিলা-পঠিত পাহাড়, যাতে নেই কোনো গাছপালা। জাহাজের অগ্রগতির সাথে সাথে যা আগিয়ে চলেছে দূর হতে আরো দূরে, এবং দৃষ্টির প্রায় বাইরে, এমন আর এক কুয়াশা-ধূসর দূরত্বে গিয়ে আমরা পৌছুই যেখান থেকে ভূভাগ কেবল অনুভব করা যায়, ইন্দ্রিয় দিয়ে দেখা যায় না। সুয়েজ খারের বুকে এই সমস্ত পথটি জুড়ে আমরা যে পানি দেখতে পাই, তা লাল নয়, ধূসর এবং তারপর শেষ বিকালে আমরা যখন ঢুকে পড়ি খোলামেলা প্রসস্ত লোহিত সাগরে, দেখা গেলো, আদর করা বাতাসের মৃদু পরশের নীচে ভূমধ্যসাগরের মতোই লোহিত সাগরও নীল।

জাহাজে কেবল হজ্ব-যাত্রীরাই রয়েছে এবং তারা সংখ্যায় এতো বেশি যে, এতোগুলি লোককে বহন করার ক্ষমতা জাহাজের নেই বললেই চলে। সংক্ষিপ্ত হজ্ব মৌসুমের মুনাফার জন্য পাগল লোভী জাহাজ-কোম্পানীই যাত্রীদের আরাম –আয়াশের দিকে লক্ষ্য না রেখে, আক্ষরিক অর্থেই জাহাজটিকে বোঝাই করছে কানায় কানায়। ডেকের উপর কেবনিগুলিতে প্যাসেজে, প্রত্যেক সিড়িতে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীর ডাইনিং রুমগুলিতে, যাত্রী বহনের জন্যই জাহাজের যে খোলগুলি খঅলি করে মই লাগানো হয়েছে, সেগুলিতেঃ প্রত্যেকটি খালি জায়গা ও কোনে মানুষেকে একত্র গাগাগাদি করে ঠাসা হয়েছে খুবই যন্ত্রণাদয়কভাবে। ওদের প্রায় সকলেই মিসর এবং উত্তর আফ্রিকার হ্জ্বযাত্রী। পরম নম্রতার সাথে, কেবলমাত্র এই সফরের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ওরা কোনো প্রতিবাদ ও অভেোগ না করে সহ্য করে যাচ্ছে এহেন অনাবশ্যক কষ্ট। কিভাবে ওরা-নারী, পুরুষ, শিশু-গাদাগাদি ঠাসাঠাসি একেকটা দল হিসাবে ডেকের পাটাতনের উপর পশুর মতো শুয়ে আছে এবং অতি কষ্টের সাথে তাদের গেরস্থালীর বাসনপত্র ঘষামাজা করে পরিষ্কার করছে; রাঁধছে (কারণ, কোম্পানী কোনো খাবার সরবরাহ করছে না) কেমন করে সবসময় ঠেলাঠেলি করে ওরা পানির জন্য এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে টিনের মগ বা ক্যানভাস মোড়া পানির পাত্র নিয়ে, প্রতি মূহুর্তেই একটি যন্ত্রণা মানুষের এই চাপাচাপির মধ্যে; কেমন করে ওরা দিনে পাঁচবার জমায়েত হয় পানির কলের চারপাশে-কেননা অতোগুলি মানুষের জন্য অতি অল্প কটি ট্যাগই রয়েছে সালাতের আগে ওযু করার জন্য। কেমন করে ওরা যাতনা ভোগ করছে জাহাজের গভীর খোলের দম বন্ধ করা বাতাসে, ডেকের দুই তলা নীচের খোলগুলিতে যেখানে অন্য সময়ে< কেবল গাঁট এবং জিনিসপত্রের কেসই ভ্রমণ করে-যে কেউ তা দেখলে সে-ই উপলব্ধি করবে ঈমানের জোর, বিশ্বাসের শক্তি, যে শক্তিতে এর-হজ্বযাত্রীরা শক্তিমান;কারণ মক্কার চিন্তায় ওরা এমনি মশগুল, এমনি নিমগ্ন যে, ওদের এই কষ্ট ওরা আসলে অনুভব করছে বরেই মনে হয় না। ওদের মুখে কেবল হজ্বেরই কথা এবং যে আবেগ নিয়ে ওরা ওদের আসন্ন ভবিষ্যতের দিকে তাকাচ্ছে, তাতে দীপ্ত-উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ওদের মন। মেয়েলোকেরা প্রায়ই কোরাসে গাইছে পবিত্র নগরীর গান আর বারবার ঘুরে-ফিরে উঠছে একটি ধ্বনি-‘লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক।’

দ্বিতীয় দিনের প্রায় দুপুরের দিকে জাহাজের সিটি বেজে ওঠেঃ এ তারই সংকেত যে আমরা রাবিগের অক্ষাংশে পৌঁছে গেছি। রাবিগ জেদ্দার উত্তরের একটি ছোট্ট বন্দর, যেখানে প্রাচীন এক ঐতিহ্যে মুতাবিক, উত্তর অঞ্চল থেকে আগত পুরুষ হজ্বযাত্রীদের খুলে ফেলতে হয় তাদের দৈনন্দিন পোশাক-আশাক এবং পরতে হয় ইহরাম তথা হ্জ্বযাত্রীদের পোশাক। এ পোশাকের মধ্যে আছে সেলােই না করা দুই টুকরা সাদা পশমী অথবা সুতী কাপড়, যার এক খণ্ড পেঁচানো হয় কোমরে এবং পৌছে হাঁটুর নীচে পর্যন্ত এবং অন্য খণ্ডটি আলগাভাবে ঝুলানো হয় একটি কাঁধের উপর আর মাথা থাকে খোলা, অনাবৃত। এই যে পোশাক, যার মূলে রয়েছে রসূলের অতীতের একটি আদশ, এর যুক্তি এই যে, হজ্বের সময় আল্লাহর ঘর যিয়ারতের জন্য পৃথিবীর সব জায়গা থেকে যে মুমিনেরা এসে ভীড় করে, তারা একে অপরের অপরিচিত, এ অনুভূতি যেনো তাদের মধ্যে না থাকে- জাত ও জাতির মধ্যে অথবা ধনী কিংবা উঁচু-নিচুর মধ্যে কোনো ব্যবধানা যেনো না থাকে, যেনো ওরা সকলেই জানতে পারে-ওরা ভাই ভাই, আল্লাহ এবং মানুষের কাছে সমান। আর দেখতে না দেখতে আমাদের জাহাজ থেকে কোথায় গায়েব হয়ে গেলো পুরুষদের সকল রং-বেরংয়ের বার্ণাঢ্য পোশাক! এখন আর আপনি দেখতে পাবেন না তিউনিসের লাল ‘তারবুস’, মরক্কেবাসীদের জমকালো দামী বার্নাস অথবা মিসরীয় ‘লোহিনের’ রুচি-বিবর্জিত গল্পাবিয়াঃ এখন  আপনার চারপাশে সর্বত্র রয়েছে হজ্বযাত্রীদের গায়ের উপর, যারা এখন নড়াচড়া করছে মহত্তর মর্যাদার সংগে হজ্বের উদ্দেশ্যে এই পরিবর্তনের স্পষ্টতই প্রভাবিত হয়ে। ইহরাম যেহেতু রমণীদের শরীরের অনেকখানি ব্যক্ত করে দেবে এজন্য মহিলা হজ্বযাত্রীরা ওদের স্বাভাবিক পোশাক-আশাকই পারেন। কিন্তু আমাদের জাহাজে যেমন দেখতে পেলাম-ওদের পোশাক হয়, কেবলি কালো না হয় কেবলি সাদা-মিসরীয় রমণীদের গায়ে কালো গাউন আর উত্তর আফ্রিকার স্ত্রীলোকদের পরণে সাদা-ওদের এই পোশাক বিন্দুমাত্র রঙের পরশু বুলায় না সামগ্রিম চিত্রের মধ্যে।

তৃতীয় দিনের ভোরবেলা জাহাজ নোঙর ফেলে আরবের উপকূলকে সামনে রেখে আমরা প্রায় সকলেই দাঁড়িয়ে আছি রেলিংয়ে এবং তাকাচ্ছি স্থলভাগের দিকে, যা ভোরের কুয়াশার মধ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।

সকল দিকেই দেখতে পাচ্ছি অন্যান্য হজ্বযাত্রী জাহাজের ছায়া-শরীর এবং সেই সব জাহাজ ও স্থলভাগের মধ্যে পানিতে বিবর্ণ হলুদ ও পান্না সবুজের রেখাঃ পানির নিচে প্রবল প্রাচীর, লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূলের সমুখে যে দীর্ঘ প্রতিকূল প্রাচীরমালা রয়েছে তারই অংশ। ওগুল ছড়িয়ে পুবদিকে দেখা যাচেছ পাহাড়ের মতোই একটা-কিছু নিচু এবং আলো আঁধারীতে ঢাকা; কিন্তু ওর পিছনদিকে আকস্মাৎ যখন সূর্য উঠলো এ আর পাহাড় রইলো না; হয়ে উঠলো সমুদ্র-তীরের একটি শহর, যা সমুদ্রের কিনার থেকে ধাপে ধাপে উঠে গেছে উপরদিকে, শহররের মধ্যভাগ পর্যন্ত ক্রমেই উচু হতে আরে উঁচু হয়ে ওঠা ঘরবাড়ি নিয়ে-  একটি ছোট্ট নাজুক ইমারত যে- যা গোলাপী এবং হলদে –ধূসর প্রবাল পাথর দিয়ে তৈরিঃ জিদ্দা বন্দর। ক্রমে আমর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কোণ-তোলা ঝালর-দেয়া  খিড়কি-জানালা এবং বেলকনির আড়াল আড়াল, বহু-বছরের আর্দ্র আবহাওয়া যাকে দিয়েছে একই রকম এক ধূসর রঙ। মধ্যস্থালে একটি মীনর উঠেছে আকাশ ফুঁড়ে, সাদা এবং উর্ধ্বে তোলা একটি আঙুরের মতোই, ঋজু, সরল।

আবার ধ্বনি উঠলো লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক-আত্মসমর্পণ এবং উদ্দীপনার এক হর্ষোৎফুল্ল ধ্বনি, যা জাহাজের সাদা পোশাক পরা ‍উত্তেজিত হজ্ব-যাত্রীদের মদ্যে থেকে উঠে পানির উপর দিয়ে ধাবিত হয় তাদের পরম আশা ও স্বপ্নের দেশের দিকে!

ওদের আশা এবং আমরাওঃ কারণ আমার কাছে আরব উপকূলের এই দৃশ্য আমার বহু বছরের অনুসন্ধানের চূড়ান্ত পরিণতি। আমি আমার স্ত্রী এলসার দিকে তাকাই যে ছিলো আমার এ হজ্ব যাত্রায় আমার সহযাত্রী এবং তার চোখ্রে পাঠ করি একই অনুভূতি.. .

আর তারপর, আমরা দেখতে পাই এক ঝাঁক শুভ্র ডান তীরে বেগে আমাদের দিকে চুটে আসছে মূল স্থলভাগ থেকেঃ আরবের উপকূলীয় কিশতী লাতিন পালি উচিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে আসছে নৌকাগুলি, মোলায়েম ছন্দে নিঃশব্দে, যেনো দুই অদৃশ্য প্রবাল প্রচীরের মধ্যকার ফাঁক দিয়ে ঘুরে এঁকে বেঁকে, আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য তৈরি আরবের পাঠানো প্রথম দূতেরা। নৌকাগুলি ধীরে ধীরে ক্রমেই কাছে ঘেঁষে আসে এবং শেষ পর্যন্ত সব কটিই ভিড় করে এক সংগে, জাহাজের পাশে মাস্তুল হেলিয়ে দুলিয়ে আর ওদের পালগুলি গুটানো হাতে লাগলো একটি পর একিট করে , অতিশয় ব্যস্ততার সংগে সুইশ সুইশ শব্দ করে আর পালে পৎ পৎ আওয়াজ তুরে-যেনো এক ঝাঁক বিশাল সারস পাখি নেমে পড়েছে খাবারের সন্ধানে। এবং মুহুর্তকাল আগের নীরবতা থেকে ওদের মধ্যে জাগরো এক কর্কশ আওয়াজ আর চিৎকারঃ এ হচ্ছে নৌকার মাঝিদের চিৎকার যারা এখন লাফিয়ে এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় উঠতে শুরু করছে এবং হামলা চলিয়েছে জাহাজের সিড়ির ‍উপর হজ্বযাত্রীদের গাট্টি বোচক, বাক্স-পেটেরা ধরবার জন্য। আর পবিত্র ভূমির দৃশ্যে হজ্বযাত্রীরা উত্তেজনায় এতোই অভিভূত যে, ওরা নিজেদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে ওদের উপর যা ঘটেছে তাই ওরা মেনে নিচ্ছে!

নৌকাগুলি ভারী এবং প্রশস্ত, ওদের খোলের পারিপাট্যবিহীন এবড়ো-থেবড়ো গড়ন, ওদের ‍উটু মাস্তুল আর পালের সৌন্দর্য ও ছিমছাম রূপের সাথে বিস্ময়করভাবে বেমানান। নিশ্চয় এ ধরনের একটি নৌকায় চড়েই, হয়তো বা এ জাতেরই একটি আরো কিচু বড়ো এক নৌযানে চড়ে সেই দুঃসাহসী সমুদ্রজয়ী সিন্দাবাদ বের হয়ে পড়েছিলো, যে-এডভেঞ্চারের জন্য কেউ তাকে অনুরোধ করেনি এমনি সব এডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে এবং নেমে পড়েছিলো এক দ্বীপে যা ছিলো আসলে.. . ওহো কী ভয়ংকর এক তিমি মাছের পিঠ.. . আর এ ধরনের জাহাজে করেই সিন্দাবাদের অনেক অনেক ফিনিশীয়রা এই লোহিত সাগরের মধ্যে দিয়ে পাল তুলে রওানা দিতো দক্ষিণদিকে আর আরব সাগর পাড়ি দিয়ে চলতো তাদের সফর..  গরম মসলা, আগর, ধূপধুনা এবং ওফিরের রত্নভাণ্ডারের সন্ধানে.. .।

আর এখন আমরা, সেই সব দুঃসাহসী বীর সমুদ্র-যাত্রীদের ক্ষীণ বামন উত্তরাধিকারীরা, নৌকায় করে চলেছি প্রবাল সাগরের মধ্যে দিয়ে, পানির নীচে নিমজ্জিত প্রবাল প্রাচীর এড়িয়ে, প্রশস্ত বক্র রেখায়ঃ হজ্বযাত্রী সব , গায়ে সাদা কাপড়, কেস, বাক্স, ট্রাংক আর বাণ্ডিলের ফাঁকে ফাঁকে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি বোবা এক দংগল মানুষ.. . প্রত্যাশায় বুক আমাদের কাঁপছে, আমরা শিহরিত হচ্ছি!

প্রত্যাশঅয় ভরপুর ছিলাম আমিও। কিন্তু নৌকার গলুই-এ আমার হাতে আমার স্ত্রীর হাত নিয়ে যখন বসে আছি, কী করে আমার পক্ষে আগাম প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হতো যে, হজ্ব যাত্রার এ সজ সামান্য একটি প্রয়াস আমাদের জীবনকে বদলে দেবে এতো গভীরভাবে, অমন সম্পূর্ণভাবে? আবার, আমি ভাবতে বাধ্য হই সিন্দাবাদের কখা। সে যখন তার দেশের উপকূল ছেড়ে গিয়ে  পড়েছিলো সমুদ্দুরে, আমার মতোই তারও কোনে ধারণাই ছিলো না ভবিষ্যৎ কী বহন করে আনতে যাচ্চে তার জন্য; পরে যেসব বিচিত্র এ্যাডভেঞ্চার তার জীবনে ঘটেছিলো সে তা আগাম দেখেনি, দেখার ইচ্ছাও তার ছিলো না; সে চেয়েছিলো কেবল সওদাগরি করতে আর টাকা কামাই করতে। আমি হজ্ব করা ছাড়া আর কিছুই চাইনি; কিন্তু তার এবং আমার জীবনে যেসব ব্যাপার ঘটবার ছিলো, প্রকৃতই যখন সেগুলি ঘটে গেলো, তখন আর আমাদের দুজনের কারো পক্ষেই পুরানো চোখ দিয়ে তাকানে সম্ভব হলো না আমাদের পৃথিবীর দিকে।

একথা ঠিক, বসবার সে নাবিককে যে জীন, যাদুগ্রস্থ স্ত্রীলোক বা বিশাল রক পাখির মুকাবিলা করতে হয়েছিলো, তেমন উদ্ভদ কল্পনা প্রসূত কিছুই আমার জীবনে ঘটেনিঃ কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার সে প্রথম হজ্ব  আমর জীবনের গভীরে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলো, ঐ নাবিকেরা সকল সমুদ্র যাত্রা মিলেও ওর জীবনে সে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এলসার জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে সম্মুখে এবং তা কতো আসন্ন, আমাদের দুজনের কেউ তো তার কোনো পূর্ব আলামত পাইনি। তার আর আমার নিজের বেলায় আমি বুঝতে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমিই পশ্চিমা জগত ছেড়ে এসেছি মুসলমানদের মধ্যে থাকার জন্য; কিন্তু আমি জানতাম না যে, আমি আমার গোটা অতীতটাকেই পেছনে ফেলে যচ্ছি। কোনো রকম হুশিয়ারী না জানিয়েই আমার পুরানো পৃথিবী ফুরিয়ে আসছিলো আমার জন্যঃ পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণাও অনুভূতি, প্রয়াস –প্রচেষ্টা ও মানুসিক চিত্রকল্পের সেই পৃথিবী! আমার পেছনে একটি দরোজা বন্ধ হয়ে আসছিলো আস্তে আস্তে, এতো নীরবে, এতো চুপিচুপি যে, আমি এ বিষয়ে সচেতন পর্যন্ত ছিলাম নাঃ কিন্তু দিন সম্পূর্ণ বদলে যাবে আর তার সংগে সকল কামন-বাসনার লক্ষ্যও-এ ই ছিলো নিয়তি!

তখন পর্যন্ত, আমর প্রাচ্যের বহু দেখ দেখা হয়ে গেছে। ইউরোপের যে-কোনো দেখ থেকে ইরান এবং মিসরকে অনেক বেশি ভালো করে আমি জানি। বহুদিন হলো কাবুল আর অপরিচিত নয় আমার কাছে; দামেশক ও ইসফাহানের বাজারগুলি আমার জানা-শোনা। তাই আমি , ‘ততো তুচ্ছ আর মামুলি’ এসব এ কথা মনে করে পারিনি যখন আমি জিদ্দার একটি বাজারের মদ্যে দিয়ে হাঁটঠি এই প্রথমবার, আর প্রত্যক্ষ করছি প্রাচ্যের অন্যত্র যা অনেক বেশি পূর্ণরূপে দেখতে পাওয়া যায়, তারই একটি জগাখিচুড়ি এবং নিরবয়ব পুনরাবৃত্তি!

 বাজারটি  ঢেকে দেওয়া হয়েছে কাঠের তক্তা এবং ছালার চট দিয়ে, প্রচণ্ড রোদকে আড়াল করার জন্য; তারি ছেদা এবং ফাটা দিয়ে বশে আনা সূর্যরশ্মি আলো দিচ্ছে আর ছায়ান্ধকারকে মণ্ডিত করছে একটা সোনালী আভায়। এখানে ওখানে খোলা জায়গায় রয়েছে রান্না করার চুলা, যার সামনে নিগ্রো বালকেরা গোশতের ছোটো ছোটো টুকরা সেঁকছে গনগনে কয়লার উপরে, শিকে বিদ্ধ করে। আর রয়েছে কফির দোকান, বার্নিশ করা পিতলের বাসন এবং পামপাতার তৈরি আসন সমেতঃ চোখে পড়ছে ইউরোপীয় এবং প্রাচ্য রবিশে ভর্তি দোকানপাঠ! সর্বত্রই গুমোট, অসহ্য গরম, মাছের গন্ধ আর প্রবাল চূর্ণ। সব জায়গায় মানুষের ভিড়, সাদা পোশাক পরা অসংখ্য হজ্বযাত্রী আর জিদ্দার বার্ণঢ্য সংসারধর্মী নাগরিকেরা, যাদের চেহারায় পোশাকে এবং চাল-চলনে মিলন ঘটেছে মুসলিম জাহানের সকল দেশেরঃ হয়তো পিতা একজন হিন্দুস্থানী যখন তার নাম- তিনি নিজে হয়তো মালয় ও আরবোর মিশ্রণ-বিয়ে করেছেন এক নারীকে যিনি তাঁর পিতার দিক থেকে উজবেকের বংশধর আর মায়ের দিক থেকে সম্ভবত সোমালী খান্দানেরঃ এ হচ্ছে জীবন্ত সাক্ষ্য বহু শতাব্দীর হজ্বযাত্রা ও ইসলামী পরিবেশের, যাতে রঙের ভেদ বা জাতে জাতে বৈষশ্যের কোনো অবকাশ নেই। স্থানীয় এবং হজ্বযাত্রীদের দ্বারা আনীত রক্তের মিশ্রণ ছাড়াও সে সময়ে (১৯২৭) হিজাযে জিদ্দায় ছিলো একমাত্র স্থন, যেখানে অমুসলমানদের বাস করতে দেওয়া হতো। মাঝে মাঝে দেখা যায় ইউরোপীয় ভাষায় লেখা দোকানের সাইনবোর্ড, আর সাদা ট্রাপিক্যাল পোশাক, রোদ-ঠেকানো হেলমেট বা হ্যাট মাথায় লোকজন, কনস্যুলেটরগুলি উপরে পত পত করছে বিদেশী পতাকা।

এ সবই যেনো এখনো স্থলভাগের সাথে ততোটুকু সম্পর্কিত নয়  যতোটুকু সমুদ্দুরের সাথেঃ বন্দরের শব্দ ও গন্ধের সংগে, ক্ষীণ-বংকিম প্রবলারেখা ছাড়িয়ে নোঙর ফেলা জাহাজের আর শামপা ত্রিকোণ পালওয়ালা জেলে নৌকার সংগে এমন একটা জগত যা ভূমধ্যসাগর থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। যদিও কিছূ আলাদা মনে হচ্ছে এরি মধ্যে, বাড়িগুলি, মৃদুমন্দ বাতাসের উন্মকউত, যার সম্মুখভাগ জমকালো সুগঠিত, কাজ-করা কাঠ দিয়ে তৈরি জানালার ফ্রেম আর বেলকনিগুলি অতি  পাতলা ও চিকন কাঠের শলার স্ক্রীন দিয়ে ঢাকা-যে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে খোলা জায়গার সবকিছু অবাধে দেখতে পারে ঘরের লোকেরা, অথচ পথচারী দেখতে পায় না ভেতরে কী রয়েছে। এ সব কাঠে র কাজ গোলাপী প্রবাল পাথরের দেয়ালের উর ধূসর সবুজ ফিতার মতো বসানো, নাজুক এবং অতি সামঞ্জস্যময়। এ আর ভূমধ্যসাগর নয় এবং সম্পূর্ণরূপে আরবও নয়; এ হচ্ছে লোহিত সাগরের উপকূলীয় জগত, যার উভয় তীরে দেখা যায় এ ধরনের স্থপত্য রীতি।

অবিশ্যি, এরি মধ্যে আরব তার নিজস্বতা ঘোষণা করলো ইস্পাতের মতো আকাশে, নগ্ন শিলা গঠিত পাহাড়ে এবং ‍পুবদিকে বালিয়াড়িগুলিতে এবং মহত্তের সেই নিশ্বাসে ও সেই নগ্ন বিরলতায়, যা হামেশঅই অমন বিস্ময়করভাবে পরস্পর জড়াজড়ি করে আছে আরবের ভূ-দৃশ্যে।

পরদিন বিকালে আমাদের কাফেলা তার যাত্রা শুরু করে মক্কার পথে, এঁকে বেঁকে-হজ্বযাত্রী বেদুঈন, হাওদা পিঠে অথবা হাওদা ছাড়া উট, সওয়ারী উট, জমকালো রঙিন-কাপড় দিয়ে পিঠে ঢেকে দেয়া গাধা, এ সবের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে শহরের পুব প্রবেশ পথের দিকে। প্রায়ই মোটর গাড়ি ছুটে যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়ে-সৌদি আরবে একেবারে প্রথমিদিকের মোটর গাড়ি-বোঝাই বোঝাই হজ্বযাত্রী নিয়ে-হর্ণ বাজাতে বাজাতে। মনে হলে, উটগুলি বুঝতে পারছে এই নতুন দানবগুলি ওদের দুশমন। কারণ যখনি কোনো মোটরগাড়ি ওদের কাছে আসে ওরা সংকুচিত হয়ে পড়ে, প্রাণপ ণে বাড়ির প্রাচীরের দিকে ছুটে যায়, ওদের লম্বা গলা এদিক-ওদিক নাড়তে নাড়তে-হতভম্ব, অসহায় প্রাণী। ভীতিপ্রদভাবে, এক নতুন সময়ের উন্মেষ হচ্ছে এই দীর্ঘদেহী ধৈর্যশীল জানোয়ারগুলির জন্য এবং ভয় আর চরম অবলুপ্তির আলামতো ওদের ভয়ার্ত করে তুলছে। কিছুক্ষণ পরেই আমরা নগরীর সাদা প্রাচীর পেছনে ফেলে যাই এবং হঠাৎ আমরা নিজেদের দেখতে পাই একটি মরুভুমিতে-একটি প্রশস্ত প্রান্তরে, ধূসর-বাদামী, নির্জন-এখানে ওখানে কাটাবন ও স্তেপ ঘাসের ঘাসের গুচ্ছ, আর সেই প্রান্তর ভেদ করে নীচু বিচ্ছিন্ন কতকগুলি পাহাড় উঠেছে সমুদ্দুরে দ্বীপপুঞ্জের মতো, যার পুবদিকে প্রাচীর হেন দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা উচু শিলা-গঠিত সব পাহাড়, নীল ধূসর, দেখতে এবড়ো-থেবড়ো, প্রানের চিহ্ণ-বর্জিত। সেই ভয়াবহা প্রান্তরের সর্বত্র আনাগোনা করছে কাফেলে, অনেকগুলি দীর্ঘ মিছিল করে-শত শত, হাজার হাজার উট, জানোয়ার পেছনে, একই সারিতে, হাওদা, হ্জ্বযাত্রী এবং গাট্টি-বোচকাতে বোঝাই-কখনো হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে আড়ালের আবার ফের আভাসে উঠছে চোখের সামনে। ক্রমশ সকল পথ গিয়ে মিলিত হয় একটিমাত্র ধূলি-ধূসর পথে, একই ধরনের কাফেলার দীর্ঘ শত শত বছরের পদচিহ্ণ দ্বারা তৈরি যে পথ।

মরুভূমির সেই নীরবাত, উটের পায়ের ঝপ ঝপ শব্দ, মাঝে মাঝে বেদুঈন উট চালকদের  ডাক-হাঁক এবং এখানে ওখানে, কোনো হ্জ্বযাত্রীর নিচু গলার গানে যে নীরতা ভাঙে না বরং আরো গাঢ় হয়ে ওঠে, আমি হঠাৎ তারই বিরাট এক লোহমর্ষক অনুভূতিতে অভিভূত হয়ে পড়ি-সে সর্বপ্লাবী সেই অনুভূতি আমাকে এতোই বিহ্বল করে দিলো যে বলা যেতে পারে এ যেনো এক দিব্যসৃষ্টিঃ আমি নিজেকে দেখতে পেলাম এক অদৃশ্য অতল গহ্বরের উপর ঝুলন্ত এক সেতুর উপরঃ যে সেতু এতোই দীর্ঘ যে, আমি যে প্রান্ত থেকে এসেছি এরি মধ্যে তা হারিয়ে গেছে সুদূর অস্পষ্ট দূরত্বে, অথচ তার অন্য প্রান্তের আভাসও আমার চোখে ভেসে ওঠেনি এখনো। আমি দাঁড়িয়ে আছি মাঝখানেঃ আর আমার হৃদপিণ্ড আতংকে কুঁকড়ে গেলো যখন আমি এভাবে নিজেকে দেখতে পেলাম একটি সেতুর দুই প্রান্তের মাঝখানে-ইতমিধ্যেই এক প্রান্ত থেকে অনেক-অনেক দূরে এবং এখনো অন্য প্রান্তের খুব কাছে নই-আর দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মনে হলো, আমাকে এভাবে সবসময়ই থাকতে হবে দুই প্রান্তের মাঝখানে, হামেশাই গর্জনশীল অতল গহ্বরের উপর.. .

-যখন আমার সামনের উঢের উপর এক মিসরীয় রমণী হঠাৎ তোলে হজ্বযাত্রীদের সেই সুপ্রাচীন  ধ্বনি ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’- আর ভেঙে খান খান হয়ে যায় আার স্বপ্ন!

সবদিক থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি মানুষেরা কোরসে ধ্বনি তুলছে ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’-অথবা একজন মিসরীয় ‘কিষাণ’ রমণী গান গাইছে রসূলুল্লাহর সম্মানে, যার পর অপর একজন রমণীর উণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে একটি ‘গাত্রাফা’, আরব রমণীদের  সেই হর্ষোৎফুল ধ্বনি, যা রমণীরা তুলে থাকে সকল উৎসবের সময়ে-যেমন বিয়ে-শাদি, শিশুর জন্ম, খৎনা আর সকল প্রকার ধর্মীয় মিছিলে িএবং হজ্বের মিছিলে তো বটেই। আগেকার দিনের বীরের দেশ আরবে, যখন সর্দারের কন্যারা সওয়ারীর পিঠে আরোহণ করে তাদের কবিলার পুরুষদের সাথে যুদ্ধে যেতো, ওদের অধিকতর বীরেচিত কার্যে অনুপ্রাণত ও উত্তেজিত করার জন্য (কারণ এই সব রমণীদের কোনো একজনকে নিহত হতে দেয়া এবং তারো চাইতে খারাপ, দুশমন কর্তৃক বন্দিনী হতে দেয়া চরম অসম্মানের কাজ বলে গণ্য হতো) তখন এই ‘গাত্রাফা’ প্রায়ই শোনা যেতো যুদ্ধের ময়দানে।

প্রায় সকল হজ্বযাত্রীই হাওদায় করে চলছে-একেকটি উটের পিঠে দুটি করে হাওদা, আর হাওদাগুলির দুলনি ধীরে ধীরে আরেহীকে করে তোলে মানসিক দিক দিয়ে ক্লান্ত, এলোমেলো আর স্লায়ুগুলিকে দেয়া নিদারুণ যন্ত্রণা, এমনি অবিশ্রান্ত সে আন্দোলন আর দুলনি। কিছুক্ষণের জন্য সমস্ত ক্ষমতা হারিয়ে ঝিমাতে থাকে আরোহী, হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে ওঠে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে, আবার জেগে ওঠে ঘুম থেকে। যে-সব উট চালক কাফেলার সংগে সংগেদ চলেছে পায়ে হেঁটে, কিছুক্ষণ পর পর ওরা ওদের উটগুলিকে হাঁক ছেড়ে ডাকে। ওদের কেউ কেউ  উটের দীর্ঘায়িত পদক্ষেপের ছন্দে মাঝে মাঝে গান ধরে।

সকালের দিকে আমরা বাহবা পৌছুই। ওখানে কাফেলা থামলো দিনের জন্য, কারণ গরম এতো বেশি যে, কেবল রাতের বেলয়ই সফর সম্ভব।

এ গ্রামটি-আসলে যা অগোছালো পর্ণকুটির, কফির দোকান, পামপাতার কয়েকটি কুঁড়ে ঘর এবং একটি ছোট্ট মসজিদ নিয়ে তৈরি দুটি সারি ছাড়া কিছুই নয়-জিদ্দা এবং মক্কার ঠিক মাঝখানে এমন একটি জায়গায় অবস্থিত, যেখানে কাফেলা এসে দিনের জন্য থাকে, বহুকাল ধরে। আমরা উপকূল পেছনে ফেলে আসার পর সারা পথে যে-দৃশ্য দেখতে দেখতে এসেছি এখানকার ভূ-দৃশ্যও তাইঃ এক মরুভূমি, এখানে ওখানে রয়েছে আলাদা আলাদা সব পাহাড়, আর পুবদিকে রয়েছে আরো উচু নীচু পর্বতমালা, যা উকূলের নিচু অঞ্চলটিকে পৃথক করে দিয়েছে মদ্যে আরবের মালভূমি থেকে। কিন্তু এখন আমাদের চারপাশের এ েোটা মরুভূমিকে মনে হচ্ছে সেনাবাহিনীর এক বিশাল ছাউনি, অসংখ্য তাঁবু, উট, হাওদা, গাট্টি-বোচকা, আর বহু ভাষার মিলন-আরবী, হিন্দুস্তানী, মালয়ী, ফারসী, সোমালী, তুর্কী, পশতু, আমহারা এবং আল্লাহই জানেন আরো কতো কতো ভাষা! আসলে এ হচ্ছে জাতিপুঞ্জের সত্যিকার জমায়েত, এক সমাবেশ। কিন্তু প্রত্যেকেই যেহেতু পরেছে সবাইকে একরূপ করে দেয় ‘ইহরাম’ সেজন্য কোন কোন লোক কোন বংশ বা কোন জাতির তা প্রায় নযরে পড়ছে না বললেই চলে এবং সকল জাতি মিলে দেখাচ্ছে যেনো একটিমাত্র জাতি!

সারারাত চলার পর হজ্বযাত্রীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ওদের মধ্যে খুব কম লোকই জানে-বিশ্রামের সময়টিকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। ওদের প্রায় সকলের কাছেই সফর খুব সম্ভব একটি অতি অস্বাভাবিক উদ্যম, আর ওদের অনেকের কাছেই এ হচ্ছে ওদের জীবনের প্রথম সফর- যা অমনি এক নতুন সফর, অমনি এক মহান লক্ষ্যের অভিমুখে। স্বভাব্তই চঞ্চল হবার কারণ রয়েছে ওদের ওদের ছোটাছুটি করতে হবে এদিক-ওদিক-কোনোকিছু করবার জন্য  ওদের হাতগুলিকে হাতড়াতে হবে, যদি তা ওদের থলে, বস্তা এবং গাট্টি-বোচকা  খোলা ও বাঁধার চাইতে বেশি কিছু না-ও হয়, তবুঃ অন্যথায় পৃথিবীর সাথে ওদের সম্পর্ক হয়ে পড়বে ছিন্ন, ওরা নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে বসবে অপার্থিব সুখে, যেমন হারিয়ে যায় মানুষ সমুদ্দুরে.. … … .

আমার মনে হলে, আমার তাঁবুর ঠিক পরের তাঁবুটিতে যে পরিবারটি রয়ে ওদের বেলায় তা-ই ঘটেছে; বোঝা যাচ্ছে ওরা বাংলাদেশের কোনো এক গ্রাম থেকে আগত হজ্বযাত্রী। ওরা ক্বচিৎ কথা বলছেঃ ওরা বসে আছে মাটিতে পায়ের উপর পা রেখে, ওদের অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ পুবে, মক্কার দিকে-মরুভূমির অভ্যন্তরে-মরুভূমির অভ্যন্তরে যা ঝিকমিক –করা উত্তাপে তেতে আছে। ওদের মুখে অমন একটি সুদূল প্রশান্তি রয়েছে যে, আমার মনে হলো, ওরা যেন ইতিমধ্যেই আল্লাহর ঘরের সম্মুখে অবস্থান করছে এবং প্রায় তাঁর উপস্থিতির মধ্যেই রয়েছে। লোকগুলির সৌন্দর্য দৃষ্টি আকর্ষন করে, হালকা পাতলা, কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো বাবাড়ি চুল, আর কুচকুচে তেলতেলে মসৃণ কালো দাড়ি।

ওদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে একটি কম্বলের উপরঃ তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছে দুটি তরুণী-ওদের লাল নীল রঙের প্রশস্ত সালোয়ার, রূপার কাজ করা জামা আর পিঠের উপর ঝুলে-পড়া গাঢ় কালো কেশদামের মধ্যে ওদের মনে হচ্ছে যেনো বহু রঙের ছোট্ট দুটি পাখি। ওদের মধ্যে যেটি বয়সে ছোট সে তার নাকের একটি ছেদায় পরছে একটি সোনার রিঙ।

বিকালে পীড়িত লোকিট মারা গেলো। প্রাচ্যের দেশগুরিতে মেয়েরা প্রায়ই যেরূপ মাতম করে, এ মেয়েগুলি তেমন কিছু করলো নাঃ কারণ এ লোকটি হজ্বের পথে মারা গেছে, পাক যমীনে, আর এজন্য সে ধন্য। লোকগুলি লাশটিকে গোসল করায় এবং মৃত লোকটি তার পোশাক হিসাবে যে কাপড় পরেছিলো তা-ই দিয়ে ওরা তার কাফন দেয়। তারপর ওদের মধ্যে একজন দাঁড়ায় তাঁবুর সম্মুখে, হাত দুটি পেয়ালার মতো করে  মুখের কাছে আনে এবং উচ্চৈঃস্বরে আযান দেয়ঃ আল্লাহু আকবর’, ‘আল্লাহু আকবর’,- ‘আল্লাহ মহান’, ‘আল্লাহ মহান’, ‘লা-ইলাহা –ইল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ’- আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর রসূল!.. … . মৃতের জন্য দোয়া! তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর দয়া করুন। সকল দিক থেকে ইহরাম বাঁধা লোকেরা ছুটতে  ছুটেতে এসে জমায়েত হয় এবং ‘ইমামে’র পিছে সারির পর সারি বেঁধে দাঁড়ায়, একটি বহৎ ফৌজের সিপাইদের মতো। জানাযায় সালাত শেষ হওয়ার পর ওরা একটি করব খোঁড়ে, একটি বৃদ্ধ লোক কুরআন থেকে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে আর তারপর, ওরা ধুলি নিক্ষেপ করে মৃত হজ্বযাত্রীর উপর, যে কাঁৎ হয়ে শুয়ে আছে, তার মুখ মক্কার দিকে করে.. .।

দ্বিতীয় দিনের সকালে সূর্যোদয়ের আগ ধূলি-প্রান্তর সংকীর্ণ হয়ে আসে, পাহাড়গুলি পরস্পরের আরো কাছ ঘেঁষে এসে মিলিত হয়; আমরা একটি গিরিখাদ পার হয়ে যায় এবং ভোরের ফিকে আলোতে মক্কার প্রথম ইমারতগুলি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে-তারপর সূর্য যখন  আসমানে উঠছে, আমরা প্রবেশ করি পবিত্র নগরীর রাস্তায়।

এখনকার ঘর-বাড়িগুলি জিদ্দার ঘরবাড়ির মতোই; একই ধরনের কাজ-করা পোচ-বিশিষ্ট জানালা আর ঢাকা বেলকনি; কিন্তু এগুলি তৈরি করতে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তা জিদ্দার হালকা রঙের প্রবাল পাথরের চেয়ে বেশি ভারী,  বেশি পুরু মনে হলো। এখনো খুব সকাল; কিন্তু এরি মধ্যে গাঢ় সর্বব্যাপী উত্তাপ ক্রমেই বেড়ে উঠতে শুরু করেছে। অনেকগুলি বাড়ির সামনেই পাতার রয়েছে বেঞ্চি যার উপর শ্রান্ত, ক্লান্ত লোকেরা ঘুমিয়ে আছে। যে-সব কাঁচা রাস্তা দিয়ে আমাদের হেলে –দুলে –চলা কাফেলা  নগরীর কেন্দ্রের দিকে আগয়ে চলেছে সেগুলি সংকীর্ণ হতে সংকীর্ণতরো হয়ে আসছে। হজ্ব উৎসবের আর মাত্র কদিন বাকী। এজন্য রাস্তায় ভিড় অতি প্রচণ্ড। অগণিত হ্জ্ব যাত্রীর গাদে সাদা ‘ইহরাম’ এবং অন্যরা অনেকে সাময়িকভাবে ইহরাম বদল করে পরেছে তাদের নিত্যদিনের কাপড়- মুসিলিম জাহানের সকল দোশের পোশাক; ভিস্তিরা নুয়ে পড়েছে ভারি মশকের ভারে অথবা  বাঁকের নীচে, যা থেকে বালতির মতো দুদিক থেকে ঝূলছে পানিভর্তি পেট্রোলের টিন, গাধা-চালক এবং সওয়ারী গর্দভেরা চলছে ওদের গলার ঘন্টি বাজাতে বাজাতে, পিঠ ওদের উজ্জ্বল রঙিন কাপড়ে ঢাকা; আর এই যে মহামিলন-যেনো একে পূর্ণতা দানের জন্য বিপরীত  দিক থেকে আসছে উটেরা, পিঠে শূন্য হাওদা চাপানো, আসছে ভিন্ন ভিন্ন স্বরে ডাক ছাড়তে ছাড়তে। সংকীর্ণ রাস্তাগুলিতে এমন হৈহুল্লা শোরগোল চলছে যে, আপনার মনে হতে পারে হজ্ব এমন কোনো জিনিস নয় যা বহু- বহু শতব্দী ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রত্যেক বছর, বরং এ যেনো হঠাৎ একটি চমক, একটি বিস্ময়, যার জন্য প্রস্তু ছিলো না মানুষ! শেষ পর্যন্ত আমাদরে কাফেলা আর কাফেলা রইলো না, হয়ে দাঁড়ালো এক বিশৃংখল জটলা-উট, হাওয়া গাট্টি-বোচকা, হজ্বযাত্রী, উট-চালক আর হট্টগোলের!

আমি থেকে হাসান আবিদ নাম এক মশহুর ‘মুতাব্বিফ’ বা মালুমের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। এখন এক বিশৃংখলার মদ্যে তাকে কিংবা তার ঘর খুঁজে বের করার সম্ভাবনা খুবই কম মনে হলো। কিন্তু হঠাৎ কোনো এক ব্যক্তি চীৎকার করে উঠলো, ‘হাসান আবিদ’,-হাসান আবিদের হজ্বযাত্রিগণ! আপনার কোথায়? এবং বোতলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা জিনের মতো এক তরুণ আচমকা দেখা দেয় আমাদের সামনে আর খুব নীচু করে মাথা ঝুঁকিয়ে তার পিছু পিছু চলার জন্য আমাদের অনুরোধ করে। হাসান আবিদই তাকে পাঠিয়েছে পথ দেখিয়ে ওর বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাবার জন্য। যে তরুণটি আগে আমাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এসেছিলো,  মুতাব্বিফে’র বাড়িতে পর্যাপ্ত নাশতার পর আমি তারিই সংগে পবিত্র মসজিদে যাই। মানুষ ভর্তি লোকজন গিজগিজ-করা রাস্তার ভেতর দিয়ে আমরা পায়ে হেঁটে চলি কসাইদের দোকান ছাড়িয়ে রেখেছে। আমরা আগিয়ে যাই ঝাঁক ঝাঁক মাছি, তরকারী, শাক-সব্জির গন্ধ, ধূলিবারিল ভেতর দিয়ে ঘামতে ঘামতে। তারপর আমরা অতিক্রম করি একটি সংর্কীর্ণ উপরদিকে ঢাকা বাজার, যেখানে কেবল বস্ত্র ব্যবসায়ীদেরই দোকন রযেছে, রঙের মহোৎসব। পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য স্থানের বাজারের মতোই এখানকার দোকানগুলি হচ্ছে কেবল কতকগুলি তাক, মাটি থেকে এক গজ উচু, যেখানে দোকানী বসেছে পায়ের উপর পা রেখে, সকল উপকরণ ও রঙের কাপড়ের থান স্তূপীকৃত তার চারপাশে, আর মাথার উপর ঝুলছে সারি সারি সকল রকম পোশাকের কাপড়, মুসলিম জাহানের সকল জাতির জন্য!

এবং এছাড়াও রযেছে সকল জাতের সকল পোশাকের সুরতের মানুষ কারো, মাথায় পাগড়ী, কারো মাথা খঅলি, কেউ কেউ নীরবে হাঁটছে মাথা নীচু করে, হয়তো বা হাতে একটি তসবিদানা নিয়ে। আর অন্যেরা ত্বরিৎ পদে দৌড়াচ্ছে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ; সোমালীদের নমনীয় বাদামী দেহ ওদের ঢিলেঢালা রোমক পোশাকের ভাঁজের ফাঁফে ফাঁকে চিকমিক করছে তামার মতো; আর আরবের মধ্যভাগের উচু অঞ্চলের লোকেরা, হালকা পাতলা শরীর, চিকন-চাকন মুখ, চাল –চলনে গর্বিত; বোরখার ভারি অংগ-প্রত্যংগ ও দৃঢ় মজবুত গড়নের উজবুকেরা, যারা মক্কায় এই গরমেও পরে আছে তুলাভরা কাপ্তান আর হাঁটু-উচা চামড়ার বুট; সারং –পরা জাভার মেয়েরা যাদের মুখ অনাবৃত এবং চোখের আকৃতি বাদামের মতো; মরক্কোর লোকেরা চলাফেরা করছে, ধীর পদক্ষেপে, সাদা, ‘বার্নাসে’ মর্যাদামণ্ডিত ওরা;  মক্কার লোকদের পরণে সাদা সূতী পোশাক আর তালু ঢাকা হাস্যকর রকমের ছোট্ট গোল টুপী মাথায়; মিসরীয় ‘ফেলাহীন’দের মুখে উত্তেজনা, কালো চোখওয়ালা সাদা পোশাক পরা ভারতীয়রা উকি মারছে তাদের বিপুল তুষারশুভ্র পাগড়ির নীচ থেকে, আর ভারতীয় রমণীরা, ওদের সাদা বোরখা’য় এমনি অভেদ্যভাবে আচ্ছাদিত যে, ওদের দেখাচ্ছে চলন্ত তাঁবুর মতো; তিমবুকতু অথবা দাহমীর বিরাটকায় নিগ্রোরা রয়েছে এখানে, গায়ে ওদের নীল ঢিলে ঢালা পোশাক আর মাথায় তালু ঢাকা লাল টুপি; আর ক্ষুদ্র পরিপাটি দেহের অধিকারী চীনা মহিলারা, বিচিত্র রঙিন প্রজাপতির মতো, লঘু পদে হাঁটছে মাপা পদক্ষেপে, যা দেখাচ্ছে হরিণীর পায়ের খুরের মতো। সকল দিকেই এক চীৎকার ও ভিড়ের শোরগোলজাত উত্তেজনা, যার ফলে আমার মনে হলো, আমি রয়েছি আছড়ে-পড়া ঢেউয়ের একেবারে মাঝখানে, যে ঢেউয়ের কেবল কিছু খুঁটিনাটিই আমি ধারণা করতে পারি, তার সংহত একটা চিত্র কখনো নয়। সবকিছু ভেসে চলেছে অগণিত ভাষায় গুঞ্জনের এবং উষ্ণ অংগভংগি ও উত্তেজনার মধ্যে। আর এভাবেই এক সময় নিজেদের আমরা দেখতে পেলাম-পবিত্র মসজিদ ‘হারামে’র একটি প্রবেশ পথের সম্মুখে।

এটি তিনটি খিলানের এক প্রবেশপথ, পাথর-বিছানো সিড়ি উঠে গেছে ধাপে ধাপে, প্রবেশ পথের মুখ পর্যন্ত; মুখে বসে আছে এক অর্ধ-উলংগ ভারতীয় ভিক্ষুক, তার জিরজিরে কংকালসার হাত ‍দুটি আমাদের দিকে বাড়িয়ে। আর তখুনি আমি প্রথম দেখতে পেলাম-পবিত্র গৃহের ভেতরের বর্গক্ষেত্রের মতো দেখতে স্থানটি, যা রয়েছে রাস্তার সমতল থেকে অনেক নীচে, প্রবেশপথের মুখ থেকে অনেক বেশি নিচুতে, আর এজন্য আমার চোখের সামনে তা উদ্ভাসিত হলো একটি গামলার মতোঃ এক বৃহৎ চতুর্ভুজ, যা বহু স্তম্ভের উপর স্থাপিত অর্ধবৃত্তাকার অনেকগুলি খিলান দ্বারা রেষ্টিত এবং তার মধ্যখানে রয়েছে বর্গাকৃতি সমান ছটি পার্শ্ববিশিষ্ট চল্লিশ ফুট উচু এক ইমারত, কালো চাদরে ঢাকা আর চাদরটিকে বেষ্ট করে রয়েছে একটি চওড়া ডোরা যার উপর কুরআনের আয়াতগুলি লেখা হয়েছে জরির হরফে; যা গিলাফের উপরের অংশকে পেঁচিয়ে বেষ্টন করেছে গিলাফটিকেঃ কা’বাঘর.. .।

তাহলে এ-হচ্ছে কা’বা, বহু বহু শতক ধরে কতো লাখো কোটি মানুষের আকাংখার লক্ষ্যস্থল! এই লক্ষ্যে পৌছুনোর জন্য যুগ যুগ ধরে অগণিত হজ্বযাত্রী কী বিপুল ত্যাগই না স্বীকার করেছে! অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে পথেই, অনেকেই এ লক্ষ্যে পৌছেছে বিপুল কষ্ট ও ক্ষতি স্বীকারের পর; তবু ওদে সকলের কাছেই এই ছোট্ট বর্গাকৃতি ইমারতটি ছিলো ওদের আকংখার শীর্ষবিন্দু আর এখানে পৌছুতে পারার অর্থই ছিলো সার্থকতা, পূর্ণতা। এখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রায় নিখুঁত কিউব (যা এর আরবী নামের ধাতুগত অর্থ-অর্থাৎ কা’বা) একটি কালো চাদরে সম্পূর্ণ ঢাকা, মসজিদের বিশাল চতুর্ভূজের ঠিক মাঝখানে একটি প্রশান্ত দ্বীপ যেনোঃ পৃথিবীর আর যে-কোনো স্থানের যে-কোনো স্থাপত্য –কর্মের চাইতেই অনেক বেশি শান্ত, স্লিগ্ধ। মনে অনেকটা এ কথাই উদয় হতে চায় যে, কাবাঘর যিনি প্রথম নির্মাণর করেছিলেন-কারণ ইবরাহীমের মূল ইমারতটি কয়েকবারই পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে একই আকারে-তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর সামনে মানুষের বিনয় ও ক্ষুদ্রতার একটি রূপক- কাহিনী তৈরি করতে। কা’বাগৃহের নির্মাতা জানতেন স্থাপত্য –কর্মের ছন্দের কোনো সৌন্দর্যই, রেখার পূর্ণতাই-তা যতো মহৎ এবং বলিষ্ঠই হোক, আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার প্রতি সুবিচার কখনো করতে পারে না, আর এজন্য তিনি নিজেকে সীমিত রেখেছিলেন কল্পনায় আনা যেতে পারে এমন একটি সরলতম তিন আয়তনের নকশার মধ্যে-বর্গাকৃতি সমান ছয় পার্শ্বের পাথরে তৈরি একটি ইমারত।

আমি পৃথিবীর বহু মুসলিম মসজিদ দেখেছি যেসব মসজিদের ভেতরে মহান শিল্পীদের হাত সৃষ্টি করেছে অনুপ্রাণিত শিল্প-নিদর্শন। আমি মসজিদ দেখেছি উত্তর আফ্রিকাতে, ঝলমলে ইবাদতগাহ, মর্মর পাথর আর সাদা অ্যালবাস্টারে তৈরি, আমি দেখেছি জেরুযালেমে মসজিদুল আকসা, যা প্রচণ্ডভাবে নিখুঁত এক গম্বুজ, এক নাজুক কাঠামের উপর স্থাপিত, কোনো রকম দ্বন্ধ্না বাধিয়ে হালকা এবং ভারির একত্র মিলানোর স্বপ্ন; আর ইস্তাম্বুলে আজিমুশশান প্রাসাদগুলি-যেমন সুলায়মানিয়া, ইয়েনী-ওয়ালিদে, রায়াজিদ মসজিদ আর এশিয়া মাইনরে ব্রুসার মসজিদ এবং ইরানের সাফাবিদ আমলের মসজিদসমূহ-পাথর, বহু রঙের ম্যাজোলিক টালী, মোজাইক, রূপার এম্বোজ করা দরোজার উপর বৃহৎ স্টেলাসিটে খিলান, শ্বেত পাথর এবং ফিরোজা নীল গ্যালারীসহ চিকন মীনার, মর্মর ঢাকা চতুর্ভুজ, যার মধ্যে রয়েছে ফোয়ারা, বয়োবৃদ্ধ কদলী বৃক্ষ-এ সকলের এক রাজকীয় সামঞ্জস্যপুর্ণ সমাবেশ; আর সমরখন্দে তাইমুর লঙের মসজিদগুলি মহৎ ধ্বংসাবশেষ –ওসবের অবক্ষয়ের মধ্যেও চমৎকার!

এ সমস্তই দেখেছি আমি-কিন্তু এই মূহুর্তে আমি কা’বার সম্মুখে যতো প্রচণ্ডভাবে অনুভব করছি-নির্মাতার হাত এসে পৌছেছে নিবিড়ভাবে, একেবারে তাঁর ধর্মীয় চেতনার এতো কাছে-তেমনটি জীবনে আর কখনো অনুভব করিনি। একটি কিউবের চরম সরলতায় রেখা-কর্মের সকল সৌন্দর্য সম্পূর্ণভাবে বিসর্জনের মদ্যে উচ্চারিত হয়েছে এই ভাবঃ মানুষ নিজ হাতে যে সৌন্দর্যই সৃষ্টি করতে সক্ষম হোক না কেন, তাকে আল্লাহর জন্য উপযুক্ত মনে করা হবে একেবারেই অর্থহীন আত্মশ্লাঘা; এক কারণে, আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করার জন্য সরলতম  যে ধারণা মানুষের পক্ষে সম্ভব তাই মহত্তম। মিসরের পিরামিডগুলির গাণিতিক সরলতার  যে ধারণা মানুষের পক্ষে  মূলে ও ক্রিয়া করে থাকবে একই ধরনের অনুভূতি, যদিও সেখানে কিছুটা মানুষের আত্মশ্লাঘা ও তার এক অভিব্যক্তি খুঁজে পেয়েছিলাম, তার ইমারতগুলিকে যে বিপুর আকারে সে নির্মাণ করেছিলো, তার মধ্যে। কিন্তু এখানে কা’বায় এর আকার পর্যন্ত ঘোষণা করছে মানুষের আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পনের। এই ছোট্ট ইমারতটির দৃপ্ত বিনয়ের কোনো তুলনা সেই পৃথিবীতে।

কা’বায় প্রবেশের পথ মাত্র একটিই রয়েছে, রৌপ্যমণ্ডিত একটি দরোজা উত্তর-পুবদিকে, জমি থেকে প্রায় সাত ফুট উচুতে। যার ফলে, একানে পৌছুনো যায় কেবল অমন একটি কাঠের সিঁড়ির সাহায্যে যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়, যা ঐ দরোজার সামনে স্থাপন করা হয় বছরের অল্প কটি দিনের জন্য ভেতরটি, যা সাধারণত বন্ধই থাকে (আমি পরবর্তীকালে কয়েকবার তা দেখেছি) খুবই সাদাসিধা: মেঝেটি মর্মর পাথরে তৈরি, অল্প কটি গালিচা বিছানো থাকে মেঝেয় এবং ব্রোঞ্জ আর রূপার বাতি ঝুলে একটি ছাদ থেকে, যাকে ধরে রেখেছে ভারি কাঠের কতকগুলি কড়িকাঠ। বস্তুত কা’বার ভের ভাগের খাস কোনো নিজস্ব মর্তবা নেই, কারণ কা’বার পবিত্রতা গোটা ইমারাতটি সংগে জড়িত-যা হচ্ছে ‘কিবলা’ অর্থাৎ সালাতের দিক, সমগ্র মুসলিম জাহানের জন্য। আল্লাহর একত্বের এই প্রতীকের দিকেই মুখক ফেরায় দুনিয়অর কোটি মুসলমান, দিনে পাঁচবার করে।

ইমারতটির পুব কোণে প্রোথিক এবং অনাবৃত অবস্থায় রাকা হয়েছে একটি ঘোর কালো পাথর, যাকে ঘিরে রয়েছে একটি চওড়া রূপার ফ্রেম। এই কালো পাথরটি, যা পুরুষের পর পুরুষ ধরে হজ্ব-যাত্রীদের চুমোয় চুমোয়, গর্ত হয়ে গেছে, অমুসলিমদের কাছে অনেক ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে আছে। ওদের বিশ্বাস, এ হচ্ছে একটি ভৌতিক প্রতীক যা মুহাম্মদ স্বীকার করে নিয়েছেন মক্কার কাফিরদের প্রতি একটি কনসেশন হিসাবে। আসল সত্য থেকে এর চেয়ে দূরের আর কিছুই হতে পারে না। ঠিক যেমন কা’বা একটি তাজিমের বিষয়, পূজার বিষয় নয়, তেমনি হচ্ছে এ কালো পাথরটিও। এটিকে সম্মান করা হয় হযরত ইব্রাহিম যে প্রথম ইমারতটি তৈরি করেছিলেন তারই একমাত্র অবশিষ্ট পাথর হিসাবে, আর যেহেতু বিদায় হজ্বের সময় রসূলুল্লাহর ওষ্ঠদ্বয় এ পাথরকে স্পর্শ করেছিলো কেবল সে কারণেই তখন থেকে একইভাবে সকল হজ্বযাত্রী একে চুমু খেয়ে এসেছেন। মহানবী ভালো করেই জানতেন যে, পরবর্তীকালের মুমিনেরা সবসময় অনুসরণ করতে তাঁর দৃষ্টান্ত। যখন তিনি এ পাথরটিকে চুমু খাচ্ছিলেন, তিনি জানতেন, অনাগতকালের সকল হজ্বযাত্রীর ঠোঁট এখানে এসে চিরকালই সাক্ষাৎ পারে তাঁর ওষ্ঠাধরের স্মৃতি! তাঁর পবিত্র ওষ্ঠাধরের স্মৃতরি –একটা প্রতীকী আলিংগনের আকারে যা তিনি রেখে গেছেন  তাঁর সমস্ত উম্মতের জন্য কালোত্তীর্ণ এবং মৃত্যুঞ্জয়ী আলংগন-যখনি তার কৃষ্ণ পাথরটির উপর স্পর্শ করবে তাঁর পবিত্র ঠোঁট দুটি। আর হজ্বযাত্রীরা –যখন ওরা কালো পাথরটিকে চুমু খায়, তখন অনুভব করে ওরা রসূলুল্লাহকে আলিংগন করছে এবং আলিংগন করছে অন্য সকল মুসলমানকে যারা এখানে এসেছে তাদের আগে এবং যারা আসবে তাদের পরে!

কোনো মুসলিমই এ কথা অস্বীকার করবে না যে, রসূলুল্লাহর বহু বহু আগেও অস্তিত্ব ছিলো কা’বার। আসলে এর গুরুত্ব খাস করে এই বাস্তব সত্যের মধ্যই নিহিত। রসূলুল্লাহ দাবী করেনিনি যে, তিনি একটি নতুন ধর্মের স্থপয়িতা। পক্ষান্তরে কুরআনেরর কুরআনের দাবী অনুসারে আল্লাহর কাছে ‘আত্মসমর্পণ; অর্থাৎ ‘ইসলাম’, মানব চেতনার উন্মেষেল শুরু থেকেই মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হিসাবে রয়েছে। হযরত ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং আল্লাহর আর সকল নবী এ-ই শিখিয়েছেন; এর  মধ্যে কুরআন হচ্ছে ঐশী প্রত্যাদেশের সর্বশেষ। মুসলমানেরা এ কথাও অস্বীকার করেন না যে, এ পবিত্র গৃহটি ভরা ছিলো মূর্তি এবং ভৌতিক প্রতীকে, মুহাম্মদ সেগুলি ভেঙে ফেলার আগে, ঠিক যেমন মূসা সিনাইতে সোনার বাছুর ভেঙে চুরমার করেছিলেনঃ কারণ কা’বাঘরের এ মূর্তিগুলি স্থাপন করার অনেক অনেক আগেও প্রকৃত আল্রাহর ইবাদত হতো এখানে, আর তাই মুহাম্মদ যা করলেন, তা ইবরাহীমের মসজিদকে তাঁর  মূল উদ্দেশ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠার বেশি কিছু ছিলো না।

.. .                                      .. .            .. .                 .. .

এবং এইখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি হযরত ইবরাহীমের ইবাদত গৃহের সামনে আর কোনো চিন্তা ছাড়াই তাকাই ( কারণ চিন্তা এবং ধ্যান এসেছিলো অনেক পরে) সেই বিস্ময়কর ইমারতের দিকে এবং আমার ভেতরের কোনো কোনো লুক্কায়িত প্রসন্ন বীজ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক গর্বিত উল্লাস, একটা গানের মতো।

মসৃণ মর্মরখণ্ড, যার উপর নৃত্য করছে সূর্যরশ্মির প্রতিবিম্ব, তাই দিয়ে, কা’বার চারিদিকে একটি প্রশস্ত বৃত্তের আকারে ঢেকে দেওয়অ হয়েছে মাটি এবং মর্মরখণ্ডগুলির উপরে বহু মানুষ. নারী এবং পুরুষ পদচারণা করছে, কালো চাদরে ঢাকা আল্লাহর ঘর, ঘুরে ঘুরে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ কাঁদছে, কেউ কেউ আল্লাহকে চীৎকার করে ডাকছে মুনাজাতে, আর বুহ জনেরই মুখে কথা নেই, চোখে পানি নেই, কেবল ওরা হেঁটে চলেছে মাথা নিচু করে.. .।

কা’বাঘরের চারদিকে সাতবার পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করা হজ্বে’র অংশঃ ইসলামের এই কেন্দ্রীয় পবিত্র স্থানটির প্রতি কেবল সম্মান দেখানোর জন্যই নয়, বরং ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার বুনিয়াদী দাবিটি কী, প্রত্যেককে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই এর লক্ষ্য। কা’বা হচ্ছে আল্লাহর একত্বের প্রতীক, আর কা’বাকে ঘিরে শরীরী প্রদক্ষিণ মানবিক ক্রিয়াকলাপের প্রতীকস্বরূপ এক অভিব্যক্তি, যার অর্থ এই যে, যা ‘অন্তজীবন’ পদটিতে নিহিত আমাদরে চিন্তা এবং অনুভূতিই কেবল নয়, বরং আল্লাহকে আমদের সক্রিয় বহিজীবন, আমাদের ক্রিয়াকলাপ এবং বাস্তব উদ্যেগ –প্রয়াসেরও কেন্দ্র করতে হবে অবশ্যই।

আর আমিও ধীরে ধীরে হয়ে পড়ি, মাঝে  মাঝে আমি আমার নিকটে একটি পুরুষ বা স্ত্রীলোক সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি; আমার চোখের সামনে আলগা আলগা দ্রুত চলমান বহু চিত্র ভেসে ওঠে এবং মিলিয়ে যায়। সাদা ‘ইহরাম’ পরা এক বিশালদেহী নিগ্রোকে দেখতে পেলাম তার মজবুত কালো কব্জিতে চেনের মত জড়িয়ে রাখা হয়েছে একটি কাঠে র তসবীহ। এক যয়ীফ মালয়ী পা টিপে টিপে কিছুক্ষণ হাঁটলো আমার পাশাপাশি, তার বাহু দুটি যেন অসহায়, দিশাহারা অবস্থায় ঝুলে আছে তার বাটিক সারং ঘেঁষে। ঘন উদ্ধত ভরুর নীচে ধূসর চোখ কার চোখ এগুলি? এবং এই মুহূর্তে তা হারিয়ে গেলো ভিড়ের মদ্যে। এই কালো পাথরের সামনে বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে এক ভারতীয় তরুণীঃ বোঝাই হচ্ছে, সে অসুস্থ; ওর সংকীর্ণ নাজুক মুখের উপর ফুটে আছে বিস্ময়কর রকমে প্রকাশ্য এক আরজু, যা দর্শকদের কাছ দৃষ্টি-গ্রাহ্য, স্বচ্ছ পরিষ্কার পুকুরের তলদেশে মাছ এবং শৈবালের পরানের মতো। সে তার ফ্যাকাশে হাত দুটির তালু উল্টিয়ে উচিয়ে রেখেছে কা’বার দিকে আর তার আঙুলগুলি কাঁপছে যেন এক নির্বাক প্রার্থনার সংগে তাল রেখে.. .।

আমি হেঁটে চলেছি; মিনিটের পর মিনিট কেটে যাচ্ছে এবং আমার হৃদয়ে ক্ষুদ্র এবং তিক্ত যা কিছু ছিলো সবই আমার হৃদয়কে ত্যাগ করতে শুরু করে। আমি হয়ে উঠি বৃত্তাকার স্রোতের অংশ-ওহো, আমরা যা করে চলেছি, এ-ই কি তা হলে তার অর্থঃ সচেতন হওয়া, উপলব্ধি করা যে, আমরা প্রত্যেকেই হচ্ছি একটা কক্ষপথে একটা গতির, এটা আন্দোলনের অংশ। এ-ই কি সম্ভবত সকল বেদিশা সকল বিভ্রান্তির শেষ? এবং মুহুর্তগুলি মিলিয়ে গেলো, সময় দাঁড়ালো চুপ করে  স্থির হয়ে-আর এই হচেছ কেন্দ্র, বিশ্বজগতের!

নয় দিন পর এলসা মারা গেলো।

ও মারা যায় হঠাৎ এক হপ্তার কম অসুখে ভুগে। প্রথম মনে হয়েছিলো গরম এবং অনব্যস্ত খাবারের কারণে সামান্য অসুস্থতার বেশি কিছু নয়। পরে দেখা গেলো, এ হচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলের এক অজ্ঞাত ব্যঅধি যার মুকাবিলায় একেবারেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে মক্কার হাসপাতালের সিরীয় ডাক্তারেরা। আমাকে ঘিরে নামলো অন্ধ তমসা আর চরম নৈরাশ্য।

ওকে কবর দেওয়া হলো মক্কার ধুলিময় গোরস্তানে। ওর কবরের উপর স্থাপন করা হলো একটি পাথর। এই শিলাখন্ডে কোনো লিপি খোদাই করতে আমার মন মানলো না; কারণ আমার মনে হলো, শিলালিপির চিন্তা করা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করারিই শামিল আর এই মুহুর্তে আমি আমার ভবিষ্যৎ আর ধারণাও করতে পারিছি না।

এলসার কচি ছেলে আহমদ এক বছরেরও বেশি হয়ে গেলো আমার সাথে, আরবের অভ্যন্তরে। সে ছিলো আমার সংগী-এক সাহসী, দশক বছর বয়সের সহচর। কিন্তু কিছুদিন পর তাকেও আমার বিদায় জানাতে হলো। কারণ তার মা-এর পরিবার শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজী করাতে সক্ষম হলো-আহমদকে অবশ্যি ইস্কুলে পাঠাতে হবে ইউরোপে। এরপর এলসার আর কিছুই রইলো না তার  স্মৃতি এবং মক্কার গোরস্তানে একটি শিলাও এক ঘোর অন্ধকার ছাড়া, যা অপসৃত হয়েছিলো অনেক পরে, আরবের চিরন্তন আলিংগনে আমার নিজেকে সঁপে দেবার পর। রাত অনেক গড়িয়ে গেছে, কিন্তু আমরা এখনো বসে আছি নিষ্প্রভ ক্যাম্পফায়ারের চারপাশে। আবু সাঈদ, ততোক্ষণে তার কামনার প্রচণ্ড ঝড় কাটিয়ে উঠেছে; তার চোখ দুটি এখন করুণ, কিছুটা ক্লান্ত। নূরা সম্পর্কে সে আমাদের সাথে এভাবে কথা বলতে লাগলো, মানুষ যেভাবে কথা বলে থাকে তার কোনো প্রিয়জন সম্বন্ধে, যে মারা গেছে অনেক আগে।

-‘আপনি তো জানেন ও সুন্দরী ছিলো না, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসতাম’।

আমাদের মাথার উপর পূর্ণ চাঁদ-একটা জীবন্ত প্রাণীর মতো তার পূর্ণতা। বিস্ময়কর বিষয় নয় যে, ইসলাম-পূর্ব যুগের আরবেরা চাঁদকে মনে করতো আল্লাহর এক কন্যা’ বলে? –দীর্ঘকেশী দেবী ‘আল-লাত’, যে তার রহস্যময় প্রজননের জন্ম দিতো। তার সম্মানে প্রাচীন মক্কার এবং তায়েফের যুবক-যুবতীরা পূর্ণিমার রাতগুলি উদযাপন করতো খোলা আসমানের নীচে, উচ্ছৃংখল  মাতলামিতে, প্রেম-লীলা আর কাব্য প্রতিযোগিতায়। মাটির কলস আর চামড়ার বোতল থেকে প্রবাহিত হতো রক্তলাল সূরা, আর যেহেতু তা ছিলো অতিশয় লাল, অতিশয় উত্তেজক সেজন্য কবিরা মদনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত উন্মার্গ কবিতায় এর উপমা দিতো রমণীর খুনের সঙে। এই গর্বিত আবেগান্ধ তরুণেরা তাদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস ঢেলে দিতো আল-লাতের কোলে, ‘যার লাবণ্য চাঁদের কিরনের মতো, যখন চাঁদ পূর্ণ হয় ষোলকলায়, আর যার মহত্ত হচ্ছে এক ঝাঁক কালো সারস পাখির আকাশে ডানা মেলে ওড়ার মতো’- প্রাচীন কালের তারুণীময়ী শক্তিমতী এই দেবী, যে তার ডান বিস্তার করেছিলো দক্ষিণ আরব থেকে উত্তরদিকে এবং সুদূর হেল্লাস পর্যন্ত পৌছেছিল মতো লেটোর আকৃতিতে।

আল-লাতের এই পরিব্যাপ্ত ধোঁয়াটে প্রকৃতিপূজা এবং তার সাথে আরো এক দংগল দেবদেবীর পূজা থেকে, আল-কুরআনের এক আল্লাহর সমুচ্চ ধারণায় পৌছুনো ছিলো আরদের জন্য এক দীর্ঘ দরাজ পথের সফর। সে যা-ই হোক, মানুষ সবসময় তার আত্মার পথে দূর যাত্রা করতে ভালোবেসেছে-এখানে এই আরবেও, বিশ্বের অন্যান্য দেমের চাইতে তা মোটেও কম নয়ঃ দীর্ঘ সফরকে সে অতো গভীরভাবে ভালোবেসেছে যে, তার গোটা ইতিহাসকেই বর্ণনা করা যেতে পারে তার ধর্ম অনুসন্ধানের ইতিহাস বলে।

আরবদের কাছে এ অনুসন্ধান সবসময়ই পরমের অনুসন্ধান। এমনকি, ওদের একবারে আদকালেও যখন ওদে চারপাশের পৃথিবীকে অগণিত দেবতা ও দেও-দানব দিয়ে একবারে পূর্ণ করে ফেলেছিলো, তখনো ওরা সবসময় সচেতন ছিলো সেই পরম এক সম্পর্কে, যিুন তাঁর পরম সত্য তও মাহাত্ম্যে অবস্থান করেন সকল দেবদেবীর উপরে, এক অদৃশ্য, আবোধগর্ম, সর্বময় শক্তি, মানুষের কল্পনা-সাধ্য সবকিছুর বহু উর্ধ্বে, সকল কার্যের উপর শাশ্বত হেতু। ওদের কাছে দেবী ‘আল-লাত’ এবং তা ঐশী ভগ্নিদ্বয়, ‘মানত’ ও ‘উজ্জা’ আল্লাহর কন্য ‘র বেশি কিছু লাগ না, যারা অজ্ঞেয় এক এবং দুশ্যমান জগতের মধ্যে স্থাপন করে যোগসূত্র। মানুষের শৈমবকে যে-সব ধারণাতীত শক্তি ঘিরে ছিলো তারি প্রতীকঃ কিন্তু আরবীয় চিন্তার পশ্চাতভূমির গভীরে সবসময়েই বিদ্যমান ছিলো ‘এক’ –এর জ্ঞান, প্রতি মুহূর্তে সচেতন সজ্ঞান বিশ্বাসে জ্বলে উঠতে উন্মুখ। এর অন্যথা কি করেই বা হতে পারতো? ওরা এমন এক জাতি যা এক কঠোর আকাশ ও যমীনের মাঝখানে নীরবতা ও নির্জনতায় বিকাশ লাভ করেছে। এই কঠোর সাদাসিধা অন্তহীন স্থানের মধ্যে ওদের জীবন ছিলো সত্যি কষ্টকর। তাই, ওদের পক্ষে এমন একটি শক্তির আকাংখা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব ছিলো না, যা সকল সত্তা ও সৃষ্টিকে বেষ্টন  করে থাকবে অভ্রান্ত সুবিচার ও করুণায়, কঠোরতা ও প্রজ্ঞায়ঃ আল্লাহ.. . মহান আল্লাহ । তিনি অবস্থান করেন অননত্কালব্যাপী এবং দীপ্তি ছড়িয়ে আলোকি করেন অনন্তকে; কিন্তু তুমি যেহেতু তাঁর কর্মের গণ্ডির মধ্যেই রয়েছে সে কারণে তিনি তোমার নিকটতরো-‘তোমার গর্দানের ধমনী থেকেও..  ‘

…                            …                                                          …                                   …

ক্যাম্পাফায়ার নিভে গেছে। যায়েদ এবং আবু সাইয়িদ ঘুমাচ্ছে আর কাছেই আমাদের তিনিটি উষ্ট্রী শুয়ে আছে চাঁদের আলোয় শুভ্র বালুর উপর, আর জাবর কাটছে মৃদু কড়মড় শবদ করে, মাঝে মাঝে থেমে থেমে। চমৎকার প্রাণী.. . কখনে কখনো ওদের একটি অবস্থান বদলায় এবং তার শৃংগবৎ কুবের সমতল দিকে যমীনের উপর ঘষে, আর মাঝে মাঝে নাকের ভেতর দিয়ে শব্দ করে, যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। চমৎকার, সুস্পষ্টভাবে চিহ্ণিত। হ্যাঁ, মানুষ যত জন্তুকে ব্যবহার করে, সে সবের মধ্যে এই সকল ভূ-দৃশ্য থেকে স্বতন্ত্র, ভিন্নঃ সুনির্দিষ্ট কোনো অভিব্যক্তিহীন এই জীবগুলি দোল খায় বৈপরীত্যে মধ্যে, বিষণ্ণ এবং তা সত্ত্বেও অপরিসীম নম্র, বিনীত।

আমার ‍ঘুম আসছে না, আর এজন্য আমি তাঁবু থেকে হাঁটতে হাঁটতে আগিয়ে যাই এবং নিকটবর্তী একটি টিলায় গিয়ে উঠি। পশ্চিম দিগন্তের উপর একেবারে নীচুতে আকোশে ঝুলে আছে চাঁদ এবং আলোকিত করছে নীচু শিলাগঠিত পাহাড়গুলিকে, যা জেগে উঠছে ভূতর মতো, মৃত প্রান্তরের মধ্য থেকে। এখান থেকে শুরু করে হেজাজের উপকূলীয় নিম্মঞ্চলগুলি বেয়ে চলেছে পশ্চিমদিকে, খুব আস্তে আস্তে ঢালু হতে হতেঃ এক সারি উপত্যকা, যাকে ছেদ করেছে বহু আঁকাবাঁকা শুকিয়ে যাওয়া স্রোতরেখা, যাতে কোনো প্রানের চিহ্ণই নেই , যেখানে গাঁ নেই, ঘরবাড়ি নেই, কোনো গাছপালা নেই-চাঁদের আলোর নগ্নতায় অনঢ় এসব উপত্যকা। এবং তবু, এই বজন প্রাণহীন ভূমি থেকেই, এই বালুময় উপত্যকা আর নগ্ন পাহাড়গুলির মাঝখানে থেকেই ফোয়ারার মতো উৎসারিত হলো মানব ইতিহাসে জীবনকে পরমতম স্বীকৃতি দেয়া ধর্ম… .

উষ্ণ এবং নিথবর এ রাত। আধো আলো এবং দূরত্বের কারণে পাহাড়গুলি যেনো নড়চে, আন্দোলিত হচ্ছে। চাঁদের আলোর নিচে এক স্লান, নীল, নিস্প্রভ দ্যোতি স্পন্দিত হচ্ছে। আর এই অনুজ্জ্বল নীলের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে এক দুগ্ধবৎ শুভ্র জ্যোতির আভাস ভৌতিক স্মৃতির মতো পৃথিবীর সকল রঙের; কিন্তু এ অপার্থিব নীল সব রঙকেই দেয় নিষ্প্রভ করে, গলে গিয়ে দিগন্তে রূপান্তরিত না হয়েই আর এ যেন অনধিগম্য, অজ্ঞেয় বস্তুর প্রতি এক প্রবল আহ্বান!

এখান থেকে খুব দূরে নয়; আমার চোখের কাছে লুকানো আরাফাত প্রান্তর রয়েছে এই  প্রাণহীন বিজন উপত্যকা ও পাহাড়গুলির মাঝখানে-মক্কায় যে-সকল হজ্জ্বযাত্রী আসে, সকলেই বছরে যে প্রান্তরে একদিন জমায়েত হয় রোজ হাশরের স্মারক হিসাবে, যেদিন প্রত্যেক মানুষকে তার স্রষ্টার নিকট জবাবদিহি করতে হবে, দাঁড়িয়েছি, খালি মাথায়, হ্জ্জ্বযাত্রীর সাদা পোশাকে, অগনিত সাদা পোশাক-পরা হ্জ্জ্বযাত্রীর মধ্যে, যারা এসেছে তিনটি মহাদেশ থেকে। আমাদের সকলের মুখ ‘জাবল আর রহমা’র দিকে-‘রহমতের পাহাড়’ যা মাথা ‍তুলে দাঁড়িয়েছে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মাঝখান থেকেঃ দাঁড়িয়ে এবং লক্ষ্য ক’রে কেটে গেছে দুপুর, কেটে  গেছে কিবাল, সেই অনিবার্য দিবসের কথা ভাবতে ভাবতে ‘যখন তোমাদের প্রকাশ করা হবে দৃষ্টির সম্মুখে আর তোমাদের গোপন কিছুই থাকবে না লুক্কায়িত… ।

এবং আমি যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াই আর নীচের দিকে তাকাই, আমার সমুখের ভূ-দৃশ্যের জ্যোছনাধোয়া নীল,  অদৃশ্য আরাফাত প্রান্তরের দিকে, যা  মুহুর্তকাল আগওে ছিলো সম্পূর্ণ নির্জীব হঠাৎ তা জীবন্ত হয়ে ওঠে-এর মধ্য দিয়ে মানব-জীবনের যে স্রোত বয়ে গেছে তাদের সকলের জীবন প্রবাহ সমেত এবং ভরে ওঠে সব কোটি কোটি সেইসব নর-নারীর রহস্যময় কন্ঠস্বরে যারা সব ম্কা এবং মদীনার মধ্যে পদচারণা করেছে, উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলেছে, তেরো শো বারেরও বেশি হজ্জ ‍উৎসব, তেরো শো বছরের সাদা পোশাক পরা কোটি কোটি হজ্জযাত্রী; আমি শুনতে পাই ওদের চলে যাওয়ার দিনগুলির শব্দ ও ধ্বনি, বিশ্বাস তথা ঈমানের সেই ডানা, যা ওদেরকে আগলে নিয়ে এসে জমা করেছে এই  শিলাপাহাড় আর বালুময় দেশে  এবং আপাত-নির্জীবতা আবার ঝাপ্টাচ্ছে  জীবনের উষ্ণতায়, বহু শহকের পরিধির উপর, আর সে প্রবল পাখা ঝাপ্টা আমাকে টেনে নিয়ে আসে এর কক্ষপথের মধ্যে এবং আমার চলে যাওয়া দিনগুলিকে এসে হাজির করে বর্তমানের ভেতরে এবং আবার আমি উট হাঁকিয়ে চলেছি প্রান্তরের উপর দিয়ে-।

-উট হাঁকিয়ে, ধাবমান উটের পায়ের আঘাতে বজ্রধ্বনি তুলে, প্রান্তরের উপর দিয়ে, ইহরাম-পরা হাজার হাজার বেদুঈনের সংগে আমি ফিরে এসেছি আরাফাত থেকে মক্কায়-সেই গর্জনশীল, পৃথিবী কাঁপানো, অগণিত ধাবমান উষ্ট্রী ও মানুষের অনিবার্য তরংগের একটি ক্ষুদ্র কণা; মানুষগুলির হাতে উচু দণ্ডে ঝুলানো নিজ নিজ গোত্রের ঝাণ্ডা, যা বাতাসে বাড়ি মারছে মাদলের মতো, আর তারে গোত্রীয় যুদ্ধের চীৎকার ছিন্ন করে দিচ্ছে বাতাসকেঃ ‘ইয়া রাওগা, ইয়া রওগা’- যে ধ্বনি তোলে আতাইবা উপজাতির লোকের আহ্বান ক’রে  তাদের পূর্বপুরুষকে, যার জবাবে হারব গোত্র হাক ছাড়ে ‘ইয়া আউফ, ইয়া আউফ’, এবং এর প্রায় সম্পূর্ণ বিরুদেধ প্রতিধ্বনি ওঠে সারির একেবারে ডানদিকের বিনার থেকে ‘শাম্মার, ইয়া শাম্মার’।

আমরা উট হাঁকিয়ে ছুটে চলেছি, উড়ে চলেছি প্রান্তরের উপর দিয়ে এবং আমার মনে হলো, আমরা উড়ছি বাতাসে ভর করে, এমন একটি আনন্দের মধ্যে আমরা নিজেদের হারিয়েছে যার শেষ সেই, যার সীমা নেই.. . এবং বায়ু আমার কানে আনন্দের এক উন্মাদ উল্লাস ঘোষণা করে তারস্বরেঃ তুমি আর বেগানা পর রইবে না কখনো-কখখনো না, কখখনো না!

আমার ডানদিকে রয়েছে আমার ভায়েরা এবং আমার বাঁদিকে রয়েছে ভায়েরা, ওরা সকলেই আমার অজানা; কিন্তু কেউই আমার পর নয়, বেগানা নয়ঃ আমাদের লক্ষ্যভিমুখে ছুটে চলার  এই প্রচণ্ড উল্লাসে আমরা একটি মাত্র দল, একই লক্ষ্যের সন্ধানে! প্রশস্ত এই পৃথিবী আমাদের সম্মুখে আর আমারেদ হৃদয়ে মিটমিট করে জ্বলছে সেই শিখার একটি স্ফুলিংগ যা জ্বলেছিলো মহানবীর সাহাবাদের অন্তরে। আমার ডান দিকের ভায়ের এবং  বাঁদিকের ভায়েরা-ওরা জানে যে, ওদের কাছ থেকে যা আশা করা হয়েছিলো তা থেকে ওরা পড়ে গেছে পেছনে এবং বহু  শতকের পরিক্রমায় ওরে হৃদয় হয়ে উঠেছে ছোট্ট, সংকীর্ণঃ এবং তবু সাফল্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করা হয়নি ওদের নিকট থেকে, আমাদের কাছ থেকে… .!

সমুদ্রের মতো উদ্বেলিত ভিড়ের মধ্যে থেকে কোনো একজন তার গোত্রীয় চিৎকার ছেড়ে ঈমানের ধ্বনি তোলেঃ আমরা তারই ভাই, যে নিজেকে সমর্পণ করে আল্লাহর নিকট, এবং অপর একজন তার সাথে যোগ দেয়-‘আল্লাহু আকবর,-আল্লাহ মহান।

আর উপজাতিগুলির প্রত্যেকটি দল এই একই ধ্বনি তোলে। এই মুহূর্তে ওরা আর গোত্রীয় অহমিকায় মাতাল নযদি বেদুঈন নয়ঃ ওরা এমন মানুষ যারা জানে আল্লাহর রহস্য সত্যি-সত্যি অপেক্ষা করছে ওদের জন্য.. … আমাদের জন্য.. . হাজার হাজার ধাবমান উষ্ট্রের পদধ্বনি আর শত শত ঝাণ্ডার পতপত আওয়াজের মধ্যে ওদের চীৎকার ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় সাফল্যের তুমুল গর্জনেঃ আল্লাহ আকবর।

এ গর্জন প্রবল বিশাল তরংগের আকারে প্রবাহিত হয় উটের পিঠে ধাবমান হাজার হাজার মানুষের উপর দিয়ে, বিশাল বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর দিয়ে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি কিনার পর্যন্তঃ  আল্লাহ আকবর! এই লোকগুলি ওদের ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবন ছড়িয়ে হয়ে উঠেছে বৃহৎ আর ওদের ঈমান এখন ওদের ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে সামনের দিকে, একত্বে, কোনো জরিপ করা হয়নি এমন সব দিগন্তের দিকে.. . আকাংখা এখন আর ছোট্ট এবং গোপন থাকবে না; এর জাগরণ হয়েছে, -চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া  সাফল্যের সূর্যোদয়! মানুষ াতর এই সাফল্যের  দীর্ঘ পদক্ষেপে আগিয়ে চলে, আল্লাহর দেয়া সকল গৌরব ও দীপ্তির সংগে; তার পদক্ষেপেই তার ‍উল্লাস, তার জ্ঞানই মুক্তি, তআর তার পৃথিবী এমন একটি মণ্ডল যার নেই কোনো সীমা.. .।

উষ্ট্রগুলির গেতের গন্ধ, তাদের নিঃশ্বাস এবং হ্রেষাধ্বনি, তাদের অগণিত পায়ের আঘাতে ওঠা বজ্রের আওয়াজ, মানুষের চীৎকার, জীনের পেরেক থেকে ঝুলানো রাইফেলের টুং টুং, ধূলিবালি আর ঘাম ভেতরে এক আনন্দময়, সুখকর প্রশান্তি।

আমি আমার জীনের উপর ঘুরে বসি এবং আমার পেছনে দেখতে পাই হাজার হাজার সাদা সাদা কাপড়-পর উট সওয়ারদের, ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে ভেঙে পড়া জটলা পাকানো ভিড় এবং ওদের ছাড়িয়ে সেই সেতুটি, যার উপর দিয়ে আমি এসেছিঃ এর শেষপ্রান্ত রয়েছে ঠিক আমার পেছনে আর এর শুরু ইতমধ্যে আরিয়ে গেছে দূর ব্যবধানের কুয়াশায়।

About মুহাম্মদ আসাদ