দর্শন কোষ

Slave Owing System : দাস ব্যবস্থা

দাস ব্যবস্থা-অর্থাৎ যে ব্যবস্থায় অধিক সংখ্যক মানুষ দাস এবং অল্পসংখ্যক মানুষ দাসের মালিক বা প্রভু। দাস ব্যবস্থা মানুষের সমাজের ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। আদিম সাম্যবাদী সমাজ ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দাস ব্যবস্থার উদ্ভব হয়। পৃথিবীর সব দেশেই এক যুগে দাস ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল। দাস ব্যবস্থার চরম বিকাশ দেখা যায় প্রাচীন গ্রিস এবং রোমান সাম্রাজ্যে। গ্রিস এবং রোমে দাসরাই ছিল প্রধান উৎপাদনী শক্তি। দাসের প্রভুরা ছিল শাসক শ্রেণী। শাসক শ্রেণীর মধ্যে দাসের মালিক ব্যতীত জমির মালিক, তখনকার যন্ত্রাদি তৈরির কারখানার মালিক, অর্থ=ঋণদাতা সুদ গ্রহণকারী মহাজন এবং বাণিজ্যের সওদাগরও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দুই প্রধান শ্রেণীর মধ্যবর্তী স্তরে ছিল কৃষক, হস্তশিল্পী, ভবঘুরে সর্বহারা এবং দুঃস্থ কারিগর। উৎপাদনের উপায় এবং উৎপাদনী দাসদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল দাস ব্যবস্থার উৎপাদনী শক্তির মূল ভিত্তি। মালিকশ্রেণী দাসদের পশুবৎ বিবেচনা করত। প্রভু শ্রেণীর দার্শনিক এ্যারিস্টটল দাস প্রথাকে রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য বলে যুক্তি প্রদর্শন করেছিলেন। তাঁর মতে দাস হচ্ছে প্রভুর সজীব যন্ত্র। অজীব যন্ত্রের সঙ্গে দাসের পার্থক্য এখানে যে, অজীব যন্ত্র প্রভুর আদেশ বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে না; কিন্তু সজীব দাস প্রভুর আদেশ এবং ইচ্ছা ইশারামাত্র বুঝতে পারে এবং তা কার্যকর করতে পারে। কিন্তু দাস কখনো শাসক হতে পারে না। দাসের কর্তব্য হচ্ছে প্রভুর জন্য শ্রম করা। এবং প্রভুর কাজ হচ্ছে দাসের শ্রমের ফলে জীবিকার চিন্তামুক্ত যে অবকাশ সে লাভ করেছে সে অবকাশকে শাসনকার্যে ব্যয়িত করা। দাসকে পশুর ন্যায় খাটাবার ফলে দাসদের উৎপাদনে আগ্রহ ও শক্তি ক্রমাণ্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। তবুও দাসের সংখ্যা প্রচুর হওয়াতে দাসের পরিশ্রমের ভিত্তিতে গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলিতে এবং রোমে দর্শন, প্রাচীন বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য প্রভৃতি শাখায় সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। দাস এবং প্রভুতে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত হওয়ার পর্যায়ে রাষ্ট্রযন্ত্রেরও উদ্ভব ঘটে। শোষিত দাস সর্বদা যে নীরবে নিজেদের ভাগ্য মেনে নিয়েছিল একথা সত্যি নয়। বরঞ্চ দাস সমাজের সমগ্র ইতিহাসই শ্রেণীসংগ্রমের ইতিহাস। গ্রিসে এবং রোমে বিভিন্ন সময়ে দাসদের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। রোমের দাস স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে খ্রি.পূ. ৭৩ সালে যে বিদ্রোহ ঘটে তা ব্যাপকতায় এবং দাসদের বীরত্বে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। দাসদের বিদ্রোহের সঙ্গে কৃষকদের সহানুভূতি এবং সাহায্যও যুক্ত থাকতো। দাসের শোষনের ভিত্তিতে সভ্যতার বিকাশ যখন আর সম্ভব হচ্ছিল না তখন দাস ব্যবস্থায় ভাঙ্গন শুরু হয় এবং কৃষিকাজের য্ন্ত্রপাতির উন্নতি দাস ব্যবস্থাকে সমাজে অগ্রগতির প্রতিবন্ধক শক্তিতে পরিণত করে। পরিণামে দাস ব্যবস্থার স্থানে সামন্ততান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা হয়। তবে দাস ব্যবস্থার বিলোপ দাস সমাজ ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটে নি। সামন্তবাদী সমাজে দাসব্যবস্থার রেশ দীর্ঘকাল যাবৎ টিকে ছিল। এখনো যে সমস্ত দেশে সামন্তবাদী অর্থনীতি টিকে আছে সেখানে দাসব্যবস্থার পরিচয়মূলক প্রথার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।

Social Contract, Theory of : সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব

রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বিধিবিধানের উৎপত্তি সম্পর্কিত একটি তত্ত্বের নাম হচ্ছে সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব। সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকে বিকাশমান পুঁজিপতি শ্রেণী যখন রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস করে শাসন ক্ষমতায় নিজেদের অধিকার কায়েম করার চেষ্টা করে হবস, গ্যাসেন্দী, স্পিনাজো, লক এবং রুশোর রচনাবলীতে এই তত্ত্বের বিশেষ আলোচনা দেখা যায়। রাজতন্ত্র এবং সামন্তবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সে যুগের অগ্রসর বুর্জোয়া শ্রেণী সামাজিক চুক্তির তত্ত্বকে একটি আদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের প্রবক্তাগণ রাষ্ট্রের উদ্ভবের প্রশ্নে রাষ্ট্রের উদ্ভবপূর্ণ অবস্থার দুটি চিত্র অঙ্কন করেন। কউ মনে করেন যে, রাষ্ট্রের উদ্ভবের প্রশ্নে মানুষ পরস্পর আত্মঘাতী দ্বন্ধে লিপ্ত ছিল। এই দ্বন্ধের ফলে মানুষ বুঝতে পারে যে এই দ্বন্ধ বন্ধ না করলে সমাজের কোনো ব্যক্তির পক্ষেই বেঁচে থাকা এবং কোনো অধিকার ভোগ করা সম্ভব হবে না। এই উপলব্ধি থেকে মানুষ চুক্তিবদ্ধ হয়ে শাসক এবং রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করে। সামাজিক চুক্তির এই তত্ত্ব বুর্জোয়া বিকাশের যুগের তত্ত্ব হলেও এর আভাস প্রাচীনকালের গ্রীসের সফিস্টদের বক্তব্য এবং চীনের প্রাচীন দার্শনিক মোজুর দর্শনের মধ্যে পাওয়া যায়।

Socialism : সমাজতন্ত্র

কলকারখানা এবং জমি হচ্ছে রাষ্ট্রের উৎপাদনের উপায়। উৎপাদনের উপায়ের সমষ্টিগত মালিকানার ভিত্তিতে যে আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে সমাজতন্ত্র বলে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সর্বহারার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মাত্র সমাজতন্ত্র কায়েম হতে পারে। সমাজতান্ত্রিক মালিকানা দুটি রূপ গ্রহণ করতে পারেঃ রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং সমবায়মূলক ও যৌথ মালিকানা। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শ্রেণীশোষনের অবস্থান থাকতে পারে না, জাতিগত বৈষম্য ও শোষণের অবসান ঘটে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে জাতিগত বৈষমে্যর মূল কারণ হচ্ছে উন্নত জাতির মালিকশ্রেণী অনুন্নত জাতিকে নিজেদের পণ্যের বাজার হিসেবে দেখে এবং তাদের উন্নতিতে নিজেদের স্বার্থ বিপন্ন বলে বোধ করে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে শুধু শ্রেণীতে শ্রেণীতে নয়, শহরের সঙ্গে গ্রামের এবং মানসিক শ্রমের সঙ্গে দৈহিক শ্রমের সৃষ্টি বিরোধ বৃদ্ধি পেতে থাকে, শহর গ্রামকে জীবনের অশিক্ষিত পশ্চাদপদ অংশ বলে বিবেচনা করে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি শহর ও গ্রামকে পরস্পরের পরিপূরক আর্থিক ও সামাজিক অঞ্চল হিসেবে উন্নত করে তোলে। সমাজতন্ত্রে সৌভ্রাতৃত্বমূলক দুটি প্রধান শ্রেণীর অস্তিত্ত্ব থাকে-কারখানার শ্রমিক শ্রেণী, যৌথ খামারের কৃষক শ্রেণী। গোড়ার দিকে বুদ্ধিজীবি বলে পুঁজিবাদের অবশেষ হিসেবে একটি শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির সর্বজনীনতার মাধ্যমে বুদ্ধিজীবিরা আর পৃথক শ্রেণী বলে বিবেচিত হতে পারে না। যে শ্রমিক সেই বুদ্ধিজীবি; যে কৃষক সেও তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির মানে বুদ্ধিজীবি। নাগরিকদের কার্যগত পার্থক্য থাকতে পারে; কেউ অফিসে, কেউ আদলতে, কেউ কারখানায় , কেউবা খামারে কর্মরত। সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় প্রতিদ্বন্ধী শ্রেণীকে পর্যুদস্তু করতে সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের আবশ্যক। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রেরে প্রাথমিক সীমাবদ্ধতা এই যে, পুঁজিবাদী উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধী সকল শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যায় না। প্রতিরোধী শক্তির অবশেষের জন্য সমাজতন্ত্র কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকার করে না। জাতি বা বর্ণভেদেও কোনো বৈষম্য সমাজতন্ত্র স্বীকার করে না। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য সাম্যবাদের পৌছানো। সাম্যবাদের মূল নীতি : যার যেমন ক্ষমতা, সে তেমনভাবে শ্রম করবে এবং তার যেমন প্রয়োজন, তেমনভাবে তার প্রয়োজনের পূরণ হবে। সোভিয়েত রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে চরম রক্তক্ষয়ী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি ছিল সমাজতান্ত্রিক। বর্তমানে পৃথিবীর আরো অনেক দেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

Socialism, Downfall of ? : সমাজতন্ত্রের পতন

১৯১৭ সালে বলশেভিক পার্টি রাশিয়ায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার গঠন করে। গোড়ার দিকে ভি.আই. লেনিন এই সরকারের নেতৃত্ব দেন। ভি.আই. লেনিনের অকাল মৃত্যুর পরে (ভি.আই. লেনিন ১৮৭০-১৯২৪) জে.ভি. স্টালিন কমউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর পর্যন্ত সরকার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। স্ট্যালিনের মৃত্যুর পরে স্টালিন সম্পর্কে রাশিয়া  ও কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে নানা সমালোচনার উদ্ভব হতে থাকে। ১৯৫৬ সালে এই সমালোচনা কমি উনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নিকিতা ক্রুশ্চেভের বিখ্যাত বক্তৃতার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ বিরোধের পরিণতিতে রাশিয়ার আভ্যন্তরীণ কমিউনিস্ট বিরোধী শক্তি পার্টি এবং সরকারের ক্ষমতা দখল করে। ১৯৮৫ সালে গরভাচেভ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। এ ঘটনাকে সমাজতন্ত্রের পতন বলে আখ্যায়িত করা হয়।

Socrates : সক্রেটিস (৪৬৯-৩৯৯ খ্রি.পূ.)

সক্রেটিস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক। তিনি ছিলেন এথেন্স নগর রাষ্ট্রের নাগরিক। তিনি নিজে কিছু রচনা করেন নি। তাঁর দর্শন এবং জীবনকাহিনী জানা যায় তাঁর বিখ্যাত শিষ্য প্লেটোর রচনাবলী থেকে। প্লেটো সংলাপের আকারে তাঁর সমস্ত দার্শনিক পুস্তক রচনা করেন। প্লেটোর সকল গ্রন্থেরই নায়ক হচ্ছেন সক্রেটিস। সক্রেটিস পথে ঘাটে বাজারে সর্বদা তত্ত্বকথার আলোচনা করতেন। প্রচলিত বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা কোনো কিছুকেই তিনি বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করতেন না। তিনি ছিলেন জ্ঞানের অন্বেষক। তাঁর জনপ্রিয়তা এবং প্রচলিত ধর্ম এবং নীতি সম্পর্কে তরুণদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করার প্রবণতায় আতঙ্কিত হয়ে এথেন্স সরকার তাঁকে তরুণদের বিপথগামী করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। সক্রেটিস ক্ষমা প্রার্থনা করে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ সম্পর্কে আর প্রশ্ন তুলবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে; অন্যথায় তাঁকে হেমলক পান করে মৃত্যুবরণ করতে হবে-এথেন্স নগরের আদালত এই দন্ড ঘোষণা করে। তাঁর শিষ্যগণ তাঁকে গোপনে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও সক্রেটিস ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা গোপনে পলায়ন করে জীবনরক্ষা কোনোটিকেই গ্রহণ করলেন না, হেমলক পান করে অকম্পিত চিত্তে মৃত্যুকে বরণ করেন। তাঁর জীবনের এই উপাখ্যান প্লেটোর গ্রন্থসমূহ থেকে পাওয়া যায়। তাঁর জীবনত্যাগের এই কাহিনী তাঁকে পৃথিবীর ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। সক্রেটিসকে লোকে অনেক জ্ঞানী বলতেন। এই খ্যাতির বিশ্লেষণে তিনি পরিহাস করে বলেছিলনঃ আমাকে কেন লোকে জ্ঞানী বলে, আমি কতটুকু জানি, এই প্রশ্নের রহস্যভেদ করার জন্য আমি কতমানুষকে প্রশ্ন করেছি। যাকে প্রশ্ন করেছি, সেই –ই অক্লেশে সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। দিনের পরিভ্রমণ শেষে আমি ক্লান্ত দেহে সিদ্ধান্ত নিয়েছি : এতসব ‘জ্ঞানীর’ মাঝে আমার যদি কিছু পার্থক্য থাকে তবে সে এই যে, আমি জানি যে আমি কিছু জানি না; কিন্তু এরা জানে না যে এরা কিছু জানে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বুঝা যায় – তিনি মানুষের জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ মনে করতেন। বিশ্বের মূল সত্তা সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে না। মানুষ কেবল সেই সত্তার সৃষ্ট ভাবকেই জানতে পারে। ভাব মানুষের মনের ব্যাপার। সক্রেটিসের পূর্বে গ্রিসের দর্শন ছিল প্রধানত বস্তুবাদী এবং প্রকৃতিবাদী। সক্রেটিস এবং প্লেটোর দর্শন মূলত ভাববাদী। সক্রেটিস এবং প্লেটোর কাছে ভাবই হচ্ছে সত্য। মানুষ ভাবের সঙ্গে পরিচিত হয়। মানুষের মনের ভাব চরম ভাবের প্রকাশ।

Stalin, J.V. : জে.ভি. স্টালিন (১৮৭৯১৯৫৩ খ্রি.)

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপ্লবের নেতা হিসেবে লেনিনের পরেই স্টালিনের নাম কমিউনিস্ট মতবাদের সমর্থকগণ দীর্ঘদিন যাবত উল্লেখ করেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর প্রথমে স্ট্যালিনবাদের সমালোচনা শুরু হয় এবং স্টালিন জনমনের অতিভক্তির বেদি থেকে একজন একনায়কতন্ত্রী নির্মম শাসক হিসেবে চিত্রিত হন। স্টালিন ১৮৭৯ সালে জর্জিয়ার একটি শ্রমজীবি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৯ সালে তিনি শিক্ষায়তন হতে বহিষ্কৃত হন বিশৃঙ্খলার অপরাধে। জার সরকার তাঁকে দুইবার সাইবেরিয়াতে নির্বাসনে পাঠায়। দুবারই সাইবেরিয়া হতে পলায়ন করে স্টালিন গোপন মার্কসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯১২ সালে স্টালিন জাতি সমস্যার আলোচনা করে ‘মার্কসবাদ ও জাতি সমস্যা’ নামক তাঁর রাজনীতিক নিবন্ধ আলোচনা করেন। ১৯১৭ সালে তিনি সাম্যবাদী দলে মুখপাত্র ‘প্রাভদা’র সম্পাদক নিযুক্ত হন। বিপ্লবের পরে লেনিনের প্রথম সোভিয়েত সরকারে স্ট্যালিনকে জাতিসমূহের কমিশনার বা মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। ১৯২৪ সাসালে লেনিনের মৃত্যুর পর তিনি বলশেভিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতার বলয় তার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। ১৯৪১ সালে এডলফ হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে স্ট্যালিন যুদ্ধ পরিচালনার সমগ্র দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রাথমিক বিপর্যয় সামলে স্টালিন প্রতিআক্রমণে অগ্রসর হন। এই সময় সমগ্র বিশ্বে সোভিয়েত জনগণের প্রতিরোধ বিরাট বিস্ময়ের সৃষ্টি করে এবং সোভিয়েত এর সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্টালিনের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা শত্রু মিত্র সকলের স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু যুদ্ধে বিজয়ের পরেও স্টালিন দেশব্যাপী জরুরী অবস্থা বজায় রেখে প্রাকযুদ্ধকালীন অবস্থা অব্যাহত রাখেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসে (১৯৫৬) তৎকালীন সম্পাদক ক্রুশ্চেভ স্ট্যালিন চরিত্র সম্পর্কে এতাবৎকালের বিমুগ্ধতার ধুলস্যাৎ করে দেন।

Subconscious : অবচেতন

মনোবিজ্ঞানীগণ, বিশেষ করে ফ্রয়েড ও তাঁর অনুসারীগণ মনের চেতনাকে চেতন, অবচেতন ও অচেতন এই তিনভাগে বিভক্ত করেন। যখন আমরা মানসিকভাবে কিংবা ইন্দ্রিয় দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়কে অবলোকন করি তখন সেই নির্দিষ্ট বস্তুতে আমাদের চেতনা সীমাবদ্ধ থাকবে। এজন্য চেতনার পরিধি বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ। কিন্তু চেতনার যে পরিবেশ অর্থাৎ চেতনার মুহুর্ত এবং চেতনার বিষয়টিকে ঘিরে অপর যে সকল বস্তু এবং স্মৃতি অবস্থান করে সেগুলিকে বলা হয় অবচেতন। অবচেতনের বৈশিষ্ট্য এই যে, অবচেতন চেতনার বর্হিভাগে অবস্থান করলেও আমরা ইচ্ছা করলে তার যে কোনো একটিকে চেতনার কেন্দ্রেও নিয়ে আসতে পারি এবং আমাদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুর উপর অবচেতন প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব প্রয়োগ করে। মনের অবচেতন অংশে আমাদের অবদমিত ইচ্ছাগুলি আশ্রয় গ্রহণ করে। অচেতনকে আমরা ইচ্ছা করলেই চেতনার মধ্যে নিয়ে আসতে পারি নে। অচেতন আমাদের ব্যক্তিত্বকে পরোক্ষভাবে প্রভাবান্বিত করে।

Sufficient Reason, Principle of : উপযুক্ত যুক্তি বা প্রমাণের তত্ত্ব

উপযুক্ত প্রমাণের তত্ত্ব যুক্তিশাস্ত্রের একটি মৌলিক নীতি। এর মূল বক্তব্য হচ্ছে, আমরা কোনো বক্তব্যকেই উপযুক্ত প্রমাণ ব্যতীত সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারি নে। কোনো বক্তব্যের প্রমাণ বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে। বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষায় একটা বক্তব্য প্রমাণিত হতে পারে। আবার প্রতিপাদ্য বক্তব্যটিতে অপর কোনো প্রমাণিত বা জ্ঞাত সত্যের অন্তর্ভুক্ত করে এর সত্যতাকে প্রমাণ করা যায়। মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়-এই বক্তব্যটি বাস্তব ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রমাণিত হওয়ার পরে সত্য বলে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ‘রহীমের মৃত্যু হবে’ কিংবা ‘রহীম মরণশীল’ এমন বক্তব্য আমরা ‘সকল মানুষ মরণশীল’ এবং ‘রহীম একজন মানুষ’ অর্থাৎ রহীমকে জ্ঞাত সত্য, স্বীকৃত সত্য, ‘সকল মানুষ মরণশীল’ এর অন্তর্ভুক্ত করে ‘রহীমের একদিন মৃত্যু হবে’ বক্তব্যটিকে সত্য বলে গ্রহণ করি। এখানে ‘রহীম একজন মানুষ’ এ প্রমাণই ‘রহীমের একদিন মৃত্যু হবে’ এ বক্তব্যের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হচ্ছে। উপযুক্ত প্রমাণের তত্ত্বটি দার্শনিক লাইবিনিজ সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা সহকারে রচনা করেন। উপযুক্ত প্রমাণের বিধানটি যুক্তির অন্যান্য মৌলিক বিধান যথা ‘পরস্পর বিরোধি কথা সত্য হতে পারে না’ কিংবা ন্যায্যপন্থার বিধান-অর্থাৎ কোনো দুটি বিকল্প যদি পরস্পর বিরোধাত্বক ও সামগ্রিক হয়, তা হলে তাদের যে কোনো একটি সত্য না হয়ে পারে না-এ বিধানের ন্যায় ব্যাপক বিধান। এ কারণে এ বিধানের প্রয়োগের পরিধি ব্যাপক এবং প্রয়োগের ক্ষেত্র সার্বিক।

Sufism : সুফিতত্ত্ব

ইসলামের রহস্যবাদী ব্যাখ্যাকে সুফিতত্ত্ব বলা হয়। এবং এই তত্ত্ব প্রচারকারী সম্প্রদায়কে সুফি বলা হয়। সুফিতত্ত্বে উদ্ভব ঘটে অষ্টম শতকে। গোড়ার দিকে সুফিতমবাদে সর্বেশ্বরবাদের ছাপ দেখা যায়। অর্থাৎ পৃথিবীর সব কিছুই আল্লাহ, এরূপ অভিমত সুফিরা পোষণ করতেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক ধারা, বিশেষ করে নব প্লেটোবাদ, ভারতীয় দর্শন এবং খ্রিষ্টীয় ভাবধারার মিশ্রণে সুফিবাদ গভীর রহস্যবাদে পরিণত হয়। আল্লাহই সব সৃষ্টির মূলে। এখন আর সব কিছুই আল্লাহ নয়; সব কিছুতেই আল্লাহর প্রকাশ ঘটেছে এ ব্যাখ্যা মুখ্য হয়ে ‍উঠে। আর তাই ধ্যানের মাধ্যমে অভিভূত অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সাধনাই হওয়া উচিত মানুষের একমাত্র সাধনা। সুফিতত্ত্বের প্রবক্তাদের মধ্যে দ্বাদশ শতকের পারস্যের আল-সুহরাওয়ার্দী, আরব দেশের আল-গাজ্জালী (একাদশ শতক), মনসুর হাল্লাজ, ইবন আল আরবি, রূমী এবং জামির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুফি সাধকগণ চারটি স্তরের মধ্য দিয়ে সাধক লাভ করেন-শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারিফাত।

Syed Ahmad Khan : সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮ খ্রি.)

ঊনবিংশ শতকের ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম চিন্তাবিদ এবং আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানচর্চার ‍উদ্যোগী সংগঠক পুরুষ। ১৮৫৭ সালের ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তীতে সৈয়দ আহমদ খান ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করলেও তিনি মুসলিম সমাজের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান বিস্তারের উপর বিশেষ জোর প্রদান করেন। ধর্মের ব্যাখ্যাতেও তিনি উদারতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। উত্তর ভারতের মুসলমানদের মাতৃভাষা উর্দূতে জ্ঞান বিজ্ঞান এর জন্য তিনি একটি অনুবাদকেন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ‘পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচার ও আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গাজীপুর কলেজ এবং আলীগড়ে সাহিত্য ও বিজ্ঞান সমিতি স্থাপন করেন। কালক্রমে এই প্রতিষ্ঠান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।” পরবর্তীতে পাকিস্তান বা মুসলমান প্রধান অঞ্চল নিয়ে ভারতে স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরির আন্দোলনের আদর্শগত সূত্রপাত ঘটে আলীগড়ে-একথা বলা যায়। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে আধুনিকতা এবং চিন্তার উদারতা প্রচারের একনিষ্ঠ উদ্যোগের দিক থেকে সৈয়দ আহমদ খান রাজা রামমোহনের সঙ্গে তুলনীয়।

Tao, Taoism : তাও, তাওবাদ

তাও হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র। তাও বলতে স্বভাব, প্রকৃতি এবং পরবর্তীকালে প্রাকৃতিক বিধান বুঝাত। একে নীতির সূত্র বা আদর্শ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। চীনের দর্শনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘তাও’ সূত্রের অর্থেরও বিকাশ ঘটেছে। চীনের ভাববাদী দার্শনিকগণ ‘তাও’ কে একটি ভাববাদী সূত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আবার লাওজু, সুনজু, ওয়াংচাং প্রমুখ বস্তুবাদী দার্শনিক তাওকে বস্তুর প্রকৃতি এবং বস্তুর পরিবর্তনের নিয়ম বা বিধান বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

Tautology : শব্দান্তর সংজ্ঞা

প্রচলিত ইউরোপীয় যুক্তিশাস্ত্রে সংজ্ঞার ক্ষেত্রে টটোলজি বা শব্দান্তর সংজ্ঞা একটি ত্রুটির নাম। শব্দান্তর সংজ্ঞায় যে পদটির সংজ্ঞা দেবার কথা সে পদটির কোনো মৌলিক গুণের উল্লেখ না করে পদটিকে ভিন্নতর শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। এটি ত্রুটি এ কারণে যে, সংজ্ঞা দ্বারা সংজ্ঞেয় পদটির অর্থ স্পষ্টরূপে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সংজ্ঞার মধ্যে যদি মূল পদটির শব্দান্তরে পুনরুল্লেখ থাকে কিংবা পদটির সমার্থক কোনো শব্দ দ্বারা সংজ্ঞার কাজ শেষ করা হয়, তা হলে পদটির অর্থ স্পষ্ট হতে পারে না। ‘দেহ হচ্ছে শরীর’, ‘বিদ্যা জ্ঞান’, ‘ভ্রান্তি হচ্ছে ভ্রান্ত ধারণা’-এগুলি শব্দান্তর সংজ্ঞার দৃষ্টান্ত। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলা হয় বলে একে ‘চক্রক’ ত্রুটিও বলা হয়।

 

Technocracy :  বিশেষজ্ঞতন্ত্র, প্রযুক্তিতন্ত্র

গণতন্ত্র নয়, সমাজতন্ত্র নয়, বিশেষজ্ঞতন্ত্র। যারা যে বিষয় জানে, যে বিষয়ে যাদের দক্ষতা আছে, তারাই কেবল সে কাজ করতে পারে, অপরে করতে গেলে অনর্থ ঘটে। রাষ্ট্রের অরাজকতা এবং অস্থিরতার মূলে রয়েছে রাজনীতিবিদদের শাসন। এর স্থানে বিশেষজ্ঞদের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেই রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা এবং স্বাভাবিকতা প্রত্যাবর্তন করতে পারে। এই তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ থর্সটাইন ভেবলেন। এ তত্ত্ব প্রকারান্তরে বিশেষজ্ঞের নামে একচেটিয়া পুঁজিবাদের শাসনকে স্থায়ী এবং জোরদার করার উদ্দেশ্য সাধন করে।

Thales : থেলিস (৬২৪-৫৪৭ খ্রি.পূ.)

থেলিস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক। গ্রিসের উপাখ্যানে থেলিসকে সাত জ্ঞানীর এক জ্ঞানী বলে অভিহিত করা হয়। থেলিস ব্যাবিলন এবং মিশরের জোর্তিবিদ্যা এবং অঙ্কশাস্ত্র আয়ত্ত করেছিলেন বলেও কথিত আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৫-৫৮৪ সালে যে সূর্য গ্রহণ হয়েছিল তার ভবিষ্যদ্বাণী থেলিস করেছিলেন। থেলিসের দর্শন ছিল স্বতস্ফূর্ত বস্তুবাদ। থেলিসের মনে প্রশ্ন জেগেছিল প্রাকৃতিক পরিবর্তন এবং বৈচিত্র্যের মূল কি? থেলিস এই প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন : জলই হচ্ছে বস্তু জগতের মূল সত্তা।

থেলিস ছিলেন এশিয়া মাইনরের সমৃদ্ধশালী মাইলেটাস এর অধিবাসী। প্রাচীন গ্রিক দর্শনের উৎপত্তি গ্রিক ভূ-খন্ডে ঘটে নি। এর উৎপত্তি ঘটেছিল মাইটেলাস এ। থেলিস ব্যতীত এ্যানাক্সিমেন্ডার এবং এ্যানাক্সেমেনিসও ছিলেন মাইলেটাসের দার্শনিক। এই তিনজনের দর্শন নিয়ে গড়ে উঠেছিল মাইলেটাসের বা মাইলেশীয় দর্শন।

Thomas Aquinas St :  সেইন্ট টমাস এক্যুইনাস

মধ্যযুগের রাষ্ট্রীয় দর্শনের ইতিহাসে তিনজন খ্রিষ্টধর্মীয় যাজক চিন্তাবিদদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁরা হচ্ছেনঃ ১. সেইন্ট বার্নার্ড (১০৯১-১১৫৩)। ইনি ক্লেয়ার ভর বার্নার্ড নামে পরিচিত। ২. সেলিসবারির জন (১১৫৫-১১৮০)। ৩. সেইন্ট টমাস এ্যকুইনাস (১২২৭-১২৭৪)।

ইউরোপীয় ইতিহাসের মধ্যযুগে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রধান রাজনীতিক সমস্যা ছিল রাষ্ট্র এবং ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার সমস্যা। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরু পোপের অধিনায়কত্বে সমগ্র ইউরোপবাসী এক খ্রিষ্টীয় যাজক সাম্রাজ্য সংগঠিত হয়েছিল। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যা, প্রার্থনার পৌরহিত্য ইত্যাদি এই সংগঠনের করণীয় হলেও ক্রমান্বয়ে এই সংগঠনের ক্ষমতা পারলৌকিক হতে ইহলৌকিক এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে বিস্তার লাভ করে। খ্রিষ্টীয় যাজক সংগঠন বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়ে মধ্যযুগের অন্যতম সমাজতান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত হয়। রোম নগরীতে এই শক্তিকেন্দ্র স্থাপিত হয়। যাজকতন্ত্র তার নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা রাজা কিংবা রাষ্ট্রীয় সরকারের উপর বিস্তারিত করার প্রয়াস পায়। এই প্রচেষ্টাতে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের, রাজার সঙ্গে পোপের পারস্পরিক বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। কে বড়? রাষ্ট্র না ধর্ম? পোপ না রাজা? এই প্রশ্নে উভয় পক্ষের যুক্তি, প্রতিযুক্তির ভিত্তিতে মধ্যযুগের দর্শন, বিশেষ করে তার রাষ্ট্রীয় দর্শন বিকাশ লাভ করে। সেইন্ট বার্নার্ড জাগতিক এবং ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। পোপ জাগতিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে যেরূপ ধর্মীয় সংগঠনকে জড়িত করেছিলেন এবং রাষ্ট্রশাসনে যেরূপ হস্তক্ষেপ করেছেন সেইন্ট বার্নার্ড তার নিন্দা করেন। তাঁর অভিমত ছিলঃ রাষ্ট্রীয় শাসন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। পুরোহিত ধর্মীয় কাজ সমাধা করবে। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পোপ অর্থাৎ পুরোহিতের হস্তক্ষেপ অনুচিত।

মধ্যযুগে রাষ্ট্রনীতিক দর্শনের প্রধান ব্যাখ্যাদাতা ছিলেন সেইন্ট টমাস এ্যাক্যুইনাস। তিনি ছিলেন ইতালির অধিবাসী। তাঁর রচনার মধ্যে ‘সুমমা থিউলজিকা’(১২৬৫-৭৩)ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি এরিস্টটলের ‘রাষ্ট্রনীতি’ বা ‘পলিটিক্স’ এর উপর আলোচনামূলক একখানি গ্রন্থও রচনা করেন। টমাস এ্যাক্যুইনাসের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তি এবং ধর্মের মধ্যে একটা সমঝোতা স্থাপন। প্রাচীন গ্রিসের চিন্তাধারার সঙ্গে ইতোমধ্যে ইউরোপ আবার পরিচিত হতে শুরু করেছে। ইসলামের সঙ্গে ধর্মীয় যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপ প্লেটো এরিস্টটলের আরবী অনুবাদের সাক্ষাৎ পরিচয় লাভ করেছে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নতুন এক ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনের সঙ্গে ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের পরিচয় ঘটতে শুরু করে। পাছে এই পরিচয় খ্রিষ্ট ধর্মের ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে এই আশঙ্কায় এ্যাক্যুইনাস যুক্তির ভিত্তিতে ধর্মকে গ্রহণীয় করে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁর রচনায় রাষ্ট্রীয় সমস্যাসমূহের আলোচনাও কিছুটা বৈজ্ঞানিক আলোচনার রূপ গ্রহণ করে। তাঁর মতে চরম বিধান অবশ্যই প্রাকৃতিক এবং ঐশ্বরিক বিধান। কিন্তু রাষ্ট্রশাসনে মানুষের বিধানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এক্যুইনাসের মতে আইন চার প্রকার। মানুষের তৈরি আইন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় আইনের স্থান হচ্ছে সর্বনিম্নে। মানুষিক আইনের উপরে হচ্ছে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশমূলক আইন। প্রত্যাদিষ্ট বিধানের উপরে হচ্ছে বিধাতার ইচ্ছার মূর্ত প্রকাশ, প্রকৃতির বিধান। এই প্রাকৃতিক বিধানের দৃষ্টান্ত হিসেবে এ্যকুইনাস উল্লেখ করেন মানুষের আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি, যৌন মিলনের আকাঙ্খা, অপত্যস্নেহ এবং সমাজবদ্ধভাবে বাস করার মানুষের সহজাত প্রবণতা। কিন্তু সর্বোপরি হচ্ছে এক অবিনশ্বর বিধান। বিশ্বসৃষ্টির মূল হচ্ছে বিধাতার এই অবিনশ্বর বিধান। চরম সত্য হচ্চে এই শাশ্বত বিধান। তাঁর মতে, জাগতিক সমস্যার শেষ মীমাংসাকারী হচ্ছে গির্জা বা ধর্ম। রাষ্ট্র শাসক রাষ্ট্রকে শাসন করতে ধর্মীয় বিধান কার্যকর করার জন্য। রাজা বা শাসক যদি ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করে তা হলে ধর্ম এবং ধর্মীয় গুরুর অধিকার আছে তাকে সমাজচ্যূত করে জনসাধারণকে রাজার প্রতি আনুগত্য পোষণের দায়িত্ব থেকে মুক্তিদানের। বস্তুত পোপ এবং রাজার দ্বন্ধে পোপের বিজয়ের দার্শনিক ব্যাখ্যা হচ্ছে এ্যাকুইনাসের রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

 

Time and Space :  সময় ও স্থান

সাধারণভাবে বলা যায় যে, স্থান ও কাল হচ্ছে বস্তুর মৌলিক রূপ। কিন্তু স্থান ও কাল কথা দুটি যেমন গভীর অর্থবোধক তেমনি দর্শনের বিশেষ বিতর্কমূলক ভাব। আমরা প্রতিনিয়ত কথা দুটিকে ব্যবহার করি। আমরা বলি-এ বিশেষ ঘটনা এ সময়ে ঘটেছে। সব ঘটনা সময়ের মধ্যে ঘটে। আবার স্থানের ক্ষেত্রে বলি-চেয়ারটি ঐ স্থানে আছে; বাটিটি এই স্থান হতে ঐ স্থানে রাখ। অর্থাৎ বিভিন্ন খন্ড বস্তুর আধার হচ্ছে স্থান। স্থানের মধ্যে বস্তু। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঘটনা সময়ের মধ্যে থাকে-এর অর্থ কি এই যে, সময় বাস্তব অস্তিত্বময় কোনো সত্তা? অথবা সময় হচ্ছে বাস্তব ভাব মাত্র? যদি ভাব হয়, তাহলে সে ভাব মনে কিভাবে আসে? সময়ের ভাব কি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আসে? না, সময়ের ভিত্তিতে আমরা অভিজ্ঞতাকে অনুধাবন করি? স্থান নিয়েও একই প্রশ্ন। বস্তু মাত্রকেই স্থানের পটভূমিতে বা স্থানের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে বুঝতে হয়। তা হলে ‘স্থান’ ভাবটি কি আমাদের জন্মগত এবং সকল অভিজ্ঞতা উর্ধ্ব ভাব? প্রকৃতপক্ষে স্থান ও কাল দর্শনের অন্যতম মূল প্রশ্ন। বার্কলে, হিউম, কান্ট এঁরা সবাই সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এদের মতে স্থান ও কাল হচ্ছে মানুষের জন্মগত ও অভিজ্ঞতা উর্ধ্ব ভাব। এই দুটি ভাব না থাকলে মানুষের পক্ষে কোনো অভিজ্ঞতাকে বুঝা সম্ভব হতো না। সমস্ত অভিজ্ঞতার মূলে আছে স্থান ও কাল। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্থান ও কাল নয়। স্থান ও কালের ভিত্তিতে অভিজ্ঞতা। স্থান ও কাল বস্তুরই অবিচ্ছেদ্য রূপ। স্থান ও কালের বাইরে কোনো বস্তু নেই। আবার বস্তুর বাইরেও স্থান ও কালের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই।

Totemism : টোটেমবাদ

টোটেম হচ্ছে পবিত্র দ্রব্য বা পশু কিংবা তার প্রতীক। গাছ, গাছড়া, পশু ইত্যাদিকে পূর্বপুরুষ বা পূর্বপুরুষের প্রতীক বলে বিশ্বাস করা ছিল টোটেমবাদের বৈশিষ্ট্য। আদিম মানুষ বিশ্বাস করত রক্তের সম্বন্ধে সম্পর্কিত বিশেষ বিশেষ গোত্রের উদ্ভব ঘটেছে একটি বিশেষ পশু বা বিশেষ বৃক্ষ থেকে। কাজেই এই বিশেষ পশু বা বৃক্ষ হচ্ছে এ গোত্রের রক্ষক বা দেবতা। রক্তের বাইরে অপর সামাজিক সম্পর্কের তখনো বিকাশ ঘটে নি। পশু শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ তখনো জীবনধারনের প্রধান অবলম্বন। এই অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে টোটেমের বিশ্বাসে। অষ্ট্রেলিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অধিবাসীদের মধ্যে টোটেমাবাদের রেশ এখনো দেখা যায়। যে কোনো দেশের লোককথা ও সাহিত্যে পশুর মানুষে রূপান্তরিত হওয়া বা মানুষের পশু জন্মগ্রহণের যে কাহিনী পাওয়া যায় তাও পশুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে টোটেমবাদী বিশ্বাসের রূপ।

Trotsky : ট্রটস্কী (১৮৭৯-১৯৪০ খ্রি.)

বিখ্যাত রুশ বিপ্লবী নেতা। জারের আমলে প্রথম ১৮৯৮ সালে ট্রটস্কী তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য গ্রেপ্তার হন এবং তাকে সাইবেরিয়াতে নির্বাসন দেওয়া হয়। নির্বাসন হতে পলায়ন করে ট্রটস্কী লন্ডন চলে যান। সেখানে লেনিনেরে সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৯০৫ সালে পার্টির মধ্যে বিপ্লবের কর্মপন্থা নিয়ে মতবিরোধ হলে অধিকাংশ লেনিনের নেতৃত্বের বলশেভিক পার্টিতে যোগ দেন। ট্রটস্কী সংখ্যালঘিষ্ঠদের মেনশেভিক এর সাথে থাকেন। ১৯০৫ সালে আবারো গ্রেপ্তার হয়ে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন এবং আবারো পলায়ন করেন। ১৯১৭ সালে ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। পরে রাশিয়ায় ফিরে বলশেভিকদের সাথে মিলিতভাবে নভেম্বর বিপ্লব সাফল্যমন্ডিত করায় ভূমিকা রাখেন। তিনি রাশিয়ার বৈদেশিক মন্ত্রী ছিলেন কিছুকাল। তিনি অস্থির প্রকৃতির ছিলেন তবে তাঁর বাকপটুতা বেশ বিখ্যাত ছিল। অনেক গ্রন্থও তিনি রচনা করেন। বিপ্লবের পর লেনিনের সাথে তাঁর মতবিরোধ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি মনে করতেন বিপ্লবের কোনো বিরাম নেই এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে একইকালে সমগ্র পৃথিবীতে অনুষ্ঠিত হতে হবে। না হলে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো দেশে বিপ্লব সাফল্যমন্ডিত হলেও টিকে থাকতে পারে না। লেনিন এর পরে স্টালিনের সঙ্গেও ট্রটস্কীর তত্ত্বগত এবং নেতৃত্বগত বিরোধ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ১৯২৭ সালে তাঁকে পার্টি হতে বহিষ্কার করা হয় এবং ১৯২৯ সালে দেশ হতে নির্বাসন দেওয়া হয়। মেক্সিকোতে অবস্থানকালে ট্রটস্কী ১৯৪০ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পেছনে স্টালিনের হাত আছে বলে অনেকে মনে করেন।

Unconscious : অচেতন

অচেতনের দুটি অর্থ করা যায়। ১. মানুষের অচেতন কাজ। ব্যক্তি সচেতনভাবে যেমন কাজ করে তেমনি সে এমন অনেকগুলি কাজ করে যেগুলিতে তার চেতনা এবং বুদ্ধির ভূমিকা প্রত্যক্ষ নয়। যেমন, চোখের পাতা নড়া। চোখের পাতা আমরা সচেতনভাবেও নাড়তে পারি, একথা ঠিক। কিন্তু আমাদের সচেতন ইচ্ছা এবং চেষ্টা ছাড়াও চোখের পাতা নড়ে। আমরা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কেউ আমাদের কোনো ইন্দ্রিয়কে উত্তেজক দ্বারা স্পর্শ করলে সে ইন্দ্রিয় প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিন্তু এ কাজ আমাদের চেতনা ও বুদ্ধি দ্বারা সংঘটিত নয়। যেমন ঘুমন্ত অবস্থায় জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি আঙ্গুলে ছোঁয়ালে আঙুল আত্মরক্ষার্থে আগুন থেকে সরে যায়। স্বপ্নের ঘোরে ঘুমন্ত অবস্থায় অনেকে অনেক সময় হাঁটে কিংবা অপর কোনো কাজ করে। একেও অচেতন কাজ বলা যায়। ২. দ্বিতীয় অর্থে অচেতন বলতে মনের বিশেষ একটি বিশেষ বিভাগকে বুঝানো হয়। ফ্রয়েডবাদীগণ মানুষের মনকে বিশ্লেষণ করে তিনটি স্তরে বিভক্ত করে : চেতন, অবচেতন এবং অচেতন। মানুষের মনের চেতন স্তর খুবই সংকীর্ণ। মানুষের অভিজ্ঞতার খুব সামান্যই চেতন স্তরে বিরাজ করে। অভিজ্ঞতার কিছু থাকে চেতনার কাছাকাছি অবচেতনে। অবচেতনের স্মৃতি, বাসনা, ঘটনা মন ইচ্ছা করলেই চেতনের মধ্যে টেনে আনতে পারে। ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার অধিকাংশের উৎস হচ্ছে যৌনানুভূতি। ব্যক্তি যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে সমাজে বসবাস করে তার যৌন কামনাকে চরিতার্থ করতে পারে না। ফলে ব্যক্তির বাসনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতৃপ্তেই থেকে যায়। ব্যক্তির চেতনা পরিবেশকে মেনে নিয়ে অতৃপ্ত কামনাকে দমন করে। কিন্তু বাসনামাত্রই একটি শক্তি। তৃপ্ত কামনার শক্তি তৃপ্তিতে নিঃশেষ হয়। কিন্তু অতৃপ্ত কামনার শক্তি নিঃশেষ হয় না। অবদমিত কামনা অচেতনের কোঠা থেকে স্বপ্নের ঘোরে, শরীরের নতুন কোনো বিকারে কিংবা উপসর্গে কিংবা অপর কোনো দুর্বোধ্য আকারে চেতনাকে এড়িয়ে নিজেদের তৃপ্তি সাধন করতে চায়। কাজেই ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণে অচেতন নিষ্ক্রিয় বা শক্তিহীন নয়। মনের এই ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চেয়ে ভাববাদী কল্পনার অধিক ব্যবহার বলে মনোবিজ্ঞানের আচরণবাদী এবং অন্যান্য ধারা অভিমত পোষণ করে।

Universe :  বিশ্ব

স্থান ও কালে বিস্তারিত সীমাহীন বৈচিত্রময় বস্তুর সামগ্রিক নাম হচ্ছে বিশ্ব। আধুনিক বিজ্ঞান তার বাস্তব পরিমাপের হিসেবে যে জগৎকে জ্ঞানের পরিধির মধ্যে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে সে জ্ঞান সীমাবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সে আমাদের বিশ্বের অসীমতার ধারণাকে পূর্বের চাইতে অধিকতর বিস্তৃত করে দিয়েছে। (বিজ্ঞানের পরিমাপক পরিধি ৩০০ কোটি আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত। এক আলোকবৎসরের পরিমাণ হচ্ছে ৬,০০০,০০০,০০০,০০০ মাইল)। জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতে আমরা যে সৌরমন্ডলে বাস করছি-সেটাই একমাত্র সৌরমন্ডল নয়। অসংখ্য তারকার প্রত্যেকটি তারকাই এক একটি সূর্য। প্রত্যেকেরই গ্রহ উপগ্রহের মন্ডল আছে। আবার বহু মন্ডলের স্তূপ নিয়ে রয়েছে মন্ডল স্তূপ। এই মন্ডলে স্তূপেরও স্তূপ আছে। বস্তুর বিভিন্ন সংগঠনের এই মন্ডলগুলি গঠিত। বস্তুর বিভিন্ন প্রকাশের কিছুটার সঙ্গে পৃথিবী গ্রহের মানুষ পরিচিত হয়েছে। কিন্তু বস্তুর সাংগঠিনিক বৈচিত্র্য নিয়ন্ত্রণকারী কোনো নির্দিষ্ট বিধানকে মানুষ আজো আবিষ্কার করতে পারে নি।

Upanishad : উপনিষদ

প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ। বেদের ব্যাখ্যা উপনিষদ। শত শত বৎসর ধরে বেদসমূহের যে ব্যাখ্যা রচিত হয়েছে তার সংকলনে তৈরি হয়েছে উপনিষদ। প্রাচীনতম উপনিষদের রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব দশ থেকে ষষ্ঠ শতককে মনে করা হয়। উপনিষদে বেদের দেবতাদের নতুন দার্শনিক ব্যাখ্যা উপস্থিত করা হয়েছে। পুনর্জন্মের তত্ত্বকে মানুষে সৎ অসৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত করে তার একটা নীতিগত যৌক্তিকতা দাঁড় করানো হয়েছে। পুনর্জন্মের বন্ধন হতে মুক্তিকামী মানুষকে ধ্যান করতে হবে সেই অনাদি অনন্ত ব্রহ্মকে যার সঙ্গে মানুষের আত্মা অভেদ। দেহের বারংবার জন্মের শৃঙ্খল হতে মুক্তি হচ্ছে আত্মার কাম্য। পুনর্জন্মের শৃঙ্খল হতে মুক্ত হয়ে আত্মা ব্রহ্মতে লীন হয়ে যায়। উপনিষদে বস্তুবাদী লোকায়ত দর্শনেরও আভাস পাওয়া যায়। কেননা লোকায়ত দর্শনকে খন্ডন করে উপনিষদকারগণ বেদের ব্যাখ্যা রচনা করেছেন। উপনিষদ থেকেই দেখা যায় যে, লোকায়ত দর্শনের মতে-সৃষ্টির মূলে আছে ক্ষিতি, অপ, তেজ, ব্যোম, বায়ু, স্থান ও কালরূপ বস্তু। লোকায়ত দর্শন মানুষের মৃত্যুর পরে আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে।

Vedanta : বেদান্ত

বেদের অন্ত বেদান্ত। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের একটি শাখা বেদান্ত নামে পরিচিত। বেদান্তে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দার্শনিক ব্যাখ্যার সংমিশ্রণ পাওয়া যায়। বেদান্ত সূত্রাকারে তৃতীয় ও চতূর্থ খ্রিষ্ট শতকে এই দর্শনের সুসংবদ্ধতা ঘটে। বেদান্ত দর্শনে দুটো ধারার বিকাশ ঘটেছে। একটি হচ্ছে অদ্বৈতবাদী অভিমত। খ্রিষ্টাব্দের অষ্টম শতকে শঙ্করাচার্য অদ্বৈততত্ত্বের যুক্তিগত ব্যাখ্যা রচনা করেন। অদ্বৈত মতে মূল সত্তা হচ্ছে এক ঈশ্বর। ঈশ্বর সংজ্ঞার অতীত। অদ্বৈত মতে, বিশ্বের বৈচিত্র্য মায়া, সত্য নয়। অবিদ্যার কারণেই মানুষের মনে এই মায়া বা বস্তুকে সত্য ধারণা ভ্রমের সৃষ্টি হয়েছে। সত্য জ্ঞানের পথ হচ্ছে সজ্ঞা বা অলৌকিক অনুভূতি। তিন প্রকার সত্তা-বস্তু, আত্মা এবং পরমাত্মা বা ঈশ্বর পরস্পর নির্ভরশীল। পরমাত্মা আমাদের দেহ ও মন- উভয়ের নিয়ন্তা। ধর্ম হিসেবে অদ্বৈত ধর্মের আরাধ্য হচ্ছে শিব এবং বিশিষ্ট অদ্বৈতের আরাধ্য বিষ্ঞু। বেদান্ত দর্শন প্রাচীন ভাববাদী দর্শনের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

Vivekananda : বিবেকানন্দ (১৮৬৩১৯০২ খ্রি.)

ঊনবিংশ শতকের ভারতের অন্যতম চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবোধ সঞ্চারকারী নেতা। বিবেকানন্দের পারিবারিক নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৮৮০-৮৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। এ সময় তিনি দার্শনিক ও ধর্মীয় নেতা রামকৃষ্ঞ পরমসংহের প্রভাবে আসেন এবং সন্নাসধর্ম গ্রহণ করেন। এ সময় থেকে তিনি বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন। বিবেকানন্দ অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। ১৮৯৩ সালে বিবেকানন্দ বিশ্বভ্রমণে বের হন এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড এবং জাপানে বহু সুধী সমাবেশে ভাষণ দান করেন। ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ঞ মিশন নামে ধর্ম প্রচারকারী এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। হিন্দু সমাজের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র এই বর্ণভেদের নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন যে, এগুলি সমাজের বিকাশের পর্যায়সূচক। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের শাসন শেষ হয়েছে। পুঁজিবাদী যে সমাজ চলছে, সে হচ্ছে বৈশ্যের সমাজ। কিন্তু মানুষের ভবিষ্যৎ সমাজের রূপ হবে শূদ্রের সমাজ অর্থাৎ নির্যাতিত মানুষের সমাজ।

Voltaire : ভলটেয়ার (১৬৯৪১৭৭৮ খ্রি.)

ভলটেয়ার ছিলেন অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সের বহুমুখী প্রতিভা। ভলটেয়ার একাধারে লেখক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক এবং ফরাসিদের নবজাগরণের নেতা ছিলেন। ভলটেয়ার আপসহীনভাবে সামন্তবাদ এবং খ্রিষ্টীয় গোঁড়ামির বিরোধী ছিলেন। তাঁর বিদ্রুপাত্মক রচনার ধার শাসকগোষ্ঠীর নিকট অসহনীয় ছিল। এজন্য ১৭১৭ সালে ও ১৭২৫ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। তাঁর মতে বিজ্ঞান সত্য, তথাপি বিশ্বের একজন মূল পরিচালক আছেন। তিনি ঈশ্বর। তবে ঈশ্বরের ব্যাখ্যায় তিনি ধর্মীয় ব্যাখ্যা অস্বীকার করতে চেয়েছেন। প্রকৃতি শাশ্বত বিধানের নিয়মে ক্রিয়াশীল। ঈশ্বর প্রকৃতি হতে আলাদা কোনো অস্তিত্ব নয়। প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ক্রিয়াশীলতা ঈশ্বর। চেতনা বস্তুরই অন্তর্নিহিত চরিত্র। কিন্তু এ চরিত্রের বিকাশ ঘটেছে সজীব দেহে, অপর কোথাও নয়। জ্ঞানের প্রশ্নে ভলটেয়ার লকের অনুসারী ছিলেন। ভলটেয়ার ছিলেন বিকাশমান পুঁজিবাদী শ্রেণীর ভাবগত মুখপাত্র। কারণ তিনি সামন্তবাদের বিরোধিতা করেছেন; আইনের চোখে সকলে সমান একথা বলেছেনে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সম্পত্তির মালিকদের উপর করধার্যের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। এগুলি সবই পুঁজিবাদী বিকাশের সহায়ক। তাঁর বিদ্রুপের প্রধান লক্ষ্য ছিল গোঁড়া যাজক সম্প্রদায়। তিনি খ্রিষ্টীয় গীর্জাকে মানুষের প্রগতির প্রধান শত্রু বলে মনে করতেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব, বিশেষ করে অন্যায়ের দন্ডদানকারী ঈশ্বরের অস্তিত্ব কল্পনা সাধারণ মানুষের জন্য তিনি আবশ্যক বলে বোধ করতেন। ভলটেয়ার রচনা ও দৃষ্টিভঙ্গি ফরাসি বিপ্লবের পথকে প্রশস্ত করেছিল।

Wang Chung : ওয়াং চুং (২৭১০৪ খ্রি.)

ওয়াং চুং ছিলেন চীনের খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের বস্তুবাদী দার্শনিক। স্বর্গ কিংবা ঈশ্বর সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা, ভাববাদের এই তত্ত্ব তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর মতে সবকিছুর মূলে আছে ‘চী’ বা বস্তুগত সত্তা। ‘চী’র সম্মেলনে সমস্ত অস্তিত্বের সৃষ্টি এবং ‘চী’র বিয়োজনে সমস্ত অস্তিত্বের ধ্বংস। তাঁর মতে মানুষের জ্ঞানের সূচনা তার ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে। সমাজের বিকাশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে না। মানুষই সমাজের চালক শক্তি। সভ্যতা বৃত্তাকারে অগ্রসর হয়। একটি সভ্যতার উত্থান, বিকাশ ও ক্ষয় আছে। এই বৃত্তের পর আবার আর এক সভ্যতার উদ্ভব ঘটে; সে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং পরিশেষে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পৌনঃপুনিকভাবে সভ্যতার এই বৃত্তি পরিক্রম চলতে থাকে।

War : যুদ্ধ

যুদ্ধ মানুষের ইতিহাসের প্রাচীনতম ঘটনা। মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, গোত্রে গোত্রে বিভাগ এবং পরবর্তীকালে দাস প্রভুর ভিত্তিতে শ্রেণীসমাজে বিভক্ত হওয়া থেকে অদ্যাবধি মানুষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে আসছে। যুদ্ধের এই ইতিহাস থেকে অনেক ভাববাদী দার্শনিক যুদ্ধকে মানুষের স্বভাবেরই প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক পুঁজিবাদী সভ্যতার জঙ্গি দার্শনিকগণ যুদ্ধকে মানুষের মধ্যে মানুষের মধ্যে যোগ্যতম জাতির বেঁচে থাকার স্বাভাবিক উপায় হিসেবে গণ্য করেছেন। কিন্তু মার্কসবাদ যুদ্ধকে অযৌক্তিক এবং অসঙ্গত বলে ব্যাখ্যা করে। মার্কসবাদের মতে যুদ্ধের কারণ মানুষের চিরন্তন প্রকৃতি নয় বা যোগ্যজনের বেঁচে থাকার ইচ্ছা নয়। দাস কিংবা সামন্তবাদী যুগে সম্রাটগণ যে যুদ্ধাভিযানে বের হয়ে দুর্বল দেশ বা জাতিসমূহকে ধ্বংস করে তাদেরকে দাসে পরিণত করত তার সঙ্গে সেই সময়কার অর্থনীতি সম্পর্কিত ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযু্দ্ধ শেষে বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বর্তমানকালে শান্তির শক্তি যেমন দুর্বল নয় তেমনি বিশ্বে সে সহযোগী শক্তিবিচ্ছিন্নও নয়। মুক্তিকামী এবং মুক্তিপ্রাপ্ত স্বাধীনভাবে উন্নয়নকামী দেশসমূহ শান্তির সহযোগী শক্তি। ফলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধ বাধাবার পরিকল্পনায় যুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে আজ আর সুনিশ্চিত নয়। এ কারণে মারণাস্ত্রের অভূতপূর্ব উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বযুদ্ধ আজ যে কোনো মুহুর্তের আশঙ্কা বলে অনেকে মনে করেন না। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও যেমন শক্তিশালী, শান্তির শক্তিও তেমনি শক্তিশালী। এই শক্তির সমতা যুদ্ধ বাধার একটা প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। শান্তিকামী রাষ্ট্র এবং তার অনুসারী রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের মতে আজকের যুগে যুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা আবশ্যক। সীমাবদ্ধ যুদ্ধের মীমাংসা হতে পারে। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের বিশ্ব ধ্বংস ব্যতীত আর কোনো মীমাংসা নেই। এবং সীমাবদ্ধ যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে কোথাও অবিমিশ্য বিজয় লাভ করে নি। আলজেরিয়া, মিশর, বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের যুদ্ধের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে এ সত্যের প্রমাণ মিলবে। সীমাবদ্ধ যুদ্ধের ক্ষেত্রেও মুক্তিকামী জাতির হাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরাজয়ই একাধিক পরিমাণে নিশ্চিত হয়ে উঠছে।

Xenophanes : জেনোফেনস (আনুমানিক শতক খ্রি.পূ.)

প্রাচীন গ্রিক দা্র্শনিক জেনোফেনস ইলিয় দর্শনের প্রতিষ্ঠা করেন। জেনোফেনসকে কোলোফনের জেনোফস বলা হতো। তিনি কবি এবং বঙ্গ রচনাকারীও ছিলেন। মানুষ দেবতাদের নিজেদের মতই কল্পনা করে। সেই প্রাচীনকালেও করত। তখনো এক ঈশ্বরের কল্পনা আসে নি। মানুষের সমাজের মত দেবতাদেরও সমাজ ছিল। তাদের জন্ম ছিল। প্রেম, ভালবাসা, বিবাহ, হিংসাবিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা ছিল। দেবতাদের মধ্যে ছোট, বড়, মাঝারি ছিল, ক্ষমতারও তারতম্য ছিল। অলিম্পিয়া পাহাড়ে তাদের বাস ছিল। এমনি ছিল মানুষদের বিশ্বাস। কিন্তু জেনোফেনস এভাবে ভাবতেন না। তিনি প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যে প্রথম যিনি বললেন, দেবতারা মানুষের কল্পনা। মানুষের কল্পনা বলেই দেবতারা মানুষের মত। পশুদের ভাষা আমরা বুঝি না। কিন্তু পশুরা যদি দেবতা মানতো তাহলে পশুরাও নিজেদের দেবতাদের পশু বলেই কল্পনা করত। জেনোফেনস সক্রেটিসের পূর্ববর্তী অন্যান্য দার্শনিকদের ন্যায় ছিলেন প্রকৃতিবাদী। তিনি বস্তুর মূলে ক্ষিতি, অপ, তেজ প্রভৃতি বস্তুকে স্বীকার করে আবার চিন্তার মাধ্যমে সব সত্তার মূলে এক পরমসত্তার সিদ্ধান্তে পৌছেছিলেন। তাঁর পরমসত্তা অবিভাজ্য এবং অপরিবর্তনীয়। জেনোফেনস অবশ্য বহু এবং একের পারস্পরিক রূপান্তরের সমস্যাটির কোনো সমাধান দেন নি, কিন্তু বহু এবং একের স্বীকৃতি পরবর্তীকালে বহু এবং একের দ্বান্ধিক সম্পর্কের তত্ত্বের পথ উন্মুক্ত করেছিল।

Yang Chu : ইয়াং চু (আনুমানিক ৩৯৫-৩৩৫ খ্রি.পূ.)

ইয়াং চু ছিলেন প্রাচীন চীনের একজন বস্তুবাদী দার্শনিক। তাঁর বস্তুবাদ অবশ্য আদিকালের স্বতঃস্ফূর্ত বস্তুবাদের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ছিল। ইয়াং চু ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অমরতার তত্ত্বকেও তীব্রভাবে সমালোজনা করেন। ইয়াং চু বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতিজগতে যা কিছু ঘটছে সবই প্রকৃতির প্রয়োজনের বিধানে সংঘটিত হচ্ছে। প্রকৃতির প্রয়োজনের বিধান তাঁর কাছে ভবিতব্য বলে বোধ হতো। ইয়াং চুর মতে মৃত্যু এবং ধ্বংস জন্মের অনিবার্য পরিণাম। যা কিছু জন্মাবে তার অবশ্যই মৃত্যু এবং ধ্বংস থাকবে। কাজেই অমরতা অকল্পনীয়। জীবন যাপনের ক্ষেত্রে ইয়াং চু’র নীতি হচ্ছে, ব্যক্তি তার কামনা, বাসনা, ইচ্ছার পরিপূরণের উদ্দেশ্য নিয়ে জীবনযাপন করবে। মৃত্যুর পরে কি ঘটবে সেই অজ্ঞেয় কিংবা অস্তিত্বহীন ভাগ্যের চিন্তায় বিমর্ষ না হয়ে বর্তমানের জীবনকে ভোগ করাই হবে ব্যক্তির অনুসরণীয় নীতি। প্রাচীন চীনের প্রতিষ্ঠিত কনফুসীয় সমাজনীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইয়াং চুর এই ব্যক্তিবাদের তত্ত্ব বিকাশ লাভ করেছিল।

Yoga : যোগ

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ভাববাদী ধারার অন্যতম ধারার নাম ছিল যোগ। যোগদর্শনের মূল কথা ছিল জন্ম, মৃত্যু এবং জাগতিক জীবনের বন্ধন থেকে পরিপূর্ণ মুক্তি অর্জনের সাধনা। এই মুক্তির মাধ্যম ছিল দুটি : বৈরাগ্য এবং যোগ বা ধ্যান। জগৎ এবং জীবনকে মায়া বলে বিবেচনা করলেই মানুষের মনে জগৎ সম্পর্কে বৈরাগ্যের সৃষ্টি হবে আর যোগের মাধ্যমেই ব্যক্তি ঈশ্বর বা চরম সত্তাতে জ্ঞাত হতে পারবে। প্রাচীন শাস্ত্রকার পতঞ্জলি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে যোগ প্রক্রিয়াসমূহকে ‘যোগ সূত্রের’ মধ্যে গ্রথিত করেছন বলে মনে করা হয়। ইন্দ্রিয়সমূহের উপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই মাত্র ব্যক্তি যোগ সাধনে সক্ষম, যোগসূত্রের এটাই মূল কথা।

Zeno of Citium : সাইটিয়ামের জেনো (আনুমানিক ৩৩৬-২৬৪ খ্রি.পূ.)

সাইটিয়ামের জেনো স্টয়সিজম বা নিস্পৃহবাদের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাইপ্রাস দ্বীপের সাইটিয়াম শহরে জেনোর জন্ম। খ্রি.পূ. ৩০০ অব্দে জেনো এথেন্স নগরীতে তাঁর নিজের নিস্পৃহবাদের দর্শনাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দর্শনকে যুক্তি, পদার্থ এবং নীতি এই তিনভাগে ভাগ করেছিলেন। জেনো ‘স্টোয়া’ অর্থাৎ চিত্রিত বারান্দা গৃহ থেকে তাঁর দর্শন প্রচার করতেন বলে তাঁর দর্শন স্টয়সিজম এবং তাঁর অনুসারীদের স্টয়েক বলে অভিহিত করা হয়।

Zoroastriantism : জোরোয়াস্ত্রবাদ

প্রাচীন পারস্যের দ্বৈতবোধক ধর্ম ছিল জোরোয়াস্ত্রবাদ। উপকাহিনীর প্রেরিত পুরুষ জোরোয়াস্ত্র এই ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খ্রি.পূ. ৬০০ শতকে। জোরোস্ত্রবাদের মূল তত্ত্ব হচ্ছে সৎ এবং অসৎ এর দ্বন্ধ। সৎ এর দেবতা হচ্ছে আহরুমাজদা এবং অসৎ এর দেবতা হচ্ছে আহরিমান। সৎ হচ্ছে আলো, অগ্নি; অসৎ হচ্ছে অন্ধকার। সৎ এবং অসৎ এর এই দ্বন্ধ চিরন্তন। কিন্তু পরিণামে সৎ এরই বিজয় ঘটবে। জোরোয়াস্ত্রবাদের প্রভাব পরবর্তীকালে ইহুদী এবং খিষ্টধর্মের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। ভারতের পারসি সম্প্রদায় জোরোয়াস্ত্রবাদের আধুনিক অনুসারী। পারসি সম্প্রদায় আবার প্রাচীন দ্বৈতবাদের সঙ্গে একশ্বরবাদকেও স্বীকার করেন। তাঁদের ধর্মগ্রন্থের নাম আবেস্তা (বা জেন্দআবেস্তা)।

‘দর্শনকোষ’ রচনার ক্ষেত্রে যে সমস্ত বিশ্বকোষ এবং গ্রন্থের উপর নির্ভর করা হয়েছে তার মধ্যে নিম্নেরগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগঃ

১. Dictionary of Philosophy, Published by Progress Publishers, Moscow 1967, 1984

২. Encyclopedia Britannica

৩. Encyclopedia of Philosophy

৪. Encyclopedia of Americana : 1963

৫. Chamber’s Encyclopedia : 1967

৬. Encyclopedia of Religions and Ethics 1959

৭. Hitory of Western Philosophy : Bertrand Russell

৮. Everyman’s Encyclopedia

৯. বিশ্বকোষ : নগেন্দ্রনাথ বসু

১০. ভারতকোষ-বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলিকাতা

About সরদার ফজলুল করিম