ইসলামে হালাল হারামের বিধান

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

halal-1

ইসলামে হালাল হারামের বিধান

আল্লামা ইউসূফ আল-কারযাভী

অনুবাদঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

অনুবাদকের কথা

আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভী লিখিত আরবী গ্রন্থ আলহালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম– এর বাংলা অনুবাদ ‘ইসলামের হালাল-হারামের বিধান’ বাংলাভাষী সুধীমণ্ডলীর কাছে উপস্থিত করতে পেরে আমি আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালার শোকর আদায় করছি। এ নগণ্য ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’য়ালা আল্লামা কারযাভী লিখিত ‘ফিক্‌হুয্‌-যাকাত’-এর দুইটি বিরাট খন্ডের বাংলা অনুবাদ ইতিপূর্বে পেশ করার তওফীক দিয়েছেন। সেজন্যে শোকর আদায় করার মতো ভাষা আমার জানা নেই।

বস্তুত ইউসুফ আল-কারযাভী বর্তমান শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ ইসলামী ফিকাহ্‌বিদ- একথা শুধু আমার নয়, একালের বহু বিখ্যাত মনীষীই তা অকপটে স্বীকার করেছেন। তা যেমন তাঁর লিখিত সব কয়টি বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অকাট্যভাবে প্রমাণ করে, তেমনি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘ইসলামের যাকাত বিধান’-এর দুইটি খণ্ড ও তাঁর লিখিত অমর গ্রন্থ আল ঈমান ওয়াল হায়াত অবলম্বনে আমার লিখিত ‘উন্নত জীবনের আদর্শ’ও পাঠকদের কাছে নিঃসন্দেহ করে তুলেছে।

গ্রন্থকারের বর্তমান গ্রন্থখানিও যেমন ব্যাপক আলোচনাপূর্ণ তেমনি এর তুলনা দুনিয়ার আরবী, উর্দু ও অন্যান্য কোন ভাষায়ই খুঁজে পাওয়া যাবে না। গ্রন্থকার নিজেই বলেছেনঃ হালাল-হারাম বিষয়ে এ গ্রন্থখানি বিশ্ব ইসলামী সাহিত্যে সর্বোচ্চ সংযোজন। গ্রন্থকারের এ দাবি যে একশ’ ভাগ সত্য, তা এর পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন। আলোচ্য বিষয়ের বিভিন্ন অংশ ফিক্‌হ’র কিতাবসমূহে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে রয়েছে, কিন্তু তা প্রাচীন পদ্ধতিতে লেখা বলে আধুনিক কালের লোকদের পক্ষে তা থেকে বক্তব্য উদ্ধার করা কঠিন। একটি নির্দিষ্ট শিরোনামে পূর্ণ ব্যাপকতা, যৌক্তিক মানে ও আধুনিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ই এই প্রথমবার একত্রে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। ফলে গ্রন্থখানি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিষয়াদির ‘বিশ্বকোষ’ হওয়ার মর্যাদা অর্জন করেছে। এ কারণেই সারা দুনিয়ার মনীষীগণের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। এর মূল আরবী গ্রন্থের বহু কয়টি সংস্করণ প্রকাশ এবং তুর্কী ও ইংরেজী ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশ ও তার বিপুল চাহিদা এ কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে।

গ্রন্থখানিতে আলোচিত বিষয়াবলীর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তওহীদ ও রিসালাত-এর সাথে সাথে হালাল-হারামের মাস্‌লাসমূহ সমানভাবে মৌলিক গুরুত্বের অধিকারী। হালাল-হারামের পার্থক্য ব্যতীত না ঈমান ও ইসলাম গ্রহণযোগ্য হতে পারে, না কোন ইবাদতই আল্লাহ্‌র কাছে একবিন্দু কবুল হতে পারে। আমি মনে করি, হালাল-হারাম এর পার্থক্য রক্ষা করে না চললে মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা পেতে পারে না বরং মানুষের পশুর স্তরে নেমে যাওয়া অবধারিত। গ্রন্থকার পূর্ণ ব্যাপকতা সহকারে বিষয় সংশ্লিষ্ট সকল দিক ও সকল শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা উপস্থাপিত করেছেন সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে।

এ গ্রন্থে আলোচিত বিষয়গুলো এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল ইসলামী চিন্তা কেন্দ্রসমূহে এ সম্পর্কে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্য চালানো হচ্ছে। এক কথায় বললে বলা যায়, এসব হচ্ছে আধুনিক মনের জিজ্ঞাসা এবং গ্রন্থ সেই আধুনিক জিজ্ঞাসারই সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ জবাব। এসব বিষয়ে আরও বহু ইসলামী চিন্তাবিদ গবেষণা চালিয়েছেন, কিন্তু এ গ্রন্থকার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উচ্চমানের ব্যাপক তত্ত্ব ও তথ্যভিত্তিক গবেষণার ফসল উপস্থাপিত করেছেন, তা দৃষ্টান্তহীন বললেও অত্যুক্তি হবে না। তিনি চিন্তা ও বিবেচনা ও অগ্রাধিকার দানের ক্ষেত্রে পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করেছেন, যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।

গ্রন্থখানির এ উচ্চমানতার দিকে লক্ষ্য করেই আমি এর অনুবাদ করেছি। আমি মনে করতে পারছি যে, দ্বীন-ইসলামের সম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক আদর্শ বাঙলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষিত সমাজের কাছে উপস্থাপনের যে কঠিন দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত, বর্তমান গ্রন্থখানি সেই দায়িত্ব পালন পর্যায়ে এক মহান সংযোজন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ বিরাট গ্রন্থখানি প্রকাশ করেও সেই দায়িত্ব পালন করছে। এ গ্রন্থে গৃহীত সব কয়টি সিদ্ধান্তে অনুবাদকের সম্পূর্ণরূপে একমত হওয়ার কোন শর্ত অবশ্যই নেই।

মুহাম্মাদ আবদুর রহীম

১ মে, ১৯৮৪ ইং

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

গ্রন্থকারের ভূমিকা

ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে মিসরের জামে আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্রে একটি পরিকল্পনা গ্রহীত হয়। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলিম ও অমুসলিমদের সম্মুখে ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষার ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করাই এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। এ মহতী পরিকল্পনায় কার্যত অংশগ্রহণের জন্যে জামে আযহার কর্তৃপক্ষই আমাকে আহ্‌বান জানিয়েছিলেন।

সন্দেহ নেই, গ্রন্থ প্রণয়ন সংক্রান্ত এ পরিকল্পনা অত্যন্ত মূল্যবান এবং আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রয়োজনীতা অপরিসীম। এ ধরণের একটি পরিকল্পনা নিয়ে বহু পূর্ব থেকে কাজ করা আবশ্যক ছিল। কেননা বস্তুতই ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলিম জনগণ ইসলাম সম্পর্কে খুব সামান্যই জানেন। আর সে সামান্য জ্ঞানও নানাবিধ বিকৃতি ও সংশয়ে জর্জরিত। এরই কাছাকাছি সময়ে আমার এ আযহারী বন্ধু আমেরিকা পরিভ্রমণ করে আমাকে লিখলেন যে, এসব দেশে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মুসলিম মদ্য ব্যবসা ও পানশালা (Bar) চালিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। কিন্তু মুসলিমদের জন্যে এ কাজ যে সম্পূর্ণ হারাম ও কঠিন গুনাহ, সে বিষয়ে এদের একবিন্দু চেতনা নেই।

তিনি আরও লিখেছেন, মুসলিম পুরুষরা খ্রীস্টান ও ইয়াহূদী- এমনকি নাস্তিক, পৌত্তলিক, মূর্তিপূজারী (Heathen, Idolater)-দের কন্যা স্ত্রীরূপে গ্রহণ করছে, মুসলিম কন্যাদের বিয়ে করতে প্রস্তুত হচ্ছে না।

আর মুসলিমদের অবস্থা যখন এই, তখন অমুসলিমদের অবস্থা কি হতে পারে, তা বলাই নিষ্প্রয়োজন। তারা তো ইসলামের একটা বাহ্যিক বীভৎস রূপই দেখতে পাচ্ছে। ইসলামের অন্তর্নিহিত প্রকৃত সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হওয়ার কোন সুযোগই তারা পাচ্ছে না। ফলে তারা ইসলামের ও মুসলিমদের (মুসলিম হওয়ার দাবিদারদের) প্রতি সকল শ্রদ্ধা-ভক্তি নিঃশেষে হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে ইসলামের দুশমন খ্রীস্টান মিশনারীরা ও হিংসুক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোই তাদের সামনে ইসলামের এ বিকৃত চেহারা তুলে ধরে আসছে আবহমান কাল থেকে। এ জন্যে তারা দিনরাত অত্যন্ত হীন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে আবহমান কাল থেকে। অথচ দুনিয়ার মুসলিম চিন্তাবিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অচেতন ও অনবহিত হয়ে রয়েছেন।

তাই এক্ষণে যদি আমাদের চিন্তাবিদদের চেতনা জেগে থাকে ও এ মহতী কার্যক্রমের পরিকল্পনা নেয়া হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত মুবারক ও সময়োপযোগী হয়েছে, যা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ইসলামী দাওয়াতের এ মহামূল্য কাজে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য, তাতেও কোন  সন্দেহ নেই। এ কাজ কেবল যে ‘জামে আযহার’ (আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়) কেন্দ্রিক হওয়া উচিত তা-ই নয়, তা তার বাইরে সমগ্র মুসলিম জাহানেও হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে আমি মনে করি।

উক্ত ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে এ গ্রন্থকারকে একখানি গ্রন্থ রচনা করতে বলা হয়। তার শিরোনাম দেয়া হয়ঃ ‘আল হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম’- ইসলামে হালাল হারামের বিধান।

সেই সঙ্গে বলে দেয়া হয় যে, গ্রন্থখানি যেন বিস্তারিত আলোচনা-সম্বলিত ও সহজবোধ্য ভাষায় রচিত হয় এবং তাতে দুনিয়ার অন্যান্য ধর্মমত ও সাংস্কৃতির দৃষ্টিকোণের সাথে তুলনামূলক আলোচনা পেশ করা হয়।

প্রথম দৃষ্টিতে ‘হালাল-হারাম’ বিষয়টি যদিও সহজ মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। বিশেষত এজন্যেও যে, এ বিষয়ের ওপর দ্বীনী সাহিত্যে এখন পর্যন্ত কোন গ্রন্থ লিখিত হয় নি, না প্রাচীনকালে, না আধুনিক কালে। বিষয়টির উপকরণসমূহ যদিও তাফসীর, হাদীস ও ইসলামী ফিকাহ্‌র বিস্তারিত অধ্যায়সমূহে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে এবং পাঠকগণ সেসব অধ্যয়নকালে বিভিন্ন পর্যায়ে তার সাথে পরিচিত হন, কিন্তু সে সমস্ত উপকরণ একখানি গ্রন্থে একত্রে সন্নিবেশিত করা কিছুমাত্র সহজ কার্য নয়।

তা ছাড়া বিষয়টি এমন যে, লেখককে এমন বহু ব্যাপারেই একটা চূড়ান্ত ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়, যেসব ব্যাপারে প্রাচীনকালের মনীষীদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। উপরন্তু সেসব বিষয় মুহাদ্দিসদের রায় সর্বতোভাবে এক এবং অভিন্নও নয়। আর হালাল-হারামের ব্যাপারে বিভিন্ন মতের মধ্য থেকে একটি মাত্র মতকে অগ্রাধিকার দিতে হলেও বিস্তারিতভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে হয়। শুধু তাই নয়, এ পর্যায়ের আলোচনায় আলোচনাকারীকে ঐকান্তিক নিষ্ঠা সহকারে সত্যের সন্ধানে আত্ননিয়োগ করতে হয় এবং সেজন্যে প্রাণপণ পরিশ্রম করাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

ইসলাম বিষয়ে একালের লেখক, গবেষক ও গ্রন্থকারদের দুভাগে ভাগ করা যায়ঃ

এক ভাগের লোকদের সম্পর্কে বলা যায়, পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাংস্কৃতির চাকচিক্যে তাদের চোখ ঝলসে গেছে। শুধু তাই নয়, পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাংস্কৃতিকে তাঁরা এক বিরাট দেবতারূপেই গণ্য করেছেন। তার প্রতি তাঁরা পূর্ণ আনুগত্য জানিয়ে তারই পূজা, উপাসনা ও আরাধনায় নিমগ্ন হয়েছেন। তাঁরা সে দেবতার সম্মুখে পূজার উপাচার ও ভেট-উপঢৌকনও পেশ করছেন একনিষ্টভাবে। তার সম্মুখে এঁদের দৃষ্টি ভীত-সন্ত্রস্ত ও অবনত হয়ে আছে। তাঁরা পাশ্চাত্য-সভ্যতা-সংস্কৃতি উৎসারিত সব কিছুকেই চূড়ান্ত সত্য ও চিরকালীন অনুসরণীয় মনে করে নিয়েছেন। তার সাথে মতবিরোধ করতে বা তা থেকে ভিন্নতর মত গ্রহণ করতে ও বিপরীত মতকে খণ্ডন করতে তাঁরা আদৌ প্রস্তুত নন। এ পর্যায়ে কোন বিষয়ের সাথে যদি মিল ঘটে যায়, তাহলে তাঁরা উল্লসিত স্বপ্নে চিৎকার করে উঠেন। আর যেখানেই বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়, সেখানেই কোন-না-কোনরূপে সামঞ্জস্য বা সমন্বয় সাধনে ব্রতী হন অথবা ইসলামের দিক দিয়ে কৈফিয়তের সুরে কথা বলতে শুরু করেন কিংবা ইসলামের দৃষ্টিকোণকে বিকৃতি করে এমন একটা ব্যাখ্যা পেশ করেন, যার সাথে ইসলামের আদৌ কোন মিল নেই। তাতে তাদের এ ধারণাই প্রকট হয়ে উঠে যে, পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দর্শনের বিরুদ্ধে ইসলামের যেন কিছু বলবার নেই। প্রতিকৃতি, ছবি, প্রতিমূর্তি, জীবের ভাস্কর্য, সুদী ব্যবসায় ও ভিন্ন স্ত্রীলোকের সাথে নিভৃত নিবিড় সাক্ষাতকার, নারীদের নারীত্ব থেকে বিদ্রোহ এবং পুরুষদের স্বর্ণ-রৌপ্যের ভূষণ বা অলঙকারাদির ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ে তাদের বক্তব্য থেকে আমি এ মনোভাবেরই স্পষ্ট পরিচিতি আঁচ করতে পেরেছি। ইসলামে তালাক ও এক সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের যে অনুমতি রয়েছে, সেক্ষেত্রেও তাদের মনোভাব কিছুমাত্র ভিন্নতর নয়। মনে হচ্ছে, তাদের বিশ্বাস, পাশ্চাত্য যা হালাল করেছে তা অবশ্যই হালাল, যা হারাম করেছে তা অবশ্যেই হারাম হবে অথচ ইসলাম একটা স্বতন্ত্র জীবন দর্শন, তা মহান আল্লাহ্‌র নাযিল করা বিধান আর আল্লাহর বিধানই সর্বোপরি ও সর্বজয়ী হবে, এটাই বাঞ্ছনীয়। ইসলামকেই অনুসরণ করতে হবে, তা কাউকে বা অন্য কিছুকে অনুসরণ করতে পারে না- একথা তারা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছেন। আল্লাহ্‌ই হচ্ছেন মাবুদ আর সব বান্দা। মাবুদ কখনই বান্দাকে অনুসরণ করতে, তার অধীন হয়ে থাকতে রাজী হতে পারেন না। স্রষ্টা কোন্‌ কারণে সৃষ্টি কাছে নতি স্বীকার করবেন? আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

………… (আরবী)…………..

প্রকৃত সত্য- মহান আল্লাহ-যদি লোকদের খামখেয়ালীর অনুসরণ করে চলে, তাহলে তো নভোমণ্ডল, পৃথিবী ও তাতে যা কিছু রয়েছে তা সব কিছুই কঠিনভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।

………… (আরবী)…………..

বল, তোমরা আল্লাহর সাথে যাদের শরীক করছ, তাদের মধ্যে কেউ কি পরম সত্যের পথ প্রদর্শন করে। আর বল, যিনি পরম সত্যের পথ প্রদর্শন করেন তিনি অনুসৃত হওয়ার বেশি অধিকারী, না যা আদৌ কোন পথ দেখায় না- তাকেই বরং পথ দেখাতে হয়,- এ ব্যাপারে সে-ই বেশি অধিকারসম্পন্ন।

এ হচ্ছে লেখক গ্রন্থকারদের এক শ্রেণী সম্পর্কিত কথা। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা তো হালাল হারামের বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট মতের ওপর অবিচল হয়ে রয়েছে। এ ব্যাপারে তাঁরা হয়ত কোন কিতাবের ভাষ্যের ওপর নির্ভর করেছেন অথবা ধারণা করেছেন ওটাই ইসলাম হবে। ফলে তাঁরা তাঁদের বদ্ধমূলক ধারণা থেকে একবিন্দু সরে দাঁড়াতেও প্রস্তুত নন। এমন কি, এ বিষয়ে শরীয়াতের দলিল-প্রমাণের পরীক্ষা-পর্যালোচনা করে দেখতেও তাঁরা সম্পূর্ণ নারাজ অথচ স্বমত ও ভিন্ন মতের দলিল-প্রমাণসমূহ তুলনামূলকভাবে পরীক্ষণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভবপর হতো।

এ শ্রেণীর লোকদের কাছে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত, দাবা খেলা, নারী শিক্ষা, মেয়েদের মুখমণ্ডল বাহুদ্বয় অনাবৃত রাখা প্রভৃতি সম্পর্কে আপনাদের মত কি? তাহলে তাঁরা বলে বা লিখে দেবেন ‘হারাম’। এক্ষেত্রে পূর্বকালীন মনীষীবৃন্দ কি ভূমিকা গ্রহণ করতেন বা কথা বলার কি ধরণ বা ভঙ্গি অনুসরণ করতেন, তাও তাঁরা ভুলে গেছেন। কেননা যে জিনিস বা কাজ সম্পর্কে চূড়ান্ত ও নিঃসন্দেহভাবে জানা যায়নি যে, তা হারাম, তাঁরা কখনই তাকে হারাম বলতেন না। বরং তাঁরা বলতেন, আমি এটা পছন্দ করি না বা আমি এটা ঘৃণা করি ইত্যাদি। এ প্রেক্ষিতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এ দুই শ্রেণীর কোন বিশেষ একটি শ্রেণীর মধ্যে নিজেকে শামিল করব না। কেননা আমার দ্বীনই আমাকে পাশ্চাত্যের বান্দা- অন্ধ অনুসরণকারী হতে দেয় না। কেননা আমি তো মহান আল্লাহ্‌কেই আমার রব্বরূপে স্বীকার করেছি, ইসলামকে আমার জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধানরূপে মেনে নিয়েছি এবং বিশ্বাস করেছি মুহাম্মাদ সা.- ই আল্লাহর শেষ রাসূল।

দ্বিতীয়ত, আমার বিবেক-বুদ্ধি যেহেতু এখনও জাগ্রত, সচেতন, এ কারণে কোন একটি ফকীহ্‌ মাযহাবকেই আমি সকল বিষয়ের চূড়ান্ত বলে স্বীকার করে নিতে পারি না। কেননা তা যেমন নির্ভুল হতে পারে, তেমনি তো ভুল হওয়ার আশংকা থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ইমাম ইবনুল জাওজী বলেছেন, অন্ধ অনুসরণকারী এক অনির্ভরযোগ্য ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। আর তাতে বিবেক-বুদ্ধিকে সম্পূর্ণ অকেজো করে রাখা হয়। বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা-বিবেচনা শক্তি মানুষের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত একটি মহৎ গুণ। তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণের নীতি গ্রহণ করা হলে এ মহৎ গুণের যাবতীয় কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা হয়। যার হাতে আলোর মশাল রয়েছে সে যদি তা নিভিয়ে অন্ধকারে পথ চলতে শুরু করে, তবে তার এ হাস্যকর আচরণ কোনক্রমেই যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত হতে পারে না।

এ কারণে আমি নিজেকে বিশেষ কোন মাযহাবী গোষ্ঠীর সাথে জড়িত করিনি। কেননা আমার মতে প্রকৃত সত্য বিশেষ একটি মাযহাবী মতের মধ্যে সীমিত হয়ে থাকে নি। দুনিয়ার প্রচলিত এসব মাযহাবের ইমামগণ নিজেদের নির্ভুল নিষ্পাপ হওয়ার দাবিও করেননি কখনও। আসলে তাঁরা ছিলেন সত্যানুসন্ধানের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টাকারী মুজতাহিদ। আর কোন ভুল করে থাকলেও তারা এক গুণ সওয়াব পাবেন, আর যদি নির্ভুল ইজতিহাদী মত প্রকাশে সক্ষম হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন। বস্তুতঃ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিষ্ঠাপূর্ণ ও অনাসক্ত সত্যানুসন্ধানের এটাই হচ্ছে ঘোষিত মর্যাদা।

ইমাম মালিক র. বলেছেনঃ

………… (আরবী)…………..

নবী করীম সা. ব্যতীত অন্যান্য সব মানুষেল মর্যাদাই হচ্ছে এই যে, তার কথার কিছু অংশ গ্রহণও করা যায়, বর্জনও করা যায়।

ইমাম শাফেয়ী র. বলেছেনঃ

………… (আরবী)…………..

আমার মত নির্ভুল, তবে ভুল হওয়ার আশংকা আছে। আর আমার ছাড়া অন্যান্যদের মত ভুল, তবে নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

সে সুবিজ্ঞ মুসলিম জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা-পর্যালোচনা করার এবং তন্মধ্য থেকে কোন একটি মতকে অগ্রাধিকার দেয়ার যোগ্যতা ও উপকরণের অধিকারী, তার পক্ষে মাযহাব সমূহের মধ্য থেকে বিশেষ কোন একটি মাযহাবের নিকট বন্দী হয়ে থাকা কিংবা বিশেষ কোন ফিকাহ্‌ বিশারদের মতের অন্ধ অনুসারী হওয়া কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। বরং তার তো দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে চলার নীতি অবলম্বন করা কর্তব্য। তখন যে দলিলটি নির্ভুল হবে, যার প্রমাণ অকাট্য হবে, সেটিকেই অনুসরণ করে চলবে। আর যার সনদ দুর্বল, দলিলের অকাট্যতা অপ্রমাণিত তা সহজেই পরিত্যক্ত হবে। অতএব এরূপ একটি মত গৃহীত হয়ে থাকলে তাও অবশ্যই পরিত্যক্ত হওয়া উচিত। হযরত আলী রা. নীতিকথা হিসেবে বলেছিলেনঃ

………… (আরবী)…………..

লোকদের দেখে সত্যকে চিনবার ও জানবার চেষ্টা কর না। বরং সত্যকে সত্য হিসেবেই জানতে ও চিনতে চেষ্টা কর এবং তারই ভিত্তিতে খোঁজ কর সেই সত্যের ধারক লোকদের।

জামে আযহারের সংস্কৃতি পরিষদের নির্দেশ পালন করতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছি। প্রতিটি বিষয়কেই আমি দলিলের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে এবং তুলনা করে মৌল কারণের দৃষ্টিতে কোন একটি মতকে অগ্রাধিকার দিতে চেষ্টা করেছি। এ পর্যায়ে আমি আধুনিক যুগের চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান-তথ্যকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছি। সর্বক্ষেত্রেই আমি ইসলামের দৃষ্টিকোণকে স্বর্ণোজ্জ্বল ও অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ ভিত্তিকই পেয়েছি। আর এটাই স্বাভাবিক। কেননা ইসলাম তো বিশ্বমানবতার দ্বীন। আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

………… (আরবী)…………..

আল্লাহর রঙ। আর আল্লাহর রঙের তুলনায় অধিক উত্তম রঙ আর কি হতে পারে?

হালাল-হারামের ব্যাপারটি একটি চিরন্তন ব্যাপার। প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি জাতির জীবনে এ প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে হারামের পরিমাণ ও তার প্রকৃতি পর্যায়ে যে মতভেদ রয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না। অবশ্য তার কারণও ভিন্ন রয়েছে। এ পর্যায়ের দৃষ্টিকোণ প্রতিটি জাতির প্রাথমিক পর্যায়ের আকীদা-বিশ্বাস ও আবহমানকালের সংস্কার ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট।

উত্তরকালে বড় বড় আসমানী দ্বীন শরীয়াতের বিধানসমূহ উপস্থাপিত করেছে। আর তাতে হালাল-হারামের ব্যাপারটি অবশ্যই উপস্থিত রয়েছে। দ্বীনের প্রতি ঈমান গ্রহণের পর ব্যাপারটি নিছক সংস্কার বা গোষ্ঠগত প্রচলন কিংবা রেওয়াজের ব্যাপার হয়ে থাকে নি। তখন তা মানবীয় আদর্শের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তখন হালাল-হারাম নির্ধারণের অনেক ক্ষেত্রেই সমসাময়িক সমাজ দৃষ্টি ও প্রবণতার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অবস্থার পরিবর্তনে হালাল-হারামেরও পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের পরিবর্তনের প্রভাবকেও অস্বীকার করা যায় নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ইয়াহূদীদের সমাজে অনেক হারামই ছিল সাময়িক। সে হারাম-সীমালংঘন করার অপরাধে আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে শাস্তি দিয়েছেন। যদিও এ হারাম কোন চিরন্তন ব্যাপার ছিল না। হযরত ঈসা আ. বনী ইসরাঈলদের লক্ষ্য করে যে কথা বলেছিলেন, কুরআনে তা উদ্ধৃত হয়েছে এ ভাষায়ঃ

………… (আরবী)…………..

আমার পূর্ববর্তী তওরাতের সত্যতা ঘোষণাকারী এবং আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেব এমন কিছু কিছু জিনিস, যা তোমাদের প্রতি হারাম করে দেয়া হয়েছিল।

পরে দ্বীন-ইসলাম যখন অবতীর্ণ হল, তখন মানবতা পূর্ণতা লাভ করেছে, তা নবুয়্যাত ও রিসালাতের সর্বশেষ অবদান গ্রহণের জন্যে উপযুক্ত হয়ে উঠেছিল। তখন আল্লাহ তা’আলা ইসলামের সর্বশেষ শরীয়াতের শাশ্বত ও চিরস্থায়ী বিধান নাযিল করলেন। সূরা আলমায়িদার আয়াতে বিভিন্ন হারাম খাদ্যের উল্লেখ করার পর আল্লাহ তা’আলা একথাই ঘোষণা করেছেন নিম্নোদ্ধৃত ভাষায়ঃ

………… (আরবী)…………..

আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত দান সম্পূর্ণ ও সমাপ্ত করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে দিলাম।

বস্তুত ইসলামে হালাল-হারামের চিন্তা অত্যন্ত সহজ-সরল ও সুস্পষ্ট। নভোমন্ডল ও পৃথিবী আল্লাহ্‌র কাছ থেকে যে আমানতের বোঝা বহনে অক্ষমতা ও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, এ ব্যাপারটি সে আমানতেরও অংশ। কেননা তা মানুষ নিজের স্কন্ধে সাগ্রহে গ্রহণ করেছিল। আর তা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধান পালন ও পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব বহনের আমানত। এ এক কঠিন ও দুর্বহ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব গ্রহণের ভিত্তিতেই মানুষকে সওয়াব কিংবা আযাদ দেয়া হবে কিয়ামতের দিন। মানুষ যাতে এ আমানতের বোঝা যথাযথভাবে বহন করতে পারে এবং এতদসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের সমর্থ হয় সেজন্যেই আল্লাহ তা’আলা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন, নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং জীবন বিধানরূপে নাযিল করেছেন তাঁর মহান গ্রন্থাবলী। এমতাবস্থায় মানুষের এরূপ প্রশ্ন করার অধিকার নেই যে, তাদের জন্যে হালাল-হারাম বিধান কেন দেয়া হল, কেন তাদের উন্মুক্ত ও বল্গাহারা করে ছেড়ে দেয়া হয় না? বস্তুত এ হচ্ছে আল্লাহ্‌র পরীক্ষণ ব্যবস্থার পরিশিষ্ট। এটা কেবল মানুষের ওপরই প্রবর্তিত। আল্লাহর অসংখ্য সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কেবলমাত্র মানব জাতিকেই এজন্যে বাছাই করে মনোনীত করা হয়েছে। কেননা মানুষ ফেরেশতাদের ন্যয় নিছক ‘আত্মা’ নয়, নিছক লালসা-কামনা সর্বস্বও নয় জন্তু-জানোয়ারের মতো। মানুষ এ দুটির সমন্বয়- অতীব ভারসাম্যপূর্ণ সৃষ্টি। মানুষ তার এ সমন্বিত সত্তা উন্নীত করে ফেরেশতাদের মর্যাদায় পৌঁছতে পারে, হতে পারে তার চাইতেও উত্তম ও উন্নত। সে সঙ্গে অধঃপতনের নিম্নতম পংকে ডুবে গিয়ে জন্তু-জানোয়ার কিংবা তার চাইতেও নীচে ও নিকৃষ্ট অবস্থায় উপনীত হতে পারে।

অপর এক দৃষ্টিতে এ হালাল-হারামের ব্যাপারটি ইসলামী শরীয়াত বিধানের আকাশে সদা আবর্তনশীল। মানুষের কল্যাণ বিধান এবং ক্ষতি ও দুর্ভাগ্য মোচনের ভিত্তির ওপর তা প্রতিষ্ঠিত। এর দ্বারা মানুষের জীবনকে সুষ্ঠু, সুন্দর ও সহজতর করাই উদ্দেশ্য। এ বিধান যেমন একদিকে সমস্ত বিপর্যয় প্রতিরোধ করে, তেমনি সমস্ত কল্যাণকে সক্রিয় করে তোলে। সমগ্র মানবতার সার্বিক কল্যাণ বিধানই তার চরম লক্ষ্য। তার আত্মার কল্যাণ, দেহের কল্যাণ, বিবেক-বুদ্ধির সুস্থতা এ বিধান পালনেই নিহিত। মানুষ বিভিন্ন জাতি, বর্ণ, দেশ-কাল প্রভৃতিতে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও এ বিধান থেকেই কল্যাণ লাভ করতে সক্ষম।

এ বিধান দ্বীন-ইসলামের অবিচ্ছিন্ন অংশ। এ দ্বীন নাযিল হয়েছে সমগ্র মানুষের জন্যে সার্বিক কল্যাণের ও রহমতের বাহন হিসেবে। এ কথা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন তাঁর সর্বশেষ রাসূলকে সম্বোধন করেঃ

………… (আরবী)…………..

সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতি রহমতরূপেই তোমাকে পাঠিয়েছি।

রাসূল সা. নিজেও বলেছেনঃ

………… (আরবী)…………..

নিঃসন্দেহে আমি সুপরিশীলিত রহমত মাত্র।

এ রহমতের ফল হিসেবেই আল্লাহ তাঁর এ সর্বশেষ উম্মতের উপর থেকে সর্বপ্রকার কষ্ট, কঠোরতা ও কৃচ্ছ সাধনার নিয়মাদি তুলে নিয়েছেন। ‘সব কিছু বৈধ- কোন কিছুই নিষিদ্ধ হয়’, এ নীতির কদর্যতা থেকেও তাদের মুক্ত করেছেন। মূর্তিপূজারী ও কোন কোন কিতাবী ধর্ম-পালনকারী গোষ্ঠী আবার কৃচ্ছ সাধনা ও কষ্ট-কঠোরতার নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে সকল প্রকার পাক-পবিত্র জিনিসকে নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছে এবং বহু প্রকার জঘন্য ঘৃণ্য কাজ বা জিনিসকে নিজেদের জন্যে ‘হালাল’ করে নিয়েছে। আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

………… (আরবী)…………..

আমার রহমত প্রতিটি জিনিসকেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি অবশ্য তা নির্দিষ্ট করে দেব সেসব লোকদের জন্যে, যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করে, যাকাত দেয় এবং যারা আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি ঈমানদার তারাই উম্মী নবীকে অনুসরণ করে চলে। তাদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে তাঁর কথা লিখিত দেখতে পায়। এ নবীই তাদের ভাল ভাল কাজের আদেশ করে, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলে, তাদের জন্যে ভাল ভাল ও পবিত্র জিনিসসমূহ হালাল ঘোষণা করে, তাদের জন্যে হারাম ঘোষণা করে সব নিকৃষ্ট ও জঘন্য বীভৎস কাজ বা দ্রব্যসমূহ এবং তাদের ওপর যে বোঝা ও শৃঙ্খল আবহমানকাল থেকে চেপে বসে আছে, তা থেকে তাদের মুক্ত করে।

হালাল-হারামের ব্যাপারে ইসলামী বিধান যে দুটি আয়াতের ওপর ভিত্তিশীল, তার উল্লেখ এ গ্রন্থের শুরুতে দেয়া হয়েছে।

শেষ কথা হচ্ছে, হালাল-হারাম বিষয়ে লিখিত এ ক্ষুদ্র পরিসর গ্রন্থখানির গুরুত্ব স্বীকৃত হতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আধুনিক মুসলিম গ্রন্থ প্রণয়ন পর্যায়ে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে মনে করি। এ গ্রন্থ মুসলিম জীবনের বহু সমস্যার সমাধান করবে এবং বহু ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত বিষয়াদি সংক্রান্ত প্রশ্নের সঠিক জবাব জনসমক্ষে উপস্থাপিত করবে। মুসলিমদের জন্যে হালাল কি, হারাম কি এবং তার নিহিত প্রকৃত কারণ ও যুক্তি কি, তা সব বিস্তারিতভাবে এ গ্রন্থের মাধমে জানা যাবে বলে আমার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে।

সর্বশেষে জামে আযহারের ভাইস চ্যান্সেলর ও ইসলামী সংস্কৃতি পরিষদের প্রতি শুকরিয়া না জানালে আমার দায়িত্ব পালন হবে না। কেননা তাঁদের কথানুযায়ীই আমি এ গ্রন্থ পণয়নে উদ্যোগী হয়েছি।

 

ইসলামে হালালহারামের বিধান

প্রথম অধ্যায়

সংজ্ঞা

সমস্ত জিনিস মূলত মুবাহজায়েয

হালাল বা হারাম নির্ধারণ কেবলমাত্র আল্লাহ্ অধিকার

হালালকে হারাম করা এবং হারামকে হালাল ঘোষণা করা শিরক

হারাম জিনিসমূহে অত্যন্ত ক্ষতিকর

হালাল জিনিস মানুষকে হারাম নির্ভর হওয়া থেকে মুক্ত করে

যা হারামের কারণ তাও হারাম

হারামের ব্যাপারে কৌশল অবলম্বনও হারাম

নিয়ত ভাল হলেই হারাম জিনিস হালাল হয়ে যায় না

হারাম জিনিস থেকে নিজকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে সন্দেহের জিনিসমূহ পরিহার করে চলা

হারাম সকলের জন্যেই হারাম

প্রয়োজন তীব্র হলে অনেক নিষিদ্ধ জিনিসও মুবাহ হতে পারে

 

সংজ্ঞা

হালালঃ মুবাহ, নিষিদ্ধ নয় এমন শরীয়াত প্রবর্তক যা করার অনুমতি দিয়েছেন কিংবা যা করতে নিষেধ করেন নি।

হারামঃ শরীয়াতদাতা যা স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, যা করলে পরকালে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। অনেক সময় দুনিয়ায়ও দণ্ড ভোগ করতে হবে।

মাকরূহঃ যে কাজ করতে শরীয়াতদাতা নিষেধ করেছেন, কিন্তু খুব কড়াকড়িভাবে নিষেধ করেন নি। হারামের তুলনায় এর নিষিদ্ধতা অনেক কম ও ক্ষীণ। হারাম কাজ করলে যে শান্তি প্রাপ্য, মাকরূহ করলে তা পেতে হয় না। তবে ক্রমাগতভাবে মাকরূহ কাজ করতে থাকলে হারাম কাজের শাস্তি ভোগ করতে হবে।

ইসলাম-পূর্ব লোকেরা বহু দিক দিয়েই চরম গুমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। হালাল-হারামের ব্যাপারটি ছিল তন্মধ্যে অন্যতম। এ পর্যায়ে তাদের গুমরাহীর রূপ ছিল এই যে, তারা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল মনে করে নিয়েছিল। এ ব্যাপারে সাধারণ মুশরিক এবং আহলে কিতাব ইয়াহূদী ও খ্রীস্টান সকলেরই দৃষ্টিকোণ ছিল সম্পূর্ণ অভিন্ন। এ গুমরাহী দুটি চরম প্রান্তিকে উপনীত হয়েছিল। ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ ও খ্রীস্টীয় বৈরাগ্যবাদ পৌঁছে গিয়েছিল চরমে। যেসব ধর্মমতে দেহকে কষ্ট ও পীড়ন দান বৈধ ছিল, উত্তম খাদ্য-বস্ত্র ও অলংকার-চাকচিক্যমণ্ডিত জিনিসপত্র ব্যবহার করাকে হারাম ঘোষণা করেছিল, তাও ছিল সেই চরমেই উপনীত। কোন কোন বৈষ্ণব-বৈরাগীর মতো পা ধোয়া এবং গোসল করাও গুনাহের কাজরূপে নির্দিষ্ট হয়েছিল।

পারস্যে মুজ্‌দাক ধর্মমত ছিল অপর এক প্রান্তিক সীমায় অবস্থিত। এ মতে সব কিছুই ছিল ‘মুবাহ’- বৈধ- বলে বিবেচিত। কোন কিছুই নিষিদ্ধ ছিল না। মানুষের ইয্‌যত-আবরূ মানুষের কাছে অতীব পবিত্র ও সম্মানার্হ বিষয় হলেও তা ক্ষুণ্ন বা নষ্ট করা এ ধর্মমতের দৃষ্টিতে কিছুমাত্র অন্যায় ছিল না।

জাহিলিয়াতের যুগে আরবরা হালাল-হারামের একটা সম্পূর্ণ ভুল মানদণ্ড ঠিক করে নিয়েছিল। তাদের মত মদ্যপান, বেশি বেশি সুদ খাওয়া, নারীদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন কিংবা তাদের সাথে নির্যাতনমূলক আচরণ ও সন্তান হত্যা প্রভৃতি ধরণের জঘন্যতম কাজেও কিছুমাত্র দোষ বা আপত্তি ছিল না। সন্তান হত্যার ন্যায় জঘন্য ও বীভৎস কাজকে লোভনীয় আকর্ষনীয় ও গৌরবজনক কাজরূপে চিত্রিত করা হয়েছিল। এজন্যে পিতৃ হৃদয়ে একবিন্দু মমতাও থাকত না এবং এ জঘন্য কাজ থেকে তাদের বিরত রাখতে পারত না। এ পর্যায়েই কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

وَكَذَٰلِكَ زَيَّنَ لِكَثِيرٍ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ قَتْلَ أَوْلَادِهِمْ شُرَكَاؤُهُمْ لِيُرْدُوهُمْ وَلِيَلْبِسُوا عَلَيْهِمْ دِينَهُمْ

এবং এমনিভাবে তাদের শরীকরা বহু সংখ্যক মুশরিকদের জন্যে তাদের নিজেদের সন্তানকে হত্যা করার কাজকে খুবই আকর্ষণীয় বানিয়ে দিয়েছে যেন তারা তাদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত করে, এবং তাদের নিকট তাদের দ্বীনকে সন্দেহপূর্ণ বানিয়ে দেয়। (সূরা আনআমঃ ১৩৭)

এ উদ্দেশ্যে তখন কতিপয় কথা রচনা করে তার বৈধতা প্রমাণ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। আর সে কথাগুলো হচ্ছে, অভাব-অনটন ও দারিদ্রের আশংকা, কন্যা সন্তান হওয়াটা লজ্জার কারণ প্রভৃতি। নিজেদের উপাস্যদের নৈকট্য লাভ করার উদ্দেশ্যে সন্তানদের বলিদান করতেও তারা কুণ্ঠিত হতো না। বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, একদিকে তারা কলিজার টুকরা সন্তান হত্যা করা কিংবা জীবন্ত প্রোথিত করাকে সম্পূর্ণ বৈধ মনে করে নিয়েছিল। অপরদিকে তারা বহু প্রকারের পবিত্র ও হালাল ফসল এবং জন্তু ভক্ষণকে নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছিল। আর চরম মাত্রার বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এ নিষেধের কথাকে তারা দ্বীনের বিধান বলে প্রচার করে বেড়াত। তাদের দাবি ছিল, স্বয়ং আল্লাহ্‌ই এ সব জিনিস হারাম করে দিয়েছেন।

কিন্তু এ কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাদের এ দাবির প্রতিবাদ করে ইরশাদ করেছেনঃ

وَقَالُوا هَٰذِهِ أَنْعَامٌ وَحَرْثٌ حِجْرٌ لَّا يَطْعَمُهَا إِلَّا مَن نَّشَاءُ بِزَعْمِهِمْ وَأَنْعَامٌ حُرِّمَتْ ظُهُورُهَا وَأَنْعَامٌ لَّا يَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا افْتِرَاءً عَلَيْهِ ۚ سَيَجْزِيهِم بِمَا كَانُوا يَفْتَرُونَ

আর তারা বলত এসবই চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত্রের ফসল হারাম। তা খেতে পারবে না কেউ- তবে আমরা যাদের চাব তারা খাবে। এটা তাদের মনগড়া ধারণা। আরও কতিপয় জন্তু রয়েছে, যাদের পৃষ্ঠকে হারাম করা হয়েছে, এছাড়া যেসব জন্তুর ওপর যবাই করা কালে আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করে না আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করতে গিয়ে, তাদের এ মিথ্যা আরোপের প্রতিফল তাদের অবশ্যই দেয়া হবে। (সূরা আনআমঃ ১৩৮)

যেসব জিনিস হারাম হওয়া উচিত, তাকে যারা হালাল করে নিয়েছে এবং যা হালাল হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাকে যারা হারাম করে নিয়েছে, তারা যে সত্য পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে, কুরআন মজীদ তা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে। কুরআন বলছেঃ

……….. (আরবী) ……….

যেসব লোক নির্বুদ্ধিতার কারণে কোনরূপ জ্ঞান ও যুক্তি ব্যতীত নিজেদের সন্তান হত্যা করছে িএবং আল্লাহর দেয়া রিযিককে হারাম গণ্য করেছে- আল্লাহ সম্পর্কে ভিত্তিহীন মনোভাব পোষণ করে, তারা ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরা সকলেই গুমরাহ হয়ে গেছে এবং কখনও হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে না।

ইসলাম যে অবস্থার মধ্যে নাযিল হয়েছিল, তখন তা হালাল-হারাম নির্ধারণে এরূপ বিকৃতি ও গুমরাহীরই সম্মুখীন হয়েছিল। এমন কিছু ভিত্তি রচনা করতে হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করে এ হালাল-হারামের ব্যাপারটি চূড়ান্ত মীমাংসা হতে পারে। তার জন্যে একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হয়েছে। তার ওপর রেখে প্রতিটি ব্যাপারকে সুষ্ঠুভাবে যাচাই করা হয়েছে। এ জন্যে সুবিচারের মাপকাঠি সর্বসমক্ষে দাঁড় করাতে হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে অতীব ভারসাম্যপূর্ণভাবে হালাল-হারাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলেই মুসলিম উম্মতকে ‘মধ্যম নীতি অবলম্বনকারী জাতি’- (আরবী) বলে ঘোষণা করা শোভনীয় হয়েছিল। কেননা একদিকে রয়েছে গুমরাহ্‌-পথভ্রষ্ট জাতি; অপরদিকে বিকৃতকারী জাতি- ডানে ও বামে। আর তার মাঝখানে মুসলিম জাতির অবস্থিতি। তারা উভয় দিকের দোষমুক্ত। এ জন্যেই আল্লাহ তাদের ‘উত্তম জাতি’ নামেও অভিহিত করেছেন। বলেছেন, বিশ্বমানবতার কল্যাণের উদ্দেশ্যেই এ জাতির সৃষ্টি।

. সব জিনিসের ব্যাপারেই মৌল নীতি হচ্ছেতা মুবাহ

শরীয়াতের বিধান প্রণয়নে ইসলামের সর্বপ্রথম মৌল নীতি হচ্ছে আল্লাহ্‌ তা’আলা মানুষের জন্যে যত জিনিসই সৃষ্টি করেছেন, তা সবই হালাল ও মুবাহ্‌। শরীয়াতের বিধান রচয়িতার অকাট্য, সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত ঘোষণায় যদি কোনটিকে ‘হারাম’ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে তবে কেবল সেটিই হারাম। কিন্তু কোন বিষয়ে যদি অকাট্য কোন ঘোষণা প্রমাণিত না হয় কিংবা কোন দলিল থেকে যদি অকাট্য কোন ঘোষণা প্রমাণিত না হয় কিংবা কোন দলিল থেকে যদি সুস্পষ্টভাবে কোন জিনিসের হারাম হওয়ার কথা নিঃসন্দেহে জানা না যায়, তাহলে তার তার মৌল অবস্থা- মুবাহ্‌ হওয়ার অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তাকে হারাম বলা যাবে না। কোন যয়ীফ হাদীস এক্ষেত্রে দলিল হিসেবে গ্রহণীয় হতে পারে না।

আল্লাহ্‌ সৃষ্ট সব জিনিসই যে মূলগতভাবে হালাল তা কোন মনগড়া কথা নয়। তা কুরআন মজীদের বহু কয়টি আয়াতে সুস্পষ্ট ঘোষণা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এ পর্যায়ের কয়েকটি আয়াত এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছেঃ

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا

সেই মহান আল্লাহ্‌ই তোমাদের (ভোগ-ব্যবহারের) জন্যে সৃষ্টি করেছেন সে সব কিছুই যা আছে এ পৃথিবীতে। (সূরা বাকারাঃ ২৯)

وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِّنْهُ

নভোমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তার সব কিছুই আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্যে কর্মে নিরত করে রেখেছেন। (সূরা জাছিয়াহঃ ১৩)

أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً

তুমি কি লক্ষ্য করনি, নভোমণ্ডলে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ্‌ তা’আলা মানুষের কল্যাণের জন্যে নিয়োজিত করে রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি বাহ্যিক ও গোপনীয়- দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান নিয়ামতসমূহ উদারভাবে ঢেলে দিয়েছেন? (সূরা লোকমানঃ ২০)

এ সব ঘোষণা থেকে সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীস্থ সব কিছুই আল্লাহ্‌ তা’আলা মানুষের জন্য- মানুষের কল্যাণের ও রোগ-ব্যবহারের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন, কর্মে নিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ কথা বলে আল্লাহ্‌ মানুষের প্রতি তাঁর অপরিসীম অনুগ্রহের কথাই জানিয়ে দিয়েছেন। তাহলে বিশ্বলোকের সব কিছুই মানুষের জন্যে অবশ্যই হালাল হবে। তার কোন একটির ভোগ-ব্যবহার মানুষের নিষিদ্ধ হতে পারে না, সব কিছুর পক্ষেই আল্লাহ্‌র অনুমতি নিরাজিত। এ সবই তো আল্লাহর দেয়া নিয়ামত। তা যদি নিষিদ্ধই হবে, তাহলে তা সব মানুষের জন্যে সৃষ্টি করার কথা বলার কি তাৎপর্য থাকতে পারে?

তবে আল্লাহ নিজেই যদি সৃষ্ট সব কিছুর মধ্য থেকে কিছু কিছু জিনিস হারাম করে দিয়ে থাকেন, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। এরূপ কোন কোন জিনিস বিশেস কারণে ও বিশেষ কল্যাণ-উদ্দেশ্যে হারাম করে দিয়ে থাকলে তা অবশ্যই মানতে হবে। তা সাধারণভাবে হালাল কর দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মাত্র এবং সে ব্যতিক্রমের মূলে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে বলে মনে করতে হবে।

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলামী শরীয়াতে হারামের পরিধি খুব বেশি সংকীর্ণ। হালালের ক্ষেত্র বিপুলভাবে বিস্তীর্ণ ও প্রশস্ত। কেননা সুস্পষ্ট অকাট্য ভাষায় হারাম ঘোষণাকারী আয়াত খুবই অল্প এবং তা কয়েকটি মাত্র। ইতিবাচকভাবে যে সব বিষয়ে নতুন করে কিছু বলা হয়নি- না হালাল, না হারাম, তা তো সে মৌল নীতির ভিত্তিতেই বিবেচিত হবে। আল্লাহ্‌র ক্ষমার সীমার মধ্যে গণ্য হবে।

এই পর্যায়ে রাসূলে কারীম সা.- এর ঘোষণাও উল্লেখ্য। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ

……… (আরবী)……….

আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, যা হারাম করেছেন তা হারাম। আর যে বিষয়ে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তাতে ক্ষমা রয়েছে। অতএব তোমরা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে তাঁর ক্ষমা গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ্‌ তো কোন কিছু ভুলে যান না- (ভুলবশত বলেন নি এমন তো হতে পারে না)। এ কথার প্রমাণ হিসেবে তিনি পাঠ করলেনঃ ‘‘তোমাদের প্রভু ভুলে যান না।’’ (কুরআনের একটি আয়াতের অংশ)

হযরত সালমান ফারসী বর্ণনা করেছেনঃ

………….. (আরবী)………….

রাসূলে কারীম সা. কে চর্বি, মাখন, পনির ও কোমল পশু লোমের তৈরী বস্ত্রাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ্‌ তাঁর কিতাবে যা হালাল ঘোষণা করেছেন, তা হালাল। যা হারাম ঘোষণা করেছেন তাঁর কিতাবে, তা হারাম। আর যে বিষয়ে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তা সেসব জিনিসের মধ্যে গণ্য যা করলে আল্লাহ্‌ ক্ষমা করে দেবেন।

প্রশ্নের উত্তরে রাসূলে করীম সা. এক-একটি জিনিস সম্পর্কে কোন কথা বলেন নি। এ পর্যায়ে শাশ্বত নীতিই তিনি ঘোষণা করলেন, যে নীতির ভিত্তিতে হালাল-হারাম নির্ধারিত হয়ে থাকে এবং হওয়া উচিত। আল্লাহ কোন্‌ কোন্‌ জিনিস হারাম করেছেন, তা এ মূলনীতির ভিত্তিতে অতি সহজেই নির্ধারিত হতে পারে। আর অতঃপর যে সব বিষয়ে হারামের কোন ঘোষণা পাওয়া যাবে না, তা সবই হালাল বলে বিবেচিত হবে।

নবী কারীম সা. বলেছেনঃ

………… আরবী ………….

আল্লাহ তা’আলা কতগুলো কাজকে ফরয করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা তা নষ্ট করে ফেল না। তিনি কতগুলো সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তোমরা সে সীমা লংঘন করো না। কিছু কিছু জিনিসকে তিনি হারাম করেছেন, তোমরা তার বিরোধিতা করো না। আর তোমাদের প্রতি অনুগ্রহবশত- না ভুলে গিয়ে অনেক বিষয়ে তিনি পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। অতএব সে বিষয়ে তোমরা বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

এ পর্যায়ে আমি একটি বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই। ‘মৌলিকভাবে সব কিছুই মুবাহ্‌’ কথাটি কতগুলো দ্রব্য-সামগ্রীর ব্যাপারেই প্রযোজ্য নয়। যাবতীয় কাজকর্ম, হস্তক্ষেপ, পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি- যা ইবাদতের ব্যাপারসমূহে গণ্য নয় সেক্ষেত্রেও এ মৌল নীতিটি প্রযোজ্য। এগুলো আমরা বলি আদত-অভ্যাস, পারস্পরিক কার্যাদি। এসবের মূল কথা হলো, আসলে তা সবই অ-হারাম- শর্তহীনভাবেই তা হালাল। তবে শরীয়াতদাতা যদি কোন কাজকে হারাম ঘোষণা করে থাকেন এবং কোন বিষয়ে কোন শর্ত আরোপ করে থাকেন, তবে তা অবশ্যই হারাম হবে এবং সে শর্তকে অবশ্যই মানতে হবে। এ পর্যায়ে আল্লাহ্‌র ঘোষণা হচ্ছেঃ

…………. আরবী …………..

তোমাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছে, তার সব কিছুই সুস্পষ্ট করে তিনি তোমাদের বলে দিয়েছেন।

এ ঘোষণা দ্রব্যাদি ও কার্যাদি উভয় ব্যাপারেই প্রযোজ্য। কিন্তু ইবাদতের ব্যাপার এ থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। কেননা তা-ই হচ্ছে আসল দ্বীন- দ্বীনের মৌল ব্যাপার আর তা কেবলমাত্র ওহীর সূত্রেই লাভ করা যেতে পারে। ওহীর মাধ্যমে যা ইবাদত বলে জানা যায়নি, তা কখনই এবং কোনক্রমেই ইবাদতের মধ্যে গণ্য হতে পারে না। এ সম্পর্কে রাসূলে কারীম সা.- এর ঘোষণা হচ্ছেঃ

………… আরবী …………..

আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে শামিল নয় এমন কোন জিনিস যদি কেউ দ্বীনের মধ্যে নতুন করে উদ্ভাবন করে তবে তা অবশ্যই প্রত্যাখাত হবে। (বুখারী, মুসলিম)

কেননা প্রকৃত দ্বীন দুটো কাজের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। একটি হচ্ছে এই যে, বন্দেগী করা হবে কেবলমাত্র এক আল্লাহ্‌র- এক আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো বন্দেগী করা হবে না। এবং দ্বিতীয়টি এই যে, কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র বন্দেগী করা হবে কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র দেয়া বিধান অনুযায়ী, অন্য কোনভাবে নয়। কাজেই কেউ যদি নিজের পক্ষ থেকে ইবাদতের কোন পন্থা বা অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করে- সে যে-ই হোক না কেন- তা গুমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয়। তা গ্রহণ করা নয়, প্রত্যাখ্যান করতে হবে ঈমানদার লোকদের। কেননা শরীয়াতের বিধান রচয়িতা তো কেবলমাত্র আল্লাহ্‌। তিনিই ইবাদত পাওয়ার অধিকারী, ইবাদতের পন্থা ও নিয়ম কেবল তিনিই বলে দিতে পারেন, অন্য কেউ নয়। আর তাঁর প্রদর্শিত পথ-পন্থা ও নিয়মে ইবাদত করা হলেই তা তাঁর কাছে গৃহীত হতে পারে, কেবল সেই ইবাদতের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জিত হতে পারে।

তবে সাধারণ অভ্যাস-আদত কিংবা পারস্পরিক লেনদের সম্পর্ক বিনিময় প্রভৃতি পন্থা ও পদ্ধতির উদ্ভাবক মানুষ নিজে, শরীয়তদাতা নন। শরীয়াতদাতা এ পর্যায়ে শুধু বলে দেবেন কোন্‌ পন্থা- পদ্ধতি বা নিয়ম ঠিক- যথার্থ এবং কোন্‌টি যথার্থ নয়। যে ধরণের কাজ বিপর্যয় ও ক্ষতি মুক্ত সেগুলোকে তিনি বহাল রাখারই পক্ষপাতী।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেনঃ বান্দাদের কথাবার্তা ও কাজকর্ম সংক্রান্ত তৎপরতা দু’ধরণের। কতগুলো আছে ইবাদত, যদ্দারা লোকদের দ্বীনী অবস্থার সংশোধন সাধিত হয়। আর কতগুলো আছে আদত-অভ্যাস, দুনিয়ায় বসবাস করার জন্যে তা মানুষের জীবনে জরুরী। এ পর্যায়ে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ হল আল্লাহ যেসব ইবাদত ফরয করে দিয়েছেন কিংবা যা তিনি পছন্দ করেন, তা শরীয়তের বিধঅন ব্যতীত অন্য কোনভাবে প্রমাণিত হতে পারে না।

তবে মানুষের আদত-অভ্যাস সংক্রান্ত ব্যাপারাদির কথা স্বতন্ত্র। কেননা তা তো মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে নিজেরাই উদ্ভাবন করে। এসব উদ্ভাবনের পর্যায়ে প্রশ্ন থাকবে শুধু এই যে, তা যেন শরীয়তের পরিপন্থী না হয়। আর আল্লাহ্‌ স্বয়ং যে বিষয়ে কোন আপত্তি করেন নি, সে বিষয়ে অপর কারো আপত্তির কোন গুরুত্ব থাকতে পারে না। আদেশ-নিষেধ- উভয়টিই শরীয়তের বিধান। ইবাদত হবে শুধু সেসব কাজ, যার নির্দেশ দেননি, সে বিষয়ে নিষেধবাণী উচ্চারণ করার অন্য কার কি অধিকার থাকতে পারে?

এ কারণে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. প্রমুখ হাদীস-পারদর্শী ফকীহ্‌গণ বলতেন যে, ইবাদতসমূহ মূলত ওহী সূত্রে প্রমাণিত। কাজেই শরীয়তের বিধান শুধু তাই, যার পক্ষে শরীয়তের কোন ফয়সালা এসেছে। যে সম্পর্কে তেমন কিছুই নেই, তাকে শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত মনে করা আল্লাহ্‌র ওপর কর্তৃত্ব করার শামিল। এ পর্যায়েই আল্লাহ্‌র এ আয়াত ঘোষিত হয়েছেঃ

أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ

ওদের জন্যে এমন সব শরীক উপাস্য আছে নাকি, যারা ওদের জন্যে এমন বিধান রচনা করে দিয়েছে, যার কোন অনুমতিই আল্লাহ্‌ দেন নি? (সূরা শূরাঃ ২১)

এ কারণেই মানুষের সাধারণ আদত-অভ্যাসের ব্যাপারটি ভিন্নতর। আসলে তা সবই মুবাহ- দোষমুক্ত, অনির্দিষ্ট। তার মধ্য থেকে যে যেটিকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন, কেবল সে সেটিই হারাম হবে, অন্য কিছু নয়। এ কথাকে সত্য না মানলে আমাদের প্রতি এ আয়াতটি প্রযোজ্য হবেঃ

قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا

আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্যে যে রিয্‌ক নাযিল করেছেন, তন্মধ্য থেকে কিছু তোমরা হারাম বানিয়েছ আর কিছু হালাল? …….এটা কি রকম কাজ তা কি তোমরা ভেবে দেখেছ? (সূরা ইউনুসঃ ৫৯)

এ হচ্ছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক কল্যাণবহ মৌল নীতি বিশেষ। এ মৌল নীতির ভিত্তিতে আমরা বলবো, ক্রয়-বিক্রয়, হেবা, ইজারা ইত্যাদি মানুষেল সামাজিক জীবনের আদত-অভ্যাস বা প্রচলনের ব্যাপার। এ দুনিয়ায় জীবন যাপনের জন্যে এগুলো মানুষকে মেনে চলতে হয়- যেমন পানাহার ও পোশাক পরিধান মানুষের অপরিহার্য হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে শরীয়ত উত্তম ও সুষ্ঠু নিয়মাদি শিক্ষা দিয়েছে। তাই যে যে ক্ষেত্রে কোনরূপ বিপর্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে শরীয়ত তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে এবং যা একান্তই জরুরী তা অপরিহার্য কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে। অতঃপর যা যা অবাঞ্ছনীয় দেখা গেছে, সে সবকে ‘মাকরূহ’ বলেছে আর যে যে কাজে সার্বিক কল্যাণ লক্ষ্য করা গেছে, সেগুলোকে বলেছেন মুস্তাহাব। ফলে এক্ষেত্রের কাজগুলোকে আমূল উৎপাটিত করার বা নতুন করে ঢালাই করার প্রয়োজন হয়নি।

এ সত্য প্রতিভাত হওয়ার পর বলা যায়, লোকেরা নিজেদের ইচ্ছেমত লেন-দেন, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও মজুরী বিনিময়ে কাজ করার জন্যে সম্পূর্ণ স্বাধীন, যতক্ষণ না শরীয়ত তার কোন কাজকের হারাম বলে ঘোষণা করছে। লোকদের পানাহারের ব্যাপারটির দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে যা যা হারাম, তা পরিহার করে চললেই হলো। এ ছাড়া এক্ষেত্রে আর কোন বিধি-নিষেধের নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে বাধ্য করা হয়নি। ফলে তা সবেই মৌলিকভাবে মুবাহ-অনিষিদ্ধ।

………….. আরবী ………….

এ মৌল নীতির ভিত্তিতে ইবনে তাইমিয়ার ছঅত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এবং হাম্বলী মাযহাবের সব ফিকাহবিদই বলেছেনঃ

………….. আরবী ………….

চুক্তি ও শর্তাদি মূলত সবই মুবাহ। যে চুক্তি সম্পর্কে শরীয়ত কোন আপত্তি করেনি এবং যা হারাম ঘোষিত হয় নি, তা সবই হালাল।

সহীহ্‌ হাদীস থেকেও এ মৌল নীতির সমর্থন পাওয়া যায়। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্‌ বলেছেনঃ

……………. আরবী …………….

আমরা আযল করছিলাম, তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল। নিষেধ করার মতো কিছু থাকলে কুরআন তা অবশ্যই নিষেধ করে দিত। [তাই বলে আযল নিষিদ্ধ নয়, এমন কথা বলা যাবে না কেননা হাদীসটি প্রাথমিক পর্যায়ের পরে অন্যান্য হাদীসে তার নিষেধও বর্ণিত হয়েছেঅনুবাদক]

এ থেকে শুধু এতটুকুই প্রমাণ করতে চাচ্ছি যে, যে বিষয়ে ওহীসূত্রে কোন নিষেধ আসেনি তা অনিষিদ্ধ, তা হারাম নয়। নিষেধকারী কোন ঘোষণা নাযিল না হওয়া পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ জায়েয। শরীয়ত সম্পর্কে এ ছিল সাহাবীদের বিশ্বাস এবং তাঁরা যে শরীয়তের মূলতত্ত্ব যথার্থ বুঝতে পেরেছিলেন, তা এ কথা থেকেই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

মোটকথা এ সব দৃষ্টান্ত ও দলিল থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, সে ইবাদত ও সে নিয়মের ইবাদতই শরীয়তসম্মত, যা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। আর মানুষের আদত-অভ্যাসের মধ্য থেকে হারাম শুধু তা-ই যা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা হারাম ঘোষনা করেছেন। আল্লাহ্‌ যা হারাম করেন নি, তা কখনই হারাম হতে পারে না।

. হালালহারাম ঘোষণা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ্

আল্লাহ্‌র ইসলাম দ্বিতীয় মৌল নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে যে, হালাল-হারাম ঘোষণা করার অধিকার কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলার। সৃষ্টির হাত থেকে এ কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। আল্লাহ্‌র দ্বীনের বা বৈষয়িকতার দৃষ্টিতে তার মর্যাদা যা-ই হোক না কেন, এ অধিকার কারোরই নেই। এ কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র অধিকার বলে স্বীকৃতব্য। আলেম, পীর-দরবেশ, রাজা-বাদশাহ্‌, নেতা, আল্লাহ্‌র বান্দাদের ওপর কোন কিছু হারাম করার কোন অধিকার কারো নেই। যদি কেউ তা করার দুঃসাহস করে তাহলে বুঝবে হবে সে আল্লাহ্‌র নির্ধারিত সীমা লংঘন করছে। দ্বীনী আইন-বিধান প্রণয়নে আল্লাহ্‌র নিরংকুশ অধিকারকে যারা কেড়ে নিতে চাচ্ছে, তাদের এ কাজকে যারা খুশি মনে মেনে নেবে ও গ্রহণ করবে, অনুসরণ করবে, তারা আল্লাহর সাথে তাদের শরীক করার মতো মারাত্মক অপরাধ করবে। শিরকের এ অপরাধ আল্লাহ্‌ কিছুতেই ক্ষমা করবে না। সূরা আশশুরার পূর্বোদ্ধৃত আয়াতটি এখানেও পঠিতব্যঃ

أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ.

ওদের কি এমন শরীক বা উপাস্য আছে নাকি, যারা ওদের জন্যে দ্বীনের এমন বিধান রচনা করে দিচ্ছে, যার জন্যে আল্লাহ্‌ কোন অনুমতিই দেন নি? ইয়াহূদী ও খ্রীস্টানরা হালাল-হারাম নির্ধারণের নিরংকুশ কর্তৃত্ব দিয়েছিল তাদের পাদ্রী ও পণ্ডিতদের। কুরআন মজীদ এ দিকে ইঙ্গত করেই বলেছেঃ

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

ওরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে ওদের পাদ্রী-পণ্ডিতদের খোদা বানিয়ে নিয়েছে আর ঈসা মসীহ্‌কে। অথচ ওদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কেবলমাত্র এক আল্লাহ্‌র দাসত্ব ও বন্দেগী করতে। আসলে সে আল্লাহ্‌ ছাড়া ইলাহ আর কেউ নয়- নেই। তিনি সর্বাত্মকভাবে পবিত্র, ওদের শিরকের অনেক ঊর্ধ্বে তিনি। (সূরা তাওবাঃ ৩১)

আলী ইবনে হাতিম পূবে খ্রীস্ট ধর্ম অবলম্বনকারী ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে যখন দেখতে পেলেন, নবী করীম সা. উক্ত আয়াত পড়ছেন, তখন তিনি বললেনঃ

………… আরবী ……………..

হে রাসূল! ওরা তো ওদের পাদ্রী-পণ্ডিতদের ইবাদত করেনি?

রাসূলে কারীম সা. জবাবে বললেনঃ তাই নাকি? এ পাদ্রী-পণ্ডিতরাই তো ওদের জন্যে হালাল-হারাম নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং ওরা তা-ই সাগ্রহে ঐকান্তিকভাবে মেনে নিয়েছে। আর কুরআনে এটাকেই বলা হয়েছে ওদের ‘ইবাদত’ অর্থাৎ এরূপ করাই ইবাদত। ‘ইবাদত’ বলতে যা বোঝায়, তা ওরা করেছে সেই পাদ্রী-পণ্ডিতদের। [তিরমিযী প্রভৃতি]

অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবী কারীম সা. উপরিউক্ত আয়াতটির ব্যাখ্যা দান পর্যায়ে বলেছেনঃ

…………….. আরবী ……………..

ওরা ওদের পাদ্রী-পণ্ডিতদের বন্দেগী করত না, এ কথা কি সত্য? কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ পাদ্রী-পণ্ডিতরা যখন কোন জিনিসকে তাদের জন্যে হালাল ঘোষণা করত, তখন তারাও সেটাকে হালালরূপে গ্রহণ করে নিত এবং অনুরূপভাবে যখন ওরা তাদের জন্যে কোন জিনিসকে হারাম বলে দিত, অমনি তারা সেটাকে হারাম মেনে নিত। বস্তুত কাউকে এরূপ অধিকার বা মর্যাদা দানই হচ্ছে তার ইবাদত করা।

খ্রীস্টানরা চিরকাল এ বিশ্বাসই পোষণ করে আসছে যে, হযরত ঈসা মসীহ্‌ আ. ঊর্ধ্বলোকে চলে যাওয়ার পূর্বে তাঁর ছাত্র-সাগরিদদের হালাল-হারাম করার পূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়ে গেছেন। তারা নিজেদের ইচ্ছেমত হালাল-হারাম ঘোষণা করতে পারে। ইঞ্জিল মথি গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছেঃ

আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, তোমরা পৃথিবীতে যাহা কিছু বন্ধ করিবে, তাহা স্বর্গে বন্ধ হইবে এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু মুক্ত করিবে, তাহা স্বর্গে মুক্ত হইবে।

মুশরিকদের সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছে- তারা আল্লাহ্‌র অনুমতি ব্যতিরেকে নিজরোই হালাল-হারাম নির্ধারণ করেছে।

ইরশাদ করা হয়েছেঃ

قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ ۖ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ

তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ্‌ তোমাদের রিয্‌ক যে দিয়েছেন, তার মধ্যে হালাল-হারাম তোমরা নির্ধারিত করে নিয়েছে? বল, আল্লাহ কি তোমাদের তা করার অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা কথা বানিয়ে বলেছ? (সূরা ইউনূসঃ ৫৯)

আল্লাহ আরও বলেছেনঃ

وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ

তোমাদের মুখে যা আসে তা-ই বলে দিও না- এটা হালাল ও এটা হারাম। এতে আল্লাহর নামে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা চালানো হবে। আর যারাই আল্লাহ্‌র নামে এ ধরণের মিথ্যা কথা প্রচার করে, তারা কখনই কল্যাণ বা সাফল্য লাভ করতে পারে না। (সূরা নহলঃ ১১৬)

এ সব সুস্পষ্ট অকাট্য আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে নিঃসন্দেহে জানতে ও বুঝতে পারা যায় যে, হালাল-হারাম নির্ধারণ ও ঘোষণার একমাত্র অধিকার মহান আল্লাহ্‌র। একমাত্র আল্লাহ্‌ ছাড়া এ অধিকার অন্য কারো নেই, থাকতে পারে না। তিনি নিজেই এ কাজ করেছেন এবং তা তিনি তাঁর নিজের কালাম কুরআন মজীদে বলে দিয়েছেন, না হয় তাঁর নবী-রাসূলের বাণীতে ঘোষণা করিয়েছেন। হালাল-হারাম করণ পর্যায়ে আল্লাহ্‌র সিদ্ধান্তকে লংঘন করার কোন অধিকারই কারো নেই। ফিকাহবিদগণ তা করেনও নি। কুরআন মজীদে বলেই দেয়া হয়েছেঃ

وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ

আল্লাহ যা কিছু তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন তা তিনি নিজেই সুস্পষ্ট ও ভিন্ন ভিন্ন করে তোমাদের জন্যে বলে দিয়েছেন। (সূরা আনআমঃ ১১৯)

বস্তুত হালাল-হারাম নির্ধারণও কি জায়েয, কি নাজায়েয, তা মৌলিকভাবে ও নিজস্ব মর্জি অনুযায়ী চিহ্নিত করার কোন অধিকার বা কর্তৃত্বই ফিকাহবিদদের নেই। কেননা এটা তো দ্বীনী শরীয়ত রচনা পর্যায়ের কাজ। ফিকাহবিদগণ ইজতিহাদ করতে পারেন, শরীয়তের ব্যাপারে তাঁদের মতামত- নেতৃত্ব স্বীকৃতব্য। তা সত্ত্বেও তাঁরা কোন বিষয়ে ফতোয়া দিতে রীতিমত ভয় পেতেন। একজনের কাছে ফতোয়া চাওয়া হলে তিনি অন্য জনের কাছে যেতে বলে নিজে এ কাজ এড়িয়ে যেতেন। কেননা তাঁদের ভয় ছিল, এ কাজ করতে গিয়ে কোন ভুল করে বসতে পারেন, হালালকে হারাম বা এর বিপরীত করার অপরাধ হয়ে যেতে পারে। আর তা করা কিছুতেই উচিত হতে পারে না।

ইমাম শাফঈ তাঁর (আরবী) গ্রন্থে ইমাম আবূ হানীফার ছাত্র কাযী আবূ ইউসূফের কথা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ

‘আমি বিপুল সংখ্যক সুবিজ্ঞ সুবিজ্ঞ ও দ্বীন পারদর্শীদের দেখেছি। তাঁরা ফতোয়া দেয়া পছন্দ করেন না। কোন জিনিসকে তাঁরা সরাসরি হালাল বা হারাম বলার পরিবর্তে কুরআনে যা আছে, কোনরূপ ব্যাখ্যা ছাড়া তা বলে দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করতেন। বিশিষ্ট তাবেয়ী আলেম ইবনুস সায়েব বলেছেনঃ তোমরা সে রকম লোক হবে না যে বলে, আল্লাহ্‌ অমুক জিনিসটি হালাল করেছেন কিংবা এটা আল্লাহর খুব পছন্দ। কেননা কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, ‘না আমি ওটাকে হালাল করেছিলাম, আর না ওটা আমার পছন্দ ছিল।’ তেমনি সে ব্যক্তির মতও যেন তোমার অবস্থা না হয়, যে বলে ‘অমুক জিনিসটা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, ‘তুই মিথ্যাবাদী, আমি তো ওটাকে হারাম করিনি, ও কাজ করতে নিষেধও করে দেইনি। কূফার প্রখ্যাত তাবেয়ী ফিকাহ্‌ বিশারদ ইবরাহীম নখয়ী সম্পর্কে উদ্ধৃত হয়েছে, তাঁর ছাত্র-শাগরিদগণ যখন ফতোয়া দিতেন, তখন, এটা মাকরূহ কিংবা এতে কোন দোষ নেই, প্রভৃতি ধরণের কথা বলতেন। কেননা কোন জিনিসকে হালাল বা হারাম বলে নির্ধারণ করার মত দায়িত্বহীন কাজ আর কিছু হতে পারে না।

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেনঃ

…………… আরবী …………..

যে জিনিসটার হারাম হওয়ার কথা নিশ্চিত-নির্দিষ্ট-অকাট্যভাবে জানা গেছে, কেবলমাত্র সেই জিনিসটা ছাড়া অন্য কোন জিনিসের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কালের মনীষীগণ কখনও হারাম শব্দটি প্রয়োগ করতেন না।

অনুরূপভাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র.- কে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জবাবে তিনি বলতেনঃ আমি ওটাকে মাকরূহ মনে করি অথবা আমি ওটাকে ভাল মনে করি না বা পছন্দ করি না’। ইমাম মালিক, ইমাম আবূ হানীফা ও অন্যান্য ইমামদের সম্পর্কেও এ কথাই সত্য।

. হালালকে হারাম হারামকে হালালকরণ শির্ পর্যায়ে অপরাধ

যে সব লোক নিজ নিজ স্বভাবে হালাল-হারামকরণের অধিকারী বলে নিজেদের মনে করে, ইসলাম তাদের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। বিশেষভাবে হালালকে যারা হারাম বলে, তাদের ওপর ইসলামের আক্রমণ অত্যন্ত কঠোর। কেননা এর ফলে মানুষ অকারণ সংকীর্ণতা ও কৃচ্ছ্রতার মধ্যে পড়ে যায়, অথচ আল্লাহ্‌ তো বিপুল প্রশস্ততা দান করেছেন। এরূপ নীতির ফলে লোকদের মনে ভিত্তিহীন কৃচ্ছ্রতা ও সূক্ষ্ণতা অবলম্বনের প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠে অথচ নবী করীম সা. এ কৃচ্ছ্রতা সূক্ষ্ণতি সূক্ষ্ণতার প্রবণতাকে কঠোর ভাষায় পরিহার করে চলতে বলেছেন। এ নীতি অবলম্বনকারীদের প্রতি তিনি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ

……………. আরবী …………..

সাবধান! দ্বীন-ইসলামের খুঁটিনাটি ব্যাপারে কঠোরতাকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে ধ্বংস হয়ে গেছে.. ধ্বংস হয়ে গেছে। (মুসলিম, আহমাদ, আবূ দাউদ)

তিনি মুহাম্মাদী রিসালাতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

……………. আরবী …………..

আমি এমন এক দ্বীনসহ প্রেরিত হয়েছি, যা একমুখী, ঐকান্তিক ও সুপ্রশস্ত।

বস্তুত দ্বীন ইসলাম যে আকীদা-বিশ্বাস ও তওহীদ-স্রষ্টাকে সর্বদিক দিয়ে এক ও অংশীদারহীন মান্য করার ব্যাপারে একক আদর্শবাদী এবং শরীয়াত ও কর্মবিধানের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদার ও প্রশস্ত, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। শিরক এবং হালালকে হারাম করণের কাজটি তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

একটি হাদীসে নবী কারীম সা. জানিয়েছেন, আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

………………. আরবী ………………..

আমি আমার বান্দাদের একমুখী ঐকান্তিক আদর্শের ওপর সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তানেরা তাদের প্ররোচিত ও বিভ্রান্ত করেছে। তাদের ওপর সেসব জিনিসকে হারাম করে দিয়েছে, যা আমি হালাল করেছিলাম। তাদের হুকুম দিয়েছে আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক বানাবার, যাদের আমার সাথে শরীক হওয়ার কোন সনদ আমি কখনোই নাযিল করিনি। (মুসলিম)

এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, হালালকে হারাম বলা শিরক পর্যায়ের কাজ। আরব মুশরিকরা যে শিরক করত, মূর্তিপূজা করত, ক্ষেত-ফসল ও জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় পবিত্র জিনিসগুলোকে নিজেদের জন্যে হারাম বানিয়ে নিয়েছিল, কুরআন মজীদ সেজন্যে তাদের প্রতি তীব্র রোষ প্রকাশ করেছে। কেননা এগুলো সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা’আলা কোন সনদ বা সমর্থন নাযিল করেন নি। বহীরা, সায়েরা, অসীলা ও হাম- এসবই ছিল তাদের হারাম করা জন্তুগুলোর নাম। উষ্ট্রী পাঁচটি বাচ্চা প্রসব করলে ও শেষ বাচ্চাটি পুরুষ হলে এ মুশরিকরা সে উষ্ট্রীটির কান কেটে দিত। তার পৃষ্ঠে সওয়ার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের উপাস্য দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে মুক্ত করে দিত। অতঃপর সে উষ্ট্রীটিকে যবেহ করা বা তার ওপর বোঝা চাপানো সবই সম্পূর্ণ হারাম বলে ঘোষণা করত। পানি-ঘাট কিংবা চারণভূমি থেকে সেটাকে তাড়ানও সম্ভবপর হতো না। এ উষ্ট্রীটির নাম দিত ‘বহীরা’ অর্থাৎ কান কাটা উষ্ট্রী। ‘সায়েরা’ বলা হতো সে উষ্ট্রীটিকে যেটিকে তার মালিক বিদেশ সফর থেকে ফিরে এসে বা রোগমুক্তি লাভ করে দেবতাদের নামে উৎসর্গ করে ছেড়ে দিত। ছাড়ী স্ত্রী ছানা প্রসব করলে নিজের অধিকারের মনে করত। আর পুরুষ ছানা প্রসব করলে মনে করত ওটার ওপর দেবতাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর পুরুষ স্ত্রী উভয় ধরণের ছানা প্রসব করলে পুরুষ ছানাকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলিদানের পরিবর্তে সেটাকে মুক্ত করে দিত। তখন সেটার নাম হত ‘অসীলা’। আর যে উষ্ট্রীর শাবকের শাবক বোঝা বহনের উপযুক্ত হতো সে বৃদ্ধা উষ্ট্রীকে বোঝা বহন ও সওয়ারীর কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ হয়ে যেত। এটারই নাম হতো ‘হাম’।

এভাবে এ জন্তুগুলোকে হারাম মনে করাকে কুরআন মজীদ তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেছে। পিতৃ পুরুষদের অন্ধ অনুসরণ করতে গিয়ে এ ধরণের কাজ করা যে কোনক্রমেই উচিত নয়, তা কুরআন মজীদ সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে। বলা হয়েছেঃ

مَا جَعَلَ اللَّهُ مِن بَحِيرَةٍ وَلَا سَائِبَةٍ وَلَا وَصِيلَةٍ وَلَا حَامٍ ۙ وَلَٰكِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۖ وَأَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ – وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَىٰ مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ قَالُوا حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۚ أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ –

আল্লাহ্‌ বহীরা, সায়েরা, অসীলা এবং হাম প্রভৃতি কিছুই বানান নি। এ কাফিররা আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। ওদের অধিকাংশই নির্বোধ। ওদের যখনই আহ্‌বান করা হয় যে, আল্লাহ্‌র নাযিল করা বিধান গ্রহণ কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, তখন ওরা বলে যে, আমাদের বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া রীতিনীতিই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। অথচ ওদের বাপ-দাদারা কিছুই জানত না, সত্য পথ-প্রাপ্তও ছিল না তারা, তা সত্ত্বেও কি ওরা তাদের পথ অনুসরণ করে চলতে থাকবে। (সূরা মায়িদাঃ ১০৩১০৪)

সূরা আলরাফ এ প্রকৃত হারাম জিনিসগুলোর উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ

বল, আল্লাহ্‌, তাঁর বান্দাদের জন্যে যেসব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন এবং যেসব পবিত্র রিয্‌কের ব্যবস্থা করেছেন, সে সবকে কে হারাম করে দিল? (সূরা আলআরাফঃ ৩২)

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ

বল, আমার রব্ব তো এসব জিনিস হারাম ঘোষণা করেছেন; নির্লজ্জতার কাজ, প্রকাশ্য বা গোপনীয় পাপ, অকারণ ও অন্যায় বাড়াবাড়ি, আর আল্লাহ্‌র সাথে শির্‌ক, যার সমর্থনে তিনি কোন সনদ নাযিল করেন নি। সেই সঙ্গে যা জানো না, তা আল্লাহ্‌র নামে বলা। (সূরা আল রাফঃ ৩৩)

হালাল ও হারামকরণ সংক্রান্ত এ বিতর্ক মক্কী সূরাসমূহে উদ্ধৃত হয়েছে। তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, কুরআনের দৃষ্টিতে এ ব্যঅপারটি ছোটখাটো ও খুঁটিনাটি বা গুরুত্বহীন নয়। বরং এটার সম্পর্ক ইসলামের মৌল নীতি ও সামগ্রিক আদর্শের সাথে।

মদীনা শরীফে মুসলমানদের মধ্যে কৃচ্ছ্রতা ও পবিত্র জিনিসগুলোকে নিজেদের ওপর হারাম করার প্রবণতা তীব্রভাবে দেখা দেয়। এ পর্যায়ে আল্লাহ্‌ তা’আলা অকাট্য ও সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করে তাদেরকে আল্লাহ্‌র নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে ও সিরাতুল মুস্তাকীমের ওপের অবিচল হয়ে চলতে বলেছেন। তার ইরশাদ হচ্ছেঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ – وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنتُم بِهِ مُؤْمِنُونَ

হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্যে যেসব পবিত্র দ্রব্য হালাল করেছেন, সে সবকে তোমরা ‘হারাম’ মনে করো না। আর সীমালংঘন করবে না। নিশ্চিত জানবে, সীমালংঘনকারীদের আল্লাহ্‌ আদৌ পছন্দ করেন না। আল্লাহ যেসব হালাল ও পবিত্র রিয্‌ক তোমাদের দান করেছেন তোমরা তা ভক্ষণ কর। সে সঙ্গে সেই আল্লাহ্‌কে ভয় করতে থাক, যাঁর প্রতি তোমরা ঈমানদার বলে দাবি করেছ। (সূরা মায়িদাঃ ৮৭৮৮)

. হারাম জিনিস ক্ষতিকর

আল্লাহ্‌ তা’আলা সমগ্র মানুষের সৃষ্টিকর্তা। তিনি মানুষকে এতসব অমূল্য নিয়ামত দান করেছেন, যার কোন হিসাব-নিকাশ করা সম্ভবপর নয়। তাই স্বভাবতই তাঁর অধিকার রয়েছে মানুষের জন্যে কোন কিছুকে হারাম বা হালাল ঘোষণা করার। এ ব্যাপারে কারো কোন প্রশ্ন করার বা আপত্তি জানাবার কোন অধিকারই থাকতে পারে না। তিনি রব্ব- এ হিসেবেই তাঁর এ অধিকার। মানুষ তাঁরই বান্দা। এ বান্দাহ হিসেবেই মানুষ তাঁর এ অধিকার মেনে চলতে বাধ্য। ঠিক যেমন রব্ব হিসেবেই তিনি মানুষকে নিজের বান্দা বানিয়েছেন এবং পালন করে চলার জন্যে দিয়েছেন জীবন-বিধান ও নিয়মতন্ত্র। তবে আল্লাহ্‌ যেহেতু তাঁর বান্দাদের প্রতি অপরিসীম দয়াবান- এ কারণে তিনি এ ব্যাপারে কোন জবরদস্তিও যেমন করেন নি, তেমনি অযৌক্তিক বা বিবেক-বুদ্ধি পরিপন্থী কোন বিধানও দেন নি। তিনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই এক-একটা জিনিসকে হালাল বা হারাম ঘোষণা করেছেন। সার্বিকভাবে সমগ্র মানবতার মৌলিক কল্যাণ সাধনই এর চরম লক্ষ্য। এ কারণে তিনি মানুষের জন্যে কেবল পাক-পবিত্র, উত্তম-উৎকৃষ্ট জিনিসিই হালাল করেছেন এবং হারাম করেছেন যাবতীয় নিকৃষ্ট-নষ্ট-খারাপ-ক্ষতিকর দ্রব্যাদি।

প্রসঙ্গত বলা যায়, তিনি ইয়াহূদীদের প্রতি কিছু কিছু ভাল ও উৎকৃষ্ট জিনিসও হারাম করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা ছিল স্বয়ং ইয়াহূদীদের নাফরমানীসূচক আচরণের শাস্তিস্বরূপ। কেননা ওরা আল্লাহ্‌র হালাল হারামের সীমাকে স্বেচ্ছাচারিতা করে লংঘন করেছিল। আল্লাহ্‌ সেই কথাই বলেছেন নিম্নোক্ত আয়াতেঃ

وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ ۖ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ۚ ذَٰلِكَ جَزَيْنَاهُم بِبَغْيِهِمْ ۖ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ

যারা ইয়াহূদী ধর্মমত গ্রহণ করেছে তাদের ওপর আমরা হারাম করে দিয়েছিলাম সবরকমের নখধারী পাখী, গরু-ছাগলের চর্বি- শুধু তা বাদে যা ওদের পৃষ্ঠে বা আঁতুরিতে কিংবা হাড়ের সঙ্গে লাগা আছে। আর তা তাদের বিদ্রোহাত্মক ভূমিকার প্রতিশোধ হিসেবেই আমরা তা করেছি। এরূপ করাতে আমরা নিঃসন্দেহে যথার্থ ও সত্যবাদীই ছিলাম। (সূরা আনআমঃ ১৪৬)

ইয়াহূদীরা কি ধরণের বিদ্রোহাত্মক ভূমিকা অবলম্বন করেছিল, কুরআনের অপর এক সূরায় তা বলে দেয়া হয়েছে। আয়াতটি এইঃ

فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا – وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ

যারা ইয়াহূদী মত গ্রহণ করে জুলুম করেছে, এ জুলুমের কারণে আমরা তাদের প্রতি সে সব জিনিসই হারাম করে দিয়েছি, যা তাদের জন্যে হালাল করে দেয়া হয়েছিল। সে সঙ্গে তাদের এ অপরাধের কারণেও যে, তারা লোকদেরকে খুব বেশি বাধা দিত, তারা সুদ গ্রহণ করত অথচ তা থেকে তাদের নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল, আর তারা অবৈধ উপায়ে লোকদের ধন-মাল ভক্ষণ করত। (সূরা আ্ন্নিসাঃ ১৬০১৬১)

উত্তরকালে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর সর্বশেষ ও নবী-রাসূল আগমন সমাপ্তকারী রাসূল সব মানুষের জন্যে পাঠালেন। মানবতা এ সময় পূর্ণবয়স্কতা ও পুরামাত্রায় বিবেক-বুদ্ধি লাভ করেছিল। তখন আল্লাহ্‌ তা’আলা অনুগ্রহ করে তাদের ওপর থেকে সাময়িকভাবে চালানো সেই হারামের দুর্বহ বোঝা দূর করে দিলেন। আহলি কিতাব লোকদের কাছে এ রিসালাতের পরিচয় ছিল-কুরআন মজীদে তার উল্লেখ করা হয়েছে এ ভাষায়ঃ

يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ

তারা তাদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে তার কথা লিখিত দেখতে পায়। সে তাদের ভাল ভাল কাজের আদেশ করে, খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করে, তাদের জন্যে পাকপবিত্র জিনিসসমূহ হালাল ঘোষণা করে। আর তাদের ওপর যে সব দুর্বহ বোঝা ও শৃঙ্খলাদি চাপানো ছিল, তা তাদের ওপর থেকে নামিয়ে দেয়। (সূরা আরাফঃ ১৫৭)

অতঃপর অপরাধের কাফ্‌ফারা স্বরূপ ভাল, পবিত্র, উত্তম দ্রব্যাদি হারাম করার পরিবর্তে ইসলামে অন্যান্য পন্থা ও উপায়ের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। গুনাহের কাফ্‌ফারার জন্যে খালেস তওবার ব্যবস্থা করা হয়। পানি যেমন করে ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়, তওবাও ঠিক তেমনি গুনাহ্‌ মাফ করিয়ে দেয়। এ ছাড়া এমন অনেক কাজেরও বিধান দেয়া হয়েছে, যা খারাপ কাজকে নির্মূল করে দেয়। দান-সাদকা ও গুনাহের আগুন নির্বাপিত করে, যেমন করে পানি নিভিয়ে দেয় আগুন। এছাড়া চলমান জীবনে এমন অনেক দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসীবত ভোগ করতে হয় যা বান্দার গুণাহ-খাতা ও ভুল-ভ্রান্তি শুষ্ক পত্র-পল্লবের মতই ঝরিয়ে দেয়। এ কারণে ইসলামের এ সত্য অকাট্য হয়ে দেখা দিয়েছে যে, তা যা কিছু হারাম করেছে, তা অবশ্যই খারাপ, নিকৃষ্ট ও ক্ষতিকর।

বস্তুত যা খুব বেশি ও সম্পূর্ণ ক্ষতিকর তার উপকারের তুলনায় তাকেই হারাম করে দিয়েছে। যার যা খালেসভাবে উপকারী ও কল্যাণকর তাকে হালাল করে দেয়া হয়েছে। মদ্য ও জুয়া প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের এ কথাই বলা হয়েছেঃ

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا

হে নবী! লোকেরা তোমার কাছে মদ্য ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বল, ও দুটোতে বড় গুনাহ্‌ রয়েছে, যদিও ফায়দাও কিছু রয়েছে, আর ও দুটো কল্যাণের তুলনায় ক্ষতিই অনেক বেশি। (সূরা বাকারাঃ ২১৯)

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলামে হালাল কি- যখনই এরূপ প্রশ্ন করা হবে তখনই বলা যাবে পাক=পবিত্র কল্যাণকর দ্রব্যাদি অর্থাৎ সুস্থ মানব মন যেসব জিনিস ভাল ও উত্তম মনে করে এবং কোনরূপ আদত-অভ্যাসের বশবর্তী না হয়েও সব মানুষ মোটামুটিভাবে তা পছন্দ করে তা-ই হচ্ছে হালাল। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

…………….. আরবী ……………….

লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করে তাদের জন্যে কি কি হালাল করা হয়েছে। হে নবী আপনি বলে দিন, তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সে সব জিনিসই, যা পবিত্র-পরিচ্ছন্ন ও উত্তম-উৎকৃষ্ট।

অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

………….. আরবী ……………..

আজ তোমাদের জন্যে হালাল করে দেয়া হয়েছে সেসব জিনিসই যা পাক-পবিত্র পরিচ্ছন্ন-উৎকৃষ্ট-ভাল।

যে কারণে আল্লাহ্‌ তা’আলা কোন জিনিসকে হারাম ঘোষণা করেছেন তা হচ্ছে সে জিনিসের নিকৃষ্টতা, খারাবি ও ক্ষতিকারতা। আর তা সব মুসলমানকেই বিস্তারিতভাবে জানতে হবে এমন কোন কথা নেই। কেননা সেসব বিষয়ে সঠিক জ্ঞান সমানভাবে সকলেরই থাকে না। হয়ত কেউ কেউ জানতে পারে আর অনেকেরই তা অজানা থেকে যায়। অনেক সময় একটি জিনিসের দোষ ও নিকৃষ্টতা হয়ত এখনও প্রকাশিত হয়নি, পরবর্তীকালে তা অবশ্যই জানা যাবে। এ অবস্থায় ঈমানদার ব্যক্তিমাত্রেরই কর্তব্য আল্লাহ্‌র ঘোষণাকে অকুণ্ঠিত চিত্তে ও নিঃসংকোচে মেনে নেয়া। বলা যে, জানলাম ও মেনে নিলাম।

আল্লাহ্‌ তা’আলা শূকরের গোশ্‌ত হারাম করেছেন। মুসলিমরা শুধু এতটুকুই বুঝতে পারল যে, তা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও খারাপ বলেই হারাম করা হয়েছে। কিন্তু কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানেরও অগ্রগতি ঘটে। তার ফলে জানা গেল যে, শূকরের গোশ্‌তে এক প্রকার ধ্বংসাত্মক ও মানব হত্যাকারী বিষাক্ত জীবাণূ রয়েছে। কিন্তু শূকরের গোশ্‌ত সংক্রান্ত এ জ্ঞান যদি নাও জানা যেত কিংবা এর চাইতে ভিন্নতর কিছুও জানা যেত তাহলেও মুসলিমদের আকীদা কখনও পরিবর্তন হতো না। কেননা আল্লাহ্‌র ঘোষণায় তা নাপাক ও অত্যন্ত খারাপ।

দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ্য, নবী করীম সা. ইরশাদ করেছেনঃ

………………. আরবী ………………

তিনটি অভিশাপ আহ্‌বানকারী জিনিস থেকে তোমরা দূরে থাক। তা হচ্ছে পানি পানের স্থানে, রাস্তার মাঝখানে ও ছায়াচ্ছন্ন স্থানে পায়খানা করা। (আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকিম, বায়হাকী)

প্রাথমিককালে এ কথাটির তাৎপর্য শুধু এতটুকুই বোঝা গিয়েছিল যে, এ তিনটি স্থানে পায়খানা করা খুবই খারাপ কাজ- ভদ্রতা, শূচিতা ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিকাশের ফলে উত্তরকালে আমরা জানতে পারলাম যে, এ কাজটি সাধারণ স্বাস্থ্যনীতির দৃষ্টিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা এ কাজের ফলে মারাত্মক ধরণের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের যতই বিকাশ ও অগ্রগতি সাধিত হবে, ইসলামী শরীয়তের বিধান রচনার মূলে নিহিত কারণ ও কল্যাণ-দৃষ্টি ততই বেশি উদ্‌ঘাটিত হতে থাকবে। হালাল-হারাম নির্ধারণের মৌল কারণ জানতে আর কিছুই বাকী থাকবে না। বস্তুত ইসলামী শরীয়তের মূলে রচয়িতার বিশ্বমানবতার প্রতি অকৃত্রিম কল্যাণ বিবেচনা নিহিত রয়েছে। আর তা হবেই না বা কেন? তা রচিত সে মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞানী অপরিসীম দয়াবান আল্লাহ্‌র। তাই কুরআন মজীদের বলা হয়েছেঃ

وَاللَّهُ يَعْلَمُ الْمُفْسِدَ مِنَ الْمُصْلِحِ ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَأَعْنَتَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

কোন্‌টি বিপর্যয়কারী- খারাপ এবং কোন্‌টি কল্যাণকর- ভাল, তা আল্লাহ্‌ তা’আলা নির্ভুল ও সঠিকভাবে জানেন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের কঠিন কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারতেন। (কিন্তু তিনি তা চান নি) নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ সর্বজয়ী- দুর্জয়, মহাবিজ্ঞানী। (সূরা বাকারাঃ ২২০)

. হালাল যথেষ্ট, হারাম অপ্রয়োজনীয়

বস্তুত ইসলাম এক মহাসৌন্দর্য মণ্ডিত জীবন বিধান। মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের উদ্দেশ্যে তা নাযিল করা হয়েছে। এ বিধানে যদি কোন জিনিস হারাম ঘোষিত হয়ে থাকে, তবে তার পরিবর্তে কোন উৎকৃষ্টতর জিনিসকে হালাল করে দেয়া হয়েছে। অতীব উত্তম বিকল্প পেশ করা হয়েছে। সে বিকল্প এমনি যে, তার দ্বারা এক দিকে যেমন সমস্ত বিপর্যয় সৃষ্টিকারী জিনিসের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় তেমনি অপর দিকে হারাম জিনিসের প্রতি মুখাপেক্ষিতা বা তার ওপর নির্ভরশীলতা নিঃশেষ হয়ে যায়। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম র. এদিকে ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ

ইসলাম পাশা খেলার মাধ্যমে ভাগ্য জানাকে হারাম করে দিয়েছে। তার পরিবর্তে ইস্তেখারার দো’আর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। [ইসলাম মুসলমানদের শিখিয়েছে যে, কোন কাজ করার পূর্বে সে যেন পরামর্শ করে এবং ইস্তেখারা করে ইরশাদ হয়েছে, যে ইস্তেখারা করে সে ব্যর্থ হয় না এবং যে পরামর্শ করে, সে লজ্জিত হয় না ইস্তেখারা অর্থ, যে দুটি ব্যাপার নিয়ে সে দ্বন্দ্বে পড়েছেকোন্টা করবে, সে যেন দুটির মধ্যে যেটি উত্তম সেটির সন্ধান পাওয়ার জন্যে আল্লাহ্ কাছে দো করে এজন্যে নামায দো মাসুরার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে]

ইসলাম সুদ খাওয়াকে হারাম করে দিয়েছে। তার পরিবর্তে মুনাফাপূর্ণ ব্যবসা বৈধ করে দিয়েছে।

জুয়া হারাম করেছে, তার পরিবর্তে ঘোড়া, উষ্ট্র ও তীরের সেসব প্রতিযোগিতা লব্ধ ধনমাল গ্রহণ জায়েয করেছে, যা শরীয়াতের পরিপন্থী নয়।

পুরুষদের প্রতি রেশম ব্যবহার হারাম করা হয়েছে। তার পরিবর্তে সূতা, পশম, কাতানের বিভিন্ন সৌন্দর্যময় পোশাক বৈধ করেছে।

জ্বিনা-ব্যভিচার ও পুংমৈথুন হারাম করেছে। তার পরিবর্তে বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম বৈধ করেছে।

মাদক দ্রব্য হারাম করা হয়েছে। তার পরিবর্তে দেহ ও মনের উপকারী সুস্বাদু পানীয় হালাল করে দিয়েছে।

খারাপ ও নিকৃষ্ট ধরণের খাদ্য হারাম করেছে। তার পরিবর্তে উত্তম উৎকৃষ্ট ও ভাল-ভাল খাদ্য হালাল করে দিয়েছেন।

এভাবে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিধানের পর্যালোচনা করা হলে প্রমাণিত হবে যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা যদি একদিকে মানুষের জীবনে কোন কোন জিনিসকে হারাম করে সংকীর্ণ করে থাকেন তাহলে অপর দিকে বহু জিনিসকে হালাল করে জীবনকে বিপুল প্রশস্ততা ও উদারতা এনে দিয়েছেন। এক দিকের দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছেন বটে, কিন্তু অপরদিকের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। কেননা আল্লাহ্‌ তা’আলা মানব জীবনকে কোন দুরূহ কষ্ট ও কৃচ্ছ্রতার মধ্যে ফেলে দিতে চান নি। তাদের জন্যে স্বাচ্ছন্দ্যই তাঁর কাম্য। তিনি মানুষের জীবনকে কল্যাণ, নির্ভুল হেদায়াত ও রহমতে কানায় কানায় ভরে দিতে চেয়েছেন। আল্লাহ নিজেই জানিয়ে দিয়েছেনঃ

يُرِيدُ اللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ – وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَيُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الشَّهَوَاتِ أَن تَمِيلُوا مَيْلًا عَظِيمًا – يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ ۚ وَخُلِقَ الْإِنسَانُ ضَعِيفًا

আল্লাহ চান যে, তিনি তোমাদের কাছে তাঁর আইন বিধান সুস্পষ্ট করে বলে দেবেন। তোমাদের জানিয়ে দেবেন অতীত হয়ে যাওয়া লোকদের হেদায়েতের নিয়ম ও পন্থাসমূহ। তিনি স্বীয় রহমত সহকারে তোমাদের প্রতি উন্মুখ। আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞানী। আল্লাহ তো তোমাদের প্রতি রহমতের আচরণ করতে চান, কিন্তু যারা নিজেদের কামনা-বাসনা-লালসার অনুসরণ করে চলেছে, তারা তোমাদের সত্যপথ থেকে বহু দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে দুর্বহ বোঝা লাঘব করতে চান। কেননা মানুষ তো দুর্বলতম সৃষ্টি। (সূরা নিসাঃ ২৬২৮)

. হারাম কাজের নিমিত্তও হারাম

ইসলামের একটা মৌল নীতি হচ্ছে, যা হারাম কাজের হেতু, তাও হারাম। এভাবেই ইসলাম হারাম কাজ সঙ্ঘটিত হওয়ার কারণসমূহকেও হারাম করে দিয়েছে। কেননা এ কারণসমূহ বন্ধ না হলে আসল হারাম কাজটি অনুষ্ঠিত হতে কোনই অসুবিধা থাকবে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়- ইসলাম জ্বিনা বা ব্যভিচার হারাম করেছে। এ হারাম কাজকে সহজ, সুবিধাজনক ও অনিবার্য করে দেয় যেসব কারণ, ইসলাম তাকেও হারাম ঘোষণা করেছে। এ পর্যায়ের কাজের মধ্যে রয়েছে নারীদের অবাধ-উন্মুক্ত ও উচ্ছৃঙ্খল চলা-ফেরা, খারাপভাবে নারী-পুরুষের নিভৃত একাকীত্বে মিলিত হওয়া, অবাধ দেখা-সাক্ষাত, মেলামেশা, গোপন প্রেম-বন্ধুত্ব, নগ্ন ছবি, অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও যৌন উত্তেজন গান-বাজনা ইত্যাদি। এর কারণে ইসলামী শরীয়াত-পারদর্শিতাগণ মূলনীতি ঘোষণা করেছেনঃ

‘যা যা হারাম কাজ ঘটায় তা-ও হারাম।’

এ প্রেক্ষিতে ইসলামের অপর একটি মৌল নীতিও বিবেচ্য। তা হচ্ছে মূল হারাম কাজ যে করে, কেবল সে-ই সেজন্যে গুনাহ্‌গার ও অপরাধী গণ্য হয় না। এ কাজে যে লোক যতটুকু সহায়তা যুগিয়েছে সেও ততটুকু মাত্রয় গুনাহগার ও অপরাধী গণ্য হবে- এ সহায়তা-সহযোগিতা বস্তুগতভাবে হোক কিংবা শাব্দিকভাবে। মূল হারাম কাজে যে যতটুকু সাহায্য করেছে, মূল গুনাহে সে ঠিক ততটুকুই অংশীদার রয়েছে। এ কারণে নবী কারীম সা. কেবলমাত্র মদ্যপায়ীর ওপরই অভিশাপ বর্ষণ করেন নি, সে সঙ্গে মদ্য উৎপাদক, ব্যবস্থাপক, বহনকারী, যার জন্যে বহন করা হয়েছে সেই সকলের উপর- এমন কি তার মূল্য গ্রহণকারীর উপরও অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। অনুরূপভাবে সুদ যে খায়, যে খাওয়ায়, যে তার দলিল লেখে ও সাক্ষী হয়, এ এসব লোকই অভিশপ্ত। অতএব এ কাজটি হারাম কাজের সহায়ক, তাও হারাম। আর হারাম কাজে যে-ই যতটা সাহায্য করে সে ততটা এ গুনাহে শরীক হবে, তা কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।

. হারাম কাজে কৌশল অবলম্বনও হারাম

যে সব বাহ্যিক কারণ মানুষকে হারাম কাজের দিকে টেনে নেয়, তাও যেমন হারাম, তেমনি গোপন করা- কৌশলের সাহায্যে কার্য সম্পাদনও হারাম। এ সব অপকৌশল শয়তানের প্ররোচনার ফল। ইয়াহূদীরা আল্লাহ্‌র হারাম করে দেয়া কাজ ও জিনিস কৌশলের মাধ্যমে হালাল বানিয়ে নিয়েছিল। এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য। নবী করীম সা. ইরশাদ করেছেনঃ

………….. আরবী ……………

ইয়াহূদীরা যে কাজ করেছিল তোমরা তা করো না। আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন, তা সামান্য কৌশলের সাহায্যে হালাল করতে যেয়ো না।

আল্লাহ তা’আলা ইয়াহূদীদের জন্যে শনিবারে কোনরূপ শিকার করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তারা কৌশল করে সে হারামকে হালাল বানিয়ে নিয়েছিল। তারা শুক্রবারে গর্ত খুড়ে রাখত, শনিবারে তাতে মাছ এসে জমা হয়ে থাকত আর রোববার দিন তারা তা ধরত। ওরা এরূপ কৌশল করাকে মোটেই অন্যায় মনে করত না। কিন্তু ইসলামী আইনবিদদের বিবেচনায় এরূপ করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা আসলে আল্লাহ চেয়েছিলেন তারা শিকার কার্য হতে বিরত থাকুক- তা প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে।

কোন হারাম জিনিসের নাম বা তার বাহ্যিক আকৃতি পরিবর্তন করে দিলে এবং তার মূল অবস্থায় কোনরূপ পরিবর্তন না এসে থাকলে সে জিনিসটি হালাল হয়ে যাবে না এটা বরং হারামকে এড়ানর জন্যে একটা অপকৌশল মাত্র। লোকেরা যদি নতুন নতুন আকৃতির উদ্ভব করতে থাকে এবং সুদের ন্যায় একটা নাজায়েয কাজ করার জন্যে কৌশল অবলম্বন করে কিংবা মদ্যকে একটা ভাল নামে অভিহিত করে তা পান করতে শুরু করে দেয় তাহলেই তার হারাম ও গুনাহ হওয়ার কোনরূপ পার্থক্য সূচিত হবে না। রাসূলে কারীম সা. পূর্বেই সে বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে ইরশাদ করেছেনঃ

…………….. আরবী ……………….

আমার উম্মতের মধ্য থেকে একদল লোক সূরার নাম পরিবর্তন করে তাকে হালাল করে নিতে চাইবে। (আহমদ)

লোকেরা যে নৈতিকতা বিধ্বংসী নৃত্যকে ‘শিল্প’ বা ‘ললিতকলা’ নামে অভিহিত করছে, ‘সূরাকে পানীয়’ বলছে, সুদকে মুনাফা (interest) নামে চিহ্নিত করছে, এটা কালের ঘাত-প্রতিঘাত ও আবর্তন-বিবর্তনেরই সুফল মাত্র নতুবা মূল কাজটির হারাম হওয়ার কোনরূপ পার্থক্য সঙ্ঘটিত হয়নি।

. নিয়ত ভাল হলেই হারাম হালাল হয় না

এ কথায় সন্দেহ নেই যে, ইসলাম শরীয়তী ব্যাপারাদিতে সদুদ্দেশ্য পরায়ণতা, দোষমুক্ত লক্ষ্য ও নিঃস্বার্থ মন-মানসিকতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। স্বয়ং নবী কারীম সা. বলেছেনঃ

…………. আরবী ……………..

সমস্ত কাজের মূল্যায়ন হয় নিয়তের ভিত্তিতে। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই পায়, যা সে ইচ্ছা করে। নিয়তের কারণেই মুবাহ্‌ ও আদত-অভ্যাস পর্যায়ের কার্যসমূহ ইবাদত ও আল্লাহ্‌র নৈকট্যলাভের কারণ হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। যে লোক খাদ্য গ্রহণ করে জীবন রক্ষা ও শান্তি অর্জনের জন্যে, যেন সে আল্লাহ্‌র জনগণের প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়, তার এ খাদ্য-পানীয় গ্রহণও ইবাদত ও আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের ও স্ত্রীর চরিত্র পবিত্র রাখা ও সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে যে লোক নিজ স্ত্রীর সাথে সঙ্গম কাজে লিপ্ত হবে, তার এ কাজও ইবাদত পর্যায়ে গণ্য হবে এবং সে সওয়াবের অধিকারী হবে। এ প্রসঙ্গেই নবী সা. বলেছেনঃ

…………… আরবী ………………

তোমাদের একজনের তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম কার্য করাও এক প্রকার সওয়াবের কাজ। সাহাবী গণ জিজ্ঞেস করলে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! একজন তার যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করল আর তাতেই সে সওয়াব পেয়ে যাবে? রাসূল বললেনঃ সে যদি হারাম সঙ্গমে লিপ্ত হতো, তাহলে কি সে গুনাহ্‌গার হতো না? অনুরূপভাবে সে বৈধ ও হালাল যৌন কর্মেও সওয়াব পাওয়ার অধিকারী হবে। (বুখারী, মুসলিম)

হাদীসে আরও উদ্ধৃত হয়েছেঃ

…………….. আরবী ……………..

যে ব্যক্তি দুনিয়ার হালাল জিনিসসমূহ অর্জন করতে চাইবে স্বীয় আত্মমর্যাদা রক্ষা, স্বীয় পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণ ও নিজের প্রতিবেশীর প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার উদ্দেশ্যে, সে আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাত করবে এরূপ অবস্থায় যে, তার মুখমণ্ডল পূর্ণিমা রাতের চাঁদের মত অত্যুজ্জ্বল ও আলোকমণ্ডিত হবে। (তাবারানী)

এভাবে মুমিন ব্যক্তি যে জায়েয কাজই করবে তা ভাল নিয়তের দরুন ইবাদত হয়ে যাবে। কিন্তু হারাম সর্বাবস্থায়ই হারাম থেকে যাবে, তা যত ভাল ও পবিত্র উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, যতই বড় উত্তম ও উন্নত লক্ষ্য তার মূলে থাক না কেন। কোন উন্নত লক্ষ্য অর্জনের জন্যে হারাম পন্থা গ্রহণ ইসলাম আদৌ পছন্দ করে না।

কেননা ইসলাম লক্ষ্যের উচ্চতর, মহত্তর হওয়া এবং তার অর্জনের উপায় ও পন্থার পবিত্র হওয়া- এ দুটিই কাম্য। উদ্দেশ্য সর্ব প্রকারের উপায় ও পন্থাকে বৈধ করে দেয়- এ সুবিধাবাদী নীতি ইসলাম মেনে নিতে আদৌ প্রস্তুত নয়। উপরন্তু সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জন্যে বহু সংখ্যক ভুল পন্থা ও উপায় গ্রহণের প্রয়োজন আছে বলেও ইসলাম মনে করে না। পক্ষান্তরে সঠিক ও নির্ভুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জন্যে সঠিক নির্ভুল ও পবিত্র পন্থা ও উপায় অবলম্বন করাকে একান্তই জরুরী বলে মনে করে। কেউ যদি মসজিদ নির্মাণ বা জনকল্যাণমূলক কাজ করার উদ্দেশ্যে সুদ, ঘুষ, হারাম, খেলা-তামাসা, জুয়া ও অন্যান্য নিষিদ্ধ উপায়ে অর্থোপার্জন করে তাহলে তার এ ভাল উদ্দে্শ্য হারাম কাজের হারাম হওয়াটাকে পরিবর্তন করে হালাল করে দেবে না। কেননা ইসলামের উদ্দেশ্য, মনোভাব বা শুভ ইচ্ছা হারামের ওপর কিছুমাত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। নবী করীম সা. এ শিক্ষাদান প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

………….. আরবী …………..

আল্লাহ্‌ পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিসই কবুল করেন। ঈমানদার লোকদের তিনি সে আদেশই দিয়েছেন যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন, তাঁর নবী-রাসূলগণকে। বলেছেনঃ (কুরআনের আয়অত) হে রাসূলগণ! পবিত্র দ্রব্যসামগ্রী খাও ও নেক কাজ কর। তোমরা যা কিছুই কর, আমি সে বিষয়ে পূর্ণ অবহিত। (সূরা মুমিনূনঃ ৫১)

আরও বলেছেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ

হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আমাদের দেয়া পবিত্র রিযিকসমূহ ভক্ষণ করো।  (সূরা বাকারাঃ ১৭২)

অতঃপর রাসূল সা. বললেনঃ

…………… আরবী ……………..

এক ব্যক্তি দীর্ঘ পথসফর করে। তার মাথার চুল এলোমেলো, উস্কো-খুস্কো, পদযুগল ধূলি মলিন। সে তার দুটি হাত উপরের দিকে তুলে বারবার দো’আ করে আল্লাহ, আল্লাহ! কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিচ্ছদ হারাম- হারাম খাদ্যে সে লালিত পালিত হয়েছে। এহেন ব্যক্তির দো’আ আল্লাহর কাছে কি করে কবুল হতে পারে? (মুসলিম, তিরমিযী)

তিনি আরও বলেছেনঃ

…………… আরবী. ………..

যে লোক হারাম মাল সঞ্চয় করল, পরে তা দান করে দিল, সে তার কোন সওয়াব পাবে না। তার হারাম উপার্জনের গুনাহ্‌ তো তার উপর বোঝা হয়ে চাপবেই।

……………… আরবী. ……………

বান্দা হারাম মাল উপার্জন করে যা দান-সাদ্‌কা করে, তা কবুল করা হবে না। তা থেকে সে ব্যয় করে তাতে বরকতও হয় না। আর যা পশ্চাতে রেখে যায়, তা তার জাহান্নামে যাওয়ার পাথেয় হয় মাত্র। সত্যি কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা অন্যায়কে অন্যায় দ্বারা নির্মূল করেন না। বরং অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা দূর করেন। আর আসলে ময়লা-আবর্জনা ময়লা-আবর্জনাকে দূল করতে পারে না।

. হারাম থেকে দূরে থাকার জন্যে সন্দেহপূর্ণ কাজ পরিহার

দুনিয়ার মানুষের প্রতি আল্লাহর বড় রহমত হচ্ছে এই যে, তিনি হালাল যেমন স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, তেমনি হারামকেও চিহ্নিত করে দিয়েছেন।

وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ

তোমাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছে, আল্লাহ্‌ তা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। (আল আনআমঃ ১১৯)

কাজেই যা সুস্পষ্টরূপে হালাল তা করায় কোন বাধা-প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে না। আর যা সুস্পষ্টরূপে হারাম, কোনরূপ উপায়হীন অবস্থা ভিন্ন সাধারণ ভাবে তা করার কোন অনুমতি দেয়া যেতে পারে না। এতদ্ব্যতীত এ সুস্পষ্ট হালাল ও সুপ্রকট হারামের মাঝখানে সন্দেহপূর্ণ জিনিসগুলোরও একটা পর্যায় রয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে মানুষ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। এগুলোর সন্দেহপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণ অস্পষ্ট থাকে কখনও প্রাপ্ত অকাট্য দলিলটি প্রয়োগ করার ব্যাপারে অকাট্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না বলে মানুষ চরমভাবে সংশয়ের মধ্যে নিপতিত হয়ে পড়ে। এসব সন্দেহপূর্ণ জিনিস পরিহার করাকে ইসলামে বলা হয় আল্লাহ-ভীতি, তাকওয়া, অন্যায় থেকে বাঁচার জন্যে সতর্কতাবলম্বন। তা পাপ পথ বন্ধ করার কাজ করে। মানুষকে তা নির্ভুল প্রশিক্ষণ দেয়, সঠিক পথে পরিচালিত করে। অন্যথায় মুনষ সন্দেহপূর্ণ কাজের মধ্যে লিপ্ত হয়ে হারাম কাজের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। নবী কারীম সা. নিজেই এ মৌল নীতি ঘোষণা করেছেনঃ

…………….. আরবী …………………

হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট। এ দুটির মাঝখানে কতিপয় জিনিস সন্দেহপূর্ণ। সেসব সম্পর্কে অনেক লোকেরই জানা নেই যে, আসলে তা হালাল না হারাম। এরূপ অবস্থায় যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন ও স্বীয় মান-মর্যাদা রক্ষার জন্যে সেসব থেকে দূরে থাকে, সে নিশ্চয়ই নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তন্মধ্য থেকে কোন কিছুর সাথে জড়িয়ে পড়বে, তার পক্ষে হারামের মধ্যে পড়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। যে ব্যক্তি নিজের জন্তুগুলোকে নিষিদ্ধ চারণভূমির আশে-পাশে চড়ায়, তার পক্ষে সে নিষিদ্ধ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তোমরা শোন, প্রত্যেক রাজা-বাদশাহরই একটি ‘সুরক্ষিত চারণভূমি’ থাকে। আরও শোন আল্লাহ্‌র হারাম করা জিনিসগুলোই তাঁর সংরক্ষিত চারণভূমি। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী)

১০. হারাম সকলেরই জন্যে

ইসলামী শরীয়তে হারামের বিধান সাধারণ, নির্বিশেষ এবং সকলেরই জন্যে। কোন জিনিস এক দেশের লোকদের জন্যে হারাম আর অপর দেশের লোকদের জন্যে হালাল হবে কিংবা কৃষ্নাঙ্গের জন্যে নিষিদ্ধ হবে আর শ্বেতাঙ্গদের জন্যে তা অনুমোদিত হবে, ইসলামে এমনটা হতেই পারে না। কোন বিশেষ শ্রেণী বা গোষ্ঠীর লোকদের জন্যে হালাল হবে আর অন্যদের জন্যে তা নিষিদ্ধ হবে ইসলামে তা-ও সম্পূর্ণ অকল্পনীয়। ইসলামে পাদ্রী পুরোহিত পণ্ডিত বা রাজা-বাদশাহ-অভিজাত প্রভৃতি শ্রেণীর লোকদের জন্যে কোন বিশেষ মর্যাদা স্বীকৃত হয়নি। তারা নিজেদের বিশেষ মর্যাদার দোহাই দিয়ে একদিকে নিজেদের লালসা চরিতার্থ করবে আর অপর দিক জনগণের ওপর বিশেষণ ধরণের আধিপত্য বিস্তার করে থাকবে, তার কোন সুযোগই ইসলামে দেয়া হয়নি। এ দিক দিয়ে মুসলিমদেরও নেই কোন বিশেষ মর্যাদা বা অধিকার। মুসলিমদের জন্যে একটি জিনিস হালাল হবে, আর অন্যদের জন্যে সে জিনিসটিই হবে হারাম ইসলামে এমন কোন বিধান আদৌ স্থান পায়নি। কেননা আল্লাহ তা’আলা তো নির্বিশেষ সমস্ত মানুষের রব্ব। অনুরূপভাবে তাঁর দেয়া জীবন-বিধান- ইসলামী শরীয়াত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্যে দিগ্‌দিশারী। কাজেই তাঁর শরীয়তের যে যে জিনিসকে হালাল করেছেন, তা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্যে হালাল। পক্ষান্তরে যা যা হারাম করেছেন, তা সবই হারাম সকলের জন্যে এবং কিয়ামত পর্যন্ত।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, যেমন চুরি। তা সকলের জন্যেই হারাম। চোর মুসলিম হোক কি অমুসলিম- সব ক্ষেত্রেই সমান। চোরের পরিচয় যাই হোক তাকে হোক কি অমুসলিম-সব ক্ষেত্রেই সমান। চোরের পরিচয় যাই হোক তাকে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে অনিবার্যভাবে। রাসূলে কারীম সা. নিজেই এ নীতির বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেনঃ

……………. আরবী ………………

আল্লাহ্‌র নামে শপথ! মুহাম্মাদ-কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করে তাহলে তার হাতও কর্তিত হবে। (বুখারী)

রাসূলে কারীম সা.- এর জীবদ্দশায় চুরির একটি ঘটনা সঙ্ঘটিত হয়। তাতে একজন মুসলিম ও একজন ইয়াহূদীর ওপর সন্দেহ হয়। মুসলিম ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন ইয়াহূদী ব্যক্তির ওপর দোষ চাপাতে থাকে, অথচ প্রকৃত পক্ষে মুসলিম ব্যক্তিই চুরি করেছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ্‌র কাছ থেকে ওহী নাযিল হয়ে নিরপেক্ষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং ইয়াহুদীকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। ইরশাদ করা হয়ঃ

إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ۚ وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا – وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا – وَلَا تُجَادِلْ عَنِ الَّذِينَ يَخْتَانُونَ أَنفُسَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ خَوَّانًا أَثِيمًا –

এ কিতাব আমরা তোমার প্রতি সত্যতা সহকারে নাযিল করেছি, যেন তুমি লোকদের মধ্যে সে অনুযায়ী ফয়সালা ও প্রশাসন চালাতে পারে, যা আল্লাহ্‌ তোমাকে দেখিয়েছেন। তুমি খিয়ানতকারীদের পক্ষে ঝগড়াকারীদের পক্ষে ঝগড়াকারী হবে না। আর সে লোকদের পক্ষে ওকালতি করবে না যারা নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। আল্লাহ খিয়ানতকারী ও পাপ-প্রবণ লোকদের আদৌ পছন্দ করেন না। (সূরা নিসাঃ ১০৫১০৭)

ইয়াহূদীরা তাদের প্রতি অবতীর্ণ আল্লাহ্‌র কিতাবে অনেক রদবদল করেছিল ইচ্ছেমত। তারা এ সিদ্ধান্ত করেছিল যে, ইয়াহূদীদের প্রতি সুদ হারাম হবে তখন, যদি সে তার কোন ইয়াহূদী ভাইকে ঋণ দেয়। কিন্তু অ-ইয়াহূদীকে সুদ ভিত্তিক ঋণ দিতে কোন নিষেধ নেই, তা হারাম নয়। তাদের গ্রন্থে লিখিত রয়েছেঃ

তুমি তোমার ভাইকে সুদভিত্তিক ঋণ দিও না তবে ভিন্ন জাতির লোককে সুদভিত্তিক ঋণ দিতে পারে।

কুরআন মাজীদেও ইয়াহূদীদের এ দুষ্কৃতির উল্লেখ রয়েছে। তাতে বলা হয়েছেঃ

وَمِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ إِن تَأْمَنْهُ بِقِنطَارٍ يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ وَمِنْهُم مَّنْ إِن تَأْمَنْهُ بِدِينَارٍ لَّا يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ إِلَّا مَا دُمْتَ عَلَيْهِ قَائِمًا ۗ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لَيْسَ عَلَيْنَا فِي الْأُمِّيِّينَ سَبِيلٌ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

ওদের মধ্যে এমন সব লোকও রয়েছে, তোমরা যদি একটি মুদ্রাও তাদের কাছে আমানত রাখ, তাহলে তারা তা ফিরিয়ে দেবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মাথার ওপর চড়ে বসবে। তার কারণ হচ্ছে, তারা বলেন, উম্মী (অ-ইয়াহূদী)- দের ব্যাপারে আমাদের কোন দায়িত্ব নেই। আর তারা বুঝে শুনেই আল্লাহ্‌র নামে এ মিথ্যা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। (সূরা আলেইমরানঃ ৭৫)

তারা যে আল্লাহ্‌র নামে মিথ্যার প্রচার করেছে, তাতে কোন  সন্দেহ নেই। কেননা আল্লাহ্‌র বিধান ও শরীয়তের বিধান বিভিন্ন জাতির মধ্যে পার্থক্য করে না। বিশ্বাসঘাতকতাকে সব নবী-রাসূলের জবানীতেই আল্লাহ্‌ তা’আলা হারাম ঘোষণা করিয়েছেন। ইয়াহূদীদের এ ঝগড়াটা যে নিতান্তই হীন, নীচ ও সংকীর্ণ মন-মানসিকতার পরিণাম তাতে কোনই সন্দেহ নেই। কোন আসমানী দ্বীনে তার একবিন্দু স্থান থাকতে পারে না। কেননা উন্নতমানের নৈতিকতা ও সত্যবাদ সব সময়ই মানবিক ও নির্বিশেষ হয়ে থাকে। তাই একটা জিনিস কারো জন্যে হালাল আর কারো জন্যে হারাম হতেই পারে না। যেমন আমানত রক্ষা। তা তাদের কাছে উত্তম চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বলে স্বীকৃত ছিল বটে; কিন্তু নির্বিশেষে নয়। তা ছিল বিশেষভাবে তাদের নিজস্ব গোত্রের পরস্পরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু গোত্রের বাইরে ভিন্ন লোকদের সঙ্গে সব রকমের বিশ্বাসঘাতকতা শুধু বৈধই নয়, অত্যন্ত শ্রেয় কর্তব্য এবং প্রিয়।

এভাবে মানুষে মানুষে, গোত্রে-গোত্রে ও জাতিতে-জাতিতে বিভেদ সৃষ্টিকারী অনেক প্রাচীন ধর্মীয় ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতের প্রচলন রয়েছে সর্বত্র। এগুলো যেমন অমানবিক, তেমনি প্রকৃত যুক্তির কষ্টিপাথরে অনুত্তীর্ণ। অতএব তা পরিহার্য।

১১. প্রয়োজন নিষিদ্ধকে বৈধ করে

ইসলামের হারাম করার ক্ষেত্র ও পরিধি অত্যন্ত সংকীর্ণ। কিন্তু তার পরও যা যা হারাম করেছে, তাতে অত্যন্ত কঠোরতা ও অনমনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছে। হারাম কাজের দিকের প্রকাশ্য ও গোপনীয় পথসমূহও রুদ্ধ করে দিয়েছে। অতপর যা হারাম কাজের কারণ, তাকেও হারাম করা হয়েছে। যা হারাম কাজে সাহায্য ও সহায়তা করে, তার সুযোগ করে দেয়া, তাও ইসলামে হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে। কৌশল করে কোন হারামকে হালাল করতে চেষ্টা করাকেও হারাম করে দেয়া হয়েছে। তবে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনের তাগিদকে ইসলাম অস্বীকার করেনি। মানুষের মানবিক দুর্বলতার প্রতিও একবিন্দু উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয়নি। তাই প্রবল পরাক্রান্ত মাত্রার প্রয়োজন ও মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার প্রতি লক্ষ্য রেখে- মৌল প্রয়োজন পূরণ পরিমাণ হারাম গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে অনুমতিও অবাধ নয়, শর্তহীন নয়। প্রয়োজন পূরণ ও ধ্বংস থেকে বাঁচার মৌল লক্ষ্য মাত্র। এ কারণে আল্লাহ্‌ তা’আলা মৃত জীব, রক্ত ও শূকরের গোশত খাওয়া হারাম ঘোষণা করার পর ইরশাদ করেছেনঃ

فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

যে ব্যীক্ত নিরূপায় হয়ে যাব, েসে নিজে ইচ্ছুক সীমালংঘনকারী না হয়ে যদি ওসব থেকে কিছু পরিমাণ ভক্ষণ করে, তাহলে তার কোন গুনাহ্‌ হবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল দয়াবান। (সূরা বাকারাঃ ১৭৩)

আল্লাহ্‌ তা’আলার কুরআনে এ অনুমতির কথা বারবার ঘোষণা করেছেন। আর এ কথা থেকেই ইসলামী আইন পারদর্শিগণ এ মূলনীতি গ্রহণ করেছেনঃ

‘প্রয়োজন নিষিদ্ধ জিনিসকেও বৈধ করে দেয়।’

কিন্তু এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে, এসব কয়টি স্থানেই নিরুপায় ব্যক্তির জন্যে ‘ইচ্ছুক ও সীমালঙ্ঘনকারী না হওয়ার’ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তার অর্থ এই যে, নিরুপায় হয়ে গেলে, হালাল খাদ্য না-পাওয়া গেলে, ক্ষুধার তাড়নায় প্রাণবায়ু উড়ে যাওয়ার আশংকা তীব্র হয়ে দেখা দিয়ে তখন ‘হারাম খাদ্য খাওয়া যাবে বটে; কিন্তু তার প্রতি লোভ, কামনা, স্বাদ-আস্বাদন ও তৃপ্তি অর্জন লক্ষ্য হতে পারবে না। আর দ্বিতীয়ত তা খেতে গিয়ে ন্যুনতম প্রয়োজন পরিমাণ খাওয়া যাবে, উদর পূর্তি করে খাওয়া যাবে না। এ শর্ত থেকে আইনবিদগণ আর একটি মূল নীতি নির্ধারণ করেছেন। আর তা হচ্ছেঃ

………………. আরবী. ……………

প্রয়োজনই তার পরিমাণ (বা পরিমাণের সীমা) নির্ধারণ করে।

মানুষকে প্রয়োজনের নিকট নত হতে হয়, একথা ঠিক। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মানুষ প্রয়োজনের নিকট সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে দেবে, নিজের সত্তার রশি তার হস্তে সপে দেবে। তাকে তো হালালের সাথেই জড়িত হয়ে থাকতে হবে। তারই সন্ধানে তাকে দিন-রাত ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হবে। প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ জিনিস সাময়িকভাবে ও ন্যূনতম প্রয়োজন-পরিমাণ গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছে, তাকেই যেন চিরদিন আকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা না করে এবং স্বাদ-আস্বাদনে নিমগ্ন হয়ে না পড়ে, তার প্রতি তীক্ষ্ণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখা একান্তই আবশ্যক।

প্রয়োজনের তীব্রতার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ গ্রহণের অনুমতি দিয়ে ইসলাম তার মৌল ভাবধারারই বাস্তবতা প্রমাণ করেছে এবং তার নিজস্ব নীতি ও আদর্শের দৃষ্টি খুব সহজতার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এ থেকে আল্লাহ তা’আলার এ ঘোষণার সত্যতাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছেঃ

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

আল্লাহ্‌ তোমাদের প্রতি সহজতা রক্ষা করতে চান। তোমাদের প্রতি কোনরূপ কঠোরতা করার তার কোন ইচ্ছাই নেই। (সূরা বাকারাঃ ১৮৫)

مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে কষ্ট ও সংকীর্ণতার মধ্যে নিক্ষেপ করতে চান না। বরং তিনি তোমাদের পবিত্র পরিচ্ছন্ন করতে এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামত দান সম্পূর্ণ করতেই ইচ্ছুক, যেন তোমরা শোকর কর। (সূরা মায়িদাঃ )

يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ ۚ وَخُلِقَ الْإِنسَانُ ضَعِيفًا

আল্লাহ্‌র তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান। কেননা মানুষ তো দূর্বল অক্ষম সৃষ্টি হয়েছে। (সূরা নিসাঃ ২৮)

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবনে হালালহারাম

খাদ্য পানীয়

পোশাক অলংকারসৌন্দর্য

ঘরবাড়ি

উপার্জন পেশা

 

মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবনে হালালহারাম

খাদ্য ও পানীয়- বিশেষ করে পশুকুলের মধ্য থেকে খাদ্য গ্রহণ ব্যাপারে প্রাচীনতম কাল থেকেই জাতিসমূহের মধ্যে মতবিরোধ বা মতপার্থক্য চলে এসেছে। কোন্‌ কোন্‌ জিনিস জায়েয ও বৈধ এবং কোন্‌ কোন্‌ জিনিস নয়, এই নিয়েই মতবিরোধ দানা বেঁধে উঠেছে।

উদ্ভিজ খাদ্য ও পানীয়র ক্ষেত্রে মতবিরোধ খুব বেশি এবং ব্যাপক নয়। ইসলাম মদ্যপান হারাম করে দিয়েছে, তা আঙ্গুর দিয়ে বানান হোক, বা খেজুর, যব কিংবা অন্যকিছু দিয়ে। অনুরূপভাবে যেসব জিনিস মানুষের বিবেক-বুদ্ধি বিকৃত করে দেয় অথবা কোনরূপ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে, আর যা স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর তা সবই হারাম।

তবে পশু জাতীয় খাদ্যের ব্যাপারে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।

ব্রাহ্মণদের দৃষ্টিতে পশু যবাই করা খাওয়া

ব্রাহ্মণ ইত্যাদি ধর্মবিশ্বাসী ও কোন কোন দার্শনিক মতাবলম্বীদের দৃষ্টিতে পশু যবাই করা ও খাওয়া তাদের নিজেদের জন্যে হারাম। উদ্ভিদ বা শাক-সব্জিই তাদের একমাত্র খাদ্য। কেননা তাদের মতে পশু যবাই করা নিতান্তই মর্মান্তিক ও নির্দয়তার কাজ। ওদেরও বাঁচার অধিকার আছে এবং সে অধিকার থেকে বঞ্ছিত করা যেতে পারে না।

কিন্তু বিশ্ব প্রকৃতির ওপর দৃষ্টিপাত করলে ও গভীর সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, পশু যবাই করা একান্তই নির্দোষ কাজ। কেননা দুনিয়ার এসব জন্তু-জানোয়ার কোন নিজস্ব স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি নয়। ওদের বুদ্ধি-বিবেক ও নিজস্ব ইচ্ছা ও বাছাই করার শক্তি বলতে কিছু নেই। ওদের স্বাভাবিক দেহ সংস্থা স্বতঃই প্রমাণ করে যে, ওরা মূলত মানুষের খেদমতের কাজ সুসম্পন্ন করার উদ্দেশ্যেই সৃষ্ট ও নিয়োজিত। মানুষ ওগুলোকে নিয়ন্ত্রণে এনে অনেক কার্য সম্পাদন করে। অনুরূপভাবে ওদের যবাই করে ওদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হলে তাতে আপত্তির কিছুই থাকতে পারে না। সৃষ্টিলোকে সদা কার্যকর আল্লাহ্‌র প্রদত্ত নিয়ম হচ্ছে, নিকৃষ্ট ও নীচ সৃষ্টি উত্তম ও উচ্চতর সৃষ্টির জন্য আত্মাহুতি দিচ্ছে। অনুরূপই জন্তু-জানোয়ার মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে নিরন্তন। অনুরূপই জন্তু-জানোয়ার মানুষের খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মানব সমষ্টির নিরাপত্তার জন্যে ব্যক্তিকে হত্যা করা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে রয়েছে। মানুষের জন্য পশু যবাই করা না হলে ওরা যে মৃত্যু ও ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে পারছে, এমন তো নয়। অন্যান্য অধিক শক্তিশালী হিংস্র জন্তু-দানব কর্তৃক ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে ওদের খাদ্যে পরিণত হওয়া তো অবধারিত। অথবা ওরা স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হবে। আর তা ওদের গলদেশে শানিত অস্ত্র চালিয়ে যবেহ করার তুলনায় অধিক কষ্টদায়ক হওয়া নিশ্চিত।

ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতে হারাম জন্তু

আসমানী কিতাবে বিশ্বাসীদের মধ্যে ইয়াহুদীদের প্রতি স্থল ও জলভাগের বহু জন্তু-জানোয়ারকে হারাম করে দেয়া হয়েছে। পুরাতন নিয়ম-এর লাভী পরিভ্রমণের একাদশ অধ্যায়ে তার বিস্তারিত বিবরণ উদ্ধৃত হয়েছে। এই পর্যায়ে কিছু কিছু কথা কুরআন মজীদেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়াহূদীদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছিল, তা এ থেকে জানা যায়। আর এই হারামকরণ কেবল যে তাদের নিজেদের জুলুম ও বিদ্রোহমূলক কার্যকলাপের কারণে শাস্তিদানের উদ্দেশ্যেই হয়েছিল, তা স্পষ্ট করেই বলে দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ

وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ ۖ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ۚ ذَٰلِكَ جَزَيْنَاهُم بِبَغْيِهِمْ ۖ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ

আর যারা ইয়াহুদী হয়েছে তাদের প্রতি আমরা সব নখ্‌ধারী জন্তু হারাম করে দিয়েছিলাম। আর গরু ও ছাগলের চর্বিও- ওদের পৃষ্ঠ ও অন্ত্রের সাথে কিংবা অস্থির সাথে জড়িত, তা ছাড়া এ কাজটি করা হয়েছে তাদের আল্লাহ বিরোধী শাস্তিস্বরূপ। আর তা করায় আমি যথার্থ ভূমিকা গ্রহণকারী নিঃসন্দেহে। (সূরা আনআমঃ ১৪৬)

এ হচ্ছে ইয়াহুদীদের সম্পর্কিত ব্যাপার। খ্রিস্টানদের ব্যাপারটি অনুরূপই বটে। কেননা এক্ষেত্রে তারা ইয়াহুদীদেরই অধীন। কেননা ইনজিল এ নির্দেশকে নাকচ করে দেয়নি। বরং ঘোষণা করেছেঃ ‘ঈসা মসীহ পূর্ববর্তী শরীয়ত নাকচ করা রজন্য আসেন নি। বরং এসেছে তাকে পূর্ণত্ব দানের জন্যে। কিন্তু খ্রিস্টানরা নিজেরাই শরীয়তের বিধি লংঘন করেছে এবং তওরাতে তাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছিল সে সবকেই তারা হালাল বানিয়ে নিয়েছে। খাদ্য-পানীর ব্যাপারে তারা পবিত্র ‘পোলস’- এর বিধি বিধান পালন করে এবং দেবতা মূর্তির জন্যে উৎসর্গীকৃত জন্তু ছাড়া আর সব কিছুকেই তারা হালাল ঘোষণা করল। পোলস্‌ তার কারণ দর্শিয়ে বলেছে, ‘পবিত্র লোকদের জন্য সব কিছুই পবিত্র। আর যা কিছুই মুখের মধ্যে চলে যায়, তা অপবিত্র করে না। বরং যা মুখ থেকে নির্গত হয়, তাই নাপাক করে দেয়।’ এ যুক্তির ভিত্তিতেই তারা শূকরের গোশ্‌তও জায়েয করে নিল অথচ তওরাতে কিতাবের সুস্পষ্ট ঘোষণুযায়ী তা আজ পর্যন্ত তাদের জন্যে সম্পূর্ণ হারাম হয়ে রয়েছে।

ইসলাম পূর্ব যুগের আরবদের অবস্থা

ইসলামের আগমণের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে আরব সমাজ কোন কোন জন্তুকে নাপাক মনে করে এবং কোন কোনটিকে দেবদেবীর নৈকট্য লাভ ও কুসংস্কার অনুসরণের দরুন নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছিল। বহীরা, সায়েবা, অসীলা ও হাম প্রভৃতি এ পর্যায়ে হারাম জন্তু-পূর্বে এর ব্যাখ্যঅ দেয়া হয়েছে। আর তার বিপরীত মৃত জীব এ বহমান রক্ত প্রভৃতি অনেক নাপাক জিনিসই জায়েয ও হালাল ঘোষণা করেছিল।

ইসলাম পবিত্র জিনিসগুলো মুবাহ করেছে

ইসলাম আগমনকালে আরব দেশের লোকেরা পাশব খাদ্যের ব্যাপারে পূর্ববর্তিরূপে নানাভাবে বিপরীত চিন্তায় জর্জরিত ছিল। এ কারণে সমগ্র মানুষকে সম্বোধন করে ইসলাম বলেছেঃ

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

হে জনগণ, জমিনে যে সব জিনিস হালাল পবিত্র তা ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ কর না। কেননা শয়তান তোমাদের জন্যে প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বাকারাঃ ১৬৮)

অন্য কথায়, ইসলাম সর্বসাধাণেকে নির্বিশেষে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘হে লোকেরা তোমরা পৃথিবীর এ বিশাল-বিস্তীর্ণ দস্তুরখানা থেকে পবিত্র উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো খাদ্য হিসেবে গ্রহণ কর। আর শয়তানের দেখানে পথে আদৌ চলবে না’। অর্থাৎ আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তাকে হারাম গণ্য করে বিভ্রান্তির গভীর গহ্‌বরে নিপতিত হবে না। অতঃপর মুমিনদের প্রতি বিশেষভাবে সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ

……………… আরবী ……………

হে ঈমানদার লোকেরা! আমরা তোমাদেরকে যেসব পবিত্র জিনিস রিযিক স্বরূপ দিয়েছি তোমরা তা খাও ও আল্লাহ্‌র শোকর কর যদি তোমরা বিশেষ ও একান্তভাবে তাঁরই বন্দেগী করতে প্রস্তুত হয়ে থাক। তিনি তো তোমাদের জন্যে শুধু মৃত বস্তু, রক্ত ও শূকরের গোশ্‌ত এবং আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ দেয়া জন্তু হারাম করে দিয়েছেন। তবে যে কেউ চরমভাবে ঠেকায় পড়ে যায়- কিন্তু সে তার জন্যে ইচ্ছুকও নয়, তার পক্ষে তা ভক্ষণ করায় কোন গুনাহ হবে না। আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, দয়াবান।

এই বিশেষভাবে সম্বোধন করে বলা কথার দ্বারা আল্লাহ্‌ ঈমানদার লোকদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন পবিত্র উৎকৃষ্ট আহার করে। সেই সঙ্গে দয়াবান দাতার যেন তারা শোকর আদায় করে, তাঁর নিয়ামতের দানসমূহের মর্যাদা রক্ষা করে হক্‌ আদায় করে। তারপর বলা হয়েছে, আয়াতটিতে যে চার ধরণের জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে, সে কয়টি ছাড়া অন্য কোন জিনিসই আল্লাহ্‌ হারাম করেন নি। বলা হয়েছেঃ

قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বল, আমার প্রতি যে ওহী নাযিল হয়েছে তাতে তো কোন আহারকারীর প্রতি কোন জিনিস হারাম বলে চিহ্নিত হতে দেখি না- মৃত জন্তু, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের গোশত অথবা আল্লাহ্‌ ভিন্ন অন্য কারোর উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তু ব্যতীত। কেউ যদি ঠেকায় পড়ে এসব থেকে কিছু আহার করে- আগ্রহী ইচ্ছুক বা প্রয়োজনের সীমালংঘনকারী না হয়ে তাহলে তোমার আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল দয়াবান। (সূরা আনআমঃ ১৪৫)

সূরা আলমায়িদায় এসব হারাম জিনিসের বিবরণ পেশ করার পর বলা হয়েছেঃ

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ

তোমাদের প্রতি মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস, যা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য দেবদেবীর জন্যে উৎসর্গীকৃত হয়েছে, যা গলায় ফাঁস লেগে মরেছে, যা আঘাত পেয়ে মরেছে, যা উপর থেকে পড়ে গিয়ে মরেছে, যা শিং-এর গুতা খেয়ে মরেছে, যা কোন হিংস্র জন্তু কর্তৃক ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে, যা তোমরা যবেহ করতে পেরেছ তা ব্যতীত আর যা কোন দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হয়েছে। (সূরা আল মায়েদাঃ )

এ আয়াতে দশটি হারাম জন্তুর উল্লেখ করা হয়েছে। তার পূর্ববর্তী আয়াতে মাত্র পাঁচটি হারাম জিনিসের উল্লেখ ছিল। তাই এ দুয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। বরং একটি আয়াত অপর আয়াতের ব্যাখ্যা বিশেষ। কেননা গলায় ফাঁস লেগে, আঘাত পেয়ে, ওপর থেকে পড়ে গিয়ে, শিং- এর গুতায় হিংস্র জন্তু কর্তৃক ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে মৃত- এ সব জন্তুই আসলে মৃত, মৃতেরই বিভিন্ন রূপ মাত্র। দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তুও অ-আল্লাহ্‌র নামে যবেহ করা জন্তুর পর্যায়ে গণ্য। ফলে প্রকৃত পক্ষে চার প্রকারের জন্তুই হারাম।

মৃত জন্তুর হারাম হওয়ার কারণসমূহ

কুরআনের যেসব আয়াতে হারাম খাদ্যসমূহ উল্লেখ রয়েছে তন্মধ্যে সর্বত্র প্রথম উল্লেখিত হয়েছে আল-মায়তা-তা’র। অর্থাৎ সে জন্তু ও পাখি যা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে। অন্য কথায় যে জীব বা পাখির মৃত্যু যবেহ বা শিকার করার ফলে সঙ্ঘটিত হয়নি।

কিন্তু এ জন্তু খদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে নিষেধ ও হারাম করার এবং সেটিকে নিষ্ফল ও বিনষ্ট হতে দেয়ার মূলে কি কারণ থাকতে পারে, এ হচ্ছে আধুনিক মন মানসের জিজ্ঞাস্য। উত্তরে বলতে চাই, মৃত জন্তু ও পাখি হারাম হওয়ার ও তাকে বিনষ্ট হয়ে যেতে দেয়ার মূলে কতগুলো কল্যাণমূলক কারণ নিহিত রয়েছেঃ

ক. সুস্থ মানব প্রকৃতি মৃত জীব ঘৃণা করে। বিবেকবান মানুষ মুর্দার খাওয়াকে অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ বলে মনে করে। তা মানুষের জন্যে নিতান্তই অশোভন ও হীন কাজ বলে বিশ্বাস করে। এ কারণেই সমস্ত আসমানী গ্রন্থে ও ধর্মে মুর্দার খাওয়াকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে ও সর্বত্র জবেহ করা জন্তু খাওয়াকে পছন্দ করা হয়েছে। যবেহ করার পদ্ধতি ও নিয়ম যতই বিভিন্ন হোক না কেন।

খ. মানুষ যা লাভ করার ইচ্ছা করেনি, মনে কামনাও জাগেনি, তা সে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করুক, সেটা আল্লাহ্‌র পছন্দ নয়। মুর্দারের অবস্থা ঠিক তেমনই। তবে যে জন্তু যবেহ করা হয় কিংবা যা শিকার করা হয়, তাতে মানুষের সংকল্প ও চেষ্টা-যত্নের কোন অংশ শামিল থাকে বলে তা পছন্দনীয় হয়ে থাকে।

গ. যে জন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে, তার সম্পর্কে আশংকা থাকে, হতে পারে সেটি চিরন্তন রোগাক্রান্ত বা কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কিংবা বিষাক্ত ঘাস বা উদ্ভিদ খেয়ে মরেছে। আর তাহলে তা খাওয়ার দরুন বিরাট ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। অথবা হতে পারে তা খুব বেশি দুর্বল বা স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার দরুন সেটি মরেছে।

ঘ. মানুষের জন্যে মুর্দার হারাম করে আল্লাহ তা’আলা পশু-পাখিগুলোর জন্য বিশেষ রহমতে খাদ্যের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কেননা সেগুলোও আমাদের ন্যায় আল্লাহ্‌র সৃষ্টি।

ঙ. আরও একটি দিক হলো এই যে, মানুষ তার মালিকানাধীন জন্তুগুলোকে রোগাক্রান্ত বা দুর্বল হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবার জন্যে ফেলে না রাখে। বরং হয় চিকিৎসা করাবে অবিলম্বে কিংবা যবেহ করে চিরশান্তি দান করবে।

প্রবাহিত রক্ত হারাম কেন

হারাম জিনিসগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থান হচ্ছে প্রবাহিত রক্তের। হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিল্লী (প্লীহা) সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম কি? তিনি বললেনঃ খেতে পার। লোকেরা বলল, তা তো আসলে জমাট বাধা রক্ত মাত্র? জবাবে বললেন, আল্লাহ্‌ তা’আলা মাত্র প্রবাহিত রক্ত হারাম করেছেন। কেননা তা অপবিত্র ময়লাযুক্ত, ন্যাক্কারজনক (Filth)। পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ ও সুস্থ মানব প্রকৃতি তা ঘৃণা না করে পারে না। তাছাড়া মৃত জন্তুর ন্যায় তাতেও ক্ষতিকর জীবাণু থাকা খুবই সম্ভব।

জাহিলিয়াতের যুগে কারো তীব্র ক্ষুধা অনুভূত হলে অস্থি বা কোন ধারাল জিনিস উষ্ট্র কিংবা অন্য জন্তুর গাত্রে বসিয়ে দিত। তাতে যে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে পড়ত, সে তা সাগ্রহে পান করত। এ ধরণের কাজের ফলে জন্তুগুলো মর্মান্তিক জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগ করতে বাধ্য হতো। রক্ত বের হয়ে যাওয়ার ফলে সেটার দুর্বল হয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দিত। এ সব কারণে আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রবহমান রক্ত হারাম করে দিয়েছেন।

শূকরের গোশত

এ তালিকার তৃতীয় জিনিস হচ্ছে শূকরের গোশত। সুস্থ স্বভাব-প্রকৃতি মাত্রই তা ঘৃণা করে। কেননা তা না-পাক। শূকরের গোশতের প্রতি সুস্থ রুচি কোন মানুষ আকর্ষণ বোধ করতে পারে বলে কল্পনাও করা যায় না। কেননা শূকরের অতি লোভনীয় খাদ্য হয় সব রকমের পায়খানা ও ময়লা-আবর্জনা। আধুনিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও তা খাওয়া সর্বত্রই বিশেষ করে, গ্রীষ্ম প্রধান দেশে খুবই ক্ষতিকর। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ থেকেও প্রমাণিত হয়েছে যে, শূকরের গোশত আহার করা হলে দেহে এমন এক প্রকারের পোকার সৃষ্টি হয়, যা স্বাস্থ্যকে কুরে কুরে খায়।

{বিজ্ঞানের সর্বশেষ পরীক্ষণে জানা গেছে, শূকর গোশতে এসব জীবাণু জন্মিতে পারেঃ Cysticerus teunicallis, Cysticereus cellulosae Spargamune mousoni, Echinococeus podymorphus, paragonimus weater manall- অনুবাদক}

ভবিষ্যতে তার ক্ষতির আরও অনেক দিক- অনেক কারণ- আবিষ্কৃত হতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে শূকরের গোশত সব সময় আহার করলে মানব চরিত্রে নির্লজ্জতা জাগে, আত্মমর্যাদা বোধ শেষ হয়ে যায়।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্যে উৎসর্গিত জন্তু

চতুর্থ হারাম জন্তু হচ্ছে আল্লাহ্‌ ছাড়া কারো জন্যে উৎসর্গীকৃত জন্তু-জানোয়ার ভক্ষণ করা। তাও হারাম। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো নামে কোন জন্তু যবাই বা বলি দেয়া হলে, তাতে অপর কারো নাম উচ্চারণ করা হলে তা মুসলমান মাত্রের জন্যেই হারাম হয়ে যায়। মূর্তিপূজারীরা তাদের দেবদেবী ও প্রতিমার জন্যে জন্তু-জানোয়ার উৎসর্গ করত বা এখনও করছে। বলি দিত বা যবেহ করত। যেহেতু তা এক আল্লাহ্‌ ছাড়া দেবদেবীদের জন্যে উৎসর্গীকৃত হয়েছে এবং তা করে সে সবের নৈকট্যলাভ করতে চাওয়া হয়েছে, তার বন্দেগী করতে চাওয়া হয়েছে এবং তা চরম শির্‌ক- এর কাজ। এ কারণে এক আল্লাহর প্রতি ঈমানদার মানুষ সে সব জন্তু খেতে পারে না। তওহীদী দ্বীনের দৃষ্টিতে তা খাওয়া পরিষ্কার শির্‌ক। এ কারণেই তা হারাম। তওহীদী আকীদা-বিশ্বাসের পরিবত্রতা সংরক্ষণ এবং শিরক ও বতু-পরস্থি থেকে মানুষকে দূরে রাখা, তার প্রতি মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলাই এর উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তা’আলাই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তার জন্যে পৃথিবীর সব কিছু নিয়ন্ত্রিত করেছেন। জন্তু-জানোয়ারও মানুষের অধীন, মানুষের খিদমতে নিয়োজিত। মানুষের কল্যাণের জন্যে তা যবেহ করা সম্পূর্ণ জায়েয। তবে শর্ত এই যে, যবেহ করার সময় এক আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করতে হবে, বলতে হবেঃ ‘আল্লাহু আকবর’। তাহলে তা থেকে প্রমাণিত হবে যে, একটি জীবন্ত সৃষ্টিকে যবেহ করে তার প্রাণ সংহার করার এই কাজটি করা হচ্ছে সেই আল্লাহ্‌রই দেয়া অনুমতিক্রমে। কিন্তু যবেহ করার সময় অন্য কারো নাম উচ্চারিত হলে আল্লাহ্‌র এই অনুমতিকে কার্যত নাকচ করে দেয়া হয়। এ কারণে এই জন্তুটিকে হারাম ঘোষণা করে তা থেকে লোকটিকে দূরে রাখতে চাওয়া হয়েছে।

কয়েক প্রকারের মুর্দার

মোটামুটি এই চারটি জিনিসই মূলত হারাম। তবে সূরা আলমায়িদায় তার যে কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ এসেছে, সে দৃষ্টিতে তার সংখ্যা দশ হয়ে যায়। অবশিষ্টগুলো এইঃ

৫. মুনখানিকাতুঃ গলায় ফাঁস লেগে মরা জন্তু;

৬. মওকুয়াতুঃ লাঠি বা অন্য কোন শক্ত জিনিসের আঘাতে মরে যাওয়া জন্তু;

৭. মুতারাদ্দিয়াতুঃ উচ্চস্থান থেকে পড়ে গিয়ে বা কূয়া কিংবা খালে পড়ে মরে যাওয়া জন্তু;

৮. নতীহাতুঃ অপর কোন জন্তুর শিং-এর গুঁতায় মরে যাওয়া জন্তু;

৯. হিংস্র জন্তু কর্তৃক ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া জন্তু- যার দেহের কোন অংশ খেয়ে ফেলেছে, আর এ কারণে তার মৃত্যু ঘটেছে; এই পাঁচ প্রকারের জন্তুর উল্লেখ করার পর আল্লাহ্‌ তা’আলা ইরশাদ করেছেন- এই সবের মধ্য থেকে কোন জন্তুকে জীবিত পেয়ে সেটিকে যবেহ করা হলে তা হারাম নয়; বরং তা তোমরা খেতে পার। যবেহ করার জন্যে জীবনের ধুঁকধুঁকি থাকাই যথেষ্ট। হযরত আলী রা. বলেছেনঃ

………. (আরবী)………………..

লাঠির আঘাতে, উপর থেকে পড়ে, শিং-এর গুঁতোয় মরে যাওয়া এসব জন্তুকে জীবিত থাকা অবস্থায়- যখন হাত বা পা নাড়ায়-যবেহ করা হলে তা তোমরা খাবে।

দাহ্হাক বলেছেনঃ জাহিলিয়াত যুগের লোকেরা এসব জন্তু যবেহ না করেই ভক্ষণ করত। কিন্তু আল্লাহ্‌ তা’আলা ইসলামে এসব খাওয়াকে হারাম করে দিয়েছেন। তবে এর মধ্য থেকে যেটির সামান্য আয়ু থাকতেও- পা, লেজ বা চক্ষু নড়াচড়া করা অবস্থায় যবেহ করা গেলে তা হালাল হবে।

(কোন কোন ফিকাহ্‌বিদের মতে তার মধ্যে জীবনের স্থিতি থাকা আবশ্যক। যা রক্ত প্রবাহিত হওয়া ও হাত-পা শক্তভাবে নড়াচড়া করতে থাকলে তবে যবেহ করার পর হালাল হবে।)

এসব মুর্দার হারাম করার কারণ

এসব মুর্দার হারাম হওয়ার মূলে সেসব কারণ ও উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে যা ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষভাবে বলা চলে, মানুষ জন্তু-জানোয়ারের প্রতি দয়াশীল এবং ওসবের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ অনুকম্পা সম্পন্ন হয়ে উঠুক- শরীয়তের এটাই লক্ষ্য। মানুষ যেন জন্তুগুলোকে অসহায় করে ছেড়ে না দেয়। এ রকম যে, কোনটি গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরল, আর কোনটি উঁচুস্থান থেকে পড়ে গিয়ে মরল, আর কোনটি অন্য জন্তুর সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে শিং-এর গুঁতা খেয়ে মরে গেল, জন্তুর মালিক সে ব্যাপারে নিজের কোন দায়িত্বই অনুভব করে না, তা আল্লাহ্‌র আদৌ পছন্দ নয়। জন্তুগুলোকে কেউ এমন নির্মমভাবে মারধোর করে, যার ফলে সেটির মরে যাওয়া অবধারিত হয়ে পড়ে। তা আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জন্তুর লড়াই লাগিয়ে অনেকে আনন্দ পায় বা জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে। তাতে একটি জন্তু অপর জন্তুটিকে গুঁতিয়ে আহত ও রক্তরঞ্চিত করে দেয় এবং তার ফলে সেটির মরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এই কাজও আল্লাহ পছন্দ করেন না।

হিংস্র জন্তুর ছিন্নভিন্ন করে দেয়া পশু খাওয়াও হারাম। তাতে মানুষের মর্যাদা রক্ষাই আসল লক্ষ্য। কেননা, পশুর উচ্ছিষ্ট খাওয়া মানুষের জন্যে শোভন হতে পারে না। তা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে চাওয়া হয়েছে। জাহিলিয়াত যুগে এসব জন্তুকে লোকেরা নিঃসংকোচে খেত। কিন্তু আল্লাহ্‌ তা’আলা হিংস্র জন্তুর উচ্ছিষ্ট খাওয়া মুমিনদের জন্যে হারাম করে দিয়েছেন।

দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তু

হারাম জন্তুগুলোর মধ্যে দশম হচ্ছে সেই জন্তু, যা কোন দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানে হত্যা করা হবে। যার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হবে আল্লাহ্‌ ছাড়া অপর কোন শক্তি, ব্যক্তি বা দেবতার পূজা করা। জাহিলিয়াত যুগে কাবা ঘরের চতুর্দিকে এ রকমের অনেক ‘স্থান’ নির্মিত হয়েছিল। আর তখনকার লোকেরা তাদের উপাস্য দেবতাদের পূজা করা ও সে সবের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সেসব স্থানে পশু যবাই করত। এক কথায় এটাও অ-আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে বলিদান মাত্র। উভয় ক্ষেত্রেই অ-আল্লাহ্‌ শক্তির প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো ও তা বড় করে তোলা- তার বড়ত্ব দেখানোই চরম লক্ষ্য। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, ‘অ-আল্লাহ্‌র নামে যবেহ করা জন্তু’ কথাটি সে জন্তুর জন্যে ব্যবহৃত হতে পারে যেটিকে যবেহ করার সময় কোন ‘বুত’ সম্মুখে নেই। বরং কোন বুতের নামে যবেহ করা হলেই হলো। কিন্তু স্থান- এ যবেহ করা জন্তু আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো নামে যবেহ না করা হলেও তা হারাম হবে। অন্য কথায় প্রথমাবস্থায় ‘স্থান’ নির্দিষ্ট থাকে না। আর দ্বিতীয় অবস্থায় স্থান সুনির্দিষ্ট থাকে।

কাবাঘরের চতুর্দিকে যেসব ‘স্থান’ নির্মিত হয়েছিল, লোকদের ধারণা ছিল, এসব স্থানে জন্তু যবেহ করা হলে তাতে আল্লাহ্‌র ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। কুরআন এই ভুল ধারণার অপনোদন করেছে এবং এই কাজটিকে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। নতুবা অ-আল্লাহ্‌র জন্যে যবেহ করা জন্তু বলতে ‘স্থান’-এ যবেহ করা জন্তুটিও শামিল রয়েছে।

মাছ পঙ্গপাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান

ইসলামে মাছ ও এ ধরণের জলজ জন্তু সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান দেয়া হয়েছে। তাকে হারাম করা জন্তুগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়নি। নবী করীম সা. সমুদ্র-পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি জবাবে ইরশাদ করলেনঃ

……….. আরবী ……………

সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মুর্দার হালাল।

কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

……….. আরবী ……………

সমুদ্রের শিকার এবং তার খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে।

হযরত উমর রা. এ আয়াতাংশের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

‘সমুদ্রের শিকার’ বলতে সমুদ্রে যা কিছু শিকার করা হয় সে সব জীব বোঝান হয়েছে। আর সমুদ্রের খাদ্য বলতে বুঝিয়েছে তা যা সমুদ্র নিজেই ওপরে নিক্ষেপ করে।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও বলেছেনঃ সমুদ্রের খাদ্য বলতে সমুদ্রের ‘মৃত জীব’ বুঝান হয়েছে।

বুখারী মুসলিম গ্রন্থে হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত এই হাদীস খানি উদ্ধৃত হয়েছেঃ

……….. আরবী ……………

নবী করীম সা. সাহাবীদের একটি বাহিনীকে কোন বিশেষ অভিযানে প্রেরণ করেন। তাদের হাতে একটি বড় মাছ পড়ে। সমুদ্র মাছটিকে ওপরে নিক্ষেপ করেছিল অর্থাৎ সেটি ছিল মৃত। তারা মাছটিকে বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে আহার করতে থাকেন। পরে তাঁরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তাঁরা নবী করীম সা. কে এ বিষয়ে অবহিত করলেন। তিনি তাঁদের বললেনঃ ‘আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্যে যে রিয্‌ক বের করেছেন, তোমরা তা খাও। সে মাছটির কোন অংশ তোমাদের কাছে অবশিষ্ট থাকলে তা আমাদেরও খাওয়াও।’ তখন কেউ কেউ সে মাছের কিছু অংশ নবী করীম সা. এর খেদমতে পেশ করেন। তিনি তা আহার করেন। (বুখারী)

পঙ্গপাল সম্পর্কেও শরীয়তের এই বিধানই কার্যকর। নবী করীম সা. মৃত পঙ্গপাল আহার করার অনুমতি দিয়েছেন। কেননা তা যবেহ করা যায় না। হযরত ইবনে আবু লাইলা বলেছেনঃ

……….. আরবী ……………

আমরা রাসূলে করীম সা. এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধাভিযানে গিয়েছি। আর তখন তাঁর সঙ্গে আমরা পঙ্গপাল আহার করেছি।

মৃত জন্তুর চামড়া, অস্থি পশম ব্যবহার

‘মুর্দার হারাম’ অর্থ তা খাওয়া হারাম। কিন্তু মৃত জন্তুর চামড়া, শিং, অস্থি ও পশম ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই। শুধু তাই নয়, তা কাম্যও বটে। কেননা তা এমন  সম্পদ যা ব্যবহার করা ও কাজে লাগানো সম্ভব। অতএব বিনষ্ট করা জায়েয হতে পারে না।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেনঃ

উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মুনার ক্রীতদাস দানস্বরূপ একটা ছাগল লাভ করে। পরে সেটি মরে যায়। নবী করীম সা. তা দেখতে পেয়ে বললেনঃ তোমরা এটির চামড়া তুলে নিচ্ছ না কেন, তা পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক করে তোমরা কাজে লাগাবে। লোকেরা বলল, ওটা তো মরে গেছে। রাসূল সা. বললেনঃ মুর্দার খাওয়াটাই শুধু হারাম।

নবী করীম সা. মৃত জন্তুর চামড়া পবিত্র পরিচ্ছন্ন করার নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেনঃ

……….. আরবী ……………

চামড়া দাবাগাত করে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করা জন্তুটিকে যবেহ করার শামিল। (আবু দাউদ, নিসায়ী)

অপর একটি বর্ণনায় উদ্ধৃত হয়েছেঃ

‘দাবাগাত’ চামড়ার ময়লা অপবিত্রতাকে দূর করে দেয়। (হাকেম)

‘মুসলিম প্রভৃতি গ্রন্থে নবী কারীম সা. এর এ উক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছেঃ

……….. আরবী …………….

যে চামড়াই ‘দাবাগাত’ (Tanning) করা হবে সেটিই পবিত্র হয়ে যাবে।

এ এক সাধারণ বিধান। সকল প্রকার জন্তুর চামড়া সম্পর্কেই এ বিধান প্রযোজ্য। কুকুর ও শূকরের চামড়ার ব্যাপারও ভিন্নতর কিছু নয়। ফিকাহবিদদের এই মত।

উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদা রা. বলেছেনঃ

আমাদের একটি ছাগল মরে গেল। তখন আমরা তার চামড়া দাবাগাত করে নিই। পরে আমরা সব সময় তাতে ‘নবীয’ (খেজুরের শরবত) তৈরী করতে থাকি। এভাবে সেটি আমাদের একটি পুরাতন মশক পাত্রে পরিণত হয়ে গেল। (বুখারী)

ঠেকার অবস্থায় স্বতন্ত্র হুকুম

এখানে যে হারামের বিধান ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, আসলে তা সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ অবস্থায় স্বাধীন ইচ্ছায় গ্রহণীয় নীতি। কিন্তু ঠেকার অবস্থা তা থেকে স্বতন্ত্র। পূর্বে এ পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেছেনঃ

وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ

আল্লাহ্‌ তা’আলা ভিন্ন ভিন্ন করে তোমাদের বলে দিয়েছেন, যা কিছু তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে যদি তোমরা ঠেকায় পড়ে গিয়ে তার কোনটি গ্রহণ করতে বাধ্য হও। (সূরা আনআমঃ ১১৯)

‘ঠেকায় পরে গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়া’ একটা সর্ববাদী সম্মত ও সমর্থিত ব্যাপার। খাদ্যের পর্যায়ে এই ‘ঠেকায় পড়াটা’ কে অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়। যেমন কেউ ক্ষুধায় খুব বেশি কাতর হয়ে পড়ল। (কোন কোন ফিকাহ্‌বিদের মতে) এই ক্ষুধার্তবস্থায় তার একটি দিন ও একটি রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে সে এমন কিছু পেল না, যা খেয়ে সে তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারে। এ সময় তার সম্মুখে সহজলভ্য হয়ে আছে শুধু হারাম খাদ্য। তখন সে ন্যূনতম পরিমাণ গ্রহণ করে প্রয়োজন পূরণ করতে পারে ও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে সক্ষম হতে পারে। শরীয়তে তার জন্যে এ অনুমতি রয়েছে। ইমাম মালিক র. বলেছেনঃ

………… আরবী …………

ঠেকায় পড়ে হারাম খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ হচ্ছে পেট পূর্ণ হওয়া (Satisfaction) এবং হালাল খাদ্য পাওয়ার সময় পর্যন্ত তা থেকে পাথেয় গ্রহণ।

কিন্তু অন্যান্যরা বলেছেনঃ

………… আরবী …………

এ ঠেকায় পড়া লোকটি শুধু এতটা পরিমাণ হারাম খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, যতটা শেষ শ্বাস-প্রশ্বাসটা চলমান রাখার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে।

সম্ভবতঃ এ মতটিই কুরআনের ঘোষণার- (আরবী) ‘অধিক ইচ্ছুক-আগ্রহী ও সীমালংঘনকারী না হয়ে’- সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষুধার ব্যাপারটিকে সুস্পষ্ট করে দেয়ার জন্যে কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছেঃ

………… আরবী …………

যে লোক ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয় কোন হারাম জিনিস খায়, গুনাহর প্রতি কোনরূপ প্রবণতা ও আগ্রহ ব্যতীতই, তাহলে আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

চিকিৎসার প্রয়োজনে

চিকিৎসা পর্যায়ে ঠেকে যাওয়ার রূপটি হচ্ছে, কোন হারাম জিনিস ঔষধ হিসেবে গ্রহণ করার ওপরই যদি কারো রোগমুক্তি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে এ সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম কি হবে তাই প্রশ্ন। ফিকাহবিদগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কোন কোন ফিকাহ্‌বিদ চিকিৎসার ব্যাপারটিকে খাদ্যের মতো অতটা তীব্র কঠিন অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন না। এ মতের সমর্থনে তাঁরা রাসূলে কারীম সা. এর একটি বাণীরও উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হচ্ছেঃ

………… আরবী …………

তোমাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছে, তাতে আল্লাহ্‌ তোমাদের রোগমুক্তির ব্যবস্থা রাখেন নি। (বুখারী)

অনেক ফিকাহ্‌বিদ আবার চিকিৎসার প্রয়োজনটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছেন এবং ওষুধ বা চিকিৎসার ব্যাপারটিকেও খাদ্যের সমান প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন। কেননা মূলত জীবনের জন্যে যেমন খাদ্য প্রয়োজনীয়, তেমনি ঔষধের প্রয়োজনও কোন  ক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। তাই এ নিষিদ্ধ দ্রব্যাদি প্রয়োজনে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা তাঁদের মতে নিশ্চয়ই মুবাহ হওয়া বাঞ্ছনীয়। দলিল হিসেবে তাঁরা আরও বলেছেন, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও জুবাইর ইবনুর আওয়াম রা. চর্ম রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। নবী করীম সা. তাঁদের জন্যে রেশমী পোশাক ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন- যদিও তা সাধারণভাবে নিষিদ্ধই ছিল এবং তা পরার ওপর নবী করীম সা. অভিশাপ বর্ষণ করেছেণ।

সম্ভবতঃ এ মতটিই ইসলামের মৌল ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্যশীল। কেননা মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে যে-কোন কার্যকর পন্থা গ্রহণ প্রতিটি শরীয়তী ব্যবস্থারই মূল লক্ষ্য।

কিন্তু হারাম দ্রব্য সম্বলিত ঔষধ চিকিৎসার্থে ব্যবহার করার অনুমতি কতিপয় শর্তের ওপর ভিত্তিশীল। শর্তগুলো হচ্ছেঃ

১. সে ঔষধটি ব্যবহার করা না হলে স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃতই কোন বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে বলে নিশ্চিতভাবে বিবেচিত হতে হবে।

২. সে ঔষধটি ছাড়া তার স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প হতে পারে হালাল দ্রব্য সম্বলিত এমন কোন ঔষধ পাওয়াই যায় না- এমন অবস্থা হতে হবে।

৩. এ বিষয়ে আল্লাহ্‌ বিশ্বাসী মুসলিম চিকিৎসকের কাছ থেকে সুস্পষ্ট অনুমোদন পেতে হবে।

আমাদের নিজস্ব জ্ঞান তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য চিকিৎসাবিদদের থেকে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে একটি কথা আমরা অতিরিক্ত বলতে চাই। তা হচ্ছে, কোন হারাম দ্রব্য সম্বলিত ঔষধ ব্যবহার করা জীবন রক্ষার জন্যে একেবারে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে, এমন অবস্থা আসলেই নয়। তবু নীতিগতভাবে ও সতর্কতার ভিত্তিতে আমরা এ ধরণের ঔষধ ব্যবহারের অনিবার্যতাকে অস্বীকার করছি না। কেননা কোন মুসলিমের এমন স্থান বা অবস্থায় পড়ে যাওয়া- যেখানে এসব হারাম ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না- একেবারে অসম্ভব মনে করা ঠিক নহে।

সামষ্টিক পর্যায়ে প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকলে ব্যক্তিপ্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না

এক ব্যক্তি তার নিজ দেশে খাদ্যবস্তু পায় না বা তার কাছে তা নেই, এটা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে সে সব দিক দিয়ে চরম ঠেকায় পড়ে গেছে এবং এখন সে হারাম খাদ্য না খেলে তার প্রাণ বাঁচে না, একথাটি গ্রহণীয় হতে পারে না। কেননা সে যে দেশের নাগরিক ও যে সমাজের একজন, সে দেশ ও সমাজের বা তার লোকজনের কাছে তো বিপুল খাদ্যসম্ভার মজুদই রয়েছে। এরূপ অবস্থায় ঠেকায়-পড়া ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করতে হবে অন্যান্য লোকের উদ্বৃত্ত খাদ্যসম্ভার থেকে। এরূপ ব্যবস্থার সাহায্যে এ লোকটিকে হারাম খাওয়া থেকে রক্ষা করা যেতে  পারে এবং তা একান্তই কর্তব্য। বস্তুত পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে সে ইসলামী সমাজের পূর্ণত্ব বিধান করতে হবে। এ সমাজের প্রত্যেকে অপর প্রত্যেকের জন্যে দায়ী। এ সমাজের সমস্ত ব্যক্তিসত্তার সমষ্টি এক অভিন্ন ব্যক্তিসত্তায় পরিণত হয়ে থাকে। এ ধরণের সমাজই হতে পারে শিশাঢালা প্রাচীর বিশেষ। তার প্রতিটি ইট খণ্ড অপরাপর ইট খণ্ডসমূহের জন্যে পৃষ্ঠপোষক। (হাদীসের মর্ম)

সামষ্টিক দায়িত্ব পালন পর্যায়ে ইমাম ইবনে হাজম-এর একটি উদ্বৃতি ইসলামের ফিকাহবিদদের জন্যে দিশারী হয়ে আছে। তিনি লিখেছেনঃ

কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্যে চরম ঠেকায়-পড়া অবস্থায়ও মুর্দার বা শূকরের মাংস আহার করা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কেননা তার মুসলিম বা অমুসলিম প্রতিবেশির কাছে অতিরিক্ত খাদ্যবস্তু মজুদ রয়েছে। এমতাবস্থায় তার কর্তব্য হচ্ছে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার দেয়া। এ প্রেক্ষিতে ঠেকায়-পড়া লোকটির জন্যে মুর্দার বা শূকরের মাংস খেতে বাধ্য মনে করা যায় না। তার পক্ষে তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে খাদ্য-পানীয়ের অতিরিক্ত অংশ হাসিল করা সম্পূর্ণ বৈধ- তার এ অধিকার রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তাকে যদি লড়াইও করতে হয় এবং তাতে সে মৃত্যুও বরণ করে, তাহলে হত্যাকারীর ‘কিসাস’ হতে হবে। আর এ অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের পথে বাধাদানকারীকে যদি হত্যাও করতে হয় তবু তা করা যাবে এবং নিহত ব্যক্তির ওপর আল্লাহ্‌র অভিশাপ বর্ষিত হবে। কেননা এ নিহত ব্যক্তি একজন ঠেকায়-পড়া ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে তার বৈধ অধিকার লাভের পথে বাধা দিয়েছে। এ কারণে সে বিদ্রোহী লোকদের মধ্যে গণ্য হবে। আর তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে আল্লাহ্‌ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেনঃ

فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّهِ

পরে তাদের একটি পক্ষ যদি অপর পক্ষের ওপর আক্রমণ চালায়, তাহলে এ সীমালংঘনকারীদের ওপর যুদ্ধ চালাও, যেন শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহ্‌র বিধানের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। (সূরা হুজুরাতঃ )

সত্যি কথা, যে ভাইর অধিকার হরণ বা অস্বীকার করা হয় কিংবা তার পথে বাধার সৃষ্টি করে মূলত সে-ই বিদ্রোহী। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এ কারণেই যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

যবেহ করার শরীয়তসম্মত পন্থা

সামুদ্রিক জীব সবই হালাল

জীব, জন্তু তাদের অবস্থান ও বসবাস স্থানের দৃষ্টিতে দুটি ভাগে বিভক্ত। হয় তারা সামুদ্রবাসী, না হয় স্থল অধিবাসী।

সামুদ্রিক জীব বলতে বেঝায় যেসব প্রাণী যা পানিতে অবস্থান ও বসবাস করে এবং পানি ভিন্ন যাদের জীবন অকল্পনীয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে মূলত তা সবই হালাল, তা যেখানেই পাওয়া যাক না কেন। তা পানির মধ্য থেকে জীবিতই ধরা হোক, কি মৃত মরে উঠুক আর নাই উঠুক। ক্ষুদ্রাকার ও বিরাটকার মাছসমূহ এর মধ্যে পড়ে। আর সামদ্রিক কুকুর কিংবা সামুদ্রিক শূকর বলতে যে জীবগুলোকে বোঝায় তাও এবং এ ধরনের অপরাপর মাছ জাতীয় জীব- সবই হালাল পর্যায়ে গণ্য। তাকে ধরেছে বা মেরেছে কিংবা শিকার করেছে- সে মুসলিম কি কাফির- সে প্রশ্ন এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবান্তর। বস্তুত সমুদ্রে যা কিছু এবং যত কিছুই রয়েছে তা সব হালাল করে দেয়ে আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশাল পর্যায়ের অনুগ্রহ দান করেছেন। সামুদ্রিক জীবদের মধ্য থেকে বিশেষ কোন শ্রেনীকে হারাম ঘোষণা করা হয়নি এবং তাদের যবেহ করার কোন শর্তও আরোপ করা হয়নি। বরং মানুষকে এক্ষেত্রে অবাধ অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সে নিজের কষ্ট ও অভাব লাঘবের জন্য যতটা ইচ্ছা সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে পারে। আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর বন্দাদের প্রতি তার বিষেশ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ প্রসঙ্গেই ইরশাদ করেছেন :

(আরবী***********)

সেই মহান আল্লাহই নদী-সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়োজিত করে রেখেছেন, যেন তোমরা তা থেকে তাজা গোশত গ্রহণ করতে পার।

বলেছেন :

(আরবী*******************)

তোমাদের জন্যে সমুদ্রের শিকার ও খাদ্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। তা তেমাদের ও পরিভ্রমণকারীদের জন্যে সামগ্রী। (সূরা মায়িদা : ৯৬)

এ দুটি আয়াতে সব সামুদ্রিক জীবকেই সাধারণভাবে ও নির্বিশেষে হালাল করার কথা ঘোষিত হয়েছে।

স্থলভাগের হারাম জীব-জন্তু

স্থলভাগের জীব-জন্তু ও প্রাণীকূলের মধ্যে কেবলমাত্র শূকর মাংস, মৃত, রক্ত এবং অ-আল্লাহর নামে উত্সর্গীকৃত বা যবেহকৃত ছাড়া আর কোনটিকেই হারাম ঘোষনা করা হয়নি। এ পর্যায়ের কথা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে।

কিন্তু কুরআন মজীদেই হালাল-হারাম ঘোষণার কিছু দায়িত্ব আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মদ (সা) এর উপর অর্পন করেছেন। তাঁর দায়িত্ব বর্ণনা পর্যায়ে বলা হযেছে :

 (আরবী*******************)

তিনি লোকদের জন্যে পবিত্র উত্কৃষ্ট দ্রব্যাদি হালাল করেন এবং খারাপ পচা-নিকৃষ্ট জিনিসসমূহ হারাম করেছেন। (সূরা আল-আরাফ : ১৫৭)

খবীস’ বলতে বোঝায় তা, যা সাধারণভাবে মানব সমষ্টির সুস্থ রুচিতে জঘন্য মনে হয়- কিছু সংখ্যক লোক যদি তা পছন্দ করেও।

এ পর্যায়েরই একটি হাদীস হচ্ছে :

(আরবী**********************)

নবী করীম (সা) খায়বর যুদ্ধের দিনে গার্হাস্থ্য গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী)

বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত হয়েছে : (আরবী**********************)

নবী করীম (সা) নখরধারী সব হিংস্র জীব এবং সব ছিড়ে খাওয়া পাখির গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।

বাঘ, শৃগাল, চিতা ইত্যাদি প্রথম পর্যায়ের জন্তু। আর চিল, শকুণ, বাজ প্রভৃতি নখরধারী পাখিগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এর মত হচ্ছে, কুরআন মজীদের যে চারটি জীব হারাম বলে উল্লিখিত হয়েছে, তাছাড়া আর কোনটিই হারাম নয়। মনে হচ্ছে, হাদীসে যেসব জন্তুর গোশত খেতে নিষেধ করা হয়েছে তাঁর মতে তা খাওয়া হারাম নয়, মাকরূহ মাত্র। অথবা এও হতে পারে যে, তিনি হয়ত এ হাদীস কয়টি জানতেই পারেন নি।

তিনি বলেছেন : (আরবী************************)

ইসলাম-পূর্ব যুগে লোকেরা অনেক কিছু খেত, আর অনেক কিছু খারাপ মনে করে খেত না। পরে আল্লাহ তার নবীকে পাঠালেন এবং তাঁর কিতাব নাযিল করলেন। তাতে তাঁর হালাল ও হারাম সংক্রান্ত ঘোষণা প্রকাশ করলেন। কাজেই তাতে যা হালাল, তা হালালই আর তাতে যা হারাম তা হারামই। আর যে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে, তা সবই নির্দোষ ও মাফ।

অতপর তিনি সূরা আল আনয়াম এর পূর্বোদ্ধৃত ১৪৫ নং আয়াতটি পাঠ করেন। এ আয়াতের আলোকেই হযরত ইবনে আব্বাস (রা) মনে করেন যে, গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া হালাল। ইমাম মালিক (রা) ও এর মতই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, হিংস্র ও ছিন্ন-ভিন্ন করে আহারকারী জন্তুগুলোর গোশত খাওয়া হারাম নয়, বড়জোর মাকরূহ।

তবে এ কথা চুড়ান্ত যে, হারাম জন্তুগুলো যবেহ করলেই তা হালাল হয়ে যাবে, এমন কোন কথা নেই। যবেহ করা হলে চামড়া ট্রেনিং না করেই পবিত্র বিবেচিত হতে পারে মাত্র।

গৃহপালিত জন্তু হালাল হওয়ার জন্যে যবেহ করা শর্ত

যে সব স্থলভাগের জন্তু-জানোয়ার খাওয়া জায়েয, তা দুভাগে বিভক্ত।

কতগুলো জন্তু এমন, যা মানুষের নিয়ন্ত্রনাধীন। উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি ধরনের গৃহপালিত জন্তু এবং হাঁস-মোরগ ইত্যাদি যেসব পাখি গার্হাস্থ পর্যায়ে লালন-পালন করা হয়, তা এক প্রকার। আর অপর প্রকারের জীব হচ্ছে সেসব, যা মানুষের নিয়ন্ত্রনে আসে না বা যেসবের উপর নিয়ন্ত্রণ চালান মানুষের সাধ্যাতীত।

প্রথম প্রকারের জন্তু ও পাখিগুলোর গোশত খাওয়া হলাল। তাবে তার জন্যে শর্ত, হচ্ছে, তাকে শরীয়তের প্রথা অনুযায়ী যবেহ করতে হবে।

শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করা শর্ত

শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করার জরুরী শর্ত হচ্ছে :

১. জন্তু যবেহ বা নহর করতে হবে ধারাল অস্ত্র দ্বারা। যেন রক্ত প্রবাহিত হতে পারে ও রগগুলো যেন ভালভাবে কেটে যায়। সে অস্ত্র পাথরেরও হতে পারে, লৌহ বা কাষ্ট নির্মিতও হতে পারে কিংবা হযরত আদী ইবনে হাতেম তায়ী বলেন:

(আরবী******************)

আমি বললাম, হে রাসূল! আমরা জন্তু শিকার করি, কিন্তু তখন আমাদের কাছে ছুরি-চাকু থাকে না, থাকে শানিত পাথর বা বাশের খণ্ড। তখন আমরা কি করব? রাসূল (সা) বললেন : রক্ত প্রবাহিত কর যে জিনিস দ্বারাই সম্ভব হোক এবং তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।  (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)

২. গলদেশে ছুরি চালাতে হবে অথবা গলার নিচের অংশে ছুরি বসিয়ে দিতে হবে, (প্রচলিত ভাষায় এটাই নহর) যার ফলে জন্তুটির মৃত্যু সঙ্ঘটিত হবে।

যবেহর পূর্ণতার পন্থা হচ্ছে, খাদ্যনালী ও গলার মধ্যের বড় দুটি রগ কেটে দিতে হবে। কিন্তু যখন নির্দিষ্ট স্থানে ছুরি চালান অসম্ভব হয়ে পড়বে, যেমন একটা গুরু কুয়ার মধ্যে পড়ে গেছে, তার মাথা ভিতরে, পায়ের দিকটা বাইরে রয়েছে স্বাভাবিক নিয়মে যথাস্থানে যবেহ করা যাবে না। তখন তার অবস্থা হবে শিকার করা জন্তুর মতো। তখন ধারাল অস্ত্র সাধ্যমত যে কোন স্থানে চালিয়ে রক্ত প্রবাহিত করেত হবে। তা করা হলে হালাল হয়ে যাবে।

বুখারী-মুসলিমে হযরত রাফে ইবনে খদীজা (রা) থেকে হাদীস উদ্বৃত হয়েছে। তিনি বলেন:

 (আরবী**************)

এক পরিভ্রমণে আমরা নবী করীম (সা) এর সঙ্গে ছিলাম। সহসা একটি উট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। তখন লোকদের সঙ্গে ঘোড়া ছিল না বলে দ্রুত গতিতে গিয়ে সেটাকে ধরা গেল না। এক ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ করে উটকে বেঁধে ফেলল। তা দেখে নবী করীম (সা) বললেন : এসব চতুষ্পদ জন্তু এভাবে আয়াত্তের বাইরে চলে গেলে তখন তোমরাও তার অনুরূপ আচরণই করবে।

৩. যবেহ করার সময় আল্লাহ ছাড়া আর কারো নাম উচ্চারণ করা যাবে না। এ এক সর্ববাদী সম্মত কথা। তার কারণ হচ্ছে, জাহিলিয়াত যুগে লোকেরা তাদের উপাস্যদের দেবী দেবতা-মূর্তির নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জন্তু যবেহ করত। যবেহ করার সময় তারা সে সব দেব-দেবীর নাম উচ্চারণ করত অথবা নির্দিষ্ট স্থানে বলিদান করত। কুরআন মজিদে এসব হারাম করা হয়েছে। পূর্বেই এতদসংক্রান্ত আয়াতের উল্লেখ করা হয়েছে।

৪. যে জন্তুটি যবেহ করা হচ্ছে, তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে। কুরআনের আয়াতে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে এ ভাষায় : (আরবী**********************)

তোমরা যদি আল্লাহর আয়াতসমূহের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক, তাহলে যেসব জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে তোমরা সেগুলো খাও। (সূরা আন’আম : ১১৮)

ইরশাদ হয়েছে : (আরবী******************)

যেসব জন্তু যবেহকালে আল্লাহরও নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তোমরা তা খেও না। কেননা তা খাওয়া ফাসিকী (ইসলামের সীমালংঘনমূলক কাজ।

রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: (আরবী*************************)

যে জন্তুর রক্ত প্রবাহিত করা হয়েছে এবং তখন তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে, তোমরা তা খাও। (বুখারী)

যেসব হাদীসে শিকার করার উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করার এবং শিক্ষা দেয়া কুকুরকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠাবার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার কথা বলা হয়েছে, তা উপরিউক্ত মতেরই সমর্থক। কোন কোন আলেমের মতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ তো জরুরী; কিন্তু ঠিক যবেহ করার মূহুর্তেই এ নাম নিতে হবে, এমনটা প্রয়োজন নয়। খাওয়ার সময় নাম উচ্চারণও যথেষ্ট। কেননা যে লোক খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে সে তো নিশ্চয়ই এমন জিনিস খায় না, যার উপর আল্লাহ নাম উচ্চারণ করা হয়নি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন : (আরবী***********************)

নতুন ইসলাম গ্রহণকারী কিছু লোক নবী করীম (সা) কে জিজ্ঞাসা করলেন, লোকেরা আমাদের নিকট গোশত নিয়ে আসে, তারা তার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছিল কিনা, তা আমাদের জানা নেই। এক্ষণে আমরা তা খাব, না খাব না? নবী করীম (সা) জবাবে বললেন : তামরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর এবং খাও। (বুখারী)

যবেহ করার এ নিয়মের তাত্পর্য

জন্তু যবেহ করার এরূপ বিধিবদ্ধ করার মৌল কারণ হচ্ছে, জন্তুটির প্রাণ যেন এমনভাবে সংহার করা হয়, যাতে করে সেটির কম সে কম কষ্ট ভোগ হয়। যবেহর অস্ত্রটি খুব ধারাল হওয়ার ও গলদেশে যবেহ করা শর্ত এ জন্যেই করা হয়েছে। কোননা এসব জিনিস দ্বারা যবেহ করা হলে জন্তুটির কণ্ঠদেশ রুদ্ধ করার মতো অবস্থা হয়। নবী করীম (সা) ছুরিটিকে অতিশয় ধারাল বানানো এবং জন্তুটিকে শান্তি দাদের নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন : (আরবী************************)

আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি ব্যাপারে এ ক্ষত্রে দয়াশীলতা অবলম্বন ফরয করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা যখন হত্যা করবে, তখন অবশ্যই দয়াশীলতা সহকারে হত্যা করবে। আর যখন যবেহ করবে, তখনও সুন্দর ও উত্তমভাবে যবেহ করবে। তোমাদের প্রত্যেকেরই কর্তব্য যবেহ করার সময় যার যার ছুরিকে খুব ধারাল বানিয়ে নেয়া এবং যবেহ করার পর সেটাকে ধীরে ধীরে প্রশান্তি লাভ করার সুযোগ দেয়া। (বুখারী)

এ সহানুভূতি ও দয়াশীলতা পর্যায়ে হযরত ইবনে উমর বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ্য। তিনি বলেন :

(আরবী**********)

নবী করীম (সা) আদেশ করেছেন ছুরি শানিত করতে এবং অপরাপর জন্তু থেকে গোপন রাখতে। তাই বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন যবেহ করার কাজ করবে, তখন তা যেন সম্পূর্ণতায় পৌছায়। (ইবনে মাযাহ)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, এক ব্যক্তি একটি বকরী শোয়ায়ে তার ছুরিতে ধার দিতেছিল্ তা দেখে নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী***********************)

তুমি কি বকরীটিকে কয়েকবার মারতে চাও? ওটিকে শোয়াবার আগে কেন তুমি তোমার ছুরিকে শানিত করে নাও নি। (হাকেম)

হযরত উমর (রা) দেখতে পেলেন, এক ব্যক্তি তার পা দিয়ে চেপে ধরে তার বকরীটিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যবেহ করার উদ্দেশ্যে। তখন তিনি লোকটিকে বললেন : (আরবী**********************)

তোমার জন্যে দু:খ! তুমি বকরীটিকে খুব ভালভাবে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাও।

এ পর্যায়ে ইসলামী চিন্তাধারা সাধারণভাবে এরূপেই আমরা পাচ্ছি। আর তা হচ্ছে, বোবা জন্তুর প্রতি দয়াশীলতা এবং ওটিকে সব রকমের কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দেয়া – যতটা সম্ভব।

জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা উষ্ট্রের ঝুটি (Hamp) জীবন্ত অবস্থায় কেটে নিয়ে খেতে খুব ভালবাসত। আর তারা জীবন্ত অবস্থায় দুম্বার পিছণে ঝুরে থাকা চাকতি কেটে নিয়ে যেত। তাতে করে ওদের কষ্টের সীমা থাকত না। এ করণে নবী করীম (সা) জীবন্ত জন্তুর দেহাংশ কেটে নেয়াকে হারাম করে দিয়েছেন । বলেছেন :

(আরবী*******************)

জন্তুর জীবন্ত অবস্থায় তার দেহাংশ কেটে নেয়া হলে সেটাকে মৃত মনে করতে হবে (এবং তা হারাম) । (আহম্মদ আবু দাউদ, তিরমিযী)

যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণের তাত্পর্য

যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার অপরিহার্যতার মূলে গভীর সূক্ষ্য কারণ নিহিত। সে বিষয়ে অবহিত হওয়া ও সে দিকে লক্ষ্য দেয়া বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।

মূর্তিপূজারী ও জাহিলিয়াতের লোকেরা যবেহ করার সময় তাদের মা’বুদদের নাম উচ্চারণ করত। ইসলামে তদস্থলে আল্লাহর নাম উচ্চারণের বিধান দেয়া হয়েছে। কেননা মুশরিকরা যখন যবেহ করার সময় তাদের উপাস্যদের নাম লয়, তখন এক আল্লাহর প্রতি ঈমানদার লোকেরা অনুরূপ সময়ে তা না করে কি থাকতে পারে?

দ্বিতীয়ত : জন্তুগুলোও তো মানুষেরই মতো এক আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ যে ওগুলোর প্রাণ হরণ করবে, তাতে আল্লাহর অনুমতি থাকা একান্তই আবশ্যক। যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হলে এই অনুমতি লাভেরই ঘোষণা হয়ে যায়। এ সময় সে যেন বলছে, আমি এ কাজটি করছি এ জন্যে নয় যে, ওগুলো দুর্বল, অক্ষম ও অসহায়ক। আমি ওগুলোর ওপর জুলুম করতে চাইলে। বরং যবেহ করার এই যে কাজটি আমি করছি, তা একমাত্র আল্লাহর অনুমতিক্রমেই করছি। তার নাম নিয়েই আমি শিকার করছি এবং তাঁরই নাম সহকারে আমি তা খাচ্ছি।

ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের যবেহ করা জন্তু

জন্তু যবেহ করার ব্যাপারে ইসলাম কত কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা আমরা এর পূর্বে দেখেছি। বস্তুত ইসলামে এ ব্যপারটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ। আরব মুশরিক ও জাহিলিয়াতের লোকেরা জন্তু যবেহ করার ব্যাপারটিকে তাদের আকীদা অনুযায়ী ধর্মের অঙ্গ ও পূজা-উপাসনার অপরিহার্য অনুষ্টানের মধ্যে গণ্য করে নিয়েছিল। তারা জন্তু যবেহ করে আসলে তাদের দেবদেবী-উপাস্যদের সন্তুষ্টি ও নৈকট্যই অর্জন করতে চেয়েছে। এই কারণে দেবদেবীর উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানেই তারা জন্তু যবেহ করত। আর তখন তাদের দেবদেবীর নাম উচ্চারণ করত।

ইসলাম এসব বন্ধ করে দিয়ে যবেহ করার সময় একমাত্র আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে স্থাপিত ও কার্যকর করল। আল্লাহ ছাড়া অপর কারো নাম লওয়াকে সম্পূর্ণ নিষেধ করে দিল। ওসব নির্দিষ্ট স্থান সমূহে জন্তু যবেহ করা এবং এক আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নামে উত্সর্গীকৃত জন্তু হারাম করে দিয়েছে।

আহলি কিতাব- ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা- মূলত তাওহীদে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু পরে তাদের ঈমানী আকীদায় শিরক অনুপ্রবেশ করে। কেননা তাদের কাছে সে দ্বীনের দাওয়াত পৌছেছিল এমন সব লোকের মাধ্যমে, যারা শিরক-আকীদায় দোষ ও মালিন্য থেকে নিজেদের বিশ্বাস ও মনমানসকে মুক্তি করে নিতে পারেনি। এ কারণে মুসলিমদের মনে এ ভাবটা জেগে উঠার খুব বেশি সম্ভাবনা ছিল যে, ওদেরকে মূর্তিপূজারী মুশরিক মনে করে তদনুরূপ আচরণই ওদের সাথে অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ওদের ব্যাপারে মূর্তিপূজারীদের থেকে ভিন্নতর রীতি অবলম্বন করার নির্দেশ দিলেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ওদের সাথে একত্রিত হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে, যেমন অনুমতি দেয়া হয়েছে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের। আল্লাহ তাআলা কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াতে ইরশাদ করেছেন : (আরবী********************)

আজকের দিনে তোমাদের জন্যে সব পবিত্র উত্কস্ট খাদ্য হালাল করে দেয়া হলো, আর তাদের খাদ্যও, যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে- তোমাদের জন্যে হালাল এবং তোমাদের খাদ্যও হালাল তাদের জন্যে। (সূরা মায়িদা : ৫)

এক কথায় এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে সকল প্রকার পবিত্র উত্কৃস্ট খাদ্য সম্পূর্ণ হালাল। অতএব বহীরা‘ সায়েরা‘ আসীলা, বা হাম‘ বলতে আর কিছু নেই। আর ইয়াহুদী খ্রিস্টান আহলি কিতাব জাতিগুলোর খাদ্য মৌলিকভাবে তোমাদের জন্যে হালাল। আল্লাহ তা কখনই হারাম করেন নি। তোমাদের খাদ্যও তাদের জন্যে হালাল। তাহলে তাদের যবেহ করা বা শিরক করা জন্তুর গোশত খাওয়াও তোমাদের জন্যে জায়েয। অনুরূপভাবে তোমরা যা যবেহ কর বা শিরক কর তা তাদের খাওয়াতেও কোন নিষেধ নেই।

তবে আরবের মুশরিকদের ব্যাপারে ইসলাম খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বন করেছে। কিন্তু আহলি কিতাবের সাথে নম্র আচরণ গ্রহণ করেছে। তার কারণ হচ্ছে, আহলি কিতাব লোকেরা ওহী, নবুওয়্যাত এবং মোটামুটি দ্বীনের মৌলিক নিয়ম নীতিগুলো মানে। এ কারণে তারা ঈমানদারদের খুবই নিকটে অবস্থিত। খাওয়া-দাওয়ায় তাদের সাথে শরীক হওয়া, তাদের কন্যা বিয়ে করা এবং তাদের সাথে মিলমিশ করা শরীয়তসম্মত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে তাদের জন্যে সুযোগ দেয়া হয়েছে যে, তারা ইসলামকে লোকদের ঘরে, কথা ও কাজ, নৈতিকতা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে তা আসল রূপে প্রত্যেক্ষ করার সুযোগ পাবে। এ উপায়েই তারা জানতে পারবে যে, মূলত ইসলাম এমন এক দ্বীন, যা উচ্চতর তত্ত্ব ও সত্য, পূর্ণাঙ্গ নিয়মাদি, অতীব উত্তম বিশ্বাস ব্যবস্থা সমূহের ওপর ভিত্তিশীল। এতে শিরক ও অর্থহীন কথাবার্তার কোন স্থান নেই।

কুরআনে ঘোষণা : (আরবী*****************)

কিতাবপ্রাপ্ত লোকদের খাদ্য।

কথাটি খুবই সাধারণ ও ব্যাপক অর্থ জ্ঞাপক। সর্বপ্রকারের খাদ্যই এর অন্তর্ভূক্ত। ওদের যবেহ করা জন্তুর গোশত এবং অন্যান্য খাদ্য সবই হালাল। কাজেই এ সবকিছুই আমাদের স্থায়ীভাবেই হালাল। তবে যদি হারাম করে দেয়া হয়ে থাকে যেমন মৃত জন্তু, প্রবাহিত রক্ত শূকরের গোশত- এগুলো খাওয়া জায়েয নয়। এটা সর্ববাধিসম্মত মত। তা যে কোন কিতাবী লোকের কাছেই হোক কিংবা হোক কোন মুসলিমের কাছে- তাতে কোন পার্থক্য নেই।

তবে এখানে কতগুলো বিষয় বিশেষভাবে মুসলমানদের জন্যে বিবেচনা প্রয়োজন।

১. গির্জা ও মেলাতে হারের জন্যে যবেহ করা জন্তু

কোন কিতাবী লোক সম্পর্কে যতক্ষন না জানা যাবে যে, সে যবেহ করার সময় ঈসা-মসীহ বা উজাইর প্রভৃতি অ-আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছে ততক্ষণ পর্যন্ত তা যবেহ করা জন্তুর গোশত খাওয়া হালাল। কিন্তু যখন জানা যাবে যে, সে যবেহ করার সময় অ-আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছে, তখন সেই বিশেষ জন্তুটি হারাম হয়ে যাবে বলে ফিকাহবিদগণ মত প্রকাশ করেছেন।

তবে কেউ কেউ বলেছেন : আল্লাহ তো ওদের খাদ্য আমাদের জন্যে হালাল করেই দিয়েছেন। এখন তারা যবেহ করাকালে কি বলে, কার নাম উচ্চারণ করে তা আল্লাহই ভাল জানেন। (সেদিকে লক্ষ্য দেয়ার প্রয়োজন নেই)

আহলি কিতাবের ঈদ উত্সব ও গীর্জা ইত্যাদি অনষ্ঠান উপলক্ষে যবেহ করা জন্তু সম্পর্কে ইমাম মালিকের কাছে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন : (আরবী***********)

আমি তা খাওয়া মাকরূহ মনে করি না। [ইমাম মালিকের মাযহাবে এটাই ফতোয়া। তিনি এ কালের কোন কোন আলেমের ন্যায় হারাম ঘোষণায় খুব তাড়াহুড়া করতেন না। শুধু মাকরূহ বলেই ক্ষন্ত থাকতেন।]

তাঁর এই মাকরূহ মনে কারাটা তাঁর নিজস্ব অতিরিক্ত তাকওয়ার ব্যাপার। তাঁর সন্দেহ হয়েছে অ-আল্লাহর নামে যবেহ হওয়ার। তাই তিনি তা খাওয়া মাকরূহ মনে করেছেন। কিন্তু তিনি তা হারাম মনে করেন নি। কেননা তাঁর মতে আহলি কিতাবের ক্ষেত্রে অ-আল্লাহর নামে যবেহ করার অর্থ হচ্ছে তারা তাদের উপাস্যদের উপাসনা ও তাদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যে জন্তু যবেহ করে সে জন্তু তারা নিজেরা খায় না। তাবে যেসব জন্তু তারা নিজারা খাওয়ার উদ্দেশ্যে যবেহ করে তা তাদের খাদ্যের মধ্যে গণ্য আর তা আমাদের জন্যে হালাল বলে নিজেই ঘোষনা করেছেন। [মুগনী কিতাবে আছে যে, যদি কোন আহলি কিতাব যবেহ করার সময় জ্ঞাতসারে আল্লাহর নাম উচ্চারণ না করে তবে তার যবেহ করা পশু খাওয়া হালাল নয়। হযরত আলী (রা) থেকে এটাই বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম শাফেয়ী, নাখয়ী, হাম্মাদ, ইসহাক এবং হানাফী মতাবলম্বিগণের মতও এটাই। আহলি কিতাবের খাদ্য হালাল হওয়া সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতের মর্ম এই যে, তাদের যবেহ করা ঐসব পশু খাওয়া হালাল যাতে যবেহের নির্ধারিত শর্তগুলো পূর্ণ করা হয়েছে- যেমনিভাবে মুসলমানদেরকেও পূর্ণ করতে হয়। হাঁ তবে একথা সঠিকভাবে জানা যায় যে, যবেহকারী আল্লাহর নাম নিয়েছে বা নেয়নি কিংবা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নাম নিয়েছে অথবা নেয়নি তবে তার যবেহ করা পশু খাওয়া হালাল। কেননা আমাদের জন্যে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমান এবং আহলি কিতাবের যবেহ করা পশু হালাল করেছেন। বন্তুত আল্লাহ তা’আলা জানেন যে, আমরা প্রত্যেক যবেহকারী ব্যক্তির অবস্থঅ সম্পর্কে অবগত হতে পারি না। (আল-মুণনী : ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৭১)]

২. বিদ্যুত্ স্পর্শে যবেহ করা বা টিনবদ্ধ গোশত খাওয়া

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আহলি কিতাব- ইয়াহুদ-খ্রিস্টানদের যবেহ করার নিয়ম কি আমাদের নিয়মের অনুরূপ হতে হবে? আমারা যেমন তীক্ষ্ণ অস্ত্র দ্বারা গলা কেটে দিই, ওদের যবেহেও কি এ রকমেরই হতে হবে?

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই এ ব্যাপারে এ শর্তটি আরোপ করেছেন। তবে মালিকী মাযহাবের আলেম জামায়াত ফতোয়া দিয়েছেন যে, তা জরুরী শর্ত নয়।

কাযী ইবনুল আরাবী সূরা আল-মায়িদার আয়াতের তাফরীরে বলেছেন :

একথা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, আহলি কিতাবের শিকার ও খাবার আল্লাহর জায়েয হলে ঘোষিত জিনিসগুলোর মধ্যে গণ্য। তা নি:শর্তে হালাল। একথাটি বিশেষভাবে বলা হয়েছে, যেন এ ব্যাপারে সব শোবাহ সন্দেহ দূরীভূত হয়ে যায়, ভুল ধারণার লেশমাত্র অবিশষ্ট না থাকে। আমার নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, খ্রিস্টানরা মুরগীর গলা মুচড়িয়ে দিয়ে মারে। পরে তারা তা রান্না করে। এরূপ অবস্থায় কি আমরা তাদের সাথে খাবারে শরীক হতে পারি? ওদের খাবার কি খাওয়া যেতে পারে? আমি বললাম, খাওয়া যেতে পারে। কেননা তা খ্রিস্টান এবং তাদের পাদ্রী-পণ্ডিতদের খাবার। যদিও আমাদের মতে যবেহ করার এ নিয়াম ঠিক নয়। কিন্তু আল্লাহ তো ওদের খাবার আমাদের জন্যে সাধারণভাবে হালাল করে দিয়েছেন। আর ওরা ওদের দ্বীনে যেখানেই জায়েয মনে করে, তা আমাদের জন্যেও হালাল। তবে সে সব আহার্য আল্লাহ তাআলা ওদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন, সেগুলো খাওয়া যাবে না। আমাদের বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, এ আহলি কিতাবরা ওদের কন্যাদের আমাদের কাছে বিয়ে দেয়। তাদের সাথে সঙ্গম জায়েয। এমতবস্থায় ওদের যবেহ করা জন্তু আমরা খাব না কেন? হালাল-হারামের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হলে যৌন সঙ্গমের তুলনায় খাদ্য খাওয়ার ব্যাপারটি অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

এ তাফসীরকারই অপর এক স্থানে লিখেছেন :

ওরা যবেহ করে না, গলায় ফাঁস দিয়ে বা মাথা নিষ্পেষিত করে মারে । তারপর ওরা তা খায়। এ কারণে তা আমাদের জন্য মুর্দার ও হারাম। কিন্তু ও (নাজায়েয হওয়া ও উপরে বর্ণিত জায়েয হওয়ার) ব্যাপারদ্বয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা আহলি কিতাব যেটিকে সঠিক যবেহ মনে করে তা খাওয়া আমাদের জন্যে অবশ্যই হালাল হবে। যদিও আমাদের দৃষ্টিতে ওদের যবেহ করার এ নিয়ম ঠিক নয়। কিন্তু যে সম্পর্কে ওরা নিজেরাই মনে করে, এ যবেহটা ঠিক নয়, তা আমাদের জন্যেও হালাল নয়। যবেহ অর্থ জন্তুটির প্রাণ বের করা হবে ওটি খাওয়া হালাল-করণের ইচ্ছায়।’

মালিকী মাযহাবের অনুসারী একটি জামায়াতের এই মত।

এ আলোচনার আলোকে আমরা আহলি কিতাব লোকদের টিনবন্দী ও সংরক্ষিত মোরড় বা গরুর গোশত সম্পর্কিত শরীয়তের নির্দেশ বুঝতে পারি। ওদের দেশে মোরগগুলো বিদ্যুত্ স্পর্শে যবেহ করার কাজ করা হয়। এ গুলোকে ওরা নিজেরা যতক্ষণ হালাল খাদ্য মনে করতে থাকবে, আয়াতটির সাধারণ ঘোষণা অনুসারে তা আমাদের জন্যে হালাল বিবেচিত হতে থাকবে। [কিন্তু এ কথাটি সর্ববাদীসম্মত নয়। সাধারণভাবেই জানা আছে যে, টিনবন্দী গোশত শরীয়ত মুতাবিক যবেহ করা জন্তু বা প্রাণীর নয়। এক কোপে কাটা বা যবেহ করার সময় সচেতনভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা কেবলমাত্র আহলি কিতাব লোকদের মনে করলেই আমাদের জন্যেও হালাল হতে পারে না। সাধারণত যে রকমটা হয়ে থাকে, সে দৃষ্টিতে ফতোয়া দেয়া আবশ্যক। তাই যে জন্তু শরীয়তসম্মত নিয়মে যবেহ করা হয়নি তা খাওয়া জায়েয নয়। তার যবেহকারী মুসলিম হলেও নয়। -(অনুবাদক)]

তবে কমিউনিষ্ট দেশসমূহে তৈরী টিনবন্দী গোশত খাওয়া আমাদের জন্যে আদৌ জায়েয হতে পারে না। কেননা ওরা ধর্ম নামের সব কিছুকেই অবিশ্বাস ও অস্বীকার করেছে। কাজেই ওরা আহলি কিতাব এর মধ্যে গণ্য নয়।

অগ্নি পূজক প্রভৃতির যবেহ করা জন্তু

অগ্নিপূজক বা প্রাচীন পারসিক ধর্মাবলম্বীদের যবেহ করা জন্তুর গোশত খাওয়া সম্পর্কে ইলমওয়ালারা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তা খেতে নিষেধ করেছেন কেননা ওরা আসলে মুশরিক। অপরাপর মণীষীরা বলেছেন, তা খাওয়া হালাল। কেননা নবী করীম (সা) বলেছেন : (আরবী******************)

ওদের সাথে আহলি-কিতাব সুলভ আচরণ করো। (মালিক, শাফী)’

এ কারণেই হিজর নামক স্থানের অগ্নিপূজারীদের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া হয়েছিল। (বুখারী)

ইবনে হাজম তাঁর আল-মুহলা গ্রন্থে লিখেছেন : (আরবী**********************)

ওরাও আহলি কিতাব। অতএব সর্ব ব্যাপারে ওদের সাথে আহলি কিতাবের ন্যায় আচরণ গ্রহণ করতে হবে। [জমহুর আলিমদের মতে মজুসী- অগ্নিপূজক বা পারসিকদের যবেহ করা জন্তু খাওয়া জায়েয নয়। হযরত ইবনে মাসউদ, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত আলী, হযরত জাবির, ইমাম মালিক, ইমাম জুহরী, ইমাম শাফিয়ী, হানাফী ফিকাহবিদগণ এবং ইমাম আহমদ প্রমুখ এ মত প্রকাশ করেছেন। ইবনে কুদামাহর মতে নবী করীম (সা) এর উপরিউক্ত উক্তি ‘ওদের সাথে আহলি কিতাবের ন্যায় আচরণ গ্রহণ কর‘ কথাটি কেবলমাত্র জিযিয়া ধার্য করা পর্যায়ে প্রযোজ্য। ওদের যবেহ করা জন্তু খাওয়া ও ওদের মেয়ে বিয়ে করার ব্যাপারে এ নির্দেশ নয়। (আরবী************************)

আল্লামা জাসসাস বলেন, মুজসীদের সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদের মতে ওরা আহলি কিতাব নয়। খুব কম লোকই ওদের আহলি কিতাব মনে করে। কুরআনে মাত্র দুটি সম্প্রদায়কে আহলি কিতাব বলা হয়েছে। মজুসীদেরও আহলি কিতাব গণ্য করে দুটির পরিবর্তে তিনটি সম্প্রদায়ের কথা বলা হতো। নবী করীম (সা) ও ওরা আহলি কিতাব একথা বলেনে নি। আহলি কিতাবের ন্যায় আচরণ করতে বলেছেন মাত্র। আর তাও ওদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার ব্যাপারে । (আরবী*********) – অনুবাদক।]

ইমাম আবু হানিফার মতে ছাবী ধর্মাবলম্বীরা আহলী কিতাব। (অনেকে ব্রাহ্মণদেরও আহলি কিতাব মনে করে। বলা হয়, ওদের প্রতি কিতাব নাযিল হয়েছিল, যদিও তারা হারিয়ে ফেলেছে।)

দৃষ্টির অন্তরালবর্তী জিনিসের খোঁজ করা অনাবশ্যক

যা চোখের অন্তরালে অবস্থিত, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা ও খোঁজ খবর লওয়ার জন্যে চেষ্টা করা- কিভাবে যবেহ করা হয়েছে, যবেহের সব কয়াটি শর্ত পূর্ণ হয়েছে কিনা, যবেহ কালে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে কিনা- এ ধরণের অজানা বিষয়সমূহ জানতে চেষ্টা করা মুসলিম ব্যক্তির দায়িত্বভুক্ত নয়। কেননা মুসলিম ব্যক্তি যবেহ করে থাকলে অপরাপর অজানা বিষয়াদি- সে অজ্ঞ-মূর্খ, ফাসিক বা কিতাবী- যাই হোক না কেন, তা খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল। পূর্বেই বলা হয়েছে, সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূল, লোকেরা আমাদের কাছে গোশত নিয়ে আসে, তারা যবেহ কালে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছে, কি করেনি তা আমরা জানি না, এ অবস্থায় কি করব? ‍রাসূল বললেন : তোমরা বিসমিল্লাহ বলে আহার কর।

এ হাদীস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন :

এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, কাজ কর্ম ও হস্তক্ষেপ ইত্যাদি সব কিছুই যথার্থ ও ঠিকঠাক আছে মনে করতে হবে, যতক্ষণ তার খারাপ বা বাতিল হওয়ার অকাট্ট দলিল পাওয়া যাবে।

শিকার

আরব ও ‍দুনিয়ার অন্যান্য জাতিগুলোর বিপুল সংখ্যক লোকই শিকার কার্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন যাবন করছে। এ কারণে কুরআন ও সুন্নাতে এ বিষয়টির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ফিকাহ গ্রন্থ রচয়িতাগণ নিজ নিজ গ্রন্থে এজন্যে স্বতন্ত্র্য অধ্যায় রচনা করেছেন। তাঁরা এর মধ্যে কি হালাল ও কি হারাম, এ ক্ষেত্রে কি ওয়াজিব কি মুস্তহাব, তা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। এভাবে বিস্তারিত বলার প্রয়োজনও ছিল। কেননা যে সব জন্তু বা পাখির গোশত পবিত্র ও উত্কষ্ট তার অনেক গুলোই এমন যে, তা মানুষের আওতাধীন থাকে না। তা ধরা ও কাবু করাও সহজসাধ্য নয়। কেননা সেগুলো মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত নয়। এ কারণে ইসলাম আয়ত্তাধীন জন্তু প্রাণী যবেহ করার ব্যাপারে গলায় বা গলার নিম্ন দেশে ছুরি চালানোর যে শর্ত আরোপ করেছে, এসব জন্তু-প্রাণী হালাল হওয়ার জন্যে সে ধরনের শর্ত আরোপ করা হয়নি। বরং সেগুলো যবেহ করার জন্যে সহজ পন্থা নির্ধারণ করেছে। এতে করে মানুষের কষ্ট অনেকটা লাঘব করা হয়েছে এবং খাদ্যের ক্ষেত্রে প্রশস্ত করা হয়েছে।

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন সমূহের প্রতি পূর্ণমাত্রায় দৃষ্টি রক্ষা করেছে। এ পর্যায়ে যে সব শর্ত আরোপিত হয়েছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও তার বিধান ব্যবস্থা সমূহের কাছে আত্মসমর্পণ করুক। আর একজন মুসলিমকে যেমন সর্ব ব্যাপারে ও ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ামাদি পালন করতে হয়, এক্ষেত্রেও যেন সে ইসলামের নিয়মগুলো যথাযথভাবে পালন করে।

এ পর্যায়ের কতগুলো শর্ত হচ্ছে শিকারকারী সংক্রান্ত, কতগুলো শিকার করা জীব সংক্রান্ত এবং কতকগুলো শিকার কার্য সংক্রান্ত।

এখানে স্থলভাগের প্রাণী শিকার সম্পর্কে বলা হচ্ছে। জলভাগের শিকার সম্পর্কে তো ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আর তার সারকথা হচ্ছে, কোনরূপ নিষেধ ছাড়াই সব কিছুকে আল্লাহ তা‘আলা হালাল করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে :

(আরবী***************)

সামুদ্রিক শিকার ও সেখানে থেকে পাওয়া খাদ্যই তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। (সূরা মায়িদা : ৯৬)

শিকারী সম্পর্কিত কথা

স্থলভাগে শিকারীর জন্যে সেই শর্ত যা যবেহকারীর জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, তাকে মুসলিম হতে হবে অথবা আহলি কিতাব। আহলি কিতাব পর্যায়ে পড়ে এমন লোকের শিকারও খাওয়া যাবে- যেমন দাবি ও মাজুসী।

ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, নিরর্থক শিকার করা অর্থাত্ খাওয়ার উদ্দেশ্য না নিয়ে অথবা অপর কোন সুফল পূর্ণ কাজের উদ্দেশ্যে না রেখে শিকার করা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা বিনা কারণে ও উদ্দেশ্যহীনভাবে প্রাণী হত্যা করার অনুমতি ইসলাম দেয়ানি। হাদীসে বলা হয়েছে : (আরবী********৯৫***********)

যেলোক কোন পাখি অর্থহীন উদ্দেশ্যহীনভাবে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবে, হে আল্লাহ অমুক লোকটি আমাকে অর্থহীনভাবে হত্যা করেছিল, কোন ফায়দা লাভের জন্যে হত্যা করেনি।

অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে : (আরবী***********************)

যে লোক কোন চড়ুই বা তার বড় কোন পাখি অন্যায়ভাবে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার বিষয়ে নিশ্চয়ই কৈফিয়ত চাইবেন। সাহাবী বললেন হে রাসূল, ওদের আবার কি হক রয়েছে? বললেন : ওদের হক হচ্ছে ওদের যবেহ করে খেতে হবে, ওদের মস্তক কেটে নিক্ষেপ করে দেয়া নয়।

শিকারীর জন্যে আরও শর্ত হচ্ছে, সে যেন হজ্জ কিংবা উমরার জন্যে ইহরাম বাধা অবস্থার লোক না হয়। কেননা ইহরাম বাধা অবস্থায় মুসলিম পূর্ণাঙ্গ শান্তি নিরাপত্তা ও বিপদ মুক্তির অবস্থায অবস্থান করে। এ ব্যাপারে তার ক্ষেত্রে অত্যান্ত প্রশস্ত। তার চারপার্শ্বের সব জীব এবং পাখিরাও পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করে থাকে। এমন কি ইহরাম বাধা মুসলিমের হাতের বা তীরের নাগালের মধ্যেও যদি কোন শিকার এসে যায়, তবুও সে শিকার থেকে বিরত থাকবে। এ হচ্ছে মুসলিমের ধৈর্যের প্রশিক্ষণ পর্যায়ের ব্যবস্থা। তাই কুরআনে বলা হয়েছে : (আরবী***********************)

হে ঈমানদার লোকেরা, আল্লাহ শিকার জাতীয় জিনিস দ্বারা তোমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করবেন। তোমাদের হাত ও তীর তা নাগালের মধ্যে পেয়ে যাবে। আল্লাহকে অজ্ঞাতসারে কে সে ভয় করে, তা তিনি জানতে চান। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ সীমালংঘন করে, তবে তার জন্যে পীড়াদায়ক আযাব রয়েছে।

(আরবী********************)

হে ঈমানদার লোকেরা ! তোমরা ইহরাম বাঁধা থাকা অবস্থায় শিকার করবে না। (সূরা মায়িদা : ৯৫)

(আরবী*******************)

তোমরা যতক্ষণ ইহরাম বাধা অবস্থায় থাকবে, ততক্ষন তোমাদের জন্যে স্থলভাগে শিকার করা হারাম করা হয়েছে। (সূরা মায়িদা:৯৬)

শিকার প্রাণী সম্পর্কিত শর্ত

যে জন্তু বা প্রাণী শিকার করা হবে, সে সম্পর্কে শর্ত হচ্ছে, তা এমন জন্তু বা প্রাণী হবে যাকে ধরে তার গলা বা মজ্জাস্থি (marrow) তে যবেহ করা সম্ভব হবে না। যদি তা সম্ভব হয় তা হলে তা অবশ্যই নির্দিষ্ট নিয়মে যবেহ করতে হবে, তা না করা হলে হালাল হবে না।

যদি তীর নিক্ষেপ করা বা শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুরের দ্বারা শিকার করা না হয়, আর তা এমন অবস্থায় হস্তগত হয় যে, তার মধ্যে এখনও জীবনের স্থিতি রয়েছে তা হলে প্রচলিত নিয়মে গলদেশে যবেহ করতে হবে। কিন্তু যদি তা স্থিতিশীল জীবন নেই, এমন অবস্থায় হস্তগত হয় তাহলে সেটি যবেহ না করাই সঙ্গত। আর যদি তার সেই অবস্থায় সেটিকে মৃত্যুর জন্যে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে কোন গুনাহ হবে না। বুখারী ও মুসলিম এ হাদীস উদ্বৃত হয়েছে :

(আরবী*****************)

তুমি যখন তোমার শিকারী কুকুর পাঠাবে তখনই তার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে। পরে তা যদি শিকারকে তোমার জন্যে আটকে রাখে আর তুমি সেটি জীবন্ত অবস্থায় হাতে পাও তাহলে তুমি যবেহ করবে।

শিকার করার উপায়

যে সব উপায়ে শিকার করা যায় তা দুধরনের :

১. তীক্ষ্ণ শানিত অস্ত্র, যেমন তলোয়ার, বল্লম ইত্যাদি। কুরআনের আয়াতে এ দিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায় :

 (আরবী********)

তা পায় তোমাদের হস্ত এবং তীরসমূহ। (সূরা মায়িদা : ৯৪)

২. শিকারী জন্তু, যাকে শিকার কার্যের জন্যে রীতিমত শিক্ষিত ও ট্রেনিং প্রাপ্ত করা হয়েছে, যেমন কুকুর, বাজ ইত্যাদি। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : (আরবী******************)

তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সব পাক-পবিত্র জিনিস, আর তোমাদের যেসব শিকারী জন্তু ট্রেনিং প্রদত্ত, আল্লাহ তোমাদের যা শিখিয়েছেন তা দিয়ে তোমরাও শিক্ষিত করে তোল………। (সূরা মায়িদা : ৪)

শানিত অস্ত্র দ্বারা শিকার করা

অস্ত্র দ্বারা শিকার করানোর দুটি শর্ত রয়েছে :

প্রথম, অস্ত্রটি শিকারের দেহের মধ্যে এমনভাবে বিদ্ধ হয়ে যাবে যে, এই জখমই সেটির মৃত্যুর কারণ হবে। অস্ত্রের চাপে পড়ে যেন মৃত্যু না হয়। হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) নবী করীম (সা) কে জিজ্ঞাসা করলেন :

(আরবী***************)

আমি ফলা ছাড়া তীর দ্বারাই শিকার করি। আর তা লক্ষ্য ভেদ করে, সেটি খাওয়া কি জায়েয?

রাসূলে করীম (সা) জবাবে বললেন : (আরবী*******************)

যখন তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তার ধারালো দিকটা যদি দেহে ঢুকে যায় তাহলে তা খাও। আর যদি পাশাপাশি লাগে ও তার আঘাতে মরে তাহলে তা খাবে না। (বুখারী, মুসলিম)

এ হাদীস থেকে জানা গেল, শিকরীর দেহে ঢুকে পড়াটাই আসল লক্ষ্য। যদি শিকারের মৃত্যু হয় ভারী বোঝার তলায় চাপা পড়ে তাহলে তা খাওয়া জায়েয হবে না। এ হিসেবে বন্দুক ও পিস্তল রিভালবারের গুলী দ্বারা শিকার করা জন্তু হালাল হবে। কোননা এই গুলী দেহভ্যন্তরে তীর, বল্লম, ও তরবারীর তুলনায়ও অধিক শানিত ও গভীরভাবে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে ইমাম আহমদ কর্তৃক উদ্বৃত একটি হাদীস হচ্ছে : (আরবী****************)

বন্দুক দ্বারা শিকার করা জন্তু বা পাখি খাবে না, তবে যবেহ করলে তা খেতে পার। আর বুখারী উদ্বৃত হযরত ইবনে উমর (রা) এর একটি উক্তিহচ্ছে : বন্দুক দ্বারা করা শিকার মওকযা লাঠির আঘাতে মরা জন্তুর মতোই হারাম, এতে বন্দোকা অর্থ মাটির ঢিলা। তা নিক্ষেপ করে শিকার করা জন্তু নিশ্চয়ই হারাম। কিন্তু এখানে বন্দুক বলতে আমরা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র মনে করছি এবং তার দ্বারা শিকার করা জন্তু অবশ্যই হালার হবে।

বুন্দেকার সাথে সাদৃশ্য সম্পন্ন জিনিস হচ্ছে প্রস্তর খণ্ড বা পাকা ইটের টুকরা। নবী করীম (সা) বলেছেন :

(আরবী*********৯৮***********)

প্রস্তরখণ্ড বাইটের টুকরা দ্বারা শিকার কারা যায় না, শত্রুকেও গভীরভাবে যখম করা চলে না। তবে তাদ্দারা দাঁত ভাঙ্গা যায় ও চক্ষু ফোটান যায়। (বুখারী, মুসলিম)

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, হাতিয়ার নিক্ষেপ করা বা অস্ত্র চালানর সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে। নবী করীম (সা) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) কে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন। ও বিষয়ে তাঁর বর্ণনা করা হাদীসসমূহ বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী।

কুকুর দ্বারা শিকার করা

কুকুর বা বাজ, শিকার ইত্যাদি দ্বারা যখন শিকার করতে চাওয়া হবে, তখন নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পালন করতে হবে :

একটি হচ্ছে, জন্তু বা পাখিটিকে শিকার করার কাজটি রীতিমত শিক্ষা ও ট্রেনিং দিতে হবে।

দ্বিতীয় এই যে, শিক্ষাপ্রাপ্ত জন্তু বা পাখিটী তার মালিকের জন্যে শিকার করবে, নিজের খাওয়ার জন্যে নয়। কুরআনের ইঙ্গিত থেকে তাই বুঝতে পারা যায়।

আর তৃতীয় হচ্ছে, সেটিকে শিকারের উদ্দেশ্য পাঠানোর সময় সেটির উপর বিসমিল্লাহ বলে দিতে হবে।

নিম্নোদ্বৃত আয়াতে এ সব কটি শর্তের কথা বলে দেয়া হয়েছে :

(আরভী******************)

লোকেরা তোমার কাছে জিজ্ঞাস করে তাদের জন্যে কি কি হালাল করা হয়েছে? তুমি বল, তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সব পাক-পবিত্র উত্কষ্ট দ্রব্য এবং যেসব শিকারী জন্তু বা পাখি তোমরা শিখিয়ে পড়িয়ে তৈয়ার করে নিয়েছ শিকার করার জন্যে- ওরা যা তোমাদের জন্যে আটকিয়ে রাখবে তা তোমরা খাও এবং তার ওপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।

১. শিকারী জন্তু বা পাখি শিক্ষাদানের ব্যাপারটিও সুস্পষ্ট। তা হচ্ছে সেটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রন কার্যকর করা, নিজ আদেশ মতো সেটিকে পরিচালিত করতে পারা, যখন যেদিকে ইচ্ছা সেটিকে চালিত করতে পারা এবং সেটির সে অনুযায়ী কাজ করতে প্রস্তুত হওয়া। শিকার করে মালিকের কাছে উপস্থিত করতে অভ্যস্ত হওয়া, মালিকের অনুপস্থিতিতে তার জিনিসপত্রের রক্ষণাবেক্ষণ। করা। মালিক সেটিকে তাড়ালে তাড়িত হওয়া। এ সব শর্ত আরোপের ব্যাপারে কোন কোন ফিকাহবিদের কিছুটা দ্বিমত আছে বটে, কিন্তু মোট কথা হলো, প্রচলিত নিয়মে শিকারী জন্তু বা পাখিকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে।

২. মালিকের জন্যে শিকার রক্ষা করার অর্থ, শিকারী জন্তু বা পাখি শিকারটিকে নিজে খাবে না, মালিকের জন্যে রেখে দেবে। নবী করীম (সা) বলেছেন : (আরবী*******************)

তুমি যখন শিকার করার উদ্দেশ্যে কুকুর প্রেরণ কর, তখন সে শিকার করে তা থেকে যদি কিছু খায়, তাহলে তুমি তা খাবে না। কেননা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেটি শিকারকে নিজের জন্যেই ধরে রেখেছে। আর পাঠানর পর শিকার করে যদি নিজে না খায়, তাহলে তুমি তা খেতে পার। কেননা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেটি তার মালিকের জন্যে শিকারকে ধরে রেখেছে। (আহমদ)

কোন কোন ফিকাহবিদ শিকারী জন্তু – কুকুর ও শিকারী পাখি যেমন বাজ শিকরার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বলেছেন, শিকারী পাখি যদি শিকার থেকে কিছু খায়ও তবু তা খাওয়া মুবাহ। কিন্তু কুকুর খেলে তা খাওয়া যায়েয নয়।

এই দুটি শর্তে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। কুকুরকে শিকার কার্যের জন্যে শিক্ষিত করে তোলা ও তার শিকার করে শিকারটিকে মালিকের জন্যে ধরে রাখা মানুষের উচ্চ মর্যাদার সথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুকুরের উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে মানুষকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যেই এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কেননা কুকুর শিক্ষাপ্রাপ্ত হলে ও শিকার করে সেটিকে মালিকের জন্যে ধরে রাখলে সেটি এক শিকার যন্ত্র মাত্র, শিকারী শিকার কাজে ব্যবহার করেছে। যেমন শিকারী তীর বল্লম বা বন্দুক চলিয়ে থাকে।

৩. কুকুর পাঠানর সময় বিসমিল্লাহ বলাটা তীর নিক্ষেপ বা বল্লম কিংবা ছুরি চালান করে বিসমিল্লাহ বলার মতোই। কুরআনের আয়াতে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে : (আরবী*******************)

৪. এ বিষয়ে বহু সহীহ হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, যেমন হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) বর্ণিত হাদীসমূহ।

উপরিউক্ত শর্ত থেকে একথাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, প্রেরিত কুকুরটির সাথে অপর কোন কুকুর শরীক হলে এ দুয়ের শিকার খাওয়া হালাল হবে না। হযরত আদী (রা) জিজ্ঞাস করলেন :

(আরবী******************)

আমি আমার কুকুর শিকারের জন্যে পাঠাই, পরে সেটির সঙ্গে দ্বিতীয় একটি অপরিচিত কুকুরও দেখতে পাই, তখন কি করব?

নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী***************)

তাহলে তুমি শিকার খাবে না। কেননা তুমি তো বিসমিল্লাহ বলেছ তোমার নিজের প্রেরিত কুকুরটির উপর, অপরটির ওপর নয়। (আর তুমি জান না এ দুটির মধ্যে কোনটি শিকার করেছে?)

তীর নিক্ষেপ করা বা শিকার পাঠানর সময় বিসমিল্লাহ বলতে যদি ভুলে যায়, তাহলে খাওয়ার সময় এই ভুল শুধরে নিলেই চলবে। আল্লাহ দয়া করে মসলিম উম্মতের অনেক ভুল-ভ্রান্তিই মাফ করে দিয়েছেন এবং দেন। এটাই সেই পর্যায়ের গণ্য।

তীর নিক্ষেপের পর শিকার মৃতাবস্থায় পাওয়া

এ রকমটা প্রায় ঘটে ও ঘটতে পারে যে, শিকারী শিকারের উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করল, তা শিকারকে বিদ্ধ করল, পরেতা চোখের আড়ালে পড়ে যায়, হারিয়ে যায়। কিছু সময় পর সেটি মৃত্যু অবস্থায় পাওয়া যায়- কয়েকদিন পর পাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। এরূপ অবস্থায় কয়েকটি শর্তে শিকারটি হালাল হতে পারে :

১. সেটি যেন পানিতে পড়ে না থাকে। এ পর্যায়ে হাদীস হচ্ছে : রাসূলে করীম (সা) বলেছেন :

(আরবী***********)

তুমি যখন তোমার তীর নিক্ষেপ করলে শিকারকে লক্ষ্য করে তখন সেটি পাও নিহত অবস্থায়, তাহলে তুমি সেটি খাও। তবে যদি সেটিকে পানিতে পড়া অবস্থায় দেখ, তাহলে খাবে না। কেননা শিকারটি তোমার তীরের আঘাতে মরেছে না পানিতে ডুবে মরেছে, তা তুমি জান না।

২. অপর কোন তীরের চিহ্ন তার উপর থাকবে না, যার ফলে জানা যেতে পারে যে, অপর কোন তীরই তার মৃত্যুর কারণ হয়নি। হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) বললেন : (আরবী********************)

ইয়া রাসূল! আমি তো শিকার করার জন্যে তীর নিক্ষেপ করি। পরের দিন সেটি আমি পাই, তার ওপর আমার তীর বিদ্ধ হয়ে আছে।

নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী****************)

তুমি যদি নিশ্চিতভাবেই জানতে পার যে, তোমার নিক্ষিপ্ত তীরই ওটিকে মেরেছে এবং তার ওপর কোন হিংস্র জন্তুর কোন চিহ্ন না পাওয়া যায়, তাহলে তুমি তা খেতে পার। (তিরমিযী)

৩. শিকারটা যেন পচেঁ যাওয়ার উপক্রম না হয়। কেননা সুস্থ মানব প্রকৃতি পঁচা জিনিস খেতে ঘৃণা করে। তা ছাড়া তার ক্ষতিকর দিক তো রয়েছেই। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে : নবী করীম (সা) হযরত আবু সা‘লাবা (রা) কে বললেন :

(আরবী*****************)

তুমি তীর নিক্ষেপ করার পর তা যদি তিনটি দিন অদৃশ্য হয়ে থাকে এবং তার পর তুমি শিকারের খোঁজ পাও, তাহলে তা পঁচে না গেলে তুমি খেতে পার।

মদ্য

মদ্য বা সূরা বলা হয় এমন এক এ্যালকোহলীয় পদার্থকে, যা পান করা হলে নেশাগ্রস্ত হতে হয়।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পর্যায়ে আমরা প্রথমেই বলতে চাই, এ পদার্থটি পান করার ফলে ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি ও দৈহিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়। তার দ্বীনদারীও নি:শেষ হয়ে যায়। বৈষয়িকতার দিক দিয়েও তাকে কঠিন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যেতে হয়। তার পরিবারটিকেও বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়তে হয়। আর এরূপ অবস্থা জাতি ও সমাজের বস্তুগত, নৈতিক ও আধ্যত্মিক জীবনে চরম দুর্গতি নিয়ে আসে অনিবার্যভাবে।

একজন বিশেষজ্ঞ ঠিকই বলেছেন যে মানুষকে সুরা যতটা কঠিন আঘাত হেনেছে ততটা আর কিছুই নয়। দুনিয়ার হাসপাতালসমূহ করে দেখলে দেখা যাবে মদ্য পানের দরুণ বহু লোক পাগল হয়ে গেছে, চিকিত্সার করা যায় না এমন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। মন-মগজের সুস্থতা হারিয়ে ফেলে হত্যাকাণ্ড ঘটায়, স্নায়বিক রোগে জর্জরিত হয়ে থাকে, পেটে স্থায়ী রোগ সৃষ্টি হয়। এমনকি অনেকে স্থীয় ধন-সম্পদ উড়িয়ে নি:স্ব সর্বস্ব হয়ে পড়ে। এদের সংখ্যা এত বেশি হবে যে, এদেরকে যত নসীহতই করা হোক, সবই বৃথা যাবে। এদের জীবনে কোনরূপ পরিবর্তন আনা সম্ভবপর হবে না।

জাহিলিয়াতের যুগে আরবরা সুরা পানের জন্যে পাগল হয়ে গিয়েছিলে। তাদেরও সুরা আসক্তির কোন সীমা ছিল না। তাদের ভাষায় সুরার প্রায় একশটি নাম রাখা হয়েছিল। তাদের কাব্য ও কবিতায় সুরার বিভিন্ন প্রকারের উল্লেখ রয়েছে, প্রত্যেক প্রকারের বিশেষত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। তা পান ও পরিবেশনকরী-কারিণীদের সৌন্দর্য বর্ণনায়, সুরা পানের মজলিস সমূহের গুণগানের মুখর হয়ে উঠেছিল।

ইসলাম এসে তাদেরকে একটা সুনির্দিষ্ট ও সুস্থ পথে শিক্ষিত ও পরিচালিত করে। এজন্যে মদ্যপান হারামকরণের ক্রমিক নীতি অবলম্বিত হয়েছে।

সর্ব প্রথম নেশাগ্রস্থ হয়ে নামায পড়তে নিষেধ করা হয়। অতপর তাদের বোঝান হয় যে, মদ্যপানের গুনাহ তার কল্যাণের তুলনায় অনেক বেশি। আর শেষ পর্যায়ে সূরা আল মায়িদার ব্যাপক তাত্পর্যপূর্ণ আয়াতের মাধ্যমে মদ্যপানকে চিরদিনের তরে ও চূড়ান্তভাবে হারাম করা হয়। আয়াতটি এই : (আরবী*************************)

হে ঈমানদার লোকেরা, নিশ্চিতভাবে জানবে, মদ্য, জুয়া, বলিদাদের নির্দিষ্ট স্থান এবং ভাগ্য জানার নিয়ম নিতান্তই অপবিত্র শয়তানী তত্পরতা মাত্র। অতএব তোমরা তা পরিহার কর। আশা করা যায়, তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে। এ মদ্য ও জায়ার মধ্যে তোমাদের নিক্ষেপ করে শয়তান তোমাদের পরস্পরে শত্রুতা ও হিংসা-দ্বেষ সৃষ্টি করে দেয়; আর আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখে। এমনতবস্থায় তোমরা এসব কাজ থেকে বিরত হবে কি?

এ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তা’আলা মদ্যপান ও জুয়া খেলাকে কঠোর ভাষায় হারাম করেছেন এবং তা পরিহার করার জন্যে অত্যন্ত কড়া আদেশ বা তাগিদ করেছেন। এ আয়াতে মদ্যপান ও জুয়া খেলাকে বলিদানের স্থান ও ভাগ্য জানার উপায়াবলীর সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে এ দুটির জঘন্যতা ও বীভত্সতা দেখাবার জন্যে। এ কাজকে কুরআনী ভাষায় رجس বলা হয়েছে এবং এটাকে শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। আর শয়তানী কাজ যে জঘন্য রকমের নির্লজ্জতা তা বলাই বাহুল্য। এভাবে আয়াতে এ দুটিকে পরিহার করতে বলা হয়েছে। আর এ দুটোকে সামষ্টিক ক্ষতির দিক ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, এর ফলে মদ্যপায়ী নামায পড়তে পারবে না, আল্লাহকে ভুলে যাবে। লোকদের পরস্পরের মধ্যে চরম হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রাণের শত্রুতা পর্যন্ত সৃষ্টি হয়ে পড়বে। নাময পড়া ও আল্লাহকে স্মরণ করা- এ দুটো আত্মিক উত্কর্ষ লাভের মাধ্যমে মানুষ হারিয়ে ফেলবে। এসব বলার পর ঈমানদার লোকেরা সে দুটির কাজ সম্পূর্ণ পরিহার করে চলবে কিনা, তা অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানতে চাওয়া হয়েছে।

এরূপ কড়া আদেশ ও নির্দেশের জবাবে মুমিনদের একটি মাত্র কথাই বলার থাকতে পারে। আর তা হচ্ছে :

হে খোদা ! আমরা পরিহার করলাম।

হে খোদা আমরা তা থেকে বিরত থাকলাম।

আর কার্যত মুসলিম বিস্ময়কর দৃশ্যের সৃষ্টি করল। কিছু সংখ্যক মুসলিম একস্থানে একত্রিত হয়ে মদ্যপান করছিল। কারো হাতে পাত্র ছিল কিছু পান করেছে, এখনও পাত্র শেষ হয়নি। এ আয়াত শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গেই সে পাত্রটি মুখের কাছ থেকে টেনে নিল এবং অবশিষ্ট অংশ উপুড় করে ফেলে দিল।

মদ্য পানের এ দুষ্ক্রিয়া যা ব্যক্তি পরিবার সমাজ জাতি ও রাষ্ট্রের জীবন কঠিনভাবে প্রতিফলিত হয়, আধুনিক কালেরও বহু কয়টি রাষ্ট্র আইন ও ক্ষমতার বলে তা নিষিদ্ধকরণের জন্যে চেষ্টা চালিয়েছে। আমেরিকা এক সময় আইনের জোরে মদ্যপান বন্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এ কাজ চরমভাবে ব্যর্থতা স্বীকার করতে হয়। কেবলমাত্র ইসলামই মদ্যপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার মূলোত্পাটনে পূর্ণমাত্রায় সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

গীর্জা-কর্তৃপক্ষের মধ্যে সূরা পান সম্পর্কে খ্রিষ্টীয় ধর্মমত নির্ধারণে বড় মতদ্বৈততা দেখা দিয়েছে। তারা ইনজিলের এক একটি বাক্যাংশকে ভিত্তি করে একটা মত দাঁড় করিয়েছে :

অল্প পরিমাণ সুরা পান পাকস্থলীর জন্যে ভাল উপকারী।

এ কথা যদি নির্ভুল হয় আর মদ্য পাকস্থলীর জন্যে ভালই হয়, তাহলে অল্প পরিমাণ পান করত করতে মদ্যপায়ী বেশি বেশি পরিমাণে পান করতে শুরু করে দেবে, এটা তো অবধারিত। মদের একটি পাত্র আরও বহু কয়টি পাত্রের কামনা জাগিয়ে দেয় মাত্র। ফলে মাদ্যপান সে যেমন অভ্যস্থ হয়ে পড়বে, তেমনি পরিমাণের কোন সীমা রক্ষা করাই তার পক্ষে সম্ভব হবে না।

কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ইসলামের ভুমিকা সুস্পষ্ট এবং অকাট্য। তার মতো শুধু মদ পানই হারাম নয়, সে কাজ সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতাও সম্পূর্ণরূপে হারাম।

সমস্ত মাদক দ্রব্যই হারাম

নবী করীম (সা) যখন সর্বপ্রথম মদ্যপান নিষেধ ঘোষণা করেন তখন তিনি কি দিয়ে সুরা তৈরী করা হয়, সেদিকে আদৌ ভ্রুক্ষেপ করেন নি। তার নযর নিবদ্ধ ছিল তার ফল ও প্রতিক্রিয়ার উপর। আর তা হচ্ছে মাদকতা। কাজেই যে জিনিসেই মাদকতা থাকবে, তাই হারাম বিবেচিত হবে, তা সে বস্তু থেকেই তৈরী হোক- না কেন। মদ্য সম্পর্কে এ হচ্ছে ইসলামের চূড়ান্ত কথা। অতএব Beer এবং তার মতো অন্যান্য সর্বপ্রকার মাদক পানীয়ই সম্পূর্ণ হারাম।

নবী করীম (সা) এর কাছে মধু, ভুট্টা ও যব থেকে তৈরী মদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল। জবাবে তিনি একটি মৌলনীতির ঘোষনা করেন এবং বলেন : (আরবী*********************)

সকল প্রকার মাদক দ্রব্যই খামর। আর সব খামরই হারাম। (মুসলিম)

হযরত উমর ফারূক (রা) নবী করীম (সা) এর মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষনা করেছিলেন :

(আরবী************)

যে দ্রব্যই মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন ও বিকৃত করে, তাই খামর এবং নিষিদ্ধ। (বুখারী, মুসলিম )

মাদক দ্রব্য মাত্রই হারাম- অল্প হোক কি বেশি

ইসলামে মাদক দ্রব্য মাত্রই হারাম ঘোষিত হয়েছে। এ ব্যাপারে তার পরিমাণের ওপর মোটেই দৃষ্টি দেয়া হয়ানি। কাজেই তার পরিমাণ কম হোক কি বেশি, উভয় অবস্থায়ই তা হারাম। এ পিচ্ছিল পথে পা দিয়ে মানুষ যেন আছাড়ের পর আছাড় খেতে বাধ্য না হয়, সে জন্যেই এ ব্যবস্থা। নবী করীম (সা) স্পষ্ট করে বলেছেন :

(আাবী****************)

যে জিনিসের অধিক পরিমাণ নেশাগ্রস্ত করে, তার অঞ্জলী ভরা পরিমাণও হারাম। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)

(আরবী*******************)

যে জিনিসের কয়েক রতি পরিমাণও নেশাগ্রস্ত করে, তার অঞ্জলী ভরা পরিমাণও হারাম।

সুরার ব্যবসা

নবী করীম (সা) সুরা কম কি বেশি পরিমাণ পান করাকেই শুধু হারাম করে ক্ষান্ত হন নি। সুরার ব্যবসা করাকেও তিনি হারাম ঘোষণা করেছেন। এমনকি, অমুসলিমদের সাথেও এ ব্যবসা জায়েয নয়। কাজেই সুরার আমদানী বা রফতানী পর্যায়ের ব্যবসা করা কোন মুসলমানদের জন্যেই জায়েয হতে পারে না। সুরা উত্পাদনের কারখানা নির্মাণ বা বার খুলে বসা- কোনটিই জায়েয নয়। সুরার দোকানে চাকরী করাও সমানভাবে নিষিদ্ধ। এ কারণেই নবী করীম (সা) সুরার ব্যাপারে দশ ব্যক্তির ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। তারা হচ্ছে :(আরবী**********************)

সুরা উত্পাদনকারী, যে, উত্পাদন করায়, মদ্যপায়ী, বহনকারী, যার কাছে বহন করে নেয়া হয়, যে পান করায় পরিবেশনকারী, বিক্রয়কারী, মূল্য গ্রহণ ও ভক্ষণকারী, ক্রয়কারী এবং যার জন্যে তা ক্রয় করা হয়- এ সকলেরই ওপর অভিশাপ। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

(আরবী*******************)

আল্লাহ তাআলা সুরা পান হারাম করেছেন। কাজেই যে ই এ হুকুম জানতে পারবে তার কাছে তার কিছু পরিমাণ থাকলেও তা পানও করতে পারবে না, তা বিক্রয়ও করবে না। (মুসলিম)

হাদীস বর্ণনা কারী বলেন, এ সময় যার কাছে সূরা মজুদ ছিল। তারা সকলেই তা মদীনার পথে ঘাটে প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন।

সুরা পানের সব পথ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, কোন মুসলমান যেন এমন কোন ব্যক্তির কাছে আঙ্গুর বিক্রয় না করে, যার সম্পর্কে জানা যাবে সে, সে আঙ্গুর দ্বারা সুরা তৈয়ার করবে।

হাদীসে বলা হয়েছে : (আরবী************************)

যে লোক আঙ্গুরের ফসল কেটে রাখাই করবে কোন ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে যে তা থেকে সুরা তৈরী করবে, তাহলে সে জেনে-শুনেই আগুনে ঝাপ দিল। (আল তিবরানী ফিল আওসাত)

মুসলমান সুরা উপঢৌকন দিতে পারে না

সুরা বিক্রয় করা ও তার  মূল্য ভক্ষন করাই মুসলমানদের জন্যে হারাম নয়, কোন মুসলিম ব্যক্তিই তা কোন অমুসলিমকে উপঢৌকন স্বারূপ দেয়াও সম্পূর্ণ হারাম। তার জন্যেও এ উপঢৌকন আসতে পারে না। কেননা মুসলমান পবিত্র। সে পবিত্র জিনিস  ছাড়া অন্য কিছু উপঢৌকন বা মেহমানী হিসেবে কাউকে দিতেও পারেনা সে নিজেও গ্রহণ করতে পারে না। এক ব্যক্তি রাসূলে করীমের খেদমতে হাদিয়া হিসেবে সুরা পেশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। নবী করীম (সা) তা জানতে পেরে তাকে বললেন যে, আল্লাহ তাআলা সুরা হারাম করেছেন। তখন লোকটি বলল : তাহলে আমি তা বিক্রয় করে দিই? রাসূল বললেন : (আরবী***********)

যিনি তা পান করা হারাম করেছেন তিনিই তা কোন ইয়াহুদীকে তোহফাস্বরূপ দেয়াও হারাম করেছেন।

তখন লোকটি বলল, তাহলে আমি তা নিয়ে কি করব? রাসূলে করীম (সা) বললেন : মদীনার অলিগলিতে তা প্রবাহিত কর।

সুরা পানের আসর পরিহার করা

এ প্রেক্ষিতেই মুসলিম মাত্রকেই সুরা পানের আসর বা মজলিস পরিহার করে চলবার জন্যে আদেশ করা হয়েছে। মদ্যপায়ীদের সঙ্গে উঠা বসা করাও তাদের জন্যে নিষেধ। হযরত উমর (রা) বর্ণনা করেছেন : হযরত রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন :  (আরবী**********************)

আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার ব্যক্তি যেন এমন মজলিসে বা টেবিলে একত্রে না বসে, যেখানে সুরা পরিবেশন করা হয়। (আহম্মদ)

অপরদিকে মুসলিম মাত্রেই কর্তব্য অন্যায় ও পাপকর্য বন্ধ করার জন্যে চেষ্টা করা। কিন্তু তা করা যদি সম্ভবই না হয়, তাহলে সে নিজে তো অন্তত সেখানে থেকে কেটে পড়বে।

হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজীজ মদ্যপায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে সে লোকদেরও দোররা মারতেন, যারা তাদের মজলিসে উঠা বসা করত- নিজেরা তা পান না করলেও। একবার কতিপয় মদ্যপায়ী ধরে আনা হলো। তিনি তাদের শাস্তি দেবার নির্দেশ দিলেন। কেউ বললেন , তাহলে তো ওকেই প্রথম শাস্তি দিতে হবে। তোমরা কি আল্লাহর ও ফরমান শুনতে পাওনি :

(আরবী******)

তোমাদের কুরআনে এ ফরমান নাযিল হয়েছে যে, তোমরা যখন আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করতে ও তার প্রতি ঠাট্রা-বিদ্রুপ করা কথাবর্তা শুনতে পাবে, তখন তোমরা তার সাথে আর বসবে না। পরে যদি তারা অন্য কোন কথায় মনোযোগ দেয়, তখন অবশ্য অন্য কথা। কিন্তু ঐ সময়ও যদি তোমরা তাদের সাথে বসা থাক, তাহলে তোমরাও অনুরূপ অপরাধে অপরাধী হবে।

সুরা রোগ- ঔষধ নয়

এসব অকাট্য দলিল- প্রমাণের ভিত্তিতে বোঝা যায়, ইসলাম সুরা বিরোধী সংগ্রামে অত্যন্ত কঠিন ও অনমনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মুসলিমকে তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে। মুসলমান ও সুরা পানের মাঝে দুর্লংঘ্য প্রাচীর দাঁড় করাতে চেয়েছে। যেন একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র ও পথও উন্মুক্ত না থাকে। সুরাকে কোন কাজে ব্যবহার করার কোন সুযোগই মুসলমানদের জন্যে উন্মুক্ত রাখা হয়নি।

মুসলমানের জন্য মদ্যপান- সামান্য পরিমাণও জায়েয রাখা হয়নি। তা ক্রয়-বিক্রয়ও করা যেতে পারে না। হাদিয়া-তোহফা হিসেবে তা করো জন্যে পেশ করাও যেতে পারে না। তা তৈরী করাও নিষেধ, স্বীয় দোকানে, অফিসে বা বসবাসের ঘরে তা রাখাও সম্পূর্ণ হারাম। উত্সব-দাওয়াত-যিয়াফত-মেহমানদারীতে তা পেশ করা যেতে পারে না। অমুসলিম মেহমানদের মেহমানদারীও করা যেতে পারে না তা দিয়ে। অনুরূপভাবে খাদ্য পানীয়ের সাথে তা মিলিয়ে দেয়ারও কোন অনুমতি নেই ইসলামে।

তবে ঔষধ হিসেবে সুরা ব্যবহার করা যায় কিনা- আজকের মানুষের এ একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাসূলে করীম (সা) কেও এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বললেন : (আরবী*******************)

সুরা কোন ঔষধ নয় আসলে তা ব্যাধি মাত্র । (মুসলিম, আহম্মদ, আবূ দাউদ, তিরমিযী)

রাসূলে করীম (সা) বলেছেন : (আরবী*********************)

আল্লাহ রোগ-ব্যাধি ও তার ঔষধ উভয়ই নাযিল করেছে। তোমাদের রোগের চিকিত্সার ব্যবস্থাও তিনি করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা চিকিত্সা করবে, তবে হারাম জিনিস দ্বারা নয়। (আবু দাউদ)

(আরবী*******************)

যে সব জিনিস তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে, আল্লাহ তাতে তোমাদের রোগের আরোগ্য রাখেন নি।

সুরা ও অন্যন্য হারাম দ্রব্য দ্বারা চিকিত্সা করান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা কোন বিস্ময়োদ্দিপক ব্যাপার নয়। কেননা একটি জিনিস হারাম করার অর্থ হচ্ছে তা থেকে দূরে থাকতে বলা, তা সম্পূর্ণ ও সর্বতোভাবে পরিহার করে চলতে নির্দেশ দেয়া। এক্ষণে তাই যদি ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সে হারাম জিনিসের মধ্যেই ডুবে থাকতে হবে, তার দিকেই উত্সাহ যোগান হবে। আর তাহলে সে জিনিস হারাম করাটাই অর্থহীন হয়ে যায়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এ যুক্তিই দেখিয়েছেন।

তিনি আরও বলেছেন : হারাম জিনিস ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি থাকলে তার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আকর্ষণই বৃদ্ধি পাবে। কেননা তার প্রতি মনের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে তা যখন উপকারী প্রমাণিত হবে, রোগ নিরাময়কারী ও স্বাস্থ্যদানকারী মনে হবে, তখন তা থেকে বিরত থাকা সম্ভব হবে না। সুরাকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি থাকলে তা লালসা চরিতার্থ করার উপায় হয়ে দাঁড়াবে। এ পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানস্তত্ত্বিক দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম লিখেছেন :

ঔষধ দ্বারা আরোগ্য লাভের জন্যে তা আগ্রহ ও আন্তরিকতা সহকারে ব্যবহার করা কর্তব্য। তাকে উপকারী মনে করতে হবে। আল্লাহ তাতে যে আরোগ্য রেখেছেন তার বরকত লাভ সম্ভব হবে বলে মনে করতে হবে বলে মনে করতে হবে। কিন্তু একজন মুসলমান বিশ্বাস করে যে, সুরা অকাট্যভাবে হারাম। এ বিশ্বাসের কারণেই তার পক্ষে সুরার দ্বারা আরোগ্য লাভ সম্ভব হবে না। এরূপ বিশ্বাস সুরা সম্পর্কে ভাল ধারণার সৃষ্টি হতে দেবে না। তা আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করাও কঠিন। বরং বান্দা ইমানে যতটা পরিপাক হবে, সুরাকে সে তত বেশি ঘৃণাই করবে। তাকে খারাপ মনে করবে, তা সে সহ্যই করতে পারবে না। এরূপ অবস্থায় সুরা ব্যবহারে রোগমুক্তি লাভ সম্ভব হবে না বরং তাতে তার রোগ বেড়েই যাবে। (আরবী*******************)

এ সব কথাই সত্য। তবুও প্রয়োজন ও ঠেকা-বাধাও শরীয়তের দৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ জন্যে তার প্রতি লক্ষ্য রেখে শরীয়তের বিধান রচনা করা হয়েছে। যে রোগে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে আর তার জন্যে সুরা বা সুরা মিশ্রিত কোন ঔষধ যদি একমাত্র ঔষধ রূপে চিহ্নিত করা হয়, তা ছাড়া যদি এমন আর কোন ঔষধই পাওয়া না যায় তার বিকল্প হতে পারে কোন ইমানদার মুসলিম ডাক্তারই যদি তার ব্যবস্থা দিয়ে থাকে যার মধ্যে ঈমানী বলিষ্ঠতা বর্তমান, কেবলমাত্র এরূপ অবস্থায়ই তা ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। (তবে এরূপ অবস্থা ‍খুব যে দেখা যায় তা নয়) কেননা শরীয়ত মানুষের জীবন সহজতা নিয়ে আসে, প্রতিবন্ধকতা ও  অসুবিধা দূর করে। অবশ্য ইসলামের এ অনুমতি নির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ সীমার মধ্যেই কাজে লাগাতে হবে, তা লংঘন করা যাবে না। আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন : (আরবী*******************)

কেউ যদি কঠিনভাবে ঠেকায় পড়ে যায় কিন্তু সে নিজে ইচ্ছুক ও আগ্রহী নয়, সীমালংঘনকারীও নয়, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান।

চেতানা নাশক দ্রব্যাদি

খামর তাই যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি আচ্ছন্ন করে দেয়। এ একটি অতী গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক তাত্পর্যপূর্ণ মৌলনীতি। হযরত উমর (রা) রাসূলে করীমের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দান প্রসঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন। এ কথার আলোকে কুরআনে ব্যবহৃত خمر শব্দের তাত্পর্য বোঝা যায় এবং এ ব্যাপারে কোনরূপ শোবাহ-সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এ থেকে অকাট্যভাবে জানা গেল, যে দ্রব্যই মানুষের বিবেক-বুদ্ধি আচ্ছন্ন করে, অনুভূতি ও বিচার-বুদ্ধি, বোধশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ শক্তি হরণ বা কোন রূপ প্রভাবিত করে, তাই খামর বা সুরা (মদ্য) নামে অভিহিত। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সে জিনিসকেই চিরদিনের তরে হারাম করেছেন।

গাঁজা, আফিম, কোকেন, প্রভৃতি এই পর্যায়েরই জিনিস। তা মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে দেয় যে, দুরবর্তী জিনিস নিকটবর্তী এবং নিকটবর্তী জিনিস দূরবর্তী মনে হয়। যা বস্তবিকই বর্তমান, সে ব্যাপারে বিভ্রম বা ভ্রান্তি হতে শুরু করে। আর যা প্রকৃতপক্ষেই নেই, তা আছে বলে মনে করতে থাকে। এভাবে সে চরম ভুল-ভ্রন্তি ও ভিত্তিহীন ধারণা-কল্পনার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে নিজের সত্তা নিজের দীন ধর্ম ও দুনিয়া সব কিছুই ভুলে গিয়ে নিছক কল্পনার জগতে বিচরণ করতে শুরু করে।

তা ছাড়া এ ধরনের মাদক দ্রব্য পানে স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। স্নায়ুবন্ডলী চেতনা হারিয়ে ফেলে। শরীর দুর্বল হয়ে যায়। উপরন্তু তার দুর্বলসম মানসিকতা, সাহসহীনতা, নৈতিক পতন ও ইচ্ছাশক্তি ধৈর্যহীনতার সৃষ্টি হয়, তার ফলে এসব বিষাক্ত দ্রব্যাদি পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি সমাজ দেহে ব্যাপক পচন ধরিয়ে দেয়।

এতসব দোষ ও বিপর্যয় চাড়াও ধন-মালের অপচয় এবং ঘর-সংসারের ভাঙন ও বিপর্যয় এক অনিবার্য  পরিণতি। অনেক সময় এসব চেতনা নাশক (annesthetic) দ্রব্যাদি পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি তার সন্তান-সন্ততির খাবার –দাবারের পয়সাও এই দ্রব্য ক্রয়ে ব্যয় করে ফেলে। এ জন্য দুর্নীতি ও অসত্ পন্থা অবলম্বনেও তাদের কোন কন্ঠা বা দ্বিধা থাকে না।

পূর্বেই বলা হয়েছে, ইসলামের মৌলনীতি হচ্ছে, হারাম জিনিস সমূহই সর্ব প্রকার জঘন্যতা, মন্দত্ব, নিকৃষ্টতা ও ক্ষতির কারণ। আর বাস্তবত এ সত্য উদঘাটিত হয়েছে যে, স্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে মনস্তাত্ত্বিক, সামষ্টিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিতেও এ সব জিনিসই অত্যান্ত ক্ষতিকর ও মারাত্বক- এতে কোনই সন্দেহ নেই। যে সব ফিকাহবীদ জীবনদ্দশায় এ সব জিনিসের প্রচলন শুরু হয়েছিল, তারা এগুলোর জঘন্যতা ও নিকৃষ্টতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এদের মধ্যে সর্বাগ্রসর। তিনি লিখেছেন:

হাশীশ-গাঁজা হারাম। তাতে বেঁহুশী হোক আর নাই হোক। তা পান করলে হৃদয়-চাঞ্চন্য, উল্লাস-স্ফূর্তী এবং আনন্দে আত্মহারা ভাব জেগে উঠে। এ কারণে প্রধানত খোদাদ্রোহী লোকেরাই তা পান করতে অভ্যস্থ। ক্রিয়া ও বিশেষত্বের দিক দিয়ে তা সুরার মতই উত্তেজক। তা মানুষকে ঝগড়া-ঝাটি করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর গাঁজা বুদ্ধিবিভ্রম ঘটিয়ে চরম জিল্লতির সৃষ্টি করে। তা মানুষের বিবেক ও মেজাজ প্রকৃতিও খারাপ করে দেয়। তা যৌন দুষ্প্রবৃত্তির উত্তেজনা সৃষ্টি করে। মানুষ আত্মমর্যাদাবোধও হারিয়ে ফেলে। এসব কারণে গাঁজা মাদকতার দিক দিয়ে সুরার চাইতেও বেশি নিকৃষ্ট ও অনিষ্টকর। তাতার সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থানের প্রভাবে লোকেদের মধ্যে এ জিনিসের ব্যাপক প্রচলন ঘাটায়। তা পান করলে- পরিমাণ বেশি বা কম- মদ্যপানের দণ্ড আশি বা চল্লিশ চাবুক মারা উচিত।

যে ব্যক্তি গাঁজা পান করেছে বলে প্রমাণিত হবে, মনে করতে হবে সে সুরা পান করার অপরাধ করেছে। কোন কোন দিক দিয়ে তা সুরা পানের চাইতেও বেশি মাত্রায় অপরাধ। কাজেই তাকে সুরা পানের দণ্ডই দিতে হবে। শরীয়তের নিয়ম হলো যেসব হারাম জিনিসের প্রতি মনে কামনা ও বাসনা জাগে যেমন সুরা ও ব্যভিচার তাতে হদ্দ জারী করতে হবে। কিন্তু যেসব জিনিসের প্রতি কামনা জাগে না, যেমন মুর্দার খাওয়া, তা খেলে তাজীর দিতে হবে। আর গাঁজা পানকারীদের কাছে তা এতই প্রিয় ও লোভনীয় যে, তা তারা কখনই ত্যাগ করতে পারে না অথচ কুরআন ‍ও সুন্নাতের অকাট্য দলিলাদি এগুলোর হারাম হওয়ার কথা এতই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যেমন সুরা ও অন্যান্য ধরনের জিনিস হারাম হওয়া প্রমান করে।

(আরবী**************)

ক্ষতিকর জিনিস মাত্রই হারাম

ইসলামী শরীয়তের সাধারন নিয়মে মুসলমানের পক্ষে এমন কোন জিনিস খাওয়া বা পান করা জায়েয নয়, যা তাকে সঙ্গে সঙ্গে অথবা ধীরে ধীরে ধ্বংস ও সংহার করতে পারে। সর্ব প্রকারের বিষ বা অপর কোন ক্ষতিকর জিনিস এ জন্যেই হারাম। খুব বেশি পরিমান পানাহার করাও নাজায়েয, কেননা তাতে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। মুসলিমকে কেবল নফসের দাবি পূরণের কাজ করলেই চলবে না, তার দ্বীন, মিল্লাত, জীবন, স্বাস্থ্য, ধন-মাল ও আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতও তার কছে আমানস্বরূপ রক্ষিত। সে সবের হকও আদায় করতে হবে। কাজেই এর কোন একটা জিনিসও বিনষ্ট করার তার কোন অধিকার নেই। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : (আরবী**********************)

তোমরা নিজেদের সত্তাকে হত্যা কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতীব দয়াময়। (সূরা আন-নিসা : ২৯)

(আরভী*********************)

তোমরা নিজেদের হাতেই নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষপ করবে না।

রাসূলে করীম (সা) বলেছেন : (আরবী********************)

নিজের ক্ষতি স্বীকার করবে না, অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

এসব মৌল নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, তামাক ব্যবহারকারীদের বক্ষে তা যদি ক্ষতিকর হয়, তাহলে তা হারাম। (হারাম বলার সরাসরি কোন দলিল নেই।  যা আছে তাতে বড়জোর মাকরূহ বলা যায়) বিশেষ করে চিকিত্সক যদি কোন বিশেষ ব্যক্তির পক্ষে তামাক খাওয়া ক্ষতিকর বলে দেয়, তাহলে তা উপরিউদ্বৃত আয়াতে নিষিদ্ধ আর যদি তা স্বাস্থ্য হানিকর নাও হয়, তবু তাতে যে ধন মালের চরম অপচয় হয়, তাতে না কোন দ্বীনী ফায়দা আছে, না বৈষয়িক, এতে কোন সন্দেহ নেই। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : (আরভী*************************)

ধন-মালের অপচয় বিনষ্ট করতে নবী করীম (সা) নিষেধ করেছন।

কিন্তু কেউ যদি এতদূর গরীব হয়ে থাকে, যার পক্ষে তার নিজে ও পরিবারবর্গের জন্যে প্রয়োজনীয় খরচ পত্র যোগাড় করাও কঠিন, তাহলে তার জন্যে এ নিষেধ অধিক কড়া ও তাগিদপূর্ণ।

পোশাক পরিচ্ছদ

মুসলমান আল্লাহর সৃষ্টি করা সৌন্দর্য পোশাক ও উত্তম পরিচ্ছদ ব্যবহার করে নিজের আকার-আকৃতি, ছবি-সুরত সৌন্দের্যমণ্ডিত করবে, ইসলামে তা শুধু জায়েযই নয়, তা পুরোপুরি কাম্যও বটে।

ইসলাম পোশাক দ্বারা দুটো লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। একটি হচ্ছে লজ্জাস্থান আবৃতকরণ আর দ্বিতীয়টি সৌন্দর্য লাভ। আল্লাহ তাআলা জাতির জন্যে পরিচ্ছদ ও সৌন্দর্য সামগ্রীর সুব্যবস্থা করে বিরাট অনুগ্রহ করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন :

(আরবী*********************)

হে আদম সন্তান ! আমরা তোমাদের জন্যে পোশাক পরিচ্ছদ নাযিল করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং তোমাদের ভূষণও। পোশাকের উদ্দেশ্যে লজ্জাস্থান আবৃতকরণ এবং ভূষণ- এ দুয়ের মধ্যে অবশ্যই সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য স্থাপন ও রক্ষা করতে হবে। এ ভারসাম্য নষ্ট করা হলে ইসলামের রাজপথ পরিহার করে শয়তানী পথ অবলম্বন করা হবে। এ এক অতীব গুরুত্বপূর্ন তত্ত্ব। নিম্নোদ্বৃত আয়াতে আল্লাহ তাআলা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে নগ্নতা ও সৌন্দর্যহীনতার পথ অবলম্বন করতে সুস্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন : (আরবী*********************)

হে আদম সন্তান! শয়তান যেন তোমাদের বিপদে নাফেলে, যেমন করে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত করেছিল এবং তাদের পোশাক তাদের গাত্র থেকে খসিয়ে নিয়েছিল, যেন তাদের লজ্জাস্থানসমূহ তাদের সমুখে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। (সুরা আল-আরাফ : ২৭)

অপর আয়াতে বলেছেন : (আরবী*********************)

হে আদম সন্তান! তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর প্রতিটি মসজিদের উপস্থিতিকালে এবং খাও, পান কর, কিন্তু সীমালংঘন করো না। (সূরা আল-আরাফ :৩১)

সুসভ্য মানুষ তার দেহের যেমন গোপন অঙ্গ উলঙ্গ করতে লজ্জাবোধ করে, তা আবৃত এবঙ ন্যাংটা পশুদের থেকে স্বতন্ত্র ছবি-সুরত গ্রহণ করাকে ইসলাম মুসলিম মাত্রের জন্যেই ফরয করে দিয়েছে। ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে নির্জন একাকিত্বও লজ্জাস্থান আবৃত করে রাখবে, যেন লজ্জা-শরম মানুষের অভ্যাস ও স্বাভাবগত ভূষণে পরিণত হয়।

বহজ ইবনে হাকীম তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন : (আরবী*********************)

আমি বললাম, হে রাসূল ! আমরা আমাদের সতরের ব্যাপারে কতটা সতর্কতা অবলম্বন করব? আর কতটা নয়? রাসল বললেন, তোমার লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ কর- নিজ স্ত্রী ও ক্রিতদাসী ছাড়া- অন্য সকলের থেকেই। আমি বললাম, হে রাসূল! লোকেরা যখন সফর ইত্যাদিকালে একত্রে উঠাবসা করবে তখন? বললেন : তখনও যতটা সম্ভব লজ্জাস্থান আবৃত রাখবে। আমি বললাম, আমাদের কেউ যখন একাকী থাকে, তখন? বললেন : আল্লাহ তা‘আলাকে অধিক লজ্জা করাই সকলের কর্তব্য। (আহম্মদ, আবু-দাউদ, ইবনে মাযাহ, তিরমিযী, হাকেম, বায়হাকী)

পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বিধায়ক দ্বীন

ইসলাম সৌন্দর্যর পূর্বে পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা পরিচ্ছন্নতা সর্বপ্রকার সৌন্দর্য-শোভা ও চাকচিক্যের জন্যে ভিত্তিস্বরূপ কাজ করে রাসূলে করীম (সা) বলেছেন :

(আরবী*******************)

তোমরা সকলে পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন কর। কেননা ইসলাম পরিচ্ছন্ন দ্বীন।

(আরবী*********************)

পরিচ্ছন্নতা ঈমান ডেকে আনে। আর ঈমান তার সঙ্গীকে নিয়ে জান্নাতে চলে যাবে। (তিবরানী)

নবী করীম (সা) শরীর, পোশাক, ঘর-বাড়ি ও রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন করার ও রাখার জন্য উত্সাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে দাঁত, হাত ও মস্তক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন।

পরিচ্ছন্নতার এ গুরুত্ব দ্বীন-ইসলামে কিছুমাত্র আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। কেননা এ দ্বীনই নামাযের ন্যায় এক প্রাথমিক ইবাদতের জন্যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাকে কুঞ্চিকার ন্যায় বলে ঘোষনা করেছে। এ কারণে নামাযীর নামায কবুল হয় না যদি না তার শরীর পোশাক ও স্থান পরিচ্ছন্ন থাকে। গোসল ও অযু দ্বারা যে পরিচ্ছন্নতা পবিত্রতা অর্জিত হয়, এ পরিচ্ছন্নতা তা থেকে ভিন্নতর জিনিস।

আরবীয় লোকেরা গ্রাম্য ও মরু পরিবেশে বসবাস করত। তার দরুন অনেক লোকই পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের ব্যাপারে তেমন সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন মনে করত না। এ কারণে নবী করীম (সা) সব সময়ই তাদের মধ্যে পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার অনুভূমি জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করতেন। তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের এতটা উন্নত করে তুলেছিলেন যে, তারা দুনিয়ার সেরা সভ্য জাতিতে পরিণত হয়েছিল। সব রকমের হীনতা, নীরবতা তাদের জীবনে অতীত হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের অবস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য বিকশিত হয়ে উঠেছিল।

এক ব্যক্তি নবী করীম (সা) এর খেদমতে হাজির হয়েছিল। তার দাড়ি ও মাথার চুল অবিন্যস্ত অবস্থায় ছিল। রাসূল (সা) তার প্রতি এমন ভাবে ইঙ্গিত করলেন যে, মনে হলো, তিনি হয়ত তাকে চুল দাড়ি ঠিকঠাক করার নির্দেশ দিচ্ছেন। সে তাই করে চুল-দাড়ি ঠিকঠাক করে রাসূলের সম্মুখে হাজির হলো। তাকে দেখে নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী**************)

এটা ভাল, না কারো এমন ভাবে আসা ভাল যে, তার মাথা আউলানো-ঝাউলানো থাকবে, যেন সে কতটা শয়তান।

নবী করীম (সা) অপর এক ব্যক্তিকে দেখলেন তার মাথার চুল আউলানো-ঝাউলানো। তিনি বললেন : (আরবী**********)

ও লোকটি মাথার চুলগুলো ঠিকঠাক করার জন্যে কি কিছুই পায়নি? ময়লা কাপড়-চোপড় পরা অপর একটি লোককে দেখে তিনি বললেন : ও লোকটি তা কাপড় পরিষ্কার করে ধৌত করার কি কিছুই পায়নি ? (আবু দাউদ)

রাসূলে করীম (সা) অপর একটি লোককে দেখতে পেলেন, যার পরণে খারাপ ধরনের কাপড় ছিল। তাকে বললেন :- তোমার কি ধন-মাল কিছু আছে ?

লোকটি বলল : জি হ্যাঁ। জিজ্ঞাস করলেন : কি ধরণের ধন-মাল? লোকটি বলল :

(আরবী******************)

আল্লাহ আমাকে সব ধরনের ধন-মাল দিয়েছেন।

তখন নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী**********************)

আল্লাহ যখন তোমাকে ধন-মাল দিয়েছেন, তখন আল্লাহর নেয়ামত ও তাঁর অনুগ্রহের পরিচয় তোমার ওপর থেকে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। (নিসায়ী)

নবী করীম (সা) জুম‘আ ও দুই ঈদ ধরনের জন-সম্মেলনসমূহের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নাতার সুষ্ঠু ব্যবস্থা রক্ষার জন্যে বিশেষ তাগিদ করেছেন। তিনি বলেছেন : (আরবী******************)

সম্ভব হলে কাম-কাজের কালে পরা দুখানি কাপড় ছাড়া জুমা‘আর দিনে ভিন্ন দুখানি কাপড় পরিধান করা কর্তব্য। (আবু দাউদ)

স্বর্ণ ও রেশমী কাপড় পুরুষদের জন্যে হারাম

ইসলাম যেখানে সৌন্দর্যকে বৈধ এবং কাম্য ঘোষণা করেছে এবং তাকে হারাম মনে করতে নিষেধ করেছে- যেমন বলা হয়েছে :

(আরবী*******************)

বল, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্যে যে সৌন্দর্য ও পবিত্র রিযকসমূহের ব্যবস্থঅ করেছেন, তাকে কে হারাম করেছিল? (সূরা আরাফ :৩২)

যেখানে পুরুষদের জন্যে দুই ধরনের সৌন্দর্যের জিনিস হারাম করা হয়েছে, যদিও তা মাহিলাদের জন্যে সম্পূর্ণ হালাল করা হয়েছে : প্রথম, স্বর্ণালংকার ব্যবহার।

দ্বিতীয়, খাঁটি রেশমী বস্ত্র পরিধান।

হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন : (আরবী*******************)

নবী করীম (সা) রেশম ডান হাতে নিয়ে এবং স্বর্ণ বাম হাতে নিয়ে বললেন : এ দুটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষ লোকদের জন্যে হারাম। (আহমদ, আবু দাউদ, নিসারী)

হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি নবী করীম (সা) কে বলতে শুনেছি : (আরবী**************)

তোমরা রেশমী কাপড় পরিধান করবে না। কেননা যে লোক দুনিয়ায় রেশমী কাপড় পরিধান করবে, সে পরকালে তা পরতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)

রেশমী পোশাক সম্পর্কে তিনি বলেছেন : (আরবী*****************)

এটা সেই লোকদের পোশাক, পরকালে যাদের কোন কিছুই প্রাপ্য নেই।

নবী করীম (সা) এক ব্যক্তির হাতে একটি স্বর্ণের অঙ্গুরীয় দেখতে পেলেন। তখন তিনি-সেটিকে টেনে বের করে দূরে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন : (আরবী**********************)

তুমি কি নিজ হস্তে স্ফূলিঙ্গ ধরে রাখতে চাও?

পরে নবী করীম (সা) উঠে চলে যাওয়ার পর লোকটিকে বলা হয়,  তোমার আঙ্গুরীয় তুলে নাও এবং সেটা কাজে লাগাও। তখন সে বলল : (আরবী*********************)

না, আল্লাহর কসম। রাসূলে করীম (সা) যা দূরে নিক্ষেপ করেছেন আমি তা তুলে নেব না। (মুসলিম)

এই স্বর্ণের অঙ্গুরীয়ের ন্যায় আধুনিকাকালে বিলাসী ধনশালী লোকদের দেখা যায় স্বর্ণের কলম, স্বর্ণের সিগারেট লাইটার, স্বর্নের সিগারেট কেস ও স্বর্নের সিগারেট হোল্ডার প্রভৃতি ব্যবহার করতে। এ সবই হারাম।

তাবে রৌপ্য নির্মিত অঙ্গুরীয় ব্যবহার করা পুরুষের জন্যেও হালাল এবং মুবাহ করেছেন নবী করীম (সা)। বুখারী শরীফে হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন : (আরবী***********************)

নবী করীম (সা) একটি রৌপ্যের অঙ্গুরীয় নানিয়েছিলেন এবং সেটি তার হাতেই শোভা পাচ্ছিল। পরে তা হযরত আবু বকরের হতে শোভা পেতে থাকে। তাঁর পরে হযরত উমরের হাতে এবং তার পর হযরত উসমানের হাতে। শেষ পর্যন্ত তা আরীস নামক কূপে পড়ে যায়। (বুখারী)

এ ছাড়া লোহা ও অন্যান্য তৈরী আঙ্গুরীয় ব্যবহার করা হারাম নয়। কোন অকট্য দলিল দ্বারাই তার হারাম হওয়ার কথা জানা যায় না এবং বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম (সা) এক ব্যক্তিকে মোহরানা সম্পর্কে বলেছেন : (আবরী****)

কোন কিছু তালাশ করে নিয়ে আস, একটি লোহার আঙ্গুরীয়ই হোক না কেন।

ইমাম বুখারী এ হাদীসের ভিত্তিতে লৌহ নির্মিত অঙ্গুরীয় ব্যবহার জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন।

তবে প্রকৃত কোন কারণ থাকলে রেশমী কাপড় ব্যবহার করা জায়েয হতে পারে। নবী করীম (সা) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ও হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (সা) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) কে তাঁদের খোস-পাঁচড়া ও চুলকানি ধরনের রোগের কারণে রেশমী কাপড় ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

রেশম ও স্বর্ণ ব্যবহার পুরুষদের জন্যে হারাম করার কারণ

রেশম ও স্বর্ণালংকার ব্যবহার পুরুষদের জন্যে হারাম করার মৌল উদ্দেশ্যে হচ্ছে, তাদের অতি উত্তম নৈতিক প্রশিক্ষণ দান। কেননা দ্বীন-ইসলাম জিহাদ ও শক্তি প্রদর্শনের দ্বীন। তাই তা সর্বপ্রকার নৈতিক দুর্বলতা উচ্ছঙ্খলতা ও পতন থেকে পৌরুষকে রক্ষা করা ইসলামের লক্ষ্য। আল্লাহ তা‘আলা পুরুষকে এক বিশেষ ধরনের অঙ্গ সৌষ্ঠব ও সংগঠন কাঠামো দান করেছেন এবং তা নারী থেকে ভিন্নতর। কাজেই পুরুষদের উচিত নয় সুন্দরী নারীদের সেঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে মূল্যবান অলংকারাদি ও খুব চাকচিক্যপূর্ন পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে শুরু করা। এতদ্ব্যতীত সামষ্টিক ও সামগ্রিক কন্যাণও এর মুলে নিহিত রয়েছে।

ইসলাম বিলাসিত, আরাম-আয়েশ ও জাঁকজমকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। পুরুষদের জন্যে স্বর্ণালংকার ও রেশমী পোশাক হারাম করা এ সংগ্রামেরই একটি অংশ বিশেষ। কেননা বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশ কুরআনের দৃষ্টিতে জাতীয় ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারন হয়ে দেখা দিতে পারে। তা সামষ্টিক জুলুম ও শোষণের ফসলও। কেননা মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক বিপল সংখ্যক লোককে এবং দরিদ্রদের শোষণ করেই এ বিলাসিতার পাহাড় জমা করে ও সীমাহীন আরাম-আয়েশ উপভোগ করে। আর এ শ্রেনীর লোকেরাই চিরকাল যে কোন সামাজিক সংশোধন ও সামষ্টিক কল্যাণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে শক্তি প্রতিরোধক হয়ে দাড়িয়েছে। এ পর্যায়ে কুরআনের ঘোষণা হচ্ছে : (আরবী************************)

আমরা যখন কোন দেশ ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত করি, তখন সেখানে সচ্ছল অবস্থার বিলাসী ও আরাম-আয়েশে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের নিয়োজিত করি, তারা সেখানে আল্লাহর নাফরমানী করতে শুরু করে। তখন আযাবের ফয়সালা সেখানকার লোকদের ওপর কার্যকর করে দিই, সেটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিই। (সুরা বনী ইসরাইল : ১৬)

(আরবী***********************)

আমরা যখন কোন ভয় প্রদর্শনকারীকে কোন লোকালয়ের প্রতি প্রেরণ করি এবং সে তা করতে শুরু করে, তখন সেখানকার সুখী বিলাসী বড় লোকেরা বলতে শুরু করে, তোমাদের যে দায়িত্ব সহকারে পাঠান হয়েছে, তা অস্বীকার করছি। (সূরা আস-সাবাঃ ৩৪)

কুরআনের এ ভাবধারা ও দৃষ্টিকোণের সাথে সামঞ্জন্য রক্ষা করেই নবী করীম (সা) বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশের দ্রব্য-সামগ্রীকে মুসলিম জীবনে হারাম করে দিয়েছেন। তাই দেখতে পাই, একদিকে পুরুষদের জন্যে যেমন স্বর্ণালংকার ও রেশমী কাপড় হারাম করে দিয়েছেন, অপরদিকে ঠিক তেমনি পুরুশ-নারী- উভয়ের প্রতিই হারাম করে দিয়েছেন যাবতীয় স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈজস পাত্রদি।

এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কারণও নিহিত রয়েছে। কেননা স্বর্ণ নগদ সম্পদ হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষিত মূলধন রূপে গণ্য। কাজেই তা পুরুষদের পক্ষ অলংকার বা পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না।

মহিলাদের জন্যে তা হালাল কেন

মহিলাদের জন্যে স্বর্ণালংকার ও রেশমী পোশাক ব্যবহার হারাম না করে মহিলাদের বিশেষ দিক গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারী প্রকৃতি স্বভাবতঃই সৌন্দর্যপ্রবণ। রূপ চর্চা, প্রসাধন ও অলংকারাদি ব্যবহারের একটা স্বাভাবিক দাবি রয়েছে নারী চরিত্রে। তবে এসবের সাহায্যে ভিন পুরুষদের আকৃষ্ট করা ও তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলার কোন অনুমতি বা সুযোগ ইসলামে নেই। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী****************)

যে নারীই সুগন্ধি লাগিয়ে ভিন পুরুষদের সান্নিধ্যে যায়, তার সুঘ্রাণ তারা পেয়ে যায়, সে ব্যভিচারীনী এবং তার প্রতি দৃষ্টিই ব্যভিচারী দৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায়। (নাসায়ী, ইবনে খারা, ইবনে হারয়াশ)

নারী সমাজকে সতর্ককরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী*******************)

মহিলারা যেন তাদের পা এমন জোরে না ফেলে, যাতে করে তাদের লুকিয়ে রাখা সৌন্দর্য প্রকাশিত ও গোচরীভূত হয়ে যেতে পারে। (সূরা নূরঃ ৩১)

মুসলিম মহিলার পোশাক

ইসলাম মহিলাদের জন্যে এমন পোশাক পরিধান হারাম করে দিয়েছে, যার ভেতর দিয়ে দেহের কান্তি (সৌন্দর্য) বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়তে পারে। অনুরূপভাবে যে পোশাকের দরুন দেহের বিশেষ বিশেষ অংশ উলঙ্গ হয়ে থাকে এবং তা দেখে পুরুষেরা যৌন উত্তেজনা বোধ করতে পারে, তেমন পোশাক পরাও মহিলাদের জন্যে সম্পূর্ণ হারাম। বক্ষদ্বয়, কোমর, উরু বা পিঠ ও পেট উলঙ্গ রেখে পোশাক পরা কোন মুসলিম মহিলার জন্যে আদৌ জায়েয নয়।

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবি****************)

দুই ধরনের লোক জাহান্নামী হবে। এক ধরনের লোক হচ্ছে, সেসব জালিম শাসক-প্রশাসক, যাদের সঙ্গে গরুর লেজের মত চাবুক সবসময় ঝুলতে থাকবে এবং যা দিয়ে তারা লোকদের ওপর আঘাত করতে থাকবে। আর দ্বিতীয় হচ্ছে সেসব মেয়েলোক, যারা কাপড় পরিধান করেও ন্যাংটা থাকে। তারা পুরুষদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করবে আর নিজেরাও পুরুষদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে। তাদের মাথা উষ্ট্রের ঝুঁকেপড়া চুটের মতো হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তার সুগন্ধিও তারা পাবে না। যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। (মুসলিম)

কাপড় পরা সত্ত্বেও যেসব নারী উলঙ্গ থাকে এ কারণে যে, তাদের কাপড় দেহের সর্বাঙ্গ আবৃত করে না, তাদের কাপড় এতই পাতলা যে, তার ভেতর দিয়ে দেহের কান্তি (সৌন্দর্য) ফুটে বের হয়ে আসে। আর এজন্যেও যে, তারা কাপড় পরবেই দেহের যৌন উত্তেজক অংশসমূহ উন্মুক্ত রেখে। এ উভয় অবস্থায়ই কাপড় পরার মৌল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। বর্তমানের আধুনিকারা এ ধরনের পোশাক পরতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এই নারীদের মাথাকে উটের চুটের মতো বলা হয়েছে এ কারণে যে, তারা তাদের মাথার চুলের খোপা মাথার ওপর খুব উঁচু করে বাঁধে। মনে হচ্ছে, নবী করীম (সা) ভবিষ্যতের অদৃশ্যকে তখনই সুস্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন। কেননা মেয়েদের চুল বাঁধার এই প্রচলন আধুনিক কালের। সেকালে এ অবস্থা ছিল না। একালে চুল সুন্দর করার ও তাতে খোপা বেঁধে ‘ফ্যাশন্যাবল’ বানানর জন্যে বিশেষ বিশেষ শহরে আধুনিক স্টাইলের ‘সেলুন’ গড়ে উঠেছে। এসব সেলুনকে আরবী ভাষায় (আরবি*************) ‘কাওয়াফির’ বলা হয়। প্রায় সর্বত্রই এগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব পুরুষই পালন করছে। তারা তাদের এ শ্রমের বিনিময়ে মোটা মোটা পারিশ্রমিক দাবি ও আদায় করে থাকে। শুধু তা-ই নয়, মেয়েরা আল্লাহর দেয়া স্বাভাবিক চুলকে অ-যথেষ্ট মনে করে কৃত্রিম চুল ক্রয় করে নিজেদের মাথার চুলের সাথে একত্রিত করে নেয়।

অবস্থা হচ্ছে, একদিকে এক শ্রেণীর পুরুষ হাস্য, নম্রতা-মসৃণতায়, ‍রূপ ও সৌনর্যে-এবং দেখতে শুনতে নারীদেরছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। আর অপরদিকে নারীরা আকর্ষণীয়া হয়ে পুরুষদের আকৃষ্ট করতে চেষ্টা চালাচ্ছে সর্বতভাবে।

উপরিউক্ত হাদীসে একটি বিশেষ কথার দিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক স্বৈরাচার বা রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র ও নৈতিক বিপর্যয় এ দুয়ের মাঝে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সময়ের অবস্থা এ কথার বাস্তবতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে। স্বৈরাচারী রাজনীতিকরা চিরকাল জাতিকে যৌন লালসাপূর্ণ কাজ-কর্মে মগ্ন রাখে এবং লোকদের ব্যক্তিগত ঝামেলা-জটিলতায় জড়িত করে জাতীয় সমস্যাবলী থেকে তাদের দৃষ্টি ভিন্নদিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, যেন তাদের স্বৈরতন্ত্রের প্রতি কারো নজর না পড়ে।

নারী ও পুরুষের মাঝে সাদৃশ্য সৃষ্টি

নবী করীম (সা) ঘোষণা করেছেন, নারীর জন্যে পুরুষালী পোশাক পরিধান করা এবং পুরুষদের জন্যে নারীসুলভ পোশাক পরা সম্পূর্ণ হারাম। (আহমদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনে মাজা, ইবনে হাবান)

উপরন্তু তিনি পুরুষের সাথে নারীর এবং নারীর সাথে পুরুষের সাদৃশ্যকারীদের ওপর অভিশাপ করেছেন। (বুখারী)

সাদৃশ্যকরণ পর্যায়ে কথাবার্তা, গতিবিধি, চলাফেরা, ওঠাবসা ও পোশাক পরা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই গণ্য। স্বীয় প্রকৃতিকে অস্বীকার করা ও স্বভাবের দাবিসমূহের প্রহিপূরণ করতে প্রস্তুত না হওয়া- তার বিপরীত আচর-আচরণ অবলম্বন করাই হচ্ছে মানব জীবনে ও সমাজ ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার মৌল কারণ। পুরুষ এক বিশেষ স্বভাব-প্রকৃতির অধিকারী। নারীদের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। একজনের স্বভাব প্রকৃতির সাথে অপর জনের স্বভাব-প্রকৃতির আদৌ কোন মিল বা সাদৃশ্য নেই। কিন্তু পুরুষ যখন ‘নারী’ হবার চেষ্টা চালায় এবং নারীরা পুরুষালী চালচলন ও স্বভাব-প্রকৃতি ধারণ করতে চায়, তখন চরম নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ই হয় অনিবার্য পরিণতি।

যে পুরুষকে আল্লাহ্ তা’আলা পুরুষ বানিয়েছেন, কিন্তু সে নিজেকে নারী বানাতে ও নারীর সাথে সাদৃশ্য করতে চায় এবং যে নারীকে আল্লাহ্ তা’আলা নারী বানিয়েছেন, কিন্তু সে নিজেকে পুরুষালী বিশেষত্বে ভূষিত করতে চায়, এ উভয়ের ওপর রাসূলে করীম (সা) অভিসম্পাত করেছেন, দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই তারা অভিশপ্ত। আল্লাহর ফেরেশতাগণও এ অভিসম্পাতে একাত্ম।

এ কারণেই নবী করীম (সা)পুরুষদের জন্যে হলুদ বর্ণের কাপড় নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ (আরবি****************)

রাসূলে করীম (সা) আমাকে স্বর্ণের অঙ্গুরীয়, রেশমী পোশাক ও হলুদ বর্ণের কাপড় ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)

হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ রাসূলে করীম আমার পরনে দুখানি হলুদ কাপড় দেখতে পেয়ে বললেনঃ (আরবি****************)

এ হচ্ছে কাফিরদের কাপড়। কাজেই তুমি তা পরবে না।

খ্যাতি ও অহংকারের পোশাক

পানীয়, খাদ্য ও পরিধেয় সব পবিত্র জিনিসই মুসলমানের জন্যে হালাল। তবে তাতে শর্ত হচ্ছে তা গ্রহণে যেন সীমালংঘন করা না হয়। এবং কোনরূপ অহংকার ও গৌরব প্রকাশ না পায়।

আরবী পরিভাষায় ‘ইসরাফ’ বলতে বোঝায় হালাল জিনিসের মাত্রাতিরিক্ত ও সীমালংঘনমূলক ব্যবহার। আর অহংকারী গৌরবী মনোভাবও মানসিক ব্যাপার। বাইরে তার প্রকাশ খুব কমই ঘটে। নিজেকে বড় কিছু মনে করে অহমিকায় পড়ে যাওয়াই হচ্ছে অহংকার। অন্যদের তুলনায় নিজেকে বড় বলে জাহির করাই হচ্ছে গৌরব। আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন মজীদে ঘোষণা করেছেনঃ (আরবি****************)

আত্মগৌরবে মগ্ন ও অহংকারী কোন ব্যক্তিই আল্লাহ্ পছন্দ করেন না, ভালবাসেন না। (সূরা আল-হাদীদঃ ২৩)

নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোক তার কাপড় অহংকার সহকারে টানবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার প্রাতি নজরও দেবেন না। (বুখারী, মুসলিম)

অহংকার ও গৌরবের ভাবধারা থেকে মুসলমানকে দূরে রাখার জন্যেই নবী করীম (সা) খ্যাতি ও প্রসিদ্ধর পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন। যে ধরনের পোশাক পরলে জনসাধারণ থেকে স্বতন্ত্র কেউ- এটা প্রকাশ পায় ও পোশাকের দরুন তার বড়ত্ব জাহির হয়, তা-ই হচ্ছে খ্যাতি ও প্রসিদ্ধির পোশাক। রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোক খ্যাতি ও সমৃদ্ধির পোশাক পরিধান করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাকে লাঞ্ছণা ও অবমাননার পোশাক পরিয়ে দেবেন। (আহমদ, আবূ দাঊদ, নিসায়ী, ইবনে মাযাহ)

এক ব্যক্তি হযরত উমর (রা)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলঃ আমি কোন ধরনের পোশাক পরব? তখন তিনি বললেনঃ (আরবি****************)

তুমি সেই পোশাক পরবে, যার দরুন নির্জ্ঞান-নির্বোধ লোকেরা তোমাকে হালকা ও অগম্ভির মনে করবে না (অর্থাৎ হীন ও নীচ ধরনের পোশাক) এবং বুদ্ধিমান লোকেরা তাতে কোন দোষ বের করতে না পারে (অর্থাৎ ভারস্যাম্য নষ্ট হয়, এমন পোশাক পরবে না)। (তিবরানী)

মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্যের জন্যে আল্লাহ্ সৃষ্টি বিকৃতকরণঃ

সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টায় এমন সব কাজ করা, যার ফলে আল্লাহর সৃষ্টিই বিকৃত হয়ে যায়, ইসলাম আদৌ তা সমর্থন করে না। কুরআন এ কাজকে শয়তানের ‘অহী’ বা পরামর্শ বলে অভিহিত করেছে। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী শয়তান তার কু-প্ররোচনা সম্পর্কে নিজেই বলেছেঃ (আরবি****************)

আমি আমার অনুসরণকারীদের আদেশ করব। ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকেই বিকৃত করে দেবে। (সূরা আন-নিসাঃ ১১৯)

দেহে চিত্র অংকন, দাঁত শানিতকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে অপারেশন করান

শরীরে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে নানা চিত্র অংকন করান এবং দাঁত শানিত করান ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবি****************)

যে মেয়েলোক দেহে উল্কি (সুচিবিদ্ধ করে চিত্র অংকন) করে, যে তা করায়, যে দাঁত শানিত বানায় এবং যে তা বানাতে বলে, এ সব কয়টি শ্রেণীর লোকের ওপরই নবী করীম (সা) অভিসম্পাত করেছেন। (মুসলিম )

উল্কি বানানর জন্যে সাধারণত নীল রং ব্যবহার করা হয় এবং খুবই বিশ্রী ধরনের চিত্রাদি অংকন করান হয়। তার ফলে মুখাবরণ ও হাত কুশ্রী হয়ে যায়। আরব এবং বিশেষ করে মেয়েরা এ কাজে তো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা তাদের সমগ্র গাত্রে এ উল্কি আঁকিয়ে থাকে। কোন কোন ধর্মানুসারী লোক তো তাদের দেবদেবীর ছবি ও প্রতীকসমূহের চিত্র আঁকিয়ে থাকে। খিৃস্টানরা নিজেদের হাত ও বুকের ওপর ক্রুশ-এর চিত্র আঁকায়।

এসব খারাবী ছাড়াও একটা বড় খারাবী হচ্ছে, উল্কি বানানর সময় দেহে সূচ বিদ্ধ করা হয় বলে তাতে খুবই কষ্ট ও যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এ কারণে এ কাজ করা ও করান উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ ও অভিশপ্ত।

‘অশর’ দাঁতসমূহকে শানিত ও তীক্ষ্ণ সরু বানান ও যে বানাতে বলে এ উভয়ের ওপর রাসূলে করীম (সা) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। যে নারী অন্যের দ্বারা এ কাজ করায়, তার ওপরও অভিসম্পাত। কোন পুরুষ এ কাজ করলে সেও সে অভিশাপের মধ্যে পড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

দাঁত সম্পর্কে একথা যেমন সত্য তেমনি দাঁতসমূহের মধ্যে খোদাই করা ও গর্ত রচনা করাকেও হারাম ঘোষণা করেছেন রাসূলে করীম (সা)। হদীসে উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবি****************)

দাঁতসমূহের মধ্যে ফারাক ও খোদাই করায় যেসব স্ত্রীলোক সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, তাদের ওপরও রাসূলে করীম (সা) অভিসম্পাত করেছেন। কেননা তারা আল্লাহর সৃষ্টির স্বাভাবিক অবস্থাকে বিকৃতি করে দেয়।

নারীদের মধ্যে অনেকেরই মুখের দাঁতে স্বাভাবিকভাবে ফাঁক থাকে, অনেকের আবার তা থাকে না। যাদের তা থাকে না, তারা কৃত্রিমভাবে তা করিয়ে নেয়। ফলে সে লোকদের ধোকা দেয়। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যেই এ কৃত্রিমতায় আশ্রয় লওয়া হয়। এর ফলে ইসলামের দৃষ্টিতে তার স্বভাব-প্রকৃতিতিও কৃত্রিমতা এসে যায়। ইসলাম তা আদৌ বরদাশত করতে রাজী নয়।

উপরে যে হাদীসসমূহ উদ্ধৃত হয়েছে, তা সহীহ্। এসব হাদীসের ভিত্তিতে আমরা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অপরেশন (অস্ত্রোপাচার) করান সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম জানতে পারি। এ কালের দেহ ও যৌন আস্বাদন পূজারী সভ্যতাই এসব অস্ত্রোপাচারের প্রচলন করেছে। একালের বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার এ এক অন্যতম অবদান বলতে হবে। লোকেরা এ প্ররোচনায় পড়ে নিজেদের নাক কিংবা বক্ষ (স্তন) প্রভৃতির আকৃতি মনমতো ও লোভনীয় বানাবার উদ্দেশ্যে পুরুষ ও নারী হাজার হাজার টাকা ব্যয় করছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কাজ আল্লাহর অভিশাপই টেনে আনে। এ কাজ যেমন কষ্টদায়ক, তেমনি  আল্লাহর বানান আকৃতিকে শুধু-শুধুই পরিবর্তন করার শামিল। আর আসলেও অস্ত্রোপাচারে যে পরিবর্তনটুকু আনা যায়, তা অতিসামান্য, প্রকৃত কোন পরিবর্তন সাধন সম্ভবই নয়। বড়জোর দৈহিক পরিবর্তনই করান যেতে পারে, আত্মিক নয়।

তবে যদি কারো কোন ক্রটি থাকে, যা মূল দেহ কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত এবং সেটির কারণে কষ্ট অুনভূত হয়  কিংবা মানসিক কুণ্ঠায় জর্জরিত হতে থাকে, তাবে তার চিকিৎসা করানয় কোন দোষ নেই।  তবে উদ্দেশ্য হতে হবে শুধু সে অসুবিধাটা দূর করান। কেননা তাতে সে কষ্ট পাচ্ছে, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এটা জায়েয এজন্যে যে, আল্লাহ দ্বীনে আমাদের জন্যে কোন কষ্টের কারণ রাখেন নি। (আরবী*****************)

হাদীস থেকেও এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়। হাদীসে সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্য অস্ত্রোপাচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই এ উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপাচার করা হলে নিশ্চিয়ই অভিশাপের উপযুক্ত হতে হবে। কিন্তু কোন কষ্ট দূর করা বা প্রয়োজন পূরণ করার উদ্দেশ্যে তা করান হলে তাতে কোনই দোষ হতে পারে না।

ভ্রূ সরুকরণ

মাত্রাতিরিক্ত রূপ ও সৌন্দর্য অর্জনের আর একট আধুনিক উপায় হচ্ছে, চুল বা পশম উপড়ান। আর তা সাধারণত, কপালের ভ্রূ চুল উপড়িয়ে ভ্রূকে যথাসম্ভব সরু করা। কিন্তু এ কাজটি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। রাসূলে করীম (সা) এ কাজ যে করে, তার উপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। (আরবী**********************)

যে স্ত্রীলোক চুল বা পশম উপড়ায় এবং যে অপরের দ্বারা একাজ করায় রাসূলে করীম (সা) উভয়ের ওপর অভিশাপ বর্ষন করেছেন। (আবূ দাউদ)

চুল বা পশম উপড়ানর ব্যাপারটি আরও কঠিন হারাম হয়ে দেখা দেয়, যখন তা চরিত্রহীনা মেয়েদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এবং তাদের একটি বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়ায়। হানাফী মাযহাবের কোন কোন আলেম বলেছেনঃ মেয়েদের মুখবণ্ডলের চুল উপড়িয়ে পরিষ্কার করা, লাল রঙ লাগান, নকশা আঁকা ও নখে পালিশ লাগানো জায়েয। তবে তা স্বামীর অনুমতিক্রমে হতে হবে। কেননা এসব কাজ সৌন্দযের অলংকারের মধ্যে গণ্য। কিন্তু ইমাম নববী মুখবণ্ডরের চুল বা পশম উপড়ানর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি এ কাজকে পূর্বোদ্ধৃত হাদীসের ভিত্তিতে হারাম বলেছেন। অবশ্য আবূ দাউদ তার সুনান’ গ্রন্থে লিখেছেন, যে নারী তার ভ্রূতে নকশা ও ছবি বানিয়ে সেটিকে সরু করে, হাদীসে তাকে نامصه বলা হয়েছে। এতে এতে করে ইমাম নববীর মতের প্রতিবাদ হয়ে গেছে। কেননা মুখবণ্ডলের চুল বা পশম দূর করা অভিশপ্ত কাজের মধ্যে গণ্য নয়।

তাবারনী’ গ্রন্থে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, আবু ইসহাকের স্ত্রী যুবতী ছিলেন। সৌন্দযের পিপাসু ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা) এর কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাস করলেন: স্ত্রী কি তার স্বামীর জন্যে মুখমণ্ডলের পশম দূর করতে পারে? হযরত আয়েশা (রা) বললেনঃ ‘কষ্টের ব্যপারগুলো সাধ্যমত দূর কর। (আরবী*******************)

চুলে জোড়া লাগান

স্ত্রীলোকের পক্ষে নিজের মাথার চুলের সঙ্গে অপরের চুলের (পরচুলা) জোড়া লাগিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাও হারাম। তা আসল চুল হোক, কি নকল চুল।

ইমাম বুখারী হযরত আয়েশা, আসমা, ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর ও আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে হাদীস উদ্ধৃত করেছেনঃ

(আরবী*********১৩১************)

চুলে যে জোড়া লাগায় এবং যে অন্যদের দ্বারা একাজ করায়- উভয় নারীর ওপর রাসূলে করীম (সা) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।

নারী সম্পর্কে যখন একথা, তখন পুরুষরা একাজ করলে তো নিশ্চয়ই এ অভিশাপে পড়ে যাবে, তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। নবী করীম (সা) এ কাজকে تد ليس অর্থাৎ প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি যে নারীর মাথার চুল কোন রোগের কারণে ঝড়ে পড়ে যায়, তার পক্ষে অন্য কারো চুল নিজের মাথায় জাড়ান জায়েয নয়। বিবাহের কনে- যাকে স্বামীর কাছে পাঠান হচ্ছে-তার জন্যেও এ কাজ হারাম।

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, আনসার বংশের একটি মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর রোগে মাথার চুল পড়ে যায়। সে তার নিজের মাথায় অন্য চুল লাগাবার ইচ্ছা করে। এ বিষয়ে নবী করীম (সা) কে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি বললেনঃ (আরবী*********)

যে চুল জোড়া লাগায় এবং যে অন্য কারো দ্বারা একাজ করায়- উভয় নারীর উপরই আল্লাহ তা’আলা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।

হযরত আসমা (রা) তাঁর একটি মেয়েলি-লোগের কারণে চুল পড়ে যাওয়ায় এ কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে নবী করীম (সা) উপরিউক্ত উক্তিই করেন।

সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেনঃ হযরত মুয়াবিয়া মদীনায় এলেন- এটাই ছিল তাঁর শেষ আগমন। তখন তিনি আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। ভাষণ ব্যাপদেশে তিনি এক গোছা চুল বের করলেন বললেনঃ (আরবী******************)

ইয়াহূদী ছাড়া আর কেউ এ ফ্যাশন করে বলে আমি মনে করি না। নবী করীম (সা) এ কাজকে মিথ্যা-ধোঁকা বলে অভিহিত করেছেন অর্থাৎ চুলের সাথে অপরের চুল জড়ান।

অপর এক বর্ননা মতে হযরত মুয়াবিয়া মদীনাবাসীদের বলেনঃ (আরবী**********************)

তোমাদের আলিমগণ এখন কোথায়? রাসূলে করীম (সা) এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা আমি নিজে শুনতে পেয়েছি। তাঁকে এ-ও বলতে শুনেছি যে, বনী ইসরাঈলী মেয়েরা যখন এ ফ্যাশন শুরু করেছিল তখনই তাদের ধ্বংস শুরু হয়ে গিয়েছিল। (বুখারী)

নবী করীম (সা) এ কাজকে মিথ্যা-ধোঁকা বলে অভিহিত করেছেন। তাতে এ কাজ নিষিদ্ধ হওয়ার তাত্পর্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। আসলে এ কাজ এক প্রকার ধোঁকা ও প্রতারণাই বটে এবং তা মিথ্যার সাহায্যে। এ ধরনের কাজের অনুমতি থাকলে ধোঁকা প্রতারনা করাও জায়েয হয়ে যেত অথচ ইসলামে তা ভয়নক গুনাহর কাজ। নবী করীম (সা) বলেছেন। (আরবী************)

যে আমাদের ধোঁকা দেবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়।

ইমাম খাত্তাবী বলেছেনঃ এ কাজ নিষিদ্ধ এজন্য যে, এতে মানুষকে ধোঁকা দেয়া হয়, প্রতারিত করা হয়। উপরন্তু এ কাজ দ্বারা আল্লাহর আসল সৃষ্টি রূপ পরিবর্তন করে দেয়া হয় এবং সেটাই হচ্ছে বড় অপরাধ। হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণিত উপরে উদ্ধৃত হাদীসে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর হাদীসসমূহে চুলের সঙ্গে চুল জড়ান ও মেশান-তা স্বাভাবিক হোক, কি কৃত্রিম –মূলত ধোঁকা ও প্রতারণারই কাজ। তবে চুলের সাথে চুল ছাড়া অন্য কিছু-সূতা বস্ত্রখণ্ড ইত্যাদি জড়ান হলে তা নাজায়েয হবে না। এ পর্যায়ে হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ (আরবী************)

সূতা, রেশম কিংবা খোপা বানানর পশম জড়ালে তা দোষের হবে না।

ইমাম আহমদ ইবনে আম্বলও তা জায়েয বলেছেন।

খেজাব লাগন

মাথার চুল ও দাড়িতে খেজাব লাগানর এক প্রকারের সৌন্দর্য-চর্চার ব্যাপার। ইয়াহুদী ও খ্রীস্টান প্রভৃতি আহলি কিতাব লোকেরা খেজাব লাগিয়ে দাড়ি ও চুলের রং পরিবর্তন করার পক্ষপাতি নয়। কেননা তাদের ধারণা হচ্ছে, সোন্দর্য-চর্চা ও রূপ বৃদ্ধিকরণ দ্বীনদারী ও আল্লাহ পরস্তির পরিপন্থী। আর দ্বীনদারীর ক্ষেত্রে দুনিয়াত্যাগী, বৈরাগী, বৈঞ্চব প্রভৃতি সীমালংঘন ও অতিরিক্ত বাড়াবাড়িকারীদের এ-ই হচ্ছে নীতি। কিন্তু রাসূলে করীম (সা) এ লোকদের অনুসরণ করতে ও অনুরূপ আচার-আচরণ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসলমানরা অন্তরের ও বাইরের দিক দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও নীতি আদর্শের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত নবী করীম (সা) এ লোকদের অনুসরণ করতে ও অনুরূপ আচর-আচারণ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসলমানরা অন্তরের ও বাইরের দিক দিয়ে নিজেদেরও স্বতন্ত্র সত্তা ও নীতি-আদর্শের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অক্ষুণ্ন আখতে সক্ষম হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবী************************)

ইয়াহুদী খ্রিস্টানরা খেজাব লাগান না। তোমরা তাদের বিরোধিতা কর।

এ আদর্শটি মুস্তাহাব ধরনের, সাহাবীগণ তাই মনে করেছেন। কেননা এ আদেশটি থাকা সত্ত্বেও সকল সাহাবী খেজাব লাগান নি। যেমন হযরত আবু বকর ও উমর (রা) লাগিয়েছেন, কিন্তু হযরত আলী ও উবাই ইবনে কায়াব (রা) লাগান নি। (আরবী*****)

কিন্তু খেজাব কি দিয়ে লাগান হবে? কালো কিংবা যে কোন রঙ লাগন যায় কি? না, কালো খেজাব লাগন পরিহার করতে হবে? এ প্রশ্নের জাবাব এই যে, যেসব লোক বার্ধক্য পৌছে গেছে, তাদের পক্ষে কালো খেজাব লাগান বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা মক্কা বিজয়কালে হযরত আবূ বকর (রা) তখন তাঁর পিতা আবু কাহাফাকে রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত করালেন, তিনি দেখলেন, তার মাথার চুল একেবারে সাদা হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেনঃ (আরবী*********************)

এ চুলের রঙ পরিবর্তন করে দাও। তবে কালো রং পরিহার কর। (মুসলিম)

কিন্তু যে লোকের অবস্থা বা বয়স আবু কাহাফার মত হয়নি, সে যদি কালো খেজাব ব্যবহার করে তাহলে উপরিউক্ত হাদীস অনুযায়ীই নাজায়েয হবে না। ইমাম জুহরী এ মতই প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী*******************)

আমাদের মুখমণ্ডল যখন তরজাতা ছিল, নব্যতা ও তারুণ্যপূর্ণ ছিল, তখন আমরা কালো খেজার ব্যবহার করেছি। কিন্তু যখন আমাদের মুখমণ্ডল ও দাঁতে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেল, তখন আমরা তা ত্যাগ করেছি। (ফাতহুল  বারী)

কালো খেজাব ব্যবহার করা সাধারণভাবেই জায়েয বলে মত জানিয়েছেন সায়াদ ইবনে আবূ ওয়াককাস, উকবা ইবনে আমের, হাসান ও হুসাইন এবং জরীর প্রমুখ সাহাবী (রা)

কিন্তু অপর কতক আলিমের মতে কালো খেজাব লাগান জায়েয নয়। তবে তাঁদের মতেও জিহাদের সময় শত্রু পক্ষকে ভীত-সন্ত্রস্ত্র করার উদ্দেশ্যে তা লাগান যেতে পারে, যেন শত্রুপক্ষ মনে করে যে, সেনাবাহিনীর সব লোকই যুবক। তাতে তারা অনেকটা শংকিত বোধ করবে। (আরবী***********)

হযরত আবূ যর গিফারী (রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী*********************)

বার্ধক্যের শ্বেত-শুভবর্ণ পরিবর্তন করার উত্তম দ্রব্য হচ্ছে হেনা ও কাতাম।

কাতাম হচ্ছে একটা ইয়েমেনী ঘাস। তার রক্ত লালমুখী কালো। আর হেনা বর্ণ লাল। হযরত হাসান (রা) বর্ণনা করেছেনঃ হযরত আবূ বকর হেনা ও কাতাম ইভয় প্রকার খেজাবই ব্যবহার করেছেন আর হযরত উমর (রা) কেবলমাত্র খালেস হেনাই ব্যবহার করেছেন খেজাব হিসেবে।

দাড়ি বাড়ানো-লম্বাকরণ

আমদের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে গণ্য একটি ব্যাপার হচ্ছে দাড়ি বৃদ্ধিকরণ। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবী**********************)

তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর এবং দাড়ি বাড়াও, আর গোফঁ কাট। (বুখারী)

وفروا দাড়ি বাড়াও’ অর্থাৎ দাড়ি রেখে দাও, ছেড়ে দাও- আপনা থেকে বাড়তে দাও। হাদীসে এ আদেশের কারণও বলা হয়েছে। তা হচ্ছে মুশরিকদের বিরোধিতা। আর এ মুশরিক বলতে অগ্নিপূজারী মজুদীদের বোঝান হয়েছে। কেননা ওরা দাড়ি কেটে ফেলত। ওদের অকেনে আবার দাড়ি আবার দাড়ি মুণ্ডনও করত। আর রাসূলে করীম (সা) এদেরই বিরোধীতা করতে বলেছেন। তিনি মুসলমানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে ও প্রশিক্ষন দিতে চেয়েছিলেন, যেন তাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুন্ন থাকে। যেন তারা ঈমান-আকিদার দিক দিয়েও যেমন মুশরিকদের থেকে ভিন্নতর, তেমনি ব্যহ্যিক দিক দিয়েও যেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়ে ওঠে। তবে দাড়ি মুণ্ডনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কেননা তাতে যেমন প্রকৃতির বিরোধীতা হয় তেমনি নারীদের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি করা হয় অথচ দাড়ি হচ্ছে পুরুষের লক্ষণ পরিচায়ক। বাহ্যিকভাবে তাই পুরুষকে নারী থেকে স্বতন্ত্র করে দেয়।

তবে দাড়ি ছেড়ে দেয়া- বাড়ানর এই নির্দেশটির অর্থ এই নয় যে, দাড়ির কোন কিছু আদৌ কাটা যাবে না। কেননা দাড়ি অনেক সময় সীমাতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায় যে তা দেখতেও খারাপ লাগবে। তাতে সে ব্যক্তির পক্ষে বিশেষ কষ্ট ও অসুবিদার কারণ দেখা দিতে পারে। তাই তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থেকে কাটা যেতে পারে। তিরমিজী শরীফে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবী********)

নবী করীম (সা) তাঁর দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থেকে কাটতেন।

প্রাচীনকালের লোকদের অনেকেই তা করতেন। ইয়ায বলেছেনঃ (আারবী************************)

দাড়ি মুণ্ডন করা, তা কেটে ছেটে সমান সমান বানান মাকরূহ। কিন্তু যদি বড় হয়ে যায়, তাহলে তা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থেকে কেটে ফেলা ভালই। (আরবী****************)

আবু শামাহ বলেছেনঃ এ কালে এমন লোক দেখা যায়, যারা দাড়ি মুণ্ডন করে অথচ অগ্নিপূজারীদের সম্পর্কে একথা সর্বজনবিদিত যে, তারা দাড়ি কর্তন করত।

এ পর্যায়ে আমি বরতে চাই, বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলামের দুশমন, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদীদের অনুসরণ করতে গিয়ে দাড়ি মুণ্ডন করতে শুরু করেছে। আর তা করে তারা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ওদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে। কেননা বিজিত লোকেরাই বিজয়ী জাতির সংস্কৃতির অনুকরণ ও অনুসরণ করে থাকে অথচ রাসূলে করীম (সা) যে কাফিরদের বিরোধীতা করতে বলেছে এবং তাদের সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করতে নিষেধ করেছেন, তা তারা বেমালুম ভুলে বসেছে। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী***********************)

যে ব্যক্তি যে জাতির সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করবে, সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। বহু ফিকহবিদ দাড়ি বাড়ান সংক্রান্ত রাসূলে করীম (সা) এর হাদীসের প্রেক্ষিতে দাড়ি মুণ্ডন করাকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। কেননা এ আদেশ পালন করা ওয়াজিব। এই বিশেষ আদেশ মুশরিকদের বিরোধিতাকরণের ওপর ভিত্তিশীল। আর তাদের বিরোধিতা করা মুসলমানদের জন্যে ওয়াজিব। আগের কালের কোন লোক এই ওয়াজিব তরক করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই।

কিন্তু এ কালের কিছু কিছু আলিম কালের প্রভাব প্রভাবিত হয়েও সাধারণ প্রচলন দেখে বলতে শুরু করেছেন যে, দাড়ি মুণ্ডনে কোন দোষ নেই। তাঁরা আরও বলতে শুরু করেছেন যে, দাড়ি লম্বা করে রাখা রাসূলে করীমে (সা) এর নিজস্ব অভ্যাসগত কাজ ছিল। তা শরীয়তের কোন ব্যাপার নয় এবং তা ইবাদত পর্যায়বুক্তও নয়। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে দাড়ি ছেড়ে দেয়া- লম্বা করা কেবলমাত্র রাসূলের নিজের কাজ দ্বারাই প্রমাণিত নয়। তার সাথে কারণ হিসেবে যুক্ত রয়েছে কাফিরদের বিরোধিতা। ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, সর্বক্ষেত্রে কাফির মুশরিকদের বিরোধিতা শরীয়তের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে গণ্য। বাহ্যিক সাদৃশ্য প্রীতি প্রণয় ভালবাসা বন্ধুত্বের ভাব জাগিয়ে তোলে অন্তরের মধ্যে। ঠিক যেমন অন্তরের ভালবাসা বাহ্যিক সাদৃশ্য সৃষ্টি করে। মানুষের অনুভূতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এর সত্যতা প্রমাণিত। তিনি আরও লিখেছন, কাফির মুশরিকদের বিরোধিতার আদেশ এবং তাদের সাথে সাদৃশ্যকরণের নিষেধ কুরআন, হাদীস ও ইজমা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আর যে জিনিস বা কাজে  কোন খারাবীর করণ নিহিত, তাই হারাম বলা যাবে। কাফিরদের বাহ্যিক কাজ-কর্মের সাথে সাদৃশ্য খারাপ চরিত্র ও কার্যকলাপের অনুসরণের কারণ। বরং সাদৃশ্যের এ কাজের ধারা আকীদা-বিশ্বাস বলয় পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে বলে আশংকা করা যায়। এ প্রভাবটা ধরা যায় না, কেননা তাতে যে আসল দোষের উদ্রেক হয়, তা বাহ্যত চোখে পড়ে না। কিন্তু তা একবার বসে গেলেই তা দূর করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই যা-ই কোন খরাবীর নিমিত্ত হবে, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। (আরবী*******************)

সর্বশেষ উল্লেখ্য, দাড়ি মুন্ডন সম্পর্কে তিনটি কথা। একটি কথা হচ্ছে দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম। দ্বিতীয় কথা, দাড়ি মুণ্ডন মাকরূহ।

এই কথাটি ফতহুল বারী গ্রন্থে কাযী ইয়াযের নামে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আর তৃতীয় কথা হচ্ছে, তা জায়েয।

এ কালের বেশ কিছু সংখ্যক আলিম এ মত পোষন করলে এর মধ্যে মাঝামঝি, সত্য নিকটবর্তী ও অধিক ইনসাফপূর্ণ কথা হচ্ছে, দাড়ি মণ্ডন মাকরূহ, হারাম নয়। কেননা রাসূলে করীমের যে কোন আদেশই নিরংকুশভাবে ওয়াজিব হয়ে যায় না, যদিও কাফির মুশরিকদের বিরোধিতা করার কারণ ভিত্তি হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। তার অতি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের বিরোধিতা করার জন্য খেজাব লাগিয়ে বার্ধক্যের শ্বেতবর্ণ পাল্টে দিতে আদেশ করেছেন। কিন্তু কোন কোন সাহাবী এ আদেশ পালন করতে গিয়ে তা করেন নি। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ পর্যায়ের আদেশ মুস্তাহাব পর্যায়ের।

এ কথা সত্য যে, আগের কালের কোন মুসলমান দাড়ি মুণ্ডন করেছেন বলে জানা যায় না। তা এজন্যেও তো পারে যে, সেকালে লোকেরা দাড়ি মুণ্ডন প্রয়োজন মনে করতেন না; বরং তা রাখাই তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

ঘর-বসবাসের স্থান

ঘর কিংবা বসবাস করার স্থান লোকদের জন্যে এক সুরক্ষিত আশ্রায়স্থল। এ ঘরেই তাদের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন জাপিত হয়ে থাকে। মানুষ নিজের ঘরে নিজেকে সর্বপ্রকার সামাজিক বিধিবন্ধন থেকে মুক্ত মনে করতে থাকে। মানুষ নিজের ঘরেই আরাম ও বিশ্রাম লাভ করে মনে পায় পরম প্রশান্তি। এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহাবলীর উল্লেখ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ (আরবী******************)

আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্যে তোমাদের ঘরগুলোকে শান্তির আকর বানিয়েছেন। (সূরা নহলঃ৮০)

নবী করীম (সা) প্রশস্ত ঘর-বাড়ি পছন্দ করতেন। তিনি এ ধরনের ঘর-বাড়িকে বৈষয়িক সৌভাগ্যের নিমিত্ত মনে করতেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী************************)

চারিটি জিনিস কল্যাণের আকর। তা হচ্ছে, পবিত্র চরিত্রবতী স্ত্রী, প্রশস্ত ঘর, ভাল প্রতিবেশী এবং উত্তম যানবাহন।

নবী করীম (সা) প্রায়ই দো’আ করতেনঃ (আরবী*********************)

হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহ মাপ কর, আমার ঘরে আমার জন্যে প্রশস্ততা দাও এবং আমার রিযিক আমাকে বরকত দাও।

জনৈক লোক বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি প্রায়ই এই দো’আ কেন করেন? জবাবে তিনি বললেনঃ

(আরবী****************)

এই দো’আয় কি কোন একটি জিনিসও বাদ পড়েছে?

নবী করীম (সা) ঘর-বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন এই পরিচ্ছন্নতা-পরিচ্ছন্নতাবাদী দ্বীন-ইসলামের একটা বাহ্যিক প্রকাশ ও বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং যেন এরই ভিত্তিতে মুসলমান সেসব লোক থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিসিক্ত হতে পারে, যাদের ধর্মে ময়লা-অপরিচ্ছন্নতাই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের একমাত্র মাধ্যম। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবী************************)

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্রতা পছন্দ করেন। তিনি দয়াবান, অনুগ্রহসম্পন্ন, দয়া অনুগ্রহ তিনি পছন্দ করেন। তিনি দাতা, দান তিনি পছন্দ করেন। অতিএব তোমরা সকলে তোমাদের ঘরের আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখ এবং ইয়াহুদীদের সাথে সাদৃশ্য রাখবে না। (তিরমিযী)

বিলাসিতা ও পৌত্তলিকতার প্রকাশ

মুসলমানদের জন্যে তাদের ঘর-বাড়ি তেল-বার্নিশ, চাকচিক্য ও বৈধ ধরনের রূপ-সৌন্দর্য দিয়ে সুসজ্জিত করা কিছুমাত্র নিষিদ্ধ নয়।

স্বয়ং আল্লাহ তা’আলাই বলেছেনঃ (আরবী**********************)

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্যে যেসব রূপ-সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করে দিতে পারে?

বস্তুত মুসলমান তার ঘর-বাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় জিনিস খুব সুন্দর সুগঠিত, সুসজ্জিত ও চাকচিক্যময় করে রাখবে, তা কিছু মাত্র নিষিদ্ধ নয়। কোন দোষ নেই তাতে।

নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোকের হৃদয়ে একবিন্দু অহংকার থাকবে, সে বেহেশতে যেতে পারবে না। তখন একজন বললঃ ইয়া রাসূল! আমেদের একজন পছন্দ করে যে, তার কাপড়-জুতা খুবই সুন্দর হোক, এটাও কি অহংকারের মধ্যে পড়ে? রাসূল বললেনঃ মোটেই না। কেননা আল্লাহ্ সুন্দর, তিনি সুন্দর ও সৌন্দর্যকে ভালবাসেন। (মুসলিম)

অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ (আরবি****************)

একজন সুন্দর সুশ্রী ব্যক্তি নবী করীম (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলল? আমি সৌন্দর্য পছন্দ করি, আমাকে তার অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে যেমন দেখছেন। এমনকি জুতার ফিতার ক্ষেত্রেও কেউ আমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যাক, তাও আমি পছন্দ করি না। হে রাসূল, এটাও কি অহংকারের মধ্যে গণ্য হবে? তিনি বললেন, না বরং অহংকার হচ্ছে প্রকৃত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং লোকদের হীন ও নগণ্য মনে করা। (আবূ দাঊদ)

অবশ্য ইসলামে জীবনের কোন দিকেই অতিশয় বাড়াবাড়ি ও সীমাতিরিক্ততা আদৌ পছন্দ নয়। মুসলমানের ঘর-বাড়ি বিলাসিতা ও জাঁকজমকের লীলাকেন্দ্র হোক, নবী করীম (সা) এটাও পছন্দ করেন নি। কুরআনে তা নিষেধ করা হয়েছে অথবা পৌত্তলিকতার প্রকাশ হওয়াও পছন্দনীয় নয়। কেননা আল্লাহ্ তওহীদী দ্বীন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তিতে লড়াই করেছে।

স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র

ঠিক এ কারণেই মুসলমানদের ঘরে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র ও খাঁটি রেশমের শয্যা থাকাটাও হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ নীতির বিরোধিতার জন্যে নবী করীম (সা) কঠোর ভাষায় কঠিন পরিণতির কথা শুনিয়েছেন। উম্মে সালমা (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোক স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করবে, তার পেটে জাহান্নামের আগুন টগবগ করতে থাকবে। (মুসলিম)

(আরবি****************)

রাসূলে করীম (সা) স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করতে, রেশমী ও মখমলের কাপড় পরিধান করতে এবং তার ওপর আসন গ্রহণ করতে আমাদের নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ এগুলো কাফিরদের জন্যে দুনিয়ায় এবং আমাদের জন্যে আখিরাতে প্রাপ্য। (বুখারী)

আর যা ব্যবহার করা হারাম, তা তোহফা বা অর্ঘ-উপহার হিসেবে দেয়াও হারাম, সাজ-সজ্জা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তার ব্যবহারও হারাম।

স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার ও রেশমের শয্যা গ্রহণ পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যেই হারাম। ঘর-বাড়ি বিলাসদ্রব্য থেকে মুক্ত ও পবিত্রকরণই এগুলোকে হারাম করার একমাত্র উদ্দেশ্য। ইবনে কুদামা এ পর্যায়ে খুব সুন্দর লিখেছেনঃ

হাদীসে সাধারণভাবেই এ কথাগুলো এসেছে বলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই তা সমানভাবে হারাম। কেননা এগুলোকে হারাম করার উদ্দেশ্য হচ্ছে অপচয়, বেহুদা খরচ-গৌরব-গর্ব ও দরিদ্রদের মনে আঘাত দান বন্ধ করা। আর তা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান। তবে স্ত্রীলোকদের জন্যে অলংকারাদির ব্যবহার জায়েয শুধু এজন্যে, যেন তারা তাদের স্বামীদের জন্যে সাজ-সজ্জা করতে পারে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, হারাম করার এই যদি কারণ হয়ে থাকে তাহলে ইয়াকূত-হীরা জহরত- মহামূল্য পাথরের বর্তনাদি হারাম হল না কেন? তার জবাব হচ্ছে, গরীব লোকেরা এসব জিনিসের সাথে পরিচিত নয়। কাজেই ধনী লোকেরা যদি তা ব্যবহার করে তাহলে গরীব লোকদের মন কষ্ট পাওয়ার কোন কারণ হয় না। তাছাড়া এসব মহামূল্য পাথর পরিমাণে খুব কমই থাকে বলে তা দিয়ে পাত্র বানানর কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ কারণেতা হারাম করার কোন প্রয়োজনই অবিশষ্ট থাকে না। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যের ব্যাপারটি ভিন্নতর। (আরবি****************)

এসব কারণ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণও নিহিত রয়েছে এসব জিপিহ্ন হারাম হওয়ার পেছনে। সেদিকে পূর্বেই ইঙ্গিত শরেছি। মূলতঃ স্বর্ণ ও রৌপ্য আন্তর্জাতিক দৃস্টষ্টতে নগদ মূলধন বলে গণ্য। আল্লাহ্ তা’আলা তাকে ধন-মালের মূল্যমানরূপে নির্দিষ্ট করেছেন। তাতে এক প্রকারের প্রকাশ শক্তি নিহিত রয়েছে। তা মূল্য সমূহের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে ও রক্ষা করে, তা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়েরও কাজ করে। আল্লাহ্ তা’আলা এভাবে তার ব্যবহারের পদ্ধতি বলে দিয়ে মানুষকে তাঁর নিয়ামত দানে ধন্য করেছেন। মানুষ যেন তাকে আবর্তনের মধ্যে রাখে, এটাই আল্লাহ্ চান। তকে নগদ সম্পদ হিসেবে ঘরে বন্ধ করে বা পাত্র সৌন্দর্য সামগী করে বেকার ফেলে রাখবে- তা আল্লাহ্ তা’আলা আদৌ পছন্দ করেন না।

ইমাম গাযযালী এ বিষয়ে খুব সুন্দরভাবে লিখেছেনঃ

যে লোক দিরহাম বা দীনার প্রভৃতি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র নির্মাণ করবে (বা ক্রয় করে রাখাবে) সে আল্লাহর নিয়ামতের না-শোকরিয়া করে। ধন-সম্পদ মজুদ করে রাখার চাইতে বেশি অপরাধ সে করে। নগর প্রশাসককে কাপড় বোনা বা ঝাড়ু দেয়ার নগণ্য কাজ- যা সাধারণ মানুষ করতে পারে- লাগালে যেমন হয় এও ঠিক তেমনি। সেগুলোকে এভাবে ব্যবহার করার পরিবর্তে সঞ্চয় করে রাখা বরং ভাল। কেননা পাকা মাটি, লোহা, সীসা ও তামা প্রভৃতি প্রবহমান জিনিসকে সংরক্ষিত করার জন্যে স্বর্ণ-রৌপ্যের স্থলাভিষিক্ত। আর তৈজসপত্র প্রবহমান জিনিসগুলো সংরক্ষিত রাখার জন্যেই হয়ে থাকে। কিন্তু পাকা মাটি ও লোহা দ্বারা নগদ সম্পদ লাভের উদ্দেশ্য হাসিল করা যায় না। যে লোক এ তত্ত্বের সাথে পরিচিত নয়, তার কাছে আল্লাহ্ প্রদত্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট হওয়া উচিত এবং তাকে এ হাদীস শুনিয়ে দেয়া উচিত যেঃ (আরবি****************)

যে ব্যক্তি স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করে, সে নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ভর্তি করে। (ইহইয়াউ উলুম)

এভাবে হারামের বিধান দেয়ার ফলে মুসলমানদের ঘরের কাজকর্মে কোনরূপ সংকীর্ণতার উদ্ভুব হবে- এমনটা মনে করা ঠিক নয়। কেননা এর বাইরে পবিত্র ও হালাল জিনিসসমূহের ক্ষেত্র অনেক প্রশস্ত। কাঁচ-চিনামাটি, তামা এবং এ ধরনের বহু প্রকারের ধাতব পাত্র অনেক উত্তম ও ঝকঝকে। তুলা, সূতা ইত্যাদির বিছানা-বালিশ অনেক আরামদায়ক।

ইসলামে প্রতিকৃতি হারাম

মুসরমানদের ঘর-বাড়িতে জীবের প্রতিকৃতি (Statue) সংরক্ষণকে ইসলাম হারাম করে দিয়েছে। সম্মানিত ব্যক্তিদের ছবি বা প্রতিকৃতিও এর অন্তর্ভুক্ত। এসব জিনিস কারো ঘরে থাকলে সেখান থেকে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতা পালিয়ে যায়। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবি****************)

যে ঘরে ছবি বা প্রতিকৃতি অবস্থিত, সেখানে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।

বিশেষজ্ঞগণ তার কারণ নির্দেশ করে বলেছেন, ঘরের প্রাচীরে যারা জীবের ছবি ঝুলিয়ে রাখে, তারা কাফিরদের মতোই কাজ করে। কেননা কাফিররাই সাধারণত নিজেদের বাড়ি-ঘরের প্রাচীরের সাথে ছবি ও প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে রেখে থাকে এবং সেগুলোর প্রতি সম্মান ও ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকে। ফেরেশতাগণ এ কাজ পছন্দ করেন না বলেই তাঁরা এসব ঘর ত্যাগ করে চলে যান এবং তথায় ফিরে আসেন না।

ইসলামে প্রতিকৃতি নির্মাণকেও হারাম করে দেয়া হয়েছে। অমুসলিমদের জন্যে বানান হলেও তা জায়েয হবে না। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবি****************)

যে সব লোক এ সব ছবি ও প্রতিকৃতি রচনা বা নির্মাণ করে, কিয়ামতের দিন তারাই অধিক আযাবে নিক্ষিপ্ত হবে।

অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ (আরবি****************)

এরা সেই লোক, যারা আল্লাহর সৃষ্টি কার্যের সাথে সাদৃশ্য করতে চেষ্টা করছে।

নবী করীম (সা) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোক কোন জীবের ছবি আঁকবে বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করবে, কিয়ামতের দিন তাতে রূপ ফঁকে দেয়ার জন্যে তাকে বাধ্য করা হবে। কিন্তু সে তা কখনই পারবে না। (বুখারী)

প্রকৃত রূহ দিয়ে সেটিকে জীবন্ত বানানর দায়িত্ব দেয়ার অর্থ এ অসম্ভব কাজ করতে চাওয়ার শাস্তি তাকে দেয়া হবে। কেননা এ কাজে সে কখনই সক্ষম হবে না।

ছবি ও প্রতিকৃতি হারাম করার কারণ

(ক) ছবি ও প্রতিকৃতি হারাম করার অনেকগুলো করণ রয়েছে। তন্মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, তওহীদী বিশ্বাসের সংরক্ষণ এবং পৌত্তলিকতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কার্যাবলি পরিহার। কেননা পৌত্তলিকরা নিজেদের হাতেই ছবি ও প্রতিকৃতি নির্মাণ করে এবং সিটিকেই পবিত্র মনে করে তার পূজা-উপাসনা করে, তারই সম্মুখে বিনয়াবনত হয়ে মাথা ঠেকায়, দাঁড়ায়।

তওহীদী আকীদার ব্যাপারে ইসলাম অনমনীয়, ক্ষমাহীন। আর সেরূপ পওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা যে সব জাতি তাদের আদর্শ পূর্বপুরুষ ও জাতীয় হিরো পর্যায়ের লোকদের স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ ছবি ও প্রতিকৃতি নির্মাণ করে, কিছুকাল অতিবাহিত হয়ার পর তারাই সেই ছবি-প্রতিকৃতিকে ‘মহান পবিত্র-শ্রদ্ধেয়’ মনে করতে শুরু করে। সেগুলোকেই উপাস্য দেবতা মনে করে সেগুলোর পূজা করতে আরম্ভ করে। অলক্ষ্যে সেগুলোকে ভয় করে, সেগুলোর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চেষ্টা করে, আশা-আকাঙ্খার পরিপূরণ করতে সচেষ্ট হয়। বরকত হাসিল করার উদ্দেশ্যে সেগুলোর সম্মুখে হাজির হতে শুরু করে। উদ্দ, সুয়া, ইয়াগুম, ইয়াউক ও নসর প্রভৃতি প্রতিমূর্তির পশ্চাতে এই ইতিহাসই নিহিত রয়েছে।

এ ব্যাপারে ইসলামের সতর্কতা কোন বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। কেননা ইসলাম তো সর্ব প্রকারের বিপর্যয় ও ভাঙ্গনের পথ রুদ্ধ করনতে বদ্ধপরিকর। যেসব ছিদ্রপথে প্রকাশ্য শিরক বা গোপনীয় শিরক মানুষের মন-মগজে প্রবেশ করতে ও স্থান দখল করে তাদের মুশরিক বানাতে পারে অথবা যেসব পথে সমাজে পৌত্তলিকতা ও ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ির প্রচলন হতে পারে, তা সব চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়াই ইসলামের লক্ষ্য। এ ব্যাপারে ইসলামের অনমনীয় নীতি ও ভূমিক এজন্যও যে, ইসলামী শরীয়ত কোন এক কালের, এক যুগের বা এক দেশ ও বংশের লোকদের জন্যে নয়- তা সর্বকালের সকল মানুষের জন্যে জীবন-বিধান। তারা দুনিয়ার যে-কোন অংশে বা দেশেই বসবাস করুক না কেন, কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষই তা যথাযথ পালন করতে পারে।

(খ) ছবি ও প্রতিকৃতি রচনা হারাম হওয়ার আর একটি কারণ হলো প্রতিকৃতি বা ছবি নির্মাতা এ ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়ে যে, সে বুঝি একটা জিনিসকে অনস্তিত্ব থেকে বের করে এনে অস্তিত্বসম্পন্ন করে দিতে সক্ষম হয়েছে অথবা মাটি, পাথর বা কালি-কলম দ্বারা একটা জীবন্ত সত্তা বানিয়ে ফেলেছে। বাস্তব ঘটনাবলীই এ ধারণার সত্যতা প্রমাণ করে। উল্লেখ করা যেতে পারে, একজন লোক একটি প্রতিকৃতি নির্মাণ করল। তার পরে সে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার তলায় অবস্থান করতে থাকল। প্রতিকৃতিটি যখন পূর্ণাঙ্গ তৈরী হয়ে গেল, তখন সে তার সম্মুখে দাড়িয়ে তার নাক-নকশা ও তার সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত সৌন্দর্য দেখে আত্মশ্লাঘায় মেতে উঠল ও অহংকারে স্ফীত হয়ে প্রতিমূর্তিটিকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলঃ ওরে কথা বল, কথা বল, (যেন ওটা একটা জীবন্ত সত্ত্বা)।

ঠিক এ কারণেই রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে সব লোক এ ধরনের প্রতিকৃতি-প্রতিমূর্তি নির্মাণ করে, কিয়ামতের দিন তাদের আযাব দেয়া হবে এবং বলা হবেঃ তোমরা যা কিছু সৃষ্টি করেছিলে, তা এখন জীবন্ত করে দাও। (বুখারী, মুসলিম)

হাদীসে বলা হয়েছে আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে আমার সৃষ্টির ন্যায় সৃষ্টি কর্ম করতে চায়, তার তুলনায় অধিক জালিম আর কে হতে পারে? ওরা যব বা গমের একটা দানা সৃষ্টি করে দিক না! (কেমন ক্ষমতা বুঝব)। (বুখারী, মুসলিম)

(গ) এ কর্মে যারা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে চায়, তারা কোন স্থানে গিয়েই থেমে যায় না। তারা নারীদেহের নগ্ন ও অর্ধনগ্ন ছবি ও প্রতিকৃতি বানাতে শুরু করে। পৌত্তলিকতা বোতপরস্তির প্রতীক ক্রুশ মূর্তি প্রকৃতি নির্মাণেও তারা একবিন্দু দ্বিধা বা সংকোচ করে না অথচ এ ধরনের জিনিস বানান মুসলমানের পক্ষে আদৌ জায়েয নয়।

(ঘ) এতে সন্দেহ নেই যে, প্রতিকৃতি বিলাসী জীবনের পরিচায়ক। বিলাসী ও জাঁকজমককারী ধনী লোকদের একটা চিরকালের রীতি, তারা নিজেদের প্রাসাদপম ঘর-বাড়িগুলোকে প্রতিকৃতি ও ছবি দিয়ে সজ্জিত করে রাখে। নিজেদের কক্ষসমূহের প্রাচীর ঢেকে দেয় ছবির পর ছবি লাগিয়ে। নানা ধাতু দিয়ে প্রতিকৃতি বানিয়ে শিল্প-দক্ষতা ও শিল্পপ্রিয়তা প্রমাণ ও প্রদর্শন করে। দ্বীন-ইসলাম সর্বপ্রকার বিলাস-ব্যসন সামগ্রী ও তার প্রকাশ প্রমাণের প্রতীকসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। মুসলমানদের ঘরে প্রতিকৃতির সমাবেশ বা অস্তিত্ব বরদাশত করা ইসলামের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয় এবং তা সম্পূর্ণ হারাম ঘোষিত হওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।

মহাপুরুষদের স্মৃতিরক্ষার উপায়

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, জাতীয় ইতিহাসে যেসব মহাপুরুষ চিরস্মরণীয় কীর্তি রেখে গেছেন তাঁদের অবদান সমূহের কথা সকলের মনে চির জাগরুক করে রাখার জন্যে তাদের বস্তুগত প্রতিকৃতি (Statue) দাঁড় করিয়ে তাদের অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেবে না, অনাগত বংশধরদের সম্মুখে তাদের চিরভাস্বর করে রাখবে না? জাতির স্মরণশক্তি তো খুব তেজস্বী নয়, মানুষ তো ভুলে যায় সব কিছু। কালের স্রোত তাদের বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন করে দেয়। এরূপ অবস্থায় প্রতিকৃতি নির্মাণ করতে দোষ কি?

এর জবাব হচ্ছে, ইসলাম ব্যক্তিত্বের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত শ্রদ্ধা বা ভক্তি প্রদর্শন পছন্দ করে না। সে ব্যক্তিত্ব যত বড়, যত উঁচু এবং মৃত বা জীবিত- যাই হোক না কেন। নবী করীম (সা) বলেছেনঃ

তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করো না, যেমন করে খ্রিস্টানরা ঈসা ইবনে মরিয়মের সীমালংঘনমূলক প্রশংসা করেছে। তোমরা বরং আমাকে বলবেঃ আল্লাহর দাস, তাঁর রাসূল।

সাহাবিগণ নবী করীম (সা)-এর সম্মানার্থে দাঁড়াতে ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেই তাঁদের নিষেধ করে দিলেন। বললেনঃ (আরবি****************)

অনারব লোকেরা যেমন পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে দাড়িয়ে থাকে তোমরা সেরূপ দাঁড়িয়ে যেও না। (আবূ দাঊদ, ইবনে মাযাহ)

রাসূলে করীম (সা)-এর দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর তাঁর উম্মতের লোকেরা যেন তাঁর প্রতি মর্যাদা ও সম্মান বা ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখাতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে না যায়। বলেছেনঃ (আরবি****************)

আমার কবরকে কেন্দ্র করে তোমরা উৎসব করতে শরু করে দিও না।

তিনি আল্লাহর কাছে অহরহ দো’আ করতেনঃ (আরবি****************)

হে আল্লাহ্! আমার কবরকে তুমি পূজ্যমূর্তি হতে দিও না।

কিছুলোক রাসূলে করীম (সা)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলতে শুরু করলঃ

হে আল্লাহর রাসূল! হে আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তিত্ব;

হে আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তিত্বের সুযোগ্য পুত্র;

হে আমাদের সরদার, হে আমাদের সরদার-তনয়;

এসব শুনে নবী করীম (সা) বললেনঃ (আরবি****************)

হে লোকেরা! তোমরা আজ পর্যন্ত আমাকে যেভাবে ডাকতে, সম্বোধন করতে, সেভাবে ডাক! শয়তান যেন তোমাদের ধোঁকায় ফেলতে না পারে। আমি তো মুহাম্মদ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহ্ আমাকে যে স্থান ও মর্যাদা দিয়েছেন, তোমরা যেন তার চাইতে উঁচুতে আমাকে উঠিয়ে দিতে না চাও। (নিসায়ী)

ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি নির্মাণ করে মূর্তির ন্যায় স্থাপন করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সেজন্যে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করা- সম্মান প্রদর্শনের এ রীতি ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়।

শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা দাবিদাররা এবং বাতিল ও মনগড়া ইতিহাস সৃষ্টিকারীরা এসব ষড়যন্ত্রমূলক উপায়ে দুনিয়ার জাতিসমূহকে বিভ্রান্ত করছে আবহমানকাল ধরে। আর জাতির প্রকৃত খাদেম ও কল্যাণকারীদের তারা কখনই লোকদের সম্মুখে আসতে দেয়নি, দূরে লুকিয়ে রেখেছে। পরিচিত হওয়ার বা তাদের চিনবার কোন সুযোগই হতে দেয়নি।

ঈমানদার লোক যে চিরস্থায়িত্বের কামনা করে তা কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে থেকেই পাওয়া যেতে পারে। তিনিই জানেন সব গোপন ও লুকান কথা। আর তিনি কখনই কিছু ভুলে যান না। তাঁর কোন ভুল-ত্রুটি হতেই পারে না। কত শত বিরাট বিরাট ব্যক্তিত্বের নাম তাঁর কাছে স্থায়ী রেজিষ্টারে লিখিত হয়ে আছে, যদিও মানুষ তাদের জানে না, চিনে না। কেননা আল্লাহ্ নেক, মুত্তাকী ও অপরিচিত অজ্ঞাতনামা লোকদেরই পছন্দ করেন, কোন মজলিসে নেক, মুত্তাকী ও অপরিচিত অজ্ঞাতনামা লোকদেরই পছন্দ করেন, কোন মজলিসে আসীন থাকলে তাক চেনা যাবে না, অনুপস্থিত হলে তাকে কেউ সন্ধানও করবে না।

যদি চিরস্থায়িত্বই কাম্য হয়ে থাকে, তাহলে এ ধরনের প্রতিকৃতি বা মূর্তি দাঁড় করে তা লাভ করা সম্ভব হবে না। তার একটিমাত্র উপায় রয়েছে এবং সে উপায়ই ইসলামে পছন্দনীয়, সমর্থিত আর তা হচ্ছে, সে ব্যক্তিত্ব সমূহের স্মরণ লোকদের মন-মগজে দৃঢ়মূল করে বসিয়ে দিতে হবে। লোকদের মুখে মুখে তাদের গুণগান ও প্রশংসা উচ্চারিত ও ধ্বনিত হবে। তারা যেসব ভাল ভাল কল্যাণকর কাজ করেছেন, অতুলনীয় কৃতিত্ব রেখে গেছেন, সেসব দেখে অনাগত বংশধরেরা তাঁদের প্রশংসা ও গুণগান অনন্তকাল ধরে করতে থাকবে, তাই তো স্বাভাবিক।

রাসূলে করীম (সা), খুলফায়ে রাশেদুন, ইসলামের ঐতিহাসিক নেতৃবৃন্দ ও ইমাম মুজতাহিদগণের স্মৃতি কোন ছবি বা পাখন নির্মিত প্রতিকৃতি দিয়ে অক্ষয় ও চিরস্মরণীয় করে রাখা হয়নি। পাথর খোদাই করে তাঁদের প্রতিমূর্তি নির্মাণ করা হয়নি, বরং এক বংশের লোক তাদের পূর্ববংশের লোকদের- সন্তান, পিতা-মাতা-চাচা-দাদার কাছ থেকে তাদের অক্ষয়-অতুলনীয় কীর্তির কথা মুখে মুখে- স্মৃতিশক্তি থেকে স্মৃতিশক্তিতে স্থানান্তরিত হতে হতে এ পর্যন্ত চলে এসেছে, মুখে মুখে তাদের কল্যাণময় উল্লেখ হয়েছে, সভা সম্মেলনে তার ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। মানুষের মন ও মগজ তাদের কীর্তি গাঁথায় ভরপুর হয়ে রয়েছে এবং তা অনন্তকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে অব্যাহতভাবে। কোনরূপ ছবি প্রতিকৃতি রচনা ছাড়াই তাঁর চিরস্মরণীয় ও অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেনও চিরকাল।

[ দামেশক বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়ত বিভাগের প্রাক্তন প্রধান আল-উস্তাদ মুহাম্মদ আল-মুবারক জামে আজহারে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে যে আলোচনা পেশ করেছিলেন, তার একটা অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি। তিনি বলেছিলেনঃ বর্তমানে আমরা নতুন নতুন পরিবেশ পরিস্থিতি, সংগঠন ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের সম্মুখীন হচ্ছি। কিন্তু তার মধ্যে অনেকগুলোই এমন যা আমাদের নির্ভুল আকীদা-বিশ্বাস ও চিরাচরিত নিয়ম-নীতির সাথে কিছুমাত্র সামঞ্জস্যশীল নয়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, জাতীয় ‘হিরো’ দের চিরস্মরণীয় করে রাখবার উদ্দেশ্যে ইউরোপ-আমেরিকায় অনুসৃত প্রতিমূর্তি নির্মাণ নীতি। আমরা যখন স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত দৃষ্টিতে চিন্তা করি, তখন দেখতে পাই যে, প্রাচীনকালের আরবরা তাদের বড় বড় লোকদের অপূর্ব ও ঐতিহাসিক কার্যকলাপ-যেমন জাতীয় স্বার্থে আত্মদান, তুলনাহীন দানশীলতা, বদান্যতা ও অপরিসীম সাহস-বীরত্বকে বিশেষ এক পন্থায় চিরস্মরণীয় করে রাখত। তাদের কিসসা-কিহিনীতে এবং সভা-সম্মেলনে এগুলোর ব্যাপক উল্লেখ হতো এবং বংশের পর বংশের লোকদের কাছে তা অবিস্মরণীয় করে রাখত। তাদের কাব্য-কবিতায় তাদের উচ্চ-প্রশংসা লিখিত হতো। ঐতিহাসিক হাতেম তায়ীর দানশীলতা ও উনশজার বীরত্ব কাহিনী এভাবেই চিরস্থায়ী হয়েছিল।

ইসলাম এসে এ পদ্ধতিকেই বলিষ্ট করে দেয়। আল্লাহর সেরা সৃষ্টি ও সর্বশেষ নবীকে একজন মানুষ হিসেবেই উপস্থাপিত করা হয়েছে। তাঁর নিজের মুখেই ঘোষণা করিয়েছেঃ (আরবি****************)

আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তবে আমার কাছে ওহী আসে।

এর ফলে মানুষের মূল্য ও মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াল তাঁর আমল, তার দেহ নয়। রাসূলকে সকলেরই অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করা হলো যেন সমস্ত মানুষ নিঃসংকোচে তাঁর অনুসরণ করতে পারে। সেই সঙ্গে ব্যক্তির পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন- তাকে এতটা বড় করে তোলা, যা ইবাদতে পর্যন্ত পৌঁছে যায়, পরিহার করা হলো। কেননা তাতে করে পরোক্ষভাবে মানুষকে হীন ও সামান্য-নগণ্য করা হয়।

এ কারণেই রাসূলে করীম (সা)-এর ইন্তেকাল হলে প্রথম খলীফা উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেনঃ (আরবি****************)

যে লোক মুহাম্মাদ (সা)-এর বন্দেগী করত, তার জানা উচিত যে, মুহাম্মাদ (সা) মরে গেছেন এবং যে লোক আল্লাহর ইবাদত করত, তার জানা উচিত, আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনই মরবেন না।

অতঃপর তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবি****************)

মুহাম্মাদ (সা) রাসূল ছাড়া আর কিছুই নন। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। এখন যদি সে মরে যায় বা নিহত হয়, তাহলে তোমরা কি পাশ্চাদপসরণ করবে?

ইসলাম মানুষকে চিরস্মরণীয় করে রাখে তার জনকল্যাণমূলক নেক আমলের মাধ্যমে এবং চিরস্থায়ী করে রেখেছে মুসলিম জনগণের মনে। তাঁদের বড় ছোট সকলেই সমানভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁদের নেক আমলসমূহের স্মৃতির মাধ্যমে। হযরত উমর (রা) সুবিচারপূর্ণ বলিষ্ঠ রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালন দক্ষতার দরুন, হযরত আবূ বকর দৃঢ় সংকল্প র নির্ভুল দূরদর্শিতার মাধ্যমে, হযরত আলী পরহেযগারী ও বীরত্বের মাধ্যমে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন লোকদের মনে-মগজে। তাদের চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্যে পাথর নির্মিত প্রতিকৃতির ওপর নির্ভরশীল হতে হয়নি। তাঁদের কীর্তিই তাঁদের চিরস্মরণীয় করেছে, করেছে তাদের তুলনাহীন পবিত্র চরিত্র।

বস্তুতঃ প্রতিকৃতি নির্মাণ করে বড় লোকদের চিরস্মরণীয় করে রাখার নীতি গ্রহণ করা হলে পিছনের দিকে ফিরে যাওয়া হবে, প্রগতি হবে না হবে পশ্চাদগতি এবং উন্নত মর্যাদা থেকে হবে অধোগতি। রোমান গ্রীকরাই এ নীতি গ্রহণ করেছেন প্রথমে। পরে ইউরোপীয়রা তা অনুসরণ করেছে। কেননা এরা স্বভাবের দিক দিয়ে সকলেই পৌত্তলিকতাবাদী। ররা ব্যক্তিদের অপলনীয় কার্যবলীকে কার্যবলীকে র্যথার্থ মূল্য দেয়নি। বরং এজন্যে তাদের দেবতার মর্যাদা দিয়েছে। দেবতাদেরই বানিয়েছে জাতীয় হিরো।]

শিশুদের খেলনায় দেষ নেই

কিছু কিছু মূর্তি-প্রতিকৃতি এমনও হয়ে থাকে যেগুলো দ্বারা কারো প্রতি অসীম ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখান হয় না, অতিশয় বিলাসিতা ও বড়লোকী দেখানও লক্ষ্য হয় না। তাছাড়া পূর্বোক্ত আলোচনায় যে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে, তারও কোন অবকাশ থাকে না। এ ধরনের মূর্তি-প্রতিকৃতি সম্পর্কে ইসলাম সংকীর্ণ মানসিকতা ও অসহনশীলতা প্রদর্শন করেনি। তাতে কোন দোষ্ণমনে করা হয়নি।

ছোট বালক-বালিকাদের খেলনা হিসেবে তৈরী মূর্তি-প্রতিকৃতিগুলো এ পর্যায়ে গণ্য। যেমন পুতুল, বিড়াল-কুকুর, পাখি প্রভৃতি জীব-জন্তুর মূর্তি। এগুলোর প্রতি কোনরূপ ভক্তিশ্রদ্ধা প্রকাশ করার বা অন্তরে থাকার কোন প্রশ্ন উঠে না। শিশুরা, বালক-বালিকারা তা নিয়ে শুধু খেলা করে, তার পূজা করে না। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ (আরবি****************)

আমি রাসুলে করীম (সা)-এর উপস্থিতিতে মেয়েদের নিয়ে খেলা করতাম। আমার বান্ধবীরা আমার কাছে আসত ও রাসূলের ভয়ে লুকিয়ে যেত অথচ আমার কাছে ওদের আসা ও আমার সাথে খেলা করায় রাসূল খুশীই হতেন। (বুখারী, মুসলিম)

অপর একটি বর্ণনায় উদ্ধৃত হয়েছে, একদা নবী করীম (সা) তাঁকে বললেনঃ এগুলো কি? তিনি বললেনঃ এগুলো আমার পুতুল। বললেনঃ ওগুলোর মাঝখানে ওটা কি? বললেন? ওটা ঘোড়া। জিজ্ঞেস করলেনঃ ও ঘোড়াটির উপর কি? বললেনঃ ওদুটো পাখা। বললেন? ঘোড়ার আবার পাখা হয় নাকি?

হযরত আয়েশা (রা) বললেনঃ ‘আপনি কি শুনেন নি, দাঊদ-পুত্র হযরত সুলায়মানের পাখাওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবী করীম (সা) হেসে উঠলেন। সে হাসিতে তাঁর দাঁত মুবারক প্রকাশ হয়ে পড়ল। (আবূ দাঊদ)

হাদীসে যেসব পুতুলের উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে বালক-বালিকারা খেলা করে। হযরত আয়েশা (রা) বিয়ের সময় খুবই অল্প বয়স্কা বালিকা ছিলেন।

ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ (আরবি****************)

উপরিউক্ত কথোপকথন সম্বলিত হাদীসটি প্রমাণ করে যে, বাচ্চাদের এ ধরনের প্রতিকৃতি দ্বারা খেলতে দেয়া জায়েয।

অবশ্য ইমাম মালিক (র) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এ ধরনের পুতুল ইত্যাদি খেলনা বাচ্চাদের জন্যে ক্রয় করে আনাকে মাকরূহ মনে করতেন। আর কাযী ইয়ায বলেছেন, ছোট ছোট মেয়েদের পুতুল দ্বারা খেলা করা জায়েয।

এ সব খেলনার মধ্যে সেসব পুতুলও শামিল, যা মিঠাই দ্বারা তৈরী করা হয় ও মেলা-তেহারে বিক্রয় হয়। বাচ্চারা তা নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করে। তারপর নিজেরাই তা খেয়ে ফেলে।

অসম্পূর্ণ ও বিকৃত প্রতিকৃতি

হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, হযরত জিবরাঈল (আ) নবী করীম (সা)-এর ঘরে প্রবেশ করা থেকে একবার বিরত রয়েছিলেন এজন্যে যে, তাঁর ঘরের দ্বারপথে একটা প্রতিকৃতি রক্ষিত ছিল। দ্বিতীয় দিন এসেও প্রবেশ করেন নি। তখন তিনি নবী করীম (সা)-কে বললেনঃ (আরবি****************)

প্রতিকৃতিটির মস্তক ছেদন করে দিন। ফলে সেটি গাছের আকৃতি ধারণ করবে। (আর তা হলে তাঁর প্রবেশে কোন বাধা থাকবে না।) (আবূ দাঊদ, নাসায়ী, তিরমিযী)

একদল বিশেষজ্ঞ এই হাদীসের ভিত্তিতে বলেছেন যে, যে ছবি বা প্রতিকৃতি সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ, কেবল তা-ই হারাম। কিন্তু যে ছবি-প্রতিকৃতির কোন অঙ্গ নেই,- যে অঙ্গ ভিন্ন একটা জীবন্ত দেহ বেঁচে থাকতে পারে না, তা জায়েয।

আসল কথা হচ্ছে, হযরত জিবরাইল (আ) মস্তক ছেদন করতে বলেছিলেন যেন সেটার আকৃতি গাছের মত হয়ে যায়। এ থেকে বোঝা যায় যে, অঙ্গ ভিন্ন জীবন্ত দেহ বাঁচে না সেটার কথাই নয়। সেটাকে বিকৃত করাই হচ্ছে প্রকৃত কথা। যেমন সেটা এমন কোন আকার হয়ে না থাকে, যা দেখলে অন্তরে ভক্তি-শ্রদ্ধার ভাব জেগে উঠতে পারে।

একটু চিন্তা করলে ও ইনসাফের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে কোন সন্দেহ ছাড়াই আমরা বলতে পারি যে, ঘর সাজাবার উদ্দেশ্যে যেসব পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়, রাজা-বাদশাহ-রাষ্ট্রনেতা-সৈনিক-কবি-সাহিত্যিকদের সেসব অর্ধাঙ্গ প্রতিকৃতির খুব বেশি করে হারাম হতে হবে, যা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মাঠে-ময়দানে চৌরাস্তায় সংস্থাপন করা হয়।

বিদেহী ছবি-প্রতিকৃতি

প্রতিকৃতি পর্যায়ে ইসলামের দৃষ্টিকোণ একক্ষণ আলোচিত হলো। এক্ষণে কাগজ, কাপড়, পর্দা, প্রাচীর, মেঝে, মঞ্চ ও মুদ্রা ইত্যাদির ওপর অংকিত শৈল্পিক ছবিসমূহ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কি সেটাই প্রশ্ন।

তার জবাবে বলতে চাই, মূলতঃ ছবিটা কিসের, কোথায় রাখা হচ্ছে, কিভাবে তার ব্যবহার হবে এবং শিল্পী সেটা কি উদ্দেশ্যে বানিয়েছে, ছবি সম্পর্কে শরীয়তের ফয়সালা জানাবার পূর্বে এসব কথা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

এসব শৈল্পিক ছবি যদি আল্লাহ্ ছাড়া যেসব মা’বুদ রয়েছে তাদের হয় যেমন ঈসা (আ)-এর ছবি, যাঁকে খ্রিস্টানরা নিজেদের মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে কিংবা গাভী বা গরুর ছবি হয়, যা হিন্দুদের দেবতা- এ সবের ছবি যেহেতু এ উদ্দেশ্যেই নির্মাতা নির্মাণ করেছে, আর তারা কাফির। ছবির মাধ্যমে কুফরী ও গুমরাহী প্রচার করাই তাদের লক্ষ্য। এ সব ছবি অংকনকারীদের সম্পর্কেই নবী করীম (সা) কঠিন কঠোর বাণী শুনিয়েছেন। এ পর্যায়ে তাঁর বাণী হচ্ছেঃ (আরবি****************)

ছবি নির্মাতারাই কিয়ামতের দিন কঠিনতম আযাবে নিক্ষিপ্ত হবে। (মুসলিম)

তাবারী লিখেছেনঃ

এখানে সেই ছবি নির্মাতার কথা বলা হয়েছে যার বানান ছবির পূজা করা হয়। জেনে শুনে এ ধরনের ছবি বানান কুফরী কাজ। কিন্তু যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্যে নয়, অপর কোন উদ্দেশ্যে ছবি তোলে বা বানায়, সে শুধু গুনাহগার হবে।

যে লোক ‍ছবিকে পবিত্র জ্ঞান করে প্রাচীরগাত্রে ঝুলায়, তার সম্পর্কে এই কথা। কোন মুসলিমই এ কাজ করতে পারে না। তবে যদি কেউ ইসলামই ত্যাগ করে, তবে তার কথা স্বতন্ত্র।

এরই অনুরূপ অবস্থা হচ্ছে এমন জিনিসের ছবি বানান, যার পূজা করা হয় না বটে, কিন্তু মূরত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের সাথে সাদৃশ্য করা, অন্য কথায় ছবি নির্মাণ সে-ও যেন দাবি করছে যে, সেও আল্লাহরই মতো সৃষ্টি ও উদ্ভাবন ক্ষমতার অধিকারী।

এরূপ ব্যক্তি তার ইচ্ছা ও সংকল্পের কারণে দ্বীন-ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। এ ধরনের ছবি নির্মাতাদের সম্পর্কেই হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবি****************)

কঠিনতম আযাবে নিক্ষিপ্ত হবে সেসব লোক, যারা সৃষ্টিকর্মে আল্লাহর সাথে সাদৃশ্য করে। (মুসলিম)

ব্যাপারটির সম্পর্ক ছবি-নির্মাতার নিয়তের সাথে। নিম্নোদ্ধৃত হাদীস থেকেও এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়। তাতে আল্লাহর কথা উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবি****************)

যে লোক আমার সৃষ্টির মতই সৃষ্টিকর্ম করতে শুরু করে, তার চাইতে বড় জালিম আর কেউ হতে পারে না। এ লোকেরা একটা দানা বা একটা বিন্দুই সৃষ্টি করে দেখাক না।

হাদীসটির শব্দসমূহ থেকে বোঝা যায়, সাদৃশ্য করার ইচ্ছা করা এবং ইলাহ হওয়ার বিশেষত্ব-সৃষ্টিকর্ম ও নবোদ্ভাবনে সমতা করা বুঝান হচ্ছে। আল্লাহ্ তা’আলা এ কাজকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। বলেছেন, যদি বাস্তবিকই সাদৃশ্য করতে চাও, তাহলে একটা জীব বা দানা অথবা একটি বিন্দু সৃষ্টি করেই দেখাও না কেন? এ থেকে একথাও জানা যায় যে, সে লোক এ উদ্দেশ্য নিয়েই তা করেছিল। এ কারণে আল্লাহ্ তা’আলা কিয়ামতের দিন তাদের এ শাস্তি দেবেন যে, জনগণের সম্মুখেই তাদের নিজেদের সৃষ্ট দেহে প্রাণের সঞ্চার করার জন্যে বলবেন। কিন্তু তা করতে তারা কখনই সক্ষম হবে না।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ দিয়ে যেসব ছবি বা প্রতিকৃতিকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয় কিংবা বৈষয়িক দৃষ্টিতে তাদের সম্মানযোগ্য মনে করা হয় সেগুলো বানান এবং সংরক্ষণ হারাম। প্রথম প্রকারের ছবি ও প্রতিকৃতি হতে পারে নবী-রাসূল, ফেরেশতা ও নেককার লোকদের। যেমন হযরত ইবরাহীম, হযরত ইসহাক, হযরত মূসা, হযরত মরিয়ম ও হযরত জিবরাঈলের ছবি বা প্রতিকৃতি। খ্রিস্টানদের সমাজে এ পর্যয়ের ছবি ও প্রতিকৃতি সংরক্ষণের ব্যাপক রেওয়াজ রয়েছে। বহু বিদয়াতী মুসলমানও তাদের অনুসরণ করে। তারা হযরত আলী ও ফাতিমা (রা) প্রমুখের ছবি বা প্রতিকৃতি বানিয়ে থাকে।

আর দ্বিতীয় পর্যায়ের ছবি বা প্রতিকৃতি হয়ে থাকে রাজা-বাদশাহ, শাসক, ডিকটেটর ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের। প্রথম প্রকারের ছবি প্রতিকৃতি বানানর তুলনায় এদেরটা বানান কিছুটা কম গুনাহ। কিন্তু বড় বড় কাফির, জালিম ও ফাসিক-ফাজির ব্যক্তিদের ছবি প্রতিকৃতি বানালে এ গুনাহ অধিক তীব্র হয়ে দেখা দেয়। যেমন সেসব শাসকদের ছবি প্রতিকৃতি, যারা আল্লাহর বিধান মুতাবিক শাসন কার্য সম্পন্ন করে না। সেসব নেতাদের বড় ছবি প্রতিকৃতি যারা আল্লাহর দেয়া জীবনাদর্শকে বাদ দিয়ে অন্য কোন দিকে লোকদের ডাকে। সেসব শিল্পী-সাহিত্যিকদের ছবি ও প্রতিকৃতি, যারা বাতিল মতাদর্শ প্রচার করে এবং লোকদের মধ্যে নির্লজ্জতা, নগ্নতা ও চরিত্রহীনতা প্রসার ঘটায়।

রাসূলের সমসাময়িক যুগে প্রধানতঃ পবিত্রতা ও সম্মান প্রদর্শনার্থেই ছবি বা প্রতিকৃতি বানান হতো। আর সেগুলোর বেশির ভাগ রোমান পারসিক অর্থাৎ খ্রিস্টান ও অগ্নি পূজারীদেরই কাজ হতো। এ কারণে সে সবের ওপরে ধর্মীয় ভক্তি-শ্রদ্ধা ও শাসকদের প্রতি পবিত্রতাবোধের ছাপ প্রকট হয়ে থাকত। হযরত আবুদ্ দোহা বলেনঃ (আরবি****************)

আমি মাশরূকের সাথে একটি ঘরে ছিলাম। তাতে বহু প্রতিকৃতি ও ছবি রক্ষিত ছিল। সেসব দেখে মাশরূক আমাকে বললেনঃ এগুলো কি কিসরা’র প্রতিকৃতি? আমি বললামঃ না, এ হযরত মরিয়মের প্রতিকৃতি। সম্ভবতঃ মাশরূক মনে করেছিলেন, এসব প্রতিকৃতি অগ্নি পূজারীদের নির্মিত! কেননা তারা পাত্রে ইত্যাদিতে নিজেদের রাজা-বাদশাহদের ছবি বানিয়ে থাকে। কিন্তু জানা গেল যে, এসব প্রতিকৃতি খ্রিস্টানদের নির্মিত। এ পর্যায়ে মাশরূক বললেনঃ আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে সর্বাধিক আযাব পাওয়ার যোগ্য সেসব লোক, যারা ছবি প্রতিকৃতি বানিয়ে থাকে।

এসব ব্যতীত উদ্ভিদ-গাছ, নদী, জাহাজ, পাহাড়, চন্দ্র, সূর্য, তারকা প্রভৃতি প্রাণহীন নৈসর্গিক দৃশ্যাবলীর ছবি বানান ও রাখায় কোন দোষ নেই। এ ব্যাপারে কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই।

কিন্তু প্রাণীর ছবি হলে আর তাতে পূর্ববর্ণিত ভাবধারার আশংকা না থাকলে- শ্রদ্ধা – ভক্তি, সম্মান পবিত্রতার ভাবধারা জাগানর ছবি না হলে এবং তাতে আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির সাথে সাদৃশ্যকরণ উদ্দেশ্য না হলে এ গ্রন্থকারের মতে তাতে কোন গুনাহ নেই, তা হারাম নয়। নিম্নোদ্ধৃত হাদীসদ্বয় থেকে তার সমর্থন পাওয়া যায়ঃ (আরবি****************)

আবূ তালহা সাহাবী থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন, ফেরেশতা এমন ঘরে প্রবেশ করে না, যেখানে ছবি রয়েছে। এই হাদীসের বর্ণনাকারী বুসর বলেছেন, পরে যায়েদ অসুস্থ হলে আমরা তাকে দেখতে গেলাম। দেখলাম, তার ঘরের দরজায় ঝুলান পর্দায় ছবি রয়েছে। রাসূলের বেগম মায়মুনার লালিত-পালিত উবায়দুল্লাহ খাওলানীকে জিজ্ঞেস করলাম, যায়েদ ছবি সম্পর্কে প্রথম ‍দিন আমাদের কি বলেছিলেন? উবায়দুল্লাহ্ জবাবে বললেন, তিনি যে সময় ছবি হারম বলেছিলেন, তখন এই ব্যতিক্রমের কথাও বলেছিলেন যে, কাপড়ে অংকিত হলে দোষ নেই।

উতবা থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ তালহা আনসারীকে দেখতে গেলেন। তথায় তিনি সহল ইবনে হানীফকে উপস্থিত পেলেন। আবূ তালহা এক ব্যক্তিকে বললেন, নিচ থেকে বিছানাটা বের করে আন। এ কথা শুনে সহল বললেন, ওটাকে কেন বের করে নিচ্ছ? তিনি বললেনঃ এজন্যে যে, ওটাতে ছবি রয়েছে। আর নবী করীম (সা) ছবি সম্পর্কে কি কি বলেছেন, তা তো আপনার জানাই আছে। সহল বললেন, তিনি এও বলেছেন যে, কাপড়ে অংকিত হলে দোষ নেই। আবূ তালহা ঠিকই বলেছেন, কিন্তু আমি মনে করি, ওটা সরিয়ে দেয়াই ভাল।

এ দুটো হাদীস থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে, হারাম ছবি বলতে প্রতিকৃতি (Statue) বোঝায়। কিন্তু যেসব ছবি কাষ্ঠফলক, তক্তা বা শক্ত কাগজ বা কাপড়, বিছানা বা প্রাচীরের ওপর অংকিত করা হয়, সেগুলো যে হারাম, তা কোন সহীহ স্পষ্ট ও অকাট্য হাদীস থেকে প্রমাণিত নয়।

তবে সহীহ্ হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত যে, নবী করীম (সা) এ ধরনের ছবির প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। কেননা তাতে বিলাসিতা, বড়লোকী ও বৈষয়িক স্বার্থপূজার সাথে পূর্ণ সাদৃশ্য ও একত্মতা লক্ষ্য করা যায়।

হযরত আবূ তালহা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ আমি রাসূলে করীম (সা) কে বলতে শুনেছি, তিনি বললেনঃ (আরবি****************)

যে ঘরে কুকুর বা প্রতিকৃতি রয়েছে, তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।

তিনি বলেন, পরে আমি হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম। এই লোকটি বলেছেনঃ রাসূলে করীম (সা) নাকি বলেছেন যে, যে ঘরে কুকুর বা প্রতিকৃতি থাকবে, তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না। আপনি কি শুনেছেন, রাসূল করীম (সা) এরূপ বলেছেনঃ তিনি বললেনঃ না। তবে আমি নিজে তাকে যা যা করতে দেখেছি, তা তোমার কাছে বর্ণনা করছি। রাসূলে করীম (সা) যুদ্ধে বের হয়ে গেলেন। তখন একটা চাদর দিয়ে দরজায় পর্দা করলাম। তিনি ফিরে এসে দরজায় সেই চাদরটি ঝুলতে দেখতে পেলেন। তাঁর চেহারায় অস্বস্তি ও অপছন্দের ভাব প্রকট হয়ে উঠল। পরে তিনি চাদরটি টেনে নিয়ে ছিড়ে ফেললেন এবং  বললেনঃ আল্লাহ্ আমাদের পাথর ও মাটি সমূহ কাপড় দিয়ে সজ্জিত করার নির্দেশ দেন নি। হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ আমি সে কাপড় দিয়ে দুটি বালিশ বানালাম এবং তাতে খেজুর গাছের ছাল ভরে দিলাম। শেষে তিনি এ ব্যাপারে কোন আপত্তি করেন নি।

এই হাদীসটি থেকে খুব বেশি যা প্রমাণিত হয়, তা হচ্ছে এই যে, প্রাচীর ইত্যাদিকে ছবি যুক্ত কাপড় দ্বারা সাজ্জিত করা মাকরূহ তানজীহী মাত্র। ইমাম নববী লিখেছেনঃ (আরবি****************)

হাদীসটিতে এমন কোন কথা নেই, যা হারাম প্রমাণ করে। কেননা হাদীসের কথা ‘আল্লাহ্ আমাদের এর নির্দেশ দেন নি’ কথাটি দ্বারা না ওয়াজিব প্রমাণিত হয়, না হয় মুস্তাহাব। আর হারামও প্রমাণিত হয় না।

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত অপর একটি হাদীস থেকেও এরূপ জানা যায়। হাদীসটি হচ্ছেঃ (আরবি****************)

আমার একটা পর্দার কাপড় ছিল। তার ওপর একটি পাখির ছবি অংকিত ছিল। কেউ ঘরে প্রবেশ করতে গেলে সেটার ওপর তার নজর পড়ত। এই দেখে নবী করীম (সা) আমাকে বললেনঃ ওটা সরিয়ে রাখ। কেননা আমি যখন ঘরে প্রবেশ করি, তখন ওটার ওপর আমার দৃষ্টি পরে ও দুনিয়া চোখের সম্মুখে ভেসে ওঠে।

নবী করীম (সা) পর্দার কাপড়টি ছিড়ে ফেলতে বলেন নি, সরিয়ে নিতে বলেছিলেন। এ কারণে যেসব জিনিস বৈষয়িকতা ও বৈষয়িক জাঁকজমক সুখ-স্বাচ্ছন্দের দৃশ্য স্মরণ করিয়ে দেয়, তার প্রতি আকর্ষন বৃদ্ধি করে নবী করীম (সা) সেসব জিনিস চোখের সুন্নাত ও নফল নামায সাধারণত নিজের ঘরেই পড়তেন। উপরিউক্ত ধরনের ছবি ও প্রতিকৃতি সম্বলিত চাদর ও পর্দা মানুষকে নিজেদের প্রতি নিরন্তর আকর্ষণ করতে থাকে। তার প্রভাবে আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক নতি স্বীকার ও একনিষ্টভাবে প্রার্থনা-মুনাজাতে নিমগ্ন হওয়া অনেকটা ব্যাহত হয়ে পড়ে। অন্তর গাফিল হয়ে যায়। হযরত আনাস (রা) বলেছেনঃ

হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে একটি পর্দার কাপড় ছিল। সেটা তিনি ঘরের একদিকে লাগিয়ে রাখতেন। নবী করীম (সা) তাঁকে বললেনঃ ওটাকে সরিয়ে রাখ। কেননা ওটার ওপর অংকিত ছবিগুলো নামাযে আমার সামনে পড়ে।

এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, একটি পাখি ও অন্যান্য ছবি সম্বলিত কাপড়টির অস্তিত্ব নবী করীম (সা) বরদাশত করেছিলেন। কাপড় দুটি ছিড়ে ফেলার নির্দেশ দেন নি।

এ সব হাদীস ও এ ধরনের অপরাপর হাদীসের ভিত্তিতে সেকালের লোকদের মত হচ্ছে, যে ছবি বা প্রতিকৃতির ছায়া পড়ে- অন্য কথায় যা দেহসত্তা সম্পন্ন, কেবল সেগুলোই হারাম। পক্ষান্তরে যেগুলোর কোন ছায়া পড়ে না, তাতে কোন দোষ নেই।

ইমাম নববী মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যায় এই মতের প্রতিবাদ করে লিখেছেন, এ ধরনের মত বাতিল, গ্রহণ-অযোগ্য। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী ইমাম নববীর সমালোচনা করে বলেছেন, এই মতটি মদীনার সেকালের বিশিষ্ট ফিকাহবিদ কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ঘোষণা করেছেন এবং সহীহ সনদ সহকারে বর্ণিত হয়েছে।

শায়খ বখীত ইমাম খাত্তাবীর ‍উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। সে উক্তি এইঃ

যে ব্যক্তি জীব-জন্তুর আকৃতি বানায় আর যে শিল্পী বৃক্ষাদির ছবি আঁকে আমি মনে করি উপরিউক্ত কঠোর বাণী তাদের জন্যে নয়। যদিও এ পর্যায়ের সমস্ত কাজই অপছন্দনীয় এবং তাতে মানুষের লক্ষ্য অপ্রয়োজনীয় কাজকর্মের দিকে নিবদ্ধ হয়ে যায়।

খাত্তাবীর এই উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে শায়খ বখীত লিখেছেনঃ

তার কারণ হচ্ছে, যে ব্যক্তি জীবের আকৃতি রচনা করে, সে আসালে জীবের আ্কৃতি উদ্ভাবন করে না, আকার-আকৃতির একটা রূপ-রেখার তৈয়ার করে মাত্র। এভাবে যেসব ছবি আঁকা হয়, তাতে তার এমন বহু রূপ-প্রত্যঙ্গই উহ্য থেকে যায়, যা না হলে কোন জীবেরই জীবিত যাক সম্ভব হয় না। বরং আসলে দেহটাই অনুপস্থিত থাকে। কাজেই তা জীবের সেই ছবি নয়, যার অংকনকারী কিয়ামতের দিন রূহ ফুঁকে দেয়ার শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হতে পারে অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না। যে ছবি আঁকা সম্পর্কে কঠোর বাণী উচ্চারিত হয়েছে, তা হচ্ছে দেহসম্পন্ন প্রতিকৃতি নির্মাণ, যার ছায়া হয়ে থাকে, যার কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যা না হলে জীবিত থাকতে পারে না- অনুপস্থিত থাকে না। যে প্রতিকৃতি এ ধরনের হবে, তাতেই রূহ ফুঁকে দেয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু ছবি অংকনকারী তাতে রূহ দিতে অক্ষম। তাহলে তার অর্থ এ নয় যে, প্রতিকৃতিটিএত জীবন গ্রহণের যোগ্যতাই নেই। বরং এটা ছকি অংকনকারীর অক্ষমতা। কাজেই তাতে অক্ষম হওয়ার দায়িত্ব তার ওপরই বর্তায়।

বিদেহী ছবি বানান যে জায়েয, নিম্নোদ্ধৃত হাদীস থেকেও তার সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহর  তা’আলা ইরশাদ করেছেন:

(আরবী******************)

তার তুলনায় অধিক জালিম আার কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির ন্যায় সৃষ্টিকর্ম করে এদের তো উচিত একটা কণা সৃষ্টি করা, এদের তো উচিত একটা গমের দানা সৃষ্টি করা।

আসলে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি- আমরা যেমন দেখছি- শুধু সমতল স্থানের ওপর রেখা মাত্র নয়, বরং তা দৈর্ঘ-প্রস্থসম্পন্ন দেহবিশিষ্বট সৃষ্টি। যেমন আল্লাহ নিজেই বলেছৈন:

(আরবী*****************)

সেই আল্লাহ্‌ই মাতৃগর্ভে যেমন চাহেন তেমন তোমাদের আকার-আকৃতি দিয়ে থাকেন।

এ মতের বিরুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসটিই দলিল হিসেবে পেশ করা যেতে পারে। হাদীসটি হচ্ছেঃ

(আরবী****************)

হযরত আয়েশা (রা) একটা বালিশ ক্রয় করেছিলেন। তার ওপর ছবি ছিল। রাসূলে করীম (সা) সেটা বাইরে থেকে দেখতে পেয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন না, দরজাতেই দাঁড়িয়ে থাকলে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি রাসূলে করীমের চেহারা মুবারকে অস্বস্তি ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে নিবেদন করলাম: হে রাসূলুল্লাহ! আমি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করছি, আমার দ্বারা কি অপরাধ হয়ে গেল? বললেন: এ বালিশটি কোত্থেকে আলে? হযরত আয়েশা বললেন্: এ ধরনের ছবি যারা  বানায়, কিয়ামতের দিন তাদের আযাব দেয়া হবে এবং তাদের বলা হবে, এখন তোমাদের সৃষ্টির মধ্যে প্রাণ দাও। পরে তিনি বললেন: যে খরে ছবি থাকে, ফেরেশতা সে ঘরে প্রবেশ করে না।

মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত বর্ণনায় অতিরিক্ত কথা এটুকু:

(আরবী****************)

পরে আমি সেটা কেটে দুটি ছোট ছোট বালিশ বানালাম। রাসূলে করীম (সা) তার ওপর হেলান দেয়ার জন্যে ঘরে ব্যবহার করতে থাকলেন। হযরত আয়েশার কথার অর্থ হচ্ছে, ছবি সম্বলিত বালিশটিকে দুটি ছোট বালিশ বানিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু নিম্নোক্ত কয়েকটি ব্যাপার এ হাদীসের বিপরীত:

১. এক হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত। বর্ণনাগুলো পরস্পরে বৈপরীত্য রয়েছে। কোন কোন বর্ণনা বলা হয়েছে, ছবি সম্বলিত বালিশটি কেটে দুটি ছোট বালিশ বানান হলো, যা তিনি ব্যবহার করতেন। কিন্তু অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি তা ব্যবহার করেননি।

২. কোন কোন বর্ণনা থেকে তা ব্যবহ৮ার করা শুধু মাকরূহ মনে হয়। আর তাও ছবি সম্বলিত কাপড় দ্বার প্রাচীর সজ্জিত করা প্রসঙ্গে। তা এক প্রকারের বিলাসিতা ও বড়লোকি চাল। এ চাল রাসূলের আদৌ পছন্দ ছিল না। তিনি বলেছেন:

(আরবী*************)

পাথর ও মাটিকে পোশাক পরাবার কোন আদেশই আল্লাহ আমাদের দেননি।

৩. মুসলিম শরীফে স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা) থেকেই ছবি সম্বলিত পর্দা সম্পর্কে যে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, তাতে নবী করীম (সা) নিজেই বলেছেন: ‘ওটা সরিয়ে রাখ, কেননা আমার নযর যখন ওর ওপর পড়ে তখন দুনিয়া আমার স্মরণে এসে যায়। এ কথা থেকে চূড়ান্ত ভাবে হারাম প্রমাণিত হয় না।

৪. সেই হাদীসটির বিপরীত, যাতে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা’র ঘরে যে পর্দা ছিল, রাসূলে করীম (সা) সেটাকে সরিয়ে নিতে বলেছিলেন। কেননা তাতে যে ছবি আঁকা রয়েছে, তা নামাযের সময়ে তাঁর সম্মেোখ এসে পড়ে। হাফেজ ইবনে হাজার বলেন: এ হাদীস ও হযরত আয়েশা’র বালিশ সম্পর্কিত হাদীস- এ দুটোর মধ্যে সমন্বয় সাধন কঠিন। কেননা এ হাদীস থেকে জানা যায়, পর্দাটি সরিয়ে ফেলার জন্যে নবী করীম (সা) আদেশ করেছিলেন এজন্যে যে, নামাযের সময় ছবিটি একেবারে চোখের সম্মুখে এসে পড়ে। নতুবা শুধু ছবির কারণে এ নির্দেশ তিনি দেন নি।

অতঃপর দুটি হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে তিন বলেছেন: প্রথম হাদীসে যেসব ছবির কথা রয়েছে তা প্রাণীর ছবি। আর এ হাদীসে যে ছবির উল্লেখ, তা প্রাণীর নয়।

কিন্তু এ সামঞ্জস্য বিধান যথার্থ নয়। কেননা পর্দা সম্পর্কি হাদীসে পাখির ছবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. আবূ তালহা বর্ণিত হাদীসও উপরিউক্ত হাদীসের বিপরীত। তাতে কাপড়ের ওপর অংকিত ছবিকে হারাম বলা হয়নি।

আল্লাম কুরতুবী লিখেছেন:

দুটো হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের একটি উপায় হচ্ছে একথা বলা যে, হযরত আয়েশা বর্ণিত হাদীসে শুধু মাকরূহ বলা হয়েছে এবং আবূ তালহা বর্ণিত হাদীস থেকে শুধু জায়েজ প্রমাণিত হয়। আর তা মাকরূহ হওয়ার পরিপন্থী নয়।

হাফেজ ইবনে হাজারের মতে এ সমন্বয় উত্তম।

৬. হযরত আয়েশার ঠেসবালিশ সম্পর্কিত হাদীসের বর্ণনাকারী তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর। তাঁর মতে যে ছবির ছায়া পড়ে না, তা জায়েয ছিল। ইবনে আউন বলেন: আমি কাসেমের কাছে গেলাম। তিনি মক্কার উচ্চাংশে নিজের ঘরে অবস্থান করছিলেন। আমি তাঁর ঘরে একটা সুসজ্জিত কোঠা দেখলাম। তার ওপর ‘কুন্দুস’ নামক এক প্রকারের জলজন্তু ও উমকা নামক এক প্রকারের পাখির ছবি অংকিত ছিল।

হাফেজ ইবনে হাজার বলেন:

সম্ভবতঃ যে হাদীসে (আরবী*********) তবে কাপড়ে অংকিত হলে (নাজায়েয নয়)’ কথাটি থেকে তিনি সাধারণভাবে জায়েয বুঝেছেন। আর সম্ভবনত হযরত আয়েশার ঘরের পর্দা সম্পর্কি হাদীসের ব্যাখ্যা তাঁর মতে এই ছিল যে, তার পর্দার কাপড়টি বিত্রিতও ছিল এবং তা প্রাচীল ঢাকার কাজেও ব্যবহার করা হতো। এ সম্পর্কেই রাসূলের কথা:” ‘মাটি ও পাথরকে কাপড় পরাবার আদেশ আমাদের দেয়া হয়নি।’ কাসেম ইবনে মুহাম্মদ মদীনার তদানীন্তন সাতজন বিশিষ্ট ফিকাহবিদের অন্যতম। তিনি হেলান দেয়ার বালিশ সম্পর্কিত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিনি যদি ‘সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠ’ ধরনের ক্ষেত্রে ছবি থাকা জায়েয মনে না করতেন, তাহলে সেখানে তিনি নিশ্চয়ই তা ব্যবহার করতেন না। (ফাতহুল বারী)

কিন্তু ছবি ও ছবি অংকনকারী পর্যায়ে বর্ণিত এসব হাদীস থেকে একটি সম্ভবতক এই প্রকাশ পায় যে, রাসূলে করীম (সা) প্রথমদিকে- যখন শির্‌ক, বুতপরস্তি ও ও ছবিকে পবিত্র মনে করার কাল অতীত হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি- ছবির ব্যাপারে খুব কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু উত্তরকালে তওহীদী আকীদা যখনে লোকদের মনে মগজে সুদৃঢ় হয়ে বসে গেছে, তখন বিদেহী ছবি রাখার অনুমতি দিয়েছেন- যা আসলে শুধু নকশা ও রেখামাত্র। তা-ই যদি না হবে, না হবে, তাহলে তাঁর নিজের ঘরে কোন ছবি সম্বলিত পর্দার অস্তিত্ত্বকেও তিনি আদৌ বরদাশ্‌ত করতেন না। আর কাপড়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি স্বরূপ অংকিত ছবিকে জায়েয বলতেন না। কাগজ ও প্রাচীরগাত্রে আঁকা ছবি সম্পর্কে এ থেকেই ধারণা করা যায়।

হানাফী মাযহাবের অন্যতম চিন্তাবিদ (ইমাম) তাহভী লিখেছেন: শরীয়তের বিধানদাতা শুরুতে সর্বপ্রকার ভচি-প্রকৃতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কাগজ বা কাপড়ে অংকিত চিত্র পর্যন্ত এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা মূর্তি-প্রতিকৃতি পূজার সময়কাল অতিবাহিত হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। তখনো। এ কারণে সর্বপ্রকারের ছবি-চিত্রই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ নিষেধ ঘোষণা কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর তিনি কাপড়ে অংডিকত নক্‌শা-চিত্র ও নিষেধের আওতার বাইরে ঘোষণা করেন সাধারণ প্রয়োজনের দৃষ্টেোত। সেসব ছবিও জায়েয করে দেয়া হয়, যার প্রতি তেমন কোন সম্মান বা মর্যাদা দেখানো হয় না। যেসব ছবির অসম্মান করা হয় সেগুলোর প্রতি সম্মান বা মর্যদা দেখানোর আশংকা থাকে না। তবে সেসব ছবির প্রতি সাধারণতঃ অমর্যাদা দেখান হয় না, যে সবের ওপর নিষিধ পূর্ববৎ বহাল থেকে যায়। (আল জাওয়াবে শাফী)

ছবির প্রতি অমর্যাদাই তাকে জায়েয  করে

কোন ছবিতে যদি এতটা পরিবর্তন সাধন করা হয়, যার দরযুন তা মর্যাদাযোগ্য থাকে না- অমর্যাদা সম্পন্ত হয়ে থাকে, তা বৈধতার আওতার মধ্যে এসে যায়। হাদীসে বলা হয়েছে, হযরত বিরাঈল (আ) ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলে নবী করীম (স) বললেন:

(আরবী***************)

আসুন, জিরাঈল বললেন: আমি কি করে ঘরে প্রবেশ করব, আপনার ঘরে ছবি সম্বলিত পর্দা ঝুলছে! ওটা যদি রাখতেই হয়, তাহলে ছবির মাথা কেটে দিন কিংবা পর্দার কাপড়টি ছিড়ে বালিশ বা বিছানা বানিয়ে নিন।

এ কারণেইা হযরত আয়েশা (রা) যখন হেলান দেয়ার বালিশটির কারণে নবী করীম (স)-এর চেহারায় অস্বস্তির লক্ষণ দেখলেন, তখন ছিড়ে দুটো ছোট ছোট বালিশ বানিয়ে নিয়েছিলেন। এতে করে ছবির প্রতি গুরুত্বহীনতা প্রদর্শন করা হলো এবং কোনোরূপ সম্মান দেখানর আশংকা থাকে না।

আগের কালের লোকদের সম্পর্কে উদ্ধৃত হয়েছে যে, মর্যাদাহীন ছবি ব্যবহার করাতে তাঁরা কোন দোষ মনে করতেন না। ওরওয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি পাখি ও মানুষের চিত্র সম্বলিত বালিশের ওপর হেলান দিতেন। ইকরামা বলেন, বলেন, ছবিকে প্রতিষ্ঠিত করা- উঁচু করে রাখাকে আলিমগণ পছন্দ করতেন না। আর যেসব ছবি সাধারণত পদদলিত হয়, তাতে তিনি দোষ মনে করতেন না। বালিশ-বিছানায় অংকিত ছবি তো পদদলিত হয়ই, এজন্যে তা জায়েয।

ফটোগ্রাফীর ছবি

এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রতিকৃতি নির্মাণ ও প্রতিকৃতি নির্মাতা পর্যায়ে যে সব হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, তা সবই প্রতিকৃতি সম্পর্কে, যা খোদাই করা হয় কিংবা যা হাতে আঁকা হয়। কিন্তু ক্যামেরার দ্বার প্রতিবিম্বের সাহায্যে গৃহীত আলোক চিত্রের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ নবোদ্ভাবিত। এ ফটোগ্রাফী রাসূলে করীমের যুগে ছিল না। এখানে প্রশ্ন ওঠে, প্রতিকৃতি ও প্রতিকৃতি নির্মাতা সম্পর্কে যেসব আইন-বিধান উদ্ধৃত হয়েছে, তা কি এই ফটোগ্রাফীর ওপর প্রযোজ্য?

সে সব আলিম মনে করেন, দেহ সম্পন্ন প্রতিকৃতি নির্মাণই হারাম, তাঁদের মতে ফটোগ্রাফীর ছবিতে কোন দোষ নেই, বিশেষ করে, যখন তা অসম্পূর্ণ অবস্থায় থাকে।

অপরাপর আলিমদের মত যা, সে পর্যায়ে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিবিম্ব সৃষ্ট ছবি কি সেই ছবির সমতুল্য, যা শিল্পী তার ব্রাশ দ্বারা নিজে আঁকে? কিংবা কোন কোন হাদীসে যেমন ‘ইল্লাত’ (Reason) হিসেবে বলা হয়েছে: প্রতিকৃতি নির্মাতা আল্লাহর সৃষ্টি কর্মের সাথে সাদৃশ্য করে, ফটোগ্রাফীতে কি তা উপস্থিত নেই? আর ফিকাহ্‌ দর্শনের দৃষ্টিতে ‘ইল্লাত’ (Reason)-ই যখন থাকে না, তখন তার ভিত্তিতে যে হুকুক-নির্তেষ করা হয়েছে তাও অবশিষ্ট থাকে না। (অর্থাৎ মূলত সাদৃশ্যই যখন নেই, তখন তা হারাম হতে পারে না।)

এ পর্যায়ে মিশরের মুফতি শায়খ মুহাম্মাদ বখীত মরহুম প্রদত্ত ফতোয়া অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তিনি লিখেছেন: ফটোগ্রাফীর সাহায্যে গৃহীত ছবি- যা আলোর প্রতিবিম্বকে বিশেষ উপায়ে আটকে নেয়ার দরুন সম্ভবপর হয়- সেই ছবি প্রতিকৃতির অন্তর্ভুক্ত নয়, যা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। কেননা যে ধরনের ছবি-প্রতিকৃতি নির্মাণ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা হচ্ছে ছবি-প্রতিকৃতি উদ্ভাবন ও নির্মাণ করা প্রসঙ্গে, যা পূর্বে বর্তমান বা নির্মিত ছিল না, যা বানানর ফলে আল্লাহর সৃষ্ট কোন জীবন্ত জিনিসের সাথে সাদৃশ্য করা হয়। কিন্তু ক্যামেরার সাহায্যে গৃহীত ফটো সেই পর্যায়ে পড়ে না।

(আরবীঁ*****************)

বস্তুত ফটোর মূলকথা এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে সে বিষয়ে হুকুম এই। তবে বহু আলিমই ছবি সম্পর্কে- তা যে ধরনেরই হোক না কেন- খুব কড়াকড়ি করে থাকেন এবং তা মাকরূহ (অনেকে স্পষ্ট হারাম) মনে করেন। ফটোগ্রাফীকে নাজায়েয মনে করেন। এতদসত্ত্বেও আলিমগণও প্রয়েঅজন ও জাতীয় বা তমদ্দুনিক কল্যাণে ছবি তোলা জায়েয বলেন, যেমন পরিচিত কার্ড বা পাসপোর্ট ইত্যাদির। বিশেষ করে সন্ধিগ্ন ব্যক্তিদের ছবি এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা তওজীহর জন্যে ব্যবহৃত  ছবি প্রভৃতি। এই ধরনের ছবি দ্বারা না কারো প্রতি কোনো শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শন লক্ষ্য হয়, না এতে আকীদা খারাপ হওয়ার কোন আশংকা থাকতে পারে। কাপড়ে অংকিত চিত্রকে রাসূলে করীম (সা) হারামের মধ্যে গণ্য করেন নি। তাই তার তুলনায় অধিক বেশি প্রয়োজনীয় এ ধরনের ছবি তো অবশ্যই হারামের আওতা বহির্ভূত হবে।

ছবির উদ্দেশ্য

ছবি কি উদ্দেশ্যে বানান হচ্ছে, ছবির হারাম হওয়া না হওয়া এ প্রশ্নের খুব বেশি গুরুত্ব রয়েছে এবং এরই ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা সম্ভব, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যেসব ছবির উদ্দেশ্য ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস, তার শরীয়ত এবং তার সংস্কৃতি ও রীতি-নীতির পরিপন্থী, তার হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন মুসলমানই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন না। অতএব নারীদেহের নগ্ন বা অর্ধ নগ্ন ছবি এবং নারী বিশেষত্ব সম্পন্ত ও যৌন-উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে যেসব অঙ্গ দর্শনে, সেসবের ছবি, সেসবের রেখাচিত্র বানাও সম্পূর্ণ হারাম। মানুষের মধ্যে যৌন-স্পৃহা ও তার উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং হীন মন-মানসিকতাকে দাউ দাউ করা আগুনের মতো উত্তপ্ত করে দেয়ার লক্ষ্যে পত্র-পত্রিকাদিতে যে ধরনের ছবি বা স্কেচ প্রকাশ করা হয়, তা যে হারাম এবং তা যে অত্যন্ত মারাত্মক তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না। এ ধরনের ছবি বা চিত্রের ব্যাপক প্রচার করা, ছাপানো ও সংরক্ষণ করা, ঘর অফিস ও প্রকাশ্য স্থানে ঝুলিয়ে রাখা, তার প্রদর্শনী করা, প্রাচীর গাত্রে তা লাগিয়ে রাখা- ইচ্ছা ও আগ্রহের বশবর্তী হয়ে তা দেখা ও পর্যবেক্ষণ করা সবই এ হারাম পর্যায়ের মধ্যে গণ্য।

কাফির-ফাসিক ও জালিম লোকদের ছবি সম্পর্কেও এ কথা। এ পর্যায়ের লোকদের ছবি প্রতিকৃতি রচনা বা সংরক্ষণ করা কোন মুসলমানের পক্ষেই শোভন নয়, উচিত নয়। যেসব নাস্তিক নেতা আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে, আল্লাহর শরীয়তকে অগ্রাহ্য করে কিংবা যেসব মূর্তিপূজারী আল্লাহর সাথে শিরক করার কাজে লিপ্ত, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টন- যারা হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর নবুয়্যাতকে অস্বীকার করে কিংবা যেসব লোক মুসলিম হওয়ার দাবি করা সত্ত্বেও আল্লাহর নাযিল করা বিধানকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র শাসন, নীতি নির্ধারণ ও বিচার ফয়সালার কাজ করছে-স যারা সমাজের নির্লজ্জতা ও বিপর্যয় ছড়াচ্ছে- যেমন অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা ও নর্তক-নর্তকী ইত্যাদিদের ছবিও সম্পূর্ণ হারাম।

যারা মূর্তিপূজার প্রসার ঘটায়, ইসলামের বিপরীত ধর্মের নিদর্শন- মূর্তি প্রতিকৃতি ও ক্রুশ ইত্যাদির ছবি কোনক্রমেই জায়েয নয়। রাসূলে করীম (স)-এর যুগে সম্ভবতঃ বেশির ভাগ বিছানার চাদর ও পর্দা-বালিশের কাপড়ে এ ধরনের ছবি চিত্রিত হতো। এ কারণে হাদীসে বলা হয়েছে:

(আরবী*************)

নবী করীম (সা) তাঁর ঘরে এমন কোন জিনিস রাখতেন না, যার ওপর ক্রুশ ইত্যাদির ছবি আছে। এরূপ জিনিস থাকলে তা ছিড়ে ছিন্নভিন্ন করে দিতেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

(আরবী***************)

মক্কা বিজয় বছরে যখন নবী করীম (সা) হারামের মধ্যে ছবি দেখতে পেলেন, তখন তিনি প্রবেশ করলেন না পরে তা মুছে ফেলা হয় এবং তার পরই তিনি তথায় প্রবেশ করেন।

সেখানে যেসব ছবি ছিলত তা থেকে মক্কার মুশরিকদের মূর্তিপূজা ও তাদের প্রাচীন গুমরাহীই প্রকট হয়ে উঠেছিল।

হযরত আলী (রা) বর্ণিত, নবী করীম (সা) একদা জানাযায় শরীক হয়েছিলেন। তখন বললেন:

(আরবী***********)

তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে মদীনায় গিয়ে প্রতিটি কবর সমতল করে দেবে এবং কোন একটি ছবিও রাখবে না, প্রত্যেকটিকেই বিকৃত করে দেবে?

এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসূল, আমি এ আঞ্জাম দেয়ার জন্যে প্রস্তুত। এ কথা শুনে মদীনাবাসীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো।…. পরে সেই লোকটি ফিরে এসে নিবেদন করলেন:

(আরবী****************)

হে রাসূল! আমি একটি মূর্তিও রাখি নি, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছি। কোন একটি কবরকেও বাদ দেই নি, সবগুলোকে সমতল করে দিয়েছি এবং প্রতিটি ছবিকে আমি বিকৃত করে দিয়েছি, কোনটিকেই রেহাই দেইনি।

এ কথা শুনে নবী করীম (সা) ঘোষণা করলেন:

(আরবী*********)

অতঃপর যে লোকই এ কাজগুলোর মধ্যে থেকে কোন একটি কাজও করবে সে সেই হেদায়েতের অমান্যকারী হবে, যা মুমাহম্মাদ (সা) এর প্রতি নাযিল হয়েছে। (মুসনাদে আহমদ)

এ হাদীসে নবী করীম (স) যেসব ছবি বিকৃত করতে ও নির্মূল করতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো জাহিলিয়াতের যুগের কুফরী ও শিরকের প্রতীক ও নিদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়। এ কারণেই নবী করীম (স) এসব থেকে মদীনাকে মুক্ত ও পবিত্র করতে চেয়েছিলেন। আর এজন্যেই এসব কাজের মধ্যে কোন একটিও পুনরায় করাকে আল্লাহর নাযিল করা বিধানের প্রতি কুফরী ও অমান্য করার শামিল বলে ঘোষণা করেছন।

ছবি-প্রতিকৃতি ও তার নির্মাতা সম্পর্কিত বিধানের সার-নির্যাস

ছবি-প্রতিকৃতি ও তার নির্মাতা সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের যে বিধান বিস্তারিতভাবে আলোচিত হলো, তার সার-নির্যাস এইঃ

ক. আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য উপাস্য দেবতারূপে গৃহীতদের ছবি-প্রতিকৃতি সর্বাধিক কঠিন হারাম এবং তার গুনাহর সব চাইতে বেশি। খ্রিস্টানদের মাবুদ হযরত মসীহর (তাঁর মা মেরির) ছবি তার বড়  দৃষ্টান্ত। এ ধরনের ছবি নির্মাণ সুস্পষ্ট কুফরী। কেউ যদি জেনে শুনে ইচ্ছা করে এ ধরনের ছবি নির্মান করে, তাহলে বুঝতে হবে, সে কাফির হয়ে গেছে। এ ধরনের ছবির প্রতিকৃতি নির্মান কঠিনতম গুনাহের কাজ ও অত্যন্ত জগণ্য ও ঘৃণ্য। আর যে ব্যক্তিই এ ধরনের ছবির প্রচলন করবে কিংবা কোন না কোনভাবে সে সবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, সে নিজের পরিমাণ অনুপাতে গুনাহে শরীক হলো।

খ. তার চাইতে কম গুনাহ হচ্ছে এমন সব ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি নির্মান, যার পুজা করা না হলেও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। যেমন কোন দেশের রাজা-বাদশা, সর্বোচ্চ নেতা, প্রশাসক, ডিকটেটর ইত্যাদি-এদের স্মৃতিস্তম্ভ স্বরূপ প্রতিকৃতি নির্মান করে উন্মুক্ত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। প্রতিকৃতি অসম্পূর্ণ বা সম্পুর্ণ হওয়ার দিক দিয়ে গুনাহে কোন তারতম্য হয় না।

ঘ. এর চেয়েও কম গুনাহ হচ্ছে এমন সব ব্যক্তির প্রতিকৃতি নির্মাণ, যাদের তাযীম ও পবিত্রতা প্রদর্শন করা হয় না। তবে তাও হারাম, এ সম্পর্কে কোন দ্বিমত নেই। তবে যাদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য জ্ঞাপন করা হয়, তা এ পর্যায়ে পড়ে না। যেমন বাচ্চাদের খেলনা ও মিঠাই মণ্ডা দিয়ে কোন প্রতিকৃতি বানান- যা খেয়ে ফেলা হয়।

ঙ. এর পরে আসে বিদেহী ছবিগুলোর প্রশ্ন। অর্থাৎ শৈল্পিক ছবি সেসব ব্যক্তিত্বের যাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়, যেমন প্রশাসক, জননেতা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতা প্রমুখের ছবি। বিশেষ করে যদি তা কোথাও স্থাপন করা বা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। হারামের মাত্রা আরও কঠিন ও তীব্র হয়ে ওঠে যদি জালিম, ফাসিক-ফাজির-নাস্তিক ইত্যাদি ধরনের লোকদের ছবি হয়। কেননা এসব লোকের প্রতি তাযীম-সম্মান-উক্তি দেখান ইসলামকে নির্মূল করার সমান অপরাধ।

চ. গুনাহর দৃষ্টিতে তার চেয়ে কম মাত্রার হচ্ছে সেসব ছবি তোলা, যা অঙ্গ-সৌষ্ঠব ও দেহসম্পন্ন হয়, সেসব প্রাণীর ছবিও যাদের প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন কর হয় না বটে। তবে তা বিলাসিতার প্রকাশক। এ ধরনের ছবি সম্বলিত কাপড় দ্বারা দরজা ও প্রাচীর আবৃত করা মাকরূহ ছাড়া আর কিছুই নয়।

ছ. অ-প্রাণীদের ছবি-যেমন খেজুর গাছ, নদী, জাহাজ, পাহাড়, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক দৃশ্যাবলীর ছবি বানান ও সংরক্ষণ কোনটাইতেই গুনাহ নেই যদি তা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী থেকে মানুষকে গাফিল করে না দেয় কিংবা নিছক বিলাসিতার প্রতীক না হয়। অন্যথায় এ ধরনের ছবি মাকরূহ।

জ. এর পরে আসে প্রতিবিম্ব রচিত ছবি-অর্থাৎ ফটোর কথা। তা মূলতঃ মুবাহ- যদি তার মূলে কোন হারাম কাজ লক্ষ্য হয়ে না থাকে যেমন যে ব্যক্তির ছবি তার ধর্মীয় পবিত্রতা বা বৈষয়িক সম্মান প্রদর্শনমূলক। বিশেষ করে সে ব্যক্তি যদি কাফির হয়- যদি সে মূর্তি পূজারী হয় বা কমিউনিস্ট কিংবা পথভ্রষ্ট কোন শিল্পী, তাহলে তা জায়েয নয়।

ঝ. আর সর্বশেষ কথা এই যে, হারাম প্রতিকৃতি ও ছবি বিকৃত করে দেয়া হলে কিংবা অসম্মানিত ও হীন বানিয়ে দেয়া হলে তা হারামের তালিকা থেকে খারিজ হয়ে হালাল পর্যায়ে গণ্য হয়ে যায়। যেমন বিছানার চাদরে বা মেঝেতে অংকিত চিত্র, যা পা জুতা দিয়ে দলিত করা হয় ইত্যাদি।

বিনা প্রয়োজনে কুকুর পালা

নবী করীম (সা) বিনা প্রয়োজনে ঘরে কুকুর পালতে নিষেধ করেছেন।

দুনিয়ার এমন কুরুচিসম্পন্ন লোকের অভাব নেই, যারা কুকুর লালন-পালনে দু’হাতে অর্থব্যয় করে; কিন্তু মানব সন্তানের জন্যে এক ক্রান্তি ব্যয় করতেও কার্পণ্য ও কুণ্ঠা দেখায়। অনেকে আবার কুকুরের মান-অভিমান রক্ষার জন্যে অর্থ ব্যয় করেই ক্ষেন্ত হয় না, তার সাথে হৃদয়াবেগকে জড়িত করে। আর তা হয় তখন, যখন নিজের আত্মীয় স্বজনের প্রতি মনের টান অনুভব করে না এবং নিজের প্রতিবেশী ও ভাইকে ভুলে যেতে বসে (অথচ কুকুরের প্রতি এক বিন্দু উপেক্ষা সহ্য হয় না)।

মুসলমানের ঘরে কুকুর স্থান পেলে আশংকা হয়, তা খাবার, পাত্র ইত্যাদি চেটে নাপাক করে দিতে পারে। নবী করীম (স) বলেছেনঃ (আরবী**********************)

কুকুর কারো পাত্রে মুখ দিলে সেটাতে সাতবার ধুতে হবে- একবার অবশ্যই মাটি দিয়ে মাজতে হবে।

কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ঘরে কুকুর পালা নিষেধ এজন্যে যে, তা অতিথি-আগন্তককে দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। ভিখারীকে ভয় পাইয়ে দেয় এবং পথিককে কামড়াতেও কসুর করে না।

নবী করীম (স) বলেছেনঃ (আরবী**********************)

আমার কাছে হযরত জিবরাঈল (আ) এসে বললেনঃ আমি গত রাতে আপনার কাছে এসেছিলাম; কিন্তু ধরে প্রবেশ করিনি এজন্যে যে, দরজায় একটা প্রতিকৃতি ছিল, ঘরে ছবি সম্বলিত পর্দা ছিল, এ ছাড়া ঘরে কুকুরও ছিল। এক্ষণে আপনি ঘরের প্রতিকৃতিটির মাথাটি কেটে ফেলার আদেশ করুন, তাহলে ওটা গাছের আকৃতি ধারণ করবে, আর পর্দার কাপড়টি কেটে দুটো বালিশ বানাবার হুকুম দিন, যা ‍দিনরাত দলিত হতে থাকবে এবং কুকুরটি বহিষ্কার করে দিন।

এখানে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা এই বিনা প্রয়োজনে রক্ষিত কুকুর সম্পর্কে।

শিকার ও পাহারাদারির জন্যে কুকুর রাখা

যে কুকুর কোন প্রয়োজনে পালা হবে- যেমন শিকারী কুকুর এবং ক্ষেত-খামার বা গৃহপালিত পশুর রক্ষণাবেক্ষণ ও পাহারাদারীর জন্যে পালিত কুকুর- তা এই নিষেধ-নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবরী***************)

 শিকার বা ক্ষেত-খামার, বাড়ি বা পশু পাহারাদারির ‍উদ্দেশ্য ছাড়া যে লোক কুকুর লালন করবে ও রাখবে, প্রতিদিন তার নেক আমল থেকে এক কীরাত পরিমাণ লাঘব হতে থাকবে।

কোন কোন ফিকাহবীদ এই হাদীস থেকে কুকুর রাখা নিষেধ বলে যে মত প্রকাশ করেছেন, তা মাকরূহ মাত্র, হারাম নয়। কেননা কুকুর পালা যদি হারাম হত তাহলে সর্বাবস্থায়ই তা হারাম হতো এবং সব সময়ই তা বর্জন করে চলতে হতো- আমল লাঘব হোক আর না হোক।

ঘর-বাড়িতে কুকুর পালতে যে নিষেধ করা হয়েছে, তার অর্থ এই নয় যে, তার প্রতি নির্মমতা অবলম্বিত হবে কিংবা তাদের নির্মূল করা বা নিধন করার জন্য এই আদেশ নয়। কেনান নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবী********************)

কুকুর যদি আল্লাহর সৃষ্ট একটি প্রজাতি না হতো যেমন আরও অনেক প্রজাতি রয়েছে, তাহলে আমি তা হত্যা করার নির্দেশ দিতাম।

রাসূলে করীম (সা) এ কথাটি দ্বারা উপরিউক্ত গুরুত্বপূর্ণ মতেরই সমর্থন দিয়েছেন। আর প্রকৃত ও বড় সত্য হল, খোদ কুরআন মজীদই এ দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেঃ (আরবী************************)

পৃথিবীতে বিচরণশীল যত জন্তু আছে এবং যত পাখি, তার দুই ডানায় ভর করে উড়ে বেড়ায়, ওরা সবাই তোমাদের মতো ভিন্ন ভিন্নভাবে সৃষ্ট এক-একটা প্রজাতি। (সুরা আন’আমঃ৩৮)

নবী করীম (সা) তাঁর সাহাবীদের সম্মুখে এক ব্যক্তির কাহিনী বর্ণনা করেছেন। লোকটি মরূভূমির মধ্যে একটি কুকুর দেখতে পেল। কুকুরটি হাপাচ্ছিল ও পিপাসার তাড়নায় মাটি চাটছিল। লোকটি তা দেখে কুপের নিকট গিয়ে বালতি ভরে পানি তুলল ও কুকুরটিকে পানি খাইয়ে পরিতৃপ্ত করে দিল। আল্লাহ তা’আলা তার এই কাজকে কবুল করলেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দিলেন।

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কুকুর পালন

আমরা এমন ধরনের লোক দেখতে পাই, যারা পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রেমে অন্ধ হয়ে নিজেদের দয়ার্দ্র হৃদয়, উচ্চ মানবতাবাদী ও সর্বজীবে দয়াশীল মনে করে। তারা ইসলামের দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করে এই বলে যে, তাতে এমন বুদ্ধিমান, বন্ধুসুলভ ও বিশ্বস্ত জন্তু থেকে বিরত থাকতে বলা হলো কি করে? এ ধরনের লোকদের গোচরে আমরা এ জার্মান মনীষীর লিখিত ও জার্মানীর এ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রচনা পেশ করতে চাই। এই রচনায় কুকুর পালা কুকুরের সংস্পর্শ গ্রহণের দরুন যে সব বিবাদ অবশ্যম্ভাবী, তা ব্যক্ত করা হয়েছে। রচনাটি এইঃ

বিগত কয়েক বছরে লোকদের কুকুর পালনের আগ্রহ খুব বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে এর পরিণামে কি বিপদ ঘটতে পারে সেদিকে লোকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা একান্ত ই জরুরী মনে হচ্ছে। বিশেষ করে যখন লোকেরা শুধু কুকুর পালন করেই ক্ষান্ত হয় না, তার সাথে খেলা করে, তাকে চুম্বন করে। উপরন্তু কুকুর এমনভাবে মুক্ত করে দেয়া হয় যে, ছোট বড় সকলেরই হাত চাটে। অনেক সময় উদ্বৃত্ত খাবার নিজেদের পাত্রে বা থালায় করেই কুকুরের সামনে ধরে দেয়া হয়। এছাড়া এ অভ্যাস এতই খারাপ যে, সুস্থ বিবেক ও সরুচি তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না। তা পরিচ্ছন্নতার নিয়ম-কানুনেরও পরিপন্থী।

স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিচার করলে কুকুর পালা ও তার সথে হাস্যরসকরণে যে বিপদ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর ঘনীভূত হয়ে আসতে পারে, তাকে সামান্য ও নগন্য মনে করা কিছুতেই উচিত হতে পারে না। অনেক লোক নিজের অজ্ঞতার খুব ভারী মাশুল দিতে বাধ্য হয়। তার কারণ এই যে, কুকুরের দেহে এমন এমন জীবানু রয়েছে যা এমন রোগ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্থায়ী এবং যা চিকিৎসা করে সারান যায় না। কত লোক যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন দিতে বাধ্য হয় তা গুণে শেষ করা যায় না।

এ জীবাণুর আকৃতি ফিতার ন্যায়। তা মানবদেহে ফোঁড়া-পাঁচড়ার ন্যায় রোগ সৃষ্টি করে। এ ধরনের জীবাণু গৃহপালিত পশু ও বিশেষ করে শূকরের দেহেও পাওযা যায়; কিন্তু লালিত-পালিত হয়ে বড় হওয়ার গুণ কেবল কুকুর দেহের জীবানূরই রয়েছে।

শকুন ও শৃগালের দেহেও জীবানু থাকে। তবে বিড়ালের দেহে বড় একটা দেখা যায় না। এই জীবাণু অন্যান্য ফিতা-আকৃতির জীবানু থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। তা এতই সূক্ষ্ম ও সরু হয় যে, দেখাই যায় না। এ সম্পর্কে বিগত কয়েক মাসের মধ্যে কিছু তথ্য জানা গেছে।

প্রবন্ধ রচয়িতা পরে লিখেছেনঃ

এসব জীবানূ মানুষের কলিজায় প্রবেশ করে। আর তথায় নানাভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তা অনেক সময় ফুসফুসে, ডিম্ব, তিল্লি, গুর্দা ও মস্তকের ভিতরে প্রবেশ করে। তখন এগুলোর আকৃতি অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এমন অবস্থা দেখা দেয় যে, বিশেষজ্ঞগণও তা ধরতে ও চিনতে অক্ষম হয়ে পড়েন।

সে যাই হোক, এ জীবানুর দরুন যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তা দেহের যে অংশেই হোক না কেন, স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর ও মারাত্মক। এসব জীবাণুর কোন চিকিৎসা আজ পর্যন্ত জানা যায় নি। এ করনে চিকিৎসা-অযোগ্য রোগের মুকাবিলা করার জন্যে আমাদের পূর্ণ শক্তিতে চেষ্টা করতে হবে। এ বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে।

জার্মান চিকিৎসাবিদ নুললর বলেছেন , কুকুরের জীবণুর দরুন মানব দেহে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তার সংখ্যা শতকরা এক-এর কম নয় কিছুতেই। আর কোন কোন দেশে শতকরা বারো পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ রোগের প্রতিরোধ করার সর্বোত্তম প্রন্থা হচ্ছে, এ জীবনুগুলোকে কুকুর দেহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ করে রাখা, তাকে ছড়িয়ে পড়তে না দেয়া।…..

মানুষ যদি নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে ও জীবন বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে কুকুরের সঙ্গে গলাগলি ও চুমাচুমি করা পরিহার করতে হবে। তাকে নিকটে ঘেষতে দেয়া যাবে না, বাচ্চাদের তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। কুকুরকে তখন নিজেদের হাত চাটতে দেয়া উচিত হবে না। বাচ্চাদের খেলা, বেড়ান ও আনন্দ স্ফূর্তি করার স্থানে কুকুরকে থাকতে দেয়া ও তথায় ময়লা ছড়াবার সুযোগ দেয়া চলবে না। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয়, ছেলে মেয়েদের খেলার জায়গাতেই খুব বেশি সংখ্যক কুকুর থাকতে দেখা যায়।

কুকুরের খাবার পাত্র সম্পর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র হওয়া আবশ্যক। মানুষ নিজেদের খাবারের জন্যে যেসব পাত্র ব্যবহার করে, সেসব কুকুরকে চাটবার জন্যে দেয়া খুবই অনুচিত। সেগুলোকে হাটে-বাজারে ও হোটেলে-রান্নাঘরে প্রবেশ করতে দেয়া উচিত নয়। মোটকথা, কুকুরের ব্যাপারে সতর্কতাবলম্বন করে পানাহারের সব কিছু থেকে ওদের সরিয়ে রাখতে হবে।

একজন বিধর্মী চিন্তাবিদের এ চিন্তামূলক বর্ণনা সম্মুখে রেখে বিবেচনা করে দেখা আবশ্যক যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা) যে কুকুরের সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা করতে নিষেধ করেছেন, তা কতখানি বাস্তব ভিত্তিক এবং একান্তই বিজ্ঞানসম্মত। পানাহার সংক্রন্ত পাত্রগুলোতে কুকুর যাতে মুখ লাগাতে না পারে, সেজন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। উপরন্তু বিনা প্রয়োজনে কুকুর পালতেও নিষেধ করেছেন। উপরিউক্ত বিবরণের আলোকে চিন্তা করলে রাসূলে করীম (সা) এর দেয়া বিধানে বিশ্বমানবতার জন্যে যে কি বিরাট কল্যাণ নিহিত রয়েছে তা সুস্পষ্ট অনুধাবন করা যায়।

বস্তুত নবী করীম (সা) ছিলেন একজন উম্মী। কিন্তু তা সত্ত্বে তাঁর উপস্থাপিত শিক্ষা এ কালের- এ চৌদ্দশত বছর পরে অতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের সাথে যে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ তা দেখলেই বিস্ময়াভিভূত হতে হয়। এ সত্য দেখার সাথে সাথে আমাদের কণ্ঠে স্বতঃ স্ফূর্তভাবে কুরআন মজীদের এ ঘোষণা ধ্বনিত হয়ে উঠেঃ (আরবী***************)

নবী নিজের ইচ্ছামত কিছুই বলেন না, যা বলেন তা ওহী ভিন্ন আর কিছু নয়।

উপার্জন ও পেশা

(আরবী****************)

সেই আল্লাহই তোমাদের জন্যে জমিনকে নম্র-মসৃন বিনীত বানিয়েছেন। অতএব তোমরা তা স্কন্ধসমূহে চল এবং আল্লাহর রিযিক আহার কর।

উপার্জন পর্যায়ে এ হচ্ছে আল্লাহর মৌলিক হেদায়েত। আর তার জন্যে জমিনকে আল্লাহ তা’আলা মানুষের খেদমতের জন্যে নিয়োজিত করেছেন। কাজেই এ নিয়ামত পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে এবং তার পরতে পরতে চেষ্টা ও সাধনা নিয়োজিত করতে হবে। আল্লাহর অনুগ্রহের দান পাওয়ার সন্ধানে।

কর্মক্ষম ব্যক্তির নিষ্কর্মা বসে থাকা হারাম

কোন মুসলমান ইবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হওয়ার বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতার নাম করে রিযক উপার্জন থেকে বিরত বা বেপরোয়া হয়ে থাকবে তা কিছুতেই হতে পারে না। কেননা আকাশ থেকে স্বর্ণ রৌপ্যের বর্ষণ হবার নয়।

অনুরূপ ভাবে লোকদের দান-সাদকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকা এবং জীবিকা উপার্জনের উপায়-উপকরণ হস্তগত হওয়া সত্ত্বেও তা ব্যবহার করে উপার্জনে আত্মনিয়োগ না করা এ পন্থায় নিজের ও নিজ আত্মীয়-স্বজনের প্রয়োজনাবলী পূরণ করতে চেষ্টা না করা কোনক্রমেই জায়েয হতে পারে না। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ

(আরবী*********************)

দান-খয়রাত গ্রহণ করা কোন ধনী লোকদের জন্যে জায়েয নয়, শক্তিমান ও সুস্থ্য ব্যক্তির জন্যেও নয়।

কোন মুসলিম অপর কারো সম্মুখে ভিক্ষার হাত প্রসারিত করবে যার ফলে তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য বিলীন হয়ে যাবে এবং স্বীয় মনুষ্যত্বের মান-মর্যাদা অকারণ ক্ষতিগ্রস্ত করবে, নবী করীম (সা) এ ব্যাপারে কঠিন ও কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী*****************)

যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে ভিক্ষা চায়, সে নিজ হস্তে অঙ্গার অকত্রিত করার মতো ভয়াবহ কাজ করে। (বায়হাকী, ইবনে খাযিমাহ)

তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবী***************************)

যে লোক ধনী হওয়ার উদ্দেশ্যে লোকদের কাছে ভিক্ষা চাইবে, সে নিজের চেহারাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্যে ক্ষতযুক্ত করে দিল, সে জাহান্নামের গরম পাথর ভক্ষণ করতে বাধ্য হবে। এখানে যার ইচ্ছা নিজের জন্যে এসব জিনিস বেশি পরিমাণে সংগ্রহ করুক, আর যার ইচ্ছা কম করুক। (তিরমীযী)

তাঁর আরও একটি কথাঃ (আরবী******************)

যে ব্যক্তি নিজেকে ভিক্ষা করার কাজে অভ্যস্ত বানায়, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে এমন অবস্থায় যে, তার মুখমণ্ডলে এক টুকরা গোশতও থাকবে না। (বুখারী, মুসলিম)

এ ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করার জন্যে নবী করীম (সা) মুসলমানদের ইজ্জতের হেফাযত করেছেন এবং তাদের মধ্যে আত্মসম্মান বোধ, অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা ও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত থাকর গুনাবলী লালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

ভিক্ষাবৃত্তি জায়েয হয় কখন

কিন্তু তা সত্ত্বের নবী করীম (সা) লোকদের ঠেকা বাধার প্রতি পুরোপুরি লক্ষ্য রেখেছেন। কোন লোক যদি ভিক্ষা চাইতে ও সরকার বা ব্যক্তিদের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্যই হয়, তাহলে অবশ্য গুনাহ হবে না। নবী করীম (সা) ইরশাদ

(আরবী********************)

ভিক্ষা চাওয়া যখম করার সমার্থক। যে ব্যক্তি ভিক্ষা করে সে স্বীয় মুখমণ্ডলকে ক্ষতবিক্ষত করে। কাজেই যার ইচ্ছা নিজের মুখমণ্ডলকে সে অবস্থায় রেখে দিক, আর যার ইচ্ছা সে তা ত্যাগ করুক। তবে কেউ যদি কোন বর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ভিক্ষা চায় কিংবা এমন কোন ব্যাপারে চাইতে হয় যা একান্তই অপরিহার্য, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। (আবূদাউদ, নিসায়ী)

আবু বাশার কুবাইসা ইবনুল মাখারিক (রা) বলেনঃ

(আরবী*************************)

আমি এক ব্যাপারে জামানতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। এ কারণে আমি রাসূলে করীম (সা) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে ভিক্ষা চাইলাম। তিনি বললেনঃ অপেক্ষা কর, সাদকার মাল এসে যাবে, তা থেকে তোমাকে দিইয়ে দেব। পরে বললেন, হে কাবাইসা, ভিক্ষা চাওয়া জায়েয নয় তিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে। একজন, যে কারো জন্যে জামানতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তার জন্যে ভিক্ষা চাওয়া জায়েয যতক্ষণ না প্রার্থিত পরিমাণ মাল সে পাবে। তারপর তার বিরত হয়ে যাওয়া উচিত। দ্বিতীয় ব্যক্তি যার ধন-মাল কোন বিপদে পড়ার কারনে ধ্বংস হয়ে গেছে। সে ব্যক্তি ভিক্ষা করতে পারে, যতদিনে তার জীবনযাত্রা চালানর ব্যবস্থা না হয়। আর তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছে সে অনশনের সম্মখীন হয়ে যায়, যতক্ষণ তার পাড়ার তিনজন সমঝদার লোক বলে দেবে যে, লোকটি অনশনগ্রস্ত। এরূপ অবস্থায় তার পক্ষে ভিক্ষা চাওয়া জায়েয, যতক্ষণ না জীবনযাত্রা চালানর ব্যবস্থা হয়ে যায়।

এতদ্ব্যতীত যে ব্যক্তিই ভিক্ষা করে, তার জন্যে এ মাল হারামের, যা সে ভক্ষণ করে।

শ্রম সম্মানজনক

লোকেরা কোন কাজকে হীন জ্ঞান করে। কিন্তু নবী করীম (সা) তা সমর্থন করে নি। তিনি তাঁর সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, যে কোন কাজই হোক-না-কেন, তাতেই সম্মান ও পরিপূর্ণ ইযযত নিহিত রয়েছে এবং লোকদের সাহায্য গ্রহণে ও তাঁর ওপর নির্ভরতায়ই রয়েছে সর্বপ্রকারের যিল্লাতি ও অপমান। তিনি বলেছেনঃ (আরবী*********************)

কোন ব্যক্তির রশি নিয়ে জঙ্গলে যাওয়া ও নিজের মাথায় কাষ্ঠের বোঝা বহন করে নিয়ে আসা ও তার বিক্রয় করে উপার্জন করা- যার ফলে আল্লাহ তাঁর ইযযতের সংরক্ষন করে দেবেন- লোকদের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার তুলনায় অনেক ভাল ও কল্যাণময়- লোকেরা তাকে দেবে কিনা দেবে তারও কোন নিশ্চয়তা যখন নেই।

অতএব মুসলমান ব্যক্তির উচিত কৃষি, ব্যবসা, শিল্প ও এ ধরনের যে কোন কাজ বা চাকরি করে উপার্জন করা- যতক্ষণ না তা হারাম কাজে জড়িত হয়ে পড়ার মতো কোন কাজ হবে।

কৃষিকার্য দ্বারা উপার্জন

কুরআন মাজীদ আল্লাহ তা‘আলা মানুষের প্রতি স্বীয় ও অনুগ্রহের উল্লেখ প্রসঙ্গে কৃষিকার্য সংক্রান্ত বহু নীতিগতভাবে জরুরী হেদায়েত দিয়েচছন।

পৃথিবীর মাটি ও জমিকে আল্লাহ তা‘আলা উৎপাদন ও ফসল ফলানর কাজ করার যোগ্য বানিয়ে দিয়েছেন। তাকে বানিয়েছেন শয্যা, মেঝে, তা সৃষ্টির জন্যে আল্লাহর বড় একটা নিয়ামত।  এনিয়ামতের কথা স্বরণ রাখা ও তার মূল্য বোঝা একান্তই কর্তব্য।

ইরশদ হয়েছেঃ (আরবী***********)

আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্যে জমিকে শয্যা ও মেঝে বানিয়েছেন,  যেন তোমারা তার ওপর অবস্থিত উন্মুক্ত পথঘাটে চলাচল করতে পার।   (সূরা নূহঃ১৯-২০

জমিকে তিনি সৃষ্টিকুলের জন্যে বানিয়েছেন। তাতে ফল, খেজুর গাছ, আবরণধারী, শস্য-ভূষিসহ ও ফুল রয়েছে সুগন্ধিযুক্ত। তাহলে তোমারা তোমাদের আল্লহর কুদরতের কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?

বৃষ্টিরূপে তিনি পানি বষণ করেছেন এবং দা খাল-ঝর্ণয় প্রবাহিত করেছেন আর তার সাহায্যে তিনি মৃত জমিকে জীবিত করেন।

 (আরবী************)

তিনি ঊর্ধ্ধলোক থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। পরে তার সাহায্যে সর্বপ্রকারের উদ্ভিদ,  গাছপালা ইত্যাদি উৎপাদন করেছি,  পরে তাতে সবুজ-শ্যামল-তাজা শাখা-প্রশাখা বের করেছি- তা থেকেই আমারা স্তরসম্পন্ন দানা বের করি।

 (আরবী **************

মানুষের কর্তব্য তার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি দেয়া- চিন্তা করা। আমারাই প্রয়োজনমত পানি বর্ষণ করেছি। পরে জমি বিস্ময়করভাবে দীর্ণ করেছি আর তাতে শস্য, আঙ্গুর ও তরিতরকারী উৎপাদন করেছি।

বাতাসকে আল্লাহ্ সুসংবাদদাতা করে পাঠিয়ে থাকেন। তার সাহায্যে মেঘমালঅ চলাচল করে এবং উুদ্ভিদসমূহ ফলাধারী হয়।

 (আরবী***************)

আর জমিকে বিস্তীর্ণ বানিয়েছি,  তাতে সংস্থাপিত করেছি উচু শক্ত পর্বতমালা এবং তাতে প্রতিটি জিনিস সুপরিকল্পিত ও পরিমিতভাবে উৎপাদিত করেছি। আর আমারা তোমাদের জীবিকা তাতেই বানিয়েছি তাদের জন্যেও, যাদের তোমারা রিয্কদাতা নও। আর প্রতিটি জিনিসেরই সম্ভার-স্তপ আমাদের কাছে সংরক্ষিত, একটা জ্ঞাত পরিমাণেই আমারা তা থেকে প্রদান করে থাকি। বাতাসকে আমারা ফল ভারাক্রান্ত করেই পাঠিয়ে থাকি। পরে ঊর্ধ্ধলোক থেকে পানি বর্ষণ করি আর তোমাদেরে সিক্ত করি তা দিয়ে। নতুন তোমারা তো আর সমাহার সঞ্চয় করে রাখতে পারতে না।  (সুরা হিজরঃ১৯-২২)

এ সব কটি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কৃষিকাজে নিয়ামত ও তার সহজ সাধ্যতার উপয়-উপকরণের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।  রাসূলে কারীম (স)  বলেছেনঃ  (আরবী**********)

যে মুসলমানই কোন গাছ লাগায় বা ক্ষেত করে আর তা থেকে পাখি বা মানুষ যা খায়, তা তার জন্যে দান হয়ে যায়।  (বুখার, মুসলিম)

অর্থাৎ তার এই কাজের সওয়াব অব্যাহতভাবে হতে তাকে,  যতদিন সেই গাছ বা ক্ষেত থেকে খাওয়ার কাজ চলতে থাকে। যদিও জমির মালিক বা বৃক্ষ রোপনকারী মরেই গিয়ে থাক না কেন কিংবা তার মালিকানা হস্তান্তরিতই হোক না কেন

বিশেষজ্ঞগণের মতে আল্লাহর দয়া ও দানশীলতার পক্ষে এটা অসম্ভব নয় যে, তিনি এরূপ ব্যাক্তিকে তার মৃত্যুর পরও সওয়াব দান করতে থাকবেন যেমন করে তার জীবদ্দশায় তাকে দিচ্ছিলেন। সাদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম, যার দ্বারা লোকেরা উপকৃত হয় ‍কিংবা নেক-বখ্ত সন্তান, যে তার জন্যে দো‘আ করতে থাকে অথবা কোন রোপিত বৃক্ষ, কৃষি এবং সীমান্ত প্রহরা –এই ছয়টি কাজ সম্পর্কেই উপরিউক্ত াথা প্রযোজ্য।

হাদীমে উদ্ধৃত হয়েছে, েএক ব্যক্তি হযরত আবুদ্দারদা  (রাঃ)  এর কাছে উপস্থিত হলো। তখন তিনি আখরোটের চারা রোপন করছেন, ওটাতে ফল ধরতে তো অনেক বছর লেগে যাবে?….জাবাবে আবুদ্দারদা (রাঃ) বললেনঃতাতে ক্ষতি কি?অন্যরা খাবে আর আমি তার সওয়াব কামাই করব?

নবী করীম (স) -এর অপর এক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃআমি আমার কান দিয়ে রাসূলে কারীম (স) কে বলতে শুনেছিঃ (আরবী ***************)

যে ব্যাক্তি কোন গাছ লাগায়, তার পরে তার হেফাযত ও দেখাশোনা করতে থাকে, যতদিন না সে গাছে ফল ধরে, এই সময়ে সে ফলের যা কিছু ক্ষুতি সাধিত হবে, তার সওয়াব সে আল্লাহর কাছ থেকে পাবে।

এ সমস্ত এবং এ ধরনের আরও বহু হাদীসকে ভিক্তি করে বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন যে, কৃষিকাজ উপার্জনের অপরাপর উপায়ের তুলনায় অনেক উত্তম। কিন্তু অপর কিছু বিশেষজ্ঞের মতে শিল্প ও হতের কাজ অনেক ভাল। আবার কাহারও কাহারও মতে ব্যবসাই উওম উপায়।

অপর কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন কাজ উত্তম বিবেচিত হতে পারে, যেমন খাদ্যের তীব্র অভাব হলে কৃষিকার্য উত্তম । কেননা তার কল্যাণ সাধরণভাবে সকলেরই প্রাপ্য।  আর যখন ডাকাত পড়ার কারণে হাটে-বাজারে কম মালের আমদানী হয়, তখন ব্যবসা ভাল কাজ আর শিল্পজাত দ্রব্যদির প্রয়োজন পূরণে শিল্পকর্ম উত্তম বিবেচিত হবে।  (আরবী******************)

এই শেষে উল্লিথিদ বিবরণ আধুনিক অর্থনৈতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরিভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

হারাম কৃষিকার্য

ইসলাম যে সব উদ্ভিদ খাওয়া  হারাম হারাম ঘোষণা করেছে কিংবা যার ব্যবহার ক্ষতিকর, তার চাষাবাদও হারাম। যেমন গাজাঁ, আফিম ইত্যাদি।

তামাক সম্পর্কেও এ কথা। তবে তা হারাম যাঁরা মনে করেন, তামাক খাওয়া হারাম তাদের মতে। অনেকে এ মতটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর যাদের মতে তামাক খাওয়া মাকরূহ, তাদের মতে তার চাষাবাদও মাকরূহ।

অমুসলিমদের কাছে বিক্রয় করে অর্থ পাওয়া যাবে- এ উদ্দেশ্যে কোন হারাম জিনিসেন চাষাবাদ করা মুসলমানের পক্ষে জায়েয নয়। মুসলমান হারাম জিনিসেন প্রচলন করার কাজ কখনই করতে পারে না।  তাই শূকর লালন-পালন করা ওঅমুসলমান খৃস্টান প্রভৃতির নিকট বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে- মুসলমানদের জন্যে জায়েয নয়। আমরা পূর্বেই বলেছি ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল আঙুর এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করা জায়েয নয়, যে  তা দিয়ে সুরা (মদ)  বানাবে বলে জানা যাবে।

শিল্প ইত্যাদি

ইসলম কৃষিকর্মের উৎসাহ দিয়েছে। তার সৌর্ন্দর বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে। এ কাজে বিপুল সওয়াব হওয়ার কথাও কলে দিয়েছে। কিন্তু মুসলিম মিল্লাতের লোকেরা কেবল কৃষিকর্মে মগ্ন হয়ে থাকবে- যেমন ঝিনুকের পোকা  (sea sell) ঝিনুকের মধ্যেই বন্দী থাকে- তা আদৌ পছন্দনীয় নয়। শুধু কৃষিকার্যকে যথেষ্ট মনে করা ও চাষের গরুর পিছনে পিছনে চলতে থাকাকে ইসলাম মুসলমানদের জন্যে পছন্দ করে না। কেননা তাই যদি হয় তাহলে সম্ভাব্য জাতীয় বিপদ-আপদের মুকাবিলা করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হবে না। এ কারণে নবী করীম  (স) যদি কৃষিকাজরক লাঞ্ছনার কাজ বলে থাকেন,  তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কেননা কালের কাস্তবতা সেই কথার সত্যতা প্রকট করে তুলেছে। তিনি বলেনঃ (আরবী***********************)

তোমরা যদি সুদভিত্তিক বেচা-কেনার কাজ কর ও গরু-মহিষের লেজুর ধরেই পড়ে থাক, জিহাদে মনোযোগ না দিয়ে কৃষিকার্য়য মগ্ন হয়ে থাক,  তাহলে আল্লাহ তোমাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন। পরে তা দূর করা যাবে না  যতক্ষণ না তোমারা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে ।  (আবূ দাউদ) এ কারণে কৃষি কার্য়ের সঙ্গে শিল্প-পেশার কাজ করাও জরুরী । এসবের  সাহায্যেই সচ্ছল-স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রয়োজন এবং একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী উম্মত-ৈএকটি সুদৃঢ় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার দাবিসমূহ পূরণ হতে পারে। শিল্প পেশা ইসলারে দৃষ্টিতে একটা বৈধ কাজ-ই নয়-যেমন কোন কোন আলিম ও ই, া,  কলেছেন- তা ফরযে কিফায়াও অর্থাৎ মুসলিম সমাজে সর্ব প্রকারের শিল্প ব্যবসায়ে পারদর্শী এত বেশি লোকের বর্তমান থাকা আবশ্যক যেন জাতীয় প্রয়োজন পূণে হতে কোন অসুবিধাই না হয় ও তার নিজের যাবতীয় কাজ সুসম্পন্ন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়। শিল্প পেশার কোন দিক যদি এমন অনটন দেখা দেয় যে, সে কাজ করার লোকই পাওয়া যায় না,  তাহলে গোটা সমাজ ও জাতীই সেজন্যে দোষী ও গুনাহগার হবে-বিশেষ করে নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্র পরিচালকবৃন্দ সেজন্যে দায়ী হবে।

ইমাম গাজালী (র)  বলেছেনঃ

সেসব জ্ঞান অর্জনই ফরযে  কিফায়া,  যা ছাড়া মানুষের বৈষয়িক জীবন চলতে পারে না।  যেমন চিকিৎসা বিদ্যা, দেহের সুস্থতা রক্ষা জন্যে তা একান্তই জরুরী। অংক বা হিসাববিদ্যা, পারস্পরিক লেন-দেন,  অসীয়ত ও মীরাস বন্টনসহ যাবতীয় কাজে তা অপরিহার্য। সে সব বিদ্যা-এমন যে, তা জারা-লোক বর্তমান না থাকলে জনগণক কঠিন অসুবিধার সন্মুখীন হতে হয়।  আর কেউ যখন এ ধরনের কাজে লেগে যায়, তখন অন্যরা এ কাজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে।  এ কারণে আমাদের মতে চিকিৎসা ও হিসাববিদ্যা ফরযে কিফায়া। বনেদী ধরনের কাজ ও শিল্পও ফরযে কিফায়া ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন জমি চাষাবাদ, হালচষ, কাপড় বুনন, পশু পালন ইত্যাদি। ক্ষের কার্য ও দর্জীকর্ম করাও এ ফরয়ে কিফায়াই।  কোন দেশে এসবের ব্যবস্থা না থাকলে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। আরবী****************)

কুরআন মজীদে বহু প্রকারের শিল্পকর্মের প্রুত ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে এবং সেগুলো যে দুনিয়ার মানুষের প্রতি আল্লহর বড় নিয়ামত, তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছেঃযেমন হযরত দাঊদ  (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ইসলামে হালাল-হারামের বিধান (আরবী*******************)

আমার তার জন্যে লোহাকে নরম করে দিয়েছি, নির্দেশ দিয়েছি, বর্ম  তৈয়ার করা এবং তার কড়াগুলো ঠিক পরিমাণ মতো বানাও।  (সূরা সবাঃ১০-১১)

আর আমারা তাকে বর্ম য়ৈার করার শিল্পবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিলাম, যেন তা যুদ্ধে তোমাদের প্রতিরক্ষা করতে পারে। তাহলে তোমারা কি শোকর আদয় করবে? (সূরা আম্বিয়াঃ৮০)

হযরত সুলায়মান  (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে।

আর আমরা তার জন্যে তামার ঘর্ণা প্রবাহিত করেছি এবং এমন জ্বিন তার অধীন করে দিয়েছি যারা তাদের আল্লাহর নির্দেশে তার সন্মুখে কাজ করত।

আর আমরা তার জন্যে তামার ঘর্ণা প্রবাহিত করেছি এবং এমন জ্বিন তার অধীনে করে দিয়েছি যারা তাদের আল্লাহর নির্দেশে তার সন্মুখে কাজ করত। তাদের মধ্যে যে যে আমার নির্দেশ অমান্য করত, তাকে আমারা জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডুলির আযাবের স্বাদ আস্বাদ করাতাম!তারা তার  (সুলায়মানের ) জন্য যা সে চাইত, নির্মাণ করত, উঁচু উঁচু প্রাসাদ ইমারত, প্রতিষ্ঠিত ডেগসমূহ। হে দাউদ বংশধরেরা!শোরক আদায়কারী হিসেবে কাজ কর।

কুরআনের যুল-কারনাইনের সুউচ্চ সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণেরও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ (আরবী *********************)

আমার রব্ব আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা অনেক। তোমারা শুধু শ্রম-মেহনত করেই আমরা সাহায্য করা।  আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে বাঁধ বেঁধে দেব। আমাকে লোহার চাদর এনে দাওে।  শেষে দুটো পর্বতের মধ্যকার শূণ্যতাকে সে যখন ভরাট করে দিল, তখন লোকদের বলল, এখন আগুন জ্বালাও। যখন এই অগ্নি-প্রাচীর আগুনের মতো সম্পূর্ণ লাল বর্ণ ধারণ করল, তখন সে বলল, আনো এখানে  আমি তার ওপর গলিত তামা ঢেলে দেব। এ বাঁধটি এতই দৃঢ় বানান হয়েছিল যে, ইয়াজুজ-মাজুজ তার ওপর চড়েও আমতে পারত না, আর তার মধ্যে সুরঙ্গ রচনাও তাদের জন্যে আরো কঠিন ছিল।  (সূরা কাহাফঃ৯৫-৯৭)

হযরত নূহের নৌকা নির্মাণের কাহিনীও কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে এক সুদৃঢ় জাহাজ নির্মাণের ইশারা বিধৃত, যা নদী সমুদ্রে পাহড়ের মতো উন্নত হয়ে জলতে সমক্ষম।  বলা হয়েছেঃ  (আরবী*************)

নদী-সমূদ্রের বুকে পর্বতের ন্যায় মাথা উঁচু করে চলমান জাহাজগুলো আল্লাহরই নিদর্শন বিশেষ।  (সূরা শূরাঃ৩২)

কুরআনের বহু সংখ্যক সূরায় সর্বপ্রকারের শিকার-বিদ্যা ও কার্য়ের**** উল্লেখ হয়েছে। যেমন মৎস্য শিকার, সামুদ্রিক জন্ত শিকার,  স্থলভাগের জন্ত শিকার এবং মণি-মুক্তা আহরণের উদ্দেশ্যে ডুবুরি দ্যিা ইত্যাদি।

সর্বোপরি কুরআন মাজীদ লোহার সঠিক মূল্য ও কর্যাকারিতার উল্লেখ হয়েছে।

তার পূর্বের কোন ধর্মগ্রন্থ বা মানবরচিত গ্রন্থেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়না। কুনআনে রাসূল প্রেরণ ও কিতাব নাযিল করণের উল্লেখ করার পর বলা হয়েছেঃ  (আরবী************************)

এবং আমরা লোহা সৃষ্টি করেছি। তাতে কঠিন শক্তি নিহিত রয়েছে এবং আছে জনগণের অশেষ অসীম কল্যাণ।

এ আয়াতটি যে সূরা‘লৌহ’। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, লৌহ শিল্পের ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

বস্তত ইসলামের দৃষ্টিতে মানব সমাজের প্রয়োজন পূরণ ও প্রকৃত কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে যে শিল্পকর্মই করা হবে , তা-ই‘আমলে সালেহ’-নেক আমল বিবেচিত হবে। যদি সে কাজে সত্যিই আন্তরিকতা রক্ষা করা হয় এবং যেরূপ নৈপূণ্য ও দক্ষতা অবলম্বন করতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে, তা পুরোমাত্রায় অবলম্বিত হয়।

মানব সমাজে অত্যন্ত হীন ও নগণ্য বিবেচিত কত শিল্প-পোশাকে ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদাবান বানিয়েছে। যেমন ছাগল চরানর রাখালকে লোকেরা সন্মানের চোখে দেখত না। কিন্ত নবী করীস (স)  বলেছেনঃ (আরবী**************)

আল্লাগর প্রেরিদ প্রত্যেক নবীই ছাগল চরিয়েছেন।  সাহাবিগণ জিজ্ঞেসা করলেনঃ (আরবী***********)

হে রাসুল! আপনিও কি ছাগল চরিয়েছেন?

সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ (আরবী**************)

হে রাসূল!আপনিও কি ছাগল চরিয়েছেন?

জবাবে তিনি বললেনঃ (আরবী***************)

হ্যা,  আমি মজুরীর বিনিময়ে মক্কার লোকদের ছাগল চরিয়েছ।  (বুখারী)

খতামুন্নবীয়ীন হযরত মুহাম্মাদ  (স)  ছাগল চরিয়েছেন।  বড় কথা,  সে ছাগল তাঁর নিজের ছিলনা।  বরং তা ছিল মক্কার লোকদের এবং তিনি তা নির্দিষ্ট  পরিমাণ মজুরীর ‍বিনিময়ে চরিয়েছিলেন। এ কথার উল্লেখ করে নবী করীম  (স) তাঁর সাহাবীদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন যে,  যারা কাজ করে –কাজ করে উপার্জন করে,  তাদেরই গৌরব । যারা নিষ্কর্ম বসে থাকে ও উপার্জনহীন থেকে লোকদের ওপর দিয়ে খায়, তাদের কোন গৌরব বা মর্যাদা নেই।

কুরআন মজীদে হযরত ঈসা  (আ) -এর কিসসা উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে,  তিনি একজন বৃদ্ধ শায়খের কাছে শ্রমিক হিসেবে ক্রমাগত আটটি বছর পর্যন্ত কাজ করেছেন। তার এ শ্রমের মজুরী ছিল, বৃদ্ধের কন্যাদের একজনকে তাঁর কাছে বিয়ে দেয়া। হযরত ঈসা (আ)  তার কছে খুবই ভাল শ্রমিক বলে গণ্য হচ্ছিলেন, খুবই বিশ্বস্ত কর্মী ছিলেন তিনি। বৃদ্ধের এক কন্যা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা সহকারে বলেছিলঃআরবী (******************)

হে পিতা,  তুমি ওকে শ্রমিক হিসেবে মজুীরীর বিনিময়ে ঠিক করে রাখ। নিজের রাখা কর্মচারী উত্তম তো সে-ই হতে পারে, যে শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত।

হযরত ইবনে আবাস  (রা)  বর্ণনা করেছেন, হযরত দাউদ বর্ম ও তৈজসপত্র নির্মাতা ছিলেন। হযরত আদম ছিলেন জমি চাষকারী। হযরত নূহ  (আ)  ছিলেন মিস্ত্রী, হযরত ইদরীস  (আ)  ছিলেন দর্জী এবং হযরত মূসা  (আ)  ছিলেন ছাগলের রাখাল।

অতএব মুসলমান  যে কোন হালাল পেশা গ্রহণ করে সন্তষ্ট থাকতে পারে। প্রত্যেক নবীই কোন-না কোন পেশা অবশ্যই অবলম্বন করতেন। সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে।  (আরবী*****************)

নিজের শ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত খাদ্যের তুলনায় উওম খাবার কেউ খেতে পারে না । আর আল্লাহর নবী দাউদ  (আ)  শ্রম করেই উপার্জন করতেন ও খাবার জোটাতেন।  (বুখারী)

নিষিদ্ধ কজ ও পেশা

তবে কিছু কিছু কাজ ও পেশা ইসলাম মুসলমানদের জন্যে হারাম ঘোষণা করেছে। কেননা এসব কাজ ও পেশা লোকদের আকীদা, বিশ্বাস , চরিত্র, মান-সন্মন ও সাংস্কৃতিক মূল্যমানকে বয়ানকভাব ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বেশ্যাবৃত্তি

বেশ্যাবৃত্তি একটা পেশা হিসেবে পাশ্চত্যের ও পাশ্চাত্যানুসারী অনেকগুলো দেশেই স্বকৃত ও সমর্থিত। এজন্যে  রীতিমত অনুমতি ও লাইসেন্স দেয়া হয়, দেয়া হয় অবাধ নির্বিরোধ সুযোগ-সুবিধা। এই বৃত্তিটিকেও দেশ চলতি অন্যান্য পেশার মতো  একটা পেশার মর্যাদা দেয়া হয় এবং এ পেশা সংক্রান্ত যাবতীয় অধিকার দান করা হয়।

কিন্তু ইসলাম এ পেশার ওপর কুঠোরাঘাত করেছে এবং স্বাধীনা কিংবা ক্রীতদাস কোন রমণীকেই স্বীয় স্ত্রী-অঙ্গের দ্বার কোনরূপ উপার্জন করার অনুমতি দেয়নি।

জাহিলিয়াতের যুগে কেউ কেউ তার ক্রীতদাসীর ওপর দৈনিক হারে ‘কর’ ধার্য করত। এ ‘কর’ তাদের মালিকদের রীতেমত আদায় করে দিতে তারা বাধ্য ছিল। সেজন্যে তাঁকে যে কোন উপায়েই হোক উপার্জন  করতে হতো।  এ কারণে অনেক দাসীই ধার্যকৃত ‘কর’ আদায়ের নিমিত্তে বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য হতো। অনেক দাসী-মালিক আবার সরাসরি দাসীকে এ কাজে নিয়োজিত করত। আর তার বিনিময়ে সে মোটা পরিমাণ উপর্জন করত। উত্তরকালে ইসলাম এসে নারীদের এ চরম দুর্দশা ও জঘন্য কজকর্মের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দান করে। এ সময়ই আল্লাহর ফরমান নাযিল হয়ঃ (আরবী)

তোমারা তোমাদের দাসী বা কন্যদের বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য করনা- ওরা তো পবিত্রতা ও সতীত্ব রক্ষা করে থাকতে চায়-শুধু এজন্যে যে,  এরা মাধ্যমে তোমরা বৈষয়িক স্বার্থ লাভ করবে।  (সূরা আন-নূরঃ৩৩)

হযরত ইবনে আব্বাস  (রা)  বর্ণনা করেছেনঃমুনাফিক প্রধান আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলে করীম (স) -এর কাছে উপস্থিত হলো।  তার সাথে ছিল ‘মুয়াযত’ নাম্নী এক অনিন্দ্যসুন্দরী দাসী।  সে বললঃইয়া রাসূল!এই মেয়েটি অমুক ইয়াতীমের মালিকানাধীন দাসী। আপনি কি ওকে বেশ্যাবৃত্তি করার অনুমতী দেবেন?তাহলে সে ইয়াতীমরা অনেক মুনাফা লাভ করতে পারত। নবী করীম (স) জবাবে স্পষ্ট ভাষায় বললেনঃ‘না’।

নবী করীম (স) এই বীভৎস পেশার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিলেন, তার রোজগারে যারই কোন ফায়দা হোক,  বড় কোন প্রয়োজনই পূরণ হোক এবং বহু বড় মহৎ উদ্দেশ্যেই হোক-না কেন , ইসলামী সমাজকে সর্ব প্রকারের পাপ কার্জের পংকিলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখই ইসলামের লক্ষ্য।

নৃত্য ও যৌন শিল্পকর্ম

ইসলাম যৌন উত্তেজক নৃত্য পেশা হিসেবে গ্রহণ করা আদৌ সমর্থন করে না। অনুরূপভাবে এমন কাজেও ইসলামে অনুমোদন নেই, যা মন-মেজাজে যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। অশ্লীল গান, নির্লজ্জ অভিনয় এবং এ ধরনের অন্যান্য অর্থহীন কাজকর্ম এ পর্যায়ে পড়ে। বর্তমান কালে একে যদিও Art বা শিল্পকলা-এ লোভনীয় নামে অভিহিত করা হয় এবং তাকে উন্নতি-অগ্রগতি লাভের জন্যে অপরিহার্য মনে করা হয় কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তা চরম শুমরাহী ভিন্ন আর কিছুই নয়।

বস্তুত বৈবাহিক সম্পর্ক ভিন্ন অন্য কোনভাবেই নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষিত হয়েছে। যেসব কথা ও কাজ এ পথ উন্মুক্ত করে দেয়, ইসলামের দৃষ্টিতে তা সবাই সম্পূর্ণ হারাম। কুরআন জ্বেনা-ব্যভিচার হারাম ঘোষণার জন্যে যে মুজিযাপূর্ণ পদ্ধতি  অবলম্বন করেছে, তাতেই এই তত্ত্ব নিহিত।

কুরআনের ঘোষণা হচ্ছেঃ (আরবী*****************)

জ্বেনা-ব্যভিচারের নিকটেও ঘেঁষবে না। কেননা তা অত্যন্ত নির্লজ্জতার কাজ এবং খুবই কদর্য পথ ও উপায়া।  (সূরা বনী-ইসরাইলঃ৩২০)

ওপরে আমরা যা যা বলেছি, উপরন্ত যেসব কথাকে লোকেরা যৌন উত্তেজক মনে করে, তা সবাই এ ব্যভিচারের নিকটবর্তী করে দেয়ার উপকরণ। বরং তা-ই মনুষকে সেদিকে উদ্ধুদ্ধ করে,  তার প্রতি আকর্ষণ তীব্র করে তোলে।  কজেই এ পর্যয়ে যত কাজ আছে তা যারা করে তারা খুবই মারাত্নক কাচ করে, তাতে সন্তেহ নেই।

ভস্কর্য, প্রতিকৃতি ও ক্রুশ নির্মাণ মিল্প

ইসলামে প্রতিকৃতি হারাম। উপরে বিস্তারিতভাবে তার বিশ্লেষণ দেয়া হয়েছ। প্রতিকৃতি নির্মাণ আরো কঠিনভাবে হারাম। বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে,  সায়ীদ ইবনুল হাসান বলেনঃ (আরবী****************)

আমি ইবনে আব্বাস  (রা) -এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক  ব্যক্তি এল। বললঃহে ইবনে আব্বাস!হতের কারিগরিই আমার জীবিকার উপায়। আমি এ ধরনের ছবি তৈরী করি। ইবনে আব্বস  (রা) বললেনঃআমি স্বয়ং রাসূলে করীম  (স) -কে যা বলতে শুনেছি, তোমাকে আমি ঠিক তাই শোরাব। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ছবি বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করবে তাতে রূহ দেয়ার শাস্তি আল্লাহ তাকে দেবেন, কিন্তু সে তাতে রূহ কখনই দিতে পারবে না।  এ কথা  ‍শুনে প্রতিক্রিয়ায় লোকটির মুখমন্ডল বিকৃত ও ম্লান হয়ে গেল।  ইবনে আব্বাস তাকে বললেনঃতুমি যদি ছবি বা প্রতিকৃতি বানাতেই চও, তাহলে গাছ ইত্যাদি নিষ্প্রাণ জিনিসের ছবি বানাও।  (বুখারী)

মূর্তি, ক্রুশ-এধরনের সব জিনিস সম্পর্কে এ একই বিধান প্রযোজ্য।

তবে ফটোগ্রাফীর ছবি সম্পর্কে তো আমারা পূর্বেই বলেছি যে, শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ হচ্ছে, তা জায়েয।  আর খুব বেশি বললে মাকরূহই বলা যায়। তবে শর্ত এই যে,  সেই কাজটা মূলতঃকোন হরাম উদ্দেশ্যে হতে পারবে না। যেমন নারীর যৌন আকর্ষণমূলক অঙ্গসমূহকে উলঙ্গ করে তোলা, নারী-পুরুষের জুম্বনরত অবস্থায় ছবি এবং যেসবের বড়ত্ব বা পবিত্রতা প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেমবের ছবি তোলা-যেমন ফেরেশতা, নবী-রসূল ইত্যাদির ছবি।

মাদক ও জ্ঞান-বুদ্ধির বিনষ্টকারী দ্রব্যাদি দশিল্প

পূর্বেই বলা হয়েছে, মাদক-মদ্য প্রচলনে যে কোন রকমের অংশগ্রহণ বা সাহায্য সহযোগিতাকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। তা বানান-প্রস্তুত করণ, বন্টন বা পান করা-করান, সবই সম্পূ্র্ণরূপে নিষিদ্ধ। যে লোকই এ কাজ করবে, সে-ই রাসূলের ভাষায় অভিশপ্ত।

হাশীশও আফিমের ন্যায় বিবেক-বুদ্ধি বিলোপকারী যাবতীয় দ্রব্যাদি মাদক দ্রবের মতই হারামি।  এসব জিনিসের লেন-দেন, ক্রয়-বিক্রয়, বিলি –বন্টনও তার উৎপাদন শিল্প-সবই হারাম। মুসলমানের পক্ষে এমন কোন শিল্পকর্ম বা পেশা অবলম্বন করা যা হারাম কাজের ওপর ভিত্তিশীল কিংবা যারা দ্বারা কোন হারাম কাজের প্রচলন ঘটে ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অপছন্দনীয়,  অবাঞ্ছনীয়।

ব্যবসা করে উপার্জন করা

ইসলাম কুরআনী ঘোষণা ও রাসূলের সুন্নাতের মাধ্যমে ব্যবসা করার ওপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং তা করার জন্যে বলিষ্ঠ আহবান জানিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের জন্যেও উৎসাহ দিয়েছে এবং তাকে আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান বলেছে। ওপরন্ত  ব্যবসায়ের জন্যে যারা বিদেশ সফর করে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর পথে জিহাদকারী লোকদের সাথে। বলা হয়েছেঃ     (আরবী********************)

কিছু লোক আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে বিদেশ সফর করবে এবং অপর কিছু লোক আল্লাহর পথে যুদ্ধ-জিহাদ করবে।  (সূরা মুজাম্মিলঃ২০)

আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ ও যাতায়াত পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ।  এ পথই মানুষে ও জাতিসূহের জন্যে অভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অবাধ সুযোগ করে দিয়েছে। এ ব্যাপরটাকে আল্লাহ ত‘আলা মনুষের প্রতি তাঁর এক বিশেষ অনুগ্রহের অবাদান বলে উল্লেখ করেছেন। সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ ও অনুকূল বানান ও জাহাজ চালানর সুযোগ দানের অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ ত‘আলা নিজেই বলেছেনঃ (আরবী******************)

আর তোমারা দেখতে পা্ও, নদী-সমুদ্রে নৌকা-জহাজ পানির বক্ষ দীর্ণ করে চলাচল করছে, যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের সন্ধান করতে পার একং তাঁর শোকর আদায় করতে পর।  (সূর ফাতিরঃ১২)

কোন কোন আয়াতে সেই সাথে বাতাস চালাবার কথাও বলা হয়েছেঃ (আরবী*******************)

তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও যে, তিনি বাতাসসমূহকে সুসংবাদ দেয়ার ও তোমাদেরকে তাঁর রহমতের সাথে পরিচিতকরণের জন্যে পাঠান এবং এজন্যেও যে, নৌকা-জাহাজগুলো তাঁর নির্দেশে চলতে পারে এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহের সন্ধান করতে ও কার শোকর আদায় করতে পার।

আাল্লাহ তা‘আলা মক্কায় লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করে তাদের জন্যে এমন সব ব্যবস্থা কর্যকর করে দিয়েছেন যে, তাদের নগর মক্কা সমগ্র আরব উপদ্বীপের মধ্যে একটি বিশেষ ও বিশিষ্ট ধরনের ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল। হযরত ইবরাহীম  (আ)  দো‘আ করেছিলেনঃ (আরবী*******************)

অতএব হে আল্লাহ!তুমি লোকদের মনকে তাদের প্রতি আগ্রহী বানিয়ে দাও এবং তাদের রিযক দাও নানা প্রকারের ফলমুল দিয়ে, যেন তারা শোকর করতে পারে।

এ দো‘আও মক্কাবাসীদের জন্যে খুবই কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে। অনুরুপভাবে কুরাইশদের প্রতিও আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করেছিলেন ইয়েমেনমুখী শীতকালীন ব্যবসায়ী সফর এবং সিরিয়ামুখী গ্রীষ্মকালীন ব্যবসায়ী সফরে সুষ্ঠু ও নিরাপদ ব্যবস্থা করে দিয়ে। আর তাদের এ সফরকালীন নিরাপত্তা ছিল আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং তা করা হয়েছিল এজন্যে যে, তারা কাবা ঘরের খেদমতে আঞ্জাম দিত। আতএব তদের উচিত একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে তাঁর এ অনুগ্রহের শোকর আদায় করা। কেননা তিনিই কাবা ঘরের একমাত্র রব্ব একমাত্র অনুগ্রহকারী আল্লাহ।  (আরবী******************)

যেহেতু কুরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে অর্থাৎ শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন বিদেশ সফরে তাদের অভ্যাস রয়েছে। অতএব তাদের কর্তব্য এ ঘরে আল্লাহর ইবাদত করা,  যিনি তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে খেতে দিয়েছেন এবং সকল প্রকারের ভয়-ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন।  (সূরা কুরাইশ)

ইসলাম মুসলমানকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী লেন-দেন ও যাতায়াত-যোগাযোগের বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে। প্রত্যেক বছর হজ্জের সময় এ সুযোগ আসে। আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট ভাষায় এ  হজ্জকালীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেছেনঃ (আরবী***************)

আযাতে উল্লিথিত ‘কল্যাণকর ব্যবস্থাসূহের ‘মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হচ্ছে ব্যবসা। কিন্তু মুসলমানরা হজ্জের সময় ব্যবসা করতে কুষ্ঠবোধ করত। তারা মনে করত, হজ্জের সময় ব্যবসা করলে হজ্জের খলেস নিয়তে দোষ প্রবেশ করবে এবং তাদের ইবদতের পরিচ্ছন্নতা ও নিষ্কলুষতা বিনষ্ট হবে। এ পর্যয়ে কুরআন মজীদে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছেঃ (আরবী****************)

তোমারা যদি হজ্জকালে তোমাদের আল্লাহর কাছ থেকে অনুগ্রহ পেতে চাও, তবে তাতে তোমাদের কোন দোষ হবে না।  (সূরা বাকারাঃ১৯৮)

যে সব লোক মসজিদে বসে সতাল সন্ধা আল্লাহর তসবীহ জপে কুরআন মজীদ তদের উদ্দেশ্য করে বলেছেঃ (আরবী********************)

এমন বহু লোক রয়েছে,  ব্যবসা বা নগদ বেচা-কেনা যাদের আল্লাহর যিকির নামায কয়েম করা ও যাকাত দেয়ার দ্বীনী কজ-কর্ম থেকে ভুলিয়ে রাখতে পারে না।  (সূরা আন-নূরঃ৩৭)

এর অর্থ কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলমান মসজিদের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকা লোক হতে পারে না। নয় তারা দরবেশ, পরনির্ভশীল বা দুনিয়া ত্যাগী-সন্ন্যাসী বা বৈরাগী। অনুরূপভাবে তারা দুনিয়ার কাজে একান্তভাবে মশগুল হয়ে যাওয়া লোকও নয়। আসলে তারা হচ্ছে কজের লোক। আর তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে,  তদের বৈষয়িক কজ দ্বীনী, অনুরূপভাবে তারা দুনিয়ার কজে একান্তভাবে মশগুল হয়ে যাওয়া লোকও নয়।  আসলে তারা হচ্ছে কাজের লোক্। আর তদের বিশেষত্ব হচ্ছে,  তাদের বৈষয়িক কাজ দ্বীনী দায়িত্ব পালন থেকে তদের বিরত ও বিস্মৃত করে রাখতে পারে না।

কুরআন মজীদে ব্যবসা সংক্রান্ত কথাবার্তার ‍কিয়দাংশ আমরা উপরে তুলে ধরলাম।

এরপর সুন্নত ও হা্দীসের কথা। নবী করীম  (স)  নিজে ব্যবসায়ের কজের জন্যে বিপুলভাবে উৎসাহ দান করেছেন। এ ব্যাপারটি তাঁর কছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজে কথা ও কাজ দ্বারা এ কাজের ভিত্তি সুদৃঢ় করে দিয়েছেন।

এ পর্যায়ে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ কথাসমূহের মধ্য থেকে কুতিপয় নীতিকথা এখানে উল্লেখ করছিঃ (আরবী**************)

বিশ্বস্ত সত্যাশ্রয়ী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন শহীদদের সাথে অবস্থান করবে।  (আরবী***********)

সততা পরায়ণ বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবী স্বয়ং সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গী হবেন।

নবী করীম  (স) ব্যবসায়ীদের মুজাহিদ ও আল্লাহর পথে শাহাদত বরণকারীদের  সমান মর্যাদায় উল্লেখ করেছেন দেখেও আমাদের মনে কোন বিস্ময়ের উদ্রেক হয় না। কেননা, জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে প্রমাণ করেছে যে, জিহাদ কেবলমাত্র যুদ্ধের ময়দানেই অনুষ্ঠিত হয় না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই জিহাদ অবশ্যম্ভাবী।

রাসূলে করীম  (স) ওয়াদা করেছেন, ব্যসায়ীরা আল্লাহর  কাছে এ উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং পরকালে তাদের জন্যে হবে এই অশেষ সওয়াব। কেননা, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই লোভ ও লালসার দাসত্ব হতে দেখা যায়। যে কোন উপায়ে মুনাফা লুন্ঠনের প্রবনতা খুবই প্রকট হয়ে থাকে এ ক্ষেত্রে । আর ধন ধন সৃষ্টি করে,  মুনাফা আরও মুনাফা লাভের জন্যে মানুষকে প্ররোচিত করে। কিন্তু যে ব্যবসায়ী সততা ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা রক্ষা করে, সে তো জিহাদকারী ব্যক্তি। সে প্রতিনিয়ত লোভ-লালসার সাথে মুকাবিলা করে চলছে। অতএব মুজাহিদের মর্যাদা তার জন্যে খুবই শোভনীয় এবং বাঞ্ছনীয়।

ব্যবসায়ের ধর্ম হচ্ছে, তা মানুষকে ধন-দৌলতের স্তুপে ডুবিয়ে দেয়। সে দিন-রাত মূলধন ও মুনাফার হিসেব করতেই নিমগ্ন হয়ে থাকে। এমন কি আমরা দেখতে পাচ্ছি,  নবী করীম  (স) মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে খোতবা দিচ্ছেন, এমন সময় একটি ব্যবসায়ী কফেলা পণ্য –দ্রব্য-সম্ভার নিয়ে তথায় উপস্থিত হয়। লোকেরা এই কফেলার পৌছার খবর পাওয়ার সাথে সাথে রাসূলের খোতবার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে সেদিকে দৌড়ে গেল।  এ প্রক্ষিতেই কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।  (আরবী***************)

ওরা যখন কোন ব্যবসা  বা আনন্দানুষ্ঠান দেখে দখন ওরা সেদিকেই দৌড়ে যায় এবং হে নবী তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফেলে যায়।  যা কিছু আল্লাহর কাছে রেয়ছে তা এ আনন্দানষ্ঠান ও ব্যবসা অপেক্ষা অনেক ভালো ও কল্যাণময় এবং আল্লাহই হচ্ছে সর্বত্তম রিযিকদাতা।  (সূরা জুমা‘আঃ১১)

কাজেই যে লোক এ ঘর্ণাবর্তে পড়েও  ‍দৃঢ় ঈমানদার ও প্রত্যয়শীল,  আল্লাহর ভয়ে ভরপুর অন্তর ও আল্লাহর যিকিরে সিক্ত হয়ে থকতে পারে, সে তো নিঃসন্দেহে আল্লহর নিয়ামত প্রাপ্ত নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের মধ্যে গণ্য হবে।

ব্যবসার ব্যাপারে আমাদের পথ-প্রদর্শনের জন্যে রাসূলে করীম  (স) -এর কর্মনীতিই যথেষ্ট। তিনি যেমন আধ্যাত্মিক দিকের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় গুরুত্বারোপ করেছেন, তেমনি মদীনায় তাকওয়ার ও আল্লাহর সন্তাষ্টির ভিত্তিতে মসজিদও কয়েম করেছিলেন। যেন তা আল্লাহর ইবাদত, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও চর্চা এবং দ্বীনী দাওয়াত প্রচারের কেন্দ্র হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্র এবং সরকারেরও কেন্দ্র (Head Quarter) হতে পরে। তিনি মানুষের অর্থনৈতিক দিকের ওপরও যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি খালেস ইসলামী বাজার সৃষ্টি করেছিলেন, যার ওপর ইয়াহূদীদের কোন কর্তৃত্ব  বা আধিপত্য চলতে পরত না। পূর্ব থেকে চলে আসা বনূ কায়নুকা বাজার ইয়াহূদীদেরই কর্তৃত্বাধীন ছিল। নবী (স) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজারের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ম-কানুন নিজেই পচলন করেছিলেন এবং নিজেই সেটার দেখাসোনা করতেন। এ বাজারটির বৈশিষ্ট্য এই যে তথায় কোনরুপ ধোঁকা-প্রতারণা ঠকাঠকির করবার বা মাপে-ওজনে  কোনরূপ কম-বেশি করার কিংবা পণ্যদ্রব্য আটক করে লোকদের কষ্ট দেয়ার কোন সুযোগই ছিল না।

এ সবের সাথে সাথে আমার লক্ষ্য করছি, সাসূলে করীমের সাহাবিগণের মধ্যে সুবিজ্ঞ ব্যবসায়ী, সুদক্ষ কারিগর,  কৃষক এবং সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয় সকল কাজ ও বিদ্যার দক্ষতাসম্পন্ন ও পেশাবলম্বনকারী লোক রয়েছেন।

রাসূলে করীম  (স) লোকদের মধ্যে বসবাস করতেন।  দাঁর ওপর আল্লাহর ফরমান – কুরআনের আয়াত নাযিল হতো। লোকদের মধ্যে তিনি  তা পাঠ করে শোনাতেন। জিবরাঈল  (আ)  সকল-সন্ধ্যা ওহী নিয়ে তাঁর কাছে আসতেন।

সাহবিগণের অবস্থা ছিল এই যে, তাঁরা রাসূলে করীম  (স) থেকে এক মুহূর্তের তররেও বিচ্ছিন্ন হওয়া পছন্দ করতেন না। এসব সত্ত্বের আমরা দেখি, মসস্ত  সাহাবী নিজ নিজ কাজ ও পেশায় মগ্ন রয়েছেন। কেউ হয়ত ব্যবসায়ী সফর করেছেন, কেউ নিজের খেজুরের বাগান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আাবার কেউ কেউ নিজের পেশা ও কারিগরি কাজ থেকে নিয়ে মশগুল থাকার দরুন রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত হয়ে দ্বীন শেখার কাজ থেকে বঞ্চিত থাকছেন। ফলে তিনি কাঁর অপর এক ভাই –যিনি রাসূলের দরবারে উপস্থিত থাকতে পেরেছিলেন-থেকে সব কিছু জেনে নিচ্ছেন। এটা তাঁদের কর্তব্যও ছিল। কেননা রাসূলে করীম  (স) স্থায়ী নীতি হিসাবে ঘোষণা করে দিয়েছিলেনঃ (আরবী*****************)

উপস্থিত লোক যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে সবকিছু পৌছে দেয়।

অধিকাংশ আনসার কৃষিকাজে রত থাকতেন। আর মুহাজিররা সাধারণতঃব্যবসায়ী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) মুহাজির ছিলেন। তাঁর কর্মনীতি আমাদের সন্মুখে চিরভাস্বর হয়ে আছে। তাঁর দ্বীনী ভাই সা‘দ ইবনে আনসারী তাঁকে কাঁর অর্ধেক সম্পদ,  তাঁর দুটি বাড়ির একটি এবং দুই স্ত্রীর মধ্য থেকে একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তাঁর কাছে বিবাহ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

তিনি সা‘দ (রা) -কে বললেনঃ (আরবী*****************)

আল্লাহ আপনার ধন-মাল ও পরিবার-পরিজনে বরকত দিন। আমার ওসবের কোন প্রয়োজন হবে না। এখন ব্যবসা করার মতো কোন বাজার থাকলে আমাকে দেখিযে দিন, আমি ব্যবসা করব।

সা‘দ বললেন, হ্যাঁ, বনু কায়নুকার বাজার রয়েছে তো! পরের দিন তিনি পনির ও ঘি সহ বাজারে চলে গেলেন ও বিক্রি করেন। তিনি এ ব্যাবসা চলিয়ে প্রচুর সম্পদ উপার্জন করেন। , মৃত্যুকলে তিনি এক বিপুল বৈভব রেখে গিয়েছিলেন।

হযরত আবূ বকর  (রা) -এর দৃষ্টান্ত আরও ভাস্বর। তিনি বরাবর ব্যবসাই করেছেন। এজন্যে প্রানপণ খাটা-খাটুনি করতেন। এমন কি খলীফা নির্বাচিত হওয়ার দিনও তিনি বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন।

হযরত উমর (রা) নিজের সম্পর্কে বলেনঃ (আরবী*******************)

বাজারের কেনা-বেচা আমাকে এমনভাবে মশগুল করে রেখেছিল যে, আমি রাসূলে করীম (স) -এর হাদীস শ্রবণ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম।

হযরত উসমান (রা)  ও অপরাপর সাহাবী সম্পর্কে এই কথা।

ব্যবসা সম্পর্কে গির্জার ভূমিকা

ইসলাম পূর্বোক্তভাবে দ্বীন ইসলামের ছায়াতলে থেকে তারা জগতিক মহাযাত্রা অব্যহত রেখেছে। ইসলামে বিশ্বাসী লোকেরা ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ করেছে;কিন্ত এ কাজে ব্যস্ততা ও নিমগ্নতা তাদের আল্লাহর যিকির থেকে গাফিল করেনি, আল্লাহর আনুগত্যের পথ তেকে করেনি একবিন্দু বিচ্যুত। অথচ এ সময়কালে মধ্যযুগের বড় বড় দেশ ওি খ্রিস্টন ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহের জনগণ ব্যবসা সম্পর্কে দৃষ্টি পরস্পর-বিরোধী মতের মধ্যে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিল।  একদিকে ছিল‘নিষ্কৃতির’মত।  ব্যবসায়ের তৎপরতায় মশগুল হলে নফস বহু প্রকরের গুনাহের আবিলতায় পংকিল হয়ে পড়বে, কাজেই নিজেকে তা থেকে রক্ষা করতে হবে এবং সে জন্যে এ ধরনের কাজকর্ম থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। অপরদিকে ধারণা ছির, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের শিক্ষা ও মতের বিরুদ্ধে ব্যবসা ও শিল্পকর্মে আত্মনিয়োগ করলে মানুষ অভিশপ্ত হয়ে যাবে। কেননা এই গুনাহ কেবল একটি খারাপ কাজই নয়, তা চিরন্তন পাপ ও সর্বকালের অভিশাপ যেমন পৃথিবীতে তেমনি আকাশলোকেও; ইহকালে এবংপরকালে।

কিদ্দীস অগস্টস বলেনঃকয়-কারবার (Business)  মূলতই  গুনাহ। কেননা তার প্রভবে নফস বা মন মহাসত্য আল্লাহর দিক  থেকে হটে যায়।

অপর একজন বলেনঃযে ব্যক্তি কোন কিছু ক্রয় করে সেই অবস্থাই সে জিনিসকে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে, তাতে কোনরূপ পরিবর্তন আনা হয় না; তাহলে এ শেষ ব্যক্তি সেসব ক্রয়-বিক্রয়কারী গোষ্ঠীর মধ্যে শামিল হয়ে যায়, যার প্রকৃত ইবাদতের উচ্চতর ও পরিবেশ থেকে দূরে ছিটকে পড়েছে।

আসলে এসব কথাবার্তা কিদ্দীস রোলসের উপস্থাপিত শিক্ষার দীর্ঘসূত্রিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিদ্দীস বলেছিলেন, কোন খ্রিস্টানেরই যেহেতু তার অপর খ্রিস্টান ভাইয়ের সাথে কোনরূপ ঝগড়া –ফাসাদে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়,  এজন্যেই খ্রিস্টনদের মধ্যে কোন ব্যবসায়ী তৎপরতা থাকাও বাঞ্ছনীয় নয়।

হারাম ব্যবসা

কিন্তু ইসলামে ব্যবসা হারাম নয়। তবে যে ব্যবসায়ে জুলুম, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, ঠকবাজি, মুনাফাখোরী কিংবা কোন নিষিদ্ধ জিনিসের ক্রয়-বিক্রয়, উত্পাদন হয় তা নিশ্চয়ই হারাম।

যেমন মদের ব্যবসা, বিবেক-বুদ্ধি আচ্ছন্নকারী দ্রব্যাদির ক্রয়-বিক্রয় কিংবা শূকর ব্যবসা অথবা মূর্তি, প্রতিকৃতি বা অনুরূপ ধরনের ব্যবসা নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ। কেননা এ জিনিসগুলো গ্রহন, পান, চলাচলকরণ ও তা থেকে উপকার গ্রহণ ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম করে দেয়া হয়েছে । ইসলাম এ কাজের প্রতি কোন সমর্থন দিতে আদৌ প্রস্তুত নয়। এসব পথে যা কিছুই উপার্জন হয় তা হারাম ও জঘন্য। তা খাওয়ার ফলে ব্যক্তির দেহে যে গোশত বৃদ্ধি পাবে, তার জন্যে জাহান্নামই উপযুক্ত স্থান। যেসব লোক এ সব নিষিদ্ধ জিনিসের ব্যবসায় লিপ্ত, সে সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত হবে বলে মনে করার কোন কারণই থাকতে পারে না। কেননা এসব ব্যবসায়ের ভিত্তই হচ্ছে ঘৃণ্য এবং হারাম। ইসলাম তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং এ ব্যবসাকে চালু রাখতে আদৌ প্রস্তুত নয়।

তবে স্বর্ণ বা রেশমের- রেশমী কাপড়ের ব্যবসা করা হারাম নয়। কেননা এ দুটো পুরুষদের জন্যে না হলেও নারীদের জন্যে তো হালাল। তবে এসব জিনিস দ্বারা তৈরী এমন জিনিসের কারবার- যা কেবল পুরুষরাই ব্যবহার করে, তা জায়েয হবে না।

হালাল ও জায়েয ব্যবসায়ে ব্যবসায়ীর কতগুলো কর্তব্য রয়েছে। সে কর্তব্য পালন না করলে ব্যবসায়ীকে কিয়ামতের দিন গুনাহগারদের দলভুক্ত হতে  হবে। আর এ গুনাহগাররা অবশ্যই জাহান্নামে যাবে।

নবী করীম (সা) একদিন নামাযের জন্যে বের হয়ে এলেন। তিনি দেখতে পেলেন, লোকেরা কেনা-বেচা করছে। তিনি দেখতে পেলেন, লোকেরা কেনা-বেচা করছে। তিনি তাদের বললেনঃ

হে ব্যবসায়ী লোকেরা ! লোকেরা রাসূলের ডাকে সাড়া দিল। তারা সেদিকে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল। তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ (আরবী**********************)

কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহাপাপীরূপে উত্থিত হবে। তবে তারা নয় যারা আল্লাহকে ভয় করবে, নেকভাবে সততা ও সভ্যতা সহকারে ব্যবসায়ের কাজ সম্পন্ন করবে। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা) বলেছেন : রাসূলে করীম (সা) আমাদের কাছে আসতেন- আমরা ছিলাম ব্যবসায়ী এবং বলতেন : (আরবী*****************)

হে ব্যবসায়ীরা, তোমরা মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কারবার থেকে অবশ্যই দূরে সরে থাকবে।

এত এব ব্যবসায়ীদের কর্তব্য এ মিথ্যাকে সম্পূরূপে পরিহার করে চলা। কেননা ব্যবসায়ীদের জন্যে তাই হচ্ছে একটি অতি বড় বিপদ। মিথ্যাই মানুষকে পাপের পথে টেনে নিয়ে যায়। আর পাপের পথের পরিণতি হচ্ছে জাহান্নাম। তাদের খুব বেশি কিরা-কসম করাও পরিহার করা কর্তব্য। বিশেষ করে মিথ্যা কসম খাওয়া খুবই মারাত্মক। কেননা নবী করীম (সা) বলেছেন:

(আরবী*****************)

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তিনজনের প্রতি তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না, তাদের জন্যে হবে পীড়াদায়ক আযাব। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে মিথ্যা কিরা-কসম করে যে লোক তার পণ্য বিক্রয় করে সে।

আবু সায়ীদ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, একজন বেদুঈন একটি ছাগী নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম, তুমি কি ছাগীটি তিন দিরহাম বিক্রয় করবে? লোকটি বললঃ না আল্লাহ কসম। কিন্তু পরে সে সেই মূল্যেই ছাগীটি বিক্রয় করে দিল। আমি এ ব্যাপারটি রাসূলে করীম (সা) এর কাছে উল্লেখ করলাম। তিনি শুনে বললেন: (আরবী************)

লোকটি দুনিয়ার বিনিময়ে তার পরকালকে বিক্রি করে দিয়েছে।

ব্যবসায়ীর উচিত ধোঁকাবাজি ও ঠকবাজি থেকে দূরে থাকা। কেননা যে লোক ধোঁকাবাজি ও ঠকবাজি করে, সে ইসলামী উম্মতের বাইরে চলে গেছে।

ওজন ও পরিমাপে কমবেশি করা অত্যান্ত খারাপ কাজ। মুনাফাখোরী ও মজুদদারী তাকে পরিহার করে চলতে হবে। কেননা তা করলে আল্লাহ ও রাসূল তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবেন।

সুদী কারবার করা চলবে না। কেননা সুদকে সুদী করবার লব্ধ মুনাফাকে আল্লাহ তা’আলা নির্মূল নিশ্চিহ্ন করে দেন, হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী****************)

কোন লোক যদি সুদের একটি দিরহামও জেনে শুনে খায় তবে তা ছত্রিশ বার জ্বেনা করার চাইতেও বড় গুনাহ। (আহম্মদ)

এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরে করা হবে।

চাকরি

চাকরি করে রুজি-রোজগার করা মুসলিম মাত্রের জন্যেই জায়েয। তা সরকারী চাকরি, হোক, কোন প্রতিষ্ঠানের হোক কিংবা কোন ব্যক্তিগতভাবে করো কাছে। যতদিন সে চাকরি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়ত্ব পালন করতে সক্ষম থাকবে, ততদিন এ চাকরি করা তার জন্যে বৈধ। কিন্তু যার মধ্যে যে কাজের যোগ্যতা নেই, তার পক্ষে সেকাজের নিয়োগ প্রার্থনা করা জায়েয নয়। বিশেষ করে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ সম্পর্কে এ শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবী****************)

ধ্বংস প্রশাসকদের জন্যে, ধ্বংস নেতৃস্থনীয় লোকদের জন্যে, ধ্বংস কোষাধ্যক্ষদের জন্যে। কত না লোক কিয়ামতের দিন কামনা করবে, তাদের চুলের চুটি যদি সুরাইয়া তারকার সাথে বেঁধে দেয়া হতো এবং তাদের যদি আসমান ও জমিনের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা হতো, তবে কতই না ভাল হতো।

হযরত আবূ যর (রা) থেকে বর্ণিতঃ (আরবী***********************)

আমি বললাম, হে রাসূল! আপনি কি আমাকে কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করবেন না? এ কথা শুনে তিনি তাঁর হাত আমার কাঁধের ওপর রাখলেন এবং বললেন : হে আবু যর তুমি বড় দুর্বল ব্যক্তি। আর এ পদ হচ্ছে কঠিন আমানতের ব্যাপার। কিয়ামতের দিন তাই হবে লজ্জা ও লঞ্ছনার কারণ। কেবল সে লোক ছাড়া, যে তা পূর্ণ সততা সহকারে গ্রহণ করল এবং এ পদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তার ওপর বর্তায় তা সে যথাযথ পালন করল।

নবী করীম (সা) আরও বলেছেনঃ (আরবী******************)

বিচারক তিন ধরনের। তন্মধ্যে এক ধরনের বিচারক জান্নাতে যাবে। আর অপর দুধরনের বিচারক যাবে জাহান্নামে। জান্নাতে যাবে সে বিচারক যে প্রকৃত সত্যকে জানতে পারল এবং সে অনুযায়ী ফয়সালা করল- রায় দিল। কিন্তু যে বিচারক প্রকৃত সত্য জানতে পেরে জুলুম করল, সে জাহান্নামে যাবে। আর সেও জাহান্নামে যাবে সে মূর্খতা ‍ও অজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচারকার্য সমাধা করল।

অতএব এসব বড় বড় দায়ত্বপূর্ণ পদের জন্যে কোনরূপ কামনা বা প্রার্থনা করা এবং তা পাওয়ার জন্যে চেষ্টা করা কোন মুসলমানেরই উচিত নয়, যদিও কোন পদের যোগ্যতা তার রয়েছে। কেননা যে ব্যক্তি কোন পদকে নিজের রব্ব বানিয়ে নেবে তার সে পদই তাকে তার গোলাম বানিয়ে নেবে। আর যে লোক পৃথিবীতে বাহ্যত প্রকাশমান ফলাফলকেই সব কিছু মনে করবে, সে আসমানী তওফীক থেকে বঞ্চিত হবে।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে সামুরাতা (রা) বলেনঃ (আরবী****************)

রাসূলে করীম (সা) আমাকে বললেন : হে আবদুর রহমান! কোন নেতৃত্ব তুমি চাইবে না। কেননা তুমি যদি না চাইতেই পেয়ে যাও তাহলে তোমাকে সে দায়িত্ব পালনে সাহায্য করা হবে। আর যদি প্রার্থনা ও চেষ্টার ফলে তুমি পাও, তাহলে তোমাকে তারই ওপর নির্ভরশীল বানিয়ে দেয়া হবে।

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: (আরবী*******************)

যে লোক বিচারকের পদ লাভ করার কামনা করল, তা চাইল ও সেজন্যে সুপারিশ করল, তাকে তারই হাতে সোপর্দ করে দেয়া হবে, আর কেউ যদি এ পদ গ্রহন করত বাধ্য হলো ( নিজে চাইল না) তার সাহায্যার্থে একজন ফেরেশতা আল্লাহ নাযিল করবেন। (আবু দাউদ, তিরমিযী)

এসব কথা সে পর্যায়ে প্রযোজ্য যখন শূন্যপদ পূরণের জন্যে অন্যান্য লোক মজুদ রয়েছে। পক্ষান্তরে অবস্থা যদি এই হয় যে, শুন্য পদ পূরণ করার জন্যে সে ছাড়া আর কেউ নেই এবং দেখা যাবে যে, সেই কাজের জন্যে নিজেকে পেশ না করলে সার্বিক কল্যাণই অচল হয়ে যাবে, জাতীয় কার্যাবলী বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন নিজেকে সেই কাজের জন্যে পেশ করায় কোন দোষ নেই। কুরআন মজীদ হযরত ইউসুফের কিসসা আমাদেরকে শুনিয়েছে। তাতে উল্লেখ হয়েছে যে, তিনি নিজেই বাদশাহকে বলেছিলেন : (আরবী********************)

সে বলল, রাজ্য ও রাষ্ট্রের ধন-ভণ্ডারসমূহের ওপর আমাকে কর্তৃত্বশীল করে নিযুক্ত করুন। আমি তো হেফাযত ও সংরক্ষণকারী এবং সব বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী।

রাজনৈতিক পদ লাভের জন্যে প্রার্থনা করা ব্যাপাটিকেও ইসলামের পথ-নির্দেশ এরূপ।

হারাম চাকরি

চাকরি করা জায়েয পর্যায়ে আমরা এ পর্যন্ত যা কিছু বললাম, তা কেবল সেসব চাকরির বেলায় যখন সে চাকরির কাজে মুসলিম জনগণের পক্ষে ক্ষতির কারণ নিহিত থাকবে না। অতএব মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কোন সৈন্যবাহিনীর কোন পদে চাকরি করা কোন মুসলমানের পক্ষে জায়েয হতে পারে না। অনুরূপভাবে যে প্রতিষ্ঠান বা শিল্প কারখানা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে অস্ত্রশস্ত্র তৈয়ার করার কাজে নিযুক্ত, তার কোন চাকরি করা মুসলমানদের জন্যে জায়েয নয়। ইসলাম ও মুসলামনদের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রোপাগাণ্ডা চালানর প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এ কথা।

এ রূপেই জুলুম বা হারাম কাজে সাহায্য সহায়তাকারী কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় চাকরি গ্রহণও মুসলমানের জন্যে হারাম। যেমন কোন সুদী কারবারের প্রতিষ্ঠান, মদ্য উত্পানদের কারখানা বা মদ্য বিক্রির দোকান, কোন নৃত্যশালা, থিয়েটার, ছায়াছবি নির্মান ইত্যাদি ধরনের কাজে চাকরি গ্রহণও জায়য হতে পারে না।

এসব ক্ষেত্রে চাকরি গ্রহণকারীরা এই বলে নিষ্কৃতি পেতে পারে না যে, তারা নিজেরা তো হারাম কাজ করছে না। কেননা পূর্বেই বলেছি, ইসলামের মৌলনীতি হচ্ছে পাপ কাজের সাহায্য করাও পাপ- সে সাহায্য যে রকমেরই এবং যতটা মাত্রারই হোক না কেন। এ কারণেই নবী করীম (সা) সুদী কারবারের চুক্তি বা হিসাব লেখক এবং তার সাক্ষীদের ওপর যেমন অভিশাপ বর্ষণ করেছেন, তেমনি অভিশাপ করেছেন সুদখোরদের ওপরও। অভিশাপ করেছেন মদ্য চোলাইকারী ও মদ্য পরিবেশনাকরীর ওপর যেমন করেছেন মদ্যপের ওপর।

এ বিধান ও নির্দেশ তখনকার জন্যে, যখন এ ধরনের চাকরি বা কাজ গ্রহনের জন্যে মানুষ সাংঘাতিক অসুবিধায় পড়ে বাধ্য হবেন। কিন্তু বাস্তবিকই যদি কোন মুসলমান এরূপ অসুবিধায় পড়ে যায় এবং এ কাজ ছাড়া অন্য কোন হালাল ধরনের চাকরি না-ইপাওয়া যায়, তাহলে মনে মনে এ কাজের প্রতি ঘৃণা পোষণ সহকারে এ চাকরি নেয়া যেতে পারে। তবে এ ছাড়া হালাল কোন চাকরি পাওয়া যায় কিনা তার জন্যে অবিশ্রান্ত চেষ্টা চালাতে থাকতে হবে, যেন আল্লাহর অনুগ্রহে এ কাজ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে পুরোপুরি হালাল কোন পেশা বা চাকরি পাওয়া সম্ভব হয় এবং হারাম উপর্জন থেকে বেঁচে যেতে পারে।

মুসলমান সব সময় সন্দেহ বা সংশয়পূর্ণ কাজ থেকে দূরে সরে থাকতে চেষ্টা করবে। কেননা তা দ্বীন পালন ও আকীদার ক্ষেত্রে দুর্বলতার সৃষ্টি করে। তাই এ কাজে বিরাট পরিমাণ উপার্জন ও প্রচুর ধন লাভ সম্ভবপর হলেও মুসলিম ব্যক্তি তা পরিহার করে চলে। নবী করীম (সা) বলেছেন : (আরবী*****************)

যা তোমাকে সংশয়ে ফেলে তা পরিহার কর এবং যা সন্দেহমুক্ত উন্মুক্ত মনে হয়, তাই গ্রহণ করো। (আহমদ, তিরমিযী, নিসায়ী)

তিনি আরো বলেছেন : (আরবী******************)

যাতে সংশয় রয়েছে তা ছেড়ে দিয়ে যাতে কোনরূপ সংশয় নেই তা যতক্ষন না গ্রহণ করবে, ততক্ষণ মানুষ মুক্তাকীদের মর্যাদা লাভ করতে পারে না। (তিরমিযী)

(অন্য কথায় দোষ থেকে বাঁচতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দোষমুক্ত জিনিসও ত্যাগ করা মুক্তাকীদের কাজ।)

উপার্জন পর্যায়ে সাধারণ নিময়

উপার্জন পর্যায়ে সাধারণ নিময় হচ্ছে, যে কোন উপায়ে যে কোন পথ ও পন্থায় ইচ্ছা উপার্জন করতে চেষ্টা করাকে ইসলাম মুসলমানদের জন্যে জায়েয করেনি। বরং ইসলাম উপার্জনের জন্যে শরীয়তসম্মত পন্থা ও শরীয়ত অসমর্থিত পন্থার মধ্যে পার্থক্য করার নির্দেশ দিয়েছে। এ নীতির মূল কথা হচ্ছে সামাজিক-সামষ্টিক কল্যান। আর এ পার্থক্যকরণের মৌলনীতি হচ্ছে যেসব পথে উপার্জন বা মুনাফা লাভ করার ক্ষেত্রে অপরের ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী তা শরীয়তসম্মত পন্থা নয় আর যে সব পন্থায় ব্যক্তিদের পরস্পরের মধ্যে  মুনাফার বন্টন হয় পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও অনুমতির ভিত্তিতে এবং সে বন্টন হয় সুবিচারপূর্ণ, তা অবশ্যই শরীয়ত-সমর্থিত পন্থা।

আল্লাহ তা’আলা নিজেই এ মৌলনীতি ঘোষণা করেছেন কুরআনের নিম্মোদ্ধৃত আয়াতেঃ (আরবী****************)

হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা বাতিল পন্থায় তোমাদের পরস্পরের মাল ভক্ষণ করবে না। তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে যদি ব্যবসা করা হয়, তাহলে গ্রহন করতে পার। তেমরা নিজেদের হত্যা করো না। কেননা আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড়ই দয়াবান। যে লোক সীমালংঘন ও জুলুম স্বরূপ এ কাজ করবে, তাকে আমরা অবশ্যই জাহান্নামে পৌঁছে দেব।

এ আয়াতে ব্যবসাকে দুটো শর্তের ভিত্তিতে জায়েয ঘোষণা করা হয়েছেঃ

প্রথম, ব্যবসায় পক্ষদ্বয়ের পূর্ণ সন্তুষ্টি ও সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হতে হবে এবং দ্বিতীয়, তাতে এক পক্ষের মুনাফা অপর পক্ষের ক্ষতির ফলে হতে পারবে না। আয়াতের তোমরা নিজেদের হত্যা করো না অংশ থেকে তাই প্রমাণিত হয়।

তাফসীরকারগণ উপরোদ্ধৃত আয়াতের যে দুটো তাফসীর পেশ করেছেন, এক্ষেত্রে এ দুটোই প্রযোজ্য। প্রথম তাত্পর্য, লোকেরা পরস্পরকে হত্যা করবে না। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, তোমরা নিজেদের হাত নিজেদের হত্যা করবে না। উভয় দিক দিয়েই আয়াতটির সারকথা হচ্ছে, যে লোকই তার ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের জন্যে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, সে যেন সেই দ্বিতীয় ব্যক্তির রক্ত শুঁষে নিচ্ছে। আর তার পরিণতিতে নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করে। অতএব চুরি, ঘুষখোরি, জুয়া ও ধোঁকা-প্রতারণা, খারাপ জিনিস দিয়ে ভাল জিনিসের মূল্য গ্রহণ ও সুদী কারবার- এ সব ধরনের কাজেই এ দুটো কারণ প্রকটভাবে বর্তমান। আর এ করণেই তা শরীয়তে সমর্থিত নয়। কোন কোন অবস্থায় পারস্পরিক সম্মতির শর্তটি পাওয়া গেলেও অপর গুরুত্বপূর্ণ শর্ত- তোমরা নিজেদের হত্যা কর না- (অর্থাৎ অপরের ক্ষতি না হওয়ার শর্ত) অনুপস্থিত। তাই তা জায়েয নয়।

[মওলানা মওদূদী লিখিত অর্থনীতির ভিত্তি]

তৃতীয় অধ্যায়

বিবাহ-শাদী ও পারিবারিক জীবনে হালাল-হারাম

স্বভাবগত কামনা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রসীমা

বিবাহ

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক

জন্মনিয়ন্ত্রণ

তালাক

পিতামাতা ও সন্তানদের পারস্পরিক সম্পর্ক

স্বাভাবিক কামনা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রসীমা

আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়ায় মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ এখানে আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব ও দুনিয়া আবাদকরণের কর্তব্য পালন করবে। এ কাজ সুসম্পন্ন হওয়ার জন্যে মানব প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষা পাওয়া এবং এখানে তাদের জীবনধারা অব্যাহতভাবে চলতে থাকা একান্তই আবশ্যক। তাহলেই মানুষ এখানে চাষাবাদের কাজ করতে পারে, শিল্প-প্রতিষ্ঠান কায়েম করে নিত্য পরিবর্তনশীল প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদন করতে পারবে। এক কথায় পৃথিবী আবাদকরণ, মানব সমাজের প্রতিষ্ঠা বিধান এবং আল্লাহর ন্যস্ত করা দায়িত্ব সমূহ পালন করে আল্লাহর হক্ক আদায় করা সম্ভবপর হতে পারে। এই উদ্দেশ্যের বাস্তবতা বিধানের জন্যেই আল্লাহ্ তা’আলা মানুষের স্বভাবে কতগুলো মৌলিক দাবি ও কামনা-বাসনা স্পৃহা-প্রবৃত্তি সুসংহত করে জন্মগতভাবেই রেখে দিয়েছেন। এই জিনিসই ব্যক্তি ও সমষ্টি গোটা মানব প্রজাতির স্থিতি ও অব্যাহত অগ্রগতির নিমিত্ত হয়ে আছে। মানুষকে এ কাজের জন্যে বাদ্য করে দেয়া হয়েছে।

তন্মধ্যে একটি হচ্ছে খাবার গ্রহণের ইচ্ছা। মানুষ পেট ভরে খাবার গ্রহণে উদ্যোগী হয় তার স্বাভাবিক ইচ্ছার কারণেই এবং এর ফলেই জীবনে বেচেঁ থাকা তার পক্ষে সম্ভবপর হয়।

দ্বিতীয় হচ্ছে, যৌন ইচ্ছা-কামনা-বাসনা। এরই ওপর মানব প্রজাতির রক্ষা পাওয়া- বংশের ধারা অব্যাহতভাবে নির্ভর করে। মানব প্রকৃতি নিহিত এই স্পৃহা অত্যন্ত তীব্র, শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রণ-অযোগ্য। তার বিশেষত্ব হচ্ছে, তা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের ইচ্ছা-বাসনা হিসেবে চরিতার্থ করতে বাধ্য করতে একান্তভাবে বাধ্যঃ

যৌন স্পৃহা পর্যায়ে মানুষের ভূমিকা

১. মানুষ হয় এ স্পৃহার লাগাম খুলে দেবে। তা যদৃচ্ছ ও যত্রতত্র চরিতার্থ করার পথে কোন নিয়ন্ত্রণ বা সংযম রক্ষা করবে না। এ জন্যে কোন দ্বীনী, নৈতিক বা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বা নিয়ন্ত্রণকে একবিন্দু আমল দেবে না, সবকিছু লংঘন করে যাবে। এ ক্ষেত্রে একটি মত হচ্ছে, সবকিছু করা যাবে, কোন কিছুই নিষিদ্ধ নয়। এ মতের লোকেরা না কোন দ্বীন মানে, না কোন নৈতিক পবিত্রতায় তারা বিশ্বাসী। যৌন স্পৃহা চরিতার্থ করণে এ লোকেরা এই ভূমিকাই অবলম্বন করে। কিন্তু এ ভূমিকা মানুষকে পশু ও জন্তু-জানোয়ারের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আর ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ তথা রাষ্ট্রে সর্বাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে।

২. দ্বিতীয় ভূমিকা এই হতে পারে যে, এ স্পৃহার মুকাবিলা করা হবে, তাকে প্রবল শক্তিতে দমন করা হবে, তাকে সমূলে ধ্বংস করা হবে, যেন এ ইচ্ছাটা কখনই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। কৃচ্ছ সাধনা, বৈরাগ্যবাদ ও সবকিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখার প্রবণতা যাদের, এক্ষেত্রে তারাই উপরিউক্ত ভূমিকা অবলম্বন করে। এই ভূমিকায় এ স্বভাবগত প্রবণতাটাই খতম হয়ে যায়। এ স্পৃহা চরিতার্থ করার জন্যে জন্মগতভাবেই যে ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ স্পৃহা মানব বংশ রক্ষায় যে অবদান রাখতে সক্ষম, উক্ত ভূমিকা তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

৩. তৃতীয় ভূমিকা এই হতে পারে যে, এ স্পৃহা চরিতার্থ করার জন্যে একটা নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা হবে। তা এ নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের সীমার মধ্যে স্বাধীন ও উন্মুক্ত হবে, তাকে নির্মূলও করা হবে না, না পাগলের ন্যায় সীমালংঘনের কোন অনুমতি দেয়া হবে। আসমানী ধর্মসমূহ এই নীতিই করেছে। এ কারণে প্রায় সমস্ত ধর্মেই ব্যভিচার হারাম করা হয়েছে এবং বিবাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থার প্রচলন করেছে। বিশেষত দ্বীন-ইসলাম মানুষের স্পৃহাকে স্বভাবগত শক্তিরূপে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তা হালাল পথে চরিতার্থ করার জন্যে পন্থা উদ্ভাবন করেছে। অবিবাহিত ও নারী সংস্পর্শ পরিহার করে চলার প্রবণতাকে নিন্দা ও নিষেধ করেছে। অপর দিকে জ্বেনা-ব্যভিচার ও তার আনুসঙ্গিক যে যে কাজ মানুষকে সে দিকে টেনে নিয়ে যায়, তা সবই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

বিবেচনা করে দেখলেই স্বীকার করতে হবে যে, ইসলাম অবলম্বিত নীতি ও ভূমিকাই মধ্যম ও সুবিচার ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। কেননা বিবাহের ব্যবস্থা কার্যকর না হলে এ স্বভাবগত শক্তি মানব বংশের ধারা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তার দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম থেকে যেত।  পক্ষান্তরে জ্বেনা-ব্যভিচার হারাম করা না হলে নারীর জন্যে কোন পুরুষের সাথে বিবাহিত হয়ে নির্দিষ্ট হয়ে থাকার ব্যবস্থা দেয়া না হলে সেই পরিবার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারত না, যা প্রেম-প্রীতি প্রণয়-ভালবাসার লীলাকেন্দ্র হয়ে থাকে। এরূপ পরিবার সংস্থা গড়ে না উঠলে সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। সমাজের উন্নতি অগ্রগতিরও কোন সুযোগ আসতে পারে না।

জ্বেনার কাছেও যাবে না

আমরা যখন দেখি, সমস্ত আসমানী দ্বীনই ঐক্যবদ্ধভাবে জ্বেনা-ব্যভিচারকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষিত হয়েছে তখন আমাদের মনে এক বিন্দু বিস্ময়ের উদ্রেক হয় না। ইসলাম হচ্ছে আসমান থেকে অবতীর্ণ সর্বশেষ দ্বীন। এ ব্যাপারে তা খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বন করেছে, নিষেধ করেছে, হারাম ঘোষণা করেছে এবং বংশ সংমিশ্রিত হওয়ার, বংশ বিনষ্ট হওয়ার, পারিবারিক ভাঙন ও বিপর্যয় সূচিত হওয়ার, পারস্পরিক শুভ সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার, সংক্রামক ব্যধির প্রবাল্য সৃষ্টি হওয়ার, লালসার তীব্রতা বৃদ্ধির ও চরিত্র ধ্বংস হওয়ার সমস্ত কারণ সম্পর্কে বিশেষ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। এ জন্যেই আল্লাহ্ তা’আলা শুধু জ্বেনা নিষেধ করেই ক্ষান্ত হন নি, তিনি বলেছেনঃ (আরবী****************)

তোমরা জ্বেনার কাছেও যাবে না। কেননা তা অতন্ত নির্লজ্জতার কাজ এবং খুবই খারাপ পথ। (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৩২)

আমরা দেখছি, ইসলাম যখন কোন কাজকে হারাম করে, তখন সেই হারাম কাজের সব ছিদ্রপথ- যে যে কাজ সেই পর্যন্ত মানুষকে পৌঁছে দেয় তা সবই বন্ধ করে হারাম ঘোষণা করে।

অতএব যেসব কাজ যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে, নারী বা পুরুষকে যা নৈতিক পতনের মুখে নিয়ে যায়, নির্লজ্জ কজে উদ্বুদ্ধ করে কিংবা তার কাছে পৌঁছে দেয়, সে কাজ সহজতর করে দেয়, ইসলাম সেসবই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সম্পূর্ণ হারাম করে দিয়েছে। কেননা হারামের পথ উন্মুক্ত ও সহজসাধ্য হয়ে থাকলে সেই মূল হারাম থেকে রক্ষা পাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভবপর হয় না। বিপর্যয় রোধ করা হয়ে যায় সম্পূর্ণ অসম্ভব।

ভিন মেয়েলোকের সাথে নিভৃতে সাক্ষাৎ হারাম

এ পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, ভিন্ মেয়েলোকের সাথে নিভৃত একাকীত্বে একত্রিত হওয়া এমতাবস্থায় যে, সে মেয়েলোকটি তার বিবাহিতা স্ত্রী নয়, মা-বোন-ফুফু-খালা প্রভৃতি মুহররমও নয়। এটা নিছক কোন অবিশ্বাসের ব্যাপার নয় বরং এরূপ অবস্থায় শয়তানী ওয়াসওয়াসায় পড়ে দুজনই চরিত্র হানিকর কাজে লিপ্ত হতে পারে। তা থেকে তাদের রক্ষা করার ব্যবস্থা এটা। মোমের সূতায় আগুন লাগালে তাপে মোম গলতে থাকাই স্বাভাবিক। দুই ভিন্ মেয়ে-পুরুষ যুবক-যুবতীর নিভৃত একাকীত্বে একত্রিত হতে পারাটাই উভয়কে পারস্পরিক আকর্ষণে একাকার করে দেয়ার অনিবার্য পরিস্থিতির উদ্ভব না হওয়াই বরং অস্বাভাবিক। কেননা তথায় তৃতীয় কেউ নেই। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (সা)-এর বাণী স্মরণীয়। ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী****************)

আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি যার ঈমান আছে সে যেন কোন নারীর সাথে এভাবে নিভৃত একাকীত্বে মিলিত না হয় যে, তথায় কোন মুহাররাম (পুরুষ বা মেয়েলোক) নেই। কেননা এরূপ সময়ে এ দুই জনের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত থাকবে শয়তান। আর শয়তানের কারসাজি তো সকলেরই জানা আছে। (মুসনাদে আহমদ)

নবীর বেগমদের সম্পর্কে কুরআন মজীদের আয়াতঃ (আরবী****************)

তোমরা যদি নবীর বেগমগণের কাছে কোন জিনিস চাও তাহলে পর্দার আড়ালে থেকে চাইবে। তোমাদের ও তাদের অন্তর পবিত্র রাখার জন্যে এ এক উত্তম ব্যবস্থা। (সূরা আহযাবঃ ৫৩)

এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবী লিখেছেনঃ

এ আয়াতে সে সব ভাবধারার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা মেয়েদের জন্যে পুরুষদের মনে ও পুরুষদের জন্যে মেয়েদের মনে স্বভাবতই জেগে ওঠে অর্থাৎ ‍যদি পর্দার আড়ালে থেকে জিনিস চাওয়ার এ নীতি পালন করা হয়, তাহলে কোনরূপ সন্দেহের উদ্রেক হবে না। কেউ কোন মিথ্যা দোষারোপও করতে পারবে না। আর আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্যেও এ ব্যবস্থা অধিক সতর্কতামূলক। এ থেকে একথাও বুঝতে পারা যায় যে, গায়র মুহাররম স্ত্রী লোকের সাথে নিভৃত একাকীত্বে মিলিত হলে নিজেকে বেঁধে না রাখতে পারার আশংকাই বেশি। তাই তা এড়িয়ে চলা উত্তম। এ পর্যায়ে নিজের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করাও সহজ।

এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (সা) স্বামীর নিকটাত্মীয়দের সাথে স্ত্রীর ঘনিষ্ট মেলামেশার ব্যাপারেও সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। স্বামীর ভাই, চাচাতো ভাই ইত্যাদিই স্বামীর নিকটাত্মীয় এবং এদের সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ ক্ষেত্রে প্রায়ই উপেক্ষা অবলম্বন করতে দেখা যায় এবং পরিণতি সম্পর্কে খুব কমই চিন্তা করা হয় অথচ আপন জনের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও ‍নিবিড় একাকীত্ব অধিকতর বিপজ্জনক। এরূপ অবস্থায় পদস্খলন হওয়াও অস্বাভাবিক বা বিরল নয়।

কেননা, ‘আপনজন’ যত সহজে স্ত্রীলোকের ঘরে প্রবেশ করতে পারে- প্রবেশ করলে কারো কিছু বলার থাকে না- সম্পূর্ণ অনাত্মীয় ও অপরিচিত জনের পক্ষে ততটা সহজ নয়।

স্ত্রীর নিজের অ-মুহাররম নিকটাত্মীয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও এই কথা। তর চাচাতো ভাই, খালাতো-মামাতো ভাই এ পর্যায়ে গণ্য। কাজেই এদের মধ্যে কারো সাথে একাকীত্বে মিলিত হওয়া জায়েয নয়। নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবী****************)

তোমরা ভিন্ মেয়েলোকদের ঘনিষ্ঠ একাকীত্বে প্রবেশ করবে না। একজন আনসারী সাহাবী বললেনঃ হে রাসূল! আপনি স্বামীর নিকটাত্মীয়দের সম্পর্কে কি বলেন? রাসূলে করীম (সা) বললেনঃ স্বামীর নিকটাত্মীয়রা মৃত্যু সমতুল্য।

অর্থাৎ এই ঘনিষ্ট একাকীত্ব বিপদ ও ধ্বংস ডেকে আনে। গুনাহ যদি সঙ্ঘটিত হয়েই যায় তাহলে তো দ্বীনের দিক দিয়ে ধ্বংস হলো, আর স্বামী তা জানতে পেরে তাকে তালাক দিয়ে দিলে দাম্পত্য জীবনের বিপর্যয় শুরু হয়ে গেল। উপরন্তু নিকটাত্মীয়দের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, খারাপ ধারণা ও অনাস্থা এসে গেলে সামাজিক-সামস্টিক জীবনের সম্পর্ক-বন্ধন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। আর এ এক সর্বাত্মক বিপর্যয় সন্দেহ নেই।

সত্য কথা এই যে, ভিন্ পুরুষ নারীর নিভৃতে একাকীত্বে মিলিত হওয়ার প্রভাব শুধু মানুষে হৃদয়বেগ ও চিন্তা-ভাবনার ওপরই পড়ে না, গোটা পরিবার, স্বামী-স্ত্রী- দাম্পত্য জীবনের স্থিতি এবং তাদের পারস্পরিক গোপন কথাবার্তা ইত্যাদি সব কিছুর ওপরই তার তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। উপরন্তু তা থেকে মিথ্যা দোষারোপকারী ও বকবককারী লোকদের পক্ষে ভিত্তিহীন কথা বলার একটা বিরাট সুযোগ জুটে যায়। এ ধরনের লোকদের লক্ষ্য দাম্পত্য জীবনের স্থিতি নিয়ে আসা নয়; ভাঙন বিপর্যয় সৃষ্টি করা মাত্র।

ইবনুর আমীর বলেছেন, আরবরা যেমন বলে  (আরবী****************) (সিংহই মৃত্যু), বলে, (আরবী****************) (প্রশাসক আগুল), অর্থাৎ এ দুটো জিনিসের সাথে সাক্ষাৎ মানুষের জন্যে মৃত্যু ও আগুনের সাথে সাক্ষাতের সমান; তেমনি তারা বলে (আরবী****************) (স্বামীর নিকটাত্মীয় মৃত্যু তুল্য) অর্থাৎ স্বামীর নিকটাত্মীয়দের সাথে নিভৃত মিলিত হওয়া নিতান্ত অপরিচিত-অনাত্মীয় পুরুষের সাথে নিভৃত মিলিত হওয়ার তুলনায় অধিক মারাত্মক ও বিপজ্জনক। কেননা তারা অনেক সময় স্ত্রীর মনে এমন এমন জিনিসের চাহিদা সৃষ্টি করে দেয়, যা সংগ্রহ করে দেয় স্বামী-বেচারার পক্ষে বড়ই কঠিন ও দুষ্কর হয়ে থাকে। অনেক সময় তারা খারাপ আচরণ করতে উদ্ধত হয়ে থাকে। তা ছাড়া স্বামীর আত্মীয়-স্বজন তার অনুপস্থিতিতে তার ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তার গোপন অবস্থার তত্ত্ব জেনে যাবে, তা সে আদৌ পছন্দ করতে পারে না।

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি লালসার দৃষ্টিতে তাকান

পুরুষ ভিন্ স্ত্রীলোকের ওপর দৃষ্টিপাত করবে কিংবা নারী ভিন্ পুরুষের প্রতি, ইসলাম এ ব্যাপারটিকে হারাম ঘোষণা করেছে। কেননা চক্ষু হৃদয়ের কুঞ্চিকা। দৃষ্টি বিপর্যয়ের আগাম সংবাদদাতা শক্তি, তা-ই জ্বেনার বার্তা বহনকারী। একজন প্রাচিন আরব কবি বলেছেনঃ (আরবী****************)

সর্বপ্রকার দুর্ঘটনার সূচনা দৃষ্টি থেকেই হয়। সামান্য ষ্ফুলিঙ্গ থেকেই সর্বগ্রাসী অগ্নিকুণ্ডলি জ্বলে উঠে।

এ কালের একজন কবি বলেছেনঃ (আরবী****************)

প্রথমে দৃষ্টি, পরে মিষ্টি স্মিত হাসি, তারপরে অভিবাদনের বিনিময়। তারপরে কথাবার্তা, তারপরে ওয়াদা প্রতিশ্রুতি আর শেষে সাক্ষাতকার।

এ করণে আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত মুমিন নারী-পুরুষকে পারস্পরিক চক্ষু নত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, সেই সাথে দিয়েছেন লজ্জাস্থানের পবিত্রতা সংরক্ষণ করার হুকুম। বলেছেনঃ (আরবী****************)

মুমিন পুরুষদের বল তাদের দৃষ্টি নত রাখতে ও তাদের লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করতে। এ নীতিই তাদের জন্যে পবিত্রতার। তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ্ খুবই অবহিত। অনুরূপভাবে ঈমানদার মহিলাদের বল তাদের দৃষ্টি নত রাখতে ও তাদের লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করতে।

এ  দুটি আয়াতে নারী ও পুরুষ উভয়কেই নিজেদের দৃষ্টি নত রাখতে ও লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দৃষ্টি নত রাখার জন্যে দেয়া নির্দেশের কুরআনে উদ্ধৃত ভাষা হচ্ছেঃ (আরবী****************) অর্থাৎ গোটা দৃষ্টি নত রাখার নয়, কোন কোন দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ পর্যায়ে কোন কোন অংশের কথা বলা হয়নি, সম্পূর্ণ ও সমগ্রভাবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছ। কেননা শরীয়তের তাই কাম্য। কিন্তু দৃষ্টির ব্যাপারটি ভিন্নতর। প্রয়োজন পূরণ, বিপদ দূরীকরণ ও কল্যাণের পথ দেখার অপরিহার্যতার জন্যে আল্লাহ্ তাতে বিশেষ নম্রতা ও উদারতা দেখিয়েছেন। কিন্তু লজ্জাস্থানের ব্যাপারে এরূপ নয়।

অতএব কোন দৃষ্টি নত রাখার অর্থ এ নয় যে, মানুষকে চোখ বন্ধ করে নিতে হবে কিংবা মাথা মাটির দিকে এমনভাবে নুইয়ে নিতে হবে যে, মাটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। আয়াতের বক্তব্যও তা নয়। আর তা সম্ভবপরও নয়। সূরা লুকমানের ১৯ আয়াতে বলা হয়েছেঃ (আরবী****************) –এবং নিম্ন কর তোমার কোন কোন কণ্ঠধ্বনি।’ এ আয়াতে মুখ বন্ধ করে রাখতে বলা হয়নি, কণ্ঠের সব রকমের আওয়াজই যে ক্ষীণ হতে হবে এমন কথাও নয়। (আরবী****************) –এর অর্থ দৃষ্টিকে যথেচ্ছ বিচরণ করতে দেবে না, কাছাকাছি সব কিছুর ওপর দৃষ্টি পড়া বাঞ্ছনীয় নয়। কাজেই বিপরীত লিঙ্গের ওপর দৃষ্টি পড়লে- না দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করে তার সৌন্দর্য-সুদা পান করায় লিপ্ত হবে, না ঘুরে ফিরে বারে বারে তাকে দেখবে। এ-ই হচ্ছে আয়াতের আসল বক্তব্য।

রাসূল করীম (সা) হযরত আলী (রা)-কে বলেছেনঃ (আরবী****************)

হে আলী, দৃষ্টির পর দৃষ্টি ফেলবে না। তুমি প্রথমবারই দেখতে পার, তারপর দ্বিতীয় বার নয়। (আহমদ, আবূ দাঊদ, তিরমিযী)

বিপরীত লিঙ্গের ওপর লোভী কামুক দৃষ্টিতে তাকানকে চোখের জ্বেনা বলেছেন। হাদীসের ভাষায় হচ্ছেঃ (আরবী****************)

চোখদ্বয়ও ব্যভিচার করে। আর তা হচ্ছে দৃষ্টিপাত। (বুখারী)

‘দৃষ্টিপাত’ কে জ্বেনা বলেছেন এজন্যে যে, তাতেও এক প্রকারের স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ ঘটে। আর এ উপায়ে শরীয়ত-বিরোধী পন্থায় যৌন স্পৃহা চরিতার্থ করা হয়। ইনজীরে উদ্ধৃত হযরত ঈসার মুখ থেকেও অনুরূপ উক্তি রয়েছেঃ

আগে থেকে তোমাদের বলা হচ্ছিল যে, জ্বেনা করবে না, কিন্তু আমি বলছি, যে নিজ চোখ দিয়ে দেখল, সে জ্বেনা-ই করল।

এই লোভী লালসাপংকিল দৃষ্টি কেবল চারিত্রিক পবিত্রতা ও সতীত্বের জন্যেই বিপদজ্জনক নয়, মনের একনিষ্ঠতা ও হৃদয়ের শান্তি-স্বস্তির পক্ষেও তা খুবই ক্ষতিকর। কেননা তাতে মনে চরম অস্বস্তি ও অস্থিরতার সৃষ্টি হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ হারাম

ইসলামে দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ এক সাধারণ নির্দেশ। তাই লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত হলে সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কেননা নবী করীম (সা) লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে নিষেধ করেছেন, তা কোন পুরুষের লজ্জাস্থান হোক কিংবা স্ত্রীলোকের, যৌন স্পৃহা সহকারে হোক কিংবা তা ছাড়াই এবং এ নির্দেশ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবী****************)

কোন পুরুষ অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে এবং কোন নারী অপর নারীর লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে না। এবং এক কাপড়ে কোন পুরুষ অপর পুরুষের সঙ্গে এক নারী অপর নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবে না।

পুরুষের লজ্জাস্থান বলতে বোঝায় নাভি থেকে হাটু পর্যন্তকার দেহাংশ। এ দিকে কোন পুরুষ বা মেয়েলোকের নজর দেয়া জায়েয নয়। অবশ্য ইবনে হাজম প্রমুখ কতিপয় ইমামের মতে উরু এর মধ্যে গণ্য নয়।

আর নারীর লজ্জাস্থান ভিন্ পুরুষের জন্যে মুখমণ্ডল ও দুই হাতের পাঞ্জাদ্বয় ব্যতীত সমগ্র দেহ। আর মুহাররম পুরুষের জন্যে- যেমন তার পিতা, ভাই- স্ত্রীলোকের লজ্জাস্থান সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করব।

পরন্তু দেহের যে অংশ লজ্জাস্থান বলে চিহ্নিত, যার প্রতি অপর কারো দৃষ্টিপাত জায়েয নয়, তা হাত বা দেহাংশ দিয়ে স্পর্শ করাও অপরের জন্যে জায়েয নয়।

লজ্জাস্থান দেখা বা স্পর্শ করা সম্পর্কে এই যা কিছু বলা হলো তা সাধারণ অবস্থার কথা- যখন বাস্তবিকই কোন প্রয়োজন দেখা দেয় না। কিন্তু যদি সত্যিই কোন প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে তখন তা হারাম হবে না; যেমন চিকিৎসা বা রিলিফ করা কালে এ প্রয়োজন দেখা দিয়ে থাকে। আর দৃষ্টিদান জায়েয বলে যা বলা হলো, তা এ শর্তে যে, এরূপ দৃষ্টিদানে কোনরূপ বিপদ ঘটার কারণ হবে না। অন্যথায় দৃষ্টিদানের অনুমতি নকচ হয়ে যাবে। কেননা মূল পাপের পথ বন্ধ করা শরীয়তের একটা প্রধান নিয়ম।

পুরুষ বা নারীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ

উপরে যা বলা হল তা থেকে এ কথাটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, পুরুষের লজ্জাস্থান বহির্ভূত- নাভি থেকে হাটু পর্যন্ত ছাড়া- দেহের অন্যান্য অংশের ওপর নারীর দৃষ্টি নিক্ষেপ জায়েয হবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ তাতে কোনরূপ যৌন স্পৃহা না জাগবে বা কোন ধরনের বিপদের আশংকা না থাকবে। রাসূলে করীম (সা) হযরত আয়েশা (রা)-কে হাবশীদের প্রতি তাকানোর অনুমতি দিয়েছিলেন, তারা তাদের অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মসজিদে নববীতেই খেলা দেখাচ্ছিল। ফলে তিনি তাদের প্রতি পর্দার আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখছিলেন। পরে তিনি নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়লে সেখান থেকে চলে গেলেন। (বুখারী, মুসলিম)

নারীর লজ্জাস্থান বহির্ভূত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ- মুখমণ্ডল ও দুই হাতের পাঞ্জার প্রতি পুরুষের তাকান জায়েয, যদি তাতে কোনরূপ যৌন লালসার সংমিশ্রণ না থাকে কিংবা পাপ সঙ্ঘটিত হওয়ার আশংকা না থাকে।

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হযরত আসমা বিনতে আবূ বকর (রা)- তাঁর বোন- নবী করীম (সা)-এর সম্মুখে হাযির হলেন। তার পরনে এমন পাতলা কাপড় ছিল যে, তা দিয়ে তাঁর দেহের কান্তি প্রস্ফূটিত হচ্ছিল। নবী করীম (সা) তা দেখে দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ (আরবী****************)

হে আসমা, মেয়েলোক যখন পূর্ণ বয়স্ক হয়ে যায়, তখন তার মুখমণ্ডল ও হাতের পাঞ্জাদ্বয় ব্যতীত দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোন কিছুই দৃশ্যমান হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। (আবূ দাঊদ)

হাদীসটি যদিও সূত্রের বিচারে দুর্বল, কিন্তু এ পর্যয়ে বহু কয়টি সহীহ হাদীসে বিহদের আশংকা না থাকলে মুখমণ্ডল ও হাতের পাঞ্জাদ্বয়ের ওপর দৃষ্টিপাত জায়েয হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে বলে উক্ত হাদীসটির সে দুর্বলতা দূর হয়ে গেছে।

সারকথা হচ্ছে, পুরুষ বা নারীর লজ্জাস্থান বহির্ভূত অঙ্গের প্রতি নির্দোষ দৃষ্টিপাত জায়েয এবং হালাল। তবে বারবার তাকানো এবং সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে স্বাদ নিয়ে তাকানো জায়েয নয়। কেননা তাতেই বিপদ সঙ্ঘটিত হওয়ার আশংকা রয়েছে।

তবে যে অঙ্গ দেখা হালাল নয় তার দিকে আকস্মিকভাবে দৃষ্টি পড়ে যাওয়ায় কোন দোষ ধরা হবে না। এটা ইসলামের উদারতা। হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ (আরবী****************)

রাসূলে করীম (সা)-কে আকস্মিক দৃষ্টি পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ তোমার দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নাও।

অর্থাৎ সে একবারের পর দ্বিতীয়বার তাকাবে না।

নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ সমস্যা

উপরে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। দুটো আয়াতে এ পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যে বিধান দেয়া হয়েছে। এর তৃতীয় আয়াতটিতে নারীদের জন্যে বিশেষভাবে একটি নের্দেশের উল্লেখ হয়েছে। নির্দেশটি এইঃ (আরবী****************)

তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। তবে যা স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে তার কথা স্বতন্ত্র। (সূরা নূরঃ ৩১)

নারীর ‘সৌন্দর্য’ বলতে সেসব জিনিসই বোঝায়, যা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিতা ও রূপসী বানিয়ে দেয়। এর মধ্যে মুখমণ্ডল, কেশদাম ও দৈহিক লালিমা প্রভৃতি জন্মগত সৌন্দর্য শামিল রয়েছে। যেমন রয়েছে কাপড়, অলংকার ও প্রসাধনী দ্রব্যাদি প্রভৃতি দ্বারা অর্জিত সৌন্দর্য ও রূপ-মাধুর্য। আল্লাহ্ তা’আলা পূর্বোদ্ধৃত আয়াতটিতে নারীদের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখতে, প্রকাশ হতে না দিতে। তা থেকে বাইরে থাকছে শুধু তা যা স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে।

এই স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে বলতে কি বোঝায়, তা নির্ধারণে বিভিন্ন তাফসীরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে’ বলতে প্রয়োজনের কারণে কোনরূপ ইচ্ছা ছাড়াই যা প্রকাশ হয়ে পড়ে তা-ই কি বোঝায়? যেমন বাতাসের ঝাপটায় কোন কিছু প্রকাশ হয়ে পড়ল? অথবা তার অর্থ হবে, সাধারণত ও অভ্যাসবশত যা প্রকাশিত হয়? …..এ ব্যাপারে আসল কথা হচ্ছে প্রকাশিত হওয়া।

পূর্বকালের মনীষীদের মধ্যে অধিকাংশ লোক এ শেষোক্ত মতই পোষণ করতেন বলে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ‘যা স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে’ অংশের তাফসীরে বলেছেন, তা হচ্ছে চোখের সুরমা, কাজল, পাউডার, অঙ্গুরীয় প্রভৃতি। হযরত আনাস (রা) থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে।

চোখে সুরমা লাগান ও আঙ্গুলে আঙ্গুরীয় পরিধান করা মুবাহ্। সেজন্যে এ দুটো স্থানের প্রকাশ পাওয়া অনিবার্য। আর তা হচ্ছে মুখমণ্ডল ও পাঞ্জাদ্বয়। হযরত সায়ীদ ইবনে জুবাইর, আতা, আওযায়ী প্রমুখ থেকেও এরূপ মতই বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আয়েশা ও কাতাদাহ প্রমুখ দুহাতের কংকনকেও এর মধ্যে শামিল করেছেন। যে সৌন্দর্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, বাহুর সে অংশ তা থেকে বাদ পড়ে যায়। মুষ্টি থেকে অর্ধেক বাহু পর্যন্ত সীমা নির্ধারণে মতের বিভিন্নতা বিদ্যমান।

এ প্রশস্ততার বিপরীত অন্যরা সংকীর্ণতার অবতারণা করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ ও নখয়ী প্রমুখ ‘যা স্বতঃই প্রকাশিত হয়ে পড়ে’ কথাটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, তা হচ্ছে চাদর ও কাপড়, যা দেহের বাইরে পরা হয়। কেননা তা গোপন করা ও ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।

তবে সাহাবী ও তাবেয়ীনের অনেকে ‘যা স্বতঃই প্রকাশিত হয়ে পড়ে’ কথাটির ভিত্তিতে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তা হচ্ছে মুখমণ্ডল ও দুই পাঞ্জা এবং এ ছাড়া যে সৌন্দর্য থাকবে না, তা। আর আমি এ সবকেই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করি। হাতের আঙ্গুরীয় ও চোখের সুরমা ইত্যাদি এর মধ্যে গণ্য।

সিঁদুর, পালিশ, পাউডারের ব্যাপারটি এ থেকে ভিন্নতর। একালের মেয়েরা এসব কপোল, ওষ্ঠাধর ও নখে ব্যবহার করে। কিন্তু তা খুব অবাঞ্ছনীয় বাড়াবাড়ি। এসব শুধু ঘরের মধ্যেই ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু অধুনা মেয়েরা ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় পুরুষদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে এসব ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এ কাজটি সম্পূর্ণ হারাম। ‘যা স্বতঃই প্রকাশিত হয়’-এর অর্থে শুধু চাদর বা বোরকা প্রভৃতি বাহ্যিক জিনিসগুলোই বোঝান হয়েছে’ মনে করা সমীচীন নয়। কেননা এসব কাপড়ের প্রকাশিত হওয়া তো একটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার, প্রকাশ না হয়েই পারে না। তাই তা গোপন করার কোন আদেশ হতেই পারে না। আর শুধু ‘বাতাসের ধাক্কায় যা প্রকাশিত হয়ে পড়ে’ মনে করাও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এতে মানুষের কোন দখল নেই। কাজেই সে বিষয়ে কিছু বলা-না-বলা সমান। ঐ কথাটি দ্বারা যা সহজেই বুঝতে পারা যায়, তা হচ্ছে, যা লুকানো যায়, প্রকাশ করার ব্যাপারে এগুলো বাদ যাবে। ঈমানদার মহিলাদের জন্যে এটা একটা সুবিধা দান পর্যায়ের কথা। আর এ সুবিধাদান যে মুখমণ্ডল ও কবজিদ্বয় সম্পর্কেই থাকা উচিত, তা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত কথা।

মুখমণ্ডল ও পাঞ্জাদ্বয় সম্পর্কে এ সুবিধাদানের যৌক্তিকতা অনুধাবন করতে হবে। কেননা এ দুটো সব সময় লুকিয়ে রাখা মেয়েদের জন্যে খুবই কষ্টকর। বিশেষ করে বৈধ প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হলে তখন যে এ দুটো অংশ প্রকাশ করা জরুরী হয়ে পড়ে তা অস্বীকার করা যায় না। যেমন বিধাবা মেয়েলোকের পক্ষে তার ইয়াতীম সন্তানদের জন্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করা এবং দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের তাদের স্বামীদের সাহায্যার্থে বাইরে বের হতে হলে মুখমণ্ডল ও কবজি উন্মুক্ত করা তো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরূপ অবস্থায় মুখমণ্ডল ও কবজিদ্বয় আবৃত করা হলে চলাফেরা করা বড়ই কঠিন ও কষ্ঠকর হয়ে পড়বে।

ইমাম কুরতুবী বলেছেনঃ

চেহারা ও কবজিদ্বয় সাধারণতঃ বিশেষ করে নামায, হজ্জ, উমরা প্রভৃতি ইবাদত করার সময়- খুলেই যায়। তাই ‘তবে স্বতঃই যা প্রকাশিত হয়ে পড়ে’ বলে এসব অঙ্গ আবৃত রাখার নির্দেশের বাইরে রাখা হয়েছে বলে মনে করাই অধিকতর যথার্থ কথা। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস এ কথাই বলে। হাদীসটি এই (পূর্বেও উদ্ধৃত হয়েছে) : (আরবী****************)

হযরত আবূ বকর (রা)-এর কন্যা আসমা নবী করীম (সা)-এর সমীপে উপস্থিত হলে- তার পরনে ছিল পাতলা কাপড়। রাসূলে করীম (সা) তাঁর ‍দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ হে আসমা! মেয়েলোক পূর্ণ বয়স্কা হয়ে গেলে তার দেহের মুখমণ্ডল ও কবজিদ্বয় ছাড়া আর কিছুই দৃশমান হওয়া উচিত নয়।

আল্লাহ্ তা’আলার নিম্নোক্ত কথাটি থেকেও উপরিউক্ত কথারই সমর্থন মেলেঃ (আরবী****************)

মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের চোখ নিম্নমুখী রাখে। (সূরা নূরঃ ৩০)

এ থেকেই বোঝা যায় যে, মেয়েদের মুখমণ্ডল আবৃত নয়- উন্মুক্ত- বলেই পুরুষদের বলা হয়েছে চোখ নিম্নমুখী রাখতে অর্থাৎ সে মুখের দিকে তাকাবে না।

কেননা সমস্ত দেহসহ মুখমণ্ডলও যদি আবৃত থাকে তাহলে চোখ নীচু রাখতে বলার কোন অর্থ হয় না। কেননা ওখানে দেখবার মতো তো কিছুই নেই।

এতদসত্ত্বেও মুসলিম নারী তার যাবতীয় সৌন্দর্য-অলংকার লুকিয়ে রাখার জন্যে প্রাণপণে চেষ্টা করা কর্তব্য। এমনকি মুখমণ্ডলও উন্মুক্ত করা উচিত নয়। কেননা ‍মুখমণ্ডল দেখেই তা নৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা হয়। এ যুগে খোদাদ্রোহিতার ব্যাপক প্রচলন এ প্রয়োজনকে আরও তীব্র করে দিয়েছে। নারী-সুন্দরী রূপসী হলে তো মুখমণ্ডলকে ঢেকে রাখা ছাড়া অন্য কোন কথা চিন্তাই করা যায় না। কেননা নারী মুখের রূপ-সৌন্দর্যই পুরুষকে আকৃষ্ট করে সবচাইতে বেশি।

(আরবী****************)

এবং নিজেদের বক্ষদেশের ওপর নিজেদের দোপাট্রার আচঁল চেপে রাখেবে।

মুসলিম নারীকে তার দোপাট্টা দ্বারা তার মাথা ঢেকে রাখতে হবে, মাথার উপর আবরণ চাপিয়ে রাখবে, যে-কোন ধরনের কাপড় দ্বারা সম্ভব হোক তার বক্ষকে অবশ্যই আবৃত করে রাখবে। যেন এসব বিপদ সৃষ্টিকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনাবৃত হয়ে ন যায় এবং দুষ্ট লোকদের সন্ধানী দৃষ্টি ও মৌমাছিদের লোলুপ চোখ সে সবের ওপর পড়তে না পারে।

(আরবী****************)

এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না তাদের স্বামী ও পিতাদের ছাড়া অন্য কারো সামনে। (সূরা নূরঃ ৩১)

এ আদেশ মুমিন নারীদের গোপন সৌন্দর্য ভিন্ পুরুষেদের সম্মুখে প্রকাশ না করতে বরং লুকিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। এ গোপন সৌন্দর্য বলতে কান, চুল, গ্রীবা, ঘাড়, বুক, পায়ের নালা ইত্যাদি বোঝায়। ভিন্ পুরুষদের সম্মুখে মুখমণ্ডল ও পাঞ্জাদ্বয় প্রকাশ করার অনুমতি দেয়া সত্ত্বেও এ নিষেধ বাণী উচ্চারিত হওয়া খুবই গুরুত্ববহ।

বারো শ্রেণীর মানুষকে এ নিষেধবাণীর বাইরে রাখা হয়েছেঃ

১. তাদের স্বামী। অতএব স্বামীর পক্ষে স্ত্রী দেহের যে কোন অঙ্গ দেখা সম্পূর্ণ জায়েয। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী****************)

তোমার লজ্জাস্থান তোমান স্বামী ছাড়া আর সকলের থেকে রক্ষা কর- আবৃত রাখ।

২. পিতা, দাদা, পরদাদা এর মধ্যে শামিল, তা বাবার দিক থেকে হোক কিংবা মার দিকে থেকে।

৩. স্বামীর পিতা, তার নিজের পিতার সমান।

৪. তাদের পুত্র, তাদের সন্তানের পুত্ররা- মেয়েরাও এর অন্তর্ভুক্ত।

৫. স্বামীর পুত্র- এ এক অনিবার্য ব্যাপার। তাছাড়া সে ঘরে এদের জন্যে মা স্বরূপই বটে।

৬. তাদের ভাই আপন ও সৎ-এক মা বা এক পিতার সন্তান হিসেবে।

৭. ভাইয়ের পুত্র, কেননা ফুফু-ভাতিজার মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ হারাম।

৮. বোন-পুত্র কেননা খালা-বোন পুত্রের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে হারাম।

৯. তাদের নারীকুল। আপন আত্মীয়া নারী-বংশের দিক দিয়ে আপন কিংবা দ্বীনের দিক দিয়ে, সকলের সাথে অবাধ সাক্ষাৎ চলতে পারে। তবে অমুসলিম নারীদের মুসলিম নারীর সৌন্দর্য দেখান জায়েয নয়। শুধু ততটুকুই দেখান যেতে পারে, যতটা ভিন্ পুরুষকে দেখান যায়।

১০. ক্রীতদাস-দাসী। কেননা ইসলাম তাদের পরিবারের অঙ্গ বানিয়ে দিয়েছে। কোন কোন ইমামের মতে এ অনুমতি কেবল দাসীদের বেলায়, দাসদের বেলায় নয়।

১১. অধীন ও প্রয়োজনহীন পুরুষ। এরা একে তো অধীন, দ্বিতীয়তঃ এদের নারীর প্রতি কোন বিশেষ আকর্ষণ নেই- হয় শারীরিক অক্ষমতার কারণে কিংবা বুদ্ধি-বিবেকের দিক দিয়ে অপরিপক্ক হওয়ার কারণে। সাধারণ বেতনভুক কর্মচারী যারা বাড়ির কাজকর্ম করে ও ঘরে আসা যাওয়া করতে বাধ্য হয়, অথচ যৌন আকর্ষণ না থাকার দরুন কোনরূপ বিপদের আশংকাও নেই।

১২. যেসব বালক এখনও নারীর লজ্জাস্থানের প্রতি কোন আকর্ষণ লাভ করে নি। ওরা বয়সে ছোট, নাবালেগ, যৌন চেতনা জাগানি এখনও। সে চেতনা জেগেছে বলে টের পেলে নারীর গোপন সৌন্দর্য তাদের সম্মুখে উন্মক্ত করা জায়েয নয়। পূর্ণ বয়স্ক না হলেও নয়।

কুরআনের আয়াতে চাচা ও মামার উল্লেখ করা হয়নি। কেননা তারা পিতার সমতুল্য। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী****************)

চাচা পিতার সমতুল্য

নারীদের সতর

পূর্বকর্তী আলোচনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি, নারীদেহের যে যে অংশ প্রকাশ করা জায়েয নয়, তা-ই তার লজ্জাস্থান এবং তা ঢেকে রাখা ওয়াজিব, তা উন্মুক্ত রাখা সম্পূর্ণ হারাম।

অতএব ভিন্ পুরুষদের সম্মুখে এবং অমুসলিম নারীদের ক্ষেত্রেও- নারীর মুখমণ্ডল ও কবজিদ্বয় ব্যতীত সমস্ত দেহই লজ্জাস্থান- অবশ্যই আবৃত রাখতে হবে। মুখমণ্ডল ও কবজিদ্বয় যেহেতু কাজকর্ম গ্রহণ-দান ইত্যাদি কাজের জন্যে উন্মুক্ত রাখা অপরিহার্য এ কারণে তা অনাবৃত রাখা জায়েয যেনম ইমাম রাযী লিখেছেন। এ ছাড়া দেহের যে অঙ্গ উন্মুক্ত রাখা বা করা জরুরী নয়, তা ঢেকে রাখার জন্যে আদেশ করা হয়েছে। স্বভাবগতভাবে যা উন্মুক্ত রাখা হয় এবং যা প্রকাশ করার প্রয়োজন দেখা দেয় তা খুলে রাখার অনুমতি দেয় হয়েছে। কেননা ইসলামী শরীয়তের বিধান ভারসাম্যপূর্ণ, মানব কল্যাণমুখী। ইমাম রাযী লিখেছেনঃ

মুখমণ্ডল ও পাঞ্জাদ্বয় প্রকাশ করা অপরিহার্য বলে তা নারীদের গোপন অঙ্গের মধ্যে গণ্য নয় বলে সকলেই ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তবে পা উন্মুক্ত রাখা অপরিহার্য নয়। তাই তা নারীর গোপন অঙ্গের মধ্যে গণ্য কিনা- এ নিয়ে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। (আরবী****************)

সূরা নূর-এর আয়াতে যেমন বলা হয়েছে, উপরিউক্ত বারো শ্রেণীর পুরুষদের ক্ষেত্রে কান, ঘাড়, চুল, বুক, বাহুদ্বয় ও নলাদ্বয় ব্যতীত সমস্ত অঙ্গ আবৃত করে রাখতে হবে। তাদের সম্মুখে এ সব অঙ্গ প্রকাশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে শরীয়তে। এ ছাড়া দেহের অন্যান্য অঙ্গ ও অংশ যেমন পিঠ, পেট, লিঙ্গস্থান, উরুদ্বয় প্রভৃতি স্বামী ছাড়া অপর কোন পুরুষ বা নারীর সম্মুখে উন্মুক্ত করা একেবারেই জায়েয নয়।

আয়াতের এ তাৎপর্য কয়েকজন ইমামের মতের খুবই নিকটবর্তী। মুহাররম পুরুষদের জন্যে নারীর লজ্জাস্থান শুধু নাভি ও হাটুর মধ্যবর্তী অংশ। অন্য নারীদের জন্যেও এই পর্যন্তই সীমা। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে নারীর লজ্জাস্থান মুহাররম পুরুষের জন্যে শুধু এতটুকু যতটা কাম-কাজ করার সময়ও উন্মুক্ত হয় না। ঘরে কাজ-কাম করার সময় নারীদেহের যেসব অংশ সাধারণত উন্মুক্ত থাকে, মুহাররম পুরুষদের সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করাও নাজায়েয নয়।

মু’মিন নারীদের প্রতি আল্লাহর নির্দেম হচ্ছে, তারা যখন ঘরের কাজে বইরে যাবে তখন একটি বড় চাদর দ্বারা সমস্ত দেহ আবৃত করে নেবে। এর ফলে অন্যান্য কাফির ও খারপ চরিত্রের নারীদের থেকে তাদের স্বাতন্ত্র্য সকলেরই সম্মুখে প্রতিভাত হবে। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নবীকে উম্মতের সকলকে একথা জানিয়ে দেয়ার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী****************)

হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিন নারীদের বলে দিন যে, তারা যেন তাদের দেহের ওপর চাদর ফেলে রাখে। এ এক উত্তম পন্থা। এর ফলে তাদের চেনা যাবে এবং তাদের কেউ জ্বালাতন করবে না।

(আরবী****************) বহু বচনের শব্দ। এক বচনে (আরবী****************) তার অর্থ প্রশস্ত কাপড়। এ কালের বোরকা এ পর্যায়ে পড়ে।

জাহিলিয়াতের যুগে নারীরা যখন ঘর থেকে বাইরে যেত, তখন নিজেদের কোন কোন সৌন্দর্য- বুক, ঘাড়-গলা, চুল প্রভৃতি খোলা রাখত। দুষ্ট চরিত্রের লোকেরা তাদের পিছে লেগে যেত। এ অবস্থায় এ আয়াত নাযিল হয়েছে। এতে মুমিন নারীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা তাদের চাদরের একাংশ