মুসলিম মনীষীদের ছেলেবেলা

সবাই যার সুনাম করে

খোরাসান।

পারস্যের একটি প্রাচীন জেলা। বর্তমান ইরান দেশকে পারস্য বলা হতো। বলখ খোরাসানের একটি প্রসিদ্ধ শহর। সেই বলখ শহরে এক শিশুর জন্ম হয়। সাধারণ শিশু তিনি নন। অনেক গুণের অধিকারী হন এই শিশু। সুন্দর দুটো চোখ। চমৎকার দেহের গড়ন। শান্ত ও ধীর স্থির। যে শিশুর জন্মে বলখ শহর ধন্য। এই অসামান্য শিশু পরে সারা মুসলিম জাহানে মওলানা নামে পরিচিত হন। তিনি জ্ঞান সাধনার দ্বারা মুসলিম জাতির জন্য অনেক জ্ঞান গর্ভ পুস্তক লিখে গেছেন।

তাঁর নাম মওলানা রুমী। পুরো নাম মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন রুমী। পিতার নাম মোহাম্মদ বাহাউদ্দীন। পিতা প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রঃ)-এর বংশধর। তাঁর মাতা ছিলেন আমাদের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রঃ)-র বংশধর। পিতা ও মাতার দিক দিয়ে তিনি মস্ত বড়ো বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মেধা ও চারিত্রিক গুণাবলী দিয়ে তিনি বংশের সুনাম বজায় রেখেছিলেন।

পিতা মাওলানা বাহাউদ্দীন তখনকার নামকরা আলিম ছিলেন। তিনি সকলের কাছে প্রিয় ছিলেন জ্ঞানী ও বুযুর্গ হিসেবে। সত্য কথা বলতে তিনি কখনো পিছপা হতেন না। এজন্য সেই সময়ে খোরাসানের সুলতানের সংগে তাঁর নানা রকম মতভেদ দেখা দেয়। আসলে জ্ঞানী লোকেরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না। শত বিপদ এলেও যা সত্য ও ঠিক তা বলে যান।

সুলতান খাওয়ারিমজ শাহ তখন খোরাসানের শাসনকর্তা। সুলতান খুব ভালো লোক ছিলেন না। নানা রকম অন্যায় কাজ করতো। তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু লোক কথা বলতে লাগলেন। সুলতান মনে করতো তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা কথা বলতেন তাঁদের মধ্যে মাওলানা বাহাউদ্দীন একজন।

সুলতান খাওয়ারিজম শাহ রেগে গেলেন মাওলানা বাহাউদ্দীনের উপর। তিনি অত্যাচার করতে থাকেন। কিন্তু বাহাউদ্দীন ছিলেন আপোষহীন। তিনি নিজের সম্মান বজায় রাখার জন্য বলখ শহর ত্যাগ করলেন।

তিনি শিশু রুমীকে সাথে করে পায়ে হেঁটে বিদেশের পথে রওয়ানা হলেন। বাগদাদ, মক্কা শরীফ, মালটা, লারিন্দা প্রভৃতি শহর হয়ে অবশেষে কোনিয়া শহরে হাজির হন।

কোনিয়া রোমের একটি প্রাচীন শহর। ফোরাত নদীর তীরে শহরটি অবস্থিত। আলাউদ্দীন কায়কোবাদ তখন কোনিয়ার শাসনকর্তা। তিনি তাঁদেরকে সেখানে থাকার অনুমতি দিলেন। তাঁরা স্থায়ীভাবে রোমে বসবাস করতে থাকেন। সেই স্থানের নাম অনুসারে মাওলানা জালাল উদ্দীন ‘রুমী’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

বালক রুমী শিক্ষা জীবন শুরু হয় পিতার কাছে। সায়্যীদ বোরহানউদ্দীন ছিলেন সেকালের মস্ত বড় জ্ঞানী ব্যক্তি। তাঁর কাছেই রুমীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় এবং প্রথম চার পাঁচ বছর তাঁর কাছেই শিক্ষা লাভ করেন তিনি। মাত্র কয়েক বছর বয়স তাঁর। এই বয়সেই তিনি কুরআন মুখস্থ করে ফেললেন। খুবই সুন্দর ও ভক্তি সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কুরআন তিলাওয়াতের সময় দু’চোখ দিয়ে তাঁর অশ্রু গড়িয়ে পড়তো অনবরত। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। কেবল বই পুস্তকের মধ্যেই রুমীর জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিলো না। রুমী বাল্য বয়সেই মুখস্ত করেছলেন অনেক হাদীস।

রুমীর বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তাঁর বাবা মা পবিত্র হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা যাত্রা করেন। সেই সময়ের তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ দেখার সুযোগ পান। এতে তাঁর জ্ঞান অনেক বেড়ে যায়।

শায়েখ ফরিদউদ্দীন আত্তার ফারসী সাহিত্যের একজন বড় কবি। শুধু নাম করা কবি নন, তিনি একজন দার্শনিক ও বিখ্যাত সূফী দরবেশ ছিরেন। রুমীর বয়স যখন বার বছর তখন তাঁর বাবা নিশাপুরে মায়েখ ফরিদউদ্দীন আত্তারের কাছে তাঁকে নিয়ে যান।

বালক রুমীকে দেখেই শায়েখ ফরিদউদ্দীন আত্তার খুব খুশী হলেন। রুমীর প্রতিভা দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেনঃ এই বালক সারা দুনিয়ায় এমন জ্ঞানের আগুন জ্বালাবে যে আগুনে পড়ে বহু মানুষ খাঁটি সোনায় পরিণত হবে। যতদিন দুনিয়া টিকে থাকবে ততদিন তাঁর নাম মুছে যাবে না। সবাই সুনাম করবে।

সুফী দরবেশ কাকে বলে? যাঁরা আল্লাহর জ্ঞান সাধনায় সাধক হয়েছে তাঁদেরকে বলা হয় সুফী দরবেশ। শামস-ই-তাব্রিজ ছিলেন এক বড়ো সুফী ও দরবেশ। মাওলানা রুমী তাঁর কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। বালক রুমীর জীবনে চার জন পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তির আবদার সব চেয়ে বেশী। তাঁদের মধ্যে প্রথম হচ্ছেন তাঁর তাবা মোহাম্মদ বাহাউদ্দীন, দ্বিতীয় ফরিদ উদ্দীন আত্তার, তৃতীয় সায়্যীদ বোরহান উদ্দীন এবং চতুর্থ শামস-ই-তাব্রিজ।

ধর্ম নিয়ে আলোচনায় মশগুল থাকতেন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকে তিনি রীতিমত রোযা রাখা শুরু করেন। ছোটবেলায় খেলাধুলায় সময় কাটাতেন না। যেখানে সেখানে আড্ডা দিতেন না। সব সময় শুধু ভাবতেন আর ভাবতেন। তিনি ভাবতেন কে তিনি? কী এই পৃথিবী? কোত্থেকে এতো কিছুর আগমন? কোথায় আবার তারা ফিরে যাচ্ছে? এমনি ভাবনায় সময় কাটতো তাঁর।

মহাকবি রুমী মুসলমানদের কাছে খুবই পরিচিত। শুধু কি তাই? তাঁর লেকা মহাকাব্য মাসনুবী মুসলমানদের অত্যন্ত প্রিয় মহা গ্রন্থ।

মাসনুবী ফার্সী ভাষায় রচিত। সবাই নাম দিয়েছে ‘মাসনুবী শরীফ’। পৃথিবীর সবকটি সেরা ভাষায় মাসনুবীর অনুবাদ হয়েছে। প্রায় তেতাল্লিশ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি মাসনুবী শরীফ লিখেছেন। মাসনুবীর ভাষ্য সহজ-বর্ণনা ভংগী খুবই মধুর। বাংলা ভাষায় মাসনুবীর অনুবাদ হয়েছে। ইউরোপের এক নামকরা মনীষী উউলিসন তাঁর নাম। তিনি মাসনুবী শরীফ ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন। তিনি বলেছেন দুনিয়ার সব ধরনের মানুষেরই মাসনুবী পাঠ করা উচিত। কারণ এতে শুধু ধর্মের কথাই বলা হয়নি, এটা হচ্ছে সকল মানুষের জীবনের তত্ত্বকথা।

রুমীর মাসনুবী শরীফের একটি সুন্দর কাহিনী বলছি শোনো। অনেক অনেক দিন আগের কথা। মহা পরাক্রমশালী এক সম্রাট ছিলেন। একদিন সম্রাট মন্ত্রীদেরকে সাথে করে শিকার করতে বের হলেন। বন আর বন। সেই বনের গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে তিনি হাঁটছেন। হঠাৎ সম্রাটের চোখে পড়লো এক সুন্দরী ক্রীতদাসী। সম্রাট সুন্দরী ক্রীতদাসীর রূপে মুগ্ধ হলেন। মুগ্ধ বাদশাহ অনেক অনেক টাকা দিয়ে ক্রীতদাসীকে মুক্ত করে নিলেন। সুন্দরী ক্রীতদাসী বাদশার সাথী হলো। বাদশাও ক্রীতদাসীকে পেয়ে খুব খুশী। কিন্তু আল্লাহর কুদরতী খেলা কে বুঝতে পারে। হঠাৎ করে ক্রীতদাসী রোগে অসুস্থ হয়ে পড়লো।

বাদশার অবস্থাটা কেম ছিলো একটু ভেবে দেখো। প্রবাদ আছে এক ব্যক্তির গাধা ছিলো, কিন্তু ছিলো না গাধা পালার মত কোন লোক! আবার যখন গাধা পালার লোক যোগাড় হলো, অমনি বাঘে ধরে নিয়ে গেলো গাধাটি। ছিলো একটি কলসী, কিন্তু পানি ছিলো না তাতে। পানি যখন পাওয়া গেলো, তখনই কলসিটি ভেঙ্গে গেলো। বাদশার কপালও ছিলো ঠিক তেমন।

বাদশাহ দেশ বিদেশের নামকরা ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তারদেরকে বললেনঃ আমার এবং ক্রীতদাসীদের-এ দুইজনের জীবন নির্ভর করছে আপনার সুচিকিৎসার উপর। যিনি আমার প্রিয় ক্রীতদাসীকে ভালো করতে পারবেন তাঁকে দেবো অনেক অনেক মণিমুক্তা।

সেখানে ডাক্তার ছিলেন অনেক। বাদশার কথায় সবাই বললেনঃ চিন্তা করবেন না জাঁহাপনা। আমরা আমাদের সকল ডাক্তারী জ্ঞান দিয়ে আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করতে চেষ্টা করবো। আমরা এক একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক এক বিভাগে পারদর্শী। সকল রোগের ওষুধ আছে আমাদের হাতে।

কিন্তু ডাক্তাররা শত চেষ্টা করেও রোগীকে আর ভালো করতে পারলেন না। সুন্দরী ক্রীতদাসী প্রায় মর মর অবস্থা। বাদশার চোখে পানি। তিনি দেখলেন এক একটি ওষুধ দেওয়ার পর সৃষ্টি হয় এক একটি রোগ। সবাই ভেবে অবাক! কিন্তু কেন এমন হলো বলতে পারো? ডাক্তাররা ক্রীতদাসীর চিকিৎসা করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলেন আল্লাহর নাম। তাঁরা ছিলেন অহংকারী। তাঁরা তাঁদের নিজেদের গর্বে এতই মত্ত ছিলেন যে একবারও বললেন না ইনশাআল্লাহ। আর তোমরা জান আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না।

ডাক্তারদের ওষুধে কোন কাজ হচ্ছিলো না বাদশাহ তা বুঝতে পারলেন। কারণ বাদশাহ ছিলেন খুবই আল্লাহভক্ত। আল্লাহর রহস্য সম্পর্কে ছিলেন তাঁর জ্ঞান।

তাই বাদশাহ খালি পায়ে ছুটে গেলেন মসজিদে। মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে সবাই সমান। বাদশাহ অনুতপ্ত হলেন এবং হু হু করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর চোখের পানিতে জায়নামায ভিজে গেল। কিছুক্ষণ কাঁদার পর বাদশাহ মুনাজাত করলেন আল্লাহর দরবারে। বাদশাহ দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন, একজন পরহেজগার লোক বাদশাহকে বলছেনঃ হে বাদশাহ, আল্লাহর দরবারে তোমার মুনাজাত কবুল হয়েছে।

সকাল বেলায় বাদশাহ দেখলেন এক পরহেজগার হেকিম তার দেহলীযে উপস্থিত। প্রেমিক বাদশাহ হেকিমকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন।

হেকিম সুন্দরী ক্রীতদাসীর সাথে আলোচনা করলেন তার রোগ সম্পর্কে। হেকিম বাদশাকে বললেনঃ ক্রীতদাসীর মানসিক রোগ হয়েছে। অন্য কোন ওষুধে তাঁর রোগ ভালো হবে না। ক্রীতদাসীর ইচ্ছামত তার মনের চিকিৎসা করার পর সুন্দরী ক্রীতদাসী ভালো হয়ে উঠলো। প্রেমের কারণেই সুন্দরী ক্রীতদাসী অসুত্থ হয়ে পড়েছিলো। আধ্যাত্মিক প্রেমকে বুঝানোর জন্য রুমী এরূপ প্রেমের উল্লেখ করেছেন তাঁর লেখা মাসনুবী শরীফে। মাসনুবী শরীফের জন্যই লোকেরা তাঁকে উপাধি দিলো বিশ্বপ্রেমিক। সবাই বলে তাঁকে বিশ্ব প্রেমিক রুমী।

বিশ্ব প্রেমিক রুমী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও আসলে তিনি ছিলেন মহাসাধক ও সুফী। এ কারণে মুসলমারনা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর নাম করে।

তোমরাও বড় হয়ে এই মহা সাধকের জীবনী পড়বে।

মহান দার্শনিক

মুসলিম জাহানের একটি দেশ। নাম ইরান। আগে দেশটির নাম ছিলো পারস্য। সেই ইরান দেশের একটি দেশ খোরাসান। খোরাসান প্রদেশের তুস জেলা। জেলার দু’টি শহর তাহেরান এবং তাকান। তাহেরান শহরের একটি ছেলে। নাম তাঁর আল-গাযযালী (রঃ)। পুরা নাম আবু হামিদ মোহাম্মদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে তাওস আহম্মদ আল তূসী আল সাফী আল নিশাপুরী।

ছোটবেলা থেকেই আল-গাযযালী (রঃ) একটু ভিন্ন রকম ছিলেন। একা এবং নিরিবিলিতে থাকতে তাঁর বেশী ভালো লাগতো।

তাঁর আব্বা ছিলেন খুবই পরহেজগার লোক। সব সময় পাক পবিত্র থাকতেন। সময় পেলেই কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আল গাযযালী (রঃ) তখনও শিশু। তাঁর পিতা ইনকিতাল করলেন। পিতার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে মা দুটি সন্তান রেখে মারা যান। পিতা নাবালক ছেলে দু’টিকে এক পরহেজগার বন্ধুর কাছে রেখে যান। বন্ধুর হাতে কিছু টাকা দিয়ে তাঁকে অনুরোধ করলেন এই টাকা দ্বারা তাঁদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে।

বেশী টাকা পয়সা তিনি রেখে যেতে পারলেন না। কারণ তাঁদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না।

পিতার বন্ধুর নিকট আল-গাযযালী (রঃ)-র প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হলো। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন খুবই মনোযোগী। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর অনেক কিছু শেখা হয়ে গেলো। সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ মুখস্থ করা ছাড়াও হাদীস শরীফ পাঠেও তিনি অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। অল্প বয়সেই ভালো ছাত্র হিসেবে তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

শুধুমাত্র ওস্তাদের নিকট বই পড়েই তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারতেন না। জীবন, জগত ও প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি চিন্তা করতেন গভীরভাবে। তিনি যে বিষয়ে পড়াশোনা করতেন তা শেষ না করে থামতেন না। পিতার বন্ধু তাঁর জ্ঞান পিপাসা দেখে অবাক হয়ে যেতেন। তিনি দু’হাত তুলে তাঁর জন্য আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতেন।

এবার তাঁর উচ্চ শিক্ষার পালা। সেই সময়ে স্কুল কলেজ খুব বেশী ছিলো না। নামকরা ওস্তাদগণ নিজেদের বাড়ীতে অথবা মসজিদে ছাত্রদের শিক্ষা দান করতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মসজিদেই সব কিছু হতো, শিক্ষা বলো, বিচার বলো, দেশ শাসন বলো, সকল কিছুই মসজিদে হতো। ধনী লোকেরা সে রকম শিক্ষায় অর্থ সাহায্য করতেন, ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার খরচও তাঁরা বহন করতেন।

সবেমাত্র তাঁর আঠার বছর বয়স। আল-গাযযালী (রঃ) উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য পায়ে হেঁটে জুর্জান প্রদেমে হাজির হলেন।

সেই সময়ে শিক্ষাদানের একটা নিয়ম ছিলো। শিক্ষক ক্লাসে যা পড়াতেন ছাত্ররা তা লিখে রাকতো। এ রকম লিখে রাখা খাতাকে নোট বই বলা হয়।

একদিন জুর্জান প্রদেশ থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ী ফেরার পথে ডাকাত দল বালক গাযযালীকে (রঃ) আক্রমণ করলো। ডাকাতরা তাঁর দেহ তল্লামী করে তাঁর নিকট থেকে সব কেড়ে নিলো। ডাকাতরা তাঁর নোটবইগুলোও কেড়ে নিলো। আল-গাযযালী (রঃ) এতে খুবই দুঃখিত হলেন; কিন্তু ভয় পেলেন না। কিছুক্ষণ পর সাহস করে তিনি ডাকাত সরদারের কাছে নোট বইগুলো ফেরত চাইলেন। ডাকাত সরদার তাচ্ছিল্যের স্বরে বললোঃ ওহ তোমার বিদ্যা তো আমার হাতে! তুমি তো এখন বিদ্যাহীন। বিদ্যা পুস্তকে রেখেও বিদ্বান হওয়া যায় নাকি? যাও, তোমার নোটবইগুলো নিয়ে যাও।

গাযযালী (রঃ) ডাকাত সরদারের কথায় লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেন। বাড়ী ফিরে রাত দিন পড়ার কাজে পরিশ্রম করতে লাগলেন। অবশেষে তিন বছরের মধ্যে তিনি সমস্ত নোট মুখস্থ করে ফেললেন।

১০৭৭ সাল। আল-গাযযালী (রঃ)-এর বয়স তখন বিশ বছর। আরও উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি নিশাপুরে হাযিল হলেন। তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান ছিলো নিশাপুর। বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসার মতো নিশাপুরের বায়হাকিয়া মাদ্রাসারও তখন খুব নাম ডাক। এটি ছিলো ইসলাম জগতের সর্বপ্রথম মাদ্রাসা। দেশ বিদেশের বহু ছাত্র এখানে এসে পড়াশোনা করতো।

ইমামুল হারামাইনের মুসলিম বিশ্বের প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ও আলেম। আল-গাযযালী (রঃ) মনের মস্ত দরদ আর ভালোবাসা দিয়ে এ বুযুর্গ আলেমের নিকট জ্ঞান সাধনা করতে থাকলেন। জ্ঞান অর্জনে তাঁর আগ্রহ আর অসাধারণ প্রতিভা অল্প দিনের মধ্যেই ইমামুল হারামায়েনের নজরে পড়লো। আর কেনই বা পড়বে না? তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান সাধক। আল-গাযযালী (রঃ)-এর মতো প্রতিভাকে চিনতে তাঁর ভুল হবে কেন? তাঁর দিকে তিনি আরো মনোযোগ দিলেন। ফলে অল্প দিনের মধ্যে তিনি মুসলিম জাহানের এক বড় প্রতিভা হিসেবে সুনাম অর্জন করলেন। তখন আল-গাযযালী (রঃ)-এর মতো এত বড়ো আলেম আর একজনও ছিলেন না।

আল-গাযযালী (রঃ) পরবর্তীকালে মস্ত বড়ো আলেম, মুহাদ্দিস, মুফাছছির ও ইসলামী দর্শনবিশারদ হয়েছেন।

পরনিন্দা করা ভালো নয়। কাজে বা কথায় একজন অন্যজনের নিন্দা করাকে বলে পরনিন্দা। ইসলামে পরনিন্দাকে গীবত বলে। গীবত করা গুনাহর কাজ। ইমাম গাযযালী (রঃ) গীবতের কারণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। কেন মানুষ একে অপরের গীবত করে? তার উত্তরে তিনি আটটি কারণের কথা বলেছেনঃ

১। মানুষ যখন কারো কোন কথায় রাগ হয়, রাগের মাথায় সে অন্যের সমালোচনা করে। এতে সে মনে করে প্রতিশোধ গ্রহন করেছে। এতে তার রাগ কমে।

২। এক সাথে বসে কয়েকজন লোক যদি কারো গীবত করে আর সেই সময় যদি কোন লোক সেখানে এসে উপস্থিত হয় তখন সেও গীবত করে থাকে। কারণ তার চুপচাপ বসে থাকা কেউ পছন্দ করবে না।

৩। কোন লোক যদি মনে করে যে, ভবিষ্যতে লোকটি আমার দুর্নাম করতে পারে তবে সে ঐ ব্যক্তির নামে কুৎসা রটনা করে। এতে সে বোঝাতে চায় যে, লোকটি সম্পর্কে সত্য কথা বলায় সে আমার সাথে এমন শত্রুতা করছে।

৪। কারো প্রতি যখন মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয় তখন সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য অন্য লোককে অপবাদ দেয়।

৫। নিজের কৃতিত্ব প্রমাণ করার জন্য সাধারণত অন্য লোকের দোষ গেয়ে বেড়ায়।

৬। পরশ্রী লোক তার সমসাময়িক কোন লোকের সুনাম সহ্য করতে পারে না। অবশেষে কোন উপায় না দেখে গীবত করে যাতে লোকের কাছে তার সুনাম নষ্ট হয়।

৭। হাসি তামাসার জন্য অনেক সময় খেয়াল খুশি মতো একে অন্যের গীবত করে থাকে।

৮। কারো প্রতি ব্যঙ্গবিদ্রুপ এবং উপহাস করার উদ্দেশ্যে অনেক সময় গীবত করা হয়।

ইমাম গাযযালী গীবতকে অত্যন্ত ঘৃণা করতেন।

শিক্ষা গ্রহণের সময়ই দেশের চারদিকে ইমাম গাযযালী (রঃ)-র সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

জ্ঞানসাধনার সাথে সাথে তিনি এক আল্লাহর খোঁজ করতে লাগলেন। রাতদিন পরিশ্রমের ফলে তাঁর শরীরও দুর্বল হয়ে পড়লো। তাঁর খাওয়া-দাওয়া কমে গেলো। রাত্রে ঘুম হতো না। শরীর দুর্বল ও রক্তহীন হয়ে পড়লো। লোকের অনুরোধে তিনি ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করলেন। ডাক্তার তাঁকে নিয়মমত ওষুধ দিলেন। কিন্তু কোন কাজ হলো না। তাঁর এ রোগ আল্লাহকে পাবার জন্য। তাঁকে না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর এ রোগ ভালো হবে না। তাই দুনিয়ার সব কিছু ভুলে তিনি একমাত্র আল্লাহর চিন্তায় মশগুল থাকতেন। ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন চঞ্চল। পরাধীনতাকে তিনি ঘৃণা করতেন। স্বাধীনভাবে থাকতে তিনি ভালবাসতেন। ঘর সংসারের মায়া ত্যাগ করলেন। আত্মীয় পরিজন সবাইকে ভুলে গেলেন। ধন-সম্পদ ও মূল্যবান পোষাক-পরিচ্ছদ ত্যাগ করলেন। মাত্র একখানা মোটা কম্বল গায়ে দিয়ে ঘরবাড়ী ছেড়ে তিনি আল্লাহর খোঁজে বের হয়ে পড়লেন। একমাত্র ভাবনা কোথায় গেলে তিনি আল্লাহর খোঁজ পাবেন। আল্লাহর চিন্তায় তিনি ডুবে গেলেন।

আল্লাহর প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিলো অনেক বেশী। সম সমস্যার সমাধান করতেন তিনি কুরআন ও হাদীসের আলোকে।

মানুষের শরীর। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গতিবিধি। বুকের মধ্যে যে হৃদপিণ্ডটি ধুক ধুক করে তা আত্মা নয়। আত্মা ভিন্ন বস্তু। হৃদপিণ্ডের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। হৃদপিণ্ড একটি গোশতপিণ্ড মাত্র। মানুষ মরে গেলেও হৃদপিণ্ড থাকে। মরলে কিন্তু আত্মা থাকে না। মানুষের শরীর ধ্বংস হয়, কিন্তু আত্মা কখনও ধ্বংস হয় না। মৃত্যুর পরও আত্মা জীবিত থাকে। ইমাম গাযযালী (রঃ) এ সত্যকে নিয়ে গবেষণা করেণ। এবং তাঁর গবেষণার ফলে আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান দান করেন। তাঁর গভীর জ্ঞান দেখে ছোট বড়ো সবাই মুগ্ধ হয়ে যেতো। তখন দুনিয়া জুড়ে সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় মুসলিম জাহানে তাঁর মত জ্ঞানী লোক আর দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। তাই তাঁকে ইমাম গাযযালী উপাধি দেওয়া হয়। ইমাম অর্থ নেতা। তিনি কোন রাজ্যের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও চিন্তারাজ্যের নেতা।

ইসলামী দর্শনে ছিলো অগাধ জ্ঞান। মুসলমানদের কাছে তিনি দার্শনিক হিসেবেই পরিচিত। এই দার্শনিক হিজরী ৫০৫ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরেই তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর দিন ভোরে উঠে অযু করে তিনি ফজরের নামায পড়েন। অতঃপর কাফনের কাপড় আনতে আদেশ করেন। কাপড় আনা হলে তাতে চুমু দিলেন ও কেবলামুখী হয়ে মুয়ে পড়েন এবং জীবনের স্রষ্টাকে জীবন দান করেন। এই মহামনিষী ও দার্শনিক আবু হামেদ মোহাম্মদ আল গাযযালী সমস্ত দুনিয়ায় আজ ও ইমাম গাযযালী নামে প্রসিদ্ধ।

চিকিৎসকের ছেলে বিজ্ঞানী

এক হাজার বছর আগেকার কথা। হাইয়ান তখন কুফা নগরীর চিকিৎসক। কুফা ইরাক দেশে অবস্থিত। উমাইয়া শাসনের রাজধানী তখন কুফা। উমাইয়া বংশের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ ভাব। তাই মাতৃভূমি দক্ষিণ আরব ছেড়ে কুফায় এলেন তিনি। মনে দুনিয়ার অশান্তি। মাথায় তাঁর রাজ্যের চিন্তা কিভাবে উমাইয়া রাজতন্ত্রের অবসন ঘটানো যায়। এই ইচ্ছা পূরণের জন্য সংগ্রাম চালাতে হাইয়ান সপরিবারে তুস নগরের দিকে যাত্রা করলেন। সেই সময় তাঁর একটি ছেলে সন্তান ভূমিষ্ট হয়।

ছেলেটির নাম রাখা হয় জাবীর ইবনে হাইয়ান। মা বুকের মাঝে আগলে রাখলেন। মায়ের আদর আর বাপের স্নেহ দুই-ই পেলেন জাবীর। কিন্তু পাবের স্নেহ তাঁর ভাগ্যে বেশি দিন মিললো না। হাইয়ানের ষড়যন্ত্রের কথা খলিফা জানতে পারলেন। খলিফা হাইয়ানকে ধরে আনলেন এবং মৃত্যুদণ্ড দিলেন।

অসহায় শিশু জাবীরকে নিয়ে মা যাত্রা করলেন দক্ষিণ আরবে। সাধারণ শিশু পরে সারা মুসলিম জাহানে পরিচিত হন একজন রসায়নবিদ হিসেবে। জাবির ইবনে হাইয়ান তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন দক্ষিণ আরবের স্থানীয় বিদ্যালয়ে। ইয়েমেনের নাম করা গণিত শিক্ষক হারবী আল হিমারী তাঁকে গণিত শিক্ষা দেন। চিকিৎসকের ছেলে জাবীর। তাই চিকিৎসার উপরও জ্ঞানলাভ করলেন তিনি অনেক।

তখনকার দিনে বর্তমান যুগের মতো বড়ো বড়ো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো না। সুযোগ-সুবিধাও ছিলো কম। যাঁরা জ্ঞান পিপাসু তাঁরা অনেক কষ্ট করতেন। কষ্ট ও মেহনত করে তাঁদের জ্ঞান আহরণ করতে হতো। বহুদুর দেশ পাড়ি দিতে হতো তাঁদেরকে।

জাবীর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ফেললেন। এতে তাঁর সাধ মিটলো না। তাই তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য দক্ষিণ আরব ছেড়ে পায়ে হেঁটে চলতে লাগলেন। সেই ধু ধু বালুময় পথে। কখনো মরুভূমি, কখনো পাহাড়-পর্বত, বনজংগল পেরিয়ে পথ হাঁটছেন তো হাঁটছেনই। বুকে তাঁর অনেক আশা। তাই পথের কোন বিপদই তাঁকে ঠেকাতে পারলো না। অবশেষে অনেক পথ হেঁটে পিতার কর্মস্থল কুফা নগরীতে এসে হাজির হলেন।

ইমাম জাফর আস সাদিক তখন কুফার বড়ো জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি জাবীরকে সাধ্যমত বিদ্যা শিক্ষা দিলেন। কিন্তু এতেও তাঁর মন শান্ত হলো না –তৃপ্তি পেলেন না। তিনি যন্ত্রপাতি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। হাতে কলমে রসায়নের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করলেন তিনি। অতঃপর তিনি ‘নাইট্রিক এসিড’ আবিস্কার করলেন। ইমাম জাফর আস সাদিকের কাছেই জাবির রসায়নশাস্ত্র শেখেন। রসায়ন চর্চা করে তিনি অনেক খ্যাতি অর্জন করেন।

ইমাম জাফরের সাথে পরিচয়ে জাবিরের অনেক লাভ হয়। তাঁরই চেষ্টায় তিনি শাহী দরবারের নেক নযরে পড়েন। তখন ঘটে একটি চমৎকার ঘটনা। খলীফা হারুন অর-রশীদের উযিরে আযম ইয়াহিয়ার এক সুন্দরী বাঁদী ছিলো। একবার বাঁদীর কঠিন অসুখ হয়। দেশ বিদেশ থেকে অনেক হেকিম ডাকা হলো তাঁর চিকিৎসার জন্য। সবাই একে একে করলেন। কিন্তু সে অসুখ কিছুতেই সারে না। কেউ সারাতেও পারলেন না। শেষে ডাক পড়ে জাবিরের। আর তাঁর সুচিকিৎসায় বাঁদীর অসুখ একদম সেরে যায়। ফলে জাবির উযিরের আপন জন হয়ে পড়েন। আর সেই সুযোগে তিনি খলীফা হারুন অর-রশীদেরও সুনজরে পড়েন। জাবির খুব খুশি। এবার কুফা ছেড়ে তিনি বাগদাদে চলে আসেন। সেখানে একদিকে চলে তাঁর ডাক্তারী আর এক দিকে চলে বিজ্ঞানের নানান বিষয় নিয়ে গবেষণা।

কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই রাজনীতির নানা রকম খেলা শুরু হলো সেখানে। জাবিরের রাজনীতি ভালো লাগে না। তবুও দুষ্ট লোকেরা চক্রান্ত করে তাঁকে জড়িয়ে ফেলে। খলীফা তাঁকে দুশমন ভাবলেন। তিনি রাজদ্রোহী বলে সাব্যস্ত হন।

জাবির মহাভাবনায় পড়ে গেলেন। তিনি জানেন রাজদ্রোহীর একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। জান বাঁচানোর উপায় খুঁজতে থাকেন তিনি। অনেক ভাবনার পর উপায় না দেখে তিনি কুফায় পালিয়ে গেলেন। কুফায় তিনি বসবাস শুরু করেন। এবং বিজ্ঞান সাধনায় মনোযোগ দেন।

তাঁর জীবন ছিলো এতোদিন কষ্টের আর সংগ্রামের। কুফায় ফিরে এসে তিনি পেলেন শান্তি। এখানে তিনি গড়ে তুললেন একটি ল্যাবরেটরি –গবেষণাগার। তিনি নিজেই গবেষণা করবেন এতে। ল্যাবরেটরী ছাড়া বিজ্ঞানের গবেষণা ভালো চলে না।

কুফায় তিনি যে ল্যাবরেটরি তৈরী করেন সেটাই ছিলো দুনিয়ার প্রথম বিজ্ঞান গবেষণাগার। জীবনের শেষ দিনপর্যন্ত জাবির এই ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানের সাধনা করেছেন।

পরবর্তী জীবনে জাবির একদিকে ডাক্তার আর এক দিকে রসায়নবিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু তিনি শুধুমাত্র এই দুটি বিষয় নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দেন নি। আরো নানা রকম বিষয়ে তিনি গবেষণা করেছিলেন। সে কারণেই তাঁর খ্যাতি ছিরো দুনিয়াজোড়া।

জাবির ডাক্তারী আর রসায়নসহ নানা বিষয়ের উপর বহু বই লিখেছেন। তাঁর এসব বইয়ের বিষয় ছিলো চিকিৎসা, রসায়ন, খনিজ পদার্থ, বিশেষ করে নানা রকম পিাথর এবং দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি।

শুধুমাত্র ডাক্তারীর উপর তিনি বই লেখেন পাঁচ শ’র মতো। তাঁর লেখা ডাক্তারী বইগুলোতে ছিলো ঔষধ বানানোর কায়দা-কানুন, রোগ ধরবার উপায়, ঔষধ নির্বাচন ও এ্যানাটমি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব জ্ঞানের অনেক কথা। এতে আরো ছিলো চিকিৎসা সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ। এমনকি বিষের উপরেও তাঁর লেখা একখানি বই ছিলো। বইটির নাম আল-জহর।

ধারণা করা হয় তাঁর নিজের চিন্তাভাবনা আর গবেষণার ফলে চিকিৎসা বিষয়ের উপর এতো বই লেখা সম্ভব হয়েছে যা বিশে আজও সমাদ্রিত। তবে চিকিৎসার উপর এতো বই লিখলেও এবং পেশায় তিনি ডাক্তার হলেও আসরে রসায়নবিদ হিসেবে ছিলো তাঁর নামডাক।

প্রতিনি ধাতুরই বিশেষ বিশেষ গুণ আছে, কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। জাবির এ সবের কথা ভালোভাবে জানতেন। গ্রীক দেশের বিজ্ঞানীরা তাঁর আগে এ সকল জিনিস নিয়ে সবচেয়ে বেশী গবেষণা করেছিলেন। তাঁদের জ্ঞান থেকেও এ সকল বিষয়ে জাবিরের জ্ঞান ছিলো আরো বেশী।

গ্রীক বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকেও তাঁর গবেষণা ছিলো অনেক উন্নত। এর জন্য তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা ইউরোপে। ইউরোপ যখন রসায়ন শিক্ষায় খুব উন্নত তখনও সেখানকার বিজ্ঞানীরা ধাতু সম্পর্কেত তাঁর মতামত এক কথায় মেনে নিয়েছেন। আজ থেকৈ দু’শ বছর আগেও সেখানে তাঁর নামডাক ছিলো।

খনি থেকে তোলা কোন ধাতুই সব সময় একেবারে খাঁটি অবস্থায় পাওয়া যায় না। তার সাথে প্রায়ই কিছু আজে বাজে জিনিস মিশে থাকে। এসব বাদ দিয়ে কিভাবে আসল ধাতুটুকু বের করে নিতে হয় জাবির তা প্রথম দুনিয়াকে জানান। তাঁর এই জ্ঞান লোহার বেলায় তিনি সবচেয়ে বেশী কাজে লাগিয়েছেন আর এসবের কথা তিনি তাঁর বইপত্রে লিখে রেখে গেছেন। তাঁর বইয়ে এমনি আরো অনেক জিনিস তৈরীর নিয়মকানুন লেখা আছে।

কাপড় আর চামড়ার জন্যে পাকা রং, ওয়াটার প্রুফ কাপড়ে আর লোকার মরচে ধরা পরিস্কার করা, বার্নিশ, চুলের নানা রকম কলপ ইত্যাদি তৈরীর কথা ও কৌশলও লেখা আছে তাঁর বইয়ে।

লেখার জন্য কম খরচে পাকা ও উজ্জ্বল রংয়ের কালি তৈরী করা হতো।

কাঁচ তৈরীর কৌশল তিনিই আবিস্কার করেছিলেন। রসায়নের গবেষণার কাজে লাগে এরূপ এ্যাসিটিক এসিড, নাইট্রিক এসিড তৈরীর কৌশলও তিনি আবিস্কার করেছিলেন।

জাবিরের একটা বড়ো গুণ ছিলো। তিনি লবণ তৈরী করতে পারতেন। প্রথমে তিনি লতাপাতা আর একটা জিনিস পুড়িয়ে ছাই করে পটাশ আর সোডা তৈরী করতেন। পটাশ আর সোডা এসিডের সাথে মিশিয়ে তিনি লবণ তৈরী করেছিলেন। গন্ধককে খারের সংগে তাপ দিয়ে সিলভার অব সালফার এবং মিল্ক অব সালফার তৈরীর কৌশলও তিনি আবিস্কার করেন।

গবেষণা কাজে ব্যবহৃত হয় এমন ধাততু যেমন সাইট্রিক এসিড, আর্সেনিক, এ্যন্টিমনি, সিলভার নাইট্রেট, কিউপ্রিক ক্লোরাইড ইত্যাদি জিনিসের জ্ঞানও তাঁর যথেষ্ট ছিলো। তাছাড়া রসায়নের গবেষণা কাজে তিনি এসব জিনিস ব্যবসারও করেছেন এবং ভিট্রিওল, ফিটকিরি, সল্টফিটার ইত্যাদি অনেক রসায়নিক জিনিস তিনি তৈরী করতে পারতেন।

জাবির বলেছিলেন, রসায়নে গবেষণা করা চাট্টিখানি কথা নয়। রাসয়নবিদদের সবচেয়ে বড়ো কাজ হচ্ছে হাতে-কলমে কাজ করা আর তার পরীক্ষা চালানো।  হাতে কলকে কাজ না করলে কিংবা নিজে পরীক্ষা না চালালে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনায় কোন ফায়দা হয় না। তাই সব ব্যাপারেই পরীক্ষা চালাতে হবে। তবেই পাওয়া যাবে সেই বিষয় সম্পর্কে পুরো ধারনা বা জ্ঞান।

জাবির আরো বলেছিলেনঃ আমার ধন-দওলত, টাকা-পয়সা আমার ছেলেরা ভাইয়েরা ভোগ করবে। কিন্তু জ্ঞানের সাধনা করে আমি যা পেয়েছি, লোকে আমাকে কেবল তারই জন্যে স্মরণ করবে।

রকেট। রকেটের নাম কে না শুনেছে। মানুষ রকেটের সাহায্যে মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছে। এটম বোমা –এই বোমা দ্বারা পৃথিবীকে করা যায় ধ্বংস। মানুষ ইচ্ছে করলে তা দিয়ে পারে বিশ্বকে নতুন করে গড়তে। রসায়ন নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করে আজ বিজ্ঞানীরা এগুলো আবিস্কার করেছেন।

অনেক আরব বিজ্ঞানী এই রসায়নের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করে অমর হয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে থেকে সবার আগে নাম করতে হয় জাবির ইবনে হাইয়ানের। তাঁর জ্ঞান সাধনা থেকেই আরব জগতে রসায়ন গবেষণা শুরু হয়। এমন কি তিনি সম্ভবত সারা দুনিয়ারই প্রথম রসায়নবিদ-বৈজ্ঞানিক।

তাঁর জ্ঞান সাধনা দেখে কে না অবাক হবে। আরো অবাক হবার মতো ব্যাপার, জাবির ছিলেন চিকিৎসকের ছেলে। কিন্তু তিনি কিনা চিকিৎসক না হয়ে হয়েছিলেন বিজ্ঞানী। বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানীর আজও তাঁর নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। রসায়ন বিজ্ঞানের উপর তাঁর দেয়া পদ্ধতি এখনো গবেষণা কাজে ব্যবহৃত হয়। তোমরা বড়ো হয়ে যখন রসায়ন বিজ্ঞানের গবেষণা ও নানা রকম পরীক্ষা চালাবে তখন বুঝতে পারবে বিজ্ঞানে জাবিরের অবদান কত বেশী। তোমাদের জন্য কত কি আব্সিকার করে গেছেন মহান বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান।

এই মহান বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান ৮০৪ খৃষ্টাব্দে ইনতিকাল করেন।

 

About হারুনুর রশীদ