নবীদের সংগ্রামী জীবন

প্রথম মানুষ প্রথম নবী আদম

আলাইহিস সালাম

মহাবিশ্ব ও পৃথিবী

এই মহা বিশ্বে রয়েছে লক্ষ কোটি গ্রহ নক্ষত্র। মেঘমুক্ত আকাশে মাথার উপর শুন্যলোকে তাকিয়ে দেখুন, বলুনতো কী দেখতে পান? হ্যাঁ, দিনে প্রচণ্ড তেজদীপ্ত সূর্য। রাতে ঝলমল মিটমিটে তাঁরার আলো। এইতো আমরা দেখি দিবানিশি। বাপও দেখেছেন। দাদা দেখেছেন। পরদাদা দেখেছেন, পূর্বপুরুষরা সবাই দেখেছেন। কবে থেকে ওদের শুরু আর কবে যে হবে শেষ, কেউ জানে না তা। একই পথে, একই নিয়মে ওরা চলছে তো চলছেই। কে ওদের সৃষ্টি করেছেন? আপনি নিশ্চয়ই বলবেন, এক আল্লাহ ছাড়া আবার কে? হ্যাঁ তিনি গোটা বিশ্ব জগত সৃষ্টি করেছেন মাত্র ছয়দিনে। (দেখুন আল কুরআনঃ সুরা আরাফঃ ৪৫, সুরা ইউনুসঃ ৩, সুরা হুদঃ ৭, সুরা ফুরকানঃ ৫৯, সুরা সাজদাঃ ৪, সুরা কাহাফঃ ৩৮, সুরা হাদিদঃ ৪) ছয় দিনে মানে ছয়টি কালে। তিনিই গোটা বিশ্ব জগতের স্রস্টা, শাসক ও পরিচালক। তিনিই সমস্ত ক্ষমতার উৎস।

মহা বিশ্বে এই যে লাখো কোটি গ্রহ নক্ষত্র, ওদের আবার ভিন্ন ভিন্ন পরিবার আছে। একেক পরিবারের অনেক অনেক সদস্য আছে। ওদের যে মোট কয়টি পরিবার আছে, আর একেক পরিবারে যে কতজন সদস্য আছে, সে কথা কেউ বলতে পারবে না। আমাদের এই পৃথিবীও কিন্তু একটা গ্রহ। একটি নক্ষত্র পরিবারের সদস্য। এবার নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পেরেছেন, মহান আল্লাহর গোটা সৃষ্টিলোকের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশই মাত্র আমাদের এই পৃথিবী।

তিনি এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন মনের মত সুন্দর করে। সাজিয়েছেন অপরূপ সাজে। এখানে শান্ত সাগর গতিমান। চঞ্চল নদী বহমান। পর্বতমালা শিরতুলে উঁকি মারে আকাশে। দিনে সূর্যের আলো। রাতে মিষ্টি হাসি চাঁদের। সবুজের বন। গাছের ছায়া। পাখির কলতান। ফুলের গন্ধ। ফলের সমারোহ। সবকিছু আছে অফুরান। নেই শুধু সেই—–।

প্রতিনিধি পাঠাবার সিদ্ধান্ত

নেই শুধু সেই মানুষ। সেই মানুষ, যার জন্যে এই পৃথিবীর সবকিছু বানিয়েছেন তিনি।(সুরা ২ আল বাকারাঃ আয়াত ২৯) তিনি পৃথিবীতে তাঁর নতুন প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আর সিদ্ধান্ত নিলেন, মানুষ সৃষ্টি করে তাঁকেই পৃথিবীতে তাঁর নতুন প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠাবেন। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ। কে আছে তাঁর সিদ্ধান্ত নাড়াবার? তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের কথা ফেরেস্তাদের জানিয়ে দিলেন। বললেন, ‘‘হে ফেরেস্তারা, পৃথিবী নামের নতুন যে গ্রহটি আছে, সেখানে আমি এক নতুন প্রজন্মকে প্রতিনিধি নিয়োগ করবো।’’

ঘোষণাটি শুনে তাঁরা আঁতকে ওঠে।

ফেরেস্তা কারা? হ্যাঁ, তারাও আল্লাহর সৃষ্টি। তাঁর দাস। তাঁর সাম্রাজ্যের একান্ত বিনীত বাধ্যগত কর্মচারী। আল্লাহর নির্দেশে তাঁরা গ্রহ নক্ষত্র পরিচালনা করে। পানি, বাতাস, মেঘমালা পরিচালনা করে। জীবন মৃত্যু দান করে। তাঁরই নির্দেশে আরো করে হাজারো রকমের কাজ। মোট কথা তাঁরা তাঁর দাস কর্মচারী। দাসত্ব করা ছাড়া তাঁরা আর কিছু জানে না,বুঝে না।

তাইতো তাঁরা প্রভুর বক্তব্যে ‘প্রতিনিধি’ শব্দটি শুনে আঁতকে ওঠে। কারন এ শব্দটির মধ্যে ‘স্বাধীনতার’ গন্ধ আছে। আর স্বাধীনতা পেলে স্বেচ্ছাচারীতার আশংকা থাকে। তাইতো তাঁরা বলে উঠলোঃ

‘‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যে সেখানকার ব্যবস্থাপনায় বিপর্যায় সৃষ্টি করবে, আর করবে হানাহানি রক্তপাত? আপনার প্রশংশা আর গুনগান করার জন্যেতো আমরাই নিযুক্ত রয়েছি।’’ (সুরা ২ আল বাকারা-আয়াত ৩০)

আল্লাহ তাঁদের বলে দিলেনঃ ‘‘আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।’’ (সুরা ৬ আনয়ামঃ আয়াত ২, সুরা মুমিনুনঃ আয়াত ১২, সুরা সাজদাঃ আয়াত ৭)

সৃষ্টি করলেন আদমকে

তারপর কি হল? তারপর তিনি সৃষ্টি করলেন প্রথম মানুষ। সৃষ্টি করলেন তাঁকে মাটি দিয়ে। (সুরা ২ আল বাকারাঃ আয়াত ৩০) মাটির দেহ তৈরি হয়ে যাবার পর তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন জীবন। তিনি হয়ে গেলেন এক জ্যান্ত মানুষ। আল্লাহ তাঁর নাম দিলেন ‘আদম’। তিনি আদমকে শুধু জ্যান্ত মানুষই বানান্ নি। বরং ‘‘খালাকাল ইনসান, আল্লামাহুল বাইয়ান’’-তাঁকে মানুষ বানালেন এবং কথা বলা শিখালেন।

আদম পৃথিবীর সব মানুষের পিতা।

জ্ঞানী আদম

তারপর মহান আল্লাহ ‘আদমকে সব কিছুর নাম শিখালেন’। (সুরা আল বাকারাঃ আয়াত ৩১)

নাম শিখানোর মানে কী? নাম শিখানোর মানে পরিচয় শিখানো। গুনবৈশিষ্ট এবং ব্যাবহার বিধি জানানো। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আদমকে সব কিছুর পরিচয় জানিয়ে দিলেন। জানিয়ে দিলেন ব্যাবহার করার নিয়ম কানুন। প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করবার জন্যে এ শিক্ষা লাভ করার প্রয়োজন ছিল অনিবার্য। এবার ফেরেশতাদের দেকে বললেনঃ

‘‘তোমরা যে ধারনা করছিলে, তা যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে বল দেখি এই জিনিসগুলির নাম।’’ (সুরা ২ আল বাকারাঃ আয়াত ৩১)

কী করে বলবে তাঁরা? তাঁদের তো এগুলি সম্পর্কে কোন জ্ঞানই দেয়া হয় নি। তাঁরা বিনীত কয়ে বললো –‘‘ প্রভূ, ত্রুটিমুক্ত পবিত্র তোমার স্বত্বা। আমরা তো কিছুই জানি না। কেবলমাত্র তুমি যতটুকু শিখিয়েছ, ততটুকুই আমরা জানি। সমস্ত জ্ঞান ও বিজ্ঞতার মালিক তো তুমিই।’’ (সুরা আল বাকারাঃ আয়াত ৩২)

এবার তিনি আদমকে নির্দেশ দিলেন, ‘‘আদম, তুমি ওদেরকে এ জিনিসগুলির পরিচয় বলে দাও।’’ আদম (আঃ) সবগুলি জিনিসের পরিচয় তাঁদেরকে বলে দিলেন। (আল বাকারাঃ আয়াত ৩৩)

আদমের প্রতি সাজদাবনত হবার হুকুম

এই আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ফেরেশতারা যা সন্দেহ করেছিলো, তারই জবাব দেয়া হয়েছে। তাঁদের বুঝিয়ে দেয়া হল, মানুষকে কেবল ক্ষমতা আর সাধীনতাই দেয়া হবে না, বরং তাঁদের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রয়গের জন্যে জ্ঞানও দেয়া হবে।

এবার আল্লাহ্‌ ফেরেশতাদের হুকুম দিলেনঃ ‘‘আদমের সামনে নত হও। ’’

আল্লাহর নির্দেশে সবাই আদমের সামনে অবনতো হলো। (আল বাকারাঃ আয়াত ৩৪)

ইবলিসের কাণ্ড

কিন্তু ইবলিস অবনতো হতে অস্বীকার করলো। সে অহংকার করে বললোঃ ‘‘আমি আদমের চাইতে উত্তম। কারন তুমি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছ। আর আদমকে তো মাটি দিয়ে তৈরি করেছ। ’’

এভাবে ইবলিস তিনটি অমার্জনীয় অপরাধ করলো। সেঃ

১। আল্লাহর হুকুম অমান্য করলো,

২। অহংকার করলো এবং

৩। নিজেই নিজেকে উত্তম বলে ঘোষণা করলো।

এই তিনটির চাইতে নিকৃষ্ট অসৎগুন আর হয় না। সুতরাং আল্লাহ্‌ তাঁকে ‘‘অভিশপ্ত শয়তান’’ বলে আখ্যা দিলেন। বললেনঃ ‘ তুই এখান থেকে নেমে যা। এখানে থেকে অহংকার করবার কোন অধিকার তোর নেই। যা, তুই বেরিয়ে যা। এখন থেকে তুই অপমানিত ও লাঞ্ছিতদেরই একজন।’’ (আল আরাফঃ আয়াত ১৩)

এবার সে সমস্ত কল্যাণ ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হল। আর ‘ইবলিস’ মানেই নিরাশ। কিন্তু সে অহংকার ত্যাগ করলো না। সে ভাবল, আদমের কারনেই তো আমি বঞ্চিত আর অভিশপ্ত হয়েছি। সুতরাং আদম ও আদমের সন্তানদের ক্ষতি করার জন্য আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করবো। সে আল্লাহকে বললোঃ ‘আমাকে পূনরুথ্যান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন।’’ এই ‘অবকাশ দিন বলতে শয়তান আল্লাহর কাছে দুটি সুযোগ চাইলোঃ

১। কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুযোগ এবং

২। আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করার সুযোগ।

‘‘আল্লাহ্‌ বললেন- যা তোকে সুযোগ দিলাম।’’ (আল আরাফঃ আয়াত ১৫, সুরা আল হিজরঃ আয়াত ৩৭) শয়তান বলল-

‘‘আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করার জন্যে এখন থেকে আমি তোমার সরল সঠিক পথের বাঁকে বাঁকে ওঁৎ পেতে বসে থাকবো। সামনে পিছে, ডানে বামে, সব দিক থেকে আমি তাঁদের ঘিরে ফেলব। ফলে তাঁদের মধ্যে থেকে খুব কম লোককেই তুমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ পাবে।’’ (সুরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ১৬-১৭)

আল্লাহ বল্লেনঃ আমার বান্দাদের উপর তোর কোন প্রভাব প্রতিপত্তি চলবে না। তুই জোর করে তাঁদের সঠিক পথ থেকে ফেরাতে পারবি না। তুইতো পারবি কেবল চালবাজি করতে। মিথ্যা আশার লোভ দেখাতে। পাপের কাজকে চাকচিক্যময় করে দেখাতে। আর ভ্রান্ত পথের আকর্ষণ সৃষ্টি করতে। এই সুযোগই তো কেবল তোকে দেয়া হয়েছে। লোকদের জোর করে হেদায়েতের পথ থেকে গোমরাহির পথে টেনে নেবার ক্ষমতা তোকে দেয়া হয় নি। তবে যে সব মানুষ তোর প্রলোভনে পড়বে, আমি তাঁদেরকে আর তোকে দিয়ে জাহান্নাম ভর্তি করবো। (ইসরাঃ আয়াত ৬২-৬৫, সুরা হিজরঃ আয়াত ৪২)

এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছি, যে সব মানুষ আল্লাহর হুকুম মেনে চলবে, শয়তান তাঁদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। সে ক্ষমতা শয়তানের নেই। শয়তান কেবল তাদেরই বিপথগামী করতে পারবে, যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে না। কিংবা তাঁর হুকুম পালনে গাফলতি করে।

আদম ও হাওয়া জান্নাতে

তারপর কি হল? –তারপর মহান আল্লাহ্‌ শয়তানকে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দিলেন। আর আদমকে থাকতে দিলেন জান্নাতে। প্রথমত আদম ছিলেন একা। তারপর আল্লাহ্‌ আদমের (পাঁজরের হাড়) থেকে তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন। (আন নিসাঃ আয়াত ১)

এবার তিনি আদমের কাছে কিছু নির্দেশ পাঠালেন। বল্লেনঃ ‘‘হে আদম, তুমি আর তোমার স্ত্রী দুজনেই জান্নাতে থাকো। যা খুশি ইচ্ছামত খাও। তবে শুনো ঐ যে গাছটি, সেটির কাছেও যেও না। সেটির ফল খেও না। খেলে জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।’’ (আল বাকারাঃ আয়াত ৩৫)

বাবা আদম আর মা হাওয়া দারুন সুখে জান্নাতে থাকতে লাগলেন। কী চমৎকার জায়গা জান্নাত। সুখ আর আনন্দের অন্ত নেই এখানে। কিন্তু আদম হাওয়ার এই আনন্দ, এই সুখ শয়তানের সহ্য হয় না। সে ভাবলো, আদমের কারনেই তো আমার এই লাঞ্ছনা। যে করেই হোক, আমি যেমন আল্লাহর হুকুম অমান্য করে লাঞ্ছিত হয়েছি। এস রকমভাবে আদমকে দিয়েও আল্লাহর হুকুম অমান্য করাতে হবে। তখন সেও হবে আমারত মত লাঞ্ছিত ও অপদস্থ।

শয়তান প্রতারনা করলো

আদম ও হাওয়া তখন পর্যন্ত শয়তানের ধোকা প্রতারনা সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা লাভ করেন নি। এই সুযোগে শয়তান খুব ভালো মানুষের বেশে এসে তাঁদের ধোঁকা দিল। সে বললোঃ তোমাদের প্রভূ তোমাদের এই গাছের নিচে যেতে নিষেধ করেছেন কেন জান? আসলে এই গাছের ফল খেলে উচ্চ মর্যাদা লাভ করা যায়। ফেরেশতা হওয়া যায়। তাছাড়া চিরদিন বেঁচে থাকা যায়। তোমরা যেন আবার ফেরেশতা না হয়ে বস, যেন চিরকাল বেঁচে না থাকো, সে জন্যই তোমাদের প্রভূ এ গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন। সে কসম করে বললোঃ ‘আমি তোমাদের ভালো চাই’। এভাবে সে দুজনকেই তার প্রতারনার জালে বন্দী করে ফেললো।(আল আরাফঃ আয়াত ২০-২২)

তাঁরা দুজনেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে বসলেন। আল্লাহর নিষেধের কথা ভুলে গেলেন তাঁরা। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তাঁরা অমান্য করে বসলেন মহান আল্লাহর নির্দেশ।

সাথে সাথে তাঁদের জান্নাতি পোশাক খশে পড়লো। তাঁরা গাছের পাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জা আবৃত করতে থাকেন। এসময় আল্লাহ্‌ পাক তাঁদের দেকে বললেন- আমি কি তোমাদের নিষেধ করিনি এ গাছটির কাছে যেতে? আমি কি তোমাদের বলিনি শয়তান তোমাদের সুস্পষ্ট দুশমন।? (আল আরাফঃ আয়াত ২২)

আদম ও হাওয়ার অনুতাপ

আদম ও হাওয়া দুজনেই তাঁদের ভুল বুঝতে পারলেন। চরম অনুতপ্ত হলেন তাঁরা। অপরাধবোধ তাঁদের ভীষণ ব্যাকুল করে তুললো। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তাঁরা। অনুতপ্ত মনে কাতর কণ্ঠে তাঁরা ফরিয়াদ করলেন প্রভূর দরবারেঃ

‘‘ওগো প্রভূ, আমরা তো নিজেদের উপর অবিচার করে বসেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো, আমাদের প্রতি রহম না করো, তবে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।’’ (সুরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ২৬)

আল্লাহ ক্ষমা করে দিলেন তাঁদের

তাঁদের এই আন্তরিক অনুশোচনা ও তওবা আল্লাহ কবুল করলেন। (আল বাকারাঃ আয়াত ৩৭)

ফলে আদম ও হাওয়া শয়তানের প্রতারনার জালে আবদ্ধ হয়ে যে অপরাধ করে ফেলেছিলেন, মহান আল্লাহ্‌ তা মাফ করে দিলেন। তাঁরা পূনরায় আগের মত নিষ্পাপ হয়ে গেলেন।

এখানে একটি জরুরি বিষয় বুঝে নেয়া দরকার। সেটা হলো, প্রথমে আমরা দেখেছি, ইবলিস আল্লাহর হুকুম অমান্য করে অভিশপ্ত হয়েছে। আর এখানে দেখলাম, আদম (আঃ) এবং তাঁর স্ত্রীও আল্লাহর হুকুম অমান্য করলেন। কিন্তু তাঁরা রয়ে গেলেন নিষ্পাপ ও আল্লাহর প্রিয়, এর কারন কি? – এর কারন হল, শয়তান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছেঃ

১। বুঝে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে।

২। সে নিজেকে বড় মনে করেছে।

৩। সে নিজেকে উত্তম মনে করেছে।

৪। সে অহংকার করেছে।

৫। সে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছে।

৬। এই অপরাধের জন্যে সে মোটেও অনুতপ্ত হয় নি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নি।

অন্যদিকে আদম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী হাওয়াঃ

১। ইচ্ছাকৃতভাবে বুঝে শুনে আল্লাহর হুকুম অমান্য করেন নি।

২। তাঁরা বিদ্রোহও করেন নি।

৩। তাঁরা অহংকারও করেন নি।

৪। তাঁরা সচেতনভাবে মূলত আল্লাহর একান্তই আনুগত্য ছিলেন।

৫। তাঁরা অপরাধ করেছেন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে।

৬। তাঁরা ভুল বুঝবার সাথে সাথে অনুতপ্ত হন। আল্লাহর ভয়ে কম্পিত হন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

খেলাফতের দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে এলেন আদম

এভাবেই আদম (আঃ) আল্লাহর দাস ও খলিফা হবার মর্যাদা রক্ষা করেন। আল্লাহ্‌ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হন। তাই আল্লাহ্‌ তাঁর মূল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ইচ্ছা করলেন। অর্থাৎ তিনি আদম (আঃ) কে পৃথিবী নামক তাঁর প্রতিনিধি বানিয়ে দিলেন।কারন এ জন্যইতো তিনি তাঁকে সৃষ্টি করেছিলেন। মাঝখানে কিছুদিন জান্নাতে রেখে একটা পরীক্ষা নিলেন মাত্র। এ পরীক্ষার মাধ্যমে আসলে এক বিরাট অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন হজরত আদম (আঃ)। প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠাবার কালে, মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে বলে দিলেনঃ যাও পৃথিবীতে অবতরন করো। তোমার শত্রু শয়তানও সেখানে যাবে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমরা বসবাস করবে। সেখানে তোমাদের জীবন সামগ্রীরও ব্যাবস্থা আছে। সেখানেই তোমাদের বাচতে হবে। সেখানেই তোমাদের মরতে হবে। আবার সেখান থেকেই তোমাদের বের করে আনা হবে, পুনরুত্থিত করা হবে। (আল আরাফঃ আয়াত ২৪-২৫)

এ প্রসঙ্গে তিনি হজরত আদম (আঃ) কে আর বলে দিলেন, আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে জীবন পদ্ধতি যাবে। যে আমার দেয়া জীবন পদ্ধতির অনুসরন করবে, তাঁর কোন ভয় থাকবে না। থাকবে না, কোন দুঃখ, কোন বেদনা। অর্থাৎ সে অনায়াসে আবার জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং চিরকাল সুখে থাকবে। (আল বাকারাঃ আয়াত ২৮)

আল্লাহ আরো বলে দিলেনঃ তবে যারা আমার জীবন পদ্ধতি অমান্য করবে আর মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে আমার আয়াতকে, চিরদিন তাঁদের আগুনে ফেলে রাখবো। তাঁরা তাঁদের চির শত্রু অভিশপ্ত শয়তানের সাথে অনন্ত জীবন জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। (আল বাকারাঃ আয়াত ২৯)

এভাবে পৃথিবীর জন্যে সৃষ্টি করা মানুষ হজরত আদম (আঃ) –কে আল্লাহ্‌ তাঁর খলীফা ও নবী বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতে থাকেন। আদম (আঃ) তাঁর সন্তানদেরকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতে শিখান। শয়তানের ধোঁকা প্রতারনা সম্পর্কে সতর্ক করেন। তাঁর শয়তানের বিরদ্ধে সংগ্রাম করেই জীবন কাটান।

আদম (আঃ) ছিলেন পৃথিবীর প্রথম মানুষ। তিনিই ছিলেন পয়লা নবী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী ভদ্র ও রূচিবান। ছিলেন উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। ছিলেন অত্যন্ত সঞ্জমশীল, আল্লহভীরু ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমপির্ত। পোশাক ছিল তাঁর ভূষণ। এইসব মহান গুনাবলীর অধিকারী একজন সভ্য মানুষের মাধ্যমেই পৃথিবীতে শুরু হয় মানুষের শুভযাত্রা। আমরা এবং আমাদের আগের ও পরের সমস্ত মানুষই হজরত আদম (আঃ) এর সন্তান। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ

‘হে মানুষ, তোমাদের প্রভূকে ভয় করো। তিনিইতো তোমাদেরকে একটি মাত্র প্রান থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর থেকেই তাঁর জুড়ি তৈরি করেছেন। আর তাঁদের দুজন থেকেই বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ আর নারী। (আন নিসাঃ আয়াত ১)

জেনে রাখুন

শেষ করবার আগে কয়েকটি জরুরী কথা জানিয়ে দেই। জেনে রাখলে কাজে আসবে। কুরআন মাজীদে –

১। আদম (আঃ) এর নাম উচ্চারিত হয়েছে পঁচিশবার।

২। আট স্থানে মানুষকে আদমের সন্তান বলা হয়েছে।

৩। ইবলিস শব্দটি উল্লেখ রয়েছে এগারো বার।

৪। ৮৮ বার শয়তান শব্দের উল্লেখ হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ বার এক বচনে আর আঠারো বার বহুবচনে। আল্লাহদ্রোহী মানব নেতাদেরকেও কুরানে শয়তান বলা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলা হয়েছে।

৫। নিম্নোক্ত সুরা গুলোয় হজরত আদম (আঃ) এর ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছেঃ সুরা আল বাকারা, আল আরাফ, বনি ইসরাইল, আল কাহাফ, তোয়াহা, আল হিজর, সোয়াদ।

হজরত আদম (আঃ) এর জীবন কথা থেকে আমরা এই স্লোগান নিতে পারিঃ

আল্লাহর হুকুম মানতে হবে,

শয়তানের পথ ছাড়তে হবে।

জান্নাতে মোদের যেতে হবে,

শয়তানের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

উচ্চ মর্যাদার নবী ইদ্রীস

(আঃ)

আল কুরআনে যে পঁচিশ জন নবীর নাম উল্লেখ আছে, তাঁদেরই একজন ইদ্রিস (আঃ)। মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে অনেক উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। আল কুরআনে তিনি ইদ্রিস (আঃ) সম্পর্কে বলেনঃ

‘‘এই মহাগ্রন্থে ইদ্রিসের কথা স্মরণ করো। সে ছিল একজন বড় সত্যপন্থী মানুষ ও নবী। আমি তাঁকে অনেক বড় উচ্চস্থানে উঠিয়েছি।’’ (সুরা মরিয়মঃ আয়াত ৫৬-৫৭)

দেখলেন তো, স্বয়ং আল্লাহ্‌ পাকই তাঁকে অনেক উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। আর মহান আল্লাহ্‌ যাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন, তাঁর চেয়ে বড় ভাগ্যবান ব্যাক্তি আর কে?

তিনি কোন সময়কার নবী?

ইদ্রিস (আঃ) প্রাগৈতিহাসিক যুগের নবী। তাই তিনি কোন সময়কার নবী, সে বিষয়ে মতভেদ আছে। তবে অনেক মুফাসসির বলেছেন, কুরআনের বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, তিনি নূহ (আঃ) এর পূর্বেকার নবী ছিলেন এবং আদম (আঃ) এর সন্তান বা নিকট বংশধরদের একজন ছিলেন। ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, আদম (আঃ) এক হাজার বছর বেঁচে ছিলেন। ইদ্রিস (আঃ) তাঁর জীবনের তিন শত আট বছর পেয়েছিলেন।

তিনি কোন দেশের নবী ছিলেন?

তিনি কোন সময়কার নবী ছিলেন, কুরআনে যেমন সে কথা বলা হয় নি, ঠিক তেমনি তিনি কোন দেশের নবী ছিলেন সে কথাও কুরআনে বলা হয় নি। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন, তিনি বেবিলনের লোক। আবার কেউ কেউ বলেছেন- তিনি মিশরের লোক। আসলে দুটি কথাই ঠিক। তিনি বেবিলনে জন্ম গ্রহন করেন। এখানে নবুয়ত লাভ করেন, মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকেন। এখানে কিছু লোক ঈমান আনে, আর বাকী লোকেরা ঈমান আনতে অস্বীকার করে। শুধু তাই নয়, বরং তাঁরা হজরত ইদ্রিস ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতা আরম্ভ করে। ফলে ইদ্রিস (আঃ) তাঁর সংগী সাথীদেরকে নিয়ে মিশরের দিকে হিজরত করেন। এখানে এসে তিনি নীল নদের তীরে বসতি স্থাপন করেন এবং এখানকার মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে থাকেন।

ইদ্রিস (আঃ) এর নবুয়ত

হজরত আদম ও হজরত শীষ (আঃ) এর পরে আল্লাহ্‌ তায়ালা হজরত ইদ্রিসকে নবুয়ত প্রদান করেন। তিনি বড় জ্ঞানী লোক ছিলেন। তাঁকে প্রাচীনতম বিজ্ঞানী বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় তিনিই সর্বপ্রথম কলম ব্যবহার করেন।

ইসরাইলী বর্ণনায় ইদ্রিস (আঃ) কে ‘হনোক’ বলা হয়েছে। তালমূদে বলা হয়েছে- ‘হনোক’ তিন শত তিপ্পান্ন বছর পর্যন্ত মানব সন্তানদের উপর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তাঁর শাসন ছিল ন্যায় ও সুবিচারপূর্ণ শাসন। তাঁর শাশনামলে পৃথিবীতে মহান আল্লাহর অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হতে থাকে। (The Talmud Selections, pp. 18-21)

হজরত ইদ্রিস (আঃ) একসময় খারাপ লোকদের থেকে নিঃসম্পর্ক হয়ে আল্লাহর ইবাদাত বন্দেগী করছিলেন। এরি মধ্যে তাঁর কাছে আল্লাহর ফেরেশতা এসে তাঁকে ডেকে বললেন, ‘হে ইদ্রিস, ওঠো একাকি থাকার জীবন ত্যাগ করো। মানুষের মাঝে চলা ফেরা করো এবং তাঁদের সঠিক পথ দেখাও।’ এ নির্দেশ পেয়ে হজরত ইদ্রীস বের হয়ে আসেন এবং মানুষকে ডেকে উপদেশ দিতে শুরু করেন।

বেবিলনের লোকেরা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য কিছু লোক হজরত ইদ্রিসের দাওয়াত কবুল করে আল্লাহর পথে চলতে আরম্ভ করেন। কিন্তু অধিকাংশ লোক আল্লাহর পথে আস্তে অস্বীকার করে। তাঁরা হজরত ইদ্রিস ও তাঁর সাথীদের সাথে খুবই খারাপ আচরন করে। তিনি যখন দেখলেন এদের আর সৎ পথে আসার আর কোন সম্ভাবনা নেই, তখন তিনি তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে মিশরের দিকে হিজরত করেন এবং নীল নদের তীরে বসতি স্থাপন করেন। হজরত ইদ্রিস এখানকার লোকদেরকে সৎ পথে চলার উপদেশ দিতে আরম্ভ করেন। লোকেরা তাঁর প্রচেষ্টায় ব্যাপকভাবে আল্লাহর পথে আসতে থাকে। তিনি এসব লোকদের উপর আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ফলে পৃথিবীর বুকে নেমে আসে শান্তি আর সুখের ফোয়ারা। হজরত ইদ্রিস (আঃ) মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার কাজে এবং মানুষকে আল্লাহর আইন অনুযায়ী চালাবার কাজে যত বিরোধিতার এবং দুঃখ মুসিবতেরই সম্মুখীন হয়েছেন, তাতে তিনি চরম ধৈর্য ও সবর অবলম্বন করেন। তাইতো মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁর প্রশংসা

করে পবিত্র কুরআনে বলেনঃ

‘‘আর ইসমাঈল, ইদ্রিস, যুলকিফল এরা প্রত্যেকেই ছিল ধৈর্যশীল। আমি তাঁদের প্রবেশ করিয়েছি আমার রহমতের মাঝে। তাঁরা ছিল সৎ এবং সংশোধনকামী।’’ (সুরা ২১ আল আম্বিয়াঃ আয়াত ৮৫)

হজরত ইদ্রিস (আঃ) এর উপদেশ

ইসরাইলী সূত্র এবং কিংবদন্তী আকারে হজরত ইদ্রিস (আঃ) এর বেশ কিছু উপদেশ এবং জ্ঞানের কথা প্রচলিত আছে। এখানে বলে দিচ্ছি তাঁর কিছু উপদেশ ও জ্ঞানের কথা-

১। আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে যদি সংযোগ থাকে ধৈর্য ও সবরের, তবে বিজয় তাঁর সুনিশ্চিত।

২। ভাগ্যবান সে, যে আত্মসমালোচনা করে। আল্লাহ্‌ প্রভূর দরবারে প্রত্যেক ব্যাক্তির সুপারিশ হল তাঁর নেক আমল।

৩। সঠিকভাবে কর্তব্য পালনের মধ্যেই আনন্দ। শরিয়া দ্বীনের পূর্ণতা দান করে। আর যে ব্যাক্তি দ্বীনের দিক থেকে পূর্ণ, সেই ব্যাক্তিত্তশালী।

হজরত ইদ্রিস (আঃ) মানুষকে আল্লাহর হুকুম পালন করতে বলতেন। তাঁরই ইবাদাত ও দাসত্ব করতে বলতেন। তিনি মানুষকে উপদেশ দিতেনঃ পরকালে নিজেকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে, দুনিয়াতে নেক আমল করতে এবং এই ক্ষনস্থায়ী দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করতে। তিনি নির্দেশ দিতেন সালাত কায়েম করতে, সিয়াম পালন করতে, যাকাত পরিশোধ করতে এবং পবিত্রতা অবলম্বন করতে।

কথিত আছে, হজরত ইদ্রিস (আঃ) এর সময়কালে বিরাশিটি ভাষা চালু ছিল। তিনি সবগুলি ভাষা জানতেন এবং সবগুলি ভাষাতেই কথা বলতে পারতেন। তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তাঁদের নিজেদের ভাষায় উপদেশ দিতেন। আল কুরআনে মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ

‘‘আমি যখনই কোন রাসুল পাঠিয়েছি, সে নিজ কওমের ভাষায় তাঁদের দাওয়াত দিয়েছে।’’ (সুরা ইব্রাহীমঃ আয়াত ৪)

জানা যায় হজরত ইদ্রিস (আঃ)- ই সর্বপ্রথম নগর রাজনীতির চালু করেন এবং নগর সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর সময় ১৮৮ টি নগর গড়ে উঠেছিলো।

তাঁর মৃত্যু ও তাঁর মর্যাদা

আল কুরআনে আল্লাহ্‌ তায়ালা ইদ্রিস (আঃ) সম্পর্কে বলেছেনঃ

‘আমি তাঁকে অনেক উচ্চ স্থানে উঠিয়েছি।’ এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় অনেক তাফসীরকার বলেন- পৃথিবীতে হজরত ইদ্রিস (আঃ) এর মৃত্যু হয়নি, বরং আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। হতে পারে মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁকে জীবন্ত উঠিয়ে নিয়ে গেছেন এবং অনেক উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। তবে আসল কথা আল্লাহই ভালো জানেন।

হ্যাঁ, এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা বলে দিচ্ছি। তাহলো আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সঃ) যখন মি’রাজে গিয়েছিলেন, তখন চতুর্থ আকাশে হজরত ইদ্রিস (আঃ) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হজরত ইদ্রিস তাঁকে দেখে বলে ওঠেনঃ ‘শুভেচ্ছা স্বাগতম, হে আমার মহান ভাই।’

কুরআন মাজীদে হজরত ইদ্রিস (আঃ) এর নাম দুইবার উল্লেখ হয়েছে। একবার সুরা মরিয়মে আর একবার সুরা আম্বিয়াতে। উভয় স্থানেই আল্লাহ্‌ তায়ালা ইদ্রিস (আঃ) এর উচ্চ গুনাবলীর এবং বড় মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। এই মহাপুরুষ ও মহান নবীর উপর বর্ষিত হোক চির শান্তি ও করুনাধারা।

৩।

হাজার বছরের সংগ্রামী নূহ

(আঃ)

অনেক অনেক বছর হলো আদম আলাইহিস সালাম বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। তাঁর স্ত্রী হাওয়াও আর বেঁচে নেই। তাঁদের মৃত্যুর পর শত শত বছরের ব্যবধানে অনেক বেড়ে গিয়েছিল তাঁদের বংশধারা। এখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য নারী পুরুষ আদম সন্তান। ইরাকসহ বর্তমান আরব দেশগুলিই ছিল তাঁদের বসবাসের এলাকা।

আদম (আঃ) এর মৃত্যুর পর দীর্ঘ দিন তাঁর সন্তানেরা ইসলামের পথেই চলে। চলে আল্লাহর পথে। মেনে চলে আল্লাহর বিধান। অনুসরন করে আল্লাহর নবী আদমের পদাংক। তাঁদের মাঝে জন্ম নেয় অনেক ইসলামী নেতা ও আলেম। তাঁরাও তাঁদেরকে সৎ পথে পরিচালিত করার চেষ্টা সাধনা করে যান। এরি মধ্যে হজরত ইদ্রিস (আঃ) ও অতীত হয়ে যান। কিন্তু কালক্রমে আদম সন্তানরা আদম আলাইহিস সালামের শিক্ষা ভুলে যান। ভুলে যান ইদ্রিস আলাইহিস সালামের উপদেশ। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায় তাঁরা। ইসলামের পথ থেকে তাঁরা সড়ে পড়ে দূরে। বাঁকা পথে চলতে শুরু করে তাঁরা। বিপথে এগিয়ে যায় অনেক দূর।

ফলে তাঁরা শয়তানের অনুসারী হয়ে যায়। পরিনত হয় আত্নার দাসে। তাঁরা অহংকারি হয়ে পড়ে। দুনিয়ার জীবনটাকেই বড় করে দেখতে শুরু করে। এখানকার লাভ ক্ষতিকেই তাঁরা আসল লাভ ক্ষতি মনে করে। শুধু তাই নয়। বরং সব চাইতে বড় অপরাধটিও তাঁরা করে বসে। সেটা হল শিরক। তাঁরা শিরকে নিমজ্জিত হয়। মানে মনগড়া দেবদেবীদের তাঁরা আল্লাহর অংশীদার আর প্রতিপক্ষ বানিয়ে নেয়। পূজা করার জন্যে তাঁরা মূর্তি তৈরি করে নেয়। তাঁদের কয়েকটি মূর্তির নাম বলছি।

হ্যাঁ, তাঁদের বড় মূর্তিটির নাম ছিলপ ‘অদ্দ’। এ ছিল পুরুষ দেবতা। একটি মূর্তির নাম ছিল ‘সূয়া’। এটি ছিল দেবী। একটির নাম ছিল ‘ইয়াগুস’। এটির আকৃতি ছিল সিংহের মত। একটি মূর্তি ছিল ঘোড়ার আকৃতির। এটির নাম ছিল ‘ইয়াউক’। আরো একটি বড় মূর্তি ছিলো। ঈগল আকৃতির এই মূর্তিটির নাম ছিল ‘নসর’। (সুরা নূহ আয়াত ২৩)

এইসব মূর্তির তাঁরা পূজা করতো। এসব অসহায় দেবদেবীকে তাঁরা আল্লাহর অংশীদার বানিয়েছিলো। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন মানুষ হয়েও তাঁরা দুবে গিয়েছিলো তাঁরা কতটা অন্ধকারে। তাঁদেরই এক উঁচু ঘরে জন্ম নেয় এক শিশু। সে বড়ো হয়ে ওঠে তাঁদেরই মাঝে। কৈশোর, তারুণ্য পার হয়ে যৌবনে এসে উপনীত হয়। তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি, যোগ্যতা, দক্ষতা দেখে সবাই ভাবে, ভবিষ্যতে সেই হবে তাঁদের নেতা। নেতৃত্বের সকল যোগ্যতাই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর মধ্যে। সে কখনো মিথ্যা বলে না। অন্যায় অপরাধে জড়িত হয় না। কারো প্রতি অবিচার করে না। উন্নত পবিত্র চরিত্রের সে অধিকারী।

ফলে সকলেরই সে প্রিয় পাত্র। তাঁর মতো বিশ্বস্ত দ্বিতীয় আর কেউ তাঁদের মধ্যে নেই। কী সেই যুবকটির নাম? নাম তাঁর নূহ। নূহ তাঁদের আশা ভরসার স্থল। তাঁদের পরিকল্পনা মতো নূহ- ই হবে তাঁদের প্রিয় নেতা। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ভিন্ন। আল্লাহ্‌ নূহকে নবী মনোনীত করেন। তাঁর কাছে অহী পাঠানঃ ‘‘কঠিন শাস্তি আশার আগেই তুমি তোমার জাতির লোকদেরকে সাবধান করে দাও।’’ (সূরা নূহঃ আয়াত ১)

আল্লাহ্‌ নূহের কাছে তাঁর দ্বীন নাযীল করেন। দ্বীন মানে জীবন যাপনের ব্যবস্থা। আল্লাহর দ্বীনের নাম ‘ইসলাম’। আল্লাহর দ্বীন অনুযায়ী জীবন যাপন না করলে যে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে, নিজ জাতিকে সে ব্যাপারে সতরক করার জন্যে আল্লাহ্‌ নূহ –কে নির্দেশ প্রদান করেন।

নূহ তাঁর জাতির লোকদের বললেন- ‘‘হে আমার জাতির ভাইয়েরা, তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তাঁর হুকুম মেনে চলো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তোমরা কেবল তাকেই ভয় করো। আর আমার কথা মেনে চলো। আমার আনুগত্য করো। যদি তাই না করো, আমার ভয় হচ্ছে, তবে তোমাদের উপর একদিন কথি শাস্তি এসে পড়বে। আমি কিন্তু তোমাদের স্পষ্ট ভাষায় সাবধান করে দিচ্ছি।’’

নূহ তাঁদের আর বলেনঃ ‘‘আমি তোমাদের যেভাবে চলতে বলছি, তোমরা যদি সেভাবে চলো, তবে আল্লাহ্‌ তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। আর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন। নইলে কিন্তু আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে।’’ (সূরা নুহঃ আয়াত ২৪-২৫)

নূহের এই কল্যাণময় হিতাকাঙ্ক্ষী আহবানের জবাবে তাঁর জাতির নেতারা বললোঃ তুমি কেমন করে হলে আল্লাহর রাসুল? তুমি তো আমাদেরই মতো একজন মানুষ।(সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ২৭)

সাধারন মানুষের উপর কিন্তু নূহের ছিলো দারুন প্রভাব। তাঁরা জাতির স্বার্থপর নেতাদের চাইতে নূহ-কেই বেসি ভালোবাসতো। নেতারা যখন দেখলো জনগন তো নূহের কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। তাঁর সাথী হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের সমস্ত কায়েমি স্বার্থ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তখন তাঁরা জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্যে কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। তাঁরা জনগণকে বলেঃ

‘‘দেখো নূহের কাণ্ড, সে তো তোমাদের মতই একজন মানুষ মাত্র। কিন্তু সে নিজেকে আল্লাহর রাসুল বলে দাবী করছে। আসলে ওসব কিছু নয়। সে এভাবে দেশের প্রধান নেতা এবং করতা হতে চায়। কোন মানুষ যে আল্লাহর রাসুল হতে পারে, এমন কথা তো বাপদাদার কালেও শুনি নি। আল্লাহ্‌ যদি আমাদের মাঝে কোন রাসুল পাঠাতেনই তবে নিশ্চয়ই কোন ফেরেশতা পাঠাতেন। তোমরা ওর কথায় কান দিও না। ওকে আসলে জীনে পেয়েছে।’’ (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ২৩-২৫)

এভাবে বৈষয়িক স্বার্থের ধারক এই নেতারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে দিলো। তাঁরা নূহের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলো। নূহ দিন রাত তাঁদের সত্য পথে আসার জন্যে ডাকতে থাকেন বুঝাতে থাকেন। নূহ তাঁদের আল্লাহর পথে আনবার জন্যে যে কী আপ্রান চেষ্টা করেছেন, তা আমরা নূহ (আঃ) এর কথা থেকেই জানতে পারি। তিনি মহান আল্লাহর কাছে তাঁর কাজের রিপোর্ট দিতে গিয়ে বলেনঃ

‘‘হে আমার প্রভূ, আমি আমার জাতির লোকদের দিনরাত ডেকেছি তোমার দিকে। কিন্তু আমার আহবানে তাঁদের এড়িয়ে চলার মাত্রা বেড়েই চলেছে। আমি যখনই তাঁদের ডেকেছি তোমার ক্ষমার দিকে, তাঁরা তাঁদের কানে আঙুল ঢেসে দিয়েছে। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে দিয়েছে। এসব অসদাচরনে তাঁরা অনেক বাড়াবাড়ি করে চলেছে। তাঁরা সীমাহীন অহংকারে ডুবে পড়েছে। পরে আমি তাঁদের উঁচু গলায় ডেকেছি। প্রকাশে দাওয়াত দিয়েছি। গোপনে গোপনেও বুঝিয়েছি। আমি তাঁদের বলেছি, তোমরা তোমাদের মালিকের কাছে ক্ষমা চাও। তিনি বড় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে পানি বর্ষণ করবেন। ধনমাল আর সন্তান দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন। তোমাদের জন্যে বাগবাগিচা সৃষ্টি করে দেবেন। নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবেন।” (সূরা ৭১ নূহঃ আয়াত ৫-১২)

নূহ তাঁদের বুঝালেন, কেন তোমরা আল্লাহর পথে আসবে না? তিনি তাঁদের বললেনঃ

“দেখনা, আল্লাহ্‌ কিভাবে স্তরে স্তরে সাতটি আকাশ বানিয়েছেন? চাঁদকে বানিয়েছেন আলো আর সূর্যকে প্রদীপ? আল্লাহই তো তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আবার তিনি এই মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেবেন। তারপর তোমাদের বের করবেন এই মাটি থেকেই। আল্লাহই তো পৃথিবীটাকে তোমাদের জন্যে সমতল করে বিছিয়ে দিয়েছেন, যাতে করে তোমরা উন্মুক্ত পথ ঘাট দিয়ে চলাচল করতে পার।” (সূরা ৭১ নূহঃ আয়াত ১৫-২০) এত করে বুঝাবার পরেও তাঁরা নূহের কথা শুনলনা। তাঁরা নিজেদের গোঁড়ামি আর অহংকারে অটল রইল। তাঁরা নূহকে বললোঃ

আমরা কেমন করে তোমার প্রতি ঈমান আনি? তোমার অনুসারী যে কয়জন হয়েছে, ওরা তো সব ছোট লোক। আমরা তোমাদেরকে আমাদের চাইতে বেশী মর্যাদাবান মনে করি না। বরং আমরা তোমাদের মিথ্যাবাদীই মনে করি।(সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ২৭)

তারা আর বললোঃ “আমরাতো তোমাকে দেখছি স্পষ্ট মিথ্যাবাদী।” (সূরা আল আরাফঃ আয়াত ৬০)

নূহ তাদের আবারো বুঝালেন, “হে আমার জাতির ভাইয়েরা, আমি মোটেও বিপথে চলছি না। আমি তো বিশ্বজগতের মালিকের বানীবাহক। আমি তো কেবল আমার প্রভূর বানীই তোমাদের কাছে পৌছে দিচ্ছি। আমি তো কেবল তোমাদেরই কল্যাণই চাই। আমি আল্লাহর পক্ষ এমন সব জিনিস জানি, যা তোমরা জানো না। হে আমার দেশবাসী, তোমরা একটু ভেবে দেখো, আমি যদি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া সুস্পষ্ট প্রমানের উপর থাকি আর তিনি যদি আমাকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহও দান করে থাকেন, কিন্তু তোমরা যদি তা না দেখতে পেলে, তবে আমার কি করবার আছে? তোমরা মেনে নিতে না চাইলে আমি তো আর তোমাদের উপর তা চাপিয়ে দিতে পারিনা। হে আমার ভাইয়েরা, আমি যে দিন রাত তোমাদের আল্লাহর পথে ডাকছি, তার বিনিময়ে তো আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাই না। আমি তো কেবল আল্লাহর কাছে এর বিনিময় চাই। এতেও কি তোমরা বুঝতে পারছোনা যে, তোমাদের ডাকার এ কাজে আমার কোন স্বার্থ নেই?” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৬১-৬২, সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ২৮-২৯)

এভাবে আল্লাহর মহান ধৈর্যশীল নবী হজরত নূহ (আঃ) কয়েক শত বছর পর্যন্ত তাদের আল্লাহর পথে ডাকেন। তাদের সত্য পথে আনার অবিরাম চেষ্টা করেন। ধ্বংস ও শাস্তির হাত থেকে তাদের বাঁচাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তাঁর এই মহৎ কাজের জবাব দেয় তিরস্কার, বিরোধিতা আর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। তাদের সমস্ত বিরোধিতা আর ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় হাজার বছর ধরে তিনি পরম ধৈর্যের সাথে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যান। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় তাদের বুঝাবার চেষ্টা করেন।

কিন্তু তাঁর হাজারো মর্মস্পর্শী আবেদন নিবেদনের পর তারা তাঁর কথা শুনলো না। আল্লাহর দ্বীন কবুল করলো না তারা। স্বার্থপর নেতারা জনগণকে বলে দিলোঃ “তোমরা কিছুতেই নূহের কথায় ফেসে যাবে না। তাঁর কথায় কোন অবস্থাতেই তোমরা দেব দেবীদের ত্যাগ করতে পারবেনা। ত্যাগ করতে পারবেনা ‘অদ্দ’ আর ‘শুয়া’ কে। ইয়াগুস, ইয়াউক আর নসরকেও পরিত্যাগ করতে পারবে না। এভাবে তারা অধিকাংশ জনগণকে সম্পূর্ণ বিপথগামী করে দিলো।” (সূরা ৭১ নূহঃ আয়াত ২৩-২৪)

শুধু কি তাই? বরং তারা এর চাইতেও বড় ষড়যন্ত্র করলো। কি সেই ষড়যন্ত্র? তাহলো, তারা আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) –কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো। কুরআনের ভাষায়- ‘ওয়া মাকারু মাকরান কুব্বারা’ – তারা এক বিরাট ষড়যন্ত্র পাকালো। (সূরা ৭১ নূহঃ আয়াত ২২) তারা নূহ (আঃ) কে অহংকারী ভাষায় শাসিয়ে দিলোঃ “নূহ, তুমি যদি বিরত না হও, তবে বলে দিচ্ছি, তুমি হতভাগ্যদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”১০ (সূরা ২৬ শুয়ারা” আয়াত ১১৬)

শুধু তাই নয়, তারা নূহ (আঃ) কে ধমকের সুরে আরো বললোঃ

“তুমি তো এতদিন আমাদের সাথে বড় বেশী বিবাদ করেছ। শুনো, তুমি যে আমাদের ধমক দিচ্ছিলে, তোমার কথা না শুনলে আমাদের উপর বিরাট শাস্তি নেমে আসবে, কোথায় সেই শাস্তি? তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে শাস্তিটা নিয়ে এসে দেখাও।” (সূরা হুদঃ আয়াত ৩২)

নূহ (আঃ) বললেন, দেখো তোমাদের শাস্তি দেয়া তো আমার কাজ নয়। সেটা আল্লাহর কাজ। তিনি চাইলে তোমাদের শাস্তি দেবেন। আর তিনি শাস্তি দিতে চাইলে টা তোমরা কিছুতেই আটকাতে পারবেনা। শুধু তাই নয়, তখন যদি আমিও তোমাদের কোন উপকার করতে চাই, করতে পারবোনা। আল্লাহর ফায়সালা পরিবর্তন করার সাধ্য কারো নাই।” (সূরা হুদঃ আয়াত ৩৩-৩৪)

এবার মহান আল্লাহ্‌ অহীর মাধ্যমে তাঁর প্রিয় দাস নূহকে জানিয়ে দিলেন, “হে নূহ, তোমার জাতির যে কয়জন লোক ঈমান এনেছে, তাদের পর এখন আর কেউ ঈমান আনবে না। সুতরাং তুমি তাদের কার্যকলাপে দুঃখিত হইও না।” (সূরা হুদঃ আয়াত ৩৬)

আল্লাহর বিচক্ষন বান্দাহ ও নবী হজরত নূহ (আ) এটাকে তাঁর অবাধ্য ও চরম অধপতিত জাতির উপর অচিরেই আল্লাহর আজাব আসবার সবুজ সংকেত মনে করলে। তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন, “আমার প্রভূ, তুমি এই কাফিরগুলির একজনকেও বাঁচিয়ে রেখো না। তুমি যদি তাদের ছেড়ে দাও, তাহলে তারা তোমার বান্দাদেরকে বিপথগামী করে ছাড়বে। আর তাদের ঔরসের প্রজন্মও দূরাচারী আর কাফিরই হবে। হে প্রভূ, তুমি আমাকে আর আমার বাবা মাকে মাফ করে দাও। আর সেসব নারী পুরুষকেও মাফ করে দাও, যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করেছে।” (সূরা ৭১ নূহঃ আয়াত ২৬-২৮)

 নূহ আরও বললেন, “প্রভূ, এই লোকগুলির মোকাবেলায় তুমি আমাকে সাহায্য করো। ওরা আমাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করছে। আমাকে অস্বীকার করছে। এখন আমার আর তাদের মাঝে তুমি চুড়ান্ত ফায়সালা করে দাও। তবে আমাকে আর আমার সাথী মুমিনদের তোমার পাকড়াও থেকে বাঁচাও। ১১ (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ২৬, সূরা ২৬ শুয়ারা” আয়াত ১১৭-১১৮)

আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এবার চুড়ান্ত একটা ফায়সালা হয়ে যাবে। কী সেই ফায়সালা? ফায়সালাটা হলো, আল্লাহ্‌ নূহের জাতির এই দুষ্ট লোকগুলিকে ধ্বংস করে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। এটাই আল্লাহর নিয়ম। কোন জাতি বিপথগামী হলে, আল্লাহ্‌ তাদের সত্য পথ দেখানোর জন্যে নবী বা সংশোধনকারী পাঠান। নবীরা তাদের সত্য পথে আনার জন্যে সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালান। অসৎ লোকদের সাংঘাতিক বিরোধিতাড় মূখেও তাঁরা জনগণকে সংশোধন করবার চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যান। কিন্তু তাদের সকল চেস্টার পরও যখন আল্লাহ্‌ বাস্তবে দেখে নেন যে, এই লোকগুলি আর সত্য পথে আসবে না। তখন তিনি তাদের ধ্বংস করে দেন। নূহ (আঃ) এর জাতির বাস্তব অবস্থাও তাই ছিলো। আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) হাজার বছর ধরে তাদের আল্লাহর পথে আনার চেষ্টা করেন। দিনরাত তিনি তাদের বুঝান। গোপনে গোপনে বুঝান। জনসভা, আলোচনা সভা করে বুঝান। তারা শুনতে চায় না, তবু তিনি জোড় গলায় তাদের ডেকে ডেকে বুঝান। তাঁকে দেখলে তারা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিত। তিনি কথা বলতে গেলে তারা কানে আঙ্গুল চেপে ধরত। হাজারো রকমের তিরস্কার তারা তাঁকে নিয়ে করতো। বলত এতো ম্যাজেসিয়ান। কিন্তু তিনি তাদের সত্য পথে আনার অবিরাম চেষ্টা সাধনা চালিয়েই যান। কিছু যুবক অবশ্য ঈমান আনে। কিন্তু জাতির সর্দার নেতারা পরবর্তী সময়ে জনগনের আল্লাহর পথে আসার সকল পথ বন্ধ করে দেয়। তখন তারা সবাই আল্লাহর চরম বিরোধী হয়ে যায়। তাদের সত্য পথে আসার আর কোন সম্ভাবনাই আর বাকী থাকে না। এমনকি তারা আল্লাহর নবীকে হত্যা করার পর্যন্ত ষড়যন্ত্র করে। অবশেষে আলাহ তাদের পৃথিবী থেকে ধ্বংস করার ফায়সালা করেন। তিনি নূহ (আ)-কে নির্দেশ দেন, “নূহ, আমার তদারকীতে তুমি একটি নৌযান তৈরি করো।”১২ (সূরা হুদঃ আয়াত ৩৭)

আল্লাহ্‌ নূহ (আ)-কে আর বলে দিলেন, “চুলা ফেটে যখন পানি উঠবে, তখন তুমি নৌযানের মধ্যে সব রকমের জীবজন্তু এক জোড়া এক জোড়া করে উঠাবে। তবে তাদের উঠাবেনা যাদের ব্যাপারে আমি ফায়সালা দিয়ে দিয়েছি, যে তারা ডুবে মরবে।”১৩ (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ২৭)

আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তৈরি করতে লাগলেন এক বিশাল নৌযান। জাতির অসৎ নেতারা যখন সেখান দিয়ে যাতায়াত করতো, তারা নৌযান তৈরি নিয়েও নূহের প্রতি বিদ্রুপ করতো। তারা তাঁকে তিরস্কার করতো।”১৪ (সূরা হুদঃ আয়াত ৩৮) আসলে তাদের আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি ঈমানই ছিলো না। তারপর কি হলো? তারপর একদিন নৌযান তৈরি শেষ হলো। নূহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর? এরপর একদিন হঠাৎ দেখা গেলো চুলা ফেটে মাটির নিচ থেকে অনর্গল পানি বেরুতে লাগলো। নূহ (আঃ) বুঝতে পারলেন আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে। নূহ ঈমানদারদের ডেকে বললেন, তোমরা জলদি করে নৌযানে ওঠে পড়ো। তিনি তারাতারি করে সমস্ত ঈমানদার লোকদের নৌযানে তুলে দিলেন। সব রকমের জীব জন্তু একেক জোড়া তুলে নিলেন। দুজন ছাড়া তাঁর পরিবারের সকলকে তুলে নিলেন।

কে সেই দু’জন? এদের একজন নূহ (আঃ) এর স্ত্রী। এই মহিলা কিন্তু বাপদাদার জাহেলি ধর্ম অনুসারীদের পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে আল্লাহও তাঁকে প্লাবনের পানিতে ডুবিয়ে মারলেন। আরেক জন কে? আরেকজন হলো স্বয়ং নূহ (আঃ) এর হতভাগ্য পুত্র। সেও ঈমান আনে নি। নির্দেশমতো সবাই যখন নৌযানে উঠে গেল, তখন কি হলো? দেখতে দেখতে তখন ঘটে গেল এক অবাক কাণ্ড। চারিদিকে যমিন ফেটে সৃষ্টি হলো অসংখ্য ঝর্ণাধারা। প্লাবনের বেগে মাটির নিচে থেকে উঠতে শুরু করলো পানি আর পানি। সাথে সাথে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। নিচে থেকেও উঠছে পানি। উপর থেকেও পড়ছে পানি। চারিদিকে পানি আর পানি। পানির উপরে ভাসতে শুরু করলো নৌযান। নূহ (আঃ) দোয়া করলেনঃ

“আল্লাহর নামে শুরু হচ্ছে এর চলা আর আলাহর নামেই থামবে এ নৌযান। আমার প্রভূ অবশ্যি অতিশয় ক্ষমাশীল দয়াময়।” (সূরা হুদঃ আয়াত ৪১)

অদূরেই নূহের কাফির পুত্রটি দাঁড়িয়ে ছিলো। নূহ দেখলেন, পাহারের মতো উঁচু হয়ে এক বিরাট ঢেউ এগিয়ে আসছে। তিনি চিৎকার করে ছেলেকে ডেকে বললেন, এখনো সময় আছে ঈমান এনে আমাদের সাথী হয়ে যা। কাফিরদের সাথী হইসনে। এক্ষুনি ডুবে মরবি।”

অসৎ ছেলেটি বললোঃ “আমি পাহাড়ে উঠে যাবো, পানি আমাকে কিছুই করতে পারবেনা।” নূহ (আঃ) বললেন- একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আজ কেঊ রক্ষা পাবে না।” এরি মধ্যে এক বিরাট ঢেঊ এসে ছেলেকে তলিয়ে নিয়ে গেলো।১৫ (সূরা হুদঃ আয়াত ৪২-৪৩)

আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, নবীর পথে না চলার পরিনতি কতো ভয়াবহ। ঈমানের পথে না এলে নবীর ছেলে হলেও আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। নবীর স্ত্রী হলেও মুক্তি পাওয়া যায়না। দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির একমাত্র পথ হলও ঈমানের পথ, নবী দেখানো পথ। এরপর ঘটনা কি হলো? এরপর পানিতে সমস্ত কিছু ভেসে গেলো। বড় বড় পাহাড় পানির মধ্যে তলিয়ে গেলো। দিন যায়, রাত আসে। মাস যায়, মাস আসে। আকাশ আর পাতালের পানিতে পৃথিবী তলিয়েই চলেছে। নূহ (আঃ) এর নৌযানের মানুষ আর প্রাণীগুলো ছাড়া সমস্ত জীবজন্তু মরে শেষ। একটি মানুষও আর বেঁচে নেই। সব দুষ্ট লোক আর আল্লাহর নবীর শত্রুরা ধ্বংস হয়ে শেষ হয়ে গেছে। আল্লাহ্‌ তায়ালা এভাবে তাঁর প্রিয় নবী নুহ (আঃ) ও তাঁর সাথীদেরকে রক্ষা করলেন যালিমদের অত্যাচার ষড়যন্ত্র থেকে। তাই তিনি নূহ (আঃ)- কে নির্দেশ দিলেন এই ভাষায় শোকর আদায় করতেঃ

“শোকর সেই মহান আল্লাহর, যিনি যালিমদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।” (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ২৮)

সেই সাথে আল্লাহ্‌ নূহ (আ)-কে এই দোয়া করতেও নির্দেশ দিলেনঃ

“প্রভূ, আমাকে বরকতপূর্ণ স্থানে অবতরন করাও, আর তুমিইতো সর্বোত্তম স্থানে অবতরন করিয়ে থাকো।” (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ২৯)

অবশেষে আলাহ একদিন হুকুম দিলেনঃ “হে পৃথিবী সমস্ত পানি গিলে ফেলো, হে আকাশ বর্ষণ বন্ধ করো।’’১৬ (সূরা হুদঃ আয়াত ৪৪)

মহান আল্লাহর নির্দেশে আকাশ পানি বর্ষণ বন্ধ করলো। পৃথিবী তাকে ডুবিয়ে রাখা সমস্ত পানি চুষে খেয়ে ফেললো। তারপর কি হলো? তারপর নূহ (আঃ) এর নৌযানটি জুদি১৭ (সূরা হুদঃ আয়াত ৪৪) পাহাড়ের চুড়ায় এসে ঠেকলো। জুদি পাহাড় কোথায় জানেন? আর্মেনিয়া থেকে কুর্দিস্তান পর্যন্ত রয়েছে এক দীর্ঘ পর্বতমালা। এই পর্বতমালারই একটি নাম হলো জুদি পর্বত। এটি কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইবনে উমর দ্বীপের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। মুসলমানরা হজরত উমর (রাঃ) এর খিলাফত আমলে যখন ইরাক ও আল জাজিরা বিজয় করেন, তখন মুসলিম সৈনিকদের অনেকেই জুদি পাহাড়ের উপর নূহ (আঃ) এর নৌযান দেখতে পান।

নৌযান জুদি পর্বতে ঠেকার পর কি হলো? এবার আল্লাহ্‌ নির্দেশ দিলেনঃ “হে নূহ, নেমে পড়ো। নেমে আসো পৃথিবীতে। এখন থেকে তোমার প্রতি আর তোমার সংগী সাথীদের প্রতি আমার নিকট হইতে রইলো শান্তি আর প্রাচুর্য।”১৮ (সূরা হুদঃ আয়াত ৪৮)

তাঁরা নেমে আসেন পৃথিবীতে। সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকেন আল্লাহর অনুগত দাস হিসেবে। এভাবেই আল্লাহ্‌ সৎ লোকদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে দেন পৃথিবীর বুকে।

সবশেষে কয়েকটি খবর জানিয়ে দিচ্ছি

১। কুরআনে নূহ (আঃ) এর নাম উচ্চারিত হয়েছে তিতাল্লিশ বার।

২। যে সব সুরায় নূহের কথা ও কাহিনী উল্লেখ হয়েছে। সেগুলো হলোঃ আলে ইমরান, আনয়াম, নিসা,আরাফ, তাওবা, ইউনুস, হুদ, ইবরাহীম, বনি ইসরাইল, মরিয়ম, আম্বিয়া, হজ্জ, মুমিনুন, ফুরকান, শুয়ারা, আন কাবুত, আহযাব, সাফফাত, সোয়াদ, মুমিন, শুরা, কাফ, যারিয়াত, নাজম, কামার, তাহরীম, নূহ।

৩। নূহ (আঃ) এর কাহিনী বিস্তারিত জানা যাবে সূরা আরাফ, হুদ, মুমিনুন, শোয়ারা এবং নূহে।

 

৪।

আদ জাতির নবী হুদ (আঃ)

নূহ (আঃ) এর পরে

আমরা আগেই জেনেছি, নূহ (আঃ) এর সময় আল্লাহ্‌ তাঁর দ্বীনের শত্রুদের প্লাবন দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। বাঁচিয়ে রেখেছিলেন কেবল হযরত নুহ (আঃ) আর তাঁর ঈমানদার সাথিদের। এই বেঁচে থাকা মুমিনরা আর তাদের বংশধরেরা অনেকদিন আল্লাহর বিধান আর নবীর আদর্শ মাফিক জীবন যাপন করেন।

কিন্তু দীর্ঘদিন পর লোকেরা আবার ভুল পথে চলতে শুরু করে। তাঁরা নবীর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে বহু মনগড়া খোদা বানিয়ে নেয়। এমনি করে তাঁরা ডুবে পড়লো শিরক আর মূর্খতার অন্ধকারে।

আদ জাতি

সেকালে আরবের সবচে’ শক্তিশালী জাতি ছিলো আ’দ জাতি। ইয়েমেন, হাজরামাউত ও আহকাফ অঞ্চল নিয়ে এরা এক বিরাট রাজ্য গড়ে তুলেছিলো। তাদের ছিলো অগাধ দৈহিক শক্তি আর ছিলো বিরাট রাজশক্তি। তাঁরা গড়ে তুলেছিলো বড় বড় শহর, বিরাট বিরাট গম্বুজধারী অট্টালিকা আর বিলাস সামগ্রী। নূহ (আঃ) এর পর আল্লাহ্‌ তায়ালা আ’দ জাতিকে ক্ষমতা প্রদান করেন। তাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি বানান। নিজের অপার অনুগ্রহে তাদের চরম উন্নতি দান করেন। ফলে গোটা আরবের উপর চলতে থাকে তাদের দাপট। কিন্তু এ উন্নতির ফলে তাঁরা গর্ব ও অহংকারে নিমজ্জিত হয়। নূহ (আঃ) এর দেখানো পথ থেকে তাঁরা দূরে সরে যায়। মহান আল্লাহকে ভুলে গিয়ে তাঁরা নিজেদের স্বার্থে বহু মনগড়া খোদা বানিয়ে নেয়। নূহ (আঃ) এর তুফানের পর তারাই সর্বপ্রথম মূর্তি পূজা শুরু করে। তাদের জাতীয় নেতাগন ছিলও যালিম, স্বৈরাচারী। জনগনকে তাঁরা নিজেদের হুকুমের দাস বানিয়ে নিয়েছিলো। তাঁরা এতই অহংকারী হয়ে উঠেছিলো যে, কাউকেই পরোয়া করতো না। তাঁরা ঘোষনা করলো, “আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে?” (সূরা ৪১ হামিম আস সিজদাঃ আয়াত ১৫)

অথচ তাঁরা ভুলে গেলো যে, আলাহই সর্বশক্তিমান। আল্লাহই তাদের এতো উন্নতি দান করেছেন।

মুক্তির বার্তা নিয়ে এলেন হুদ

আদ জাতীকে সুপথ দেখাবার জন্যে আল্লাহ্‌ তাদের মাঝে একজন নবী পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেন। এ জাতির সবচে’ ভালো লোক হুদকে আল্লাহ্‌ তাদের নবী মনোনীত করেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ “আমি আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে রাসুল বানিয়ে পাঠালাম। হুদ আমার বানী পেয়ে তাঁর জাতির লোকদের ডেকে বললোঃ

“হে আমার জাতির ভাইয়েরা, তোমরা আল্লাহর হুকুম পালন করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তোমরা কি তোমাদের পাপ কাজের অশুভ পরিনতির ভয় করো না?” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৬৫)

আল্লাহর নবী হুদ (আঃ) তাদের বুঝালেন-

“ভাইয়েরা আমার, তোমরা তোমাদের দয়াময় প্রভূর কাছে ক্ষমা চাও। তাঁর দিকে ফিরে এসো। তাহলে তিনি তোমাদের বৃষ্টি বর্ষীয়ে পানি দেবেন। তোমাদের বর্তমান শক্তিকে আরো শক্তিশালী করবেন। দেখো। তোমরা অপরাধীদের মতো তাঁকে উপেক্ষা করো না।” (সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ৫২)

দরদভরা হৃদয় নিয়ে হজরত হুদ তাদের আর বললেনঃ

“তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করবে না? দেখো, আমি তোমাদের জন্যে একজন বিশ্বস্ত রাসুল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো। আর আমার কথা মেনে চলো। আমি যে তোমাদের বুঝাবার এতো চেষ্টা করছি, এর বিনিময়ে আমি তো তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাইনা। এতে কি তোমরা বুঝতে পারছো না, এ কাজে আমার কোন স্বার্থ নেই? আমিতো কেবল তোমাদের কল্যাণ চাই। আমাকে প্রতিদান দেবেন তো আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন।” (সূরা ২৬ শুয়ারা” আয়াত ১২৪-১২৭)

হুদ (আঃ) তাঁদের আরো বুঝালেনঃ

“তোমাদের এ কি হলো? প্রতিটি স্থানেই কেন তোমরা অর্থহীন স্মারক ইমারত (ভাস্কর্য) বানাচ্ছো? কেনই বা এতো অট্টালিকা গড়ে তুলছো? এগুলো কি তোমাদের চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে ভাবছো? তোমরা যখন কাউকেও পাকড়াও করো, তখন কেন নির্বিচারে অত্যাচারীর ভূমিকা পালন করো? এবার এসো আল্লাহকে ভয় করো আর আমার কথা মেনে নাও। সেই মহান প্রভূকে ভয় করো যিনি তোমাদের সবকিছুই দিয়েছেন। তোমরাতো জানোই তিনি তোমাদের দিয়েছেন অগনিত পশু, অসংখ্য সন্তান-সন্তুতি। দিয়েছেন কতোনা বাগ-বাগিচা, নদ-নদী, ঝর্ণাধারা। তোমাদের ব্যাপারে এক গুরতর দিনের শাস্তির আশংকা আমি করছি।” (সূরা ২৬ শুয়ারাঃ আয়াত ১২৮-১৩৫)

এভাবে হুদ (আঃ) তাঁর জাতির লোকদেরকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করেন। তাঁদের তিনি মহান প্রভূ আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। বস্তুগত উন্নতির আল্লাহকে ভুলে থাকতে নিষেধ করেন। পরকালের খারাপ পরিনতির কথা তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁদের ক্ষমা চাইতে বলেন। আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে বলেন। আল্লাহর হুকুম পালন করতে এবং নবীর পথে চলতে বলেন। তিনি তাঁদের বলেনঃ এটাই পার্থিব কল্যাণ আর পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথ।

নেতারা নবীর প্রতিপক্ষ হলো

এতো আন্তরিক আহবান আর কল্যাণময় উপদেশ সত্ত্বেও আদ জাতি নবীর কথা শুনলো না। আল্লাহর পথে এলো না। দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করতে পারলো না। উল্টো তাঁরা নবীর সাথে বিতর্ক শুরু করলো। তাঁদের শাসকরা নবীকে বললোঃ

“আমরা মনে করি তুমি বোকা। তোমার কোন বুদ্ধি নেই। তাছাড়া আমাদের ধারনা, তুমি এসব মিথ্যা কথা বলছো।” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৬৬)

তাঁরা আল্লাহর রাসুলকে আরো বললোঃ

“তোমার উপদেশ আমরা মানিনা। তোমার এসব উপদেশ সেকেলে লোকদের অভ্যাস ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে আমাদের উপর কোন শাস্তিই আসবে না।” (সূরা ২৬ শুয়ারাঃ আয়াত ১৩৬-১৩৮)

তাঁদের প্রতিবাদের জবাবে আল্লাহর নবী বললেনঃ

“হে আমার জাতির ভাইয়েরা, আমি কোন বোকা নির্বোধ ব্যাক্তি নই। বরং আমি বিশ্ব জগতের মালিক মহান আল্লাহর রাসুল। আমিতো কেবল তোমাদের কাছে মহান আমার আল্লাহর বার্তাই পৌছে দিচ্ছি। আর আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত কল্যাণকামী। ” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৬৭-৬৮)

হজরত হুদ তাঁদের আর বললেনঃ

“তোমাদের সতর্ক করার জন্যে তোমাদের জাতিরই এক ব্যাক্তির কাছে তোমাদের প্রভূর পক্ষ থেকে ‘উপদেশ বার্তা’ এসেছে বলে কি তোমরা বিস্মিত হচ্ছো? স্মরণ করো নূহের জাতির পর আল্লাহ্‌ তো তোমাদেরকেই পৃথিবীর প্রতিনিধি বানিয়েছেন। তোমাদের জনবল ও দেহবলের অধিকারী করেছেন। সুতরাং আল্লাহর দানশীলতাকে স্মরণ রেখো। আশা করা যায়, তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে। ” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৬৯)

পার্থিব কায়েমি স্বার্থ আর শয়তানের ধোঁকা আদ জাতির নেতাদের প্রতারিত করলো। তাঁরা আল্লাহর নবীকে বললোঃ

“হে হুদ, তুমি কি এ জন্যে নবী হয়ে এসেছো যে, আমরা কেবল এক খোদার ইবাদাত করবো আর আমাদের বাপদাদারা যে সব মা’বুদের (দেব দেবীর) পূজা করতো, তাঁদের ত্যাগ করবো? তুমি তো আমাদের কাছে কোন দলিল প্রমান নিয়ে আসো নি। আমরা কখনো তোমার কোথায় আমাদের খোদাগুলোকে ত্যাগ করবোনা। আমরা বলছি, আমাদের খোদাদের কোন একটির গজব তোমার উপর আপতিত হয়েছে।” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৭০, সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ৫৩-৫৪)

এবার আল্লাহর নবী হুদ (আঃ) তাঁদের বললেনঃ

“তোমাদের উপর তোমাদের মালিক আল্লাহর অভিশাপ আর গজব এসে পড়েছে। তোমরা কি আমার সাথে সেই সব মনগড়া খোদাদের ব্যাপারে বিতর্ক করছো, যেগুলোর নাম তৈরি করেছো তোমরা নিজেরা আর তোমাদের বাপ দাদারা? অথচ সেগুলোর পক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রমান নেই। তোমরা যদি আমার কথা না শোনো, তবে অপেক্ষা করতে থাকো। আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি। ” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৭১)

হজরত হুদ (আঃ) এর দীর্ঘ দাওয়াতের ফলে জনগনের মধ্যে একটা নাড়া পড়েছিল। তাঁরা শিরক করছিলো ঠিকই কিন্তু আল্লাহকে তাঁরা জানতো। আর হুদ (আঃ) যেহেতু তাঁদের আল্লাহর দিকেই ডাকছিলেন, সুতরাং তাঁর দাওয়াতের একটা বিরাট প্রভাব জনগনের উপর পড়ছিল। তাই জনগণ হজরত হুদের প্রতি ঈমান এনে ফেলতে পারে এই ভয়ে ক্ষমতাসীন শাসক ও নেতারা ময়দানে নেমে এলো। জনসভা করে তাঁরা হজরত হুদ (আঃ) এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উপস্থাপন করতে লাগলো। তাঁরা জনগণকে বললোঃ

“এ ব্যাক্তি তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। তোমরা যা খাও, সেও তাই খায়। তোমরা যা পান করো, সেও তাই পান করে। কেমন করে সে নবী হতে পারে? তবে তাঁর কথা মেনে নিলে তোমাদের দারুন ক্ষতি হবে। হুদ যে তোমাদের বলছে, তোমরা যখন মরে গিয়ে মাটির সাথে হাড়-গোড়ে পরিণত হবে, তখন তোমাদের আবার কবর থেকে বের করে আনা হবে। তাঁর এই অঙ্গীকার অসম্ভব। আমাদের এই পৃথিবীর জীবনটাই তো একমাত্র জীবন। আমাদের মরন বাচন সব এখানেই শেষ। আসলে আমাদের আর কখনো উঠানো হবে না। আল্লাহর নাম নিয়ে হুদ মূলতঃ মিথ্যে বলছে। আমরা তাঁর কথা মানি না। ”(সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ৩৩-৩৮)

কিছু লোক ঈমান আনলো

বিবেকবান লোকদের মনে সত্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হলেও যালিম অত্যাচারী শাসকদের ভয়ে তাঁরা সত্য গ্রহন করতে এগিয়ে আসেনি। কেবল কিছু সংখ্যক সাহসী যুবক যুবতীই আল্লাহর পথে এগিয়ে এলো। তাঁরা নবীর সাথি হলো। জীবন বাজী রেখে তাঁরা আল্লাহর পথে কাজ করতে থাকলো। এখন জাতি সুস্পষ্টভাবে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো। এক পক্ষে রয়েছেন আল্লাহর নবী আর তাঁর সাথী একদল যুবক যুবতী। গোটা জাতির তুলনায় এদের সংখ্যা ছিলো খুবই কম। প্রতিপক্ষে ছিল শাসক গোষ্ঠী আর ঐ সব লোক, বাতিল সমাজের সাথে জড়িয়ে ছিলো যাদের স্বার্থ। নবীর নেতৃত্বে এ সমাজ ভেঙ্গে নতুন সমাজ গঠিত হলে এদের স্বার্থ নষ্ট হবে বলে এরা সবাই নবী ও নবীর সাথীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললো।

সময় ঘনিয়ে এলো

আল্লাহর নবী হুদ (আঃ) অবশেষে তাঁদের চরম বিরোধিতা ও প্রতিরোধের মোকাবেলায় বলে দিলেনঃ “আমি তোমাদের সামনে সাক্ষী হিসেবে স্বয়ং আল্লাহকেই পেশ করছি। আর তোমরা সাক্ষী থাকো, আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতায় তোমরা যাদের অংশীদার বানাচ্ছো আমি তাঁদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছি। তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে যা করার করো। আমার ভরসা তো মহান আল্লাহর উপর। তিনি আমারো মালিক, তোমাদেরও মালিক। সমস্ত জীবের ভাগ্য নিয়ন্তা তো তিনিই। তিনি যা করেন, তাই সঠিক। ” (সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ৫৪-৫৬)

হজরত হুদ তাঁদের আর বলে দিলেনঃ

“তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নিতে চাও, নাও। কিন্তু জেনে রেখো, আল্লাহ্‌ আমাকে যে বার্তা নিয়ে পাঠিয়েছেন তা আমি তোমাদের কাছে পুরোপুরি পৌছে দিয়েছি। এখন আমার প্রভূ তোমাদের স্থলে অন্য জাতিকে বসাবেন এবং তোমরা তাঁর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। ” (সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ৫৭)

অতঃপর সবধরনের চেষ্টা শেষ করার পর হজরত হুদ (আঃ) যখন দেখলেন এদের সৎ পথে আসার আর কোন সম্ভাবনা নাই, তখন মনে বড় কষ্ট নিয়ে তিনি দোয়া করলেনঃ

“আমার প্রভূ, এরা তো মিথ্যা বলে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন তুমিই আমাকে সাহায্য করো। ” (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ৩৯)

জবাব এলোঃ

“ অচিরেই এরা নিজেদের কৃতকর্মের (নিষ্ফল) অনুশোচনা করবে। ” (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ৪০)

ধ্বংস হলো আ’দ জাতি

আল্লাহর নবী হুদ (আঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে সংকেত পেলেন যে, তিনি এখন এ জাতিকে ধ্বংস করে দেবেন। বড় মনোবেদনার সাথে তিনি তাঁদের জানিয়ে দিলেনঃ “আল্লাহর রোষ এবং আযাব তোমাদের জন্যে অবধারিত হয়ে পড়েছে। ” জাতির শাসকরা অহংকার করে বললো, “আমাদের চাইতে শক্তিশালী আর কে আছে? ” তাঁরা হজরত হুদকে আরো বললো- “তুমি যে আমাদের শাস্তি দেয়ার অংগীকার করছো, তুমি সত্যবাদী হলে সেই শাস্তি দিয়ে দেখাও। ”

অবশেষে তাঁদের উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়লো। উপত্যকার দিক থেকে আযাব তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছিলো। তাঁরা বললো- এতো মেঘ, অনেক বৃষ্টি হবে। হুদ বললেনঃ

“এই সেই অংগীকার, যার জন্যে তোমরা তাড়াহুড়ো করছিলে। এটা প্রচণ্ড ঝড়। এতে রয়েছে চরম যন্ত্রনাদায়ক আযাব। এটা প্রতিটা বস্তুকে ধ্বংস করে রেখে যাবে। ” (সূরা ৪৬ আহকাফঃ আয়াত ২৪)

অল্প পরেই ধেয়ে এলো মেঘ। ধ্বংস করে দিয়ে গেলো সব কিছু। ধ্বংস হয়ে গেলো আল্লাহদ্রোহী শক্তি। আল কুরআনে তাঁদের ধংশের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

“আর আ’দ জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে ঠাণ্ডা ঝড় বায়ু দিয়ে। সে বায়ু তিনি তাঁদের উপর দিয়ে চালিয়ে দেন একাধারে সাত রাত আট দিন। অতঃপর সেখানে তাঁরা চিৎপাত হয়ে পড়ে থাকলো যেন উপড়ানো খেজুর গাছের কাণ্ড। কোন পাপীই তা থেকে রক্ষা পায়নি। ” (সূরা ৬৯ আল হাক্কাহঃ আয়াত ৬-৮)

“এক বিকট ধ্বনি এসে তাঁদের পাকড়াও করলো। আর আমি তাঁদের ধ্বংস করে দিলাম খড় কুটোর মতো। ” (সূরা আল মুমিনুনঃ আয়াত ৪১)

এভাবে ধ্বংস হয়ে গেলো তৎকালীন বিশ্বের মহা শক্তিশালী আ’দ জাতি। আল্লাহ্‌ তাঁদের ধ্বংস করে দিলেন, ধ্বংস করে দিলেন তাঁদের দেশ ও সুরম্য শহর। ধূলিস্যাত হয়ে গেলো তাঁদের অহংকার। বিরান হয়ে গেলো তাঁদের জনবসতি। তাঁদের শহর ‘আহকাফ’ এখন এক বিরাট মরুভূমি। এখনো সেই ভূতুরে মরুভূমি অতিক্রম করতে লোকেরা ভয় পায়। শোনা যায়, সেই মরুভূমিতে যা কিছু পড়ে সবই তলিয়ে যায়।

প্রাচীনকালে এতই নাম করা ছিলও যে, এখনো লোকেরা তাঁদের নাম অনুযায়ী যে কোন প্রাচীন জাতিকে ‘আদি জাতি’, ‘আদি বাসী’ বলে থাকে। প্রাচীন ভাষাকে ‘আদি ভাষা’ বলে থাকে। এতো প্রতাপশালী একটি জাতিকেও মহান আল্লাহ্‌ ধ্বংস করে দিলেন তাঁর আয়াতকে অস্বীকার করা ও তাঁর নবীকে অমান্য করার ফলে। তাঁদের ধ্বংসের ইতিহাসের মধ্যে পৃথিবীর সকল জাতির জন্যেই রয়েছে উপদেশ।

হজরত হুদ ও তাঁর সাথিরা বেঁচে গেলেন

কিন্তু এই সর্বগ্রাসী ধ্বংস থেকে আল্লাহ্‌ হুদ (আঃ) ও তাঁর সাথিদের (ঈমানদার) বাঁচিয়ে দিলেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“ যখন আমার হুকুম এসে গেলো, তখন আমি নিজ রহমতে হুদ ও তাঁর সাথে ঈমান গ্রহনকারীদের রক্ষা করলাম আর এক কঠিন আযাব থেকে তাঁদের বাঁচালাম। ” (সূরা ১১ হুদঃ আয়াত ৫৮)

আযাব আসার পূর্বক্ষণে আল্লাহ্‌ পাকের নির্দেশে হুদ (আঃ) তাঁর সাথিদের নিয়ে নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নেন। এভাবেই আল্লাহ্‌ তাঁদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। মহান আল্লাহ্‌ আ’দ জাতির যে সব পাপিষ্ঠদের ধ্বংস করে দিয়েছেন, তাঁরা ছিলো প্রথম আ’দ। ” (সূরা ৫৩ আন নাজমঃ আয়াত ৫০)। আর হজরত হুদ (আঃ) এর সাথে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন দ্বিতীয় আ’দ। পরবর্তীকালে এই দ্বিতীয় আদ’ই আবার বড় আকার ধারন করে।

হুদ (আঃ) কিসের দাওয়াত দিয়েছেন?

হুদ (আঃ) তাঁর জাতিকে কি দাওয়াত দিয়েছেন? আসুন কুরআন মাজীদ দেখি। কুরআন বলে হজরত হুদ (আঃ) তাঁর জাতিকে বলেছিলেনঃ

১। হে আমার জাতি, তোমরা কেবল এক আল্লাহর হুকুম পালন করো।

২। আল্লাহ্‌ ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নাই।

৩। নিজেদের অপরাধের জন্যে তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।

৪। তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এসো।

৫। আমি তো কেবল আমার প্রভূর বার্তা তোমাদের কাছে পৌছে দিচ্ছি।

৬। আমি কেবল তোমাদের কল্যাণ চাই।

৭। আমি বোকা নই আমি আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের রাসুল।

৮। কল্যাণ চাও তো মহান আল্লাহর দান সমূহকে স্মরণ করো।

৯। আমার প্রভূ সঠিক পথে পরিচালিত করেন।

১০। সমস্ত প্রানীর ভাগ্য আল্লাহর হাতে।

১১। আমি আমার মালিক ও তোমাদের মালিক আল্লাহর উপর ভরসা রাখি।

১২। তোমরা বিবেক খাটিয়ে চলো।

১৩। তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ্‌ অন্য কোন জাতিকে তোমাদের স্থানে বসাবেন।

১৪। আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতায় তোমরা যাদের শরীক করছো, আমি তাঁদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছি।

১৫। আমি তোমাদের জন্যে একজন বিশ্বস্ত রাসুল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমার আনুগত্য করো।

১৬। আমি তোমাদের উপর এক কঠিন দিনের শাস্তির ভয় করছি।

১৭। মহান আল্লাহই সমস্ত জ্ঞানের উৎস।

১৮। এ কাজের বিনিময়ে আমি তোমাদের কছে কোন প্রতিদান চাই না। আমাকে প্রতিদান দেয়ার দায়িত্ব মহান আল্লাহর। (হুদ আলাইহিস সালামের এই আহবানগুলি কুরআন থেকে নেয়া হয়েছে)

কুরআনে হজরত হুদ ও আ’দ জাতির উল্লেখ

কুরআন মাজীদে হিজরত হুদ (আঃ) এর নাম উল্লেখ আছে সাত বার। আ’দ জাতির নাম উল্লেখ হয়েছে চব্বিশ বার। হুদ (আঃ) এর নাম উল্লেখ হয়েছে সূরা আ’রাফ আয়াত ৬৫ ; হুদ আয়াত ৫০,৫৩,৫৮,৬০, ৮৯ এবং সূরা শোয়ারা; আয়াত ১২৪। হজরত হুদ হজরত হুদ (আঃ) ও আ’দ জাতির কথা উল্লেখ যে সব সুরায় – সূরা আরাফ, সূরা তাওবা, সূরা হুদ, সূরা ইবরাহীম, সূরা হাজ্জ, সূরা শোয়ারা, সূরা ফুরকান, সূরা আনকাবুত, সূরা সোয়াদ, সূরা মুমিনুন, সূরা হামিম আস সিজদা, সূরা আহকাফ, সূরা কাফ, সূরা যারিয়াত, সূরা আন নাজম, সূরা আল কামার, সূরা আলহাক্কাহ এবং সূরা আল ফজরে। এসব সূরা থেকেই হজরত হুদ (আঃ) এর জীবন কথা লেখা হলো।

৫।

সামুদ জাতির নবী সালেহ

(আঃ)

আগেই বলেছি নবীকে অমান্য করার ফলে কি ভয়াবহ ধ্বংস নেমে এসেছিলো আ’দ জাতির উপর। সে জাতি অহংকারী লোকেরা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। বেঁচে থাকেন কেবল হজরত হুদ (আঃ) আর তাঁর গুটি কয়েক অনুসারী। এঁরা এবং এদের সন্তানরা অনেক দিন আল্লাহর পথে চলতে থাকেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা মহান আল্লাহকে ভুলে যেতে থাকে। পার্থিব মোহ তাঁদের বিপথে পরিচালিত করে। দুনিয়ার আকর্ষণ তাঁদের পরকালীন সাফল্যের কথা ভুলিয়ে রাখে। ফলে পার্থিব উন্নতির জন্যে তাঁরা নবীর পথ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সুবিধা ভোগীরা সমাজের স্বার্থকে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। এরা মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে ‘যেমনী নাচাও তেমনী নাচি’ ধরনের অনেক দেব দেবীর মূর্তি বানিয়ে নেয়। এভাবে একদিকে তাঁরা শিরক, কুফর ও জাহেলিয়াতের চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে জৈবিক ভোগ বিলাসের জন্যে পাহাড় খোঁদাই করে প্রাচীন ভারতীয় ইলোরা অজন্তার মতো অসংখ্য মনোহরী প্রাসাদ গড়ে তোলে। এই আল্লাহ্‌ বিমুখ বৈষয়িক উন্নতি তাঁদেরকে চরম হঠকারি ও অহংকারী বানিয়ে তোলে। এই হঠকারী জাতির নাম কি আপনারা জানেন?

হ্যা, এদের নামই সামুদ জাতি।

সামুদ জাতির আবাস

হুদ (আঃ) এঁর সাথে আ’দ জাতির যে লোকগুলো বেঁচে গিয়েছিলেন, সামুদ জাতি তাঁদেরই উত্তর পুরুষ। পরবর্তী কালে এ বংশের কোন প্রভাবশালী নেতার নামে এরা সামুদ জাতি নামে পরিচিত হয়। প্রথমে ‘আ’দের’ ধ্বংসের পর উত্তর দিকে সরে এসে এরা নিজেদের আবাস ও বসতি গড়ে তোলে। সেকালে এদের আবাস এলাকার নাম ছিল ‘হিজর’। এ কারনে কুরআনে এদেরকে ‘আসহাবুল হিজর’ বা হিজরবাসী নামেও অভিহিত করা হয়েছে। (সূরা ১৫ আল হিজর” আয়াত ৮০-৮৪)। তাঁদের সেই ঐতিহাসিক এলাকার বর্তমান নাম হলো ‘ফাজ্জুন্নাকাহ’ এবং ‘মাদায়েনে সালেহ’। এ স্থানটির অবস্থান হিজাজ ও সিরিয়ার গোটা মধ্যবর্তী অঞ্চল জুড়ে।

বৈষয়িক উন্নতি ও নৈতিক অধঃপতন

সামুদ জাতির বৈষয়িক ও নৈতিক অবস্থা ছিল আ’দ জাতিরই অনুরুপ। সামুদ জাতি সমতল ভুমি আর পাহাড়ের গাত্র খোদাই করে গড়ে তোলে ভুরি ভুরি সুরম্য অট্টালিকা। এগুলোর প্রযুক্তিগত কারুকাজ ছিল খুবই উন্নত। তাছাড়া এগুলো ছিল অত্যন্ত বিলাসবহুল। ছিল ঝর্নাধারা, বাগবাগিচা, থরে থরে খেজুরের বাগান। এতো সব প্রাসাদ, মনোরম উদ্যান আর স্মৃতিসৌধ তাঁরা কেন গড়ে তুলেছিল? কুরআন বলছে ‘ফারেহীন’ অর্থাৎ তাঁরা এগুলো গড়ে তুলেছিল গর্ব- অহংকার, ক্ষমতা, অর্থ আর প্রযুক্তিগত উন্নতি দেখানোর জন্যে। (সূরা ৪০ আল মুমিনুনঃ আয়াত ৮৩)

কুরআন আরো বলছে, তাঁরা সাধারন মানুষের উপর যুলুম ও শোষন করে তাঁদের দুর্বল করে রেখেছিল। গোটা জনগনের তুলনায় অল্প সংখ্যক লোকের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব।

মূর্তি পূজাকে তাঁরা তাঁদের ধর্ম বানিয়ে নিয়েছিল। আর মূর্তিগুলোর উপর পৌরোহিত্য করতো এসব নেতারা। দেব দেবীর মূর্তির নামেই জনগণকে করা হত শোষন। মনগড়া পূজা অর্চনা করার মধ্যেই ছিল তাঁদের যাবতীয় সুবিধা। ধর্মের মুখোশ পরেই তাঁরা আল্লাহদ্রোহীতার নেতৃত্ব দেয়।

এঁর পয়লা সুবিধা ছিল এই যে, দেব দেবীর নামে নেতাদের পক্ষে নিজেদের মনগড়া আইনই জনগনের উপর চাপিয়ে দেয়া ছিল অত্যন্ত সহজ। দ্বিতীয় সুবিধা ছিল, অসাড় দেব দেবীর পক্ষে ঠাকুরগিরি করে জনগণকে শোষণ করার পথ ছিল অত্যন্ত সুগম। তাছাড়া পুরোহিত সেজে জনগনের উপর কৃতিত্ব করা ছিল খুবই সহজ। এভাবে জনগন ছিল সমাজপতিদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। অর্থাৎ জনগন ছিল সমাজপতিদের হুকুমের দাস। সমাজপতিরা ছিলো যালিম, প্রতারক আর শোষক। এই ঘুনে ধরা নোংরা নৈতিক ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাঁদের শিল্প, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নতির বাহার। বাইরের চাকচিক্য দিয়ে ঢেকে রেখেছিল তাঁদের ভেতরের কলুষতা।

আলোর মশাল নিয়ে এলেন সালেহ

এই অধঃপতিত জাতিকে মুক্তির পথ দেখানোর জন্যে মহান আল্লাহ্‌ সামুদ জাতির সবচাইতে সৎ ও যোগ্য ব্যাক্তি সালেহ কে তাঁদের নবী নিযুক্ত করলেন। আল্লাহর বানী আর হিদায়েতের আলো নিয়ে হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম হাজির জনগন এবং জাতির নেতৃবৃন্দের কাছে। অত্যন্ত দরদ ভরা হৃদয় নিয়ে তিনি তাঁদের আহবান জানালেন কল্যাণ ও মুক্তির দিকে। আহবান জানালেন তাঁদের মালিক ও প্রভু মহান আল্লাহর দিকে। বললেন-

“হে আমার জাতির ভাইয়েরা, তোমরা এক আল্লাহর হুকুম পালন করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নাই। নেই কোন হুকুমকর্তা। তিনিই তো যমীন থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর এখানেই তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুতরাং তোমাদের অপরাধের জন্যে তাঁর কাছে ক্ষমা চাও আর তাঁর দিকে ফিরে এসো। তিনি অবশ্যই তোমাদের দাকে সাড়া দেবেন।” (সূরা ১১, হুদ আয়াত ৬১)

তাঁদের ভাই সালেহ তাঁদের আর উপদেশ দিলেন-

“তোমরা কি ভয় করবেনা? আমি তোমাদের জন্যে একজন বিশ্বস্ত রাসুল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমার কথা মেনে নাও। তোমাদের বুঝাবার জন্যে আমি যে এতো কস্ট করছি, এর বিনিময়ে আমি তো তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইনা। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহর দায়িত্বে। তোমাদের এই সব উদ্যান, ঝর্নাধারা, ক্ষেত-খামার, বাগান ভরা রসাল খেজুর আর অহংকার প্রদর্শনের জন্যে পাহাড় গাত্রে নির্মিত বালাখানাসমূহের মধ্যে কি তোমাদের চিরদিন নিরাপদে থাকতে দেয়া হবে? সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমার কথা মেনে নাও। এই সীমালংঘনকারী নেতাদের হুকুম মেনোনা। তাঁরা তো পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। কোন সংস্কার সংশোধনের কাজ তাঁরা করছেনা।” (সূরা ২৬ আশ-শোয়ারা, আয়াত ১৪২-১৫২)

এসব মর্মস্পর্শী উপদেশের জবাবে জাতির নেতারা বললো –

“হে সালেহ, এতোদিন তোমাকে নিয়ে আমাদের কতই না আশা ভরশা ছিল। আর এখন কিনা তুমি আমাদেরকে আমাদের দেব দেবীদের পূজা উপাসনা থেকে বিরত রাখতে চাও। তোমার কোথায় আমাদের সন্দেহ- সংশয় রয়েছে।” (সূরা ১১, হুদ আয়াত ৬২)

সালেহ বললেনঃ

“ভাইয়েরা আমার, তোমরা একটু ভেবে দেখো। আমি যদি আমার প্রভূর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক উজ্জ্বল প্রমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি আর তাঁর বিশেষ অনুগ্রহেও ধন্য হওয়া থাকি, তবে কে আমাকে তাঁর পাকড়াও থেকে রক্ষা করবে যদি তাঁর নির্দেশের খেলাফ করি? (সূরা ১১, হুদ আয়াত ৬৩)

তাঁদের কল্যাণের পথে আনার জন্যে হজরত সালেহ তাঁদের এতো করে বুঝালেন। কিন্তু তাঁরা বুঝলোনা। তারা শলা পরামর্শ করলোঃ “আমাদের সবার মাঝে সে একজন মাত্র লোক। আমরা সবাই তাঁর অনুসরন করবো? তাহলে আমরা তো ভ্রান্তি আর অগ্নিতে নিমজ্জিত হবো। আমাদের সবার মাঝে কেবল তাঁরই উপর উপদেশ অবতীর্ণ হলো? আসলে সে মিথ্যাবাদী।”

সাধারন জনগনের মন হজরত সালেহ (আঃ) এর উপদেশে বিগলিত হচ্ছিলো। কিন্তু এইভাবে তারা জনগণকে ডেকে এনে আবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলো।

নিদর্শন দেখাবার দাবী

জাতির নেতারা এবার হজরত সালেহ (আঃ) এর প্রতি এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলো। তারা বললো-

“তোমার উপর কেউ যাদু করেছে। নইলে তুমি তো আমাদেরই মতো একজন মানুষ। হ্যাঁ তবে তুমি যদি সত্য নবী হয়ে থাকো, তাহলে কোন নিদর্শন দেখাও।” (সূরা ২৬ আশ-শোয়ারা, আয়াত ১৫৩- ১৫৪)

কেউ কেউ বলেছেন, এ কথা বলে তারা একটি বড় পাথর খণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করে বললো- এই পাথরের ভেতর থেকে যদি গাভীন উটনী বের করে আনতে পারো, তবে আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনবো এবং তোমার আনুগত্য করবো। তারা মনে করেছিলো, তাঁদের এ দাবী পূরন করা হজরত সালেহ (আঃ) এর জন্যে অসম্ভব। তারপর কি হলো? তারপর হজরত সালেহ তাঁদেরকে নিদর্শন দেখানোর জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তাঁর বুক ভরা আশা ছিলো, নিদর্শন দেখালে হয়তো তারা ঈমান আনবে।

আল্লাহ বললেন- “হে সালেহ, আমি উটনী পাঠাচ্ছি ঠিকই। তবে এই উটনী হবে তাঁদের জন্যে চুড়ান্ত পরীক্ষা স্বরূপ। তুমি স্থির থাকো আর তাঁদেরকে বলে দাওঃ “কূপের পানি পান করার জন্যে তাঁদের মাঝে পালা ভাগ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ একদিন পুরো পানি পান করবে সেই উটনী আর একদিন পান করবে তাঁর সবাই আর তাঁদের পশুরা।” (সূরা ২৬ আশ-শোয়ারা, আয়াত ১৫৫)

আল্লাহর নিদর্শনের উটনী

ব্যাস, আল্লাহর নির্দেশে সমস্ত মানুষের সামনে পাথর থেকে উটনী বেরিয়ে এলো। হজরত সালেহ এবার উটনীর ব্যাপারে মহান আল্লাহর ফরমান তাঁদের জানিয়ে দিলেন। একটি ছোট্ট ভাষন তিনি তাঁদের সামনে পেশ করলেন –

“হে আমার জাতির ভাইয়েরা, সত্যিই আল্লাহ ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নাই। সুতরাং তোমরা কেবল তাঁরই হুকুম পালন করো। দেখো তোমাদের প্রভূর পক্ষ থেকে তোমাদের সামনে সুস্পষ্ট প্রমান এসে পড়েছে। এটি আল্লাহর উটনী। এটি তোমাদের জন্যে চুড়ান্ত নিদর্শন। সতরাং একে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দাও। আল্লাহর যমীনে সে মুক্তভাবে চড়ে বেড়াবে। কেউ তার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করার চেষ্টা করো না। তাহলে চরম পীড়াদায়ক শাস্তি তোমাদের গ্রাস করে নেবে। তোমরা সে সময়টার কথা স্মরণ করো, যখন মহান আল্লাহ আ’দ জাতির উপর তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেন এবং এমনভাবে এ ভূখণ্ডে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করেন যে, তোমরা মুক্ত ময়দানে প্রসাদ নির্মাণ করছো আর পাহাড় কেটে বিলাস গ্রহ করছো। সুতরাং মহান আলাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো। দেশে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের মতো সীমালঙ্ঘন করোনা।” (সূরা ৭ আল আরাফ, আয়াত ৭৩-৭৪)

জাতি বিভক্ত হয়ে গেলো দুইভাগে

মহান নবী হজরত সালেহ (আঃ) এর আহবানে সত্য উপলব্ধি করতে পেরে জাতির কিছু লোক ঈমান আনলো। আল্লাহর পয়হে এলো। নবীর সাথী হলো। তবে এদের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু জাতির নেতারা এবং তাঁদের অধিকাংশ অনুসারী ঈমান গ্রহন করলোনা। এই হঠকারী নেতারা ঐ নির্যাতিত মুমিন্দের লক্ষ্য করে বললো – ‘তোমরা কি সত্যি যানো যে, সালেহ তাঁর প্রভুর রাসুল?’ (সূরা ৭ আল আরাফ, আয়াত ৭৫)

মুমিনরা বললেন –‘আমরা অবশ্যই জানতে পেরেছি এবং তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি।’ (সূরা ৭ আল আরাফ, আয়াত ৭৫)

অহংকারী নেতারা বললো- ‘তোমরা যে বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছ, আমরা তা মানিনা।’ (সূরা ৭ আল আরাফ, আয়াত ৭৬)

তারা হত্যা করলো উটনীকে

দেখলেন তো, লোকগুলো কত বড় গাদ্দার। তারাই নবীর কাছে নিদর্শন দাবী করেছিলো। তারাই বলেছিল প্রমান স্বরূপ নিদর্শন দেখাতে পারলে তারা ঈমান আনবে। নবী নিদর্শন দেখালেন। তাঁদের চোখের সামনে এতো বড় ঘটনা ঘটে গেলো। আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত নিদর্শন তাঁদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু অঙ্গীকার করেও তারা ঈমান আনলোনা। আসলে সকল নবীর সমকালীন লোকেরাই এভেবে নবীর কাছে নিদর্শন দাবী করতো। কিন্তু তা দেখার পর তারা আর ঈমান আনতোনা। এ জন্যেই আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবী হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ) –কে বলে দিয়েছেন, তোমার বিরোধীরা যতই নিদর্শন দাবী করুক, নিদর্শন দেখার পর আর তারা ঈমান আনবেনা। ফেরেস্তা এসেও যদি বলে, এমনকি মৃত ব্যক্তিও যদি ঘোষনা দেয়, ইনি আল্লাহর নবী, তবু তারা মানবেনা। যাই হোক আসল কথায় আসা যাক।

আল্লাহর উটনী স্বাধীনভাবে চরে বেড়াতে লাগলো। একদিনের সমস্ত পানিই উটনী পান করতো। তাঁদের ক্ষেত-খামারে সে অবাধে বিচরন করতো। এভাবে বেশ কিছুকাল অতিবাহিত হয়। ঈমান না আনলেও এই অলৌকিক উটের ব্যাপারে তাঁদের মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিলো। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও উটনীকে তারা অনেকদিন বরদাশত করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলোনা। তারা শলা পরামর্শ করলো। সিদ্ধান্ত নিল উটনীকে তারা হত্যা করবে। কিন্তু কে নেবে উটনীকে হত্যা করার দায়িত্ব? এক চরম হতভাগা এগিয়ে এলো। জাতির নেতারা তাঁর উপরে এ দায়িত্ব সপে দিলো। এক চরম ভয়াবহ পরিনতির ভয় তারা করলোনা। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর উটনীকে তারা হত্যা করলো। এভাবে দ্রুত এগিয়ে এলো তারা নিজেদের করুন পরিনতির দিকে। তারপর কি হলো?

আর মাত্র তিন দিন

উটনী হত্যার খইবর পেয়ে, হজরত সালেহ কম্পিত হলেন। কিন্তু আফসোস, তাঁর জাতি বুঝলনা। তাঁর আর কিছুই করার নেই। তিনি দৌড়ে এলেন। তারা বললো- সালেহ, তুমি তো অংগীকার করেছিলে একে হত্যা করলে আমাদের উপর বিরাট বিপথ নেমে আসবে। কোথায় তোমার সেই বিপদ? যদি সত্যি তুমি রাসুল হয়ে থাকো, তবে এনে দেখাও দেখি সেই বিপদ। আল্লাহর নবী সালেহ এবার তাঁদের জানিয়ে দিলেন-

‘এখন তোমাদের শেষ পরিনতির সময় আর মাত্র তিনদিন বাকী আছে। নিজেদের সুরম্য প্রাসাদগুলোতে বসে এই তিনদিন ভালো করে ভোগ বিলাস করে নাও। এ এক অনিবার্য অংগীকার।”(সূরা ১১, হুদ আয়াত ৬৫)

এবার নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্র

উটনীকে হত্যা করার পর এবার সামুদ জাতির নেতারা স্বয়ং হজরত সালেহ (আঃ)-কেই সপরিবারে হত্যা করার ফায়সালা করলো। তারা ভাবলো, সালেহই তো আমাদের পথের আসল কাঁটা। সে-ই তো আমাদের ভোগ বিলাসে বাধা দিচ্ছে। আমাদের জীবন পদ্ধতি বদলে দিতে চাচ্ছে। আমাদের ক্ষমতা হাতছাড়া করতে চাইছে। আমাদের সমালচোনা করছে। জনগণকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। তাঁর কারনেই তো এখন আমাদের উপর বিপদ আসার আশংকা দেখা দিয়েছে। সুতরাং তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলেই সব চুকে যায়। সামুদ জাতির নয়টি সম্প্রদায়ের নেতারা বসে শেষ পর্যন্ত ঐ তিন দিনের মধ্যেই নবীকে হত্যা করার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আরো সিদ্ধান্ত নেয়, হত্যার পরে সালেহর অলী-অভিভাবক হিসেবে যিনি তাঁর রক্তমূল্যের দাবীদার হবেন, তাঁকে বলবো, আমরা এ হত্যাকান্ডে জড়িত নই। এ ঘটনা কুরআন মাজীদে এভাবে বর্ণনা করেছে-

“শহরে ছিলো নয়জন দলপতি। তারা দেশকে অন্যায় অনাচারে বিপর্যস্ত করে তুলেছিলো। কোন প্রকার ভালো কাজ তারা করতোনা। তারা একে অপরকে বললো- আল্লাহর কসম খেয়ে অংগীকার করো, রাতেই আমরা সালেহ আর তাঁর পরিবারবর্গের উপর আক্রমন চালাবো। তারপর তাঁর অলীকে বলবো, তোমার বংশ ধ্বংস হবার সময় আমরা ওখানে উপস্থিতই ছিলাম না। আমরা সত্য সত্য বলছি।” (সূরা আন নামল ২৭ আয়াত ৪৮-৪৯)

ওদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মহান আল্লাহ্‌ বলেন- “তারা একটা ষড়যন্ত্র পাকালো আর আমরাও একটা পরিকল্পনা বানালাম। যা তারা টেরই পেলোনা।” (সূরা আন নামল ২৭ আয়াত ৫০)

ধ্বংস হলো সামুদ জাতি

আল্লাহর সে পরিকল্পনাটি কী? তা হলো সামুদ জাতির ধ্বংস। আল্লাহ্‌ বলেন-

“এখন চেয়ে দেখো, তাঁদের ষড়যন্ত্রের পরিনতি কি হলো? আমি তাঁদের ধ্বংস করে দিলাম, সেই সাথে তাঁদের জাতিকেও। ” (সূরা আন নামল ২৭ আয়াত ৫১)

আল্লাহ্‌ সামুদ জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিলেন। তাঁদের গর্ব অহংকার ও ভোগ বিলাস সব তলিয়ে গেলো। মুফাসসিরগন তাঁদের ধ্বংসের বিবরন দিতে গিয়ে বলেছেন- হজরত সালেহ যে তাঁদের তিন দিনের সময় বেধে দিলেন, তাতে তাঁদের অন্তরে ভয় ঢুকে গেলো। প্রথম দিন তাঁদের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। দ্বিতীয় দিন তাঁদের চেহারা লালবর্ণ হয়ে যায়, আর তৃতীয় দিনে তাঁদের চেহারা হয়ে যায় কালো। অতঃপর তিনদিন শেষ হবার পরপরই রাত্রিবেলা হঠাৎ এক বিকট ধ্বনি এবং সাথে সাথে ভুমিকম্প শুরু হয়ে যায়। বজ্রধ্বনি আর ভুকম্পনে তারা সম্পূর্ণ বিনাস হয়ে গেলো। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“হঠাৎ বজ্রধ্বনি এসে তাঁদের পাকড়াও করলো। যখন ভোর হলো, তখন দেখা গেলো, তারা নিজেদের ঘর দোরে মরে উপর হয়ে পড়ে রইলো, যেনো এসব ঘরে তারা কোন দিনই বসবাস করেনি।”(সূরা ১১, হুদ আয়াত ৬৭-৬৮)

তাঁদের উন্নত প্রযুক্তির সুরম্য অট্টালিকা সমূহের ধ্বংসাবশেষ আজো তাঁদের অঞ্চলে শিক্ষনীয় হয়ে পড়ে আছে।

বেঁচে গেলেন সালেহ এবং তাঁর সাথীরা

তারা হজরত সালেহ- কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো যে রাতে, সে রাতেই মহান আল্লাহ্‌ তাঁদের ধ্বংস করে দিলেন। সে ধ্বংস থেকে আল্লাহ্‌ পাক হজরত সালে এবং তাঁর সাথীদের রক্ষা করেছিলেন। তাঁদের নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখলেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“অতঃপর যখন ওদের দ্ধংশ হবার নির্দিষ্ট সময়টি আসলো, তখন আমরা সালেহ এবং তাঁর সাহে যারা ঈমান এনেছিল, তাঁদেরকে আমাদের বিশেষ রহমতের দ্বারা রক্ষা করলাম। সেদিনকার লাঞ্ছনা থেকে নিরাপদ রাখলাম। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু দুর্দান্ত ক্ষমতার অধিকারী এবং মহাপরাক্রমশীল।” (সূরা ১১, হুদ আয়াত ৬৬)

সামুদ জাতি কেন ধ্বংস হলো?

সামুদ জাতি বৈষয়িকভাবে চরম উন্নতি লাভ করার পরও কেন ধ্বংস হলো? কেন তারা বিলীন হয়ে গেলো? কেন হলো তাঁদের এই অপমানকর বিনাশ? এর কারন খুব সহজ। এর কারন হলো-

১। তারা শিরকে লিপ্ত হয়েছিলো।

২। তারা এক আল্লাহর আইন ও বিধান মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো।

৩। তারা নবী ও নবীর পথকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো।

৪। তারা দুষ্কৃতকারী ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের অনুসরন করেছিলো।

৫। পরকালের তুলনায় বৈষয়িক জীবনকে তারা অগ্রাধিকার দিয়েছিল।

৬। লাগামহীন ভোগ বিলাসে তারা নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল।

৭। তারা সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বাধা দিয়েছিল।

৮। আল্লাহর নিদর্শন দাবী করেও তা তারা প্রত্যাখ্যান করেছিলো।

৯। তারা আল্লাহর নিদর্শন উটনীকে হত্যা করেছিল।

১০। তারা আল্লাহর নবীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো।

১১। তারা অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।

কুরআনে সালেহ ও তাঁর জাতির উল্লেখ

এবার জানিয়ে দিচ্ছি কুরআনে হজরত সালেহ (আঃ) ও তাঁর জাতি সামুদের কথা কোথায় উল্লেখ আছে। হ্যাঁ, আল কুরআনে হজরত সালেহ (আঃ) এর নাম উল্লেখ আছে ৯ বার। যেসব সুরায় উল্লেখ আছে সেগুলো হলো- সূরা আল আরাফ, আয়াত ৭৩,৭৫,৭৭, সূরা হুদ, আয়াত ৬১,৬২,৬৬,৮৯, সূরা শোয়ারা, আয়াত ১৪২, সূরা নামল, আয়াত ৪৫।

আল কুরআনে সামুদ জাতির নাম উল্লেখ আছে ২৬ স্থানে। সেগুলো হলো- সূরা আল আরাফ,আয়াত ৭৩, তাওবা, ৭০, হুদ ৬১,৬৮,৬৮,৯৫, ইবরাহীম ৯, ইস্রা ৫৯, হজ্জ ৪২, ফুরকান ৩৮, শোয়ারা ১৪১, নামল ৪৫, আন কবুত ৩৮, সোয়াদ ১৩, মুমিন ৩১, হামিমুস সাজদা ১৩-১৭, কাফ ১৩, যারিয়াত ৪৩, আন নাজম ৫১, আল কামার ২৩, আল হাক্কাহ ৪,৫, বুরুজ ১৮, আল ফজর, আশ সামস ১১।

কুরআনের সুরাগুলো জানিয়ে দিলাম। সরাসরি কুরআন পড়লে আপনারা নিজেরাই এ ঘটনার আরো অনেক শিক্ষণীয় দিক জানতে পারবেন।

About আবদুস শহীদ নাসিম