ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

৮.

ইসলামী সংস্কৃতিতে ঈমানের গুরুত্ব

ঈমানী বিষয়বস্তুর সামগ্রিক পর্যালোচনা

ঈমানের পা্ঁচটি বিষয় সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাতে এর প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে ইসলামের বিস্তৃত প্রত্যয়, নির্ভুল মাপকাঠির বিচারে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা, মানবীয় চরিত্রের ওপর তার প্রভাব এবং সংস্কৃতির ভিত রচনায় তার ভূমিকা স্পষ্টত জানা গেছে। এবার ঈমানের সামগ্রিকভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখা দরকার।

এ গ্রন্থের প্রাথমিক অধ্যায়গুলোতে বলা হয়েছে যে, ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর হচ্ছে পার্থিব জীবন সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণা। তাহলো এই যে, এ দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা সাধারণ সৃষ্ট বস্তুর মতো নয়, বরং তাকে এখানে বিশ্ব প্রভুর তরফ থেকে প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ধারনার প্রেক্ষিতে একটি যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হিসেবে আপন স্রষ্টা ও মনিবের সন্তুষ্টি অর্জন করা মানব জীবনে স্বাভাবিক লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, আর এ লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে:

প্রথমত, আল্লাহ সম্পর্কে নিভুল জ্ঞান লাভ করা।

দ্বিতীয়ত, শুধু আল্লাহকেই আদেশ ও নিষেধকারী, আইন ও বিধানদাতা, বন্দেগী ও আনুগত্য লাভের যোগ্য মনে করা এবং নিজের যাবতীয় ক্ষমতা ইখতিয়ারকে সম্পূর্ণ খোদায়ী বিধানের অধীন করে নেয়া।

তৃতীয়ত, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার বিশেষ প্রণালী ও পদ্ধতিগুলো জানা।

চতুর্থত, আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের সুফল এবং অসন্তুষ্টি বিধানের কুফল অবহিত হওয়া, যাতে করে পার্থিব জীবনের অসম্পূর্ণ ফলাফল থেকে কেউ প্রতারিত না হয়।

বস্তুত ইতিপূর্বে যে পাঁচ প্রত্যয় বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে, তা এ বুনিয়াদী প্রয়োজনই পূরণ করছে।

আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে কুরআনে যা কিছু বিবৃত হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হলো : যে মহান সত্তার তরফ থেকে মানুষকে প্রতিনিধি বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং যাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করাই তাঁর জীবনের পরম লক্ষ্য, তাঁর সম্পর্কে যেনো সে নির্ভুল জ্ঞান লাভ করতে পারে। তেমনি ফেরেশতাদের সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হলো: মানুষ যেনো বিশ্ব প্রকৃতির ক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর কোনটিকে প্রভু মনে করে না বসে এবং প্রভুত্বের ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে শরীকদার ঘোষণা না করে। এরুপ নির্ভুল জ্ঞান লাভের পর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার তাৎপর্য হলো : বিশ্বপ্রকৃতির ওপর, এমন কি স্বয়ং মানব জীবনের অচেতন দিকের ওপর যেমন আল্লাহর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বিরাজমান, তেমনি জীবনের সজ্ঞান ও সচেতন দিকেও মানুষ শুধু আল্লাহরই কর্তৃত্ব স্বীকার করবে। প্রতিটি ব্যাপারে আল্লাহকেই আইন প্রণেতা এবং নিজেকে সেই আইনের অনুবর্তী জ্ঞান করবে। নিজের ক্ষমতা ইখতিয়ারকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার অধীন করে দেবে। বস্তুত এরুপ ঈমানী শক্তিই মানুষকে আল্লাহর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের সামনে স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে মাথা নত করে দেয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এর দ্বারা মর্দে-মু’মিনের ভেতর এক বিশেষ ধরনের বিবেকের সৃষ্টি হয় এবং এক বিশেষ ধরনের চরিত্র গড়ে উঠে-যা আল্লাহর আইন-বিধানে বাধ্যতামূলক নয়, এবং স্বেচ্ছামূলক অনুসৃতির জন্যে একান্ত প্রয়োজন।

তৃতীয় প্রয়োজনটি পূর্ণ করে নবুওয়াত ও কিতাবের প্রতি বিশ্বাস। এ দু’টির মাধ্যমেই মানুষ তার জন্যে আল্লাহর নির্ধারিত আইন-কানুন ও বিধি-ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান লাভ করে। মানুষের ক্ষমতা ইখতিয়ারকে আল্লাহ যেসব সীমারেখার অধীন করে দিয়েছেন, এ দু’টির মাধ্যমেই মানুষ সেগুলো চিনে নিতে পারে। ‘ঈমান বির রিসালাত’ এবং ‘ঈমান বিল কিতাবের’ মানেই হচ্ছে রসূলের শিক্ষাকে আল্লাহর শিক্ষা এবং তাঁর পেশকৃত কিতাবকে আল্লাহর কিতাব মনে করা। আর এ ঈমানের বলেই আল্লাহর রসূল ও তাঁর কিতাবের মাধ্যমে প্রদর্শিত বিধি-ব্যবস্থা, আইন-কানুন ও রীতিনীতি, দৃঢ়তা ও সংকল্পের সাথে পালন করার মতো যোগ্যতা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে।

চতুর্থ বা সর্বশেষ প্রয়োজনটি পূর্ণ করার জন্যে রয়েছে পরকাল সংক্রান্ত জ্ঞান। এর দ্বারা মানুষের দৃষ্টি এতো প্রখর হয়ে যায় যে, দুনিয়াবী জীবনের এ বাহ্যদৃশ্যের পেছনে সে এক স্বতন্ত্র জগতের অস্তিত্ব দেখতে পায়। তার স্পষ্টত মনে হয় যে, এ দুনিয়ার মঙ্গল-অমঙ্গল ও উপকার-অপকার আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কোন মাপকাঠি নয়। আল্লাহর তরফ থেকে কর্মের সুফল ও কুফল এ দুনিয়ায় শেষ হয়ে যায় না, বরং তার চূড়ান্ত ফয়সালা ও ফলাফল ঘোষিত হবে স্বতন্ত্র এক জগতে। এবং সেই ফয়সালাই হবে সম্পূর্ণ নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। সেই ফয়সালায় সাফল্য ও কামিয়াবী লাভ করতে হলে এ দুনিয়ায় খোদায়ী আইন-বিধানের নির্ভুল অনুসরণ এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখার পূর্ণ সংরক্ষণই হচ্ছে একমাত্র উপায়। এ জ্ঞান ও বিশ্বাসের প্রতি সুদৃঢ় প্রত্যয়কেই বলা হয় ঈমান বিল আখেরাত বা পরকাল বিশ্বাস। বস্তুত ঈমান বিল্লাহর পর মানুষকে ইসলামী আইন-কানুনের অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকরী শক্তি। আর ইসলামী সংস্কৃতির জন্যে মানুষকে মানসিক দিক থেকে যোগ্য ও সমর্থ করে তোলার ব্যাপারেও এ প্রত্যয়টির রয়েছে বিরাট ভূমিকা।

এ আলোচনা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে ইসলামের বিশিষ্ট ধারনা ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য ইতিপূর্বে যে ধারাগুলো এঁকে দিয়েছিলো, আলোচ্য মৌল প্রত্যয়গুলো ঠিক সেই ধারায়ই সংস্কৃতির সংগঠন ও ভিত্তি স্থাপন করেছে। বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে এমনি সংস্কৃতির জন্যে যে মৌল প্রত্যয়ের প্রয়োজন, তা এ পাঁচটি বিষয় নিয়ে গঠিত হতে পারে। এ ছাড়া অন্য কোন প্রত্যয়ের ভেতরেই এ বিশেষ ধরনের সংস্কৃতির ভিত্তি হওয়ার মতো যোগ্যতা নেই। কারণ অন্য কোন প্রত্যয়ই জীবন সম্পর্কে এ বিশেষ ধারণা ও লক্ষ্যের সাথে সামন্জ্ঞস্যশীল নয়।

ইসলামী সংস্কৃতির কাঠামো

ঈমান তথা ইসলামের প্রত্যয়বাদ সস্পর্কে ওপরের বিস্তৃত আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই এর ভিত্তির ওপর গড়া সংস্কৃতির একটা পূর্ণ কাঠামো আমাদের সামনে এসে পড়ে। এ কাঠামোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

এক: এ সংস্কৃতির ব্যবস্থাপনা একটি রাজ্যের ব্যবস্থাপনার মতো। এতে আল্লাহর মর্যাদা সাধারণ ধর্মীয় মত অনুসারে নিছক একজন ‘উপাস্যে’র মতো নয়। বরং পার্থিব মত অনুযায়ি তিনি সর্বোচ্চ শাসকও। প্রকৃতপক্ষে তিনি হচ্ছেন এ বিশাল রাজ্যের বাদশাহ শাহানশাহ। রসূল তাঁর প্রতিনিধি। কুরআন তাঁর আইন গ্রন্থ। যে ব্যক্তি তাঁর বাদশাহীকে স্বীকার করে তাঁর প্রতিনিধির আনুগত্য এবং তাঁর আইন গ্রন্থের অনুসরণ করে সে এই রাজ্যের প্রজা। মুসলমান হওয়ার মানেই হচ্ছে এই যে, সেই বাদশাহ তাঁর প্রতিনিধি ও আইন গ্রন্থের মাধ্যমে যে আইন বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন-তার কার্যকরণ ও যৌক্তিকতা বোধগম্য হোক কি না হোক-বিনা বাক্য ব্যয়ে তার স্বীকার করতে হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর এ সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং তাঁর আইন বিধানকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধে স্থান দিতে স্বীকৃত না হবে এবং তাঁর আদেশাবলী মানা বা না মানার অধিকারকে নিজের জন্যে সুরক্ষিত রাখবে, তার জন্যে রাজ্যের কোথাও এতটুকু স্থান নেই।

দুই: এ সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে চূড়ান্ত সাফল্যের (অর্থাৎ পরকালীন বিচারে বিশ্ব প্রভুর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হওয়ার) জন্যে প্রস্তুত করা আর তার দৃষ্টিতে এ সাফল্য অর্জনটা বর্তমান জীবনে মানুষের নির্ভুল আচরনের ওপর নির্ভরশীল। পরন্তু চূড়ান্ত ফলাফলের দৃষ্টিতে কোন্ সব কাজ উপকারী, আর কোন্ সব কাজ অপকারী, তা জানা মানুষের সাধ্য নয়, বরং আখেরাতে ফয়সালাকারী আল্লাহই তা উত্তমরূপে অবহিত। এ কারনেই এ সংষ্কৃতি জীবনের সকল বিষয়াদিতে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থা অনুসনণ করার এবং নিজের কর্ম স্বাধীনতাকে খোদায়ী শরীয়ত দ্বারা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে মানুষের কাছে দাবী জানায়। অনুরূপভাবে এ সংস্কৃতি হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার এক মহত্তম সমন্বয়। একে প্রচলিত সংকীর্ণ অর্থে ‘ধর্ম’ নামে আখ্যায়িত করা চলে না। এ হচ্ছে একটি ব্যাপকতর জীবনব্যবস্থা বা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক কাজ-কর্ম, সামাজীক ক্রিয়া-কান্ড, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপরই পরিব্যাপ্ত। আর এ সমস্ত বিষয়ে যে পদ্ধতি ও আইন-বিধান আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তারই সামষ্টিক নাম হচ্ছে ‘দ্বীন ইসলাম’ বা ‘ইসলামী সংস্কৃতি’।

তিন: এ সংস্কৃতি কোন জাতীয়, (ভৌগলিক বা ভাষাগত অর্থে) দেশীয় বা গোত্রীয় সংস্কৃতি নয়। বরং সঠিক অর্থে এটি হচ্ছে মানবীয় সংস্কৃতি। এ মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবেই আহবান জানায়। যে ব্যক্তি তাওহীদ, রিসালাত, কিতাব ও পরকালের প্রতি ঈমান পোষণ করে, তাকেই সে নিজের চৌহদ্দির মধ্যে গ্রহণ করে। এমনিভাবে এ সংস্কৃতির এক বিশ্বব্যাপী উদার জাতীয়তা গঠন করে –যার মধ্যে বর্ণ-গোত্র-ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষই প্রবেশ করতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে সমগ্র দুনিয়ার বুকে বিস্তৃত হবার মতো অনন্য যোগ্যতা। সমগ্র আদম সন্তানকে একই জাতীয় সূত্রে সম্পৃক্ত করার এবং তাদের সবাইকে একই সংস্কৃতির অনুসারী করে তোলার মতো যোগ্যতারও সে অধিকারী। কিন্তু এ বিশ্বব্যাপী মানবীয় ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা দ্বারা তার আসল লক্ষ্য শুধু নিজ অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করারই নয়, বরং মানব জাতির রব তার মঙ্গল ও ভালাইর জন্যে যে নির্ভুল জ্ঞান ও কর্মনীতি দান করেছেন, সমগ্র মানুষকে তার সুফলের অংশীদার করে তোলাই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। এ কারনেই এ ভ্রাতৃসংঘে শামিল হবার জন্যে প্রথমত সে ঈমানের শর্ত আরোপ করেছে এবং সেই সাথে যারা আল্লাহর সর্বোচ্চ ক্ষমতার সামনে মাথা নত করতে প্রস্তুত এবং আল্লাহর রসূল ও তাঁর কিতাবের দ্বারা নির্ধারিত সীমারেখা ও আইন-বিধান পালন করতে ইচ্ছুক, কেবল তাদেরকেই এ সংঘের জন্যে মনোনীত করেছে। কারণ এ ধরনের লোকেরাই শুধু (তারা সংখ্যায় যতো অল্পই হোক) এ সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় খাপ খাওয়াতে পারে এবং এদের দ্বারাই একটি নির্ভুল ও সুদৃঢ় জীবন-ব্যবস্থা কায়েম হতে পারে। এ ব্যবস্থায় অবিশ্বাসী, মুনাফেক বা ক্ষীণ বিশ্বাসী লোকদের স্থান পাওয়া এর শক্তির লক্ষণ নয়, বরং তা দুর্বলতারই লক্ষণ।

চার: সীমাহীনতা ও বিশ্বজনীনতার সাথে এ সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর প্রচন্ড নিয়মানুবর্তিতা (Discipline) এবং শক্তিশালী বন্ধন। এর সাহায্যেই সে নিজের অনুসারীদেরকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকে নিজস্ব আইনের অনুগত করে তোলে। এর কারণ এই যে, আইন প্রণয়ন ও সীমা নির্ধারণ করার পূর্বে সে আইনের অনুসরণ ও সীমা সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করে নেয়। অন্য কথায়, আদেশ দেয়ার পূর্বেই সে আদেশ দ্বারা কার্যকরী হওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করে। এ জন্যে সর্বপ্রথমে সে মানুষের আল্লাহর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়। তারপর তাকে এ নিশ্চয়তা দেয় যে, রসূল ও কিতাবের মাধ্যমে যে বিধান দেয়া হয়েছে তা আল্লাহরই বিধান এবং তার আনুগত্য ঠিক আল্লাহরই আনুগত্য। পরন্তু তার মনের ভেতর সে এক অতন্দ্র প্রহরী নিযুক্ত করে দেয়-সে সর্বদা ও সর্বাবস্থায় তাকে খোদায়ী বিধান পালনে উদ্বুদ্ধ করে, তার বিরুদ্ধাচরণের জন্যে তিরষ্কার করে এবং পরকালীন শাস্তির ভয় দেখায়। এভাবে যখন প্রতিটি ব্যক্তির মন ও বিবেকের ভেতর এ কার্যকর শক্তিকে বদ্ধমূল করে নিজের অনুসারীদের মধ্যে স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে আইনানুবর্তন, বিধি-নিষেধ পালন ও সদগুণরাজিতে বিভূষিত হওয়ার মতো যোগ্যতার সৃষ্টি করা হয়, তখনি সে তাদের সামনে নিজস্ব আইন বিধান পেশ করে, তাদের জন্যে কর্মসীমা নির্ধারণ করে, তাদের জন্যে জীবন যাত্রা প্রণালী তৈরী করে এবং নিজস্ব লক্ষ্য হাসিলের জন্যে তাদের কাছে কঠোরতর ত্যাগ স্বীকারের দাবী জানায়। বস্তুত এটা অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক কর্মপন্থা, এর চেয়ে বিচক্ষণ পন্থা আর কিছুই হতে পারে না। এ পন্থায় ইসলামী সংস্কৃতি যে বিরাট প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করেছে, অন্য কোন সংস্কৃতি তা লাভ করতে পারেনি।

পাঁচ: পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে এ সংস্কৃতি এক নির্ভুল সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে এবং এক সৎ ও পবিত্র জনসমাজ (Society) গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু এর অন্তর্ভুক্ত লোকেরা উত্তম চরিত্র ও সদগুনরাজতে বিভূষিত না হওয়া পর্যন্ত এরূপ সমাজ গঠন সম্ভবপর নয়। এ কারণেই এর সভ্যদের ব্যক্তি চরিত্র সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজন, যাতে করে অতি স্বাভাবিকভাবে সৎ কর্মরাজির অনুশীলন হওয়ার মতো সুদৃঢ় চরিত্র তাদের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে। বস্তুত ইসলাম তার সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় এ নিয়মটির প্রতি পুরোপুরি লক্ষ্য রেখেছে। লোকদের ট্রেনিং-এর জন্যে ইসলাম সর্বপ্রথম তাদের মধ্যে ঈমান ও প্রত্যয়কে বদ্ধমূল করে দেয়-কারণ তাদের মধ্যে উঁচুমানের মযবুত চরিত্র সৃষ্টি করার এটাই হচ্ছে একমাত্র পন্থা। এ ঈমানের বলেই সে লোকদের মধ্যে সততা, বিশ্বস্ততা, সচ্চরিত্র, আত্মনুশীলন, সত্য প্রীতি, আত্মসংযম, সংগঠন, বদান্যতা, উদার দৃষ্টি, আত্মসম্ভ্রম, বিনয়-নম্রতা, উচ্চাভিলাস, সৎসাহস, আত্মত্যাগ, কর্তব্যবোধ, ধৈর্যশীলতা, দৃঢ়চিত্ততা, বীর্যবত্তা, আত্মতৃপ্তি, নেতৃ আনুগত্য আইনানুবর্তিতা ‍ইত্যাকার উৎকৃষ্ট গুনরাজির সৃষ্টি করে। সেই সাথে তাদের সংঘবদ্ধতার স্বাভাবিক পরিণামে যাতে একটি উৎকৃষ্ট জনসমাজ গড়ে উঠে, তাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে যোগ্য করে তোলে।

 ছয়: এ সংস্কৃতির ঈমান তথা প্রত্যয়বাদে একদিকে সচ্চরিত্র ও সৎ গুনরাজি সৃষ্টি করায় এবং তা প্রতিপালন এবং সংরক্ষণের উপযোগী সকল শক্তি বর্তমান রয়েছে। অন্যদিকে পার্থিব উপায়-উপকরণ উত্তমরুপে ব্যবহার করার ও আল্লাহর দেয়া শক্তি নিচয়কে সুষমভাবে প্রয়োগ করার জন্যে যোগ্য করে তোলার মতো শক্তিও এর ভেতরেই নিহিত রয়েছে। পরন্তু এ প্রত্যয়বাদই দুনিয়ার প্রকৃত উন্নতি করার জন্যে প্রয়োজনীয় উৎকৃষ্ট গুনাবলী মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে। এর মধ্যে মানুষের কর্মশক্তিকে সুসংহত করার এবং তাকে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করার মতো প্রচন্ড শক্তি বর্তমান রয়েছে। সেই সাথে এ কর্মশক্তিকে সীমাতিক্রম করতে না দেয়ার এবং সত্যিকার কল্যাণ পথ থেকে বিচ্যুত হতে না দেয়ার শক্তিও এর মধ্যে নিহিত রয়েছে। এভাবে যেসব গুনাবলী অন্যান্য ধর্মীয় ও পার্থিব প্রত্যয়ের মধ্যে পৃথক পৃথকভাবে পাওয়া যায়, ইসলামী প্রত্যয়বাদ তা সবই একত্রে ও উৎকৃষ্টরূপে বর্তমান রয়েছে। আর যেসব বিকৃতি বিভিন্ন ধর্মীয় ও পার্থিব প্রত্যয়ে লক্ষ্য করা যায় সেইসব থেকে এ প্রত্যয়বাদ সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।

ইসলামী সংস্কৃতিতে ঈমানের গুরুত্ব

এ হচ্ছে ইসলামের প্রতিষ্টিত সংস্কৃতির একটি সংক্ষিপ্ত কাঠামো, আমরা যদি উদাহরণত একে একটি ইমারত ধরে নেই, তাহলে বলতে হয়: এ ইমারতটিকে সুদৃঢ় করে তোলার জন্যে এর ভিত্তি ভূমিকে গভীরভাবে খনন করা হয়েছে। তারপর খুব বাছবিচার করে আরও পাকাপোক্ত ইট এর জন্যে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তা উৎকৃষ্ট সিমেন্ট দিয়ে গাঁথা হয়েছে। অতপর ইমারতটি এমন জাঁকালোভাবে নির্মিত হয়েছে যে, উচ্চতায় তা আসমান পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে এবং প্রশস্তে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তরলাভ করেছে। কিন্তু এতো প্রশস্ত ও উচ্চতা সত্তেও এর প্রাচীর ও স্তম্ভগুলো এতোটুকু কেঁপে ওঠে না, বরং তা পাহাড়ের ন্যায় অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এ ইমারতের দরজা জানালাগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, বাইরের আলো ও নির্মল বায়ু এর মধ্যে সুন্দরভাবে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু ধূলা, বালু, আবর্জনা ও দূষিত বায়ুকে তা আদৌ প্রবেশ করতে দেয় না। আলোচ্য ইমারতটির এ সমস্ত গুণ-বৈশিষ্ট্য একটি মাত্র জিনিসের কারণে সৃষ্টি হয়েছে, আর তা হচ্ছে ঈমান। এটিই তার মূল ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে দিয়েছে। এটিই অকেজো ও নিস্ক্রিয় উপাদান বর্জন করে উৎকৃষ্ট উপাদান গ্রহণ করেছে। এটিই কাঁচা মাটি পুড়ে পাকা ইট তৈরী করেছে। এর ওপরই ইমারতের প্রশস্ততা, উচ্চতা ও দৃঢ়তা নির্ভরশীল, এটি যেমন তাকে প্রশস্ততা উচ্চতা ও দৃঢ়তা দান করেছে তেমনি বাহ্যিক অনিষ্ট থেকেও তাকে সুরক্ষিত করে দিয়েছে এবং সর্বপ্রকার নির্দোষ ও পবিত্র জিনিসকে তার মধ্যে প্রবেশ করার সুযোগ দিয়েছে। কাজেই ঈমান হচ্ছে এ ইমারতের প্রাণ তুল্য। এটি না হলে তার কায়েম থাকা দুরের কথা, নির্মিত হওয়াই সম্ভব নয়। আর এটি দুর্বল হলে তার অর্থ দাঁড়াবে এই যে, ইমারতের গোটা ভিত্তিই কমজোর, তার ইটগুলো কাঁচা, তার চুন-সিমেন্ট খারাব, তার স্তম্ভগুলো টল-টলায়মান, তার প্রাচীরগুলো সুগ্রথিত নয়। তার মধ্যে প্রশস্ততা ও উচ্চতার কোন যোগ্যতা নেই। তার ভেতর বাহ্যিক অনিষ্টকে প্রতিহত করার এবং নিজের পবিত্র ও নির্দোষ জিনিসগুলেরকে সুরক্ষিত রাখার মতো শক্তি নেই।

ফলকথা, ঈমানের অনুপস্থিতি ইসলামেরই অনুপস্থিতির শামিল। অনুরূপভাবে ঈমানের দুর্বলতা তারই দুর্বলতা এবং ঈমানের শক্তি তারই শক্তির নামান্তর পরন্তু ইসলাম যেহেতু একটি ধর্ম মাত্রই নয়, বরং এটি সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, সামাজিকতা, রাজনীতি সবকিছুরই সমন্বয়, এ কারণে এখানে ঈমানের গুরুত্ব নিছক ধর্মীয় বিন্যাসের মতোই নয়; বরং এর ওপর লোকদের গোটা নৈতিক আচরণ ও জীবনধারা একান্তভাবে নির্ভরশীল। এটিই তাদের পারস্পারিক ক্রিয়াকর্মের সুস্থতা পরিচ্ছন্নতার প্রধান অবলম্বন। এটিই তাদেরকে সংহত করে একটি জাতিতে পরিণত করে। এটিই তাদের জাতীয়তা ও সংস্কৃতির নিরাপত্তা বিধান করে। এটিই তাদের সভ্যতা, সামাজিকতা ও রাজনীতির মূল প্রাণবস্তু। এটি ছাড়া ইসলাম শুধু একটি ‘ধর্ম’ হিসেবে কায়েম হতে পারে না তাই নয়, বরং একটি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবেও প্রতিষ্টা লাভ করতে পারে না। ঈমান দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসেরই দুর্বলতা বলা চলে না, বরং তার অর্থ দাঁড়াবে এই যে, মুসলমাদের নৈতিক জীবন খারাপ হয়ে গেছে। তাদের স্বভাব-চরিত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের পারষ্পারিক ক্রিয়াকর্ম বিগড়ে গেছে। তাদের সভ্যতা ও সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাদের জাতীয়তার সূত্র ছিন্ন হয়ে গেছে। একটি স্বাধীন, সম্মানিত ও শক্তিমান জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে তারা অক্ষম হয়ে পড়েছে। বস্তুত এ কারনেই ইসলামী ব্যবস্থায় ঈমানকেই ইসলাম ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যের মাপকাঠি রূপে গ্রহণ করা হয়েছে। এক ব্যক্তি যখন ঈমান কবুল করলো, তখন সে মুসলিম জাতির মধ্যেই প্রবেশ করে; মুসলমানদের সভ্যতা, সামাজিকতা, রাজনীতি সবকিছুতে সে সমান অংশীদার হয় এবং সমস্ত রীতিনীতি ও আইন-কানুন তার প্রতি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি ঈমান কবুল না করে তাহলে ইসলামের সীমার মধ্যে সে কিছুতেই প্রবেশ করতে পারে না। ইসলামের জামায়াতে সে কিছুতেই শরীকদার হতে পারবে না। কারণ এ ব্যবস্থাপনায় তার পক্ষে খাপ খাওয়ানো সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার। এর আইন-কানুন ও বিধি ব্যবস্থা সে কিছুতেই পালন করতে পারে না।

মুনাফেকীর ভয়

যারা ঈমানের দাওয়াতকে খোলাখুলি প্রত্যাখ্যান করে, তাদের ব্যাপার তো সুস্পষ্ট। তাদের এবং মুসলমানদের মধ্যে কুফর ও ঈমানের অতি সুস্পষ্ট ও দুর্লংঘ্য সীমারেখা বিদ্যমান। সেই সীমা ডিঙিয়ে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে তারা কখনো অনিষ্ট সাধন করতে পারে না। কিন্তু যারা মু’মিন না হয়েও ঈমানের দাবী করে মুসলমানদের দলে ঢুকে পড়েছে, যাদের অন্তরে সন্দেহের ব্যাধি লুকিয়ে রয়েছে কিংবা যাদের বিশ্বাস অতি দুর্বল তাদের অস্তিত্ব ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে অতীব মারাত্মক। কারণ তারা ইসলামের সীমার মধ্যে দাখিল হলেও ইসলামী চরিত্র ও ইসলামী জীবনধারা গ্রহণ করেনি। তারা ইসলামী আইনের অনুসরণ এবং আল্লাহর বিধানের সংরক্ষণ করেনি; বরং তারা নিজেদের বিকৃত চরিত্র ও আচরণ দ্বারা মুসলমানদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ও বিকৃত করে দিচ্ছে, নিজেদের মানসিক ব্যাধির সাহায্যে মুসলমানদের জাতীয়তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার শিকড় উপড়ে ফেলছে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ভেতর ও বাইর থেকে নানারুপ ফেতনা সৃষ্টিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে। কুরআন মজীদে এ ধরনের লোকদেরকেই মুনাফেক বা কপট বিশ্বাসী বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং এদের অনুপ্রবেশের ফলে মুসলিম সমাজে যেসব ফেতনার সৃষ্টি হয়ে থাকে, সেগুলোও সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ শ্রেণীর লোকদের পরিচয় এই যে, এরা ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু আদতে ঈমানদার নয়:

———— আরবী লেখা ——————-

“যারা বলে যে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি, অথচ তারা ঈমানদার নয়।” –(সূরা আল বাকারা: ৮)

তারা মুসলমানদের সাথে মুসলমানদের মত কথা বলে আর কাফেরদের সাথে কাফেরদের মতো:

———— আরবী লেখা ——————-

“তারা ঈমানদার লোকদের সাথে দেখা হলে বলে যে, আমরা ঈমান এনেছি আর তাদের শয়তানদের কাছে গেলে বলে যে, আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি।” –(সূরা আল বাকারা: ১৪)

তারা খোদায়ী বাণীকে উপহাস করে এবং তাদের মধ্যে সন্দেহের কথা ছড়িয়ে লোকদেরকে বিভ্রান্ত করে:

———— আরবী লেখা ——————-

“তোমরা যখন আল্লাহর আয়াতের প্রতি অবিশ্বাস করতে এবং তাকে উপহাস করতে দেখবে, তখন তাদের সাথে উপবেশন করবে না” –(সূরা আন নিসা : ১৪০)

তারা ধর্মীয় কর্তব্য পালনে কুন্ঠাবোধ করে আর পালন করলেও নিতান্ত বাধ্য হয়ে মুসলমানদের দেখবার জন্যেই করে, নচেত মূলত তাদের অন্তর আল্লাহর বিধানের আনুগত্যের ব্যাপারে অত্যন্ত কুন্ঠিত:

———— আরবী লেখা ——————-

“তারা যখন নামাজের জন্যে দাঁড়ায় তো অত্যন্ত কুন্ঠার সাথে দাঁড়ায় আর শুধু লোকদেরকে দেখাবার জন্যেই এরুপ করে থাকে, নচেত আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর স্মরণ করলেও খুব কমই করে থাকে। তারা মাঝখানে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে; তারা পুরোপুরি এদিকেও নয় ওদিকেও নয়।” –(সূরা আন নিসা : ১৪২-১৪৩)

———— আরবী লেখা ——————-

তারা নামাজের জন্যে আসে না কুন্ঠাবোধ ছাড়া এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না বিরক্তি ছাড়া।” –(সূরা আত তাওবা: ৫৪)

———— আরবী লেখা ——————-

“এমন কতক বেদুঈন রয়েছে, তারা আল্লাহর পথে কিছু ব্যয় করাকে বাধ্যতামূলক জরিমানা মনে করে।” –(সূরা আত তাওবা: ৯৮)

তারা ইসলামের দাবী করে বটে, কিন্তু ইসলামী আইনের অনুসরণ করে না; বরং নিজেদের বিষয় কর্মে কুফরী আইনের অনুসরণ করে:

———— আরবী লেখা ——————

“তুমি কি সেইসব লোককে দেখনি, যারা তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি ঈমান আনার দাবী করে বটে, কিন্তু নিজেদের বিষয়-কর্মকে শয়তানী বিচারকদের কাছে নিয়ে যেতে চায়। অথচ, তাদেরকে তার (শয়তানী শক্তির) আদেশ না মানারই হুকুম দেয়া হয়েছে।” –(সূরা আন নিসা: ৬০)

তারা নিজেদের ক্রিয়া-কর্ম তো খারাপ করেই, পরন্ত মুসলমানদের আকীদা-আমলকেও খারাপ করার প্রয়াস পায়:

————- আরবী লেখা —————–

“তারা (লোকদেরকে) দুষ্কুতির আদেশ দেয়, সৎকাজ থেকে বিরত রাখে এবং সৎকাজ থেকে তাদের হাত সংকুচিত হয়ে থাকে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, এ জন্যে আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন।” –(সূরা আত তাওবা: ৬৭)

————– আরবী লেখা ——————-

“তারা চায় যে, তারা যেমন কুফরী করেছে, তোমরাও যদি তেমনি কুফরী করতে। তাহলে তোমরা এবং তারা সমান হয়ে যেত।” –(সূরা আন নিসা: ৮৯)

তারা মুসলমানের সাথে ততক্ষণই থাকে, যতক্ষণ তাদের স্বার্থ থাকে। যেখানে স্বার্থ থাকে না কিংবা কম থাকে, সেখানেই তারা মুসলমানদের সঙ্গ ত্যাগ করে।

————– আরবী লেখা —————

“তাদের কেউ কেউ সদকার বিলি-বন্টনে তোমার প্রতি বিদ্রূপ বর্ষণ করে; তাদেরকে যদি সদকার অংশ দেয়া হয় তো খুশী হয়ে যায় আর না দেয়া হলেই বিগড়ে যায়।”-(সূরা আত তাওবাঃ ৫৮)

এভাবে যখন ইসলাম ও মুসলমানের ওপর বিপদ ঘনিয়ে আসে তখন তারা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বসে; কারণ ইসলামের প্রতি তাদের আদতেই কোন ভালোবাসা নেই বিধায় তার জন্য কোন ত্যাগ স্বীকার করতেই তারা সম্মত নয় আর সে ত্যাগ স্বীকারে কোন প্রতিফল পাওয়া যাবে এমন প্রত্যাশাও তারা করে না। এমনকি ইসলামের সত্যতায়ই তাদের বিশ্বাস নেই; এ কারণেই তার স্বার্থে জীবন পণ করতে তারা প্রস্তুত নয়। তারা নানাভাবে যুদ্ধ থেকে দুরে থাকার এবং নিজেদের জীবন বাঁচার চেষ্টা করে। আর কখনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও নিতান্ত অপ্রসন্নচিত্তেই করে। ফলে তাদের এ অংশগ্রহণ মুসলমানদের জন্য শক্তির পরিবর্তে দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এ অবস্থাটিই সূরায়ে আলে ইমরান (রুকূঃ ১২-১৭), সূরায়ে আন নিসা (রুকূঃ ১০, ১১, ১২, ২০), সূরায়ে আত তাওবা (রুকূঃ ৭, ১১, ১২) এবং সূরা আহযাব (রুকূঃ ২)-এ সবিস্তারে বিবৃত করা হয়েছে।

এদের সবচেয়ে মারাত্মক পরিচয় হলো এই যে, মুসলমানদের উপর যখন বিপদের ঘনঘটা নেমে আসে, তখন এরা কাফেরদের পক্ষে গিয়ে যোগদান করে। তাদেরকে মুসলমানের ভেতরকার খবর সরবরাহ করে। তাদের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করে। মুসলমানদের বিপদ দেখে খুশী হয়। নিজ কওমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কাফেরদের কাছ থেকে স্বার্থ ও মর্যাদা লাভ করে। প্রতিটি ইসলামের বিরোধী ফেতনায় তারা সামনে এগিয়ে অংশগ্রহণ করে। এবং মুসলমানদের দলে অনৈক্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। এ পরিচয়টিও আলে ইমরান, নিসা, তাওবা, আহযাব এবং মুনাফিকুন-এ বিস্তৃতরূপে বর্ণনা করা হয়েছে।

এর থেকে ভালো মতোই আন্দাজ করা চলে যে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তার জন্য খাঁটি, নির্ভুল ও যথার্থ ঈমান একান্ত আবশ্যক। ঈমানের দূর্বলতা এ ব্যবস্থার মূল শিকড় থেকে নিয়ে ডালপালা পর্যন্ত সবটাকেই অন্তসারশূন্য করে দেয়। এর মারাত্মক প্রভাব থেকে সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, সামাজিকতা, রাজনীতি কোন কিছুই রক্ষা পেতে পারে না।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.