ইসলামে হালাল হারামের বিধান

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

পোশাক পরিচ্ছদ

মুসলমান আল্লাহর সৃষ্টি করা সৌন্দর্য পোশাক ও উত্তম পরিচ্ছদ ব্যবহার করে নিজের আকার-আকৃতি, ছবি-সুরত সৌন্দের্যমণ্ডিত করবে, ইসলামে তা শুধু জায়েযই নয়, তা পুরোপুরি কাম্যও বটে।

ইসলাম পোশাক দ্বারা দুটো লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। একটি হচ্ছে লজ্জাস্থান আবৃতকরণ আর দ্বিতীয়টি সৌন্দর্য লাভ। আল্লাহ তাআলা জাতির জন্যে পরিচ্ছদ ও সৌন্দর্য সামগ্রীর সুব্যবস্থা করে বিরাট অনুগ্রহ করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন :

(আরবী*********************)

হে আদম সন্তান ! আমরা তোমাদের জন্যে পোশাক পরিচ্ছদ নাযিল করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং তোমাদের ভূষণও। পোশাকের উদ্দেশ্যে লজ্জাস্থান আবৃতকরণ এবং ভূষণ- এ দুয়ের মধ্যে অবশ্যই সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য স্থাপন ও রক্ষা করতে হবে। এ ভারসাম্য নষ্ট করা হলে ইসলামের রাজপথ পরিহার করে শয়তানী পথ অবলম্বন করা হবে। এ এক অতীব গুরুত্বপূর্ন তত্ত্ব। নিম্নোদ্বৃত আয়াতে আল্লাহ তাআলা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে নগ্নতা ও সৌন্দর্যহীনতার পথ অবলম্বন করতে সুস্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন : (আরবী*********************)

হে আদম সন্তান! শয়তান যেন তোমাদের বিপদে নাফেলে, যেমন করে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত করেছিল এবং তাদের পোশাক তাদের গাত্র থেকে খসিয়ে নিয়েছিল, যেন তাদের লজ্জাস্থানসমূহ তাদের সমুখে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। (সুরা আল-আরাফ : ২৭)

অপর আয়াতে বলেছেন : (আরবী*********************)

হে আদম সন্তান! তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর প্রতিটি মসজিদের উপস্থিতিকালে এবং খাও, পান কর, কিন্তু সীমালংঘন করো না। (সূরা আল-আরাফ :৩১)

সুসভ্য মানুষ তার দেহের যেমন গোপন অঙ্গ উলঙ্গ করতে লজ্জাবোধ করে, তা আবৃত এবঙ ন্যাংটা পশুদের থেকে স্বতন্ত্র ছবি-সুরত গ্রহণ করাকে ইসলাম মুসলিম মাত্রের জন্যেই ফরয করে দিয়েছে। ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে নির্জন একাকিত্বও লজ্জাস্থান আবৃত করে রাখবে, যেন লজ্জা-শরম মানুষের অভ্যাস ও স্বাভাবগত ভূষণে পরিণত হয়।

বহজ ইবনে হাকীম তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন : (আরবী*********************)

আমি বললাম, হে রাসূল ! আমরা আমাদের সতরের ব্যাপারে কতটা সতর্কতা অবলম্বন করব? আর কতটা নয়? রাসল বললেন, তোমার লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ কর- নিজ স্ত্রী ও ক্রিতদাসী ছাড়া- অন্য সকলের থেকেই। আমি বললাম, হে রাসূল! লোকেরা যখন সফর ইত্যাদিকালে একত্রে উঠাবসা করবে তখন? বললেন : তখনও যতটা সম্ভব লজ্জাস্থান আবৃত রাখবে। আমি বললাম, আমাদের কেউ যখন একাকী থাকে, তখন? বললেন : আল্লাহ তা‘আলাকে অধিক লজ্জা করাই সকলের কর্তব্য। (আহম্মদ, আবু-দাউদ, ইবনে মাযাহ, তিরমিযী, হাকেম, বায়হাকী)

পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বিধায়ক দ্বীন

ইসলাম সৌন্দর্যর পূর্বে পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা পরিচ্ছন্নতা সর্বপ্রকার সৌন্দর্য-শোভা ও চাকচিক্যের জন্যে ভিত্তিস্বরূপ কাজ করে রাসূলে করীম (সা) বলেছেন :

(আরবী*******************)

তোমরা সকলে পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন কর। কেননা ইসলাম পরিচ্ছন্ন দ্বীন।

(আরবী*********************)

পরিচ্ছন্নতা ঈমান ডেকে আনে। আর ঈমান তার সঙ্গীকে নিয়ে জান্নাতে চলে যাবে। (তিবরানী)

নবী করীম (সা) শরীর, পোশাক, ঘর-বাড়ি ও রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন করার ও রাখার জন্য উত্সাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে দাঁত, হাত ও মস্তক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন।

পরিচ্ছন্নতার এ গুরুত্ব দ্বীন-ইসলামে কিছুমাত্র আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। কেননা এ দ্বীনই নামাযের ন্যায় এক প্রাথমিক ইবাদতের জন্যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাকে কুঞ্চিকার ন্যায় বলে ঘোষনা করেছে। এ কারণে নামাযীর নামায কবুল হয় না যদি না তার শরীর পোশাক ও স্থান পরিচ্ছন্ন থাকে। গোসল ও অযু দ্বারা যে পরিচ্ছন্নতা পবিত্রতা অর্জিত হয়, এ পরিচ্ছন্নতা তা থেকে ভিন্নতর জিনিস।

আরবীয় লোকেরা গ্রাম্য ও মরু পরিবেশে বসবাস করত। তার দরুন অনেক লোকই পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের ব্যাপারে তেমন সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন মনে করত না। এ কারণে নবী করীম (সা) সব সময়ই তাদের মধ্যে পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার অনুভূমি জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করতেন। তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের এতটা উন্নত করে তুলেছিলেন যে, তারা দুনিয়ার সেরা সভ্য জাতিতে পরিণত হয়েছিল। সব রকমের হীনতা, নীরবতা তাদের জীবনে অতীত হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের অবস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য বিকশিত হয়ে উঠেছিল।

এক ব্যক্তি নবী করীম (সা) এর খেদমতে হাজির হয়েছিল। তার দাড়ি ও মাথার চুল অবিন্যস্ত অবস্থায় ছিল। রাসূল (সা) তার প্রতি এমন ভাবে ইঙ্গিত করলেন যে, মনে হলো, তিনি হয়ত তাকে চুল দাড়ি ঠিকঠাক করার নির্দেশ দিচ্ছেন। সে তাই করে চুল-দাড়ি ঠিকঠাক করে রাসূলের সম্মুখে হাজির হলো। তাকে দেখে নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী**************)

এটা ভাল, না কারো এমন ভাবে আসা ভাল যে, তার মাথা আউলানো-ঝাউলানো থাকবে, যেন সে কতটা শয়তান।

নবী করীম (সা) অপর এক ব্যক্তিকে দেখলেন তার মাথার চুল আউলানো-ঝাউলানো। তিনি বললেন : (আরবী**********)

ও লোকটি মাথার চুলগুলো ঠিকঠাক করার জন্যে কি কিছুই পায়নি? ময়লা কাপড়-চোপড় পরা অপর একটি লোককে দেখে তিনি বললেন : ও লোকটি তা কাপড় পরিষ্কার করে ধৌত করার কি কিছুই পায়নি ? (আবু দাউদ)

রাসূলে করীম (সা) অপর একটি লোককে দেখতে পেলেন, যার পরণে খারাপ ধরনের কাপড় ছিল। তাকে বললেন :- তোমার কি ধন-মাল কিছু আছে ?

লোকটি বলল : জি হ্যাঁ। জিজ্ঞাস করলেন : কি ধরণের ধন-মাল? লোকটি বলল :

(আরবী******************)

আল্লাহ আমাকে সব ধরনের ধন-মাল দিয়েছেন।

তখন নবী করীম (সা) বললেন : (আরবী**********************)

আল্লাহ যখন তোমাকে ধন-মাল দিয়েছেন, তখন আল্লাহর নেয়ামত ও তাঁর অনুগ্রহের পরিচয় তোমার ওপর থেকে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। (নিসায়ী)

নবী করীম (সা) জুম‘আ ও দুই ঈদ ধরনের জন-সম্মেলনসমূহের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নাতার সুষ্ঠু ব্যবস্থা রক্ষার জন্যে বিশেষ তাগিদ করেছেন। তিনি বলেছেন : (আরবী******************)

সম্ভব হলে কাম-কাজের কালে পরা দুখানি কাপড় ছাড়া জুমা‘আর দিনে ভিন্ন দুখানি কাপড় পরিধান করা কর্তব্য। (আবু দাউদ)

স্বর্ণ ও রেশমী কাপড় পুরুষদের জন্যে হারাম

ইসলাম যেখানে সৌন্দর্যকে বৈধ এবং কাম্য ঘোষণা করেছে এবং তাকে হারাম মনে করতে নিষেধ করেছে- যেমন বলা হয়েছে :

(আরবী*******************)

বল, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্যে যে সৌন্দর্য ও পবিত্র রিযকসমূহের ব্যবস্থঅ করেছেন, তাকে কে হারাম করেছিল? (সূরা আরাফ :৩২)

যেখানে পুরুষদের জন্যে দুই ধরনের সৌন্দর্যের জিনিস হারাম করা হয়েছে, যদিও তা মাহিলাদের জন্যে সম্পূর্ণ হালাল করা হয়েছে : প্রথম, স্বর্ণালংকার ব্যবহার।

দ্বিতীয়, খাঁটি রেশমী বস্ত্র পরিধান।

হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন : (আরবী*******************)

নবী করীম (সা) রেশম ডান হাতে নিয়ে এবং স্বর্ণ বাম হাতে নিয়ে বললেন : এ দুটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষ লোকদের জন্যে হারাম। (আহমদ, আবু দাউদ, নিসারী)

হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি নবী করীম (সা) কে বলতে শুনেছি : (আরবী**************)

তোমরা রেশমী কাপড় পরিধান করবে না। কেননা যে লোক দুনিয়ায় রেশমী কাপড় পরিধান করবে, সে পরকালে তা পরতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)

রেশমী পোশাক সম্পর্কে তিনি বলেছেন : (আরবী*****************)

এটা সেই লোকদের পোশাক, পরকালে যাদের কোন কিছুই প্রাপ্য নেই।

নবী করীম (সা) এক ব্যক্তির হাতে একটি স্বর্ণের অঙ্গুরীয় দেখতে পেলেন। তখন তিনি-সেটিকে টেনে বের করে দূরে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন : (আরবী**********************)

তুমি কি নিজ হস্তে স্ফূলিঙ্গ ধরে রাখতে চাও?

পরে নবী করীম (সা) উঠে চলে যাওয়ার পর লোকটিকে বলা হয়,  তোমার আঙ্গুরীয় তুলে নাও এবং সেটা কাজে লাগাও। তখন সে বলল : (আরবী*********************)

না, আল্লাহর কসম। রাসূলে করীম (সা) যা দূরে নিক্ষেপ করেছেন আমি তা তুলে নেব না। (মুসলিম)

এই স্বর্ণের অঙ্গুরীয়ের ন্যায় আধুনিকাকালে বিলাসী ধনশালী লোকদের দেখা যায় স্বর্ণের কলম, স্বর্ণের সিগারেট লাইটার, স্বর্নের সিগারেট কেস ও স্বর্নের সিগারেট হোল্ডার প্রভৃতি ব্যবহার করতে। এ সবই হারাম।

তাবে রৌপ্য নির্মিত অঙ্গুরীয় ব্যবহার করা পুরুষের জন্যেও হালাল এবং মুবাহ করেছেন নবী করীম (সা)। বুখারী শরীফে হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন : (আরবী***********************)

নবী করীম (সা) একটি রৌপ্যের অঙ্গুরীয় নানিয়েছিলেন এবং সেটি তার হাতেই শোভা পাচ্ছিল। পরে তা হযরত আবু বকরের হতে শোভা পেতে থাকে। তাঁর পরে হযরত উমরের হাতে এবং তার পর হযরত উসমানের হাতে। শেষ পর্যন্ত তা আরীস নামক কূপে পড়ে যায়। (বুখারী)

এ ছাড়া লোহা ও অন্যান্য তৈরী আঙ্গুরীয় ব্যবহার করা হারাম নয়। কোন অকট্য দলিল দ্বারাই তার হারাম হওয়ার কথা জানা যায় না এবং বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম (সা) এক ব্যক্তিকে মোহরানা সম্পর্কে বলেছেন : (আবরী****)

কোন কিছু তালাশ করে নিয়ে আস, একটি লোহার আঙ্গুরীয়ই হোক না কেন।

ইমাম বুখারী এ হাদীসের ভিত্তিতে লৌহ নির্মিত অঙ্গুরীয় ব্যবহার জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন।

তবে প্রকৃত কোন কারণ থাকলে রেশমী কাপড় ব্যবহার করা জায়েয হতে পারে। নবী করীম (সা) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ও হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (সা) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) কে তাঁদের খোস-পাঁচড়া ও চুলকানি ধরনের রোগের কারণে রেশমী কাপড় ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

রেশম ও স্বর্ণ ব্যবহার পুরুষদের জন্যে হারাম করার কারণ

রেশম ও স্বর্ণালংকার ব্যবহার পুরুষদের জন্যে হারাম করার মৌল উদ্দেশ্যে হচ্ছে, তাদের অতি উত্তম নৈতিক প্রশিক্ষণ দান। কেননা দ্বীন-ইসলাম জিহাদ ও শক্তি প্রদর্শনের দ্বীন। তাই তা সর্বপ্রকার নৈতিক দুর্বলতা উচ্ছঙ্খলতা ও পতন থেকে পৌরুষকে রক্ষা করা ইসলামের লক্ষ্য। আল্লাহ তা‘আলা পুরুষকে এক বিশেষ ধরনের অঙ্গ সৌষ্ঠব ও সংগঠন কাঠামো দান করেছেন এবং তা নারী থেকে ভিন্নতর। কাজেই পুরুষদের উচিত নয় সুন্দরী নারীদের সেঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে মূল্যবান অলংকারাদি ও খুব চাকচিক্যপূর্ন পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে শুরু করা। এতদ্ব্যতীত সামষ্টিক ও সামগ্রিক কন্যাণও এর মুলে নিহিত রয়েছে।

ইসলাম বিলাসিত, আরাম-আয়েশ ও জাঁকজমকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। পুরুষদের জন্যে স্বর্ণালংকার ও রেশমী পোশাক হারাম করা এ সংগ্রামেরই একটি অংশ বিশেষ। কেননা বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশ কুরআনের দৃষ্টিতে জাতীয় ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারন হয়ে দেখা দিতে পারে। তা সামষ্টিক জুলুম ও শোষণের ফসলও। কেননা মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক বিপল সংখ্যক লোককে এবং দরিদ্রদের শোষণ করেই এ বিলাসিতার পাহাড় জমা করে ও সীমাহীন আরাম-আয়েশ উপভোগ করে। আর এ শ্রেনীর লোকেরাই চিরকাল যে কোন সামাজিক সংশোধন ও সামষ্টিক কল্যাণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে শক্তি প্রতিরোধক হয়ে দাড়িয়েছে। এ পর্যায়ে কুরআনের ঘোষণা হচ্ছে : (আরবী************************)

আমরা যখন কোন দেশ ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত করি, তখন সেখানে সচ্ছল অবস্থার বিলাসী ও আরাম-আয়েশে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের নিয়োজিত করি, তারা সেখানে আল্লাহর নাফরমানী করতে শুরু করে। তখন আযাবের ফয়সালা সেখানকার লোকদের ওপর কার্যকর করে দিই, সেটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিই। (সুরা বনী ইসরাইল : ১৬)

(আরবী***********************)

আমরা যখন কোন ভয় প্রদর্শনকারীকে কোন লোকালয়ের প্রতি প্রেরণ করি এবং সে তা করতে শুরু করে, তখন সেখানকার সুখী বিলাসী বড় লোকেরা বলতে শুরু করে, তোমাদের যে দায়িত্ব সহকারে পাঠান হয়েছে, তা অস্বীকার করছি। (সূরা আস-সাবাঃ ৩৪)

কুরআনের এ ভাবধারা ও দৃষ্টিকোণের সাথে সামঞ্জন্য রক্ষা করেই নবী করীম (সা) বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশের দ্রব্য-সামগ্রীকে মুসলিম জীবনে হারাম করে দিয়েছেন। তাই দেখতে পাই, একদিকে পুরুষদের জন্যে যেমন স্বর্ণালংকার ও রেশমী কাপড় হারাম করে দিয়েছেন, অপরদিকে ঠিক তেমনি পুরুশ-নারী- উভয়ের প্রতিই হারাম করে দিয়েছেন যাবতীয় স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈজস পাত্রদি।

এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কারণও নিহিত রয়েছে। কেননা স্বর্ণ নগদ সম্পদ হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষিত মূলধন রূপে গণ্য। কাজেই তা পুরুষদের পক্ষ অলংকার বা পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না।

মহিলাদের জন্যে তা হালাল কেন

মহিলাদের জন্যে স্বর্ণালংকার ও রেশমী পোশাক ব্যবহার হারাম না করে মহিলাদের বিশেষ দিক গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারী প্রকৃতি স্বভাবতঃই সৌন্দর্যপ্রবণ। রূপ চর্চা, প্রসাধন ও অলংকারাদি ব্যবহারের একটা স্বাভাবিক দাবি রয়েছে নারী চরিত্রে। তবে এসবের সাহায্যে ভিন পুরুষদের আকৃষ্ট করা ও তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলার কোন অনুমতি বা সুযোগ ইসলামে নেই। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী****************)

যে নারীই সুগন্ধি লাগিয়ে ভিন পুরুষদের সান্নিধ্যে যায়, তার সুঘ্রাণ তারা পেয়ে যায়, সে ব্যভিচারীনী এবং তার প্রতি দৃষ্টিই ব্যভিচারী দৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায়। (নাসায়ী, ইবনে খারা, ইবনে হারয়াশ)

নারী সমাজকে সতর্ককরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী*******************)

মহিলারা যেন তাদের পা এমন জোরে না ফেলে, যাতে করে তাদের লুকিয়ে রাখা সৌন্দর্য প্রকাশিত ও গোচরীভূত হয়ে যেতে পারে। (সূরা নূরঃ ৩১)

মুসলিম মহিলার পোশাক

ইসলাম মহিলাদের জন্যে এমন পোশাক পরিধান হারাম করে দিয়েছে, যার ভেতর দিয়ে দেহের কান্তি (সৌন্দর্য) বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়তে পারে। অনুরূপভাবে যে পোশাকের দরুন দেহের বিশেষ বিশেষ অংশ উলঙ্গ হয়ে থাকে এবং তা দেখে পুরুষেরা যৌন উত্তেজনা বোধ করতে পারে, তেমন পোশাক পরাও মহিলাদের জন্যে সম্পূর্ণ হারাম। বক্ষদ্বয়, কোমর, উরু বা পিঠ ও পেট উলঙ্গ রেখে পোশাক পরা কোন মুসলিম মহিলার জন্যে আদৌ জায়েয নয়।

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ (আরবি****************)

দুই ধরনের লোক জাহান্নামী হবে। এক ধরনের লোক হচ্ছে, সেসব জালিম শাসক-প্রশাসক, যাদের সঙ্গে গরুর লেজের মত চাবুক সবসময় ঝুলতে থাকবে এবং যা দিয়ে তারা লোকদের ওপর আঘাত করতে থাকবে। আর দ্বিতীয় হচ্ছে সেসব মেয়েলোক, যারা কাপড় পরিধান করেও ন্যাংটা থাকে। তারা পুরুষদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করবে আর নিজেরাও পুরুষদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে। তাদের মাথা উষ্ট্রের ঝুঁকেপড়া চুটের মতো হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তার সুগন্ধিও তারা পাবে না। যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। (মুসলিম)

কাপড় পরা সত্ত্বেও যেসব নারী উলঙ্গ থাকে এ কারণে যে, তাদের কাপড় দেহের সর্বাঙ্গ আবৃত করে না, তাদের কাপড় এতই পাতলা যে, তার ভেতর দিয়ে দেহের কান্তি (সৌন্দর্য) ফুটে বের হয়ে আসে। আর এজন্যেও যে, তারা কাপড় পরবেই দেহের যৌন উত্তেজক অংশসমূহ উন্মুক্ত রেখে। এ উভয় অবস্থায়ই কাপড় পরার মৌল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। বর্তমানের আধুনিকারা এ ধরনের পোশাক পরতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এই নারীদের মাথাকে উটের চুটের মতো বলা হয়েছে এ কারণে যে, তারা তাদের মাথার চুলের খোপা মাথার ওপর খুব উঁচু করে বাঁধে। মনে হচ্ছে, নবী করীম (সা) ভবিষ্যতের অদৃশ্যকে তখনই সুস্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন। কেননা মেয়েদের চুল বাঁধার এই প্রচলন আধুনিক কালের। সেকালে এ অবস্থা ছিল না। একালে চুল সুন্দর করার ও তাতে খোপা বেঁধে ‘ফ্যাশন্যাবল’ বানানর জন্যে বিশেষ বিশেষ শহরে আধুনিক স্টাইলের ‘সেলুন’ গড়ে উঠেছে। এসব সেলুনকে আরবী ভাষায় (আরবি*************) ‘কাওয়াফির’ বলা হয়। প্রায় সর্বত্রই এগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব পুরুষই পালন করছে। তারা তাদের এ শ্রমের বিনিময়ে মোটা মোটা পারিশ্রমিক দাবি ও আদায় করে থাকে। শুধু তা-ই নয়, মেয়েরা আল্লাহর দেয়া স্বাভাবিক চুলকে অ-যথেষ্ট মনে করে কৃত্রিম চুল ক্রয় করে নিজেদের মাথার চুলের সাথে একত্রিত করে নেয়।

অবস্থা হচ্ছে, একদিকে এক শ্রেণীর পুরুষ হাস্য, নম্রতা-মসৃণতায়, ‍রূপ ও সৌনর্যে-এবং দেখতে শুনতে নারীদেরছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। আর অপরদিকে নারীরা আকর্ষণীয়া হয়ে পুরুষদের আকৃষ্ট করতে চেষ্টা চালাচ্ছে সর্বতভাবে।

উপরিউক্ত হাদীসে একটি বিশেষ কথার দিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক স্বৈরাচার বা রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র ও নৈতিক বিপর্যয় এ দুয়ের মাঝে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সময়ের অবস্থা এ কথার বাস্তবতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে। স্বৈরাচারী রাজনীতিকরা চিরকাল জাতিকে যৌন লালসাপূর্ণ কাজ-কর্মে মগ্ন রাখে এবং লোকদের ব্যক্তিগত ঝামেলা-জটিলতায় জড়িত করে জাতীয় সমস্যাবলী থেকে তাদের দৃষ্টি ভিন্নদিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, যেন তাদের স্বৈরতন্ত্রের প্রতি কারো নজর না পড়ে।

নারী ও পুরুষের মাঝে সাদৃশ্য সৃষ্টি

নবী করীম (সা) ঘোষণা করেছেন, নারীর জন্যে পুরুষালী পোশাক পরিধান করা এবং পুরুষদের জন্যে নারীসুলভ পোশাক পরা সম্পূর্ণ হারাম। (আহমদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনে মাজা, ইবনে হাবান)

উপরন্তু তিনি পুরুষের সাথে নারীর এবং নারীর সাথে পুরুষের সাদৃশ্যকারীদের ওপর অভিশাপ করেছেন। (বুখারী)

সাদৃশ্যকরণ পর্যায়ে কথাবার্তা, গতিবিধি, চলাফেরা, ওঠাবসা ও পোশাক পরা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই গণ্য। স্বীয় প্রকৃতিকে অস্বীকার করা ও স্বভাবের দাবিসমূহের প্রহিপূরণ করতে প্রস্তুত না হওয়া- তার বিপরীত আচর-আচরণ অবলম্বন করাই হচ্ছে মানব জীবনে ও সমাজ ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার মৌল কারণ। পুরুষ এক বিশেষ স্বভাব-প্রকৃতির অধিকারী। নারীদের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। একজনের স্বভাব প্রকৃতির সাথে অপর জনের স্বভাব-প্রকৃতির আদৌ কোন মিল বা সাদৃশ্য নেই। কিন্তু পুরুষ যখন ‘নারী’ হবার চেষ্টা চালায় এবং নারীরা পুরুষালী চালচলন ও স্বভাব-প্রকৃতি ধারণ করতে চায়, তখন চরম নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ই হয় অনিবার্য পরিণতি।

যে পুরুষকে আল্লাহ্ তা’আলা পুরুষ বানিয়েছেন, কিন্তু সে নিজেকে নারী বানাতে ও নারীর সাথে সাদৃশ্য করতে চায় এবং যে নারীকে আল্লাহ্ তা’আলা নারী বানিয়েছেন, কিন্তু সে নিজেকে পুরুষালী বিশেষত্বে ভূষিত করতে চায়, এ উভয়ের ওপর রাসূলে করীম (সা) অভিসম্পাত করেছেন, দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই তারা অভিশপ্ত। আল্লাহর ফেরেশতাগণও এ অভিসম্পাতে একাত্ম।

এ কারণেই নবী করীম (সা)পুরুষদের জন্যে হলুদ বর্ণের কাপড় নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ (আরবি****************)

রাসূলে করীম (সা) আমাকে স্বর্ণের অঙ্গুরীয়, রেশমী পোশাক ও হলুদ বর্ণের কাপড় ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)

হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ রাসূলে করীম আমার পরনে দুখানি হলুদ কাপড় দেখতে পেয়ে বললেনঃ (আরবি****************)

এ হচ্ছে কাফিরদের কাপড়। কাজেই তুমি তা পরবে না।

খ্যাতি ও অহংকারের পোশাক

পানীয়, খাদ্য ও পরিধেয় সব পবিত্র জিনিসই মুসলমানের জন্যে হালাল। তবে তাতে শর্ত হচ্ছে তা গ্রহণে যেন সীমালংঘন করা না হয়। এবং কোনরূপ অহংকার ও গৌরব প্রকাশ না পায়।

আরবী পরিভাষায় ‘ইসরাফ’ বলতে বোঝায় হালাল জিনিসের মাত্রাতিরিক্ত ও সীমালংঘনমূলক ব্যবহার। আর অহংকারী গৌরবী মনোভাবও মানসিক ব্যাপার। বাইরে তার প্রকাশ খুব কমই ঘটে। নিজেকে বড় কিছু মনে করে অহমিকায় পড়ে যাওয়াই হচ্ছে অহংকার। অন্যদের তুলনায় নিজেকে বড় বলে জাহির করাই হচ্ছে গৌরব। আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন মজীদে ঘোষণা করেছেনঃ (আরবি****************)

আত্মগৌরবে মগ্ন ও অহংকারী কোন ব্যক্তিই আল্লাহ্ পছন্দ করেন না, ভালবাসেন না। (সূরা আল-হাদীদঃ ২৩)

নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোক তার কাপড় অহংকার সহকারে টানবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার প্রাতি নজরও দেবেন না। (বুখারী, মুসলিম)

অহংকার ও গৌরবের ভাবধারা থেকে মুসলমানকে দূরে রাখার জন্যেই নবী করীম (সা) খ্যাতি ও প্রসিদ্ধর পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন। যে ধরনের পোশাক পরলে জনসাধারণ থেকে স্বতন্ত্র কেউ- এটা প্রকাশ পায় ও পোশাকের দরুন তার বড়ত্ব জাহির হয়, তা-ই হচ্ছে খ্যাতি ও প্রসিদ্ধির পোশাক। রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি****************)

যে লোক খ্যাতি ও সমৃদ্ধির পোশাক পরিধান করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাকে লাঞ্ছণা ও অবমাননার পোশাক পরিয়ে দেবেন। (আহমদ, আবূ দাঊদ, নিসায়ী, ইবনে মাযাহ)

এক ব্যক্তি হযরত উমর (রা)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলঃ আমি কোন ধরনের পোশাক পরব? তখন তিনি বললেনঃ (আরবি****************)

তুমি সেই পোশাক পরবে, যার দরুন নির্জ্ঞান-নির্বোধ লোকেরা তোমাকে হালকা ও অগম্ভির মনে করবে না (অর্থাৎ হীন ও নীচ ধরনের পোশাক) এবং বুদ্ধিমান লোকেরা তাতে কোন দোষ বের করতে না পারে (অর্থাৎ ভারস্যাম্য নষ্ট হয়, এমন পোশাক পরবে না)। (তিবরানী)

মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্যের জন্যে আল্লাহ্ সৃষ্টি বিকৃতকরণঃ

সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টায় এমন সব কাজ করা, যার ফলে আল্লাহর সৃষ্টিই বিকৃত হয়ে যায়, ইসলাম আদৌ তা সমর্থন করে না। কুরআন এ কাজকে শয়তানের ‘অহী’ বা পরামর্শ বলে অভিহিত করেছে। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী শয়তান তার কু-প্ররোচনা সম্পর্কে নিজেই বলেছেঃ (আরবি****************)

আমি আমার অনুসরণকারীদের আদেশ করব। ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকেই বিকৃত করে দেবে। (সূরা আন-নিসাঃ ১১৯)

দেহে চিত্র অংকন, দাঁত শানিতকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে অপারেশন করান

শরীরে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে নানা চিত্র অংকন করান এবং দাঁত শানিত করান ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবি****************)

যে মেয়েলোক দেহে উল্কি (সুচিবিদ্ধ করে চিত্র অংকন) করে, যে তা করায়, যে দাঁত শানিত বানায় এবং যে তা বানাতে বলে, এ সব কয়টি শ্রেণীর লোকের ওপরই নবী করীম (সা) অভিসম্পাত করেছেন। (মুসলিম )

উল্কি বানানর জন্যে সাধারণত নীল রং ব্যবহার করা হয় এবং খুবই বিশ্রী ধরনের চিত্রাদি অংকন করান হয়। তার ফলে মুখাবরণ ও হাত কুশ্রী হয়ে যায়। আরব এবং বিশেষ করে মেয়েরা এ কাজে তো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা তাদের সমগ্র গাত্রে এ উল্কি আঁকিয়ে থাকে। কোন কোন ধর্মানুসারী লোক তো তাদের দেবদেবীর ছবি ও প্রতীকসমূহের চিত্র আঁকিয়ে থাকে। খিৃস্টানরা নিজেদের হাত ও বুকের ওপর ক্রুশ-এর চিত্র আঁকায়।

এসব খারাবী ছাড়াও একটা বড় খারাবী হচ্ছে, উল্কি বানানর সময় দেহে সূচ বিদ্ধ করা হয় বলে তাতে খুবই কষ্ট ও যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এ কারণে এ কাজ করা ও করান উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ ও অভিশপ্ত।

‘অশর’ দাঁতসমূহকে শানিত ও তীক্ষ্ণ সরু বানান ও যে বানাতে বলে এ উভয়ের ওপর রাসূলে করীম (সা) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। যে নারী অন্যের দ্বারা এ কাজ করায়, তার ওপরও অভিসম্পাত। কোন পুরুষ এ কাজ করলে সেও সে অভিশাপের মধ্যে পড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

দাঁত সম্পর্কে একথা যেমন সত্য তেমনি দাঁতসমূহের মধ্যে খোদাই করা ও গর্ত রচনা করাকেও হারাম ঘোষণা করেছেন রাসূলে করীম (সা)। হদীসে উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবি****************)

দাঁতসমূহের মধ্যে ফারাক ও খোদাই করায় যেসব স্ত্রীলোক সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, তাদের ওপরও রাসূলে করীম (সা) অভিসম্পাত করেছেন। কেননা তারা আল্লাহর সৃষ্টির স্বাভাবিক অবস্থাকে বিকৃতি করে দেয়।

নারীদের মধ্যে অনেকেরই মুখের দাঁতে স্বাভাবিকভাবে ফাঁক থাকে, অনেকের আবার তা থাকে না। যাদের তা থাকে না, তারা কৃত্রিমভাবে তা করিয়ে নেয়। ফলে সে লোকদের ধোকা দেয়। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যেই এ কৃত্রিমতায় আশ্রয় লওয়া হয়। এর ফলে ইসলামের দৃষ্টিতে তার স্বভাব-প্রকৃতিতিও কৃত্রিমতা এসে যায়। ইসলাম তা আদৌ বরদাশত করতে রাজী নয়।

উপরে যে হাদীসসমূহ উদ্ধৃত হয়েছে, তা সহীহ্। এসব হাদীসের ভিত্তিতে আমরা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অপরেশন (অস্ত্রোপাচার) করান সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম জানতে পারি। এ কালের দেহ ও যৌন আস্বাদন পূজারী সভ্যতাই এসব অস্ত্রোপাচারের প্রচলন করেছে। একালের বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার এ এক অন্যতম অবদান বলতে হবে। লোকেরা এ প্ররোচনায় পড়ে নিজেদের নাক কিংবা বক্ষ (স্তন) প্রভৃতির আকৃতি মনমতো ও লোভনীয় বানাবার উদ্দেশ্যে পুরুষ ও নারী হাজার হাজার টাকা ব্যয় করছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কাজ আল্লাহর অভিশাপই টেনে আনে। এ কাজ যেমন কষ্টদায়ক, তেমনি  আল্লাহর বানান আকৃতিকে শুধু-শুধুই পরিবর্তন করার শামিল। আর আসলেও অস্ত্রোপাচারে যে পরিবর্তনটুকু আনা যায়, তা অতিসামান্য, প্রকৃত কোন পরিবর্তন সাধন সম্ভবই নয়। বড়জোর দৈহিক পরিবর্তনই করান যেতে পারে, আত্মিক নয়।

তবে যদি কারো কোন ক্রটি থাকে, যা মূল দেহ কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত এবং সেটির কারণে কষ্ট অুনভূত হয়  কিংবা মানসিক কুণ্ঠায় জর্জরিত হতে থাকে, তাবে তার চিকিৎসা করানয় কোন দোষ নেই।  তবে উদ্দেশ্য হতে হবে শুধু সে অসুবিধাটা দূর করান। কেননা তাতে সে কষ্ট পাচ্ছে, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এটা জায়েয এজন্যে যে, আল্লাহ দ্বীনে আমাদের জন্যে কোন কষ্টের কারণ রাখেন নি। (আরবী*****************)

হাদীস থেকেও এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়। হাদীসে সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্য অস্ত্রোপাচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই এ উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপাচার করা হলে নিশ্চিয়ই অভিশাপের উপযুক্ত হতে হবে। কিন্তু কোন কষ্ট দূর করা বা প্রয়োজন পূরণ করার উদ্দেশ্যে তা করান হলে তাতে কোনই দোষ হতে পারে না।

ভ্রূ সরুকরণ

মাত্রাতিরিক্ত রূপ ও সৌন্দর্য অর্জনের আর একট আধুনিক উপায় হচ্ছে, চুল বা পশম উপড়ান। আর তা সাধারণত, কপালের ভ্রূ চুল উপড়িয়ে ভ্রূকে যথাসম্ভব সরু করা। কিন্তু এ কাজটি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। রাসূলে করীম (সা) এ কাজ যে করে, তার উপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। (আরবী**********************)

যে স্ত্রীলোক চুল বা পশম উপড়ায় এবং যে অপরের দ্বারা একাজ করায় রাসূলে করীম (সা) উভয়ের ওপর অভিশাপ বর্ষন করেছেন। (আবূ দাউদ)

চুল বা পশম উপড়ানর ব্যাপারটি আরও কঠিন হারাম হয়ে দেখা দেয়, যখন তা চরিত্রহীনা মেয়েদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এবং তাদের একটি বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়ায়। হানাফী মাযহাবের কোন কোন আলেম বলেছেনঃ মেয়েদের মুখবণ্ডলের চুল উপড়িয়ে পরিষ্কার করা, লাল রঙ লাগান, নকশা আঁকা ও নখে পালিশ লাগানো জায়েয। তবে তা স্বামীর অনুমতিক্রমে হতে হবে। কেননা এসব কাজ সৌন্দযের অলংকারের মধ্যে গণ্য। কিন্তু ইমাম নববী মুখবণ্ডরের চুল বা পশম উপড়ানর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি এ কাজকে পূর্বোদ্ধৃত হাদীসের ভিত্তিতে হারাম বলেছেন। অবশ্য আবূ দাউদ তার সুনান’ গ্রন্থে লিখেছেন, যে নারী তার ভ্রূতে নকশা ও ছবি বানিয়ে সেটিকে সরু করে, হাদীসে তাকে نامصه বলা হয়েছে। এতে এতে করে ইমাম নববীর মতের প্রতিবাদ হয়ে গেছে। কেননা মুখবণ্ডলের চুল বা পশম দূর করা অভিশপ্ত কাজের মধ্যে গণ্য নয়।

তাবারনী’ গ্রন্থে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, আবু ইসহাকের স্ত্রী যুবতী ছিলেন। সৌন্দযের পিপাসু ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা) এর কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাস করলেন: স্ত্রী কি তার স্বামীর জন্যে মুখমণ্ডলের পশম দূর করতে পারে? হযরত আয়েশা (রা) বললেনঃ ‘কষ্টের ব্যপারগুলো সাধ্যমত দূর কর। (আরবী*******************)

চুলে জোড়া লাগান

স্ত্রীলোকের পক্ষে নিজের মাথার চুলের সঙ্গে অপরের চুলের (পরচুলা) জোড়া লাগিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাও হারাম। তা আসল চুল হোক, কি নকল চুল।

ইমাম বুখারী হযরত আয়েশা, আসমা, ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর ও আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে হাদীস উদ্ধৃত করেছেনঃ

(আরবী*********১৩১************)

চুলে যে জোড়া লাগায় এবং যে অন্যদের দ্বারা একাজ করায়- উভয় নারীর ওপর রাসূলে করীম (সা) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।

নারী সম্পর্কে যখন একথা, তখন পুরুষরা একাজ করলে তো নিশ্চয়ই এ অভিশাপে পড়ে যাবে, তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। নবী করীম (সা) এ কাজকে تد ليس অর্থাৎ প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি যে নারীর মাথার চুল কোন রোগের কারণে ঝড়ে পড়ে যায়, তার পক্ষে অন্য কারো চুল নিজের মাথায় জাড়ান জায়েয নয়। বিবাহের কনে- যাকে স্বামীর কাছে পাঠান হচ্ছে-তার জন্যেও এ কাজ হারাম।

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, আনসার বংশের একটি মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর রোগে মাথার চুল পড়ে যায়। সে তার নিজের মাথায় অন্য চুল লাগাবার ইচ্ছা করে। এ বিষয়ে নবী করীম (সা) কে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি বললেনঃ (আরবী*********)

যে চুল জোড়া লাগায় এবং যে অন্য কারো দ্বারা একাজ করায়- উভয় নারীর উপরই আল্লাহ তা’আলা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।

হযরত আসমা (রা) তাঁর একটি মেয়েলি-লোগের কারণে চুল পড়ে যাওয়ায় এ কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে নবী করীম (সা) উপরিউক্ত উক্তিই করেন।

সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেনঃ হযরত মুয়াবিয়া মদীনায় এলেন- এটাই ছিল তাঁর শেষ আগমন। তখন তিনি আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। ভাষণ ব্যাপদেশে তিনি এক গোছা চুল বের করলেন বললেনঃ (আরবী******************)

ইয়াহূদী ছাড়া আর কেউ এ ফ্যাশন করে বলে আমি মনে করি না। নবী করীম (সা) এ কাজকে মিথ্যা-ধোঁকা বলে অভিহিত করেছেন অর্থাৎ চুলের সাথে অপরের চুল জড়ান।

অপর এক বর্ননা মতে হযরত মুয়াবিয়া মদীনাবাসীদের বলেনঃ (আরবী**********************)

তোমাদের আলিমগণ এখন কোথায়? রাসূলে করীম (সা) এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা আমি নিজে শুনতে পেয়েছি। তাঁকে এ-ও বলতে শুনেছি যে, বনী ইসরাঈলী মেয়েরা যখন এ ফ্যাশন শুরু করেছিল তখনই তাদের ধ্বংস শুরু হয়ে গিয়েছিল। (বুখারী)

নবী করীম (সা) এ কাজকে মিথ্যা-ধোঁকা বলে অভিহিত করেছেন। তাতে এ কাজ নিষিদ্ধ হওয়ার তাত্পর্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। আসলে এ কাজ এক প্রকার ধোঁকা ও প্রতারণাই বটে এবং তা মিথ্যার সাহায্যে। এ ধরনের কাজের অনুমতি থাকলে ধোঁকা প্রতারনা করাও জায়েয হয়ে যেত অথচ ইসলামে তা ভয়নক গুনাহর কাজ। নবী করীম (সা) বলেছেন। (আরবী************)

যে আমাদের ধোঁকা দেবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়।

ইমাম খাত্তাবী বলেছেনঃ এ কাজ নিষিদ্ধ এজন্য যে, এতে মানুষকে ধোঁকা দেয়া হয়, প্রতারিত করা হয়। উপরন্তু এ কাজ দ্বারা আল্লাহর আসল সৃষ্টি রূপ পরিবর্তন করে দেয়া হয় এবং সেটাই হচ্ছে বড় অপরাধ। হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণিত উপরে উদ্ধৃত হাদীসে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর হাদীসসমূহে চুলের সঙ্গে চুল জড়ান ও মেশান-তা স্বাভাবিক হোক, কি কৃত্রিম –মূলত ধোঁকা ও প্রতারণারই কাজ। তবে চুলের সাথে চুল ছাড়া অন্য কিছু-সূতা বস্ত্রখণ্ড ইত্যাদি জড়ান হলে তা নাজায়েয হবে না। এ পর্যায়ে হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ (আরবী************)

সূতা, রেশম কিংবা খোপা বানানর পশম জড়ালে তা দোষের হবে না।

ইমাম আহমদ ইবনে আম্বলও তা জায়েয বলেছেন।

খেজাব লাগন

মাথার চুল ও দাড়িতে খেজাব লাগানর এক প্রকারের সৌন্দর্য-চর্চার ব্যাপার। ইয়াহুদী ও খ্রীস্টান প্রভৃতি আহলি কিতাব লোকেরা খেজাব লাগিয়ে দাড়ি ও চুলের রং পরিবর্তন করার পক্ষপাতি নয়। কেননা তাদের ধারণা হচ্ছে, সোন্দর্য-চর্চা ও রূপ বৃদ্ধিকরণ দ্বীনদারী ও আল্লাহ পরস্তির পরিপন্থী। আর দ্বীনদারীর ক্ষেত্রে দুনিয়াত্যাগী, বৈরাগী, বৈঞ্চব প্রভৃতি সীমালংঘন ও অতিরিক্ত বাড়াবাড়িকারীদের এ-ই হচ্ছে নীতি। কিন্তু রাসূলে করীম (সা) এ লোকদের অনুসরণ করতে ও অনুরূপ আচার-আচরণ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসলমানরা অন্তরের ও বাইরের দিক দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও নীতি আদর্শের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত নবী করীম (সা) এ লোকদের অনুসরণ করতে ও অনুরূপ আচর-আচারণ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসলমানরা অন্তরের ও বাইরের দিক দিয়ে নিজেদেরও স্বতন্ত্র সত্তা ও নীতি-আদর্শের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অক্ষুণ্ন আখতে সক্ষম হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবী************************)

ইয়াহুদী খ্রিস্টানরা খেজাব লাগান না। তোমরা তাদের বিরোধিতা কর।

এ আদর্শটি মুস্তাহাব ধরনের, সাহাবীগণ তাই মনে করেছেন। কেননা এ আদেশটি থাকা সত্ত্বেও সকল সাহাবী খেজাব লাগান নি। যেমন হযরত আবু বকর ও উমর (রা) লাগিয়েছেন, কিন্তু হযরত আলী ও উবাই ইবনে কায়াব (রা) লাগান নি। (আরবী*****)

কিন্তু খেজাব কি দিয়ে লাগান হবে? কালো কিংবা যে কোন রঙ লাগন যায় কি? না, কালো খেজাব লাগন পরিহার করতে হবে? এ প্রশ্নের জাবাব এই যে, যেসব লোক বার্ধক্য পৌছে গেছে, তাদের পক্ষে কালো খেজাব লাগান বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা মক্কা বিজয়কালে হযরত আবূ বকর (রা) তখন তাঁর পিতা আবু কাহাফাকে রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত করালেন, তিনি দেখলেন, তার মাথার চুল একেবারে সাদা হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেনঃ (আরবী*********************)

এ চুলের রঙ পরিবর্তন করে দাও। তবে কালো রং পরিহার কর। (মুসলিম)

কিন্তু যে লোকের অবস্থা বা বয়স আবু কাহাফার মত হয়নি, সে যদি কালো খেজাব ব্যবহার করে তাহলে উপরিউক্ত হাদীস অনুযায়ীই নাজায়েয হবে না। ইমাম জুহরী এ মতই প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী*******************)

আমাদের মুখমণ্ডল যখন তরজাতা ছিল, নব্যতা ও তারুণ্যপূর্ণ ছিল, তখন আমরা কালো খেজার ব্যবহার করেছি। কিন্তু যখন আমাদের মুখমণ্ডল ও দাঁতে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেল, তখন আমরা তা ত্যাগ করেছি। (ফাতহুল  বারী)

কালো খেজাব ব্যবহার করা সাধারণভাবেই জায়েয বলে মত জানিয়েছেন সায়াদ ইবনে আবূ ওয়াককাস, উকবা ইবনে আমের, হাসান ও হুসাইন এবং জরীর প্রমুখ সাহাবী (রা)

কিন্তু অপর কতক আলিমের মতে কালো খেজাব লাগান জায়েয নয়। তবে তাঁদের মতেও জিহাদের সময় শত্রু পক্ষকে ভীত-সন্ত্রস্ত্র করার উদ্দেশ্যে তা লাগান যেতে পারে, যেন শত্রুপক্ষ মনে করে যে, সেনাবাহিনীর সব লোকই যুবক। তাতে তারা অনেকটা শংকিত বোধ করবে। (আরবী***********)

হযরত আবূ যর গিফারী (রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী*********************)

বার্ধক্যের শ্বেত-শুভবর্ণ পরিবর্তন করার উত্তম দ্রব্য হচ্ছে হেনা ও কাতাম।

কাতাম হচ্ছে একটা ইয়েমেনী ঘাস। তার রক্ত লালমুখী কালো। আর হেনা বর্ণ লাল। হযরত হাসান (রা) বর্ণনা করেছেনঃ হযরত আবূ বকর হেনা ও কাতাম ইভয় প্রকার খেজাবই ব্যবহার করেছেন আর হযরত উমর (রা) কেবলমাত্র খালেস হেনাই ব্যবহার করেছেন খেজাব হিসেবে।

দাড়ি বাড়ানো-লম্বাকরণ

আমদের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে গণ্য একটি ব্যাপার হচ্ছে দাড়ি বৃদ্ধিকরণ। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবী**********************)

তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর এবং দাড়ি বাড়াও, আর গোফঁ কাট। (বুখারী)

وفروا দাড়ি বাড়াও’ অর্থাৎ দাড়ি রেখে দাও, ছেড়ে দাও- আপনা থেকে বাড়তে দাও। হাদীসে এ আদেশের কারণও বলা হয়েছে। তা হচ্ছে মুশরিকদের বিরোধিতা। আর এ মুশরিক বলতে অগ্নিপূজারী মজুদীদের বোঝান হয়েছে। কেননা ওরা দাড়ি কেটে ফেলত। ওদের অকেনে আবার দাড়ি আবার দাড়ি মুণ্ডনও করত। আর রাসূলে করীম (সা) এদেরই বিরোধীতা করতে বলেছেন। তিনি মুসলমানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে ও প্রশিক্ষন দিতে চেয়েছিলেন, যেন তাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুন্ন থাকে। যেন তারা ঈমান-আকিদার দিক দিয়েও যেমন মুশরিকদের থেকে ভিন্নতর, তেমনি ব্যহ্যিক দিক দিয়েও যেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়ে ওঠে। তবে দাড়ি মুণ্ডনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কেননা তাতে যেমন প্রকৃতির বিরোধীতা হয় তেমনি নারীদের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি করা হয় অথচ দাড়ি হচ্ছে পুরুষের লক্ষণ পরিচায়ক। বাহ্যিকভাবে তাই পুরুষকে নারী থেকে স্বতন্ত্র করে দেয়।

তবে দাড়ি ছেড়ে দেয়া- বাড়ানর এই নির্দেশটির অর্থ এই নয় যে, দাড়ির কোন কিছু আদৌ কাটা যাবে না। কেননা দাড়ি অনেক সময় সীমাতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায় যে তা দেখতেও খারাপ লাগবে। তাতে সে ব্যক্তির পক্ষে বিশেষ কষ্ট ও অসুবিদার কারণ দেখা দিতে পারে। তাই তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থেকে কাটা যেতে পারে। তিরমিজী শরীফে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবী********)

নবী করীম (সা) তাঁর দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থেকে কাটতেন।

প্রাচীনকালের লোকদের অনেকেই তা করতেন। ইয়ায বলেছেনঃ (আারবী************************)

দাড়ি মুণ্ডন করা, তা কেটে ছেটে সমান সমান বানান মাকরূহ। কিন্তু যদি বড় হয়ে যায়, তাহলে তা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থেকে কেটে ফেলা ভালই। (আরবী****************)

আবু শামাহ বলেছেনঃ এ কালে এমন লোক দেখা যায়, যারা দাড়ি মুণ্ডন করে অথচ অগ্নিপূজারীদের সম্পর্কে একথা সর্বজনবিদিত যে, তারা দাড়ি কর্তন করত।

এ পর্যায়ে আমি বরতে চাই, বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলামের দুশমন, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদীদের অনুসরণ করতে গিয়ে দাড়ি মুণ্ডন করতে শুরু করেছে। আর তা করে তারা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ওদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে। কেননা বিজিত লোকেরাই বিজয়ী জাতির সংস্কৃতির অনুকরণ ও অনুসরণ করে থাকে অথচ রাসূলে করীম (সা) যে কাফিরদের বিরোধীতা করতে বলেছে এবং তাদের সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করতে নিষেধ করেছেন, তা তারা বেমালুম ভুলে বসেছে। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী***********************)

যে ব্যক্তি যে জাতির সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করবে, সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। বহু ফিকহবিদ দাড়ি বাড়ান সংক্রান্ত রাসূলে করীম (সা) এর হাদীসের প্রেক্ষিতে দাড়ি মুণ্ডন করাকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। কেননা এ আদেশ পালন করা ওয়াজিব। এই বিশেষ আদেশ মুশরিকদের বিরোধিতাকরণের ওপর ভিত্তিশীল। আর তাদের বিরোধিতা করা মুসলমানদের জন্যে ওয়াজিব। আগের কালের কোন লোক এই ওয়াজিব তরক করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই।

কিন্তু এ কালের কিছু কিছু আলিম কালের প্রভাব প্রভাবিত হয়েও সাধারণ প্রচলন দেখে বলতে শুরু করেছেন যে, দাড়ি মুণ্ডনে কোন দোষ নেই। তাঁরা আরও বলতে শুরু করেছেন যে, দাড়ি লম্বা করে রাখা রাসূলে করীমে (সা) এর নিজস্ব অভ্যাসগত কাজ ছিল। তা শরীয়তের কোন ব্যাপার নয় এবং তা ইবাদত পর্যায়বুক্তও নয়। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে দাড়ি ছেড়ে দেয়া- লম্বা করা কেবলমাত্র রাসূলের নিজের কাজ দ্বারাই প্রমাণিত নয়। তার সাথে কারণ হিসেবে যুক্ত রয়েছে কাফিরদের বিরোধিতা। ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, সর্বক্ষেত্রে কাফির মুশরিকদের বিরোধিতা শরীয়তের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে গণ্য। বাহ্যিক সাদৃশ্য প্রীতি প্রণয় ভালবাসা বন্ধুত্বের ভাব জাগিয়ে তোলে অন্তরের মধ্যে। ঠিক যেমন অন্তরের ভালবাসা বাহ্যিক সাদৃশ্য সৃষ্টি করে। মানুষের অনুভূতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এর সত্যতা প্রমাণিত। তিনি আরও লিখেছন, কাফির মুশরিকদের বিরোধিতার আদেশ এবং তাদের সাথে সাদৃশ্যকরণের নিষেধ কুরআন, হাদীস ও ইজমা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আর যে জিনিস বা কাজে  কোন খারাবীর করণ নিহিত, তাই হারাম বলা যাবে। কাফিরদের বাহ্যিক কাজ-কর্মের সাথে সাদৃশ্য খারাপ চরিত্র ও কার্যকলাপের অনুসরণের কারণ। বরং সাদৃশ্যের এ কাজের ধারা আকীদা-বিশ্বাস বলয় পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে বলে আশংকা করা যায়। এ প্রভাবটা ধরা যায় না, কেননা তাতে যে আসল দোষের উদ্রেক হয়, তা বাহ্যত চোখে পড়ে না। কিন্তু তা একবার বসে গেলেই তা দূর করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই যা-ই কোন খরাবীর নিমিত্ত হবে, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। (আরবী*******************)

সর্বশেষ উল্লেখ্য, দাড়ি মুন্ডন সম্পর্কে তিনটি কথা। একটি কথা হচ্ছে দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম। দ্বিতীয় কথা, দাড়ি মুণ্ডন মাকরূহ।

এই কথাটি ফতহুল বারী গ্রন্থে কাযী ইয়াযের নামে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আর তৃতীয় কথা হচ্ছে, তা জায়েয।

এ কালের বেশ কিছু সংখ্যক আলিম এ মত পোষন করলে এর মধ্যে মাঝামঝি, সত্য নিকটবর্তী ও অধিক ইনসাফপূর্ণ কথা হচ্ছে, দাড়ি মণ্ডন মাকরূহ, হারাম নয়। কেননা রাসূলে করীমের যে কোন আদেশই নিরংকুশভাবে ওয়াজিব হয়ে যায় না, যদিও কাফির মুশরিকদের বিরোধিতা করার কারণ ভিত্তি হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। তার অতি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের বিরোধিতা করার জন্য খেজাব লাগিয়ে বার্ধক্যের শ্বেতবর্ণ পাল্টে দিতে আদেশ করেছেন। কিন্তু কোন কোন সাহাবী এ আদেশ পালন করতে গিয়ে তা করেন নি। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ পর্যায়ের আদেশ মুস্তাহাব পর্যায়ের।

এ কথা সত্য যে, আগের কালের কোন মুসলমান দাড়ি মুণ্ডন করেছেন বলে জানা যায় না। তা এজন্যেও তো পারে যে, সেকালে লোকেরা দাড়ি মুণ্ডন প্রয়োজন মনে করতেন না; বরং তা রাখাই তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

About ইউসুফ আল কারযাভী