সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর

শিক্ষা ব্যবস্থা

সেই সময়ে সর্বক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেতে তাদের ছিল প্রবল দাপট। শকুনের মতো ডানা বিস্তার করেছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে।

ইংরেজদের প্রত্যক্ষ মদদে তখন হিন্দু জমিদারদের অবস্থা অত্যন্ত ভাল। ফুলে ফেঁপে তারা কলাগাছ হয়ে গেল রাতারাতি।

তাদের ষড়যন্তে মুসলমানদের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব ন্ধ হয়ে গেল। গ্রামে গ্রামে হিন্দু পণ্ডিতদের গ্রাম্য পাঠশালা স্থাপহ হলো। নামী-দামী পাঠশালায় মুসলমানের সন্তানদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।

গ্রামের পাঠশালায় নিম্নশ্রেণীর হিন্দু-কুমার, কামার, নাপি, ধোপাদের সন্তানরা আসা-যাওয়অ করতো। মুসলমানের সন্তানদেরকেও তাদের সাথে একত্রে লেখাপড়া করতে হতো। ফলে শৈশবকালে, সেই কচি হৃদয়ে মুসলিম পরিবারের সন্তানদের মধ্যে হিন্দুয়ানী শিক্ষা ও সংস্কৃতি কৌশলে হিন্দু পণ্ডিতরা ঢুকিয়ে দিতো।

মুসলমান ছাত্রদেরকেও হিন্দু দেবদেবীর স্তবস্তুতি মুখস্থ করতে হতো। বিশেষ করে সরস্বতীর বন্দনা মুখস্থ করা তাদের জন্যে ছিল বাধ্যতামূলক।

তখনকার পাঠ্যবিইয়ে হিন্দু ধর্মের মহিমা কীর্তন, দেবদেবেীর বন্দনা ও স্তবস্তূতিতে ছিল পরিপূর্ণ।

ছুটি হবার পর পাঠশালা ত্যাগ করার সময় তখন একটি ছাড়া আবৃত্তি করে গুরু মহাশয়কে নমষ্কার করে বাড়ি ফিরতে হতো।

সেই ছড়াটি হলো:

সরস্বতী ভগবতী, মোরে দাও বর,

চল ভাই পড়ে সব, মোরা যাই ঘর।

ঝিকিমিকি ঝিকিরে সুবর্ণের চক,

পাত-দোত নিয়ে চল, জয় গুরুদেব।

নিসার আলীর সময়টা ছিল এমনি। এমনি ছিল তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থা।

অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর হিন্দুদের আধিপত্যের কারণে মুসলমানদের ঘরে ঘরে বিরাজ করতো অন্ধকার। ঘোরতর অন্ধকার।

সেই অন্ধকারের মধ্যেই ধীরে ধীরে জ্বলে উঠলো একটি আলোর মশাল। নাম তাঁর নিসার আলী তিতুমীর।

স্বদেশে ফেরার পর

মক্কা থেকে হজ্জ ও সফর শেষ করে দেশে ফিরলেন নিসার আলী।

দেশে ফিরে তিনি দেখলেন তাঁর স্বজাতির করুণ অবস্থা।

দেখলেন ইংরেজ দস্যু এবং জমিদারদের অত্যচারের নির্মম চিত্র। দেখলেন মুসলিম সমাজ ভেসে যাচ্ছে এক অমানিশার মহা সমুদ্রে।

এসব দেখে আঁতকে উঠলেন নিসার আলী।

কেঁদে উঠলো তাঁর কোমল হৃদয়।

তিনি ভাবলেন, আর বসে থাকার সময় নেই।

এখনিই কূলে ভেড়াতে হবে মুসলমানের ভাসমান তরী। তা না হলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ইসলামের আলো। শেষ হয়ে যাবে আমাদের সমাজ। আমাদের স্বজাতি।

মুসলমানের মুক্তির জন্যে নিসার আলীর বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।

সিতনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাদেরকে মুক্ত করতে হবে ইংরেজ গোলামী থেকে। হিন্দুদের খপ্পর থেকে। মুক্ত করতে হবে ইসলামকে। মুক্ত করতে হবে বাংলার কৃষককে তথা সকল মানুষকে।

এই চেতনা থকেই নিসার আলী কাল বিলম্ব না করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে।

দৃপ্ত শপথ নিয়ে তিনি তাঁর যাত্রা শুরু করলেন।

সেই যাত্রার নাম- উত্তাল সংগ্রাম।

সময়টা ছিল আঠঅরো শো সাতাশ সাল।

যাত্রা হলো শুরু

স্বদেশে ফিরে কয়েকদিন একটু বিশ্রাম নিলেন নিসার আলী।

দীর্ঘ ভ্রমণে তিনি ক্লান্ত বোধ করছিলেন। কিন্তু বেশি দিন আর বিশ্রাম করা তাঁর পকেষ সম্ভব হলো না। কর্তব্য তাঁকে ডাকছে হাতছানি দিয়ে কর্তব্যের টানে নিসার আলী নির্দিষ্ট সময়ে সাড়া দিলেন সাইয়েদ আহমদ বেরেলভীর আহ্বানে।

মক্কা থেকে বিদায় নেবার সময় তিনি তাঁর সাথীদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, একটি নির্দিষ্ট দিনে সবাই একত্রিত হবেন।

কথাটা ভোলেননি নিসার আলী।

তিনি রওয়ান দিলেন।

একে একে সবাই এলেন। সাইয়েদ আহমদও উপস্থিত হয়েছেন।  জায়গাটি ছিল- কলকাতার শামসুননিসা খানমের বাগান বাড়ি।

শামসুননিসা খানমের বাগান বাড়িতে বসে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হলো।

আলোচনা হলো ইংরেজ শাসন, হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার এবং মুসলমানদের দুরাবস্থা নিয়ে।

আলোচনা চললো বহুক্ষণ ধরে।

আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, মুসলমানদের মুক্তির জন্যে একটি মুজাহিদ বাহিনী গঠন করা হবে।

সেই মুজাহিদদের কেন্দ্রীয় রাজধানী হবে পাটনা। প্রত্যেক প্রদেশে হবে প্রাদেশিক রাজধানী। প্রাদেশিক রাজধানী থেকে কেন্দ্রে জিহাদ পরিচালনার জন্যে অর্থ প্রেরণ করা হবে।

এসব সিদ্ধান্তের পর নিসার আলী উপস্থিতিদেরকে লক্ষ্য করে একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি বলেন:

“বাংলঅদেশের মুসলমানদের ঈমান খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদেরকে খাঁটি মুসলমান না করা পর্যন্ত জিহাদে পাঠানো বিপজ্জনক হবে। আমি তাদের মধ্যে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছুবার দায়িত্ব নিচ্ছি। শুধু তাই নয়, আমি মনে করি, নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরাও আমাদের সংগ্রামে যোগদান করতে পারে। কারণ ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, ক্ষত্রিয় ও কায়স্থ জাতির ওপর নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা সন্তুষ্ট নয়। আমরা যদি মুসলমানদেরকে পাক্কা মুসলমান বানিয়ে নিম্নশ্রেণীর হিন্দু ও মুসলমানকে একত্রিত করতে পারি তাহলে… কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে কেন্দ্রকে সাহায্য করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হবে না।…”

অবাক মিছিল

সাইয়েদ আহমদের সাথে বৈঠক শেষ করে কলকাতা তেকে ফিরে এলেন নিসার আলী আপন গ্রামে।

গ্রামে ফিরে এসে তিনি শুরু করলেন তাঁর দাওয়াতী অভিযান।

তিনি সরল সহজ ভাষায় বুঝান সাধারণ মুসলমানকে। বুঝান তাদেরকে সত্য মিথ্যার পার্থক্য।

বুঝান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পথ।

তিনি ভাগ্যাহত মুসলমানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতেন। তাদের কাছে পৌঁছে দিতেন সত্যের আহ্বান।

নিসার আলীর এই দাওয়াতের মূল কথা ছিল- ইসলামে পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন এবং প্রত্যেকটি কাজকর্মে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেল (সা) অনুসরণ।

মুসলমানদেরকে সঠিক পথের  সন্ধান দেবার জন্যে নিসার আলী ত্যাগ করলেন নিজের ব্যক্তিগত আরাম আয়েশ। ত্যাগ করলেন সুখ-সম্ভোগ। ত্যাগ করলেন অর্থ-বিত্ত আর প্রতিপত্তির লালসা। নিজেকে তিনি কুরবানী করে দিলেন আল্লাহর রাস্তায়।

তখনো দীন প্রচারের কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত নিসার আলী।

চারপাশের অবহেলিত লাঞ্ছিত মুসলমান একে একে তাঁর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে।

তারা শামিল হচ্ছে আলোর মিছিলে।

দীনি দাওয়াতের পাশাপাশি নিসার আলীর লক্ষ্য করলেন তাঁর চারপাশকে। দেখলেন ইংরেজদের শোষন আর উৎপীড়ন। দেখলেন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার। বুঝলেন, ‍মুসলমানদের তারা মানুষের মধ্যেই গণ্য করেনা।

বাংলার মুসলমানদের এই করুণ অবস্থায় কেঁদে উঠলো নিসার আলীর হৃদয়।

তিনি উপেক্ষা করতে পারলেণ না তাদের আর্তনাদ, তাদের আকাশ বিদারী আহাজারী।

মুহূর্তেই তিনি ফিরে দাঁড়ালেন।

ফিরে দাঁড়ালেন সাহসের পর্বতকে বুকে ধারণ করে। ভাবলেন- মুধু ইসলামের দাওয়াত দিলেই মুসলমানের ভাগ্য চাকা ঘুরানো যাবে না। এরপ্রয়েঅজন সম্মুখ সংগ্রামের।

গর্জে উঠলেন দুঃসাহী নিসার আীল। তিনি বললেন:

“কৃষক সম্প্রদায়ের হিন্দুদের সাথে একতাবদ্ধ হয়ে তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”

এবং তারপর।–

তারপরই নিসার আলী জাগিয়ে তুললেন এক অসামান্য আলোর মিছিল। তাঁর সাথে যুক্ত হলো ধীরে ধীরে হাজার মুক্তিপাগল মানুষ।

যুক্ত হলো তারা নিসার আলীর জীবন জাগানো অবাক মিছিলে।

প্রতিবাদের ফুলকি

দীনি দাওয়াতের কাজ করার জন্যে নিসার আলীর নামটি তখন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

একদিনের ঘটনা।

সরফরাজপুর নামক গ্রামবাসীর ছুটে এলো তাঁর কাছে।

তারা জানালো তাদের বুকে জমে থাকা হাজারো দুঃখ-ব্যথার কথা।

সহজ সরল নিপীড়িত মানুষ তারা। তারা মুসলমান। অথচ নামায আদায় করতে পারে না। মসজিদে গিয়ে আদায় করতে পারে না জুমাআর নামায। কী ভীষণ বেদনার ব্যাপার!

ধীরস্থির ভাবে মন দিয়ে নিসার আলী শুনলেন তাদের কথা। তারপর তাদের অনুরোধে তিনি সেখানকার ধ্বংসপ্রাপ্ত শাহী মসজিদটি পুনঃনর্মাণের ব্যবস্থা করে দিলেন।

এই শাহী মসজিদ পুনঃনির্মাণের পর সেখানে থেকে প্রচারের জন্যে তিনি একটি খানকাও স্থাপন করেন।

হিন্দু জমিদারদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নিসার আলী পুনঃনির্মাণ করলেন সফররাজপুর শাহী মসজিদ। তাঁর উদ্যোগটি ছিল ইংরেজ ও হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রথম ফুলীক।

মসজিদটি নির্মাণের পর সেই এলাকার মুসলমানের মনে আবার স্বস্তি ফিরে এলো। তারা পুনরায় প্রশান্ত হৃদয়ে পাঞ্জেগানা ও জুমআর নামাজ আদায় করতে থাকলো।

এই মসজিদে জুমআর নামাজের পর নিসার আলী নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানকে আহ্বান করে একটি ভাষণ দেন।

ইতিহাসখ্যাত এই ভাষণটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখন নিসার আলীর সেই ভাষণটির সাথে পরিচিত হবো।

একটি ঐতিহাসক ভাষণ

সরফরাজপুর শাহী মসজিদে জুমআর নামায শেষে হিন্দু-মুসলমানকে আহ্বান করে নিসার আলী বলেন:

“ইসলাম শান্তির ধর্ম। যারা মুসলমান নয় তাদের সাথে শুধু ধর্মের দিকে পৃথব বলে, বিবাদ বিসম্বাদ করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূর কিছুতেই পছন্দ করেন না।

তবে ইসলাম একথা বলে, যদি কোনো প্রবল শক্তিশালী অমুসলমান কোনো দুর্বল মুসলমানের ওপর অন্যায় উৎপীড়ন করে, তাহলে মুসলমানরা সেই দুর্বলকে সাহায্য করতে বাধ্য।

মুসলমানকে কথা-বার্তায়, আচার-আচরণ, চাল-চলন ও কাজকর্ম পছন্দ করে, তাহলে শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদেরকে অমুসলিমদের সাথে স্থান দেবেন।

…. ইসলামী শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফত- এই চার মিলিয়ে মুসলমানদের পূর্ণাঙ্গ জীবন এবং এর মধ্যেই রয়েছে তাদের ইতকাল-পরকালের মুক্তি।

এর প্রতি কেউ উপেক্ষা প্রদর্শন করলে আল্লাহ তাকে কঠোর শাস্তি দেবেন।

নামায পড়া, রোজা রাখা, দাড়ি রাখা, গোঁফ ছাঁটা মুসলমানদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। যারা মুসলমানদের আদর্শে এসব পরিত্যগ করবে, আল্লাহ তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেবেন।”

নিসার আলীর ডাক

ওয়াজ-নসিহত, বক্তৃতা এবং সদুপদেশের মাধ্যমে নিসার আলী ডাকতে থাকেন লাঞ্ছিত মানুষকে।

তিনি ডাকেন আল্লাহর পথে।

রাসূলের (স) পথে।

তিনি তাদেরকে বুঝান- ইসলামের পথই সত্য সঠিক পথ।

নিসার আলীর বুকে ছিল সাহসের সমুদ্র। ছিল পর্বত সমান বিশ্বাস। বিশ্বাস এবং আস্থা ছিল আল্লাহর ওপর। যিনি সকল সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা।

দেশকে ইংরেজ শাসন মুক্ত করা ছিল নিসার আলীর স্বপ্ন। তাঁর সাধ ছিল দেশ এবং মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করায়।

ইচ্ছা ছিল- জীবন বিধান ইসলামকে যাবতীয় অন্যায় অবিচার আর নানাবিধ জঞ্জাল থেকে কলুষমুক্ত করা। ইসলামের পূর্ণ বিকাশ দেখতে চেয়েছিলেন নিসার আলী তাঁর দেশের মাটিতে। মানুষের মাঝে দীনের দাওয়াত পৌঁছানোর।

ঘুম ভাঙ্গানোর প্রয়োজন এই  জাতিকে।

তিনি জানতেন, যদি একবার এই জাতি মাথা উঁচু করে, গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে যায় সাহসের সাথে, তাহলে হিন্দু জমিদার কেন, ইংরেজ দস্য কেন- পৃথিবীর কোনো শক্তিই আমাদের সামনে টিকে থাকতে পারবে না।

ঈমানের শক্তি- ভীষণ এক শক্তি।

সাহসের শক্তি- দুর্বর এক শক্তি।

সেই শক্তিকে রুখতে পারেনা কেউ।

অসীম আত্মবিশ্বাসে মানুষকে সত্যের পথে ডাকতে থাকেন নিসার আলী। ডাকতে থাকেন ধৈর্যের সাথে।

একদিকে অভাব-দারিদ্রের কষ্ট। অপর দিকে হিন্দু জমিদার এবং ইংরেজদের শোষণ অত্যাচার আর নির্যাতনের নিত্য নতুন অবছোবল। এতো লাঞ্ছনার মুখে আর টিকতে পারছিল না তখনকার মানুষ।

তারাও মুক্তি চাচ্ছিল।

মুক্তি চাচ্ছিল এইসব অত্যচারীদের নির্মম নিষ্ঠুর পদাঘাত থেকে।

তাই নিসার আলীর ডাক যখন তাদের কাছে পৌঁছুলো তখন তারা আবার কিছু স্বস্তি ফিরে পেল। তারা আবার যেন ফিরে পেল প্রাণ।

মুহূর্তে জেগে উঠলো তারা।

প্রতিবাদী ভঙ্গিতে তারা ফিরে দাঁড়ালো। তাদের সামনে আছেন সাহসী এক সেনাপতি- সাইয়েদ নিসার আলী।

কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের সংখ্যা দাঁড়িযে গেল চার-পাঁচ শো। বিরাট ব্যাপার বটে!

এদের মধ্যে ছিল নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মুসলমান- ছিল চাষী, মজুর, তাঁতী ও সমাজের অন্যান্য পেশার মেহনতী মানুষ। এদের মধ্যে অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দু ও হিন্দু জমিদার কর্তৃক নিপীড়িত নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও ছিল।

এরা সবাই সেদিন নিসার আলীর ডাকে সারা দিয়েছিল। নতুন করে বাঁচার জন্যে তাদের মুকেও সেদিন জ্বলে উঠেছিল দাউ দাউ প্রতিবাদের ভয়ালো আগুন।

অশুভ কম্পন

নিসার আলীর জ্বালাময়ী ভাষণে আগুন ধরে গেল ইংরেজ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বুকে। আগুন ধরে গেল জমিদারদের হৃদয়ে। নিসার আলীর দাওয়াত এবং তাঁর হুংকারে কেঁপে উঠলো তারা। কম্পন তুললো তাদের দুরু দুরু বুকে।

এই বুঝ নস্যাৎ হয়ে গেল তাদের সকল ষড়যন্ত্র।

এই বুঝি ভেঙ্গে পড়লো তাদের মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নির্মূল করার পরিকল্পনা।

ভীষণভাবে ক্ষেপে গেল উচ্চবর্ণের হিন্দুরা।

ক্ষেপে গেল ইংরেজরা।

হিংস্র পশুর মতো তারা ক্ষেপে উঠলো নিসার আলীর ওপর।

আসলে এমনটিই হয়।

সত্যের পথে লড়তে গেলে রিরুদ্ধ পক্ষরা ক্ষেপে তো যাবেই। কেননা তাদের স্বার্থ এবং ক্ষমতার দর্প তখন তো আর অবশিষ্ট থাকবে না।

তখন ভেঙ্গে পড়বে তাদের মিথ্যার মসনদ।

ভেঙ্গে পড়বে বিলাসী বালাখকানা।

আর ফুর ফুর করে উড়ে যাবে সকল অবাঞ্ছিত স্বপ্ন।

অপূর্ণ রয়ে যাবে তাবৎ আকাঙ্ক্ষা।

ভয়গুলো প্রবেশ করলো তাদের শরীরে বিষাক্ত সাপের ছোবলের মতো। তারা আর স্থির থাকতে পারলে না। তাদের এতোদিনের ভোগ-বিলাস আর আরামের ঘরে অকস্মাৎ প্রবেশ করলো আতংক। প্রকম্পিত হয়ে উঠলো তারা।

ভেবে চিন্তে তারা বার করলো নিসার আলীর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের ধারালো অস্ত্র। এবং তা প্রয়োগ করতে লাগলো একের পর এক।

বাধার পর্বত

নিসার আলীর তৎপরতায় হিংসায় মরিয়া হয়ে উঠলো যারা- তাদের  মধ্যে প্রথম হলো পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়।

কৃষ্ণদেব কেবল অত্যাচারী জমিদারই ছিল ন। সে ছিল অন্যান্য অত্যাচারী জমিদারদের এক জঘন্য নেতাও। বিরাট তার দাপট। বিশাল তার প্রতিপত্তি। এতোদিন যাবৎ সে অবাধে নির্যাতন চালিয়ে আসছিল তার প্রজা- মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর।

অত্যাচার আর শোষণ করে যাচ্ছিল তাদেরকে।

কিন্তু বাধ সাধলো নিসার আলীর দাওয়অত। বাধ সাধলো তার কর্মতৎপরতা।

এসব দেখে জমিদার কৃষ্ণদেব ক্ষেপে গেল চরমভাবে। সে মেতে উঠলো নতুন ষড়যন্ত্রে।

নিসার আলীর গতিবিধি, কার্যক্রম এবং প্রচার ও প্রচারণার খবরাখবর সংগ্রহের জন্যে কৃষ্ণদেব উতলা হয়ে উঠলো।

জমিদার বলে কথা!

তার ছিল অনেক পাইক-পেয়াদা, গোমস্তা এবং বরকন্দাজ।

এদের মধ্যে অনেক অসহায় মুসলমানও ছিল। যারা নিতান্ত পেটের দায়ে কৃষ্ণদেবের তাবেদারী করতো।

সে ভাবলো, কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হবে।

তার অধীনে ছিল একজন মুসলমান পাইক। নাম- মতিউল্লাহ। জমিদার কৃষ্ণদেব তাকে ‘মতিলাল’ বলে ডাকতো। একদিন মতিকে ডেকে কৃষ্ণদেব বললো:

‘তিতু ওহাবী ধর্মাবলম্বী। ওহাবীরা তোমাদের হযরত মুহাম্মদের ধর্মমতের পরম শত্রু। কিন্তু তারা এমন চালাক যে, কথার মধ্যে তাদেরকে ওহাবী বলে ধরা যাবে না। সুতরাং আমার মুসলমান প্রজাদেরকে বিপথগামী হতে দিতে পারিনা। আজ থেকে তিতুর গতিবিধির দিকে নজর রাখবে এবং সব কথা আমাকে জানাবে।”

ষড়যন্ত্রের প্রথম ছোবল

নিসার আলীর কার্যক্রমের ওপর নজর রাখার দায়িত্ব মতিউল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েও নিশ্চিন্তে বসে থাকলো না কৃষ্ণদেব রায়।

সে ছুটে গেল গোবরা ডাঙ্গার গোবিন্দপুরের জমিদার দেবনাথ রায়ের কাছে। ছুটে গেল গোবর ডাঙ্গার জমিদার কালী প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের কাছেও।

তাদের সাথে ষড়যন্ত্রে নানা অলিপথ গলিপথ নিয়ে আলোচনা করলো ধূর্ত কৃষ্ণদেব।

পরামর্শ আর আলাপ-আলোচনা চললো দীর্ঘক্ষণ। তাদের পিছনে ছিল ইংরেজদের প্রত্যক্ষ মদদ। ছিল তাদের ই্ন্ধন।

এক সময় পরামর্শ সভা শেষ হলো।

সিদ্ধঅন্ত নিল তারা- শান্তিভংগের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হবে নিসার আলীকে। এই অভিযোগটি উত্থানের ভার দেয়া হবে প্রজাদের ভেতর কোনো মুসলমানকে। তারপর তাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে তারা নিসার আলীর বিচার করবে।

সিদ্ধান্তের পালা শেষ।

এবার মুসলমান প্রজা খোঁজার পালা।

কৃষ্ণদেব আবার ডাকলো মতিউল্লাহকে।

মতিউল্লাহ কৃষ্ণদেবের একজন বিশ্বস্ত অনুচর।

পয়সা আর সুযোগ সুবিধার আশ্বাস দিয়ে জমিদার কৃষ্ণদেব তাকে বললো, তোকে একটা কাজ করতে হবে।

মতিউল্লাহ জিজ্ঞেস করলো, কি কাজ?

কৃষ্ণদেব আস্তে করে বললো- “তুই তোর পরিবার থেকে কয়েকজনকে নিয়ে নিসার আলীর বিরুদ্ধে একটি নালিশ পেশ করবি আমার কাছে। শান্তি ভংগের নালিশ। আমি বলে দেব তাতে কি কি জানাবি। তারপর আমি তোদের হিতের জন্যে নিসার আলীর বিচার করবো।”

মুর্খ মানুষ মতিউল্লাহ।

সে সাত-প্যাঁচ কিছু না বুঝে বললো, “ঠিক আছে। আপনি যা ভালো বোঝেন।”

এরপর কৃষ্ণদেবের সাজিয়ে দেয়া অভিযোগসহ তারই কাছে নালিশ  জানালো মতিউল্লাহ। সাথে ছিল তার চাচা গোপাল, জ্ঞাতি ভাই নেপাল ও গোবর্ধন। তারা কৃষ্ণদেবের ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে তারেই সাজিয়ে দেয়া নালিশে মিথ্যা এবং বানোয়াট অভিযোগ করলো যে:

“চাঁদপুর নিবাসী তিতুমীর তার ওহাবী ধর্ম প্রচারের জন্যে আমারে সর্পরাজপুর (মুসলমানী নাম সরফরাজপুর) গ্রামে এসে আখড়া গেড়েছে এবং আমাদেরকে ওহাবী ধর্মমতে দীক্ষিত করার জন্যে নানা রকম জুলুম জবরদস্তি করছে। আমরা বংশানুক্রমে যেভাবে বাপ-দাদার ধর্ম পালন করে আসছি, তিতুমীর তাতে বাধান করছে। তিতুমীর ও তার দলের লোকেরা যাতে সর্পরাজপুরের জনগণের ওপর কোনো প্রকার অত্যাচার করে তাদের ধর্মে দীক্ষিত করতে না পারে, জোর করে আমাকে দাড়ি রাখতে গোঁফ ছাটাতে, গোহত্যা করতে, আরব দেশের নাম রাখতে বাধ্য করতে ন পারে, হিন্দু-মুসলমান দাংগা বাধাতে না পারে, হুজুরের দরবারে তার বিহিত ব্যবস্থার জন্যে আমাদের নালিশ। হুজুর আমাদের মনিব। হুজুর আমাদের বাপ মা।”

About মোশাররফ হোসেন খান