হাদীসের কিসসা

৭৮। লুকমান হাকীমের কিসসা

হযরত লুকমান হাকীম হযরত দাউদ (আঃ) এর সমসাময়িক একজন অত্যন্ত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি ছিলেন। পবিত্র কুরআনে তার নাম উল্লেখ করতঃ তার কতিপয় উপদেশ উদ্ধৃত করা হয়েছে। নবী না হয়েও কুরআনে তার মত এত গুরুত্ত আর কোন ব্যক্তি পান নি। নবী বা রাসুল না হওয়া সত্তেও তার কথাবারতা ও আচরণে নবীসুলভ বিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও সততা প্রতিফলিত হতো। এজন্য তিনি লুকমান হাকীম নামে পরিচিত ছিলেন ।

হযরত লুকমানের জন্মস্থান বা বংশ পরিচয় সংক্রান্ত কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে তার সম্পর্কে শুধু নিম্নোক্ত তথ্য সমূহ জানা যায়ঃ

প্রথম জীবনে তিনি সিরিয়ায় এক ধনবান ব্যক্তির অধীনে গোলামীর জীবন যাপন করেন। তারপর তার মধ্যে অসাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে তার মনিব তাকে মুক্ত করে দেয়।

গোলামী জীবনের পূর্বে তিনি মেষ রাখাল ছিলেন বলে জানা যায়। সেই সময় তার সমবয়সী আর এক রাখালও তার সাথে মেষ চরাতো। তাদের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ত ছিল।

পরবর্তীকালে যখন হযরত লুকমান একজন হাকীম অরথাৎ জ্ঞানী ব্যক্তিরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন, তখন তার সেই বাল্য বন্ধুটি একদিন তাকে একটি বিরাট জনসমাবেশে ওয়ায নসিহত করতে দেখে। সে সমাবেশ শেষে তাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কি সেই ব্যক্তি নও, যার সাথে আমি মাঠে বকরী চড়াতাম। হযরত লুকমান বললেন, হা, তুমি আমাকে ঠিকই চিনেছ। আমি বাল্যকালে বকরী চরাতাম। সে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি এই মর্যাদা কিভাবে অরজন করলে? তিনি বললেনঃ আমি চারটি সভাব দ্বারা এই মর্যাদা লাভ করেছিঃ (১) কখনো হারাম সম্পদ উপার্জন করিনি । (২) কখনো মিথ্যা বলিনি। (৩) কখনো আমানতের খেয়ানত করিনি। (৪) কখনো সময়ের অপচয় করিনি।

অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা প্রসূত ও জ্ঞানদীপ্ত কথা ও করমকান্ডকে হিকমত বলা হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতে হযরত লুকমানের যে সব হিকমত বর্ণিত হয়েছে, তার কিছু কিছু নিম্নে তুলে ধরা হয়েছেঃ

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হিকমতের বাণীঃ-

নিজ পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশাবলী

(১) হে বৎস! আল্লাহর সাথে কারো শরীক করো না। আল্লাহর সাথে শরীক করা একটি মারাত্মক জুলুম।

(২) হে বৎস! তুমি যদি একটি তিলের মত ক্ষুদ্র আকার ধারণ কর, অতঃপর কোন পাথরের অভ্যন্তরে অথবা আকাশের অপরে অথবা ভূগর্ভে আত্মগোপন কর, তবুও আল্লাহ সেখান থেকে তোমাকে বের করবেন।

(৩) হে বৎস! তুমি নামায কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ কর এবং এই পথে যে বিপদ আপদের সম্মুখীন হও, তাতে ধৈর‌য ধারণ কর।

(৪) মানুষের সাথে আচরণের সময় মুখ বিকৃত করো না এবং পৃথিবীতে অহংকারের সাথে চলাফেরা করো না। ধীরস্থিরভাবে চলাফেরা কর এবং অনুচ্চ কন্ঠে কথা বল।

রেওয়ায়েত থেকে প্রাপ্ত হিকমতের বিবরণঃ-

(১) হযরত লুকমান যখন গোলামীর জীবন যাপন করতেন, তখন একই মুনিবের অধীন তার সাথে আরো একটি গোলাম কর্মরত ছিল। একবার সেই গোলামটি মনিবের কোন খাদ্যদ্রব্য চুরি করে খেয়ে ফেলে। মনিব উভয়কে দোষারোপ করেন এতে হযরত লুকমান ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন, তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। অতঃপর মুনিবকে পরামর্শ দিলেন যে, আপনি আমাদের দু’জনকে গরম পানি খাইয়ে দিন। এতে উভয়ের বমি হবে এবং যে প্রকৃত চোর, তার পেট থেকে বমির সাথে ভক্ষিত জিনিষের অংশ বেরিয়ে পড়বে। মনিব তার পরামর্শ মত কাজ করলেন এবং হযরত লুকমান নির্দোষ সাব্যস্ত হলেন।

এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, কো ন মিথ্যা অপবাদ মাথায় নিয়ে কারো চুপ করে বসে থাকা উচিৎ নয়। তাৎক্ষনিকভাবে তার প্রতিবাদ করা উচিত এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করা উচিত।

(২) একবার হযরত লুকমানের মনিব তার বন্ধুর সাথে পাশা খেলে হেরে যায়। খেলার যে বাজী পূর্বাহ্নে নির্ধারিত হয়েছিল, সে অনুসারে হয় তাকে তার সমস্ত সম্পদ বিজয়ী বন্ধুকে দিতে হবে, নতুবা পার্শ্ববর্তী নদীর সমস্ত পানি তাকে খেয়ে ফেলতে হবে। খেলায় হেরে যাবার পর বন্ধুটি তার মনিবকে এই দুটি শর্তের একটি অবিলম্বে পালন করার জন্য চাপ দিতে লাগলো। মনিব অতি কষ্টে তার বন্ধুর কাছ থেকে একদিন সময় নিয়ে বাড়িতে চলে এল এবং লুকমানকে সমস্ত বিষয় খুলে বললো। লুকমান একটু চিন্তা করেই তাকে বললেনঃ আপনি আমার বন্ধুকে এক কানাকড়িও দেবেন না। বরং নদীর পানি খেয়ে ফেলার শর্তটাই পালন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করবেন। তবে তাকে বলবেন, প্রথমে সে যেন নদীর দু’পাশে বাধ দিয়ে দেয়। তা না হলে এক দিক দিয়ে পানি খেয়ে ফেললে অন্য দিক থেকে নদীতে আরো পানি ঢুকে পড়বে। হযরত লুকমানের শিখানো এই বুদ্ধিতে তার মুনিব বিপদ থেকে রক্ষা পেল এবং তার বন্ধু অবৈধভাবে বন্ধুর অর্থ আত্মসাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। এতে খুশী হয়ে মনিব তাকে মুক্তি দিলেন।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মানুষকে অন্যের জুলুম ও শোষণ থেকে বাচানোর জন্য যেখানে শক্তি প্রয়োগের পথ বন্ধ, সেখানে কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।

(৩) আর একদিন হযরত লুকমান হাকীমের মনিব তাকে আদেশ দিল যে, আমার জন্য একটি বকরী যবাই করে তার দেহের সর্বোত্তম অংশ রান্না করে নিয়ে এস। হযরত লুকমান বকরীর হৃদপিন্ড ও জিহবা রান্না করে আনলেন। পরদিন মনিব আবার নির্দেশ দিলেন বকরীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ রান্না করতে। লুকমান আবারো হৃদপিন্ড ও জিহবা রান্না করে খাওয়ালেন। মনিব জিজ্ঞাসা করলোঃ কি হে লুকমান! আজও দেখি, তুমি একই অংগ রান্না করে এনেছ। একই অংগ সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট কিভাবে হয়? হযরত লুকমান বললেনঃ যে কোন জীবের জিহবা ও হৃদপিন্ডই তার প্রধান অংগ। এই দুটি যখন ভালো থাকে, তখন সেও হয় উৎকৃষ্ট জীব। আর এ দুটি যখন খারাপ হয়, তখন সে হয় নিকৃষ্ট জীব।

এই ঘটনা থেকে প্রকারান্তরে হযরত লুকমান শিক্ষা দিলেন যে, মানুষের বেলায়ও এই কথা প্রযোজ্য। সে যদি তার হৃদয় দিয়ে সৎ চিন্তা করে এবং জিহবা দিয়ে সৎ কথা বলে, পবিত্র জিনিষ পানাহার করে, তবে সে সর্বোত্তম প্রাণীতে পরিণত হতে পারে, নতুবা নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত হবে। বলা বাহুল্য, তার এ হিকমতটি হাদীস ও কুরআনের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

(৪) আর একদিন হযরত লুকমানের মনিব তাকে নির্দেশ দিল তার যমীনে তিল বপন করতে। হযরত লুকমান চালাকী করে তিলের পরিবর্তে সরিষা বপন করলেন। পরে যখন ফসল জন্মালো, তখন মনিব বললো, আমি তো তোমাকে তিল বপন করতে বলেছিলাম। তুমি সরিষা বপন করলে কেন? হযরত লুকমান বললেনঃ আমি তো ভেবেছিলাম, সরিষা বুনলেই তিল হবে। মনিব বললেনঃ তা কি করে হয়? তখন হযরত লুকমান বললেনঃ আপনি যখন সব সময় পাপ কাজ করে উত্তম ফল বেহেশত পাওয়ার আশা করেন, তখন সরিষা বুনে আমি তিল পাওয়ার আশা করলে দোষ কী? এ কথা শুনে মনিব চমকে উঠলো এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করলো।

(৫) আর একবার লুকমান হাকীম একটি জাহাজে আরোহন করে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলেন। জাহাজে একজন সওদাগর ও তার সাথে একটি বালক ভৃত্য ছিল। জাহাজ সমুদ্রের মাঝখানে গেলে তার উত্তাল তরংগমালা দেখে বালকটি বিকট চিৎকার করে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। সে জীবনে আগে কখনো সমুদ্র দেখে নি। তাই সমুদ্রের মাঝখানে এসে সে ভয়ে কাদতে লাগলো। সওদাগর অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনই লাভ হলো না। এই অবস্থা দেখে লুকমান হাকীম সওদাগরের কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে বললেন,‘আপনি বোধ হয়, বালকটির কান্নাকাটি থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদি কিছু মনে না করেন, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। সওদাগর সানন্দে রাযী হলো। লুকমান বালকটিকে নিয়ে জাহাজের এক প্রান্তে চলে এলেন। তারপর তার কোমরে একটি রশি দিয়ে শক্ত করে বাধলেন। অতঃপর তাকে সাগরের পানির মধ্যে ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ রশি ধরে টেনে নিয়ে চললেন। বালকটি পানিতে পড়বার সময় গগণবিদারী একটা চিৎকার দিল। কিন্তু তারপরই নিরবে হাবুডুবু খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর লুকমান তাকে টেনে তুললেন এবং সওদাগরের কাছে রেখে এলেন। এবার সে আর কান্নাকাটি করলো না । শান্ত হয়ে বসে থাকলো। সওদাগর বিস্মিত হয়ে লুকমানকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ অসম্ভবকে আপনি কিভাবে সম্ভব করলেন? লুকমান বললেনঃ ব্যাপারটা কঠিন কিছু ছিল না। বালকটি সমুদ্র কখনো দেখেনি। তাই সমুদ্রের ভয়াল চেহারা দরশনই তাকে ভয়ে দিশেহারা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যখন সে দেখলো, সমুদ্রের পানিতে পড়ে যাওয়া বা ডুবে যাওয়া আরো ভয়াবহ ব্যাপার। তখন তার কাছে জাহাজে বসে সমুদ্র দেখা অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক কাজ বলে মনে হতে লাগলো। এ জন্যই সে এখন শান্ত। আমি বিষয়টা প্রথমেই বুঝে নিয়ে এই কৌশল প্রয়োগ করেছি ।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, বিপদ দেখেই অস্থির হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে যে, যে বিপদ এখন সামনে এসেছে ভবিষ্যতে তার চেয়েও বড় বিপদ আশা বিচিত্র কিছু নয়।

৭৯নামায সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনা

বর্ণিত আছে যে, বণী ইসরাঈলের এক মহিলা একবার হযরত মূসার (আঃ) কাছে এল । সে বললোঃ হে আলাহর রাসুল । আমি একটি ভীষণ পাপের কাজ করেছি । পরে তওবাও করেছি । আপনি দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন । মূসা (আঃ) বললেনঃ তুমি কী গুনাহ করেছো? সে বললোঃ আমি ব্যভিচার করেছিলাম । অতঃপর একটি অবৈধ সন্তান প্রসব করি এবং তাকে হত্যা করে ফেলি । মূসা (আঃ) বললেনঃ “হে মহাপতাকিনী । এক্ষুনি বেরিয়ে যাও । আমার আশংকা, আকাশ থেকে এক্ষুনি আগুন নামবে এবং তাতে আমরা সবাই ভস্মীভূত হবো ।” মহিলাটি ভগ্ন হৃদয়ে বেরিয়ে গেল । অল্পক্ষণ পরেই জিবরীল (আঃ) এলেন । তিনি বললেনঃ “হে মূসা! আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞাসা করাছেন কী কারণে এই তওবাকারিণীকে তাড়িয়ে দিলেন? তার চেয়েও কি কোন অধম মানুষকে আপনি দেখেন নি?” মূসা বললেনঃ “হে জিবরীল! এর চেয়ে পাপিষ্ঠ কে আছে?” জিবরীল (আঃ) বললেনঃ “ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তর্ককারী ।”

অপর একটি ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি তার বোনের দাফন কাফন সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখলো তার মানিব্যাগটি নেই । পরে তার মনে হলো, ওটা কবরের ভেতর পরে গেছে । তাই সে ফিরে গিয়ে কবর খুড়লো । দেখলো, কবর জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জলছে । সে পুণরায় মাটি চাপা দিয়ে কাদতে কাদতে বাড়ী গেল । তার মায়ের কাছে সমস্ত ঘটনা জানালে তিনি বললেন, মেয়েটি নামাযের ব্যাপারে খামখেয়ালী করতো এবং সময় গড়িয়ে গেলে নামায পড়তো । বিনা ওজরে নামায কাযা করলে যদি এরুপ পরিণতি হতে পারে তাহলে বেনামাযীর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে । তা ভাবতেও গা শিউরে উঠে ।

শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নামায পড়াই যথেষ্ঠ নয় । নামাযকে শুষ্ঠুভাবে ও বিশুদ্ধভাবে পড়াও জরুরী । নচেত অশুদ্ধ নামায পড়া নামায না পড়ারই সমতুল্য । বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, একদিন এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো । রাসুল (সাঃ) তখন মসজিদেই বসে ছিলেন । লোকটি নামায পড়লো । অতঃপর রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলো । তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেনঃ তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড় । কারণ তুমি নামায পড়নি । সে চলে গেল এবং আগের মত আবার নামায পড়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলো । তিনি সালামের জবাব দিয়ে আবার বললেনঃ তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড় । কেননা তুমি নামায পড়নি । এরুপ তিনবার নামায পড়ার পর লোকটি বললোঃ হে আল্লাহর রাসুল । আমি এর চেয়ে ভালো ভাবে নামায পড়তে পারি না । আমাকে শিখিয়ে দিন । তিনি বললেনঃ “প্রথমে নামাযে দাঁড়িয়ে তাকবীর বল । অতঃপর যতটুকু পার কুরআন পাঠ কর । অতঃপর রুকু কর এবং রুকুতে গিয়ে স্থির হও । অতঃপর উঠে সোজা হয়ে দাড়াও । তারপর সিজদা দাও এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হও । তারপর স্থির হয়ে বস । অতঃপর আবার সিজদা দাও এবং সিজদায় স্থির হও । এভাবে নামায শেষ কর ।”

শিক্ষাঃ

ঈমানের পরেই নামায সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ণ কর্তব্য । সময়ানুবর্তীতার সাথে ও বিশুদ্ধভাবে নামায না পড়লে আখেরাতে নাজাত লাভের আশা করা যায় না ।

 

৮০‍উদ্যানের মালিকদের ঘটনা

 

হযরত ইবনে আব্বাস(রা) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়ামানে একটি চমৎকার ফলের বাগান ছিল। হযরত ঈসা (আ) এর উম্মতের জনৈক মুমিন ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি এই উদ্যানটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর নিয়ম ছিল যে, ঐ উদ্যানের ফলমূল আহরণের সময় তিনি দরিদ্র লোকদের জন্য তার একটা অংশ রেখে দিতেন। ফলে সেখান হতে খাদ্যশস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল এবং ঐ বাগানের ওপর তাদের অনেকাংশে জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এজন্য প্রতিবছর ফসল কাটার মওসুমে সেখানে ফকীর মিসকীনদের ভিড় লেগে যেত।

হযরত ঈসা(আ) এর আকাশে উত্থিত হওয়ার কিছুকাল পর এই পুণ্যবান ব্যক্তিও ইন্তিকাল করেন। তাঁর তিন পুত্র ঐ বাগান ও ক্ষেতের উত্তরাধিকারী হলো। তারা পরস্পর এই মর্মে শলাপরামর্শ করলো যে, এখন আমাদের সদস্য বেড়ে গেছে। সেই অনুপাতে ফসলের ফলন হচ্ছে না। তাই এখন আর পিতার আমলের মত ফকীর মিসকীনদের জন্য ফসল ও ফলমূল রেখে দেওয়া সম্ভব নয়। কোন কোন রেওয়ায়াতে আছে যে, কোন কোন পুত্র এও পর্য্যন্ত বললো যে, আমাদের পিতাতো বোকা ছিল বলে ফলমূল বিলাতো। এখন আমাদের ঐ প্রথা বন্ধ করে দিতে হবে। তারা স্থির করলো যে, ভোরবেলা বেশ খানিকটা রাত থাকতে উঠে ফসল কেটে আনা হবে, যাতে ফকীর মিসকীনরা টের না পায় এবং বাগানের কাছে ভীড় না জমায়। তারা দৃঢ়ভাবে সংকল্প নিল যে, ফকীর-মিসকীনদের জন্য কোন অংশই রাখা হবে না।

 কিন্তু ভোররাতের নির্দিষ্ট সময় ঘনিয়ে আসার আগেই ঐ বাগানে এক ভয়াবহ আগুনে ঝড় এসে সমস্ত ফসলকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিল। অথচ বাগানের মালিকেরা এ ঘটনার বিন্দু বিসর্গও টের পেল না। কারণ তারা ঘুমিয়ে ছিল এবং ঐ ঝড় নির্দিষ্ট বাগান ছাড়া অন্য কোথাও আঘাত হানে নি।

 ভোররাতে তারা যথাসময়ে বাগানে গিয়ে দেখে সেখানে একটা ফাঁকা ময়দান ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রথমে তারা ভাবলো তারা পথ ভুলে অন্য কোথাও এসে পড়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তারা সবকিছু বুঝতে পারলো এবং অনুশোচনা করতে লাগলো। পরে তারা তাওবা করে। ইমাম বাগাওয়ী বর্ণনা করেন যে, তাওবা করার পর আল্লাহ তাদেরকে আরো ভালো একটা উদ্যান দান করেছিলেনে এবং তারা তাদের পিতার নীতি অনুসরণ করে আরো সমৃদ্ধশালী হয়েছিল।

শিক্ষাঃ এই ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের সূরা কালামে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। এর শিক্ষা এই যে, আল্লাহর দেয়া সম্পত্তি হতে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে থাকলে আল্লাহ সেই সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেন, তেমনি দান বন্ধ করলে তিনি তা ধ্বংস ও করে দিতে পারেন। বিশেষত, যেখানে কোনো সৎকর্ম আগে হতে চালু রয়েছে সেখানে তা বন্ধ করে দিলে আল্লাহর গযব নাযিল হওয়া অবধারিত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা যদি আমার নিয়ামতের শোকর আদায় কর, তবে আমি তা আরো বাড়িয়ে দেব। আর যদি নাশোকরী কর তবে জেনে রেখ, আমার আযাব অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।” (সূরা ইবরাহীম)।এ কথা সহজেই বোধগম্য যে, আল্লাহর দেয়া সম্পদ হতে দরিদ্র্যদেরকে বঞ্চিত করা এবং শুধু নিজেই সম্পূর্ণ ভোগ করা চরম নাশোকরী ও অকৃতজ্ঞতার শামিল।

 

৮১আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিরুদ্ধে শত্রুতার পরিণাম

হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুসা (আঃ) এর আমলে বনী ইসরাইল গোত্রে একজন নামকরা আলেম ছিলেন । তার নাম ছিল বালয়াম বাউরা । তিনি তাওরাতের হাফেয ও মুফাসসির ছিলেন এবং ইসমে আযম জানতেন । তার একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল এই যে, আল্লাহর ইসমে আযম উচ্চারণ করে তিনি যে দোয়াই করতেন, তা আল্লাহ কবুল করতেন এবং এ বিষয়টি বণী ইসরাইল ও অন্যান্য গোত্রের লোকদের জানা ছিল ।

হযরত মুসা (আঃ) যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন বালয়াম বাউরা কিনানে বণী ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে বাস করতেন এবং তাদের ও হযরত মুসা (আঃ) এর সংগে তার ভালো সম্পর্ক ছিল । কিন্তু হযরত মুসা (আঃ) এর ইন্তিকালের পর যখন তার ভাগ্নে হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ) বণী ইসরাইলের শাসক ও খলীফা নিযুক্ত হন, তখন বালয়াম বাউরা তার সরকারের একটি উচ্চ পদ লাভের প্রত্যাশা করেন । কিন্তু হযরত ইউশা (আঃ) তা দিতে অসীকার করায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে পার্শ্ববর্তী মোশরেক রাজ্য বেলকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন । এই রাজ্যের রাজা তাকে বসবাসের জন্য একখন্ড জমি দান করেন এবং সেখানে তিনি বাড়ী বানিয়ে বসবাস করতে থাকেন ।

ওদিকে হযরত ইউশা (আঃ) এর নেতৃত্যে বণী ইসরাইল পার্শ্ববর্তী ইল্লিয়া রাজ্য জয় করে বেলকা রাজ্যের সীমান্তে উপনীত হয় । বেলকার মোশরেক রাজ্য দখল করে সেখানে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাকে আদেশ দেন । তদানুসারে হযরত ইউশা বেলকা রাজ্যের মোশরেক রাজাকে ইসলাম গ্রহণ নতুবা আত্মসমর্পনের জন্য চরমপত্র দেন । বেলকার রাজা চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করে হযরত ইউশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে । উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয় এবং তাতে হযরত ইউশার বাহিনী বিজয়ী হয় । বেলকার রাজার সৈন্যদের একাংশ নিহত হয় এবং অপরাংশ পালিয়ে যায় । এই অবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে উক্ত রাজা বালয়াম বাউরার শরণাপন্ন হয় । সে তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলে যে, আমার এই বিপদের দিনে আপনার সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন । আপনি আপনার আল্লাহর নিকট দোয়া করুন যেন আমরা ইউশার সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করতে পারি এবং তাকে তাড়িয়ে দিতে পারি ।

বালয়াম বাউরা বললেন, হযরত ইউশা (আঃ) আল্লাহর নবী ও প্রিয় ব্যক্তি । তার বিরুদ্ধে দোয়া করা আমার পক্ষে ঘোরতর পাপের কাজ হবে । তাছাড়া এরুপ দোয়া কবুল হওয়ার আশা করা যায় না । আপনি বরঞ্চ ইসলাম গ্রহণ করুন । আপনার রাজ্য নিরাপদ থাকবে ।

রাজা ভীষণ ক্রুদ্ধ হলো । সে বালয়াম বাউরাকে একদিকে হত্যার ভীতি প্রদরশন করতে লাগলো, অপরদিকে বালয়াম বাউরার স্ত্রীর কাছে গোপনে দূত পাঠিয়ে বিপুল অর্থ প্রদানের প্রলোভন দিতে লাগলো । বালয়াম বাউরা দেখলেন, তিনি আপনজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি কাফের রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে তাদের মুঠোর মধ্যে চরম অসহায় অবস্থায় পতিত হয়েছেন । এখানে রাজার বিপুল শক্তির মোকাবিলা করা তার সাধ্যাতীত । অপরদিকে অরথের প্রলোভনেও তিনি দিশাহারা হয়ে পড়লেন । তাই তিনি রাজাকে বললেন, আমাকে একদিন সময় দিন । রাজা তাকে সময় দিল । বালয়াম বাউরার নিয়ম ছিল, কোন বিষয়ে দোয়া করতে হলে প্রথমে আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইতেন । আল্লাহ তাকে সপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন অনুমতি দেয়া হলো কি না । একদিন সময় নিয়ে বালয়াম বাউরা আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলেন । আল্লাহ তাকে সপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, আমার নবীর বিরুদ্ধে কোন দোয়া গ্রহণযোগ্য নয় এবং এরুপ দোয়া করলে তোমার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে ।

বালয়াম বাউরা রাজাকে তার সপ্নের কথা জানালেন । রাজা তাকে বললেন, আপনাকে আরো একদিন সময় দেয়া গেল । আবার অনুমতি প্রারথনা করুন । বালয়াম বাউরা আবারো অনুমতি প্রারথনা করে ঘুমিয়ে গেলেন । এবার তাকে সপ্নে কিছুই জানানো হলো না । বালয়াম বাউরা কিছুটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেলেন । তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছেন এমন সময় রাজার দূত এসে তাকে আবার তাড়া দিল দোয়া করার জন্য । এই সময় শয়তান তাকে এই মর্মে  প্ররোচনা দিল যে, গত রাতে আল্লাহ যে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তাকে মৌন সম্মতি ধরে নেয়া যায় । তাছাড়া দোয়ার মাধ্যমে কাফের বাদশাকা বিজয়ী হতে সাহায্য করলেসে হয়তো তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে এবং পরবর্তী সময়ে তাকে হেদায়েত করা সহজ হবে । অথচ তিনি একথা ভেবে দেখলেন না যে, আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে শত্রুতার আচরণ করা কত বড় মারাত্মক গুনাহর কাজ এবং এরুপ কাজ করে কোন বাতিল শক্তিকে সত্যের দিকে আকৃষ্ট করার আশা দুরাশা মাত্র । তাছাড়া যে কাজ আল্লাহর কিতাবে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সপ্নের মাধ্যমে তার রদবদল হতে পারে না । আসলে দুনিয়াবী সার্থের মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি এ দিকটি ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি ।

বালয়াম বাউরা চিরাচরিত নিয়মে তার গাধার পিঠে চড়ে পাহাড়ের ওপর নির্মিত তার নির্জন ইবাদতখানায় রওনা হলেন রাজার পক্ষে দোয়া করার মতলবে । কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, এই সময় আল্লাহর হুকুমে গাধাটির চলনশক্তি রহিত হয়ে যায় । বালয়াম বাউরা তাকে প্রহার করতে আরম্ভ করলে সে বাকশক্তি প্রাপ্ত হয় এবং বলে যে, তুমি যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছ, আল্লাহ আমাকে সেজন্য তোমাকে বহন করে নিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন । এই সময় রাজার লোকজনদের একটি বিরাট দল বালয়াম বাউরার সঙ্গে যাচ্ছিল । বালয়াম বাউরা অগত্যা সেই জায়গায় দাড়িয়েই দোয়া করলেন । কিন্তু তিনি যে দোয়া করলেন, তার মুখ দিয়ে ঠিক তার বিপরীত কথা তার অজান্তেই উচ্চারিত হতে লাগলো । তিনি বললেন “রাজাকে বিজয়ী কর ।” কিন্তু সবাই শুনতে পেল, যেন তিনি বলছেন “হযরত ইউশাকে বিজয়ী কর ।” তাই রাজার লোকেরা চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে লাগলো । তারা বললো, ওহে বালয়াম, আপনি তো উলটা দোয়া করছেন । বালয়াম বললেন, আমি ঠিকই দোয়া করছিলাম । কিন্তু আমার জিহবা এখন আমার আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে । এই সময়ে বালয়াম বাউরার জিহবা হঠাৎ কুকুরের জিহবার মত লম্বা হয়ে বুকের ওপর ঝুলে পড়লো । কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, শুধু জিহবা নয়, তার শরীরের ওপরের অরধাংশ কুকুরের মত হয়ে যায় এবং নিম্নাংশ মানুষের মত বহাল থাকে ।

এবার বালয়াম বাউরা বললো, আমার তো দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই বরবাদ হয়ে গেল । এখন তোমরা একটি কাজ কর । তোমরা তোমাদের সুন্দরী নারীদেরকে বণী ইসরাইলী সৈন্যদের মধ্যে লেলিয়ে দাও । এতে তারা ঐ নারীদের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে এবং তাদের পরাজয় অবধারিত হবে । রাজা এই পরামর্শ অনুসারে কাজ করলো এবং সকল সুন্দরী যুবতীদেরকে সৈন্য বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে দিল । বণী ইসরাইলী বাহিনী এই পরীক্ষায় কৃতকারয হতে পারলো না । তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হলো এবং তাদের মধ্যে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লো । ফলে বহু সংখ্যক সৈন্য মারা গেল এবং পরাজয়ের সম্মুখীন হলো । আল্লাহর নবী হযরত ইউশা (আঃ) এই অবস্থা দেখে সেনাবাহিনীর মধ্যে আল্লাহর ভীতি জাগিয়ে তুললেন এবং বেহায়া নারীগুলিকে ধরে ধরে হত্যা করলেন । সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃংখলা ও খোদাভীতি পুণরুজ্জীবিত হওয়ার পর তিনি পুণরায় সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ চালালেন । এবার তার বাহিনী জয়যুক্ত হলো এবং বেলকার রাজ্য থেকে মোশরেক রাজার রাজত্ত সমূলে উৎখাত করা হলো । বালয়াম বাউরা যুদ্ধে মারা না গেলেও তার কাছ থেকে ইসমে আযম কেড়ে নেয়া হলো এবং অতঃপর তার আর কোন দোয়া কবুল হতো না । আর তার দেহাকৃতিতে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা তার মৃত্যু পর্যন্ত বহাল রইল ।

(তাফসীরে খাজেন, কাসাসুল আম্বিয়া, তাফসীরে মায়ারিফুল)

শিক্ষাঃ

এই ঘটনা থেকে নিম্নলিখিত শিক্ষাসমূহ গ্রহণ করা যায়ঃ

(১) নিজের জ্ঞান গরিমা ও ইবাদত উপাসনার ব্যাপারে কারো গরবিত হওয়া উচিত নয় । কারণ শওয়তান ও খোদাদ্রোহী মানুষদের প্ররোচনায় বিপথগামী হওয়া মোটেই বিচিত্র নয়, যদি আল্লাহ সাহায্য ও রহমত না করেন ।

(২) এমন পরিবেশ ও কারযকলাপ থেকে দূরে থাকা উচিৎ, যাতে ঈমান ও চরিত্র বিপন্ন হবার আশংকা থাকে । বিশেষতঃ দুনিয়াবী সার্থের ক্ষতির কারনে উত্তেজিত হয়ে সৎ্লোকদের সৎসরগ ত্যাগ করে অসৎ ও বাতিলপন্থীদের সংসরগ গ্রহণ করা নিজের ঈমান ও চরিত্রকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ার শামিল ।

(৩) কোন অবস্থাতেই আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত লোকদের সাথে শত্রুতা ও বিদ্যেষ পোষণ করা উচিত নয় । এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোন প্রিয়জনের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করি ।

(৪) অসৎ ও পথভ্রষ্ট লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং তাদের নিমন্ত্রণ ও উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত । এ কাজ করেই বালয়াম বাউরা আল্লাহর গযবে পতিত হয়েছিল ।

(৫) অশ্লীলতা ও হারামের অনুসরণ গোটা জাতির ধবংস ও পতন ডেকে আনে ।

(৬) অসৎ কাজে ও অশ্লীলতায় প্ররোচনাদানকারীকে, চাই সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, কঠোর হস্তে দমন করা কর্তব্য ।

(৭) আল্লাহর প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা, মেধা প্রতিভা এবং ক্ষমতা ও পদমর্যাদাকে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও আল্লাহর দীনের ক্ষতি সাধনে ব্যবহার করা আল্লাহর গযবকে ডেকে আনার শামিল । এ ব্যাপারে সকলের সতর্ক থাকা উচিত ।

৮২হযরত আইউব (আ) এর অগ্নিপরীক্ষা

হযরত আইউব(আ) এমন একজন নবী ছিলেন, যাকে আল্লাহ তায়ালা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত করে কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্য অবলম্বন করে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ফলে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে সাবির অর্থাৎ ধৈর্যশীল উপাধিতে ভূষিত করেন।

প্রথম দিকে হযরত আইউব(আ) ছিলেন অত্যন্ত সুখী ও সম্পদশালী মানুষ। তাঁর ছিল বহু ধন-সম্পদ, নয়নাভিরাম বাসভবন, বহু সন্তান-সন্ততি, চাকর বাকর ও গবাদি পশু। কিন্তু অল্প কিছুকাল পরেই তিনি পরীক্ষায় পতিত হন। তাঁর সমস্ত ধন সম্পদ ও চাকর নওকর তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। উপরন্তু তাঁর শরীরে কুষ্ঠের মত এক মারাত্মক চর্মরোগ দেখা দেয়। জিহবা ও হৃৎপিন্ড ছাড়া তাঁর শরীরের কোন অংশই ঐ রোগের কবল হতে মুক্ত ছিল না। সেই অবস্থায়ও তিনি জিহবা ও মন দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতেন।

ঘৃণার উদ্রেককারী এই রোগের দরুণ তাঁর আপনজনরাও তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একমাত্র তাঁর স্ত্রী কাছে থেকে পরিচর্যা করতেন। তিনি ছিলেন হযরত ইউসূফ(আ) এর মেয়ে বা পৌত্রী লাইয়া, মতান্তরে রহীমা, সমস্ত সহায় সম্পদ শেষ হয়ে গেলে তাঁর স্ত্রী মজুরী খেটে অর্থোপার্জন করে তা দিয়ে খাওয়া ও পরিচর্যার ব্যয় নির্বাহ করতেন।

হযরত আইউব(আ) লোকালয়ের বাইরে গিয়ে এক নির্জন স্থানে প্রায় সাত বছর অবস্থান করেন। তাঁর কাছে কেউ আসতো না। তাঁর স্ত্রী যখন তাঁকে বললেনঃ আপনি এই বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তখন তিনি বললেনঃ আমি সত্তুর বছর আল্লাহর নিয়ামতের মধ্যে কাটিয়েছি। মাত্র সাত বছর দুঃখ কষ্ট ভোগ করেই এত অস্থির হব কেন? যখন ধৈর্যধারণে অক্ষম হবো তখন এই দোয়া করবো।

অবশেষে এক সময় তার রোগ যন্ত্রণা যখন ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।

আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলে এবং তাঁকে আদেশ দিলেনঃ নিজের পায়ের গোড়ালি দ্বারা মাটিতে আঘাত কর। মাটি হতে স্বচ্ছ পানির ঝর্ণা ফুটে বেরুবে। সেই পানি পান কর ও তা দ্বারা গোসল কর। হযরত আইয়ুব আদেশ পালন করলেন। ঝর্ণার পানি দ্বারা গোসল করা মাত্রই তার সমস্ত রোগ দূর হয়ে গেল এবং তিনি একজন সুস্থ সবল যুবকে পরিণত হলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য বেহেশতী পোশাক পাঠিয়ে দিলেন। সেই পোশাক পরে তিনি পরিষ্কার জায়গায় বসে রইলেন।

ওদিকে তাঁর স্ত্রী প্রতিদিনের মত মজুরী খেটে তাঁর পরিচর্যা করতে এলেন। কিন্তু স্বামীকে যথাস্থানে না পেয়ে কাঁদতে লাগলেন। পাশে বসা সুস্থ সবল হযরত আইয়ূবকে দেখেও তিনি চিনতে পারলেন না। তিনি তাকেই জিজ্ঞাসা করলেনঃ এখানে যে রোগা লোকটি পড়ে ছিল, তাকে দেখেছেন নাকি? তাকে কোন হিংস্র পশুতে খেয়ে ফেলেছেন এই আশংকায় তিনি কাঁদতে লাগলেন।

হযরত আইউব(আ) তাঁর স্ত্রীর কান্নাকাটি দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি বললেনঃ আমিই আইয়ূব। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করে আমাকে স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপর আল্লাহ তাকে তার যাবতীয় ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততি ফিরিয়ে দেন।

শিক্ষাঃ বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য দোয়া ও চেষ্টার পাশাপাশি ধৈর্যধারণও করতে হবে। কেননা আল্লাহ প্রত্যেক বিপদ আপদ একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবতীর্ণ করেন ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। যতক্ষণ আল্লাহর নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত না হয়, ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। রাসূল(সা) বলেছেনঃ নবীগণ সবচেয়ে বেশী বিপদে আক্রান্ত হন, তাঁদের পর অন্যান্য সৎলোকেরা পর্যায়ক্রমে আক্রান্ত হন। প্রত্যেকের পরীক্ষা তার ঈমানের দৃঢ়তা অনুপাতে হয়ে থাকে।

৮৩হযরত ঈসা (আ) ও দাম্ভিক দরবেশ

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা(আ) এর সময়ে ফিলিস্তিনে একজন প্রসিদ্ধ দরবেশ বাস করতো। সে হযরত ঈসার এমন প্রিয়পাত্র ছিল যে তিনি স্বয়ং কখনো কখনো তার খানকায় গিয়ে তাকে সদুপদেশ দিতেন। তৎকালে ঐ অঞ্চলে একজন কুখ্যাত নরঘাতক দস্যুও বাস করতো। সে শুধু ডাকাতি ও নরহত্যায়ই লিপ্ত ছিলো না, সেই সাথে সমসাময়িক জুলুমবাজ সরকারের পোষা গুন্ডা হিসেবে হযরত ঈসা ও তার সঙ্গীসাথীদের ওপর অকথ্য নির্যাতনও চালাতো। এজন্য অন্যান্যের মতো উল্লেখিত দরবেশও তাকে প্রচন্ডভাবে ভয় পেত ও ঘৃণা করতো।

সহসা এই দস্যুর জীবনে পরিবর্তন এল এবং সে ঈমান আনার জন্য হযরত ঈসার(আ) সাথে সাক্ষাত করতে গেলো। হযরত ঈসা এ সময় নিজ বাসস্থানে ছিলেন না। দস্যুটি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে, তিনি উক্ত দরবেশের খানকায় আছেন। অগত্য সে সেখানেই গিয়ে হাজির হলো। দরবেশের দরজায় কড়া নাড়লে ভেতর হতে দরবেশ উঁকি দিয়ে দেখতে পেল তার বহু পরিচিত সেই দস্যুটি দাঁড়িয়ে, যার হাতে তাকে পূর্বে বহু নির্যাতন সইতে হয়েছে। সে ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করলো, “কে?” দস্যুটি জবাব দিল, “আমি অমুক, আমি আল্লাহর নবী ঈসার(আ) সাথে দেখা করতে চাই। আমি ঈমান আনতে চাই।” হযরত ঈসা ভিতরেই ছিলেন। তিনি দরবেশকে বললেন, “দরজা খুলে ওকে আসতে দাও।” কিন্তু দরবেশটি হযরত ঈসার আদর ও স্নেহ পেয়ে দাম্ভিক ও একগুঁয়ে হয়ে উঠছিল। সে হযরত ঈসার সাথে বাক বিতন্ডা শুরু করে দিল। তাকে এই বদ লোকটির সাথে সাক্ষাত না করতে অনুরোধ করলো। হযরত ঈসা তাকে যতই বুঝান যে, সে যত খারাপই থাকুক এখন ভালো হতে এসেছে, তাকে সুযোগ দিতে হবে, দরবেশ ততই একগুঁয়ে হয়ে উঠেন। সে বললো, এই লোকটি এত পাপী যে, আল্লাহর নবী ও তার মত দরবেশের সাথে দেখা করারও অযোগ্য। এমনকি সে এতদূরও বললো যে, “এতবড় পাপী লোকের সাথে আল্লাহ যদি আমাকে পরকালে বেহেশতও দেন একসাথে, তবে তাও হবে আমার দোজখতুল্য।”

অতঃপর দরবেশের অনড় মনোভাব দেখে হযরত ঈসা(আ) ওহীর নির্দেশ পেয়ে ঘর হতে বের হয়ে আসলেন এবং বাইরে একটি গাছের নীচে বসে দস্যুকে তাওবা করালেন ও ইসলাম গ্রহণ করালেন। এরপর হযরত ঈসার নিকট একটি ওহী নাযিল হলো। হযরত ঈসাকে আল্লাহ আদেশ দিলেন ঐ দরবেশকে জানিয়ে দেন যে, আল্লাহ তার মনের আশা পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাকে এই নওমুসলিমের সাথে একত্রে বেহেশতে বাস করতে হবে না। প্রচন্ড ঘৃণা ও হিংসার দায়ে আল্লাহ তার সকল নেক আমল বাতিল করে দিয়ে তার জন্য দোজখের ফায়সালা দিয়েছেন এবং তাওবাকারী আগন্তুকের জন্য বেহেশতের।

শিক্ষাঃ কোন ব্যক্তি তওবার মাধ্যমে একনিষ্ঠভাবে সত্যের পথে ফিরে আসার পর তার বিরুদ্ধে তার পূর্ববর্তী জীবনের প্রাপ্ত কর্মকান্ডের জন্য ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা অন্যায়।

৮৪হযরত ঈসা (আ), তিন সহচর ও স্বর্ণের উট

একবার হযরত ঈসা (আ) তাঁর তিন সহচরকে সাথে নিয়ে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে এক জায়গায় দু’টি স্বর্ণের ইট পাওয়া গেল। হযরত ঈসার(আ) তিন সহচর সঙ্গে সঙ্গে ইট দু’খানা তুলে নিতে ছুটে এল। তিনি তাদেরকে তা স্পর্শ করতে নিষেধ করলেন, “এ দুটো স্বর্ণের ইট দ্বারা হয়তো আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। এ দু’টো ইট তোমাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করতে পারে।” কিন্তু ঐ তিন সহচর তাঁর উপদেশে কর্ণপাত করলো না। তারা পরস্পর পরামর্শ করে একমত হলো যে, ইট দুটি তারা ভেঙ্গে অথবা বিক্রি করে ভাগ করে নিবে। হযরত ঈসা(আ) তাদের অনড় মনোভাব দেখে বিরক্ত হয়ে তাদের ত্যাগ করে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ঐ তিন সহচরের প্রচন্ড ক্ষিধে পেলে তারা তাদের একজনকে খাবার আনতে পাঠালো। ইত্যবসরে অবশিষ্ট দুজন ফন্দী আঁটলো, ঐ ব্যক্তি খাবার নিয়ে আসলে একযোগে আক্রমণ করে তাকে খতম করে ফেলবে। তাহলে ইট আর ভাগ করতে হবে না। দুজনের প্রত্যেকে আস্ত একখান করে ইট পাবে। ঐদিকে শয়তানের কুপ্ররোচনায় যে ব্যক্তি বাজারে খাবার আনতে গেল সে নিজের খাবার খেয়ে আসলো এবং অবশিষ্ট দুজনের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল।

যথাসময়ে ঐ ব্যক্তি খাবার নিয়ে ফিরে এল এবং সাথে সাথেই অপর দু ব্যক্তি একযোগে আক্রমণ করে তাকে মারতে মারতে মেরেই ফেললো। এরপর একপাশে লাশটা সরিয়ে রেখে পরম আনন্দে খেতে বসলো। আর যায় কোথায়। এক লোকমা খেতেই চিৎকার করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লো।

পরদিন হযরত ঈসা ঐ এলাকায় ফিরে এলে দেখলেন, তার তিন সহচরই মরে পড়ে আছে। আর তাদের লাশের পাশেই জ্বল জ্বল করছে স্বর্ণের ইট দু’টো।

শিক্ষাঃ  এ কিসসাটিও অত্যন্ত শিক্ষামূলক। প্রথমতঃ চুক্তি লঙ্ঘন করে তারা নিজেদের সঙ্গী তথা শরীকদেরকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করেছিল, যার পরিণাম হয়েছিল অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক। তাই কখনো পারস্পরিক চুক্তি অথবা ওয়াদা লঙ্ঘন করা চাই না এবং কারো ন্যায্য অধিকার হরণ করা উচিত নয়।

দ্বিতীয়তঃ তারা আল্লাহর নবীর সাথে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে সফরে বেরিয়েছিল। পথিমধ্যে পার্থিব সম্পদের প্রলোভনে সেই মহৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় এবং আল্লাহর নবীর নিষেধাজ্ঞাও অমান্য করে। তাই মনে রাখতে হবে, আল্লাহর ও রাসূলের নাফরমানী এবং বাতিলের প্রলোভনে সত্য হতে বিচ্যূত হওয়ার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে থাকে।

৮৫হযরত ইবরাহীম (আ) ও বিবি সারার ঘটনা

একবার হযরত ইবরাহীম (আ) স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে সাথে নিয়ে সফর করছিলেন। পথিমধ্যে একটি রাজ্যে তাকে যাত্রাবিরতি করতে হয়। ঐ রাজ্যের রাজা ছিল অত্যন্ত দুরাচারী যালেম। তার নিয়ম ছিল, কোন পথিকের সাথে তার স্ত্রী থাকলে সে স্ত্রীকে গ্রেফতার করে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতো। তবে কেউ বোন বা মেয়েকে নিয়ে সফর করলে তাদের কোন ক্ষতি করতো না।

হযরত ইবরাহীমের সস্ত্রীক ঐ রাজ্যে পৌঁছামাত্রই রাজার কাছে খবর পৌঁছে গেল। হযরত ইবরাহীম পূর্বাহ্নে এলাকার লোকদের কাছ হতে রাজার নিষ্ঠুর নিয়মের কথা জেনে গিয়েছিলেন। তাই তিনি আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখলেন যে, রাজার কাছে নীত হলে তিনি সারাকে স্ত্রী নয়, বোন বলে পরিচয় দিবেন।

যথাসময়ে রাজার প্রহরীরা তাঁদের উভয়কে ধরে রাজদরবারে নিয়ে গেল। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, এই মহিলা তোমার কে? তিনি বললেনঃ আমার বোন। রাজা তার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য সারাকে আলাদা ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। সারাও হযরত ইবরাহীমের শেখানো মত জানালেন যে, আমরা উভয়ে ভাইবোন। আসলে তাদের মনে মনে ছিল যে, তারা ইসলামী ভাই বোন-এই অর্থেই ঐ কথা বলবেন।

সারাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যখন আলাদা ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন হযরত ইবরাহীম নামায পড়ে নিভৃতে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে লাগলেন এবং সারার নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতে লাগলেন। অবশেষে সারার জবাবে সন্তুষ্ট হয়ে রাজা উভয়কে মুক্তি দিল।

শিক্ষাঃ

. যালেমের যুলুম হতে বাঁচার জন্য অন্য কোন উপায় না থাকলে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে। তবে সেক্ষেত্রেও নির্জলা মিথ্যা বলার চেয়ে ‘তাওরিয়া’ করাই (পরোক্ষ অর্থে বলা) শ্রেয়। যেখানে এটাও সম্ভব না হবে, সেখানে আত্মরক্ষার জন্য নির্জলা মিথ্যা কথা বলাও বৈধ হবে।

২. ইসলামের দিকে আহবান জানানো যাদের জীবনের লক্ষ্য ও ব্রত, তাদেরকে হযরত ইবরাহীম (আ) এর এই ঘটনা হতে শিক্ষা গ্রহণ করতঃ সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ও যুগের রীতি প্রথা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে এবং কিভাবে বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করা যায় সে ব্যাপারে বিচক্ষণতা ও দুরদর্শিতার সাথে পরিকল্পনা করতে হবে।

৩. যথাযথ বিচক্ষণতা ও কুশলতা প্রয়োগ করার পরও সাফল্যের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া অব্যাহত রাখতে হবে। কোন অবস্থাতেই আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।  

About আকরাম ফারুক