দর্শন কোষ

Evolution and Revolution: বিবর্তন এবং বিপ্লব

বিবর্তন ও বিপ্লব বিকাশের অবিচ্ছেদ্য দুটি দিক। বিবর্তন বলতে কোনো অস্তিত্ব বা বিষয়ের মধ্যে পরিবর্তনের ধারাবাহিক এবং পরিমাণগত বৃদ্ধিকে বুঝায়। বিপ্লব বলতে বিকাশের কোনো পর্যায়ে অস্তিত্বের মধ্যে দ্রুত এবং আকস্মিক পরিবর্তন বুঝায়।

বিবর্তন ও বিপ্লবের মধ্যকার সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য, এটি আধুনিক বিজ্ঞানের এবং সমাজবিজ্ঞান, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তত্ত্ব। পূর্বে মানুষ বিবর্তন ও বিপ্লবকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং বিরোধাত্মক ব্যাপার বলে মনে করত। পূর্বে এরূপ ধারণা ছিল যে, বিবর্তন ঘটতে থাকবে; অর্থাৎ পরিবর্তনের কেবল পরিমাণগত বৃদ্ধি হতে থাকবে, অস্তিত্বে নতুন কোনো গুণের উদ্ভব হবে না। এ ধারনার অস্তিত্বের বিকাশে বিবর্তন একমাত্র প্রক্রিয়া। এ ধারণায় বিপ্লব কেবল জবরদস্তির নামান্তর। অস্তিত্বের বহির্ভূত কোনো শক্তি হিসাবে বাইরে থেকে অস্তিত্বকে পরিবর্তিত করতে চায়। আধুনিক বিজ্ঞান অস্তিত্বের বিকাশের ধারণাকে সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। পানি যখন উত্তপ্ত হতে থাকে, তখন পানির মদ্যে বিন্দু বিন্দু পরিমান পরিবর্তন সংঘটিত হতে  থাকে। কিন্তু পরিবর্তনের এই বৃদ্ধি অনির্দিষ্ট কালের জন্য কেবল পরিমাণেই সীমাবদ্ধ থেকে পানিকে পানি হিসাবে বজায় রেখে এগোয় না। পরিবর্তনের পরিমাণগত বৃদ্ধির একটা চরম বিন্দুতে পানির পুরাতন অস্তিত্বের আমূল রূপান্তর সংঘটিত হয়। পানি বাষ্পে পরিণত হয়। পানি থেকেই বাষ্প; কিন্তু পানি এবং বাষ্পকে আমরা দৃশ্যত এক অস্তিত্ব মনে করি না। এখানে পানির বিকাশে বিবর্তনের একটা স্তরে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, এ কথা বলা যায়। প্রাকৃতিক জগতে এরূপ দৃষ্টান্তের অভাব নেই।

সামাজিক জীবনে বিবর্তন ও বিপ্লব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ঘটেছে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এবং মার্কসবাদের হাতে। মার্কসবাদের প্রবক্তাগণ প্রাকৃতিক জগতের অস্তিত্বে সক্রিয় পরিবর্তনের নিয়মকে সমাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে বলেন যে, সমাজ-দেহেও পরিবর্তনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে পেয়ে একটি চরম পর্যায়ে বিপ্লব সংগঠিত হয়। বিপ্লব কোনো অস্বাভাবিক কিংবা অস্তিত্বের বহির্ভূত ব্যাপার নয়। বস্তুগত কিংবা সামাজিক সমস্ত অস্তিত্বই সতত গতিশীল। অস্তিত্ব মাত্রের গতি সৃষ্টি হয় তার আভ্যন্তরিক বিরোধের ভিত্তিতে। অস্তিত্বের অন্তর্গত দ্বন্দ্বমান শক্তির বিরোধ বিভিন্ন কারণে  বৃদ্ধি পেতে পেতে একটা বিস্ফোরণের মূহুর্তে উপস্থিত হয়। এক বিস্ফোরণই বিপ্লব। বিপ্লবের ফলে অস্তিত্বের এমন সব চরিত্র সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে চরিত্রগুলি বিপ্লবের পূর্বে অস্তিত্বের মধ্যে সুপ্ত কিংবা স্বল্প প্রকাশিত ছিল; কিন্ত এরূপ প্রবল এবং প্রধান হয়ে কার্যকর হয় নি।

বিবর্তন শব্দের একটা সাধারণ ব্যবহার আছে। সমাজের বিবর্তন, বিশ্ব জগতের বিবর্তন। এরূফ ব্যবহারে কোনো ক্ষেত্রে বিবর্তন ও বিপ্লবসহ পরিবর্তনের সমগ্র বিষয়টিকেই বুঝান হয়।

বিপ্লব শব্দের অনেক বিকৃত এবং সংকীর্ণ ব্যবহারও দেখা যায়। বিপ্লবের মৌলিক অর্থ অস্তিত্বে অদৃষ্টপূর্ব নতুন চরিত্রের উদ্ভব। কিন্তু অনেক সময়ে কোনো রাষ্ট্রকাঠামোতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জবরদস্তি ক্ষমতা দখলকেও বিপ্লব বলে অভিহিত করা হয়। পাকিস্তানে ১৯৫৮ সালে শাসনযন্ত্রের অধিকারীর ক্ষেত্রে অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কিছু সংখ্যক ব্যক্তির রদ-বদল সংঘটিত হয়েছিল। এই ঘটনায় পাকিস্তানের সামাজিক চরিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটে নি। কিন্তু শাসকগণ একে বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছিল। জবরদস্তি এবং রক্তপাত মাত্রকেই বিপ্লব বলা যায় না। বাস্তব সমাজের মধ্যে মৌলিকভাবে নতুন চরিত্রের উদ্ভব বিপ্লবকে সূচিত করে।

Existence: অস্তিত্ব

সাধারণ ‘অস্তিত্ব’ দ্বারা স্থায়ী, অস্থায়ী, স্থির এবং অস্থির সমস্ত সৃষ্টিকেই বুঝায়। তা হলেও অনেকে আবার অস্তিত্বকে সার-অস্তিত্ব এবং অসার-অস্তিত্ব বলে বিভক্ত করেন। যাঁরা এরূপ করেন, তাঁরা মনে করেন যে, সাধারণভাবে দৃষ্ট এবং জ্ঞাত অস্তিত্বের গভীরে এক মূল অস্তিত্ব বিরাজমান। দৃশ্য বা দৃষ্ট অস্তিত্ব সদা পরিবর্তনমান। কিন্তু মূল অস্তিত্বির কোনো পরিবর্তন নেই। এঁদের মতে মূল অস্তিত্ব বা সার-অস্তিত্বকে মানুষ জানতে পারে না। এরূপ চিন্তা ভাববাদী চিন্তা। অস্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ অর্থে সার এবং অসারের পার্থক্য চিন্তা করা চলে। তুলনামূলকভাবে যা গভীরে, দৃষ্টির আড়ালে এবং অপর অস্তিত্বের ধারক হিসাবে কাজ করে, তাকে সার-অস্তিত্ব এবং যে অস্তিত্ব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, সদা পরিবর্তনশীল, অস্থির এবং আকস্মিক, তাকে অসার-অস্তিত্ব বলা চলে। কিন্তু সার এবং অসার মিলেই সমগ্র অস্তিত্ব। অসারের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য গতিহীন এবং অপরিবর্তনীয় কোনো সার-অস্তিত্বের কল্পনা করা চলে না। অস্তিত্বমাত্রই গতিময় এবং পরিবর্তনশীল্

অস্তিত্বের আর একটি বিশেষ অর্থ পাওয়া যায় অস্তিত্ববাদী দর্শনে। এ দর্শনের মূল হচ্ছে ‘অস্তিত্ব’। আর এ অস্তিত্ব বলতে বুঝাবে মানুষ বা ব্যক্তির অলব্ধ সুপ্ত সম্ভাবনা। ব্যক্তিকে ঘিরে আছে যে পরিবেশ বা বাস্তব জীবন, সে অস্তিত্ব হচ্ছে অনিত্য অস্তিত্ব। কিন্তু নিত্য-অস্তিত্ব হচ্ছে ব্যক্তির সুপ্ত সম্ভাবনা। এ অস্তিত্বের মূলে আছে কোনো এক রহস্যময় বিধাতা বা শক্তি। প্রতিনিয়ত যে-ব্যক্তিরূপে আমরা জীবন যাপন করি, সে ব্যক্তি বাস্তব পরিবেশ দ্বার নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি। এ অসার। এখানে তার নিজের শক্তির কোনো প্রকাশ নেই। কিন্তু কোনো সংকটকালে পরিবেশকে উপেক্ষা কিংবা অতিক্রম করে যে অস্তিত্ব আকস্মিকভাবে প্রকাশিত হয়, ব্যক্তির সেই অস্তিত্বই সার বা মূল অস্তিত্ব। ব্যক্তির এ অস্তিত্ব বুদ্ধি ও জ্ঞানের বাইরে কোনো সংকটমুহুর্তে মানুষ এর আলোকে আকস্মিকভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

Existentialism: অস্তিত্ববাদ

অস্তিত্ববাদ আধুনিক দর্শনের একটি চিন্তাধারা। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর যুগে জার্মানি এবং ফরাসি দেশে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের বিপর্যস্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এই চিন্তার উদ্ভব এবং বিস্তার দেখা যায়।

অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ এবং বিশেষ করে ব্যক্তির অস্তিত্ব। কিন্তু এই প্রশ্নের আলোচনাকারীদের মধ্যে মতামতেরও পার্থক্য আছে।

ইউরোপ এবং আমেরিকার কয়েকজন খ্যাতনামা লেখকের সৃজনশীল গল্প, উপন্যাস, কবিতায় অস্তিত্ববাদী মতের প্রকাশ ঘটেছে। এঁদের রচনায় প্রচার এবং পরিচয়ের মাধ্যমে অস্তিত্ববাদী দর্শন আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও কিছুটা প্রসার লাভ করেছে; এই সমস্ত লেখকের মধ্যে কার্ল জাসপার্স (১৮৮৩-১৯৬৯), মার্টিন হাইডেগার (১৮৮৯-১০৭৬), আলবেয়ার ক্যামু (১৯১৩-১৯৬২), জাঁ পল সার্ত্রে (১৯০৫-১৯৮০), ফ্রাঞ্জ কাফকা (১৮৮৩-১৯২৪) বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।

অস্তিত্ববাদী চিন্তাধারাকে বুঝার জন্য উনিশ শতকের ইউরোপে উদ্ভুত ‘জীবনের দর্শণ’ নামক তত্ত্বটির পরিচয় থাকা আবশ্যক। বস্তুত ‘জীবনের দর্শন’ই অস্তিত্ববাদের উৎস এবং পটভূমি। উনিশ শতকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষ করে জীববিদ্যায় এবং মনোবিজ্ঞানে যে বিস্ময়কর আবিস্কারসমূহ সংঘটিত হয়, তাতে জীবন ও জগতের এতকদিনকার সহজ এবং যান্ত্রিক ব্যাখ্যা অকেজো হয়ে দাঁড়ায়। জীবন ও জগৎ বস্তু বটে কিন্তু সে বস্তু সহজ নয়, সে বস্তু জটিল। তার যান্ত্রিক ব্যাখ্যা মানুষের মনের বহু প্রশ্নের জবাব দানেই অক্ষম। এতনিদকার ভাববাদী কিংবা অষ্টাদশ শতকের যান্ত্রিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যার বিফলতার প্রতিক্রিয়ায় একদল চিন্তাবিদের কাছে জীবন এক অজ্ঞেয় রহস্যের আধার বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। জীবন হচ্ছে এক অসীম শক্তির উৎস; এ না বস্তু; না চেতনা। এর গতি আছে, এর প্রকাশ আছে। কিন্তু সে গতি বা প্রকাশ আমাদের বুদ্ধির আয়ত্তযোগ্য নয়। একে মানুষ কেবল তার সহজাত সজ্ঞা, ইনট্যুইশন বা সম্মোহিত অনুভূতির মাধ্যমেই উপলব্ধি করতে পারে। আর যেহেতু সজ্ঞা বা সম্মোহিত অবস্থা নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার তাই জীবনের উপলব্ধি ব্যক্তিগত ছাড়া সমষ্টিগত জ্ঞানের ব্যাপার হতে পারে না। জীবনের কোনো বিজ্ঞান তৈরি করা সম্ভব নয়, জীবন কেবল অনুভূতি বা উপলব্ধির বিষয়। জীবনের এরূপ ব্যাখ্যই শপেনহার (১৭৭৮-১৮৬০) এবং হেনরী বার্গসঁ (১৮৫৯-১৯৪১) প্রমুখ দার্শনিকের তত্ত্বে দেখা যায়। ডেনমার্কের আত্মবিমোহিত বুদ্ধিজীবী সোরেন কিয়ের্কেগার্ড (১৮১৩-১৮৫৫)-এর রচনায়ও এই ‘জীবনদর্শনের’ সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কিয়ের্কেগার্ডকে অস্তিত্ববাদের সাক্ষাৎ পূর্বসূরি বলে মনে করা হয়। কিয়ের্কেগার্ড দর্শনের ক্ষেত্রে চরম ভাববাদ কিংবা ধর্মের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টীয় যাজকদের ব্যাখ্যা কোনোটাকেই স্বীকার করতে পারেন নি। নিজের জীবনে কিয়ের্কেগার্ড ছিলেন অস্বাভাবিকরূপে আত্মকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিবাদী। এই জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর চিন্তা ও রচনায়। তাঁর মতে এই জগতে ব্যক্তির অস্তিত্বই হচ্ছে কেন্দ্র-কথা। ব্যক্তি তার সংকটরূপে প্রতিভাসিত। সর্বক্ষণ সে সংকটের মুখোমুখি। হয় তাকে এ পথ গ্রহণ করতে হয়, নয় ওপথ; হয় তাকে এটা করতে হবে, নয় ওটা। সংকটের মোকাবেলাতেই ব্যক্তি তার অস্তিত্বের পরিচয় দিতে পারে এবং তাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। কিয়ের্কেগার্ডের মতে সামগ্রিকভাবে দেখলে মানুষের জীবনের দুটি সংকট প্রধান। হয় সে পরিবেশকে গ্রহণ করে নিজের অস্তিত্বকে লুপ্ত করে দেবে জীবনের ভোগে-দুর্ভোগে, আনন্দ-কষ্টে নিমজ্জিত হবে; নয়তো সে পরিবেশকে উপেক্ষা করে বিধাতার কিট আত্মসমর্পণ করে সেই উপেক্ষার শক্তিতে আর আত্মসমর্পণের স্বাধীনতায় নিজের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করবে। কিয়ের্কেগার্ড তাঁর একখানি গ্রন্থের নামকরণই করেছিরেন ‘হয়/নয়’ রূপে।

অস্তিত্ববাদের মতে দর্শনের করণীয় হচ্ছে বিষয় এবং বিষয়ীকে অবিভাজ্য এবং সামগ্রিক সত্তা হিসাবে ব্যাখ্যা করা। বিষয় এবং বিষয়ী, জ্ঞান এবং জ্ঞাতার অবিচ্ছেদ্য সত্তাই হচ্ছে অস্তিত্ব। এ অস্তিত্বকে ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের সংকট সীমায় দাঁড়িয়ে। মৃত্যু, যন্ত্রণা, পাপবোধ, অসন্তোষের মধ্যেই ব্যক্তি সেই সংকট সীমায় উপনীত হতে পারে। বুদ্ধি বা যুক্তির মাধ্যমে এ অস্তিত্বকে জানা সম্ভব নয়।

অস্তিত্ববাদের প্রাথমিক প্রবক্তা কিয়ের্কেগার্ডের সিদ্ধান্তে ধর্মীয় ভাব সুস্পষ্ট। কিন্তু অস্তত্ববাদীগণ সাধারণত নাস্তিক বলে মনে করা হয়। এঁদের ভাবধারার মধ্যে নিটশের দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। নিটশে ‘ঈশ্বর’কে মৃত বলে ঘোষণা করেছিলেন। সার্ত্রের বক্তব্য হচ্ছে ঈশ্বরকে অস্বীকার করেই ব্যক্তিকে বাঁচতে হবে। আর ঈশ্বরই হচ্ছে ব্যক্তি জীবনে সমস্ব বন্ধনের মূল। সেই ঈশ্বরই যখন অস্বীকৃত, ব্যক্তি তখন অবাধ-স্বাধীন। তার নিজের কাছে ছাড়া অপর কারুর কাছে তার কোনো জবাবদিহি করার নেই। অপর কারুর কাছে দায়িত্ব বা কর্তব্যে সে দায়ী নয়। সবার বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ। সব কিছুকে, সব আইন-কানুন, ভালো-মন্দ, নিয়ম-নীতি, প্রেম-ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, দান-গ্রহণ সব কিছুকে অস্বীকার করার চেষ্টায় এবং সে চেষ্টার সফলতার মধ্যে ব্যক্তির অস্তিত্ব নিহিত। সেই চেষ্টতেই ব্যক্তির অস্তিত্বের উপলব্ধি। জগৎ আর ব্যক্তি পরস্পর-বিরুদ্ধ শক্তি। এ জগতে ব্যক্তি বহিরাগত। অস্তিত্ববাদী সাহিত্যিকদের মধ্যে সমধিক পরিচিত আলবেয়ার ক্যামু তাঁর এক উপন্যাসের নাম দিয়েছিলেন ‘বহিরাগত’ বা ‘আউটসাইডার’। তাঁর অপর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্লেগ’ উপন্যাসেও পরিবেশের সমস্ত ঘটনা, দুর্ঘটনা, ভয়, আতঙ্ক, মৃত্যু, প্রেমিকার আহবান সব কিছুর প্রতি অত্যদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা সহকারে দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের আকর্ষণীয় চিত্র নায়কের চরিত্রে অঙ্কিত হতে দেখা যায়। আলবেয়ার ক্যামুর আর একখানি উপন্যাস ‘মিথ অব সিসিপাস’-এর প্রতিপাদ্য ছিল: আত্মহত্যার যদি কোনো যুক্তি না থাকে, বেঁচে থাকারও কোনো যুক্তি নেই। অতএব যুক্তিগতভাবে ব্যক্তি যখন আত্মহত্যা করতে পারে না কিংবা বাঁচতেও পারে না, তখন ‘কেবল বাঁচার জন্য বাঁচা’ ব্যতীত ব্যক্তির জন্য আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

আধুনিক পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত সমাজ-ব্যবস্থা, পুঁজিবাদের চরম উন্নতি ঘটে ঊনবিংশ শতকে। তার বিকাশের সমস্ত গোড়া থেকেই শুরু হয় তার তীব্র ক্ষয়ের যুগ। এখন সেখানে সম্ভাবনা কেবলমাত্র ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সংঘর্ষ নয়, কেবলমাত্র শ্রেণীর হাতে শ্রেণীর শোষণ নয়। এখন মানুষের জীবনের প্রতি মুহুর্তের আশঙ্কা জাতিতে জাতিতে বৈরীর, ধ্বংসযজ্ঞের, মিথ্যার বেসাতির এবং যে মানুষ এই আশ্চর্য মানব সভ্যতা সৃষ্টি করেছে সেই মানুষের হাতে তার নিশ্চিহ্ন বিলোপের সম্ভাবনা এক অযৌক্তিক অসঙ্গত এবং ভীতিজনক অবস্থা। এরই প্রকাশ হিসাবে প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। মানুষের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, ন্যায়-নীতি, শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে। এই বিপর্যস্ত অবস্থায় যে-বুদ্ধিজীবী মানুষের জন্য মুক্তির এবং অগ্রসরের আর কোনো পথ আবিস্কার করতে অক্ষম তার পক্ষে নৈরাজ্যিক মনোভাব নিয়ে চরম বিপর্যয়ে চিন্তাবিদ মাত্রই অস্তিত্ববাদী হয় নি। পৃথিবীর মানুষ প্রতিষ্ঠিত সমাজ-ব্যবস্থার বিপর্যয়কে মানুষের জন্য চরম বলে স্বীকার করে নি; সংঘবদ্ধ চেষ্টায় সে এমন এক নতুন সঙ্গত সমাজ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে যেখানে ব্যক্তি, সমষ্টির মধ্যেই নিজের অস্তিত্বের সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারবে। সে হিসাবে অস্তিত্ববাদ সাধারণ চিন্তার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। অস্তিত্ববাদ এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর বিপর্যস্ত মনের প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে চরম আত্মরতিমূলক প্রতিক্রিয়া।

F

Fa Chila: ফাচিয়া

প্রাচীন চীনের একটি অগ্রসরকামী চিন্তাধারা। এই ধারার প্রধান প্রবক্তা হিসাবে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় এবং দ্বিতীয় শতাব্দীতে আমরা শাঙচুন এবং হানফিজু নামক দুজন দার্শনিকের সাক্ষাৎ পাই।

আলোচ্য সময়ে চীনের সমাজ-দেহ একটা পরিবর্তনের প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষের অর্থনীতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহজতর বিনিময় পদ্ধতির উদ্ভবে সমাজে নতুনতর শক্তির সৃষ্টি হচ্ছিল। এর ফলে এতদিনকার অনড় সীমাবদ্ধ মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠী-সমাজ বিচলিত হয়ে উঠল। তার স্থানে ব্যাপকতর এলকাভিত্তিক নতুন অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়াস পেতে লাগল। ফাচিয়া সীমাবদ্ধ গোষ্ঠী-সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামী নতুনতর অভিজাত তন্ত্রেরই আদর্শগত হাতিয়ার। ফাচিয়া মতের অনুসারীগণ গোষ্ঠীতান্ত্রিক বিভাগের স্থানে ঐক্যবদ্ধ চীন গঠনের এবং সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশের পক্ষপাতী ছিল। হানফিজু ছিলেন  এই নতুন বিকাশের দার্শনিক। তিনি বলতেন, বস্তুজগতের নিয়ামত হচ্ছে ‘তাও’ বা প্রাকৃতিক বিধান। কোনো অতিপ্রাকৃতিক বিধাতা নয়। তেমনি সমাজের নিয়ামত হিসাবেও থাকবে সামাজিক বিধান বা ‘ফা’। সামাজিক বিধান দ্বারাই মানুষ সংগ্রাম করবে রক্ষণশীল শক্তির বিরুদ্ধে। হানফিজু এবং ফাচিয়ার অন্যান্য অনুসারীরা ধর্মান্ধতা, রহস্যবাদ এবং কুসংস্কারের বিরোধী ছিলেন।

Fabian Society, Fabianism: ফ্যাবিয়ান সমিতি, ফ্যাবিয়ানবাদ

প্রাচীন রোমের বিখ্যাত সমরবিদ ফ্যাবিয়াস-এর নামের ভিত্তিতে ঊনবিংশ শতকের ইংল্যাণ্ডের একদল গণতান্ত্রিক সমাজবাদী চিন্তাবিদের প্রতিষ্ঠিত সমিতি ‘ফেবিয়ান সোসাইটি’ নামে পরিচিত। রোমের সমরবিদ ফ্যাবিয়াসের নাম গ্রহণ করার কারণ এই সমরবিদ সেকালে (খ্রি. পূ. ৩২২-২৯৫) কারথেজের সঙ্গে রোমের যুদ্ধে যে কৌশল গ্রহন করেছিলেন সে কৌশলের বৈশিষ্ট্য ছিল ‘বিলম্বিতকরণ’। ল্যাটিন শব্দ ‘কাংটেটর’-এর অর্থ হলো বিলম্বকারী। ফ্যাবিয়াসকে তাই ‘কাংটেটর’ বলা হতো। ফ্যাবিয়াস কার্থেজের প্রখ্যাত সমরবিদ হানিবলের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ পরিহার করে যুদ্ধ প্রলম্বিত করে পরিশেষে হানিবলকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। আধুনিককালে, ঊনবিংশ শতকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন যখন বিস্তার লাভ করতে থাকে তখন ইংল্যাণ্ডের গণতন্ত্রবাদী বেশ কিছু সমাজবাদী পুঁজিবাদের সঙ্গে সরাসরি মারাত্মক সংঘর্ষ বা বিপ্লবকে পরিহার করে ক্রমান্বয়ে প্রচারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্বকে গ্রহণ করেন। তাঁদের তত্ত্বের সারমর্মকে প্রকাশের জন্য ‘ফ্যাবিয়াস’ নামের ভিত্তিতে তাঁদের সমিতিকে ফ্যাবিয়ান সমিতি বলে অভিহিত করেন। এই সমিতির সূচনাকলের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ, সিডনী ওয়েব, সিডনী অলিভার এবং গ্রাহাম ওয়ালাস। ১৮৮৯ সনে ‘ফ্যাবিয়ান নিবন্ধাবলী’ বা ‘ফ্যাবিয়ান এসেজ’ নামক গ্রস্থ প্রকাশের মাধ্যমে এই সমিতির প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই সমিতির উদ্যোগে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বের কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে এই কমিটি থেকে ইংল্যাণ্ডের লেবার পার্টির উদ্ভব ঘটে। প্রায় ১৯১৪ সন পর্যন্ত ফ্যাবিয়ান সমিতির কার্যক্রমে জোর ছিল। এই সময়ে সমিতির সদস্যসংখ্যা ১৫০০০ এবং স্থানীয়ভাবে প্রায় ১০০০টি সমিতিকে পৌঁছেছিল। ১৯২০ ও ত্রিশের দশকে সমিতির কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। ১৯৩৯ সনের দিকে এ্যাটলী, জি.ডি.এইচ. কোল প্রমুখ রাজনীতিক নেতা এবং লেখকের উদ্যোগে সমিতিটিকে পুনর্গঠিত হতে দেখা যায়। এর পরেও সমিতিটির কার্যক্রমের, বিশেষ করে এদের ‘ক্রমান্বয়বাদী’ সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রকাশ নানা সম্মেলন আহবান, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে ঘটতে দেখা যায়। ইংল্যাণ্ডের লেবার পার্টিকে ফ্যাবিয়ান সোসাইটির প্রধান ফলশ্রুতি এবং উত্তরাধিকারী বলে বিবেচনা করা চলে। বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে প্রায় ১৩০ জন সদস্য ফ্যাবিয়ান সমিতিভুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে হ্যারলড উইলসনের নাম উল্লেখযোগ্য। (দ্র. Socialism, ফ্যাবিয়ান সমাজতন্ত্র)।

Fall of Bastil: বাস্তিলের পতন

ফ্রান্সের বিপ্লব-এর সময়ে ১৪ জুলাই, ১৭৮৯ সালে বিদ্রোহী জনতা বাস্তিল দুর্গ অধিকার করল। পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু তাঁর স্নেহাস্পদ কন্যা ইন্দিরা প্রিয়দর্শীনিকে পত্রাকারে লিখেছেন, “বাস্তিলের পতন ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ঘটনা। সারাদেশ ব্যাপী বাস্তিলের পতন ছিল মহাবিদ্রোহের সংকেত। এর অর্থ দাঁড়াল, ফ্রান্সে প্রাচীন রীতি সামন্তপ্রথা রাজার একাধিপত্য এবং সম্প্রদায় বিশেষের বিশেষ অধিকারের পরিসমাপ্তি। ১৪ই জুলাই ক্রুব্ধ জনতার কাছে বাস্তিল দুর্গের পতন হল”।

Family: পরিবার

বিবাহ-বন্ধনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন ইত্যাদি সামাজিক সম্পর্কের উৎস হচ্ছে পরিবার। পরিবার হচ্ছে মানুষের একটি ঐতিহাসিক সামাজিক সংস্থা এর বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট হয় মানুষের জৈবিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং তার নৈতিক ও মানসিক ধ্যান-ধারণা দ্বারা।

মানুষের সামাজিক সংস্থাসমূহের মধ্যে প্রাচীনতম হলেও মানুষের জীবনের আদিতে পরিবারের অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের জীবনের বিকাশের একটি বিশেষ পর্যায়ে পরিবারের উদ্ভব ঘটে। মানুষের প্রয়োজনবোধ থেকেই যে-কোন সামাজিক সংস্থার সৃষ্টি। মানুষের যৌন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতেই পরিবারের সৃষ্টি। আদিতে নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক ও সামাজিক কোনো বিধি-নিষেধের অস্তিত্ব ছিল না। এই বিধি-নিষেধের প্রথম উদ্ভব ঘটে গোত্রতান্ত্রিক সমাজে। মানুষ এতদিতে যাযাবর শিকারী জীবনের জন্য যৌন সম্পর্ক ছাড়া জীবিকার উপায় এবং সম্পত্তির উপর অধিকারের ধারাবাহিকতার প্রয়োজনও মানুষ অনুভব করতে শুরু করেছে। এই প্রয়োজন সাধনের জন্যই প্রথম পরিবারের উদ্ভব ঘটে। বর্তমানে পরিবারের উদ্ভব ঘটে মাতৃতান্ত্রিক রূপে। সন্তানের জনক সমাজে তখন তত সুনির্দিষ্ট ছিল না। কিন্তু সন্তানের জননী সুনির্দিষ্ট। জননীর মাধ্যমেই তাই বংশের ধারাবাহিকতা চিহ্নিত করা সহজ ছিল। আর্থিক বিকাশেও তখন পর্যন্ত নারী-পুরুষের কাজের বিভাগ তত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায় নি। কালক্রমে নারী-পুরুষে কাজের বিভাগ এবং সম্পত্তির ভোগ সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজনে নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্কের অধিকতর নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়। এই পরিক্রমায় পিতৃতান্ত্রিক পরিবার সৃষ্টি হয়। এ বিকাশ পৃথিবীর সর্বত্র এই সময়ে ঘটে নি। আজো মানব সমাজের কোনো কোনো অংশে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় পাওয়া যায়। পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের বৈশিষ্ট্যও যুগ এবং সমাজ-নিরপেক্ষ নয়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের পরিবারের আভ্যন্তরিক বৈশিষ্ট্য পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের তুলনায় পুঁজিতান্ত্রিক সমাজেও পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট হয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বার্থ দ্বারা।

নারী-পুরুষের সম্পর্কের নিয়ামকও ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কিন্তু মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পত্তির ভোগ ও রক্ষাই যে একমাত্র নিয়ামক হবে –এমন কোনো চরম কথা নেই। জীবন ধারনের উপায় যখন ব্যক্তি এবং পরিবারের জন্য কোনো সমস্যামূলক প্রশ্ন থাকবে না, তখন পরিবারের বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে নতুনতর রূপান্তর  সংঘটিত হবে। সংকীর্ণ আর্থিক স্বার্থকে অতিক্রম করে নতুনতর মানবিকতা বোধ তখন পরিবারের আভ্যন্তরিক সম্পর্কের মূল নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়াবে। নারী ও পুরুষ তখন সমান সুযোগ ও অধিকার-ভোগী মানুষে পরিণত হবে। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ পরিবারের এইরূপ রূপান্তরকে স্বাভাবিক বলে গণ্য করে এবং এই আদর্শ অর্জনকে সামাজিক বিপ্লবের অন্যতম লকষ্য বলে ঘোষণা করে।

Fascism: ফ্যাসিবাদ

পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া মহাজনী মূলধনের চরম জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়াশীল ও সন্ত্রাসমূলক প্রকাশ হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ইতালিতে এবং ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। ফ্যাসিবাদ চরম জাতীয়তাবাদ, অযৌক্তিক ধর্ম ও বর্ণবিদ্বেষ এবং উদ্দেশ্য সাধনে চরম বর্বরতার আদর্শ প্রচার করে। ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের চরম সংকটের পরিচয়বাহক। সাম্রাজ্যবাদী যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের চরম যুগ। জাতীয় ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের বিকাশ যখন নিঃশেষিত, তখন পুঁজিবাদ নিজের শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র গ্রহণ করে। সাম্রাজ্যবাদী যুগেরও পরিণামে পুঁজিবাদ সামাজিক সংকটের ফলে বিপ্লব এবং নিজের উচ্ছেদ অত্যাসন্ন দেখে জাতীয় ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের সকল ব্যবস্থা পরিত্যাগ করে স্বৈরতন্ত্রের রূপ গ্রহণ করে। সমাজতন্ত্রই পুঁজিবাদের মূল প্রতিশক্তি। এ জ্ঞান থেকে শ্রমিক শ্রেণীকে ফ্যাসিবাদ তার আক্রমণের মূল লক্ষ্য বলে নির্দিষ্ট করে। শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী আদর্শ ও সংগঠনকে ব্যর্থ করার জন্য একদিকে তার উপর সে চরম অত্যাচারের নীতি যেমন গ্রহণ করে, তেমনি তার মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ‘জাতির ঊর্ধ্বে কিছু নেই’, ‘আমার জাতি সবার সেবা’, ‘জাতীয় সমাজন্ত্র’ ইত্যাদি ভাবধারা প্রচারের সর্বপ্রকার মাধ্যম গ্রহণ করে। ফ্যাসিবাদের আক্রমণ জাতীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না।বর্বরতা, অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও অন্ধ জাতীয়তাবাদ দ্বারা সঙ্কটের সমাধান করতে না পেরে ফ্যাসিবাদ অপর জাতি ও দেশকে আক্রমণ করতে শুরু করে। দেশের মানুষের দৃষ্টিতে আভ্যন্তরিক সংকট থেকে এভাবে বাইরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ফ্যাসিবাদী ইতালি এবং জাপান দখলের বেপরোয়া জঙ্গী নীতি থেকেই শুরু হয়। পরবর্তীকালে ফ্যাসিবাদী ইতালি ও জাপান জার্মানির সঙ্গে মিলিত হয়ে বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী অক্ষ তৈরি করে। বিশ্ব্যাপী অভূতপূর্ব ক্ষয়-ক্ষতি ও জীবন বিনাশের পরে ফ্যাসিবাদী শক্তি পরাভূত হয়। ফ্যাসিবাদী আদর্শের স্থায়ী উচ্ছেদ সমগ্র পৃথিবীতে সামাজিক বিপ্লব ব্যতীত সম্ভব নয়। বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশ সংকট থেকে পরিত্রাণের শেষ উপায় হিসাবে এখনো ফ্যাসিবাদী চরিত্র গ্রহণ করার চেষ্টা করছে।

Fatalism: অদৃষ্টবাদ

মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা-নিরপেক্ষভাবেই তার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সংঘটিত হয়, এরূপ বিশ্বাসকে অদৃষ্টবাদ বলে। প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে এই ধারণা এরূপ ব্যাপক ছিল যে, কেবল মানুষ নয়, অলিম্পিয়া পাহাড়ের অধিবাসী দেবতাগণও স্বাধীন হয়। তাদের জীবনও ঊর্ধ্বতর অপর কোনো শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস একটি সাধারণ এবং প্রায় সর্বজনীন বিশ্বাস। দৈনন্দিন জীবনের ক্ষেত্রে না হলেও সাধারণ মানুষ মনে করে মানুষের জন্ম, মৃত্যু, যুদ্ধ, ঝড়, ঝঞ্ঝা, দুর্যোগ, সামাজিক বিপ্লবের ন্যায় বিরাট ঘটনাসমূহ মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা তার কার্যকলাপের উপর নির্ভর করে না। বিশ্ববিধাতার ইচ্ছানুযায়ী এরূপ ঘটনা সংঘটিত হয়। অদৃষ্টবাদের বিশ্বাদ একেবারে নেতিবাচকও হতে পরে। এমন ক্ষেত্রে মানুষ মনে করে যে, বিশ্বের ঘটনা প্রবাহরে মধ্যে মানুষ একেবারে অসহায়। আবার এ বিশ্বাস যুক্তিগত হতে পারে। যুক্তিগত বিশ্বাসে মানুষ এরূপ যুক্তি দেবার চেষ্টা করে যে, স্রষ্টার দ্বারা যখন সৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টার হাতে বিশ্বের সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হওয়াই স্বাভাবিক। যুক্তিগত অদৃষ্টবাদ কোনো কোনো ব্যাখ্যায় ‘নির্ধারিত ভবিষ্যৎ’-এর তত্ত্বরূপে প্রকাশিত হয়েছে। আবার কেউ একে ‘ইচ্ছাবাদ’ বলেও অভিহিত করেছেন। ‘ইচ্ছাবাদের’ দাবি হলো যে, বিশ্বের মূল হচ্ছে ইচ্ছা। ইচ্ছার কারণেই বিশ্বের সৃষ্টি। বিশ্বের ঘটনা-প্রবাহ কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এক অলৌকিক ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত। মানুষের ইচ্ছা পরিবেশের উপর নির্ভরশীল নয়। মানুষের ইচ্ছারও মূল হচ্ছে সেই অতিপ্রাকৃতিক আদি ইচ্ছা। এখানে অবশ্য আদি ইচ্ছা বলতে প্রকারান্তরে বিধাতাকেই বুঝান হয়। ইতিহাসে অদৃষ্টবাদ সব সময়েই জ্ঞান এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একদিকে অদৃষ্টবাদ মানুষকে ঘটনা-প্রবাহের নিষ্ক্রিয় দাসে যেমন পরিণত করতে পারে, তেমনি অদৃষ্টবাদের মাধ্যমে ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং অন্ধ জাতীয়তা ও ফ্যাসিবাদ সমাজকে গ্রাস করতে পারে। ভাগ্য আমাদের বিশ্ব-শাসনের জন্য নির্বাচিত করেছে, আমরা নির্বাচিত জাতি –এ বিশ্বাসেই ফ্যাসিবাদের জন্ম।

Federalism: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা

‘ফেডারেশন’ থেকে ‘ফেডারেলিজম’। একটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভাষা, জাতি বা অঞ্চলগত বৈচিত্র্যকে সমন্বিত করে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা হয় তাকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অভিহিত করা হয়। এর বিপরীতে ইউনিটারী বা এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা বলে কথাটি প্রচলিত। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য এরূপ যে, রাষ্ট্রের অন্তর্গত প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলির কিছুটা স্বকীয় সংগঠন ও ক্ষমতার বিধান থাকে। অঙ্গরাজ্যগুলির কি ক্ষমতা এবং সংগঠন থাকবে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তা সমগ্র রাষ্ট্রের মূল সংবিধানে লিপিবদ্ধ রাখা হয়। এরূপ সংবিধানে অনেক সময়ে কেন্দ্রীয়ক্ষমতা, অঙ্গরাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং যৌথ তথা অঙ্গরাজ্য এবং কেন্দ্রের যুক্তক্ষমতা বলে ক্ষমতার তিনটি তালিকারও উল্লেখ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কোথাও কোথাও যুক্তরাষ্ট্রীয় এবং অঙ্গরাষ্ট্রীয় নাগরিকতারও বিধান থাকে। সাধারণত সমগ্র দেশের রক্ষাব্যবস্থা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বা কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত থাকে। অঙ্গরাষ্ট্রীয় ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারসমূহের ক্ষমতা প্রয়োগে বিরোধ দেখা দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট তার নিষ্পত্তি করে। এবং তার রায়কে সকলের জন্য মান্য বলে বিবেচনা করা হয়। মূল সংবিধানের ব্যাখ্যার দায়িত্বও সুপ্রিম কোর্ট পালন করে। যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এরূপ একটি শর্ত সংবিধানে রাখা হয় যে অঙ্গরাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী তাদের সম্মতি ব্যতিরেকে সংবিধানের সংশোধন করা হবে না।

আধুনিক কালে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রথম উদ্ভব দেখা যায় আমেরিকাতে। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধকালে উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ এক সম্মেলনে মিলিত হয়ে আপন স্বকীয়তা বা অধিকার বজায় রেখে এক ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ বা ‘আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র’ নামে তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে আবার দাস সমস্যার মীমাংসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গরাষ্ট্র, বিশেষ করে দাসদের মুক্তির সমর্থক উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দাসব্যবস্থা বজায় রাখার সমর্থক দক্ষিণ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলির আপসহীন মতবিরোধের ফলে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। (দ্র. আমেরিকার গৃহযুদ্ধ)।

সমস্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অভিন্ন নয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা। সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি প্রধান সাংবিধানিক বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, সেখানে অঙ্গরাষ্ট্রগুলির বিচ্ছিন্ন হওয়ার এবং বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষা করার সাংবিধানিক অধিকারের স্বীকৃতি ছিল। বাস্তবে অবশ্য সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাষ্ট্র এই অধিকারকে ব্যবহার করে নি। তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দাবির ভিত্তিতে জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত রিপাবলিক ইউক্রেন এবং বাইলোরুশিয়ার প্রতিনিধিত্বকে স্বীকার করা হয়। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের চরিত্রে অঙ্গরাজ্যের অধিকারের চাইতে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকারের বৈশিষ্ট্যই প্রবল। অবশ্য রাষ্ট্র বিজ্ঞানের গবেষকদের মতে রাষ্ট্রনির্বিশেষে বর্তমান যুগে প্রত্যেকটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। (নব্বই এর দশকে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের ভেঙে যাওয়ার ঘটনা স্মরণযোগ্য)।

Fetishism: বস্তুরতি

প্রাকৃতিক কোনো বস্তুর পূজা বা আরাধনাকে বস্তুরতি বলা হয়। বস্তুরতি আদিম সমাজের ধর্মের অঙ্গীভূত ছিল। প্রাকৃতিক জগতের বিভিন্ন বস্তুর রহস্য মানুষের তখনো অজানা ছিল। পাহাড়, পর্বত, ঝড়ঝঞ্ঝা, মেঘ, বিদ্যুৎ যাবতীয় শক্তিশালী বস্তুরই কৃপার পাত্র ছিল মানুষ। ফলে আরাধনা ও পূজা দ্বারা এই সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তিকে সন্তুষ্ট করে প্রাকৃতিক বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মানুষ মনে করত। বস্তুরতি থেকে গোত্র প্রতীকবাদের উদ্ভব ঘটে। প্রাচীনকালে গোত্র দেবতা হিসাবে প্রাকৃতিক কোনো বিশেষ বস্তু বা বস্তুকে এক একটি গোত্র বিশেষভাবে মান্য করত। তার পূজা করত। এবং সেই বস্তু বা জন্তুর প্রতীক বহন করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করত। এই বস্তুরতির রেশ আধুনিক কালেও যে সমস্ত ধর্মে মূর্তিপূজা, ক্রশ ধারণ, পাথর চুম্বন প্রভৃতি প্রচলিত আছে তার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ‘বস্তুরতি’ শব্দ আজকাল কিছুটা ব্যাপকতর অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কোনো কিছুর উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করাকে বস্তুরতি বলা হয়। এই অর্থে আধুনিক অর্থনীতিতে ‘পণ্যপূজা’ বা ‘পণ্যরতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

Feudalism: সামন্তবাদ

মানুষের সামাজিক আর্থিক বিকাশের একটি পর্যায়। মানুষের সামাজিক বিকাশ তার জীবিকার উপায় এবং উৎপাদন সম্পর্কে বিকাশের ভিত্তিতে প্রধানত নির্দিষ্ট হয়। জমির কর্ষণ থেকে জীবন ধারনের প্রধান উপায় শস্য লাভের কৌশল মানুষের আয়ত্তে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন দাস সমাজের ভাঙনের মধ্য দিয়ে নতুন সামন্ত সমাজের উদ্ভব হয়। সামন্ত সমাজের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি জমি। জমির মালিকানার ভিত্তিতে জমির প্রভু বা সামন্ত সমানের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি জমি। জমির মালিকানার ভিত্তিতে জমির প্রভু বা সামন্ত-প্রভু সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই প্রাচীন দাস সমাজের পরে সামন্ত সমাজের বিকাশ ঘটেছে। উৎপাদনের উপায়ের নতুনতর বিকাশে সামন্ত সমাজের স্থা আধুনিক কালে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুঁজিবাদের পরবর্তী ঐতিহাসিক পর্যায় সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্রও পৃথিবীর একাধিক দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সমাজের বিকাশ ও রূপান্তর যান্ত্রিক নয়। সমাজতন্ত্রের যুগেও অনেক দেশে সামন্ততন্ত্রের রেশ দেখতে পাওয়া যায়। ইউরোপে ফরাসি বিপ্লব অর্থাৎ ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত সামন্ততন্ত্রের স্থায়িত্বের কাল ধরা হয়। সামন্ততন্ত্রে জমির সাক্ষাৎ উৎপাদনকারী কৃষকের নিকট থেকে নানাপ্রকার কর আদায় করত। এই করের পরিমাণ অনেক সময় তার উৎপাদিত সমস্ত সম্পদকে গ্রাস করত। এমনকি, উৎপাদনের পরিমাণ নির্বিশেষে তার উপর খাজনা ধার্য হতো। ফলে অনেক স্থানে কৃষক দৈহিক যাতায়াতের স্বাধীনতা হারিয়ে ভূমির সীমানায় বন্দি ভূমিদাসে পরিণত হতো। সামন্ত সমাজের শাসক ও শোষখ শ্রেণী রাজা, সামন্ত-প্রভু, জমিদার এবং ধর্মযাজকদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। কিন্তু সমাজ বিরোধ-শূন্য ছিল না। শাসক শ্রেণীসমূহ অর্থাৎ রাজা, সামন্ত-প্রভু ও  ধর্মযাজক এদের মধ্যে যেমনি নিরন্তর ক্ষমতার অন্তর্বিরোধ চলত, তেমনি সমগ্র শাসক শোষকদের বিরুদ্ধে শোষিত কৃষক সমাজের বিদ্রোহের প্রয়াস সামন্ত সমাজের ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

Feuerbach, Ludwig: লুডউইগ ফয়েরবাক (১৮০৪-৭২ খ্রি.)

জার্মানির বস্তুবাদী দার্শনিক। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু তাঁর বস্তুবাদী চিন্তাধারার জন্য ১৮৩০ সালে  ফয়েরবাককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। হেগেলের ভাববাদের সমালোচনা এবং ধর্মের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার জন্য ফয়েরবাক এঙ্গেলস, মার্কস এবং সমসাময়িক অন্যান্য বস্তুবাদী চিন্তাবিদদের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। ফয়েরবাকের চিন্তাদারা এবং রচনাসমূহের বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি ধর্মের উৎপত্তি ও বিকাশের বিশ্লেষণ করে ভাববাদের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক প্রমাণ করেন। হেগেলের দ্বান্দ্বিকতার মূল চরিত্র যে ভাববাদ তাও ফয়েরবাক বিশ্লেষণ করে দেখান। জ্ঞানতত্ত্বে তিনি অজ্ঞেয়বাদের বিরোধিতা করেন। জ্ঞানের উৎস হচ্ছে অভিজ্ঞতা এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতি। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও ইন্দ্রিয়ানুভূতির উপর গুরুত্ব আরোপ করতে যেয়ে তিনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে মনের ভূমিকা অস্বীকার করেন নি। মানুষের জ্ঞান ও চেতনা কেবল ব্যক্তিক নয়। ফয়েরবাক মনে করতেন জ্ঞান এবং জ্ঞাতা, বিষয় ও বিষয়ীর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতেই জ্ঞানের উদ্ভব। কাজেই জ্ঞান হচ্ছে সামাজিক প্রক্রিয়া। কিন্তু মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর মতে ফয়েরবাক উনিশ শতকের বস্তুবাদীদের পথিকৃৎ হলেও তাঁর চিন্তাধারার সীমাবদ্ধতা ছিল। ইতিহাস ও সমাজের মধ্যে তিনি যেমন ধর্মের উৎপত্তি নির্দেশ করে সমাজবিজ্ঞানীদের ভূমিকা পালন করেছেন, তেমনি আবার ধর্মকে মানুষের অচেতন আত্মচেতনার প্রকাশ বা নিজের চরিত্রের বাস্তব রূপায়ন বলে তিনি ধর্মের ভাববাদী ব্যাখ্যার রহস্যে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন। মানুষের নীতিরোধকেও তাই তিনি বাস্তব পরিবেশ ও সমাজনির্দিষ্ট বিষয়ের চেয়ে মানুষের চিরন্তন সুখান্বেষী স্বভাবের পক্রাশ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ফয়েরবাক নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের সাক্ষাৎ পূর্বগামীদের অন্যতম ছিলেন।

Fichte: ফিকটে (১৭৬২-১৮১৪ খ্রি.)

জার্মান ভাববাদী দর্শনে কাণ্টের পরেই ফিক্টের স্থান। জার্মান ভাববাদী দর্শনে কাণ্টের পরেই ফিক্টের স্থান। দরিদ্র ঘরের সন্তান ফিক্টে কিশোর বয়স থেকেই অসাধারণ বুদ্ধির পরিচয় দেন। তাঁর জীবনে প্রথম খ্যাতি আসে আকস্মিকভাবে। ১৭৯০ সালে কাণ্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তিনি বেনামীতে কাণ্টীয় দর্শনের ব্যাখ্যামূলক একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলে বুদ্ধিজীবী মহল একে কাণ্টের নিজের রচনা বলে মনে করেন। কিন্তু কাণ্ট বললেন, এ লেখা তাঁর নয়। প্রবন্ধের লেখকের নাম প্রকাশিত হলে লেখক ফিক্টে জার্মানির সাহিত্যিক ও দার্শনিক মহলে প্রখ্যাত হয়ে পড়েন। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের ভাবধারা, বিশেষ করে বুদ্ধির মুক্তির জোয়ার ফিক্টেকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। মানুষের চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা জন্মগত। এই অভিমত প্রচার করে ফিক্টে দুখানি পুস্তিকা লেখেন। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর বয়স যখন মাত্র ৩১ বৎসর, তখন ফিক্টে জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিবাগের অধ্যক্ষ নিয়োজিত হন। কিন্তু  ছাত্র এবং তরুণদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং ধর্মের নীতিগত ব্যাখ্যার কারণে ফিক্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়ে দর্শন বিভাগ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কাণ্টের পরবর্তীকালে ফিক্টের দর্শনের গভীরতাই উনিশ শতকের গোড়ায় ইউরোপে জার্মানীকে দর্শনের বিশিষ্ট কেন্দ্রে পরিণত করে। ফিক্টে ভাববাদী হলেও তিনি কাণ্টের দর্শনের অন্তর্নিহিত অসামঞ্জস্যের সমালোচনা করেন। কাণ্ট তাঁর দর্শনকে বুদ্ধি, বিচার এবং নীতি এই তিন ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। ফিক্টে সমালোচনা করে বলেন, কাণ্টের বিভাগগুলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন। ফিক্টের মতে দর্শনের এরূপ বিভাগ অসঙ্গত। দর্শন হচ্ছে অবিভাজ্য এক সত্তা। মানুষের বুদ্ধি, বিচার এবং নীতি সবই সেই অবিভাজ্য সত্তারই প্রকাশ। কাণ্টের সত্তার সত্তা বা ‘থিং ইন ইটসেলফ’-এর তত্ত্বকে তিনি অস্বীকার করেন। মানুষের জীবনের নিয়ামত অবাস্তব চিন্তা নয়, বাস্তব কর্মই মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে। মানুষের বাস্তব কর্ম নির্দিষ্ট হবে মানুসের নীতিবোধ দ্বারা। জ্ঞানের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তিতেই মানুষ বাস্তব জীবন যাপন করবে। সত্তার প্রকাশ এবং অপ্রকাশ এ দুই-এর মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। আসলে এরূপ দ্বৈত অস্তিত্বের কোনো সত্তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। ফিক্টের ভাববাদকে আত্ম-ভাববাদ বলা চলে। চরম আত্মাই সব সৃষ্টির মূল। চেতনার চরম নৈতিক উপলব্ধি হচ্ছে চরম আত্মা। ব্যক্তিক আত্মা চরম আত্মার অনুকূল। ফিক্টের নীতি-দর্শনের একটি মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ব্যক্তির স্বাধীনতার সমস্যা। ফিক্টে মনে করতেন, ব্যক্তি স্বাধীন বলতে এ কথা বুঝায় না যে ব্যক্তি আদৌ কোনো বিধানের অনিবার্যতার উপলব্ধিতেই ব্যক্তির স্বাধীনতা নিহিত। ইতিহাসের কোনো বিশেষ যুগে ব্যক্তির স্বাধীনতা ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে যুগের বাস্তব অবস্থার উপর। ফিক্টের মধ্যে জার্মান ধনতন্ত্রবাদের বিকাশের বৈপরীত্যগুলির প্রকাশ দেখা যায়। বুদ্ধির মুক্তি এবং বাস্তব জীবনের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রসর চিন্তাবিদ। কিন্তু বিশ্বজগতের ব্যাখ্যায় তিনি ভাববাদের সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ।

Fideism: বিশ্বাসবাদ

যুক্তি নয়, বিশ্বাস দ্বারাই মানুষ চরম সত্যকে লাভ করতে পারে, এই মতকে বিশ্বাসবাদ বলা হয়। শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়, দর্শনের ক্ষেত্রেও বিশ্বাসবাদের প্রকাশ দেখা যায়। বিশেষ করে ভাববাদী দর্শনের মৌলিক কোনো প্রশ্নের সমাধানে পরিণামে বিশ্বাসের আশ্রয় গ্রহণ একটি সাধারণ সত্য। ধর্মীয় বিশ্বাসেরও কিছু রকম-ভেদ দেখা যায়। এর একটি প্রকাশকে চরম বিশ্বাস বলা যায়। চরম বিশ্বাস যুক্তিবিরোধী। চরম বিশ্বাস বিজ্ঞানের সার্থকতা অস্বীকার করে। এজন্য চরম বিশ্বাসবাদ যুক্তিবিরোধী। অস্তিত্ববাদী দর্শনের বিশ্বাসবাদী কিয়ের্কেগার্ড এবং অন্যান্য দার্শনিক অ-যুক্তি বা যুক্তির ঊর্ধ্বে কোনো মাধ্যমকে চরম জ্ঞানের উপায় বলে মনে করেন। এঁদের একটি কথা আছে ‘যা অবিশ্বাস্য তাকেই আমি বিশ্বাস করি’। এর অর্থ, বিশ্বাস্য হচ্ছে সাধারণ। অবিশ্বাস্য হচ্ছে অসাধারণ। আর অসাধারণের মধ্যেই সত্য, সাধারণের মধ্যে নয়। কিন্তু সেন্ট অগাস্টিনের ন্যায় ধর্মীয় দার্শনিকগণ যুক্তির তাৎপর্য পুরাপুরি অস্বীকার করেন না। এ জন্য তাঁদের মতকে নরমপন্থী বিশ্বাসবাদ বলা হয়। সেণ্ট অগাস্টিন বলতেন, বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে আমরা সত্যের অনুসন্ধান শুরু করি। কিন্তু অনুসন্ধানের শেষে দেখতে পাই যে, কেবল যক্তিতে চরম সত্য লাভ সম্ভব নয়। বিশ্বাসেই চরম সত্য লাভ করা যায়। দর্শনের বিশ্বাসবাদ সাক্ষাৎভাবে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত না হতে পারে।

অজ্ঞেয়বাদী হিউম বলতেন মানুষ বস্তু, কার্যকারণ, স্থানকাল কোনো কিছুর অস্তিত্বই জানতে পারে না। মানুষ কেবল বিশ্বাস করে যে, এসব সত্যের অস্তিত্ব আছে। জর্জ সান্তায়ানা মনে করতেন যে, মানুষের অস্তিত্বের মূল বিশ্বাস তা না যুক্তিগত, না ধর্মীয়। কতকগুলি মৌলিক জান্তব বিশ্বাস বা ধারণার উপর মানুষ জীবনযাপন করে।

বার্ট্রাণ্ড রাসেল মনে করতেন যে, বিশ্বাসই পুরোপুরি করা মানুষের অসাধ্য। বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলি ভিত্তিও বিশ্বাস, যুক্তিগত প্রমাণ নয়। দ্বন্দ্বমূলক বা বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ বিশ্বাসকে অস্বীকার করে না সত্য। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মতে বিশ্বাস হচ্ছে জ্ঞানের সদা বিকাশমান প্রক্রিয়ার একটি প্রয়োজনীয় শর্ত। কিন্তু তাই বলে যুক্তি এবং বাস্তব অনুসন্ধানের বাইরে জ্ঞান লাভের বিশ্বাসরূপ কোনো অনন্যনির্ভর মাধ্যম থাককে পারে না। অভিজ্ঞতা-ঊর্ধ্ব বিশ্বাস আকর, জ্ঞানলাভের কোনো মাধ্যম নয়।

Filmer, Robert: রবার্ট ফিলমার (১৫৮৯-১৬৫৩ খ্রি.)

সপ্তদশ শতকের ইংল্যাণ্ডের একজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। রবার্ট ফিলমার অবশ্য অধিক খ্যাতিলাভ করেন তাঁর মৃত্যুর পর। ১৬৪৯-এর গৃহযুদ্ধে পার্লামেন্ট-পক্ষের বিজয় এবং রাজার বিচার ও রাচার শিরচ্ছেদ ঘটলেও ক্রমওয়েলের পার্লামেন্টীয় শাসনের পরে ইংল্যাণ্ডে পুনরায় রাজতন্ত্রের প্রবর্তন ঘটে। সেই সময়কার ইংল্যাণ্ডে রাজা বনাম পার্লামেন্টের বিতর্কের সঙ্গে ধর্মের ক্ষেত্রে ক্যাথলিক বনাব প্রটেস্ট্যান্টবাদও একটি বড় রকমের আলোড়নকারী বিতর্ক ছিল। ইংল্যাণ্ডের কোনো রাজা প্রটেস্ট্যান্টবাদও একটি বড় রকমের আলোড়নকারী বিতর্ক ছিল। ইংল্যাণ্ডের কোনো রাজা ক্যাথলিকবাদী হতে পারবে না –নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা একটি সামাজিক ধর্মীয় বিধান বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু দ্বীতিয় র্চাসের আসন্ন মৃত্যুর কালে সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে এই বিতর্ক পুনরায় জাগরিত হয়। তা ছাড়া গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত পার্লামেণ্টের ক্ষমতাকে ‘অস্বীকার করে ইংল্যাণ্ডের রাজা যখন নিজস্ব ক্ষমতা ব্যবহার করার প্রবণতা দেখাতে পুনরায় শুরু করে তখন সে সার্বভৌম: রাজা, না পার্লামেণ্ট তথা জনসাধারণের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান, এই প্রশ্ন রাজনৈতিক বিতর্কে প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। এ সময়ে আবার একপক্ষ রাজতন্ত্র তথা রাজার সার্বভৌমত্বের উপর যুক্তি প্রদর্শন করতে থাকে। অপর পক্ষ জনসাধারনের সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব উপস্থিত করে। রবার্ট ফিলমামেরর খ্যাতি তখন এই কারণে ঘটে যে তিনি তাঁর জীবিতকালে ‘প্যাটরিয়ারকা’ বা ‘ন্যাচারাল পাওয়ার অব কিংস’ –অর্থাৎ রাজার ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে যে পুস্তক রজার পক্ষীয়গণ তাঁর মৃত্যুর ত্রিশ বৎসর পরে ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশ করে। এই গ্রন্থে ফিলমার একদিকে যেমন ধর্মীয় যুক্তিতে আদমকে ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রথম রাজা এবং আদমের পুত্র হিসাবে পার্থিব রাজাকে ঈশ্বরসৃষ্ট রাজারই উত্তরাধিকরকারীরূপে সার্বভৌম বলে মত প্রকাশ করেন, তেমনি জনসাধারনের সার্বভৌমত্বকে যাঁরা প্রকৃতির বিদান এবং সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে সমর্থন করে, তাঁদের যুক্তিকে বেশ জোরের সঙ্গে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছিলেন। ফিলমানের মতে ‘জনসাধারণ’ কথাটাই বাস্তবতাহীন। জনসাধারনের কোনোকালে চুক্তি করে সম্মতি জানিয়ে রাষ্ট্র এবং রাজা তৈরি করেছিল –এটা না ঐতিহাসিক, না যুক্তিভিত্তিক। জনসাধারণ আসলে ‘মুণ্ডবিহীন এবং সংখ্যা ব্যততি’ আর কিছু নয়। তাঁর কথায় ‘হেডলেস মালটিচুড’। জন লক তাঁর ঐতিহাসিক ‘টু প্রিটিজেস অব সিভিল গভর্নমেন্ট’ –নামক গ্রন্থে রবার্ট ফিলমারের যুক্তিকে খণ্ডন করেন। রাজনৈতিক এ সকল বিতর্কের একটি বাস্তব সমাধান ঘটে ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের পার্লমেন্ট কর্তৃক রাজার শাসনের শর্তাবলী নির্ধারণপূর্বক পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ঘোষণার মাধ্যমে।

 

About সরদার ফজলুল করিম