মুসলিম মনীষীদের ছেলেবেলা

চলমান পেজের সূচীপত্র

মস্ত বড় জ্ঞানী

সোভিয়েট রাশিয়া। বর্তমান বিশ্বের এক নাম করা দেশ। সেই দেশের একটি মুসলিম প্রদেশ উজবেকিস্তান।

অনেক অনেকদিন আগে উজবেকিস্তানকে বুখারা বলা হতো। বুখারা দেশটি ভারি সুন্দর। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘরবাড়ী। খালি গায়ে লোকেরা চলাফেরা করতে পারে না। কারণ বার মাসেই সেখানে শীত থাকে। বুখারার পাশেই ইরান দেশ। সেই ইরান দেশের এক লোক, নাম তাঁর মুগীরা। তিনি ইরান ছেড়ে এসে বুখারা শহরে বসবাস করছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ আগুনের পুজো করতো। এক আল্লাহর প্রতি তাঁদের বিশ্বাস ছিলো না। মুসলমানরা এক আল্লাহর ইবাদত করে। আগুন পানি বাতাসসহ দুনিয়ার সকল কিছুই তো এক আল্লাহর সৃষ্টি! মুগীরা তার পূর্বপুরুষদের মতো অগ্নি পুজো করতো। কিন্তু তিনি অগ্নি পুজো করলে কি হবে, এতে তাঁর বিশ্বাস ছিলো না। তিনি সৃষ্টিকর্তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতে তিনি মুসলমানদের ধর্মকে ঠিক মনে করলেন। সেই সময় বুখারার গভর্ণর ছিলেন মুসলমান। খুব ভালো লোক ছিলেন তিনি। ব্যবহার ছিলো তাঁর সুন্দর। মুগীরা গভর্ণরের কাছে গেলেন। গভর্ণরের ব্যবহারে তিনি উৎসাহ পেয়ে বললেনঃ জনাব, আমি মুসলমান হবো। গভর্ণর এতে খুব খুশী হলেন। তাঁকে পাক পবিত্র করে ‘কালেমা’ পাঠ করালেন। গভর্ণরের নাম ছিলো য়ামানুল জুফী। এভাবে কাটলো অনেক দিন। তারপর একদিন মুগীরা স্ত্রীর কোল জুড়ে আসলো একটি ফুটফুটে ছেলে। ছেলেটি খুবই সুন্দর। মাতাপিতা আদর করে নাম রাখলেন ইবরাহীম। খাঁটি মুসলমান রূপে বড় হয়ে উঠলেন তিনি। সৎভাবে ব্যবসা করতেন। লোকদেরকে ঠকাতেন না। খারাপ বা ভেজাল মাল বিক্রয় করতেন না। সৎভাবে ব্যবসা করে অনেক টাকা হলো তাঁর। এই ইবরাহীমের পুত্র ইসমাঈল নিজের সাধনায় জ্ঞানের শিখড়ে আরোহন করলেন, হলেন বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ও একজন সৎ ব্যবসায়ী।

১৯৪ হিজরী সাল। ইসমাঈলের এক ছেলে জন্ম নিলো। নাম মুহাম্মদ। সুন্দর ফুটফুটে চাঁদের মতো তাঁর মুখ। এই ছেলেটিই বড়ো হয়ে মুসলিম জাহানে ইমাম বুখারী (রঃ) হিসেবে পরিচিত হন।

তাঁর জ্ঞান গুণ ছিলো অসাধারণ। হাদীস সংকলক হিসেবে তাঁর নাম দুনিয়াজোড়া। তিনি প্রায় ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেন। ছয় লক্ষ হাদীসের মধ্যে দু’লক্ষ হাদীস ছিলো তাঁর মুখস্ত। এমন ছেলের সুনাম কে না করে বলো।

বুখারী (রঃ) যখন হাদীস সংগ্রহ করছিলেন সেই সময় আরও কয়েকজন মনীষী এ কাজে আত্মনিয়োগ করেন। হাদীস-শাস্ত্রের কথা বলতে গেলে তাঁদের কথাও বলতে হয়। তাঁরা হলেন ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে মাজা, ইমাম তিরমিযি (রঃ)। হাদীস সংগ্রহকারীদের মধ্যে ইমাম বুখারী (রঃ) এবং এঁর পর পাঁচ জন হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ। ইমাম বুখারী (রঃ) ও এই পাঁচজন মুহাদ্দিসের পর সংকলিত হাদীস গ্রন্থ ‘সিহাহ সিত্তা’ নামে পরিচিত।

ইমাম বুখারী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থখানি সকলের কাছে সহীহ বুখারী নামে পরিচিত। এ গ্রন্থ সংকলন করার সময় তিনি যে নিয়ম পালন করেন তা শুনতেও অবাক লাগে। এ সম্পর্কে বুখারী (রঃ) নিজেই বলেনঃ এক একটি হাদীস লেখার আগে আমি দু’রাকাত নফল নামায পড়ে মুনাজাত করেছিঃ হে আল্লাহ আমি অজ্ঞ। আমার হৃদয়ে জ্ঞানের আলো জ্বেলে দাও। হাদীস লেখায় আমি যেনো ভুল না করি।

এভাবে মুনাজাত করে তিনি মদীনায় অবস্থান কালে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর কবরের পাশে বসে এক একটি হাদীস লিখতেন এবং লেখার পূর্বে গোসল করে নামায আদায় করতেন।

ইমাম বুখারী (রঃ) তখন খুব ছোট। তাঁর আব্বা মারা গেলেন। মা তাঁকে আদর দিয়ে লালন পালন করতে লাগলেন। দৈবক্রমে তাঁর চোখের জ্যোতি কমে যাচ্ছিলো। তা দেখে মায়ের দুঃখের অন্ত ছিলো না। মা ভাবে, হায়! সারাটা জীবন ছেলেটির কতই না কষ্ট হবে! অনেক বড়ো বড়ো হেকিম দেখানো হলো। কিন্তু কোন হেকিম তাঁকে ভালো করতে পারলেন না।

মা ছিলেন পরহেজগার মহিলা। নামায পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলেন। আর ধৈর্য ধরে দোয়া করতে লাগলেনঃ আল্লাহ যেনো ছেলেকে ভালো করে দেয়। আল্লাহ, বড়ো দয়ালু। দুঃখিনী মায়ের দোয়া কবুল করলেন। এভাবে তাঁর মা একদিন ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাঁকে বললেনঃ হে পরহেজগার মহিলা, আপনার দুঃখ দূর হলো। আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করে তাঁর চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ভোরে ঘুম ভাঙার পর তিনি দেখলেন বুখারী (রঃ)-এর চোখের সমস্ত অন্ধত্ব দূর হয়ে গেছে। তিনি আল্লাহর শোকার আদায় করলেন।

দশ বছর তাঁর বয়স। বুখারী (রঃ) নিকটস্থ মক্তবে লেখাপড়া করতেন। সেই সময় হতে তিনি আলিমদের মুখে যে সব হাদীস শুনতেন সেসব মুখস্থ করে ফেলতেন।

তখনকার সময়ে শিক্ষার বিষয় ছিলো কুরআন ও হাদীস। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স) যেভাবে যা বলছেন, তা হুবহু গ্রহণ করতে হবে। এটাই নিয়ম। কিন্তু তখন কোনো বই ছিলো না। কারণ বর্তমানের মতো কাগজ তখন ছিলো না। হাড়, চামড়া ও পাথরের উপর লিখে রাখতে হতো। তখন হাদীস বা নবী (সঃ)-র বাণী লিখে রাখা সম্ভব হতো না। যাঁরা শুনতেন তাঁরা মনে রাখতেন। এঁদেরকে সাহাবী বলা হয়। নবী (সঃ) ইনতিকালের পর ধীরে ধীরে সাহাবীরা বয়োবৃদ্ধ হলেন। আবার অনেকে শহীদ হলেন। মুসলমানরা তখন কুরআন ও হাদীসকে চিরকালের জন্য হিফাজত করতে চাইলেন, এ প্রয়োজনে কুরআন হাদীস সংগ্রহ শুরু হয়। কুরআন নির্ভুলভাবে সংগৃহীত হলো। কারণ অনেক সাহাবী কুরআনে হাফিজ ছিলেন। কিন্তু হাদীস সংগ্রহের বেলায় সমস্যা দেখা দিলো। নবী (স) কোন সময় কার কাছে কি বলেছেন তা একত্রে জড়ো করা এবং নির্ভুলভাবে সেগুলো হুবহু বর্ণনা করা সহজ ছিলো না।

জ্ঞানী লোকেরা হাদীস পড়াশোনা করতো। তাঁরা শুধুমাত্র লোকদের মুখে হাদীস শুনতেন না, লোকটি কেমন করে খোঁজও নিতেন। বুখারী (রঃ) সে জ্ঞানীদের মধ্যে নাম করা একজন ছিলেন। হাদীস পড়াশোনায় তাঁর জ্ঞান ছিলো অগাধ। কিছু দিনের মধ্যে বুখারী (রঃ) মক্তবের পড়া শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

অল্প সময়ের মধ্যেই এই বালকের সে সাধ পুরো হতে চললো। আল্লামা দাখেলী তখন বুখারার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। মায়ের অনুমতি নিয়ে বুখারী (রঃ) আল্লামা দাখেলীর খিদমতে শাগরিদ হওয়ার জন্য আরজি পেশ করলেন। আল্লামা দাখেলী এ জ্ঞানী বালককে আনন্দের সাথে শাগরিদভুক্ত করে নিলেণ। এর মধ্যে একদিন একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেলো। ক্লাশে পড়াবার সময় আল্লামা দাখেলী একটি হাদীসের সনদে ভুল করে বসলেন। বুখারী (রঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, “জনাব, ওখানে আপনার ভুল হয়েছে”। কথা শুনে শিক্ষকের রাগ হচ্ছিল। পরে হাদীস গ্রন্থ বের করে দেখলেন বুখারী (রঃ) ঠিকই বলেছেন। আসলে তিনিই ভুল বলেছেন। এতে দাখেলী খুশী হলেন। বালক বুখারী (রঃ)-এর মেধাশক্তির প্রশংসা করে তাঁর ভবিষ্যত সম্বন্ধে খোশখবরী দিলেন। মক্কা, মদীনাসহ মুসলিম দুনিয়ার বড়ো বড়ো শহর ঘুরে এসে বুখারী (রঃ) ষোল বছর বয়সেই হাদীসের সকল কেতাব মুখস্ত করে ফেললেণ।

একদিনের একটি সুন্দর ঘটনা। বালক বুখারী (রঃ)-র সহপাঠী হামিদন বিন ইসমাইল বললেনঃ বুখারী, তুমি কাগজ কলম নিয়ে ক্লাসে আসো না। উস্তাদের শিক্ষণীয় বিষয় কি করে তুমি মনে রাখবে? তখন বুখারী (রঃ) উত্তর দিলেনঃ তবে শোনো বন্ধুগণ,  তোমাদের লেখার সাথে আমার স্মরণ শক্তির প্রতিযোগিতা হোক। বন্ধুরা বুখারী (রঃ)-র কথায় রাজী হলো। বন্ধুরা তাদের বহু দিনের লেখা পনের হাজার হাদীসের খাতা সামনে রাখলো। বালক বুখারী (রঃ) এক এক করে পনেরা হাজার হাদীস অনর্গল মুখস্থ বলে দিলেন। এ স্মরণ শক্তি দেখে বন্ধুরা আশ্চর্য হলো! বুখারী (রঃ)-র ব্যক্তিত্বের নিকট বন্ধুদের মস্তক ভক্তিতে নত হয়ে পড়লো।

বালক বুখারী (রঃ) অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন মানব দরদী। মানুষকে তিনি মনে প্রাণে ভালোবাসতেন। তাদের সুখ-দুঃখে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হতো। মানুষের কল্যাণ সাধনে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তাঁর জন্য নিজকে অশেষ কষ্ট স্বীকার করতে হলেও তিনি কিছুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করতেন না।

শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন আল্লাহ ভক্ত এক মহান বালক। আল্লাহর ধ্যান ছিলো তাঁর জীবনের পরম সাধনা।

বুখারী (রঃ) চিরকালের এক বিরল প্রতিভা। যুগে যুগে তাঁর মতো এমন প্রতিভাবান ব্যক্তি খুব কমই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। বেঁচে থাকবেন মস্ত বড়ো জ্ঞানী হিসেবে।

বুখারী (রঃ)-র আব্বা অনেক অনেক ধনসম্পদ রেখে ইনতিকাল করেছিরেন। তিনি এসব ধনসম্পদ ব্যবসায়ে লাগাতেন। কিন্তু জ্ঞান সাধনায় ডুবে থাকতেন বলে তিনি বিভিন্ন লোকদের মারফতে ব্যবসা চালাতেন। তবে তিনি কর্মচারীদের কাজকর্মের দিকে খুব খেয়াল রাখতেন। তাঁর দ্বারা যেনো কোনো লোক না ঠকে সেদিকেও নজর রাখতেন। বেশী দাবমের জিনিসের সাথে কম দামের জিনিস মিশিয়ে বেশী দামে বিক্রি করা বা খারাপ জিনিসকে ভালো বলে চালানো এসব কাজ যাতে কর্মচারীরা না করতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতেন তিনি।

বুখারী (রঃ)-র মন ছিলো খুবই উদার। কোন লোক তাঁর ক্ষতি করলেও তার বদলা তিনি নিতে চাইতেন না।

একদিন তাঁর ব্যবসায়ের এক অংশীদার তাঁর পঁচিশ হাজার দেরহাম নিয়ে পালিয়ে গেলো। লোকটি কোন জায়গায় লুকিয়ে আছে ইমাম বুখারী (রঃ)-কে তা জানানো হলো এবং লোকটিকে পাকড়াও করার জন্য বলা হলো। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ) এতে রাজি হলেন না। এজন্য সেখানকার গভর্ণরকে অনুরোধ জানাতে হবে। হয়তো তাঁর কাজ হাসিল হবে। কিন্তু গভর্ণর এই উপকারের বদলায় তাঁর দ্বারা কোন অন্যায় কাজও করিয়ে নেবার সুযোগ খুঁজতে পারেন। বুখারী (রঃ)-র বন্ধুরা তাঁর অগোচরেই পলাতক লোকটিকে ধরার ব্যবস্থা করলেন। একথা জানতে পেরে বুখারী (রঃ) খুব রেগে গেলেন। তিনি দেরী না করে বন্ধুদেরকে জানিয়ে দিলেন তারা যেনো লোকটির সাথে কোনরূপ খারাপ ব্যবহার না করে।

ঘটনাক্রমে সেখানকার গভর্ণর ঘটনাটি জানতে পারলেন। গভর্ণর লোকটিকে ধরে আটকিয়ে রাখলেন আর পঁচিশ হাজার দেরহাম জরিমান করলেন। ইমাম বুখারী (রঃ) খবর পেয়ে দুঃখিত হলেন। তিনি লোকটিকে বাঁচানোর কথা ভাবলেন। গভর্ণরের কাছে গিয়ে একটি শর্তে তিনি তা মীমাংসা করলেন। লোকটির জরিমানা পঁচিশ হাজার দেরহামের বছর বছর মাত্র দশ দেরহাম করে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু দুষ্ট লোকটি বুখারী (রঃ)-র একটি দেরহামও আর ফেরত দিলো না। এভাবে বুখারী (রঃ) নিজের ক্ষতি করেও পরের উপকার করতেন।

বুখারী (রঃ) ব্যবসা করে যে টাকা আয় করতেন তা শুধু নিজের কাজে খরচ করতেন না বরং আয়ের বেশীর ভাগ টাকা তিনি গরীব, ফকির ও দুঃখীদের মধ্যে দান করে দিতেন। সাধারণ খাওয়া-দাওয়া করে বুখারী (রঃ) খুশী থাকতেন। কোন রকম বিলাসিতা করা তিনি পছন্দ করতেন না। বুখারী (রঃ) আমাদেরপ্রিয় নবী (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদের মত পাক পবিত্র জীবন যাপন করতে ভালোবাসতেন।

আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) মানুষকে বলেছেন চাকরবাকরদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে। বুখারী (রঃ)-র বাড়ীতেও চাকরবাকর ছিলো। একদিন বুখারী (রঃ) ঘরে বসে আছেন। তাঁর পাশেই ছিলো একটি কালির দোয়াত। ঘরের এক দাসী তাঁর কাছে দিয়ে যাচ্ছিল, অসাবধানে চলাতে তার পা লেগে কালির দোয়াত উল্টে পড়ে গেলো। পড়া মাত্রই কালি চারদিকে ছিটিয়ে পড়লো। এতে কার না রাগ হয়। কিন্তু বুখারী (রঃ) রাগ সংযত করে বললেনঃ তুমি ঠিকমত হাঁটতে পারো না? দাসী বেআদবের মত জবাব দিলোঃ পথ না থাকলে আমি কি করে চলবো?

অন্য কেউ হলে হয়ত রাগে দাসীকে মারধর করতো। কিন্তু বুখারী (রঃ) তাতেও রাগ না করে দাসীকে বললেনঃ যাও, তোমাকে আযাদ করে দিলাম। অথচ তাঁর দাসীকে তিনি মারধর করলেও কেউ কিছু বতে পারতো না। বুখারী (রঃ) দাসীর সাথে এত সুন্দর ব্যবহার করতে দেখে তাঁর পাশে বসা এক ভদ্রলোক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ দাসী অন্যায় করলো, তাকে শাস্তি না দিয়ে আপনি তাকে মুক্তি দিলেন, এটা  কি রকম ব্যাপার? বুখারী (রঃ) জবাব দিলেনঃ আমি আমার মনকে এ ব্যাপারে রাজী করালাম।

কারো আড়ালে কারো দোষের কথা বলার নাম গীবত। গীবত করা ইসলামে নিষেধ। একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে বুখারী (রঃ) কখনো কারো গীবত করতেন না। এরূপ সামান্য অন্যায় হলেও তিনি অনুতপ্ত হতেন।

একদিন এক অন্ধ লোকের কাছে তিনি মাফ চাইলেন। অন্ধ লোকটি কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে জানতে চাইলো ব্যাপারটি কি! তখন বুখারী (রঃ) বললেনঃ একদিন আপনি খুব খুশী মনে হাত ও মাথা দুলিয়ে কথা বলছিলেন। আপনার হাত ও মাথা নাড়ার ভংগ দেখে আমার খুব হাসি পাচ্ছিলো। এজন্যই আমি অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে মাফ চাচ্ছি। অন্ধ লোকটি খুশি হয়ে বললোঃ না এ তেমন কিছু নয়। আমি মাফ করে দিলাম।

নিজের কাজ নিজে করলে সম্মান কমে না। বুখারী (রঃ) নিজের কাজ নিজেই করতেন। সে সব কাজ নিজের পক্ষে করা সম্ভব তা করতে অন্য কারো সাহায্য নিতে চাইতেন না।

সারা বিশ্বের মধ্যে যে ক’জন জ্ঞানী-গুণী লোক কাজ কর্মে খাঁটি মানুষ হিসেবে পরিচিত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে  বুখারী (রঃ) ছিলেন অন্যতম। প্রিয় নবী (সঃ)-র কথাগুলো তিনি যেমন মুখস্থ রাখতেন তেমনি সেই কথামত চলতেন। ইসলামের নিয়ম-নীতির বাইরে তিনি কিছুই করতেন না। কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান সাধনার জন্যই তিনি জীবনে মস্ত বড়ো জ্ঞানীর সম্মান লাভ করেছেন। মুসলিম জাহানে তিনি বেঁচে থাকবেন মস্ত বড়ো জ্ঞানী হিসেবে। ২৫৬ হিজরী ঈদুল ফিতরের দিন তিনি ইনতিকাল করেন। ঈদের দিন যোহরের সময় সমরকন্দের খরতংগ গ্রামে তাঁকে দাফন করা হয়। দুনিয়ার বুকে প্রায় বাষট্টি বছর বেঁচে ছিলেন এই জ্ঞানবীর। কোটি কোটি মানুষ এই মহাজ্ঞানীর জন্য চোখের পানি ফেলে। পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ এই জ্ঞানীর নাম ইমাম বুখারী (রঃ)। যার লেখা বোখারী শরীফ আজ পৃথিবী বিখ্যাত।

জ্ঞানের যুবরাজ

“দেহ ভাগ হলেও আত্মার যেমন ভাগ হয় না, তেমনি দেহের ধ্বংসের সাথে সাথে আত্মা ধ্বংস হয় না –আত্মা অক্ষয়, তার ধ্বংস নেই। জন্ম-মৃত্যু ও সুখ-দুঃখের উপর মানুষের কোন হাত নেই। মানুষ তার ভাগ্যের অধীন। আর সে ভাগ্যকে পরিচালনা করেন এক আল্লাহ”।

আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগেকার কথা। এ মহাসত্যের উপর গবেষণা করেছেন এক মুসলিম মনীষী। তিনি একাধারে দর্শন, গণিত, জ্যামিতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান সাধনা করে মুসলিম জাতির অনেক উপকার করেছেন। এতো গুণের সমাহার একজন মানুষের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।

শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন নামকরা একজন চিকিৎসক। জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসায় তাঁর কৃতিত্ব সত্যিই অবাক হবার মতো! চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর লেখা ‘আলকানুন’ একটি অমূল্য কিতাব। এতে সাত শত ষাটটি ঔষধের বিবরণ রয়েছে; আলোচনা করা হয়েছে অনেক অনেক কঠিন রোগের কারণ ও চিকিৎসার নিয়ম কানুন। তখনকার সময়ে এমনটি আর কেউ করতে পারেন নি যার জন্য ইউরোপের চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে এই কিতাবটি পাঠ্য ছিলো। সকল ভাষার লোকেরা যাতে কিতাবটি পড়তে পারে, সেজন্য ইংরেজী, ফরাসী, ল্যাটিন, হিব্রুসহ নানা ভাষায় কিতাবটি অনুবাদ করা হয়।

তখনকার দিনে মুসলমানরাই ছিলো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি। রাজ্য জয় বা শারীরিক শক্তি খাটিয়ে তারা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেন নি। শিক্ষা, সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্যই ছিলেন শ্রেষ্ঠ।

বর্তমানের জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীরা মুসলমান জ্ঞানী বিজ্ঞানীদের লিখে যাওয়া গ্রন্থরাজির উপর গবেষণা করে নিজেদেরকে বড়ো করতে পেরেছে। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রাথমিক শিক্ষা তারা মুসলমানদের নিকট থেকেই লাভ করেছিলো।

সেই সময়ে মুসলমানদের মধ্যে বহু মনীষী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ রসায়নবিজ্ঞানী, কেউ পদার্থবিজ্ঞানী, কেউ চিকিৎসা বিজ্ঞানী, কেউ দার্শনিক, কেউ বা ঐতিহাসিক। এমনি আরো কত কি হয়েছেন তাঁরা। ইবনে সীনা, ইবনে খালদুন, ইবনে রুশদ, আলগাযযালী (রঃ), আল রাযী –এঁদের নাম দুনিয়ার সবাই জানে। সবাই চেনে। সুনাম করে।

ইবনে সীনা মুসলিম মনীষীদের মধ্যে নামকরা একজন বিজ্ঞানী। তিনি সে যুগের একজন শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ছিলেন। তা ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লেখক ও বিজ্ঞ চিকিৎসক।

৯৮০ সালের এক শুভ দিনে মুসলিম জাহানের অন্যতম মনীষী ইবনে সীনা জন্মগ্রহণ করেন। মাতাপিতা পুত্রের নাম রাখেন আবু আলী হোসেন ইবনে সীনা। পরে তিনি শুধু ইবনে সীনা নামেই সুপরিচিত হয়ে উঠেছিরেন। ইবনে সীনাযে গ্রামে জন্ম্রগহণ করেন তার নাম ‘আফসালা’। তূর্কীস্তানের নাম করা শহর বুখারা। সেই শহরের নিকটে সেই ছোট গ্রাম আফসালা। তাঁর বাবার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম সেতারা বিবি। বাবা বুখারার শাসনকর্তার দেওয়ানের কাজ করতেন।

ইবনে সীনার ছেলেবেলা বুখারা শহরেই কাটে। পাহাড় ঘেরা বুখারার মনোরম পরিবেশ বালক ইবনে সীনা ধীরে ধীরে লালিত পালিত হতে থাকেন। বাবা ছিলেন গরীব। কিন্তু তাঁর বিদ্যাবুদ্ধি ছিলো অনেক। জ্ঞান সাধনাতে অনেক আগ্রহ ছিলো তাঁর। সব সময় তাঁর ঘরে জ্ঞানের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। বুযর্গ আলিম ও বড়ো বড়ো পণ্ডিত লোক কুরআন হাদীস নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁর কাছে আসতেন। ধর্মের নানা বিষয় তাঁরা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন বালক ইবনে সীনা তাঁর বাবার পাশে বসে গভীর আগ্রহ সকারে তা শুনতেন। দেখতে দেখতে বাবার পাশে থেকে অল্প বয়সেই দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতির উপর তিনি অনেক জ্ঞান লাভ করলেন। পিতা আবদুল্লাহ, খুব যত্ন ও আদরের সাথে ইবনে সীনাকে লালন পালন করতে লাগলেন। তিনি ইবনে সীনার মধ্যেমেধা আর প্রতিভার বীজ লুকিয়ে রয়েছে বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পুত্রের প্রতিভা বিকাশের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান হলেন। তাঁর জন্য উত্তম শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তাঁর গুণাবলী যাতে বিকশিত হতে পারে সেজন্য তিনি শিক্ষাক রেখে তাঁকে তালিম দিতে লাগলেন।

বয়স তাঁর পাঁচ বছর। গৃহ শিক্ষকের নিকট ইবনে সীনার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। শৈশব কাল থেকেই লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন খুবই মনোযোগী। কিছু দিনের মধ্যে তিনি অনেক কিছু শিখে ফেললেন। গৃহ শিক্ষক তাঁর অসামান্য প্রতিভার প্রশংসা করলেন।

দশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার আগেই তিনি হলেন কুরআন হাফিজ। পুরো কুরআন শরীফ মুখস্থ করা ছাড়াও কুরআনের অর্থ কি ও কেন এবং কোথায়,  তা জানার চেষ্টা করতেন তিনি। তাঁর চিন্তা শক্তি ছিলো অত্যন্ত তীক্ষ্ম। যখণ যে বিষয়ে পড়াশোনা করতেন তা শেষ না করে অবসর নিতেন না। অতি অল্প বয়সেই নাম করা জ্ঞান হিসেবে তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। তাঁর প্রতিভার কথা জানতে পেরে লোকেরা তাঁকে হাফিজ উপাধি দিলো। হাফিজ অর্থ জ্ঞানী।

আল নাতিলি তখনকার নাম করা শিক্ষক। বালক ইবনে সীনা তাঁর কাছে লেখাপড়া শিখতেন। শিক্ষক বলতেনঃ ইবনে সীনার শিক্ষকতা করতে গিয়ে আমি যে আনন্দ পেলাম তা আর কোথাও পাইনি। নাতিলি ইবনে সীনার আব্বা হুযুরকে ডেকে বললেনঃ দেখবেন আপনার ছেলে একদিন দুনিয়ার একজন সেরা জ্ঞানী হবে। ওর লেখা পড়ায় যেনো কোন অবহেলা না করা হয়।

ইবনে সীনার শৈশব জীবন খুবই সুন্দর ছিলো। জীবনের সব কিছুকেই তিনি সহজভাবে গ্রহণ করছিলেন। যা পেতেন তাতেই তিনি সন্তুষ্ট  থাকতেন। অসম্ভব কিছু  পাওয়ার প্রতি তাঁর লোভ ছিলো না। জাঁকজমক বা আড়ম্বরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিলো না। তিনি ছিলেন মানবদরদী। মানুষকে তিনি নিজের প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবাসতেন। মানুষের দুঃখে তাঁর হৃদয় হতো ব্যথিত।

শুধুতাই নয়, তিনি ছিলেন আল্লাহভক্ত। আল্লাহর ধ্যান ছিলো তাঁর জীবনের পরম সাধনা। তাই  তো আল্লাহ তাঁকে অ-সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী করেছেন।

বালক ইবনে সীনা শিক্ষকদের কাছে নানা রকম প্রশ্ন করতেন। উত্তরও পেতেন। কিন্তু শিক্ষকের উত্তরে তিনি সুষ্ট হতে পারতেন না। নতুন নতুন জিজ্ঞাসায় তাঁর আগ্রহ আরো বেড়ে যেতো। নামায পড়ে তিনি আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে বলতেনঃ হে আল্লাহ! তুমি জ্ঞানের দুয়ার খুলে দাও। সমস্যা সমাধানের পথ দেখাও। আরও সহজ করে দাও। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা দাও। আমার অন্তরকে খুলে দাও।

এতো অল্প বয়সেই তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহর কাছে না চাইলে কোন কিছু পাওয়া যায় না। তাঁর কাছে কোনো কিছুর অভাব নেই। চাইলে তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না। তিনি সর্বশক্তিমান। সব কিছু দানকারী।

তাই তো ইবনে সীনার সকল চাওয়া পাওয়া ছিলো এক আল্লাহর কাছে।

মাত্র ষোল বছর বয়সে ইবনে সীনা হলেন চিকিৎসক। নামকরা চিকিৎসক। দেশ বিদেশ থেকে বহু চিকিৎসক তাঁর কাছে চিকিৎসাশাস্ত্র ও তাঁর আবিস্কৃত চিকিৎসা প্রণালী শিক্ষা করতে আসতেন।

বুখারার বাধশাহর এক কঠিন রোগ হলো। দেশ বিদেশের নামকরা হেকিমদেরকে ডাকলেন তিনি। তাঁরা বাদশার চিকিৎসা করলেন। কিন্তু রোগ ভালো হলো না। দিনে দিনে বাদশাহর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লো। অবশেষে বাদশার লোকেরা ইবনে সীনাকে ডেকে আনলেন। তিনি বাদশাকে ভালভাবে পরীক্সা করে বললেন তাঁর রোগ ভালো হবে; চিন্তুর কোন কারণ নেই। বাশহার লোকেরা তাঁর কথা বিশ্বাস করতে পারলো না। কিন্তু ইবনে সীনা ঔষধ দিলেন এবং বাদশাহ অল্প সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এ ঘটনার পর সবাই তাঁর সুনাম করতে লাগলো। বাদশার কাছেও তাঁর অনেক কদর হলো। বাদশা তাঁকে অনেক আদর যত্ন করলেন। তিনি ইবনে সীনাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনাকে কি দিলে আপনি খুশী হবেন? যা কিছু চাইবেন তা-ই দেওয়া হবে।

তিনি ইচ্ছা করলেই বাদশাহের কাছ থেকে উচ্চ রাজপদ, ধন সম্পদ লাভ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করলেন না। এ সবের প্রতি তাঁর লোভ ছিলো না। তিনি ছিলেন জ্ঞান সাধক। তাই তিনি জবাব দিলেনঃ জাঁহাপনা, আমি রাজদরবারের লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করার অনুমতি চাই। অন্য কোন কিছুতে আমার প্রয়োজন নেই।

বাদশাহ অবাক হয়ে গেলেন।

জ্ঞানী লোকের যোগ্য জবাব বটে। বাদশাহ তাঁর কথায় খুশী হয়ে হুকুম দিলেনঃ আজ থেকে রাজদরবারের লাইব্রেরী আপনার জন্য সব সময় খোলা থাকবে।

লাইব্রেরীতে প্রবেশ করে ইবনে সীনা দেখতে পেলেন সেখানে জ্ঞানের অনেক অনেক বই। তাঁর মন খুশীতে ভরে গেলো। তাঁর মন এতো  খুশ  হলো যে, দুনিয়ার ধনসম্পদে ভরে দিলেও তিনি এতো খুশী হতেন না। ইবনে সীনা এ সময় এতো পড়াশোন করতেন যে, দিবারাত্রের মধ্যে একটুও ঘুমাতেন না।

একটি মজার ঘটনা। এক সময় ইস্পাহানের শাহাজাদার এক অদ্ভুত রকমের রোগ দেখা দিলো। শাহাজাদা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলো। সে দিনরাত শুধু চিৎকার করে বলতোঃ আমি গরু, আমাকে জবাই করে আমাকে জবাই করো। আমার গোশত দিয়ে মজাদার কাবাব বানাও।

দেশের বড়ো বড়ো হেকিমকে দিয়ে তার চিকিৎসা চললো। কিন্তু কোন ফল হলো না। শাহাজাদার রোগ দিন দিন বেড়েই চললো। সে খাওয়া-দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিলো। এমন কি ঔষধ পর্যন্ত মুখে দিতো না। সবই ফেলে দিতো। আর সবাইকে বলতে তার কোন রোগ হয় নি। সে শুধু জবাই হতে চায়। এমন আজব রোগের কথা কেউ কোন দিন শোনে নি।

এদিকে না খেয়ে খেয়ে শাহাজাদা আধমরা হয়ে গেলো। খাওয়া নেই ঘুম নেই। কেবলই সে চিৎকার করেঃ আমি গরু, আমাকে জবাই কর। অবশেষে সবাই ইবনে সীনার নিকট গেলো। তিনি লোকের মুখে সব কথা শুনে বললেনঃ শাহাজাদাকে খুশির খবর দাও। কসাই আসছে। তাকে জবাই করা হবে।

লোকেরা শাহাজাদাকে এ খবর শোনালো। খবর শুনে শাহাজাদা খুব খুশী হলো। কিছুক্ষণ পর ইবনে সীনা শাহাজাদার কাছে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর হাতে খুব ধারালো দু’খানা ছুরি! এ ব্যাপার দেখে সবাই ঘাবড়ে গেলো। অবাক হওয়ার মত কাণ্ড! ইবনে সীনা কি শাহাজাদাকে সত্যি সত্যিই জবাই করবেন!

তিনি দুজন লোককে হুকুম করলেন গরুটাকে ধরে শোয়াবার জন্য। একথা শুনে খুশী হয়ে শাহাজাদা নিজেই শুয়ে পড়লো। জবাই হবার জন্য তৈরী হলো সে। ইবনে সীনা ছুরি হাতে নিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শাহাজাদার গলায় ছুরি ধরলেন এবং বাঁ হাতটা তার বুকের ওপর রাখলেন। এমন সময় হঠাৎ ঘৃনা ভরে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বললেনঃ না, গরুটা একদম শুকিয়ে গেছে। এর গোশত দিয়ে মোটেও কাবাব হবে না। একে কিছুদিন ভাল করে খাইয়ে মোটা করো। তখন জবাই করলে গোশত দিয়ে ভাল কাবাব হবে।

ইবনে সীনার কথা শুনে শাহাজাদার মন খারাপ হলো। ভাবলো, সত্যিই তো মোটা না হলে গোশত দিয়ে কি করে কাবাব বানাবে? তারপর ইবনে সীনার কথামত শাহাজাদাকে ভালো ভালো খাবার দেওয়া হলো। শাহাজাদা মনের খুশীতে পেট ভরে খেতে লাগলো। তাতে সে দিন দিন মোটা তাজা হয়ে উঠলো। আর এদিকে ইবনে সীনা শাহাজাদার প্রতিদিনের খাবারের সাথে দাওয়াই চালাতে লাগলেন। তার ফলে অল্প দিনের মধ্যেই শাহাজাদার শরীর ভালো হয়ে গেলো। তার মনের রোগও চলে গেলো। সে জবাই হতে আর চাইলো না। বাদশাহ ইবনে সীনার ওপর খুবই খুশী হলেন। অবাক হলেন তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি দেখে। এমনি বড়ো চিকিৎসক ছিলেন ইবনে সীনা!

একুশ বছর বয়সে ইবনে সীনা জ্ঞানের নানা বিষয়ে বই লেখা শুরু করলেন। তাঁর লেখা বইগুলো অবাক করে দিয়েছে বিশ্বকে। তিনি ছিলেন জ্ঞানের পরশমণি। যা স্পর্শ করেন তাই সোনা হয়ে যায়। যাতে হাত দিয়েছেন তাতেই চরম সুনাম পেলেন। জ্ঞানের সকল বিষয়ে তাঁর হাত ছিলো। তাই তো দুনিয়ার লোকে বলে, ইবনে সীনা জ্ঞানের যুবরাজ।

এমনিভাবে জ্ঞানের যুবরাজ ইবনে সীনার ছেলেবেলা শেষ হলো। পরবর্তী কর্মজীবন ছিলো তাঁর উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত। তাঁর জীবন এতো গুণের সমাহার ছিলো যে, দুনিয়ার মানুষ হাজার বছর পরও তাঁর কথা বলে –মুসলমানরা গর্বের সাথে তাঁর নাম স্মণ করে। ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয়।

একদিন ইবনে সীনার পেটের ব্যথা দেখা দিলো। ডাক্তার বললেন, অতিরিক্ত সময় পড়াশোনা করার ফলে এ রোগ দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া ও ঠিকমত না ঘুমানোর জন্য তাঁর স্বাস্থ্য ভিষন খারাপ হয়ে পড়লো। পড়াশোনার জন্য ইবনে সীনা স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেন নি। এর ফলেই এ কঠিন ব্যথা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসা করার পরও তাঁর পেটের ব্যথা কমলো না। দিন দিন বাড়তে লাগলো।

অসুস্থ থেকেও ইবনে সীনা বিশ্রাম গ্রহণ করেন নি। এ অবস্থায়ও তিনি দিনরাত লেখাপড়া করে কাটাতেন। তাঁর বন্ধুরা বলতেনঃ আপনি শরীরের প্রতি যে রকম অবহেলা করছেন তাতে আপনার হায়াত কমে যেতে পারে। তার জবাবে ইবনে সীনা বললেনঃ কতদিন বাঁচবো তা কে জানে? হায়াত মওত তো আল্লাহর হাতে। তবে জীবনের সাধ ও কর্তব্য তাড়াতাড়ি শেষ করাই ভালো।

তাঁর কাছে কর্তব্য কাজ সমাধা করার মত বড়ো কাজ আর কিছুই ছিলো না। অজ্ঞ লোকদেরকে তিনি পছন্দ করতেন না। ইবনে সীনা একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন। তিনি যুক্তি দ্বারা ইসলাম ধর্মকে বোঝবার চেষ্টা করেছিলেন। কারণ ইসলাম যুক্তি ও প্রগতির ধর্ম। কুসংস্কার ইসলাম ধর্মের লোকেরা বিশ্বাস করে না।

ইবনে সীনার এক চাকর তাঁর কিছু টাকা গোপনে আত্মসাৎ করেছিলো। চোরের মন সব সময়ই ভয়ে ভয়ে থাকে।চাকরটিও সব সময় ভয়ে ছিলো যে, ইবনে সীনার নিকট কখন জানি ব্যাপারটি ধরা পড়ে যায়! তোমরা আগেই জেনেছো যে, ইবনে সীনার পেটের ব্যথা ছিলো। একদিন তাঁর পেটের ব্যথা খুব বেড়ে গেলো। তিনি চাকরকে ঔষধ তৈরী করে দিতে বলেন। চাকর মনে মনে ভাবলো এই তো সুযোগ। তাঁকে যদি মেরে ফেলতে পারি তবে আমার আর ধরা পড়ার ভয় থাকবে না। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। চাকরটি ঔষধের সাথে আফিম মিশিয়ে দিলো এবং ঔষধ খেতে বললো ইবনে সীনাকে। তিনি বুঝতে পারলেন না। আফিম মেশানো ঔষধ তিনি খেয়ে ফেললেন। ইবনে সীনার শরীর এতে খুবই দুর্বল হয়ে পড়লো। আফিমের বিষ ক্রিয়ার ফলে ইবনে সীনার জীবনী শক্তি শেষ হয়ে এলো। অবশেষে ৪২৮ হিজরীতে মাত্র সাতান্ন বছর বয়সে এ মুসলিম মনীষী ইনতিকাল করলেন।

জ্ঞানের আকাশ থেকে যে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি ঝরে পড়লো তাঁরই নাম ইবনে সীনা।

 

About হারুনুর রশীদ