হাজী শরীয়তুল্লাহ

গর্জে উঠলেন সাহসী সৈনিক

মুসলমানদের অধঃপতন দেখে আঁতকে উঠলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ!

অন্ধকার থেকে তাদের আলোর পথে তুলে আনবার জন্যে তিনি ব্যাপকভাবে দীনি দাওয়াতের কাজ শুরু করলেন।

যাবতীয় কুসংস্কার আন্দোলন চালাতে থাকলেন।

সাধারণ মুসলমানকে নৈতিক শিক্ষায় তিনি উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। অপরদিকে তিন ইংরেজ এবং অত্যাচারী জমিদার হিন্দুদের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ালেন।

তারা ক্ষেপেগেল ভীষণভাবে হাজী শরীয়তুল্লাহর প্রতি।

তবও তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গর্জে উঠলেন সাহসী সৈনিক- হাজী শরীয়তুল্লাহ

দীর্ঘকাল মক্কায় থেকে হাজী শরীয়তুল্লাহ কেবল কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, তাসাউফই শেখেননি, তিনি বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন ইসলাম, সমাজ বিজ্ঞান ও রাজনীতি সম্পর্কেও।

এ সময়ে তিনি বুঝলেন, ইসলাম কেবল একটি ধর্মের নাম মাত্র নয় বরং একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম- ইসলাম।

ইসলামের বিস্তারিত ব্যাখ্যা সম্পর্কে অবহিত হবার পর এর প্রচার এবং প্রসারের জন্যে হাজী শরীয়তুল্লাহ নতুনভাবে উদ্যোগী হলেন।

এক মহা আত্ম-প্রত্যয়ের সাথে তিনি নিজের পথকে আবিষ্কার করলেন। আত্মত্যাগ ও আত্মকুরবানীর শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করলেন ব্যাপকভাবে।

এই দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন তিনি তাঁর স্বগ্রামে। স্বদেশে।

আপন-পর-সকল মানুষের মাঝে।

কিন্তু কাজটি ছিলেঅ না খুব সহজসাধ্য। কেননা তখনো তাঁর চারপাশে অশিক্ষা, কুশিক্ষা এবং অপসংস্কৃতির পংকিলে হাবুডুবু খাচ্ছিলো সাধারণ মুসলমান।

তখনকার সামাজিক অবস্থাটা ছিলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

একদিকে চলছে ধর্মীয় অনাচার, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা। আর আছে সাধারণ মুসলমানদের ঘাড়ের ওপর ইংরেজ দস্যু, নীলকর ও অত্যঅচারী হিন্দু জমিদারদের ক্ষিপ্ত শাণিত চাবুক!

আচেতাদের হাতে চকচকে ক্ষুরধার তরবারি!

এর মধ্যে দিয়েই হাজী শরীয়তুল্লাহ নতুনভাবে, নতুন উদ্যমে ঝড়ের মতো এগিয়ে চললেন সামনে।

ক্রমাগত।

ফরায়েজী আন্দোলন

সতেরো শো চৌষট্টি সাল।

মীর কাসিমকে পরাজিত করলো ইংরেজরা।

এরপর থেকে তারা মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো অনেকগুণে।

ইংরেজরা মুসলমানদেরকে সকল দিক দিয়ে ধ্বংস এবং নির্মূল করার জন্যে নানা ধরনের অপকৌশলের আশ্রয় নিলো!

মেতে উঠলো তারা ঘৃণ্য-কুটিল ষড়যন্ত্রে।

ইংরেজরা আক্রমণ করলো মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর। তাদের অর্থনীতির ওপর।

মুলমানদের আয়মা, লাখেরাজ বাজেয়াপ্ত হলো।

তাদের হাত থেকে খাজনা আদায়েল ভার ছিনিয়ে নিয়ে তা দিয়ে দিলে অনুগত হিন্দুদের হাতে।

আর এই সুযোগ পেয়ে চরম সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। বহুদিন যাবত তারাও ওঁৎ পেতে ছিলো সুযোগের অপেক্ষায়।

এমনি একট মোক্ষম অস্ত্রের খোঁজ করছিলো তারা বহুদিন থেকে- যা দিয়ে বহুকালের শত্রু- মুসলমানদেরকে তারা আরো বেশি করে শায়েস্তা করতে পারে।

খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে হিন্দুরা বিপুল বেগে চড়াও হলো মুসলমানদের ওপর। ইংরেজদের সরাসরি মদদ পেয়ে তাদের সাহসের মাত্রা বেড়ে গেলো হাজার গুণে।

খাজনা আদায়ের অজুহাতে কারণে-অকারণে তারা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন চালাতে থাকলো অত্যন্ত নির্মমভাবে।

কি ভয়ানক ছিল তাদের সেই অত্যাচার আর নিপীড়ন!

তাদের সেই নির্মম নিষ্ঠুরতার ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে এখনো শরীর শিউরে ওঠে!

ভয়ে এবং আতংক কেঁপে ওঠে বুক।

মুসলমানদের অর্থ-সম্পদ, জমি জায়গা ছলে বলে দখল করেও তৃপ্ত হতো না হিন্দুরা।

শারীরিকভাবেও তারা নির্যাতন চালাতো তাদের ওপর।

আর মুসলমানদের ধর্মীয় কাজে বাধা সৃষ্টি করা ছিলো তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।

অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের এলাকায় কোনো মুসলমান গরু কিংবা পশু কুরবানী দিতে পারতো না।

দিতে পারতো না মসজিদে আযান।

এমনকি ইসলারেম অন্যান্য হুকুম-আহকামও পালন করতে পারতো না স্বাধীনভাবে।

মুসলমানদের সকল ক্ষেত্রেই বাধা দিতো হিন্দু জমিদাররা।

জমিদারদের সাথে থাকতো পশু স্বভাপের হিংস্র লাঠিয়াল বাহিন।

তারা মুসলমানদের ওপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়তো বাঘের মতো।

কি জঘন্য এবং মর্মান্তিক বিষয়!

হিন্দু জমিদাররা এ সময়ে মুসলমানদের দাড়ির ওপরও ট্যাক্‌স বসিয়ে দিলো!

তাদের ধূতি পরতে বাধ্য করা হতো!

দাড়ি কেটে গোঁফ রাখতে নির্দেশ দিতো!

আর পূজার সময়ে মুসলমানদের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করতো চাঁ঳দা, ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ পূজার আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র!

এছাড়াও তারা গরীব মুসলমানদের পূজার সময়ে খাটিয়ে নিতো বিনা পারিশ্রমিকে।

যারা তাদের অবাধ্য হতো তাদের ওপর চালাতো নির্মম নির্যাতন।

এভাবেই মুসলমানরা অর্থ এবং ধর্ম হারিয়ে হিন্দুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিলো।

মুসলমানদের ঠিক এই চরম দুঃসময়ে মক্কা থেকে ফিরে এলেন আপন স্বদেশে হাজী শরীয়তুল্লাহ।

তিনি স্বদেশের বুকে পা রেখেই আঁতকে উঠলেন!

চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন অবাক বিস্ময়ে!

কেঁপে উঠলো তাঁর দরদ ভরা বুক!

দেখলেন হিন্দু-মুসলমানের আচার আচরণ।

তাদের এই আচার আচরণের মধ্যে খুঁজে পেলেন না হিন্দু মুসলমানের মৌলিক পার্থক্যকারী ইসলামের সেই মহান আদর্শ এবং শিক্ষা।

ইসলামের চর্চা নেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ জীবনের কোথাও।

মুসলমানদের কাছে তিনি শুনলেন তাদের সকল দুর্ভাগ্যের কথা।

শুনলেন ইংরেজ এবং হিন্দদের অত্যচারের কথা।

নিজের চোখেও দেখলেন অনেক কিছু।

এসব দেখে আর শুনে ব্যথিত হলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ!

ভাগ্যহত মুসলমানদের অন্ধকারের কালো গুহা থেকে টেনে তুলবার জন্যে তিনি সংকল্পবদ্ধ হলেন কঠিনভাবে।

আর তখনই হিন্দু ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে তাঁর সাহসী কণ্ঠ!

শুরু হলো তাঁর দেশ, জাতি ও ইসলামী আদর্শ-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের দুর্বার সংগ্রাম!

সংস্কারের এক কঠিন সংগ্রাম!

হাজী শরীয়তুল্লাহর এই সংগ্রামের নাম, এই আন্দোলনের নাম-‘ফরায়েজী আন্দোলন।’

‘ফরজ’ থেকে ‘ফরায়েজী’। ফরায়েজ শব্দটি বহুবচন।

ফরিজাহ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় আলআহর নির্দেশিত অবশ্য কর্তব্যসমূহ। যারা এই কর্তব্যসমূহ পালনে অংগীকারাবদ্ধ তাদেরকে ‘ফরায়েজী’ বলা হয়।

হাজী শরীয়তুল্লাহ সকল আরাম আয়েশ ত্যাগ করে গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকেশহরে ঘুড়ে বেড়ান।

এভাবে ঘুরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেন আপন সংগঠনের জন্যে নিবেদিত কর্মী। সক্রিয় সদস্য।

হাজী শরীয়তুল্লাহ এই আন্দোলনের আগুনকে ছড়িয়ে দেন চারদিকে।

যারা ইসলামের ফরজসমূহ পালন করতে রাজি তারাই কেবল ফরায়েজী আন্দোলনের সদস্য হতে পারতো।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিপুল সংখ্যক ‍মুসলমানকে এই আন্দোলনের সদস্য করে তুলেছিলেন।

হাজী শরীয়তুল্লাহ তাঁর সদস্য এবং সাধারণ মুসলমানকে ধর্মের সাথে কর্মের মিল রাখার জন্যে কঠোরভাবে নির্দেশ দিলেন।

আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলার জন্যে তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানালেন। আহ্বান জানালেন শিরক, কুফরী ও বিদআত থেকে দূরে থাকতে।

ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির আলোকে নিজের জীবনযাত্রা পরিচালনা ও আচার অনুষ্ঠান পালন করার জন্যে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করলেন।

হাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলন সম্পর্কে জেমস টেইলর বলেন, যে “কুরআনকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই ছিলো ফরায়েজী আন্দোলনের উদ্দেশ্য।

কুরআন যেসব অনুষ্ঠানাদি সমর্থন করে না তা সবই ছিলো বর্জনীয়।

মহররমের অনুষ্ঠান পালনই শুধু নিষিদ্ধ ছিলো না, এ অনুষ্ঠানের ক্রিয়াকলাপ দেখাও ছিলো তাদের জন্যে নিষিদ্ধ।”

যেখানে পশু কুরবানী দেয়াই ছিল, সেখানে হিন্দুদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হাজী শরীয়তুল্লাহ নিজেই গরু কুরবানী দিলেন।

সবাই অবাক- বিস্ময়ে দেখলো হাজী শরীয়তুল্লাহর সাহস।

তাঁর এই সাহসে অন্য মুসলমানও উদ্বুদ্ধ হলো।

এরপর তিনি অন্যান্য মুসলমানকেও গরু কুরবানী দিতে বললেন।

দাড়ির ওপর ট্যাক্‌স দিতেও মুসলমানদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন। আর শক্তভাবে নিষেধ করলেন হিন্দুদের পূজা পার্বণে চাঁদা বা পশু পাখি দিতে। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি আরো বেশী সোচ্চার হলেন। চারকিকে শুরু হয়ে গেলো তুমুল আন্দোলন!

হাজী শরীয়তুল্লাহর এই সাহসী আন্দোলন ছিলো সত্যের পক্ষে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

হাজী শরীয়তুল্লাহর এই সাহসীকর্ম তৎপরতায় ক্ষেপে গেলো অত্যাচারী হিন্দুরা।

ক্ষেপে গেলো হিন্দু জমিদার এবং ইংরেজরাও।

চারদিকে শুরু হয়ে গেলো সংঘর্ষ!

সংঘর্ষ হলো তাদের জায়গায়!

কিন্তু পিছু হটলো না ফরায়েজীর সিংহদিল কর্মীরা!

যতোই বাধা আসতে থাকলো, ততোই বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকলো ফরায়েজী আন্দোলনের তীব্র আগুন।

শত বাধার মুখেও হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন অনড় এক পর্বত!

আর তাঁর সাথীরাও ছিলো তেমনি সত্যের পথের এক একজন সিংহপুরুষ!

হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন হানাফী মাজহাবের অনুসারী এবং সেই সাথে বাংলাভাষী।

পারিবারিকভাবে ক্ষুদ্র তালুকদার হলেও শেষ পর্যন্ত সেটাও ছিল না।

তিনি যখন হজ পালন করে বাড়ি ফেরেন, তখন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না।

অন্যদিকে মুসলমান সমাজের উঁচু দরের বা আশরাফ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না।

তাতে কি

তবুও মধ্যম গড়নের, দীর্ঘ দাড়ি সম্বলিত হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন বাঙালি মুসলমানের জন্য প্রকৃত ইসলামী সমাজ সংস্কারের একজন রূপকার।

তাই সাধারণ মানুষের মাছে তাঁর মিশে যাওয়া খুব অসুবিধা হয়নি। বরং সাধারণ মানুষ তাঁর বুকে ঠাঁই পেয়েছে। পেয়েছে মাঝে একজন আপন লোক। তার ওপর তিনি ইসলামের পুণ্যভূমি মক্কায় দীর্ঘদিন অবস্থান করে অনেক কিছু শিখেছেন। তাঁর সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন চরিত্র সাদামাঠা জীবন অমায়িক ব্যবহার, আন্তরিক, প্রয়াস, সবাইকে সমান মর্যাদা প্রদানের অঙ্গীকার- যে কাউকে মোহিত ও মুগ্ধ করার জন্য ছিল যথেষ্ট।

এমন একজন অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য নেতাই তখনকার পরিবেশে প্রয়োজন ছিল অনেক বেশী।

সাধারণ মানুষের সমস্যা তিনি বুঝতেন এবং কিভাবে তার সমাধান করা যায়, তাও জানা ছিল তাঁর। ফলে তিনি সহজেই একটি গতিশীল আন্দোলন সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।

ফলে সেই সময়ে অনেক আন্দোলন সৃষ্টি হলেও ফরায়েজী আন্দোলনই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে কার্যকর, ফলপ্রসূ এবং স্থায়ী।

ইংরেজ সিভিলিয়ন জেম টেলর তা ‘A Sketch of the Topography and statistics of Dacca’ তে লিখেছেন,

“১৮২৮ সালের পর থেকে ফরায়েজী আন্দোলন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে।”

অন্যদিকে জেমস ওয়াইজের মতে,

“শিরক ও বিদআত থেকে স্থানীয় মুসলমানদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে হাজী শরীয়তুল্লাহই পূর্ববঙ্গের ইসলামের প্রথম সংস্কারক ও প্রচারক।”

সুতরাং এ থেকেই বুঝা যায়, ইসলামের জন্য হাজী শরীয়তুল্লাহর অবদানটা কত বেশী!

একজন অভিভাবকের কথা

হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলার মুসলিম সমাজে একজন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতেন।

বিপদে মুসিবতে, সুখে-দুঃখে তিনি তাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন।

তিনি ছিলেন তাদের জন্যে একজন দরদী অভিভাবক ও পরামর্শদাতা।

হিন্দু জমিদার ও ইংরেজ ব্যবসায়ীদের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলিম জনগণকে হাজী শরীয়তুল্লাহ ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন।

তিনি হিন্দু জমিদারদের অনেক অবৈধ কর আদায়ের বিরোধিতা করেন।

অবৈধ কর না দেবার জন্যে হাজী শরীয়তুল্লাহ মুসলিম জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কঠিনভাবে।

হাজী শরীয়তুল্লাহ একদিকে রাজনৈতিকভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হন। আর অপরদিকে সামাজিকভাবে তিনি অত্যাচারী হিন্দু জমিদার ও নীল কুঠিয়ালতের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন।

সেই সাথে বেগবান রাখেন তিনি মুসলমানদের মধ্যে শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার দূর করার জন্য সংস্কারের এক মহা বিপ্লবের ধারা।

শরীয়তুল্লাহর এই সংগ্রাম অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে।

ফড়িয়ে পড়ে ফরিদপুর, বরিশা, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঢাকা, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা প্রভৃতি জিলায়ও।

তাঁর এই সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলো সমাজের প্রধানত দরিদ্র কৃষক শ্রেণী। যারা হিন্দু জমিদার ও ইংরেজদের অত্যাচার আর শোষণের শিকার ছিলো। হাজী শরীয়তুল্লাহ তাদের ঐক্যবদ্ধ করেন। ঐক্যবদ্ধ করলেন তিনি অসহায়, নিঃস্ব ভাগ্যহত মানুষকে।

তাদেরকে শুনালেন তিনি আশার বাণী।

আঠারো শো সাইত্রিশ সালে তাঁর এই সংগ্রামী আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রায় বারো হাজারের মতো।

কম কথা!

এই বিপুল সংখ্যক সদস্যের বাইরেও ছিলো একটি বিশাল জনশক্তি।

যারা তাঁর আন্দোলনকে সকল সময় সমর্থন ও সহযোগিতা করতো।

হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন প্রকৃত অর্থেই দুঃখী মানুষের জন্যে একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক।

গরীবের কষ্ট তিনি সইতে পারতেন না কখনো।

তাই তিনি সকল সময়ই তাদের পাশেগিয়ে দাঁড়াতেন।

এমন জন-দরদী নেতার অভাব ছিল তখন।

হাজী শরীয়তুল্লাহ সময়ের সেই দাবি ও চাহিদা পূরণে তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেন।

About মোশাররফ হোসেন খান