সাহাবীদের গল্প শোন

দৃপ্ত ঈমানের ফুলকি

নাম হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা)। দুরন্ত সাহসী এক সাহাবী। অত্যন্ত মেধাবী ও অসাধারণ জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। তবে স্বভাবে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও অতিশয় দীনহীন। তিনি খুব সাধারণবাবে জীবনযাপন করতেন। তাঁর জীবনচলায় বাহুল্য বলতে কিছু ছিল না। জাঁকজমক ও চাকচিক্য তিনি মোটেও পছন্দ করতেন না। কোনো রকমে চলতে পারলেই তিনি খুশী হতেন।

একদিনের ঘটনা

শাম দেশের ফাহলে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। খ্রিষ্টান রোমানরা ছিল মুসলমানদের প্রতিপক্ষ। তারা মুসলিম বাহিনীর রণ-প্রস্তুতির কতা শুনে ঘাবেড় গেল। রোমানরা ভাবল মুসলমানদের সাথে এখনই যুদ্ধ করা সমীচীন হবে না। তাই রোমান সেনাপতি সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলো।

মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আবু উবাইদা (রা)। তখনকার যুগের সেনাপতি অত্যন্ত দক্ষ ও পারদর্শী সেনাপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সুনিপুণ যুদ্ধ বিশারদ হিসেবে আবু উবাইদার নাম সর্বত্র আলোচিত হতো। আর মুয়াজ (রা)? তিনিও একজন দক্ষ সমরবিদ ও পারদর্শী কূটনীতিক হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় তিনি ছিলেন অনন্য। তাই সেনাপতি উবাইদা (রা) রোমানদের সাথে আলোচনার জন্য মুয়াজ (রা)-এর নাম ঠিক করলেন। সন্ধি স্থাপনের বিষয়টি যে কারোর পক্ষে আলোচনা করা সমীচীন নয়। এর জন্য চাই জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক। এ ক্ষেত্রে হযরত মুয়াজই ছিলেন এগিয়ে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা) সময়মত রোমাদন সেনা ছাউনিতে গিয়ে হাজির হলেন। কিন্তু তাঁবুতে পা রেখেই অবাক হলেন তিনি। অতিশয় জাঁকজমক ও চাকচিক্য করে সাজানো হয়েছে সেই তাঁবু। সেখানে বিছানো হয়েছে সোনালী কারুকাজ করা গালিচা। দেখে মনে হলো, এটা যেন এক বাদশাহি বালাখানা।

একজন পদস্থ রোমান সৈনিক তাঁবুর গেটে হযরত মুয়াজকে সাদর সম্ভাষণ জানাল। তারপর রীতি অনুযায়ী তাঁকে তাঁবুর ভেতরে নিয়ে গেল। একটি অনিন্দ্য সুন্দর আসনে নিয়ে তাঁকে বসানো হলো। এসব আয়োজন হযরত মুয়াজের মোটেও পছন্দ হলো না। তাই তাঁর চোখে-মুখে বিরক্তির ভাব পরিলক্ষিত হলো। তিনি বললেনঃ দেখুন ভাই, আমি এসব রাজকীয় জাঁকজমক পছন্দ করি না। কারণ, দরিদ্র মানুষকে শোষিত ও বষ্ণিত রেখে এসব দামি আসন বানানো হয়েছে। একথা বলেই তিনি মাটির ওপর বসে পড়লেন। মুয়াজের অবস্থা দেখে খ্রিষ্টানরা তো হতবাক। একজন সেনা তাই বললঃ আপনি এক মহান ব্যক্তি। আপনি দেশেল নামীদামী লোক। চারদিকে আপনার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। অনেকেই আপনাকে সম্মান করে। আমরাও আপনাকে অসম্ভব সম্মান করি। তাই সম্মানজনক স্থানেই আমরা আপনাকে বসাতে চাই। অথচ আপনি তা পরিহার করলেন?

খ্রিষ্টান সৈন্যের কথা শুনে মুয়াজ (রা) মুচকি হাসলেন। তারপর বললেনঃ শোন সেনারা! তোমরা আমাকে অনেক বড় বলে জানলেও আমি কিন্তু তা নই। আমি অতি সাধারণ ও নগণ্য মানুষ মাত্র। অত সম্মান ও চাকচিক্য আমার প্রয়োজন নেই। আর তাই মাটিতে বসতেও আমার অসুবিধা নেই।

হযরত মুয়াজের কথা শুনে খ্রিষ্টানরা আরেকবার বিস্মিত হলো। তারা বলল, কী অবা কথা বলছেন আপনি! আপনি তো অনেক বড় মাপের মানুষ। আপনি মোটেও সাধারণ নন। তাই মাটিতে বসা আপনাকে মানায় না। মাটিতে তো বসবে দাসেরা।

খ্রিষ্টানদের কথা শুনে মুয়াজ (রা) আরেকবার হাসলেন। তিনি মনে মনে বললেন, তোমরা জান না সৈন্যরা, এ মুয়াজই আল্লাহর বড় দাস। আর এ দাসের কোন বিলাসিতা নেই। এবার হযরত মুয়াজ (রা) দৃঢ়ভাবে বললেন: ভাই, তোমরা ঠিকই বলেছ। মাটিতে বসা দাস শ্রেণীর লোকদেরই কাজ। সমাজে ওরা ছোট, তাই ওরা মাটিতে বসে। আমিও যে আল্লাহর খুবই নগণ্য এক দাস। তাই মাটিতে বসতে পারায় আমি ধন্য হয়েছি।

হযরত মুয়াজ (রা) নিজেকে দাস বলে স্বীকৃতি দেয়ায় খ্রিষ্টানরা অবাক হলো। তাই তারা বিস্ময়ের সাথে হযরত মুয়াজের মুখের দিকে অনেকক্সণ অপলকনেত্রে তাকিয়ে রইল। তাদের বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না। তাই হযরত মুয়োজের প্রতি তাদের কৌতুহল আরও বেড়ে গেল।

:আপনার চেয়েও বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তি কি আপনাদের মধ্যে আরও কেউ আছে? –জিজ্ঞেস করল খ্রিষ্টানদের একজন।

: কী বলছ তোমরা? আমি মর্যাদাবান? কে বলল তোমাদের? অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন হযরত মুয়াজ (রা)।

: মুসলমানদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আমার মতো অধম আর কেউ নেই। -মুয়াজ (রা) আবারো জানালেন।

এবার খ্রিষ্টানদের বিস্ময় আরও একবার বেড়ে গেল। হযরত মুয়াজের কথাবার্তা শুনে তারা বেশ ভাবনায় পড়ে গেল। মুসলমানদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সামর্থ্য নিতে তাররা চিন্তায় পড়ে গেল। মুসলমানদের আচরণ, ঐতিহ্য ও উদারতা তাদের মনকে নাড়া দিল। তারা আরও ভাবনায় পড়ল মুসলমানদের সাহস ও বীরত্ব নিয়ে। ফলে রোমানদের মদেন ভয়ের উদ্রেক হলো। তারা ভাবল, হযরত মুয়াজই যদি একজন সাধারণ মানুষ হন, তা হলে মুসলমানদের না জানি আরও কত অসাধারণ মানুষ আছেন! এমন অসাধারণ ও খোদাভীরু মুসলিম বাহিনীর সাথে লড়াই করা মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু। এদের সাথে যুদ্ধ করে জয়লাভের চিন্তা করাও বোকামী। তাই রোমানরা হযরত মুয়াজের সাথে সন্ধি স্থাপন করাকেই শ্রেয় বলে মনে করল। ফলে ভয়ানক যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত কেটে গেল।

হিজরী পনের সনের আরেকটি ঘটনা। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠায় ইয়ারমুক ময়দান কেঁপে উঠল। একদিকে মুসলিম বাহিনী, অন্যদিকে ইসলামবিরোধী কুফরী শক্তি। ভয়ানক যুদ্ধ চলছে ইয়ারমুকে। কুফরের দল সর্বশক্তি নিয়ে মুসলমানদর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এ যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্বে আছেন হযরত মুয়াজ (রা)। যুদ্ধ পরিচালনা করছেন তিনি। মুসলিম সেনারা প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ল। শত্রুপক্ষ বেশ শক্তিশালী। তাদের মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ল। তারপরও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে লড়ছে হযরত মুয়াজের সেনারা। সবার মধ্যে ছিল অদম্য সাহস ও আল্লাহতাআলার ওপর অপার ভরসা।

সেনাপতি মুয়াজ (রা) আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থাশীল। ঈমানের দৃঢ়তা ও সত্যের পাহাড়সম শক্তি তাঁর বুকে অসীম ফুলকি ছড়াচ্ছে। হযরত মুয়াজের স্বপ্ন আল্লাহর দ্বীনের গোলাপের পাপড়িতে ভরা। আল্লাহর মদদ যে হযরত মুয়াজের সাথে আছে তা তিনি ভালো করেই জানেন। তাই শত্রুরা প্রবল গতিতে ছুটছে দেখেও সেনাপতি বিচলিত হলেন না।

হযরত মুয়াজ (রা) এতক্ষণ তাঁর ঘোড়ার পিঠে সওয়ার অবস্থায় ছিলেন। তিনি সবকিছু গভীর মনোযোগসহকারে দেখছিলেন। আর যুদ্ধের কৌশল নিয়ে ভাবছিলেন। এবার তিনি ঘোড়া থেকে নেমে মাটিতে পা রাখলেন। তার সাথেই লড়তে এসেছে তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র। হযরত মুয়াজ ঘোড়াটি পুত্রের জন্য ছেড়ে দিলেন। মুয়াজ এবার নিজ পুত্রকে সাথে নিয়ে জ্বলে উঠলেন। প্রচণ্ড সাহস ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে হযরত মুয়াজ (রা) শত্রুদের মোকাবেলা করলেন। তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল মুসলিম সেনারা। ফলে ক্ষণিকের মধ্যেই পাল্টে গেল ইয়ারমুক ময়দানের দৃশ্য। হযরত মুয়াজ রোমান বাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।

সেদিন প্রাণপণে লড়লেন মুয়াজ (রা)। তাঁর সাহসের ফুলকিতে শত্রুরা পিছু হটতে শুধু করল। ফলে ইয়ারমুকে বিজয়ী হলো মুসলিম বাহিনী। শত্রুদের অনেকেই মারা পড়ল। কেউ বা বন্দী হলো। যারা ময়দান ছেড়ে পালাতে পারল, তারা জানে বেঁচে গেল।

হযরত মুয়াজের সাহসের আগ্নেয়গিরি ক্ষণিকের মধ্যে রোমান বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত করল। তাঁর সাহস ও আল্লাহর মদদে শত্রুদের সব বাধা তছনছ হয়ে গেল। ফলে আল্লাহর সৈনিকদের মুখে হাসি ফুটল। স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো ছিল এই হাসি। হযরত মুয়াজর দৃপ্ত ঈমানের ফুলকির কাছে মিথ্যার পাহাড় ভেঙেচুরে মিশে গেল।

ব ল তে  পা রো?

১। ফাহলের যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি কে ছিলেন?

২। হযরত মুয়াজ কেমন লোক ছিলেন?

৩। হযরত মুয়াজ মাটিতে বসে কী উক্তি করেছিলেন?

৪। ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি কে ছিলেন?

৫। ইয়ারমুকে কারা পরাজিত হলো?

সত্যপিয়াসী সাহাবী হযরত তালহা (রা)

হযরত তালহা (রা) একজন বিশিষ্ট সাহাবীর নাম। একসময় তিনি ব্যবসার কাজে গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। তাঁদের বাণিজ্য কাফেলা গিয়ে থামল এক বিশাল বাজারের পাশে। তাই সেখানে ছিল অনেক মানুষের ভিড়। কেউ ক্রেতা, কেউ বা বিক্রেতা। দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে এসেছে লোকজন। হযরত তালহা (রা) এসেছেন সুদূর মক্কা থেকে। উট-ঘোড়া-গাধাগুলো বেঁধে কাফেলার লোকজন ঢুকল বাজারে। হযরত তালহা (রা) লোকের ভিড় ঠেলে বাজারে একটি গলিপথ ধরে হাঁটছিলেন।

এমন সময় তাঁর কানে ভেসে এলো কোনো একজনের ভাষনের একটি আওয়াজ। তবে তা অস্পষ্ট হওয়ার কারণে তিনি কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলেন না। তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন, খানিকটা দূরে একটু উঁচুস্থানে দাঁড়িয়ে একজন লোক হাত নেড়ে নেড়ে কিছু একটা বলছে। পাশে অনেক লোকের একটা জটলাও দেখা গেল। হযরত তালহা (রা) লোকটির দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি শুনলেন লোকটি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছে, হে আমার ভাইয়েরা, এখানে কি মক্কার কোনো লোক আছে? তোমরা কি কোনো মক্কাবাসীর সন্ধান দিতে পার?

লোকটার কথা শুনে হযরত তালহা (রা) –এর মনে খটকা লাগল। কী ব্যাপার! লোকটা মক্কার অধিবাসী খুঁজছে কেন? আর সেখানকার লোক খুঁজতে এভাবে চিৎকার করেই বা বলতে হবে কেন? লোকটা কি কোনো সমস্যায় পড়ল, না কি সে কারও খোঁজ নিতে মক্কার লোক খুঁজছে? তালহা (রা) ভাবতে ভাবতে কয়েক কদম সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর হাত উঁচু করে লোকটার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন এবং বললেন,

: হ্যাঁ আমি আছি। আমি মক্কাবাসী। আমি কুরাইশ বংশের লোক। তুমি চাইলে আমাকে বলতে পার।

তালহা (রা)-এর কথা শুনে লোকটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাঁর চোখেমুখে যেন স্বস্তির আভা ফুটে উঠল। মনে হলো লোকটা যেন বহুদিন খুঁজে মক্কার এ লোকটির সন্ধান পেয়েছে। তাই দেরি না করে লোকটি হযরত তালহা (রা)-এর দিকে এসে বলল,

: তুমি মক্কা থেকে এসেছ? আচ্ছা, তুমি কি বলতে পার, তোমাদের দেশে আহমাদ নামে কি কেউ আসছে?

কথা শুনে তালহা (রা) ভাবনায় পড়ে গেলেন। লোকটার প্রশ্ন নিয়ে ভাবেন আর অবাক হন। বারবার ভালো করে তাকিয়ে দেখেন লোকটাকে পাগল বলে মনে হয় না। তাঁর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছুও লক্ষ করা যায় না। লোকটার শরীরে পাদরীর পোশাক, মানে লোকটা ধর্মে খ্রিষ্টান। দেখতে দেখতে তালহা (রা) –এর মন উৎসুক হয়ে উঠল। তিনি এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন,

: আচ্ছা জনব, আহমাদের কথা কেন জানতে চাইলেন? সে কার ছেলে? কী তার পরিচয়?

: তা হলে শোন, বলছি। আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ। তিনি এ মাসেই মক্কায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। তিনি শেষ নবী হয়ে এসেছেন।

: আবদুল্লাহর পুত্র আহমাদ! কই নামে কাউকে তো জানি না। এমন কারও নাম তো শুনিনি? নবী হবার এমন দাবির কথাও আমি জানি না। আচ্ছা, তুমি এসব জানলে কিভাবে? –তালহা (রা) প্রশ্ন করেন লোকটাকে।

: তা হলে মন দিয়ে শোন। আজ থেকে সাড়ে পাঁচশত বছর আগের কথা। দুনিয়ায় এসেছিলেন একজন নবী। নাম তাঁর ঈসা (আ)। আমরা তাঁকে যীশু বলে ডাকি। তাঁর ওপর এক আসমানী কিতাব নাজিল হয়েছিল। কিতাবের নাম ইঞ্জিল। এ কিতাবে মহান প্রভু আল্লাহতাআলার কাছ থেকে নাজিল হয়েছিল। এ কিতাবেই লেখা আছে আহমাদের নাম, তাঁর নবী হওয়ার কথা। এ রমজান মাসেই তি নবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। ইঞ্জিলের এ কথা মিথ্যা হতে পারে না। অবশ্যই আহমাদ নামে একজন নবী আসবেন।

লোকটার কথা যতই শুনছিলেন তালহা (রা) ততই যেন অবাক হচ্ছিলেন। তাঁর সত্যসন্ধানী মনের গভীরে চলছিল তোলপাড়। ক্ষণিকের মধ্যেই তিনি উতলা হয়ে উঠলেন। তাঁর চোখেমুখে এক নূরানী আভা যেন জ্বলজ্বল করে উঠল। লোকটা তালহার এ পরিবর্তন গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন। তালহা (রা)-এর মধ্যে এ অস্থিরতা দেখে লোকটা বললেন,

: হে যুবক! ব্যবসার কথা ভুলে যাও। এখনই চলে যাও মক্কায়। আহমাদ নামে লোকটিকে খুঁজে বের কর। তাঁর কথা শোন এবং তাঁর সাথেই থাক।

তালহা (রা) লোকটার কথা শুনতে শুনতে একসময় যেন চৈতন্য হারিয়ে ফেলেন। তাঁর মন চলে যায় সুদূর মক্কায়। এক ফাঁকে পাদরী কখন যে তাঁর দৃষ্টি থেকৈ ভিড়ের মাঝে হারিয়ৈ যান তিনি বলত পারেন না। তালহা (রা)-এর মন আবার উতলা হয়ে ওঠে। ব্যবসায় কাজে এসেছেন। কিন্তু কিছুতেই তাঁর মন বসছে না। ঘুরেফিররে পাদরীর কথাই তাঁর মনে বারবার উঁকিবুকি মারে। আহমাদের খবর জানতে তাঁর মন অস্থির হয়ে ওঠে।

অবশেষে তালহা (রা) তাঁর কাফেলার সাথীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা করেন মক্কায়। পথিমধ্যে যাকে পান তাকেই বলেন,

: তুমি কি মুহাম্মদকে চেন? তিনি নাকি নিজেকে নবী বলে দাবি করেছেন? তোমরা কি জান তাঁর ঠিকানা?

লোকজন তালহা (রা)-এর কথা শুনে অবাক হয়। কেউ বা বলে লোকটা পাগল নাকি? আরে কী বলে এসব? অনেকে আবার নানা কথা বলে যে যার কাজে চলে যায়।

এভাবে পথ চলতে তালহা (রা) একসময় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। তাঁর মধ্যে উতলা উতলা ভাব। এক অজানা অস্থিরতা তাঁকে যেন ঘিরে রেখেছে। তাই স্বজনরা তাঁর চারপাশে এসে ভিড় করে। তাঁকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। সবাই বলে, কী হলো ছেলেটার? কোন অঘটন ঘটেনি তো? কাফেলার লোকদের সাথে ঝামেলা বাধেনি তো? সবাই তাঁকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। তিনি তার কোনো জবাব দেন না। একসময় তালহা (রা) আত্মীয়দের বলেন,

: আচ্ছা, তোমরা কি আহমাদ নামে কাউকে চেন, কাউকে কি তোমরা নবী বলে দাবি করতে শুনেছ?

হযরত তালহার প্রশ্দন শুনে আত্মীয়-স্বজনরা সবাই তো হতবাক। তাদের সবার প্রশ্ন, একি কথা বলছে তালহা! ওর হলো কী? ও কার কথা বলছে? কেউ বা বলে ছেলেটার মাথা খারাপ হলো নাকি?

আপনজনরা তাঁকে সান্ত্বনা দেন। বিশ্রাম নিতে বলেন। কিন্তু তালহা (রা)-এর অস্থিরতা কাটে না। কারও সান্ত্বনা বা অভয় হযরত তালহাকে টলাতে পারে না। তাঁর কথা একটাই,

: তোমরা বলো, কে এই আহমাদ? তিনি কোথায়? তাঁর সন্ধান আমাকে দাও। এভাবে চলতে চলতে একদিন হঠাৎ একজন বলে ওঠে,

: তালহা! বলি শোন। জানতে পারলাম, হাশেমি বংশের ছেলে আবদুল্লাহর পুত্রের নাম নাকি মুহাম্মদ। শুনেছি, তিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করছেন। তাঁর ওপর নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাজিল হয়েছে!

লোকটর কথা শুনে চমকে ওঠেন তালহা। তা হলে পাদরীর কথাই কি সত্যি! তালহা (রা) অস্থিরভাবে জিজ্ঞেস করেন,

: আচ্ছা, কবে তিনি নবী দাবি করেছেন? তিনি কী বলেছেন, শুনি।

লোকটি বলল,

: শোন তা হলে, সেদিনের কথা। তুমি ব্যবসার কাজে সিরিয়ায় যাওয়ার পরপরই ঘটে গেল সেই ঘটনা। কি অবাক কাণ্ড! আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ (সা০ নিজেকে নবী বলে দাবি করলেন।  এ নিয়ে যে কত কথা, কত আলোচনা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এটা নিয়ে নানাজন নানা কথা বলছে। অনেকেই মুহাম্মদ (সা)-এর কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। শুনলাম, আবু কোহাফার ছেলে আবু বকর (রা)ও নাকি তাঁর দলে যোগ দিয়েছে।

লোকটার মুখে মুহাম্মদ (সা)-এ খবর শুনে তালহা (রা)-এর মন উতলা হয়ে উঠল। হযরত আবু বকর (রা)-কে তিনি ভালো করেই জানেন। তাঁর সাথে হযরত তালহা (রা) –এর খুব জানাশোনা আছে। তাই তালহা (রা) তাঁর মন আর স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি ছুটে গেলেন আবু বকর (রা)-এর কাছে। তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, শুনলাম, মুহাম্মদ (সা) নবী হয়েছেন, আপনি কি এ খবর জানেন?

: তুমি ঠিকই শুনেছ। আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ (সা) নবী হয়েছেন। তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। -জানালেন হযরত আবু বকর (রা)।

: তা হলে আপনিও কি তাঁর অনুসারী হয়েছেন?

: হ্যাঁ তালহা। তোমার অনুমান ঠিক। আমি কালেমা পড়ে মুসলমান হয়েছি।

একথা শুনে হযরত তালহা (রা)-এর মন কেঁপে উঠল। আবু বকর (র)-এর কথায় তালহা (রা)-এর মনের দুয়ার খুলে গেল। আবু বকর (রা) তালহা (রা)-এর মনের অবস্থা অনুমান করতে পারলেন। তাই তিনি বললেন,

: শোন তালহা! মিথ্যা ও অন্যায় আর কতকাল চলবে? মিথ্যার বেসাতি করে কী লাভ? মূর্তি পূজার কোনো মানে হয় না, বরং চলে এসো, এক আল্লাহর পথে। তাঁর দরবারে মাথা নত করাই শ্রেয়।

হযরত আবু বকর (রা)-এর কথা শুনে তালহা (রা) আর কিছুই বলতে পারলেন না। খানিকক্ষণ অপলক নেত্রে চেয়ে থাকলে আবু বকর (রা)-এর দিকে। তাঁর মনের গভীরে কী যেন এক তোলপাড় খেলে গেল। আবু বকর (রা) তালহা (রা) –এর পরিবর্তন লক্ষ করে মনে মনে মহান স্রষ্টা আল্লাহর শোকরিয়া জানালেন। আর দেরি না করে আবু বকর (রা) হযরত তালহা (রা)-কে নিয়ে মহানবী (সা)-এর দরবারে হাজির হলেন।

পথে যেনে যেতে তালহা (রা)-এর মনে আল্লাহর নবী সম্পর্কে কল্পনার নানা ফানুস উড়ছিল। তাঁর কোন কিছুই যেন সহ্য হচ্ছিল না। মহানবী (সা)-কে দেখে তাঁর অতৃপ্তির চোখ কখন জুড়াবেন, সে জন্যই যেন তাঁর এই অস্থিরতা। তালহা (রা) যখন মহানবী (সা)-এর সামনে গিয়ে হাজির হলেন, তখন সীমাহীন প্রশান্তির এক বেহেশতি আবেশ তাঁর দেহমন ছুঁয়ে গেল। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। আর তখনই তিনি কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম কবুল করে নিলেন, শামিল হয়ে গেলেন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে।

এভাবে হযরত তালহা (রা)-এর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র সতের বছর।

ব ল তে  পা রো?

১। হযরত তালহা (রা) ব্যবসার কাজে কোথায় গেলেন?

২। তালহা (রা) বাজারে গিয়ে কী শুনতে পেলেন?

৩। লোকটি কার খোঁজ করছিল?

৪। লোকটি তালহা (রা)-কে কার ব্যাপারে কী বলছিল?

৫। হযরত তালহা (রা) কিভাবে মুহাম্মদ (সা)-এর কথা জানতে পারলেন?

৬। আবু বকর (রা) তালহাকে কী বললেন?

৭। কত বচর বয়সে তালহা (রা) ইসলাম কবুল করেন?

রাসূল (সা)-এর প্রতি ভালোবাসা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ছিলেন দুনিয়ার সেরা মানুষ। তাঁর কথা, কাজ, আচরণ, ব্যবহার সবই ছিল অতুলনীয়। তাঁর অনুপম চরিত্রমাধুর্য সবাইকে মুগ্ধ করত। তাঁকে ভালোবেসে কত মানষের মন যে বিগলিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মহানবী (সা)-কে কাছে পেয়ে অনেকে তাঁর জন্য জীবনে উৎসর্গ করেছে। অনেকের কাছে প্রিয় নবীর সান্নিধ্য মা-বাবার আদরের চেয়েও তুচ্ছ মনে হয়েছে। তাদেরই একজন জায়েদ (রা)। পিতার নাম হারেসা। তিনি বিশ্বাসে ছিলেন খ্রিষ্টান।

হযরত যায়েদ তখন খুব ছোট। চাঁদের মতো ফুটফুটে শিশু যায়েদ। মায়ের কলিজার টুকরো এ শিশু। জায়েদকে মা বুকে জড়িয়ে রাখেন। সোনামণিকে আদর করে মায়েরা যেমন প্রাণ জুড়ান, জায়েদের মায়ের অবস্থাও সে রকমই। কিন্তু  জায়েদকে বেশি দিন আদর করার ভাগ্য মায়ের হয়ে ওঠেনি।

একদিন মা আদরের সন্তানকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিলেন। আরব দেশের মরুময় পথ। সে জামানায় মরুপথে যাতায়াত ছিল সীমাহীন কষ্টকর। তখন সূর্যের প্রচণ্ড তাপ মাথায় নিয়ে চলতে হতো। তা ছাড়া ডাকাতের উপদ্রব তো ছিলই। ডাকাতরা মরুভূমির ফাঁক-ফোকরে ওঁৎ পেতে বসে থাকত। সুযোগ পেলেই এরা অকস্মাৎ পথচারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং লোকজনের সর্বস্ব লুট করে নিত। অনেক সময় ডাকাতরা লোকজনকে বন্দী করে নিয়ে যেত। এসব বন্দীকে তারা ক্রীতদাস হিসেবে হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দিন।

জায়েধ ও তাঁর মায়ের ভাগ্যও ঘটল একই ঘটনা। তারা ডাকাতের হাতে পড়লেন। তস্কররা তাদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেল। ছোট বালক জায়েদসহ অনেককে ডাকাতরা বন্দী করল। একদিন জায়েদকে বিক্রি করে দেয়া হলো। এ সুযোগে হাকিম নামে এক লোক জায়েদকে কিনে নিল।

হাকিম ছিলেন হযরত খাদিজা (রা)-এর আপনজন। হাকিমের খালা তিনি। হাকিম জায়েদকে এনে খালা খাদিজার হাতে সমর্পণ করলেন। খাদিজা (রা) ছিলেন আরবের সেরা ধনী মহিলা। তাই তাঁর ঘরে অনেক দাস-দাসী কাজ করত। আরও কাজের লোচ চাই তাঁর। তাই জায়েদকেও তিনি কাজের জন্য রেখে দিলেন। খাদিজার ঘরে বালক জায়েদ বড় হতে লাগলেন। জায়েদ ছিলেন খুব বিশ্বস্ত ও কর্মঠ।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত খাদিজার সাথে মহানবী (সা)-এর বিয়ে হলো। এবার হযরত খাদিজা বালক জায়েদকে স্বামীর খেদমতে নিয়োগ করলেন। মহানবী (সা)-এর সান্নিধ্য পেয়ে জায়েদ তো মহাখুশী। আল্লাহর নবী সাথে থাকা যে বড় ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্যবান না হলে কেউ আল্লাহর নবীর এ কাছের জন হতে পারত না। খাদিজা (রা) যেমন জায়েদকে ভালোবাসতেন, তেমনি মহানব (সা)ও তাঁকে আদর করতেন।

ছোটবেলা থেকে জায়েধ মা-বাবার তেমন একটা আদর পাননি। তাতে কী? তিনি হযরত খাদিজার কাছে মায়ের চেয়েও বেশী আদর পেয়েছেন। আর এখন মহানবী (সা)-এর কাছে পেলেন বাবার আদর। ফলে তাঁর আনন্দ ও সুখ আর কে দেখে? এমনি করে জায়েদের নিগুলো সুখে-আনন্দে ভালই কাটছিল। মহানবী (সা)-এর খেদমত আর ইসলামের কাজ ছাড়া তাঁর কোনো ভাবনা নেই। নেই কোনো পিছুটানও।

তবে একদিন ঘটল এক ঘটনা। একদল হজযাত্রী কাবাঘর জেয়ারত করতে মক্কায় এলো। তাদের সাথে হযরত জায়েদের দেখা হলে যাত্রীদের একজন হযরত জায়েদকে চিনে ফেলল। সে নিশ্চিত হলো, এই বালকই হারেসার হারানো পুত্র জায়েদ। তাই তারা বিষয়টি হারেসাকে জানাবে বলে ভাবল। হজ সেরে লোকেরা বাড়িতে ফিরে হারেসাকে ঠিকই সবকথা খুলে বলল। প্রাণপ্রিয় পুত্র জায়েদের খবর শুনে বাবা হারেসার বুক খুশীতে লাফিয়ে উঠল। তাই কালবিলম্ব না করে সে তড়িঘড়ি করে মক্কায় হাজির হলো। জায়েধ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে থাকেন। তাই হারেসা সোজা মহানবী (সা)-এর বাড়ীতে গিয়ে উঠল।

মহানবী (সা)-এর বাড়িতে গিয়ে হারেসা ঠিকই জায়েদকে দেখতে পেল। অনেকদিন পর প্রাণাধিক পুত্রের মুখ দেখে হারেসার চোখ বেয়ে নেমে এলো আনন্দ অশ্রু। সে মহানবী (সা)-কে বলল,

: দেখুন নবীজি! জায়েদ আমার ছেলে, বুকের ধন, ও আমার হারিয়ে যাওয়া মানিক। আমি ওকে নিতে এসেছি। জায়েদকে দয়া করে ফিরিয়ে দিন। এ জন্য যা মূল্য চান আমি তা দিতে প্রস্তুত আছি। আপনি তো মহামানব। তাই না করবেন না। আমার ছেলে আমাকে ফিরিয়ে দিন।

মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর নবী। মানবতার দিশারি তিনি। মানুষের কল্যাণে তাঁর প্রাণ ছিল অবারিত, উদার। তিনি মানুষের প্রভু হতে আসেননি, এসেছেন মানুষের বন্ধু হয়ে। মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তির সওগাত নিয়ে তিনি দুনিয়ায় এসেছেন। তিনি দয়া, মায়া, মমতা ও মানবতার অগ্রদূত। মা-বাবার কাছে সন্তানের যে মূল্য তা তিনি সম্যক অনুধাবন করতে পারেন। তাই জায়েদের পিতা হারেসার দুঃখ তিনি বোঝেন। জায়েদের জন্য কী মুক্তিপণ নেবেন মহানবী (সা)! বরং তিনিই তো মানুষকে তাঁর সর্বস্ব বিলিয়ে দেন।

এ ক্ষেত্রেও মানবতার দিশারি তার প্রমাণ দিলেন। জায়েদ তাঁর সেবক। শুধু সেবক বললে ভুল হবে। তিনি আল্লাহর নবী (সা)-এর খুবই প্রিয়জন। তারপরও মহানবী (সা) নিজের কথা ভাবলেন না। জায়েদকে তিনি সাহিমুখে হারেসার হাতে তুলে দিলেন। হারেসা তো হতবাক। এত সহজে ছেলেকে ফিরে পাবেন, তা ছিল হারেসার কল্পনারও বাইরে। মহানবী (সা)-এর উদারতা দেখে হারেসা আবেগে –কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হলো। তার খুশি আর কে দেখে? কারও হারানো পুত্র ফিরে পাবার আনন্দ ও তৃপ্তি যে কত মধুর তা ঐ মা-বাবা ছাড়া আর কারো অনুধাবন করাও কঠিন। আজ হারেসার মনের অবস্থাও তাই। পুত্র জায়েদকে পেয়ে হারেসার বুক ভরে গেল। সে ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।

এমন সময় ঘটল উলটো এক ঘটনা। জায়েধ এতক্ষণ ধরে সবই শুনছিল। এবার সে বেঁকে বসল। তার এক কথা, রাসুল (সা)-কে ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। জায়েদ বলল: আমি আমার বাবা ও মাকে পেয়ে গেছি। নবীজি আমার বাবা, খাদিজা (রা) আমার মা। তাঁরাই আমাকে সত্যিকারের আদর করেছেন। আমি বাবা-মাকে ছেড়ে কোথাও কারও কাছে যাব না।

বাবা হারেসা জায়েদের অনড় অবস্থা দেখে হতাশ হলেন। পুত্রকে অনেক করে বুঝালেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। এতে জায়েদের মন গলল না। অগত্যা সুখে মহানবী (সা)-এর সেবা করে যেতে লাগলেন। এভাবেই জায়েদ আজীবন মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে থেকে গেলেন।

দেখতে দেখতে জায়েদ বড় হলেন। বিয়ে শাদির সময় হলে নবীজির আপন চাচাতো বোন জয়নাবের সাথে তাঁর বিয়ে দেয়া হলো। ফলে নবী পরিবারে সাথে জায়েদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলো। জায়েদের এক ছেলে সন্তান ছিল। নাম উসামা। নবীজি তাকে বড্ড বেশি আদর করতেন। নবীজি তাঁর প্রিয় নাতি হাসান-হোসেনের মতোই উসামাকে ভালোবাসতেন।

মক্কা বিজয়ের দিনের ঘটনা। মহানবী (সা) উটে চড়ে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন। তখন তাঁর সাথে উটের পিঠে বসেছিলেন উসামা। তা থেকেই বোঝা যায়, উসামা মহানবী (সা)-এর কত কাছের জন ছিলেন। মহানবী (সা)-এর গভীর ভালোবাসা পেয়ে জায়েদ বাবা-মাকে পর্যন্ত ভুলে যেতে পেরেছেন। মহানবী (সা)-এর ভালোবাসার কাছে জায়েদের সবই ছিল তুচ্ছ। জায়েদের কাছে মহানবী (সা) ছিলেন এক পরশ পাথর। তাঁর জাদুকরী ছোঁয়ায় জীবন বদলে গিয়েছিল জায়েদের। এভাবে আরও কত লাখো কোটি মানুষের জীবনকে আল্লাহর নবী (সা)-এর আদর্শ বদলে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই!

ব ল তে  পা রো?

১। জায়েদ কে ছিলেন? তাঁর পিতার নাম কী?

২। একদিন বেড়াতে গিয়ে জায়েদের ভাগ্যে কী ঘটল?

৩। জায়েদের খবর কারা তার বাবাকে জানাল?

৪। জায়েদের পিতা মহানবী (সা)-কে গিয়ে কী বলেছিল?

হযরত খাব্বাব (রা)-এর অনন্য জীবন

মক্কার কাফের মুশরেকরা ছিল প্রবল ক্ষমতাধর। তারা ছিল প্রচণ্ড ইসলামবিরোধী। কাফেরেদে বেশির ভাগই ছিল ভয়ানক প্রকৃতির লোক। একেবারে ক্ষ্যাপা হায়েনার মতো ভয়ানক। উম্মে আনমার তাদেরই একজন। সে ছিল ব্যবসায়ী। দাস বেচা-কেনা ছিল তার পেশা। দাসরাও তো অন্যদের মতোই মানুষ ছিল। তবুও তখনকার দিনে বাজার নিয়ে দাসদের কেনা-বেচা করা হতো। মানুষকে মানুষ বেচত, কেউবা তাকে কিনত। এরকম কাজ যে কতটা অমানবিক ছিল তা কল্পনা করাও কঠিন। তবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর মুহাম্মদ (সা) এ অপমানজনক পেশার অবসান ঘটালেন।

উম্মে আনমার দাস বেচাকেনা করলে কী হবে? তার নিজের জন্যও এটা দাসের প্রয়োজন হয়ে পড়ল। তাই সে একজন বলিষ্ঠ ও ছটপটে দাস খুঁজছিল। দাস কেনার জন্য আনমার একদিন বাজারে গেল। শত শত দাস উঠেছে বাজারে। এদের মধ্যে একজনকে আনমারের খুব পছন্দ হলো। দাসটি ছিল বেশ জোয়ান ও শক্ত-সমর্থ। দাসটির নাম খাব্বাব। তাকে বেশ ভদ্র ও বুদ্ধিমদান বলে মনে হচ্ছিল। তাই দাসটিকে পেয়ে আনমার যারপরনাই খুশি হলো। বিক্রেতার দাবি মিটিয়ে আনমার খাব্বাবকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। সে দাসটিকে তরবারি তৈরির কলাকৌশল শেখানোর পরিকল্পনা নিল। তাই তাকে মক্কায় একজন কর্মকারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলো। খাব্বাব ছিলেন বেশ বুদ্ধিমান। তাই তিনি অল্পদিনের মধ্যেই তরবারি বানানো শিখে ফেললেন। হযরত খাব্বাবের বুদ্ধিমত্তা ও গুণের কারণে আনমার যারপরনাই খুশি হলো। দাসটির সাহস, যোগ্যতা ও ন্যায়নিষ্ঠা আনমারকে বিস্মিত করল।

তখন ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগ। ইসলামের দাওয়াত প্রচারের কাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছে। মহানবী (সা) অতি গোপনে দীনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা তাঁর সাথী হয়েছেন তাঁরাও অতি সাবধানে মানুষকে দীনের দাওয়াত দিচ্ছেন। ইসলাম প্রচারের এ খবর হযরত খাব্বাবের কানে এসে পৌঁছল। আর যায় কোথায়? তাঁর মন ছিল সত্যের প্রতি অনুরাগী। তাই হযরত খাব্বাব (রা) আর বসে থাকতে পারলেন না। তিনি চুপি চুপি মহানবী (সা)-এর কাছে গিয়ে তাঁর মনের বাসনা খুলে বললেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।

ইসলাম কবুল করার ফলে বদলে গেল হযরত খাব্বাবের জীবন। দীনের পরশ তাঁকে সত্যের প্রতি আরও বেশি আকুল করে তুলল। খোদায়ী দীনের স্পর্শ পেয়ে তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। এখন তাঁর একটাই ভাবনা। আল্লাহর কথা কিভাবে প্রচার করা যায়। কিভাবে ইসলামের আলো পথহারা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়। তিনি কামারশালায় কাজ করেন। আর ফাঁকে ফাঁকে শুধু আল্লাহর চিন্তায় মগ্ন থাকেন।

খাব্বাব (রা) নিজে থেকে না বললেও তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবর চাপা থাকল না। বাতাসের বেগে তা মক্কার সবখানে ছড়িয়ে পড়ল। এ খবর মনিব আনমারের কানেও গেল। দাস ইসলাম কবল করেছে! আনমারের মাথায় আগুন ধরে গেল। তাই ইসলামবিরোধী আনমার বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল।

ক্ষণিকের মধ্যেই আনমার তার দলবলসহ কামারশালায় গিয়ে হাজির হলো। সেখানে পেয়ে গেল খাব্বাবকে। আর যায় কোথায়? প্রচণ্ড রাগ ও উত্তেজনায় কাঁপছে আনমার। সে হুঙ্কার ছেড়ে বলল,

: তুই না কি মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছিস, বল, জবাব দে?

: হ্যাঁ করেছি, জবাব দিলেন খাব্বাব।

এমনিতেই আনামর ছিল বেশ উত্তেজিত। মুখের ওপর খাব্বাবের জবাব শুনে সে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো রেগে গেল। আনমার রাগতস্বরে বলল,

: তোর এত বড় সাহস? আমার কেনা গোলাম হয়ে তুই আমার ধর্ম ত্যাগ করেছিস? তুই নাস্তিক হয়ে গেছিস? বলতে বলতে খাব্বাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আনমার। তার দলের লোকেরা কামারশালার হাতুড়ি ও লোহার পাত দিয়ে হযরত খাব্বাবকে পেটাতে লাগল। গায়ে যত শক্তি ছিল তা দিয়ে খাব্বাব (রা)-কে এলোপাতাড়ি মারতে লাগল।

ফলে আঘাতের পর আঘাতে খাব্বাবের দেহ ক্ষতবিক্ষত হলো। তাঁর শরীরের চামড়া ছিঁড়ে গেল। মাথা কেটে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগল। টাটকা খুন ঝরতে জরতে খাব্বাবের দেহ প্রায় অবশ হয়ে পড়ল। অত লোকের শত আঘাত তিনি আর সইতে পারছিলেন না। ফলে একসময় জ্ঞান হারালেন। সেদিন তো এভঅবেই কেটে গেল। মারের এই ধাক্কা সামলাতে তাঁকে যে কী কষ্ট পেতে হয়েছে তা বর্ণনা করাও কঠিন। তারপর থেকে আরও বহুবার খাব্বাবকে অনেক জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। মার খেয়েছেন, জীবনেরও হুকমি এসেছে। তারপরও হযরত খাব্বাব (রা) দীনের স্পর্শ ত্যাগ করেননি।

অনেক সময় মনিবের লোকেরা তাঁকে পশুর মতো করে টেনে-হিঁচড়ে মরুভূমিতে নিয়ে যেত। ভর দুপুরে মরুভূমি আগুনের ফুলকি ছড়াত। আর এ সময় দুশমনরা হযরত খাব্বাবকে তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে রাখত।

কখনও তাঁর শরীরে লোহর বর্ম পরানো হতো। ফলে তিনি নড়াচড়া করতে পারতেন না। মাঝে মাঝে ফুটন্ত বালুতে উপুড় করে শুইয়ে খাব্বাবকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ফেলে রাখা হতো। ফলে গরমে তাঁর চামড়া পুড়ে যেত। অনেক সময় গরমে ঘাম ঝরতে ঝরতে খাব্বাব (রা) অবশ হয়ে যেতেন। তখন তৃষ্ণায় তাঁর বুক ফেটে যেতে চাইত। তিনি পানি চেয়ে চিৎকার করতেন। এতে কাফেররা কুশি হতো। তারা হায়েনার মতো কপট হাসি হেসে খাব্বাবকে উপহাস করত। এক ফোঁটা পানি তো দিতই না, বরং তারা খাব্বাবকে উদ্দেশ্য করে বলত,

: বোঝ মজা। মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করার শাস্তি বোঝ। এবার মাথা ঠিক হয়েছে তো? তা হলে ইসলাম ত্যাগ কর। নতুন ধর্ম ত্যাগ করলে তোকে ছেড়ে দেব। পানি, খাবার সবই পাবে। শুধু বল, আমি মুহাম্মদের ধর্ম ছেড়ে দিলাম।

হযরত খাব্বাব (রা) দুশমনদের কথা শুনে আরও দৃঢ় হন। তাঁর মুখে তখন জোরে জোরে ধ্বনিত হতো মহান আল্লাহর নাম। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। তারপর আবারও জ্ঞান ফিরে এলে আল্লাহকেই ডাকতে থাকতেন।

হযরত খাব্বাবের ওপর দিনের পর দিন ধরে চলত এ ধরনের নির্যাতন। উম্মে আনমারের বদমেজাজিও অত্যাচারী এক ভাই ছিল। সে ছিল আরও নিষ্ঠুর। সে প্রতিদিন খাব্বাবের কামারশালায় যেত। এসেই উত্তপ্ত লোহার পাত তুলে চেপে ধরত খাব্বাবের মাথায়। এতে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে খাব্বাবের জ্ঞান হারিয়ে যেত। হুঁশ ফিরে এলে তাঁকে আবারও নির্যাতন করা হতো। তারপরও তিনি দমে যাননি। কোনো অত্যাচারকেই খাব্বাব পরোয়া করতেন না।

হযরত খাব্বাব ছিলেন অতিশয় দরিদ্র। তবে তাঁর মন ছিল সত্যের সম্পদ ও সৌন্দর্যে ভরপর। তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো দৃঢ়চেতা ও অনড়। মহান আল্লাহকে ভালবেসে তিনি আরও ইস্পাত কঠিন হয়ে ওঠেন।

তিনি একাই কাফের কুরাইশতের সাথে লড়াই করেছেন। তাদের অন্যায় ও অসত্য অহমিকাবোধকে রুখে দাঁড়িয়েছেন। কাফেরদের শত নিপীড়নের মুখেও মিথ্যা ও অন্যায়ের কাছে তিনি মাথা নত করেননি, সত্যের পথ থেকে একচুলও নড়েননি। হযরত খাব্বাব (রা) আমাদের জন্য তাই অনন্য আদর্শ হয়ে আছেন।

ব ল তে  পা রো?

১। উম্মে আনমার কে? সে কিসের ব্যবসা করত?

২। হযরত খাব্বাবকে কে কিনে নিল? তাঁকে কী কাজ শেখানো হলো?

৩। ইসলাম গ্রহণ করলে খাব্বাব (রা)-এর ওপর কিরূপ নির্যাতন নেমে এলো?

৪। খাব্বাব (রা)-কে মরুভূমিতে নিয়ে কিভাবে নির্যাতন করা হতো?

৫। খাব্ববা (রা)-এর আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল?

 

About ইকবাল কবীর মোহন