দর্শন কোষ

Heidegger: হাইডেগার (১৮৮৯-১৯৭৬ খ্রি.)

হাইডেগার জার্মান অস্তিত্ববাদী দার্শনিক ফ্যাসিবাদের পোষকতা করে ১৯৩৩ সালে ফ্রাইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের পরে উক্ত পদ থেকে তাঁকে অপসারিত  করা হয়। অস্তিত্ববাদী চিন্তাধারয় হাইডেগার কিয়ের্কেগার্ডের অনুসারী। তবে কিয়ের্কেগার্ডের অনুসারী। তবে কিয়ের্কেগার্ড যেখানে অন্ধবিশ্বাসের হাতে আত্মসমর্পণকে ব্যক্তির জন্য একমাত্র গ্রহণীয় পথ বলে চিহ্নিত করেছেন, সেখানে হাইডেগার নাস্তিকতার মনোভাব পোষণ করেন। হাইডেগারের দর্শনের মূল হচ্ছে মুহুর্তবাদ-এর তত্ত্ব। উদ্বেগ, আশঙ্কা, ভীতি এগুলি হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের সহজাত স্মারক। এগুলির মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব। নিজের অস্তিত্ব উপলব্ধির জন্য মানুষের প্রয়োজন হচ্ছে বাস্তব জগতের সমস্ত লক্ষ্য ও আদর্শের চিন্তা পরিত্যাগ করে জীবনের ভঙ্গুরতা, মৃত্যু, অনিত্যতা –এই মূল সত্যের মুখোমুখি হওয়া। জাগতিক দায়-দায়িত্ব, কামনা, স্বপ্ন অস্তিত্বের এই মৌলিক সত্য উপলব্ধি ব্যাহত করে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েই মাত্র মানুষ নিজের অস্তিত্বের মুহুর্তকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে। বিজ্হানের বিরোধিতা এবং জীবন সম্পর্কে গভীর হতাশা হচ্ছে হাইডেগারের অস্তিত্ববাদের বৈশিষ্ট্য।

Heliocentricism and Geocentricism: সূর্যকেন্দ্রিকতা ও ভূকেন্দ্রিকতা

পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার সম্পর্ক এব মহাবিশ্ব সম্পর্কে দুটি পরস্পরবিরোধী বৈজ্ঞানিক অভিমত। সূর্যকেন্দ্রিকতাই হচ্ছে বর্তমানে গৃহীত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী অন্যান্য গ্রহের ন্যায় পৃথিবী নিজ কক্ষে ঘুর্ণ্যমান অবস্থায় সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সূর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব কেবল আধুনিককালে প্রমাণিত ও সত্য বলে গৃহীত হলেও প্রাচীনকালেও বিভিন্ন দার্শনিকের মধ্যে এই তত্ত্বের অনুসরণ দেখা যায়। বিশেষ করে ৩১০-২৩০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টার্কাস এবং তাঁর পরবর্তী নিকোলাস স্পষ্টরূপেই মনে করতেন যে, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু প্লেটো, এ্যারিস্টটল ভূকেন্দ্রিকতার তত্ত্বের পরিপোষক ছিলেন। প্লেটো এবং এ্যারিস্টটল এবং পরবর্তীকালের টলেমীর ব্যাখ্যার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসযুক্ত হয়ে ভূকেন্দ্রিকতার তত্ত্বকে বহুকাল যাবৎ অপতিদ্বন্দ্বী করে রেখেছিল। আধুনিককালে এর উপর প্রথম আঘাত হানেন কপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩ খ্রি.)। কপারনিকাস আঙ্কিকভাবে সূর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব প্রমাণিত করেন। পরবর্তীকালে গেলিলিও, কেপলার ও নিউটন এই তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিকভাবে অধিকতর শক্তিশালী করেন। সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব অনুযায়ী সূর্য বিশ্বের একমাত্র কেন্দ্র নয়; সূর্য কেবলমাত্র সৌরমণ্ডলের কেন্দ্র; মহাবিশ্বব্যাপী এরূপ আরো সূর্য আছে এবং তাদের কেন্দ্র করে অগণিত মণ্ডলেরও অস্তিত্ব রয়েছে।

Heracledes: হেরাক্লিডাস (৪০০ খ্রি পূ.)

হেরাক্লিডস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন দার্শনিক। প্লেটোর একাডেমীর সদস্য এবং তাঁর শিষ্য হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু দার্শনিক মতামতের ক্ষেত্রে হেরাক্লিডসের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। পদার্থবিদ্যা, সঙ্গীত, ব্যাকরণ, ছন্দ এবং ইতিহাস প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর রচনার নমুনা গবেষকগণ আবিস্কার করেন। বিশ্বজগতের মূল গঠনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অণুবাদী। তাঁর মতে, ‘নাউস’ বা এক বিশ্বপ্রজ্ঞা জগতের মূল অণুগুলিকে সৃষ্টি করেছে। জ্যোতির্মণ্ডলের ব্যাখ্যায় হেরাক্লিডাস-এর মধ্যে সূর্যকেন্দ্রিকতার আভাস পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে সূর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব সুস্পষ্টভাবে এরিস্টার্কাস পোষণ করতেন। কিন্তু তার প্রাথমিক আভাস হেরাক্লিডাস-এর রচনাতেও দেখা যায়। হেরাক্লিডস মনে করতেন পৃথিবী নয়, সূর্য হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র। হেরাক্লিডস অবশ্য সূর্যের আবর্তন অনুমান করতে পারেন নি। তিনি মনে করতেন সূর্য স্থির এবং পৃথিবী তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।

Heraclitus: হেরাক্লিটাস (৫৩৫-৪৭৫ খ্রি. পূ.)

প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন হেরাক্লিটাস। বিরামহীন পরিবর্তনের ব্যাখ্যাতা হিসাবে তাঁর বিশেষ পরিচয়। এক নদীতে কেউ দুবার অবগাহন করতে পারে না, এ উক্তি বিখ্যাত হেরাক্লিটাসের বলেই পরিচিত। হেরাক্লিটাস মনে করতেন, বিশ্বের মূল বস্তু হচ্ছে আগুন। আগুন প্রবাহ ও পরিবর্তনের উত্তম দৃষ্টান্ত। সমগ্র বিশ্ব এবং তার অভ্যন্তরের বিশেষ বিশেষ বস্তু, কিংবা আত্মা সবকিছুর উৎপত্তি ঘটেছে আগুন থেকে। বিশ্বের সৃষ্টি অলৌকিক কোনো দেবতা দ্বারা ঘটে নি। আগুনের আকারে বিশ্ব বা বস্তু সব সময়েই ছিল এবং সব সময়েই থাকবে। এই অস্তিত্বের মূলে আছে বিশ্বের নিজস্ব ‘লগোস’ বা বিধান। হেরাক্লিটাস বিশ্বের প্রবাহকে মনে করতেন চক্রবৎ। এক চক্র বা এক কাল সমাপ্ত হলে বিশ্বের বস্তুপুঞ্জ আগুনে রূপান্তরিত হয়ে আর এক পরিক্রমা শুরু করে। নিয়ত পরিবর্তমান বস্তুপুঞ্জ নিজ নিজ অস্তিত্ব থেকে তার বিপরীতে পরিবর্তিত হতে থাকে। গরম ঠাণ্ডায় এবং ঠাণ্ডা গরমে রূপান্তরিত হয়। বস্তুর বিপরীতে পরিবর্তনের মূলে রয়েছে সংঘর্ষ। বিপরীতের সংঘর্ষেই বস্তুর পরিবর্তন ও প্রবাহ। এই নিয়ত পরিবর্তন ও প্রবাহের ফলে জগতের কোনো কিছুই অপর কিচু থেকে বিযুক্ত নয়। সব কিছুর সঙ্গে সব কিছু যুক্ত। কাজেই সব কিছুই আপেক্ষিক। জ্ঞানের প্রশ্নেও হেরাক্লিটাস ছিলেন বস্তুবাদী। তাঁর মতে ইন্দ্রিয় হচ্ছে জ্ঞানের মূল। ইন্দ্রিয়ানুভূতি এবং যুক্তি বা বুদ্ধি দ্বারা মানুষ সব রহস্যকেই ভেদ করতে পারে। মানুষের কাছে অজ্ঞেয় অলৌকিক কোনো জগৎ নেই। ‘প্রকৃতি’ সম্পর্কে হেরাক্লিটাসের বিখ্যাত রচনাংশ থেকে গবেষকগণ তাঁর দর্শন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর সমসাময়িক প্রায় সব দার্শনিকের চিন্তাধারার বিরোধী ছিল হেরাক্লিটাসের চিন্তাধারা।

Heredity: বংশগতি, বংশানুক্রমিতা

জন্ম থেকে সন্তানে জীবনের চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতাকে বংশগতি বলা হয়। জীববিদ্যায় বংশগতির মাধ্যমের প্রশ্ন একটি বিতর্কিত এবং বিশেষ আলোচিত প্রশ্ন। বিপরীত যৌনের সম্মেলনে জীবের উৎপাদন। কিন্তু জনকের গুণ সন্তানে কীভাবে প্রভাহিত হয় তার ধারণা পূর্বে স্পষ্ট ছিল না। কোষময় জীবের সৃষ্টি ধারায় পুরুষ ও নারীর ভূমিকার বৈশিষ্ট্য নির্ধারনের চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে সাধারণভাবে এই বলা যায় যে, বংশক্রম বা বংশগতির মূল হচ্ছে জীবের সঙ্গে পরিবেশের সম্পকর্ এবং উভয়ের পারস্পরিক প্রভাব। যে-কোনো শ্রেণীর জীবের জন্য তার পরিবেশই প্রধান। পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তিত করে কিংবা নিজের প্রয়োজনে পরিবেশকে পরিবর্তিত করে জীবমাত্র জীবন ধারণ করার প্রয়াস পায়। এই প্রক্রিয়ায় জীবের যে চরিত্র, বৈশিষ্ট্য বা দেহগত কাঠামো বাঁচার অনুকূল বলে প্রমাণিত হয় সেই চরিত্র বা কাঠামো স্বভাবগত নির্বাচনের মাধ্যমে জীব নিজের অস্তিত্বের ধারাবাহিক অংশ হিসাবে তৈরি করে নেয় এবং যে চরিত্র বা কাঠামো বাঁচার প্রতিকূল হয় তা বর্জিত হয়ে অস্তিত্ব থেকে ক্রমান্বয়ে বিচ্ছিন্ন এবং বিলুপ্ত হয়ে যায়। জীবের বিবর্তনের মূল কারণ হচ্ছে এই পরিবর্তন এবং স্বভাবগত নির্বাচনের জৈবিক ক্ষমতা।

Hieroglyphs, Theory of: প্রতীকবাদ

জ্ঞানের প্রশ্নে একটি বিশেষ তত্ত্ব। ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির মাধ্যমে আমরা বস্তু জগতের প্রতিচ্ছবি লাভ করি। এই প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে মন বস্ত জগতের জ্ঞান তৈরি করে। এটি হচ্ছে জ্ঞানের সাধারণ গৃহীত তত্ত্ব। কিন্তু প্রতীকবাদ জ্ঞানের এই তত্ত্বকে স্বীকার করে না। প্রতীকবাদের মতে ইন্দ্রিয়ানুভূতি আমাদের মনে বস্তুর হুবহু প্রতিচ্ছবি তৈরি করে না, সে মনের মধ্যে কতকগুলি প্রতীক বা সঙ্কেতের সৃষ্টি করে। এই প্রতীক বা সঙ্কেতগুলির সঙ্গে বস্তুর চরিত্রের কোনো সাদৃশ্য নেই। বিশ শতকের গোড়ার দিকে রুশ দার্শনিক প্লেখানভ জ্ঞানের প্রশ্নে ‘প্রতীক’ শব্দের ব্যবহার করেন। প্রতীকবাদ জ্ঞানের প্রশ্নে অজ্ঞেয়বাদে পর্যবসিত হতে পারে। কারণ, ইন্দ্রিয়ানুভূতি যদি বস্তুর চরিত্রকে মনের মধ্যে প্রতিফলিত না করে কেবল কতকগুলি বৈশিষ্ট্যহীন প্রতীক মাত্র সৃষ্টি করে তা হলে বস্তুর চরিত্র জানা মনের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মনের কাছে বস্তু অজ্ঞেয় থেকে যায়। দ্বন্দ্বমূলক বা বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ প্রতীকবাদকে সঠিক মনে করে না। ইন্দ্রিয়ানুভূতি মনে বস্তুজগতের হুবহু প্রতিচ্ছবি তৈরি না করলেও ইন্দ্রিয় হচ্ছে বস্তুজগৎ ও মনের মধ্যকার সাক্ষাৎ যোগসূত্র। ইন্দ্রিয়দত্ত অনুভূতিগুলি হচ্ছে মনের নিকট বস্তুজগতের জ্ঞান তৈরির স্থূল কাঁচামাল বিশেষ। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বস্তুজগতের সঙ্গে মনের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কে মনের বিশ্লেষণ, সংশ্লেসণ, অনুমান ইত্যাকার বিভিন্ন ক্ষমতা বিকাশ লাভ করেছে। মন ইন্দ্রিয়ের দেওয়া অনুভূতির পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ প্রভৃতি মারফত বস্তুজগতের ধারণা তৈরি করে। এ ধারণা বা জ্ঞান কোনো সময়ে চরম এবং অপরিবর্তনীয় নয়। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মন ও বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যেমন নিরন্তর চলছে তেমনি বস্তুজগৎ সম্পর্কে মনের জ্ঞানও বিকশিত হচ্ছে।

Hinduism: হিন্দু ধর্ম

ভারতবর্ষের প্রাচীন ধর্ম। বর্তমানকালেও পৃথিবীর প্রচলিত ধর্মসমূহের অন্যতম ধর্ম হচ্ছে হিন্দু ধর্ম। ‘হিন্দুদের ধর্ম’ হিসাবেও  শব্দটির ব্যবহার করা হতো। এবং এদিক থেকে ‘ইণ্ডাস’ অঞ্চলের অধিবাসীদের ধর্মকে হিন্দু ধর্ম বলা হতো। এ থেকে বুঝতে পারা যায় হিন্দু ধর্ম দ্বারা কোনো সীমাবদ্ধ সুনির্দিষ্ট একক বিশ্বাসের বদলে প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন অহ্চলের এবং যুগের অধিবাসীদের নানা প্রকার বিশ্বাস, আচার, আচরণ ও চিন্তাকে সামগ্রিকভাবে বুঝানো হতো। প্রাচীনকালে এই সমস্ত বিশ্বাস ও দর্শন আর্যদের ভারত আগমনের পূর্বেও ভারতে এক বিকশিত সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। অনুমান করা হয় খ্রি. পূ. ১৮০০-১৫০০ শতকের সময়কালে ভারতের বাইরে থেকে আগত আর্যদের সঙ্গে আদি ভারতবাসী তথা অনার্যদের দীর্ঘকালব্যাপী সংঘর্ষ এবং সমন্বয় প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। কালক্রমে আদি ভারতবাসীদের দেবদেবী বিশ্বাসও আর্যদের দেবদেবী ও বিশ্বাসের অঙ্গীভূত হয়ে এক বিস্তারিত এবং মিশ্র এক ধর্ম ব্যবস্থা বিকশিত হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর এই তিন শক্তি হচ্ছে হিন্দু ধর্মের মূল অলৌকিক শক্তি। ভারতীয় দর্শন এবং ভারতীয় ধর্ম, দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করা কষ্টকর। কর্মের ভিত্তিতে বারংবার পুনর্জন্ম এবং এই দারার ক্রমান্বয়ে কর্মের বন্ধন থেকে আত্মার মুক্তি, হিন্দু ধর্মের অন্যতম দার্শনিক বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মের সমাজব্যবস্থায় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল চার বর্ণাশ্রমব্যবস্থা: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র। আদিতে জীবিকার বিভাগ হিসাবে এই ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়ে থাকলেও পরবর্তীতে এই ব্যবস্থা জন্মগত এবং অপরিবর্তনীয় হয়ে দাঁড়ায় এবং একটির চেয়ে অপরটি উত্তম কিংবা অধম বলে বিবেচিত হয়। এই বর্ণাশ্রমে সবচেয়ে নিম্নে অবস্থিত শূদ্র এবং হরিজন। তারা উচ্চতর, বিশেষ করে উচ্চমত শ্রেণী ব্রাহ্মনের কাছে অস্পৃশ্য বলে গণ্য হতো। সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণাশ্যমের এই ভেদ ভারতবর্ষে আজও বিলুপ্ত হয় নি। এই ভেদাভেদের মূল ভিত্তি যে উচ্চতর অর্থনৈতিক শ্রেণীর সঙ্গে নিম্নতর বিত্তহীন মানুষের স্বার্থ এবং অধিকারের বৈষম্য এবং সংঘর্ষ, তা আধুনিককালে বুঝতে অসুবিধা হয় না। মহাত্মা গান্ধী সামাজিক বিপ্লবের পরিবর্তে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে প্রেম ও দয়ার কথা প্রচার করে এই বর্ণভেদের বৈষম্যকে দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাঁর সে ব্যক্তিভিত্তিক মহৎ চেষ্টা তেমন সফল হতে পারে নি।

Hippocratis: হিপোক্রাটিস (৪৬০-৩৭৫ খ্রি. পূ.)

প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসাবিদ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলে তিনি পরিচিত। সততার সঙ্গে মানুষের সেবাই হবে একজন চিকিৎসকদের নীতি বা ধর্ম –এই মর্মে চিকিৎসকের শপথ নেওয়ার যে কথা তিনি বলেচিলেন তা আজো ‘হিপোক্রাটিসের শপথ’ বলে সম্মানিত। তাঁর জীবনকালে তিনি গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তাঁর চিকিৎসার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা। পর্যবেক্ষণ হচ্ছে বিজ্ঞানের প্রথম শর্ত। সেকালেও রোগের ক্ষেত্রে শল্য চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের তিনি একজন প্রবক্তা ছিলেন। মানুষের রোগের মূলে রয়েছে দেহের রক্তের সংশ্লেষণ ব্যত্যয়ের উদ্ভব এরূফ অভিমত পোষণ করে দেহের জলীয় পদার্থকে তিনি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেন। ধীর, স্থির চরিত্রের অধিকারী হিপোক্রাটিসের মন তাঁর রোগীদের জন্য যেমন সহানুভূতিতে পূর্ণ ছিল, তেমনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান দ্বারা তাঁর সহকর্মী ও উত্তরাধিকারী চিকৎসক-সমাজও যেন লাভবান হতে পারে, তেমন একটি দার্শনিক এবং সহৃদয় বোধ দ্বারা হিপোক্রাটিস উদ্ধুদ্ধ ছিলেন। বিজ্ঞানের সেই সূচনাকালে যেখানে কল্পনা এবং দর্শনেরই ছিল প্রাধান্য সেখানে হিপোক্রাটিস সেই পথিকৃৎদের অন্যতম যাঁরা যুক্তিকে বাস্তব পর্যবেক্ষণে প্রয়োগ করে প্রমাণযোগ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বস্তুত হিপোক্রাটিসের অনুসৃত পদ্ধতিই আরোহী বিজ্ঞান তথা ‘ইনডাকটিভ সায়েন্স’-এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ কারণে হিপোক্রাটিস এবং তাঁর অনুসারীদের রচনাসমূহের তাৎপর্য কেবল চিকিৎসাশাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেকালে হঠাৎ মূর্ছা যাওয়া এবং  অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিকে ভৌতিক বা অলৌকিক বলে সাধারণ মানুষ ধারণা করত। রোগের কার্যকারণবোধ স্বীকৃত ছিল না। কিন্তু এই কালেই হিপোক্রাটিসের একজন অনুসারী মূর্ছা যাওয়ার ঘটনাকে কার্যকারণের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। এ প্রসঙ্গে খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ৪০০ বৎসর পূর্বে হিপোক্রাটিসের রচিত ‘অলৌকিক রোগ’ বা ‘সেকরেড ডিজিজ’ নামক রচনায় তার নিম্নোক্ত উক্তিটি বিশেষ তাৎপর্যময় উক্তি বলে বোধ হয়।

“যেসব রোগকে অলৌকিক বলে অভিহিত করা হয় তারাও কারণবিহীন নয়। অন্য রোগের মতো এ সকলেও উৎস হচ্ছে দেহের মধ্যে শৈত্য, তাপ, বায়ু এবং এরূপ নিত্য-অস্থির উপাদানসমূহের প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণ। সব ঘটনারই পূর্ব ঘটনা থাকে। যে তার অন্বেষণ করে সে অবশ্যই তার সাক্ষাৎ লাভে সক্ষম হয়”। (দ্র A Short History of Scientific Ideas to 1900 by Charles Singer. Oxford University Press 1959.)।

Hippocratic Oath: হিপোক্রাটিসের শপথ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের চিকিৎসাবিদ হিপোক্রাটিস অসুস্থ মানুষের সেবায় নিঃস্বার্থ এবং সততার সঙ্গে চিকিৎসকমাত্রের করণীয় হিসাবে যে শপথনামা তৈরি করেছিলেন তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে পৃথিবীব্যাপী হিপোক্রাটিসের শপথ বা ‘হিপোক্রাটিক ওথ’ নামে পরিচিত। হিপোক্রাটিসের শপথের মর্মকথা ছিল এরূপ: “যে গুরু আমাদের শিক্ষাদান করেছেন মহৎ এই শাস্ত্র, তিনি আমার পিতার মতো: আমার জীবন তাঁর জীবনেরই অঙ্গস্বরূপ আমার যা কিছু সুখ, তাকে আমি ভোগ করব আমার সেই পিতার সঙ্গে মিলিতভাবে। তাঁর সন্তানতরা আমরা নিজের সহোদর সম। আমার কর্তব্য আমার এ সহোদরদের শিক্ষাদান করা আমার গুরুর প্রদত্ত এই শাস্ত্র-কৌশলকে। এই শাস্ত্রকে আয়ত্ত করার অদিকার কেবল তাদেরই যারা এই শাস্ত্রের নীতিকে মান্য করার প্রতিশ্রুতিতে স্বইচ্ছাতে আবদ্ধ। আমার জ্ঞান, ক্ষমতা এবং বিবেচনাবোধ দ্বারা আমি আমার রোগীদের তেমন নিরাময়পত্রই প্রদান করব, যা তাদের মঙ্গল সাধন করবে, উপশমে সাহায্য করবে এবং ক্ষতির কোনো কারণ হবে না। কোনো মারাত্মক ঔষধ যা আমার রোগীর মৃত্যু ঘটাতে পারে, আমি তেমন কোনো ঔষধের ব্যবস্থা আমার রোগীকে প্রদান করব না কিংবা মাতার গর্ভজাত ভ্রুণকে বিনষ্টকারী কোনো উপায়েরও আমি উৎস হবো না। আমার জীবনের এবং এই শাস্ত্রের পবিত্রতা রক্ষা করা হবে আমার পালনীয় ব্রত। আমার রোগীর দেহে বিষাক্ত পদার্থের বিমোক্ষণে শল্য ক্রিয়ার প্রয়োজন হলে তা সম্পন্ন করার দায়িত্ব কেবল এমন ক্রিয়ার বিশেষজ্ঞেরই: অবিশেষজ্ঞের নয়। আমার রোগীর গৃহে প্রবেশ ঘটবে তার উপশম এবং মঙ্গলের জন্য: স্ত্রী কিংবা পুরুষ, দাস কিংবা অ-দাস কারুর প্রতি কোনো মোহাকর্ষণ আমার জন্য অপবিত্র। আমার চিকিৎসাকর্মকালে আমার রোগীর যা কিছু তথ্য আমার জ্ঞানের মধ্যে আসুক না কেন তাকে গোপন রাখা এবং প্রকাশ না করা হবে আমার শাস্ত্রীয় কর্তব্য। আমার  এই আনুগত্যই হবে আমার জীবনের সকল সুখ ও সম্মানের একমাত্র ভিত্তি। এবং এর কোনো ব্যত্যয় নিয়ে আসবে আমার জীবনে এর বিপরীত তথা অভিশাপ এই হোক আমার জীবনের প্রত্যয় এবং প্রত্যাশা”।

History, Economic Interpretation of: ইতিসাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা

ইতিহাসের মার্কসবাদী ব্যাখ্যাকে অনেক সময়ে ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা বলে অভিহিত করা হয়। বস্তুত মার্কসবাদের মূল সূত্র তিনটি বলে পরিচিত ১. বস্তুবাদ তথা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ২. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বা ইতিহাসের ব্যাখ্যায় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রয়োগ ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ; ৩. সমাজের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ। মার্কস মানুষকেই ইতিহাসের নির্মাতা বলেছেন। তাঁর মতে মানুষই ইতহাস তৈরি করে। কিন্তু যে-কোন ব্যক্তি-মানুষের ইচ্ছামাফিক নয়। মানুষ ইতিহাসের বিধানকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দ্বারা দ্বান্দ্বিকভাবে জ্ঞাত হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাস নির্মাতার ভূমিকা পালণন। এর অর্থ, ব্যক্তি-নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসের বিকাশের বিধান আছে। এই প্রসঙ্গে মার্কস বলেছিলেন, এ যাবৎকালের দর্শনের ইতিহাসের বিকাশের বিধান আছে। এই প্রসঙ্গে মার্কস বলেছিলেন, এ যাবৎকালের দর্শনের ইতিহাসে দেখা যায়, দার্শনিকগণ নানাভাবে জীবন ও সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন। যেন মানুষের ব্যাখ্যা করার অধিকতর কোনো ভূমিকা নেই। ‘আসলে প্রয়োজন এখন কেবল ব্যাখ্যার নয়, প্রয়োজন মাজকে পরিবর্তনের’। এমন কথা দ্বারা মার্কস ইতিহাসের বিকাশে ইতিহাসের বিধানের জ্ঞানে সমৃদ্ধ মানুষের সক্রিয় ভূমিকার উপর জোর প্রদান করতে চেয়েছেন। মার্কসীয় সূত্রের সহজ ব্যাখ্যা এই যে, ১. বস্তু হচ্ছে মূল সত্তা; ২. বস্তুবাম্রই দ্বন্দ্বমূলক গতিসম্পন্ন; ৩. মানুষও বস্তুর দ্বন্দ্বমান বিকাশের প্রকাশ এবং মানুষের সামাজিক জীবনের ইতিহাসও হচ্ছে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের দৃষ্টান্তস্বরূপ; ৪. মানুষের সমাজ-জীবনের মূল হচ্ছে মানুসের জীবন নির্বাহের জন্য কর্মকাণ্ড ততা তার অর্থনৈতিক কার্যাবলী। অর্থনৈতিক কার্যাবলীর প্রধান হচ্ছে জীবিকা সংগ্রসের হাতিয়ার বা উপায় এবং এই হাতিয়ার বা উপায়সমূহের ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সম্পর্ক। এর একটিকে উৎপাদনের শক্তি এবং অপরটিকে উৎপাদনের সম্পর্ক বলে অভিহিত করা চলে। উৎপাদনের উপায় বা শক্তি এবং উৎপাদনের সম্পর্ক অপরিবর্তিত থাকে না। তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বমূলক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তার পরিবর্তিত হয় এবং আদিমকাল থেকে পরবর্তিত হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে ঊনবিংশ শতকের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উপনীত হয়েছেঠ। এই পরিবর্তন প্রবহমান। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্তার পর থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের পরে, সমাজ উৎপাদনের উপায়ের মালিক এবং অ-মালিক, এরূপ আর্থিক শ্রেণীতে বিভক্ত হয়েছে। পুনরায় অর্থনৈতিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে যৌথ মালিকানা তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সমাজ অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর-বিরোধী দ্বন্দ্বমান শ্রেণীবিভক্ত সমাজ এবং এই সমাজের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। মানব সমাজের ইতিহাসের এরূপ ব্যাখ্যা ইতিহাসের ব্যাখ্যা হিসাবে পরিচিত। (দ্র. Dialecal Materialism: দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ)।

Historicism: ঐতিহাসিকতাবাদ

ইতিহাসের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বস্তু বা বিষয়ের উদ্ভব এবং বিকাশের অনুধাবন। ঐতিহাসিকতাবাদ বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি মৌলিক পদ্ধতি। জগৎ ও সমাজের প্রশ্নে আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত প্রচলিত পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য ছিল দার্শনিক কল্পনা ও বিশ্লেষণ। এ পদ্ধতিতে সমস্যামাত্রকে নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন মনে করা হতো। ফলে, বাস্তব অবস্থা, অতীত ঘটনা ইত্যাদি নিরপেক্ষভাবে দার্শনিকগণ যে-কোন সমস্যার রহস্যোদঘাটন এবং সমাধান সম্ভব বলে মনে করতেন। অনেকে ইতিহাসকে মনে করতেন একটা চক্রের আবর্তন। এরূপ আবর্তনে সমাজে এবং জগতে নতুনের কোনো বিকাশ সম্ভব বলে মনে করা হয় না। চক্রের আবর্তনে একই ঘটনা, সমস্যা বা বিষয় বারবার আবির্ভূত হয়। ইতিহাস ও জগতের এই দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত সমাজ ও বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে জ্ঞানের বিকাশকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। ঐতিহাসিকতাবাদ দার্শনিক সেই ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে সমাজ ও ইতিহাসের সর্বত্র আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোনো বস্তু বা ঘটনাই কালনিরপেক্ষ নয়। তার বর্তমান চরিত্র নিদিষ্ট হচ্ছে তার অতীত উদ্ভব এবং বিকাশ দ্বারা। তার ভবিষ্যৎও নির্দিষ্ট হবে সেই বিকাশের প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত বর্তমান দ্বারা। সমাজের কোনো অবস্থারই হুবহু পুনরাবর্তন সম্ভব নয়। ইতিহাসকে সদা নতুন দিগন্তে অগ্রসরমান রথ বলে মনে করা চলে, তাকে শুধু চক্র বলে মনে করা চলে না। অতীতই ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে; কোনো অতীত ভবিষ্যৎ ফিরে আসতে পারে না। জীবনের জন্ম ও বিকাশকে চার্লস ডারউইন ঐতিহাসিকতার তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করে জীববিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিকাশকে অবারিত করে দিয়েছেন। ঐতিহাসিকতাবাদের তত্ত্ব প্রয়োগ করে মার্কসবাদ মানুসের সামাজকি জীবনের বিকাশের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তৈরি করেছে।

Hitler Adolf: এ্যাডলফ হিটলার

হিটলারের (১৮৮৯-1945) পার্টির নাম ছিল ফ্যাসিস্ট পার্টি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে হিটলারের বিরোধী সমাজতান্ত্রিক পার্টি ছিল জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টি। জার্মান রাইখকে বলা হত পার্লামেন্ট। হিটলারের পার্টি রাইখে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিকে দায়ী করে কমিউনিস্টদের ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করতে থাকে। দ্বিতীয় যুদ্ধের সময়ে হিটলারের আসল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েট ইউনিয়নকে ধ্বংস করা। এই উদ্দেশ্যে ইউরোপের অন্যান্য দেশ আক্রমণ করার পরে ১৯৪১ সালে সোভিয়েট ইউনিয়নকে সর্বগ্রাসীভাবে আক্রমণ করে। সোভয়েট ইউনিয়নের নেতা স্ট্যালিনের নেতৃত্বে আমরণ প্রতিরোধ করতে থাকে। হিটলারের বাহিনী মস্কো ঘেরাও করে ফেললেও মস্কো দখল করতে ব্যর্থ হয়। সোভিয়েট সৈন্য পাল্টা আক্রমণ করে ফ্যাসিস্ট বাহিনী পরাজিত করে বার্লিন পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে মিত্রপক্ষের রুজভেল্ট এবং ইংল্যাণ্ডের নেতা উইনস্টোন চার্চিলের মিলিত সভায় হিটলারের বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। সংক্ষেপে এটাই হচ্ছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কাহিনী।

Hobbes, Thomas: টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯ খ্রি.)

টমাস হবস ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংল্যাণ্ডের বস্তুবাদী দার্শনিক। ইংল্যাণ্ডে এই সময়ে ধনতান্ত্রিক সমাজ-বিপ্লব সংঘটিত হচ্ছে। ধানতান্ত্রিক বিপ্লবের এই পরিবেশ টমাস হবসকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। হবসকে যান্ত্রিক বস্তুবাদের ব্যাখ্যাতা বলা হয়। তাঁর মতে সমগ্র জগৎ হচ্ছে বস্তুর সমষ্টি। মানুষও বস্তুমাত্র। জগৎ ও সমাজ, সর্বক্ষেত্রে একটি মাত্র মৌলিক বিধান কার্যরত রয়েছে। সে বিধান হচ্ছে বস্তুর যান্ত্রিক গতি। মানুষ কিংবা অপরাপর জন্তু বস্তুর জটিল গ্রন্থনে সৃষ্ট যন্ত্রবিশেষ। কোনো যন্ত্র যেমন বাইরে থেকে দেওয়া শক্তির জোরে চলতে থাকে, মানুষ এবং জন্তুরও বাইরের শক্তি দ্বারা চালিত হচ্ছে। কাজে কাজেই মানুষ বা অপর প্রাণীর মধ্যে দেহের অতিরিক্ত অস্তিত্বসম্পন্ন আত্মা বলে কিছু নেই। বিধাতাকে আত্মার স্রষ্টা বলা হয়; কিন্তু বিধাতা মনুষের কল্পনার সৃষ্টি বৈ কোনো অস্তিত্ব নয়। বস্তু থেকে বস্তুর পার্থক্য কেবল সংখ্যা বা পরিমাণগত। হবস বিধাতাকে কাল্পনিক বলে বস্তুবাদের পরিপোষক হয়েছেন, কিন্তু বস্তুর গতি বস্তুর বাইরে থেকে আসে মনে করে বস্তুকে আর এক কাল্পনিক শক্তির উপর নির্ভরশীল করেছেন। বস্তু যে আপন শক্তিতেই গতিসম্পন্ন, এ ধারণাকে অস্বীকার করেন। ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির ভিত্তিতেই মানুষের জ্ঞান তৈরি হয়, অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে বা সহজাত কোনো ভাবের মাধ্যমে নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শাসনের প্রশ্নে হবস রাজার ঐশ্বরিক অধিকারের তত্ত্বকে নাকচ কর সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব সমর্থন করেন। তাঁর মতে মানুষের সম্মিলিত চুক্তির ভিত্তিতে সমাজ তৈরি হয়েছে এবং রাজাও চুক্তির ভিত্তিতে রাজ্য শাসন করেন। রাজার হাতে চুক্তির ভিত্তিতে অধিকার সমর্পণ করার পরে নাগরিকের রাজাকে অমান্য করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠিত হয় না, সমাজ দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং জনসাধারনের জন্য একমাত্র রাজতন্ত্রই সর্বোত্তম শাসন-ব্যবস্থা। কারণ, সমাজের ব্যক্তিমাত্রই স্বভাবগতভাবে স্বার্থপর এবং অপরের অধিকারের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন। এর ফলে শক্তিশালী শাসক ব্যতীত সমাজে অরাজকতা বিরাজ করারই আশঙ্কা। শাসকের শক্তি সীমাবদ্ধ হলে শাসক সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হবে। মূলত একচ্ছত্র শাসন সমর্থন করলেও হবস মনে করতেন, ব্যক্তি তার জীবন রক্ষার প্রয়োজনে বিদ্রোহের অধিকারী। হবসের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বের বিস্তারিত প্রকাশ ঘটেছে ‘লেভিয়াথান’ নামক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ।

Holbach: হলবাক (১৭২৩-১৭৮৯ খ্রি.)

ফরাসি বিপ্লব-পূর্বকালের বস্তুবাদী দার্শনিক। ফরাসি বিশ্বকোষকারকদের নাম জ্ঞানের ইতিহাসে বিখ্যাত। হলবাককে এই বিশ্বকোষকারকদের কেন্দ্রীয় শক্তি বলে মনে করা হতো। তাঁর ‘লা সিস্তেম দা লা ন্যাচার’ নামক গ্রন্থ প্যারিস পার্লামেণ্টের আদেশে ১৮৭০ সালে ভস্মীভূত করা হয়। হলবাকের মতামত ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ধর্ম এবং ভাববাদী দর্শনের তিনি ছিলেন বিরোধী। তাঁর মতে ধর্মের উৎপত্তি অধিকাংশ মানুষের অজ্ঞতা, ভয় এবং কিছু সংখ্যক সচেতন লোকের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক অভিসন্ধির মধ্যে নিহিত। হলবাক ধর্মযাজক বার্কলে ব্যাখ্যাত ভাববাদের তীব্র সমালোচনা করে ভাববাদকে মানুসের সাধারণ বুদ্ধির বিরোধী এক অবাস্তব তত্ত্ব বলে অভিহিত করেন। বস্তুর বাইরে কোনো অস্তিত্ব নেই; বস্তু আমাদের ইন্দ্রিয়কে আঘাত করে আমাদের মধ্যে অনুভূতির সৃষ্টি করে। বস্তুর মৌল পদার্থ হচ্ছে অবিভাজ্য অণু। হলবাকের মতে বস্তুর গতি আছে কিন্তু সে গতি যান্ত্রিক। মানুষ প্রকৃতির অংশ এবং প্রাকৃতিক বিধানে সে আবদ্ধ। মানুষ প্রাকৃতিক বিধানের অধীন –এ তত্ত্বের যেরূপ ব্যাখ্যা হলবাক করেন তাতে মনে হয় যেন মানুষ অসহায়ভাবে নিয়ন্ত্রণবাদের দাস।

Hsun Tzu : সুনজু(২৪৯-২৩৮ খৃ.পূ)

প্রাচীন চীনের একজন বস্তুবাদী দার্শনিক ছিলেন সুনজু। তাঁর সময়কার প্রচলিত চিন্তাধারার তিনি ছিলেন বিরোধী। সমগ্র বিশ্বকে বস্তু হিসেবে ব্যাখ্যা করার তিনি চেষ্টা করেন। বিশ্বের কোনো স্রষ্টা আছে-এ কথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তিনি প্রকৃতির ক্ষেত্রে দুটি শক্তি অস্তি (ইয়াং) এবং নাস্তি( ইন) এর তত্ত্ব তৈরি করেন। বিশ্বের সব কিছুই নিয়ত অস্তি এবং মাস্তির পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভূত ও পরিবর্তিত হয়ে চলছে। তাঁর মতে জ্ঞানের শুরু ইন্দ্রিয়ের অনুভূতিতে। কিন্তু শুধু অনুভূতি জ্ঞান নয়। মানুষের বুদ্ধি ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূতির ভিত্তিতে প্রকৃতির জ্ঞান তৈরি করে। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায়। মানুষের মধ্যে যার যা কিছু মহৎ তা শিক্ষার দ্বারাই সৃষ্টি হয়। চীনের দর্শনের পরবর্তী বিকাশ সুনজুর চিন্তাধারা দ্বারা বিরাটভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।

Hume, David: ডেভিড হিউম(১৭১১-১৭৬৬ খৃ.)

ইংরেজী ভাববাদী দার্শনিক ডেভিড হিউম মনোবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। জ্ঞানের সমস্যার যে ব্যাখ্যা হিউম উপস্থাপিত করেন তা পরবর্তীতে ভাববাদী দর্শনকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেন। ‘জ্ঞানের মূল হচ্ছে ভাব’- এ তত্ত্ব দুটি ধারার সৃষ্টি করে। জন লক বলেছেন, ভাবের মূল হচ্ছে অভিজ্ঞতা। বার্কলে বলেছেন, ভাবের মূল হচ্ছে মন। ভাব মনকে অতিক্রম করে বস্তু বা অভিজ্ঞতায় আদৌ পৌছতে পারে না। এ তর্কে হিউম যোগদান করে বললেন, এই বিরোধিতায় জ্ঞানের মূল সমস্যার কোনোরূপ মীমাংসা আদৌ সম্ভব নয়।

‘বস্তু আছে কি নেই’ এরূপ প্রশ্নের সমাধান  ভাবের তত্ত্ব দ্বারা কোনোরূপে সম্ভব নয়। হিউমের মতে আসলে মানুষ বস্তুর জ্ঞান আদৌ লাভ করতে পারে না। তার অর্থ এই নয় যে, বস্তু নেই-একথা মানুষ জানতে পেরেছে। বস্তু আছে বা নেই জ্ঞান দ্বারা মানুষ এর কোনো উত্তরই দিতে পারে না। বস্তুর সঠিক জ্ঞান বলতেও কিছু নেই। সঠিকজ্ঞান কেবলমাত্র অঙ্কশাস্ত্রেই সম্ভব। কারণ, অঙ্কের কারবার বস্তু নিয়ে নয়, সংখ্যা নিয়ে, সূত্র নিয়ে। সংখ্যা বা সূত্র কোনো বস্তু নয়। জ্ঞানের মূল কাজ বস্তুর অস্তিত্ব নির্ণয় করা নয়। জ্ঞানের কাজ হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনের সহায়ক মাধ্যম হওয়া। ভাবের প্রবাহ বা ধারা নিয়ে আমাদের সাধারণ জ্ঞান তৈরি হয়। কিন্তু ভাবের মূল কি, তা মানুষের অজ্ঞেয়। বস্তু আছে কি নেই-দুটোই আমাদের অবিশ্বাসের ব্যাপার, প্রমাণের বিষয় নয়। আমরা বিশ্বাস করি, ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে। কোনো ঘটনাকে কোনো ঘটনার কারণ কিংবা ফল হিসেবে আমরা চিহ্নিত করি। কিন্তু ঘটনার মধ্যে কারণ কিংবা ফল আছে বলে প্রমাণ করা চলে না। মানুষের মধ্যে যে সময় বোধ আছে, তা থেকে মানুষ ঘটনাসমূহকে কালের বুকে পূর্বাপর হিসেবে কল্পনা করতে পারে; কিন্তু তার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজে বার করে তার ভিত্তিতে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী সে করতে পারে না। মানুষ অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কেবল আশা করতে পারে যে, অতীতে যা ঘটেছে ভবিষ্যতেও তা ঘটবে। কিন্তু অনিবার্য পুনরাবৃত্তির নিয়ম সে আবিষ্কার করতে পারে না। হিউম অবশ্য মানুষের ভাবের রাজ্যকে অরাজক বলতে চান নি। মানুষ অভিজ্ঞতার মধ্যে অনেক ভাবকে শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে সংঘটিত হতে দেখে। কিন্তু কার্যকারণের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশ্বাস এক কথা, আর তার অস্তিত্ব প্রমাণ আর এক কথা। মোট কথা, জ্ঞানের সমস্যার বিশ্লেষণে হিউম দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষের পক্ষে জ্ঞান অর্থাৎ বস্তুর লাভ সম্ভব নয়। এই জন্য হিউমকে অজ্ঞেয়বাদী বলে অভিহিত করা হয়।

Hunger-strike: অনশন

অনশন শব্দটির অর্থ হচ্ছে কোনো খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ না করা। উপবাসে থাকা। বিভিন্ন ধর্মে কোনো কোনো উপলক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উপবাস করার নিয়ম দেখা যায়। এরূপ অনশন দ্বারা মানুষ মনের শান্তি লাভ করতে চায় এবং ধর্মের অনুশাসন লাভ করে। কিন্তু আধুনিককালে অনশন একটি রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে অনশনকে সংগ্রামের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ভারত উপমহাদেশ যখন ইংরেজ শক্তির শাসনে ছিল তখন ইংরেজ সরকার বিভিন্ন সময় স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে এবং কারাগারে বন্দীদের উপর নানারূপ নির্যাতন করার নীতি অনুসরণ করেছে। কারাগারে আবদ্ধ এরূপ বন্দী নিতান্তই অসহায়। বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে তার দৈহিক সংগ্রাম করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এমন  অবস্থাতেও যে বন্দী তার বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের উপায় বের করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত ভারতের কারাগারে আবদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীগণ বহুবার স্থাপন করেছেন। তাঁরা কারাগারে নিজেদের জন্য রাজনৈতিক ও মানবিক মর্যাদা আদায়ের জন্য এবং সরকার কিংবা কারাগার কর্তৃপক্ষের অন্যায় আদেশ ও আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক উপায় হিসেবে খাদ্যগ্রহণ করার অস্বীকার করার নীতি গ্রহণ করেন। ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন যাবত অনশন বা এরূপে স্বেচ্ছায় খাদ্য গ্রহণ না করে বন্দিশালায় বহু বন্দি মৃত্যুও বরণ করেছেন। তাঁদের সেই মৃত্যু দেশের ব্যাপকতর জনসাধারণের মাঝে আবেগের সঞ্চার করেছে এবং দেশের মানুষকে স্বাধীনতা আন্দোলনে অধিকতর উদ্বুদ্ধ করেছে। এভাবে কারাগারের মধ্যে আবদ্ধ থেকেও নিজেদের জীবনদান করে রাজবন্দিরা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে অগ্রসর করে দিয়েছেন। এরূপ ঘটনা ও জীবন দানের কাহিনীর মধ্যে লাহোর দূর্গে বন্দী বাংলার বিপ্লবী নেতা যতীন দাসের ১৯২৯ সনে ৬৩ দিনের অনশন এবং এই অনশনে তাঁর মৃত্যু একটি স্মরণীয় ঘটনা। কারাগারে অনশনে যতীন দাসের মৃত্যু ঐ সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষকে আন্দোলিত করে তুলেছিল। কবি রবীন্দ্রনাথ যতীন দাসের মৃত্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করেছিলেন এবং জনসাধারণের প্রতিবাদসভায় যোগদান করেছিলেন। আন্দামান দ্বীপে কারারুদ্ধ রাজনৈতিক বন্দিরাও একাধিকবার সে যুগে অনশন ধর্মঘট করেছিলেন এবং তাতে জানা-অজানা বহু বন্দি মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তান শাসনামলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে শত শত রাজবন্দি আমরণ অনশন ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৯৪৯-১৯৫০ সনে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অবলম্বিত ৫৮ দিনের অনশন ধর্মঘট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই অনশনে কুষ্টিয়ার শ্রমিক নেতা শিবেন রায় নিহত হন। কারাগারের বাইরেও রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা অনশন করার দৃষ্টান্ত আছে। এরূপ অনশনের দৃষ্টান্ত প্রথম স্থাপন করেন ভারতের অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী। তিনি অনেকবার ঘোষণা করে অনশন করেছেন। কেবল ইংরেজ শক্তির কোনো নীতি বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে নয়। নিজের ‘আত্মাকে শুদ্ধ’ করার উদ্দেশ্যে বা দেশবাসীর কোনো অবাঞ্চিত আচরণের প্রতিবাদেও অনির্দিষ্টকালের বা আমরণ অনশনের ঘোষণা দ্বারা তিনি অনশন করেছেন। বাংলাদেশের জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীও গান্ধীজির অনুসরণে বিভিন্ন সময়ে অনশন করেছেন।

ভারতের বাইরে, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজবন্দিদের অনশন সাম্প্রতিককালে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। ১৯৮২ সনে এরূপ অনশনে একাধিক রাজবন্দি মৃত্যুবরণ করেছেন।

Hypothesis: প্রকল্প, আন্দাজ

কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে কোনো একটিকে নির্বাচন করে প্রমাণ ও পরীক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতিকে প্রকল্প বা আন্দাজের ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া বলে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রকল্প একটি প্রয়োজনীয় স্তর। মঙ্গল গ্রহে জীবন আছে কিনা এ প্রশ্নের একাধিক উত্তর সম্ভব। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট জবাব বাছাই করে এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিককে অগ্রসর হতে হয়। একটি প্রকল্প সাধারণত সরাসরিভাবে প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত হয় না। প্রকল্প প্রমাণের পদ্ধতিটি এইরূপ যদি গৃহীত আন্দাজ বা প্রকল্পটি সঠিক হয় তা হলে বাস্তব ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরিফল দৃষ্ট বা সংঘটিত হবে। অনুমিত পরিফল বাস্তবে সংঘটিত হয়েছে। সুতরাং গৃহীত প্রকল্পটি সত্য বলে প্রমাণিত হলো। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রধান স্তরগুলিকে নিম্নোক্তভাবে নির্দিষ্ট করা যায়। কোনো সমস্যার বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রথমে পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু হয়। এ-টি প্রথম স্তর। পর্যবেক্ষণে সংগৃহীত তথ্যাদির বিশ্লেষণে যদি একাধিক সমাধানের সম্ভাবনা দেখা যায়, তবে একটি সমাধান বাছাই করা হয়। এটি গবেষণার দ্বিতীয় বা প্রকল্পের স্তর। একাধিক সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে একটি সমাধানের নির্বাচনের প্রধান শর্ত হচ্ছে নির্বাচিত প্রকল্পটিকে সর্বোত্তম বিবেচনা করতে হবে। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক বিধানসমূহের বিরোধী কোনো প্রকল্পকে গ্রহণ করা যাবে না। প্রকল্পটি প্রমাণযোগ্য হতে হবে। নির্বাচিত প্রকল্পের ভিত্তিতে গবেষণার প্রমাণ ও প্রয়োগ অর্থাৎ তৃতীয় স্তর শুরু হয়। প্রমাণ ও প্রয়োগে নির্বাচিত প্রকল্পটি সঠিক দেখা গেলে প্রকল্পটি প্রকল্প বা আন্দাজ হিসেবে না থেকে সঠিক সমাধান বলে বিবেচিত হয়। অপরদিকে প্রমাণ ও প্রয়োগে নির্বাচিত প্রকল্প নাকচ হলে গবেষণাকে নতুন আর একটি প্রকল্প গ্রহণ করে প্রয়োগ ও প্রমাণের অধ্যায় পুণরায় শুরু করতে হয়। নির্বাচিত প্রকল্পকে কার্য প্রকল্প বলেও অভিহিত করা হয়।

Ibn Khaledun : ইবনে খালেদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.)

আরব সভ্যতার ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসের দার্শনিক হিসাবে ইবনে খালদুন এর নাম সুবিখ্যাত। উত্তর আফ্রিকার তিউনিসে তাঁর জন্ম। তাঁর শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক জীবনের বিচিত্র কর্মকান্ডের কেন্দ্র প্রধানত উত্তর আফ্রিকা। মাত্র বিশ বছর বয়সে দেশের সুলতানের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি নিযুক্ত হন। তারপর কখনো সুলতানের কর্মসচিব, কখনো সুলতানের কাজি, কখনো রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিচিত্র দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। তাঁর জীবনে উত্থান পতন কম ছিল না। সুলতানের বিরাগভাজন হওয়াতে দুবার তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। মঙ্গোল বাদশাহ তৈমুর লঙ এর দিগ্বিজয়ের অভিযানে সিরিয়া আক্রান্ত হলে মিসরের সুলতানের সঙ্গে যে যুদ্ধ ঘটে তাতে তৈমুর লঙ এর বাহিনীর হাতে ইবনে খালদুন বন্দী হন। তাঁকে তৈমুর লঙ এর দরবারে হাজির করা হয়। তৈমুর লঙ তাঁর পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে মুক্তি দিয়ে মিসরে প্রেরণ করেন। ইবনু খালদুন কায়রোর আল আজহার মসজিদের শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যাপকও নিযুক্ত হয়েছিলেন। কায়রোতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।

আত্মজীবনী ব্যতীত ইবনু খালদুন এর প্রধান এবং সুবিপুল ইতিহাস সম্পর্কিত গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘কিতাব উল ইবার ওয়া দেওয়ান উল মুরতাদা ওয়া আল খবর ফি আয়াম উল আরব ওয়া আল আজম ওয়া আল বারবার’। এই গ্রন্থে ইতিহাসের বিবরণগত অংশে লেখক প্রথমে আরব এবং তার প্রতিবেশী জাতিসমূহের ইতিহাস এবং তারপরে বারবার ও উত্তর আফ্রিকার জাতিসমূহের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু এই বিবরণের পূর্বে তিনি ইতিহাস পাঠের তত্ত্বগত যে ভূমিকা বা ‘মুকাদ্দিমা’ রচনা করেন তা ইতিহাস তত্ত্বে এক আশ্চর্য অমর অবদান বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে। মুকাদ্দিমার মধ্যে ইবনু খালদুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বন্ধনের মূল কি এবং কোনো স্থান বা রাষ্ট্রের অধিবাসীর চরিত্র তাদের চারিপাশের জলবায়ু ও জীবিকার্জনের উপায় দ্বারা কিভাবে প্রভাবিত ও গঠিত হয় এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিধি বিধানে কিভাবে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তার মৌলিক ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনা পেশ করেন। সমাজ ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে এরূপ বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আলোচনা জ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথম। এ কারণে ইবনু খালদুন সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের দর্শনের অবিসংবাদী জনক বলে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইবনু খালদুনের বিবরণ আরব দেশসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইতিহাসকে বিজ্ঞান হিসাবে তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন। আধুনিক পাশ্চাত্য জগতের অন্যতম ইতিহাসকার আর্নল্ট টয়েনবি তাঁর সুবিখ্যাত ‘স্টাডি অব হিস্টরি’ গ্রন্থে ইবনু খালদুনের মূল্যায়ণ করে বলেছেন, ‘খালদুনের  ইতিহাসের দর্শন জ্ঞানের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত অনতিক্রান্ত সৃষ্টির মর্যাদায় মহিমান্বিত। জর্জ সারটন তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘ইনট্রোডাকশন টু দ্য হিস্টরি অব সায়েন্স’ গ্রন্থে এরূপ উল্লেখ করেছেন যে, কেবলমাত্র মধ্যযুগেরই নয়, প্রাচীন ঐতিহাসিকগণের পর ম্যাকিয়াভেলি পর্যন্ত ইতিহাসের তত্ত্ব ও মানুষের অভিজ্ঞতার দর্শনের ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের সমকক্ষ অপর কেউ জন্মগ্রহণ করেন নি।

ইউরোপীয় ইতিহাসের মধ্যযুগের এক পর্বে আরবী ভাষার রচনাবলী ল্যাটিন ভাষায় অনুদিত হওয়ার মরসুম শুরু হয়েছিল। এই সময়ে অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপ আরবী সভ্যতার মহৎ সৃষ্টি এবং প্রাচীন গ্রিসের দর্শনের পরিচয় লাভ করে। ইবনে খালদুনের জন্ম অনুবাদের এই মরসুমের পরে ঘটায় ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইবনু খালদুনের আরবি রচনাবলি ও তাঁর উৎকর্ষ ইউরোপে ছিল অপরিচিত। ১৮৬২-৬৮ সালের দিকে ফরাসি দেশে ফরাসি ভাষায় সর্বপ্রথম তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থের অনুবাদ হয়। ইংরেজি অনুবাদ ঘটে মাত্র অতি সাম্প্রতিককালে ১৯৫৮ সালে।

Ibn Rushd : ইবনে রুশদ (১১৬২-১১৯৮ খ্রি.)

আরব সভ্যতার বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক। ইউরোপে তিনি ‘আভারস’ নামে পরিচিত। জন্ম মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত স্পেনের কর্ডোভা শহরে। আইন, ধর্মতত্ত্ব, অংকশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং দর্শন অর্থাৎ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর অগাধ প্রগাঢ় পান্ডিত্য ছিল।

ইবনে রুশদনের দার্শনিক চিন্তার বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি ইসলামের ধর্মীয়বোধের বিরোধিতা না করেও গ্রিসের দার্শনিক এরিস্টটলের দর্শনের বস্তুবাদী দিক বিকশিত করার চেষ্টা করেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বস্তু এবং গতির কোনো স্রষ্টা নেই। আত্মার অমরতা ও পরকালকে ইবনে রুশদ অস্বীকার করেন। আল-গাজ্জালীর ধর্মীয় রহস্যবাদকে ইবনে রুশদ তীব্রভাবে সমালোচনা করেন। প্রাচীণ গ্রীক দর্শনের সঙ্গে ইউরোপের সাক্ষাৎ পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিলেন ইবনে রুশদ। এরিস্টটলের দর্শনের যে ব্যাখ্যা তিনি রচনা করেন তার মাধ্যমে ইউরোপের জ্ঞানজগৎ গ্রিক দর্শনের পরিচয় লাভ করে। ইবনে ‍রুশদের দর্শন এবং তার অনুসারীগণ মুসলিম ও খ্রিষ্টীয় ধর্মের গোঁড়াপন্থীগণের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তাঁর কোনো কোনো গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাদের এই বিরোধিতা ইবনে রুশদের দর্শনের শক্তি এবং প্রভাবের পরিচায়ক। কেবলমাত্র মুসলিম সাম্রাজ্য নয়, ত্রয়োদশ শতকের ফরাসি চিন্তাধারার উপরও ইবনে রুশদের অগ্রসর চিন্তাধারার প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। ইতালিতে চতুর্দশ হতে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইবনে রুশদের চিন্তাধারার সাক্ষাত পাওয়া যায়। ইবনে রুশদের দর্শনের প্রধান অভিমত হচ্ছে বিশ্ব চিরস্থায়ী এবং আত্মাও দেহের ন্যায় মরণশীল। ধর্মের সঙ্গে বিরোধ এড়াবার জন্য ইবনে রুশদ দ্বৈত সত্ত্বার তত্ত্ব রচনা করেন। তিনি বলতেন, সত্য দুই প্রকারঃ দর্শন ও বিজ্ঞানের সত্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সত্য। দর্শন ও বিজ্ঞানের সত্য যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসের কাছে গ্রাহ্য নয়, তেমনি জগৎ সম্পর্কে ধর্মের ব্যাখ্যা ও বিজ্ঞান ও দর্শনের কাছে গ্রহণীয় হতে পারে না। মধ্যযুগে বিজ্ঞান যখন গোঁড়ামির শিকল ভেঙ্গে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে তখন ইবনে রুশদের দার্শনিক রচনা্র মধ্যে এরিস্টটলের দর্শনবিষয়ক তার তিন খন্ডের বক্তব্য সমধিক পরিচিত। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর তিনি সাত খন্ডে ‘কিতাব উল কুললিয়াত’ নামে যে বিশ্বকোষ রচনা করেন তাও জ্ঞানের ইতহিাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই বিশ্বকোষে ইবনে রুশদ শরীরাংশ, দেহতত্ত্ব, রোগতত্ত্ব, সাধারণ চিকিৎসা, খাদ্য ও ঔষধপথ্য ব্যবস্থা এবং আরোগ্য বিজ্ঞানের সুবিস্তারিত বিবরণ পেশ করেন।

Ibn-Sina : ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.)

মধ্য এশিয়ার বুখারার আবু আলী ইবনে সিনা ইউরোপে দার্শনিক আভিসেনা নামে পরিচিত; দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কবি ইবনে সিনার জীবন ছিল বিপুল জ্ঞানরাশিতে সমৃদ্ধ ও ঘটনায় বিচিত্র। অতি অল্প বয়সে তাঁর বুদ্ধির আশ্চর্য দীপ্তি প্রকাশ পায়। দশ বছর বয়সে তিনি হাফেজে কোরআন এবং ষোল বৎসরে চিকিৎসার একটি নতুন পদ্ধতির আবিষ্কারক হিসেবে সকলের বিস্ময় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সতেরো বছর বয়সে বুখারার আমীর তাঁকে দরবারের চিকিৎসক নিযুক্ত করেন। কিন্তু এই আমীরের পতনের পর ইবনে সিনার জীবনেও অনিশ্চয়তা নেমে আসে। এরপর থেকে দেশে-বিদেশে ঘুরে ঘুরে তাঁকে জীবন কাটাতে হয়। এক সময় ইবনে সিনা কারাগারেও নিক্ষিপ্ত হন। কারাগার হতে পলায়ন করে তিনি ইস্পাহান যান।

আরব সভ্যতায় প্রাচীন গ্রীসের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনকে সংযোজিত করে আরব সভ্যতার মাধ্যমে ইউরোপে সেই অমর জ্ঞান সম্ভারকে পৌছে দেয়ার ক্ষেত্রে ইবনে সিনার অবদান অতুলনীয়। ইবনে সিনা ইউক্লিডের জ্যামিতিকে আরবী ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন এবং এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যা, তত্ত্ববিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার নতুনতর বিকাশ সাধন করেন। ইবনে সিনার দর্শনে ভাববাদী ও বস্তুবাদী উভয় ধারারই আমরা পরিচয় পাই। ইবনে সিনা গতি, শূণ্যতা, তাপ, আলো, স্থানিক আকর্ষণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গবেষণা করেন। সে যুগে প্রচলিত আল-কেমি বা কিমিয়া বিদ্যার ধাতু রূপান্তরবাদকে তিনি অস্বীকার করেন।

ইবনে সিনার অবদানের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর রচিত তাঁর বিশ্বকোষ ‘কানুন’। চিকিৎসার তত্ত্ব, অমিশ্র বা সহজতর ঔষধাদি, রোগের সাধারণ প্রকার, রোগের নিরাময় ব্যবস্থা এবং মিশ্র ঔষধ প্রভৃতি বিষয়ের উপর পাঁচ খন্ডে রচিত সুবিপুল ‘কানুন’ এ ইবনে সিনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমস্ত তথ্য ও তত্ত্ব এরূপভাবে পেশ করেন যে, তাঁর এই গ্রন্থ চিকিৎসা বিজ্ঞানের গুরু বলে পরিচিত গ্যালেনের গ্রন্থসমূহকে অতিক্রম করে যায় এবং পাঁচ শতাধিক বছর ধরে চিকিৎসা-বিজ্ঞানে অপ্রতিদ্বন্ধী জ্ঞানগ্রন্থ বলে প্রতিষ্ঠিত থাকে। মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবনে সিনার কানুন এরূপ অভ্রান্ত বলে গৃহীত হতে থাকে যে, এর বাইরে অপর কোনো তত্ত্ব বা তথ্য থাকতে পারে বলে মানুষ বিশ্বাস করতে চাইত না। এর ফলে পরবর্তীকালে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধিকতর বিকাশের ক্ষেত্রে ইবনে সিনার ‘কানুন’ প্রতিবন্ধকতার দুর্গ হয়ে দাঁড়ায়।

Idea : ভাব

‘ভাব’ বলতে সাধারণত কোনো কিছু সম্পর্কে মানুষের মনের ধারণা বুঝায়। এই শব্দ বা পদটি বহুল পরিচিত এবং ব্যবহৃত হলেও দর্শন এবং মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ভাব’ এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা দেখতে পাওয়া যায় না। ‘ভাব’ মনের ব্যাপার-একথা স্বীকার করলেও ভাব কিভাবে তৈরি হয় এবং ‘ভাব ও ভাবের উৎস’-এ দুয়ের মধ্যে কি পার্থক্য, কি সম্পর্ক এবং কে প্রধান, এ প্রশ্নে বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।

ভাবের আলোচনা দুভাবে করা যায়। একটি হচ্ছে মনোবিজ্ঞানের দিক হতে অন্যটি দর্শনের, বিশেষ করে জ্ঞানতত্ত্বের দিক থেকে। মনোবিজ্ঞানে ভাব দ্বারা মানসিক ক্রিয়া বুঝানো হয়। জ্ঞানতত্ত্বে ভাব হচ্ছে জ্ঞানের মাধ্যম। ভাবের মাধ্যমে আমরা জগতকে জানি। এজন্যই আমরা বলি, এই বস্তুটি বা ঐ বস্তুটি সম্পর্কে আমার ধারণা বা ভাব হচ্ছে ইত্যাদি। অর্থাৎ কোনো বস্তু সম্পর্কে আমাদের মন যখন চিন্তা করে তখন বস্তু দৈহিকভাবে আমাদের মনের মধ্যে প্রবেশ করে তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। বস্তু থেকে আমাদের ইন্দ্রিয় যে সমস্ত বোধ বা অনুভূতি লাভ করে সেই অনুভূতিসমূহের মাধ্যমে মন বস্তুর প্রতিকৃতি তৈরি করে। যুক্তিবিদ্যায় ভাব বা পদকে ব্যক্তিবাচক, সাধারণ, বস্তুবাচক, গুণবাচক প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়।

দর্শনের ইতিহাসে ভাবের তিনটি ব্যাখ্যা বা তত্ত্ব বিশেষভাবে পরিচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রাচীন তত্ত্ব হচ্ছে প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর তত্ত্ব(৪২৭-৩৪৭ খ্রি.পূ.); দ্বিতীয় হচ্ছে অভিজ্ঞতাবাদী এবং বিশেষ করে ইংরেজ দার্শনিক জন লকের ব্যাখ্যা, তৃতীয়টি জার্মান দার্শনিক হেগেলের।

প্লেটো ভাব বলতে মনের সৃষ্টি বুঝিয়েছেন। বস্তু ভাবকে মনের মধ্যে তৈরি করে কিংবা ভাবের উৎস হচ্ছে বস্তু, সাধারণ এই মতকে অস্বীকার করে প্লেটো বলেন, এতে মনে হতে পারে যে, বস্তু হচ্ছে প্র্রধান, ভাব অপ্রধান এবং ভাব বস্তুর উপর নির্ভরশীল। প্লেটোর মতে মনের বাইরে ভাবের নিজস্ব একটি সত্তা আছে। ভাবের সেই সত্তাই মনের সব ভাবের উৎস। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, জ্যামিতিক ‘ত্রিভুজ’ সম্পর্কে মানুষ কথা বলে। ত্রিভুজের ভাব সে মনে ধারণ করে। ত্রিভুজ মানুষের বস্তুজগতের একটি মাধ্যম। কিন্তু বস্তুজগতে ‘ত্রিভুজ’ এর কোনো অস্তিত্ব নেই। কাজেই একথা বলা চলেনা যে, ত্রিভুজ নামক কোনো বস্তু মানুষের মনে ত্রিভুজ ধারণার সৃষ্টি করে। প্লেটোর মতে ত্রিভুজ হচ্ছে একটি স্বাধীন অস্তিত্বসম্পন্ন ভাব। এই ভাবই মানেুষের মনে ত্রিভুজ ভাবনার সৃষ্টি করে। কাগজের পৃষ্ঠায় কিংবা মাটির বুকে অঙ্কিত কোনো ত্রিভুজের সম্পূর্ণতা অসম্পূর্ণতা এই স্বাধীন ‘ত্রিভুজ’ ভাবের সঙ্গে তুলনাক্রমেই মানুষ স্থির করে। প্লেটোর এই ব্যাখ্যা বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ। এই ব্যাখ্যানুযায়ী কেবল জ্যামিতকি ত্রিভুজ নয়, বস্তুজগতের সমস্ত কিছুরই মূল হচ্ছে ভাব। দার্শনিক যদি বিশ্বচরাচরের তাৎপর্য্য উপলব্ধি করতে চায় তবে তাকে এই ভাবের ‍উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে; ভাবের তাৎপর্য্য উপলব্ধি করতে হবে। প্লেটোর এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে দর্শনের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ভাববাদ। বস্তুত ভাববাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিভূ হিসাবেই প্লেটোর পরিচয়।

অভিজ্ঞতাবাদী জন লকের মতে মানুষ যা কিছু সম্পর্কে চিন্তা করে তাই তার মনের ভাব। একটি টেবিল সম্পর্কে যখন আমি চিন্তা করি তখন ‘টেবিল’টা আমার মনের ভাব; একটা ‘চেয়ার’ সম্পর্কে যখন চিন্তা করি তখন ‘চেয়ার’টা মনের ভাব। এই অর্থে পৃথিবীর সমস্ত বস্তুপুঞ্জই আমার মনের ভাব। এবং বস্তুপুঞ্জ বা অভিজ্ঞতাই হচ্ছে ভাবের উৎস। কিন্তু তাই বলে চেয়ার নামক ভাবটাই বস্তু নয়। চেয়াররূপ ভাব বস্তু নয়, কিন্তু তার উৎস। বস্তু-ভাবের এই দ্বৈত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে যে ভাববাদ উদ্ভূত হয় তাকে অনেক সময় অভিজ্ঞতাবাদ বা ব্রিটিশ ভাববাদ নামে অভিহিত করা হয়।

ভাবের তৃতীয় প্রধান ব্যাখ্যা দেন হেগেল। হেগেলের মতের সঙ্গে এ ব্যাপারে প্লেটোর ব্যাখ্যার সাদৃশ্য আছে। হেগেল বলেনঃ বস্তুপুঞ্জের কোনো একটি তাৎপর্য বস্তুপুঞ্জের অপর সকল থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। অংশের সাথে অংশের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত সমগ্রের উপলব্ধির মাধ্যমেই এই সমগ্রের কোনো অংশবিশেষেরও তাৎপর্য উপলব্ধি সম্ভব। দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যাক সংখ্যা ‘৩’ কে। সংখ্যা ‘৩’ এর নিজস্ব কোনো অনন্য নির্ভর অর্থ নেই। ‘৩’, ২ এবং ৪ এর সাথে সম্পর্কিত এবং এ সম্পর্ক বুঝার মাধ্যমেই ‘৩’ এর তাৎপর্য বুঝা সম্ভব। কিন্তু এই সমগ্রের উপলব্ধি ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্ভব নয়। এই সমগ্র হচ্ছে মনের উপলব্ধি। অন্য কথায় এই সমগ্র বস্তুপুঞ্জ হলেও কেবলমাত্র বস্তুপুঞ্জ নয়। এই সমগ্র হচ্ছে মনের ভাব এবং আমাদের উপলব্ধ বস্তুপুঞ্জ হচ্ছে এই ভাবেরই সংবদ্ধ প্রকাশ। বাস্তব জগত ভাবের প্রকাশমাত্র নয়, বাস্তব জগতই ভাব এর এরূপ অর্থ প্রকাশ পায় বলে হেগেল এর এই ভাববাদকে অনেকে বাস্তব ভাববাদ বা অবজেকটিভ আইডিয়ালিজম বলে অভিহিত করেন।

মনের ভাবের সৃষ্টি এবং বস্তুজগতের সাথে তার সম্পর্কে প্রশ্নটি বিশেষ জটিল প্রশ্ন। দর্শনের ইতিহাসে যে সকল ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তার কোনোটিতে ভাব প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অন্য কোনোটিতে বিশেষ করে বস্তুবাদের ব্যাখ্যায়, ভাব ও মন অস্বীকৃত হয়ে সবকিছু অনড় বস্তুপুঞ্জে পর্যবসিত হয়েছে। মার্কসবাদ বা দ্বন্ধমূলক বস্তুবাদে মন এবং বস্তু উভয়ের স্বীকৃতিসহ একটি সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই মত অনুযায়ী ভাব এবং বস্তুর মধ্যে বস্তু অবশ্যই প্রধান। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এবং মষ্তিষ্কের কোষে বস্তুর আঘাতজনিত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মনে বস্তুর ছবি বা ভাব সৃষ্টি হয়। মানুষের মনও গতিময় বস্তুর বিকাশের ফলশ্রুতি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বস্তু প্রধান হলেও বস্তুপুঞ্জ এবং মনের যে পারস্পরিক ও দ্বন্ধমূলক সম্পর্ক বিদ্যমান সেখানে বস্তু যেমন মনের উপর ক্রিয়াশীল হয়ে ভাবের সৃষ্টি করে, ভাবও তেমনি বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল হয়ে বস্তু এবং পরিবেশকে পরিবর্তনে মানুষের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে।

Idealism : ভাববাদ

Objective Idealism : বাস্তব ভাববাদ

দর্শনের দুটি প্রধান ধারার একটি হচ্ছে ভাববাদ। অপর একটি বিপরীত ধারা হচ্ছে বস্তুবাদ। বিশ্ব রহস্যের ক্ষেত্রে মুল প্রশ্ন হচ্ছেঃ বস্তু প্রধান, না মন বা ভাব প্রধান?

এই প্রশ্নে ভাববাদের সাধারণ জবাব হচ্ছে মন বা অ-বস্তুই হচ্ছে প্রধান, বস্তু প্রধান নয়। কারণ, সাধারণ মানুষ দেখতে পায় যে, বস্তুর পরিবর্তন, ক্ষয় এবং বিলুপ্তি আছে। এবং যার পরিবর্তন বা বিলুপ্তি ঘটে সে নিশ্চয়ই শক্তিশালী বা মূল বলে স্বীকৃত হতে পারে না। এই স্থূল মত অনুযায়ী মন বা ভাবের কোনো ক্ষয় বা পরিবর্তন নেই। কারণ মন বা ভাব অবস্তু। কাজেই ভাব হচ্ছে বস্তুর চেয়ে শক্তিশালী। ভাববাদের এই সাধারণ ব্যাখ্যার সঙ্গে সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে ধর্মীয় বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসে সব কিছুর যে স্রষ্টা এবং চালক সে বস্তু নয়। তিনি বস্তু হতে পারেন না, বস্তুর উর্ধে্বর কোনো শক্তি।

অতীন্দ্রিয় এবং অ-বস্তুমূলক কোনো কিছুকে মূল বলে ঘোষণা করার একটি সামাজিক তাৎপর্য্ আছে। বস্তুর সঙ্গে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের সম্পর্ক সাক্ষাত। বস্তু চোখে দেখা যায়, তাকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়। বস্তুকে জীবনের মূল শক্তি বলে স্বীকার করলে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ সম্পর্কের তাৎপর্য্যকে স্বীকার করতে হয় এবং সাধারণ মানুষ বস্তুকে পরিবর্তন করে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে এ কথাও স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এরূপ স্বীকৃতি শ্রেণীবিভক্ত সমাজের শাসক শ্রেণীর স্বার্থবহ হতে পারে না। এ কারণে ভাববাদ অর্থাৎ সমস্ত শক্তির মূল হিসাবে অতীন্দ্রিয় বা অবস্তুমূলক কোনো সত্তার তত্ত্ব শাসক শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সার্বজনীন বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এসেছে।

দর্শনে ভাববাদকে দুটি উপবিভাগে বিভক্ত করা হয়; (১) বাস্তুব ভাববাদ, (২)  মনময় ভাববাদ। বাস্তব ভাববাদ ব্যক্তির মনের বাইরে একটি অতিব্যক্তিক এবং অতিপ্রাকৃতিক কোনো ভাবকে সব কিছুর মূল বলে মনে করা হয়। মনময় ভাববাদ মনের চেতনাকে অস্তিত্বের মূল বলে নির্দিষ্ট করা হয়। মনময় ভাববাদের প্রধান ব্যাখ্যাতা ছিলেন জর্জ বাকলে। বস্তুর স্বাধীন অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বার্কলে বলেন, মনের ভাবের বাইরে কোনো বস্তুর অস্তিত্বের কথা ব্যক্তি জানতে পারে না। ব্যক্তির কাছের সকল অস্তিত্বই তার সচেতন মনের উপলব্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ। মন যা উপলব্ধি করে, ব্যক্তির কাছে শুধু তাই অস্তিত্বময়। বার্কলের মতে জগত আছে বলে মানুষ তা দেখে একথা ঠিক নয়, মানুষ দেখে বলে জগত আছে। অবশ্য বাস্তব ভাববাদ এবং মনময় ভাববাদ যে একেবারে পরস্পর বিরোধী তা নয়। বাস্তব ভাববাদ ব্যক্তির মনের ভাবকে অস্বীকার করে না। ব্যক্তির মনের ভাব অতিব্যক্তিক স্বাধীন ভাবের ছায়া বা প্রকাশ বলে বাস্তব ভাববাদীর অনেকে মনে করছেন। আবার মনময় ভাববাদ পাছে চূড়ান্তরূপে ব্যক্তিক মনময়তায় পর্য্যবসিত হয়, এ কারণে মনময় ভাববাদ ব্যক্তির মন নিরপেক্ষ ভগবান বা অনুরূপ কোনো সর্বময় মনের অস্তিত্ব স্বীকার করে প্রকারান্তরে বাস্তব ভাববাদকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

বাস্তব ভাববাদের প্রকৃষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় প্রাচীনকালের দার্শনিক প্লেটোর দর্শনে এবং আধুনিক কালের জার্মান দার্শনিক হেগেলের চিন্তাধারায়। প্লেটোর ভাব কোনো ব্যক্তির মনের ভাব নয়। এ ভাব সবকিছুর উর্ধ্বে। এই ভাবের আংশিক প্রকাশ হচ্ছে ব্যক্তির মনের ভাব এবং জগতের সব বস্তু। হেগেলের দ্বন্ধমূলক ভাববাদের ব্যাখ্যায় জগতের কোনো কিছুই, সে ব্যক্তির মনের ভাব হোক কিংবা বহির্জগতের কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা ঘটনা হোক, পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। কোনো কিছুর তাৎপর্য্য বিচ্ছিন্নভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সবকিছু নিয়ে সমগ্র এবং সমগ্রের মধ্যে সবকিছু। কিন্তু এই সমগ্র ব্যক্তির ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। এই সমগ্র ব্যক্তির কেবল বুদ্ধি, যুক্তি ও মন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে। এই সমগ্র কোনো বিশেষ বস্তু নয়। আবার কোনো বিশেষ বস্তু এই সমগ্রের বাইরে নয়। এই সমগ্র কোনো ব্যক্তির মনের কল্পনাও নয়। আবার ব্যক্তি মন ছাড়া এ সমগ্রের উপলব্ধি করতেও অক্ষম। হেগেল সমগ্রের আভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে দ্বন্ধমূলক বললেও সমগ্রকে যেহেতু তিনি বস্তু বলতেও অস্বীকার করেছেন এবং তাকে ব্যক্তিক মনের বাইরের অস্তিত্ব বলে বর্ণনা করেছেন-একারণে হেগেলের ভাববাদকে বাস্তব ভাববাদ বলে অভিহিত করা হয়। ভাববাদী দর্শনের সাম্প্রতিক ইতিহাসে যে সমস্ত নতুনতর তত্ত্বের সাক্ষাত পাওয়া যায় তার মধ্যে পজিভিটিজম বা দৃষ্টসত্তাবাদ, নিওরিয়ালিজম বা নব্যবাস্তববাদ, এক্সিটেনশালিজম বা অস্তিত্ববাদ, ব্যক্তিত্ববাদ, জীবনের দর্শনবাদ প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।

Idealistic Understanding of History: ইতিহাসের ভাববাদী ব্যাখ্যা

সমাজ ও সভ্যতার ভাববাদী কাহিনী নিয়ে রচিত হয় ইতিহাস। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য তাই আবশ্যক ইতিহাস অর্থাৎ সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তনের মূল শক্তি কি তা জানার। ইতিহাসের পরিবর্তন কে সংঘটিত করে? যুগের মহামানব, মানুষের চেতনা, অতিপ্রাকৃত বিধাতা? অথবা সমাজ ও সভ্যতা পরিবর্তন হয় সামাজিক কোন বিধানবলে? এই প্রশ্ন মনুষ্য সমাজের উদ্ভবকাল হতে চলে আসছে। এ প্রশ্নের দুটি প্রধান জবাবের সাক্ষাত ইতিহাসে পাওয়া যায়। এর একটি হচ্ছে: সমাজ ও সভ্যতার মূল চালক হচ্ছে মানুষের চেতনা। এই চেতনার মূলে আছেন বিধাতা। বিধাতার নির্বাচিত সম্রাট ও মহামানবগণ সমাজ ও সভ্যতার মূল চালক হিসাবে কাজ করেন। তাঁদের ইচ্ছাতেই সমাজ ও সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশ কিংবা বিলয় ঘটে। এই ব্যাখ্যা ইতিহাসের ভাববাদী ব্যাখ্যা বলে পরিচিত। সম্রাট ও মহামানবগণের আগমন ও তিরোধান এবং বৃহৎ বৃহৎ সামাজিক গোষ্ঠী বা সাম্রাজ্যের উত্থান পতন আদিকাল হতে সাধারণ মানুষের কাছে রহস্যজনক এবং ‍দুর্বোধ্য বলে বোধ হয়েছে। বিরাট ও বিপুল কিছুর তাৎপর্য্য চিন্তা ও যুক্তির মারফত বিভিন্ন ঘটনার সংশ্লেষণ ব্যতীত সাক্ষাৎভাবে উপলব্ধি করা ব্যক্তিমাত্রের পক্ষে দুঃসাধ্য। এই দুঃসাধ্যতার সুযোগ গ্রহণ করে প্রত্যেক সমাজের প্রতিষ্ঠিত সম্প্রদায়ের রাষ্ট্র ও শিক্ষাযন্ত্র ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে রহস্যাবৃত করে রাখার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসের ভাববাদী ব্যাখ্যা এই চেষ্টারই পরিপোষক। ফরাসি বিপ্লবের পূ্র্ব পর্য্যন্ত সমাজ ও ইতিহাসের ব্যাখ্যার এটিই ছিল প্রধান ধারা। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং ফরাসি বিপ্লব এই ব্যাখ্যাকে অসার প্রতিপন্ন করে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ককে ইতিহাসের মূল চালক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। কোনো বিশেষ যুগের ও সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যে কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না, তা যে ঐশ্বরিক কোনো বিধানও নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মার্কসবাদী সমাজতাত্ত্বিকগণ তা বিশ্লেষণ করে দেখান। মার্কসবাদ বা দ্বন্ধমূলক ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হচ্ছে ইতিহাসের ভাববাদী ব্যাখ্যার বিরোধী অপর প্রধান ব্যাখ্যা।

About সরদার ফজলুল করিম