আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

তৃতীয় অধ্যায়

শৈল্পিক চিত্র

চিত্র কুরআন মজীদের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। আল-কুরআনের উদ্দেশ্যকে হৃদয়পটে অংকিত করার এটি একটি উপকরণ। চিত্রের দ্বারা অব্যক্ত ও দুর্বোধ্য বিষয়ের কল্পিত ছবি মনের মুকুরে প্রতিবিম্বিত করা হয়। বিজ্ঞচিত ভাবে চিত্রিত এ চিত্রগুলো জীবন ও কর্মের ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ কল্পিব বিষয় তখন স্বরূপে মূর্তমান হয়ে চোখের সামনে উপস্থিত হয়। মৃত মানুষ জীবিত মানুষে রূপান্তর হয়ে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়।

ছবিতে বর্ণনা, সাক্ষ্য ও ঘটনাবলী দৃশ্যাকারে চোখের সামনে ভেসে উঠে এবং তাতে জীবন ও কর্ম চাঞ্চক্যতা সৃষ্টি হয়। যদি তার মধ্যে সংলাপ ও ভাষা সংযোজন করা যায়, তাহলে তা জীবন্ত অভিনেতা হিসেবে প্রকাশ পায়। এসব কিছুই সেই স্ক্রীন বা পর্দার ওপর প্রতিফলিত হয় যা স্টেইজের ওপর থাকে। শ্রোতা কিংবা পাঠক এতো তন্ময় হয়ে যায় যে, সে ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলে যায়, এতো আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করা হচ্ছে, যেখানে এ ধরনের উদাহরণ দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করার জন্য। বরং সে তখন দিব্য দৃষ্টিতে সমস্ত ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করে। একের পর এক দৃশ্যাবলী পরিবর্তন হতে থাকে। তার মনে হতে থাকে এতো শুধু ছবি নয় এবং এ যেন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

যখন মস্তিষ্কের গোপনীয় কথা, মনোজাগতিক অবস্থা, মানুষের গতি-প্রকৃতির চিত্রায়ণ করা হয় তা শুধুমাত্র প্রাণহীন কিছু বাক্যের মাধ্যমেই প্রকাশ করা হয়। তার মধ্যে কোন রঙ্গের প্রলেপ থাকে না, কিংবা তার মুখ থেকে কোন শব্দ বা বাক্যও নির্গত হয় না। তবু আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না, আল-কুরআনের অলৌকিকতার ও চমক। এমনি ধরনের বিভিন্ন বিষয়ের সার্থক চিত্রায়ণ ও উপমা উৎক্ষেপনে আল-কুরআন পরিপূর্ণ। যে উদ্দেশ্যের কথা আমরা কেটু আগে বলেছি যেখানে সেই রকম কোন উদ্দেশ্যের কথা আমরা একটু আগে বলেছি যেখানে সেই রকম কোন উদ্দেশ্য পাওয়া যাবে সেখানে কুর্ন ও ঢংয়েই তার বর্ণনা পেশ করেছে। -যেমন পুরোনো বিষয় কিংবা মানবিক দৃষ্টান্ত অথবা সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের পুনরালোচনা বা কিয়ামতের দৃশ্য চিত্রায়ণ কিংবা জান্নাতের শান্তি ও জাহান্নামের শাস্তির চাক্ষুষ বিবরণ অথবা বিতর্কের বর্ণনা ইত্যাদি। শুধুমাত্র কুরআনের বাচনভঙ্গিকে আকর্ষণীয় করার জন্য এ কাজ করা হয়নি। এটি কুরআনের নির্দিষ্ট ও বিশেষ এক পদ্ধতি। যাকে আমরা চিত্রায়ণের পদ্ধতি বলে অভিহিত করতে পারি।

আমরা ছবির তাৎপর্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করার চেষ্টা করবো, যাতে বুঝা যায়, আল-কুরআনে শৈল্পিক চিত্রের সীমা-পরিসীমা কী। ছবি তো রঙকুলির সাহায্যে আঁকা যায়, আবার চিন্তা ও ধ্যানের সাহায্যেও আঁকা যায়। আবার সঙ্গীতের রাগিনীর মাধ্যমেও কোন চিত্রের সার্থক পরিস্ফুটন ঘটানো যায়। কখনো এমনও হয় যে, চিত্রের উপকরণ হিসেবে বাক্য, শব্দ, পাঠের ঢং ও আনুসঙ্গিক বিষয়সমূহও ব্যবহৃত হয়। যখন এ ধরনের চিত্র আমাদের ামনে আসে তখন চোখ-কান, চিন্তা-চেতনা, মন-মস্তিষ্ক সবকিছু মিলেই তা উপভোগ করা হয়।

একটি কথা মনে রাখা আবশ্যক, কুরআনী ছবিগুলো স্কেচ ও রঙ্গের সাহায্যে অংকিত হয়নি বরং তা হয়েছে মানুষের জীবন ও জগতের সাহায্যে। এগুলো এমন ছবি যা চেতনা ও অনুভূতি থেকে নিঃসৃত হয়। অর্থগুলো ছবির রঙ হয়ে মানুষের মানসপটে প্রতিবিম্বিত হয়।

এখন আমরা এর কিছু উদাহরণ পেশ করবো।

ভাববে বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ

১. একথা বুঝানো উদ্দেশ্য ছিল, কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে কাফিরদের কোন অভিযোগ কিংবা অনুরোধ গৃহিত হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও জান্নাতে প্রবেশ করাটা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। একথা বুঝানোর জন্র কত সুন্দর এক চিত্র অংকন করা হয়েছে।

(আরবী**************)

যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং এবং এগুলো থেকে অহংকার করেছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা ততোক্ষণ জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না যতোক্ষণ না সূচের ছিত্র দিয়ে উট প্রবেশ করতে পারবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪০)

এ আয়াত পড়া কিংবা শোনামাত্র পাঠকের সামনে দুটো ছবি ভেসে উঠে। একটি আসমানের দরজা খোলার ছবি এবং অপরটি সুইয়ের ছিদ্রপথে প্রবেশ করার জন্য হৃষ্টপুষ্ট এক উটের প্রচেষ্টারত ছবিৎ। অবোধগম্য এক জটিল বিষয়কে বোধগম্য করার জন্য পরিচিত এক চিত্রে পেশ করা হয়েছে। মানুষের মনে এটি শুধু ভাবের সৃষ্টি করে না বরং বাস্তব ও প্রত্যক্ষ ছবিরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠে।

২. আল্লাহ তা’আলা বুঝাতে চান, কিয়ামতের দিন কাফিরদের ভালো কাজসমূহকে এমনভাবে নষ্ট করে দেবেন, মনে হবে তার কোন অস্তিত্বই কখনো ছিল না। নিচের বাক্যে একথাটির সুন্দর এক চিত্র অংকিত হয়েছে:”

(আরবী***********)

আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করবো, তারপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। (সূরা আল-ফুরকান: ২৩)

এ আয়াত পড়ে পাঠক যখন বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার কথা চিন্তা করে তখন তাদের এ আমলের অসারতার চিত্র তার মানসপটে ভেসে উঠে।

৩. নিচের আয়াতটিতেও এ রকম আরেকটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী**************)

যারা তাদের পালনকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, তাদের আমলের উদাহরণ হচ্ছে- সেই ছাই ভস্মের মতো যার ওপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের হস্তগত হবে না। (সূরা ইবরাহীম : ১৮)

ধূলিঝড়ের দিনের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এমন একটি করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি মানুষই কল্পনার চোখে দেখতে থাকে, প্রবল ঝটিকা সব কিছুকে তছনছ করে দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে উড়িয়ে নিয়ে গেল, যা আর শত চেষ্টাতেও একত্রিত করা সম্ভব হলো না। তেমনিভাবেই কাফিরদের আমল নিষ্ফল ও বরবাদ হয়ে যাবে।

৪. আল্লাহ তা’আলা বলতে চান, যদি কোন ব্যক্তি কাউকে কিছু দান করলো কিছু পরে তাকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে হেয় করার চেষ্টা করলো, তাহলে তার এ দান বিফলে গেল। এরই এক চাক্ষুষ জুবন্ত ছবি এ আয়াতটিতে তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী************)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাতকে বরবাদ করে দিয়ো না সেই ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো যার ওপর কিছু মাটি পড়েছিল, কিন্তু এক প্রবল বৃষ্টি তা ধুলে পরিষ্কার করে দিলো। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পাবে না যা তারা উপার্জন করেছে। (সূরা আল-বাকারা: ২৬৪)

এ আয়অতে এক দ্বিমুখী চিত্র অংকন করা হয়েছে। প্রথম চিত্রটি হচ্ছে একটি নগ্ন পাথর যার ওপর মাটির হাল্কা প্রলেব পড়েছে মাত্র কিন্তু এক প্রবল বৃষ্টি তা ধুয়ে পরিষআর করে দিলো। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পাবে না যা তারা উপার্জন করেছে। (সূরা আল-বাকারা: ২৬৪)

এ আয়াতে এক দ্বিমুখী চিত্র অংকন করা হয়েছে। প্রথম চিত্রটি হচ্ছে একটি নগ্ন পাথর যার ওপর মাটির হাল্কা প্রলেব পড়েছে মাত্র কিন্তু বৃষ্টি এলে তা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়, ফলে পাথর পাথরের চেহারা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। এ উদাহরণ হচ্ছে যারা দান করে বলে বেড়ায় তাদের জন্য। পরে বলা হয়েছে যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে- বাগানের মতো। যেখানে কম হোক কিংবা বেশি কোন বৃষ্টিই বৃথা যায় না। তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে। এমনকি যদি কোন বৃষ্টি নাও হয় তবু তা ফল উৎপন্ন করবে।

আমি এখানে একথা বলতে চাই না যে, উপরোক্ত ছবি দুটোতে স্থান ও কালের সামঞ্জস্য কতটুকু। সেগুলোর সাদৃশ্য বিধানে কি ধরনের সৌন্দর্যের পোশাক পরানো হয়েছে। তাছাড়া একথা বলাও আমার উদ্দেশ্য নয় যে, পাথরের ওপর হাল্কা মাটির আস্তরণ বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝান হয়েছে, যে দান-খয়রাত করে আবার দান গ্রহিতাকে কষ্ট দেয় অর্থাৎ সেই দান সাময়িকভাবে তাদের কুৎসিত চেহারাকে ঢেকে রাখে কিন্তু অল্প পরেই তাদের সে চেহারা নগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়ে।

আমি বলতে চাই ছবির উপকরণ সম্পর্কে। অবশ্য এ পুস্তকে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য স্বতন্ত্র একটি অধ্যায়ই রাখা হয়েছে।

৫. এ বিষয়ের আরেকটি চিত্র হচ্ছে:

(আরবী***********)

তারা এ দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করে তার উপমা ঝড়ো হাওয়ার মতো, যাতে রয়েছে তুষারে শৈত্য, যা সেই শস্য ক্ষেতে গিয়ে লেগেছে যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। অতপর সেগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। (সূরা আলে-ইমরান: ১১৭)

এ আয়াতে এমন এক ক্ষেতের দৃশ্য অংকিত হয়েছে, যে ক্ষেতের ওপর দিয়ে তুষার ঝড় প্রবাহিত হয়েছে, ফলে তার সমস্ত ফল-ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্ষেতের মালিকের সমস্ত শ্রম ও মেহনত ব্যর্থ হয়েছে। এতো পরিশ্রমের পরও শস্য ঘরে তুলতে পারলো না। হুবহু এ ধরনর কাজই হচ্ছে, যারা কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে আল্লাহর পথে দান করে বিনিময় পাবার আশা রাখে, কিন্তু কুফরী তাদের সে নেক আমলকে ভূমিসাৎ করে দেয়।

এ ‍দৃশ্যে (**) সির্‌রুন) শব্দটি কতো পরিকল্পিতভাবে চয়ন করা হয়েছে এবং এ শব্দটি দিয়ে দৃশ্যটিকে সৌন্দর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মনে হয় ঠাণ্ডার ছোট ছোট গোলা দিয়ে শস্য ক্ষেতকে ধ্বংস করা হচ্ছে। শব্দটি গোটা চিত্রকে প্রাণবন্ত করে দিয়েছে। এ ধরনের শব্দ চয়ন সম্পর্কে আলোচনার জন্য আমরা স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রেখেছি।

৬. আল্লাহ তা’আলার বুঝাতে চান যদি কেউ তাঁকে ডাকে তবে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন এবং তার মনোবাসনা পুরো করে দেন। তাঁকে ছাড়া যদি আর কাউকে ডাকা হয় তবে সে তার ডাক শুনতেও পায় না এবং তার কোন মনোবাসনা পূর্ণও করতে পারে না। কারণ সে তো আর সবকিছুর মালিক নয়। এ বিষয়ে নিচের আয়াতে কতো সুন্দর এক চিত্র অংকন করা হয়েছে।

(আরবী**************)

সত্যের আহ্বানে একমাত্র তাঁরই এবং তাঁকে ছাড়া যাদেরকে ডাকে, তারা তাদের কোন কাজে আসে না। ওদের দৃষ্টান্ত এমন কেউ দু’হাত পানির দিকে প্রসারিত করলো, যেন পানি তার মুখে পৌঁছে যায়, অথচ পানি কখনোই তার মুখে পৌঁছুবে না। কাফিরদের যতো আহ্বান তা সবই বিফল। (সূরা আর-রা’দ: ১৪)

এটি অত্যন্ত চিত্রাকর্ষক এক ছবি। যা মানুষকে সে দিকে আকর্ষণ করে। কথার দ্বারা এর চেয়ে আকর্ষণীয় কোন চিত্র অংকন করা সম্ভব নয়। দেখুন ছবিটি কতো স্বচ্ছ- এক ব্যক্তি পানির পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে পানিকে আহ্বান করছে তার মুখে প্রবেশ করার জন্য, কিন্তু সে পানি কখনো তার মুখে প্রবেশ করবে না?

৭. উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহকে ছাড়া অন্য যাদের পূজা-অর্চনা করা হয়, সেগুলো না কিছু শুনতে পায়, না কিছু দেখতে পায়, জ্ঞান-বুদ্ধি ও শক্তি থেকে মাহরূম। কাজেই যারা তাদের বন্দেগী করে সে বন্দেগী বিফল হতে বাধ্য। এটি প্রকাশের জন্য যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে তা এমন মর্মস্পর্শী যে, অন্য কোন উপায়ে তা আঁকা সম্ভব নয়।

(আরবী*************)

কাফিরদের উপমা এরূপ, কোন ব্যক্তি এমন কিছু (পশু)-কে আহ্বান করে যারা শুধুমাত্র চীৎকার ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না। তারা বোবা, বধির ও অন্ধ, কিছুই বুঝে না। (সূরা আল-বাকারা: ১৭১)

কাফিররা যেসব মাবুদদেরকে আহ্বান করে তারা আহ্বানে সাড়া দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। তারা না পারে আহ্বানের মূল্যায়ণ করতে আর না পারে তাদের আহ্বানে উদ্দে অনুধাবন করতে। এটি একটি উপমা। এ আয়াতে এমন এক সম্প্রদায়ের চিত্র অংকিত হয়েছে যারা তাদের মাবুদদেরকে আহ্বান করে ঠিকই কিন্তু এর তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাটির পুতুল তো কিছুই বুঝে না। তারা এতো উদাসীন যে, তাদের আহ্বান যথাযথ জায়গায় পৌছুল কিনা কিংবা সে আহ্বানে কোন সাড়া মিললো কিনা এ সম্পর্কে কোন খবরই তারা রাখে না।

৮. এখানে বুঝানো উদ্দেশ্য, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকা হয় এবং যাদের উপাসনা করা হয়, তারা অত্যন্ত দুর্বল। কাজেই যারা নিজেরাই এতো দুর্বল তারা কি করে অপরকে রক্ষা করতে পারে? তারই সুন্দর চিত্র অংকিত হয়েছে এ আয়াতটিতে:

(আরবী*****************)

যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অপরকে অভিভাবক বানায় তাদের উদাহরণ মাকড়সার মতো। সে ঘর বানায়। আর সব ঘরের মধ্যে একমাত্র মাকড়সার ঘরই অত্যন্ত দুর্বল। (সূরা আল-আনকাবুত: ৪১)

আয়াতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে প্রতিপালক মনে করে, তারা তো মাকড়সার ঘরের মতো এক দুর্বল ঘরে আশ্রয় নেয়। যা সামান্য আঘাতেই নষ্ট হয়ে যায়। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, এতা স্থুল দৃষ্টান্তের পরও তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না, তারা মুর্খতা ও অহংকারেই নিমজ্জিত।

৯. এখানে যে কথাটি বুঝানো উদ্দেশ্য তা হচ্ছ- মুশরিকরা এমন এক কাজে জড়িয়ে গেছে তা অসার, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই। এমন একটি বস্তুর সাথে তার তুলনা করা হয়েছে যা ভাসমান কিন্তু তা ভেসে থাকাটাও কষ্টকর।

(আরবী************)

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করলো, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে ছিল। অতপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। (সূরা আল-হাজ্জ: ৩১)

এ আয়াতে মুশরিকদের করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নিজেদের অজান্তেই যেন তারা মুহূর্তের মধ্যে আসমান থেকে ছিটকে পড়ে কিন্তু মাটি স্পর্শ করার পূর্বেই মাংসাসী কোন পাখী তাকে থাবা মেরে নিয়ে যায় অথবা বাতাস তাকে এমন জায়গায় নিরুদ্দেশ্য করে নিয়ে যায় যেখান থেকে আর প্রত্যাবর্তন করা কখনো সম্ভবপর নয়।

১০. ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আহলে কিতাবদের আল্লাহ আসমানী কিতাব দিয়েছিল। তারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনার ঘোষণা এবং শপথও করেছিল। কিন্তু সামান্য পার্থিব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি তারা। ফলে তাদের প্রতিশ্রুতিকে নিজেরা নষ্ট করে ফেলেছিল। তাই কিয়ামতের দিন তারা কতোটা দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে বার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এ আয়াতে কারীমের মাধ্যমে।

(আরবী************)

যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রি করে দেয়, আখিরাতে তাদের কোন অংশ নেই। তাদের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কোন কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টি দেবেন না, এমনকি তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (সূরা আলে-ইমরান: ৭৭)

এখানে আহলে কিতাবদের বদ নসীবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বঞ্চিত বস্তুর উল্লেখ না করে এমন কিছু আলামতের কথা বলা হয়েছে, মেযন স্বতঃই বুঝা যায় যে, বঞ্চিত বস্তুটি কী। যেমন বলা হয়েছে, আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না বা তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। একথাগুলো বলে আল্লাহ বুঝাতে চেয়েছেন যে, তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং চিরসুখে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করা হবে।

মনোজাগতিক চিত্র

১. যে ব্যক্তি তওহীদের ওপর শিরকের জীবনকে বেছে নেয় সে কতটুকু পেরেশানীতে নিমজ্জিত হয় তা বুঝানোর জন্য নিচের আয়াতটি পেশ করা হয়েছে। অনেক ইলাহর মধ্যে কিভাবে তার মনকে ভাগ-বাটোয়অরা করে নেয় এবং তার মনোজাগতিক অবস্থা কেমন হয়, কিভাবে হেদায়েত ও ভ্রষ্টতার মধ্যে তার মন দোদুল্যমান থাকে তার বাস্তব চিত্র এ আয়াতটি:

(আরবী************)

তুমি বলে দাও, আমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুকে আহ্বান করবো, যে আমাদের কোন উপকার কিংবা ক্ষতি কিছুই করতে পারে না। আমরা কি পেছনের দিকে ফিরে যাব আল্লাহর হেদায়েতের পর, ঐ ব্যক্তির মতো যাকে শয়তান বনভূমিতে বিপথগামী করে দিয়েছে, ফলে সে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে? আর তার সহচররা তাকে পথের দিকে ডেকে বলছে। এসো আমাদের কাছে। (সূরা আল-আনআ’ম: ৭১)

এ আয়াতে ঐ ব্যক্তির ছবি আঁকা হয়েছে, যাকে শয়তান বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। তার সাথীরা তাকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করছে কিন্তু সে ভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারভে না, সাথী এবং শয়তান এ দু’দিকের কোন্‌ দিকে সে সাড়া দেবে, পা বাড়াবে।

২. আল্লাহ তা’আলা ঐ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করতে চাচ্ছেন যাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় পথ-নির্দেশ দেয়ার পর সে বহুদূরে পালিয়ে যাবার জন্য বিরামহীন প্রচেষ্টায় লিপ্ত। এ যেন পতনের স্রোতে ভাসিয়ে দেবারই প্রচেষ্টা। এদিকে মানবিক চাহিদা ও লোভ-লালসা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। জ্ঞান এবং মূর্খতা উভয়ই তার জন্য লাঞ্ছনার কারণ। সে মূর্খতার কারণেও শান্তি পাচ্ছে না, আবার জ্ঞানও তাকে কোন কল্যাণ দিকে পারছে না। এ ছবিটি নিচের ক’টি বাক্যে কতো সুন্দরভাবেই না ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

(আরবী************)

তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দাও, সেই লোকের অবস্থা, যাকে আমি আমার নিদর্শন (হেদায়েত) দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। তার পেছনে শয়তান লেগেছে, ফলে সে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে। অবশ্য আমি ইচ্ছে করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে পারতাম সেসব নির্শনের বদৌলতে। কিন্তু সে অধপতিত ও রিপুর বশীভূত হয়ে রিইলো। তার উপমা হচ্ছে সেই কুকুরের মতো, যদি তাকে তাড়া করো তবু হাঁপাবে আর যদি ছোড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। (সূরা আল-আরাফ: ১৭৫-১৭৬)

এ ছবিটি হচ্ছে লাঞ্ছনা ও জিল্লাতীর বাস্তব রূপায়ণ। এটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এক চিত্র। চির ভাস্বর। এটি এমন এক ছবি যা নিজেই প্রকাশ করে দেয় তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এখানে দ্বীনি গুরুত্বের সাথে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব মিলে একাকার হয়ে গেছে। কুরআন আঁকা সবগুলো ছবির মধ্যেই এরূপ মিল পাওয়া যায়।

৩. এবার আল্লাহ তা’আলা বুঝাতে চাচ্ছেন, এমন এক ব্যক্তির কথা যার বিশ্সাব ঠুনকো, হৃদযের গভীরে যা প্রোথিত নয়। দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব। ঈমানের অধিকারী হওয়ার পরও সে ঈমানের পথে জুলুম-নির্যাতন বরদাশত করতে রাজী নয়। নির্ঝঞ্ঝাটে থেকে ঈমান বহাল রাখতে চায়। তার বিশ্বাসে এমন দৃঢ়তা আসেনি যে, সে যে কোন রকম ঝুঁকির মুকাবেলায় অবিচল থাকবে। এমনি ধরনের লাভ-লোকসানের দোলায় দোদুল্যমান এক চিত্র:

(আরবী************)

মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণ প্রাপ্ত হয় তবে ইবাদতের ওপর কায়েম থাকে, আর যদি কোন পরীক্ষায় নিমজ্জিত হয় তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো দুনিয়ায় আখিরাতে। এতো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা হাজ্জ: ১১)

হারফিন (***) বা প্রান্তিক সীমা কথাটি বলেই ছবিটিকে চোখের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। যেখানেদেখা যাচ্ছে দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তি এমনভাবে ইবাদত করে, সে ইবাদতের মধ্যেই প্রমাণ করে দেয় যে, সঠিক পথে স্থির অবিচল থেকে ইবাদত করার যোগ্য সে নয়। এ ছবিটি মানুষের মনে এমনভাবে প্রতিবিম্বিত হয় যা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

আমি যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম তখন কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে এই স্থানে পৌঁছুলেই আমার মনের মুকুরে ভেসে উঠতো একটি জীবন্ত ছবি যার কথা আমি আজও ভুলিনি।

সেদিনের সেই ছবি আর আজকের অনুভূতির মধ্যে খুব একটি ব্যবধান নেই। সেদিন একে শুধুই একটি ছবি মনে করতাম আর আজ মনে হয় এটি একটি উপমামাত্র। সত্যিকারের ছবি নয়।

আমি মনে করি, আল-কুরআন এমন অলৌকিকভাবে তার বক্তব্য পেশ করেছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রতিটি পাঠক তা বুঝতে সক্ষম এবং প্রতিটি পাঠকের কাছেই তা জীবন্ত ছবি হয়ে ভেসে উঠে।

৪. যেসব মুসলমান ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জাহান্নামের গর্তের কিনারায় অবস্থান করছিল, তাদের চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:

(আরবী**************)

তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সম্প্রতি স্থাপন করে দিয়েছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁরই অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই। তোমরা এক আগুনের গর্তের কিনারে অবস্থান করছিলে, তা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। (সূরা আলে-ইমরান: ১০৩)

চিত্রে বুঝানো হয়েছে, তোমরা আগুনের এক গর্তের কিনারে অবস্থান করছিলে। যেখানে সামান্য একটু পা ফসকে গেলেই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতো। অর্থাৎ যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ না করতে তবে জাহান্নাম ছিল তোমাদের জন্য অবধারিত।

এখানে উপমার গ্রহণযোগ্যতা এবং সত্যতা নিয়ে কথা নেই। এখানে যে জিনিসটি গুরুত্বপূর্ন তা হচ্ছে অন্তর্লোকে মুসলমানদের যে ছবিটি প্রতিভাত হয়ে উঠে, মনে হয় তারা ইতোপূর্বে আগুনের গুহায় নিশ্চিত পড়ে যাচ্ছিল। কোন শিল্পিী কি তার রঙ-তুলির সাহায্যে মনোজাগতিক এমন নিখুঁত স্থির ছবি আঁকতে পারতো? অথচ কুরআন রঙ, তুলি এবং ক্যানভাস (চিত্রপট) ছাড়াই কয়েকটি শব্দ দিয়ে কতো সুন্দর এক নিখুঁত ছবি এঁকে দিয়েছে।

আমরা এ ছবিতে দেখতে পাই, আগুরে একটি গর্ত, তার পাশে বসা কতিপয় লো, মাঝের ফাঁকটুকু হচ্ছে দুনিয়ার জীবন, মুসলমান হওয়ার পর তাদের এ গর্তের মাঝে এক বিশাল দেয়াল সৃষ্টি হলো, যা অতিক্রম করে আর ঐ গর্তে পড়ার কোন সম্ভাবনাই রইলো না।

৫. আমরা এ রকম আরেকটি চিত্র দেখতে পাই, যে ব্যক্তি তার যাবতীয় কাজের ভিত্তি তাকওয়ার ওপর না রেখে অন্য কিছুর ওপর রেখেছে:

(আরবী**********)

যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির ওপর, সে তার চেয়ে ভালো কাজ করেছে- যে তার ঘরের ভিত্তি করেছে কোন গর্তের কিনারায়, যা ধ্বসে পড়ার উপক্রম এবং তাকে নিয়ে তা জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়। (সূরা আত্‌-তাওবা: ১০৯)

জাহান্নামে পতিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তের চিত্রটি এ আয়াতে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে: (আরবী*****) অর্থাৎ ঐ দালান তাকে নিয়ে জাহান্নামে পতিত হচ্ছে। এখানে দুনিয়ার জীবনকালকে এতো তুচ্ছ মনে করা হয়েছে যে, তার ইঙ্গিত পর্যন্ত করার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। এখানে (****) শব্দে (***) এর জায়গায় নেয়া যেতো, কিন্তু তা নেয়া হয়নি। কারণ যা ঘটতে সামান্য বিলম্ব আছে এমন কিছু বুঝানোর সময় (***) ব্যবহৃত হয় কিন্তু (**) দিয়ে বুঝানো হচ্ছে, সে দালান পড়ন্ত অবস্থায় আছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তা জাহান্নামের মধ্যে হারিয়ে যাবে। জাহান্নাম এবং পড়ন্ত দালানের মধ্যবর্তী দূরত্বটুকুই হচ্ছে দুনিয়ার জীবনযা ক্রমশ জাহান্নামের নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছে।

মানবিক চিত্র

আল-কুরআন মানুষের মনোজাগতিক ছবি আঁকার সাথে সাথে মানবিক অবস্থার ছবিও তুলে ধরেছে। আমরা ইতোপূর্বে (আরবী*******) প্রসেঙ্গ (যার দ্বিধা-দ্বন্ধে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে…।) আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে নিচে আরো কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:

১. অনর্থক বিতর্ক ও অসার যুক্তি-প্রামাণকে খণ্ডন করে সঠিক দলিল-প্রমাণ তুলে ধরলেও যে কোন ফায়দা নেই তারই এক মনোজ্ঞ চিত্র অংকন করা হয়েছে নিচের আয়াত ক’টিতে।

(আরবী*************)

যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোন দরজা খুলে দেই আর তাতে ওরা দিনভর আরোহন করতে থাকে, তবু ওরা একথাই বলবে যে, আমাদের দৃষ্টি বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে, না হয় আমরা জাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।

অন্যত্র বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যদি আমি কাগজে লিখিত কোন বিষয় তাদের কাছে অবতীর্ণ করতাম, আর সেগুলো তারা হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতো, তবু তারা বলতো: এটি একটি প্রকাশ জাদু ঝারা আর কিছুই নয়। (সূরা আল-আনআ’ম : ৭)

২. এখানে যে বিষযটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা হচ্ছে- মানুষ তখনই তার প্রতিপালককে চেনে যখন সে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়। যখন সুদিন আসে তখন ত্রাণকর্তাকে সে ভুলে বসে। এ কথাগুলোকে সাদাসিদাভাবে বর্ণনা নাকরে এক মনোজ্ঞ চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। চলচিত্রের মত পরিবর্তনের সময় তার মধ্যে এমন এক মানুষের ছবি ভেসে উঠে, যা মানব সমাজে অধিকাংশ পাওয়া যায়।

(আরবী************)

তিনিই তোমাদেরকে জলে ও স্থলে ভ্রমণ করান। যখন তোমরা নৌকায় আরোহণ কর আর তা লোকজনকে নিয়ে অনুকূল হাওয়ায় বয়ে চলে, তারা আনন্দিত হয়। (হঠাৎ) নৌকা তীব্র বাতাসের কবলে পড়ে, আর চতুর্দিক থেকে আসতে থাকে ঢেউয়ের পর ঢেউ। তারা বুঝতে পারে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তখন আল্লাহকে ডাকতে থাকে তার ইবাদতে নিঃস্বার্থ হয়ে। ‘যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দাও তবে আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো।’ অতপর যখন আল্লাহ তাদেরকে বাঁচিয়ে দেন, তখনই তারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অনাচারে লিপ্ত হয়। (সূরা ইউনুস: ২২-১৩)

এভাবেই একে জীবন্ত ও চলমান এক ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নৌকা ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। একবার ওপরে আবার নীচে। মনে হচ্ছে নৌকা পানির তলায় তলিয়ে যাচ্ছে। আরোহীরা মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং মৃত্যু ভয় তাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে। এমতাবস্থায় তারা প্রাণপণে আল্লাহকে স্মরণ করছে। আয়াতের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে মানুষ সম্মোহিত হয়ে পড়ে। পুরো ছবিটি জীবন্ত হয়ে তার সামনে নড়াচড়া করতে থাকে। আমরা বলতে পারি এ আয়াতটি পুরোপুরিভাবে তার বক্তব্য সর্বোত্তম পদ্ধতিতে আমাদের কাছে তুলে ধরতে পেরেছে।

৩. এমন এক ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য, যার বাহ্যিক দিক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মন ভুলোনো। কিন্ত অভ্যন্তরনী দিক অত্যন্ত কুৎসিত ও বিপজ্জনক। দেখুন কতো সুন্দরভাবে সে চিত্র অংকিত হয়েছে।

(আরবী************)

যারা মুমিন তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতপর যখন কোন দ্ব্যর্থহীন সূরা অবতীর্ণ হয় এবং সেখানে জিহাদের উল্লেখ থাকে, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, তুমি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছিত লোকদের মতো তোমার দিকে তাকিযে থাকতে দেখবে। (সূরা মুহাম্মদ : ২০)

মৃত্যু মুহূর্তে মানুষের অবস্থা কেমন হয়তা কি কোন ছবির সাহায্যে বুঝানো সম্ভব? অথচ কতো সুন্দরভাবে উপরোক্ত আয়াতে এ চিত্রটি প্রস্ফুটিত হয়েছে। সেই সাথে তাদের লাঞ্ছিত মুখাবয়বের করুণ ছবিও ভেসে উঠেছে।

৪. অনেক সময় মানুষের এ মানবিক দিকটির চিত্র সাধারণ ঘটনার মাধ্যমে তুলে থরা হয়। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট ঘটনা অতিকৃম করে তা চিরন্তনী এক ছবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

(আরবী***********)

মূসার পর তুমি কি বনী ইসরাঈলের একটি দলকে দেখনি? যখন তারা তাদের নবীর কাছে বললো: আমাদের জন্র একজন বাদশাহ মনোনীত করে দিন, যাতে (তাঁর নেতৃত্বে) আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। নবী বললেন, তোমাদের প্রতিও কি এমন ধারণা করা যায় যে, যুদ্ধের নির্দেশ এলে তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বললো, আমাদের এমন কী হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবো না? অথচ আমরা বিতাড়িত হয়েছি আমাদের ঘর-বাড়ি ও সন্তান সন্তুতি থেকে। অতপর যখন যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হলো, তখন সামান্য ক’জন ছাড়া সবাই ঘুরে দাঁড়ালো। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালো করেই চেনেন। (সূরা বাকারা: ২৪৬)

এখানে স্পষ্ট বুঝা যায় বনী ইসরাঈল যখন বেশ আরাম-আয়েশেছিল তখন তারা বাহাদুরীর মিথ্যা আস্ফালন প্রদর্শন করছিল। জিহাদের নির্দেশ আসা মাত্র তাদের বাহাদুরীর বেলুন চুপসেগেল এবং তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ হয়ে ছিল। এটি এমন কোন ঘটনা যা একবারই ঘটে গেল। স্থান ও কালের গণ্ডি পেরিয়ে এ ধরনের ঘটনার বার বার প্রদর্শনী হয়। এমন লোক মানব সমাজেই ছিল, আছে এবং থাকবে।

এতোক্ষণ আমি কেবল সেই উদাহরণগুলো বর্ণনা করলাম যেখানে মনোজাগতিক ও মানবিক অবস্থার ছবিই শুধু পেশ করা হয়নি বরং সেই ছবিগুলোকে জীবন্ত ও চলমান করে তুলে ধরা হয়েছে। এখন আমি এমনকিছু উদাহরণ তুলে ধরতে চাই কুরআন যেখানে সংঘটিত ঘটনাবলী কিংবা প্রবাদ প্রবচন অথবা বিভিন্ন কিস্‌সা-কাহিনীরপ্রাণবন্ত ও চিত্তাকর্ষক ছবি এঁকেছে। উল্লেখ্য যে, সেগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা নেই বরং একটি সাথে আরেকটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান।

সংঘটিত বিপর্যয়ের চিত্র

১. চিন্তা করে দেখুন, আহযাব যুদ্ধে কাফিরদের পরাজয়ের যে ছবি কুরআনে আঁকা হয়েছে, মনে হয় সমস্ত যুদ্ধের ময়দান চোখের সামনে। সেখানে যেসব তৎপরতা চলছিল তা জীবন্ত ও চলমান হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠে। অনুভব কল্পনার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ ছবি দেখে ধারণা করা হয়, আমাদের সামনেই যেন সে যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে, তার কোন অংশই আমাদের দৃষ্টির বাইরে নেই। নিচের শব্দগুচ্ছেরমাধ্যমে আঁকা হয়েছে সেই ছবি।

(আরবী************)

হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। যখন শত্রুবাহিনী তোমাদেরকে ঘিরে ফেলেছিল, তখনআমি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঞ্চাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যা তোমরা দেখতে পাওনি। তোমরা যা করো আল্লাহ দেখেন। যখন তারা তোমাদের কাছাকাছি হচ্ছিল উচ্চভূমি ও নিম্নভূমিথেকে, (তা দেখে) তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছিল, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করা শুরু করেছিলে। সে সময় মুমিনগণ পরীক্ষিত হচ্ছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল। তখন মুনাফিক ও যাদের মনে রোগ ছিল তারা বলতে লাগল: আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। একদল বললো, হে ইয়াসরিববাসী! এটি টিকবার মতো জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চলো। আরেকদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল: আমাদের ঘর-বাড়ি অরক্ষিত। মূলত তা অরক্ষিত ছিল না, পালানোই তাদের উদ্দেশ্য। (সূরা আল-আহযাব: ৯-১৩)

চিন্তা করে দেখুন, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট এবং যুদ্ধের ময়দানের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ঘটনাবলীর কতো নিখুঁত এক চিত্র অংকিত হয়েছে। চোখের সামনে এ ছবি ভেসে বেড়ায়। শত্রুসৈন্য চতুর্দিকে ঘিরে ফেলেছে, মুসলমানগণ দিশেহারা হয়ে শুধু বিস্ফোরিত চাখে তাকিয়ে আছে।তাদের পা পর্যন্ত পিছলে পড়ার উপক্রম। এদিকে মুনাফিকরা বিপর্য সৃষ্টির প্রয়াসে লিপ্ত। তার াবলতেলাগল, রাসূল তোমাদেরকে এতদিন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা মিথ্যের ফানুস মাত্র। তোমরা এদের মুকাবেলা করে ময়দানে টিকে থাকতে পারবে না। সময় থাকতে কেটে পড়ো। কেউ কেউ ঘরবাড়ি অরক্ষিত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করে পালানোর সুযোগ খুঁজতে লাগল।

সত্যি কথা বলতে কি, যুদ্ধের ময়দানের এমন কোন দিক নেই যা এ চিত্রে তুলে ধরা হয়নি। পুরো ময়দানের দৃশ্য হুহবু চোখের সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছিল এক সত্যি ঘটনা, যা সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু তার কুরআনী চিত্র কাফিরদের পরাজয়ের সেই বিরল দৃশ্যে কমবেশি করতে পারে, তবু তা কালোত্তীর্ণ ও চিরন্তনী। যেখানেই দু’দলে সংঘর্ষ বাধে এবং এক পক্ষ পর্যদুস্ত হয়তখনসেই ছবি চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

২. উপরিউক্ত চিত্রের অনুরূপ আরেকটি চিত্র অংকিত হয়েছে নিচের ঘটনাটিতে। যা আগেরটির মতোই কালোত্তীর্ণ ও চিরন্তনী এবং একে পৃথক করে দেখার কোন সুযোগ রাখে না। চিন্তা করে দেখুন।

(আরবী**********)

আর আল্লাহ সেই ওয়াদাকে সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তোমরা তাঁরই নির্দেশে ওদের খতম করছিলে। এমনকি যখন তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছ ও কর্তব্য স্থির করার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হয়েছ। আর যা তোমরা চাইতে তা দেখার পর কৃতঘ্নতা প্রদর্শন করেছ, সেখানে তোমাদের কার কাম্য ছিল দুনিয়া আর কার কাম্য ছিল আখিরাত। অতপর তোমাদেরকে তাদে ওপর থেকে সরিয়ে দিলেন যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। মূলত আল্লাহ তোমাদেরকে মাফ করে দিছেন, কেননা আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল। তোমরা ওপরে উঠে যাচ্ছিলে, পেছন দিকে কারো প্রতি ফিরেও তাকাওনি, অথচ রাসূল তোমাদেরকে পেছন থেকে ডাকছিল। অতপর তোমাদের ওপর নেমে এলা শোকের ওপরে শোক, যেন তোমরা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুর জন্য দুঃখ না করো এবং যার সম্মুখীন হচ্ছ সে জন্য বিমর্ষ না হও। বস্তুত আল্লাহ তোমাদের কাজের ব্যাপারে পূর্ণ অবহিত রয়েছেন। তারপর তোমাদের শোককে শান্তিতে পরিণত করে দিলেন যা ছিল তন্দ্রার মতো। সে তন্দ্রায় তোমাদের কেউ কেউ ঝিমুচ্ছিল আবার কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল। আল্লাহ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মতো। তারা বলছিল, আমাদের হাতে কি করার মতো কিছুই নেই? তুমি বল, সবকিছুই আল্লাহর হাতে। তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে- তোমার কাছে প্রকাশ করে না- তাও। তারা বলে: আমাদের হাতে যদি কিছু থাকতো তবে আমরা এখানে নিহত হতাম না। (সূরা আলে-ইমরান: ১৫২-১৫৪)

এ আয়াতগুলো পড়ে আমার এ ধারণা হচ্ছে যে, সেই লোক এবং সময় সবকিছুই যেন আমি চাক্ষুষ দর্শন করছি। যা যুদ্ধের ময়দানে ছিল। (এ চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে উহুদ যুদ্ধের ময়দান থেকে – অনুবাদক)

রূপক ঘটনাবলীর চিত্র

১. বাগান মালিকদের কাহিনী

এখন আমি রূপক ঘটনাবলীর সেই ছবি নিয়ে উপস্থাপন করবো যা আল-কুরআনে আঁকা হয়েছে।

আমরা এখন বাগান মালিকদের সামনে দাঁড়িয়ে। সেই বাগান আখিরাতের নয় দুনিয়াতেই বিদ্যমান। বাগানের মালিকগণ রাতে কিছু চিন্তা-ভাবনা করছে। ফকীর-মিসকিনরা সেই বাগানের ফল খেত। কিন্তু বাগান মালিকগণ তাদেরকে বঞ্চিত করে শুধু নিজেরাই লাভবান হতে চাচ্ছে। এবার দেখা যাক পরিণতি কি হয়।

(আরবী**********)

আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি, যেমন পরীক্ষা করেছিলাম বাগান মালিকদের। যখন তারা শপথ করেছিল, বাগানের ফল সংগ্রহ করবে। কিন্তু ‘ইনাআল্লাহ’ বললো না। (সূরা আল-কলম: ১৭-১৮)

তারা রাতে সিদ্ধান্ত নিলো খুব ভোরে ফল সংগ্রহ করবে এবং সেখানে ফকীর-মিসকিনের কোন অংশ রাখবে না। এবার আমরা রাতের অন্ধকারে উঁকি দিয়ে দেখি সেখানে কী ঘটছে। শুধুই অন্ধকার। জীবন নাটক সেখানে স্তিমিত। রাতের আঁধারে হঠাৎ কিছু এটা নড়াচড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তা আকার-আকৃতিহীন, কোন অশরীরী বস্তু।

(আরবী*************)

অতপর তোমার পালনকর্তার তরফ থেকে বাগান এক বিপর্যয় নেমে এলো, তখন তরা নিদ্রিত। সকাল পর্যন্ত তাদের সবকিছু ছিন্নভিন্ন খড়-কুটার মতো হয়ে গেলো।

এসব কিছুই তাদের অগোচরে ঘটলো। যখন সকাল হলো তখন একে-অপরকে ডেকে বললো: চলো ফল সংগ্রহ করতে যাই। অথচ তারা জানতেও পারলো না, রাতের আঁধারে কি তাণ্ডব কাণ্ডই না ঘটে গেছে তাদের বাগানের ওপর দিয়ে।

(আরবী********)

সকালে তারা একে-অপরকে ডেকে বললো: ফল সংগ্রহ করতে চাইলে তাড়াতাড়ি বাগানে চলো। তারপর তারা ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে পথ চলতে লাগল। আজ যেন কোন মিসকিন বাগানে প্রবেশ করতে না পারে। (সূরা আল-কলম: ২১-২৪)

এখন কিছু সময়ের জন্য দর্শকদের একটু চুপ থাকা উচিত। কেউ যেন না বলেন, কী ঘটে গেছে তাদের বাগানে। আবার কেউ কৌতুক অনুভব করে হা-হা করে হেসে ফেলাটাও ঠিক হবে না। দর্শকগণ একটু অপেক্ষা করে দেখুন তাদের জন্য কত বড় ধোকা অপেক্ষা করছে। তরা ফিসফিস করে কথা বলছে, যেন কথা শুনে কোন মিসকিন খবর পেয়ে না যায়। দর্শকগণ! আর কতোক্ষণ আপনারা হাসি চেপে রাখবেন। এবার হাসুন। প্রাণখুলে হাসুন। তাদের সাথে বড় কৌতুক হচ্ছে:

(আরবী***************)

তারা (আনন্দের আতিশয্যে) লাফিয়ে চলতে লাগল।

নিঃসন্দেহে তারা অপরকে বঞ্চিত করতে সক্ষম, কিন্তু নিজেদেরকে বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়।

হঠাৎ তারা বাগানের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে চিৎকার করে উঠলো। এ দৃশ্য দেখে দর্শকগণ ইচ্ছেমতো হাসতে পারেন।

(আরবী**********)

যখন তারা তাদের বাগান দেখল, তখন বলতে লাগল: অবশ্যই আমরা আমাদের বাগানের রাস্তা ভুলে (অন্যত্র) চলে এসেছি।

বাগানের অবস্থা দেখে তারা বিশ্বাসই করতে পারল না, তারা বললো:

এটাতো আমাদের সে বাগান নয়, যা ফলে ভরপুর ছিল। অবশ্যই আমরা রাস্তা ভুলে অন্যত্র চলে এসেছি।

(আরবী***********)

না হয়, আমাদের কপাল পুড়েছে। (সূরা আল-কলম: ২৭)

(আরবী*********)

তাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি বললো: আমি কি তোমাদের বলিনি, এখনো তোমরা আল্লাহ তা’আলার পবিত্রতা বর্ণনা করছো না কেন? তারা বললো: আমরা আমাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। অবশ্যই আমরা জুলুম করেছিলাম। (সূরা আল-কলম: ২৮-২৯)

কিন্তু সময় পার করে অনুশোচনা করারয় কি লাভ? এটি একটি রীতি, যখন কোন দুর্ঘটনা ঘরেট তখননিজেরা পরস্পর বাগ-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়এবং একে-অপরকে দোষী করার প্রয়াস পায়। তেমনিভাবে তারাও শুরু করলো একাজ।

(আরবী*********)

অতপর তারা একে-অপরকে ভর্ৎসনা করতে লাগল। (কলাম: ৩০)

তারপর তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছলো।

(আরবী***********)

তারা বললো: হায়! দুর্ভোগ আমাদের, আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী। সম্ভবত আমাদের পালনকর্তা এর পরিবর্তে (এর চেয়েও) উত্তম বাগান আমাদের দেবেন। আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছেই প্রত্যাশা করি। (সূরা আল-কলম: ২১-২২)

]২. দুটো বাগানে মালিকের কাহিনী

এবার আপনাদেরকে আরেকজন বাগান মালিকের কাহিনী শোনাব। তবে তার বাগান একটি নয়, দুটো। আর সেই বাগানও কোন অংশে কম ছিল না, যে বাগানের কাথা আপনারা শুনলেন। এ ঘটনারসাথে আরেক ব্যক্তি জড়িত। কিন্তু তার কোন বাগান নেই, আছে এমন একটি হৃদয় যা ঈমানের নূরে ঝলমলে। উভয়েই নিজেদের মনের কথা খুলে বলছিল। সেখানে দুটো বাগানের মালিককে ঐ ব্যক্তির প্রতীক বানানো হয়েছে, যে নিজের ধন-দৌলতের মোহে পড়ে অহংকারের বশবর্তী হয়ে ঐ শক্তিকেই ভুলে বসেছে যার হাতে তার জীবন, মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ। এর কারণহচ্ছে, বর্তমানে তার শান-শওকত ও ধন-দৌলত এবং শক্তি-সামর্থ প্রচুর। পক্ষান্তরে তার সাথী, যে সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করে, তাঁর কাছেই সাহায্য-সহযোগিতা ায়। এবং সর্বাবস্থায় কুফর ও বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকে।

(আরবী**********)

তুমি তাদেরকে দু’ ব্যক্তির কাহিনী শুনিয়ে দাও। আমি তাদের একজনকে দুটো আঙ্গুরের বাগান দিয়েছিলাম এবং খেজুর গাছ দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিল। আর দু’ বাগানের মাঝে ছিল শস্যক্ষেত। উভয় বাগানই ছিল ফলবাগান। তাতে কিছুমাত্র কমতি ছিল না এবং উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে ছিল প্রবাহিত নহর। (সূরা আল-কাহফ: ৩২-৩৬)

এ আয়াত থেকে দুটো বাগানের দৃশ্য প্রস্ফূটিত হয়ে উঠে, যা ছিল সুজলা-সুফলতা ও সবুজ-শ্যামল। এটি প্রথম দৃশ্য। দ্বিতীয় হচ্ছে:

(আরবী**********)

সে ফল সংগ্রহ করলো। অতঃপর কথা প্রসঙ্গে (একদিন) সাথীকে বললো: আমার মনে হয় না, এ বাগান ধ্বংসহয়ে যাবে।আর আমি মনে করি না, কিয়ামত সংঘটিত হবে।যদি কখনো প্রতিপালকের নিকট আমাকে পৌঁছে দেয়া হয় তবে সেখানে এর চেয়ে আর উৎকৃষ্ট বস্তু পাব। (সূরা আল-কাহফ: ৩৪)

তাদের কথোপকথনে বুঝা যায়, তখনতরা উভয়েই সেই বাগানের দিকে যাচ্ছিল এবং গল্প করছিল। বাগানের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। কারণ তার পরই বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

নিজের প্রতি জুলূম করে সে তার বাগানে প্রবেশ করলো। সে বললো:

আমার মনে হয় না, এ বাগান কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। আর আমি মনেকরি না, কিয়ামত সংঘটিত হবে। যদি কখনো প্রতিপালকের নিকট আমাকে পৌঁছে দেয়া হয় তবে সেখানে এর চেয়ে আরো উৎকৃষ্ট বস্তু পাব। (সূরা আল-কাহফ: ৩৫-৩৬)

আমরা দেখতে পাই, ঐ ব্যক্তি অহংকার ও দাম্ভিকতার শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ভেবে দেখুন, গরীব সঙ্গীটির ওপর তার কথাবার্তার কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল? তার কাছে তো বাগান ছিলনা এবং ধন-সম্পদর প্রাচুর্যও ছিল না। এমনকি দু’জন লোক তার পক্ষে লাঠি ধরবেতাও ছিলনা। একথা ঠিক, তার আর কিছু না থাকলেও ঈমানের মতো সম্পদ ছিল্ যার কারণে সে নিজেকে ছোট মনেকরতো না। প্রতিপালকের সম্মান ও মর্যাদার কথা কখন ভুলেনি। তাই বাগান মালিক সাথীটিকে সে স্মরণ করিয়ে দিলো, চিন্তা করে দেখতুমি কতো নিকৃষ্ট বস্তুর সৃষ্টি। কাজেই গর্ব করা তোমার সাজে না।

(আরবী***********)

তার সঙ্গী তাকে বললো: তুমি তাঁকে অস্বীকার করছো, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, অতপর বীর্য থেকে, তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন তামাকে মানবাকৃঙতিতে? কিন্তু আমিতো একথাই বলি, আল্লাহ আমার পালনকর্তা, তাঁর সাথে শরীক আর কাউকে আমি পালনকর্তা মানি না। যদি তুমিআমাকে ধনে ও জনে তোমার চেয়ে কম মনে করো, তবে বাগানে প্রবেশ করার সময় কেন বললে না: মা-শা-আল্লাহ, লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর শক্তি ছাড়া আর কোন শক্তি নেই)। আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে তোমার বাগানের চেয়েও উত্তম বস্তু দান করবেন এবং তোমার বাগানের ওপর আসমান থেকে আগুন পাঠাবেন, ফলে সকালে তা পরিষ্কার মাঠ হয়ে যাবে। অথবা সকালে তার পানি শুকিয়ে যাবে, কিন্তু তুমি তার সন্ধান পাবে না। (সূরা আল-কাহফ: ৩৮-৪১)

এখানে সাথীদ্বয়ের দৃশ্য শেষ। এক সাথী মোরগের মতো গর্দান উঁচু করে আস্ফালন করছে। বাগ-বাগিচা গর্বে তার পা যেন আর মাটিতেই পড়তে চায় না। অপর পক্ষে আরেক সাথী মুমিন, ঈমানকেই সে বড় ধনদৌলত মনে করে। সাথীকে নসীহত করে বললো: এতো নিয়ামত ভোগ করে তার কী করা উচিত। মনে হয় তার সাথী সেই থায় কোন কান দেয়নি। সাথীর অহমিকা দেখে অন্য সাথীর রেগে যাওয়া, এটিই স্বাভাবিক। এক পর্যায়ে মনের দুঃখে বদ দো’আও করে ফেলল এবং রাগের সাথেই একে অপর থেকে পৃথক হয়ে গেল। এবার দেখব তারপর কি হলো? ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

অতপর তার সমস্ত ফল ধ্বংস হয়ে গেল এবং সে তাতে যা ব্যয় করেছিল তার জন্য সকালে হাত কচলিয়ে আক্ষেপ করতে লাগল। বাগানটি সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছিল। সে বলতে লাগল: হায়! আমি যদি কাউকে আমার পালনকর্তার সাথে শরীক না করতাম। (সূরা আল-কাহাফ: ৪২)

সত্যি কথা বলতে কি, ঐ মুমিন ব্যক্তির দো’আকে আল্লাহ কবুল করে নিয়েছিল। আমরা দেখলাম, ঐ মু’মিন ব্যক্তির সাথীটির দুরাবস্থা ও তার অনুতাপ। বাগান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আফসোস বা অনুতাপে কী আসে যায়? সে একথা বলে দুঃখ প্রকাশ করলো, কেন অন্যকে আল্লাহর সাথে শরীক করলো। আসুন দুঃখ ও ইস্তিগফারের এ দৃশ্য শেষ করি। যবনিকা পতন এবং দৃশ্যের সমাপন।

প্রকৃত ঘটনাবলীর চিত্র

এতোক্ষণ আমরা রূপক ঘটনাবলীর চিত্র উপস্থাপন করলাম। এবার আমরা কয়েকটি প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করবো।

১. হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ): আমরা এখন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কাহিনী চিত্র পেশ করবো। যখন তিনি পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে নিয়ে কা’বা ঘর নির্মাণ করছিল। মনে হয় এ ঘটনা শত শত বছর আগের নয়, এখনই আমরা বাপ-বেটার কা’বা ঘর নির্মাণ এবং তাদের দো’আ প্রত্যক্ষ করছি।

(আরবী***********)

স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিল, (তখন তরা দো’আ করলো): হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের খেদমত কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত। পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে আপনার আজ্ঞাবহ করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি করুন। আমাদেরকে হজ্জের রীতি-নীতি বলে দিন এবং আমাদেরকে মাফ করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী দয়ালূ। হে প্রতিপালক! আমাদের মধ্যে থেকে ই তাদের কাছে একজন রাসল পাঠান, যে তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে। তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র রবে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞানী।

দো’আ শেষ, দৃশ্যের যবনিকাপাত।

খবর থেকে দো’আর দিক প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন। প্রকৃতপক্ষে এ পরিবর্তনই গোটা দৃশ্যটিকে জীবন্ত করে তুলেছে এবং চোখের সামনে হাজির করেছে। খবর হচ্ছে:

(আরবী*********)

যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল আল্লাহর ঘরের ভিত্তি উঁচু করছিল।

খবর থেকে দো’আর দিকে প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন। প্রকৃতপক্ষে এ পরিবর্তনই গোটা ‍দৃশ্যটিকে জীবন্ত করে তুলেছে এবং চোখের সামনে এনে হাজির করেছে। খবর হচ্ছে:

(আরবী***********)

যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল আল্লাহর ঘরের ভিত্তিকে উঁচু করছিল।

এ খবরের পরিণতিতে পর্দা উঠে যায়। মঞ্চ অর্থাৎ খানায়ে কা’বা ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ) চোখের সামনে প্রতিবাত হয়ে উঠেন। পিতা-পুত্র দু’জনই দীর্ঘ দো’আয় মশগুল।

এখানে শৈল্পিক সৌন্দর্য এবং অলৌকিকত্বের যে দিক তা হচ্ছে ঘটনা বর্ণনা শুরু করেই দো’আয় পরিবর্তন করে দেয়া। এখানে এমন একটি শব্দও নেই যা থেকে বুঝা যায়, পিতা-পুত্র নির্মাণ কাজ ক্ষণিকের জন্য বাদ দিয়ে এ দো’আ করেছিল। যদি ধরে নেয়া হয়, ঘটনা এখনো চলমান। শেষ হয়নি। তাহলে এর অলৌকিকত্ব আরো বেড়ে যায়। যদি এভাবে শুরু করা হতো: “যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বা ঘরের দেয়াল গাঁথাছিল তখন এ দো’আ করছিল।” তাহলে এ ধরনের কথায় কোন চমক থাকত না। সেটি গতানুগতিক একটি ঘটনা হিসেবে দাঁড়াত। কিন্তু যে স্টাইলে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তা শুধুমাত্র ঘটনা নয়। তা জীবন্ত ও চলমান একটি দৃশ্য, মনে হয় আজও মঞ্চে তা প্রদর্শিত হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যও মঞ্চ শূণ্য নয়। পুরো দৃশ্যটি চলমান হয়ে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ছবিতে যে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করা হয়েছে তা শুধুমাত্র একটি শব্দ [তারা দো’আ করলো’; (***)] পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়ায় সম্ভব হয়েছে। আল-কুরআনের বিশেষত্বই এখানে।

২. হযরত নূহ (আ)-এর প্লাবন: এখন আমরা হযরত নূহ (আ)-এর প্লাবনের চিত্র তুলে ধরবো। যেখানে বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

আর নৌকাখানি তাদেরকে বহন করে নিয়ে চললো পর্বতসম তরঙ্গমালার মাঝে। (সূরা হুদ: ৪২)

এ বিপজ্জনক মুহূর্তে হযরত নূহ (আ)-এর পিতৃত্ব জেগে উঠায় তিনি অত্যন্ত বিচলিত। কারণ পুত্র এখন সবকিছুকে অস্বীকার করছে। তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন কাফিরদের সাথে পুত্রও সলীল সমাধি লাভ করবে। নূহ (আ) মানবিক দুর্বলতায় পড়ে গেলেন। নূহ (আ)-এর ভেতরের মানুষটি নবীর ওপর প্রাধান্য পেল। তখন অত্যন্ত অনুনয়-বিনয় করে পুত্রকে ডাকলেন।

(আরবী***********)

আর নূহ তাঁর ছেলেকে ডাক দিলেন, সে দূরে সরে ছিল। তিনি বললেন: বেটা! আমাদের সাথে উঠে এসো, কাফিরদের সাথে থেকো না। (সূরা হুদ: ৪২)

কিন্তু পিতার শত অনুনয়-বিনয়কে বেয়াড়া পুত্র কোন পরওয়াই করলো না। যে যৌবন ও শক্তি-সামর্থের গর্বে স্ফীত হয়ে উঠলো।

(আরবী***********)

সে বললো: আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেবো, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। (সূরা হূদ : ৪৩)

পিতা ব্যাকুলচিত্তে সর্বশেষ আহ্বান করলেন:

(আরবী***********)

নূহ বললো: আজ আল্লাহর হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। (সূরা হূদ : ৪৩)

এরপর একটি তরঙ্গ এসে সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

(আরবী***********)

এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সি নিমজ্জিত হয়ে গেল। (সূরা হূদ: ৪৩)

কতো বড় মর্মান্তিক দৃশ্য! ভয়ে শ্রোতদের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে। পাহাড়সম ঢেউয়ের মধ্যে নৌকা চলছে। হযরত নূহ (আ) পেরেশান হয়ে পুত্রকে আহ্বান করছেন। কিন্তু পুত্র শক্তি-সামর্থের বাহাদুরী দেখিয়ে সে আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করছে। এ কথাবার্তা চলা অবস্থায় হঠাৎ এক তরঙ্গ এসে সবকিছুকে তছনছ করে দিলো। এ দৃশ্য অবলোকন করে মানুষের ভেতর সেই অবস্থা সৃষ্টি হয়, যে অবস্থা বাপ-বেটা অর্থাৎ নূহ (আ) ও তার সন্তানের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। শুধু মানুষ কেন অন্য প্রাণীকেও প্রভাবিত এবং বেদনাপ্লুত না করে ছাড়ে না।

কিয়ামতের চিত্র

এখন আমরা প্রথমে কিয়ামতের দৃশ্যাবলী বর্ণনা করবো তারপর কুরআনে কারীমে শান্তি ও শাস্তির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সে সম্পর্কে আলোকপাত করবো। কারণ, শৈল্পিক চিত্রের’ সাথে এগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

১. কিয়ামতের চিত্র অংকন করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন:

(আরবী***********)

যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এবং অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তখন তারা অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন। (সূরা আল-ক্বামার: ৬-৮)

এটি কিয়ামতের দৃশ্যসমূহের মধ্যে একটি দৃশ্য। সংক্ষিপ্ত বটে কিন্তু হৃদয়কে নাড়া দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। পঙ্গপালের উপমায় কতো চমৎকারভাবে চিত্রটিকে উস্থাপন করা হয়েছে। পঙ্গপাল যখন উড়ে তখন বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো মনে হয়। তদ্রূপ মানুষ যখন কবর থেকে উঠে আহ্বানকারীর দিকে ছুটবে তখন তারা দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকবে। মনে হবে কোন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারবে না, কোথায যাচ্ছে বা কেন যাচ্ছে। তাদেরকে অপছন্দনীয় এক বিষয়ের দিকে ডাকা হবে। তাদের চোখ অবনমিত হবে। এ হচ্ছে সর্বশেষ আলামত। যার মাধ্যমে চিত্রটি পূর্ণতায় পৌঁছে যায়।

পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে কাফিররা বলবে এটিতো বড় কঠিন দিন। ছোট ছোট বাক্যে কতো সুন্দর করে পুরো ছবিটিকে তুলে ধরা হয়েছে। শ্রোতার হৃদয়পটে ভেসে উঠে একটি বিশাল মাঠ, মনে হয় সবাই কবর থেকে উঠে একযোগে দৌড়াচ্ছে। সকলের মাথা নিচু। চেহারা ভয়ে বিহ্বল। এ যেন এক জীবন্ত ও চলমান ছবি।

২. এটি হচ্ছে কিয়ামতের দৃশ্য সমূহের মধ্যে দ্বিতীয় দৃশ্য। এ দৃশ্যে মানুষের পালানোর কথাও আছে এবং ভীত-বিহ্বল অবস্থার কথাও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এটি পূর্বের দৃশ্যের চেয়েও করুণ ও ভয়াবহ।

(আরবী***********)

জালিমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না। তাদেরকে তো ঐদিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চোখ ভয়ে বিস্ফোরিত হয়ে যাবে। (মানুষ) উর্ধ্বশ্বাসে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে (হাশরের মাঠের দিকে)। দৃষ্টি তাদের দিকে ফিরে আসবে না, ভয়ে অন্তর উড়ে যাবে। (সূরা ইবরাহীম : ৪২-৪৩)

এখানে চারটি অবস্থার কথা বলা হয়েছে। যা একের পর এক সংঘটিত হবে। একই ঘটনার চারটি দৃশ্য যা পালাক্রমে পদর্শিত হচ্ছে। ভয়, লজ্জা ও লাঞ্ছনায় অবনত মস্তক। তার ওপর দুশ্চিন্তা ও ভয়ের ভায়া দুর্ভাবনায় মন প্রাণ ছেয়ে যায়। এ ছবিটি জীবিতদেরকে দেখানো হচ্ছে, আবার যাদের ছবি দেখানো হচ্ছে তারাও মানুষ। ছবির লোকজন এবং দর্শক-শ্রোতা উভয়ের মাঝেই জাতিগত এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয়ের অনুভূতি পর্যন্ত এক ও অভিন্ন। মনে হয় একদলের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আরেক দলে সঞ্চালন হয়ে তাদের মন-মস্তিষ্ট ছেয়ে যায়। পাঠক মনে করে এ অবস্থা স্বয়ং তার ওপর দিয়েই বয়ে যাচ্ছে।

৩. অতপর ভয় ও আতংকের আরেকটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ চিত্রটি পূর্বের চেয়ে আরো ভয়ংকর। শব্দগুলো যেন সেই ভয়াবহ অবস্থায় পুরোপুরি বর্ণনা দিতে পারছে না। আমরা এ বিভীষিকাময় চিত্রটি তুলে ধরলাম, যেন এটি নিজের অবস্থার নিজেরই প্রকাশ করতে পারে।

(আরবী***********)

হে মানুষ তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তনদানকাররিণী দুধ পানরত সন্তান রেখে পালিয়ে যাবে। ভয়ে গর্ভবতী মহিলার গর্ভপাত ঘটে যাবে। লোকদেরকে তুমি মাতালের মতো দেখতে পাবে কিন্তু তার নেশাগ্রস্ত হবে না। আল্লাহর আযাব এতোদূর ভয়াবহ হবে। (সূরা আল-হাজ্জ: ১-২)

এ বিভীষিকা মানুষকে এমন হতবিহ্বল করে তুলবে যে, স্তনসদানরত মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকেও ভুলে যাবে। গর্ভবতী সবকিছু প্রত্যক্ষ করবে কিন্তু তাকে লক্ষ্য করার মতো কেউ থাকবে না। ছুটোছুটি করবে বটে কিন্তু ছুটোছুটির সেই অনুভূতিও তার থাকবে না। ফলে ভয়ে ও আতংকে তার গর্ভপাত ঘটে যাবে। মানুষ ছুটোছুটি শুরু করবে বটে কিন্তু মনে হবে তাদের পা জমিনে লেগে গেছে। মানুষ সবকিছু সংঘটিত হতে দেখবে কিন্তু এতো দ্রুত তা সংঘটিত হবে, মানুষ কিছুই বুঝে উঠতে পারবে না। জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যাবে। দেখলে মনে হবে তারা মাতাল। অথচ তারা নেশাগ্রস্ত হবে না, কর্তব্য কর্মকে স্থির করতে না পেরে তারা এরূপ আচরণ করবে। এগুলো হচ্ছে আল্লাহর শাস্তির সামন্যতম প্রভাব মাত্র। মনে হবে মানুষ এসব নিজের সামনে সংঘটিত হতে দেখছে। চিন্তাশক্তিও ধারণ করতে চায় কিন্তু ভয়ঙ্কর বিভীষিকা তাকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। এজন্য মনোজগতে তা স্থায়ীভাবে সমাসীন হতে পারে না।

৪ ইতোপূর্বে কিয়ামতের তিনটি বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যার ছবি (জীবন্ত হয়ে) চোখের সামনে ভেসে উঠে। কিন্তু এমন কিছু দৃশ্য আছে, যা শুধু অনুভূতিকে নাড়া দেয় মাত্র:

(আরবী***********)

সেদিন প্রত্যেকেরই এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।

(আরবী***********)

প্রাণের বন্ধু আরেক বন্ধুকেও সেদিন জিজ্ঞেস করবে না।

দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার সংক্ষিপ্ত অথচ হৃদয়গ্রাহী চিত্র এর চেয়ে আর কী হতে পারে? অন্তরে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা ছাড়া আর কিছুর স্থান নেই। দুর্ভাবনা তা হৃদয়-মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সে অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশও পায় না।

৫. কিয়ামত সংঘটিত হওয়া এবং কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবার আরেকটি দৃশ্য। কিছুটা বিস্তৃত এসব ‍দৃশ্য। তবু প্রতিটি ‍দৃশ্যের মাঝে সামান্য বিরতি পরিলক্ষিত হয়।

(আরবী***********)

তারা কেবলমাত্র একটি ভয়াবহ শব্দের অপেক্ষা করছে, যা তাদেরকে আঘাত করবে তাদের বাক-বিতণ্ডাকালে। তখন তারা ওসিয়ত করতেও সক্ষম হবে না এবং তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারবে না। (সূরা ইয়াসীন: ৪৯-৫০)

এখানে প্রথম ‍ফুঁকের কথা বলা হয়েছে। প্রথম শব্দেই শুরু হয়ে যাবে বিপর্যয়। এতো দ্রুত সংঘটিত হবে যে, ওসিয়ত পর্যন্ত করার সময় পাবে না। কবরবাসী কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে। তারপর কি হবে? ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, অমনি তারা কবর থেকে উঠে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটতে থাকবে। তারা বলবে, হায় আফসোস! কে আমাদেরকে নিদ্রা থেকে জাগিযে দিলো? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা করেছিল এবং রাসয়লগণ সত্য বলেছেন। (ইয়াসীন: ৫১-৫২)

এখানে দ্বিতীয় ফুঁকের কথা বলা হয়েছে। প্রথম ফুঁকে তো সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বিতীয় ফুঁকের পর সবাই হয়রান-পেরেশান হয়ে কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে। আশ্চর্য হয়ে (ঈমানদারগণ) বলাবলি করবে, কে আমাদেরকে এমন সুখনিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিলো? তারপর পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বলবে: প্রভু দয়াময় যে ওয়াদা আমাদের নিকট করেছিল এবং নবী-রসূলগণ যে সংবাদ আমাদেরকে প্রদান করেছিল আজ তা সত্য হলো।

(আরবী***********)

এটি তো হবে এক মহানিনাদ। সেই মুহূর্তেই তাদের সবাইকে আমার সামনে উপস্থিত করা হবে। সেদিন কারো প্রতি জুলুম করা হবে না বরং তোমরা যা করবে কেবল তারই প্রতিদান পাবে। (ইয়াসীন: ৫৩-৫৪)

এটি সর্বশেষ ফুঁক, যেন মানুষ আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যায়। সেদিন আমল অনুযায়ী মানুষ সেখানে জমায়েত হবে। এ দৃশ্য আপাতত এখানে শেষ।

এখন যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে সে-ই এসব চিত্র প্রত্যক্ষ করবে। মনে হবে তাকেই যেন লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে: “সেদিন কারো প্রতি জুলুম করা হবে না, শুধু তোমরা যা করবে কেবল তারই প্রতিদান পরবে।”

৬. কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত লোক একত্রিত হবে এবং আল্লাহর দরবারে কৈফিয়ত দিতে থাকবে তখন আমরা এমন একটি দল দেখতে পাই যারা পৃথিবীতে পরস্পর প্রতিবেশী ছিল্ কিন্তু তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না। অহংকার ও দাম্ভিকতায় পরিপূর্ণ ছিল। সে তার প্রতিবেশীকে গুমরাহ বলতো, তাদের মধ্যে অনেক মু’মিনদেরকে কষ্ট দিত। মু’মিনগণ যখন জান্নাতী হবার দাবি করতো তখন তাদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ শুরু করা হতো। সেদিন যখন তাদেরকে দলে দলে জাহান্নামে প্রবেশ করা হবে। তখন একদল প্রবেশের সাথে সাথে আরেক দলের খবর তাদেরকে দেয়া হবে।

(আরবী***********)

এই তো একদল তোমাদের সাথে প্রবেশ করছে। (সূরা ছোয়াদ: ৫৯)

প্রতি উত্তরে বলা হবে: (আরবী***********)

তাদের জন্য কোন অভিনন্দন নেই, তারা তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা ছোয়াদ: ৫৯)

যাকে যালি দিত সে শুনে কি চুপ থাকবে? নিশ্চয় নয়। সে তখন বলবে:

(আরবী***********)

তারা বলবৈ, তোমাদের জন্যও তো অভিনন্দর নেই। তোমরাই আমাদেরকে এ বিপদের সম্মুখীন করেছ। এটি কতোই না ঘৃণ্য আবাসস্থল। (সূরা ছোয়াদ : ৬০)

তারপর সম্মিলিত কণ্ঠে বলে উঠবে: (আরবী***********)

তারা বলবে: হে আমাদের পালনকর্তা! যে আমাদেরকে এর সম্মুখীন করেছে, আপনি তাকে দিগুণ শাস্তি দিন। (সূরা ছোয়াদ: ৬১)

তারপর কি ঘটবে? তারা ঈমানদারদেরকে সেখানে দেখতে পারেব না, যাদেরকে পৃথিবীতে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো এবঙ নিজেদের গায়ের জ্বালা ঝাড়ত। তারা আজ তাদের সাথে জাহান্নামে নেই এ কেমন কথা?

(আরবী***********)

এবং তারা বলবে: আমাদের কি হলো, যাদেরকে আমরা খারাপ মনে করতাম তাদেরকে তো দেখছি না! আমরা কি শুধু শুধুই তাদেরকে ঠাট্টার পাত্র মনে করতাম, না আমাদের চোখ ভুল দেখছে? এ ব্যাপারে জাহান্নামীদের বাক-বিতণ্ডা অবশ্যম্ভাবী। (সূরা ছোয়াদ: ৬২-৬৪)

জাহান্নামীদের ঝগড়া-বিবাদ আমাদের সামনে এমনভাবে উপস্থিত হয়, যেন আমরা প্রত্যেকে তা প্রত্যক্ষ করছি। প্রতিটি মানুষই মনে করে, স্বয়ং তার চিত্রটিকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সে ঐ দূরবস্থা থেকে মুক্তির জন্য চেষ্টা করে। আর এ চেষ্টার ফলে উক্ত দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া হয়তো সম্ভব।

শান্তি ও শাস্তির দৃশ্যাবলী

বিগত আলোচনায় আমরা কবর, কিয়ামত, পুনরুত্থান এবং হাশরের দৃশ্যাবলী অবলোকজন করেছি। এবার আমরা জান্নাত ও জাহান্নামের শান্তি ও শাস্তির কিছু দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবো।

১. জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:

(আরবী************)

কাফিরদের জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। তারা যখন সেখানে পৌঁছবে, তখন তার দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের দ্বাররক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে নবী-রাসূল আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ আবৃত্তি করতো এবং সতর্ক করতো এ দিনের সাক্ষাতের ব্যাপারে? তারা বলবে, হ্যাঁ। কিন্তু কাফরদের প্রতি শাস্তি অবধারত হয়ে গেছে। তারপর বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করো, চিরদিনের জন্য। অহংকারীদের জন্য কতো নিকৃষ্ট স্থান।

জান্নাতীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করতো তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা উন্মুক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন জান্নাতের দ্বারক্ষীগণ তাদেরকে বলবে: তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাক, চিরদিনের জন্য এ জান্নাতে প্রবেশ করো। তারা বলবে: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের প্রতি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এর উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছে সেখানে অবস্থান করবো। (দেখো) মেহনতকারীদের পুরষ্কার কতোই না চমৎকার। (সূরা আয-যুমার: ৭৩-৬৪)

নিচের আয়াতটির মাধ্যমে এ দৃশ্যের যবনিকা টানা হয়েছে:

(আরবী*************)

তুমি ফেরেশতাদেরকে দেখছে, তারা আরশের চারপাশ ঘিরে তাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছে। তাদের সবার মাঝে ন্যায়বিচার করা হবে। বলা হবে যে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর।

এ চিত্রগুলো এতো সুস্পষ্ট যে, এর পৃথক কোন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। বোর আসুন, আমরা জাহান্নাম ও জান্নাতীদের পিছু পিছ গিয়ে তাদের কিছু হাল-অবস্থা জেনে নেই।

২. জাহান্নামীদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ হবে পাপীদের খাদ্য। তা গলিত তামার মতো পেটে ফুটতে থাকবে, যেমন পানি ফুটে। (বলা হবে) একে ধরো এবং টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাও এবংতার মাথার ওপর ফুটন্ত গরম পানির আযাব ঢেলে দাও। (আরও বলা হবে) স্বাদ গ্রহণ করো, তুমিতো সম্মানত, সম্ভ্রান্ত। এ ব্যাপারেতো তোমরা সন্দেহে ছিলে।

সাথে সাথে জান্নাতীদের কথা বলা হয়েছে এভাবে:

(আরবী*************)

নিশ্চয়ই মুত্তাকীগণ নিরাপদ স্থনে থাকবে ঝর্ণা ও বাগানসমূহে। তারা পরিধান করবে চিকন ও পুরু রেশমী বস্ত্র, মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই হবে। আর আমি তাদেরকে সুনয়না হুরদের সাথে বিয়ে দেব। সেখানে তারা শান্তমনে বিভিন্ন ফলমূল চেয়ে পাঠাবে। সেখানে তারা কোন মৃত্যুর ‍মুখোমুখি হবে না প্রথম মৃত্যু ব্যতীত এবং তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্ত রাখা হবে। (সূরা আদ-দোখান: ৫১-৫৬)

৩. আমরা কিয়ামতের দৃশ্যাবলী এমন এক জায়গায় শেষ করেছি যেখান বিপরীতধর্মী দুটো চিত্র ছিল। এখানেও তেমনি ধরনের আরও কয়েকটি চিত্র:

(আরবী************)

জান্নাতীগণ জাহান্নামীদেরকে ডেকে বলবে: আমাদের সাথে আমাদের প্রতিপালক যে ওয়াদা করেছিল, তা আমরা সত্য পেয়েছি। অতএব তোমরাও কি তোমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা সঠিক পেয়েছ? তারা বলবে: হ্যাঁ। অতপর একজন ঘোষক উভয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবে: আল্লাহর অভিসম্পাত জালিমদের ওপর যারা আল্লাহর পথে বাধা দিতো এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করত। তারা পরকালের ব্যাপারেও অবিশ্বাসী ছিল।

(আরবী***********)

উভয়ের মাঝে প্রাচীর থাকবে এবং আ’রাফের ওপরে অনেক লোক থাকবে। তারা প্রত্যেককে তাদের চিহ্ন দেখে চিনে নেবে। তারা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবে: তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা তখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না, কিন্তু প্রবেশ করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামীদের ওপর পতিত হবে তখন তারা বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে জালিমদের সাথী করো না। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪৬-৪৭)

(আরবী*************)

আ’রাফবাসী যাদেরকে তাদের চিহ্ন দেখে চিনতে তাদেরকে ডেকে বলবে: তোমাদের দলবল ও ঔদ্ধত্য তোমাদের কোন কাজেইা এলো না। এরা কি তারাই, যাদের সম্পর্কে তোমরা কসম খেয়ে বলতে যে, আল্লাহ এদেরপ্রতি অনুগ্রহ করবেন না। (বলা হবে) জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমাদের কোন ভয় নেই এবঙ তোমরা কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে না। জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবে: আমাদের নিকট সামান্য খাদও ও পানীয় নিক্ষেপ করো অথবা আল্লাহ যে রিয্‌ক দিয়েছেন তা থেকেই কিছু দাও। জান্নাতীগণ উত্তর দিবে: এগুলো কাফিরদের জন্য আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন।

ওপরের উদ্ধৃতিগুলোতে বেশ কিছু দৃশ্য এসেছে, যা একের পর এক আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে।

আয়াতগুলো পড়ে মনে হয় আমরা জান্নাতী ও জাহান্নামীদের সামনে দাঁড়ানো। জান্নাতীগণ জাহান্নামীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছে: আমাদের প্রতিপালক যে ওয়াদা আমাদের করেছিল আমরা তা সত্য পেয়েছি। আর তোমাদের ব্যাপারে যে ওয়াদা করেছিল তা কি তোমরা সঠিকভাবে পেয়েছ? এ প্রশ্নের মাধ্যমে জাহান্নামীদের সাথে যে উপহাস করা হয়েছে তা সুস্পষ্ট। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা তা অস্বীকার করতে পারবে না; বরং স্বীকার করতে বাধ্য হবে। এমন সময় ঘোষক উভয় দলের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেবে, জালিমদের ওপর আল্লাহর লা’নত।

তারপর আমরা আ’রাফবাসীদের সামনে গিয়ে দেখতে পাই তারা জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। একটি উঁচু দেয়ালের ওপর কিছু লোকের সমাবেশ। যেখান থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম দুটোই দেখা যায়। জান্নাতীদের দেখা মাত্র তারা সালাম ও সম্বর্ধনা দিচ্ছে আর যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামীদের ওপর গিয়ে পড়ছে সাথে সাথে তারা তাদেরকে তিরষ্কার ও ভর্ৎসনা করছে এবং তাদেরকে সম্বাধন করে বলছে: তোমরা তো জান্নাতীদের ব্যাপারে পৃথিবীতে কসম করে বলতে, তাদের ওপর আল্লাহর মেহেরবানী হবে না। আজ দেখতো তারা কোথায়? জান্নাতে কতো শান-শওকত ও সম্মান-মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করছে।

তারপর আমরা দেখতে পাই জাহান্নামীদের কাছে খাদ্য ও পানীয়ের জন্য আবদার করছে। জান্নাতীদের সামনে আল্লাহ সমস্ত নিয়ামত উপস্থিত রেখেছেন কিন্তু তারা একথা বলেই তাদেরকে বিদায় করে দিচ্ছে যে, আল্লাহ কাফিরদের জন্য জান্নাতের খাদ্য ও পানীয় এ উভয়টি হারাম করে দিয়েছেন।

এ হচ্ছে কিয়ামতের দৃশ্য, জান্নাত ও জাহান্নামের শান্তি ও শাস্তির দৃশ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- পাঠকগণ যখন আয়াতগুলো পড়েন তখন কি তারা এ ঘটনাগুলোকে ভবিষ্যতে ঘটবে বলে মনে করেন? না একথা মনে করেন যে, ঘটনাগুলো এ মুহূর্তে এবং আমার চোখের সামনেই ঘটে চলেছে?

আল্লাহর কসম! আমি যখনই এ আয়াতগুলো পড়েছ, তখনই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি সম্পূরণরূপে ভুলে গেছি যে, এ ঘটনাগুলো কুরআনী বিষয়ের আবরণে আমি দেখতে পাচ্ছি। বরং আমার মনে হয়েছে, আমি আমার নিজের চোখে সমস্ত ঘটনা সংঘটিত হতে দেখছি, যে ছবি কল্পনা নয়- চাক্ষুস। সত্যি কথা বলতে কি, এটি আল-কুরআনের অলৌকিক এক কৌশল এবং শিল্প নৈপুণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ আলোচনা এখানে শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে- আল কুরআন যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, তার মধ্যে একটি উদ্দেশ্য এমনও আছে যা বাহ্যত চিত্রায়নের সুত্র থেকে ব্যতিক্রম মনে হয়। তা হচ্ছে কুরআন যুক্তি-তর্কের সাহায্যে দ্বীনের দিকে লোকদেরকে আহ্বান করে।

তা আল-কুরআনের প্রকৃতি এবং চিত্রায়নের উপকরণ বাদ দিয়ে জ্ঞানগত- উপকরণ গ্রহণ করা যায়। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছুতেও আল-কুরআনেরচিত্রায়নের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এ থেকে বুঝা যায় চিত্রায়নের পদ্ধতি কুরআনের অন্যান্য পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। এ অধ্যায়ে আমিসে প্রসঙ্গেই আলোচনা করতে চাই। সংক্ষেপে উদাহরণসহ আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। বিস্তারিত আলোচনা গ্রন্থের শেষ দিকে ভিন্ন এক অধ্যায়ে পেয়ে যাবেন।

৪. প্রাকৃতিক ‍দৃশ্যের মধ্রে স্থির ও চিরন্তনী দৃশ্য হচ্ছে সর্বদা প্রকাশমান আকাশ। মানুষকে আকাশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল-কুরআনে অনেক জায়গায় বলা হয়েছে, দেখ, এটি আল্লাহর কুদরতের এক শক্তিশালী প্রমাণ। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

তিনি আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতপর তা মেঘমালাকে সঞ্চারিত করে। তারপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছে আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে স্তরে স্তরে রাখেন। অতপর তুমি তা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হতে দেখ। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছে তা পৌঁছে দেন, তখন তারা আনন্দিত হয়। তারা প্রথম থেকেই তাদের প্রতি এ বৃষ্টি বর্ষিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিরাশ ছিল্ অতএব, আল্লাহর রহমতের ফল দেখে নাও; কিভাবে তিনি মৃত জমিনকে জীবিত করেন। অবশ্যই তিনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন এবং প্রতিটি বস্তুর ওপরই তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সূরা আর-রূম: ৪৮-৫০)

লক্ষ্য করে দেখুন, কিভাবে আল্লাহর কুদরত কাজ করছে। বাতাস প্রবাহিত হওয়া, তারপর সেই বাতাস কর্তৃক জলীয় বাষ্পকে ধারণ করা, অতপর তা মেঘমালায় রূপান্তর হওয়া এবং সর্বশেষে মেঘ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া। আর তা সাধারণ মানুষের খুশির কারণ হওয়া। উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত-শুষ্ক জমিনকে জীবিত ও তরতাজা করা। এসব দৃশ্য যখন একের পর এক মানসপটে ভেসে উঠে তখন মানুষের অবচেতন মন প্রভাবিত না হয়েই পারে না। পরিশেষে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে

(আরবী*********)

নিশ্চয়ই তিনি মৃতকে জীবিতকারী এবফ প্রতিটি বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান।

৫. ৪নং দৃশ্যের পরিধি ছিল ব্যাপক কিন্তু ৫নং দৃশ্যটি জমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট। দুটো দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। চিন্তা করে দেখুন-

(আরবী**********)

তুমি কি দেখনি, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং সেই পানি জমিনের ঝর্ণাসমূহে প্রবাহিত করেন, তারপর সেই পানি দিয়ে রঙ-বেরঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতপর তা শুকিয়ে যায়, যা তোমরা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ সেগুলো খড়কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয়ই এতে বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশ রয়েছে। (যুমার: ২১)

এটি জমিনর এক চিত্র। এ চিত্রে জমিনের বিভিন্ন অবস্থার কথা বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি অবস্থা মানুষকে চোখে দেখার চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়। দেখুন আসমান থেকে বৃষ্টি হয। সে বৃষ্টিতে জমিন রঙ-বেরঙের ফল-ফসলে ভরে যায়। আবার সে ফসল পেকে বাদামী রঙ ধারণ করে। এক সময় সেগুলো খড়কুটোয় পরিণত হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়। এ আয়াতে (***) (ছুম্মা) শব্দটি যেভাবে ও যে জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে তাতে চোখ ও মনকে চিন্তা-ভাবনার পূর্ণ সুযোগ করে দেয়, দ্বিতীয অবস্থা চোখের সামনে উদ্ভাসিত হওয়ার পূর্বেই। কোন দৃশ্যকে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরতে যে ধরনের বিন্যাস ও উপস্থাপনার প্রয়োজন, তা এখানে বিদ্যমা। (সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে- ইনশাআল্লাহ্‌)

৬. কিছু ছবি তো সম্পূর্ণ জীবন্ত। দেখুন- পাখী পা গুটিয়ে শুধু ডানায় ভর করে আকাশে উড়ে বেড়ায়। আবার অবতরণের মুহূর্তে পায়ে ভর করে দাঁড়ায়। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

তারা কি তাদের মাঝার ওপর পাখী বিস্তারকারী ও পাখী সংকোচনকারী উড়ন্ত পাখীদেরকে লক্ষ্য করে না? রহমান আল্লাহই তাদেরকে স্থির রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপরই দৃষ্টি রাখেন। (সূরা আল-মুলক: ১৯)

এ আয়াতে দুটো দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম পাখী আকাশে ডানা মেলে উড়ে এবং উড়ার সময় সে তার পা গুটিয়ে রাখে। দ্বিতীয়ত, অবততরণের মুহূর্তে সে পায়ে ভর করে দাঁড়ানের জন্য আগেই পা দুটো বের করে নেয়। এ চিত্র মানুষ হর-হামেশাই দেখে থাকে কিন্তু কখনো এ বিষয়ে তারা মাথা ঘামায় না। আল-কুরআন মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আল্লাহর এক কুদরতি নিদর্শন।

৭. জমিনে বারবার আরেকটি দৃশ্যের অবতারণা হয় কিন্তু মানুষ চোখ মেলে তা দেখে না এবং এ ব্যাপারে সে দেখার প্রয়োজন অনুভব করে না। যদি এর রহস্য নিয়ে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করতো তবে রহস্যের নতুন দিগন্ত তার সামনে উন্মোচিত হতো, এটি হচ্ছে শরীরী বস্তুর ছায়া, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে স্থির মনে হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সূক্ষ্মভাবে তা চলমান। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী************)

তুমি কি তোমার পালনকর্তাকে দেখ না, তিনি কিভাবে ছায়া বিস্তৃত করেন? তিনি ইচ্ছে করলে একে স্থির রাখতে পারেন। এরপর আমি সূর্যকে করেছি এর নির্দেশক। অতপর আমি একে নিজের দিকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনি। (সূরা আল-ফুরকান: ৪৫-৪৬)

উল্লেখিত আয়াত দুটো মানুষের চিন্তার জগতে দোলা দেয়। মন ও মানসকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীতে এ ধরনের দৃশ্যের অভাব নেই, যা প্রতিমুহূর্তে আমাদের দৃষ্টিগোচর না হয়। কিন্তু যখন তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় তখন তা এক নতুন বস্তু হিসেবে প্রতিভাত হয়ে উঠে। আর এটি তখনই সম্ভব যখন কোন দৃশ্যকে প্রত্যক্ষ করা হয় চোখ, মন ও মস্তিষ্ক দিয়ে একযোগে।

৮. পৃথিবীতে এমন বহু জিনিস আছে যাকে শিক্ষামূলক মনে করা হয়। কিন্তু মানুষের অনুভূতিতে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় তা হচ্ছে কোন জাতির ধ্বংসাবশেষ। চোখ তা বাহ্যিকভাবে প্রত্যক্ষ করে এবং মনের চোখ তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তাই আল-কুরআন অপরাধীদের পরিণতি সম্পর্কে মানুষের চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলার জন্য তাদেরকে এ দুর্বল দিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং দেখে না, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণামকী হয়েছে? তারা তাদের চেয়ে বেশি শক্তিশাী ছিল, তারা জমি চাষ করতো এবং তাদের চেয়ে বেশি ফসল ফলাত। তাদের কাছে রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে এসেছিল। বস্তুত আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিল না বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। (আর-রূম: ৯)

উপরোক্ত আলোচনা একথাই প্রমাণ করে যে, আল-কুরআন চিত্রায়ণ ও দৃশ্যায়ন পদ্ধতিকে একটি স্টাইল হিসেবে গ্রহণ করেছে। এজন্য চিত্রায়ণ পদ্ধতিটি মূল ভিত্তির গুরুত্ব রাখে। এ পদ্ধতিটি সার্বিক বিষয় ও উদ্দেশ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। এটি কুরআনের এমন এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য যা কুরআন বিশেষজ্ঞগণ আল-কুরআনের ছত্রে ছত্রে তা পেয়ে থাকেন।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী