নবীদের সংগ্রামী জীবন

৬।

অগ্নী পরীক্ষায় বিজয়ী বীর ইবরাহীম

(আঃ)

জন্ম ও কৈশোর

হাজার হাজার বছর আগের কথা। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। নমরূদীয় ইরাকের ঊর নগরীতে জন্ম হয় এক শিশুর। একদিন সেই শিশুটিই হন কালের সাক্ষী এক মহাপুরুষ। ওর বাবা আজর ছিলেন বড় একজন ধর্মীয় পুরোহিত। তিনি নিজের হাতে মূর্তি তৈরি করতেন। আর ঐ মূর্তিগুলোকেই সারা দেশের মানুষ দেবতা বলে মানতো। ওদের পূজা উপাসনা করতো। ছেলে জন্ম হওয়ায় বাবা আজর দারূন খুশি। ভাবেন, আমার পরে আমার এই ছেলেই হবে ধর্মীয় পুরোহিত। নিজ হাতে সে দেবতা বানাবে। সে রক্ষা করবে আমার ধর্মীয় ঐতিহ্য। মনের খুশিতে আজর তাঁর পুত্রের নাম রাখেন ইব্রাহিম। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ভিন্ন। তিনি ইব্রাহীমকে দিয়ে মূর্তি ভাংগার পরিকল্পনা করেন। আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী ইব্রাহিম বড় হতে থাকে। ইব্রাহীমকে তিনি নিজ ভান্ডার থেকে দান করেন অগাধ জ্ঞান, বুদ্ধি আর দূরদৃষ্টি। কারন তিনি তো তাঁকে নবী বানাবেন। তিনি তো তাঁকে এক বিরাট নেতৃত্বের আসনে বসাবেন। তাই ছোট বেলা থেকেই তাঁর জ্ঞান বুদ্ধি দ্রুত বৃদ্ধি হতে থাকে। কিশোর বয়স থেকেই ইব্রাহিম সব কিছু যুক্তি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করতে থাকেন।

চিন্তা করেন ইব্রাহিম

ইব্রাহিম ভাবেন, নিজেদের হাতে মূর্তি বানিয়ে সেগুলোকে খোদা মানা তো বিরাট বোকামি। যারা কারো উপকার করতে পারে না, কারো অপকারও করতে পারে না, তারা খোদা হয় কেমন করে? কেউ যদি ঐ দেবতাগুলির ক্ষতি করতে চায়, তা থেকেও দেবতাগুলি আত্মরক্ষা করতে পারেনা। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর পিতা ও সমাজের লোকেরা বিরাট ভুলের মধ্যে রয়েছে। তিনি তাঁর বাবাকে বলেন-

“বাবা, আপনি কি মূর্তিকে খোদা মানেন? আমিতো দেখছি, আপনি এবং আপনার জাতির লোকেরা পরিস্কার ভুলের মধ্যে আছেন।” (সূরা আল আনাম, আয়াত ৭৪)

ইব্রহীম দেখলেন, তাঁর জাতির লোকেরা চন্দ্র-সূর্য, নক্ষত্রেরও পূজা করছে। তারা মনে করলো, এগুলো তো শক্তিশালী দেবতা। কিন্তু এরা যে খোদা হতে পারেনা, তা তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। রাত্রি বেলা নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ইব্রাহিম বলেন- তোমরা বলছো এ আমার প্রভু, অতঃপর নক্ষত্র যখন ডুবে গেলো, তখন তিনি বলে দিলেন, অস্তমিত হওয়া জিনিসকে আমি পছন্দ করিনা। এরপর উজ্জ্বল চাঁদ উদয় হলো। তিনি বললেন- তবে এই হবে প্রভু, কিন্তু যখন চাঁদও ডুবে গেলো, তিনি তখন বললেন- এতো খোদা হতে পারেনা। আসল প্রভু মহাবিশ্বের মালিক নিজেই যদি আমাকে পথ না দেখান, তবে আমিতো বিপথগামীদের দলভুক্ত হয়ে পড়বো।

অতপর সকাল হলে পুবাকাশে ঝলমল করে সূর্য উঠলো। তবে তো এই হবে খোদা। কারন এতো সবার বড়। তারপর সন্ধ্যায় যখন সূর্য ডুবে গেলো, তখন তিনি তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বললেন- তোমরা যাদেরকে মহান সৃষ্টিকর্তার অংশীদার ভাবছো, আমি তাঁদের সকলের দিক থেকে মুখ ফেরালাম। আমি সেই মহান প্রভুর নিকট আত্মসমর্পণ করছি, যিনি আসমান আর জমিনকে সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁর সাথে কাউকেও অংশীদার বানাবোনা।

শুরু হলো বিবাদ

এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর জাতির লোকেরা তাঁর সাথে বিবাদে লিপ্ত হলো। তিনি তাঁদের বললেন- “তোমরা কি মহান আল্লাহর ব্যাপারে আমার সাথে বিতর্ক করছো? তিনি তো সঠিক পথ দেখিয়েছেন। তোমরা যাদেরকে আল্লাহর আংশীদার মানো, আমি ওদের ভয় করিনা। আমি জানি ওরা আমার কোন ক্ষতি করতে পারবেনা।

ইব্রাহিম তাঁর বাবাকে বললেন- “বাবা আপনি কেন সেই সব জিনিসের ইবাদাত করেন? যেগুলো কানে শুনেনা, চোখে দেখেনা এবং আপনার কোন উপকার করতে পারেনা। বাবা আমি সত্য জ্ঞান লাভ করেছি, যা আপনি লাভ করেননি। আমার দেখানো পথে চলুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাবো। বাবা, কেন আপনি শয়তানের দাসত্ব করছেন? শয়তান তো দয়াময় আল্লাহর অবাধ্য।” (সূরা মরিয়ম, আয়াত ৪২-৪৪)

জবাবে ইব্রাহীমের পিতা বললেন- “ইব্রাহিম, তুই কি আমার খোদাদের থেকে দূরে সরে গেলি? শোণো, এই পথ থেকে ফেরত না এলে, আমি তোকে পাথর মেরে হত্যা করবো।” (সূরা মরিয়ম, আয়াত ৪৬)

মূর্তি ভাংগার পালা

কোন কিছুতেই যখন জাতির লোকেরা সত্য গ্রহনে প্রস্তুত হলোনা, তখন ইব্রাহিম একদিন ঘোষণা করলেন- তোমাদের অনুপস্থিতিতে একদিন তোমাদের এই মিথ্যা খোদাদের বিরুদ্ধে একটা চাল চালবো। ইব্রাহীমের কোথায় তারা তেমন একটা গুরুত্ব দিলোনা। একদিন সব লোক এক ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতে চলে গেলো। ইব্রাহীমকেও তারা উৎসবে যেতে বলে। ইন্তু অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও তিনি গেলেন না। নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন- আমি পীড়িত। আমি যাবোনা। সুতরাং তাঁকে রেখেই তারা চলে গেলো। শহর পুরুষ শুন্য হয়ে পড়লো। এই সুযোগে ইব্রাহিম ওদের ঠাকুর ঘরে এলেন। দেখলেন, সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ওদের মূর্তি দেবতাগুলো। ওদের সামনে রয়েছে দামি দামি খাবার জিনিস। ইব্রাহিম ওদের বললেন- “তোমাদের কি হয়েছে? এসব স্বাদের জিনিস খাওনা কেন? কি হলো, কথা বলছোনা কেন? তারপর তিনি মূর্তিগুলোকে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেললেন। কিন্তু ঠাকুর দেবতাটিকে ভাংলেন না। ওকে ওর যায়গায়ই রেখে দিলেন।

উরসব শেষে লোকেরা ফিরে এলো। দেবতাদের অবস্থা দেখে সবার মাথায় হাত। তারা বলাবলি করতে লাগলো- কোন যালিম আমাদের খোদাদের সাথে এই ব্যাবহার করলো? কেউ কেউ বললো – আমরা যুবক ইব্রাহীমকে এদের ব্যাপারে সমালোচনা করতে শুনেছি।

নেতারা গোস্বায় ফেটে পড়লো। বললো – অপরাধীকে ধরে নিয়ে এসো সবার সামনে। ইব্রাহীমকে আনা হলো। তারা বললো- ‘ইব্রাহিম, আমাদের খোদাদের সাথে এই ব্যাবহার কি তুমি করেছো?” ইব্রাহিম ভাবলেন, ওদের খোদাদের অক্ষমতা প্রমান করার এটাই বড় সুযোগ। তিনি বললেন- নয়তো ওদেরকেই জিজ্ঞেস করুন, কে মেরেছে ওদের? ঐ বড়টাকেই জিজ্ঞেস করুন, সে-ই ভেঙ্গেছে নাকি?

ইব্রাহীমের কথা শুনে তারা লজ্জিত হলো। মনে মনে ভাবলো, আসলে আমরাই তো অন্যায়কারী। তারপর মাথানত করে তারা বললো- ‘ইব্রাহিম, দেবতাগুলো যে কথা বলতে পারেনা, তাতো তুমি ভালো করেই জানো।’

ইব্রাহিম সবাইকে সম্বোধন করে বললেন – “তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব জিনিসের পূজা উপাসনা করো, যেগুলো তোমাদের ভালোও করতে পারেনা, আবার মন্দও করতে পারেনা? দুঃখ তোমাদের জন্যে, কেন তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এগুলোর ইবাদাত করো? তোমাদের কি একটুও বিবেক বুদ্ধি নেই?” এবার তারা ইব্রাহীমকে ঘিরে ফেললো। চারদিকে হৈ হট্টগোল শুরু করে দিলো। ইব্রাহিম জোর গলায় বললেন – ‘তোমরা কি তোমাদের নিজেদের হাতে বানানো মূর্তির ইবাদাত করবে? অথচ তোমাদেরকে তো সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্‌।’

রাজ দরবারে আনা হলো

তারা ইব্রাহীমকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়লো। কী করবে তাঁকে নিয়ে? সে তো দেবতাদের আর কোন মান-ইজ্জতই বাকী রাখলোনা। তারা বিভিন্ন রকম শলা পরামর্শ করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত ইব্রাহীমের বিষয়টি তারা রাজ দরবারে তুললো। তাঁদের রাজা ছিলো নমরুদ। নমরূদকে তারা বুঝালো, ইব্রাহীমের ব্যাপারে বড় কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সে আমাদের ধর্মও বিনাশ করবে, আপনার রাজত্বও বিনাশ করবে।

রাজা বললেন- ইব্রাহীমকে আমার কাছে নিয়ে এসো। অতঃপর ইব্রাহীমকে নমরূদের সামনে হাজির করা হলো। নমরূদ তাঁর সাথে কথা বললেন। ইব্রাহিম তাঁকে আল্লাহর দিকে আহবান জানান। কিন্তু নমরূদ ইব্রাহীমের সাথে আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক শুরু করলো। বললো- তোমার প্রভু কে?

ইব্রাহিম- আমার প্রভু তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত দান করেন।

নমরূদ- আমিও মানুষকে মারতে পারি, আবার জীবিত রাখতে পারি। (নমরূদ মৃত্যুদন্ড দেউয়া দুজন কয়েদীকে এনে একজনকে হত্যা করলো, আর একজনকে ছেড়ে দিলো।)

ইব্রাহিম- ‘আমার আল্লাহ্‌ সূর্যকে পূর্বদিক থেকে উঠান, তুমি যদি সত্যি সত্যি প্রভু হয়ে থাকো, তবে সূর্যকে পশ্চিম দিক থেকে উঠাও তো দেখি।’ (সূরা ২ আল বাকারা, আয়াত ২৫৮)

একথা শুনে রাজা হতভম্ব, হতবাক ও নিরুত্তর হয়ে গেলো। আল্লাহ্‌ তো যালিমদের পথ দেখান না। এভাবে ইব্রাহীমের যুক্তির কাছে রাজা প্রজা সবাই পরাস্থ হলো। ইব্রাহিম যুক্তির মাধ্যমে মূর্তিকে খোদা মানার অসারতা প্রমান করে দিলেন। চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রকে খোদা মানা ভুল প্রমান করে দিলেন। রাজা বাদশাহকে প্রভু মানার ভ্রান্তি স্পষ্ট করে দিলেন। তাঁদের ধর্ম ও সব দেবতাই যে মিথ্যা, সেকথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিলেন। সাথে তিনি তাঁদেরকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহবান জানালেন। আল্লাহর পয়গাম তিনি তাঁদের কাছে পৌছে দেন।

অগ্নীকুন্ডে নিক্ষেপ

কিন্তু তারা কিছুতেই ঈমান আনলো না। বরং নৈতিকভাবে ইব্রাহীমের কাছে পরাজিত হয়ে তারা তাঁর উপরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। অন্ধ বর্বরতায় মেতে উঠলো তারা। সিদ্ধান্ত নিলো ইব্রাহীমকে হত্যা করার। কিন্তু কিভাবে হত্যা করবে তাঁকে? তারা ফায়সালা করলো বিরাট অগ্নীকুন্ড বানাবে। তারপর তাতে পুড়িয়ে মারবে ইব্রাহীমকে। যে কথা সে কাজ। এক বিরাট অগ্নীকুন্ড বানালো তারা। এটা ছিলো ইব্রাহীমের জন্যে এক বড় পরীক্ষা। আল্লাহও ইব্রাহিমকে বাজিয়ে নিতে চাইলেন। তিনি দেখতে চাইলেন ইব্রাহিম কি জীবন বাঁচানোর জন্যে ঈমান ত্যাগ করে, নাকি ঈমান বাঁচানোর জন্যে জীবন কুরবানী করে? কিন্তু ইব্রাহিম তো অগ্নী পরীক্ষার বিজয়ী বীর। তিনি তো জীবন বাঁচানোর জন্যে কিছুতেই আল্লাহকে এবং আল্লাহর দ্বীনকে ত্যাগ করতে পারেননা। তিনি তো আল্লাহ্‌ এবং আল্লাহর দ্বীনকে জীবনের চাইতে অনেক অনেক বেশী ভালোবাসেন। কাফিররা তাঁকে অগ্নীকুন্ডে নিক্ষেপ করার জন্যে নিয়ে এলো। তিনি তাঁদের কাছে নতো হননি। জীবন ভিক্ষা চাননি। জীবন বাঁচানোর জন্যে নিজের দীন এবং ঈমান ত্যাগ করেননি। তাঁর তেজোদীপ্ত ঈমান তাঁকে বলে দিলো- ইব্রাহিম, জীবন মৃত্যুর মালিক তো তোমার মহান প্রভু আল্লাহ্‌। তাঁর ঈমান তাঁকে বলে দেয়, আল্লাহ্‌ যদি আমার কোন ক্ষতি করতে না চান, তবে গোটা পৃথিবী এক হয়েও তা থেকে আমাকে রক্ষা করতে পারবেনা।

নিশ্চিত মনে আল্লাহর উপর ভরসা করে তিনি অগ্নীকুন্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওরা তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে নিক্ষেপ করলো নিজেদের তৈরি করা নরকে। আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমের প্রতি পরম খুশি হয়ে আগুনকে বলে দিলেন- “হে আগুন, ইব্রাহীমের প্রতি সুশীতল এবং শান্তিময় হয়ে যাও।”

আগুনের কি সাধ্য আছে সৃষ্টিকর্তার হুকুম অমান্য করার?

সুতরাং অগ্নীকুন্ডে ইব্রাহিম সম্পূর্ণ নিরাপদ থেকে গেলেন। আগুন তাঁর কোনই ক্ষতি করলোনা। বরং আল্লাহর হুকুমে সে ইব্রাহীমের সেবায় নিয়োজিত হলো। ইব্রাহীমের জাতি আবার তাঁর কাছে পরাজিত হলো। ইব্রাহিম আবার তাঁদের কাছে প্রমান করে দিলেন, তাঁদের দেবতারা নিজেদের রক্ষা করতেই অক্ষম। আর তিনি যে মহান প্রভুর প্রতি তাঁদের ডাকছেন, তিনি যে কোন ক্ষতি থেকে বান্দাদের রক্ষা করতে সক্ষম। তিনি সর্বশক্তিমান। তিনিই একমাত্র সত্তা যার হুকুম পালন করা উচিত। যার ইবাদাত উপাসনা করা উচিত।

হিজরত করেন ইব্রাহিম

অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পেয়ে ইব্রাহিম আল্লাহর পথে আসার জন্যে তাঁদেরকে অনেক বুঝান। কিন্তু তারা কিছুতেই নিজেদের পূর্বপুরুষদের ভুল পথ ত্যাগ করতে রাজি হয়নি। বরং ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। ইব্রাহিম দেখলেন, এ মানুষগুলোর আর হিদায়াতের পথে আসার সম্ভাবনা নেই। তখন তিনি আল্লাহর হুকুমে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে রওয়ানা করলেন। সাথে ছিলেন স্ত্রী সারাহ আর ভাতিজা লূত। জাতির লোকদের মধ্যে কেবল ভাতিজা লুতই ঈমান এনেছিলেন। প্রিয় জন্মভূমি থেকে হিজরত করেন ইব্রাহিম। এবার তিনি উন্মুক্ত বিশ্বে দাওয়াতী কাজ বিস্তার করা শুরু করেন। মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে ডাকতে তিনি সিরিয়ার দিকে যাত্রা করেন। সেখান থেকে চলে যান ফিলিস্তিন এলাকায়। আল্লাহর বার্তা বইয়ে নিয়ে যান তিনি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। দীর্ঘ পথের ভ্রমন, মানুষের বিরোধিতা, অত্যাচার নির্যাতন আর হাজারো রকমের কষ্ট তাঁকে ক্লান্ত করতে পারেনি। তিনি মানুষকে দাওয়াত দিয়েই চলেছেন।

এবার তিনি ফিলিস্তি থেকে যাত্রা শুরু করেন মিশরের দিকে। কেবল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান জানানোর জন্যেই এ মহামানব ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। পাড়ি দেন মরু-প্রান্তর, সমুদ্র পাথার। এসব কিছুই করেন তিনি তাঁর মহান প্রভু দয়াময় আল্লাহকে খুশি করার জন্যে। তাইতো জন্মভূমি ত্যাগের সময় প্রশান্ত দীল ইব্রাহিম বলেছিলেন-

“আমি আমার প্রভুর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।” (সূরা ৩৭ আস সাফফাত, আয়াত ৯৯)

মিশরে এসে তিনি এখানকার মানুষকে দাওয়াত দিতে থাকেন আল্লাহর দিকে। সাথে তাঁর স্ত্রী সারাহ আর ভাতিজা লুত। মিশরে এসে দেখেন এখানকার বাদশাহ বড়ই স্বৈরাচারী-যালিম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাদশাহ হজরত ইব্রাহিম আর তাঁর স্ত্রীর আল্লাহ ভক্তিতে মুগ্ধ হন এবং ইব্রাহিম ও সারাহর সেবা করার জন্যে নিজ কন্যা হাজেরাকে ইব্রাহীমের নিকট বিয়ে দেন। ইব্রাহীমকে অনেক ধন-দৌলত প্রদান করেন।

আবার ফিলিস্তিনে

মিশর থেকে ইব্রাহিম (আঃ) আবার ফিরে আসেন ফিলিস্তিনে। এবার ফিলিস্তিনকেই তিনি তাঁর দাওয়াতী কাজের মূল কেন্দ্র বানান। ভাতিজা লুতকে জর্ডান এলাকায় নিজের প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকেও নবুয়ত দান করেন।

ইব্রাহীমের মনে বড় দুঃখ, তিনি বৃদ্ধ বয়সে এসে উপনীত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর কোন সন্তানাদী নেই। স্ত্রী সারাহ ছিলেন একজন বন্ধ্যা মহিলা। তাঁর কোন সন্তানাদী হতো না। ইব্রাহিম আল্লাহর কাছে দোয়া করেন-

“হে প্রভু, আমাকে একটি সৎ সন্তান দান করো।”(সূরা ৩৭ আস সাফফাত, আয়াত ১০০)

পরম দয়াময় আল্লাহ্‌ তাঁর দোয়া কবুল করেন। স্ত্রী হাজেরার ঘরে তাঁর এক সুন্দর ফুটফুটে ছেলের জন্ম হয়। তিনি পুত্রের নাম রাখেন ইসমাঈল। বৃদ্ধ বয়সে শিশু পুত্রের হাসিতে তাঁর মন ভরে উঠে। কিন্তু এই পুত্রের ভালবাসা নিয়েও আল্লাহ্‌ তাঁকে পরীক্ষায় ফেলেন। আল্লাহ্‌ তাঁকে বাজিয়ে দেখতে চান, তিনি পুত্রের ভালবাসার চেয়ে আল্লাহর হুকুম পালন করাকে বড় জানেন কী-না? ঈশমাঈলকে মক্কায় রেখে আসার নির্দেশ

এবার আল্লাহ্‌ ইসমাঈল আর তাঁর মা হাজেরাকে মক্কার জনমানব ও ফল পানি শস্যহীন মরুভূমিতে রেখে আসার নির্দেশ দেন। কিন্তু ইব্রাহিম যে, আল্লাহকে সবার চেয়ে বেশী ভালবাসেন। তিনি যে জানেন, আল্লাহর হুকুম অমান্য করা যায়না। তাইতো তিনি হাজেরা আর শিশু পুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় এসে উপস্থিত হন। আল্লাহর ইংগীতে তিনি তাঁদেরকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আবার ফিলিস্তিন অভিমুখে রওয়ানা করেন। হাজেরাকে বলে যান, আমি আল্লাহর হুকুমে তোমাদেরকে এখানে রেখে গেলাম। হাজেরাকে কিছু খাদ্য ও এক মশক পানি দিয়ে আসেন। প্রশান্ত সমুদ্রের মতো প্রশস্ত হৃদয় আর হিমালয়ের মতো অটল ধৈর্যশীল ইব্রাহিম আল্লাহ্‌ প্রদত্ত পরীক্ষায় বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেন ফিলিস্তিনে।

আল্লাহর দীনের দাওয়াত নিয়ে ইব্রাহিম ঘুরে বেড়ান ফিলিস্তিন, জর্ডান আর হিজাযের বিভিন্ন এলাকায়। একাজ করাই তাঁর মূল দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনের ফাকা ফাকে তিনি মক্কায় যান। স্ত্রী পুত্রকে দেখে আসেন। হাটি হাটি পা পা করে ছেলে বড় হয়ে ওঠে। সাথে সাথে ছেলের প্রতি ইব্রাহীমের মহব্বতও উপচে উঠে। ফলে আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমকে আবার বাজিয়ে নিতে চান।

পুত্র কুরবানীর হুকুম

ইসমাঈলের এখন বুঝ বুদ্ধি হয়েছে। ইব্রাহীমের সাথে এখন পুত্র ইসমাঈল ঘরে বাইরে যাতায়াত করেন। পিতা যদি বৃদ্ধ বয়সে উদীয়মান কিশোর পুত্রকে নিজের সাহায্যকারী হিসেবে পান, তবে তাঁর প্রতি যে পিতার মহব্বত কতটা বেড়ে যায়, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। ঠিক এমনই এক সময়ে আল্লাহ্‌ পাক ইব্রাহীমকে স্বপ্নে ইসমাঈলকে কুরবানী করার নির্দেশ প্রদান করেন। বলে দেন, ‘ইব্রাহিম, তোমার প্রিয়তম পুত্রকে কুরবানী করো।’ আল্লাহর হুকুম লংঘন করা যায়না। তাঁর হুকুম পালন করা অবধারিত।

পুত্রের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন ইব্রাহীমকে আল্লাহর হুকুম পালন করা থেকে বিরত রাখতে পারেনা। তিনি পুত্রকে ডেকে নিয়ে জানালেন- ‘পুত্রয়ামার, আল্লাহ্‌ আমাকে স্বপ্নে হুকুম করেছেন তোমাকে কুরবানী করার জন্যে। এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি? ’

‘যেমন বাপ, তেমন ছেলে।’ উর্দু ভাষায় বলা হয় ‘বাপকা বেটা’।   আর আরবী ভাষায় বলা হয় ‘হওয়া ইবনু আবিহী’। কথাটি যেন ইসমাঈলের জন্যে একশো পারসেন্ট প্রযোজ্য। আল্লাহর হুকুমের কাছে তিনি পিতার মতই নুইয়ে দিলেন মাথা। বললেন- ‘আব্বু, আল্লাহর হুকুম কার্যকর করুন। ইনশা’য়াল্লাহ আপনি আমাকে অটল ধৈর্যশীল পাবেন।’ দয়া ও করুনার সাগর মহান আল্লাহ্‌ তো তাঁদের পিতা পুত্র দু’জনের কথা শুনছিলেন। এসময় তাঁদের প্রতি যে তাঁর মহব্বত ও রহমতের স্রোতধারা কিভাবে বইয়ে আসছিলো তা একমাত্র তিনিই জানেন। প্রভু রহমান এ সময়টির কথা নিজ ভাষায় এভাবে বর্ণনা করেন-

“ওরা দু’জনেই যখন আমার হুকুমের কাছে মাথা নত করে দিলো আর ইব্রাহিম পুত্রকে (জবাই করার জন্য) উপুড় করে শুইয়ে দিলো, তখন আমি তাঁকে ডাক দিয়ে বললাম, ইব্রাহিম তুমি স্বপ্নে দেখা তুমি স্বপ্নে দেখা হুকুমকে সত্যে পরিনত করে দেখালে পুণ্যবানদের এভাবেই আমি প্রতিফল দান করি। এটা ছিলো একটা বিরাট পরীক্ষা। অতঃপর একটি বড় কুরবানীর বিনিময়ে আমি তাঁর পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর পরবর্তী লোকদের মাঝে একথা স্থায়ী করে দিলাম যে, ইব্রাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।” (সূরা ৩৭ আস সাফফাত, আয়াত ১০৩-১০৯)

ব্যাপারতো বুঝতেই পেরেছেন। বাপ ছেলে দুজনই আল্লাহর হুকুম পালন করার জন্যে তৈরি হয়ে গেলেন। ইব্রাহিম পুত্রকে কুরবানী করার জন্যে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। চোখ বন্ধ করে পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে দিতে উদ্যত হলেন। ঠিক এমনই সময় তাঁর প্রিয়তম প্রভু ডাক দিয়ে বললেন- ইব্রাহিম থামো, তুমি আমার হুকুম পালন করেছো বলে প্রমান দিয়েছ। ইব্রাহিম চোখ খুলে দেখলেন সামনে একটি দুম্বা দাড়িয়ে আছে। আল্লাহ্‌ বলে দিলেন পুত্রের পরিবর্তে এবার এই দুম্বাটিকে কুরবানী করে দাও। আর তোমার এই কুরবানী হবে বিরাট এক ঐতিহাসিক কুরবানী।

এবার ইব্রাহিম দুম্বাটিকে যবেহ করে দিলেন। প্রিয় পুত্রকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমের ঐ বিরাট কুরবানীকে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্যে মুসলিমদের মাঝে প্রতি বছর কুরবানী করার নিয়ম চালু করে দিলেন। আজো আমরা ইব্রাহিম (আঃ) এর সেই মহান কুরবানীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতি বছর ঐ তারিখে পশু কুরবানী করি। এভাবেই আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমকে বানিয়েছেন কালের সাক্ষী এক মহাপুরুষ।

এই চরম পরীক্ষাটিতেও ইব্রাহিম যখন উত্তীর্ণ হলেন, তখন আল্লাহ্‌ একদিকে তাঁকে নিজের খলিল বা বন্ধু বানিয়ে নিলেন। আল কুরআনে তাঁর নেতৃত্বের বিষয়টি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে –

“স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন ইব্রাহীমকে তাঁর প্রভু বেশ কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন আর সব ক’টিতেই সে উত্তীর্ণ হলো, তখন তিনি তাঁকে বললেন- আমি তোমাকে সন মানুষের নেতা বানাতে চাই। ইব্রাহিম জানতে চাইলো- এই প্রতিশ্রুতি কি আমার সন্তানদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য হবে? তিনি বললেন- আমার প্রতিশ্রুতি যালিমদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হবেনা। (সূরা ২ আল বাকারা আয়াত ১২৪)

এটাই আল্লাহর নীতি। তিনি কাউকেও বড় কোন দায়িত্ব ও নেতৃত্ব দিতে চাইলে তাঁকে ভালোভাবে বাজিয়ে নেন। সব পরীক্ষায় বিজয়ী হওয়ার পরে তিনি ইব্রাহীমকে শুধু নেতৃত্বই দেননি, সেই সাথে বৃদ্ধ বন্ধ্যা স্ত্রী সারাহর ঘরেও একটি পুত্র সন্তান দান করেন। তাঁর নাম ইসহাক। শুধু তাই নয় মহান আল্লাহ্‌ তাঁর দুই ছেলেকেই নবী মনোনীত করেন।

আল্লাহর কুদরত দর্শন

ইব্রাহিম (আঃ) এর প্রতি আল্লাহর এতো বড় অনুগ্রহের কারন কি? তা হলো, আল্লাহর প্রতি তাঁর পরম আস্থা ও প্রত্যয়। মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে আসমান ও যমীনের সমস্ত নিদর্শন দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সে কারনেই তাঁর মধ্যে সৃষ্টি হয় আল্লাহর প্রতি মজবুত ও অটল প্রত্যয়। আল্লাহর প্রতি নিজের পরম আস্থাকে আরো মজবুত করে নেবার জন্যে তিনি আল্লাহর কাছে একটা আবদার করেন। সে আবদারটি কুরআনের বর্ণনায় শুনুন-

“সে ঘটনাটি স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম বলেছিল, আমার প্রভু, তুমি কেমন করে মৃত্যুকে জীবিত করো আমাকে একটু চোখের সামনে দেখিয়ে দাও। তিনি বললেন- তুমি কি তা বিশ্বাস করোনা? ইব্রাহিম বললো- অবশ্যি বিশ্বাস করি, তবে আমার মনের সান্ত্বনার জন্যে নিজের চোখে দেখতে চাই। তিনি বললেন- তবে তুমি চারটি পাখি ধরো। সেগুলোকে নিজের কাছে ভালোভাবে পোষ মানিয়ে নাও। তারপর সেগুলিকে (যবাই করে) সেগুলোর একেকটি অংশ একেক পাহাড়ে রেঝে এসো। অতঃপর তুমি ওদের ডাকো। দেখবে ওরা তোমার কাছে দৌড়ে আসবে। জেনে রাখো, আল্লাহ্‌ বড় ক্ষমতাশীল মহাবিজ্ঞানী।” (সূরা ২ আল বাকারা আয়াত ২৬০)

কুরআনের বিবরন থেকে ঘটনাটি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। ইব্রাহিম পাখিগুলোকে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে এসে ওদেরকে ডাক দেন। সাথে সাথে ওরা জীবিত হয়ে ইব্রাহীমের কাছে উড়ে আসে। আল্লাহ্‌ তাঁকে চাক্ষুস দেখিয়ে দিলেন, তিনি কিভাবে মৃতকে জীবিত করতে পারেন। এভাবেই আল্লাহ্‌ কিয়ামতের দিন সব মানুষকে জীবিত করবেন এবং সবাই হাশরের ময়দানে দৌড়ে এসে একত্রিত হবে। বিষয়টি ইব্রাহিম স্বচক্ষে দেখে পরম প্রত্যয় ও প্রশান্তি লাভ করেন।

কা’বা ঘর নির্মাণ

এবার আল্লাহ্‌ তাঁর প্রিয় ইব্রাহীমকে আরেকটি বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি তাঁকে কা’বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রদান করেন। কোন জায়গাটিতে কা’বা ঘর নির্মাণ করতে হবে, তাও তিনি বলে দেন। সেই জায়গাটি তো এখন আমাদের সকলেরই জানা। কা’বা ঘর নির্মাণ করেছিলেন ইব্রাহিম (আঃ) পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে। এটিতো সেই জায়গা যেখানে তিনি রেখে এসেছিলেন শিশু পুত্র ইসমাঈল আর তাঁর মা হাজেরাকে। এটি তো সেই স্থান, যার পাশে মিনাতেই কুরবানী করতে গিয়েছিলেন প্রিয়তম পুত্র ইসমাঈলকে। আল্লাহর নির্দেশে পিতা-পুত্র দু’জনে মিলে নিপুন কারিগরের মতো কা’বার ভীত উঠালেন। তারপর নির্মাণ সম্পন্ন করলেন আল্লাহর ঘর কা’বা ঘরের। এ সময় দু’জনেই দয়াময় রহমানের দরবারে দোয়া করলেন-

“আমাদের প্রভু, তুমি আমাদের এই কাজ কবুল করো। তুমিতো সবই শোন এবং সবই জানো। প্রভু, আমাদেরকে তোমার অনুগত রাখো। আমাদের বংশ থেকে তোমার অনুগত একটি উম্মত সৃষ্টি করে দাও। তোমার হুকুম পালন করার নিয়ম আমাদের জানিয়ে দাও। আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দাও। তুমি তো মহাক্ষমাশীল দয়াবান। আমাদের প্রভু, এদের মধ্য থেকেই এদের মাঝে একজন রাসুল পাঠিয়ো—-।” (সূরা ২ আল বাকারা আয়াত ১২৮-১২৯)

মহান আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমের তৈরি ঘরকে নিজের ঘর বলে ঘোষণা দিলেন। এ ঘরকে তিনি চিরদিন বাঁচিয়ে রাখলেন। তিনি ইব্রাহীমকে বলে দিলেন-

“এই ঘরে হজ্জ পালন করার জন্যে মানুষকে সাধারনভাবে অনুমতি দিয়ে দাও। মানুষ বহু দূর দুরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে উটে চড়ে তোমার কাছে আসবে। —এই প্রাচীনতম ঘরের তাওয়াফ করবে।” (সূরা আল হাজ্জ আয়াত ২৭-২৯)

এভাবে মহান আল্লাহ্‌ ইব্রাহিম (আঃ) এর কীর্তিসমূহকে চির স্মরণীয় করে রাখলেন। তাঁর নির্মাণ করা ঘরকে কেন্দ্র করে হজ্জ, তাওয়াফ ও কুরবানীর নিয়ম চিরস্থায়ী করে দিলেন। এই মহান ঘর ও ঘরের কাছে রেখে যাওয়া নিজ পরিবারের জন্যে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন-

“প্রভু, এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানাও। আমার প্রভু, আমার সন্তানদের একটি অংশকে তোমার এই মহাসম্মানিত ঘরের কাছে এনে পুনর্বাসিত করেছি। এটাতো পানি ও তরুলতাশুন্য এক মরু প্রান্তর। প্রভু, ওদের এখানে রেখেছি যেন, এরা সালাত কায়েম করে। সুতরাং তুমি ওদের প্রতি মানুষের মনকে অনুরক্ত বানিয়ে দাও। শোকর সেই মহান আল্লাহর, যিনি এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে দুটি সন্তান ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। প্রভু, আমাকে এবং আমার সন্তানদেরকে সালাত কায়েমকারী বানাও।” (সূরা ১৪ ইব্রাহিমঃ আয়াত ৩৫-৪০)

কুরআনে হজরত ইবরাহীমের প্রশংসনীয় গুনাবলী

মহান আল্লাহ্‌ তাঁর কিতাব আল কুরআনে ইব্রাহিম (আঃ) এর গুনবৈশিষ্টের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এখানে আমরা কয়েকটি উল্লেখ করলাম-

১। “পৃথিবীর কাজের জন্যে আমি ইব্রাহীমকে বাছাই করেছিলাম।”

২। “তাঁর প্রভু যখন বললেন- ‘আত্মসমর্পণ করো’। সে বললো- ‘সারা জাহানের প্রভুর নিকট আমি আত্মসমর্পণ করলাম।’’

৩। “সে বললো- পুত্র আমার, মৃত্যু পর্যন্ত আলালহর কাছে আত্মসমর্পিত থাকো।”

৪। “তোমরা খাটিভাবে ইবরাহীমের পথ অনুসরন করো।”

৫। “আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমকে তাঁর বন্ধু বানিয়েছেন।”

৬। “আমি ইব্রাহীমকে আসমান ও যমীনের সমস্ত নিদর্শন দেখিয়েছি।”

৭। “সে বললো- আমি আসমান ও যমীনের স্রষ্টার দিকে মুখ ফিরালাম।”

৮। “ইব্রাহিম ছিলো বড়ই ধৈর্যশীল কোমল হৃদয় ও আমার প্রতি অনুরক্ত।”

৯। “ইব্রাহিম নিজেই ছিলো একটি উম্মাহ। সে একমুখী হয়ে আল্লাহর অনুগত ছিল।”

১০। “আল্লাহর অনুগ্রহরাজির প্রতি সে ছিলো শোকরগুজার। তিনি তাঁকে পছন্দ করেছেন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।”

১১। “ইব্রাহিম ছিলো এক অতি সত্যবাদী মানুষ এবং নবী। ”

১২। “ইব্রাহীমকে আমি সতর্কবুদ্ধি ও জ্ঞান দান করেছি।”

১৩।“আমি বললাম- হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের প্রতি সুশীতল, শান্তিময় ও নিরাপদ হয়ে যাও।”

১৪। “আমি ডেকে বললাম- হে ইব্রাহিম, তুমি স্বপ্নে দেখা হুকুমকে সত্যে পরিনত করেছো।”

১৫। “তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে ইবরাহীমের মধ্যে—–।”

জেনে নিন

এবার কয়েকটি তথ্য জেনে নিন। সেগুলো হলো- কুরআন মাজীদে ইবরাহীমের নাম উচ্চারিত হয়েছে ৬৯ বার। যেসব সুরাতে ইব্রাহিম (আঃ) সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে- সূরা আল বাকারা, আন নিসা, আন-আম, তাওবা, হুদ, ইব্রাহিম, হিজর, আন নাহল, মরিয়ম, আম্বিয়া, আল হাজ্জ, শোয়ারা, আন কাবুত, সাফফাত, যুখরুফ, যারিয়াত, মুমতাহিনা।

৭।

জর্ডান অঞ্চলের নবী লুত

(আঃ)

হজরত লুতের পরিচয়

হজরত লুত (আঃ) আল্লাহর এক সম্মানিত নবী। তিনি সেই সব নবীদের একজন, যাদের জাতি ঈমান আনেনি। হজরত লুতের জাতি যে কেবল ঈমান আনেনি, তা নয়, বরং তাঁর জাতির লোকেরা ছিলো সেকালের সবচেয়ে পাপিষ্ঠ লোক। হজরত লুত (আঃ) সেইসব নবীদেরও একজন, যাদের জাতিকে আল্লাহ্‌ ইসলামের বিরোধিতা করার কারনে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। হজরত নূহ, হজরত সালেহ ও হজরত হুদ (আঃ) এর জাতির মতোই লুত (আঃ) এর জাতিকেও আল্লাহ্‌ পাক ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

হজরত লুত (আঃ) ছিলেন মহান নবী হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ভাতিজা। হজরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন নিজ দেশ ইরাকে ইসলাম প্রচার করছিলেন, তখন সেখানে মাত্র দু’জন লোক ঈমান এনেছিলেন। এদের একজন ছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এর স্ত্রী সারাহ আর অন্নজন ছিলেন তাঁর ভাতিজা হজরত লুত (আঃ)। তিনি যখন ইরাক থেকে হিজরত করতে বাধ্য হন, তখন কেবল এ দু’জনই তাঁর হিজরতের সাথী হন।

হিজরত ও নবুয়্যত লাভ

রাজা নমরূদের অত্যাচারে যখন নিজ দেশে ইসলাম প্রচার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন লুত চাচা ইব্রাহিম (আঃ) এর সাথে দেশ ত্যাগ করেন। চাচার সাথে দীন প্রচারের কাজে তিনি ফিলিস্তিন, সিরিয়া হয়ে আফ্রিকার মিশরে পাড়ি জমান। মহান নবী হজরত ইব্রাহীমের ইসলাম প্রচারের সাথী হিসেবে লুত অগাধ জ্ঞান ও প্রশিক্ষন লাভ করেন। ফলে আল্লাহ্‌ তায়ালা তাকেও নবুয়্যত দান করেন এবং জর্ডান এলাকায় একটি পাপিষ্ঠ জাতির কাছে ইসলাম প্রচারের গুরু দায়িত্বে নিযুক্ত করেন।

কোন সে জাতি?

কোন সে জাতি? যার কাছে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব অর্পিত হয় হজরত লুত (আঃ) এর উপর? কুরআনে এদেরকে ‘কওমে লুত বা লুতের জাতি’ বলা হয়েছে। এ জাতি যে অঞ্চলে বাস করতো, বর্তমানে সে অঞ্চলের নাম ট্রান্স জর্ডান। এ জায়গাটি ইরাক ও ফিলিস্তিনের মাঝামাঝি অবস্থিত। সেকালে এ জাতির প্রধান শহরের নাম ছিলো সাদুম। এছাড়াও তাঁদের আরো অনেকগুলো শহর ছিলো। চরম পাপাচারের কারনে আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁদেরকে ধ্বংস করে দেন। তাঁদের শহরগুলোকে তলিয়ে দেন। বর্তমানে যাকে লুত সাগর বা Dead Sea (মৃত সাগর) বলা হয়, তাঁদের শহরগুলো তলিয়ে এতেই মিশে গিয়েছিলো। লুত সাগরের পূর্ব-দক্ষিন অঞ্চলে আজো তাঁদের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান আছে। হজরত ইব্রাহীম (আঃ) এর প্রতিনিধি হিসেবে এ এলাকাতেই হজরত লুত (আঃ) ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

লুত জাতির পাপাচার

লুত (আঃ) এর জাতির মতো পাপিষ্ঠ জাতি খুব কমই ছিলো। তাঁদের চরিত্র এতো খারাপ ছিলো, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। তারা ছিলো সমকামী। তারা প্রকাশ্যে অশ্লীল কাজ এবং জনসমাবেশে কুকর্মে লিপ্ত হতো। ডাকাতি-রাহাজানি ছিলো, তাঁদের নিত্য দিনের কাজ।

তাঁদের এলাকায় কোন ভালো মানুষ এসে নিরাপদে ফিরে যেতে পারতোনা। কোনো ব্যাবসায়ী বণিক তাঁদের এলাকায় গেলে সব কিছু খুইয়ে আসতে হতো। তাঁদের মধ্যে সামান্যতম লজ্জা শরম পর্যন্ত ছিলোনা। তাঁদের মাঝে একজন সৎ লোকও ছিলোনা, যে পাপ কাজে বাধা দেবে। এমন একটি প্রানিও ছিলোনা, যে পাপকে ঘৃণা করতো। এমন একজন লোকও ছিলোনা, যে কোন অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করতো।

হজরত লুতের আহবান

এই পাপিষ্ঠ লোকদের সত্য পথ দেখানোর জন্যেই মহান আল্লাহ্‌ হজরত লুত (আঃ) কে পাঠালেন। তিনি এসে তাঁদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকলেন। মহান আল্লাহকে ভয় করতে বললেন, কুরআনের ভাষায়-

“লুতের জাতি রাসুলদেরকে অস্বীকার করেছিলো। লুত তাঁদের বলেছিল, তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করবেনা? আমি তোমাদের জন্যে একজন বিশ্বস্ত রাসুল। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর আমার কথা মেনে নাও।”

আল্লাহর পরম ধৈর্যশীল নবী তাঁদের আরো বললেন-

“তোমরা এমন পাপাচার করছো, যা তোমাদের আগে কোন জাতি করেনি। তোমরা একটি সীমালংঘনকারী জাতি।” (সূরা ৭ আল আরাফঃ আয়াত ৮০)

তিনি তাঁদের বলেছিলেন-

“কেন তোমরা নরদের সাথে নোংরা কাজ করো? কেন দাকাতি-রাহাজানি করো? আর জনসমাবেশে কুকাজে লিপ্ত হও।”

এভাবে লুত (আঃ) দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের অনেক উপদেশ দিলেন, আল্লাহর পথে আসতে বললেন। পাপাচার থেকে বিরত হতে বললেন। কুকর্মের প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু তাঁদের একটি লোকও উপদেশ গ্রহন করলোনা। বরং——-

হজরত লুতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

হ্যাঁ, ওরা হযরত লুতের উপদেশ তো গ্রহন করলোই না, সৎ পথে তো এলোই না, বরং হযরত লুতের সংশোধন কাজের বিরুদ্ধে গড়ে তুললো বিরাট প্রতিরোধ। কেউ তাঁদের ভালো হবার কথা বলুক এটা তারা সহ্য করতে পারতো না। পাপ কাজ ত্যাগ করার কথা তারা শুনতে পারতোনা। ফলে হযরত লুত (আঃ) এর বিরামহীন সংশোধন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তারা ক্ষেপে উঠলো। হযরত লুত যে তাঁদেরকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখিয়েছেন এর জবাবে তারা প্রথমে হযরত লুতকে বললো- আমরা তো তোমাকে আর তোমার খোদাকে প্রত্যাখ্যান করেছি। কই তোমার খোদার আযাব? তুমি যদি সত্যি খোদার নবী হতে তবে তো আল্লাহর আযাব এনে দেখাতে পারতে। তারা আল্লাহর নবী হযরত লুতকে শাসিয়ে বললো-

“লুত, যদি তুমি তোমার সংশোধন কাজ থেকে বিরত না হও, তবে তোমাকে অবশ্যই আমাদের দেশ থেকে বের করে দেব।” (সূরা ২৬ আশ-শোয়ারা, আয়াত ৬৭)

কিন্তু আল্লাহর কোন নবী তো আল্লাহর দ্বীন প্রচারের কাজে বিরত থাকতে পারেননা। মানুষকে সৎ পথে ডাকার ও সংশোধন করার কাজ থেকে বিরত হতে পারেননা। হযরত লুত তাঁর মিশন চালিয়ে যেতে থাকলেন। অবশেষে তারা আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে চরম সিদ্ধান্ত নিলো। নেতারা জনগণকে বললো –

“এই লুত আর তাঁর পরিবার পরিজনকে দেশ থেকে বের করে দাও। ওরা বড় পবিত্র লোক।”

এলো ধ্বংসের ফেরেস্তারা

আল্লাহর নবী হযরত লুত (আঃ) এর পুত পবিত্রতা নিয়ে ওরা যখন তিরস্কার করতে থাকলো, আর তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেবার ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করতে থাকলো, তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ ঐ জাতিটিকে পৃথিবীর বুক থেকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্যে ফেরেস্তা পাঠিয়ে দিলেন। ফেরেস্তারা প্রথমে হযরত ইব্রাহীমের কাছে এলো। তাঁর স্ত্রী সারাহর ঘরে তাঁর একটি পুত্র সন্তান হবার সুসংবাদ দিলো। বিদায় নেয়ার সময় ইব্রাহিম তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন-

“হে দুতেরা, আপনারা কি কোন অভিযানে এসেছেন?

-হ্যাঁ, আমরা ঐ অঞ্চলকে (সাদুম) ধ্বংস করে দিতে এসেছি। আমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাঁদেরকে পাথর মেরে ধংস করে দিতে। আপনার মহান প্রভু আল্লাহর পক্ষ থেকে পাথরে চিহ্ন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

ইব্রাহিম বললেন- সেখানে তো লুত আছে, তাঁর কি উপায় হবে?

 ফেরেস্তারা বললেন- আমরা জানি সেখানে কারা আছে? লুত আর তাঁর পরিজনকে নিরাপদ রাখা হবে। অতপর ফেরেস্তারা সে এলাকায় চলে এলেন সুস্রী মানুষের বেশ ধরে। এসে হযরত লুতের ঘরে উঠলেন। লুত তাঁদের চিনতে পারেননি। বললেন- আপনাদের তো চিনতে পারছি না।

তারা বললো- আমরা আপনার কাছে এসেছি। এই লোকেরা যেই বিষয়ে সন্দেহ করছে আমরা সে বিষয়ে ফায়সালা করতে এসেছি। এতোক্ষনে হযরত লুতের বাড়িতে নতুন মেহমানদের আসার খবর পেয়ে গেছে শহরের সব মন্দ লোকেরা। বদমাশ লোকগুলো দৌড়ে এলো মেহমানদের সাথে খারাপ কাজ করার মতলবে। লুত তাঁদের বাধা দিলেন। আফসোস করে বললেন- তোমাদের মাঝে কি একজন ভালো মানুষও নেই?

ফেরেস্তারা হযরত লুতকে কানে কানে বলে দিলেন, আমরা আল্লাহর দূত ফেরেস্তা। এরা আমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবেনা। রাতের একটি অংশ পার হয়ে গেলে আপনি আপনার পরিবার- পরিজনকে নিয়ে এই এলাকা ত্যাগ করে চলে যাবেন। ওদের ধ্বংসের নির্ধারিত সময়টি হলো ভোর। ভোর তো ঘনিয়ে এলো। তারপর ক হলো? তারপর ভোর হয়ে এলো। ভোর হবার আগেই আল্লাহর নির্দেশে হযরত লুত এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন। এদিকে ফেরেস্তারা গোটা এলাকার জমিনকে সম্পূর্ণ ওলট-পালট করে দিলেন। অবিরাম পাথর নিক্ষেপ করে সব কিছু ধ্বংস করে দিলেন। তাঁদের একটি লোককেও বাঁচিয়ে রাখা হলোনা। বিরান করে দেয়া হলো সবকিছু। সম্পূর্ণ বিনাশ হয়ে গেলো পাপিষ্ঠ জাতি। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“আমি তাঁদের প্রচন্ড বর্ষণের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিলাম। সতর্ক করার পরও যারা সংশোধন হয়না, তাঁদের উপর এমন নিকৃষ্ট বর্ষণই করা হয়ে থাকে।”

নবীর দুর্ভাগা স্ত্রী

যারা ধ্বংস হয়েছে, তাঁদের সাথে হযরত লুত (আঃ) এর স্ত্রীও রয়েছেন। ইনি নবীর স্ত্রী হয়েও কুফরির পক্ষ ত্যাগ করেননি। নবীকে তাঁর দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করেননি। ফলে আল্লাহ্‌ তায়ালা কাফিরদের সাথে তাকেও ধ্বংস করে দেন। হযরত লুত যখন রাতে ঐ এলাকা ত্যাগ করেন, তখন তাঁর এই স্ত্রী তাঁর সাথে যাননি। কাফিরদের সাথে থেকে যান এবং আল্লাহর গযবে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যান। আল্লাহ্‌ বলেন-

“আমি লুত আর তাঁর পরিবার-পরিজনকে সেই ধ্বংস থেকে বাঁচালাম। তবে তাঁর বৃদ্ধা (স্ত্রী) কাফিরদের সাথে রয়ে গেলো। আর আমি তাঁদের সম্পূর্ণ ধংস করে দিলাম। ”

আল কুরআনের অন্য এক স্থানে মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“আল্লাহ্‌ কাফিরদের উপমা বানিয়েছেন নূহ আর লুতের স্ত্রীকে। তারা দু’জন আমার দুই নেক বান্দার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলো। কিন্তু তারা তাঁদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। স্বামী নবী হয়েও আল্লাহর আযাব থেকে তাঁদের বাচাবার ব্যাপারে উপকারে আসলো না। তাঁদের নির্দেশ দেয়া হলো- দোযখীদের সাথে প্রবেশ করো দোযখে।” (সূরা ৬৬ আত তাহরিম। আয়াত ১০)

লুত জাতি কেন ধ্বংস হলো?

হযরত লুত (আঃ) এর জাতিকে আল্লাহ্‌ পাক কেন সমূলে ধংস করলেন? কারন, তারা-

১। আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করেছিলো।

২। চরম অস্লীলতা ও নির্লজ্জতার মাঝে নিমজ্জিত হয়েছিলো।

৩। নিকৃষ্ট ধরনের পাপ কাজে (সমকামিতায়) ডুবে গিয়েছিল।

৪। ডাকাতি, রাহাজানি ও লুণ্ঠনের রাজত্ব গড়ে তুলেছিল।

৫। চরম কৃপণতা ও নিষ্ঠুরতা তাঁদের স্বভাবে পরিনত হয়েছিল।

৬। পুত পবিত্র জীবন যাপনকে তারা বিদ্রূপ ও ব্যাঙ্গ করতো।

৭। তারা নবীকে দেশ থেকে বের করে দেবার ষড়যন্ত্র করেছিলো।

৮। নবীকে বিদ্রূপ করে আল্লাহর আযাব আসার দাবী করেছিলো।

কুরআনে লুত (আঃ)

আল্লাহ্‌ তায়ালা আল কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন- “আমি ইসমাঈল, ইউশা, ইউনুস এবং লুতকে গোটা জগতবাসীর উপর মর্যাদা দান করেছি।’ সত্যিই মহান আল্লাহ্‌ তাঁর এই নবীকে বিরাট মর্যাদা দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে লুত নামটি ২৭ বার উচ্চারিত হয়েছে। যেসব সুরায় উল্লেখ হয়েছে, সেগুলো বলে দিচ্ছি- আনআম-৮৬, আ’রাফ-৮০, হুদ-৭০,৭৪,৭৭,৮১, হিজর- ৫৯,৬১, আম্বিয়া- ৭১,৭৪, হাজ্জ-৪৩, শোয়ারা- ১৬০,১৬১,১৬৭, আন নামল-৫৪,৫৬, আনকাবুত- ২৬,২৭,৩২,৩, সাফফাত- ১৩৩, সয়াদ-১৩, কাফ-১৩, আল কামার- ৩৩,৩৪, আত তাহরিম-১০।

৮।

কুরবানীর নবী ইসমাঈল

(আঃ)

“এ কিতাবে ইসমাঈলকেও স্মরণ করো। সে ছিলো প্রতিশ্রুতি পালনকারী। ছিল একজন রাসূল ও নবী। সে তাঁর লোকজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতো। আর সে ছিলো তাঁর প্রভুর অবারিত সন্তোষ প্রাপ্ত।” – (আল কুরআন ১৯- ৫৪,৫৫)

কে এই ইসমাঈল?

আল্লাহর অবারিত সন্তোষ প্রাপ্ত এই মানুষটি কে? কী তাঁর পরিচয়? কেনইবা আল্লাহ্‌ তাঁর উপর নিজ সন্তোষের দুয়ার খুলে দিয়েছেন? হ্যাঁ, আসুন আমরা তাঁকে জানি, খুজে দেখি আল্লাহর কিতাবে তাঁর কি পরিচয় দেয়া হয়েছে?

ইনি হলেন বিশ্বনেতা আল্লাহর নবী ইব্রাহিম (আঃ) এর পুত্র। তাঁর মায়ের নাম হাজেরা। ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহন করেন। পরে মক্কায় মায়ের কোলে লালিত- পালিত হন। একটু বড় হলে আল্লাহ্‌ তাঁর পিতাকে নির্দেশ দেন তাঁকে কুরবানী করবার জন্যে। পিতার মতই তিনি আল্লাহর হুকুমের কাছে মাথা নত করে দেন।

এরপর তিনি পিতা ইব্রাহিম (আঃ) এর সাথে কা’বা ঘর নির্মাণ করেন। আল্লাহ্‌ তাঁকে নবয়্যত দান করেন। তিনি আরবের হিজাযে সালাত এবং যাকাত ভিত্তিক একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ করেন। ইনিই হলেন মহান আল্লাহর অবারিত সন্তোষ লাভকারী নবী হজরত ইসমাঈল (আঃ)।

মায়ের সাথে মক্কায় এলেন

ইব্রাহিম (আঃ) এর ছিলেন দু’জন স্ত্রী। বড়জন সারাহ আর ছোটজন হাজেরা। সারাহ বুড়ি হয়ে গেছেন, এখনো তাঁর কোন ছেলেমেয়ে হয়নি। কিন্তু আল্লাহ্‌ হাজেরাকে চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি ছেলে দান করেন। বুড়ো বয়েসে ছেলে পেয়ে ইব্রাহীমের যে কি আনন্দ তা কি আর ভাষায় প্রকাশ করা যায়? তিনি ছেলের নাম রাখেন ইসমাঈল।

কিন্তু আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমকে নিজের বন্ধু বানাবার জন্যে কতো যে পরীক্ষা করেছেন, তাঁর ইয়ত্তা নেই। শিশুপুত্রের ব্যাপারে তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেন। বললেন- শিশু ইসমাঈল ও তাঁর মাকে মক্কার মরু প্রান্তরে রেখে এসো। ইব্রাহীমের কাছে আল্লাহর হুকুম শিরোধার্য। তিনি তাঁদের নিয়ে ফিলিস্তিন থেকে রওয়ানা করলেন মক্কার দিকে। সহীহ বুখারীতে এ ঘটনার বিবরন দিয়ে বড় একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে-

ইব্রাহিম হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে রওয়ানা করেন। পথে হজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে একদিন তিনি তাদের নিয়ে মক্কায় এসে উপস্থিত হলেন। এখন যেখানে কা’বা ঘর ও যমযমের কূপ এখানেই একটি গাছের নিচে তাঁদের রাখেন। তখন মক্কায় কোন মানুষ ছিলোনা। পানিও ছিলো না। ইব্রাহিম তাঁদের এক থলে খেজুর আর এক মশক পানি দিয়ে ফিরে চললেন ফিলিস্তিনের দিকে। হাজেরা তাঁর পিছে পিছে দৌড়ে এলেন। বললেন- আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদের এখানে রেখে যাচ্ছেন? ইব্রাহিম জবাব দিলেন- হ্যাঁ। একথা শুনে হাজেরা বললেন- ‘ঠিক আছে, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ আমাদের ধ্বংস করবেননা।’ একথা বলে তিনি ফিরে এলেন যথাস্থানে। এদিকে ইব্রাহিম যে প্রিয়তম পুত্র স্ত্রীকে রেখে ফিরে চলেছেন, তাঁর বুক তো ফেটে যাচ্ছিলো। তাঁর হৃদয়ের কান্না তখন আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কেউ দেখেননি। কিন্তু এ যে আল্লাহর হুকুম। আর তাঁর হুকুম পালন করাতো অপরিহার্য। আল্লাহর হুকুমে ইব্রাহিম এতো বড় বিরহের কাজও করতে পারেন। বুকের মধ্যে মনকে চেপে ধরে নীরবে তিনি ফিরে চলেছেন। পিছনে ফিরে তাকাননি। তাকালে ওদের চেহারা তাঁকে আল্লাহর নির্দেশ পালনে বাধা দিতে পারে। তাঁর হৃদয় যেন সমুদ্রের মতো উদার আর হিমালয়ের মতো অবিচল। সামনে অগ্রসর হয়ে চলেছেন তিনি। কিছুদূর এসে একটি টিলার উপরে উঠে ফিরে দাঁড়ালেন। এখান থেকে আর ওদের দেখা যায়না। এখানে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম দয়াময় প্রভু মহান আল্লাহর দরবারে দুহাত তুলে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দোয়া করলেন-

“আমার প্রভু, এই দানা-পানিহীন মরুভূমিতে তোমারই সম্মানিত ঘরের পাশে আমার সন্তানের বসতি স্থাপন করে গেলাম। প্রভু, ওদের এখানে রেখে গেলাম যাতে ওরা সালাত কায়েম করে। তাই তুমি মানুষের মনকে ওদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিও আর ফলফলারি দ্বারা ওদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিও, যেন ওরা তোমার শুকোরগুজার হয়ে থাকে।” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৩৭)

অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছার উপর মনকে অটল রেখে ধীরে ধীরে ইব্রাহিম চলে এলেন ফিলিস্তিনের দিকে। এ দিকে হাজেরা থলের খেজুর আর মশকের পানি খেয়ে দিন কাটাতে থাকেন। শিশু ইসমাঈল মায়ের বুকের দুধ পান করেন। কিন্তু অচিরেই মশকের পানি শেষ হয়ে গেলো। পিপাসায় তাঁর ছাতি ফেটে যায়। বুকে দুধ আসেনা। বাচ্চাও ক্ষুদায় পিপাসায় ধড়পড় করছে। মৃত্যু যেন হাতছানি দিয়ে তাঁদের ডাকছে। চোখের সামনে অনাহারে শিশুপুত্রের করুন মৃত্যু কোন মা কি সহ্য করতে পারে? পুত্রকে বাঁচানোর জন্যে তিনি পানির খোজে দৌড়ালেন। সামনেই একটি পাহাড়। এই পাহাড়ের নাম সাফা পাহাড়। তিনি দৌড়ে সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে গেলেন। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন কোন মানুষ দেখতে পান কিনা? উদ্দেশ্য হলো মানুষ দেখতে পেলে কিছু পানি চেয়ে নেবেন। কিন্তু না কোথাও কোন মানুষ দেখা যায়না।

এবার দ্রুত পাহাড় থেকে নেমে পড়লেন। সামনে মাঠের ওপাশেই আর একটি পাহাড়। এর নাম মারওয়া পাহাড়। হাজেরা দৌড়ে এসে মারওয়া পাহাড়ের উপরে উঠলেন। দুই পাহাড়ের মাঝে সাত চক্কর দৌড়াদৌড়ী করলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোন মানুষের সন্ধান পেলেন না। ছেলে মৃত প্রায় আর নিজের জীবন ওষ্ঠাগত। হাজেরা চোখের সামনে বাচার আর কোন উপায় দেখেন না। এখন তিনি সম্পূর্ণ অসহায়।

আল্লাহর উপহার যমযমের কূপ

কিন্তু আল্লাহ্‌ যে অসহায়ের সহায়, হাজেরা হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনলেন। আশার আলো নিয়ে সেদিকে কান খাড়া করলেন। বললেন- তুমি যেই হওনা কেন, সম্ভব হলে আমাকে সাহায্য করো। হঠাৎ তিনি একজন ফেরেস্তাকে দেখতে পেলেন। এখন যেখানে যমযমের কুপ, ফেরেস্তা সেখানে দাঁড়িয়ে মাটির উপরে পায়ের গোড়ালি দিয়ে একটি আঘাত করলেন। সাথে সাথে মাটির নিচ থেকে উপচে উঠতে লাগলো পানি। হাজেরা দৌড়ে এসে চারপাশে বাধ দিলেন। অঞ্জলি ভরে পানি পান করলেন। মশকে পানি ভরে নিলেন। বুকে দুধ এলো। ইসমাঈলকে প্রান ভরে দুধ পান করালেন। এর নামই যমযম কূপ। সুপেয় অনাবিল পানির অবিরাম ধারা। ফেরেস্তা বলে গেলেন আপনার ভয়ের কোন কারন নেই। এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। আপনার পুত্র বড় হয়ে তাঁর পিতার সাথে আল্লাহর ঘর পুনর্নির্মাণ করবে। আপনারা নিরাপদ।

ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন

আল্লাহর অসীম সাহায্য পেয়ে হাজেরা আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। দিন যায় রাত আসে। ইসমাঈল ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠেন। এদিকে পানির সন্ধান পেয়ে মক্কার আকাশে পাখি এলো। পানির সন্ধান পেয়ে ইয়েমেন দেশের জুরহুম গোত্রের একদল লোক মক্কায় বসবাস করার জন্যে হাজেরার অনুমতি চাইলো। তিনি তাঁদের অনুমতি দিলেন। ফলে মক্কায় জনবসতি গড়ে উঠলো। পানির ছোঁয়াচ পেয়ে মরুভূমিতে ফল ফলারি উৎপন্ন হতে থাকলো। আল্লাহ্‌ ইসমাঈল ও তাঁর মায়ের সব অসুবিধা দূর করে দিলেন। এখানে যে জনবসতি গড়ে উঠেছে তাঁর কৃতৃত্ব কিন্তু ইসমাঈলের মায়ের হাতেই থাকলো। ইব্রাহিম (আঃ) প্রায়ই প্রানপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল ও স্ত্রী হাজেরাকে দেখার জন্যে মক্কায় আসেন। ইসমাঈলের হাঁটাহাঁটি দৌড়াদৌড়ি দেখে ইব্রাহীমের মন ভরে যায়। ফুটফুটে টুকটুকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আনন্দে আল্লাহর শোকর আদায় করেন। যখন আসে পাশের মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার জন্যে বের হন, ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে যান। এভাবে কিছু দিন মক্কায় থেকে আবার চলে যান ফিলিস্তিনে। আবার ফিরে আসেন মক্কায়। ইসমাঈল দিন দিন বেড়ে ওঠেন। পিতা তাঁকে মনের মতো সুন্দর করে গড়ে তোলেন। যেমন বাপ, তেমনি আল্লাহর অনুগত হয়ে গড়ে উঠে ইসমাঈল। ফলে পিতার মহব্বত বেড়ে যায় পুত্রের প্রতি। আল্লাহর প্রতি তাঁদের পিতা পুত্রের ভালোবাসাকে আল্লাহ্‌ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

যবাই হবার হুকুম পেলেন

ইব্রাহিম একদিন স্বপ্ন দেখেন তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন। নবীদের স্বপ্নও একপ্রকার অহী বা আল্লাহর আদেশ। আল্লাহর হুকুম শিরোধার্য। কিন্তু ইসমাঈল কি এ হুকুম মেনে নেবে? আসলে আল্লাহ্‌ তো সে পরীক্ষাই নিতে চান। আল্লাহতো দেখতে চান ইসমাঈল আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা পেতে দেয় কিনা? নিজের জীবনের চাইতেও আল্লাহর হুকুম পালন করাকে বড় কর্তব্য মনে করে কিনা? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে সে নিজের জীবনকে কুরবানী করতে প্রস্তুত আছে কিনা?

কিন্তু ইসমাঈলতো তাঁর পিতার মতই আল্লাহর অনুগত। আল্লাহর সন্তুষ্টির চাইতে বড় কোন কাম্য তাঁর নেই। পিতা ইব্রাহিম আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরবানী করার হুকুম জানিয়ে দেয়ার সাথে সাথে আল্লাহর অতি সম্মানিত দাস ইসমাঈল বলে উঠেন –

“আব্বা, আপনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করুন। ইনশা’য়াল্লাহ আপনি আমাকে অটল অবিচল ও দ্রঢ় মনোবলের অধিকারী পাবেন।” (সূরা ৩৭ আসসাফফাত, আয়াত ১০২)

তারপর যখন পিতা পুত্র দুইজনই আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করে দিলেন এবং ইব্রাহিম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন, তখন নিজের দুই ‘প্রভু পাগল’ দাসের জন্যে আল্লাহর মহব্বতের দরিয়া উথলে উঠলো। সাথে সাথে তিনি ডাক দিয়ে বললেন-

‘ইব্রাহিম, থামো। স্বপ্নকে তুমি সত্য প্রমান করে দেখিয়েছ।” (সূরা ৩৭ আসসাফফাত, আয়াত ১০৫)

ব্যাস, বাপ বেটা দুইজনই আল্লাহর পরীক্ষায় পাশ করলেন। আর আল্লাহর পরীক্ষায় পাশ করার চাইতে বড় বিজয় কি হতে পারে? আল্লাহর ফেরেস্তারা ইব্রাহীমের সামনে একটি দুম্বা এনে রেখে দিলেন এবং সেটিকে কুরাবানী করে দিতে বললেন। ইব্রাহিম কৃতজ্ঞ মনে পুত্রের পরিবর্তে দুম্বাটি যবাই করে দিলেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“আমরা একটি মহান কুরবানীর বিনিময়ে ইসমাঈলকে ছাড়িয়ে নিলাম।” (সূরা ৩৭ আসসাফফাত, আয়াত ১০৭)

সত্যি এটা ছিলো একটা বিরাট কুরবানী। আল্লাহর হুকুম মতো পিতা পুত্রকে কুরবানী করতে রাজি হয়ে যান। আবার পুত্রও আল্লাহর হুকুমে যবাই হবার জন্যে ছুরির নিচে গলা পেতে দেন। তাইতো এটা একটা বিরাট কুরবানী, বিরাট আত্মত্যাগ। সে জন্যই আল্লাহ্‌ তায়ালা এই বিরাট কুরবনীকে চিরদিন স্মরণীয় করে রাখার জন্যে সেই তারিখে যেনো মুমিনেরা আল্লাহর হুকুমে নিজেদের আত্মত্যাগের প্রমান স্বরূপ পশু কুরবানী করে, এ নিয়ম চালু রেখেছেন। বিগত প্রায় চার হাজার বছর থেকে মানুষ ইসমাঈল ও তাঁর পিতার সেই বিরাট কুরবানীকে স্মরণ করে। প্রতি বছর ঐ তারিখে মুসলিমরা আল্লাহর উদ্দেশে পশু কুরবানী করে। যারা মক্কায় হজ্জ পালন করতে যায়, ঐ তারিখে সেখানে কুরবানী করা তাঁদের জন্যে অবশ্য করনীয় কাজ। যারা আল্লাহর হুকুমের সামনে বিনীত হয়ে মাথা নত করে দেন, আল্লাহ্‌ তাঁদের এভাবেই পুরস্কৃত করেন। পরীক্ষায় পাশের পর আল্লাহ্‌ ইসমাঈলকে নবুয়্যত দান করেন।

এর আগে ইসমাঈলের মা পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন মহান আল্লাহ্‌ সেই ঘটনাটিকেও চির স্মরণীয় করে রাখলেন। যারাই মক্কায় হজ্জ করতে যাবে, তাঁদের জন্যে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করার নিয়ম আল্লাহ্‌ চালু করে দিলেন। মা হাজেরার সেই কষ্টকে আল্লাহ্‌ স্মরণীয় করে রাখলেন কেন?

কারন তিনি যে আল্লাহর ইচ্ছায় মক্কার জনমানবহীন মরুভূমিতে বসবাস করতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী ইব্রাহিম যখন বললেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁকে এই মরুভূমিতে রেখে যাচ্ছেন, তখন তিনি একমাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা করে সেখানে থেকে গেলেন। তাঁর এই যে বিরাট আল্লাহ্‌নির্ভরতা, এরি বিনিময়ে আল্লাহ্‌ পাক তাঁকে চির স্মরণীয় ও সম্মানিত করে রাখলেন।

বিয়ে করলেন পিতা হলেন

দিন যায় রাত আসে। বছর ঘুরে আসে নতুন বছর। ইসমাঈল বড় হয়ে উঠেন। পাশেই বসবাস করছে জুরহুম গোত্রের লোকেরা। ইসমাঈল তাঁর সুন্দর ও চমৎকার মানবীয় গুনাবলীর জন্যে তাঁদের খুব প্রিয় হয়ে উঠেন। ইসমাঈল যৌবনপ্রাপ্ত হলে তারা তাঁদের এক মেয়েকে ইসমাঈলের কাছে বিয়ে দেয়। বিয়ের কিছুকাল পরেই তাঁর মা হাজেরা ইহলোক ত্যাগ করেন। আল্লাহ্‌ পাক ইসমাঈলের মাকে নিজ রহমতের ছায়াতলে স্থান দিন। এরই মাঝে ইব্রাহিম এলেন প্রিয় পুত্র ও স্ত্রীকে দেখার জন্যে। ইসমাঈল এসময় মক্কার বাইরে ছিলেন। ইব্রাহিম এসে পুত্রকে বাড়িতে পেলেননা। স্ত্রী হাজেরাও মৃত। ঘরে শুধু পুত্রবধু। কিন্তু পুত্রবধু একজন সত্যিকার মুমিন মহিলার মতো আচরন করেননি। একজন নবীর স্ত্রী আর একজন নবীর পুত্র বধু হিসেবে তো তাঁর আদর্শ মুসলিম মহিলা হওয়া উচিত ছিলো। ফলে পিতার নির্দেশে ইসমাঈল এ মহিলাকে তালাক দেন এবং আরেকজন সত্যিকার মুমিন মহিলাকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাঁর কয়েকটি ছেলেমেয়ে জন্ম হয়। তাঁরাও আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠেন।

কা’বা নির্মাণে অংশ নিলেন

একদিন পিতা ইব্রাহিম ইসমাঈলকে ডেকে বললেন- ‘আল্লাহ্‌ আমাকে একটি কাজের হুকুম দিয়েছেন। তুমি কি আমাকে সে কাজে সাহায্য করবে? ইসমাঈল বললেন- হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করবো।’ ইব্রাহিম সাম্নের উঁচু টিলাটি দেখিয়ে বললেন- ‘মহান আল্লাহ্‌ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাবার নির্দেশ দিয়েছেন।’

অতঃপর বার বেটা দু’জন মিলে আল্লাহর ঘর কা’বা ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করলেন। ইসমাঈল পাথর যোগান দেন আর ইব্রাহিম গাঁথুনি গেঁথে দেয়াল নির্মাণ করেন, ছাদ নির্মাণ করেন। গাঁথুনি যখন উপরে উঠছিলো, তখন ইসমাঈল একটি বড় পাথর এনে দিলেন। ইব্রাহিম সে পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। আজও সে পাথরটি কা’বা ঘরের সামনে বিদ্যমান আছে। আপনি যখন হজ্জ বা উমরা করতে যাবেন সে পাথরটি দেখতে পাবেন। ওখানে দু’রাকাত নামাজ পড়তে হয়। সে পাথরটির নাম মাকামে ইব্রাহিম। বাপ ছেলে মিলে যখন বাইতুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) নির্মাণ শেষ করলেন, তখন দু’জনে প্রভু দয়াময় মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, তিনি যেন তাঁদের এই খিদমত কবুল করে নেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁদের এই বিরাট খিদমত কবুল করে নেন। তাঁদের নির্মাণ করা ঐ ঘরকে চিরদিনের জন্যে হজ্জ ও তাওয়াফের কেন্দ্রে পরিনত করে দেন। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আল্লাহর এই ঘরকে তাওয়াফ করার জন্য মক্কায় ছুটে যায়। আপনি সেই ঘরের তাওয়াফ করার নিয়ত করে রাখুন। হয়তো আল্লাহ্‌ একদিন সুযোগ করে দিবেন। অতঃপর ঐ ঘরকে কেন্দ্র করে মক্কা একটি স্থায়ী শহরে পরিনত হয়। সারা পৃথিবী থেকে আল্লাহ্‌ ভক্ত লোকেরা ছুটে আসে সেখানে। আল্লাহর ঘর ধরে তারা রোনাজারি করে।

সালাত ও যাকাত ভিত্তিক সমাজ গড়লেন

ইসমাঈলের পিতা ইব্রাহিম (আঃ) মহান আল্লাহ্‌ তায়ালার দরবারে দোয়া করেছিলেন- ‘আমাকে নেক্কার সন্তান দান করো।’ সত্যিই আল্লাহ্‌ তাঁকে নেক পুত্র দান করেন। ইব্রাহিম আরো দোয়া করেছিলেন- ‘প্রভু, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানাও, আমার সন্তানদেরকেও।’

ইসমাঈলকে আল্লাহ্‌ তায়ালা শুধু নেক্কারই বানাননি, শুধু সালাত কায়েমকারীই বানাননি, সেই সাথে একজন আদর্শ নবীও বানিয়েছিলেন। তাইতো মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“ইসমাঈল, আলয়াসা, ইউনুস, লুত এদের প্রত্যেককেই আমি বিশ্ববাসীর উপর মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা আল আনাম, আয়াত ৮৬)

ইসমাঈল মক্কা ও হিজাযের লোকদেরকে আল্লাহর পথে ডাকেন। তাঁদের তিনি আল্লাহকে জানার, বুঝার ও আল্লাহর পথে চলার তা’লিম দেন। তিনি তাঁদের সালাত কায়েম করার নির্দেশ দেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যাকাত ভিত্তিক সমাজ গড়ার শিক্ষা দেন। সালাত ও যাকাত ভিত্তিক একটি আদর্শ সমাজ গড়ার কাজ করতে গিয়ে তাঁকে অনেক বিপদ মুসিবত ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি সবার সাথে এসব কিছুর মোকাবেলা করেন। তাইতো আল্লাহ্‌ তাঁর প্রশংসা করে বলেন-

“ইসমাঈল, ইদ্রীস, যুলকিফল এরা সবাই ছিল সবর অবলম্বনকারী। আমি তাঁদেরকে আমার রহমতের ছায়াতলে স্থান দিয়েছি। তারা ছিলো যোগ্য লোক এবং সততার প্রতীক।” (সূরা ২১ আল আম্বিয়া, আয়াত ৮৫)

ইসমাঈল (আঃ) তাঁর লোকদেরকে নিয়ে কা’বা কেন্দ্রিক একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ গড়েন। জানা যায়, তাঁর বারোজন পুত্র ছিলো এবং তারা সকলেই ছিলেন ইসলামী সমাজের কাণ্ডারি।

তাঁরই বংশে জন্ম নিলেন মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ

মহান আল্লাহ্‌ ইসমাঈল (আঃ) কে আরো একটি বড় মর্যাদা দান করেছেন। সেটা হলো, তাঁরই বংশে পাঠিয়েছেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে। কা’বা নির্মাণের পর ইসমাঈল পিতা ইব্রাহীমের সংগে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন।

“প্রভু, আমাদের বংশ থেকে তাঁদের মাঝে একজন রাসুল পাঠিও, যিনি ওদেরকে তোমার আয়াত পাঠ করে শোনাবেন, কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন আর তাঁদের জীবনকে পরিশুদ্ধ পরিচ্ছন্ন করবেন। ” (সূরা বাকারা, আয়াত ১২৯)

আল্লাহ্‌ ইসমাঈল ও তাঁর পিতার দোয়া কবুল করেন। ইসমাঈলের বংশেই মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহর আবির্ভাব ঘটান। মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ এসে পৃথিবীতে আবার ইব্রাহিম ও ইসমাঈল (আঃ) এর মতই কা’বা কেন্দ্রিক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কা’বা এবং কা’বা কেন্দ্রিক হজ্জ, কুরবানী, তাওয়াফ, সাফা মারওয়া দৌড়াদৌড়ি মাকামে ইব্রাহীমে সালাত আদায় ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ পাক ইব্রাহিম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ) ও তাঁর সম্মানিত মা হাজেরা আলাইহিস সালামকে চিরদিন পৃথিবীতে স্মরণীয় করে রাখার ব্যবস্থা করলেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁর অনুগত দাসদের এভাবেই পুরস্কৃত করেন।

কুরআনে ইসমাঈল (আঃ)

মহান আল্লাহ্‌ তাঁর প্রিয় নবী ইসমাঈল (আঃ)-কে বিরাট সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন। কুরআন মাজীদে মোট বারোটি স্থানে আল্লাহ্‌ পাক ইসমাঈলের নাম উল্লেখ করেন। কয়েকটি আয়াত তো আগেই উল্লেখ করেছি। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে আরো বলেন-

“স্মরণ করো, ইসমাঈল, আলয়াসা, যুলকিফলকে। এরা সবাই ছিলো উত্তম আদর্শ।” (সূরা ৩৮ সোয়াদ, আয়াত ৪৮)

“হে মুহাম্মাদ, তোমার কাছে আমি অহী পাঠাচ্ছি, যেমন পাঠিয়েছিলাম নূহ এবং তাঁর পরবর্তী নবীদের কাছে, যেমন পাঠিয়েছিলাম ইব্রাহিম ও ইসমাঈলের কাছে।” (সূরা ২ আল বাকারা, আয়াত ১৩৬)

“হে মুহাম্মাদ, বলো- আমরা আল্লাহকে মানি আর ইসমাঈল ও ইব্রাহীমের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাও মানি।” (সূরা ২ আল বাকারা, আয়াত ১৩৬)

যেসব সুরায় ইসমাঈল (আঃ) এর কথা উল্লেখ হয়েছে, সেগুলো হলো- সূরা আল বাকারাঃ ১২৫-১৪০, আলে ইমরানঃ ৮৪, আন নিসাঃ ১৬৩, আল আনআমঃ ৮৬, ইব্রাহীমঃ ৩৯, মরিয়মঃ ৫৪, আল আম্বিয়াঃ ৮৫, সোয়াদঃ ৪৮।

৯।

ইবরাহীম পুত্র ইসহাক

(আঃ)

পূর্ব কথা

আপনারা আগেই জেনে এসেছেন মহান রাসুল আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম (আঃ) এর কাহিনী। শুনেছেন তাঁর অগ্নীপরীক্ষার কথা, হিজরতের কথা এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোর কথা। শেষ বয়েসে মহান আল্লাহ তাঁকে দুটি পুত্র সন্তান দান করেন। দুজনকেই নবয়্যত দান করেন এবং আরো দান করেন উচ্চ মর্যাদা। তাঁদের একজন ইসমাঈল (আঃ) এবং অপরজন ইসহাক (আঃ)। ইসমাঈলের ইতিহাস তো আগেই বলে এসেছি। এবার শুনা যাক ইসহাকের কথা। হযরত ইব্রাহীমের ছিলেন দুই জন স্ত্রী। একজন সারাহ আর অপরজন হাজেরা। সারাহ প্রথম স্ত্রী। তাঁকে সাথে নিয়েই হযরত ইবরাহীম তাঁর মাতৃভূমি ইরাক থেকে হিজরত করেন। অনেক দেশ ঘুরে মিশরে যান। সেখানে বিয়ে করেন দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরাকে। সেখান থেকে ফিরে আসেন ফিলিস্তিনে। এখানে আসার পর হাজেরার ঘরে তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করেন। সে পুত্রই ছিলেন কুরবানীর নবী হযরত ইসমাঈল (আঃ)। আল্লাহর হুকুমে হযরত ইবরাহীম শিশুপুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মাকে মক্কায় নিয়ে রেখে আসেন। সারাহ ফিলিস্তিনেই থেকে যান। হযরত ইবরাহীমও ফিলিস্তিনেই থাকতেন। আবার মক্কায় গিয়ে স্ত্রী ও পুত্র ইসমাঈলকে দেখাশুনা করে আসতেন।

সারাহর দুঃখ

কিন্তু সারার বড় দুঃখ। তিনি একজন বৃদ্ধা মহিলা। তাঁর সন্তানাদি হয়না। অথচ সব নারীই মা হতে চায়। সন্তানের মুখ দেখতে চায়। সন্তানকে বুকভরা আদর আর স্নেহ মমতা দিয়ে জড়িয়ে রাখতে চায়। মা ডাক না শুনলে কোন নারীরই বুক ভরেনা। সন্তান ছাড়া নারীর কোল থাকে শুন্য। বুকভরা আশা নিয়ে সারাহ সবসময় দয়াময় আল্লাহর কাছে দোয়া করেন সন্তান চেয়ে। কিন্তু আজো তাঁর সন্তান হয়নি। তিনি বৃদ্ধা হয়ে পড়েছেন। বয়েস হয়ে গেছে নব্বই। স্বামীও এখন শতায়ু বৃদ্ধ। সন্তান লাভের আর কি আশা? এ ঘরে সন্তান লাভের ব্যাপারে এখন দুজনই নিরাশ। কিন্তু হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটে গেলো। কী সে কাণ্ড?

সুসংবাদ পেলেন সারাহ

হঠাৎ একদিন হযরত ইব্রাহীমের বাড়িতে এলো কয়েকজন তাগড়া যুবক। অতি সুন্দর সুশ্রী হৃষ্টপুষ্ট ওরা। যেনো শক্তিশালী যোদ্ধা এবং বিরাট কোন সম্রাটের সৈনিক। তাঁদের আকস্মিক আগমনে ইবরাহীম ভয় পেয়ে গেলেন। তবে তারা এসেই হযরত ইব্রাহীমকে সালাম দেন এবং তিনিও সালামের জবাব দিয়ে তাঁদেরকে মেহমান হিসেবে গ্রহন করেন।

মেহমান এলে হযরত ইবরাহীম অত্যন্ত খুশি হতেন। কারন তিনি ছিলেন বড় মেহেমান নেওয়াজ। ওদের বসতে দিয়ে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। অল্পক্ষনের মধ্যেই তাজা গরুর গোশত ভুনা করে নিয়ে আসলেন। সারাও পিছে পিছে এসে পর্দার আড়ালে দাঁড়ালেন। ইবরাহীম সারার ভুনা করা মজাদার গোশত তাঁদের পরিবেশন করতে থাকলেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড। ওরা হাত গুটিয়ে রাখলো। খাবার স্পর্শ করছেনা। ইবরাহীম ভাবলেন- নিশচয়ই এরা শত্রু হতে পারে। বললেন- আপনারা কারা? আপনাদের তো চিনতে পারছিনা? আপনাদেরকে আমার ভয় হচ্ছে।

এবার তারা মুখ খুললো। বললো- আপনি ভয় পাবেননা। আমরা আল্লাহর দূত ফেরেস্তা। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে আপনার জন্যে সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। সারার ঘরে আপনার একটি বিজ্ঞ পুত্র সন্তান জন্ম হবে। একথা শুনে সারাহ বিস্মিত হয়ে সামনে এগিয়ে এলেন। কপালে হাত মেরে বললেন- এতো এক বিস্ময়ের খবর, আমি হয়ে গেছি বুড়ি থুরথুড়ি। তাঁর উপরে জনমের বন্ধ্যা। শুধু কি তাই? আমার স্বামীও শতায়ু বৃদ্ধ। কেমন করে হবে আমার ছেলে?

ফেরেস্তারা বললেন- “এতো আল্লাহর সিদ্ধান্ত। আপনি কি আল্লাহর ফায়সালার ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করছেন? এ সুসংবাদ নির্ঘাত সত্য। এর কোন নড়চড় হবেনা। আপনার গর্ভে ইসহাক জন্ম নেবেই। শুধু তাই নয়, ইসহাক একজন নবী হবে আর তাঁর ঘরেও জন্ম নেবে আরেক নবী ইয়াকুব। এ হচ্ছে আল্লাহর রহমত। পথভ্রান্তরা ছাড়া কি কেউ আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হয়? আল্লাহ মহাজ্ঞানী, মহাকৌশলী, সপ্রসংশিত, অতিশয় মর্যাদাবান। তিনি যা চান তাই হয়। হে ঘরবাসী, আল্লাহর রহমত আর বরকতের ধারা বর্ষিত হোক আপনাদের প্রতি।” (সূরা ১১ হুদ-৭২,৭৩)

জন্ম নিলেন ইসহাক

আল্লাহর হুকুমের নড়চড় নেই। হযরত ইবরাহীম আর সারার ঘর উজ্জ্বল করে জন্ম গ্রহন করলেন ইসহাক। চাঁদের মতো ফুটফুটে ছেলে। বুড়ো বয়েসে ছেলে হলে আদরের সীমা থাকেনা। বাবা মার আদরে লালিত পালিত হয়ে বড় হতে থাকলেন ইসহাক। যেমন বাপ তেমন ছেলে। মহান আল্লাহ ইসহাককে দান করেছেন দারুন মেধা, জ্ঞান এবং বুঝ ও বুদ্ধি।

নবুয়্যত লাভ

বড় হলে ইসহাককে আল্লাহ তায়ালা নবুয়্যত দান করেন। একজন প্রশংসিত নবী হিসেবে কুরআন মাজীদে বার বার তাঁর নাম উল্লেখ হয়েছে। ফিলিস্তিন অঞ্চলে তিনি তাঁর পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। হযরত ইবরাহীম যে বিরাট অঞ্চলে ইসলাম কায়েম করে গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তারা দুই ভাই ইসমাঈল ও ইসহাক তার দায়িত্ব গ্রহন করেন। হিজায অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন বড় ভাই ইসমাঈল (আঃ)। আর ফিলিস্তিন অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন ছোট ভাই ইসহাক (আঃ)।

হযরত ইসহাকের বংশ

হযরত ইসহাককে আল্লাহ তায়ালা এক ঐতিহাসিক গোত্রের পূর্বপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পুত্র ইয়াকুবকে আল্লাহ তায়ালা নবী মনোনীত করেন। ইয়াকুবের আরেক নাম ছিলো ইসরাইল। তাঁর সন্তানরা বনী ইসরাইল (ইসরাইলের বংশধর) হিসেবে খুবই খ্যাতি অর্জন করেছে। মূলত এ বংশের ধারাবাহিকতা হযরত ইসহাক (আঃ) থেকেই আরম্ভ হয়। এ বংশে আল্লাহ অসংখ্য নবী প্রেরন করেছেন। ইসলামের সঠিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত অবস্থায় এ বংশের লোকেরা আজো পৃথিবীতে বর্তমান আছে।

হযরত ইসহাকের প্রশংসনীয় গুনাবলী

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজীদে তাঁর দাস ও নবী হযরত ইসহাক (আঃ) এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এবার কুরআন থেকে তাঁর প্রশংসা আর গুনাবলী জেনে নেয়া যাক। মহান আল্লাহ বলেন-

১। “আমার দাস ইবরাহীম, ইসহাক আর ইয়াকুবের কথা স্মরণ করো। তারা ছিলো বড় কর্মঠ আর দুরদৃষ্টি সম্পন্ন। একটি খাঁটি গুনের কারনে আমি তাঁদের মর্যাদাবান করেছিলাম। আর টা হলো পরকালের চিন্তা। তারা আমার কাছে বাছাই করা আদর্শ মানুষ।” (সূরা সোয়াদ, আয়াত ১০২)

২। “অতপর আমি ইব্রাহীমকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম। বললাম- সে হবে একজন নবী ও উন্নত আমলের সুযোগ্য লোক।” (সূরা আস সাফফাত, আয়াত ১১২)

৩। “আর আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাককে। তাছাড়াও ইয়াকুবকে। তারা প্রত্যেকেই ছিলো সৎ সুযোগ্য। আমি তাঁদের নেতা বানিয়েছি। তারা আমার নির্দেশ মতো মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করতো। আমি তাঁদের কাছে অহী করেছিলাম কল্যাণমূলক কাজ করার, সালাত কায়েম করার ও যাকাত পরিশোধ করার। তারা ছিলো আমার একান্ত অনুগত। ” (সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ৭৩)

৪। “অতপর আমি তাঁকে ইসহাক ও ইয়াকুবের মতো সন্তান দান করলাম। আর তাঁদের প্রত্যেককেই বানালাম নবী। নিজ রহমতে তাঁদের ধন্য করলাম আর মানুষের মাঝে তাঁদেরকে সত্যিকার সুনাম ও সুখ্যাতি দান করলাম।” (সূরা মরিয়ম, আয়াত ৪৯-৫০)

৫। “হে মুহাম্মাদ, আমি তোমার প্রতি তেমনই অহী নাযিল করেছি, যেমন করেছিলাম নুহ এবং তাঁর মধ্যবর্তী নবীদের উপর। যেমন আমি অহী পাঠিয়েছি ইব্রাহীন, ইসমাঈল, ইসহাক—এর প্রতি— এরা সবাই ছিলো সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসুল।” (সূরা নিসা, আয়াত ১৬৩-১৬৫)

 কুরআন মাজীদের এ আয়াতগুলো থেকে আমরা হযরত ইসহাক (আঃ) এর অনেকগুলো প্রশংসিত গুনাবলীর কথা জানতে পারি। মহান আল্লাহ নিজেই তাঁর এসব গুনাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন। গুনগুলো হলো-

১। পরকালের চিন্তা। অর্থাৎ পরকালমুখী চিন্তা ও পরকালমুখী কাজ।

২। কর্মঠ। অর্থাৎ দক্ষতা ও কর্মমুখীতা।

৩। দূরদৃষ্টি।

৪। সততা ও যোগ্যতা।

৫। উন্নত আমল।

৬। আল্লাহর আনুগত্য ও বাধ্যতা।

৭। সুসংবাদদাতা। অর্থাৎ মুমিনদের জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

৮। সতর্ককারী। অর্থাৎ আল্লাহর পাকড়াও সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করেছেন।

৯। সামাজিক নেতৃত্ব দান।

১০। নেতৃত্ব লাভের পর-

     ক. আল্লাহর বিধান মতো মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছেন।

     খ. জনকল্যাণমূলক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

     গ. সালাত কায়েম করেছেন এবং

     ঘ. যাকাত ভিত্তিক অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এসব কারনে আল্লাহ তাঁকে উচ্চ মর্যাদা ও সুনাম সুখ্যাতি দান করেছেন।

কুরআনে উল্লেখ

কুরআন মাজীদে হযরত ইসহাকের নাম উল্লেখ হয়েছে ১৭ বার। যেসব সুরাতে উল্লেখ হয়েছে, সেগুলো হলো –

সূরা আল বাকারাঃ ১৩৩,১৩৬,১৪০। আলে ইমরানঃ ৮৪। নিসাঃ ১৬৩। আল আনআমঃ ৮৪। হুদঃ ৭১। ইউসুফঃ ৬,৩৮। ইব্রাহীমঃ ৩৯। মরিয়মঃ ৪৯। আল আম্বিয়াঃ ৭২। আন কাবুতঃ ২৭। আস সাফফাতঃ ১১২,১১৩। সোয়াদঃ ৪৫।

১০।

ইসরাইলিদের পিতৃপুরুষ ইয়াকুব

(আঃ)

নাম ও বংশ পরিচয়

মহাকালের সাক্ষী এক মহাপুরুষ ইয়াকুব (আঃ)। পৃথিবীর এক ঐতিহাসিক বংশের তিনি আদি পুরুষ। সেকালে ইবরানী ভাষা নামে একটি ভাষা চালু ছিলো। বহ নবীর মুখের ভাষা ছিলো এই ইবরানী ভাষা। এ ভাষায় আল্লাহ তায়ালা কিতাবও নাযিল করেছেন। হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর ভাষাও ছিলো এই ইবরানী ভাষা। এ ভাষায় তাঁর নাম ছিলো ইসরাইল। এর অর্থ কি? ইসরাইল মানে আল্লাহর দাস। অন্য সকল নবীর মতো তিনিও আল্লাহর দাসই ছিলেন। তবে সেই সাথে তাঁর নামটিও ছিলো ‘আল্লাহর দাস’। এর আরবী অনুবাদ হল ‘আব্দুল্লাহ’। হযরত ইয়াকুব (আঃ) ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান একজন নবী। পূর্বপুরুষের দিক থেকে তিনি এক সম্মানিত নবীর পুত্র আরেক সম্মানিত নবীর নাতি। অর্থাৎ তিনি ছিলেন হযরত ইব্রাহীমের নাতি আর হযরত ইসহাকের পুত্র। অন্যদিকে তাঁর বংশেও জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য নবী। তিনি ইসরাইল নামে পরিচিত হবার কারনে তাঁর বংশধরদের বলা হয় ‘বনী ইসরাইল’ বা ইসরাইলের বংশধর।

কোন কোন সুত্র থেকে জানা যায় তাঁর বংশধরদের মধ্যে চার হাজার নবী জন্মগ্রহন করেন। হযরত ইউসুফ, মুসা, হারুন, দাউদ, সুলাইমান, যাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা আলাইহিস সালাম প্রমুখ বিখ্যাত নবী রাসুলগন ছিলেন তাঁরই বংশধর।

জন্ম ও শৈশব

আপনারা আগেই জেনেছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রথম স্ত্রী সারাকে নিয়ে ফিলিস্তিনের কেনান শহরে বসবাস করতেন। এখানে সারার ঘরে জন্ম নেন হযরত ইসহাক (আঃ)। আর এ শহরেই জন্ম হয় ইসহাকের পুত্র হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর। নবীর পুত্র শৈশব থেকেই জ্ঞানে গুনে নবীর মতো হয়ে গড়ে উঠতে থাকেন। তাঁর উন্নত জ্ঞান বুদ্ধি সুন্দর স্বভাব চরিত্র আর অমায়িক ব্যবহার দেখে ছোট বেলা থেকেই বুঝা যাচ্ছিলো, তিনি হবেন একজন মহামানব।

যৌবনকালে খালার বাড়ি

ইয়াকুব যখন যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন একদিন তাঁর মা রিফকাহ তাঁকে তাঁর খালার বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বললেন- তুই সেখানে গিয়ে থাকগে। যুবক ইয়াকুব মায়ের নির্দেশে খালার বাড়ি চলে এলেন। আপনারা নিশ্চয়ই ব্যবিলন শহরের নাম শুনেছেন। হ্যাঁ, এখন এই শহরটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শহরটি ছিলো ইরাকে। এই ব্যবিলনের ‘ফুদ্দানে আরাম’ নামক স্থানেই ছিলো ইয়াকুবের খালার বাড়ি। এখানে এসে ইয়াকুব শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা আর মেধা বৃদ্ধির বিরাট সুযোগ পেলেন।

বিয়ে করলেন ইয়াকুব

খালার বাড়িতে ইয়াকুব সতের বা বিশ বছর অবস্থান করেন। এখানেই তিনি বিয়ে শাদি করেন। তিনি চারটি বিয়ে করেন। বড় স্ত্রীর নাম ছিলো লিয়া, দ্বিতীয় স্ত্রী রাহিল, তৃতীয় স্ত্রী যুলফা আর চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন বলুহা। তাঁর কোন স্ত্রীর ঘরে কয়টি ছেলে হয়েছিলো, ইতিহাসে তাও উল্লেখ আছে। আসুন তাঁর পুত্রদের নাম আপনাদের জানিয়ে দেই- লিয়ার ঘরে জন্ম হয় ছয়টি পুত্রের। ওদের নাম হলো- রুবিল, শামউন, লাভি, ইয়াহুযা, ইসাখার ও যাবলুন।

রাহিলের ঘরে জন্ম নেন দুইজন পুত্র সন্তান। তারা হলেন- ইউসুফ ও বনী ইয়ামীন।

যুলফার ঘরে জন্ম হয় দুই ছেলে জাদ ও আশির।

বলুহার ঘরেও দুইটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। তারা হলেন- দান ও নাফতালি।

এবার বলুনতো হযরত ইয়াকুবের মোট কয়টি ছেলে ছিলো? গুনে দেখুন, সব মিলে হলো- বারোটি। এই বারো ছেলে থেকেই জন্ম নেয় বনী ইসরাইলের বারোটি শাখা গোত্র। এদের মধ্যে লাভির বংশে জন্ম নেন হযরত মুসা ও হারুন (আঃ)। ইয়াহুযা ছিলেন ধর্মীয় দিক থেকে খুবই প্রভাবশালী। পরবর্তীকালে তাঁর নাম অনুসারেই আসল ধর্ম বিকৃত হয়ে জন্ম নেয় ইয়াহুদি ধর্মের। একপুত্র ইউসুফ (আঃ) তো পরে মিশরে গিয়ে সেখানকার শাসক হন।

ফিরে এলেন কেনানে

অনেক দিন হয়ে গেলো খালার বাড়ি। এবার ডাক পড়েছে নিজের বাড়ি ফিরে আসার। বিনিয়ামিন ছাড়া তাঁর এগারটি পুত্রের জন্ম খালার বাড়িতেই হয়। বিবি বাচ্চা সবাইকে নিয়ে ইয়াকুব রওয়ানা করলেন ফিলিস্তিনের দিকে। অনেক দিন দূরে থাকার পর এবার এসে পৌঁছে গেলেন নিজ মাতৃভূমি কেনানে। কেনানে আসার পর ছোট ছেলে বিনইয়ামিনের জন্ম হয়। এতোগুলো নাতি পেয়ে দাদা দাদি দারুন খুশি। বাড়ি ফিরে ইয়াকুব আল্লাহর পথে নিজের জানমাল পুরোপুরি নিয়োজিত করেন।

নবী হলেন ইয়াকুব

ইয়াকুব ছিলেন আল্লাহর জন্যে নিবেদিতপ্রান। আল্লাহও তাঁকে নিজের জন্যে বাছাই করে নেন। দান করেন নবুয়্যত। ফিলিস্তিন অঞ্চলে আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ) পুত্র ইসহাকের উপরে দায়িত্ব দিয়ে যান। ইসহাক (আঃ) বৃদ্ধ বয়েসে উপনীত হবার পরে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকেই পুত্র ইয়াকুব তাঁর প্রতিনিধি মনোনীত হন। কিছুকাল পর হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর পিতা হযরত ইসহাক (আঃ) ইহলোক ত্যাগ করেন। হযরত ইয়াকুব গোটা ফিলিস্তিন অঞ্চলে আল্লাহর দীনের পতাকা উড্ডীন করেন। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে বয়ে নিয়ে যান আল্লাহর বানী। মানুষকে সমবেত করেন আল্লাহর দীনের পতাকাতলে।

ধৈর্য জ্ঞান ও আল্লাহ নির্ভরতার প্রতীক

প্রিয় নবী ইয়াকুব (আঃ) ছিলেন পরম ধৈর্যশীল ও ধৈর্যের পাহাড়। তাঁর প্রিয়তম পুত্র ইউসুফকে তাঁর ভাইয়েরা যখন অন্ধকূপে ফেলে বাড়ি এসে তাঁর কাছে বলেছিলো, ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। তখন এই চরম দুঃখ ও বেদনার সংবাদ শুনে তিনি কেবল এতোটুকুই বলেছিলেন-

“বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্যে একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে দিয়েছে। আমি ধৈর্য ধরবো, উত্তম ধৈর্য। তোমরা যে কথা সাজিয়েছ, তাঁর জন্যে কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া যেতে পারে।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ১৮)

ছোট ছেলে বিন ইয়ামিনকে যখন তাঁর ভাইয়েরা চুরির ঘটনার জন্যে মিশরে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছিলো, তখনো তিনি একই ভাষায় বলেছিলেন-

“আমি উত্তমভাবেই ধৈর্য ধারন করলাম। মহান আল্লাহ হয়তো ওদের সবাইকেই আমার কাছে এনে দিবেন।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৮৩)

“আমি আমার দুঃখ বেদনার ফরিয়াদ কেবল আল্লাহর কাছেই করবো। আল্লাহর ব্যাপারে আমি যততুকু জানি তোমরা তা জানোনা। হে আমার ছেলেরা, তোমরা যাও, ইউসুফ ও তাঁর ভাইকে (বনিয়ামিন) খুজে দেখো। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৮৬-৮৭)

হযরত ইয়াকুবের ঐ দুষ্ট প্রকৃতির দশটি ছেলে যখন মিশর শাসকের পরিচয় পেলো, তখন তারা দেখলো, এতো তাঁদেরই সেই ভাই ইউসুফ, যাকে তারা অন্ধকূপে ফেলে দিয়েছিলো। ইউসুফ তাঁদের ক্ষমা করে দিলেন। ইউসুফের জন্যে চিন্তা করতে করতে হযরত ইয়াকুবের দুটি চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ইউসুফ তাঁর ভাইদের কাছে নিজের জামা দিয়ে বললেন- এটি নিয়ে আমার আব্বার মুখমণ্ডলে রাখো, তাতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। তারা যখন ইউসুফের সসংবাদ আর তাঁর জামা নিয়ে কেনানের উদ্দেশে রওয়ানা করলো, তখন হযরত ইয়াকুব বাড়ির লোকদের বললেন-

“আমি ইউসুফের সুবাস পাচ্ছি।”(সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৯৪)

অতপর সুসংবাদ বহনকারীরা যখন ইউসুফের জামাটি এনে তাঁর মুখমণ্ডলে রাখলো, সাথে সাথে তিনি দৃষ্টিশক্তি লাভ করলেন। তখন তিনি তাঁর ঘরের লোকদের বললেন-

 “আমি না তোমাদের বলেছিলাম, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব কথা জানি, যা তোমরা জানোনা।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৯৬)

বৃদ্ধ বয়েসে মিশর এলেন

কি সৌভাগ্য হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর। মহান আল্লাহ তাঁর হারানো ছেলে ইউসুফকে মিশরের শাসক বানিয়েছেন। ইউসুফ তাঁর ভাইদের বলে পাঠিয়েছেন পরিবারের সবাইকে মিশর নিয়ে আসতে। হযরত ইয়াকুবের সেই অপরাধী ছেলেগুলো বাড়ি এসে বললো-

“আব্বাজান, আপনি আমাদের অপরাধ মাফির জন্যে দোয়া করুন। সত্যিই আমরা অপরাধী ছিলাম।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৯৭)

হযরত ইয়াকুব বললেন-

“আমি আমার প্রভুর দরবারে তোমাদের ক্ষমা করে দেবার জন্যে আবেদন জানাবো। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম করুনাময়।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৯৮)

অতপর হযরত ইয়াকুব সপরিবারে মিশর চলে এলেন। এ সময় তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তারা যখন মিশরে এসে পৌঁছলেন, তখন হযরত ইউসুফ বিরাট শোভাযাত্রা সহকারে তাঁর পিতা মাতাকে অভ্যর্থনা জানালেন। অত্যন্ত সম্মানের সাথে ইউসুফ তাঁর বাবা মাকে নিজের কাছে সিংহাসনে উঠিয়ে বসালেন।

মিশরে হিজরত করে আসার পর হযরত ইয়াকুব (আঃ) আরো সতের বছর বেঁচে ছিলেন। এ হিজরতের সময় তাঁর বয়স ছিলো একশো ত্রিশ বছর। একশো সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি মিশরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ছেলেদেরকে অসিয়ত করে যান, তাঁকে যেন ফিলিস্তিনে নিয়ে তাঁর পিতা মাতার পাশে সমাহিত করা হয়।

পুত্রদের প্রতি উপদেশ

হযরত ইয়াকুব জনগন ও তাঁর পুত্রদের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, কুরআনের দুটি স্থানে তাঁর কিছু অংশ বর্ণিত হয়েছে। যখন তাঁর দশ ছেলে ছোট ছেলে বিনইয়ামিনকে সাথে নিয়ে খাদ্য শস্য আনার জন্যে মিশর যাত্রা করেছিলে, তখন তিনি তাঁদের উপদেশ দিলেন-

“হে আমার ছেলেরা, তোমরা মিশরের রাজধানীতে একটি প্রবেশ পথে ঢুকো না। বিভিন্ন গেইট দিয়ে প্রবেশ করো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা থেকে আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারবোনা। সমস্ত কৃতিত্ব তো আল্লাহর হাতে। আমি তাঁরই উপর ভরসা করছি। সকল ভরসাকারীকে তাঁরই উপরে ভরসা করতে হবে।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৬৭)

আল্লাহর নবী ইয়াকুবের এই উপদেশটিতে কয়েকটি মৌলিক কথা রয়েছে। সেগুলো হলো-

১. যাবতীয় কাজে কর্মকৌশল (tactics) অবলম্বন করা উচিত।

২. কর্মকৌশল অবলম্বন করার পরই আল্লাহর ইচ্ছা ও ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত।

৩. আল্লাহকেই সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তিতের উৎস মনে করতে হবে।

৪. সকল বিষয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত।

সূরা বাকারায় হযরত ইয়াকুবের উপদেশগুলো এভাবে উল্লেখ হয়েছে-

“ইয়াকুব তাঁর সন্তানদের এই উপদেশ দিয়েছিলোঃ হে আমার সন্তানেরা, আল্লাহ তোমাদের জন্যে মনোনীত করেছেন ‘আদ দীন’ (অর্থাৎ দ্বীন ইসলাম) সুতরাং তোমরা মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) থাকো। সে মৃত্যুকালে তাঁর সন্তানদের জিজ্ঞেস করেছিলো- আমার মৃত্যুর পর তোমরা কার ইবাদাত ও দাসত্ব করবে? জবাবে তারা বলেছিল, আমরা সেই এক আল্লাহর ইবাদাত ও দাসত্ব করবো। যাকে আপনি ও আপনার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল এবং ইসহাক ইলাহ হিসেবে মেনেছেন। আমরা তাঁরই অনুগত হয়ে থাকবো।” (সূরা ২ আল বাকারাঃ আয়াত ১৩২-১৩৩)

হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর এই উপদেশটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি থেকে আমরা জানতে পারি-

১. ইসলামই হলো আল্লাহর মনোনীত দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা।

২. আল্লাহর মনোনীত দীনের অনুসারীরা মুসলিম।

৩. সকল নবী একই দীনের বাহক ও প্রচারক ছিলেন।

৪. আমৃত্যু আল্লাহর অনুগত বাধ্যগত হয়ে থাকাই প্রকৃত মুমিনের কাজ।

৫. মুসলিম হওয়া মানে আল্লাহর দাসত্ব করা।

আল কুরআনে উল্লেখ

কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ তাঁর দাস ও নবী হযরত ইয়াকুবের ভুয়সী প্রশংসা করেছেন। আল কুরআনে ১৬ বার তাঁর নাম উল্লেখ হয়েছে। যেসব আয়াতে তাঁর নাম উল্লেখ হয়েছে সে আয়াতগুলো এবং সেগুলোর তাফসির পড়লেই আপনারা তাঁর সম্পর্কে আরো জানতে পারবেন। এবার জেনে নিন কোথায় কোথায় উল্লেখ হয়েছে তাঁর নাম –

সূরা আল বাকারা- ১৩২, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০।

সূরা আলে ইমরান- ৮৪।

সূরা আন নিসা- ১৬৩।

সূরা আল আনয়াম- ৮৪।

সূরা হুদ- ৭১।

সূরা ইউসুফ- ৬, ৩৮, ৬৮।

সূরা মরিয়ম- ৬, ৪৯।

সূরা আল আম্বিয়া- ৭২।

সূরা আল আনকাবুত- ২৭।

সূরা সোয়াদ- ৪৫।

 মহান আল্লাহ হজরত ইয়াকুব (আঃ) সম্পর্কে বলেন-

“সে (ইয়াকুব) ছিলো আমার দেয়া শিক্ষায় জ্ঞানবান। কিন্তু অধিকাংশ লোক প্রকৃত সত্য জানেনা।” (সূরা ইউসুফঃ আয়াত ৬৮)

About আবদুস শহীদ নাসিম