হাদীসের কিসসা

৬৮। অকৃতজ্ঞতার পরিণাম

সেকালে ইহুদি বংশে তিনটি লোক ছিল। একজনের সর্বাঙ্গে ধবল, একজনের মাথায় টাক, আর একজনের দুই চোখ অন্ধ। আল্লাহ তাহাদের পরীক্ষার জন্য তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠাইলেন। ফেরেশতা হইলেন আল্লাহর দূত। তাহারা নূরের তৈয়ারি। এমনি কেহ তাহাদিগকে দেখিতে পায় না। আল্লাহর হুকুমে তাহারা সকল কাজ করিয়া থাকেন।
ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরিয়া প্রথমে ধবল রোগীর নিকটে আসিলেন। তিনি তাহাকে বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাস?

ধবল রোগী বলিল, আহা! আমার গায়ের রং যদি ভালো হয়। সকলে যে আমাকে ঘৃণা করে।

স্বর্গীয় দূত তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার রোগ সারিয়া গেল। তাহার গায়ের চামড়া ভালো হইল। তারপর আল্লাহর দূত পুনরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন এখন তুমি কী চাও?

সে বলিল, আমি উট চাই।

দূত তাহাকে একটি গাভিন উট দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।

তারপর সেই ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাস?

সে বলিল, আহা! আমার এই রোগ যদি সারিয়া যায়! যদি আমার মাথায় চুল উঠে! আল্লাহর দূত তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার টাক সারিয়া গেল। তাহার মাথায় চুল গজাইল। দূত পুনরায় বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?

সে বলিল, গাই।

তিনি তাহাকে একটি গাভিন গাই দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।

তারপর স্বর্গীয় দূত অন্ধের কাছে গেলেন। গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাস?

সে বলিল, আল্লাহ আমার চোখ ভালো করিয়া দিন। আমি যেন লোকের মুখ দেখিতে পাই।

স্বর্গীয় দূত তাহার চোখে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার চোখ ভালো হইয়া গেল। তারপর তিনি তাহাকে বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?

সে বলিল, আমি ছাগল চাই। স্বর্গীয় দূত তাহাকে একটি গাভিন ছাগল দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।

তারপর উটের বাচ্চা হইল, গাইয়ের বাছুর হইল, ছাগলের ছানা হইল। এইরকম করিয়া উটে, গাইয়ে, ছাগলে তাহাদের মাঠ বোঝাই হইয়া গেল।

কিছুদিন পর আবার সেই ফেরেশতা পূর্বের মত মানুষের রূপ ধরিয়া, সেই যে আগের ধবল রোগী ছিল, তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন।

সেখানে গিয়া তিনি বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আসিয়া আমার সব পুঁজি ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার আর দেশে ফিরিবার উপায় নাই। তিনি তোমাকে সুন্দর গায়ের রং দিয়াছেন, সুন্দর চামড়া দিয়াছেন, আর এত ধনদৌলত দিয়াছেন, তাহার দোহাই দিয়া তোমার কাছে একটি উট চাহিতেছি।

সে বলিল, উটের অনেক দাম, কী করিয়া দিই?

স্বর্গীয় দূত বলিলেন, ওহে! আমি যেন তোমাকে চিনিতে পারিতেছি। তুমি না ধবল রোগী ছিলে, আর সকলে তোমাকে ঘৃণা করিত? তুমি না গরিব ছিলে, পরে আল্লাহ তোমাকে ধনদৌলত দিয়াছেন?

সে বলিল, না, তা কেন? এ সব তো আমার বরাবরই আছে। স্বর্গীয় দূত বলিলেন, আচ্ছা! যদি তুমি মিথ্যা বলিয়া থাক, তবে তুমি যেমন ছিলে আল্লাহ আবার তোমাকে তাহাই করিবেন।

তারপর দূত পূর্বে যে টাকওয়ালা ছিল, তাহার কাছে গেলেন। সেখানে গিয়া আগের মত একটি গাই চাহিলেন। সেও ধবল রোগীর মত তাহাকে কিছুই দিল না। তখন দূত বলিলেন, আচ্ছা, যদি তুমি মিথ্যা কথা বলিয়া থাকে তবে যেমন ছিলে আল্লাহ তোমাকে আবার তেমনই করিবেন।

তারপর স্বর্গীয় দূত পূর্বে যে অন্ধ ছিল, তাহার কাছে গিয়া বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আমার সম্বল ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার দেশে পৌঁছিবার আর কোন উপায় নাই। যিনি তোমার চক্ষু ভালো করিয়া দিয়াছেন, আমি তোমাকে সেই আল্লাহর দোহাই দিয়া একটি ছাগল চাহিতেছি, যেন আমি সেই ছাগল বেচা টাকা দিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে পারি।

তখন সে বলিল, হ্যাঁ ঠিক তো। আমি অন্ধ ছিলাম, পরে আল্লাহ আবার আমাকে দেখিবার ক্ষমতা দিয়াছেন। আমি গরিব ছিলাম, তিনি আমাকে আমির করিয়াছেন। তুমি যাহা চাও লও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর উদ্দেশে যে জিনিস লইতে তোমার মন চায়, তাহা যদি তুমি না লও, তবে আমি তোমাকে কিছুতেই ভালো লোক বলিব না।

ফেরেশতা তখন বলিলেন, বাস্। তোমার জিনিস তোমারই থাক। তোমাদের পরীক্ষা লওয়া হইল। অপর দু’জন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ। আল্লাহ তোমার উপর খুশি হইয়াছেন, আর তাহাদের উপর বেজার হইয়াছেন। (বুখারী শরীফ এর হাদীস অবলম্বনে)।

৬৯।আছহাবুল উখদূদের কাহিনী

হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে জে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ বহুকাল পূর্বে একজন রাজা ছিলেন। সেই রাজার ছিল একজন যাদুকর। ঐ যাদুকর বৃদ্ধ হ’লে একদিন সে রাজাকে বলল, ‘আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি এবং আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। সুতরাং আমার নিকট একটি ছেলে পাঠান, যাকে আমি ভালভাবে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব’। বাদশাহ তার নিকট একটি বালককে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলেন। বালকটি যাদুকরের নিকট যে পথ দিয়ে যাতায়াত করত, সে পথে ছিল এক সন্ন্যাসীর আস্তানা। সন্ন্যাসী ঐখানে বসে কখনো ইবাদাত করতেন, আবার কখনো লোকদের নিকট ওয়াজ-নসিহাত করতেন।  বালকটিও পথের পাসে দাঁড়িয়ে তার ওয়াজ নসীহত শুনত।  ফলে যাদুকরের নিকট পৌছাতে বালকটির দেরী হ’ত বলে যাদুকর তাকে প্রহার করত। বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট এ কথা জানালে তিনি বালককে শিখিয়ে দেন যে, তুমি যদি যাদুকর কে ভয় কর তাহ’লে বলবে, বাড়ীর লোকজন আমাকে পাঠাতে বিলম্ব করেছে এবং বাড়ীর লোকজনকে ভয় পেলে বলবে, যাদুকরই আমাকে ছুটি দিতে বিলম্ব করেছে।

বালকটি এভাবে একদিকে যাদু বিদ্যা অন্যদিকে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা  করতে লাগলো। একদিন পথে সে দেখল, একটি বৃহদাকার প্রাণী মানুষের চলাচলের পথ রোধ করে বসে আছে। বালকটি ভাবল, আজ পরীক্ষা করে দেখব যে আল্লাহর কাছে যাদুকরের ধর্ম শ্রেষ্ঠ, না সন্ন্যাসীর ধর্ম শ্রেষ্ঠ ? অতঃপর সে একটি পাথর নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ্‌! যাদুকরের কার্যকলাপ অপেক্ষা সন্ন্যাসীর কার্যকলাপ যদি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় হয়, তবে এই প্রাণীটিকে এই পাথরের আঘাতে মেরে ফেল। যেন লোকজন যাতায়াত করতে পারে’। এই বলে প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে সে পাথরটি ছুঁড়ে মারল এবং প্রাণীটি মারা গেল ও লোক চলাচল শুরু হ’ল। এরপর বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে তাকে ঘটনাটি জানালে তিনি তাকে বললেন, ‘বৎস! তুমি এখনই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছ। তোমার প্রকৃত স্বরূপ আমি বুঝতে পারছি। শীঘ্রই তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। যদি তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হও তাহ’লে যেন আমার কথা প্রকাশ করে দিও না’।

তারপ বালকটির দো‘আয় জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেতে লাগলো , কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি নিরাময় হ’তে লাগল এবং লোকজন অন্যান্য রোগ হ’তেও আরোগ্য লাভ করতে লাগল।

এদিকে রাজার একজন সহচর অন্ধ হয়েছিল। সে বহু উপঢৌকনসহ বালকটির নিকট গিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দাও, তাহ’লে এ সবই তোমার’। বালকটি বলল, ‘আমিতো কাউকে আরোগ্য করতে পারি না । বরং রোগ ভাল করেন আল্লাহ্‌। অতএব আপনি যদি আল্লাহ্‌ প্রতি ঈমান আনেন, তাহ’লে আমি আপনার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহ্‌ নিকটে দো‘আ করতে পারি। তাতে তিনি হয়ত আপনাকে আরোগ্য দান করতে পারেন’। ফলে লোকটি আল্লাহ্‌ প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহ্‌ তাকে আরোগ্য দান করলেন।

পূর্বের ন্যায় তিনি রাজার নিকটে গিয়ে বসলে রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল’? সে বলল, ‘আমার রব’। রাজা বললেন, আমি ছাড়া তোমার রব আছে কি’? সে বলল, ‘আমার ও আপনার উভয়ের রব আল্লাহ্‌’। এতে রাজা তাকে ধরে তার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। অবশেষে সে বালকটির নাম প্রকাশ করে দিল। অতঃপর বালকটিকে রাজদরবারে আনা হ’ল। রাজা তাকে বললেন, ‘বৎস! আমি জানতে পারলাম যে, তুমি তোমার যাদুর গুণে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত লোকদের রোগ নিরাময় করছ এবং অন্যান্য কঠিন রোগও নিরাময় করে চলেছ। বালকটি বলল, আমি কাউকে রোগ মুক্ত করি না। রোগ মুক্ত করেন আল্লাহ্‌’। তখন রাজা তাকে পাকড়াও করে তার উপর উৎপীড়ন চালাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সে সন্ন্যাসীর কথা প্রকাশ করে দিল। তখন সন্ন্যাসীকে ধরে আনা হ’ল এবং তাঁকে বলা হ’ল, তুমি তোমার ধর্ম পরিত্যাগ কর। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। তখন রাজার আদেশক্রমে করাত নিয়ে আসা হ’লে তিনি তা তার মাথার মাঝখানে বসালেন এবং তাঁর মাথা ও শরীর চিরে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন। তারপর রাজার সহচরকে আনা হ’ল এবং তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হ’ল। কিন্তু সেও অস্বীকৃতি জানালে তাকেও করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করা হ’ল।

তারপর বালকটিকে হাযির করে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হ’ল। বালকটিও নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করল। তখন রাজা তাকে তার লোকজনের নিকট দিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সঙ্গে করে পাহাড়ে আরোহণ করতে থাক। যখন তোমরা পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে পৌঁছবে, তখন তাকে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলবে। সে যদি অস্বীকার করে, তাহ’লে তোমরা তাকে সেখান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিবে’। তারা বালকটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠলে বালকটি দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ্‌! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের কাছ থেকে রক্ষা কর’। তৎক্ষণাৎ পাহাড়টি কম্পিত হয়ে উঠল এবং তারা নীচে পড়ে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকট এসে উপস্থিত হ’ল। রাজা তখন তাকে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীদের কি হ’ল’? তখন সে বলল, আল্লাহ্‌ই আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

তারপর রাজা তাকে তার একদল লোকের নিকট সোপর্দ করে আদেশ দিলেন, ‘একে একটি বড় নৌকায় উঠিয়ে নদীর মাঝখানে নিয়ে যাও। যদি সে নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করে, তো ভাল। নচেৎ তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর’। তারা বালকটিকে নিয়ে মাঝ নদীতে পৌঁছলে বালকটি পূর্বের ন্যায় দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ্‌! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা কর’। এতে নৌকা ভীষণভাবে কাত হয়ে পড়ল। ফলে রাজার লোকজন নদীতে ডুবে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্ত দেহে) রাজার নিকটে আসলে রাজা তাকে বললেন, তোমার সঙ্গীদের কি অবস্থা? সে বলল, আল্লাহ্‌ই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর সে রাজাকে বলল, ‘আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন আমাকে কোনভাবেই হত্যা করতে পারবেন না। যতক্ষণ না আমি যা বলব, আপনি তা করবেন। রাজা বললেন, ‘সেটা কি’? বালকটি বলল, ‘আপনি একটি বিস্তীর্ণ মাঠে সকল লোককে হাযির করুন এবং সেই মাঠে খেজুরের একটি গুঁড়ি পুঁতে তার উপরিভাগে আমাকে বেঁধে রাখুন। তারপর আমার তূণীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকে সংযোজিত করুন। তারপর  (بسم الله الرحمن الرحيم ) “বালকটির রব আল্লাহ্‌ নামে” বলে আমার দিকে তীরটি নিক্ষেপ করুন।

আপনি যদি এ পন্থা অবলম্বন করেন, তবেই আমাকে হত্যা করতে পারবেন। বালকের কথামত এক বিস্তীর্ণ মাঠে রাজা সকল লোককে সমবেত করলেন এবং বালকটিকে একটি খেজুর গাছের গুঁড়ির উপরে বাঁধলেন। তারপর রাজা বালকটির তূণীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যভাগে সংযোজিত করলেন। তারপর বলে বালকটির দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। তীরটি বালকের চোখ ও কানের মধ্যভাগে বিদ্ধ হ’ল। বালকটি এক হাতে তীর-বিদ্ধ স্থানটি চেপে ধরল। অতঃপর সে মারা গেল।

এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনগণ বলে উঠল, ‘আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম’। তারপর রাজার লোকজন তাঁর নিকট গিয়ে বলল, ‘আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। সব লোক বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনল’।তখন রাজা রাস্তা গুলির চৌমাথায় প্রকাণ্ড গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। তার কথা মতো গর্ত খনন করে তাতে আগুন প্রজ্বলিত করা হ’ল। তারপর রাজা হুকুম দিলেন, ‘যে ব্যক্তি বালকের ধর্ম পরিত্যাগ করবে না, তাকে ঐ আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মার। অথবা তাকে বলবে, তুমি এই আগুনে ঝাঁপ দাও। রাজার লোকেরা তার হুকম পালন করতে লাগল। ইতিমধ্যে একজন রমণীকে তার শিশুসন্তান সহ উপস্থিত করা হ’ল। রমণীটি আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতস্ততঃ করতে থাকলে শিশুটি বলে উঠল, ‘মা ছবর অবলম্বন করে আগুনে প্রবেশ করুন। কেননা আপনি হক পথে আছেন’।

পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস হয়েছিল গর্ত ওয়ালারা- ইন্ধন পূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসা আল্লাহর’ (বুরূজ ৪-৮)

[ছহীহ মুসলিম হা/৩০০৫ ‘যুহদ ও রক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচেছদ-১৭, ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হা/২৩৯৭৬]।

পর্যালোচনাঃ এই ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক আসহাবুল উখদুদের ঘটনা বলা হয়। উখদুদ অর্থ আগুনের কুন্ডলী। পবিত্র কুরআনের সূরা আল বুরুজে এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সাধারণ অবস্থায় নিজেকে হত্যা করতে কাউকে পরামর্শ দেওয়া বা তার কৌশল শিখিয়ে দেওয়া আত্মহত্যার শামিল। আত্মহত্যা কখনো জায়েজ নয়। তবে আলোচ্য ঘটনায় বালকটি যে পরিস্থিতিতে এ কাজ করেছিলে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে পড়ে না। তা ছাড়া সম্ভবতঃ সে আল্লাহর ইঙ্গিতে কাজ করেছিল, যা ওহী ব্যতীত ইলহামের মাধ্যমেও আসতে পারে। এমনও হতে পারে যে, এরূপ কৌশলে জীবন বিসর্জন দেয়ার ফলে সমগ্র দেশ ঈমান আনবে বলে বালক ধারণা করেছিল, বাস্তবেও তাই ঘটেছিল।

শিক্ষাঃ এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির যে কোন সময় যে কোন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। এমনকি যদি ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত হয় এবং তাতে কিছু সাফল্য ও বিজয় আসতে থাকে, তাহলেও প্রত্যেক সাফল্যের সাথে সাথে পরীক্ষার তীব্রতা ও কঠোরতা বেড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।

দ্বিতীয় শিক্ষা এই যে, এক আল্লাহর প্রতি ঈমানই্ ছিল হযরত ঈসা(আ)এর প্রকৃত শিক্ষা। তিনিও ইসলামের নবী ছিলেন এবং ইসলামেরই দাওয়াত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে তার অনুসারীরা তার আনীত ইসলামী শরীয়ত বিকৃত করে নাম রাখে খৃস্টবাদ এবং নিজেরা খৃস্টান নামে পরিচিত হয়। এই খৃস্টবাদ ও খৃস্টানদের সাথে হযরত ঈসার প্রকৃত শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই। আলোচ্য ঘটনায় উল্লেখিত দরবেশ, বালক ও অন্যান্য শহীদগণ ছিলেন হযরত ঈসার প্রকৃত অনুসারী ও খাঁটি মুসলমান-খৃস্টান নয়।

৭০সততার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত

একবার এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির নিকট হতে এক খন্ড জমি কিনল। ক্রেতা তার কেনা জমিতে স্বর্ণমুদ্রায় পূর্ণ একটি কলসি পেল। সে তৎক্ষনাত ঐ জমির মালিকের নিকট কলসীটি নিয়ে গেল এবং বললোঃ “তোমার এই স্বর্ণ নিয়ে নাও। তোমার জমিতে এটা পাওয়া গিয়েছে। আমিতো তোমার কাছ হতে জমি কিনেছি, স্বর্ণ কিনি নি।” সাবেক জমিওয়ালা বললো, “না, ঐ স্বর্ণ তোমার। কেননা আমি ঐ জমিতে যেখানে যা কিছু আছে-সব শুদ্ধই বিক্রয় করেছি।” কিন্তু ক্রেতা কিছুতেই এ কথা মানতে রাজী হলো না।

অবশেষে  উভয়ই তৃতীয় এক ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করলো। তৃতীয় ব্যক্তিটি উভয়ের বক্তব্য শুনলেন। দেখলেন, উভয়ে নিজ নিজ বক্তব্যে অনড়। তখন বিরোধ মিটাবার কি উপায় বের করা যায় ভাবতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত একটি কৌশল তিনি উদ্ভাবন করে ফেললেন।

তিনি বিবদমান লোক দুটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কোন সন্তান আছে কি? একজন জানালো তার একটি ছেলে আছে। অপরজন জানালো তার একটি মেয়ে আছে।

মধ্যস্ততাকারী বললেন, ঠিক আছে। এই স্বর্ণ তোমাদের কাউকেই নিতে হবে না। তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের পরস্পর বিয়ে দাও। এই স্বর্ণ দিয়ে বিয়ের ব্যয় নির্বাহ কর এবং যা বেঁচে যায়, তা নব দম্পতিকে উপঢৌকন দাও।

উভয়ে এই রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল।(বুখারী ও মুসলিম)।

শিক্ষাঃ

(১) যে কোন বিরোধ বা বিতর্কের মীমাংসার জন্য নিরপেক্ষ তৃতীয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্থতা গ্রহণ করা ইসলামের রীতি। এই তৃতীয় ব্যক্তি উভয় বিবদমান পক্ষের সম্মতিক্রমে মনোনীত হবে এবং তার ফায়সালা মেনে নেয়া উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হবে।

(২)আলোচ্য ঘটনার বিবদমান ব্যক্তিদ্বয় খোদাভীরুতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উভয়েই জমির ভেতর প্রাপ্ত স্বর্ণকে অপর পক্ষকে দেয়ার জন্য উদগ্রীব-নেয়ার জন্য নয়। মুমিনের চরিত্র এমনই হওয়া উচিত।

(৩)ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে বিক্রেতার বক্তব্যই সঠিক। কেননা জমি যখন বিক্রয় অথবা দানসূত্রে হস্তান্তরিত হয়, তখন বিক্রেতা বা দাতা ইচ্ছাপূর্বক কোন কিছু বাদ না দিলে ঐ জমির ওপরে বা অভ্যন্তরে যা-ই থাক, সব সমেতই হস্তান্তরিত হবে। দাতা বা বিক্রেতা যদি কোন জিনিস দান বা বিক্রয় বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে, তবে তা হস্তান্তরের আগেই বা যে সময়ের জন্য ক্রেতা বা বিক্রেতা অনুমতি দেয়, সে সময়ের মধ্যেই তা সরিয়ে নিতে হবে।

(৪) ছেলে বা মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য কি ধরণের পরিবার ও কি ধরণের বর কনে খোঁজা দরকার, সে ব্যাপারেও এই কিসসাটিতে চমৎকার শিক্ষা রয়েছে। একটি উন্নত মানের ইসলামী চরিত্র সম্পন্ন পরিবারের বর কনেই প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের কাম্য হওয়া উচিত। পরিবারের ইসলামী ভাবধারা অক্ষুণ্ন রাখার এটাই একমাত্র উপায়।

৭১ তওবার মহিমা

বনি ইসরাইলের একজন লোক ছিল যে ৯৯ টি মানুষকে হত্যা করেছিল। সে তওবা করার চিন্তাভাবনা করছিল। তাই সে একজন আবিদের কাছে গেল। [আবিদ ও আলেম এর মধ্যে পার্থক্য আছে। আবিদ মানে যিনি সৎ ও সরল পথের উপর আছেন কিন্তু তার ভিতর জ্ঞান (শরীয়তের গভীর জ্ঞান) নেই, যেটা একজন আলেমের আছে]

সেই লোকটি এই আবিদকে বলল, “আমি ৯৯ টা মানুষকে হত্যা করেছি। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?”

আবিদ যখন এটা শুনলেন তখন বললেন যে, “তুমি ৯৯ টা লোককে খুন করেছ! আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা কিছুতেই তোমাকে ক্ষমা করবেন না‍!।”

এখন সেই লোকটা আবিদকে খুন করে ফেলল!!

[এই লোকটির কাছে মানুষ হত্যা করা এতটাই সহজ, পানির মত। তার সাথে তার মতের মিল হয়নি বলে সে তাকে (আবিদ) মেরে ফেলল! সে তার ফতোয়া পছন্দ করেনি বলে তাকে মেরেই ফেলল!]

এরপরও সে তওবা করার জন্য উঠেপড়ে লাগলো। তার অন্তরের ভিতর কিছু অংশ হলেও ভাল ছিল। সুতরাং এ সময়ে সে খোঁজ করলো যে কাকে জিজ্ঞাসা করা যায়, সে জানতে পারলো এক আলেম এর কথা।

সে সেই আলেমের কাছে গেল এবং বললো, “আমি ১০০ টা মানুষকে হত্যা করেছি। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?”

কিন্তু এই আলেম তাকে বললেন, “হ্যাঁ, তোমার আশা আছে! তুমি যদি তওবা কর তাহলে আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন যদিওবা তুমি ১০০ টি লোককে হত্যা করেছ। যদি আল্লাহ তোমার জন্য তওবার দরজা খুলে রাখেন তবে কে তোমাকে তা থেকে প্রতিরোধ করবে?” {যদিওবা এই লোকটি ১০০ টা মানুষকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তার তওবা করাতে খুশি হবেন।}

কিন্তু আলেমের ফতোয়া এখানেই শেষ হয়না তিনি আরও বলেন, “তোমাকে এই শহরের ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। এইটা হল খারাপ একটা শহর, আমি চাই যে তুমি এই শহর ছেড়ে অন্য শহরে যাও যেখানে এমন সব লোকেরা রয়েছে যারা আল্লাহর ইবাদত করে ফলে তুমি তাদের সাথে ইবাদত করতে পারবে।”

আলেম বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই লোকটি যতক্ষণ এই শহরে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পাপ কাজ করতেই থাকবে যদিওবা সে তওবা করে! কারণ সে খুন করার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেছে, ঠিক একজন ড্রাগ অ্যাডিক্টের (নেশাখোরের) মত। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন নেশাগ্রস্থ ব্যক্তি সেই একই পরিবেশ, একই সঙ্গ, একই গ্রুপের মধ্যে থাকবে যদিওবা সেই ব্যক্তি তওবাও করে তার পরও সে একই কাজ করতে থাকবে। তাকে পরিবেশ বদলাতে হবে, কারণ তার চারপাশের সবকিছু সেই নেশার সাথে সম্পর্কিত। যখনই ড্রাগ ডিলার, যার কাছ থেকে সে ড্রাগ কিনতো, তার সাথে সাক্ষাৎ হলে সেটা ড্রাগের কথা মনে করিয়ে দিবে, যে বন্ধুর সাথে নেশা করা হত তার সাথে দেখা হলে ড্রাগের কথা মনে পড়বে। একই ঘটনা ঘটে যারা মদ খায়। তারা পাব (Pub) দেখলে, মদের বোতল দেখলেই মদ খাওয়ার কথা মনে পড়ে। তাই এসব থেকে দূরে থাকতে হলে এসবের পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে হবে। সে কারণেই আলেম সেই খুনিকে বললেন তার শহর থেকে চলে গিয়ে অন্য শহরে ভাল লোকদের সাথে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালার ইবাদত করতে। ভাল লোকদের সংস্পর্শে থাকলে সেটা আপনাকে ভাল কাজ করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বিপরীতভাবে, খারাপ সঙ্গে থাকলে সেটা আপনার পতন ঘটাবে।

মুহাম্মাদ (স) বলেন, “যদি তুমি একজন কামারের পাশে বসে থাক তবে তোমার গা দিয়ে কামারের মত গন্ধ বের হবে। আর যদি তুমি সেই লোকের পাশে বস যে কস্তুর বিক্রি করে তাহলে তুমি তার সুবাস কিছুটা শোষণ করে নেবে।” অর্থাৎ যদিওবা আমরা একটি কাজের সাথে জড়িত নাও থাকি কিন্তু ঐ পরিবেশে থাকার কারণে আমরা সেই গন্ধটা নিজের মধ্যে নিয়ে নেব, সেটা আমাদের অনিচ্ছা স্বত্তেও হবে। তাই আমাদের উচিৎ সর্বদা ভাল মানুষের সংস্পর্শে থাকা। পরিবেশের একটা বিরাট প্রভাব এসব ক্ষেত্রে আছে।

তাই সেই আলেম তাকে তার শহর থেকে অন্য শহরে যেতে বলেছিলেন। তার কথা মত সেই লোক অন্য শহরের দিকে রওনা দিল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছেমাফিক, সেই লোকটি সেই শহরে পৌছানোর আগেই মারা গেল।

যখন সে মারা গেল, তখন মৃত্যুর ফেরেস্তারা তার রূহ কবজ করার জন্য আসলেন। যখন একজন ভাল লোক মারা যায় তখন রহমতের ফেরেস্তা তার রূহ কবজ করতে আসেন আর যখন একজন খারাপ লোক মারা যায় তখন শাস্তির ফেরেস্তা তার রূহ কবজ করতে আসেন। কিন্তু যেহেতু এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পরিষ্কার ছিলনা, তাই দুই ধরণের ফেরেস্তাদের দলই আসলেন তার রূহ কবজ করার জন্য!! এবং সেখানে একটা বিতর্ক জন্ম নিল!!

শাস্তির ফেরেস্তা বললেন, এই লোক আমাদের, কারণ সে এখনো তওবা করেনি/কবুল হয়নি! তার সদিচ্ছা ছিল কিন্তু সে সেখানে (অন্য শহরে) পৌছুতে পারেনি। রহমতের ফেরেস্তা বললেন, না, সে তওবা করেছে এবং সে সেই শহরে যাওয়ার জন্য রওনা দিয়ে দিয়েছে! তো দুই দলের ফেরেস্তারাই বিতর্ক করছিল যে কারা সেই ব্যক্তির রূহ নিবে।

তাই আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা এই বিতর্ক দূর করার জন্য তাদের কাছে আরেকজন ফেরেস্তা পাঠালেন। তিনি তাঁদের বললেন, সে যেখানে মারা গিয়েছে সেখান থেকে উভয় শহরেরই দূরত্ব পরিমাপ কর। যদি তোমরা তাকে তার নিজের শহরের কাছে পাও তবে সে জাহান্নামী আর যদি সে অন্য শহরের (ভাল লোকদের) নিকটবর্তী হয় তবে সে জান্নাতী!

মুহাম্মাদ (স) বলেন, “প্রকৃতপক্ষে সে নিজের শহরের নিকটবর্তী ছিল!!” তাহলে তার স্থান কোথায় হবে? জাহান্নাম!!

কিন্তু মুহাম্মাদ (স) বলেন, আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা জমিনকে নির্দেশ দেন, তার (লোকটা) এবং তার নিজের শহরের মধ্যকার দূরত্বকে বিস্তৃত করার এবং তার (লোকটা) ও অন্য শহর (ভাল লোকদের) মধ্যকার দূরত্বকে সংকুচিত করার!! [অর্থাৎ তাঁর দেহ মনে হবে ভাল শহরের কাছে, কিন্তু সে মারা গেছে নিজের শহরের কাছে]

যখন ফেরেস্তারা মাপতে আসলেন তখন তারা সেই ব্যক্তিকে অন্য শহরের (ভাল লোকদের) দিকে নিকটবর্তীরূপে পেলেন এবং আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা তাকে ক্ষমা করলেন এবং রহমতের ফেরেশতারা তার প্রাণ সংহার করলো। (বুখারী, মুসলিমও ইবনে মাজাহ এর হাদীস অনুসারে)।

শিক্ষাঃ এ কিসসাটিও অনেক শিক্ষণীয়। বিশেষতঃ নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এ হাদীসের অন্যতম শিক্ষণীয় বলে বিবেচিত হতে পারেঃ

১. মূর্খ দরবেশের চেয়ে হকপন্থী আলেমই মানুষকে সৎপথের সন্ধান দিতে অধিকতর যোগ্য।

২. কেউ যদি একনিষ্ঠ মনে ন্যায়পথে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার পথ কেউ আটকাতে পারবে না। আল্লাহ স্বয়ং তাকে সাহায্য করেন।

৩. সৎ হবার জন্য সৎ লোকদের সংসর্গ অবলম্বন ও অসৎ লোকদের সাহচর্য পরিত্যাজ্য। এ জন্য প্রয়োজনে নিজের জন্মভূমি হতে হিজরত করা কর্তব্য। আর হিজরত করা যেখানে সম্ভব নয় কিংবা হিজরত করে যথার্থ সৎলোকের সংসর্গ পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই, সেখানে একমাত্র বিকল্প কর্মপন্থা হলো, আশেপাশের মানুষকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচী নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়া। আল্লাহ আমাদেরকে সৎলোক ও সৎ পরিবেশ তৈরির তাওফীক দিন। আমীন।

৭২ আল্লাহর পথে দানের মাহাত্ম্য

আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাঠে অবস্থান করছিল। এমন সময় সে মেঘের মধ্যে একটি শব্দ শুনতে পেল : ‘অমুকের বাগানে পানি দাও’। অতঃপর মেঘমালা সেই দিকে সরে গেল এবং এক প্রস্তরময় স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করল। তখন দেখা গেল, সেখানকার নালাগুলির মধ্যে একটি নালা সমস্ত পানি নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তখন সে ব্যক্তি পানির দিকে এগিয়ে গেল এবং দেখল যে, এক ব্যক্তি তার বাগানে দাঁড়িয়ে সেচযন্ত্র দ্বারা পানি সেচ দিচ্ছে। তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ্‌র বান্দা! তোমার নাম কি? ব্যক্তিটি জবাবে বলল, আমার নাম অমুক- যে নাম সে মেঘের মধ্যে শুনেছিল। তখন লোকটি বলল : হে আল্লাহ্‌র বান্দা! তুমি কেন আমার নাম জিজ্ঞেস করলে? সে বলল : এই পানি যেই মেঘের তার মধ্যে আমি একটি শব্দ শুনেছি যে, তোমার নাম করে বলা হয়েছে, অমুকের বাগানে পানি দাও! (হে আল্লাহ্‌র বান্দা, বল) তুমি তা দ্বারা কি কি কাজ কর? সে উত্তরে বলল, যখন তুমি এ কথা বললে তখন শুনো, এই বৃষ্টির পানিতে যা উৎপাদন হয়, তার প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করি এবং তা ভাগ করি। এক ভাগ দান করি, একভাগ আমি ও আমার পরিবার খাই এবং অপর ভাগ জমিতে লাগাই। (মুসলিম শরীফ, তারগীব ও তারহীব)।

শিক্ষাঃ

(১) এ ঘটনাটি থেকে জানা যায় যে, নিজের যাবতীয় প্রমাণ পুরণের পর অবশিষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করা নয় বরং উপার্জিত সম্পদের একটি অংশ প্রথমেই আল্লাহর পথে দান করা এবং এরপর বাদবাকী অংশ দিয়ে নিজের প্রয়োজন পুরন করাই ইসলামী রীতি। কেননা এতে অনেক সময় আদৌ কোন অবশিষ্ট অংশ নাও থাকতে পারে। প্রথমে আল্লাহর পথে দাতব্য অংশটি নির্ধারণ বা দান করলে আল্লাহ খুশী হন এবং যে বান্দা এরূপ নীতি অবলম্বন করে তার জীবিকা বৃদ্ধি নিশ্চিত করেন।

(২) সাধারণ কৃষক শ্রমিক ও মুটে মজুর শ্রেণীর লোককে অবজ্ঞা করা মোটেই উচিত নয়। এ ধরনের নগন্য লোকরাও আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর অলীর মর্যাদায় উপনীত হতে পারে।

৭৩ নিজের ক্ষতি স্বীকার করে পরোপকার

প্রাচীনকালে একবার দুই ব্যক্তি একসাথে সফরে বেরুলো। এদের একজন সবসময় আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতো। অপরজন ছিল আল্লাহর হুকুম পালনে উদাসীন। পথিমধ্যে একসময় প্রথমোক্ত ব্যক্তি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লো। ক্রমে সে বেহুশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি মনে মনে বললো, “এই সৎ ও খোদাভীরু লোকটি যদি পিপাসায় মারা যায় এবং আমার সাথে পানি থাকা সত্ত্বেও যদি না খাওয়াই, তাহলে আল্লাহর আক্রোশ হতে আমি কোনভাবেই রক্ষা পাবো না। পক্ষান্তরে তাকে পানি খাওয়ালে পরবর্তীতে আমি নিজে পিপাসায় মরে যাবো। এখন তা হলে কি করা?”

কয়েক মুহুর্ত ভেবেচিন্তে সে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাকে কয়েক ফোঁটা পানি খাইয়ে দিল এবং নিজের জন্যও কিছু সঞ্চিত রাখলো। এভাবে তাদের একত্রে সফরের পালা শেষ হলো।

এই দুই ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথম ব্যক্তিকে জান্নাত ও দ্বিতীয় ব্যক্তিকে জাহান্নামের অধিবাসী বলে ঘোষণা করা হলো। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে যখন ফেরেশতারা জাহান্নামে নিয়ে যেতে আরম্ভ করলো, তখন সহসা প্রথম ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলো। সে ঐ ব্যক্তিকে চিনতে পেরে বললো, “ওহে আল্লাহর প্রিয় বান্দা! তুমি কি আমাকে চেন?” সে বললো, “তুমি কে?” তখন সে বললো, “আমি অমুক। এক বিপদের দিনে আমরা মিলিত হয়েছিলাম এবং তোমাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পানি খাইয়ে প্রাণ রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলাম।” তখন ঘটনাটা প্রথম ব্যক্তির মনে পড়লো এবং দোজখের ফেরেশতাকে থামতে বললো। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাকে সাথে নিয়ে বেহেশতে চলে গেল।(তাবরানী, বায়হাকী)।

৭৪ ওয়াদামত ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বোখারী শরীফে সংকলিত একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন।  প্রিয় নবী স. এরশাদ করেছেন : বণী ইসরাঈলে এক ব্যক্তি ছিল যে অন্য এক ধনাঢ্য ব্যক্তি থেকে এক হাজার দিনার ঋণ চেয়েছিল। সে ব্যক্তি বললো : তুমি যে ঋণ গ্রহণ করবে তার জন্য একজন সাক্ষী হাযির কর।

ধারপ্রার্থী লোকটি বলল : আমার জন্য সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট।

ধনাঢ্য লোকটি বলল : তুমি যে টাকা ফেরত দেবে এজন্য জামিন দরকার,সে বললো আমার জামিন স্বয়ং আল্লাহ পাক।

একথার উপর সনতুষ্ট হয়ে এক হাজার দিনার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ দিল। এর পর সে সামুদ্রিক পথে বিদেশে সফরে চলে গেল। কাজ শেষ হলে সে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরে হাযির হল। এবং জাহাজের অপেক্ষা করতে লাগলো,কিন্তু কোন জাহাজের ব্যবস্থা হলনা। এদিকে ঋণ আদায়ের সময় এসেগেল,সে অত্যন্ত ব্যাকুল চিত্তে সময় কাটায় কিন্তু জাহাজের কোন ব্যবস্থাই হলোনা|

তখন ঔ ব্যক্তি একটি কাঠের খন্ড হাতে নিয়ে তার মাঝখানে ফাঁকা করলো এবং এক হাজার দিনার এবং একটি চিঠি তার মধ্যে রেখে দিল। এর পর কাঠের খন্ডটির মুখ বন্ধ করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলো এবং বলল : হে আল্লাহ! তুমি তো জান আমি শুধু  তোমাকে সাক্ষী করে এবং তোমার জামানতে এক হাজার দিনার ঋণ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি সর্বপরি চেষ্টা সত্ত্বেও সমুদ্র পার হতে পারছিনা তাই বাধ্য হয়ে তোমার প্রতি ভরসা করে এ কাঠের খন্ডে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা রেখে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছি। তুমি তাকে তা পৌঁছে দাও। কাঠের কন্ডটি মুহূর্তে পানিতে ডুবে গেল। এর পরও সে অনেক চেষ্টা করলো সমুদ্র পার হতে,কিন্তু সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলো। এদিকে ঋণ দাতা সমুদ্র তীরে এসে অপেক্ষা করছে যে ঐ ব্যক্তি আজকের তারিখে তার ঋণ শোধ করবে। কিন্তু পুরোদিন অপেক্ষা করার পরও যখন দেখলো কোন জাহাজ আসলো না তখন সে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসার ইচ্ছা করলো। এমন সময় সমুদ্র তীরে একটি কাঠের খন্ড দেখতে পেলে তা সে তুলে নেয়,এ ইচ্ছা করে যে হয়তো জ্বালানির কাজে আসবে। বাড়ীতে আসার পর কাঠের কন্ডটি খুলে দেখে তাতে রয়েছে একটি চিঠি ও এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা। কিছু দিন পর সে ব্যক্তি দেশে ফিরে ঋণ দাতার নিকট গেল এবং পৃথকভাবে তাকে এক হাজার দিনার দিল। কারণ সে ভেবেছিল প্রেরিত এক হাজার দিনার তার মহাজন পায়নি। এমনিকি ব্যাপারটা তাকে জিজ্ঞাসা করতেও সে সংকোচ বোধ করলো। এক হাজার দিনার হাতে গুঁজে দিয়ে সে তার বিলম্বের জন্য ওজর পেশ করে ক্ষমা চাইতে লাগলো।

সে বললো : তুমি যে কাঠের টুকরাতে আমার নামে এক হাজার দিনার পাঠিয়ে ছিলে আল্লাহ পাক তা আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন। এখন আমার এই এক হাজার দিনার প্রয়োজন নেই। এটা তুমি নিয়ে যাও।” (বুখারী ও নাসাঈ অবলম্বনে)।

শিক্ষাঃ

(১) ওয়াদামত ঋণ পরিশোধ করা কর্তব্য। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে লড়াই করে শহীদ হয়, তার সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করলেও ঋণ মাফ করেন না। কারণ ওটা বান্দার হক।

(২)যে কোন ব্যাপারে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা সত্ত্বেও যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা কর্তব্য।

(৩) ঋণের আদান-প্রদান কালে সাক্ষী বা জামিন রাখা অথবা লিখিত দলীল সাক্ষর করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক। তবে পূর্ববর্তী নবীদের শরীয়তে এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা ছিল না। কুরআনের সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। কুরআনের সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে যাতে কোন বিতর্কের সৃষ্টি না হয়।

(৪) কোন ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য বা জামিন হাজির করতে অক্ষম হয় এবং আল্লাহকে সাক্ষী ও জামিন রাখে, তবে তাকে বিশ্বাস করে ঋণ দিয়ে তাকে বিপদ হতে উদ্ধার করা উত্তম। মনে রাখতে হবে, সুদবিহীন ঋণ প্রদান ক্ষেত্র বিশেষে দান করার চেয়েও বেশি সাওয়াবের কাজ। কেননা এটা সাধারণতঃ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারে সহায়তা করে। দানশীল ব্যক্তি সাধারণত নিজের ইচ্ছা অনুসারে উদ্ধৃত্ত সম্পদ হতে দান করে থাকে। কিন্তু ঋণদাতা বিপন্ন ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য নিজের অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ হতেও ঋণ দিয়ে থাকে।

৭৫ অপাত্রে দান

হযরত রাসূলুল্লাহ(সা)বলেনঃ একবার এক ব্যক্তি শপথ করলো যে, আজ রাতে কিছু সাদকা না করে সে ঘুমাবে না। অতঃপর ছদকার অর্থ নিয়ে রাস্তায় বেরুলো। যে ব্যক্তিকে সে ছদকা দিল, সে ছিল একজন চোর। লোকটি তাকে চিনতো না। যখন ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেল, তখন লোকে তাকে উপহাস করলো যে, একটা চোরকে সে ছদকা দিয়েছে। কিন্তু সে কিছুমাত্র হতোদ্যম হলো না। বরং আল্লাহর শোকর আদায় করলো।

পরের দিন পুনরায় শপথ করলো যে, রাতে কিছু ছদকা না নিয়ে সে ঘুমাবে না। কিন্তু আজও তার ছদকা গিয়ে পড়লো এক ব্যভিচারীর হাতে। এবারও তাকে বিদ্রুপ শুনতে হলো এবং সে যথারীতি আল্লাহর শোকর আদায় করলো।

তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। আজ তার ছদকা জুটলো এক ধনী ব্যক্তির কপালে। আজও তাকে উপহাসে জর্জরিত করা হলো। কিন্তু সে আল্লাহর শোকর আদায় করলো।

এই লোকটি কিছুদিন পর মারা গেলে ফেরেশতারা তাকে জানালেন যে, তার সকল ছদকাই কবুল হয়েছে। চোরকে দেয়া ছদকা এই জন্য কবুল হয়েছে যে, এ ছদকা পাওয়ার পর তার চুরির অভ্যাস ত্যাগ করার আশা করা যায়। ব্যভিচারীরও শুধরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ধনী ব্যক্তি ছদকা পেয়ে লজ্জিত হয়ে নিজে ছদকার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।

শিক্ষাঃ দান ছদকা না জেনে অপাত্রে দিলেও তা বৃথা যায় না। তবে জেনেশুনে উপযুক্ত ও অভাবী ব্যক্তিকেই দেওয়া উত্তম। কোন অপরাধী যদি ছদকা পেলে শুধরে যাবে বলে আশা করা যায়, তবে তাকে ছদকা দেওয়া যাবে।

৭৬ অন্যায়ের প্রতিরোধ

একবার আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা জীবরিলকে আদেশে দিলেন যে, “যাও, অমুক জনপদটি ধ্বংস করে দিয়ে এসো।” জিবরীল সেই জনপদটিকে গিয়েই দেখলেন সেখানে একজন দরবেশ রয়েছেন, দিনরাত তিনি নামায পড়েন ও যিকির তাসবীহ করেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি আল্লাহকে বললেন, “হে আল্লাহ! এখানে তোমার এক বান্দা রয়েছে যিনি সর্বক্ষণ তোমাকে স্মরণ করছেন”।

আল্লাহ জবাবে বললেনঃ তাকে শুদ্ধই ধ্বংস করে দাও। কেননা তার সামনে ইসলামের অবমাননা হয়, নাফরমানী করা হয়, জুলুমবাজী ও পাপাচারের সয়লাব বয়ে যায়। কিন্তু তার মুখমন্ডলে তাতে কোন বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠে না এবং তার মন কিছুমাত্র অস্থির হয় না।

অতঃপর জিবরীল সেই জনপদটি ধ্বংস করে দেন।

শিক্ষাঃ

অন্যায়, অত্যাচার ও পাপাচারের প্রতিরোধে যার যতটুকু ক্ষমতা থাকে, সে অনুসারে অবদান রাখা কর্তব্য। কর্তব্য পালন না করে কেবল নফল নামায ও যিকির ইত্যাদিতে ব্যাপৃত থাকলে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি হতে রেহাই পাওয়া যাবে না। এক হাদীসে রাসূল(সা) বলেছেনঃ কোন অন্যায় কাজ সংগঠিত হতে দেখলে সর্বশক্তি দিয়ে তা ঠেকাও, তা যদি না পার তবে মুখ দিয়ে সদুপদেশ দাও, তাও যদি না পার তবে মনে মনে তাকে ঘৃণা ও অপছন্দ কর এবং কিভাবে তা বন্ধ করা যায় তা চিন্তা করতে থাকো। শেষোক্ত পন্থা হলো সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।

৭৭ তিনজন মুসাফির

আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের পূর্বের যুগে তিন ব্যক্তির একটি দল কোথাও যাত্রা করেছিল, যাত্রাপথে রাত যাপনের জন্য একটি গুহাতে তারা আগমন করে এবং তাতে প্রবেশ করে। অকস্মাৎ পাহাড় থেকে একটি পাথর খসে পড়ে এবং বন্ধ করে দেয় তাদের উপর গুহামুখ।

এমন অসহায় অবস্থায় তারা বলাবলি করছিল, তোমাদেরকে এ পাথর হতে মুক্ত  করতে পারবে এমন কিছুই হয়ত নেই। তবে যদি তোমরা নিজ নিজ নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া কর, নাজাত
পেতে পার।

তাদের একজন বলল : “হে আল্লাহ ! আমার বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন,আমি তাদেরকে দেওয়ার
পূর্বে আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্য-স্ত্রী,সন্তান ও গোলাম পরিচারকদের কাউকে রাতের খাবার দুগ্ধ পেশ করতাম না। একদিনের ঘটনা : ঘাসাচ্ছাদিত চারণভূমির অনুসন্ধানে বেরহয়ে বহু দূরে চলে গেলাম। আমার ফেরার পূর্বেই তারা ঘুমিয়ে পরেছিলেন। আমি তাদের জন্য—রাতের খাবার —দুগ্ধ দোহন করলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম তারা ঘুমাচ্ছেন।তাদের আগে পরিবারের কাউকে-স্ত্রী-সন্তান বা মালিকানাধীন গোলাম-পরিচারকদের দুধ দেয়াকে অপছন্দ করলাম। আমি পেয়ালা হাতে তাদের জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম, এতেই সকাল হয়ে গেল। অতঃপর তারা জাগ্রত হলেন এবং তাদের রাতের খাবার দুধ পান করলেন। হে আল্লাহ ! আমি এ খেদমত যদি আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি, তাহলে এ পাথরের মুসিবত হতে আমাদের মুক্তি দিন।”

তার এই দোয়ার ফলে পাথর সামান্য সরে গেল, কিন্তু তাদের বের হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

অপর ব্যক্তি বলল : “হে আল্লাহ ! আমার একজন চাচাতো বোন ছিল, সে ছিল আমার নিকট সমস্ত মানুষের চেয়ে প্রিয়। আমি তাকে পাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম। সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং আমার থেকে দূরে সরে থাকল। পরে কোন এক সময় দুর্ভিক্ষ তাড়িত, অভাবগ্রস্ত হয়ে আমার কাছে ঋণের জন্য আসে, আমি তাকে একশত বিশ দিরহাম দেই, এ শর্তে যে—আমার এবং তার মাঝখানের বাধা দূর করে দেবে। সে তাতেও রাজি হল। আমি যখন তার উপর সক্ষম হলাম, সে বলল : অবৈধ ভাবে সতীচ্ছেদ  করার অনুমতি দিচ্ছি না— তবে বৈধভাবে হলে ভিন্ন কথা। আমি তার কাছ থেকে ফিরে আসলাম। অথচ তখনও সে আমার নিকট সবার চেয়ে প্রিয় ছিল। যে স্বর্ণ-মুদ্রা আমি তাকে দিয়েছিলাম, তা পরিত্যাগ করলাম। হে আল্লাহ ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি, তাহলে আমরা যে মুসিবতে আছি,তা হতে মুক্তি দাও।”

পাথর সরে গেল তবে এখনও তাদের বের হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট হল না।

তৃতীয় ব্যক্তি বলল, “হে আল্লাহ ! আমি কয়েকজন মজুর নিয়োগ করেছিলাম, অতঃপর তাদের পাওনা তাদের দিয়ে দেই। তবে এক ব্যক্তি ব্যতীত—সে নিজের মজুরি পরিত্যাগ করে চলে যায়। আমি তার মজুরি বার বার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছি। যার ফলে সম্পদ অনেক বৃদ্ধি পায়। অনেক দিন পরে সে আমার কাছে এসে বলে, হে আব্দুল্লাহ, আমার মজুরি পরিশোধ কর। আমি তাকে বললাম, তুমি যা কিছু দেখছ—উট-গরু-বকরি- গোলাম—সব তোমার মজুরি। সে বলল : হে আব্দুল্লাহ ! তুমি আমার সাথে উপহাস করো না। আমি বললাম, উপহাস করছি না। অতঃপর সে সবগুলো গ্রহণ করল এবং তা হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। কিছুই রেখে যায়নি। হে আল্লাহ ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি, তাহলে আমরা যে মুসিবতে আছি তা হতে মুক্তি দাও।

পাথর সরে গেল। তারা সকলে নিরাপদে হেঁটে বের হয়ে আসল। (বুখারী, মুসলিম ও নাসায়ী অবলম্বনে)।

শিক্ষাঃ হাদীসের কিসসাটি অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। বিশেষতঃ নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলিকে এর অন্যতম প্রধান শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যায়ঃ

১. নিজের কৃত কোন সৎ কর্মের জন্য গর্ববোধ বা অহংকার প্রকাশ করা যদিও অন্যায়, কিন্তু কোন ভাল কাজ করতে পারা এবং খারাপ কাজ পরিহার করতে পারাকে নিজের সৌভাগ্য ও আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে সন্তোষ ও তৃপ্তি বোধ করা এবং আল্লাহর শোকর করা মহত্ত্বের পরিচায়ক। এক হাদীসে বলা হয়েছে, “ভালো কাজ করতে পেরে আনন্দ বোধ করা ও খারাপ কাজ করে অনুতপ্ত হয়ো ঈমানের লক্ষণ।” আর এ ধরনের কোন নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠ সৎকর্ম যদি নিজের অতীত জীবনে থেকে থাকে, তবে তার দোহাই দিয়ে দোয়াও করা যায় এবং সে দোয়া কবুল হওয়ারও আশা করা যায়।

২. পিতামাতার খিদমত, পরোপকার ও খোদাভীতি মানুষকে আখিরাতের কল্যাণের পাশাপাশি বহুবিধ পার্থিব বিপদ মুসিবত হতেও উদ্ধার করে।

৩. পিতামাতার অধিকার স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকারের ওপর অগ্রগন্য। বিশেষত পিতামাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব উপার্জনক্ষম সন্তানদের।

৪. শ্রমিক মালিক সম্পর্কের একটি চমকপ্রদ নমুনা এ হাদীসে তুলে ধরা হয়েছে। মালিকের নিকট শ্রমিকের কোন পাওনা গচ্ছিত থাকলে তা হারাম উপায়ে নয় বরং হালাল পন্থায় লাভজনক ব্যবসায়ে খাঁটিয়ে যতদূর সম্ভব বাড়িয়ে ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও মহৎ কাজ। আর না হোক, চাওয়ামাত্র টালবাহানা না করে আসল পাওনা সম্পূর্ণরূপে ফেরত দেয়া বাঞ্ছনীয়। শ্রমিকের উৎপাদনের লভ্যাংশে শরীক করার প্রতি লভ্যাংশ প্রদানও এ হাদীসের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হয়।

৫. বিপন্ন মানুষকে বিশেষত নারীকে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে স্বার্থোদ্ধারের মানসে কোন সাহায্য করা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ধরনের শোষণ ও ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচায়ক।

৬. শত বিপদাপদ ও নির্যাতনের ভিতরেও জুলুমকারীকে সদুপদেশ দান, সতর্ক করা ও খোদাভীতির শিক্ষা দিতে কুন্ঠিত হওয়া চাই না। মুসলিম নারী ক্রীতদাসী হয়েও স্বীয় জালেম ও অমুসলিম মনিবকে ক্রমাগত সদুপদেশ দিতে দিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমে পরিণত করেছে-এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। আলোচ্য হাদীসটিতেও এক দুর্ভিক্ষপীড়িত মুসলিম রমণীর সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সতীত্ব লক্ষণীয়।

৭. সর্বাবস্থায় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা কর্তব্য। যেমন আল্লাহর ঐ তিন বান্দা করেছিলেন।

About আকরাম ফারুক