কোরাণের গল্প

কাবা গৃহের প্রতিষ্ঠা

পূর্বে খোদাতা’লার এবাদতের জন্য কোন মসজিদ বা গৃহ নির্দিষ্ট ছিলো না। খোদার আদেশে হযরত ইব্রাহিম সর্বপ্রথম মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই উপাসনা গৃহ নির্মাণ শুধু তিনি ও তাঁহার পুত্র ইসমাইল দু’জনে করেছেন। হযরত ইসমাইল পাথর তুলে দিতেন ও হযরত ইব্রাহিম সেই পাথর দ্বারা দেওয়াল গাঁথতেন। এইরূপে পিতাপুত্রে কাবা ঘরের প্রাচীর নির্মাণ করেন। কিন্তু ইহার ছাদ নির্মাণ তিনি করেননি।

কাবা নির্মাণ করতে বহুদিন সময় লেগেছিলো। এত বেশি দিন লেগেছিলো যে, হযরত ইব্রাহিম যে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতেন, তার ওপরে তাঁর পায়ের চিহ্ন আঁকা হয়ে গেছে। আজও পর্যন্ত পাথরখানি আছে। হাজিগণ কাবা প্রদক্ষিণের পূর্বে ঐ স্থানে নামাজ পড়ে থাকেন। এর নাম মকামে ইব্রাহিম।

কাবাগৃহ নির্মাণ শেষ হলে ইব্রাহিম প্রার্থনা করেছিলেনঃ হে পরোয়ারদিগার (পালনকর্তা) আমরা পিতাপুত্রে পরিশ্রম করে যে গৃহ নির্মাণ করলুম, হে প্রভু, তুমি তা গ্রহণ করো। হে সর্বশক্তিমান, আমরা ও আমাদের বংশধরেরা যেন তোমার জন্য আত্মোৎসর্গ করতে পারি। আমাদের বংশধরগণের জন্য তাদের মধ্য থেকেই তুমি এমন মহামাহনব পাঠাও যাঁরা তোমারবাণী সকলকে শোনাবেন।

আল্লাহতা’লা তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ করেছিলেন। তিনি পুনরায় প্রার্থনা করেছিলেনঃ হে প্রভু এই স্থানে শাস্তি দাও ও সমস্ত বাধাবিঘ্ন দূর করো। হে দয়াময়, আমি তোমার এই পবিত্র গৃহের নিকটে আমাদের বংশধরগণের জন্য বাসস্থান মনোনীত করলুম। এ স্থান যেন শস্যশ্যামল হয়ে উঠে। শেষ বিচারেরদিনে তুমি আমাকে, আমার পিতামাতাকে, আমার বংশধরগণকে এবং তোমাকে যাঁরা বিশ্বাসী তাদের সবাইকে ক্ষমা করিও।

ইউসুফ ও জুলেখা

বৃদ্ধ বয়সে বিবি সারা খাতুনের গর্ভে হযতর ইব্রাহিমের এক পুত্র সন্তান জন্মে। তাঁহার নাম ইসরাইল (আঃ)। ইসরাঈলের দুই পুত্র ইয়াশা ও ইয়াকুব। ইয়াকুবের বারোটি পুত্র, তন্মধ্যে একাদশ পুত্র হযরত ইউসুফ। কনিষ্ঠ পুত্রের নাম বনি-ইয়ামিন।

হযরত ইয়াকুব জানতেন যে, ইউসুফ ভবিষ্যৎ জীবনে নবী  হবেন। তিনি অতি গুণবান, শ্রী ও লাবণ্যমণ্ডিত ছিলেন। শৈশবেই ইউসুফ ও বনি ইয়ামিন মাতৃহীন হন। নানা কারণে হযরত ইয়াকুব অন্যান্য সন্তান অপেক্ষা ইউসুফকে একটু বেশী আদর যত্ন করতেন। এই জন্য বিমাতার গর্ভে অপর দশজন ভ্রাতা ইউসুফকে একটু ঈর্ষার চক্ষে দেখতেন।

ইউসুফ একদা রাত্রে স্বপ্ন দেখতে পেলেন –সূর্য চন্দ্র ও এগারটি নক্ষত্র তাঁকে যেন অভিবাদন করছে। পরদিন পিতার নিকটে কথাটা বললেন। ইয়াকুব স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শুনে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেনঃ তোমার পিতামাতা ও এগারটি ভাইয়ের চাইতে তুমি শ্রেষ্ঠ হবে। কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি তোমর অপর ভ্রাতাদের নিকটে এ বিষয়ে কিছু বলো না। কারণ তা হলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে পারে।

পিতার মনে আশঙ্কা ছিলো একে তো ভাইরা ইউসুফকে হিংসার চোখে দেখে তার ওপরে তারা কোনো গতিকে স্বপ্নের কথা জানতে পেরে হয়তো আরো হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু সাবধানতা সত্ত্বেও ভ্রাতারা স্বপ্ন বৃত্তান্ত জানতে পারলো। তারা পরামর্শ করতে লাগলো, কিরূপে ইউসুফকে তাদের মধ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। অনেক যুক্তিতর্কের পর তারা স্থির করলো তাঁকে না মেরে কূপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। যদি ভাগ্যে থাকে কোন পথিকের দয়ায় তাঁর প্রাণরক্ষা হলেও হতে পারে।

এইরূপ পরামর্শ করে তারা পিতার নিকটে গিয়ে বললেনঃ আব্বা, ইউসুফ তো এখন বড়োসড়ো হয়েছে, ওকে আর বাড়িতে রাতদিন না রেখে আমাদের সঙ্গে মাঠে পাঠিয়ে দিন। সেখানে সে খেলাধূলা করবে। আমরা তাকে দেখাশুনা করবো।

হযরত ইয়াকুব প্রথমে তাদের কথায় রাজি হলেন না। কিন্তু তাদের পীড়াপীড়ি ও অনেক তর্কের পর অবশেষে তাদের সঙ্গে যেতে অনুমতি দিলেন।

পরের দিন তারা ইউসুফকে অনেক দূরে এক নির্জন মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে তার দেহ থেকে জামা কাপড় খুলে নিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করলো। ইউসুফ প্রায় মরে যাবার মতো হলেন। তাদের সবচেয়ে বড় ভাই বললোঃ তোমরা ওকে মেরে ফেলো না। ওকে কূয়ার মধ্যে ফেলে দাও।

তখন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে তারা কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে গেলো।

বাড়ি এসে পিতার নিকটে তারা কপট দুঃখ প্রকাশ করতে করতে জানালোঃ আব্বা ইউসুফকে বাঘে খেয়েছে। এই দেখুন তার জামায় রক্ত।

হযরত ইয়াকুব আর কি করেন। তিনি শোকে মুহ্যমান হয়ে কাঁদতে লাগলেন। কয়েকদিন পরে একদল সওদাগর সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মরুভূমির পথে সঙ্গে পানীয় প্রায় নিঃশেষ হওয়ার কূপ থেকে পানি সংগ্রহের ইচ্ছা করে তাঁরা বালতি নামিয়ে দিলেন। সেই সময়ে খোদার আদেশে ইউসুফ তাঁদের বালতির মধ্যে উঠে এলেন। ওদিকে তাঁর দশ ভাই তখন সেখানে ভেড়া চরাচ্ছিল। তারা ইউসুফকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে বললোঃ কি আশ্চর্য, এ যে আমাদের সেই গোলাম –কয়েক দিন থেকে পালিয়ে এসেছে। একে যদি আপনারা ক্রয় করেন তবে আমরা বিক্রি করতে পারি।

প্রতিবাদ করলে ভ্রাতারা পাছে তাঁকে বধ করে এই ভয়ে ইউসুফ চুপ করে রইলেন। কয়েকটি টাকা দিয়ে সওদাগরেরা তাঁকে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে ইউসুফ মিশর দেশে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে তাঁকে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে ইউসুফ মিশর দেশে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে তাঁকে তাঁরা বাদশাহের এক আত্মীয় কিৎফীর আজিজ নামক একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকটে বিক্রয় করলেন। আজিজ ইউসুফকে তাঁর স্ত্রী জুলেখার খাস গোলাম করে দিলেন।

ইউসুফ বয়ঃপ্রাপ্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে অসামান্য রূপবান হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর অপরূপ শ্রী, লাবণ্য ও সুগঠিত দেহ সৌষ্ঠবের প্রতি প্রভু-পত্নী জুলেখা দিন দিন আকৃষ্ট হতে লাগলেন। একদিন তিনি তাঁর প্রতি আনুগত্য হবার জন্য অনুরোধ জানালেন। কিন্তু ইউসুফ সে কথায় একেবারে কর্ণপাত মাত্র করলেন না। জুরেখা নানা প্রকার প্রলোভন দিয়েও তার মন জয় করতে পারলেন না। অবশেষে নিরাশ হয়ে তিনি তাঁর স্বামীর নিকটে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন।

ইউসুফ দোষারোপের প্রতিবাদ করে বললেনঃ এই নারীই আমাকে অন্যায় কার্যে লিপ্ত করবার চেষ্টা করেছে।

এইরূপে একে অন্যের নামে দোষ দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন। ইউসুফ ও জুলেখার এই সকল কাহিনী ক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়লো। অন্যান্য রমণীরা ছি ছি করতে লাগলো। তারা জুলেখার দোষ দিতে লাগলো।

জুলেখা যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর সম্বন্ধে অপরাপর মহিলারা অন্যায় আলোচনা আরম্ভ করেছে, তখন তিনি তাদের জব্দ করার জন্য ফন্দী আঁটলেন। তিনি একদিন তাদের নিমন্ত্রণ করলেন এবং ছুরি দিয়ে কেটে খেতে হয় এমন একটি খাবার প্রস্তুত করলেন। সকলে খেতে এলে তাদের প্রত্যেককে এক একটি ছুরি দিলেন। তারা যখন খেতে আরসম্ভ করেছে ঠিক সেই সমেয় জুলেখা ইউসুফকে ডাকলেন। ইউসুফকে দেখে মেয়রা এত বিস্মিত ও মুগ্ধ হলো যে তারা খাবার কাটতে গিয়ে নিজেদের আঙ্গুল কেটে ফেললো। তারা বলাবলি করতে লাগলোঃ এত রূপ! এত সুন্দর! এ কি মানুষ না ফেরেশতা।

জুলেখা সেই সময়ে সুযোগ পেয়ে বললেনঃ তোমরা আমাকে দোষী করছিলে –এবার তো তোমরাও দোষী।

নিমন্ত্রিত মহিলারা এবাসের সত্য সত্যই লজ্জিত হলো।

ইউসুফের প্রতি নারীদের এইরূপ আসক্তির কথা জানতে পেরে সমাজের মাতব্বরেরা শঙ্কিত হলেন। তাঁরা নৈতিক জীবন পবিত্র রাখার জন্য ইউসুফের বিরুদ্ধে বাদশাহের নিকট অভিযোগ করলেন। বাদশাহ উপায়ান্তর না পেয়ে নিরপরাধ ইউসুফের কারাবাসের হুকুম দিলেন।

ইউসুফক কয়েদখানায় নেওয়া হলো। তাঁর সঙ্গে আরো দু’টি যুবককে কারাগারে প্রেরণ করা হলো।

একদা রাত্রে সেই যুবক দু’টি স্বপ্ন দেখলো। সেই স্বপ্নের কথা ইউসুফকে জানালো। একজন বললো, সে যেন আঙ্গুর থেকে রস বের করছে।

অপর একজন বললো, সে যেন মাথায় বয়ে  রুটি নিয়ে যাচ্ছে! কতকগুলি পাখি সেই রুটিগুলো ঠুকরে খাচ্ছে।

ইউসুফ খোদাতা’লার কৃপায় প্রগাঢ় তত্ত্বদর্শী হয়েছিলেন। তিনি স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শ্রবণ করে বললেনঃ দেখ, তোমাদরে একজন শীঘ্রই মুক্তি পাবে এবং বাদশাহের সঙ্গী নিযুক্ত হয়ে তাঁকে শরবত পান করাবে। অপরজনের ফাঁসী হবে এবং তার মাথা পাখিতে ঠুকরে খাবে।

কয়েকদিনের মধ্যেই ইউসুফের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য সত্যই ফলে গেলো। একজন মুক্তি পেলো অপর জনের ফাঁসী হলো। যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিলো সে বাদশাহের অনুচর নিযুক্ত হলো।

কিছুদিন পরে বাদশাহ এক স্বপ্ন দেখলেন, সাতটি কৃশকায় গাভী সাতটি বলবতী গাভীকে খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি শীর্ণ ধানের শীষ সাতটি সতেজ ধানের শীষকে খেয়ে ফেলছে। বাদশাহ পরদিন দরবারে স্বপ্ন বৃত্তান্ত প্রকাশ করে অনুচরদের কাছে এর অর্থ জানতে চাইলেন। কিন্তু কেউ সদুত্তর দিতে পারলো না। কারাগারের সেই যুবক সেখানে উপস্থিত ছিলো। ইউসুফের কথা তার মনে পড়ে গেলো তখনই তাঁর কাছে গিয়ে সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। ইউসুফ  বললেনঃ প্রথমে সাত বৎসর খুব ভীষণ অজন্মা ও দুর্ভিক্ষ হবে সে সময় তোমরা সেই সঞ্চিত শস্য থেকে খরচ করতে পারবে।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পেয়ে বাদশাহ খুব সন্তুষ্ট এবং ইউসুফকে তাঁর নিকটে আনবার সঙ্কল্প করলেন।

যে সকল মেয়ে অসাবধানতায় নিজেদের আঙ্গুল কেটে ফেলেছিলো, তাদের কাছে অনুসন্ধান করে বাদশাহ  জানতে পারলেন ইউসুফ তাদের সংগে কোনো অসদ্ব্যবহার করেননি। তারাই ইউসুফকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলো। জুলেখাও সেখানে ছিলেন। তিনি এ কথার সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিলেন। বাদশাহ সব কথ শুনে অনুতপ্ত হলেন এবং ইউসুফকে মুক্তি দিয়ে তাঁকে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী  নিযুক্ত করলেন।

ইউসুফের স্বপ্নের ব্যাখ্যা সত্য সত্যই সফল হলো। প্রথম সাত বৎসর ভাল ফসল হলো এবং পরের সাত বৎসর ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো।

মিশরের সঞ্চিত খাদ্যের কথা জানতে পেরে নানা দেশ থেকে লোকজন আসতে লাগলো। ইউসুফের ভ্রাতারাও খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে এলো। তিনি তাদের দেখে চিনতে পারলেন, কিন্তু তারা তাঁকে চিনতে পারলো না। তিনি ভ্রাতাদের খাদ্য দিয়ে বলে দিলেনঃ আবার যখনআসবে তোমাদের ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এসো। তাকে না  নিয়ে এলে খাদ্য পাবে না। এই বলে অনুচরবর্গের দ্বারা কিছু অর্থ গোপনে খাদ্যের থলির মধ্যে পুরে দিলেন।

তারা বাড়ি গিয়ে তাদের পিতাকে মিশরের শাসনকর্তার অনেক গুণের কথা বর্ণনা করলো এবং এবারে ছোট ভাইকে নিয়ে যাবার জন্য বলে দিয়েছেন সে কথাও জানালো। হযরত ইয়াকুব তাদের পূর্বের কাজ স্মরণ করে কনিষ্ঠ পুত্র বনি ইয়ামিনকে তাদের সঙ্গে দিতে রাজি হলেন না।

খাদ্যের বস্তা খোলা হবার পর তার মধ্যে টাকা দেখতে পেয়ে তারা খুবই বিস্মিত হলো।

পুনরায় খাদ্যাভাব ঘটলে তারা তাদের পিতাকে গিয়ে শক্ত করে ধরে বললোঃ আব্বা, আপনি ছোট ভাইকে আমাদের সংগে যেতে দিন। খোদার নামে শপথ করে বলছি, আমরা তাকে অক্ষত দেহে  ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।

পিতা তাদের জিদের কাছে পরাজিত হয়ে অগত্যা অনুমতি দিলেন। বনি-ইয়ামিনকে সংগে নিয়ে তারা গেলো এবং ইউসুফের নির্দেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করলো। ইউসুফের কাছে যখন তারা পৌঁছলো তখন ছোট ভাইকে ডেকে নিয়ে তিনি নিজের পরিচয় প্রদান করলেন।

অন্যবারের মতন এবারেও তাদের বস্তা বোঝাই করে খাদ্য দেওয়া হলো। ইউসুফের এক চাকর একটি পেয়ালা ইচ্ছা করে ছোট ভাইয়ের বস্তায় লুকিয়ে রেখে দিলো।

পেয়ালা হারিয়ে যাওয়ায় বিশেষ সোরগোল পড়ে গেলো। অবশেষে অনেক খোঁজা-খুঁজির পর বনি-ইয়ামিনের বস্তার মধ্যে সেটা পাওয়া গেলো।

বনি-ইয়ামিনকে বাদশাহের কাছে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। তার ভ্রাতারা বললেনঃ আমাদের পিতা খুব বৃদ্ধ হয়েছেন। এটি তার সকলের ছোট ছেলে। একে ফিরিয়ে না নিয়ে গেলে পিতা বড়ই কষ্ট পাবেন। আপনি এর বদলে আমাদের একজনকে রাখুন!

ইউসুফ বললেনঃ তা হতে পারে না।

সকলের বড় ভাই অন্যান্য সকলকে বললোঃ তোমরা ফিরে যাও, আমি আল্লাহর নাম শপথ করে পিতাকে বলে একে নিয়ে এসেছি। কোন মুখে পিতার কাছে ফিরে যাবো। আমি বনি-ইয়ামিনের সঙ্গে এখানেই থাকবো‍!

তারা দেশে গিয়ে হযরত ইয়াকুবকে সমস্ত সংবাদ জানালো। তিনি শুনে দুঃসহ শোকে আর্তনাদ করতে লাগলেন। শোক কিঞ্চিৎ প্রশতিম হলে বললেনঃ দেখ আল্লাহর দয়ায় আমি অনেক কিছু জানি। তোমরা আল্লাহর ওপরে বিশ্বাস রেখে ইউসুফ ও বনি ইয়ামিনের খোঁজ করো।

পিতার আদেশে তারা পুনরায় মিশরে গেলো এবং খাদ্য কিনতে চাইলো। সেই সময় ইউসুফ তাদের কাছে নিজের পরিচয় প্রদান করলেন। বললেনঃ আল্লাহতা’লা তোমাদের ক্ষমা করবেন, তিনি ক্ষমাশীল। তোমরা আমার এই জামা পিতার কাছে নিয়ে যাও, তাহলে তিনি জানতে পারবেন।

আল্লাহর কৃপায় ইয়াকুব সব জানতে পারলেন। ইউসুফের ভাইরা এসে তার জামা পিতাকে দিলেন। হযরত ইয়াকুব খুশী হয়ে বললেনঃ পূর্বেই বলেছি, আমি যা জানি তোমরা তা জান না।

ইউসুফের পরামর্শ মতো  তাঁর ভ্রাতারা তাদের পিতামাতা ও অন্যান্য পরিজনদের নিয়ে মিশরে গেলেন। সেখানে ইউসুফ তাঁদের বসবাস করবার ব্যবস্থা করে দিলেন।

শাদ্দাদের বেহেশত

অনেক আগের কথা। আরব দেশে সাদ নামে একটি বংশ ছিলো। এই বংশের লোকদের চেহারা ছিলো যেমন খুব লম্বা এবং চওড়া, গায়েও তেমনি ভীষণ শক্তি।

তারাই ছিলো তখন আরব দেশে প্রবল এবং প্রধান।

তাদের একজন বাদশাহ ছিলো –তার নাম শাদ্দাদ। শাদ্দাদ ছিলো সাত মুলুকের বাদশাহ। তার ধন-দৌলতর সীমা ছিলো না। হাজার হাজার সিন্দুকে ভরা মণি, মুক্তা, হীরা জহরৎ। পিলপানায় লক্ষ লক্ষ হাতী, আস্তাবলে অসংখ্য ঘোড়া। সিপাই-শাস্ত্রী যে কত তার লেখাজোকা ছিলো না। উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র, আমলা-গোমস্তায় তার রঙমহল দিনরাত গম-গম করতো।

সাধারণতঃ মানুষের ধনদৌলত যদি  একটু বেশি থেকে থাকে তবে সে একটু অহঙ্কারী হয়ই। শাদ্দাদ বাদশাহের দেমাগ এত বেশী হয়েছিলযে, একদিন সে দরবারে বসে উজীর-নাজীরদের ডেকে সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে বললোঃ দেখ, আমার যে রকম শক্তি সামর্থ্য আর খুবসুরৎ চেহারা, তাতে আমি কি খোদা হবার উপযুক্ত নই?

উজীর-নাজীরেরা তাকে তোষামোদ করে বললোঃ নিশ্চয়ই।এত যার ধন-দৌলত, লোক-লস্কর, উজীর-নাজীর, দালান-কোঠা, হাতী-ঘোড়া তিনি যদি খোদা না হন, তবে আর খোদা হবার উপযুক্ত এ দুনিয়ায় কে? এত সিন্দুক ভরা মণিমুক্তা, হীরা-জহরৎ এত হাতী-ঘোড়া আর দরবার ভরা আমাদের মতো উজীর-নাজীর খোদা তার চৌদ্দপুরুষেও দেখেনি। সুতরাং আপনিই আমাদের খোদা।

আরব দেশের লোকেরা সে সময়ে গাছ, পাথর প্রভৃতি পূজা করতো। শাদ্দাদ এটা মোটেই পছন্দ করতো না। সে হুকুম জারি করলোঃ কেউ ইটপাথর বা অন্য মূর্তি পূজা করতে পারবে না, তার বদলে সম্রাট শাদ্দাদকে সকলের পূজা করতে হবে।

সাত মুলুকের বাদশাহ শাদ্দাদ, তার হুকুমের ওপরে কথা বলে এমন সাধ্য কারো নেই। সুতরাং তার হুকুম মতো কাজ চলতে লাগলো।

একদিন গুদ নামক একজন পয়গম্বর তার দরবারে এসে হাজির হলেন। পয়গম্বরেরা খোদার খুব  প্রিয়। তাঁরা নবাব বাদশাহদের ভয় করতে যাবেন কেন। হুদ পয়গম্বর তাকে বললেনঃ তুমি নাকি খোদার ওপর খোদকারী করার চেষ্টা করছো? তোমার এ দুঃসাহস কেন? পরকালের ভয় যদি থাকে তবে আল্লাহতা’লার উপর ঈমান আনো।

হুদ নবীর দুঃসাহস দেখে দরবারের সকলে অবাক! উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র যার ভয়ে সর্বদা সন্ত্রস্ত-স্বয়ং বেগম সাহেবা যার কথার ওপরে কথা বলতে পারেন না, সামান্য একজন দরবেশ কিনা তাকে দিচ্ছে উপদেশ! এত বাচালতা! ক্রোধে শাদ্দাদের চোখ দুটো দাল হয়ে উঠলো। মেঘগর্জনের মতো হুঙ্কার দিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলোঃ মূর্খ ফকির, তোমার খোদাকে মানতে যাবো কিসের জন্য?

হুদ নবী বললেনঃ তিনি পরম মঙ্গলময়। তিনি দুনিয়াতে তোমাকে সুখে রাখবেন এবং মৃত্যুর পর তোমাকে বেহেশতে থাকতে দিবেন।

শাদ্দারেদ ওষ্ঠে এইবার ক্রোধের পরিবর্তে হাসি ফুটে উঠলো। বললোঃ তোমার খোদা কি আমার থেকেও বেশী সুখী।

হুদ হেসে জবাব দিলেনঃ নিশ্চয়ই! খোদাতা’লা নেকবান্দার জন্য বেহেশত তৈরি করেছেন। দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলে পরকালে বেহেশত। বেহেশতের অতুলনীয় শোভা, অনন্ত শান্তি, অফুরন্ত সুখ, চাঁদের মতো খুবসুরৎ হুরী তো তুমি ভোগ করতে পারবে না।

শাদ্দাদ অবজ্ঞা ভরে হো-হো করে হেসে উঠলো। বললোঃ রেখে দাও তোমার খোদার বেহেশতের কাহিনী। অমন আজগুবি গল্প ঢের ঢের শুনেছি।

হুদ বললেনঃ আজগুবি নয় –সত্যি সত্যিই। খোদার এমন অপরূপ বেহেশত কি তোমার পছন্দ হয় না?

শাদ্দাদ জবাব দিলোঃ হবে না কেন –এমন আজব বেহেশত কার অপছন্দ বলো? কিন্তু তাই বলে তোমার খোদার পায়ে আমি মাথা ঠুকতে যাবো কেন? আমি কি খোদার মতো বেহেশত তৈরি করতে পারি না!

হুদ বললঃ বাদশাহ, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে, নইলে এমন কথা বলতে না। খোদা যা করতে পারেন তা মানবের সাধ্যাতীত।

শাদ্দাদ সহাস্যে বললোঃ মূর্খেরা এমন কল্পনাই করে বটে! কিন্তু আমি নিশ্চয়ই পারবো। তোমার খোদার চেয়ে আমার টাকা পয়সা লোক-লস্কর কিছু অভাব আছে নাকি? আমি দেখিয়ে দেবো, তোমার খোদার বেহেশত থেকে আমার বেহেশত কত বেশি সুন্দর।

শাদ্দাদের কথা শুনে হুদ ভয়ানক রেগে গেলেন। বললেনঃ মূর্খ বাদশাহ এত স্পর্ধা তোমার! শীঘ্রই দেখতে পাবে –এত অহঙ্কার কিছুতেই খোদা সহ্য করবেন না।

শাদ্দাদ ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেনঃ কে আছ, এই ভিখারীটাকে ঘাড়  ধরে বের করে দাও।

হুদ নবী অপমানিত হয়ে চলে গেলেন।

কিছুদিন পরের কথা।

বদখেয়ালী শাদ্দাদ তার তাঁবেদার বাদশাহদের ফরমান জারি করে জানালেনঃ খোদার বেহেশতের চেয়ে বেশী সুন্দর করে অপর একটি বেহেশত আমি সৃষ্টি করতে সঙ্কল্প করেছি। সুতরাং উপযুক্ত জায়গায় সন্ধান করো।

হুকুম মাত্র জায়গা তল্লাসের ধুম পড়ে গেলো। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবার দেশের এয়মন স্থানটি সকলের পছন্দ হলো। স্থানটি লম্বায় আট হাজার মাইল আর চওড়ায় ছিলো পাঁচ হাজার মাইল।

বেহেশতের উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেছে শুনে শাদ্দাদ খুশী হলো। তারপর হুকুম জারি করলো যে সাত মুলুকে যে, সব হীরা, মণি, মুক্তা, জহরৎ আছে সব এক জায়দগায় জড়ো করতে হবে। বাদশাহের হুকুম কেউ অমান্য করতে সাহস করলো না।

দেখতে দেখতে দামী দামী হীরা, মণি, পান্না, জহরৎ এয়মন মুলুকে জমা হতে লাগলো।

দুনিয়ার যেখানে যত সুন্দর মূল্যবান জিনিস ছিলো বেহশত সর্বাঙ্গ সুন্দর ইয়াকুত ও মার্বেল যোগার করা হলো। লক্ষ লক্ষ মজুর ও কারিগর কাজ করতে আরম্ভ করলো। দিনরাত পরিশ্রম করে তিনশ’ বছর ধরে বেহেশত রচনা করা হলো। তা সত্য সত্যই বিচিত্র কারুকার্যময় ও অপূর্ব চমকপ্রদ হয়েছিল।

এই বেহেশতের যে দিকে নজর দেওয়অ যায় সেই দিকেই অপরূপ। চারিদিকে শ্বেত পাথরের দেওয়াল ও থাম, তাতে কুশলী শিল্পীদের চমৎকার কারুকার্য-দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। দেয়ালের গায়ে নানা রঙের ইয়াকুত পাথর দিয়ে এমন সুন্দর লতাপাতা ও ফুল তৈরি করা হয়েছে যে, ভ্রমর ও মৌমাছির জীবন্ত মনে করে তার ওপরে এসে বসে। রঙমহলের চারিপাশে হাজার হাজার ঝড় লণ্ঠন ঝুলছ, কিন্তু বাতির দরকার হয় না। অন্ধকার রাত্রেও সেই ঘরগুলো চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল।

মহরে ধারেই বসবাস ঘর ও হাওয়াখানা। মণিমুক্তা-খচিত শ্বেত ও কৃষ্ণবর্ণ পাথরের কৌচ ও মেঝে সজ্জিত রয়েছে। মেঝের ওপরে নানারঙের নানা আকারের সুন্দর সুন্দর ফুলদানী, তাতে সাজানো রয়েছে জমরদ ও ইয়াকুত পাথরের নানা রকমের ফুলের তোড়া। তা থেকে আতর গোলাপ মেশক ও জাফরাতের খোশবু ছুটছে।

মহলের চারিপাশে বাগান। বাগানে সোনা রূপার গাছ। তার পাতা, ফল, ফুল, নানা বর্ণের পাথর দিয়ে তৈরি। ভ্রমর ও মৌমাছিগুলো এমন সুন্দরভাবে নির্মিত যে তারা বুঝি সত্য সত্যই ফুলের ওপরে বসে মধু পান করছে। সেই সব ফুলফল থেকে যে সৌরভ বের হচ্ছে তাতে চারিদিকের বাতাস ভর ভর করছে।

এই সব গাছের নিচে দিয়ে কুল কুল শব্দে বয়ে চলেছে গোলাপপানির নহর। তার পানি এত স্বচ্ছ যে, মনে হয় তরর মুক্তার ধারা বয়ে যাচ্ছে। সেই নহরের ধারে ধারে হীরা-মণি-মুক্তার বাঁধানো ঘাট। সেখানে চুনি-পান্নার তৈরি শত শত সুন্দরীরর যেন গোসল করছে।

তার পরেই নাচঘর। কোনো ঘরে ওস্তাদেরা হাত নেড়ে মাথা দুলিয়ে নানা অঙ্গতরী করে গান করছে, বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে –কোনো ঘরে কিন্নকণ্ঠি সুন্দরী বালিকারা তালে তালে নাচছে এবং গান গাইছি। এরাই শাদ্দাদের বেহেশতের হুরী। নানা দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে এদের এখানে জমায়েত করা হয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নাচছে চাঁদের মতো খুবসুরৎ হাজার হাজার কচি কচি বালক।

অনিন্দ্য সুন্দর করে বেহেশত নির্মাণ করা হয়ে গেলো। শাদ্দাদকে সংবাদ দেওয়া হলো। সে তখন অধীন নবাব বাদশাহদিগকে হুকুমজারি করে জানিয়ে দিলো, তারা যেন শীগগিরই শাদ্দাদের সহিত মিলিত হয়। তাদের সঙ্গে নিয়ে সে তার বেহেশত দেখতে যাবে। প্রজাগণকে আমোদ আহলাদ করবার হুকুম দেওয়া হলো। বাদশাহের হুকুম মেনে তারা নাচ করতে লাগলো এবং হরদম বাজি পোড়াতে লাগলো।

এক শুবদিনে সুন্দর সুসজ্জিত ঘোড়ায় চড়ে পাত্র-মিত্র, উজীর-নাজীর, লোক-লস্কর, সৈন্য-সামন্ত সঙ্গে নিয়ে ঢাক, ঢোল, কাড়া, নাকাড়া, দামামা বাজাতে বাজাতে হাজারবাদশাহ তার সৃষ্ট বেহেশত দেখতে চললো।

গল্পগুজব করতে তারা এগিয়ে চললো। দূর থেকে নজর পড়লো বেহেশতের একটা অংশ। এত চমকপ্রদ, এত জমকালো যে, চোখ ঝলসে যেতে লাগলো। আনন্দে শাদ্দাদের মুখ দিয়ে কথা সরলো না। তাপর একটু সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে লাগলোঃ ঐ আমার বেহেশত! ঐ বেহেশতের সিংহাসনে আমি খোদা হয়ে সববো, আর তোমরা হবে আমার ফেরেশতা। হুরীর যখন হাত পা নেড়ে নাচবে আর গাইবে তখন কি মজাই না হবে।

উজীর-নাজীর ওমরাহগণ তার কথায় সায় দিয়ে তোষামোদ করে তাকে কুশী করতে লাগলো। এমনি করতে করতে তারা বেহেশতের দরজায় এসে হাজির হলো। শাদ্দাদ সকলের আগে আগে যাচ্ছিল! সে বেহেশতের দ্বারদেশে একটি রূপবান যুবক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো। তার সুন্দর চেহারা দেখে খুশী হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলোঃ তুমি কি এই বেহেশতের দারোয়ান?

যু্বক উত্তর করলোঃ আমি  মালাকুল মওৎ!

শাদ্দাদ চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলোঃ তাঁর মানে?

যুবক উত্তর করলোঃ আমি আজরাইল। তোমার প্রাণ বের করে নিয়ে যাবার জন্য খোদা আমাকে পাঠিয়েছেন।

শাদ্দাদ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। চিৎকার করে বললোঃ সাবধান! আমার সঙ্গে তামাসা! কে আছিস বলে অন্যের প্রতীক্ষা না করে নিজেই খাপ থেকে তরবারী বের করে যুবককে কাটতে অগ্রসর হলো।

কিন্তু কি আশ্চর্য! তার হাত উঁচু হয়েই রইলো। উত্তেজনায় শরীর দিয়ে দরদর ধারায় ঘাম নির্গত হতে লাগলো। চিৎকার করে বললোঃ সৈন্যগণ, শয়তানকে মাটিতে পুঁতে ফেলো।

যুবক অট্টহাসি হেসে প্রশ্ন করলোঃ কই তোমার সৈন্য সামন্ত?

শাদ্দাদ পিছন ফিরে দেখতে পেলো, তার লোক-লস্কর, সৈন্য-সামন্ত একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভয়ে সে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো। তারপর ভীত কণ্ঠে বললোঃ সত্যই তুমি কি আজরাইল?

আজরাইল বললোঃ হ্যাঁ। দেরী করবার ফুরসৎ আমার নেই। আমি এখনই তোমার প্রাণ বের করে নেবো।

শাদ্দাদ চারিদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলো। সে শিশুর মতো নিঃসহায়ভাবে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলো। মিনতি করে বললোঃ একটু সময় আমাকে দাও ভাই আজরাইল। অনেক সাধ করে আমি বেহেশত তৈরি করেছি, একটিবার আমায় তা দেখতে দাও! এই বলে সে ঘোড়া থেকে নামবার চেষ্টা করলো।

মেঘের মতো গর্জন করে আজরাইল বললোঃ খবরদার, এক পা এগিয়ে আসবে না। শাদ্দাদ হাউ-মাউ করতে শুরু করে দিলো। সেই অবস্থাতেই আজরাইলতার প্রাণ বের করে নিয়ে চলে গেলো।

তারপর কি হলো?

হঠাৎ একটা ভীষণ  আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে শাদ্দাদের অতি সাধের বেহেশত, তার শ্রী, ঐশ্বর্য, লোক-লস্কর, উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র সবকিছু চক্ষের পলকে মাটির মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেলো। দুনিয়ার ওপরে তার আর কোন চিহ্নই রইলো না।  শুধু মানুষের মনে চিরদিনের মতো আঁকা হয়ে রইলো আত্মম্ভরিতা অহঙ্কারের শাস্তি কিরূপ ভয়ঙ্কর।

পাপাচারী জমজম

অনেকদিন আগের কথা। একদিন হযরত ঈসা সিরিয়ার পথে যেতে যেতে একটা মানুষের মাথার খুলি পড়ে রয়েছে দেখতে পেলেন। সেই খুলিটার সঙ্গে কথা বলবার জন্য তাঁর খেয়াল হলো। তিনি তখনই খোদার দরগায় আরজ করলেনঃ হে প্রভু আমাকে এই খুলির সঙ্গে কতা বলবার শক্তি দাও।

খোদা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। হযরত ঈসা খুলিকে বললেনঃ হে অপরিচিত কঙ্কাল, তোমাকে যে কথা জিজ্ঞাসা করবো, তার ঠিক ঠিক উত্তর দাও।

বলবার সঙ্গে সঙ্গে ঈসা শুনতে পেলেন, পরিস্কার ভাষায় সেই খুলিটা ‘কলেমা শাহাদাত’ পাঠ করলো।

ঈসা জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি পুরুষ না স্ত্রী?

খুলি উত্তর করলোঃ পুরুষ।

ঈসা বললেনঃ তোমার নাম কি?

খুলি উত্তর করলোঃ জমজম।

ঈসা আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি আগে কি ছিলে?

খুলি উত্তর করলোঃ আমি আগে বাদশাহ ছিলাম!

ঈসা বললেনঃ বটে। তোমার জীবনে কি কি কাজ করেছিলে?

খুলি উত্তর করলোঃ আমি আগে একজন বাদশাহ ছিলাম। ধন-দৌলত, লোক-লস্কর আমার এত বেশি ছিলো যে, দুনিয়ার বাদশাহরা তা দেখে অবাক হয়ে যেতো। তারা আমাকে খুব ভয় আর সম্মান করতো। আমি কিন্তু কারো ওপর কোন অত্যাচার করতাম না। গরীব-দুঃখীদের সাধ্যমতো দান করতান। সমস্ত দিন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু ভুলেও কখনো খোদার নাম মুখে আনতাম না। এমনি করে অনেকদিন আমি বাদশাহী করেছিলাম। একদিন দরবারে বসে কাজ করছি, এমন সময় হঠাৎ আমার মাথা ব্যথা হলো। যন্ত্রণা ক্রমে বাড়তে লাগলো। কিন্তু যন্ত্রণা ক্রমে অহস্য হয়ে উঠলো। যেখানে যত বড় হেকিম ছিলো, চিকিৎসার জন্য তাদের সকলকে ডাকা হলো। কিন্তু কিচুতেই কিছু হলো না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম। মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়তে আরম্ভ করলাম। এমন সময় হঠাৎ একটা আওয়াজ আমার কাণে ঢুকলো। কেহ যেন চিৎকার করে বলছেঃ জমজমের প্রাণ বের করে দোজখে ফেলে দাও। সেই সঙ্গে সঙ্গে এক বিকট মূর্তি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। উঃ, কি ভীষণ তার চেহারা! দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। তারপর কি হলো আমার মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো তখন দেখলাম প্রাণ নিয়ে যাবার জন্য আজরাইল একা আসেনি –তার সঙ্গে আরো অনেক ফেরেশতা এসেছে। তাদের কারো হাতে লোহার ডাণ্ডা, কারো হাতে শিক, কারো হাতে তলোয়ার। সমস্তই আগুনের পোড়ান জবাফুলের মতো রাঙ্গা। তারা সেই সমস্ত দিয়ে আমাকে সেঁকা ও খোঁচা দিতে লাগলো। আমি যন্ত্রনায় চিৎকার করে বলতে লাগলামঃ ওগো তোমরা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমায় মেরো না। আমায় ছেড়ে দাও। আমার ভাণ্ডারে যত ধন-দৌলত হীরা-জহরৎ আছে সব তোমাদের দেবো। এই কথা শুনে তাদের মধ্যে একজন লোহার মতো শক্ত হাতে আমার গালে একটা চাপর দিয়ে বললোঃ রে নাদান! খোদা কারো ধন-দৌলতের পরোয়া করে না।

যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে কাতরভাবে তাদের মিনতি করে বললামঃ ওগো তোমরা আমায় ছেড়ে দাও। তার বদলে আমার বংশের প্রত্যেক আমি খোদার নামে কোরবানী করবো। এই বলে তাদের দয়ার ভিখিরী হয়ে কাতর নয়নে তাদেরদিকে চেয়ে রইলাম। তারা দাঁত কড়মড় করে ধমকে দিয়ে বললোঃ রে বেয়াদব! খোদা কি ঘোষখোর?

আজরাইল তখন ফেরশতাদের বললেনঃ আর দেরী করো না, এখনই এর প্রাণ বের করে দোজখে ফেলে দাও।

তারপর তারা আমার প্রাণ বের করে নিয়ে গেলো।

তারপর কি হলো আর জানবার ক্ষমতা রইলো না। হঠাৎ মনে হলো যেন আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। চোখ খুললাম। আমি কোথায় আছি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না। অন্ধকার, চারিদিকে ঘন অন্ধকার –আলো নেই, বাতাস নেই। এই অবস্থা আমার অসহ্য হয়ে উঠলো, ক্রমে বুঝতে পারলাম যে আমাকে কবর দেওয়া হয়েছে আর সেই কবরের মধ্যে যেন হাজার ফেরেশতা এক সঙ্গে চিৎকার করে বলছেঃ রে নাদান! আমরা তোর প্রাণ বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম পুনরায় তোর দেহের মধ্যে প্রাণ দিয়েছি। এখন এই কাফনের কাপড়ের উপর লেখ, দুনিয়ায় তুই কি কি কাজ করেছিস।

জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যা যা করেছি সব আমার মনে স্পষ্ট জাগতে লাগলো। আমি এক এক করে অল্প সময়ের মধ্যে লিখে ফেললাম।

তারপর ফেরেশতারা ভয়ানক গর্জন করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ বল তোর খোদা কে?

আমি ভয়ে ভয়ে উত্তর করলামঃ তোমরাই আমার খোদা। আমি অন্য খোদা জানি না। তোমরা আমাকে রক্ষা  করো।

এই কথা শুনে তারা ভয়ানক রেগে গেলো। লোহর ডাণ্ডা দিয়ে আমাকে বেদম প্রহার আরম্ভ করলো। তারপর মনে হতে লাগলো, কবরের মাটি চারিদিক থেকে যেন আমাকে পিষে ফেলবার চেষ্টা করছে। ক্রমে দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। মাটি চিৎকার করে বলতে লাগলোঃ রে বেঈমান! শত শত বৎসর আমার পিঠের উপরে বাদশাহী করে কত অত্যাচার করেছিস আর খোদার না-ফরমানী করেছিস তাই তোর এই শাস্তি। এই কথা বলে মাটি আমার হাড়গুলোকে গুঁড়ো করে ফেলবার চেষ্টা করতে লাগলো।

অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেছি এমন সময়ে কতকগুলি ভীষণ-মূর্তিজীব আমাকে ধরে ওপরে নিয়ে গেলো। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাবলাম, খোদা মেহেরবানি করে আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু সে ভরসা শূন্যে মিলিয়ে গেলো যখন দেখলাম তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেলো আর একজন লম্বা সাদা দাড়িওয়ালা বিকট চেহারার লোকের কাছে। সে লোকটা ভীষণ চিৎকার করেবলে উঠলোঃ এই কমবখতকে (হতভাগ্যকে) আগুনের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলো, তারপর পায়ের দিক থেকে উল্টো করে ছিড়ে ফেলো।

তারা কখনই প্রভুর হুকুম তামিল করতে আরম্ভ করলো। এরপর তারা আমাকে পচা দুর্গন্ধময় একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলো।

ক্ষুধায়, পিপাসায় আর অসহ্য যন্ত্রণায় হৃদপিণ্ড যেন বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। আমি কাতরভাবে তাদের বললামঃ দোহাই তোমাদের, আমাকে এক পাত্র পানি দাও।

ফেরেশতারা কিসের রস এনে আমাকে খেতে দিলো। চোখ বুঁজে সেই রস মুখের মধ্যে ঢেলে দিলাম। উঃ কি বিশ্রী দুর্গন্ধ? মনে হতে লাগলো এ জিনিস না খাওয়াই আমার পক্ষে ভাল ছিলো! চিৎকার করে বলতে লাগলামঃ কে আছ, আমায় এক পাত্র পানি দাও, পিপাসায় আমার প্রাণ যায়।

সেই কাতরোক্তি শুনে অপর একজন ফেরেশতা এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো। মনে ভরসা হলো, এইবার বুঝি বেঁচে গেলাম। চোখ বুঁজে এক নিঃশ্বাস সবটুকু পান করলাম। উঃ এ যে আরো কটু ও দুর্গন্ধ! সমস্ত অন্তরটা জ্বলে যেতে লাগলো। নাক, মুখ, চোখ, কান এমন কি লোমের গোড়া দিয়ে পর্যন্ত দুর্গন্ধ বের হতে লাগলো। আমি চিৎকার করতে লাগলামঃ তোমরা এমন তিল তিন করে যাতনা দিয়ে আমাকে না মেরে যা করবার একেবারেই করে ফেলো। আমি আর সহ্য  করতে পারছি না।

তারা কেউ আমার কথা গ্রাহ্য তো করলোই না বরং আমার সেই অবস্থা দেখে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে লাগলো। আমি যতই যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলাম, ততই তারা হো-হো করে হাসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে একজন ভীষণদর্শন ব্যক্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। তার ভয়াবহ আকৃতি  দেখে আমার বুক শুকিয়ে গেলো। সে তার বিষ-মাখানো লম্বা নখে আমাকে গেঁথে শূন্যে সোকরাৎ নামক এক পাহাড়ে নিয়ে গেলো। সেই পাহাড়ে সাতটা কূপ। প্রত্যেক কূপ থেকে বিষাক্ত গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। প্রত্যেক কূপে হাজার হাজার বিষাক্ত সাপ ও বিছা পরস্পর কামড়া-কামড়ি করছে আর তাদের মুখের বিষ-নিঃশ্বাসের এই ধুম নির্গত হচ্ছে। ফেরেশতারা আমার চুল ধরে সেই কূপের মধ্যে ফেলে দিলো। সাপ-বিছারা চারিদিক থেকে আমাকে কামড়াতে আরম্ভ করে দিলো। জ্বালায় চিৎকার করতে  লাগলাম।

তারপর তারা আমাকে এক পুকুরের কাছে নিয়ে গেলো। সে পুকুরে পানি নেই, শুধু পুঁজ, রক্ত ও বিষে ভলা সেই পুকুর। আমার চুল ধরে সেই পুকুরের মধ্যে জোর করে তারা ডুবিয়ে রাখলো। যতই ওপরে উঠার চেষ্টা করি, ততই তারা জোর করে আমাকে চেপে ধরে রাখতে লাগলো। এই  রকম করে এক কূপ থেকে আর এক কূপে এবং এক পুকুর থেকেআর এক পুকুরে হাজার বার ডুবিয়ে হাজার বার তুলে একশত বছর ধরে আমাকে কষ্ট দিলো।

তারপর আজ হঠাৎ শুনতে পেলাম কে যেন কাকে বলছে, যে পথে হযরত ঈসা যাচ্ছেন সেই পথে জমজমকে দোজখ থেকে তুলে ফেলে দাও। দুনিয়াতে সে অনেক ভাল কাজও করেছিলো। অন্নহীনকে অন্ন এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করেছিলো! সে আজ তার পুরস্কার পাবে। সে খোদার নাম একবারও মুখে আনেনি বলে যে পাপ করেছিলো তার শাস্তি পুরোমাত্রায় ভোগ করবার পর আবার দুনিয়াতে যাবে।

ঈসা জিজ্ঞাসা করলেনঃ জমজম তুমি আমার কাছে কি চাও?

জমজম বললোঃ তুমি খোদার কাছে এই প্রার্থনা করো, তিনি যেন আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন।

ঈসা দুই হাত তুলে জমজমের জন্য খোদার কাছে আরজ করলেন। তারপর বললেনঃ জমজমের হাড় মাংস সমস্ত একত্র হয়ে পুনর্জীবন লাভ করুক।

বলতে না বলতে একটি সুদর্শন যুবক মাটি থেকে দাঁড়িয়ে হযরত ঈসাকে সালাম করলো।

 

About বন্দে আলী মিয়া