মক্কার পথ

মধ্যপথ

এক

আমরা হাইল ত্যাগ করেছি এবং উটের উপর সওয়ার হয়ে মদীনার দিকে চলেছিঃ আমরা এখন তিনজন,কারণ ইবনে মুসাদের একজন লোক, মনসুর আল-আসসাফ, এখন আমাদের যাত্রাপথের একটি অংশে আমাদের সংগে চলেছে ‘আমীরে’র এক আদেশ নিয়ে।

মনসুর এতোই সুন্দর যে, পাশ্চাত্য কোন নগরীর কোন রাস্তায় বের হলে তাকে দেখবার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠতো সকল রমণী। সে খুবই লম্বা, মুখমন্ডল মজবুত, বীরত্বব্যঞ্জক, আর তার মুখাবয়ব বিস্ময়কর রূপে মসৃণ। তার গায়ের চামড়া সাদাটে বাদামী রঙের যা আরবদের মধ্যে সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করার একটি অভ্রান্ত লক্ষণ; তার কালো চোখ দু’টি সুগঠিত, ভুরু জোড়ার নিচে থেকে দুনিয়াকে নিরীক্ষণ করে আগ্রহের সাথে। তার মধ্যে জায়েদের কমনীয়তা অথবা প্রশাস্ত নিরাসক্তির কিছুই নেই; তার মুখের রেখাগুলি থেকে বোঝা যায়, মনসুর প্রচণ্ড- অথচ শাসনে-রাখা প্রবৃত্তির অধিকারী, রেখাগুলি তার চেহারায় এমনি একটি বিষণ্নতা এনে দিয়েছে যা আমার শাম্মার দোস্তের স্নিগ্ধ গাম্ভীর্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তবে জায়েদের মতোই মনসুরও দুনিয়ার অনেক কিছু দেখেছে এবং তার সহবত সত্যই আনন্দদায়ক।

আমরা নুফুদের বালুমাটির জায়গায় এখন যে ধূসর এবং হলদে কংকরময় স্থানে এসে পৌঁছেছি, সেখানে দেখতে পাচ্চি, নানা রকম ছোট ছোট জীব-জানোয়ার, যারা কি না ভরে রেখেছে স্থানটিকেঃ ক্ষুদ্র ধুসর গিরগিটিগুলি এক অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে আমাদের উটের পায়ের ফাঁক দিয়ে এঁকেবেকে ছুটি গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে একটি কাঁটা গুল্মের নিচে আর জ্বলন্ত চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে যখন আমরা সেগুলিকে পাশে রেখে আগিয়ে চলেছি, দেখতে পাচ্ছি ছোট্ট ধুসর ফোলা ফোলা মোটা লেজওয়ালা মেটো ইঁদুর, দেখতে অনৈকটা কাঠবিড়ালীর মতো, আর এদেরই স্বগোত্রীয় মারমথ, যার গোশত নযদী বেদুঈনের নিকট খুবই প্রিয়, আজতক আমি অতিমাত্রায় মোলায়েম যেসব সুস্বাদু খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ করেছি, এর গোশত তারি অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে এক ফুট লম্বা হালাল এক ধরনের সরীসৃপ, যাকে বলা হয় ‘দাব’- এই প্রাণীটি জীবন ধারণ করে লতাগুল্মের মূল খেয়ে এবং এর গোশতের স্বাদ মোরগ এবং মাছের মাঝামাঝি। আমরা দেখতে পাই- ছোট্ট মুরগীর ডিমের আকারের চতুষ্পদী গোবরে পোকা মর্মস্পশী ধৈর্যের সংগে একদলা শুকনা উটের লাদ গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে; সামনের পায়ের উপর শরীরের ভর রেখে পিছনের মজবুত উটের পাগুলি দিয়ে দলটিকে ঠেলছে পেছনদি। আর এভাবে খুঁজে পাওয়া মহামূল্য বস্তুটিকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওদের আবাস গৃহের দিকে অত্যন্ত কষ্টের সংগে এবং যখনই কোন নুড়ি পাথর ওদের পথ রুদ্ধ করছে, ওরা চিৎ হড়ে পড়ছে মাটির উপর, আর অনেক কষ্টের সাথে গড়াগড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, এভাবে তাদের আয়ত্তাধীন বস্তুটিকে গড়িয়ে নিয়ে যায় আরো কয়েক ইঞ্চি সামনে, আবার চিৎ হড়ে পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায় এবং কাজে লেগে যায়, ক্লান্তিহীন শ্রান্তিহীন… কখনো বা ধূসর খরগোশ ধুসর ঝোপ-ঝাড়ের নিচে থেকে লম্বা ধাপ ফেলে আগিয়ে যায়। একবার আমরা দেখতে পেলাম কয়েকটি হরিণ, কিন্তু অতো দূরে যে, গুলী করা সম্ভব হলো না; দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী নীল ধূসর ছায়ার ভেতরে হারিয়ে গেলো ওরা।

-‘হে মুহাম্মদ, আপনি আমাকে বলূন’ জিজ্ঞাস করে মনসূর, ‘আপনি কেমন করে আরবদের মধ্যে আপনার স্থাপন করে নিলেন? এবং কেমন করেই বা আপনি কবুল করলেন ইসলাম?’

-‘তা কেমন করে ঘটলো, বলছি,’ মাঝপথে বলে ওঠে জায়েদ- প্রথম তিনি আরবদের ভালোবেসে ফেলেছিলেন এবং ওদের ভালোবেসে ওদের ধর্মকেও ভালোবেসে ফেলেন। চাচা, আমি কি ঠিক বলিনি?’

-‘জায়েদ যা বলেছে, তা সত্য মনসুর। বহু বছর আগে আমি যখন আরব ভুমিতে আসি তখন আমি তোমাদের জীবন পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। এবং যখন আমি নিজেকেই জিজ্ঞাস করতে লাগলাম, তোমরা কী ভাবো এবং তোমরা কী বিশ্বাস করো, তখন আমি জানতে পারলাম ইসলাম কী’!

-‘কিন্তু, হে মুহাম্মদ, আপনি কি হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর সত্যিকার কালাম?”

-‘না, তা নয়, এতো তাড়াতাড়ি এ উপলব্ধি হয়নি। আমি তো তখন বিশ্বাসই করতাম না যে, আল্লাহ মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ কথা বলেছেন, অথবা যে কিতাবগুলিকে মানুষ তাঁর কালাম বলে দাবি করে সেগুলি জ্ঞানী মানুষের পুস্তক ছাড়া আর কিছু….’।

মনসুর আমার দিকে তাকায় চরম অবিশ্বাসের সংগেঃ ‘তা কি করে হতে পারে মুহাম্মদ? আপনি কি কখনো মূসা যে-কিতাব এনেছিলেন তাতেও, কিংবা হযরত ঈসার শিক্ষাতেও বিশ্বাস স্থাপন করেননি? কিন্তু আমি তো সবসময় ভেবেছি পশ্চিমের লোকেরা আর যাই-হোক, এগুলি বিশ্বাস করে’।

-‘কেউ কেউ করে, মনসুর এবং অন্যরা করে না, আর আমি ছিলাম এই অন্যদেরই একজন…..’।

এবং আমি তাকে বোঝাই যে, অনেককাল ধরে পশ্চিমের দিকে অনেক লোক তাদের নিজেদের কিতাবকে এবং তার সংগে অপর কারো ধর্মগ্রন্হকে আর আল্লাহর সত্যিকার ওহী বা প্রত্যাদেশ মনে করে না। বরঞ্চ ওগুলির মধ্যে ওরা দেখতে পায় বহু বহু যুগের পরিক্রমায় বিকশিত মানুষের ধর্মীয় আশা-আকাংখার ইতিহাস।

-‘কিন্তু ইসলামের সংগে কিছুটা পরিচিত হওয়ার সংগে সংগে ভীষণ একটা হোঁচট খায় আমার এই দৃষ্টিভংগি’, আমার কথার জের টেনে আমি বলি, ‘আমার এই পরিচয় হয় তখন যখন আমি দেখতে পেলাম ইউরোপীয়দের মতো যা’ মানুষের জীবন-পদ্ধতি হওয়া উচিত মুসলমানদের জীবন-ধারনের রীতিনীতি তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; এবং যখনি ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে আমি আরো বেশি কিছু শিখতে লাগলাম প্রত্যেকবারই আমার মনে হলো যেনো এমন কিছু আবিষ্কার করেছি যা আমি না জেনেও সবসময় জানতাম….’।

এবং এভাবে আমি মনসুরকে বলে চলি মধ্যপ্রাচ্যে আমার পয়লা সফরের কথাকেমন করে আমি সিনাই মরুভূমিতে হাসিল করেছিলাম আরবদের সম্পর্কে  আমার প্রথম ধারণা, সে কথা; ফিলিস্থিনে, মিসরে, ট্রান্সজর্ডান ও সিরিয়াতে আমি কী দেখছি, কী অনুভব করেছি, সে কাহিনী; কেমন করে দামেশকে আমি পয়লা এই পূর্বাভাস পাই যে, তখনো অকল্পিত এক সত্যের পথ, ধীরে ধীরে উদঘাটিত হচ্ছে আমার সামনে এবং কেমন করে তুরস্ক সফরের পর ফিরে গিয়েছিলাম ইউরোপে এবং বুঝতে পেরেছিলাম, পশ্চিমা জগতে আবার নতুন করে বাস করা আমার পক্ষে কঠিন; কারণ একদিকেআরব জাতিসমূহ এবং তাদের সংস্কৃতি সংগে আমার প্রথম পরিচয় মধ্যে যে এক বিস্ময়কর অস্বস্তির জন্ম দিয়েছিলো তার গভীরতো তাৎপর্য উপলব্ধির জন্যে আমি ব্যগ্র ছিলাম এ আশায় যে, এতে করে আমি নিজে জীবন থেকে যা প্রত্যাশা করি তা আরো নিবিড় করে বোঝার জন্যে তা হবে সহায়ক, অন্যদিাকে, আমি তখন এমন একটা বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছি যেখানে আমার নিকট এ সত্য  ক্রমেই স্পষ্টতরো হয়ে উঠেছিলো যে, পাশ্চাত্য সমাজের আশাআকাংখার ও লক্ষ্যের সংগে নিজেকে আর কখনো আমি এক করে দেখতে পারবো না।

১৯২৪ সালের বসন্তকালে ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ আমাকেদ্বিতীয়বারের মতো পাঠায় মধ্যপ্রাচ্যে। আমার আগেকার সফরগুলি বর্ণনা করে আমি যে বই লিখতে শুরু করেছিলাম শেষপর্যন্ত  তা সম্পূর্ণ হয়েছিলে। (আমি মধ্যেপ্রচ্যের পথে রওনা করার কয়েক মাস পরেই Unromantisches Morgenlandএর নামে বইটি ছাপা হয়। এই নামকরণের দ্বারা বুঝতে চেয়েছিলাম, বইটি মুসলিম প্রাচ্যের বহিরাংগের রোমান্টিক বিজাতীয় চিত্র নয়, বরং এটি তার দৈনন্দিন জীবানের বাস্তব সত্যগুলির মর্মস্থলে পৌঁছুনোরই একটি প্রয়াস। যদিও বইটির জিওনিষ্টবিরোধী মনোভাব এবং আরবদের জন্যে অস্বাভাবিক প্রীতী জার্মান পত্র পত্রিকায় বেশ কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিলো, তবু আমার ধারণা, বইটি খুব বেশি কাটেনি।

আবার আমি ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিই। সম্মুখে দেখতে পেলাম মিসরের উপকূলভাগ। পোর্ট সৈয়দ থেকে কায়রো পর্যন্ত ট্রেনে ভ্রমণ একটা পরিচিতি বইয়র পাতা উল্টানোর মতোই মনে হলো। সুয়েজ খাল এবং মানজালা হ্রদের মাঝখানে মিসরের অপরাহ্ণ উন্নোচিত করেছে তার স্বরূপ। বুনো হাঁস পানিতে সাঁতার কাটছে এবং ঝাউ গাছগুলি নাড়ছে তাদের সুন্দর অর্ধবৃত্তাকার  শাখাপুঞ্জ। সমতল অঞ্চলে জেগে উঠছে গ্রামের পর গ্রামযা প্রথমে ছিলো বালুকাময় আর কোথাও বা তৃণলতায় ঢাকা। বসন্তকালের জমিতে অলসভাবে পা ফেলতে ফেলতে লাঙল টেনে চলেছে, লম্বা লম্বা ধাপে, কসস মাথায়, হাত, দুবা্র দুপাশে ছেড়ে দিয়ে, তখন আমি নিজেকে বললাম সারা বিশ্বে কোন কিছুইসবচেয়ে নিখুঁত গাড়ি, অথবা সবচেয়ে গর্বের বস্তু পুল, কিংবা সবচেয়ে ভাবগর্ভ কোন বইপারে না প্রতীচ্যে হারিয়ে যাওয়া প্রাচ্য ইতিমধ্যেই বিপন্ন হয়ে পড়া এই শ্রেণীর স্থান পূরণ করতে যেশ্রী মানুষের আসল  সত্তা এবং তার চারদিকে পৃথিবীর মধ্যে এক যাদুগরী সুরসংগতির অভিব্যক্তি ছাড়া কিছু নয়

এবার আমি ভ্রমণ করছিলাম প্রথম শ্রেণীতে। আমি ছাড়া আমার কম্পার্টমেন্টে ছিলো আর মাত্র দুজন লোক, আলেকজেন্দ্রিয়ার এক গ্রীক ব্যবসায়ীভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের সকল বাসিন্দার মধ্যে সহজ আলাপ জমানোর যে বৈশিষ্ট্যটি দেখা যায় সেই বৈশিষ্ট্য নিয়ে সে আমাকে অতি অল্প সমেয়েই এক উত্তেজনাপূর্ণ  আলোচনায় জড়িয়ে ফেলে, আমরা যা কিছু দেখছিলাম তারি উপর সে করে চলছিলো চটুল রসিক মন্তব্যঃ এবং একজন মিসরীয় উম্দা অর্থাৎ গ্রাম্য  সর্দার তার দামী রেশমের কাফতান এবং তার স্কার্ফের ভিতর থেকে বেরিযে থাকা ঘড়ির  পুরু সোনার চেন দেখে স্পষ্টই যাকে একজন ধনী ব্যক্তি বলে মনে হয়, বোঝা গেল, সে যে একেবারে গন্ডমূর্খ তাতেই সে খুশি! বলতে কি, আমদের সংগে আলাপে যোগ দেয়ার সত্ত্বেও আলোচনার মধ্যে সেও তার তীক্ষ কান্ডজ্ঞানের পরিচয় দেয় এবং গ্রীক সওদাগরটির সংগে তর্কযুদ্ধে নৈপুণ্যের প্রমাণ দেয় বার বার।

আমার মনে আছে, আমরা আলাপ করছিলাম ইসলামের এমন কটি সামাজিক মূলনীতি নিায়ে যা সে সময়ে আমার চিন্তাধারাকে অধিকার করে রেখেছিলো প্রবলভাবে। ইসলামী আইনের সামাজিক ইনসাফের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রশংসার সাথে আমার গ্রীক সহযাত্রীটি পুরাপুরি একমত হতে পারছিলো না।

আপনি একে যত ইনসাফসম্মত মনে করছেন, আসলে তা তেমন ইনসাফসম্মত নয় বন্ধু! আমরা ইতিমধ্যেই ফরাসী ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছি। আমাদের মিসরীয় সহযাত্রীটির সুবিধার জন্য আবার আরবী ভাষায় ফিরে এসে গ্রীক বন্ধুটি আমাকে লক্ষ্য করে বলে, তোমরা বলে থাকো, তোমাদের ধর্ম খুবই ইনসাফের ধর্ম। তুমি তাহলে বলতে পারো কেন ইসলাম মুসলমান পুরষকে খৃষ্টান অথবা ইহুদী মেয়ে শাদি করার অনুমতি দেয় অথচ তাদের মেয়ে ও বোনদেরকে কোন খৃষ্টান অথবা ইহুদী পুরুষের নিকট শাদি দিতে রাযী হয় না? তুমি কি একে ইনসাফ বলতে চাও, আ্যঁ?

নিশ্চয়, মূহুর্তের জন্য ইতস্তত না করে জমকালো পোষাকপরা উম্মাদটি বলে, শোনো! তোমাকে বলছি, কেন আমদের ধর্মীয় বিধানে এ ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা, মুসলমানরা, বিশ্বাস করি না যে, ঈসাতাঁর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোকআল্লাহ পুত্র ছিলেন। তবে আমরা মনে করি যে. তিনি আল্লাহর একজন সত্যিকার নবী ছিলেন। যেমন আমরা মনে করি মূসা, ইবরাহীম এবং বাইবেলে উল্লিখিত অন্য সকলেই নবী ছিলেন। শেস নবী হযরত মুহাম্মদ কে যেভাবে পাঠানো হয়েছিলো, সেভাবেই সকল নবীকেও পাঠানা হয়েছিলো, সেভাবেই সকল নবীকে ও পাঠানো হয়েছিলো মানবজাতির নিকট। কাজেই, যদি কোন ইহুদী বা খৃষ্টান বালিকা কোন মুসলমান পুরুষকে বিয়ে করে, সি নিশ্চিত থাকতে পারে তার নিকট যেসব ব্যক্তি পবিত্র, তার নতুন পরিবারে তাঁদের কারো প্রতি কোনো অশ্রদ্ধেয় উক্তি করা হবেনা; অথচ এ কথা নিশ্চিত যে, যদি কোন মুসলিম বালিকা কোন অমুসলিমকে বিয়ে করে, তাহলে যাকে সে আল্লাহর রসূল বলে বিশ্বাস করে তাঁকে অবমাননা করে হবেএমনিকি তার নিজের সন্তানরাও তাঁর অবমাননা করতে পারে, কারণ এটি সত্য নয় যে, সন্তানেরা সাধারণত পিতার ধর্মই অনুসরণ করে! তুমি কি মনে করো একটি মুসলিমা বালিকাকে এ ধরণের যন্ত্রণা এবং অবমাননার দিকে ঠেলে দেওয়া ইনসাফ হবে?

গ্রীক বৃদ্ধটির অসহায়ভঅবে তার কাঁধ ঝাঁকুনি দিলে; কিন্তু কোনা জবাব খুঁজে পেলো না। আমার মনে হলো, এই সরল নিরক্ষর উম্মাদটি , তার নিজের জাতি যেবিশেষ কান্ডজ্ঞানের অধিকারী তারই সাহায্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের একেবারে মর্মমূল স্পর্শ করেছে এবং দ্বিতীয়বারের মতো আমি, যেমনটি ঘটেছিলে জেরুযালেমের সেই বৃদ্ধ হাজীর বেলায়, উপলব্ধি করলাম, ইসলামের দিকে একটি নতুন দরজা যেনো খুলে দেওয়া হচ্ছে আমর জন্য।

আমার পরিবর্তিত আর্থিক অবস্থায় এখন আমি কায়রোতে এমন একটি স্টাইলে জীবনযাপন করতে সক্ষম, যা কয়েক মাস আগে আমার পক্ষে ছিলো অচিন্ত্যনীয়। এখন আর আমাকে সিকিআনি গুণতে হয় না। এই শহরে প্রথম বসবাসকালে যখন আমাকে জীবন ধারণ করতে হতো পাউরুটি, জলপাই আর দুধের উপর, সে সময়ে কথা  ‍ভূলে গেলাম। কিন্তু এক ব্যাপারে আমি আমার অতীতের ঐতিহ্য বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখিঃ কায়রোর কোনো জৌলুসপূর্ণ এলাকায় না থেকে আমি আমার পুরানো বান্ধবী, ত্রিয়েস্তের সেই স্থুলাংগী রমণিীটির বাড়িতেই কয়েকটি কামড়া ভাড়া করি। মহিলাটি আমাকে পেয়ে দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেন এবং আমার দুই গালে মায়ের স্নেহে চুমু খান।

আমর এখানে আসার তৃতীয় দিনে, সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছিলো, আমি শুনতে পেলাম দুর্গ থেকে কামানের চাপা আওয়াজ। সেই মূহুর্তে কিল্লার মসজিদে দুপাশ থেকে আকাশের দিকে উঠেযাওয়া দুটি মিনারের সর্বোচ্চ গ্যালরীতে লাফিয়ে উঠলো একটি আলোর বৃত্ত এবং নগরীর সব কটি মসজিদের মিনার একই ধরণের আলোকমালায় শোভিত হয়ে উঠলো, আর প্রত্যেকটি মিনারের উপর একই রূপ আলোর বৃত্ত ফুটে উঠলো। পুরনো কায়রোর ভেতর দিয়ে এক বিস্ময়কর গতিচাঞ্চল্য প্রবাহিত হলোনগরীর মানুষের পদক্ষেপ দ্রুততরো এবং যুগপৎ অধিকতরো আনন্দচঞ্চল হয়ে উঠলো এবং উচ্চতরো হয়ে উঠলো রাস্তার বহু বিচিত্র ধ্বনিঃ আপনি অনুভব করছেন এবং প্রয় শুনতে পাচ্ছেন সর্বত্র একটি নতুন উত্তেজনার তরংগধ্বনি!

 এবং সবকিছুই ঘটলো এ কারণে যে, দ্বিতীয়বার চাঁদ ঘোষণা করেছে নতুন মাসের আগমনবার্তা (কারণ ইসলামী পঞ্জিকা চলে চন্দ্র মাস আর সনের হিসেবে) এবং মাসটি হচ্ছে রমযান মাস, ইসলামী সনের সবচেয়ে গাম্ভীর্য ও গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাস স্মরণ করিায়ে দেয় তেরশো বছরেরও আগের সে সময়ের কথা যখন ইতিহাসের বর্ণনা মতে, রসুলুল্লাহ পেয়েছিলেন আলকুরআনের প্রথম ওহী। প্রত্যেক মুসলিম এ মাসে কঠোরভাবে সিয়াম পালন করবেএই হচ্ছে বিধান; যারা অসুস্থ তারা ছাড়া নারীপুরুষ সকলের জন্যেই খানাপিনা (এমন কি ধুমপানও) নিষিদ্ধ, সুবেহ সাদেকের আগে পূর্ব দিগন্তে যে আলোর রেখা দেখা যায় সেই মূহুর্ত থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ত্রিশ দিনের জন্য। এ ত্রিশ দিন কায়রোর লোকেরা চলাফেরা করে চোখে এমন উজ্জ্বলতা নিয়ে যে, যেনো ওরা উন্নীত হয়েছে এক পবিত্র এলাকায়। ত্রিশ রাত ধরে আপনি শুনতে পাবেন কামানের আওয়াজ, সংগীতের সুর এবং আনন্দ কোলাহল, যখন মসজিদগুলি আলোকে ঝলমল করছে দিনের আগমন পর্যন্ত।

জানতে পারলাম রমযানের এই মাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটিঃ আপনাকে খাদ্য ও পানি বর্জন করতে হবে এই উদ্দেশ্যে যে, আপনিও যেনো আপনার নিজের শরীরে অনুভব করতে পারেন দরিদ্র এবং বুভুক্ষরা যা অনুভব করে। এভাবে মানুষের চেতনায় সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে একটি ধর্মীয় মৌলিক নীতির উপর।

রমযান মাসে রোযা আর একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবনে নিজে নিজে শৃংখলা মেনে চলার অভ্যাসযা কিনা যুক্তিগত নৈতিকতার একটি দিক, যে নৈতিকতাকে ইসলামের সকল শিক্ষার মাধ্যই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (যেমন, সকল প্রকার মাদক দ্রব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে, কারণ ইসলাম মনে করে মাদক দ্রব্য হচ্ছে চৈতন্য ও দায়িত্ববোধ থেকে নিস্কৃতি পাবার অতি সহজ এক উপায়)। এ দুটি  উপাদানের মধ্যে অর্থাৎ মানুসের ভ্রাতৃত্ব এবং ব্যাক্তির স্বআরোপিত নিয়মানুবর্তিতায় ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিভংগির রূপরেখা আমার কাছে ধীরে ধীরে স্পস্ট হয়ে উঠতে শুরু করলো।

ইসলামের প্রকৃত অর্থ কী এবং ইসলাম কী চায়, তার একটা পূর্ণতরো চিত্র পাবার প্রয়াসে আমি, কায়রোর কোনো কোনো মুসলিম বন্ধু যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতে পেরেছিলেন তার দ্বারা প্রচুর উপকৃত হই। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্থানের অধিকারী হচ্ছেন শায়খ মোস্তফা আলা মারাঘি সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামী পন্ডিতদের অন্যতম এবং সন্দেহতীতভাবেই আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিমদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর (কয়েক বছর পার তিনি আলআজহারের রেকটর হয়েছিলেন)। খুব সম্ভব তখন তাঁর বয়স ছিলো চল্লিশ এবং পঞ্চাশের মাঝামাঝি, কিন্তু তাঁর মজবু পেশীবহুল দেহে ছিলো কুড়ি বছরের তরুনের তৎপরতা ও প্রাণশক্তি। তাঁর পান্ডিত্য ও গাম্ভীর্য সত্ত্বে ও মূহুর্তের জন্যও কখনো তিনি তাঁর রসবোধ হারাননি। তিনি ছিলেন মিসরের মহান সংস্কারক মুহাম্দ আবদুহুর একজন ছাত্র এবং তাঁর যৌবনকালের অনুপ্রেরণার উৎস, অগ্নিপুরুষ জামালউদ্দীন আল আফগানীর সহচর্য লাভে ধন্য শায়খ আলমারাঘি নিজেও ছিলেন একজন তীক্ষ্মধী বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তবিধ। তিনি একথা বোঝাতে কখনোই ভুলতেন না যে, সাম্প্রতিককালের মুসলমানরা তাদের ধর্মের আদর্শ থেকে সত্যি অনেক দূরে সরে পড়েছে এবং আজকের মুসলমানের জীবন ও চিন্তার মাপকাঠিতে মুহাম্মদের শিক্ষার সম্ভাবনাগুলির পরিমাপ করার চাইতে বাড় আর কিছু হতে পারে না।

ঠিক যেমন, ভূল হবে, তিনি বলতেন, খৃষ্টানদের একে অপরের প্রতি প্রেমহীন আচরণের মধ্যে হযরত ঈসার প্রেমের বাণীর অস্বীকৃতি দেখা

এ সতর্কবাণীর সংগে শায়খ আলমারাঘি আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন আল আজহারের সংগে।

কায়রোর সবচেয়ে পুরানো বাজার মৌস্কি স্ক্রীটের ভীড়ের হট্টাগোল থেকে বের হয়ে আমরা পৌঁছুই একটি ছোট্ট নির্জন দূরবর্তী স্কোয়ারেযার একটি দিক হচ্ছে, আল আযহার, মসজিদের সরল প্রশস্ত সম্মুখভাগ। একটি দোপাল্লার গেট এবং ছায়া ঢাকা প্রাংগনের ভেতর দিয়ে আমরা খাস মসজিদের চত্বরে প্রবেশ করি। একটি বৃহৎ চতুর্ভূজ, যা বহু পুরানো মেহরাব আর্কেড দ্বারা বেষ্টিত। মাথায় পাগড়ী পরা, লম্বা কালো রঙে জোব্বা গায়ে, ছাত্ররা বসে আছে মাদুরের উপর আর নীচু স্বরে পড়ছে তাদের এই পুস্তকক এবং পান্ডুলিপি। সামনে, মসজিদের বৃহৎ ছাদঢাকা মিলনায়তনে লেকচার দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজন ওস্তাদও বসে আছেন খড়ের মাদুরের উপর, স্তম্ভের নিচে, লম্বা সারিগুলি ধরে হল ঘরটিকি ছেদ করেছে, আর প্রত্যেক ওস্তাদের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে হাঁটু গেড়ে বসেছে এক দল শিক্ষার্থী। অধ্যাপক তাঁর স্বর একবার ও উচু করেন না, ফলে, তাঁর উচ্চারিত কোনো শব্দই যাতে মিস না হয় সেজন্য দরকার হয় প্রচুর মনেোযোগ এবং অভিনিবেশের। যে কোন ব্যক্তির পক্ষেই এ চিন্তা স্বাভাবিক যে, এ ধরণের অভিনিবেশ সত্যিকার পান্ডিত্যের সহায়ক না হয়ে পারে না। কিন্তু শায়খ আলমারাঘি শিগগিরিই আমার সে ভূল ধারণা ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন।

আপনি ঐ পন্ডিতদেরকে দেখতে পাচ্ছেন? তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন, ওরা হচ্ছে ভারতের সেই পবিত্র গাভীদের মতো, যে গাভী, আমি শুনেছি রাস্তার উপর যেতো ছাপা কাগজ পায়, সবই খেয়ে ফেলে।হ্যাঁ, যে সব বই শত শত বছর আগে লেখা হয়েছে সে সবের মুদ্রিত পৃষ্ঠাগুলি ওরা গোগ্রাসে গিলতে থাকে, কিন্তু কখনো হজম করে না। ওরা আজ আর চিন্তা করে না নিজেরা। ওরা পড়ে আর পুনরাবৃত্তি করে, পড়ে আর পুনরাবৃত্তি করতেই শেশে, পুরুষের পর পুরুষ ধরে ।

কিন্তু শায়খ মুস্তাফা আমি মাঝখানে প্রশ্ন করি, আর যাই হোক, আল আজহার তো ইসলামী শিক্ষার মূল কেন্দ্র এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমানদের তামদ্দুনিক ইতিহাসের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠায় এর নামের সাক্ষাৎ পাই। গত দশ শতকে এই বিশ্ববিদ্যালয় যেসব চিন্তাবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা, দার্শনিক ও গণিতবিদের জন্ম দিয়েছে তাঁদের সম্বর্কে আপনি কি বলেন?

কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই আলআজহার আর এ ধরণের মনীষীদের জন্ম দিচ্ছে না। শায়খ দুঃখ করে বলেন, তাও হয়তো পুরাপুরি সত্য নয়; হাল আমলেও কখনো কখনো কোনো কোনো স্বাধীন চিন্তাবিদের অভ্যূদয় হয়েছে আলআজহার থেকে। কিন্তু মোটামুটি একথা সত্য যে, গোটা মুসলিম জাহান যে বন্ধাত্বে ভুগছে আলআজহারও সেই বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়েছে, আর এর সেকালের উদ্যোগ অনুপ্রেরণা এখন নির্বাপিত ছাড়া আর কিছু নয়। আপনি যেসব প্রচীন মুসলিম চিন্তাবিদের কথাতদ উল্লেখ করলেন তাঁরা স্বপ্নেও কখনো একথা ভাবেননি যে, বহু শতাব্দী পর তাঁদের চিন্তার ধারাবাহিকতা বজায় না রেবেও তার বিকাশ সাধন না করে, শুধু বার বার ঘুরে ফিরে তার পুনরাবৃত্তি করা হবে, যেনো সেগুলি পরম ও অভ্রান্ত সত্য! যদি আমরা পরিবর্তরন চাই ভালোর দিকে, তাহলে আমাদের বর্তমান চিন্তানুকরণের পরিবর্তে চিন্তাশীতাকে করতে হবে উৎসাহিত.

আল আজহারের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে শায়খ আলমারাঘির এই তীক্ষ্ম মন্তব্য, আপনি মুসলিম জাহানের সর্ব্রত্র যে সাংস্কৃতিক ক্ষয়িষ্ণুতার মুখামুখি হবেন তার গভীরতম কারণগুলির অন্যতম কারণটি বুঝতে আমকে সাহায্য করে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে এই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জড়ত্বপ্রাপ্তটি কি বিভিন্ন মাত্রায় প্রতিবিম্বিত নয় মুসলমানদের বর্তমানের সামাজিক বন্ধ্যাত্বেো? এই মানসিক জড়ত্বেরই আরেকটি রূপ কি আমরা দেখতে পাই না, নিস্ক্রিয়তার সংগে প্রায় অলসভাবে সেই অনাবশ্যক দারিদ্রকে স্বীকারক করে নেওয়াতে যার মধ্যে বহু মুসলমান বাস করছে? যেসব সামাজিক অন্যায় তাদের উপর অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেগুলি মুখ বুঁজে বরদাশত করার মধ্যে।

এবং তাহলে কি এ খুবই বিস্ময়কর, আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, মুসলমানদের অবক্ষয়ের এমন সব বাস্তব প্রমাণদিতে মজবুত হয়েই প্রতীচ্যে এতো সব ভুল ধারণার উদ্ভব হয়েছে? ইসলাম সম্বন্ধে প্রতীচ্যের জনসমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সংক্ষেপে বর্ণনা করা যায় এভাবেঃ মুসলমানদের পতনের প্রধান কারণই হচ্ছে ইসলাম, যা খৃষ্ট বা ইহুদী ধর্মের সাথে তুলনীয় একটিক ধর্মীয় আদর্শ হওয়া তো দূরের কথা, বরং এ হচ্ছে এক গলি মিশ্রণ, মরুভূমিসুলব অন্ধত্ব, স্থূলি ইন্দ্রিয়পয়ণতা, কুসংস্কার আর বোবা অদৃ্ষ্টবাদ, যা উন্নততরো মহত্তরো সামাজিক অবস্থার দিকে মানব জাতির যে অভিযান চলছে তাতে ইসলামের অনুসারীদেকে শরীক হতে বাধা দেয়; ইসলাম মানবমনকে সংস্কার অথবা জিজ্ঞাসাবিরুদ্ধতা থেকে মুক্ত তো করেই না, বরং এই বিরুদ্ধতাকে আরো মজবুত করে থকে। তাই যতো জলদি জলদি মুস্যিলম জাতিগুলি ইসলামী বিশ্বাস এবং সামাজিক আচারআচরণের গোলামি থেকে আযাদ হবে এবং পাশ্চাত্য জীবনপদ্ধতি গ্রহণ করতে রাজীক হবে, ততোই তাদের জন্যে মঙ্গলবাকি দুনিয়ার জন্যেও

অতোদিনে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে আমার এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, ইসলাম সম্পর্কে গড়পড়তা প্রতীচ্যবাসীর ধারণা একেবারেই বিকৃত। আল কুরআনের পাতায় পাতায় আমি যা দেখতে পেলাম তা বিশ্ব জগত সম্পর্কে মোটেই এক স্থুল বস্তুবাদী ধারণা নয়, বরং আল্লাহ সম্পর্কে একটি গাঢ় গভীর চেতনা, যার অভিব্যক্তি ঘটেছে আল্লাহ সৃষ্ট গোটা প্রাকৃতিকে যুক্তিক দিয়ে গ্রহণ করার মধ্যেপাশাপাশি বুদ্ধিক এবং ইন্দ্রিয়জ স্পৃহা, আত্মিক প্রয়োজন ও সামাজিক চাহিদার মধ্যে একটি সুন্দর সামঞ্জস্য! আমার স্পষ্ট হয়ে উঠলো দিবালোকের মতোঃ মুসলমানদের পতনের জন্যে ইসলামের ক্রটিবিচ্যুতি নয়, বরং ইসলামের আদর্শ মুতাবিক জীবনযাপনে আমাদের ব্যর্থতাই দায়ী।

কারণ, এ কথা তো সত্য যে, ইসলামই প্রথমদিকের মুসলমানদের তামদ্দুনিক দিক দিক দিায়ে উচ্চতার স্বর্ণ চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলো তাদের কর্মশক্তিকে সজ্ঞান চিন্তার দিকে পরিচালিত করে;এই সজ্ঞান চিন্তাই তো আল্লাহর সৃষ্টির প্রকৃতি তথ্য তাঁর অভিপ্রায়কে বোঝার একমাত্র উপায়। মুসলমানেরা দুর্বোধ্য, এমনকি বুদ্ধির অনধিগম্য কোনো ডগ্মায় বিশ্বাস করুক এমন কোনো দাবী করা হয়নি তাদের কাছে; বস্তুত হযরতের শিক্ষায় কোনো রকম অন্ধ বিশ্বাসের স্থন নেই। আর এ কারনেই প্রথম দিকের যে জ্ঞানানুসন্ধিৎসা মুসলিম ইতিহাসকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে, পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো, তাকে চিরচারিত ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধের বেদনাদায়ক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে ঘোষণা করা হয়নি। পক্ষান্তরে বলা যায়, এর উদ্ভব ঘটেছে খাস করে ঐ ধর্ম থেকেই। আরবের নবী ঘোষণা করেনঃ জ্ঞানের অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য পবিত্রতম কর্তব্য; আর তাঁর উম্মতের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিলো এই বিশ্বাস যে, কেবলমাত্র জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই আল্লাহর পূর্ণ ইবাদত সম্ভব। আল্লাহ কোনো রোগ পয়দা করেন না তার ওষুধ সৃষ্টি না করে, –মহানবীর এই কথা নিয়ে যখন তাঁরা গভীরভাবে চিন্ত করলেন, তখন তাঁদের এই উপলদ্ধি হলো যে, অজ্ঞাত ওষুধের অনুসন্ধান করে তাঁরা পৃথিবেীতে আল্লাহর অভিপ্রায়কে পূর্ণ করার ব্যাপারে সহায়তা করতে পারেন, আর এভাবেই তাদের নিকট চিকিৎসা গবেষণা একটি ধর্মীয় কর্তব্যের পবিত্রতায় মান্ডিত হয়ে ওঠে। তাঁরা পাঠ করলেন আলকুরআনের এই আয়াতঃ আমি প্রত্যেক প্রাণীকে সৃষ্টি করি পানি থেকআর এই শব্দগুলির তাৎপর্য ভেদ করতে গিয়ে তাঁরা প্রাণীসত্তাসমূহ এবং সেগুলির বিকাশ সম্বন্ধে অধ্যয়ন শুরু করেন, আর এভাবেই তাঁরা জীববিজ্ঞানের বুনিয়াদ স্থাপন করেন। নক্ষত্রমালা ও তাদের গতিবিধির সামঞ্জস্যের প্রতি আলকুরআন অঙ্গুঁলি নির্দেশ করে স্র্যষ্টার মহিমা হিসাবে এবং এভাবেই মুসলমানরা জ্যোতিবিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রকে গ্রহণ করে এমন এক আগ্রহউদ্দীপনার সাথে যা অন্যান্য ধর্মে কেবল প্রার্থনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। কোপার্নিকাসের যে পদ্ধতি নিজ কক্ষপথে পৃথিবীর আব র্তন এবং সূর্যের চারদিকে গ্রহপুঞ্জের পরিক্রমণকে সাবিত করে, ইউরেোপে তার বিবর্তন ঘটে মাত্র ষোড়ষ শতকের শুরুর দিকে (শাস্ত্রবিদরা যার মুকাবিলা করেছিলেন প্রচন্ড আক্রোশের সাথে, কারণ তাঁরা মনে করতে এতে বাইবেলের আক্ষরিক শিক্ষার বিরোধিতা রয়েছে) কিন্তু এ পদ্ধতির বুনিয়াদ পত্তন হয় আরো ছয়শো বছর আগে, মুসলিম দেশগুলিতে কারণ ইতিমধ্যই নবম ও দশম শতকেই মুসলিম জ্যেতিবিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌছেছিলেন যে পৃথিবীর আকার গোল এবং সে আব র্তন করে তার নিজস্ব কক্ষপথে। তারা অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমার সঠিক হিসাব করতে সক্ষম হন এবং তাঁদের অনেকেই দাবী করতেন, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে আর তাঁদের এ দাবীর জন্য তাঁরা ধর্মদ্রোহীতার  অভিযোগে অভিযুক্ত হয়নি। এভাবেই তাঁরা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও শরীরতত্বের চর্চ্চা  করেন এভং অন্যান্য বিজ্ঞানের চর্চায়ও আত্মনিয়োগ করেন। বলাবাহুল্য, এসব বিষয়েই মুসলিম প্রতিভা তার সবচেয়ে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভগুলি রেখে গেছে। এই সব স্তম্ভ তৈরী করতে গিয়ে তাঁরা তাঁদের মহানবীর নসিহত অনুসরণ করেছেন, তার বেশি কিছু করেননি। মহানবীর সে নসিহত এইঃ কেউ যদি জ্ঞানের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, আল্লাহ তার জন্য বেহেশতের পথ সহজ করে দেন, বিজ্ঞানী তো আল্লাহর পথেই চলে থকেন কেবল কলমের কালির মর্যাদা শহীদের লোহুর চাইতেও পবিত্র তরো।

মুসলিম ইতিহাসের গোটা সৃজনশীল যুগটিতেই অর্থাৎ মহানবীর পর প্রথম পাঁচশো বছরের মধ্যে, মুসলিম সভ্যতার চাইতে, জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিক্ষার মহত্তরো কোনো পৃষ্ঠপোষক কেউ ছিলোন না; যেসব দেশে ইসলাম ছিলো চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী সেসব দেশ ছাড়া অধিকতরো নিরাপদ আশ্রয়ও ছিলো না আর কোথাও।

একইভাবে কুরআনের শিক্ষায় প্রভাবিত হলো সামাজিক জীবন যখন খৃষ্টান ইউরোপ মহামারী হলেই মনে করতো আল্লাহর গজব হচ্ছে যার নিকট মানুষের আত্মসমর্পণ করা ছাড় উপায় নেই। সেই সময়ে এবং তারো অনেক আগে, মুসলমানেরা তাদের নবীর এই নির্দেশ অনুসরণ করতো যে, মহামারী প্রতিরোধ করবার জন্য মহামারী উপদ্রুত শহর ও এলাকাগুলিকে আলাদা করে ফেলতে হবে সুস্থ এলাকাগিুলি থেকে এবং যখন, খৃষ্টান জগতের রাজাবাদশাহ ও অভিজাতরাও গোসল করাকে একটি প্রায় ইতর বিলাসিতা বলে মনে করতেন, সে সময়েও, এমনকি দরিদ্রতম মুসলিম ঘরেও ছিলো কমপক্ষে একটি করে গোসলখানা, আর প্রাত্যেক মুসলিম নগরীতেই ছিলো সর্বসাধারণের জন্যে সার্বিক ব্যবস্থাসহ গোসলখানা (দৃষ্টান্তস্বরূপ নবম শতকে এক কর্ডোভাতেই ছিলো এ ধরনের তিনশ গোসলখানা)। এবং এসবই করা হয়েছেোলো মহানবীর একটি শিক্ষা কার্যকরী করতে গিয়েঃ পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংগ। মুসলমান যখন জাগতিক জীবনের সুন্দর বস্তুগুলি উপভোগ করতো তখন সে আধ্যাত্মিক জীবনের চাহিদার সাথে কোনো বিরোধে মুখামুখি হতো না, কারণ রসূল্লুল্লাহ (সা)-এর শিক্ষা অনুসারে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জীবনে তাঁর ঐশ্বর্যের নিদর্শন দেখতে ভালোবাসেন।

অল্প কথায়, ইসলাম প্রবল প্রেরণা, যোগালো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনের জন্য যা মানবেতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল পৃষ্ঠাগুলির একটি দখল করে আছে, আর ইসলাম এ প্রেরণা সৃষ্টি করে বৃদ্ধিকে স্বীকৃতি দিায়ে এবং আজ্ঞেয়তাবাদকে অস্বীকার করে। এর মানে নিস্ক্রিয়তা নয়, কর্মবাদ; সন্ন্যাসবাদ নয়, জীবনবাদ। কাজেই এতে বিস্ময়ের অবকাশ খুবই কম যে, আরবের সীমা সরহদ অতিক্রম করার সাথে সাথেই ইসলাম দ্রুত গতিতে নতুন নতুন অনুসারী লাভ করতে থকে। পল এবং অগাস্টিনের প্রচারিত খৃষ্টধর্ম পার্থিব জীবনের প্রতি যে ঘৃণাতাচ্ছিল্য পোষণ করে তারই মধ্যে লালিত বর্ধিত সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার মানুষেরা এবং কিছুকাল পরে, ভিশিগথিক স্পেনের লোকেরা হঠাৎ এমন একটি আদর্শের মুখামুখি হলো যা, আদি পাপে বিশ্বাসের অন্ধতা অস্বীকার করে এবং মানুষের পার্থিব জীবনের সহজাত মর্যাদার উপর দেয় গুরুত্ব; আর এ কারণেই তার এসে জড়ো হতে লাগালো নিত্যবর্ধমান সংখ্যায়, এই জীবনাদর্শের পাশে যা তাদের শেখালোমানুষ হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। ইসলামের ইতিহাসের গৌরবজ্জ্বল ঊষাকালে ইসলামের বিস্ময়কর বিজয়ের এই হচ্ছে ব্যাখ্যা, তরবারির জোরে মানুসকে দীক্ষিক করার উপকথা নয়।

মুসলমানেরা ইসলামকে মহত্ত্ব দান করেনি, ইসলামই মুসলমানদেরকে দিয়েছিলো মহত্ত্ব। কিন্তু যে মূহুর্তে তাদের বিশ্বাস হয়ে দাঁড়ালো তাদের অভ্যাসের বস্তু, তা তাদের জীবনের কর্মসূচী আর রইলো না, যে কর্মসূচী আর রইলো না, যে কর্মসূচী সজ্ঞান অনুসরনের বিষয়, তখনি , তাদের সভ্যতার তলদেশে যে সৃজনশীল উদ্দীপনা বিদ্যামান ছিলো তাতে শুরু হলো ক্ষয় এবং ক্রমে তা ডেকে নিয়ে এলো নিস্ক্রিয়তা, বন্ধ্যাত্ব এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়।

আমি যে নতুন অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করলাম এবং যে অগ্রগতি রাভ করে চলেছিলাম আরবী ভাষায় (আমি আলআজহারের একজন ছাত্রকে নিয়োগ করেছিলাম আরার রোজাকর পাঠের জন্য) তাতে মনে হলো, আমি এখন  অমন একটি জিনিসের অধিকারী হয়েছি যা বলা যেতে পারে মুসলিম মানের চাবিকাঠি। মাত্র কমাস আগেই আমি যে আমার বই এ লিখেছিলাম কোনো ইউরোপীয়ই পারে না সচেতনভাবে গোটা ছবিটার ধারণা করতে, সেব্যাপারে আর আমার পক্ষে অতোটা নিশ্চিত বোধ করা সম্ভব হলো না; কারণ , এখন এই মুসলিম জাহান প্রতীচ্য ভাবানুষংগের কাছে আর সম্পূর্ণ চিন্তাভ্যাসগুলি থেকে কিছুটা আযাদ হতে পারে এবং এ সম্ভাবনা মেনে নেয় যে, এসব চিন্তাভ্যাসই হয়তো একমাত্র গ্রহণযোগ্য চিন্তাভ্যাস নয়, তাহলে এককালের এতো অপরিচিত মুসলিম জগতও হয়ে উঠতে পারে বুদ্ধিগ্রাহ্য

কিন্তু যদিও আমি দেখতে পেলাম, ইসলামের অনেক কিছুই আমার বুদ্ধি এবং সহজাত অনুভূতির কাছে আবেদন জানায়, তবু আমি বাঞ্ছনীয় মনে করিনি যে, সে পদ্ধতি তার নিজের কল্পিত বাদ উদ্ভাবিত নয়, তেমন কিছুর সংগে একজন বুদ্ধিমান মানুষের সকল চিন্তা গোটা জীবন দৃষ্টির খাপ নেয়া উাচিত।

আমাকে বলুন, শায়খ মুস্তাফা, একবার আমি আমার পন্ডিত বন্ধু আলমারঘিকে বলি, একটি বিশেষ শিক্ষা এবং কতক গুলি বিশেষ শিক্ষা একং কতকগুলি বিশেষ নির্দেশের মধ্যে কারো নিজেকে গন্ডীবদ্ধ রাখার প্রয়োজন কী? সমস্ত নৈতিক প্রেরণাকে অন্তর্বাণীর আওতায় রেথে দেওয়াই কি শ্রেয় নয়?

তরুণ বন্ধু, আপনি যা আমাকে জিজ্ঞাস করছেন, তা তো আসলে এই যে, আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রয়োজন কী? জবাবটি খুবই সোজা। খুব অল্প লোকইকেবল নবীরাই অন্তর্বাণী তাঁদের হৃদয়ে যা বলে তা বুঝবার প্রকৃত ক্ষমতা রাখেন। আমরা বেশিরভাগই  ব্যক্তিস্বার্থ এবং কামনাবাসনার জালে বন্দী এবং আমাদের হৃদয় যা বলে, আমার প্রত্যেকেই যদি তাই মেনে চলি, তাহলে  আমরা সার্বিক নৈতিক বিশৃংখলার সম্মুখীন হবো এবং আচারআচরণের কোনো পন্থার বিষয়েইে একমত হতে পারবো না। আপনি অবশ্য জিজ্ঞাস করতে পারেন, এই সাধারণ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম আছে কি নাঃ আলোকপ্রাপ্ত লোকেরা মনে করে, তারা কোন বিষয়কে ভালো বা মন্দ করবে এ বিষয়ে তারা অন্যের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। কিন্তু তাহলেও আমি আপনাকে জিজ্ঞাস করছিঅনেক মানুষই বহু মানুষই কি তাদের নিজেদের জন্য এই বিমেষ অধিকার দাবি করবে না? এ বং তার ফলই কী হবে।

. .. ……      .            .          

         

আমি প্রায় ছহপ্তা হলো কায়রোতে আছি। এ সময়ের মধ্যে আবার আমি ম্যালেরিয়ায় ভুগি। এর আগের বছর আমি ম্যালেরিয়ায় পয়রা আক্রান্ত হয়েছিলাম ফিলিস্তিনে। মাথা ধরা, মাথা ঘোরা এবং সারা যন্ত্রণার সাথে শুরু হয় জ্বর এবং  দিনের শেষে আমাকে বিছানায় শুয়ে পড়তে হয় চিৎ হয়ে; আমার হাত তোলবার ক্ষমতা পর্যন্ত রইলো না। আমর বাড়ির মালিক সিনোরা ভিতেল্লি আমার চারপাশে অমন ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটাছুটি করতে লাগলেন যে, মনে হলো তিনি যেন প্রায় উপভোগই করছেন আমার অসহায়ত্বকে! আসলে কিন্তু আমর জন্য তাঁর উদ্বেগ আন্তরিক, নির্ভেজাল। তিনি আমাকে খেতে দিলেন গরম দুধ, মাথায় ঠান্ড পানির পট্টি দিলেন; কিন্তু আমি যখন তাঁকে বললাম ডাক্তার ডাকাই সংগত হবে, তিনি রাগে ঘেন্নায় একেবারে জ্বলে উঠেনঃ

ডাক্তার? ডাক্তার না ছাই! এই কসাইগুলি ম্যালেরিয়ার ব্যাপারে কী জানে? আমি এদের যে কোন জনের চাইতে এ বিষয়ে বেশী জানি। আমর মরহুম দ্বিতীয় স্বামী এই রোগেই মারা যায় আলবানিয়ায়। আমরা কয়েক বছর দুরাজ্জোতে ছিলাম। ও বেচারা প্রায়ই কষ্ট পেতো তোমার চাইতে অনেক বেশী যন্ত্রনায়তবে আমাতে তার আস্থা ছিলো সবসময়

আমি অতো কাহিল হয়ে পড়েচিলাম যে, আমার তর্ক করার কোনো ক্ষমতাই ছিলো না। কাজেই আমি তাঁর ইচ্ছামতো গ্রীক সূরা ও কুইনিনের এক উগ্র মিকচার আমি খাইচিনি মাখানো বড়ি নয়, একেবারে খাঁটি চূর্ণ ওষুধ, যার তিক্ততা জ্বরের চাইতেও বেশি কাঁপন ধরিয়ে দেয় আমার মধ্যে। কিন্তু যেভাবেই হোক, বলতে বিস্ময়কর ঠেকবে হয়তো মা ভিতোল্লির প্রতি ছিলো আমার পূর্ণ আস্থা, তাঁর মরহুম দ্বিতীয় স্বামী অশুভ উল্লেখ সত্ত্বেও।

সেই রাতে, যখন জ্বরে আমার সারা গা জ্বলছে,হঠাৎ রাস্তা থেকে আসা একটি মোলায়েম, গাঢ় সংগীত আমি শুনতে পেলামএকটি ব্যারেল ওর্গানের বাজনা।

এ ওর্গান সেই সব সাধারণ ব্যারেল ওর্গানের একটি নয় যাতে রয়েছে টানা হাপর এবং ছিদ্রযুক্ত নল, বরং তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ভাঙ্গা ভাঙ্গা সূর তোলা সেকেলে ক্লেভিকার্ড এর সূক্ষ্ম বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে খুবই নাজুক এবং খুবই সীমাবদ্ধ বলে বহুকাল আগেই ইউরোপ পরিত্যাক্ত হয়েছে। এর আগেও আমি এ ধরনের ব্যারেল ওর্গান দেখেছি কায়রোতেঃ একটি লোক বাক্সটি বহন করছে তার পিঠে, আর একটি বালক তার পিছু পিছূ চলছে আর হাতল ঘুরাচ্ছে। এবং তা থেকে সুরগুলি উঠছে, আলাদা আলাদা প্রত্যেকটি, সংক্ষিপ্ত এবং পরিচ্ছন্ন; যেনো তীরের মতো ভেদ করছে লক্ষ্যবিন্দু, মধ্যকার ব্যবধান ডিঙ্গিয়ে, কাঁচের টুঙটাঙ শব্দ তুলে; সুরগুলি একটি আরেকটি থেকে এতোই আলাদা, এতেই স্বতন্ত্র যে, তাতে করে শ্রোতার পক্ষে পুরা সংগীতটির মানে উপলদ্ধি করা মোটেই সম্ভব নয়। বরং তার বদলে এ সংগীত তাকে টেনে নিয়ে যায় নরম, গাঢ় কতকগুলি মূহুর্তের মধ্যে দিয়ে, ঝাঁকুনি দিতে দিতে। এগুলি যেন একটা গোপন রহস্য যা আপনি উদঘাটন করতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না; এবং সারারাত ধরে এই সুরগুলি আমার মস্তিকে বার বার ঘুরপাক খেয়ে আমাকে দিচ্ছিলো যন্ত্রণা, এমন একটি ঘূর্ণ্যমান বৃত্তের মতো, যা থেকে আমার অব্যাহতি ছিল না স্কুটারীতে আমি ঘূর্ণ্যমান দরবেশদে যেনাচ দেখেছিলাম তারই মতোসে কি কয়েক মাস আগের কথা, না কয়েক বছর, যখন আমি অতিক্রম করছিলাম পৃথিবীর গভীরতম সাইপ্রেস বনভূমি

এ এক অতি অসাধারণ বনানী, স্কুটারীর সেই গোরস্থান, ইস্তাম্বুল থেকে শুরু করে বসফোরাপসের ঠিক মাঝখান দিয়েঃ অগণিত দেওদার গাছের ফাঁকে ফাঁকে অলিগলি আর পথ এবং সেই সব গাছের নিচে, অগণিত খাড়া এবং মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা শিলাসমাধি, যাতে খোদিত রয়েছে বাতাসেপানিতে ক্ষয়ে যাওয়া আরবী শিলালিপি। বহুকাল আগে থেকেই পরিত্যাক্ত হয়েছিলো গোরস্তানটি; এখানে যেসব মৃত শায়িত রয়েছে তাদের মৃত্য হয়েছে বহুবহু অতীতে। তাদের দেহ থেকে উদগত হয়েছে বিশাল বিশাল বৃক্ষের কান্ড, কোনেটি ষাট ফুট, কোনেটি আশি ফুট উঁচু। পরিবর্তনশীল ঋতুচক্রের ভেতর তিদয়ে বেড়ে উঠেছে এই সব বনস্পতি, এক নিশ্চল নীরবতার মধ্যেআর এ বনানীতে এ নীরবতা এমনি ব্যাপকও প্রগাঢ় যে, মানুষের পক্ষে সেখানে বিমর্ষ হওয়ারও অবকাশ নেই। মৃতরা যে ঘুমিয়ে থাকতে পারে তা আমি এমন গভীর করে, এমন তীব্রভাবে, আর কোথাও অনুভব করিনি। এই মৃতরা মানুষ ছিলো অমন এক জগতের বাসিন্দা যেখানে জীবনধারণ ছিলো নির্বিঘ্নে শান্তিময়; এরা এক ত্বরাবিহীন মানবজাতির মৃত সন্তান।

গোরস্তানের ভেতর কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা পর, স্কুটারীর চিপা অলিগলির ভেতর দিয়ে আমি এসে পৌঁছুলাম একটি মসজিদের কাছে। ওটি যে একটি মসজিদ তা কেবল এর দারোজার উপর চমৎকার করুকার্যময় আরবী লিপি দেখে বুঝতে পারলাম। দরোজাটি অর্ধেক খোলা। আমি সেই দরোজা দিয়ে ঢুকে আধো আলো আধো ছায়ায় ঘেরা একটি কোঠায় এসে দাঁড়াই। সেখানে একটি গালিচার উপর একজন বৃদ্ধঅতি বৃদ্ধকেব্যক্তিকে চক্রাকারে ঘিরে বসে আছে মাত্র কজন  লোক। এদের প্রত্যেকেরই পরনে লম্বা জোব্বা এবং মাথায় উঁচু, তামাটে রঙের কিনরাহীন শোলার টুপি। বৃদ্ধ ইমাম আল কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন একঘেঁয়ে সুরে। একটি দেয়াল ঘেষে বসেছে কয়েকজন সংগীত শিল্পীঃ ঢোল বাদক, বংশী বাদক এবং কামাঞ্জা বাদক,তাদের লম্বা গলাওয়ালা ভায়োলিনের মতো সংগীত যন্ত্রাদি নিয়ে।

হঠাৎ আমার মনে হলে, এতোকাল যে নাচনেওয়ালা দরবেশদের কথা আমি ভুরি ভুরি শনে এসেছি, এ অদ্ভুদ মাহফিলটি নিশ্চয় ওদেরঃ সেই মরমীয়া পন্থা, যা নির্দিষ্ট ছন্দে, বারবার পুনরাবৃত্ত ক্রমবর্ধমান দ্রুততালে কতকগুলি অংগ সঞ্চালনের মাধ্যমে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির মধ্যে আনতে চায় মোহবেশ, যা তাকে ক্ষমতা দেয় আল্লাহকে প্রত্যক্ষ এবং ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করতে।

ইমামের তিলাওয়াতের পর যে নীরবতা নেমে এরো তা হঠাৎ ভেঙে খান খান হয়ে গেলো একটি মিহি অথচ সুউচ্চ স্বরগ্রামে তোলা বংশীধ্বনীতেঃ এবং সংগীত শুরু হলো, একঘেঁয়ে একটানা সুরে, প্রায় আর্তনাদের ভংগীতে যেনো। মনে হলো, যেনো একটি মাত্র অংঘ সঞ্চালনের সাথে দরবেশরা দাঁড়িয়ে গেলো, জোব্বা ছুঁড়ে ফেলে দিলো এবং দাঁড়ালো তাদের শুভ ঝুলন্ত কৃর্তা গায় নিয়ে, যা পৌঁছেছে গিয়ে তাদের হাঁটু পর্যন্ত; গেরো দেওযা রুমাল দিয়ে কোমরে বাঁধা সেই কুর্তা; এরপর তারা প্রত্যেকেই অনেকটা ঘুরে দাঁড়ালো, যার ফলে, একটি বৃত্তের আকারে দাঁড়িয়ে তারা প্রতি দুজনে হলো একে অন্যের মুখামুখি। এরপর তারা বুকের উপর হাত দুটি আড়াআড়ি রেখে, একে অন্যের প্রতি ঘাড় নোয়ায় গভীর আন্তরিকতার সাথে, (এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়লো, প্রাচীনকালের দ্বৈত সংগীতের কথা এবং নানারকম কাজকরা কোট গায়ে নাইটদের কথা, যারা সম্ভ্রমের সাথে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাতো মহিলাদের।) পরমূহুর্তে সকল দরবেশ তাদের বহু বিস্তার করলো দুপাশে, ডান হাতের তালু উপর দিকে ঘূরালো এবং বা হাতের তালু ঘরালো নিচের দিকে। ফিসফিস করা ধ্বনির মতো তাদের ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো একটি শব্দ হুয়াতিনি (অর্থাৎ আল্লাহ)। এই মোলায়েমভাবে উচ্চারিত ধ্বনি ঠোঁটে নিয়ে তারা প্রত্যেক ধীরে ধীরে ঘুরতে লাগলো নিজ নিজ কক্ষপথে, সেই সংগতীতের তালে তালে দেহকে আন্দোলিত করে, যেনো তা আসছিলো অনেক..অনেক দূর থেকে। তারা তাদের শির ঝুঁকিযে দিলো. ঘাড় বাঁকিয়ে পেছন দিকে, চোখ তাদের বুঁজে এলো এবং একটি মসৃণ কাঠিন্য ছড়িয়ে পড়লো, প্রশস্ত, প্রচুর কাপড় দিয়ে তৈরি কুর্তাগুলি বাতাস পেয়ে ফুলে ফেঁপে উঠে ঘূর্ন্যমান মানুষগুলির চারপাশে তৈরি করে একটি বিশাল চক্র, যেনো সমুদ্দুরে চক্রাকারে আবর্তিত শুভ্র ঘূর্ণিপাক। তাদের মুখমন্ডলে গভীর নিমগ্নতার ছাপ..বৃত্তাকারে আব র্তন রূপ পেলো চক্রবৎ ঘূর্ণনে এক ধরণের মোহাবেশ, আর হার্ষোচ্ছাাস পষ্ট অভিব্যক্তি লাভ করে তাদের সকলের মধ্যে। তাদের অর্ধ বিস্ফোরিক ঠোঁট থেকে অসংখ্য, অগুণতিবার উচ্চারিত হতে লাগলো কেবল একটি শব্দ হূয়া..হূয়া..হূয়া-; তাদের দেহ কেবলি পাক খেতে লাগলো ঘুরে ঘুরে এবং মনে হলো, সংগীত যেনো তাদের টেনে নিচ্ছে তার চাপা, পাকখাওয়া একঘেয়ে ঐকতানের দিকে, একঘেঁয়েভাবেই যে সুর উঠছে উচ্চগ্রামে এবং আমার মনে হলো, আমি নিজেই যেনো অপ্রতিরোধ্যভাবে সেই ঘূর্ণিপাকের টানে চলেছি উর্ধ্বদিকে, খাড়া ঘূর্ণ্যমান, মাথা ঘুরিয়ে দেয়া এক সিঁড়ি ভেঙ্গে, নিরন্তর আরো উপরে নিয়ত ঘুরে ঘুরে ওঠা সিঁড়ি মাড়িয়ে, কোনো এক অবোধ্য অজ্ঞেয় পরিণামের দিকে।..যাতোক্ষণ না মাদাম ভিতেল্লির দরাজ বন্ধুত্বপূর্ণ হাত আমার কপাল স্পর্শ করায় সম্পূর্ণ থোকে গেলো ঘূর্ণিপাক, এবং আমার মোহাবেশ ভেঙ্গে চুরে আমাকে আবার নিয়ে এলো স্কুটারী থেকে কায়রোর শিলামন্ডিত একটি কক্ষের স্লিগ্ধ শীতলতায়

যাই হোক, সিনোরা ভিতেল্লি ভুল করেননি। তাঁর উপদেশে আমি ম্যালেরিয়ার ধকল কাটিয়ে উঠলাম, ততো শীঘ্র না হলেও, আমার নিয়মিত ডাক্তার আমার রোগ সারাতে যে সময় নিতেন নিদেনপক্ষে সেই সময়ের মধ্যেই। দুদিনের মধ্যেই আমার জ্বর সম্পূর্ণ সেরে গেলো এবং তিসরা রোজ বিছানা ছেদেড় আমি বসলাম একটি আরামদায়ক চেয়ারে। তবু চলাফেরা করার মত শক্তি আমার মোটেই ছিলো না। সময় হয়ে উঠলো খুবই মন্থর, দুর্বহ। দুএবার আমার শিক্ষকছাত্রটি আলআজহার থেকে এলেন আমাকে দেখতে, সংগে করে আমার জন্য তিনি আনলেন কিছু বই।

আমার সাম্প্রতিক বুখারে বয়ে আনা স্কুটারীর ঘূর্ণ্যমান দরবেশদের স্মৃতি, যেমন করেই হোক, আমাকে ভাবিয়ে তোলে। অপ্রতাশিতভাবেই এ ব্যাপারটি আমার কাছে এমন এক রহস্যময় তাৎপর্য গ্রহণ করলো যা আমার মূল অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট ছিলো না মোটেই। এই তরীকার গূঢ় আচার অনুষ্ঠানগুলিবিভিন্ন মুসলিম দেশে আমি যেসব  তরীকা দেখেছি , তারই একটি এই তরীকাআমার মনে ইসলামের যে চিত্র ধীরে ধীরে অভিব্যক্তি লাভ করছেো তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হলো না। আমি আমার আজহারী বন্ধকে অনুরোদ করি এ বিষয়ে আমাকে প্রাচ্যদেশীয় কিছু বই সরবরাহ করতে। এবং এসব বইপুস্তক পকেড়, এ ধরণের গুহ্য প্রথা যে অমুসলিম উৎস থেকেই ইসলামে প্রবেশ করেছে, আমার এই সহজাত সংশয়ই প্রমাণিত হলো। মুসলিম মরমীবাদী, যারা সূফী বলে পরিচিত, তাদের ধ্যানধারণা যে গ্রীক যে গ্রীক দুজ্ঞেয়বাদীদের, ভারতীয়দের, এমনকি কখনো কখনো খৃষ্টানদের প্রভাব ব্যক্ত করে তাতে কোনো সন্দেহনেই; এবং এই প্রভাবের ফলেই আমদানি হয় সন্ন্যাসপন্থী ধ্যানধারণা ও আচারআচরণ যার সাথে আরবের মহানবীর পয়গামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর পযগামে যুক্তিকেই বিশ্বাস অর্জনের একমাত্র পথ বলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিভংগীতে মরমীয়া অভিজ্ঞতার সম্ভাব্যতা একেবারেই অবাস্তব বলে বিবেচনার অযোগ্য না হলেও,ইসলাম ছিলো মূলতই একটি যুক্তিভিক্তিক প্রস্তাবনা, আবেগসর্বস্ব নয়। যদিও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম তার অনুসারীদের মধ্যে অতিশয় ভাবাতিশয্যপূর্ণ এক অনুরাগের জন্ম দেয়, তবু হযরত মুহাম্মদের শিক্ষায়, ধর্মীয় অনুভূতি উপলদ্ধির ক্ষেত্রে ভাবাতিশয্যকে কেবল ভাবাতিশয্য হিসাবেই, তেমন কোনো স্বাধীন ভূমিকা দেওয়া হয়নি। কারণ , ভাবাতিশয্য যকো গভীরই হোক, আত্মগত কামনা ও ভীতির দ্বারা তার প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী, যুক্তি যতোটা প্রভাবিত হতে পারে তার চাইতেযুক্তির মধ্যে ভ্রান্তি  অবকাশ যাই থাকুক।

                                                  ..

বুঝলে মনসুর, এমনি খন্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়েই ইসলাম নিজেকে উন্মেচিত করে আমার নিকট; কথাবার্তা, বই পড়া কিংবা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে, এখানে এক ঝরক ওখানে এক ঝলকএমনিভাবে, ধীরে ধীরে প্রায় আমার অজ্ঞাতেই

 

দুই

আমরা যখন রাতের জন্য তাঁবু গাড়ি জায়েদ আমাদের জন্য রুটি সেঁকতে বসে যায়। মোটা গমের আটার সংগে মিশিয়ে পানি দিয়ে পয়লা সে একটি পিন্ড বানায়, তারপর চেপ্টা গোলাকার রুটি তৈরী করে, এক ইঞ্চি পুরু। এরপর সে বালুতে একটি গর্ত খুঁড়ে এবং সেখানে শুষ্ক ডালপালা গুঁজে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং আগুনটা হঠাৎ বিস্ফোরিত হবার পর যখন থেমে যায়, তখন জ্বলন্ত আংগারের উপর রুটিটা রেখে দেয় এবং তার উপর গরম ছাই বিছিয়ে দিয়ে তার উপর স্তূপীকৃত ডালপালায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সে রুটিটির উপার থেকে অঙ্গার ও ডালপালা সরিয়ে সেটিকে উল্টিয়ে দেয় এবং আগের মতোই ঢেকে দিয়ে তার উপর আবার আাগুন ধরায়। আরো আধ ঘন্টা পরে সেঁকা রুটিটি অংগারের নিচ থেকে খুঁড়ে বের করে এবং বাকি ধূলা এবং ছাই ছাড়ানোর জন্য একটি কাঠি দিয়ে তাতে বারবার আঘাত করে। আমরা সে রুটি খাই পরিষ্কার মাখন মাখিয়ে, খেজুর দিয়ে। বলাবাহুল্য এর চেয়ে সুস্বাদু রুটি আর কোথাও পাওয়া অসম্ভব!

আমার এবং জায়েদের মতো মনসুরের ক্ষিধাও তৃপ্ত হলো, কিন্তু তার ঔৎসুক্য নয়। আমরা যখন আগুনটিকে ঘিরে শুয়ে আছি, সে আমকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলোশেষপর্যন্ত কেমন করে আমি মুসলমান হলাম এবং যখন ওর কাছে তা ব্যাখ্যা করতে যাই, আমি অনেকটা বিস্ময়ে চকিত হয়ে উঠি, ইসলামের পথে আমার দীর্ঘ সফর কথায় প্রকাশ করা কতোই না কঠিন!

কারণ, হে মনসুর, ইসলাম আমার কাছে এসেছে দস্যুর মতো, যে মানুষের ঘরে প্রবেশ করে রাতের বেলা, চুপি পুচি, কোনো শব্দ বা শেরাগোল না করে; তফাতটা এই যে, দস্যুরা যা করে ইসলাম তা করে নি, ইসলাম আমার ঘরে প্রবেশ করলো চিরকালের জন্য, চলে যাবার জন্য নয়। কিন্তু আমাকে যে মুসলমান হতে হবে একথা আবিষ্কার করতে আমার কেটে গেলো বহু বছর..

মধ্যপ্রাচ্যে আমার  দ্বিতীয় সফরের সেই দিনগুলির কথা যখন স্মরণ করিযখন ইসলাম আমার মনের উপর দখন বিস্তার করতে শুরু করেছে প্রবল্যের সংগেআমার মনে হয়, আমি যে আবিষ্কারের সন্ধানেই এক সফরে বেরিায়েছি এ বিষয়ে তখনো আমি ছিলাম সচেতন। প্রত্যেক দিন ভেতর থেকে জেগে ওঠে নতুন নতুন প্রশ্ন এবং বাইরে থেকে আসে নতুন সমাধানএসবই অমন একটা কিছুর প্রতিধ্বনি জাগ্রত করে যা আমার মনের পশ্চাদভুমিতে কোথাও ছিলো লুক্কায়িত। এবং ইসলাম সম্বন্ধে আমার জ্ঞান যতোই পরিষ্কার হতে থাকে, বারবার উপলদ্ধি করি, একটি সত্যকে আমি চিরদিনই জেনেছি সে সম্পর্কে সচেতন না হয়েও, আর তাই ক্রমে ক্রমে উদঘাটিত হচ্ছে, বলা যায়, প্রমাণিত হচেছ

১৯২৪এর গ্রীষ্মের প্রথমদিকে, আমি কায়রোর থেকে বের হই এক দীর্ঘ সফরে, যাতে আমার লাগে দুটি বছরের বেশির ভাগ সময়। প্রায় দুবছর আমি দেশদেশান্তর ঘুরে বেড়াই, এমন সব দেশের মধ্যে দিয়ে যা তদের ঐতিহ্যের প্রজ্ঞার দিক দিয়ে প্রাচীন হলেও আমার মনের উপর তার প্রভাবের দিকক দিয়ে চির নতুন। আমার সফরে কোনো তাড়াহুড়া ছিলো না; একেক জায়গায় আমি দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকি। দ্বিতীয়বার আমি ট্রান্সজর্ডান যাই এবং আমীর আবদুল্লাহর সাথে কদিন কাটাইসেই বেদুঈন মুলুকের উষ্ণ বীর্যবত্তায় হৈহুল্লোড় করে, যা তখনো পাশ্চাত্য প্রভাব স্রোতের সাথে নিজের চরিত্রমে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়নি। সেবার আমার জন্য একটি ফরাসী ভিসার ব্যবস্থা করেছিলো ফ্রংকফুর্টার শাইটুঙ; আমি আবার সিরিয়া ভ্রমণের সুযোগ পেলাম। দামেশক বেশিদিন থাকিনি; আমার চলার পথে এ প্রাচীন নগরী এসেই পেছনে পড়ে গেলো। বায়রুতের লেবাননী সজীবতা আমাকে আলিংগন করে কিছু সমযের জন্য, কিন্তু শীগগিরই আমি তা ভুলে যাই, সিরীয় ত্রিপোলির বিজন নিদ্রালুতায়, তার নীরব প্রশান্তিতে। খোলা বন্দরে ছোটো ছোটো বাদমওয়ালা জাহাজগুলি তাদের নোঙর টান খেয়ে খেয়ে নচছে, আর লাতিন মাস্তুলগুলি মৃদু্ ক্যাঁচ্কোঁচ আওয়াজ করছে। জেটিতে একটি কফি হাউসের সামনে টুলে বসে বিকালের রোদে ত্রিপোলির নাগরিকেরা মজাসে কফি খাচ্ছে আর হুক টানছে। সর্বত্রই শান্তি আর সন্তোষ, আর মনেহলো তাদের খাবার রয়েছে অঢেল! এমন কি, ভিক্ষুকেরও যোনো আরামপ্রদ কবোষ্ণ রোদ উপভোগ করছে. যেনো বলছে, আহা, ত্রিপোলিতে ভিক্ষুক হওয়াও কতো আনন্দের! আমি এলাম আলেপ্পোতে। এর রাস্তাঘাট আর দালানকোঠা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় জেরুযালেমের কথা। পুরানো পাথুরে ঘরবাড়ি, যা যমীন থেকে উদগত হয়েছে বলে মনে হয়, আর অন্ধকার ধনুকেরমতো বাঁকা তোরণশোভিত পথঘাট, নির্জন নীরব চক আর চত্বর এবং খোদাই করা জানালা। অবশ্য, আলেপ্পোর অন্তজীবন ছিলো জেরুযালেমের চাইতে  একেবারে আলাদা। জেরুজালেমের প্রবল মেজাজটি ছিলো অদ্ভুদ, পরস্পর বিরোধী জাতীয় স্রোতের পাশাপাশি একট যন্ত্রনাদায়ক খিচুনির মতো। ধ্যানধারণা এবং গভীর ধর্মীয় ভাবাবেগের পরেই সেখানে একটা বিষাক্ত মেঘের মতোই স্থায়িভাবে জেঁকে বসেছিলো মা্নুষ আর বস্তু সম্পর্ক প্রায় দুর্জ্ঞেয় এক বিদ্বেষ। কিন্তু আলেপ্পো আরব এবং লেবাননের একটা মিশ্রণ হওয়া সত্ত্বেও এবং নিকটবর্তী তুরস্কের হালকা ছাপ তার উপর পড়লেও, আলেপ্পো স্ববিরোধীমুক্ত এবং স্নিগ্ধ, প্রশান্ত। কাঠের ব্যালকনি আর পাথুরে সমুখভাগ নিয়ে, ঘরবাড়িগুলি তাদের নিশ্চলতার মধ্যেও প্রাণবন্ত। প্রাচীন বাজারে হস্ত শিল্পীদের নির্বাক কর্মব্যস্ততা, পুরানো সরাইখানাগুলির চত্বর যার উপরে ছাদ আর দুপাশে সারিসারি দোকান, নানা পণ্যে বোঝাই। মিতব্যয়িতা এভং তার সংগে একট লঘুপ্রকৃতির লালসাআর উভয়ই সকল প্রকার ঈর্ষা থেকেমুক্ত; কোনো প্রকার ব্যস্ততা নেই, আর অমনি এক অবকাশ এপরদেশী জনকেও আলিংগন করে এবং তার মধ্যেও জাগায় এ আকাংখা যে, তার নিজের জীবন ও যেনো নির্বিঘ্ন অবকাশে শিকড় গেড়ে স্থির হতে পারে। এ সমস্তই বয়ে চলেছে, একত্রে একটি তীব্র মনোমুগ্ধকর ছন্দে।

আলেপ্পো থেকে গাড়িতে করে আমি পৌঁছলাম সিরিয়ায় একেবারে উওরের একটি শহরদায়রআযযোর এ। আমার ইচ্ছা ওখান থেকে আমি ধরবো বাগদাদের পথ, যাবো ফোরাতের সমান্তরাল প্রাচীন সরু কাফেলার পথের উপর অবস্থিত বাগদাদে। আর সেই সফরেই প্রথম সাক্ষাৎ পাই জায়েদের।

বাগদাদদামেশকের রাস্তায় কবছর ধরে মোটরগাড়ি চলছে। কিন্তু সেদিক দিয়ে ফোরাতের সমান্তরার রাস্তাটি ছিলো সামান্যই পরিচিতি। বলতে কি, আমার আগে একটি মাত্র মোটর গাড়িই   গিয়েছিলো কমাস আগে। এমনকি , আমার আর্মেনীয় ড্রাইবারও এর আগে কোনোদিন দায়রআযযোর অতিক্রম করেনি যদিও তার আত্মবিশ্বাস প্রবল, যেমন করেই হোক পথ বার করে নেবে। তা সত্ত্বেও তার মনে হলো, আরো বাস্তব আরো নির্ভরযোগ্য তাথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। তাই আমরা দুজন এক সংগে বাজারে ঘুরলাম তথ্যের সন্ধানে।

বাজারে স্তানটি গোটা দায়রআয যোর এর মধ্য দিয়ে আগিয়ে গেছে লম্বালম্বি। এটিকে একটি সিরীয় প্রাদেশীক শহর এবং একটি বেদুঈন রাজধানীর মিশ্রণ বলা যেতে পারেযদিও বেদুঈনী প্রভাবই এর উপর বেশি। এখানে দুটি বিশ্বের মিলন হয়েছে এক অদ্ভুদ সাদৃশ্য। এক দোকানে বিক্রি হচ্ছে আধুনিক অথচ মুদ্রিত ছবিওয়ালা পোষ্টকার্ড, যখন ঠিক তারপরেই, অন্য এক জায়গায় কয়েকজন বেদুঈন মরুভমিতে বৃষ্টি সম্বন্ধে কথা বলছে, কথা বলছে সিরিয়ার বিশরআনাজা কবিলা ও ইরাকের শাম্মার গোত্রের মধ্যকার হালের বিবাদ সম্পর্কে। একজন উল্লেখ করে, কিছুকাল আগে নযদী বেদুঈন সর্দার ফয়সল আদ দাবিশ দক্ষিণ ইরাকে যে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছিলেন, তার কথা; বার বার আরবের বুজর্গ আদমি ইবনে সউদের নাম উচ্চারিত হয় তার মুখে। লম্বা লম্বা ও রূপার কাজকরা হাতলওয়ালা পুরানা গাদা বন্দুকযা আজকার আর কেউ কেনে না, কারণ হাল আমলের রাইফেলগুলি এর চাইতে অনেক বেশি কার্যকরীএকটা স্বপ্নচ্ছন্ন ধূলিধুসর অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে তিনটি মহাদেশ থেকে আনা পুরানো ই্উনিফর্মের কাপড়, নযদী উটের জীন, গুড ইয়ার টায়ার, লীপজিগের ঝাড়বাতি এবং আল জাওফ থেকে আনা হত বাদামী বেদুঈনী জো্বাতে। অবশ্য, সেকেলে জিনিসগুলির মধ্যে পশ্চিমা পণ্যগুলিকে অবাঞ্ছিত আগন্তুক মনে হলো না; ওদের উপযোগিতাই ওদের জন্য স্বাভাবিক নিজস্ব একিট স্থান করে দেয়। বেদুঈনদের বাস্তবতাবোধ জাগ্রত ও ব্যাপক; এবং সেই কারণের মনে হলো, যে সব জিনিস গতকালও ছিলো ওদের মরু কাফেলার সরাইখানা থেকে অনেক দূরের বস্ত সেসব নতুন জিনিসকেও ওরা সহজেই গ্রহণ করেছে আর  ওদের পুরানো সত্তাকে বিসর্জন না দিয়ে সেগুলিকে নিয়েছে আপন করে। ওদের অন্তর্জগতের এই যে স্থিতিশীলতা, আমি মনে মনে ভাবি, তাই হয়তো ওদের দিয়েছে সেই শক্তি যার বলে ওা নয়া জমানার বন্যা স্রোতের মুকাবিলা করতে পারছে এবং হয়তো, তার কাছে হার না মানার ও ক্ষমতা ওদের দিয়েছে, কারণ এ লোকগুলির কাছে এখন নয়া জামানা খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে শুরু করোছে. আর লোকগুলি কেমন? মাত্র কিছুদিন আগেও ওরা ছিলো বহির্জগত থেকে দূরে, নিাজের মধ্যেই সমাহিত। কিন্তু তাই বলে, ওদের দরোজায় এই টোকা দুশমনের কড়া নাড়া ছিলো না; নিষ্কলুষ ঔৎসুক্যের সাথে ওরা গ্রহণ করেছে এই সব নতুনত্বকে, বলা যায়,যেনো আঙ্গুল দিয়ে সবদিক থেকে তাকে পরখ করে দেখছে এবং তার সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করছে। পাশ্চাত্য নতুনত্ব এইসব সরল উম্মি বেদুঈনের কী ক্ষতি করতে পারে আমি তা কতো সামান্যই তখন উপলদ্ধি করেছিলাম

আমার আর্মেনীয় ড্রাইবার যখন একদল বেদুঈনের নিকট খোঁজখবর নিচ্ছে ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ আমার হাতের আস্তিনে একটা প্রবল টান পড়ে। সংগে সংগে আমি দাঁড়ালামদেখলাম, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশোর্ধ একবাহুল্য বর্জিত সুন্দর আরব।

আপনার ইজাযত নিয়ে, আফেন্দ , একটু নিচু রুক্ষ স্বরে বলে, আমি শুনতে পেলাম, আপনি মোটরে করে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনি আপনার পথ সম্বন্ধে নিশ্চিত নন। আপনার সাথে আমাকে নিন, আপনার কিছু সাহয্যে আসতে পারি।

আমি তৎক্ষণাৎ লোকটিকে পছন্দ করে ফেলি এবং ওকে জিজ্ঞাস করি, ও কে?

আমি জায়েদ ইবনে গনিম, ও জবাব দেয়, আমি ইরাকী আগায়েলে নোকরি করি।

তখনি আমি লক্ষ্য করলামওর কাফতানে  খাকী রঙ এবং ইরাকী মরু কনস্টেবলের প্রতীক সপ্ত রশ্নিবিশিষ্ট তারকা, তার কালো ইগাসএর উপর। এ ধরেোণের ফৌজকে আরবরা  বলো আগায়েল। তুর্কীদের আমল থেকেই এর অস্তিত্ব রয়েছে। স্বেচ্ছায় এ বৃত্তি যারা গ্রহণ করে তাদেরই নিয়ে গঠিত এই ফৌজযাদের রিক্রট করা হয় কেবলি আরব থেকেমরুস্তেপ যাদের আস্তানা এবং উট যাদের বন্ধু। ওদের দুঃসাহসী রক্ত ওদের রুক্ষ, বিলাস বর্জিত স্বদেশ থেকে ওদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে এমন এক জগতে হাজির করেছে যেখানে টাকা পয়সা বেশী, গতি চাঞ্চল্য এবং আজও  আগামীকালের মধ্যে পরিবর্তন অধিকতরো।

জায়েদ আমাকে বললো, ও সিরীয়ইরাক সরহদের শাসন সম্পর্কিত কোনো এক ব্যাপারে ওর এক অফিসারের সাথে দায়রআয যোরএ এসেছে। অফিসারটি ইরাকে ফিরে গেলেও ওর এক ব্যক্তিগত কাজে পেছনে রয়ে গেছে এবং এখন দামেশক হয়ে, অধিকতরো ঢালু অথচ অনেক বেশি ঘুরতি পথে না গিয়ে ও আমার সাথে ফিরে যাওয়াই পছন্দ করে। ও খোলাখুলি আমার নিকট স্বীকার করে, ও আজ পর্যন্ত কখনো ফোরাত বরাবর সমস্ত রাস্তা সফর করেনি এবং আমার মতোই সেও জানে, নদীর বহু শাখাপ্রশাখা এভং বাঁকের জন্য সমসময় আমরা নদীর সাহায্যে পথ পাবো না, –কিন্তু, জায়েদ বলে, মরুভূমি মরুভুমিই এবং সূর্য ও তারকারাজি একই চিন্তার কারণ নেই, ইনশাআল্লাহ আমরা পথ খুঁজে পাবোই। ওর প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাসে আমি আনন্দিত হই এবং আনন্দের সাথে রাজী হয়ে যাই ওকে আমার সাথে নিতে।

পরদিন সকালে আমরা দায়রআযযোর থেকে বারহয়ে পড়ি। বিশাল হাম্মাদ মরুভূমির উপর দিয়ে গড়িয়ে চলরো আমাদের মডেল টি ফোর্ড গাড়ির চাক শিলানূড়ি বিছানো এক অনন্ত,সমতল, কখনো আস্ফন্টের মতোই মসৃণ এবং সমান, কখনো ঢেউএর আকারে বিস্তৃত, দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত। কখনো কখনো ফোরাত নদী পড়ে আমদের বাঁদিকেকর্দমাক্ত,শান্ত এবং নদীর পাড় নিচুআপনারমনে হবে, যেন একটি নীরব হ্রদ,যতোক্ষণ না ভসমান একটি কাঠের টুকরা অথবা কিশ্তী আপনার নজরে পড়ে এবং তাতে করে প্রচন্ড স্রোত ধরা পড়ে। ফোরাত একটি প্রশস্ত নদী, তার মেজাজ রাজকীয়; এ কোনো শব্দ জাগায় না, এ নদী ক্রীড়াশীল নয়, এ ছুটে চলে না,ফেনা শীর্ষ ঢেউএ ভেঙ্গে পড়ে না, পানি ছুঁড়ে মারে না। ফোরাত বয়ে চলে ধীরে ধীরে, –প্রশান্ত গতিতে,ছড়িয়ে দেয় প্রশস্ত ফিতার মতো, বন্ধনহীনা নদী, নিজের রাজকীয় পথ নিজেই সে ঠিক করে নিচ্ছে, মরুর অনুভবযোগ্য ঢালুর দিকে, অসংখ্য বাঁক ঘুরে ঘুরে, মরুভুমির সাথে সমতা বজায় রেকে, মরুভুমির মতোই গর্বের সাথে। কারণ, নদীর মতোই মরুভুমির বিস্তুত, মরুভূমিও শক্তিধর এবং প্রশান্ত।

আমাদের নতুন সংগী জায়েদ বসেছে ড্রাইবারের পাশে, হাঁটু তুলে একটি পা গাড়ির দরোজায় ঝুলিয়ে। ওর গায়ে জ্বরজ্বল করছে লাল মরক্কো চামড়ার তৈরি বুট যা ও আগরে দিন কিনেছে দায়রআয যোরএর বাজার থেকে।

কখনো কখনো আমরা সাক্ষাৎ পাই উট সওয়ারদের, যেনো শূন্য থেকে হঠাৎ ওরা আবির্ভূত হয়েছে মরুভুমির মাঝখানে, মুহুর্তের জন্য নিশ্চল হয়ে  দাঁড়ায়, আমাদের গাড়ির দিকে লক্ষ্য করে , আবার ওদের সওয়ারী জানোয়ার গুলিকে হাঁকিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যায়। স্পষ্টতই ওরা পশুচারী, রোদে পুড়ে ওদের মুখের রঙ গাঢ় তামাটে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে আমরা স্বল্পক্ষণের জন্য থাকি জরাজীর্ণ সরাইখানায়, তারপর শুরু হয় মরুভূমির অনন্তবিস্তার। ফোরাত হারিয়ে যায় দিগন্তের ওপারে। বায়ুতে ঝেটিয়ে জমা করা বালু,শিলানুড়ি বিছানা একেক টুকরা জমি এবং এখনে ওখানে কিছু ঘাসের গুচ্ছ অথবা কাঁটাবন নযরে পড়ে। আমদের ডান পাশে, গাছপালা শূণ্য এবং প্রখর রোদের নিচে ভেঙ্গে পড়া এক নিচু ফাটা ফাটা দাগবিশিষ্ট শৈলমালা হঠাৎ জেগে ওঠে এবং মরুভূমির অস্তহীনতাকে আড়াল করে দেয়। ঐ সংকীর্ণ শৈল শ্রেণীর ওপাশে কী রয়েছে? আমি বিস্ময়র সংগে নিজেকে শুধাই। আর আমি জানি, যদিও ওপাশে রয়েছে একই রকম সমান অথবা পাহাড়ী মরুভূমি, এবই রকম বালু এবং একই রকম কঠিন নূড়ি সূর্যের নিচে জ্বলছে তাদের কুমারী কাঠিন্যে, তবু একটা ব্যাখ্যাতীত রহস্যের নিশ্বাস যেনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে । ওখানে কী থাকতে পারে? আমার পরিপার্শ্বে এর কোনো জবাব বা প্রতিধ্বনি নেই; বিকালের কাঁপতে থাকা নিস্তদ্ধতায় কোনো শব্দ জাগছে না, কেবল আমাদের ইঞ্জিনের গুঞ্জন এবং শিলা নূড়ির উপর দিয়ে চলমান টায়ারের শো শো ধ্বনি ছাড়া। পৃথিবীর প্রান্ত কি ওখানে এক আদিম অতল গহবরে তলিয়ে গেছে? আমি যেহেতু জানি না, তাই অজ্ঞাত কিছু রয়েছে ওখানে আর যেহেতু আমি কোনোদিনই হয়তো তা জানতে পারবো না, তাই ত আজ্ঞেয়, অজ্ঞাত!

বিকালে আমাদের ড্রাইবার আবিষ্কার করলো, পেছনে ফেলে আসা মরু সরাইখানা থেকে সে ইঞ্জিনের জন্য পানি আনতে ভুলে গেছে। নদী অনেক ধূরে; আশপাশের বহু মাইলের মধ্যে কোনো ইঁদারা নেই। আমাদের চারপাশে ধ্যানমগ্ন রয়েছে ঢেউখেলানো দিগন্ত পর্যন্ত এক শূন্য,শুভ্র তপ্ত খঅড়িমাটির মতো প্রান্তর, তার উপর খেলা করছে এক নরম মোলায়েম উষ্ণ হাওয়া,-যেনো আসছে শূন্য থেকে এবং যাচ্ছেও শূন্যেরই দিকে, যার শুরুও নেই, শেষও নেইযেনো মাহকাল থেকেই উত্থিত একটা চাপা গুঞ্জনধ্বনি!

ড্রাইবারটি,সকল লেবানিজের মতো যে বাহ্য লৌকিতার ধার ধারে না (তাদের এই গুণটির আমিকদর করতামকিন্তু ঠিক সেই মূহুর্তে নয়), বলে, –ওহো, তাই  হোক, তবু আমরা পরের মরুসরাইতে পৌঁছুতে পারবো।

 কিন্তু তাতে মনে হলো, আমরা হয়তো তবু সেখানে পৌঁছুতে নাও পারি। সূর্য জ্বলছে, রেডিয়েটারে পানি টগটগ করচে চাএর কেটলির পানির মতো। আবার আমাদের দেখা হয় পশুচারীদের সাথে। পানি! না, উট পনেরো ঘন্টায় যতোদূর যেতে পারে, সে দূরত্বের মধ্যে , পনেরোটি উষ্ট্রঘন্টার মধ্যে কোথাও পানি নেই।

তাহলে, তোমরা পান করো কী? মরিয়া হয়ে জিজ্ঞাস করে আর্মেনীয়টি।

ওরা হেসে ওঠে, আমরা উটের দুধ খাই

এই দ্রুতগামী শয়তানের গাড়ির অদ্ভুত লোকগুরি পানি কোথঅয় জানতে চাইছে দেখে ওরা মনে মনে নিশ্চয় খুব বিস্মিত হয়েছে। কারণ, প্রত্যেকটি বেদুঈন শিশুও ওদের বলে দিতে পারে এ অঞ্চলে পানি নেই কোথাও।

ভয়ানক অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি। ইঞ্জিন ফেল করার কারণে, এখানে মরুভুমিতে আটকে পড়ে থাকা, পানি নেই, খাবার নেই, অমন অবস্থায় এবং অপেক্ষা করাত, যতোক্ষণ না আরেকিটি গাড়ি আসে আমাদের পথেহয়তো আসছে,না হয় পরশুবিংবা হয়তো আসছে মাসে.

আস্তে আস্তে ড্রাইভারের স্মিত ঔদাসীন্যের ভাব টুটে যায়। সে গাড়ি থাকিয়ে রেডিয়েটারের ঢাকনা খোলে; একটি সাদা গাঢ় ধুম্রকুন্ডলী ফোস করে নির্গত হয়। রেডিয়েটর থেকে আমার ফ্লাক্সে কিছু পানি ছিলো তাই আমি উৎসর্গ করি ইঞ্জিনের উদ্দেশ্যে। আর্মেনীয়টি তার সাথে যোগ করে কিছু তেল এবং সাহসী ফোর্ড গড়িটি আমাদের নিয়ে আগিয়ে যায় কিছুক্ষণ।

আমার মনে হয়, সেই আশাবাদী বলে, ওখানে আমাদের ডানদিকে আমরা পানি পেতেও পারি। দেখছেন, ওই পাহাড়গুলি কতো সবুজ দেখাচ্ছেমনেহয়, ওখানে তাজা ঘাস আছে। এবং যেখানে বছরের এই সময়ে ঘাস জন্মায়, যখন কোনো বৃষ্টি হয় না, সেখানে নিশ্চয় পানি আছে। এবং পানি যদি থাকেই, আমরা কেন গাড়ি চালিয়ে ওখানে উঠে পানি সংগ্রহ করবো না?

যুক্তির মধ্যে হামেশাই থাকে অনিবার্য এক শক্তি এবং এখানেও সেই জোর রয়েছে যদিও মনে হলো, আর্মেনীয়ল যুক্তিটা আচাচ্ছে ক্রাচে ভর করে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আমরা পথ ছেড়ে দিয়ে গড় গড় আওয়াজ তুলে কয়েক মাইল আগাই পাহাড়ের দিকে। কিন্তিু পানি নেই পাহাড়ের ঢালুগুলি আচ্ছাদিত রয়েছে, ঘসে নয়, সবুজাত পাথরে।

মোটরে একটা হিসিং শব্দ হলো, পিস্টনগুলি রূঢ়ভাবে আঘাত করতে থাকে, গাড়ির ঢাকনার জোড়ার ফাঁক দিয়ে বার হছ্ছে ধূঁয়া, সাদা কুন্ডলীর আকারে। আর কয়েক মিনিট.. এবং তরপরই , কিছু ন কিছুতেই চিড়ু ধরবে, ক্রাংক শ্যাফট্টি ভেঙ্গে যাবেকিংবা এই রকম সূ** অন্য একটা কিছু। কিন্তু এবার আমরা কাফেলার পথ থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছি। এখন যদি কিছু ঘটে, আমদের হতাশ হয়ে বসে পড়তে হবে এই নির্জন স্থানে। আমাদের যা কিছু তেল ছিলো তার প্রায় সবটুকুই দেয়া হয়েছে রেডিয়েটারে। আর্মেনীয়টি প্রায় পাগলামি শুরু করে দেয়, সে পানির খোঁজ করে ফিরছিলো, বাঁদিকে গাড়ির মোড় ঘুরিয়ে তারপর ডনি দিকে, সার্কাসের ভেতর বাজিকর যেভঅবে ডানেবাঁয়ে গতি পরিবর্তন করে, ঘুর পাক খায়, তেমনি, । কিন্তু তবু পানির কোনো সম্ভাবানা দেখা গেলো না। এবং দামী ফরাসী মদের যেবোতলটি আমি আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমর্পণ করলাম, তাও উত্তপ্ত রেডিয়েটারের বেশি কাজে লাগলো না শরাবজাত বাষ্পপুঞ্জে আমদের আচ্ছাদিত করা ছাড়া; এবং তার ফলে জায়েদ (যে কেো শরাব খায়নি) প্রায় বমি করে ফেলে।

যে পাথুরে নিস্ক্রিয়তায় জায়েদ এতোক্ষণ হারিয়ে গিয়েছিলো এই শেষ এক্সপেরিমেন্টে তা টুটে খান খান হয়ে গেলো। একটি ক্রদ্ধ অংগভংগির সাথে সে তার কুফিয়া টেনে নামিয়ে দেয় চোখের উপর, গাড়ির উত্তপ্ত কিনারের উপর নুয়ে পড়ে আর মরুভূমির দিকে তাকাতে থাকে বারবারসেই নির্ভূল, সতর্ক একাগ্রতার সাথে, যা খোলা আসমানের নিচে যারা জীবনের বেশির ভাগ কাটায়, তাদের একটা বৈশিষ্ট্য, যারা নিজেদের ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করতে অভ্যস্ত। আমরা উদ্বেগের সাথে এন্তজারি করিবেশি কিছু আশা ছাড়াইকারণ, আগেই সে আমদের বলেছে দেশের এই অংশে জীবনে সে কখনো আসেনি। কিন্তু সে তার হাত তুলে উত্তরদিকে নির্দেশ করে এবং বলে ওঠে

ওই যে’!

শব্দ তো নয়, যেনো একটি হুকুম, একটি আদেশ! ড্রাইভারটি বেজায় খুশি যে তাকে মুক্তিদেবার জন্য একজনকে পাওয়া গেলো। কোনো প্রশ্ন না করে সংগে সংগে সে আদেশ পালন করে। যন্ত্রদায়কভঅবে হাঁপাতে হাঁপাতে ইঞ্জিনটি আমাদের নিয়ে চলে উত্তরমুখে। কিন্তু হঠাৎ জায়েদ একটু উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে তার হাত রাখে ড্রাইভারের কাঁধের উপর এবং তাকে থামতে বলে। কিছুক্ষণের জন্য সে সম্মুখ দিকে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে বসে শুঁকে শুঁকে শিকার ধরা কুকুরের মতো। তার চাপা ঠোঁটের আশপাশে কাঁপছে সামান্য, প্রায় অনুভবযোগ্য একটা উত্তেজনা।

না, ওদিকে হাঁকা, সে চিৎকার করে ওঠে এবং উত্তরপূর্বদিকে ইশারা করে।

জলদি। ড্রাইবার আবার তার হুকুম তামিল করে একটি কথাও না বলে। কয়েক মিনিট পর আবার জায়েদের মুখে আদেশথামো! এবং সে লঘূভংগিতে লাফিয়ে পড়ে গাড়ি থেকে, তার লম্বা জো্ব্বা সে দলা করে নিজের দুহাতে নেয় এবং সোজা সামনের দিকে ছুটে যায়, থেমে পড়ে এবং কয়েকবার ঘুরে ঘুরে দেখে, যেনো কিছু খুঁজছে কিংবা নিবিড়ভঅবে কিছু শুনছে এবং অনেকক্ষণের জন্য ইঞ্জিনের কথা, আমার মুসিবতের কথা আমি ভুলে যাই, আমি এতোই মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি একটি মানুষের দৃশ্য, নিজের সকল ইন্দ্রিয় আর স্নায়ু দিয়ে যে চেষ্টা করছে প্রকৃতির সাথে নিবিড় যোগ স্থাপনের জন্য। এবং হঠাৎ সে লম্বা লম্বা ধাপে ছুটতে শুর করে দিলো, আর দুটি স্তুপের মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গায় অদৃশ্য হয়ে গেলো। মুহূর্তকাল পরেই আবার মাথা দেখা গেলো এবং তার হাত দটি আন্দোলি হতে লাগলোঃ

পানি!

আমরা তার কাছে ছুটে যাই। হ্যাঁ, তাই বটে । উপরে ঝুলেপড়া শিলা দ্বারা রোদ, থেকে বাঁচানো একটি গর্তে ঝলমল করছে পানির একটি ছোট্ট ডোভা, বিগত শীতের বৃষ্টির কিছু অবশেষ, হলদেবাদামি, কাদা মেশানো, কিন্তু তবু পানিপানি! কোনো এক ধারণাতীত মরুভূমিজ ইন্দ্রিয়নুভূতি এই পানির অস্তিত্ব প্রকাশ করে দিয়েছে নযদের লোকটির নিকট..

এবং আমি আর আর্মেনীয় ড্রাইভারটি যখন খালি গ্যাসোলিন টিনে সেই পানি তুলে বহু অত্যাচারিত ইঞ্জিনে নিয়ে ঢালছি জায়েদ তখন স্মিত হাসিতে স্নিগ্ধ হয়েএক নির্বাক বীর যেনোগাড়িটির পাশ দিয়ে একবার সম্মুখ দিকে হাঁটছে, আরেকবার পেছিনদিকে।

.. .. .. … … …       …                    …                    ….

 

তৃতীয় দিন দুপুর বেলা আমরা ইরাকী গেরাম ফোরাতের তীরবর্তী আনায় পৌঁছলাম, এবং তার পামকুঞ্জ আর মাটির দেয়ালের মধ্যে দিয়ে কয়েক ঘন্টা গাড়ি হাঁকালাম। ওখানে আমরা জায়েদের কথা মতো দেখতে পেলাম বহু আগায়েলকে; যাদের বেশী ভাগ তারই কবিলার লোক। পাম গাছের ছায়ায় দীর্ঘ পদক্ষেপে চলাফেরা করছে চিক্কণ চিকচিক করা অশ্বরাজির মধ্যে দিয়ে, যাদের উপরে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে রোদ আর সবুজের মধ্য দিয়ে পরিশ্রুত হয়ে আসা আলো, যেনো একেকজন নৃপতিশ্রী ও আভিজাত্যপূর্ণ এবং অধস্তনের প্রতি সৌজন্যময়। পথ চলতে চলতে জায়েদ ওদের কারো কারো প্রতি সম্মানের সাথে একটু মাথা নোয়ায় এবং তার মুখের দুপাশে  তার লম্বা চুল ঝাঁকুনি খায়। মরুভূমি আর শহর দগ্ধ করা উত্তাপের মধ্যে কঠোর জীবন যাপন করলেও জায়েদ এতোই অনুভূতিশীল যে, গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে আমাদের দ্রুত অগ্রগমনের মধ্যেও সে তার মাথার পাগড়ী পেঁচিয়ে মুখের উপর বাঁধে যাতে ধূলা মুখে ঢুকে না পড়ে, যেধুলায় আমরা, বিকৃত স্বভাব শহুরে লোকেরাও খুব অস্বস্তি বোধ করতাম না। আবার যখন আমরা শিলানুড়ির উপর দিয়ে চালাচ্ছি এবং পথেও আর ধূলাবালি নেই, জায়েদ প্রায় সম্পূর্ণ বালিকাসুলভ এক মধুর ভংগীতে আর কুফিয়া ঠেলে  দেয় পেছন দিকে এবং শুরু করে দেয় গান। হঠাৎ সে তার মুল খোলে এবং গাইতে শুরু করেসমতল ভেদ করে হঠাৎ উপর দিকে উৎক্ষিপ্ত গিরি প্রাচীরের আকস্মিকতায় একটি নয্দী কাসিদা, এক ধরনের গজল গান, একটানা একঘেয়ে ছন্দে, টেনে বার করা সুরের আন্দোলন, মরুবায়ুর মতো প্রবাহমান, যার শুরুও নেই, শেষও নেই। পরের গাঁয়ে পৌঁছানোর পর জায়েদ ড্রাইভারকে অনুরোধ করে থামবার জন্য। তারপর সে গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে ৈএবং এই পথটুকু তাকে লিফট দেয়ার জন্য শুকরিয়া জানিযে পিঠের উপর তার রাইফেলটিকে ফেলে সে পামপুঞ্জের মধ্যে হারিয়ে যায়; গাড়িটির মধ্যে পড়ে থাকলো এমন একটি গন্ধ যার কোনো নাম নেই, নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ এক মনুষ্যত্বের সুরভি, আত্মার সরল নিষ্কলুষাতর সুদূল বিস্তৃত , অথবা কখনো বিস্মৃতনয়, অমন এক অনুরণময় অতীত স্মৃতিচারণ।

আনায় সেদিন আমার মনে হয়নি যে, জায়েদের সাথে আবার কখনো আমার দেখা হবে।কিন্তু আমি যা জানিনি তাই ঘটলো।

          … .                         ..                                   …                       ….                  ….        ….

 

পরদিন আমি পৌঁছুই হিত শহরে; ফোরাতের তীরে এমন এক স্থানে এ ছোট্ট শহরে অবস্থিত; যেখানে মরুভূমি থেকে ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে দামেশক থেকে বাগদাদ যাবার পুরান কাফেলাসড়কটি। শহরটি অবস্থিত একটি পহাড়ের চূড়ায়, দেয়াল আর কিল্লা সমেত যেনো একটি প্রাচীন অর্ধবিস্মৃত দুর্গবিশেষ। এর ভেতরে বা বাইরের ঘরবাড়িগুলি যেনো গিয়ে ঢুকে পড়েছে নগরপ্রাচীরের মধ্যে। ঘরবাড়িগুলির কোনো জানালা নেই, আছে কেবল কয়েকটি চিড় বা ফাটাল, দূর্গের ভেতর থেকে অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধার জন্য দুর্গপ্রাচীরে যে সব ছেদা রাখা হয় সেই রকম ছেদার মতো। শহরের ভেতর থেকে আসমানের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি মিনার।

নদীর পারে একটি কাফেলাসরাইতে রাত কাটানোর জন্য আমি আমার চলায় যতি টেনে দিই। ড্রাইভার এবং আমার জন্য যখন রাতের খানা তৈরি হচ্ছে আমি তখন উঠানের মধ্যে যে কুয়াটি রয়েছে সেই কুয়তে গিয়ে হাত মুখ ধুই। আমি মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে বসেছি, এমন সময় কোনো একজন লোক, যে লম্বানল ওয়ালা পানির পাত্রটি আমিরেখেছিলাম সেইটি তুলেনিয়ে আস্তে আস্তে আমার হাতের উপর পানি ঢালতে থাকে। আমি মুখ তুলে তাকাই এবং আমার সম্মুখে দেখতে পাইমোটা হাড্ডির কালো চেহারার একটি মানুষকে, যার মাথায় রয়েছে পশমের টুপি। অনুরুদ্ধ না হয়েই অযাচিতভঅবে ও আমাকে সাহায্য করছে আমার হাত মুখধোয়ার কাজে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো সে আরব নয়।আমি যখন তাকে জিজ্ঞাসস করলাম সে কে, ভাঙা ভাঙা আরবীতে সে জবাব দিলোআমি একজন তাতার, আজারবাইজান থেকে এসেছি। তার চোখ দুটি কুকুরে চোখের মতো উষ্ণ আন্তরিকতাময় এবং  তার গায়ের এক সময়কার ফৌজী উর্দি প্রায় ছিন্ন, জীর্ণ!

আমি তার সাথে কথা বলতে শুরু করি, কিছুটা আরবীতে এবং কিছুটা টুকরা টুকরা ফার্সী ভাষায়, যা আমি শিখেছিলাম কায়রোতে এক ইরানী ছাত্রের কাছে। জানতে পারলাম, তাতারটি নাম ইব্রাহিম। তার জীবনের প্রায় সবটুকু এখন তার বয়স প্রায় চল্লিশসে কাটিয়েছে ইরানের পথেঘাটে; বছরের পর বছর সে মালবাহী ওয়াগন চালিয়েছে তাব্রিজ থেকে তেহরানে, মেশেদ থেকে বিরযান্দে, তেহরান থেকে ইসফাহান এবং শিরাজে এবং একবার সো ঘোড়াসেওয়ার একদলকে  পরিচারনা করেছে নিজের দল হিসাবে; ইরানী অশ্বরোহী বাহিনীতে সে সেপাই হিসাবে কাজ করেছে একবার, কাজ করেছে ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসাবে এক তুর্কোমান সর্দারের; এক সময়ে সে ইসফাহানের কাফেলা সরাইগুলিতে সহিসও ছিলো। কিন্তু এবার কারবালাযাত্রী ইরানী তীর্থযাত্রীদের এক কাফেলায় খচ্চরের চালক হিসাবে ইরাকে আসার পর, কাফেলার সর্দারের সাথে ফাসাদ করে সে তার কাজ খুইয়ে বসেছে এবং এভাবে এক বেগানা মুলুকে সহায় সম্বলহীন হয়ে সে আটকা পড়ে গেছে।

পরে সেই রাত্রে কাফেলা সরাই এর পাম গাছ শোভিত প্রাংগণে, একটি কাঠের বেঞ্চিতে আমি গা এলিয়ে দিয়েছিলাম ঘুমাবার জন্য। গরম পড়েছিলো অসহ্যআর ঝাঁকে ঝাঁকে মশাযেনো মেঘপুঞ্জমানুষের খুন পিয়ে ফুলে ঢোল হয়ে ওঠা ভঅরি মুশার ঝাঁক। অল্প কটি লন্ঠন অন্ধকারের মধ্যে ছড়াচ্ছে তাদের করুণ আবছা আলো। কয়েকটি ঘোড়া, সরাইখানার মালিকেরই হবে হয়তো, একটা দেয়ালের সাধে বাঁধা। তাতার ইব্রাহিম তারই একিটকে বুরুশ করছে। যেভাবে সে ঘোড়াটি বরুশ করছে তাতে বোঝঅ যায় সে যে কেবল ঘোড়া চেনে তানয়, সে ঘোড়াকে ভালোও বাসে। তার আঙ্গুলগুলি এমনভঅবে টোকা দিচ্ছে ঘোড়ার খাড়া কেশরে  যেমন করে প্রেমিক তাত বুলায় তার প্রেমিকের কেশদামে।

হঠাৎ আমার মনে একটা ধারণ এলো। আমি আমার সফরে ইরানের পথে চলেছি এবং আমার সম্মুখে রয়েছে ঘোড়ার পিঠে দীর্ঘ বহু মাসের সফর। আমি কেন এই লোকটিকে নিচ্ছি না আমার সাথে? মনে হলো লোকটি উত্তম এবং বেশ চুপচাপ। আর এ ধরণেরে একটি লোকের আমার নিশ্চয় দরকার হবে, যে ইরানের প্রায় প্রত্যেকটি পথঘাটের খবর রাখে, আর প্রত্যেকটি কাফেলা সরাই ই যার জানাশোনা, নিজের ঘরের মতো।

পরদিন সকালে যখন তাকে আমি বললাম আমিতাকে আমার নওকর করে নিতে পারি, তখন কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে সে প্রায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো এবং ফারসী ভাষায় আমাকে বললোঃ হযরত, এর জন্য কখনো আপনার অনুশোচনা করতে হবে না!

                        .                         

সে হচ্ছে আলেপ্পো থেকে আমার মোটর সফরের পঞ্চম দিনের দুপুর, যখন প্রথম আমার নযরে পড়লো বাগদাদের প্রশস্ত ওয়েসিসের দৃশ্য। অসংখ্য পামগাছের মাথার ফাঁক দিয়ে আসমানের দিকেওঠা সোনালী কাজ করে মসজিদের গম্বুজ এবং সুউচ্চ মিনার ঝলমর করছে। রাস্তার দুপাশেই রয়েছে একটি বিাশাল প্রাচীন গোরস্তানভেঙে ভেঙে পড়ছে যার কবরগুলি শিলাধূসর, উষার এবং পরিত্যক্ত। মিহি ধূসর ধূলা স্তদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোরস্তানটির উপর; এবং দুপুরের খর রোদে এই ধূলিধূসরতাকে মনে হচ্ছে রূপালী কাজ করা স্বচ্ছ পাতলা কাপড়ের নেকাবের মতোঅতীতের মৃত জগত আর জীবন্ত বর্তমানের মধ্যে কুয়াশঅর মিহি দেয়াল যেনো। হ্যাঁ, হওয়া উচিত, সব সময় আমি মনে মনে ভাবিযখন কেউ অমন কোনো এক নগরীর নিকটবর্তী থেকে এমনি সম্পূর্ণ আলাদা যে, সে পার্থক্য মন ধারণাই করতে পারে না….

এবং তারপর আমরা ডুব দিলাম পামবীথির মাঝেমাইলের পর মাইল প্রকান্ড প্রকান্ড গাছের গুঁড়ি এবং বাঁকা বাঁকা পাতাযতোক্ষণ না পামবাগিচা এসে হঠাৎ থেমে গেলো তাইগ্রিস নদর খআড় পাড়ের কাছে। নদীটি ফোরাত থেকে ভিন্ন ধরানের। কাদা সবুজে মেশানো রঙ্গ, ভারিক্কিএবং কুল কুল শ্বদ করে চলেছেসেই অপর নদীটির নীরব রাজকীয় প্রবাহের কাটে ঠিক যেনো অচেনা এক বিদেশী, পর! এবং আমরা যখন তাইগ্রীস পার হলাম নৌকা দিয়ে, তৈরি একটি দোলখাওয়া ব্রিজের উপর দিয়ে, পারস্য উপসাগরের আগুনে উত্তাপ ছাড়িয়ে পড়রো আমাদের উপর।

বাগদাদের সেকালের শানশওকত এবং জেল্লার কিছুই অবশিষ্ট নেই। মধ্যযুগকে মোংগলদের উপর্যুপরি হামলায় এ নগরী এমনভাবে ধ্বংস হয় যে, হারুনঅররশীদেরক পুরান রাজধানীর কথা স্মরণ করিয়ে দেবার মতো কিছুই বাকি নেই। দাঁড়িয়ে আছে এলোমেলোভাবে ইট দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ির এক শহরমনে হয় যে, সম্ভাব্য পরিবর্তনের চিন্তায় সাময়িক এক ব্যবস্থা যেনো। আসলেই কিন্তু এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার আকারে এ ধরণের একটি পরিবর্তন ইতিমধ্যে সূচিত হয়ে গিয়েছিলো। নগরীটিতে আবার প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়েছে; নতুন নতুন দালানকোঠা জেগে উঠছে; ঘুমন্ত এক তুর্কী প্রাদেশিক হেডকোয়ার্টার থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক আরবীয় রাজধানী।

প্রচন্ড গরমের ছাপক পড়েছে সব কিছুর উপরেক এবং সকল গতিচাঞ্চল্যকে করে তুলেছে মন্থর। লোকজন রাস্তায় চলছে ধীর পদক্ষেপ। মনে হয় ওদের রক্ত খুবই গাঢ় এবং ওদের মধ্যে কোনো ছন্দ এবং মাধুর্য নেই। সাদকালোক চেক কাপড়ের পাগড়ীর নিচে ওদের মুখ দেখাচ্ছে অতিমাত্রায় গম্ভীর এবং অবন্ধুসুলব। গর্বিত আত্মসমাহিত মর্যাদায় মন্ডিত কোনো সুন্দর আরব মুখমন্ডল যখনি আমি দেখেছি, তার মাথায়ক দেখছি লাল, অথবা এবং সাদা রঙের কুফিয়াযার অর্থ হচ্ছে, লোকটি এখানকার নয়, সে এসেছে উত্তরাঞ্চল থেকে, কিংবা সিরীয় মরুভূমি থেকে অথবা মধ্য আরব থেকে।

কিন্তু এই লোকগুলির মধ্যে প্রচন্ড এক শক্তি দীপ্যমানঘৃণার শক্তিযে বৈদেশিক শক্তি তাদের স্বাধীনতা হরণ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণার। দেও দানোর মতোই মুক্তির কামনায় হামেশাই আচ্ছন্ন বাগদাদের লোকেরা। হয়তো এই দৈত্যেরই কালো গভীর ছায়া পড়েছে তাদের মুাখের  উপর। হয়তো এ সব মুখই সম্পূর্ণ আলাদা এক চেহারার হয়ে উঠে যখন ওরা শহরের সংকীর্ণ অলিগলি ও  পাঁচিলঘেরা প্রাংগণগুলিডতে ওদের নিজেদের রোকজনের সাথে মুলাকাত করে। কারণ একটু নিবিড়ভাবে ওদের দিকে তাকালে আপনি বুঝতে পারবেনওদের চেহারা সম্পূর্ণ মাধুর্য বর্জিত নয়। মাঝে মাঝে অন্যান্য আরবেব মতোই  ওরা হাসতে জানে। কখনো কখনো অন্যান্য আরবের মতোই ওরা ওদের জোব্বা আভিজাত্যপূর্ণ তাচ্ছিল্যের সাথে ওদের পেছনে পেছনে ছেঁচড়িয়ে টেনে টেনে নেয় ধুলার উপর দিয়ে; ভাবটা যেনো এইঃ ওরা মর্মরের তৈরী প্রাসাদের মোজাইক করা মেঝের উপর দিয়ে হাঁটছে! ওরা  ওদের রমণীদের রা্সতায় আলস্যভবে বেড়াতে দেয় বর্ণাঢ্য বিচিত্র কিংখাবের চাদরে চাদরে নিজেদের ঢেকে; বোরকাপরা মহামূল্য রমণীকূল, লালকালো নীলরূপালী এবং বোর্দো লাল কিংখাব পরা মূর্তি সকল ধীরে ধীরে সোনারা ছাপ এঁকে দিচ্ছি নিঃশব্দ চরণে

.. .. .. .                        .. .. ..    ..    ..

আমরা বাগদাদে পৌঁছুনোর কয়েক হপ্তা পরে আমি যখন বড়ো বাজারের মধ্যে পায়চারি করছি, পিপাকৃতি ছাদঘেরা ঈষৎ আঁধার গলিপথগুলির একটি থেকে হঠাৎ প্রতিধ্বনিত হলো একটি চিৎকার। এক কোণ থেকে একটি মানুষ ছুটে গেলো, তারপর আরেকজন, তারপর তৃতীয় আরেকজন। এবং বাজারের লোকও ছুটতে শুরু করলোএমন একটি আতংকে তাড়িত হয়ে ক যার কারণ আমি জানিক না, ওরাই জানে। ঘোড়ার ক্ষুরের খটখট আওয়াজঃ ভীতসন্ত্রস্ত মুখি একটি সওয়ার ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটলো জনতার ভীড়ের দিকে, যে ভীড় ভেঙ্গে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো তার সামনে। আরো লোক দৌড়াচ্ছে এবং সবাই আসছে একই দিক থেকে এবং তাদের সাথে ছুটছে বাজারের দোকানীরা। ধাক্কা খেতে খেতে, ঝাঁকুনি খেতে খেতে গোটা দলটাই প্রবলবেগে আগাচ্ছে সামনের দিকে। দোকানদাররা ত্রস্তসন্ত্রস্ত হয়ে নিজ নিজ দোকানের সামনে স্থাপন করছে কাঠের তক্তা। কেউই  কথা বলছে না,  কেউক অপরকে ডাকছে না। শুধু মাঝে মাঝে আমি শুনতে পাচ্ছি পড়ন্ত মানুষেল চিৎকার, একটি শিশু আর্তনাদ করে উঠলো হৃদয় বিদীর্ণ করা শব্দে..

কী হলো? কোনো জবাব নেই। যেদিকেই তাকাই বিমর্ষ মুখ নযরে পড়ে। একটি ভারী ওয়াগযা একনো গাটুরি দিয়ে অর্ধেক বোঝাই চালক ছাড়াই ছুটে চছে সংকীর্ণ গলির ভেতর দিয়ে, ধাবমান ঘোড়া টেনে নিয়ে চলছে ওয়াগনটি।দূরে মাটির পাত্রের একটি স্তূপ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছেএবং আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, ভাঙা হাড়িপাতিলের টুকরাগুলি গড়াগড়ি যাচ্ছে মাটিডতে। এই সব কন্ড ধ্বনি এবং লোকজনের পায়ের আওয়াজ আর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ বাদ দিলে, এক গভীর এবং চাপা নীরবতাই জেঁকে আছে সর্বত্রঠিক যেমনটি মাঝে মাঝে দেখা দেয় যায় ভূমিকম্পের আগেআগে। শোনা যাচ্ছে, কেবল ছুটান্ত মানুষের পৌনঃপুনিক পদধ্বনি; কখনো শোনা যাচ্ছে প্রবহমান জনতার মধ্যক থেকে ছিটকে বার হয়ে পড়া কোনো নারী বা শিশুর আর্ত চিৎকার। আবর দেখা গেলো কতিপয় ঘোড় সওয়ার। ভীতি, পলায়ন এবং নীরবতা! ছাঁদঢাকা রাস্তাগুলি যেখানে একে অপরকে ছেদ করেছে সেখানে এক উন্মত্ত সমাবেশ, এক মাতাল হট্টগোল!

এসব ক্রসিং এর একটিতে  দংগলের সৃস্টি হয়েছে তাতে আটকা পড়ে আমার অবস্থা অমন হলো যে আমি আগাতেও পারছি না, পিছাতেও পারছি না এবং বলতে কি, কোথায় যে আমি যাবো, তাও আমি কজানি না। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি টের পেলাম, আামর বাজুতে কে যেনো চেপে ধরেছে, আর কেউ নয় জায়েদ, সে আমকে টানছে তার দিকে, দুটি দোকানের মাঝখানে পিপা দিয়ে তৈরি করা একটি ব্যরিকেডের পেছনে।

নড়বেন না, সে কানে কানে বলে।

কী  যেন একটা শাঁ করে চলে কগোলো পাশ দিয়ে; রাইফেলের বুলেট? অসম্ভব

অনেক দূরে, বাজারের মাঝখানে কোনো স্থান থেকে, বহু কন্ঠের চাপা গর্জন ভেসে এলো। আবার কিছু একটা শাঁ  করে চলে যায়, এবার আর এ বিষয়ে কোনো ভুলের আশংকা নেই। বুলেটের শব্দদূরে, একট অস্পষ্ট ঘর্ষণের শব্দ, যেনো কেউ কেউ মটরশুট ছড়াচ্ছে শুকনা শক্ত মেঝের উপর। ধীরে ধীরে আওয়াজ আগিয়ে আসে এবং ক্রমেই তা বাড়তে থাকেসেই ঘন ঘন আওয়াজ যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে নিয়মিত ব্যবধানেএবং আমি বুঝতে পারলাম ব্যাপারটি কীঃ মিশিনগান, কামানের শব্দ…..

 আগেও যেমন  বহুবার হয়েছে, আবারো তেমনি বাগদাদ নতুন করে বিদ্রোহ করেছে এর আগের দিন১৯২৪এর উনত্রিশে মে। ইরাকী পার্লামেন্টে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রেটব্রিটেনের সাথে একটি মৈত্রী চুক্তি অনুমোদন করে। আর এই মুহূর্তে একটি হতা্যশ জাতি আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেএকটি বৃহৎ ইউরোপীয় শক্তির বন্ধুত্বের বিরুদ্ধি..

এবেং পরে আমি জানতে পারলাম, বিক্ষোভ দমন করার জন্য বাজারে ঢোকার সকল পথ ব্রিটিশ ফৌজ বন্ধ করে দিয়েছে।  সেদিন বাজারে, নির্বিচার গোলাগুলিতে বহু লোক মারা যায়। জায়েদ বাধা না দিলে আমিও হয়তো সোজা ছূটে যেতাম কামানের আগুনের মুখে।

আর এটিই ছিলো আমদের বন্ধুত্বের সত্যিকার সূচনা। জায়েদের বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন স্বল্পভাষী পৌরুষ আমাকে আক র্ষণ করে প্রচন্ডভঅবে। আর ওর দিক থেকে বরা যায়, সেও স্পষ্টই তরুন ইউরোপীয়টিকে ভালোবেসে ফেলেছিলো, আরবদের বিরুদ্ধে এবং তাদের জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে যার তেমন কোনো সংস্কার ছিলো না। ও আমাকে বললো ওর জীবনের সাদামটা কাহিনী। কেমন করে এর আগে ওর পিতার মতোই  ও বড়ো হয়েছিলো হাইলের শাসকদের চাকুরিতে, ইবরে রশিদের শাম্মার খান্দানের অধীনে; কেমন করে যখন ১৯২১ সনে ইবনে সউদ হাইল দখল করে নেন এবং ইবনে সাউদের হাতে ইবনে রশিদের খান্দানের সর্বশেষ আমীর বন্দী হন, তখন শা্ম্মার কবিলার বহু মানুষ এবং তাদের সাথে জায়েদও, নতুন শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ না করে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে বেছে নিয়ে বার হয়ে পড়েছিলো দেশ ছেড়ে। আর এখন রয়েছে এখানে, তার আইগালে সাতটি কোণাওয়ালা ইরাকী তারকা পরে, বুকে তার জোয়ানী কালের স্বদেশের জন্য আকুল আকুতি নিয়ে।

ইরাকে আমার সফরের হপ্তাগুলিতে আমরা একে অপরের অনেক কিছু জানবার সুযোগ পাই এবং এর পরের বছরগুলিতে আমরা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলি। আমি মাঝে মাঝে তাকে চিঠিপত্র লিখি এবং বছরে দুএকবার তাকে ইরান বা আফগানিস্তানের কোনো বাজার থেকে কিনে ছোট্ট উপহার পাঠাই। প্রত্যেকবারই তার অগোছালো, প্রায়অবাধ্য বিশ্রী হাতের লেখায় জবাব দেয় এবং দিনগুলির কথা উল্লেখ করে, যখন আমরা এক সাথে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ফোরতের পার দিয়ে চলেছি, কিংবা পাখাওয়ালা সিংহ দেখতে গিয়েছি ব্যবিলনের ধ্বংসাবেশেষের মধ্যে। তারপর শেষমেষ, আমিযখন আরবে এলাম ১৯২৭ সনে, তখন আমি তাকে অনুরোধ করি আমার সাথে যোগ দিতে; পরের বছরই জায়েদ আমার সাথে মিলিত হয়। এবং তারপর থেকেই সে আমার সংগী হিসাবে রয়েছে, যতোটা না একজন নফর হিসাবে তার চাএত অনেক বেশি আমার এক কমরেড হিসাবে।

  ..  ..  ..              ..  ..                ..   . ..  .

তৃতীয় দশকের গোড়ার দিকেও ইরানে মোটর গাড়ি ছিলো অপেক্ষাকৃত বিরল; বড়ো বড়ো কেন্দ্রগুলির মধ্যে কয়েকটি ভাড়াই চলাফেরা করতো। তিন চারটি ট্রাংক রোড বাদ দিয়ে চলাফেরা করতে চাইলে ঘোড়া টানা গাড়ির উপরই নির্ভর করতো হতো। এবং সেগুলিও যে সব জায়গায় যেতো তা নয়; কারণ ইরানের বহু জায়গায় তখন রাস্তাঘাটের অস্তিত্বই ছিলো না । আমার মতো লোকের জন্য যেকোনো দেশের মানুষের সাথে তাদের শর্ত মেনেই মেলামেমা করতে আমি উৎসুকঘোড়ায় চড়ে সফর করাই ছিলো সুস্পষ্পি ইংগিত; আর এ কারণেই, বাগদাদে আমরা শেষ হপ্তায় ইবরাহীমকে সংগে নিয়ে রোজ সকালে যেতাম শহরের বাইরে ঘোড়ার বাজারে। কয়েকদিন দরকষাকষির পর আমি নিজের জন্যে একটি ঘোড়া ও ইবরাহীমের জন্য একটি খচ্চর কিনি। আমার সওয়ারীটি ছিলো দক্ষিণ ইরানের একটি অতি সুন্দর আসলি, লালবাদমী রঙেন টাট্টু ঘোড়া, আর খচ্চরটি ছিলো পষ্টই তুরষ্ক থেকে আনীত একটি প্রাণোচ্ছল মগড়া একগুঁয়ে জানোয়ার, যার পেশীগুলি ছিলো ধূসর মখমখের চামড়ার নিচে ইস্পাতের মোটা রজ্জুর মতো; স্বচ্ছন্দে এটি বহন করতো তার সওয়ার ছাড়াও আমার বড়ো বড়ো থলেগুলি, যার আমি রাখতাম আমর প্রয়োজনীয় সবকিছু।

আমার ঘোড়ায় চড়ে এবং খচ্চরটিকে একটি রশিা ধরে চালাতে চালাতে ইব্রাহিম এক সকালে বার হয়ে পড়লো ইরানী সরহদে, ইরাকের সর্বশেষ শহর  খানিকিনের দিকে। শহরটি হচ্ছে বাগদাদ রেলওয়ের একটি শাখা লাইনের ইস্টিশন। দুদিন পর আমি ট্রেনে রওনা করি, ওখানে ইব্রাহিমের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য

আমরা খানিকিন এবং আরব জাহানকে পেছনে ফেলে এসেছি। আমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে হরদে পাহাড় সবউচ্চতরো গিরিমালার বিরুদ্ধে সান্ত্রী যেনোইরানী মালভূমির পর্বতমালা, এক নতুন এবং প্রতীক্ষমান পৃথিবী। সীমান্ত চৌকিটি হচ্ছে একাকী এক ছোট্ট ইমারত , যার উপর তোলা রয়েছে একটি বিবর্ণ পতাকাসবুজসাদা এবং লাল রঙ্গের, যাতে রয়েছে তরবারি ও উদীয়মান সূর্য সহ সিংহের প্রতীক। অল্প কজন শুল্কঅফিসার , যাদের মাথার চুল কালো, গায়ের রঙ ফরসা, পরনে ময়লা ইউনিফর্ম আর পায়ে চটি জুতা, অনেকটা যেনো বন্ধুত্বপূর্ণ রসিকতার সাথেই পরীক্ষা করে আমার সামান্য লাগেজপত্র। তারপর ওদের একজন আমাকে সম্বোধন করে বরেঃ

সবকিছুই ঠিক আছে, জনবাআলী, হুযুরের মরতবা আমাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের অনেক উপরে। আপনি মেহেরবানী করে আমাদের সাথে চা পান করে আমাদেরকে অনুগৃহীত করবেন?

এবং আমি যখন এইবাকভংগীর মাধ্যমে ব্যক্ত আজব  এবং সেকেলে শিষ্টাচার নিায়ে বিস্ময় বোধ করছিলাম কথন হঠাৎ আমর মনে হলো, ফারসী জবান তার বহু আরবী শব্দ সত্ত্বেও আরবী ভাষা থেকে কতো ভিন্ন, কতো আলাদা! এর মধ্যে রয়েছে একটি দ্যোতনাময় অনুশীলিত মাধুর্য, আরবদের উষ্ণ ব্যঞ্জনধ্বনির ভাষার পর, ফারসী স্বরবর্ণের মোলায়েম মুক্ত ধ্বনি বিস্ময়করূপে পাশ্চাত্য ধরণের শোনালো।

মুসফির বেশে কেবল আমরিই ছিলাম না। চার ঘোড়ার টানা অনেকগুলি ভারি ক্যানভাসে ঢাকা ওয়াগান শুল্ক অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং কাছেই এক কাফেলা তাঁবু গেড়েছে। খোলা তাঁবুর আগুনে লোকজন তাদের খাবার রান্না করছে।যদিও বেলা তখন বিকালের প্রথম দিক, তবু মনে হলো, ওরা যেনো আরো আগাবার চিন্তাই করছে না এবং আমরাও , আমি জানি না, কেন, একই সিদ্ধান্ত নিই। খোলা জায়গায় রাতটা আমরা কাটাই যমূীনের উপর কম্বল বিছিয়ে।

ভোরের প্রথমদিকে, কটি ও্য়াগান ও কাফেলা আবার চলতে শুরু করলো নাঙা পর্বতমালার দিকে আমরাও আমদের নিজ নিজ সওয়ারীতে চড়ে তাদের সাথে রওনা করি। রাস্তাটি ঘুরে ঘরে উপর দিকে উঠেছে, এ কারণে দুজন শীগ্গীই ধীরগতি ওয়াগনগুলিকে পেছনে ফেলে যাই এবং এরপর আমর আমদের সওয়ারী হাঁকিয়ে কুর্দদের পার্বত্য দেশের গভীর হতে গভীরতরো অঞ্চলো ঢুকে পড়িদীর্ঘদেহী, ফর্সা পশুচারীদের বাসভূমিতে।

আমি ওদের পয়লা লোকটিকে দেখলাম, যখন রাস্তার মোড়ে ডারপালা ও ছনের তৈরি, খশ্ খশ্ শব্দ করা একটি কুটির থেকে সে বের হয়ে এলো এবং কোনো কথা না বলে  কানায় কানায় দুধ ভর্তি একটি কাঠের বাটি আমাদের সামনে তুালে ধরালো। তার বয়স খুব সম্ভব সতেরো; খালি পা, উস্কোখুস্কো, গোসল করে বলে মনে হলো না; হাত পা আ ধোয়া, অপরিষ্কার;একটা শোলার টুপির অবশেষ তার অগোছালো মাথায়ক শোভা পাচ্ছে। আমি সেইক পাতলা সামান্য নুনমেশানোক এবং বিস্ময়কররূপে ঠান্ডা দুধ পান করছি আর বাটির কাঁধির উপর দিয়ে দেখছি দুটি নীল চোখ, আমার প্রতি পলকহীন নিবদ্ধ দুটি চোখ। নবজাত পশুর উপর ছড়িয়ে থাকে যে ভঙুর আর্দ্র মিষ্টি কুয়াশাচ্ছন্নতা, এক আদি নিদ্রালুতা, যা এখনো পুরাপুরি টুটেনি, তারই কিছু যেনো ঘনিয়ে আছে ওর চোখ দুটিতে!

বিকালে আমরা পৌঁছুই তাঁবু দিয়ে তৈরী একটি কুর্দী গাঁয়ে , পাহাড়ের ঢালগুলির মধ্যে চুপচাপ পড়ে থাকা ঘেঁষাঘেঁষি  তাঁবুর একটি গাঁ। দেখতে সিরিয়া কিংবা ইরাকের অর্ধযাযাবর বেদুঈনদের তাঁবুর মতোই এই তাঁবুগুলি। ছাগপশমের তৈরি মোটা কালো কাপড় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে খড়ের মাদুর দিয়ে। কাছেই বয়ে যাচ্ছে একটি নহর, যার দুপারে ছড়িয়ে আছে সারি সারি পপলার গাছের ছায়া; সেই নহরের মধ্যে মাথা জাগিয়ে থাকা একটা শিলার উপর এক জোড়া সারস পাখী উত্তেজিতভাবে ঠোঁটে ঠোঁটে আঘাত করে শব্দ সৃষ্টি করছে এবং পাখা ঝাপটাচ্ছে; ইন্ডিগোব্লু জ্যাকেট পরা একটি লোক তার দীর্ঘ অথচ হালকা পদক্ষেপে আগাচ্ছে তাঁবুর দিকে; তার মাটির সাথে সম্পৃক্ত অথচ খুবই শিথিল চরনভংগি থেকেযেনো কথা বলছে প্রাচীন বেদুঈন রক্ত! লালনীল মেশানো রঙের ঝুলন্ত কাপড় পেছন থেকে মাটির উপর টেনে টেনে, কাঁধের উপর একটা লম্বা মাটির পাত্র রেখে একটি রমণী ধীরে ধীরে চলেছে নহরটির দিকে। তার উরুদ্বয় পষ্ট রেখায়িত হয়ে উঠেছে তার  পোশাকের মিহি কাপড় ফুটেঃ ভয়োলিনের তারের মতো দীর্ঘ এবং টানা রেখা! পানির কিনারে গিয়ে ও হাঁটু গেড়ে বসে এবং কলসে পানি ভরার জন্য পনির উপর নুয়ে পড়ে। তার পাগড়ির  মতো মাথার কাপড় খসে পড়ে এবং রক্তের একটি  স্র্রোতের মতো তা স্পর্শ ক রে ঝকঝক পানির উপরিভাগ, কিন্তু কেবল মুহূর্তের জন্যই; কাপকড়টি তুলে আবার সে তার মাথার চারপাশে জড়ায়, একটি মাত্র বিলীয়মান ভংগিতে, যা এখনো যেনো তার হাঁটু গেড়ে বসারই অংশ এবং একই ভংগির অন্তর্গত।

কিছু পরে আমি চারটি তরুণী এবং এক বৃদ্ধের সথে নহরটির ধারে গিয়ে বসি। মুক্ত স্বাধীন জীবন থেকে পাওয়া এক নিটেল মাধুর্য ও স্বাভাবিকতা রয়েছে ওদের চারজনের মধ্যেইঃ সৌন্দর্য , যা নিজের সম্বন্ধে সচেতন অথচ সৎ পবিত্র, যা নিজেকে লুকাতে জানে না, অথচ সলজ্জতা ও নম্রতা থেকে যাকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে সুন্দরী তার নাম গানের পাখীর নামতুতু (স্বরবর্ণটি উচ্চারিত হয় ফারসী ভাষার মতো)। নাজুক ভূরুজোড়া  পর্যন্ত তার গোটা কপালটাই একটি গাঢ় লাল রঙ্গের যার মধ্যে নীলের আভা রয়েছেস্কার্ফ দিয়ে ঢাকা; চোখের পাতাগুলিতে সুরমা মাখানো; স্কার্ফের নিচে থেকে ঠেলে বার হয়েছে বাদামী লার অলকগুচ্ছ, যার মধ্যে চিকনচিকন রূপার চেন সূতার মতো পাকিয়ে জড়ানো হয়েছে। প্রত্যেকবার মাথা নাড়ার সাথে সাথেই সেগুলি ঝন্ ঝন্ করে উঠেছে নাজুক টোলপড় গন্ডরেখার সাথে ধাক্কা খেয়ে।

আমরা সকলেই আমাদের কথাবার্তা, বাতচিত্ উপভোগ করিযদিও তখনো আমার ফারসী কথাবার্তা গোছানো হতে পারেনি, (কুর্দী ভাষার সাথে ফারসীর সম্পর্ক আছে)। এই কচি মেয়েগুলি, যারা নিজেদের কবিলার গম্ভীর বাইরে কখনো যায়নি এবং লেখাপড়াও জানে না, আসলে কিন্তু খুবই চালাক। ওরা সহজেই আমার ঠেকে ঠেকে বলা কথাগুলি বুঝতে পারে এবং প্রায়ই আমি যে শব্দটির জন্য অন্ধকারে হাত বাড়াচ্ছি সেটি বেছে নিয়ে নেহায়েতই বাস্তব নিশ্চয়তার সাথে আমার মুখে তুালে দিচ্ছে। ওরা কী করে, আমি ওদের নিকট জানতে চাই, ওরা জবাব দেয়, েএক যাযাবর রমণীল দিনগুলি যে বহু সংখ্যক ছোট্ট অথচ মহৎ কাজে ঠাসা থাকে সেগুলির তালিকা তুরে ধরেঃ দুটি চেপ্টা পাথরের মধ্যে অর্থাৎ যাতায় গম পেশা, জ্বলন্ত অংগারে রুটি সেঁকা , ভেড়ার দুধ দোয়া, চামড়ার থলির মধ্যে দই ঝাঁকুনি দিয়ে মাখন তোলা, হাতে চালানো তাঁতে ভেড়ার পশম থেকে সুতা তৈরি, এমন সবা প্যাটার্ন গালিচা বোনা এবং কিলিম বোনা  যা তাদের জাতের মতোই প্রাচীন এবং পুরানো; এবং সন্তান গর্ভে ধারণ করা আর তাদের পুরুষদের বিশ্রাম ও প্রেম দেওয়া..

এমন জীবন, যাতে কোনো পরিবর্তন নেই। আজ, গতকাল এবং আগামীকাল। সময় বলে কিছু নেই এই পশুচারীদের জন্য্শুধু দিনরাত ঋতুর অনুবর্তন ছাড়া। রাতকে করা হয়েছে আঁধার, ঘুমানোর জন্য; দিনকে বলা হয় আলোকোজ্জ্বল জীবনের দরকারী চিজগুলি যোগাড় করার জন্য; শীত ঋতুর আবির্ভাব ঘটে ক্রমবর্ধমান শীতের মধ্যে এবং পাহাড় পর্বতে চারণক্ষেত্রের স্বপ্লতায়; তাই ওরা ওদের পশুপাল এবং তাঁবু নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পৌঁছায় উষ্ণ প্রান্তরগুলিতে, মেসোটটেমিয়ায় এবং তাইগ্রীসে; পরে যখন গ্রীষ্ম ঋতু প্রখরতরো হয়ে গরমে এবং তপ্ত হাওয়অয়, তখন ওরা আবার ফিরে যায় পার্বত্য অঞ্চরে, এখানে, না হয় ওখানে, কবিলার ঐতিহ্যগত স্থান গুলির মধ্যে কোথাও।

আপনার  কি কখনো পাথরের তৈরি ঘরে থাকতে ইচ্ছা হয় না? আমি বৃদ্ধ লোকটিকে জিজ্ঞাস করি, যিনি এখন পর্যন্ত প্রায় একটি কথাও বলেন নি এবং স্মিত হাসির সাথে শুনছিলেন আমাদের বাতচিত; কখনো কি ইচ্ছা হয়না যে, আপনি নিজে মাঠের মালিক হন?

 বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বরেনঃ না, পানি যদি ডোবার মধ্যে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে, পানি হয়ে উঠে বন্ধ, কর্দমাক্ত এবং ; যখন পানির স্রোত থাকে, পানি বয়ে চলে, কেবল তখনি তা থাকে স্বচ্ছ পরিষ্কার

. . .  .. . .                  .. .   ..             ..       .

কালক্রমে কুর্দিস্তান হারিয়ে যায় পেছনে। প্রায় আঠারোটি মাস আমি সকল দেশের মধ্যে সবচেয়ে আজব যে দেশ সেই ইরানের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াই। এতে করে আমি অমন এক জাতিকে জানতে পারলাম, যার মধ্যে মিলন ঘটেছে তিন হাজার বছরের সংস্কৃতির প্রজ্ঞা এবং শিশুসুলভ চঞ্চল অনিশ্চয়তারএমন এক জাতি, –যে, নিজের প্রতি এবং তার চারদিকে যা ঘচে চরেছে তার দিকে তাকাতে জানে এক ধীর আলস  উন্নাসিকতরা সাথে, এবং পরক্ষণেই পারে কম্পিত হতে উদ্দাম আগ্নেয়গিরির আবেগে উত্তেজনায়। শহরনগরের মার্জিত আরাম আয়েশ আমি উপভোগ করি, তার সাথে উপভোগ করি প্রাণকে আনন্দে উদ্বেল করে তোলা স্তেপ অঞ্চরে তীক্ষ্ণ বাতাস। আমি ঘুমিয়েছি প্রাদেশিক গভর্নরদের প্রাসাদে যখন ডজন চাকরবাকর খাড়া রয়েছে আমার হুকুম তালিম করার জন্য, আবার আমিই ঘুমিয়েছি আর্ধেক ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাফেলাসরাখানায়, যেখানে আমাকে রাতের বেলা হুমিয়ার থাকতে হতো  আমাকে বিচ্ছু কামড়ে দেবার আগেই সেগুলিকে মেরে ফেলার জন্য । বখতিয়ারী এবং কাশগাই গোত্রের মেহমান হিসাবে আমি আস্ত ভেড়ার রোস্ট খেয়েছি এবং ধনী সওদাগরদের খাবার ঘরে বসে খেয়েছি টার্কির রোষ্ট, যার ভেতরে ঠাসা থাকতো এ্যাপ্রিকট্খুবানী। আমি মুহর্রমের ত্যাগ এবং খুনমাতাল করা উন্মাদন লক্ষ্য করেছি, শুনেছি হাফিজের নাজুক গীতাকবিতা যা ইরানের অতীত গৌরবের উত্তরাধিকারীরা গায় একটা বাঁশীর সুরের সংগে। আমি ইস্ফাহানের পপ্ লার বীথির নিচ দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি এবং বিশাল মসজিদগুলির সোনায় মোড়া গম্বুজ , ঝুলন্ত প্রবেশদ্বার ও মাহমূল্য বাহির্ভাগের চমৎকারিত্বে মুগ্ধ হয়েছি। ফারসী জবানও আমর কাছে আরবীর মতোই আপন হয়ে উঠালো। শহর বন্দরে শিক্ষিত লোকদের সাথে যেমন আমি কথাবার্তা  বলেছি, তেমনি আলাপ করেছি সেপাই এবং যাযাবরদের সাথে, বাজারে ব্যবসায়ীদের সাথে, মন্ত্রী এবং ধর্মীয় নেতাদের সাথে, ভবঘুরে দরবেশদের সাথে এবং রাস্তার পাশে সরাইখানায় জ্ঞান আফিমখোরদের সাথে। আমি শহরেও থেকেছি, গাঁয়েও থেকেছি, নিজের  মাল পত্র নিয়ে সফডর করেছি মরুভূমি এবং বিপজ্জনক লোনা দলদলা জলাভূমির মধ্য দিয়ে। নিজেকে আমি সর্ম্পর্ণ হারিয়ে ফেলেছিলাম সেই ভেঙেপড়া বিস্ময়কর আজব দেশের কালশূন্য  আবহাওয়অয়। আমি ইরানী লোকদের সাথে, তাদের জীবন ও চিন্তার সাথে এমন ঘনিষ্ট হয়ে উঠলাম যে, আমি যেনো ওদের মধ্যেই জান্মেছি। কিন্তু এই দেশ, আর এই জীবনপুরানো রত্নের মতোই, যা অস্পষ্ট আলো ছড়িয়ে দেয় সকল দিক থেকেআমার কাছে খখনো তাতোটা ঘনিষ্ট হতে পারেনি যাতোটা আপন হয়ে উঠেছে আরবদের কাঁচস্বচ্ছ জগত।

ছয় মাসেরও অধিক আমি ঘোড়া হাঁকিয়ে বেড়াই আফগানিস্তানের অরণ্য্য, পর্বতমাল আর স্তেপ অঞ্চলেঃ হ্যাঁ, টি মাস এমিন একটি জগতে ছুটে বেড়াই যেখানে অস্ত্র প্রত্যেক মানুষই রাখেঅলংকার হিসাবে নয়;যেখানে প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি পদক্ষেপেই সতর্কভাবে লক্ষ্য করতে হয়, পাছে না বাতাসের মধ্য দিয়ে গান গাইতে গাইতে ছুটে আসে বুলেট! কয়েকবার আমাকে, ইব্রাহিম ও আমাদের রাস্তার সাময়িক সংগীদের নিজেদের জানবাঁচানোর জন্য লড়তে হয়  ডাকাতদের সাথে। আফগানিস্তান সে সময় দুস্যডাকাতে গিজ্ গিজ্ করতো। কিন্তু শুক্রবার হলে দস্যুদের তরফ থেকে ভয়ের কোনো কারণ থাকতো না, কারণ রাব্বুল আলামীনের ইবাদতের জন্য নির্ধারিত দিনে কাউকে খুন করা বা কারো কিছু লুট করা তার লজ্জার বিষয়  মনে করতো। এক সময় কান্দাহারের কাছে আমি গুলী খেতে খেতে বেঁচে যাই , কারণ মাঠে কাজ করছে অমন এক গ্রাম্য সুন্দরী রমণীর খোলা মুখের উপর আমি লক্ষ্য করেছিলাম নিজের অজান্তে, যদিও হিন্দুকুমের উঁচু উঁচু গিরিপথে চেঙ্গিস খানের সেপাইলস্কারের বংশধর মোংগলদের মাঝে এক কোঠায়, পর্ণ কুটীরের মেঝেয় মেজবানের তরুণী স্ত্রী আর বোনদের এক সাথে  ঘুমালেও বিসদৃশ মনে হয় না। কয়েক হপ্তা আমি বাদশাহ আমানুল্লাহ খানের মেহমান হিসাবে কাটালাম তাঁর রাজধানী কাবুলে; রাতের পর রাত কাটালাম াতঁর আলিম উলামা আর পর্ডিতদের সাথে কুরআনের শিক্ষা নিয়ে আলোচা করে। এবং আরো অনেক রাত কেটেছে পাঠান খানদের কালো তাঁবুতে বসেযেসব এলাকা নানা উপজাতির অন্তর্দ্বন্ধ্ জর্জরিত সেই এলাকাগুরি কী করে সফর করতে পারিই তারই আলোচনায়।

এবং ইরান ও আফগানিস্তানের সেই দুবছরের প্রক্যেকটি দিনের আবির্ভাবের সংগে আমার মধ্যে েএই নিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে থাকে যে, আমি যেনো একটা চূড়ান্ত ফয়সালায় পৌছাতে যাচ্ছি!

.. .. .         .. .             ..          .. .          ..

কারণ ব্যাপার এই দাঁড়ালো মনসুর, মুসলমানের কীভাবে জীবন যাপন করে তা বুঝতে পারার দরুন প্রত্যেক দিনই ইসলাম সম্বন্ধে আমার জ্ঞান উন্নততরো হতে লাগলো। আমার মনে সব সময়ই সর্বোচ্চ স্থান দখন করে নিয়ে ছিলো ইসলাম..

ঈশা  সালাতের সময় হলো, রাতের আসমারে দিকে এক ঝলক তাকিয়ে জায়েদ বলে।

আমরা সলে দিনের সর্বশেষ প্রার্থনার জন্য কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াই, আমর তিনজন, মক্কার দিকে মুখ করে । জায়েদ এবং মনসুর পাশাপাশি দাঁড়াই এবং আম দাঁড়াই তাদের সম্মখে, জামাতের ইমাম হিসাবে (কারণ রসূলুল্লাহ প্রত্যেক দুই বা ততোদিক রোকের সমাবেশকেই জামাত বলেছেন), আমি আমার হাত দুটি তুলি উপরের দিকে এবং শুরু করি আল্লাহু আকবর কেবল আল্লাহেই মাহন এবং  তারপর মুসলামনেরা যেমন সবসময় করেন আমিও তেমনিভঅবে কুরআনের সূরা ফাতিহা আবৃত্তি করিঃ

দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে

প্রশংসা তো কেবল আল্লাহর

যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক,

 দয়াময়, পরম দয়ালু,

কর্মফল দিবসের মালিক।

আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি।

এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই,

আমাদিকে দেখাও সহজসরল পথ,

তাহাদের পথ, যাহাদিগকে তুমি অনুগ্রহ দান কিরয়াছ,

তাহাদের নয়, যাহার তোমার ক্রেধের পাত্র হইয়াছে,

তাহাদের নয়, যাহারা পথভ্রষ্ট।

এরপরে আবৃত্তি করি একশ’’ বারে নম্বর সূরা ঃ

দয়াময়, আল্লাহ এক, অদ্বৈত,

তিনি অভাবমুক্ত, সর্ববিষয়ের নির্ভর,

তিনি জনক নহেন, তিনি জাতও নহেন,

এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই।

যদি ও থাকে, তবু খুব কমই আছে সে জিনিস যা এক সংগে ইবাদত করার মতো মানুষকে পরষ্পররের অতো কাছে, অতো নিকটে এনে দেয়, আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক ধর্মের ক্ষেত্রেই এ কথঅ সত্য এবং খাস করে ইসলামের বেলায় একথা আরো বিশি সত্য, কারণ ইসলাম এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে, আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে কোনো মধ্যস্থের দরকার নেই এবং আসলে তা সম্ভবও নয়। ইসলামে কেনো প্রকার পুরোহিত ব্যবস্থা, পাদরী প্রথা এমনি সংগঠিত চার্চ না থাকায়, প্রত্যেক মুসলমানই অনুভব করে যে, যখন সে জামাতে সালাত আদায় করে তখন সে একটি কমন  বন্দেগীতে সত্যিকারভাবে অংশগ্রহণ করছে, কেবল হাযিরা দিচ্ছে না। ইসলামে যেহেতু দীক্ষার কোন ব্যাপার নেই, তাই প্রত্যে বালেগ এবং সুস্থ মস্তিষ্ক মুসলমান যেকোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারে, তা জামাতে ইমামতিই হোক, শাদীর মাহফিল সম্পন্ন করাই হোক, অথবা মৃতের দাফন কার্য পরিচালনা করািই হোক। আল্লাহর বন্দেগীর জন্য কারো বিশেষ করে মনোনীত হওয়ার দরকার নেইঃমুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উস্তাদ এবং নেতারা সহজ সরল মানুষ (কখনো ন্যা য্যভাবেই এবং কখনো উপযুক্ত না হয়েও ) ধর্মতত্ত্ব এবং ফিকাহতে পন্ডিত্যের জন্য যাঁদের সুনা ম আছে।

 

তিন

 

আমারঘুম ভাঙে সূর্যোদয়ের সংগেঃ কিন্তু আমার চোখের পাতা এখনো ঘুমে ভরি। আমার মুখের উপর দিয়ে একটা নাজুক গুঞ্জন ধ্বনি তুলে বাতাস বয়ে যায়, বিলীয়মান রাত থেকে উঠন্ত দিনের ভেতরে।

ধুয়ে মুছে মুখ থেকে ঘুম তাড়ানোর জন্য আমি উঠে পড়ি। ঠান্ডা পানি যেনো একটি পরশ সুদূরের ল্যান্ডস্কেপআধাঁর বৃক্ষপুঞ্জে ঢাকা পর্বত এবং নদীনালা যা চেরে এবং ব য়ে যায় এবং সবসময় থকে স্বচ্ছ, পরিষ্কার সে সকালের!..আমি আমার উরুর উপর বসি এবং মাথা পেছন দিক ঠেলে দিই, যাতে আমার মুখমন্ডল আর্দ্র থাকতে পারে অনেকক্ষণ ধরে; বাতাস মুখের আর্দ্রতার উপর মৃদু ঝাঁপটা দেয়, ঝাপটা দেয়  সকল ঠান্ডা দিনের নাজুক স্মৃতি দিয়েঅনেক অনেক আগের শীতের দিনগুলির কথা, পাহাড়পর্বত আর ফুলে ফেঁপে ধেয়ে চলা নদী নালার কথঅা.. . তুষার এবং চোখ ঝলাসনো শুভ্রতার মধ্যে দিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলার কথা.. . বহু বছর আগের সেই দিনটির শ্রভ্রতা, যখন আমি ইরানের পথহীনতুষারে ঢাকা পর্বতের উপর দিয়ে ঘোড়ায় করে চলেছি, আস্তে আস্তে সামনের দিকে ঘোড়াটিকে ধাক্কা দিতে দিতে আর ঘোড়ার প্রত্যেকটি পদক্ষেপের মানেই হচ্ছেতুষারে তার পা দেবে যাওয়া, তারপর বহু কষ্ট করে তুষারের ভেতর থেকে টেনে পা বের করা.. .

সেদিন বিকালে, আমার মনে পড়ে, আমরা একটি গাঁয়ে বিশ্রাম করি, যার বাসিন্দারা দেখতে যাযাবরদেরই মতো। ভূমিতে দশ কি বারেটি গর্ত, তার উপর ছনলতা ও মাটি দিয়ে নিচু গম্বুজের মতো ছাদ সেই নিঃসঙ্গ বসতিটিকে দিয়েছে এক ছুঁচোর নগরীরর চেহারা! দিক্ষণপূর্ব ইরানের কিরমান প্রাদেশের একটি স্থানের কথা এটি। রূপকথার পাতালবাসীদর মাতেই লোকজন হামাগুঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে আজও বিদেশীদের দিকে তাকায় তাজ্জবের সাথে। এ ধরণের একটি মটির গম্বুজের উপর বসে এক তরুণী তার দীর্ঘ, কালো, উস্কুখুস্কু চুল আঁচড়াচ্ছে। তার জলপাইবাদমী মুখখানা , মুদিত চোখ নিয়ে ফেরানো রয়েছে বিবর্ণ দুপুরে সূর্যের দিকে আর স গান গেয়ে চলেছে নিচু স্বরে, এক রকমের অদ্ভুদ ভাষায় ধাতুর তৈরি বাজুবন্দ ঝমঝম করছে তার হাতের কব্জিতেকব্জিগুলি চিকন এবং মজবুত , কোনো এক আদিম অরাণ্যের বুনো জানোয়ারের পার ক্ষুর আর পার সন্ধিস্থলের মতো।

ঝিমিয়ে পড়া অংগপ্রত্যংগগুলিকে চাঙা করে তোলার জন্য চা আর আরক গিলতে থাকি, প্রচুর পরিমাণেই গিলি সশস্ত্র পুলিশটিকে নিয়ে, যে আমাদের সংগী হিসাবে এসেছে ইব্রাহিম আর আমার সাথে। আমি যখন আবার আমার ঘোড়ার চড়লাম, তৃপ্তি মতো চা আর আরক গিলে এবং টগটগ করে সওয়ারী হাঁকিয়ে যাত্রা শুরু করলাম, সহসা যেনো গোটা বিশ্বটাই প্রশস্ত আর স্বচ্ছ হয়ে বিস্তৃত হলো আমার সম্মুখে, যেমনটি আর কখনো হয়নি আর আগে। আমি এর অনন্তকালীন রূপ দেখতে পেলাম এবং তার হ*স্পন্দন অনুভব করলাম ধূসর নির্জনতায়, শুভ্র একাকীত্বে, আর মুহূত্বকাল আগেও আমার নিকট যা কিছু গোপন,লুকানো, তাই এবার প্রত্যক্ষ করছি, কখন আমাদের নিকট আল্লাহর গোপন রহস্যগুলি আপনা আপনি উন্মোচিত হবেঃ যখন এই রহস্যগুলিই সর্বক্ষণ আমাদের প্রতীক্ষায় রয়েছে আমাদেরকে তাদের নিকট খুলে মেলে ধরবার জন্য.. .

আমাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হলো একটি উঁচু সমতল অঞ্চল; আর আমি, আমার ঘোড়ার পেটে বুগি মেরে ক্ষুরের আঘাতে বিচ্ছুরিত বরফ আমার চারপাশে উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে অজস্র স্ফুলিংগের অত্যুজ্জ্বল আবরণের মতো! জমাট স্রোতের বরফের উপর গর্জাতে লাগলো আমাকে ঘোড়ার ক্ষুর.. .

আমার মনে হয়, তখনি আমি উপলন্ধি করি সেই অযাচিত করুণা, যার কথাযদিও তখনো আমি নিজে পুরাপুরি বুঝিনিআমাকে ফাদার ফেলিক্স বলেছিলেন বহুবহু আগে, যখন আমি শুরু করতে যাচ্ছিলাম সেই সফর যা পরে আমার গোটা জীবনটাকেই বদরে দেয়ঃ করুণায় উদ্ভাসনযা মানুষকে বলে দেয়তুমিই.. তুমিই হচ্ছো  প্রত্যাশিত ব্যক্তি.. বরফের উপর দিয়ে আমার সেই ঘোড়া হাঁকিয়ে উন্মত্ত চলার আর আমার ইসলাম কবুল করার মধ্যে লেগেছিলো বছরের কিছু বেশি। কিন্তু তখনো আমি ঘোড়া হাঁকিয়ে হাঁকিয়ে চলছিলাম একটি তীরের মতো, আমার অজান্তেই সোজা মক্কার দিকে..

.. .              .. .              .. .             …  .. .

এবং এখন আমার মুখ শুকনা আর সাত বছরের ও অধিক কাল আগের আমার সেই ইরানী শীতের দিন আবার পেছনে পড়ে যায়; পেছনে পড়ে যায়, কিন্তু হারিয়ে যায় না। কারণ সেই অতীত এই বর্তমানেরই অংশ!

মৃদু ঠান্ডা হাওয়া, আসন্ন প্রভাতেরই যা নিশ্বাস, কাঁটা ঝোপগুলিকে আন্দোলিক করে যায়। নক্ষত্রগুলি বিবর্ণ হয়ে উঠেছে । জায়েদ,মনসুর! ওঠো.. . ওঠো. তোমরা। আবার আমরা  আগুন ধরাই এবং আমাদের কফি গরম করে নিই। এরপর, আমরা আমাদের উটের পর জীন চড়িয়ে দেবো এবং চলবো আরেকটি দিনের মধ্য দিয়ে সেই মরুভূমির ভেতর দিয়ে যা আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে দুবাহু মেলে।

 

 

About মুহাম্মদ আসাদ