হাদীসের কিসসা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Slide1 (11)

হাদীসের কিসসা

আকরাম ফারুক


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

ভূমিকা

কিসসা কাহিনী ও গল্প বলা আবহমান কাল থেকেই শিক্ষার একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। নৈতিক অথবা নৈতিকতা বিরোধী-যে বিষয়েই মানুষকে প্রেরণা দান ও উদ্বুদ্ধ করণের আকাংখা পোষণ করা হোকনা কেন, কিসসা কাহিনীর মাধ্যমে তা সর্বোত্তম পর্যায়ে করা সম্ভব। সর্বশ্রেণীর মানুষকে, বিশেষতঃ শিশুদেরকে নৈতিক শিক্ষা দানের জন্য অতীত কিংবা বর্তমানের সর্বজনমান্য ব্যক্তিবর্গের জীবনী, ঘটনাবলী ও শিক্ষামূলক গল্প কাহিনী শোনানো ও প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত বই পড়তে দেয়া খুবই ফলদায়ক হয়ে থাকে।

মান্ব মনের এই স্বভাবগত ঝোঁক ও আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতেই অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থের বিরাট অংশ জুড়ে ইতিহাস ও ঘটনাবলী সন্নিবেশিত হতে দেখা যায়। মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং হাদীস গ্রন্থসমূহও বহুলাংশে ইতিহাস ও কাহিনীতে পরিপূর্ণ। কুরআনের এই ইতিহাস অংশ আলাদাভাবে কাসাসুল কুরআন নামে বিভিন্ন ভাষায় রচিত ও অনুদিত হয়েছে। কিন্তু হাদীসের কিসসা কাহিনী ও ইতিহাস সংবলিত অংশ বিশেষতঃ রাসূলুল্লাহ(সা) এর পূর্ববর্তী ঘটনাবলী আলাদাভাবে বই আকারে সংকলিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অথচ এই ঘটনাবলী সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে প্রমাণিত হতে পারে।

হাদীসের কিসসা নামে হাদীসে বর্ণিত ঘটনাবলীর এই ক্ষুদ্র সংকলনটি রচনার পটভূমি এটাই। কিসসাগুলি বিশুদ্ধ হাদীস হতে সংকলন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। “হাদীসের কিসসা” সর্বস্তরের মানুষ বিশেষতঃ শিশু কিশোরদের নিকট ইসলামের শিক্ষা বিস্তারের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই রচিত। আল্লাহ এ উদ্দেশ্য সফল করুন, এটাই তার দরবারে অধমের সকরুণ প্রার্থনা।

আকরাম ফারুক

ফায়দাবাদ, আযমপুর, ঢাকা।

০১-০৯-১৯৯৩

সূচীপত্রঃ

১। বিশ্বনবীর একটি স্বপ্ন

২। মিরাজের ঘটনা

৩। মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা

৪। মহানবীর আখলাক

৫। খলীফার আখলাক

৬। হযরত আবু বকরের(রা)খোদাভীতি

৮। হযরত আবু বকর(রা) অনুশোচনা

৯। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা

১০। হযরত ওমর(রা) এর ইসলাম গ্রহণ

১১। স্বামী স্ত্রীর আচরণে সহনশীলতা

১২। রাসূলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারকারী এক মুরতাদের শাস্তি

১৩। জাবালার উদ্ধত্য ও হযরত ওমর(রা)

১৪। হযরত খাব্বাব(রা) এর ত্যাগ ও কুরবানী

১৫। হযরত ওমরের(রা) শাসনে প্রজাদের সম-অধিকার

১৬। হযরত ওমর(রা) ও গভর্নর হরমুযান

১৭। হযরত ওমরের(রা) ন্যায় বিচারের আর একটি উদাহরণ

১৮। হযরত ওমর কর্তৃক স্বীয় পুত্রের বিচার

১৯। সততার পুরস্কার

২০। কাযী শুরাইহের ন্যায় বিচার

২১। হযরত উসমানের দানশীলতা ও মিতব্যয়িতা

২২। সাতশো গুণ লাভ

২৩। হযরত আলীর(রা) খোদাভীতি

২৪। অধিক সম্পদের মোহ ও কৃপণতার পরিণাম

২৫। হযরত আবু যার গিফারীর ইসলাম গ্রহণ

২৬। পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করার পরিণাম

২৭। কুরাইশ নেতাগণের গোপনে রাসূলুল্লাহর(সা) কুরআন পাঠ শ্রবণ

২৮। তাবুক অভিযানে অনুপস্থিত তিন সাহাবীর তওবার কাহিনী

২৯। হযরত সালমান ফারসীর ইসলাম গ্রহণ

৩০। মিথ্যা সকল পাপের জননী

৩১। মসজিদে যেরারের ঘটনা

৩২। মানুষের পরিণাম তার শেষ কর্মের উপর নির্ভরশীল

৩৩। বিনা তদন্তে কারো সম্পর্কে খারাচ ধারণা পোষণ ও অপপ্রচার

৩৪। বদর যোদ্ধাদের মর্যাদা

৩৫। সুরাকার বিবেক জেগে উঠলো

৩৬। হযরত খুবাইবের শাহাদাত

৩৭। আবু জাহলের যুলুম প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ(সা)

৩৮। বীরে মাউনার হৃদয় বিদারক ঘটনা

৩৯। মুমিনের নামায

৪০। মুমিনের আতিথেয়তা

৪১। মুমিনের আত্মসংযম

৪২। মুমিনের আত্মসমালোচনা

৪৩। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অগ্নিপরীক্ষায় মুমিনের দৃঢ়তা

৪৪। কুফরীর আস্তাকুঁড়ে ঈমানের রক্তগোলাপ

৪৫। ভিক্ষাবৃত্তি একটি কলংক

৪৬। পরোপকারী মানুষই শ্রেষ্ঠ মানুষ

৪৭। মোনাফেকীর পরিণাম

৪৮। রাখাল ছেলের খোদাভীতি

৪৯। প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর পথে দান করা

৫০। একটি নাকের মূল্য

৫১। পশুপাখির প্রতি দয়া মুমিনের কর্তব্য

৫২। খোদাভীরু সাহাবীর অলৌকিকভাবে জীবন রক্ষা

৫৩। ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের ন্যায়বিচার

৫৪। বাইতুল মাকদাস বিজয়ী হযরত উইশা ইবনে নুনের কাহিনী

৫৫। হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইরের ফরহেজগারী ও কৃতজ্ঞতা

৫৬। ইমাম আবু হানিফার মহানুভবতা

৫৭। ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক

৫৮। কে বেশি দানশীল

৫৯। একজন আরব শেখের মহানুভবতা

৬০। দুঃসাহসী বীর বিশর বিন আমরের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

৬১। হযরত যুলকিফলের ক্রোধ সংবরণ

৬২। মুক্তির জন্য নিজের সৎলোক হওয়াই যথেষ্ট নয়

৬৩। মসজিদুল আকসা নির্মাণের ঘটনা

৬৪। হযরত উযাইর(আ) এর কাহিনী

৬৫। কাদেসিয়ার এক দুর্ধর্ষ বীরের কাহিনী

৬৬। কে ধনী, কে গরীব

৬৭। উম্মে সুলাইমের দেনমোহর

৬৮। অকৃতজ্ঞতার পরিণাম

৬৯। আসহাবুল উখদুদের ঘটনা

৭০। সততার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত

৭১। তওবার মহিমা

৭২। আল্লাহর পথে দানের মাহাত্ম

৭৩। নিজের ক্ষতি স্বীকার করে পরোপকার

৭৪। ওয়াদামত ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব

৭৫। অপাত্রে দান

৭৬। অন্যায়ের প্রতিরোধ

৭৭। তিনজন মুসাফির

৭৮। লুকমান হাকীমের কিসসা

৭৯। নামায সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনা

৮০। উদ্যানের মালিকদের ঘটনা

৮১। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিরুদ্ধে শত্রুতার পরিণাম

৮২। হযরত আইয়ূব(আ) এর অগ্নিপরীক্ষা

৮৩। হযরত ঈসা(আ) ও দাম্ভিক দরবেশ

৮৪। হযরত ঈসা(আ), তিন সহচর এবং স্বর্ণের ইট

৮৫। হযরত ইবরাহীম(আ) ও বিবি সারার ঘটনা

৮৬। হযরত ইবরাহীম (আ) ও ভিক্ষুক

৮৭। হযরত ইবরাহীম(আ) ও তদীয় পরিবারের মক্কায় পুনর্বাসন

৮৮। হযরত মূসা(আ) ও পানির বোতল

৮৯। হযরত মূসা(আ) ও খিজির(আ) এর সফর

৯০। হযরত মূসা(আ) ও ইসতিসকার নামায

৯১। হযরত খিজিরের(আ) বদান্যতা

৯২। শাদ্দাদের বেহেশতের কাহিনী

৯৩। হযরত ঈসা(আ) এর উম্মতের এক দরবেশের কাহিনী

৯৪। হযরত সোলায়মান (আ) এর ন্যায়বিচার

৯৫। হযরত  ইউনূস(আ) এর কাহিনী

৯৬। উয়াইস কারনীর ঘটনা

 

বিশ্বনবীর একটি স্বপ্ন

 

হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি ছিল এই যে, প্রতিদিন ফজরের নামাযের পর সাহাবীদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছে কি না বা কারো কিছু জিজ্ঞাসা আছে কি না জানতে চাইতেন। কেউ কিছু জানতে চাইলে তাকে তিনি যথাযথ পরামর্শ দিতেন।

একদিন এরূপ জিজ্ঞাসা করার পর কেউ কিছু বলছে না দেখে তিনি নিজেই বলতে আরম্ভ করলেন। আজ আমি অতি সুন্দর ও আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, দুই ব্যক্তি আমার হাত ধরে আমাকে এক পবিত্র স্থানের দিকে নিয়ে চললো। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, এক ব্যক্তি বসে আছে আর অপর ব্যক্তি তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো লোকটির হাতে করাতের মত একখানা অস্ত্র আছে। সেই করাত দিয়ে সে বসে থাকা লোকটির মাথা চিরে ফেলছে। একবার মুখের দিক দিয়ে করাত ঢুকিয়ে দিয়ে  কেটে ফেলছে।

আবার বিপরীত দিক দিয়েও তদ্রুপ করছে। এক দিক দিয়ে কাটার পর যখন অপর দিক দিয়ে কাটতে যায় তখন আগের দিক জোড়া লেগে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ অবস্থা দেখে আমি আমার সঙ্গীদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলাম, এ কি ব্যাপার? তারা বললো, সামনে চলুন।

কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, একজন লোক শুয়ে আছে। অপর একজন একখানা ভারী পাথর নিয়ে তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো লোকটি ঐ পাথরের আঘাতে শোয়া লোকটির মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। পাথরটি সে এত জোরে মারে যে, মাথাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে সে অনেক দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। অতঃপর লোকটি যে পাথর কুড়িয়ে আনতে যায়, অমনি ভাঙ্গা মাথা জোড়া লেগে ভাল হয়ে যায়। সে ঐ পাথর কুড়িয়ে এনে পুনরায় মাথায় আঘাত করে এবং মাথা আবার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। এইভাবে ক্রমাগত ভাঙ্গা ও জোড়া লাগার পর্ব চলছে। এই লোমহর্ষক দৃশ্য দেখে আমি আতংকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কি আমাকে খুলে বলুন। তারা কোনো জবাব না দিয়ে পুনরায় বললেন, আগে চলুন। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে দেখি, একটি প্রকান্ড গর্ত। গর্তটির মুখ সরু, কিন্তু অভ্যন্তর ভাগ অত্যন্ত গভীর ও প্রশস্ত। এ যেন একটি জ্বলন্ত চুলো, যার ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আর তার ভেতরে বহুসংখ্যক নর-নারী দগ্ধীভূত হচ্ছে। আগুনের তেজ এত বেশী যেন তাতে ঢেউ খেলছে। ঢেউয়ের সাথে যখন আগুন উচু হয়ে ওঠে, তখন ঐ লোকগুলো উথলে গর্তের মুখের কাছে চলে আসে। আবার যেই আগুন নীচে নেমে যায়, অমনি তারাও সাথে সাথে নীচে নেমে যায়। আমি আতংকিত হয়ে সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, বন্ধুগণ! এবার আমাকে বলুন ব্যাপারটি কি? কিন্তু এবার তারাও কোনো জবাব না দিয়ে বললেন, আগে চলুন।

আমরা সামনে এগুতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, একটি রক্তের নদী বয়ে চলছে। তীরে একটি লোক দাঁড়িয়ে। তার কাছে স্তুপীকৃত রয়েছে কিছু পাথর। নদীর মধ্যে হাবুডুবু খেয়ে একটি লোক অতি কষ্টে কিনারের দিকে আসার চেষ্টা করছে। কিনারের কাছাকাছি আসামাত্রই তীরবর্তী লোকটি তার দিকে এত জোরে পাথর ছুঁড়ে মারছে যে, সে আবার নদীর মাঝখানে চলে যাচ্ছে। এভাবে ক্রমাগত তার হাবুডুবু খেতে খেতে কুলে আসার এবং কুল থেকে পাথর মেরে তাকে মাঝ নদীতে হটিয়ে দেয়ার কার্যক্রম চলছে। এমন নির্মম আচরণ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে আমার সঙ্গীকে বললামঃ বলুন, এ কি ব্যাপার? কিন্তু এবারও তারা জবাব না দিয়ে বললেন, সামনে চলুন।

আমরা আবার এগুতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম একটি সুন্দর সবুজ ‍উদ্যান। উদ্যানের মাঝখানে একটি উঁচু গাছ। তার নীচে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছে। বৃদ্ধকে বেষ্টন করে বসে আছে বহুসংখ্যক বালক বালিকা। গাছের অপর পারে আরো এক ব্যক্তি বসে রয়েছে। তার সামনে আগুন জ্বলছে। ঐ লোকটি আগুনের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। সঙ্গীদ্বয় আমাকে গাছে উঠালেন। গাছের মাঝখানে গিয়ে দেখলাম একটি মনোরম প্রাসাদ। এত সুন্দর ভবন আমি আর কখনো দেখি নি। ঐ ভবনে বালক বালিকা ও স্ত্রী পুরুষ-সকল শ্রেণীর মানুষ বিদ্যমান। সঙ্গীদ্বয় আমাকে আরো উপরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আরো একটি মনোরম গৃহ দেখতে পেলাম। তার ভেতরে দেখলাম শুধু কিছু সংখ্যক যুবক ও বৃদ্ধ উপস্থিত। আমি সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আপনারা আমাকে নানা জায়গা ঘুরিয়ে অনেক কিছু দেখালেন। এবার এ সবের রহস্য আমাকে খুলে বলুন।

সঙ্গীদ্বয় বলতে লাগলেনঃ প্রথম যে লোকটির মাথা করাত দিয়ে চেরাই করতে দেখলেন, তার মিথ্যা বলার অভ্যাস ছিল। সে যে সব মিথ্যা রটাতো, তা সমগ্র সমাজে প্রসিদ্ধ হয়ে যেতো। কিয়ামত পর্যন্ত তার এরূপ শাস্তি হতে থাকবে।

তারপর যার মাথা পাথরের আঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হতে দেখলেন, সে ছিল একজন মস্ত বড় আলেম। নিজে কুরআন হাদীস শিখেছিল, কিন্তু তা অন্যকে শিখায়নি এবং নিজেও তদনুসারে আমল করে নি। হাশরের দিন পর্যন্ত তার এ রকম শাস্তি হতে থাকবে।

তারপর যাদেরকে আগুনের বদ্ধ চুলায় জ্বলতে দেখলেন তারা ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এই আযাব চলতে থাকবে।

রক্তের নদীতে হাবুডুবু খাওয়া লোকটি দুনিয়ায় সুদ ও ঘুষ খেতো এবং এতিম ও বিধবার সম্পদ আত্মসাৎ করতো।

গাছের নীচে যে বৃদ্ধকে বালক বালিকা পরিবেষ্টিত দেখলেন, উনি হযরত ইবরাহীম এবং বালক বালিকারা হচ্ছে নাবালক অবস্থায় মৃত ছেলেমেয়ে। আর যাকে আগুন জ্বালাতে দেখলেন, তিনি দোযখের দারোগা মালেক। গাছের উপর প্রথম যে ভবনটি দেখেছেন, ওটা সাধারণ ঈমানদারদের বেহেশতের বাড়িঘর। আর দ্বিতীয় যে প্রাসাদটি দেখেছেন, তা হচ্ছে ইসলামের জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের বাসস্থান। আর আমি জিবরাঈল এবং আমার সংগী ইনি মিকাইল। অতঃপর জিবরীল আমাকে বললেন, উপরের দিকে তাকান। আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে একখন্ড সাদা মেঘের মত দেখলাম। জিবরীল বললেন, ওটা আপনার বাসস্থান। আমি বললাম, আমাকে ঐ বাড়িতে যেতে দিন। জিবরীল বললেন, এখনো সময় হয় নি। পৃথিবীতে এখনো আপনার আয়ুকাল বাকী আছে। দুনিয়ার জীবন শেষ হলে আপনি ওখানে যাবেন।

শিক্ষাঃ এ হাদীসটিতে রাসূল(সা) কে স্বপ্নের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধের পরকালীন শাস্তির নমুনা দেখানোর বিবরণ রয়েছে। নবীদের স্বপ্ন ওহীর অন্তর্ভুক্ত এবং অকাট্য সত্য। সুতরাং এ শাস্তির ব্যাপারে আমাদের সুদৃঢ় ঈমান রাখা এবং এগুলিকে স্মরণে রেখে এসব অপরাধ থেকে নিবৃত্ত থাকা উচিত। বিশেষতঃ এমন কয়েকটি অপরাধের ওপর এখানে আলোকপাত করা হয়েছে, যা সামাজিক অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যা গোটা সমাজকে অন্যায় ও অনাচারের কবলে নিক্ষেপ করে। যেমনঃ মিথ্যাচার, সুদ, ঘুষ ও পরের অর্থ আত্মসাৎ করা এবং ইসলামের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা প্রচারে বিমুখ হওয়া ও সে অনুসারে আমল না করা। একজন মিথ্যাবাদী যেমন মিথ্যা গুজব, অপবাদ ও কুৎসা রটিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত, বিপথগামী ও গোটা দেশবাসীকে অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করে থাকে। একজন আলেম তেমনি তার নিষ্ক্রিয়তা ও বদআমলী দ্বারা অন্য যে কোনো খারাপ লোকের চেয়ে সমাজকে অধিকতর অপকর্মে প্ররোচিত করে থাকে। আর পরের সম্পদ আত্মসাৎকারী এবং সুদখোর ও ঘুষখোর যে গোটা সমাজকে কিভাবে জুলুম, নিপীড়ন ও শোষণ করে তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না।

 

মিরাজের ঘটনাঃ

মিরাজ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ(সা) এর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর, অলৌকিক ও শিক্ষামূলক ঘটনা। রাত্রে সংঘটিত হয়েছে বলে অনেকে একে স্বপ্ন ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছে। আসলে এটি একটি বাস্তব ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পূর্ণ জাগ্রত ও সচেতন অবস্থায় ফেরেশতাদের সাহচর্যে প্রথমে বায়তুল মোকাদ্দাস এবং পরে সেখান থেকে সাত আসমান ও তারও উর্ধ্ব জগত পরিভ্রমণ করেন। এই ঘটনা সম্পর্কে নিম্নে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম হতে সমন্বিত বিবরণ উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ(সা) একদিন সকালে সাহাবায়ে কেরামের মজলিশে বললেন, “গত রাত্রে আমার প্রতিপালক আমাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন।গত রাত্রে আমি যখন মসজিদুল হারামে ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন তিনজন ফেরেশতা আমার কাছে আসলেন। তাঁরা আমাকে জাগিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যমযম কুয়ার কাছে নিয়ে রাখলেন। অতঃপর জিবরীল আমার গলা থেকে বুক পর্যন্ত চিরে ফেললেন এবং আমার বুক ও পেটের ভেতর থেকে সমুদয় বস্তু বের করলেন। তারপর নিজ হাতে জমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে আমার পেট পবিত্র করলেন। অতঃপর একটি সোনার পাত্র আনা হলো। ঐ পাত্র থেকে ঈমান ও হিকমত নিয়ে বুক ও গলার ধমনীগুলো পূর্ণ করলেন এবং জোড়া লাগিয়ে দিলেন। অতঃপর আমাকে মসজিদুল হারামের দরজায় আনা হলো। সেখানে জিবরীল আমাকে বহন করার জন্য খচ্চর সদৃশ বোরাক নামক একটি জন্তু পেশ করলেন। জন্তুটি ছিল শ্বেত বর্ণের। আমি যখন তাতে আরোহণ করলাম, তখন তা এত দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো যে, তার পেছনের পা দুটি যে স্থানে স্পর্শ করে, সেখান থেকে সামনের পা যেখানে পড়ে তার দূরত্ব দৃষ্টিসীমার দূরত্বের সমান। এভাবে তা আমাকে বিদ্যুৎবেগে নিয়ে বায়তুল মাকদাসে গিয়ে উপনীত হলো। এখানে জিবরীলের ইংগীতে বোরাকটিকে মাসজিদুল আকসার দরজার কাছে একটি বিশেষ জায়গায় বেঁধে রাখা হলো। বনী ইসরাঈলের নবীগণ এই মসজিদে নামায পড়তে এসে তাদের বাহনকে এ জায়গায় বেঁধে রাখতেন।

অতঃপর আমি মসজিদুর আকসার ভিতর প্রবেশ করে দু’রাকাত নফল নামায পড়লাম। কোনো কোনো বর্ণনা অনুসারে, পূর্ববর্তী সকল নবীগণের ইমাম হয়ে জামায়াতে নামায পড়লাম। তারপর সেখান হতে উর্ধ্বজগতে আরোহনের প্রস্তুতি শুরু হলো। প্রথমে জিবরীল আমার সামনে দু’টি পেয়ালা পেশ করলেন। এর একটিতে দুধ ও অপরটিতে মদ ছিল। আমি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করলাম এবং মদের পেয়ালা ফেরত দিলাম। তা দেখে জিবরীল বললেন, আপনি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করে স্বাভাবিক দ্বীনকে গ্রহণ করেছেন। অতঃপর উর্ধ্বজগতের ভ্রমণ শুরু হলো। আমাকে ও জিবরীলকে নিয়ে বোরাক আকাশের দিকে উড়ে চলল। আমরা প্রথম আসমানে পোঁছলে জিবরীল দ্বাররক্ষী ফেরেশতাদেরকে দরজা খুলে দিতে বললেন। রক্ষী ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করলেন, কে? জিবরীল উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সংগে কে? জিবরীল উত্তর দিলেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ফেরেশতারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি আল্লাহর নিমন্ত্রণ পেয়ে এসেছেন? জিবরীল বললেন, অবশ্যই। ফেরেশতারা দরজা খুলতে খুলতে বললেন, এমন ব্যক্তির আগমন মোবারক হোক। আমরা যখন প্রথম আকাশে প্রবেশ করলাম, প্রথমেই হযরত আদম(আ)এর সাথে দেখা হল। জিবরীল আমাকে বললেন, ইনি আপনার পিতা আদম আলাইহিস সালাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি আমার সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, স্বাগতম, হে সম্মানিত পুত্র ও সম্মানিত নবী। অতঃপর দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলাম। এখানে প্রথম আসমানের মত প্রশ্নোত্তরের পালা অতিক্রম করে দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম। সেখানে হযরত ইয়াহিয়া ও ঈশা(আ) এর সাথে সাক্ষাত হলো। জিবরীল আমাকে তাঁদের উভয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং বললেন, আপনিই আগে সালাম করুন। আমি সালাম করলে তাঁরা উত্তর দিয়ে বললেন, “স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই ও সম্মানিত নবী।” অতঃপর তৃতীয় আসমানে পৌঁছলে পূর্বের মত ঘটনাই ঘটলো এবং সেখানে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাত হলো। জিবরীল আমাকে বললেন, আপনিই আগে সালাম করুন। আমি সালাম করলে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, “স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই ও সম্মানিত নবী।” অতঃপর চতূর্থ আসমানে একইরকম প্রশ্নোত্তর পর্ব অতিক্রম করে হযরত ইদরীস আলাইহিস সালামের সাক্ষাত হলো। অতঃপর পঞ্চম আসমানে হযরত হারূন (আ) ও ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আ) এর সাথে একইভাবে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু হযরত মূসার(আ) কাছ হতে বিদায় নেয়ার সময় তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আপনার এই অসাধারণ মর্যাদার জন্য আমার ঈর্ষা হচ্ছে যে, আপনার উম্মত আমার উম্মতের তুলনায় বহু গুণ বেশী বেহেশতবাসী হবে। অতঃপর পূর্বোক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অতিক্রম করে আমরা যখন সপ্তম আসমানে পৌঁছলাম, তখন সেখানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি সেখানে বায়তুল মা’মুরের দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসেছিলেন। এই বায়তুল মা’মুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার নতুন নতুন ফেরেশতা প্রবেশ করেন।

তিনি আমার সালামের জবাব দিয়ে বললেন,“স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই ও সম্মানিত নবী।” অতঃপর সেখান থেকে আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় (শাব্দিক অর্থে সীমান্তের বরই গাছ, তবে এটি আসলে কি গাছ তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না) নিয়ে যাওয়া হলো।

অতঃপর আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে হুকুম দিলেন যে, আপনার ও আপনার উম্মতের উপর ৫০ ওয়াক্ত নামায ফরয হলো। অতঃপর আমি নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। পথিমধ্যে হযরত মূসা(আ) এর সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই মিরাজের সফরে আপনি কি উপঢৌকন পেলেন? আমি বললাম, ৫০ ওয়াক্ত নামায। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এই ভারী বোঝা বহন করতে পারবে না। সুতরাং আপনি আবার ফিরে যান এবং আরো কমিয়ে দেয়ার আবেদন জানান। কেননা আমি আপনার পূর্বে নিজের উম্মাতকে পরীক্ষা করেছি। এ কথা শুনে আমি আল্লাহর দরবারে ফিরে গেলাম এবং মিনতি জানানোর পর ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হলো। অতঃপর মূসার কাছে আসলে তিনি পুনরায় বললেন, এখনো অনেক বেশী রয়েছে, আবার যান এবং আরো কমিয়ে আনুন। আমি আবার গেলাম। এবারও আরো ৫ ওয়াক্ত কমানো হলো। অতঃপর মূসার পীড়াপীড়িতে আবার যাই এবং আবার ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে আনি। এভাবে কয়েকবার গিয়ে কমাতে কমাতে যখন মাত্র ৫ ওয়াক্ত বাকী রইল, তখনও মূসা আমাকে বললেন, আমি বনী ইসরাঈলের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আপনার উম্মাত ৫ ওয়াক্তও সহ্য করতে পারবে না। সুতরাং আবার যান এবং কমিয়ে আনুন। কেননা প্রতিবার ৫ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। এবার গেলেও হয়তো ৫ ওয়াক্ত কমানো হবে। তখন আমার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আমি এখন পুনরায় কমানোর আবেদন জানাতে লজ্জাবোধ করছি।”

বুখারী শরীফের রেওয়ায়াতে আরো বলা হয়েছে যে, শেষবারেও রাসূলুল্লাহ(সা) আল্লাহর কাছে যান এবং বলেন, হে প্রতিপালক! আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি খুবই দুর্বল। অতএব আমার প্রতি এ নির্দেশকে আরো হালকা করে দিন। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মদ! রাসূল (সা) জবাব দিলেনঃ হে প্রভু, আমি হাযির। আল্লাহ বললেনঃ আমার নির্দেশের কোনো রদবদল হয় না। আমি তোমাদের প্রতি যা ফরয করেছিলাম, তা উম্মুল কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। প্রত্যেক সত কাজের নেকী দশগুণ। উম্মুল কিতাব বা লওহে মাহফুযে পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিখা থাকলো। শুধু তোমার ও তোমার উম্মাতের জন্য তা ৫ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর তিনি নেমে এলেন এবং নিজেকে জাগ্রত অবস্থায় মসজিদুল হারামে উপনীত দেখতে পেলেন।

শিক্ষাঃ মিরাজের ঘটনার শিক্ষা অনেক। এখানে তার মাত্র কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা তুলে ধরছি।

(১) নামায যে ইসলামী ইবাদতগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা হতে দিবালোকের মত স্পষ্ট। আল্লাহ অন্যান্য সকল ইবাদত ফরয করার জন্য ওহী নাযিল করাই যথেষ্ট মনে করেছেন। কিন্তু নামায ফরয করার জন্য ১১৩ বার নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও তাকে যথেষ্ট মনে করেন নি। বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়ে রাসূল(সা) কে নিজের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে নিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামায এমন ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ফরয করলেন যে, প্রতি ওয়াক্তের নামায দশটি ওয়াক্তের সমান বলে ধারণা দেয়া হলো। যাতে এর একটি ওয়াক্তও কেউ তরক করার সাহস না পায়।

(২) রাসূলুল্লাহ(সা) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পূর্ববর্তী সকল নবীকে প্রথমে সালাম দিয়েছেন। এ দ্বারা ইসলামের এ শিক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, কোন জায়গায় আগে থেকে উপস্থিত ব্যক্তি এবং পরে আগত ব্যক্তির মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তির কর্তব্য প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে সালাম করা, চাই মর্যাদার দিক দিয়ে যিনিই শ্রেষ্ঠ হোন না কেন।

৩। মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা

 হযরত জাবের থেকে বর্ণিত আছে যে, আমরা রাসূল(সা) এর সঙ্গে যাতুর রিকাব অভিযানে গিয়েছিলাম। একটি ছায়াদার বৃক্ষ দেখে সেখানে রাসূল(সা) বিশ্রাম করতে লাগলেন। আর আমরা কিছু দূরে অবস্থান করতে লাগলাম। সহসা শত্রুপক্ষীয় একজন মোশরেক রাসূল(সা) এর কাছে এল। এ সময়ে রাসূল(সা) ঘুমন্ত ছিলেন এবং তাঁর তরবারী গাছের সাথে ঝুলছিল। সে এসেই রাসূলুল্লাহর(সা) তরবারী হাতে নিয়ে বললো, হে মুহাম্মদ! এখন তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে? রাসূল(সা) নির্ভীকভাবে দৃপ্ত কন্ঠে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। এ কথা শোনামাত্র লোকটির হাত থেকে তরবারী খসে পড়ল। অমনি রাসূল(সা) তরবারী তুলে নিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ বল, এখন কে তোমাকে আমার হাত হতে রক্ষা করবে? সে বললোঃ আপনি মহানুভবতা প্রদর্শন করুন। রাসূল(সা) বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত আছ যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা’বুদ নেই এবং আমি তাঁর রাসূল। সে বললোঃ না। তবে আমি ওয়াদা করছি যে, আমি কখনো আপনার সাথে যুদ্ধ করবো না এবং আপনার শত্রুদের সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করতে আসবো না। রাসূল(সা) তাকে মুক্ত করে দিলেন। সে চলে গেল। নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে সে বললোঃ আমি মুহাম্মদের(সা) সাথে সাক্ষাত করে এলাম। পৃথিবীতে তার চেয়ে উত্তম মানুষ আর নেই।

শিক্ষাঃ (১) আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, অবিচল নির্ভরতা ও সৎসাহস মুমিন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

(২) নাগালে পেয়েও শত্রুর প্রতি মহানুভবতা ও ক্ষমা প্রদর্শন ইসলামের দাওয়াত দাতাদের সবচেয়ে মূল্যবান গুণ। এ দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।

(৩) শত্রুকে সব সময় স্বমতে দীক্ষিত করার আশা করা ঠিক নয়। কখনো কখনো তার শত্রুতার তীব্রতা হ্রাস পাওয়াকেই যথেষ্ট মনে করা উচিত। তাকে সংঘর্ষের পথ থেকে সরাতে পারাও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

৪। মহানবীর আখলাক

(ক) একবার এক সফরে থাকাকালে রাসূল(সা) সাহাবীগণকে একটি ছাগল জবাই করে রান্না করতে বললেন। জনৈক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটি জবাই করবো। আর এক সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটির চামড়া খসাব ও গোশত বানাবো। তৃতীয় সাহাবী আবদার করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটি রান্না করবো। রাসূল(সা) বললেন, ঠিক আছে। আর আমি ছাগলটি রান্নার জন্য জ্বালানী কাঠ কুড়িয়ে আনবো।

সকলে একযোগে বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ(সা), এ কাজটিও আমরা করতে পারবো, আপনার কিছু করতে হবে না। রাসূল(সা) বললেন, আমি জানি, ও কাজটি আমি না পারলেও তোমরা করতে পারবে। কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসে থাকা পছন্দ করি না। আল্লাহও এটা পছন্দ করেন না যে, তার কোন বান্দা তার সাথীদের মধ্যে স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসে থাকুক।

শিক্ষাঃ

মহানবী(সা) এর এই গুণটি পদমর্যাদা সম্পন্নসহ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের আয়ত্ত্ব করা উচিত। অফিস আদালতে বা ঘরোয়া জীবনে সর্বক্ষেত্রে প্রত্যেকের পরস্পরের সহযোগিতা করা উচিত।

(খ) জনৈক ইহুদীর কাছে রাসূল(সা) এর কিছু ঋণ ছিল। লোকটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধের জন্য তাড়া দিতে লাগলো। সে মদিনার এক রাস্তায় রাসূল(সা) এর মুখোমুখি হয়ে বললো, “তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধরেরা সময়মত ঋণ পরিশোধ কর না।”

হযরত ওমর তাঁর এই আচরণ দেখে রেগে গিয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, ওর গর্দান কেটে ফেলি।”

রাসূল(সা) বললেন, “হে ওমর, আমার এই ইহুদীর জন্য অন্য রকম আচরণের প্রয়োজন ছিল। তুমি বরং ওকে উত্তম পন্থায় ঋণ ফেরত চাইতে বল, আর আমাকে উত্তম পন্থায় ঋণ পরিশোধ করতে বল।”

অতঃপর তিনি ইহুদীর দিকে ফিরে বললেন, তুমি কালকেই তোমার দেয়া ঋণ ফেরত পাবে।

এদিকে রাসূল(সা) এর ব্যবহারে ইহুদীর মনে ভাবান্তর দেখা দিল। সে এগিয়ে এসে বললোঃ “আমি আসলে আপনার প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলাম। তাওরাতে শেষ নবীর এ রকম আলামতই লেখা আছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনিই আল্লাহর রাসূল।” এই বলে সে ইসলাম গ্রহণ করলো।

শিক্ষাঃ

-স্বচ্ছল ব্যক্তির কোনো অস্বচ্ছল ব্যক্তিকে ঋণ দেয়া খুবই সাওয়াবের কাজ। আর সময় মত ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তাকে সময় বাড়িয়ে দেয়া আরো মহৎ কাজ। তবে সময় হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধের জন্য তাড়া দেয়া ও কটূক্তি করায় ঋণ দেয়ার সাওয়াব কমে যায়।

-কারো আচরণে সহসা উত্তেজিত হওয়া উচিত নয়। ধৈর্য্য ও সহিষ্ঞুতায় কখনো কখনো অকল্পনীয় সুফল পাওয়া যায়।

৫। খলিফার আখলাক

(ক) হযরত আবু বকর ছিদ্দীক(রা) যেদিন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন সেদিনই সকালে কাপড়ের বড় একটা পুটলি মাথায় করে বাড়ি থেকে বেরুলেন। পথে হযরত ওমরের সাথে তার দেখা হলো। ওমর জিজ্ঞাসা করলেন, ওহে রাসূলুল্লাহর খলীফা, আপনি কোথায় চলেছেন?

হযরত আবু বকর বললেন, বাজারে।

হযরত ওমর বললেন, আপনি মুসলমানদের শাসনভার গ্রহণ করেছেন। এখন বাজারে আপনার কি কাজ?

আবু বকর বললেন, বাজারে না গেলে আমার ছেলেমেয়েকে খাওয়াবো কোত্থেকে? নিজের ছেলেমেয়েদের যদি আমি খাবার দিতে না পারি তাহলে গোটা দেশের মুসলমানদেরও তো আমি খাবার দিতে পারবো না।

ওমর বললেন, চলুন, মসজিদে নববীতে যাই। সবার সাথে আলোচনা করে আপনার ও আপনার পরিবারের খোরপোশের কি ব্যবস্থা করা যায়, যাতে আপনি দেশের কল্যাণ সাধন ও খিলাফতের দায়িত্ব পালনে একাগ্রচিত্তে কাজ করতে পারেন। মসজিদে গিয়ে আবু বকর ও ওমর বাইতুল মালের সচিব আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ ও আরো কিছু সংখ্যক সাহাবীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেন এবং ওমর তাঁর অভিমত প্রকাশ করলেন। তখন সকলে আবু বকর ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রচলিত নিয়েমে যতটা দরকার খোরপোষ বরাদ্দ করলেন।

শিক্ষাঃ মুসলমানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরকে এরূপ বেতনভাতা দেওয়া উচিত, যাতে তারা মৌলিক প্রয়োজনের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থেকে একাগ্রচিত্তে কাজ করতে পারেন এবং কোনো দুর্নীতিতে লিপ্ত হতে বাধ্য না হন।

(খ) খলিফা হওয়ার পর হযরত ওমর(রা) রাত জেগে এ বলে কাঁদতেন যে, আল্লাহর কসম, আমার শাসনকালে ছাগলও যদি নদীর কিনারে অযত্নে পড়ে থাকে, তবে আমার আশংকা হয় যে, কিয়ামতের দিন তার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

একদিন তিনি একজন সঙ্গীকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক মহিলা তাকে ডেকে থামালো। তারপর বললো, একদিন তুমি শিশু ওমর ছিলে, এখন তুমি বয়স্ক ওমর হয়েছ। কাল তুমি ওমর ছিলে, আজ হয়েছ মুসলমানদের খলীফা। হে ওমর, আল্লাহ তোমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। মহিলার কথা শুনে ওমর অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। খলীফার সঙ্গী মহিলাকে বললো, ওহে আল্লাহর বান্দী, একটু সংযত হয়ে কথা বলুন। যিনি এই পৃথিবীতে আল্লাহর রাসূলের খলীফা, তাঁকে আপনি কাঁদিয়ে ফেললেন।

ওমর বললেন, “ওহে আমার সহযাত্রী, এ মহিলাকে বলতে দাও। উনি হচ্ছেন সেই খাওলা বিনতে হাকীম, যার কথা স্বয়ং আল্লাহও শুনেছেন এবং পবিত্র কুরআনে তা বর্ণনাও করেছেন, “হে রাসূল, সেই মহিলার কথা আল্লাহ শুনেছেন যে তোমার সাথে তার স্বামীর ব্যাপারে বাকবিতন্ডা করে এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে। আল্লাহ তোমাদের উভয়ের আলোচনা শ্রবণ করেন।” সুতরাং খাত্তাবের পুত্র ওমরকে তার কথা শুনতেই হবে।”

শিক্ষাঃ শাসকদের কর্তব্য প্রজাদের যাবতীয় অভাব অভিযোগ অনুযোগ ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করা ও যথাসাধ্য প্রতিকার করা।

৬। হযরত আবু বকরের খোদাভীতি

সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর(রা) এর একজন গোলাম ছিল। সে হযরত আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু অর্থ দেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন। অতঃপর প্রতিদিন সে তার মুক্তিপণের কিছু অংশ নিয়ে আসতো। হযরত আবু বকর(রা)তাকে জিজ্ঞেস করতেন, কিভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিতে পারত তবে তা গ্রহণ করতেন, নতুবা করতেন না। একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার জিনিস নিয়ে এল। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে সেই খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন। তাঁরপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ খাবার তুমি কিভাবে সংগ্রহ করেছ? সে বললোঃ আমি জাহেলিয়াত আমলে লোকের ভাগ্যগণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না। কেবল ধোকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্যগণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত। হযরত আবু বকর(রা) বললেনঃ কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছ। তারপর গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বমিতে খাওয়া জিনিস বেরুলোনা। তখন তিনি পানি চাইলেন। পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভু্ক্ত দ্রব্য পেট থেকে বের করে দিলেন। লোকেরা বললঃ আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন। ঐ এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? হযরত আবু বকর(রা) বললেনঃ ঐ খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যুবরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম। কেননা আমি শুনেছি, রাসূল(সা) বলেছেনঃ “যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য দোযখের আগুনই উত্তম।” তাই আমি আশংকা করেছিলাম যে এই এক লোকমা খাদ্য দ্বারা আমার শরীরের কিছু অংশ গঠিত হতে পারে।

শিক্ষাঃ আখিরাতের কঠিন ও অবধারিত শাস্তির কথা মনে রেখে সব সময় হালাল হারাম বাছ বিচার করে চলা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

৭। হযরত আবু বকরের(রা) জনসেবা

হযরত আবু বকর(রা) কে খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছে একথা যখন ঘোষণা করা হলো তখন মহল্লার একটি গরীব মেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো যে, আবু বকর(রা) খলীফা হয়েছেন, তাতে তোমার কি অসুবিধা হয়েছে? মেয়েটি বললো, “আমাদের ছাগলগুলোর কী হবে?” জিজ্ঞেস করা হলো, “এর অর্থ?” সে বললো, এখনতো উনি খলীফা হয়ে গেছেন। আমাদের ছাগল ক’টার দেখাশোনাই বা কে করবে, এগুলোর দুধই বা কে দুইয়ে দিবে? এ কথার কেনো জবাব দেয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না। কিন্তু পরদিন খুব ভোরে মেয়েটি অবাক হয়ে দেখলো যে, হযরত আবু বকর(রা) যথাসময়ে তাদের বাড়ি গিয়েছেন এবং দুধ দোহাচ্ছেন। আর যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “মা, তুমি একটুও চিন্তা করো না। আমি প্রতিদিন এভাবেই তোমার কাজ করে দিয়ে যাবো।” তাবাকাতে ইবনে সাদে আছে যে, মেয়েটির বিচলিত হওয়ার সংবাদ শুনে হযরত আবু বকর(রা) বলেছিলেন, আমি আশা করি খেলাফতের দায়িত্ব আমার আল্লাহর বান্দাদের সেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আমি এখনো এ দরিদ্র মেয়েটির ছাগল দোহন করে দিয়ে আসবো ইনশাল্লাহ।

ইবনে আসাকার লিখেছেন যে, আবু বকর(রা) খেলাফতের পূর্বে তিন বছর এবং খেলাফতের পরে এক বছর পর্যন্ত মহল্লার দরিদ্র পরিবারগুলির ছাগল দোহন করে দিয়ে আসতেন।

আবু ছালেহ গিফারী বর্ণনা করেন যে, হযরত আবু বকর(রা) যখন খলীফা হন তখন মদীনার এক অন্ধ বুড়ীর বাড়ির কাজকর্ম হযরত ওমর(রা) স্বহস্তে করে দিতেন। তার প্রয়োজনীয় পানি এনে দিতেন ও বাজার সওদা করে দিতেন।

একদিন ওমর সেখানে গিয়ে দেখেন বুড়ীর বাড়ি একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কলসিতে পানি আনা হয়েছে, বাজারও করা হয়েছে। তিনি ভাবলেন, বুড়ীর কোনো প্রতিবেশি হয়তো কাজগুলো করে দিয়ে গেছে। পরদিনও দেখলেন একই অবস্থা। সব কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। এবার হযরত ওমরের কৌতুহল হলো। ভাবলেন, এই মহানুভব ব্যক্তিটি কে তা না দেখে ছাড়বেন না।

একদিন নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে এসে লুকিয়ে রইলেন। দেখলেন অতি প্রত্যুষে এক ব্যক্তি বুড়ীর বাড়ির দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছেন। হযরত ওমর বুঝতে পারলেন যে, এই ব্যক্তিই সেই মহান ব্যক্তি যিনি তারও আগে এসে বুড়ীর সমস্ত কাজ সেরে দিয়ে যান। ব্যক্তিটি বুড়ীর ঘরের মধ্যে এসে যখন কাজ শুরু করে দিল তখন হযরত ওমর যেয়ে দেখেন, ইনি আর কেউ নন, স্বয়ং খলীফা হযরত আবু বকর(রা)। হযরত ওমর বললেন, হে রাসূলের প্রতিনিধি! মুসলিম জাহানের শাসন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই বুড়ীর তদারকীও চালিয়ে যেতে চান নাকি? হযরত আবু বকর(রা) জবাব না দিয়ে একটু মুচকি হেসে যথারীতি কাজ করতে লাগলেন।

শিক্ষাঃ সাধারণত উচ্চপদস্থ লোকেরা অন্যের কাজ করা দূরে থাক, নিজের কাজও করতে চায় না। চাকর চাকরানী ও যন্ত্রের মাধ্যমে সব কাজ সারতে চেষ্টা করে। হযরত আবু বাকরের হাতে দাস দাসীর অভাব ছিল না। উপকারের কাজটা কোনো ভৃত্যকে পাঠিয়ে দিয়েও করাতে পারতেন। কিন্তু আখেরাতের বাড়তি সাওয়াবের আশায় এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মানসে এভাবে স্বহস্তে অন্যের সেবা করেছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন থাকা অবস্থায়। সকল যুগের মুসলমানদের সকল পর্যায়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জন্য এটি একটি চমকপ্রদ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

৮। হযরত আবু বকর(রা) এর অনুশোচনা

এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর         সিদ্দীক(রা) কে গালি দিচ্ছিল। সেখানে রাসূল(সা) উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর(রা) কোনো বাদ প্রতিবাদ না করে নীরবে গালি শুনতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি ঐ ব্যক্তিতে তারই দেয়া একটি গালি ফেরত দিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ(সা) এর মুখে অসন্তোষের চিহ্ন ফুটে উঠল। তিনি উঠে বাড়ীতে চলে গেলেন। হযরত আবু বকর(রা) ঘাবড়ে গেলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, “হে রাসূল! লোকটি যখন আমাকে গালি দিচ্ছিল আপনি চুপচাপ শুনছিলেন। যেই আমি জবাব দিলাম অমনি অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে চলে এলেন।”

রাসূল(সা) বললেন, “শোন আবু বকর, যতক্ষণ তুমি চুপ ছিলে এবং ধৈর্য ধারণ করছিলে, ততক্ষণ তোমার সাথে আল্লাহর একজন ফেরেশতা ছিল, যিনি তোমার পক্ষ হতে জবাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু যখন তুমি নিজেই জবাব দিতে শুরু করলে তখন ঐ ফেরেশতা চলে গেলেন এবং মাঝখানে এক শয়তান এসে গেল। সে তোমাদের উভয়ের মধ্যে গোলযোগ তীব্রতম করতে চাইছিল। হে আবু বকর! মনে রেখ কোনো বান্দার উপর যদি যুলুম ও বাড়াবাড়ি হতে থাকে এবং সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা ক্ষমা করতে থাকে এবং কোনো প্রতিশোধ নেয়া হতে বিরত থাকে, তবে আল্লাহ যুলুমকারীর বিরুদ্ধে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করে।”

হযরত আবু বকর(রা) অনুতপ্ত হলেন যে, ধৈর্যহারা হয়ে তিনি আল্লাহর ফেরেশতার সাহায্য হতে বঞ্চিত হয়ে গেলেন।

শিক্ষাঃ এই ঘটনা আমাদের সামনে ধৈর্যের শিক্ষাই নতুন করে তুলে ধরেছে। রাসূল(সা) বলেছেনঃ “ধৈর্য এমন একটা গাছ, যার সারা গায়ে কাঁটা, কিন্তু এর ফল অত্যন্ত মজাদার।” সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের উচিত চরম উস্কানীর মুখেও ধৈর্য ধারণ করা ও ক্রোধ সম্বরণ করা। উস্কানীর মুখে ক্রোধ সম্বরণের সহজ পন্থা হলো সালাম দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করা, নচেত ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযূ করা।

ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা

 হযরত ওমর(রা) তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। একবার রাতের বেলা একটা সুরেলা আওয়াজ শুনতে পেলেন। একটি লোক গান গাইছিলো। তাঁর সন্দেহ হলো। তিনি প্রাচীরে উঠে দেখলেন, পাশের ঘরে এক পুরুষ বসে আছে। তার পাশে মদ ভর্তি একটি পাত্র ও গ্লাস। অদূরে এক মহিলাও রয়েছে। খলিফা চিৎকার করে বললেন, ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই কি মনে করেছিস যে, তুই আল্লাহর নাফরমানী করবি, আর তিনি তোর গোপন অভিসারের কথা ফাঁস করবেন না? জবাবে সে বললোঃ “আমিরুল মোমেনীন, তাড়াহুড়ো করবেন না। আমি যদি একটি গুনাহও করে থাকি, তবে আপনি করেছেন তিনটি গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা মানুষের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করেছেন কিন্তু  আপনি দোষ ত্রুটি খুঁজছেন। আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন কারো বাড়িতে ঢুকলে দরজা দিয়ে ঢুকতে, কিন্তু আপনি প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছেন। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, নিজের বাড়ি ছাড়া অন্যের বাড়িতে অনুমতি না নিয়ে ঢুকতে। কিন্তু আপনি আমার অনুমতি ছাড়াই আমার বাড়িতে প্রবেশ করেছেন।”

এ জবাব শুনে হযরত ওমর(রা) নিজের ভুল স্বীকার করলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না। তবে তার কাছ হতে অংগীকার আদায় করলেন যে, সে পাপের পথ ত্যাগ করে সৎ পথে ফিরে আসবে।

শিক্ষাঃ অন্যায়ের প্রতিরোধে সক্রিয় থাকা প্রত্যেক মুসলিমের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনেও অনেক সতর্কতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়। নচেৎ প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। হযরত ওমরের(রা) ঘটনা থেকে সেই শিক্ষাই পাওয়া যায়।

১০ হযরত ওমর(রা) এর ইসলাম গ্রহণ

 ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, কুরাইশ প্রতিনিধি আমর ইবনুল আ’স ও আব্দুল্লাহ ইবনে রবীয়া’ যখন আবিসিনিয়া থেকে ফিরে এল এবং সেখানে হিযরত করতে যাওয়া মুসলমানদের ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলো না, তার অল্প কয়েকদিন পরেই ওমর বিন খাত্তাবের ন্যায় দুর্দান্ত সাহসী ও প্রতাপশালী ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ও হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণে রাসূল(সা) ও সাহাবীগণের মনোবল যথেষ্ট বেড়ে যায় এবং তারা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অনুভব করেন। এর আগে তাঁরা কাবার চত্ত্বরে নামায পড়ারও সাহস পেতেন না। ইসলাম গ্রহণের পর ওমর ঝুঁকি নিয়ে কাবার চত্তরে নামায পড়েন এবং তাঁর সাথে অন্যান্য সাহাবীগণও নামায পড়েন।

উম্মে আবদুল্লাহ বিনতে আবু খাসয়ামা(রা) বলেন যে, আমরা একে একে সবাই আবিসিনিয়ায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার স্বামী আমের তখন একটা পারিবারিক কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। সহসা ওমর ইবনুল খাত্তাব এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। তখনো তিনি মোশরেক। তার জুলুম অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। ওমর বললেনঃ হে উম্মে আবদুল্লাহ! আপনারা বুঝি বিদায় হচ্ছেন? আমি বললামঃ হ্যাঁ, আল্লাহর কসম। আল্লাহর পৃথিবীতে বেড়িয়ে পড়বো। তোমরা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছ, অনেক নির্যাতন চালিয়েছ। আল্লাহ এ অবস্থা থেকে আমাদের উদ্ধার করবেন। ওমর বললেনঃ “আল্লাহ আপনাদের সাথী হোন।” তার কথায় এমন একটা সহানুভূতির ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল যা আর কখনো দেখি নি। এরপর ওমর ইবনুল খাত্তাব চলে গেলেন। তবে আমার মনে হচ্ছিল, আমার দেশ ত্যাগের খবরে তিনি মর্মাহত। কিছুক্ষণ পর আমের প্রয়োজন সেরে ঘরে ফিলে এলো। আমি তাকে বললামঃ “ওহে    আবদুল্লাহর বাবা! এই মাত্র ওমর এসেছিল। আমাদের প্রতি তার সে কি সহানুভূতি ও উদ্বেগ, তা যদি তুমি দেখতে!” আমের বললেনঃ তুমি তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশাণ্বিত? আমি বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করলেও তুমি যাকে দেখেছ সে(খাত্তাবের ছেলে ওমর) ইসলাম গ্রহণ করবে না। ইসলামের প্রতি ওমরের যে প্রচন্ড বিদ্বেষ, হঠকারিতা ও একগুঁয়েমির প্রকাশ দেখা যাচ্ছিল, তার দরুণ আমের হতাশ হয়েই অনুরূপ কথা বলেছিলিন।

হযরত ওমরের(রা) ইসলাম গ্রহণের কারণঃ  

ইবনে ইসহাক হতে বর্ণিত আছে যে, ‘ওমরের বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব ও তার স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফায়েল ওমরের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা ওমরের কাছ হতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম বিন আবদুল্লাহ আন নাহামও একইভাবে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ওমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনু আদি বিন কা’বের অন্তর্ভুক্ত এই ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি। খাব্বার ইবনুল আরাত(বনু তামীম বংশোদ্ভূত এই সাহাসী জাহিলিয়াতের যুগে তরবারী তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং বনু খোযায়া গোত্রের উম্মে আনমার নাম্মী মহিলার মুক্ত গোলাম ছিলেন) নামক অপর এক নওমুসলিম গোপনে ফাতিমা বিনতে খাত্তাবকে কুরআন পড়িয়ে যেতেন। একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব উন্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে রাসূল(সা) ও তাঁর একদল সাহাবীর সন্ধানে বেড়িয়ে পড়লেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, প্রায় ৪০ জন নারী ও পুরুষ সাহাবীসহ রাসূল(সা) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী একটা ঘরে সমবেত হয়েছেন। রাসূল(সা) এর তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু বকর সিদ্দীক বিন আবু কুহাফা এবং আলী বিন আবু তালিবসহ এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যারা রাসূল(সা) এর সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সাথে হিজরত করেন নি।’ পথে নাঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে ওমরের(রা) দেখা হলো। তিনি বললেন, কোথায় চলেছ ওমর? ওমর বললেন, “ধর্মচ্যূত মুহাম্মদের সন্ধানে চলেছি, যে কুরাইশ বংশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদের বুদ্ধিমানদের বোকা সাব্যস্ত করেছে, তাদের অনুসৃত ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালাগাল করেছে। আমি ওকে হত্যা করবো।” নাঈম বললেন, “ওহে ওমর, আল্লাহর কসম, তুমি আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়েছ। তুমি কি মনে কর, মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনু আবদ মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে আর তুমি পৃথিবীর ওপর অবাধে বিচরণ করে বেড়াতে পারবে? তোমার কি উচিত নয় আগে পরিবার পরিজনের দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদেরকে শোধরানো?” ওমর বললেনঃ “আমার পরিবার পরিজনের কি হলো?” নঈম বললেন, “তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব। আল্লাহর কসম, তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করেছে। পারলে তাদেরকে সামলাও।” ওমর তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলেন তার বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে। যখন তিনি তাদের কাছে রওনা হলেন তখন তাদের কাছে খাব্বাব ইবনুল আরাত ছিলেন। তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআনের একটি অংশ হাতে নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। এই অংশটিতে ছিল সূরা ত্বা-হা। ওমরেরর আওয়াজ শুনে খাব্বাব গা ঢাকা দিলেন। তিনি ঘরের কোন এক অংশে লুকিয়ে রইলেন। আর ফাতেমা কুরআনের কোনো একটি অংশ নিজের উরুর নিচে চাপা দিয়ে রইলেন। ঘরের কাছাকাছি পৌঁছার পর ওমর খাব্বাবের পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন। ঘরে ঢুকে তিনি বললেন, “একটি দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনেছিলাম। ওটা কি?” তাঁরা উভয়ে বললেন, “না, আপনি কিছুই শুনেন নি।” ওমর বললেন, “নিশ্চয়ই শুনেছি। আর আল্লাহর কসম, এটাও জেনেছি যে, তোমরা উভয়ই মুহাম্মদের অনুসারী হয়ে গেছ।” কথাটা বলে ভগ্নিপতি সাঈদকে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন। তার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলে তিনি তাকে মেরে জখম করে দিলেন। এই কান্ড ঘটানোর পর তাঁর বোন এবং ভগ্নিপতি একযোগে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন যা করতে চান করুন।” ওমর যখন দেখলেন তার বোনের শরীর রক্তাক্ত, তখন অনুতপ্ত হলেন। তিনি স্বীয় বোনকে বললেন, “আমাকে এই পুস্তিকাটি দাও, যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম। আমি একটু দেখবো মুহাম্মাদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে।” ওমর লেখাপড়া জানা লোক। তিনি একথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললেন, “আমার ভয় হয় আপনি নষ্ট করে ফেলেন কি না।” ওমর বললেন, “ভয় পেয়ো না।” অতঃপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন, “ওটি আমি পড়েই তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।” ওমরের এ কথাটি শুনে ফাতেমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। তিনি বললেন, “ভাইজান! আপনি যে অপবিত্র! কেননা আপনি এখনো মোশরেক। অথচ এই পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া স্পর্শ করতে পারে না।” ওমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন। এবার ফাতিমা তাকে পুস্তিকাখানি দিলেন। তাতে সূরা ত্বা-হা লিখিত ছিল। তিনি তা পড়লেন। প্রথম অংশটি পড়েই বললেনঃ “আহ্! কি সুন্দর কথা! কী মহৎ বাণী!” তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বা তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁকে বললেন, “হে ওমর! আল্লাহর কসম, আমার মনে আশা সঞ্চার হচ্ছে যে আল্লাহ হয়তো আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন। আমি গতকাল শুনলাম রাসূল(সা) দোয়া করেছেন, “ হে আল্লাহ! ‍তুমি আবুল হিকাম বিন হিশাম অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি কর। অতএব, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন, হে ওমর।”

ওমর বললেন, “হে খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মদের সন্ধান দাও। আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করবো।” খাব্বাব বললেন, “তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন। সেখানে তাঁর সাথে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন।” ওমর তাঁর তরবারী আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূল(সা) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন। সেখানে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূল(সা) এর জনৈক সাহাবী দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে তাকালেন। দেখলেন ওমর মুক্ত তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি শংকিত চিত্তে রাসূল(সা) এর কাছে গিয়ে বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ! এ যে ওমর ইবনুল খাত্তাব একেবারে নগ্ন তরবারী হাতে!” হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব বললেন, “ওকে ভিতরে আসার অনুমতি দিন। সে যদি কোনো শুভ কামনা নিয়ে এসে থাকে, আমরা তার প্রতি বদান্যতা দেখাব। আর যদি কোনো কু-বাসনা নিয়ে এসে থাকে তাহলে ওর তরবারী দিয়েই ওকে হত্যা করবো।” রাসূল(সা) বললেন, “ওকে ভেতরে আসতে দাও।” উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন। রাসূল(সা) নিজে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। রাসূল(সা) তার পাজামা বাঁধার জায়গা অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণা মিলিত হয়, সেখানটা ধরে তাঁকে প্রচন্ডজোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন, “কি হে খাত্তাবের পুত্র! তোমার এখানে আগমন ঘটলো কিভাবে? আমার তো মনে হয়, আল্লাহ তোমার ওপর কোনো বিপর্যয় না নামানো পর্যন্ত তুমি ফিরবে না।” ওমর বললেন, “ হে রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার কাছে এসেছি আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর ও আপনার কাছে আল্লাহর পক্ষ হতে যা কিছু আসে তার ওপর ঈমান আনবার জন্য।” এ কথা শুনামাত্র রাসূল(সা) এমন জোরে “আল্লাহু আকবার” বলে উঠলেন যে, ঐ ঘরের ভেতর রাসূল(সা) এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন সবাই বুঝলেন যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করেছে।

এরপর রাসূল(সা) এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন। হামযার পর ওমর(রা) এর ইসলাম গ্রহণে তাঁদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল। তারা নিশ্চিত হলেন যে, ওঁরা দুজন রাসূল(সা) এর প্রতিরক্ষায় অবদান রাখবেন এবং ইসলামের দুশমনদের মোকাবিলায় মুসলমানদের সহযোগিতা করবেন।

এটি তাঁর ইসলাম গ্রহণ সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বর্ণনা।

ওমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আতা ও মুজাহিদের বর্ণনাঃ ইবনে ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আবি নুজাইহ আল মাক্কী স্বীয় শিষ্য আতা, মুজাহিদ অথবা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওমর(রা) এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে যে তিনি স্বয়ং নিম্নরূপ বলতেনঃ “ আমি ইসলামের কট্টর বিরোধী ছিলাম। জাহেলী যুগে আমি খুব মদের ভক্ত ছিলাম। মদ পেলে খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের একটা মজলিশ বসতো উমার বিন আবদ বিন ইমরান আল মাখযুমীর পারিবারিক বাসস্থানের নিকটস্থ খাজওয়ারা নামক স্থানে। সেখানে কুরাইশের বহু লোক সমবেত হতো। একদিন রাতে ঐ আসরে আমার আমার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাদের কাউকেই পেলাম না। এরপর ভাবলাম, মক্কার অমুক মদ বিক্রেতার কাছে গেলে হয়তো মদ খেতে পারতাম। তার উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাকে পেলামনা। এরপর মনে মনে বললাম, কা’বা শরীফে গিয়ে সাতবার অথবা সত্তরবার যদি তওয়াফ করতাম, মন্দ হতো না। অতঃপর কা’বা শরীফে তাওয়াফ করার জন্য মসজিদুল হারামে উপনীত হলাম। সেখানে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ(সা) নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখনো সিরিয়ার দিকে মুখ করে নামায পড়তেন। নিজের ও সিরিয়ার মাঝখানে কা’বা শরীফকে রাখতেন। রূকনে আসওয়াদ ও রূকনে ইয়ামানীর মাঝে বসে তিনি নামায পড়তেন। তাঁকে দেখেই আপন মনেই বললাম, আল্লাহর কসম, আজকের রাতটি যদি মুহাম্মাদের(সা) আবৃত্তি শুনে কাটিয়ে দিতাম এবং সে কি বলে তা অবহিত হতাম, তাহলেও কাজ হতো। কিন্তু সেই সাথে এটাও ভাবলাম যে, মুহাম্মদের(সা) খুব কাছে গিয়ে যদি শুনি তাহলে তিনি ভয় পেয়ে যাবেন। তাই হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে এলাম, কা’বা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলাম। রাসূল(সা) তখনো যথারীতি দাঁড়িয়ে নামাযে কুরআন পাঠ করে যাচ্ছেন। অবশেষে আমি তাঁর ঠিক সামনে কা’বার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যখন কুরআন শুনলাম, আমার মন নরম হয়ে গেল। আমি কেঁদে দিলাম। ইসলাম আমার মনমগজ দখল করে ফেললো। রাসূল(সা) নামায শেষ করে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি ওখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি যখন কা’বা থেকে যেতেন, ইবনে আবি হুসাইনের বাড়ির কাছ দিয়ে যেতেন। এই বাড়ী ছিল তার সাফা ও মারওয়ার দৌড়েরও শেষ সীমা। সেখান থেকে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বাড়ী এবং আজহার বিন আবদ আওফ আযযুহরীর বাড়ির মাঝখান দিয়ে, তারপর আখনাস বিন শুরাইকের বাড়ী হয়ে নিজের বাড়ীতে চলে যেতেন। দারুর রাকতাতে ছিল রাসূল(সা) এর বাড়ী। এই জায়গাটি ছিল আবু সুফিয়ানের ছেলে মুয়াবীয়ার মালিকানাধীন। ওমর(রা) বললেন, আমি রাসূল(সা) এর পিছু পিছু চলতে লাগলাম। যখন তিনি আব্বাসের বাড়ী ও ইবনে আযহারের বাড়ীর মাঝখানে গিয়ে পৌছলেন, তখন তাঁকে গিয়ে ধরলাম। আমার আওয়ায শুনেই রাসূল(সা) আমাকে চিনে ফেললেন। রাসূল(সা) মনে করলেন আমি তাঁকে কষ্ট দিতে এসেছি। তাই তিনি আমাকে একটা ধমক দিলেন। ধমক দিয়েই আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে খাত্তাবের পুত্র! এ মুহুর্তে তুমি কি উদ্দেশ্যে এসেছ?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাঁর কাছে যা কিছু আল্লাহর কাছ থেকে আসে, তার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্যে।” এ কথা শুনে রাসূল(সা) আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। তারপর বললেন, “হে ওমর! আল্লাহ তোমাকে হেদায়াত করেছেন।” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলালেন এবং আমি যাতে ইসলামের উপর অবিচল থাকি সে জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর রাসূল(সা)এর কাছ হতে বিদায় হলাম এবং তিনি নিজের বাড়ীতে প্রবেশ করলেন।”

ইবনে ইসহাক বলেনঃ ওমরের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে উপরের দুটি ঘটনার মধ্যে কোনটি সঠিক তা আল্লাহই ভালো জানেন।

ইসলামের ওপর ওমরের দৃঢ়তাঃ ইবনে ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমারের মুক্ত গোলাম না’ফে ইবনে উমার থেকে বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা ওমর যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন জিজ্ঞাসা করলেন যে, কুরাইশের কোন ব্যক্তি সর্বাধিক প্রচার মুখর? তাকে বলা হলো, জামীল বিন মুয়াম্মার আল জুমহী। তিনি তৎক্ষণাৎ তার ‍উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার বলেনঃ আমি তাঁর পেছনে পেছনে ছুটলাম এবং তিনি কি করেন দেখতে লাগলাম। তখন আমি একজন বালক হলেও যা কিছু দেখি সবই বুঝতে পারি। ওমর(রা) জামীলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ “হে জামীল! আমি ইসলাম গ্রহণ ও মুহাম্মদের ধর্মে প্রবেশ করেছি।” ইবনে ওমর বলেন, জামীল তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপ না দিয়ে চাদর গুটিয়ে হাঁটতে লাগল। ওমর(রা) তার পিছু পিছু চললেন। আমিও আমার পিতার পিছু পিছু চললাম। চলতে চলতে মসজিদুল হারামের দরজার কাছে পৌঁছে সে বিকট চিৎকার করে বললো, “হে কুরাইশ জনমন্ডলী! শুনে নাও, ওমর ধর্মচ্যূত হয়ে গেছে।” এ সময় কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কা’বার চত্ত্বরে তাদের আড্ডায় বসেছিল। ওমর তার পেছনে দাঁড়িয়ে বললেনঃ “জামীল মিথ্যা বলছে, আমি ধর্মচ্যূত হইনি, ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ(সা) তার বান্দা ও রাসূল।” সঙ্গে সঙ্গে সকলে তার দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে এল। ওমর ও কুরাইশ জনতার মধ্যে লড়াই চললো দুপুর পর্যন্ত। এক সময় ওমর ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে বসে পড়লেন। মারমুখী জনতা তখনো তাঁর মাথার উপরে। ওমর বলতে লাগলেনঃ তোমরা যা খুশী কর। আল্লাহর কসম, আমরা যদি তিনশো লোক হতাম, তাহলে আমরা তোমাদের জন্য রণাঙ্গন ছেড়ে দিতাম অথবা তোমরা ছেড়ে দিতে।”(অর্থাৎ মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হলে তোমরা এত মারমুখী হতে না)। উভয়পক্ষ যখন এই পর্যায়ে, তখন সহসা সেখানে একজন প্রবীণ কুরাইশ সর্দারের আবির্ভাব ঘটলো। মূল্যবান ইয়ামানী চাদর ও নকশাদার আলখেল্লা পরিহিত এই বৃদ্ধ এসে তাদের পাশে দাঁড়ালেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কি হয়েছে? তারা বললো, “ওমর ধর্মচ্যূত হয়ে গেছে।” বৃদ্ধ বললেন, “তাতে কী? থামো। একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় একটি জিনিস গ্রহণ করেছে। তোমরা তার কি করতে চাও? তোমরা কি ভেবেছ, বনু আদি বিন কা’ব[ওমর(রা) এর গোত্র] তাদের সদস্যকে তোমাদের হাতে এভাবেই ছেড়ে দেবে? ওকে ছেড়ে দাও।” ইবনে উমার(রা) বললেনঃ এ কথার পর তারা নিজেদের উত্তেজিত ভাবাবেগকে সংযত করলো। পরে মদীনায় হিজরত করার পর আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ আব্বা, ঐ বৃদ্ধটি কে, যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন মারমুখো জনতাকে আপনার কাছ থেকে ধমক দিয়ে হটিয়ে দিয়েছিলেন? তিনি বললেন, তিনি আস ইবনে ওয়ায়েল আসসাহমী।

ইবনে হিশাম বলেনঃ আমাকে কোনো কোনো বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও তাঁর পিতার কথোপকথনটি ছিল এরককঃ

ইবনে ওমরঃ আব্বা! ঐ লোকটি কে, যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন মক্কাতে যারা আপনার ওপর আক্রমণ করেছিল, তাদেরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন? আল্লাহ উনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”

হযরত ওমর(রা)ঃ “হে বৎস্য! তিনি আস ইবনে ওয়ায়েল। আল্লাহ তাকে কোনোই উত্তম প্রতিদান যেন না দেন।” কারণ ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত ভালো কাজের প্রতিদান পাওয়া যায়না। আ’স ইবনে ওয়ায়েল মোশরেক অবস্থায় এ কাজটি করেন এবং কখনো মুসলমান হন নি।

হযরত ওমর(রা) বলেনঃ “সেই রাত্রে ইসলাম গ্রহণ করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম যে মক্কাবাসীর মধ্যে যে ব্যক্তি রাসূল(সা) এর সবচেয়ে কট্টর দুশমন, তার কাছে যাবো এবং তাকে জানাবো যে, আমি মুসলমান হয়ে গেছি। ভেবে দেখলাম যে এই ব্যক্তিটি তো আবু জাহল ছাড়া আর কেউ নয়।” উল্লেখ্য যে, ওমর(রা) আবু জাহলের আপন বোন খানতামা বিনতে হিশাম ইবনুল মুগীরার পুত্র ছিলেন। যাহোক, ওমর বললেনঃ আমি পরদিন সকালে তার কাছে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লাম। আবু জাহল আমার কাছে বেরিয়ে এলো এবং বললোঃ “আমার ভাগ্নেকে স্বাগত! তুমি কি খবর নিয়ে এসেছ ওমর?” আমি বললাম, “মামা, আমি আপনাকে জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ(সা) এর প্রতি ঈমান এনেছি। তিনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন তাও সত্য বলে মেনে নিয়েছি।” এরপর তিনি আমার মুখের উপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং বললেনঃ “ধিক তোমাকে এবং ধিক তোমাকে বহন করে আনা সংবাদকে।”

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেনঃ হযরত ওমরের(রা) ইসলাম গ্রহণ করা ছিল একটি বিজয়, তাঁর মদীনায় হিজরত ছিল আল্লাহর সাহায্য স্বরূপ এবং তাঁর খিলাফত ছিল আল্লাহর রহমত স্বরূপ।

শিক্ষাঃ

(১) পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেই হযরত ওমর(রা) হেদায়াত লাভ করেছিলেন। তাই ইসলামের পুনরুজ্জীবন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যারাই কাজ করতে চায়, কেয়ামত পর্যন্ত তাদের এ কাজ সরাসরি কুরআন দিয়েই শুরু করতে হবে।

(২) রাসূল(সা) ওমরের নাম ধরে দোয়া করতেন তাঁর হেদায়াতের জন্য। তাই রাসূল(সা) এর পদানুসরণ করে আমাদেরও ইসলামের শত্রুদের হেদায়াতের জন্য নাম ধরে দোয়া করা উচিত। শুধু প্রচার ও শিক্ষা দান করেই ক্ষান্ত থাকা উচিত নয়। কেননা হেদায়াতের আসল চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে রয়েছে।

(৩) আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর মক্কার অবস্থান ছিল চরম নৈরাশ্যজনক। কিন্তু এহেন পরিস্থিতিতেও আল্লাহ তায়ালা হযরত ওমরের(রা) মত ব্যক্তিত্বকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সুতরাং কোনো পরিস্থিতিতেই মুসলমানদের হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তায়ালা অকল্পনীয়ভাবে সাহায্য পাঠাতে পারেন।

১১ স্বামী স্ত্রীর আচরণে সহনশীলতা

বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ওমর(রা)এর নিকট নালিশ করতে ও তাঁর পরামর্শ নিতে এলো। এসে হযরত ওমরের(রা) বাস ভবনের দরজায় দাঁড়াতেই শুনতে পেলে তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় ও উচ্চস্বরে তাঁকে তিরস্কার করেছে, আর হযরত ওমর তা নীরবে শুনেছেন। লোকটি তৎক্ষণাত ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সে ভাবলো, হযরত ওমরের(রা) মত কঠোর মেজাজের মানুষের যখন এই অবস্থা এবং তিনি খলীফা, তখন আমি আর কে? ঠিক এই সময়ে হযরত ওমর বাইরে বেরিয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি তাঁর দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছে। তিনি তাঁকে ডেকে ফেরালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জন্য এসেছ? সে বললোঃ “আমিরুল মোমেনীন! আমি আপনার কাছে এসেছিলাম নিজের স্ত্রীর বদমেজাজ ও কঠোর ব্যবহার সম্পর্কে নালিশ করতে। কিন্তু এসে নিজ কানে যা শুনতে পেলাম, তাতে মনে হলো আপনার স্ত্রীরও একই অবস্থা। তাই এই স্বান্তনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম যে, খোদ আমিরুল মোমেনীনের যখন নিজের স্ত্রীর সাথে এরূপ অবস্থা, তখন আমি আর কোথাকার কে?

হযরত ওমর(রা) বললেনঃ “ওহে দ্বীনি ভাই, শোন! আমি আমার স্ত্রীর এরূপ আচরণ সহ্য করি দুটি কারণে-প্রথমতঃ আমার কাছে তার অনেক অধিকার পাওনা আছে। দ্বিতীয়তঃ সে আমার খাবার রান্না করে, রুটি বানায়, কাপড় ধোয় ও আমার সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। অথচ এর কোনটি তার কাছে আমার প্রাপ্য নয় এবং সে এগুলো করতে বাধ্য নয়। এ সবের কারণে আমার মনে শান্তি বিরাজ করে এবং আমি হারাম উপার্জন থেকে রক্ষা পাই। এ কারণেই আমি তাকে সহ্য করি। লোকটি বললোঃ হে আমিরুল মোমেনীন, আমার স্ত্রীও তদ্রুপ। হযরত ওমর(রা) বললেনঃ তাহলে সহ্য করতে থাকো ভাই। দুনিয়ার জীবনতো অল্প কটা দিনের!

শিক্ষাঃ ইসলাম যে নারীর প্রতি কত উদার ও সহনশীল হওয়ার শিক্ষা দেয় তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই ঘটনা থেকে শরীয়তের এই বিধিও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিছক প্রথাগতভাবে আমাদের সমাজে মনে করা হয় যে, রান্না বান্না করা, কাপড় ধোয়া ও গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ করা স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু আসলে তা তার কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়। এ সব কাজ করা স্ত্রীর ইচ্ছাধীন। শুধু স্বামী ও সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্খা থেকেই স্ত্রীরা নিজের ইচ্ছায় এসব কাজ করে থাকেন। এ সব কাজে কোনো ত্রুটি হলে সেজন্য তাকে শাস্তি বা বকাঝকা করা জায়েয নয়। তবে স্বামীর সম্পদ ও সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান অবশ্যই স্ত্রীর দায়িত্ব।

১২ রাসূলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারকারী এক মুরতাদের শাস্তি

হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনায় বিশর নামক একজন মুনাফিক বাস করতো। একবার জনৈক ইহুদীর সাথে তার বিবাদ বেধে যায়। ইহুদী বললোঃ চল, আমরা মুহাম্মদ(সা) এর কাছে গিয়ে এর মীমাংসা করে আসি। বিশর প্রথমে এ প্রস্তাবে রাজী হলো না। সে ইহুদী নেতা কা’ব ইবনে আশরাফের কাছে মীমাংসার জন্য যাওয়ার প্রস্তাব করলো। কা’ব ইবনে আশরাফ ছিল মুসলমানদের কট্টর দুশমন। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এই ইহুদী নেতার কাছ থেকে মীমাংসা কামনা করেছিল মুসলমান পরিচয় দানকারী বিশর। অথচ ইহুদী লোকটি স্বয়ং রাসূল এর উপর এর বিচারের ভার অর্পণ করতে চাইছিল। আসলে এর কারণ ছিল এই যে, রাসূল(সা) এর বিচার যে পুরোপুরি ন্যায়সংগত হবে তা উভয়ে জানতো। কিন্তু ন্যায়সংগত মীমাংসা হলে মুনাফিক হেরে যেত আর ইহুদী জয়লাভ করত।

অনেক তর্ক বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত ইহুদীর মতই স্থির হল। উভয়ে রাসূল(সা) এর কাছে গিয়ে বিবাদটার মীমাংসার ভার তাঁর ওপর অর্পণ করলো। রাসূল(সা) মামলার ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে ইহুদীর পক্ষে রায় দিলেন এবং বিশর হেরে গেল। সে এ মীমাংসায় অসন্তুষ্ট হয়ে ইহুদীকে এই মর্মে সম্মত করে যে, বিষয়টির চূড়ান্ত মীমাংসার জন্য তারা হযরত ওমরের নিকট যাবে। বিশর ভেবেছিল যে, হযরত ওমর যেহেতু কাফেরদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠিন, তাই তিনি ইহুদীর মোকাবিলায় তার পক্ষে রায় দেবেন।

দু’জনেই হযরত ওমরের নিকট উপস্থিত হলো। ইহুদী তাঁকে পুরো ঘটনা জানালো এবং বললো, এ ব্যাপারে রাসূল(সা) যে ফায়সালা করেছেন, তা আমার পক্ষে। কিন্তু এ লোকটি তাতে সম্মত নয়। তাই আমাকে আপনার নিকট নিয়ে এসেছে।

হযরত ওমর বিশরকে জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনা কি এরূপ? সে বললো, হাঁ। তখন হযরত ওমর বললেন, তাহলে একটু অপেক্ষা কর। এই বলে তিনি ঘরের ভেতর থেকে একখানা তলোয়ার নিয়ে এলেন এবং “যে লোক রাসূলের ফায়সালা মেনে নিতে রাজী হয় না, ওমরের কাছে তার ফায়সালা হলো এই……” এই বলে চোখের নিমেষে বিশরকে দ্বিখন্ডিত করে ফেললেন।

এরপর বিশরের উত্তরাধিকারীরা রাসূল(সা) এর নিকট হযরত ওমরের(রা) বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ করলো যে, তিনি শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত একজন মুসলমানকে হত্যা করেছেন। এ সময় রাসূল(সা) এর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ কথা বেরিয়ে আসে যে, “ওমর কোনো মুসলমানকে হত্যা করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে এটা আমি মনে করি না।”

আসলে হযরত ওমর(রা) তাকে এই মনে করে হত্যা করেছেন যে, সে যেহেতু আল্লাহর রাসূলের ফায়সালা প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে স্পষ্টতই মুরতাদ ও কাফের হয়ে গিয়েছে। ইসলামী শরীয়তে মুরতাদের সর্বসম্মত শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড সেটাই তিনি তাকে দিয়েছেন। আর এর অব্যাহতি পর সূরা নিসার ৬০ থেকে ৬৮ নং আয়াত নাযিল হয়ে হযরত ওমরের(রা) অভিমতকে সঠিক প্রমাণিত করে।

শিক্ষাঃ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল(সা) এর আদেশ, নিষেধ বা সিদ্ধান্তকে যারা প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে, তাদেরকে মুসলমান বলে মনে করা বৈধ নয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে এ ধরনের লোকদের মৃত্যুদন্ড দেয়া অপরিহার্য। অন্যথায়, এ ধরনের মুরতাদদের সমাজচ্যূত করা ও নিন্দা প্রতিবাদের মাধ্যমে কোনঠাসা করে রাখতে হবে, যাতে আর কেউ মুরতাদ হবার ধৃষ্টতা না দেখায়।

১৩ জাবালার ঔদ্ধত্য ও হযরত ওমর(রা)

একবার হযরত ওমর(রা) হজ্জ করতে মক্কায় এলেন। তিনি কা’বার চারপাশে তওয়াফ করছিলেন। তাঁর সাথে সাথে একই কাতারে তওয়াফ করছিলেন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিবেশী এক রাজা জাবালা ইবনে আইহাম। জাবালা কা’বার চারপাশ প্রদক্ষিণ করার সময় সহসা আরোক তওয়াফকারী জনৈক দরিদ্র আরব বেদুইনের পায়ের তলায় চাপা পড়ে জাবালার বহু মূল্যবান ইহরামের চাদরের এক কোণা। চাদরটি রাজার কাঁধের ওপর থেকে টান লেগে নীচে পড়ে যায়।

ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন জাবালা। লোকটির কোনো ওজর আপত্তি না শুনে জাবালা তার গালে প্রবল জোরে একটি চড় বসিয়ে দেন।

লোকটি তৎক্ষণাত খলীফার নিকট গিয়ে নালিশ করে এবং এই অন্যায়ের বিচার চায়। খলিফা জাবালাকে তৎক্ষণাত ডেকে পাঠান এবং জিজ্ঞাসা করেন যে, অভিযোগ সত্যি কি না। জাবালা উদ্ধত স্বরে জবাব দেন, “সম্পূর্ণ সত্য। এই পাজিটা আমার চাদর পদদলিত করে আল্লাহর ঘরের সামনে আমাকে প্রায় উলংগ করে দিয়েছে।”

খলিফা দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, “কিন্তু এটা ছিল একটা দুর্ঘটনা।” জাবালা স্পর্ধিত কন্ঠে বললেন, “আমি তার পরোয়া করি নে। কা’বা শরীফের সম্মানের খাতিরে ও কা’বার চত্ত্বরে রক্তপাত নিষিদ্ধ থাকার কারণে আমি যথেষ্ট ক্রোধ সংবরণ করেছি। নচেত ওকে আমি চপেটাঘাত নয় হত্যাই করতাম।”

জাবালা হযরত ওমরের একজন শক্তিশালী মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। খলিফা তাই একটু থামলেন এবং কিছু চিন্তাভাবনা করলেন। অতঃপর শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে বললেন, “জাবালা, তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন বাদী ক্ষমা না করলে তোমাকে ইসলামী আইনের শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে এবং বাদীর হাতে পাল্টা একটি চপেটাঘাত খেতে হবে।”

স্তম্ভিত হয়ে জাবালা বললেন, “আমি একজন যোদ্ধা। আর ও হচ্ছে একজন সাধারণ কৃষক।”

হযরত ওমর(রা) বললেন, “তোমরা উভয়ে মুসলমান এবং আইনের চোখে সবাই সমান।”

জাবালা বললো, “যে ধর্মে রাজা ও একজন সাধারণ প্রজাকে সমান চোখে দেখা হয়, আমি তার আনুগত্য করতে পারি নে। ঐ চাষা যদি আমাকে চপেটাঘাত করে তবে আমি ইসলাম ত্যাগ করবো।”(নাউযুবিল্লাহ)।

হযরত ওমর ততোধিক কঠোর স্বরে জবাব দিলেন, “তোমার মত হাজার জাবালাও যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবে সেই ভয়ে ইসলামের একটি ক্ষুদ্রতম বিধিও লংঘিত হতে পারে না। তোমাকে এ শাস্তি পেতেই হবে। আর একথাও জেনে রাখ, ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক মুসলমান বানায় না। তোমাকেও বানায় নি। কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করা সহজ নয়। মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।”

হযরত ওমরের শেষোক্ত কথাটা শুনে জাবালা রাগে ও ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো। হযরত ওমরের নির্দেশে বাদী তৎক্ষণাত সজোরে জাবালার মুখে ঠাস করে একটি চড় বসিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নিল।

জাবালা ক্রোধে চক্ষু লাল করে বাদীর দিকে একবার তাকালো। অতঃপর রাগে গরগর করতে করতে কা’বার চত্ত্বর ত্যাগ করে নীরবে চলে গেল। জানা যায়, এরপর জাবালা ইবনে আইহাম ইসলাম ত্যাগ করে প্রাণের ভয়ে সোজা রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলি কাটায়।

১৪ হযরত খাব্বাব (রা) এর ত্যাগ ও কুরবানী

 হযরত ওমর(রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নগ্ন তরবারী হাতে নিয়ে যেদিন রাসূল(সা) কে হত্যা করতে রওয়ানা হয়েছিলেন, সেইদিন পথিমধ্যে নিজের বোন ও ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে সাময়িকভাবে গন্তব্য স্থান পরিবর্তন করেন এবং প্রথমে বোন ভগ্নিপতিকে ইসলাম গ্রহণের শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বোনো বাড়ীতে গিয়ে দেখতে পান তারা কুরআন পড়ছে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়াচ্ছিল তিনি ছিলেন খাব্বাব ইবনে আরত(রা)। হযরত ওমর বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই খাব্বাব প্রাণভয়ে আত্মগোপন করেন। কেননা বোন ভগ্নিপতি রক্তের টানে রক্ষা পেলেও সেদিন খাব্বারের বাঁচার কোনো আশা ছিল না ওমরের নগ্ন তরবারী হতে। সেদিন যা হবার তা হলো। প্রথম সাক্ষাতে বোন ভগ্নিপতি কিছু মার খেলেও কুরআনের আয়াত ক’টি পড়ে তাঁর আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি রাসূলের(সা) কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। খাব্বাবের সাথে হযরত ওমরের হয়েছিল সেইদিন প্রথম সাক্ষাত। তারপর দরিদ্র খাব্বাবের উপর মক্কার কোরেশদের আরো অনেক নির্যাতন হয়েছে। হযরত ওমর শুনেছেন, কিন্তু প্রতিকার করতে পারেন নি।

কিন্তু আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে হযরত ওমরের সামনে বসে আছেন মহান ত্যাগী সাহাবী খাব্বাব। আজ ইসলাম বিজয়ী আসনে অধিষ্ঠিত। হযরত ওমর আজ মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা। তাওহীদ ও রিসালাতের সাথে সংঘর্ষে কুফর ও শিরক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর হয়ে ইসলামের আলোকে চারদিক উদ্ভাসিত। কিন্তু হযরত ওমরের(রা) প্রবল ইচ্ছা, খাব্বাবের সেই নির্যাতনের কাহিনীগুলো শুনবেন। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, “ইসলাম গ্রহণের পর আপনার উপর কি ধরনের নির্যাতন হয়েছে, একটু বলবেন?”

হযরত ওমরের প্রশ্ন হযরত খাব্বাবকে আবার দূর অতীতে টেনে নিয়ে গেল এবং মক্কার ১৩ বছরের সেই রক্তক্ষরা দিনগুলিকে তার চোখের সামনে হাজির করলো। সে নির্যাতনে ঈমান ও একীনে উজ্জীবিত মর্দে মুমিনরা ছাড়া আর কেউ তেরো বছর তো দূরের কথা, তেরো দিনও বরদাশত করতে পারতো না। হযরত খাব্বাব কোন্ কাহিনী দিয়ে শুরু করবেন এবং কোনটা বাদ্ দিয়ে কোনটা বলবেন। তাই ভেবে ভেবে কয়েক মুহুর্ত নীরবে কাটিয়ে দিলেন। শেষে বলতে চেয়েও বলতে পারলেন না। অবশেষে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজের জামা খুলে কোমরের একটি অংশ আমিরুল মোমেনীনকে দেখালেন। জায়গাটা ছিল জখমের চিহ্নে পরিপূর্ণ। আমীরুল মুমিনীন দেখামাত্র চিৎকার করে বলে উঠলেনঃ

“আল্লাহু আকবার! এই নাকি আপনার কোমর। আমি তো আজ পর্যন্ত কোন মানুষের এমন কোমর দেখি নি।”

খাব্বাব বললেন, “জি, আমিরুল মোমেনীন, কতবার যে আমাকে লোহার বর্মসহ তপ্ত মরুভূমিতে টেনে হিচড়ে বেড়ানো হয়েছে এবং কতবার যে আমার কোমরের চর্বিতে ওদের আগুন নিভেছে, তা আমি স্মরণ করতে পারি না। তারপর আল্লাহর শোকর যে, একদিন আমরা সমস্ত নির্যাতন থেকে মুক্তি পেলাম।”

সহসা হযরত খাব্বাব কান্না শুরু করে দিলেন।

হযরত ওমর বললেন, “ খাব্বাব, আজ কেন কাঁদছেন?”

হযরত খাব্বাব চোখের পানি ফেলতে ফেলতে জবাব দিলেন, “আমি কাঁদছি এজন্য যে, জেহাদের পর জেহাদ করে বিজয় অর্জন করার পর আল্লাহ আমাদের জন্য সুখ সমৃদ্ধি ও ধন দৌলতের দ্বার খুলে দিয়েছেন। আমাদের মাথার উপর সম্মান ও মর্যাদার পতাকা উড়ছে। আমার আশংকা হয় যে আমাদের ক্ষুদ্র ও সৎ কাজগুলির প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে কি না এবং আখেরাতে আমাদের খালি হাতে উঠতে হবে কি না।”

এই নিঃস্বার্থ ত্যাগী পুরুষ ইন্তিকালের সময় ওসিয়ত করেন, “ আমাকে তোমরা লোকালয়ে নয়, কুফার জংগলে কবর দিও। জংগল আমাকে ডাকছে।”

তাঁর ইন্তিকালের পর একদিন হযরত আলী(রা) তাঁর কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন, “আল্লাহ খাব্বাবের ওপর রহমত করুন। তিনি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেন, সানন্দে হিজরত করেন, জেহাদে জীবন কাটান এবং মুসিবতের পর মুসিবত বরদাশত করেন। অথচ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে এক চুলও বেশি পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেন নি।”

১৫ হযরত ওমরের(রা) শাসনে প্রজাদের সম অধিকার

মিশর বিজয়ী সেনাপতি আমর ইবনুল আস তখন মিশরের গভর্নর। তাঁর শাসনে মিশরের জনগণ বেশ শান্তিতেই কাটাচ্ছিল। কিন্তু তাঁর একটা বেয়াড়া ছেলে তাঁর ন্যায়পরায়নার সুনাম প্রায় নষ্ট করতে উদ্যত হয়েছিল। সে যখনই পথে বেরুত, সবাইকে নিজের চালচলন দ্বারা বুঝিয়ে দিত যে, সে কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং গভর্নরের ছেলে।

একদিন সে জনৈক মিশরীয় খৃস্টানের ছেলেকে প্রহার করলো। দরিদ্র মিশরীয় গভর্নরের কাছে তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস পেল না। তাই নীরবে হজম করলো। কয়েকদিন পর তার জনৈক প্রতিবেশি মদীনা হতে ফিরে এসে জানালো যে, খলিফা ওমর অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ শাসক। তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করেন এবং কেউ কারো ওপর যুলুম করেছে জানলে কঠোর শাস্তি দেন। এ কথা শুনে ঐ মিশরীয় খৃস্টান একটি উটের পিঠে চড়ে দীর্ঘ সতেরো দিন চলার পর মদীনায় খলিফার কাছে পৌছলো এবং গভর্নরের ছেলের বিপক্ষে মোকদ্দমা দায়ের করলো। হযরত ওমর তৎক্ষণাত হযরত আমর ইবনুল আস এবং তার ছেলেকে মদীনায় ডেকে আনলেন। অতঃপর বিচার বসলো।

সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা হযরত আমর ইবনুল আসের(রা) ছেলে দোষী প্রমাণিত হলো। খলিফা ওমর(রা) অভিযোগকারীর ছেলেকে দেখিয়ে বললেন, সে তোমাকে যেভাবে যে কয়বার প্রহার করেছে তুমিও সেই কয়বার তদ্রুপ প্রহার কর। ছেলেটি যথাযথভাবে প্রতিশোধ নিল।

তারপর খলিফা বললেন, “প্রজারা শাসকের দাস নয়। শাসকরা প্রজাদের সেবক। প্রজারা ঠিক তেমনি স্বাধীন যেমন তাদের মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হবার সময় স্বাধীন ছিল।”

১৬ হযরত ওমর(রা) ও গভর্নর হরমুযান

পারস্যের নাহাওয়ান্দ্র প্রদেশের গভর্নর হরমুযান ইসলামের এক কট্টর দুশমন ছিল। সে মুসলমানদের সাথে পারস্যের যুদ্ধ বাধানোর প্রধান হোতা ছিল। সে নিজেও খুবই শৌর্য বীর্যের সাথে যুদ্ধ করেছিল। অবশেষে হরমুযান মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে ও কারাবন্দী হয়। কারাবন্দী হবার পর সে ভেবেছিল এবার আর তার রেহাই নেই। মুসলমানরা হয় তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিবে নচেৎ মৃত্যুদন্ড দিবে। কারণ তার অতীত কার্যকলাপ দ্বারা সে মুসলমানদের সাথে নিজের সম্পর্ক খুবই খারাপ করে ফেলেছিল। কিন্তু তাকে এই দুই শাস্তির কোনোটাই দেওয়া হলো না। তাকে কিছু করের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হলো। হরমুযান নিজের রাজধানীতে ফিরে এল, তৎক্ষণাত আরো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু করলো এবং এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে ফিরে এলো। এবারও হরমুযান ধরা পড়ে বন্দী হলো। হরমুযানকে পাকড়াও করে যখন হযরত ওমরের(রা) কাছে নিয়ে আসা হলো তখন হযরত ওমর তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। বন্দী এবার তার মৃত্যুদন্ড সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত ছিল। প্রতি মুহুর্তে সে তাই মৃত্যুর আশংকা করেছিল।

সহসা হযরত ওমর জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমিই নাহাওয়ান্দ্রের বিদ্রোহী গভর্নর?

হরমুযানঃ জ্বি, আমিই।

হযরত ওমরঃ তুমি কি সেই ব্যক্তি যে বার বার মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে?

হরমুযানঃ জ্বী, আমিই।

হযরত ওমরঃ এ ধরনের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড তা তুমি জান?

হরমুযানঃ জ্বী, জানি।

হযরত ওমরঃ বেশ, তাহলে তুমি এই শাস্তি এখনি নিতে প্রস্তুত?

হরমুযানঃ আমি প্রস্তুত। তবে মৃত্যুর পূর্বে আপনার নিকট আমার্ একটিমাত্র আবেদন আছে।

হযরত ওমরঃ সেটি কী?

হরমুযানঃ আমি খুব পিপাসা বোধ করছি। আমি এক গ্লাস পানি চাইতে পারি?

হযরত ওমরঃ অবশ্যই।

এই সময় হযরত ওমরের নির্দেশে তাকে এক গ্লাস পানি দেয়া হলো।

হরমুযানঃ আমিরুল মু’মিনীন, আমি আশংকা করছি যে, আমি পানি খাওয়ার সময়েই আমার মস্তক ছিন্ন করা হতে পারে।

হযরত ওমরঃ কখনো নয়। তোমার এই পানি খাওয়া শেষ হবার আগে কেউ তোমার চুলও স্পর্শ করবে না।

হরমুযানঃ (একটু থেমে) আমিরুল মু’মিনীন, আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন যে আমি এই পানি খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত আপনারা আমার চুলও স্পর্শ করবেন না। আমি পানি পান করবো না। (এই বলেই সে পানি ঢেলে ফেলে দিল)। এখন আপনি আমাকে হত্যা করতে পারেন না।

হযরত ওমরঃ (মুচকি হেসে) ওহে গভর্নর, এটা তোমার চালাকী। যাহোক, ওমর যখন কথা দিয়েছে, তখন সে তার কথা রাখবেই। যাও, তুমি মুক্ত।

এর কিছুকাল পরে একদিন হরমুযান একদল সঙ্গী পরিবেষ্টিত হয়ে আবার মদীনায় এল এবং হযরত ওমরের সাথে সাক্ষাত করলো। সে বললো, “আমিরুল মু’মিনীন, এবার আমি নতুন জীবনের সন্ধানে এসেছি। আমাদের সবাইকে ইসলামে দীক্ষিত করুন।”

১৭ হযরত ওমরের(রা) ন্যায় বিচারের আর একটি উদাহরণ

একবার কিছু সুগন্ধী দ্রব্য বাহরাইন থেকে হযরত ওমরের নিকট পাঠানো হলো। তিনি সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এই সুগন্ধী দ্রব্যটিকে মেপে সমান ভাগ করে মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করতে পারে?”

তাঁর স্ত্রী হযরত আতেকা বললেন, “আমিরুল মু’মিনীন, আমি পারবো।”

হযরত ওমর বললেন, “আতেকা ছাড়া আর কেউ আছে কি?”

হযরত আতেকা বললেন, “আমিরুল মু’মিনীন, আমি মেপে দিলে অসুবিধা কী?”

হযরত ওমর বললেন, “আমার আশংকা হয় যে, মাপার সময় তুমি জিনিসটা হাত দিয়ে ধরবে এবং তোমার হাত সুবাসিত হয়ে যাবে। অতঃপর সেই সুবাসিত হাত তুমি মুখে মেখে নেবে এবং সুগন্ধী উপভোগ করবে। অন্যদের চাইতে এতটুকু বাড়তি সুবিধা তুমি পেয়ে যাও, তা আমি পছন্দ করি না।”

শিক্ষাঃ

একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য স্বীয় স্ত্রী বা অধীনস্তদের ওপর এত কঠোরতা আরোপ না করলেও চলতো। কিন্তু খলীফা বা যে কোনো স্তরের নেতৃবৃন্দের পক্ষে এরূপ কঠোর ও সূক্ষ্ম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। কারণ নেতামাত্রই আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তি। তার পক্ষে নিজেকে এবং নিজের ঘনিষ্ঠজনদেরকে বিন্দুমাত্রও ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই।

১৮হযরত ওমর কর্তৃক স্বীয় পুত্রের বিচার

একবার হযরত ওমরের নিকট একটি অভিযোগ এল যে, তার পুত্র আবু শাহমা মদ খেয়েছে। অভিযোগটা অন্যান্য লোকের কানেও এল। অনেকে ফিসফিসানি শুরু করে দিল যে, এবার দেখবো খলিফার আইনের শাসন নিজের ছেলের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে। কিন্তু তাদের ধারণাটা অচিরেই মাঠে মারা গেল। কেননা অন্যরা শৈথিল্য দেখাতে পারে এই আশংকায় হযরত ওমর তাঁর ছেলের মামলা আদালতে না পাঠিয়ে নিজের হাতে তুলে নিলেন।

ছেলের মদ খাওয়ার সত্যতা প্রমাণিত হলো। ইসলামী আইনে এর শাস্তি ৮০ ঘা বেত্রদন্ড। এবারও হযরত ওমর অন্যের ওপর নির্ভর করলেন না। কেননা অন্যরা দুর্বলতা দেখাতে পারে। তিনি নিজেই পুরো ৮০ ঘা বেত্রদন্ড। এবারও হযরত ওমর অন্যের উপর নির্ভর করলেন না। কেনান অন্যরা দুর্বলতা দেখাতে পারে। তিনি নিজ হাতেই পুরো ৮০ টা বেত্রাঘাত নিজের ছেলের পিঠে লাগালেন। আবু শাহমা এই শাস্তিতে মারা গেলেন। কিন্তু হযরত ওমর আল্লাহর শোকর আদায় করলেন যে, তিনি তাকে এমন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছেন। কোনো কোনো রেওয়ায়াতে আছে যে, ৮০টি বেত্রাঘাতের কয়েকটি বাকী থাকতেই ছেলে মারা গেলে হযরত ওমর তার কবরের ওপর বাকী বেত্রাঘাতগুলো করেন।

শিক্ষাঃ

ইসলামী আইন ও নীতিমালা প্রয়োগের ব্যাপারে কোনো আপোষের অবকাশ নেই। আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ সাক্ষী হিসাবে ইনসাফ কায়েম কর, এমনকি তা যদি তোমাদের নিজেদের, পিতামাতার ও ঘনিষ্টজনদের বিরুদ্ধেও যায়।”

১৯ সততার পুরস্কারঃ

রাত প্রায় দুপুর গড়িয়ে চলছে। ঘুমন্ত মদীনা নগরী। এরই অলিগলি দিয়ে ধীরপদে প্রতিদিনের মত হেটে চলেছেন ছদ্মবেশী খলীফা হযরত ওমর। খোঁজ খবর নিচ্ছেন প্রজাদের। হঠাৎ একটি কুঁড়েঘর থেকে ফিসফিস করে একটি কথোপকথন তাঁর কানে ভেসে এল। খলীফা দাঁড়িয়ে গেলেন পুরো কথোপকথন শুনতে। এক বৃদ্ধা মহিলা তার মেয়েকে বলছে, “দুধ বেঁচতে দেয়ার সময় একটু পানি মিশিয়ে দিসনা কেন? তুই তো জানিস, কি অভাব আমাদের। ঐটুকু দুধে আর ক’টা পয়সা হবে। একটু পানি মেশালে কিছুটা স্বচ্ছলতার মুখ দেখা যেত।”

“কিন্তু তুমি খলীফার আদেশ ভুলে গেলে, আম্মী? তিনি যে বলেছেন কেউ যেন দুধের সাথে পানি না মেশায়।”

“বলেছেন, তাতে কী হয়েছে? খলীফা বা তার কোনো কর্মচারী তো আর দেখতে আসছেন না আমরা কী করছি।”

“কিন্তু আম্মী, তিনি বা তার কোনো কর্মচারী দেখুক বা না দেখুক, তার আদেশতো প্রত্যেক মুসলমানের মেনে চলা দরকার। তা ছাড়া খলীফা যদি নাও জানেন, আল্লাহ তো জানবেন। তিনি তো সব কিছু দেখেন, শোনেন এবং জানেন।”

খলীফা নীরবে প্রস্থান করলেন। নিজের সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “শুনলে তো? এই মেয়েটাকে কী পুরস্কার দেয়া যায় তার সততার জন্য?”

“তাকে বড়সড় একটা পুরস্কার দেয়া উচিত। ধরুন, এক হাজার দিরহাম।”

“না, তা যথেষ্ট নয়। আমি তাকে সততার সর্বোচ্চ পুরস্কার দেব। আমি তাকে আপন করে নেব।”

খলীফার সঙ্গী অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, খলীফা কী পুরস্কার দিতে চান?”

পরদিন সকালে খলীফা মেয়েটিকে তার দরবারে ডেকে পাঠালেন। মেয়েটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে হাজির হলো মুসলিম সাম্রাজ্যের মহাশক্তিধর শাসকের সামনে।

খলীফা তাঁর ছেলেদের ডাকলেন। তাদেরকে শোনালেন গতরাতে তার শোনা আলাপচারিতার কথা। তারপর বললেনঃ “হে আমার ছেলেরা, আমি চাই তোমাদের কোন একজন এই মেয়েটিকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করুক। কেননা এর চেয়ে ভালো কোনো পাত্রী আমি তোমাদের জন্য জোগাড় করতে পারবো বলে মনে হয় না।”

একটি ছেলে পিতার প্রস্তাবে রাজী হলো। মেয়েটিও সম্মতি দিল। আর সে খলীফার সম্মানিত পুত্রবধূতে পরিণত হলো। বর্ণিত আছে যে, পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ওমর নামে পরিচিত ও পঞ্চম খোলাফায়ে রাশেদ নামে আখ্যায়িত মহান শাসক ওমর বিন আবদুল আযীয এই মেয়েরই দৌহিত্র ছিলেন।

শিক্ষাঃ এই ঘটনাটি একদিকে যেমন প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের সততার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে, অপরদিকে তেমনি মুসলিম নেতৃবৃন্দ সততার কেমন মর্যাদা দিতেন ও কদর করতেন, তাও এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। মনে রাখতে হবে, গুণের কদর দিতে না পারলে সমাজে সদগুণের বিকাশ ঘটা সম্ভব নয়।

২০ কাযী শুরাইহের ন্যায়বিচার      

একবার হযরত ওমর (রা) জনৈক বেদুইনের কাছ থেকে একটি ঘোড়া কিনলেন। ঘোড়ার দাম পরিশোধ করেই তিনি ঘোড়ায় চড়লেন এবং তাকে হাঁকিয়ে নিয়ে গেলেন। কিছুদূর যেতেই ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে খোঁড়া হয়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘোড়াকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে ঐ বেদুইনের কাছে নিয়ে গেলেন। হযরত ওমর ভেবেছিলেন ঘোড়াটির আগে থেকেই পায়ে কোনো খুঁত ছিল, যা সামান্য ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে গেছে। তিনি ঘোড়ার মালিককে বললেন, “তোমার ঘোড়া ফেরত নাও। এর পা ভাঙ্গা।”

সে বললোঃ “আমিরুল মু’মিনীন! আমি ফেরত নিতে পারবো না। কারণ আমি যখন বিক্রী করেছি, তখন ঘোড়াটি ভাল ছিল।”

হযরত ওমর বললেনঃ “ঠিক আছে। একজন সালিশ মানা হোক। সে আমাদের বিরোধ মিটিয়ে দিবে।”

লোকটি বললোঃ শুরাইহ বিন হারিস কান্দী নামে একজন ভালো জ্ঞানী লোককে আমি চিনি। তাকেই শালিশ মানা হোক। হযরত ওমর রাজী হলেন। উভয়ে শুরাইহের খলিফাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আমিরুল মু’মিনীন! আপনি কি ঘোড়াটি সুস্থ অবস্থায় কিনেছিলেন?”

হযরত ওমর বললেন, হ্যাঁ।

শুরাইহ বললেন, তাহলে হয় আপনি ঘোড়াটি মূল্য দিয়ে কিনে নিন। নচেত যে অবস্থায় কিনেছিলেন সে অবস্থায় ফেরত দিন।

এ কথা শুনে খলিফা ওমর(রা) চমৎকৃত হয়ে বললেনঃ “এটাই সঠিক বিচার বটে। তুমি সম্পূর্ণ নির্ভূল মত ও ন্যায্য রায় দিয়েছ। তুমি কুফা চলে যাও। আজ থেকে তুমি কুফার বিচারপতি।”

সেই থেকে দীর্ঘ ষাট বছর যাবত পর্যন্ত তিনি মুসলিম জাহানের বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। যতদূর জানা যায়, হযরত আলীর সময়ে তিনি খলিফার বিরুদ্ধে অনুরূপ আর একটি রায় দিয়ে প্রধান বিচারপতির পদে উন্নীত হন। তারপর উমাইয়া শাসনকালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অবর্ণনীয় অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো শাসকই তাকে পদচ্যূত করার সাহস পান নি।

হযরত আলী(রা) একবার তাঁর অতিপ্রিয় বর্ম হারিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর জনৈক ইহুদীর হাতে সেটি দেখেই চিনে ফেললেন। লোকটি কুফার বাজারে সেটি বিক্রয় করতে এনেছিল। হযরত আলী তাকে বললেনঃ “এতো আমার বর্ম। আমার একটি উটের পিঠ থেকে এটি অমুক রাত্রে অমুক জায়গায় পড়ে গিয়েছিল।”

ইহুদী বললোঃ “আমীরুল মুমিনীন! ওটা আমার বর্ম এবং আমার দখলেই রয়েছে।”

হযরত আলী পুনরায় বললেনঃ “এটি আমারই বর্ম। আমি এটাকে কাউকে দানও করি নি, কারো কাছে বিক্রয়ও করি নি। এটি তোমার হাতে কিভাবে গেল?”

ইহুদী বললোঃ “চলুন, কাযীর দরবারে যাওয়া যাক।”

হযরত আলী(রা) বললেনঃ “বেশ, তাই হোক। চলো।” তারা উভয়ে গেলেন বিচারপতি শুরাইহের দরবারে। বিচারপতি শুরাইহ উভয়ের বক্তব্য জানতে চাইলে উভয়ে বর্মটি নিজের বলে যথারীতি দাবী জানালেন।

বিচারপতি খলিফাকে সম্বোধন করে বললেনঃ “আমিরুল মু’মিনীন! আপনাকে দু’জন সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। হযরত আলী বললেনঃ “আমার ভৃত্য কিম্বার এবং ছেলে হাসান সাক্ষী আছে।”

শুরাইহ বললেনঃ “আপনার ভৃত্যের সাক্ষ্য নিতে পারি। কিন্তু ছেলের সাক্ষ্য নিতে পারবো না। কেননা বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য শরীয়তের আইনে অচল।”

হযরত আলী বললেনঃ “বলেন কি আপনি? একজন বেহেশতবাসীর সাক্ষ্য চলবে না? আপনি কি শোনেন নি, রাসূল(সা) বলেছেন, হাসান ও হোসেন বেহেশতের যুবকদের নেতা?”

শুরাইহ বললেনঃ “শুনেছি আমিরুল মু’মিনীন! তবু আমি বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণ করবো না।” অনন্যোপায় হযরত আলী ইহুদীকে বললেনঃ “ঠিক আছে। বর্মটা তুমিই নিয়ে নাও। আমার কাছে এই দু’জন ছাড়া আর কোনো সাক্ষী নেই।”

ইহুদী তৎক্ষণাৎ বললোঃ “আমিরুল মু’মিনীন! আমি স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ওটা আপনারই বর্ম। কি আশ্চর্য! মুসলমানদের খলিফা আমাকে কাজীর দরবারে হাজির করে আর সেই কাযী খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেয়। এমন সত্য ও ন্যায়ের ব্যবস্থা যে ধর্মে রয়েছে আমি সেই ইসলামকে গ্রহণ করেছি। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু………..।”

অতঃপর বিচারপতি শুরাইহকে সে জানালো যে, “খলিফা সিফফীন যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমি তাঁর পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। হঠাৎ তাঁর উটের পিঠ থেকে এই বর্মটি পড়ে গেলে আমি তা তুলে নিই।”

হযরত আলী(রা) বলেনঃ “বেশ! তুমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছ, তখন আমি ওটা তোমাকে উপহার দিলাম।”

এই লোকটি পরবর্তীকালে নাহরাওয়ানে হযরত আলীর নেতৃত্বে খারেজীদের সাথে যুদ্ধ করার সময় শহীদ হন।

আর একবার কাযী শুরাইহের ছেলে জনৈক আসামীর জামিন হয়। আসামী জামিনে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে গেলে শুরাইহ আসামীর বিনিময়ে ছেলেকে জেলে আটকান। যতদিন আসামীকে খুঁজে পাওয়া যায় নি ততদিন সে জেলে আটক এবং কাযী সাহেব স্বয়ং বন্দী ছেলের জন্য জেলখানায় খাবার দিয়ে আসতেন।

কাযী শুরাইহের আর এক ছেলে একবার এক গোত্রের সাথে জমিজমা সংক্রান্ত মোকদ্দমার সম্মুখীন হন। মোকদ্দমাটি শুরাইহের আদালতেই আসার কথা ছিল। তাই পিতার সাথে আগেভাগেই পরামর্শ করার জন্য ছেলেটি একদিন বললোঃ আব্বা, আপনি আমার মামলার বিবরণটি পুরোপুরি শুনে আমাকে বলুন আমার জেতার সম্ভাবনা আছে কি না। যদি থাকে তাহলে আমি মামলাটি রুজু করবো। নচেত বিরত থাকবো। বিচারপতি শুরাইহ পুরো ঘটনা শুনে ছেলেকে মামলা রুজু করার পরামর্শ দিলেন।

যথাসময়ে মামলার শুনানি শুরু হলো। শুনানী শেষে শুরাইহ নিজের ছেলের বিরুদ্ধে রায় দিলেন।

রাত্রে বাসায় এসে ছেলে পিতার কাছে অনুযোগের সুরে বললোঃ “আব্বা, আপনি আমাকে এভাবে অপমান করলেন! আমি যদি আগেভাগে আপনার পরামর্শ না নিতাম, তা হলেও একটা সান্তনা ছিল। কিন্তু…..।”

কাযী শুরাইহ বললেনঃ “হে বৎস! তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবার কাছ হতে প্রিয়; কিন্তু তোমার কাছ হতেও আল্লাহ আমার কাছে অনেক বেশী প্রিয়। আমি জানতাম, তোমার বিপক্ষের দাবীই সঠিক ও ন্যায়সংগত। কিন্তু তোমাকে সেটা জানিয়ে দিলে তুমি তাদের সাথে এমনভাবে আপোষ করে নিতে পারতে, যার ফলে তাদের প্রাপ্য অংশ বিশেষ তোমাকে দিতে হতো। তেমনটি ঘটলে আল্লাহ আমার উপর নারাজ হতেন। এজন্যই আমি তোমাকে মামলা আদালতে আনবার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এখন তোমার খুশি হওয়া উচিত যে, তুমি অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পত্তি দখল করা থেকে রক্ষা পেলে।”

বর্ণিত আছে যে, বিচারপতি শুরাইহ যখন কোনো মামলার শুনানী গ্রহণ করতেন, তখন সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্য দেওয়ার ভয়াবহ পরিণাম স্মরণ করিয়ে দিতেন এবং বলতেন, “তোমাদের সাক্ষ্যের ওপরই এই মামলার রায় নির্ভরশীল। এখনো সময় আছে, তোমরা ইচ্ছা করলে সাক্ষ্য না দিয়েও চলে যেতে পারো।”

এরপরও যখন সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে চাইতো, তিনি সাক্ষ্য নিতেন এবং রায় দেয়ার সময় বিজয়ী পক্ষকে হুশিয়ার করে দিতেন যে, “শুধুমাত্র সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই আমি এই রায় দিলাম। আল্লাহ যা হারাম করেছেন, এই রায়ের দ্বারা তা হালাল হবে না।”

সম্ভবতঃ এসব দুর্লভ গুণ বৈশিষ্ট্যের কারণেই হাজার হাজার জ্ঞানীগুণী সাহাবী বেঁচে থাকা সত্ত্বেও হযরত ওমরের আমল থেকে শুরু করে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনামল পর্যন্ত দীর্ঘ ৬০ বছরব্যাপী কাযী শুরাইহ মুসলিম জাহানের প্রধান বিচারপতির পদে বহাল আছেন।

২১। হযরত উসমানের দানশীলতা ও মিতব্যয়িতা

একদিন এক নিঃস্ব লোক রাসূলের নিকট এসে কিছু সাহায্য চাইল। তখন রাসূলের নিকট কিছুই ছিল না। তিনি লোকটাকে হযরত উসমানের নিকট পাঠালেন। দরিদ্র ব্যক্তিটি হযরত উসমানের গৃহে উপস্থিত হয়ে দেখে যে একদল পিঁপড়ে বেশ কিছু শস্য একটি স্তুপ থেকে গর্তে নিয়ে যাচ্ছে। হযরত উসমান শস্যগুলো একত্রিত করে কিছু শস্য পিঁপড়ের গর্তের কাছে ছড়িয়ে বাকীগুলি আবার স্তুপে রেখে দিচ্ছিলেন। লোকটি ধারণা করলো যে হযরত উসমান বড় কৃপণ। সে মনে মনে ভাবলো যে দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও সে নিজে পিঁপড়ের মুখ হতে শস্য কেড়ে নিতো না। তাই কিছুই না চেয়ে লোকটি চলে গেল।

পরদিন লোকটি আবার রাসূলের নিকট উপস্থিত হল এবং কিছু চাইল। সে রাসূলকে জানাল যে, কৃপণ উসমানের (রা) নিকট কিছুই আশা করা যায় না, তাই সে কিছুই চায় নি। রাসূল(সা) তাকে আবার হযরত উসমানের নিকট পাঠালেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেল এবং দেখতে পেল যে হযরত উসমান(রা) তাঁর চাকরকে বাতির সলতে উঁচু করে দেয়ার দায়ে বকাঝকা করছেন। কারণ তাতে অধিক তেল খরচ হয়। দরিদ্র লোকটি মনে মনে ভাবলো যে তার বাড়িতে আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে এবং সে কখনও এরূপ তেলের হিসাব করে না। হযরত উসমানের কৃপণতা সম্বন্ধে তার ধারণা আরো জোরদার হলো। কিছু না চেয়েই সে আবার রাসূল(সা) এর নিকট ফিরে গেল। হযরত উসমানের বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ শুনে রাসূল(সা) মৃদু হাসলেন এবং লোকটিকে আবার বললেন হযরত উসমানের কাছে ফিরে যেতে এবং কিছু চাইতে।

তৃতীয়বার লোকটি হযরত উসমানের নিকট এসে দেখে যে হযরত উসমানের বাড়ীতে তুলা শুকাতে দেয়া হয়েছে। ঢেকে দেয়া হয়েছে জাল দিয়ে। জালের নিচ হতে কিছু তুলা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। হযরত উসমান সেগুলিকে ধরে আবার জালের নিচে রাখছেন। লোকটির মন অত্যন্ত বিরূপ হয়ে উঠলো। ভাবলো এমন কৃপণও কি কিছু দান করতে পারে? তবুও যেহেতু রাসূল তাকে তিনবার উসমান(রা) এর কাছে পাঠিয়েছেন, তাই সে গিয়ে কিছু চাইলো।

হযরত উসমান ভাবলেন, লোকটিকে কি দেওয়া যায়, যে লোককে রাসূল (সা) তার নিকট সাহায্যের জন্য পাঠিয়েছেন, তার চাইতে সাহায্য নেওয়ার যোগ্য আর কে হতে পারে?

তখন দেখা গেল বেশ দূরে একটি সরু রেখা। রেখাটিকে একটি উটের কাফেলা বলেই মনে হলো। কিছুক্ষণ পর হযরত উসমান বুঝতে পারলেন, যে কাফেলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় গিয়েছিল সেটিই ফিরে আসছে। হযরত উসমান তাকে লিখে দিলেন যে ঐ কাফেলার সবচেয়ে ভাল উটটি এবং যার উপর সবচেয়ে বেশি দ্রব্যসম্ভার আছে সেটিই সে নিতে পারে। লোকটি প্রথম মনে করলো যে হযরত উসমান তামাসা করছেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পরও লোকটি তার দান সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারলো না। সন্দিগ্ধ চিত্তে সে গেল কাফেলার নিকট। সবচেয়ে ভালো এবং প্রথম উটটিই তার পছন্দ হলো। সেটি সে নিতে চাইল। কাফেলার পরিচালক অনুমতি দিল। কিন্তু মরুভূমিতে চলাকালে প্রথম উটটিকে কাফেলা হতে সরিয়ে নেয়া সহজ নয়। সবগুলো উটই প্রথমটিকে অনুসরণ করল। কাফেলার পরিচালক তখন লোকটিকে বললো যে আস্তানায় ফিরে যাওয়ার পর উটটি দেয়া হবে। হযরত উসমানের নিকট খবর দেয়া হল যে, একটি উটকে কাফেলা হতে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয় নি। তাই তখন তার নির্দেশ পালন করা হয় নি। খবর শুনে হযরত উসমান(রা) বললেন, হয়ত আল্লাহর ইচ্ছা এই যে, কাফেলার সবগুলি উটই লোকটি পাবে। অতঃপর তিনি কাফেলার পরিচালককে নির্দেশ দিলেন যে সবগুলো উটই যেন লোকটিকে দেয়া হয়। লোকটিতো বিস্ময়ে অবাক! অতো বড় কৃপণের কিভাবে এতো বড় দান করা সম্ভব হলো? হতবাক হয়ে সে তার পূর্ববর্তী তিন অভিজ্ঞতা জানাল এবং দু’প্রকার ব্যবহারের তাৎপর্য কি জানতে চাইল।

হযরত উসমান যে জবাব দিলেন তার সারমর্ম এই যে, আল্লাহ বিশ্বের সমস্ত সম্পদের মালিক, মানুষ হলো তত্ত্বাবধানকারী বা পাহারাদার। সে শুধু আল্লাহর ইচ্ছানুসারে সম্পদ নিজের জন্য এবং সমাজের অপরাপর ব্যক্তির কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারবে। মানুষের কাজ হলো আল্লাহর সম্পদ নিজের মর্জিমত রক্ষণাবেক্ষণ করা। যদি কোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানকালে কোনো সম্পদের এক কণামাত্র বিনষ্ট হয় তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সম্পদের অধিকার শুধু বিশেষ সুবিধা নয়, বরং একটি বিরাট দায়িত্ব।”

শিক্ষাঃ মুমিনকে অবশ্যই দানশীল হতে হবে, কিন্তু সে কখনো অপচয়কারী ও অপব্যয়কারী হতে পারবে না। কেনান “অপচয়কারী ও অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।”(আল কুরআন)।

২২ সাতশো গুণ লাভ

হযরত আবু বকর(রা) এর খেলাফতকালে এক দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। খাদ্যদ্রব্য একেবারেই দুর্লভ হয়ে পড়ে এবং মানুষের দুঃখ দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে। সেই সময় হযরত উসমানের প্রায় এক হাজার মন গমের একটি চালান বিদেশ হতে মদীনায় পৌঁছলো। শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁর কাছে এল। তারা তাঁর সমস্ত গমের চালান ৫০% লাভে কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিল। সেই সাথে তারা এও ওয়াদা করল যে, তারা দুর্ভিক্ষ পীড়িত জনগণের দুর্দশা লাঘবের জন্যই এটা কিনতে চেয়েছে।

হযরত ওসমান(রা) বললেন, “তোমরা যদি আমাকে এক হাজার গুণ লাভ দিতে পার, তবে আমি দিতে পারি। কেননা অন্য একজন আমাকে সাতশো গুণ লাভ দিতে চেয়েছেন।”

ব্যবসায়ীরা বললো, “বলেন কি? চালান মদীনায় আসার পর তো আমরাই প্রথম এলাম আপনার কাছে। সাতশো গুণ লাভের প্রস্তাব কে কখন দিলো?”

হযরত ওসমান বললেন, “এই প্রস্তাব আমি পেয়েছি আল্লাহর কাছ থেকে। আমি এই চালানের সমস্ত গম বিনামূল্যে গরীবদের মধ্যে বিতরণ করবো। এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে সাতশো গুণ বেশি পূণ্য দিবেন বলে ওয়াদা করেছেন।”

শিক্ষাঃ পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৬১ নং আয়াতে এই ওয়াদার উল্লেখ রয়েছে। হযরত ওসমান(রা) সম্ভবত ঐদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। হযরত ওসমানের মহানুভবতার এই ঘটনা বিপন্ন মানুষের সেবাকে ইসলাম কত গুরুত্ব দেয়, তারই প্রমাণ বহন করে। জনসেবা ও ত্যাগের এই মনোভাব বিশেষভাবে ধনীদের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়া খুবই জরুরী।

২৩ হযরত আলীর (রা) খোদাভীতি

হযরত আলী(রা) তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। একদিন তার ছোটভাই আকীল তার কাছে এসে নিজের অনেক অভাব অভিযোগের কথা জানালেন এবং তাকে কিছু সাহায্য দেয়ার অনুরোধ করলেন। হযরত আলী বললেন, জনগণের সম্পদের কোষাগার বাইতুল মাল থেকে আমি তোমাকে এক কপর্দকও দিতে পারবো না। মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আমি বেতন পেলে তা থেকে তোমাকে কিছু দেয়া হবে। হযরত আকীল বললেন, আপনি নিজের বেতন অগ্রিম নিয়ে নিন। হযরত আলী বললেন, আমার বেতন অন্য সকলের বেতনের সাথে আসবে। অগ্রিম নেয়ার কোনো অধিকার আমার নেই। হযরত আকীল নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, একটা কিছু করুন। আমার সংসার চলছে না। যেভাবেই হোক আমাকে কিছু সাহায্য দিন। হযরত আলী বললেন, বাজারের কোনো দোকান থেকে তালা ভেঙ্গে কিছু নিয়ে নাও। আকীল বললেন, ওটাতো চুরি বা ডাকাতি বলে গণ্য হবে। হযরত আলী(রা) বললেন, এই মুহুর্তে আমি যদি বাইতুল মাল থেকে তোমাকে কিছু দেই তবে তাও চুরি বা ডাকাতি বলে গণ্য হবে। কেননা ওটা জনগণের সম্পদ এবং জনগণ আমাকে ওখান থেকে নেয়ার অনুমতি দেয় নি।

অগত্য হযরত আকীল হযরত মোয়াবিয়ার নিকট গেলে তিনি তাকে একশো দিরহাম দিয়ে বললেন, তুমি মসজিদে দাঁড়িয়ে সকলকে জানাবে যে, আলীর কাছে সাহায্য চেয়ে পাইনি, কিন্তু মোয়াবিয়ার কাছে চেয়ে পেয়েছি।

ইত্যবসরে হযরত আকীল হযরত আলীর বক্তব্যের যৌক্তিকতা বুঝতে পারলেন। তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আলীর কাছে অন্যায়ভাবে সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি খোদাভীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর মোয়াবিয়ার কাছে সাহায্য চাইলে তিনি খোদাভীতির পরিবর্তে আমাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

২৪ অধিক সম্পদের মোহ ও কৃপণতার পরিণাম

একবার সালামা ইবনে হাতেম আনসারী নামক এক সাহাবী রাসূল(সা) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল(সা), আমার জন্য দোয়া করুন, যেন আমি অনেক বড় ধনী হতে পারি। রাসূল(সা) বললেন, আমি যে নীতি অনুসরণ করে চলেছি, তা কি তোমার পছন্দ নয়? আল্লাহর কসম, আমি ইচ্ছা করলে মদীনার পাহাড়গুলো সোনা হয়ে আমার সাথে সাথে ঘুরতো। কিন্তু এমন ধনী হওয়া আমার পছন্দ নয়। এ কথা শুনে লোকটি ফিরে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আাবার ফিরে এল। এবার সে বললোঃ হে রাসূল(সা)! আমি ওয়াদা করছি যে, আমি যদি ধনী হয়ে যাই তাহলে প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য হক পৌঁছে দেব। এ কথা শুনে রাসূল(সা) তার বিপুল ধনসম্পদ হোক-এই মর্মে দোয়া করলেন। এর ফলে তার ছাগল ভেড়া প্রভৃতিতে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি দেখা দিল। ফলে মদীনার যে জায়গায় সে বাস করতো তাতে আর তার স্থান সংকুলান হতো না। সে মদীনার বাইরে চলে গেল। তবে যোহর ও আসরের নামায মদীনার মসজিদে নববীতে পড়তো। তার অন্যান্য নামায সে নিজের বাসস্থানেই পড়তো।

এরপর তার গৃহপালিত পশুর সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। এর ফলে নতুন জায়গাটিও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে দাঁড়ালো। তাই সে মদীনা হতে আরো দূরে গিয়ে থাকতে আরম্ভ করলো। সেখান থেকে সে শুধু জুমার নামায মদীনায় এসে পড়তে লাগলো। অন্যান্য নামায নিজের বাসস্থানেই পড়তো। ক্রমে তার সম্পদ আরো বেড়ে গেলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হলো। সেখান থেকে সে জুমার নামাযেও মসজিদে আসতে পারতো না।

কিছুদিন পর রাসূল(সা) সালাবা সম্পর্কে লোকদের কাছে খোঁজ খবর জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হলো যে, সালাবার সম্পদ এত বেশি হয়েছে যে, শহরের কাছে কোথাও তার স্থান সংকুলান হয় নি। তাই এখন সে আর এদিকে আসে না। এ কথা শুনে রাসূল(সা) তিনবার বললেন, “ইয়া ওয়াইহা সালাবা!” অর্থাৎ সালাবার জন্য আফসোস।

ঠিক এই সময় যাকাতের আয়াত নাযিল হয়। তাতে রাসূল(সা)কে মুসলমানদের কাছ হতে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি যাকাত আদায়ের জন্য মুসলমানদের কাছে লোক পাঠালেন। কয়েকজন লোককে সালাবার কাছে পাঠালেন। আর কয়েকজনকে বনু সুলাইমের আর এক ধনীর কাছেও পাঠালেন।

যখন আদায়কারীরা সালাবার কাছে যাকাত চাইল এবং রাসূল(সা) এর লিখিত ফরমান দেখালো; তখন সালাবা বলতে লাগলো, এতো জিযিয়া কর হয়ে গেল, যা অমুসলমানদের কাছ হতে আদায় করা হয়। তারপর বললো, এখন আপনারা যান। ফেরার পথে আসবেন। তখন তারা চলে গেলেন।

পক্ষান্তরে বনু সুলাইমের ধনী লোকটি রাসূল(সা) এর আদেশ শুনে  নিজের গৃহপালিত পশুর মধ্য থেকে বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মানের পশু যাকাত হিসেবে দিলেন। আদায়কারীরা বললেন, আমাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে, উৎকৃষ্টমানের পশু যেন না নিই। বনু সুলাইমের ধনী লোকটি বললো, আমি নিজের ইচ্ছায় দিচ্ছি। দয়া করে গ্রহণ করুন।

অতঃপর আদায়কারীগণ সালাবার কাছে গেলে সে বললো, “কই, দেখি যাকাতের আইন আমাকে দেখাও। তারপর তা দেখে আবার বলতে লাগলোঃ আমি তো মুসলমান। অমুসলমানদের মত জিযিয়া কেন দিতে যাবো? যা হোক, আপনারা এখন যান। আমি পরে ভেবে চিন্তে জানাবো।”

যখন আদায়কারীরা রাসূল(সা) এর কাছে ফিরে গেল তখন সকল বৃত্তা্ন্ত শুনে রাসূল(সা) আবার তিনবার বললেন, “সালাবার জন্য আক্ষেপ!” আর সুলাইমের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। এরপর সালাবার প্রতি ইঙ্গিত করে সূরা তাওবার একটি আয়াত নাযিল হয়। তাতে এই ধরনের লোকদের নিন্দা করা হয়, যারা সম্পদশালী হলে হকদারদের হক দিবে বলে ওয়াদা করেছে, কিন্তু পরে সেই ওয়াদা ভুলে গিয়ে কৃপণতা করতে আরম্ভ করেছে। আয়াতে বলা হয় যে, এই ধরনের লোকদের মনে আল্লাহ মোনাফেকী গভীরভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।

রাসূল(সা) যখন সালাবার জন্য তিনবার আক্ষেপ প্রকাশ করলেন এবং কুরআনের আয়াতও নাযিল হলো, তখন সেখানে সালাবার একজন আত্মীয় ছিলো। সে গিয়ে সালাবাকে সব জানালো এবং তাকে তার আচরণের জন্য তিরস্কার করলো। সালাবা ভীষণ ঘাবড়ে গেল এবং মদীনায় হাজির হয়ে বললো, “হে রাসূল! আমার যাকাত গ্রহণ করুন। রাসূল(সা) বললেন, আল্লাহ তোমার যাকাত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এ কথা শুনে সালাবা আফসোস করতে লাগলো।

রাসূল(সা) বললেন, “এটা তো তোমার নিজের কৃতকার্যের ফল। আমি তোমাকে হুকুম করেছিলাম। তুমি তা মাননি। এখন আর তোমার যাকাত কবুল হতে পারে না। তখন সালাবা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে গেল। এর কিছুদিন পরেই রাসূল(সা) ইন্তিকাল করেন। এরপর সালাবা যথাক্রমে হযরত আবু বকর ও ওমর(রা) কে যাকাত গ্রহণ করতে আবেদন জানায়। কিন্তু তারা রাসূল(সা) এর নীতি অনুসরণ করেন। হযরত ওসমানও তার যাকাত গ্রহণে অস্বীকার করেন। হযরত ওসমানের খেলাফতকালেই তার মৃত্যু হয়।(মাআ’রেফুল কুরআন এর সৌজন্যে)।

শিক্ষাঃ হালাল সম্পদে ধনী হওয়ার চেষ্টা করা ও আশা করা যদিও বৈধ, তবুও এত বেশি সম্পদের লোভ করা উচিত নয়, যা মানুষকে ইসলাম হতে দূরে সরিয়ে দেয়। আর প্রাপ্ত সম্পদের যাকাত ও সদকা দিতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করা উচিত নয়।

২৫ হযরত আবু জার গিফারীর ইসলাম গ্রহণ

হযরত আবু যার গিফারী তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ আমি যখন জানতে পারলাম যে, মক্কায় এমন এক ব্যক্তির আগমন ঘটেছে, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন, তখন আমি আমার ভাইকে ঐ ব্যক্তির(মুহাম্মদ সাঃ) নিকট পাঠালাম এবং তাঁর সম্পর্কে সবিস্তারে জেনে আসতে বললাম। সে গেল, তাঁর সাথে দেখা করলো এবং ফিরে এসে আমাকে জানালো যে, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি সৎ কাজের আদেশ দেন এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করেন। কিন্তু আমি তার এই বিবরণে সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।

অগত্যা আমি নিজে কিছু খাবার এবং একটি লাঠি নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মক্কায় পৌঁছে আমি এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। আমি তাকে চিনতামও না, আবার কোরেশদের ভয়ে কাউকে তার কথা জিজ্ঞেসও করতে পারছিলাম না। তাই আমি যমযমের পানি পান করে দিন কয়েক মসজিদুল হারামেই কাটিয়ে দিলাম।

একদিন আলী আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ মনে হয় তুমি বহিরাগত। আমি বললামঃ সত্যিই তাই। তিনি বললেনঃ তবে আমার বাড়ি চল। আমি তার সাথে চললাম। পথে তিনিও আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, আমিও তাকে কিছু বললাম না। আলীর বাড়িতে রাত কাটিয়ে ভোর বেলা আবার মসজিদুল হারামে গিয়ে হাজির হলাম। ভাবলাম, সুযোগমত কাউকে জিজ্ঞাসা করবো। কিন্তু এদিনও তেমন সুযোগ হলো না।

আলী আজও আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ লোকটা কি থাকার কোনো জায়গাই পেলনা যে, মসজিদুল হারামেই ক্রমাগত থাকতে আরম্ভ করেছে? আমি বললামঃ না ভাই, জায়গা পাইনি। তিনি বললেনঃ আমার সাথে চল। পথিমধ্যে তিনি বললেন, তোমার হয়েছে টা কী? কী চাও এখানে? আমি বললাম, আমার ব্যাপারটা যদি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন তাহলে বলতে পারি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন। আমি তখন তাকে সমস্ত কথা খুলে বললাম। তিনি বললেন, ঠিক আছে। তুমি আমার সাথে চল। আমি সেই ব্যক্তির কাছেই যাচ্ছি। আমি যেখানে প্রবেশ করবো, তুমিও সেখানেই প্রবেশ করবে। আর পথিমধ্যে যদি তোমার জন্য ক্ষতিকর কোনো লোক দেখি, তাহলে আমি জুতা ঠিক করার ভান করে বসে পড়বো, তুমি চলতে থাকবে। তাহলে কেউ তোমাকে আমার সাথী বলে সন্দেহ করবে না।

এরপর আমি তাকে অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। অবশেষে তিনি রাসূল(সা) এর কাছে উপনীত হলেন এবং আমিও উপনীত হলাম। আমি নবীকে বললাম, আমার সামনে ইসলাম পেশ করুন। তিনি পেশ করলেন। আমি তৎক্ষণাত ইসলাম কবুল করলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে আবু যার, তোমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা আপাততঃ কারো কাছে প্রকাশ না করে সরাসরি নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাও। তারপর আমাদের বিজয় হলে এসো। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, এই বাণী আমি নিশ্চয়ই লোক সমক্ষে প্রকাশ করবো। এই বলে মসজিদুল হারামে এসে কুরাইশদেরকে সম্বোধন করে বললামঃ হে কুরাইশগণ, শোন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

আর যায় কোথায়। আমাকে ধর্মত্যাগী বলে গালি দিয়ে সবাই ধর ধর করে তেড়ে এলো এবং আমাকে পিটিয়ে আধামরা করে ফেললো। আব্বাস এসে আমাকে রক্ষা করলেন। পরদিন আবার একইভাবে ঘোষণা করলাম এবং কুরাইশদের হাতে একইভাবে গণপিটুনি খেলাম। এই ছিল আমার ইসলাম গ্রহণের প্রথম অবস্থা।

শিক্ষাঃ অতিমাত্রায় বৈরী পরিবেশে নিজের ইসলামী পরিচয় প্রকাশ করে বিপদ ডেকে আনা অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার কাজ। হযরত আবু যারের সিদ্ধান্তটি ছিল নিতান্ত ব্যক্তিগত ও ব্যতিক্রমধর্মী। সাধারণ মানুষের পক্ষে এরূপ করা উচিত নয়।  

২৬ পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করার পরিণাম

ইমাম তাবরানী ও ইমাম আহমদ একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। রাসূল(সা) এর যুগে আলকামা নামে মদীনায় এক যুবক বাস করতো। সে নামায, রোযা ও সাদকার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগীতে অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে লিপ্ত থাকতো। একবার সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে তার স্ত্রী রাসূল(সা)এর কাছে খবর পাঠালো যে, “আমার স্বামী আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। হে রাসূল, আমি আপনাকে তার অবস্থা জানানো জরুরী মনে করছি।” রাসূল(সা) তৎক্ষণাৎ হযরত আম্মার, সুহাইব্ ও বিলাল(রা) কে তার কাছে পাঠালেন। তাদেরকে বলে দিলেন যে, “তোমরা তার কাছে গিয়ে তাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়াও।” তারা গিয়ে দেখলেন, আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। তাই তারা তাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” পড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু সে কোনো মতেই কলেমা উচ্চারণ করতে পারছিল না। অগত্যা তারা রাসূল(সা) এর কাছে খবর পাঠালেন যে, আলকামার মুখে কলেমা উচ্চারিত হচ্ছে না। যে ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে এসেছিল, তার কাছে রাসূল(সা) জিজ্ঞাসা করলেনঃ “আলকামার পিতামাতার মধ্যে কেউ কি জীবিত আছে?” সে বললো, “হাঁ রাসূল, তার বৃদ্ধ মা কেবল বেঁচে আছেন।” রাসূল(সা) তাকে তৎক্ষণাৎ আলকামার মায়ের কাছে পাঠালেন এবং তাকে বললেন, “তাকে গিয়ে বল যে, তুমি যদি রাসূল(সা) এর কাছে যেতে পার তবে চল, নচেত অপেক্ষা কর, তিনি তোমার সাথে সাক্ষাত করতে আসছেন।” দূত আলকামার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে রাসূল(সা) যা বলেছেন তা জানালে আলকামার মা বললেন, “রাসূল(সা) এর জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। তার কাছে বরং আমিই যাবো।” বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূল(সা) এর কাছে এসে সালাম করলেন। রাসূল(সা) সালামের জবাব দিয়ে বললেন, “ওহে আলকামার মা, আমাকে আপনি সত্য কথা বলবেন। আর যদি মিথ্যা বলেন, তবে আল্লাহর কাছ হতে আমার কাছে ওহী আসবে। বলুনতো, আপনার ছেলে আলকামার স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল?” বৃদ্ধা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! সে প্রচুর পরিমাণে নামায, রোযা ও সাদকা আদায় করতো।” রাসূল(সা) বললেনঃ “তার প্রতি আপনার মনোভাব কী?” রাসূল(সা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।” রাসূল(সা) বললেন, “কেন?” বৃদ্ধা বললেন, “সে তার স্ত্রীকে আমার উপর অগ্রাধিকার দিত এবং আমার আদেশ অমান্য করতো।” রাসূল(সা) বললেন, “আলকামার মায়ের অসন্তুষ্ট হেতু কলেমার উচ্চারণে আলকামার জিহবা আড়ষ্ট হয়ে গেছে।” তারপর রাসূল(সা) বললেন, “হে বিলাল যাও, আমার জন্য প্রচুর পরিমাণে কাষ্ঠ জোগাড় করিয়া নিয়া আস।”

বৃদ্ধা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, কাষ্ঠ দিয়ে কী করবেন?” রাসূল(সা) বললেন, “আমি ওকে আপনার সামনেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেব।” বৃদ্ধা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল। আমার সামনেই আমার ছেলেকে আগুন দিয়ে পোড়াবেন। আমি তা সহ্য করতে পারবো না।” রাসূল(সা) বললেন, “ওহে আলকামার মা, আল্লাহর আযাব এর চেয়েও কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এখন আপনি যদি চান যে, আল্লাহ আপনার ছেলেকে মাফ করে দিক, তাহলে তাকে আপনি মাফ করে দিন এবং তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। নচেত যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ তার কসম, যতক্ষণ আপনি তার উপর অসন্তুষ্ট থাকবেন, ততক্ষণ নামায, রোযা ও সাদকা দিয়ে আলকামার কোনো লাভ হবে না।” একথা শুনে আলকামার মা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহকে, আল্লাহর ফেরেশতাদেরকে এবং এখানে যে সকল মুসলমান উপস্থিত তাদের সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি আমার ছেলে আলকামার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি।” রাসূল(সা) বললেনঃ “ওহে বিলাল, এবার আলকামার কাছে যাও। দেখ, সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলতে পারে কিনা। কেননা, আমার মনে হয়, আলকামার মা আমার কাছে কোনো লাজ লজ্জা না রেখে যথার্থ কথাই বলেছে।” হযরত বিলাল(রা) তৎক্ষণাত গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করছে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু”। অতঃপর বিলাল গৃহে প্রবেশ করে উপস্থিত জনতাকে বললেনঃ শুনে রাখ, আলকামার মা অসন্তুষ্ট থাকার কারণে সে প্রথমে কলেমা উচ্চারণ করতে পারে নি। পরে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার জিহবা কলেমা উচ্চারণে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর আলকামা সেদিনই মারা যায় এবং রাসূল(সা) নিজে উপস্থিত হয়ে তার গোসল ও দাফনের নির্দেশ দেন, জানাযার নামায পড়ান ও দাফনে শরীক হন। অতঃপর তার কবরে দাঁড়িয়ে রাসূল(সা) বললেন, “হে আনসার ও মুহাজেরগণ! যে ব্যক্তি মায়ের উপর স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দেয় তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত! আল্লাহ তার পক্ষে কোনো সুপারিশ কবুল করবেন না। কেবল তওবা করে ও মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করে তাকে সন্তুষ্ট করলেই নিস্তার পাওয়া যাবে। মনে রাখবে, মায়ের সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তোষ এবং মায়ের অসন্তোষেই আল্লাহর অসন্তোষ।”

শিক্ষাঃ ১। আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে পিতা মাতাকে সন্তুষ্ট রাখার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত এবং মৃত্যুর পূর্বে পিতামাতার কাছ হতে ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত।

২। মুমূর্ষ ব্যক্তিকে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা ঘনিষ্ঠ লোকদের কর্তব্য।

২৭। কুরাইশ নেতাগণের গোপনে রাসূলুল্লাহর(সা) কুরআন পাঠ শ্রবণ

বর্ণিত আছে যে, একদিন রাতে আবু সূফিয়ান বিন হারব, আবু জাহল বিন হিশাম এবং আখনাস বিন শুরাইক-এই তিনজন শীর্ষস্থানীয় কুরাইশ নেতা রাসূল(সা) এর কুরআন পাঠ শ্রবণের কৌতুহল কোনোভাবেই চেপে রাখতে না পেরে গোপনে বেরিয়ে পড়লো। এ সময় তিনি নিজের বাড়িতে তাহাজ্জুদের নামাযে কুরআন পড়ছিলেন। এই তিনজনের প্রত্যেকে এমন একটি জায়গা নিয়ে বসে পড়লো, যেখান থেকে সহজেই তেলাওয়াত শুনা যায়। অথচ নিজেদের অবস্থা গোপন থাকে। তারা এমন দূরত্বে অবস্থান করতে লাগলো যে, কে কোথায় বসেছে তা কেউ জানতে পারে নি। রাতভর তারা পরম আগ্রহ সহকারে কুরআন পাঠ শুনলো। সকালে বাড়ীর দিকে ফিরার পথে পরস্পরের সাক্ষাত হলো। প্রত্যেকে পরস্পরকে তিরস্কার করে বলতে লাগলো, “ছি ছি! এ কাজ আর কখনে করো না। তোমাদের বখাটে চেলা চামুন্ডাদের কেউ যদি তোমাদের এভাবে দেখে ফেলে, তাহলে আর রক্ষা নেই। তারা একটা খারাপ ধারণা নিয়ে বসবে।” তারপর সবাই চলে গেল।

পরদিন রাতে আবার তিনজনই নিজ নিজ জায়গায় এসে বসলো এবং সারারাত ধরে রাসূল(সা) এর কুরআন পড়া শুনলো। সকাল বেলা আবার পরস্পরে সাক্ষাত এবং একই ধরনের আলাপ বিনিময় হলো। তারপর সবাই চলে গেল। তৃতীয় দিনও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। এবার তারা চূড়ান্তভাবে অঙ্গীকার করলো যে, এমন কাজ আর কখনো করবে না। তারপর সবাই বিদায় নিলো।

পরদিন সকালে বৃদ্ধ আখনাস তার লাঠিটা ভর করে রওনা হলো। প্রথমে আবু সুফিয়ানের কাছে হাজির হলো। সে বললোঃ “ওহে হানযালার বাবা! মুহাম্মদের কাছ থেকে যা শুনলে সে সম্পর্কে তোমার মতামত কি?” আবু সুফিয়ান বললো, “আল্লাহর কসম, আমি কিছু কথা এমন শুনেছি, যা আমি জানি এবং তার অর্থও বুঝি। আবার কিছু কথা এমনও শুনলাম যার অর্থ বুঝলাম না।” আখনাস বললো, “আল্লাহর কসম, আমার অবস্থাও তদ্রুপ।”

এরপর তার কাছ হতে বিদায় নিয়ে সে আবু জাহলের কাছে গেল। আবু জাহলকে বললোঃ “ওহে আবুল হিকাম, মুহাম্মদের কাছে যা শুনলে সে সম্পর্কে তোমার অভিমত কি?” সে বললো, “কি আর বলবো? আমরা আর বনু আবদ মানাফ-এ দুটি কুরাইশী গোত্র আবহমান কাল ধরে মান ইজ্জত নিয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করে এসেছি। আপ্যায়ন ও ভোজের আয়োজন তারাও করেছে, আমরাও করেছি। সামাজিক দায়দায়িত্ব তারাও বহন করেছে, আমরাও করেছি। সব কিছুতে আমরা যখন সমানে সমানে টক্কর দিয়ে চলেছি, তখন হঠাৎ তারা বলে উঠলোঃ আমাদের ভেতর একজন নবী আছে, যার কাছে আকাশ হতে ওহী আসে। এত বড় একটা জিনিসে আমরা তাদের সমকক্ষ হব কি করে? আল্লাহর কসম, আমরা তার উপর কখনো ঈমান আনবো না এবং কক্ষনো তাকে স্বীকৃতি দেব না।” ও কথা শুনে তার কাছ হতে বিদায় নিল। (সীরাতে ইবনে হিশাম)।

শিক্ষাঃ এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আল্লাহর দ্বীনের বিরোধীতা যারাই করে, তারা তাকে সত্য জেনেই নিছক কায়েমী স্বার্থের কারণেই করে। তাছাড়া তাদের ভিতর একটা হীনমন্যতা সক্রিয় থাকে। আবু জাহল প্রমুখ কুরাইশ নেতাদের মধ্যে হীনমন্যতার কারণ ছিল এই যে, ওহীর কারণে বনু হাশেমের সাথে তাদের সমকক্ষতা ও ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং বনু হাশেমের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। আর এ যুগে কোনো ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীরা হীনমন্যতায় ভুগবে এজন্য যে, ইসলামী আন্দোলনের লোকেরা এত উন্নত মানের চরিত্র ও নিঃস্বার্থ জনসেবার নমুনা পেশ করে থাকে, যার সমকক্ষ তারা কখনো হতে পারবে না। তাই ইসলামী চরিত্র সম্পন্ন লোকদের হাতে কখনো ক্ষমতা গেলে  দেশবাসী দুর্নীতিমুক্ত শাসনের স্বাদ পাবে। ফলে ধর্মহীন শক্তিগুলোকে জনগণ আর কখনো ক্ষমতায় আসতে দেবে না। এ কারণে এ যুগের প্রতিষ্ঠিত জাহেলী শক্তিও সর্বশক্তি দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে থাকে।

 এ ঘটনা থেকে আরো জানা যায় যে, ইসলামের শত্রুদেরও সাধারণ মনস্তত্ব হলো ইসলামের তাত্ত্বিক বিষয় তাদের জানার প্রচ্ছন্ন কৌতুহল থাকে। নেতৃস্থানীয় লোকেরা এ কৌতুহল পার্থিব স্বার্থের কারণে করে থাকে। কিন্তু শত্রুতা যতই তীব্র হয়, তাদের প্রভাবাধীন সাধারণ মানুষের মনে ইসলামকে জানার আগ্রহ ততই প্রবল হয়ে থাকে।

২৮। তাবুক অভিযানে অনুপস্থিত তিন সাহাবীর তওবার কাহিনী

হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের সেনাপতিত্বে যে কয়টি যুদ্ধ বা যুদ্ধাভিযান সংঘটিত হয়, তন্মধ্যে তাবুক যুদ্ধাভিযান ছিল অন্যতম। যদিও প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির কারণে এ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সংঘটিত হয় নি। কিন্তু তথাপি যুদ্ধের নির্ধারিত স্থান তাবুক –এ মুসলিম বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে ও সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সদলবলে যেতে হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের পর এটাই ছিল ইসলামের সর্বশেষ বৃহত্তম যুদ্ধাভিযান। এই অভিযানের জন্য সাহাবায়ে কেরামের কারো শারীরিক অনুপস্থিতির অনুমতিতো ছিলই না, অধিকন্তু প্রত্যেক সাহাবীকে সাধ্যমতো সর্বোচ্চ পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দেওয়ার আহবান জানানো হয়েছিল। তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে যখন আর্থিক সাহায্য চাওয়া হয়, তখন হযরত ওমর(রা) নিজের সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক আর হযরত আবু বকর(রা) সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি দান করেছিলেন।

কিন্তু তিনজন সাহাবী এই যুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে বিনা ওজরে অনুপস্থিত থাকেন। তারা হলেন কা’ব বিন মালেক, হিলাল ইবনে উমাইয়া ও মুরারা বিন রাবী। এই তিনজন সাহাবী সম্পর্কে অপর কোনো সাহাবীর এমনকি স্বয়ং রাসূল(সা) এরও কখনো কোনো অভিযোগ বা সংশয় ছিল না। তাঁদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় কোনো খাদ ছিল না। তথাপি সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ এই অভিযানে তারা সম্পূর্ণ বিনা ওজরে অনুপস্থিত ছিলেন। এ সংক্রান্ত বিশদ ঘটনা স্বয়ং হযরত কা’ব ইবনে মালেক বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনা নিম্নরূপঃ

কা’ব বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(সা) এর নেতৃত্বে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তন্মধ্যে তাবুক ও বদর ছাড়া আর কোনোটিতেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা অনুপস্থিত ছিলেন তাদের কাউকে আল্লাহর আক্রোশের সম্মুখীন হতে হয়নি। কেননা বদর যুদ্ধে রাসূল(সা) এর উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের কাফেলাকে ধাওয়া করা। এরূপ করতে গিয়ে হঠাৎ এক সময় যুদ্ধ বেঁধে যায়। আকাবার রাতে রাসূল(সা) ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা এবং ইসলাম ও রাসূল(সা) কে সাহায্য করার জন্য যে ৭০ জন এর কাছ হতে শপথ গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ঐ রাতটি আমার কাছে যুদ্ধের চেয়েও প্রিয় ছিল।

তাবুক যুদ্ধের সময় আমি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও স্বচ্ছল অবস্থায় ছিলাম। এ সময় আমার কাছে দুটো সওয়ারী ছিল, যা এর আগে কখনো ছিল না। রাসূল(সা) এর নিয়ম ছিল, যখনই কোনো যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতেন, কখনো পরিষ্কারভাবে স্থান, এলাকা বা কো্ন্ দিকে যাওয়া হবে তাও পর্যন্ত জানাতেন না। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের সময়টা ছিল ভীষণ গরমের সময়। পথও ছিল দীর্ঘ এবং তার কোথাও গাছপালা, লতাপাতা ও পানি ছিল না আর শত্রুর সংখ্যাও ছিল অত্যধিক। তাই রাসূল(সা) যুদ্ধের সকল প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য বিষয় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, যাতে তারা ভালোভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। এ সময় রাসূল(সা) এর সহযোদ্ধার সংখ্যা ছিল বিপুল। তবে তাদের নামধাম লেখার জন্য কোনো খাতাপত্র বা রেজিস্টার ছিল না। এ যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত থাকতে চায়-এমন লোক একজনও ছিল না। তবে সকল সাহাবী এও মনে করতেন যে, কেউ যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে আল্লাহর ওহী না আসা পর্যন্ত রাসূল(সা) তা জানতে পারতেন না।

রাসূল(সা) যখন এ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন, তখন ফল পেকে গিয়েছিল এবং ছায়া খুবই ভালো লাগতো। রাসূল(সা) ও তার সাথী মুসলমানগণ পূর্ণোদ্দমে যুদ্ধের প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। আমিও প্রতিদিন ভাবতাম প্রস্তুতি নেব। কিন্তু কোনো প্রস্তুতিই নেয়া হতো না। এমনিই দিন কেটে যেত। আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতাম, আমিতো যেকোন সময় প্রস্তুতি নিতে পারবো। ব্যস্ত হওয়ার দরকার কি? এভাবে দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। একদিন ভোরে তিনি মুসলমানদেরকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন। তখনো আমার প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। আমি মনে মনে বললাম, তারা চলে যায় যাক। আমি পথেই তাদেরকে ধরতে পারবো। তাদের রওনা হয়ে যাওয়ার পরের দিন আমি রওনা হতে চাইলাম। কিন্তু দিনটা কেটে গেলো, আমার রওনা দেয়া হয়ে উঠলো না। পরদিন সকালে আবার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু এবারও পারলাম না রওনা দিতে। এভাবে গড়িমসির মধ্য দিয়ে দিনের পর দিন কেটে গেল। ততক্ষণে মুসলিম বাহিনী অনেক দূর চলে গেছে। আমি কয়েকবার বেরিয়ে দ্রুত বেগে তাদেরকে ধরে ফেলার সংকল্প করেও পিছিয়ে গেলাম। আফসোস তখনও যদি কাজটি সেরে ফেলতাম। কিন্তু আসলে তা বোধ হয় আমার ভাগ্যে ছিল না। রাসূল(সা) ও মুসলমানদের চলে যাওয়ার পর আমি যখন মদীনায় জনসাধারণের মধ্যে বেরুতাম, তখন পথে ঘাটে মুনাফিক ও পিড়াব্যাধিগ্রস্ত লোক ছাড়া আর কাউকে দেখতাম না। এ পরিস্থিতিতে নিজেকে দেখে আমার খুবই দুঃখ লাগতো।

রাসূল(সা) তাবুক যাওয়ার পথে আমার সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করেন নি। তবে তাবুকে পৌছে জিজ্ঞেস করেন যে, কা’বের কি হয়েছে? বনু সালামার এক ব্যক্তি বললোঃ হে রাসূলুল্লাহ! নিজের সম্পদের মায়া ও আত্মাভিমানের কারণে সে আসেনি। মুয়াজ ইবনে জাবাল এ কথা শুনে বললেনঃ “ছি, কি একটা বাজে কথা তুমি বললে! আল্লাহর কসম, তার সম্পর্কে আমরা কখনো কোন খারাপ কথা শুনিনি।” রাসূল(সা) উভয়ের বাক্য বিনিময়ের মধ্যে চুপ করে থাকলেন।

কা’ব ইবনে মালেক বলেনঃ যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূল(সা) ফিরে আসছেন, তখন ভাবলাম, এমন কোনো মিথ্যা ওজর বাহানা করা যায় কিনা, যাতে আমি তাঁর অসন্তোষ থেকে রক্ষা পেতে পারি। কিন্তু পরক্ষণেই এসব চিন্তা আমার দূর হয়ে গেল। আমি মনে মনে বললাম যে, মিথ্যে ওজর দিয়ে আমি রেহাই পাব না। কারণ রাসূল(সা) ওহীর মাধ্যমে জেনে ফেলবেন। কাজেই পুরোপুরি সত্য কথা বলবো বলে স্থির করলাম। রাসূল(সা) পরদিন সকালে ফিরে এসে মসজিদে নববীতে বসলে তাবুক যুদ্ধে যারা যায়নি তারা একে একে আসতে লাগলো এবং প্রায় ৮০ জন(মতান্তরে ৮২ জন) নানারকম ওজর বাহানা পেশ করে কসম খেতে লাগলো। রাসূল(সা) তাদের ওজর মেনে নিলেন, তাদের কাছ হতে পুনরায় বায়য়াত নিলেন, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং তাদের গোপন বিষয় আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলেন। আমিও তাঁর কাছে এলাম। আমি সালাম দিলে তিনি ঈষৎ ক্রোধ মিশ্রিত মুচকি হাসিসহ জবাব দিলেন। তারপর বসতে বলে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কি হয়েছিল যে তাবুকে যেতে পারলে না? তুমি না সওয়ারী কিনে নিয়েছিলে? আমি বললামঃ জি, সওয়ারী কিনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি যদি আপনি ছাড়া অন্য কারো সামনে বসতাম, তাহলে তার আক্রোশ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিথ্যা ওজর পেশ করে চলে যেতাম। কারণ কথা বলার দক্ষতা আমারও আছে। কিন্তু আমি জানি, আজ আপনার কাছে মিথ্যা বলে আপনাকে খুশি করা গেলেও আল্লাহ তায়ালা কালই সব ফাঁস করে দিয়ে আপনাকে আমার উপর অসন্তুষ্ট করে দিবেন। আর যদি সত্য বলি, তাতে আপনি অসন্তুষ্ট হলেও আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা আছে। আল্লাহর কসম, আমার না যাওয়ার জন্য কোন ওজর ছিল না। আল্লাহর কসম, আমি এ সময়ে সর্ব প্রকারে সুস্থ, সবল ও সক্ষম ছিলাম।

রাসূল(সা) আমার কথা শুনে বললেনঃ কা’ব সত্য কথা বলেছে। বেশ, তুমি এখন যাও। দেখ, আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত দেন।

আমি বিদায় নিলাম। বনু সালামার লোকেরাও আমার সাথে চলতে লাগলো। তারা আমাকে বললোঃ“আমরা তো আজ পর্যন্ত তোমার কোন পাপ কাজের কথা শুনিনি। অন্যান্যদের মত তুমিও একটা ওজর পেশ করে দিলেই পারতে। তারপর রাসূল(সা) তোমার জন্য ক্ষমা চাইতেন এবং তাতেই তোমার গোনাহ মাফ হয়ে যেত।” তারা এভাবে আমাকে ক্রমাগত তিরস্কার করতে লাগলো। ফলে এক পর্যায়ে মনে মনে স্থির করে ফেললাম, রাসূল(সা) এর কাছে ফিরে যাই এবং আগে যা বলেছি তা ভুল প্রতিপন্ন করে আসি। সহসা আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ আচ্ছা, আমার মত অকপটে সত্য বলে ভুল স্বীকার করতে তোমরা কি আর কাউকে দেখেছ? তারা বললোঃহ্যাঁ, হিলাল বিন উমাইয়া ও মুরারা বিন রবীও তোমার মতই কথা বলেছে। এই দুজনকে আমি ভালোভাবে জানতাম। তারা ছিলেন খুবই সৎলোক এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। তাদের দু’জনের কথা শুনে আমি আমার পূর্বের বক্তব্যে অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

এদিকে রাসূল(সা) তাবুকে অনুপস্থিত থাকা লোকদের মধ্যে আমাদের তিনজনের সাথে কথা বলা সকল মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ করে দিলেন। তাই লোকেরা আমাদেরকে বয়কট করে চললো। যেন আমরা তাদের একেবারেই অচেনা মানুষ। দুনিয়াটাই যেন আমার কাছে বদলে গেল। এভাবে পঞ্চাশ দিন কেটে গেল। অন্য দু’জন তো ঘরেই বসে রইলো এবং কান্নাকাটি করতে লাগলো। কিন্তু আমি বাইরে বেরুতাম এবং মসজিদে নববীতে নামায আদায় করতাম ও বাজারে ঘুরতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতো না। আমি রাসূল(সা) এর কাছে যেতাম। তিনি নামাযের পর মজলিসে বসলে সেখানেও তাকে সালাম দিতাম, আর দেখতাম, সালামের জবাবে তার ঠোঁট নড়তো কিনা। আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে নামায পড়তাম। আমি বাঁকা দৃষ্টিতে তাঁকে দেখতাম আমি নামায পড়ার সময় তিনি আমার দিকে তাকাতেন, আর আমি তাকালেই মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এ অবস্থায় অনেকদিন কেটে গেল। ক্রমে আমি অস্থির ও দিশেহারা হয়ে পড়লাম। একদিন আমার অতি প্রিয় চাচাতো ভাই আবু কাতাদাহকে সালাম করলাম। কিন্তু সে সালামের জবাব পর্যন্ত দিল না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলামঃ হে আবু কাতাদাহ! আমি যে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসি, তা কি তুমি স্বীকার কর না? সে একথার কোন জবাব দিল না। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করলেও জবাব দিল না। তৃতীয়বার আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে শুধু বললোঃ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই(সা) ভালো জানেন। আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আমি তার কাছ হতে ফিরে এলাম। এই সময় একদিন মদীনার বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এই সময় সিরিয়ার একজন খৃস্টান কৃষক মদীনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি করতে এসেছিল। সে লোকজনের কাছে আমার ঠিকানা সন্ধান করছিল। লোকেরা আমাকে দেখিয়ে দিলে সে গাসসানের রাজার একটি চিঠি আমার হাতে দিল। চিঠিতে রাজা লিখেছেঃ আমি জানতে পেরেছি যে, আপনার নেতা আপনাকে খুব কষ্ট দিচ্ছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার যোগ্য রাখেন নি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন। আমরা আপনাকে সম্মানের সাথে রাখবো। চিঠিটা পড়ার সাথে সাথে আমি মনে মনে বললাম, এ আর এক পরীক্ষা। আমি তৎক্ষণাত তা চুলোর মধ্যে নিক্ষেপ করলাম।

এভাবে চল্লিশ দিন কেটে গেল রাসূল(সা) এর এক দূত আমার কাছে এসে বললোঃ রাসূল(সা) তোমাকে তোমার স্ত্রী হতে পৃথক হয়ে যাবার আদেশ দিয়েছেন। আমি বললামঃ ওকে তালাক দেব নাকি? দূত বললেনঃ না, তালাক দিতে হবে না, তবে তার কাছে যাবে না। আমার অন্য দু’জন সাথীকেও একই হুকুম দেয়া হল। আমি আমার স্ত্রীকে বললামঃ তুমি বাপের বাড়ীতে চলে যাও এবং আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। হিলাল ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী রাসূল(সা) এর কাছে এসে বললেনঃ হে রাসূল! আমার স্বামী বুড়ো হয়ে গেছে। তার কোন ভৃত্য নেই। আমি যদি তার দৈনন্দিন কাজকর্ম করে তার সেবা করে দেই, তাতে কি আপত্তি আছে? রাসূল(সা) বললেন, আপত্তি নেই। তবে সে যেন তোমার কাছে না আসে। আমাকেও কেউ কেউ বললো যে, তুমি রাসূল(সা) এর কাছে গিয়ে স্ত্রীর জন্য অনুমতি নিয়ে এসো। আমি বললামঃ না, আমি কোন অনুমতি আনতে যাব না। জানি না তিনি কি ভাববেন। কারণ হিলাল বিন উমাইয়া বুড়ো, আর আমি যুবক।

এভাবে আরো দশটি দিন কেটে গেল একদিন আমি ফজরের নামায পড়ে অত্যন্ত বিষন্ন মনে বসেছিলাম। সহসা কে একজন চিৎকার করে বলতে বলতে ছুটে আসতে লাগলোঃ ক্বাব ইবনে মালেক! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আমি তৎক্ষণাত সেজদায় পড়ে গেলাম। আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের মুসিবত কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ(সা) ঐদিন ফজরের নামাজের পর ঘোষণা দিয়েছেন যে, আল্লাহ আমাদের তাওবা কবুল করে নিয়েছেন। লোকেরা দলে দলে এসে আমাকে অভিনন্দন জানাতে লাগলো। এরপর আমি রাসূল(সা) এর সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম। আমি দেখলাম, তিনিও আমার সুসংবাদে আনন্দিত। আমি বললামঃ হে রাসূলুল্লাহ(সা)! আমার তওবা কবুলের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ আমার সমস্ত ধনসম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে সদকা করে দিতে চাই। রাসূল(সা) বললেনঃ সব নয়, কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দাও। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ এবার আমাকে সত্য কথা বলার কারণে ক্ষমা করেছেন। কাজেই এরপর বাকী জীবন আমি সর্বদা সত্য কথাই বলতে থাকবো। আল্লাহ যেন আমাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করেন।

শিক্ষাঃ

(১) এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য কথা বলার নীতিতে অটল থাকতে হবে। চাই তাতে যত কঠিন পরীক্ষাই আসুকনা কেন।

(২)আল্লাহ মোনাফেকদেরকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন না বরং মুমিনদেরকেই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এই তিন মুমিন ব্যতীত বাকী ৮২ জন মিথ্যা অজুহাত পেশ করলেও তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়নি। কারণ তারা ছিল মুনাফিক। তাই আল্লাহ তাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে চান নি।

(৩) ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের অধিকার রয়েছে কুরআন হাদীসের সীমার মধ্যে নিষ্ঠাবান কর্মীদেরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন করা বা ‍গুরুতর ভুল কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া। এ সব ক্ষেত্রে আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে এবং কোন দিক থেকে কুপ্ররোচণা এলে তা উপেক্ষা করে পরীক্ষায় কৃতকার্য হবার চেষ্টা করতে হবে।

(৪) ইসলামী আন্দোলনের কোন পর্যায়ে কারো কোন সাফল্য বা কৃতিত্ব প্রমাণিত হলে তার জন্য যাতে অন্তরে গর্ব বা অহমিকার সৃষ্টি না হয় সেজন্য সম্ভব হলে সদকা করা উত্তম। আর সেই সাথে তওবা ইসতিগফারও অব্যাহত রাখা উচিত।

(৫) অলসতা ও সিদ্ধান্তহীনতা এই তিনজন মুজাহিদের জীবনে চরম সংকট সৃষ্টি করেছিল। কাজেই অলসতা, গড়িমসি ও সিদ্ধান্তহীনতা সর্বোতভাবে পরিত্যাজ্য।

২৯ হযরত সালমান ফারসীর ইসলাম গ্রহণ

হযরত সালমান ফারসী প্রথম জীবনে একজন অগ্নউপাসক ছিলেন। পরে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সবশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি পারস্যের ইসফাহান প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন। তার পিতা ছিলেন একজন বিত্তশালী গ্রাম্য মোড়ল। তিনি তাকে এত বেশি স্নেহ করতেন যে, তাকে বাড়ী থেকে কোথাও যেতে দিতেন না। তিনি জানান যে, এই সময়ে তিনি অগ্নি উপাসকদের ধর্মে গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। এক মুহুর্তের জন্যও যাতে আগুন নিভতে না পারে-এভাবে কুন্ডলী জ্বালিয়ে রাখতে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এ সময়ে ঘটনাক্রমে একটি জমি দেখাশুনার দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত করা হয়। এই জমি দেখতে গিয়ে তিনি পিতার অনুমতিক্রমে বাড়ীর বাইরে যাওয়া আসা করতে লাগলেন। এই সময় তার যাওয়া আসার পথের পাশে একটি খৃস্টান গীর্জা তার নজরে পড়ে। লোকজনের হৈ চৈ শুনে কৌতুহল বশতঃ তিনি সেই গীর্জার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাদের উপাসনা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং মনে মনে বলেন, অগ্নি উপাসকদের ধর্মের চেয়ে এই ধর্ম অনেক ভাল। ঐ দিন আর জমি দেখতে যাওয়া হলো না। তিনি সারাদিন গীর্জায় কাটিয়ে দিলেন। গীর্জার লোকদের কাছে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, এই ধর্মের উৎস কোথায়? তারা জানালো যে, সিরিয়ায়। এরপর তিনি তাঁর পিতার কাছে ফিরে গেলেন। তাঁর পিতা তাঁকে জিজ্ঞাসা তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে? সালমান গীর্জার ঘটনা খুলে বললেন। সেই সাথে এই কথাও বললেন যে, ঐ ধর্ম তাঁর কাছে ভালো লেগেছে। একথা শুনে তার বাবা বললেন, না বাবা, তোমার জন্য তোমার বাপ দাদার ধর্মই ভালো।

সালমান বললেন, না বাবা, ঐ ধর্মই ভাল। এতে তিনি তাঁকে নিয়ে ভীত হয়ে পড়লেন এবং তাঁর পায়ে শিকল পরিয়ে দিলেন। এই সময় সালমান গোপনে গীর্জায় খৃস্টানদের নিকট খবর পাঠান যে, আপনাদের কাছে সিরিয়া থেকে কোনো কাফেলা এলে আমাকে জানাবেন। কিছুদিন পর সিরিয়া থেকে একটা কাফেলা এল। তারা যথাসময়ে সালমানকে সে খবর জানালো। সালমান বলে পাঠালেন যে, এই কাফেলার কাজ যখন শেষ হবে এবং তারা সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিবে, তখন আমাকে জানাবেন। তারপর কাফেলার কাজ শেষে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলে তা সালমানকে জানানো হলো। সালমান তৎক্ষণাত স্বীয় পিতার স্নেহের শিকল ভেঙ্গে গোপনে তাদের সাথে সিরিয়ায় চলে গেলেন। সিরিয়ায় গিয়ে তিনি লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করলেনঃ এই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী কে? তারা তাকে জানালো যে, গীর্জার পাদ্রীই সবচেয়ে জ্ঞানী।

সালমান পাদ্রীর নিকট হাজির হয়ে বললেনঃ আমি এই ধর্মের প্রতি খুবই আগ্রহী। আমি আপনার সহচর হয়ে আপনার সেবা করতে চাই এবং আপনার কাছ থেকে ধর্ম শিখতে ও উপাসনা করতে চাই। পাদ্রী সালমানকে স্বীয় গীর্জায় থাকতে দিলেন এবং সালমান খৃস্টধর্মে দীক্ষা নিতে লাগলেন। এই সময়ে সালমান বুঝতে পারলেন যে, উক্ত পাদ্রী খুবই অসৎ। সে জনসাধারণের কাছ হতে সদকা আদায় করে এবং তা গরীবদের মধ্যে বিতরণ না করে নিজে আত্মসাৎ করে। এভাবে সে বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করে। সালমান এরপর থেকে তাকে ঘৃণা করতে লাগলেন এবং এই স্থান ত্যাগ করার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।

এই পাদ্রী মারা গেলে খৃস্টানরা তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য সমবেত হয়। সালমান তাদেরকে বললেনঃ এ লোকটি চরম দুর্নীতিবাজ ছিল। সে তোমাদেরকে ছদকা দিতে উপদেশ দিত। কিন্তু নিজে তোমাদের দেয়া ছদকাগুলো আত্মসাৎ করতো। তারা সালমানকে বললোঃ তোমার এসব অভিযোগ যে সত্য, তার প্রমাণ কী? তিনি এর প্রমাণস্বরূপ তার জমা করা সাতটি সোনা রূপা ভর্তি কলসি বের করে দেখালেন। তা দেখে সমবেত জনতা ক্রুদ্ধ স্বরে বললোঃ আমরা এ নরাধমকে কবর দেব না। তারপর লাশকে তারা শূলে চড়াল। তার উপর পাথর ছুঁড়লো এবং তারপর একজন নতুন যাজক নিয়োগ করলো।

নতুন যাজক ছিল একজন নিরেট সৎলোক। পৃথিবীর ধন-সম্পদের প্রতি তার কোন লালসা ছিল না। সালমান কিছুদিন তার কাছে থাকলেন। তারপর তার মৃত্যু কাছাকাছি এলে সালমান তাকে বললেনঃ জনাব, আমি তো এতদিন এখানে কাটালাম। এখন আপনার পর আমি কোথায় কার কাছে যাবো বলে দিন।

তিনি বললেনঃ বাবা! আমি যতটা খাঁটি ধর্মের অনুসারী ছিলাম, এখন তেমন আর কাউকে দেখি না। ভালো লোকেরা সব পরপাড়ে পাড়ি জমিয়েছে। এখন যারা আছে, তারা অধিকাংশই ধর্মকে খানিকটা বিকৃত করেছে, আর খানিকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। তবে মুসেলে একজন আছে খাঁটি ধর্মের অনুসারী। তুমি তার কাছে চলে যাও।

সালমান মুসেলের যাজকের কাছে গেলন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনিও মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে নসিবেইনের এক ব্যক্তির সন্ধান দিয়ে গেলেন। অতঃপর সালমান নসিবাইনে গেলেন। সেখানেকার পাদ্রীর কাছে কিছুদিন থাকার পর তিনিও মারা গেলেন। মারা যাওয়ার সময় আম্মুরিয়ার আর একজন যাজকের সন্ধান দিয়ে গেলেন। সালমান আম্মুরিয়ায় চলে গেলেন।

আম্মুরিয়ায় কিছুদিন থাকার পর সেখানকার যাজকও মারা গেলেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে সালমান তার কাছে একজন সৎ যাজকের সন্ধান চাইলে তিনি বললেনঃ এখন আমার জানামতে সঠিক ধর্মের কোন অনুসারী যাজক পৃথিবীতে জীবিত নেই। তবে একজন নতুন নবীর আবির্ভাবের সময় পৃথিবীতে ঘনিয়ে এসেছে। তিনি ইবরাহীম(আ) এর দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। তিনি আরব ভূমিতে আবির্ভূত হবেন এবং দুই মরুর মাঝে খেজুরের বাগানে পরিপূর্ণ জায়গায় হিজরত করবেন। তিনি হাদিয়া নিবেন কিন্তু ছদকা গ্রহণ করবেন না। তার দুই কাঁধের মাঝে নব্যুয়তের সীল থাকবে। তুমি যদি সেই দেশে যেতে পার তবে যেও।

আম্মুরিয়ায় হযরত সালমান অনেক ছাগল ভেড়া পুষতেন। তারই একপাল ছাগল ভেড়া একদল আরব বনিককে দিয়ে তিনি আম্মুরিয়া থেকে আরব চলে গেলেন। ওয়াদিল কুরাতে তারা তাকে এক ইহুদীর নিকট বিক্রী করে দিল। সালমান এই ইহুদীর খেজুরের বাগানে কাজ করতে লাগলেন। ঐ খেজুরের বাগান দেখে তিনি ভেবেছিলেন, এটাই সেই আখেরী নবীর আবির্ভাব স্থান। তাই তিনি ইহুদীর কাছে থাকতে লাগলেন।

হযরত সালমান বলেনঃ “এই সময় একদিন মদীনা হতে আমার ইহুদী মনিবের একজন আত্মীয় এল। বনু কুরায়যা গোত্রের এই ইহুদী আমাকে কিনে নিয়ে মদীনায় চলে এল। মদীনাকেই দেখে আমি চিনতে পারলাম যেন ওটা অবিকল আমার আম্মুরিয়ার ওস্তাদের বর্ণিত জায়গা। তাই আমি ওখানেই থাকতে লাগলাম। এই সময় মক্কায় রাসূল(সা) নব্যূয়ত লাভ করেছেন বলে শুনলাম। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত খবরাখবর জানতে পারলাম না। কিছুদিন পর তিনি মদীনায় হিজরত করে আসলেন।

একদিন আমি খেজুর ভর্তি গাছের মাথায় চড়ে আমার মনিবের জন্য কিছু কাজ করছি। মনিব তখন আমার নিচে বসা ছিলেন। সহসা তার এক চাচাতো ভাই এসে তাকে বললোঃ আল্লাহ কায়লার বংশধরকে ধ্বংস করুন। (আওস ও খাজরাজ এই দুই গোত্রের মায়ের নাম কায়লা। তাই কায়লার বংশধর বলতে ঐ দুই গোত্রকে বুঝানো হয়েছে)। ওরা এখন মক্কা হতে আগত এক ব্যক্তির চারিপাশে ভিড় করছে। লোকটি আজই এসেছে। আওস ও খাজরাজ মনে করে সে নাকি এ যুগের নবী এবং সর্বশেষ নবী। হযরত সালমান বললেনঃ খেজুর গাছের উপর বসে আমি যখন এ খবর শুনলাম, তখন আনন্দে ও উত্তেজনায় এত বেসামাল হয়ে গিয়েছিলাম             যে, আমি মনিবের ঘাড়ের উপর পড়ে যাব বলে আশংকা হচ্ছিল। অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে গাছ হতে নেমে এসে ঐ লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি কার কথা যেন বলেছিলেন? অমনি আমার মনিব আমাকে ঠাস করে একটি চড় বসিয়ে দিল। সে বললোঃ তোর তা দিয়ে কি দরকার? আমি বললামঃ কিছু না. কৌতুহল বশতঃ জিজ্ঞেস করেছিলাম।

হযরত সালমান বলেনঃ এরপর আমি নিজের কাছে সঞ্চিত কিছু খাবার জিনিস নিয়ে সন্ধ্যা বেলায় গোপনে কুবাতে রাসূল(সা) এর কাছে উপস্থিত হলাম। তাকে বললামঃ আমি শুনেছি, আপনার সাথে অনেক দরিদ্র লোক রয়েছে। তাদের কাছে আমি কিছু ছদকা এনেছি। এই বলে উক্ত খাদ্য হাযির করলে তিনি সাহাবীদেরকে তা খেতে দিলেন। কিন্তু নিজে খেলেন না। তখন আমি মনে মনে বললামঃ আম্মুরিয়ার যাজক যে তিনটি আলামতের কথা বলেছে, তার একটি পেয়ে গেলাম। অতঃপর আমি সেদিনকার মত চলে এলাম।

আর একদিন আরো কিছু খাবার নিয়ে তা হাদীয়া হিসেবে পেশ করলাম। রাসূল(সা) তা নিজেও খেলেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। এরপর আমি দ্বিতীয় আলামতটিও পেয়ে গেলাম।

এরপর যখন তিনি বাকীযুল গারকাদ নামক কবরস্থানে তাঁর জনৈক সাহাবীর দাফন সম্পন্ন করে ফিরে আসছিলেন, তখন আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। সেই সময় রাসূল(সা) এর গায়ে ঢিলেঢালা পোশাক ছিল। আমি নব্যুয়তের মোহরটি দেখার জন্য তাঁর ঘাড়ের উপর চোখ বুলাতে লাগলেন। রাসূল(সা) আমার চাহনির হাবভাব দেখে বুঝে ফেললেন এবং তাঁর পিঠের উপর থেকে চাদর উঠিয়ে ফেলে দিলেন। আমি তখন নব্যুয়তের মোহর দেখে চিনতে পারলাম। আমি মোহরটিতে চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়লাম এবং কাঁদতে লাগলাম। রাসূল(সা) আমাকে বললেনঃ সামনে এস। আমি সামনে গিয়ে বসে পড়লাম। অতঃপর অতীতের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম।

এরপর রাসূল(সা) আমাকে ইহুদীর দাসত্ব হতে মুক্ত হবার জন্য ৪০ আউন্স স্বর্ণ দিলেন। ঐ স্বর্ণ ইহুদীকে দিয়ে আমি মুক্তি লাভ করলাম। কিন্তু বদর ও ওহুদ যুদ্ধ আমার দাসত্বকালে সংঘটিত হয়। তাই আমি তাতে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।

শিক্ষাঃ হযরত সালমান ফারসীর ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনা অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। এর সর্বপ্রধান শিক্ষা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মদ(সা) ছাড়া পৃথিবীতে আল্লাহ প্রেরিত আর কোন নবীর শরীয়ত অবিকৃত অবস্থায় নেই। তাই ইসলাম ছাড়া আর কোন ধর্ম সঠিক ও নির্ভুল নয়। এই সত্য ও সঠিক দ্বীনের সন্ধান লাভের জন্য হযরত সালমান ফারসী প্রথম দিন হতেই অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাঁর অক্লান্ত সাধনাকে সফল করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তায়ালা সত্যের সন্ধানরত প্রত্যেক মানুষকেই সত্যের সন্ধান দিয়ে থাকেন।

৩০ মিথ্যা সকল পাপের জননী

একবার রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মধ্যে তিনটি বদঅভ্যাস রয়েছেঃ মিথ্যা বলা, চুরি করা ও মদ খাওয়া। আমি তিনটি বদঅভ্যাসই ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু একসাথে তিনটি ছাড়তে পারছি না। আমাকে একটি একটি করে এগুলি পরিত্যাগ করার সুযোগ দিন এবং কোনটি আগে ত্যাগ করবো তা বলে দিন।

রাসূল(সা) একটু চিন্তা করে বললেনঃ তুমি প্রথমে মিথ্যা বলার অভ্যাস ত্যাগ কর। আর এই ত্যাগ করার উপর বহাল আছ কিনা, তা জানানোর জন্য মাঝে মাঝে আমার কাছে এস।

সে এতে রাজী হয়ে গেল এবং কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলবে না বলে দৃঢ় সংকল্প করলো।

রাত্রে সে অভ্যাসমত চুরি করতে বেরিয়ে পড়লো। কেননা এটা সে বাদ দেওয়ার ওয়াদা করেনি। কিন্তু কিছুদূর গেলেই তার মনে হলোঃ রাসূল(সা) এর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি যদি চুরি করেছি কিনা জিজ্ঞেস করেন তা হলে তো মিথ্যা বলা যাবে না। কাজেই সত্য বলে স্বীকারোক্তি দিতে হবে। আর তাহলে রাসূল(সা) এর দরবারে অপমানতো সহ্য করতেই হবে। উপরন্তু হাতটাও কাটা যাবে। অনেক ভেবে চিন্তে সে ফিরে এল। চুরি করতে যাওয়া হলো না।

এরপর সে মদ খাওয়ার জন্য গ্লাস হাতে নিয়ে তাতে মদ ঢাললো। কিন্তু মুখে দিতে গিয়ে আবার একই প্রশ্ন তার মনে উদিত হলো। রাসূল(সা) এর দরবারে আজ হোক কাল হোক তাকে তো যেতেই হবে। তিনি যদি জিজ্ঞেস করেন, মদ খাওয়া চলছে কিনা, তাহলে কি জবাব দেব? মিথ্যা তো বলা যাবে না। আর সত্য বললে অপমান ও ৮০ ঘা বেত্রদন্ড। অতএব, মদও সে ছেড়ে দিল।

এভাবে মিথ্যা ছেড়ে দিয়ে সে একে এক সব কয়টি চারিত্রিক দোষ হতে মুক্তি পেল। রাসূল(সা) সত্যই বলেছেনঃ মিথ্যা হলো সকল পাপের জননী।

শিক্ষাঃ এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করার একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত চমকপ্রদ কৌশল শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সেই শিক্ষাটি এই যে, ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড ও চরিত্র যখন কারো অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, তখন তাকে রাতারাতি শুধরে পবিত্র করা সম্ভব হয় না। এজন্য ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। এতে সফলতা লাভ করা সহজ হবে। এ কথা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন সঠিক, জাতির ক্ষেত্রেও তেমনি অভ্রান্ত।

৩১ মসজিদে জেরারের ঘটনা

মদীনায় আবু আমের নামক এক খৃস্টান পাদ্রী বাস করতো। তার ছেলে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত হানযালা (রা)। শহীদ হওয়ার পর ফেরেশতারা তাঁকে গোসল দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা খৃস্টধর্মের উপর অবিচল ছিল।

রাসূল(সা) হিজরত করে মদীনায় যাওয়ার পর আবু আমের তাঁর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন আপত্তি ও সন্দেহ উত্থাপন করে। রাসূল(সা) তার সকল আপত্তির জবাব দেন। কিন্তু তবু সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

সে বললোঃ আমাদের দু’জনের মধ্যে যে মিথ্যুক সে যেন অভিশপ্ত ও আত্মীয় স্বজন হতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। সে রাসূল(সা) কে একথাও জানিয়ে দিল যে, সে রাসূল(সা) এর শত্রুদেরকে সবসময় সাহায্য করতে থাকবে। নিজের এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সে বদর হতে হুনাইন পর্যন্ত সকল যুদ্ধে মুসলমানদের শত্রুদের পক্ষ অবলম্বন করে। হুনায়নের যুদ্ধে যখন হাওয়াযেনের মত বিশালাকার গোত্র মুসলমানদের কাছে হেরে গেল, তখন সে ভগ্ন হৃদয়ে তৎকালীন খৃস্টধর্মের ঘাঁটি সিরিয়ায় চলে যায় এবং আত্মীয় স্বজন হতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। এভাবে তার নিজের বদদোয়া ও অভিশাপ দ্বারা সে নিজেই ঘায়েল হয়।

জীবদ্দশায় আবু আমের পাদ্রী আজীবন ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতা করে। এমনকি সে রোম সম্রাটকে মদীনায় আক্রমণ চালিয়ে মুসলমানদের নাম নিশানা মুছে ফেলার প্ররোচনাও দিয়েছিল।

মদীনার মুসলমানদের মধ্যে যারা বর্ণচোরা, ভন্ড ও মোনাফেক ছিল, সর্বকালের ও সর্বদেশের মোনাফেকদের মতই তারাও ইহুদী ও খৃস্টানদের ক্রীড়নক ছিল। বিশেষতঃ আবু আমেরের তারা খুবই ভক্ত ও অনুগত ছিল। আবু আমের এই মোনাফেকদের কাছে চিঠি লিখলো যে, আমি রোম সম্রাটকে মদীনা আক্রমণ করার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু সম্রাটের বাহিনীকে সহযোগিতা করে এমন একটি দল মদীনাতেও সংগঠিত হওয়া জরুরী। এ জন্য তোমরা মদীনায় মসজিদের নাম দিয়ে একটি গৃহ নির্মাণ কর, যেন মদীনার মুসলমানদের মধ্যে কোন সন্দেহ সৃষ্টি না হয়। সেই গৃহে নিজেরাও সমবেত হও, কিছু অস্ত্র শস্ত্র ও সাজ সরঞ্জাম তাতে সংগ্রহ করে রাখ।

তার এ চিঠির ভিত্তিতে বারোজন মোনাফেক মদীনার কোবা মহল্লায় একটি মসজিদ নির্মাণ করলো। এই মহল্লায় রাসূল(সা) হিজরত করে এসে প্রথম অবস্থান করেছিলেন এবং একটি মসজিদ তৈরি করেছিলেন। অতঃপর তারা স্থির করলো যে, ঐ মসজিদে রাসূল(সা) দ্বারা এক ওয়াক্ত নামায পড়াবে। এতে মুসলমানদের মনে আর কোন সন্দেহ থাকবে না। তারা বুঝবে এটাও অন্যান্য মসজিদের মতই একটা মসজিদ।

তাদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল(সা) এর সাথে সাক্ষাত করে বুঝালো যে, কোবার বর্তমান মসজিদটি অনেক দূরে অবস্থিত। দুর্বল ও অসুস্থ লোকেরা এতদূর যেতে পারে না। তাছাড়া ওখানে সব লোকের সংকুলনাও হয় না। তাই আমরা আর একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি এতে এক ওয়াক্ত নামায পড়ে উদ্বোধন করে দিয়ে যান।

রাসূল(সা) তখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই ওয়াদা করলেন যে, যুদ্ধ হতে ফিরে এসে তিনি ওখানে নামায পড়াবেন। কিন্তু তাবুক হতে ফেরার পথে সূরা তাওবার সংশ্লিষ্ট আয়াত কয়টি নাযিল করে আল্লাহ তাতে নামায পড়াতে নিষেধ করলেন এবং তাকে ‘মসজিদে যেরার’ (ক্ষতিকর মসজিদ) নামে আখ্যায়িত করলেন। রাসূল(সা) এই নির্দেশ অনুসারে নামায তো পড়লেনইনা, অধিকন্তু কতিপয় সাহাবীকে পাঠিয়ে দিয়ে মসজিদটি আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিলেন।

সূরা তাওবার সংশ্লিষ্ট আয়াতে এই মসজিদটিকে তিনটি কারণে মসজিদে যেরার বলা হয়েছেঃ এক. তা দ্বারা ইসলামের ক্ষতি সাধন ও কুফরী প্রতিষ্ঠার সংকল্প করা হয়েছিল। দুই. তা দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। তিন. সেখানে ইসলামের শত্রুদেরক আশ্রয় দেয়ার ফন্দি আটা হয়েছিলউ।েউ

উউলউ উল্লেখিত তিনটি উদ্দেশ্যে যখন যেখানেই কোন গৃহ নির্মাণ, কোন দল বা প্রতিষ্ঠান গঠন কিংবা আর কোন ধরনের স্থাপনার কাজ করা হবে, তখন তা মসজিদে যেরারেরই পর্যায়ভুক্ত হবে এবং মুসলমানদের দায়িত্ব হবে তা প্রথম সুযোগেই ধ্বংস করা, চাই তা মসজিদ হোক বা অন্য কোন আকারেই গঠিত হোক। এ কারণে হযরত ওমর(রা) এক মসজিদের পার্শ্বে আর একটি মসজিদ নির্মাণ করতে নিষেধ করেন। অনুরূপভাবে কোন প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নিয়োজিত দল বা সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান গঠন করা বৈধ হবে না।

শিক্ষাঃ () মুসলমান নাম ধারণ করেও ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদের আনুগত্য করা সুস্পষ্ট মোনাফেকীর লক্ষণ।

(২) অজ্ঞতা বা ভুলবশত কোন অন্যায় কাজের ওয়াদা করলে সেই ওয়াদা ভংগ করা শুধু জায়েয নয় বরং ওয়াজিব।

৩২মানুষের পরিণাম তার শেষ কর্মের উপর নির্ভরশীল

হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণনা করেন যে, আমরা খায়বরের যুদ্ধে রাসূল(সা) এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে দাবী করতো এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল(সা) বললেনঃ “এই ব্যক্তি দোজখবাসী।” তারপর যুদ্ধ শুরু হলে লোকটি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলো এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হলো। এক সময় আঘাতের চোটে সে অচল হয়ে পড়লো। তখন এক সাহাবী এসে রাসূল(সা)কে বললেন, “ওহে আল্লাহর রাসূল! ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার মত কী? যে ব্যক্তিকে আপনি দোযখবাসী বলেছিলেন, সেতো প্রচন্ডভাবে যুদ্ধ করছে এবং আহত হয়েছে।” নবী করীম(সা) বললেন, “শুনে রাখো, সে দোজখবাসী।” এতে কোন কোন মুসলমান সন্দেহ পোষণ করতে লাগলেন।

ইত্যবসরে লোকটি ক্ষতস্থানের তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলো। অতঃপর সে নিজের তীর হাতে নিয়ে তা দিয়ে নিজের গলা ফুঁড়ে আত্মহত্যা করলো। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বহুসংখ্যক সাহাবী রাসূল(সা) এর কাছে ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার কথাকে সত্যে পরিণত করেছেন। অমুক লোকটিতো নিজের গলা ফুঁড়ে আত্মহত্যা করেছে।” তখন রাসূল(সা) বললেন, “ওহে বিলাল! ওঠো। জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, মুমিন ব্যতীত কেউ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর পাপী লোক দ্বারাও আল্লাহ কখনো কখনো এ দ্বীনের সাহায্য করে থাকেন।”

অন্য রেওয়ায়াতে আছে, রাসূল(সা) বললেনঃ কোন কোন বান্দা দোযখীর ন্যায় আমল করে, অথচ সে বেহেশতবাসী। আবার কোন কোন বান্দা বেহেশতবাসীর ন্যায় কাজ করে, অথচ সে দোজখবাসী। আর মনে রাখবে, কর্মের ফলাফল শেষ কর্মের উপর নির্ভরশীল।

শিক্ষাঃ আত্মহত্যা শুধু কবীরা গুনাহ তথা মহাপাপই শুধু নয়, বরং তা ঈমানকেও ধ্বংস করে দেয় এবং সকল কৃত সৎ কাজ বিনষ্ট করে দেয়। তাই আত্মহত্যাকারী শত ভালো কাজ করলেও দোজখবাসী হয়ে থাকে।

৩৩বিনা তদন্তে কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ অপপ্রচার

মুসনাদে আহমদের বরাত দিয়ে ইবনে কাছীর বর্ণনা করেন যে, বনুল মোস্তালিক গোত্রের সরদার, উম্মুল মুমিনীন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা হারেছ ইবনে যেরার রাসূল(সা) এর দরবারে হাজির হলে তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং যাকাত প্রদানের আদেশ দিলেন। হারেস ইসলামের দাওয়াত কবুল এবং যাকাত প্রদানের ওয়াদা করে বললেনঃ এখন আমি নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইসলাম ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দেব। যারা আমার কথা মানবে ও যাকাত দিবে, আমি তাদের যাকাত একত্রিত করে আমার কাছে জমা রাখবো। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখ পর্যন্ত কোন দূত আমার কাছে পাঠাবেন। আমি তার কাছে যাকাতের জমাকৃত অর্থ দিয়ে দেব। এরপর হারেস ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোন দূত না আসায় হারেসের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলো। তিনি ভাবলেন, হয়তো রাসূল(সা) কোন কারণে আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠানোর কোন কারণ থাকতে পারে না। হারেস তার এই আশংকার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও ব্যক্ত করলেন। অতঃপর সবাই মিলে একদিন রাসূল(সা) এর কাছে যাবেন বলে স্থির করলেন।

এদিকে নির্ধারিত তারিখে রাসূল(সা) ওলীদ বিন ওকবাকে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ওলীদের মনে এই ধারণা জন্মে যে, যেহেতু এই গোত্রের সাথে তার পুরনো শত্রু রয়েছে, তাই তারা হয়তো তাকে একা পেয়ে হত্যা করে ফেলবে। এই আশংকার ভিত্তিতে তিনি আর একা অগ্রসর না হয়ে সেখান থেকেই ফিরে আসেন এবং রাসূল(সা) কে গিয়ে বলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকেও হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। তখন রাসূল(সা) রাগান্বিত হয়ে হযরত খালীদ বিন ওলীদের নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ প্রেরণ করেন। ঠিক এই সময়ে হারেস মদীনার উপকন্ঠে উপস্থিত হয়ে এই মুজাহিদ বাহিনীকে দেখতে পান। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কোন গোত্রের দিকে রওনা হয়েছেন। তারা বললেন, আমরা তোমাদের গোত্রের দিকেই যাচ্ছি। হারেস কারণ জিজ্ঞেস করলে তাকে ওলীদ বিন উকবার কথিত পুরো কাহিনী শুনানো হলো। তাকে বলা হলো যে, বনুল মুস্তালিক গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে ওলীদকে হত্যা করার ফন্দী আঁটছে। এ কথা শুনে হারেস বললেন, আল্লাহর কসম আমি ওলীদ বিন উকবাকে দেখিনি। সে আমার কাছে যায়নি। অতঃপর হারেস রাসূল(সা) এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি যাকাত দিতে অস্বীকার করেছ এবং আমার দূতকে হত্যা করতে চেয়েছ? হারিস বললেন, কখনো নয়। আল্লাহর কসম, সে আমার কাছে যায়নি এবং আমি তাকে দেখিওনি। নির্ধারিত সময়ে আপনার দূত যায়নি বলে আমার আশংকা হয় যে, আপনি হয়তো কোন ত্রুটির কারণে আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

কোন কোন রেওয়ায়াতে আছে যে, ওলীদ বিন উকবা রাসূল(সা) এর নির্দেশ মোতাবেক বনুল মোস্তালিক গোত্রে পোঁছেন। গোত্রের লোকেরা আগেই জানতো যে, রাসূল(সা) এর দূত অমুক তারিখে আসবে। তাই তারা অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে বস্তি থেকে বেরিয়ে আসে। ওলীদ সন্দেহ করলেন যে, তারা বোধ হয় পুরনো শত্রুতার কারণে তাকে হত্যা করতে এগিয়ে আসছে। তাই তিনি সেখান থেকেই ফিরে আসেন এবং রাসূল(সা) এর কাছে নিজ ধারণা অনুযায়ী অভিযোগ পেশ করলেন যে, তারা যাকাত দেয়ার পরিবর্তে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে। তখন রাসূল(সা) খালিদ বিন ওলীদকে প্রেরণ করলেন এবং বলে দিলেন যে পূর্ণ তদন্ত ও অনুসন্ধানের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। খালিদ বিন ওলীদ রাতের বেলায় বস্তির নিকট পৌঁছে গোপনে কয়েকজন গুপ্তচর পাঠিয়ে দিলেন। তারা ফিরে এসে সংবাদ দিল যে তারা সবাই ঈমান ও ইসলামের উপর অটল আছে এবং যাকাত দিতে প্রস্তুত আছে। তাদের মধ্যে ইসলামের বিপরীত কিছুই নেই। খালেদ ফিরে এসে রাসূল(সা) এর নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের সূরা আল হুজরাত নাযিল হয়। বিশেষত এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আয়াতটি হলোঃ

“হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি সাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।”

শিক্ষাঃ  এই ঘটনা এবং এই ঘটনা উপলক্ষে অবতীর্ণ সূরার সংশ্লিষ্ট আয়াতের প্রধান শিক্ষা এই যে, কোন প্রচারণা চাই তা মৌখিক হোক বা লিখিত হোক-বক্তা বা লেখকের চারিত্রিক মান ও খবরের গুরুত্ব বিবেচনা করে গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে। খবর যদি এমন গুরুতর হয় যে, তার ভিত্তিতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হতে পারে তবে তা তদন্ত ছাড়া গ্রহণ করা যাবে না। সংবাদদাতা অসৎ হলে তো নয়ই, এমনকি সৎ হলেও না। কেননা খবরটি তার ইচ্ছাকৃত অপপ্রচার না হয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণেও হতে পারে। আর ফাসেক বা অসৎ লোক হলেতো তা গ্রহণ করাই যাবে না তদন্ত ছাড়া। কেননা তা একটা নিরেট মিথ্যাচারও হতে পারে। রাসূল(সা) বলেছেন, একজন লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।

 

৩৪বদর যোদ্ধাদের মর্যাদা 

বিভিন্ন সহীহ রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, বদর যুদ্ধের পর মক্কা বিজয়ের কিছু আগে মক্কার সারা নাম্নী একজন গায়িকা মহিলা মদীনায় আগমন করে। রাসূল(সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি হিজরত করতে এসেছ? সে বললো, না। রাসূল(সা) বললেন, তাহলে কি করতে এসেছ? সে বললো, আপনারা মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক ছিলেন। আপনাদের উপর নির্ভর করেই আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন মক্কার বড় বড় সর্দাররা বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছে। আর আপনারাও এখানে চলে এসেছেন। ফলে আমার জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমি অনন্যোপায় হয়ে আপনাদের সাহায্য চাইতে এসেছি। রাসূল(সা) বললেন, তুমি মক্কার পেশাদার গায়িকা। যে যুবকরা তোমার গানে মুগ্ধ হয়ে তোমাকে অনেক অর্থ দিত তারা কোথায়? সে বললো, বদর যুদ্ধের পর তাদের গান বাজনার জৌলুস শেষ হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত তারা কেউ আমার খোঁজ নেয়নি। অতঃপর রাসূল(সা) কোরেশ বংশীয় মোহাজেরদেরকে তাকে সাহায্য করার জন্য উৎসাহ দিলেন। তাঁরা তাকে কিছু নগদ অর্থ ও কাপড় চোপড় দিয়ে বিদায় দিল।

এ সময় মক্কার কাফেররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করেছে। ফলে রাসূল(সা) কাফেরদের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনার সংকল্প নিয়ে গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই প্রস্তুতির কথা যেন কিছুতেই মক্কার লোকেরা আগে ভাগে জানতে না পারে, সেজন্য তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে গোপনীয়তা রক্ষা করতে যাচ্ছিলেন।

মদীনায় যারা প্রথম প্রথম হিজরত করেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী হাতেম ইবনে আবি বালতা’য়া। ইয়েমেনী বংশোদ্ভূত এই সাহাবী ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায়ই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। মক্কায় তাঁর রক্ত সম্পর্কীয় বা ঘনিষ্ঠ কোন আত্মীয় স্বজন ছিল না। তিনি হিজরত করে মদীনায় চলে যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা মক্কায়ই ছিল। রাসূল(সা) ও অন্যান্য সাহাবীদের হিজরতের পর মক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদের উপর কাফেররা নানাভাবে জুলুম করতো। যে সব মোহাজিরের আত্মীয় স্বজন মক্কায় ছিল, তাদের সন্তান সন্তনিরা কোন রকমে নিরাপদ থাকতো। হাতেবের কোন আত্মীয় স্বজন না থাকায় তার পরিবার পরিজন মারাত্মক ঝুঁকি ও ‍নির্যাতনের সম্মুখীন ছিল। তাই তিনি ভাবলেন, তার পরিবারকে রক্ষা করার মত কেউ যখন নেই, তখন তিনি যদি মক্কাবাসীদের উপকার করে তাদের সহানুভূতি অর্জন করেন, তাহলে তারা হয়তো তার পরিবারের উপর জুলুম করবে না। তাই ঐ গায়িকা মহিলার মক্কা গমনকে তিনি একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করলেন।

হাতেবের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, রাসূল(সা) কে আল্লাহ তায়ালা মক্কা অভিযানে বিজয় দান করবেন। তাই তিনি যদি আগেভাগে মক্কা অভিযানের বিষয়টি মক্কাবাসীর নিকট ফাঁস করে দেন, তাহলে তাঁর কিংবা ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। তিনি ভাবলেন, একটি পত্র লিখে মক্কাবাসীকে জানিয়ে দিবেন যে, রাসূল(সা)মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে তাঁর পরিবারের হেফাজতের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাই তিনি একটি চিঠি লিখে গায়িকা সারার হাতে দিয়ে দিলেন, যাতে সে মক্কার বিশিষ্ট লোকদের নিকট তা পৌঁছিয়ে দেয়। গায়িকা চিঠিটি নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। (তাফসীরে কুরতুবী, মাযহারী)।

এদিকে রাসূল(সা) কে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে ব্যাপারটা জানিয়ে দিলেন এবং মহিলাটি কোন পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাও জানালেন।

বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল(সা) হযরত আলী, আবু মুরসাদ ও যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে আদেশ দিলেন ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে মহিলাকে ধরার জন্য। তার কাছে মক্কাবাসীর নামে হাতেব ইবনে বালতায়ার চিঠি আছে। তাকে পাকড়াও করে চিঠিটি উদ্ধার করে নিয়ে এস। তারা দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে পথিমধ্যেই তাকে ধরে ফেললেন। তারা মহিলাকে বললেন, তোমার কাছে একটা চিঠি আছে ওটা দিয়ে দাও। সে বললো, আমার কাছে কোন চিঠি নেই। তারা প্রাথমিক তল্লাশীতে কোন চিঠি পেলেন না, কিন্তু তারা দমলেন না। কেননা রাসূল(সা) এর কথা মিথ্যা হতে পারে না। তাই তারা কঠোর ভাষায় বললেন, চিঠিটা বের করে দাও। নচেত আমরা তোমাকে নগ্ন করে তল্লাশী করবো।

সে নিরুপায় হয়ে চিঠিটা বের করে দিল। আমরা চিঠিটা নিয়ে রাসূল(সা) এর কাছে হাজির হলাম। হযরত ওমর(রা) ঘটনা শুনেই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেনঃ হে রাসূল! এই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও সমস্ত মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সে আমাদের গোপন তথ্য কাফেরদের কাছে লিখে পাঠিয়েছে। অতএব, অনুমতি দিন। আমি ওর গর্দান উড়িয়ে দিই।

রাসূল(সা) হাতেবকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার এই কাজের কারণ কি? হাতেব বললেন, হে রাসূল! আমার ঈমানে কোন ত্রুটি হয়নি। ব্যাপার এই যে, আমি ভাবলাম, আমি যদি মক্কাবাসীর একটু উপকার করি, তাহলে তারা আমার পরিবারের কোন ক্ষতি করবে না। ভেবে দেখুন, আমিই একমাত্র মোহাজের, যার কোন আপনজন মক্কায় নেই। অথচ আমার পরিবার মক্কায় রয়েছে। অন্য সবার স্বগোত্রীয়রা তাদের পরিবারের তদারকী করে। কিন্তু আমার তেমন কেউ নেই।

রাসূল(সা) হাতেবের বক্তব্য শুনে বললেন, সে সত্য বলেছে। অতএব, তোমরা তার সম্পর্কে ভাল ছাড়া মন্দ বলো না। হযরত ওমর(রা) তথাপি ঈমানের আবেগে অধীর হয়ে তার আগের কথাটি পুনরায় উচ্চারণ করলেন। তখন রাসূল(সা) বললেন, সে একজন বদর যোদ্ধা। আল্লাহ তায়ালা বদর যোদ্ধাদের সকল গোনাহ মাফ করেছেন এবং তাদের জন্য জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন। কোন কোন রেওয়ায়াতে আছে, রাসূল(সা)বলেন-“আল্লাহ হয়তো বদর যোদ্ধাদের বলে দিয়েছেন, তোমরা যা খুশী তাই কর”। এই কথা শুনে হযরত ওমর(রা) চোখের পানি ফেলে দিয়ে বললেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই(সা) ভাল জানেন। (ইবনে কাছির)। কোন কোন রেওয়ায়াতে হাতেবের এ উক্তিও বর্ণিত হয়েছে-আমি এই কাজ ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য করিনি। কেননা আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, রাসূল(সা) বিজয়ী হবেনই। মক্কাবাসী জেনে গেলেও ক্ষতি হবে না।

শিক্ষাঃ () এই ঘটনা হতে প্রমাণিত হয় যে, বদর যুদ্ধের ন্যায় ঈমানের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাহাবায়ে কিরামের ভুলত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর এ ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মুমিনদেরকে তাদের ভুল ত্রুটির জন্য সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয় এবং বিনা তদন্তে ত্বড়িত সিদ্ধান্ত নেয়াও উচিত নয়।

(২) ক্ষমার ঘোষণা সত্ত্বেও এটা মানতে হবে যে, এ ধরনের কাজ ভুল। মুসলমানদের স্বার্থের ক্ষতিকর কোন কাজ কোন অবস্থায়ই করা চাই না। হয়ত হাতেবের এই ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে সূরা মুমতাহিনা নাযিল হয় এবং তাতে এ কাজের কঠোর সমালোচনা করে মুসলমানদেরকে কাফেরদের সাহায্য ও সহানুভূতি গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়। কাজটি যদি ভুল ও অন্যায় না হতো তাহলে রাসূল(সা) চিঠিটা আটকাতেন না এবং সূরা মুমতাহিনায় এর সমালোচনা হতো না।

৩৫। সুরাকার বিবেক জেগে উঠলো

সুরাকা ইবনে মালেক। কুরাইশ বংশের এক দুঃসাহসী যুবক। রাসূল(সা) যেদিন হযরত আলীকে(রা) বিছানায় শুইয়ে রেখে হযরত আবু বকরকে (রা) সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করার জন্য মক্কা হতে বেরুলেন, সেই দিনই কুরাইশ নেতারা ঘোষণা দিল যে, মুহাম্মদকে যে ব্যক্তি খুঁজে ধরে আনতে পারবে, তাকে একশো উট পুরস্কার দেয়া হবে। এই পুরস্কার লাভের আশায় চারিদিকে ঘোড়া ছুটাতে লাগলো দুর্ধর্ষ যুবক সুরাকা ইবনে মালেক এবং আরো অনেকে। রাসূল(সা) ও আবু বকর(রা) দিন কয়েক মক্কার পার্শ্ববর্তী সূর পর্বত গুহায় কাটিয়েছিলেন। সে সময়ে অনেকেই তাদের ঘোড়ার পদচিহ্ন ধরে সূর পর্বত গুহার কাছে গিয়েছিল। কিন্তু গুহার মুখে আল্লাহ নিযুক্ত রক্ষী মাকড়সা জাল বুনে তাদের গতি রোধ করে দেয়। সবাই মনে করলো যে, তারা এই গুহার ভিতরে থাকলে মাকড়সার জাল ছিঁড়ে যেত। অগত্যা সবাই ওখান থেকে ফিরে যায়। এরপর মুহাম্মদ(সা) ও আবু বকর(রা) কে খোঁজার চেষ্টা থেকে সুরাকা ছাড়া আর সবাই বিরত হয়। একা সুরাকা মক্কার চারিপাশে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে।

যেদিন আল্লাহর হুকুমে হযরত আবু বকরকে সাথে নিয়ে রাসূল(সা) সূর পর্বত গুহা হতে বেরিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন সেদিন সহসা সূরাকার নজরে পরে গেলেন। তারা দু’জন যাচ্ছিলেন উটের পিঠে সওয়ার হয়ে। তাই সূরাকা ঘোড়া ছুটিয়ে খুব দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছে গেল। পেছনে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনে দুজনেই চমকে উঠলেন। দেখলেন পেছনে অতি নিকটেই যমদূতের মত আসছেন সূরাকা ইবনে মালেক। হযরত আবু বকর(রা) যিনি সূর পর্বতের গুহায় বসেও এক একবার কাফেরদের পদ শব্দে চমকে উঠে রাসূল(সা)কে নিজের অজানা আশংকার কথা জানাচ্ছিলেন, তখন রাসূল(সা) তাকে এই বলে প্রবোধ দিচ্ছিলেন যে, “আবু বকর চিন্তা করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” সেই প্রবোধ বাক্যে আবু বকর শান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন? সে সময় আর যা হোক, কাফেররা তাঁদের সাক্ষাত দেখতে পায় নি। কিন্তু এখন কী হবে? এখন যে শত্রু তাদেরকে সরাসরি দেখতে পাচ্ছে, দিনের আলোয় দেখে চিনতেও পারবে এবং ঘোড়সওয়ারের পক্ষে উষ্ট্রারোহীকে ধরা একেবারেই সহজ। ওদিকে সূরাকা বিকট শব্দে শাসাচ্ছে আর বলছে, আবু বকর, এখন তোমাদের আর নিস্তার নেই। ছুটাছুটি করে লাভ নেই। থামো। রাসূল(সা) আবু বকরের বিহবল অবস্থা দেখে আবারও তাকে শান্ত হতে বললেন এবং বললেন, “ভয় পেয়োনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”

আবু বকর যতটা দ্রুত সম্ভব উটকে হাঁকাতে লাগলেন। ওদিকে সূরাকা যখন একেবারে তাঁদের কাছে এসে পড়লো, তখন ঘটলো এক অভাবনীয় ঘটনা। সূরাকার ঘোড়ার পা হাঁটু সমান মাটিতে দেবে গেল। সূরাকা অনেক চেষ্টা করে তাকে উঠালো। ইত্যবসরে রাসূল(সা) ও আবু বকর(রা) আরো বেশ খানিকটা দূরে চলে এলেন। সূরাকা আবার প্রবল জোরে ঘোড়া হাঁকাতে লাগলো। আবার কাছে এসে গেল। কিন্তু আবার সেই ঘটনা ঘটলো। আবারো সূরাকার ঘোড়ার পা হাঁটু সমান মাটিতে দেবে গেল। সূরাকা আবার তাকে ওঠালো এবং আবার হাঁকিয়ে কাছে চলে গেল। আবারো একই ঘটনা ঘটলো। এভাবে ক্রমাগত কয়েকবার ঘটার পর সূরাকার বিবেক জেগে উঠলো। সে আর তাদের পদানুসরণ না করে ফিরে গেল আবু জাহলের কাছে। তখন আবু জাহলের নাম ছিল “আবুল হিকাম” অর্থাৎ বুদ্ধিমান বা প্রাজ্ঞ। আবু জাহল যখন তাকে তার অভিযান সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলো সে একটি কবিতার মাধ্যমে পুরো ঘটনা বিবৃত করলো। কবিতাটির প্রথম কয়টি লাইন এরূপঃ

“ওহে আবুল হিকাম, তুমি যদি আমার ঘোড়ার অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে যে, কিভাবে তার পাগুলো মাটিতে দেবে যাচ্ছিল, তাহলে তুমি অবাক হতে এবং তোমার কোন সন্দেহ থাকতো না যে, মুহাম্মদ(সা) একজন নবী ও পথপ্রদর্শক, তাঁর মুকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই।”

যতদূর জানা যায়, সূরাকা এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু নিজের মুসলমান হওয়ার কথা গোপন রাখেন এবং মক্কাতেই অবস্থান করেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি রাসূল(সা) এর সাথে দেখা করেন এবং প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন।

শিক্ষাঃ সত্যকে উপলব্ধি করার পর সত্যের বিরোধীতা করা হতে বিরত হলে আল্লাহর গযব হতে রক্ষা পাওয়া ও হেদায়াতের আশা করা যায়।

৩৬। হযরত খুবাইবের শাহাদাত

 ওহুদ যুদ্ধের পর আযল ও কারাহ গোত্রের একদল লোক রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট এসে বললোঃ হে রাসূল! আমাদের গোত্রে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। তারা আমাদেরকে কুরআন পড়াবেন এবং ইসলামের বিধিসমূহ শিখাবেন। রাসূল(সা) তাদের কথামত সরল বিশ্বাসে আসেম ইবনে সাবেত, খুবাইব ইবনে আদী এবং যায়েদ ইবনে দাখিনা সহ ছয়জন মতান্তরে দশজন সাহাবীকে পাঠিয়ে দেন। অপরদিকে এক স্থানে কাফেরদের দুইশত যোদ্ধা মুসলমানদের এই সংক্ষিপ্ত জামাতটির অপেক্ষা করিতেছিল। মুসলমানদের জামাত তখন তথায় পৌছিলেন তখন নাঙ্গা তরবারী বিজলীর শক্তিতে তাঁহাদের অভ্যর্থনা করিল। মুসলমানরা যদিও কোরআনের বাণী প্রচার করিতে বাহির হইয়াছিলেন, কিন্তু একেবারে নিরস্ত্র ছিলেন না। সংকট দেখার সঙ্গে সঙ্গেই দুইশত তরবারির সম্মুখে দশটি তরবারিও কোষমুক্ত হইল এবং উভয়পক্ষে তুমুল সংগ্রাম শুরু হইয়া গেল। আটজন সাহাবী বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করিয়া শহীদ হইয়া গেলেন। হযরত খুবাইব ইবনে আদী এবং যায়েদ ইবনে দাসেনা (রা) নামক দুই সিংহপুরুষ গ্রেফতার হইয়া গেলেন। সুফিয়ান হোযালী এই দুই বীরকে মক্কায় লাইয়া গিয়া নগদ মূল্যে মক্কার হিংস্র পশুদের নিকট বিক্রয় করিয়া আসিল।
উভয় বন্দীকেই হারেস ইবনে আমেরের গৃহে রাখা হইল। কাফেররা এইরূপ নির্দেশ দিল, তাহাদের রুটি বা পানি কিছুই যেন দেওয়া না হয়। হারেস অক্ষরে অক্ষরের নির্দেশ পালন করিল। বন্দীদের জন্য খাবার সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল।

মুসলমানদের জামাত তখন তথায় পৌছিলেন তখন নাঙ্গা তরবারী বিজলীর শক্তিতে তাঁহাদের অভ্যর্থনা করিল। মুসলমানরা যদিও কোরআনের বাণী প্রচার করিতে বাহির হইয়াছিলেন, কিন্তু একেবারে নিরস্ত্র ছিলেন না। সংকট দেখার সঙ্গে সঙ্গেই দুইশত তরবারির সম্মুখে দশটি তরবারিও কোষমুক্ত হইল এবং উভয়পক্ষে তুমুল সংগ্রাম শুরু হইয়া গেল। আটজন সাহাবী বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করিয়া শহীদ হইয়া গেলেন। হযরত খুবাইব ইবনে আদী এবং যায়েদ ইবনে দাসেনা (রা) নামক দুই সিংহপুরুষ গ্রেফতার হইয়া গেলেন। সুফিয়ান হোযালী এই দুই বীরকে মক্কায় লাইয়া গিয়া নগদ মূল্যে মক্কার হিংস্র পশুদের নিকট বিক্রয় করিয়া আসিল।
উভয় বন্দীকেই হারেস ইবনে আমেরের গৃহে রাখা হইল। কাফেররা এইরূপ নির্দেশ দিল, তাহাদের রুটি বা পানি কিছুই যেন দেওয়া না হয়। হারেস অক্ষরে অক্ষরের নির্দেশ পালন করিল। বন্দীদের জন্য খাবার সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল।
একদিন হারেসের শিশুপুত্র একটি ছুরি লইয়া খেলিতে খেলিতে বন্দী হযরত খুবাইবের নিকট পৌছিয়া গেল। দীর্ঘ কয়েকদিনের ক্ষুধার্ত পিপাসায় কাতর আল্লাহর এই নেক বান্দা হারেসের শিশুকে কোলে তুলিয়া লইলেন এবং তাহার হাত হইতে ছুরি লইয়া মাটিতে রাখিয়া দিলেন। ইতিমধ্যেই হারেসের স্ত্রী আসিয়া দেখিল, খুবাইব শিশু ও ছুরি সম্মুখে লইয়া বসিয়া আছেন। স্ত্রীলোকটি মুসলিম চরিত্র সম্পর্কে কিছই জানিত না। এই মারাত্মক অবস্থা দেখিয়া ভয়ে আতঙ্কে তাহার প্রাণ শুকাইয়া গেল এবং অধীর কণ্ঠে চিত্কার করিতে শুরু করিল। হযরত খুবাইব (রা) স্ত্রীলোকটিকে অধীরতা অনুভব করিতে পারিয়া বলিতে লাগিলেন, “ভগ্নী, আপনি শান্ত হউন, আমি এই নিষ্পাপ শিশুটিকে হত্যা করিব না। মুসলমানরা জুলুম করেনা।” এই কথা বলিয়াই হযরত খুবাইব শিশুটিকে কোল হইতে নামাইয়া দিলেন। শিশু ছুটিয়া গিয়া মায়ের কোলে উঠিয়া পড়িল।
কোরায়শ দল কয়েকদিন অপেক্ষা করিল, কিন্তু অনাহারে যখন মৃত্যু হইল না তখন তাঁহাকে হত্যা করার জন্য তারিখ ঘোষণা করা হইল। খোলা ময়দানে একটি কাষ্ঠফলক পোঁতা হইল। কোরায়শ দল ফলকটির চারিধারে তরবারি ও বর্শা উঠাইয়া দাঁড়াইল। কেহ কেহ তরবারি ভাজিতে ছিল। কেহ কেহ ধনুকে তীর সংযোজন করিতেছিল। এমনবস্থায় ঘোষণা করা হইল, খুবাইবকে আনা হইতেছে। মুহূর্তে ময়দান সরগরম হইয়া উঠিল। উত্সুক দর্শকের দল চারিদিকে ছুটাছুটি করিতে শুরু করিল। কিছু লোক অস্ত্র ঠিক করিতে করিতে বন্দীর উপর আক্রমণ করিয়া পৈশাচিক উপায়ে রক্ত প্রবাহিত করার জন্য প্রস্তুহ হইল।
বীর মুসলিম হযরত খুবাইব (রা) এক পা এক পা করিয়া বধ্যভূমির দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তাঁহাকে শূলের নীচে আনিয়া খাড়া করা হইল। এক ব্যক্তি তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিল, খুবাইব, আমরা তোমার এই বিপদে দুঃখ অনুভব করিতেছি। এখনও যদি তুমি ইসলাম ত্যাগ কর তবে তোমাকে মুক্তি দেওয়া যাইতে পারে।
হযরত খুবাইব (রা) সম্বোধনকারীর দিকে মুখ করিয়া বলিতে লাগিলেন, ইসলামই যদি অবশিষ্ট না থাকে, তবে জীবন রক্ষা অর্থহীন। এই দৃঢ়তাব্যঞ্জক জবাব জনতার মধ্যে বিদ্যুতের ন্যায় ছড়াইয়া পড়িল। ক্ষণিকের জন্য উত্তেজিত জনতা স্তব্ধ নীরব হইয়া গেল।
দ্বিতীয় এক ব্যক্তি অগ্রসর হইয়া বলিল, “খুবাইব, কোন অন্তিম ইচ্ছা থাকিলে বলিতে পার।”
হযরত খুবাইব (রা) জবাব দিলেন, “মাত্র দুই রাকাত নামায পড়িতে চাই; অন্য কোন ইচ্ছা নাই।” জনতা জানাইয়া দিল, ভাল কথা- শীঘ্র সারিয়া নাও। ফাঁসির রজ্জু প্রস্তুত ছিল, হযরত খুবাইব (রা) নীচে দাঁড়াইয়া প্রাণ ভরিয়া শেষ বারের মত প্রিয়তমের এবাদত করিতে প্রস্তুত হইলেন। হৃদয়ের নিষ্ঠা ও অনুরাগ নিংড়ানো এই মুখ প্রিয়তমের গুণগান করিতে যাইয়া বন্ধ হইতে চাহিল না। যে দুই হাত মহান আল্লাহর সম্দুখে বন্ধ হইয়াছিল, তাহা আর খুলিতে চাহিল না। রুকুর উদ্দেশে অবনত কোমর আর সোজা হইতে চাহিল না। মাটির বিছানা হিইতে সেজ্দার অনুরাগ শেষ হইল না! চক্ষুযুদগল হইতে এত বিনয়ের অশ্রু প্রবাহিত হইতে চাহিল, যেন শরীরের প্র্রতি রক্তবিন্দু অশ্রু হইয়া চোখের কোণে নামিয়া আসে। আল্লাহর এই ঊষর পৃথিবী যেন অশ্রু সিঞ্চনীতে জান্নাতুল ফেরদাউসের প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরিয়অ উঠে!
হযরত খুবাইবের প্রেমিক অন্তরে আত্মনিবেদনের আনন্দে মত্ত ছিল, কিন্তু হঠাৎ তিনি অন্তর হইতে এক নূতন আহ্বান শুনিতে পাইলেন, এই আহ্বান বুঝি একমাত্র শহীদের অন্তরই অনুভব করিতে পারে। তিনি যেন অনুভব করিলেন, নামায অধিক লম্বা করিলে কাফেরগণ এই কথা ভাবিতে শুরু করিবে, তাঁহার মুসলিম অন্তর বুঝি মৃত্যু ভয়ে ভীত হইয়া গিয়াছে। এই কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ডান দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কাফেরদের তরফ হইতে কোন জবাব আসিল না, কিন্তু তাহাদের অগণিত তীরের তীক্ষ্ম মুখ উবং উত্তোলিত তরবারির তীক্ষ্মধার যেন সজীব হইয়া সালামের জবাব দিয়া উঠিল। তিন বাম দিকে মুখ ফিরাইয়াও সালামের বাণী উচ্চারণ করিলেন। কাফেরকুলের নির্বাক জামাত উহারও কোন জবাব দিতে পারিল না, কিন্তু অগণিত বর্শার সুচিতীক্ষ্ম ফলক যেন বলিয়া উঠিল, হে ইসলামের অমর মোজাহেদ, তোমার উপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হউক।
মরদে মোজাহেদ হযরত খুবাইব (রা) সালাম ফিরাইয়া শূলের নীচে আসিয়া দাঁড়াইলেন। কাফেররা তাঁহাকে কাষ্ঠের সহিত বন্ধন করতঃ তীক্ষ্মধার তীর ছুঁড়িয়া তাঁহার খোদা প্রেমের শেষ পরীক্ষা লইতে শুরু করিল। একব্যক্তি পূর্বেই মানাযের বিছানায় মরদে মুমিনের যে পবিত্র রক্ত অশ্রুর বন্যায় প্রবাহিত হইয়া আসিতেছিল, তাহাই শত ছিদ্র দিয়া বাহির হইতে শুরু করিল। হযরত খুবাইবের এই ধৈর্য কি অপূর্ব! শূলের স্তম্ভের সহিত তাঁহার সর্বশরীর আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা রহিয়াছে। তৎপর এক এক তীর আসিয়া তাঁহার শরীরে এপার ওপার হইয়া যাইতেছে। তীক্ষ্মধার বর্শা তাঁহার বুকের পাঁজর ভেধ করিয়া বিদ্ধ হইতেছে। এক একটি আঘাত তিনি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করিতেছেন, কিন্তু এই অবস্থায়ও তিনি ইসলামের কঠোর স্বীকারোক্তিতে অটল রহিয়াছেন। দুঃখ-বেদনার এই প্রলয়ও তাঁহার অন্তরকে ইসলামের উপর হইতে হটাইতে পারিতেছে না।
এই সময় আর এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার বুকে বর্শা রাখিল। ধীরে ধীরে তাহা এতটুকু বিদ্ধ করিল যে, অর্ধেকটুকু ফলক তাঁহার শরীরে প্রবিষ্ট হইয়া গেল। এই সময় আক্রমণকারী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “এখন তোমার স্থানে যদি মোহাম্মদকে বাঁধিয়া তোমাকে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তুমি কি উহা পছন্দ করিবে?” ধৈর্যেরে প্রতিমূর্তি হযরত খুবাইব (রা) একটি একটি করিয়া অস্ত্রের কঠিন আঘাত সহ্য করিতেছিলেন, কিন্তু তাঁহার নিকট পাপাত্মার এই একমাত্র বাক্যবাণ যেন সহ্য হইল না। যবানের এক এক ফোঁটা রক্ত যদিও ইতিপূর্বেই নিঃশেষে ঝরিয়া পড়িয়াছিল, তবুও এই শুষ্ক মুখেই নূতন শক্তি দেখা দিল। জ্বালাময়ী ভাষায় তিনি বালিতে লাগিলেন, “নিষ্ঠুর! খোদা জানেন, আমি তিলে তিলে প্রাণ দিয়া দিতে পারি, কিন্তু আল্লাহর রসূলের পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার দৃশ্যও সহ্য করিতে আমি প্রস্তুত নই।”
নামায পড়ার পর হইতে হযরত খুবাইবের উপর যে কঠিন বিপদ নামিয়া আসিতেছিল তাহার প্রত্যেকটি আঘাতই তিনি অম্লান বদনে সহ্য করিয়া চলিয়াছিলেন, তাঁহার প্রশান্ত যবান হইতে এক একটি আঘাতের সহিত এক একটি কবিতা বাহির হইয়া আসিতেছিল। প্রশান্ত কণ্ঠে তিনি বলিতেছিলেন,-“
১. লোক দলে দলে আমার চারিদকে সমবেত হইয়াছে। কবিলা, জামাত সকলেরই যেন এখানে উপস্থিতি বিশেষ প্রয়োজনীয় হইয়া পড়িয়াছে।
২. এই সমাবেশ একমাত্র শক্রুতা প্রদর্শনের জন্য অনুষ্ঠিত হইয়াছে। ইহারা আমার বিরুদ্ধে জিঘাংসা বৃত্তিরই প্রদর্শন করিতেছে মাত্র এবং আমাকে এখানে মৃত্যুর খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে।
৩. ইহারা এই প্রদর্শনীতে স্ত্রীলোক ও শিশুদিগকে সমবেত করিয়া একটি উচ্চ মঞ্চের একত্রিত করিয়া রাখিয়াছে।
৪. ইহারা বলে, যদি ইসলাম অস্বীকার করি তহবে আমাকে মুক্ত করিয়া দিবে, কিন্তু আমার পক্ষে ইসলাম পরিত্যাগের চাইতে মৃত্যু কবুল করা যে অনেক সহজ। আমার চক্ষু হইতে যদিও অশ্রু ঝরিতেছে, তথাপি আমার অন্তর সম্পূর্ণ শান্ত।
৫. আমি শত্রুর সম্মুখে মস্তক অবনত করিব না, কাহারও বিরুদ্ধে ফরিয়াদও করিব না। আমি ভীত হইব না। কেননা, আমি জানি, আল্লাহর সান্নিধ্যেই যাইতেছি।
৬. আমি মৃত্যুতে ভয় করি না, কেননা আমি জানি, সর্বাবস্থায়ই মৃত্যু আসিবে। আমার কেবল একটি ভয় আছে এবং তাহা দোযখের আগুনের ভয়।
৭. আরশের মালিক আমার দ্বারা সেবা করাইয়াছেন এবং দৃঢ়তা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়াছেন। কাফেররা এখন আমার শরীর টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিয়াছে, এতক্ষণে আমার সকল আশাই শেষ হইয়া গিয়াছে।
৮. আমি আমার এই অসহায়তা, নিঃসঙ্গতার জন্য কেবলমাত্র আল্লাহর নিকটই ফরিয়াদ করিতেছি। জানি না আমার মৃত্যুর পর উহাদের কি ইচ্ছা! যত কিছুই হউক, আল্লাহর পথে যখন আমি জীবন দান করিতেছি, তখন উহারা যাহা কিছুই করুক না কেন, ইহাতে আমার আর কোন ভাবনা নাই।” এরপর হযরত খুবাইবকে শহীদ করা হয়।

শিক্ষাঃ হযরত খুবাইবের শাহাদাত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকারীদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ ও চমকপ্রদ ঘটনা। এমন লোমহর্ষক নির্যাতন ও হত্যার মুখে অবিচল থাকা অত্যন্ত মজবুত ঈমানের পরিচায়ক যা আল্লাহর রহমত ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এই ঘটনার আরো একটি শিক্ষা এই যে, ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের শত্রুর দুরভিসন্ধি, চক্রান্ত ও ধাপ্পাবাজী সম্পর্কে সাবধান হতে হবে। আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশায় এরূপ ঘটনা ঘটিয়ে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

৩৭ আবু জাহলের জুলুম প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ (সা)

জাহেলিয়াতের যুগে আবু জাহল জনৈক ইয়াতিমের অভিভাবক ছিল। সে ঐ ইয়াতিমের পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশুনার নামে নিজেই ভোগ দখল করত এবং ইয়াতিমকে তার কোন অংশই দিত না। একদিন সেই ইয়াতিম বালক তার কাছে এসে পিতার পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছু অংশ চাইল। তার গায়ে তখন কাপড় চোপড়ও ছিল না। কিন্তু পাষন্ড আবু জাহল তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করলোনা। ছেলেটি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে হতাশ হয়ে ফিরে চলল। কোরায়েশ নেতাদের কয়েকজন দুষ্টুমি করে তাঁকে বললোঃ “মুহাম্মদের(সা) কাছে নালিশ করে দে। সে আবু জাহলের কাছে সুপারিশ করে তোর সম্পত্তি আদায় করে দেবে।” আসলে তাদের মতলব ছিল আবু জাহলের সাথে একটা টক্কর লাগিয়ে দিয়ে রাসূল(সা) কে জব্দ করা। ছেলেটি জানতোই না যে, আবু জাহলের সাথে তার সম্পর্ক কী এবং তারা কোন্ উদ্দেশ্যে তাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে। সে সরল মনে রাসূল(সা)এর কাছে হাজির হলো এবং নিজের পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো।

রাসূল(সা) তৎক্ষণাত উঠলেন এবং তাঁর কট্টর দুশমন আবু জাহলের কাছে চলে গেলেন। তাঁকে দেখে আবু জাহল স্বাগত জানালো। তিনি যখন বললেন যে, এই ছেলেটার পাওনা দিয়ে দাও, তখন সে নির্বিবাদে মেনে নিল এবং তার পাওনা দিয়ে দিল। ওদিকে কুরায়শ নেতারা অপেক্ষায় ছিল আবু জাহল ও মুহাম্মদের(সা) মধ্যে কী কান্ড ঘটে তা দেখার জন্য। তারা একটা মজার সংঘর্ষ ঘটার খবরের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু যখন পুরো ঘটনার খবর পেল, তখন অবাক হয়ে গেল এবং আবু জাহলকে এসে ভৎসর্না করতে লাগলো যে, সে এমন সুযোগ হাতছাড়া করলো কেন  এবং সেও ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে বলে চিৎকার করতে লাগলো। আবু জাহল তাদেরকে বললোঃ “আল্লাহর কসম, আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করি নি। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম যেন মুহাম্মদের ডানে ও বামে এক একটা বর্শা রয়েছে, আমি তার কথামত কাজ না করলে তা আমার বুকের মধ্যে ঢুকে যাবে।”

শিক্ষাঃ ইয়াতিম ও দুস্থ মানুষের উপর কেউ নির্যাতন করলে তা নীরবে বরদাশত করা উচিত নয়। সমাজের প্রভাবশালী লোকদের উচিত আল্লাহর উপর ভরসা করে যুলুম প্রতিরোধের চেষ্টা করা। যালেমদের সাধারণতঃ মনোবল কম থাকে। দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে তারা প্রায়ই হার মানে। এ কাজে একাকী অগ্রসর হলেও আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার আশা করা যায়।

৩৮ বীরে মাউনার হৃদয়বিদারক ঘটনা

চতূর্থ হিজরীর সফর মাসে নাজদ থেকে আবু বারা আমের ইবনে মালিক ইবনে জা’ফর রাসূলুল্লাহ (সা) র সাথে দেখা করতে মদীনায় আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সামনে ইসলাম পেশ করেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। সে ইসলাম গ্রহণও করলো না, ইসলামের বিরুদ্ধেও কিছু বললো না। সে বললো, “হে মুহাম্মাদ, আপনি যদি কিছুসংখ্যক সাহাবীকে নাজদবাসীর কাছে পাঠিয়ে দেন এবং তারা তাদেরকে আপনার দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দেন, আমার মনে হয়, তাহলে তারা আপনার দ্বীন গ্রহণ করনে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “নাজদবাসী তাদের ক্ষতি করতে পারে বলে আমার আশংকা হয়।” আবু বারা বললেন, “আমি তদের নিরাপত্তার জিম্মাদার। আপনি তাদেরকে পাঠিয়ে দিন। তারা জনগণকে আপনার দ্বীনের দিতে দাওয়াত দিক।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের মধ্য থেকে বাছা বাছা চল্লিশজন সুযোগ্য সাহাবীকে বনু সায়েদা গোত্রের বিশিষ্ট সাহাবী মুনযির ইবনে আমরের নেতৃত্বে পাঠিয়ে দিলেন। মুনযির ‘মুয়ান্নিক লিয়ামুত’ [তাঁকে এ উপাধিদানের কারণ হলো, তিনি শাহাদাত লাভের জন্য দ্রুতগতিতে ধাবমান হন।] (দ্রুত মৃত্যুকে আলিঙ্গনকারী) নামে অভিহিত হতেন। তাঁর সুযোগ্য সঙ্গী ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী হারেস ইবনে ছিম্মা, হারাম ইবনে মিলহান, উরওয়া ইবনে আসমা, নাফে ইবনে বুদাইল ইবনে ওয়ারকা ও আবু বাক্র সিদ্দীকের (রা) মুক্ত গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা। তাঁরা রওয়ানা দিয়ে বীরে মাউনাতে গিয়ে অবস্থান করলেন। এই জলাশয়টি বনু আমেরের আবাসভূমি ও বনু সুলাইমের প্রস্তরময় এলাকার মাঝখানে অবস্থিত। উভয় এলাকাই জলাশয়টির নিকটবর্তী হলেও বনু সুলাইমের এলাকা ছিল অধিকতর নিকটবর্তী।

ইসলামের কট্রর দুশমন আমের ইবনে তুফাইলের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি নিয়ে গেলেন হারাম ইবনে মিলহান (রা)। তিনি যখন তার কাছে উপস্থিত হলেন, তখন সে চিঠির দিকে ভ্রুক্ষেপমাত্র না করে হারাম ইবনে মিরহানকে হত্যা করলো। তারপর বাদবাকী সাহাবীদেরকেও খতম করার জন্য সে বনু আমেরের সাহায্য চাইলো। কিন্তু বনু আমের তার অনুরোধ এই বলে প্রত্যাখ্যান করলো যে, “ আমরা বনু বারার প্রতিশ্রƒতি ভঙ্গ করতে চাই না। আবু বারা তাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে।” আমের অগত্যা সুলাইমের কয়েকটি উপগোত্রের সাহায্য চাইল। তারা সঙ্গে সঙ্গে সম্মত হলো এবং তাদেরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো। সাহাবাগণ তাদেরকে দেখে তরবারী হাতে নিলেন এবং লড়াই করতে করতে শহীদ হলেন। শুধু কা’ব ইবনে যায়িদ রক্ষা পেলেন। কাফিররা তাঁকে মৃত মনে করে ফেলে রেখে যায়। অথচ তিনি বেঁচে ছিলেন। অনেক রক্তপাতের দরুণ দুর্বল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও নিহতদের স্তূপের মধ্য থেকে প্রাণ নিয়ে কোন রকমে পালিয়ে যান এবং পরে খন্দকের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।

আক্রান্ত হবার সময় দু’জন সাহাবী আমর ইবনে উমাইয়া দামরী ও জনৈক আনসারী [মুনযির বিন মুহাম্মাদ বিন উকবা। ] সাহাবী কোন কারণে দল থেকে কিছুদূরে অবস্থান করছিলেন। তাঁরা তাঁদের সঙ্গীদের বিপদের কথা জানতেন না। কিন্তু তাঁদের মাথার ওপর কতকগুলো পাখী উড়তে দেখে তাঁদের মনে সন্দেহ জাগে। তাঁরা ভাবলেন, পাখীগুলোর ওড়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে। তাঁরা তাঁদের অবস্থা দেখবার জন্য এগিয়ে গেলেন। দেখলেন সবাই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আর তাঁদের ওপর আক্রমণকারী দলকেও উপস্থিত দেখলেন। আনসারী আমর ইবন উমাইয়াকে বললেন, “এখন আমাদের কি করা উচিত বলে মনে করেন?” তিনি বললেন, “আমার ইচ্ছা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে গিয়ে দেখা করি এবং সমস্ত ব্যাপার তাঁকে জানাই।” আনসারী বললেন, “যে রণক্ষেত্রে মুনযির ইবনে আমর শহীদ হয়েছেন সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে আমি পালাতে চাই না। আমি নিজে কখনো লোকমুখে হত্যাকান্ডের খবর শোনার অপেক্ষায় বসে থাকতাম না।” অতঃপর তিনি লড়াই করে শহীদ হলেন।

আমর ইবনে উমাইয়াকে কাফিররা আটক ও বন্দী করলো। তিনি মুদার গোত্রের লোক একথা শুনে আমের ইবনে তুফাইল তাঁর কপালের চুল কেটে নিল এবং তাঁর মায়ের একটা দাস মুক্ত করার মানত ছিল মনে করে তাঁকে সেই বাবদে মুক্তি দিল। এরপর আমর ইবনে উমাইয়া মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মদীনার অনতিদূরে অবস্থিত কারকারাতে পৌঁছলো বনু আমেরের দুই ব্যক্তি এসে তাঁর সাথে একই ছায়ায় বিশ্রাম নিতে লাগলো। বনু আমেরের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা নিরাপত্তা ও আনাক্রমণ চুক্তি যে ছিল, সেকথা আমর জানতেন না। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, তারা বনু আমের গোত্রের লোক। তিনি একটু অপেক্ষা করলেন। যেই তারা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলো অমনি উভয়ের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করলেন। তাঁর ধারণা ছিল, বনু আমের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের হত্যাকা- চালিয়েছে এবং সে কারণে বনু আমের থেকে প্রতিশোধ নেয়া উচিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট উপনীত হয়ে আমর ইবনে উমাইয়া সমস্ত ঘটনা জানালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি যে দু’জনকে হত্যা করেছো, তাদের জন্য আমাকে রক্তপণ (দিয়াত) দিতে হবে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এ ঘটনা আবু বারাই ঘটালো। আমি এটা অপছন্দ করেছিলাম এবং শংকিত ছিলাম।” আবু বারা ঘটনা জানতে পেরে খুবই দুঃখিত হলেন। আমের ইবনে তুফাইল তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিয়ে দেয়ার এবং তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের ওপর বিপদ নেমে আসায় আবু বারা ক্ষোভ প্রকাশ করে। নিতদের মধ্যে আমের ইবনে ফুহাইরাও ছিলেন। হিশাম ইবনে উরওয়াহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমের ইবনে তুফাইল বলতো, “ঐ দলের ভেতরে একটি লোক ছিল যাকে হত্যা অব্যবহিত পর তাঁকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে দেখলাম। অবশেষে দেখলাম সে যেন আকাশে উঠে উধাও হয়ে গেছে। কে সেই, লোকটি?” লোকেরা বললো, “সে আমের ইবনে ফুহাইরা।” [হযরত আবু বকর সিদ্দিকের মুক্ত সাবেক ক্রীতদাস এবং রাসূল (সা) ও আবু বকরের মদীনায় হিজরতকালীন পথপ্রদর্শক।]

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন যে, আমের ইবনে তোফায়েলের সহযোগী জাবার পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তার ইসলাম গ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেনঃ বীরে মাউনার ঘটনার সময় আমি বর্শা দিয়ে একবার একজন সাহাবীর দু’কাঁধের মাঝখানে যখন আঘাত করলাম এবং বর্শা যখন তাঁর বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেল, তখন ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তকে সে দু’হাতে মুখে মাখাচ্ছিল আর বলছিলঃ “ফুযতু ওয়া রাব্বিল কা’বা।” অর্থাৎ, কাবার প্রভুর শপথ, আমি সফল হয়েছি। একথা শুনে আমি মনে মনে বললা, “এ ব্যক্তি আমার হাতে খুন হলো তার আবার সাফল্য এল কোত্থেকে? পরে আমি অনেকের কাছে একথার মর্ম জিজ্ঞাসা করি। তারা আমাকে জানায় যে, সে নিজের শহীদ হওয়াকেই সাফল্য বলে বিশ্বাস করতো। আর এ বিশ্বাস শুধু তার একার নয়, প্রত্যেক মুমিনেরই।

শিক্ষাঃ শাহাদাত বাহ্যতঃ ব্যর্থতা মনে হলেও আসলে তা মুমিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কুরআনে আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ হতে তাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। ফলে হত্যা করে ও নিহত হয়। …………….আর এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।”(সূরা তাওবা)।

 

৩৯ মুমিনের নামায

একবার রাসূলুল্লাহ(সা) জানতে পারলেন যে, নাজদে দুটি গোত্র মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি কালবিলম্ব না করে সাতশো সাহাবীকে সাথে নিয়ে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে নাজদ অভিমুখে যাত্রা করলেন। হযরত উসমান ইবনে আফফানকে তিনি মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে রেখে গেলেন। যথাস্থানে পৌঁছে তিনি মদীনার ‘যাতুর রিকা’ নামক পর্বতবেষ্টিত এক উপত্যকায় শিবির স্থাপন করলেন। এ কারণে এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গাযওয়াজে যায়তুর রিকা’।

রাসূলুল্লাহ(সা) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর ত্বড়িত উপস্থিতির ফলে শত্রুদল এতই ঘাবড়ে গেল যে, তারা রণে ভংগ দিয়ে চতূর্দিকে পালিয়ে গেল। ফলে যুদ্ধ না করেই রাসূল(সা) সসৈন্যে মদীনায় ফিরে এলেন। তবে এই অভিযানকালে আর একটি চকমপ্রদ ঘটনা ঘটে যা মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই অভিযানকালে রাসূল(সা) এর তাবু পাহারা দেয়ার জন্য প্রতি রাত্রে পালাক্রমে কয়েকজন করে সাহাবীকে নিয়োগ করা হয়। যেদিন হযরত আব্বাদ(রা) ও আম্মার ইবনে ইয়াসার(রা)কে পাহারার কাজে নিয়োগ করা হয়, সেই দিনই ঘটে এই মর্মস্পর্শী ঘটনা।

হযরত আব্বাদ ও হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার পরস্পরে পুরো রাতটাকে এভাবে ভাগ করে নিয়েছিলেন যে, প্রথম ভাগে পাহারার দায়িত্ব হযরত আব্বাদের উপর এবং শেষের অংশ হযরত আম্মারের ওপর পড়লো। হযরত আব্বাদের পাহারার পালা শুরু হলো। তিনি ছিলেন অত্যধিক নফল নামাযের ভক্ত। তাই ভাবলেন, এত দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে লাভ কী? সময়টা নামায পড়ে কাটিয়ে দেয়া যাক। তাই তিনি নফল নামাযের নিয়ত করে নামাযে সূরা কাহাফ পড়া শুরু করে দিলেন। ওদিকে হযরত আম্মার ঘুমিয়ে পড়লেন। হযরত আব্বাদ যখন নামাযে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সূরা পাঠরত তখন চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। এক কাফের সন্তর্পণে সামনে এল। সে দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পেল না যে, কোন পাহারাদার আছে কি না। তবে দূর থেকে হযরত আব্বাদকে একটা গাছ মনে করল। আবার তার মনে সন্দেহ হলো যে, ওটা গাছ না হয়ে একটা মানুষও হতে পারে। তাই সে নিজের সন্দেহ ভঙ্গনের জন্য তাকে লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়লো। তীর হযরত আব্বাদের পিঠে গিয়ে ঢুকলো, কিন্তু নামায ছাড়লেন না। কাফেরটি সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য একে একে তিনটি তীর ছুঁড়লো। প্রত্যেকটি তীর তাঁর গায়ে বিদ্ধ হয়ে প্রবল রক্তপাত ঘটালো। অগত্যা তিনি বাধ্য হয়ে নামায ছেড়ে দিয়ে হযরত আম্মারকে ঘুম থেকে ডাকলেন। ইত্যবসরে তাঁর নড়াচড়া টের পেয়ে এবং কথাবার্তা শুনে শত্রু সৈন্যটি নীরবে প্রস্থান করলো। হযরত আম্মার তাঁকে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি প্রথম তীরের সাথে সাথেই আমাকে ডাকলেন না কেন?”

হযরত আব্বাদ বললেনঃ আমি নামাযে সূরা কাহাফ পাঠ করছিলাম। এতে এত মজা লাগছিল যে সূরা শেষ না করে কিছুতেই নামায ছাড়তে ইচ্ছা করছিল না।

হযরত আব্বাদ (রা) হযরত আবু বকর(রা) এর খেলাফতকালে মুরতাদদের বিরুদ্ধেও জিহাদে অংশগ্রহণ করেন এবং ভন্ড নবী মুসাইলামার বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হন।

শিক্ষাঃ (১) শত্রুর আক্রমণের প্রস্তুতির কথা জানার পর চুপ করে বসে না থেকে আক্রমণ প্রতিহত করার যথাসাধ্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত।

(২) নামাযে পঠিত কুরআনের অর্থের দিকে খেয়াল রাখলে নামাযে মনোনিবেশ করা সহজ হয়।

৪০ মুমিনের আতিথেয়তা

একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে বললোঃ আমি অনাহারে আছি। রাসূল(সা) তৎক্ষনাত অন্য এক ব্যক্তিকে নিজের এক স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে কিছু খাবার আনতে বললেন। কিন্তু রাসূল(সা) এর ঐ স্ত্রী জানালেন যে, তাঁর কাছে পানি ছাড়া আর কিছুই নেই। অতঃপর একে একে সকল স্ত্রীর কাছে খাবার চেয়ে পাঠালেন। কিন্তু প্রত্যেকের কাছে একই জবাব পেলেন যে, পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।

অতঃপর রাসূল(সা) তাঁর সাহাবীগণের কাছে জানতে চাইলেন যে, তোমাদের কারো এই ব্যক্তিকে আজকের মত আতিথেয়তা করার ক্ষমতা আছে কি? আনসারদের একজন বললেনঃ “হে রাসূল! আমি প্রস্তুত।” তিনি লোকটিকে নিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে গেলেন এবং তাঁর স্ত্র্রীকে বললেনঃ “আল্লাহর রাসূলের মেহমানকে যতন কর।” স্ত্রী বললেনঃ “আমার ছেলেমেয়েদের খাবার ছাড়া আর কিছু নেই।” সাহাবী বললেনঃ “বেশ তো। ওদেরকে অন্য বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট করে রাখ। তারপর রাতের খাবার চাইলে ঘুম পাড়িয়ে রাখ। আর আমাদের মেহমান খেতে আসলে আলো নিভিয়ে দাও আর এরূপ ভান কর যেন আমরাও সাথে খাচ্ছি।” অতঃপর তারা একত্রে বসলেন। কিন্তু শুধু মেহমান তৃপ্ত সহকারে আহার করলো। আর তারা উভয়ে এবং ছেলেমেয়েরা অনাহারে রাত কাটিয়ে দিলেন। সকাল বেলা তিনি যখন রাসূল(সা) এর নিকট এলেন, তখন দেখলেন, রাসূল(সা) পুরো ঘটনা ওহীর মাধ্যমে জেনে ফেলেছেন। তিনি বললেন, “তোমরা দু’জনে তোমাদের মেহমানের সাথে রাত্রে যে ব্যবহার করেছ, তাতে আল্লাহ তায়ালা মুগ্ধ হয়েছেন।”(বুখারী ও মুসলিম)।

শিক্ষাঃ মেহমানের যত্ন করা ইসলামের অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এমনকি প্রয়োজনে নিজেরা অভুক্ত থেকেও মেহমানকে আপ্যায়ন করা উচিত।

৪১ মুমিনর আত্মসংযম

এক রণাঙ্গনে মুসলমান বাহিনীর সাথে কাফেরদের প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। হযরত আলী(রা) এক অমুসলিম যোদ্ধাকে ধরাশায়ী করে তার বুকের উপর চড়ে বসেছেন। হাতে নগ্ন তরবারী। এখনি তার বুকে বসিয়ে দিবেন। সহসা ধরাশায়ী অমুসলিম সৈনিকটি তার শেষ অস্ত্র চালাতে গিয়ে বুকের ওপর চেপে বসা হযরত আলীর(রা) মুখে থুথু দিয়ে ভরে দিল। হযরত আলী(রা) এক মুহুর্ত থমকে বসে রইলেন। তারপর তার বুকের উপর থেকে উঠে আসলেন। তরবারি দূরে নিক্ষেপ করে বললেন, “যাও, তুমি মুক্ত।”

কাফের সৈনিকটি তো হতবাক। সে যে একটি যুদ্ধের ময়দানে রয়েছে একথা ভুলে গেল। সে জিজ্ঞাসা করলোঃ আলী তোমার কি হয়েছে? আমাকে অমন হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দিলে যে!

হযরত আলী(রা) বললেনঃ ময়দানে তোমাদের সাথে যে যুদ্ধ চলছিল সেটা চলছিল ইসলামের সাথে। কিন্তু যে মুহুর্তে তুমি আমার মুখে থুথু দিলে, তখন তোমার ওপর আমার প্রচন্ড আক্রোশ সৃষ্টি হলো। সেটা ছিল আমার ব্যক্তিগত আক্রোশ। এই আক্রোশের বশে তোমাকে হত্যা করলে গুনাহ হবে। তাই ক্রোধ সম্বরণ করলাম।

সৈনিকটি তৎক্ষণাত বললোঃ “যে ধর্ম তোমাকে এমন কঠিন মুহুর্তেও আত্মসংযম শিক্ষা দেয়, তাতে আমাকেও দীক্ষিত কর।” এই বলে সে ইসলাম গ্রহণ করলো।

শিক্ষাঃ ব্যক্তিগত আক্রোশের বশে কারো ওপর আক্রমণ করা জায়েজ নয়। তবে আত্মরক্ষার জন্য সর্বাবস্থায় যুদ্ধ করা কর্তব্য।

৪২ মৃমিনের আত্মসমালোচনা

এক ব্যক্তি উয়াইস কারনীর [একমাত্র মুমিন, যিনি রাসূল (সা) এর জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণ করেও রাসূল(সা) এর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি] সাথে সাক্ষাত করে বললোঃ “কেমন আছেন, হে উয়াইস?”

উয়াইসঃ আলহামদুল্লিাহ, ভাল আছি।

আগন্তুকঃ আজকাল কিভাবে আপনার সময় কাটে?

উয়াইসঃ সে কথা শুনিতে না চাওয়াই উত্তম। আজকাল দুনিয়ায় কোন মুমিনের সাথে শান্তিতে জীবন যাপনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। কুরআনের জ্ঞান অর্জন করলে সম্পদশালী হওয়া যায় না। এমনকি সততার সাথে জীবনযাপন করলে দুনিয়ার বন্ধু ও মেলে না।

আগন্তুকঃ রাসূল(সা) এর কাছ হতে শুনেছেন এমন একটি হাদীস আমাকে শোনান।

উয়াইসঃ আমি রাসূল(সা) এর সাক্ষাত পাই নি যে তোমাকে তাঁর হাদীস শোনাবো। তবে অন্যের মাধ্যমে পাওয়া রাসূল(সা) এর একটি উপদেশ তোমাকে শোনাচ্ছি। তিনি বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর দরবারে গিয়ে হিসাব নিকাশের সম্মুখীন হবার আগে নিজেদের হিসাব নিজেই গ্রহণ কর। আল্লাহ দুনিয়াটাকে তোমাদের জন্য একটা পুল স্বরূপ বানিয়েছেন। কাজেই তোমরা এই পুল পার হবার চেষ্টা কর।”

শিক্ষাঃ আত্মসমালোচনা করা মুমিনের একটি অপরিহার্য গুণ। অন্যের সমালোচনার পাশাপাশি নিজের সমালোচনাও সব সময় অব্যাহত রাখা উচিত। রাসূল(সা) বলেছেনঃ “তোমাদের কাজের হিসাব নেয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের কাজের সমালোচনা কর।

৪৩ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অগ্নিপরীক্ষায় মুমিনের দৃঢ়তা

(ক) হযরত আবু আবদুল্লাহ ইবনে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেনঃ একবার রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের কিছু জোয়ানকে কুরাইশদের একটি দলের মোকাবিলার জন্য পাঠালেন। আমাদের সেনাপতি ছিলেন আবু উবাইদা। রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের রসদ হিসেবে এক ব্যাগ খুরমার অতিরিক্ত কিছুই দিতে পারলেন না। ক্ষুধা লাগলে আবু উবাইদা আমাদের প্রত্যেককে একটি করে খোরমা দিতেন। শিশুরা যেমন চুষে চুষে অনেক্ষণ ধরে খায়, আমরাও তেমনিভাবে খেতাম এবং খাওয়া শেষে বেশি করে পানি খেয়ে নিতাম। এতেই আমাদের পুরো একদিন চলে যেত। কখনো কখনো আমরা উটের খাদ্য ‘খাবাত’ নামক গাছের পাতা লাঠি দিয়ে পেড়ে পানি দিয়ে ভিজিয়ে খেযে নিতাম। এভাবে চলতে চলতে আমরা সমুদ্রের কিনারে গিয়ে উপনীত হলাম। সমুদ্রতীরে আমাদের সামনে পড়লো একটা বিরাট আকারের বস্তু। দূর থেকে দেখে মনে হলো বালুর স্তূপ। কাছে গিয়ে দেখি আম্মার নামক এক প্রকান্ড সামুদ্রিক জন্তু। আবু উবায়দা প্রথমে বললেনঃ ওটা মৃত। কিন্তু পরক্ষণেই আবার বললেন, আমরা এখন আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর পথে জেহাদরত। এখন আমরা অনন্যোপায়। কাজেই, চল ওটাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাক। অতঃপর আমরা ৩০০ জন মোজাহেদ ঐ জন্তুটার উপর নির্ভর করে এক মাস কাটালাম। ওর গোশত খেয়ে আমরা বেশ মোটাসোটা হয়ে গেলাম। শুধু তাই নয়, ওর চোখের কোটর হতে আমরা কলসি কলসি চর্বিও সংগ্রহ করলাম এবং এত বড় এক টুকরো গোশত কেটে আলাদা করলাম যে, যার প্রত্যেকটা এক একটা ষাড়ের মত দেখতে। আবু উবাইদা আমাদের মধ্য থেকে ১৩ ব্যক্তিকে ওর চোখের কোটরের ওপর বসিয়ে দিলেন এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে আমাদের সবচেয়ে বড় উটটার ওপর চড়িয়ে দিলেন। এই বোঝা বহন করে উটটি রওনা হল। আমরাও অনেক গোশত কেটে নিয়ে চললাম। মদীনায় যখন রাসূল(সা) কে পুরো ঘটনা জানালাম, তখন তিনি বললেনঃ “ওটা তোমাদের খাদ্য হিসেবে আল্লাহ সরবরাহ করেছিলেন। ওর কিছু গোশত কি তোমাদের সাথে আছে, যা আমাদেরকেও খেতে দিতে পার?” তখন আমরা তার কিছু গোশত রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে পাঠালাম এবং তিনি তা খেলেন। (মুসলিম)।

(খ)  হযরত জাবের বর্ণনা করেন যে, খন্দক যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে আমরা যখন মদীনার চারিপাশে পরিখা খনন করছিলাম, তখন এক পর্যায়ে এমন শক্ত মাটি পাওয়া গেল যার ভেতর কোদাল বসতেই চায় না। সবাই এসে রাসূল (সা) কে ব্যাপারটা জানালে তিনি বললেনঃ আমি আসছি। অতঃপর তিনি রওনা হলেন। অথচ তখনও রাসূল(সা) এর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। তিনিসহ আমরা তিন দিন যাবত কোন খাবার মুখে তুলিনি। রাসূল(সা) কোদাল দিয়ে কোপ দিতেই তা নরম মাটিতে পরিণত হয়ে গেল। আমি বললামঃ হে রাসূল! আমাকে একটু বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিন।” বাড়ী গিয়ে আমি আমার স্ত্রীকে বললেনঃ রাসূল(সা) কে এমন অবস্থায় দেখেছি, যা সহ্য করার মত নয় (পেটে পাথর বাঁধা)। তোমার কাছে খাবার কিছু আছে কি? সে বললঃ আমার কাছে কিছু যব ও ছোট একটা ভেড়ার বাচ্চা রয়েছে। আমি ভেড়ার বাচ্চাটা যবাই করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষতে শুরু করল। যখন গোশত ডেগচিতে করে চুলোর ওপর চড়ানোর পর প্রায় সিদ্ধ হয়ে এসেছে এবং যব অনেকখানি পিষ্ট হয়ে গেছে, তখন আমি গিয়ে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে অল্প কিছু খাবার প্রস্তুত আছে। আপনি এবং একজন বা দু’জন চলুন।” তিনি বললেনঃ “খাবারে পরিমাণ কতটুকু?” আমি সঠিক পরিমাণ জানালাম। তিনি বললেনঃ “যথেষ্ট পবিত্র খাবার। তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বল, আমি না আসা পর্যন্ত যেন চুলোর ওপর থেকে রুটি ও গোশত না নামায়।” অতঃপর বললেনঃ “ তোমরা সবাই চল।” মোহাজেরগণ ও আনসারগণ সবাই চললেন। আমি আমার স্ত্রীর কাছে আগেভাগে গিয়ে পৌঁছলাম। আমি বললামঃ তোমার ওপর আল্লাহ সদয় হোন! রাসূল(সা) সকল আনসার ও মোহাজেরগণ নিয়ে সদলবলে এসে গেছেন। সে বললোঃ খাবার পরিমাণ কেমন তা কি তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলেন? আমি বললাম, হ্যাঁ।

যা হোক, রাসূল(সা) সমবেত আনসার ও মোহাজেরগণকে বললেনঃ “তোমরা ভিড় করো না। একে একে প্রবেশ কর।” অতঃপর রাসূল(সা) এক এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে নিতে লাগলেন, তার সাথে গোশত যুক্ত করে চুলো ও  ডেকচি ঢেকে দিয়ে সাহাবীগণকে দিতে লাগলেন। এভাবে দিতে দিতে সবাই পেট পুরে খেল এবং আরো অবশিষ্ট রইল। অন্য রেওয়ায়াতে আছে যে, রাসূল(সা) গোশত ও রুটিতে সামান্য থুথু ছিটিয়ে দিলেন। এক হাজার সাহাবী পেট পুরে খেলেন এবং তারপরও ডেকচি থেকে এমন আওয়াজ এসেছিল যে, তাতে তখনো অনেক গোশত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছিল। অতঃপর রাসূল(সা) হযরত জাবেরের স্ত্রীকে বললেনঃ তোমরা খাও এবং অন্যদেরকে খাওয়ায়। কারণ বহু লোক ক্ষধার্ত রয়েছে। (বোখারী ও মুসলিম)।

শিক্ষাঃ এই দুটি ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া গেল যে, ইসলামের জন্য যারা সংগ্রাম করে তাদেরকে কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়; বিশেষত ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের পরীক্ষা অনিবার্য। এ পরীক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দিলে আল্লাহর সাহায্যও আসবে ইনশাল্লাহ। আল্লাহ বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে ভীতি, ক্ষুধা, জান-মাল ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করবো। যারা এতে ধৈর্যধারণ করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।”

৪৪ কুফরীর আস্তাকূঁড়ে ঈমানের রক্তগোলাপ

ক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত আবু জাহলের ছেলে ইকরামা কুফরীর উপর বহাল ছিল। বদরের ময়দানে তার পিতা শোচনীয়ভাবে নিহত হওয়ার পর সে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে কম চেষ্টা করেনি। ওহুদ, খন্দক সর্বত্রই সর্বশক্তি দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছে। শেষ পর্যন্ত মক্কা বিজয়রে দিন সমস্ত কুরাইশ বংশ যখন আত্মসমর্পণ করলো সেদিনও তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু বীর কেশরী খালিদ বিন ওয়ালিদ ইকরামার প্রতিরোধ চূর্ণ করে দেন এবং ইকরামা ইয়েমেন পালিয়ে যান।

 তখন ইকরামা আত্মানুশোচনায় নিমজ্জিত হল। মুসলমান্দের হাতে মক্কার পতন হওয়ার পর সেখানে আর তার অবস্থানের সুযোগ রইল না। এদিকে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর সাথে যা করেছিল তিনি তা মাফ করে দিলেন।তবে তিনি তাদের কয়েকজনকে তাদের থেকে বাদ দিলেন। তিনি তাদের নাম ঘোষণা করে দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন, কাবার গিলাফের নিচেও তাদের পাওয়া গেলে হত্যা করা হবে। এই দলের শীর্ষে ছিলেন ইকরামা ইবনে আবু জাহল। তাই অত্যন্ত সন্তর্পণে আত্মগোপ্ন করে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং ইয়ামেনের পথে ছুটে চলল। কারণ সেখানে তার আর কোন আশ্রয়স্থল ছিল না।  তখন ইকরামার স্ত্রী উম্মে হাকীম এবং আবুসুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করতে যায়।তাদের সাথে ছিল আরো দশজন মহিলা।তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন।ইসলাম গ্রহণ করার পর ইকরামার স্ত্রী উম্মে হাকীম দাঁড়িয়ে বলেন-‘ইয়া রাসূলুল্লাহ ! ইকরামা ইয়ামেনে পালিয়ে গেছে।আপনি তাকে হত্যা করবেন এই তার ভয়। সুতরাং আপনি তাকে অভয় দিন, আল্লাহ্‌ আপনাকে অভয় দান করবেন।’ তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘ সে নিরাপদ ‘। সাথে সাথে উম্মে হাকীম তার স্বামীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন । অনেক খুঁজাখুঁজির পর তিনি ইকরামাকে তিহমা অঞ্চলের নদীর তীরে পেলেন। তিনি ইকরামাকে মক্কায় ফিরিয়ে নিতে চাইলেন,কিন্তু ইকরামা যেতে চাইল না,কারণ সে তার প্রাণ নাশের আশংকা করছিল। কিন্তু যখন উম্মে হাকীম তাকে বলল যে ,সে নিজে সরাসরি মহানবী(সাঃ) এর কাছ থেকে তার জন্য নিরাপত্তার আশ্বাস নিয়ে এসেছেন, তখন ইকরামা রাজি হল। কিছুক্ষনের মধ্যে ইকরিমা সেখানে প্রবেশ করলেন যেখানে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বসে ছিলেন। নবী, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক, উঠে দাড়ালেন এবং উষ্ণ আলিঙ্গনে ইকরিমাকে স্বাগত জানালেন।
“মুহাম্মাদ”, ইকরিমা বললেন, “উম্মু হাকীম আমাকে জানিয়েছে যে আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।”
“হ্যাঁ, সে সত্য বলেছে।” রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, “তুমি নিরাপদ।”
“আপনি মানুষকে কিসের দিকে ডাকছেন?”
“আমি তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এবং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল এ কথার সাক্ষ্য দেবার জন্য, সালাত কায়েম করার জন্য, যাকাত আদায় করার জন্য এবং ইসলামের অন্যান্য বিধিনিষেধগুলো মেনে চলার জন্য।”
“আল্লাহর শপথ”, ইকরিমা বলে চললেন, “আপনি কেবলমাত্র তার দিকেই ডেকেছেন যা সত্য এবং আপনি কেবলমাত্র সৎকাজেরই আদেশ দান করেছেন। আপনার মিশন শুরু করার আগেও আপনি আমাদেরই মাঝে ছিলেন এবং তখন আপনি কথায় ছিলেন সবচেয়ে সত্যবাদী এবং কাজে ছিলেন সবচেয়ে সঠিক।” ইকরিমা রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর দিকে তার হাত প্রসারিত করে দিলেন এবং বলে চললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল”। এরপর বললেন,
“ইয়া রাসুলুল্লাহ্ , আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে ইসলামের বিরুদ্ধে আমার সকল শত্রুতা ক্ষমা করে দেন এবং আপনার উপস্থিত ও অনুপস্থিত অবস্থায় আমি আপনার নামে যে সকল নিন্দা করেছি আর কুৎসা রটনা করেছি সেগুলো যেন তিনি ক্ষমা করে দেন।”
রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) আল্লাহর কাছে এ বলে প্রার্থনা করলেন যে, “হে প্রতিপালক, আমার বিরুদ্ধে যত শত্রুতা সে করেছে এবং তোমার আলোকে নিভিয়ে দেবার যত চেষ্টা সে করেছে তার জন্য তাকে ক্ষমা করে দাও। আমার সামনে বা পেছনে আমার সম্মানহানীর জন্য যা কিছু সে বলেছে তার জন্যও তাকে ক্ষমা করে দাও।”
ইকরিমার মুখ গভীর আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “আল্লাহর শপথ ইয়া রাসুলুল্লাহ্, আমি শপথ করছি, যা কিছু আমি আল্লাহর পথের শত্র“তার জন্য ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুন আমি ব্যয় করব আল্লাহর পথে, এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ আমি করেছি তার দ্বিগুন আমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব।”

সেদিন থেকে ইকরিমা একনিষ্ঠভাবে ইসলামের প্রবেশ করলেন। মুসলিম হিসাবে প্রতিটি যুদ্ধে তিনি জীবন বাজী রেখে অংশ নিতে লাগলেন এবং তাঁর দ্রুতগামী ঘোড়া অবিশ্বাসীদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে তুলতে লাগল। যুদ্ধ ময়দানে না থাকলে অধিকাংশ দিন তাঁর দিনের বেলা কাটত রোজা রেখে, মসজিদে ও কুরআন অধ্যয়ন করে, আর রাত কাটত নিভৃতে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে। তখন কুরআন কোন বই আকারে ছিল না, তা ছিল চামড়া, বড় উটের হাড়, উপযুক্ত কোন পাথর ইত্যাদিতে লিখিত অবস্থায়। কুরআনের সে সংরক্ষিত অংশগুলোকে বলা হয় মুসাফ। ইকরিমা প্রয়ই এ মুসাফগুলোকে নিজের চুমু খেয়ে, মুখের উপর রেখে অঝোর ধারায় কাঁদতেন আর বলতেন, ”কিতাবু রাব্বী, কালামু রাব্বী”, ”এ আমার রবের কিতাব, এ আমার রবের ভাষা”।

ইসলাম গ্রহণের সময় ইকরিমা যে ওয়াদা রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে করেছিলেন, তার প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য তিনি ভীষণ কঠোর ও দৃঢ় ছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণের পর যতগুলো যুদ্ধ মুসলিম বাহিনী অংশগ্রহণ করেছে তার প্রতিটিতেই তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর অকুতোভয় প্রথম সারির যোদ্ধা।

আবু বকর(রা) এর খেলাফতকালে সংঘটিত ইয়ারমূকের যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর দেখা গেল, মুসলিমদের মধ্যে যারা শাহাদাত বরণ করেছে তাদের মধ্যে তিনজন মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। এই তিনজন ছিলেন আল হারিস ইবন্ হিশাম, আইয়াশ ইবন্ রাবিয়া এবং ইকরিমা ইবন্ আবু জাহল। ইকরিমার খোঁজ পেয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ তার মাথা নিজ কোলে তুলে নিলেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে ক্রমাগত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো। ইকরিমা এবং আল হারিস পানির জন্য ডাকছিলেন। তাঁদের জন্য দ্রুত পানির ব্যবস্থা করা হল। পানি আনার পর আইয়াশ তাঁদের দিকে তাকালেন। তারা বললেন, “এ পানি আইয়াশকে দাও।” আইয়াশের কাছে পানি নিয়ে যাবার পর দেখা গেল তিনি ততক্ষনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে ফেলেছেন। আবার পানি যখন ইকরিমা এবং আল হারিসের দিকে নিয়ে যাওয়া হল, তখন দেখা গেল তাঁরা দুজনও ততক্ষনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছেন।

তাই আবু জাহলের ছেলে ইকরামাকে বলা হয় কুফরীর আস্তাকূঁড়ে ঈমানের একটি রক্তগোলাপ।

শিক্ষাঃ পিতা ও বংশপরিচয় ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন। কোন ব্যক্তির নিজস্ব ঈমান ও আমলই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের সাথে বিবেচনা করার দাবি রাখে। আবু জাহলের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও ইকরামা নিজের ঈমান ও আমলের বলে মুসলমানদের সেনাপতি পর্যন্ত হয়েছিল। আল্লাহর কাছেও সাহাবীর মর্যাদা পেয়েছিলেন।

৪৫। ভিক্ষাবৃত্তি একটি কলংক

একবার আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে এসে খাবার চাইল। রাসূল(সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাড়িতে কি কিছুই নেই? সে বললো একটা কম্বল আছে যার একাংশ পরিধান করি এবং অপরাংশ বিছিয়ে শুই। আর একটা পেয়ালা যা দিয়ে আমি পানি খাই। রাসূল(সা) বললেনঃ যাও, ঐ দুটি জিনিস আমার কাছে নিয়ে এস। লোকটি তৎক্ষণাত গিয়ে জিনিস দুটি নিয়ে এল।

রাসূল(সা) জিনিস দুটি তার কাছ হতে নিয়ে নিলেন এবং সমবেত সাহাবীগণকে বললেনঃ এই জিনিষ দুটি তোমরা কেউ কিনবে নাকি? একজন সাহাবী বললেনঃ আমি এক দিরহামে নিতে পারি। অপর একজন বললেনঃ আমি দুই দিরহামে নিতে পারি। রাসূল(সা) শেষোক্ত ব্যক্তিটিকে পেয়ালা ও কম্বলটি দিলেন এবং তার কাছ হতে দুই দিরহাম নিয়ে আনসারটিকে দিলেন। তাকে বললেনঃ এক দিরহাম দিয়ে খাবার কিনে তোমার পরিবারকে দাও। আর এক দিরহাম দিয়ে একখানা কুঠার কিনে আমার কাছে এস। লোকটি কুঠার কিনে নিয়ে এলে রাসূল(সা) তাতে আছাড় লাগিয়ে দিয়ে বললেনঃ “যাও এদিয়ে কাঠ কাটগে। ১৫ দিনের মধ্যে যেন তোমাকে আমি না দেখি।” সে নির্দেশ মোতাবেক কাজ করলো। একদিন এসে জানালো যে, দশ দিরহাম মুনাফা হয়েছে। এর কিছু দিয়ে সে খাবার এবং কিছু দিয়ে কাপড় কিনলো।

রাসূল(সা) তাকে বললেন, ভিক্ষার কলঙ্ক মুখে নিয়ে কেয়ামতের ময়দানে হাজির হওয়ার চাইতে তোমার এই কাজ অনেক ভাল।

শিক্ষাঃ কাজ করে অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা রাখে এমন সবল ও সুস্থ লোককে ভিক্ষা দেওয়া উচিত নয়। এ ধরনের লোকের ভিক্ষা চাওয়াও মস্ত বড় গুনাহ।

৪৬। পরোপকারী মানুষই শ্রেষ্ঠ মানুষ

একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) মসজিদে নববীতে ইতিকাফরত ছিলেন। এই সময় এক ব্যক্তি এসে তাঁকে সালাম করলো ও তাঁর কাছে বসে পড়লো। হযরত ইবনে আব্বাস তাঁকে বললেন, “তোমার কি হয়েছে? তোমাকে তো খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছে।”

আগন্তুক জবাব দিলঃ “অমুকের কাছে ঋণগ্রস্ত আছি। অথচ তা পরিশোধ করতে পারছি না।”

ইবনে আব্বাস(রা) বললেনঃ আমি কি তোমার সম্পর্কে ঐ ব্যক্তির সাথে কিছু আলোচনা করবো?

আগন্তুক বললেনঃ যদি ভাল মনে করেন করতে পারেন।

হযরত ইবনে আব্বাস তৎক্ষণাত জুতো পরলেন ও মসজিদ থেকে বের হলেন। আগন্তুক বললোঃ এ কী? আপনি করছেন কী? ইতিকাফের কথা কি ভুলে গেছেন?

ইবনে আব্বাস রাসূল(সা) এর কবর দেখিয়ে অশ্রু সজল চোখে বললেনঃ না, সেটা ভুলিনি।  তবে এই কবরে যিনি শুয়ে আছেন তাঁকে আমি বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের উপকারের জন্য সচেষ্ট হবে এবং উপকার সাধন করবে, সে দশ বছর ধরে ইতিকাফকারীর চেয়েও মর্যাদাবান হবে। অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি একদিন ইতিকাফ করে তার মধ্যে ও দোজখের মধ্যে আল্লাহ এমন তিনটি পরীক্ষা স্থাপন করেন, যার একটি থেকে অপরটির দূরত্ব সূর্যের উদয় ও অস্তের জায়গার মধ্যে দূরত্বের চেয়েও বেশি।

শিক্ষাঃ বান্দার হক তথা মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলেই পরোপকারী হওয়া সম্ভব। রাসূল(সা) বলেছেন, “কোন ব্যক্তি যতক্ষণ বান্দার সাহায়্যে নিয়োজিত থাকে, ততক্ষণ আল্লাহ তার সাহায্যে নিয়োজিত থাকেন।”

৪৭। মোনাফেকীর পরিণাম

রাসূল(সা) এর নিকট একবার এই মর্মে খবর এল যে, রাসূল মুসতালিক গোত্রের সর্দার হারেস ইবনে যেরার মদীনা আক্রমণের প্রস্ততি নিচ্ছে। হারেস ইবনে যেবার রাসূল(সা) এর অন্যতমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত হয়াইবিয়ার পিতা। তারা উভয়ে পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন।

খবর পাওয়ামাত্র রাসূল(সা) একদল মুজাহিদকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিরোধের জন্য অগ্রসর হলেন। যারা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য রাসূল(সা) এর সঙ্গী হলো, তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মুনাফিকও ছিল। এসব মোনাফেকদের উদ্দেশ্য ছিল কাফেররা পরাজিত হলে তাদের ফেলে যাওয়া সম্পদ হস্তগত করা আর মোনাফেক হওয়া সত্ত্বেও তাদের ধারণা ছিল যে, মুসলমানেরা যেহেতু অধিকাংশ যুদ্ধে জয়লাভ করেছে, তাই এই যুদ্ধেও জয়লাভ করবে।

কার্যত হলোও তাই। মুসলমানরা জয়লাভ করলেন এবং প্রতিপক্ষ ইহুদী গোত্র পরাজিত হল। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর মুসলমান শিবিরে একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল। একজন মুহাজির এবং একজন আনসার এর মধ্যে কুপ হতে পানি তোলা নিয়ে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়ার সূত্রপাত হলো। অতঃপর তা হাতাহাতির পর্যায়ে গেল। মুহাজির হাঁক দিলেনঃ “ওহে মুহাজিররা, কে কোথায় আছ আমাকে বাঁচাও।” আর আনসারও অনুরূপ আনসারদের ডাক দিলেন। ফলে উভয়পক্ষে উত্তেজনা ও সাজ সাজ রব পড়ে গেল। এভাবে মুসলমানদের মধ্যে একটি মারামারি বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল।

এই ঝগড়ার খবর পাওয়া মাত্রই রাসূল(সা) কাল বিলম্ব না করে ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেন। তিনি আনসার ও মুহাজির উভয়কে বুঝালেন যে, তোমরা উভয়ে এভাবে নিজ নিজ অঞ্চলের লোকদের ডাকছো কেন? এতো জাহিলিয়াতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এ এক নোংরা পন্থা। তোমরা এটা পরিত্যাগ করো। কেউ কারো ওপর জুলুম করলে সকল মুসলমানের উচিত মজলুমের সাহায্যে ছুটে যাওয়া এবং যালেমকে নিরস্ত করা-তা সে যেখানকার লোকই হোক না কেন। দেখতে হবে কে যালেম এবং কে মজলুম, কে আনসার কে মোহাজের বা কে কোথাকার বাসিন্দা ও কে কোন বর্ণ ও বংশের লোক তা নয়।

 রাসূল(সা) এর ভাষণ শুনে সবাই শান্ত হয়ে যে যার কাজে চলে গেল। সাহাবী উবাদা ইবনে সাবেত ঝগড়ায় লিপ্ত দুই সাহাবীর মাঝে আপোস করিয়ে দিলেন এবং যার বাড়াবাড়ি প্রমাণিত হলো, তাকে দিয়ে মাফ চাইয়ে নিলেন। কিন্তু মুনাফিকরা এই ঝগড়ার সুযোগটাকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে চাইল। তারা এই আপোস মীমাংসা মেনে নিল না। মুনাফিকদের নেতা ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই। সে মুনাফিকদের একটা গোপন সভা ডেকে সেখানে মদীনাবাসীদেরকে মক্কাবাসী মুহাজিরদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে বললোঃ তোমরাই তো ওদের আস্কারা দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছ। তোমরাই খাল কেটে কুমীর এনেছ এবং দুধ কলা দিয়ে এই সাপদের পুষেছ। এখন ওদের এত স্পর্ধা হয়েছে যে, তোমাদেরকেই ওরা দংশন করতে চাইছে। এখনও যদি তোমরা সাবধান না হও এবং ওদেরকে লালনপালন হতে বিরত না হও, তাহলে একদিন ওরাই তোমাদেরকে ধ্বংস করবে। তোমরা মদীনার সম্ভ্রান্ত লোক। আর ওরা হলো বহিরাগত নীচু জাত। মদীনায় গিয়ে তোমাদের উচিত হবে ঐ নীচুজাতদেরকে বিতাড়িত করা। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এভাবে আনসার ও মুহাজিরদের ঐক্য ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।

এই গোপন সভায় ঘটনাক্রমে হযরত যায়েদ বিন আরকাম উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার উক্ত ভাষণ শেষ হওয়া মাত্রই চিৎকার করে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম, তুইই নীচুজাত। রাসূল(সা) ও তাঁর মুমিন সাহাবীগণ ঈমানের বলে বলীয়ান ও পরস্পরের প্রতি প্রগাঢ় প্রীতি ও ভালোবাসা পোষণ করেন। ‍সুতরাং তারাই প্রকৃত সম্ভ্রান্ত লোক।”

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ভেবেছিল, পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে সে কথার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেবে ও সুর পাল্টে ফেলবে। এ জন্য সে কারো নাম উল্লেখ করে নি এবং কিছুটা স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছে। যায়েদ ইবনে আরকামের ক্ষেপে যাওয়া দেখে সে বিপদ গুনলো। পাছে তার কুফরী প্রকাশ হয়ে পড়ে তাই সে যায়েদের কাছে গিয়ে বুঝাতে লাগলো যে, আমি তো ঠাট্টাচ্ছলেই কথাগুলি বলেছিলাম। তুমি ভুল বুঝেছ।

যায়েদ সেখান থেকে উঠে সরাসরি রাসূল(সা) এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। রাসূল(সা) ঘটনাকে গুরুতর মনে করলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য যায়েদকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি ভুল বলছ না তো? যায়েদ বললেনঃ আল্লাহর কসম, আমি নিজ কানে শুনেছি। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর কথাবার্তা সমগ্র মুসলিম বাহিনীর কানে চলে গেল। সবাই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

এক পর্যায়ে হযরত ওমর রাসূল(সা) এর নিকট এসে বললেনঃ “ইয়া রাসূলুল্লাহ(সা)! আমাকে অনুমতি দিন। মোনাফেকটা গর্দান কেটে ফেলি।” রাসূল(সা) বললেন, “ওমর, লোকে যখন বলবে যে, মুহাম্মদ তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকেও হত্যা করে, তখন কী হবে?” অতঃপর তিনি হত্যা করতে নিষেধ করলেন।

হযরত ওমরের কথাটা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্রও জেনে ফেললেন। তার নামও ছিল আবদুল্লাহ এবং তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ মুমিন। তিনি রাসূল(সা) এর নিকট হাজির হয়ে বললেনঃ “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার পিতার এসব কথাবার্তার কারণে যদি তাকে হত্যা করতে চান, তবে আমাকেই আদেশ করুন, অন্য কাউকে নয়। আমি নিজ হাতে তার মস্তক কেটে আপনাকে এনে দেব। ইয়া রাসূলুল্লাহ, সমস্ত খাররাজ গোত্র জানে আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে পিতৃভক্ত। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে কোন কথা আমি সহ্য করতে পারি না। আমার আশংকা হয় যে, আপনার আদেশে অন্য কউ আমার পিতাকে হত্যা করলে আমি আমার পিতার হত্যাকারীকে দেখে আত্মসম্বরণ করতে পারবো না। ফলে তাকে আমি হত্যা করে আযাব ভোগ করবো।” রাসূল(সা) বললেনঃ তোমার পিতাকে হত্যা করার আমার কোন ইচ্ছা নেই এবং আমি কাউকে আদেশও দিই নি। এরপর এই অশান্ত পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনার জন্য রাসূল(সা) প্রচলিত নিয়মের বিপরীতে অসময়ে সফরের আদেশ দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম রওনা হলে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি কি এসব কথা বলেছ? সে অনেক কছম খেয়ে বললো যে, সে এসব কথা বলে নি। অতঃপর সাধারণ সাহাবায়ে কেরাম মনে করলেন, সম্ভবতঃ অল্প বয়স্ক যায়েদ ভুল বুঝেছে। আসলে ইবনে উবাই অমন কথা বলে নি।

 এদিকে যায়েদ পড়ে গেলেন মহা ফাঁপরে। সবাই তাকে মিথ্যুক ভাবছে মনে করে তিনি গা ঢাকা দিয়ে থাকতে লাগলেন। কিন্তু মনে মনে আশান্বিত ছিলেন যে, ঘটনার মুখোশ উন্মোচন করে অচিরেই আয়াত নাযিল হবে। বাস্তবিকই এই সফরের মধ্যে সূরা মুনাফিকুন নাযিল হয়ে যায়েদের সত্যতা প্রমাণ করে দিল। রাসূল(সা) যায়েদকে ডেকে বললেনঃ “হে বালক, আল্লাহ তোমাকে সত্যবাদী সাব্যস্ত করেছেন এবং ইবনে উবাই সম্পর্কে পুরো মুনাফিকুন সূরাটাই নাযিল করেছেন।”

ইবনে উবাই যখন মদীনার উপকন্ঠে পৌঁছলো, তখন তার মুমিন পুত্র আবদুল্লাহ তার উটের হাঁটুতে পা রেখে পিতাকে বললেনঃ “আল্লাহর কছম! ‘সম্ভ্রান্ত লোকেরা নীচু জাতের লোকদেরকে বহিষ্কার করবে’ এই কথার ব্যাখ্যা না করা পর্যন্ত তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। কে সম্ভ্রান্ত? তুমি না আল্লাহর রাসূল?”

পুত্র কর্তৃক পিতা অবরুদ্ধ এ খবর পেয়ে রাসূল(সা) ছুটে এলেন এবং পুত্রকে বললেনঃ তার পথ ছেড়ে দাও এবং তাকে মদীনায় ঢুকতে দাও।” অতঃপর সে মদীনায় প্রবেশ করলো।

শিক্ষাঃ মুনাফিকরা ইসলামের মারাত্মক দুশমন হলেও তাদের প্রতি মহানুভবতা ও সহিষ্ঞুতা প্রদর্শন করা কর্তব্য। তবে তাদের গতিবিধির ‍ওপর কড়া দৃষ্টি রাখা চাই।

৪৮ রাখাল ছেলের খোদাভীতি

একবার হযরত ওমর গভীর রাতে ছদ্মবেশে মদীনার পথ ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন এবং প্রজাদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। এই সময়ে দেখতে পেলেন এক রাখাল এক পাল ছাগল নিয়ে তার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। তিনি রাখালকে পরীক্ষা করার মানসে বললেনঃ “এই ছাগলগুলির মধ্যে যে কোন একটি ছাগল আমার কাছে বিক্রী করে দাও।”

রাখাল বললো, “এই ছাগলগুলো আমার নয়, আমার মনিবের। আমি তার ক্রীতদাস।”

ওমর বললেন, “আমরা যে জায়গায় আছি, এখানে তোমার মনিব আমাদেরকে দেখতে পাবে না। একটা ছাগল বেঁচে দাও। আর মনিবকে বলে দিও যে, একটি ছাগল বাঘে খেয়ে ফেলেছে।”

রাখাল রাগান্বিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলোঃ “আল্লাহ কি দেখতে পাচ্ছেন না?”

ওমর চুপ করে রইলেন। রাখাল তার দিকে রাগত চোখে তাকিয়ে গরগর করতে করতে ছাগল হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল।

পরদিন সকালে ওমর ঐ রাখালের মনিবের কাছে গেলেন এবং তাকে মনিবের কাছ হতে কিনে নিয়ে স্বাধীন করে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ “ওহে যুবক! কালকে তুমি আল্লাহর সম্পর্কে যে কথাটি বলেছিলে, তা আজ তোমার দুনিয়ার গোলামী চুকিয়ে দিল। আমি আশা করি তোমার এই খোদাভীতি তোমাকে কেয়ামতের দিন দোজখের আজাব থেকেও মুক্তি দিবে।”

শিক্ষাঃ তাকওয়া ও সততা যত তুচ্ছ ও নগন্য মানুষের মধ্যেই পাওয়া যাক, তাকে উপযুক্ত মর্যাদা দিতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সৎ ও খোদাভীরু।

৪৯। প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর পথে দান করা

বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, সূরা আল ইমরানের “তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ তোমরা যা ভালোবাস তা দান না কর” এই আয়াত নাযিল হলে সাহাবীগণের মধ্যে এ নিয়ে চিন্তাভাবনা ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় যে, তার সম্পত্তির মধ্যে কোন জিনিসটি বেশি প্রিয় এবং তা কত দ্রুত রাসূল(সা) এর কাছে গিয়ে দান করা যায়।

মদীনার আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ছিলেন আবু তালহা(রা)। মসজিদে নববীর বিপরীত দিকে তার একটি বাগানে “বীরহা” নামে একটি কুয়া ছিল। ক্রমে ঐ কুয়ার নামানুসারে তার বাগানটিও “বীরহা” নামে পরিচিত হয়। রাসূল(সা) মাঝে মাঝে এই বাগানে আসতেন এবং এই কুয়ার পানি খেতেন। এই কুয়ার পানি তার কাছ খুবই প্রিয় ছিল। আবু তালহারও এই কূপসহ বাগানটি অত্যন্ত মূল্যবান, উর্বর ও সর্বাপেক্ষা প্রিয় সম্পদ ছিল। উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর তিনি রাসূল(সা) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন যে, “ আমার সমস্ত বিষয় সম্পত্তির মধ্যে বীরহা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তাই এটি আমি আল্লাহর পথে ব্যয় করতে চাই। আপনি যে কাজে ভালো মনে করেন এটি ব্যয় করুন।”

রাসূল(সা) বললেনঃ “এত বড় বাগান, আমার মতে তুমি নিজের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বন্টন করে দিলেই ভালো হবে।” হযরত আবু তালহা এই উপদেশ অনুসারে বাগানটি স্বীয় আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।

ওদিকে হযরত যায়েদ বিন হারিসা তার আরোহনের প্রিয় ঘোড়াটিকে নিয়ে রাসূল(সা) এর কাছে হাজির হলেন এবং তা আল্লাহর পথে দান করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। রাসূল(সা) ঘোড়াটি তার কাছ হতে নিয়ে তারই ছেলে উসমানকে দান করলেন। হযরত যায়েদকে এতে কিছুটা দ্বিধান্বিত দেখে তাকে এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে, তোমার দান গৃহীত হয়েছে।

শিক্ষাঃ এই দুটি ঘটনা থেকে জানা গেল যে আল্লাহর পথে দান করার অর্থ শুধু ফকীর মিসকীনকে এবং ইসলামের পথে জিহাদরত ব্যক্তি বা সংস্থাকে দান করা নয়, বরং পরিবার পরিজন ও দরিদ্র আত্মীয় স্বজনকে দান করাও আল্লাহর পথে দানের শামিল এবং বিরাট সওয়াবের কাজ।

৫০। একটি নাকের মূল্য

সিরিয়া হতে পরাজিত ও বিতাড়িত রোমক সৈন্যরা তাদের তৎকালীন শক্ত ঘাঁটি মিশরের রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে অবস্থান নেয়। মুসলমানদের অগ্রাভিযান রুখে দেওয়ার জন্য তারা এখানে তাদের সকল শক্তি কেন্দ্রীভূত করে। কিন্তু অদম্য সাহাসী মুসলিম সেনাপতি হজরত আমর ইবনে আ’স (রা) এখানেও তাদের সম্মিলিত শক্তি গুড়িয়ে দেন এবং অধিকৃত শহরের শাসনভারের দায়িত্ব নিজের হাতে নেন। তিনি সেখানকার খৃস্টান প্রজাদেরকে তাদের যাবতীয় ধর্মীয় কর্মকান্ডে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।

একদিন সকালবেলা আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিষ্টান পল্লীতে হইচই পড়ে গেল। সবাই দেখা গেল বাজারে জটলা হয়ে আছে। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছে। সেখান থেকে খ্রিস্টানদের স্থানীয় আর্চবিশপ আমর ইবনে আ’স এর বাসভবনে গেলেন বাজারের ঘটনা সল্ভ করার জন্য। তাঁর সাথে আরও অনেকেই গেলেন।

সেখানে গিয়ে বিশপ জানালেন, কেউ একজন বাজারের যিশু খ্রিষ্টের মার্বেলের মূর্তির নাক গত রাতে ভেঙে ফেলেছে। এ মূর্তিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের জন্য। খ্রিষ্টানরা ধরে নিয়েছে যে এটা মুসলমানদের কাজ। তারা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।

আমর ইবেন আ’স এ কথা শুনে অত্যন্ত দু:খিত হলেন। তিনি বললেন, “আমি খুবই লজ্জিত, ব্যথিত। সত্যি কথা, ইসলামে মূর্তিপূজা জায়েজ না। কিন্তু, অন্য ধর্মের উপাস্যকে গালি দেয়া পর্যন্তও হারাম। প্লিজ, আপনি মূর্তিটা পুননির্মাণ করে নিন। আমি পূর্ণ খরচ দেব।”

কিন্তু বিশপ বললেন, “এ মূর্তি রিপেয়ার করা যাবে না।”

আ’স বললেন, “তবে নতুন করে বানান। আমি খরচ দেব।”

“না, সেটাও হবে না। আপনি জানেন, যীশু ঈশ্বরপুত্র। তাঁর মূর্তির এমন অবমাননা সহ্য করা যায় না। একটাই ক্ষতিপূরণ, আমরা আপনাদের মুহাম্মাদ (স) এর মূর্তি বানিয়ে সেটার নাক ভাঙব।”

রাগে জ্বলে গেল আ’স এর গা। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে খ্রিষ্টান বিশপকে বললেন, “আপনি যা বললেন সেটা সম্ভব না। আমাদের সম্পদ, পরিবারের চেয়েও মুহাম্মাদ (স)কে বেশি ভালবাসি। আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যেকোনো প্রস্তাব করুন আমি রাজি আছি। আমাদের যেকোনো একজনের নাক কেটে আমি আপনাদের দিতে প্রস্তুত, যার নাক আপনারা চান।”

খ্রিষ্টান নেতারা সবাই এ প্রস্তাবে সম্মত হলো।

পরদিন খ্রিষ্টান ও মুসলমান বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হলো। মিসরের শাসক সেনাপতি আমর রা: সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বললেন, “এ দেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের, তাতে আমার শাসনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। তাই এই তরবারি গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাক কেটে দিন।”

এ কথা বলেই বিশপকে একখানি ধারালো তরবারি হাতে দিলেন, বিশপ সেটা পরীক্ষা করলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রিষ্টানরা স্তম্ভিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সে নীরবতায় নি:শ্বাসের শব্দ করতেও যেন ভয় হয়।

হঠাৎ সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মুসলিম সৈন্য এগিয়ে এলো। চিৎকার করে বলল, “আমিই দোষী, সেনাপতির কোনো অপরাধ নেই। আমিই মূর্তির নাক ভেঙেছি। এইত, আমার হাতেই আছে সে নাক। তবে মূর্তি ভাঙার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। মূর্তির মাথায় বসা একটি পাখির দিকে তীর নিক্ষেপ করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

সৈন্যটি এগিয়ে এসে বিশপের তরবারির নিচে নাক পেতে দিল। স্তম্ভিত বিশপ! নির্বাক সবাই। বিশপের অন্তরাত্মা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।

তরবারি ছুড়ে বিশপ বললেন, “ধন্য সেনাপতি, ধন্য হে বীর সৈনিক, আর ধন্য আপনাদের মুহাম্মদ (সা:), যার মহান আদর্শে আপনাদের মতো মহৎ উদার নির্ভীক ও শক্তিমান ব্যক্তি গড়ে উঠেছে। যীশু খ্রিষ্টের প্রতিমূর্তিই অসম্মান করা হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়েও অন্যায় হবে যদি অঙ্গহানি করি।”

শিক্ষাঃ ইসলাম যে বিজয়ী অবস্থায় ও অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণ করে, এ ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ভারতবর্ষে আটশত বছর এবং স্পেনে আটশ বছর ইসলাম শাসন চালু ছিল। অথচ ইসলামী শাসনের পতনের পর এই দুটি দেশে অমুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বহাল রয়েছে। এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম শাসকরা অমুসলিমদের ওপর দমননীতি চালিয়ে নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করার কোন চেষ্টা করে নি। করলে এত দীর্ঘকাল পরেও অমুসলিমদের অস্তিত্ব থাকতো না।

৫১ পশুপাখির প্রতি দয়া মুমিনের কর্তব্য

একবার একটি উট রাসূলুল্লাহ(সা) এর সামনে এসে নিজস্ব ভাব ভঙ্গিতে কি যেন বলল। তিনি তখন তাকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তোমার অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তো ভালই, আর যদি মিথ্যা হয় তবে এর পরিণাম তোমাকে ভোগ করতে হবে। আমার দায়িত্ব মজলুমকে আশ্রয় দেয়া। তাই তোমার নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছি। এই ঘটনার বর্ণনাকারী হযরত তামীম দারি(রা) বলেন, উটের সাথে নবীজির বাক্যালাপের কিছুই বুঝতে না পারায় আমরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে হুজুর(সা) বললেনঃ এই উটের মালিক দীর্ঘদিন এর শ্রম নিয়েছে, বিভিন্ন কাজে খাটিয়েছে। এখন বৃদ্ধ হয়ে পড়ায় শ্রম দিতে পারে না-এ অভিযোগে তাকে জবাই করতে চায়। জবাই হওয়ার ভয়ে উটটি আমার নিকট পালিয়ে এসেছে।ইতিমধ্যে উটের মালিক সেখানে আসলো। নবীজি তাকে বললেনঃ তোমার বিরুদ্ধে এক জঘন্য নালিশ করেছে। সে জানতে চাইল কে তার বিরুদ্ধে কি নালিশ করেছে। তিনি তখন বললেনঃ এই উট দীর্ঘদিন তোমার সেবা করেছে। তুমি নাকি তাকে এখন জবাই করতে ফেলতে চাও? সে বললোঃ এটা এখন আর কোন রকম শ্রম দেয়ার উপযুক্ত নয়, কাজেই জবাই ছাড়া কি আর করা যায়! হুজুর(সা) বললেনঃ জীবন-যৌবন, শক্তি সামর্থ্য দিয়ে সে এতদিন তোমার সেবা করেছে, আর এখন জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় তুমি তাকে জবাই করতে চাও। তোমার কর্তব্য তার প্রতি সদয় হওয়া। জবাই হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে তোমার প্রতি করুণ আকুতি জানিয়েছে। কিন্তু সেদিকে কর্ণপাত করো নি, তার আত্মার ফরিয়াদ তুমি বুঝতে পার নি। এহেন অবস্থায় তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা আমার নৈতিক দায়িত্ব। এই বলে তিনি মালিকের কাছ হতে একশ’ মুদ্রায় উটটি কিনে নিলেন আর উটকে লক্ষ্য করে বললেনঃ আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে সকল প্রকার ভয়ভীতি ও অধীনতা হতে মুক্ত করে দিলাম। (নুজহাতুল মাজালেশ)।

 এক হাদীসে আছেঃ একদা একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে কুয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল। ঘটনাক্রমে এক দেহপসারিনী পাপীয়সী সেখানে আসলো। কুকুরটি কাতরতা দেখে তার মনে দয়া হলো। সে তার ওড়নার আঁচল ভিজিয়ে কয়েকবার পানি তুলে নিংড়িয়ে কুকুরটিকে পান করিয়ে তার পিপাসা মিটলো। এতে খুশি হয়ে আল্লাহ তা’য়ালা মহিলাটির গত জীবনের সমস্ত ব্যভিচার অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। (বুখারী, মুসলিম)।

৫২ খোদাভীরু সাহাবীর অলৌকিকভাবে জীবন রক্ষা

 রাত গভীর হয়ে গেছে। ঘুট ঘুটে অন্ধকারে আচ্ছন্ন মক্কার অলিগলি। ঘুমন্ত নগরীর নিস্তব্ধ পরিবেশে অতি সন্তর্পণে পা রাখলেন মুরছাদ ইবনে আবি মুরছাদ। কাফেররা যে সব মুসলমানকে আটক রেখেছিল এবং অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছিল, তাদের কয়েকজনকে গোপনে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি এসেছিলেন। রাসূল(সা) তাকে এই কাজে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি অতি সাবধানে যাচ্ছিলেন। সহসা সামনে একটা ছায়া দেখতে পেলেন। মুরছাদ ভয়ে জড়সড় হয়ে আসলেন। ছায়াটা আরো নিকটে এল। অতঃপর ছায়াটা থেকে পরিচিত এক নারী কন্ঠ ভেসে এলঃ

“মুরছাদ! তুমি? আমি চিনে ফেলেছি। কেমন আছ? কিভাবে এলে?”

“কে উনাক নাকি?” প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মুরছাদ।

“হ্যাঁ, আমি উনাক। তোমার প্রাণপ্রিয় উনাক। একদিন যাকে ছাড়া তোমার দু’দন্ডও চলতো না। এত রাতে কোথায় যাবে তুমি? চল, আমাদের বাড়ীতে। মনে আছে না অতীতের সেই দিনগুলির কথা?” বলতে বলতে মুরছাদের হাত ধরে টানতে লাগলো মুরছাদের জাহেলী যুগের প্রেমিকা ও বাল্য সংগিণী।

 মুরছাদ এক ঝটকায় হাত সরিয়ে এমন ভঙ্গিতে দূরে সরে গেলেন যেন তার হাত কোন বিষধর সাপে পেঁচিয়ে ধরেছিল।

“কী হলো? পাগল টাগল হয়ে গেছ নাকি? এ হাত একদিন তোমার কত প্রিয় ছিল, তা কি ভুলে গেলে?” উনাক বিস্ময়জড়িত কন্ঠে বললো।

“থামো উনাক। অতীতের কথা ভুলে যাও। ওটা ছিল আমার জীবনের অন্ধকার যুগ। সে সময় আমি সত্য মিথ্যা, ন্যায় অন্যায় এবং পাক নাপাকির কোন বাছবিচার করতাম না। আমি গোমরাহ ও বিপথগামী ছিলেন। আল্লাহ আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। আমি মুসলমান হয়েছি। কিন্তু তুমি এখনো মোশরেক। তা ছাড়া তুমি আমার জন্য পরস্ত্রী। পরস্ত্রীর সাথে মেলামেশা ইসলামে হারাম। কাজেই আমাকে মাফ কর। তোমার বাড়ীতে আমি যাবো না।” মুরছাদ দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বললেন।

“কত বড় আমার সাধু পুরুষগো। আমার সাথে যাবে, না চিৎকার দিয়ে সবাইকে জড় করবো?” উনাক বললো।

“মুরছাদ পবিত্র জীবন ছেড়ে অপবিত্রতার পথ আর মাড়াবে না। জাহেলী যুগের সব কিছু আমি পা দিয়ে পিষে ফেলেছি। যাও, তোমার কাজে তুমি যাও।” মুরছাদ অবিচল কন্ঠে জবাব দিল।

“আমার কাজে আমি চলে যাই, আর তুমি ধর্মচ্যূতদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাও, তাই না?” ক্রুদ্ধ সর্পিনীর মত ফুঁসতে ফুঁসতে বললো উনাক। তারপর আকাশ বাতাস ফাটিয়ে চিৎকার করে “ওহে মক্কাবাসী, এই দেখ মুরছাদ এসেছে, তোমাদের বন্দীদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাবে।”

আর যায় কোথায়! সদ্য ঘুমিয়ে পড়া মক্কাবাসী জেগে উঠলো এবং যেদিক থেকে আওয়ায আসছিল, সেই দিকে দলে দলে ছুটলো।

মুরছাদ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে একটা পাহাড়ের গর্তে আত্মগোপন করলেন। কিছু লোক ঐ গর্তের দিকে ধেয়ে গেল। মুরছাদের ধরা পড়ে যাওয়া প্রায় অবধারিত ছিল। সহসা অনেক দূর হতে এক রহস্যময় আওয়ায ভেসে এলঃ “ওদিকে নয়, এদিকে।”

এরপর মুরছাদ শুনতে পেলেন পায়ের আওয়াযগুলো ক্রমে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তার সৎ ও পরহেজগার বান্দাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেছিলেন।

শিক্ষাঃ  পবিত্র কুরআনের সূরা তালাকের একটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে অন্যান্য কাজ হতে বিরত থাকবে, আল্লাহ তাকে সংকট থেকে কোন না কোন উপায়ে উদ্ধার করবেন এবং তাকে অকল্পনীয়ভাবে জীবিকা সরবরাহ করবেন।” আলোচ্য ঘটনা এই আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এমন অলৌকিকভাবে বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়া সবার ভাগ্যে নাও জুটতে পারে, কিন্তু প্রতিদান আখিরাতে অবশ্যই পাওয়া যাবে এই বিশ্বাসে অবিচল থেকে তাকওয়া ও পরহেজগারী সর্বাবস্থায় বজায় রাখা কর্তব্য।

৫৩ ওমর ইবনে আবুদল আযীযের ন্যায়বিচার

 হযরত ওমর ইবনে আবুদল আযীয় খলীফা হবার পর সমরখন্দের এক প্রতিনিধি দল এসে অভিযোগ করলো যে, সেখানকার মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক এলাকার একটি শহর অতর্কিতে দখল করে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে জোরপূর্বক মুসলমানদের বসতি গড়ে দিয়েছেন। হযরত ওমর বিন আবদুল আযীয সমরকন্দের গভর্নরকে প্রকৃত ঘটনা কি, তার তদন্ত করার নির্দেশ দিলেন। তিনি লিখলেন যে, একজন বিচারক দ্বারা তদন্ত করতে হবে। বিচারক যদি বলেন যে, সেখান হতে মুসলমানদের বেরিয়ে যাওয়া উচিত, তাহলে তৎক্ষণাত শহর খালি করে দিতে হবে।

নির্দেশ মোতাবেক একজন মুসলিম বিচারক তদন্ত করে রায় দিলেন যে, মুসলমানদের শহর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। কেননা প্রথমে তাদের শহরবাসীকে সতর্ক করা উচিত ছিল যে এবং ইসলামের সমর বিধি অনুসারে সকল চুক্তি বাতিল করা উচিত ছিল, যাতে তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে পারে। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করা উচিত হয় নি।

সমরকন্দবাসী এ রায় শুনে নিশ্চিত হলো যে, ইসলামী সরকার ইনসাফ ও ন্যায়বিচারে অতুলনীয়। এ ধরনের লোকদের সাথে যুদ্ধ করা নিরর্থক এবং এদের শাসন আল্লাহর করুণা স্বরূপ। তাই তারা তাদের এলাকায় মুসলমানদের আবাসন সানন্দে মেনে নিল।

শিক্ষাঃ সুবিচার ও ন্যায় নীতিতে অবিচল থাকার মাধ্যমে মুসলমানরা যে কোন স্থানে অমুসলিমদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। অমুসলিমদের সাথে উত্তম সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে সব সময়ই জরুরী।

৫৪ বায়তুল মাকদাস বিজয়ী প্রথম বীর হযরত ইউশা ইবনে নূনের কাহিনী

হযরত মূসা(আ) বনী ইসরাঈলকে সাথে নিয়ে অলৌকিক উপায়ে লোহিত সাগর পেরিয়ে এক মরুভূমিতে অবস্থান করতে থাকেন। এই সময় আল্লাহ তায়ালা বেহেশত হতে মান্না এবং সালওয়া নামক খাবার পাঠিয়ে এবং আকাশ হতে মেঘের ছায়া দিয়ে তাদের জীবন যাপনের সুব্যবস্থা করেন। ইত্যবসরে আল্লাহর নির্দেশক্রমে মূসা(আ) বনী ইসরাঈলীদেরকে বলেন, “আল্লাহ একটি সুজলা সুফলা নয়নাভিরাম পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন তোমাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তোমরা সেখানে গিয়ে বসবাস করতে থাক।” এই সময়ে ফিলিস্তিন ছিল আমালেকা নামক বিশালদেহী একটি জাতির দখলে। বনী ইসরাঈলীরা লোকমুখে তাদের বিবরণ শুনেছিল। তারা জবাব দিল, “হে মূসা! ঐ দেশে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জাতি বাস করে। তাদেরকে লড়াই এর মাধ্যমে পরাজিত করে বহিষ্কার করা ছাড়া আমরা সেখানে প্রবেশ করতে পারবো না। কিন্তু তাদের সাথে আমরা লড়াই করতে অক্ষম।”

হযরত মূসা(আ) এ কথা শুনে তাঁর বিশ্বস্ত সাহাবী হযরত ইউশা ইবনে নূনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ফিলিস্তিনে পাঠালেন সেখানকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য। প্রতিনিধি দলটি ফিরে আসার পর হযরত মূসা(আ) কে জানালো যে, ঐ লোকগুলি দেখতেই শুধু বিশালদেহী, কিন্তু তেমন সাহসী ও লড়াকু নয়। বনী ইসরাঈলীরা একযোগে আক্রমণ করলে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে।

এবার হযরত মূসা(আ) বনী ইসরাঈলীদেরকে একত্রিত করে এক জ্বালামীয় ভাষণ দিয়ে তাদেরকে ফিলিস্তিনে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা বললো, “ঐ শক্তিমান জাতিটি যতক্ষণ ওখানে আছে, ততক্ষণ আমরা যাবো না। যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে আমরা যাবো।”

এই সময় হযরত ইউশা ইবনে নূন ও হযরত মূসার(আ) ভগ্নিপতি কালেব তাদেরকে অনেক বুঝালেন যে, “তোমরা ভয় পেয়না। আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে চল। তোমরা ঐ দেশটির সীমান্তে পৌঁছামাত্রই ওরা চলে যাবে এবং তোমরা বিজয়ী হবে।”

বনী ইসরাঈল বললো, “হে মূসা! ওরা থাকতে আমরা যাবো না। বরঞ্চ তুমি ও তোমার খোদা গিয়ে লড়াই করে ওদের তাড়িয়ে দিয়ে এস। আমরা ততক্ষণ এখানেই বসে থাকবো।”

এবার মূসা(আ) আল্লাহর কাছে নিবেদন করলেন, “হে আল্লাহ, আমি কেবল আমার ও আমার ভাই এর দায়িত্ব নিতে পারি। তুমি আমার সাথে আমার এ অবাধ্য জাতির সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও।”

আল্লাহ বললেন ‘এদেশটি (বায়তুল মুক্বাদ্দাস সহ শামদেশ) চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ করাহল। এ সময় তারা ভূপৃষ্ঠে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরবে। অতএব তুমি অবাধ্য কওমের জন্য দুঃখ করো না।‘ মায়েদাহ ৫/২৬।

এরপর বনী ইসরাঈল চল্লিশ বছর ধরে মরুভূমিতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এই সময়ে মিশর হতে বেরিয়ে আসা বংশধরটি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পরবর্তী বংশধরের লোকেরা পূর্ববর্তীদের পরিণতি হতে শিক্ষা নিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়। চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আ) ও হযরত হারূন(আ) কে নির্দেশ দিলেন যে বনী ইসরাঈলের বারটি গোত্রকে বারোজন সেনাপতির নেতৃত্বে বারোটি সেনাদলে বিভক্ত করে ফিলিস্তিনে পাঠাও। তদনুসারে হযরত মূসা(আ) হযরত ইয়াকূবের(আ) ১২ জন পুত্রের নামে ১২ টি সেনাদল গঠন করে।

বনী ইসরাঈলের এই সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হযরত ইউশা ইবনে নূন। এই বাহিনীর যাত্রার পূর্বেই হযরত মূসা(আ) ও হারূন (আ) একে একে ইন্তিকাল করেন। অতঃপর গোটা বনী ইসরাঈল জাতির সার্বিক নেতৃত্ব দেন হযরত মূসা(আ) এর প্রথম খলীফা হযরত ইউশা ইবনে নূন এবং তাঁর নেতৃত্বে ফিলিস্তিন বিজিত হয়। অতঃপর বাইতুল মাকদাসকে রাজধানী করে ফিলিস্তেনের অধিবাসীদেরকে হযরত ইউশা আল্লাহর কিতাব তাওরাত অনুসারে ২৭ বছর শাসন করেন। তিনি ১২৭ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন বলে বর্ণিত আছে।

শিক্ষাঃ জেহাদ থেকে পিছপা হওয়া অত্যন্ত মারাত্মক পরিণাম ডেকে আনে। পক্ষান্তরে ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে জেহাদে অবতীর্ণ হলে প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহ বিজয় লাভে সাহায্য করেন। 

৫৫ হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইরের পরহেজগারী ও কৃতজ্ঞতা

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর(রা) একবার উমাইয়া বংশীয় বাদশাহ আবুদল মালেকের সাথে দেখা করতে যান। তাঁর সাথে ছিল তাঁর ছেলে। ছেলের আব্দারক্রমে তাঁরা শাহী আস্তাবল দেখতে গেলেন। ছেলেটি কৌতুহলবশতঃ একটা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলে ঘোড়া তাকে এমন জোরে ফেলে দিল যে, সে ঘটনাস্থলেই মারা গেল। উরওয়া বাদশার দরবার হতে ক্ষুন্ন মনে বাড়ী চলে গেলেন। কয়েকদিন পর তার পায়ে এমন এক মারাত্মক ফোঁড়া হলো যে, চিকিৎসকরা তাঁর পা কেটে ফেলার পরামর্শ দিল। নচেৎ সমস্ত দেহ তা দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে।

হযরত উরওয়া পা এগিয়ে দিলেন কাটার জন্য। ডাক্তার বললো, “সামান্য মদ খেয়ে নিন যাতে অস্ত্রোপচারের কষ্ট কম অনুভূত হয়।” হযরত উরওয়া বললেন, “আমি কোন অবস্থাতেই কোন হারাম জিনিসের সাহায্য নেব না।”

চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করে পা কেটে দিল। হযরত উরওয়া শান্তভাবে বসে দোয়া দরূদ পড়তে লাগলেন। যখন রক্ত বন্ধ করার জন্য ক্ষতস্থানে লোহা পুড়িয়ে দাগানো হলো, তখন যন্ত্রণার তীব্রতা সইতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে গেলেন। হুঁশ ফিরে এলে কাটা পা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলতে লাগলেনঃ

“ওহে পা, যে আল্লাহ তোমাকে আমার বোঝা বহন করার জন্য সৃষ্টি করেছেন, তিনি ভালো করেই জানেন যে, আমি তোমার সাহায্যে হেঁটে কোন হারাম কাজ করতে যাই নি। হে আল্লাহ, তোমার শোকর যে, আমার চার হাত পার মধ্যে মাত্র একখানা তুমি নিয়েছ এবং বাকী তিনখানা অক্ষত রেখেছ; আর চার ছেলের মধ্যে মাত্র একজনকে নিয়েছ এবং তিনজনকে জীবিত রেখেছ। তুমি যদি কিছু কেড়েও নিয়ে থাক, তবে অনেক কিছু অবশিষ্টও রেখেছ। কিছুদিন যদি কষ্টও দিয়ে থাক, তবে অনেকদিন সুখ শান্তিও দিয়েছ।”

৫৬ ইমাম আবু হানিফার মহানুভবতা

ইমাম আবু হানিফার পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে একজন দিনমজুর বাস করতো। দিনের বেলায় সে নিজের কুঁড়েঘরে বসে নানা রকম কুটির শিল্পের কাজ করতো। অশালীন গান গাইতো ও প্রলাপ বকতো। তার হৈ চৈ তে ইমাম সাহেব এর গভীর রাতের নামায, যিকির ও চিন্তা গবেষণা পর্যন্ত ব্যাহত হতো। তিনি তাকে ঐ বদঅভ্যাস ত্যাগ করার জন্য প্রায়ই অত্যন্ত মিষ্ট ভাষায় উপদেশ দিতেন। কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করতো না। ইমাম অগত্যা নীরবে সবকিছু সহ্য করতেন।

একদিন রাত্রে তিনি লক্ষ্য করলেন যে, ঐ লোকটির কুড়েঘর হতে কোন হৈ চৈ এর আওয়াজ আসছে না। তিনি আজ নির্বিঘ্নে এবাদত জিকির ও চিন্তা গবেষণা চালালেন বটে, কিন্তু তাঁর মন অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো।

ভোরবেলা ইমাম সাহেব তার খোঁজ খবর নিতে গেলেন। তিনি শুনতে পেলেন যে, পুলিশ ঐ মাতাল লোকটিকে ধরে নিয়ে জেলে আটক করেছে।

তৎকালে বাগদাদের সিংহাসনে আসীন ছিলেন উমাইয়া বংশীয় বাদশাহ মানসুর্। ইমাম সাহেব বাদশাহর দরবার কঠোরভাবে এড়িয়ে চলতেন। বাদশাহ নিজেই ইমাম সাহেব এর সাথে কখনো কখনো দেখা করে যেতেন। কিন্তু আজ ইমাম সাহেব তাঁর দরিদ্র প্রতিবেশীর বিপদে অধীর হয়ে বাদশাহর দরবারে চলে গেলেন।

বাদশাহ ও তাঁর আমীর ওমরাহগণ ইমাম সাহেবকে দরবারে আসতে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তারা পরম শ্রদ্ধা সহকারে তাঁকে বসালেন।

তিনি বললেন, “মহামান্য বাদশাহ, আপনার লোকেরা আমার এক প্রতিবেশীকে ধরে এনে জেলে পুরেছে। আমি তার মুক্তি চাইতে এসেছি।”

বাদশাহ এক মুহুর্ত ভেবে জবাব দিলেন, “মান্যবর ইমাম সাহেব, আপনি আজ আমার দরবারে উপস্থিত হয়ে আমাকে যে ধন্য করলেন, সেই আনন্দে ও আপনার সম্মানের খাতিরে আপনার প্রতিবেশীসহ জেলের সকল কয়েদীকে মুক্তি দিলাম।” ইমাম সাহেব তার প্রতিবেশীকে নিয়ে বাড়ীতে ফিরলেন। দিনমজুর এরপর আর মদ স্পর্শ করে নি।

৫৭ ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক

একবার খলিফা হারুনুর রশীদের নিকট এক নাস্তিক এসে বললেন যে আপনার সাম্রাজ্যে এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে ডাকুন আমি তাকে তর্ক করে প্রমান করে দেব যে এই পৃথীবির কোন স্রস্টা নেই।এগুলো নিজে নিজে সৃস্টি হয়েছে এবং আপনা থেকেই চলে ।খলিফা হারুনুর রশীদের কিছুক্ষন ভেবে একটি চিরকুট মারাফত ইমাম আবু হানিফাকে ডাকলেন ও এই নাস্তিকের সাথে বিতর্কে অংশ নিতে অনুরোধ করলেন।

ইমাম আবু হানিফা দুত মারাফত খবর পাঠালেন যে তিনি আগামীকাল যোহরের সময় আসবেন খলিফার প্রাসাদে নামায পড়ে তারপর বির্তকে অংশ নেবেনপরদিন যোহরের নামাযের সময় খলিফা তার সভাসদ বর্গ ও নাস্তিক তি অপেক্ষা করতে লাগল।কিন্তু যোহরের নামায তো দুরের কথা আসর শেয় হয়ে গেল তিনি মাগরীবের নামাযের সময় আসলেন।নাস্তিকটি তার কাছে এত দেরীতে আসার কারন জনতে চাইল

তিনি বললেন আমি দজলা নদীর ওপারে বাস করি।আমি খলীফার দাওয়াত পেয়ে নদীতে এসে দেখি কোন নৌকা নেই।অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও কোন নৌকা পেলাম না। সহসা আমি দেখলাম একটি গাছ আপনা-আপনা উপরে পড়ল্তার পর সেটি চেরাই হয়ে নিজ থেকেই তক্তায় পরিনত হল।তারপরএটি নিজেনিজে একটি নৌকায় পরিনত হল।অত:পর আমি এটায় চড়ে বসলাম।নৌকাটি নিজে নিজে চলতে চলতে আমাকে এপারে পৌছিয়ে দিল।

 

নাস্তিকটি একথা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল।তাপর বলল ইমাম সাহেব আমাকে কি বোকা পেয়েছেন যে আমি এমন গাজাখুরি গল্প বিশ্বাস করব। একটা গাছ আপনা থেকে নৌকায় পরিনত হবে, এটা কি করে সম্ভব? ইমাম আবু হানিফা বললেন ওহে নাস্তিক সাহেব একটা গাছ যদি আপনা থেকে নৌকায় পরিনত না হতে পারে এবং নদী পরাপার না হতে পারে, তাহলে কিভাবে এই বিশাল আকাশ চন্দ্র সূর্য নক্ষত্র আপনা আপনি তৈরী হতে এবং চালু থাকতে পারে ??

নাস্তিকটি লা-জওয়াব হয়ে মুখ কাচুমাচু করে বিদায় নিল। খলিফা হারুনুর রশীদ তার তাৎক্ষনিক জবাবে মুগ্ধ হয়ে ইমাম সাহেব কে সসম্মানে বিদায় দিলেন। কোন তর্কে যাওয়ার আগেই নাস্তিকটি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে গেল।

শিক্ষাঃ নাস্তিক ও খোদাদ্রোহীদের কোন যুক্তি থাকে না। বিচক্ষণতা ও সাহস নিয়ে তাদের মোকাবিলা করলেই তারা পরাজিত হতে বাধ্য। তবে এ যুগের নাস্তিক ও খোদাদ্রোহীরা যুক্তির অভাবে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য মুসলমানদেরকে মাথা ঠান্ডা রেখে সুপরিকল্পিতভাবে শক্তি অর্জন করে জেহাদের জন্য প্রস্ততি নিতে হবে।

৫৮ কে বেশি দানশীল

একবার এক প্রখ্যাত দানশীল সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে জাফর নিজের একটা জমি দেখতে গেলেন। সেখানে একটি গোত্রের খেজুর গাছের ছায়ায় বসলেন এবং একজন নিগ্রো ক্রীতদাসকে দেখতে পেলেন। সে বাগানটি পাহারা দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সে খাওয়ার জন্য তিনটি রুটি বের করলো। সে রুটি খাওয়া শুরু করার আগেই একটা কুকুর এসে তাঁর কাছে ঘেঁসে বসলো। ক্রীতদাসটি একটি রুটি কুকুরকে দিল। কুকুর তা খেয়ে ফেললো। সে তাকে আরো একটি দিল। কুকুর তাও খেয়ে ফেললো। অতঃপর সে তৃতীয় রুটিটিও দিল এবং এক নিমিষেই কুকুর তাও খেয়ে ফেললো। আবদুল্লাহ তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন।

আবদুল্লাহ বললেনঃ তুমি প্রতিদিন কয়টি রুটি খাও?

ক্রীতদাস বললোঃ তিনটি।

আবদুল্লাহ বললেনঃ তুমি নিজে না খেয়ে সব ক’টা রুটি কুকুরকে দিয়ে দিলে কেন?

ক্রীতদাস বললোঃ এ অঞ্চলে কোন কুকুর নেই। এ কুকুরটা নিশ্চয়ই অনেকদূর থেকে এসেছে এবং নিশ্চয়ই সে ক্ষুধার্ত। তাই তাকে ফিরিয়ে দেয়া পছন্দ করি নি।

আবদুল্লাহ বললেনঃ আজ তুমি কী খাবে?

ক্রীতদাসঃ আজ আমি উপোষ করবো।

আবদুল্লাহ ইবনে জাফর মনে মনে বললেন, এতো আমার চেয়েও দানশীল। অতঃপর ঐ খেজুরের বাগান এবং ক্রীতদাসকে কিনে নিলেন এবং ক্রীতদাসকে স্বাধীন করে বাগানটি তাকে উপহার দিলেন।

৫৯ একজন আরব শেখের মহানুভবতা

তখন স্পেনে মুসলিম শাসন চলছে। আমীর আবদুর রহমান স্পেনের শাসনকর্তা। জনৈক আরব শেখ কর্ডোভার এক গোত্রের সরদার ছিলেন। তার বিপুল ধনসম্পদ ও জমিজমা ছিল।

একদিন তিনি নিজ বাগানে পায়চারী করে বেড়াচ্ছেন। এই সময় জনৈক স্পেনীয় যুবক আকস্মিকভাবে তার বাগানে ঢুকলো এবং তার পায়ে পড়ে জীবনের নিরাপত্তা চাইল।

শেখ তাকে টেনে তুললেন এবং কারণ জানতে চাইলেন। যুবক বললো, “মহানুভব শেখ, পথিমধ্যে এক যুবকের সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। আমি ক্রোধে দিশাহারা হয়ে তার মাথায় একটা আঘাত করলাম। যুবকটি তৎক্ষনাত মারা গেল। তার সঙ্গীরা আমাকে ধাওয়া করেছে। আমি জীবনের নিরাপত্তার জন্য পালাচ্ছিলাম। আপনার দরজাটা খোলা দেখে ঢুকে পড়েছি। ঐ ওরা ধেয়ে আসছে। ওদের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। দোহাই আপনার, আমাকে প্রাণে বাঁচান।” এই কথা বলে যুবকটি পুণরায় শেখের পা জড়িয়ে ধরলো। সরদার এবারও তাকে টেনে তুললেন এবং বললেন, “তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। কেউ তোমার কিছু করবে না। এসো আমার সঙ্গে।” অতঃপর তিনি যুবকটিকে তার বাড়ীর একটি গোপন কক্ষে সবার অলক্ষ্যে তালা দিয়ে রাখলেন।

যুবককে নিরাপদ কক্ষে তালাবদ্ধ করে বাগানে ফিরে আসতেই তিনি দেখতে পান একটি অকল্পনীয় দৃশ্য। তারা এক সুন্দর সুঠামদেহী যুবকের সদ্য মৃত লাশ ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে। লাশ দেখে সরদার এক প্রচন্ড আর্তচিৎকার দিয়েই সটান হয়ে পড়ে গেলেন। কারণ যুবকটি ছিল তাঁরই একমাত্র পুত্র সন্তান। উত্তেজিত জনতার মধ্য হতে একজন বললো, “মান্যবর শেখ, একটা বখাটে স্পেনীয় যুবক এই হত্যাকান্ডটা ঘটিয়েছে। সে এই পর্যন্ত এসে উধাও হয়ে গিয়েছে। আমরা তাকে ধাওয়া করে এসেছিলাম। কিন্তু ধরতে পারলাম না।”

সরদার নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন যে, তাঁর আশ্রিত যুবকই তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তানকে হত্যা করেছে। জনতা তাঁর সমস্ত বাগান তন্নতন্ন করে খুঁজলো। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পেল না। অবশেষে তারা নিরাশ হয়ে শেখকে স্বান্তনা দিয়ে চলে গেল।

আশ্রিত যুবকটি তার কক্ষ হতে এসব কিছু দেখলো এবং শুনলো। সে উপলব্ধি করতে পারলো যে, তার মৃত্যু আসন্ন। সে তার গোপন কক্ষে চরম আতংকের মধ্যে সময় কাটাতে লাগলো।

লাশটি যথারীতি গোসল, কাফন ও জানাযা শেষে সমাহিত করা হলো। শেখের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। এই কান্না ও আহাজারীর মধ্য দিয়ে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেল কেউ জানে না।

সন্ধ্যা ক্রমশ গাঢ় হয়ে এলো। রাত গভীর হতে গভীরতর হলো। বাড়ীর লোকজন কান্নাকাটি করে ক্লান্ত হয়ে এক সময়ে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়লো। কিন্তু সরদারের চোখে ঘুম নেই। তিনি তার বিছানা থেকে উঠলেন, ধীর পায়ে অপরাধী যুবকের কক্ষের কাছে গেলেন এবং তার দরজার তালা খুলে দিলেন। তখন ভয়ে কম্পমান যুবককে লক্ষ্য করে তিনি বললেনঃ “তোমার ভয়ের কোন কারণ নেই। তুমি আমার মেহমান। মুসলমান প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না। এই নাও, এই পোটলায় তোমার পথে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার আছে। আর আস্তাবল হতে একটি ঘোড়া নিয়ে এখনি এখান হতে বিদায় হও। আমার ভয় হয়, কখন আবার শয়তানের কুপ্ররোচণায় বিদ্রোহী হয়ে তোমাকে হত্যা করে বসি।”

সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় অশ্রুভরা চোখে যুবক তাকালো শেখের দিকে। অতঃপর সালাম জানিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে দ্রুত চম্পট দিল।

৬০ দুঃসাহসী বীর বিশর বিন আমরের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

দশম হিজরীর কথা। কতিপয় সাহাবী রাসূল(সা) এর পাশে বসেছিলেন। সহসা বিশর বিন আমর আল জারূদের আবির্ভাবে রাসূল(সা) এর পবিত্র মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সাহাবীগণ এই বিশরের রহস্য নিয়ে কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। তারা কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই রাসূল(সা) পূর্বদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এখানে একটু পরেই উপস্থিত হবে সেই কাফেলা, যাতে শ্রেষ্ঠ প্রাচ্যবাসীদের সমাবেশ ঘটেছে।”

সাহাবীগণ পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। এই কাফেলার পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে তাদের সকলের মন আকুপাকু করছিল যে, তারা কোন্ গোত্র এবং কোন্ এলাকার লোক। কিন্তু লজ্জ্বায় কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না। তবে হযরত ওমর(রা) আর দেরী সইতে পারলেন না। তিনি নিজের ঘোড়ায় চড়ে দূর হতে যে কাফেলাটি ধূলা উড়িয়ে আসছে তা দেখতে এগিয়ে এলেন। একেবারে কাজে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনারা কোন্ গোত্রের লোক?

তাদের নেতা জবাব দিলেন, “বনু আবদিল কায়েস গোত্রের”।

হযরত ওমর(রা) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কেন এসেছেন? ব্যবসার জন্য?”

তারা বললো, না।

রাসূল(সা) এইমাত্র আপনাদের কথা উল্লেখ করেছেন এবং খুব ভালো বলেছেন।

অনতিবিলম্বে কাফেলা রাসূল(সা) এর সামনে উপনীত হলো। তিনি তাদেরকে মোবারকবাদ জানালেন, ইসলামী নিয়মে সালাম দিলেন এবং তাদের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করে বললেনঃ “আগন্তুক কাফেলাকে অভিনন্দন; সসম্মানে ও নিঃসঙ্কোচে আসুন।” কাফেলার নেতা ছিলেন আবু গিয়াস বিশর বিন আমর বিন আল মুয়াল্লা আল আবদী। তিনি বনু আব্দুল কায়েসের শাখা বনু আবসের প্রবীণতম নেতা, সরদার ও সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি। প্রতিপক্ষীয় এক গোত্রের ওপর আক্রমণ করে তাদেরকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কৃতিত্বের জন্য তারা তাকে জারুদ বা নিপাতকারী নামে আখ্যায়িত করে। তারা এসেছিলেন আরব সাগরের উপকূলবর্তী এলাকা হতে। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার খ্যাতি সমগ্র আরব উপকূলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

 জারুদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করলো, তিনি তার নিকট ইসলাম পেশ করলেন এবং তাকে ইসলাম প্রহণের দাওয়াত ও উপদেশ দিলেন। জারুদ বললো, “ইয়া রাসূলুল্লা। আমার একটা ধর্ম আছে। এখন আপনার ধর্ম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আমি নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে রাজী আছি। তবে নিজ ধর্ম ত্যাগ করায় আমার কোন ক্ষতি হবে না- আমাকে এ নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারেন কি?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যা, আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি ইসলাম গ্রহণের অর্থ দাঁড়াবে এই যে, আল্লাহ তোমার ধর্মের চেয়েও ভাল ধর্ম গ্রহণ করার সুযোগ দিলেন।”

এ কথা শুনে জারুদ ও তার সঙ্গীরা ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দেশে ফিরে যাওয়অর জন্য সওয়ারী [বাহন] প্রার্থনা করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারী প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। তখন জারুদ বললো, “ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের স্বদেশ গমনের পথে অনেক লাওয়ারিশ পথভ্রষ্ট উট পাওয়া যায়। সেগুলোতে চড়ে আমরা যেতে পারি কি?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “না,খবরদার। এগুলোতে আরোহণ করো না। ওগুলো দোযখে যাওয়ার বাহন হবে।”

অতঃপর জারুদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে বেরিয়ে স্বদেশ মুখে রওনা হলেন। তিনি মৃত্যুকাল পর্যন্ত ইসলামের ওপর অবিচল ছিলেন এবং খুবই ভালো মুসলমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর যখন কিছু লোক ইসলাম ত্যাগ করে, সে সময়ও তিনি বেঁচে ছিলেন।

তাঁর গোত্রের এক ব্যক্তি বলে উঠলোঃ “মুহাম্মদ(সা) যদি নবী হতেন, তাহলে মরতেন না।”

সঙ্গে সঙ্গে গোত্রের আরো অনেকে তাকে সমর্থন করলো এবং মুরতাদ হয়ে যেতে লাগলো।

জারুদ তাদের সবাইকে এক জায়গায় সমবেত করে বললেনঃ “হে বনু আবদুল কায়েস, আমি তোমাদের কাছে একটি কথা জিজ্ঞেস করছি। যদি তোমাদের জানা থাকে জবাব দিও, নচেত জবাব দিওনা।”

তারা বললোঃ “ঠিক আছে, জিজ্ঞেস করুন।”

জারুদ বললেন, “তোমরা কি জান যে, অতীতেও আল্লাহর বহু নবী এসেছেন?”

তারা বললোঃ শুনেছি।

জারুদঃ তারা এখন কোথায়?

তারা বললোঃ তারা মারা গেছেন।

জারুদঃ তারা যেমন মারা গেছেন, মুহাম্মদ(সা)ও তেমনি মারা গেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মদ(সা) আল্লাহর রাসূল। আমি হযরত আবু বকরের কথার পুনরাবৃত্তি করছি যে, মুহাম্মদ(সা) যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাতে কিছু যায় আসে না। আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।

এবার তাঁর গোত্রের লোকেরাও কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বললোঃ “আমরাও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল”।

এরপর হযরত জারুদের আর একটি সৌভাগ্য লাভ করা বাকী ছিল। সেটি হলো শাহাদাত। আল্লাহ তাঁর সে আশাও পূর্ণ করলেন। একুশ হিজরীতে হযরত ওমরের(রা) আমলে পারস্যে প্রেরিত একটি সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে লড়াই করতে করতে তিনি শহীদ হন।

৬১। হযরত জুলকিফল(আ) এর ক্রোধ সংবরণঃ

পূর্বতন নবী আল-ইয়াসা‘ বার্ধক্যে উপনীত হ’লে একজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি তার সকল সাথীকে একত্রিত করে বললেন, যার মধ্যে তিনটি গুণ বিদ্যমান থাকবে, তাকেই আমি আমার খলীফা নিযুক্ত করব। গুণ তিনটি এই যে, তিনি হবেন (১) সর্বদা ছিয়াম পালনকারী (২) আল্লাহর ইবাদতে রাত্রি জাগরণকারী এবং (৩) তিনি কোন অবস্থায় রাগান্বিত হন না।

এ ঘোষণা শোনার পর সমাবেশ স্থল থেকে ঈছ বিন ইসহাক্ব বংশের জনৈক ব্যক্তি উঠে দাঁড়ালেন। সে নবীর প্রতিটি প্রশ্নের জওয়াবে হাঁ বললেন। কিন্তু তিনি সম্ভবতঃ তাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তাই দ্বিতীয় দিন আবার সমাবেশ আহবান করলেন এবং সকলের সম্মুখে পূর্বোক্ত ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু সবাই চুপ রইল, কেবল ঐ একজন ব্যক্তিই উঠে দাঁড়ালেন। তখন আল-ইয়াসা‘ (আঃ) উক্ত ব্যক্তিকেই তাঁর খলীফা নিযুক্ত করলেন, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নবুঅতী মিশন চালিয়ে নিবেন এবং মৃত্যুর পরেও তা অব্যাহত রাখবেন। বলা বাহুল্য, উক্ত ব্যক্তিই হ’লেন ‘যুল-কিফল’ (দায়িত্ব বহনকারী), পরবর্তীতে আল্লাহ যাকে নবুঅত দানে ধন্য করেন (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)

‘যুল-কিফল’ উক্ত মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন দেখে ইবলীস হিংসায় জ্বলে উঠল। সে তার বাহিনীকে বলল, যেকোন মূল্যে তার পদস্খলন ঘটাতেই হবে। কিন্তু সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলল, আমরা ইতিপূর্বে বহুবার তাকে ধোঁকা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। অতএব আমাদের পক্ষে একাজ সম্ভব নয়। তখন ইবলীস স্বয়ং এ দায়িত্ব নিল।

যুল-কিফল সারা রাত্রি ছালাতের মধ্যে অতিবাহিত করার কারণে কেবলমাত্র দুপুরে কিছুক্ষণ নিদ্রা যেতেন। ইবলীস তাকে রাগানোর জন্য ঐ সময়টাকেই বেছে নিল। একদিন সে ঠিক দুপুরে তার নিদ্রার সময় এসে দরজার কড়া নাড়লো। কাঁচা ঘুম থেকে উঠে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? উত্তর এল, আমি একজন বৃদ্ধ মযলূম। তিনি দরজা খুলে দিলে সে ভিতরে এসে বসলো এবং তার উপরে যুলুমের দীর্ঘ ফিরিস্তি বর্ণনা শুরু করল। এভাবে দুপুরে নিদ্রার সময়টা পার করে দিল। যুল-কিফল তাকে বললেন, আমি যখন বাইরে যাব, তখন এসো। আমি তোমার উপরে যুলুমের বিচার করে দেব’।

যুল-কিফল বাইরে এলেন এবং আদালত কক্ষে বসে লোকটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু সে এলো না। পরের দিন সকালেও তিনি তার জন্য অপেক্ষা করলেন, কিন্তু সে এলো না। কিন্তু দুপুরে যখন তিনি কেবল নিদ্রা গেছেন, ঠিক তখনই এসে কড়া নাড়ল। তিনি উঠে দরজা খুলে দিয়ে তাকে বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, আদালত কক্ষে মজলিস বসার পর এসো। কিন্তু তুমি কালও আসনি, আজও সকালে আসলে না। তখন লোকটি ইনিয়ে-বিনিয়ে চোখের পানি ফেলে বিরাট কৈফিয়তের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি পেশ করল। সে বলল, হুযুর! আমার বিবাদী খুবই ধূর্ত প্রকৃতির লোক। আপনাকে আদালতে বসতে দেখলেই সে আমার প্রাপ্য পরিশোধ করবে বলে কথা দেয়। কিন্তু আপনি চলে গেলেই সে তা প্রত্যাহার করে নেয়’। এইসব কথাবার্তার মধ্যে ঐদিন দুপুরের ঘুম মাটি হ’ল।

তৃতীয় দিন দুপুরে তিনি ঢুলতে ঢুলতে পরিবারের সবাইকে বললেন, আমি ঘুমিয়ে গেলে কেউ যেন দরজার কড়া না নাড়ে। বৃদ্ধ এদিন এলো এবং কড়া নাড়তে চাইল। কিন্তু বাড়ীর লোকেরা তাকে বাধা দিল। তখন সে সবার অলক্ষ্যে জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং দরজায় ধাক্কা-ধাক্কি শুরু করল। এতে যুল-কিফলের ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখলেন সেই বৃদ্ধ ঘরের মধ্যে অথচ ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তিনি বুঝে ফেললেন যে, এটা শয়তান ছাড়া কেউ নয়। তখন তিনি বললেন, তুমি তাহ’লে আল্লাহর দুশমন ইবলীস? সে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি আজ আপনার কাছে ব্যর্থ হ’লাম। আপনাকে রাগানোর জন্যই গত তিনদিন যাবত আপনাকে ঘুমানোর সময় এসে জ্বালাতন করছি। কিন্তু আপনি রাগান্বিত হলেন না। ফলে আপনাকে আমার জালে আটকাতে পারলাম না। ইতিপূর্বে আমার শিষ্যরা বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আজ আমি ব্যর্থ হ’লাম। আমি চেয়েছিলাম, যাতে আল-ইয়াসা‘ নবীর সাথে আপনার কত ওয়াদা ভঙ্গ হয়। আর সে উদ্দেশ্যেই আমি এতসব কান্ড ঘটিয়েছি। কিন্তু অবশেষে আপনিই বিজয়ী হলেন’। (ইবনে কাছীর)।

উক্ত ঘটনার কারণেই তাঁকে ‘যুল-কিফল’ (ذو الكفل)। উপাধি দেওয়া হয়। যার অর্থ, দায়িত্ব পূর্ণকারী ব্যক্তি।

শিক্ষাঃ ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকতে সংকল্পবদ্ধ হলে শয়তানের কুপ্ররোচণা ও চক্রান্ত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

৬২ মুক্তির জন্য নিজের সৎলোক হওয়াই যথেষ্ট নয়

তাফসীরে বাহরে মুহীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউশা ইবনে নূনের নিকট একবার ওহী এল যে, তোমার জাতির এক লক্ষ লোককে আযাবের মাধ্যমে ধ্বংস করা হবে। এদের মধ্যে চল্লিশ হাজার সৎলোক এবং ষাট হাজার অসৎলোক। ইউশা(আ) বললেনঃ হে রাব্বুল আলামীন! অসৎ লোকদের ধ্বংস করার কারণ তো জানি, কিন্তু সৎলোকদেরকে কেন ধ্বংস করা হবে। জবাব এলঃ এই সৎ লোকগুলিও অসৎলোকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতো। তাদের সাথে পানাহার, উঠাবসা ও হাসি তামাসায় যোগদান করতো। আমার অবাধ্যতা ও পাপাচার দেখে কখনো তাদের চেহারায় অসন্তোষের চিহ্ন ফুটে উঠতো না।

শিক্ষাঃ  এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, আল্লাহর আযাব ও অসন্তোষ হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিরেট সৎলোক হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং নিজের পার্শ্ববর্তী লোকদেরকেও সৎ বানাবার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অবশ্য অসৎ লোকদেরকে সৎ পথে আনার জন্য সাময়িকভাবে তাদের সাথে খোলামেলা ও বন্ধুত্ব করা অবৈধ ও অন্যায় হবে না। তবে এই সময়ে তাদেরকে মন দিয়ে ভালোবাসা যাবে না এবং অন্যায় কাজ হতে তাদেরকে ফেরানো বা বাধা সৃষ্টি করার জন্য প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করতে হবে।

৬৩মসজিদুল আকসা নির্মাণের ঘটনা

হযরত দাউদ(আ) এর আমলে একবার কলেরা মহামারীতে প্রায় এক লক্ষ সত্তুর হাজার লোক মারা যায়। যারা এই মহামারী থেকে রক্ষা পায় তাদেরকে হযরত দাউদ(আ) বললেনঃ তোমরা যে আল্লাহর রহমতে এই ভয়াবহ গযব হতে রক্ষা পেলে, সেজন্য আল্লাহর শোকর আদায় কর। তবে শোকর আদায় করার সর্বোত্তম পন্থা হলো মসজিদ নির্মাণ করা।

হযরত দাউদ(আ) এর নির্দেশে লোকেরা মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি খুঁড়তে শুরু করে দিল। মসজিদের প্রাচীর মানুষ সমান গাঁথা হলে আল্লাহর নিকট হতে ওহী হলঃ হে দাউদ, আমি বনী ইসরাঈলের শোকরিয়া গ্রহণ করলাম। আমি এ কাজ তোমার ছেলে সোলায়মানকে দিয়ে সম্পন্ন করবো। এখন এ কাজ স্থগিত রাখ।

মসজিদুল আকসার নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই খ্রিস্টপূর্ব ৯৬৩ সালে হযরত দাউদ(আ) এর মৃত্যু হয়ে যায়। (আতলাসুল কোরআন)। মৃত্যুর আগে ছেলে নবী সোলায়মানকে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার জন্য বলেন। পুত্র সোলায়মান পিতার বাদশাহির উত্তরাধিকারী হয়ে অসিয়ত অনুযায়ী বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের অসম্পূর্ণ কাজে হাত দেন। (আল কামিল ফিত তারিখ)। সোলায়মান এর বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তার বাদশাহি যেমন বিশাল ছিল, মসজিদুল আকসাও নির্মাণ করেছিলেন তেমনই আলিশান করে। (আতলাসু তারিখিল আম্বিয়া)। এ নির্মাণে মানুষ ও জিন উভয় জাতি সমানভাবে অংশ নিয়েছে বলে আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে বলা হয়েছে। পাথর কাটা, দেয়াল গড়া, স্তম্ভ তৈরি_ প্রতিটি কাজের ছিল পৃথক বাহিনী। জিনদের এক দলের দায়িত্ব ছিল সাগরতল থেকে মণি-মুক্তা তুলে আনা। বায়তুল মুকাদ্দাসের পেছনে নবী সোলায়মান সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করেছিলেন।

দীর্ঘ পরিশ্রমের পর সোলায়মান বনি ইসরাইলকে সমবেত করে এ মসজিদের মর্যাদা তুলে ধরেন। নির্মাণ শেষে শুকরিয়াস্বরূপ এক বিরাট ভোজের আয়োজন করেন তিনি। বায়তুল মুকাদ্দাসের এলাকাকে সোলায়মান রাজধানী বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাই আলকুদস শহরও গড়ে তুলেছিলেন সুপরিকল্পিতভাবে। (আল উনসুল জলিল)। সেখানেই খ্রিস্টপূর্ব ৯২৩ সালে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু জিনেরা যাতে কাজ শেষ করে চলে না যায়, সেজন্য আল্লাহ তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারটা তাঁদের কাছে গোপন রাখলেন। তাঁর মৃতদেহটি লাঠির ভর দিয়ে দাঁড়িয়েই রইল। এভাবে তাঁর মৃত্যুর পরও প্রায় এক বৎসর যাবত কাজ চলে ও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

হযরত সোলায়মানের(আ) লাঠিটি উইপোকায় খেয়ে ফেলায় একদিন তা ভেঙ্গে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে হযরত সোলায়মানের লাশও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

বর্ণিত আছে যে, জিনদের একটি দল এরূপ ধারণ করতো যে, তারা গায়েব অর্থাৎ অদৃশ্যের খবরাদি জানে। তাদের এই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণ করা ও দর্প চূর্ণ করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ এই কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা যদি গায়েব জানতো, তাহলে মৃত হযরত সোলায়মান(আ) এর ভয়ে দীর্ঘ এক বছর অত পরিশ্রম করে মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন করতেন না।

শিক্ষাঃ এই ঘটনা হতে নিম্নোক্ত শিক্ষা লাভ করা যায়।

১. নির্দিষ্ট সময়েই মানুষের মৃত্যু হয়। এই সময়ের কোন হেরফের হয় না এবং কাউকে এক মুহুর্তও সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয় না।

২. গায়েব এর খবর একমাত্র আল্লাহ জানেন। জিন, মানুষ বা অন্য কোন সৃষ্ট জীব গায়েব বা অদৃশ্যের খবর জানে না।

৩. আল্লাহর নিয়ামতের শোকর আদায় করার জন্য মৌখিকভাবে আলহামদুলিল্লাহ বলাই যথেষ্ট নয়, বরং কাজের মাধ্যমে বিশেষতঃ আল্লাহর পথে ত্যাগ ও সম্পদ ব্যয়ের মাধ্যমে শোকর আদায় করা কর্তব্য।

৬৪হযরত উযাইর (আ) এর কাহিনী

বখতে নসর নামক জনৈক রাজা যখন বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করে বনী ইসরাঈলের অনেক লোককে বন্দী করেছিল, তখন বন্দীদের মধ্যে হযরত উযাইর (আলাহিস সালাম )-ও ছিলেন। তিনি নবী বলে রাজা তাঁকে ছেড়ে দিল।
হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর সাথে কিন্তু টাকা, খেজুর, পানি ও একটি গাধা ছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) এমন একটি গ্রাম দেখতে পেলেন, যার ইমারত ও অট্টালিকাগুলো ধসে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল এবং সেখানে জন-মানবের কোন চিহ্নও ছিল না। এ অবস্থা দেখে উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এখানকার অধিবাসীরা তো মারা গেছে। তারা এমনভাবে বিলীন হয়ে গিয়েছে যে, যেন তারা কেউ এখানে ছিল না। আল্লাহ তা’আলা এদের আবার কিভাবে পুনর্জীবিত করবেন।
এই ভাবনা ভেবে উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) গাধাটিকে একটি গাছের সাথে বেঁধে একটু বিশ্রামের জন্য মাটিতে পিঠ রাখলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে মৃত ও ধবংসপ্রাপ্ত জনপদের মানুষদেরকে কিয়ামতের দিন কিভাবে জীবিত করবেন-দুনিয়াতে তার নজির দেখাতে ইচ্ছে করলেন। সে জন্য তাঁকে সেই অবস্থায়ই মৃত্যু দান করলেন।
এরপর আল্লাহ তা’আলা হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে এভাবে একশত বছর পর্যন্ত মৃত অবস্থায় রাখলেন। কিন্তু তাঁর শরীর নষ্ট হয়ে বা পঁচে গলে যায়নি। সাথে সাথে তাঁর গাধটিরও মৃত্যু দান করলেন। তবে গাধাটির দেহ পঁচে গলে মাটির সাথে মিশে গেল। শুধু হাঁড়গুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে। অপরদিকে তাঁর সাথে যে খাদ্য ছিল, আল্লাহর কুদরতে তার বিন্দু মাত্রও নষ্ট হল না।
মহান আল্লাহ হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে দীর্ঘ একশত বছর পর পুনঃ জীবিত করলেন। অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি এ অবস্থায় কত কাল ছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, একদিন বা দিনের কিছু অংশ হবে। হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে আল্লাহ তা’আলা যখন মৃত্যু দিয়েছিলেন, তখন ছিল সকাল আর একশত বছর পর তাঁকে যখন জীবিত করলেন, তখন ছিল বিকেল। উযাইর ( আলাইহিস সালাম )এ সময়কে সেদিনের সময়ই মনে করেছিলেন। তাই একদিন বা দিনের কিছু অংশ বলেছিলেন।
তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জানালেন, একদিন বা তার কিছু অংশ নয়, আপনি বরং একশত বছর এ অবস্থায় ছিলেন। আপনি দেখুন আপনার গাধার দিকে, তা মরে পঁচে কিভাবে কিভাবে মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। আর আপনার খাদ্য ও পানির দিকে লক্ষ্য করুন, তা সম্পূর্ণ পূর্ণ অবস্থায়ই রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা’আলা বললেন, এখন আপনি দেখবেন, গাধার অঙ্গগুলো কিভাবে জোড়া লাগে। তখন তাঁর সামনে আল্লাহ তা’আলা গাধাটিকে তার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জোড়া করে তাকে পূর্বের ন্যায় জীবিত করলেন।
হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) মহান আল্লাহর এ বিস্ময়কর কুদরত অবলোকন করে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করলেন এবং আল্লাহ তা’আলার অশেষ শুকরিয়া আদায় করলেন।
ওই একশত বছর পর সে দেশের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ও আবর্তন-বিবর্তন ঘটেছিল। বাইতুল মুকাদ্দাস বনী ইসরাঈলের দখলে পুনরায় চলে এসেছিল এবং তা ঈমানদারদের দ্বারা আবাদ হচ্ছিল। তা দেখে হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) খুব আনন্দিত হলেন।
অতঃপর হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলেন। পথিমধ্যে পেটে ক্ষুধা অনুভব করলেন। তাই তাঁর কাছে যে টাকা ছিল, তা নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস এলাকায় গিয়ে কিছু কিনতে চাইলেন। কিন্তু দোকানদাররা তাঁকে জানালো যে, এ মুদ্রা একশত বছর পূর্বে ছিল। এখন এ মুদ্রা অচল। এছাড়াও কেউ তাঁকে চিনতে পারল না এবং সবাই তাঁকে আশ্চর্য হয়ে দেখছিল। কেননা তখন তিনি পূর্বের ন্যায় যুবক ছিলেন। তা৬র সমবয়সী কেউ বেঁচে ছিল না।
তিনি তাদের কাছে উযাইর বলে নিজেকে পরিচয় দিলেন। তখন সকলেই বলতে লাগল, হযরত উযাইরকে তো বখতে নসর বন্দী করে নিয়ে গেছে। তিনি আর ফিরে আসেন নি। আমরা ভেবেছি, সম্ভবত তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তারা আরো বলল যে, উযাইরের ছেলেরা ছোট ছিল। কিন্তু তারা এখন বৃদ্ধ। উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) বললেন, আমাকে তাদের কাছে নিয়ে চলুন।
লোকেরা উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে তাঁর ছেলেদের কাছে নিয়ে গেল। উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর ছেলেরা তাঁর কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লো। কেউ তাঁর কথা বিশ্বাস করতে চাইলো না। শেষে উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) কোন উপায় না পেয়ে বললেন, তোমাদের এখানে কি দুইশ বছর বয়সের কোন বৃদ্ধ লোক আছে? তারা বললো, একজন বৃদ্ধা আছে, সে অন্ধ এবং হাঁটতে পারে না। তিনি বললেন, আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাও।
উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে সেই বৃদ্ধার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। তখন সেই বৃদ্ধা বলল, আপনি যদি উযাইর হয়ে থাকেন, তবে তাওরাত কিতাব মুখস্থ বলুন। উযাইর তা মুখস্থ পারতেন। আপনি উযাইর হলে এখনই তা প্রমাণ হবে। তখন উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) তাওরাত মুখস্থ শুনালেন।
বৃদ্ধা বললেন, আমি প্রথম প্রমাণ পেয়েছি, এবার দ্বিতীয় প্রমাণ হল, উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) যদি কোন অন্ধের চোখে হাত বুলিয়ে দিতেন, তাহলে আল্লাহর রহমতে সে ভাল হয়ে যেত। আপনি তা দেখান। উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) তখন সেই বৃদ্ধার চোখে হাত রাখলেন। আল্লাহর দয়ায় তৎক্ষনাত তার চোখ ভাল হয়ে গেল।
সবাই তখন বলল, নিঃসন্দেহে আপনি উযাইর। কিন্তু এতদিন আপনি কোথায় ছিলেন? তখন উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা খুলে বললেন। সেই কুদরতী কাহিনী সবাই খুব অবাক হল।
রাজা বখতে নসর তাওরাত কিতাব পুড়ে ফেলেছিল। তাই হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর মাধ্যমে তা নতুন করে লেখা হল। তিনি মানুষদেরকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিতে লাগলেন। সবাই উযাইর (আলাইহিস সালাম )-এর দাওয়াতে আল্লাহর দ্বীন পালন করতে লাগল।

৬৫ কাদেসিয়ার এক দূর্ধর্ষ বীরের কথা

চৌদ্দ হিজরীর মুহররম মাসের কথা। মুসলিম বাহিনী সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে কাদেসিয়ার ইরানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। ইরানী বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন মহাবীর রুস্তম। আজ যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন। তুমুল যুদ্ধ চলছে। অনেকে শহীদ হয়েছেন। আবার অনেকে আহত হয়ে শিবিরে চিকিৎসাধীন আছেন। সা‘দ বিন্ আবি ওয়াক্কাছ অসুস্থ, তাই ময়দানে যেতে পারেন নি। কাদেসিয়ার নিজ বাসস্থানের ছাদের উপর থেকে যুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তাঁর বাড়ির এক কক্ষে এক কয়েদী পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় আটকা ছিল। মদ্যপানের অপরাধে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। তার চোখে মুখে ছিল ভীষণ উৎকন্ঠা। তাঁর দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত রয়েছে রণাঙ্গণের দিকে। হযরত সা’দের স্ত্রী সালমা কোন কাজে ঐ কক্ষের দিকে যাওয়া মাত্রই কয়েদী ভারী শিকল নিয়ে টলতে টলেতে কোন রকমে তাঁর কাছে গিয়ে বললো,  “আফসোস! আমাকে মুক্ত করে দাও। তোমার সাথে অঙ্গীকার করছি, যদি রণাঙ্গন থেকে নিরাপদে ফিরে আসি তাহলে নিজেই এসে জিঞ্জিরাবদ্ধ হবো, আর যদি নিহত হই তাহলে তোমরা আমার হাত থেকে রেহাই পেলে।” সালমা অস্বীকার করলেন। কয়েদী গভীর দুঃখে আপনমনে বলছেন, ““আমার জন্যে সবচেয়ে বড় দুঃখ যবে অশ্বারোহীরা ছুটাছুটি করছে
বন্দী-স্থবির পড়ে আছি আমি মহীরূহ সাথে বাঁধা।”
তারপর সা‘দের স্ত্রী সালমা দয়াপরবশ হয়ে তার শিকল খুলে দিলেন। সে উঠে দাঁড়ালো এবং সা‘দের ঘোড়ায় চড়ে বর্শা হাতে নিয়ে রণাঙ্গনে চলে গেলো। সে শত্র“দের যে অংশের ওপরই হামলা করলো তাদেরকেই পরাজিত করলো। লোকেরা (ইসলামী বাহিনীর সৈন্যরা) বলতে লাগলো ঃ “ইসলামের সাহায্যের জন্যে ফেরেশতা এসেছে।” সা‘দ নিজে এ হামলা সমূহের দৃশ্য দেখলেন এবং বললেন ঃ “এ ধরনের লম্ফ আমার ঘোড়ার লম্ফ, কিন্তু যেভাবে বর্শার আঘাত হানা হচ্ছে তা আবু মাহ্জানের বর্শার আঘাত হানার ন্যায়, অথচ ও তো জিঞ্জিরাবদ্ধ আছে।” শত্র বাহিনী পরাজিত হলে আবু মাহ্জান ফিরে আসে এবং পুনরায় নিজের হাতেই নিজের পায়ে জিঞ্জির পরায়। সা‘দের স্ত্রী তাঁর কাছে ঘটনা খুলে বললেন। সা‘দ বললেন ঃ “আল্লাহ্র শপথ, আমি আজ সেই ব্যক্তিকে শরয়ী শাস্তি দেবো না আল্লাহ্ যার মাধ্যমে মুসলমানদের প্রতি এহেন অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন।” অতঃপর তিনি আবু মাহ্জানকে মুক্ত করে দেন। আবু মাহ্জান বললো ঃ “যে সব দিনে আমার ওপর শরয়ী শাস্তি কার্যকর করা হতো তখন তার মাধ্যমে আমি নিজেকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করতাম, কিন্তু আপনি যখন আমার ওপর থেকে শরয়ী শাস্তি তুলে নিলেন সেহেতু আমি আল্লাহ্র নামে শপথ করছি, আর কোনো দিন মদপান করবো না।”

শিক্ষাঃ শয়তানের প্ররোচনায় কেউ একই অপরাধ করে ফেললে তার তৎক্ষণাত তওবা করা উচিত এবং পরবর্তীতে প্রথম সুযোগেই জিহাদ কিংবা অন্য কোন সৎকাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃত পাপ মোচনে সচেষ্ট হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর পথে জেহাদই কৃত গুনাহের কাফফারার সবচেয়ে বড় উপায়। আল্লাহ তায়ালা ঈমান এনে জেহাদে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একাধিকবার গুনাহ মাফ করার আশ্বাস দিয়েছেন।

৬৬ কে ধনী,  কে গরীব

একবার এক ব্যক্তি প্রখ্যাত সুফী সাধক ইবরাহীম আদহামকে বললেন, “আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আমার এই জুব্বাটি আপনি হাদীয়া হিসেবে গ্রহণ করুন।”

ইবরাহীম আদহাম বললেনঃ “ ‍তুমি যদি ধনী হও, তবে হাদিয়া গ্রহণ করতে পারি। আর যদি গরীব হও, তাহলে দুঃখ প্রকাশ করছি।”

লোকটি বললোঃ আমি অবশ্যই ধনী।

আদহাম বললেনঃ তোমার কত সম্পদ আছে?

লোকটি বললোঃ দু’হাজার দীনার।

তিনি বললেনঃ তুমি কি চাওনা যে, তোমার আরো দু’হাজার দীনার হোক।

লোকটিঃ তা অবশ্যই চাই।

ইবরাহীম আদহাম বললেনঃ তাহলে তো তুমি গরীব। আমি তোমার হাদিয়া নিতে পারি না।

শিক্ষাঃ একটি হাদীসে রাসূল(সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মনের ধনী, সে-ই আসল ধনী।” আলোচ্য ঘটনাটি এই হাদীসেরই ব্যাখ্যা স্বরূপ। কেননা এখানে এক ব্যক্তির মনের দারিদ্র্যই ফুটে উঠেছে। সে ধনী বলে দাবী করেছিল। কিন্তু যেহেতু তার যে সম্পদ আছে তাতে সে তৃপ্ত নয়, তাই সে আসল ধনী নয়। সে আসলে গরীব। প্রকৃত ধনী সেই ব্যক্তি, যার আর ধনের লিপ্সা নেই এবং তার যা আছে তাতেই সে তৃপ্ত।

৬৭ উম্মে সুলাইমের দেনমোহর

রাসূল (সাঃ) যখন মদিনায় ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান তখন ঘরে ঘরে নতুন একটি
কালেমার চর্চা শুরু হল।বনু নাজ্জার গোত্রের একজন
মহিলা সবার আগে ইসলাম গ্রহণ
করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল।সে সাহসী মুসলিম
রমনীর নাম উম্মে সুলাইম (রাঃ)
উম্মে সুলাইম(রাঃ) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন
তার স্বামী বিদেশে ছিলেন।তিনি
যখন দেশে ফিরলেন তখন পরিচিতমানুষ,পরিবেশ,সম
াজকে তার খুব অপরিচিত লাগছিল।
ঘরে ঘরে ইসলামের সরব পদচারণা।তিনি দেখলেন তার
ঘরেও ইসলামের ফুলকি আলো
ছড়াচ্ছে।কিন্তু অভাগা স্বামীর কাছে সে আলো অসহ্য
যন্ত্রণার কারণ হল।তিনি প্রচন্ড রাগে
স্ত্রীকে বললেন-
শেষ পর্যন্ত তুমিও সাবী(নক্ষত্র
পুজারী)হয়ে গেলে ??
উম্মে সুলাইম বললেন-
সাবী নয় মুসলমান হয়েছি।
আমি পোত্তলিকতা ছেড়ে দিয়ে শান্তির পথ অবলম্বন
করেছি।মালিক হিসেবে দেখতো অসংখ্য দেব-দেবীর
পূজা করা ভাল,না এক আল্লাহ্র ?
আমি আল্লাহ্কে মাবুদ হিসেবে গ্রহণ করেছি।”

শিশুপুত্র আনাসকে তিনি কালেমা পড়ান। স্বামী মালেক ইবনে নযর মুশরেক ছিলেন। শিশুকে কালেমা পড়াতে দেখে স্বামী ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, ‘‘তুমি আমার শিশুপুত্রকে বেদ্বীন বানাচ্ছ।’’ স্ত্রী তাকেও দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। কিন্তু তিনি রাগ করে শ্যামদেশে চলে যান। স্ত্রী তাকে কোনভাবেই আটকাতে পারেননি। সেখানে তার এক দুশমন তাকে হত্যা করে ফেলে। উম্মে সুলাইম বিধবা হয়ে যান। এ সময় তিনি শিশুপুত্র আনাসকে নিয়ে অস্থির ছিলেন। তখন তিনি পুনরায় বিয়ে করলে আপত্তিকর কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন এবং এই বলে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন যে, ‘‘আমার শিশুপুত্র মজলিসে উঠাবসা এবং কথা বলার যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত আমি বিয়ে করবো না। পুত্র যখন আমার বিয়েতে মত দিবে, তখন বিয়ে করবো।’’
ছেলে হযরত আনাস (রাঃ)-এর উপযুক্ত বয়সে তারই কবীলার আবু তালহা উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মালেকের মতো ইনিও ছিলেন মুশরিক। আগে তার ও মালেকের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির যে কারণ ছিল, এখানেও তা-ই অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়া তাই উম্মে সুলাইম আপত্তি করে বলেন, ‘‘আমিতো মোহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। অবশ্য তোমাদের জন্য আফসোস যে, তোমরা পাথরের ও কাঠের মূর্তি পূজা কর যা তোমাদের ভাল মন্দ কিছুই করতে পারে না।’’ এ কথাগুলো তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে বললেন যার কারণে আবু-তালহার কাছে ইসলামের সত্যতা প্রতিভাত হয়ে পড়ে। তিনি চিন্তা করতে শুরু করেন। দিনরাত তাকে এই চিন্তা পেয়ে বসলো- ‘সত্যিই কি মিথ্যে ধর্ম পালন করছি? মৃত্যুর পর আমাদের জন্য কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি। কয়েকদিন চিন্তা করার পর তিনি উম্মে সুলাইমের কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। উম্মে সুলাইম (রাঃ) আবু তালহার সত্য প্রীতিতে মুগ্ধ হয়ে বলেন, ‘‘আমি তোমাকে বিয়ে করছি, ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মোহরানা তোমার কাছ থেকে নেব না।’’ অর্থাৎ আবু তালহার ইসলাম গ্রহণই তার মোহর সাব্যস্ত হয়। এ বিয়ে হয়েছে হযরত আনাস (রাঃ)-এর উদ্যোগে।

হযরত আবু তালহার ঔরসে আবু উমাইর নামে তার এক পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। অল্প বয়সেই আবু উমাইর মারা যান। তিনি তাকে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে গোসল করান, কাফন পরান এবং ঘরের একপাশে লাশ রেখে দেন। আবু তালহাকে না জানাবার জন্য তিনি সকলকে বলে রাখেন। আবু তালহা তখন কিছুদিনের জন্য ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলেন। এ দিন রাতেই তিনি ঘরে ফিরে আসেন। এসে তিনি আবু উমাইরের অবস্থা জানতে চান, উম্মে সুলাইম বললেন, সে আগের চেয়ে ভাল আছে। এরপর তিনি স্বামীকে খানাদানা করান। উভয়ে বিশ্রাম নেন। ভোর হলে তিনি স্বামীকে অত্যন্ত শান্তভাবে বললেন, আবু তালহা, কাউকে যদি কোন জিনিস ধার দেয়া হয় এবং তার দ্বারা উপকৃতই হয়, এরপর ধার দেয়া জিনিস যদি ফেরত নেয়া হয়, তবে কি তার খারাপ লাগা উচিত?’’ আবু তালহা বললেন, ‘‘এটাতো ইনসাফের কথা নয়’’। তখন উম্মে সুলাইম বললেন, তবে শুন, তোমার শিশুও ছিল আল্লাহর আমানত, তিনি তা ফেরৎ নিয়ে গেছেন।’’ এটা শুনে আবু তালহা খুবই কষ্ট পেয়ে ইন্নালিল্লাহ পড়লেন এবং জানতে চাইলেন স্ত্রী ‘‘ভালো আছে’’ বললেন কেন? উম্মে সুলাইম বললেন ‘‘সে রোগ যন্ত্রণায় যে কষ্ট পাচ্ছিল আল্লাহ তাকে এখন আরাম দিয়ে দিয়েছেন।’’ আল্লাহর রাসূল পিতামাতার এ ধৈর্যের কাহিনী শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন যে, ‘‘আল্লহ তায়ালা তোমাদের উপর অনেক খুশি হয়েছেন এবং তোমাদের ধৈর্যের বিনিময়ে আরো ভাল সন্তান দিবেন।” এর কিছুদিন পর আল্লাহ তাদেরকে একটি পুত্র সন্তান দেন। এর নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহর সাতটি পুত্র সন্তান হয়েছিল এবং তারা সকলে কুরআনের হাফেয হয়েছিল। আর উম্মে সুলাইমের অন্য পুত্র হযরত আনাস বিন মালেক তো রাসূল(সা) এর ঘনিষ্ঠতম ও প্রিয়তম সাহাবীদের অন্তুর্ভুক্ত হয়েছিলেন।

শিক্ষাঃ হযরত উম্মে সুলাইম একজন উঁচু স্তরের আদর্শ মহিলা সাহাবী। স্বামী ভক্তির পাশাপাশি তিনি সন্তানসহ গোটা পরিবারের উপর নিজের ইসলামী চরিত্রে প্রাধান্য বজায় রেখেছিলেন। এমনকি নতুন স্বামী গ্রহণ করার পূর্বে তাকেও ইসলামে দীক্ষিত করে নিয়েছিলেন। এই গুণাবলী প্রত্যেক মুসলিম নারীর ভূষণ হওয়া উচিত।

৬৮। অকৃতজ্ঞতার পরিণাম

সেকালে ইহুদি বংশে তিনটি লোক ছিল। একজনের সর্বাঙ্গে ধবল, একজনের মাথায় টাক, আর একজনের দুই চোখ অন্ধ। আল্লাহ তাহাদের পরীক্ষার জন্য তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠাইলেন। ফেরেশতা হইলেন আল্লাহর দূত। তাহারা নূরের তৈয়ারি। এমনি কেহ তাহাদিগকে দেখিতে পায় না। আল্লাহর হুকুমে তাহারা সকল কাজ করিয়া থাকেন।
ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরিয়া প্রথমে ধবল রোগীর নিকটে আসিলেন। তিনি তাহাকে বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাস?

ধবল রোগী বলিল, আহা! আমার গায়ের রং যদি ভালো হয়। সকলে যে আমাকে ঘৃণা করে।

স্বর্গীয় দূত তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার রোগ সারিয়া গেল। তাহার গায়ের চামড়া ভালো হইল। তারপর আল্লাহর দূত পুনরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন এখন তুমি কী চাও?

সে বলিল, আমি উট চাই।

দূত তাহাকে একটি গাভিন উট দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।

তারপর সেই ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাস?

সে বলিল, আহা! আমার এই রোগ যদি সারিয়া যায়! যদি আমার মাথায় চুল উঠে! আল্লাহর দূত তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার টাক সারিয়া গেল। তাহার মাথায় চুল গজাইল। দূত পুনরায় বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?

সে বলিল, গাই।

তিনি তাহাকে একটি গাভিন গাই দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।

তারপর স্বর্গীয় দূত অন্ধের কাছে গেলেন। গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাস?

সে বলিল, আল্লাহ আমার চোখ ভালো করিয়া দিন। আমি যেন লোকের মুখ দেখিতে পাই।

স্বর্গীয় দূত তাহার চোখে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার চোখ ভালো হইয়া গেল। তারপর তিনি তাহাকে বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?

সে বলিল, আমি ছাগল চাই। স্বর্গীয় দূত তাহাকে একটি গাভিন ছাগল দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।

তারপর উটের বাচ্চা হইল, গাইয়ের বাছুর হইল, ছাগলের ছানা হইল। এইরকম করিয়া উটে, গাইয়ে, ছাগলে তাহাদের মাঠ বোঝাই হইয়া গেল।

কিছুদিন পর আবার সেই ফেরেশতা পূর্বের মত মানুষের রূপ ধরিয়া, সেই যে আগের ধবল রোগী ছিল, তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন।

সেখানে গিয়া তিনি বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আসিয়া আমার সব পুঁজি ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার আর দেশে ফিরিবার উপায় নাই। তিনি তোমাকে সুন্দর গায়ের রং দিয়াছেন, সুন্দর চামড়া দিয়াছেন, আর এত ধনদৌলত দিয়াছেন, তাহার দোহাই দিয়া তোমার কাছে একটি উট চাহিতেছি।

সে বলিল, উটের অনেক দাম, কী করিয়া দিই?

স্বর্গীয় দূত বলিলেন, ওহে! আমি যেন তোমাকে চিনিতে পারিতেছি। তুমি না ধবল রোগী ছিলে, আর সকলে তোমাকে ঘৃণা করিত? তুমি না গরিব ছিলে, পরে আল্লাহ তোমাকে ধনদৌলত দিয়াছেন?

সে বলিল, না, তা কেন? এ সব তো আমার বরাবরই আছে। স্বর্গীয় দূত বলিলেন, আচ্ছা! যদি তুমি মিথ্যা বলিয়া থাক, তবে তুমি যেমন ছিলে আল্লাহ আবার তোমাকে তাহাই করিবেন।

তারপর দূত পূর্বে যে টাকওয়ালা ছিল, তাহার কাছে গেলেন। সেখানে গিয়া আগের মত একটি গাই চাহিলেন। সেও ধবল রোগীর মত তাহাকে কিছুই দিল না। তখন দূত বলিলেন, আচ্ছা, যদি তুমি মিথ্যা কথা বলিয়া থাকে তবে যেমন ছিলে আল্লাহ তোমাকে আবার তেমনই করিবেন।

তারপর স্বর্গীয় দূত পূর্বে যে অন্ধ ছিল, তাহার কাছে গিয়া বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আমার সম্বল ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার দেশে পৌঁছিবার আর কোন উপায় নাই। যিনি তোমার চক্ষু ভালো করিয়া দিয়াছেন, আমি তোমাকে সেই আল্লাহর দোহাই দিয়া একটি ছাগল চাহিতেছি, যেন আমি সেই ছাগল বেচা টাকা দিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে পারি।

তখন সে বলিল, হ্যাঁ ঠিক তো। আমি অন্ধ ছিলাম, পরে আল্লাহ আবার আমাকে দেখিবার ক্ষমতা দিয়াছেন। আমি গরিব ছিলাম, তিনি আমাকে আমির করিয়াছেন। তুমি যাহা চাও লও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর উদ্দেশে যে জিনিস লইতে তোমার মন চায়, তাহা যদি তুমি না লও, তবে আমি তোমাকে কিছুতেই ভালো লোক বলিব না।

ফেরেশতা তখন বলিলেন, বাস্। তোমার জিনিস তোমারই থাক। তোমাদের পরীক্ষা লওয়া হইল। অপর দু’জন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ। আল্লাহ তোমার উপর খুশি হইয়াছেন, আর তাহাদের উপর বেজার হইয়াছেন। (বুখারী শরীফ এর হাদীস অবলম্বনে)।

৬৯।আছহাবুল উখদূদের কাহিনী

হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে জে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ বহুকাল পূর্বে একজন রাজা ছিলেন। সেই রাজার ছিল একজন যাদুকর। ঐ যাদুকর বৃদ্ধ হ’লে একদিন সে রাজাকে বলল, ‘আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি এবং আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। সুতরাং আমার নিকট একটি ছেলে পাঠান, যাকে আমি ভালভাবে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব’। বাদশাহ তার নিকট একটি বালককে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলেন। বালকটি যাদুকরের নিকট যে পথ দিয়ে যাতায়াত করত, সে পথে ছিল এক সন্ন্যাসীর আস্তানা। সন্ন্যাসী ঐখানে বসে কখনো ইবাদাত করতেন, আবার কখনো লোকদের নিকট ওয়াজ-নসিহাত করতেন।  বালকটিও পথের পাসে দাঁড়িয়ে তার ওয়াজ নসীহত শুনত।  ফলে যাদুকরের নিকট পৌছাতে বালকটির দেরী হ’ত বলে যাদুকর তাকে প্রহার করত। বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট এ কথা জানালে তিনি বালককে শিখিয়ে দেন যে, তুমি যদি যাদুকর কে ভয় কর তাহ’লে বলবে, বাড়ীর লোকজন আমাকে পাঠাতে বিলম্ব করেছে এবং বাড়ীর লোকজনকে ভয় পেলে বলবে, যাদুকরই আমাকে ছুটি দিতে বিলম্ব করেছে।

বালকটি এভাবে একদিকে যাদু বিদ্যা অন্যদিকে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা  করতে লাগলো। একদিন পথে সে দেখল, একটি বৃহদাকার প্রাণী মানুষের চলাচলের পথ রোধ করে বসে আছে। বালকটি ভাবল, আজ পরীক্ষা করে দেখব যে আল্লাহর কাছে যাদুকরের ধর্ম শ্রেষ্ঠ, না সন্ন্যাসীর ধর্ম শ্রেষ্ঠ ? অতঃপর সে একটি পাথর নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ্‌! যাদুকরের কার্যকলাপ অপেক্ষা সন্ন্যাসীর কার্যকলাপ যদি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় হয়, তবে এই প্রাণীটিকে এই পাথরের আঘাতে মেরে ফেল। যেন লোকজন যাতায়াত করতে পারে’। এই বলে প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে সে পাথরটি ছুঁড়ে মারল এবং প্রাণীটি মারা গেল ও লোক চলাচল শুরু হ’ল। এরপর বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে তাকে ঘটনাটি জানালে তিনি তাকে বললেন, ‘বৎস! তুমি এখনই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছ। তোমার প্রকৃত স্বরূপ আমি বুঝতে পারছি। শীঘ্রই তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। যদি তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হও তাহ’লে যেন আমার কথা প্রকাশ করে দিও না’।

তারপ বালকটির দো‘আয় জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেতে লাগলো , কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি নিরাময় হ’তে লাগল এবং লোকজন অন্যান্য রোগ হ’তেও আরোগ্য লাভ করতে লাগল।

এদিকে রাজার একজন সহচর অন্ধ হয়েছিল। সে বহু উপঢৌকনসহ বালকটির নিকট গিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দাও, তাহ’লে এ সবই তোমার’। বালকটি বলল, ‘আমিতো কাউকে আরোগ্য করতে পারি না । বরং রোগ ভাল করেন আল্লাহ্‌। অতএব আপনি যদি আল্লাহ্‌ প্রতি ঈমান আনেন, তাহ’লে আমি আপনার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহ্‌ নিকটে দো‘আ করতে পারি। তাতে তিনি হয়ত আপনাকে আরোগ্য দান করতে পারেন’। ফলে লোকটি আল্লাহ্‌ প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহ্‌ তাকে আরোগ্য দান করলেন।

পূর্বের ন্যায় তিনি রাজার নিকটে গিয়ে বসলে রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল’? সে বলল, ‘আমার রব’। রাজা বললেন, আমি ছাড়া তোমার রব আছে কি’? সে বলল, ‘আমার ও আপনার উভয়ের রব আল্লাহ্‌’। এতে রাজা তাকে ধরে তার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। অবশেষে সে বালকটির নাম প্রকাশ করে দিল। অতঃপর বালকটিকে রাজদরবারে আনা হ’ল। রাজা তাকে বললেন, ‘বৎস! আমি জানতে পারলাম যে, তুমি তোমার যাদুর গুণে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত লোকদের রোগ নিরাময় করছ এবং অন্যান্য কঠিন রোগও নিরাময় করে চলেছ। বালকটি বলল, আমি কাউকে রোগ মুক্ত করি না। রোগ মুক্ত করেন আল্লাহ্‌’। তখন রাজা তাকে পাকড়াও করে তার উপর উৎপীড়ন চালাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সে সন্ন্যাসীর কথা প্রকাশ করে দিল। তখন সন্ন্যাসীকে ধরে আনা হ’ল এবং তাঁকে বলা হ’ল, তুমি তোমার ধর্ম পরিত্যাগ কর। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। তখন রাজার আদেশক্রমে করাত নিয়ে আসা হ’লে তিনি তা তার মাথার মাঝখানে বসালেন এবং তাঁর মাথা ও শরীর চিরে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন। তারপর রাজার সহচরকে আনা হ’ল এবং তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হ’ল। কিন্তু সেও অস্বীকৃতি জানালে তাকেও করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করা হ’ল।

তারপর বালকটিকে হাযির করে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হ’ল। বালকটিও নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করল। তখন রাজা তাকে তার লোকজনের নিকট দিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সঙ্গে করে পাহাড়ে আরোহণ করতে থাক। যখন তোমরা পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে পৌঁছবে, তখন তাকে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলবে। সে যদি অস্বীকার করে, তাহ’লে তোমরা তাকে সেখান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিবে’। তারা বালকটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠলে বালকটি দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ্‌! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের কাছ থেকে রক্ষা কর’। তৎক্ষণাৎ পাহাড়টি কম্পিত হয়ে উঠল এবং তারা নীচে পড়ে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকট এসে উপস্থিত হ’ল। রাজা তখন তাকে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীদের কি হ’ল’? তখন সে বলল, আল্লাহ্‌ই আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

তারপর রাজা তাকে তার একদল লোকের নিকট সোপর্দ করে আদেশ দিলেন, ‘একে একটি বড় নৌকায় উঠিয়ে নদীর মাঝখানে নিয়ে যাও। যদি সে নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করে, তো ভাল। নচেৎ তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর’। তারা বালকটিকে নিয়ে মাঝ নদীতে পৌঁছলে বালকটি পূর্বের ন্যায় দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ্‌! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা কর’। এতে নৌকা ভীষণভাবে কাত হয়ে পড়ল। ফলে রাজার লোকজন নদীতে ডুবে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্ত দেহে) রাজার নিকটে আসলে রাজা তাকে বললেন, তোমার সঙ্গীদের কি অবস্থা? সে বলল, আল্লাহ্‌ই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর সে রাজাকে বলল, ‘আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন আমাকে কোনভাবেই হত্যা করতে পারবেন না। যতক্ষণ না আমি যা বলব, আপনি তা করবেন। রাজা বললেন, ‘সেটা কি’? বালকটি বলল, ‘আপনি একটি বিস্তীর্ণ মাঠে সকল লোককে হাযির করুন এবং সেই মাঠে খেজুরের একটি গুঁড়ি পুঁতে তার উপরিভাগে আমাকে বেঁধে রাখুন। তারপর আমার তূণীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকে সংযোজিত করুন। তারপর  (بسم الله الرحمن الرحيم ) “বালকটির রব আল্লাহ্‌ নামে” বলে আমার দিকে তীরটি নিক্ষেপ করুন।

আপনি যদি এ পন্থা অবলম্বন করেন, তবেই আমাকে হত্যা করতে পারবেন। বালকের কথামত এক বিস্তীর্ণ মাঠে রাজা সকল লোককে সমবেত করলেন এবং বালকটিকে একটি খেজুর গাছের গুঁড়ির উপরে বাঁধলেন। তারপর রাজা বালকটির তূণীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যভাগে সংযোজিত করলেন। তারপর বলে বালকটির দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। তীরটি বালকের চোখ ও কানের মধ্যভাগে বিদ্ধ হ’ল। বালকটি এক হাতে তীর-বিদ্ধ স্থানটি চেপে ধরল। অতঃপর সে মারা গেল।

এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনগণ বলে উঠল, ‘আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম’। তারপর রাজার লোকজন তাঁর নিকট গিয়ে বলল, ‘আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। সব লোক বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনল’।তখন রাজা রাস্তা গুলির চৌমাথায় প্রকাণ্ড গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। তার কথা মতো গর্ত খনন করে তাতে আগুন প্রজ্বলিত করা হ’ল। তারপর রাজা হুকুম দিলেন, ‘যে ব্যক্তি বালকের ধর্ম পরিত্যাগ করবে না, তাকে ঐ আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মার। অথবা তাকে বলবে, তুমি এই আগুনে ঝাঁপ দাও। রাজার লোকেরা তার হুকম পালন করতে লাগল। ইতিমধ্যে একজন রমণীকে তার শিশুসন্তান সহ উপস্থিত করা হ’ল। রমণীটি আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতস্ততঃ করতে থাকলে শিশুটি বলে উঠল, ‘মা ছবর অবলম্বন করে আগুনে প্রবেশ করুন। কেননা আপনি হক পথে আছেন’।

পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস হয়েছিল গর্ত ওয়ালারা- ইন্ধন পূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসা আল্লাহর’ (বুরূজ ৪-৮)

[ছহীহ মুসলিম হা/৩০০৫ ‘যুহদ ও রক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচেছদ-১৭, ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হা/২৩৯৭৬]।

পর্যালোচনাঃ এই ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক আসহাবুল উখদুদের ঘটনা বলা হয়। উখদুদ অর্থ আগুনের কুন্ডলী। পবিত্র কুরআনের সূরা আল বুরুজে এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সাধারণ অবস্থায় নিজেকে হত্যা করতে কাউকে পরামর্শ দেওয়া বা তার কৌশল শিখিয়ে দেওয়া আত্মহত্যার শামিল। আত্মহত্যা কখনো জায়েজ নয়। তবে আলোচ্য ঘটনায় বালকটি যে পরিস্থিতিতে এ কাজ করেছিলে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে পড়ে না। তা ছাড়া সম্ভবতঃ সে আল্লাহর ইঙ্গিতে কাজ করেছিল, যা ওহী ব্যতীত ইলহামের মাধ্যমেও আসতে পারে। এমনও হতে পারে যে, এরূপ কৌশলে জীবন বিসর্জন দেয়ার ফলে সমগ্র দেশ ঈমান আনবে বলে বালক ধারণা করেছিল, বাস্তবেও তাই ঘটেছিল।

শিক্ষাঃ এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির যে কোন সময় যে কোন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। এমনকি যদি ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত হয় এবং তাতে কিছু সাফল্য ও বিজয় আসতে থাকে, তাহলেও প্রত্যেক সাফল্যের সাথে সাথে পরীক্ষার তীব্রতা ও কঠোরতা বেড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।

দ্বিতীয় শিক্ষা এই যে, এক আল্লাহর প্রতি ঈমানই্ ছিল হযরত ঈসা(আ)এর প্রকৃত শিক্ষা। তিনিও ইসলামের নবী ছিলেন এবং ইসলামেরই দাওয়াত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে তার অনুসারীরা তার আনীত ইসলামী শরীয়ত বিকৃত করে নাম রাখে খৃস্টবাদ এবং নিজেরা খৃস্টান নামে পরিচিত হয়। এই খৃস্টবাদ ও খৃস্টানদের সাথে হযরত ঈসার প্রকৃত শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই। আলোচ্য ঘটনায় উল্লেখিত দরবেশ, বালক ও অন্যান্য শহীদগণ ছিলেন হযরত ঈসার প্রকৃত অনুসারী ও খাঁটি মুসলমান-খৃস্টান নয়।

৭০সততার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত

একবার এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির নিকট হতে এক খন্ড জমি কিনল। ক্রেতা তার কেনা জমিতে স্বর্ণমুদ্রায় পূর্ণ একটি কলসি পেল। সে তৎক্ষনাত ঐ জমির মালিকের নিকট কলসীটি নিয়ে গেল এবং বললোঃ “তোমার এই স্বর্ণ নিয়ে নাও। তোমার জমিতে এটা পাওয়া গিয়েছে। আমিতো তোমার কাছ হতে জমি কিনেছি, স্বর্ণ কিনি নি।” সাবেক জমিওয়ালা বললো, “না, ঐ স্বর্ণ তোমার। কেননা আমি ঐ জমিতে যেখানে যা কিছু আছে-সব শুদ্ধই বিক্রয় করেছি।” কিন্তু ক্রেতা কিছুতেই এ কথা মানতে রাজী হলো না।

অবশেষে  উভয়ই তৃতীয় এক ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করলো। তৃতীয় ব্যক্তিটি উভয়ের বক্তব্য শুনলেন। দেখলেন, উভয়ে নিজ নিজ বক্তব্যে অনড়। তখন বিরোধ মিটাবার কি উপায় বের করা যায় ভাবতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত একটি কৌশল তিনি উদ্ভাবন করে ফেললেন।

তিনি বিবদমান লোক দুটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কোন সন্তান আছে কি? একজন জানালো তার একটি ছেলে আছে। অপরজন জানালো তার একটি মেয়ে আছে।

মধ্যস্ততাকারী বললেন, ঠিক আছে। এই স্বর্ণ তোমাদের কাউকেই নিতে হবে না। তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের পরস্পর বিয়ে দাও। এই স্বর্ণ দিয়ে বিয়ের ব্যয় নির্বাহ কর এবং যা বেঁচে যায়, তা নব দম্পতিকে উপঢৌকন দাও।

উভয়ে এই রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল।(বুখারী ও মুসলিম)।

শিক্ষাঃ

(১) যে কোন বিরোধ বা বিতর্কের মীমাংসার জন্য নিরপেক্ষ তৃতীয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্থতা গ্রহণ করা ইসলামের রীতি। এই তৃতীয় ব্যক্তি উভয় বিবদমান পক্ষের সম্মতিক্রমে মনোনীত হবে এবং তার ফায়সালা মেনে নেয়া উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হবে।

(২)আলোচ্য ঘটনার বিবদমান ব্যক্তিদ্বয় খোদাভীরুতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উভয়েই জমির ভেতর প্রাপ্ত স্বর্ণকে অপর পক্ষকে দেয়ার জন্য উদগ্রীব-নেয়ার জন্য নয়। মুমিনের চরিত্র এমনই হওয়া উচিত।

(৩)ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে বিক্রেতার বক্তব্যই সঠিক। কেননা জমি যখন বিক্রয় অথবা দানসূত্রে হস্তান্তরিত হয়, তখন বিক্রেতা বা দাতা ইচ্ছাপূর্বক কোন কিছু বাদ না দিলে ঐ জমির ওপরে বা অভ্যন্তরে যা-ই থাক, সব সমেতই হস্তান্তরিত হবে। দাতা বা বিক্রেতা যদি কোন জিনিস দান বা বিক্রয় বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে, তবে তা হস্তান্তরের আগেই বা যে সময়ের জন্য ক্রেতা বা বিক্রেতা অনুমতি দেয়, সে সময়ের মধ্যেই তা সরিয়ে নিতে হবে।

(৪) ছেলে বা মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য কি ধরণের পরিবার ও কি ধরণের বর কনে খোঁজা দরকার, সে ব্যাপারেও এই কিসসাটিতে চমৎকার শিক্ষা রয়েছে। একটি উন্নত মানের ইসলামী চরিত্র সম্পন্ন পরিবারের বর কনেই প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের কাম্য হওয়া উচিত। পরিবারের ইসলামী ভাবধারা অক্ষুণ্ন রাখার এটাই একমাত্র উপায়।

৭১ তওবার মহিমা

বনি ইসরাইলের একজন লোক ছিল যে ৯৯ টি মানুষকে হত্যা করেছিল। সে তওবা করার চিন্তাভাবনা করছিল। তাই সে একজন আবিদের কাছে গেল। [আবিদ ও আলেম এর মধ্যে পার্থক্য আছে। আবিদ মানে যিনি সৎ ও সরল পথের উপর আছেন কিন্তু তার ভিতর জ্ঞান (শরীয়তের গভীর জ্ঞান) নেই, যেটা একজন আলেমের আছে]

সেই লোকটি এই আবিদকে বলল, “আমি ৯৯ টা মানুষকে হত্যা করেছি। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?”

আবিদ যখন এটা শুনলেন তখন বললেন যে, “তুমি ৯৯ টা লোককে খুন করেছ! আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা কিছুতেই তোমাকে ক্ষমা করবেন না‍!।”

এখন সেই লোকটা আবিদকে খুন করে ফেলল!!

[এই লোকটির কাছে মানুষ হত্যা করা এতটাই সহজ, পানির মত। তার সাথে তার মতের মিল হয়নি বলে সে তাকে (আবিদ) মেরে ফেলল! সে তার ফতোয়া পছন্দ করেনি বলে তাকে মেরেই ফেলল!]

এরপরও সে তওবা করার জন্য উঠেপড়ে লাগলো। তার অন্তরের ভিতর কিছু অংশ হলেও ভাল ছিল। সুতরাং এ সময়ে সে খোঁজ করলো যে কাকে জিজ্ঞাসা করা যায়, সে জানতে পারলো এক আলেম এর কথা।

সে সেই আলেমের কাছে গেল এবং বললো, “আমি ১০০ টা মানুষকে হত্যা করেছি। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?”

কিন্তু এই আলেম তাকে বললেন, “হ্যাঁ, তোমার আশা আছে! তুমি যদি তওবা কর তাহলে আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন যদিওবা তুমি ১০০ টি লোককে হত্যা করেছ। যদি আল্লাহ তোমার জন্য তওবার দরজা খুলে রাখেন তবে কে তোমাকে তা থেকে প্রতিরোধ করবে?” {যদিওবা এই লোকটি ১০০ টা মানুষকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তার তওবা করাতে খুশি হবেন।}

কিন্তু আলেমের ফতোয়া এখানেই শেষ হয়না তিনি আরও বলেন, “তোমাকে এই শহরের ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। এইটা হল খারাপ একটা শহর, আমি চাই যে তুমি এই শহর ছেড়ে অন্য শহরে যাও যেখানে এমন সব লোকেরা রয়েছে যারা আল্লাহর ইবাদত করে ফলে তুমি তাদের সাথে ইবাদত করতে পারবে।”

আলেম বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই লোকটি যতক্ষণ এই শহরে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পাপ কাজ করতেই থাকবে যদিওবা সে তওবা করে! কারণ সে খুন করার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেছে, ঠিক একজন ড্রাগ অ্যাডিক্টের (নেশাখোরের) মত। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন নেশাগ্রস্থ ব্যক্তি সেই একই পরিবেশ, একই সঙ্গ, একই গ্রুপের মধ্যে থাকবে যদিওবা সেই ব্যক্তি তওবাও করে তার পরও সে একই কাজ করতে থাকবে। তাকে পরিবেশ বদলাতে হবে, কারণ তার চারপাশের সবকিছু সেই নেশার সাথে সম্পর্কিত। যখনই ড্রাগ ডিলার, যার কাছ থেকে সে ড্রাগ কিনতো, তার সাথে সাক্ষাৎ হলে সেটা ড্রাগের কথা মনে করিয়ে দিবে, যে বন্ধুর সাথে নেশা করা হত তার সাথে দেখা হলে ড্রাগের কথা মনে পড়বে। একই ঘটনা ঘটে যারা মদ খায়। তারা পাব (Pub) দেখলে, মদের বোতল দেখলেই মদ খাওয়ার কথা মনে পড়ে। তাই এসব থেকে দূরে থাকতে হলে এসবের পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে হবে। সে কারণেই আলেম সেই খুনিকে বললেন তার শহর থেকে চলে গিয়ে অন্য শহরে ভাল লোকদের সাথে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালার ইবাদত করতে। ভাল লোকদের সংস্পর্শে থাকলে সেটা আপনাকে ভাল কাজ করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বিপরীতভাবে, খারাপ সঙ্গে থাকলে সেটা আপনার পতন ঘটাবে।

মুহাম্মাদ (স) বলেন, “যদি তুমি একজন কামারের পাশে বসে থাক তবে তোমার গা দিয়ে কামারের মত গন্ধ বের হবে। আর যদি তুমি সেই লোকের পাশে বস যে কস্তুর বিক্রি করে তাহলে তুমি তার সুবাস কিছুটা শোষণ করে নেবে।” অর্থাৎ যদিওবা আমরা একটি কাজের সাথে জড়িত নাও থাকি কিন্তু ঐ পরিবেশে থাকার কারণে আমরা সেই গন্ধটা নিজের মধ্যে নিয়ে নেব, সেটা আমাদের অনিচ্ছা স্বত্তেও হবে। তাই আমাদের উচিৎ সর্বদা ভাল মানুষের সংস্পর্শে থাকা। পরিবেশের একটা বিরাট প্রভাব এসব ক্ষেত্রে আছে।

তাই সেই আলেম তাকে তার শহর থেকে অন্য শহরে যেতে বলেছিলেন। তার কথা মত সেই লোক অন্য শহরের দিকে রওনা দিল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছেমাফিক, সেই লোকটি সেই শহরে পৌছানোর আগেই মারা গেল।

যখন সে মারা গেল, তখন মৃত্যুর ফেরেস্তারা তার রূহ কবজ করার জন্য আসলেন। যখন একজন ভাল লোক মারা যায় তখন রহমতের ফেরেস্তা তার রূহ কবজ করতে আসেন আর যখন একজন খারাপ লোক মারা যায় তখন শাস্তির ফেরেস্তা তার রূহ কবজ করতে আসেন। কিন্তু যেহেতু এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পরিষ্কার ছিলনা, তাই দুই ধরণের ফেরেস্তাদের দলই আসলেন তার রূহ কবজ করার জন্য!! এবং সেখানে একটা বিতর্ক জন্ম নিল!!

শাস্তির ফেরেস্তা বললেন, এই লোক আমাদের, কারণ সে এখনো তওবা করেনি/কবুল হয়নি! তার সদিচ্ছা ছিল কিন্তু সে সেখানে (অন্য শহরে) পৌছুতে পারেনি। রহমতের ফেরেস্তা বললেন, না, সে তওবা করেছে এবং সে সেই শহরে যাওয়ার জন্য রওনা দিয়ে দিয়েছে! তো দুই দলের ফেরেস্তারাই বিতর্ক করছিল যে কারা সেই ব্যক্তির রূহ নিবে।

তাই আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা এই বিতর্ক দূর করার জন্য তাদের কাছে আরেকজন ফেরেস্তা পাঠালেন। তিনি তাঁদের বললেন, সে যেখানে মারা গিয়েছে সেখান থেকে উভয় শহরেরই দূরত্ব পরিমাপ কর। যদি তোমরা তাকে তার নিজের শহরের কাছে পাও তবে সে জাহান্নামী আর যদি সে অন্য শহরের (ভাল লোকদের) নিকটবর্তী হয় তবে সে জান্নাতী!

মুহাম্মাদ (স) বলেন, “প্রকৃতপক্ষে সে নিজের শহরের নিকটবর্তী ছিল!!” তাহলে তার স্থান কোথায় হবে? জাহান্নাম!!

কিন্তু মুহাম্মাদ (স) বলেন, আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা জমিনকে নির্দেশ দেন, তার (লোকটা) এবং তার নিজের শহরের মধ্যকার দূরত্বকে বিস্তৃত করার এবং তার (লোকটা) ও অন্য শহর (ভাল লোকদের) মধ্যকার দূরত্বকে সংকুচিত করার!! [অর্থাৎ তাঁর দেহ মনে হবে ভাল শহরের কাছে, কিন্তু সে মারা গেছে নিজের শহরের কাছে]

যখন ফেরেস্তারা মাপতে আসলেন তখন তারা সেই ব্যক্তিকে অন্য শহরের (ভাল লোকদের) দিকে নিকটবর্তীরূপে পেলেন এবং আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা তাকে ক্ষমা করলেন এবং রহমতের ফেরেশতারা তার প্রাণ সংহার করলো। (বুখারী, মুসলিমও ইবনে মাজাহ এর হাদীস অনুসারে)।

শিক্ষাঃ এ কিসসাটিও অনেক শিক্ষণীয়। বিশেষতঃ নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এ হাদীসের অন্যতম শিক্ষণীয় বলে বিবেচিত হতে পারেঃ

১. মূর্খ দরবেশের চেয়ে হকপন্থী আলেমই মানুষকে সৎপথের সন্ধান দিতে অধিকতর যোগ্য।

২. কেউ যদি একনিষ্ঠ মনে ন্যায়পথে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার পথ কেউ আটকাতে পারবে না। আল্লাহ স্বয়ং তাকে সাহায্য করেন।

৩. সৎ হবার জন্য সৎ লোকদের সংসর্গ অবলম্বন ও অসৎ লোকদের সাহচর্য পরিত্যাজ্য। এ জন্য প্রয়োজনে নিজের জন্মভূমি হতে হিজরত করা কর্তব্য। আর হিজরত করা যেখানে সম্ভব নয় কিংবা হিজরত করে যথার্থ সৎলোকের সংসর্গ পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই, সেখানে একমাত্র বিকল্প কর্মপন্থা হলো, আশেপাশের মানুষকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচী নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়া। আল্লাহ আমাদেরকে সৎলোক ও সৎ পরিবেশ তৈরির তাওফীক দিন। আমীন।

৭২ আল্লাহর পথে দানের মাহাত্ম্য

আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাঠে অবস্থান করছিল। এমন সময় সে মেঘের মধ্যে একটি শব্দ শুনতে পেল : ‘অমুকের বাগানে পানি দাও’। অতঃপর মেঘমালা সেই দিকে সরে গেল এবং এক প্রস্তরময় স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করল। তখন দেখা গেল, সেখানকার নালাগুলির মধ্যে একটি নালা সমস্ত পানি নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তখন সে ব্যক্তি পানির দিকে এগিয়ে গেল এবং দেখল যে, এক ব্যক্তি তার বাগানে দাঁড়িয়ে সেচযন্ত্র দ্বারা পানি সেচ দিচ্ছে। তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ্‌র বান্দা! তোমার নাম কি? ব্যক্তিটি জবাবে বলল, আমার নাম অমুক- যে নাম সে মেঘের মধ্যে শুনেছিল। তখন লোকটি বলল : হে আল্লাহ্‌র বান্দা! তুমি কেন আমার নাম জিজ্ঞেস করলে? সে বলল : এই পানি যেই মেঘের তার মধ্যে আমি একটি শব্দ শুনেছি যে, তোমার নাম করে বলা হয়েছে, অমুকের বাগানে পানি দাও! (হে আল্লাহ্‌র বান্দা, বল) তুমি তা দ্বারা কি কি কাজ কর? সে উত্তরে বলল, যখন তুমি এ কথা বললে তখন শুনো, এই বৃষ্টির পানিতে যা উৎপাদন হয়, তার প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করি এবং তা ভাগ করি। এক ভাগ দান করি, একভাগ আমি ও আমার পরিবার খাই এবং অপর ভাগ জমিতে লাগাই। (মুসলিম শরীফ, তারগীব ও তারহীব)।

শিক্ষাঃ

(১) এ ঘটনাটি থেকে জানা যায় যে, নিজের যাবতীয় প্রমাণ পুরণের পর অবশিষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করা নয় বরং উপার্জিত সম্পদের একটি অংশ প্রথমেই আল্লাহর পথে দান করা এবং এরপর বাদবাকী অংশ দিয়ে নিজের প্রয়োজন পুরন করাই ইসলামী রীতি। কেননা এতে অনেক সময় আদৌ কোন অবশিষ্ট অংশ নাও থাকতে পারে। প্রথমে আল্লাহর পথে দাতব্য অংশটি নির্ধারণ বা দান করলে আল্লাহ খুশী হন এবং যে বান্দা এরূপ নীতি অবলম্বন করে তার জীবিকা বৃদ্ধি নিশ্চিত করেন।

(২) সাধারণ কৃষক শ্রমিক ও মুটে মজুর শ্রেণীর লোককে অবজ্ঞা করা মোটেই উচিত নয়। এ ধরনের নগন্য লোকরাও আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর অলীর মর্যাদায় উপনীত হতে পারে।

৭৩ নিজের ক্ষতি স্বীকার করে পরোপকার

প্রাচীনকালে একবার দুই ব্যক্তি একসাথে সফরে বেরুলো। এদের একজন সবসময় আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতো। অপরজন ছিল আল্লাহর হুকুম পালনে উদাসীন। পথিমধ্যে একসময় প্রথমোক্ত ব্যক্তি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লো। ক্রমে সে বেহুশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি মনে মনে বললো, “এই সৎ ও খোদাভীরু লোকটি যদি পিপাসায় মারা যায় এবং আমার সাথে পানি থাকা সত্ত্বেও যদি না খাওয়াই, তাহলে আল্লাহর আক্রোশ হতে আমি কোনভাবেই রক্ষা পাবো না। পক্ষান্তরে তাকে পানি খাওয়ালে পরবর্তীতে আমি নিজে পিপাসায় মরে যাবো। এখন তা হলে কি করা?”

কয়েক মুহুর্ত ভেবেচিন্তে সে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাকে কয়েক ফোঁটা পানি খাইয়ে দিল এবং নিজের জন্যও কিছু সঞ্চিত রাখলো। এভাবে তাদের একত্রে সফরের পালা শেষ হলো।

এই দুই ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথম ব্যক্তিকে জান্নাত ও দ্বিতীয় ব্যক্তিকে জাহান্নামের অধিবাসী বলে ঘোষণা করা হলো। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে যখন ফেরেশতারা জাহান্নামে নিয়ে যেতে আরম্ভ করলো, তখন সহসা প্রথম ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলো। সে ঐ ব্যক্তিকে চিনতে পেরে বললো, “ওহে আল্লাহর প্রিয় বান্দা! তুমি কি আমাকে চেন?” সে বললো, “তুমি কে?” তখন সে বললো, “আমি অমুক। এক বিপদের দিনে আমরা মিলিত হয়েছিলাম এবং তোমাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পানি খাইয়ে প্রাণ রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলাম।” তখন ঘটনাটা প্রথম ব্যক্তির মনে পড়লো এবং দোজখের ফেরেশতাকে থামতে বললো। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাকে সাথে নিয়ে বেহেশতে চলে গেল।(তাবরানী, বায়হাকী)।

৭৪ ওয়াদামত ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বোখারী শরীফে সংকলিত একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন।  প্রিয় নবী স. এরশাদ করেছেন : বণী ইসরাঈলে এক ব্যক্তি ছিল যে অন্য এক ধনাঢ্য ব্যক্তি থেকে এক হাজার দিনার ঋণ চেয়েছিল। সে ব্যক্তি বললো : তুমি যে ঋণ গ্রহণ করবে তার জন্য একজন সাক্ষী হাযির কর।

ধারপ্রার্থী লোকটি বলল : আমার জন্য সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট।

ধনাঢ্য লোকটি বলল : তুমি যে টাকা ফেরত দেবে এজন্য জামিন দরকার,সে বললো আমার জামিন স্বয়ং আল্লাহ পাক।

একথার উপর সনতুষ্ট হয়ে এক হাজার দিনার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ দিল। এর পর সে সামুদ্রিক পথে বিদেশে সফরে চলে গেল। কাজ শেষ হলে সে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরে হাযির হল। এবং জাহাজের অপেক্ষা করতে লাগলো,কিন্তু কোন জাহাজের ব্যবস্থা হলনা। এদিকে ঋণ আদায়ের সময় এসেগেল,সে অত্যন্ত ব্যাকুল চিত্তে সময় কাটায় কিন্তু জাহাজের কোন ব্যবস্থাই হলোনা|

তখন ঔ ব্যক্তি একটি কাঠের খন্ড হাতে নিয়ে তার মাঝখানে ফাঁকা করলো এবং এক হাজার দিনার এবং একটি চিঠি তার মধ্যে রেখে দিল। এর পর কাঠের খন্ডটির মুখ বন্ধ করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলো এবং বলল : হে আল্লাহ! তুমি তো জান আমি শুধু  তোমাকে সাক্ষী করে এবং তোমার জামানতে এক হাজার দিনার ঋণ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি সর্বপরি চেষ্টা সত্ত্বেও সমুদ্র পার হতে পারছিনা তাই বাধ্য হয়ে তোমার প্রতি ভরসা করে এ কাঠের খন্ডে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা রেখে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছি। তুমি তাকে তা পৌঁছে দাও। কাঠের কন্ডটি মুহূর্তে পানিতে ডুবে গেল। এর পরও সে অনেক চেষ্টা করলো সমুদ্র পার হতে,কিন্তু সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলো। এদিকে ঋণ দাতা সমুদ্র তীরে এসে অপেক্ষা করছে যে ঐ ব্যক্তি আজকের তারিখে তার ঋণ শোধ করবে। কিন্তু পুরোদিন অপেক্ষা করার পরও যখন দেখলো কোন জাহাজ আসলো না তখন সে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসার ইচ্ছা করলো। এমন সময় সমুদ্র তীরে একটি কাঠের খন্ড দেখতে পেলে তা সে তুলে নেয়,এ ইচ্ছা করে যে হয়তো জ্বালানির কাজে আসবে। বাড়ীতে আসার পর কাঠের কন্ডটি খুলে দেখে তাতে রয়েছে একটি চিঠি ও এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা। কিছু দিন পর সে ব্যক্তি দেশে ফিরে ঋণ দাতার নিকট গেল এবং পৃথকভাবে তাকে এক হাজার দিনার দিল। কারণ সে ভেবেছিল প্রেরিত এক হাজার দিনার তার মহাজন পায়নি। এমনিকি ব্যাপারটা তাকে জিজ্ঞাসা করতেও সে সংকোচ বোধ করলো। এক হাজার দিনার হাতে গুঁজে দিয়ে সে তার বিলম্বের জন্য ওজর পেশ করে ক্ষমা চাইতে লাগলো।

সে বললো : তুমি যে কাঠের টুকরাতে আমার নামে এক হাজার দিনার পাঠিয়ে ছিলে আল্লাহ পাক তা আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন। এখন আমার এই এক হাজার দিনার প্রয়োজন নেই। এটা তুমি নিয়ে যাও।” (বুখারী ও নাসাঈ অবলম্বনে)।

শিক্ষাঃ

(১) ওয়াদামত ঋণ পরিশোধ করা কর্তব্য। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে লড়াই করে শহীদ হয়, তার সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করলেও ঋণ মাফ করেন না। কারণ ওটা বান্দার হক।

(২)যে কোন ব্যাপারে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা সত্ত্বেও যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা কর্তব্য।

(৩) ঋণের আদান-প্রদান কালে সাক্ষী বা জামিন রাখা অথবা লিখিত দলীল সাক্ষর করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক। তবে পূর্ববর্তী নবীদের শরীয়তে এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা ছিল না। কুরআনের সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। কুরআনের সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে যাতে কোন বিতর্কের সৃষ্টি না হয়।

(৪) কোন ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য বা জামিন হাজির করতে অক্ষম হয় এবং আল্লাহকে সাক্ষী ও জামিন রাখে, তবে তাকে বিশ্বাস করে ঋণ দিয়ে তাকে বিপদ হতে উদ্ধার করা উত্তম। মনে রাখতে হবে, সুদবিহীন ঋণ প্রদান ক্ষেত্র বিশেষে দান করার চেয়েও বেশি সাওয়াবের কাজ। কেননা এটা সাধারণতঃ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারে সহায়তা করে। দানশীল ব্যক্তি সাধারণত নিজের ইচ্ছা অনুসারে উদ্ধৃত্ত সম্পদ হতে দান করে থাকে। কিন্তু ঋণদাতা বিপন্ন ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য নিজের অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ হতেও ঋণ দিয়ে থাকে।

৭৫ অপাত্রে দান

হযরত রাসূলুল্লাহ(সা)বলেনঃ একবার এক ব্যক্তি শপথ করলো যে, আজ রাতে কিছু সাদকা না করে সে ঘুমাবে না। অতঃপর ছদকার অর্থ নিয়ে রাস্তায় বেরুলো। যে ব্যক্তিকে সে ছদকা দিল, সে ছিল একজন চোর। লোকটি তাকে চিনতো না। যখন ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেল, তখন লোকে তাকে উপহাস করলো যে, একটা চোরকে সে ছদকা দিয়েছে। কিন্তু সে কিছুমাত্র হতোদ্যম হলো না। বরং আল্লাহর শোকর আদায় করলো।

পরের দিন পুনরায় শপথ করলো যে, রাতে কিছু ছদকা না নিয়ে সে ঘুমাবে না। কিন্তু আজও তার ছদকা গিয়ে পড়লো এক ব্যভিচারীর হাতে। এবারও তাকে বিদ্রুপ শুনতে হলো এবং সে যথারীতি আল্লাহর শোকর আদায় করলো।

তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। আজ তার ছদকা জুটলো এক ধনী ব্যক্তির কপালে। আজও তাকে উপহাসে জর্জরিত করা হলো। কিন্তু সে আল্লাহর শোকর আদায় করলো।

এই লোকটি কিছুদিন পর মারা গেলে ফেরেশতারা তাকে জানালেন যে, তার সকল ছদকাই কবুল হয়েছে। চোরকে দেয়া ছদকা এই জন্য কবুল হয়েছে যে, এ ছদকা পাওয়ার পর তার চুরির অভ্যাস ত্যাগ করার আশা করা যায়। ব্যভিচারীরও শুধরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ধনী ব্যক্তি ছদকা পেয়ে লজ্জিত হয়ে নিজে ছদকার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।

শিক্ষাঃ দান ছদকা না জেনে অপাত্রে দিলেও তা বৃথা যায় না। তবে জেনেশুনে উপযুক্ত ও অভাবী ব্যক্তিকেই দেওয়া উত্তম। কোন অপরাধী যদি ছদকা পেলে শুধরে যাবে বলে আশা করা যায়, তবে তাকে ছদকা দেওয়া যাবে।

৭৬ অন্যায়ের প্রতিরোধ

একবার আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা জীবরিলকে আদেশে দিলেন যে, “যাও, অমুক জনপদটি ধ্বংস করে দিয়ে এসো।” জিবরীল সেই জনপদটিকে গিয়েই দেখলেন সেখানে একজন দরবেশ রয়েছেন, দিনরাত তিনি নামায পড়েন ও যিকির তাসবীহ করেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি আল্লাহকে বললেন, “হে আল্লাহ! এখানে তোমার এক বান্দা রয়েছে যিনি সর্বক্ষণ তোমাকে স্মরণ করছেন”।

আল্লাহ জবাবে বললেনঃ তাকে শুদ্ধই ধ্বংস করে দাও। কেননা তার সামনে ইসলামের অবমাননা হয়, নাফরমানী করা হয়, জুলুমবাজী ও পাপাচারের সয়লাব বয়ে যায়। কিন্তু তার মুখমন্ডলে তাতে কোন বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠে না এবং তার মন কিছুমাত্র অস্থির হয় না।

অতঃপর জিবরীল সেই জনপদটি ধ্বংস করে দেন।

শিক্ষাঃ

অন্যায়, অত্যাচার ও পাপাচারের প্রতিরোধে যার যতটুকু ক্ষমতা থাকে, সে অনুসারে অবদান রাখা কর্তব্য। কর্তব্য পালন না করে কেবল নফল নামায ও যিকির ইত্যাদিতে ব্যাপৃত থাকলে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি হতে রেহাই পাওয়া যাবে না। এক হাদীসে রাসূল(সা) বলেছেনঃ কোন অন্যায় কাজ সংগঠিত হতে দেখলে সর্বশক্তি দিয়ে তা ঠেকাও, তা যদি না পার তবে মুখ দিয়ে সদুপদেশ দাও, তাও যদি না পার তবে মনে মনে তাকে ঘৃণা ও অপছন্দ কর এবং কিভাবে তা বন্ধ করা যায় তা চিন্তা করতে থাকো। শেষোক্ত পন্থা হলো সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।

৭৭ তিনজন মুসাফির

আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের পূর্বের যুগে তিন ব্যক্তির একটি দল কোথাও যাত্রা করেছিল, যাত্রাপথে রাত যাপনের জন্য একটি গুহাতে তারা আগমন করে এবং তাতে প্রবেশ করে। অকস্মাৎ পাহাড় থেকে একটি পাথর খসে পড়ে এবং বন্ধ করে দেয় তাদের উপর গুহামুখ।

এমন অসহায় অবস্থায় তারা বলাবলি করছিল, তোমাদেরকে এ পাথর হতে মুক্ত  করতে পারবে এমন কিছুই হয়ত নেই। তবে যদি তোমরা নিজ নিজ নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া কর, নাজাত
পেতে পার।

তাদের একজন বলল : “হে আল্লাহ ! আমার বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন,আমি তাদেরকে দেওয়ার
পূর্বে আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্য-স্ত্রী,সন্তান ও গোলাম পরিচারকদের কাউকে রাতের খাবার দুগ্ধ পেশ করতাম না। একদিনের ঘটনা : ঘাসাচ্ছাদিত চারণভূমির অনুসন্ধানে বেরহয়ে বহু দূরে চলে গেলাম। আমার ফেরার পূর্বেই তারা ঘুমিয়ে পরেছিলেন। আমি তাদের জন্য—রাতের খাবার —দুগ্ধ দোহন করলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম তারা ঘুমাচ্ছেন।তাদের আগে পরিবারের কাউকে-স্ত্রী-সন্তান বা মালিকানাধীন গোলাম-পরিচারকদের দুধ দেয়াকে অপছন্দ করলাম। আমি পেয়ালা হাতে তাদের জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম, এতেই সকাল হয়ে গেল। অতঃপর তারা জাগ্রত হলেন এবং তাদের রাতের খাবার দুধ পান করলেন। হে আল্লাহ ! আমি এ খেদমত যদি আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি, তাহলে এ পাথরের মুসিবত হতে আমাদের মুক্তি দিন।”

তার এই দোয়ার ফলে পাথর সামান্য সরে গেল, কিন্তু তাদের বের হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

অপর ব্যক্তি বলল : “হে আল্লাহ ! আমার একজন চাচাতো বোন ছিল, সে ছিল আমার নিকট সমস্ত মানুষের চেয়ে প্রিয়। আমি তাকে পাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম। সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং আমার থেকে দূরে সরে থাকল। পরে কোন এক সময় দুর্ভিক্ষ তাড়িত, অভাবগ্রস্ত হয়ে আমার কাছে ঋণের জন্য আসে, আমি তাকে একশত বিশ দিরহাম দেই, এ শর্তে যে—আমার এবং তার মাঝখানের বাধা দূর করে দেবে। সে তাতেও রাজি হল। আমি যখন তার উপর সক্ষম হলাম, সে বলল : অবৈধ ভাবে সতীচ্ছেদ  করার অনুমতি দিচ্ছি না— তবে বৈধভাবে হলে ভিন্ন কথা। আমি তার কাছ থেকে ফিরে আসলাম। অথচ তখনও সে আমার নিকট সবার চেয়ে প্রিয় ছিল। যে স্বর্ণ-মুদ্রা আমি তাকে দিয়েছিলাম, তা পরিত্যাগ করলাম। হে আল্লাহ ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি, তাহলে আমরা যে মুসিবতে আছি,তা হতে মুক্তি দাও।”

পাথর সরে গেল তবে এখনও তাদের বের হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট হল না।

তৃতীয় ব্যক্তি বলল, “হে আল্লাহ ! আমি কয়েকজন মজুর নিয়োগ করেছিলাম, অতঃপর তাদের পাওনা তাদের দিয়ে দেই। তবে এক ব্যক্তি ব্যতীত—সে নিজের মজুরি পরিত্যাগ করে চলে যায়। আমি তার মজুরি বার বার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছি। যার ফলে সম্পদ অনেক বৃদ্ধি পায়। অনেক দিন পরে সে আমার কাছে এসে বলে, হে আব্দুল্লাহ, আমার মজুরি পরিশোধ কর। আমি তাকে বললাম, তুমি যা কিছু দেখছ—উট-গরু-বকরি- গোলাম—সব তোমার মজুরি। সে বলল : হে আব্দুল্লাহ ! তুমি আমার সাথে উপহাস করো না। আমি বললাম, উপহাস করছি না। অতঃপর সে সবগুলো গ্রহণ করল এবং তা হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। কিছুই রেখে যায়নি। হে আল্লাহ ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি, তাহলে আমরা যে মুসিবতে আছি তা হতে মুক্তি দাও।

পাথর সরে গেল। তারা সকলে নিরাপদে হেঁটে বের হয়ে আসল। (বুখারী, মুসলিম ও নাসায়ী অবলম্বনে)।

শিক্ষাঃ হাদীসের কিসসাটি অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। বিশেষতঃ নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলিকে এর অন্যতম প্রধান শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যায়ঃ

১. নিজের কৃত কোন সৎ কর্মের জন্য গর্ববোধ বা অহংকার প্রকাশ করা যদিও অন্যায়, কিন্তু কোন ভাল কাজ করতে পারা এবং খারাপ কাজ পরিহার করতে পারাকে নিজের সৌভাগ্য ও আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে সন্তোষ ও তৃপ্তি বোধ করা এবং আল্লাহর শোকর করা মহত্ত্বের পরিচায়ক। এক হাদীসে বলা হয়েছে, “ভালো কাজ করতে পেরে আনন্দ বোধ করা ও খারাপ কাজ করে অনুতপ্ত হয়ো ঈমানের লক্ষণ।” আর এ ধরনের কোন নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠ সৎকর্ম যদি নিজের অতীত জীবনে থেকে থাকে, তবে তার দোহাই দিয়ে দোয়াও করা যায় এবং সে দোয়া কবুল হওয়ারও আশা করা যায়।

২. পিতামাতার খিদমত, পরোপকার ও খোদাভীতি মানুষকে আখিরাতের কল্যাণের পাশাপাশি বহুবিধ পার্থিব বিপদ মুসিবত হতেও উদ্ধার করে।

৩. পিতামাতার অধিকার স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকারের ওপর অগ্রগন্য। বিশেষত পিতামাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব উপার্জনক্ষম সন্তানদের।

৪. শ্রমিক মালিক সম্পর্কের একটি চমকপ্রদ নমুনা এ হাদীসে তুলে ধরা হয়েছে। মালিকের নিকট শ্রমিকের কোন পাওনা গচ্ছিত থাকলে তা হারাম উপায়ে নয় বরং হালাল পন্থায় লাভজনক ব্যবসায়ে খাঁটিয়ে যতদূর সম্ভব বাড়িয়ে ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও মহৎ কাজ। আর না হোক, চাওয়ামাত্র টালবাহানা না করে আসল পাওনা সম্পূর্ণরূপে ফেরত দেয়া বাঞ্ছনীয়। শ্রমিকের উৎপাদনের লভ্যাংশে শরীক করার প্রতি লভ্যাংশ প্রদানও এ হাদীসের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হয়।

৫. বিপন্ন মানুষকে বিশেষত নারীকে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে স্বার্থোদ্ধারের মানসে কোন সাহায্য করা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ধরনের শোষণ ও ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচায়ক।

৬. শত বিপদাপদ ও নির্যাতনের ভিতরেও জুলুমকারীকে সদুপদেশ দান, সতর্ক করা ও খোদাভীতির শিক্ষা দিতে কুন্ঠিত হওয়া চাই না। মুসলিম নারী ক্রীতদাসী হয়েও স্বীয় জালেম ও অমুসলিম মনিবকে ক্রমাগত সদুপদেশ দিতে দিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমে পরিণত করেছে-এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। আলোচ্য হাদীসটিতেও এক দুর্ভিক্ষপীড়িত মুসলিম রমণীর সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সতীত্ব লক্ষণীয়।

৭. সর্বাবস্থায় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা কর্তব্য। যেমন আল্লাহর ঐ তিন বান্দা করেছিলেন।

৭৮। লুকমান হাকীমের কিসসা

হযরত লুকমান হাকীম হযরত দাউদ (আঃ) এর সমসাময়িক একজন অত্যন্ত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি ছিলেন। পবিত্র কুরআনে তার নাম উল্লেখ করতঃ তার কতিপয় উপদেশ উদ্ধৃত করা হয়েছে। নবী না হয়েও কুরআনে তার মত এত গুরুত্ত আর কোন ব্যক্তি পান নি। নবী বা রাসুল না হওয়া সত্তেও তার কথাবারতা ও আচরণে নবীসুলভ বিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও সততা প্রতিফলিত হতো। এজন্য তিনি লুকমান হাকীম নামে পরিচিত ছিলেন ।

হযরত লুকমানের জন্মস্থান বা বংশ পরিচয় সংক্রান্ত কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে তার সম্পর্কে শুধু নিম্নোক্ত তথ্য সমূহ জানা যায়ঃ

প্রথম জীবনে তিনি সিরিয়ায় এক ধনবান ব্যক্তির অধীনে গোলামীর জীবন যাপন করেন। তারপর তার মধ্যে অসাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে তার মনিব তাকে মুক্ত করে দেয়।

গোলামী জীবনের পূর্বে তিনি মেষ রাখাল ছিলেন বলে জানা যায়। সেই সময় তার সমবয়সী আর এক রাখালও তার সাথে মেষ চরাতো। তাদের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ত ছিল।

পরবর্তীকালে যখন হযরত লুকমান একজন হাকীম অরথাৎ জ্ঞানী ব্যক্তিরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন, তখন তার সেই বাল্য বন্ধুটি একদিন তাকে একটি বিরাট জনসমাবেশে ওয়ায নসিহত করতে দেখে। সে সমাবেশ শেষে তাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কি সেই ব্যক্তি নও, যার সাথে আমি মাঠে বকরী চড়াতাম। হযরত লুকমান বললেন, হা, তুমি আমাকে ঠিকই চিনেছ। আমি বাল্যকালে বকরী চরাতাম। সে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি এই মর্যাদা কিভাবে অরজন করলে? তিনি বললেনঃ আমি চারটি সভাব দ্বারা এই মর্যাদা লাভ করেছিঃ (১) কখনো হারাম সম্পদ উপার্জন করিনি । (২) কখনো মিথ্যা বলিনি। (৩) কখনো আমানতের খেয়ানত করিনি। (৪) কখনো সময়ের অপচয় করিনি।

অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা প্রসূত ও জ্ঞানদীপ্ত কথা ও করমকান্ডকে হিকমত বলা হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতে হযরত লুকমানের যে সব হিকমত বর্ণিত হয়েছে, তার কিছু কিছু নিম্নে তুলে ধরা হয়েছেঃ

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হিকমতের বাণীঃ-

নিজ পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশাবলী

(১) হে বৎস! আল্লাহর সাথে কারো শরীক করো না। আল্লাহর সাথে শরীক করা একটি মারাত্মক জুলুম।

(২) হে বৎস! তুমি যদি একটি তিলের মত ক্ষুদ্র আকার ধারণ কর, অতঃপর কোন পাথরের অভ্যন্তরে অথবা আকাশের অপরে অথবা ভূগর্ভে আত্মগোপন কর, তবুও আল্লাহ সেখান থেকে তোমাকে বের করবেন।

(৩) হে বৎস! তুমি নামায কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ কর এবং এই পথে যে বিপদ আপদের সম্মুখীন হও, তাতে ধৈর‌য ধারণ কর।

(৪) মানুষের সাথে আচরণের সময় মুখ বিকৃত করো না এবং পৃথিবীতে অহংকারের সাথে চলাফেরা করো না। ধীরস্থিরভাবে চলাফেরা কর এবং অনুচ্চ কন্ঠে কথা বল।

রেওয়ায়েত থেকে প্রাপ্ত হিকমতের বিবরণঃ-

(১) হযরত লুকমান যখন গোলামীর জীবন যাপন করতেন, তখন একই মুনিবের অধীন তার সাথে আরো একটি গোলাম কর্মরত ছিল। একবার সেই গোলামটি মনিবের কোন খাদ্যদ্রব্য চুরি করে খেয়ে ফেলে। মনিব উভয়কে দোষারোপ করেন এতে হযরত লুকমান ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন, তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। অতঃপর মুনিবকে পরামর্শ দিলেন যে, আপনি আমাদের দু’জনকে গরম পানি খাইয়ে দিন। এতে উভয়ের বমি হবে এবং যে প্রকৃত চোর, তার পেট থেকে বমির সাথে ভক্ষিত জিনিষের অংশ বেরিয়ে পড়বে। মনিব তার পরামর্শ মত কাজ করলেন এবং হযরত লুকমান নির্দোষ সাব্যস্ত হলেন।

এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, কো ন মিথ্যা অপবাদ মাথায় নিয়ে কারো চুপ করে বসে থাকা উচিৎ নয়। তাৎক্ষনিকভাবে তার প্রতিবাদ করা উচিত এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করা উচিত।

(২) একবার হযরত লুকমানের মনিব তার বন্ধুর সাথে পাশা খেলে হেরে যায়। খেলার যে বাজী পূর্বাহ্নে নির্ধারিত হয়েছিল, সে অনুসারে হয় তাকে তার সমস্ত সম্পদ বিজয়ী বন্ধুকে দিতে হবে, নতুবা পার্শ্ববর্তী নদীর সমস্ত পানি তাকে খেয়ে ফেলতে হবে। খেলায় হেরে যাবার পর বন্ধুটি তার মনিবকে এই দুটি শর্তের একটি অবিলম্বে পালন করার জন্য চাপ দিতে লাগলো। মনিব অতি কষ্টে তার বন্ধুর কাছ থেকে একদিন সময় নিয়ে বাড়িতে চলে এল এবং লুকমানকে সমস্ত বিষয় খুলে বললো। লুকমান একটু চিন্তা করেই তাকে বললেনঃ আপনি আমার বন্ধুকে এক কানাকড়িও দেবেন না। বরং নদীর পানি খেয়ে ফেলার শর্তটাই পালন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করবেন। তবে তাকে বলবেন, প্রথমে সে যেন নদীর দু’পাশে বাধ দিয়ে দেয়। তা না হলে এক দিক দিয়ে পানি খেয়ে ফেললে অন্য দিক থেকে নদীতে আরো পানি ঢুকে পড়বে। হযরত লুকমানের শিখানো এই বুদ্ধিতে তার মুনিব বিপদ থেকে রক্ষা পেল এবং তার বন্ধু অবৈধভাবে বন্ধুর অর্থ আত্মসাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। এতে খুশী হয়ে মনিব তাকে মুক্তি দিলেন।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মানুষকে অন্যের জুলুম ও শোষণ থেকে বাচানোর জন্য যেখানে শক্তি প্রয়োগের পথ বন্ধ, সেখানে কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।

(৩) আর একদিন হযরত লুকমান হাকীমের মনিব তাকে আদেশ দিল যে, আমার জন্য একটি বকরী যবাই করে তার দেহের সর্বোত্তম অংশ রান্না করে নিয়ে এস। হযরত লুকমান বকরীর হৃদপিন্ড ও জিহবা রান্না করে আনলেন। পরদিন মনিব আবার নির্দেশ দিলেন বকরীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ রান্না করতে। লুকমান আবারো হৃদপিন্ড ও জিহবা রান্না করে খাওয়ালেন। মনিব জিজ্ঞাসা করলোঃ কি হে লুকমান! আজও দেখি, তুমি একই অংগ রান্না করে এনেছ। একই অংগ সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট কিভাবে হয়? হযরত লুকমান বললেনঃ যে কোন জীবের জিহবা ও হৃদপিন্ডই তার প্রধান অংগ। এই দুটি যখন ভালো থাকে, তখন সেও হয় উৎকৃষ্ট জীব। আর এ দুটি যখন খারাপ হয়, তখন সে হয় নিকৃষ্ট জীব।

এই ঘটনা থেকে প্রকারান্তরে হযরত লুকমান শিক্ষা দিলেন যে, মানুষের বেলায়ও এই কথা প্রযোজ্য। সে যদি তার হৃদয় দিয়ে সৎ চিন্তা করে এবং জিহবা দিয়ে সৎ কথা বলে, পবিত্র জিনিষ পানাহার করে, তবে সে সর্বোত্তম প্রাণীতে পরিণত হতে পারে, নতুবা নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত হবে। বলা বাহুল্য, তার এ হিকমতটি হাদীস ও কুরআনের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

(৪) আর একদিন হযরত লুকমানের মনিব তাকে নির্দেশ দিল তার যমীনে তিল বপন করতে। হযরত লুকমান চালাকী করে তিলের পরিবর্তে সরিষা বপন করলেন। পরে যখন ফসল জন্মালো, তখন মনিব বললো, আমি তো তোমাকে তিল বপন করতে বলেছিলাম। তুমি সরিষা বপন করলে কেন? হযরত লুকমান বললেনঃ আমি তো ভেবেছিলাম, সরিষা বুনলেই তিল হবে। মনিব বললেনঃ তা কি করে হয়? তখন হযরত লুকমান বললেনঃ আপনি যখন সব সময় পাপ কাজ করে উত্তম ফল বেহেশত পাওয়ার আশা করেন, তখন সরিষা বুনে আমি তিল পাওয়ার আশা করলে দোষ কী? এ কথা শুনে মনিব চমকে উঠলো এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করলো।

(৫) আর একবার লুকমান হাকীম একটি জাহাজে আরোহন করে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলেন। জাহাজে একজন সওদাগর ও তার সাথে একটি বালক ভৃত্য ছিল। জাহাজ সমুদ্রের মাঝখানে গেলে তার উত্তাল তরংগমালা দেখে বালকটি বিকট চিৎকার করে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। সে জীবনে আগে কখনো সমুদ্র দেখে নি। তাই সমুদ্রের মাঝখানে এসে সে ভয়ে কাদতে লাগলো। সওদাগর অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনই লাভ হলো না। এই অবস্থা দেখে লুকমান হাকীম সওদাগরের কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে বললেন,‘আপনি বোধ হয়, বালকটির কান্নাকাটি থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদি কিছু মনে না করেন, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। সওদাগর সানন্দে রাযী হলো। লুকমান বালকটিকে নিয়ে জাহাজের এক প্রান্তে চলে এলেন। তারপর তার কোমরে একটি রশি দিয়ে শক্ত করে বাধলেন। অতঃপর তাকে সাগরের পানির মধ্যে ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ রশি ধরে টেনে নিয়ে চললেন। বালকটি পানিতে পড়বার সময় গগণবিদারী একটা চিৎকার দিল। কিন্তু তারপরই নিরবে হাবুডুবু খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর লুকমান তাকে টেনে তুললেন এবং সওদাগরের কাছে রেখে এলেন। এবার সে আর কান্নাকাটি করলো না । শান্ত হয়ে বসে থাকলো। সওদাগর বিস্মিত হয়ে লুকমানকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ অসম্ভবকে আপনি কিভাবে সম্ভব করলেন? লুকমান বললেনঃ ব্যাপারটা কঠিন কিছু ছিল না। বালকটি সমুদ্র কখনো দেখেনি। তাই সমুদ্রের ভয়াল চেহারা দরশনই তাকে ভয়ে দিশেহারা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যখন সে দেখলো, সমুদ্রের পানিতে পড়ে যাওয়া বা ডুবে যাওয়া আরো ভয়াবহ ব্যাপার। তখন তার কাছে জাহাজে বসে সমুদ্র দেখা অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক কাজ বলে মনে হতে লাগলো। এ জন্যই সে এখন শান্ত। আমি বিষয়টা প্রথমেই বুঝে নিয়ে এই কৌশল প্রয়োগ করেছি ।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, বিপদ দেখেই অস্থির হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে যে, যে বিপদ এখন সামনে এসেছে ভবিষ্যতে তার চেয়েও বড় বিপদ আশা বিচিত্র কিছু নয়।

৭৯নামায সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনা

বর্ণিত আছে যে, বণী ইসরাঈলের এক মহিলা একবার হযরত মূসার (আঃ) কাছে এল । সে বললোঃ হে আলাহর রাসুল । আমি একটি ভীষণ পাপের কাজ করেছি । পরে তওবাও করেছি । আপনি দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন । মূসা (আঃ) বললেনঃ তুমি কী গুনাহ করেছো? সে বললোঃ আমি ব্যভিচার করেছিলাম । অতঃপর একটি অবৈধ সন্তান প্রসব করি এবং তাকে হত্যা করে ফেলি । মূসা (আঃ) বললেনঃ “হে মহাপতাকিনী । এক্ষুনি বেরিয়ে যাও । আমার আশংকা, আকাশ থেকে এক্ষুনি আগুন নামবে এবং তাতে আমরা সবাই ভস্মীভূত হবো ।” মহিলাটি ভগ্ন হৃদয়ে বেরিয়ে গেল । অল্পক্ষণ পরেই জিবরীল (আঃ) এলেন । তিনি বললেনঃ “হে মূসা! আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞাসা করাছেন কী কারণে এই তওবাকারিণীকে তাড়িয়ে দিলেন? তার চেয়েও কি কোন অধম মানুষকে আপনি দেখেন নি?” মূসা বললেনঃ “হে জিবরীল! এর চেয়ে পাপিষ্ঠ কে আছে?” জিবরীল (আঃ) বললেনঃ “ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তর্ককারী ।”

অপর একটি ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি তার বোনের দাফন কাফন সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখলো তার মানিব্যাগটি নেই । পরে তার মনে হলো, ওটা কবরের ভেতর পরে গেছে । তাই সে ফিরে গিয়ে কবর খুড়লো । দেখলো, কবর জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জলছে । সে পুণরায় মাটি চাপা দিয়ে কাদতে কাদতে বাড়ী গেল । তার মায়ের কাছে সমস্ত ঘটনা জানালে তিনি বললেন, মেয়েটি নামাযের ব্যাপারে খামখেয়ালী করতো এবং সময় গড়িয়ে গেলে নামায পড়তো । বিনা ওজরে নামায কাযা করলে যদি এরুপ পরিণতি হতে পারে তাহলে বেনামাযীর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে । তা ভাবতেও গা শিউরে উঠে ।

শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নামায পড়াই যথেষ্ঠ নয় । নামাযকে শুষ্ঠুভাবে ও বিশুদ্ধভাবে পড়াও জরুরী । নচেত অশুদ্ধ নামায পড়া নামায না পড়ারই সমতুল্য । বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, একদিন এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো । রাসুল (সাঃ) তখন মসজিদেই বসে ছিলেন । লোকটি নামায পড়লো । অতঃপর রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলো । তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেনঃ তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড় । কারণ তুমি নামায পড়নি । সে চলে গেল এবং আগের মত আবার নামায পড়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলো । তিনি সালামের জবাব দিয়ে আবার বললেনঃ তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড় । কেননা তুমি নামায পড়নি । এরুপ তিনবার নামায পড়ার পর লোকটি বললোঃ হে আল্লাহর রাসুল । আমি এর চেয়ে ভালো ভাবে নামায পড়তে পারি না । আমাকে শিখিয়ে দিন । তিনি বললেনঃ “প্রথমে নামাযে দাঁড়িয়ে তাকবীর বল । অতঃপর যতটুকু পার কুরআন পাঠ কর । অতঃপর রুকু কর এবং রুকুতে গিয়ে স্থির হও । অতঃপর উঠে সোজা হয়ে দাড়াও । তারপর সিজদা দাও এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হও । তারপর স্থির হয়ে বস । অতঃপর আবার সিজদা দাও এবং সিজদায় স্থির হও । এভাবে নামায শেষ কর ।”

শিক্ষাঃ

ঈমানের পরেই নামায সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ণ কর্তব্য । সময়ানুবর্তীতার সাথে ও বিশুদ্ধভাবে নামায না পড়লে আখেরাতে নাজাত লাভের আশা করা যায় না ।

 

৮০‍উদ্যানের মালিকদের ঘটনা

 

হযরত ইবনে আব্বাস(রা) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়ামানে একটি চমৎকার ফলের বাগান ছিল। হযরত ঈসা (আ) এর উম্মতের জনৈক মুমিন ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি এই উদ্যানটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর নিয়ম ছিল যে, ঐ উদ্যানের ফলমূল আহরণের সময় তিনি দরিদ্র লোকদের জন্য তার একটা অংশ রেখে দিতেন। ফলে সেখান হতে খাদ্যশস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল এবং ঐ বাগানের ওপর তাদের অনেকাংশে জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এজন্য প্রতিবছর ফসল কাটার মওসুমে সেখানে ফকীর মিসকীনদের ভিড় লেগে যেত।

হযরত ঈসা(আ) এর আকাশে উত্থিত হওয়ার কিছুকাল পর এই পুণ্যবান ব্যক্তিও ইন্তিকাল করেন। তাঁর তিন পুত্র ঐ বাগান ও ক্ষেতের উত্তরাধিকারী হলো। তারা পরস্পর এই মর্মে শলাপরামর্শ করলো যে, এখন আমাদের সদস্য বেড়ে গেছে। সেই অনুপাতে ফসলের ফলন হচ্ছে না। তাই এখন আর পিতার আমলের মত ফকীর মিসকীনদের জন্য ফসল ও ফলমূল রেখে দেওয়া সম্ভব নয়। কোন কোন রেওয়ায়াতে আছে যে, কোন কোন পুত্র এও পর্য্যন্ত বললো যে, আমাদের পিতাতো বোকা ছিল বলে ফলমূল বিলাতো। এখন আমাদের ঐ প্রথা বন্ধ করে দিতে হবে। তারা স্থির করলো যে, ভোরবেলা বেশ খানিকটা রাত থাকতে উঠে ফসল কেটে আনা হবে, যাতে ফকীর মিসকীনরা টের না পায় এবং বাগানের কাছে ভীড় না জমায়। তারা দৃঢ়ভাবে সংকল্প নিল যে, ফকীর-মিসকীনদের জন্য কোন অংশই রাখা হবে না।

 কিন্তু ভোররাতের নির্দিষ্ট সময় ঘনিয়ে আসার আগেই ঐ বাগানে এক ভয়াবহ আগুনে ঝড় এসে সমস্ত ফসলকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিল। অথচ বাগানের মালিকেরা এ ঘটনার বিন্দু বিসর্গও টের পেল না। কারণ তারা ঘুমিয়ে ছিল এবং ঐ ঝড় নির্দিষ্ট বাগান ছাড়া অন্য কোথাও আঘাত হানে নি।

 ভোররাতে তারা যথাসময়ে বাগানে গিয়ে দেখে সেখানে একটা ফাঁকা ময়দান ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রথমে তারা ভাবলো তারা পথ ভুলে অন্য কোথাও এসে পড়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তারা সবকিছু বুঝতে পারলো এবং অনুশোচনা করতে লাগলো। পরে তারা তাওবা করে। ইমাম বাগাওয়ী বর্ণনা করেন যে, তাওবা করার পর আল্লাহ তাদেরকে আরো ভালো একটা উদ্যান দান করেছিলেনে এবং তারা তাদের পিতার নীতি অনুসরণ করে আরো সমৃদ্ধশালী হয়েছিল।

শিক্ষাঃ এই ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের সূরা কালামে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। এর শিক্ষা এই যে, আল্লাহর দেয়া সম্পত্তি হতে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে থাকলে আল্লাহ সেই সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেন, তেমনি দান বন্ধ করলে তিনি তা ধ্বংস ও করে দিতে পারেন। বিশেষত, যেখানে কোনো সৎকর্ম আগে হতে চালু রয়েছে সেখানে তা বন্ধ করে দিলে আল্লাহর গযব নাযিল হওয়া অবধারিত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা যদি আমার নিয়ামতের শোকর আদায় কর, তবে আমি তা আরো বাড়িয়ে দেব। আর যদি নাশোকরী কর তবে জেনে রেখ, আমার আযাব অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।” (সূরা ইবরাহীম)।এ কথা সহজেই বোধগম্য যে, আল্লাহর দেয়া সম্পদ হতে দরিদ্র্যদেরকে বঞ্চিত করা এবং শুধু নিজেই সম্পূর্ণ ভোগ করা চরম নাশোকরী ও অকৃতজ্ঞতার শামিল।

 

৮১আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিরুদ্ধে শত্রুতার পরিণাম

হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুসা (আঃ) এর আমলে বনী ইসরাইল গোত্রে একজন নামকরা আলেম ছিলেন । তার নাম ছিল বালয়াম বাউরা । তিনি তাওরাতের হাফেয ও মুফাসসির ছিলেন এবং ইসমে আযম জানতেন । তার একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল এই যে, আল্লাহর ইসমে আযম উচ্চারণ করে তিনি যে দোয়াই করতেন, তা আল্লাহ কবুল করতেন এবং এ বিষয়টি বণী ইসরাইল ও অন্যান্য গোত্রের লোকদের জানা ছিল ।

হযরত মুসা (আঃ) যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন বালয়াম বাউরা কিনানে বণী ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে বাস করতেন এবং তাদের ও হযরত মুসা (আঃ) এর সংগে তার ভালো সম্পর্ক ছিল । কিন্তু হযরত মুসা (আঃ) এর ইন্তিকালের পর যখন তার ভাগ্নে হযরত ইউশা ইবনে নূন (আঃ) বণী ইসরাইলের শাসক ও খলীফা নিযুক্ত হন, তখন বালয়াম বাউরা তার সরকারের একটি উচ্চ পদ লাভের প্রত্যাশা করেন । কিন্তু হযরত ইউশা (আঃ) তা দিতে অসীকার করায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে পার্শ্ববর্তী মোশরেক রাজ্য বেলকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন । এই রাজ্যের রাজা তাকে বসবাসের জন্য একখন্ড জমি দান করেন এবং সেখানে তিনি বাড়ী বানিয়ে বসবাস করতে থাকেন ।

ওদিকে হযরত ইউশা (আঃ) এর নেতৃত্যে বণী ইসরাইল পার্শ্ববর্তী ইল্লিয়া রাজ্য জয় করে বেলকা রাজ্যের সীমান্তে উপনীত হয় । বেলকার মোশরেক রাজ্য দখল করে সেখানে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাকে আদেশ দেন । তদানুসারে হযরত ইউশা বেলকা রাজ্যের মোশরেক রাজাকে ইসলাম গ্রহণ নতুবা আত্মসমর্পনের জন্য চরমপত্র দেন । বেলকার রাজা চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করে হযরত ইউশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে । উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয় এবং তাতে হযরত ইউশার বাহিনী বিজয়ী হয় । বেলকার রাজার সৈন্যদের একাংশ নিহত হয় এবং অপরাংশ পালিয়ে যায় । এই অবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে উক্ত রাজা বালয়াম বাউরার শরণাপন্ন হয় । সে তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলে যে, আমার এই বিপদের দিনে আপনার সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন । আপনি আপনার আল্লাহর নিকট দোয়া করুন যেন আমরা ইউশার সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করতে পারি এবং তাকে তাড়িয়ে দিতে পারি ।

বালয়াম বাউরা বললেন, হযরত ইউশা (আঃ) আল্লাহর নবী ও প্রিয় ব্যক্তি । তার বিরুদ্ধে দোয়া করা আমার পক্ষে ঘোরতর পাপের কাজ হবে । তাছাড়া এরুপ দোয়া কবুল হওয়ার আশা করা যায় না । আপনি বরঞ্চ ইসলাম গ্রহণ করুন । আপনার রাজ্য নিরাপদ থাকবে ।

রাজা ভীষণ ক্রুদ্ধ হলো । সে বালয়াম বাউরাকে একদিকে হত্যার ভীতি প্রদরশন করতে লাগলো, অপরদিকে বালয়াম বাউরার স্ত্রীর কাছে গোপনে দূত পাঠিয়ে বিপুল অর্থ প্রদানের প্রলোভন দিতে লাগলো । বালয়াম বাউরা দেখলেন, তিনি আপনজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি কাফের রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে তাদের মুঠোর মধ্যে চরম অসহায় অবস্থায় পতিত হয়েছেন । এখানে রাজার বিপুল শক্তির মোকাবিলা করা তার সাধ্যাতীত । অপরদিকে অরথের প্রলোভনেও তিনি দিশাহারা হয়ে পড়লেন । তাই তিনি রাজাকে বললেন, আমাকে একদিন সময় দিন । রাজা তাকে সময় দিল । বালয়াম বাউরার নিয়ম ছিল, কোন বিষয়ে দোয়া করতে হলে প্রথমে আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইতেন । আল্লাহ তাকে সপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন অনুমতি দেয়া হলো কি না । একদিন সময় নিয়ে বালয়াম বাউরা আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলেন । আল্লাহ তাকে সপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, আমার নবীর বিরুদ্ধে কোন দোয়া গ্রহণযোগ্য নয় এবং এরুপ দোয়া করলে তোমার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে ।

বালয়াম বাউরা রাজাকে তার সপ্নের কথা জানালেন । রাজা তাকে বললেন, আপনাকে আরো একদিন সময় দেয়া গেল । আবার অনুমতি প্রারথনা করুন । বালয়াম বাউরা আবারো অনুমতি প্রারথনা করে ঘুমিয়ে গেলেন । এবার তাকে সপ্নে কিছুই জানানো হলো না । বালয়াম বাউরা কিছুটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেলেন । তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছেন এমন সময় রাজার দূত এসে তাকে আবার তাড়া দিল দোয়া করার জন্য । এই সময় শয়তান তাকে এই মর্মে  প্ররোচনা দিল যে, গত রাতে আল্লাহ যে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তাকে মৌন সম্মতি ধরে নেয়া যায় । তাছাড়া দোয়ার মাধ্যমে কাফের বাদশাকা বিজয়ী হতে সাহায্য করলেসে হয়তো তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে এবং পরবর্তী সময়ে তাকে হেদায়েত করা সহজ হবে । অথচ তিনি একথা ভেবে দেখলেন না যে, আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে শত্রুতার আচরণ করা কত বড় মারাত্মক গুনাহর কাজ এবং এরুপ কাজ করে কোন বাতিল শক্তিকে সত্যের দিকে আকৃষ্ট করার আশা দুরাশা মাত্র । তাছাড়া যে কাজ আল্লাহর কিতাবে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সপ্নের মাধ্যমে তার রদবদল হতে পারে না । আসলে দুনিয়াবী সার্থের মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি এ দিকটি ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি ।

বালয়াম বাউরা চিরাচরিত নিয়মে তার গাধার পিঠে চড়ে পাহাড়ের ওপর নির্মিত তার নির্জন ইবাদতখানায় রওনা হলেন রাজার পক্ষে দোয়া করার মতলবে । কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, এই সময় আল্লাহর হুকুমে গাধাটির চলনশক্তি রহিত হয়ে যায় । বালয়াম বাউরা তাকে প্রহার করতে আরম্ভ করলে সে বাকশক্তি প্রাপ্ত হয় এবং বলে যে, তুমি যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছ, আল্লাহ আমাকে সেজন্য তোমাকে বহন করে নিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন । এই সময় রাজার লোকজনদের একটি বিরাট দল বালয়াম বাউরার সঙ্গে যাচ্ছিল । বালয়াম বাউরা অগত্যা সেই জায়গায় দাড়িয়েই দোয়া করলেন । কিন্তু তিনি যে দোয়া করলেন, তার মুখ দিয়ে ঠিক তার বিপরীত কথা তার অজান্তেই উচ্চারিত হতে লাগলো । তিনি বললেন “রাজাকে বিজয়ী কর ।” কিন্তু সবাই শুনতে পেল, যেন তিনি বলছেন “হযরত ইউশাকে বিজয়ী কর ।” তাই রাজার লোকেরা চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে লাগলো । তারা বললো, ওহে বালয়াম, আপনি তো উলটা দোয়া করছেন । বালয়াম বললেন, আমি ঠিকই দোয়া করছিলাম । কিন্তু আমার জিহবা এখন আমার আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে । এই সময়ে বালয়াম বাউরার জিহবা হঠাৎ কুকুরের জিহবার মত লম্বা হয়ে বুকের ওপর ঝুলে পড়লো । কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, শুধু জিহবা নয়, তার শরীরের ওপরের অরধাংশ কুকুরের মত হয়ে যায় এবং নিম্নাংশ মানুষের মত বহাল থাকে ।

এবার বালয়াম বাউরা বললো, আমার তো দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই বরবাদ হয়ে গেল । এখন তোমরা একটি কাজ কর । তোমরা তোমাদের সুন্দরী নারীদেরকে বণী ইসরাইলী সৈন্যদের মধ্যে লেলিয়ে দাও । এতে তারা ঐ নারীদের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে এবং তাদের পরাজয় অবধারিত হবে । রাজা এই পরামর্শ অনুসারে কাজ করলো এবং সকল সুন্দরী যুবতীদেরকে সৈন্য বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে দিল । বণী ইসরাইলী বাহিনী এই পরীক্ষায় কৃতকারয হতে পারলো না । তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হলো এবং তাদের মধ্যে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লো । ফলে বহু সংখ্যক সৈন্য মারা গেল এবং পরাজয়ের সম্মুখীন হলো । আল্লাহর নবী হযরত ইউশা (আঃ) এই অবস্থা দেখে সেনাবাহিনীর মধ্যে আল্লাহর ভীতি জাগিয়ে তুললেন এবং বেহায়া নারীগুলিকে ধরে ধরে হত্যা করলেন । সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃংখলা ও খোদাভীতি পুণরুজ্জীবিত হওয়ার পর তিনি পুণরায় সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ চালালেন । এবার তার বাহিনী জয়যুক্ত হলো এবং বেলকার রাজ্য থেকে মোশরেক রাজার রাজত্ত সমূলে উৎখাত করা হলো । বালয়াম বাউরা যুদ্ধে মারা না গেলেও তার কাছ থেকে ইসমে আযম কেড়ে নেয়া হলো এবং অতঃপর তার আর কোন দোয়া কবুল হতো না । আর তার দেহাকৃতিতে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা তার মৃত্যু পর্যন্ত বহাল রইল ।

(তাফসীরে খাজেন, কাসাসুল আম্বিয়া, তাফসীরে মায়ারিফুল)

শিক্ষাঃ

এই ঘটনা থেকে নিম্নলিখিত শিক্ষাসমূহ গ্রহণ করা যায়ঃ

(১) নিজের জ্ঞান গরিমা ও ইবাদত উপাসনার ব্যাপারে কারো গরবিত হওয়া উচিত নয় । কারণ শওয়তান ও খোদাদ্রোহী মানুষদের প্ররোচনায় বিপথগামী হওয়া মোটেই বিচিত্র নয়, যদি আল্লাহ সাহায্য ও রহমত না করেন ।

(২) এমন পরিবেশ ও কারযকলাপ থেকে দূরে থাকা উচিৎ, যাতে ঈমান ও চরিত্র বিপন্ন হবার আশংকা থাকে । বিশেষতঃ দুনিয়াবী সার্থের ক্ষতির কারনে উত্তেজিত হয়ে সৎ্লোকদের সৎসরগ ত্যাগ করে অসৎ ও বাতিলপন্থীদের সংসরগ গ্রহণ করা নিজের ঈমান ও চরিত্রকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ার শামিল ।

(৩) কোন অবস্থাতেই আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত লোকদের সাথে শত্রুতা ও বিদ্যেষ পোষণ করা উচিত নয় । এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোন প্রিয়জনের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করি ।

(৪) অসৎ ও পথভ্রষ্ট লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং তাদের নিমন্ত্রণ ও উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত । এ কাজ করেই বালয়াম বাউরা আল্লাহর গযবে পতিত হয়েছিল ।

(৫) অশ্লীলতা ও হারামের অনুসরণ গোটা জাতির ধবংস ও পতন ডেকে আনে ।

(৬) অসৎ কাজে ও অশ্লীলতায় প্ররোচনাদানকারীকে, চাই সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, কঠোর হস্তে দমন করা কর্তব্য ।

(৭) আল্লাহর প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা, মেধা প্রতিভা এবং ক্ষমতা ও পদমর্যাদাকে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও আল্লাহর দীনের ক্ষতি সাধনে ব্যবহার করা আল্লাহর গযবকে ডেকে আনার শামিল । এ ব্যাপারে সকলের সতর্ক থাকা উচিত ।

৮২হযরত আইউব (আ) এর অগ্নিপরীক্ষা

হযরত আইউব(আ) এমন একজন নবী ছিলেন, যাকে আল্লাহ তায়ালা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত করে কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্য অবলম্বন করে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ফলে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে সাবির অর্থাৎ ধৈর্যশীল উপাধিতে ভূষিত করেন।

প্রথম দিকে হযরত আইউব(আ) ছিলেন অত্যন্ত সুখী ও সম্পদশালী মানুষ। তাঁর ছিল বহু ধন-সম্পদ, নয়নাভিরাম বাসভবন, বহু সন্তান-সন্ততি, চাকর বাকর ও গবাদি পশু। কিন্তু অল্প কিছুকাল পরেই তিনি পরীক্ষায় পতিত হন। তাঁর সমস্ত ধন সম্পদ ও চাকর নওকর তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। উপরন্তু তাঁর শরীরে কুষ্ঠের মত এক মারাত্মক চর্মরোগ দেখা দেয়। জিহবা ও হৃৎপিন্ড ছাড়া তাঁর শরীরের কোন অংশই ঐ রোগের কবল হতে মুক্ত ছিল না। সেই অবস্থায়ও তিনি জিহবা ও মন দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতেন।

ঘৃণার উদ্রেককারী এই রোগের দরুণ তাঁর আপনজনরাও তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একমাত্র তাঁর স্ত্রী কাছে থেকে পরিচর্যা করতেন। তিনি ছিলেন হযরত ইউসূফ(আ) এর মেয়ে বা পৌত্রী লাইয়া, মতান্তরে রহীমা, সমস্ত সহায় সম্পদ শেষ হয়ে গেলে তাঁর স্ত্রী মজুরী খেটে অর্থোপার্জন করে তা দিয়ে খাওয়া ও পরিচর্যার ব্যয় নির্বাহ করতেন।

হযরত আইউব(আ) লোকালয়ের বাইরে গিয়ে এক নির্জন স্থানে প্রায় সাত বছর অবস্থান করেন। তাঁর কাছে কেউ আসতো না। তাঁর স্ত্রী যখন তাঁকে বললেনঃ আপনি এই বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তখন তিনি বললেনঃ আমি সত্তুর বছর আল্লাহর নিয়ামতের মধ্যে কাটিয়েছি। মাত্র সাত বছর দুঃখ কষ্ট ভোগ করেই এত অস্থির হব কেন? যখন ধৈর্যধারণে অক্ষম হবো তখন এই দোয়া করবো।

অবশেষে এক সময় তার রোগ যন্ত্রণা যখন ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।

আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলে এবং তাঁকে আদেশ দিলেনঃ নিজের পায়ের গোড়ালি দ্বারা মাটিতে আঘাত কর। মাটি হতে স্বচ্ছ পানির ঝর্ণা ফুটে বেরুবে। সেই পানি পান কর ও তা দ্বারা গোসল কর। হযরত আইয়ুব আদেশ পালন করলেন। ঝর্ণার পানি দ্বারা গোসল করা মাত্রই তার সমস্ত রোগ দূর হয়ে গেল এবং তিনি একজন সুস্থ সবল যুবকে পরিণত হলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য বেহেশতী পোশাক পাঠিয়ে দিলেন। সেই পোশাক পরে তিনি পরিষ্কার জায়গায় বসে রইলেন।

ওদিকে তাঁর স্ত্রী প্রতিদিনের মত মজুরী খেটে তাঁর পরিচর্যা করতে এলেন। কিন্তু স্বামীকে যথাস্থানে না পেয়ে কাঁদতে লাগলেন। পাশে বসা সুস্থ সবল হযরত আইয়ূবকে দেখেও তিনি চিনতে পারলেন না। তিনি তাকেই জিজ্ঞাসা করলেনঃ এখানে যে রোগা লোকটি পড়ে ছিল, তাকে দেখেছেন নাকি? তাকে কোন হিংস্র পশুতে খেয়ে ফেলেছেন এই আশংকায় তিনি কাঁদতে লাগলেন।

হযরত আইউব(আ) তাঁর স্ত্রীর কান্নাকাটি দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি বললেনঃ আমিই আইয়ূব। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করে আমাকে স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপর আল্লাহ তাকে তার যাবতীয় ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততি ফিরিয়ে দেন।

শিক্ষাঃ বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য দোয়া ও চেষ্টার পাশাপাশি ধৈর্যধারণও করতে হবে। কেননা আল্লাহ প্রত্যেক বিপদ আপদ একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবতীর্ণ করেন ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। যতক্ষণ আল্লাহর নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত না হয়, ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। রাসূল(সা) বলেছেনঃ নবীগণ সবচেয়ে বেশী বিপদে আক্রান্ত হন, তাঁদের পর অন্যান্য সৎলোকেরা পর্যায়ক্রমে আক্রান্ত হন। প্রত্যেকের পরীক্ষা তার ঈমানের দৃঢ়তা অনুপাতে হয়ে থাকে।

৮৩হযরত ঈসা (আ) ও দাম্ভিক দরবেশ

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা(আ) এর সময়ে ফিলিস্তিনে একজন প্রসিদ্ধ দরবেশ বাস করতো। সে হযরত ঈসার এমন প্রিয়পাত্র ছিল যে তিনি স্বয়ং কখনো কখনো তার খানকায় গিয়ে তাকে সদুপদেশ দিতেন। তৎকালে ঐ অঞ্চলে একজন কুখ্যাত নরঘাতক দস্যুও বাস করতো। সে শুধু ডাকাতি ও নরহত্যায়ই লিপ্ত ছিলো না, সেই সাথে সমসাময়িক জুলুমবাজ সরকারের পোষা গুন্ডা হিসেবে হযরত ঈসা ও তার সঙ্গীসাথীদের ওপর অকথ্য নির্যাতনও চালাতো। এজন্য অন্যান্যের মতো উল্লেখিত দরবেশও তাকে প্রচন্ডভাবে ভয় পেত ও ঘৃণা করতো।

সহসা এই দস্যুর জীবনে পরিবর্তন এল এবং সে ঈমান আনার জন্য হযরত ঈসার(আ) সাথে সাক্ষাত করতে গেলো। হযরত ঈসা এ সময় নিজ বাসস্থানে ছিলেন না। দস্যুটি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে, তিনি উক্ত দরবেশের খানকায় আছেন। অগত্য সে সেখানেই গিয়ে হাজির হলো। দরবেশের দরজায় কড়া নাড়লে ভেতর হতে দরবেশ উঁকি দিয়ে দেখতে পেল তার বহু পরিচিত সেই দস্যুটি দাঁড়িয়ে, যার হাতে তাকে পূর্বে বহু নির্যাতন সইতে হয়েছে। সে ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করলো, “কে?” দস্যুটি জবাব দিল, “আমি অমুক, আমি আল্লাহর নবী ঈসার(আ) সাথে দেখা করতে চাই। আমি ঈমান আনতে চাই।” হযরত ঈসা ভিতরেই ছিলেন। তিনি দরবেশকে বললেন, “দরজা খুলে ওকে আসতে দাও।” কিন্তু দরবেশটি হযরত ঈসার আদর ও স্নেহ পেয়ে দাম্ভিক ও একগুঁয়ে হয়ে উঠছিল। সে হযরত ঈসার সাথে বাক বিতন্ডা শুরু করে দিল। তাকে এই বদ লোকটির সাথে সাক্ষাত না করতে অনুরোধ করলো। হযরত ঈসা তাকে যতই বুঝান যে, সে যত খারাপই থাকুক এখন ভালো হতে এসেছে, তাকে সুযোগ দিতে হবে, দরবেশ ততই একগুঁয়ে হয়ে উঠেন। সে বললো, এই লোকটি এত পাপী যে, আল্লাহর নবী ও তার মত দরবেশের সাথে দেখা করারও অযোগ্য। এমনকি সে এতদূরও বললো যে, “এতবড় পাপী লোকের সাথে আল্লাহ যদি আমাকে পরকালে বেহেশতও দেন একসাথে, তবে তাও হবে আমার দোজখতুল্য।”

অতঃপর দরবেশের অনড় মনোভাব দেখে হযরত ঈসা(আ) ওহীর নির্দেশ পেয়ে ঘর হতে বের হয়ে আসলেন এবং বাইরে একটি গাছের নীচে বসে দস্যুকে তাওবা করালেন ও ইসলাম গ্রহণ করালেন। এরপর হযরত ঈসার নিকট একটি ওহী নাযিল হলো। হযরত ঈসাকে আল্লাহ আদেশ দিলেন ঐ দরবেশকে জানিয়ে দেন যে, আল্লাহ তার মনের আশা পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাকে এই নওমুসলিমের সাথে একত্রে বেহেশতে বাস করতে হবে না। প্রচন্ড ঘৃণা ও হিংসার দায়ে আল্লাহ তার সকল নেক আমল বাতিল করে দিয়ে তার জন্য দোজখের ফায়সালা দিয়েছেন এবং তাওবাকারী আগন্তুকের জন্য বেহেশতের।

শিক্ষাঃ কোন ব্যক্তি তওবার মাধ্যমে একনিষ্ঠভাবে সত্যের পথে ফিরে আসার পর তার বিরুদ্ধে তার পূর্ববর্তী জীবনের প্রাপ্ত কর্মকান্ডের জন্য ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা অন্যায়।

৮৪হযরত ঈসা (আ), তিন সহচর ও স্বর্ণের উট

একবার হযরত ঈসা (আ) তাঁর তিন সহচরকে সাথে নিয়ে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে এক জায়গায় দু’টি স্বর্ণের ইট পাওয়া গেল। হযরত ঈসার(আ) তিন সহচর সঙ্গে সঙ্গে ইট দু’খানা তুলে নিতে ছুটে এল। তিনি তাদেরকে তা স্পর্শ করতে নিষেধ করলেন, “এ দুটো স্বর্ণের ইট দ্বারা হয়তো আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। এ দু’টো ইট তোমাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করতে পারে।” কিন্তু ঐ তিন সহচর তাঁর উপদেশে কর্ণপাত করলো না। তারা পরস্পর পরামর্শ করে একমত হলো যে, ইট দুটি তারা ভেঙ্গে অথবা বিক্রি করে ভাগ করে নিবে। হযরত ঈসা(আ) তাদের অনড় মনোভাব দেখে বিরক্ত হয়ে তাদের ত্যাগ করে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ঐ তিন সহচরের প্রচন্ড ক্ষিধে পেলে তারা তাদের একজনকে খাবার আনতে পাঠালো। ইত্যবসরে অবশিষ্ট দুজন ফন্দী আঁটলো, ঐ ব্যক্তি খাবার নিয়ে আসলে একযোগে আক্রমণ করে তাকে খতম করে ফেলবে। তাহলে ইট আর ভাগ করতে হবে না। দুজনের প্রত্যেকে আস্ত একখান করে ইট পাবে। ঐদিকে শয়তানের কুপ্ররোচনায় যে ব্যক্তি বাজারে খাবার আনতে গেল সে নিজের খাবার খেয়ে আসলো এবং অবশিষ্ট দুজনের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল।

যথাসময়ে ঐ ব্যক্তি খাবার নিয়ে ফিরে এল এবং সাথে সাথেই অপর দু ব্যক্তি একযোগে আক্রমণ করে তাকে মারতে মারতে মেরেই ফেললো। এরপর একপাশে লাশটা সরিয়ে রেখে পরম আনন্দে খেতে বসলো। আর যায় কোথায়। এক লোকমা খেতেই চিৎকার করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লো।

পরদিন হযরত ঈসা ঐ এলাকায় ফিরে এলে দেখলেন, তার তিন সহচরই মরে পড়ে আছে। আর তাদের লাশের পাশেই জ্বল জ্বল করছে স্বর্ণের ইট দু’টো।

শিক্ষাঃ  এ কিসসাটিও অত্যন্ত শিক্ষামূলক। প্রথমতঃ চুক্তি লঙ্ঘন করে তারা নিজেদের সঙ্গী তথা শরীকদেরকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করেছিল, যার পরিণাম হয়েছিল অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক। তাই কখনো পারস্পরিক চুক্তি অথবা ওয়াদা লঙ্ঘন করা চাই না এবং কারো ন্যায্য অধিকার হরণ করা উচিত নয়।

দ্বিতীয়তঃ তারা আল্লাহর নবীর সাথে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে সফরে বেরিয়েছিল। পথিমধ্যে পার্থিব সম্পদের প্রলোভনে সেই মহৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় এবং আল্লাহর নবীর নিষেধাজ্ঞাও অমান্য করে। তাই মনে রাখতে হবে, আল্লাহর ও রাসূলের নাফরমানী এবং বাতিলের প্রলোভনে সত্য হতে বিচ্যূত হওয়ার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে থাকে।

৮৫হযরত ইবরাহীম (আ) ও বিবি সারার ঘটনা

একবার হযরত ইবরাহীম (আ) স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে সাথে নিয়ে সফর করছিলেন। পথিমধ্যে একটি রাজ্যে তাকে যাত্রাবিরতি করতে হয়। ঐ রাজ্যের রাজা ছিল অত্যন্ত দুরাচারী যালেম। তার নিয়ম ছিল, কোন পথিকের সাথে তার স্ত্রী থাকলে সে স্ত্রীকে গ্রেফতার করে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতো। তবে কেউ বোন বা মেয়েকে নিয়ে সফর করলে তাদের কোন ক্ষতি করতো না।

হযরত ইবরাহীমের সস্ত্রীক ঐ রাজ্যে পৌঁছামাত্রই রাজার কাছে খবর পৌঁছে গেল। হযরত ইবরাহীম পূর্বাহ্নে এলাকার লোকদের কাছ হতে রাজার নিষ্ঠুর নিয়মের কথা জেনে গিয়েছিলেন। তাই তিনি আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখলেন যে, রাজার কাছে নীত হলে তিনি সারাকে স্ত্রী নয়, বোন বলে পরিচয় দিবেন।

যথাসময়ে রাজার প্রহরীরা তাঁদের উভয়কে ধরে রাজদরবারে নিয়ে গেল। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, এই মহিলা তোমার কে? তিনি বললেনঃ আমার বোন। রাজা তার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য সারাকে আলাদা ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। সারাও হযরত ইবরাহীমের শেখানো মত জানালেন যে, আমরা উভয়ে ভাইবোন। আসলে তাদের মনে মনে ছিল যে, তারা ইসলামী ভাই বোন-এই অর্থেই ঐ কথা বলবেন।

সারাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যখন আলাদা ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন হযরত ইবরাহীম নামায পড়ে নিভৃতে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে লাগলেন এবং সারার নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতে লাগলেন। অবশেষে সারার জবাবে সন্তুষ্ট হয়ে রাজা উভয়কে মুক্তি দিল।

শিক্ষাঃ

. যালেমের যুলুম হতে বাঁচার জন্য অন্য কোন উপায় না থাকলে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে। তবে সেক্ষেত্রেও নির্জলা মিথ্যা বলার চেয়ে ‘তাওরিয়া’ করাই (পরোক্ষ অর্থে বলা) শ্রেয়। যেখানে এটাও সম্ভব না হবে, সেখানে আত্মরক্ষার জন্য নির্জলা মিথ্যা কথা বলাও বৈধ হবে।

২. ইসলামের দিকে আহবান জানানো যাদের জীবনের লক্ষ্য ও ব্রত, তাদেরকে হযরত ইবরাহীম (আ) এর এই ঘটনা হতে শিক্ষা গ্রহণ করতঃ সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ও যুগের রীতি প্রথা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে এবং কিভাবে বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করা যায় সে ব্যাপারে বিচক্ষণতা ও দুরদর্শিতার সাথে পরিকল্পনা করতে হবে।

৩. যথাযথ বিচক্ষণতা ও কুশলতা প্রয়োগ করার পরও সাফল্যের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া অব্যাহত রাখতে হবে। কোন অবস্থাতেই আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।  

৮৬হযরত ইবরাহীম (আ) ও ভিক্ষুক

বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম(আ) এত অতিথিপরায়ণ ছিলেন যে, প্রতিদিন অন্তত একজন অতিথিকে সাথে না নিয়ে খাওয়া দাওয়া করতেন না।

একদিন সারাদিনেও তিনি কোন অতিথি খুঁজে পেলেন না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সময় তিনি যখন হতাশ হয়ে গৃহের ভেতর প্রবেশ করতে যাবেন এমন সময় একজন ভিক্ষুক এসে হাজির হলো। তিনি পরম আনন্দে ভিক্ষুককে বসালেন এবং খাবার দিলেন।

সারা দিনের ক্ষুধার্ত ভিক্ষুকটি খাবার পেয়েই গোগ্রাসে খেতে শুর করল। হযরত ইবরাহীম দেখলেন, বিসমিল্লাহ না বলেই ভিক্ষুকটি খাওয়া শুরু করেছে এবং বুভুক্ষের মত গিলছে। আল্লাহর প্রিয় নবী ইবরাহীম(আ)এর এটা সহ্য হলো না। তিনি ক্রদ্ধ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেনঃ “কি হে! তুমি খাওয়ার আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলে না যে!”

ভিক্ষুক বললোঃ (নাউজুবিল্লাহ) আমি বাপু আল্লাহ-টাল্লা মানিনে। খাবার পেলে খাবো, না পেলে উপোষ করবো। এর সাথে আবার আল্লাহর নাম নেবার কি সম্পর্ক।

হযরত ইবরাহীম(আ) রেগে আগুন হয়ে বললেনঃ তবেরে হতভাগা! এর একটি দানাও তুই স্পর্শ করতে পারবি নে। এক্ষুনি দুর হ আমার সামনে থেকে।

বেচারা ভিক্ষুক আর কি করবে! এক,দুগ্রাস খেয়েছিল। এর মাঝে হযরত ইবরাহীম(আ) তার খাবারের থালাটা কেড়ে নিয়েছেন। অগত্যা সে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিদায় হলো।

কিছুক্ষণ পরেই ওহী এল। আল্লাহ ধমকের সুরে হযরত ইবরাহীমকে (আ) বললেন, “হে ইবরাহীম! দীর্ঘ আশি বছর যাবত এই অবিশ্বাসী নাস্তিককে আমি আমার পৃথিবীতে চলাফেরা ও বসবাস করতে দিয়েছি, খাবার সরবরাহ করেছি। আর তুমি কিনা একটি বেলাও তাকে সহ্য করতে ও খাওয়াতে পারলে না।”

অনুতপ্ত হয়ে হযরত ইবরাহীম(আ) ভিখারীটিকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলেন না। সেই থেকে হযরত ইবরাহীম(আ) ‍মুমিন ও কাফির নির্বিশেষে সকল মানুষকে দয়া প্রদর্শন করতে এবং সব রকমের অতিথিকে সমাদর করতেন।

শিক্ষাঃ

বিপন্ন মানুষের সেবা করার ব্যাপারে জাতি ধর্ম বর্ণ প্রভৃতির ভেদাভেদ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসূল(সা) অমুসলিম পথিক বা অতিথিকে পরম সমাদরে আপ্যায়ন করাতেন-এর ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। হযরত ঈসা(আ) ও অন্যান্য নবীদের জীবনেও এর নজীর রয়েছে। অমুসলিম দরিদ্র ব্যক্তিকে যাকাতের টাকা বা জিনিসপত্র এবং অন্যান্য নফল সদকাও দেয়া যায়। তবে অমুসলিমের ব্যাপারে ইসলাম যে তিনটি জিনিসকে গুরুত্ব দিয়ে নিষিদ্ধ করেছে তাহলো এই যে,

১. কোন মুসলিমের চেয়ে তাকে অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না।

২. তাদের সাথে নিষ্প্রয়োজনে বন্ধুত্ব ও মাখামাখি করা যাবে না।

৩. মুসলমানদের নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতায় তাদেরকে অংশীদার করা যাবে না।

৮৭হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তদীয় পরিবারের মক্কায় পুনর্বাসন

মিসর থেকে ফিরে কেন‘আনে আসার বৎসরাধিককাল পরে প্রথম সন্তান ইসমাঈলের জন্ম লাভ হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি শিশু সন্তান ও তার মা হাজেরাকে মক্কার বিজন পাহাড়ী উপত্যকায় নিঃসঙ্গভাবে রেখে আসার এলাহী নির্দেশ লাভ করেন। বস্ত্ততঃ এটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:

হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শিশু পুত্র ইসমাঈল ও তার মাকে মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসার নির্দেশ পান, তখনই তার অন্তরে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নিশ্চয়ই এ নির্দেশের মধ্যে আল্লাহর কোন মহতী পরিকল্পনা লুক্কায়িত আছে এবং নিশ্চয়ই তিনি ইসমাঈল ও তার মাকে ধ্বংস করবেন না।

অতঃপর এক থলে খেজুর ও এক মশক পানি সহ তাদের বিজনভূমিতে রেখে যখন ইবরাহীম (আঃ) একাকী ফিরে আসতে থাকেন, তখন বেদনা-বিস্মিত স্ত্রী হাজেরা ব্যাকুলভাবে তার পিছে পিছে আসতে লাগলেন। আর স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতে থাকেন। কিন্তু বুকে বেদনার পাষাণ বাঁধা ইবরাহীমের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুলো না। তখন হাজেরা বললেন, আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাচ্ছেন? ইবরাহীম ইশারায় বললেন, হ্যাঁ। তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে হাজেরা বলে উঠলেন, إذَنْ لايُضَيِّعُنَا اللهُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না’। ফিরে এলেন তিনি সন্তানের কাছে। দু’একদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে পানি ও খেজুর। কি হবে উপায়? খাদ্য ও পানি বিহনে বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে কচি বাচ্চা কি খেয়ে বাঁচবে। পাগলপরা হয়ে তিনি মানুষের সন্ধানে দৌঁড়াতে থাকেন ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের এ মাথা আর ও মাথায়। এভাবে সপ্তমবারে তিনি দূর থেকে দেখেন যে, বাচ্চার পায়ের কাছ থেকে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসছে ঝর্ণার ফল্গুধারা, জিব্রীলের পায়ের গোড়ালি বা তার পাখার আঘাতে যা সৃষ্টি হয়েছিল। ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে নিলেন অসীম মমতায়। স্নিগ্ধ পানি পান করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। হঠাৎ অদূরে একটি আওয়ায শুনে তিনি চমকে উঠলেন। উনি জিবরীল। বলে উঠলেন, لا تخافوا الضَّيعةَ، إنَّ هذا بيتُ الله يَبْنى هذا الغلامُ و أبوه وإن الله لايُضيعُ أهلَه-   ‘আপনারা ভয় পাবেন না। এখানেই আল্লাহর ঘর। এই সন্তান ও তার পিতা এ ঘর সত্বর পুনর্নির্মান করবেন। আল্লাহ তাঁর ঘরের বাসিন্দাদের ধ্বংস করবেন না’। বলেই শব্দ মিলিয়ে গেল’।

অতঃপর শুরু হ’ল ইসমাঈলী জীবনের নব অধ্যায়। পানি দেখে পাখি আসলো। পাখি ওড়া দেখে ব্যবসায়ী কাফেলা আসলো। তারা এসে পানির মালিক হিসাবে হাজেরার নিকটে অনুমতি  চাইলে তিনি এই শর্তে মনযুর করলেন যে, আপনাদের এখানে বসতি স্থাপন করতে হবে। বিনা পয়সায় এই প্রস্তাব তারা সাগ্রহে কবুল করল। এরাই হ’ল ইয়ামন থেকে আগত বনু জুরহুম গোত্র। বড় হয়ে ইসমাঈল এই গোত্রে বিয়ে করেন। এঁরাই কা‘বা গৃহের খাদেম হন এবং এদের শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটে।

ওদিকে ইবরাহীম (আঃ) যখন স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে যান তখন হাজেরার দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এই বলে,

رَّبَّنَا إِنِّيْ أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِيْ بِوَادٍ غَيْرِ ذِيْ زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيْمُوا الصَّلاَةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِيْ إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ- (ابراهيم ৩৭)-

‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার পরিবারের কিছু সদস্যকে তোমার মর্যাদামন্ডিত গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় বসবাসের জন্য রেখে যাচ্ছি। প্রভুহে! যাতে তারা ছালাত কায়েম করে। অতএব কিছু লোকের অন্তরকে তুমি এদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর। সম্ভবত: তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ  করবে’।

ইসমাইলের মা ঐ পানি পান করতে ও ইসমাঈলকে দুধ খাইয়ে লালন পালন করতে লাগলেন। যখন পানি ফুরিয়ে গেল, উভয়ে পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। শিশু ইসমাঈল তখন ভীষণভাবে ছটফট করছেন। তা দেখে হাজেরা অস্থির হয়ে নিকটবর্তী সাফা পাহাড়ে কোন মানুষ বা পানি পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কিছুই পেলেন না। সেখান থেকে মারওয়া পাহাড়ে গেলেন। কিন্তু কিছুই ফেলেন না সেখানেও। নিরূপায় ও দিশেহারা অবস্থায় তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার ছুটোছুটি করলেন। বস্তুতঃ এ কারণেই মানুষ সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ছুটোছুটি করে থাকেন। সহসা মারওয়ায় দাঁড়িয়ে তিনি একটি আওয়াজ শুনলেন। হাজেরা সেই অজানা আওয়াজ উত্থাপনকারীকে বললেনঃ “তোমার আওয়াজ আমার কানে পৌঁছেছে। তবে তোমার কাছে কোন সাহায়্যের উপকরণ আছে কিনা জানাও।” সহসা দেখলেন, জমজমের স্থানে এক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছে। সেই ফেরেশতা তাঁর পাখা দিয়ে একটু মাটি খুঁড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে পানি বেরিয়ে এলো। হযরত হাজেরা তাঁর মশকটিতে পানি ভরে নিলেন। রাসূল (সা) বলেন, “হাজেরা যদি সাথে সাথে পানিতে হাত না দিতো তবে তা একটি বিরাট নদীতে পরিণত হতো।” হযরত হাজেরা সেই পানি নিজে পান করলেন এবং ইসমাঈলকে দুধ খাওয়ালেন। ফেরেশতা তাকে বললেনঃ তুমি চিন্তিত হয়ো না। এই স্থানে আল্লাহর একটি ঘর আছে। এই শিশু ও তার বাবা ঘরটি নতুন করে নির্মাণ করবে। এই ঘরের প্রতিবেশীদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন না।

তারপর হাজেরা ও ইসমাঈল বসবাস করতে লাগলেন। হযরত ইবরাহীম মাঝে মাঝে তাদেরকে দেখতে আসতেন। আবার চলে যেতেন। (ইত্যবসরে ইসমাঈলের কুরবানির ঘটনা ঘটে)। ইতিমধ্যে জমজমের পানির সুবাদে ঐ এলাকায় মানব বসতি গড়ে ওঠে ও যৌবনে পদার্পন করার পর হযরত ইসমাইল বিয়ে করেন।

একদিন হযরত ইবরাহীম হযরত ইসমাইলের গৃহে এলেন। তখন হাজেরার ইন্তিকাল হয়েছে এবং ইসমাইলের স্ত্রী গৃহে ছিলেন। হযরত ইবরাহীম পুত্রবধূকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইসমাইল কোথায়? সে বললোঃ খাদ্য সংগ্রহ করতে বাইরে গেছেন।

হযরত ইবরাহীমঃ তোমরা কেমন আছ?

পু্ত্রবধুঃ আমরা খুব অনটনে ও দুরবস্থায় আছি।

হযরত ইবরাহীমঃ ইসমাইল এলে তাকে আমার ছালাম দিও এবং বলো, সে যেন ঘরের কপাটটি পাল্টে ফেলে। এই বলে পুত্রবধুকে নিজের পরিচয় না দিয়ে ইবরাহীম(আ) প্রস্থান করলেন।

ইসমাইল গৃহে ফিরলে তাঁর স্ত্রী তাঁকে আগন্তুক ও তার সাথে তার কথোপকথনের বিবরণ দিলেন। হযরত ইসমাইল বৃদ্ধ আগন্তুকের হুলিয়া ও কথোপকথনের বিবরণ শুনে বললেন, “উনি আমার পিতা। আমাকে তোমার কাছ হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আদেশ দিয়েছেন। তুমি তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও।” অতঃপর ইসমাইল তাকে তালাক দিয়ে নতুন স্ত্রী ঘরে আনলেন।

কিছুদিন পর পুনরায় ইবরাহীম (আ) এলেন। এদিনও ইসমাইল গৃহে ছিলেন না। নতুন পুত্রবধু ছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ তোমার স্বামী কোথায়? সে বললোঃ তিনি আমাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনতে গেছেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কেমন আছ?” সে বললো, “আল্লাহর শোকর, আমরা খুব ভাল আছি।”

হযরত ইবরাহীমঃ তোমরা কি খাও?

পুত্রবধুঃ গোশত।

হযরত ইবরাহীমঃ কি পান কর?

পুত্রবধুঃ পানি।

হযরত ইবরাহীমঃ হে আল্লাহ! এদের খাদ্য ও পানিতে বরকত দাও।

রাসূল(সা) বলেনঃ সেদিন ইসমাইলের ঘরে কোন চাউল বা গম ছিল না। থাকলে সেগুলিতেও তিনি বরকত কামনা করতেন। আজ মক্কায় যে খাদ্যের প্রাচূর্য, তা হযরত ইবরাহীমের দোয়ার ফল।

হযরত ইবরাহীম বললেনঃ ইসমাইল এলে তাকে বলো, সে যেন তার ঘরের কপাট আর না পাল্টায়।

অতঃপর ইসমাইল গৃহে ফিরলে তাঁর স্ত্রী তাকে সমস্ত ঘটনা জানালেন। ইসমাইল বললেনঃ এই আগন্তুক আমার পিতা। ‘কপাট’ বলে তিনি তোমার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এবং তোমাকে বহাল রাখতে বলেছেন।

কিছুদিন পর হযরত ইবরাহীম এসে ইসমাইলকে জানালেন যে, আল্লাহ তাকে কাবাশরীফ পুনঃনির্মাণের আদেশ দিয়েছেন। ইসমাইল সানন্দে সায় দিলেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। ইসমাইল পাথর বয়ে আনেন এবং হযরত ইবরাহীম কাবা নির্মাণ করেন। (সংক্ষেপিত) (বুখারী)।

শিক্ষাঃ  

এই ঘটনাটি বহু মূল্যবান শিক্ষায় পরিপূর্ণ। যেমনঃ

১. সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। সংসারে অভাব অনটন থাকলে তা মানুষের কাছে ব্যক্ত করা অনুচিত।

২. ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা এবং এজন্য পরিবার পরিজনকে রেখে বিদেশে সফরের প্রয়োজন হলে তাতেও কুণ্ঠিত হওয়া উচিত নয়। বিশেষতঃ মুমিন মহিলাদের পক্ষ থেকে পুরুষদেরকে এ ব্যাপারে বাধা দেবার পরিবর্তে উৎসাহ দেয়া কর্তব্য।

৩. আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতার অর্থ খাদ্য দ্রব্যের সন্ধানে চেষ্টা না চালিয়ে ঘরে বসে থাকা নয়। হযরত হাজেরা স্ত্রীলোক হয়েও দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ঘরে রেখে খাদ্য ও পানির সন্ধানে বাইরে ছুটাছুটি করছিলেন। হালাল রুজীর সন্ধানে পর্দা সহকারে বাইরে যাওয়া নারীর জন্যও অবৈধ নহে। তবে স্থায়ী পেশা হিসেবে বহিরাঙ্গনে (যেখানে পুরুষদের উপস্থিতি রয়েছে) চলাফেরা এড়িয়ে চলাই উত্তম।

৪. পুরুষদের ইসলামী দাওয়াতের কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও নিজ পরিবারের লোকজনদের নৈতিকতা ও তাকওয়া পরহেজগারীর তদারকী অব্যাহত রাখা কর্তব্য এবং তাদের সততা অনুশীলনের বাধা অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরী।

৮৮ হযরত মূসা (আ) ও পানির বোতল

হযরত আবু হুরায়রা(রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল(সা) বলেন, একবার হযরত মূসা(আ) এর মনে প্রশ্ন জাগলো যে, আল্লাহ তায়ালা কেন ঘুমান না? আল্লাহ তার মনের প্রশ্ন জানতে পেরে তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। এই ফেরেশতা হযরত মূসার(আ) দুই হাতে দুটি পানিভর্তি বোতল দিয়ে তা ধরে রাখতে বললেন এবং যতক্ষণ অনুমতি না দেয়া হবে, ততক্ষণ বোতল কোথাও নামিয়ে রাখা চলবে না বলে সাবধান করে দিলেন। হযরত মূসা ফেরেশতাকে আল্লাহর প্রেরিত মনে করে তার আদেশকেও আল্লাহর আদেশ বলে বিশ্বাস করলেন এবং তদনুযায়ীয় কাজ করলেন।

 দীর্ঘ সময় বোতল দুটি ধরে রাখতে রাখতে তিনি ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর দু’চোখে ঘুম আসতে লাগলো। যখনই ঘুম গাঢ় হয় অমনি দু’হাতের বোতল দুটি কাছাকাছি চলে আসে এবং সংঘর্ষের উপক্রম হয়। অমনি ফেরেশতা তাকে জাগিয়ে দেন এবং তিনি সতর্ক হয়ে যান। এক সময় তার ঘুম অত্যন্ত প্রবল হলো। দু’হাতের বোতল দু’টো প্রচন্ড শব্দে পরস্পর আঘাত লেগে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। তখন ফেরেশতা বললেনঃ আল্লাহ আপনার জন্য শিক্ষা স্বরূপ এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা এই বোতল দুটির মতই আকাশ ও পৃথিবীকে সামাল দিয়ে রেখেছেন। তিনি যদি ঘুমাতেন তাহলে আকাশ ও পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত।(বায়হাকী, দারকুতনী)।

শিক্ষাঃ  এ ঘটনাটি হতে মূল্যবান শিক্ষা লাভ করা যায়।

১. ক্ষুধা, ঘুম প্রভৃতি জৈবিক প্রয়োজন সাধারণ সৃষ্ট জীবের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ এসব দুর্বলতার অনেক উর্ধে্ব। তিনি সদা সচেতন ও সদা জাগ্রত। এ জন্যই বিশ্ব জগতের নিয়ম শৃংখলা সুষ্ঠুভাবে চালু রয়েছে।

২. এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ তায়ালা বিশ্বজগতকে শুধু সৃষ্টি করেই অবসর গ্রহণ করেন নি বা ক্ষান্ত থাকেন নি। বরং তিনি প্রতিটি সৃষ্টির লালন পালনেরও দায়িত্ব পালন করে চলেছেন এবং প্রতি মুহুর্তে তার তত্ত্বাবধান করছেন।

এখানে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, হযরত মূসা (আ) এর মতো একজন বিশিষ্ট নবীর মনে কেন এমন প্রশ্ন জাগলো। এর জবাব এই যে, আল্লাহকে যে ঘুম বা তন্দ্রা স্পর্শ করে না-এ ব্যাপারে হযরত মূসার(আ) মনে কোনই সন্দেহ ছিল না। তিনি কেবল বিষয়টি প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণের মাধ্যমে অধিকতর নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ একটি শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। হযরত ইবরাহীম(আ) সম্পর্কেও পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ কিভাবে মৃতকে জীবিত করবেন সে সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা একটি মৃত পাখিকে টুকরো টুকরো করে তাকে পুনরুজ্জীবিত করে দেখিয়েছিলেন এবং তাকে নিশ্চিত করেছিলেন।

মুসনাদে আহমাদে উদ্ধৃত অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, আসলে হযরত মূসার পক্ষ হতে নয় বরং বনী ইসরাঈলের পক্ষ হতে হযরত মূসার নিকট প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, আল্লাহ ঘুমান না কেন?

৮৯হযরত মূসা() হযরত খিজির() এর সফর

হযরত ইবনু আব্বাস (রা:) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনু কা‘ব (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) হ’তে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) একদা বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ’ল, কোন ব্যক্তি সর্বাধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমিই সর্বাধিক জ্ঞানী।

 জ্ঞানকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ না করার কারণে আল্লাহ তাকে তিরস্কার করে বললেন, বরং দু’সাগরের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা আছে, যিনি তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।

হযরত মূসা (আঃ) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তার নিকট পৌছাতে কে আমাকে সাহায্য্ করবে? কখনো সুফইয়ান এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমি কিভাবে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি? তখন বলা হ’ল, তুমি একটি থলিতে করে একটি মাছ নাও। যেখানে তুমি মাছটি হারাবে, সেখানেই আমার সে বান্দা আছে। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) একটি মাছ ধরলেন এবং থলিতে রাখলেন।অতঃপর মাছ নিয়ে তাঁর সঙ্গী ইউশা বিন নূনকে সাথে নিয়ে চললেন।শেষ পর্যন্ত তারা একটি পাথরের কাছে পৌছলেন এবং তার উপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিলেন।মূসা (আঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলি থেকে বের হয়ে লাফিয়ে সমুদ্রে চলে গেল।অতঃপর সে সমুদ্রে সুড়ঙ্গের মত পথ করে নিল।আর আল্লাহ্‌ মাছটির চলার পথে পানির প্রবাহ থামিয়ে দিলেন।ফলে তার গমনপথটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল। অতঃপর তারা উভয়ে অবশিষ্ট রাত এবং পুরো দিন পথ চললেন।

পরদিন সকালে হযরত মূসা (আঃ) তার সাথীকে বললেন, আমরা তো সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের খাবার নিয়ে এস।হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ্‌ যে স্থানে যাবার কথা বলেছিলেন, সেই স্থান অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনরূপ ক্লান্তিবোধ করেননি। সাথী ইউশা বিন নুন তখন বলল, আপনি কি ভেবে দেখেছেন, যে পাথরটির নিকট আমরা বিশ্রাম নিয়েছিলাম সেখানেই মাছটি অদ্ভুতভাবে সমুদ্রের মধ্যে চলে গেছে।কিন্তু আমি মাছটির কথা আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। মূলত: শয়তানই আমাকে এ কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, পথটি মাছের জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গের মত আর তাঁদের জন্য ছিল আশ্চর্যজনক ব্যাপার।

হযরত মূসা (আঃ) বললেন, আমরা তো সেই স্থানটিরই অনুসন্ধান করছি।অতঃপর তারা তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললেন এবং ঐ পাথরের নিকটে পৌঁছে দেখলেন, এক ব্যক্তি কাপড় মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। মূসা (আঃ) তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, এখানে সালাম কি করে এলো? তিনি বললেন, আমি মূসা। খিযির জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বনী ইসরাঈল বংশীয় মূসা? মূসা (আঃ) বললেন, হ্যাঁ। আমি এসেছি এজন্য যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা হ’তে আপনি আমাকে শিক্ষা দিবেন। খিযির বললেন, হে মূসা! আমার আল্লাহ্‌ প্রদত্ত কিছু জ্ঞান আছে, যা আপনি জানেন না। আর আপনিও আল্লাহ্‌ প্রদত্ত এমন কিছু জ্ঞানের অধিকারী, যা আমি জানি না। মূসা (আঃ) বললেন, আমি কি আপনার সাথী হ’তে পারি? খিযির বললেন,

‘আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। যে বিষয় আপনার জ্ঞানের আওতাধীন নয় সে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করবেন কেমন করে?’ মূসা (আঃ) বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ্‌ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না’ (কাহফ ৬৭-৬৯) ।

অতঃপর তাঁরা দু’জনে সাগরের কিনারা ধরে হেঁটে চললেন। তখন একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা তাদেরকে নৌকায় তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খিযিরকে চিনতে পেরে বিনা ভাড়ায় তাঁদেরকে নৌকায় তুলে নিলো। যখন তাঁরা দু’জনে নৌকায় চড়লেন, তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকাটির কিনারায় বসল এবং সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা বা দুই ফোঁটা পানি পান করল। খিযির বললেন, ‘হে মুসা! আমার ও আপনার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান হ’তে ততটুকুও কমেনি যত টুকু এ পাখিটি তাঁর ঠোটের দ্বারা সাগরের পানি হ্রাস করেছে’।

তখন খিযির একটি কুড়াল নিয়ে নৌকাটির একটা তক্তা খুলে ফেললেন। মূসা (আঃ) অকস্মাৎ দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেলেন যে, তিনি কুড়াল দিয়ে একটি তক্তা খুলে ফেলেছেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, আপনি একি করলেন? এ লোকেরা বিনা ভাড়ায় আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিলো, আর আপনি তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য নৌকা ছিদ্র  করে দিলেন? আপনি তো একটি গুরুতর কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার এ ব্যবহারে আমার প্রতি কঠোর হবেন না।মূসা (আঃ)-এর পক্ষ থেকে প্রথম এ কথাটি ছিল ভুলক্রমে।

অতঃপর তাঁরা যখন উভয়ে সমুদ্র পার হলেন, তখন তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করছিল।খিযির ছেলেটির মাথা দেহ হ’তে ছিন্ন করে ফেললেন। হযরত মুসা (আঃ) বললেন, আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন? আপনি খুবই খারাপ একটা কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোন প্রশ্ন করি, তাহ’লে আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না।অতঃপর উভয়ে চলতে লাগলেন।   চলতে চলতে তাঁরা একটি জনপদের অধিবাসীদের নিকট পৌঁছে তাদের নিকট কিছু খাবার চাইলেন। কিন্তু জনপদ বাসী তাদের দু’জনের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল।সেখানে তারা একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন, যা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।হযরত খিযির প্রাচীরটি মেরামত করে সুদৃঢ় করে দিলেন।হযরত মুসা (আঃ) বললেন, এই বসতির লোকদের নিকট এসে আমরা খাবার চাইলাম।তারা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল।অথচ আপনি এদের দেয়াল সোজা করে দিলেন।আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন।হযরত খিযির বললেন, এবার আমার এবং আপনার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেল।এক্ষণে যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, আমি এর তাৎপর্য বলে দিচ্ছি।

নৌকাটির ব্যাপার ছিল এই যে, সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির।তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত।আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিতে চাইলাম। কারণ, তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে ভাল নৌকা পেলেই জোরপূর্বক কেড়ে নিত। তারপর যখন এটাকে দখল করতে লোক আসল, তখন ছিদ্রযুক্ত দেখে ছেড়ে দিল। অতঃপর নৌকাওয়ালারা একটা কাঠ দ্বারা নৌকাটি মেরামত করে নিলো।আর বালকটি সূচনা লগ্নেই ছিল কাফের। আর সে ছিল তার ঈমানদার বাবা- মার বড়ই আদরের সন্তান । আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে বড় হয়ে অবাধ্যতা ও কুফরি দ্বারা তাদেরকে কষ্ট দিবে। অতঃপর আমি ইচ্ছা করলাম যে, তাদের পালনকর্তা তাদেরকে তার চেয়ে পবিত্রতায় ও ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর একটি শ্রেষ্ঠ সন্তান দান করুন।আর প্রাচীরের ব্যাপার এই যে, সেটি ছিল নগরের দু’জন ইয়াতীম বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন। তাদের পিতা ছিলেন সৎকর্ম পরায়ণ। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াপরবেশ হয়ে ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করে নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ ইচ্ছায় এসব করিনি। আপনি যে বিষয়গুলোতে ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, এই হ’ল তার ব্যাখ্যা ।

(কাহফ ৭৯-৮২; ছহীহ বুখারী হা/৩৪০১ ‘নবীদের কাহিনী’অধ্যায়,‘খিযিরের সাথে মূসা (আঃ)-এর কাহিনী’অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/২৩৮০, ‘ফাযায়েল’অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৬)

পর্যালোচনা শিক্ষাঃ

অধিকাংশ বিজ্ঞা মুফাসসিরের মতে হযরত খিজির একজন ফেরেশতা। কেননা এ ধরনের শরীয়ত বিরোধী কর্মকান্ড একজন নবীতো দূরের কথা, কোন সাধারণ মুসলমানের দ্বারাও সংঘটিত হতে পারে না। তবে ফেরেশতাগণ আল্লাহর হুকুমে এ ধরনের কাজ করতে পারেন। এ ঘটনার প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হলোঃ

১। কোন ব্যাপারে অহংকার করা উচিত নয়। বিশেষ করে জ্ঞানের বড়াই অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

২। যে কাজ শরীয়ত বিরোধী মনে হবে, তার প্রতিবাদ সঙ্গে সঙ্গেই করা উচিত। এমনকি প্রতিবাদ না করার ওয়াদা করে থাকলেও সেই ওয়াদা ভঙ্গ করে ওয়াদা করা কর্তব্য। হযরত মূসা(আ) এই আদর্শই সমুন্নত রেখেছেন।

৯০হযরত মূসা () ও ইসতিসকার নামায

হাদীসে বর্ণিত আছে, হযরত মূসা (আ.)-এর যুগে একবার অসহনীয় তাপদাহ, অসহ্য গরম আর কঠিন অনাবৃষ্টি দেখা দিল। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে দোয়া ও মুনাজাতের উদ্দেশ্যে আল্লাহর সকাশে হাত তুললেন। নির্দেশ এলো, শুধু আপনি এবং আপনার অনুগত লোকজন কেন? যারা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে রেখেছে, যারা অন্যায় অনাচার দুর্নীতি পাপাচারে লিপ্ত তাদের কি বৃষ্টির প্রয়োজন নেই? তারা কি শীতল বায়ু, প্রবাহিত পানি, ফুল ও ফসলের মুখাপেক্ষী নয়? হযরত মূসা (আ.) বললেন, হে আল্লাহ আপনার দেয়া কোন নেয়ামত থেকে কাফির-মুমিন, ভালো-মন্দ, পাপী-পূণ্যবান কেউ কি অমুখাপেক্ষী হতে পারে? তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হলো, গোটা দেশবাসীকে তওবা করতে বলুন। যথাসম্ভব অধিক লোককে সাথে নিয়ে প্রচ- উত্তাপের সময় ময়দানে জমা হয়ে ভুল স্বীকার, তওবা ও কান্নাকাটি করুন। সাথে সমাজের চিহ্নিত খারাপ লোকগুলোকে বিশেষভাবে আনবেন। হযরত মূসা (আ.) তাই করলেন।
প্রচ- খরতাপে উত্তপ্ত বালির মাঠে শত সহস্র লোক সমবেত। বাদ যায়নি নারী শিশুরাও। অনেকে নিজেদের গৃহপালিত পশুদেরও সাথে নিয়ে এসেছে। সবার মুখে তওবা, অনুতাপ, অনুশোচনা, দোয়া আর মুনাজাত। ফেরেশতা ওহী নিয়ে এলেন, আল্লাহ বলে পাঠিয়েছেন, সমাবেশের একজন লোক আছে যে শুধু তার অন্যায় অপরাধের ফলেই চলমান এ খরা উত্তাপ আর অনাবৃষ্টি। তাকে এখান থেকে চলে যেতে বল। সে যেন দাঁড়িয়ে নিজের ত্রুটি স্বীকার করে ময়দান ছেড়ে চলে যায়। অপরাধ ও পাপাচারের কথা জনসমক্ষে স্বীকার করে, তওবা করে এ লোকটি চলে গেলেই সমবেত লোকদের দোয়া কবুল হবে।

আল্লাহর প্রত্যাদেশ শুনে হযরত মূসা (আ.) লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আল্লাহ ঐ ব্যক্তির নাম বলেন নি তবে ঐ ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে নিজে ওয়াকিবহাল। আমি দেশের সমগ্র জনগণের স্বার্থে তাকে এই স্থান ত্যাগ করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।

কয়েক ঘন্টা কেটে গেল এভাবে। মূসা বারবার অনুরোধ জানাতে লাগলেন, কোনো ফলোদয় হলো না। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আকাশ মেঘে ছেয়ে গেল। অতঃপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হল।

বৃষ্টির ফলে জনগণ খুশী হলেও হযরত মূসা বেকায়দায় পড়ে গেলেন। কারণ ওহীর নির্দেশমত কোনো পাপী লোককে বের হয়ে যেতে দেখা না গেলেও বৃষ্টি এল। এতে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিল যে, হযরত মূসা(আ) ওহীর নামে যা বলছেন তা সত্যি ছিল কিনা।

আল্লাহ ওহী নাযিল করলেন, “হে মূসা! তুমি যখন পাপীকে স্থান ত্যাগ করার জন্য আবেদন জানাচ্ছিলে, সে তখন মনে মনে আমার কাছে অনুশোচনা প্রকাশ করে তওবা করেছিল এবং বললো “হে আল্লাহ! আমাকে এত লোকের সামনে অপদস্থও করোনা, আর আমার জন্য দেশবাসীকে কষ্টও দিওনা। আমাকে মাফ করে দিয়ে বৃষ্টি দাও।” আমি তার দোয়া কবুল করে বৃষ্টি দিয়েছি।(বুখারী)।

শিক্ষাঃ  গুনাহ বা ভুলত্রুটির জন্য কাউকে লোকজনের সামনে হেয় না করে তাওবার মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ দেয়া উচিত।

৯১হযরত খিজিরের () বদান্যতা

হযরত খিজির বনী ইসরাঈলের কোন এক বাজারে ঘোরাঘুরি করছিলেন। এমন সময় এক লোক এসে বললো, “আমি একজন ক্রীতদাস। আমার মনিব চারশো দিরহামের বিনিময়ে আমাকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন মুক্তিপণের জন্য আপনার কাছে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করছি। আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন।”

হযরত খিজির বললেনঃ আল্লাহ যা ইচ্ছা তা একভাবে সম্পন্ন হবেই। আমার কাছে তোমাকে দেওয়ার মত এক কানাকড়িও নেই। আমাকে মাফ কর।

কিন্তু লোকটি পীড়াপিড়ি করতে লাগলো। হযরত খিজির (আ) তখন তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রয় করে সে অর্থ দিয়ে তাঁকে মুক্তিপণ দিয়ে উক্ত লোককে দাসমুক্তির প্রস্তাব দিল। এরপর লোকটি খিজির(আ) কে বাজারে নিয়ে গিয়ে চারশো দিরহামে বিক্রয় করে। যে লোকটি হযরত খিজিরকে কিনলেন তিনি খিজির (আ) কে কোন কাজ না দিয়ে অতিথির মত যত্ন করতে লাগলো। এতে হযরত খিজির আপত্তি জানালে মনিব বললেন, “আপনি বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি। আপনাকে কষ্ট দেয়াটা আমার পছন্দ নয়।” হযরত খিজির বললেন, “আমার কোন কষ্ট হবে না। আপনি আদেশ করে দেখুন।” তখন মনিব বললো, “বেশ, তাহলে এই পাথরটি সরিয়ে ওখানটায় রাখুন।” আদেশ দিয়ে মনিব বাইরে গেলেন। কিন্তু পাথরটি ছিল এত বিরাট ও ভারী যে, ছয়জন লোক সারাদিন পরিশ্রম করেও তা সরানো সম্ভব ছিল না। অথচ একঘন্টা পর মনিব ফিরে এসে দেখেন, পাথরটি যথাস্থানে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মনিব খুব খুশী হলেন। মনিব তার বৃদ্ধ ক্রীতদাসকে বললেন, “আল্লাহর দোহাই, আপনার রহস্য কি আমাকে খুলে বলুন।” এরপর হযরত খিজির (আ) বিস্তারিত বললেন এবং তিনি যে হযরত খিজির (আ) সে পরিচয় দিলেন।

সব শুনে মনিব বললেন, “আমি আল্লাহর ও আপনার ওপর ঈমান এনেছি। না জেনে শুনে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি অনুতপ্ত।” হযরত খিজির বললেন, “না তাতে আপনার দোষ হয়নি। আপনি যা করেছেন সততা ও নিষ্ঠার সাথেই করেছেন।” মনিব বললো, “আপনি আমার সহায় সম্পদ ও পরিবার পরিজন সম্পর্কে যেমন ভাল মনে করেন তদনুযায়ী আদেশ দিন। আর আপনার মুক্তি চাইলে মুক্ত করে দেব।”

হযরত খিজির বললেন, “আমার প্রত্যাশা এই যে, আমাকে মুক্তি দিন যাতে আমি নিজের আসল মনিব আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত হতে পারি।” অতঃপর মনিব তাকে মুক্ত করে দিল। তখন হযরত খিজির(আ) বললেন, “মহান আল্লাহর শোকর আদায় করছি। যিনি আমাকে মানুষের গোলামীর বন্ধনে আবদ্ধ করার পর তা হতে মুক্তি দিয়েছেন।”।

৯২ শাদ্দাদের বেহেশতের কাহিনী

হযরত হুদ (আঃ) এর আমলে শাদ্দাদ নামে একজন অতীব পরাক্রমশালী ঐশ্বর্যশালী মহারাজা ছিল। আল্লাহর হুকুমে হযরত হুদ (আঃ) তার কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং দাওয়াত গ্রহণ করলে আখেরাতে বেহেশত লাভ অন্যথায় দোযখে যাওয়া অবধারিত বলে জানান। শাদ্দাদ হযরত হুদ (আঃ) এর  কাছে বেহেশত ও দোযখের বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইলে তিনি জানান। শাদ্দাদ তাকে বলল,তোমার আল্লাহর বেহেশত আমার প্রয়োজন নেই।বেহেশতের যে নিয়ামত ও সুখ-শান্তির বিবরণ তুমি দিলে ,অমন বেহেশত আমি নিজে এই পৃথিবীতেই বানিয়ে নিব।তুমি দেখে নিও।

হযরত হুদ (আঃ) তাকে হুশিয়ার করে দিলেন যে,আল্লাহ পরকালে যে বেহেশত তৈরী করে রেখেছেন,তোমার বানানো বেহেশত তার ধারে কাছেও যেতে পারবেনা। অধিকন্তু তুমি আল্লাহর সাথে পাল্লা দেয়ার জন্য অভিশপ্ত হবে। কিন্তু শাদ্দাদ কোন হুশিয়ারীর তোয়াক্কা করলো না। সে সত্যি সত্যিই দুনিয়ার উপর একটি সর্ব-সুখময় বেহেশত নির্মানের পরিকল্পনা করল। তার ভাগ্নে জোহাক তাজী তখন পৃথিবীর অপ্র প্রান্তে এক বিশাল সম্রাজ্যের অধিকারী ছিল। অধিকন্তু পারস্যের সম্রাট জামশেদের সম্রাজ্য দখল করে সে প্রায় অর্ধেক দুনিয়ার প্রতাপন্বিত সম্রাটে পরিনত হয়েছিল।

মহারাজা শাদ্দাদ সম্রাট জোহাক তাজী কে চিঠি লিখে তার বেহেশত নির্মানের পরিকল্পনা জানালো। অতঃপর তাকে লিখলো যে,তোমার রাজ্যে যত স্বর্ণ-রৌপ্য,হিরা-জহরত ও মনি-মাণীক্য আছে,তা সব সংগ্রহ করে আমার দরবারে পাঠিয়ে দাও। আর মিশক-আম্বর জাতীয় সুগন্ধী দ্রব্য যত আছে,তা পাঠিয়ে দাও।

অন্যান্য রাজা-মহারাজাদের কাছেও সে একই ভাবে চিঠি লিখলো এবং বেহেশত নির্মানের পরিকল্পনা জানিয়ে সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্মান সামগ্রী পাঠানোর আদেশ জারী করলো।পৃথিবীর সকল অঞ্চলের অনুগত রাজা-মহারাজারা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল।

এবার বেহেশতের স্থান নির্বাচনের পালা। বেহেশত নির্মানের উপযুক্ত স্থান খুজে বের করার জন্য শাদ্দাদ বহু সংখ্যক সরকারী কর্মচারী কে নিয়োগ করল। অবশেষে ইয়ামানের একটি শস্য শ্যামল অঞ্চলে প্রায় একশ চল্লিশ বর্গ মাইল এলাকার একটি জায়গা নির্বাচন করা হল।

বেহেশত নির্মানের জন্য নির্মান সামগ্রী ছাড়াও বিভিন্ন দেশ থেকে বাছাই করা দক্ষ মিস্ত্রী আনা হল।প্রায় তিন হাজার সুদক্ষ কারিগর কে বেহেশত নির্মানের জন্য নিয়োগ করা হল। নির্মান কাজ শুরু হয়ে গেলে শাদ্দাদ তার অধীনস্থ প্রজাদের জানিয়ে দিল জে,কারো নিকট কোন সোনা রূপা থাকলে সে যেন তা গোপন না করে এবং অবিলম্বে তা রাজ দরবারে পাঠিয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে তল্লাশী চালানোর জন্য হাজার হাজার কর্মচারী  নিয়োগ  করা হল। এই কর্মচারীরা কারো কাছে এক কণা পরিমাণ সোনা-রূপা পেলেও তা কেড়ে নিতে লাগল। এক বিধবার শিশু মেয়ের কাছে চার আনা পরিমান রূপার গহণা পেয়ে তাও তার  কেড়ে নিল। মেয়েটি কেদে গড়াগড়ি দিতে লাগল। তা দেখে বিধবা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানাল যে, হে আল্লাহ ,এই অত্যাচারী রাজা কে তুমি তার বেহেশত ভোগ করার সুযোগ দিও না। দুঃখিনী মজলুম বৃদ্ধার এই দোয়া সম্ভবত কবুল হয়ে গিয়ে ছিল।

ওদিকে মহারাজা শাদ্দাদের বেহেশত নির্মানের কাজ ধুমধামের সাথে চলতে লাগল। বিশাল ভূখন্ডের চারদিকে চল্লিশ গজ জমি খনন করে মাটি ফেলে মর্মর পাথর দিয়ে  বেহেশতের ভিত্তি নির্মান করা হল। তার উপর সোনা ও রূপার ইট দিয়ে নির্মিত হল প্রাচীর। প্রাচীরের উপর জমরূদ পাথরের ভীম ও বর্গার উপর লাল বর্ণের মূল্যবান আলমাছ পাথর ঢালাই করে প্রাসাদের ছাদ তৈরী হল। মূল প্রাসাদের ভিতরে সোনা ও রূপার কারূকার্য খচিত ইট দিয়ে বহু সংখ্যক ছোট ছোট দালান তৈরী করা হল।

সেই বেহেশতের মাঝে মাঝে তৈরী করা হয়েছিল সোনা ও রূপার  গাছ-গাছালি এবং সোনার ঘাট ও তীর বাধা পুস্করিনী ও নহর সমূহ। আর তার কোনটি দুধ,কোনটি মধু ও কোনটি শরাব দ্বারা ভর্তি করা হয়েছিল। বেহেশতের মাটির পরিবর্তে শোভা পেয়েছিল সুবাসিত মেশক ও আম্বর এবং মূল্যবান পাথর দ্বারা তার মেঝে নির্মিত হয়েছিল। বেহেশতের প্রাঙ্গন মনি মুক্তা দ্বারা ঢালাই করা হয়েছিল।

বর্ণিত আছে যে,এই বেহেশত নির্মাণ করতে প্রতিদিন অন্ততঃ চল্লিশ হাজার গাধার বোঝা পরিমান সোনা-রূপা নিঃশেষ হয়ে যেত।এইভাবে একাধারে তিনশ’ বছর ধরে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

এরপর কারিগরগণ শাদ্দাদ কে জানাল যে,বেহেশত নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। শাদ্দাদ খুশী হয়ে আদেশ দিল জে,এবার রাজ্যের সকল সুন্দ যুবক-যুবতী ও বালক-বালিকাকে বেহেশতে এনে জড়ো করা হোক। নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হল।

অবশেষে একদিন শাদ্দাদ সপরিবারে বেহেশত অভিমুখে রওনা হল।তার অসংখ্য লোক-লস্কর বেহেশতের সামনের প্রান্তরে তাকে অভবাদন জানাল। শাদ্দাদ অভবাদন গ্রহণ করে বেহেশতের প্রধান দরজার কাছে গিয়ে উপনীত হল। দেখল,একজন অপরিচিত লোক বেহেশতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। শাদ্দাদ তাকে জিজ্ঞেস করল,তুমি কে?

লোকটি বললেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাঈল।

শাদ্দাদ বললঃ তুমি এখন এখানে কি উদ্দেশ্য এসেছ?

আজরাঈল বললেনঃ আমার প্রতি নির্দেশ এসেছে তোমার জান কবজ করার।

শাদ্দাদ বললঃ আমাকে একটু সময় দাও।আমি আমার তৈরী পরম সাধের বেহেশতে একটু প্রবেশ করি এবং এক নজর ঘুরে দেখি।

আজরাঈল বললেনঃ তোমাকে এক মুহুর্তও সময় দানের অনুমতি নেই।

 শাদ্দাদ বললঃ তাহলে অন্ততঃ আমাকে ঘোড়া থেকে নামতে দাও।

আজরাঈল বললেনঃ না,তুমি যে অবস্থায় আছ,সে অবস্থায়ই তোমার জান কবজ করা হবে।

শাদ্দাদ ঘোড়া থেকে এক পা নামিয়ে দিল।কিন্তু তা বেহেশতের চৌকাঠ স্পর্শ করতে পারলনা। এই অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটল।তার বেহেশতের আশা চিরতরে নির্মূল হয়ে গেল।

ইতঃমধ্যে আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আঃ)এক প্রচন্ড আওয়াজের মাধ্যমে শাদ্দাদের বেহেশত ও লোক-লস্কর সব ধ্বংস করে দিলেন।এভাবে শাদ্দাদের রাজত্ব চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

বর্ণিত আছে যে,হযরত মুয়াবিয়ার (রাঃ) রাজত্বকালে আব্দুল্লাহ বিন কালব নামক এক ব্যক্তি ইয়ামানের একটি জায়গায় একটি মূল্যবান পাথর পেয়ে তা হযরত মুয়াবিয়ার (রাঃ) নিকট উপস্থাপন  করেন।

সেখানে তখন কা’ব বিন আহবার উপস্থিত ছিলেন।তিনি উক্ত মূল্যবান রত্ন দেখে বললেন,এটি নিশ্চয় শাদ্দাদ নির্মিত বেহেশতের ধ্বংসাবশেষ। কেননা আমি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছি যে,আমার উম্মতের মধ্যে আব্দুল্লাহ নামক এক ব্যক্তি শাদ্দাদ নির্মিত বেহেশতের স্থানে গিয়ে কিছু নিদর্শন দেখতে পাবে।

শিক্ষাঃ এই কাহিনীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে দখলকৃত সম্পদ অনেক সময় কাজে লাগেনা। আর মজলুমের দোয়া যে আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়, সে কথা একাধিক হাদীস থেকেও জানা যায় এবং এই ঘটনার মাধ্যমেও আরেকবার জানা গেল।

 

৯৩ হযরত ঈসা (আ) এর উম্মতের এক দরবেশের কাহিনী

ইবনে ইসহাক হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা(আ) আকাশে উত্থিত হওয়ার পর যখন তাঁর উম্মতের মধ্যে নানারকম শিরক বিদআত এর অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তখন যারা হযরত ঈসা(আ) এর আনীত দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেন এবং তার প্রচার চালাতে থাকেন, তাদের একটি দল একসময় ইয়ামানের নাজরান প্রদেশে বসতি স্থাপন করেন। এই দলটির নেতা ছিলেন ফিমিউন নামে দুনিয়ার স্বার্থত্যাগী, সৎ, ন্যায়পরায়ন ও কঠোর পরিশ্রমী এক ব্যাক্তি। তাঁর দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হতো। তিনি দেশ দেশান্তর সফর করে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করতেন এবং প্রধানত পল্লী অঞ্চলের মানুষের অতিথি হতেন।

ভক্তদের আতিথেয়তা ও ভক্তির বাড়াবাড়ি তাকে দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন করে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যেতে পারে-এই আশংকায় তিনি এক স্থানে বেশিদিন থাকতেন না। তিনি শুধু নিজ উপার্জন হতে খাওয়া দাওয়া করতেন। ঈসায়ী ধর্মের বিধান অনুযায়ী তিনি রবিবার কোন কাজ করতেন না এবং জনবসতি হতে দূরে নির্জন স্থানে গিয়ে সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত নামায ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। একবার সিরিয়ার একটি গ্রামে গোপনে নামায পড়াকালে সালেহ নামে একজন গ্রামবাসী তা দেখে ফেলে এবং ফিমিউনকে অত্যন্ত ভালোবেসে ফেলে। ফিমিউন যেখানে যেতেন সে তার সাথে সাথে সেখানে যেত, কিন্তু ফিমিউন টের পেতেন না। এক পর্যায়ে ফিমিউন সালেহ এর উপস্থিতি টের পেলেন। সালেহ বললেন, “হে ফিমিউন! তুমি নিশ্চয়ই অবগত আছ যে, আমি আজ পর্যন্ত তোমার মত কাউকে ভালবাসিনি। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।”

ফিমিউন বললেন, “তোমার ইচ্ছাটা মন্দ নয়। কিন্তু আমার অবস্থাতো দেখতেই পাচ্ছ। তুমি যদি মনে কর, আমার সাথে টিকতে পারবে, তাহলে থাকো।” এরপর সালেহ তাঁর সহচর হয়ে গেল। কেউ অসুস্থ হলে বা কোন দূর্ঘটনা ঘটলে ফিমিউন দোয়া করতেন এবং সে ভাল হয়ে যেত। কিন্তু কোন রুগ্ন ব্যক্তি ডাকলে তিনি যেতেন না। তবে তিনি মজুরীর বিনিময়ে মানুষের বাড়ীঘর নির্মাণ করতেন। এক গ্রামবাসীর ছেলে খুব অসুস্থ। তিনি ফিমিউনকে আনার উপায় খুঁজতে লাগলে। ফিমিউনের নিকট এসে বললেন, “ওহে ফিমিউন। আমি নিজের বাড়িতে কিছু কাজ করাতে চাই। তুমি আমার সাথে চল।” লোকটির ঘরে গেল লোকটি তার ছেলের উপর হতে চাদর সরিয়ে বলল, “হে ফিমিউন! আল্লাহর এক বান্দা অসুস্থ। তার ভাল হওয়ার জন্য দোয়া করুন।” ফিমিউন দোয়া করতেই বালকটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল।

একবার ফিমিউন ও সালেহ আরব ভূখন্ড দিয়ে ভ্রমণ করছিল। এমতাবস্থায় একটি আরব কাফেলা তাদেরকে অপহরণ করে গিয়ে নাজরানের পৌত্তলিকদের নিকট বিক্রয় করে দিল। ঐ পৌত্তলিকরা একটি খেজুর গাছের পূজা করতো। নাজরানের জনৈক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ঐ কাফেলার নিকট হতে তাঁদের উভয়কে কিনে নিল। ফিমিউনকে তাঁর মনিব যে ঘরে থাকতে দিতেন তিনি রাতে সেখানে তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন েএবং তাঁর ঘরটি কোন আলো ছাড়াই আলোকিত থাকতো। তাঁর মনিব এটি দেখে বিস্মিত হলো। জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর ধর্ম কি? ফিমিউন বিস্তারিত জানালেন এবং বললেন, “তোমরা গোমরাহীর ভিতর আছ। এ গাছ তোমাদের কোন ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না। আমি যে খোদার ইবাদত করি তাঁর নিকট প্রার্থনা করলে সে গাছটি তিনি ধ্বংস করে দিবেন। তিনি আল্লাহ, তাঁর কোন শরীক নেই।” তারঁ মনিব বললো, “বেশ তুমি গাছটিকে ধ্বংস করে দেখাওতো দেখি।”

ফিমিউন ওযূ করে দুই রাকায়াত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তৎক্ষনাত একটি ঝড় এসে গাছটিকে সমূলে উৎপাটিত করে মাটিতে ফেলে দিল। তখন তাঁর মনিবসহ নাজরানবাসী তার ধর্মে দীক্ষিত হলো। তারা হযরত ঈসা (আ) এর আসল ও অবিকৃত শরীয়তের অনুসারী হলো। এরপর নাজরানবাসীর ওপর এমন কিছু আপদ নেমে আসে যা দুনিয়ার সর্বত্র সত্য দ্বীনের অনুসারীদের ওপর নেমে এসেছে। সেই থেকে নাজরানে ঈসায়ী ধর্মের অভ্যূদয় ঘটে।

শিক্ষাঃ এই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এই যে, ইসলাম প্রচারের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের সবসময় নিজস্ব স্বতন্ত্র জীবিকার ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে জীবিকার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল, লোভমুক্ত ও হালাল উপার্জনে ব্রতী থাকা যায়। আর সর্বাবস্থায় তাদের দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া ও তাকওয়া ভিত্তিক জীবন যাপন করা উচিত।

৯৪ হযরত সোলায়মানের (আ) ন্যায়বিচার

) হযরত সোলায়মান(আ) এর আমলে একদিন দুই মহিলা একটি ছেলেকে উভয়ে নিজের দাবি করে তাঁর দরবারে বিচারপ্রার্থী হলো।

হযরত সোলায়মান প্র্রথমে উভয়ের যুক্তি প্রমাণ আলাদা আলাদা ভাবে শুনলেন। তারপর উভয়কে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তারা সমঝোতায় পৌছতে ব্যর্থ হলো। অগত্য হযরত সোলায়মান(আ) এই মর্মে রায় দিলেন যে, তোমরা যখন কোনমতেই আপোষরফা করতে রাজী নও, তখন এই শিশুকে আমি দ্বিখন্ডিত করে উভয়কে সমান সমান অংশ দিয়ে দেব।

এ কথা শুনে এক মহিলা নীরব রইলো। কিন্তু অপরজন চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। সে বললোঃ “দোহাই আল্লাহর! আপনি শিশুটিকে কাটবেন না। ওকে বরং ঐ মহিলার কোলেই দিয়ে দিন, ও বেঁচে থাকুক। আমি না হয় মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবো।”

একথা শোনার পর হযরত সোলায়মানের (আ) আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, শেষোক্ত মহিলাই শিশুটির আসল মা। তাই শিশুটি তিনি তাকেই দিলন।(বুখারী)।

শিক্ষাঃ  একজন ন্যায়পরায়ন ও বিচক্ষণ শাসক বা বিচারককে শুধু শরীয়ত ও আইন জানলেই চলে না সেই সাথে মানুষের মনস্তত্ত্বও জানতে হবে। নচেৎ সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না।

(খ) একদিন বাদশাহ দাউদ (আ.)-এর আদালতে এক বিচার  এলো। এক শস্যক্ষেত্রের মালিক এসে তার প্রতিবেশী সম্পর্কে বাদশাহর কাছে নালিশ করল। মালিক জানাল, প্রতিবেশীর ছাগলের পাল তার শস্যক্ষেতে ঢুকে সব শস্য খেয়ে ফেলেছে। এতে তার অনেক ক্ষতি হয়েছে। এর সুষ্ঠু বিচার চায় শস্যক্ষেত্রের মালিক।

বাদশাহ দাউদ (আ.) সবকিছু শুনে তাঁর রায় দিলেন। ছাগলের মালিককে জরিমানা করা হলো এবং এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছাগলের পাল পুরোটাই শস্যক্ষেত্রের মালিককে দিয়ে দেয়া হলো। ক্ষতিপূরণ পেয়ে ফসলের মালিক তো মহাখুশি। কিন্তু ছাগলের মালিকের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। সব ছাগল হারিয়ে সে নিঃস্ব হয়ে গেল। তাই সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল।

এখন তার উপায় কী হবে, পরিবার-পরিজন নিয়ে কিভাবে সে চলবে? সে চিন্তায় সে প্রায় পাগলপারার মতো পথ চলছিল। এমন সময় বালক সোলায়মান (আ.) রাস্তায় খেলা করছিলেন। তিনি লোকটির কান্না খেয়াল করলেন এবং এতে তাঁর মন নড়ে উঠল। তাই সোলায়মান (আ.) লোকটিকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন।

ছাগলের মালিক সব ঘটনা বালক সোলায়মান (আ.) কে খুলে বলল। সব শুনে সোলায়মান (আ.) বললেন,

‘ভাই! আপনি এক কাজ করুন। আপনি আবার বাদশাহর দরবারে যান এবং তাঁকে রায়টি পুনরায় বিবেচনার অনুরোধ করুন।’

লোকটি সোলায়মান (আ.) এর কথা মতো আবার বাদশাহর দরবারে গেল এবং তার ক্ষতিপূরণের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার জন্য বাদশাহকে অনুরোধ জানাল।

বাদশাহ লোকটির কথা শুনে কী যেন ভাবলেন। খানিক পরে তিনি লোকটিকে প্রশ্ন করলেন,

-আচ্ছা বলতো, বিচারটি পুনরায় বিবেচনার জন্য কে তোমাকে পরামর্শ দিয়েছে?

লোকটি কালবিলম্ব না করে জবাব দিলো,

সোলায়মান (আ.), বালক সোলায়মান (আ.) আমাকে এ পরামর্শ দিয়েছেন।

দাউদ (আ.) সবই বুঝতে পারলেন। এবার তিনি পুত্র সোলায়মানকে দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং এই রায়ের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করে তাঁকে আদেশ দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

বালক সোলায়মান (আ.) পিতার আদেশ পালন করলেন। তিনি খানিকটা ভেবে তাঁর রায় ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন,

‘ফসলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে শস্যক্ষেত্রের মালিক ছাগলের পাল পাবে এই শর্তে যে, সে ছাগলের দুধ খেতে পারবে এবং পশমও বিক্রি করতে পারবে। তবে ক্ষেত্রে আবার যখন আগের মতো ফসল হবে তখন ছাগলগুলো ছাগলের মালিককে ফেরত দিতে হবে।’

বিচারের রায় শুনে সবাইতো হতবাক। এ যে সুন্দর রায়। এ রায়ে শস্যক্ষেতের মালিক ও ছাগল পালের মালিক উভয়ে মহাখুশি। তাই তারা সানন্দে সোলায়মান (আ.) এর রায় মেনে নিল। তারা এবার যার যার বাড়িতে ফিরে গেল। আর বাদশাহ দাউদ (আ.)ও পুত্রের সুবিবেচনা ও বুদ্ধির বহর দেখে যারপরনাই আনন্দিত হলেন। তিনি এ জন্য আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করলেন।

শিক্ষাঃ অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি তার কল্যাণের কথা চিন্তা করাও প্রত্যেক বিচারকে কর্তব্য। অপরাধীকে এমন শাস্তি দেওয়া উচিত নয় যাতে সে দেউলে হয়ে যায় এবং পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়।

৯৫হযরত ইউনূস (আ) এর কাহিনী

ইউনুস (আঃ) বর্তমান ইরাকের মূছেল নগরীর নিকটবর্তী ‘নীনাওয়া’ (نينوى) জনপদের অধিবাসীদের প্রতি প্রেরিত হন। তিনি তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন এবং ঈমান ও সৎকর্মের প্রতি আহবান জানান। কিন্তু তারা তাঁর প্রতি অবাধ্যতা  প্রদর্শন করে। বারবার দাওয়াত দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হ’লে আল্লাহর হুকুমে তিনি এলাকা ত্যাগ করে চলে যান। ইতিমধ্যে তার কওমের উপরে আযাব নাযিল হওয়ার পূর্বাভাস দেখা দিল। জনপদ ত্যাগ করার সময় তিনি বলে গিয়েছিলেন যে, তিনদিন পর সেখানে গযব নাযিল হ’তে পারে। তারা ভাবল, নবী কখনো মিথ্যা বলেন না। ফলে ইউনুসের কওম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দ্রুত কুফর ও শিরক হ’তে তওবা করে এবং জনপদের সকল আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এবং গবাদিপশু সব নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা বাচ্চাদের ও গবাদিপশু গুলিকে পৃথক করে দেয় এবং নিজেরা আল্লাহর দরবারে কায়মনোচিত্তে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। তারা সর্বান্ত:করণে তওবা করে এবং আসন্ন গযব হ’তে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে। ফলে আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের উপর থেকে আযাব উঠিয়ে নেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,

فَلَوْلاَ كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلاَّ قَوْمَ يُوْنُسَ لَمَّا آمَنُوْا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِيْنٍ- (يونس ৯৮)-

‘অতএব কোন জনপদ কেন এমন হ’ল না যে, তারা এমন সময় ঈমান নিয়ে আসত, যখন ঈমান আনলে তাদের উপকারে আসত? কেবল ইউনুসের কওম ব্যতীত। যখন তারা ঈমান আনল, তখন আমরা তাদের উপর থেকে পার্থিব জীবনের অপমানজনক আযাব তুলে নিলাম এবং তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবনোপকরণ ভোগ করার অবকাশ দিলাম’ (ইউনুস ১০/৯৮)। অত্র আয়াতে ইউনুসের কওমের প্রশংসা করা হয়েছে।

ওদিকে ইউনুস (আঃ) ভেবেছিলেন যে, তাঁর কওম আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারলেন যে, আদৌ গযব নাযিল হয়নি, তখন তিনি চিন্তায় পড়লেন যে, এখন তার কওম তাকে মিথ্যাবাদী ভাববে এবং মিথ্যাবাদীর শাস্তি হিসাবে প্রথা অনুযায়ী তাকে হত্যা করবে। তখন তিনি জনপদে ফিরে না গিয়ে অন্যত্র হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। এ সময় আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা করাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি।

মাছের পেটে ইউনুস :

আল্লাহ বলেন,

وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِيْنَ- إِذْ أَبَقَ إِلَى الْفُلْكِ الْمَشْحُوْنِ- فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ الْمُدْحَضِيْنَ- فَالْتَقَمَهُ الْحُوْتُ وَهُوَ مُلِيْمٌ- (الصافات ১৩৯-১৪২)-

‘আর ইউনুস ছিল পয়গম্বরগণের একজন’। ‘যখন সে পালিয়ে যাত্রী বোঝাই নৌকায় গিয়ে পৌঁছল’। ‘অতঃপর লটারীতে সে অকৃতকার্য হ’ল’। ‘অতঃপর একটি মাছ তাকে গিলে ফেলল। এমতাবস্থায় সে ছিল নিজেকে ধিক্কার দানকারী’ (ছাফফাত ৩৭/১৩৯-১৪২)

আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা না করে নিজস্ব ইজতিহাদের ভিত্তিতে ইউনুস (আঃ) নিজ কওমকে ছেড়ে এই হিজরতে বেরিয়েছিলেন বলেই অত্র আয়াতে তাকে মনিবের নিকট থেকে পলায়নকারী বলা হয়েছে। যদিও বাহ্যত এটা কোন অপরাধ ছিল না। কিন্তু পয়গম্বর ও নৈকট্যশীলগণের মর্তবা অনেক ঊর্ধ্বে। তাই আল্লাহ তাদের ছোট-খাট ত্রুটির জন্যও পাকড়াও করেন। ফলে তিনি আল্লাহর পরীক্ষায় পতিত হন।

হিজরতকালে নদী পার হওয়ার সময় মাঝ নদীতে হঠাৎ নৌকা ডুবে যাবার উপক্রম হ’লে মাঝি বলল, একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে। নইলে সবাইকে ডুবে মরতে হবে। এজন্য লটারী হ’লে পরপর তিনবার তাঁর নাম আসে। ফলে তিনি নদীতে নিক্ষিপ্ত হন। সাথে সাথে আল্লাহর হুকুমে বিরাটকায় এক মাছ এসে তাঁকে গিলে ফেলে। কিন্তু মাছের পেটে তিনি হযম হয়ে যাননি। বরং এটা ছিল তাঁর জন্য নিরাপদ কয়েদখানা (ইবনে কাছীর, আম্বিয়া ৮৭-৮৮)। মাওয়ার্দী বলেন, মাছের পেটে অবস্থান করাটা  তাঁকে  শাস্তি  দানের উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং আদব শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ছিল। যেমন পিতা তার শিশু সন্তানকে শাসন করে শিক্ষা দিয়ে থাকেন’ (কুরতুবী, আম্বিয়া ৮৭)

ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে কত সময় বা কতদিন ছিলেন, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন- (১) এক ঘণ্টা ছিলেন (২) তিনি পূর্বাহ্নে প্রবেশ করে অপরাহ্নে বেরিয়ে আসেন (৩) ৩ দিন ছিলেন (৪) ৭ দিন ছিলেন (৫) ২০ দিন ছিলেন (৬) ৪০ দিন ছিলেন। আসলে এইসব মতভেদের কোন গুরুত্ব নেই। কেননা এসবের রচয়িতা হ’ল ইহুদী গল্পকারগণ। প্রকৃত ঘটনা আল্লাহ ভাল জানেন।

শিক্ষাঃ

১। কোন ব্যাপারে শরীয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকলে সে ব্যাপারে নিজস্ব বা অন্যের মত অনুসরণ করা কোন মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। আর নির্দেশ নিজের অজানা থাকলে যারা অভিজ্ঞ, তাদের কাছ হতে জেনে নেওয়া এবং অপেক্ষা করা জরুরী।

২। বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে ভুলত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া ও মুক্তি চাওয়া যখন আল্লাহর নবীদের নীতি, তখন সাধারণ মুসলমানদের জন্য তা আরো বেশি কর্তব্য।

৯৬ওয়াইস কারনীর ঘটনা

ইয়ামানে বসবাসকারীদের পক্ষ থেকে ওমর (রা:)-এর নিকট সাহায্যকারী দল আসলে তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, ‘তোমাদের মাঝে কি উয়াইস ইবনু আমির আছে’? অবশেষে (একদিন) উয়াইস (রহঃ) এসে গেলেন। তাকে ওমর প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি উয়াইস ইবনু আমির’? সে বলল, হ্যাঁ। ওমর (রা:) আবার বললেন, ‘মুরাদ’ সম্প্রদায়ের উপগোত্র ‘কারনের’লোক? তিনি বললেন, হ্যাঁ । তিনি বললেন, ‘আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল, আপনি তা হতে সুস্থ হয়েছেন এবং মাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান বাকী আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘আপনার মা জীবিত আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ।

ওমর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘ইয়ামানের সহযোগী দলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’জাতির উপজাতি ‘কারনের’লোক। তার কুষ্ঠরোগ হবে এবং তা হ’তে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে, সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ্‌ তা’আলা পূরণ করে দেন। তুমি যদি তাকে দিয়ে তোমার গুনাহ মাফের জন্য দোআ করাবার সুযোগ পাও, তাহলে তাই করবে।

ওমর (রা:) বলেন, ‘কাজেই আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দোআ করুন। তখন তিনি (উয়াইস) ওমরের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে দোআ করলেন। ওমর (রা:) তাকে বললেন, ‘আপনি কোথায় যেতে চান? তিনি বললেন, ‘কূফায়। তিনি (ওমর) বলেন, ‘আমি সেখানকার গভর্নরকে আপনার (সাহায্যের) জন্য লিখে দেই?” উয়াইস বললেন, ’‘না, সাধারণ মানুষের কাছে থাকতেই আমি ভালোবাসি।”

এরপর কুফাবাসীরা যখনই হজ্জ্ব করতে মক্কা ও মদীনায় আসতো, তখনই হযরত ওমর তাদের কাছে উয়াইসের খোঁজ খবর নিতেন এবং তাঁর সম্পর্কে রাসূল (সা) এর উক্তি সবাইকে বলতেন। তারপর দলে দলে লোকেরা উয়াইসের কাছে যেতো এবং গুনাহ মাফের দোয়া চাইতো।

অপর রেওয়ায়াতে আছে যে, হযরত ওমর (রা) বলেন, রাসূল (সা) উয়াইসকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী বলেছেন। রাসূল (সা) এর জীবদ্দশায় ঈমান আনা সত্ত্বেও উয়াইস নিজের কুষ্ঠ রোগ ও পঙ্গু মায়ের সেবা শুশ্রুষার কারণে রাসূল (সা) এর সাথে দেখা করতে ও সাহাবীর মর্যাদা লাভ করতে পারেন নি। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ীর মর্যাদাই শুধু দেন নি, সাহাবীদেরকেও তাঁর কাছে গুনাহ মাফের জন্য দোয়া চাইবার উপদেশে দিয়েছেন। কথিত আছে যে, উয়াইস ওহোদ যুদ্ধে রাসূল (সা) এর দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ার খবর শুনে প্রচন্ড আবেগে বেসামাল হয়ে গিয়ে নিজের কয়েকটি দাঁত পাথর দিয়ে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন।

শিক্ষাঃ ইসলামের যথার্থ অনুসারী ও শুভাকাংখী হলে সাহাবী না হয়েও মানুষ উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে ও আল্লাহর প্রিয় হতে পারে। বিশেষতঃ পিতামাতার সেবা যে মানুষকে কত উর্ধে্ব তুলে দিতে পারে তা এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

..সমাপ্ত

About আকরাম ফারুক