নবীদের সংগ্রামী জীবন

১১।

মিশর শাসক ইউসুফ

(আঃ)

পূর্বাভাস

“আব্বু, আজ রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি, এগারটি তারা এবং সূর্য আর চাঁদ আমাকে সাজদা করছে।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ০৪)

“পুত্র আমার, এ স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের বলোনা। ওরা জানতে পারলে তোমার ক্ষতি করার চিন্তা করবে। আর শয়তান তো মানুষের ঘোরতর শত্রু আছেই।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ০৫)

ছোট্ট কচি ইউসুফ যেদিন এ স্বপ্ন দেখেন, সেদিনই তাঁর বিজ্ঞ পিতা বুঝতে পারেন, মহান আল্লাহ তাঁর এই পুত্রটিকে নবুয়্যত দান করবেন। তাই তো তিনি সতর্ক করে দিলেন। সেই সাথে আরো বললেন-

“তোমাকে তোমার প্রভু তাঁর কাজের জন্যে নির্বাচিত করবেন, কথার মর্ম বুঝতে শেখাবেন আর তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের পরিবারের প্রতি ঠিক তেমনি করে তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করবেন, যেমনটি করেছিলেন তোমার পিতামহ ইসহাক ও ইব্রাহীমের প্রতি।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৫-৬)

বংশ পরিচয়

সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন- “করিম ইবনে করিম ইবনে করিম-ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম।” ‘করিম’ মানে সম্মানিত। অর্থাৎ সম্মানিত নবী হযরত ইউসুফ মহাসম্মানিত নবী ইবরাহীম (আঃ এর প্রপুত্র সম্মানিত নবী ইসহাকের পৌত্র আর সম্মানিত নবী ইয়াকুবের পুত্র।

হযরত ইউসুফ (আঃ) যেমনি ছিলেন মহান নবীদের সন্তান, তেমনি ছিলেন অত্যন্ত উন্নত চরিত্র ও পবিত্র জীবনের অধিকারী এক মহান নবী। আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেন-

“ইন্নাহু কা-না মিন ইবাদিনাল মুখলাসিন- সে ছিলো আমার একান্ত বাছাই করা দাসদের একজন। ” হযরত ইউসুফের জন্ম হয় নানার বাড়িতে। জন্মের পর পিতার সারহে দাদুর বাড়িতে চলে আসেন। দাদুর বাড়ি কোথায়? হ্যাঁ, তাঁর দাদুর বাড়ি মানে নিজের বাড়ি ছিলো ফিলিস্তিনের হেবরন শহরে। তাঁর মায়ের নাম ছিলো রাহিল। হযরত ইউসুফের পিতা ইয়াকুব (আঃ) চার বিয়ে করেছিলেন। চার ঘরে তাঁর ছিলেন মোট বারো ভাই। তবে হযরত ইউসুফের সহোদর ভাই ছিলেন মাত্র একজন, বিনয়ামিন। বারো ভাইদের মধ্যে বিনয়ামিন ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ। ইউসুফ ছিলেন সোনার ছেলে। যেমন বাপ তেমনি ছিলেন পুত্র ইউসুফ। নবীর ছেলে ঠিক নবীর মতো জ্ঞান বুদ্ধি আর চমৎকার আচার আচরন। ইবাদাত বন্দেগীতে অগ্রগামী। আল্লাহ ভীরু, আলালহ পরায়ন। বাপ দেখলেন আল্লাহর কাছে এই ছেলেই হবে তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। বাব এমন ছেলেকে বেশি আদর করবেন না তো কাকে আদর করবেন?

দশ ভাইয়ের ষড়যন্ত্র

ইউসুফ আর বিনয়ামিনকে পিতা নিজেই দেখাশুনা করতেন। তাছাড়া অত্যন্ত সুস্বভাবের অধিকারী হবার কারনে তিনি তাঁদের নিজের কাছে কাছে রাখতেন। অপরদিকে তাঁর অন্য দশটি ছেলে ছিলো দুষ্ট প্রকৃতির। তাঁরা বাপের মতো হয়ে গড়ে উঠেনি। তাছাড়া অন্যায় স্বভাব চরিত্রের কারনে তাঁরা পিতার বিশ্বাসভাজনও হতে পারেনি। তাঁরা একজোট হয়ে একদিন ষড়যন্ত্র পাকালো। তাঁরা বলাবলি করলো-

“ইউসুফ আর তাঁর ভাই বিনয়ামিন আমাদের চেয়ে বাবার কাছে অধিক প্রিয়। অথচ আমরা দশজন একটি শক্তিশালী দল। বাবা খুব ভুল করছেন। চলো আমরা ইউসুফকে মেরে ফেলি বা কোথাও নিয়ে ফেলে আসি। তখন বাবার দৃষ্টি আমাদের দিকে ফিরে আসবে। এই অপরাধটা করার পর তোমরা আবার ভালো হয়ে যেও।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৮-৯)

যে কথা সে কাজ। তাঁরা তাঁদের পিতার কাছে এসে বললো- বাবা, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদের উপর আস্থা রাখেননা কেন? আমরা তো সব সময় তাঁর ভালোই চাই। আগামীকাল ওকে আমাদের সাথে দিন। আমাদের সাথে গিয়ে ফলমূল খাবে আর দৌড়াদৌড়ি করে মন চাংগা করবে। আমরা তাঁর পূর্ণ হিফাজত করবো।

বাবা বললেন- তোমরা তাঁকে নিয়ে গেলে আমি চিন্তাগ্রস্ত থাকবো। আমার শংকা হয়, তোমরা ওর প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়বে আর এ ফাকে ওকে বাঘ খেয়ে ফেলবে।

দশ ভাই বললো- আমরা এতগুলো লোক থাকতে ওকে বাঘে খাবে? তবে তো আমরা বড় অকর্মণ্য বলে প্রমানিত হবো। তারপর কি হলো? ইনিয়ে বিনিয়ে বাবাকে এটা ওটা বুঝিয়ে ওরা পরদিন ইউসুফকে বনের দিকে নিয়ে গেলো।      আলালহভক্ত এই ছেলেটিকে ওদের হাতে ছেড়ে দিয়ে দারুন চিন্তার মধ্যে সময় কাটাতে থাকেন ইয়াকুব।

কূপে ফেলে দিলো ইউসুফকে

সে এলাকা দিয়ে ছিলো একটি আন্তর্জাতিক পথ। এ পথে মিশর থেকে সিরিয়া আর সিরিয়া থেকে মিশরে বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াত করতো। ব্যবসায়ীদের পানি পানের সুবিধার্থে লোকেরা পথিমধ্যে এখানে সেখানে পানির কূপ খনন করে রাখতো। ব্যবসায়ীরা কূপের কাছে বিশ্রাম নিতে আর বালতি ফেলে কূপ থেকে পানি উঠিয়ে পান করতো।

ইউসুফের দুরাচার নিষ্ঠুর ভাইয়েরা তাঁকে নিয়ে গিয়ে এমনই একটি কূপে ফেলে দিলো। আল্লাহ ছাড়া সেখানে ইউসুফকে সাহায্য করবার আর কেউই ছিলোনা। ইউসুফ সকল ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করলেন। তাঁর মহান প্রভু আল্লাহ অহীর মাধ্যমে তাঁকে শান্তনা দিলেন এবং ভবিষ্যতের সুসংবাদ জানিয়ে দিলেন।

বাপের কাছে বানোয়াট কাহিনী

এবার দশ ভাই ফন্দি আঁটলো বাপের কাছে এসে কি বলবে? যারা মিথ্যা বলতে পারে, তাঁদের জন্যে কোন একটা ফন্দি এঁটে নেয়া তো কঠিন নয়। ইউসুফকে কূপে ফেলে দেয়ার সময় তাঁরা তাঁর জামাটা রেখে দিয়েছিলো। একটা পশু যবাই করে এবার ইউসুফের জামায় সেটার রক্ত মেখে নিলো। সন্ধ্যার পর ভান করে কাঁদতে কাঁদতে দশ ভাই বাড়ি ফিরে এলো। ইউসুফের রক্তমাখা জামা বাপের সামনে রেখে দিয়ে বললো- “বাবা, আমরা দশভাই দৌড় প্রতিযোগিতা করছিলাম। এদিকে ইউসুফকে বসিয়ে রেখেছিলাম আমাদের জিনিসপত্রের কাছে। হঠাৎ এক নেকড়ে এসে ওকে খেয়ে ফেলে। আমরা সত্য কথা বলছি বাবা, জানি, আমরা যতই সত্য বলিনা কেন আপনি আমাদের কথা বিশ্বাস করবেননা।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ১৭)

দেখলেন তো মিথ্যাবাদীদের সত্য বলার ধরন। তাঁদের পিতা মহান নবী হযরত ইয়াকুব এতো বড় ঘটনা ঘটে যাবার পরও কেবল আল্লাহর সাহায্য চেয়ে ধৈর্য ধারন করলেন।

রাখে আল্লাহ মারে কে?

এদিকে ইউসুফের কি হলো? ইউসুফ কি বেঁচে আছেন, না কূপে ডুবে মারা গেছেন? আল্লাহ যাকে বাচান তাঁকে মারার শক্তি কার আছে? আল্লাহ কূপের মধ্যে ইউসুফের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করেন। ইউসুফ সুস্থ শরীরে বেঁচে আছেন। ইতোমধ্যে সেখানে একটি বাণিজ্য কাফেলা এসে অবতরন করলো। তাঁরা তাঁদের একজনকে কূপ থেকে পানি উঠাতে পাঠালো। সে যখন পানির জন্যে বালতি ফেললো, ইউসুফ তাঁর বালতি ধরে উঠে এলেন। লোকটি চিৎকার করে উঠলো- কি চমৎকার, এ যে এক বালক। তাঁরা তাঁকে নিয়ে গিয়ে পণ্যদ্রব্য হিসেবে বিক্রি করে দিলো। বিক্রি করলো মাত্র সামান্য কয়েক দিরহামে।

মিশরে ইউসুফ

মিশরের ‘আযিয মিশর’ উপাধিধারী এক বড় মন্ত্রী ইউসুফকে বিনিকদের কাছ থেকে কিনে নেন। তিনি ইউসুফকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে বললেন- ‘একটি ছেলে কিনে এনেছি। ওকে যত্ন করে রেখো। ও আমাদের উপকারে আসতে পারে, আর নয়তো তাঁকে আমরাই পুত্র বানিয়ে নেবো।’

এবার দেখুন আল্লাহর ক্ষমতা। তিনি কিভাবে ইউসুফকে বাঁচিয়ে নিয়ে এলেন সেকালের শক্তিশালী রাজ্য মিশরের ক্ষমতাবানদের ঘরে। আল্লাহ বলেন-

“এভাবে আমি ইউসুফের জন্যে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত হবার পথ বের করে দিলাম। সেই সাথে আমি তাঁকে সবকিছুর মর্ম বুঝার শিক্ষাও দান করলাম।”

এ ঘরে ইউসুফ রাজপুত্রের সমাদরে বড় হতে থাকলেন। এখানেই তিনি যখন পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত হলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে নবুয়্যত দান করেন। তাঁকে নবুয়্যত দান করে আল্লাহ বলেন – “আমি নেক লোকদের এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। ” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ২২)

জেলে যাবো তবু পাপ করবোনা

তখনকার মিশরের লোকদের নৈতিক চরিত্র ছিলো খুবই খারাপ। তাঁদের নারী পুরুষ সবাই নির্লজ্জের মতো পাপ কাজ করে বেড়াতো। কেউ পাপ কাজ করলে অন্যেরা সেটাকে খারাপ মনে করতোনা। ইউসুফ যেমন ছলেন জ্ঞানী, গুনী, বুদ্ধিমান, ঠিক তেমনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর, সুশ্রী এক বলিষ্ঠ যুবক। সেই ‘আযিয মিশরের’ স্ত্রী এবং অন্যান্য শহুরে মহিলারা ইউসুফকে চারিদিক থেকে পাপ কাজে নামাবার জন্যে ফুসলাতে থাকে। আযীয মিশরের স্ত্রী জুলেখা একপক্ষীয়ভাবে ইউসুফের সাথে পাপ কাজে লিপ্ত হবার জন্যে পাগল হয়ে যায়। একদিন সে ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে ইউসুফকে বলে- ‘আসো’

ইউসুফ বলেন- “এমন কর্ম থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমার প্রভু আমাকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। যারা পাপ কাজ করে তাঁরা কখনো সাফল্য অর্জন করেনা।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ২৩)

একথা বলে ইউসুফ ঘর থেকে বের হয়ে যাবার জন্যে দরজার দিকে দৌড়ালেন। মহিলাটিও তাঁকে ধরার জন্যে তাঁর পেছনে পেছনে দৌড়ালো। মহিলাটি পেছন থেকে ইউসুফের জামা টেনে ধরে। ইউসুফ দৌড়াতে থাকেন। ফলে টানাটানিতে তাঁর জামা ছিড়ে যায়। ইউসুফ দরজা পর্যন্ত চলে আসেন এবং দরজা খুলে ফেলেন। দরজা খুলতেই তাঁরা দু’জনে মহিলার স্বামী আযীয মিশরকে দরজার সামনে দাঁড়ানো দেখতে পায়। পাপিষ্ঠ মহিলাটি হন্তদন্ত হয়ে ইউসুফের প্রতি ইংগিত করে তাঁর স্বামীকে বলে উঠে- ‘যে আপনার স্ত্রীর সাথে বদ কাজ করতে চাইছে, তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করুন অথবা কঠিন শাস্তি দিন।’

ইউসুফ বললেন- আমি নই, তিনিই আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। দুই ধরনের কথার প্রেক্ষিতে আযিয মিশর বেকায়দায় পড়ে যান। এমতাবস্থায় মহিলার ঘরেরই একজন সাক্ষী দিয়ে বললো- ‘দেখুন, ইউসুফের জামা যদি সামনের দিক থেকে ছেড়া হয়ে থাকে, তাহলে ইউসুফ মিথ্যাবাদী এবং আপনার স্ত্রী সত্যবাদী। আর ইউসুফের জামা যদি পেছনের দিক থেকে ছেড়া থাকে, তাহলে ইউসুফ সত্যবাদী এবং আপনার স্ত্রী মিথ্যাবাদী।’ তাঁর স্বামী যখন দেখলেন, ইউসুফের জামা পেছন দিক থেকে ছেড়া, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেন- “এটা তোমারই চক্রান্ত। নারীদের ছলনা চক্রান্ত খুবই শক্তিশালী। হে ইউসুফ, তুমি বিষয়টা উপেক্ষা করো। হে আমার স্ত্রী, তুমি ক্ষমা চাও, কারন তুমিই দোষী।”

আযীয মিশরের স্ত্রীর এই ছিনালির খবর ছরিয়ে পড়ে চারিদিকে। কানাঘুষা চলতে থাকে উপরের তলার মহিলাদের মধ্যে। তাঁদের কথা হলো- ছিনালি করবি তো কর উপরের তলার কোন পুরুষের সাথে, ক্রীতদাসের করতে গেলি ক্যান?

তাঁদের এসব কথাবার্তার খবর এসে পৌঁছে যায় আযীয মিশরের স্ত্রী জুলেখার কানেও। তাঁর কথা হলো- ওরা আমার কাংখিত যুবকটি সম্পর্কে না জেনেই ওরা আমাকে দোষারোপ করছে।

ফলে জুলেখা তাঁদের ভুল ধারনা দূর করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে উপর তলার মহিলাদের জন্যে আয়োজন করে এক ভোজ সভার। তাঁদেরকে নিমন্ত্রন জানায় নির্দিষ্ট দিন। খাবার টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখে। কেটে কেটে খাবার জন্যে তাঁদের প্রত্যেকের জন্যে সরবরাহ করে একটি করে ছুরি। সবাই ছুরি দিয়ে ফল কেটে কেটে খাচ্ছে, এমনি সময় জুলেখা ইউসুফকে তাঁদের সামনে আসতে আদেশ করে। ইউসুফ ডাইনিং হলে ঢুকতেই সবগুলো নারী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ইউসুফের দিকে। তাঁরা আত্মভোলা হয়ে কেটে ফেলে নিজেদের হাত। তাঁরা স্বগত স্বত্বস্ফ্রত বলে উঠে- ‘আল্লাহর কসম, এতো মানুষ নয়, সাক্ষাত এক সম্মানিত ফেরেশতা।’ এবার জুলেখা বলে উঠে, দেখো, তোমরা না জেনে এমন একজন যুবকের ব্যাপারেই আমাকে তিরস্কার করছিলে। আমি অবশ্যি তাঁকে নিবেদন করেছি। কিন্তু সে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন থেকে সে যদি আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাহলে অবশ্যি আমি তাঁকে হীন ও লাঞ্ছিত করে কারাগারে নিক্ষেপ করবো। আল্লাহর একান্ত অনুগত দাস ইউসুফ তো কিছুতেই পাপ কাজে নিমজ্জিত হতে পারেননা। এখন তাঁদের সবার জালাতনে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। উপর তলার সব মহিলার দৃষ্টি এখন ইউসুফের দিকে। নাগিনীদের চতুর্মুখী ছোবলের মুখে ইউসুফ এক মুহূর্তের জন্যেও তাঁর মহামনিব আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে পা বাড়াননি। ইউসুফ আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন-

“ওগো আমার প্রভু, এরা আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে তাঁর চাইতে কারাগারই আমার কাছে অধিকতর প্রিয়। আমার প্রভু, এদের চক্রান্ত থেকে তুমি যদি আমাকে না বাঁচাও, তাহলে তো আমি এদের ফাঁদে আঁটকে যাবো।’’ (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৩৩)

কারাগারে ইউসুফ

আল্লাহ ইউসুফের ফরিয়াদ কবুল করলেন। নারীদের চক্রান্ত থেকে তাঁকে রক্ষা করলেন। যাদের নারীরা ইউসুফের জন্যে উন্মাদ হয়ে পড়েছিলো, তাঁরা একটি মেয়াদের জন্যে ইউসুফকে কারাগারে পাঠিয়ে দিলো। অথচ তাঁরা জানতো ইউসুফ সম্পূর্ণ নির্দোষ। এভাবে ইউসুফ নৈতিক পরীক্ষায় মহাবীরের বেশে বিজয়ী হলেন। আর মিশরের অভিজাত মহল তাঁর চারিত্রিক আদর্শের কাছে চরমভাবে পরাজিত হলো।

দুই কয়েদীর স্বপ্ন এবং ইউসুফের দাওয়াতী কাজ

ইউসুফ জেলে এসে কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীন প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি, উন্নত চরিত্র আর দাওয়াতী কাজে আকৃষ্ট হয়ে কয়েদীরা তাঁর ভক্ত হয়ে পড়ে। এক রাতে দু’জন কয়েদী স্বপ্ন দেখলো। তাঁরা ভাবলো, ইউসুফ ছাড়া আর কেউ তাঁদের স্বপ্নের মর্মার্থ বলে দিতে পারবেনা। ছুটে এলো তাঁরা ইউসুফের কাছে।

একজন বললো- ‘আমি স্বপ্ন দেখেছি, আমি মদ তৈরি করছি’।

অপরজন বললো- ‘আমি স্বপ্ন দেখেছি, আমার মাথায় রুটি রাখা আছে আর পাখি তা থেকে খাচ্ছে।’

এরা দু’জন ছিলো মিশর রাজের কর্মচারী। একজন ছিলো রাজার মদ প্রস্তুতকারক, আর অপরজন ছিলো রাজার রুটি প্রস্তুতকারক।

ইউসুফ ওদের স্বপ্নের কথা শুনে বললেন- তোমাদের খাবার আসার আগেই আমি তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দেবো। এই ফাকে তোমরা আমার কিছু কথা শুনো। আমি মহান প্রভু আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে তোমাদের বলছি-

“আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক করা উচিত নয়। এটা আমাদের এবং গোটা মানবজাতির উপর আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ, তিনি আমাদেরকে তাঁর ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব করার জন্যে সৃষ্টি করেননি। কিন্তু অধিকাংশ লোক তাঁর শোকর আদায় করেনা।”

“হে আমার কারাসাথীরা, চিন্তা করে দেখো, ভিন্ন ভিন্ন বহু খোদা ভালো, নাকি একজন সর্বশক্তিমান আল্লাহ ভালো? তাঁকে বাদ দিয়ে তোমরা যার ইবাদাত করছো, তাঁরা তো মাত্র কতগুলো নাম। এ নামগুলো তো তোমরাই রেখেছো।”

“আসলে সকল ক্ষমতার উৎস একমাত্র মহান আল্লাহ। কৃতিত্ব শুধুমাত্র তাঁর। তিনি হুকুম দিয়েছেন তোমরা তাঁর ছাড়া আর কারো দাসত্ব করবেনা। এটাই হলো সঠিক সরল জীবন পদ্ধতি। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানেনা।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৩৮-৪০)

ব্যাস, একটি মোক্ষম সময় বেছে নিলেন হজরত ইউসুফ ওদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ার জন্যে। এটি মোক্ষম সময় এ জন্যে ছিলো যে হজরত ইউসুফ দেখলেন-

১. তাঁরা তাঁর অত্যন্ত ভক্ত অনুরক্ত হয়েছে এবং

২. এ সময় তাঁরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনবে।

হজরত ইউসুফ তাঁদেরকে কিসের দাওয়াত দিলেন? তিনি তাঁদের যে দাওয়াত দেন, তাঁর মৌলিক কথা হলো-

১. আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরীক নাই।

২. আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর দাসত্ব করার জন্যে। অন্য কারো দাসত্ব করার জন্যে নয়।

৩. আল্লাহ সর্বজয়ী, সর্বশক্তিমান।

৪. সমস্ত ক্ষমতা ও কৃতিত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহর।

৫. তিনি মানুষকে কেবল তাঁর হুকুম মেনে চলার নির্দেশ দিয়াছেন।

৬. এক আল্লাহর নির্দেশ মতো জীবন যাপন করাই সত্য সঠিক ও বাস্তব দ্বীন বা জীবন পদ্ধতি।

এমনি চমৎকার ভাবে দাওয়াত পেশ করার পর এবার তিনি তাঁদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন। বললেন-

“তোমাদের প্রথমজন তাঁর মনিবকে মদ পান করাবার চাকুরিতে ফিরে যাবে। আর দ্বিতীয়জনকে শুলে চরিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে এবং পাখি তাঁর মাথা ঠুকে ঠুকে মগজ খাবে। এই হলো তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৪১)

সত্যি তাই হলো। একজন মুক্তি পেলো এবং নিজের পূর্বের চাকুরিতে ফিরে গেলো। অপরজনকে শুলে করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং পাখি তাঁর মাথায় বসে মগজ খুঁটে খুঁটে খায়।

স্বপ্ন দেখেন রাজা

কারাগারে হজরত ইউসুফের আরো কয়েকটি বছর কেটে যায়। তিনি সেখানেই দীনের কাজ করতে থাকেন। এরি মধ্যে মিশরের রাজা এক স্বপ্ন দেখেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন-

“সাতটি মতা তাজা গাভীকে সাতটি শুকনো হালকা পাতলা গাভী খেয়ে ফেলছে। আরো দেখেন সাতটি সবুজ শস্যের ছড়া আর সাতটি শুকনো ছড়া।”

রাজা তাঁর পারিষদবর্গকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে বললেন। কিন্তু তাঁরা কেউই এর ব্যাখ্যা করতে পারলোনা। এ সময় হঠাৎ ইউসুফের সেই কারা সাথিটির মনে পড়লো ইউসুফের কথা। সে বললো- আমাকে ইউসুফের কাছে পাঠিয়ে দিন, আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা এনে দিচ্ছি। তাই করা হলো। সে ছুটে এলো কারাগারে। ইউসুফের কাছে এসে বললো-

“হে মহাসত্যবাদী ইউসুফ, আমাদের রাজা এই স্বপ্নে দেখেছেন। আপনি এর ব্যাখ্যা বলে দিন।” ইউসুফ রাজার স্বপ্নের মর্ম বলে দিলেন। তিনি বললেন- “তোমরা সাত বছর লাগাতার চাষাবাদ করবে। এ সময় যে ফসল কাটবে, তা থেকে আহারের পরিমান ছড়া (শীষ) থেকে বের করবে, বাকিটা ছড়া সমেত রেখে দেবে। তারপর তোমাদের দেশে আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর। এ সময় খুব কমই ফসলাদি হবে। এ সময় আগের সাত বছরের সংরক্ষিত ফসল খাবে। অতপর একটি বছর আসবে, তখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং প্রচুর ফসল উঠবে।”

(সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ৪৭-৪৯)

লোকটি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে গিয়ে রাজাকে বললো। এ ব্যাখ্যা রাজার মনের মতো হলো। তিনি ব্যাখ্যাটি দারুন পছন্দ করলেন আর কারাগারে লোক পাঠিয়ে দিলেন ইউসুফকে নিয়ে আসার জন্যে। রাজার দূত যখন ইউসুফকে কারাগার থেকে বের করে নিতে এলো, ইউসুফ তাঁকে বললেন, ফিরে যাও। রাজাকে গিয়ে বলো, আগে সেই মহিলাদের বিচার করতে, যারা চক্রান্ত করে আমাকে কারাগারে পাঠিয়েছে।

রাজা সেই মহিলাদের ডেকে পাঠালেন এবং তাঁদের কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। তাঁরা বললো- “আল্লাহর কসম, ইউসুফ কোন অন্যায় করেনি, কোন পাপ করেনি। আমরাই তাঁকে ফাসাতে চেষ্টা করেছিলাম। সে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, নির্দোষ এবং সে অত্যন্ত সৎ ও সত্যবাদী।”

এ সত্য উদঘাটিত হবার পর ইউসুফ বললেন- আমি তো চেয়েছিলাম, এ সত্য প্রকাশিত হোক আর আযীয জানতে পারুক, আমি বিশ্বাস ঘাতকতা করিনি। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।

ইউসুফের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ

রাজা নির্দেশ দিলেন যাও, এবার ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাঁকে একান্তভাবে নিজের জন্যে নিয়োগ করবো। ইউসুফ জেল থেকে বেরিয়ে এলেন। রাজা যখন তাঁর সাথে কথা বললেন, তিনি তাঁর অগাধ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা আর বলিষ্ঠ নৈতিক চরিত্র দেখে অভিভূত হলেন। তিনি বললেন- আপনি এখন আমাদের এখানে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। আপনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত। ইউসুফ বললেন- আপনি দেশের অর্থ ভাণ্ডারের দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করুন। আমি তা যথাযথ সংরক্ষণ করবো। এ ব্যাপারে আমি জ্ঞান রাখি। রাজা তাই করলেন। আর এভাবেই মহান আল্লাহ ইউসুফের জন্যে রাষ্ট্রীয় কৃতিত্বের পথ পরিস্কার করে দিলেন। তিনি সৎলোকদের প্রতিদান কখনো বিনষ্ট করেননা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পৃথিবীতেও তাঁদের পুরস্কৃত করেন আর পরকালের প্রতিদান তো রয়েছেই। শেষ পর্যন্ত রাজা ইউসুফের সততা, দক্ষতা ও আন্তরিক নিষ্ঠার জন্যে গোটা দেশের শাসনভারই ছেড়ে দেন ইউসুফের উপর এবং নিজে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

ইউসুফের ভাইয়েরা এলো মিশরে

হযরত ইউসুফ (আঃ) অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবার পর সাত বছর খুব ফসল হয়। তিনি সুন্দরভাবে ফসল সংরক্ষন করেন। এরপর আসে পরবর্তী দুর্ভিক্ষের সাত বছর। এ সময় সংরক্ষিত ফসল ভাণ্ডার দিয়ে দুর্ভিক্ষের মোকাবেলা করেন। ফিলিস্তিনের দিকেও দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। মিশরে খাদ্য মজুদ থাকার খবর শুনে বিভিন্ন দেশের লোকেরা খাদ্য শস্যের জন্যে ছুটে আসে মিশরে। ইউসুফের ভাইয়েরাও খাদ্য কেনার জন্যে ছুটে আসে মিশরে। হ্যাঁ, ইউসুফের সেই দশভাই মিশরে এলো। তাঁরা অর্থকড়ি নিয়ে এসেছে খাদ্য শস্য কেনার জন্যে।

তাঁরা এসে অর্থমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলো। ফলে তাঁদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো ইউসুফের কাছে। তাঁরা ইউসুফকে মোটেও চিনতে পারেনি। কিন্তু ইউসুফ তাঁদের চিনে ফেললেন। তাঁদের সাথে কথাবার্তা বললেন। খোঁজ খবর নিলেন। বললেন, একটি ভাইকে আবার বাড়িতে রেখে এলেন কেন? আবার আসার সময় তাকেও নিয়ে আসবেন। ছোট্টভাইটিকে অর্থাৎ বিনয়ামিনকে দেখার জন্যে ইউসুফের মন ছটফট করছিলো। তিনি তাঁদের বিদায় দেয়ার সময় বলে দিলেন, দেখুন আমি খুবই অতিথি পরায়ন। দেখছেন না আমি কি রকম পাত্র ভরে দিচ্ছি? আপনাদের ছোট ভাইটিকেও নিয়ে আসবেন। ওকে নিয়ে না এলে আপনাদের আর এখানে আসার দরকার নেই। আর আপনাদের খাদ্য শস্য দেয়া হবেনা। ইউসুফ এদিকে তাঁর কর্মচারীদের গোপনে বলে দিলেন, ওরা খাদ্য শস্যের বিনিময়ে যে অর্থ দিয়েছে সেগুলো চুপিসারে, তাঁদের শস্যের বস্তায় ঢুকিয়ে ফিরিয়ে দাও। বাড়ি ফিরে এসে তাঁরা তাঁদের পিতাকে বললো- আব্বা, বিনয়ামিনকে নিয়ে না গেলে এরপর আমাদের আর খাদ্যশস্য দেবেনা। এবার ওকে আমাদের সাথে দিন। আমরা অবশ্যি তাঁর হিফাজত করবো। বস্তা খোলার পর খাদ্যশস্যের সাথে অর্থকড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে দেখে তাঁরা খুশিতে বাগবাগ হয়ে উঠলো। তাঁরা বলল- আব্বাজান, আমাদের আর কি চাই। এই দেখুন, আমাদের অর্থকড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা আবার যাবো। আমাদের ভাইয়ের হিফাজত করবো। তাঁদের পিতা হযরত ইয়াকুব বললেন- তোমাদের তো বিশ্বাস করা যায়না। আল্লাহই সত্যিকার হিফাজতকারী। আমি ততক্ষন পর্যন্ত ওকে তোমাদের সাথে দেবোনা, যতক্ষন না তোমরা আল্লাহর নামে ওকে ফিরিয়ে আনার শপথ না করবে। সুতরাং তাঁরা বিনয়ামিনকে ফিরিয়ে আনবে বলে আল্লাহর নামে শপথ করলো। এবার হযরত ইয়াকুব ওকে তাঁদের সাথে দিলেন। আর তাঁদের বলে দিলেন, তাঁরা যেন বিভিন্ন পথে মিশরে প্রবেশ করেন। একত্রে একই পথে যেনো না ঢুকে। এরপর কি হলো? এরপর তাঁরা মিশরে এলো। ইউসুফের কার্যালয়ে প্রবেশ করলো। ইউসুফ বিনয়ামিনকে একান্তে ডেকে নিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। ওহ, তখন দুই সহোদর ভাইয়ের কী যে আনন্দ, কিন্তু দশভাইকে তাঁরা এটা বুঝতে দেননি। তাঁদের মালপত্র প্রস্তুত করে দেউয়া হলো। এ সময় ইউসুফ নিজ ভাইয়ের মালের সাথে একটি সোনার পেয়ালা ঢুকিয়ে দিলেন। তাঁরা মালপত্র নিয়ে রওয়ানা করলো। কিছুদূর যেতে না যেতেই পিছে থেকে ডাক পড়লো। তাঁদের বলা হলো, তোমরা চোর।

তাঁরা জিজ্ঞেস করলো- কেন, আপনাদের কি হারিয়েছে?

 কর্মচারীরা বললো- বাদশাহর পানপাত্র হারিয়েছে। তাঁরা বললো- আল্লাহর কসম আমরা অনাসৃষ্টি করতে আসিনি। আর আমরা চোরও নই।

‘তোমাদের কথা মিথ্যা প্রমান হলে চোরের কি শাস্তি হবে?’

‘যার কাছে পেয়ালা পাওয়া যাবে, আপনারা তাঁকে রেখে দেবেন। আমাদের ওখানে যালিমদের শাস্তির বিধান এটাই।’

এবার তল্লাশি শুরু হলো। প্রথমেই দশভাইয়ের মাল তল্লাশি করা হলো। সবশেষে বিনয়ামিনের মালপত্র থেকে উদ্ধার করা হয় পেয়ালা।

দশভাই বললো- ‘এ যদি চুরি করে থাকে তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। ইতিপূর্বে তাঁর সহোদর ইউসুফও চুরি করেছিলো।’ ইউসুফ তাঁদের অপবাদ নীরবে হজম করেন। সত্য তাঁদের কাছে এখনো প্রকাশ করলেননা। মনে মনে বললেন- তোমরা বড় বদ। আল্লাহ প্রকৃত সত্য অবগত আছেন। তাঁরা আবদার করলো, বিনয়ামিন ধরা পড়লেও তাঁর পরিবর্তে তাঁদের কোন একজনকে রেখে দিতে। ইউসুফ তা অন্যায় বলে অস্বীকার করলেন। ফলে তাঁরা নিরাশ হয়ে বাইরে গিয়ে ভাবতে থাকে এখন কী করবে?

তাঁদের মধ্যে যে ভাইটি সবচে বড়, সে বললো- তোমাদের কি মনে নেই তোমরা তোমাদের পিতার সাথে কি অংগীকার করে এসেছো? তোমরা বিনয়ামিনকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে আল্লাহর নামে অংগীকার করে আসোনি? ইতোপূর্বে ইউসুফের ব্যাপারেও তোমরা বাড়াবাড়ি করেছো, তাও তোমাদের মনে আছে। এখন আমি এখানেই থেকে যাবো। আল্লাহর কোন ফায়সালা না হলে অথবা বাবা অনুমতি না দিলে আমি এখান থেকে ফিরে যাবোনা। তোমরা বাবার কাছে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলোগে।

ওরা বাড়ি ফিরে এসে যখন তাঁদের পিতা হজরত ইয়াকুবের কাছে ঘটনা বললো, তখন তিনি বললেন- আমি সবর করবো। মহান আল্লাহ ওদের দুই ভাইকেই আমার কাছে ফিরিয়ে আনতে পারেন। তিনি তো সবকিছু জানেন।

এদিকে দুঃখ বেদনায় হজরত ইয়াকুব জর্জরিত হয়ে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখ অন্ধ হয়ে যায়। তিনি ছেলেদের বলেন- যাও, ইউসুফ আর তাঁর ভাইকে অনুসন্ধান করো। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।

ইউসুফের সন্ধান লাভ

তাঁরা আবার ফিরে এলো মিশরে। ইউসুফের সাথে দেখা করে বললো- “হে আযীয, আমরা এবং আমাদের পরিবার পরিজন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। সামান্য পুঁজি নিয়ে এসেছি। আপনি দয়া করে পুরো মাত্রায় খাদ্যশস্য দিন। আমাদের দান করুন। আল্লাহ দানকারীদের অবশ্যি প্রতিদান দিয়ে থাকেন।”

ওদের বক্তব্য শুনে ইউসুফ বললেন- “তোমাদের কি মনে নেই তোমরা যখন অজ্ঞ ছিলে তখন ইউসুফ আর তাঁর ভাইয়ের সাথে কি ব্যবহারটা করেছিলে?”

একথা শুনে তাঁরা আঁতকে উঠলো। বললো- “হায়, তুমিই কি ইউসুফ?”

“হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ আর এই বিনয়ামিন আমার ভাই। মহান আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। যারাই আল্লাহকে ভয় করবে আর সবর অবলম্বন করবে, আল্লাহ সেই সৎ লোকদের কর্মফল নষ্ট করবেন না।”

ওরা দশভাই বললো- আল্লাহর কসম, আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সত্যিই আমরা বড় অপরাধ করেছি।

ইউসুফ বললো- “আজ আর তোমাদের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সব দয়ালুর বড় দয়ালু।”

এরপর ইউসুফ তাঁর গায়ের জামা তাঁদের দিয়ে বললেন- এ জামাটি নিয়ে বাড়ি চলে যাও। এটি আমার আব্বাজানের মুখমণ্ডলে রেখো। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। আর আমাদের আব্বা আম্মাসহ তোমাদের সমস্ত পরিবার পরিজনকে মিশরে নিয়ে এসো। দশভাই এবার মনের সুখে ফিলিস্তিন অভিমুখে যাত্রা করলো। এদিকে এরা যাত্রা করেছে আর ওদিকে হজরত ইয়াকুব বাড়ির লোকদের বললেন- আমি ইউসুফের সুবাস পাচ্ছি, তোমরা আমাকে বুড়ো বয়েসের বুদ্ধিভ্রষ্ট বলোনা।

ইতোমধ্যে ওরা ইউসুফের সুসংবাদ নিয়ে বাড়ি পৌঁছে গেলো। ঐ জামাটি হজরত ইয়াকুবের মুখমণ্ডলে স্পর্শ করার সাথে সাথে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। আনন্দে খুশিতে হজরত ইয়াকুব আল্লাহর শুক্রিয়া আদায় করলেন। ওরা দশভাই বাবার কাছে ক্ষমা চাইলো। বাবাকে ওদের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বললো। তিনি তাঁদের জন্যে দোয়া করলেন।

ইয়াকুব পরিবারের হিজরত

হজরত ইয়াকুব সবাইকে হিজরতের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন। সহসাই বিরাট পরিবার পরিজনের বহর নিয়ে তাঁরা মিশরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। জানা যায় এ এসময় হজরত ইয়াকুবের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিলো ৬৭ জন। তাঁরা যেদিন মিশরের রাজধানীর কাছে পৌঁছলেন, সেদিন মিশরে ছিলো একটি উৎসবের দিন। উৎসব উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক লোক এক যায়গায় একত্রিত হয়। হজরত ইউসুফ সেনাবাহিনী ও জনগনের বিরাট এক শোভাযাত্রাসহ তাঁর পিতা মাতাকে অভ্যর্থনা জানান। ইউসুফের বাবা মা ও পরিবারবর্গের মিশরে আগমনের খবর শুনে জনগনের মাঝে খুশির জোয়ার বয়ে আসে। স্বয়ং মিশরের রাজা ইউসুফকে নির্দেশ দেন, তাঁদের বড় আকারে সংবর্ধনা জানাবার। বাবা মা ও আপনজনদের মিশর আগমনে আজ ইউসুফের মনে যে কী খুশি আর কত যে আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ইউসুফ তাঁদের মহাসমারোহে এগিয়ে আনেন। বাবা মাকে নিজের আসনে বসান। তাঁরা সবাই ইউসুফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

সত্য হলো ইউসুফের স্বপ্ন

ভাইয়েরা সবাই ইউসুফের কাছে নত হলো। তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলো। বাবা মা ইউসুফকে পেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন। এভাবেই ইউসুফ ছোট্ট বেলায় যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা সত্যে পরিনত হলো। ইউসুফ বললেন-

“আব্বাজান, আমি যা স্বপ্ন দেখেছিলাম, এ হলো সেই স্বপ্নের মর্ম। আমার প্রভু, আমার স্বপ্নকে সত্যে পরিনত করেছেন। তিনি আমার প্রতি বিরাট অনুগ্রহ দেখিয়ে আমাকে কারাগার থেকে বের করে এনেছেন। আপনাদের মরু অঞ্চল থেকে বের করে এনে আমার সাথে মিলিত করেছেন। অথচ শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। আমার প্রভু অতি সূক্ষ্ম কৌশলে তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী ও সুকৌশলী।”(সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ১০০)

আল্লাহর শোকর আদায়

ইউসুফের আর কি চাই? মহান আল্লাহ তাঁকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন। কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন। নবুয়্যত দান করেছেন। রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন। বিপুল জনপ্রিয়তা দান করেছেন। অবশেষে বাবা মা আর সকল আত্মীয় স্বজনকেও এনে তাঁর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর কত যে অনুগ্রহ তাঁর উপর। তিনি অত্যন্ত বিনীত কণ্ঠে শোকর আদায় করেন তাঁর মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে-

“আমার প্রভু, তুমি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছো। কথার মর্ম বুঝতে শিখিয়েছ। হে আসমান যমীনের স্রষ্টা, দুনিয়া এবং আখিরাতে তুমিই আমার অভিভাবক। তোমার অনুগত অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিও আর নেক্কার লোকদের সাথে মিলিত করো।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ১০১)

হযরত ইউসুফের কালের মিশর

বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে জানা যায়, হযরত ইউসুফ যখন মিশর যান, তখন মিশরে পঞ্চদশতম রাজ পরিবারের শাসন চলছিলো। এ বংশের রাজাদের বলা হতো ‘রাখাল রাজা’ (Hyksos Kings)। এরা মিশরীয় ছিলো না। তাঁরা ফিলিস্তিন ও সিরিয়া অঞ্চল থেকে গিয়ে মিশরের রাজত্ব দখল করে। এ বংশের রাজাদের ‘আমালিক’ রাজাও বলা হয়। এরা বিদেশী হবার কারনে তাঁরা হজরত ইউসুফকে সাদরে গ্রহন করেছিলো। ইয়াকুব (আঃ) এঁর বংশধর বনী ইসরাইলকে দেশের সব চাইতে উর্বর এলাকায় বসতি স্থাপন করতে দিয়েছিলো। হযরত ইয়াকুবের বংশধরদের বনী ইসরাইল বলা হয়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, রাখাল রাজাদের ‘আপোসিস’ নামক রাজাই ছিলেন হযরত ইউসুফের সময়কার রাজা।

এ রাজা হযরত ইউসুফকে অত্যন্ত সম্মান দান করেন। প্রথমে ইউসুফকে তিনি অর্থমন্ত্রী বানান। পড়ে দেশ শাসনের বিরাট দায়িত্ব ভার ইউসুফের উপর অর্পণ করেন। হযরত ইউসুফ যে বিরাট যোগ্যতা ও অগাধ জ্ঞানের ভিত্তিতে দেশ শাসন করেন রাজা তাতে খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। শেষ পর্যন্ত হযরত ইয়াকুবের বংশধরেরা অর্থাৎ বনী ইসরাইলের লোকেরা ব্যাপকভাবে ক্ষমতায় অংশগ্রহন করে। বিভিন্ন স্তরে তাঁরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

কুরআনে হযরত ইউসুফ

কুরআনের একটি সুরাই রয়েছে হযরত ইউসুফের নামে। সুরাটির নাম ‘ইউসুফ’। এটি আল কুরআনের দ্বাদশ সূরা। মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। গোটা সুরায় হযরত ইউসুফের কাহিনীই বর্ণিত হয়েছে। কুরআন মাজীদে এ কাহিনীকে ‘আহাসানুল কাসাস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর মানে ‘সর্বোত্তম কল্যাণকর কাহিনী’। সত্যিই হযরত ইউসুফের জীবনীতে রয়েছে তরুন ও যুবকদের জন্যে অএন শিক্ষণীয় বিষয়। রয়েছে আদর্শ জীবন গড়ার উপাদান। আল কুরআনে হযরত ইউসুফের নাম ২৭ বার উল্লেখ করা হয়েছে। এঁর মধ্যে ২৫ বারই উল্লেখ হয়েছে সূরা ইউসুফে। তাছাড়া সূরা আনয়ামের ৮৪ ও সূরা আল মুমিনের ৩৪ নম্বর আয়াতে একবার একবার করে উল্লেখ হয়েছে। বিস্তারিত জানার জন্যে সূরা ইউসুফ পড়ে নেবেন।

হযরত ইউসুফের চারিত্রিক আদর্শ

হযরত ইউসুফ (আঃ) এর কাহিনীতে রয়েছে আমাদের জন্যে অনেক শিক্ষা। তাঁর জীবনাদর্শ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো আমরা এখানে লিখে দিচ্ছি। আসুন মনোযোগ দিয়ে সেগুলো পড়ে নেই-

১. তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব ছিলেন আল্লাহর নবী। ফলে ইউসুফ ছোট বেলা থেকেই নবীর অনুসারী হন। নবীর পথে চলেন।

২. তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞান পিপাসু। ফলে আল্লাহ তাঁকে অনেক জ্ঞান দান করেন। কথার মর্ম উপলব্ধি করার যোগ্যতা দেন।

৩. তিনি সব সময় পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। ফলে পিতা মাতাও তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।

৪. তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বাসী। যে কেউ তাঁর উপর আস্থা রাখতে পারতো।

৫. তিনি ছিলেন অত্যন্ত উন্নত চরিত্রের অধিকারী।

৬. তিনি গোপনে এবং সুযোগ পেয়েও পাপ কাজ করেননি।

৭. তিনি সব সময় আল্লাহকে ভয় করতেন।

৮. তিনি কারা নির্যাতন সয়েছেন, কিন্তু কোন প্রকার অন্যায় ও পাপ কাজ করতে রাজি হন নি।

৯. তিনি ছিলেন অত্যন্ত আমানতদার। কখনো বিশ্বাস ঘাতকতা করেননি।

১০. তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল ছিলেন। কখনো ধৈর্যহারা হননি।

১১. তিনি সুযোগ পেলেই মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতেন। দাওয়াত দিতেন।

১২. সকল বিষয়ে তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করতেন। আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতেন। তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করতেন।

১৩. তিনি তাঁর জ্ঞান ও প্রতিভার মাধ্যমে মানুষের উপকার করতেন। তাঁদের সমস্যার সনাধান বলে দিতেন

১৪. যেসব নারী তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলো, সামাজিকভাবে তিনি তাঁদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন।

১৫. তিনি সামাজিকভাবে নিজের নির্দোষ, নিষ্পাপ ও বিশ্বস্ত হবার কথা প্রমান করে দেন।

১৬. তিনি সুযোগ পেয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহন করেন।

১৭. তিনি অত্যন্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে তাঁর উপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন।

১৮. ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ভাইদের অপরাধের প্রতিশোধ নেননি।

১৯. সুযোগ পেয়েও প্রতিশোধ গ্রহন না করে ভাইদের ক্ষমা করে দেন।

২০. তিনি পিতামাতা ও ভাইদেরকে সম্মানের সাথে পুনর্বাসিত করেন।

২১. তিনি সকল সৌভাজ্ঞের জন্যে কেবল মহান আল্লাহর শোকর আদায় করেন। তাঁরই কৃতজ্ঞ হয়ে থাকেন।

২২. তিনি আল্লাহর একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত দাসের মতো অবস্থায় মৃত্যু কামনা করেন।

২৩. পরকালে তিনি নেক লোকদের সাথী হবার জন্যে মহান আল্লাহর কাছে আকুতি জানান।

আসুন, আমরা হযরত ইউসুফ (আঃ) এর এসব মহান আদর্শের অনুসরন করি। নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি।

কুরআনে ইউসুফের একটি দোয়া

ইউসুফ রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভ করেন। পিতা আল্লাহর নবী ইয়াকুবকে পরিবারবর্গসহ নিজের কাছে নিয়ে আসেন। আল্লাহ সকল দিক থেকে ইউসুফের প্রতি নিজের নিয়ামত পূর্ণ করেন। এ সময় ইউসুফ মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন-

“আমার প্রভু, তুমি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছো, আমাকে কথার মর্ম উপলব্ধি করার শিক্ষা দিয়েছ, তুমিই আসমান যমীনের স্রষ্টা। দুনিয়া এবং আখিরাতে তুমিই আমার অলি (বন্ধু, অভিভাবক, পৃষ্ঠপোষক)। মুসলিম (তোমার প্রতি আত্মসমর্পিত) হিসেবে আমার ওফাত দিও আর আমাকে মিলিত করো ন্যায়পরায়ণদের সাথে।” (সূরা ১২ ইউসুফঃ আয়াত ১০১

১২।

শুয়াইব

(আঃ)

মহান আল্লাহ আল কুরআনে যেসব সম্মানিত নবীর নাম উল্লেখ করেছেন হযরত শুয়াইব (আঃ) তাঁদেরই একজন। অন্য সকল নবীর মতো তিনিও এই মহা সত্যের প্রতিই মানুষকে আহবান করেছিলেন-

“হে আমার জাতির ভাইয়েরা, তোমরা কেবল এক আল্লাহর দাসত্ব, আনুগত্য এবং হুকুম পালন করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই।”

শুয়াইব কোন জাতির নবী ছিলেন?

কুরআন মাজীদে শুয়াইব (আঃ) কে মাদইয়ান ও আইকাবাসীদের নবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেছেন- এই দুটি নাম মূলত একটি গোত্রের দুটি নাম। আবার কেউ কেউ বলেছেন- এ দুটি আসলে দুটি গোত্রেরই নাম। হযরত শুয়াইব (আঃ) এই দুটি কওমের কাছেই নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগনের মতে, এই দুটি গোত্র ইবরাহীম (আঃ) এর বংশধর। তাঁদের বসবাসও ছিলো পাশাপাশি। কুরআনে বলা হয়েছে এ দুটি জাতি উম্মুক্ত রাজপথে অবস্থান করতো। মাদইয়ানবাসীদের বসবাস ছিলো উত্তর হিজায থেকে ফিলিস্তিনের দক্ষিনাঞ্চল জুড়ে এবং সেখান থেকে সিনাই উপত্যকার শেষ পর্যন্ত আকাবা উপসাগর এবং লোহিত সাগরের তীর জুড়ে। মাদইয়ান ছিলো তাঁদের প্রধান শহর।

বর্তমান তাবুক অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিলো আইকাহ। তাবুকের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আইকাবাসীরা বসবাস করতো। মাদইয়ান এবং আইকাবাসীদের মধ্যে বৈবাহিক, বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। এ ছাড়া উভয় জাতি একই ধরনের অসামাজিক কাজকর্ম এবং অন্যায় ও অপরাধে লিপ্ত ছিলো। সে কারনে আল্লাহ তাঁদের উভয় জাতির হেদায়েতের জন্যে একজন ব্যাক্তিকেই নবী নিযুক্ত করেন।

হযরত শুয়াইবের জন্ম হয় মাদইয়ান গোত্রে। কুরআন মাজীদে মাদইয়ানবাসীদের হজরত শুয়াইবের জাতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তাঁদেরকে ‘হে আমার জাতির ভাইয়েরা’ বলে সম্বোধন করতেন।

হযরত শুয়াইব কোন সময়কার নবী?

হযরত শুয়াইব (আঃ) যে ঠিক কোন সময়কার নবী ছিলেন, সে কথাটি একেবারে নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে কুরআনের বর্ণনা ভঙ্গি থেকে বুঝা যায়, শুয়াইব (আঃ) হজরত মুসা (আঃ) এর পূর্বেকার নবী ছিলেন। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, হযরত মুসা (আঃ), হযরত শুয়াইব (আঃ) এর সাক্ষাত লাভ করেছিলেন।

মাদইয়ান ও আইকাবাসীদের দুরাচার

মাদইয়ান ও আইকাবাসী তাঁদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম (আঃ) এর প্রচারিত দ্বীন ইসলামেরই উত্তরাধিকারী ছিলো। কিন্তু কয়েকশ বছরের ব্যবধানে তাঁরা ইসলামকে বিকৃত করে ফেলে এবং বাস্তবে ইসলামের আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে পড়ে। বিশ্বাস ও চরিত্রের দিক থেকে তাঁরা যেসব অপরাধে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলো সেগুলো হলো-

১. তারা আল্লাহর দিনকে বিকৃত করে ফেলেছিলো।

২. তারা আল্লাহর সাথে শিরক করতো। মূর্তি পূজা করতো।

৩. তারা জীবন যাপনের সঠিক পথ থেকে দূরে সরে পড়েছিলো।

৪. তারা মাপে কম দিতো। লেনদেনে হেরফের করতো। মানুষকে ঠকাতো। প্রতারনা করতো।

৫. ডাকাতি ও হাইজ্যাকি ছিলো তাঁদের নিত্য দিনের কাজ।

৬. এছাড়াও অন্যান্য পাপাচার এবং ধ্বংসাত্মক কাজে তারা লিপ্ত ছিলো।

হযরত শুয়াইবের সংস্কার আন্দোলন

এই দুটি অধঃপতিত কওমকে সংশোধন করার জন্যে আল্লাহ তায়ালা মাদইয়ানের মহান চরিত্র ও ব্যাক্তিত্বের অধিকারী শুয়াইবকে নবী নিযুক্ত করেন। শুয়াইব ছিলেন অত্যন্ত সুভাষী ও বলিষ্ঠ ব্যাক্তিত্বের অধিকারী। তিনি মর্মস্পর্শী দাওয়াত এবং আহনবানের মাধ্যমে আল্লাহর দিনের প্রচার ও জাতিকে সংশোধনের সংগ্রাম শুরু করেন। তাঁর কর্মধারা সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র আল কুরআনে বলেন –

“আর আমি মাদইয়ানবাসীদের কাছে তাঁদের ভাই শুয়াইবকে পাঠিয়েছি। সে তাঁদের বলেছিল- হে আমার জাতির ভাইয়েরা, তোমরা এক আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অপর কোন ইলাহ নাই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে সুস্পষ্ট প্রমান এসে গেছে। তাই তোমরা তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী মাপ ও ওজন পূর্ণ করে দাও। মানুষকে তাঁদের দ্রব্য সামগ্রীতে ঠকিওনা। দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। এতেই তোমাদের জন্যে রয়েছে কল্যাণ। প্রতি পথে ডাকাত হয়ে বসোনা। সন্ত্রাস সৃষ্টি করোনা। যারা ঈমান এনেছে তাঁদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রেখোনা এবং সহজ সরল পথকে বাঁকা করার চেষ্টা করোনা। চোখ খুলে দেখো অতীতে যারা ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে তাঁদের পরিনতি কী হয়েছে? ” (সূরা আরাফ-আয়াতঃ ৮৫-৮৬)

মাদইয়ানবাসীদের মতো আইকাবাসীদেরও সংশোধন করার জন্যে হজরত শুয়াইব (আঃ) আপ্রান চেষ্টা করেন। তাঁর এ প্রচেষ্টা সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ বলেন-

“আইকাবাসীরা রাসুলদের অস্বীকার করে। শুয়াইব যখন তাঁদেরকে বললো- তোমরা কি ভয় করোনা? আমি তোমাদের জন্যে একজন বিশ্বস্ত রাসুল, সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমার আনুগত্য করো। এই উপদেশ দানের কাজে আমি তো তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইনা। আমাকে পারিশ্রমিক দেয়ার দায়িত্ব তো মহান আল্লাহর। ওজন পূর্ণ করে দাও, মানুষকে তাঁদের মাল কম দিওনা, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। সেই মহান স্রষ্টাকে ভয় করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আশ শোয়ারা, আয়াত ১৭৬-১৮৪)

এভাবে মর্মস্পর্শী ভাষায় হজরত শুয়াইব (আঃ) এই দুইটি জাতিকে সংশোধন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা তাঁর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর সাথে বিতর্ক ও দ্বন্ধ-সংঘাতে লিপ্ত হয়। তারা বললো- “হে শুয়াইব তোমার সালাত কি তোমাকে এই শিক্ষাই দেয় যে, আমরা সেই সব মাবুদদের পরিত্যাগ করবো, আমাদের পূর্বপুরুষরা যাদের ইবাদাত করতো? আর আমাদের অর্থ সম্পদ ইচ্ছামত ব্যয় করার অধিকার আমাদের থাকবেনা? তুমি একজন মহৎ হৃদয়ের বড় সদাচারী ব্যাক্তিই রয়ে গেলে। ” (সূরা হুদ, আয়াত ৮৭)

তারা আর বললো- “তুমি একজন যাদুগ্রস্থ মানুষ, তুমি তো আমাদের মতই একজন সাধারন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নও। আমরা তোমাকে পরিস্কার মিথ্যাবাদী মনে করি। তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে এক টুকরা আকাশ ভেঙ্গে আমাদের উপর ফেলো দেখি।” (সূরা আশ শোয়ারা, আয়াত ১৮৫-১৮৭)

শুয়াইব বললো- “আমি তো কেবল তোমাদের সংশোধন চাই। আমার সাধ্য অনুযায়ী সংশোধনের এই চেষ্টা আমি করে যাবো। আমার বিরুদ্ধে তোমাদের হঠকারীতা যেন সেই পর্যায়ে না যায়, যার ফলে নূহ, হুদ, ও সালেহ এর জাতির উপর আল্লাহর আযাব এসেছিলো। আর লুত জাতির ধ্বংসের ইতিহাস তো তোমাদের থেকে বেশী আগের নয়। তোমরা আল্লাহর কাছে মাফ চাও এবং তাঁর দিকে ফিরে ফিরে এসো। তিনি বড় দয়ালু, বড় বন্ধু সুলভ।” (সূরা হুদ ৮৮-৯০)

এসব কথার জবাবে তারা বলছিলো – “শুয়াইব, তোমার অনেক কথাই আমাদের বুঝে আসেনা। ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক না থাকলে তোমাকে আমরা পাথর মেরে হত্যা করতাম। আমাদের চাইতে তোমার ক্ষমতা বেশী নয়।”

তাঁদের এসব কথা শুনে শুয়াইব বললেন – “আমার সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক কি আল্লাহর চাইতেও সম্মানিত? তোমরা ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের কথা বলছো, অথচ আল্লাহর ব্যাপারে মোটেই তোয়াক্কা করছোনা? তোমরা অবশ্যই আল্লাহর বেষ্টনীতে আছো।” তিনি আরো বললেন – “আমার কাজ আমি অবশ্যই করে যাবো, তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কার উপর অপমানকর আযাব আসে আর মিথ্যাবাদীই বা কে? তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও অপেক্ষা করছি।”

চরম বিরোধিতার মুখেও একদল যুবক হযরত শুয়াইবের প্রতি ঈমান আনে। চরম নির্যাতনের মুখেও তারা আল্লাহর নবীর সাথে দীনের পথে চলতে থাকে। কিন্তু বিরোধীনেতারা কিছুতেই এদের সহ্য করতে পারেনা। তারা অবশেষে হুংকার ছেড়ে ঘোষণা দিলো – “হে শুয়াইব, আমরা তোমাকে এবং তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাঁদেরকে দেশ থেকে বের করে দেবো। অথবা তোমাদেরকে আমাদের প্রচলিত ধর্মে ফিরে আসতে হবে।” (সূরা আরাফ-আয়াতঃ ৮৮)

তারা জনসভা করে জনগনের মাঝে ঘোষণা করে দিলো – তোমরা যদি শুয়াইবের দলে যোগ দাও তাহলে তোমাদের ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারবেনা। এ সব হুংকারের জবাবে হজরত শুয়াইব মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন –

“ওগো আমাদের প্রভু, আমাদের মাঝে আর আমাদের জাতির মাঝে সঠিক ফায়সালা করে দাও। তুমি তো সর্বোত্তম ফায়সালাকারী।” (সূরা আরাফ-আয়াতঃ ৮৯)

মাদইয়ান ও আইকাবাসীর ধ্বংস

হযরত শুয়াইবের অনেক চেষ্টা সাধনার পরেও যখন এই দুইটি জাতি আল্লাহর পথে আসলনা এবং নবী ও তাঁর সাথীদের উৎখাত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো, তখন আল্লাহ তায়ালা এই উভয় জাতিকে ধংস করে দিলেন। মাদইয়ানবাসীদের ধংস করলেন প্রচণ্ড বজ্রধ্বনি দিয়ে। এমনভাবে তাঁদের বিরান করে দিলেন, যেনো ওখানে কোন দিনই কোন লোক বসবাস করেনি। অপরদিকে আইকাবাসীদের ধংস করে দিলেন ছাতার মতো মেঘমালা পাঠিয়ে। মেঘ থেকে আযাব বর্ষিত হলো আর আইকাবাসীরা সম্পূর্ণভাবে ধংস হয়ে গেলো। কিন্তু মহান আল্লাহ হযরত শুয়াইব এবং তাঁর সাথীদেরকে এসব ধংসের আযাব থেকে রক্ষা করলেন। তাঁদের বাঁচিয়ে রাখলেন এবং এই মুমিনদের ঘরেই জন্ম নিলো পরবর্তী প্রজন্ম।

কুরআনে উল্লেখ

কুরআন মাজীদে সূরা আরাফ ও সূরা হুদে মাদইয়ানবাসীদের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সূরা শোয়ারায় বর্ণিত হয়েছে আইকাবাসীদের ঘটনা। কুরআন মাজীদে হজরত শুয়াইবের নাম উল্লেখ হয়েছে ১১ বার। সে আয়াতগুলো হলো – সূরা আরাফঃ ৮৫, ৮৮, ৯০, ৯২। সূরা হুদঃ ৮৫, ৮৭, ৯১, ৯৪। আন কাবুতঃ ৩৬। শোয়ারাঃ ১৭৭।

আপনি যদি কুরআন পড়েন এবং সরাসরি কুরআন থেকেই এসব ঘটনাবলী জানার চেষ্টা করেন, তাহলে অনেক কিছুই জানতে পারবেন এবং শিখতে পারবেন অনেক কিছুই। আসুন আমরা সবাই কুরআন পড়ি। নবীদের ঘটনাবলী জানি এবং নবীদের আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়ি।

১৩।

ধৈর্যের পাহাড় আইয়ুব

(আঃ)

“আর আইয়ুবের কথা চিন্তা করে দেখো। সে যখন ফরিয়াদ করলো –“ওগো আমার প্রভু, আমি কঠিন রোগে বড় কষ্টের মধ্যে আছি আর তুমি তো সবচেয়ে বড় করুনাময়। অতপর আমি তাঁর ফরিয়াদ কবুল করলাম আর দূর করে দিলাম তাঁর সব কষ্ট।”?(সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ৮৩-৮৪)

হযরত আইয়ুবের পরিচয়

আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত আইয়ুব (আঃ) এর কথা পবিত্র কুরআন শরীফের চারটি স্থানে উল্লেখ হয়েছে। সেগুলো হলো সূরা আন নিসার ১৬৩ নম্বর আয়াত, সূরা আল আনয়ামের ৮৪ নম্বর আয়াত, সূরা আল আম্বিয়ার ৬৩-৬৪ নম্বর আয়াত এবং সূরা সোয়াদের ৪১-৪৪ নম্বর আয়াত। হযরত আইয়ুবের বংশ পরিচয় পরিস্কারভাবে জানা যায়নি। এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি ছিলেন বনী ইসরাইলের একজন নবী। কেউ বলেছেন, তিনি ছিলেন মিশরীয়। তবে ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতকে অনেকে সঠিক বলেছেন। তাঁর মতে, হযরত আইয়ুবের বংশ পরিচয় হলো হযরত ইব্রাহীমের পুত্র ইসহাক, হযরত ইসহাকের পুত্র ঈশু, ঈশুর পুত্র আমুশ, আমুশের পুত্র আইয়ুব। হযরত আইয়ুব (আঃ) খ্রিষ্টপূর্ব নবম বা দশম শতকের লোক ছিলেন।

ধনী হযরত আইয়ুব

হযরত আইয়ুব (আঃ) ছিলেন এক বিরাট ধনী ব্যাক্তি। তাঁর ধন সম্পদ ছিলো অগাধ। তিনি ছিলেন অনেক অনেক ভূমি ও বাগ বাগিচার মালিক। তাঁর ছিলো অগাধ অর্থকড়ি। ছিলো অনেক সন্তান সন্তুতি। ছিলো সুস্বাস্থ্য। কিন্তু এতো বড় ধনী হলে কি হবে, এ জন্যে তাঁর ছিলনা কোন গর্ব, ছিলনা কোনো অহংকার। তিনি এগুলোকে আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ মনে করতেন। আল্লাহ তাঁকে এতো ধনসম্পদ দিয়েছেন বলে তিনি সব সময় আল্লাহর শোকর আদায় করতেন, আল্লাহর কৃতজ্ঞ হয়ে থাকতেন।

কঠিন পরীক্ষা

কিন্তু আল্লাহর নিয়ম হলো, তিনি মানুষকে দিয়েও পরীক্ষা করেন, নিয়েও পরীক্ষা করেন। আর যেসব মানুষ আল্লাহর বেশী প্রিয়, তিনি তাঁদের অনেক বড় পরীক্ষা নেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) ছিলেন আল্লাহর একজন অতিপ্রিয় দাস ও নবী। তিনি যেমন তাকে ভালবাসতেন, তেমন কঠিন পরীক্ষাও তাঁর উপর চাপিয়ে দেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) চারটি বড় বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন –

১. তাঁর সমস্ত ধন সম্পদ জমাজমি নষ্ট হয়ে যায়।

২. তাঁর সারা শরীরে কঠিন যন্ত্রনাদায়ক এক রোগ দেখা দেয়। বছরের পর বছর কাটে কিন্তু তাঁর রোগ ভালো হয়না।

৩. তাঁর স্ত্রী ছাড়া সকল আপনজন তাঁকে ছেড়ে দূরে চলে যান। তিনি সম্পূর্ণ নিঃসহায় হয়ে পড়েন।

৪. এ অবস্থায় আল্লাহর প্রতি বিমুখ হওয়ার জন্যে শয়তান তাঁকে অনবরত প্ররোচনা দিতে থাকে।

এতো বড় পরীক্ষায় পড়েও হযরত আইয়ুব (আঃ) সবর অবলম্বন করেন, ধৈর্য ধারন করেন। প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করেন। তিনি সুসময়ে যেমন তাঁর প্রভুর কৃতজ্ঞ ছিলেন, দুঃসময়েও ঠিক তেমনি কৃতজ্ঞ ছিলেন। তিনি তাঁর সমস্ত দুঃখ কষ্টের জন্যে কেবল মহান আল্লাহর কাছেই ফরিয়াদ করতেন। কেবল তাঁরই কাছে সাহায্য চাইতেন। তিনি বলতেন-

“প্রভু, আমি বড় কষ্টে আছি। আর তুমি তো সব দয়ালুর বড় দয়ালু। প্রভু, শয়তান আমাকে বড় কষ্ট ও যন্ত্রনা দিচ্ছে, তুমিতো আমার অবস্থা দেখছো।”

হযরত প্রায় সতের আঠারো বছর এই কঠিন রোগ ও অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। তিনি তাঁকে পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে বলেন। (সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪২)। হযরত আইয়ুব তাই করলেন। কী আশ্চর্য, পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করার সাথে সাথেই সেখান থেকে সচ্ছ পানির একটা ঝর্নাধারা প্রবাহিত হলো। আল্লাহ তাঁকে এ পানি পান করতে এবং এ পানি দিয়ে গোসল করতে বলেন। তিনি তাই করলেন। এর ফলে আল্লাহর দয়ায় তাঁর রোগ ভালো হয়ে গেলো।

বিবি রাহমা

রাহমা নামে হযরত আইয়ুবের একজন স্ত্রী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহভীরু, সতী এবং স্বামী পরায়না। দীর্ঘ রোগের কারনে আপনজন সবাই হযরত আইয়ুবকে ছেড়ে চলে যান। কিন্তু রাহমা। তাঁর স্ত্রী রাহমা তাঁকে ছেড়ে যাননি। বছরের পর বছর ধরে তিনি স্বামীর সেবা যত্ন করেন। অসাধারন ধৈর্যগুণ থাকলেই কোন নারী এতো বছর ধরে কঠিন রোগেও স্বামীর সেবা করে যেতে পারেন। শয়তান হযরত আইয়ুবকে সরাসরি কোন ধোঁকা দিতে না পেরে রাহমার কাছে এলো। সে রাহমাকে এই বলে প্ররোচনা দিতে থাকে, তুমি আর কতকাল সহ্য করবে? দিনের পর দিন শয়তান তাঁকে এভাবে অসঅসা দিতে থাকে। তাঁকে প্ররোচিত করতে থাকে। অবশেষে একদিন এসে তিনি স্বামীকে বললেন – এভাবে আর কতকাল পরীক্ষা চলবে? আর কতকাল বিপদ মুসিবত সইয়ে যাবো?

একথায় হযরত আইয়ুব অত্যন্ত মনোক্ষুণ্ণ হলেন। তিনি স্ত্রীকে বললেন – যতদিন দুঃখ কষ্টের মধ্যে আছো, তাঁর চেয়ে বেশী দিন কি সুখের মধ্যে কাটাওনি? যতোদিন আমি সুখে ছিলাম ততোদিন দুঃখ ভোগের আগে এ অবস্থা দূর করে দেয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে আবদার করতে আমার লজ্জা হয়। হযরত আইয়ুব স্ত্রী রাহমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। কিন্তু তাঁর মুখে যখন অধৈর্যের কথা শুনলেন এটাকে তিনি আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা মনে করলেন এবং অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। রাগের মাথায় তিনি কসম খেয়ে বললেন, এ অধৈর্যের জন্যে আমি তোমাকে একশত বেত্রাঘাত করবো। রাগ স্তিমিত হলে তিনি পেরেশান হয়ে উঠলেন, যদি কসম বাস্তবায়ন করি তাহলে তো একজন নিরপরাধকে শাস্তি দেয়া হয়। আর যদি কসম বাস্তবায়ন না করি তাহলে তো গুনাহগার হতে হয়। এর সমাধান চেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন। তিনি যতগুলো বেত্রাঘাত করার অংগীকার করেছেন, আল্লাহ তাঁকে ততগুলো শলা দিয়ে একটি আটি বানাতে বললেন। (সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪৪)

আর সেই আটি দিয়ে বিবি রাহমাকে একটি মৃদু আঘাত করতে বললেন। ব্যাস, তিনি তাই করলেন। তাঁর অংগীকার পূর্ণ হয়ে গেলো। মহান আল্লাহ তাঁদের দুজনের চিন্তা দূর করে দিলেন এবং তাঁদেরকে নিজের রহমত দ্বারা সিক্ত করলেন।

ফিরে এলো সুখের দিন

এবার হযরত আইয়ুব (আঃ) এর সুখের দিন ফিরে এলো। আল্লাহ তাঁকে রোগ ভালো করে দিলেন। আবার প্রচুর ধন সম্পদ দান করলেন। তাঁর সন্তান ও আত্মীয় স্বজনরা ফিরে এলো তাঁর কাছে। তিনি সুস্থ শরীরে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে লাগলেন। বহু দুঃখ কষ্টের পর বিবি রাহমার জীবনে আবার সুখের দিন ফিরে এলো। কোথায় বলে ‘সবুরে মেওয়া ফলে’। হযরত আইয়ুব সবর করেছিলেন, বিবি রাহমা সবর করেছিলেন। তাই সুখের দিন ফিরিয়ে দিয়ে আল্লাহ তাঁদের সবরের প্রতিদান দিলেন।

আল কুরআনে তাঁর প্রশংসা

মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে হযরত আইয়ুব (আঃ) এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন-

১. আমি আইয়ুবকে পেয়েছি পরম ধৈর্যশীল। সে ছিলো আমার এক উত্তম গোলাম, ছিলো আল্লাহমুখী। (সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪৪)

২. আইয়ুবের ব্যাপারটি ছিলো বুদ্ধিমান লোকদের জন্যে শিক্ষণীয়। (সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪৪)

৩. আইয়ুবের ঘটনা ইবাদাতকারীদের জন্যে শিক্ষণীয়। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৪)

৪. হে মুহাম্মাদ, আমি তোমার কাছে অহী পাঠাচ্ছি ঠিক সেভাবে, যেভাবে পাঠিয়েছিলাম নুহ এবং তাঁর পরবর্তী নবীদের কাছে——- ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন এবং সুলাইমানের কাছে। (সূরা আন নিসা, আয়াত ১৬৩)

শিক্ষণীয় বিষয়

বুদ্ধিমান লোকদের জন্যে যে হযরত আইয়ুবের জীবন চরিত থেকে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে, তাতো মহান আল্লাহ পাকই পবিত্র কুরআনে বলেছেন। সত্যি তাই। আসুন দেখি, আমরা তাঁর জীবন চরিত থেকে আমরা কি কি শিক্ষা পাই।

১. প্রাচুর্যের সময় আত্মহারা হয়ে আল্লাহকে ভুলে যেতে নেই।

২. ধন সম্পদ, সন্তান সন্ততি, মান ইজ্জত এই সবকে আল্লাহর দান মনে করা উচিত এবং এগুলোর জন্যে আল্লাহর শোকর আদায় করা উচিত।

৩, রোগ শোক, দুঃখ কষ্ট ও বিপদে মুসিবতে ধৈর্যহারা হতে নেই। বরং ধৈর্যের সাথে আল্লাহর উপর আশা ভরসা করে থাকা উচিত।

৪, বিপদ মুসিবত, দুঃখ কষ্ট রোগ শোক ও অসহায় অবস্থায় শয়তান মুমিনদের সাথে প্রতারনা করার সুযোগ নেয়। তাই এসব অবস্থায় শয়তানের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে থাকতে হবে।

৫, সুখের সময় আল্লাহর শোকর আদায় করা এবং দুঃখের সময় সবর অবলম্বন করা নবীদের আদর্শ।

৬, রাগ বশত কোন ভুল করে ফেললে সেজন্যে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

৭, রোগ শোক, দুঃখ কষ্ট, বিপদ মুসিবতে একজন মুমিন স্ত্রীর কোনো অবস্থাতেই স্বামীর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়। বরং পরম ধৈর্য ও সবরের সাথে স্বামীর সেবা করা উচিত।

১৪।

যুলকিফল

(আঃ)

কুরআন মাজীদে ‘যুলকিফল’ নামটি দুবার উল্লেখ হয়েছে। দু’বারই অন্যান্য নবীদের সাথে তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একবার উল্লেখ হয়েছে সূরা আল আম্বিয়াতে। সেখানে বলা হয়েছে এভাবে-

“আর ইসমাঈল, ইদ্রীস ও যুলকিফল, এরা সবাই ছিলো ধৈর্যশীল। আমার রহমত দ্বারা এদের সিক্ত করেছিলাম। এরা ছিলো যোগ্য সৎ কর্মশীল।” (সূরা ২১, আল আম্বিয়াঃ ৮৫-৮৬)

সূরা সোয়াদে তাঁর কথা উল্লেখ হয়েছে এভাবে-

“ইষমাঈল, আলইয়াসা আর যুলকিফলের কথা স্মরণ করো। এরা সবাই ছিলো উত্তম মানুষ।” (আয়াত- ৪৮)

যুলকিফল ছিলেন বনী ইসরাইলের একজন নবী। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তিনি ছিলেন হযরত আইয়ুব (আঃ) এর পুত্র। ‘যুলকিফল’ শব্দের অর্থ ভাগ্যবান। দুনিয়াবী দৃষ্টিতে নয়, পরকালীন দৃষ্টিতে ভাগ্যবান। এটি তাঁর আসল নাম নয়, বরং এটি ছিলো তাঁর উপাধি। তাঁর মূল নাম ছিলো ‘বিশর’। যুলকিফল যদি আইয়ুব (আঃ) এর পুত্র হয়ে থাকেন, তবে পিতার পরেই তিনি নবী হয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন যুলকিফল আসলে বাইবেলে উল্লেখিত যিহিস্কেল নবী। যিহিস্কেল মুসলমানদের কাছে হিযকীইল নামে পরিচিত। তাঁর এই পরিচয়টি সঠিক মনে হয়।

বাইবেলের যিহিস্কেল পুস্তক থেকে জানা যায়, রাজা বখতে নযর যখন শেষবার জেরুজালেম ধংস করেন, তাঁর আগে তিনি বহু বনী ইসরাইলীদের বন্দী করে নিয়ে যান। বখতে নযর ইরাকের খাবুর নদীর তীরে বনী ইসরাইলী বন্দীদের একটি উপনিবেশ গড়ে তোলেন। এর নাম ছিলো তেলআবিব। এখানেই খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৪ অব্দে হযরত হিযকীইল নবুয়্যত লাভ করেন। এ সময় তাঁর বয়েস ছিলো ত্রিশ বছর। এখানে তিনি বাইশ বছর যাবত বনী ইসরাইলীদের মাঝে নবুয়্যতের দায়িত্ব পালন করেন। দ্বীন প্রচারের কাজকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর লোকেরা যখন তাঁর বাড়িতে শোক প্রকাশের জন্যে আসে, তখন তিনি এতো দুঃখের মাঝেও তাঁদেরকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখাতে থাকেন।

এই হিযকীইল বা যিহিস্কেলই ছিলেন হযরত যুলকিফল (আঃ)। তিনি সেই সব নবীদের একজন যারা নিজেদের জীবনের একটি অংশ বন্দী হিসেবে কাটিয়েছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান। দিনরাত আল্লাহর দীনের কাজে নিমগ্ন থাকতেন। মানুষকে আল্লাহর ভয় দেখাতেন। তিনি শাসকদের সবসময় সত্য সততা ও ন্যায়পরায়নতার ব্যাপারে সতর্ক করতেন।

১৫।

মুসা কালিমুল্লাহ (আঃ)

মূসা (আঃ)-এর পরিচয়

মূসা ইবনে ইমরান বিন ক্বাহেছ বিন ‘আযের বিন লাভী বিন ইয়াকূব বিন ইসহাক্ব বিন ইবরাহীম (আঃ)।অর্থাৎ মূসা হ’লেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। মূসা (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল ‘ইমরান’ ও মাতার নাম ছিল ‘ইউহানিব’। তবে মায়ের নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে।উল্লেখ্য যে, মারিয়াম (আঃ)-এর পিতার নামও ছিল ‘ইমরান’। যিনি ছিলেন হযরত ঈসা (আঃ)-এর নানা। মূসা ও ঈসা উভয় নবীই ছিলেন বনী ইসরাঈল বংশীয় এবং উভয়ে বনী ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন (সাজদাহ- ৩২, ছফ -৬১)। মূসার জন্ম হয় মিসরে এবং লালিত-পালিত হন মিসর সম্রাট ফেরাঊনের ঘরে। তাঁর সহোদর ভাই হারূণ (আঃ) ছিলেন তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড় এবং তিনি মূসা (আঃ)-এর তিন বছর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন। উভয়ের মৃত্যু হয় মিসর ও শাম-এর মধ্যবর্তী তীহ্ প্রান্তরে বনী ইসরাঈলের ৪০ বছর আটক থাকাকালীন সময়ে। মাওলানা মওদূদী বলেন, মূসা (আঃ) পঞ্চাশ বছর বয়সে নবী হয়ে ফেরাঊনের দরবারে পৌঁছেন। অতঃপর তেইশ বছর দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের পর ফেরাঊন ডুবে মরে এবং বনী ইসরাঈল মিসর থেকে বেরিয়ে যায়। এ সময় মূসা (আঃ)-এর বয়স ছিল সম্ভবতঃ আশি বছর। তবে মুফতী মুহাম্মাদ শফী বলেন, ফেরাঊনের জাদুকরদের সাথে মুকাবিলার ঘটনার পর ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী মূসা (আঃ) বিশ বছর যাবত মিসরে অবস্থান করেন। এ সময় আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে নয়টি মু‘জেযা দান করেন।

উল্লেখ্য যে, আদম, ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আঃ) ব্যতীত প্রায় সকল নবীই চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছিলেন। মূসাও চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছিলেন বলে অধিকাংশ বিদ্বান মত পোষণ করেছেন। সেমতে আমরা মূসা (আঃ)-এর বয়সকে নিম্নরূপে ভাগ করতে পারি। যেমন, প্রথম ৩০ বছর মিসরে, তারপর ১০ বছর মাদিয়ানে, তারপর মিসরে ফেরার পথে তূর পাহাড়ের নিকটে ‘তুবা’ উপত্যকায় ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ। অতঃপর ২০ বছর মিসরে অবস্থান করে সেখানকার অধিবাসীদেরকে তাওহীদের দাওয়াত প্রদান। তারপর ৬০ বছর বয়সে বনী ইস্রাঈলদের নিয়ে মিসর হ’তে প্রস্থান এবং ফেরাঊনের সলিল সমাধি। অতঃপর আদি বাসস্থান কেন‘আন অধিকারী আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে জিহাদের হুকুম অমান্য করায় অবাধ্য ইস্রাঈলীদের নিয়ে ৪০ বছর যাবত তীহ্ প্রান্তরে উন্মুক্ত কারাগারে অবস্থান ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সন্নিকটে মৃত্যু সম্ভবতঃ ৮০ থেকে ১০০ বছর বয়সের মধ্যে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। আমাদের নবী (ছাঃ) সেখানে একটি লাল ঢিবির দিকে ইশারা করে সেস্থানেই মূসা (আঃ)-এর কবর হয়েছে বলে জানিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, আদম (আঃ) থেকে ইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত ১০/১২ জন নবী বাদে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সর্বমোট এক লক্ষ চবিবশ হাযার নবী-রাসূলের প্রায় সবাই ইস্রাঈল বংশের ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন সেমেটিক। কেননা ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন সাম বিন নূহ-এর ৯ম অধঃস্তন পুরুষ। এজন্য ইবরাহীমকে ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা বলা হয়।

মূসা ও ফেরাঊনের কাহিনী

সুদ্দী ও মুররাহ প্রমুখ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস ও আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) এবং বহু সংখ্যক ছাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, ফেরাঊন একদা স্বপ্নে দেখেন যে, বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিক হ’তে একটি আগুন এসে মিসরের ঘর-বাড়ি ও মূল অধিবাসী ক্বিবতীদের জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ অভিবাসী বনী ইস্রাঈলদের কিছুই হচ্ছে না। ভীত-চকিত অবস্থায় তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। অতঃপর দেশের বড় বড় জ্যোতিষী ও জাদুকরদের সমবেত করলেন এবং তাদের সম্মুখে স্বপ্নের বৃত্তান্ত বর্ণনা দিলেন ও এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। জ্যোতিষীগণ বলল যে, অতি সত্বর বনী ইস্রাঈলের মধ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। যার হাতে মিসরীয়দের ধ্বংস নেমে আসবে’।

মিসর সম্রাট ফেরাঊন জ্যোতিষীদের মাধ্যমে যখন জানতে পারলেন যে, অতি সত্বর ইস্রাঈল বংশে এমন একটা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, যে তার সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে। তখন উক্ত সন্তানের জন্ম রোধের কৌশল হিসাবে ফেরাঊন বনী ইস্রাঈলদের ঘরে নবজাত সকল পুত্র সন্তানকে ব্যাপকহারে হত্যার নির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল, এভাবে হত্যা করতে থাকলে এক সময় বনী ইস্রাঈল কওম যুবক শূন্য হয়ে যাবে। বৃদ্ধরাও মারা যাবে। মহিলারা সব দাসীবৃত্তিতে বাধ্য হবে। অথচ বনী ইস্রাঈলগণ ছিল মিসরের শাসক শ্রেণী এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জাতি। এই দূরদর্শী কপট পরিকল্পনা নিয়ে ফেরাঊন ও তার মন্ত্রীগণ সারা দেশে একদল ধাত্রী মহিলা ও ছুরিধারী জাল্লাদ নিয়োগ করে। মহিলারা বাড়ী বাড়ী গিয়ে বনী ইস্রাঈলের গর্ভবতী মহিলাদের তালিকা করত এবং প্রসবের দিন হাযির হয়ে দেখত, ছেলে না মেয়ে। ছেলে হ’লে পুরুষ জাল্লাদকে খবর দিত। সে এসে ছুরি দিয়ে মায়ের সামনে সন্তানকে যবহ করে ফেলে রেখে চলে যেত। এভাবে বনী ইস্রাঈলের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল। ইবনু কাছীর বলেন, একাধিক মুফাসসির বলেছেন যে, শাসকদল ক্বিবতীরা ফেরাঊনের কাছে গিয়ে অভিযোগ করল যে, এভাবে পুত্র সন্তান হত্যা করায় বনী ইস্রাঈলের কর্মজীবী ও শ্রমিক শ্রেণীর ঘাটতি হচ্ছে। যাতে তাদের কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে। তখন ফেরাঊন এক বছর অন্তর অন্তর পুত্র হত্যার নির্দেশ দেয়। এতে বাদ পড়া বছরে হারূণের জন্ম হয়। কিন্তু হত্যার বছরে মূসার জন্ম হয়। ফলে পিতা-মাতা তাদের নবজাত সন্তানের নিশ্চিত হত্যার আশংকায় দারুণভাবে ভীত হয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর মায়ের অন্তরে ‘ইলহাম’ করেন। যেমন আল্লাহ পরবর্তীতে মূসাকে বলেন, ‘‘আমরা তোমার উপর আরো একবার অনুগ্রহ করেছিলাম’। ‘যখন আমরা তোমার মাকে প্রত্যাদেশ করেছিলাম, যা প্রত্যাদেশ করা হয়’। ‘(এই মর্মে যে,) তোমার নবজাত সন্তানকে সিন্দুকে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দাও’। ‘অতঃপর নদী তাকে তীরে ঠেলে দেবে। অতঃপর আমার শত্রু ও তার শত্রু (ফেরাঊন) তাকে উঠিয়ে নেবে এবং আমি তোমার উপর আমার পক্ষ হ’তে বিশেষ মহববত নিক্ষেপ করেছিলাম এবং তা এজন্য যে, তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও’’ (ত্বোয়াহা -৩৭-৩৯)। বিষয়টি আল্লাহ অন্যত্র বলেন এভাবে, “আমরা মূসার মায়ের কাছে প্রত্যাদেশ করলাম এই মর্মে যে, তুমি ছেলেকে দুধ পান করাও। অতঃপর তার জীবনের ব্যাপারে যখন শংকিত হবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ করবে। তুমি ভীত হয়ো না ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ো না। আমরা ওকে তোমার কাছেই ফিরিয়ে দেব এবং ওকে নবীদের অন্তর্ভুক্ত করব”। মূলতঃ শেষের দু’টি ওয়াদাই তাঁর মাকে নিশ্চিন্ত ও উদ্বুদ্ধ করে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘মূসা জননীর অন্তর (কেবলি মূসার চিন্তায়) বিভোর হয়ে পড়ল। যদি আমরা তার অন্তরকে সুদৃঢ় করে না দিতাম, তাহ’লে সে মূসার (জন্য অস্থিরতার) বিষয়টি প্রকাশ করেই ফেলত। (আমরা তার অন্তরকে দৃঢ় করেছিলাম এ কারণে যে) সে যেন আল্লাহর উপরে প্রত্যয়শীলদের অন্তর্ভুক্ত থাকে’।

মূসা নদীতে নিক্ষিপ্ত হলেন

ফেরাঊনের সৈন্যদের হাতে নিহত হবার নিশ্চিত সম্ভাবনা দেখা দিলে আল্লাহর প্রত্যাদেশ (ইলহাম) অনুযায়ী পিতা-মাতা তাদের প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে সিন্দুকে ভরে বাড়ীর পাশের নীল নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। অতঃপর স্রোতের সাথে সাথে সিন্দুকটি এগিয়ে চলল। ওদিকে মূসার (বড়) বোন তার মায়ের হুকুমে সিন্দুকটিকে অনুসরণ করে নদীর কিনারা দিয়ে চলতে লাগল (ত্বোয়াহা -৪০)। এক সময় তা ফেরাঊনের প্রাসাদের ঘাটে এসে ভিড়ল। ফেরাঊনের পুণ্যবতী স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চাটিকে দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন। ফেরাঊন তাকে বনী ইস্রাঈল সন্তান ভেবে হত্যা করতে চাইল। কিন্তু সন্তানহীনা স্ত্রীর অপত্য স্নেহের কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ফেরাঊন নিজে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। কারণ আল্লাহ মূসার চেহারার মধ্যে বিশেষ একটা মায়াময় কমনীয়তা দান করেছিলেন (ত্বোয়াহা-৩৯)। যাকে দেখলেই মায়া পড়ে যেত। ফেরাঊনের হৃদয়ের পাষাণ গলতে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। বস্ত্ততঃ এটাও ছিল আল্লাহর মহা পরিকল্পনারই অংশ বিশেষ। ফুটফুটে শিশুটিকে দেখে ফেরাঊনের স্ত্রী তার স্বামীকে বললেন, ‘এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি। একে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি’। আল্লাহ বলেন, ‘অথচ তারা (আমার কৌশল) বুঝতে পারল না’। মূসা এক্ষণে ফেরাঊনের স্ত্রীর কোলে পুত্রস্নেহ পেতে শুরু করলেন। অতঃপর বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য রাণীর নির্দেশে বাজারে বহু ধাত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হ’ল। কিন্তু মূসা কারুরই বুকে মুখ দিচ্ছেন না। আল্লাহ বলেন, “আমরা পূর্ব থেকেই অন্যের দুধ খাওয়া থেকে মূসাকে বিরত রেখেছিলাম’। এমন সময় অপেক্ষারত মূসার ভগিনী বলল, ‘আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারের খবর দিব, যারা আপনাদের জন্য এ শিশু পুত্রের লালন-পালন করবে এবং তারা এর শুভাকাংখী’? রাণীর সম্মতিক্রমে মূসাকে প্রস্তাবিত ধাত্রীগৃহে প্রেরণ করা হ’ল। মূসা খুশী মনে মায়ের দুধ গ্রহণ করলেন। অতঃপর মায়ের কাছে রাজকীয় ভাতা ও উপঢৌকনাদি প্রেরিত হ’তে থাকল।এভাবে আল্লাহর অপার অনুগ্রহে মূসা তার মায়ের কোলে ফিরে এলেন। এভাবে একদিকে পুত্র হত্যার ভয়ংকর আতংক হ’তে মা-বাবা মুক্তি পেলেন ও নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া সন্তানকে পুনরায় বুকে ফিরে পেয়ে তাদের হৃদয় শীতল হ’ল। অন্যদিকে বহু মূল্যের রাজকীয় ভাতা পেয়ে সংসার যাত্রা নির্বাহের দুশ্চিন্তা হ’তে তারা মুক্ত হ’লেন। সাথে সাথে সম্রাট নিয়োজিত ধাত্রী হিসাবে ও সম্রাট পরিবারের সাথে বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে তাঁদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পেল। এভাবেই ফেরাঊনী কৌশলের উপরে আল্লাহর কৌশল বিজয়ী হ’ল। ফালিল্লাহিল হাম্দ।

আল্লাহ বলেন, ‘তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমরাও কৌশল করেছিলাম। কিন্তু তারা (আমাদের কৌশল) বুঝতে পারেনি’ (নমল, আয়াত ৫০)।

যৌবনে মূসা

দুগ্ধ পানের মেয়াদ শেষে মূসা অতঃপর ফেরাঊন-পুত্র হিসাবে তার গৃহে শান-শওকতের মধ্যে বড় হ’তে থাকেন। আল্লাহর রহমতে ফেরাঊনের স্ত্রীর অপত্য স্নেহ ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় দুনিয়াবী রক্ষাকবচ। এভাবে ‘যখন তিনি যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পূর্ণবয়ষ্ক মানুষে পরিণত হ’লেন, তখন আল্লাহ তাকে বিশেষ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্পদে ভূষিত করলেন’। মূসা সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্যকভাবে উপলব্ধি করলেন। দেখলেন যে, পুরা মিসরীয় সমাজ ফেরাঊনের একচ্ছত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে কঠোরভাবে শাসিত। ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’ এই সুপরিচিত ঘৃণ্য নীতির অনুসরণে ফেরাঊন তার দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল ও একটি দলকে দুর্বল করে দিয়েছিল। আর সেটি হ’ল বনু ইস্রাঈল। প্রতিদ্বন্দ্বী জন্মাবার ভয়ে সে তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যা করত ও কন্যা সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখত। এভাবে একদিকে ফেরাঊন অহংকারে স্ফীত হয়ে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ পালনকর্তা ও সর্বাধিপতি’ ভেবে সারা দেশে অনর্থ সৃষ্টি করছিল। এমনকি সে নিজেকে ‘একমাত্র উপাস্য’ বলতেও লজ্জাবোধ করেনি। অন্যদিকে মযলূম বনী ইস্রাঈলদের হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। অবশেষে আল্লাহ মযলূমদের ডাকে সাড়া দিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘দেশে যাদেরকে দুর্বল করা হয়েছিল, আমরা চাইলাম তাদের উপরে অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা করতে ও দেশের উত্তরাধিকারী করতে’। ‘এবং আমরা চাইলাম তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে এবং ফেরাঊন, হামান ও তাদের সেনাবাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তারা সেই দুর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত’।

যুবক মূসা খুনী লেন

মূসার হৃদয় মযলূমদের প্রতি করুণায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। ওদিকে আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। মূসা একদিন দুপুরের অবসরে শহরে বেড়াতে বেরিয়েছেন। এমন সময় তাঁর সামনে এক কান্ড ঘটে গেল। তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখতে পেলেন। যাদের একজন যালেম সম্রাটের ক্বিবতী বংশের এবং অন্যজন মযলূম বনু ইস্রাঈলের। মূসা তাদের থামাতে গিয়ে যালেম লোকটিকে একটা ঘুষি মারলেন। কি আশ্চর্য লোকটি তাতেই অক্কা পেল। মূসা দারুণভাবে অনুতপ্ত হলেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, “একদিন দুপুরে তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন অধিবাসীরা ছিল দিবানিদ্রার অবসরে। এ সময় তিনি দু’জন ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখতে পেলেন। এদের একজন ছিল তার নিজ গোত্রের এবং অপরজন ছিল শত্রুদলের। অতঃপর তার নিজ দলের লোকটি তার শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধে তার কাছে সাহায্য চাইল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং তাতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, ‘নিশ্চয়ই এটি শয়তানের কাজ। সে মানুষকে বিভ্রান্তকারী প্রকাশ্য শত্রু’। ‘হে আমার প্রভু! আমি নিজের উপরে যুলুম করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। অতঃপর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’।

পরের দিন ‘জনৈক ব্যক্তি ছুটে এসে মূসাকে বলল, হে মূসা! আমি তোমার শুভাকাংখী। তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি যে, এই মুহূর্তে তুমি এখান থেকে বের হয়ে চলে যাও। কেননা সম্রাটের পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে’। এই লোকটি মূসার প্রতি আকৃষ্ট ও তাঁর গুণমুগ্ধ ছিল। একথা শুনে ভীত হয়ে মূসা সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন নিরুদ্দেশ যাত্রাপথে। যেমন আল্লাহ বলেন,‘অতঃপর তিনি সেখান থেকে ভীত অবস্থায় বের হয়ে পড়লেন পথ দেখতে দেখতে এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে রক্ষা কর’। ‘এরপর যখন তিনি (পার্শ্ববর্তী রাজ্য) মাদিয়ান অভিমুখে রওয়ানা হ’লেন, তখন (দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে) বলে উঠলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার প্রভু আমাকে সরল পথ দেখাবেন’।আসলে আল্লাহ চাচ্ছিলেন, ফেরাঊনের রাজপ্রাসাদ থেকে মূসাকে বের করে নিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে পরিচিত করতে। সাথে সাথে আল্লাহ তাঁকে তৎকালীন একজন শ্রেষ্ঠ নবীর গৃহে লালিত-পালিত করে তাওহীদের বাস্তব শিক্ষায় আগাম পরিপক্ক করে নিতে চাইলেন।

মূসার পরীক্ষা সমূহ

অন্যান্য নবীদের পরীক্ষা হয়েছে সাধারণতঃ নবুঅত লাভের পরে। কিন্তু মূসার পরীক্ষা শুরু হয়েছে তার জন্ম লাভের পর থেকেই। বস্ত্ততঃ নবুঅত প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে তাঁর জীবনে বহু পরীক্ষা হয়েছে। যেমন আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে শুনিয়ে বলেন, ‘আর আমরা তোমাকে অনেক পরীক্ষায় ফেলেছি’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৪০)।

নবুঅত লাভের পূর্বে তাঁর প্রধান পরীক্ষা ছিল তিনটি। যথাঃ (১) হত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া (২) মাদিয়ানে হিজরত (৩) মাদিয়ান থেকে মিসর যাত্রা। অতঃপর নবুয়ত লাভের পর তাঁর পরীক্ষা হয় প্রধানতঃ চারটিঃ (১) জাদুকরদের মুকাবিলা (২) ফেরাঊনের যুলুমসমূহ মুকাবিলা (৩) সাগরডুবির পরীক্ষা (৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান।

নবুঅত-পূর্ব ১ম পরীক্ষা : হত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া

মূসার জন্ম হয়েছিল তাঁর কওমের উপরে আপতিত রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের ভয়ংকর বিভীষিকার মধ্যে। আল্লাহ তাঁকে অপূর্ব কৌশলের মাধ্যমে বাঁচিয়ে নেন। অতঃপর তাঁর জানী দুশমনের ঘরেই তাঁকে নিরাপদে ও সসম্মানে লালন-পালন করালেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মা ও পরিবারকে করলেন উচ্চতর সামাজিক মর্যাদায় উন্নীত। অথচ মূসার জন্মকে ঠেকানোর জন্যই ফেরাঊন তার পশুশক্তির মাধ্যমে বনু ইস্রাঈলের শত শত শিশু পুত্রকে হত্যা করে চলছিল। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।

২য় পরীক্ষা : মাদিয়ানে হিজরত

অতঃপর যৌবনকালে তাঁর দ্বিতীয় পরীক্ষা হ’ল- হিজরতের পরীক্ষা। মূলতঃ এটাই ছিল তাঁর জ্ঞানবুদ্ধি হবার পরে ১ম পরীক্ষা। শেষনবী সহ অন্যান্য নবীর জীবনে সাধারণতঃ নবুঅতপ্রাপ্তির পরে হিজরতের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিন্তু মূসা (আঃ)-এর জীবনে নবুঅত প্রাপ্তির আগেই এই কঠিন পরীক্ষা উপস্থিত হয়। অনাকাংখিত ও আকস্মিক হত্যাকান্ডের আসামী হয়ে জীবনের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত্র মূসা ফেরাঊনের রাজ্যসীমা ছেড়ে কপর্দকহীন অবস্থায় পার্শ্ববর্তী রাজ্য মাদিয়ানে গিয়ে উপস্থিত হ’লেন। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কাতর মূসা এই ভীতিকর দীর্ঘ সফরে কিভাবে চলেছেন, কি খেয়েছেন সেসব বিষয়ে তাফসীরকারগণ বিভিন্ন চমকপ্রদ ঘটনাবলী উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কুরআন এসব বিষয়ে চুপ থেকেছে বিধায় আমরাও চুপ থাকছি। তবে রওয়ানা হবার সময় যেহেতু মূসা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহর উপরে সমর্পণ করেছিলেন এবং প্রত্যাশা করেছিলেন ‘নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা আমাকে সরল পথ দেখাবেন’, অতএব তাঁকে মাদিয়ানের মত অপরিচিত রাজ্যে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া ও সসম্মানে সেখানে বসবাস করার যাবতীয় দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে যে, সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপরে নিজেকে সঁপে দিলে আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের সব দায়িত্ব নিজে নিয়ে থাকেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমান পূর্ব জর্দানের মো‘আন সামুদ্রিক বন্দরের অনতিদূরেই ‘মাদইয়ান’ অবস্থিত।

মাদিয়ানের জীবন : বিবাহ ও সংসার পালন

মাদিয়ানে প্রবেশ করে তিনি পানির আশায় একটা কূপের দিকে গেলেন। সেখানে পানি প্রার্থী লোকদের ভিড়ের অদূরে দু’টি মেয়েকে তাদের তৃষ্ণার্ত পশুগুলি সহ অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁর হৃদয় উথলে উঠলো। কেউ তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপই করছে না। মূসা নিজে মযলূম। তিনি মযলূমের ব্যথা বুঝেন। তাই কিছুক্ষণ ইতঃস্তত করে মেয়ে দু’টির দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি তাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, ‘আমরা আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ না রাখালরা তাদের পশুগুলিকে পানি পান করিয়ে চলে যায়। অথচ আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ’ (যিনি ঘরে বসে আমাদের অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে আছেন)। ‘অতঃপর তাদের পশুগুলি এনে মূসা পানি পান করালেন’ (তারপর মেয়ে দু’টি পশুগুলি নিয়ে বাড়ী চলে গেল)। মূসা একটি গাছের ছায়ায় বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার উপর যে অনুগ্রহ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী’। হঠাৎ দেখা গেল যে ‘বালিকাদ্বয়ের একজন সলজ্জ পদক্ষেপে তাঁর দিকে আসছে’। মেয়েটি এসে ধীর কণ্ঠে তাকে বলল, ‘আমার পিতা আপনাকে ডেকেছেন, যাতে আপনি যে আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন, তার বিনিময় স্বরূপ আপনাকে পুরস্কার দিতে পারেন’।

উল্লেখ্য যে, বালিকাদ্বয়ের পিতা ছিলেন মাদইয়ান বাসীদের নিকটে প্রেরিত বিখ্যাত নবী হযরত শু‘আয়েব (আঃ)। মূসা ইতিপূর্বে কখনো তাঁর নাম শোনেননি বা তাঁকে চিনতেন না। তাঁর কাছে পৌঁছে মূসা তাঁর বৃত্তান্ত সব বর্ণনা করলেন। শু‘আয়েব (আঃ) সবকিছু শুনে বললেন, ‘ভয় করো না। তুমি যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছ’। ‘এমন সময় বালিকাদ্বয়ের একজন বলল, আববা! এঁকে বাড়ীতে কর্মচারী হিসাবে রেখে দিন। কেননা আপনার কর্ম সহায়ক হিসাবে সেই-ই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত’। ‘তখন তিনি মূসাকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার বাড়ীতে কর্মচারী থাকবে। তবে যদি দশ বছর পূর্ণ করো, সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকে সদাচারী হিসাবে পাবে’। ‘মূসা বলল, আমার ও আপনার মধ্যে এই চুক্তি স্থির হ’ল। দু’টি মেয়াদের মধ্য থেকে যেকোন একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকবে না। আমরা যা বলছি, আল্লাহ তার উপরে তত্ত্বাবধায়ক’। মূলতঃ এটাই ছিল তাদের বিয়ের মোহরানা। সেযুগে এ ধরনের রেওয়াজ অনেকের মধ্যে চালু ছিল। যেমন ইতিপূর্বে ইয়াকূব (আঃ) তাঁর স্ত্রীর মোহরানা বাবদ সাত বছর শ্বশুর বাড়ীতে মেষ চরিয়েছেন। এভাবে অচেনা-অজানা দেশে এসে মূসা (আঃ) অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান এবং অন্যান্য নিরাপত্তাসহ অত্যন্ত মর্যাদাবান ও নির্ভরযোগ্য একজন অভিভাবক পেয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে পেলেন জীবন সাথী একজন পতি-পরায়ণা বুদ্ধিমতী স্ত্রী। অতঃপর সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে মূসার দিনগুলি অতিবাহিত হ’তে থাকলো। সময় গড়িয়ে এক সময় মেয়াদ পূর্ণ হ’য়ে গেল। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, তিনি চাকুরীর বাধ্যতামূলক আট বছর এবং ঐচ্ছিক দু’বছর মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। কেননা এটাই নবী চরিত্রের জন্য শোভনীয় যে, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ঐচ্ছিক দু’বছরও তিনি পূর্ণ করবেন’।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, ‘সর্বাধিক দূরদর্শী ব্যক্তি ছিলেন তিনজন: ১- ইউসুফকে ক্রয়কারী মিসরের আযীয (রাজস্বমন্ত্রী), যখন তিনি তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘একে সম্মানের সাথে রাখ, হয়তবা সে আমাদের কল্যাণে আসবে’ ২- মূসার স্ত্রী, যখন (বিবাহের পূর্বে) তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন, ‘হে পিতা, এঁকে কর্মচারী নিয়োগ করুন। নিশ্চয়ই আপনার শ্রেষ্ঠ সহযোগী তিনিই হ’তে পারেন, যিনি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত’ এবং ৩- আবুবকর ছিদ্দীক, যখন তিনি ওমরকে তাঁর পরবর্তী খলীফা মনোনীত করেন’।

৩য় পরীক্ষা: মিসর অভিমুখে যাত্রা ও পথিমধ্যে নবুঅত লাভ

মোহরানার চুক্তির মেয়াদ শেষ। এখন যাবার পালা। পুনরায় স্বদেশে ফেরা। দুরু দুরু বক্ষ। ভীত-সন্ত্রস্ত্র মন। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। তবুও যেতে হবে। পিতা-মাতা, ভাই-বোন সবাই রয়েছেন মিসরে। আল্লাহর উপরে ভরসা করে স্ত্রী-পরিবার নিয়ে বের হ’লেন পুনরায় মিসরের পথে। শুরু হ’ল তৃতীয় পরীক্ষার পালা। উল্লেখ্য, দশ বছরে তিনি দু’টি পুত্র সন্তান লাভ করেন এবং শ্বশুরের কাছ থেকে পান এক পাল দুম্বা। এছাড়া তাক্বওয়া ও পরহেযগারীর আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ তো তিনি লাভ করেছিলেন বিপুলভাবে।

পরিবারের কাফেলা নিয়ে মূসা রওয়ানা হ’লেন স্বদেশ অভিমুখে। পথিমধ্যে মিসর সীমান্তে অবস্থিত সিনাই পর্বতমালার তূর পাহাড়ের নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছলে হঠাৎ স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হ’ল। এখুনি প্রয়োজন আগুনের। কিন্তু কোথায় পাবেন আগুন। পাথরে পাথরে ঘষে বৃথা চেষ্টা করলেন কতক্ষণ। প্রচন্ড শীতে ও তুষারপাতের কারণে পাথর ঘষায় কাজ হ’ল না। দিশেহারা হয়ে চারিদিকে দেখতে লাগলেন। হঠাৎ অনতিদূরে আগুনের হলকা নজরে পড়ল। আশায় বুক বাঁধলেন। স্ত্রী ও পরিবারকে বললেন, ‘তোমরা এখানে অবস্থান কর। আমি আগুন দেখেছি। সম্ভবতঃ আমি তা থেকে তোমাদের জন্য কিছু আগুন জ্বালিয়ে আনতে পারব অথবা সেখানে পৌঁছে পথের সন্ধান পাব’ (ত্বোয়াহা-১০)। একথা দৃষ্টে মনে হয়, মূসা পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। পথিমধ্যে শাম অঞ্চলের শাসকদের পক্ষ থেকে প্রধান সড়কে বিপদাশংকা ছিল। তাই শ্বশুরের উপদেশ মোতাবেক তিনি পরিচিত রাস্তা ছেড়ে অপরিচিত রাস্তায় চলতে গিয়ে মরুভূমির মধ্যে পথ হারিয়ে ডান দিকে চলে তূর পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে গেলেন। মূলতঃ এ পথ হারানোটা ছিল আল্লাহর মহা পরিকল্পনারই অংশ।

মূসা আশান্বিত হয়ে যতই আগুনের নিকটবর্তী হন, আগুনের হল্কা ততই পিছাতে থাকে। আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, সবুজ বৃক্ষের উপরে আগুন জ্বলছে। অথচ গাছের পাতা পুড়ছে না; বরং তার উজ্জ্বলতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ে অভিভূত মূসা এক দৃষ্টে আগুনটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ এক গুরুগম্ভীর আওয়ায কানে এলো তাঁর চার পাশ থেকে। মনে হ’ল পাহাড়ের সকল প্রান্ত থেকে একই সাথে আওয়ায আসছে। মূসা তখন তূর পাহাড়ের ডান দিকে ‘তুবা’ উপত্যকায় দন্ডায়মান। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তিনি আগুনের কাছে পৌঁছলেন, তখন আওয়ায এলো, হে মূসা!’ ‘আমিই তোমার পালনকর্তা। অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল। তুমি পবিত্র উপত্যকা তুবায় রয়েছ’ (ত্বোয়াহা-১১-১২)। এর দ্বারা বিশেষ অবস্থায় পবিত্র স্থানে জুতা খোলার আদব প্রমাণিত হয়। যদিও পাক জুতা পায়ে দিয়ে ছালাত আদায় করা জায়েয।অতঃপর আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি। অতএব তোমাকে যা প্রত্যাদেশ করা হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাক’। ‘নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণে ছালাত কায়েম কর’। ‘ক্বিয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তা গোপন রাখতে চাই; যাতে প্রত্যেকে তার কর্মানুযায়ী ফল লাভ করতে পারে’। ‘সুতরাং যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতে বিশ্বাস রাখে না এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে (ক্বিয়ামত বিষয়ে সতর্ক থাকা হ’তে) নিবৃত্ত না করে। তাহ’লে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে’ (ত্বোয়াহা-১৩-১৬)।

এ পর্যন্ত আক্বীদা ও ইবাদতগত বিষয়ে নির্দেশ দানের পর এবার কর্মগত নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলছেন, ‘হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?’ ‘মূসা বললেন, এটা আমার লাঠি। এর উপরে আমি ভর দেই এবং এর দ্বারা আমার ছাগপালের জন্য গাছের পাতা ঝেড়ে নামাই। তাছাড়া এর দ্বারা আমার অন্যান্য কাজও চলে’। ‘আল্লাহ বললেন, হে মূসা! তুমি ওটা ফেলে দাও’। ‘অতঃপর তিনি ওটা (মাটিতে) ফেলে দিতেই তা সাপ হয়ে ছুটাছুটি করতে লাগল’। ‘আল্লাহ বললেন, তুমি ওটাকে ধর, ভয় করো না, আমি এখুনি ওকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেব’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ১৭-২১)। এটি ছিল মূসাকে দেওয়া ১ম মু‘জেযা। কেননা মিসর ছিল ঐসময় জাদুবিদ্যায় শীর্ষস্থানে অবস্থানকারী দেশ। সেখানকার শ্রেষ্ঠ জাদুকরদের হারিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই নবুঅতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা আবশ্যক ছিল। সেজন্যই আল্লাহ মূসাকে সবদিক দিয়ে প্রস্ত্তত করে দিচ্ছিলেন। এর ফলে মূসা নিজের মধ্যে অনেকটা শক্তি ও স্বস্তি লাভ করলেন।

১ম মু‘জেযা প্রদানের পর আল্লাহ তাকে দ্বিতীয় মু‘জেযা প্রদানের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমার হাত বগলে রাখ। তারপর দেখবে তা বের হয়ে আসবে উজ্জ্বল ও নির্মল আলো হয়ে, অন্য একটি নিদর্শন রূপে’। ‘এটা এজন্য যে, আমরা তোমাকে আমাদের বিরাট নিদর্শনাবলীর কিছু অংশ দেখাতে চাই’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ২২-২৩)।

নয়টি নিদর্শন

আল্লাহ বলেন,‘আমরা মূসাকে নয়টি নিদর্শন প্রদান করেছিলাম’ (ইসরা, আয়াত ১০১; নামল, আয়াত ১২)। এখানে ‘নিদর্শন’ অর্থ একদল বিদ্বান ‘মু‘জেযা’ নিয়েছেন। তবে ৯ সংখ্যা উল্লেখ করায় এর বেশী না হওয়াটা যরূরী নয়। বরং এর চেয়ে অনেক বেশী মু‘জেযা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। যেমন পাথরে লাঠি মারায় ১২টি গোত্রের জন্য বারোটি ঝর্ণাধারা নির্গমন, তীহ্ প্রান্তরে মেঘের ছায়া প্রদান, মান্না-সালওয়া খাদ্য অবতরণ প্রভৃতি। তবে এ নয়টি ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা ফেরাঊনী সম্প্রদায়কে প্রদর্শন করা হয়েছিল।

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) উক্ত ৯টি মু‘জেযা নিম্নরূপে গণনা করেছেন। যথা- (১) মূসা (আঃ)-এর ব্যবহৃত লাঠি, যা নিক্ষেপ করা মাত্র অজগর সাপের ন্যায় হয়ে যেত (২) শুভ্র হাত, যা বগলের নীচ থেকে বের করতেই জ্যোতির্ময় হয়ে সার্চ লাইটের মত চমকাতে থাকত (৩) নিজের তোতলামি, যা মূসার প্রার্থনাক্রমে দূর করে দেওয়া হয় (৪) ফেরাঊনী কওমের উপর প্লাবণের গযব প্রেরণ (৫) অতঃপর পঙ্গপাল (৬) উকুন (৭) ব্যাঙ (৮) রক্ত এবং অবশেষে (৯) নদী ভাগ করে তাকে সহ বনু ইস্রাঈলকে সাগরডুবি হ’তে নাজাত দান। তবে প্রথম দু’টিই ছিল সর্বপ্রধান মু‘জেযা, যা নিয়ে তিনি শুরুতে ফেরাঊনের নিকটে গিয়েছিলেন (সূরা নমল, আয়াত ১০, ১২)।

অবশ্য কুরআনে বর্ণিত আয়াত সমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথমে ফেরাঊনের সম্প্রদায়ের উপরে দুর্ভিক্ষের গযব এসেছিল। যেমন আল্লাহ বলেন,‘আমরা পাকড়াও করেছিলাম ফেরাঊনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল-ফসলাদির ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৩০)।

হাফেয ইবনু কাছীর ‘তোতলামী’টা বাদ দিয়ে ‘দুর্ভিক্ষ’সহ নয়টি নিদর্শন বর্ণনা করেছেন। অবশ্য ফেরাঊন সম্প্রদায়ের উপরে আরও একটি নিদর্শন এসেছিল ‘প্লেগ-মহামারী’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৩৪)। যাতে তাদের ৭০ হাযার লোক মারা গিয়েছিল এবং পরে মূসা (আঃ)-এর দো‘আর বরকতে মহামারী উঠে গিয়েছিল। এটাকে গণনায় ধরলে সর্বমোট নিদর্শন ১১টি হয়। তবে ‘নয়’ কথাটি ঠিক রাখতে গিয়ে কেউ তোতলামি ও প্লেগ বাদ দিয়েছেন। কেউ দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ বাদ দিয়েছেন। মূলতঃ সবটাই ছিল মূসা (আঃ)-এর নবুঅতের অকাট্ট দলীল ও গুরুত্বপূর্ণ মু‘জেযা, যা মিসরে ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের উপরে প্রদর্শিত হয়েছিল। এগুলি সবই হয়েছিল মিসরে। অতএব আমরা সেখানে পৌঁছে এসবের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

সিনাই হতে মিসর

প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীর জন্য আগুন আনতে গিয়ে মূসা এমন এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হ’লেন, যা রীতিমত ভীতিকর, শিহরণমূলক ও অভূতপূর্ব। তিনি স্ত্রীর জন্য আগুন নিয়ে যেতে পেরেছিলেন কি-না বা পরিবারের সেবায় তিনি পরে কি কি ব্যবস্থা নিলেন- এসব বিষয়ে কুরআন চুপ রয়েছে। কুরআনের গৃহীত বাকরীতি অনুযায়ী এ সবের বর্ণনা কোন যরূরী বিষয় নয়। কেননা এগুলি সাধারণ মানবিক তাকীদ, যা যেকোন স্বামীই তার স্ত্রী ও পরিবারের জন্য করে থাকে। অতএব এখন আমরা সামনের দিকে আগাব।

আল্লাহ পাক মূসাকে নবুঅত ও প্রধান দু’টি মু‘জেযা দানের পর নির্দেশ দিলেন, হে মূসা! ‘তুমি ফেরাঊনের কাছে যাও। সে উদ্ধত হয়ে গেছে’। ভীত সন্ত্রস্ত মূসা বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষ উন্মোচন করে দিন’ ‘এবং আমার কাজ সহজ করে দিন’। ‘আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন’ ‘যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে’ ‘এবং আমার পরিবারের মধ্য থেকে একজনকে আমার সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দিন’। ‘আমার ভাই হারূণকে দিন’। ‘তার মাধ্যমে আমার কোমর শক্ত করুন’ ‘এবং তাকে (নবী করে) আমার কাজে অংশীদার করুন’। ‘যাতে আমরা বেশী বেশী করে আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করতে পারি’ ‘এবং অধিক পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি’। ‘আপনি তো আমাদের অবস্থা সবই দেখছেন’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ২৪-৩৫)।

মূসার উপরোক্ত দীর্ঘ প্রার্থনার জবাবে আল্লাহ বললেন, ‘হে মূসা! তুমি যা যা চেয়েছ, সবই তোমাকে দেওয়া হ’ল’। শুধু এবার কেন, ‘আমি তোমার উপরে আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৩৬-৩৭)। বলেই আল্লাহ মূসাকে তার জন্মের পর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ও ফেরাঊনের ঘরে লালন-পালনের চমকপ্রদ কাহিনী শুনিয়ে দিলেন।

আল্লাহর খেলা বুঝা ভার। হত্যার টার্গেট হয়ে জন্মলাভ করে হত্যার ঘোষণা দানকারী সম্রাট ফেরাঊনের গৃহে পুত্রস্নেহে লালিত-পালিত হয়ে পরে যৌবনকালে পুনরায় হত্যাকান্ডের আসামী হয়ে প্রাণভয়ে ভীত ও কপর্দকশূন্য অবস্থায় স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমালেন। অতঃপর সেখানে দীর্ঘ দশ বছর মেষপালকের চাকুরী করে স্ত্রী-পরিবার নিয়ে স্বদেশ ফেরার পথে রাহযানির ভয়ে মূল রাস্তা ছেড়ে অপরিচিত রাস্তায় এসে কনকনে শীতের মধ্যে অন্ধকার রাতে প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে নিয়ে মহা বিপদগ্রস্ত স্বামী যখন অদূরে আলোর ঝলকানি দেখে আশায় বুক বেঁধে সেদিকে ছুটেছেন। তখন তিনি জানতেন না যে, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে এমন এক মহা সুসংবাদ যা দুনিয়ার কোন মানুষ ইতিপূর্বে দেখেনি, শোনেনি, কল্পনাও করেনি। বিশ্ব চরাচরের পালনকর্তা আল্লাহ স্বয়ং স্বকণ্ঠে, স্বশব্দে ও স্ব-ভাষায় তাকে ডেকে কথা বলবেন, এও কি সম্ভব? শংকিত, শিহরিত, পুলকিত মূসা সবকিছু ভুলে পুরা দেহ-মন দিয়ে শুনছেন স্বীয় প্রভুর দৈববাণী। দেখলেন তাঁর নূরের তাজাল্লী। চাইলেন প্রাণভরে যা চাওয়ার ছিল। পেলেন সাথে সাথে পরিপূর্ণভাবে। এতে বুঝা যায়, পারিবারিক সমস্যা ও রাস্তাঘাটের সমস্যা সবই আল্লাহর মেহেরবানীতে সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে গিয়েছিল যা কুরআনে উল্লেখের প্রয়োজন পড়েনি।

ওদিকে মূসার প্রার্থনা কবুলের সাথে সাথে আল্লাহ হারূণকে মিসরে অহীর মাধ্যমে নবুঅত প্রদান করলেন (মারিয়াম, আয়াত ৫৩) এবং তাকে মূসার আগমন বার্তা জানিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে মূসাকে সার্বিক সহযোগিতা করার এবং তাকে মিসরের বাইরে এসে অভ্যর্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি বনু ইস্রাঈলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এগিয়ে এসে যথাযথভাবে সে নির্দেশ পালন করেন। পালনকর্তা, আমি তাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। তাই আমি ভয় করছি যে, তারা আমাকে হত্যা করবে’। ‘আমার ভাই হারূণ, সে আমার অপেক্ষা প্রাঞ্জলভাষী। অতএব তাকে আমার সাথে সাহায্যের

মূসা হলেন কালীমুল্লাহ :

তুবা প্রান্তরের উক্ত ঘটনা থেকে মূসা কেবল নবী হ’লেন না। বরং তিনি হ’লেন ‘কালীমুল্লাহ’ বা আল্লাহর সাথে বাক্যালাপকারী। যদিও শেষনবী (ছাঃ) মে‘রাজে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু দুনিয়াতে এভাবে বাক্যালাপের সৌভাগ্য কেবলমাত্র হযরত মূসা (আঃ)-এর হয়েছিল। আল্লাহ বিভিন্ন নবীকে বিভিন্ন বিষয়ে বিশিষ্টতা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে মূসা! আমি আমার বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে এবং আমার বাক্যালাপের মাধ্যমে তোমাকে লোকদের উপরে বিশিষ্টতা দান করেছি। অতএব আমি তোমাকে যা কিছু দান করলাম, তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ থাক’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৪৪)। এভাবে আল্লাহ পাক মূসা (আঃ)-এর সাথে আরেকবার কথা বলেন, সাগর ডুবি থেকে নাজাত পাবার পরে শামে এসে একই স্থানে ‘তওরাত’ প্রদানের সময় (আ‘রাফ, আয়াত ১৩৮, ১৪৫)। এভাবে মূসা হ’লেন ‘কালীমুল্লাহ’। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে সরাসরি বাক্যালাপের পর উৎসাহিত ও পুলকিত মূসা এখানে তূর পাহাড়ের পাদদেশ এলাকায় কিছু দিন বিশ্রাম করলেন। অতঃপর মিসর অভিমুখে রওয়ানা হ’লেন। সিনাই থেকে অনতিদূরে মিসর সীমান্তে পৌঁছে গেলে যথারীতি বড় ভাই হারূণ ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন এসে তাঁদেরকে সাদর অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেলেন।

মূসা (আঃ)-এর মিসরে প্রত্যাবর্তন

ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের বিরুদ্ধে অলৌকিক লাঠি ও আলোকিত হস্ত তালুর দু’টি নিদর্শন নিয়ে মূসা (আঃ) মিসরে পৌঁছলেন। ফেরাঊন ও তার সভাসদ বর্গকে আল্লাহ ‘জাহান্নামের দিকে আহবানকারী নেতৃবৃন্দ’ হিসাবে এবং তাদের সম্প্রদায়কে ‘ফাসেক’ বা পাপাচারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ পাক মূসাকে বললেন ‘তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনবলীসহ যাও এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করো না’। ‘তোমরা উভয়ে ফেরাঊনের কাছে যাও। সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে’। ‘তোমরা তার কাছে গিয়ে নম্রভাষায় কথা বলবে। তাতে হয়ত সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে’। ‘তারা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা আশংকা করছি যে, সে আমাদের উপরে যুলুম করবে কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠবে’। ‘আল্লাহ বললেন, ‘তোমরা ভয় করো না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি তোমাদের (সব কথা) শুনবো ও (সব অবস্থা) দেখব’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৪২-৪৬)।

ফেরাঊনের নিকটে মূসা (আঃ)-এর দাওয়াত

আল্লাহর নির্দেশমত মূসা ও হারূণ ফেরাঊন ও তার সভাসদবর্গের নিকটে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর মূসা ফেরাঊনকে বললেন, ‘হে ফেরাঊন! আমি বিশ্বপ্রভুর পক্ষ হ’তে প্রেরিত রাসূল’। ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্য এসেছে, তার ব্যতিক্রম কিছু না বলার ব্যাপারে আমি দৃঢ়চিত্ত। আমি তোমাদের নিকটে তোমাদের পালনকর্তার নিদর্শন নিয়ে আগমন করেছি। অতএব তুমি বনু ইস্রাঈলগণকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও’ (আ‘রাফ, আয়াত ১০৪-১০৫)। মূসার এদাবী থেকে বুঝা যায় যে, ঐ সময় বনী ইস্রাঈলের উপরে ফেরাঊনের ও তার সম্প্রদায়ের যুলুম চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং তাদের সঙ্গে আপোষে বসবাসের কোন রাস্তা ছিল না। ফলে তিনি তাদেরকে সেখান থেকে বের করে আনতে চাইলেন। তবে এটা নিশ্চিত যে, মূসা তখনই বনু ইস্রাঈলকে নিয়ে বের হয়ে যাননি। মূসা ফেরাঊনকে বললেন,….‘তুমি বনু ইস্রাঈলদের উপরে নিপীড়ন করো না’। ‘আমরা আল্লাহর নিকট থেকে অহী লাভ করেছি যে, যে ব্যক্তি মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার উপরে আল্লাহর আযাব নেমে আসে’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৪৭-৪৮)। একথা শুনে ফেরাঊন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘মূসা! তোমার পালনকর্তা কে’? ‘মূসা বললেন, আমার পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্ত্তকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন। অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন’। ‘ফেরাঊন বলল, তাহ’লে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি?’ ‘মূসা বললেন, তাদের খবর আমার প্রভুর কাছে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা ভ্রান্ত হন না এবং বিস্মৃতও হন না’। একথা বলার পর মূসা আল্লাহর নিদর্শন সমূহ বর্ণনা শুরু করলেন, যাতে ফেরাঊন তার যৌক্তিকতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। তিনি বললেন, আমার পালনকর্তা তিনি, ‘যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন এবং তাতে চলার পথ সমূহ তৈরী করেছেন। তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তা দ্বারা বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন’। ‘তোমরা তা আহার কর ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুসমূহ চরিয়ে থাক। নিশ্চয়ই এতে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন সমূহ রয়েছে’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৪৯-৫৪)।

মুজেযা ও জাদু :

মু‘জেযা অর্থ মানুষের বুদ্ধিকে অক্ষমকারী। অর্থাৎ এমন কর্ম সংঘটিত হওয়া যা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা বহির্ভূত। (১) ‘মু‘জেযা’ কেবল নবীগণের জন্য খাছ এবং ‘কারামত’ আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের মাধ্যমে কখনো কখনো প্রকাশ করে থাকেন। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। (২) মু‘জেযা নবীগণের মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পক্ষান্তরে জাদু কেবল দুষ্ট জিন ও মানুষের মাধ্যমেই হয়ে থাকে এবং তা হয় অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাবে। (৩) জাদু কেবল পৃথিবীতেই ক্রিয়াশীল হয়, আসমানে নয়। কিন্তু মু‘জেযা আল্লাহর হুকুমে আসমান ও যমীনে সর্বত্র ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন শেষনবী (ছাঃ)-এর অঙ্গুলী সংকেতে আকাশের চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। (৪) মু‘জেযা মানুষের কল্যাণের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু জাদু স্রেফ ভেল্কিবাজি ও প্রতারণা মাত্র এবং যা মানুষের কেবল ক্ষতিই করে থাকে।

জাদুতে মানুষের সাময়িক বুদ্ধি বিভ্রম ঘটে। যা মানুষকে প্রতারিত করে। এজন্যে একে ইসলামে হারাম করা হয়েছে। মিসরীয় জাতি তথা ফেরাঊনের সম্প্রদায় ঐ সময় জাদু বিদ্যায় পারদর্শী ছিল এবং জ্যোতিষীদের প্রভাব ছিল তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে অত্যধিক। সেকারণ তাদের চিরাচরিত ধারণা অনুযায়ী মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযাকে তারা বড় ধরনের একটা জাদু ভেবেছিল মাত্র। তবে তারা তাঁকে সাধারণ জাদুকর নয়, বরং ‘বিজ্ঞ জাদুকর’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল (আ‘রাফ, আয়াত ১০৯)। কারণ তাদের হিসাব অনুযায়ী মূসার জাদু ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, যা তাদের আয়ত্তাধীন জাদু বিদ্যার বাইরের এবং যা ছিল অনুপম ও অনন্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত।

পরবর্তীকালে সুলায়মান (আঃ)-এর সময়ে ইরাকের বাবেল নগরী তৎকালীন পৃথিবীতে জাদু বিদ্যায় শীর্ষস্থান লাভ করে। তখন আল্লাহ সুলায়মান (আঃ)-কে জিন, ইনসান, বায়ু ও পশুপক্ষীর উপর ক্ষমতা দিয়ে পাঠান। এগুলিকে লোকেরা জাদু ভাবে এবং তার নবুঅতকে অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়কে জাদু ও মু‘জেযার পার্থক্য বুঝানোর জন্য প্রেরণ করেন। যাতে লোকেরা জাদুকরদের তাবেদারী ছেড়ে নবীর তাবেদার হয়।

নবুঅত পরবর্তী ১ম পরীক্ষা : জাদুকরদের মুকাবিলা

মূসা (আঃ) ও ফেরাঊনের মাঝে জাদু প্রতিযোগিতার দিন ধার্য হবার পর মূসা (আঃ) পয়গম্বর সূলভ দয়া প্রকাশে নেতাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করো না। তাহ’লে তিনি তোমাদেরকে আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেবেন। যারাই মিথ্যারোপ করে, তারাই বিফল মনোরথ হয়’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬১)। কিন্তু এতে কোন ফলোদয় হ’ল না। ফেরাঊন উঠে গিয়ে ‘তার সকল কলা-কৌশল জমা করল, অতঃপর উপস্থিত হ’ল’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬০)। ‘অতঃপর তারা তাদের কাজে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করল এবং গোপনে পরামর্শ করল’। ‘তারা বলল, এই দু’জন লোক নিশ্চিতভাবেই জাদুকর। তারা তাদের জাদু দ্বারা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করতে চায় এবং আমাদের উৎকৃষ্ট জীবনধারা রহিত করতে চায়’। ‘অতএব (হে জাদুকরগণ!) তোমরা তোমাদের যাবতীয় কলা-কৌশল সংহত কর। অতঃপর সারিবদ্ধভাবে এসো। আজ যে জয়ী হবে, সেই-ই সফলকাম হবে’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬৩-৬৪)।

জাদুকররা ফেরাঊনের নিকট সমবেত হয়ে বলল, জাদুকর ব্যক্তিটি কি দিয়ে কাজ করে? সবাই বলল, সাপ দিয়ে। তারা বলল, আল্লাহর কসম! পৃথিবীতে আমাদের উপরে এমন কেউ নেই, যে লাঠি ও রশিকে সাপ বানিয়ে কাজ করতে পারে (‘হাদীছুল কুতূন’ নাসাঈ, ইবনু জারীর, ইবনু কাছীর)। অতএব ‘আমাদের জন্য কি বিশেষ কোন পুরস্কার আছে, যদি আমরা বিজয়ী হই’? ‘সে বলল, হ্যাঁ। তখন অবশ্যই তোমরা আমার নিকটবর্তী লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (আ‘রাফ, আয়াত ১১৩-১১৪)।

জাদুকররা উৎসাহিত হয়ে মূসাকে বলল, ‘হে মূসা! হয় তুমি (তোমার জাদুর লাঠি) নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬৫)। মূসা বললেন, ‘তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন তারা ‘তাদের রশি ও লাঠি নিক্ষেপ করল’ (শো‘আরা, আয়াত ৪৪), তখন লোকদের চোখগুলিকে ধাঁধিয়ে দিল এবং তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল ও এক মহাজাদু প্রদর্শন করল’ (আ‘রাফ, আয়াত ১১৬)। ‘তাদের জাদুর প্রভাবে মূসার মনে হ’ল যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো (সাপের ন্যায়) ছুটাছুটি করছে’। ‘তাতে মূসার মনে কিছুটা ভীতির সঞ্চার হ’ল’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬৬-৬৭)। এমতাবস্থায় আল্লাহ ‘অহি’ নাযিল করে মূসাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘তুমিই বিজয়ী হবে’ ‘তোমার ডান হাতে যা আছে, তা (অর্থাৎ লাঠি) নিক্ষেপ কর। এটা তাদের সবকিছুকে যা তারা করেছে, গ্রাস করে ফেলবে। তাদের ওসব তো জাদুর খেল মাত্র। বস্ত্ততঃ জাদুকর যেখানেই থাকুক সে সফল হবে না’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬৮-৬৯)।

জাদুকররা তাদের রশি ও লাঠি সমূহ নিক্ষেপ করার সময় বলল, ‘ফেরাঊনের মর্যাদার শপথ! আমরা অবশ্যই বিজয়ী হব’ (শো‘আরা, আয়াত ৪৪)। তারপর মূসা (আঃ) আল্লাহর নামে লাঠি নিক্ষেপ করলেন। দেখা গেল তা বিরাট অজগর সাপের ন্যায় রূপ ধারণ করল এবং জাদুকরদের সমস্ত অলীক কীর্তিগুলোকে গ্রাস করতে লাগল’ (শো‘আরা, আয়াত ৪৫)।

এদৃশ্য দেখে যুগশ্রেষ্ঠ জাদুকরগণ বুঝে নিল যে, মূসার এ জাদু আসলে জাদু নয়। কেননা জাদুর সর্বোচ্চ বিদ্যা তাদের কাছেই রয়েছে। মূসা তাদের চেয়ে বড় জাদুকর হ’লে এতদিন তার নাম শোনা যেত। তার উস্তাদের খবর জানা যেত। তাছাড়া তার যৌবনকাল অবধি সে আমাদের কাছেই ছিল। কখনোই তাকে জাদু শিখতে বা জাদু খেলা দেখাতে বা জাদুর প্রতি কোনরূপ আকর্ষণও তার মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। তার পরিবারেও কোন জাদুকর নেই। তার বড় ভাই হারূণ তো সর্বদা আমাদের মাঝেই দিনাতিপাত করেছে। কখনোই তাকে এসব করতে দেখা যায়নি বা তার মুখে এখনকার মত বক্তব্য শোনা যায়নি। হঠাৎ করে কেউ বিশ্বসেরা জাদুকর হয়ে যেতে পারে না। নিশ্চয়ই এর মধ্যে অলৌকিক কোন সত্তার নিদর্শন রয়েছে, যা আয়ত্ত করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। এ সময় মূসার দেওয়া তাওহীদের দাওয়াত ও আল্লাহর গযবের ভীতি তাদের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করল। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর সত্য প্রতিষ্ঠিত হ’ল এবং বাতিল হয়ে গেল তাদের সমস্ত জাদুকর্ম’। ‘এভাবে তারা সেখানেই পরাজিত হ’ল এবং লজ্জিত হয়ে ফিরে গেল’ (আ‘রাফ, আয়াত ১১৮-১১৯)। অতঃপর ‘তারা সিজদায় পড়ে গেল’। এবং ‘বলে উঠল, আমরা বিশ্বচরাচরের পালনকর্তার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করলাম, যিনি মূসা ও হারূণের রব’ (শো‘আরা, আয়াত ৪৬-৪৮; ত্বোয়াহা, আয়াত ৭০; আ‘রাফ, আয়াত ১২০-১২১)।

পরাজয়ের এ দৃশ্য দেখে ভীত-বিহবল ফেরাঊন নিজেকে সামলে নিয়ে উপস্থিত লাখো জনতার মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য জাদুকরদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, ‘আমার অনুমতি দানের পূর্বেই তোমরা তাকে মেনে নিলে? নিশ্চয়ই সে (অর্থাৎ মূসা) তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৭১; আ‘রাফ, আয়াত ১২৩; শো‘আরা, আয়াত ৪৯)। অতঃপর সম্রাট সূলভ হুমকি দিয়ে বলল,‘শীঘ্রই তোমরা তোমাদের পরিণাম ফল জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদের সবাইকে শূলে চড়াব’ (শো‘আরা, আয়াত ৪৯)। জবাবে জাদুকররা বলল, ‘কোন ক্ষতি নেই। আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করব’। ‘আশা করি আমাদের পালনকর্তা আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সমূহ ক্ষমা করবেন’ (শো‘আরা, আয়াত ৪৯-৫১; ত্বোয়াহা, আয়াত ৭১-৭৩; আ‘রাফ, আয়াত ১২৪-১২৬)।

ফেরাঊনের ছয়টি কুটচাল

জাদুকরদের পরাজয়ের পর ফেরাঊন তার রাজনৈতিক কুটচালের মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। তার চালগুলি ছিল, (১) সে বলল: এই জাদুকররা সবাই মূসার শিষ্য। তারা চক্রান্ত করেই তার কাছে নতি স্বীকার করেছে। এটা একটা পাতানো খেলা মাত্র। আসলে ‘মূসাই হ’ল বড় জাদুকর’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৭১)। (২) সে বলল, মূসা তার জাদুর মাধ্যমে ‘নগরীর অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বের করে দিতে চায়’ (আ‘রাফ, আয়াত ১১০) এবং মূসা ও তার সম্প্রদায় এদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। (৩) সে বলল মূসা যেসব কথা বলছে ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে সেসব কথা কখনো শুনিনি’। (৪) সে বলল, হে জনগণ! এ লোকটি তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে ও দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে’। (৫) সে বলল, মূসা তোমাদের উৎকৃষ্ট (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক) জীবন ব্যবস্থা রহিত করতে চায়’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬৩)। (৬) সে মিসরীয় জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিয়েছিল এবং একটির দ্বারা অপরটিকে দুর্বল করার মাধ্যমে নিজের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রেখেছিল। আজকের বহুদলীয় গণতন্ত্র বা দলতন্ত্র ফেলে আসা ফেরাঊনী তন্ত্রের আধুনিক রূপ বলেই মনে হয়। নিজেই সবকিছু করলেও লোকদের খুশী করার জন্য ফেরাঊন বলল, ‘অতএব হে জনগণ! তোমরা এখন কি বলতে চাও’? (শো‘আরা, ৩৫; আ‘রাফ, ১১০)। এযুগের নেতারা যেমন নিজেদের সকল অপকর্ম জনগণের দোহাই দিয়ে করে থাকেন।

জাদুকরদের সত্য গ্রহণ

ধূর্ত ও কুটবুদ্ধি ফেরাঊন বুঝলো যে, তার ঔষধ কাজে লেগেছে। এখুনি মোক্ষম সময়। সে সাথে সাথে জাদুকরদের হাত-পা বিপরীতভাবে কেটে অতঃপর খেজুর গাছের সাথে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার আদেশ দিল। সে ভেবেছিল, এতে জাদুকররা ভীত হয়ে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবে। কিন্তু ফল উল্টা হ’ল। তারা একবাক্যে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিল,

 ‘আমরা তোমাকে ঐসব সুস্পষ্ট নিদর্শন (ও মু‘জেযার) উপরে প্রাধান্য দিতে পারি না, যেগুলো (মূসার মাধ্যমে) আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং প্রধান্য দিতে পারি না তোমাকে সেই সত্তার উপরে যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতএব তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনেই যা করার করবে’। ‘আমরা আমাদের পালনকর্তার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেছি, যাতে তিনি আমাদের পাপসমূহ এবং তুমি আমাদেরকে যে জাদু করতে বাধ্য করেছ, (তার পাপসমূহ) তা মার্জনা করেন। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৭২-৭৩)।

তারা আরও বলল, ‘আমরা (তো মৃত্যুর পরে) আমাদের পরওয়ারদিগারের নিকটে ফিরে যাব’। ‘বস্ত্ততঃ আমাদের সাথে তোমার শত্রুতা তো কেবল একারণেই যে, আমরা ঈমান এনেছি আমাদের পালনকর্তার নিদর্শন সমূহের প্রতি, যখন তা আমাদের নিকটে পৌঁছেছে। অতএব ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের জন্য ধৈর্যের দুয়ার খুলে দাও এবং আমাদেরকে ‘মুসলিম’ হিসাবে মৃত্যু দান কর’ (আ‘রাফ, আয়াত ১২৫-১২৬)। এটা ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না যে, ইতিপূর্বে ফেরাঊনের দরবারে মূসার লাঠির মু‘জেযা প্রদর্শনের ঘটনা থেকেই জাদুকরদের মনে প্রতীতি জন্মেছিল যে, এটা কোন জাদু নয়, এটা মু‘জেযা। কিন্তু ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের ভয়ে তারা মুখ খুলেনি। অবশেষে তাদেরকে সমবেত করার পর তাদেরকে সম্রাটের নৈকট্যশীল করার ও বিরাট পুরস্কারের লোভ দেখানো হয়। এগুলো নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রলোভনের চাপ ভিন্ন কিছুই ছিল না।

জাদুকরদের মুসলমান হয়ে যাবার অন্যতম কারণ ছিল মুকাবিলার পূর্বে ফেরাঊন ও তার জাদুকরদের উদ্দেশ্যে মূসার প্রদত্ত উপদেশমূলক ভাষণ। যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করো না। তাহ’লে তিনি তোমাদেরকে আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেবেন। বস্ত্ততঃ তারাই বিফল মনোরথ হয়, যারা মিথ্যারোপ করে’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৬১)।

মূসার মুখে একথা শুনে ফেরাঊন ও তার সভাসদরা অহংকারে স্ফীত হ’লেও জাদুকর ও সাধারণ জনগণের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়। ফলে জাদুকরদের মধ্যে গ্রুপিং হয়ে যায় এবং তারা আপোষে বিতর্কে লিপ্ত হয়। যদিও গোপন আলোচনার ভিত্তিতে সম্ভবতঃ রাজকীয় সম্মান ও বিরাট অংকের পুরস্কারের লোভে পরিশেষে তারা একমত হয়।

জনগণের প্রতিক্রিয়া

আল্লাহ বলেন, ‘ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের নির্যাতনের ভয়ে তার সম্প্রদায়ের কিছু লোক ব্যতীত কেউ তার প্রতি ঈমান আনেনি। আর ফেরাঊন তার দেশে ছিল পরাক্রান্ত এবং সে ছিল সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (ইউনুস, আয়াত ৮৩)। এতে বুঝা যায় যে, ক্বিবতীদের মধ্যে গোপনে ঈমান আনয়নকারীর সংখ্যা বেশী থাকলেও প্রকাশ্যে ঈমান আনয়নকারীর সংখ্যা নিতান্তই কম ছিল।

উল্লেখ্য যে, অত্র আয়াতে ‘তার কওমের কিছু লোক ব্যতীত’ বলতে ইবনু আববাস (রাঃ) ‘ফেরাঊনের কওমের কিছু লোক’ বলেছেন। কিন্তু ইবনু জারীর ও অনেক বিদ্বান মূসার নিজ কওম ‘বনু ইস্রাঈলের কিছু লোক’ বলেছেন। এর জবাবে হাফেয ইবনু কাছীর বলেন, এটা প্রসিদ্ধ কথা যে, বনু ইস্রাঈলের সকলেই মূসাকে নবী হিসাবে বিশ্বাস করত একমাত্র ক্বারূণ ব্যতীত। কেননা সে ছিল বিদ্রোহী এবং ফেরাঊনের সাথী। আর মূসার কারণেই বনু ইস্রাঈলগণ মূসার জন্মের আগে ও পরে সমানভাবে নির্যাতিত ছিল (আ‘রাফ, ১২৯)। অতএব অত্র আয়াতে যে মুষ্টিমেয় লোকের ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে, তারা নিশ্চিতভাবেই ছিলেন ক্বিবতী সম্প্রদায়ের। আর তারা ছিলেন, ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া, ফেরাঊনের চাচাতো ভাই জনৈক মুমিন ব্যক্তি যিনি তার ঈমান গোপন রেখেছিলেন এবং ফেরাঊনের খাজাঞ্চি ও তার স্ত্রী। যেকথা ইবনু আববাস (রাঃ) বলেছেন।

ফেরাঊনের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

জাদুকরদের সঙ্গে মুকাবিলা তথা সত্য ও মিথ্যার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ফেরাঊনের নেককার স্ত্রী ও মূসার পালক মাতা ‘আসিয়া’ উক্ত মুকাবিলার শুভ ফলাফলের জন্য সদা উদগ্রীব ছিলেন। যখন তাঁকে মূসা ও হারূণের বিজয়ের সংবাদ শোনানো হ’ল, তখন তিনি কালবিলম্ব না করে বলে ওঠেন, ‘আমি মূসা ও হারূণের পালনকর্তার উপরে ঈমান আনলাম’। নিজ স্ত্রীর ঈমানের এ খবর শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ফেরাঊন তাকে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে। মৃত্যুর পূর্বে বিবি আসিয়া কাতর কণ্ঠে স্বীয় প্রভুর নিকটে প্রার্থনা করেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ঈমানদারগণের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন ফেরাঊনের স্ত্রীর, যখন সে বলেছিল, ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ কর! আমাকে ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের হাত থেকে উদ্ধার কর এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও’ (তাহরীম, আয়াত ১১)।

নবুঅত-পরবর্তী ২য় পরীক্ষা : বনু ইস্রাঈলদের উপরে আপতিত ফেরাঊনী যুলুম সমূহ

জাদুর পরীক্ষায় পরাজিত ফেরাঊনের যাবতীয় আক্রোশ গিয়ে পড়ল এবার নিরীহ বনু ইস্রাঈলগণের উপর। জাদুকরদের ঈমান আনয়ন, অতঃপর তাদের মৃত্যুদন্ড প্রদান, বিবি আসিয়ার ঈমান আনয়ন ও তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান ইত্যাদি নিষ্ঠুর দমন নীতির মাধ্যমে এবং অত্যন্ত নোংরা কুটচাল ও মিথ্যা অপবাদ সমূহের মাধ্যমে মূসার ঈমানী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল ফেরাঊন। কিন্তু এর ফলে জনগণের মধ্যে মূসার দাওয়াত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। তাতে ফেরাঊন ও তার অহংকারী পারিষদবর্গ নতুনভাবে দমন নীতির কৌশলপত্র প্রণয়ন করল। তারা নিজেরা বিধর্মী হ’লেও সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করল। অন্যদিকে ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’-এই কুটনীতির অনুসরণে ফেরাঊনের ক্বিবতী সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে কেবল বনু ইস্রাঈলদের উপরে চূড়ান্ত যুলুম ও নির্যাতনের পরিকল্পনা করল।

১ম যুলুমঃ বনু ইস্রাঈলের নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যার নির্দেশ জারি

ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের নেতারা ইতিপূর্বে ফেরাঊনকে বলেছিল, ‘আপনি কি মূসা ও তার সম্প্রদায়কে এমনি ছেড়ে দিবেন দেশময় ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বাতিল করে দেবার জন্য? (আ‘রাফ, ১২৭)। নেতারা মূসা ও হারূণের ঈমানী দাওয়াতকে ‘ফাসাদ’ বলে অভিহিত করেছিল। এক্ষণে দেশময় মূসার দাওয়াতের ব্যাপক প্রসার বন্ধ করার জন্য এবং ফেরাঊনের নিজ সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকদের ব্যাপকহারে মূসার দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার স্রোত বন্ধ করার জন্য নিজেদের লোকদের কিছু না বলে নিরীহ বনু ইস্রাঈলদের উপরে অত্যাচার শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ফেরাঊন বলল, ‘আমি এখুনি টুকরা টুকরা করে হত্যা করব ওদের পুত্র সন্তানদেরকে এবং বাঁচিয়ে রাখব ওদের কন্যা সন্তানদেরকে। আর আমরা তো ওদের উপরে (সবদিক দিয়েই) প্রবল’ (আ‘রাফ, আয়াত ১২৭)। এভাবে মূসার জন্মকালে বনী ইস্রাঈলের সকল নবজাতক পুত্র হত্যা করার সেই ফেলে আসা লোমহর্ষক নির্যাতনের পুনরাবৃত্তির ঘোষণা প্রদান করা হ’ল।

দল ঠিক রাখার জন্য এবং সম্প্রদায়ের নেতাদের রোষাগ্নি প্রশমনের জন্য ফেরাঊন অনুরূপ ঘোষণা দিলেও মূসা ও হারূণ সম্পর্কে তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয়নি। যদিও ইতিপূর্বে সে মূসাকে কারারুদ্ধ করার এমনকি হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল (শো‘আরা,২৯; মুমিন ৪০)। কিন্তু জাদুকরদের পরাজয়ের পর এবং নিজে মূসার সর্পরূপী লাঠির মু‘জেযা দেখে ভীত বিহবল হয়ে পড়ার পর থেকে মূসার দিকে তাকানোর মত সাহসও তার ছিল না।

যাই হোক ফেরাঊনের উক্ত নিষ্ঠুর ঘোষণা জারি হওয়ার পর বনু ইস্রাঈলগণ মূসার নিকটে এসে অনুযোগের সুরে বলল, ‘তোমার আগমনের পূর্বেও আমাদেরকে নির্যাতন করা হয়েছে। আবার এখন তোমার আগমনের পরেও তাই করা হচ্ছে’ (আ‘রাফ, আয়াত ১২৯)। অর্থাৎ তোমার আগমনের পূর্বে তো এ আশায় আমাদের দিন কাটত যে, সত্বর আমাদের উদ্ধারের জন্য একজন নবীর আগমন ঘটবে। অথচ এখন তোমার আগমনের পরেও সেই একই নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাহ’লে এখন আমাদের উপায় কি? আসন্ন বিপদের আশংকায় ভীত-সন্ত্রস্ত কওমের লোকদের সান্ত্বনা দিয়ে মূসা (আঃ) বললেন, ‘তোমাদের পালনকর্তা শীঘ্রই তোমাদের শত্রুদের ধ্বংস করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দেশে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন কাজ কর’ (আ‘রাফ, আয়ত ১২৯)। তিনি বললেন,‘তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর আল্লাহর নিকটে এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই এ পৃথিবী আল্লাহর। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। বস্ত্ততঃ চূড়ান্ত পরিণাম ফল আল্লাহভীরুদের জন্যই নির্ধারিত’ (আ‘রাফ, আয়াত ১২৮)।

মূসা (আঃ) তাদেরকে আরও বলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যদি আল্লাহর উপরে ঈমান এনে থাক, তবে তাঁরই উপরে ভরসা কর যদি তোমরা আনুগত্যশীল হয়ে থাক’। জবাবে তারা বলল, আমরা আল্লাহর উপরে ভরসা করছি। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের উপরে এ যালেম কওমের শক্তি পরীক্ষা করো না’। ‘আর আমাদেরকে অনুগ্রহ করে কাফের সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও’ (ইউনুস, আয়াত ৮৪-৮৬)।

উপরোক্ত আয়াত সমূহে বুঝা যায় যে, পয়গম্বর সূলভ দরদ ও দূরদর্শিতার আলোকে মূসা (আঃ) স্বীয় ভীত-সন্ত্রস্ত কওমকে মূলতঃ দু’টি বিষয়ে উপদেশ দেন। এক- শত্রুর মোকাবেলায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং দুই- আল্লাহর সাহায্য না আসা পর্যন্ত সাহসের সাথে ধৈর্য ধারণ করা। সাথে সাথে একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, সমগ্র পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহর। তিনি যাকে খুশী এর উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেন এবং নিঃসন্দেহে শেষফল মুত্তাক্বীদের জন্যই নির্ধারিত।

ফেরাঊনের বিরুদ্ধে মূসার বদ দো

‘মূসা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি ফেরাঊনকে ও তার সর্দারদেরকে পার্থিব আড়ম্বর সমূহ ও সম্পদরাজি দান করেছ, যা দিয়ে তারা লোকদেরকে তোমার রাস্তা থেকে বিপথগামী করে। অতএব হে আমাদের প্রভু! তুমি তাদের সম্পদরাজি ধ্বংস করে দাও ও তাদের অন্তরগুলিকে শক্ত করে দাও, যাতে তারা অতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান না আনে, যতক্ষণ না তারা মর্মান্তিক আযাব প্রত্যক্ষ করে’। জবাবে আল্লাহ বললেন, তোমাদের দো‘আ কবুল হয়েছে। অতএব তোমরা দু’জন অটল থাক এবং অবশ্যই তোমরা তাদের পথে চলো না, যারা জানে না’ (ইউনুস, আয়াত ৮৮-৮৯)।

মূসা ও হারূণের উপরোক্ত দো‘আ আল্লাহ কবুল করলেন। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সঙ্গে সঙ্গে করলেন না। বরং সময় নিলেন অন্যূন বিশ বছর। এরূপ প্রলম্বিত কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহ মাযলূমের ধৈর্য পরীক্ষার সাথে সাথে যালেমেরও পরীক্ষা নিয়ে থাকেন এবং তাদের তওবা করার ও হেদায়াত প্রাপ্তির সুযোগ দেন। যাতে পরে তাদের জন্য ওযর পেশ করার কোন সুযোগ না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান’ (মুহাম্মাদ, আয়াত ৪৭)।

প্রশ্ন হ’তে পারে, এত যুলুম সত্ত্বেও আল্লাহ তাদের হিজরত করার নির্দেশ না দিয়ে সেখানেই পুনরায় ঘর বানিয়ে বসবাসের নির্দেশ দিলেন কেন? এর জবাব দু’ভাবে দেওয়া যেতে পারে।

এক- ফেরাঊন তাদেরকে হিজরতে বাধা দিত। কারণ বনু ইস্রাঈলগণকে তারা তাদের জাতীয় উন্নয়নের সহযোগী হিসাবে এবং কর্মচারী ও সেবাদাস হিসাবে ব্যবহার করত। তাছাড়া পালিয়ে আসারও কোন পথ ছিল না। কেননা নীলনদ ছিল বড় বাধা। নদী পার হওয়ার চেষ্টা করলে ফেরাঊনী সেনারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করত।

দুই- ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের মধ্যে মূসা ও হারূণের দাওয়াত সম্প্রসারণ করা। মূলতঃ এটিই ছিল আল্লাহর মূল উদ্দেশ্য। কেননা যতদিন তারা মিসরে ছিলেন, সেখানকার অধিবাসীদের নিকটে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করেছেন এবং তার ফলে বহু আল্লাহর বান্দা পথের সন্ধান পেয়ে ধন্য হয়েছেন। ফেরাঊন দেখেছিল তার দুনিয়াবী লাভ ও শান-শওকত। কিন্তু আল্লাহ চেয়েছিলেন তাওহীদের প্রচার ও প্রসার ও মানুষের হেদায়াত। সেটিই হয়েছে। ফেরাঊনেরা এখন মিসরের পিরামিডের দর্শনীয় বস্ত্ততে পরিণত হয়েছে। অথচ মিসর সহ বলা চলে পুরা আফ্রিকায় এখন ইসলামের জয়-জয়কার অব্যাহত রয়েছে।

ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের উপরে আপতিত গযব সমূহ এবং মূসা (আঃ)-এর মুজেযা সমূহ

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ফেরাঊনের জাদুকরদের সাথে শক্তি পরীক্ষার ঘটনার পর মূসা (আঃ) অন্যূন বিশ বছর যাবত মিসরে অবস্থান করে সেখানকার অধিবাসীদেরকে আল্লাহর বাণী শোনান এবং সত্য ও সরল পথের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন। এ সময়কালের মধ্যে আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে প্রধান ৯টি মু‘জেযা দান করেন। তবে প্লেগ মহামারী সহ (আ‘রাফ, আয়াত ১৩৪)। মোট নিদর্শনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টি। যার মধ্যে প্রথম দু’টি শ্রেষ্ঠ মু‘জেযা ছিল অলৌকিক লাঠি ও আলোকময় হস্ততালু। যার পরীক্ষা শুরুতেই ফেরাঊনের দরবারে এবং পরে জাদুকরদের সম্মুখে হয়ে গিয়েছিল। এরপর বাকীগুলি এসেছিল ফেরাঊনী কওমের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে তাদেরকে সাবধান করার জন্য। মূলতঃ দুনিয়াতে প্রেরিত সকল এলাহী গযবের মূল উদ্দেশ্য থাকে মানুষের হেদায়াত। যেমন আল্লাহ বলেন,‘কাফির ও ফাসিকদেরকে (জাহান্নামের) কঠিন শাস্তির পূর্বে (দুনিয়াতে) আমরা অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা (আমার দিকে) ফিরে আসে’ (সাজদাহ, আয়াত ৩২)।

মযলূম বনু ইস্রাঈলদের কাতর প্রার্থনা এবং মূসা ও হারূণের দো‘আ আল্লাহ কবুল করেছিলেন। সেমতে সর্বপ্রথম অহংকারী ফেরাঊনী কওমের দুনিয়াবী জৌলুস ও সম্পদরাজি ধ্বংসের গযব নেমে আসে। তারপর আসে অন্যান্য গযব বা নিদর্শন সমূহ। আমরা সেগুলি একে একে বর্ণনা করার প্রয়াস পাব। যাতে এযুগের মানুষ তা থেকে উপদেশ হাছিল করে।

মোট নিদর্শন সমূহ, যা মিসরে প্রদর্শিত হয়-

(১) লাঠি (২) প্রদীপ্ত হস্ততালু (৩) দুর্ভিক্ষ (৪) তূফান (৫) পঙ্গপাল (৬) উকুন (৭) ব্যাঙ (৮) রক্ত (৯) প্লেগ (১০) সাগরডুবি। প্রথম দু’টি এবং মূসার ব্যক্তিগত তোতলামি দূর হওয়াটা বাদ দিয়ে বাকী ৮টি নিদর্শন নিম্নে বর্ণিত হ’ল-

 তূফান

দুর্ভিক্ষের পরে মূসা (আঃ)-এর দো‘আর বরকতে পুনরায় ভরা মাঠ ও ভরা ফসল পেয়ে ফেরাঊনী সম্প্রদায় পিছনের সব কথা ভুলে যায় ও গর্বে স্ফীত হয়ে মূসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটাতে থাকে। তারা সাধারণ লোকদের ঈমান গ্রহণে বাধা দিতে থাকে। তারা তাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে পুনরায় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে থাকে। ফলে তাদের উপরে গযব আকারে প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস নেমে আসে। যা তাদের মাঠ-ঘাট, বাগান-ফসল, ঘর-বাড়ি সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতে ভীত হয়ে তারা আবার মূসা (আঃ)-এর কাছে এসে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আবার তারা ঈমান আনার প্রতিজ্ঞা করে ও আল্লাহর নিকটে দো‘আ করার জন্য মূসা (আঃ)-কে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। ফলে মূসা (আঃ) দো‘আ করেন ও আল্লাহর রহমতে তূফান চলে যায়। পুনরায় তারা জমি-জমা আবাদ করে ও অচিরেই তা সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে। এ দৃশ্য দেখে তারা আবার অহংকারী হয়ে ওঠে এবং বলতে থাকে, আসলে আমাদের জমির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্যেই প্লাবন এসেছিল, আর সেকারণেই আমাদের ফসল এবার সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ও বাম্পার ফলন হয়েছে। আসলে আমাদের কর্ম দক্ষতার ফল হিসাবে এটাই উপযুক্ত। এভাবে তারা অহংকারে মত্ত হয়ে আবার শুরু করল বনী ইস্রাঈলদের উপরে যুলুম-অত্যাচার। ফলে নেমে এল তৃতীয় গযব।

 পঙ্গপাল

একদিন হঠাৎ হাযার হাযার পঙ্গপাল কোত্থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ফেরাঊনীদের সব ফসল খেয়ে ছাফ করে গেল। তারা তাদের বাগ-বাগিচার ফল-ফলাদি খেয়ে সাবাড় করে ফেলল। এমনকি কাঠের দরজা-জানালা, আসবাব-পত্র পর্যন্ত খেয়ে শেষ করল। অথচ পাশাপাশি বনু ইস্রাঈলদের ঘরবাড়ি, শস্যভূমি ও বাগ-বাগিচা সবই সুরক্ষিত থাকে।

এবারও ফেরাঊনী সম্প্রদায় ছুটে এসে মূসা (আঃ)-এর কাছে কাতর কণ্ঠে নিবেদন করতে থাকে, যাতে গযব চলে যায়। তারা এবার পাকা ওয়াদা করল যে, তারা ঈমান আনবে ও বনু ইস্রাঈলদের মুক্তি দেবে। মূসা (আঃ) দো‘আ করলেন ও আযাব চলে গেল। পরে ফেরাঊনীরা দেখল যে, পঙ্গপালে খেয়ে গেলেও এখনও যা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বেশ কিছুদিন চলে যাবে। ফলে তারা আবার শয়তানী ধোঁকায় পড়ে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করল ও পূর্বের ন্যায় ঔদ্ধত্য প্রদর্শন শুরু করল। ফলে নেমে এল পরবর্তী গযব ‘উকুন’।

 উকুন

‘উকুন’ সাধারণতঃ মানুষের মাথার চুলে জন্মে থাকে। তবে এখানে ব্যাপক অর্থে ঘুণ পোকা ও কেড়ি পোকাকেও গণ্য করা হয়েছে। যা ফেরাঊনীদের সকল প্রকার কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা, খাট-পালংক ও আসবাব-পত্রে এবং খাদ্য-শস্যে লেগেছিল। তাছাড়া দেহের সর্বত্র সর্বদা উকুনের কামড়ে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। এভাবে উকুন ও ঘুণপোকার অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে এক সময় তারা কাঁদতে কাঁদতে মূসা (আঃ)-এর দরবারে এসে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে লাগলো এবং প্রতিজ্ঞার পরে প্রতিজ্ঞা করে বলতে লাগলো যে, এবারে আযাব ফিরে গেলে তারা অবশ্যই ঈমান আনবে, তাতে বিন্দুমাত্র অন্যথা হবে না। মূসা (আঃ) তাদের জন্য দো‘আ করলেন এবং আযাব চলে গেল। কিন্তু তারা কিছু দিনের মধ্যেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করল এবং পূর্বের ন্যায় অবাধ্য আচরণ শুরু করল। আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার অবকাশ দেওয়াকে তারা তাদের ভালত্বের পক্ষে দলীল হিসাবে মনে করতে লাগল এবং হেদায়াত দূরে থাক, তাদের অহংকার ক্রমে বাড়তে লাগল। মূলতঃ এগুলো ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের অবস্থা। নইলে সাধারণ মানুষ মূসা ও হারূণের দাওয়াত অন্তরে কবুল করে যাচ্ছিল এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর এতেই ছিল মূসা (আঃ)-এর সান্ত্বনা। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমরা কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন সেখানকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে উদ্বুদ্ধ করি। অতঃপর তারা পাপাচারে লিপ্ত হয়। ফলে উক্ত জনগোষ্ঠীর উপরে আদেশ অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমরা উক্ত জনপদকে সমূলে বিধ্বস্ত করি’ (ইসরা, আয়াত ১৬)। ফেরাঊনীদের উপরে সেই অবস্থা এসে গিয়েছিল। তাদের নেতারা স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেচনা হারিয়ে ফেলেছিল। তারা তাদের লোকদের বুঝাতে লাগলো যে, এসবই মূসার জাদুর খেল। আসলে আল্লাহ বলে কিছুই নেই। ফলে নেমে এল এবার ‘ব্যাঙ’-এর গযব।

ব্যাঙ

বারবার বিদ্রোহ করা সত্ত্বেও দয়ালু আল্লাহ তাদের সাবধান করার জন্য ও আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য পুনরায় গযব পাঠালেন। এবার এল ব্যাঙ। ব্যাঙে ব্যাঙে ভরে গেল তাদের ঘর-বাড়ি, হাড়ি-পাতিল, জামা-কাপড়, বিছানা-পত্তর সবকিছু। বসতে ব্যাঙ, খেতে ব্যাঙ, চলতে ব্যাঙ, গায়ে-মাথায় সর্বত্র ব্যাঙের লাফালাফি। কোন জায়গায় বসা মাত্র শত শত ব্যাঙের নীচে তলিয়ে যেতে হ’ত। এই নরম জীবটির সরস অত্যাচারে পাগলপরা হয়ে উঠল পুরা ফেরাঊনী জনপদ। অবশেষে কান্নাকাটি করে ও কাকুতি-মিনতি করে তারা এসে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলো মূসা (আঃ)-এর কাছে। এবার পাকাপাকি ওয়াদা করল যে, আযাব চলে যাবার সাথে সাথে তারা ঈমান আনবেই। কিন্তু না, যথা পূর্বং তথা পরং। ফলে পুনরায় গযব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। এবারে এল ‘রক্ত’।

রক্ত

তাদের অহংকার ও ঔদ্ধত্য চরমে উঠলে হঠাৎ একদিন দেখা গেল ‘রক্ত’। খাদ্য ও পানপাত্রে রক্ত, কূয়া ও পুকুরে রক্ত, তরি-তরকারিতে রক্ত, কলসি-বালতিতে রক্ত। একই সাথে খেতে বসে বনু ইস্রাঈলের থালা-বাটি স্বাভাবিক। কিন্তু ফেরাঊনী ক্বিবতীর থালা-বাটি রক্তে ভরা। পানি মুখে নেওয়া মাত্র গ্লাসভর্তি রক্ত। অহংকারী নেতারা বাধ্য হয়ে বনু ইস্রাঈলী মযলূমদের বাড়ীতে এসে খাদ্য ও পানি ভিক্ষা চাইত। কিন্তু যেমনি তাদের হাতে তা পৌঁছত, অমনি সেগুলো রক্তে পরিবর্তিত হয়ে যেত। ফলে তাদের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। না খেয়ে তাদের মধ্যে হাহাকার পড়ে গেল। অবশেষে পূর্বের ন্যায় আবার এসে কান্নাকাটি। মূসা (আঃ) দয়া পরবশে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করলেন। ফলে আযাব চলে গেল। কিন্তু ঐ নেতাগুলো পূর্বের মতই তাদের গোমরাহীতে অনড় রইল এবং ঈমান আনলো না। এদের এই হঠকারিতা ও কপট আচরণের কথা আল্লাহ বর্ণনা করেন এভাবে, ‘অতঃপর তারা আত্মম্ভরিতা দেখাতে লাগলো। বস্ত্ততঃ এরা ছিল পাপাসক্ত জাতি’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৩৩)। ফলে নেমে এল এবার প্লেগ মহামারী।

 প্লেগ

রক্তের আযাব উঠিয়ে নেবার পরও যখন ওরা ঈমান আনলো না, তখন আল্লাহ ওদের উপরে প্লেগ মহামারী প্রেরণ করেন (আ‘রাফ, আয়াত ১৩৪)। অনেকে এটাকে ‘বসন্ত’ রোগ বলেছেন। যাতে অল্প দিনেই তাদের সত্তর হাযার লোক মারা যায়। অথচ বনু ইস্রাঈলরা ভাল থাকে। এলাহী গযবের সাথে সাথে এগুলি ছিল মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযা এবং নবুঅতের নিদর্শন। কিন্তু জাহিল ও আত্মগর্বী নেতারা একে ‘জাদু’ বলে তাচ্ছিল্য করত।

প্লেগের মহামারীর ফলে ব্যাপক প্রাণহানিতে ভীত হয়ে তারা আবার এসে মূসা (আঃ)-এর নিকটে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে লাগল। মূসা (আঃ) আবারও তাদের জন্য দো‘আ করলেন। ফলে আযাব চলে গেল। কিন্তু তারা পূর্বের ন্যায় আবারো ওয়াদা ভঙ্গ করল। ফলে তাদের চূড়ান্ত ধ্বংস অবধারিত হয়ে গেল। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যাদের উপরে তোমার প্রভুর আদেশ নির্ধারিত হয়ে গেছে, তারা কখনো বিশ্বাস আনয়ন করে না, যদিও সব রকমের নিদর্শনাবলী তাদের নিকটে পৌছে যায়, এমনকি তারা মর্মান্তিক আযাব প্রত্যক্ষ করে’ (ইউনুস, আয়াত ৯৬-৯৭)।

 সাগর ডুবি

ক্রমাগত পরীক্ষা ও অবকাশ দানের পরও যখন কোন জাতি সম্বিত ফিরে পায় না। বরং উল্টা তাদের অহংকার বাড়তে বাড়তে তুঙ্গে ওঠে, তখন তাদের চূড়ান্ত ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ পাক বলেন,

 ‘আমরা মূসার প্রতি এই মর্মে অহী করলাম যে, আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিযোগে বের হয়ে যাও এবং তাদের জন্য সমুদ্রে শুষ্কপথ নির্ধারণ কর। পিছন থেকে এসে তোমাদের ধরে ফেলার আশংকা কর না এবং (পানিতে ডুবে যাওয়ার) ভয় কর না’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৭৭)।

আল্লাহর হুকুম পেয়ে মূসা (আঃ) রাত্রির সূচনা লগ্নে বনু ইস্রাঈলদের নিয়ে রওয়ানা হ’লেন। তাঁরা সমুদ্রের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এ সমুদ্র কোনটা ছিল এ ব্যাপারে মুফতী মুহাম্মাদ শফী তাফসীর রূহুল মা‘আনীর বরাত দিয়ে ৮৬০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, ওটা ছিল ‘ভূমধ্যসাগর’। একই তাফসীরে ৪৭৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘লোহিত সাগর’। কিন্তু মাওলানা মওদূদী খ্যাতনামা পাশ্চাত্য মনীষী লুইস গোল্ডিং-এর তথ্যানুসন্ধান মূলক ভ্রমণ কাহিনী IN THE STEPS OF MOSSES, THE LAW GIVER -এর বরাতে লিখেছেন যে, ওটা ছিল ‘লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হরদ’। মিসরের আধুনিক তাফসীরকার তানতাভীও (মৃঃ ১৯৪০ খৃঃ) বলেন যে, লোহিত সাগরে ডুবে মরা ফেরাঊনের লাশ ১৯০০ খৃষ্টাব্দের মে মাসে পাওয়া গিয়েছিল’। যদিও তা ১৯০৭ সালে পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বারো জন পুত্র মিসরে এসেছিলেন। পরবর্তী চারশত বছরে তাদের বংশ বৃদ্ধি পেয়ে ইস্রাঈলী বর্ণনা অনুযায়ী ছয় লাখ ৩০ হাযার ছাড়িয়ে যায়। মাওলানা মওদূদী বলেন, ঐ সময় মিসরে মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ২০ শতাংশের মাঝামাঝি। তবে কুরআন ও হাদীছ থেকে কেবল এতটুকু জানা যায় যে, তাদের বারোটি গোত্র ছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের জনসংখ্যা ছিল বিপুল।

নবুঅত-পরবর্তী ৩য় পরীক্ষা ও নাজাত লাভ

মূসার নবুঅতী জীবনে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইবরাহীমের অগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এটিও ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক মহা পরীক্ষা। পিছনে ফেরাঊনের হিংস্র বাহিনী, সম্মুখে অথৈ সাগর। এই কঠিন সময়ে বনু ইস্রাঈলের আতংক ও হাহাকারের মধ্যেও মূসা ছিলেন স্থির ও নিস্কম্প। দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় তিনি আল্লাহর উপরে বিশ্বাসে অটল থাকেন এবং সাথীদের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করেন। হিজরতের রাতে একইরূপ জীবন-মরণ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। যাই হোক ফেরাঊন খবর জানতে পেরে তার সেনাবাহিনীকে বনু ইস্রাঈলদের পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দিল। আল্লাহ বলেন,

 ‘সূর্যোদয়ের সময় তারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল’ (শো‘আরা, আয়াত ৬০)। ‘অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা (ভীত হয়ে) বলল, ‘আমরা তো এবার নিশ্চিত ধরা পড়ে গেলাম’। ‘তখন মূসা বললেন, কখনই নয়, আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে সত্বর পথ প্রদর্শন করবেন’। ‘অতঃপর আমরা মূসাকে আদেশ করলাম, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর। ফলে তা বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড় সদৃশ হয়ে গেল’। ‘ইতিমধ্যে আমরা সেখানে অপরদলকে (অর্থাৎ ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনীকে) পৌঁছে দিলাম’। ‘এবং মূসা ও তার সঙ্গীদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিলাম’। ‘অতঃপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম’ (শো‘আরা, আয়াত ৬০-৬৬)। এখানে ‘প্রত্যেক ভাগ’ বলতে তাফসীরকারগণ বারো গোত্রের জন্য বারোটি ভাগ বলেছেন। প্রত্যেক ভাগের লোকেরা পানির দেওয়াল ভেদ করে পরস্পরকে দেখতে পায় ও কথা বলতে পারে, যাতে তারা ভীত না হয়ে পড়ে। আমরা মনে করি এগুলো কল্পনা না করলেও চলে। মূসা ও বনু ইস্রাঈলকে সাগর পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে যেতে দেখে ফেরাঊন সরোষে ঘোড়া দাবড়িয়ে সর্বাগ্রে শুষ্ক সাগর বক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিছনে তার বিশাল বাহিনীর সবাই সাগরের মধ্যে নেমে এলো। যখন তারা সাগরের মধ্যস্থলে পৌঁছে গেল, তখন আল্লাহর হুকুমে দু’দিক থেকে বিপুল পানি রাশি ধেয়ে এসে তাদেরকে নিমেষে গ্রাস করে ফেলল। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর ফেরাঊন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। কিন্তু সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলল’ (ত্বোয়াহা, আয়াত ৭৮)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আর বনু ইস্রাঈলকে আমরা সাগর পার করে দিলাম। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনী বাড়াবাড়ি ও শত্রুতা বশতঃ। অতঃপর যখন সে (ফেরাঊন) ডুবতে লাগল, তখন বলে উঠল, আমি ঈমান আনছি এ বিষয়ে যে, সেই সত্তা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, যার উপরে ঈমান এনেছে বনু ইস্রাঈলগণ এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন’ (ইউনুস, আয়াত ৯০)। আল্লাহ বললেন,

‘এখন একথা বলছ? অথচ তুমি ইতিপূর্বে না-ফরমানী করেছিলে এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে’। ‘অতএব আজ আমরা তোমার দেহকে (বিনষ্ট হওয়া থেকে) বাঁচিয়ে দিচ্ছি। যাতে তোমার পশ্চাদ্বর্তীদের জন্য তুমি নিদর্শন হ’তে পার। বস্ত্ততঃ বহু লোক এমন রয়েছে যারা আমাদের নিদর্শনাবলীর বিষয়ে বেখবর’ (ইউনুস, আয়াত ৯১-৯২)।

স্মর্তব্য যে, সাগরডুবির দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার পরেও ভীত-সন্ত্রস্ত বনী ইস্রাঈলীরা ফেরাঊন মরেছে কি- না বিশ্বাস করতে পারছিল না। ফলে মূসা (আঃ) আল্লাহর নিকট দো‘আ করলেন। তখন আল্লাহ তার প্রাণহীন দেহ বের করে দিলেন। অতঃপর মূসার সাথীরা নিশ্চিন্ত হ’ল। উল্লেখ্য যে, ফেরাঊনের মমিকৃত দেহ অক্ষতভাবে পাওয়া যায় ১৯০৭ সালে এবং বর্তমানে তা মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে।

এতে একথাও প্রমাণিত হয় যে, ফেরাঊনের সময় মিসরীয় সভ্যতা অনেক উন্নত ছিল। তাদের সময়ে লাশ ‘মমি’ করার মত বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল আবিষ্কৃত হয়। পিরামিড, স্ফিংক্স হাযার হাযার বছর ধরে আজও সেই প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি ধারণ করে আছে, যা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। আজকের যুগের কোন কারিগর প্রাচীন এসব কারিগরী কলা-কৌশলের ধারে-কাছেও যেতে পারবে কি-না সন্দেহ।

বনু ইস্রাঈলের অবাধ্যতা ও তাদের উপরে আপতিত পরীক্ষা সমূহের বিবরণ:

১. মূর্তি পূজার আবদার

বনু ইস্রাঈল কওম মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযার বলে লোহিত সাগরে নির্ঘাত ডুবে মরা থেকে সদ্য নাজাত পেয়ে এসেছিল এবং গোটা ফেরাঊনী গোষ্ঠীকে সাগরে ডুবে মরার মর্মান্তিক দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে এসেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সিরিয়া আসার পথে কিছুদূর অগ্রসর হ’তেই তারা এমন এক জনপদের উপর দিয়ে অতিক্রম করল, যারা বিভিন্ন মূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল। তাদের পূজা-অর্চনার জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান দেখে তাদের মন সেদিকে আকৃষ্ট হ’ল এবং মূসা (আঃ)-এর কাছে গিয়ে আবেদন করল, ‘তাদের মূর্তিসমূহের ন্যায় আমাদের জন্যও একটা মূর্তি বানিয়ে দিন’। মূসা বললেন, ‘তোমরা দেখছি মূর্খতায় লিপ্ত জাতি’। তিনি বলেন, ‘এরা যে কাজে নিয়োজিত রয়েছে, তা ধ্বংস হবে এবং যা কিছু তারা করছে, তা সব বাতিল’। ‘তিনি আরও বললেন,‘আমি কি তোমাদের জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য সন্ধান করব? অথচ তিনি তোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৩৮-১৪০)।

বস্ত্ততঃ মানুষ সর্বদা আনুষ্ঠানিকতা প্রিয় এবং অদৃশ্য সত্তার চেয়ে দৃশ্যমান বস্ত্তর প্রতি অধিকতর আসক্ত। ফলে নূহ (আঃ)-এর যুগ থেকেই অদৃশ্য আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের অসীলা কল্পনা করে নিজেদের হাতে গড়া দৃশ্যমান মূর্তি সমূহের পূজা-অর্চনা চলে আসছে। অবশেষে আল্লাহ্কে ও তাঁর বিধানকে ভুলে গিয়ে মানুষ মূর্তিকে ও নিজেদের মনগড়া বিধানকে মুখ্য গণ্য করেছে। মক্কার মুশরিকরাও শেষনবীর কাছে তাদের মূর্তিপূজাকে আল্লাহর নৈকট্যের অসীলা বলে অজুহাত দিয়েছিল’ (যুমার, আয়াত ৩৯)। তাদের এই অজুহাত অগ্রাহ্য হয় এবং তাদের রক্ত হালাল গণ্য হয়। বদর, ওহোদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধসহ পরবর্তীকালের সকল জিহাদ মূলতঃ এই শিরকের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজ হাতে মূর্তি ভেঙ্গে অতঃপর পানি দিয়ে ধুয়ে কা‘বা গৃহ ছাফ করেন এবং আয়াত পাঠ করেন, ‘সত্য এসে গেল, মিথ্যা বিদূরিত হ’ল’ (ইসরা, আয়াত ৮১)।

কিন্তু দুর্ভাগ্য! মূর্তিপূজার সে স্থান আজ দখল করেছে মুসলমানদের মধ্যে কবর পূজা, ছবি-মূর্তি ও প্রতিকৃতি পূজা, স্মৃতিসৌধ, স্থানপূজা, শহীদ মিনার ও বেদী পূজা, শিখা ও আগুন পূজা ইত্যাদি। বস্ত্ততঃ এগুলি স্পষ্ট শিরক, যা থেকে নবীগণ যুগে যুগে মানুষকে সাবধান করেছেন। মূসা (আঃ) স্বীয় কওমকে তাদের মূর্খতাসূলভ আচরণের জন্য ধমকানোর পর তাদের হুঁশ ফিরলো এবং তারা বিরত হ’ল।

তওরাত লাভ

অতঃপর আল্লাহ মূসাকে অহীর মাধ্যমে ওয়াদা করলেন যে, তাকে সত্বর ‘কিতাব’ (তওরাত) প্রদান করা হবে এবং এজন্য তিনি বনু ইস্রাঈলকে সাথে নিয়ে তাকে ‘তূর পাহাড়ের দক্ষিণ পার্শ্বে’ চলে আসতে বললেন (ত্বোয়াহা, আয়াত ৮৩-৮৪)। অতঃপর মূসা (আঃ) আগে এসে আল্লাহর হুকুমে প্রথমে ত্রিশ দিন ছিয়াম ও এ‘তেকাফে মগ্ন থাকেন। এরপর আল্লাহ আরও দশদিন মেয়াদ বাড়িয়ে দেন (আ‘রাফ, আয়াত ১৪২)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এই দশদিন ছিল যিলহজ্জের প্রথম দশদিন, যা অতীব বরকতময়। ইবনু কাছীর বলেন, ১০ই যিলহজ্জ কুরবানীর দিন মূসার মেয়াদ শেষ হয় ও আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য লাভ হয়। একই দিন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর দ্বীন পরিপূর্ণতার আয়াত নাযিল হয় (মায়েদাহ ৩)। যথাসময়ে আল্লাহ মূসার সঙ্গে কথা বললেন (আ‘রাফ, আয়াত ১৪৩)। অতঃপর তাঁকে তওরাত প্রদান করলেন, যা ছিল সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী ও সরল পথ প্রদর্শনকারী (বাক্বারাহ, আয়াত ৫৩)। দীর্ঘ বিশ বছরের অধিককাল পূর্বে মিসর যাওয়ার পথে এই স্থানেই মূসা প্রথম আল্লাহর সাথে কথোপকথনের ও নবুঅত লাভের মহা সৌভাগ্য লাভ করেন। আজ আবার সেখানেই বাক্যালাপ ছাড়াও এলাহী গ্রন্থ তওরাত পেয়ে খুশীতে অধিকতর সাহসী হয়ে তিনি আল্লাহর নিকটে দাবী করে বসলেন,

 ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে দেখা দাও। আমি তোমাকে স্বচক্ষে দেখব। আল্লাহ বললেন, তুমি আমাকে (এ দুনিয়াতে) কখনোই দেখতে পাবে না। তবে তুমি (তূর) পাহাড়ের দিকে দেখতে থাক। সেটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে, তাহ’লে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। অতঃপর যখন তার প্রভু উক্ত পাহাড়ের উপরে স্বীয় জ্যোতির বিকীরণ ঘটালেন, সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। অতঃপর যখন তার জ্ঞান ফিরে এল, তখন বলল, হে প্রভু! মহা পবিত্র তোমার সত্তা! আমি তোমার নিকটে তওবা করছি এবং আমি বিশ্বাসীদের মধ্যে অগ্রণী’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৪৩)।

আল্লাহ বললেন, হে মূসা! আমি আমার ‘রিসালাত’ তথা বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে এবং বাক্যালাপের মাধ্যমে লোকদের (নবীগণের) উপরে তোমাকে বিশিষ্টতা দান করেছি। সুতরাং যা কিছু আমি তোমাকে দান করলাম তা গ্রহণ কর ও কৃতজ্ঞ থাক’। ‘আর আমরা তার জন্য ফলক সমূহে লিখে দিয়েছিলাম সর্বপ্রকার উপদেশ ও সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে। অতএব তুমি এগুলিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং স্বজাতিকে এর কল্যাণকর বিষয়সমূহ দৃঢ়তার সাথে পালনের নির্দেশ দাও। শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে দেখাব পাপাচারীদের বাসস্থান’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৪৪-১৪৫)।

উপরোক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, তখতী বা ফলকে লিখিত অবস্থায় তাঁকে কিতাব প্রদান করা হয়েছিল। আর এই তখতীগুলোর নামই হ’ল ‘তওরাত’।

গো-বৎস পূজার শাস্তি

মূসা (আঃ) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারী হঠকারী লোকদের মৃত্যুদন্ড দিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা গো-বৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করে নিজেদের উপরে যুলুম করেছ। অতএব এখন তোমাদের প্রভুর নিকটে তওবা কর এবং নিজেদেরকে পরস্পরে হত্যা কর। এটাই তোমাদের জন্য তোমাদের স্রষ্টার নিকটে কল্যাণকর’… (বাক্বারাহ, আয়াত ৫৪)। এভাবে তাদের কিছু লোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়।

তূর পাহাড় তুলে ধরা হ

এরপরেও কপট বিশ্বাসী ও হঠকারী কিছু লোক থাকে, যারা তওরাতকে মানতে অস্বীকার করে। ফলে তাদের মাথার উপরে আল্লাহ তূর পাহাড়ের একাংশ উঁচু করে ঝুলিয়ে ধরেন এবং অবশেষে নিরুপায় হয়ে তারা সবাই আনুগত্য করতে স্বীকৃত হয়। যেমন আল্লাহ বলেন,

‘আর যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তূর পাহাড়কে তোমাদের মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে, তোমাদের যে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তা মযবুতভাবে ধারণ কর এবং এতে যা কিছু রয়েছে তা স্মরণে রাখ, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হ’তে পার’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৬৩)। কিন্তু গো-বৎসের মহববত এদের হৃদয়ে এমনভাবে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, এতকিছুর পরেও তারা শিরক ছাড়তে পারেনি। আল্লাহ বলেন, ‘কুফরের কারণে তাদের অন্তরে গোবৎস প্রীতি পান করানো হয়েছিল’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৯৩)। যেমন কেউ সরাসরি শিরকে নেতৃত্ব দিয়েছে, কেউবা মুখে তওবা করলেও অন্তরে পুরোপুরি তওবা করেনি। কেউবা শিরককে ঘৃণা করতে পারেনি। কেউ বা মনে মনে ঘৃণা করলেও বাহ্যিকভাবে মেনে নিয়েছিল এবং বাধা দেওয়ার কোন চেষ্টা করেনি। আল্লাহ যখন তূর পাহাড় তুলে ধরে ভয় দেখিয়ে তাদের আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি নেন, তখনও তাদের কেউ কেউ (পরবর্তীতে) বলেছিল, ‘আমরা শুনলাম ও অমান্য করলাম’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৯৩)। যদিও অমান্য করলাম কথাটি ছিল পরের এবং তা প্রমাণিত হয়েছিল তাদের বাস্তব ক্রিয়াকর্মে। যেমন আল্লাহ এইসব প্রতিশ্রুতি দানকারীদের পরবর্তী আচরণ সম্বন্ধে বলেন,

‘‘অতঃপর তোমরা উক্ত ঘটনার পরে (তোমাদের প্রতিশ্রুতি থেকে) ফিরে গেছ। যদি আল্লাহর বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ তোমাদের উপরে না থাকত, তাহ’লে অবশ্যই তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে’’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৬৪)।

 (৩) আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখার যিদ ও তার পরিণতি

মূসা (আঃ) তূর পাহাড়ে তওরাৎ প্রাপ্ত হয়ে বনু ইস্রাঈলের কাছে ফিরে এসে তা পেশ করলেন এবং বললেন যে, এটা আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব। তোমরা এর অনুসরণ কর। তখন কিছু সংখ্যক উদ্ধত লোক বলে উঠলো, যদি আল্লাহ স্বয়ং আমাদের বলে দেন যে, এটি তাঁর প্রদত্ত কিতাব, তাহ’লেই কেবল আমরা বিশ্বাস করব, নইলে নয়। হতে পারে তুমি সেখানে চল্লিশ দিন বসে বসে এটা নিজে লিখে এনেছ। তখন মূসা (আঃ) আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদেরকে তাঁর সাথে তূর পাহাড়ে যেতে বললেন। বনী ইস্রাঈলরা তাদের মধ্যে বাছাই করা সত্তর জনকে মনোনীত করে মূসা (আঃ)-এর সাথে তূর পাহাড়ে প্রেরণ করল। সেখানে পৌঁছে তারা আল্লাহর বাণী স্বকর্ণে শুনতে পেল। এরপরেও তাদের অবাধ্য মন শান্ত হ’ল না। শয়তানী ধোঁকায় পড়ে তারা নতুন এক অজুহাত তুলে বলল, এগুলো আল্লাহর কথা না অন্য কারু কথা, আমরা বুঝবো কিভাবে? অতএব যতক্ষণ আমরা তাঁকে সশরীরে প্রকাশ্যে আমাদের সম্মুখে না দেখব, ততক্ষণ আমরা বিশ্বাস করব না যে, এসব আল্লাহর বাণী। কিন্তু যেহেতু এ পার্থিব জগতে চর্মচক্ষুতে আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা কারু নেই, তাই তাদের এই চরম ধৃষ্টতার জবাবে আসমান থেকে ভীষণ এক নিনাদ এল, যাতে সব নেতাগুলোই চোখের পলকে অক্কা পেল।

অকস্মাৎ এমন ঘটনায় মূসা (আঃ) বিস্মিত ও ভীত-বিহবল হয়ে পড়লেন। তিনি প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! এমনিতেই ওরা হঠকারী। এরপরে এদের এই মৃত্যুতে লোকেরা আমাকেই দায়ী করবে। কেননা মূল ঘটনার সাক্ষী কেউ থাকল না আমি ছাড়া। অতএব হে আল্লাহ! ওদেরকে পুনর্জীবন দান কর। যাতে আমি দায়মুক্ত হ’তে পারি এবং ওরাও গিয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে। আল্লাহ মূসার দো‘আ কবুল করলেন এবং ওদের জীবিত করলেন। এ ঘটনা আল্লাহ বর্ণনা করেন এভাবে-

 ‘আর যখন তোমরা বললে, হে মূসা! কখনোই আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখতে পাব। তখন তোমাদেরকে পাকড়াও করল এক ভীষণ নিনাদ (বজ্রপাত), যা তোমাদের চোখের সামনেই ঘটেছিল’। ‘অতঃপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমরা তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৫৫-৫৬)।

(৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানের নির্দেশ

সাগরডুবি থেকে মুক্তি পাবার পর হ’তে সিনাই উপত্যকা পেরিয়ে তূর পাহাড়ে পৌঁছা পর্যন্ত সময়কালে মূর্তিপূজার আবদার, গো-বৎস পূজা ও তার শাস্তি, তওরাৎ লাভ ও তা মানতে অস্বীকার এবং তূর পাহাড় উঠিয়ে ভয় প্রদর্শন, আল্লাহ্কে স্বচক্ষে দেখার যিদ ও তার পরিণতি প্রভৃতি ঘটনা সমূহের পর এবার তাদের মূল গন্তব্যে যাত্রার জন্য আদেশ করা হ’ল। অবাধ্য জাতিকে তাদের আদি বাসস্থানে রওয়ানার প্রাক্কালে মূসা (আঃ) তাদেরকে দূরদর্শিতাপূর্ণ উপদেশবাণী শুনান এবং যেকোন বাধা সাহসের সাথে অতিক্রম করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। সাথে সাথে তিনি তাদেরকে বিগত দিনে আল্লাহর অলৌকিক সাহায্য লাভের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অভয়বাণী শুনান। যেমন আল্লাহর ভাষায়,

 ‘আর যখন মূসা স্বীয় সম্প্রদায়কে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহরাজি স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদের মধ্যে নবীগণকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদেরকে রাজ্যাধিপতি বানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে এমন সব বস্ত্ত দিয়েছেন, যা বিশ্বজগতের কাউকে দেননি’। ‘হে আমার সম্প্রদায়! পবিত্র ভূমিতে (বায়তুল মুক্বাদ্দাস শহরে) প্রবেশ কর, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আর তোমরা পশ্চাদদিকে প্রত্যাবর্তন করবে না। তাতে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (মায়েদাহ, আয়াত ২০-২১)।

নবুঅত-পরবর্তী ৪র্থ পরীক্ষা : বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান

আল্লাহ পাক মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে বনী ইস্রাঈলকে আমালেক্বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ করে শাম দখল করতে বলেছিলেন। সাথে সাথে এ সুসংবাদও দিয়েছিলেন যে, শামের ভূখন্ড তাদের ভাগ্যে লেখা হয়ে গেছে (মায়েদাহ, আয়াত ২১)। কাজেই তোমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু এইসব বিলাসী কাপুরুষেরা আল্লাহর কথায় দৃঢ় বিশ্বাস আনতে পারেনি।

মূসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য বনী ইস্রাঈলকে সাথে নিয়ে মিসর থেকে শাম অভিমুখে রওয়ানা হ’লেন। যথা সময়ে তাঁরা জর্দান নদী পার হয়ে ‘আরীহা’ পৌঁছে শিবির স্থাপন করলেন। এটি ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম মহানগরী সমূহের অন্যতম, যা জর্দান নদী ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। যা আজও স্বনামে বিদ্যমান রয়েছে। মূসা (আঃ)-এর সময়ে এ শহরের অত্যাশ্চর্য জাঁক-জমক ও বিস্তৃতি ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।

শিবির স্থাপনের পর মূসা (আঃ) বিপক্ষ দলের অবস্থা ও অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য ১২ জন সর্দারকে প্রেরণ করলেন। যারা ছিলেন হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বারো পুত্রের বংশধরগণের ‘বারোজন প্রতিনিধি, যাদেরকে তিনি আগেই নির্বাচন করেছিলেন স্ব স্ব গোত্রের লোকদের দেখাশুনার জন্য’ (মায়েদাহ, আয়াত ১২)। তারা রওয়ানা হবার পর বায়তুল মুক্বাদ্দাস শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছলে বিপক্ষ দলের বিশালদেহী বিকট চেহারার একজন লোকের সঙ্গে সাক্ষাত হয়। ইস্রাঈলী রেওয়ায়াত সমূহে লোকটির নাম ‘আউজ ইবনে ওনুক’ বলা হয়েছে এবং তার আকার-আকৃতি ও শক্তি-সাহসের অতিরঞ্জিত বর্ণনা সমূহ উদ্ধৃত হয়েছে (ইবনু কাছীর)। যাই হোক উক্ত ব্যক্তি একাই বনু ইস্রাঈলের এই বার জন সরদারকে পাকড়াও করে তাদের বাদশাহর কাছে নিয়ে গেল এবং অভিযোগ করল যে, এই লোকগুলি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতলব নিয়ে এসেছে। বাদশাহ তার নিকটতম লোকদের সাথে পরামর্শের পর এদের ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন এই উদ্দেশ্যে যে, এরা গিয়ে তাদের নেতাকে আমালেক্বাদের জাঁক-জমক ও শৌর্য-বীর্যের স্বচক্ষে দেখা কাহিনী বর্ণনা করবে। তাতে ওরা ভয়ে এমনিতেই পিছিয়ে যাবে। পরবর্তীতে দেখা গেল যে, বাদশাহর ধারণাই সত্যে পরিণত হয়েছিল। এই ভীত-কাপুরুষ সর্দাররা জিহাদ দূরে থাক, ওদিকে তাকানোর হিম্মতও হারিয়ে ফেলেছিল।

বনু ইস্রাঈলের বারো জন সর্দার আমালেক্বাদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে স্বজাতির কাছে ফিরে এল এবং আমালেক্বাদের বিস্ময়কর উন্নতি ও অবিশ্বাস্য শক্তি-সামর্থ্যের কথা মূসা (আঃ)-এর নিকটে বর্ণনা করল। কিন্তু মূসা (আঃ) এতে মোটেই ভীত হননি। কারণ তিনি আগেই অহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। সেমতে তিনি গোত্রনেতাদের যুদ্ধ প্রস্ত্ততি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন এবং আমালেক্বাদের শৌর্য-বীর্যের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করলেন। কিন্তু দেখা গেল যে, ইউশা‘ বিন নূন ও কালেব বিন ইউক্বেন্না ব্যতীত বাকী সর্দাররা গোপনে সব ফাঁস করে দিল (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)। ফলে যা হবার তাই হ’ল। এই ভীতু আরামপ্রিয় জাতি একেবারে বেঁকে বসলো।

 ‘তারা বলল, হে মূসা! সেখানে একটি প্রবল পরাক্রান্ত জাতি রয়েছে। আমরা কখনো সেখানে যাব না, যে পর্যন্ত না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। যদি তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়, তবে নিশ্চিতই আমরা সেখানে প্রবেশ করব’ (মায়েদাহ, আয়াত ২২)। অর্থাৎ ওরা চায় যে, মূসা (আঃ) তার মু‘জেযার মাধ্যমে যেভাবে ফেরাঊনকে ডুবিয়ে মেরে আমাদের উদ্ধার করে এনেছেন, অনুরূপভাবে আমালেক্বাদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিত্যক্ত অট্টালিকা ও সম্পদরাজির উপরে আমাদের মালিক বানিয়ে দিন। অথচ আল্লাহর বিধান এই যে, বান্দাকে চেষ্টা করতে হবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। কিন্তু বনু ইস্রাঈলরা এক পাও বাড়াতে রাযী হয়নি। এমতাবস্থায়

 ‘তাদের মধ্যকার দু’জন আল্লাহভীরু ব্যক্তি (সম্ভবতঃ পূর্বের দু’জন সর্দার হবেন, যাদের মধ্যে ইউশা‘ পরে নবী হয়েছিলেন), যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন, তারা বলল, (মূসা (আঃ)-এর আদেশ মতে) ‘তোমরা ওদের উপর আক্রমণ করে (শহরের মূল) দরজায় প্রবেশ কর। (কেননা আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস যে,) যখনই তোমরা তাতে প্রবেশ করবে, তখনই তোমরা অবশ্যই জয়ী হবে। আর তোমরা আল্লাহর উপরে ভরসা কর, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক’ (মায়েদা, আয়াত ২৩)।

কিন্তু ঐ দুই নেককার সর্দারের কথার প্রতি তারা দৃকপাত করল না। বরং আরও উত্তেজিত হয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মূসা (আঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘হে মূসা! আমরা কখনোই সেখানে প্রবেশ করব না, যতক্ষণ তারা সেখানে আছে। অতএব তুমি ও তোমার পালনকর্তা যাও এবং যুদ্ধ কর গে। আমরা এখানেই বসে রইলাম’ (মায়েদাহ, আয়াত ২৪)। নবীর অবাধ্যতার ফলস্বরূপ এই জাতিকে ৪০ বছর তীহ্ প্রান্তরের উন্মুক্ত কারাগারে বন্দী থাকতে হয় (মায়েদাহ, আয়াত ২৬)। অতঃপর এইসব দুষ্টমতি নেতাদের মৃত্যুর পর পরবর্তী বংশধররা হযরত ইউশা‘ বিন নূন (আঃ)-এর নেতৃত্বে জিহাদ করে বায়তুল মুক্বাদ্দাস পুনর্দখল করে।

বনু ইস্রাঈলের এই চূড়ান্ত বেআদবী ছিল কুফরীর নামান্তর এবং অত্যন্ত পীড়াদায়ক। যা পরবর্তীতে প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়ে গেছে। বদরের যুদ্ধের সময়ে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) কিছুটা অনুরূপ অবস্থায় পতিত হয়েছিলেন। অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর অল্প সংখ্যক সবেমাত্র মুহাজির মুসলমানের মোকাবেলায় তিনগুণ শক্তিসম্পন্ন সুসজ্জিত বিরাট কুরায়েশ সেনাবাহিনীর আগমনে হতচকিত ও অপ্রস্ত্তত মুসলমানদের বিজয়ের জন্য যখন নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করছিলেন, তখন মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ আনছারী (রাঃ) দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কস্মিনকালেও ঐকথা বলব না, যা মূসা (আঃ)-এর স্বজাতি তাঁকে বলেছিল, ‘তুমি ও তোমার প্রভু যাও যুদ্ধ করগে। আমরা এখানে বসে রইলাম’ (মায়েদা, আয়াত ২৪)। বরং আমরা আপনার ডাইনে, বামে, সামনে ও পিছনে থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করব। আপনি নিশ্চিন্তে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করুন’। বিপদ মুহূর্তে সাথীদের এরূপ বীরত্বব্যঞ্জক কথায় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন।

বালআম বাঊরার ঘটনা :

ফিলিস্তীন দখলকারী ‘জাববারীন’ তথা আমালেক্বা সম্প্রদায়ের শক্তিশালী নেতারা মূসা (আঃ) প্রেরিত ১২ জন প্রতিনিধিকে ফেরৎ পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি। কারণ তারা মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযার কারণে ফেরাঊনের সসৈন্যে সাগরডুবির খবর আগেই জেনেছিল। অতএব মূসা (আঃ)-এর বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান বন্ধ করার জন্য তারা বাঁকা পথ তালাশ করল। তারা অত্যন্ত গোপনে বনু ইস্রাঈলের ঐ সময়কার একজন নামকরা সাধক ও দরবেশ আলেম বাল‘আম ইবনে বা‘ঊরা কাছে বহু মূল্যবান উপঢৌকনাদিসহ লোক পাঠাল। বাল‘আম তার স্ত্রীর অনুরোধে তা গ্রহণ করল। অতঃপর তার নিকটে আসল কথা পাড়া হ’ল যে, কিভাবে আমরা মূসার অভিযান ঠেকাতে পারি। আপনি পথ বাৎলে দিলে আমরা আরও মহামূল্যবান উপঢৌকনাদি আপনাকে প্রদান করব। বাল‘আম উঁচুদরের আলেম ছিল। যে সম্পর্কে তার নাম না নিয়েই আল্লাহ বলেন,

‘আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন সেই লোকটির অবস্থা, যাকে আমরা আমাদের নিদর্শন সমূহ দান করেছিলাম। অথচ সে তা পরিত্যাগ করে বেরিয়ে গেল। আর তার পিছনে লাগল শয়তান। ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল’ (আ‘রাফ, আয়াত ১৭৫)।

কথিত আছে যে, বাল‘আম ‘ইসমে আযম’ জানত। সে যা দো‘আ করত, তা সাথে সাথে কবুল হয়ে যেত। আমালেক্বাদের অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে সে অবশেষে মূসার বিরুদ্ধে দো‘আ করল। কিন্তু তার জিহবা দিয়ে উল্টা দো‘আ বের হ’তে লাগল যা আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে যেতে লাগল। তখন সে দো‘আ বন্ধ করল। কিন্তু অন্য এক পৈশাচিক রাস্তা সে তাদের বাৎলে দিল। সে বলল, বনু ইস্রাঈলগণের মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে দিতে পারলে আল্লাহ তাদের উপরে নারায হবেন এবং তাতে মূসার অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে’। আমালেক্বারা তার পরামর্শ গ্রহণ করল এবং তাদের সুন্দরী মেয়েদেরকে বনু ইস্রাঈলের নেতাদের সেবাদাসী হিসাবে অতি গোপনে পাঠিয়ে দিল। বড় একজন নেতা এফাঁদে পা দিল। আস্তে আস্তে তা অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত হ’ল। ফলে আল্লাহর গযব নেমে এল। বনু ইস্রাঈলীদের মধ্যে প্লেগ মহামারী দেখা দিল। কথিত আছে যে, একদিনেই সত্তর হাযার লোক মারা গেল। এ ঘটনায় বাকী সবাই তওবা করল এবং প্রথম পথভ্রষ্ট নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে রাস্তার উপরে ঝুলিয়ে রাখা হ’ল। অতঃপর আল্লাহর গযব উঠে গেল। এগুলি ইস্রাঈলী বর্ণনা। সম্ভবতঃ সম্প্রদায়ের নেতাদের ক্রমাগত অবাধ্যতা, শঠতা ও পাপাচারে অতিষ্ঠ হ’য়ে এবং একসাথে এই বিরাট জনশক্তি বিনষ্ট হওয়ায় মূসা (আঃ) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানের সংকল্প পরিত্যাগ করেন।

তীহ্ প্রান্তরের ঘটনাবলী :

নবীর সঙ্গে যে বেআদবী তারা করেছিল, তাতে আল্লাহর গযবে তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আল্লাহ পাক হয়ত এ জাতিকে আরও পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন এবং আল্লাহর অপার অনুগ্রহপুষ্ট একটি জাতি নিজেদের অবাধ্যতা ও হঠকারিতার ফলে কিভাবে আল্লাহর অভিসম্পাৎগ্রস্ত হয় এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত চিরস্থায়ী লাঞ্ছনার শিকার হয়, পৃথিবীর মানুষের নিকটে দৃষ্টান্ত হিসাবে তা পেশ করতে চেয়েছিলেন। ঠিক যেভাবে দৃষ্টান্ত হয়েছে ফেরাঊন একজন অবাধ্য ও অহংকারী নরপতি হিসাবে। আর তাই বনী ইস্রাঈলের পরীক্ষার মেয়াদ আরও বর্ধিত হ’ল। নিম্নে তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কিছু নিদর্শন বর্ণিত হ’ল।-

১. মেঘ দ্বারা ছায়া প্রদান

ছায়াশূন্য তপ্ত বালুকা বিস্তৃত মরুভূমিতে কাঠফাটা রোদে সবচেয়ে প্রয়োজন যেসব বস্ত্তর, তন্মধ্যে ‘ছায়া’ হ’ল সর্বপ্রধান। হঠকারী উম্মতের অবাধ্যতায় ত্যক্ত-বিরক্ত মূসা (আঃ) দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহর নিকটে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রার্থনা নিবেদন করেছেন। দয়ালু আল্লাহ তাঁর দো‘আ সমূহ কবুল করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাঁর বিশেষ রহমত সমূহ নাযিল করেছেন। তন্মধ্যে একটি হ’ল উন্মুক্ত তীহ্ প্রান্তরের উপরে শামিয়ানা সদৃশ মেঘমালার মাধ্যমে শান্তিদায়ক ছায়া প্রদান করা। যেমন আল্লাহ এই অকৃতজ্ঞ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘স্মরণ কর সে কথা, যখন আমরা তোমাদেরকে ছায়া দান করেছিলাম মেঘমালার মাধ্যমে’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৫৭)।

২. ঝর্ণাধারার প্রবাহ :

ছায়ার পরেই গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্ত হ’ল পানি। যার অপর নাম জীবন। পানি বিহনে তৃষ্ণার্ত পিপাসার্ত উম্মতের আহাজারিতে দয়া বিগলিত নবী মূসা স্বীয় প্রভুর নিকটে কাতর কণ্ঠে পানি প্রার্থনা করলেন। কুরআনের ভাষায়,

‘আর মূসা যখন স্বীয় জাতির জন্য পানি চাইল, তখন আমি বললাম, তোমার লাঠি দিয়ে পাথরের উপরে আঘাত কর। অতঃপর তা থেকে বেরিয়ে এলো (১২টি গোত্রের জন্য) ১২টি ঝর্ণাধারা। তাদের সব গোত্রই চিনে নিল (অর্থাৎ মূসার নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারণ করে নিল) নিজ নিজ ঘাট। (আমি বললাম,) তোমরা আল্লাহর দেওয়া রিযিক খাও আর পান কর। খবরদার যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৬০)।

বস্ত্ততঃ ইহুদী জাতি তখন থেকে এযাবত পৃথিবী ব্যাপী ফাসাদ সৃষ্টি করেই চলেছে। তারা কখনোই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনি।

৩. মান্না ও সালওয়া খাদ্য পরিবেশন :

মরুভূমির বুকে চাষবাসের সুযোগ নেই। নেই শস্য উৎপাদন ও বাইরে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ। কয়েকদিনের মধ্যেই মওজুদ খাদ্য শেষ হয়ে গেলে হাহাকার পড়ে গেল তাদের মধ্যে। নবী মূসা (আঃ) ফের দো‘আ করলেন আল্লাহর কাছে। এবার তাদের জন্য আসমান থেকে নেমে এলো জান্নাতী খাদ্য ‘মান্না ও সালওয়া’- যা পৃথিবীর আর কোন নবীর উম্মতের ভাগ্যে জুটেছে বলে জানা যায় না।

‘মান্না’ এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ তা‘আলা বনু ইস্রাঈলদের জন্য আসমান থেকে অবতীর্ণ করতেন। আর তা ছিল দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। আর ‘সালওয়া’ হচ্ছে আসমান থেকে আগত এক প্রকার পাখি।প্রথমটি দিয়ে রুটি ও দ্বিতীয়টি দিয়ে গোশতের অভাব মিটত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘কামআহ হ’ল মান্ন-এর অন্তর্ভুক্ত’। এতে বুঝা যায় ‘মান্ন’ কয়েক প্রকারের ছিল। ইংরেজীতে ‘কামআহ’ অর্থ করা হয়েছে ‘মাশরূম’ (Mashroom)। আধুনিক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, মান্ন একপ্রকার আঠা জাতীয় উপাদেয় খাদ্য। যা শুকিয়ে পিষে রুটি তৈরী করে তৃপ্তির সাথে আহার করা যায়। ‘সালওয়া’ একপ্রকার চড়ুই পাখি, যা ঐসময় সিনাই এলাকায় প্রচুর পাওয়া যেত। ব্যাঙের ছাতার মত সহজলভ্য ও কাই জাতীয় হওয়ায় সম্ভবত একে মাশরূম-এর সাথে তুলনীয় মনে করা হয়েছে। তবে মাশরূম ও ব্যাঙের ছাতা সম্পূর্ণ পৃথক জিনিস। কয়েক লাখ বনু ইস্রাঈল কয়েক বছর ধরে মান্না ও সালওয়া খেয়ে বেঁচে ছিল। এতে বুঝা যায় যে, মান্ন ছিল চাউল বা গমের মত কার্বো-হাইড্রেট-এর উৎস এবং সালওয়া বা চড়ুই জাতীয় পাখির গোশত ছিল ভিটামিন ও চর্বির উৎস। সব মিলে তারা পরিপূর্ণ খাবার নিয়মিত খেয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। দক্ষিণ ইউরোপের সিসিলিতে, আরব উপদ্বীপের ইরাকে ও ইরানে, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতবর্ষে মান্না জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন হয়। অবাধ্য বনু ইস্রাঈলরা এগুলো সিরিয়ার তীহ্ প্রান্তরে ৪০ বছরের বন্দী জীবনে বিপুলভাবে পেয়েছিল আল্লাহর বিশেষ রহমতে। ঈসার সাথী হাওয়ারীগণ এটা চেয়েছিল (মায়েদাহ, আয়াত ১১২-১১৫)। কিন্তু পেয়েছিল কি-না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

দুনিয়ায় বসেই জান্নাতের খাবার, এ এক অকল্পনীয় অনির্বচনীয় আনন্দের বিষয়। কিন্তু এই হতভাগারা তাতেও খুব বেশীদিন খুশী থাকতে পারেনি। তারা গম, তরকারি, ডাল-পেঁয়াজ ইত্যাদি খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠলো। যেমন আল্লাহ বলেন,

 ‘… আমরা তোমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছি ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’। (আমরা বললাম) এসব পবিত্র বস্ত্ত তোমরা ভক্ষণ কর (কিন্তু ওরা শুনল না, কিছু দিনের মধ্যেই তা বাদ দেওয়ার জন্য ও অন্যান্য নিম্নমানের খাদ্য খাবার জন্য যিদ ধরলো)। বস্ত্ততঃ (এর ফলে) তারা আমার কোন ক্ষতি করতে পারেনি, বরং নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করেছে’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৫৭)।

আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,

 ‘যখন তোমরা বললে, হে মূসা! আমরা একই ধরনের খাদ্যের উপরে কখনোই ধৈর্য ধারণ করতে পারব না। কাজেই তুমি তোমার প্রভুর নিকটে আমাদের পক্ষে প্রার্থনা কর তিনি যেন আমাদের জন্য এমন খাদ্য-শস্য দান করেন, যা জমিতে উৎপন্ন হয়; যেমন তরি-তরকারি, কাকুড়, গম, রসুন, ডাল, পেঁয়াজ ইত্যাদি। মূসা বললেন, তোমরা উত্তম খাদ্যের বদলে এমন খাদ্য পেতে চাও যা নিম্নস্তরের? তাহ’লে তোমরা অন্য কোন শহরে চলে যাও। সেখানে তোমরা তোমাদের চাহিদা মোতাবেক সবকিছু পাবে’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৬১)।

তওরাতের শব্দগত ও অর্থগত পরিবর্তন

ইহুদীরা তাদের এলাহী কিতাব তওরাতের শাব্দিক পরিবর্তন নবী মূসা (আঃ)-এর জীবদ্দশায় যেমন করেছিল, অর্থগত পরিবর্তনও তারা করেছিল। যেমন মূসা (আঃ) যখন তাদের ৭০ জন নেতাকে সাথে নিয়ে তূর পাহাড়ে গেলেন। অতঃপর আল্লাহর গযবে মৃত্যুবরণ করে পুনরায় তাঁর রহমতে জীবিত হয়ে ফিরে এল, তখনও এই গর্বিত জাতি তওরাত যে আল্লাহর নাযিলকৃত গ্রন্থ এ সাক্ষ্য দেওয়ার সাথে সাথে একথাও জুড়ে দিল যে, আল্লাহ তা‘আলা সবশেষে একথাও বলেছেন যে, তোমরা যতটুকু পার, আমল কর। আর যা না পার তা আমি ক্ষমা করে দিব’। অথচ এটা ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা। তাদের এই মিথ্যা সাক্ষ্যের ফলে লোকেরা বলে দিল যে, তওরাতের বিধান সমূহ মেনে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তখনই আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতাগণ তূর পাহাড়ের একাংশ উপরে তুলে ধরে তাদের হুকুম দিলেন, হয় তোমরা তওরাত মেনে নাও, না হয় ধ্বংস হও। তখন নিরুপায় হয়ে তারা তওরাত মেনে নেয়। মূসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পরেও তওরাত, যবূর ও ইঞ্জীল গ্রন্থগুলিতে তারা অসংখ্য শব্দগত ও অর্থগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ফলে এই কিতাবগুলি আসল রূপে কোথাও আর পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। ইহুদীদের তওরাত পরিবর্তনের ধরন ছিল তিনটি। এক. অর্থ ও মর্মগত পরিবর্তন, যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। দুই. শব্দগত পরিবর্তন যেমন আল্লাহ বলেন, ‘ইহুদীদের মধ্যে একটা দল আছে, যারা আল্লাহর কালামকে (যেখানে শেষনবীর আগমন সংবাদ ও তাঁর গুণাবলী সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে) তার স্বস্থান হ’তে পরিবর্তন করে দেয়’ (নিসা, আয়াত ৪৬ ; মায়েদাহ, আয়াত ১৩, ৪১)। এই পরিবর্তন তারা নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থে শাব্দিকভাবে এবং মর্মগতভাবে উভয়বিধ প্রকারে করত। ‘এভাবে তারা কখনো শব্দে, কখনো অর্থে এবং কখনো তেলাওয়াতে (মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে) পরিবর্তন করত। পরিবর্তনের এ প্রকারগুলি কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আজকাল পাশ্চাত্যের কিছু সংখ্যক খ্রীষ্টানও একথা কিছু কিছু স্বীকার করে’। আল্লাহর কিতাবের এইসব পরিবর্তন তাদের মধ্যকার আলেম ও যাজক শ্রেণীর লোকেরাই করত, সাধারণ মানুষ যাদেরকে অন্ধ ভক্তির চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস ঐসব লোকদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে বলত, এটি আল্লাহর পক্ষ হ’তে অবতীর্ণ হয়েছে- যাতে এর বিনিময়ে তারা সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে’ (বাক্বারাহ, আয়াত ৭৯)।

আল্লাহ বলেন, ‘এইসব লোকেরা মিথ্যা কথা শোনাতে এবং হারাম ভক্ষণে অভ্যস্ত’ (মায়েদাহ, আয়াত ৪২)। জনগণ তাদের কথাকেই সত্য ভাবত এবং এর বিপরীত কিছুই তারা শুনতে চাইত না। এভাবে তারা জনগণের রব-এর আসন দখল করেছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তারা তাদের আলেম ও দরবেশগণকে ‘রব’ হিসাবে গ্রহণ করেছিল আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে’ (তওবাহ, আয়াত ৩১)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ‘তারা তাদেরকে সিজদা করতে বলত না বটে। কিন্তু মানুষকে তারা আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজের নির্দেশ দিত এবং তারা তা মেনে নিত। সেকারণ আল্লাহ তাদেরকে ‘রব’ বলে আখ্যায়িত করেন’। খৃষ্টান পন্ডিত ‘আদী বিন হাতেম যখন বললেন যে,‘আমরা আমাদের আলেম-দরবেশদের পূজা করি না’। তখন তার জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তারা কি আল্লাহকৃত হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করে না? আর তোমরাও কি সেটা মেনে নাও না? ‘আদী বললেন, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘সেটাই তো ওদের ইবাদত হ’ল’।

মূসা ও খিযিরের কাহিনী

এ ঘটনাটি বনু ইস্রাঈলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং ঘটনাটি ব্যক্তিগতভাবে মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে জড়িত। পিতা ইবরাহীম (আঃ) সহ বড় বড় নবী-রাসূলগণের জীবনে পদে পদে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। মূসা (আঃ)-এর জীবনে এটাও ছিল অনুরূপ একটি পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ রয়েছে। আনুষঙ্গিক বিবরণ দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাটি তীহ্ প্রান্তরের উন্মুক্ত বন্দীশালায় থাকাকালীন সময়ে ঘটেছিল। ঘটনাটি নিম্নরূপ: ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত উবাই বিন কা‘ব (রাঃ) প্রমুখাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে বর্ণিত হাদীছ হ’তে এবং সূরা কাহফ ৬০ হ’তে ৮২ পর্যন্ত ২৩টি আয়াতে বর্ণিত বিবরণ থেকে যা জানা যায়, তার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নে বিবৃত হ’ল।-

ঘটনার প্রেক্ষাপট

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, একদিন হযরত মূসা (আঃ) বনু ইস্রাঈলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, লোকদের মধ্যে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ আছে কি? ঐ সময়ে যেহেতু মূসা ছিলেন শ্রেষ্ঠ নবী এবং তাঁর জানা মতে আর কেউ তাঁর চাইতে অধিক জ্ঞানী ছিলেন না, তাই তিনি সরলভাবে ‘না’ সূচক জবাব দেন। জবাবটি আল্লাহর পসন্দ হয়নি। কেননা এতে কিছুটা অহংকার প্রকাশ পেয়েছিল। ফলে আল্লাহ তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেন। তাঁর উচিৎ ছিল একথা বলা যে, ‘আল্লাহই সর্বাধিক অবগত’। আল্লাহ তাঁকে বললেন, ‘হে মূসা! দুই সমুদ্রের সংযোগস্থলে অবস্থানকারী আমার এক বান্দা আছে, যে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী’। একথা শুনে মূসা (আঃ) প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! আমাকে ঠিকানা বলে দিন, যাতে আমি সেখানে গিয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারি’। আল্লাহ বললেন, থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে নাও এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলের (সম্ভবতঃ লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরের মিলনস্থল) দিকে সফরে বেরিয়ে পড়। যেখানে পৌঁছার পর মাছটি জীবিত হয়ে বেরিয়ে যাবে, সেখানেই আমার সেই বান্দার সাক্ষাৎ পাবে’। মূসা (আঃ) স্বীয় ভাগিনা ও শিষ্য (এবং পরবর্তীকালে নবী) ইউশা‘ বিন নূনকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। পথিমধ্যে এক স্থানে সাগরতীরে পাথরের উপর মাথা রেখে দু’জন ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ সাগরের ঢেউয়ের ছিটা মাছের গায়ে লাগে এবং মাছটি থলের মধ্যে জীবিত হয়ে নড়েচড়ে ওঠে ও থলে থেকে বেরিয়ে সাগরে গিয়ে পড়ে। ইউশা‘ ঘুম থেকে উঠে এই বিস্ময়কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। কিন্তু মূসা (আঃ) ঘুম থেকে উঠলে তাঁকে এই ঘটনা বলতে ভুলে গেলেন। অতঃপর তারা আবার পথ চলতে শুরু করলেন এবং একদিন একরাত চলার পর ক্লান্ত হয়ে এক স্থানে বিশ্রামের জন্য বসলেন। অতঃপর মূসা (আঃ) নাশতা দিতে বললেন। তখন তার মাছের কথা মনে পড়ল এবং ওযর পেশ করে আনুপূর্বিক সব ঘটনা মূসা (আঃ)-কে বললেন এবং বললেন যে, ‘শয়তানই আমাকে একথা ভুলিয়ে দিয়েছিল’ (কাহফ, ৬৩)। তখন মূসা (আঃ) বললেন, ঐ স্থানটিই তো ছিল আমাদের গন্তব্য স্থল। ফলে তাঁরা আবার সেপথে ফিরে চললেন। অতঃপর সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলেন যে, একজন লোক আপাদ-মস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। মূসা (আঃ) তাকে সালাম করলেন। লোকটি মুখ বের করে বললেন, এদেশে সালাম? কে আপনি? বললেন, আমি বনু ইস্রাঈলের মূসা। আপনার কাছ থেকে ঐ জ্ঞান অর্জন করতে এসেছি, যা আল্লাহ আপনাকে বিশেষভাবে দান করেছেন’। খিযির বললেন, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না হে মূসা! আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান দান করেছেন, তা তিনি আপনাকে দেননি। পক্ষান্তরে আপনাকে তিনি যে জ্ঞান দান করেছেন, তা আমাকে দেননি’। মূসা বললেন, ‘আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোন আদেশ অমান্য করব না’ (কাহফ, ৬৯)। খিযির বললেন, ‘যদি আপনি আমার অনুসরণ করেনই, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজে সে সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলি’।

(১) অতঃপর তাঁরা চলতে লাগলেন। কিছু দূর গিয়ে নদী পার হওয়ার জন্য একটা নৌকা পেলেন। অতঃপর নৌকা থেকে নামার সময় তাতে ছিদ্র করে দিলেন। শারঈ বিধানের অধিকারী নবী মূসা বিষয়টিকে মেনে নিতে পারলেন না। কেননা বিনা দোষে অন্যের নৌকা ছিদ্র করে দেওয়া স্পষ্টভাবেই অন্যায়। তিনি বলেই ফেললেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি একটা গুরুতর মন্দ কাজ করলেন’। তখন খিযির বললেন, আমি কি পূর্বেই বলিনি যে, ‘আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না’। মূসা ক্ষমা চাইলেন। ইতিমধ্যে একটা কালো চড়ুই পাখি এসে নৌকার এক প্রান্তে বসল এবং সমুদ্র থেকে এক চঞ্চু পানি তুলে নিল। সে দিকে ইঙ্গিত করে খিযির মূসা (আঃ)-কে বললেন, ‘আমার ও আপনার এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের জ্ঞান মিলিতভাবে আল্লাহর জ্ঞানের মুকাবিলায় সমুদ্রের বুক থেকে পাখির চঞ্চুতে উঠানো এক ফোঁটা পানির সমতুল্য’। (২) তারপর তাঁরা সমুদ্রের তীর বেয়ে চলতে থাকলেন। কিছু দূর গিয়ে তাঁরা সাগরপাড়ে খেলায় রত একদল বালককে দেখলেন। খিযির তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও বুদ্ধিমান ছেলেটিকে ধরে এনে নিজ হাতে তাকে হত্যা করলেন। এ দৃশ্য দেখে মূসা আৎকে উঠে বললেন, একি! একটা নিষ্পাপ শিশুকে আপনি হত্যা করলেন? এ যে মস্তবড় গোনাহের কাজ’। খিযির বললেন, আমি তো পূর্বেই বলেছিলাম, আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না’। মূসা আবার ক্ষমা চাইলেন এবং বললেন, ‘এরপর যদি আমি কোন প্রশ্ন করি, তাহ’লে আপনি আমাকে আর সাথে রাখবেন না’ (কাহফ, ৭৫)।

(৩) ‘অতঃপর তারা চলতে লাগলেন। অবশেষে যখন একটি জনপদে পৌঁছলেন, তখন তাদের কাছে খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। অতঃপর তারা সেখানে একটি পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেয়ে সেটাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তখন মূসা বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিতে পারতেন’। খিযির বললেন ‘এখানেই আমার ও আপনার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হ’ল। এখন যেসব বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি, আমি সেগুলির তাৎপর্য বলে দিচ্ছি’ (কাহফ, আয়াত ৭৮)।

তাৎপর্য সমূহ :

প্রথমতঃ নৌকা ছিদ্র করার বিষয়। সেটা ছিল কয়েকজন মিসকীন দরিদ্র ব্যক্তির। তারা এ দিয়ে সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি সেটিকে ছিদ্র করে দিলাম এজন্য যে, ঐ অঞ্চলে ছিল এক যালেম বাদশাহ। সে বলপ্রয়োগে লোকদের নৌকা ছিনিয়ে নিত’। নিশ্চয়ই ছিদ্র নৌকা সে নিবে না। ফলে দরিদ্র লোকগুলি নৌকার সামান্য ত্রুটি সেরে নিয়ে পরে তাদের কাজে লাগাতে পারবে। দ্বিতীয়তঃ বালকটিকে হত্যার ব্যাপার। তার পিতা-মাতা ছিল ঈমানদার। আমি আশংকা করলাম যে, সে বড় হয়ে অবাধ্য হবে ও কাফের হবে। যা তার বাপ-মায়ের জন্য ফিৎনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমি চাইলাম যে, দয়ালু আল্লাহ তার পিতা-মাতাকে এর বদলে উত্তম সন্তান দান করুন, যে হবে সৎকর্মশীল ও বিশুদ্ধ চরিত্রের অধিকারী। যে তার পিতা-মাতাকে শান্তি দান করবে’। তৃতীয়তঃ পতনোন্মুখ প্রাচীর সোজা করে দেওয়ার ব্যাপার। উক্ত প্রাচীরের মালিক ছিল নগরীর দু’জন পিতৃহীন বালক। ঐ প্রাচীরের নীচে তাদের নেককার পিতার রক্ষিত গুপ্তধন ছিল। আল্লাহ চাইলেন যে, বালক দু’টি যুবক হওয়া পর্যন্ত প্রাচীরটি খাড়া থাক এবং তারা তাদের প্রাপ্য গুপ্তধন হস্তগত করুক। (খিযির বলেন,) ‘বস্ত্ততঃ আমি নিজ ইচ্ছায় এ সবের কিছুই করিনি’ (কাহফ, আয়াত ৮২)।

খিযির কে ছিলেন?

কুরআনে তাঁকে ‘আমাদের বান্দাদের একজন’ (কাহফ, আয়াত ৬৫) বলা হয়েছে। বুখারী শরীফে তাঁর নাম খিযির বলে উল্লেখ করা হয়েছে’। সেখানে তাঁকে নবী বলা হয়নি। জনশ্রুতি মতে তিনি একজন ওলী ছিলেন এবং মৃত্যু হয়ে গেলেও এখনও মানুষের বেশ ধরে যেকোন সময় যেকোন মানুষের উপকার করেন। ফলে জঙ্গলে ও সাগর বক্ষে বিপদাপদ থেকে বাঁচার জন্য আজও অনেকে খিযিরের অসীলা পাবার জন্য তার উদ্দেশ্যে মানত করে থাকে। এসব ধারণার প্রসার ঘটেছে মূলতঃ বড় বড় প্রাচীন মনীষীদের নামে বিভিন্ন তাফসীরের কেতাবে উল্লেখিত কিছু কিছু ভিত্তিহীন কল্পকথার উপরে ভিত্তি করে। যারা তাকে নবী বলেন, তাদের দাবীর ভিত্তি হ’ল, খিযিরের বক্তব্য ‘আমি এসব নিজের মতে করিনি’ (কাহফ, আয়াত ৮২)। অর্থাৎ সবকিছু আল্লাহর নির্দেশে করেছি। অলীগণের কাশ্ফ-ইলহাম শরী‘আতের দলীল নয়। কিন্তু নবীগণের স্বপ্নও আল্লাহর অহী হয়ে থাকে। যেজন্য ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পুত্রকে যবেহ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। অতএব বালক হত্যার মত ঘটনা কেবলমাত্র নবীর পক্ষেই সম্ভব, কোন অলীর পক্ষে আদৌ নয়। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, নবী কখনো শরী‘আত বিরোধী কাজ করতে পারেন না। ঐ সময় শরী‘আতধারী নবী ও রাসূল ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)। আর সে কারণেই খিযিরের শরী‘আত বিরোধী কাজ দেখে তিনি বারবার প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিলেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, খিযির কোন কেতাবধারী রাসূল ছিলেন না, বা তাঁর কোন উম্মত ছিল না।

এখানে আমরা যদি বিষয়টিকে কুরআনের প্রকাশ্য অর্থের উপরে ছেড়ে দিই এবং তাঁকে ‘আল্লাহর একজন বান্দা’ হিসাবে গণ্য করি, যাঁকে আল্লাহর ভাষায় ‘আমরা আমাদের পক্ষ হ’তে বিশেষ রহমত দান করেছিলাম এবং আমাদের পক্ষ হ’তে দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান’ (কাহফ, আয়াত ৬৫)। তাহ’লে তিনি নবী ছিলেন কি অলী ছিলেন, তিনি এখনো বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন, এসব বিতর্কের আর কোন অবকাশ থাকে না। যেভাবে মূসার মায়ের নিকটে আল্লাহ অহী (অর্থাৎ ইলহাম) করেছিলেন এবং যার ফলে তিনি তার সদ্য প্রসূত সন্তান মূসাকে বাক্সে ভরে সাগরে নিক্ষেপ করতে সাহসী হয়েছিলেন (ত্বোয়াহা, আয়াত ৩৮-৩৯) এবং যেভাবে জিব্রীল মানুষের রূপ ধরে এসে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ছাহাবীগণকে দ্বীনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন একই ধরনের ঘটনা মূসা ও খিযিরের ক্ষেত্রে হওয়াটাও বিস্ময়কর কিছু নয়।

মনে রাখা আবশ্যক যে, লোকমান অত্যন্ত উঁচুদরের একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তাঁর জ্ঞানপূর্ণ উপদেশসমূহ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং তার নামে একটি সূরা নাযিল হয়েছে। কিন্তু তিনি নবী ছিলেন না। লোকমানকে আল্লাহ যেমন বিশেষ ‘হিকমত’ দান করেছিলেন (লোকমান, আয়াত ১২)। খিযিরকেও তেমনি বিশেষ ‘ইল্ম’ দান করেছিলেন (কাহফ, আয়াত ৬৫)। এটা বিচিত্র কিছু নয়।

আল কুরআনে হযরত মুসা (আঃ)

আল কুরআনে হযরত মুসা (আঃ) কে অনেক বড় মর্যাদাবান নবী বলে উলেখ করা হয়েছে। বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের মর্মস্পর্শী ঘটনাবলী। আল কুরআনে হযরত মুসার নাম যতবেশী উল্লেখ করা হয়েছে আর কোন নবীর নাম এতো বেশী উল্লাখ করা হয়নি। আল কুরআনে হযরত মুসা (আঃ) এর নাম উল্লেখ হয়েছে ১৩৬ বার। হযরত মুসার সংগ্রামী জীবন বিস্তারিত জানতে পারবেন নিম্নোক্ত সুরাগুলো পড়লে – আল বাকারাঃ ৪০-১০২ আয়াত। আল আরাফঃ ১০৩-১৭১ আয়াত। ইউনুসঃ ৭৫-৯৩ আয়াত। আল কাহাফঃ ৬০-৮২ আয়াত। তোয়াহাঃ ৯-৯৮ আয়াত। শোয়ারা” ১০-৬৭ আয়াত। আল কাসাসঃ ৩-৪৭ আয়াত এবং ৭৬-৮৪ আয়াত। আল মুমিন/গাফিরঃ ২৩-৫৪ আয়াত।

হযরত মুসা (আঃ) এর এই জীবনী আল কুরআনের উল্লেখিত আয়াতের আলোকেই রচিত হয়েছে।

 

 

About আবদুস শহীদ নাসিম