দর্শন কোষ

Intuition : সজ্ঞা, বোধি

আকস্মিকভাবে, কোনোপ্রকার চিন্তা ও ভাবনা ব্যতিরেকে, কোনো সমস্যার সমাধান লাভের উপায়কে সজ্ঞা বা বোধি বলে অভিহিত করা হয়। জ্ঞানলাভের উপায় সম্পর্কে দর্শনে বিভিন্ন প্রকার মত আছে। বস্তুবাদী ও বৈজ্ঞানিক উপায় হিসাবে বুদ্ধির সহযোগে কোনো সমস্যার পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, পরীক্ষা, অনুমান ও প্রয়োগ-সমন্বিত পদ্ধতিকে জ্ঞানলাভের প্রধান উপায় বলে মনে করা হয়। কিন্তু জ্ঞানের মধ্যে সজ্ঞাবাদী মতও অনেক দার্শনিকের মধ্যে পাওয়া যায়। হেনরী বার্গসঁর দর্শনকে সজ্ঞাবাদী দর্শন বলা হয়। সজ্ঞাবাদী হিসাবে এডমন্ড হাসারেল ও জর্জ সান্তায়ানার নামও উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তির মন অনেক সময় অচিন্তনীয়ভাবে কোনো সমস্যার সমাধানে আলোচিত হয়ে ওঠে বলে সজ্ঞাবাদীগণ মনে করেন। এজন্য ব্যক্তির কোনো শিক্ষা, চিন্তা বা অভিজ্ঞতার আবশ্যক হয় না। এঁদের মতে সজ্ঞার ক্ষেত্রে ব্যক্তি থাকবে একটি নিষ্ক্রিয় গ্রাহকযন্ত্রবিশেষ। সত্য এসে সে যন্ত্রে আপনি ধরা দেবে। সজ্ঞাবাদী দর্শনের মতে চরম সত্যকে মানুষ এই উপায়েই লাভ করতে পারে-বুদ্ধি দ্বারা নয়। বুদ্ধি ও চিন্তা কেবল খন্ড সত্য উদ্ধার করতে পারে, চরম সত্য নয়। সজ্ঞাবাদী দর্শন ভাববাদী দর্শনের প্রকারবিশেষ। ভাববাদী দার্শনিক দেকার্ত এবং স্পিনাজো স্থান, কাল, পাত্র, ঈশ্বর, কার্যকারণ এবং অন্যান্য সার্বিক ভাবকে যেমনি সহজাত তেমনি সজ্ঞাজাত বলে মনে করতেন। সজ্ঞার সমার্থক চরম ভাববাদ এবং ধর্ম ও রহস্যবাদের মধ্যেই প্রধানত পাওয়া যায়। বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সজ্ঞা’র ন্যায় অতিপ্রাকৃতিক, বুদ্ধির অতীত রহস্যজনক জ্ঞানোপায়ের কোনো ক্ষমতা বা পদ্ধতি স্বীকার করা চলে না। ব্যক্তির মনে আকস্মিকভাবে কোনো সমস্যার সমাধান যে উদিত হতে পারে না, এমন নয়। কিন্তু এই আকস্মিকবোধেরও মূল ভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তির পূর্বসঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সম্ভার। অন্যথায় শিশুর মনেও জটিল সমস্যার সমাধান উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারত।

Inverse Relation, Law Of : বিপরীত ক্রমের বিধান

যুক্তির একাধিক শব্দ বা পদের অর্থের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে যুক্তিশাস্ত্রের একটি বিধানবিশেষ। যুক্তিশাস্ত্রে শব্দ বা পদের অর্থের দুটি দিকঃ একটি হচ্ছে শব্দের গুণ বা তাৎপর্যের দিক; অপরটি হচ্ছে তার পরিণাম বা সংখ্যার দিক। একে জাত্যর্থ বা ব্যক্তার্থ বলে অভিহিত করা হয়। সাধারণত জাতিবাচক পদেরই এই দুটো দিক আছে বলে মনে করা হয়। জাতিবাচক পদকে জাতি এবং উপজাতি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। যেমন, জীব, মানুষ, সভ্য মানুষ, এশিয়ার মানুষ, বাংলাদেশের মানুষ প্রভৃতি জাতিবাচক পদগুলির একটিকে অপরটির জাতি কিংবা উপজাতি হিসাবে অভিহিত করা যায়। জীব হচ্ছে মানুষ এর উপরস্থ জাতি এবং মানুষ হচ্ছে জীবের অন্তর্গত উপজাতি; আবার ‘সভ্য মানুষ’ ‘মানুষ’ পদের উপজাতি এবং মানুষ পদ হচ্ছে তার উপরস্থ জাতি। জাতি এবং উপজাতি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ একাধিক পদের জাত্যর্থ এবং ব্যক্তার্থ পরস্পর তুলনা করলে তাদের মধ্যে হ্রাসবৃদ্ধির যে ক্রম লক্ষ করা যায় তাকে বিপরীত ক্রমের বিধান বলা হয়। ‘জীব’ পদের সংখ্যা বা ব্যক্তার্থ ‘মানুষ’ পদের ব্যক্তার্থের চেয়ে অধিক। আবার ‘মানুষ’ পদের ব্যক্তার্থ ‘সভ্য মানুষ’ এর চেয়ে অধিক। ‘সভ্য মানুষ’ পদের ব্যক্তার্থ ‘এশিয়ার মানুষ’ পদের চেয়ে অধিক। অর্থাৎ জাতি থেকে উপজাতির দিকে যত অগ্রসর হওয়া যায় তত বিবেচিত পদগুলির ব্যক্তার্থ বা সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। অপরদিকে গুণ বা জাত্যর্থের ক্ষেত্রে উপজাতির থেকে জাতির দিকে অগ্রসর হলে দেখা যাবে যে, একটি উপজাতির চেয়ে তার জাতির জাত্যর্থ হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে। যেমন ‘বাংলাদেশের মানুষ’ পদের যে গুণাবলি বা জাত্যর্থ তার চেয়ে ‘এশিয়ার মানুষ’ পদের জাত্যর্থ কম। এই বিধানটিকে এভাবেও বলা যায় যে, জাতির জাত্যর্থ যেখানে উপজাতির জাত্যর্থের অন্তর্ভুক্ত সেখানে উপজাতির ব্যক্তার্থ তার উপরস্থ জাতির ব্যক্তার্থের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বিপরীত ক্রমের এই বিধান সর্বত্র প্রযোজ্য নয়। একটি মাত্র পদের উপর যেমন এটি প্রয়োগ করা যায় না, তেমনি ‘মানুষ’, ‘রঙ’, বিশ্ববিদ্যালয় এরূপ বিজাতীয় একাধিক পদের ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা চলে না। কারণ বিজাতীয় পদের মধ্যে অর্থ এবং সংখ্যাগত পারস্পরিক কোনো তুলনা চলে না।

Ionian School of Philosophy : আয়োনীয় দর্শন

প্রাচীন গ্রীসের পশ্চিম উপকূলবর্তী দ্বীপগুলি আয়োনীয় দ্বীপপুঞ্জ হিসাবে পরিচিত ছিল। এর মধ্যে সিফালোনিয়া, করফু, ইথাকা প্রভৃতি দ্বীপের নাম প্রসিদ্ধ। এই দ্বীপাঞ্চলেই প্রথম গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের উৎপত্তি ঘটে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ ও ৫ম শতকে এই অঞ্চলে যে সকল দার্শনিক দর্শন ও বিজ্ঞানের চর্চা করেন তাঁদের সর্বাগ্রে ছিলেন থেলিস। থেলিসের পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এনাক্সিমেন্ডার ও এনাক্সিমেনিস। বস্তু গ্রীক দর্শনের ইতিহাসে আয়োনীয় কিংবা মাইলেশীয় দর্শন বলতে থেলিস, এনাক্সিমেন্ডার ও এনাক্সিমেনিস এর দর্শনকে বুঝায়। এঁদের দর্শনের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, এঁরা জগতের বৈচিত্র্য এবং সৃষ্টি রহস্যকে বস্তু দ্বারা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। জগতের সর্বত্রই বস্তু বিরাজমান। এর মধ্যে আবার পানির গুরুত্ব তাঁদের কাছে সর্বাধিক বলে বোধ হয়েছে। কেননা তাঁদের চারিদিকে তাঁরা অগাধ জলরাশিকে বিস্তৃত দেখেছেন। তাই থেলিস মনে করতেন যে সর্বপ্রকার বস্তুর মূলেই আছে পানি। পরবর্তীকালে হিরাগ্লিটাস, এনাক্সাগোরাস, ডায়োজেনিস প্রমুখ দার্শনিক বস্তুর মূল হিসাবে আগুন, বাতাস, অণু কিংবা পরিবর্তমানতা ইত্যাদি সূক্ষ্মতর কারণের উল্লেখ করেন।

Iqbal, Muhammad : মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮ খ্রি.)

ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুসলিম কবি ও দার্শনিক। মুহম্মদ ইকবাল জন্মগ্রহণ করেন শিয়ালকোট শহরে, ৯ নভেম্বর, ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে। পাঞ্জাব, ক্যাম্ব্রিজ ও মিউনিকে তিনি দর্শন ও আইনবিদ্যায় জ্ঞান অর্জন করেন। ১৯০৮ সালে মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকবার তাঁর ‘পারস্যে তত্ত্ববিদ্যার বিকাশ’ বা ‘ডেভেলপমেন্ট অব মেটাফিজিক্স ইন পারসিয়া’ শীর্ষক গবেষণার জন্য ডক্টর অব ফিলসফি উপাধি অর্জন করেন। লাহোর সরকারি কলেজে মুহাম্মাদ ইকবাল কিছুকাল অধ্যাপনা করেন। ১৯২৭ সালে তিনি পাঞ্জাব আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এ থেকে বুঝা যায় যে, তিনি কেবল জ্ঞান এবং গবেষণার ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনেও বিশেষ সক্রিয় ছিলেন। ১৯৩০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সংগঠনের বার্ষিক অধিবেশনে মুহাম্মদ ইকবাল সভাপতিত্ব করেন। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁর সাহিত্যকীর্তির জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ ‘নাইট’ খেতাবে ভূষিত করেন। এরপর থেকে তিনি স্যার মুহাম্মাদ ইকবাল নামেই সর্বত্র পরিচিত হন।

ইকবাল তাঁর সাধনা ও জ্ঞানচর্চা করেন প্রধানত উর্দূ ও ফারসী ভাষায়। তাঁর কাব্যের প্রধান সুর ও বিষয় হচ্ছে মুসলমানদের হারানো অতীত ঐশ্বর্য্য এবং ঐতিহ্যের স্মৃতি এবং বর্তমান হতোদ্যম মুসলমানের প্রতি নব জাগরণের উদাত্ত আহবান। ইকবালকে তাই মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি বলে আখ্যায়িত করা হয়। মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য, শক্তি ও স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ইকবালের ঐকান্তিক প্রয়াসের জন্য তাঁকে পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের ভাবজনক বলে আখ্যায়িত করা হতো।

মুহাম্মাদ ইকবালের দার্শনিক চিন্তাধারাও মুসলমানদের উন্নতির উপায়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। তাঁর মতে মুসলমানের মুক্তির পথ হচ্ছে (১)ইসলামের বিধানের প্রতি আনুগত্য পোষণ, (২) আত্মসংযম, (৩) আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ অর্থাৎ নবীর উপর বিশ্বাস স্থাপন। মানুষের মুক্তির উপায় আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন হলেও ইকবাল কিসমত বা পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যের তত্ত্ব গ্রহণ করতে চান নি। মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে ব্যক্তির নিজের স্বাধীনতাও কম নয়। ইকবালের চিন্তাধারায় পারস্যের বিখ্যাত সুফী কবি জালালউদ্দীন রুমী, জার্মান দার্শনিক নিৎসে এবং ফরাসী দার্শনিক বার্গসঁর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ইকবালের ‘আসরারই খুদী’র মধ্যে তাঁর দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। বিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ। কিন্তু আল্লাহ এক নির্দিষ্ট সময়ে যে বিশ্বের সমস্ত ভবিষ্যৎ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সৃষ্টি করে দিয়েছেন, একথা ভাবা যায় না। আল্লাহ বিশ্বের ভূত-ভবিষ্যতের স্রষ্টা ও দ্রষ্টা তাঁর মূলগত সম্ভাবনার ভিত্তিতে; তাঁর প্রতিটি বাস্তব সৃষ্টির ভিত্তিতে নয়। অন্য কথায় আল্লাহ বিশ্ব সৃষ্টির কাজ সম্পূর্ণ করেছেন, একথা ঠিক নয়। আল্লাহ বিশ্বকে সৃষ্টি করে চলেছেন। আল্লাহর বান্দা মানুষও কেবল ক্রীড়নক নয়। মানুষও আল্লাহর প্রবহমান সৃষ্টিকার্যের সক্রিয় অংশীদার। এ তত্ত্বের মধ্যে বার্গসঁর ক্রিয়েটিভ ইভোল্যুশন এর প্রভাব স্পষ্ট।

ইকবালের প্রধান দার্শনিক রচনা হিসাবে তাঁর ‘দি রিকন্সট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম’ গ্রন্থ পরিচিত। এই গ্রন্থে কবি বলেছেন, সামাজিক ক্ষেত্রে মুক্তি এবং অগ্রগতির জন্য ইসলামকে অবশ্যই গোঁড়ামি এবং অতীতের অবাস্তক শেকল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। এক কালের বিধান অপর কালের মানুষের বিচারের উর্ধে্ব হতে পারে না। বর্তমানের মুসলমানকে অতীতের বিধান বিচার করে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে অগ্রসর হওয়ার পথ নির্ণয় করতে হবে। এরূপ তত্ত্বে ইকবালের অগ্রসর বা প্রগতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। ইকবালের অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে ‘রামুজে বেখুদী’ এবং ‘জাবিদনামা’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘জাবিদনামাকে’ তাঁর প্রধান কাব্যিক সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। স্যার মুহাম্মাদ ইকবাল ২১ এপ্রিল, ১৯৩৮ সালে লাহোরে পরলোকগমন করেন।

Islam : ইসলাম

বিশ্বধর্মসমূহের অন্যতম হচ্ছে ইসলাম। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মধ্যে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের নাম উল্লেখযোগ্য। ইসলামের অনুসরণ দেখা যায় প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়া ভূখন্ডসমূহে। ইসলামের উদ্ভবকাল ৭ম শতাব্দী। আরব দেশের বিখ্যাত কোরাইশ বংশের আব্দুল্লাহর পুত্র মুহম্মদ কে(সা) (৫৭০-৬৩২ খ্রিঃ) ইসলামের অনুসারীগণ আল্লাহর আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করেন এবং তাঁকে সম্মানের সঙ্গে হযরত মুহাম্মদ (সা) বলে উল্লেখ করেন। হযরত মুহাম্মাদ(সা) ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা।

ধর্মের দুটি দিক আছে। একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দিক। অপরটি সামাজিক দিক। ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে সাধারণ মানুষের এরূপ বিশ্বাস যে, দৃশ্য জগতের পিছনে একজন অদৃশ্য স্রষ্টা আছেন। তিনি মানুষকে সত্য পথে পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে নির্বাচিত করেন। এক ধর্মের অনুসারীগণ অপর ধর্মের নির্বাচিত মানুষকে সাধারণত স্বীকার করতে চায় না। ধর্মের উদ্ভব মানুষের রাষ্ট্রীয় সংগঠন সৃষ্টির পূর্বে ঘটেছে। ধর্ম শুধুমাত্র স্রষ্টার অস্তিত্বে ব্যক্তির বিশ্বাস নয়। সামাজিক জীবনযাপনের জন্য ধর্মের অনুশাসনসমূহও গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো ধর্মের উদ্ভবের সঙ্গে কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর সামাজিক প্রয়োজন জড়িত থাকে। আরবের গোত্রতান্ত্রিক সমাজের নতুনতর সামন্ততান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তিত হওয়ার ক্রান্তিকালে ইসলামের অভ্যুদয় ঘটে। পূর্বে যেখানে আরবের অধিবাসীগণ বিভিন্ন সর্দার বা গোষ্ঠী নেতার অধীনে বিভিন্ন গোত্র বা বংশে বিভক্ত ছিল সেখানে এই প্রথম তাঁরা বিস্তৃতর অঞ্চলের একমাত্র নেতা ‘খলিফা’র অধীনে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হলো। গোত্রতান্ত্রিক বিভাগে অর্থনৈতিক লেনদেন এবং যোগাযোগ যেখানে সংকীর্ণ ও তার বিকাশ অবরুদ্ধ হয়েছিল, সেখানে খলিফার নেতৃত্বে সংগঠিত আরব ভূখন্ডে তা এবার অবাধ হয়ে উঠল। গোত্রের সংকীর্ণ পরিধিতে বিবদমান গোষ্ঠীসমূহকে এরূপ বৃহৎ একটি জনসংস্থায় সংগঠিত করার চিন্তানায়ক এবং সংগঠক হিসাবে কাজ করেছেন হযরত মুহাম্মাদ(সা)। এই ভূমিকার মধ্যে তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা ও অগ্রসর চিন্তার যে পরিচয় বিদ্যমান তা তাঁকে ইতিহাসে অন্যতম ধর্মীয় নেতা এবং সামাজিক সংগঠক হিসাবে স্মরণীয় করে রেখেছে।

ধর্মের তত্ত্ব ও সামাজিক বিকাশ এবং আচার অনুষ্ঠানাদির ক্ষেত্রে একই অঞ্চলে উদ্ভূত পূর্বের ইহুদী, খৃস্টান এবং জরাথুস্ট্র ধর্মের প্রভাব ইসলামের মধ্যে লক্ষ করা যায়। যে কোনো ধর্মতত্ত্বের মধ্যে একটি বিশ্বতত্ত্ব বা দর্শনের আভাস থাকে। ইসলামের দর্শন কোরান এবং হযরত মুহাম্মদ(সা) এর উপদেশাবলীর উপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের প্রধান জোর আল্লাহর বিধান এবং সেই বিধান অনুযায়ী মানুষের ভাগ্য যে পূর্বনির্ধারিত এই তত্ত্বের উপর। ‘তাওক্কালাল্লাহু’ ‘আল্লাহর উপর নির্ভর কর’, ইসলামের অনুসারীদের জীবনের যে কোনো সংকটকালে এটি একটি সর্বদা উচ্চারিত বাণী। ‘আল্লাহর উপর নির্ভর কর এবং ধৈর্য্য ধারণ কর’ পরকালে পুরস্কার ও সুখ লাভ করবে-এরূপ উপদেশের উপর অত্যধিক জোরের মধ্যে মানুষকে প্রাকৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা ও সংকটে নিষ্ক্রিয় এবং অসহায় করে রাখার একটা প্রবণতা থাকে। আধুনিককালে প্রচলিত ধর্মসমূহের মধ্যে ইসলামের বিধানসমূহ যেরূপ নির্দিষ্ট, তেমনি অধিকতর অনড়। ইসলামের ধর্মীয় বিধানসমূহের ব্যাখ্যা ভিত্তিতে তার বিভিন্ন ভাবধারা বিকাশ লাভ করেছে। এই ব্যাখ্যা যে দার্শনিকগণ অধিকতর উদারভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁরা মুতাজেলাবাদী বা মুক্তচিন্তাবাদী বলে পরিচিত। মুক্তচিন্তাবাদীরা প্রাচীন গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। তাঁরা প্লেটো এবং এরিস্টটলের দর্শন আরবী ভাষায় অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তীকালে এই অনুবাদের মাধ্যমেই ইউরোপ গ্রীক দর্শনের পরিচয় লাভ করে।

Isocrates : আইসোক্রাটিস (খৃ.পূর্ব ৪৩৬-৪৩৮)

আইসোক্রাটিস ছিলেন প্লেটোর সমকালীন বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও শিক্ষক। বাগ্মী হিসাবে আইসোক্রাটিসকে এথেন্সের দশজন বাগ্মীর একজন বলে গণ্য করা হতো। অর্থবান পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও পিলোপশানীয় যুদ্ধে আইসোক্রাটিস এর পরিবার বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। যুদ্ধের পরে আইসোক্রাটিস শিক্ষকতাকে প্রধান পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। শিক্ষক হিসাবে তিনি এরূপ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন যে তাঁর নিজের ছাত্রসংখ্যা একসময় ১০০ তে উন্নীত হয়েছিল। এই ছাত্রগণ চার বছর তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করত এবং তাদের শিক্ষার দেয় ছিল ছাত্রপতি দশমিনা। এই শিক্ষকতা পেশাতেই আইসোক্রাটিস এত বেশি অর্থ উপার্জন করেন যে তাকে এথেন্স এর সবচেয়ে অর্থবান নাগরিকদের মধ্যে একজন বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু গ্রীক দর্শনের ইতিহাসে শিক্ষকদের সম্পর্কে সফিস্ট বলে যে আখ্যা প্রচলিত আছে, আইসোক্রাটিস নিজেকে তাদের মধ্যে গণ্য করতে চাইতেন না। এজন্য ‘সফিস্টদের বিরুদ্ধে’ এই নামে তিনি একটি প্রচার পুস্তিকাও রচনা করেন। এই পুস্তিকায় আইসোক্রাটিস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের সফিস্টদের শিক্ষানীতি ও দর্শন থেকে তাঁর নিজের শিক্ষানীতি ও দর্শন যে পৃথক তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তাঁর এই পুস্তিকায় তিনি সফিস্টদের বৈশিষ্ট্য হিসাবে কূটতর্কের কৌশল শিক্ষাদানকে উল্লেখ করেন। সফিস্টদের বিরুদ্ধে একটি মনোভাব তৈরি এবং সফিস্টগণ প্রশংসা বা শ্রদ্ধার পাত্র নয় এরূপ আবহাওয়া সৃষ্টিতে আইসোক্রাটিস এর পুস্তিকার বিশেষ প্রভাব ছিল। আইসোক্রাটিস এর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপীঠ পঞ্চাশ বছরের অধিককালে স্থায়ী ছিল। আইসোক্রাটিস জীবন ও জগতের বিভিন্ন প্রশ্নে তাঁর নিজস্ব একটি দর্শন দাঁড় করার চেষ্টা করেন। এদিক দিয়ে সক্রেটিস িএবং প্লেটোর সঙ্গে আইসোক্রাটিস এর একটি সাদৃশ্য আছে।  কিন্তু সক্রেটিস এর দর্শন এবং আইসোক্রাটিস এর দর্শনের মধ্যে পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য। সক্রেটিস যেখানে সাধারণ অভিমতকে সত্যলাভের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম বলে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উপর জোর দিয়েছেন সেখানে আইসোক্রাটিস বিজ্ঞানের চেয়ে দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ অভিমতকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। আইসোক্রাটিস বলতে অকেজো ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক নিশ্চিত সত্যের চেয়ে কাজের ব্যাপারে সম্ভাব্য সত্যের মূল্য অত্যধিক। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি প্লেটোর চেয়ে ভিন্নমত পোষণ করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রে প্লেটো অঙ্কশাস্ত্র এবং বিজ্ঞানের উপর জোর দিতেন। কিন্তু আইসোক্রাটিস মনে করতেন, রাষ্ট্রনীতিক বিষয়ে সঠিক অভিমত পোষণ করা এবং তাকে সঠিকভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা শিক্ষাদানই হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার মূল করণীয়। আর তাই আইসোক্রাটিস এর দর্শন রাষ্ট্রীয় জীবনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের জন্য রাজনীতিক প্রশ্নে উপযুক্ত অভিমত পোষণ এবং বাগ্মীতার সঙ্গে তার সুকৌশল প্রকাশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল।

Jainism : জৈন মতবাদ

জৈন মতবাদের দুটি দিক। একটি ধর্মীয়, অপরটি তত্ত্বগত। ধর্ম হিসাবে জৈন ধর্মের উদ্ভব ও প্রসার ঘটে বৌদ্ধধর্মের উদ্ভবের সমসাময়িক কালে। বৌদ্ধ ধর্মের ন্যায় জৈন ধর্মেও প্রচলিত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটে। মহাবীরকে জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করা হয়। মহাবীর বা জীন অর্থাৎ বিজয়ী,-জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার উপর এরূপ আখ্যা তাঁর অনুসারীদের প্রদত্ত। মহাবীরের জীবনোপাখ্যান এরূপ যে তিনি ত্রিশ বছর বয়সে পিতামাতার আকস্মিক বিয়োগে দুঃখাভিভূত হয়ে দিগম্বর বেশে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে যান। এরপর বার বৎসর যাবত অকল্পনীয় শারীরিক কৃচ্ছ্রতা এবং মানসিক সংযমের মাধ্যমে তিনি তাঁর সাধনায় সিদ্ধলাভ করেন।

 দর্শন হিসাবে ভারতীয় দর্শনের বহুতত্ত্ববাদী তত্ত্বের প্রকাশ দেখা যায় জৈন মতবাদে। জৈন দর্শনে সৃষ্টির মূল হচ্ছে তত্ত্ব বা সার। তত্ত্ব প্রধানত দুই প্রকার : জীব(আত্মা) এবং অ-জীব(আত্মার বহির্ভূত জগৎ)। আত্মা বা জীবের মূল হচ্ছে চেতনা। অ-জীবের প্রকারভেদই বস্তু। বস্তুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার সম্পর্ক, গন্ধ, শব্দ, রঙ ও স্বাদ। বস্তু অণুতে বিভাজ্য, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, পরিবর্তনশীল এবং আদি ও অন্তশূণ্য। কিন্তু তা হলেও বস্তু বিধাতার সৃষ্টি। কর্ম হচ্ছে দেহের সঙ্গে আত্মার সম্পর্কের মাধ্যম। পরম বা সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মা বলে কিছু নেই। পৃথিবীতে যত প্রাণী তত আত্মা। প্রত্যেক আত্মারই সর্বত্রগামী হওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু দেহের বন্ধনে আবদ্ধ বলে আত্মা দেহের বাইরে যেতে পারে না। মানুষকে সাধনা করতে হবে, দেহের বন্ধন থেকে আত্মাকে মুক্ত করার জন্য। জৈনমতে আত্মার মুক্তির পথ হচ্ছে ‘ত্রিরত্ন’ কে অনুসরণ করা। ত্রিরত্ন হচ্ছে জ্ঞান, ধর্ম ও বিশ্বাস। কিন্তু দেহের বন্ধন হতে আত্মার মুক্তি মানে পরম আত্মার মধ্যে জীবাত্মার লয় বা মিলন নয়। কারণ পরম আত্মা বলে কিছু নেই। আত্মার মুক্তির অর্থ বৌদ্ধ দর্শনের নির্বাণও নয়। দেহের বন্ধন হতে মুক্ত জীবাত্মা মানুষের অকল্পনীয় কোনো লোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

নীতিধর্ম বা সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে জৈন ধর্ম হচ্ছে চরম অহিংসা এবং কৃচ্ছ্রতাবাদী। ত্রিরত্নের অন্যতম রত্ন ‘ধর্মের’ অনুশাসন হচ্ছে: কোনো প্রাণীকে হত্যা করবে না; মিথ্যে কথা বলবে না; চৌর্যবৃত্তি গ্রহণ করবে না; ইন্দ্রিয়গত কোনো ভোগে লিপ্ত হবে না; এবং জ্ঞানের প্রশ্নে ইন্দ্রিয়কে অভ্রান্ত বলে মানবে না।

James, William : উইলিয়াম জেমস(১৮৪২-১৯১০ খ্রি.)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এবং ভাববাদী উইলিয়াম জেমস প্রাগমেটিজম বা প্রয়োগবাদেরও অন্যতম প্রবক্তা। হার্বার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি অধ্যাপক ছিলেন।

দর্শনে উইলিয়াম জেমস ভাববাদী হলেও মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সকলের স্বীকৃতি লাভ করেছে। তাঁর রচনাসমূহের মধ্যে ‘সাইকোলজি’ বা ‘মনোবিজ্ঞানী’ শীর্ষক গ্রন্থ আধুনিক মনোসমীক্ষার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় এক অবিসংবাদী ভূমিকা পালন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুদিন যাবৎ জেমস এর মনোবিজ্ঞান জ্ঞানের এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তক হিসাবে প্রচলিত ছিল। উইলিয়াম জেমস মানুষের মনকে ‘চেতনার স্রোত’ হিসাবে বিশ্লেষণ করেন। সত্যাসত্য বিচারের প্রশ্নে জেমস উপযোগ বা প্রয়োগবাদের আশ্রয় নেন। তাঁর মতে কোনো বিশেষ ভাব বা বিবৃতির সত্যাসত্যতার প্রধান নিরিখ হবে বাস্তবক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা বা উপযুক্ততা। বাস্তবক্ষেত্রে যে ভাব কতখানি কার্যকর বা প্রয়োজনীয় ফলদায়ক সে ভাব ততখানি সত্য। ব্যক্তির প্রয়োজন এবং স্বার্থনিরপেক্ষ সত্যের অস্তিত্ব জেমস অস্বীকার করেন। ধর্মীয় এবং অলৌকিক অভিজ্ঞতার চর্চার জন্য উইলিয়াম জেমস একটি বিশেষ ধরনের ধর্মীয় সংগঠনেরও প্রতিষ্ঠা করেন। অলৌকিক অভিজ্ঞতাকে জেমস অস্বীকার করেন নি। তাঁর মতে যুক্তি এবং প্রমাণের উর্ধে্বও অভিজ্ঞতা থাকতে পারে।

Japanese Philosophy : জাপানি দর্শন

জাপানে দার্শনিক চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে সামন্ততান্ত্রিক যুগে। জাপানি দর্শনের প্রথম উৎস ছিল প্রাচীন চীনের প্রধান দার্শনিক ধারাসমূহ, বিশেষ করে কনফুসিয়, বৌদ্ধ এবং পরবর্তীকালের নব কনফুসিয়বাদের চিন্তাধারা।

জাপানে কনফুসিয় ভাববাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে দার্শনিক ফুজউয়ারা(১৫৬১-১৬১৯ খ্রি.) এবং হায়াশি রাজান (১৫৮৩-১৬৫৭ খ্রি.) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের মতবাদ ‘সুসিগাকুহা’ নামে প্রচারিত ছিল। এই মতবাদ অনুযায়ী অস্তিত্বের চরম হচ্ছে ‘তাইকেকু’ বা ‘মুকেকু’। এই চরম অস্তিত্বই বিশ্বের নিয়ন্তা। অস্তিত্বের চরম যেমন ‘তাইকেকু’ তেমনি ভাবের মূল হচ্চে ‘রী’ অথবা ‘লী’। বস্তুর মূল ‘কী’ অথবা ‘চী’র সঙ্গে ‘তাইকেকু’ এবং ‘লী’র সংযোগে সৃষ্ট হয়েছে বিচিত্র প্রকৃতি এবং মনুষ্য জগৎ।

ইউরোপীয় দর্শনের বেকন, হবস, কপারনিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন প্রমুখ চিন্তাবিদের অভিমতের সঙ্গে পরিচয়ের ভিত্তিতে জাপানে সামন্তবাদী চিন্তাধারার প্রতিবাদী হিসাবে বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিকাশ ঘটতে থাকে। এই নবতর বিকাশে যে সমস্ত জাপানি দার্শনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে কাইবেরা একিকেন(১৬৩০-১৭১৪ খ্রি.), মুরো কুয়োসা(১৬৫৮-১৭৩৪ খ্রি.), ইতো জিনসাই(১৬২৭-১৭০৫ খ্রি.), ইয়ামা গাতা শুমান(১৬৮৭-১৭৫২ খ্রি.) এদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জাপানি সামন্তবাদের পরিণাম কাল হিসাবে সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ এবং অষ্টাদশ শতকের সূচনাকে চিহ্নিত করা চলে। এই পর্বের প্রধান বস্তুবাদী দার্শনিক ছিলেন আন্দোশাকি। তিনি নব কনফূসিয়বাদের ‘সীমাহীন ভাব’ এর তত্ত্বকে পরিত্যাগ করে ‘বিরামহীন সৃজন ক্রিয়ার’ নীতি সমর্থন করেন। বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে আন্দোশোকির ব্যাখ্যায় দ্বান্ধিক তত্ত্বের আভাস পাওয়া যায়। তাঁর মতে বিশ্বের মূল হচ্ছে পাঁচটি মৌলিক এবং সীমাহীন বস্তুগত শক্তি। এই মূল শক্তিগুলি স্বয়ংক্রিয়। আন্দোশোকি ছিলেন সামন্ততন্ত্রের আপোষহীন প্রতিবাদী এবং জ্ঞানবিকাশের উদগাতা। মানুষে মানুষে অসাম্যতাকে তিনি অস্বীকার করেছিলেন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সামাজিক বৈষম্য এবং বিরোধের মূল বলে ঘোষণা করেছিলেন। জমির যৌথ চাষকে তিনি সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রধান উপায় বলে বর্ণনা করতেন।

জাপানে আধুনিক ধনতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে : ১৮৬৭-১৮৬৮ সালে। এ বিপ্লব অসম্পূর্ণ থাকলেও ঊনবিংশ শতকের জাপানি দর্শনের বিকাশের ক্ষেত্রে এর প্রভূত প্রভাব ছিল। এই সময়ে জাপানি দর্শনে দুটি প্রতিধারার উদ্ভব ঘটে। এর একটিকে কারনো গাকূশা বা আমলাতন্ত্রের দর্শন ও বিজ্ঞান এবং অপরটিকে মিনকান গাকুশা বা জনসাধারণের দর্শন ও বিজ্ঞান বলা হত। আমলাতান্ত্রিক দর্শন যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশকে সমাজের উচ্চশ্রেণীর স্বার্থবহ করে রাখার চেষ্টা করেছে, জনসাধারণের দর্শন সেখানে জ্ঞান বিজ্ঞানকে বৃহত্তর জনসমাজের স্বার্থ সাধন করার প্রয়াস পেয়েছে। এই দ্বিতীয় ধারার একজন প্রখ্যাত বস্তুবাদী দার্শনিকের নাম হচ্ছে নাকায়ে(১৮৪৭-১৯০১ খ্রি.)। প্রগতিশীল জাপানী বিজ্ঞান ও সামাজিক চিন্তাধারার বিকাশে এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বিশ শতকের অন্যান্য বস্তুবাদী এবং দ্বান্ধিক দার্শনিকের মধ্যে রয়েছেন তোসাকাজেন(১৯০০-১৯৪৫), কোয়াকামী হাজিমে(১৮৭৯-১৯৪৬) এবং নাগাতা হিরোশি(১৯০৪-১৯৪৭)।

Jaspers, Karl : কার্ল জাসপার্স(১৮৮৩-১৯৬৯ খিৃ.)

জার্মান অস্তিত্ববাদী দর্শনের একজন প্রবক্তা। কার্ল জাসপার্স তাঁর দার্শনিক চিন্তা প্রধানত মনোবিকলনবিদ হিসাবে শুরু করেন। দার্শনিক সমস্যাসমূহের সমাধানে তিনি তাঁর মনোবিকলনবাদী চিন্তা দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হন। জাসপার্সের মতে ব্যক্তির মনোবিকলন কেবলমাত্র মানসিক বিপর্যস্ততার প্রকাশ নয়; মানসিক বিপর্যস্ততা ব্যক্তিত্বের উৎস সন্ধানের প্রকাশ। ব্যক্তির এই আত্মানুসন্ধানই হচ্ছে দর্শনের মূল। জাসপার্স মনে করেন ব্যক্তির আসল সত্তা হচ্ছে সাইফার বা প্রকাশমান সংকেত। দর্শনের মূল কাজ হচ্ছে এই সংকেতের তাৎপর্য উদ্ধার করে চলা। জ্ঞান বলতে অর্জিত স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো তথ্য বা তত্ত্ব নয়। সংকেতের তাৎপর্য উদ্ধার করার প্রকৃয়াই হচ্ছে জ্ঞান। তা ছাড়া যুক্তির মধ্যেই জ্ঞান সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বে অযৌক্তি সত্তা অনেক আছে। অযৌক্তিক মানেই অসত্য নয়। দর্শনের অপর কাজ হচ্ছে এই অযৌক্তিক সত্যকে উপলব্ধি করতে ব্যক্তিকে সাহায্য করা। জাসপার্সের অস্তিত্ববাদের প্রধান প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘বর্ডালাইন সিচুয়েশন’ বা প্রান্তিক পরিস্থিতি বা বলা চলে ‘প্রান্তিক সংকট’ এর তত্ত্বে। ব্যক্তি তার অস্তিত্ত্বের সঠিক তাৎপর্য কেবল মাত্র কোনো গভীর সংকট মুহুর্তে উপলব্ধি করতে পারে। অসুস্থতা, মৃত্যু, অনুশোচনার ব্যতীত কোনো অপরাধবোধ-এ রকম সংকটকালেই ব্যক্তির রহস্যময় অস্তিত্বের সংকেত সঠিকভাবে উন্মোচিত হয়ে যায়। এমন মুহুর্তে ব্যক্তি তার প্রাত্যহিক লেনদেন, টানাপড়েন কিংবা সত্যের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বেড়াজাল থেকে পরিপূর্ণ এক মুক্ত অবস্থায় উপনীত হতে সক্ষম হয়। আর এমন মুহুর্তেই সে তার মূল অস্তিত্বের মুখোমুখি হয়; সমস্ত সৃষ্টি ও শক্তির মূল যে বিধাতা তার অভিজ্ঞতায় ব্যক্তি এমনি মুহুর্তে গভীরভাবে অভিষিক্ত হয়।

Jeans, James : জেমস জিনস(১৮৭৭-১৯৪৬ খ্রি.)

জেমস জিনস ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সৌর জগত সম্পর্কে জেমস জিনস এর তত্ত্বটি বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। গ্রহ জগতের উদ্ভব ব্যাখ্যার জন্য জেমস জিনস তাঁর এই তত্ত্বে বলেছিলেন যে, সূর্য এবং অপর একটি তারকার মধ্যে আকস্মিক সংঘর্ষের পরিণতিতে গ্রহমন্ডলের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানকালে এই তত্ত্ব আর সঠিক বলে গৃহীত হয় না। বিজ্ঞানের উপর, বিশেষ করে কারিগরী ক্ষেত্রে তাঁর অনেক গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু জেমস জিনস বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, বিজ্ঞান ও সঙ্গীতের দর্শন প্রভৃতি বিষয়ক জনপ্রিয় বক্তৃতারাজি এবং রচনাবলীর জন্য।

Jataka : জাতক

গৌতমবুদ্ধের পূর্বজন্মসমূহের কাহিনী ভান্ডার। ‘জাতক’ অর্থ জন্মগ্রহণকারী। এ সমস্ত কাহিনী পালি সাহিত্যের সূত্ত পিটকের অঙ্গীভূত। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বুদ্ধদেব ৫৫০টি পূর্বজন্মের পরিণামে তাঁর সর্বশেষ জীবন লাভ করেন। এই সমস্ত পূর্বজন্মে তিনি কিভাবে জীবন যাপন করেছেন তার কাহিনী নিয়েই জাতক গ্রন্থ। জীবনে ব্যক্তির পক্ষে করণীয় অকরণীয়ের উপদেশমূলক জাতক কাহিনী শুধু এশিয়ায় নয়, ইউরোপেও বিভিন্ন নামে প্রচলিত হয়েছিল। ইউরোপে প্রচলিত ইশপের গল্প জাতক কাহিনীর রূপান্তর।

‘বিশ্বকোষ’ নামক প্রখ্যাত বাংলা জ্ঞানকোষে ‘জাতক’ এর বিবরণ এরূপ: ‘জাতক, বৌদ্ধ গ্রন্থবিশেষ। জাতক অর্থাৎ বুদ্ধদেবের এক এক জন্মের বিবরণ। বৌদ্ধগণ বলেন, সমস্ত জাতকের সংখ্যা ৫৫০। বুদ্ধদেব স্বয়ং শ্রাবস্তী অবস্থানকালে তাঁহার শিষ্যগণকে মোক্ষ ধর্ম শিক্ষা দিবার নিমিত্ত ৫৫০ পূর্বজন্মের যে যে অলৌকিক কার্য করিয়াছিলেন তাহাই ঐ সমস্ত জাতকে গল্পচ্ছলে বলিয়া যান। বুদ্ধের মুখ নিঃসৃত বলিয়া বৌদ্ধগণ এই সকল গ্রন্থকে পরম পবিত্র গ্রন্থ বলিয়া মান্য করেন। এখন অনেক জাতক বিলুপ্ত হইয়াছে। প্রচলিতদের মধ্যে অগস্ত্য, অপুত্রক, অধিসহ্য, শ্রেষ্ঠী, আয়ো, ভদ্রবর্ণীয়, ব্রহ্ম, ব্রাহ্মণ, বুদ্ধবোধি, চন্দ্রসূর্য, দশরথ, গঙ্গাপাল, হংস, হস্তী, কাক, কপি, ক্ষান্তি, কাল্মষ পিন্ডি, কুম্ভ, কুশ, কিন্নর, মহাবোধি, মহাকপি, মহিষ, মৈত্রীবল, মৎস্যমৃগ, মধ্যদেবীয়, পদ্মাবতী, রুরু, শত্রু, শারভ, শশ, শতপত্র, শিবি, সুভাস, সুপারগ, সূতসোম, শ্যাম, উন্মাদয়ন্তী, বানর, বর্তকপোত, বিশ, বিশ্বম্ভর, বৃষভ, ব্যঘ্র, যঞ্জ, বৃষহরণীয়, লতবু, বিতুর, পুষ্পর জাতকের নাম উল্লেখ করা যায়।……..এই সকল গ্রন্থ সংস্কৃত ও পালি ভাষায় রচিত। –অনেকে অনুমান করেন এই সকল জাতক দুই হাজার বৎসর পূর্বে রচিত হইয়াছে। ইহাদের অনেকগুলির গল্প পঞ্চতন্ত্রের বা ঈশপের গল্পের ন্যায়। অনেকগুলি আবার হিন্দু পৌরাণিক গল্পের পরিবর্তিত বৌদ্ধরূপ।

John of Salisbury : স্যালিসবারির জন(১১১৯১১৮০ খ্রি.)   

দ্বাদশ শতকের ইংল্যান্ডের একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ছিলেন স্যালিসবারির জন। ফরাসি দেশ প্যারিসে তিনি শিক্ষালাভ করেন এবং রোম ভ্রমণ করেন। ১১৫৯ সনে তিনি তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার উপর যে গ্রন্থ রচনা করেন তার নাম দিয়েছিলেন ‘পলিক্রাটিকাস’। এই গ্রন্থে মধ্যযুগের আবহাওয়াতেও জন শাসকের গুণাবলীর উপর যেসব মন্তব্য করেন তার মধ্যে যুগের প্রেক্ষিতে যুক্তি এবং সাহসের বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। জন শাসক বা রাজাকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মনে করলেও শাসককে যে বিধানকে মান্য করে প্রজাসাধারণের জন্য ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তার উপর তিনি বিশেষ জোর দেন। তাঁর মতে যে রাজা ঈশ্বরের ন্যায়ের বিধান ভঙ্গ করে শাসন করবে, তাকে প্রজাসাধারণ স্বৈরশাসক বলে বিবেচনা করবে। এবং এমন স্বৈরশাসকের হাত হতে মুক্তিলাভের জন্য প্রজাদের অধিকার আছে স্বৈরাচারী রাজাকে হত্যা করার। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রাচীন রোমের স্বৈরাচারী শাসকদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তাদের শোচণীয় পরিণতির বিবরণ দেন। এই সময়ে ইংল্যান্ডের সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় হেনরী। সম্রাটের সঙ্গে তাঁর অর্থমন্ত্রী চ্যান্সেলার টমাস বেকেটের(১১১৮-১১৭০) বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে এবং টমাস বেকেটের উপর যখন রাজরোষ নেমে আসে তখন জন টমাস বেকেটকে সমর্থন করেছিলেন। টমাস বেকেট রাজার অনুচরদের দ্বারা ১১৭০ সনে নিহত হন।

Judaism : ইহুদীবাদ

প্রাচীন ইহুদীগোত্রসমূহের বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস থেকে খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তদশ শতাব্দীতে একেশ্বরবাদী ইহুদী ধর্মের উদ্ভব ঘটে।

ইহুদীবাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, জেহোভাকে ঈশ্বর বলে মনে করা, পরিণামে ত্রাণকর্তার আবির্ভাবে আস্থা স্থাপন এবং ইহুদীরা যে ঈশ্বরের মনোনীত জাতি তা বিশ্বাস করা। ওলড টেস্টামেন্ট বা বাইবেলের প্রাচীন গ্রন্থ হচ্ছে ইহুদী ধর্মের মূল গ্রন্থ। ইহুদি ধর্মের মধ্যে একটা ঐতিহাসিকতার লক্ষণ দেখা যায়। সাধারণভাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এরূপ মনে করা হয় যে, ঈশ্বর কোনো একটা নির্দিষ্ট মুহুর্তে বিশ্বচরাচরের জীবসমূহকে সৃষ্টি করে চরম বিচারক হিসাবে তিনি তাদের অবলোকন করতে থাকেন। কিন্তু ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস যে ঈশ্বর প্রথমে জগৎ অর্থাৎ জড়বিশ্বকে সৃষ্টি করেন এবং পরবর্তী এক সময় সে জগতের মধ্যে মানুষকে সৃষ্টি করেন। এরও পরবর্তীকালে তিনি ইহুদী জাতিকে তাঁর মনোনীত জাতি হিসাবে সৃষ্টি করেন।

Judgement : রায়, মানসিক বাক্য

আইন শাস্ত্রে কোনো বিবাদ বা সমস্যার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্থিরকৃত এবং ঘোষিত সিদ্ধান্তকে রায় বলে।

যুক্তিশাস্ত্রে মানসিক বাক্য এবং ভাষায় প্রকাশিত বাক্যের মধ্যে একটা পার্থক্য করার চেষ্টা করা হয়। আমরা ভাষার মাধ্যমেই যুক্তি প্রদর্শন করি। এই যুক্তি গঠনগতভাবে কয়েকটি বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যুক্তির এরূপ বাক্যকে যৌগিক বাক্য বলা হয়। কিন্তু একটি বাক্যের বিষয়কে ভাষায় প্রকাশ করার পূর্বে আমরা প্রথমে তাকে মন বা চিন্তার মধ্যে গঠন করি। সকল মানুষ মরণশীল; রহিম একজন মানুষ; সুতরাং রহিম মরণশীল। এখানে তিনটি বাক্যের সমন্বয়ে একটি যুক্তির দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। এই বাক্যগুলির প্রত্যেকটিকে ভাষায় লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ব্যক্তিমাত্রকেই চিন্তার মধ্যে তাকে প্রাথমিকভাবে গঠন করতে হয়। একটি যৌক্তির বাক্যের এই ভাষায় প্রকাশপূর্ব পর্যায়কে মানসিক বাক্য বলা হয়।

Juliot-Curie : জুলিও কুরী (১৯০০১৯৫৮ খ্রি.)

বিখ্যাত ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী এবং বামপন্থী প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। জুলিও কুরী ও তাঁর স্ত্রী আইরেনী কুরী যুগ্মভাবে ‘কৃ্ত্রিম বিকিরণ তত্ত্ব বা আরটিফিসিয়াল রেডিও এ্যাকটিভিটি’ তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। নিউট্রন আবিষ্কার হলে জুলিও কুরী পারমাণবিক মৌলকে ভেঙে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা ও প্রয়োগের কথা বলেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেই কেবলমাত্র কুরীও দম্পতি নিবদ্ধ ছিলেন না। জুলিও কুরী বিশ্বশান্তি আন্দোলনের সক্রিয় উদ্যোগী কর্মী ছিলেন। বিশ্বশান্তি কাউন্সিলের তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন। দ্বান্ধিক বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারী জুলিও কুরী সমাজ প্রগতির জন্য একজন বৈজ্ঞানিকে সচেতন ভূমিকা পালনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সেই আদর্শকে অনুপ্রেরণাদায়কভাবে প্রয়োগ করেন।

Justice & Injustice : ন্যায়, ন্যায়বিচার, অন্যায়, অবিচার

মানুষের সামাজিক জীবনের কার্য্ক্রম, আচার আচরণের মূল্যবোধক শব্দ। কিন্তু মানুষের কোন্ কাজ ন্যায় এবং কোন্ কাজ অন্যায় এ নিয়ে দর্শন ও নীতিশাস্ত্রে বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যক্তির কোনো বিশেষ কাজ বা আচরণকে ন্যায় বলে এবং অপর কোনো কাজকে অন্যায় বলে নির্দিষ্ট করে। কিন্তু এই ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি কি? পূর্বে এরূপ ধারণা করা হতো যে ন্যায় অন্যায়ের একটা চরম এবং স্থায়ী অতিলৌকিক মাপকাঠি আছে। সেই মাপকাঠির আদর্শ কেবলমাত্র ব্যক্তির নয়, সামাজিক সমস্ত সংস্থার আচরণও মূল্যায়িত হয়। ন্যায়-অন্যায়ের সেই চরম মাপকাঠি মানুষের জন্য কেবল তার সমাজ জীবনের নিয়ন্ত্রণকারী নয়, সে আদর্শ তার জীবনে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণাদায়ক, আকর্ষণ এবং কাম্য শক্তি হিসাবেও কাজ করে। কিন্তু ন্যায়-অন্যায়ের সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস ও পর্যালোচনা প্রমাণ করেছে যে মানুষের ন্যায়-অন্যায়বোধ কোনো অপরিবর্তনীয় স্থায়ী ধারণা নয়। ন্যায়-অন্যায়ের কোনো চরম অতিলৌকিক বা ভাবগত মানদন্ডের অস্তিত্ব নেই। মানুষের ন্যায়-অন্যায়বোধ যে কেবল সমাজ থেকে সমাজে এবং যুগ থেকে যুগে পৃথক ও পরস্পরবিরোধী হয়েছে তাই নয়। দ্বন্ধমান শ্রেণীতে বিভক্ত কোনো সমাজের মধ্যে একইকালে একই বিষয়ে ন্যায়-অন্যায়ের পরস্পরবিরোধী পরিমাপক অনুসৃত হতে পারে। শ্রমিকের শ্রম ক্রয় করা এবং এই শ্রমের ভিত্তিতে মুনাফা অর্জন করা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে যেখানে পুঁজির মালিক শ্রেণী ন্যায্য, আইনসঙ্গত এমনকি সর্বজন মান্য বলে বিবেচনা করে, সেখানে শ্রমের মালিক অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণী তাকে অন্যায় ও অসঙ্গত বলে বিবেচনা করে। ন্যায়-অন্যায়ের একমাত্র বৃহৎ এবং স্থায়ী মাপকাঠি হতে পারে মানুষের কল্যাণ ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের। কিন্তু পরস্পর সংঘাতমূলক শ্রেণীর সমন্বয়ে গঠিত কোনো রাষ্ট্রে ন্যায়-অন্যায়ের এরূপ একক মাপকাঠির চিন্তা করা যায় না। দ্বন্ধমান শ্রেণীর যেখানে বিলোপ ঘটেছে সেরূপ সমন্বিত সমাজেই মাত্র ন্যায়-অন্যায়ের একক মাপকাঠির উদ্ভব ঘটতে পারে।

প্লেটো এবং এরিস্টটলের রাষ্ট্রনীতির দর্শনে ‘ন্যায়বিচার’ এর বিশেষ আলোচনা দেখা যায়। গ্রিকগণ ন্যায়কে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অলঙ্ঘনীয় আদর্শ বলে বিবেচনা করতেন। প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে দর্শনগুরু সক্রেটিস এবং সঙ্গীদের বিতর্কে ন্যায়কে অন্যতম আলোচনার বিষয় হিসাবে উপস্থিত করেন। ন্যায় সম্পর্কে প্লেটোর অভিমতের তাৎপর্য্ হচ্ছে : সমাজে যার যেমন অবস্থান সেই অবস্থান অনুযায়ী ব্যক্তির করণীয় করাই হচ্ছে ন্যায়। আবার সেই অবস্থান অনুসারে সমাজের কাছ থেকে যার যা প্রাপ্য তা পরিশোধ করাই হচ্ছে সমাজের পক্ষে ন্যায়। মোট কথা যে দাস সে দাসের মত থাকবে এবং যে প্রভু সে প্রভুর ন্যায় দাসকে শাসন করবে। এরূপ তত্ত্বের মূল অর্থ হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন কাম্য নয়।

Kant Immanuel : ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪১৮০৪ খ্রি.)

ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন অষ্টাদশ শতকের জার্মানী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী। জার্মানিতে সনাতন ভাববাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে তার খ্যাতি। জার্মানির কনাইবাগ শহরে তার জন্ম। জীবনের পরবর্তী সময়ে এই কানাইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপনা করেন।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কান্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানের নীহারিকা তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। তিনি মনে করতেন যে, যে জ্যোতির্মন্ডলে আমাদের বাস তার বাইরেও  সংখ্যাহীন জ্যোতির্মন্ডলের মহাবিশ্ব বিরাজ করছে। পৃথিবী গ্রহের আবর্তনে জোয়ার ভাটার বিপরীত প্রভাব এবং গতি স্থিতির আপেক্ষিকতার তত্ত্বকেও কান্ট প্রতিষ্ঠিত করেন। হেগেল ও মার্কস এর দ্বান্ধিক তত্ত্বের বিকাশে কান্টের এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অবদান অনস্বীকার্য।

কিন্তু কান্ট ভাববাদী দার্শনিক হিসাবেই অধিক পরিচিত। তাঁর ভাববাদকে অপরাপর ভাববাদ হতে পৃথক করে ক্রিটিকাল অর্থাৎ বিচারবাদী বা বৈচারিক বা ট্রান্সেগুন্টাল বা অতিক্রমী ভাববাদ বলেও আখ্যায়িত করা হয়। কান্টের দার্শনিক জীবনকে আমরা বৈচারিক-পূর্ব এবং বৈচারিক-উত্তর যুগ হিসাবে বিভক্ত করতে পারি।

বৈচারিক-পূর্ব যুগে সত্তার প্রশ্নে কান্ট বাস্তব সত্তা এবং যুক্তিগত সত্তার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করার প্রয়াস পান। এ যুগে কান্টের কাছে বিমূর্ত সূত্রের চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অধিকতর মূল্যবান বলে বিবেচিত হত। এক্ষেত্রে কান্টের উপর অভিজ্ঞতাবাদের প্রভাবকে আমরা লক্ষ করতে পারি। ১৭৭০ সাল থেকে কান্টের দর্শনে বিচারবাদী যুগের শুরু। তাঁর ‘ক্রিটিক অব পিওর রিজন’ বা ‘বিশুদ্ধযুক্তির সম্যক বিচার’ এর প্রকাশ ঘটে ১৭৮১ সালে এবং ‘ক্রিটিক অব প্র্যাকটিক্যাল রিজন’ ‘বাস্তবযুক্তির সম্যক বিচার’ এর প্রকাশ ঘটে ১৭৮৮ সালে।

এই সমস্ত গ্রন্থে কান্ট জ্ঞান, নীতি এবং নন্দনতত্ত্বের পর্যালোচনামূলক ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন। এ যুগে কান্টের প্রতিপাদ্য ছিল জ্ঞানের প্রকার এবং মানুষের জ্ঞান শক্তির সীমারেখার পূর্ব আলোচনা ব্যতীত আমাদের পক্ষে কোনো দার্শনিক তত্ত্ব স্থির করা আদৌ সম্ভব নয়। জ্ঞানের সীমা এবং প্রকারের পর্যালোচনার মাধ্যমে কান্ট অজ্ঞেয়বাদের সঙ্কটে সমুপস্থিত হন। তাঁর প্রত্যয় ঘটে যে, বস্তু যেমন আছে, তাকে তেমনভাবে জানা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। জ্ঞানের কতকগুলি সূত্রের মাধ্যমেই মাত্র মানুষ বস্তুকে জানতে পারে। সূত্রের মাধ্যম না থাকলে মানুষ বস্তুকে প্রত্যক্ষভাবে জানতে পারত। কিন্তু বস্তুর তেমন প্রত্যক্ষ জ্ঞান মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বস্তুকে মানুষ বস্তুত্বের সূত্র, সময়কে সময়রূপ সূত্র দ্বারাই জানতে পারে। জ্ঞানের সূত্রগুলি মানুষ অভিজ্ঞতা-পূর্বরূপে লাভ করে। কিন্তু সূত্রই সত্তা নয়। ‘সময়’রূপ সূত্রের মাধ্যমে আমরা সময়কে জানি। তার মানে এই নয় যে, ‘সময়’রূপ সূত্রই সময়। বস্তু সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের ক্যাটেগরি বা সূত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কাজেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা বস্তু বা সত্তাকে জানি না, সত্তার সূত্রমাধ্যম প্রকাশকেই জানি।

নীতিশাস্ত্রে কান্ট ‘ক্যাটেগরিকাল ইমপারেটিভ’ বা ‘শর্তহীন নিয়ামক’ এর বিধান তৈরি করেন। আচরণের ক্ষেত্রে শর্তহীন নিয়ামকের ব্যাখ্যা দিয়ে কান্ট বলেন, মানুষের আচরণের ন্যায়-অন্যায় কিংবা ভালোমন্দ নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণের ফলাফল কোনো বিবেচনার বিষয় হবে না। বিষয় নিরপেক্ষভাবে আচরণের ন্যায়-অন্যায় নির্দিষ্ট হবে। পিতা সন্তানকে পালন করবে সন্তানের কাছ থেকে ভবিষ্যতে প্রতিদান পাবার আশায় নয়, সন্তানের প্রতি স্নেহের আকর্ষণে নয়-তাকে পালন করা তার কর্তব্য বলে সে পালন করবে। নন্দতত্ত্বেও কান্ট বিষয়নির্বিশেষে এক আনন্দের কল্পনা করেন। কান্টের দর্শনে পরস্পরবিরোধিতা এবং অবাস্তবতার সাক্ষাৎ মেলে। সামাজিক বিকাশের প্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখা যাবে কান্টের দর্শনের এই দুর্বলতার মূলে ছিল অষ্টাদশ শতকের জার্মান পুঁজিবাদী শ্রেণীর অগ্রসরতা এবং দুর্বলতা।

Kautilya : কৌটিল্য(খ্রি.পূ. ৩২৭)

প্রাচীন ভারতের কূট রাজনীতিজ্ঞ এবং অর্থশাস্ত্রের প্রণেতারূপে পরিচিত। কেবল কৌটিল্য নয়, ইতিহাসে তাঁকে চাণক্য এবং বিষ্ঞুগুপ্ত বলেও উল্লেখিত হতে দেখা যায়। গ্রিক সম্রাট আলেক্সান্ডার খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ সনে ভারত অভিযানে আসেন। কৌটিল্যকে এই সময়কার রাজনীতিক বলে অনুমান করা হয়। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের অব্যবহিত পরে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রাহ্মণ পন্ডিত কৌটিল্য বা চাণ্যক্য চন্দ্রগুপ্তের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। প্রতিদ্বন্ধী এক রাজার কাছ থেকে রাজ্য অধিকারে কৌটিল্য চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রণাদাতা হিসাবে কাজ করেন এবং চন্দ্রগুপ্তের শাসনকালে তাঁর প্র্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে চন্দ্রগুপ্তের শাসনের বিস্তারিত বিবরণ আছে। ৬০০ শ্লোকে গ্রন্থখানি রচিত। এর অধ্যায় সংখ্যা ১৫০। এ গ্রন্থের গুরুত্ব ও তাৎপর্য্ এখানে যে, এর মধ্যে রাষ্ট্র শাসনের সর্ববিষয়ে সম্রাট তথা শাসকের করণীয় সম্পর্কে উপদেশ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা শাসকের প্রকৃতি সম্পর্কে গ্রীক এরিস্টটলের ‘পলিটিকস’ এর ন্যায় তাত্ত্বিক আলোচনা না থাকলেও শাসকের করণীয় সম্পর্কে কৌটিল্যের উপদেশাবলী থেকে রাষ্ট্র ও শাসক সম্পর্কে তাঁর একটি ধারণারও আভাস পাওয়া যায়। শাসকের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্র এবং নিজের শাসনকে রক্ষা করা। তার শাসনকে রক্ষা করার জন্য তাকে শত্রু মিত্রকে চিহ্নিত করতে হবে। সম্রাটের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো ষড়যন্ত্র সৃষ্ট হচ্ছে কিনা, তা জানার জন্য তাকে গুপ্তচর নিয়োগ করতে হবে। শাসককের রাষ্ট্রের বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকতে হবে। তার কর্মচারীবৃন্দকে নির্দেশ দিতে হবে। ‘অস্ত্রশাস্তের’ মধ্যে সম্রাটের দৈনন্দিন কার্যের বিভিন্ন ভাগ ও প্রহরকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র ও নিজের শাসনকে রক্ষা করার জন্য শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সম্রাটকে প্রয়োজনে নির্মম হতে হবে। এ লক্ষ্যে কোনো কৌশল গ্রহণেই সম্রাটকে দ্বিধা করা চলবে না। সম্রাটের শাসনের লক্ষ্য হবে প্রজাদের সুশাসন করা। সম্রাটকে সুশাসনের জন্য শপথ গ্রহণ করতে হবে। এই শপথের মর্ম হবে আমি প্রজাদের নির্যাতন করলে মৃত্যুর পরে আমার যেন নরকবাস ঘটে। ‘অর্থশাস্ত্রে’ শাসনের যে কূটনীতির বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় তাতে এই গ্রন্থকে সমসাময়িক গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থের কোনো কোনো আলোচনার সঙ্গে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তুলনা করা চলে। শাসককে নিজের শাসন রক্ষা করার জন্য কোনো কৌশল গ্রহণেই দ্বিধা করলে চলবে না-অর্থশাস্ত্রের এরূপ উপদেশ ইউরোপের পঞ্চদশ শতকের ম্যাকিয়াভেলীকে ই্উরোপের কৌটিল্য বলে আখ্যায়িত করা চলে।

Kautsky, Karl : কার্ল কাউটসকী(১৮৫৪১৯৩৮ খ্রি.)

জার্মান ঐতিহাসিক এবং অর্থনীতিবিদ। কার্ল কাউটসকী বিশ্বশ্রমিক আন্দোলনের দ্বিতীয় আ্নতর্জাতিক সংস্থার তাত্ত্বিক হিসাবে খ্যাত ছিলেন। ১৮৮১ সালে মার্কস এৃবং এঙ্গেলস এর সঙ্গে কাউটসকীর সাক্ষাত ঘটে। এর পূর্ব দশকেই শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কাউটসকীয় নিবন্ধসমূহ প্রকাশিত হতে থাকে। মার্কস েএবং এঙ্গেলস এর সঙ্গে সহযোগিতার যুগে ইতিহাস এবং রাজনৈতিক বিষয়ের উপর কাউটসকীর রচনাসমূহ মার্কসবাদী ভাবধারা প্রসারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ গ্রহণ করে। কিন্তু মার্কস এবং এঙ্গেলস কাউটসকীর সকল তত্ত্বের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি। তাঁরা অভিযোগ করেন যে, কাউটসকীর রচনায় মার্কসবাদের বিবৃতি প্রকাশ পেয়েছে। তাদের মতে সর্বহারা বিপ্লবের মূলতত্ত্ব যেখানে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের উচ্ছেদের ভিত্তিতে সর্বহারার রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিষ্ঠা দাবি করে সেখানে কাউটসকী মার্কসবাদের ব্যাখ্যায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে যাবার প্রবণতা দেখিয়েছেন। ১৯১০ সালে মার্কসবাদের সঙ্গে কাউটসকীর বিচ্ছেদ চূড়ান্তরূপ ধারণ করে। তিনি জার্মানীর শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান সংস্থা জার্মান সোস্যাল ডিমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে একটি বিরোধী উপদল গঠন করে মার্কসবাদের প্রকাশ্যভাবেই সমালোচনা করতে শুরু করেন। এই মতভেদের কারণে লেনিন তাকে শ্রমিক আন্দোলনের বাস্তব কার্য্ক্রম এবং তত্ত্বগত ব্যাখ্যায় সুবিধাবাদী বলে মনে করতেন। কাউটসীকর দার্শনিক রচনাসমূহে বস্তুবাদ এবং ভাববাদে সমন্বয়মূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।

Khilafat Movement : খেলাফত আন্দোলন

ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি গণআন্দোলন। এ আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন আলী ভ্রাতৃদ্বয়-মুহাম্মাদ আলী(১৮৭৮-১৯৩১) এবং শওকত আলী(১৮৭৩-১৯৩৮)। নামে ধর্মীয় হলেও তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান প্রতিষ্ঠান ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থনপুষ্ট হয়ে একটি জাতীয় আন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে এবং মূলত একটি অসহযোগ আন্দোলন বলে অভিহিত হয়। এই আন্দোলনের মূলে ছিল প্রথম মহাযুদ্ধের শেষে তুরস্কের সুলতান তথা খলিফার উপর আক্রমণাত্মক আচরণ। ভারতের মুসলমান্ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকলেও ১৯২৪ সালে কামাল আতাতুর্ক এর সমর্থনহীনতার কারণে এবং খেলাফতের অপসারণে ভারতে খেলাফত আন্দোলন বাতিল হয়ে যায়।

Kierkegaard, Soren : সোরেন কিয়ার্কেগার্ড(১৮১৩১৮৫৫ খ্রি.)

ডেনমার্কের অধিবাসী কিয়ার্কেগার্ড ছিলেন অস্তিত্ববাদের পূর্বসূরি। তাঁর মৃত্যু ঘটে ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে। কিন্তু তাঁর গ্রন্থসমূহের অনুবাদ এবং তার অভিমতের প্রচার ঘটে বিশ শতকের মধ্যভাগে। জাঁপল সাত্রে, রেনল্ড নাইবুর এবং অপরাপর অস্তিত্ববাদী দার্শনিকের উপর কিয়ার্কেগার্ডের প্রভাবে বেশ প্রত্যক্ষ। জ্ঞানের প্রশ্নে কিয়ার্কেগার্ড হেগেলের ‘চরম জ্ঞান’বাদের প্রতিবাদী ছিলেন। মানুষের পক্ষে চরমজ্ঞান লাভ সম্ভব এবং চরমজ্ঞান হচ্ছে যুক্তিগত জ্ঞান, হেগেলের এই তত্ত্বকে কিয়ার্কেগার্ড অগ্রাহ্য করেন। তিনি প্রাচীন দার্শনিক প্লেটো এবং এরিস্টটলের এরূপ অভিমতকেও অস্বীকার করেন যে, জ্ঞান মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা থেকে বহির্গত হয় এবং ব্যক্তির পক্ষে জ্ঞান অর্জনের অর্থ হচ্ছে নিজের অন্তর্নিহিত সত্য সম্পর্কে ব্যক্তির চেতনা লাভ। এর বিরোধী তত্ত্ব হিসাবে কিয়ার্কেগার্ড অভিমত প্রকাশ করেন যে, জ্ঞান অবশ্যই ব্যক্তির জন্য একটি বহিরাগত বিষয়। ব্যক্তিকে জ্ঞান আহরণ করতে হয় তার শিক্ষক কিংবা বিধাতার নিকট থেকে। বিধাতা যে কেবল আমাদের জ্ঞান দান করেন তাই নয়। বিধাতা সেই জ্ঞানকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাও আমাদের দান করেন। কিয়ার্কেগার্ডের কাছে ব্যক্তির ইচ্ছার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা এবং অনিবার্যতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে ইচ্ছার ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীন। ব্যক্তি নিজের অস্তিত্ব নিজেই স্বাধীনভাবে স্থির করতে পারে। ‘স্বাধীনতার সংজ্ঞা কি? ব্যক্তি যা চায় তা হতে পারাই হচ্ছে ব্যক্তির স্বাধীনতা’-কিয়ার্কেগার্ডের এই উক্তিটি পরবর্তীকালে অস্তিত্ববাদের মূল সূত্র হিসাবে প্রচারিত হয়। কিয়ার্কেগার্ড যে ঈশ্বরে বিশ্বাসী স্বীকার করা কঠিন হলেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব তাকে স্বীকার করতে হয়। এক্ষেত্রে বিশ্বাসের উপর তাকে নির্ভর করতে হয়। কিয়ার্কেগার্ডের গ্রন্থসমূহের শিরোনামগুলির মধ্যেই তাঁর দর্শনের আভাস পাওয়া যায়। ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আইদার/অর বা হয়/নয়। সংলাপের আকারে লিখিত এই গ্রন্থে তিনি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যার এক জবাবের বিরুদ্ধে অপর জবাব তৈরি করে জবাবের সংলাপ রচনা করেছেন। তাঁর অপর এক গ্রন্থের নাম ‘ভয়’ এবং আর একখানি শিরোনামে ‘আমৃত্যু মৃত্যু’ বা ‘সিকনেস আনটু ডেথ’। এসব গ্রন্থের মূল সুর হচ্ছে হতাশা। ধর্মীয় বিশ্বাসে আত্মসমর্পণই হচ্ছে মানুষের পক্ষে হতাশা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়-কিয়ার্কেগার্ডের দর্শনের সিদ্ধান্ত ছিল এই। সামাজিক প্রভাবের দিক দিয়ে এই দর্শনের যে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা রয়েছে তা বুঝতে কষ্ট হয় না।

Knowledge : জ্ঞান

সমাজবদ্ধ মানুষের সামাজিক শ্রম বা চিন্তার মধ্যেই জ্ঞানের উদ্ভব। পরিবর্তমান বস্তুজগৎ সম্পর্কে মানুষের ভাবগত ধারণা এবং তার ভাবগত প্রকাশ-এই দুই নিয়েই জ্ঞান। এক কথায়, জ্ঞান সামাজিক ব্যাপার। সমাজের মধ্যে ব্যক্তির ক্রিয়াকান্ডের বিশ্লেষণ ব্যতীত জ্ঞান সমস্যার সঠিক উপলব্ধি সম্ভব নয়। কিন্তু জ্ঞানের এই তত্ত্ব পূর্বে তেমন স্বীকৃত হতো না। বিশেষ করে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির অন্তর্দৃষি্ট হতে আহৃত সমাধান বা তত্ত্বকে জ্ঞান বলা হতো। এরূপ ধারণা করা হতো যে, বাস্তব জগত থেকে যে ব্যক্তি যত বিচ্ছিন্নভাবে সমস্যা নিয়ে আত্মনিবিষ্ট হতে পারে সেই তত জ্ঞানী। সমাজ ও বস্তুজগতের উর্ধ্বে কোথাও ‘জ্ঞান’-রূপ একটা অস্তিত্ব আছে। ব্যক্তি কেবল বিশ্লিষ্ট চিন্তা বা ধ্যানের মাধ্যমেই সেই জ্ঞানের সাক্ষাত লাভ করতে পারে। জ্ঞানের সর্বজনীন সূত্রগুলি মানুষের জন্যে বিধাতার দান বলে মনে করা হতো। কিন্তু দ্বন্ধমূলক বস্তুবাদের একটি অবদান এই যে, দ্বন্ধমূলক বস্তুবাদ জ্ঞানকে পরিবেশের সঙ্গে সমাজবদ্ধ ব্যক্তির ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এবং তার মাধ্যমে মানুষের মষ্তিষ্কের শক্তিবৃদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী চিন্তার বিকাশ ইত্যাদি মিলিয়ে একটি সামগ্রিক বিকাশমান প্রক্রিয়া হিসাবে উপস্থিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী জ্ঞানের যে সার্বজনীন সূত্রগুলিকে আমরা ঈশ্বর দত্ত বলে অনুমান করেছি সে সূত্রগুলিও মানুষের দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতার ফল। এই কারণে মানুষ হিসাবে পৃথিবীতে বিকাশলাভ করার গোড়া থেকেই মানুষ জ্ঞানী হতে পারে নি। বাস্তব জগতের ঘাত-প্রতিঘাতে বিকাশের একটা পর্যায়ে পৌঁছে মানুষ জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করেছে। জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা মানুষের ঐতিহাসিক বিকাশের একটি বিশেষ পর্যায়ের সূচক।

Kropotkin : ক্রোপোটকিন(১৮৪২-১৯২১ খ্রি.)

ক্রোপোটকিন প্রিন্স বা রাজকুমার ক্রোপোটকিন নামে পরিচিত। নৈরাষ্ট্রবাদের একজন বিখ্যাত তাত্ত্বিক। রুশদেশে একটি রাজবংশে তাঁর জন্ম। ভূগোলবিদ হিসাবেও তাঁর খ্যাতি আছে। রাশিয়ার সাইবেরীয় অঞ্চলে অভিযান করে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক মানচিত্র তৈরি করার তথ্যসামগ্রী তিনি সংগ্রহ করেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ক্রোপোটকিন নারোদনিক আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি কারারুদ্ধ হন। কিন্তু দু বৎসর পর কারাগার হতে পলায়ন করে ক্রোপোটকিন দেশের বাইরে চলে যান এবং ১৯১৭ সালে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বিদেশে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী দলের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। এজন্য ফরাসি সরকার ১৮৮৬ সালে তাঁকে কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। কিন্তু ফরাসি পার্লামেন্টের সদস্যদের দাবিতে তাঁকে ফরাসি সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ক্রোপোটকিন সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের ন্যায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধনের কথা বলেন। কিন্তু সাম্যবাদের সঙ্গে তাঁর তত্ত্বের পার্থক্য এই যে, ক্রোপোটকিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ মানুষের স্বেচ্ছামূলক যৌথ সংস্থার পরিণত হয়ে যাবে। উৎপাদনকারী মানুষ স্বেচ্ছামূলকভাবে আঞ্চলিক ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহে সংগঠিত হবে। তখন আর রাষ্ট্রীয় সংস্থার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সাম্যবাদও তত্ত্বগতভাবে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় মানুষের সমাজের উন্নতির কথা কল্পনা করে। কিন্তু সে অবস্থা সমাজতন্ত্রের ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়েই অর্জিত হবে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধনমাত্রই রাষ্ট্রহীন অবস্থার উদ্ভব স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে না। সাম্যবাদের সঙ্গে পার্থক্য থাকলেও বিপ্লবোত্তর রাশিয়াতে ক্রোপোটনিককে সোভিয়েত রাষ্ট্র তার খ্যাতির জন্য তাঁকে সম্মানের সঙ্গে রেখেছে। মৃত্যুর পর ক্রোপোটনিকের জন্মস্থানকে একিট জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে।

L

Labour :   শ্রম

‘শ্রম হচ্ছে প্রধানত মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রক্রিয়া। এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষ ক্রমান্বয়ে এই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

মার্কস : ক্যাপিটাল : প্রথম খন্ড

শ্রম বলতে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার শ্রমকেই বুঝায়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের রয়েছে প্রতিমুহুর্তে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক। বস্তুজগৎ যেমন মানুষকে স্পর্শ করে এবং আঘাত করে, মানুষও তেমনি বস্তুজগতকে স্পর্শ করে ও প্রত্যাঘাত করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি ও মানুষ উভয়েরই পরিবর্তন ঘটে। মানুষের হাতের যেমন ক্ষমতা আছে শক্ত পাথরকে হাতুড়ির আঘাতে চূর্ণ করার, তেমনি পাথরের ক্ষমতা আছে সেই শক্তিমান হাতের নরম তালুকে কড়াপরা কর্কশ তালুতে পরিবর্তিত করে দেওয়ার। মানুষ তাই শুধু প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে না, সে নিজেও প্রকৃতি দ্বারা পরিবর্তিত হয়।

মানুষের হাতে প্রকৃতির পরিবর্তনের মূলে আছে মানুষের শ্রম। শ্রমের তিনটি দিক। ১। মানুষ কোনো একটা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শ্রম করে। ২। মানুষ বাস্তব কোনো বস্তু বা বিষয়ের উপর তার শ্রম প্রয়োগ করে। ৩। শ্রমের উপায় হিসাবে মানুষ যন্ত্র ও কৌশল ব্যবহার করে। মানুষের অস্তিত্বের প্রধান শর্ত হচ্ছে শ্রম। শ্রম ব্যতীত মানুষ জীবন রক্ষা করতে পারে না। আবার এই শ্রমের মাধ্যমেই মানুষ পশুর স্তর থেকে নিজেকে মানুষের স্তরে উন্নত করতে পেরেছে। পশুর সঙ্গে মানুষের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে এই যে পশু যেখানে প্রকৃতির দানের উপর নির্ভর করে নিজের জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করে, মানুষ সেখানে শ্রমের মাধ্যমে সে প্রকৃতিকে নিজের দাসে পরিণত করে প্রকৃতি দ্বারা নিজের উদ্দেশ্য সাধন করার চেষ্টা করে।

কিন্তু মানুষের সামাজিক অর্থনীতি অবস্থার বিভিন্ন স্তরে শ্রম বিভিন্নভাবে বিবেচিত ও ব্যবহৃত হয়েছে। আদি সাম্যবাদী সমাজে শ্রম ছিল মানুষের যৌথশক্তি। মানুষ যৌথ ও সম্মিলিতভাবে শ্রম করত, শ্রমের উপায় বা হাতিয়ারকে যৌথ মালিকানায় ব্যবহার করত এবং শ্রমের মাধ্যমে লব্ধ ফল ফসল সম্পদকে যৌথভাবে ভোগ করত। এরূপ স্তরে এক মানুষের হাতে অন্য মানুষের শ্রমশক্তির শোষণের কোনো অবকাশ ছিল না। কিন্তু কালক্রমে সমাজ দ্বন্ধমান সমাজে শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যায়। দ্বন্ধমান সমাজে শ্রম আর প্রকৃতির পরিবর্তনে যৌথশক্তি হিসাবে ব্যবহৃত হয় না। শ্রমই জীবনরক্ষা ও তার দৈহিক ও মানসিক আরাম আয়াসের মূল হওয়াতে একের শ্রম ব্যবহার করে অপরের সুখসম্ভোগ নিশ্চিত করার প্রয়াস চলতে থাকে। দুর্বল শ্রেণীর শ্রম সবলতর শ্রেণী নিজের স্বার্থে শোষণ করতে শুরু করে। দাস সমাজে দাসের শ্রমে প্রভুর সম্পদ, সামন্তবাদী সমাজে চাষীর শ্রমে ভূস্বামীর সম্পদ এবং ধনতান্ত্রিক সমাজে কলকারখানার শ্রমিকের শ্রমের শোষণে পুঁজিপতির ধনের বৃদ্ধি। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রমকে আর মুক্তশ্রম বলা চলে না। শ্রম এখানে শৃঙ্খলিত। কিন্তু কালক্রমে আবার শৃঙ্খলিত শ্রমিক বিপ্লব করে শ্রমের মুক্তি সাধন করে। শ্রেণীহীন সমাজের প্রতিষ্ঠা করে প্রকৃতিকে আয়ত্ত করার সঠিক প্রচেষ্টায় শ্রমিক শ্রেনী মুক্ত শ্রমের যৌথ প্রয়োগের সম্ভাবনাকে সম্ভব করে তোলে।

Lafarge, Paul : পল লাফার্গ(১৮৪২-১৯১১ খ্রি.)

লাফার্গের জন্ম ফরাসি দেশে। কার্ল মার্কসের জামাতা ছিলেন। লাফার্গ মার্কসবাদকে ব্যাখ্যা করে বহু পুস্তক রচনা করেন। ‘রিলিজিয়ন অব ক্যাপিটাল’ বা পুঁজিবাদের ধর্ম ‘বর্বরযুগ হতে সভ্যতা পর্যন্ত সভ্যতার বিকাশ’ ‘আদম হাওয়ার উপাখ্যান’, ‘নবম পায়াসের স্বর্গবাস’ প্রভৃতি শিরোনামের পুস্তকে লাফার্গ সমাজ ও ধর্মের মার্কসবাদী ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন। জ্ঞান-সমস্যা নিয়েও তিনি পুস্তক রচনা করেন। জ্ঞানতত্ত্বে তিনি অজ্ঞেয়বাদকে খন্ডন করেন। লাফার্গ তার জীবদ্দশায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলেনেও অংশগ্রহণ করেন। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্যারী শহরের শ্রমিক শ্রেণী অভ্যুত্থান করে প্যারি কমউনের প্রতিষ্ঠা করেন। প্যারি শহরের শ্রমিকদের এই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে লাফার্গের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। মার্কসবাদের ব্যাখ্যায় লাফার্গ আপোসহীন ভূমিকা পোষণ করতেন। পুঁজিবাদ বিপ্লব ব্যতীত ক্রমবিকাশের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাজতন্ত্রে পরিণত হবে-শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদী তাত্ত্বিকদের এরূপ অভিমতকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। লাফার্গ তাঁর দার্শনিক রচনাসমূহে ইতিহাসের বিকাশের দ্বন্ধমূলক বিধান যে ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছা নির্বিশেষে বাস্তব, তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন এবং সমাজের অর্থনীতিক বুনিয়াদ এবং তার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক প্রভাবের সম্পর্ক যে বিদ্যমান তা প্রকাশ করেন। পরবর্তী মার্কসবাদীগণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাফার্গের তত্ত্বের অসম্পূর্ণতা, বিশেষ করে সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর তার ভাবগত কাঠামোর সক্রিয় প্রভাবের পরিপূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধি করতে না পারা এবং সাম্রাজ্যবাদী যুগের পুঁজিবাদী বৈশিষ্ট্য অনুধাবনে অক্ষমতার জন্য তাঁর সমালোচনা করলেও একজন মার্কসবাদী দার্শনিক হিসাবে লাফার্গের অবদান তাঁরা সম্মানের সঙ্গে স্বীকার করেন।

Language : ভাষা

মানুষের মনের ভাব আদান প্রদান এবং জ্ঞান অর্জনের প্রতীকময় মাধ্যমকে ভাষা বলে।

ভাষাকে ব্যবহার ও সৃষ্টির দিক থেকে স্বাভাবিক এবং কৃত্রিম এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। দৈনন্দিন জীবনে চিন্তার প্রকাশ এবং পারস্পরিক প্রত্যক্ষ যোগাযোগের যে ভাষাকে আমরা ব্যবহার করি তাকে স্বাভাবিক ভাষা বলা যায়। কিন্তু বিশ্লিষ্ট চিন্তা প্রকাশের জন্য সচেতনভাবে আমাদের ভাষা সৃষ্টিও করতে হয়। অঙ্কের চিহ্ন, পদার্থের প্রকৃতি বিশ্লেষণকারী তত্ত্বের ভাষা, দূর বার্তার কিংবা গোপন তথ্যের সংকেত ইত্যাদি ভাষাকে কৃত্রিম বলা চলে।

ভাষা মানুষের সমাজ জীবনের প্রকাশ। সঙ্গীহীন কোনো ব্যক্তির কথা চিন্তা করলে তার মুখে ভাষার বিকাশ চিন্তা করা যায় না। মানুষ জীবন রক্ষার জন্যই আদিতে সমাজবদ্ধ হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনই হচ্ছে জীবন রক্ষার মূলশর্ত। ব্যক্তিগতভাবে নয় সামাজিকভাবেই ব্যক্তিকে আদিতে খাদ্য উৎপাদন করতে হয়েছে। জীবন রক্ষার এই উপায়ের উৎপাদনে অপরাপর হাতিয়ারের মধ্যে ভাষা ছিল মানুষের অন্যতম প্রাথমিক হাতিয়ার। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ পরস্পরের শ্রমকে সংযুক্ত করে সমষ্টিগতভাবে বনের পশুকে শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে, হিংস্র ব্যাঘ্য এবং বৈরী গোত্রের আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছে এবং কালক্রমে অবকাশের ব্যবহারে সুকুমার বৃত্তির চর্চা করে সংস্কৃতির সৃষ্টি করতে পেরেছে।

ভাষা চিন্তার আধারও বটে। চিন্তার মধ্য দিয়ে ভাষার সৃষ্টি এবং বিকাশ ঘটে। কিন্তু ভাষার মধ্যেই আবার চিন্তার অবস্থান ঘটে। চেতনার বিকাশেও ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চিত্র থেকে সংকেতে উত্তরণই হচ্ছে ভাষার ক্রমবিকাশের ধারা।

ভাষা ভাবের প্রকাশ। ভাবকে দেখা যায় না। কিন্তু ভাষার সংকেতকে দেখা যায়। তার উচ্চারণকে শ্রবণ করা যায়। ভাব বিদেহী হলেও ভাবই ভাষার নিয়ন্তা। কিন্তু আমরা জানি, মানুষের ভাব সমাজোর্ধ্ব কোনো সত্তা নয়। সমাজবদ্ধ মানুষের ভাবের নিয়ন্ত্রক হচ্ছে সমাজ। ভাষা ইতিহাসেরও বাহক বটে। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার এক যুগের জ্ঞান ভান্ডারকে পরবর্তী যুগের মানুষের হাতে পৌছে দিতে পারে। এ্যাবষ্ট্রাক্ট বা বিশ্লিষ্ট চিন্তা প্রকাশের উপযুক্ত ভাষা পাইনে বলে আমরা অনেক সময় অভিযোগ করি। কিন্তু ভাষা ব্যতীত এ্যাবষ্ট্রাক্ট চিন্তা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্লিষ্ট বস্তুর পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে সাধারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ হচ্ছে জ্ঞানের প্রক্রিয়া। এ দিক থেকে যে কোনো অর্থবোধক শব্দ মাত্রই চিন্তার সাধারণীকরণ। আবার একথাও ঠিক যে চিন্তা এবং ভাষা অভিন্ন নয়। সমাজে ভাষার উদ্ভবের পরে ভাষা চিন্তা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবেই নির্দিষ্ট হয়। প্রত্যেকটি ভাষার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। শব্দের উচ্চারণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক বোধ-প্রভৃতি নিয়েই ভাষার এই আন্তরিক কাঠামো গঠিত। এই কাঠামোর বাইরে একটি ভাষার কোনো প্রতীকের অর্থ যথার্থভাবে উপলব্ধি করা সহজ নয়।

Language Movement : ভাষা আন্দোলন

১৯৫২ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে পূর্ববাংলায় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন বাংলা ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত। ঐ বৎসর ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ প্রাদেশিক সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দানের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ কয়েকজন তরুণ ছাত্র ও শ্রমিক নিহত হন। বহু বিক্ষোভকারী আহত হন এবং ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষকসহ বহুসংখ্যক লোককে গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানি সরকারের নির্যাতনে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে পড়লেও বিক্ষোভের মূল পূর্ববাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ভাষা আন্দোলন ক্রমান্বয়ে অধিকতার ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। পরিশেষ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

ভাষা আন্দোলন প্রধানত পূর্ববাংলার আন্দোলন। পাকিস্তানের ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে পূর্ববাংলার অবস্থান ও তার জনসংখ্যা ভাষা আন্দোলনের শক্তির উৎস হিসাবে কাজ করছে। ভাষা জীবনের অপরাপর সমস্যা হতে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। ভাষা জীবনযাপনের উপায় বা মাধ্যম। এজন্য ইতিহাসে সাধারণত ভাষা আন্দোলন বলে জনতার কোনো আন্দোলন বা সংগ্রামকে চিহ্নিত করা যায় না। পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত পূর্ববাংলার কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের আন্দোলন।

১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট ভারতবর্ষের শাসক ইংরেজ শক্তির মধ্যস্থতায় অখন্ড ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের ভীতিমুক্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ায় পাকিস্তানের, বিশেষত পূর্ববাংলার জনসাধারণ সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের আশা ব্যাপকভাবে পোষণ করতে শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী প্রধানত সামন্ততান্ত্রিক ও পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক হওয়াতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাভাবিক বিকাশের চেষ্টাকে তারা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের বিরোধী বলে চিন্তা করতে থাকে। পূর্ববাংলাকে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের দ্রব্যাদির বাজার এবং কর্মচারী ও সৈন্যবাহিনীর সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করে। এই নীতি কার্যকর করতে তারা পূর্ববাংলার জনসাধারণের ভাষা বাংলাকে হীন এবং হিন্দু প্রভাবাধীন বলে পাকিস্তানে পরিত্যাজ্য বলে প্রচার করে ঊর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করে। ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করেনঃ ‘উর্দূ, একমাত্র উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। তাঁর এই উক্তি এবং পাকিস্তান সরকারের উল্লেখিত উপনিবেশবাদী আচরণ ও নীতির বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার চেতনশীল ছাত্র ও মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের মধ্যে ১৯৪৮ সাল থেকেই অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে। পূর্ববাংলার জনসাধারণ, বিশেষ করে কৃষক সমাজের মধ্যে তাদের জমি, খাজনা, ফসল ইত্যাদি সমস্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই কৃষক সমিতি ও কমউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রকার আন্দোলন চলে আসছিল। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের তেভাগা, ময়মনসিংহের হাজংদের টঙ্ক এবং রাজশাহী নাচোল অঞ্চলের সাঁওতাল কৃষকদের আন্দোলন সরকারী নির্যাতনে পর্যুদস্ত হলেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে এবং পূর্ববাংলার কৃষক সমাজে বিশেষ রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার করে।

পাকিস্তানের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ পূর্ববাংলায় বাস করত। সমগ্র দেশের ১২ কোটি মানুষের মধ্যে সাতকোটির মুখের ভাষা বাংলা। সুতরাং বাংলা ভাষারই রাষ্ট্রভাষা হওয়া সঙ্গত ছিল।

ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলাদেশের জীবনে ধরাবাহিক আন্দোলন। একদিকে পাকিস্তানী শাসকচক্রের ক্রমাধিক শোষণ এবং গভীরতর ষড়যন্ত্র, অপরদিকে ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৮-৬৯ এবং ১৯৭০ সালের রাজনীতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক বিশিষ্ট আন্দোলনের মধ্যে ভাষা আন্দোলন পরিপক্বতা পেয়ে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে েএবং বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারীর স্মৃতি দিবস থেকে বাংলাদেশের সর্বাত্মক জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ৭ মার্চের তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান রমনা ময়দানের জনসভায় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ঘোষণা করে বলেনঃ “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।” ২৩ মার্চের ‘পাকিস্তান দিবস’কে ছাত্রসমাজ প্রতিরোধ দিবসে পরিণত করে। সবুজ পটভূমিতে রক্তসূর্য এবং বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কন করে তারা এক নতুন জাতীয় পতাকার সৃষ্টি করে। ঘরে ঘরে পাকিস্তানী পতাকার বদলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়।

কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগান নিয়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিরামহীন নিধনযজ্ঞ চলতে থাকে। লক্ষ লক্ষ লোক নিহত হয়। অগণিত নারী সম্ভ্রমহারা হয়। হাজার হাজার মানুষকে বন্দীশিবিরে নিক্ষেপ করা হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় দুই কোটি মানুষ হৃতসর্বস্ব এবং আশ্রয়হীন হয়। এক কোটি লোক প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের উপারে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। রক্তাক্ত অবস্থায় ২৬ শে মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতারে ঘোষিত হয় স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার কথা। স্বাধীন আন্দোলনের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে অপসারণ করেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দমন করতে পারে না। জন্মলাভ করে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি, শ্রমিক কৃষকের সন্তানদের মুক্তিবাহিনী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং চীন সরকার প্রকাশ্যে এবং গোপনে পাকিস্তান সরকারের এই হত্যাকান্ডকে সমর্থন করে তাকে আরো নির্মম করে তোলার জন্য পাকিস্তান সরকারকে মারণাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত এবং সোভিযেত ইউনিয়ন এবং বিশ্বব্যাপী সংগ্রামী জনসাধারণ বর্বর পাকিস্তান সরকারের এই গণহত্যার নিন্দা করতে থাকে। বাংলাদেশের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়েনের সক্রিয় সাহায্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে থাকে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক জটিলতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে ভারতের উপর সর্বাত্মক হামলা শুরু করলে ভারতীয় বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে। ঢাকা ও বিভিন্ন শহরের পাকিস্তানী ঘাঁটিগুলোকে ভারতীয় বিমান বাহিনী ত্বরিৎ আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করে দেয়। অবশেষে ১৬ তারিখে প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য পাকিস্তানী সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর তারিখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে শত্রুমুক্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণ করে।

১৯৫২ সালের ভাষার দাবিতে যে রক্তাক্ত সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিণতি লাভ করে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন তাই ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এবং জাতীয় মুক্তির ক্ষেত্রে একটি অনন্য তাৎপর্য্যপূর্ণ আন্দোলন।

Lamarck : লামার্ক(১৭৪৪১৮২৯ খ্রি.)

জ্যাঁ বাপ্তিস্ট লামার্ক বিখ্যাত ফরাসি জীববিজ্ঞানী। ১৮০৯ সনে লামার্ক তাঁর ‘ফিলোসফি জুয়োলজিকা’ গ্রন্থে সর্বপ্রথম জীবজগতের ক্রম বিবর্তনের একটি সামগ্রিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। প্রকৃতিবিজ্ঞানের অর্জিত সাফল্যসমূহের ভিত্তিতে লামার্ক এই অভিমত ব্যাখ্যা করেন যে, পরিবেশের পরিবর্তন প্রাণীর জীবনধারণের ক্ষেত্রে নতুন চাহিদার সৃষ্টি করে। এই চাহিদা পূরণের প্রয়াসে প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ‘ব্যবহার, অব্যবহারজনিত’ পরিবর্তন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সৃষ্টি হতে থাকে। কোনো অঙ্গের অতিব্যবহার সে অঙ্গের আদিরূপের পরিবর্তন ঘটায়; কোনো অঙ্গের অব্যবহারে সে অঙ্গের কালক্রমে বিলোপ ঘটে। জিরাফের গলা আদিতে হয়তো এরূপ লম্বা ছিল না। অবস্থার পরিবর্তনে বিশেষ অবস্থায় খাদ্য গ্রহণের চেষ্টায় জিরাফের গলা লম্বা হয়েছে। কালক্রমে এই পরিবর্তন বা বৈশিষ্ট্য জীবের বংশধারার অঙ্গীভূত হয়ে জন্মগত হতে পারে। লামার্কের এ তত্ত্ব ছিল এতদিনকার প্রজাতির আদিকাল হতে অপরিবর্তনের কাল্পনিক তত্ত্বের উপর আঘাতবিশেষ। লামার্ক তাঁর বিবর্তনের তত্ত্ব কেবলমাত্র জীবনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। তাঁর মতে অজৈবের বিবর্তনের মাধ্যমে জৈবের উদ্ভব। বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত জীবন গোড়াতে ছিল অজটিল, সরল। জটিল জীবন ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়েছে। অবশ্য লামার্ক বস্তুর স্ব-গতির কথা চিন্তা করেন নি। বস্তুর পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় গতি আদিতে ঈশ্বরই প্রদান করেছেন। এবং জৈব এবং অজৈবের বিবর্তন প্রবাহ ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। বিবর্তনে এবং বংশানুক্রমিক গুণের ‍সৃষ্টিতে পরিবেশের ভূমিকার  লামার্কীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে ডারউইন তাঁর বিবর্তনের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন।

Law : আইন, নিয়ম, বিধান

১। প্রাকৃতিক জগতে বস্তুপুঞ্জের নিত্যগতির নিয়ামক আত্মন্তিক সম্পর্ককে বিধান বলা হয়। পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বস্তুতে বস্তুতে কার্য্কারণের সুনির্দিষ্ট সূত্রকে আমরা বিধান বলি। মানুষের জ্ঞানের বিকাশে বিধানের বোধ তার চেতনার অগ্রগতির একটি বিশেষ পর্যায় সূচিত করে। বস্তুপুঞ্জের পর্যবেক্ষণে মানুষ যখন তার বহিঃপ্রকাশ এবং অন্তঃসত্ত্বার মধ্যে, অস্থায়ী এবং স্থায়ী চরিত্রের মধ্যে, পরিহার্য্য এবং অপরিহার্য্যের মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে তখনিমাত্র মানুষের পক্ষে বস্তুপুঞ্জের বৈচিত্র্য, বৈপরীত্য, অসঙ্গতির মধ্যে ঐক্য, সঙ্গতি এবং অনিবার্য বিধানকে আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। কাজেই বিধানের জ্ঞান লাভের পূর্বশর্ত হচ্ছে মানুষের বিশ্লিষ্ট চিন্তার ক্ষমতার বিকাশ, প্রকাশের অন্তরে সারকে অনুধাবন করার শক্তির স্ফূরণ। প্রাকৃতিক জগতের বিধানসমূহকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১. বিশেষ বিধান অর্থাৎ বস্তুপুঞ্জের কোনো বিশেষ অবস্থার ব্যাখ্যাকারী বিধান। ২. সাধারণ বিধান: বস্তুপুঞ্জের ব্যাপকতর পরিধির ব্যাখ্যাকারী বিধান এবং ৩. বিশ্বজগতের সার্বিক বিধান।

২। রাষ্ট্রের নিয়মনীতির অনুসরণকেও বিধান বলা হয়। একটি রাষ্ট্রের মানুষের সামাজিক আচার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রের শাসকশক্তি বিভিন্ন নিয়ম নিষেধের প্রবর্তন করে। এরূপ নিয়ম নিষেধের অলঙ্ঘনীয়তার মূলে থাকে রাষ্ট্রশক্তির দন্ডদানের ক্ষমতা। এ কারণে কোনো রাষ্ট্রের দন্ডমুন্ডের যারা নিয়ামক তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা স্বার্থ-অস্বার্থের প্রতিফলন ঘটে রাষ্ট্রীয় বিধানে। রাষ্ট্রীয় বিধানকে আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ বলে বোধ হয়। রাষ্ট্রীয় শক্তির মালিক শ্রেণী বিধানকে নিরপেক্ষ হিসাবে দেখাতে চায়। আসলে পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দ্বন্ধে লিপ্ত কোনো শ্রেণী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় বিধান নিরপেক্ষ হতে পারে না। যে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, আইনগত ও সাংস্কৃতিক বহিঃকাঠামোর নিয়ন্তা হচ্ছে তার অর্থনৈতিক অন্তঃকাঠামো। আবার অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজের উৎপাদনের উপায় এবং উৎপাদনের সম্পর্ক দ্বারা। উৎপাদনের উপায় অর্থাৎ তার যন্ত্রপাতি, হাতিয়ার এবং উৎপাদনের সম্পর্ক অর্থাৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিক মালিক সম্পর্ক দ্বারা। একটি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অর্থনীতিক বুনিয়াদের নিয়ন্ত্রক হচ্ছে উৎপাদনের যন্ত্র ও শ্রমিকের উপর মালিক শ্রেণী। যে অর্থনীতিতে শ্রমিক শ্রেণী য্ন্ত্র এবং শ্রম উভয়ের মলিক সেখানে শ্রমিক শ্রেণী তার অর্থনীতিক অন্তঃকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় বহিঃকাঠামোর নিয়ন্তা।

Leap : উৎক্রমণ, উল্লম্ফণ

কোনো বিষয় বা বস্তুর চরিত্রে পরিমাণগত পরিবর্তনের বৃদ্ধিতে গুণগত পরিবর্তনের ক্রান্তি বা সংকটমুহুর্ত হচ্ছে উৎক্রমণের মুহুর্ত। পানিতে তাপ প্রয়োগ করতে থাকলে তার উষ্ঞতা বৃদ্ধি পেতে পেতে এক সময়ে পানি তরল হতে বাষ্পীয় দ্রব্যে পরিণত হয়ে যায়। এই পরিবর্তনকে উৎক্রমণ বলা যায়। দ্বন্ধমান শ্রেণীবিভক্ত সমাজে বিরোধ ও সংঘাত বৃদ্ধি পেতে পেতে যখন সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হয় তখনো বিকাশের ক্ষেত্রে উৎক্রমণ ঘটে। ফরাসি বিপ্লব সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে ধনতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তিত হওয়া উৎক্রমণের একটি দৃষ্টান্ত। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায় রূপলাভ করা উৎক্রমণের আর একটি দৃষ্টান্ত। উৎক্রমণের মাধ্যমে একটি বস্তু বা বিষয়ের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়। উৎক্রমণের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার আকস্মিকতা। কিন্তু সমাজদেহে মৌলিক পরিবর্তন যে সবসময় আকস্মিকভাবে ঘটবে তা সত্য নয়। যে সমাজে মারাত্মক শ্রেণীদ্বন্ধ বিলুপ্ত হয়েছে তেমন সমাজে মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিপ্লব ব্যতীত ক্রমবিকাশের মাধ্যমেও নতুন মৌলিক চরিত্রের উদ্ভব ঘটতে পারে। উৎক্রমণের ক্ষেত্রে যেখানে নতুন চরিত্রের হঠাৎ উদ্ভব ঘটে এবং পুরাতনের বিলোপটাও আকস্মিক এবং সামগ্রিক বলে বোধ হয় সেখানে ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে পুরাতনের পাশাপাশি নতুন চরিত্রের উদ্ভব ঘটতে থাকে এবং এই প্রক্রিয়ার পরিণামে পুরাতন বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রাকৃতিক জগতেও ক্রমবিকাশের দৃষ্টান্ত আছে। মানুষ মানুষের চেয়ে নিম্নস্তরের জীব থেকে ভাষা ব্যবহার এবং মানসিক চিন্তার ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে পৃথক প্রাণী। জীববিজ্ঞান বলে মানুষ মনুষ্যেতর জীব থেকেই পরিবর্তিত হতে হতে মানুষের চরিত্র লাভ করেছে। তার এ পরিবর্তন ঘটেছে একটু একটু করে-প্রকৃতির সঙ্গে তার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কের ভিত্তিতে লক্ষ লক্ষ বছরের পরিধিতে।

Leibniz : লাইবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬ খ্রি.)

সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত জার্মান বাস্তব-ভাববাদী দার্শনিক। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি কেবলমাত্র দার্শনিক ছিলেন না। তাঁর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা ছিল বহুমুখী। অন্কশাস্ত্রে তাঁকে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস তত্ত্বের একজন আবিষ্কর্তা বলে স্বীকার করা হয়। পদার্থবিদ্যায় তিনি ‘শক্তি সঞ্চয়’ বিধান আবিষ্কার না করলেও তার পূর্বাভাস দান করেন। তা ছাড়া তিনি ভূতত্ত্ববিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিকও ছিলেন। কেবল তাত্ত্বিক নয়, সমাজজীবনেও লাইবনিজ একজন নিরলস সংগঠক ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী বার্লিন বিজ্ঞান একাডেমীর তিনি মূল পরিকল্পনাকারী এবং তার প্রথম সভাপতি। সপ্তদশ শতকের দার্শনিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে লাইবনিজের দার্শনিক তত্ত্ব ছিল সর্বাধিক যুক্তিনির্ভর সূক্ষ্মতত্ত্ব। বিশ্বসংসারের রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি তাঁর মোনাডালিজ গ্রন্থে ‘মোনাড’ তত্ত্ব উপস্থিত করেন। তাঁর মতে বিশ্বের গঠনগত মৌলিক সত্ত্বা হচ্ছে অসংখ্য মোনাড। মোনাড দিয়েই বিশ্ব, কিন্তু মোনাড বস্তু নয়। মোনাড অবিভাজ্য অ-বস্তু সত্তা। মোনাড প্রত্যক্ষদর্শী এবং আত্মক্রিয়। মোনাডে মোনাডে বিশ্ব গঠিত। কিন্তু লাইবনিজের মতে এক মোনাডের সঙ্গে অপর মোনাডের কোনো কার্যকারণগত সম্পর্কের অস্তিত্ব নাই। তথাপি এক মোনাডের সঙ্গে অপর মোনাড সম্পর্কিত সব মোনাড নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি সুসংহত বিশ্ব। বিশ্বের এ সুসঙ্গতি পূর্বনির্দিষ্ট। এ যেন সর্বশ্রেষ্ঠ মোনাড বা বিধাতার মধ্যে যে সঙ্গতি বিদ্যমান তারই প্রতিচ্ছায়া পড়েছে প্রতিটি মোনাডে। সত্তার এই তত্ত্বের পরিপূরক হিসাবে লাইবনিজ তাঁর জ্ঞানতত্ত্ব রচনা করেন। বস্তুর অস্তিত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যার জন্য তিনি যথোপযুক্ত যুক্তির বিধান, ‘ল অব সাফিশিয়েন্ট রিজন’ তৈরি করেন। তাঁর মতে বিশ্বজগতের ব্যাখ্যার জন্য আবশ্যক হচ্ছে বস্তুর সঙ্গে বস্তুর সম্পর্ক আবিষ্কার করা। যে বস্তু যেখানে যেমন আছে তার সে অবস্থান অবশ্যই আকস্মিক বা কারণহীন নয়। সে যেখানে যেমন আছে সেখানে তেমনভাবে থাকার কারণ আছে। পারস্পরিক সম্পর্কই হচ্ছে সে কারণ। কাজেই বিশ্বজগতে কোনো বস্তু বা ঘটনাকে অনুপযুক্ত বা অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করার উপায় নেই। বস্তু বা ঘটনামাত্রই যুক্তিগত। যুক্তিতেই তার অবস্থান। কাজেই বলা যায় যে, প্রত্যেকটি বস্তুই যুক্তিগ্রাহ্য এবং প্রত্যেকটি যুক্তিগ্রাহ্য বিষয় বা বস্তুই যথার্থ। অভিজ্ঞতাবাদী লক বলেছিলেন, মন শুরুতে দাগশূণ্য একটি শ্লেট বৈ আর কিছু নয়। এবং যার অস্তিত্ব বাস্তব অভিজ্ঞতায় নেই, তার ভাব মনের মধ্যেও জন্মাতে পারে না। জ্ঞানের এ তত্ত্বকে লাইবনিজ অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে বুদ্ধি অভিজ্ঞতা থেকে যা কিছুই গ্রহণ করুক না কেন, মানুষ বুদ্ধিকে অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করতে পারে না। মানুষের বুদ্ধি তার অভিজ্ঞতাপূর্ব শক্তি। অভিজ্ঞতা মানুষের মনে জ্ঞানের সার্বিক সূত্রের জন্ম দিতে পারে না। জ্ঞানের সার্বিক সূত্রগুলির সাহায্যেই মন অভিজ্ঞতাকে অনুধাবন করে। লাইবনিজের এই জ্ঞানতত্ত্ব ভাববাদী বুদ্ধিবাদ বলে পরিচিত। বার্টান্ড রাসেল লাইবনিজকে আঙ্কিক যুক্তিশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলে বিবেচনা করেছেন। সপ্তদশ শতকের জার্মানীর সমাজ জীবনের পটভূমিতে বিচার করলে লাইবনিজের দর্শনে সমাজের সুসঙ্গত বিকাশের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক শক্তি জার্মান ধনতন্ত্র এবং সামন্তবাদের পারস্পরিক আপসের প্রতিফলন দেখা যায়।

Lenin, V.I. : ভি আই লেনিন(১৮৭০-১৯২৪ খ্রি.)

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন মার্কস এবং এঙ্গেলস এর উত্তরসূরি। মার্কসবাদ বা দ্বন্ধমূলক বস্তুবাদের তিনি ছিলেন ব্যাখ্যাতা এবং বিপ্লবী দার্শনিক। লেনিন রুশদেশে সংঘটিত ১৯১৭ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অবিসংবাদী নেতা এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিযেত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা।

মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তান লেনিন ছোটবেলা থেকেই সক্রিয়ভাবে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। জারকে হত্যা করার চেষ্টার অভিযোগে তাঁর অগ্রজের ফাঁসি লেনিন কে গভীরভাবে আলোড়িত করে। লেনিন দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে অধিকতর অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি তাঁর ভাই এর সন্ত্রাসবাদী পন্থা পরিহার করে বিপ্লবী গণসংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক বিপ্লব সাধনের নীতি গ্রহণ করেন। ১৭ বছর বয়সে লেনিন ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে প্রথম গ্রেফতার হন। তাঁকে একটা গ্রামে অন্তরীণাবদ্ধ রাখা হয়। ১৮৯১ সালে ২১ বৎসর বয়সে লেনিন সেন্ট পিটারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিঃছাত্র হিসাবে আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। লেনিন গভীর নিষ্ঠার সাথে মার্কসবাদ অধ্যয়ন করতে থাকেন এবং সক্রিয়ভাবে ১৮৮৯-৯৩ খ্রিস্টাব্দে একটি মার্কসবাদী চক্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৪ সালে লেনিন ‘জনতার মিত্র কারা এবং সংস্কারবাদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের পদ্ধতি কি’-এই শিরোনামে তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক তত্ত্বমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯০০ সালের দিকে তিনি নিজ দেশ পরিত্যাগ করে ইউরোপের অন্য দেশে গমন করেন এবং দেশের বাইরে থেকে বিপ্লবী ‘ইসক্রা’ পত্রিকা প্রকাশ করে রাশিয়ায় প্রেরণ করে রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। ১৯০৩ সালের রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবী বলশেভিক দলের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় অভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থান জারের নির্মম অত্যাচারে পর্যবসিত হয়। ১৯০৫ এবং ১৯১৭ সালের উভয় বিপ্লবে লেনিন প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দান করেন।

বিশ শতকে ইতিহাসের নতুন পর্যায়ের সমস্যার বিচার, বিশ্লেষণ ও সমাধানে মার্কসবাদের সৃজনশীল ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের মধ্যেই লেনিনের কৃতিত্ব নিহিত। লেনিন ১৯১৬ সালে তাঁর ‘সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’ শীর্ষক সুবিখ্যাত গ্রন্থে বিশ শতকের প্রথম ধাপে পুঁজিবাদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের সুনিপুণ বিশ্লেষণ উপস্থিত করেন এবং সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদী স্তরে পুঁজিবাদী বিকাশের বিধান উদঘাটন করেন। এই বিশ্লেষণ অত্যাসন্ন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক শক্তিশালী আদর্শগত হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। লেনিনের এই গ্রন্থ তাঁর অন্যান্য সামাজিক দার্শনিক সমস্যার উপর লিখিত বহুসংখ্যক গ্রন্থের ন্যায় সমাজ বিকাশের মৌলিক সূত্রের প্রাঞ্জল উপস্থাপনার জন্য বিপ্লবী কর্মী এবং সমাজবিজ্ঞানীর নিকট চিরায়ত সাহিত্যের রূপ লাভ করেছে। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের অসম বিকাশের বাস্তব অবস্থাকে বিশ্লেষণ করে লেনিন প্রমাণ করেন যে, এমন অবস্থায় একটি বিশেষ দেশেও সমাজতন্ত্র কায়েম হতে পারে। ইতোপূর্বে ধারণা করা হতো যে, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের যে শক্তি ও বিকাশ তাতে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্বব্যাপী তা একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে দ্বন্ধমূলক বস্তুবাদের নিয়ত বিকাশের উপর লেনিন সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। ১৯০৮ সালে রচিত তাঁর ‘ম্যাটেরিয়ালিজম এন্ড এমপিরিওক্রিটিসিজম’ গ্রন্থ তার মৌলিক দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ হিসাবে সুপরিচিত। মার্কসবাদ বা দ্বন্ধমূলক বস্তুবাদের বিকৃতির অপচেষ্টাকে লেনিন তাঁর এই গ্রন্থে আপোসহীনভাবে বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করেন। এই বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে তিনি বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার ও তত্ত্বসমূহ সম্পর্কে এবং জ্ঞানের সমস্যায় তাঁর মতামত উপস্থাপিত করেন। শ্রেণী এবং শ্রেণীসংগ্রাম, রাষ্ট্র এবং বিপ্লব প্রভৃতি সমস্যা বিশ্লেষণ করে লেনিন একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তা ছাড়া তিনি সংস্কৃতি, সমাজতান্ত্রিক শিল্প, সাহিত্য এবং চারিত্রনীতি প্রভৃতি সমস্যার উপরও আলোকপাত করেন। লেনিন ভাবধারাকে লেনিনবাদ নামে অভিহিত করা হয়। লেনিনবাদ মার্কসবাদের নতুনতর বিকাশের স্মারক।

Leucippus : লিউসিপাস (৫০০-৪৪০ খ্রি.পূ.)

গ্রিক দার্শনিক ডিমোক্রিটাসের সমসাময়িক হলেও লউসিপাস ছিলেন বয়োজৈষ্ঠ্য। বস্তুর অণুতত্ত্বের মূল ধারণা লিউসিপাসই প্রতিষ্ঠা করেন। ডিমোক্রিটাস তাঁর সেই ধারণাকে পূর্ণতর তত্ত্বের রূপ দেন। তাছাড়া লিউসিপাস বিজ্ঞানের আরো তিনটি মৌলিক ধারণার সৃষ্টি করেন। ১। চরম শূণ্যতা, ২। চরম শূণ্যতার মধ্যে সঞ্চারমান অণু, ৩। যান্ত্রিক অনিবার্যতা। তাঁর রচনাসমূহের যে সমস্ত অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার ভিত্তিতে এরূপ অনুমান করা যায় যে, লউকিপাস কার্যকারণের বিধান এবং প্রয়োজনীয় যুক্তির বিধানও আবিষ্কার করেন। লউসিপাস মনে করতেন, কারণ ব্যতীত কোনো কিছুরই উদ্ভব ঘটতে পারে না। এবং যা কিছু ঘটে তার পেছেনে প্রয়োজনের অনিবার্যতা সর্বাদাই বিদ্যমান থাকে।

Levellers : সমানকারী

সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ড যখন স্বৈরাচারী রাজার শাসনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন বা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের লড়াই শুরু হয় এবং রাজা এবং পার্লামেন্টের মধ্যে সশস্ত্র গৃহযুদ্ধের রূপ গ্রহণ করে তখন কেবল সমাজের উচ্চস্তর নয়, নিম্নস্তরও আন্দোলিত হয়ে উঠে। নানা দাবি ও মতামতের প্রচার হতে থাকে। সাধারণ মানুষের মাঝে এরূপ প্রচার হতে থাকে যে, কেবলমাত্র পার্লামেন্ট এর ক্ষমতা নয়, মানুষে মানুষে অসাম্যকেও বিলুপ্ত করতে হবে। সামরিক বাহিনীর মধ্যেও সমতার দাবি উঠতে থাকে। সাম্যবাদী এরূপ মতের প্রচারকারীদের ‘লেভেলার্স’ বা ‘সমানকারী’ বলা হতো। এদের চাপে পার্লামেন্ট পক্ষের সামরিক নেতা ক্রমওয়েলকে ‘এ্যাগ্রিমেন্ট অব দ্য পিপল’ বা ‘জনতার চুক্তি’ নামে বিপ্লবী এক গণতান্ত্রিক সংবিধানকে স্বীকার করতে হয়। অবশ্য লেভেলারদের এ দাবি অচিরেই উচ্চতর শ্রেণীর প্রতিভূদের দ্বারা নাকচ হয়ে যায়। এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে এরূপ মতাবলম্বী কেন্দ্রগুলিকে ভেঙ্গে দেওয়া হয়।

Li : লী

‘লী’ কথাটি চীনের দর্শনের একটি মৌলিক ভাববোধক শব্দ। ‘লী’ দ্বারা চীনের দর্শনে বিধান, বস্তু, জগতের শৃঙ্খলা, আকার ইত্যাদি বুঝানো হয়। ভাববাদী দার্শনিকগণ ‘লী’কে বস্তুবোধক ‘চী’র বিপরীতার্থক ভাববাচক ধারণা বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কনফুসীয় মতবাদে ‘লী’কে আবার সামাজিক বিধানের সমাহার হিসাবেও ব্যাখ্যাত হতে দেখা যায়।

Liberalism : উদারতাবাদ

সপ্তাদশ-অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদের অবাধ বিকাশের প্রয়োজনে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবাধ প্রতিযোগিতার যে তত্ত্ব বিভিন্ন চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ প্রচার করেন তা উদারতাবাদ বলে পরিচিত। এই কালের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তত্ত্বও উদারতাবাদের আর এক নাম। ‘উদারতাবাদ’ ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ পদগুলি আধুনিক জীবনেও ব্যবহৃত হয় বটে। কিন্তু এককালে উদারতাবাদ বলতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে অবাধ প্রতিযোগিতাকে বুঝানো হতো বর্তমানে তার বদলে উদারতাবাদ বলতে সাধারণভাবে অরক্ষণশীল এবং পরমতসহিষ্ঞু উদার চিন্তাকে প্রধানত বুঝানো হয়।

Liberty, Theory of : স্বাধীনতার তত্ত্ব

ইউরোপে সপ্তাদশ অষ্টাদশ শতকে রাজার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধ বিভিন্ন দেশে যে আন্দোলন এবং বিপ্লব সংঘটিত হয় তার মূলদাবি ছিল রাষ্ট্রের নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করা। রাষ্ট্রে সকল ব্যক্তি সমান, রাজায় প্রজায় কোনো ভেদাভেদ নেই এবং ব্যক্তির দ্বারাই রাষ্ট্রের সৃষ্টি; ব্যক্তির কতকগুলি মৌলিক অধিকার বা স্বাধীনতা আছে, যেমন জীবন রক্ষার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ তথা শাসকের স্বাধীনতা। হবস, লক, রুশো : সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের এই সকল প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদের রচনাতে ব্যক্তিস্বাধীনতার এরূপ তত্ত্ব প্রচার হতে দেখা যায়। জন স্টুয়ার্ট মিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও  ব্যক্তির স্বাধীনতার সমস্যার বিশ্লেষণ করে যে প্রবন্ধ রচনা করেন ‘অন লিবার্টি’ বা ‘স্বাধীনতার উপর’ শিরোনামের সে আলোচনা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর লিখিত আলোচনাসমূহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোচনা বলে খ্যাতি লাভ করেছে।

Life : জীবন

বিজ্ঞান জীবনকে বস্তুর গতির একটা বিশেষ প্রকাশ বলে মনে করে। জীবনের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, জীবন বিভিন্ন প্রকার জীবদেহের মধ্যে বিধৃত। জীবন বিকাশের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন্মলাভ করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং নিজের ধারাকে রক্ষাকারী অনুরূপ জীবনের সৃষ্টি করে আবার অ-জীবে রূপান্তরিত হয়। জীবনের বিকাশের অপর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, জীব একদিকে জীবের সঙ্গে এবং অপরদিকে অজীব পরিবেশের সঙ্গে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে, সহজ থেকে জটিলতর এক জীবজগতের সৃষ্টি করেছে। সহজ থেকে জটিলতার বিবর্তনের এই ধারার সর্বাধিক জটিল বিকাশ ঘটেছে মনুষ্যজীবদেহে। জীবদেহের একটি মৌলিক চরিত্র হচ্ছে তার অভ্যন্তরস্থ সার্বক্ষণিক সৃষ্টি এবং ধ্বংসের প্রক্রিয়া। জীবদেহমাত্রই বীজকোষের সমাহার। জীবদেহে সর্বক্ষণই একদিকে এক জীবকোষের বিভাজনে অপর জীবকোষের সৃষ্টি হচ্ছে এবং অপরদিকে ক্ষয়প্রাপ্ত জীবকোষের মৃত্যু ঘটছে। জীবকোষের এই সার্বক্ষণিক ক্ষয়বৃদ্ধিকেই অনেকে জীবনের সহজ সংজ্ঞা বলে নির্দিষ্ট করেছেন। জীবের সঙ্গে অজীবের পার্থক্য কি বস্তুর অণুর একটি বিশেষ সংবদ্ধতা কিংবা বস্তর অতিরিক্ত জীবন নামক কোনো অতুলনীয় শক্তির মধ্যে নিহিত? এ তর্কের কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা হয় নি।

Locke, John : জন লক(১৬৩২-১৭০৪ খ্রি.)

জন লক ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডের বস্তুবাদী দার্শনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লেখক। তখনকার ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সমাজ জীবনে যে শ্রেণী সংগ্রাম তীব্রভাবে সংঘটিত হচ্ছিল, লক তাতে প্রত্যক্ষভাবেই অংশগ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর প্রধান দার্শনিক রচনা হচ্ছে ‘এসে কনসারনিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা মানুষের জ্ঞান সম্পর্কিত নিবন্ধ। এর প্রকাশকাল ১৬৯০। এই নিবন্ধে লক তাঁর বস্তুবাদী অভিজ্ঞতাবাদ এর জ্ঞানতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লক দেকার্তের জন্মগত ভাব এর অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। লকের মতে, অভিজ্ঞতাপূর্ব বা জন্মগত কোনো ভাবের অস্তিত্ব নেই। মানুষের মনের সব ভাবেরই মূল হচ্ছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। ভাব দুপ্রকার হতে পারে। মৌল এবং অ-মৌল বস্তুজগত সর্বক্ষণ মানুষের ইন্দ্রিয়ের উপর আঘাত হানছে। এই আঘাতের মাধ্যমে মনের মধ্যে ইন্দ্রিয়গত ভাবের উদ্ভব ঘটে। ব্যক্তি অবশ্য তার নিজের মানসিক ক্রিয়াকলাপের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছু মনোগতভাবেরও সৃষ্টি করতে পারে। ‘মনোগত ভাবের’ স্বীকৃতি দ্বারা লক জ্ঞানের প্রশ্নে ভাববাদী তত্ত্বের সঙ্গে খানিকটা আপোস করতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে জ্ঞানের তত্ত্বে লককে অবিমিশ্র বাস্তব অভিজ্ঞতাবাদী বা ইন্দ্রিয়গত ভাববাদী বলে তুলনা করা চলে না। লকের মতে ইন্দ্রিয়গত ভাব দ্বারা আমরা বস্তুর মৌলিক বা অ-মৌলিক গুণের জ্ঞান লাভ করি। ‘শক্তত্ব’ বস্তুর একটি মৌলিক গুণ। কিন্তু রং তার একটি অমৌলিক গুণ। ভাবমাত্রই জ্ঞান নয়। বাস্তবজগতের অভিজ্ঞতা থেকে ইন্দ্রিয় যে ভাব সংগ্রহ করে তা জ্ঞানের কাঁচামালবিশেষ। এই কাঁচামালের উপর মনের তুলনা, বিশ্লেষণ এবং সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জ্ঞানের সৃষ্টি। এই প্রক্রিয়াতেই মন সহজ থেকে জটিল ভাবের সৃষ্টি করে। মানুষের মনে জন্মগত কোনো ভাব থাকে না। কারণ শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন তার মন একখানি নিখাদ শ্লেট বা ‘টেবুলা রাসা’ ব্যতীত আর কিছু নয়। শিশুর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বস্তুজগত শিশুর ইন্দ্রিয়সমূহের মাধ্যমে এই নিদাগ শ্লেটে অসংখ্য দাগ কেটে দিতে থাকে। নিদাগ শ্লেটে বস্তুজগতের এই দাগই হচ্ছে ভাব বা জ্ঞানের কাঁচামাল।

মানুষের জ্ঞানের ক্ষমতা কতখানি, এটি দর্শনের একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। লক জ্ঞানের সীমাকে অসীম বলেন নি। বস্তুজগৎ এবং অ-বস্তুজগতের অনেক কিছুই মানুষ হয়ত জানতে পারে না। কিন্তু তাই বলে মানুষ জ্ঞানের ক্ষেত্রে অসহায় নয়। লক জ্ঞানের সীমাকে স্বীকার করলেও তিনি অজ্ঞেয়বাদী ছিলেন না। তাঁর কাছে জ্ঞানের মূল প্রশ্ন হচ্ছে, জীবন-যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন। এরূপ জ্ঞানলাভের ক্ষমতা মানুষের অবশ্যই আছে।

রাষ্ট্রীয় তত্ত্বে লক মানুষের আদিম অবস্থা থেকে সভ্যতার উত্তরণের স্তরসমূহের উপর আলোকপাত করেন এবং সরকারের প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোচনা করেন। ব্যক্তি-রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্নটি সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডের ধনিক শ্রেণীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ধনিক শ্রেণী আপন বিকাশের জন্য একটি সামাজিক বিপ্লব সাধন করে। তাদের কাছে রাষ্ট্রের ভূমিকা নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং তাদের সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের মধ্যে নিহিত থাকবে। সরকারের কর্তব্য হবে ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা। অধিকার হরণ করা নয়। এই ভূমিকাকে লঙ্ঘন করে রাষ্ট্র বা সরকার স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করলে নাগরিকেরও অধিকার থাকবে সে রাষ্ট্র বা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার সামাজিক ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটাবার। সামাজিক, রাজনীতিক ও দার্শনিক প্রশ্নসমূহের প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী সমাধানে  লকের চিন্তাধারার প্রভাব তৎকালে সুদূরপ্রসারী ছিল। পরবর্তীকালে ফরাসি দেশে যে বস্তুবাদী দর্শন বিকাশ লাভ করেছিল, তার প্রেরণার উৎস ছিল লকের ভাবধারা। লক বস্তুর মৌলিক ও অ-মৌলিক গুণের মধ্যে যে পার্থক্য স্বীকার করেছিলেন তাঁর সে পার্থক্যের ভিত্তিতেই আবার ভাববাদী দার্শনিক ধর্মযাজক বার্কলে জ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির মানসিক বোধে পর্যবসিত করার প্রয়াস পান।

Logic, Deductive, Inductive, Mathematical : অবরোহী, আরোহী এবং আঙ্কিক যুক্তিবিদ্যা

যুক্তিবিদ্যার প্রধান ভূমিকা হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রমাণের মূল্যায়ন। জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের উপর চিন্তা করে। এই চিন্তাকে পুনরায় ভাষায় প্রকাশ করে তাকে সামাজিক আদান প্রদানের মাধ্যমে রূপান্তরিত করে । ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে। কিন্তু জ্ঞান ব্যক্তির ব্যাপার নয়-জ্ঞান সামাজিক ব্যাপার। এ কারণে চিন্তার ভাষায় প্রকাশিত রূপ হচ্ছে যুক্তিবিদ্যার বিচার্য বিষয়। কেবল চিন্তার ব্যাপারটা মনোবিজ্ঞানের বিষয়। তথ্যের সঙ্গে তথ্যের সঙ্গতি ও সম্পর্ক, সেই তথ্য সম্পর্কে রচিত বাক্যের মধ্যে প্রকাশ পায়। তাই যুক্তিবিদ্যার সূত্রপাত ঘটে একটি যৌক্তিক বাক্যের সঙ্গে অপর একটি যৌক্তিক বাক্যের সম্পর্ক বিশ্লেষণে বাক্যের সঙ্গে বাক্যের সম্পর্ক কত প্রকারের হতে পারে, বাক্যের অংশসমূহের বৈশিষ্ট্য কি, বাক্যের পারম্পর্য কিভাবে রক্ষিত হতে পারে, ইত্যাকার প্রশ্নের আলোচনায়। খুব ব্যাপক অর্থে যুক্তিবিদ্যা হচ্ছে জ্ঞানানুসন্ধানের তত্ত্ব । নির্ভরযোগ্য জ্ঞান আহরণের বিভিন্ন পদ্ধতির আলোচনা দিয়েই যুক্তিবিদ্যার পরিমন্ডল গঠিত। পর্যবেক্ষণ, তুলনা, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ, সংজ্ঞা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হেত্বাভাষ বা ত্রুটির প্রকার, যুক্তির নীতির বিকৃতি এবং অপপ্রয়োগ ইত্যাকার প্রক্রিয়াগুলির অনসুধাবন সঠিক জ্ঞানের জন্য আবশ্যক বলে এগুলিকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য যুক্তিবিদ্যা এ সমস্ত প্রক্রিয়াও আলোচনা করে।

যুক্তির দুটি প্রধান পদ্ধতি হচ্ছেঃ অবরোহ ও আরোহ। অবরোহ যুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট যুক্তির শুরুতে প্রদত্ত এক কিংবা একাধিক বাক্যের ভিত্তিতে একটি অনিবার্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আরোহ যুক্তিতে বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বাস্তবক্ষেত্রে সম্ভব একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অবরোহ যুক্তির সিদ্ধান্তের সত্যতা যুক্তির শুরুতে গৃহীত যৌক্তিক বাক্যের সত্যতা, অসত্যতার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আরোহ যুক্তির  সিদ্ধান্তের সত্যতা নির্ভর করে বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঠিকতার উপর। অবরোহ এবং আরোহ পরস্পর পরিপূরক পদ্ধতি। যে কোনো সমস্যা সমাধানের প্রয়াসে অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা অবরোহ এবং আরোহ উভয় পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণ করি।

পূর্বে ধারণা ছিল যে, অবরোহ এবং আরোহ ব্যতীত যুক্তির আর কোনো পদ্ধতি নেই। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে দার্শনিক জর্জ বুল যুক্তির ক্ষেত্রে আঙ্গিক ও প্রতীক পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করেন। পরবর্তীকালে বার্টান্ড রাসেল এবং হোয়াইটহেড এই পদ্ধতিকে অধিকতর ব্যাপকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। যুক্তির এই আধুনিক বিকাশকে আঙ্কিক যুক্তি, প্রতীক যুক্তি কিংবা যুক্তির বীজগণিত বলেও আখ্যায়িত করা যায়। আঙ্কিকযুক্তি জটিল বলে বোধ হলেও সাধারণীকরণের ক্ষেত্রে এর যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে তা নিম্নের উদাহরণ থেকে বোঝা যায়।

সকল মানুষ মরণশীল।

সক্রেটিস একজন মানুষ।

অতএব, সক্রেটিসও মরণশীল।

অবরোহ যুক্তির এই দৃষ্টান্তটি খুবই পরিচিত। এই দৃষ্টান্তের মধ্যে অনিবার্যতার যে সত্য রয়েছে, তাকে অধিকতর সাধারণ করে আমরা বলতে পারি-

সকল ক হচ্ছে খ

সকল গ হচ্ছে ক

সকল গ হচ্ছে খ।

আবার এ সত্য আরো আঙ্কিক করে বলা যায়ঃ

ক=খ, গ=ক, সুতরাং গ=খ।

Logos : লগোস

‘লগোস’ একটি গ্রিক শব্দ। গ্রিক দর্শনে লগোস বলতে জগতের ভিত্তি হিসাবে একটি প্রজ্ঞা বা সঠিক বিধানকে বুঝাত। হিরাক্লিটাসের রচনাতেও এই শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। তার মতে, বিশ্বচরাচরের সব কিছুই নিয়ামক হচ্ছে সার্বিক, সার ও নিত্যকালের লগোস। হিরাক্লিটাসের লগোসকে হেগেল সার্বিক প্রজ্ঞা বলে ব্যাখ্যা করেছেন। গ্রিক স্টোয়িক বা অবিচলবাদীগণ লগোসকে বস্তু এবং ভাবজগতের মৌলিক বিধান বলে মনে করতেন। প্রাচ্যদর্শনে ব্যবহৃত ‘তাপ’ এবং ‘ধর্ম’ অর্থগতভাবে গ্রিক লগোস এর অনুরূপ।

Lokayata : লোকায়ত

প্রাচীন ভারতের বস্তুবাদী দর্শনকে লোকায়ত দর্শন বলে অভিহিত করা হয়। লোকায়ত মতের আদি উল্লেখ পাওয়া যায় বৌদ্ধ ধর্মযাজকীয় গ্রন্থে, বেদ এবং সংস্কৃতীয় মহাকাব্যে। প্রাচীন উপাখ্যানে মুনি বৃহস্পতিকে লোকায়ত মতের প্রতিষ্ঠাতা বলে উল্লেখ করা হয়। বেদের বিরুদ্ধে নাস্তিকতাবাদী যে-সমস্ত উক্তির সাক্ষ্য পাওয়া যায়,ল সে সমস্ত উক্তি চার্বাকের বলে মনে করা হয়। এজন্য ভারতীয় বস্তুবাদ চার্বাকবাদ বলেও চিহ্নিত হয়ে আসছে। লোকায়ত দর্শনের মূল হচ্ছে সত্তার স্বরূপ সম্পর্কে অভিমত। লোকায়ত মতে বিশ্বের মূলে আছে ক্ষিতি, অপ, তেজ এবং ব্যোম অর্থাৎ মাটি, পানি, আগুন এবং আকাশ এই চারটি অস্তিত্ব। প্রত্যেক অস্তিত্ব একপ্রকার অণুর সম্মেলনে গঠিত। অণুর চরিত্র এই যে, অণু নিজে অপরিবর্তনীয় এবং অক্ষয়। সময়ের আদি থেকেই অণু অস্তিত্বমান। বস্তুর প্রকার বা চরিত্র নির্দিষ্ট হয় তার গঠনের মৌলিক অণুর প্রকার এবং তাদের সম্মেলনের অনুপাত দ্বারা। একটি সপ্রাণ অস্তিত্বের মৃত্যুর পরে তার সাংগঠনিক অণু বিশ্লিষ্ট হয়ে অপ্রাণ বস্তুজগতে তার সদৃশ্য অণুর সঙ্গে গিয়ে সম্মিলিত হয়। লোকায়তের কোনো কোনো পাঠে ক্রমবিকাশতত্ত্বেরও সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কেননা লোকায়তবাদীগণ বস্তুকে মূল ধরে তা থেকে অপর বিশেষ বস্তু বা প্রাণের বিকাশের কথা অনুমান করেছেন। জ্ঞানের প্রশ্নে লোকায়তবাদীগণকে ইন্দ্রিয়বাদী বলা যায়। তাদের কাছে যথার্থ জ্ঞানের একমাত্র উৎস হচ্ছে ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা। ইন্দ্রিয়সদৃশ বস্তুর জ্ঞান লাভ করতে পারে। লোকায়ত মতে অনুমানসিদ্ধ জ্ঞানের কোনো স্বীকৃতি নেই। অনুমান জ্ঞানের অনির্ভরযোগ্য এবং ভ্রান্তিকর উপায়। বেদের বিধানও যথার্থ নয়। কেননা, বেদের বিধান কারো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসঞ্জাত নয়। বেদের বিধান পরোক্ষ এবং অনুমানমূলকমাত্র। লোকায়ত দর্শন ঈশ্বর কিংবা আত্মার অস্তিত্ব এবং পুনর্জন্ম-কাউকে স্বীকার করে না। জীবনযাপনের নীতিতে লোকায়তবাসীগণ ‘সুখবাদে’ বিশ্বাসী ছিলেন। লোকায়তবাদীগণের নিজস্ব রচনার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। বস্তুত ভারতীয় দর্শনের প্রধান ও পরাক্রমশালী ভাববাদী ধারা লোকায়ত দর্শনকে তীব্র সমালোচনার মাধ্যমে জনমন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টা কেবল প্রতিযুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে নি। কায়েমী স্বার্থের অনুকূলে ভাববাদী দার্শনিকগণ লোকায়তবাদীদের দৈহিকভাবেও নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে। ফলে তাদের সমালোচনার মধ্যে মাত্র লোকায়ত দর্শনের আভাস পাওয়া যায়। এতে লোকায়তবাদীদের নিজস্ব ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলেও প্রতিযুগে প্রতিষ্ঠিত ধারার বিরুদ্ধে লোকপ্রিয় এবং বস্তুবাদী একটি চিন্তাধারা যে ভারতের বুকে সংগ্রামরত ছিল, আমরা তা অনুমান করতে পারি।

Lucretius : লুক্রেশিয়াস(৯৯-৫৫ খ্রি.পূ)

লুক্রেশিয়াস প্রাচীন রোমের কবি এবং বস্তুবাদী দার্শনিক ছিলেন। ‘ডা রিরাম ন্যাচার’ বা ‘প্রকৃতি জগত’ তাঁর সুবিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। লুক্রেশিয়াস গ্রিক দার্শনিক এ্পিক্যুরাসের উত্তরসূরি। এপিক্যুরাসের দর্শনকেই তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ব্যক্তির জীবনে সুখের সমস্যা হলো মূল সমস্যা। সামাজিক সংঘাত এবং ধ্বংসের মধ্যে ব্যক্তি নিয়ত আবর্তিত। ধৈর্য্যের মধ্যে বিধিনিষেধের বন্ধনে সে আবদ্ধ। বিন্দুমাত্র বিচ্যূতি হলে দেবতাদের অভিশাপ তার উপর বর্ষিত হচ্ছে। মৃত্যুর আতঙ্ক আর মৃত্যুর পরে নরকের আজাবের আশঙ্কা জীবনের প্রতি মুহুর্তকে আবিল করে দেয়। এই ব্যক্তির সুখের পথ কি? লুক্রেশিয়াস ব্যক্তির জন্য সুখের পথের সন্ধান দানকে নিজের জীবনের ব্রত হিসাবে মনে করছেন। তাঁর মতে জগৎ, মানুষ এবং সমাজ সম্পর্কে এপিক্যুরাসের অভিমত হচ্ছে সঠিক অভিমত। এপিক্যুরাসের দর্শন অনুসরণ করলে মাত্র ব্যক্তি জীবনের এই দুঃখের জাল থেকে মুক্তির সন্ধান লাভ করতে পারবে। লুক্রেশিয়াসের মতে মৃত্যুর পরে দুঃখ বা দন্ডের আশঙ্কা ব্যক্তির পক্ষে অমূলক। কারণ আত্মা দেহের মতই মরণশীল। আত্মাও অণুর সম্মেলনে গঠিত। দেহের মৃত্যুর পরে আত্মার অণুগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মারও মৃত্যু ঘটায়। কাজেই মৃত্যুর পরে নরকের দুশ্চিন্তায় জীবনকে দুর্বিষহ করার কোনো কারণ নেই। লুক্রেশিয়াস মানুষকে লক্ষ্য করে সুন্দর করে বলেছেনঃ জীবন এবং মৃত্যু পরস্পরবিরোধী। যেখানে জীবন আছে সেখানে মৃত্যু নেই। মানুষ যখন জীবিত তখন সে মৃত নয়। আবার যখন সে মৃত তখনও তার জীবন নেই। কাজেই মৃত্যুর পরে জীবনের আশঙ্কার কোনো ভিত্তি থাকতে পারে না। দেবতাদের বাস মানুষের মধ্যে নয়। তারা শূণ্যরাজ্যের প্রাণী। তাদের পক্ষে পৃথিবীতে এসে মানুষকে দন্ডদান সম্ভব নয়। জগৎ সম্পর্কে লুক্রেশিয়াসের দর্শন তাই পুরোপুরে বস্তুবাদী। তৎকালীন রোমের সমাজ জীবনকে কুসংস্কার মুক্ত করে বুদ্ধি ও যুক্তির প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় লুক্রেশিয়াসের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মানুষের সুখের অন্বেষণে নিবেদিত কবি লুক্রেশিয়াস আত্মহত্যা করেছিলেন।

Luddites : লুডবাদী, লুডবাদ

ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের ফলে একদিকে পুরনো হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শহরে শহরে যন্ত্রভিত্তিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অপরদিকে নতুনতর যন্ত্রপাতির নিয়োগ, অবাধ প্রতিযোগিতা, অতি উৎপাদন, মন্দা, ছাঁটাই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুষঙ্গী এ সকল কারণে কর্মহীন বেকার মানুষও সৃষ্টি হতে থাকে। সচেতন, রাজনৈতিক তত্ত্বসমৃদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার পূর্বে এইসব বেকার এবং কর্মচ্যূত মানুষের মধ্যে এরূপ মনোভাবের উদয় হতো যে তাদের এই দুরবস্থার জন্য যন্ত্র এবং কারখানাই দোষী। অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে ক্যাপ্টেন লুডের নেতৃত্বে একদল শ্রমিক এরূপ চিন্তা থেকে কারখানার যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করে। ভুল চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হলেও এ আন্দোলন নির্যাতিত শ্রমিকদের অসহায় ক্ষোভের প্রকাশস্বরূপ ছিল; ধনবাদী সমাজের রাষ্ট্রব্যবস্থা অসহায় শ্রমিকদের এরূপ আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। লুডের নেতৃত্ব থেকে ‘লুডাইড’ কথাটি প্রচলিত হয়।

Luther, Martin : মারটিন লুথার(১৪৮৩-১৫৪৬ খ্রি.)

মারটিন লুথার ছিলেন পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ইউরোপের সমাজ ও খ্রিষ্টধর্মের সংস্কারবাদী আন্দোলনের নেতা এবং খ্রিস্টধর্মের প্রটেস্ট্যাট সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। লুথার ধর্মগ্রন্থ বাইবেলকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। জার্মান ভাষার গঠনে লুথারের এই অনুবাদ কর্মের অবদান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র্রীয় ক্ষমতার ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে জাযক শ্রেণীর যে বিরোধ চলে আসছিল লুথার তাতে প্রগতিশীল ভূমিকা গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মজাযকদের হস্তক্ষেপ এর অধিকারকে হ্রাস করতে সাহায্য করেন। মানুষ এবং ঈশ্বরের মধ্যে কেবল গীর্জা এবং খ্রিষ্টধর্মই একমাত্র সংযোগসূত্র এবং যাজকরাই মাত্র মানুষের স্বর্গে গমনের ছাড়পত্র মঞ্জুর করতে পারেন, একথা লুথার বিশ্বাস করতেন না। লুথার বলতেন মানুষের মুক্তি ধর্মীয় আচরণের মধ্যে নিহিত নয়। মানুষের মুক্তি বিশ্বাসের ঐকান্তিকতায়। পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার গোড়ার দিকে সামন্ততন্ত্র এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির সঙ্গে পুঁজিবাদের যে বিরোধ চলছিল, তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় লুথারের ধর্মীয় ধারণা ও আন্দোলনে। এ বিরোধে লুথার অগ্রসর চিন্তার পরিচয় দেন এবং গোঁড়ামির বিরোধিতা করেন। তবে লুথারের সামাজিক সংস্কার আন্দোলন এবং চিন্তাধারা দূর্বলতামুক্ত ছিল না। সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি আপোসের মনোভাব দেখিয়েছেন। উঠতি শহরগুলির সংস্কার আন্দোলনে তিনি শহরবাসীর স্বার্থের বিরোধিতা করেন। রাষ্ট্রীয় বিধানের মূল কি? রাষ্ট্র না মানুষের প্রকৃতি? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যথেচ্ছাচার রোধ করার জন্য আইনকে রাষ্ট্রযন্ত্রের উর্ধে্ব স্থাপনের যে প্রয়োজনীয় আন্দোলন তখন জার্মানিতে চলছিল তাতে লুথার রক্ষণশীল মত অনুসরণ করেন। ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে যে বিরাট কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তাতেও মার্টিন লুথার শাসক শ্রেণীর পক্ষ অবলম্বন করেন।

Lyceum : লাইস্যুম 

লাইস্যুম প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স নগররাষ্ট্রের একটি বাগানের নাম। এখানে ৩৩৫ খ্রি. পূর্বাব্দে এরিস্টটল তাঁর দর্শন প্রচারের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে দর্শনের ইতিহাসে লাইস্যূমকে এ্যরিস্টটলের দর্শনাগার বা একাডেমী বলেও উল্লেখ করা হয়। লাইস্যূমের স্থায়ীত্বকাল প্রায় ৮০০ বছর। এ্যরিস্টটলের মৃত্যুর পর তাঁর শিশ্যগণ লাইস্যূম পরিচালনা করেন। এঁদের মধ্যে থিওফ্রাস্টাস, ইউডেমাস, ডাইকারকাস এবং স্ট্রাটোর নাম উল্লেখযোগ্য। তবে এ্যরিস্টটলের পরে লাইস্যূম তার সৃজনশীল ও বিশ্লেষণী চরিত্র হারিয়ে কেবলমাত্র এ্যরিস্টটলের তত্ত্বের ব্যাখ্যাগারে পরিণত হয়। দাসের শোষণের উপর প্রতিষ্ঠিত গ্রিকসমাজের পতনের সঙ্গে লাইস্যূমের বিলোপ ঘটে।

Machiavelli : ম্যাকিয়াভেলী (১৪৬৯-১৫২৭ খ্রি.)

ম্যাকিয়াভেলী ছিলেন পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ইতালির জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক ও চিন্তাবিদ। মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে ইউরোপে ধনতন্ত্রের বিকাশের ভিত্তিতে ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হলেও ইতালি তখনও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য ও স্বাধীন নগরে বিভক্ত। ইতালির জাতীয় ও সামাজিক স্বার্থ ইতালিতে ঐক্যবদ্ধ সুশাসিত রাষ্ট্রের গঠন অত্যাবশ্যক করে তুললেও একদিকে রোমের পোপের আপন ক্ষমতা বজায় রাখার ইচ্ছা, অপরদিকে ইতালির রাজ্যসমূহের পারস্পরিক ঈর্ষা ও দ্বন্ধ এবং ইউরোপের বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহের হস্তক্ষেপে ইতালির ঐক্য বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। ইতালির এরূপ পটভূমিতে ম্যাকিয়াভেলীর রাজনৈতিক জীবন এবং তাঁর রাষ্ট্রীয় দর্শন রূপলাভ করে। ম্যাকিয়াভেলী ১৪৮৮ থেকে ১৫১২ সাল পর্য্যন্ত ইতালির রাজ্যগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এ প্রচেষ্টা বাধাহীন ছিল না। সামন্ততান্ত্রিক শক্তি, যাজকতন্ত্র এবং বৃহৎ রাষ্ট্রশক্তি ম্যাকিয়াভেলীর ঐক্যপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে। এই সমস্ত শক্তির স্বার্থে ১৫১২ সালে ফ্লোরেন্স সরকার ম্যাকিয়াভেলীকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে নির্বাসিত করে। এই ঘটনার পরবর্তীকালে ম্যাকিয়াভেলী সক্রিয় রাজনীতিক জীবন হতে অবসর গ্রহণ করে রাজনীতিক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর রচনার মধ্যে ‘ডিসকোর্স’ বা আলোচনা এবং ‘প্রিন্স’ বা রাষ্ট্রনায়ক বিখ্যাত। ‘প্রিন্স’ ম্যাকিয়াভেলীর মৃত্যুর পাঁচ বৎসর পরে প্রকাশিত হয়।

ম্যাকিয়াভেলী ছিলেন উদীয়মান ধনতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূ। ইতালির সামাজিক ও জাতীয় বিকাশের জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তিনি আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আর এই ঐক্য সাধনের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার যে বাস্তবনীতি তিনি ব্যাখ্যা করেন ‘ম্যাকিয়াভেলীর নীতি’ বলে তা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ‘ম্যাকিয়াভেলীর নীতি’ বলতে রাষ্ট্রের স্বার্থ সাধনের জন্য বিশেষ কোনো নৈতিকতায় আবদ্ধ না থেকে যা কিছু প্রয়োজন তাই সম্পন্ন করা বুঝায়। ম্যাকিয়াভেলী রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনা উভয়কে ধর্ম এবং নীতির বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র মানুষেরেই সৃষ্টি, কোনো ঐশ্বরিক সত্তা নয়। এবং এর পরিচালনা মানুষের কল্যাণের জন্য। এক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা নীতির বন্ধন রাষ্ট্রের জন্য অলঙ্ঘনীয় নয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তার শাসন ব্যবস্থার চরিত্র যে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, এ সত্য ম্যাকিয়াভেলী উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি রাজতন্ত্রকে সর্বাধিক কাম্য শাসনব্যবস্থা বলেছিলেন। এর প্রধান কারণ, ইতালির অনৈক্য ও অরাজকতার অবস্থায় একচ্ছত্র রাজশক্তিকে তিনি প্রয়োজনীয় বোধ করেছিলেন। ইতালিকে শুধু ঐক্যবদ্ধ নয়, তাকে সম্প্রসারিত হতে হবে, বৃহৎ হতে হবে। কারণ ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ও বিকাশ ও বৃদ্ধিতেই অস্তিত্ব। রাষ্ট্রকে ক্রমান্বয়ে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হতে হবে। অপররাজ্য গ্রাস করে হলেও তার সীমানাকে সম্প্রসারিত করতে হবে। এই বৃদ্ধিই রাষ্ট্রের জীবন। এই বৃদ্ধি যেখানে স্তব্ধ রাষ্ট্র সেখানে জড় এবং মৃতবৎ। রাষ্ট্রের বিরাট এলাকার উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বজায় রাখার জন্য ম্যাকিয়াভেলী কূটকৌশল এবং শক্তিপ্রয়োগের উপর জোর দেন। ম্যাকিয়াভেলীর মতে রাষ্ট্রে উত্তম শাসক সে যে শাসিত অর্থাৎ জনসাধারণের মধ্যে ভয় ও সমীহের ভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম। শাসক দয়ালু এবং দুর্বল হলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা এবং বিদ্রোহের উদ্ভব ঘটে। কাজেই শাসকের পক্ষে প্রশংসিত বা প্রিয় হওয়ার চেয়ে শ্রেয় হচ্ছে ভয়ের পাত্র হওয়া। ম্যাকিয়াভেলীর এরূপ বক্তব্যে তাঁর সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ব্যাখ্যার স্থানে ম্যাকিয়াভেলী রাষ্ট্রীয় সমস্যার বিচারে বাস্তব এবং ঐতিহাসিক পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তাঁর রাজনীতিক সিদ্ধান্তসমূহ একদিকে যেমন তৎকালীন ইতালির ঐক্যসাধন এবং সামাজিক বিকাশে অগ্রসর শক্তির কাজ করেছে, তেমনি তাঁর নীতিহীনতা পরবর্তীকালে ইউরোপের ধনবাদী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী এবং ফ্যাসিবাদী আগ্রাসী মনোভাব সৃষ্টিরও সহায়ক হয়েছে। ম্যাকিয়াভেলীর বিশেষ অবদান এই যে, এ পর্য্যন্ত রাষ্ট্রকে যেখানে অতিজাগতিক এবং ঐশ্বরিক সত্তা হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে সেখানে ম্যাকিয়াভেলী রাষ্ট্র যে মানুষের সৃষ্টি এবং মানুষের প্রয়োজনে তার ব্যবহার ও বিকাশ, এ সত্যকে তিনি মধ্যযুগের পটভূমিতে অগ্রগামীর সাহস নিয়ে প্রকাশ করেছেন।

ম্যাকিয়াভেলীর জীবনকালে ইতালি রোম, ফ্লোরেন্স, মিলান, ভেনিস এবং নেপলস এরূপ পাঁচটি নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এই রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ম্যাকিয়াভেলীর নিজ রাষ্ট্র ফ্লোরেন্স অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে ছিল সবচেয়ে অগ্রগামী, ইউরোপীয় নবজাগরণের অন্যতম কেন্দ্র। 

About সরদার ফজলুল করিম