ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কিতাবের প্রতি ঈমান

ইসলামের পরিভাষায় ‘কিতাব’ বলতে বুঝায় এমন গ্রন্থকে, যা মানুষের পথনির্দেশের জন্য আল্লাহ্‌র তরফ থেকে রাসূলের প্রতি অবতরণ করা হয়। এ অর্থের প্রেক্ষিতে কিতাব হচ্ছে সেই পয়গামের সরকারী বিবৃতি (Official Version) অথবা ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী ‘খোদায়ী কালাম’ যা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে, যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে এবং যাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে দুনিয়ায় পয়গম্বর প্রেরিত হয়ে থাকে। এখানে এ আলোচনার অবকাশ নেই যে ‘কিতাব’ কি অর্থে আল্লাহ্‌র কালাম এবং তার কালামুল্লাহ্‌ হবার স্বরূপ কি? এটা নিরেট খোদায়ী সম্পর্কিত আলোচনা। এর সাথে আলোচ্য বিষয়ের সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে আমরা শুধু এ দিকটির উপর আলোকপাত করবো যে, ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি রচনায় ঈমান বিল কিতাবের (কিতাবের প্রতি ঈমান) ভূমিকা কি? আর এজন্য শুধু এটুকু জেনে নেয়াই যথেষ্ট যে, পয়গম্বরের মাধ্যমে মানুষকে যে শিক্ষা দান করা উদ্দেশ্য, তার মূলনীতি ও মৌল বিষয়াদি আল্লাহ্‌র তরফ থেকে পয়গম্বরের হৃদয়ে প্রত্যাদিষ্ট হয়। তার ভাষা এবং অর্থ কোনটাতেই পয়গম্বরের নিজস্ব বুদ্ধি ও চিন্তা, তাঁর ইচ্ছা ও আকাঙ্খার বিন্দু পরিমাণ দখল থাকে না। এ কারণেই তা শব্দ এবং অর্থ উভয় দিক থেকেই আল্লাহ্‌র কালাম-পয়গম্বরের নিজস্ব রচনা নয়। পয়গম্বর একজন বিশ্বস্ত দূত হিসেবে এ কালাম আল্লাহ্‌র বান্দাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে থাকেন। তদুপরি তিনি আল্লাহ্‌র দেয়া দূরদৃষ্টির সাহায্যে তার অর্থ এবং তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। এ সকল খোদায়ী মূলনীতির ভিত্তিতে নৈতিকতা, সামাজিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির এক পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গড়ে তুলেন। শিক্ষা, প্রচার, সদুপদেশ এবং নিজের পূত পবিত্র চরিত্রের দ্বারা লোকদের ধ্যান-ধারণা, ঝোঁক-প্রবণতা ও চিন্তাধারায় এক মৌলিক পরিবর্তন সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে তাকওয়া, পবিত্রতা, নির্মলতা ও সদাচরণের ভাবধারা সঞ্চারিত করেন। শিক্ষাদীক্ষা ও বাস্তব পথনির্দেশের দ্বারা তাদেরকে এমনিভাবে সুসংহত করেন যে, নতুন মানসিকতা, নতুন চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা, নতুন রীতিনীতি ও নতুন আইন-কানুনের সাথে এক নতুন সমাজের অভ্যুদয় ঘটে। পরন্তু তিনি তাদের মধ্যে আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সেই সাথে নিজের শিক্ষাদীক্ষা ও পূত চরিত্রের এমন নিদর্শন রেখে যান, যা হামেশা এ সমাজ এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্য আলোকবর্তিকার কাজ করে।

নবুওয়াত ও কিতাবের সম্পর্ক

‘নবুওয়াত’ এবং ‘কিতাব’ উভয়ই এক আল্লাহ্‌র তরফ থেকে আগত। উভয়ে একই খোদায়ী বিষয়ের অপরিহার্য অঙ্গ এবং একই উদ্দেশ্য ও একই দাওয়াতের পূর্ণতার মাধ্যম। সেই আল্লাহ্‌র জ্ঞান এবং তাঁর হেকমত যেমন রসূলের ভিতর রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিতাবের পৃষ্ঠায়। যে শিক্ষায় শাব্দিক বর্ণনাকে বলা হয় ‘কিতাব’, তারই বাস্তব নমুনা হচ্ছে রাসূলের জীবন।

মানুষের প্রকৃতিই (ফিতরাত) কতকটা এ ধরণের যে, নিছক কিতাবী শিক্ষা থেকে সে কোন অসাধারণ ফায়দা লাভ করতে পারে না। তার জ্ঞানের সাথে সাথে একজন মানবীয় শিক্ষক এবং দিশারীও প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যিনি নিজস্ব শিক্ষার দ্বারা সেই জ্ঞানকে লোকদের হৃদয়ে দৃঢ়মূল করে দেবেন এবং তার প্রতিমূর্তি হয়ে আপন কর্মের দ্বারা লোকদের মধ্যে এ শিক্ষারই অভিপ্রেত প্রাণ চেতনার সঞ্চার করবেন। মানবীয় শিক্ষকের পথনির্দেশ ও শিক্ষা-দীক্ষা ছাড়া শুধুমাত্র কোন গ্রন্থ দুনিয়ার কোন জাতির মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনধারায় বিপ্লব সৃষ্টি করতে পেরেছে, গোটা মানবেতিহাসে এমন একটি দৃষ্টান্তও আপনারা খুঁজে পাবেন না। যে সকল দিশারী বিভিন্ন জাতির চিন্তাধারা ও কর্মকান্ডে প্রচন্ড বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন, তাঁরা যদি স্বকীয় শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাস্তব রূপ হয়ে জন্মলাভ না করতেন এবং তাঁদের শিক্ষা-দীক্ষা ও আদর্শবাদ শুধু গ্রন্থাকারেই প্রকাশিত হতো, তবে মানব প্রকৃতির কোন দুঃসাহসী রহস্যবিদই এ দাবি করতে পারতো না যে, উক্ত দিশারীদের বাস্তব শিক্ষার দ্বারা যেসব বিপ্লব সৃষ্টি হতো, নিছক এ কিতাবের দ্বারাই সেরূপ বিপ্লব সংঘটিত হতো।

অন্যদিকে মানব প্রকৃতির এও এক বৈশিষ্ট্য যে, সে মানবীয় দিশারীর সাথে সাথে তার প্রচারিত শিক্ষার একটি প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা-তা কাগজে লিপিবদ্ধ হোক কি অন্তরে সুরক্ষিত থাকুক-পেতে চায়। যে সকল নীতির ভিত্তিতে কোন দিশারী জাতির চিন্তাধারা, কর্মকান্ড, নৈতিকতা ও তমদ্দুনের ভিত্তি স্থাপন করেন, তা যদি মূল আকারে সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে তার শিক্ষার ছাপ নিশ্চিহ্ন হতে থাকে। তার সে ছাপ মুছে যাবার সাথে সাথে ব্যক্তিগত জীবন ধারা এবং সামাজিক ব্যবস্থা ও আইন-কানুনের ভিত্তিও ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। এমনকি, শেষ পর্যন্ত সে জাতির কাছে শুধু কিচ্ছা-কাহিনীই বাকি থেকে যায়। তার ভিতরে একটি শক্তিশালী সমাজ ও সভ্যতাকে অক্ষুণ্ন রাখার শক্তি আর থাকেনা। এ কারণেই যেসব দিশারীর শিক্ষা সুরক্ষিত থাকেনি, তার অনুগামীরা ভ্রান্তি ও গোমরাহীর আবর্তে পড়ে গেছে। তাঁদের সংগঠিত জাতি চিন্তা, বিশ্বাস, কর্মধারা, নৈতিকতা ও তমদ্দুনের সকল প্রকার বিকৃতির মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেসব নির্ভুল ও সঠিক নীতির ভিত্তিতে শুরুতে এ জাতির সংগঠন করা হয়েছিল, তাঁদের তিরোধানের পর সেসব নীতি ধরে রাখার মত কোন জিনিসও আর অবশিষ্ট থাকেনি।

বিশ্বস্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির এ প্রকৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। এ কারণে তিনি মানব জাতির হেদায়াতের দায়িত্ব গ্রহণ করার সময় থেকেই তার জন্যে নবুওয়াত ও প্রত্যাদেশ উভয় ধারা এক সাথে প্রবর্তন করেন। একদিকে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী লোকদেরকে তিনি নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন, অন্যদিকে তাঁদের প্রতি আপন কালামও অবতরণ করেন। যাতে করে এ দু’টি জিনিস মানব প্রকৃতির দু’টি দাবিই পূরণ করতে পারে। নবী যদি কিতাব ছাড়া আসতেন কিংবা কিতাব নবী ছাড়া আসতো, তাহলে বিচার-বুদ্ধির উদ্দেশ্য কখনো পূর্ণ হতো না।

আলোকবর্তিকা ও পথপ্রদর্শকের কুরআনী দৃষ্টান্ত

নবুওয়াত এবং কিতাবের এ সম্পর্ককে কুরআন মজীদ একটি উপমার সাহায্যে বিবৃত করেছে। তার বিভিন্ন জায়গায় নবীকে পথিকৃত ও পথপ্রদর্শকের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যার কাজ হচ্ছে পথভ্রষ্ট লোকদেরকে সঠিক পথ নির্দেশ করা। যেমন বলা হয়েছে :

*************

অন্যদিকে সে কিতাবকে ‘দীপ্তি’ (***), ‘জ্যোতি’ (***), ‘উজ্জ্বল’ (***), ‘দলিল’ (***), ‘পার্থক্যকারী’ (***), ‘আলোদানকারী’ (***), ‘বর্ণনাকারী’ ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করেছে। যেমন বলা হয়েছে :

**************

এ উপমাগুলো নিছক কবিত্ব নয়, বরং এগুলো এক গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। এর আসল বক্তব্য হলো এই যে, সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক বুদ্ধি ও অর্জিত জ্ঞান থেকে এতোটা আলোক ও পথনির্দেশ লাভ করেনা, ‘যা দ্বারা’ সে সত্যের সহজ সরল পথে চলতে পারে। এ পরিচিত ও অন্ধকার পথে তার এমন একজন অসাধারণ পথিকৃতের প্রয়োজন, যিনি এ পথের নিয়মকানুন সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত। সেই পথে তার হাতে একটি আলোকবর্তিকা থাকা দরকার যাতে করে তার সাহায্যে পথের কোথায় গর্ত রয়েছে, কোথায় পা পিছলে যায়, কোথায় কাঁটার ঝোপ রয়েছে, কোথায় থেকে বাঁকা ও ভ্রান্ত পথ বেরিয়ে গেছে ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত হয়ে পথ চলতে পারে। আর তার অনুগামী লোকেরাও সে আলোয় পথের চিহ্ন দেখে সোজা পথের লক্ষণাদি জেনে নিয়ে এবং বাঁকা পথের মোড় ও বাঁকগুলো সম্পর্কে অবহিত হয়ে পূর্ণ দূরদৃষ্টির সাথে তার অনুসরণ করতে পারে। বস্তুত রাতের অন্ধকারে পথিকৃত ও আলোকবর্তিকার মধ্যে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, নবী ও কিতাবের মধ্যেও রয়েছে ঠিক সেই সম্পর্ক। আমরা যদি পথিকৃতের হাত থেকে আলোকবর্তিকা ছিনিয়ে নেই এবং তাকে নিয়ে নিজেরাই চলতে শুরু করি, তবে পথিমধ্যে আমরা এমন সব তেমাথা, চৌমাথা এবং এক প্রকার রাস্তার সাক্ষাৎ পাবো, যেখানে গিয়ে হয় আমাদের হয়রান ও পেরেশান হয়ে থমকে যেতে হবে নতুবা সে বর্তিকার আলোয় কোনো ভ্রান্ত পথে চলতে হবে। কারণ নিছক প্রদীপের অস্তিত্ব মানুষকে পথিকৃতের সাহায্য থেকে অমুখাপেক্ষী করতে পারেনা। ঠিক তেমনি পথিকৃতের হাতে যদি আলোকবর্তিকা না থাকে, তবে আমাদের শুধু অন্ধ অনুগামীর মতো তাকে আঁকড়ে ধরে চলতে হবে এবং আলো ছাড়া আমাদের মধ্যে এতটুকু দূরদৃষ্টির সৃষ্টি হবে না, যাতে করে সোজা পথকে আমরা বাঁকা পথ থেকে পৃথক করে দেখতে পারি এবং সোজা পথের যেসব জায়গায় মানুষ হোঁচট খেয়ে বসে কিংবা তার পা পিছলে যায়, সেসব নাজুক জায়গা আমরা চিনে নিতে পারি। কাজেই আমাদের রাতের অন্ধকারে অপরিচিত পথ চলার জন্যে যেমন একজন অভিজ্ঞ ও সুপরিচিত পথনির্দেশকের প্রয়োজন হয় এবং পথের নিদর্শনাদী দেখার উপযোগী একটি প্রদীপেরও আবশ্যক হয় এবং এ দু’টির মধ্যে কোন একটি থেকেও আমরা বেপরোয়া হতে পারিনা, ঠিক তেমনি ইন্দ্রিয়াতীত সত্যের অপরিচিত জগতে-যেখানে নিছক আমাদের বিবেক-বুদ্ধির আলো কোন কাজে আসেনা-আমাদের রাসূল ও কিতাবের একইরূপ প্রয়োজন। এর মধ্যে কোনো একটির অনুসরণ ছেড়ে আমরা সোজা পথ পেতে পারিনা।

নবী হচ্ছেন এমন অভিজ্ঞ পথিকৃত, যিনি আল্লাহ্‌র দেয়া দূরদৃষ্টির সাহায্যে হেদায়াতের ছিরাতুল মুস্তাকীমকে জেনে নিয়েছেন। তিনি এ পথের খুঁটিনাটি বিষয় এমনভাবে অবহিত, কোনো পথে অসংখ্যবার যাতায়াত করলে একজন পথিকৃত যেমন তার প্রতিটি পদক্ষেপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অবহিত হয়ে থাকে।

এহেন দূরদৃষ্টিকেই বলা হয় ‘বুদ্ধিমত্তা’(***) ‘জ্ঞান’ (***) ‘পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি’ (******) ‘খোদায়ী শিক্ষা’ (*********) ও ‘খোদায়ী হেদায়াত’ (**********) যা বিশেষভাবেই নবীদেরকে দান করার কথা কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছেঃ

*************

আর কিতাব হচ্ছে এমন উজ্জল আলোকবর্তিকা, যার সাহায্যে নবী শুধু তাঁর অনুসারীদেরকে সোজা পথেই চালিত করেন না, বরং তাদেরকে এমন জ্ঞানের দীপ্তি, চিন্তার আলো এবং সত্যের প্রভা দ্বারা মণ্ডিত করে দেন যা এক উচ্চতর পর্যায়ে আল্লাহর তরফ থেকে তিনি লাভ করেছেন। সেই সাথে তাদেরকে শিক্ষাদীক্ষা দ্বারা এতখানি যোগ্য করে তোলেন যে, যদি তারা তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলে এবং ঐ আলোকবর্তিকাটি হাতে রাখে, তবে শুধু নিজেরাই সুপথ লাভ করবে না, বরং অন্যান্য লোকের জন্যেও পথপ্রদর্শক ও দিশারীতে পরিণত হবে।

************

“এ কিতাবকে আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি লোকদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে।” ( সূরা ইবরাহীম : ০১)

***************

“আমরা তোমার প্রতি জিকর (কুরআন) অবতরণ করেছি এ জন্যে যে, লোকদের জন্যে সেই হেদায়াতকে সুস্পষ্ট করে তুলবে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে; সম্ভবত তারা চিন্তা ভাবনা করতে পারে। (সূরা

উপরন্তু এক উন্নত ভঙ্গিতে এও বলে দিয়েছে যে, বস্তুজগতে প্রদীপ ও পথিকৃতের মধ্যে যে বৈসাদৃশ্য রয়েছে, আত্মিক জগতে তা নবী ও কিতাবের মধ্যে নেই। বরং সেখানে এতদুভয়ের মধ্যে এক ঐক্য সূত্র রয়েছে। তাই কোন কোন জায়গায় যে জিনিস দ্বারা কিতাবকে তুলনা করা হয়েছে, সেই জিনিস দ্বারাই অন্যত্র রসূলকেও তুলনা করা হয়েছে। এরূপ এর বিপরীত তুলনাও করা হয়েছেঃ

******************

“হে নবী! আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী স্বরুপ সুসংবাদ দাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী হিসেবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর প্রতি আহবানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে”।আবার

****************

“সত্য কথা এই যে, এই কুরআন সেই পথ দেখায়, যা পুরোপুরি সোজা ঋজু”। আয়াতে কিতাবকে বলা হয়েছে পথিকৃত।

এ থেকে জানা গেল যে, কিতাব ও রসুলের সম্পর্ক মূলত অবিচ্ছেদ্য। মানুষের হেদায়াত প্রাপ্তির জন্যে উভয়েরই সমান প্রয়োজন। ইসলাম যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব কর্মব্যবস্থা এবং যে কৃষ্টি ও তমুদ্দনকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তার প্রতিষ্ঠা, স্থিতি এবং দায়িত্বকে অবিকল ও অবিকৃত রাখার জন্যে নবুয়াত ও কিতাবের সাথে হামেশা তার সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। এ তীব্র প্রয়োজনের ভিত্তিতেই নবুওয়াত ও কিতাবকে পৃথক পৃথকভাবে ঈমানের দুটি অপরিহার্য অঙ্গ বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটির ওপরই ঈমান আনার জন্যে বারবার তাকিদ করা হয়েছে। যদি তাকিদ করা উদ্দেশ্য না হত, তাহলে এরূপ করার কোনই প্রয়োজন ছিল না, কেননা রসুলের সত্যতা স্বীকার তাঁর আনীত কিতাবেরই সত্যতা প্রমাণ করে আর কিতাবের সত্যতা স্বীকার তার আনীত ধারক-বাহকেরই সত্যতা প্রমাণের শামিল।

সকল আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান

এ ঈমান প্রসঙ্গেই ইসলাম এমন সমস্ত কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে, যা আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর নবীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। মুসলমান হবার জন্য যেমন সমস্ত নবী ও রসুলের প্রতি ঈমান আনা জরুরী, তেমনি সকল কিতাবের প্রতিও ঈমান আনা প্রয়োজন। তাই কুরআনে বারবার বলা হয়েছেঃ**************

“পরহেযগার হচ্ছে তারা যারা ঈমান আনে তোমার ওপর অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি ও তোমার পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবসমুহের প্রতিও”। -( সুরা আল বাকারাঃ ৪)

***************

“রসূল এবং সমস্ত মু’মিন ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর সকল কিতাবের প্রতি এবং তার নবীদের প্রতি।” ( সুরা আল বাকারাঃ ২৮৫)

***************

“আল্লাহ তোমার প্রতি সত্যের সাথে কিতাব নাযিল করেছেন, যা ইতিপূর্বে আগত সমস্ত কিতাবের সত্যতা প্রমাণ করে।” (সুরা আলে ইমরানঃ ৩)

***************

“বল; আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি, আমাদের ওপর অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি এবং ইব্রাহিম, ইসমাঈল, ইসহাক এবং ইয়াকুব সন্তানদের ওপর অবতীর্ণ কিতাবসমূহের প্রতি আর মূসা,ঈসা ও অন্যান্য নবীদেরকে যা তাদের প্রভুর তরফ থেকে দেয়া হয়েছিল। আমরা তাদের কারো মধ্যেই পার্থক্য করি না এবং আমরা তাদের আজ্ঞানুবর্তী”। -( সূরা আলে ইমরানঃ ৮৪)

************

“যারা এ কিতাব এবং অন্য যেসব কিতাবের সাথে আমরা নবী পাঠিয়েছিলাম, সেসব অস্বীকার করেছে, তারা খুব শীগগীরই এর পরিনাম ফল জানতে পারবে। যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল পরিহিত থাকবে; তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে উত্তপ্ত পানির মধ্যে, অতঃপর নিক্ষেপ করা হবে অগ্নিগর্ভে”। -(সুরা আল মু’মেনঃ ৭০-৭২)

************

“নিঃসন্দেহে আমরা নবীদেরকে স্পষ্ট নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছিলাম এবং তৎসহ কিতাব ও মানদণ্ড নাযিল করেছিলাম, যেন লোকেরা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়”। -( সূরা আল হাদিদঃ ২৫)

এ সাধারণ বর্ণনার সাথে কতিপয় গ্রন্থের নামোল্লেখ করেও তাদের প্রতি ইমান আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ তাওরাতকে হেদায়াত, জ্যোতি (***), ফুরকান, দীপ্তি(****), ইমাম ও রহমত নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।–( আল কাসাসঃ ৫,আল মায়েদাঃ ৬, আল আম্বিয়াঃ ৪, আহক্বাফঃ ২) এবং ইঞ্জিলকেও হেদায়াত, জ্যোতি(***) ও উপদেশমালা(***) নামে অভিহিত করা হয়েছে, (আল মায়েদাঃ৪)। ফলকথা, যেসব গ্রন্থের কথা কুরআনে বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের প্রতি সবিস্তারে এবং যাদের কথা উল্লেখ করা হয়নি, তাদের প্রতি সাধারণভাবে ঈমান আনতে হবে-এটা ইসলামের অন্যতম নীতি। ইসলামী প্রত্যয় অনুসারে দুনিয়ায় এমন কোন জাতি নেই, যার মধ্যে আল্লাহর নবী তাঁর কাছ থেকে গ্রন্থ নিয়ে আসেনি। আর দুনিয়ার বিভিন্ন অংশ ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে যতো গ্রন্থ এসেছে, তা ছিল সব একই উৎস থেকে উৎসারিত নির্ঝরিণী, একই সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মি। সমস্ত গ্রন্থই ‘ইসলাম’ নামক সত্য, সত্যতা, হেদায়াত ও জ্যোতি(***)সহ এসেছিলো। এ কারণে ‘মুসলিম’ব্যক্তি মাত্রই সে সবের প্রতি ঈমান আনে। আর যে ব্যক্তি এর কোন একটি গ্রন্থও অবিশ্বাস করে, সে সবকিছু অস্বীকার এবং প্রকৃত উৎস অস্বীকার করার দায়ে অপরাধী।

নিছক কুরআনের অনুসরন

কিন্তু ঈমানের পর এখান থেকে কার্যত অনুসরণের সীমা শুরু হয়, সেখানে অন্যন্য গ্রন্থাবলী থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে শুধু কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন। এর কতিপয় কারণ রয়েছেঃ

প্রথমত, আসমানী গ্রন্থাবলীর মধ্যে অনেকগলোই এখন অনুপস্থিত। আর যেগুলো বর্তমানে পাওয়া যায়, তার মধ্যে কুরআন ছাড়া আর কোন কিতাবই মূল ভাষা ও অর্থে সুরক্ষিত নেই। তাতে খোদায়ী কালামের সাথে মানবীয় কালাম ও ভাষা এবং অর্থ উভয় দিক দিয়ে যুক্ত হয়ে গেছে। ঐ সকল গ্রন্থে প্রবৃত্তি পূজার অনিবার্য ফলস্বরূপ হেদায়াতের সাথে গোমরাহী মিশ্রিত হয়ে গেছে। এখন তাতে কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা আছে সেটা পার্থক্য করাই কঠিন ব্যাপার হয়েছে। যেসব গ্রন্থের উপর বিভিন্ন জাতি তাদের ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং যেগুলো আসমানী গ্রন্থ বলে সন্দেহ হয়, সেগুলোর অবস্থা হচ্ছে এরূপ। কোন কোনটিতে আল্লাহর তরফ থেকে অবতীর্ণ হবার ধারণাই বর্তমান নেই। কোন কোনটি সম্পর্কে এ তথ্যটুকু পর্যন্ত জানা যায় না যে, তা আল্লাহর তরফ থেকে অবতীর্ণ হয়ে থাকলে কোন নবীর কাছে এবং কোন যুগে অবতীর্ন হয়েছিলো। কোন কোনটির ভাষার এমন মৃত্যু ঘটেছে যে, আজ তার সঠিক অর্থ নির্ণয় করা পর্যন্ত কঠিন ব্যাপার। কোন কোনটিতে মানবীয় কামনা এবং ভ্রান্ত মতবাদ ও কুসুংস্কারের স্পষ্ট মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। কোনটিতে শিরক, গায়রুল্লাহর পূজা এবং এ ধরণেরই অন্যান্য ভ্রান্ত প্রত্যয় ও আচরণের স্পষ্ট শিক্ষা রয়েছে যা কোনক্রমেই সত্য হতে পারে না। যে সকল গ্রন্থের অবস্থাই এরুপ, তা কখনো মানুষকে নির্ভুল জ্ঞান ও সঠিক আলো দান করতে পারে না। আর মানুষ তার অনুসরণ করে গোমরাহী থেকেও নিরাপদ হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, কুরআন ছাড়া বর্তমানে আর যত গ্রন্থাবলী রয়েছে তা আসমানী হোক, কি আসমানী হবার সন্দেহযুক্ত হোক- তার শিক্ষাধারা ও বিধি-ব্যবস্থায় হয় সংকীর্ণ গোত্রীয় জাতীয়তার প্রভাব সমুজ্জ্বল অথবা বিশেষ যুগের চাহিদা প্রবলতর। তা কখনোই সকল যুগে সকল মানব জাতির জন্যে হেদায়াত ও পথনির্দেশের মাধ্যম হয়নি আর হতেও পারে না।

তৃতীয়ত, একথা নিসন্দেহ যে, এ গ্রন্থাবলীর প্রত্যেকটিতে কিছু কিছু সত্য ও যথার্থ শিক্ষা বর্তমান রয়েছে এবং তাতে মানুষের স্বভাব-চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের পরিশুদ্ধির জন্যে অনেক ভালো নীতি ও বিধি-বিধানও রয়েছে; কিন্তু কোন গ্রন্থেই সমস্ত পুণ্য ও কল্যাণের সমাহার ঘটেনি; কোনটিতেই একাকী মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে নির্ভুল পথনির্দেশ করতে পারে না।

কিন্তু আল কুরআন মাজীদ এ তিনটি ত্রুটি হতে সম্পুর্ণ রূপে মুক্তঃ

একঃ রসূলে করীম(সা) যে ভাষায় কুরআন পেশ করেছিলেন, তা ঠিক সে ভাষায়ই সুরক্ষিত রয়েছে। প্রথম দিন থেকে শত-সহস্র লক্ষ মানুষ প্রত্যেক যুগে তাকে মুখস্থ করেছে। লক্ষ কোটি মানুষ প্রত্যহ তা তেলাওয়াত করছে। হামেশা তার কপি লিপিবদ্ধ করে আসছে। কখনো তার অর্থ বা বাচনে কোন পার্থক্য দেখা যায়নি। কাজেই এ ব্যাপারে কোন শোবা-সন্দেহের অবকাশ নেই যে, নবী করিম(সা)-এর জবান থেকে যে কুরআন শোনা গিয়েছিলো, তাই আজ দুনিয়ায় বর্তমান এবং চিরকাল বর্তমান থাকবে। এতে কখনো একটি শব্দের রদবদল না হয়েছে, না হতে পারে।

দুইঃ কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, যা আজো একটি জীবন্ত ভাষা। আজ দুনিয়ায় কোটি কোটি আরবি ভাষাভাষী লোক বর্তমান। কুরআন অবতরণকালে যেসব পুস্তক এ ভাষার শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ সাহিত্য ছিলো, আজ পর্যন্ত তাই রয়েছে। মৃত ভাষাগুলোর পুস্তকাদি বুঝতে আজ যেসব অসুবিধা দেখা দেয়, এসব সাহিত্যের অর্থ ও মর্ম উপলদ্ধি করতে তেমন কোন অসুবিধাই নেই।

তিনঃ কুরআন পুরোপুরি সত্য ও অভ্রান্ত এবং আদ্যপান্ত খোদায়ী শিক্ষায় পরিপূর্ণ। একে কোথাও মানবীয় আবেগ, প্রবৃত্তির লালসা, জাতীয় বা গোত্রীয় স্বার্থপরতা এবং মূর্খতাজাত গোমরাহীর চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। এর ভেতর আল্লাহর কালামের সাথে মানবীয় কালাম অনু পরিমাণও মিশ্রিত হতে পারেনি।

চারঃ এতে সকল মানব জাতিকেই আমন্ত্রন জানান হয়েছে এবং এমন আকীদা-বিশ্বাস, চরিত্র নীতি ও আচরণ বিধি পেশ করা হয়েছে যা কোন দেশ, জাতি এবং যুগ বিশেষের জন্যে নির্দিষ্ট নয়। এর প্রতিটি শিক্ষা যেমন বিশ্বজনীন, তেমনি চিরস্থায়ীও।

পাঁচঃ পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থাবলীতে যেসব সত্যতা, মৌলিকতা এবং কল্যাণ ও সৎকাজের কথা বিবৃত হয়েছিলো, এতে তার সবই সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। কোন ধর্মগ্রন্থ থেকে এমন কোন সত্য ও সৎকাজের কথা উদ্বৃত্ত করা যাবে না কুরআনে যার উল্লেখ নেই। এমন পূর্নাঙ্গ গ্রন্থের বর্তমানে মানুষ স্বভাবতই অন্য গ্রন্থ থেকে অমুখাপেক্ষিই হয়ে যায়।

এ সকল কারনেই ইসলাম সকল গ্রন্থ থেকে অনুসরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল কুরআনকেই অনুসরণের উপযোগী ঘোষণা করেছে এবং একমাত্র এ গ্রন্থকেই কর্মবিধি ও কর্মপ্রণালী হিসেবে গ্রহন করার জন্যে সমগ্র দুনিয়াকে আহব্বান জানিয়েছে।

**************

إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللّهُ وَلاَ تَكُن لِّلْخَآئِنِينَ خَصِيمًا

“আমি এ কিতাবকে তোমার প্রতি সত্যসহ নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি লোকদের মধ্যে আল্লাহর দেয়া সত্যজ্ঞান সহ বিচার-ফয়সালা করতে পারো।” (সূরা আন নিসাঃ ১০৫)

 “অতএব যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে এবং যারা তাঁর সাহায্য ও সহায়তা করেছে এবং তার সাথে অবতীর্ণ নূরের অনুসরণ করে চলেছে, তারাই কল্যাণপ্রাপ্ত্” – (সূরা আল আরাফঃ ১৫৭)

আর এ কারনেই যেসব জাতির কাছে আগে থেকেই কোন আসমানী কিতাব বর্তমান রয়েছে, তাদেরকেও কুরআনের প্রতি ঈমান আনার এবং তার অনুসরণ করে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাই বারবার কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছেঃ

******************

“হে কিতাব প্রাপ্ত্ লোক সকল! আমাদের অবতীর্ণ এ কিতাবের (কুরআন) প্রতি ঈমান আনো যা তোমাদের কাছে রক্ষিত গ্রন্থাবলীর সত্যতা স্বীকার করে।”- সূরা আন নিসাঃ ৪৭)

************

“হে কিতাবধারীগণ! তোমাদের কাছে আমাদের নবী এসেছেন; তিনি তোমাদের জন্যে এমন অনেক জিনিস প্রকাশ করে দিচ্ছেন, যা তোমরা কিতাব থেকে গোপন করছিলে আর অনেক বিষয়ে ক্ষমাও করে দিচ্ছেন। তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে জ্যোতি এবং স্পষ্টবাদী কিতাব এসেছে; এর মাধ্যমে আল্লাহ এমন লোকদেরকে শান্তির পথ প্রদর্শন করেন, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তিনি নিজ অনুমতিক্রমে তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে টেনে নিয়ে যান এবং তাদেরকে সরল-সোজা পথ প্রদর্শন করেন।” – (সূরা আল মায়েদাঃ ১৫-১৬)

****************

“আমরা তোমার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেছি এবং তা কেবল ফাসেক লোকেরাই অবিশ্বাস করে থাকে।” – (সূরা আল বাকারাঃ ৯৯)

কুরআন সংক্রান্ত বিস্তৃত প্রত্যয়

যে গ্রন্থকে মানুষের জন্যে চিন্তা ‍ও বিশ্বাসের নির্ভুল পথনির্দেশক আখ্যা দেয়া হয়েছে এবং যাকে বাস্তব জীবনের জন্যে অবশ্য পালনীয় বিধানরূপে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তার অনুসরণ ততক্ষন পর্যন্ত পূর্ণ হতে পারে না, যতক্ষন মানুষ তার অভ্রান্ত ও সত্যাশ্রয়ী হবার এবং সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হবার দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ না করবে। কারণ তার বিশুদ্ধতা সম্পর্ক যদি কোনরূপ সন্দেহ জাগ্রত হয়, তবে তার ওপর তার আস্থা ও নিশ্চিন্ততা থাকবে না এবং পূর্ণ নির্ভরতার সাথেই তার অনুসরণ করা যাবে না। এ কারণেই কুরআনের প্রতি ঈমানের (ঈমান বিল কুরআনের) আবশ্যিক অঙ্গগুলো খোদ কুরআন মজীদেই বিবৃত করে দেয়া হয়েছে। যথাঃ

একঃ কুরআন যে অর্থে অবতীর্ণ হয়েছিল, সেই অর্থ্ই সুরক্ষিত রয়েছে। কোনরূপ হ্রাস-বৃদ্ধি তাতে হয়নি। এ ব্যাপারে নিন্মোক্ত আয়াতসমূহ সাক্ষ্য বহন করছেঃ

*****************

“একে সংগ্রহ করা এবং পড়িয়ে দেয়া আমাদের কাজ; অতএব আমরা যখন একে পড়ি, তখন তুমি সেই পড়ার অনুসরণ করো। পরন্তু এর অর্থ বুঝিয়ে দেয়াও আমাদের কাজ।”- (সূরা আল কিয়ামাহঃ ১৭-১৯)

*****************

“আমরা তোমাকে এমনভাবে পড়াব যে, তুমি ভুলতে পারবে না- অবশ্য আল্লাহ যা ভুলাতে চান তার কথা স্বতন্ত্র।”- (সুরা আল আ’লাঃ ৬-৭)

*****************

“এ জিকর’কে (কুরআন) আমরাই নাযিল করেছি আর আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” – (সূরা আল হিজরঃ ৯)

****************

“তোমার প্রতি তোমার প্রভুর তরফ থেকে যা কিছু অহী পাঠানো হয়েছে তার তেলাওয়াত করো; তার কথা পরিবর্তন করার সাধ্য কারো নেই।”- (সূরা আল কাহাফঃ ২৭)

দুইঃ কুরআনের অবতরণে কোন শয়তানী শক্তির বিন্দু পরিমানও দখল নেই।

******************

“একে নিয়ে শয়তান অবতরণ করেনি; এ কাজ তাদের কারো নয় আর তারা করতেও পারে না। বরং তাদেরকে অহী শোনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।”- সূরা আশ শুয়ারাঃ ২১০-২১২)

তিনঃ কুরআনে খোদ নবীর কামনা-বাসনারও স্থান নেই।

*****************

“তিনি নিজের খুশী মতো কিছু বলছেন না, বরং এ হচ্ছে তার প্রতি অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ (অহী) মাত্র।” – (সূরা আন নাজমঃ ৩-৪)

চারঃ কুরআনে মিথ্যা ও অসত্যের আদৌ ঠাঁই নেই।

*****************

“নিশ্চিতরূপে এ এক সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত কিতাব; মিথ্যা না এর সামনে থেকে আসতে পারে, না পারে পেছন থেকে। এ এক প্রজ্ঞ ও প্রসংসিত সত্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ।” – (সূরা হা-মীম আস সাজদাহঃ ৪১-৪২)

পাঁচঃ কুরআন আগাগোড়া সত্য; কোন আন্দাজ-অনুমান নয়, বরং প্রকৃত জ্ঞানের ভিত্তিতে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে কোন বক্রতা ও কুটিলতার স্থান নেই; ইহা মানুষকে সোজা পথ দেখিয়ে দেয়।

****************

“যারা জ্ঞানবান লোক, তারা তোমার প্রতি তোমার প্রভুর কাছ থেকে অবতীর্ণ এ কিতাবকে মনে করে যে, এ-ই হচ্ছে সত্য; এ মানুষকে পরাক্রান্ত ও প্রশংসিত আল্লাহর দিকে চালিত করে।” – (সুরা সাবাঃ ৬)

**************

“নিঃসন্দেহে তা নিশ্চিত সত্য।” –(সূরা আল হাক্কাঃ ৫১)

“আমরা তাদের কাছে এমন একখানি কিতাব নিয়ে এসেছি, যাকে আমরা প্রকৃত জ্ঞানের ভিত্তিতে মু’মিনদের জন্যে বিস্তৃত হেদায়াত ও রহমত স্বরূপ বানিয়েছি।”-(সূরা আল আরাফঃ ৫২)

**************

“হে মুহাম্মদ! বলে দাও যে, যিনি আসমান ও জমিনের সমস্ত রহস্য জানেন, এ কিতাব তিনিই নাযিল করেছেন।” –(সূরা আল ফুরকানঃ ৬)

“এ কিতাবে কোন কথাই সন্দেহের ভিত্তিতে বলা হয়নি।”

****************

“আল্লাহ তার মধ্যে কোন বক্রতা রাখেননি, তা একেবারে সোজা।”

***************

“নিঃসন্দেহে এ কুরআন এমন পথপ্রদর্শণ করে, যা একেবারে সোজা”

**************

ছয়ঃ কুরআনের বিধি-বিধান ও শিক্ষা ধারায় কোন রদবদল করার কারো, এমন কি খোদ পয়গম্বরেরও নেই।

“(হে মুহাম্মদ!) বলে দাও, আমি এ কিতাবকে নিজের তরফ থেকে বদলাবার অধিকারী নই। আমি তো কেবল সেই অহীরই আনুগত্য করি, যা আমার প্রতি নাযিল করা হয়। আমি যদি আমার প্রভুর অবাধ্যতা করি তো আমার কঠিন দিন সম্পর্কে ভয় হয়।”- (সূরা ইউনুসঃ ১৫)

সাতঃ যে জিনিস কুরআনের পরিপন্থী, তা মোটেই অনুসরণ যোগ্য নয়।

************

“যা কিছু তোমাদের প্রভুর তরফ থেকে তোমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করো এবং তাকে ছেড়ে অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকদের মাত্রই অনুসরণ করো না।”- (সূরা আল আরাফঃ ৩)

এ হচ্ছে কুরআন মজীদ সম্পর্কে ইসলামের বিস্তৃত প্রত্যয় এবং এর প্রতিটি অংশের প্রতি বিশ্বাস পোষণই অত্যাবশ্যক। যার প্রত্যয়ের মধ্যে এর কোন একটি অংশেরও অভাব থাকবে সে কখনো কুরআনের নির্ভুল ও পূর্র্ণাঙ্গ আনুগত্য করতে পারবে না। বরং সে ‘ইসলাম’ নামক সোজা পথ থেকেই বিচ্যুত হয়ে যাবে।

ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর

এক কিতাব ও এক রাসূলের প্রতি ঈমান, তারই আনুগত্য-অনুসরণ, তারই গড়া ছাঁচে মানসিকতার পুনর্গঠন, সেই এক উৎস থেকে গোটা আকিদা, ইবাদাত, নৈতিকতা, লেনদেন ও সামাজিক বিধানের উৎসারণ এবং সেই ঈমান, আনুগত্য ও অনুসরণের সূত্রে গোটা মুসলিম সমাজের সংযুক্তিকরণই ইসলামকে একটি স্থায়ী সংস্কৃতি এবং সকল প্রকার বংশগত, ভাষাগত, বর্ণগত ও ভৌগলিক পার্থক্য সত্ত্বেও মুলমানদেরকে একটি জাতিতে পরিণত করে। অবশ্য জ্ঞান-বুদ্ধি, অন্বেষণ, অনুসন্ধান, দৃষ্টিভঙ্গি ও ঝোঁক প্রবণতার পার্থক্যের ফলে কুরআনের আয়াত ও রসূলের সুন্নাত থেকে আইন প্রণয়নে এবং তাদের মর্ম ও লক্ষ্য অনুধাবনে পার্থক্য সূচিত হতে পারে। কিন্তু এ পার্থক্য হচ্ছে নেহাতই খুঁটিনাটি ও ছোটখাট বিষয়ের; এটা ফিকাহ ও কালাম শাস্ত্রের বিভিন্ন মযহাবকে আলাদা- আলাদা দ্বীন এবং তাদের অনুসারীদেরকে পৃথক পৃথক জাতিতে পরিণত করে না। ইসলামী মিল্লাতের আসল ভিত্তিমূল হচ্ছে আল্লাহর রসূল হিসেবে মুহাম্মদ (সঃ)-কে একমাত্র অনুসরণীয় রূপে বরণ করা এবং আল্লাহর কিতাব হিসেবে কুরআন মজীদকে একমাত্র আইন গ্রন্থ রূপে স্বীকার করা আর দুটি জিনিসকেই গোটা আকিদা-বিশ্বাস ও আইনের উৎস বলে ঘোষণা করা। এ মৌলিক বিষয়ে যারা একমত, খুঁটিনাটি ব্যাপারে তাদের মধ্যে যতই মতানৈক্য থাকুক, তারা সবাই মিলে এক জাতি। আর এ মৌলিক বিষয়ে যারা একমত নয়, তারা পরস্পরে যতো জাতিতেই বিভক্ত হোক, কুরআনের দৃষ্টিতে তারা একটি ভিন্ন জাতি।

বস্তুত যেসব বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি নির্ভরশীল, কুরআন হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ সংকলন। যে ব্যক্তি কুরআনের প্রতি ঈমান এনেছে, সে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর নবী এবং পরকালের প্রতিও ঈমান এনেছে। কারণ এ গোটা ঈমানিয়াতের বিস্তৃত বিবরণ কুরআনেই বর্তমান রয়েছে। আর ‘ঈমান বিল কুরআনের’ (কুরআনের প্রতি ঈমান) নিশ্চিত সুফল হলো মানুষের পরিপূর্ণ ঈমান লাভ। এভাবে কুরআন মজীদে ইসলামী শরীয়তের সকল মূলনীতি মৌল বিধানও উল্লেখিত রয়েছে এবং সেসব নীতি ও বিধানকে শরীয়ত প্রণেতা নিজের কথা ও কাজ দ্বারা সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। কাজেই যে ব্যক্তি নির্ভূল ঈমানের সাথে কুরআন ও সুন্নাতে রসূলকে জীবনের যাবতীয় বিষয়াদিতে অবশ্য পালনীয় আইন বলে ঘোষণা করে, সে নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস ও কর্মের দিক দিয়ে মুসলমান। আর এহেন ঈমান ও আইন পালনের সমষ্টিকেই বলা হয় ইসলাম। যেখানে এ দু’টি জিনিস বর্তমান থাকবে সেখানে ইসলামও থাকবে। আর যেখানে এ দু’টি থাকবে না, সেখানে ইসলামও থাকবেনা।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.