ঈমানের দাবী

জীবন ও ধন সম্পদ আল্লাহর নিকট সমর্পণ ঈমানের পরিচয়

মানুষ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালোবাসে তার জীবনকে এবং তার পর তার ধন-সম্পদকে। কিন্তু একজন মু’মিন তার জীবন ও ধন-সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য অকাতরে উৎসর্গ করবে, এই হচ্ছে তার ঈমানের দাবী।

(আরবী পিডিএফ ২৬ পৃষ্ঠায়*****************************)
-প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা মু’মিনদের কাছ থেকে বেহেশতের বিনিময়ে তাদের জান ও মাল খরিদ করে নিয়েছেন। (সূরা আত-তাওবাঃ১১১)
যে ঈমানের মাধ্যমে আল্লাহ এবং বান্দাহর মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাকে এ আয়াতে প্রকৃতপক্ষে একটা ক্রয়-বিক্রয় বলা হয়েছে। অর্থাৎ ঈমান নিছক একটি বিশ্বাস মূলক মতবাদই নয়, বরঞ্চ একটি পবিত্র চুক্তি যার মাধ্যমে বান্দাহ তার জান ও মাল তার স্রষ্টা ও মালিক প্রভু আল্লাহর নিকটে বিক্রি করে দেয়। তার বিনিময়ে সে আল্লাহর কাছ থেকে এ প্রতিশ্রুতি লাভ করে যে, মরণের পর দ্বিতীয় জীবনে তাকে বেহেশত দান করা হবে। এ কেনা-বেচার মর্ম বুঝতে হলে এর বিশদ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
প্রকৃত ব্যাপার তো এছাড়া আর কিছু নয় যে, মানুষের জীবন ও ধন-সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। কারণ মানুষের জীবন ধন-সম্পদ ও জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সবকিছু বস্তু সামগ্রীর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে বেচা-কেনার প্রশ্নই আসেনা। মানুষের তো এমন কিছু নেই যা সে অপরের কাছে বিক্রি করতে পারে এবং আল্লাহ তায়ালারও সৃষ্টি ও মালিকানা বহির্ভূত এমন কিছু নেই যা তিনি ক্রয় করতে পারেন। তাহলে এ বেচা কেনার অর্থ কী?
ব্যাপার হচ্ছে এই যে, মানুসের মধ্যে এক বস্তু আছে যা আল্লাহ মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দিয়েছেন। আর সেটা হলো মানুষের স্বাধীন এখতিয়ার। অর্থাৎ তার স্বাধীন ইচ্ছা ও কোনকিছু গ্রহণ-বর্জন ও করা না করার স্বাধীনতা (Freedom of will & freedom of choice)।এতে করে অবশ্যি আসল সত্য পরিবর্তন হয়ে যায়না। অর্থাৎ জান ও মালের মালিকানা আল্লাহরই রয়ে যায়। কিন্তু মানুষকে এ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে যে, সে এ সত্যকে (সবকিছুর একচ্ছত্র মালিকানা আল্লাহর) স্বীকার করে নিতে পারে, অথবা অস্বীকারও করতে পারে। কিন্তু তার স্বাধীন এখতিয়ারের এ অর্থও হতে পারেনা যে, মানুষ প্রকৃতপক্ষে তার জীবনে, তার দেহ ও মনের এবং এসবের শক্তিসমূহেরও তার ধন-সম্পদের সে মালিক হয়ে পড়েছে। অতঃপর সে এগুলোকে যেভাবে খুশি সেভাবে ব্যবহার করবে। বরঞ্চ তার প্রকৃত অর্থ এই যে, তাকে শুধুমাত্র এ স্বাধীনতা টুকু দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বাধ্যবাধকতা ব্যতিরেকেই নিজের জীবন ও আল্লাহ প্রদত্ত যাবতীয় ধন-সম্পদের উপর খোদার মালিকানার অধিকার ইচ্ছা করলে সে স্বীকার করে নেবে, অথবা নিজেই নিজের মালিক হয়ে বসবে এবং খোদার মুখাপেক্ষী না হয়ে ইচ্ছেমতো এসবকিছু সে ব্যবহার করবে। এই হলো আসল কারণ যার জন্য কেনা-বেচার প্রশ্ন এসে যাচ্ছে। তাই বলে এই খরিদের অর্থ এই নয় যে, যে বস্তু মানুষের তা আল্লাহ খরিদ করেছেন। বরঞ্চ আসল ব্যাপার এই যে, মানুষের জান-মাল তার কাছে নিছক আমানত স্বরূপ রাখা হয়েছে। অতপর এ ব্যাপার সম্পূর্ণ আমানতদারীর ভূমিকা পালন করার স্বাধীনতা তাকে দেয়া হয়েছে। এখানে আল্লাহ তার কাছে এ দাবী করছেন যে, সে স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে বাধ্যবাধকতার চাপে নয়, আল্লাহর জিনিস আল্লাহর বলে স্বীকার করে নিক এবং জীবনভর তার মালিক মোখতার হিসেবে নয়, নিছক একজন আমানতদার হিসেবে তার ব্যবহার স্বীকার করে নিক। খেয়ানত করার যে স্বাধীনতা তাকে দেয়া হয়েছে তা সে পরিত্যাগ করুক। এভাবে দুনিয়ার এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে আল্লাহর দেয়া স্বাধীনতাকে যদি সে আল্লাহরই হাতে সমর্পণ করে, তাহলে প্রতিদান স্বরূপ আখিরাতে তাকে বেহেশতে স্থান দেয়া হবে। যে ব্যক্তি আল্লহর সাথে এ ধরনের কেনা-বেচা করবে সেই প্রকৃতপক্ষে মু’মিন। ঈমান এধ রনের কেনাবেচারই দ্বিতীয় নাম।
যে ব্যক্তি এ ধরনের কেনা-বেচাকে অস্বীকার করে অথবা নীতিগতভাবে এ কথা স্বীকার করার পর এমন আচরণ করে যা কেনা-বেচা না করার শামিল, তাহলে সে আলবৎ কাফির। কারণ ঈমান না থাকলে কাফির হওয়াটা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
একে না বেচার ব্যাপারটি আরও একটু পরিস্কার করে বুঝে নেয়া দরকার।
এ কেনা-বেচার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুটি বিরাট পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন।
(১) প্রথম পরীক্ষা এই যে, ইচ্ছা ও কর্মস্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও সে এতটুকু শালীনতা ও ভদ্রতা প্রদর্শন করে কিনা যে, প্রকৃত মালিককে মালিক মনে করে নেবে এবং নিমকহারামী ও খোদাদ্রোহীতা থেকে বিরত থাকবে।
(২) দ্বিতীয় পরীক্ষা এই যে, তার জীবন ও ধন-সম্পদের বিনিময়ে সে নগদ কিছু পাচ্ছেনা। বরঞ্চ মৃত্যুর পরের জীবনে পাওয়ার একটা প্রতিশ্রুতি মাত্র। এমতাবস্থায় সে আল্লাহর উপর এতটুকু আস্থা স্থাপন করতে পারে কি না যে, সুদূর ভবিষ্যতের এক প্রতিশ্রুতি পাওনার বিনিময়ে সে তার স্বাধীন মর্জি ও সাধ উৎসর্গ করে দিতে স্বেচ্ছায় সন্তুষ্ট চিত্তে রাজী থাকে।
(৩) দুনিয়ার যে ফিকহ শাস্ত্র অনুযায়ী ইসলামী সমাজ গঠিত হয় তার দৃষ্টিতে ঈমান তো শুধু কিছু আকীদাহ বিশ্বাসের স্বীকৃতি ও ঘোষণার নাম। অতঃপর শরীয়তের কাজী তাকে গায়ের মু’মিন (অমুসলিম) অথবা ইসলামী মিল্লাত থেকে বহিস্কৃত বলে ঘোষণা করতে পারেনা, যতক্ষণ না এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় যে ঈমানের ঘোষণার ব্যাপারে সে মিথ্যাবাদী। কিন্তু আল্লাহর নিকটে প্রকৃত ঈমানদার ত সেই ব্যক্তি যে তার ধ্যান ধারণা ও কার্যকলাপের দ্বারা স্বাধীনতা ও এখতিয়ার মা’বুদের হাতে উৎসর্গ করে দেয় এবং তাঁরই পক্ষে নিজের মালিকানার দাবী থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এখন কোন ব্যক্তি যদি ইসলামী কালিমার স্বীকৃতি দান করে, নামায রোযা প্রভৃতি নিয়মিত পালন করতে থাকে। কিন্তু আপন দেহ-মনের, মস্তিষ্ক ও দৈহিক শক্তির, আপন ধন-সম্পদের ও উহার উপাদানের এবং আপন আয়ত্তাধীন সমুদয় বস্তু সমূহের মালিক নিজেকেই মনে করে, তাহলে দুনিয়াতে তাকে মু’মিন বলা হোক না কেন আল্লাহর নিকটে সে গায়ের মু’মিন বলেই অভিহিত হবে। কারণ আল্লাহর সাথে সে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি মোটেই করেনি যাকে কুরআনের দৃষ্টিতে ঈমানের প্রকৃত গুঢ়তত্ত্ব বলা হয়েছে। আল্লাহর বাঞ্ছিত স্থানে জান-মাল উৎসর্গ করতে কুণ্ঠিত হওয়া এবং আল্লাহর অবাঞ্ছিত স্থানে তা উৎসর্গ করা এ উভয়বিধ আচরণ এমন যা এ কথা প্রমাণ করে যে, ঈমানের দাবীদার ব্যক্তি তার জান মাল আল্লাহর কাছে বিক্রি করেনি। অথবা বিক্রয় চুক্তির পর সে বিক্রীত বস্তুকে নিজের মনে করছে।
(৪)ঈমানের এ গুঢ়তত্ত্ব ইসলামী জীবন ও কুফরী জীবনকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। একজন মুসলমান ত সেই যে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর উপরে ঈমান এনেছে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর মর্জির অধীন হয়ে কাজ করে এবং তার কাজ-কর্ম এবং আচার-আচরণে কোথাও কণামাত্র স্বেচ্ছাচারিতার ঝলক দেখতে পাওয়া যায়না। অনুরূপভাবে ঈমানদারদের নিয়ে যে দল গঠিত হয়, তারা সমষ্টিগতভাবে ও কোন পলিসি, কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তাহযিব-তামাদ্দুনের কোন রীতি-নীতি, কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়ম-পদ্ধতি এবং কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালা আল্লাহর মর্জির বিপরীত অথবা শরীয়তী কানুনের বিপরীত গ্রহণ করতে পারেনা। আল্লাহ থেকে স্বাধীন হয়ে কাজ করা এবং কোন কিছু করা না করার সিদ্ধান্ত আপন মর্জির উপর ছেড়ে দেয়া অবশ্যই কুফুরী দৃষ্টিভঙ্গী। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যারা রাখে তারা ‘মুসলিম’ নামে অভিহিত হোক অথবা ‘অমুসলিম’ নামে উভয়ই সমান।
(৫) এ বেচা-কেনার দৃষ্টিতে আল্লাহর যে মর্জির আনুগত্য একজন মু’মিনের জন্য অপরিহার্য, সে মর্জি মানুষের উদ্ভাবিত বা কল্পিত মর্জি হলে চলবেনা। বরঞ্চ তা হতে হবে সেই মর্জি যা তিনি স্বয়ং ঘোষণা করেন। কোন কিছুকে নিজে নিজে মা’বুদের মর্জি বলে মনে করে তার আনুগত্য করা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মর্জির আনুগত্য হয়না, হয় আপন মর্জি বা প্রবৃত্তির আনুগত্য করা। আর এটা হবে বেচাকেনার চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত বেচা-কেনার চুক্তিতে সেই ব্যক্তি ও দল অবিচল আছে বলে মনে করতে হবে যে বা যারা তাদের গোটা জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিকর্তার দেয়া কিতাব ও রসূলে খোদার সুন্নাহ অনুযায়ী গ্রহণ করে।
আশা করি বিষয়টি এবার পরিস্কার হয়েছে, তবুও কিন্তু মনের কোণে একটি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, তার সঠিক জবাবও আমাদের জেনে রাখা দরকার।
সে প্রশ্নটি হলো এই যে, মু’মিন তার জীবন ও ধন-সম্পদ যে আল্লাহর কাছে অকাতরে বিক্রি করে দিল, তার মূল্য এ দুনিয়াতে না দিয়ে আখিরাতে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো কেন?
এ প্রশ্নের জবাব এ ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারেনা যে, বেহেশত শুধুমাত্র এ চুক্তির বিনিময় নয় যার দ্বারা বিক্রেতা তার জানমাল আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিল। বরঞ্চ বেহেশত হবে তার আচরণের বিনিময়, যে আচরণ হবে তার এমন যে বিক্রেতা তার পার্থিব জীবনে তার বিক্রিত বস্তুর প্রতি তার স্বেচ্ছাচারমূলক ব্যবহার পরিত্যাগ করবে এবং প্রকৃত আমানতদার হিসেবে খোদারই মর্জি অনুযায়ী তা ব্যবহার করবে। অতএব, এ বিক্রয় কার্য সত্যিকার অর্থে সম্পন্ন হবে যখন বিক্রেতার পার্থিব জীবন শেষ হয়ে যাবে এবং এ কথা প্রমাণিত হবে যে সে বিক্রয় চুক্তি করার পর তার জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত বিক্রির শর্তাবলী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। তার পূর্বে ন্যায়-নীতির দিক দিয়ে মূল্য পাওয়ার সে যোগ্যই হতে পারেনা।

ক্রীত বস্তুর মূল্য প্রদান আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ
এ কেনা-বেচা ও ক্রীত বস্তুর মূল্য প্রদানের ব্যাপারে বান্দাহর প্রতি আল্লাহ তায়ালার এক বিশিষ্ট অনুগ্রহ দেখা যায়। তা হলো এই যে, নিজেরই গচ্ছিত বস্তু যখন খুশি তখন তিনি বান্দার নিকট থেকে নিয়ে নিতে পারেন। তার মূল্য বা বিনিময় আবার কেন? কিন্তু মেহেরবান আল্লাহ আপন জিনিস বান্দাহর নিকট ফেরৎ নিচ্ছেন এবং তার জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বোৎকৃষ্ট মূল্য দিচ্ছেন। তা হলো বেহেশত। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর খাস মেহেরবানী ছাড়া আর কী হতে পারে?
এ কথাটিকে এক প্রেমিক কবির ভাষায় কত সুন্দর করে ব্যক্ত করা হয়েছে!
আল্লাহর পথে একজন শহীদের মনের কথা কবিতাঁর ভাষায় ব্যক্ত করে বলেছেন।
জান দিত দি হুই উসি কি থি
হক ত ইয়ে হ্যায় কে হক আদা না হুয়া।
-যে জীবন আল্লাহর পথে উৎসর্গ করলাম, সে তাঁরই দেয়া। সে জীবন তাকেই দেয়াতে আমার কোন বীরত্ব বাহাদুরী নেই। পক্ষান্তরে প্রকৃত ব্যাপার এই যে, জীবনভর তাঁর অগণিত নিয়ামত ভোগ করার পর তার হক আদায় করতে পারলাম না।
স্বতঃস্ফুর্তভাবে আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করার পর আল্লাহ প্রেমিকের কী মহান পরিতৃপ্তি প্রকাশ! এই হলো প্রকৃত ঈমানের নিদর্শন।

About আব্বাস আলী খান