আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ষষ্ঠ অধ্যায়

আল-কুরআনে সুর ও ছন্দ

আল-কুরআনের শব্দে মিল ও সাদৃশ্র সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমিতার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষিট্ট প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিচু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর সাথেও সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে আল-কুরআনের উচ্চারণের সাদৃশ্যতা।

আমি এর আগে আভাস দিযেছি যে, কুরআনে কারীমের মধ্যে সুর ও ছন্দ (শব্দের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা) আছে এবং তার কিছু প্রকার ও ধরন আছে। যা তার বক্তব্য উপস্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সমস্ত কুরআন-ই ছন্দবদ্ধ সেহেতু সর্বত্রই সুর ও তাল বিদ্যমান। দেখা গেছে একই শব্দের বিভিন্ন অক্ষর এবং একই আয়াত ও তার শেষ শব্দ ছান্দিক নিয়ম-কানুন মেন চলে। চাই সে আয়াত ছোট হোক কিংবা বড়। বাক্যের শেষ শব্দের মধ্যে সেই মিল কিভাবে হৎয়, সেসব বাক্য সম্পর্কে আমি আলোচনা করতে চাই। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে:

(আরবী*********)

আমি তাঁকে (অর্থাৎ রাসূলকে) কবিতা বা কাব্য শিক্ষা দেইনি। আর তা তাঁর জন্য শোভাও পায় না। এতো একটি স্মারক যা সুস্পষ্ট কুরআন (হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে।) (সূরা ইয়াসীন: ৬৯)

একথাটি হচ্ছে কাফিরদের ঐ অভিযোগের জবাব, যা সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে:

(আরবী*********) (তারা বলতো) সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না বরং সে একজন কবি। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৫)

আলকুরআন ঠিকই বলেছে, এটি কাব্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আরববাসী যারা একে কবিতা বা কাব্য বলতো তারা কি পাগর ছিল, না কবিতা ও কাব্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল? নিশ্চয়ই নয়। যেহেতু তারা একে কাব্য বলেছে কাজই এর মধ্যে অবশ্যই কবিতা ও কাব্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে যার যাদুকরী আবেশে তারাও মোহাবিষ্ট হয়েছিল। কুরআনের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের কোন পরিচিত ছিল, ফলে এটি যে একটি কাব্য তা তারা বুঝতে পেরেছিল। আমরা যদি কেবল মাত্রা ও অন্তমিলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তবু বুঝা যায় কাব্য ও কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য সেখানে বিদ্যমান।

তাছাড়া কুরআন গদ্য ও পদ্য উভয়কেই সুন্দরভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে। আল-কুরআন মাত্রা (****) ও অন্তমিল (****) থেকে স্বাধীন এবং এতে মিল থাকতেই হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা কুরআনের নেই। তবু সেখানে সুর ও ছন্দ বর্তমান। আয়াতের শেষে মিত্রাক্ষরের প্রয়োজন, সে প্রয়োজনও কুরআন অবশিষ্ট রাখেনি। সেই সাথে আমরা ওপরে কাব্যের যে বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করেছি সেগুলোও সে ধারণ করে নিয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কুরআনে গদ্য ও পদ্য উভয় বৈশিষ্ট্যমান। [ডাঃ ত্বা-হা হোসাইন লিখেছেন: কুরআন পদ্যও নয় কিংবা গদ্যও নয়, কুরআন শুধু কুরআন-ই। অবশ্য এতে মাত্রা ও অন্তমিল বিদ্যমান বলে মনে হয় কিন্তা তা শুধু দৃশ্যমান বাহ্যিক অবস্থার সাথেই সীমাবদ্ধ্ আরবী সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআন যে এক উৎকৃষ্ট ও উন্নত মানের গদ্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বিতীয়ত, কুরআনের গদ্যরূপ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্নধর্মী যার কোন ‍উপমা উদাহরণ পেশ করা সম্ভব নয়। -লেখক।]

সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন বাহ্যিক উচ্চারণে সে মাত্রা ও অন্তমিল দেখে, বিশেষ করে এ ব্যাপারটি ছোট ছোট আয়াত সম্বলিত সূরাগুলোতেই দৃষ্টিগোচর হয়। অথবা ঐ সমস্ত জায়গায় যেখানে কোন ঘটনাচিত্র উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য দীর্ঘ আয়াতের সূরাগুলোতেও এটি আছে তবে তা এতোটা স্পষ্ট নয়। নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করুন, যেখানে সুর, ছন্দ ও মাত্রার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে।

(আরবী*********)

নক্ষত্রের কসম, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট কিংবা বিপথগামী নয় এবং প্রবৃত্তির তাড়নায়ও কথা বলে না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা। সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। (সূরা আল-নজম: ১০৮)

(আরবী*********)

অতপর নিকটবর্তী হলো এবং ঝুলো রইলো, তখন ব্যবধান ছিল দুই ধুনক কিংবা তার চেযে কম। তখন আল্লাহ তার বান্দার প্রতি প্রত্যাদেশ করার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যাসে দেখেছে? (সূরা নজম: ৯-১২)

(আরবী*********)

নিশ্চয়িই সে তাকে আরেকবার দেখেছির, সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার কাছে অবস্থিত বসবারে জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তা দিয়ে আচ্ছন্ন হচ্ছিল। তাঁর দৃষ্টিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয়েই সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে। (সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)

(আরবী*********) তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উজ্জা সম্পর্কে এবং তৃতীয আরেকটি মানাত সম্পর্কে? (সূরা আন-নাজম: ১৯-২০)

(আরবী*********) পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য যার কন্যা সন্তান আল্লাহর জন্য? (সূরা নজম: ২১)

(আরবী*********) এ ধরনের বন্টন তো খুবই অসঙ্গত বন্টন। (সূরা আন-নজম: ২২)

উল্লেখিত আয়াতগুলোর শেষাক্ষরে মাত্রার প্রায় মিল আছে। কিন্তু আরবী ছন্দের মাত্রার চেয়ে তা কিছুটা ভিন্ন। সব আয়াতের শেষেই মিত্রাক্ষর এক ধরনের। মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের বদৌলতে প্রতিটি আয়াতের সাথে অপর আয়াতের একটি মিল সংঘটিত হয়েছে। ফলে বিচ্ছুরণ ঘটেছে অপূর্ব মূর্ছনার। এই যে, মিল ও সাদৃশ্য তার আরেকটি কারণ আছে, অবশ্য তা মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের মতো এতোটা উজ্জ্বল নয়। কেননা তা একক শব্দ, অক্ষরের বিন্যাস এবং বাক্যে শব্দসমূহের বিন্যাসের কারণে সৃষ্টি হয়। তার অনুভূতি ও উপলব্ধির পরিধি, দ্বীনি চেতনা এবং সুর ও সঙ্গীতের উপভোগের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য অন্তরার সুরেলা আওয়াজ এবং বেসুরো আওয়াজের মধ্যে পার্থক্য করা যায়, শুধুমাত্র বাক্যান্তে মিত্রাক্ষর হলেই তাকে সুর বা ছন্দ বলে অভিহিত করা যায়।

উল্লেীখত আয়াতগুলো ছোট ছোট বিধায় তা থেকে সৃষ্ট সূর-তরঙ্গের স্থায়িত্বও খুব দীর্ঘ নয়। তবে সব আয়াতের ছন্দ ও মাত্রা এক্ তাই সব আয়াতে মিল আছে। এসব আয়াতে শেষ অক্ষর এক রকম হতে হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

যেমন আধুনিক সাহিত্যে কোন গল্প-উপন্যাস লিকার সময় এদিকে নজর দেয়া হয় না, কুরআনী সুর ও ছন্দের বেলায় এসব কিছুকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অনেক আয়াত থেকে তো স্পষ্ট বুঝা যায় বাক্যান্তে মিলের জন্য সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে তা করা হয়েছে। যেমন নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করে দেখুন।

(আরবী*********) যদি এভাবে বর্ণনা না করে নিচের মত করে বর্ণনা করা হতো:

(আরবী*********) তাহলে অন্তমিলে পার্থক্য সৃষ্টি হতো এবং ছন্দপতন ঘটতো। তদ্রূপ নিচের আয়াত:

(আরবী*********) যদি এভাবে উল্লেখ না করে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হতো :

(আরবী*********) তাহলে ছন্দের মিল হতো না। ‘ইযান’ (***) শব্দটি দিয়ে সেই মিলকে পুরো করা হয়েছে।

তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, ‘আল উখরা; (***) এবং ‘ইযান’ (***) শব্দ দুটো ছন্দের মিল ছাড়া আরেোন কারণে নেয়া হয়নি, এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ। আসলে এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ নয় বরং কাব্য বিন্যাসের জন্য সূক্ষ্ম অপরিহার্যতার কারণেই এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আল-কুরআনের আরেকটি শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। একটি বিশেষ অর্থে আল-কুরআনে এ ধরনের শব্দ চয়ন করা হয়েছে এবং সাথে সাথে সেই শব্দটি সুর ও তালের মাত্রাকেও ঠিক রাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যেমন আমরা আলোচনা করেছি, আল-কুরআনের এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের উচ্চারণের সময় এক ধরনের ছন্দের মিল লক্ষ্য করা যায় এবং শেষে মিত্রাক্ষর দৃষ্টিগোচর হয়। আবার অনেক জায়গায় শব্দ নির্বাচন এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে একটি শব্দ আগ-পাছ করলেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।

প্রথম অবস্থা: প্রথম অবস্থা হচ্ছে কোন শব্দের স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করার উদাহরণ। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর একথাটি যা কুরআন হুবহু নকল করেছে:

(আরবী*********)

(ইবরাহীম (আ) বললো:) তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ, তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা? বিশ্ব প্রতিপালক ব্যতীত তারা সবাই আমার শত্রু। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন। আমি আশা করি তিনিই বিচারের দিনে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাপ করে দেবেন। (সূরা আশ-শুয়ারা: ৭৫-৮২)

উল্লেখিত আয়াতে ‘ইয়াহ্‌দিনি’ ইয়াসকিনি; (***) ইয়াশফিনি’ (***) এবং ইউহ্‌ঈনি’ (***) শব্দের শেষ থেকে উত্তম পুরুষের ‘ইয়া’ (**) কে বিলুপ্ত করা হয়েছে কারণ তা’বুদুনা (***) ও ‘আল আকদামুনা’ (***) শব্দদ্বয়ের মতো ‘নুন’ (***)-এর মিত্রাক্ষর বহাল রাখার জন্য।

এমনিভাবে নিচের আয়াত ক’টিতেও ‘ইয়া’ কে বিলুপ্ত করা হয়েছে:

(আরবী*********)

শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতে, শপথ তার যা জোড় ও বেজোড় এবং শপথ রাতের যখন তা গত হতে থাকে। এর মধ্যে আছে শপথ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য। (সূরা আল-ফজর: ১-৫)

উল্লেখিত আয়াতে ‘ইয়াসরী’ (***) শব্দের ‘ইয়া’ কে এজন্য বিলুপ্ত করা হয়েছে, যেন ‘আল-ফাজরি’ (***) ‘আশরীন’ (***) ওয়াল বিতরি’ (***) ইত্যাদি শব্দসমূহের সাথে মিল থাকে।

নিচের আয়াতগুলোও এখানে উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে।

(আরবী*********)

অতএব তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন।

এ আয়াতে ‘আদ দায়ি’ (***) শব্দের শেষ থেকে যদি ‘ইয়া’ (**) কে বিলুপ্ত করা না হতো তবে মনে হতো এ পংক্তিতে ছন্দপতন ঘটেছে। আর এ ত্রুটি কারো নজর এড়াত না। তেমনিভাবে নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করুন:

(আরবী*********)

(মূসা বললেন:) আমরাতো এ জায়গাটিই খুঁজছিলাম। অতপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চ ললো। (সূরা আল-কাহফ: ৬৪)

এ আয়াতে যদি (***) শব্দটি এভাবে (***) লিখা হতো তবে মিলের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতো।

তদ্রূপ যদি নিচের আয়াতগুলো থেকে আসল ‘ইয়া’ এবং উত্তম পুরুষের ‘ইয়া’ (***)-এর শেষ থেকে বিরতিসূচক ‘হা’ (**) কে বিলেপ করা হয় তবে অবশ্যই ছন্দ পতন ঘটবে।

(আরবী*********)

আর যার পাল্লাহ হাল্কা হবে, তার ঠিকানা হাবিয়া। তুমি কি জানো তা কি? তা হচ্ছে জ্বলনত আগুন। (সূরা আল ক্বারিয়া: ৮-১১)

নিচের আয়াতটিও লক্ষ্র করুন:

(আরবী*********)

অতপর যার আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতামযে, আমাকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হব। অতপর সে সুখ-স্বাচ্ছন্দের জীবন যাপন করবে। (সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১)

দ্বিতীয অবস্থা: শব্দের সাধারণ অবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন করা হয়নি বটে কিন্তু কৌশলী বিন্যাসে তা হয়ে উঠেছে ছন্দময়। যদি সেই বিন্যাসে সামান্যতম হেরফের করা হয় তবে ছন্দের মিল আর অবশিষ্ট থাকে না। নষ্ট হয়ে যায় সুর ব্যঞ্জনা।

(আরবী*********)

এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তাঁর পালনকর্তাকে নিভৃতে আহ্বান করেছিল এবং বলেছি: হে আমার রব্ব! আমার অস্থি বয়স ভারাবনত হয়েছে। বার্ধক্যেমাথা সুশুভ্র হয়েছে কিন্তু আপনাকে ডেকে কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৪)

ওপরের আয়াতে যদি শুধামাত্র মিন্নী (**) শব্দটিকে পরিবর্তন করে আল আযুম “(***) শব্দের পূর্বে এনে এভাবে বলা হয় যে, (আরবী********) তবে স্পষ্টতই বুঝা যায় উক্ত বাক্যে ছন্দ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র ছন্দ ও মাত্রা ঠিক রাখার জন্যই ‘মিন্নী’ (***) শব্দটিকে যথাস্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এবার দেখুন কতো সুন্দর মিল দেয়া হয়েছে। বাক্যের প্রথম দিকে বরা হয়েছে: (আরবী********) এবং তারপরই বলা হয়েছে: (আরবী********)

এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, আয়াতের ভেতর সুর ও ছন্দ এতো সূক্ষ্ম, শুধু অনুধাবন করা যায় কিন্ত ব্যক্ত করা যায় না। আগেও আমরা এ ব্যাপারে কিছুটা আলোচনা করেছি। এ ধরনের সুর ও তাল একক শব্দ সমষ্টি কিংবা একই বাক্যের বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ্ তা অনুধাবন করতে হলে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েই সম্ভব, অন্য কোনভাবে নয়।

উপরোক্ত আলোচনা একথারই ইঙ্গিত করে যে, আল-কুরআনের বর্ণনা রীতিতে সুর ও ছন্দের ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে হয়। তা এতো স্পর্শকাতর যে, শাব্দিক সাধারণ বিন্যাসের ব্যতিক্রম হলেই ছন্দপতন ঘটে যায। অথচ তা কবিতা বা কাব্য নয়। এমনকি তা কাব্যের নিয়ম-নীতি মেনে চলতেও বাধ্য নয়। কিন্তু মানুষ একে এমনভাবে সাজানো ও বিন্যাসিত দেখতে পায়, যে কারণে তারা একে কাব্য না বলে কি যে বলবে তাও ভেবে পায় না।

বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল

সুর ও ছন্দের মতো বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের কয়েকটি প্রকার আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের সেই প্রকারগুলোর কোন নিয়ম-নীতি আছে কি? এবং তা কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে আবর্তিত হয় কি?

এর উত্তর হচ্ছে- যখন একথা প্রমাণিত হয়েছে, আল-কুরআনে সূর ও ছন্দ বিদ্যমান। তাই আমরা এ প্রশ্নের জবাব সুর ও ছন্দের নিয়মানুযায়ীই দেয়ার চেষ্টা করবো। বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের ধরন বিভিন্ন সূরায় বিভিন্ন রকরে। অনেক সময় একই সূরায় একাধিক নিয়মের প্রয়োগ দেখা যায়। বিভিন্ন সূরার বাক্যান্তে বিরতির যেসব পার্থক্য পাওয়া যায় তা বাক্য ছোট, বড় কিংবা মধ্যম হওয়ার উপর নির্ভর করে। এর স্বরূপ সেই রূপ, যেরূপ কবিতার একই পঙতিতে কোন লাইন ছোট, আবর কোন লাইন বড় হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে শেষ যে কথা বলা যেতে পারে, তা হচ্ছে ছোট সূরার আয়াতন্তে বিরতিও স্বল্প। আর মাঝারি ধরনের আয়াতে বিরতি মধ্যম এবং বড় ধরনের আয়অতে বিরতি (মোটামোটি) দীর্ঘ। আর যদি অন্তমিলের দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখা যায়, ছোট সূরাগুলোতে ছন্দের সাথে উদাহরণগুলো বেশ ঘনিষ্ঠ। আবার বড় সূরাগুলোতে তাদের ঘনিষ্ঠতা কম। আল-কুরআনের সূরাসমূহের মধ্যে যে অন্তমিল পাওয়া যায় এবং যেগুলোর ব্যবহার অত্যাধিক তা হচ্ছে, ‘নূন’ (**) ‘মীম’ (**) বেং তার পূর্বে ‘ওয়াও’ (**) অথবা ‘ইয়া’ (**)। ‍উদ্দেশ্য সুর ও ছন্দের মতো এখানেও বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা।

এখন আরেকটি কথা অবশিষ্ট থেকে যায়, তা হচ্ছে একই অবস্থার বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের পার্থক্য কি জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? এর জবাব হচ্ছে- যে কথার উদাহরণ আমরা কুরআনের অধিকাংশ জায়গায় পেয়ে থাকে, তা শুধুমাত্র বৈচিত্র্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়; বরং তার কিছু উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা আছে। অনেক জায়গায় এ বৈচিত্র্যের কারণ আমরা উপলব্ধি করতে পারি আবার অনেক জায়গায় আমরা তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। যে জায়গায় আমরা ব্যর্থ হই সে জায়গায় আমরা প্রচলিত রীতি-নীতি রক্ষা করে একথা প্রতিষ্ঠিত করার ব্যর্থ প্রয়াস পাই যে, এ পদ্ধতিও চিত্রায়ণ, কল্পনা ও রূপায়ণের মতো একটি পদ্ধতি মাত্র।

যে সমস্ত জায়গায় আমরা বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের রহস্য বুঝতে পার তার মধ্যে সূরা মারইয়াম একটি। চিন্তা করুন এ সূরা শুরু হয়েছে হযরত জাকারিয়া (আ) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর ঘটনা্ দিয়ে। তারপর তার সাথে হযরত মারইয়াম ও ঈসা (আ)-এর ঘটনাটি জড়ে দেয়া হয়েছে। এ সূরায় বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল নিম্নরূপ। যা সূরার শুরুতে বর্ণনা করা হয়েছে:

(আরবী********)

এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তার বান্দা জাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তার পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিল নিভৃতে। সে বললো: হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি বয়সে বারাবনত হয়েছে, বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে, হে আমার পালনকর্তা। আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৩)

তারপর মাইরয়াম (আ)-এর ঘটনা শুরু হয়েছে এভাবে:

(আরবী********)

এ কিভাবে মারইয়অমের কথা বর্ণনা করো, যখন সে পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে পর্দা করলো। মারইয়াম বললো: আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি, যদি তুমি আল্লাহ ভীরু হও। (সূরা মারইয়াম: ১৬-১৮)

হযরত জাকারিয়া (আ) ও হযরত মারইয়াম (আ)-এর ঘটনা শেষ অক্ষরে পূর্বের অক্ষর বা হরফে-রাী (****) একই বর্ণের মাধ্যমে সমাপ্তি করা হয়েছে। আর যেখানে হযরত ঈসা (আ)-এর ঘটনা শেষকরা হয়েছে সেখানে এ পদ্ধতির কিছুটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।

(আরবী********)

(সন্তান বললো: ) আমিতো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতোদিন জীবিত থাকি, ততোদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে এবং জননীর অনুগত থাকতে। আর আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি, আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হবো। (সূরা মারইয়াম: ৩০-৩৩)

(আরবী********)

এ-ই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্য কথা, যে সম্পর্কে লোক সন্দেহ করে। আল্লাহ এমন নয় যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, ‘তিনি যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বলেন: হও, আর অমনি তা হয়ে যায়। সে আরো বললো, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাত করো, এটি সরল পথ। অতপর তাদের মধ্যে প্রতিটি দল পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করলো। সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফিরদের জন্র ধ্বংস। (সূরা মারইয়াম: ৩৪-৩৭)

ওপরের আয়অতগুলো আপনি নিরীক্ষণ করে দেখুন শেষ আয়াতের বিরতির মধ্যে পরিবর্তন এসেছে এবং তার মধ্যে দীর্ঘতা সৃষ্টি হয়েছে। এমনিভাবে অন্তমিলের সিস্টেমেও পরিবর্তন সুস্পষ্ট। শেষাক্ষরে ‘নূন’ অথবা ‘মীম’ নেয়া হয়েছে এবং তাদের পূর্বাক্ষরে ‘ওয়াও’ অথবা ‘ইয়া’ নেয়া হয়েছে। এমন মনে হয় যে, কিছুপূর্বে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছিল এবং এখন তার সমাপ্তি বর্ণনা করা হচ্ছে, যা স্বয়ং ঐ কাহিনী থেকে নেয়া।

আমরা একথার সত্যতা প্রমাণের জন্য আরো প্রমাণ উপস্থাপন করছি- যেখানে ঐ ঘটনা সমাপ্তি হয়েছে সেখানে বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল প্রথম রীতির দিকে ফিরে আসে। তা এজন্য যে, যেন পুনরায় নতুন ঘটনাবলীর দিগন্ত উন্মোচিত হয়্ ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী********)

অতপর তাদের ভেতরের দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করলো। সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফিরদের জন্য ধ্বংস। সেদিন তারা কি চমৎকার শুনবে এবং দেখবে, যেদিন তারা আমার কাছে আগমন করবে। কিন্তু আজ জালিমরা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে রয়েছে। তুমি তাদেরকে পরিতাপের দিবস সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দাও। যখন সকর ব্যাপারে মীমাংসা হয়ে যাবে। এখন তারা অসাবধানতায় আছে এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছে না। (সূরা মারইয়াম: ৩৭-৩৯)

(আরবী********)

আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকার হবো পৃথিবীর এবং তার ওপর যা আছে তার। আর আমার কাছেই তাদের সকলকে প্রত্যাবর্তন করানো হব্ তুমি এ কিতাবে ইবরাহীমের কথা শুনিয়ে দাও। নিশ্চয়ই সে ছিল সত্যবাদী নবী। যখন সে তার পিতাকে বললো: হে আমার পিতা, যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না, তার ইবাদত করো কেন? হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি, সুতরাং আমার অনুসরণ করো, আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। হে আমার পিতা! আমি আশংকা করি দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শ করবে। অতপর তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।

সূরা নামা’র শুরু ‘নূন’ (**) এবং ‘মীম’ (**) এর অন্তমিল ব্যবহার করে। যেমন:

(আরবী********)

তারা পরস্পর কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? মহাসংবাদ সম্পর্কে, যে সম্পর্কে তারা মতানৈক্য করে, না সহসাই তারা জানতে পারবে। অতরপর না, অতি সত্ত্বর তারা জানতে পারবে। (সূরা নামা: ১-৫)

যেখানে এ বর্ণনা শেষ হয়েছে এবং এর পরিবর্তে তর্ক-বিতর্কের স্টাইলে আলোচনা শুরু হয়েছে, তো হঠাৎ নিয়ম পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। যেমন:

(আরবী********)

আমি কি করিনি ভূমিকে বিছানা এবং পর্বতমালাকে পেরেক? আমি তোমাদের জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। তোমাদের নিদ্রকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী, রাতকে করেছি আবরণ। দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।

সূরা আলে-ইমরানের পুরো সূরাটিতেই ‘নুন’ এবং ‘মীম’-এর অন্তমিল বিদ্যমান। যা আল-কুরআনের সাধারণ একটি রীতি। যখন সূরা সমাপ্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং একদল ঈমানদারের দো’আর প্রসঙ্গ এসছে, তখন অন্তমিলের স্টাইলও পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেমন:

(আরবী********)

(ঈমানদারগণ বলে:) হে পরওয়ারদিগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনার। আমাদেরকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দিন। হে প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আপনি যাকে জাহানামে নিক্ষেপ করলেন তাকে অপমানিত করে ছাড়লেন। আর জালিমদের জন্য তো কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা আলে-ইমরান: ১৯১-১৯২)

বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল পরিবর্তনের এ ধারা আল-কুরআনের অনেক জায়গায়ই পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সকল জায়গায় পরিবর্তনের রহস্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা বলতে পারি না। পরিবর্তনের যে ক’টি ধারা সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল সে সম্পর্কে আমি ইঙ্গিত দিলাম। এ প্রসঙ্গে যতোটুকু আলোচনা করা হয়েছে আমার মতে তা-ই যথেস্ট।

একটি কথা অবশিস্ট থেকে যায় তা হচ্ছে আল-কুরআনের সুর ও ছন্দের রীতি-নীতি আলোচ্য বিষয় ও স্থানের (***) পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যায়। তবু আমরা একথা জোর দিয়ে বলতে পারি, কুরআনের সুর ও ছন্দ একটি বিশেষ নিয়মের অধীন। সর্বদা তা বাক্য ও তার পরিধির অনুরূপ হয়ে থাক। এটি এমন এক নীতি যার কোন ব্যতিক্রম ব্যত্যয় ঘটে না। সুর ও ছন্দের প্রকার ও বিশ্লেষণের জন্য তার নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও পরিভাষার জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া তার আলোচনা সম্ভবপর নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে পাঠকদের যেমন পরিভাষাগত জ্ঞানের অভাব আছে তদ্রূপ আমারও। কিন্তু আমি মনে করি, যদি সুর ও ছন্দের ধরন ও সেই সম্পর্কে মৌলিক কিছু আলোচনা করে দেয়া যায়, তাতেই আমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাবে।

সূরা আন-নাযিয়াতে সুর ও ছন্দের দুটো নীতি আছে যা এ সূরায় পাওয়া যায়। তার মধ্যে প্রথম নিয়মটি নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে পাওয়া যায়। সূরার এ অংশটি ছোট ছোট কিছু বাক্যের সমাহর। এ সমস্ত বাক্যে ‍মৃত্যু ও কিয়াতমের ধারা বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেখানে দ্রুত এবং বলিষ্ঠ তৎপরতা পাওয়া যায়।

ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী********)

শপথ সেই ফেরেশতাদের যারা ডুব দিয়ে আত্মা উৎপাটন করে, শপথ তাদের যারা আত্মার বাঁধন খুলে দেয় মৃদৃভাবে, শপথ তাদের যারা সন্তরণ করে দ্রুত গতিতে, শপথ তাদের যারা দ্রুত গতিতে অগ্রসর হয় এবং শপথ তাদের যারা সকল কর্ম নির্বাহ করে। কিয়ামত অবশ্যই হবে। যেদিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পনকারী্ অতপর আসবে পশ্চাতগামী। সেদিন অনেক হৃদয় ভীত-বিহ্বল হবে। (সূরা আন-নাযিয়াত: ১-৮)

(আরবী********)

তাদের দৃষ্টি অবনত হবে। তারা বলে: আমরা কি উল্টো পায়ে প্রত্যাবর্তিত হবোই, গলিত অস্থি যাবার পরও? তবেতো এ প্রত্যাবর্তন সর্বনাশা হবে। (সূরা নাযিয়াত: ৯-১১)

(আরবী********) অতএব তা হচ্ছে এক মহানিনাদ। তখনই তারা ময়দানে উপস্থিত হবে। (সূরা আন-নাযিয়াত: ১৩-১৪)

সুর ও ছন্দের দ্বিতীয প্রকার পাওয়া যায় নিম্নোক্ত আয়াতগুলো। এ আয়াতগুলো মন্থর, ধীরগতিসম্পন্ন এবং দীর্ঘতার দিকে মধ্যমাকৃতির। এ সমস্ত আয়াতের সম্পর্কে ঐ সম্পত আয়াতের মতো যেখানে কোন ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মূসা (আ) সংক্রান্ত যে সমস্ত আলোচনা এসেছে এ আয়াত ক’টি তারই অংশ বিশেষ। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী********)

মূসার বৃত্তান্ত তোমার নিকট পৌঁছেছে কি? যখন তার রব্ব তাকে তুর উপত্যকায় আহ্বান করেছিলেন, (এবং বলেছিলেন) ফিরাউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে সীমালংঘন করছে। অতপর বলো: তোমার পবিত্র হওয়ার আগ্রহ আছে কি? আমি তোমাকে তোমার রব্ব-এর দিকে পথ দেখাব, যেন তুমি তাকে ভয় করো। (সূরা আন নাযিয়াত: ১৫-১৯)

আমি ওপরে দু’ ধরনের সুর ও ছন্দের আলোচনা করলাম। আমার মনে হয়, এ দু’ প্রকারের পার্থক্য ও নিয়ম-নীতি সম্পর্কে বিশদ আলোচনার কোন প্রয়োজন নেই। দুটোর মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। উপরন্তু উভয়টির আলোচনাস্থলও এক এবং অভিন্ন। উভস্থান সুর ও ছন্দ স্বকীয়তার ভাস্বর।

আসুন এবার আমরা সুর ও ছন্দের তৃতীয় প্রকার নিয়ে কিছু আলোচনা করি। এ প্রকারের সুর ও ছন্দ বিশেষ করে দো’আর বাক্যসমূহে পাওয়া যায়। এবং সেখানে নরম সুরে হৃদয়ের আবেগকে তুলে ধরা হয়। অবশ্য এ ধরনের আয়াতগুলো কিছুটা দীর্ঘ। যেমন:

(আরবী********)

(তারা বলে:) হে পরোয়ারদিগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনার, আমাদেরকে আপনি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচান। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয়ই আপনি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করলেন তাকে অপমানিত করে ছাড়লেন। আর জালিমদের জন্র তো কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে। (এই বলে যে,) ‘তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আনো’ তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে প্রভু! তাই আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন এবং আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দিন, আর আমাদের ‍মৃত্যু দিন নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দিন- যা আপনি ওয়াদা করেছেন আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে আপনি অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি ভঙ্গ করবেন অঙ্গীকার।

অন্য এক দো’আয় বলা হয়েছে:

(আরবী********)

হে আমাদের প্রতিপালক! আপনিতো জানেন যা আমরা গোপনে করি এবং প্রকাশ্যে করি। আল্লাহর কাছে পৃথিবীতে ও আকাশে কোন কিছুই গোপন নেই, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা দো’আ শ্রবণ করেন। হে আমার প্রতিপালক আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমা সন্তানদের মধ্য থেকেও্ হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে মাফ করুন, যদিন হিসেব-নিকেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। (সূরা ইবরাহীম: ৩৮-৪০)

সুর ও ছন্দের আগের দুটো ধরনের ব্যতিক্রম এবারের ধরনটি, একথা প্রমাণের জন্য সুর ও ছন্দের কায়দা-কানুন ও তার পরিভাষাগুলো আয়ত্ব করতে হবে এমন নয়। এটি হৃদয় ‍নিঃসৃত এক ঝংকার যা উঁচু-নীচু সুর তরঙ্গে দো’আয় রূপ নিয়েছে।

আমি সুর ও ছন্দের আর একটি ধরন নিয়ে আলোচানার সাহস দেখাব। এ সুর ও ছন্দের দুলায়িত উর্মিমালা এবং তার সুরলহরী বরড় দীর্ঘ। এর প্রকৃতি ওপরে আলোচিত প্রকৃতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আমি ‍পুরো আস্থার সাথেই একথা বলতে পারি যে, এর মধ্যে এবং পূর্বে আলোচিত সুর ও ছন্দের মধ্যে যে পার্থক্য পাওয়া যায় তা দিবালোকের মতোই সুস্পষ্ট।

আমি সুর ও ছন্দের যে প্রকৃতির কথা বলতে চাচ্ছি, সেখানে উর্মিমালার সাথে সাথে গভীরতা ও প্রশস্ততাও পাওয়া যাবে। অধিকন্তু ভয় এবং বিভিষিকাও বিদ্যমান। কেননা এ সুর ও ছন্দ হচ্ছে ঝড়ের, প্লাবনের। চিন্তা করুন:

(আরবী*********)

আর নৌকাখানি তাদের বহন করে চললো পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গমালার সাথে। আর নূহ তার পুত্রকে ডাক দিরো (কারণ) সে সরে রয়েছিল। সে বললো: হে বেটা! তুমি আমাদের সাথে আরোহণ করো, এবং কাফিরদের সাথে থেকো না। পুত্র বললো: আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। নুহ বলরো: আজকের দিনে আল্লাহর হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল। ফলে সে নিমজ্জিত হয়ে গেল। (সূরা হুদ : ৪২-৪৩)

ঝড় ও প্লাবন যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তার সাথে গভীর সাদৃশ্য ‍সৃষ্টির জন্য এ আয়াতে সুর-তরঙ্গের যে অবতারণা করা হয়েছে, ঢেউয়ের মতো দীর্ঘ এবং সদা দুদুল্যমান, কখনো উঁচু এবং কখনো নিচু। এ আয়াতে শব্দ বিন্যাসের যে ধারা পাওয়া যায় তা ঝড়-বন্যা পরিবেষ্টিত বিভিষিকাময় দৃশ্যের সাথে পুরোপুরি সঙ্গত এক চিত্র।

আমরা আরেকটু ধৃষ্ঠতা দেখিয়ে সুর তরঙ্গের আরেকটি ছন্দায়িত ধরন সম্পর্কে আলোচনা করবো। কিন্তু একটি ওপরের উদাহরণের মতো এতো বেশি মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে না। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী*********)

হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করো সন্তুষ্ট স্নেহভাজন হয়ে। অতপর আমার বানআদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরা আল-ফজর: ২৭-৩০)

যখন পাঠক উচ্চস্বরে এ আয়াত পাঠ করে তখন এর কোমল সুর তরঙ্গ অনুভূত হয়। এ আয়াতে যে সুর-তরঙ্গ পাওয়া যায় তা ঐ তরঙ্গের মতো যা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ঐ আয়অতে প্রাপ্ত সুর-তরঙ্গ মৃদু ও তীব্র- উভয় অবস্থাই শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। ইয়া’র প্রথম আলিফের আওয়াজ যখন উচ্চস্বরে পৌঁছে এবং ‘আইয়্যু’ কে অপেক্ষাকৃত নিচু আওয়াজে পড়া হয় তখন সেখানে এক ধরনের সুর-তরঙ্গ পরিলক্ষিত হয়্ কিন্তু শুধু একথার দ্বারা সুর-তরঙ্গের সে সৌন্দর্য দৃষ্টিগোচর হবে না। কেননা সেখানে শুধু মাত্রার (***) মধ্যে সমতা সৃষ্টি হয়, স্বরের মধ্যে নয়। তাই সেখান থেকে সঙ্গীতের সুর অবশ্যই প্রভাবিত হয়। প্রবেশরত রূহের ওপর কোন প্রভাব পড়ে না, প্রবেশরত রূহের সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে ঐ বৈশিষ্ট্যের সাথে শব্দসমূহের স্বর ও ধ্বনির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর সন্ধান শুধু ঐ ব্যক্তি লাভ করতে পারে যে চোখ-কান খুলে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে কুরআন পাঠ করে।

আমরা এ প্রসঙ্গের এখানেই যবনিকা টানলাম। যেন সুর-তরঙ্গের অথৈ সাগরে আর হাবু-ডুবু খেতে না হয়।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী