ছোটদের শহীদ হাসানুল বান্না

আবারও কফিশপে দাওয়াত

হাসান মানুষের মধ্যে বিভেদ দেখতে চাননা। তিনি চান সকলে মিলেমিশে থাকুক। এ জন্যে তিনি ভাবতে লাগলেন, কিভাবে বিভেদ দূর রা যায়। কেউ যদি এ সমাজে ইসলামের কথা বলতে দাঁড়ায় তবে সমস্ত দল চায় তাকে নিজেদের মত কথা বলাতে। সেটাতো সম্ভব নয়। ফলে সে হয়তো একটি দলের লোক রূপে চিত্রিত হবে। অন্যরা তাকে বর্জন করবে। আর তার কথায় কান দেবেনা। হাসান চান সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে। কিন্তু এখানকার পরিবেশ তার অনুকূল নয়। হাসান সিদ্ধান্ত নিলেন সকল দল ও গ্রুপ থেকে দূরে থাকবেন আর মসজিদের ভেতর লোকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন না। এর চেয়ে কফি শপে যারা আসে তাদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ করাটাই ভাল হবে। তিনি বড় বড় তিনটি কফি শপ বাছাই করলেন। এসব কফি শপে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়। প্রতিটি কফি শপে সপ্তাহে দু’টি ইসলামী বক্তৃতা দেয়ার কর্মসূচী নেয়া হলো। এ তিনটি স্থানে হাসান নিয়মিতভাবে ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন। প্রথম প্রথম তো এ ধরনের ওয়াজে সকলেই অবাক হয়ে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে সকলে এতে অভস্ত হয়ে ওঠে আর বেশ আগ্রহ দেখাতে থাকে। হাসান তার ওয়াজের মধ্যে কাউকে আঘাত দিয়ে কোন কথা বলেন না। আল্লাহ ও পরকালের স্মরণ আর নেকী করার লাভ ও পাপ কাজে ক্ষতির দিকে নজর দিতে তিনি মানুষকে ডাকেন।

এ দাওয়াতের প্রবাব

শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে হাসানের দাওয়াত শুভ প্রভাব ফেললো। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনাও শুরু হল। যেখানে এ ধরনের ওয়াজের কর্মসূচী থাকে মানুষ শোনার জন্যে সেখানে ছুটে যায়। আর অপেক্ষা করতে থাকে কখন এই ওয়অজ হয় সে জন্য। যারা এই ওয়অজ নিয়মিত শোনে তারা জেগে ওঠে। তাদের কর্তব্য কি সেটা তারা জানতে চায়। কিভাবে চললে তারা আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচতে পারবে আর জান্নাত পাবে সেটা তারা হাসানকে জিজ্ঞেস করে। হাসান তাদের কথার জবাব দেন। কিন্তু সেব জবাই শেষ কথা নয়। তিনি শুধু মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃস্টি করেন। কেননা মানুষ আগ্রী হলে তবেই না ইসলাম মেনে চলতে পাবে।

হাতে কলমে অজু ও নামাজ শিক্ষা

আগ্রহী শ্রোতারা হাসানের কাছে আরো জানতে চান। কিন্তু কফিশপে তা’ সম্ভব নয়। সেজন্য তিনি একটি স্থান ঠিক করেন। সেখানে নিয়ে তাদের ওজু করা শেখান, কিভাবে নামাজ পড়তে হবে তা দেখান। ওজুতে কি লাভ তা বর্ণনা করেন। ওজু সম্পর্কে এক হাদীসেবলা হয়, যে লোক ভালোভাবে ওজু করে, তার দেহ থেকে সকল পাপ দূর হয়ে যায়, এমন কি তার নখের নীচ থেকেও পাপ দূর হয়ে যায়।’ নামাজ পড়লে কিলাভ হবে হাসান সে সম্পর্কে হাদিস বলেন। এরকম এক হাদিসে বলা হয়েছে ‘যে ব্যক্তি ওজু করে এবং তা ভালোভাবে সম্পন্ন করে অতঃপর দু’রাকাআত নামাজ আদায় করে এবং নিজের অন্তর আর চেহারা তাতে নিয়োজিত রাখে তবে তার জন্র জান্নাত ওয়াজেব হয়ে যায়।’

হাজী মুস্তফার স্থান

হাসান সহজ সরলভাবে ইসলামের দাওয়াত মানুষকে দিতে লাগলেন। এর ফলে এসব ওয়াজের খবর অল্প দিনের মধ্যেই দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়লো। বিপুল সংখ্যক লোক এসব ওয়াজে যোগ দিতে শুরু করে। এর মধ্যে হাসান ওয়াজের জন্য আরেকটি স্থান পেলেন। স্থানটি দিলেন কাজী মুস্তফা। তিনি আল্লাহর ওয়অস্তে এ স্থানটি দিলেন। মাগরিব থেকে ইশা পর্যন্ত সেখানে হাসান ওয়াজ করেন। এরপর কফি শপে ওয়াজ করতে যান।

ষড়যন্ত্রকারীদের হতাশা

একরাতে হাসান লক্ষ্য করেন আলেমদের মধ্যকার মতভেদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্র এক ব্যক্তি চেষ্টা করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, যারা ‍মুসলমানদের ঐক্য চায় না এটা তাদের কারাজি। তার মুখ থেকে বিরোধপূর্ণ জবাব পেলেই ইসলামের দাওয়াতের কাজে তারা বাধা দেবে। হাসান বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তিনি কিছু লোকের অসৎ উদ্দেশ্য ধরে ফেললৈন। তাই বললেন, দেখুন আমি আলেম নই। একজন সাধারণ মানুষ। কোরআনের কিছু আয়াত ও হাদিস মুখস্থ আছে। কিতাব পড়ে আমার কিছু জানা হয়েছে। আমি স্বেচ্ছায় মানুষকে ইসলামের কথা শুনাই। আমার কথা ভাল লাগলে দয়া করে তা’ শুনুন। আর যদি আরো কিছু জানতে চান তবে আলেম বা বিজ্ঞ জ্ঞানীদের কাছে যেতে পারেন। কোন সমস্যায় পড়লে তারাই তার সমাধান দেবেন। হাসান আরো বললেন আপনাদের সামনে যা বলছি এতটাই আমাদের জ্ঞানের দৌড়।

হাসানের এসব কথা শুনে ষড়যন্ত্রকারীরা হতাশ হয়। তারা কোনভাবেই আর এ দাওয়াতের কাজে বাধা দিতে পারল না।

চার শ্রেণীর কৃর্তৃত্ব

হাসান ইসমাঈলিয়ায় এসেছেন আজ কয়েক মাস হল। বছর ঘুরতে আরো কয়েক মাস বাকী। এ সময় তিনি ইসলামের দাওয়াতের কাজের সাথে সাথে ইসমাঈলিয়অর সমাজ সম্পর্কে ভাবতে থাকেন এবং সেখানকার মানুষ ও তাদের অবস্থা গভীরভাবে দেখতে থাকেন। এজন্য তিনি খুব ভালভাবে খোঁজ খবর নিতে থাকেন। খোঁজ নিয়ে দেখলেন সেখানকার চারটি শ্রেণী কর্তৃত্ব করছে। প্রথমেই রয়েছেন আলেম সমাজ, দ্বিতীয হচ্ছেন পীল সাহেবগণ, তৃতীয় হচ্ছেন শহরের গণ্যমা্য লোকজন আর চতুর্থ হচ্ছে ক্লাব।

আলেমদের প্রতি হাসান

হাসান আলেমদের প্রতি আন্তরিকভাবেই সম্মান দেখান। তিনি কফি শপেই হোক বা অন্য যে কোন স্থানেই হোক যখনই ইসলামী দাওয়ারেত কথা বলেন তখন কোন মাওলানা সাহেব এলে তাকে তাজিম ও আদবের সাথে সামনে আনেন। এজন্যে দরকার হলে কিছুক্ষণ আলোচনা বন্ধও রাখেন। আলেমদের প্রতি এভাবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখানোর ফল শুভ হয়। তাঁরাও হাসানের প্রতি বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করেন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে আলেমরা হাসানের পক্ষেই কথা বলতে থাকেন। একসময় একজন আলেম হাসানের দাওয়াতের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করেন। তিনি আল আজহারের একজন পুরান আলেম। কেউ ওয়াজ করতে থাকলে তিনি নানান খুঁটিনাটি বিষয়ে প্রশ্ন করে তাকে নাজেহাল করে আনন্দ পেতেন। একবার হাসান ইসলামী দাওয়াত নিয়ে আলোচনা করছেন। কথা প্রসঙ্গে হযরত ইব্রাহীম (আ) এর কাহিনী বর্ণনা করছেন। এমন সময় ঐ আলেম হযরত ইব্রাহীম (আ) এর পিতার নাম জানতে চাইলে। হাসান বললেণ, কেতাবে তার নাম তারেখ বলা হয়েছে। আলেম বললেন, না শব্দটা তারুখ হবে। হাসান বিরোধে না গিয়ে তারুখ শব্দটিই মেনে নিলেন। এই নামের উচ্চারণের ব্যাপারে হাসান বললেন যেহেতু নামটি আরবী শব্দ নয় কাজেই এর সঠিক উচ্চারণ সেই ভাষার উপর নির্ভর করে। এসব জিনিসগুলো আসল নয়, উপদেশ গ্রহণ করাটাই হচ্ছে এসব কিস্‌সা কাহিনী বলার উদ্দেশ্য। এদিকে এসব তর্কবিতর্কে শ্রোতারা বিরক্ত হয়ে চলে যেতে থাকে। মাওলানা সাহেব এটাই চান। কিন্তু এভাবে লোকজন চলে গেলে হাসান কিভাবে দাওয়াতের কাজ করবেন? তাই তিনি বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তা ভাবনা করলেন। শেষে এক উপায় বের করলেণ।

একদিন তিনি ঐ মাওলানা সাহেবকে বাসায় দাওয়াত করলেন। মাওলানা সাহেব এলেন। হাসান তার প্রতি বেশ ভক্তি শ্রদ্ধা দেখালেন। তিনি ফিক্‌হ এবং তাসাউফ বিষয়ের দু’টি মূল্যবান কিতাব মাওলানা সাহেবকে উপহার দিলেন। মাওলানা সাহেব এতে বেশ খুশী হলেন। এতে ভাল ফলই ফললৈা। এরপর থেকে মাওলানা সাহেব হাসানের দাওয়াতের কাজে কোন বিঘ্ন ঘটাতেন না। বরং তিনি নিজেও হাসানের ওয়াজ শুনতেন। আর অন্যদেরও তা’ শোনার দাওয়াত দিতেন। এ ঘটনা থেকে হাসান মহানবী (স) এর একটি কথার সত্যতা বুঝতে পারলেন। মহানবী (স) বলেন, তোমরা একে অন্যকে উপহার দেবে। এর ফলে উভয়ের মাঝে ভালবাসা সৃষ্টি হবে।

ঐক্য নিয়ে ভাবনা

ইসমাঈলিয়া শহরে মানুষ সরল মনা। এখানে আলেমদের কথা যেমন মানুষ শোনে তেমনি পীর মাশায়েখদের প্রতি তারা ভক্তি শ্রদ্ধা দেখায়। মিসরের বিভিন্ন স্থান থেকে পীর সাহেবরা এই শহরে আসেন। তারা ওয়াজ করেন এবং শেষে জিকরের মাহফিল করেন। হাসান এসব পীর সাহেবের মজলিসে যান তাদের কথা শোনার জন্য। তিনি তাদের কাছে মুসলমান সমাজের অবস্থা বর্ণনা করেন। পৃথিবীর সেরা জাতি মুসলমান কেন আজ এত নীচে রয়েছে সে সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, আফসোস- মিসরের রাজা ইংরেজদের কথায় উঠাবসা করেন। ইংরেজরা কিভাবে মিসরের মুসলমানদের ঠকাচ্ছে সেটাও বর্ণনা করেন। মুসলমানদের মধ্যে যাতে ঐক্য সৃষ্টি না হয় সেজন্য কাফের মুশরিকরা চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা মুসলমানদের ছোট খাট বিষয় নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি আর বিবাদ করতে উস্কানি দেয়- যাতে মুসলমানরা এক হতে না পারে। অথচ আল্লাহ চান যেন মুসলমানরা এক হয়ে আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে। হাসান দরদ ভরা মন নিয়ে এসব কথা আলোচনা করেন। ইসমাঈলিয়ার পশ্চিম দিকে বৃটিশ শিবির আর পূর্বদিকে সুয়েজ খাল কোম্পানীর অফিসই হাসানের এসব কথার বাস্তব প্রমাণ। হাসান বলেন, ইংরেজরা মিসরের সম্পদেরওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা এদেশে এসে বড় বড় দালানে আরাম আয়েশে থাকে। আর মিসরের মানুষ তাদের নিজেদের দেশে বস্তিতে বাস করে। বস্তির ঘর এতই ছোট যে মানুষ সেখানে কষ্ট করে বেঁচে থাকে। একদিকে আরাম আ
য়েশ আর অপর দিকে দুঃখ কষ্ট। সযেয়জ খাল কোম্পানী বিদেশী খৃষ্টান আর ইহুদীদের পরিচালনায় চলে। এই কোম্পানীর অফিস জাঁকজমকপূর্ণ। এখানে মিসরীয়রা চাকুরীর সন্ধানে আসে। তাদের সাথে চাকরের মত ব্যবহার করা হয়। অথচ বিদেশী খৃষ্টান আর ইহুদীরা এখানে বেশ সম্মান পায়। তারাই যেন এদেশের শাসক। কোম্পানী ইসমাঈলিয়া শহরে সব কিছুর হর্তা-কর্তা। আলো, পানি, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি পৌরসভার সব কাজ কোম্পানী নিজ হাতে নিয়ে রেখেছে। যাতায়াতের সব রাস্তা ঘাটও তাদের হাতে। কোম্পানীর অনুমতি ছাড়া কেউ এই শহরে ঢুকতে পারেনা। আবার কোম্পানীর ছাড়পত্র ছাড়া কেউ এইশহর ছাড়তেও পারে না। বড় বড় সড়কের নাম ফলকও বিদেশী ভাষায় লেখা। এসব দেখে হাসানের মন দুঃখে ভরে যায়। তিনি অনেক সময় ইসমাঈলিয়ার গহীন বনে যান। ছবির মত সাজানো সেই বনে ঘুরে বেড়ান। আবার কখনো সুন্দর ঝিলের পারে নিজের দেশের অপরূপ সৌন্দর্য দেখেন তখন তার দুঃখ শত গুনে বেড়ে যায়। মিসর বাসীর অনৈক্য আর নিজেদের কারণেই যে এই সম্পদে ভরপুর দেশটি খৃষ্টান ও ইহুদীদের লুটপাটের কেন্দ্র হয়ে পড়েছে। তা’ বুঝতে তার কষ্ট হয় না।

হাসান চান মুসলমানদের এক করতে, তাদের বিভেদ দূর রতে, এজন্যে যা করা দরকার তার সব কিছুই তিন করছেন। হাসান লক্ষ্য করলেন শহরে সম্মানিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দু’টি শিবিরে বিভক্ত। এর পেছনে ধর্মীয় খুটিনাটি বিষয় নিয়ে বিরোধই প্রধান কারণ। শহরের বাইরে থেকে কোন শ্রমিক এখানে এলে এই দুটি শিবিরের যে কোন একটির সাথে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু হাসান ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি মুসলমানদের বিভক্ত দেখতে চান না। তা উভয় শিবিরের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি যখন এক শিবিরে যান তখন অপর শিবির সম্পর্কে ভাল কথা বলেন। তাদের ভাল গুনের কথা এদের শোনান। তিনি কখনোই অপরের দোষেরে কথা আলোচনা করেন না। এর ফলে উভয় শিবিরের লোকজনই তাকে ভালবাসে আর ভাল জানে।

লেবার ক্লাবে গমন

ইসমাঈলিয়া শহরে শ্রমিকদের একটি ক্লাব রয়েছে, এটি লেবার ক্লাব নামে পরিচিত। ক্লাবে শিক্ষিত যুবকদেরও একটি দল আছে। তারা ভাল কথা শুনতে আপত্তি করেনা। নেশা প্রতিরোধ সমিতির একটি শাখাও এই ক্লাবে আছে। সমিতি মাদক দ্রব্য সেবনের কুফল নিয়ে আলোচনা করে। হাসান ক্লাবে যেতে শুরু করেন। তিনি সেখানে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আলোচনা করেন। এতে অনেকেই মুসলমান হিসাবে কি কি কাজ করতে হবে সে ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হয়।

কায়রোর মুসলিম যুব সমিতি

হাসান কায়রোর সাথেও যোগাযোগ বজায় রাখছেন। তিনি আল ফাতাহ পত্রিকার দাওয়াত চালাতে থাকেন। এর ফলে শহরের বহু লোক এই পত্রিকা গ্রাহক হন। এই পত্রিকা ইসলামী আন্দোলনের পথে মানুষকে আহ্বান জানাতে থাকে। হাসান কায়রোর মুসলিম যুব সমিতির সাতেও যোগাযোগ করেন। তিনি এই সমিতিতে নিয়মিত চাঁদা দেন এবং এর সভাপতি আব্দুল হামিদ বেক সাঈদকে পত্র লিখে জানান যে তিনি সমিতির সাথে রয়েছেন।

তিনটি ধর্মের প্রতিনিধিত্ব

হাসান ইসমাঈলিয়ায় প্রথম যখন আসেন তখন হোটেলে ওঠেন। কিন্তু বেশীদিন হোটেলে থাকতে তার ভাল লাগে না। তাই তিন কোন বাসা ভাড়া নিতে চাইলেন। স্থানীয় লোকজন একথা জানতেই তারা একটি ঘরের সন্ধান দিলেন। বাসাটি কয়েক তলা বিশিষ্ট। হাসান এবং তার সহকর্মী শিক্ষক বন্ধু উপরের তলায় ভাড়া নিলেন। বাসার দোতলার সবটা ভাড়া নেয় মিসরীয় খৃস্টানদের একটি গ্রুপ। সেখানে তারা একটা ক্লাব ও একটা গীর্জা স্থাপন করে। আর গোটা নীচের তলা ভাড়া নেয় একদল ইহুদী। তারাও সেখানে কিছু অংশ ক্লাব তার কিছু অংশ তাদের ধর্মমন্দির বানায়। হাসান আর তার বনধু তিন তলায় ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে তারা নামাজ পড়েন আর মসজিদের ঝন্য একটি স্থান নির্দিষ্ট করেন। এর ফলে গোটা বিল্ডিংটা যেন তিনটি ধর্মেরপ্রতিনিধিত্ব করতে থাকে।

ইখওয়ানুল মুসলিমুন গঠন

১৯২৮ সালের মার্চ মাস। ইসমাঈলিয়ায় হাসানের আগমনের একবছর হয়ে গেছে। সে সময় ৬ জন বন্ধু এলেন তার বাসায়। এরা হচ্ছেন, হাফেজ আবদুল হামিদ, আহমদ আল হাছরি, ফুয়াদ ইবরাহীম আব্দুর রহমান হাসবুল্লাহ, ইসমাঈল ইজ্জ এবং যাকী আল মাগরেবি। তারা হাসানের দাওয়াতে মুগ্ধ। কিছু একটা করতে চান। কিন্তু কিভাবে কি করবেন তা’ ভেবে পাচ্ছেন না। সেজন্যেই তারা হাসানের পরামরশ নিতে তার কাছে এসেছেন। তারা বললেন, হাসানের ওয়াজ শুনে তারা দেশের অবস্থা বুঝতে পারছেন। মুসলমানসেরা জাতি হয়েও আজ খৃষ্টান আর ইহুদীদের পায়ের নীচে পড়ে মার খাচ্ছে। এর কারণ তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের পথ ছেড়ে দিয়েছে। আবার যদি আল্লাহর পথে ফিরে আসে তবে তারা আবারে সম্মান ও মর্যাদা ফিরে পাবে। তাই তারা আল্লাহর পথে চলার জন্যে একটা দল করতে চায়। আর হাসান যেন তার সব ব্যবস্থা করে দেন। হাসান বুঝতে পারলেন, এতদিন ধরে তিনি যে ইসলামের পথে মানুষকে ডেকে যাচ্ছেন আজ তার সুফল ফলতে শুরু করেছে। তার ডাকে মানুষ আজ ইসলামের রশিকে মজবুত করে ধরতে আগ্রহী। এ অবস্থায় পালিয়ে যাওয়অর কোন সুযোগ নেই। কাজেই হাসান বললেন, আল্লাহ আপনাদের চেষ্টকে কবুল করুন। আমাদের কর্তব্য, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। সফলতা আল্লাহর হাতে। তিনি তাদেরকে নিয়ে আল্লাহর কাছে ওয়াদা করলেন, আজ থেকে আমরা হব ইসলামের দাওয়াতে সৈনিক। কেননা দেশ ও জাতির মঙ্গল ইসলামের দাওয়াতেরই মধ্যেই রয়েছে।

এরপর তারা শপথ করলেন, তারা ভাই ভাই হযে জীবন কাটাবেন। ইসলামের জন্য কাজ করবেন। আর ইসলামের পথে জিহাদ হবে তাদের ব্রত। একজন বললেন, আমরা কি নামে নিজেদের ডাকবো। হাসান বললেন, ইসলামের খেদমতের জন্যে আমরা পরস্পর ভাই ভাই। একাণে আমাদের নাম হবে ইখওয়ানুল মুসলিমুন। বাংলায় মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ। সলের মুখে মুখে এ নাম উচ্চারিত হল। হাসান তার এই ৬জন বন্ধুকে নিয়ে গঠন করলেন ইখওয়ানুল মুসলিমুন। যা্রা শুরু হলো নতুন এ সংগঠনের। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে আল্লাহর পথে পরিচালিত করাই হবে এই দলের কাজ।

এক বছরে ইখওয়ান

হাসান ইখওয়ানের সদস্যদের একত্রিত হবার জন্য একটি রুম ভাড়া নিলেন। শাহ ফারুক সড়কে শায়খ আলী শরীফের কাছ থেকে মাসিক ৬০ ক্রোশ দেবার চুক্তিতে এই রুমটি ভাড়া নেয়া হয়। একানে সদস্যদের শুদ্ধবাবে কোরআন শেখানো শুরু হয়। ইসলামের বিভিন্ন বিধান, রাসূল (সা) এর জীবনী এবং সাহাবা ও অলী আল্লাহদের জীবন ধারাও এখানে আলোচনা করা হয়। যোগ্য লোকদের দাওয়াতে তাবলীগের কাজ করার ট্রেনিং দেওয়া হতে থাকে। এবাবে দেখা গেল ১৯২৭-২৮ সালের শিক্ষাবর্ষ শেষে ইখওয়ানের প্রথম গ্রুপের সংখ্যা ৭০ এ পৌঁছেছে।

ইখওয়অন সদস্য হাফিজ

ইখওয়ানের সদস্যরা আল্লাহ ও তার রাসুল (সা) কে ভালবাসেন। তারা কোরআন ও হাদিস মেনে চলেন। এর ফলৈ তারা সমাজের আর পাঁচজনের তুলনায় খুবই ভাল হয়ে গেলেন। কাজেই তাদের চরিত্র দেখে শুধু অন্য মুসলমানই নয় বরং অন্য ধর্মের লোকেরাও মুগ্ধ হয়ে গেল। এরকম ইখওয়ানের এক সদস্যের নাম হাফিজ। তিনি যন্ত্রপাতি সারাবার কাজ জানেন। একজন অভিজ্ঞ টেকনেশিয়ান। কিন্তু সত্যিকার মুসলমান। তিনি আল্লাহকে ভয় করেন। কোন মানুষকে ঠকান না। যে কাজের যে মূল্য তার চেয়ে কম দাম নেন। মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা। একবারের এক ঘটনা খুবই মজার।

সুযেজ খাল কোম্পানীর প্রধান ইঞ্জিনিয়ার একজন বিদেশী খৃষ্টান। তার দেশ ফ্রান্স। তিনি একজন  ভাল ইঞ্জিনিয়ার। নাম মিঃ সভল্যান্ট। দক্ষ হওয়ায় তিনি এ চাকুরী পেয়েছেন। তার বাসায় ছিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। একবার কোন কারণে সেগুলো অচল হয়ে গেল। সেগুলো সারাবার জন্যে একজন ভাল টেকনিশিয়ান দরকার। তিনি স্থানীয় লোকদের কাছে খোঁজ করলেন। লোকেরা হাফিজের কথা জানালো। তিন হাফিজকে ডেকে যন্ত্রপাতি দেখালেন। জিজ্ঞেস করলেন,

আপনি এই কাজ করতে পারবেন?

জ্বী করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

কত নেবেন?

১৩০ ক্রোশ দিতে হবে।

আপনি কি লুটেরা?

কেন?

আপনি বেশী মজুরী চাচ্ছেন।

না, মোটেই নয়। আমি ন্যায্য মজুরীর চেয়েও কম চাচ্ছি।

আমারতো মনে হয় আপনি বেশী চাচ্ছেন।

-আচ্ছা এক কাজ করুন একজন ভাল ইঞ্জিনিয়ারকে ডাকুন- তিনি বলবেন এ কাজের মজুরী কত হতে পারে। আমি বেশী চাইলে শাস্তি হিসেবে আমি বিনা মজুরীতে আপনার কাজ করে দেব।

-ঠিক আছে তাই হবে।

মিঃ সভল্যান্ড তার কোম্পানীরই আরেকজন ইঞ্জিনিয়াকে ডেকে পাঠানে। তাকে যন্ত্রপাতি দেখালে। সেগুলোকে সারাবার মজুরী কত হতে পারে জিজ্ঞেস করলেন। ইঞ্জিনিয়ার বললেন, এর ন্যায্য মজুরী ২০০ ক্রোশ।

একথা শুনে মিঃ সভল্যান্টের টনক নড়ল। তিনি এবার আর কোন কথা না বাড়িয়ে কাজ শুরু করতে বললেন। কিন্তু হাফিজ বললেন,

-আপনি আমাকে অপমান করেছেন। সে জন্য মাফ চাইতে হবে। আর আপনার বাজে মন্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। তবেই আমি কাজ করতে পারি।

-তোমার কাছে আমাকে মাফ চাই বলছো? কে তুমি? যদি তোমার রাজা ফুয়াদও আসে আমি মাফ চাইবো না।

-মি সভল্যঅন্ট এখন আপনি আরেকটি ভুল করলেন। আপন রাজা ফুয়াদের দেশে আছেন। আপনি আমাদের দেশে মেহমান। কাজেই একথা বলা ঠিক নয়। আর রাজা ফুয়াদের প্রতি অসম্মানজনক কথা বলার সুযোগ আমি আপনাকে দেব না।

-আমি আপনার কাছে মাফ না চাইলে আপনি আমার কি করবেন

-আমি আপনাদের দূতাবাসে আর রাষ্ট্রদূতকে একথা জানাবো। এরপর প্যারিসে সুয়েজ কোম্পানীর বড় বড় কর্মকর্তাকে জানাবো। পরে ফ্রান্সের পত্র পত্রিকা সহ বিদেশের পত্র পত্রিকায় এ বিয়ে চিঠিপত্র লিখবো। এখানে প্রশাসনিক কাউন্সিলের যে সদস্যই আসবেন তাকেও জানানো হবে।

-মনে হচ্ছে কোন টেকনেশিয়ান নয় বরং আমি আমার চেয়ে বড় কোন কর্মকর্তার সাথে কথা বলছি। আপনি জানেন না ইম প্রধান ইঞ্জিনিয়ার? আমি আপনার কছে মাফ চাইবো- এটা কি হতে পারে?

-সুয়েজ কোম্পানী আমাদের দেশে রয়েছে। আপনাদের দেশে নয়। এই কোম্পানীর ওপর আপনাদের অধিকার কিছুদিনের  জন্য। শেষ পর্যন্ত আমরাই এর মালিক হব। তখন আপনি আর আপনার মত অনেকেই হবে আমাদের কর্মচারী। কাজেই আমি আমার অধিকার ছেড়ে দেব এটা কেমন করে আপনি ভাবতে পাররেন?

-আমি আপনার কাছে মাফ চাচ্ছি। আমার কথা প্রত্যাহার করছি।

-ধন্যবাদ। আমি কাজ শুরু করছি।

হাফিজ কাজ ‍শুরু কর অল্পক্ষণের মধ্যেই শেষ করলেন। কাজ শেষ হলে মিঃ সভল্যান্ট হাফিজকে ১৫০ ক্রোশ দিলেন। হাফিজ ১৩০ ক্রোশ নিয়ে বাকী ২০ ক্রোশ ফিরিয়ে দিলেন। সভল্যান্ট বললেন,

-আপনি এই ২০ ক্রোশও নিন। এটা বখশিস দিলাম।

-না না তা’ হয় না। অধিকারের চেয়ে বেশী নিয়ে আমি লুটেরা হতে চাই না।

-আমার অবাক লাগছে- সবাই কেন আপনার মত হয় না? আচ্ছা আপনি কি মোহাম্মদ (স) এর পরিবারের লোক?

-মিঃ সভল্যান্ট জেনে রাখুন- সব মুসলমানই হযরত মোহাম্মদ (স) এর পরিবারের লোক। তবে তাদের মধ্যে কিছু লোক ইহুদী খৃষ্টান সাহেবদের অনুকরণ করতে শুরু করেছে। এ কারণ তাদের স্বভাব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

মিঃ সভল্যান্ট আর কথা বলেননি। তিনি হাফিজের সাথে হাত মেলালেন। তাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় করলেন।

ইখওয়ান সদস্য হাসান মারসি

ইখওয়ানের আরেক সদস্য হাসান মারসি। তিনি রেডিও বাক্সের উন্নত মানের নমুনা তৈরী করতে পারেন। এক জায়গায় তিনি কাজ করেন। সেকালে রেডিও বাক্স তৈরীতে প্রায় এক পাউন্ড ব্যয় হত। হাসান মারসির মালিকের নাম মানিও। মানিওর একজন বন্ধু এসে গোপানে প্রস্তাব দিল যে হাসান মারসি তার জন্যে কয়েকটা বাক্স তৈরী করে দেবেন অর্ধেক দামে। শর্ত হচ্ছে মানিওকে এ সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। এভাবে প্রতিটি বাক্সে হাসান মারসি পাবেন অর্ধেক পাউন্ড আর মানিওর বন্ধুর লাভ হবে বাকী অর্ধেক পাউন্ড। অর্ধেক দামে সে বাক্স পেয়ে যাবে। হাসান মারসিরও উমার মানিওর অগাধ বিশ্বাস। এ কারণে ওয়ার্কশপের সব কাঁচামাল আর যন্ত্রপাতি সে হাসান মারসির হাতে ছেড়ে দিয়েছিল। মানিওর বন্ধু এই আস্থার অবৈধ সুবিধা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু হাসান মারসিতা হতে দেননি। তিনি বলরেণ, সব ধর্মেই অসাধুতাকে হারাম মনে করে। আমার প্রতি যার এত বড় বিশ্বাস আর আস্থা রয়েছে- তার সাথে খেয়ানত করা অসম্ভব। অথচ তার বন্ধু এবং তার ধর্মের লোক হয়ে আপনি তাই করতে চাচ্ছেন। আপনার লজ্জিত হওয়া উচিত।

-আমি মানিওকে বলবো, আপনার কারিগর আমাকে এই প্রস্তাব দিয়েছে। সে আমার কথা বিশ্বাস করবে। ফলে তোমাকে কানে ধরে বের করে দেবে। কাজেই তুমি আমার কথা মত কাজ কর। এটা ভাল হবে।

-তোমরা যা খুশী কর। ইনশাআল্লাহ তুমিই অপদস্থ হবে।

লোকটি মানিওর কাছে গিয়ে মিথ্যা কথা বললো। মানিও ব্যাপারটা সম্পর্কে খোঁজ নিলেন। তখন সব কিছু বুঝতে পারলেণ। হাসান মারসির কথাই তিনি বিশ্বাস করলেন। ফলে তার ধোঁকাবাজ বন্ধুকেই তিনি ঘর থেকে বের করেদিলেন। আর আমানতদারীর জন্য হাসান মারসির বেতন বাড়িয়ে দিলেন।

ইখওয়ানের সদস্যরা এরকমই ছিলেন। তারা ভাল মানুষ ছিলেন। তাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত। তারা যেমন ভাল মানুষ ছিলেন তেমনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন। আর সব কাজেই করতেন আল্লাহকে খুশী করার জন্য।

মসজিদ স্থাপনের সিদ্ধান্ত

হাসান ঠিক করলেন, ইসমাঈলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত ছড়াবেন। তাদের মধ্যেকাজ করবেন। তিনি নিজে একজন সহকারি শিক্ষক। তাকে বদলি হতে হবে। আর যারা দাওয়াতের কাজ করেছেন তারাও সরকারী কর্মচারী। এ জন্য স্থায়ী বাসিন্দাদের আকৃষ্ট করতে হবে। তাদের দাওয়াতের কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য শহরে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই মসজিদের সাথেই দলের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।

ইসমাঈলিয়ায় একটি মসজিদ স্থাপনের জন্য হাসান ইখওয়ানের সদস্যদের নিয়ে আলাপ আলোচনা করলেন। ঠিক হল, প্রথমে তারা নিজেরাই এজন্য দান করবেন। এরপর অন্যদের কাছে দান সংগ্রহ করবেন। সে অনুযায়ী তারা নির্ধারিত সময়ে ৫০ পাউন্ড সংগ্রহ করে আফেন্দি আবু সাউদের কাছে জমা রেন। আল্লাহর জন্য দান করলে সে দানই আল্লাহর কাছে কবুল হয়। এজন্য সদস্যরা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই দান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা দান করতে থাকলেন। এ দান করার জন্য তাদের স্বীকারের কথা তারা কাউকে বললেন না। কিন্তু মানুষ লুকাতে চাইলেও আল্লাহ তার বান্দাদের শেখানোরজন্য ভাল মানুষদের ত্যাগ স্বীকারের কথা অনেক সময় প্রকাশ করে দেন। এ রকমই একটি ঘটনা।

About নূর মোহাম্মদ মল্লিক