মোদের চলার পথ ইসলাম

তৃতীয় অধ্যায়

ইবাদত

ইবাদতের অর্থ ও তাৎপর্য

 

পাঁচটি অবশ্যকরণীয় ইবাদত

নামায

নামায মানুষের স্বভাব ধর্মের পরিচয়

নামায আল্লাহর স্মরণ

নামায প্রকৃত বান্দা তৈরী করে

নামাযের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় খোদাভীতি

জামায়াতে নামায

নামায কিভাবে উপকারে আসে

রোযা

রোযা খোদাভীতি ও খোদাপ্রেম সৃষ্টি করে

রোযা ইচ্ছা শক্তি বাড়ায়

রেযা ভ্রাতৃত্ব বাড়ায়

অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে চলা

মৌলিক গুণাবলীর লালন

রোযা সহানুভূতিশীল করে

অন্যান্য উপকার

হজ্ব

হজ্বের বিভিন্ন অনুষ্ঠান

হজ্বের তাৎপর্য

যাকাত

যাকাত একটি ইবাদত

যাকাতের গুরুত্ব

যাকাত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে

যাকাতের উপকারিতা

কোন কোন সম্পদের যাকাত দিতে হয়

যারা যাকাত নিতে পারে

ইবাদত

আল্লাহ চান এই দুনিয়ায় তাঁর দাসত্ব করুক, তাঁর আনুগত্য করুক। আল্লাহকে প্রভু হিসাবে মেনে নিয়ে তাঁর হুকুম মত মানুষ জীবন পরিচালনা করুক। জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর নির্দেশ মত করুক। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়ালা কোরআন শরীফে বলেছেন-

আমি জ্বীন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।

সূরা আয-যারিয়াত-৫৬

 

ইবাদতের অর্থ ও তাৎপর্য

‘ইবাদত’ শব্দের অর্থ বন্দেগী বা দাসত্ব। মানুষ আল্লাহর দাস বা গোলাম (আরবীতে আবদ)। আল্লাহ মানুষেল ‘মাবুদ’। কোন গোলাম বা চাকর যদি সত্যিকারভাবে তার (১) মনিবের দাসত্ব স্বীকার করে নেয় (২) তার মনিবের একান্ত অনুগত হয় এবং (৩) গোলামের মত আচরণ করে, তাঁকে সম্মান করে এবং তাঁর দানের শোকর করে তবে তার এই গোলামীকে বলে ইবাদত।

আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহর গোলামী করা। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। এইসব কাজ খোদার আইন অনুযায়ী করার নামই ‘ইবাদত’। প্রতিটি কাজ, প্রতিটি গতিবিধি খোদার নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে। এই হিসেবে সে যে কাজই করে তাই ‘ইবাদত’। এই সীমার মধ্যে তার ঘুম, জেগে থাকা, খাওয়া-দাওয়া, চলাফিরা, কথা বলা, লেনদেন সবই ‘ইবাদত’।

আল্লাহর এই দাসত্ব মেনে নেয়া জীবনের কোন এক বিশেষ মুহুর্তের জন্য নয়। দিন-রাত্রির কোন বিশেষ সময়ের জন্য নয়। দিনের চব্বিশটি ঘণ্টা, বছরের প্রতিটি দিন মোটকথা মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর গোলাম হয়ে তাঁর হুকুম মত প্রতিটি কাজ করতে হবে। তাই আল্লহর প্রকৃত দাস হিসেবে জীবন পরিচালনা করা সহজ বিষয় নয়। এজন্যে চাই দৃঢ় ঈমান, চাই সাধনা ও অনুশীলন।

আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার পথে প্রথম বাধা আসে নিজের ভিতর থেকে। মানুষের নিজের ভিতরে আছে আরামপ্রিয়তা, লোভ-লালসা, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, কামনা-বাসনা, আবেগ-উচ্ছ্বাস। সব ধরনের জড়তা, দুর্বলতা, অলসতা কাটিয়ে আল্লাহর গোলাম হিসেবে নিজকে গড়ে তোলার জন্য আল্লাহ কতকগুলো ‘কাজ’ ফরয করে মানুষকে আল্লাহর গোলাম হবার ট্রেনিং দেয়। যে যত ভালভাবে এই ট্রেনিং নেবে সে তত ভালভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারবে যেজন্য আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন। এই সব ইবাদত পালন করে মানুষ গোটা জীবনকে আল্লাহর ‘এবাদতে’ পরিণত করার উপযুক্ত হয়।

দিনে পাঁচমার নামায স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা আল্লাহর দাস-একমাত্র তাঁরই দাসত্ব করা আমাদের কর্তব্য। এক মাস পুরো রোযা পালনের মাধ্যমে মানুষ তার নিজের ভিতরের পশু প্রবৃত্তিকে শাসন করতে শিখে। যাকাত স্মরণ করিয়ে দেয় তুমি যে অর্থ উপার্জন করেছো তা খোদার দান-নিজের খেয়াল-খুশীমত তা খরচ করলে চলবেনা। আল্লাহর হুকুম মত তোমার অর্থ ব্যয় করতে হবে। হজ্ব মানুষের মন ভরিয়ে দেয় খোদার প্রেম ও ভালবাসায়। আল্লাহ মহান ও শ্রেষ্ঠ এই অনুভূতি তার হৃদয়ে এমন দাগ কাটে যা কোনদিন ভুলে যাবার নয়। তাই আল্লাহর গোলাম হবার জন্য আমাদেরকে সঠিকভাবে নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত আদায় করতে হবে।

পাঁচটি অবশ্যকরণীয় ইবাদত

কালেমা শাহাদাতের ঘোষণা দান, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত এই পাঁচটি ইবাদতকে আল্লাহ আমাদের জন্য অবশ্যকরণীয় ইবাদত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই পাঁচটি ইবাদতকে ইসলামের ভিত্তি (আরকানে দ্বীন) বলা হয়। একটি ঘর যেমন খুঁটি বা ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, এও ঠিক তেমনি। কালেমা শাহাদাতের ঘোষণা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর একত্ব ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর রেসালাতের স্বীকৃতি। আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের (সঃ) অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে গড়ে তুলতে হবে। আর এ কাজে আমাদেরকে সাহায্য করে অন্য চারটি আরকান-নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত।

নামায

নামায ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরআনের ভাষায় এর নাম ‘সালাত’। নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাতের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশী যে ইবাদতটি করতে হয় তা হলো নামায। নামায ফরজ হবার পর থেকে প্রতিদিন পাঁচবার অবশ্যই এই নামায আদায় করতে হয়।

নামায মানুষের স্বভাব ধর্মের পরিচয়

মানুষেল স্বভাব হলো এক বিরাট শক্তির কাছে নিজকে পেশ করা ও শ্রদ্ধা জানানো। নদী যেমন আপনা আপনি বিরাট সমুদ্রের দিকে ছুটে চলে, তেমনি মানুষও এক মহৎ লক্ষ্য বা পথে নিজকে নিবেদন করতে চায়। তাই যুগে যুগে মানুষ কোন না কোন কিছুকে বিরাট শক্তিময় মনে করে তার পূজা করেছে।

আল্লাহ হচ্ছেন সৃষ্টি জগতের বৃহত্তম সত্তা। আল্লাহকে পাওয়াই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। তাই আল্লাহর সামনে নিজকে পেশ করে, মনে-প্রাণে এবং উচ্চারণে তাঁর প্রশংসা করে, তাঁর কাছে নিজকে নিবেদনের ওয়াদা করে, বুকে হাত রেখে দৃষ্টি অবনমিত রেখে, কোমর অবনত করে, মাটিতে মাথা রেখে যে ‘কাজ’ বা ইবাদতটিকে আমরা নামায বলি তা মানুষের স্বভাব ধর্মেরই পরিচয়।

নামায মানুষের দেহ ও মনের এক স্বাভাবিক দাবী। প্রত্যেক নবী রাসূল তাই তাঁর অনুসারীদেরকে আল্লহার সামনে নিজকে পেশ করা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং আল্লাহর প্রশংসা করার জন্য নামাযের মত কোন না কোন ইবাদতকে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবী আমাদেরকে দিয়েছেন দিনে পাঁচবার নামাযের শিক্ষা।

নামায আল্লাহর স্মরণ বা জেকের

আমরা নামায আদায়ের মাধ্যমে আল্লহাকে স্মরণ করি। নামায আমাদেরকে আল্লাহে স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমাকে স্মরণ করার জন্য নামায আদায় কর।

সূরা ত্বাহা-১৪

ইসলামের সবচেয়ে বড় কথা হলো আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর আনুগত্য। মুসলমান হিসেবে দুনিয়ার প্রতিটি কাজে সব সময় স্মরণ রাখতে হবেঃ আল্লাহ আছেন, তিনি আমাকে দেখছেন এবং আমার অন্তরের সব কিছু জানেন। ‘শয়তান’ আমাদেরকে তার দাস বানাতে চায়। আমাদের ভুলিয়ে রাখতে চায় সব সময়। তাই ‘আল্লাহর স্মরণ’ সব সময় জাগরুক রাখার জন্যেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হয়। ঘুম থেকে উঠে দিনের শুরুতে একবার, দিনের নানান কাজের ফাঁকে তিন তিনবার এবং রাতের বেলায় ঘুমের সময় হলে আর একবার আনুষ্ঠানিকভাবে নামায আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ‘আমরা আল্লাহর গোলাম’।

নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ)-এর শেখানো নিয়ম অনুযায়ী তাই আমরা নামায আদায় করছি। একজন মুসলমানদের নামাযের দিকে ভালভাবে লক্ষ্য করো, কি সুন্দর এক ব্যবস্থা। আল্লাহকে স্মরণ করার, আল্লাহর দাসত্ব ঘোষণা করার, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার, আল্লাহর কিতাবের শিক্ষাকে বারবার উচ্চারণ করার, রাসূলের সত্যতা স্বীকার করার, আল্লাহর আদলতে জবাবদিহির কথা স্মরণ করার জন্য এর চেয়ে চমৎকার ব্যবস্থা কি আর আছে? চেয়ে দেখ, নামাযের জন্য পাঁচবার ওজু, নামাযে দাঁড়ানোর আদব, রুকু সেজদার মাধ্যমে ফুটে উঠা বিনয়ীভাবে-সব কিছু মিলিয়ে নবীজির শেখানো নামায মানুষকে কত পবিত্র করে, মহান করে তোলে মাটির মানুষকে।

এজন মুসলমান ঘুম থেকে উঠে পাখী ডাকা সকালে নামাযের মত একটি সুন্দর ব্যবস্থার মাধ্যমে শুরু করে তার দিন-সতেজ অনুভূতিতে। এরপর কাজের ফাঁকে গড়িয়ে যায় দিন। ভরা দুপুরে মুয়াজ্জিনের ডাকে আবার সে সজাগ হয় যোহরের সময়। ঈমানকে তাজা করে নিয়ে সে আবার ফিরে যায় দুনিয়ার কাজ কারবারে। কয়েক ঘণ্টা পর পড়ন্ত বেলায় আছরের নামায। তাজা করে নেয় সে আবার তার ঈমানকে। এরপর দিন শেষ হয়-হয় মাগরিবের সময়। ভোরে সে যে এবাদতের মধ্য দিয়ে শুরু করেছিল দিন-রাতও শুরু করে সে সেই এবাদতের মধ্য দিয়ে-যেনো সেই শিক্ষা সতেজ থাকে তার চেতনায় রাতভর। তারপর ঘনিয়ে আসে এশার সময়। দিনের কোলাহলে সে যে সুযোগ পায়নি রাত্রির প্রশান্তিতে নিশ্চিন্তে মনে সেই এবাদতে মশগুল হয় তার দেহ-মন।

এই হলো সেই নামায-নবীর শেখানো নামায, যা ইসলামের ভিত্তিতে মজবুত করে। যে বড় ‘এবাদতের’ জন্য আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন- মানুষকে সেই ‘এবাদতের’ জন্য  তৈরী করার ‘ইবাদত’ নামায।

নামায প্রকৃত বান্দা তৈরী করে

মুসলমান হিসেবে প্রতি পদে পদে আল্লাহর হুকুম মেনে চলা আমাদের কর্তব্য। তাই মনের মধ্যে সব সময় থাকতে হবে এই কর্তব্যবোধ। মন থাকবে আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য সদা প্রস্তুত। আল্লাহর হুকুম মানাকে জীবনের এক স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করে নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ট্রেনিং-এর ঠিক সৈনিকের মত। একজন সৈনিককে যেমন প্রতিদিন যুদ্ধ করতে না হলেও যুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। একজন মুসলমানকেও তেমনি সকল অবস্থায় আল্লাহর আইন পালনের জন্য প্রস্তুত থাকার উদ্দেশ্যে নামাযের মাধ্যমে প্রতিদিন ট্রেনিং নিতে হয়। সৈনিকের মত নিয়ম-শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, ধৈর্য, সাহস শৃঙ্খলার ট্রেনিং সে পায় নামাযের মাধ্যমে।

মুসলমান সে যে প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তে ইসলাম অনুযায়ী কাজ করবে, কুফরী ও ফাসেকীর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আর এইভাবে মনে-প্রাণে প্রস্তুত হবার ‘ট্রেনিং’-এর জন্য দিন রাতের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়েছে। আল্লাহকে খুশী করার জন্য, জেহাদে প্রস্তুত সৈনিক হিসেবে গড়ে উঠার এক বাস্তব কর্মসূচী নামায। বাস্তব জীবনে আমরা আল্লাহর আইন মানতে প্রস্তুত কিনা তার পরীক্ষা ও প্রমাণ নেবার জন্যই এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায। আর এজন্যই নামায পড়াকেই নবীজি কুফর ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্যের প্রধান চিহ্ন বলে উল্লেখ করেছেন।

নামাযের মাধ্যমে সৃষ্টিহয় খোদাভীতি

আল্লাহ আমাদেরকে সব সময় সব জায়গায় দেখছেন, আমাদের সব কিছু জানেন ও শুনে। খোদার দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে থাকা যায় না। মনের মধ্যে এই বিশ্বাস যত দৃঢ় হবে, আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধান মেনে চলা তত সহজ হবে। আর এই বিশ্বাস দুর্বল হলে মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকা কঠিন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মাধ্যমে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃড় হয়। তাই নামায মুসলমান হিসেবে জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় এক ইবাদত।

প্রত্যেক দিন পাঁচবার নামায আদায় করা খুব কঠিন কাজ বলে মনে হয় কিন্তু যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে, তাদের জন্য এ এক সহজ কাজ। আল্লাহ এ কথা সুন্দরভাবে কোরআনে বলেছেনঃ

তোমরা ধৈর্য এবং নামাযের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাহায্য চাও-

এটি সত্য একটি কঠিন কাজ, কিন্তু তাদের জন্য কঠিন নয় যারা মনে রেখেছে যে, একদিন আল্লাহর সাথে দেখা হবে এবং তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

সূরা বাকারা-৪৫-৪৬

 

জামায়াতে নামায

নামাযে আমরা কোরআন থেকে কিছু অংশ পাঠ করি। কোরআন আল্লাহর বিধান। বুঝে শুনে কোরআনের এসব আয়াত পাঠের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর বিধানকে জানার সুযোগ পাই। এছাড়া নামাযের জামায়াতে শিক্ষিত অশিক্ষিত সব ধরনের মুসলমানই একত্রিত হয়। এর মাধ্যমে মনের আদান প্রদানের এক চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে আল্লাহর আইন, বিধি-বিধান জেনে নেওয়ারও এক সুন্দর সুযোগ হয়। জামায়াতে নামাযের ব্যবস্থা সৃষ্টি করে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা।

খোদার দুশমনদেরকে নির্মূল করা এবং দুনিয়ায় খোদার আইন জারি করার জন্য মুসলমানদের যে মিলিত শক্তির প্রয়োজন –যে ঐক্য শক্তির প্রয়োজন-দিনরাত পাঁচবার জামায়াতে নামায, জুময়ার দিনে বড় জামায়াত, বছরের দুই ঈদের জামায়াত মুসলমানদের মধ্যে সেই ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে –সেই ঐক্য-চেতনার জন্ম দেয়। আর সারা বিশ্বের মুসলমাদনরা একই ভাষায় একই পদ্ধতিতে নামায আদায়ের মাধ্যমে সেই চেতনারই সাক্ষ্য দেয় যে মুসলমানরা এক জাতি।

নামায কিভাবে উপকারে আসে

নামায আমাদের মধ্যে যেসব ভাল গুণ ও অভ্যাস সৃষ্টি করে তা আলোচনা করা হলো। কিন্তু এখানে একটি কথা ভালভাবে জেনে তিনে হবে –তা হলো নামায থেকে আমরা এতসব উপকার তখনই পাবো যখন আমরা জেনে বুঝে নামায আদায় করবো। নামাযের মধ্যে আমরা আল্লাহর দাস হিসেবে নিজকে ঘোষণা দিয়ে তাঁর সামনে বিনয়ের সাথে যেভাবে রুকু করছি, সিজদা করছি, নামাযের বাইরে দুনিয়ায় অন্যান্য কাজও আমাদেরকে তেমনি আল্লাহর গোলামের মতই করতে হবে। আল্লাহ যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন, নামায আদায় করার পর সেস কাজ কি আমরা করতে পারি?

নামাযের মধ্যে আমরা যেখানে বলছিঃ হে প্রভু‍! আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমারই কাছে সব কিছু চাই –(সূরা ফাতেহা) সেখানে নামাযের বাইরে কি আমরা আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন কাজ করতে পারি?

নামাযের মধ্যে আমরা যেখানে বলছিঃ হে প্রভু! আমরা তোমরাই ইবাদত করি, তোমারই কাছে সব কিছু চাই- (সূরা ফাতেহা) সেখানে নামাযের বাইরে কি আমরা আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন কাজ করতে পারি?

তাই নামায থেকে ফায়দা বা উপকার পাওয়ার উপায় হলোঃ

১। নামাযে আমরা যা যা পড়ছি বা বলছি সেসব কিছুর অর্থ ভালভাবে বুঝতে হবে।

২। আল্লাহর সামনে নামায আদায় করছি এই অনুভূতি নিয়ে নামায আদায় করতে হবে।

৩। নামাযের মাধ্যমে যেসব শপথ নিচ্ছি –যেসব ওয়াদা করছি নামাযের বাইরে আমাদের সব কাজে তার ছাপ থাকতে হবে।

রোযা

প্রতি বছর রমজান মাসে মুসলমানরা রোযা রাখে। রোযাকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘সওম’। ‘সওম’ অর্থ বিরতি থাকা বা বিরত রাখা। রোযার দিনে রোযাদাররা কোন জিনিস খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকে। শুধু তাই নয়, রোযা রাখলে খারাপ কথা বলা যায় না, খারাপ কাজ করা যায় না, খারাপ চিন্তা করা যায় না।

এমনিভাবে নামায আমাদেরকে যে শিক্ষা প্রতিদিন পাঁচবার স্মরণ করিয়ে দেয়, রোযা বছরে একবার তা একমাস ধরে প্রতি মুহুর্তে স্মরণ করিয়ে দেয়, রোযা বছরে একবার তা একমাস ধরে প্রতি মুহুর্তে স্মরণ করিতে দিতে থাকে। এ হলো মহান প্রভু আল্লাহর হুকুম-আহকাম মানার জন্য প্রস্তুত হবার বার্ষিক ট্রেনিং প্রোগ্রাম। পুরো একমাস এমনিভাবে কঠিন সাধনা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয। মজার ব্যাপার হলো, এমনিভাবে রোযা রাখা শুধু আমাদের জন্যই যে ফরয করা হয়েছে তা নয়, আমাদের প্রিয় নবীর পূর্বেও যে সকল নবী ছিলেন তাঁদের অনুসারীদের জন্যও রোযার বিধান ছিল।

কোরআনে আল্লাহ বলেছেন-

হে ঈমানদাররা, তোমাদের জন্য রোযা রাখা ফরয করা হয়েছে

যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর তা ফরয করা হয়েছিল।

আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পরহেযগারীর গুণ সৃষ্টি হবে।

সূরা বাকারা-১৮৩

কোরআনের এই আয়াত থেকে রোযার উদ্দেশ্য কি তা জানা যায়। কেউ ভালভাবে, ভাল নিয়তে রোযা রাখলে রোযার মাধ্যমে তার মধ্যে পরহেযগারীর গুণ সৃষ্টি হয়। পরহেযগারী কি? দুনিয়ার সব লোভ-লালসা ও খারাপ কাজ থেকে নিজকে দূরে রাখার নাম পরহেযগারী।

রোযা খোদাভীতি ও খোদাপ্রেম সৃষ্টি করে

রোযার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে খোদাভীতি ও খোদাপ্রেম সৃষ্টি হয়। একটু খেয়াল করে দেখ, রোযার দিনে মানুষ যা কিছু ভাল কাজ করে তা কাউকে দেখানোর জন্য নয়। একমাত্র আল্লাহর জন্যই সব কিছু করে। সামান্য কিছু লুকিয়ে খেলে, কেউ কি তা দেখতে পারবে? খারাপ কিছু চিন্তা করলে কেউ কি তা জানতে পারবে? কিন্তু যে রোযা রাখে সে এটা বিশ্বাস করে যে, কোন মানুষ তা না দেখলেও আল্লাহ সব কিছু দেখেন, সবকিছু জানেন এবং সবকিছু শুনেন। এমনিভাবে আল্লাহকে স্মরণ করেই সে সারাদিন কষ্ট করে, ক্ষুধা লাগলেও কিছু খায়না। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য ভাল কাজ করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখলে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়।

রোযা ইচ্ছা শক্তি বাড়ায়

রোযা নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। মানুষ সাধারণতঃ একটু আরাম চায়, একটু আয়েশ চায়, ভাল খেতে চায় এটা স্বাভাবিক। কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এ আগ্রহকে সব সময় সীমার মধ্যে রাখতে হয়। আর এ জন্য প্রয়োজন ইচ্ছা শক্তি। রোযা এ ইচ্ছা শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। মনের ভিতরে দৃঢ় হয় খোদাভীতি। আল্লাহ সব জায়গায় আছেন, সব কিছু দেখছেন –এই বিশ্বাস হয় মজবুত। আখেরাতের জীবনের উপর ঈমান হয় দৃঢ়। আল্লাহ ও রাসুলের আদর্শের প্রতি ভালবাসা হয় আরও গভীর। আল্লাহর বিধান পালনের কর্তব্য অনুভূতি হয় বলিষ্ঠ।

রোযা ভ্রাতৃত্ব বাড়ায়

রমযান মাস আসলে সব দেশের মুসলমানরা রোযা রাখে। এ পৃথিবীর মুসলমানরা এক আল্লাহর নির্দেশে, একই নবীর দেখানো নিয়মে রোযা রাখে। এর ফলে সব মুসলমানের মনে ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি জেগে উঠে। দুনিয়ায় আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য যে ঐক্যশক্তির প্রয়োজন তারই অনুশীলনে ব্যস্ত থাকে মুসলিম জাতি পুরো এক মাস।

অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে চলা

আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন জীবনের সকল ব্যাপারে খাপ খাইয়ে চলার মত মানসিক অবস্থা, প্রজ্ঞা ও কৌশল। রমযান মাসে মানুষেল দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন ঘটে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজকে মহৎ উদ্দেশ্যে গড়ে তোলার খাতিরে পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হয় রমযান মাসে।

মৌলিক গুণাবলীসমূহের লালন

এমনিভাবে আবার লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য যেসব ব্যবহারিক ও মৌলিক গুণাবলী একান্ত প্রয়োজন –রোযা মানুষের মধ্যে সেসব গুণাবলী বিকাশে সাহায্য করে। কর্তব্যের প্রতি অবিচলতা, ধৈর্য্য, একাগ্রতা, কষ্ট সহিষ্ণুতা, প্রদর্শনেচ্ছা পরিহার, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, এইসব মৌলিক গুণাবলী রোযার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। মোটকথা এই দুনিয়ায় নেতৃত্ব দানের জন্য মুসলমানদের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক মৌলিক গুণাবলী প্রয়োজন তারই সাধনার জন্য রোযার মত এক সুন্দর ইবাদত যেন ফরয করা হয়েছে মুসলিম জাতির জন্য। মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নিঃসন্দেহে এ এক অপূর্ব নিয়ামত।

রোযা সহানুভূতিশীল করে।

ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় যে কষ্ট তা রোযাদাররা উপলব্ধি করতে পারে। ফলে সমাজের ধনীরা দারিদ্র্যের কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে। ফলে সহানুভূতি ও সহমর্মিতার গুণাবলী বিকশিত হয় সমাজে।

রোযার অন্যান্য উপকার

এ ছাড়াও রোযা রাখলে স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও বেশ কিছু উপকার হয়। শরীরের চর্বি জাতীয় উপাদান কমে যায়। দেহের জন্য ক্ষতিকর অনেক জীবাণূ এবং রাসায়নিক পদার্থ যেমন ইউরিক এসিড প্রভৃতির পরিমাণ কমে যায়। এমনিভাবে রেযার অনেক উপকার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য এ নয়। রোযা রাখার সবচেয়ে বড় কথা হলো –আরা রোযা এজন্যই রাখি যে আল্লাহ রোযা রাখতে বলেছেন এবং আল্লাহর অনুগত গোলাম হওয়ার উদ্দেশ্যেই আমরা রোযা রাখি।

হজ্ব

‘হজ্ব’ একটি আরবী শব্দ। এর অর্থ হলো কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে বের হওয়া। ইসলামে হজ্ব বলতে আমরা বুঝি –যিলহজ্ব মাসে আরব দেশের মক্কা নগরে অবস্থিত কাবা ঘরে পৌঁছা। সেখানে যাওয়ার পর কতকগুলো আচার-অনুষ্ঠান করতে হয়। এসব কাজ কোরআন ও সুন্নাহ (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লামের দেখানো নিয়ম) অনুযায়ী করা হয়। আসলে নবী হযরত ইব্রাহীন আলাইহিস সালাম, তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) এবং পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্মরণেই এ সব আচার অনুষ্ঠান করা হয়। আল্লাহর প্রতি প্রেম, ত্যাগ ও কোরবানীর কারণে হযরত ইব্রাহীন (আ)-এর নাম আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। হজ্ব পালনের আসল উদ্দেশ্যই হলো সেই ত্যাগ ও কোরবানীর কথা স্মরণ করে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে নিজকে বিলিয়ে দেয়া।

দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, সুখ, টাকা-পয়সার প্রতি মোহ, সম্পদের প্রতি লোভ, ছেলেমেয়ের প্রতি ভালবাসা প্রভৃতি মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে রাখে। হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে এসব বিষয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর প্রতি ভালবাসার উপরে তিনি কোন কিছুকে বড় করে দেখেননি। এমনকি আল্লাহকে খুশী করার জন্য নিজের স্ত্রী-পুত্রকে নির্জন স্থানে রেখে এসেছিলেন। নিজের পুত্রকে কোরবানী দিতে চেয়েছিলেন। আল্লাহর পথে এর চেয়ে বড় ত্যাগ আর কি হতে পারে? তাই আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বের এই ঘটনা আজও আমাদেরকে সমানভাবে প্রেরণা দেয়। হজ্বের সময় হযরত ইব্রাহীন (আঃ), তাঁর স্ত্রী এবং পুত্র ইসমাঈল (আ) এর কথা স্মরণ করে হাজীরা প্রেরণা পান নিজকে আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেয়ার। হজ্বের সময় বিভিন্ন গোত্র ও বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা একত্রিত হয়। বংশ, শিক্ষা, অর্থ সব কিছুর ভেদাভেদ ভুলে আল্লাহর ডাকে জমা হন সকলে। সকলের গায়ে একই ধরনের কাপড়। সকলে একই আচার-অনুষ্ঠান করছেন। সকলেই এক আল্লাহতে খুশী করার জন্য এসেছেন। আল্লাহর সামনে সবাই সমান হয়ে যান। মুসলমানদের মধ্যে এমনিভাবে সৃষ্টি হয় ভ্রাতৃত্ব। সকলেরই মনে পড়ে যায় কেয়ামতের দিন এমনিভাবে সব মানুষকে আল্লাহর সামনে একত্রিত হতে হবে।

হজ্বের সময় একজন মুসলমান সেইসব জায়গা দেখার সৌভাগ্য পান যেখানে মহানবী (স)-এর জীবন কেটেছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই স্মরণে পড়ে অনেক ঘটনা। মনে পড়ে যায় রাসূল (স)-এর সংগ্রামী জীবন, রাসূল (স)-এর সাথীদের কথা।

হজ্ব হলো ইসলামের পাঁচটি মূলনীতির একটি। সামর্থ আছে এমন মুসলমানের জন্যে জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। সামর্থ্যবান বলতে বুঝায় –তার স্বাস্থ্য ভাল থাকতে হবে, তার পক্ষে হজ্বের জন্য পথ খরচ ও অন্যান্য খরচ করা সম্ভব হতে হবে এবং হজ্বে চলে গেলে তার পরিবারের সকলের যেন ভালভাবে দিন কাটে।

এমন এক সামর্থ্যবান মুসলমান যদি একবার হজ্ব না করেই মারা যান তবে তার বদলে অন্য কেউ হজ্ব পারন করতে পারেন। অসুস্থ লোকদের বদলে অন্য কেউ হজ্ব করতে পারে।

এখানে বলে রাকা দরকার, কাবা হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জন্মস্থান নয় এবং কেউ রাসূল (সা) কিংবা অন্য কোন ব্যক্তিকে পূজা করার জন্য সেখানে যান না। কাবা এবং অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের সাথে জড়িত ইতিহাস ও ঘটনার কারণেই এই জায়গাগুলো হাজীদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ। কাবায় পৌঁছা মানে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়া। তাঁর সামনে হাজির হওয়া। তাই হাজীরা আল্লাহর ঘর দেখার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চস্বরে বলে উঠেন ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক –হে প্রভু হাজির হয়ে গেছি’।

হজ্বের বিভিন্ন অনুষ্ঠান

হজ্ব করতে যাওয়ার সময় প্রত্যেক হাজীকে এহরাম বাঁধতে হয়। এহরাম বাঁধা অর্থ হলো হজ্ব পালনের ইচ্ছা ঘোষণা করা-নিয়ত করা। এহরামের পরই শুরু হয় হজ্ব। এহরাম বাঁধার পরপরই হাজীরা যেন নিজকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিলেন। এরপর থেকে কোন খারাপ কাজ কিংবা খারাপ চিন্তাও হাজীরা করেন না। সুন্দর ও পবিত্র ভাব সবার মনে, শান্তির ভাব সকলের হৃদয়ে।

এহরাম অবস্থায় কেউ খারাপ কথা বলেন না। এ অবস্থায় কোন ঝগড়া করা যায় না। কোন প্রাণীকে আঘাত বা হত্যা করা যায় না। এমনকি শরীরের স্বাভাবিক দাবীগুলো পূরণ থেকে বিরত থাকতে হয়।

শুধু বাইরের দিক থেকে নয় –মনের দিক থেকেও একমাত্র আল্লাহর কথাই চিন্তা এবং নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো স্মরণ করে আল্লাহর কাছে মাফ চান হাজীরা। হজ্বের অনুষ্ঠানগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে থাকেন। শুরু থেকে নিয়ে মিনায় পৌঁছে, প্রথম পাথর মারা পর্যন্ত হাজীরা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করেন তালবিয়াঃ

লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক, লা শারিকা লাকা লাব্বায়িক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান্নি’মাতা লাক ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাকা।

অর্থঃ আমি হাজির। হে প্রভু, আমি হাজির হয়ে গেছি তোমার দরবারে। তোমর কোন শরীক নেই। আমি তোমার সামনে হাজির হয়ে গেছি। সমস্ত প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই এবং সব কিছুর মালিকানা বা কর্তৃত্ব তোমারই। তোমার কোন শরীক নেই।

কাবা পৌঁছেই হাজীরা দোয়া করেন এবং কাবার চারদিকে সাতবার ঘুরে আসেন। কালো পাথর (আল আসওয়াদ) থেকে এই ঘোরা শুরু হয়। ঐতিহাসিক এই কালো পাথরে চুমু দিয়ে অথবা তা স্পর্শ করে কিংবা শুধু তার দিকে হাত তুলে এই ঘোরা শুরু হয়। এইভাবে হাজীরা শুধু আল্লাহর হুকুম পালন করেন  রাসূল (সঃ)-এর দেখানো পথে।

এরপর হাজীদেরকে কাবার পাশেই দুই পাহাড়-সাফা ও মারওয়ার মাঝে দৌড় দিতে হয় সাতবার। হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর স্ত্রী বিবি হাজরা (আ) ও পুত্র ইসমাইলকে (আ) আল্লাহর হুকুমে মক্কার ধূসর মরুভূমির বুকে রেখে গিয়েছিলেন। খাবার ফুরিয়ে গেলো। মরুভূমির খাঁ খাঁ রোদে পানির জন্য কাতরাচ্ছে শিশু। মাতা হাজরা (আ) পাগলের মত পানির সন্ধানে একবার সাফা পাহাড়ে উঠছেন আবার দৌড়ে নেমে মারওয়ায় উঠছেন –কোথাও পানি পাওয়া যায় কিনা। কোথাও পানি নেই। ফিরে এসে দেখেন পুত্র ইসমাইলের (আ) পায়ের কাছে তৈরী হয়েছে এক ফোয়ারা। এই হলো যমযম। পরে এই যমযম বালুর নীচে চাপা পড়ে যায়। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর দাদা মুত্তালিব একদিন স্বপ্নে এই যমযমের সন্ধান পান। ফলে এই যমযমের উৎস আবার খুঁজে পাওয়া যায়।

পানির জন্য হাজরার এই দৌড়াদৌড়িকে স্মরণ করে হাজীদেরকে ‘সাঈ’ করতে হয়। প্রত্যেক হাজী সাফার উপরে উঠেন। ‘তালবিয়া’ উচ্চারণ করে নামেন এবং মারওয়ায় পৌঁছেন –আবার উপরে উঠেন এবং সেই তালবিয়া উচ্চারণ করেন। এইভাবে সাতবার দৌড় দিতে হয়।

হজ্বের তাৎপর্য

এইভাবে লক্ষ্য করে দেখা যায় হজ্বের আচার-অনুষ্ঠানগুলো শুধু কতকগুলো সাধারণ অনুষ্ঠান নয়। ঈমানকে মজবুত করার জন্য, দুনিয়ার সকল কোলাহল ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্র মনে আল্লাহর সামনে হাজির হবার জন্য মনকে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহকে পাওয়ার জন্য সব ধরনের কষ্টকে স্বীকার করার মত মানসিকতা তৈরীর উদ্দেশ্যে হজ্ব এক অনুপম ‘ইবাদত’।

হজ্বের মধ্যে যেন এক হয়ে গেছে নামায, রোযা, যাকাতের শিক্ষা। আমরা দিনে পাঁচবার আল্লাহকে নামাযের মাধ্যমে স্মরণ করি। আর হজ্বের সময় সব সময় সকল মুহুর্তে আল্লাহর স্মরণেই কাটে। আমরা যাকাতের মাধ্যমে আল্লাহর পথে সম্পদের মোহ ত্যাগ স্বীকার করি। হজ্ব পালন করতে হলে তার চেয়েও বেশী আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। রোযা আমাদেরকে শিখায় দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত থেকে নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে। হজ্বের সময় এহরাম অবস্তায় তার চেয়েও বেশী কঠোর সাধনা করতে হয়। হজ্বের সকল আচার-অনুষ্ঠান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা সকলেই আল্লাহর। আমাদেরকে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে –আমাদেরকে তাঁরই আদেশ অনুযায়ী চলতে হবে।

যাকাত

দুনিয়ার মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। একেক কাজ একেক ধরনের। একেক কাজ একেক উদ্দেশ্যের। একজন মুসলমানকে দুনিয়ার সব কাজ এমনভাবে করতে হয় যেন আল্লাহ খুশী হন। টাকা-পয়সা মানুষের জীবনে খুব দরকারী জিনিস। তাই টাকা-পয়সা আয় করতে হয় সকলকেই। কিন্তু টাকা-পয়সার প্রতি লোভ থাকাটা সর্বনাশের। ধন-দৌলতের কারণে লোক গরীব, ধনী হয়। এজন্য একজন অন্য একজনের চেয়ে বড় হয়। টাকার অহংকারে এক মানুষ অন্য মানুষকে হেয় ভাবে দেখে। টাকার ফলে আরাম-আয়েশে সহজেই মেতে উঠে। তাই টাকা উপার্জন, খরচ করা এবং টাকা জমানোর ব্যাপারে প্রত্যেক লোককে সতর্ক হতে হবে। আমাদের প্রভু আল্লাহ। তিনি মানুষের এ দুর্বলতাটা ভালভাবে জানেন। তাই টাকা-পয়সা ও ধন-দৌলতের ব্যাপারেও তিনি পথনির্দেশ দিয়েছেন। কিভাবে টাকা উপার্জন করতে হবে, কিভাবে খরচ করতে হবে, এসব তিনি জানিয়ে দিয়েছেন মানুষকে।

যাকাত একটি ইবাদত

আল্লাহর নির্দেশ মত কাজ করাকে ইবাদত বলে। আল্লাহর নির্দেশ মত টাকা উপার্জন করা এবং খরচ করাও তাই ইবাদত। যাদের টাকা-পয়সা আছে তাদের জন্য এমনি একটি ইবাদত যাকাত।

প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানকে তার সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট হারে কিছু অর্থ গরীবদের মধ্যে বিলি করতে হয়, একে ‘যাকাত’ বলে। মোটকথা ধনী মুসলমানদের সম্পদের কিছু অংশ তাদের গরীব ভাইদেরকে দিতে হয়। তাই অনেকে ভুল করে যাকাতকে মনে করে ‘দান’ অথবা ট্যাক্স। আসলে যাকাত দান কিংবা ট্যাক্সের মত কোন জিনিস নয়। এটা এমন একটি দায়িত্ব যা আল্লাহ পালন করতে বলেছেন। যাকাত একটি ইবাদত।

যাকাত কথাটি আরবী। এ শব্দের অর্থ হলো পবিত্রতা। যাকাত টাকা-পয়সার প্রতি লোভ-লালসা থেকে মনকে পবিত্র রাখে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব সুন্দর বলেছেনঃ

তোমাদের বাকী ধন-দৌলতকে পবিত্র করার জন্যই আল্লাহ যাকাতন ফরয করেছেন। (আবু দাউদ, যাকাত অধ্যায়)

যাকাতের এই অর্থ আমাদেরকে একথাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, টাকা-পয়সা উপার্জন করতে হলে তা পবিত্র উপায়েই করতে হবে।

যাকাত সমাজকেও পবিত্র করে। সমানে অর্থনৈতিক সমস্যার সুন্দর সমাধান দিয়েছে যাকাত। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ঈমানের পবিত্রতার পর আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে ভাল কাজ হলো দয়া, ক্ষমা, অন্যের জন্য ভাল কাজ করা।

যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, যারা রাগকে দমন করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হয়, যারা ভাল কাজ করে আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।

সূরা আল ইমরান-১৩৪

যাকাতের গুরুত্ব

আল্লাহ এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। এই পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তো তাঁরই। মানুষ শুধু তাঁর খলিফা। তাই মুসলমানরা টাকা উপার্জন করে, খরচ করে, দান করে সব আল্লাহকে খুশী করার জন্য। টাকা উপার্জন করা বা জমানোই আসল কাজ নয়। টাকা-পয়সা অপ্রয়োজনীয় ও খারাপ কাজে ব্যয় করা বা অন্য লোকের উপর নিজেকে বড় প্রমাণ করার জন্য খাটানো কিংবা জুলুম নির্যাতন এবং শোষনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নয়। একটা পবিত্র জীবন যাপনের জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। তাই অর্থকে পবিত্র পথে খরচ করা দরকার। টাকা পয়সা কখনও সমাজে অভিশাপ হয়ে থাকে। যখন কিছু লোক অন্যায়ভাবে টাকা জমাবার সুযোগ পায়, যখন কিছু সংখ্যক লোকের হাতে সমাজের সব টাকা জমায় হয় এবং সেই হাতেগোনা কয়েকজন লোক নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য অন্যের উপর নিজের মাতব্বরী খাটায় এবং অন্যান্য নোংরা কাজে সে টাকা খরচ করে, তখনই সমাজে দেখা দেয় বিপর্যয়।

একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। রক্ত আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু দরকার হলো সে রক্ত আমাদের শরীরের সব শিরা-উপশিরায় দৌড়াদৌড়ি করবে। কোথাও জমা হয়ে গেলে আমাদের শরীর হবে অসুস্থ। তেমনি একটি সমাজে টাকা-পয়সাকে হতে হবে সচল। তাই এমন একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে, যার ফলে টাকা কোথাও কারও হাতে অন্যায়ভাবে জমা থাকনে না পারে। যাকাতের মাধ্যমে ধনী লোকদের কিছু সম্পদ গরীবদের হাতে পৌঁছে যায়। এভাবে ‘অর্থ’ সমাজে সচল অবস্থায় থাকে।

ইসলাম একটি সুন্দর সমাজ গড়তে চায়। টাকা-পয়সা, মাল-সম্পদের ব্যাপারটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ইসলাম এ বিষয়ের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্য যাকাতকে ইসলামের একটি স্তম্ভ বলা হয়েছে। নামায, রোযা, হজ্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, যাকাতও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।

যাকাত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

নামায, রোযার মত যাকাতের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর কাছে নিজেকে নত করে দেয়া, আল্লাহ যা দিয়েছেন তার শুকরিয়া আদায় করা এবং আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। মোটকথা, দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে আল্লাহকে খুশী করা। তাই যাকাত দেয়া আল্লাহর একটি হুকুম পালন করা।

আল্লাহকে খুশী করার জন্য যাকাত দেয়া হয়। কারো এটা মনে করা উচিত নয় যে, অনুগ্রহ দেখিয়ে একজনকে যাকাত দেয়া হচ্ছে। আসলে যে যাকাত নেয়, তার এটা পাওয়ার অধিকার আছে এবং যে দেয় তার এটা কর্তব্য। তাই অন্যান্য এবাদতের মত যাকাত দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে যিনি দিচ্ছেন তার এবং যিনি নিচ্ছেন তার-দুজনেরই মনের উদ্দেশ্য বা নিয়ত পবিত্র হওয়া উচিত। যাকাত দিতে পারা তাই কোন অহংকারের বিষয় নয়, এটা নামাযের মত পবিত্র একটা ইবাদত। যাকাত দেয়ার পর তাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা দরকার। আল্লাহর দরবারে নিজের অন্যান্য গোনাহর জন্য মাফ চাওয়া দরকার।

যাকাতের উপকারিতা

নৈতিক দিক থেকে যাকাতের উপকার হলো-যাকাত যে দেয় তার মন থেকে অর্থের প্রতি লোভ এবং স্বার্থপরতা দূর হয়ে যায়। আবার যাকাত নেওয়ার ফলে ধনীদের প্রতি হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা থাকে না।

একটি সমাজে যাকাতের উপকারতা অনেক। যে সমাজে যাকাতের ব্যবস্থা থাকে, সে সমাজে ধনীরা গরীবদের প্রতি হয় দয়াশীল ও সহানুভূতিশীল। আর গরীবদের মন থেকে সব কালিমা মুছে যায়। যে ভাই তার চেয়ে ভাল অবস্থায় আছে তার প্রতি তার ভাল ধারণা হয়।

যে সমাজে যাকাত ব্যবস্থা চালু আছে সে সমাজে ধনীদের মধ্যে টাকা জমানোর ইচ্ছা লোপ পায় এবং টাকা জমানোর সুযোগও কম থাকে। ফলে টাকা-পসাকে হাতিয়ার করে যে জুলুম, শোষণ, হিংসা-বিদ্বেষ তা অচিরেই দূর হয়ে যায়।

যাকাত এমন একটি সমাজ সৃষ্টি করে যে সমাজে ভালবাসা থাকে, থাকে সম্মান, ভ্রাতৃত্ব, মমতা, সহানুভূতি। সে সমাজের একজন অন্য জনের কল্যাণের চিন্তা করে। আর তাই একটি ইসলামী সমাজে ধনী মুসলমানদের কাজ থেকে যাকাত আদয় করে নিয়ে সমাজের কল্যাণের জন্য তা ব্যয় করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) তাই যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আসলে যাকাত এমনভাবে দেয়া দরকার যাতে সব মিলিয়ে সমাজের উপকার হয়। সমাজ থেকে দূর হয়ে যায় দারিদ্রতার অভিশাপ।

কোন কোন সম্পদের যাকাত দিতে হয়

নগদ টাকা ও অলংকার, গবাদী পশু এবং ক্ষেতের ফসলের জন্য যাকাত দিতে হয়। গবাদী পশু ও ক্ষেততের ফসলের জন্য যাকাতের হিসাবটা বেশ জটিল।

নগদ টাকার ব্যাপারে হিসাব হলো কমপক্ষে শতকরা আড়াই ভাগ। বছরের শেষে সব খরচের পর যার কাছে কমপক্ষে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমান টাকা থাকে, তাকে যাকাত দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি হলো সর্বনিম্নহার।

যারা যাকাত নিতে পারে

কোরআনে বলা হয়েছে-

এই সাদাকাসমূহ (যাকাত) তো কেবল তাদের জন্য যারা নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, যারা তা সংগ্রহ করে (কর্মচারী), যাদের মনকে আকর্ষণ করা হলো (নও-মুসলিম) ঋণ গ্রস্তদের ঋণ মুক্ত করার জন্য, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সবকিচু জানেন এবং তিনি মহাজ্ঞানী

সূরা তওবা-৬০

তাহলে দেখা যায় ধনী লোকদের জমানো টাকা থেকে যাকাত পায়ঃ

  • গরীব
  • মিসকিন
  • নও-মুসলিমঃ যারা অন্য ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়েছে
  • দাস-দাসীঃ দাস-দাসীদের মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হয়
  • যারা যাকাত সংগ্রক করেঃ সরকারীভাবে যাকাত সংগ্রহের জন্য যেসব কর্মচারী কাজ করে
  • মুসাফির
  • যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে