দর্শন কোষ

Declaration of Independence: স্বাধীনতার ঘোষণা

ইংল্যাণ্ডের শাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকার উপনিবেশসমূহ ১৭৭৬ সনে ৪ জুলাই তারিখে যে ঘোষণা দ্বারা স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করে তা ইতিহাসে স্বাধীনতার ঘোষণা তথা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা নামে খ্যাতি লাভ করেছে। ঘোষণাটির মধ্যে টমাস জেফারসন, বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রভৃতি প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও রাজনীতিকগণ স্বাধীণতার যে যুক্তি উল্লেখ করেন সে যুক্তি মানুষের রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক অধিকার তত্ত্বের তাৎপর্যে পূর্ণ। এই ঘোষণার মধ্যে দার্শনিক লকের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘টু ট্রিটিজেস অন সিভিল গভর্ণমেন্ট’ বা শাসনব্যবস্থার উপর দুটি নিবন্ধের গভীল প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘আমেরিকার তেরটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বসম্মত ঘোষণা’ শিরোনামে উচ্চারিত ঘোষণার মুখবন্ধে বলা হয়: ইতিহাসের গতিপথে যখন একটি জনসমষ্টির জন্য অনিবার্যরূপে প্রয়োজন হয়ে পড়ে অপর একটি জনসমষ্টির সঙ্গে ছেদন করে প্রকৃতি এবং বিধির প্রদত্ত মানুষের সার্বভৌম এবং সমঅধিকারকে স্থাপন করার, তখন সেই সম্পর্ক ছেদনের যুক্তিকে প্রকাশিত করারও প্রয়োজন উপস্থিত হয়। সেই প্রয়োজনের বোধ থেকে আমরা ঘোষণা করছি পৃথিবীর সকল মানুষ জন্মগতভাবে সমান। এবং বিধাতা কতিপয় অবিচ্ছেদ্য অধিকারে ভূষিত করে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এবং এই অধিকারের অন্তর্গত হচ্ছে জীবন, স্বাধীণতা এবং সুখের অর্জন। মানুষের জীবন, স্বাধীণতা এবং সুখের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য গঠিত হয় সরকার। এবং এই সরকার তথা শাসকের ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতার উৎস হচ্ছে রাষ্ট্রের শাসিত তথা জনসাধারণ। এবং সেই কারণেই যখন কোনো সরকার শাসিতের এই মৌলিক অধিকারসমূহের ধ্বংসকারী হয়ে দাঁঢ়ায় তখন জনসাধারণের অধিকার থাকে সেই সরকারকে বিলুপ্ত কিংবা পরিবর্তিত করে নতুন সরকার গঠিত করার।

আমেরিকার স্বাধীণতার ঘোষণাপত্র ফরাসি বিপ্লবের চিন্তাবিদদের বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। এখনও যুক্তরাষ্ট্রে ৪ জুলাইকে সাধারণ ছুটির মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

Deduction: সিদ্ধান্ত, অনুমান, অবরোহ

এক কিংবা একাধিত প্রতিজ্ঞা বা যৌক্তিক দত্তবাক্য থেকে তাদের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো অনুমান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ইংরেজীতে ডিডাকশান বলে। দূরে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে; মনে হয় ওখানে আগুণ লেগেছে। এখানে ‘আগুণ লেগেছে’ এ সিদ্ধান্তটি ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে এই দত্ত সত্যের ভিত্তিতে গৃহীত অনুমান। অনুমানকে যুক্তিশাস্ত্রে সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। কোনো সার্বিক বা সাধারণ সত্য থেকে কোনো বিশেষ সত্যের অনুমানকে অবরোহী অনুমান এবং বিশেষ সত্যের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সাধারণ বা সার্বিক সত্যে পৌঁছাকে আরোহী অনুমান বলা হয়। এই বিবাগ অনুযায়ী ‘সকল মানুষ মরণশীল; সক্রেটিস একজন মানুষ সুতরাং সক্রেটিসও মরণশীল’, এই পদ্ধতিটিকে আরোহী অনুমান এবং ‘রাম মরেছে, রহিম মরেছে, করিম করেছে, সুতরাং সকল মানুষ মরবে বা সকল মানুষ মরণশীল’, এই দৃষ্টান্তটিকে একটি আরোহী অনুমানের দৃষ্টান্ত বলা হয়। উপরোক্ত বিভাগ থেকে মনে হতে পারে যে, অবরোহী ও আরোহী অনুমান পরস্পর পৃথক এবং আরোহী অনুমানই কেবল বৈজ্ঞানিক এবং অভিজ্ঞতা-সিদ্ধ অনুমান, অবরোহী অনুমান অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনুমান নয়। কিন্তু আবরোহী এবং আরোহী অনুমানের এরূপ ব্যাখ্যা ঠিক নয়। আরোহী এবং অবরোহী অনুমান পরস্পর নির্ভরশীল এবং সংযুক্ত। যুগব্যাপী সঞ্চিত অভিজ্ঞতা দ্বারাই বিশেষকে ব্যাখ্যা করি; বিশেষ সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানলাভ করি। বিশেষের ভিত্তিতে নির্বিশেষে জ্ঞান লাভ এবং নির্বিশেষের প্রয়োগে বিশেষের অনুধাবন –জ্ঞানের এই দ্বিবিধ প্রক্রিয়া আদিকাল থেকেই মানুষ অনুসরণ করে আসছে। তবে এ প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ প্রথমে বিস্তারিতভাবে করেন গ্রিক দার্শনিক এ্যারিস্টটল। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কতকগুলি সূত্র ব্যাখ্যা করেন। এগুলিকে যুক্তিশাস্ত্রের এ্যারিস্টটলীয় বিধান বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ বিধানগুল প্রধানত অবরোহী অনুমানের বিধান। এ জন্য অবরোহী অনুমানের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে এ্যারিস্টটলকে উল্লেখ করা হয়। অবরোহী অনুমানের সঠিকতা নির্ভর করে দত্ত সত্যের সঙ্গে অনুমিত সত্যের অন্তর্নিহিত সংযোগের উপর। দত্তবাক্য বা সত্যগুলি যদি পরস্পর সম্পর্কিত না হয় তা হলে তা থেকে কোনো সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা চলে না। এ নিয়মের অপর একটি তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, অবরোহী অনুমানে দত্তবাক্য বা অনুমিত বাক্যের বাস্তব যথার্থতা বিচার্য বিষয় নয়। অবরোহী অনুমানের বিচার্য বিষয় হচ্ছে প্রতিজ্ঞা বা দত্তবাক্য যা আছে (সত্য কিংবা মিথ্যা যাই হোক না কেন), তার ভিত্তিতে অনুমিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে কিনা। এ নিয়মে ‘সকল মানুষ অমর’ এ দত্তবাক্য থেকে ‘রহিম একজন মানুষ, সুতরাং রহিমও অমর’, এ সিদ্ধান্তে আমরা গ্রহণ করতে পারি। গ্রিসের ন্যায় ভারতীয় উপমহাদেশের অনুমান শাস্ত্রও অতি প্রাচীন। গ্রীক বৈজ্ঞানিক ইউক্লিডের জ্যামিতি অবরোহী অনুমানের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্ত। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে কিছু সংখ্যক আধুনিক দার্শনিক ‘আঙ্কিক অনুমানের’ বিশ্লেষণ দ্বারা অনুমানের ক্ষেত্রে নতুনতর বিকাশ সাধন করেছেন।

Definition: সংজ্ঞা

ইংরেজী ‘ডেফিনিশন’ শব্দটি ল্যাটিন ‘ডিফিনিশিও’ শব্দ থেকে উদ্ভুত। ‘ডেফিনিশিও’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিহ্নিত করা। যে বৈশিষ্ট্য ব্যতিরেকে একটি বিষয় আর সেই বিষয় বলে পরিচিত হতে পারে না, কেবলমাত্র সেই বৈশিষ্ট্যই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে- অপর কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। আমাদের জীবনে সংজ্ঞার আবশ্যকতা সমধিক। সংজ্ঞা একটি সংকেত বিশেষ। সংজ্ঞা দ্বারা আমরা নির্দিষ্ট বিষয়কে স্মরণ রাখি। বস্তুপুঞ্জকে সংজ্ঞা দ্বারা শ্রেণীবিভক্ত করি। সংজ্ঞাকরণের ক্ষমতা মানুষের জ্ঞানের বিকাশের একটি উন্নত স্তরের পরিচায়ক। মানুষ যখন তার মস্তিষ্ক দ্বারা বিশেষকে পর্যবেক্ষণ করে বিশেষে বিশেষে সম্ভব হয়েছে। সংজ্ঞাকরণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ প্রথমে এ্যারিস্টটল করেছেন বলে ইউরোপীয় দর্শনের ইতিহাস উল্লেখ করা হয়। এ্যারিস্টটল সংজ্ঞাকরণের বিধান নির্দিষ্ট করে বলেছেন যে, সংজ্ঞাকরণের অর্থ হচ্ছে, সংজ্ঞেয় পদের জাতি এবং সহজাতির সঙ্গে তার পার্থক্যসূচক গুণের নির্দেশ করা। এর দৃষ্টান্ত হিসাবে তিনি মানুষকে ‘যুক্তিবাদী জীব’ বলে উল্লেখ করেছেন। মানুষ জীবের অন্তর্গত। অর্থাৎ জীব বা জন্তু হচ্ছে মানুষের জাতি এবং যুক্তিবাদিতা হচ্ছে তার সহজাতি কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি পশুর সঙ্গে তার পার্থক্যসূচক গুণ। এই বিধান অনুযায়ী ব্যক্তিবাচক কোনো পদের সংজ্ঞা সম্ভব নয়। রহিম একটি ব্যক্তিবাচক পদ। একটি নাম। রহিম মানুষ হলে তাকে একজন মানুষ বলা যায় বটে –কিন্তু তাতে তার বিশেষ কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। যে বিশেষ গুণে রহিম করিম কিংবা যাদব নয়, যে গুণ রহিমকে একজন মানুষ বললেই স্পষ্ট হয় না। এ জন্য বিশেষ ব্যক্তি বা বস্তুর কোনো যৌক্তিক সংজ্ঞা হতে পারে না। সংজ্ঞা হতে পারে কেবলমাত্র জাতিবাচক পদের। কিন্তু যে জাতি পরিধিতে ব্যাপকতম কিংবা চরম, তারও সংজ্ঞা চলে না। কেননা চরম জাতিকে অপর কোনো বৃহত্তর জাতির অন্তর্ভুক্ত করে পরিচিত করা চলে না। মানুষকে জন্তুর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। জন্তুকে প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করে পরিচিত করা চলে না। তাই এ্যারিস্টটলের বিধান অনুযায়ী চরম জাতি এবং ব্য্কিত বা বস্তুবিশেষের কোনো সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়।

Deism: ঈশ্বরবাদ

সৃষ্টির আদি কারণরূপে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস। এটি একটি দার্শনিক তত্ত্ব। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। ধর্মীয় ঈশ্বর কেবল আদি স্রষ্টা নন। তিনি তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধির নিকট প্রত্যাদেশ মারফত তাঁর অস্তিত্ব ঘোষণা করেন। তিনি সৃষ্টির ধারক, বাহক, প্রতিপালক এবং বিচারক। দয়া-মায়া, কঠোরতা বিভিন্ন গুণে তিনি গুণান্বিত বলে মানুষ কল্পনা করে। তিনি সর্বশক্তিমান। এই প্রচলিত ধর্মীয় ঈশ্বরবাদের পরিবর্তে ইংল্যাণ্ডের হার্বার্ট (১৫৮৩-১৬৩৮ খ্রি.) দার্শনিক ঈশ্বরবাদের ব্যাখ্যা তৈরী করেন। দার্শনিক ঈশ্বরবাদের মতে সৃষ্টির আদি কারণ হিসাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আমাদের বিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু ধর্মীয় ঈশ্বর এবং সৃষ্টির আদি কারণরূপ ঈশ্বর এক নয়। দার্শনিক ঈশ্বর বিশ্বজগতের আদি কারণ মাত্র। তিনি জগতের সর্বকালের ধারক, বাহক কিংবা নিয়ন্তা নন। সৃষ্ট হওয়ার পরে সৃষ্টির সঙ্গে ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্ব জগৎ তার আপন বিধান অনুযায়ী চলছে, ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী নয়। দার্শনিক ঈশ্বরবাদের প্রচারকালে এর একটি প্রগতিশীল ভূমিকা ছিল। প্রচলিত অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস-বিজ্ঞানের বিকাশে প্রতিবন্ধকতার কাজ করছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে বিজ্ঞানের স্বীকৃতিকে অনিবার্য করে তুলেছিল। এরূপ অবস্থায় ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিশ্বাস জাগতিক জ্ঞানের বিকাশে যাতে প্রতিবন্ধক হয়ে থাকতে না পারে, সে জন্যই হার্বার্ট দার্শনিক ঈশ্বর তত্ত্বের ব্যাখ্যা দেন। ঈশ্বরকে সামাজিকভাবে অস্বীকার করা চলে না, আবার ঈশ্বরকে জ্ঞানের পথে দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড় করেও রাখা যায় না –দার্শনিক ঈশ্বরবাদ এই মানসিকতা থেকেই উদ্ভুত। এ তত্ত্ব অনুযায়ী যুক্তির মাধ্যমেই ইশ্বরকে স্বীকার করা যায়। আবার যুক্তিগতভাবে এও স্বীকার করতে হয় যে, আদি কারণের অধিক কিছুর জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন নায়। এভাবে ঈশ্বর ও বিজ্ঞান উভয়কে রক্ষা করা সম্ভব বলে শুধু হার্বার্ট নন, তাঁর পরবর্তী ভলটেয়ার, রুশো, লক, নিউটন, অনেক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী এই যুগে এই অভিমত পোষণ করেছিলেন। আধুনিককালে ধর্মীয় ঈশ্বরবাদ এবং দার্শনিক ঈশ্বরবাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়ই মূলত ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী তত্ত্ব বলে পরিচিত।

Democracy: গণতন্ত্র

আধুনিক রাষ্ট্রমাত্রেরই শাসন বা পরিচালব্যবস্থার আরাধ্য পদ্ধতি হচ্ছে গণতন্ত্র। শব্দগতভাবেও গণের তন্ত্র বা ব্যবস্থা হচ্ছে গণতন্ত্র। যে শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রের অধিবাসীদের প্রাপ্তবয়স্ক এবং সুস্থ অংশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয় তাকে গণতন্ত্র বলে। আধুনিক শাসনব্যবস্থার প্রধান রূপ গণতন্ত্র হলেও, গণতন্ত্র কেবল আধুনিক সভ্যতারই অবদান এমন কথা বলা যায় না। সীমিতভাবে হলেও, প্রাচীন নগর রাষ্ট্র এথেন্সের অ-দাস বা প্রভুশ্রেণীর অধিবাসীরা প্রত্যক্ষ সভা সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করত বলে জানা যায়। গ্রিক শব্দ ‘ডেমস’ বা ‘সাধারণ’ থেকে ইংরেজী ‘ডিমোক্রাসী’ শব্দের উদ্ভব ঘটেছে বলে রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ মনে করেন। এথেন্সের রাষ্ট্র পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণ নাগরিকদের গণসম্মেলন বা একলেসিয়াতে গৃহীত হতো বলে প্রাচীন এথেন্সের গণতন্ত্রকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এবং আধুনিকখালের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পারিচালিত ব্যবস্থাকে পরোক্ষ গণতন্ত্র বলা হয়।

প্রতিনিধিত্বমূলক আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ইউরোপে। ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্সে প্রথমে সামন্তবাদ এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন লড়াই এবং সংগ্রামের শাসনব্যবস্থাই হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিদ্যমান প্রধান অর্থনৈতিক বা উৎপাদনব্যবস্থার স্বার্থসাধকারী পরিচালন বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংল্যাণ্ডের সপ্তদশ শতকের এবং ফ্রান্সের অষ্টাদশ শতকের বিপ্লবসমূহের মধ্যে সেকালের উদীয়মান নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তথা পণ্য উৎপাদনকারী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চাহিদারই প্রকাশ ঘটেছিল। এজন্য এই বিপ্লবসমূহকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চাহিদারই প্রকাশ ঘটেছিল। এজন্য এই বিপ্লবসমূহকে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে অভিহিত করা হয়। এই নতুন শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাপ্ত বয়স্কদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আইনসভা বা পার্লামেণ্টের গঠন এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পরিচালনায় দেশের শাসন। শাসনব্যবস্থার এই কাঠামোগত রূপ একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা –প্রভৃতি অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-এর মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহের রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে পার্লামেণ্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা শাসন পরিচালনায় ব্যাপকতর জনসাধারণের চেতনা ও শক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় বলে কায়েমী স্বার্থ ও সংকীর্ণ চিন্তার বাহক এবং অর্থনৈতিক শ্রেণীর মুখপাত্র হিসাবে অনেক সময়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নাকচ করে সামরিক-চক্র শাসন কায়েক করেছে। অবশ্য এমন সামরিক শাসকদের ক্ষমতা দখলের এই অজুহাতটি উল্লেখযোগ্য যে প্রায়শ এরা বলে থাকে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে কিংবা দেশ গণতন্ত্রের উপযুক্ত হয় নি কিংবা দেশে আর্থিক ও আইন শৃঙ্খলার সংকট তীব্র হয়েছে, সে কারণে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠায় এরা বাধ্য হয়েছে এবং পরিণামে গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে। অর্থাৎ সামরিক শাসকরাও গণতন্ত্রকে চূড়ান্তরূপে নাকচ করে দিবার ক্ষমতা রাখে না।

আধুনিক কালের রাজনৈতিক আলোচনায় ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি আবার ব্যাখ্যামূলকভাবেও ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীতে আজ দুটি প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। এদের একটি ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। অপরটি হচ্ছে যৌথ বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই দুই ব্যবস্থার মুখপাত্রগণ সাধারণত প্রতিপক্ষীয় ব্যবস্থার পরিচালন বা শাসনকে যথার্থ গণতন্ত্র বলে স্বীকার করতে চায় না। মার্কসবাদীগণ পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের প্রধান তথা পুঁজিবাদী শ্রেণীর শাসন বলে অভিহিত করে; সংখ্যাগুরু শ্রমজীবী জগণের গণতান্ত্রিক শাসন নয়। বিপরীতভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমর্থকরা সমাজতান্ত্রিক দেশের শাসনব্যবস্থাকে একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা দলের ডিক্টেটরশীপ বলে অভিহিত করে থাকে। এরূপ বিতর্কের একটি তাৎপর্য এই যে, গণতন্ত্র যেমন একটি শাসনব্যবস্থা, তেমনি একটি আরাধ্য আদর্শও বটে। এ কারণে এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অপর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ‘গণতন্ত্র’ দ্বারা হুবহু অভিন্ন কোন শাসনব্যবস্থা বা কাঠামোকে বুঝান সম্ভব নয়।

Democratic Centralism: গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা

কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালন ব্যবস্থা এবং সমাজতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনীতি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং তত্ত্ব। ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা’ শব্দগতভাবে পরস্পর বিরোধী বলে বোধ হতে পারে। গণতান্ত্রিক বললে কেন্দ্রীকতা বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববিহীন একটি অবস্থা, আবার কেন্দ্রীকতা বললে গণতন্ত্রের অভাব মনে হয়। আসলে নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিকতা উভয়ই সঙ্গতিবিহীন সমাজ। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ প্রবল শ্রেণীল নেতৃত্ব এবং শাসনে পরিচালিত হয়। সেজন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের সে সমাজে যথার্থ গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক উদ্যোগ থাকে না। শাসক এবং প্রবল শ্রেণীর কেন্দ্রীকতাই তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক কথা শ্রেণীহীন সমাজে একদিকে যেখানে সমাজের সম্পদের ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রয়োজন, তেমনি সমাজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সকল কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত মানুষের সচেতন এবং সম্মতিসূচক অংশগ্রহণও আবশ্যক। এবং এ কারণেই কেন্দ্রীকতা এবং গণতন্ত্রের ভারসাম্য এবং সমন্বয় অপরিহার্য। এর যে-কোন একটি ব্যত্যয় সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নানা বিচ্যুতি এবং সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। এ দুটি উপাদানের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি যেমন উপলব্ধি করা আবশ্যক, তেমনি বাস্তব জীবনে উভয়ের প্রয়োগের চেষ্টা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মার্কসবাদীগণ লেনিনের এরূপ উক্তির উল্লেখ করেন যেখানে লেনিন বলেছেন “গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তর এবং ক্ষেত্রের উদ্যোগের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত এবং পরিচালনাকে সংযুক্ত করে সমাজের সামগ্রিক উন্নতি এবং বিকাশকে সম্ভব করে’।

Democritus: ডিমোক্রিটাস (৪৬০-৩৭০ খ্রি. পূ.)

প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত বস্তুবাদী দার্শনিক। জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রাচীনকালের প্রথম বিশ্বজ্ঞানী হিসাবেও ডিমোক্রিটাস স্মরণীয়। পদার্থবিদ্যা, মনোবিদ্যা, ন্যায়, গণিত, চিকিৎসা, কৃষি, চিত্রশিল্প, সাহিত্য, নীতিশাস্ত্র এবং সামরিক কৌশল –এরূপ বিচিত্র বিষয়ের উপর ২৯০ টি পুস্তক বা পুস্তকাংশ ডিমোক্রিটাস রচনা করেছিলেন বলে গবেষকগণ মনে করে। বিজ্ঞান ও দর্শনের সর্বপ্রথম বিশ্ব জগতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা লাভ করি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী সৃষ্টির মূল শক্তি হচ্ছে অণুর এবং মহাশূন্যতা। অসংখ্য মৌলিক অণু মহাশূন্যতার মধ্যে নিরন্তর আবর্তিত হচ্ছে। এই আবর্তনের অণুতে অণুতে সংঘর্ষ ঘটছে; মহাশূন্যতার মধ্যে সংযোগও সাধিত হচ্ছে। এই সংঘর্ষ এবং সংযোগের মাধ্যমে সৃষ্ট হচ্ছে সমস্ত রকম বস্তুপুঞ্জ। বস্তুর সৃষ্টির পেছনে আবর্তিত অণু ব্যতীত ঈশ্বর বা অণুর অতীত অপর কোনো সত্তা নেই। সংযুক্ত অণুর বিয়োজনে সৃষ্ট বস্তুর ধ্বংস। অণুর নতুনতর সংযোগে ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্তু আবার নতুনতন বস্তুরূপে সৃষ্ট হয়। অণুর মধ্যেই অণুর গতি। অণুর সঙ্গে অণুর পার্থক্য শুধু আকারে, অবস্থানে এবং পারস্পরিক সংযোগের প্রকারে। রঙ, স্বাদ কিংবা এরূপ অপর কোনো গুণ অণুর মধ্যে নেই। এ সমস্ত গুণ অণুর জটিল সংযোগক্রমে বস্তুর মধ্যে সৃষ্ট হয়। বিশ্ব চরাচরে যা কিছু সংঘটিত হচ্ছে তা অনুর কারণে অনিবার্যভাবে সংঘটিত হচ্ছে। বস্তুজগতে কারণহীনতা বলে কিছু নেই। আমাদের অজ্ঞানতা থেকেই আকস্মিকতা বা কারণহীনতার বিশ্বাস জন্মে। মানুষ আত্মাকে অ-বস্তু মনে করে। কিন্তু আত্মাও অণুর সংযোগ ফল। এ কারণে আত্মাও বস্তু, অ-বস্তু নয়। অণুর বিয়োজননে দেহের মৃত্যুর সঙ্গে আত্মারও মৃত্যু ঘটে। আত্মার অমরতা অযৌক্তিক কথা। বস্তুজগতের বাইরে দেবতাদেরও অপর কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না। দেবতাদের অস্তিত্ব থাকলে তারাও জন্ম-মৃত্যুর নিয়মে আবদ্ধ। দেবতাদের অস্তিত্বের যে বিশ্বাস সাধারণ মানুষ পোষণ করে, তার মূলে রয়েছে ধূমকেতু, ভূমিকম্প, উল্কাপাত, লাভার উদগীরণ ইত্যাকার বৃহৎ বৃহৎ প্রকৃতির ঘটনাপুঞ্জ সম্পর্কে অজ্ঞানতা ও ভীতি। তৎকালীন দাসভিত্তিক অভিজাততন্ত্রের সামাজিক ব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন ডেমোক্রিটাস। ডিমোক্রিটাসের বস্তুবাদের তত্ত্বকে আমরা পরবর্তী গ্রিক দার্শনিক এপিকুরাস এবং রোমান দার্শনিক লিউক্রেটিসারে বস্তুবাদের তত্ত্বকে আমরা পরবর্তী গ্রিক দার্শনিক এপিকুরাস এবং রোমান দার্শনিক লিউক্রেটিয়াসের মধ্যে অনুসৃত হতে দেখি।

Derozio: হেনরি ডিরোজিও (১৮০৯-১৮৩১ খ্রি.)

উনিশ শতকে বঙ্গে ইংরেজী শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে, বিশেষ করে কলকাতায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে নবজাগরণ সূচিত হয় তার অন্যতম প্রাণপুরুষরূপে স্মরণীয় হচ্ছেন হেনরি ডিরোজিও। ডিরোজিও এ্যাংলো ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু নিজেকে তিনি ভারতীয় বলে দাবি করতেন এবং বাংলার মণীষীগণও তাঁকে বাঙালীবলে গর্ববোধ করেন। মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে তিনি আকস্মিকবাবে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর এই স্বল্পকালের জীবনও মহৎ কর্ম এবং বিচিত্র উদ্যোগে এরূপ পূর্ণ ছিল যে, সে জীবনের স্মরণে উত্তর কালের মন শ্রদ্ধা এবং বিস্ময়ে ভরে ওঠে। ডিরোজিও ‘ইতিহাস, দর্শণ এবং ইংরেজী সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন’। তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত এবং যুক্তিবাদী। ১৮২৬ সনে তিনি হিন্দু কলেজে শিক্ষকরূপে যোগদান করেন। তাঁর চারিত্রিক উদারতা এবং সাহসন,ন সংস্কার-মুক্ত মন এবং জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ও দর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর দখল তাঁকে তাঁর ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষকে পরিণত করে। তাঁর গৃহে ছিল ছাত্রদের অবাধ অধিকার। যুগের বিচারে নিষিদ্ধ দ্রব্য এবং চিন্তা উভয়েরই ছিল তাঁর গৃহে তাঁর তরুণ ছাত্রদের আপ্যায়নের উপাদান। তিনি তাঁর ছাত্রদের প্রচলিত সকল রকম সামাজিক, ধর্মীয় এবং বুদ্ধিগত সংকীর্ণতা, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মনোভাব দ্বারা অনুপ্রাণিত করে তুলতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত বিতর্ক এবং আলোচনা সমিতি বা সভাসমূহ যে যুদের কলকাতারবিদ্বৎ মহলের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ডিরোজিওর শিষ্যদের ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বলা হতো। ডিরোজিও তরুণদের মধ্যে এরূপ বিদ্রোহের ভাব সৃষ্টি করাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন এবং প্রাচীনপন্থীদের বিরোধিতার কারণে তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষকতা থেকে ১৮৩১ সনের এপ্রিল মাসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং এই সনেই ১ জুন তারিখে তাঁর মৃত্যু হয়। (দ্র. সংসদ বাঙালি চিরতাভিধানঃ গোপাল হালদার: বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা।)

Descartes, Rene: দেকার্ত (১৫৯৬-১৬৫০ খ্রি.)

সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও গণিতশাস্ত্রবিদ বিজ্ঞানী। কর্মজীবনের দেকার্ত প্রতমে স্বদেশের সামরিক বাহিনীতে নিযুক্ত করেন এবং সেখানে প্রায় বিশ বছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে তিনি দর্শন ও বিজ্ঞানের চর্চা করেন। তাঁর বৈজ্ঞাননিক মতামতের জন্য হল্যাণ্ডের গোঁড়া ধর্মযাজকদের হাতে তাঁকে নানাপ্রকার নিগ্রহ ভোগ করতে হয়। তাদের নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য দেকার্ত অবশেষে সুইডেনে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সুইডেনেই মৃত্যুমুখে পতিত হন। জ্যামিতি এবং মেকানিক্স বা বলবিদ্যার ক্ষেত্রে দেকার্ত গতি এবং স্তিতির আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিয়ম আবিস্কার করেন। সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে বস্তুবাদী মত তখনো আশ্রুত। এ ক্ষেত্রেও দেকার্ত বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দেবার প্রয়াস পান। বস্তুর ব্যাখ্যায় দেকার্ত এরূপ মত পোষণ করতেন যে, বস্তুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার স্থানভিত্তিক বিস্তার। বস্তুর বিভিন্ন গুণের মধ্যে বিস্তারের ক্ষেত্রে বস্তু অনন্যনির্ভর। অর্থাৎ বস্তুর স্বাদ, গন্ধ, রঙ ইত্যাকার অন্যান্য গুণ মানুষের মনের উপর নির্ভরশীল হলেও বস্তুর বিস্তার মনের উপর নির্ভর করে না। দেকার্তের বস্তুবাদ অবিমিশ্র নয়। বস্তুর অস্তিত্ব যেমন তিনি স্বীকার করেছেন, তেমনি বস্তুর গতির প্রশ্নে তিনি ভাববাদের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তাঁর মতে বস্তুর গতির আদি কারণ হচ্ছে ঈশ্বর। ঈশ্বর গতি ও স্থিতি উভয়ই বস্তুর মধ্যে তৈরী করেন এবং গতি ও স্থিতির পরিমাণের অপরিবর্তনীয়তাও তিনি রক্ষা করেন। দেকার্তের এ মতবাদকে দ্বৈতবাদ বলা যায়। মানুষের দেহ এবং মনের ব্যাখ্যায়ও দেকার্ত দ্বৈতবাদী। মানুষ হচ্ছে দেহ এবং মনের সম্মিলিত সংগঠন। দেহ হচ্ছে মনহীন বস্তু আর মন হচ্ছে বস্তুহীন সত্তা। দেহ আর মন চরিত্রগতভাবে পরস্পর বিরোধী। এই দুই বিরোধী সত্তা পাইনিয়াল গ্লাণ্ড নামক একটি তন্ত্রীয় মাধ্যমে মিলিত হয়ে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়। বেকনের ন্যায় দেকার্তও প্রকৃতির কার্যকারণ জ্ঞাত হয়ে প্রকৃতিকে জয় করা এবং মানুষের চরিত্রকে উন্নত করাই জ্ঞানের উদ্দেশ্য বলে মনে করতেন। সঠিক জ্ঞানলাভের কি পদ্ধতি হবে? এর জবাবে দেকার্ত তাঁর বিখ্যাত সন্দেহবাদের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, সুনিশ্চিত জ্ঞানলাভের জন্য এমন একটি ভিত্তি থেকে শুরু করতে হবে, যে ভিত্তি সর্বপ্রকার সন্দেহের ঊর্ধ্বে। যে সূত্র সন্দেহযোগ্য তার মাধ্যমে সুনিশ্চিত জ্ঞানলাভ সম্ভব নয়। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে দেকার্ত প্রচলিত সমস্ত সূত্রের উপর সন্দেহ পোষণ করতে করতে ‘আমার নিজের অস্তিত্ব সন্দেহের ঊর্ধ্বে’ বা ‘কাজিটো আরগোসাম’ –এই সিদ্ধান্তে আসেন। ব্যক্তি সব কিছুতেই সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু সে নিজের অস্তিত্বকে সন্দেহ করতে পারে না। এ তত্ত্বের একটি অজ্ঞেয়বাদী তাৎপর্য আছে। কিন্তু দেকার্ত অজ্ঞেয়বাদী না হয়ে নিজের তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, নিজের অস্তিত্ব সন্দেহাতীত, এই সূত্রকে স্বতঃসিদ্ধ হিসাবে গ্রহণ করে আমরা জগতের সুনিশ্চিত জ্ঞানমণ্ডল আবার তৈরী করতে পারি। দেকার্তের এই জ্ঞানতত্ত্ব সাধারণত র‌্যাশনালিজম বা যুক্তিতত্ব নামে পরিচিত। তাঁর মতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজের অস্তিত্বের মতো আরো কতকগুলি জন্মগত সুনিশ্চিত সূত্রগুলি ঈশ্বর মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে দেন। ঈশ্বরের সৃষ্টি বলে এ সূত্রগুলি সন্দেহাতীত এবং সন্দেহাতীত সূত্রের ভিত্তিতে যুক্তি পরম্পরায় লব্ধ যে-কোন জ্ঞান সঠিক হতে বাধ্য। দেকার্ত তাঁর দর্শনে ও চিন্তায় যথার্থই দ্বৈতবাদী ছিলেন। এ কারণে একদিকে বস্তুবাদী মত দ্বারা তিনি যেমন গোঁড়ামীর বেড়াজাল বেঙে চিন্তার মুক্তিকে সাহায্য করেছেন, তেমনি অপরদিকে অতি-প্রাকৃতিক অস্তিত্বে জ্ঞানের মূল স্থাপন করে তিনি ইউরোপের আধুনিক দর্শনে ভাববাদী ধারারও প্রবর্তন করেন।

Determinism, Indeterminism: নির্ধারণবাদ, অনির্ধারণবাদ

জীবন ও জগতের সবকিছুই কার্যকারণের বিধান দ্বারা নির্ধারিত, এ তত্ত্বকে নির্ধরণবাদ বলা হয়। এর বিপরীতে, কোনো কিছুই কিছুর দ্বারা নির্ধারিত নয় কিংবা কোনো ঘটনা বা কার্য কিসের দ্বারা নির্ধারিত, তা ঈশ্বর বাদে কেউ জানে না এবং সে কারণে কোনো কিছু পূর্ব নির্ধারিত একথা মানুষ বলতে পারে না, এই বিশ্বাসকে অনির্ধারণবাদ বলা হয়। নির্ধারণবাদ এবং অনির্ধারণবাদ অনিবার্যতা এবং স্বাধীনতা কথাটিরই আর এক প্রকাশ। (দ্র. Freedom and Necessity: স্বাধীনতা এব অনিবার্যতা)।

Dewey, John: জন ডিউন (১৮৫৯-১৯৫২ খ্রি.)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত দার্শনিক এবং শিক্ষাবিদ জন ডিউইকে আমেরিকান প্রাগমেটিজম বা প্রয়োগবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করা হয়। তিনি তাঁর এই দর্শনে এই অভিমতের উপর জোর দেন যে, কোনো ভাবের যথার্থতার মাপকাঠি হচ্ছে বাস্তব জীবনে তাঁর প্রত্যাশিত ফল পাওয়া, না-পাওয়া। অর্থাৎ কার্যক্ষেত্রে কোনো বাব বা তত্ত্ব ফলদায়ক না হলে সে তত্ত্বের কোনো মূল্য নেই। চিকাগোতে তিনি তার চিন্তাধারার পরীক্ষাগার হিসাবে শিশুদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার বিষয়ে তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে, ‘দি স্কুল এ্যাণ্ড সোসাইটি’, ‘দি চাইলড এ্যাণ্ড দি কারিকুলাম’ এবং ‘হাউ ইউ থিঙ্ক’। ‘ডিমোক্রসি এ্যাণ্ড এডুকেশন’ তাঁর সমধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এর প্রকাশকাল ১৯১৬। শিক্ষার সমস্যার উপর রচিত তাঁর গ্রন্থসমূহে ডিউই শিশুদের শিক্ষাকে সমাজের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করা, কর্মের ভিত্তিতে শিক্ষা প্রদান, খেলাধুলার সঙ্গে শিক্ষার যোগ প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর গভীর চিন্তা ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত অভিমতসমূহকে প্রকাশ করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দ্বারা সমাজকে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষের প্রজ্ঞার যৌথ সম্মিলন ও প্রয়োগের উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

Dhirendranath Datta: ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬-১৯৭১) ১৯৪৮ সনের ২৩শে ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার প্রন্তটি উত্থাপন করেছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই। তিনি পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের সভ্য ছিলেন। উর্দু এবং ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলাকেও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি বলেই ১৯৪৮ সন থেকেই তিনি পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টির পাহারায় ছিলেন। তারই পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৪ই এপ্রিল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অকথ্য নির্যাতনের পর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাই ধীরেন্ত্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ: এ কথা ইতিহাসগতভাবে উল্লেখ করার দাবী রাখে।

Dialectics: দ্বন্দ্ব, দ্বান্দ্বিকতা

 

Dialectical Materialism: দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ

প্রাকৃতিক জগৎ, মানুষের সমাজ এবং চিন্তার ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল বিধানসমূহের পরিচায় জ্ঞাপক তত্ত্ব। ইংরেজী ‘ডায়ালেটিকস’ শব্দ গ্রিক শব্দ ‘ডায়ালোগ’ থেকে উদ্ভুত। গ্রিক দর্শনে ডায়ালোগ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সমাধান সন্ধানের পদ্ধতিকে গ্রিক দার্শনিকরা ডায়ালোগ বলতেন। প্রশ্ন, উত্তর বা পাল্টা প্রশ্নের মধ্যে একটা দ্বন্দ্বের অবস্থা বিরাজমান। এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে সমাধানের পৌঁছার প্রক্রিয়ায় একটা গতির আভাসও বিদ্যমান। বস্তুদ দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন, গতি, এ কথাগুলি পরস্পরের ইঙ্গিতসূচক। যেখানে দ্বন্দ্ব আছে, সেখানে পরিবর্তন ও গতি আছে। প্রাচীন গ্রিসের একাধিক বস্তুবাদী দার্শনিক জগৎ সম্পর্কে তাঁদের ব্যাখ্যায় এই দ্বন্দ্ব গতি ও পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেছেন। প্লেটো ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাববাদী দার্শনিক হলেও তাঁর সংলাপসমূহ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির উত্তম দৃষ্টান্ত। দ্বন্দ্ব কেবল প্রশ্নোত্তরের ক্ষেত্রে নয়। তার সংলাপে এরূপ আবাবসও পাওয়া যায় যে, ‘ভাব’ বা চরম যে সত্তা তাকেও নির্দ্বান্দ্বিকভাবে সম্যকরূপে উপলব্ধি করা যায় না। চরম সত্তা একদিক দিয়ে যেমন অস্তিত্ব, তেমনি অপর দিক দিয়ে সে অনস্তিত্ব, একদিকে সে যেমন নিজে যা তাই, তেমনি সে নিজে যা নয় তা-ও বটে। সে অপরিবর্তনীয়, আবার পরিবর্তনীয়। যে-কোনো অস্তিত্বের আভ্যন্তরিক দ্বন্দ্বকে অস্তিত্বের মূল বলে স্বীকৃতিদাব এবং জগৎ, সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ব্যাপকতম প্রয়োগ ঘটেছে আধুনিককালে মার্কসীয় দার্শনিকদের দ্বারা। এ দর্শনের প্রবক্তা হিসাবে কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেলস বিখ্যাত। মার্কস এবং এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিকতার পূর্ণতম ব্যাখ্যা হেগেল-এর দর্শনে ঘটেছে বলে মনে করেন। তাঁদের মতে প্রাচীন দর্শনের পর হেগেলই সুস্পষ্টভাবে দ্বান্দ্বিকতার নীতি প্রকাশ করেছেন। হেগেলের মতে আমাদের চিন্তাই যে কেবল অস্তি, নাস্তি এবং নাস্তির নাস্তিত্বের মাধ্যমে নতুনতর অস্তির উদ্ভবের প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয় তাই নয়, চরম সত্তাও অনুরূপ অস্তি ও নাস্তির দ্বন্দ্বের মাধ্যমে নিজের সত্তাকে সৃষ্টি করে চলে। মার্কস এবং এঙ্গেলস হেগেলের দ্বান্দ্বিক গতিকে স্বীকার করেছেন, অপর দিকে তেমনি চরম সত্তাকে ভাব বরে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কাছে বস্তু চরম ভাবের দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ার প্রকাশবিশেষ, বস্তু চরম সত্তা নয়। মার্কস এঙ্গেলস হেগেলের ক্রিয়াশীল তেমনি চরম সত্তা হচ্ছে বস্তু, ভাব নয়। ভাব হচ্ছে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে ক্রিয়াশীল বস্তুরই বিকাশবিশেষ। এদিক দিয়ে মার্কসবাদ হেগেলের দর্শনের পরিপূর্ণ প্রতিপক্ষ। কাজেই হেগেলীয় ডায়ালেকটিকস বা দ্বান্দ্বিকতা বস্তুর ক্রিয়াশীলতা এবং জ্ঞানের ক্রিয়াশীলতাকে একই সূত্রে আবদ্ধ করেছে। বস্তু এবং বস্তুর জ্ঞানের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা যায়: বস্তুর মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ম বিদ্যমান। দ্বন্দ্ব থেকে গতির সঞ্চার। দ্বন্দ্বহীন এবং গতিহীন কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই। দ্বন্দ্বমূলক গতিকে একটা বিশেষ অবস্থা থেকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, একটা বিশেষ অবস্থাকে যদি ‘অস্তি’ বলে বিবেচনা করা যায়, তা হলে দ্বন্দ্ব এবং গতির কারণে কালক্রমে ‘অস্তি’ নাস্তির সৃষ্টি করে, অস্তি ও নস্তির সংগ্রামে আবার কালক্রমে নতুনবাবে অস্তিত্বের সৃষ্টি হয় যার মধ্যে অস্তি ও নাস্তির অভিনব এবং উন্নততর সম্মেলন সংঘটিত হয়। ইংরেজীতে এই তিনটি অবস্থা ‘থিসিস’, ‘এ্যান্টিথিসিস’ এবং ‘সিনথেসিস’ বলে পরিচিত। দ্বান্দ্বিক গতির আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, দ্বন্দ্বের মাধ্যমে পরিবর্তনের ক্রম সব সময় এক রকম থাকে না। পরিবর্তনের ক্রম বৃদ্ধি পেয়ে পেয়ে অবস্থার ক্ষেত্রে একটা গুণগত পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে। মার্কস এবং এঙ্গেলস বস্তুর ক্ষেত্রে এই দ্বান্দ্বিকতার নীতি প্রয়োগ করে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ এবং সমাজ ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দ্বারা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আদি সাম্যবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজের উত্তরণকে মার্কসবাদীগণ ইতিহাসের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন। এই নীতিতে কালক্রমে পুঁজিবাদী সমাজ নতুনতন সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত হবে বলেও মার্কস ও এঙ্গেলস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সোভিয়েত রাশিয়া এবং অন্য অনেক দেশে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন এবং অপরদিকে পুঁজিবাদের পক্ষ থেকে তার তীব্র বিরোধিতা চলছে, একেও দ্বন্দ্বমূলক দর্শনের বাস্তব দৃষ্টান্ত বলে গণ্য করা হয়।

Dialogue: সংলাপ

সাহিত্যিক রচনায় দুটি চরিত্রের মধ্যকর কথোপকথনকে সংলাপ বলে। সাধারণ কথোপকথন থেকে সংলাপের বৈশিষ্ট্য এই যে, সংলাপ পূর্বপরিকল্পিত এবং এর মাধ্যমে রচনাকারী কোনো একটা প্রতিচাদ্যকে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণের স্তরে নিয়ে যান। কোনো সমস্যা বা প্রশ্নের উভয় দিক উপস্থাপনের জন্য সাহিত্যিকগণ সংলাপকে সব যুগেই একটি উত্তম কৌশল বলে বিবেচনা করেছেন। লেখক প্রশ্নের পরস্পরবিরোধী দুটি দিক দুই চরিত্রের মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থিত করেন যাতে যুক্তির খণ্ডনে যুক্তি অগ্রসর হতে হতে এমন সিদ্ধান্ত সমুপস্তিত হয় যেখানে আর বিরোধের অবকাশ থাকে না। যে চরিত্র প্রতিপাদ্যের প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করেছে সে চরিত্রও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতাকে স্বীকার করে। সংলাপমূলক রচনার উদ্ভব গ্রিক সাহিত্যে বলে অনেকে মনে করেন। সক্রেটিসকে প্রধান চরিত্র করে প্লেটো তাঁর সমস্ত দার্শনিক তত্ত্বকে সংলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁর রচনা কেবলমাত্র দার্শনিক এই বিতর্কের জন্যই নয়; তার নাটকীয়তা এবং রচনার মাধুর্যও অতুলনীয়। প্লেটোর সংলাপমূলক রচনাশৈলী কোনো উদ্ভাবন নয়। প্লেটোর পূর্বে গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে তত্ত্ব পেশ করার রীতি প্রচলিত ছিল। সক্রেটিস কোনো গ্রন্থ রচনা করেন নি। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তিনি অপর চরিত্রের সঙ্গে জীবন ও জগতের সমস্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতেন। এবং বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাত্ত্বিক বিষয় পেশ করার জন্য সংলাপের স্থানে নিবন্ধই প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সংলাপ একেবারে পরিত্যক্ত হয় না। বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিক অন্যান্য শৈলীর সঙ্গে সংলাপের শৈলীও ব্যবহার করেছেন। ইংরেজী সাহিত্যে দর্শনের ক্ষেত্রে জর্জ বার্কলের ‘হাইলাস ও ফিলোনাস’ –এর সংলাপ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

Dicast: ডাইকাস্ট

প্রাচীন এথেন্স নগর-রাষ্ট্রের একটি রাষ্ট্রীয় পদের নাম। ডাইকাস্টকে জুরী বা বিচার-ব্যবস্থা বলে মনে করা যায়। এথেন্সের যারা নাগরিক অর্থাৎ যারা দাস কিংবা ঋণের দায়ে নাগরিকতা থেকে বঞ্চিত হয় নি এমন নগরবাসীদের মধ্য থেকে প্রতি বছর ছহাজার বিচারকের একটি তালিকা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হতো। এই বিচারক বা ডাইকাস্টগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিধানের ব্যাখ্যা এবং বিরোধমূলক ঘটনার বিচার করতেন। গোড়ার দিকে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক না থাকলেও ডাইকাস্টদের জন্য পেরিক্লিস (খ্রি. পূ. ৪৯০-৪২৯) বেতন-দানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এথেন্সের রাজনীতিক দলাদলি ও বিরোধ দ্বারা বিশেভভাবে প্রভাবিত হত। নিরপেক্ষ বিবেচনা বা বিচারের পরিবর্তেথ ডাইকাস্টের সদস্যগণ তাদের মনোভাব এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা অধিক পরিচালিত হতেন। এথেন্সের বিচার-ব্যবস্থার এই দুর্নীতিকে বিষয় করে রচিত গ্রিক নাট্যকার এ্যারিন্সোফেনিসের ‘ওয়াসপ’ বা বোলতা নামক নাটক বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল।

Dictatorship of the proletariat: সর্বহারার একনায়কত্ব

সর্বহারার একনায়কত্ব কথাটি মার্কসবাদী রাষ্ট্রতত্ত্বের একটি ধারণা। মার্কসবাদী রাষ্ট্রতত্ত্বানুযায়ী শ্রেণীবিভক্ত সমাজে রাষ্ট্র হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত শাসক শ্রেণীর হাতে বিভিন্ন প্রকারে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অস্ত্র। মার্কসবাদীরা মনে করেন যে, মানব সমাজে রাষ্ট্র অতীতের সর্বযুগে বিদ্যমান ছিল না এবং ভবিষ্যতেও একদিন থাকবে না। আদিম সাম্যবাদী মানব সমাজে রাষ্ট্রের উদ্ভব সম্ভব ছিল না। উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতির একটা পর্যায়ে সমাজ যখন উৎপাদনের উপায়ের কিছু সংখ্যক মালিক এবং উৎপাদনের উপায়হীন অধিক সংখ্যক মানুষে বিভক্ত হয়ে গেল, তখনি মাত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। এই অবস্থায় উৎপাদনের উপায়ের একচ্ছত্র মালিকদের আইন প্রণয়নের এবং আইনভঙ্গকারীর শাস্তিবিধানের ব্যবস্থার। প্রথম যুগের শ্রেণীবিভক্ত অর্থাৎ দাস সমাজের রাষ্ট্র আধুনিককালের রাষ্ট্র থেকে সহজতর হলেও মূলত উভয়ের চরিত্রই এক। রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য উৎপাদনের মালিকদের মৌলিক স্বার্থ প্রতিপক্ষের হাত থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা। মার্কসবাদী তত্ত্বানুযায়ী শ্রেণীবিভক্ত দাস সমাজ, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ এবং পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ-এর প্রত্যেকটি পর্যায়েই রাষ্ট্র হচ্ছে শাসকশ্রেণীর একনায়কত্বের ধারক ও বাহক। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কথা বলা হলেও এর কোনো গণতন্ত্রই পুঁজিবাদের উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৭ সালের বিপ্লবে রাশিয়ায় এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তীকালে অপর কয়েকটি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের রূপ কি? এ প্রশ্নের জবাবে মার্কসবাদের অন্যতম ব্যাখ্যাকারী এবং নেতা ভি.আই. লেনিন বলেছেন যে, সমাজতন্ত্রও পরিপূর্ণরূপে শ্রেণীহীন রাষ্ট্র নয়। সমাজতন্ত্র শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ এবং পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থ পরস্পর-বিরোধী। এ কারণে শ্রমিকশ্রেণীকে বিপ্লব মারফৎ পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কোনো শ্রেণীই তার স্বার্থ বিনা প্রতিবাদে বা বিনা প্রতিরোধে প্রতিপক্ষকে ছেড়ে দেয় না। জীবনের ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। বিপ্লবের পূর্বে যেমন, বিপ্লবের পরেও তেমনি প্রকাশ্য-পরোক্ষ, সশস্ত্র-নিরস্ত্র এবং ভাবগত নানাভাবে পুঁজিবাদ শ্রমিকশ্রেণীকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বহির্দেশের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের সহায়তায় উচ্ছেদ করে পুনরায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কায়েম করার চেষ্টা সমাজতান্ত্রিক দেশে চলতে থাকা সম্ভব। এ কারণে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে নির্বিকার থাকলে চলে না। শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য তাকেও সংগঠনগত সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। তাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠন। এদিক থেকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রও একটি শ্রেণী-রাষ্ট্র। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এবং শ্রমিকশ্রেণীর একক নেতৃত্ব রক্ষাকারী সংগঠন। এ কারণে সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সংগঠনকে সর্বহারার বা শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব বলা হয়। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পার্থক্য এখানে যে, পুঁজিবাদ উচ্ছেদ হওয়ার করণে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষিত এবং উৎসাদিত পুঁজিপতি শ্রেণীর প্রতিরোধ বিলুপ্ত হলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষাকারী ভূমিকার প্রয়োজনও বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং সাম্যবাদী মানব সমাজে শ্রেণী হিসাবে কোনো বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থরক্ষা করার কোনো রাষ্ট্রীয় সংগঠনের প্রয়োজন আদৌ থাকবে না। রাষ্ট্র বলতে এখন যা বুঝায়, তেমন শক্তি প্রয়োগকারী সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মার্কসবাদের এই রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব থেকে দেখা যায় যে, সর্বহারার একনায়কত্ব পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে পৌঁছার জন্য আবশ্যকীয় একটি অন্তর্বর্তী স্তরবিশেষ। ১৮৭০ সালে প্যারিস শহরে শ্রমিকরাও বিপ্লবের মাধ্যমে প্যারিকম্যুরন নামে একটি শ্রমিক-রাষ্ট্র কায়েম করেছিল। ফরাসী ধনীকশ্রেণী শক্তি প্রয়োগ করে সেদিন তাকে পর্যুদস্ত করে দেয়। কার্লমার্কস এবং এঙ্গেলস প্যারিকম্যুনের পরিণতি থেকে সমাজতন্ত্র রক্ষার জন্য সর্বহারার একনায়কত্বের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন।

Diderot: দিদেরত (১৭১৩-১৭৮৪ খ্রি.)

অষ্টাদশ শতকে ফরাসিদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারের জন্য ‘বিশ্বকোষ’ রচনার পরিকল্পনা করেছিলেন মুক্তিবুদ্ধির যে পথিকৃতরা তাঁদের অন্যতম ছিলেন দিদেরাত। ইংল্যাণ্ডের প্রকাশিত সেকালের বিশ্বকোষের আদর্শে দিদেরস ফরাসি ভাষায় বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির উপর বিশ্বকোষ রচনার কথা চিন্তা করেন। এ কাজে তাঁর অপর এক সঙ্গী ছিলেন ডি’ আলেম্বার্ট। বিরাট প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে তাঁরা জ্ঞান প্রচারের এই পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে থাকলে ১৭৫৯ সনে সামন্ততান্ত্রিক সরকার এ পরিকল্পনার কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এমন অবস্থায় অনেক সঙ্গী তাঁকে পরিত্যাগ করেন। কিন্তু দিদেরত পরাজয় স্বীকার করতে থাকেন। তাঁর এই অদম্য চেষ্টা ক্রমান্বয়ে তাঁকে ফরাসি বিদ্বৎ মহলে সম্মান ও শ্রদ্ধার আসতে প্রতিষ্ঠিত করে। অভিজাত শ্রেণীর উদারপন্থী ব্যারণ এবং লেখক ডি হলবাক তাঁর পৃষ্ঠপোষক হন। বিশ বছরের চেষ্টায় ফরাসি বিশ্বকোষের যে ১৭টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল, সে জ্ঞানকোষ ফরাসি জনমানসে নতুন বৈজ্ঞানিক ও ইহজাগতিক এক দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। দারিদ্র্যের কারণে নিজের অপরিসীম পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত তার গ্রন্থাগারটিকে প্যারিস থেকে স্থানান্তর না করে প্যারিসে দিতেরতকে তার গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত করেন। বিশ্বকোষ তৈরির উদ্যোগের পূর্বে দিদেরত ফরাসি দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার অন্যায় এবং কুসংস্কারকে ব্যঙ্গ করে যে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সরকার তা নিষিদ্ধ করে দিদেরতকে কারাগারে বন্দি করেছিলেন। কিন্তু কোনো নির্যাতন মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা দিদেরতকে দমিন করতে পারে নি। তাঁর জীবনকালেই তিনি ফরাসি দেশের অন্যতম অগ্রসর চিন্তানায়ক এবং লেখক স্বীকৃতি লাভ করেন।

Diagenes: ডায়োজেনিস (খ্রি. পূ ৪১২-৩২৩)

ডায়োজেনিস ছিলেন গ্রিসের সিনিক বা উদাসীন দার্শনিক (দ্র. Cynic: উদাসীন) ডায়োজেনিস সিনি দর্শনের প্রবক্তা এ্যান্টিসথেনিসের শিষ্য ছিলেন। একবার সমুদ্রযাত্রায় জলদস্যুরা তাঁকে অপহরণ করে কোরিন্থে দাস হিসাবে বিক্রিয় করে। কোরিন্থে তিনি জীবনের বাকি অংশ অতিবাহিত করেন এবং তাঁর আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্বতাপালনমূলক দর্শনের প্রচার করেন। তাঁর সম্পর্কে নানা উপকথা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, সম্রাট আলেকজান্ডার তাঁর কি উপকার করতে পারেন এরূপ প্রশ্নকালে তিনি ব্যঙ্গসহকারে বলেছিলেন: আপনি দয়া করে আমার সূর্যের আলোকটুকু আড়াল না করে সরে দাঁড়াতে পারেন। ডায়োজেনিস মনে করতেন, জীবনের সার্থকতা ভোগে নয়, ত্যাগে এবং কষ্টভোগে, কৃচ্ছ্বতাসাধনে। কষ্ট এবং দুঃখভোগ উত্তম চরিত্র অর্জনের প্রকৃষ্ট উপায়। প্রকৃতিতে প্রত্যাবর্তন এবং সহজ জীবনযাপনেই মাত্র মানুষের সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অস্থিরতা থেকে মুক্তির পথ। ডায়োজেনিস প্লেটোর ভাব বা নির্বিশেষে সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। তাঁর মতে বিকাশই একমাত্র অস্তিত্ব। নির্বিশেষে অস্তিত্বহীন।

Distribution of Terms: পদের বণ্টন

যুক্তিবিদ্যায় একটি যুক্তির মধ্যে বাক্যের একটি টার্ম বা পদের সংখ্যা বা ব্যাক্তার্থকে সামগ্রিকভাবে বুঝানো হল বাক্যের সেই পদটিকে বণ্টিত পদ বা ডিস্ট্রিব্যুটেড টার্ম বলে। অবরোহ যুক্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যুক্তির মধ্যে পদের বণ্টন এবং অ-বণ্টনের প্রতি দৃষ্টি রাখা আবশ্যক হয়। যৌক্তিক বাক্যকে সাধারণত চারভাগে ভাগ করা হয় যথা: সার্বিক এবং বিশেষ; হ্যাঁ বাচক এবং না বাচক। একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সার্বিক হাঁ বাচক বাক্য তার উদ্দেশ্য পদকে, সার্বিক না বাচক তার উদ্দেশ্য বিধেয় উভয় পদকে, বিশেষ না বাচক কেবল তার বিধেয় পদকে বণ্টন করে। কিন্তু বিশেষ হ্যাঁ বাচক কোনো পদকেই বণ্টন করে না। সকল মানুষ মরণশীল, এটি একটি সার্বিক হাঁ বাচক বাক্য। এখানে উদ্দেশ্যপদ ‘মানুষ’ –এর সংখ্যা বা ব্যক্তার্থের সমগ্রের উপর বক্তব্যটি প্রযোজ্য বলে উদ্দেশ্য পদটি বণ্টিত। ‘কিছু মানুষ সৎ’ এটি একটি বিশেষ হ্যাঁ বাচক বাক্য। এখানে সকল মানুষের ক্ষেত্রে যেমন সততার কথাটি প্রযোজ্য নয়, তেমনি সকল সৎ-এর উপরও এই বাক্যের ‘কিছু মানুষ’ পদটি প্রযোজ্য নয়। এ কারণে এই বাক্যের কোনো পদই বণ্টিত নয়। যুক্তির মধ্যে কোনো পদ বণ্টন না করে সিদ্ধান্তে তাকে বণ্টন করা হলে অবণ্টিত পদের বণ্টনজনিত ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

Divine Right: ঐশ্বরিক অধিকার

ঐশ্বরিক অধিকার একটি রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী রাজা বিধাতার প্রতিনিধি। রাজার আনুগত্য বিধাতার প্রতি। প্রজার আনুগত্য রাজার প্রতি। রাজার কোনো কাজের জন্য রাজা প্রজার নিকট দায়ী থাকবে না। সে দায়ী থাকবে বিধাতার নিকট। রাজার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে যুক্তিসঙ্গত এবং জোরদার করার জন্য এক সময়ে এই তত্ত্ব বিশেষবাবে ব্যবহৃত হতো। এই তত্ত্ব এরূপ চরম আকারে রাষ্ট্রীয় শাসনে প্রয়োগ করতে শুরু করেন যে, এর ফলে সপ্তদশ শতকের ইংল্যাণ্ডে রাজার সঙ্গে পার্লমেন্ট ও জনসাধারণের বিরোধ তীব্র আকার গ্রহণ করেন। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্বের বিশেষ প্রভাব ছিল। ফরাসি বিপ্লব এই তত্ত্বকে আঘাত করে বুর্জোয়া বিপ্লব সংঘটিত করে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে।

Dream: স্বপ্ন

স্বপ্ত বয়স নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রায় নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। ‘নিদ্রার মধ্যে চেতনার একটি প্রকাশ’ বলে স্বপ্নের একটি সংজ্ঞা দেওয়া চলে। সাধারণভাবে একথা সত্য যে, নিদ্রার মধ্যে দেহের সচেতন কার্যাবলী বন্ধ বা স্থগিত থাকে। নিদ্রার মধ্যে আমরা কোনো দ্রব্যকে চোখ দিয়ে দেখি না। হাত নেড়ে কোনো কাজ করি না। পা দিয়ে হাঁটি না। তাই মনে করা হয়, নিদ্রার মধ্যে মস্তিষ্ক বিশ্রাম করে নিজের ক্ষয়কে পূরণ করে জাগরিক হয়ে পুনরায় কার্যে নিবদ্ধ হয়। কিন্তু নিদ্রার মধ্যে মস্তিষ্ক যে একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকে না তারই পরিচয় বহন করে মানুষের স্বপ্ন। আমরা বলি মানুষ স্বপ্ন দেখে। অবশ্যই আমরা চোখ দিয়ে স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে সচেতন সময়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের একরূপ অভিজ্ঞতা ঘটে। ‘স্বপ্ন’ ব্যাপারটা পূর্বে ঐশ্বরিক এবং রহস্যজনক ব্যাপার বলে মনে করা হতো। যেমন প্রাচীনকালে তেমনি এখনো সাধারণ মানুষ তাদের স্বপ্নের তাৎপর্য উদঘাটনের জন্য ধর্মীয় পুরুষ তথা পীর দরবেশ সন্ন্যাসীর শরণাপন্ন হয়। কিন্তু আধুনিককালে স্বপ্ন নিয়ে বৈজ্ঞানিকগণ, বিশেষ করে মনোবিজ্ঞানীগণ বিশেষ গবেষণা সম্পাদন করার চেষ্টা করেছেন। সাধারণভাবে আজকাল স্বপ্নকে বাস্তব জীবনের অপূর্ণ কামনা বাসনার একরকম পূরণ বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা দ্বারা দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্বপ্নের বিষয়ের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুদের বেশিরভাব স্বপ্নই তাদের সচেতন অবস্থার নানা আদর আবদার আঘাতের সঙ্গে জড়িত। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এরূপ সম্পর্ক সহজে ধরা না গেলেও, যে কামনা বাসনা মানুষ তার সচেতন সামাজিক জীবনে নানা বাধা নিষেধ সংকোচ ও সংস্কারে পূরণ করতে পারে না সেসব কামনা বাসনা প্রত্যক্ষরূপে না হলেও পরোক্ষ এবং নানা প্রতীকে নিদ্রার মধ্যে যে তাকে কিছুটা তৃপ্ত করতে পারে, এ অভিমত আজ সাধারণভাবে স্বীকৃত। স্বপ্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় বিংশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে ইউরোপের চিকিৎসাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী সিগমণ্ড ফ্রয়েডের গবেষণা ও প্রকাশনায়। ফ্রয়েড এবং তাঁর অনুসারী মনোবিজ্ঞানীগণ মনকে চেতন, অবচেতন ভাগে ভাগ করে বিবেচনা করেন। তাঁদের মনের চেতন ভাগ তেমন বৃহৎ নয়। মানুষের আপাত বিস্মৃত এবং অবদমিত চিন্তা, ভাবনা, উদ্বেগ, কামনা অবচেতনা এবং অচেতনে নিক্ষিপ্ত হলেও তারা বিলুপ্ত হয়ে যায় না। প্রত্যেকটি কামনা একটি শক্তি বা এনারজিবিশেষ। যে –কোন ভাবে প্রকাশের মাধ্যমে তার পূর্তি না ঘটলে তার বিলোপ ঘটে না। ফ্রয়েড স্বপ্নকে মানুষের অবচেতন এবং অচেতন জগতের রহস্য উদ্ধারের একটি চাবিকাঠি বলে গণ্য করেন। এই তত্ত্বের উপরই আধুনিক মনঃসমীক্ষণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

Dutt, Aswinkumar: অশ্বীনীকুমার দত্ত (১৮৫৬-১৯২৩ খ্রি.)

বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল জেলার অধিবাসী। অশ্বিনীকুমার তত্তের পৈতৃক বাড়ি এই জেলার বাটাজোড় গ্রামে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর পিতার কর্মস্থল পটুয়াখালীতে। পিতা ব্রজমোহন দত্ত একজন সাবজজ ছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের নেতৃস্থানীয় পরিবার বরিশালের দত্ত পরিবার। অশ্বিনীকুমার দত্ত এম, এ, বি, এল ছিলেন। ছাত্রজীবনের পরে কিছুকাল তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই তিনি শিক্ষকতার চাকুরী পরিত্যাগ করে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর পিতা ব্রজমোহনের নামে তিনি বি, এম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৮৪ সনে। ১৮৮৯ সনে ব্রজমোহন কলেজ বা বি.এম. কলেজকেও তিনি স্থাপন করেন। এই কলেজে তিনি পঁচিশ বছর কোনো বেতন গ্রহণ না করে অধ্যাপকের কাজ করেন। তাঁর উদ্যোগে ১৮৮৭ সনে বাখরগঞ্জ (বরিশাল জেলার পুরাতন নাম) ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড স্থাপিত হয়। অশ্বিনীকুমার দত্ত তৎকালীন ভারতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালী কর্মী ছিলেন। বরিশালের তিনি জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। ১৯০৬ সনে বরিশালে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে অশ্বিনীকুমার দত্তসহ কংগ্রেসের বহু নেতা আহত হন। ১৯০৮-১৯১০-এ অশ্বিনীকুমার কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার কর্মকাণ্ড কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজসেবামূলক কার্যে তাঁর সাংগঠনিক শক্তি তিনি নিয়োগ করেন। তি ব্রাহ্ম সমাজে যোগদান করেছিলেন এবং সমাজ ও ধর্ম সম্পর্কে তাঁর চিন্তাধারা ব্যাখ্যা করে যে সকল পুস্তক রচনা করেন –সে সকল পুস্তক তাঁকে একজন বিশিষ্ট সাধক এবং চিন্তাবিদ হিসাবে বৃহত্তর জনসমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর রচনাসমূহের মধ্যে ‘ভক্তিযোগ’, ‘কর্মযোগ’, ‘প্রেম’, ‘আত্মপ্রতিষ্ঠা’, ‘ভারতগীতি’ প্রভৃতি বিখ্যাত। বরিশালে বিখ্যাত স্বদেশ প্রেমিক চারণ কবি ও গায়ক মুকুন্দ দাস (যজ্ঞেস্বর দাস) অশ্বিনীকুমারের অনুপ্রেরণায় নিজের মুদী দোকানের ব্যবসায় পরিত্যাগ করে ‘মুকুন্দ দাস’ নামে খ্যাতি অর্জন করেন। সমগ্র জীবনব্যাপী তাঁর সমাজসেবা অশ্বিনীকুমারকে দেশব্যাপী মহৎ আত্মার অধিকারী বলে প্রতিষ্ঠিত করে। বরিশাল শহরে আজ অবধি বি.এম. স্কুল; বি.এম কলেজ এবং অশ্বিনীকুমার টাউন হল তাঁর কর্মোদ্যোগের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। পাকিস্তান-শাসনকালে ষাটের দশকে প্রতিক্রিয়াশীল মহল অশ্বিনীকুমারের অবদান অস্বীকার করে বরিশাল শহরের ‘অশ্বিনীকুমার টাউন হলে’র নাম পরিবর্তন করে ‘আয়ুব খাঁ টাউন হল’ রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক তরুণ সমাজ ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলনের সময়ে এই প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করে টাউন হলের নাম ‘অশ্বিনীকুমার টাউন হল’ হিসাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।

E

Eckecticism: সারবাদ, সমন্বয়বাদ

তত্ত্বের ক্ষেত্রে কেউ যদি একাধিক তত্ত্বের অংশবিশেষ গ্রহণ করে সবটা মিলিয়ে একটা তত্ত্বের আকার দেবার চেষ্টা করেন, তা হলে তাঁকে সারবাদী বা সমন্বয়বাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়। জ্ঞানের রাজ্যে বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে একটি মাত্র তত্ত্বই উদ্ভুত হয় নি। একই সমস্যার ব্যাপারে বিভিন্ন চিন্তাবিদ ও দার্শনিক বিভিন্ন মত উপস্থিত করেছেন। বস্তু, জীবন, জগৎ প্রভৃতির মূল চরিত্র কি? এ প্রশ্নে বস্তবাদ মনে করে যে, বস্তুই সব কিছুর মূল। অপরপক্ষে ভাববাদ মনে করে মানুষের মনের ভাব কিংবা ব্যক্তির মন নিরপেক্ষ এক চরম ভাবই হচ্ছে সব কিছুর মূল। এ দুটো মত পরস্পর বিরোধী। সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ মনে করে আর্থিক উৎপাদনেরর ক্ষেত্রে ব্যক্তির অর্থাৎ পুঁজিসম্পন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার অবাধ স্বাধীনতা এবং উদ্যোগই কাম্য। সমাজতন্ত্রবাদ মনে করে উৎপাদনের উপায়ের উপর সমষ্টির অধিকারই কাম্য, ব্যক্তিগত মালিকানা অসঙ্গত। এ দুটি মতও পরস্পর-বিরোধী। সাধারণত যে বস্তুবাদী, সে ভাববাদকে গ্রাহ্য করতে চায় না। যে পুঁজিবাদী, সমাজতন্ত্রবাদকে পুরোপুরি নাকচ করে। যে-কোন তত্ত্বের ব্যাখ্যাতা অনুসারীর পক্ষে এটাই যুক্তিসঙ্গত। কারণ একটি তত্ত্ব সামগ্রিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতার দাবির ভিত্তিতে। সাধারণ মানুষ সবসময়ে কোনো একটি তত্ত্বের একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে জীবন যাপন করে না। দৈনন্দিন প্রয়োজনে এবং সমস্যার সাময়িক জবাবে বিভিন্ন তত্ত্বের, এমনকি পরস্পর-বিরোধী তত্ত্বের পছন্দমতো অংশ সে গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না। এ প্রবণতা কেবল সাধারণের ক্ষেত্রে নয়। ইতিহাসে প্রখ্যাত অনেক চিন্তাবিদের মধ্যেও বিভিন্ন মত সমন্বয়ের প্রয়াস দেখা যায়। বিভিন্ন মতের সমন্বয়কে একটা প্রবণতা হিসাবে ব্যাখ্যা করাই সঙ্গত। সর্বমতের সমন্বয় মারফত কোনো ঐক্যবদ্ধ সামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব দাঁড় করানো সম্ভব নয়। যাঁরা এরূপ চেষ্টা করেন, তাঁদের মধ্যে মানুষের কল্যাণ সাধনের একটা সহজ আবেগই বেশি কাজ করে। তাঁরা মনে করেন, সত্য কোনো একটি তত্ত্বের মধ্যে নিহিত না থেকে সমস্ত তত্ত্বেই আংশিকভাবে প্রকাশিত হতে পারে। সত্যসন্ধানীর কাজ হবে সমস্ত ক্ষেত্র থেকে অংশসমূহকে একত্র করে সত্যের একটি সমগ্র-সত্তা তৈরি করা। এরূপ ইচ্ছার মধ্যে কল্পনার প্রকাশই বেশী। ফলে, সমন্বয়বাদী তত্ত্বের একটির সাথে অপরটির সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। সমন্বয়বাদীর মতে পুঁজিবাদ ও সমানতন্ত্রবাদ, বস্তুবাদ ও ভাববাদ একই সময়ে গ্রাহ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। সমন্বয়বাদী মনে করে, সমাজতন্ত্রবাদ এবং পুঁজিবাদ মিলিয়ে সর্বসমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। আধুনিককালের ন্যায় দর্শনের ইতিহাসে অতীতকালেও এরূপ সমন্বয়বাদী লেখক ও দার্শনিকের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। প্রাচীন রোমের বাগ্মী ও দার্শনিক সিসিরো (১০৬-৪৩ খ্রি পূ.) এরূপ সমন্বয়বাদী বলে প্রখ্যাত। সমন্বয়বাদের মনোভাব থেকে তিনি মতামত-নিরপেক্ষভাবে প্রাচীন গ্রিকদর্শনের সর্বপ্রকার দার্শনিক মতকে রোমকদের কাছে পেশ করার চেষ্টা করেন।

 

About সরদার ফজলুল করিম