শিক্ষা ব্যবস্থার ইসলামী রূপরেখা


Warning: Division by zero in /home/icsbook/public_html/wp-content/plugins/page-links-single-page-option/addons/scrolling-pagination/scrolling-pagination-functions.php on line 47

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কিন্তু তাই বলে কি তাদের শিক্ষার কোন প্রয়োজন নেই? প্রত্যেক জীবেরই জীবন ধারণের উপযোগী খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়। নিতান্ত বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই তাদেরকে কাজ করতেও আমরা দেখতে পাই। জীবশিশু তার পূর্ণ বিকাশ লাবেল উপযোগী গুণাবলিও অর্জন করে থাকে। এসব মেনে নেওয়া সত্ত্বেও আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, মানুষের ন্যায় ‘বুদ্ধি’ প্রয়োগ দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে চেষ্টা করে তাদেরকে শিক্ষা লাভ করতে হয় না।
মানবশিশুর বিকাশ, এমনকি অস্তিত্ব পর্যন্ত তার পিতামাতা এবং অন্যান্য শিক্ষকের উপর যেরূপ নির্ভরশীল, অন্যান্য জীবের মধ্যে সেরূপ নির্ভরশীতার প্রয়োজন হয় না। মানবশিশু আগুনকে খেলার জিনিস মনে করে তাতে হাত দেয়, নিজের পায়খানাকে হালুয়ার মতো মুখে দেয়। কিন্তু কোন বিরাড়শিশুকে এরূপ করতে দেখা যায় না। যে কুকুর মানুষের মলকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তার শিশুকেও কোনদিন নিজের পায়খানা মুখে দিতে দেখা যায় না। মানুষের শৈশবকাল এতো দীর্ঘ যে, পনেরো-বিশ বছর পর্যন্ত তাকে পিতাতামা, শিক্ষক ও অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে উপযোগী গুনাবলি অর্জন করতে হয়। অথচ মানুষের চেয়ে দীর্ঘজীবী প্রাণীদের বেলায়ও এরূপ নির্ভরশীলতার প্রয়োজন হয় না। সুতরাং দেখা যায় যে, মানবশিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম প্রচেষ্টা দ্বারা যা শিক্ষা দিতে হয়, অন্যান্য জীবশিশু তা সহজাত বৃত্তি দ্বারা আপনা-আপনিই লাভ করে থাকে।
কিন্তু মানুসের যাবতীয় জ্ঞানের জন্যই শিক্ষার প্রয়োজন। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে মানুষের শিক্ষার সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
“প্রয়োজনীয় গুণাবলি ও জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ব্যবস্থার নামই শিক্ষা।”
এ ধরনের শিক্ষা একমাত্র মানুষেরই প্রয়োজন। অন্যান্য জীব-জানোয়ার এ ঝামেলা থেকে মুক্ত। কোন্টা খাওয়া ঠিক ও কোন্টা খাওয়া ঠিক নয়, তা জানার জন্য ছাগশিশুর নাসিকাযন্ত্রের সহজাত ক্ষমতাই যথেষ্ট। কিন্তু মানবশিশুকে তা বড়দের নিকট থেকে শিখতে হয়।
শৈশবকালে মানুষও সহজাত বৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হয় বটে; কিন্তু যতই তার বুদ্ধি ও ববেচনাশক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, ততিই উক্ত সহজাত বৃত্তি বুদ্ধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মানব চরিত্র গঠনের প্রাথমিক স্তরে বালক-বালিকারা ইচ্ছাকৃতভাবে জ্ঞানার্জন করার চেষ্টা না করলেও বড়দের ইচ্ছাকৃত চেষ্টার ফলেই তখন তারা শিক্ষা লাভ করে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তারা নিজেরাই চেষ্টা করে জ্ঞানার্জন করতে অভ্যস্ত হতে থাকে।

মানুষের পরিচয়

মানুষ সম্বন্ধে সঠিক ধারণা ব্যতীত যদি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয় তাহলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কিছুতেই সফল হতে পারে না। তাই মানুষের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে যুক্তিপূর্ণ আলোচনার প্রয়োজন।
মানুষ সৃষ্টিজগতের বহু রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রত্যেক যুগেই বস্তুজগতের বিভিন্ন শক্তিকে নিজের উপকারে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ওহীর জ্ঞান ব্যতীত এবং নবীদের শিক্ষা ব্যতীত কোন কালেই মানুষ তার নিজের প্রকৃত পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হয়নি।
আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে এতো বিপুল শক্তির অধিকারী করেছে যে, মানুষ আজ পাখির চেয়েও দ্রুত উড়তে সক্ষম এবং দ্রুততম প্রাণীর চেয়েও অধিকতর বেগে চলার উপযোগী যানবাহনের অধিকারী। এমনকি গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে বিচরণের ক্ষমতায়ও ভূষিত হয়েছে। কিন্তু ‘প্রকৃত মানুষ’ হিসেবে দুনিয়ায় জীবন যাপন করার উপযোগী শিক্ষা থেকে আধুনিক মানুষ বঞ্চিত রয়ে গেলো।
এর মুল কারণ এই যে, মানুষ নিজেকে ভালোভাবে চিনতে সক্ষম হয়নি। ‍শুধু বিবেবুদ্ধি প্রয়োগ করে মানুষ নিজেকে চিনতে অক্ষম বলেই মানুষের মহান স্রষ্টা রাসূলের মারফতে যুগে যুগে মানুষকে আত্মজ্ঞান দান করেছেন। তাই মানুষের প্রকৃত পরিচয় পেতে হলে আমদেরকে কুরআন মাজীদের নিক ‘ধরনা’ দিতে হবে।

কুরআনে মানুষের পরিচয়

কুরআন অন্যান্য জীবের সাথে মানুষের যে ব্যবধা নির্দেশ করে তা এই যে, ‘মানুষ নৈতিক জীব’ আর অন্যান্য জীব নৈতিকতার বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ ‍মুক্ত। ভালো ও মন্দ, সৎ ও অসৎ, সত্য ও মিথ্যার বিচার করার ক্ষমতা মানুষ ছাড়া আর কোন জীবের মধ্যে আমরা দেখতে পাই না। মিথ্যার বেসাতিই যার সম্বল, সে মানুষটিও ‘মিথ্যা বলা অন্যায়’ বলে স্বীকার করে। মিথ্যা বলাকে ভালো কাজ মনে করলে সে ‘মিথ্যুক’ উপাধিতে ভূষিত হওয়া পছন্দ করতো। ‘চুরি করা খারাপ’ এ কথা স্বীকার করে বলেই চোর প্রকাশ্যে না গিযে গোপনে চুরি করতে যায়। ভালোমন্দের এই বিচারজ্ঞানই মানুষকে অন্যান্য জীব থেকে পৃথক করেছে। যারা এঈ নৈতিক দিককে উন্নতি করার চেষ্টা করে না, কুরআন তাদের সম্বন্ধে মন্তব্য করে যে,
(আরবী**************)
“তারা পশুর ন্যায়; বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।” নৈতিকতার উন্নতি ব্যতীত মানুষ তার যাবতীয় শক্তি যখন ব্যবহার করে তখন সে পশুর চেয়েও অনিষ্টকর ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। চিন্তাশক্তিও বুদ্দি মানুষের বিরাট অস্ত্র। এ অস্ত্রের সাহায্যে শারীরিক আকারে ক্ষুদ্র হয়েও সে বিরাট বপুবিশিষ্ট হাতীর উপর কর্তৃত্ব করে। কিন্তু নৈতিকতার বিকাশ না হলে এই বুদ্ধিশক্তিকেই সে মানব জাতির অকল্যাণে প্রয়োগ করে। কিন্তু নৈতিকতার অবনতির ফলে যখন কেউ মিথ্যা বলে তখন সে কুকুরের চেয়েও অধম হয়ে পড়ে। কেননা কুকুর মিথ্যা বলতে পারে না। তাই বস্তুগত শক্তির সঠিক ব্যবহার নৈতিকতার উপরই নির্ভরশীল। একটি ছুরি নৈতিকতা সম্পন্ন ব্যক্তির হাতে ব্যবহৃত হলে তা মানুষের উপকারই করবে। কিন্তু নৈতিকতার অভাব হলে এ ছুরিই তাকে ডাকাতে পরিণত করবে। নৈতিকতার বিকাশ ব্যতী আধুনিক বিশ্ব এতো প্রচণ্ড বস্তুরশক্তির অধিকারী হয়েছে, বলেই আজ মানব জাতি এতো বড় সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। আণবিক শক্তি ও মহাশূন্যের ব্যবহার আজ মানব জাতির অস্তিত্বকে শঙ্কুল করে তুলেছে। কেননা এসব শক্তি নৈতিকতায় ভূষিত মানবের হাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না, নৈতিকতাহীন দানবের হিংস্র থাবা দ্বারাই এদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
কুরআন হাত. পা, চোখ-কানবিশিষ্ট শরীরটিকে প্রকৃত মানুষ মনে করে না। কুরআনের মতে, এ দেহ সৃষ্টির বহু পূর্বে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। কুরআনের পরিভাষায় সেই মানুষটিই হলো ‘রূহ’ বা আত্মা। এ আত্মাই নৈতিকতার আধার। রূহকে উন্নত করার ব্যবস্থা না করলে এ শরীর পশুর ন্যায় ব্যবহার করবে। শরীরের যত সব বস্তুগত দাবি আছে তা পূরণের জন্য মানবদেহ সকল সময়ই ব্যস্ত। পেট খালি হলেই সে খাদ্যের জন্য ব্যস্ত হয়। মানুষ সেই খাদ্য চুরি করে আনলো, না পরিশ্রম করে অর্জন করলো সে বিষয়ে পেটের কোন মাথাব্যাথা নেই। তার খাদ্যের প্রয়োজন। অন্যায়ভাবে খাদ্য এনে দিলেও সে নিশ্চিন্তে খেতে থাকে। কিন্তু তখন রূহ বলতে থাকে যে, কাজটা অন্যায় হলো। গৃহপালিত পশু রজ্জু ছিঁড়ে নিজেরই দয়ালু মনিবের সাজানো বাগান খেতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। নৈতিকতার বন্ধন ছিঁড়তে পারলে মানবদেহও তেমনি একটি পশুতে পরিণত হয়। মহানবী (স) তাই নৈতিকিতাসম্পন্ন মানুষকে এমন এক ঘোড়ার সাথে তুলনা করেছেন, যা রজ্জু দ্বারা এক খুঁটির সাথে আবদ্ধ। এ ঘোড়াটি যেমন স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে না তেমনি মানুষ স্বাধীনতাও নৈতিকতার রজ্জু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই কেবল রজ্জুর সীমা পর্যন্তই সে স্বাধীনভবে চলাফেরা করতে সক্ষম।

দেহ ও আত্মার দ্বন্দ্ব

উপরিউক্ত আলোচনা ছাড়াও প্রত্যেক ব্যক্তিই তার বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, মানুষের আত্মার সাথে তার দেহের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব লেগে আছে। মানুষ অনেক নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপ হতে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করে কিন্তু অনেক সময় দেহের তাগিদের নিকট পরাজয় বরণ করে। এ দ্বন্দ্বে দেহের জ্বালায় অস্থির হয়েই একশ্রেণীর মানুষ নৈতিকতার চাপে বৈরাগী হওয়ার প্রেরণা লাভ করে। তারা ‘দরবেশ’ ও ‘সন্যাসী’ হলেও মানুষের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়। তারা নির্জীব পাথর ও নিশ্চল গাছের ন্যায় জীবন-যাপন করে মনুষ্যত্বের উচ্চস্থান থেকে পতিত হয়। আবার অন্যদিকে অধিকাংশ লোক দেহের নিকট পরাজিত হয়ে আত্মাকে পঙ্গু করে পশুর ন্যায় জীবনযাপন করে। কুরআনে মানুষকে এ দ্বন্দ্বে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য যে বিধান দিয়েছে, তা দেহের সকল দাবিকে নৈতিকতার সীমার ভেতরে পূরণ করতে সাহায্য করে। দেহের দাবিকে অস্বীকার করার বিরুদ্ধে কুরআন বলে, “বৈরাগ্য সাধনের নীতি মানুষ নিজেই আবিষ্কার করেছে, আমরা তাকে এ নির্দেশ দান করিনি।” (সূরা হাদীদ: ২৭)
% | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | সম্পুর্ণ বই এক পেজে »

About শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম