সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর

জন্ম : আলোকিত ভুবনে

চব্বিশ পরগণা জিলার চাঁদপুর গ্রাম। গোবরডাঙ্গা স্টেশন থেকে বারো চৌদ্দ ক্রোশ দূরে। কয়েকমাইল উত্তরে ইতিহাসখ্যাত নারিকেল বাড়িয়া। আর মাত্র দুই ক্রোশ দূরে ইছামতী নদী। এরই মাঝখানের একটি গ্রাম- চাঁদপুর।

গ্রামটি খুব শান্ত। চারদিকে কেবল গাছ-পালা। ফসলের ক্ষেত। যেদিকে চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ। গাছে গাছে পাখির কলরব। ইছামতী নদীর কুলুকুলু স্রোতের ডাক।

খুব ভোরে ফজরের সুমধুর আযানের ধ্বনিতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে চাঁদপুর গ্রামের মানুষ। তারপর মেঠোপথ ধরে ছুটে চলে ক্ষেতের দিকে।

এই সবুজ-শ্যামল চাঁদপুর গ্রামের একটি বিখ্যাত পরিবার। বহুকাল থেকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।

নাম- সাইয়েদ এবং মীরন পরিবার।

‘সাইয়েদ’ এবং ‘মীর’ পরিবারের রহস্যটা একটু পরে জানা যাবে। তার আগে জানা যাক নিসার আলীর জন্মের কথাটা।

সতেরো শো বিরাশি সাল।

দিনটির কথা এখন আর কেউ মনে করতে পারে না। তা না পারুক।

আকাশে সূর্য উঠলে তো সবাই জেনে যায়। তখন চারদিকে কেমন সোনালী আলো। চারদিকে তখন কেবল রোদ্দুরের ঝরকানি। ঠিক তেমনি।

তেমনি অবস্থা হয়েছিল সেদিন। সতেরো শো বিরাশি সালের সেই ঐতিহাসিক দিনটিতে। তাঁর জন্মের মুহূর্তে। ভূমিষ্ট হলেন তিনি।

তিনি মানে- সাইয়েদ নিসার আলী।

বাংলার ইতিহাসের এক আলোকি পুরুষ।

তিনি ভূমিষ্ঠ হলেন এই দিনে। চাঁদপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।

পলাশীর যুদ্ধ হয়েছিল সতেরো শো সাতান্ন সালে ২৩ শে জুন। আর নিসার আলীর জন্মগ্রহণ করলেন সতেরো শো বিরাশি সালে। অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধের পঁচিশ বছর পর।

নিসার আলীর পিতার নাম- সাইয়েদ হাসান আলী। আর মায়েল নাম- আবেদা রোকাইয়া খাতুন।

নিসার আলী- ‘তিতুমীন’ নামেই আমাদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত।

আসলে ‘তিতুমীর’ তাঁর কোনো নাম নয়। এমনকি ডাকনাও নয়। তাঁর প্রকৃত নাম-সাইয়েদ নিসার আলী। তবুও তিনি ‘তিতুমীর’ নামে পরিচিত হলেন কিভাবে

সে এক মজার ব্যাপার বটে।

সেই ঘটনাটিই আগে জেনে নেয়া যাক।

তিতুমীরে নামের গোপন রহস্য

খুব ছোটোকালে। ছোটোকালে নিসার আলী ছিলেন কুব হালকা পাতলা। একদিকে ছিলেন রোগাটে, অন্যদিকে ছিলেন দারুণ দুর্বল।

রোগ ব্যাধিতে সব সময় ভুগতেন তিনি। মেজাজটাও তাই হয়ে উঠেছিল বেজায় খিটখিটে।

শরীর সুস্থ না থাকলে পৃথিবীর কোনো কিছুই ভালো লাগে না।

নিসার আলীর অবস্থাও হয়েছিল তাই। খাওয়অয় রুচি নেই। খেলায় মন নেই। সারাদন কেবল ঘ্যানর ঘ্যানর। কান্না শুধু কান্না।

তিনি ছিলেন পরিবারের সবার কাছে চোখের মণি। কলিজার টুকরো। আদর যত্ন আর সেবার কোনো কমতি নেই। তবুও সুস্থ হয় না। নিসার আলীর শরীর- স্বাস্থ্য।

তাঁকে নিয়ে মহাভাবনায় পড়লেন পিতা হাসান আলী। আর মা রোকাইয়া তো ছেলের জন্যে ভাবতে ভাবতে প্রায় নাওয়া খাওয়াই ছেড়ে দিলেন।

কিন্তু দাদী?

তিনিও ভাবেন। ভাবেন অতি আদরের নিসারকে নিয়ে।

না ভেবে কি উপায় আছে?

নিষার তো  কেবল একটি ছেলেই শুধু নন। তিনি একটি পরিবারের ভবিষ্যত। একটি পরিবারের জ্বলজ্বল পিদিম।

দাদী ভাবেন, যে করে হোক নিসারকে সুস্থ করে তুলতে হবে।

দাদী হেকিম ডাকেন। কবিরাজ ডাকেন। ওষুধের পর ওষুধ চলে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না।

তবুও হতাশ হন না দাদী। নিরাশ হন না আল্লাহর অপার রহমত থেকে।

চেষ্টা চালাতে থাকেন তিনি।

জ্ঞানী-গুণীদের পরামর্শ নেন দাদী। পরামর্শ নেন হেকিম এবং কবিারাজের। তারা বলেন, গাছগাছালির ছাল, পাতা আর লতা-গুল্মের ভেতর রিয়েছে নিসার আলীর জন্যে প্রকৃত ওষুধ।

গাছগাছালির ছাল এবং লতাপাতার ভেতর রয়েছে অনেক গুণ। রয়েছে অনেক শক্তি।

দাদী এবার নজর দিলেন সেই দিকে। হাত বাড়ালেন বনোজ ওষুধের দিকে। সারাদিন তিনি এইসব যোগাড়ের চেষ্টায় থাকেন। প্রয়োজনীয় লতাপাতা যেখানেই পাওয়া যায় সেখান থেকেই দাদী সংগ্রহ করার লোকজন দিয়ে।

তারপর সেই লতাপাতা আর গাছের ছাল বেটে তার রস খাওয়ান প্রাণপ্রিয় নিসার আলীকে।

গাছের লতাপাতার রস যে তিতা, সে কথা সবাই জানে।

নিসার আলীও তা জানেন। তবুও তিনি কেমন মজা করে সেই তিতা রস ঢক ঢক করে গিলে ফেলেন। অনায়াসে। পান করে যান সেইসব।

দাদী বাটি বাটি তিতা রস নিসার আলীর ‍মুখের সামনে তুলে ধরেন। আর নিসার আলী মধু পান করার মতো তা নিমিষেই সাবাড় করে দেন।

দাদী তো অবাক।

কি আশ্চর্যের কথা!

যে তিতা ওষুধ অন্যান্য শিশুদের নাক মুখ চেপে ধরে খাওয়াতে হয়, তা কিনা নিসার আলী তৃপ্তির সাথেই পান করে!

পড়শিরাও কাণ্ড দেখে হতবাক। দাদী নিসার আলীকে আদরে আদরে ভরে দেন। ভরে দেন নিসার আলীর হৃদয়-মন।

দাদীর হৃদয় উজার করা আদর স্নেহে দুকূল ছাপিয়ে ওঠে নিসার আলীর মনের বিশাল সমুদ্র।

পড়শিরা তাকিয়ে থাকেন দাদীর দিকে। তাকিয়ে থাকেন নিসার আলীর দিকে। তাদের চোখে মুখে বিস্ময়ভরা জিজ্ঞাসার তুফান।

সেই তুফান ভেঙ্গে হেসে ওঠেন ধবধবে জোছনার মতো মহীয়সী দাদী।

আদর করে আরও কাছে টেনে নেন কলিজার মানিক নিসার আলীকে। সোহাগ করতে করতে বলেন-

এ আমার সোনার টুকরো। আমার বংশের প্রদীপ। আমার আদরের ‘তিতামীর’।

কোনো রকম কান্নাকাটি আর বায়না ছাড়া নিসার আলী দাদীর দেয়া সেই তিতা ওষুধ পান করতেন বলে দাদী তাঁকে সোহাগ করে ডাকলেন ‘তিতামীর’ বলে।

ব্যাস! আর যায় কোথায়!

সেই থেকেই শুরু।

দাদীর সেই সোহাগের ডাক থেকেই বাড়ির অন্যান্যরা তাঁকে মাঝে মাঝে ডাকতে থাকেন তিতামীর বলে। সেটিও ছিল আদর আর সোহাগে ভরা ডাক।

কিন্তু তারপর। তারপর আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে তিতামীর নামটি ছড়িয়ে পড়লো পরিবারের  বাইরে। পড়শির মধ্যে। গ্রামের আর দশজনের মাঝে।

এভাবেই ‘তিতামীর’ ক্রমশ হয়ে গেলেন আর একটু বদলে ‘তিতুমীর’।

কালে কালে তিতুমীর নামটি এতোই জনপ্রিয় এবং পরিচিত হয়ে উঠলো যে, তাঁর আসল নামটিও ঢাকা পড়ে গেল অনেকটা কুয়াশার ভেতর।

সাইয়েদ নিসার আলী নামটি এখনো সাধারণ মানুষ তেমন করে জানেন না। এই নামটি তো এতোদিনে অনেকে ভুলতেই বসেছে।

অধিকাংশ মানুষই তাঁকে ‘তিতুমীর বলেই জানে।

সাইয়েদ নিসার আলীকে আর কজনই বা চেনে?

তবুও সঠিক। এটাই তাঁর প্রকৃত নাম। তাঁর প্রকৃত নাম- সাইয়েদ নিসার আলী।

অনেকেই মনে করেন, নিসার আলীর জন্ম হয়েছিল একটি অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে।

কিন্তু  কথাটি সত্য নয়।

বরং তিনি জন্মেছিলেন একটি বিখ্যাত পরিবারে। খান্দানী বংশে।

সেই খান্দানী পরিবারটি ছিল যেমনি নামী-দামী, তেমনি মর্যাদাসম্পন্ন। দু-দশ গ্রাম জুড়েছিল এই পরিবারটির সুনাম-সুযশ। ছিল তাদের নাম ডাক। আশ-পাশের সবাই শ্রদ্ধা করতো পরিবারটিকে।

এখন আমরা নিসার আলীর বংশের সেই গৌরবগাঁথা কিছু কথা জানবো। সেই সাথে জানবো তাঁর বংশের উজ্জ্বলতম আরও কিছু তথ্য।

যা কিনা একেকটি হীরক খণ্ডের মতোই অত্যন্ত মূল্যবান। গুরুত্বপূর্ণ।

বংশ পরিচয়

নিসার আলীর জন্ম হয়েছিল সাইয়েদ ও মীর নামক একটি বিখ্যাত বংশে। কিন্তু ইংরেজরা সেই সময় প্রকৃত সত্যকে পাশ কেটে বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছিল।

ইংরেজরা কখনো মুসলমানকে ভালো চোখে দেখেনি। মুসলমানকে তারা সব সময় খারাপ চোকে দেখতো। ছোট করে দেখতো। ঘৃণার চোখে তাকাতো। আর নানান ‍কূট-কৌশলে মুসলমানদেরকে আপন করার চেষ্টা  করতো। তারা ছিলো মিথ্যার জাহাজ। মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা লেখা এবং মিথ্যা ভাষণে তাদের কোনো জুড়ি ছিলনা।

কিভাবে তারা মুসলমানকে হেয় এবং ছোট করতে পারে সেই চিন্তাতেই তারা মশগুল থাকতো। আর মুসলিম নেতা, মুসলিম বীর এবং মুসলিম শাসকদেরকে তো ইংরেজরা কখনো সহ্যই করতে পারতো না। এজন্যে তারা তাদের নামে তাদের পরিবার ও তাদের চরিত্রের ওপর মিথ্যা কলংক লাগিয়ে দিত।

ঠিক তেমনি করতো তারা ইতিহাসের ক্ষেত্রেও।

মুখের কথা তো আর বেশি দিনটিকে থাকে না। কিন্তু ইতিহাস? ইতিহাস তো বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যন্ত টিকে থাকে।

ইংরেজরা একদিকে ছিল যেমন শিক্ষিত, অপর দিকে ছিল তেমনি চালাক এবং ধূর্ত।

তারা জানতো, কোনো মুসলমান সম্পর্কে কিংবা কোনো মুসলিমবীর বা নেতা সম্পর্কে যদি ইতিহাসে একবার খারাপ চরিত্রে, কুৎসিতভাবে তুলে ধরা যায় তাহলে তা শত-সহস্র বছর ধরে চালু থাকবে। হোক না তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। হোক না তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা বানানো কথা। তবুও তাই পড়বে সবাই। পড়বে আর ভাববে, হয়তো এটাই সঠিক ইতিহাস।

ইংরেজদের এই মিথ্যা এবং ভুল ইতিহাস লেখার কারণ- ওই যে বললাম, আমাদের পূর্ব পুরুষকে ছোট করে তুলে ধরা! যাতে করে উত্তর প্রজন্মরা তাদের পূর্ব পুরুষকে ঘৃণা করে। তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে।

তাই কি হয়? ষড়যন্ত্র আর মিথ্যা যত ‍নিখুঁতিই হোক না কেন, সত্যের এটা আলাদা ক্ষমতা আছে। বিশাল ক্ষমতা। সত্য তো সত্যই সূর্যের মতো। কেউ তাকে রুখতে পারে না। সুমদ্রের বিশাল সরঙ্গের মতো। কেই তাকে দাবিয়ে রাখতে পারে না।

যা সত্য তা একদিন না একদিন প্রকাশ হয়েই পড়ে। আর যখন প্রকৃত সত্য ভোরের সূর্যের মতো ভেসে ওঠে, তখন মিথ্যা আড়ালে চলে যায়।

এভাবে একদিন আবারও লেখা হয় সত্য ইতিহাস। খসে পড়ে মিথ্যা ইতিহাসের নোংড়া পাতা। বেদলে যায় ইতিহাসের পুরনো চেহারা।

ঠিক এমনি হয়েছে সাইয়েদ নিসার আলীর ক্ষেত্রে।

নিসার আলী আজীবন সংগ্রাম করেছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। ইংরেজ শাসন, দুঃশাসন এবং শোষণের বিরুদ্ধে।

তাঁর সংগ্রামের কথা আমরা পরে জানবো। তার আগে নিসার আলীর বংশ পরিচয়টা জেনে নেয়া যাক।

ইংরেজের বিরুদ্ধে সব সময় লড়বার কারণে নিসার আলীকে তারা আদৌ ভালো চোখে দেখতো না। তারা চেষ্টা করতো কিভাবে বাংলার এই দুঃসাহসী বীরকে পরাস্ত করা যায়।

নিসার আলীকে ছোট করার জন্যে তাঁর সম্পর্কে ইংরেজরা অনেক মিথ্যা এবং বানানো কাহিনী লিখেছে। তাঁর পরবার এবং বংশ পরিচয়েও রয়েছে সেই মিথ্যার ছলচাতুরি। এভাবে তারা নিসার আলীর জীবনেতিহাসকে কলংকিত করতে চেয়েছে।

ইংরেজ ঐতিহাসিকরা লিখেছে- নিসার আলী একটি সামান্য কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যে পরিবারটি ছিল মূর্খ এবং অশিক্ষিত।

আসলে কিন্তু তা নয়।

ইংরেজদের এই তথ্যটি স্পূর্ণ ভুল। ভুল এবং মিথ্যা। মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।

নিসার আলীকৈ আমাদের কাছে খাটো করে দেখানোর জন্যে চতুর ইংরেজরা এই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল।

আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, নিসার আলী জন্মেছিলেন একটি বিখ্যাত এবং নামকরা বিরাট পরিবারে। বহুদূর পর্যন্ত ছিল সেই পরিবারটির সুনাম-সুখ্যাতি।

শুধু এক পুরুষ নয়। কয়েক পুরুষ আগে থেকেও এই পরিবারটি ছিল খুবই মর্যাদা সম্পন্ন। ধন-সম্পদে, বিত্ত-বৈভবে, ধর্মীয় আচার আচরণে, সম্মানে, মর্যাদায়, গৌরবে- মোট কথা, সকল দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল নিসার আলীর পূর্ব পুরুষেরা। শ্রেষ্ঠ ছিল তাঁর পরিবারটি।

বহুকাল আগের কথা। নিসার আলীর জন্মেরও অনেক-অনেক দিন পূর্বের কথা।

তখন সুদূর আরব দেশ থেকে অলি-দরবেশ আসতেন এই উপমহাদেশে। আসতেন নদী সমুদ্র পার হয়ে এই বাংলায়। তারা আসতেন সত্যের আলো জ্বালাতে। আসতেন দীন ইসলামের মশাল হাতে নিয়ে। ইসলাম প্রচারের জন্যে তাঁরা বাংলার বিভিন্ন শহরে বন্দরে, বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁরা এই বাংলার অন্ধকার ঘরে আবার সত্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতেনে।

তাঁরা মানুষকে ডাকতেন সত্যের পথে।

ইসলামের পথে।

আল্লাহর পথে। আলোর পথে।

আজ আমাদের মধ্যে ইসলামের যে আলোটুকু জ্বলছে তা সেই সব অলি-দরবেশদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। তাঁদের ত্যাগ, কুরবানী আর পরিশ্রমেই আজ এদেশে ইসলারেম এই জাগরণ।

তখন যে সব অলি-দরবেশ এ দেশে ইসলাম প্রচার  ও প্রসারের জন্যে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত দু জন অলি-দরবেশ।

তাঁদের একজনের নাম- সাইয়েদ শাহ হাসান রাজী। আর অপর জনের নাম- সাইয়েদ শাহ জালাল রাজী।

এই দুজন অলি-দরবেশের নাম পুরনো দলিল দস্তাবেজও আছে।

ইসলাম প্রচারের জন্যে তাঁদের ত্যাগ ও কুরবানী ছিল অপরসীম। তাঁদের দীন প্রচারের ব্যাপ্তি ছিল বহুদূর। বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁদের কাজের পরিধি। আর তাঁদের সুন্দর চরিত্র ও আচারণের খ্যাতি ছিল সেই সময়ের সকল মানুষের মুখে মুখে।

তাঁদের সত্যের আহ্বানে তখন সাড়া পড়ে গিয়েছিল চারদিকে। দলে দলে লোক ইসলারেম ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল। তাঁদের কাছে এসে সদ্য আলোকপ্রাপ্ত মানুষেরা তৃপ্তি পেত। আনন্দ পেত। পেত হৃদয় ও মনের খোরাক।

একদিন সেই দুজন অলি-দরবেশের কাছে গেলেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাঁদের একজনের নাম- সাইয়েদ শাহ আব্বাস আলী এবং অন্যজনের নাম- সাইয়েদ শাহ শাহাদাত আলী।

তাঁরা দুজনই ছিলেন আপন ভাই।

আব্বাস আলী এবং শাহাদাত আলী এই দুই ভাই দুজন অলি-দরবেশের কাছে গিয়ে তাঁদের হৃদয়ের আকুতি জানালেন। দুই ভাই সেই দিনই ওই দুজন অলি-দরবেশের কাছে মুরীদ হলেন।

সেই দিন থেকে দুই ভাই হয়ে গেলেন তাঁদের খলীফা। তাঁদের শিষ্য। মনে-প্রাণে দুই ভাই ইসলামকে ধারণ করে তা প্রচার প্রসারের জন্যে চেষ্টা করতে থাকলেন। কালে কালে তাঁদের ত্যাগ এবং কুরবানীতে চারদিকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তাঁদের আচরণ, তাঁদের ব্যবহার, তাঁদের জীবনের সব- সব কিছুই ছিল ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী। তাঁরা সব সময় ইসলামের হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। মেনে চলতেন আল্লাহর আদেশ-নিষেধ। তাঁরাও পথভোলা মানুষকে ডাকতেন। ডাকতেন আলোর পথে। ডাকতেন সত্যের পথে।

সাইয়েদ আব্বাস আলী এবং সাইয়েদ শাহাদাত আলী ইসলামের খেদমতে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছিলেন। উৎসর্গ করেছিলেন দীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে।

মানুষকে সত্য পথে ডাকতে হলে অবশ্যই সমাজে বসবাস করে ডাকতে হবে।

সমাজের দশজনের সাথে না মিশলে, সমাজের মানুষের সাথে সম্পর্ক না রাখলে মানুষ তাদের কথা শুনবে কেন?

সাইয়েদ আব্বা আলী ও সাইয়েদ শাহাদাত আলীও একথা ভালো করে জানতেন। তাঁরাও ছিলেন সমাজবদ্ধ। ছিলেন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং বিখ্যাত। তাঁরাও ছিলেন অন্য দশজনের মতো সংসারী। ছিলেন সামাজিক মানুষ।

একদিন সাইয়েদ শাহাদাতের ঘরে জন্ম নিলেন একটি পুত্র সন্তান। নাম রাখলেন সাইয়েদ শাহ হাশমত আলী।

হাশমত আলীও বড়ো হয়ে পিতা এবং চাচার পদাংক অনুসরণ করেছিলেন। তিনিও তাঁদের মতো ইসলামের খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।

এই বিখ্যাত সাইয়েদ পরিবারেই একদিন জন্ম নিলেন বাংলার সাহসী পুরুষ দুঃসাহসী মুজাহিদ- সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর।

নিসার আলী ছিলেন তাঁর পূর্ব পুরুষ সাইয়েদ শাহ হাশমত আলীর ত্রিশতম অধস্তন।

তাঁর পিতা সাইয়েদ হাসান আলীও ছিলেন একজন সুপরিচিত বিখ্যাত ব্যক্তি। ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যে গৌরবোজ্জ্বল ছিল তাঁর পরিবারটি।

যে বংশীয় গৌরব, মর্যাদা এবং আদর্শ-ঐতিহ্য এই পরিবারে প্রবেশ করেছিল শতশত বছর আগে, সেই বংশীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিল শত শত বছর পরেও।

কয়েক শতকের মর্যাদা সম্পন্ন নিসার আলীর এই বংশটি সাইয়েদ এবং মীর উভয় পরিচয়েই সবার কাছে পরিচিত ছিল।

তাঁর পূর্বে এই বংশের জন্ম নিয়েছেন বেশ কিছু অলি-দরবেশ। তাঁদের পরিচিতও ছিল অনেক ব্যাপক।

নিসার আলী কোনো অখ্যাত বা মূর্খ পরিবারে জন্ম নেননি। তিনি জন্ম নেননি নাম-নিশানহীন কোনো অজ্ঞাত কৃষক পরিবারেও।

ইংরেজ ঐতিহাসিকরা যে মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করেছে তাঁর বংশ সম্পর্কে, তা আদৌ সঠিক নয়। বরং সাইয়েদ নিসার আলীর জন্ম হয়েছিল এমন এক প্রাচীন খান্দানী পরিবারে, যে পরিবারের মান মর্যাদা এবং গৌরব ছিল অনেক-অনেক বেশি।

সাইয়েদ নিসার আলীর সেই ইতিহাসখ্যাত পরিবার এবং বংশের মতো তেমন শ্রেষ্ঠ বংশ আজও আমাদের মধ্যে বির।

কিন্তু এতো বড়ো বংশে জন্মগ্রহণ করেও নিসার আলীর মধ্যে এতোটুকু ছিলনা বংশের অহংকার।

বংশের অহংকার করা ভালো নয়।

বংশের সুনাম-সুখ্যাতি প্রমাণ করতে হয় কাজ দিয়ে। নিজের আচার ব্যবহার আর মনুষত্ব দিয়ে।

নিসার আলী একথা জানতেন। জানতের খুব ভালো করে। আর জানতেন বলেই তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। তৈরি করেছিলেন নিজেকে যোগ্য করে। তিল তিল করে ক্রমশ গড়ে তুলেছিলেন আপন ভিত্তিভূমি।

 

About মোশাররফ হোসেন খান