মক্কার পথ

হাওয়া

এক

আমরা চলেছি তো চলেছি-দু’টি মানুষ দু’টি উটের উপর এবং সকাল গড়িয়ে ছাড়িয়ে গেল আমাদেরকে।

-‘এ ভারি তাজ্জব ব্যাপার-ভারি বিস্ময়কর ব্যাপার’, নীরবতার মধ্যে জায়েদের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়।

-‘ তাজ্জব ব্যাপার কী, জায়েদ?’

-‘একি তাজ্জব ব্যাপার নয় চাচাজান, মাত্র ক’দিন আমরা যাচ্ছিলাম তায়েমার দিকে, কিন্তু এখন আমাদের উটগুলির মুখ রয়েছে মক্কার দিকে। আমার বিশ্বাস যে, সেই রাতের আগে আপনি নিজেও তা জানতে না। আপনি বদ্দুর মতোই ভবঘুরে.. এই ঠিক যেমন আমি! চাচাজান, একি কোনো জিন, যে আজ থেকে চার বছর আগে হঠাৎ আমার মনে জাগিয়ে দিয়েছিলো আপনার সাথে মক্কায় দেখা করার বাসনা এবং এখন আপনার মনে জন্ম দিয়েছে মক্কা যাওয়ার সিদ্ধান্ত? এমনি করে কি আমরা হাওয়ার মুখে উড়ে চলেছি, আমরা কী চাই তা জানি না বলে?’

-‘না যায়েদ, তুমি আমি- আমরা স্বেচ্ছায় হাওয়ার মুখে ভেসে চলেছি, কারণ আমরা জানি, আমরা কী চাই; আমাদের হৃদয় তা জানে, যদিও আমাদের চিন্তা কখনো কখনো তা অনুধাবন করতে দেরী করে বসে; কিন্তু পরিণামে আমাদের চিন্তা আমাদের হৃদয়ের সাথে তাল রেখেই চলে এবং তখন আমরা ভাবি, আমরা একটি সিদ্ধান্তে এসেছি..!

.. .                        .. .                        …                            .. .             .. .                …

হয়তে দশ বছর আগে, সেদিনও আমার হৃদয় তা জানতো না, যখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম জাহাজের পাটাতনে। জাহাজটি আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলো নিকট প্রাচ্যের দিকে আমার পয়লা সফরে, দক্ষিণমুখে, কৃষ্ণসাগরের ভেতর দিয়ে ধূসর কিনারহীন কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রির অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে, কুয়াশার মোড়া এক ভোর অতিক্রম করে বসফোরাসের অভিমুখে। সমুদ্দুর মনে হচ্ছিলো সীসার মতো, কখনো ফেনা ছিটকে পড়ছিলো পাটাতনের উপর আর ইঞ্জিনের আঘাত যেন হৃদস্পন্দনের শামিল!

আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলাম-দৃষ্টি আমার পাণ্ডুর ছায়াচ্ছন্নতার দিকে। কেউ যদি তখন আমাকে জিজ্ঞাস করতো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি কী ভাবছিলাম কিংবা প্রাচ্যে আমার এই পয়লা অভিযানে আমি ঠিক কী প্রত্যাশা নিয়ে বের হয়েছি আমার পক্ষে পরিষ্কার জবাব দেয়া খুবই কঠিন হতো। ঔৎসুক্য সম্ভবত, কিন্তু এ এমন এক ঔৎসুক্য যা তীব্র ছিলো না এবং মনে হয়, এর লক্ষ্য ছিলো অমন বিষয় যার বিশেষ কোনো গুরুত্বই ছিলো না। আমার অস্বত্বির এই কুয়াশা, যা সমুদ্রের উপর ঘনায়মান কুয়াশার সাথেই যেনো কিছুটা সম্পর্কিত-তার লক্ষ্য ছিলো না বিদেশ-ভূমি কিংবা আসছে দিনগুলির মানুষেরা, নিকট ভবিষ্যতের ছবিসমুহ, অদ্ভূত শহর-বন্দর আর চেহারা-সুরত, বিদেশী কাপড়- চোপড় আর চাল-চলন, যা শীঘ্রই আমার চোখে ছায়া ফেলতে লাগলো, আমার চিন্তায় সেগুলির স্থান ছিলো খুব অল্পই। সফরে কিছুটা আকস্মিক এক ব্যাপার মনে হয়েছিলো আমার কাছে। আমি একে গ্রহণ করেছিলাম আমার দীর্ঘ সফরে এক আনন্দদায়ক অথচ তেমন-বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় এমনি এক অবকাশ হিসাবে। সে সময়টায় আমার মন বিচলিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলো অতীতের ভাবনায়!

অতীত? সত্যি কি আমার কোনো অতীত আছে? আমার বয়স তখন বাইশ বছর। কিন্তু আমর বয়সের মানুষ-সেসব মানুষ যারা জন্মেছে এই তকের শুরুতে-সম্ভবত আগের যে –কোনো কালের মানুষের চাইতে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠেছে; অল্পদিনের মধ্যেই তাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেক বেশি দীর্ঘ জীবনের-আর আমার মনে হলো, আমি যেনো পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি সময়ের সুদীর্ঘ বিস্তানের দিকে চোখ মেলে। এই বছরগুলির সব কটি বাঁধা-বিপত্তি এবং দুঃসাহসিক অভিযান-সেইসব আশা-আকাঙ্খা, চেষ্টা ও ব্যর্থতা আর সেই সব রমণী এবং জীবনের উপর আমর প্রথম অতর্কিত সব হামল-সবই আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে। তারা ঝলমল আসমানের নীচে সেইসব অন্তহীন রাত, যখন আমি ঠিক জানতাম না আমি কী চাই এবং কোনো দোস্তের সাথে হেঁটে চলেছি জনশূন্য রাস্তায়, পারমার্থিক বিষেয়ে কথা বলতে বলতে-বেমালুম ভূলে যেতাম যে, পকেট কতো শূন্য এবং আসছে কাল আমার জন্য কতো অনিশ্চিত-একটি সুখদায় অসন্তোষ, যা কেবল একজন তরুণই অনুভব করতে পারে, তার সংগে দুনিয়াকে বদলে দেবার আর তাকে নুতন করে নির্মাণ করার বাসনা- সমাজকে কীভাবে বিন্যস্ত হওয়া উচিত তাদের সম্পর্ক, যাতে করে প্রত্যেটি মানুষ যে একাকীত্ব দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে তা ভেঙে-চুরে সকলেই বেরিয়ে আসতে পারে এবং সত্যিকার পারস্পরিক সহয়োগিতা ও বন্ধুত্বের মধ্যে কাটাতে পারে জীবন? ভালো কী এবং মন্দ কী, ভাগ্য কী- কিংবা ভিন্নভাবে বলতে গেলেঃ মানুষের কী করা উচিত, যাতে করে সে যথার্থভাবেই এবং কেবল মুখে নয়, তার জীবনের সাথে এক ও অভিন্ন হতে পারে এবং  বলতে পারে, ‘আমি আর আমার অদৃষ্ট আলাদা নয়, একই’-এই ধরনের সব আলোচনা যা কখনো ফুরাতে চাইতো না। ভিয়েনা ও বার্লিনের সাহিত্যের ক্যাফে গুলি যেখানে অবিরাম তর্ক-বিতর্ক চলতো ‘রূপ’ ও ‘স্টাইল’ ও ‘প্রকাশভংগি’ নিয়ে, রাজনৈতিক স্বাধীনাতর অর্থ নিয়ে, নারী ও পুরাষের মেলামেশা নিয়ে.. . জানার ক্ষুধা এবং কখনো কখনো পেটের ক্ষুধাও .. . এবং অসংযত ইন্দ্রিয়াবেগের মধ্যে কাটানো রাতগুলিঃ ভোরে বিছানা পড়ে থাকতো নোংরা, এলোমেলোভাবে, যখন রাতের উত্তেজনায় পড়তো ভাটা আর তা ধীরে ধীরে হয়ে উঠতো ধূসর, কঠিন আর নিরানন্দ। কিন্তু যখন সকাল হতো তখন আমি ভুলে যেতাম ভোরের রিক্তাবশেষের কথা এবং দুলতে দুলতে আবার চলতে শুরু করতাম এবং টের পেতাম পায়ের নীচে জমিন যেনো আনন্দে কাঁপছে,.. . একটি নতুনমুখ দেখা বা নতুন বই হাতে নেবার উত্তেজনা.. প্রশ্নের জবাব খুঁজে  বেড়ানো এবং অর্ধেক উত্তর পাওয়া,-এবং সেইসব অতিশয় বিরল মুহূর্তে যখন মনে হতো; পৃথিবী যেনো সহসা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে, উপলব্ধির চকিত আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে-উপলব্ধি যার আভাস এনে দিতো এমন কিছু উদঘাটনের পূর্বে কখনো যার নাগাল পায়নি কেউঃ সকল প্রশ্নের এক জবাব.. .

বিশ শতকের গোড়ার দিকের সেই বছরগুলি ছিলো অদ্ভুত বিস্ময়কর। সর্বথ্র তখন সামাজিক ও নৈতিক অনিশ্চয়তার যে আবহাওয়া বিরাজ করছে, তা-ই  জন্ম দেয় বেপরোয়া আশাবাদের, আর তার প্রকাশ ঘটে একদিকে সংগীত, চিত্রকলা ও নাটকে দুঃসাহসিক-পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে, অন্যদিকে সংস্কৃতির রূপরেখা ও কাঠামো সম্পর্কে আঁধারে হাতড়ানোতে, প্রায়শ বৈপ্লবিক অনুসন্ধানের; কিন্তু এই জোর করে বাঁচিয়ে রাখা আশাবাদের পাশাপাশিই তখন চলছে একটি আধ্যাত্মিক শূন্যতা, একটি, একট অস্পষ্ট উন্নাসিক আপেক্ষিকতাবাদ, যার জন্ম হয়েছিলো মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে  এক ক্রমবর্ধমান নৈরাশ্যের মধ্যে।

আমার অল্প বয়স সত্ত্বেও আমার নিকট এ বিষয় গোপন ছিলো না যে, মাহযুদ্ধের ধ্বংসলীলার পর ভয়-বিধ্বস্ত, অসন্তুষ্ট, ভাবাবেগ-পীড়িত, উত্তেজিত, উচ্চগ্রামে বাঁধা ইউরোপীয় জগতে কোনো কিছুই আর ঠিক –ঠাক চলছিলো না আগের মতো। আমি দেখতে পেলাম, এর আসল উপাস্য আর আধ্যাত্মিক কিছু নয়, এর একমাত্র উপাস্য হচ্ছে ‘কমফর্ট’, আরাম-আয়েশ। সন্দেহ নেই যে, তখনো এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁদের অনুভূতি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হতো ধর্মীয় তাৎপর্য দ্বারা, যাঁরা নিজেদের সভ্যতার সার-নির্যাসের সাথে তাঁদের নৈতিক বিশ্বাসগুলিকে খাপ-খাওয়ানোর জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম।

গড়পড়তা একজন ইউরোপীয়, সে গণতন্ত্রী হোক আর কমিউনিস্টই হোক, মজদুর হোক আর বুদ্ধিজীবীই হোক, তার কাছে অর্তপূর্ণ বিশ্বাস একটিই ছিলো বলে মনে হয়ঃ বৈষয়িক উন্নতির পূজা-এই বিশ্বাসে যে, জীবনকে ক্রমাগত সহজতরো করে তোলা ছাড়া জীবনের আর কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না, কিংবা সাম্প্রতিক পরিভাষায় যেমন বলা হয়ে থাকে,  জীবনকে ‘প্রকৃতির কবল থেকে আযাদ করাই  জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য’। এই ধর্মের মন্দির হচ্ছে বিশাল কল-কারখানা, সিনেমা, রাসায়নিক, গবেষণার,  নৃত্যশালা, পানি বিদ্যুৎ সংস্থাসমূহ আর এ ধরনের মন্দিরের পুরোত ঠাকুর হচ্ছে ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, চিত্রতারকা, সংখ্যাতত্ত্ববিদ, শিক্ষা-পরিচালক, রেকর্ড স্রষ্টা বৈমানিক এবং কমিসারেরা! ভালো এবং মন্দের ধারণার ব্যাপারে সার্বিক মতানৈক্য এবং সকল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সুবিধাবাদের আশ্রয় গ্রহণ- এরি মধ্যে অভিব্যক্তি ঘটলো নৈতিক ব্যর্থতার-সেই সুবিধাবাদিতার যা চুনকাম করা রাস্তার বারাংগনার সংগে তুলনীয়, যে বারাংগনা যখনি বাঞ্ছিত হয় যে-কোন জনের কাছে যে-কোনো সময়ে নিজেকে দান করে থাকে। ক্ষমতা ও সুখের অতৃপ্ত লালসাই পাশ্চাত্য সমাজকে অনিবার্যভাবে বিভক্ত করে রেখেছে পরস্পর-বিরোধী বিভিন্ন দলে, যে দলগুলি প্রত্যেকটিই সর্বপ্রকার অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত এবং যখনি আর যেখানেই তাদের পারস্পরিক স্বার্থে সংঘাত বাঁধছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তমদ্দুনের ক্ষেত্রে এর ফল হলো এমন এক ধরনের মানুষের সৃষ্টি, বাস্তব উপযোগিতাই যার কাছে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড ছিলো বলে মনে হয়, যার কাছে ন্যায়-অন্যায়ের সর্বোচ্চ মাপকাঠিই ছিলো জাগতিক সাফল্য।

আমি দেখতে পেলাম আমাদের জীবন কতো অসুখী এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে মানুষের সংগে মানুষের সত্যিকার যোগ কতো সামান্য, যদিও সমাজ ও জাতির উপর জোর দেয়া হচ্ছে কান-ফাটানো, প্রায় ‍উন্নত্ত চিৎকারের সাথে। আমরা আমাদের সহজাত অনুভূতির দুনিয়া থেকে কত দূরে সরে পড়েছি আর আমাদের আত্মা কতো সংকীর্ণ কতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। আমি এ সবই দেখতে পেলাম। কিন্তু যে কারণেই হোক, এ চিন্তা কখনো আমার মনে গভীরভাবে জাগেনি, যেমন কখনো তা জাগেনি আমার চারপাশে আংশিক সমাধান, হয়তো ইউরোপের নিজের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বাইরে কোথাও থাকতে পারে। আমাদের সকল চিন্তার আদি আর অন্ত ছিলো ইউরোপ। এবং সতেরো বছর কিংবা তার কাছাকাছি বয়সে, আমর লাওসে’র সন্ধান লাভও এ ব্যাপারে আমার মনোভংগির কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

  . ..                                        …                                                  …

এছিলো একটি খাঁটি আবিষ্কার। এর আগে কখনো আমি লাওসের নামই শুনিনি, আর তাঁর দর্শন সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ও ছিলো না, তখন একদিন আমি হঠাৎ ভিয়েনার এক বইয়ের দোকানের কাউন্টারে পেয়ে গেলাম তাও-কে-কিং-এর একটি জার্মান তর্জমা। বইটির অদ্ভুত নাম আমাকে কিছুটা উৎসুক করে তোলে। এলোমেলোভাবে বইটির পাতা উল্টাতে গিয়ে হঠাৎ আমার নজরে পড়ে বইটির ছোট্ট তাৎপর্যবহ অধ্যায়গুলির একটির উপর, আর আমি অনুভব করি, সুখের ছুরিকাঘাতের মতো একটি হঠাৎ রোমান্স, একটা আকস্মিক শিহরণ, ফলে আমি নিজ পরিপার্শ্বের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে, যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম মন্ত্রমুগ্ধবৎ স্থির নিশ্চল হয়ে, বইটি হাতে নিয়ে; কারণ,  এ বইতে আমি জীবনকে দেখতে পেলাম তার পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ নির্মলরূপে, সমস্ত ফাটল ও দ্বন্ধ থেকে মুক্ত সেই শান্ত, নম্র আনন্দের মধ্যে যা উর্ধ্বাভিগামী, যার অবকাশ হামেশাই রয়েছে মানব হৃদয়ে, যখনি মানুষ যত্নবান হয় তার আপন স্বাধীনতার সদ্ব্যবহারে।… এ যে সত্য, তা আমি জানতামঃ এমন এক সত্য এ, যা সত্য ছিলো সবসময়ই, যদিও আমরা তা ভুলে গেছি, আর এই মুহূর্তে এই সত্যকে প্রত্যক্ষ করলাম সেই আনন্দের সংগে, যে আনন্দের সংগে মানুষ ফিরে আসে তার বহু দিনের হারানো ঘরে.. ..

তখন থেকে কয়েকটি বছর ধরে লাওসে ছিলেন আমার জন্য এক জানালা বিশেষ, যার ফাঁক দিয়ে আমি তাকাতাম জীবনের কাঁচ-স্বচ্ছ এলাকাগুলির দিকে, যে-জীবন ছিলো সমস্ত সংকীর্ণতা ও মানুষের নিজের সৃষ্ট ভয়-ভীতি থেকে অনেক দূরে, শিশুসুলভ বাতিক থেকে মুক্ত, যে বাতিক আমাদের বাধ্য করেছিলো, মুহূর্ত থেকে মুহুর্তে হামেশা এবং যে-কোনো মূল্যে, জাগতিক উন্নতির মাধ্যমে নতুন করে আমাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা বিধান করতে। কথা এ নয় যে, ‘বৈষয়িক উন্নতি’ আমার দৃষ্টিতে অন্যায়, কিংবা অনাবশ্যক মনে হতো-বরং তখনো আমি তা কল্যাণকর এবং প্রয়োজনীয় বলেই ভাবতাম। কিন্তু একই সংগে আমার এ বিশ্বাসও জন্মেছিলো, ‘বৈষয়িক উন্নতি’ কখনো তার আসল লক্ষ্য হাসিল করতে পারে না, যে লক্ষ্য মানুষের সামগ্রিক সুখ বৃদ্ধি,- যদি না এ উন্নতির সাথে থাকে আমাদের আধ্যাত্মিক মনোভংগির নব রূপায়ণ আর পরম মূল্যগুলিতে, অন্য-নিরেপেক্ষ, এক নতুন বিশ্বাস। কিন্তু এই নব রূপায়ণ কী করে সম্ভব আর এই নব মূল্যায়ন কী ধরনের হবে তা আমার কাছে  পরিষ্কার ছিলো না মোটেই।

জীবন আঁকড়ে ধরে তার উপর জুলুম না করে মানুষের উচিত জীবনের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়া-লাওসের এ বিশেষ প্রচারের মতো কেউ প্রচার করতে শুরু করলেই যে মানুষ জীবনের লক্ষ্য-বদলে ফেলবে এবং এভাবে সে তার চেষ্টা –সাধনার দিক পরিবর্তন করবে এমন প্রত্যাশা অলস কল্পনা ছাড়া আর কিছুই হতো না। কেবলমাত্র প্রচার, কেবলমাত্র বুদ্ধিগত উপলব্ধি ইউরোপীয় সমাজের আাধ্যাত্মিক মনোভংগিতে কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম ছিলো না মোটেই। প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো হৃদয়ের এক নতুন বিশ্বাস, এক নতুন ধর্মের-ঈমানের আগুনে উদ্দীপিত হয়ে সেসব মূল্যের নিকট আত্মসমর্পণের-যেগুলিতে ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’র কোনো অবকাশ নাই। কিন্তু সে ধর্ম কোথায় পাওয়অ যাবে….?

 যে কারণেই হোক, এ আমর মনে জাগেনি যে, লাওসে, ক্ষণস্থায়ী এবং সে কারণে পরিবর্তনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক মনোভাবের বিরুদ্ধেই তাঁর প্রবল আপত্তি তুলেছিলেন। বরং তাঁর চ্যালেঞ্জ ছিলো সেই মৌলিক ধারণার বিরুদ্ধে যা থেকে পয়দা হয় এই মনোভংগি। আমি তা জানলে এ সিদ্ধান্তে আসতেই বাধ্য হাতাম যে, লাওসে আত্মার যে নির্ভার প্রশান্তির কথা বলেছেন সেখানে পৌছুনোর ক্ষমতা নাই ইউরোপের, যদি না সে সাহস সঞ্চয় করে নিজের আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কেই প্রশ্ন তোলো। অবশ্য, সজ্ঞানে এরূপ একটা সিদ্ধান্তে আসার জন্য তখন আমার বয়স ছিলো খুবই কম.. . চৈনিক দরবেশের সেই প্রতিবাদের পূর্ণ তাৎপর্য এবং তার সামগ্রিক ঐশ্বর্য বোঝার বয়স আমার তখনো হয়নি। একথা সত্য যে, তাঁর বাণী আমার অন্তরতম সত্ত্বাকে ধরে নাড়া দিয়েছিলো-আমার কাছে তা জীবনের অমন একটা রূপ উদঘাতিত করেছিলো যাতে মানুষ তার ভাগ্যের সংগে এবং এভাবে তার নিজেরই সংগে একাত্মবোধ করতে পারে। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না-এ ধরনের একটা দর্শন কী করে বিশুদ্ধ মানসিক অনুধ্যানের গণ্ডী ডিঙিয়ে যেতে পারে এবং বাস্তবে রূপায়িত হতে পারে ইউরোপীয় জীবনের পটভূমিকায়। ফলে, ধীরে ধীরে আমার সন্দেহ হতে লাগলো- এর রূপায়ন আদতেই সম্ভব কিনা। আমি অবশ্য তখনো সেই বিন্দুতে এসে পৌছুইনি যেখানে এসে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারিঃ যদি তার মূলনীতিগুলির আলোকে ইউরোপীয় জীবন-পদ্ধতির বিচার করা হয়, তাহলে সে জীবন পদ্ধতিই একমাত্র সম্বাব্য জীবন পদ্ধতি কি না। অন্য কথায়, আমি আমার চারপাশের আর সকলের মতোই সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন ছিলাম ইউরোপের অহং-সর্বস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভংগির দ্বারা।

তাই, লাওসে’র কণ্ঠস্বর কখনো একদম নীরব হয়ে না পড়লেও,  ক্রমে ক্রমে তা সরে গেলো চিন্তামূলক কল্পনার পশ্চাদভূমিতে এবং কালে তা হয়ে উঠটো কেবল সুন্দর কবিতার বাহন, আর কিছু নয়। আমি তখনো তা মাঝে মাঝে পড়তাম এবং সুখদায়ক এক প্রত্যাশার ছুরিতে জখম হতাম। প্রত্যেকবারই কিন্তু বইটি আমি এই ঐকান্তিক অনুশোচনার সাথে রেখে দিতাম যে এ কোনো হাতীর দাঁতের তৈরি মিনারের দিকে স্বপ্নের ডাক ছাড়া কিছু নয় এবং আমি যে জগতের অংশ সেই বেসুরো, তিক্ত এবং লোভান্ধ জগতের সাথে যদিও আমি তাল রেখে চলতে পারছিলাম না তবু হাতীর দাঁতে তৈরি মিনারে বাস করার ইচ্ছা আমার ছিলো না।

তবু, সে সময়ে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে যে-সব লক্ষ্য ও প্রয়াস নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছিলো এবং ইউরোপের সাহিত্য, কলা ও রাজনীতিকে ভরে ‍তুলেছিলো প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্কের গুঞ্জন ধ্বনিতে, আমি তাতে মোটেই কোনো উদ্দীপনা বোধ করছিলাম না- কারণ, এসব লক্ষ্য ও প্রয়াসের বেশির ভাগ একে অপরের যতো বিরোধীই হোক না কেন, সব কটির মধ্যেই একটি জিনিস ছিলো কমন বা সাধারণঃ তা এই সরল ধারণা যে, জীবনকে বর্তমান বিভ্রান্তি থেকে টেনে তোলা এবং ‘উন্নত করা’ সত্যি সম্ভব  যদি কেবল বাহ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা উন্নত করা যায়। এ আমি তখনো খুব গভীরভাবেই অনুভব করেছিলাম, কেবলমাত্র বৈষয়িক উন্নতি কেনো সমাধা নয় এবং যদিও আমি নিশ্চিত করে জানতাম না সমাধান কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তবু আমি নিজের মধ্যে সে উৎসাহ উত্তেজনার সন্দেহাতীত প্রমাণ কখনো পাইনি যা আমার সমকালীন লোকের ‘প্রগতির নামে অনুভব করতো।

একথা ঠিক নয় যে, আমি অসুখী ছিলাম। আমি কোনো দিনই অর্ন্তমুখী ছিলাম না। আর ঠিক সেই সময়ে আমি আমার ব্যবহারিক জীবনে প্রায় অসাধারণ সাফল্য উপভোগ করছিলাম। যদিও আমি পোশাকে পেশা হিসাবে খুব গুরুত্ব দিতে সামন্যই ইচ্ছুক ছিলাম, তবু ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে আমার কাজ আমার জন্য বৃহত্তর পৃথিবীর বহু পথ খুলে দিয়েছে বলে মনে হলো-কারণ বহু ভাষা জানতাম বলে আমি তখন সহ-সম্পাদক পদে উন্নীত হয়েছি এবং স্ক্যণ্ডিনেভিয়ান দেমগুলির পত্র-পত্রিকার জন্য সংবাদ সরবরাহের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়েছে। ক্যাফে দা ওয়েসটেন্স এবং তার আত্মিক উত্তরাধিকারী রোমানিশেষ ক্যাফে-দুটি ছিলো অনেকটা আমার মন মানসের স্ব-গৃহঃ এ দুজায়গায় তখনকার দিনের প্রায় সকল বিখ্যাত লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, অভিনেতা এবং চিত্রপরিচালকেরা জমায়েত হতেন। নামকরা এইসব লোকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো বন্ধুত্বের এবং কখনো কখনো অন্তরংগতার, আর নিজেকে আমি মনে করতাম তাঁদেরই একজন, অন্ত দৃষ্টিভংগির দিকে দিয়ে, খ্যাতিতে না হলেও। আমি গভীর বন্ধুত্ব এবং ক্ষণিক প্রেম দুই-ই উপভোগ করেছি। জীবন আমার কাছে ছিলো উত্তেজনাময়, প্রতিশুতি-প্রত্যাশায় ভরপুর এবং বিচিছন্ন অনুভূতিতে বার্ণঢ্য; কারণ, আমি জানতামা না আমি সত্যি কী চাই, যদিও তরুণের হাস্যকর ঔদ্ধত্যের সংগে, যুগপৎ এ প্রত্যয়ও জন্মেছিলো যে, একদিন আমি তা অবশ্য জানতে পারবো। তাই আমি আমার হৃদয়ের তৃপ্তি ও অতৃপ্তির দোলকে ঠিক একইভাবে দোল খাচ্ছিলাম, যেমন দোল কাচ্ছিলো বহু তরুণ সেই বিস্ময়কর বছরগুলিতে-কারণ, আমাদের কেউই প্রকৃত অসুখী ছিলো না যেমনি সত্যি তেমনি এ-ও সত্যি যে খুব অল্প কজনকেই সেদিন জ্ঞাতসারে সুখী বলে মনে হতো।

আমি অসুখী ছিলাম না কিন্তু আমার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের কিংবা তাদের মধ্যকার কোনো দলের বিভিন্নমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আশা-আকঙ্খায় অংশগ্রহণে আমার অক্ষমতা কালক্রমে এই অস্পষ্ট ধারণার রূপ নেই যে, আমি ঠিক ওদের কেউ নই, ওদের সংগে আমার সম্পর্ক নেই এবং আমি তারি সংগে আবার অস্পষ্টভাবে এ বাসনাও জন্মালো যে আমাকে কারো অংগীভূত হতে হবেই, তবে কারঃ- কোনো কিছুর অংশ হতে হবেই—তবে কিসেরঃ

 …                         …                                             …                                       …

তারপর একদিন ১৯২২ সনের বসন্তকালে আমি আমার মাম ডোরিয়ানের একটি চিঠি পেলাম।

ডোরিয়ান ছিলেন আমার আম্মার সবচেয়ে ছোট ভাই। মামা ভাগ্নের নয়, বরং বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো আমাদের দুজনের মধ্যে। তিনি ছিলেন একজন মনোবিকলনবিদ, ফ্রয়েডের প্রথমদিকের একজন শাগরিদ; সে সময় তিনি জেরুযালেম একটি মানসিক হাসপাতালের প্রধান ছিলেন। তিনি নিজে যেহেতু জিওনিস্ট ছিলেন না এবং জিওনিজমের প্রতি তাঁর তেমন সহানুভুতিও ছিলো না, পক্ষান্তরে আরবদের প্রতিই তিনি ছিলেন আকৃষ্ট যার আর কিছুই দেবার ছিলো না। মামা ছিলেন অবিবাহিত, তাই তাঁর এই এককীত্বে এই তরুন ভাগ্নেটি তাঁর সাথী হতে পারে। তিনি তাঁর চিঠিতে ভিয়েনার সেই উত্তেজনাময় দিনগুলির কথা উল্লেক করেন যখন তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মনোবিকলনবদ্যার নতুন দুনিয়ায় এবং এই বলে শেষ করেনঃ তুমি একনে চলে আসো এবং আমার সাথে কয়েখ মাস থাকে। আমি তোমার আসা-যাওয়ার খরচ বহন করবো। তোমার যখন ইচ্ছ তখনই বালিনে ফিরে যেতে পারবে। এখানে এলে তুমি থাকবে এক পরম আনন্দদায়ক পুরোনো আরব পাথুরে ঘরে, যা গরমের দিনি ঈষৎ শীতল (এবং শীতকালে ভয়ানক ঠাণ্ডা)। আমরা দু’জনে এক সংগে সময় কাটাবো। আমার বইপত্র রয়েছে প্রচুর, তোমার চার পাশের অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন তুমি হাঁফিয়ে উঠবে তখন তুমি পড়তে পারবে যতো ইচ্ছ্. ..।

আমি আমার মন স্থির করে ফেললাম তৎপরতার সাথে। অবশ্য এ তৎপরতা সব-সময়ই আমার জীবনের বড়ো বড়ো সিদ্ধান্তের বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে। পরদিন সকালেই আমি ইউনাইটেড টেলিগ্রাফ অফিসে ডঃ ডামার্টকে জানিয়ে দিলাম-আমাকে এক জরুরী কাজের তাগিদে নিকট-প্রাচ্য যেতে হচ্ছে, কাজেই এক হপ্তার মধ্যে আমি এজেন্সী ছেড়ে দিচ্ছি,-

কেউ যদি তখন আমাকে বলতো, ইসলামী দুনিয়ার সাথে আমার এই পয়লা পরিচয় একটি অবসরকালীন অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমিত থাকবে না, বরং তার ফল হবে অনেক-অনেক সূদুর প্রসারী এবং তা আমার জীবনেরই মোড় ফিরিয়ে দেবে তার সে ধারণা আমি একেবারেই অবাস্তব ও অযৌক্তিক বলে হেসে উড়িয়ে দিতাম। একথাও ঠিক নয় যে, বেশির ভাগ ইউরোপীয়র মতোই আরব্য উপন্যাসের রোমান্টিক আবহাওয়ায় যেসব দেশের সাথে আমার মন জড়িয়েছিলো আমি সেসবের মোহ থেকে মুক্ত ছিলাম। আমি অবশ্য বর্ণের সমারোহ, উদ্দাম রীতিনীতি এভং বিচিত্র সাক্ষাৎকার আশা করেছি। কিন্তু একথা কখনো আমার মনে হয়নি যে, আমি আত্মার জগতেও নতুন নতুন অভিযান প্রত্যাশা করতে পারি। এই নতুন সফরে আমার জন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে মনে হলো না। ইতিপূর্বে আমার জীবনে আমি যেসব ধারণ লাভ করেছি সেগুলিকে আমি সহজভাবেই পশ্চিমা বিশ্ব-দৃষ্টির সাথে মিলিয়ে নিয়েছি এবং আশা করেছি, এতে করে আমি আমার পরিচিত একমাত্র সাংস্কৃতিক পরিবেশের আওতায় অনুভূতি ও ধারণার এ প্রশস্ততর, ক্ষেত্রে পৌছুতে পারবো। এভং আপনি যদি এ সম্পর্কে চিন্তা করেন, এর চেয়ে ভিন্ন উপলদ্ধি আমার পক্ষে কী করেই বা সম্ভব ছিলো? আমি ছিলাম এক অতি-অতি তরুণ ইউরোপীয় এবং এই বিশ্বাসের মধ্যে আমি বড়ো হয়েছি যে, ইসলাম এবং ইসলামের উদ্দিষ্ট সবকিছুই মানুষের ইতিহাসের একটি রোমান্টিক গলিপথ ছাড়া কিছু নয়, কাজেই, ই্উরোপীয় পশ্চিমারা কেবলমাত্র যে-দুটি ধর্মকে গুরুত্বের সাথেবিবেচনার লায়েক মনে করে সেই খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মের সাথে তার উল্লেখও অনুচিত, তুলনার তো কথাই ওঠে না।

ইসলামী বিষয়বস্তুর বিরদ্ধে (যদিও মুসলিম জীবনের রোমান্টিসাইজড বহিরংগের বিরুদ্ধে নয়) এই অস্পষ্ট ইউরোপীয় বিদ্বেষ নিয়ে আমি ১৯২২ সনের গ্রীষ্মকালে আমর সফর শুরু করি। নিজের প্রতি সুবিচার করতে গিয়ে আমি যদি একথা বলতে না পারি যে আমি একটা ব্যক্তিগত তাৎপর্যের মধ্যে ডুবেছিলাম, তা সত্ত্বেও আমি অজান্তেই গভীরভাবে বিজড়িত ছিলাম সেই আত্মনিমগ্না, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায়, যা পাশ্চাত্যের সকল সময়েরেই একিট বৈশিষ্ট্য।

…                                            …                                           …

এবং এখন আমি প্রাচ্যের পথে, একটি জাহাজের পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে আছি। একটি মন্থর সফর আমাকে এনে পৌছিয়ে দিলো কনস্টঞ্জায় এবং সেখান থেকে এই কুয়াশাচ্ছন্ন প্রভাবে।

কুযাশার পর্দার আড়াল থেকে চোখের সামনে ভেসে ‍উঠলো একটি লাল বাদাম, তারপর তা ঢলে গেলো জাহাজের একেবারে কাছ দিয়ে পাশ কেটে। বাদামটি দেখা গেলো বলে বুঝতে পারলাম কুয়াশা কাটিয়ে সুরুজ উঠি উঠি করছে। কয়েকটি পাণ্ডুর যেনো অনেকটা ধাতুর কাঠিন্য আর কি। তাদেরই চাপে দুধের মতো সাদা জমাট কুয়াশা যেনো ধীরে ধীরে অথচ গা ছড়িয়ে বসলো পানির উপর, তারপর সেগুলি বেঁকে বৃত্তাকারে আলাদা হয়ে গেলো, অবশেষে সুরুজের রশ্নির ডান বাম পাশ থেকে সেগুলি বিস্তৃত ভাসমান রক্তচাপের আকারে উঠতে লাগলো উপরদিকে, পাখার মতো।

‘সুপ্রভাত’। একটি গাঢ়, পূর্ণ কণ্ঠস্বর শোনা গেলো। আমি ঘুরে দাঁড়াই এবং আমর পূর্ব সন্ধ্যার সংগীটির কালো আলখিল্লাটি চিনতে পারি। আরো চিনতে পারি একটি মুখের বন্ধুত্বপূর্ণ সেই স্লিদ্ধ হাসি যা আমাদের কয়েক ঘন্টার পরিচয়ের মধ্যেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি। জেস্যূট পাদরীটি ছিলেন আধা পোল আধা ফরাসী, তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার একটি কলেজে পড়াতেন। ছুটি ভোগ করার পর তিনি আবার তাঁর কর্মস্থানে ফিরে যাচ্ছেন। জাহাজে ওঠার পর আমরা সন্ধ্যাটা কাটিয়েছিলাম অন্তরং আলাপে। যদিও শীগগীরই বুঝতে পারলামে বহু বিষয়েই আমাদের মতের অমিল ব্যাপক, তবে অনেক বিষয়েই আমাদের মধ্যে মিলও রয়েছে; এবং এটুকু বুঝবার  মতো যথেষ্ট বয়সও তখন আমার হয়েছে যে, এমন একজন মানুষ আমার সামনে রয়েছেন যিনি একটা চমৎকার, সিরিয়াস অথচ সুরসিক মনের অধিকারী.. .।

–‘সুপ্রভাত ফাদার ফেলিক্স, সমুদ্দুরের দিকে একটু চেয়ে দেখুন’—

সূর্যোদয়ের সাথে দিবালোক এবং রঙের আবির্ভাব ঘটেছে। আমরা ভোরের হাওয়ার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম জাহাজের গলুই-এর উপর। অসম্ভবের নেশায় মেতে আমি নিজেই চেষ্টা করলাম ঢেউ-এর ওঠা-পড়ার মধ্যে রঙের গতি নির্ধারণ করতে। নীল? সবুজ? ধূসর? রঙটা নীল হতে পারতো, কিন্তু এরি মধ্যে একটা রক্ত-লাল উজ্জ্বল দীপ্তি, যা কাঁপছিলো এবং  যা ছিলো সূর্যেরেই প্রতিফরন, গড়িয়ে গেলো ঢেউ-এর ঢালু উপত্যকার উপর দিয়ে, অথচ ঢেউ-এর চূড়াটি ভেঙে পড়লো বরফের মতো সাদা ফেনপুঞ্জে এবং তার উপর দিয়ে ছুটে গেলো ইস্পাতের মতো-ধূসর, ছিন্ন, কুঞ্চিত বস্ত্রের আকারে। মুহুর্তকাল আগে যা ছিলো একটা ঢেউ এর পাহাড় তা-ই এখন হয়ে উঠেছে একটা স্পন্দনশীল গতি-রূপান্তরিত হলো হাজারো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আলাদা আলাদা ঘূর্ণিপাকে এবং সেইসব ঘূর্ণিপাকের ছায়া-ঢাকা গর্তের মধ্যে, রক্তের মতো লাল রঙটি বদলে গিয়ে হয়ে উঠলৈা গাঢ়, স্লিগ্ধ সবুজ; তারপর সেই সবুজ রঙটি উঠতে লাগলো উপরদিকে এবং রূপান্তরিত হলো কাঁপতে থাকা স্পন্দনময় বেগুনীতে, যা নিম্মগামী হয়ে পয়লা শরাবের মতো লাল হয়ে উঠলো, কিন্তু মুহূর্তকাল পরেই আবার তীব্যবেগে উর্ধ্বগামী হলো আসামনী নীল রঙে, পরিণত হলো ঢেউ-এর চূড়া্য় এবং ভেঙে পড়লো এবং আবার সাদা ফেনপুঞ্জ তার জাল ছড়িয়ে দিলো গড়াগড়ি-যাওয়া পানির পাহাড়গুলির উপর, উদ্ধতভাবে.. . এবং এভাবে এ অনন্ত খেলা চলতেই থাকলো।

রঙের এই খেলা এবং মুহূর্তে  মুহূর্তে এর পরিবর্তনশীল ছন্দ আমি কখনো অনুধাবন করতে সক্ষম হবো না, এ বোধ আমার এমন একটি অস্থিরতা এনে দিলো যা প্রায় এক দৈহিক অনুভূতিই শামিল। বলা যায়, আমি যখন আমার চোকের কোণ দিয়ে অনেকটা লঘুভাবে এর দিকে তাকালাম মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, গোটা ব্যাপারটিকে একটিমাত্র ছবির মধ্যে ধরা হয়তো সম্ভবঃ কিন্তু সতর্কভাবে সজ্ঞান মনোনিবেশ  করতে গিয়ে, যা একটি বিচ্ছিন্ন ধারণাকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন ধারণার সাথে যুক্ত করার এক অভ্যাস বিশেষ, কেবল কতকগুলি ভাঙাচোরা, আলাদা আলাদা ছবিই পাওয়া গেলো, আর কিছু নয়। কিন্তু এই সংকট থেকে, এই অদ্ভুদ বিরক্তিকর বিভ্রান্তির মধ্যেও একদা অত্যন্ত স্পষ্ট ধারণা হলো আমার-কিংবা বলা যায়, সেই মুহর্তে আমার ঠিক এরূপই মনে হলো- এভং আমি প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই স্বগত বলে উঠলামঃ

-‘ যে কেউ এ সমস্তকে তার ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধি করতে পারবে সেই পারবে তার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে।’

-’তুমি কী বলতে চাইছো, আমি জানি’, ফাদার ফেলিক্স জবাব দেন, ‘কিন্তু নিয়তির উপর প্রভুত্ব করার ইচ্ছা মানুষের কেন হবে? দুঃখ –কষ্ট থেকে রেহাই পাবার জন্য? তার চেয়ে কি নিয়তি থেকে মুক্ত হওয়াই উত্তম নয়?’

-‘আপনি তো প্রায় একজন বৌদ্ধের মতোই কথা বলছেন, ফাদার ফেলিক্স! তাহলে কি আপনিও মনে করেন নির্বাণিই সকল জীবরে লক্ষ্য?’

-‘না, না, নিশ্চয় নয়- আমরা খৃশ্চানরা জীবন এবং অনুভূতির বিনাশ চাই না- আমরা কেবল চাই জীবনকে বস্তু আর ইন্দ্রিয়ের এলাকা থেকে আত্মার জগতে উন্নীত করতে।’

-‘কিন্তু তা কি সন্ন্যাস নয়?’

-‘এ সন্ন্যাস নয়, তরুণ বন্ধু সন্ন্যাস নয়! এ-ই একমাত্র পথ প্রকৃত জীবনের.. . শান্তির…’

বসফোরাস প্রাণালী উন্মুক্ত হলো আমাদের সামনে-একটি প্রশস্ত পানি-পথ, যার দু’পাশে  দাঁড়িয়ে আছে শিলাগঠিত পাহাড়। এখানে ওখানে আমি দেখতে পাচ্ছি থামের উপর তৈরি হাওয়া খেলানো দালান-কোঠা, চত্বর-বিশিষ্ট বাগ বাগিচা, রহস্যময় উচ্চতায় জেগে ওঠা সাইপ্রেস বৃক্ষরাজি এবং প্রাচীন জেনিসারী কিল্লাসমূহ, জমাট স্তূপীকৃত শিলা, যা শিকারী পাখীর বাসার মতো ঝুলে আছে পানির উপর। মনে হলো যেনো বহুদূর থেকে এলো ফাদার ফেলিক্সের গলার স্বরঃ

-তুমি ভেবে দেখো-বাসনার … সকল মানুষের বাসনার গভীরতম প্রতীক হচ্ছে- জান্নাতরূপ প্রতীক। তুমি সকল সময়ই দেখতে পাবে, যদিও সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন চিত্রে, তবু তার অর্থ সবসময়ই এক, মানুষ নিয়তির হাত থেকে মুক্ত হতে চায়। জান্নাতে মানুাষের নিয়তি বলে কিছু নেই; মানুষ যখন দেহ আর প্রকৃতির প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করলো এবং এভাবে, আমরা যাকে আদি পাপ বরি সেই পাপ করে বসলো, তখনি এলো নিয়তি। সেই আদি পাপটি কী?- মানুষের পথে বাধাস্বরূপ দেহের যে প্ররোচনা তাতে আত্মার পদস্থলন, আর প্ররোচনাগুলিই হচ্ছে আসলে মানুসের প্রকুতির মধ্যে অবশিষ্ট পশু –স্বভাব। মানুষের সার, মানবিক ও মানবিক-ঐশি অংশ হচেছ কেবল তার আত্মা। আত্মার অভিযাত্রা হচ্ছে আলোর দিকে। কিন্তু আদি পাপের জন্য তার পথ সবসময়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন সব বাধার দ্বারা, যা দেহের হাড় এবং অদৈব গঠন ও তার প্ররোচনাগুলি থেকে উদ্ভুত। তাই খৃশ্চান ধর্মের লক্ষ্য হচ্ছে জীবনের আসার, ক্ষণিক পাশবিক দিক হতে মানুষের নিজের মুক্তি এবং তার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকরে প্রত্যাবর্তন!’

দুমিনার বিশিষ্ট প্রাচীন কিল্লা রুমিলি হিসাব দেখতে পেলাম। এর একটি দেয়াল- কিল্লার ভেতর থেকে দুশমনকে আক্রম্যন করার জন্য যাতে ছিরো অসংখ্য ছিদ্র-নেমে এসেছে প্রায় পনির কিনার পর্যন্ত। তীরে, কিল্লার দেয়ালগুলির দ্বারা তৈরি অর্ধবৃত্তটির মধ্যে একটি ছোট্ট তুর্কি গোরস্তান, যার কবরের পাথরগুলি ভেঙে পড়ে আছে, যেন শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখছে।

-‘তা হতে পারে ফাদার ফেরিক্স, কিন্তু আমার মনে হয় এভং আবার বয়সের অনেকেই এরূপ মনে করে, দেহের গঠনের মধ্যে সার আর অসারেরঃ পার্থক্য নিরূপণে এবং দেহ আর আত্মাকে পৃথক করার মধ্যে কোথায় যেনো একটা ভুল রযে গেছে।… সংক্ষেপে, আমি আপনার মতো সাথে একমত হতে পারছিনা যে, দেহের দাবি, রক্ত-মাংস আর পার্থিব নিয়তির মধ্যে মহৎ পবিত্র কিছুই নেই-আমার কামনার লক্ষ্য অন্যত্র! আমি জীবনের এমন একটি রূপের স্বপ্ন দেখি যদিও আমি স্বীকার করছি, এখানে তা খুব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না-যাতে-গোটা মানুষ, দেহ-আত্মায় মিলে মানুষ, তার সত্ত্বার গভীর হতে গভীরতরো পূর্ণতার জন্য চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাবে, যাতে আত্মা আর ইন্দ্রিয় একে অপরের শত্রু হবে না-যাতে মানুষ যেমন তার নিজের ভেতরের ঐক্য উপলব্ধি করবে তেমনি ঐক্য উপলব্ধি করবে তার নিয়তির তাৎপর্যের সংগে, যাতে করে সে তার জীবনের চূড়ায় পৌছুনোর পর বলতে পারে-‘আমি আমার নিয়তি।’

-‘এ তো হেলনীয় স্বপ্ন’। ফাদার ফেলিক্স জবাব দেন-‘কিন্তু এ স্বপ্নের পরিণতি কী হয়েছিলো? প্রথম ওর্ফিক আর ডায়োনোসিয়ান রহস্যে, তারপর আফলাতুন আর প্লোতিনিয়াসের ভাবধারায়, আর এমনি করে,আবার এই উপলব্ধিতেও যে, দেহ আর আত্মা পরস্পর বিরোধী… দেহের প্রভুত্ব থেকে আত্মার মুক্তি সাধন, এই হচ্ছে খৃশ্চান মুক্তির অর্থ, ক্রুশে আমাদের প্রভুর আত্মোৎসর্গে আমাদের বিশ্বাসের তাৎপর্য.. . ‘এখানে তিনি থামলেনঃ তারপর আমার দিকে এক ঝলক চেয়ে বললেন, ‘দেখো আমি সব সময়ই কিন্তু মিশনারী নই.. আমি যদি তোমাকে আমার বিশ্বাসের কথা বলি, তুমি আমাকে ক্ষমা করো, কারণ এ তোমার বিশ্বাস নয়.. .

-কিন্তু আমর কোনো বিশ্বাসই নেই’, আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি।

-হ্যাঁ, ফাদার ফেলিক্স বলেন, আমি তা জানি, বিশ্বাসের অভাব, বরঞ্চ বলা উচিত বিশ্বাস করার অক্ষমতা- এ হচ্ছে আমাদের জামানার আসল রোগ। তুমি আরো অনেকের মতোই বাস করছো একটি বিভ্রান্তির মধ্যে, যা হাজার বছরের পুরোনো। বিভ্রান্তিটি এই যে, মানুষের চেষ্টা –সাধনার দিক বুদ্ধিই দেখতে পারে। কিন্তু বুদ্ধি নিজে আধ্যাত্মিক জ্ঞান পর্যন্ত পৌছুতে পারে না, কারণ জাগতিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য জ্ঞান একেবারেই মশহুল। বিশ্বাস –কেবল বিশ্বাসই পারে আমাদেরকে এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করতে।

-‘বিশ্বাস? আমি জিজ্ঞাস করি, আপনি আবার এ শব্দটি উল্লেক করলেন। একটি বিষয় আমি বুজতে পারি না, আপনি বলেছেন যে, কেবল বুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞান হাসিল ও সৎ জীবন-যাপন সম্ভব নয়; বিশ্বাসের দরকার-আপনি বলেছেন। আমি আপনার সাথে ষোলো আনা একমত। কিন্তু যার বিশ্বাসই নেই সে কী করে বিশ্বাস অর্জন করবে? এর কোনো পথ আছে কি, অর্থাৎ এমন কোনো পথ যা আমাদের ইচ্ছার জন্য, উন্মুক্ত।’

-কেবলমাত্র ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রিয় বন্ধু। এ পথ কুলে যায় একমাত্র আল্লাহরই রহমতে। তবে, এ পথ সবসময়ই তারই জন্য উন্মুক্ত হয় যে তার অন্তরের অন্তস্থল থেকেই প্রার্থনা করে আলোকের জন্য-দিশার জন্য।’

-‘প্রার্থনা করে? কিন্তু ফাদার ফেলিক্স, মানুষ যখন প্রর্থনা করতে পারে তখন তার বিশ্বাস তো রয়েছেই। আপনি আমাকে একটা বৃত্তের চারদিকে চালাতে চাইছেন-কারণ, কোনো মানুষ যদি প্রার্থনা করে, যার কাছে সে প্রার্থনা করছে তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার প্রত্যয় তো আগে থেকেই রয়েছে। এই প্রত্যয় তার কী করে এলো? তার বুদ্ধির মাধ্যমে? এর অর্থ কি একথা স্বীকার করার শামিল নয় যে, বুদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন অসম্ভব? তা বাদ দিলেও এমন কারো কাছে রহমতের কী অর্থই বা হতে পারে যার এ জাতীয় কোনো অভিজ্ঞতা নেই?

পাদ্রিটি তাঁর কাঁধ ঝাঁকুনি দিলেন অনুশোচনার সংগে, আমার তাই মনে হলো। কেউ যদি নিজে আল্লাহকে উপলব্ধি করতে না পেরে থাকে তার উচিত অন্যদের অভিজ্ঞতার দ্বারা পথ চলার জন্য তৈরি থাকা, এমন সব লোকের অভিজ্ঞতার দ্বারা যাঁরা তাঁকে উপলব্ধি করেছেন.. .

……                    .. .                  .. .

কয়েকদিন পর আমরা নামলাম আলেকজেন্দ্রিয়ার সেদিন বিকালেই আমি ফিলিস্তিন রওনা হই।

ট্রেন সোজা তীর বেগে ছুটে চললো সেই বিকালভর, মোলায়েম আর্দ্র, ব-দ্বীপের দৃশ্যগুলি পাড়ি দিয়ে। পথে পড়লো নীলনদ থেকে নেয়া নহরসমূহ-বহু আঁধা-বোটের বাদামের ছায়ায় ছায়ায় ঢাকা শহর। দেখতে দেখতে পেছনে হারিয়ে গেলো ছোটো ছোটে বহু শহর; সারি সারি ধূলায় ধূসর ঘরবাড়ি এবং হালকা মিনারসব। বাক্সের মতো দেখতে মাটির কুটির নিয়ে গড়ে ওঠা গাঁয়ের পর গাঁ ছুটে গেলো পেছনদিকে। ফসল তুলে নেয়া কার্পাসের জমি, অংকুর গজানো আখের ক্ষেত; মোটা-সোটা মোষ এখন ঘরে চলেছে রাখাল ছাড়াই, সারাদিন কাদায় ভর্তি ডোবাতে গা ডুবিয়ে তাকার পর –এমনি কতো দৃশ্য চোখে পড়তেই পড়তেই আবার হারিয়ে যেতে লাগলো পেছনে। দূরে দেখতে পেলাম লম্বা জোব্বা পরা মানুষ – মনে হলো ওরা যেন ভেসে চলেছে-এমনি পরিষ্কার স্বচ্ছ ছিলো হাওয়া, সুউচ্চ নীল, যেনো কাঁচ –নির্মিত আসমানের নীচে। খালগুলির তীরে তীরে নল-খাগড়া নুয়ে পড়েছে বাতাসের ধাক্কায়; কালো রঙের সূক্ষ্ণ রেশমের পোশাকপরা রমণীরা ওদের মাটির কলসীতে পানি ভরছেঃ অদ্ভুদ সুন্দর সব রমণী, তন্বী, কআর দীঘাংগী, তওদের হাঁটা দেখে মনে হলো লম্বা লম্বা শাখাবিশিষ্ট গাছপালার কথা, যারা মৃদুভাবে আন্দোলিত হয় বাতাসে অথচ শক্ত মজবুত! তরুণী এবং মায়েরা-সকলেই হাঁটছে এমনি ভেসে ভেসে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তারপর তা বয়ে চলে, বিশাল, বিশ্রাম-নেয়া কোনো প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। হালকা-পাতলা গড়নের পুরুষেরা হেঁটে চলেছে বাড়ির দিকে তাদের জমি থেকে, আর মনে হচ্ছে ওরা যেন একেকটি বিশাল পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে- আর একই সংগে এ-ও মনে হলো-ধীরে ধীরে মিলিয়ে দিনের থেকে ওদের যেনো তুলে নেয়া হয়েছে। মনে হলো, ওদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপেরই যেনো একেকটা নিজস্ব অস্তিত্ব আছে-নিজেতেই নিজে সম্পূর্ণ একেকটি পদক্ষেপ-চিরন্তর, আর চিরন্তনের মধ্যে সবসময় কেবল ঐ একটি পদক্ষেপেই তো আছে। এই যে হালাক স্নিগ্ধতার ভাব-হয়তো এর মূলে রয়েছে নীল-বদ্বীপের মাদকতাময় সান্ধ্য আলো অথবা হয়তো অতো-সব নতুন জিনিস দেখার পর আমরাই নিজের চঞ্চলতা; কিন্তু কারণ যাই হোক, হঠাৎ আমি আমার নিজের ভেতরে অনুভব করলাম, ইউরোপের ভারঃ আমাদের সকল কাজে ইচ্ছাকৃত উদ্দেশ্যের ভার। আমি নিজে নিজে ভাবলাম, আমাদরে জন্য সত্যের সাথে সাক্ষাৎ কী কঠিন! সবসময়ই আমরা চেষ্টা করে চলেছি একে হাতের মুঠায় ধরার জন্য.. . কিন্তু সত্য হাতে ধরা দিতে রাজী নয়। কেবল যেখানে সত্য মানুষকে অভিভূত করে সেখানেই তা আত্মসমর্পণ করে মানুষের কাছে।

মিসরীয় ক্ষেত-মজুরের পদক্ষেপ, যা এরি মধ্যে হারিয়ে গেছে দূরে, অন্ধকারে, আমার মনের ভেতরে দোল খেতে থাকে মহৎ সমস্ত কিছুর জন্য প্রশংসা করা একটা সংগীতের মতো।

আমরা সুয়েজ খালে এষে পৌছুই এবং একটি সমকোনের মতো হঠাৎ মোড় ফিরি আর কিছুক্ষনের জন্য ধূসর কালো তীর  বেয়ে উত্তরকে চলতে টেনে বের করা একটি সুর।জোছনা মেখে খালটি রূপান্তরিত হয়েছে একটি সত্যিকার অথচ স্বপ্নের প্রশস্ত রাস্তায়-যেনো ঝকঝকে ধাতুর একটি গাঢ় বন্ধনী! তুপ্ত, ক্লান্ত, নীল উপত্যকার মাটি এক বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে বালিয়াড়ির পর বালিয়াড়ি গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে! এই বালিয়াড়িগুলি খালের দুতীরকে অমন একটি অস্পষ্টতা আর তীক্ষ্ণতার দ্বারা ঘিরে রেখেছে যা রাতের অন্য ল্যাণ্ডস্কেপে ক্বচিৎ দেখা যায়। নিবিষ্ট নীরবতার মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে আছে একেকটা ড্রেজারের কংকাল। ওদিকে, অপর পারে ছুটে চলেছে এক উট চালক, ছুটে চলেছে প্রায় অদৃশ্যভাবে, আর এরি মধ্যে তাকে গ্রাস করে ফেলেছে রাত্রি … কী বিশাল সহজ স্রোতঃ লোহিত সাগর থেকে তোতো হ্রদ হয়ে ভূমধ্যসগার পর্যন্ত.. . সোজা এক মরুভূমির মধ্য দিয়ে, যাতে করে, ভারত মহাসাগর আছাড় খেয়ে পড়তে পারে ইউরোপের অবতরণ স্থলগুলিতে।.. .

কাস্তারায় কিছুক্ষণের জন্য ট্রেন সফরের পড়ে এবং একটি অলস মন্থর ফেরি মুসাফিরদের নিয়ে যায় ওপারে, নীরব নিস্পন্দ খাল পাড়ি দিয়ে। ফিলিস্তিনের ট্রেন ছাড়ার তখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমি ষ্টেশন ঘরের সামনেই বসে পড়ি। বাতাস গরম ছাড়ার তখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমি ষ্টেশন ঘরের সামনেই বসে পড়ি। বাতাস গরম আর শুকনা। আমার ডানে মরুভূমি, বামে মরুভূমি-একটানা কাঁপা-কাঁপা ধূসরতা, এখানে ওখানে দাগ বুলানো, আর কোনো জন্তুর বিচ্ছিন্ন ডাকে বিঘ্নিত-হয় শিয়াল না হয় কুকুরের ডাক। উজ্জ্বল কার্পেটের কাপড়ে তৈরি ভারি বস্তা নিায়ে একটি বেদুঈন উঠে এলো ফেরি থেকে এবং আগিয়ে গেলো দূরে একটি দলের দিকে- আর এই মাত্র আমি দেখতে পেলাম, ওরা কতকগুলি নিশ্চল মানুষ আর হাঁটু-গেড়ে বসে পড়া কতকগুলি উট, পিঠে বোঝা চাপিয়ে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি। মনে হলো, ওরা যেন বেদুঈনটির আসার ইন্তেজারিতে ছিলো। বেদুঈনটি তার বস্তাগুলি একটি উটের পিঠে রেখে দেয় ধপ করে; গোটা কয়েক কথার আদন-প্রদান হয়, তারপর সামনের পা –এর উপর, সওয়ারীরা দাঁড়িয়ে যায়, পয়লা পেছনের পা-এর উপর, তারপর সামনের পা-এ উপর, সওয়ারীরা সামনে-পেছনে দুরতে থাকে- তারপর তারা মোলায়েম শপশপ আওয়াজ তুলে উট হাঁকিয়ে রওনা করে দেয় এবং অল্পক্ষনের জন্য আমার চোখ অনুষরণ করেঃ বিলীয়মান পণ্ডগুলির দোল খাওয়া হালকা রঙের শরীর এবং চওড়া, বাদামী ও সাদা ডোরাওয়ালা বেদুঈন পোশাক।

একটি রেল মজুর আমার দিকে আগিয়ে এলো। ওরা গায়ে একটি নীল রঙের ওভারকোট, আর মনে হলো, লোকটি খোঁড়া। সে আমার সিগারেট থেকে ওর নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিলো এবং ভাঙা ভাঙা ফরাসীতে আমাকে জিজ্ঞাস করলো,“আপনি জেরুজালেম যাচ্ছেন’? যখন আমি বললাম ‘হ্যাঁ’, সে আবার জিজ্ঞাস করে, ‘প্রই প্রথমবার’?

 আমি কথা নেড়ে সায় দিই। সে চলে যাবার উদ্যোগ করছিলো, পরে আবার আমার দিকে ফিরে বসলো- ‘আপনি কি ওখানে সিনাই মরুভূমি থেকে আসা বড়ো কাফেলাটি দেখেছেন? দেখেন নি? তাহলে আসুন আমার সাথে, ওদের সাথে দেখা করি গিয়ে। আপনার হাতে সময় আছে এখনো।

একটা নীরব শূন্যতার মধ্য দিয়ে, একটা সংকীর্ণ বহু-ব্যবহৃত রাস্তা ধরে আমরা আগাতে থাকি। আমাদের জুতার তলা বালুতে ডুবে যায়। রাস্তাটি গিয়ে পৌছুছে বালিয়াড়িগুলি পর্যন্ত। আঁধারে একটি কুকুর ডেকে ওঠে। ছোটো ছোটো কাঁটা-বনের মধ্যে হোঁচট খেতে খেতে আমরা যাখন আগাচ্ছিলাম, আমার কানে ভেসে এলো বহু কণ্ঠস্বর-অস্পস্ট, এলোমেলো, চাপা, যেনো বহু মানুষের গলার আওয়াজ; আর, মরুভূমির শুকনা বাতাসের সাথে মিশে এলো বহু বিশ্রামরত জন্তুর উগ্র অথচ মোলায়েম গন্ধ। হঠাৎ যেমন আমরা কুয়াশা-ঢাকা রাতে শহর-বন্দরে কখনো কখনো দেখতে পাই, রাস্তার প্রান্তে এখনো অদৃশ্য কোনো প্রদীপের আলোর কাঁপুনি, যা কেবল কুয়াশাকেই উজ্জ্বল করে তোলে-একটা চিকন আলোর শিখা নীচ থেকে উঠরো উপরদিকে, -যেনো মাটির নীচে থেকে উঠেছে েএবং সোজা আঁধার হাওয়া ভেদ করে উঠছে উর্ধ্বে। এ হচ্ছে একটি আগুনের দীপ্তি যা উঠে এসেছে বালিয়াড়ি দুটির মধ্যকার গভীর খাদ থেকে, পথটি ঘন কাঁটাবনে এমনি আচ্ছন্ন যে আমি তার তলা দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি এখন মানুষের আওয়াজই কেবল শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু যারা কথা বলছে তাদের এখনো দেখতে পাচ্ছি না। আমি শুনতে পেলাম উটের নিশ্বাষের আওয়াজ এবং সেই সংকীর্ণ পথে কেমন করে ওরা একে অপরের সাথে গা ঘষছে, তারি শব্দ। মানুষের একটি বিশাল কালো ছায়া পড়ে আলোটির উপর, ছুটে যায় বিপরীতদিকের ঢালুর দিকে, তারপর আবার নীচের দিকে নেমে আসে। আরো কয়েক পা আগানোর পর সমস্ত কিছু দেখতে পেলাম- হাঁটু ভেঙে একটি বড়ো বৃত্তের আকারে জামিনের উপর বসে আছে অনেকগুলি উট, এখানে ওখানে স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে জিনের পাশে বাঁধা থলে ও বস্তা-এবং সে-সবের মধ্যে কতকগুলি মানুষের মূর্তি! জন্তুগুলির গন্ধ শরাবের মতোই মিষ্টি আর গাঢ় যেনো। কখনো কখনো একেকটি উপ তার গা নাড়ে, যার আকৃতি চারপাশের আঁধারের দরুন বোঝা যাচ্ছে না, তারপর সে ঘাড় তোলে এবং নাকে একটা শব্দ করে রাতের বায়ূতে শ্বাস নেয়; মনে হলো যেনো দীর্ঘশ্বাস ফেলছেঃ এভাবে আমি জীবনে প্রথম শুনলাম উটের দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ। একটি ভেড়া আস্তে আস্তে ডাকছে-একটা কুকুর গরগর করে উঠছে এবং সেই সংকীর্ণ পথটির বাইরে রাত সর্বত্রই অন্ধকার আর তারকাহীন।

এরি মধ্যে দেরি হয়ে গেছে। আমাকে ষ্টেশনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আমি খুবই ধীরে ধীরে আগাতে থাকি সেই পথ দিয়ে, যে পথ দিয়ে আমরা এসেছিলাম- হতবুদ্ধি এবং বিস্ময়করভাবে বিচলিত-যেনো অমন একটি রহস্যজনক অভিজ্ঞতায় আমি হতবুদ্ধি এবং বিচলিত যা আমার হৃদয়ের একটি কোণকে আচ্ছন্ন করেছে এবং আমাকে আর যেতে দেবে না! ট্রেন আমাকে নিয়ে যায় সিনাই মরুভূমির মধ্য দিয়ে। মরুভূমির রাতের ঠাণ্ডা, আর ঢিলা বালুর উপর বসানো রেল লাইনের উপর দিয়ে চলা গাড়ীর ধাক্কা আর ঝাঁকুনিতে আমি ক্লান্ত, নির্ঘুম। আমার উল্টা দিকে বসেছে এক বেদুঈন, তামাটে রঙের বিশাল আবায় গায়ে দিয়ে। সেও ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলো-পাগড়ির কাপড় দিয়ে সে ঢেকে নিায়েছে মুখ। পায়ের উপর পা রেখে সে পদ্মাসন করে বেঞ্চির উপর বসেছে, আর তার কোলের উপর পড়ে আছে রূপার কাজ করা খাপে ঢাকা একটা বাঁকা তলোয়ার। প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। বাইরে বালিয়াড়ির আর ক্যকটাস বনের রূপরেখা দেখতে পাচ্ছি আমি।

এখনো আমার মনে পড়ছে কেমন করে সেদিন ভোর হয়েছিলো-ধূসর কালো ছবি এঁকে, ধীরে ধীরে রূপরেখা অংকন করে- এবং কেমন করে তা বালিয়াড়িগুলিকে অন্ধকার থেকে তুলে তৈরি করছিলো কতকগুলি জমাট স্তূপ-বিশার এবং সাঞ্জস্যপূর্ণ। ক্রমে ফুটে-ওঠা আধো আলোতে দেখতে পেলাম কতকগুলি তাঁবু, দেখতে দেখেতে সেগুলিও হারিয়ে গেলো পেছনে এবং তার নীচে দেখলাম, বাতাসে ছড়ানো কুয়াশার জালের মতো জেলেদের জাল, দূরে দূরে গাড়া খুঁটির সংগে বেঁধে মাটির উপর ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে শুকানোর জন্যঃ মরুভূমিতে মাছ ধরার জাল, ভোরের বাতাসে দুলছে, যেনো স্বপ্নের পর্দা দিন আর রাত্রির মধ্যে, স্বচ্ছ, অবাস্তব।

ডানদিকে মরুভূমি- বাঁদিকে সমুদ্দুর। সমুদ্দুরের উপকূলে দেখলাম একাকী এক উট চালককে। সম্ভবত সে সারারাত উটের উপর সওয়ার ছিলো। মনো হলো, এখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে গাদির উপর গা এলিয়ে দিয়ে-এবং ওরা দুজনে, উট চালক এবং উট, উভয়ই দোল খাচ্ছে একই ছন্দে। আবার নজরে পড়ে বেদুঈনদের কালো তাঁবু; মেয়েরা এরি মধ্যে তাঁবু থেকে বের হয়ে পড়েছে মাটির কলস মাথায় নিয়ে কুয়াতে যাবার জন্য তৈরি হয়ে। আধো-আধো আলো স্পষ্টতরো হয়ে উঠছে আর সেই আলোর মধ্যে জেগে উঠছে একটি সুস্পষ্ট জগৎ যেনো অদৃশ্য তাগিদে চালিত হয়ে-যা কিছু সহজ সরল এ বিস্ময় যেনো তারি থেকে উদ্ভুত এবং এর যেনো শেষ নেই!

স্থূল থেকে স্থূলতরো রশ্মিতে সূর্য ছড়িয়ে পড়ছে বালুরাশির উপর আর ভোরের ধূসরাত বিস্ফুরিত হলো নারাংগি-সোনালি বর্ণের আতশবাজি হয়ে। আমরা ছুটে চলেছি আল আরশি নামক ওয়েসিসে মধ্যে দিয়ে। দুপাশের সারি সারি পাম তরু, পাম শাখা হাজার হাজার সূক্ষ্ণগ্র বর্শার মতো দাঁড়িয়ে আছে দু’ধারে আলোছায়ায় সৃষ্টি হয়েছে বাদামী –সবুজ জালির যেনোঃ এরি মদ্যে ছুটে চলেছি আমরা। আমি দেখতে পেলাম, একটি মেয়ে, মাথায় একটি ভরা কলসী চাপিয়ে ফিরে আসছে কুয়া থেকে, তারপর পাম গাছের নীচে দিয়ে চলা একটি পথ ধরে আগাচ্ছে। মেয়েটির পরনে লাল আর নীল মেশানো একটি পোশাক, লম্বা তার ঝুল-মনো হলো, ও যেনো উপকথার এক সম্ভ্রন্ত রমণী!

আল-আরিশের পাম বাগিচা যেমন আকস্মিক নজরে পড়লো তেমনি দ্রুত তা আড়াল হয়ে গেরো চোখের। এখন আমরা সফর করছি শাঁখ-রঙ আলোর ভিতর দিয়ে। বাএর কাঁপতে থাকা জানালার সার্শিগুলি, ওপাশে অমন একটা নীরবতা জেঁকে আছে যা আমি কখনো সম্ভব বলে ভাবতেও পারিনি। যতো রূপ আর গতিবিধি  নজড়ে পড়লো, মনো হলো কোনোটিরই যেনো গতকাল বা আসছে কাল বলে কিছু নেই, ওগুলি যেনো ওখানেই জমানো রয়েছে ইচ্ছাকৃত অনন্যতায়। দেখতে পেলাম নরম মোলায়েম বালু, বাতাস সেই বালুকে রূপান্তরিত করেছে নরম নরম বালু-টিলায়, যা সূর্যের নীচে খুব পুরোনো পার্চমেন্টের মতোই দীপ্তি পাচ্ছে স্নান কমলালেবুর রঙে-তবে, পার্চমেন্টের চাইতে কিছুটা নরম কেবল, আর ভাঙতি ও বাঁকুগুরিতে তা কম ভঙুর-টিলার চূড়ায় চূড়ায় বারু আঘাত করছে, বীণাযন্ত্রে তীক্ষ্ণ সুনির্দিষ্ট আঘাতের মতো, টিলাগুলির পার্শ্বদেশ অপরিসীম কোমল, যার অগভীর গর্ত ও ভাঁজগুলিতে পড়েছে স্বচ্ছ জল রঙ ছায়া-রক্তবর্ণ, হালকা নীল, রক্তিমাত, আর মর্চের মতো ফ্যাকাশে লাল রঙ। দুধের মতো উজ্জ্ব সাদা মেঘ, এখানে ওখানে ক্যাকটাস ঝোঁপ এবং কখনো লম্বা শাখাবিশিষ্ট শক্ত ঘাস নজরে পড়লো। দু-একবার আমি দেখলাম হালকা-পাতলা খালি পা বেদুঈনদেরকে এবং পাম শাখা বোঝাই এক উটের কাফেলাকে, যা তারা এক জায়গা থেকে নিয়ে চলেছে আরেক জায়গায়। মহৎ প্রাকৃতিক দৃশ্যে আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি!

কয়েকবারই আমরা থামি ছোটো স্টেশনগুলিতে, যা সাধারণত কাঠ আর টিনের তৈরি কতিপয় ব্যারাক ছাড়া আর কিছুই নয়। তামাটে রঙের, ছেঁড়া কাপড় পরা ছেলেরা ঝুড়ি নিয়ে ছুটাছুটি করছে, জলপাই, পুরা সিদ্ধ আণ্ডা আর মাছ এবং চেপটা আটার পাউরুটি বিক্রির জন্য হাঁকছে। আমার বিপরীতদিকে যে বেদুঈন বসেছিলো সে তার মাথার পাগড়ি খুলে পরে জানালাটা খুলে দিলো। তার মুখখানা পাতলা, বাদামী, তীক্ষ্ণ-সেই বাজপাখীর মুখ,যা সব সময়ই নিবিষ্টভাবে চেয়ে থাকে সামনের দিকে। সে একটি কেক কেনে এবং মোড় ফিরে বসার উপক্রম করে; এমন সময় তার নজর পড়ে আমার উপর এবং কোনো কথা না বলেই সে কেকটি ভেংগে দুটুকরা করে অর্ধেকটা আমার দিকে আগিয়ে দেয়। কিন্তু ও যখন দেখরো আমি ইতস্তত ও বিস্ময় বোধ করছি, ও হেসে ফেললো এবং আমি দেখতে পেরাম সেই কোমল হাসিটি তার মুখে এবং তার মুহূর্তকাল আগেকার অভিনিবেশেরর সাথে মানিয়েছে চমৎকার; সেই কোমল হাসি হেসে সে অমন একটি শব্দ উচ্চারণ কররো যা তখন আমি বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝতে পারি; সে বললো ‘তফদ্দল’- ‘আমাকে অনুগৃহীত করুন’। আমি কেকের টুকরাটি নিলাম এবং মাথা নেড়ে তাকে ধন্যবাদ জানালাম।আরেকজন মুসাফির, তার মাথায় একটি লাল ফেজ টুপি, এ ছাড়া তার বাকী সক কাপড়-চোপড়ই ইউরোপীয়, মনে হলো লোকটি একজন ছোটো- খাটো ব্যবসায়ী, অযাচিতভাবে সে দোভাষীর দায়িত্ব গ্রহণ করলো। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে বললো-

-‘সে বলে,তুমি মুসাফির, সে-ও মুসাফির। তার পথ এবং তোমার পথ একই।’

এখন যখন আমি সেই ছোটো ঘটনাটির কথা ভাবি, আমার মনেহয়, আরব চরিত্রের প্রতি আমার পরবর্তী সকল প্রেমের মূলে হয়তো পড়েছে এরি প্রভাব। কারণ, এই যে, বেদুঈনটি অপরিচয়ের অতো সব বাধা সত্ত্বেও সফরে এক আকস্মিক সহাযাত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব উপলব্ধি করেছে-এবং তার সংগে রুটি ভাগ করে খেতে চাইছে, তার আচরণে আমি এরি মধ্যে এক ভারমুক্ত মনুষ্যত্বের বিশ্বাস ও পদক্ষেপ অবশ্যি অনুভব করে থাকবো!

এর কিছুক্ষণ পরেই পথে পড়লো পুরোনো গাজা শহর, যেনো একটা মাটির কিল্লা, তার বিস্তৃতত জীবন কাটাচ্ছে একটি বালু-পাহাড়ের উপর, ফণিমনসার প্রাচীরের মধ্যে। আমার বেদুঈন সংগীটি তার বোঝার থলেগুলি জমা করে গম্ভীর হাসির সাথে আমাকে সালাম জানালো, তারপর ঘাটির উপর লুটিয়ে পড়া কাপড়ের প্রান্ত দিয়ে বালুতে ঝাড়ু দিতে দিতে গাড়ী থেকে নেমে পড়লো। বাইরে প্লাটফর্মে আরো দুজন বেদুঈন দাঁড়িয়েছিলো, ওরা তার সাথে হাত মোসাফা করে এবং তার দু’গালে চুমু খেয়ে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়।

ইংরেজি বোলনেওয়ালা ব্যবসায়ীটি তার হাত রাখলো আমার বাজুর উপর, বললো ‘আমার সাথে আসুন। এখানে পনেরো মিনিট সময় আছে।’

স্টেশন ঘরের ওপাশে একটি কাফেলা তাঁবু খাটিয়েছে। আমার সাথী আমাকে জানালো-ওরা উত্তর হিজাযের বেদুঈন, ওদের মুখমণ্ডল বাদামী রঙের, ধূলি-ধূসর, আর বুনো আবেগে উত্তপ্ত। আমাদের বন্ধুটি গিয়ে দাঁড়ালো ওদের মাঝে। মনে হলো, ও বেশ কিছুটা মান্যগণ্য ব্যক্তি, কারণ ওরা সবাই ওকে ‍ঘিরে অর্ধ-বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেলো এবং ওর প্রশ্নাদির জবাব দিতে লাগলো। ব্যবসায়ীটি ওদের সাথে কথা বলে। তখন ওরা আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আমাদের শহরে জীবনের কথা ভেবে ওরা বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে.. . আমার মনে হলো, কতকটা গর্বিত উন্মসিকতার সংগেই যেনো আমাদের দিকে তাকালো। ওদেরকে ঘিরে রয়েছে একটি আযাদীর পরিবেশ, একটি মুক্ত আবহাওয়া। ওদের জীবনকে বুঝবার জন্য আমার মনে একটা তীব্র খায়েশ জাগলো। বাতাস শুকনা ও শিহরণ-জাগানো; মনে হলো, শরীর ভেদ করে যেনো সে বাতাস আমার ভেতর ঢুকছে। এই আবহাওয়ায় যেনো সমস্ত কাঠিন্যের গেরো খুলে যায়, সমস্ত চিন্তা হয়ে পড়ে এলোমেলো, অলস আর নিশ্চল! এর মধ্যে অমন একটা সময়হীনতা রয়েছে, যাতে প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রত্যেকটি ধ্বনি, প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রত্যেকটি ধ্বনি, প্রত্যেকটি ঘ্রাণ একেকটি সুনির্দিষ্ট নিজস্ব মূল্যের রূপ ধারণ করে। ক্রমে আমার এ উপলব্ধি হলোঃ মরুভূমির পরিবেশে যেসব বেদুঈন বাস করে তারা জীবনকে নিশ্চয়ই অন্য সকল অঞ্চলের মানুষের চেয়ে একেবারে আলাদভাবে দেখে, অনুভব করে; যে-সব অরসেসন ও স্বপ্ন অধিকতরো ঠাণ্ডা ও সম্পদশালী অঞ্চলের বাসিন্দাদেরই বৈশিষ্ট্য, ওরা নিশ্চয়ই সেগুলি থেকে মুক্ত এবং সম্ভবত বহু স্বপ্ন থেকেও, এবং নিশ্চয়ই তাদের বহু রুটি থেকেও! ওরা যেহেতু ওদের নিজের অনুভূতিরই উপর অন্তরংগতরোভাবে নির্ভর করে, তাই ঐ সব মরুবাসী অবশ্যি জাগতিক সকল বস্তুর জন্যই স্থির করে সম্পূর্ণ আলাদা মূল্যমান।

হয়তো এ ছিলো আমার নিজের জীবনেরই ভাবী বিপ্লবের পূর্বাভাস-যা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো এক আরব দেশে, সেই পয়লা দিনটিতে বেদঈনদের দৃশ্যে, -এমন এক জগতের পূর্বাভাস, যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় অমন কোনো সীমা নেই, অথচ যা রূপহীন নয়ঃ যে জগত নিজেতেই নিজ পূর্ণ-এবং তা সত্ত্বেও, সবদিক দিায়েই উন্মুক্তঃ এমন এক জগৎ যা কিছুদিন পরেই হয়ে উঠলো আমার নিজের জগৎ! একথা ঠিক নয় যে, ভবিষ্যতে আমার ভাগ্যে কী রেখেছে সে সম্বন্ধে আমি তখন সচেতন ছিলাম; নিশ্চয়ই নয়। বরং এহচ্ছে সেই অনুভূতি যখন আ্পনি, জীবনে পয়লা এক অপরিচিত বাড়িতে ঢোকেন এবং অর্ধ পথে একটি অনির্দেশ্য গন্ধে আপনাকে অস্পষ্ট আভাস দেয়, যা- কিচু সে ঘরে ঘটবে সে সবের- যা ঘটবে আপনাকেই কেন্দ্র করে এবং সেগুলি যাদি আনন্দের হয়, আপনি অনুভব করবেন আপনার হৃদয় যেনো আকস্মিক হর্ষের ছুরিতে বিদ্ধ হয়েছে-এবং এসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক-অনেক পরেও আপনার তা মনে পড়বে এবং আপনি মনে মনে বলবেন, আমি তো বহু আগে, ঠিক এভাবেই-অন্য কোনো রূপে নয়, এ সমস্তের আভাস পেয়েছিলাম সেই হল ঘরে, সেই পয়লা মুহূর্তেই-সেই পয়লা মুহূর্তেই!

দুই

মরুভূমির উপর দিয়ে বয়ে যায় তীব্র হাওয়া, আর মুহুর্তের জন্য জায়েদ ভাবে, আমরা আরেকটা বালু- ঝড়ের সম্মুখীন হতে চলেছি। বালু-ঝড় এলো না বটে, কিন্তু হাওয়া আমাদেরকে রেহাই দিলো না-আমাদেরকে অনুসরণ করতে লাগলো নিয়মিত দমকা বায়ুর রূপে এবং আমরা যখন এক বালু উপত্যকায় নামি তখন সেই বাতাসের ঝাপটাগুলি এক হয়ে বয়ে যেতে লাগলো এক নিরবচ্ছিন্ন শন শন ধ্বনিরূপে। উপত্যকার মাঝখানটাতে পাম গাছে ভরা একটি গাঁ, কটি আলাদা বস্তি নিয়ে আর প্রত্যেকটি বস্তি মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা-গাঁটি ঘূর্ণি বায়ূতে উড়ানো ধুলা-বালুতে প্রায় ঢাকাই পড়ে গেছে।

এলাকাটি যেনো বাতাসের একটি গুহাঃ হররোজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বায়ু এখানে তার সবল ডানা দিয়ে ক্রমাগত ঝাপটা মারে, রাতের বেলা চুপ করে থাকে এবং পরদিন আবার নতুন শক্তি নিয়ে জেগে ওঠে। বাতাসের এই বিরামহীন আঘাতে নুয়ে –পড়া পাম গাছগুলি যতোটুকা উচু হওয়া উচিত ততো উচু হতে পারে না,-বাধাগ্রস্তই থেকে যায়, জমিনের কাছাকাছি চারদিকে শাখা প্রসারিত করে। এসব পাম গাছের জন্য সবসময়ই রয়েছে চারিদিকে আগিয়ে আসা বালিয়াড়ির ভয়। প্রতেকটি মেওয়া বাগিচার চারপাশে গাঁর লোকেরা সারি সারি তামারিস্ক না লাগালে গা’টি অনেক আগেই  বালুতে ডুবে যেতো।  এই লম্বা গাছগুলির প্রতিরোধ- ক্ষমতা পাম গাছের চাইতে বেশি। এ সব গাছ, বস্তিগুলির চারপাশে তাদের মজবুত কাণ্ড এবং মর্মর-ধ্বনি  জাগানো চিরহরিৎ শাখা দিয়ে তৈরি করে একটা জীবন্ত দেয়াল আর ওদেরকে দেয় একটা অনিশ্চিত নিরাপত্তা।

আমরা গাঁ’ ‘আমিরে’র মাটির ঘরের কাছে অবতরণ করি- ইচ্ছাঃ বিকালের এই গরমে এখানে আমরা একটু বিশ্রাম নেবো। মেহমানদের অভ্যর্থনার জন্যে যে ‘কাহওয়া’ নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে তা উন্মুক্ত এবং তাতে রয়েছে দারিদ্রের চিহ্ন। কফি জ্বাল দেয়ার পাথুরে চুলার সামনে রয়েছে কেবল একটি খড়ের মাদুর। কিন্তু স্বভাবতই আরবের মেহমানদারির কাছে সব রকমের দারিদ্রই হার মানে- কারণ, মাদুরের উপর আমরা বসতে না বসতেই চুলায় ডালপালা গুঁজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো; সদ্য-ভাজা কফির দানাগুলি তামার যে হামানদিস্তার গুঁড়া করা হচ্ছে তার ঝনঝন শব্দ কামরাটাকে দেয় একটা বাসের উপযোগী বৈশিষ্ট্য; আর সমস্ত বড়ো একটা থালায় স্তূপীকৃত হালকা বাদামী রঙের  খেজুর ক্ষুধা দূরে করে মূসাফিরদের।

আমাদের মেজবান ছোট্ট হালকা-পাতলা এক বৃদ্ধ, বেতো, মিটমিটে চোখ, গায়ে কেবল একটি সূতী কাপড় আর মাথায় পাগড়ি- আমাদেরকে এতে শরীক হওয়ার জন্য আহবান করেনঃ

-‘আল্লাহ আপনাদের হায়াত দরাজ করুন। এ বাড়ি আপনাদের বাড়ি। আল্লাহর নামে খান। আমাদের কেবল এ-ই আছে’- আর তিনি তাঁর হাত দিয়ে একটি ওজরখাহীর ভংগি করেন, একটি মাত্র ভংগি- আর তার ভাগ্যের সমস্ত ভার ব্যক্ত হয় মানুষকে সম্বোধন করার সেই অকৃত্রিম শক্তিতে, যা সেইসব জাতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যারা সহজ অনুভূতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখে জিন্দেগী ওজরান করে- তবে খেজুরগুলি মন্দ নয়, খান হে মুসাফিরেরা, আমাদের সাধ্যমতো যা দিতে পারছি,,,,,,।‘

সত্যি, আমি জীবনে যতো উৎকৃষ্ট খেজুর খেয়েছি এ খেজুর তারি মধ্যে গণ্য হবার যোগ্য আর আমাদের মেজবানও স্পষ্টই খুশি আমাদের খিদায়, যা তিনি মেটাতে সক্ষম! তিনি আবার শুরু করেনঃ

-‘বাতাস…. বাতাস…. আমাদের জীবনকে এ করে তোলে কঠোর, কষ্টময়; কিন্তু আল্লাহরই মর্জি! আমাদের গাছ-গাছড়াগুলিকে ধ্বংস করে দেয় বাতাস। এগুলি যাতে বালূতে ঢাকা না পড়ে এজন্য হামেশাই আমাদেরকে লড়াই করতে হয়। অবশ্য সব সময়ই যে এমনটি ছিলো তা নয়। আগেকার দিনে এতো বাতাস এখানে ছিল না, আর তখন গাঁ’টা ছিলো বড়ো আর সমৃদ্ধিশালী। কিন্তু এখন গাঁ’টা ছোটো হয়ে গেছে। আমাদের তরুণদের অনেকেই এখান থেকে চলে যাচ্ছে- কারণ, সবাই এ ধরনের জীবন বরদাশত করতে সক্ষত নয়। দিনে দিনে বালূ ক্রমেই চারদিকে ঘেরাও করে ফেলছে আমাদেরকে। বেশি দিন নেই যখন আর এ পাম গাছগুলির জন্য কোনো জায়গাই থাকবে না। এই বাতাস…. কিন্তু আমরা নালিশ করি না। আপনারা জানেন নবী- তাঁর উপর আল্লাহর রহমত হোক- আমাদেরকে বলেছেন- ‘আল্লাহ বলেন, নিয়তিকে তিরস্কার করো না, কারণ জেনে রাখো আমিই নিয়তি….।

খুব সম্ভব  আমি চমকে উঠেছিলাম- কারণ বৃদ্ধ তাঁর কথা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগের সাথে তাকালেন আমার দিকে, যেনো আমি কেন চমকে উঠেীছ তা বুঝতে পেরে তিনি স্মিত হাসলেন। অনেকটা যেনো রমণীর মুখের হাসি- সেই ক্লান্ত জরাজীর্ণ মুখে সে হাসি দেখতে অদ্ভুত ঠেকলো। বৃদ্ধ মৃদু স্বরে, যেনো অনেকটা স্বাগত, আবার বলেনঃ

‘জেনে রাখো আমিই নিয়তি’- তাঁর কথার সংগে তাঁর মাথা যেভাবে আন্দোলিত হলো তাতেই ব্যক্ত হলো জীবনে তাঁর নিজের স্থানের গর্বিত স্বীকৃতি। অতটুকু  প্রশান্তি আর নিশ্চয়তার সংগে বাস্তবের এরূপ স্বীকৃতি জীবনে আমি কখনো দেখিনি, এমনকি সুখী মানুষের মধ্যেও নয়। তিনি শূন্য একটি বৃত্ত রচনা করেন বাহু অনেক প্রসারিত করে অস্পস্টভাবে; যেনো অনেকটা ইন্দ্রিয়াসক্তিরাই দ্যোতক তাঁরা বাহুর আন্দোলন।

এমন একটি বৃত্ত তিনি আঁকলেন বাহু প্রসারিত করে যার মধ্যে মানুষের এই জীবনের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই পড়েঃ দরিদ্র, অন্ধকার ঘর, বায়ূ আর তার চিরন্তন গর্জন, বালুর অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি, সুখের বাসনা আর যা অপরিবর্তনীয় তার কাছে আত্মসমর্প; খেজুর-ভর্তি থালা, চির-হরিৎ ঝাউ গাছের প্রাচীরের আড়ালে বেঁচে থাকার জন্য ফল- বাগিচাগুলির সংগ্রাম; চুলায় ধরানো আগুন ওপাশে উঠানের কোথাও কোনো এক তরুনীর হাস্যঃ এবং আমি এই সমস্তর মধ্যে, এর যে অংগভংগী ও সংকেত এসবকে জবিন্ত ও একত্র করেছে তাতে এমন এক বলিষ্ঠ আত্মার সংগতি শুনতে পেলাম যা কোনো অবস্থাকেই বাধা বলে জানে না, যা নিজের মধ্যেই শান্ত।

আমি আবার ফিরে যাই, অনেক আগে, দশ বছর পূর্বে জেরুজালেম, শরৎকালে সেই দিনটিতে, যখন আরো একজন বৃদ্ধ আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনের কথা, মানুষ যে আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই কেবল পারে আল্লাহর সংগে শান্তিময় সম্পর্ক স্থাপন করতে, আর এভাবে, নিজের নিয়তির সাথেও।

সেই শরৎকালে, আমি ছিলাম আমার মামা ডোরিয়ানের বাড়িতে- পুরানা জেরুজালেম নগরীর ঠিক মাঝখানে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছিলো- ফলে আমি বাইরে বেশি যেতে পারছিলাম না। প্রায়ই আমি জানালায় বসে থাকতাম; বাড়ির পেছনের মস্ত বড়ো একটা উঠানের দিকে সেই জানালাটা থাকতো খোলা। উঠানটি ছিলো বৃদ্ধ এক আরবের; লোকে তাকে ‘হাজী’ বলতো- কারণ, তিনি মক্কায় হজ্জ্ব করেছিলেন। তিনি সওয়ারি আর মাল বহনের জন্য গাধা ভাড়া খাটাতেন। কাজেই তাঁর উঠানখানা হয়ে উঠেছিলো একটা সরাইখানার মতো।

রোজ সকালে সুরুজ ওঠার আগেই উট- বোঝাই করে শাক-সব্জি, তরি-তরকারি ও ফলমূল আনা হতো আশ-পাশের গ্রামাঞ্চল হতে; তারপর সেগুলি গাধার পিঠে চাপিয়ে শহরের বাজারে চিপা গলিপথে পাঠিয়ে দেয়া হতো। দিনের বেলা দেখতাম উটের বিশাল ভারি দেহগুলি মাটির উপর বিশ্রাম করছে; লোকজন হামেশা হৈ হল্ল করে উট আর গাধাগুলির দেখ-শোন করছে, তত্ত্ব-তালাবি নিচ্ছে, অবশ্য মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ওরা বাধ্য হয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতো  আস্তাবলে। উট আার গাধা চালক এই লোকগুলি ছিলো দরিদ্র আর ওদের গায়ে দেখতাম ছেড়া জামা-কাপড়; কিন্তু চাল-চলনে আর আচরণে ওদের তুলনা করা চলে মুক্ত-স্বাধীন নৃপতিদের সাথে। যখন ওরা একত্রে কেতে বসতো জমিনের উপরে আর আটার তৈরী চেপ্টা রুটি খেতো সামান্য পনীর বা দু’চারটি জলপাই-এর সাথেম আমি তাদের আচরণের আভিজাত্য ও স্বতঃস্ফুর্ততার এবং তাদের হৃদয়ের প্রশান্তির প্রশংসা না করে পারতাম না। আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম- ওরা নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সকল বস্তুকেও ওরা শ্রদ্ধা করে। হাজী সাব একটি ছড়ি ভর করে পায়চারী করতেন, কারণ, তিনি ছিলেন বাতের রোগী, আর তাঁর হাঁটু গিয়েছিলো ফুলে, ওদের মধ্যে এক রকম সর্দার ছিলেন তিনি-। দেখতাম, ওরা কোনো আপত্তি না করেই ওর কথা শুনছে। দিনে কয়েকবার তিনি ওদেরকে জমায়েত করতেন সালাতের জন্য, আর বৃষ্টি না হলে ওরা খোলা জায়গায়ই সালাত আদায় করতো। ওরা সব ক’জন একটিমাত্র লম্বা কাতারে দাঁড়ায় এবং তিনি ওদের ‘ইমাম’  হিসাবে দাঁড়ানের ওদের সম্মুখে। সালাতে নিখুঁৎ অংগ সঞ্চালনের দিকে দিয়ে ওরা যেনো সৈনিক, ওরা একই সংগে মক্কার দিকে মুখ করে মাথা নীচু করে, আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে এবং জমিনের উপর কপাল ঠেকায়। মনে হতো ওরা যেনো ইমামের মুখের অশ্রুত শব্দগুলি অনুসরণক করছে,- ইমাম, যিনি সিজদা থেকে উঠে আবার সিজদায় যাওয়ার আগে নগ্ন পায়ে দাঁড়ান জায়নামাজের উপর, তাঁর চোখ বোঁজা, হাত দু’টি ভাঁজ করে বুকের উপর রাখা, নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ছেন, স্পষ্টই  তনি গভীর ধ্যানে সমাহিতঃ আমি দেখতাম, তিনি তাঁর সমগ্র আত্মা দিয়ে প্রার্থনা করছেন!

এ ধরনের একটি প্রকৃত প্রার্থনার সাথে, প্রায় যান্ত্রিক অংগ সঞ্চালনের যোগ দেখে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করি এবং একদিন ‘হাজী’ সাবকে,  যিন কিছু ইংরেজি বোঝেন, জিগগাস করিঃ

-‘আপনারা কি সত্যি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ চান আপনারা বারবার নুয়ে হাঁটু গেড়ে সিজদা করে তাঁর প্রতি আপনাদের ভক্তি দেখাবেন? এর চেয়ে কি নিজের দিকে তাকানো এবং নিজের অন্তরের নিভৃতে তাঁর প্রতি প্রার্থনাই উত্তম নয়? আপনাদের এ ধরনের অংগ সঞ্চালনের কারণ কি?

কথাগুলি মুখ থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমার অনুশোচনা হলো, কারণ, এই বৃদ্ধ লোকটির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার ইচ্ছা আমার ছিলো না। কিন্তু ‘হাজী’ সাবকে মোটেই আহত মনে হলো না। তাঁর দন্তহীন মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো, তিনি বললেনঃ

-‘তাহলে, এ ছাড়া আমরা আর কীভাবে আল্লাহর ইবাদত করবো? তিনি কি দেহ আর আত্মা, দু’ই এক সংগে সৃষ্টি করেননি? শুনুন, আপনাকে বলছি, আমরা মুসলমানরা যেভাবে প্রার্থনা করি কেবল, সেইভাবেই প্রার্থনা করে থাকি, অন্যভাবে করি না। আমরা কাবা’র দিকে মুখ করে দাড়াই, মক্কায় অবস্থিত আল্লাহর পবিত্র ঘরের দিকে, এ সত্য উপলব্ধি করে যে দুনিয়ার সকল মুসলমানেরই মুখ- সে যেখানেই থাকুক না কেন- প্রার্থনায় এই ঘরের দিকেই ফেরানো হয়, আর আমরা সকলে মিলে একটি মাত্র দেহের শামিল এবং আল্লাহ হচ্ছেন আমাদের ধ্যান-ধারণার কেন্দ্র। প্রথম আমরা সরল সোজা হয়ে দাঁড়াই এবং পাক কুরআন থেকে তিলাওয়াত করি, একথা মনে রেখে যে, এ হচ্ছে তাঁরই কালাম, মানুষকে দেয়া হয়েছৈ যাতে সে জীবনে সরল, ন্যায়পরায়ণ ও অটল হতে পারে, তারপরে আমরা বলি, আল্লাহ মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ। এর দ্বারা আমরা নিজেদের একথা স্মরণ করিয়ে দিই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই যে আমাদের উপাস্য হতে পারে। একথা বলার পরে আমরা গভীরভাবে নুয়ে পড়ি, কারণ আমরা তাঁকে সম্মান করি সকলের উপরে এবং তাঁর শক্তি ও মহিমার প্রশংসা জ্ঞাপন করি। এরপর আমরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে জমিনে কপাল ঠেকাই, কারণ, আমরা উপলব্ধি করি যে, তাঁর সম্মুখে আমরা ধূলিকণা মাত্র এবং আমরা কিছুই না- আর তিনি আমাদের স্রষ্টা, লালন-পালনকর্তা। এরপর আমরা জমিন থেকে আমাদের মাথা তুলি আর স্থির হয়ে বসি, আর প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদের পাপ ক্ষমা করে দেন, আমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, আমাদের সোজা-সরণ পথে পরিচালনা করেন; এবং আমাদেরকে স্বাস্থ্য ও রিযিক দেন- তারপর আবার আমরা সিজদায় যাই, এক আল্লাহর মহিমার সম্মুখে ধূলিতে আমাদের কপাল ঠেকাই। এরপর আবার স্থির হয়ে ব সি, আর প্রার্থনা করি যেনো তিনি, নবী মুহাম্মদ, যিনি আল্লাহর বানী আমাদের কাছে এনে দেন তাঁর প্রতি রহমত করেন, যেমন তিনি রহমত করেছিলেন পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদেরকেঃ আমরা প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদেরকে এবং যারা সত্য পথে চলে তাদের সকলকে রহমত করেন; আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করি যেনো তিনি আমাদেরকে ইহজগতের কল্যাণ এবং পরকারের কল্যাণ- দু’ই দান করেন। সবার শেষে আমরা আমাদের মাথা ডানদিকে এবং বামদিকে ঘুরাই- এবং বলি, তোমাদের সকলের উপর আল্লাহর শান্তি আর রহমত বর্ষিত হোক, এবং এভাবে যাঁরা সৎকর্মপরায়ণ, যেখানেই তাঁরা থাকুক না কেন তাঁদের সকলের প্রতি আমরা জানাই অভিবাদন।

এভাবেই আমাদের রাসূল (স) সালাত আদায় করতেন এবং এভাবেই সর্বকালে সালাত সম্পাদনের জন্য তিনি তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন, যাতে তারা স্বেচ্ছায় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে, আর ইসলামের অর্থ এ-ই এবং এভাবেই তাঁর সংগে শান্তিময় সম্পর্ক স্থপন করতে পারে আর তাদের নিজেদের নিয়তির সংগেও।

অবশ্য বৃদ্ধ লোকটি হুবহু এই শব্দগুলি ব্যবহার করেননি- কিন্তু তিনি যা বলেছিলেন তার অর্থ হলো এ-ই এবং এভাবেই আমি এগুলি স্মরণ করে থাকি। কয়েক বছর পর আমি বুঝতে পেরেছিলাম ‘হাজী’ সাব তাঁর এই ব্যাখ্যা দ্বারাই ইসলামের দরোজা পয়লা খুলে দিয়েছিলেন আমার জন্য। তা সত্ত্বেও আমি, ইসলাম আমার নিজের ধর্ম হয়ে উঠতে পারে এ চিন্তা আমার মনে প্রবেশ করারও বহু আগে এক দীনতা অনুভব করতে শুরু করেছিলাম- যখনি দেখতাম, যেমন দেখতাম প্রায়ই- একজন লোক নাঙ্গা পায়ে দাঁড়িয়ে আছে তার জায়নামাযের উপর, কিংবা খড়ের মাদুরের উপর- বুকের উপর হাত দু’টি ভাঁজ করে রেখে, মাথা নীচু করে সম্পুর্ণভাবে নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে, তার চাপাশে যা ঘটছে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে- সে মসজিদের ভেতরেই হোক, অথবা কর্মব্যস্ত কোনো রাস্তার ফুটপাতেই হোকঃ একজন মানুষ যার নিজেকে নিয়ে কোনো নালিশ নেই- শান্ত এবং তৃপ্ত!

*         *            *          *          *          *

মামা ডোরিয়ান আমাকে যে ‘আরব পাথুরে ঘরের’ কথা লিখেছিলেন তা ছিলো সত্যি আনন্দদায়ক। বাড়িটি ছিলো’ প্রাচীন নগরীর’ কিনারে, ‘জাফা-দরোজার’ কাছে। এর প্রশস্ত, উঁচু সিলিং-বিশিষ্ট কোঠাগুলি, অতীতের বিভিন্ন জামানায় যেসব অভিজাত এখানে বসবাস করতেন, তাঁদেরই স্মৃতিতে যেনো ভারাক্রান্ত- আর এর দেয়ালগুলির নিকটবর্তী বাজার থেকে ভেঙে- পড়া জীবন্ত বর্তমানের স্পন্দনে স্পন্দিত। আর সে সব দৃশ্য, ধ্বনি আর গন্ধ এমনি যার সংগে আমার অতীতের অভিজ্ঞতার কোনো মিলই নেই।

ছাতের চত্বর থেমে আমি দেখতে পেলাম- সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত প্রাচীন নগরীর এলাকা- জালের মতো ছড়ানো তার অনিয়মিত পথ-ঘাট আর পাথরে খোদাই অলি-গলিসহ। অপর প্রান্তে রয়েছেন, বিশাল বিস্তৃতির বিচারে অনেক কাছে, সুলায়মানের মসজিদ-এলাকা, আর রয়েছে একেবারে শেষ সীমানায় মসজিদুল আকসা’ যা মক্কা মদীনার পরেই সবচেয়ে পবিত্র গণ্য, আর ঠিক মাঝখানটায় রয়েছে, ‘পাথুরে গম্বুজ’। তার ওপাশে প্রাচীন পবিত্র নগরীর দেয়ালগুলি প্রসারিত রয়েছে কিদরণ উপত্যকার দিকে আর উপত্যকার ওপাশে জেগে উঠেছে মোলায়েম মসৃণ লতা-পাতাশূণ্য পাহাড়- কেবল পাহাড়ের ঢালুগুলিই এখানে-ওখানে জলপাই গাছের দ্বারা চিহ্নিত। পূর্বদিকে এর চেয়ে কিছুটা উর্বরতার চিহ্ন মেলে; ওদিকেই দেখতে পেলাম একটা বাগিচা, ঢালু হয়ে নেমে এসেছে রাস্তার দিকে, গাঢ় সবুজ সে বাগিচা আর দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এটি হচ্ছে ‘জেথসিমেনের উদ্যান’। এরি মধ্য থেকে একদিকে জলপাই ও অপরদিকে সাইপ্রেস গাছের মধ্যে সোনালী, পেঁয়াজের আকারের রুশ গির্জার গম্বুজগুলি ঝলমল করছে।

এ যেনো, কিমিয়াগরের বক- যন্ত্রে আন্দোলিত কম্পিত ঢালাই তরল পদার্থ, পরিস্কার অথচ অবর্ণনীয়, হাজারো রঙে বিচিত্র, যা শব্দের অতীত, এমনকি, চিন্তারও আয়ত্তাতীত। এ রকমই আমার মনে হতো জলপাই পর্বত থেকে জর্ডান উপত্যকা আর মৃত-সাগরকে। ঢেউ- খেলানো পাহাড় আর দুগ্ধ-শুভ্র উজ্জ্বল পটভূমিকায় যেনো রুদ্ধশ্বাসের মতো অংকিত; তার সংগে জর্ডান নদীর গাঢ়-নীল রেখা এবং দূরে মৃত-সাগরের গোল আবর্ত এবং আরো দূরে, যেনো নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ আরেকটি জগৎ, প্রদোষ-মগ্ন মোআব গিরিশ্রেণী- এমন একটি অবিশ্বাস্য, বিচিত্র রূপময় সৌন্দর্য-চিত্র যে, আমার অন্তর তাতে উক্তেজনায় কাঁপতে শুরু করত।

আমার কাছে জেরুজালেম ছিলো একটি সম্পূর্ণ নতুন দুনিয়া। ‘পুরোনো নগরী’র প্রত্যেকটি স্থান থেকে জেগে উঠতো কতো ঐতিহাসিক স্মৃতিঃ সেই সব রাস্তা, যারা শুনেছে ইশায়াকে প্রচার করতে, সেই সব খোয়া যার উপর দিয়ে হযরত ঈসা (আ) হাঁটতেন, সেই সব প্রাচীর যা পুরোনো হয়ে গিয়েছিলো যখন রোমান সৈনিকদের ভারি পদক্ষেপ প্রতিধ্বনিত হতো সেগুলি থেকে, আর দরোজার উপরের খিলান, যাতে খোদাই রয়েছে সালাহুদদীনের আমরের লিপি। আসমান ছিলো গাঢ় নীল, যা ভূমধ্যসাগরীয় অন্যান্য দেশকে যারা জানে তাদের কাছে হয়তো নতুন মনে হতো না। কিন্তু আমার কাছে- যেহেতু আমি বেড়ে উঠেছি অনেক কম-বন্ধুত্বপূর্ণ আবহাওয়ায়- এই নীল ছিলো যগপৎ একটি আহবান ও একটি প্রতিশ্রুতি। বাড়ি-ঘর আর রাস্তাঘাটগুলি যেনো কাঁপতে থাকা একটা কোমল উজ্জ্বলতায় মোড়ানো, আর লোকজনের চলন-বলন স্বতস্ফুর্ত, জড়তামুক্ত, অংগভংগী সম্ভ্রম ও আভিজাত্যপূর্ণ- আর লোজন মানেই এখানকার আরবেরা,- কারণ ওরাই শুরু থেকে আমার চেতনায় ছাপ এঁকে দিয়েছিলো এদেশের মানুষ হিসাবে- এদেশেরই মাটি আর ইতিহাস থেকে তা জন্ম লাভ করেছে এবং এখানকার আলো-বাতাসের সাথে ওরা আছে এক হয়ে। ওদের পোশাক-পরিচ্ছদ বিচিত্র, বর্ণাঢ্য, বাইবেলী বর্ণনার দৈর্ঘ্য ও বিস্তার তাদের পরনের কাপড়ের; ‘ফেলাহ’ হোক, আর বদ্যু হোক- কারণ, আমি প্রায়ই দেখতাম বদ্যা শহরে আসছে জিনিস-পত্র কেনা-বেচা করার জন্য প্রত্যেকেই তাদের কাপড়-চোপড় পরে নিজের মতো করে, সবসময়ই অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা, যেনো মুহূর্তের প্রেরণায় সে একটা নেহাৎ-নিজস্ব ফ্যাশন উদ্ভাবন করেছে।

ডোরিয়ানের বাড়ির সামনেই, সম্ভবত চল্লিশ গগজের মতো দূরেই দাউদের কেল্লার কাড়া-কাল-জীর্ণ প্রাচীরগুলি উঠেছে- এই কেল্লাটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষের অংশবিশেষ; এটি একটি খাঁটি মধ্যযুগীয় আরব নগর-দুর্গ, আর সম্ভবত এটি তৈরি হয়েছিলো হিরোদীয় আমলের বুনিয়াদের উপরে; এর প্রহরা-কক্ষটি মিনারের মতো উঁচু আর সংকীর্ণ। (বাদশাহ দাউদের সাথে এর প্রত্যক্ষ কোনো যোগ না থাকলেও ইহুদীরা সবসময়েই একে এ নামেই অভিহিত করেছে; কারণ, বলা হয়, এখানে ‘জিওন’ পাহাড়ের উপরেই পুরানো শাহী প্রাসাদ ছিলো অবস্থিত)। ‘প্রাচীন নগরী’টির দিকে রয়েছে একটি নীচু প্রশস্ত দালান, যার ভেতর দিয়ে চলে গেছে প্রবেশ দরোজাটি আর দরোজার সম্মুখে পুরোনো পরিখাটির উপরই রয়েছে পাথরে তৈরি ধনুকের মতো বাঁদকা তোরণ- একটি পুল। বদ্যুরা যখন শহরে আসে তখন এই পথটিকে ওরা নিয়মিত ব্যবহার করে ওদের মিলনের জায়গারূপে। একদিন আমি দেখতে পেলাম- এক দীর্ঘ- দেহ বদ্যু সেখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে, রূপালী ধূসর আসমানের পটভূমিকায় একটি দেহাকৃতি, যেনো প্রাচীন কোনো উপকথার এক মূর্তি। ছোট্ট-লাল বাদামী দাড়ির ফ্রেমে, ধারালো চোয়াল- মুখমণ্ডলে একটি গভীর গাম্ভীর্যের অভিব্যক্তিঃ বিষণ্ন মলিন মুখমণ্ডল যেনো সে কোনো কিছুর প্রত্যাশা করছে, অথচ ভাবতে পারছে না যে, সত্যি তা ঘটবে। তার গায়ের চওড়া বাদামী-সাদা ডোরাওয়ালা আলখিল্লাটি জির্ণ এবং ছেঁড়া! আর হঠাৎ আমার মনে হলো, কেন মনে হলো জানি না, এ আলখিল্লাটি লোকটির গায়ে রয়েছৈ বহু মাস ধরে বিপদ আর পালিয়ে বেড়ানোর বহু মাস- ও কি তা হলে সেই ক’জন যোদ্ধারই একজন, যারা হযরত দাউদের অনুগমন করেছিলেন, হয়তো এই মুহূর্তে কোথাও জুদী পাহাড়ের কোলে এ গুহায় লুকিয়ে ঘুমিয়ে আছেন দাউদ, আর এই বিশ্বস্ত ও সাহসী বন্ধুটি একজন সংগী নিয়ে চুপি চুটি এই রাজধানী শহরে এসেছে- দেখেতে- ‘সল’ তাদের নেতা সম্পর্কে কী ভাবেন আর তাঁর জন্য ফিরে আসা নিরাপদ কি না এবং এখন, এই মুহূর্তে, দাউদের এই বন্ধুটি এখানে অপেক্সা করছে তার সংগীটির জন্য, সমূহ অমংগলের আশংকা নিয়েঃ ওরা হয়তো খোশ-খবর নিয়ে যেতে পারবে না দাউদের কাছে……

হঠাৎ বদ্যুটি নড়ে ওঠে এবং ঢালু বেয়ে নীচুতে নামতে শুরু করে আর আমার স্বপ্ন-কল্পনা টুটে যায়। তখন, সহসা আমার মনে পড়লোঃ এই লোকটি হচ্ছে একজন আরব, আর ওরা, বাইবেলের সেই মূর্তিগুলি ছিলো ইহুদী। কিন্তু আমার এই বিস্ময় কেবর মুহূর্তকাল স্থায়ী হলো, কারণ, অকস্মাৎ আমি বুঝতে পারলাম সেই স্বচ্ছতার সংগে যা হঠাৎ বিদ্যুৎ- ঝলকের মতো কখনো কখনো আমাদের অন্তরে ঝলসে ওঠে এবং পৃথিবীকে উদ্ভাসিত করে দেয় হৃদয়ের একটি মাত্র স্পন্দন-কালের জন্য সেই স্বচ্ছতার সংগে আমি বুঝতে পারলাম- দাউদ এবং দাউদের সময় ইবরাহীম ও ইবরাহীমের সময়ের মতোই তাদের আরব উৎসমূলের অনেক কাছে, আর সে কারণে, আজকের বেদুঈনদেরও তা নিকটতরো আজকের ইহুদীদের চাইতে- যাঁরা নিজেদেরকে মনে করে দাউদ ও ইবরাহীমের খান্দান বলে…..

আমি প্রায়ই বসতাম জাফা-দরোঝার নীচে, পাথর নির্মিত সূঁচালো স্বম্ভটির উপর এবং দেখতাম দলে দলে মানুষ প্রাচীন নগরীতে ঢুকছে আর সেখান থেকে বের হচ্ছে, সবাই একে অপরের সাথে গা ঘষতে ঘষতে, একে অপরকে কুনইয়ের ধাক্কা দিতে দিতে চলছে- আরব এবং ইহুদী যতো রকমের হতে পারে, সকলেই। এদের মধ্যে রয়েছে শক্ত হাডডিওয়ালা ‘ফেলাহীন’ মাথায় বাদামী রঙের কাপড় অথবা কমলা-রঙের পাগড়ি; আরো রয়েছে বেদুঈনেরা, মুখমণ্ডল, তাদের তীক্ষ্ম, পরিচ্ছন্ন এবং প্রায় সব সময়ই কৃশ; ওরা আলখিল্লা পরে এক আশ্চর্য আত্মস্থ ভংগীতে, প্রায়ই দু’হাত নিতম্বের উপর রেখে কনুই প্রসারিত করে দিয়ে, যেনো তারা নিশ্চিত যে, প্রত্যেকেই ওদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেবে। ওদের মধ্যে কিষাণ রমণীদেরও দেখতামঃ কালো বা নীল রঙের সূতী বস্ত্র গায়ে, বুকের উপর সাদা সূতায় ফুল তোলা; প্রায়ই ওদের মাথায় থাকতো জুড়ি এবং ওরা চলতো একটা নম্র, সহজ সুন্দর গতিচ্ছন্দে। পেছন দিক থেকে তাকিয়ে অনেক ষাট বছরের রমণীকেও মনে হতো রমনী। ওদের চোখের দৃষ্টি মনে হতো পরিস্কার এবং বয়সের প্রভাব-মুক্ত- যদি না ওরা আক্রান্ত হতো ‘ট্রাকোমা’ দ্বারা- এটি একটি দুরারোগ্য মিসরীয় চক্ষুরোগ, যা ভূমধ্যসাগরের পূর্বের সকল দেশের জন্যই এক অভিশাপ বিশেষ।

এবং ইহুদীদেরও দেখতামঃ স্থানীয় ইহুদী, যারা পরতো ‘তারবুশ’, আর চওড়া, বিশাল আলখিল্লা, মুখাকৃতির দিক দিয়ে যাদের গভীর মিল রয়েছে আরবদের সাথে; পোলাণ্ড আর রশিয়া থেকে এসেছে যে ইহুদীরা, তারা তাদের অতীত ইউরোপীয় জীবনের এতো ক্ষুদ্রতা আর সংকীর্ণতা নিয়ে এসেছে সাথে করে যে ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তারা দাবি করে তারা আর মরক্কো ও তিউনিসিয়ার সাদা বার্নাস পরিহিত গর্বিত ইহুদীরা একই বংশের লোক। তবু, ইউরোপীয় ইহুদীরা তাদের চারপাশের চিত্রের সংগে স্পষ্টই বেমানান হলেও ইহুদী জীবন ও রাজনীতির সুর এবং মেজাজ তারাই সৃষ্টি করে, আর এ কারণে, আরব ও ইহুদীদের মধ্যে প্রায় দৃশ্যমান মন- কষাকষির জন্য ওরাই দায়ী।

ঐ সময়ে একজন সাধারণ ইউরোপীয় কতোটুকু জানতো আরবদের সম্বন্ধে? আসলে কিচ্ছুই না। সে নিকট প্রাচ্যে আসার সময় সংগে বয়ে নিয়ে আসতো কতকগুলি রোমান্টিক এবং ভ্রান্ত ধারণা এবং যদি সদিচ্ছা থাকতো এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে যদি সে সৎ হতো, তা’হলে তাকে স্বীকার করতেই হতো যে, আরবদের সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞানই নেই। ফিলিস্তিনে আসার আগে আমি তো কখনো এ দেশকে আরবদেশ বলে ভাবিনি। অবশ্য, আমার এ অস্পষ্ট ধারণা হয়েছিলো যে, এখানে ‘কিছু সংখ্যক’ আরবও বাস করে- তবে ওদের আমি কল্পনা করেছিলাম কেবল মরুভূমির তাঁবুর বাসিন্দা যাযাবর এবং স্নিগ্ধ মরূদ্যানের বাসিন্দারূপে। ফিলিস্তিন সম্পর্কে এর আগে আমি যা কিছু পড়েছি সবই জিওনিস্টদের লেখা; স্বভাবতই এবং কেবল নিজেদের দৃষ্টিভংগীতেই ওরা লিখে থাকে। তাই আমি বুঝতে পারিনি যে, শহরগুলিও আরবদের দ্বারা পূর্ণ, বুঝতে পারিনি যে, আসলে ১৯২২ সনেও ফিলিস্তিনে যেখানে ইহুদী ছিলো একজন, সেখানে পাঁচজন ছিলো আরব, সে কারণে ফিলিস্তিন যতোটা না ইহুদীদের দেশ তার চাইতে বহু-বহু গুণে বেশি আরবদেরই দেশ!

আমি যখন জিওনিস্ট সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যান মিঃ উসীশকিনের নিকট এ বিষয়ে মন্তব্য করলাম, আমার মনে হলো, জিওনিস্টরা আবরদের এই সংখ্যাগুরুত্বের সত্যটিকে বিবেচনা করে দেখতেও রাজী নয়। জিওজিজমের বিরুদ্ধে আরবদের বিরোধিতাকে তারা কোনো গুরুত্ব দিতেই তৈরি নয়। মিঃ উসীশকিনের প্রতিক্রিয়া আরবদের প্রতি ঘেন্না ও তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছুই মনে হলো নাঃ

-‘এদেশে আমাদের বিরুদ্ধে আরবদের সত্যিকার কোনে আন্দোলনই নেই- অথ্যাৎ, এমন কোনো আন্দোলনই নেই যার মূল রয়েছে জনতার মধ্যে। যাকে আপনি বিরোধিতা মনে করছেন এ সবই আসলে কতিপয় অসন্তুষ্ট এজিটেটরের চিৎকার মাত্র। নিজে নিজেই তা ভেঙে পড়বে কয়েক মাসেই- বড়জোর কয়েক বছরেই’।

তাঁর এ যুক্তি আমার কাছে মোটেই সন্তোষজনক মনে হলো না। শুরু থেকেই আমার মনে হচ্ছিলো ফিলিস্তিনে ইহুদী বসতি স্থাপনের গোটা ধারণাটি কৃত্রিম, অবাস্তব আর তার চাইতে বিপদের কথা- এতে করে, ইউরোপীয় জ ীবনের সকল জটিলতা ও অসমাধ্য সমস্যা এমন একটি দেশে আমদানি হওয়ার আশংকা রয়েছে যা হয়তো এ সবকে বাদ দিয়েই অধিকতরো সুখ থাকতে পারে। ফিলিস্তিনে ইহুদীরা সত্যি এমনভাবে আসছিলো না যাকে বলা যেতে পারে প্রত্যাবর্তন, বরং তারা, ফিলিস্তিনকে ইউরোপীয় লক্ষ্য নিয়ে ইউরোপীয় ছকে স্বদেশে পরিণত করার জন্যই মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। অল্প কথায় ওরা হচ্ছে দরোজায় প্রবিষ্ট বিদেশী। তাই নিজেদের মাঝখানে ইহুদীদের একটি স্বদেশের ধারণার বিরুদ্ধে আরবদের দৃঢ় বিরোধিতায় আমি আপত্তির কিছুই খুঁজে পাইনি। বরং আমি শীগগীরই বুঝতে পারলাম, জোর করে একটি ইহুদী রাষ্ট্র চাপিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে আর এর বিরুদ্দে আরবরা সংগতভাবেই সংগ্রাম করে চলেছে।

১৯১৭ সনের ব্যালফোর ঘোষণায়, ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী ‘জাতীয় আবাসে’র ওয়াদা করা হয়। আমি এই ঘোষণায় দেখতে পেলাম একটি নিবিড় রাজনৈতিক চাল, সকল ঔপনিবেশিক শক্তিই যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। চালটি হচ্ছে ভেদনীতির মাধ্যমে কোনো দেশ শাসনের বহু পুরোনো নীতি। ফিলিস্তিনের বেলায় এই নীতিটি ছিলো আরো নির্লজ্জ। কারণ, ১৯১৬ সনে তুরস্কের বিরুদ্দে ইংরেজকে সাহায্যের প্রতিদান  হিসাবে ইংরেজরা তখনকার মক্কার শাসক শরীফ হোসেনকে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের প্রতিশ্রতি দিয়েছিলো। কথা ছিলো, ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী সব ক’টি দেশ নিয়ে গঠিত হবে এ রাষ্ট্র। ইংরেজেরা যে কেবল এক বছর পরই ফ্রান্সের সাথে সাইফ-পিকট চুক্তি করে (যাতে ক’রে লেবানন ও সিরিয়ার উপর ফরাসী প্রভুত্ব কায়েম হয়) সে ওয়াদা খেলাফ করে তা নয়, বরং আরবদের ব্যাপারে ওরা যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলো কার্যত ফিলিস্তিনকে তার আওতা থেকেও বাদ দেয়া হয়।

নিজে ইহুদী খান্দানের লোক হলেও শুরু থেকেই আমি জিওনি- নিজমের বিরুদ্ধের এক প্রচণ্ড আপত্তি অনুভব করি। আরবদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত সহানুভূতির কথা বাদ দিলেও বিদেশী বৃহৎ শক্তির সাহায্যে বহিরাগতরা বাইরে থেকে এ দেশে আসবে সংখ্যা গুরুত্ব অর্জনের প্রকাশ্য উদ্দেশ্য নিয়ে আর এভাবে একটা জাতিকে উচ্ছেদ করবে তার দেশ থেকে, যে- দেশ স্মরণাতীতকাল থেকে বরাবরই তারই দেশ- ব্যাপারটি আমার কাছে ঘোর নৈতিকতা- বিরুদ্দ বলে মনে হলো। তাই আরব- ইহুদী সমস্যা নিয়ে যখনি কোনো কথা ওঠে আমি স্বভাবতই আরবদের পক্ষ নিই। আর এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতো প্রায়ই। এ মাসগুলিতে যে- সব ইহুদীর সংস্পর্শে আমি আসি তাদের প্রায় সকলেই আমার মনোভাব বুঝতে ছিলো অপারগ। আমি আরবদের মধ্যে যা দেখেছি তা ওরা বুঝতে পারতো না। ওদের মতে, আরবরা এক পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী ছাড়া আর কিছুই নয়। অমন এক মনোভাব নিয়ে ওরা আরবদের প্রতি তাকাতো যা মধ্যে আফ্রিকার ইউরোপীয় আবাদীদের মনোভাবের থেকে খুব আলাদা নয়। আরবরা কী ভাবছে এ নিয়ে ওদের মোটেই কোনো মাথাব্যাথা ছিল না। ওদের প্রায় কেউই আরবী শেখার কোনো চেষ্টা করতো না, আর স কলেই বিনাদ্বিধায় এই আপ্তবাক্য গ্রহণ করেছিলো যে, ফিলিস্তিন হচ্ছে ইহুদীদেরই ন্যায্য উত্তরাধিকার।

এ বিষয়ে, জিওনিস্ট আন্দোলনের তর্কাতীত নেতা শাইম ওয়াইজম্যানের সংগে আমার যে মুখতসর আলোচনা হয়েছিলো এখনো তা আমার মনে আছে। তিনি ফিলিস্তিনে তাঁর নিয়মিত সফরের একটিতে এখানে এসেছিলেন। (আমার বিশ্বাস, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ছিলো লগুনে) তাঁর সাথে আমার দেখা হয় এক ইহুদী বন্ধুর বাড়িতে। এ লোকটির অপরিসীম প্রাণশক্তিতে আমি প্রভাবিত না হয়ে পারিনি- এমন এক প্রাণশক্তি যার অভিব্যক্তি ঘটেছিলো তাঁর দৈহিক গতিবিধিতেও, তাঁর দীর্ঘ স্প্রিং- এর মতো পদক্ষেপেও, কারণ এভাবেই তিনি পায়চারি করছিলেন ঘরের ভেতর। আমি  প্রভাবিত না হয়ে পারিনি তাঁর প্রশস্ত কপালে ফুটে ওটা বুদ্ধির দীপ্তিতে আর তাঁর চোখের মর্মভেদী চাহনিতে।

তিনি কথা বলছিলেন টাকা- কড়ির অসুবিধা সম্বন্ধে যে- সব অসুবিধা ইহুদী জাতীয়- আবাসের স্বপ্নকে রূপ দেবার পথে ছিলো বাধাস্বরূপ- আর বলছিলেন, বিদেশে ইহুদীরা এই স্বপ্নে যে সাড়া দেয় তার ক্ষীণতা সম্বন্ধে। এতে আমার এই বিরক্তিকর ধারণাই হলোঃ

ওয়াইজম্যানও প্রায় অন্য সকল ইহুদীর মতোই উৎসুক ছিলেন ফিলিস্তিনে যা কিছু ঘটছিলো তার নৈতিক দায়িত্ব ‘বহির্জগতে’ চালান দিতে। এর ফলে আমি বাধ্য হলাম সেই সশ্রদ্ধ নীরবতা ভাঙতে যে নীরবতার সাথে উপস্থিত সকলেই তাঁর কথা শুনছিলো। আমি জিগগাস করিঃ

-‘কিন্তু আরবদের সম্বন্ধে কী?’

আলোচনার মধ্যে এ ধরনের একটি তাল- কাটা সুর এনে নিশ্চয়ই আমি ‘ভূল’ করেছিলাম, কারণ, ওয়াইজম্যান তাঁর মুখ ধীরে ধীরে ফেরালেন আমার দিকে, তাঁর হাতের পেয়ালাটি রেখে দিলেন আর আমরা কথাটির পুনরাবৃক্তি করলেনঃ

-‘এবং আরবদের সম্বন্ধে কী?’

-‘আরবদের তুমুল বিরোধিতার মুখে আপনি কী করে আশা করছেন যে, ফিলিস্তিনকে আপনার নিজেদের স্বদেশ বানিয়ে ফেলবেন? অথচ, মোদ্দাকথা তো এই, আরবরাই এদেশে সংখ্যাগুরু।

জিওনিস্ট নেতা কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন- ‘আমরা আমা করছি, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ওরা আর মেজরিটি থাকছে না’।

-‘হয়তো তা-ই! আপনি এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বহু বছর ধরে, আপনি পরিস্থিতি আমার চেয়ে অবশ্যই ভালো বোঝেন। কিন্তু আরবরা যে- সব রাজনৈতিক বাধাবিঘ্ন আপনাদের জন্য সৃষ্টি করতে পারে- হয়তো না-ও করতে পারে- সে সবের কথা বাদ দিয়েও, এ সম্যার নৈতিক দিকটা কি আপনাকে মোটেই বিব্রত করে না? আপনি কি মনে করেন না যে, যারা এদেশে চিরকাল বসবাস করে এসেছে তাদের উচ্ছেদ করা আপনাদের পক্ষে অন্যায়?’

-‘কিন্তু এদেশ তো আমাদের’, ডঃ ওয়াইজম্যান ভুরু জোড়া কপালে তুলে জবাব দেন, ‘যা থেকে আমাদেরকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিলো আমরা তো তাই ফেরত নেয়ার বেশি কিছু করছি না’।

-‘কিন্তু আপনারা প্রায় দু’হাজার বছরের কাছাকাছি ফিলিস্তিন থেকে দূরে রয়েছেন। এর আগে, আপনারা এদেশ শাসন করেছিলেন, কিন্তু পুরা দেমটি কখনো নয়- পাঁচমো বছরেরও কম। আপনি কি মনে করেন না যে, একই যুক্তিতে আরবরা দাবি করতে পারে স্পেন, কারণ, তারাও তো স্পেনে কর্তৃত্ব করেছিলো প্রায় সাতশো বছর, আর প্রায় পাঁচশো বছর আগে তা সম্পূর্ণ খুইয়ে বসে’।

দেখতে পেলাম ডঃ ওয়াইজম্যান অধৈয্য হয়ে উঠেছেনঃ

-‘বাজে কথা! আরবরা তো স্পেন ‘জয় করেছিলো’ মাত্র; সে দেশ কখনো তাদের নিজেদের আদি বাসভূমি ছিলো না। তাই, স্পেনীয়রা শেষ নাগাদ ওদেরকে সেখান থেকে বের করে দিয়েছিলো- তা ঠিকই হয়েছিলো’।

-‘মাফ করবেন’ আমি পাল্টা জবাব দিই, ‘আমার মনে হচ্ছে এতে ঐতিহাসিক তথ্যগত কিছু ভুল রয়ে গেছে। আসলে, হিব্রুরাও তো ফিলিস্তিনে এসেছিলো বিজয়ী হিসাবে। তাদের বহু বহু আসে এখানে বাস করতো অনেক সেমিটিক এবং অ-সেমেটিক গোত্র- যেমন আমেরাইত, এদুমাইত, ফিলিস্টাইন, মোআইবাত এবং হিট্টাইট প্রভৃতি। ইসরাঈল এবং যুদা’র রাজত্বকালেও তো এসব কবিলা এখানেই বাস করতো। রোমানরা যখন আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেয় তখনো ঐসব গোত্র এখানেই বাস করতো। ওরা এখনো এখানেই বাস করছে। সপ্তম শতকে যে- সব আরব এ অঞ্চল জয় করে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করে, তারা সবসময়ই জনসংখ্যার  একটি ক্ষুদ্র মাইনরিটি মাত্র ছিলো। বাকী যাদেরকে আমরা আজ ফিলিস্তিনী বা সিরীয় ‘আরব’ বলে বর্ণনা করে থাকি আসলে তারা হচ্ছে এখানকার আরবায়িত মূল বাসিন্দা মাত্র। বহু শতাব্দীতে এদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। অন্যরা খ্রিস্টানই রয়ে গেছে। মুসলমানেরা স্বভাবতই আরব থেকে আগত তাদের ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়। কিন্তু আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ লোক, যারা আরবীতে কথা বলে, তারা মুসলমানই হোক বা খ্রিস্টানই হোক, তারা সরাসরি সূত্রে, এখানকার আদি বাসিন্দাদেরই বংশধর- আদি এই অর্থে যে, হিব্রুরা এখানে আসার বহু শতাব্দী আগেও তারা এখানেই বাস করতো’!

আমার এই বিস্ফোরণে ডঃ ওয়াইজম্যান ভদ্র হাসিতে মোলায়েম হয়ে ওঠেন এবং আলোচনার মোড় অন্য বিষয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেন।

আমার এই হস্তক্ষেপের যে পরিণতি হলো তাতে আমি সুখী হইনি। আমি অবশ্যি আশা করিনি, উপস্থিত কেউ- ডঃ ওয়াইজম্যান তো ননই- আমার সাথে একমত হবেন যে, নৈতিকতার বিচারে জিওনিস্ট আদর্শটি খুবই দুর্বল এবং খোলো। কিন্তু এই প্রত্যাশা আমার ছিলোঃ আরবদের লক্ষ্যের প্রতি আমার সমর্থন আর কিছু না হোক জীওনিস্ট নেতৃত্বের মধ্যে অন্তত কিছুটা অস্বস্তির জন্ম দেবে- এমন এক অস্বস্তি যা ওদের মধ্যে এনে দিতে পারে আরও বেশি অর্ন্তমূখিতা, আর তাতে করে হয়তো একথা মেনে নেয়ার জন্য সৃষ্টি করতে পারে অধিকতরো মানসিক প্রস্তুতি। কথাটি এই যে, আরবদের জিওনিজম বিরোধিতার মধ্যে একটি নৈতিক অধিকারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার কিছুটা ঘটলো না। তার বদলে আমি দেখতে পেলাম একটা শূন্য দেয়াল যেন চোখ বের করে তাকিয়ে আছে আমার দিকেঃ আমার হঠকারিতার বিরুদ্ধে তিরস্কারই ভরা প্রতিবাদ- এখন সেই হঠকারিতা, যা ওদের পূর্বপুরুষদের দেশে, ইহুদীদের প্রশ্নাতীত অীধকার সম্ভন্ধে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস করেছে!

ভেবে ভেবে বিস্মিত হতাম আমি- অমন সৃজনধর্মী বুদ্ধির অধিকারী ইহুদীদের পক্ষে জিওনিস্ট- আরব বিরোধটিকে কী করে কেবল ইহুদীদেরই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সম্ভব হচ্ছে! ওরা কি বুঝতে পারেনি যে, শেষতক ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সমস্যাটির সমাধান কেবলমাত্র আরবদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ভেতর দিয়েই সম্ভব হতে পারে? ওদের এই পলিসি যে যন্ত্রণাদায়ক ভবিষ্যৎ ডেকে আনবে অনিবার্যভাবেই সে বিষয়ে ওরা কি ছিলো সত্যি সত্যি অতোটা অন্ধ? যদি সামরিকভাবে সকলও হয় তবু এক শক্রভাবাপন্ন আরব সমুদ্দুরের মধ্যে ইহুদী- রাষ্ট্ররূপ ছোট্ট দ্বপটি চিরকারের জন্য যে সংঘাত, ঘেন্না ও তিক্ততার মুখোমুখি হবে তা দেখার মতো দৃষ্টিশক্তি কি ওদের একেবারেই ছিলো না?

এবং কী আশ্চর্য, আমি ভাবতাম, যে জাতি তার দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসে, বারবার অন্যায় জুলুম-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, আজ সে-ই তার নিজের লক্ষ্য হাসিলের ঐকান্তিক চেষ্টায় অপর একটি জাতির প্রতি মারাত্মক জুলুম করতে উদ্যত- আর সে জাতিও এমন এক জাতি যারা ইহুদীদের অতীত দুঃখ- কষ্টের ব্যাপারে একেবারেই নিরপরাধ! আমি জানতাম, ইতিহাসে এরূপ ঘটনা কখনো ঘটেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার চোখের সামনেই তা ঘটতে যাচ্ছে দেখে আমার দুঃখের সীমা রইলো না।

 সে সময়ে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ে আমার এই অষ্টপ্রহর চিন্তা- ভাবনার মূলে যে কেবল আরবদের প্রতি আমার সহানুভূতি আর জিওনিস্টদের এক্সপেরিমেন্ট আমার উদ্বেগই কাজ করেছে তা নয়- এর মূলে আমার সাংবাদিক কৌতূহলও ছিলো সক্রিয়- কারণ আমি তখন ‘ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ- এর বিশেষ সংবাদদাতা আর ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ সংবাদপত্রগুলির অন্যতম ছিলো এ কাগজ। অনেকটা আকস্মিকভাবেই আমি এ সুযোগ পেয়ে যাই।

এক সন্ধ্যায় আমি আমার এক স্যুটকেসে ঠাঁসা পুরোনো কাগজগুলি বাছাই করছি- কাগজ ঘাটতে ঘাটতে এক বছর আগে বার্লিনে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি হিসাবে যে কার্ডটি আমাকে দেওয়া হয়েছিলো, তা পেয়ে গেলাম। আমি প্রায়  ওটি ছিঁড়েই ফেলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় ডোরিয়ান মামা আমার হাত ধরে রসিকতার সাথে বলে উঠলেনঃ ‘ছিঁড়ো না। তুমি যদি হাইকমিশন অফিসে এই কার্ডটি পেশ করো কয়েকদিনের মধ্যেই সরকারী ভবনে খানার দাওয়াত পেয়ে যাবে। এদেশে সাংবাদিকরা খুবই বাঞ্ছিত জীব’।

আমি যদিও অনাবশ্যক কার্ডটি ছিঁড়ে ফেললাম, তবু মামার ঠাট্টা আমার মধ্যে এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। অবশ্য আমি সরকারী ভবনে খানার দাওয়াতের জন্য মোটেই উদগ্রীব ছিলাম না- কিন্তু তাই বলে এমন একটি সময়ে নিকটপ্রাচ্যে থাকার এই দুর্লভ সুযোগ কেন আমি কাজে লাগাবো না- যখন দেখতে পাচ্ছি- মধ্য ইউরোপের খুব কম সাংবাদিকই এখানে সফরের সুযোগ পাচ্ছে, আমি কেন আবার আমার সাংবাদিক কাজকর্ম শুরু করবো না? তবে ইউনাইটেড টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি হিসাবে নয়, কোনো একটি মশহুর দৈনিকের সংবাদদাতা হিসাবে। এবং যেরূপ আকস্মাৎ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি তেমনি সহসা আমি স্থির করে ফেললাম- আমি ‘সত্যিকার’ সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করবো!

‘ইউনাইটেড টেলিগ্রাফে’র সাথে এক বছর কাজ করলেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের সাথেই আমার সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিলো না। তাছাড়া, যেহেতু আমার নিজের নামে আজো কিছুই ছাপা হয়নি, তাই সংবাদপত্র জগতে আমার নাম এখনো সম্পূর্ণ অজানা, অপরিচিত। অবশ্য, এতে আমি নিরাশ হয়ে পড়িনি। আমি ফিলিস্তিন সম্পর্কে আমার ধারণার উপর একটি প্রবন্ধ লিখলাম এবং দশটি জার্মান সংবাদপত্রে পাঠালাম তার কপি। সংগে আমি এ প্রস্তাবও দিলাম যে, নিকট-প্রাচ্যের উপর আমি ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধ লিখতে তৈরি আছে।

এ হচ্ছে ১৯২২ শেষের দিকের মাসগুলির কথা- তখন জার্মানীতে চরম সর্বনাশা মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। জার্মান সংবাদপত্রগুলির পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিলো। অতি অল্পসংখ্যক খবরের কাগজই পারবতো মুদ্রায় তাদের বৈদেশিক সংবাদদাতাদের খরচ বহন করতে। কাজেই এ মোটেই আশ্চর্যজনক ছিলো না যে, আমি যে-দশটি সংবাদপত্রে আমার নমুনা প্রবন্ধটি পাঠিয়েছিলাম তারা একের পর এক, কমবেশি ভদ্র বাষায় তাদের প্রত্যাখ্যানের কথা লিখে জানালো। দশটি পত্রিকার মধ্যে কেবল একটিই আমার পরামর্শ গ্রহণ করে এবং মনে হয়, আমি যা লিখেছিলাম তাতে খুশি হয়েই আমাকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিশেষ ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা নিয়োগ করে, আর তার সংগে একটি চুক্তিপত্রও পাঠায়- ফিরে গিয়ে আমাকে একটি বই লিখে দিতে হবে। এই পত্রিকাটিই ‘ফ্রাংকফুটার শাইটুঙ’। আমি প্রায় কাৎ হয়ে গেলাম যখন দেখতে পেলাম, আমি যেড কেবল একটি সংবাদপত্রের সাথে (আর কী সে সংবাদপত্র!) সম্পর্কই স্থাপন করতে পেরেছি তা নয়, পয়লা চেষ্টায়ই অমন একটা মর্যাদা হাসিল করেছি যা বহু ঝানু সাংবাদিকেরও ঈর্ষার বস্তু হতে পারে!

অবশ্য এর মধ্যে একটা কাঁটাও ছিলো। মুদ্রাস্ফীতির জন্য ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’ আমাকে নগদ টাকায় আমার মাইনে দিতে সক্ষম ছিলো না। বিনয়ের সাথে তারা বললো, আমার পারিশ্রমিক দেয়া হবে জার্মান মার্কের হিসাবে; ওদের মতোই আমিও জানতাম যে, এতে আমার প্রবন্ধগুলি পাঠাবার জন্য খামের উপর যে টিকেট লাগাতে হবে তার খরচ বহন করাও কঠিন হবে। কিন্তু ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর বিশেষ সংবাদদাতা হওয়ার গৌরব অনেক- অনেক বেশি মূল্যবান মনে হলো- সংবাদদাতা হিসাবে টাকা- কড়ি না পাওয়অর সাময়িক অসুবিধা সত্ত্বেও। আমি ফিলিস্তিনের উপর প্রবন্ধ লিখতে শুরু করে দিলাম এই আশায় যে, শীগগীরই হোক বা বিলম্বেই হোক, ভাগ্যে কোনো শুভ পরিবর্তনের ফলে, একদিন হয়তো আমি গোটা নিকট-প্রাচ্যেই, সফর করতে সক্ষম হবো।

*         *              *        *          *          *          *          *          *

ফিলিস্তিনে এখন আমার বন্ধু অনেক- ইহুদী এবং আরব, উভয়ই।

একথা সত্য যে, আরবদের প্রতি আমার সহানুভতির জন্য যা ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এ প্রকামিত আমার প্রবন্ধ গুলিতে ছিলো সুস্পষ্ট, জিওনিস্টরা আমাকে দেখতো অনেকটা বিস্ময়-মেশানো সন্দেহের সংগে। স্পষ্টই তারা স্থির করতে পারছিলো না আমি কি আরবদের দ্বারা ‘খরিদ’ হয়ে গেছি (কারণ, জিওনিস্টরা প্রায় সমস্ত কিছুকেই টাকা- কড়ির অর্থে ব্যাখ্যা করতে ছিলো অভ্যস্ত)! না কি, আমি কেবল একটা উদ্ভট বুদ্ধিজীবী, বিদেশী সবকিছুকেই যে ভালোবাসে। কিন্তু তখন যেসব ইহুদী ফিলিস্তিনে বাস করতো তাদের সবাই যে জিওনিস্ট ছিলো তা নয়। ওদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনে এসেছে, রাজনৈতিক কোনো মতলব নিয়ে নয়, বরং পাকভূমি আর তার সাথে জড়িত বাইবেলী স্মৃতি- অনুষংগের প্রতি একটী ধর্মীয় অনুরাগবশে।

এই দলের মধ্যে ছিলেন আমার ডাচ বন্ধু ইয়াকব দ্য হান- দেখতে ছোটো- খাটো, গোলগাল, মুখে সোনালী রঙের দাড়ি, বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। এখানে আমার আসার আগে তিনি ছিলেন হল্যান্ডের একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক। এখন তিনি আমস্টার্ডামের ‘হ্যাণ্ডলসব্লাড’ ও লণ্ডনের ‘ডেলি একপ্রেসে’র বিশেষ সংবাদদাতা। তাঁর ধর্মবিশ্বাস ছিলো গভীর, পূর্ব ইউরোপের যে- কোনো ইহুদীর মতোই গোঁড়া- কিন্তু তিনি জিওনিস্ট চিন্তাধারা সমর্থন করতেন না, কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘প্রতিশ্রুত ভূমিতে তাঁর জাতির প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদেরকে মিসাইঅ্যার আগমনের অপেক্ষা করতে হবে’।

-‘আমরা ইহুদীরা’, তিনি আমাকে একাধিকবার বলেছেন, ‘আমরা পাক ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলাম এবং পৃথিবীর সর্বত্র আমাদেরকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো, কারণ আল্লাহ আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমরা তা পালন করতে পারিনি। তিনি আমাদেরকে মনোনীত করেছিলেন তাঁর কালাম প্রচারের জন্য, কিন্তু আমরা আমাদের উদ্ধত অহংকার- বশে ভাবতে শুরু করলাম, তিনি কেবল খাতিরেই ‘মনোনীত জাতি’ করেছেন- এবং এভাবে আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। এখন আর তওবা করা আর অন্তর সাফ করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। এবং আমরা যখন আবার তাঁর কালাম শোনার লায়েক হবো, তিনি একজন মিসাইঅ্যা পাঠাবেন তাঁর বান্দাদেরকে প্রতিশ্রুত দেশে আবার নিয়ে যাবার জন্যে’।

-‘কিন্তু’, আমি জিগগাস করি, ‘জিওনিস্ট’ আন্দোলনের মূলেও এই মিসাইঅ্যার ধারণা নেই কি? আপনি জানেন, আমি তা সমর্থন করি না; কিন্তু প্রত্যেক জাতিরই কি এ বাসনা স্বাভাবিক নয় যে, তাদের একটি নিজস্ব আবাস-ভূমি থাকবে?

ডঃ দ্য হান আমার দিকে একটু লঘু পরিহাস মেশানো নজরে তাকান,- ‘আপনি কি মনে করেন, ইতিহাস কেবল কতগুলি ঘটনাপস্পরা? আমি তা মনে করি না। আল্লাহ যে, আমাদেরকে বাধ্য করেছিলেন আমাদের দেশ হারাতে, আর আমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নানা দেশে, তা উদ্দেশ্যহীন ছিলো না। কিন্তু জিওনিস্টরা নিজেরা একথা স্বীকার করতে রাজী নয়; যে- আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব আমাদের পতনের জন্য দায়ী ওরা সেই অন্ধতায়ই ভূগছে। ইহুদীদের দু’হাজার বছরের নির্বাসন এবং দুঃখ-কষ্ট ওদেরকে কিছুই শেখায়নি। আমাদের দুঃখ-কষ্টের মূল কারণটি বুঝবার চেষ্টা না করে তাকে এখন এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে; বলা যায়, পশ্চিমা শক্তির রাজনীতি থেকে পাওয়া বুনিয়াদের উপর একটা ‘জাতীয় আবাস’ তৈরি করে- এবং জাতীয় আবাসভূমি তৈরিরর এই প্রচেষ্টায় অপর একটি জাতিকে তার নিজের আবাস থেকে বঞ্চিত করার অপরাধই করে চলেছে ওরা!

স্বভাবতই, ইয়াকব দ্য হানের রাজনৈতিক মতামত তাকে জিওনিস্টদের মধ্যে খুবই অপ্রিয় করে তোলে (আসলে আমার ফিলিস্তিন ত্যাগের কিছুদিন পরেই, আমি শুনে মর্মাহত হই যে, তাঁকে সন্ত্রাসবাদীরা এক রাত্রে গুলী করে হত্যা করেছে।) তাঁর সংগে যখন আমার পরিচয় হয় তখন তাঁর নিজের মতের অল্প ক’জন ইহুদীদের মধ্যেই তাঁর সামাজিক মেলামেশা ছিলো সীমাবদ্ধ- এদের কেউ কেউ ছিলো ইউরোপীয়, কেউ কেউ ছিলো আরব। আরবদের প্রতি তাঁর খুবই দরদ ছিলো বলে মনে হয়, আর তাঁর সম্বন্ধে আরবদেরও ছিলো খুব উচ্চ ধারণা। ওরা প্রায়ই ওঁকে দাওয়াত করতো ওদের বাড়িতে। আসলে তখনো আবরা ইহুদী হিসাবেই ইহুদীদের প্রতি সর্বতোভাবে বির্দ্বিষ্ট হয়ে ওঠেনি। কেবল ব্যালফোর ঘোষণার পরই- অর্থাৎ শত শত বছর পাশাপাশি সম্প্রীতির সাথে বসবাস এবং একটা জাতিগত ঐক্য-চেতনা সত্ত্বেও আরবরা ইহুদীদেরকে রাজনৈতিক দুশমন ভাবতে শুরু করে। কিন্তু দ্বিতীয় দশকের প্রথমদিকের বদলে- যাওয়া পরিস্থিতিতেও আরবরা জিওনিস্ট এবং ডঃ দ্যা হা’নের মতো বন্ধুভাবাপন্ন ইহুদীদেরকে স্পষ্টভাবেই আলাদা করে দেখতো।

….      ….         ….       ….       ….

আরবদের মধ্যে আমার সফরের এই প্রথমদিকের নিয়তি-নির্দিষ্ট মাসগুলি যেনো আবেগ-অনুভুতি ও চেতনা প্রতিবিম্বের এক প্রবাহ বইয়ে দিলো। বলতে কি, ব্যক্তিগত ধরনের কতকগুলি অনুচ্চারিত আশা- আকাঙ্ক্ষা আমার চেতনায় স্থান পাবার দাবি জানাতে থাকলো্

আমি অমন একটা জীবনবোধের সম্মুখীন হলাম যা ছিলো আমার কাছে একেবারেই নতুন। মনে হলো, এই মানুষগুলির রক্ত থেকে একটি উষ্ণ, তপ্ত, মানবিক নিশ্বাস প্রবাহিক হচ্ছে ওদের চিন্তায়, ওদের অংগ-ভংগীতে- আত্মার সেইসব যন্ত্রণাদায়ক ফাটল, ভয়, ক্ষোভ এবং মানসিক বাধার সেইসব প্রেত যা ইউরোপের জীবনকে কুৎসিততরে এবং প্রতিশ্রতির দিক দিয়ে অতো কাঙাল করেছে…. এই আরবদের মধ্যে এর কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই। আমি আমার নিজেরও অজান্তে হামেমা যা কামনা করে এসেছি তারই কিছুটা পেতে শুরু করি আরবদের মধ্যেঃ হালকাভাবে জীবনের সকল প্রশ্নের মুকাবিলা করার জন্য এটি একটি আবেগধর্মী মনোভাব। বলা যায়, অনুভূমির ক্ষেত্রে এক মহৎ কাণ্ডজ্ঞান।

কালক্রমে, এই মুসলিম জাতির মর্মকথা বোঝা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে উঠলো। এর কারণ এ নয় যে, ওদের ধর্ম আমাকে আকর্ষণ করেছিলো (কারণ তখনো এ সম্বন্ধে আমি জানতাম সামান্যই)। বরং তা এ কারণেই আমার কাছে অতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, ওদের মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছিলাম মন ও ইন্দ্রিয়ের এক সহজাত সংগতি, যা ইউরোপ খুইয়ে বসেছিলো। আরো নিবিড়ভাবে আরবদের জীবন বোঝার মাধ্যকে কি আমাদের পম্চিমা জগতের দুঃখ-যন্ত্রণা, মানবিক সংহতিকর ক্ষয়কর অভাব আর সেই দুঃখ-যন্ত্রণার কারণের মধ্যে যে গোপন সম্পর্ক রয়েছে তা আবিস্কার করার সম্ভব নয়? কী সেই জিনিস, যা আমাদেরকে, পশ্চিমাদেরকে, জীবনের সেই পরম স্বাধীনতা থেকে পলায়ন করতে শিখিয়েছে, যে স্বাধীনতার অধিকারী এই আরবেরা, ওদের এই মানসিক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের যুগেও- যার অধিকারী আমরাও হয়তো ছিলাম অতীতের কোনো এক সময়ে? তা যদি না হতো, আমরা কী করে সৃষ্টি করতে পারতাম আমাদের অতীতের মহৎ সব শিল্পকলা, মধ্যযুগের সার্থক গির্জাসমূহ, রেনেসাঁসের উন্মাদ উল্লাস, রেমব্রাতের চিত্রের আলো-আধাঁরের খেলা, বাখের সুর-মূর্ছনা, মোজার্টের স্নিগ্ধ মোলায়েম অস্বপ্ন, আমাদের চাষীদের চিত্রকলায় ময়ূরের পেখমের গৌরব এবং অস্পষ্ট, প্রায় অমূল্য শিখর- চূড়ার দিকে বীথোফোনের গর্জনময় আশায়-দীপ্ত উড্ডয়ন, যেখান থেকে মানুষ বলতে পারে- ‘আমি আর আমার নিয়তি অভিন্ন।

আত্মশক্তির প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য কী তা আমরা জানি না বলে আমাদের পক্ষে আর ঐসব শক্তির সত্যিকার ব্যবহার সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে আর কখনো জ ন্ম হবে না কোনো বীথোফেনের বা কোনো রেমব্রাতের! তার বদলে এখন আমরা জানি শিল্পকলায়, সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রনীতি-বিজ্ঞানে প্রকাশের নব নব রূপ নিয়ে কেবল মারাত্মক  দলাদলি, কেবলি পরস্পরবিরোধী শ্লোগান, ও সূক্ষ্মভাবে, পরিকল্পিত নীতির মদ্যে তুমুল সংগ্রাম। আমাদের সব যন্ত্রপাতি, আর   আসমান- ছোঁয়া দালাকোঠা আমাদের আত্মার সমগ্রতা পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও… ইউরোপের অতীতের সেই হারানো আত্মিক গৌরব কি প্রকৃতপক্ষে চিরদিনের জন্যই হারিয়ে গেছে? আমরা কোথায় ভূল করেছি তা উপলব্ধি করে আমরা কি সেই আত্মিক গৌরবের কিছুটা ফিরে পেতে পারি না?

এবং প্রথমে যা, আরবদের  রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রতি, আরবীয় জীবনের বাইরের রূপ, আর আমি এ জাতির লোকদের মধ্যে আবেগের দিক দিয়ে যে স্থির- নিশ্চয়তা লক্ষ্য করেছি তার প্রতি আমার পক্ষে সহানুভুতি মাত্র ছিলো, তাই ধীরে ধীরে আমার অজ্ঞাতসারে, এমন কিছুতে রূপান্তরিত হলো যা এক ব্যক্তিগত অন্বেষার সাথেই তুলনীয়। আমি ধীরে ধীরে আরো সচেতন হয়ে উঠলাম একটি আচ্ছন্ন-করা তন্ময় বাসনা সম্পর্কে- জানার এ বাসনা যে, আবেগের দিক দিয়ে ওদের নিশ্চিন্ত নির্ভরতার মূলে কী রয়েছে, আর কী সেই জিনিস যা আরবদের জীবনকে অতো আলাদা করে দিয়েছে পাশ্চাত্য জীবন থেকে? আর মনে হলো, এই বাসনা যেনো আমার নিজের গহনতম সমস্যাগুলির সাথেই রহস্যজনকভাবে জড়িত। আমি পথ খুঁজতে লাগলাম যা আমাকে দেবে আরদের চরিত্রে, তাদের ধ্যান-ধারণায় গভীরতরো অন্তদৃষ্টি, যে চরিত্র- ও ধ্যান-ধারণা ওদেরকে দিয়েছে একটা বিশেষ রূপ আর আত্মিক দিক দিয়ে ওদেরকে করেছে ইউরোপীয়দের থেকে অতো স্বতন্ত্র! ওদের ইতিহাস, তমদ্দুন আর ধর্ম সম্বন্ধে আমি গভীরভাবে পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। আর এই তাগিদ, যা আমি সেই জিনিসটি আবিস্কার করার জন্য অনুভব করি যা ওদের হৃদয়কে করেছে উদ্বুদ্ধ আর পরিপূর্ণ আর দিয়েছে ওদের পথের দিশা- তারি মধ্যে যেনো আমি আভাস পেলাম একটি প্রেরণার, এক গোপন শক্তি আবিষ্কারের, যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে, পূর্ণ করেছ, আর দিয়েছে দিক-নির্দেশনার প্রতিশ্রুতি।

 

About মুহাম্মদ আসাদ