কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইলাহ

 

আভিধানিক তত্ত্ব

শব্দটির মূল অক্ষর আলিফ -লাম-হা (——-)। এ মূল অক্ষর থেকে অভিধানে যেসব শব্দ পাওয়া যায়, তার বিবরণ এইঃ

——– সে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছে।

——– তার আশ্রয়ে গিয়ে বা তার সাথে সর্ম্পক স্থাপন-করে আমি শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করেছি।

—————————— কোন দুঃখ -কষ্টে পড়ে লোকটি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছে, অতপর অপর কোন ব্যক্তি তাকে আশ্রয় দান করেছে।

—————————— প্রবল আগ্রহ বশত লোকটি অপর ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ দিয়েছে।

———————– মাতৃহারা উষ্ট্রীর বাচ্চা মাকে পেয়েই তার কোলে আশ্রয় নিয়েছে।

—————————– আচ্ছাদিত বা প্রচ্ছন্ন হয়েছে, বুলন্দ হয়েছে, ওপরে উঠেছে।

————-ইবাদাত করেছে।

————– এর অর্থ ইবাদাত (পুজা) ও ইলাহ অর্থ মাবুদ কোন্ কারণে কি সম্পর্কে হয়েছে, এসকল ধাতুগত অর্থের প্রতি লক্ষ করলে তা জানা যায়।

একঃ প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষের অন্তরে ইবাদাতের প্রাথমিক প্রেরণা সৃষ্টি হয়। তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, বিপদাপদে তাকে আশ্রয় দিতে পারে এমন একটা দারণা মানুষের মনে জাগার আগে সে কারো ইবাদাতের কথা কল্পনাও করতে পারে না।

দুইঃ কাউকে নিজের চেয়ে উন্নততর মনে না করে মানুষ তাকে অভাব পূরণকারী বলে ধারণাও করতে পারে না। কেবল পদ-মর্যাদার দিক থেকে তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়, বরং শক্তি -সামর্থের দিক থেকেও তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে হবে।

তিনঃ একথাও সত্য যে, কার্যকারণ পরস্পরার অধীন যেসব বস্তু দ্বারা সাধারনত মানুষের প্রয়োজন পুরণ হয়; যার প্রয়োজন পূরণের সকল কার্য মানুষের চক্ষুর সম্মুখে বা তার জ্ঞান-সীমার পরিমন্ডলে থাকে, তার পূজা-অর্চনার কোন প্রেরণা মানুষের মনে জাগে না। উদাহরণ স্বরূপ ব্যয় করার জন্য আমার টাকার প্রয়োজন, আমি কোন ব্যক্তির নিকট গিয়ে চাকুরী বা মজুরীর জান্যে আবেদন করি। সে ব্যক্তি আমার আবেদন গ্রহণ করে আমাকে কোন কাজ দেয়, আর সে কাজের বিনিময়ও আমাকে দেয়। এসব কার্য যেহেতু আমার পঞ্ঝ ইন্দ্রিয় ও জ্ঞান -সীমার মধ্যে সংঘটিত হয়েছে, আমি জানি সে কিভাবে আমার প্রয়োজন পূরণ করেছে। তাই তার পূজনীয় হওয়ার কোন ধারণাও আমার অন্তরে উদয় হয় না। যখন কারো ব্যক্তিত্ব, শক্তি -সামর্থ বা প্রয়োজন পূরণ এবং প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া রহস্যাবৃত তাকে-কেবল তখই কোন ব্যক্তিকে পূজা করার ধারণা আমার অন্তরে জাগতে পারে। এজন্যই মা’বুদের জন্যে এমন শব্দ চয়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রাধান্যের সাথে প্রচ্ছন্নতা ও অস্থিরতা-চঞ্ঝলতার অর্থও শামিল রয়েছে।

চারঃ যার সম্পর্কেই মানুষ ধারণা করে যে, অভাবের সময় সে অভাব দূর করতে পারে, বিপদের সময় আশ্রয় দিতে পারে, অস্থিরতার সময় শান্তি দিতে পারে, আগ্রহের সাথে তার প্রতি মনোযোগী হওয়া মানুষের জন্যে অপরিহার্য।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে জানা যায় যে, যে সকল ধারণার ভিত্তিতে মা’বুদের জন্য ইলাহ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তা এইঃ প্রয়োজন পূরণ করা, আশ্রয় দান করা, শান্তি-স্বস্তি দান করা, উচ্চতর ক্ষমতার অধিকারী হওয়া, প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হওয়া, যে সকল অধিকার ও ক্ষমতার ভিত্তিতে এ আশা করা যেতে পারে যে, মা’বুদ অভাব পূরণকারী এবং আশ্রয় দানকারী হতে পারে এমন সব ক্ষমতা, অধিকারের মালিক হওয়া, তার ব্যক্তিত্ব রহস্যাবৃত হওয়া বা সাধারণ দৃশ্যপটে না থাকা, তার প্রতি মানুষের আগ্রহী হওয়া।

ইলাহ ম্পর্কে জাহেলী যুগের ধারণা

এ আভিধানিক তত্ত্ব আলোচনার পর আমরা দেখবো, উলুহিয়্যাত সম্পর্কে আরববাসী এবং প্রাচীন জাতিসমূহের এমন কি ধারণা ছিলো, যা কোরআন রদ করতে চায়।

—————————– তারা আল্লাহ ছাড়া আরও ইলাহ বানিয়ে রেখেছে, যেন তা তাদের জন্যে শক্তির কারণ হতে পারে (বা তার আশ্রয়ে এসে তারা নিরাপদ হতে পারে) ছুরা: মারিয়ামঃ ৮১

একঃ ———————————— তারা আল্লাহ ছাড়া আরও ইলাহ বানিয়ে রেখেছে, এ আশায় যে, তাদের সাহায্য করা হবে (অর্থাৎ সে সকল ইলাহ তাদের সাহায্য করবে) ছুরা: ইয়াছিনঃ ৮৪

এ আয়াতদ্বয় থেকে জানা যায় যে, জাহেলী যুগের লোকেরা যাকে ইলাহ বলতো, তার সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিলো এই যে, সে তাদের নায়ক, চালক,বিপদাপদে তাদেরকে হেফাযত করে, তার সাহায্য পেয়ে তারা ভয় ও অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে।

দুইঃ —————————– অতঃপর যখন তোমার রব-এর ফয়সলার সময় উপস্থিত হলো, তখন আল্লাহ ব্যতীত যে ইলাহকে তারা ডাকতো, তা তাদের ধ্বংস ব্যতীত অন্য কোন ব্যাপারে সংযোজনের কারণ হতে পারে নি। -ছুরা হুদঃ ১০১

——————————————– আল্লাহ্ র পরিবর্তে এরা যাকে ডাকে, সে তো কোন জিনিসেরই স্রষ্টা নয়, বরং সে তো নিজেই সৃষ্ট জীব। জীবন্ত নয়, মৃত সে। কবে নব জীবন দিয়ে তাদের পুনরুত্থিত করা হবে, তারও কোন খবর নেই, তাদের এক ইলাহ -ই তো হচ্ছেন তোমাদের ইলাহ। _ আন-নাহালঃ ২০-২২

———————— আর আল্লাহ্ র সাথে অপর কোন ইলাহকে ডেকো না। তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই।১ -ছুরা-কাসাসঃ ৮৮

(১)(এখানে স্মর্তব্য যে, কোরআনে ইলাহ শব্দ দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। একঃ এমন মা’বুদ (উপাস্য) কার্যত যার ইবাদাত করা হচ্ছে, সে মাবুদ সত্য হোক বা মিথ্যা। দুইঃ মা’বুদ,মুলত যিনি ইবাদাতের যোগ্য। এ আয়াতে দু’স্থানে এই দুই পৃথক পৃথক অর্থে ইলাহ শব্দটি ব্যাবহৃত হয়েছে।)

———————— যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য শরীকদের ডাকছে, তারা নিছক কল্পনা ব্যতীত আর কিছুরই অনুসরণ করছে না। তারা কেবল ধারনা-কল্পনার অনুসরণ করে কল্পনার পেছনেই ছুটে চলে। -ইউনুসঃ ৬৬

এ আয়াতগুলোতে কয়েকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। একঃ জাহেলী যুগের লোকেরা যাকে ইলাহ বলতো, অসুবিধা দূরীকরণ এবং অভাব পূরণের জন্যে তারা তাকে ডাকতো। অন্য কথায়, তারা তার নিকট দোয়া করতো।

দুইঃ তাদের এই ইলাহ শুধু জিন, ফেরেশতা বা দেবতা-ই ছিল না, বরং মৃত ব্যক্তিও ছিল। কোরআনের এ আয়াত থেকে একথা স্পষ্ট জানা যায়-

——————- তারা মৃত, জীবিত নয়। কবে পুনরুথ্থিত হবে, তাও তারা জানে না।

তিনঃ যে সকল ইলাহ সম্পর্কে তারা ধারণা করতো যে, তারা ওদের দোয়া শুনছে তাদের সাহায্যে হাজির হতেও তারা সক্ষম।

দোয়ার তাৎপর্য এবং তাদের কাছ থেকে যে সাহায্য আশা করা হয়। তার ধরন-প্রকৃতিও এখানে স্মরণ রাখা দরকার। আমার যদি পিপাসা পায়, আর আমি খাদেমকে পানি আনার জন্যে ডাকি অথবা আমি যদি অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্যে ডাক্তার ডাকি,তবে তাকে দোয়া বলা চলে না।খাদেম বা চিকিৎসককে ইলাহ বানানোও এর অর্থ নয়। কারণ এসব কিছুই কার্যকারণ পরস্পরার অধীন-তার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু আমি পিপাসার্ত বা অসুস্থ অবস্থায় খাদেম-চিকিৎসককে না ডেকে যদি কোন ওলী-বুযুর্গ বা কোন দেবতাকে ডাকি তবে তা হবে তাকে ইলাহ বানানো এবং তার নিকট দোয়া চাওয়া কারণ যে ওলী-বুযুর্গ ব্যক্তি আমার থেকে হাজার মাইল দূরে কবরে শুয়ে আছেন, তাঁকে ডাকার অর্থ, আমি তাঁকে শ্রোতা-দ্রষ্টা মনে করি। তাঁর সম্পর্কে আমি এ ধারণা পোষণ করি যে, কার্যকারণ জগতের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত, যার ফলে তিনি আমার কাছে পানি পৌছাতে পারেন, পারেন আমার অসুখ দূর করার ব্যবস্থা করতে। অনুরূপভাবে এমতাবস্থায় কোন দেবতাকে ডাকার অর্থ হচ্ছেঃ পানি বা সুস্থতা-অসুস্থতার উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। অতি প্রাকৃতিকভাবে আমার অভাব পূরণ করার জন্যে তিনি কার্যকারণকে সক্রিয় করতে পারেন। সুতরাং যে ধারণার ভিত্তিতে ইলাহর নিকট দোয়া চাওয়া হয়, তা অবশ্যই এক অতি প্রাকৃতিক শক্তি (Supernatural Authority) আর এর সাথে রয়েছে অতি প্রাকৃতিক শক্তির অধিকরী হওয়ার ধারণা।

তিনঃ —————————————————- তোমাদের আশে-পাশে যেসব জনপদের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় তার বাসিন্দাদের আমরা ধ্বংস করেছি। তারা যাতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে এজন্যে আমরা তাদেরকে বারবার পর্যায়ক্রমে আমাদের নিদর্শন দেখিয়েছি। আল্লাহ্ কে ত্যাগ করে তারা যাদেরকে নৈকট্য লাভের মাধ্যমে মনে করে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছিলো, তারা কেন তাদের সাহায়্য করে নি? সাহায্য করা তো দূরে থাক, বরং তারা তাদেরকে ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলো। তাদের মিথ্যা মনগড়া আচরণের এটাই ছিলো স্বরূপ। – -ছুরা: আল আহকাফঃ ২৭-২৮

———————————————— যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি কেন তাঁর ইবাদাত করবো না, যাঁর দিকে তোমাদের সকলকে ফিরে যেতে হবে? তাঁকে ত্যাগ করে আমি কি ওদেরকে ইলাহ বানাবো, যাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, রহমান যদি আমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করেন, তখন তাদের সুপারিশ আমার কোন কাজেই আসবে না, পারবে না তারা আমাকে মুক্ত করতে? – ছুরা: ইয়াছিনঃ ২২-২৩

———————————————– আল্লাহ ছাড়াও যারা অন্যকে সহযোগী কর্মকুশলী বানিয়ে রেখেছে এবং বলে যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ্ র নিকটবর্তী করবে, এজন্যই আমরা তাদের ইবাদাত করছি। যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে, আল্লাহ (কেয়ামতের দিন) তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। – জুমারঃ ৩

——————————————- তারা আল্লাহ ছাড়া এমন শক্তিরও ইবাদাত করছে, যারা তাদের উপকার- অপকার কোনটাই করতে পারে না। তারা বলেঃ এরা আল্লাহ্ র কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে।- ইউনুসঃ ১৮

এ আয়াতগুলোতে আরও কতিপয় বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এসব আয়াত থেকে জানা যায় যে, জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের ইলাহ সম্পর্কে একথা মনে করত না যে, সমস্ত খোদায়ী তাদের মধ্যে বিলি-বন্টন করা হয়েছে, তাদের ওপরে কোন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নেই। তারা স্পষ্টত এক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ধারণা পোষণ করতো। এজন্যে তাদের ভাষায় ছিলো আল্লাহ শব্দটি। অন্যান্য ইলাহ সম্পর্কে তাদের মৌল বিশ্বাস ছিলো এই যে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের খোদায়ীতে তাদের এ সকল ইলাহর কিছুটা দখল ও প্রভাব আছে। এদের কথা মেনে নেয়া হয়, এদের মাধ্যমে আমাদের কার্য সিদ্ধি হতে পারে, এদের সুপারিশ দ্বারা আমরা উপকৃত হতে পারি, বাঁচতে পারি অনিষ্ট থেকে। এসব ধারণার ভিত্তিতেই তারা আল্লাহর সাথে এ সবকেও ইলাহ মনে করতো। তাই তাদের পরিভাষা অনুযায়ী কাউকে আল্লাহর নিকট সুপারিশকারী মনে করে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, তার সামনে সম্মান -শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং নযর-নেয়ায পেশ করা মানে তাদেরকে ইলাহ বানানো।১

টিকাঃ(১) ( এখানে জেনে নেয়া দরকার যে, সুপারিশ দু’প্রকার। একঃ এমন ধরনের সুপারিশ, যা কোন-না-কোন রকম শক্তি বা প্রভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে কোন রকমে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা মানিয়ে নিয়ে তবেই ছাড়া হয়। দুইঃ যার ধারণা নিছক আবেদন -নিবেদনের অনুরূপ জোর পূর্বক মানিয়ে নেয়ার মতো কোন ক্ষমতা যার পেছনে কার্যকর থাকে না। প্রথম অর্থ অনুযায়ী কাউকেও সুপারিশকারী মনে করা, তাকে ইলাহ বানানো, খোদার খোদায়ীতে অংশীদার করা এক কথা। কোরআন এ ধরনের সুপারিশ অস্বীকার করে। দ্বিতীয় অর্থ অনুযায়ী নবী-রসূল, ফেরেশতা, সাধু -সজ্জন, মোমেন ও সব বান্দা অন্য বান্দাদের জন্যে সুপারিশ করতে পারে। কারো সুপারিশ কবুল করা না করার পূর্ণ ইখতিয়ার রয়েছে আল্লাহর। কোরআন ও ধরনের সুপারিশ স্বীকার করে।)

———————————————————————————- আর আল্লাহ বলেনঃ দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। ইলাহ তো কেবল একজনই। সুতরাং তোমরা কেবল আমাকেই ভয় করো। ছুরা-নহরঃ ৫১

——————————————————————————— (ইব্রাহীম বলেন), তোমারা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করছো আমি তাদেরকে আদৌ ভয় করি না। অবশ্য আমার রব যদি কিছু চান তবে তা অবশ্যই হতে পারে। – আল-আনআম-৮০

———————————————————————- (হুদ -এর জাতির লোকেরা তাঁকে বললো) আমরা বলবো, আমাদের কোনও এক ইলাহ তোমাকে আভিশাপ করেছে। ছুরা -হুদঃ ৫৪

এসব আয়াত থেকে জানা যায় যে, জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের ইলাহ সম্পর্কে আশংকা করতো যে, আমারা যদি তাদেরকে কোনভাবে নারাজ করি বা আমরা যদি তাদের শুভ দৃষ্টি থেকে বঞ্ঝিত হেয়ে পড়ি তাহলে আমাদের উপর রোগ-শোক, অভাব -আনটন, জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি এবং অন্যান্য রকমের বিপদ আপতিত হবে।

পাঁচঃ ——————————————————————————– তারা আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদের ওলামা ও পাদ্রীদেরকে তাদের রব বানিয়ে নিয়েছে। মসীহ ইবনে মরিয়ামকেও রব বনিয়েছে। অথচ তাদেরকে বেবল এক ইলাহর ইবাদাতের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো, তিনি ভিন্ন আর কোন ইলাহ নেই। ছুরা-তওবাঃ ৩১

———————————————————————————- যে ব্যক্তি তার মনের লোভ-লালসাকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে, তার সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? তুমি কি তার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারো?আল-ফোরানঃ ৪৩

——————————————————————————– এমনি করে অনেক মুশরেকদের জন্যে তাদের মনগড়া শরীকরা (অর্থাৎ ইলুহিয়াতের ব্যাপারে অংশীদাররা) নিজেদের সন্তান হত্যার কাজকে কতই না সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। -আল-আনআমঃ ১৩৭

—————————————————————————- তাদের কি এমন শরিক (অর্থাৎ উলুহিয়াতের ব্যাপারে অংশীদার) রয়েছে, যারা তাদের জন্যে এমন শরীয়ত নির্ধারণ করেছে, যার আল্লাহ অনুমতি দেন নি। আশ-শুরাঃ ২১

এ সকল আয়াতে ইলাহর আর একটি অর্থ পাওয়া যায়। পূর্বের অর্থগুলো থেকে এ অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এখানে এমন কোন অতি-প্রাকৃতিক ব্যক্তির ধারণা অনুপস্থিত। যাকে ইলাহ বানানো হয়েছে, তা হয় কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তির প্রবৃত্তি। তার নিকট দোয়া করা হতো বা তাকে হিতাহিতের অধিকারী মনে করা হতো এবং তার আশায় প্রার্থনা করা হতো-এ সকল অর্থে এখানে ইলাহ বানানো হয় নি, বরং তাঁকে ইলাহ বানানো হয়েছে এ অর্থে যে, তাঁর নির্দেশকে আইন হিসাবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, তার আদেশ-নিষেধ মেনে নেয়া হয়েছে তার হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। এ ধারণা করে নেয়া হয়েছে যে, তাঁর নির্দেশ দেয়ার বা নিষেধ করার ইখতিয়ার রয়েছে; তাঁর চেয়ে উর্ধ্বতন এমন কোন অথরিটি (Authority) নেই যার অনুমেদন গ্রহণ বা যার দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজন পড়তে পারে।

প্রথম আয়াত ওলামা ও পাদ্রীদেরকে (কোরআনের ভাষায় আহবার ও রোহবান) ইলাহ বানাবার উল্লেখ রয়েছে। এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাই আমরা হাদীসে। হযরত আদী ইবনে হাতেম (রাঃ) এ আয়াত সম্পর্কে, রসূলুল্লাহ্ (স) কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ তোমাদের ওলামা ও রাহেব-পাদ্রীরা যে জিনিসকে হালাল করেছে, তোমরা তাকে হালাল মনে করতে, আর তারা যাকে হারাম করতো, তোমরা তাকে হারাম বলে স্বীকার করে নিতে। এ ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম কি, তার কোন পরওয়াও করতে না তোমরা।

দ্বিতীয় আয়াতটির অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট। যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির আনুগত্য করে তার নির্দেশকেই সর্বোচ্চ স্থান দেয়, মূলত সে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকেই ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। আলোচ্য আয়াত থেকে একথা সহজেই জানা যায়।

অবশ্য পরবর্তী আয়াতদ্বয়ের ইলাহর পরিবর্তে ‘শরীক’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আমরা আয়াতের তরজমায় স্পষ্ট করে দিয়েছি যে, শরীক এর অর্থ উলুহিয়াত-এর অংশীদার করা। এ আয়াতদ্বয় স্পষ্ট ফয়সালা করছে যে, আল্লাহর নির্দেশের প্রমাণ ছাড়াই যারা কোন প্রথা বা নিয়ম -বিধানকে বৈধ আইন বলে মনে করে, সে আইন প্রণেতাকে তারা উলুহিয়াতে আল্লাহর শরীক করে।

ইলাহ বনাম ক্ষমতা

ইলাহ-এর যতগুলো অর্থ ওপরে আলোচিত হয়েছে, তার সবগুলোর মধ্যে এক যুক্তিপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। যে ব্যক্তি অতি-প্রাকৃতিক অর্থ কাউকে সাহায্যকারী, সহযোগী, অভাব দূরকারী, প্রয়োজন পূরণকারী, দোয়া শ্রবণকারী, ইষ্ট বা অনিষ্ট সাধনকারী বলে মনে করে, তার এমনটি মনে করার কারণ এই যে, তার মতে সে ব্যক্তি বিশ্ব-জাহান পরিচালনায় কোন-না-কোন প্রকার ক্ষমতার অধিকারী। অনুরূপভাবে কেউ যদি কোন ব্যক্তকে ভয় করে এবং মনে করে যে, তার অসন্তুষ্টি আমার জন্যে ক্ষতির কারণ এবং সন্তুষ্টি কল্যণকর। তার এ বিশ্বাস ও কর্মের কারণও এছাড়া আর কিছুই নয় যে, তার মনে সে ব্যক্তি সম্পর্কে এক ধরনের শক্তির ধারণা রয়েছে। অপরপক্ষে কোন ব্যক্তি মহান আল্লাহ রাব্বুল-আলামীনকে স্বীকার করা সত্ত্বেও অভাবে অন্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তার এহেন কর্মের কারণও শুধু এই যে, খোদার খোদায়ীতে সে অন্যকে কোন-না-কোন প্রকার অংশীদার বলে মনে করে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কারো নির্দেশকে আইন এবং কারো আদেশ-নিষেধকে অবশ্য পালনীয় বলে মনে করে, সেও তাকে সবোর্চ্চ ক্ষমতার অধিকারী স্বীকার করে। সুতরাং উলুহিয়াতের প্রকৃত স্পিরিট হচ্ছে ক্ষমতা। বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপনায় তার কর্তৃত্ব অতি-প্রাকৃতিক ধরনের বা বৈষয়িক জীবনে মানুষ তার নির্দেশের অধীন; আর তার নির্দেশ যথাস্থানে অবশ্য পালনীয়- এর যে কোন অর্থেই সে ক্ষমতাকে স্বীকার করে নেয়া হোক না কেন।

কোরআনের যুক্তি

ক্ষমতার এ ধারনার ভিত্তিতেই গায়রুল্লার অস্বীকার এবং কেবল আল্লাহর ইলাহিয়াত প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই কোরআন সর্বশক্তি নিয়োজিত করে।কোরআনের যুক্তি এই যে, আসমান-যমীনে একক সত্তাই সকল ক্ষমতা ইখতিয়ারের মালিক। সৃষ্টি করা,নিয়ামত দান করা,নির্দেশ দেয়া,শক্তি-সামর্থ্য-সব কিছুই তাঁর হস্তে নিহিত।সব কিছুই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাঁর আনুগত্য করছে।তিনি ব্যতিত কারো কোন ক্ষমতা নেই, নেই কারো নির্দশ দানের অধিকার, সৃজন, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার রহস্য সম্পর্কেও কেউ অবগত নয়, তাঁর শাসন-ক্ষমতায় কেউ সামান্যতম অংশীদারও নয়। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তিনি ব্যতীত অপর কোন ইলাহ নেই। আসলে যখন অন্য কোন ইলাহ নেই, তবে অন্যদেরকে ইলাহ মনে করে তোমরা যেসব কাজ করছো মূলত ভুল ও অন্যায়। সে কাজ দোয়া-প্রার্থনা করা, সুপারিশকারী বানানো বা নির্দেশ পালন এবং আনূগত্য করার-যে কোন কার্যই হোক না কেন, তোমরা অন্যের সাথে যে সকল সম্পর্ক স্থাপন করে আছো তা সবই কেবল আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। কারণ তিনিই হচ্ছেন একক ক্ষমতার অধিকারী।

এ ব্যাপারে কোরআন যেভাবে যুক্তি উপস্থাপনা করছে, তা কোরআনের ভাষায়ই শুনুনঃ

————————————————————————————- আর তিনি হচ্ছেন এমন এক সত্তা, যিনি আসমানেও ইলাহ, আর যমীনেও ইলাহ এবং তিনি হাকীম ও আলীম-অতি কৌশলী, মহাজ্ঞানী (অর্থাৎ আসমান-যমীনে রাজত্ব করার জন্যে যে জ্ঞান ওকৌশল দরকার, তা সবই তাঁর আছে)- ছুরা-আয-যুখরুফঃ ৮৪

—————————————————————————— তবে কি যে সৃষ্টি করে আর যে সৃষ্টি করে না, দু’জনে সমান হতে পারে? —— এ সামান্য কথাটুকুও কি তোমাদের উপলব্ধিতে আসে না? —– আল্লাহকে বাদ দিয়ে এরা অন্য যাদেরকে ডাকে, তারা তো কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তারাই তো অন্যের সৃষ্টি। —– তোমাদের ইলাহ তো এক- ই -ইলাহ। -আন-নাহালঃ ১৭-২২

—————————————————————— মানব জাতি, তোমাদের প্রতি আল্লাহর যে অনুগ্রহ করয়েছে, তোমরা তা স্মরণ করো। আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন স্রষ্ট্রা আছেন কি যিনি আসমান-যমীন থেকে তোমাদেরকে রিজিক দেন/ তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। তবুও তোমরা কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছ? – ছুরা- ফাতিরঃ ৩

———————————————————— বল, তোমরা কি চিন্তা করে দেখছো যে, আল্লাহ যদি তোমাদের শ্রবণ ও দর্শন শক্তি রহিত করেন আর অন্তরের ওপর চাপ মেরে দেন (অর্থাৎ জ্ঞান-বুদ্ধি ছিনিয়ে নেন) তবে আল্লাহ ব্যতীত কোন্ ইলাহ আছে, যে তোমাদেরকে এসব কিছু এনে দেবে? আনআম-৪৬

—————————————————————– তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত অপর কোন ইলাহ নেই, দুনিয়া ও আখেরাতে প্রশংসা কেবল তাঁরই জন্যে। তিনি একাই নির্দেশ দান এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। বল, তোমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখছো যে, আল্লাহ যদি কেয়ামতের দিন পর্যন্ত তোমাদের জন্যে রাতকে স্থায়ী করে দেন, তবে তোমাদেরকে আলো এনে দিতে পারে, এমন কোন ইলাহ আছে কি? তোমরা কি শুনতে পাও না/ বল, তোমরা কি ভেবে দেখনি, আল্লাহ যদি তোমাদের ওপর স্থায়ীভাবে দিন চেপে দেন, তবে তোমাদের শান্তি লাভের জন্যে রাত এনে দিতে পারে, এমন কোন ইলাহ আছে? তোমরা কি দেখতে পাওনা! -আল-কাসাস-৭০-৭২

———————————————————————— বল, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা কিছু মনে করে বসে আছো, তাদের ডেকে দেখো। আসমান-যমীনে তারা অণুমাত্র বস্তুরও মালিক নয়, আসমান-যমীনের ব্যবস্থাপনায় তাদের কোন অংশ নেই, এতে কেউ আল্লাহ্ র সাহায্যকারীও নেই। যার পক্ষে আল্লাহ নিজে সুপারিশের অনুমতি দেন, তিনি ব্যতীত আল্লাহর কাছে আর কারো সুপরারিশও কোন কাজে আসে না। (ছুরা আস-সাবা-২২-২৩)

———————————– তিনি আসমান রাজি ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনিই রাতের পর দিন এবং দিনের পর রাতকে আবর্তিত করেন। চন্দ্র ও সূর্যকে তিনি অনুগত করে রেখেছেন। সকলেই নির্ধারিত সময়ের দিকে ধাবিত হয়। …. তিনি এক ব্যক্তি থেকে তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করেছেন (অর্থাৎ মানব জীবনের সূচনা করেছেন)। অতপর সে ব্যক্তি থেকেই তার যুগল বানিয়েছেন। আর তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুরও করেছেন আটটি জোড়া। তিনি মাতৃগর্ভে তোমাদের এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তিনটি পর্দার (তিন পর্দা অর্থ -পেট, গর্ভাশয় ও জরায়ু। ) অভ্যন্তরে তোমাদের সৃষ্টির উপর্যযুপরি কয়েকটি স্তর অতিক্রান্ত হয়। এ আল্লাহই তোমাদের রব। শাসন ক্ষমতা তাঁরই জন্যে। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তাহলে তোমরা কোন্ দিকে ধাবিত হচ্ছ? (ছুরা আয-যুমার-৫-৬)

————————————– কে তোমাদের জন্য আকাশরাজি ও যমীন সৃষ্টি করেছেন? অতপর আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বারি বর্ষণ করেছেন; আর সৃজন করেছেন সুদৃশ্য বাগান, যার গুল্ম-লতা সৃষ্টি করা তোমাদের আয়ত্তাধীন ছিল না। এ সকল কাজে আল্লাহর সাথে আরও কি কোন শরীক আছে? এরা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কে এ যমীনকে বসবাসের উপযোগী করেছেন, আর তার জন্যে পাহাড়কে করেছেন নোঙ্গর, আর দুটি সমুদ্রের মধ্যবাগে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। এ সকল কাজে আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ কি শরীক আছে? কিন্তু অধিকাংশ মুশরেকদেরই কোন জ্ঞান-বুদ্ধি নেই। এমন কে আছেন, যিনি অস্থিরতার সময় মানুষর দোয়া শোনেন, তার কষ্ট দূর করেন? কে তিনি, যিনি তোমাদেরকে দুনিয়ার খলীফা করেন (অর্থাৎ ভোগ – ব্যবহারের অধিকার দান করেন)? এ সকল কাজেও কি আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ অংশিদার আছে কি? তোমরা খুব সামান্যই চিন্তা কর। জল-স্থলের অন্ধকারে কে তোমাদের পথ দেখান; অতপর তাঁর রহমত (অর্থাৎ বৃষ্টির) পুর্বে সুসংবাদ দানকারী বায়ু প্রবাহিত করেন? এ সকল কাজেও কি আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ অংশীদার আছে? ওরা যে সব শিরক করছে, তা থেকে আল্লাহ অনেক ঊর্ধ্বে। কে তিনি, যিনি সৃষ্টির সূচনা করেন এবং তার পুনরাবৃত্তি করেন? কে তোমাদেরকে আসমান-যমীন থেকে রিজিক দান করেন? আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহও কি এ সকল কাজে শরীক আছে? বল, তোমরা যদি শিরকের ব্যাপারে সত্যাশ্রয়ী হও, তবে প্রমাণ দাও।১ ছুরা আন-নামল-৬০-৬৪

(১)(অর্থাৎ তোমার যদি স্বীকবার করো যে, এ সকল কাজ আল্লাহর এবং এতে তাঁর কোন শরীক নেই, তাহলে কোন্ ইলাহিয়াতের ব্যাপারে তাঁর সাথে অন্যদেরকে শরীক করছো? যাদের কোন ক্ষমতা নেই, আসমান-যমীনে যাদের কোন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কার্য নেই, তারা কিভাবে ইলাহ সেজে বসেছে? ) ——————————— যিনি আসমান – যমিনের রাজত্বের অধিকারী। তিনি কাউকে সন্তান হিসাবে গ্রহন কেন নি, শাসন-ক্ষমতায় তাঁর কোন শরীকও নেই। তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্যে যথার্থ পরিমানও নির্ধারণ করেছেন। মানুষ তাকে ত্যাগ করে এমন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তারা নিজেরাই হয় সৃষ্ট, যারা নিজের জন্যেও কোন লাভ-ক্ষতির মালিক নন, জীবন-মৃত্যু এবং পুনরুথানের ব্যাপারে যাদের কোন ক্ষমতাই নেই। – আল-ফোরকান-২৩

——————————— তিনিই তো অসমান যমীনকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব প্রদানকারী। তাঁর পুত্র কি করে হতে পারে? অথচ তাঁর তো স্ত্রীই নেই? তিনিই তো সকল বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন; তিনি সব বস্তুর জ্ঞান রাখেন। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। তিনি ব্যতীত অপর কোন ইলাহ নেই। তিনি সব কিছুর স্রষ্টা। অতএব, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদাত করো। সব কিছুর সংরক্ষণ এবং তত্ত্বাবধানের জন্যে তিনিই যথেস্ট। ছুরা আনআম- ১০১-১০২

—————————————— এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদেরকেও খোদায়ীতে শরীক-সহায়ক স্থাপন করে, আল্লাহর মতো তাদেরকেও ভালোবাসে। অথচ ঈমানদাররা আল্লাহকে ভালবাসেন সবচেয়ে বেশী। আযাব নিযিল হওয়ার সময় এই যালিমরা যে সত্যটি উপলব্ধি করবে, তা যদি তারা আজই উপলব্ধি করতো যে, সর্বময় ক্ষমতা -সব রকম শক্তি আল্লাহরই হাতে নিহিত! ছুরা আল-বাকারা-১৬৫

——————————— বল, আল্লাহ ব্যতীত যে সব মাবুদকে তোমরা অভাব পূরণের জন্যে ডাক, তাদের অবস্থা সম্পর্কে তোমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছো? যমীনের কতটুকু অংশ তাদের সৃষ্টি বা আসমানের সৃষ্টিতে তাদের কতটুকু অংশ আছে, আমাকে একটু দেখাওতো!…. যারা আল্লাহকে ছেড়ে এমন সবকে ডাকে, যারা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের ডাকে সাড়া দিতে পারে না, তাদের চেয়ে বেশী গোমরাহ আর কে হতে পারে?১ (১)টিকা: (অর্থাৎ তাদের আবেদনের জবাবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনা। ) ————————————- আসমান- জমীনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও ইলাহ থাকতো, তবে বিশ্বের ব্যবস্থাপনা ওলট -পালট হয়ে যেতো। সুতরাং আল্লাহ, যিনি আরশ (অর্থাৎ বিশ্বের শাসন-ক্ষমতা) – এর মালিক, তাঁর সম্পর্কে ওরা যা কিছু বলছে, তা থেকে তিনি মুক্ত -পবিত্র। তিনি তাঁর কোন কাজের জন্যে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন; অন্য সকলেই (তাঁর কাছে) জবাবদিহি করতে বাধ্য।

——————————— আল্লাহ কোন পুত্রও গ্রহণ করেন নি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। যদি এমন হতো, তাহলে সকল ইলাহ তার নিজের সৃষ্ট বস্তু নিয়ে পৃথক হয়ে যেতো, আর একে অন্যের ওপর চড়াও হতো। (ছুরা আল-মুমেনুন -৯১)

——————————— – বল, আল্লাহ্র সাথে যদি অন্য ইলাহ হতো, যেমন লোকেরা বলছে, তাহলে তারা আরশ-অধিপতির রাজত্ব দখল করার জন্যে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করতো। তিনি পাক; ওরা যা বলছে, তা থেকে তিনি অনেক উর্ধে। – বনী ইসরাইল – ৪২-৪৩

এ সকল আয়াতে আদ্যোপান্ত একই কেন্দ্রীয় ধারনা দেখতে পাওয়া যায়। আর তা এইঃ ইলাহিয়াত ও ক্ষমতা অবিচ্ছেদ্যভাব সম্পৃক্ত -ওতপ্রোতভাব জড়তি। স্পিরিট ও তাৎপর্যের দিক থেকে উভয়ই এক জিনিস। যার ক্ষমতা নেই, সে ইলাহ হতে পার না- ইলাহ হওয়া উচিৎ নয় তার। যার ক্ষমতা আছে, কেবল সে-ই ইলাহ হতে পারে- ইলাহ তাঁরই উচতি হওয়া। কারণ ইলাহর নিকট আমাদের যতো প্রকার প্রয়োজন রয়েছে, অন্য কথায়; যে সব প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে কাউকে ইলাহ স্বীকার করার আমাদের প্রয়োজন পড়ে, তার কোন একটি প্রয়োজনও ক্ষমতা ছাড়া পূরণ হতে পারে না। সুতরাং ক্ষমতাবিহীনের ইলাহ হওয়া অর্থহীন, অবান্তর। আর তার দিকে প্রত্যাবর্তন নিষ্ফল।

এ কেন্দ্রীয় ধারণাটি কোরআন যেভাবে উপস্থাপন করেছে, নিন্মোক্ত ধারায় তার ভুমিকা ও ফলাফল ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যায়।

একঃ অভাব পূরণ, জটিলতা দূরীকরণ, আশ্রয় দান, সাহায্য- সহযোগিতা প্রদান, তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণ এবং আহবানে সাড়া দান – এ সবকে তোমরা মামুলী কাজ মনে করছো, আসলে এগুলো কোন মামুলী কাজ নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টিধর্ম এবং ব্যবস্থাপনা শক্তির সাথে এ সবের যোগসূত্র নিহিত। তোমাদের সামান্যতম প্রয়োজন যেভাবে পূরণ হয়,তা নিয়ে চিন্তা করলে জানতে পারবে যে, আসমান যমীনের বিশাল কারখানায় অসংখ্য-অগণিত কার্য- কারণের সার্বিক ক্রিয়া ছাড়া তা পূরণ হওয়া অসম্ভব। তোমাদের পান করার এক গ্লাস পানি, আহার্যের একটি কণার কথাই চিন্তা করো; এ সামান্য জিনিস সরবরাহের জন্যে সূর্য, যমীন, বায়ু ও সমুদ্রকে কতো কাজ করতে হয়, তা আল্লাহ্ -ই জানেন। তবেই তো এসব জিনিস তোমাদের কাছে পৌছায়। সুতারাং তোমাদের দোয়া শ্রবণ এবং অভাব অভিযোগ দূরীকরণের জন্যে কোন মামুলী ক্ষমতা নয়,বরং এমন এক ক্ষমতা দরকার; আসমান-যমীনের সৃষ্টি, গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন, বায়ু প্রবাহ এবং বারি বর্ষণের জন্যে-এক কথায়, সমগ্র বশ্বি-জাহানের পরিচালনা ও শৃংখলা বিধানের জন্যে যে ক্ষমতা দরকার।

দুইঃ এ ক্ষমতা অবিভাজ্য। সৃষ্টি করার ক্ষমতা একজনের হাতে থাকবে আর জীবিকা সরবরাহের ক্ষমতা থাকবে অন্য জনের হাতে, সূর্য একজনের অধিকারে থাকবে, যমীন অন্যজনের অধিকারে, সৃষ্টি করা করো ইখতিয়ারে থাকবে, সুস্থতা- অসুস্থতা অন্যকারো ইখতিয়ারে, জীবন ও মৃত্যু কোন তৃতীয় জনের ইখতিয়ারে- এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। এমন হলে বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্হাপনা কিছুতেই চলতে পারতো না। সুতরাং সকল ক্ষমতা ইখতিয়ার একই কেন্দ্রীয় শাসকের অধিকারে থাকা একান্ত জরুরী। এমনটি হোক, তা বিশ্বজাহানের ব্যবস্থাপনারও দাবি। মূলত হয়েছেও তাই।

তিনঃ যেহেতু একই শাসকের হস্তে সমস্ত ক্ষমতা নিহিত, ক্ষমতায় বিন্দুমাত্র কারো কোন হিস্যা নেই, সুতরাং উলুহিয়াতও সর্বতোভাবে সে শাসনকর্তার জন্যেই নিদির্ষ্ট, তাতেও কেউ অংশীদার নেই। তোমাদের ফরিয়াদে সাড়া দিতে পারে, দোয়া কবুল করতে পারে-এমন ক্ষমতা কারো নেই। সুতরাং ইলাহর যে অর্থ-ই তোমাদের মানস-পটে আছে, তার প্রেক্ষিতে অন্য কোন ইলাহ নেই। এমন কি বিশ্ব-জাহানের নিয়ন্তা-পরিচালকের নৈকট্য লাভের প্রেক্ষিতে তার কিছুটা ক্ষমতা চলবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে-এ অর্থেও কোন ইলাহ নেই। তার রাজ্য পরিচালন ব্যবস্থায় কারও বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। তাঁর কার্যাবলীতে কেউ দখল দিতে পারে না। সুপারিশ কবুল করা না করা সম্পূর্ণ তাঁর ইখতিয়ারে। কারো এমন কোন ক্ষমতা নেই, যার ভিত্তিতে সে তার সুপারিশ কবুল করাতে পারে।

চারঃ একক সর্বোচ্চ ক্ষমতার দাবি এই যে, সার্বভৌমত্ব ও নেতৃত্ব কতৃর্ত্বের যত শ্রেণী বিভাগ আছে, একক সার্বিক ক্ষমতার অধিকারীর অস্তিত্বের মধ্যে তা সবই কেন্দ্রীভূত হবে। সার্বভৌমত্বের কোন অংশও অন্য কারো দিকে স্থানান্তরিত হবে না। তিনিই যখন স্রষ্টা, সৃষ্টি-কর্মে কেউ তাঁর শরীক নেই, রিজিকদাতা তিনি, রিজিক দানে কেউ তাঁর অংশীদার নেই, বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনায় তিনি একক চালক, ব্যবস্থাপক- পরিচালনায় কেউই তাঁর সাথে শরীক নেই। সুতরাং নির্দেশদাতা এবং আইনদাতা-বিধাদাতারও তিনিই। ক্ষমতার এ পর্যায়েও কারো অংশীদার হওয়ার কোন কারণ নেই। যেমনি করে তাঁর রাজ্যের পরিসীমায় অন্য কারো ফরিয়াদে সাড়া দানকারী, অভাব পুরণকারী এবং আশ্রয়দাতা হওয়া মিথ্যা, তেমনি করে স্বতন্ত্র নির্দেশদাতা, স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী নৃপতি এবং স্বাধীন আইন-বিধানদাতা হওয়াও ভুল-মিথ্যা। সৃষ্ট করা এবং জীবিকা দান, জীবন মৃত্যু দান, চন্দ্র সূর্যের বশীকরণ, রাত দিনের আবর্তন-বিবর্তন, পরিমাণ নির্ধারণ, নির্দেশ দান এবং একক রাজত্ব-কর্তৃত্ব, আইন বিধান দান- এ সবই হচ্ছে একক ক্ষমতা ও সার্বভৌমিকথার বিভিন্ন দিক। এ ক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য। কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহ্র নির্দেশের অনুমোদন ছাড়াই কাউকে আনুগত্যের যোগ্য মনে করে, তবে সে তেমনি শির্ক করে, যেমনি শির্ক করে গায়রুল্লার কাছে প্রার্থনাকারী ব্যক্তি। কোন ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক অর্থে রাজাধিরাজ (——) সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং নিরংকুশ শাসক (—) বলে দাবী করে, তবে তার এ দাবী সরাসরি আল্লাহ্র দাবীর অনুরূপ; যেমন, অতি-প্রাকৃতিক অর্থে কারো এ দাবী করা যে, আমিই তোমার পৃষ্ঠপোষক, কর্মকুশলী, সাহায্যকারী ও সংরক্ষক। এজন্যে যেখানেই সৃষ্টি বস্তুর পরিমাণ এবং বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় আল্লাহকে লা-শরীক বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেই — নির্দেশ দেয়ার অধিকার একমাত্র তাঁর (–) বৈধ অধিকার কেবল তাঁরই এবং (–) কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্বে কেউই তাঁর শরীক নেই ইত্যাদিও বলা হয়েছে। এসব থেকে স্পষ্টই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, রাজত্ব-কর্তৃত্বের অর্থও উলুহিয়াত (–) -এর তাৎপর্যের শামিল। এ অর্থের দিক থেকেও আল্লাহ্র সাথে অন্য কারো অংশীদারিত্ব স্বীকার না করা ইলাহর একত্বের জন্যে অপরিহার্য। নিন্মোক্ত আয়াতে এ কথাটি আরও স্পষ্ট করে ব্যক্ত করা হয়েছেঃ

বল, হে আল্লাহ। রাজত্বের মালিক। যাকে খূশী রাজ্য দান কর, যার কাছ থেকে খুশী রাজ্য ছিনিয়ে নাও। যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করো, যাকে খুশী অপদস্তকরো। -আলে-ইমরান-২৬

সুতরাং প্রকৃত বাদশা আল্লাহ অতি মহান। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। মহান আরশ-এর অধিকারী। আল-মুমেনূন-১১৬

বল, মানুষের রব, মানুষের বাদশা, মানুষের ইলাহর নিকট আমি আশ্রয় প্রার্থনা করি। -আন-নাস-১-৩

সূরায়ে আল মুমিন -এর ১৬ নং আয়াতে এর চেয়েও স্পষ্ট করে বলা হয়েছেঃ

যেদিন সব মানুষই আবরণ মুক্ত হবে, তাদের কোন রহস্যই আল্লাহ্র কাছে গোপন থাকবে না। আজ কার রাজত্ব? নিশ্চই একক মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর।

অর্থাৎ যেদিন সকল মানুষের নেকাব খুলে ফেলা হবে, কারো কোন রহস্যই আল্লাহর কাছে গোপন থাকবে না, তখন ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবেঃ আজ রাজত্ব কার? একমাত্র একক আল্লাহ্র, যাঁর ক্ষমতা সকলের ওপরে প্রবল-এ ছাড়া সেদিন অন্য কোন জবাব হবে না। ইমাম আহমদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দান প্রসঙ্গে বলেছেন : আসমান-যমীনকে মুষ্টি বদ্ধ করে আল্লাহ তায়ালা ডাক দিয়ে বলবেনঃ আমি বাদশা, আমি পরাক্রমশালী, আমি প্রবল প্রতিপত্তির অধিকারী, যমীনে যারা বাদশা সেজে বসেছিলো, তারা কোথায় প্রভাব-প্রতাপশালী দাম্ভিক নরপতিরা?

এ হাদীসটি আলোচ্য আয়াতের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাখ্যা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমন (রাঃ) বলেন-হুজুর (সঃ) যখন ভাষণে এ শব্দগুলো উচ্চারণ করছিলেন, তখন তাঁর দেহে এমন কম্পন হচ্ছিলো, আমরা আশংকা করছিলাম তিনি যেন মিম্বর থেকে পড়ে না যান!

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.