আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Slide1

আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য

সাইয়েদ কুতুব শহীদ

ভাষান্তর : মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

প্রকাশকের কথা

আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য গ্রন্থটি আধুনিক প্রকাশনী ১৯৯৭ সালে প্রথম এবং ২০০১ সালে এর ২য় সংস্করণ প্রকাশ করে। মাস তিনেক আগে অনুবাদক সাহেব আমাদের কাছে গ্রন্থটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের জন্য নিয়ে আসে। অনুবাদকের কাছ থেকে অনুবাদস্বত্ব নিয়ে আমরা এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করছি।

আল্লাহ অহী এ কুরআনকে অনুপম রচনাশৈলীর মাধ্যমে উপস্থাপনের জন্য লেখক যেমন মহান আল্লাহর কাছে পুরষ্কৃক হবেন। তেমনি বর্তমান মুসলিম জাতির কাছেও অমর হয়ে রইলেন। সাথে সাথে এর অনুবাদকও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে অপূর্ব এ গ্রন্থটি উপহার দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতার জালে আবদ্ধ হয়ে রইলেন।

খায়রুন প্রকাশনী এ গ্রন্থটি উপহার দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতার জালে আবদ্ধ হয়ে রইলেন।

খাইরুন প্রকাশনী এ গ্রন্থখানি প্রকাশ করে জাতির কাছে ভালো ভালো গ্রন্থ উপহার দেওয়ার তাদের যে ওয়াদা তা পূরণ করে যাচ্ছে।

প্রকাশক

লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

নাম ও বংশ পরিচয় : নাম সাইয়েদ। কুতুব তাঁদের বংশীয় উপাধি। তাঁর পূর্বপুরুষগণ আরব উপদ্বীপ থেকে এসে মিসরের উত্তরাঞ্চলে মূসা নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী ইব্রাহীম কুতুব। মায়ের নাম ফাতিমা হুসাইন ওসমান। তিনি অত্যন্ত দ্বীনদার ও আল্লাহভীরু মহিলা ছিলেন। সাইয়েদ কুতুব ১৯০৬ সনের ২০শে জানুয়ারী শুক্রবার পিত্রালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বড় সন্তান। মেজো মুহাম্মদ কুতুব। তারপর তিন বোন, হামিদা কুতুব, আমিনা কুতুব, তৃতীয় বোনের নাম জানা যায়নি।

শিক্ষা জীবন: মায়ের ইচ্ছোনুযায়ী তিনি শৈশবেই পবিত্র কুরআন কণ্ঠন্ষ (হিফয) করেন। তারপর গ্রাম্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করে দেয়া হয়। তখনকার একটি আইন ছিল, কেউ যদি তার সন্তানকে মিসরে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ৈ পড়াতে ইচ্ছে করতেন তাহলে সর্বপ্রথম তাকে কুরআন হিফ্‌য করাতে হতো। যেহেতু পিতা-মাতার ঐকান্তিক ইচ্ছে ছিল তাদের বড় ছেলে সাইয়েদকে আল-আজহারে পড়াবেন, তাই তাকে হাফেযে কুরআন বানান। পরবর্তীতে পিতা মূসা গ্রাম ছেড়ে কায়রোর উপকণ্ঠে এসে হালওয়ান নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন এবং তাঁকে তাজহীযিয়াতু দারুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। এ মাদ্রাসায় শুধু তাদেরকেই ভর্তি করা হতো যারা এখান থেকে পাশ করে কায়রো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চাইত। তিনি এ মাদ্রাসা থেকে ১৯২৯ সনে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে দারুল উলুম কায়রো (বর্তমান নাম কায়রো ইউনিভার্সিটিতে) ভর্তি হোন। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৩৩ সনে বি, এ, পাশ করেন এবং ডিপ্লোমা-ইন-এডুকেশন ডিগ্রী লাভ করেন। এ ডিগ্রীই তখন প্রমাণ করতো, এ ছেলে অত্যন্ত মেধাবী।

কর্মজীবন: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী নেবার পর সেখানেই তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বেশ কিছুদিন সফলভাবে অধ্যাপনা করার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্কুল ইন্সপেক্টর নিযুক্ত হন। এ পদটি ছিল মিসরে অত্যন্ত সম্মানজনক পদ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেই তাঁকে ১৯৪৯ সনে শিক্ষার ওপর গবেষণামূলক উচ্চতর ডিগ্রী সংগ্রহের জন্য আমেরিকা পাঠানো হয়। সেখানে দু’বছর লেখাপড়া ও গবেষণা শেষে ১৯৫১ সনে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আমেরিকা থাকাকালিন সময়েই বস্তুবাদী সমাজের দুরাবস্থা লক্ষ্য করেন এবং তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে, একমাত্র ইসলামই আক্ষরিক অর্থে মানব সমাজকে কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারে।

এরপর তিনি দেশে ফিরে ইসলামের ওপর ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণা শুরু করেন। সেই গবেষণার ফসল ‘কুরআনে আঁকা কিয়ামতের চিত্র’ ও ‘আল কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য’।

ইসলামী আন্দোলনে যোগদান : আমেরিকা থেকে ফিরেই তিনি ‘ইখওয়ানুল মুসলিমুন’ নামক ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কর্মসূচী যাচাই করে মনোপুত হওয়ায় ঐ দলের সদস্য হয়ে যান। ১৯৫২ সনের জুলাই মাসে তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমুনের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তখন থেকে তিনি পরিপূর্ণ ইসলামী আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫৪ সনে সাইয়েদ কুতুবের সম্পাদনায় ইখওয়ানের একটি সাময়িকী প্রকাশ করা হয়। কিন্দু দু’মাস পরই কর্ণেল নাসেরের সরকার তা বন্ধ করে দেন।

গ্রেফতার ও শাস্তি: শুরু হয় ইখওয়ান নেতা ও কর্মীদেরকে গ্রেফতার ও নির্যাতন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সাইয়েদ কুতুবও ছিল। সাইয়েদ কুতুবকে বিভিন্ন জেলে রাখা হয় এবং তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। তাঁরই এক সহকর্মী জনাব ইউসুফ আল আযম লিখেছেন: ‘নির্যাতনের পাহাড় তাঁর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল্ তাঁকে আগুনে ছ্যাঁকা দেয়া হতো, কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হতো, মাথার ওপর কখনো অত্যন্ত গরম পানি আবার কখনো অত্যন্ত ঠান্ডা পানি ঢালা হতো। লাথি, ঘুষি, বেত্রাঘাত ইত্যাদির মাধ্যমেও নির্যাতন করা হতো, কিন্তু তিনি ছিলেন ঈমান ও ইয়াকীনে অবিচল- নির্ভিক।– (শহীদ সাইয়েদ কুতুব’ পৃষ্ঠা-৩০)

১৯৫৫ সনের ১৩ই জুলাই বিচারের নামে এক প্রহসন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাঁকে পনের বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। তাঁকে নির্যাতন করে এতো অসুস্থ ও দুর্বল করা হয়, যার ফলে তিনি আদালতে পর্যন্ত হাজির হতে পারেননি। এক বছর সশ্রম দণ্ড ভোগের পর নাসের সরকার তাকে প্রস্তাব করেন, তিনি যদি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তবে তাকে মুক্তি দেয়া হবে। মর্দে মুমিন এ প্রস্তাবের যে উত্তর দিয়েছিলেন তা যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেছিলেন:

আমি এ প্রস্তাবে এ কারণেই বিস্ময় বোধ করছি যে, একজন জালিম কি করে একজন মজলুমকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলতে পারে। আল্লাহর কসম! যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে তবু আমি এরূপ উচ্চারণ করতে রাজী নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমনভাবে পৌঁছুতে চাই যে, তিনি আমার ওপর এবং আমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট।

জেল থেকে মুক্তি লাভ: ১৯৬৪ সনের মাঝামাঝি ইরাকের প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম আরিফ মিসর সফরে যান এবং তিনি সাইয়েদ কুতুবের মুক্তির সুপারিশ করেন। ফলে তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। তিনি জেলে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ ১০ বছরে বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর “ফি যিলালিল কুরআন’ রচনা করেন।

দ্বিতীয়বার গ্রেফতার ও শাহাদাত:

এক বছর যেতে না যেতেই তাঁকে ক্ষমতা দখলের চেষ্টার অপবাদ দিয়ে আবার গ্রেফতার করা হয়। সাথে চার ভাই-বোনসহ বিশ হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তার মধ্যে প্রায় ৭শ’ মহিলাও ছিল।

অতঃপর নামমাত্র বিচার অনুষ্ঠান করে তাঁকে এবং তাঁর দুই সাথীকে ফাঁসির নির্দেশ দেয়া হয় এবং ১৯৬৬ সনের ২৯শে আগস্ট সোমবার তা কার্যকর করা হয়। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

সাইয়েদ কুতুব রচিত গ্রন্থাবলী

(ক) গবেষণামূলক:

(১) ফী যিলালিল কুরআন (৬ খণ্ড)

(২) আত তাসবীরুল ফান্নী যিল কুরআন (আল কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য)

(৩) মুশাহিদুল কিয়ামতি ফিল কুরআন (কুরআনের আঁকা কিয়ামতের চিত্র)

(৪) আল আদালাতুল ইজতিমাইয়্যা ফিল ইসলাম (ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার)

(৫) আস সালামুল ‘আ’লামী ওয়াল ইসলাম (বিশ্বশান্তি ও ইসলাম)

(৬) দারাসাতে ইসলামীয়্যা (ইসলামী রচনাবলী)

(৭) মা’রিফাতুল ইসলাম ওয়ার রিসালিয়াহ (ইসলাম ও পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব)

(৮) নাহ্বু মুজতামিউ’ ইসলামী (ইসলামের সমাজ চিত্র)

(৯) মুয়াল্লিম ফিত্‌ তরীক (ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা)

(১০) হাযা আদ্‌ দ্বীন (ইসলাম একটি জীবন ব্যবস্থা)

(খ) কাব্য ও কবিতা

১। কাফিলাতুর রাকীক (কাব্য)

২। হুলমুল ফাজরী (কাব্য)

৩। আল শাতিয়্যুল মাজহুল (কাব্য)

(গ) উপন্যাস:

১। আশওয়াক (কাঁটা)

২। তিফলে মিনাল ক্বারিয়া (গ্রামের ছেলে)

৩। মদীনাতুল মাসহুর (যাদুর শহর)

(ঘ) শিশু-কিশোরদের জন্য:

১। কাসাসুদ দীনিয়াহ্‌ (নবী কহিনী)

(ঙ) অন্যান্য:

১। মুহিম্মাতুশ শায়ির ফিল হায়াত (কবি জীবনের আসল কাজ)

২। আল আত্‌ইয়াফুল আরবাআ (চার ভাই বোনের চিন্তাধারা)

৩। আমেরিকা আলআতি রাআইতু (আমার দেখা আমেরিকা)

৪। কিতাব ওয়া শাখছিস্যাত (গ্রন্থ ও ব্যক্তিত্ব)

৫। আন নাকদুল আদাবী উছুলুহু ওয়া মানাহাজাহু (সাহিত্য সমালোচনার মূলনীতি ও পদ্ধতি)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

নিবেদন

মুহতারামা আম্মা! আমি এ গ্রন্থখানাকে আপনার নামে নিবেদন করছি।

প্রিয় মা আমার! স্মৃতিপটে একটা কথা এখনো জ্বলজ্বল করছে, প্রতিটি রমযান মাস এলে কারী সাহেব আমাদের ঘরে এসে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা তা কান লাগিয়ে পর্দার আড়াল থেকে তন্ময় হয়ে শুনতেন। যখন আমি শিশুসুলভ চীৎকার জুড়ে দিতাম তখন আপনি ইঙ্গিতে আমাকে চুপ করতে বলতেন। তখন আমিও আপনার সাথে কুরআন শ্রবণে শরীক হয়ে যেতাম। যদিও আমি তখন তা অনুধাবন করতে সক্ষম ছিলাম না। কিন্তু আমার মনে আক্ষরিক উচ্চারণগুলো বদ্ধমূল হয়ে যেতো। তারপর আমি যখন আপনার হাত ধরে হাটতে শিখলাম তখন আপনি আমাকে গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আপনার বড় ইচ্ছে ছিল আল্লাহ যেন তাঁর কালামকে কণ্ঠস্থ করার জন্য আমার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেন। অবশ্য আল্লাহ আমাকে খুশ ইলহানের মতো নিয়ামত দান করেছেন। আম যেন আপনার সামনে বসে প্রায় সময় তা তিলাওয়াত করতে পারি। আমি পূর্ণ কুরআন হিফজ করে নিলাম। আপনার অহংকার একটি অংশ পূর্ণ হয়ে গেল।

প্রিয় আম্মা আমার! আজ আপনি আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু এখনো আপনার সেই ছবি আমার স্মৃতিপটে অম্লান। ঘরে আপনি রেডিও সেটের কাছে বসে যেভাবে কারী সাহেবের তিলাওয়াত শুনতেন, আমি আজও সে স্মৃতি ভুলতে পারিনি। তিলাওয়াত শ্রবণরত অবস্থায় মুখমণ্ডল যে সুন্দর ও পবিত্র রূপ ধারণ করতো, আপনার মন-মস্তিষ্কে তার যে প্রভাব পড়তো সে স্মৃতি আজও মূর্তমান আমার হৃদয় পটে।

ওগো আমার জন্মদাত্রী! আপনার সেই মা’সুম শিশুটি আজ নওজোয়ান যুবক। আপনার সেই চেষ্টার ফসল আজ আপনার নামে নিবেদন করছি। আল্লাহ যেন আপনার কবরের ওপর ভোরে শিশিরের মতো শান্তি অবতীর্ণ করেন এবং আপনার সন্তানকেও যেন মাহফুজ রাখেন।

আপনার সন্তান

সাইয়েদ কুতুব

অনুবাদকের কথা

আপনি কি কুরআন বুঝতে চান? কুরআন যে এক জীবন্ত মুজিযা, সম্মোহনী শক্তির উৎস তা কি স্বীকার করেন? আপনি কুরআন পড়েন ঠিকই কিন্তু তা আপনাকে পুরোপুরি আকৃষ্ট করতে পারে না, কিন্তু কেন? এ কুরআনে এমন কাহিনি আছে যা রূপকথাকেও হার মানায়, এমন ছবি আছে যা আজ পর্যন্ত কোন শিল্পীই আঁকতে পারেনি, এমন সুরের মুর্ছনা ও ব্যাথার রাগিনী আছে যা সমস্ত সুরের জগতকে আচ্ছন্ন করে রাখে- এগুলোর সাথে আপনার পরিচয় হয়েছে কি? না হলে আল-কুরআন জনাব সাইয়েদ কুতুবের এ গ্রন্থখানা পড়ুন। এটি আপনাকে দেবে এক নতুন দিগন্তের পথ-নির্দেশ। আপনার সামনে উন্মক্ত করে দেবে কুরআনের সমস্ত রহস্যের দ্বার। আপনি হারিয়ে যাবেন কুরআনের অসীমতায়, অতল গহনে। কোন শক্তিই আপনাকে ফেরাতে পারবে না সে গভীর মায়াপুরী থেকে।

সাইয়েদ কুতুব একজন গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন, এ পরিচয়েই ইসলামী ‍দুনিয়া তাঁকে চেনেন। কিন্তু তিনি যে আধুনিক আরবী সাহিত্যের উঁচুস্তরের একজন সাহিত্যিক ছিলেন এবং তিনি ছিলেন এক অমর কথাশিল্পী সে কথা ক’জন খবর রাখেন। শুধু তাই নয়, শিল্পকলা, ললিত কলা, চারু ও কারুকলা ইত্যদি বিষয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। তাই আল-কুরআনকে তিনি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। কারাজীবনে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন তিনি এ কুরআন নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। তিনি ছিলেন একদিকে হাফেজে কুরআন, অপরদিকে তাঁর মাতৃভাষা ছিল আরবী, আর এ দুটো দিকই গবেষণা কর্মে তাঁকে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তিনি নিজেই বলেছেন:

আমার মতে এক অধক ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তা’আলার এক বিরাট অনুগ্রহ, আমি যখন আল-কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছি, তখন তিনি আমার জন্য রহমতের সব ক’টি দরজা খুলে দিয়েছেন এবং আমাকে আল-কুরআনের রূহের এতো নিকটবর্তী করে দিয়েছেন, মনে হয় যেন কুরআন নিজেই বুঝি আমার জন্য তার সমস্ত সত্য ও রহস্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। -(ফী যিলালিল কুরআনের মূল ভূমিকা থেকে)

এ মূল্যবান গ্রন্থখানার পরতে পরতে সাহিত্যের ছোঁয়া, এটি বিনিসূতার এক কথামালা। ভাষা এতো উন্নত ও সমৃদ্ধ যে, আমি ইতোপূর্বে তিনবার এ গ্রন্থখানা অনুবাদে মনস্থ করে বিরত রয়েছি। সাহস পাইনি। তাই বলে এটি অনুবাদের লোভও সম্বরণ করতে পারিনি। পরিশেষে চতুর্থবারে মহান আল্লাহর কাছে কুকুতি মিনতির সাথে কৃপাভিক্ষা চেয়ে এ মহান কাজে হাত দিয়েছি। কাজ পিঁপড়ের গতিতে আগালেও করুণাময়ের রহমতের পরশে তা পূর্ণতায় পৌছে গেল। তবে সাহিত্যের সেই উচ্চ মানটা পুরোপুরি ধরে রাখতে পেরেছি সে দাবি আমি করছি না, কিন্তু লেখক যা বুঝাতে চেয়েছেন তা আপনাদের সামনে হুবহু উপস্থাপরে স্বেচ্ছায় কোন ত্রুটি করিনি। তারপরও কথা থেকে যায়, আমি একেতো কোন বড় আলিম নই। তারপর আধুনিক আরবী সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান নেই বললেই চলে, তদুপরি আমি এক দুর্বল মানুষ,ভুল-ত্রুটিই যার নিত্যদিনের সাথী। তাই এ কাজ করতে গিয়েও হয়তো কোন জায়গায় ভুল করে থাকতে পারি, যা আমি এখনো অবগত নই। যদি কোন আল্লাহর বান্দার নিকট এ ধরনের কোন ভুল-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হয় তবে মেহেরবানী করে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আমি পরবর্তী সংশোধন করে দেবার চেষ্টা করবো, ইনশা আল্লাহ্‌।

পরিশেষে দরবারে ইলাহীতে নতশিরে প্রার্থনা, তিনি যেন এ গ্রন্থের লেখককে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদান প্রদান করেন। তার সাথে এ অধম অনুবাদক, প্রকাশক ও পাঠকগণকেও যেন আল্লাহ মা’ফ করে দেন এবং জান্নাতে লেখকের সাথে মিলিত হবার তওফিক দেন। আরো মিনতি এই যে, লেখকের মতো আমাদের কাছেও যেন আল্লাহ তাঁর কুরআনে হাকীমের সমস্ত রহস্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। আমীন।

বিনীত

মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মুমিন

সূচি পত্র

বিষয়

লেখকের কথা

আমি কুরআনকে কিভাবে পেয়েছি?

প্রথম অধ্যায়

আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

ওয়ালীদ বিন মুগিরার ঘটনা

আল কুরআন সম্মোহনী শক্তির উৎস

ইসলাম গ্রহণের মূল চালিকা শক্তি

আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তির উৎস কোথায়?

দ্বিতীয় অধ্যায়

আল-কুরআনের গবেষণা ও তাফসীর

সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈদের যুগে তাফসীর

তৃতীয় অধ্যায়

শৈল্পিক চিত্র

ভাবকে বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ

মনোজাগতিক চিত্র

মানবিক চিত্র

সংঘটিত বিপর্যয়ের চিত্র

রূপক ঘটনাবলীর চিত্র

১. বাগান মালিকদের কাহিনী

২. দুটো বাগানের মালিকের কাহিনী

প্রকৃত ঘটনাবলীর চিত্র

১. হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)

২. হযরত নূহ (আ)- এর প্লাবন

কিয়ামতের চিত্র

শান্তি ও শাস্তির দৃশ্যাবলী

চতুর্থ অধ্যায়

কল্পনা ও রূপায়ণ

পঞ্চম অধ্যায়

আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাস

শৈল্পিক বিন্যাসের ধরন

ষষ্ঠ অধ্যায়

আল-কুরআনের সুর ও ছন্দ

প্রথশ অবস্থা

দ্বিতীয় অবস্থা

বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল

সপ্তম অধ্যায়

কুরআনী চিত্রের উপাদান

শৈল্পিক বিন্যাসের একটি সূক্ষ্ম দিক

কুরআনী চিত্রের স্থায়িত্বকাল

দীর্ঘ চিত্র

অষ্টম অধ্যায়

প্রসঙ্গঃ আল কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

১. ওহী ও রিসালাতের স্বীকৃতি

২. এক ও অভিন্ন দ্বীন

৩. আল্লাহর ওপর ঈমান

৪. সমস্ত নবী-রাসূল একই দাওয়াত দিয়েছেন

৫. প্রত্যেক নবী-রাসূলের দ্বীনের যোগসূত্র৬. নবী-রাসূলদের সফলতা ও মিথ্যেবাদীদের ধ্বংস

৭. সুসংবাদ ও সতর্কীকরণের সত্যতা

৮. নবী-রাসূলদেরকে প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের বর্ণনা

৯. আদম সন্তানকে শয়তানের শত্রুতা থেকে সতর্ক করা

১০. অন্যান্য আরো কতিপয় কারণ

নবম অধ্যায়

আল কুরআনের ঘটনাবলী দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার প্রমাণ

কাহিনীর সংক্ষেপ ও বিস্তৃতি

উপসংহার ও পরিণতি বর্ণনা

কাহিনী বর্ণনায় দ্বীনি ও শৈল্পিক সংমিশ্রণ

কাহিনীর শৈল্পিক রূপ

দশম অধ্যায়

কাহিনীর শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য

১. বর্ণনার বিভিন্নতা

২. হঠাৎ রহস্যের জট খোলা

৩. দৃশ্যান্তরে বিরতি

৪. ঘটনার মাধ্যমে দৃশ্যাংকন

আবেগ অনুভূতির চিত্র

কাহিনীতে ব্যক্তিত্বের ছাপ

১. চঞ্চল প্রকৃতির নেতা

২. কোমল হৃদয়- সহনশীল ব্যক্তিত্ব

৩. হযরত ইউসুফ (আ)

৪. হযরত আদম (আ)

৫. হযরত সুলাইমান (আ)- এর ঘটনা

এগার অধ্যায়

মানুষের স্বরূপ

১. মানব প্রকৃতি

২. ঠুনকো বিশ্বাসী

৩. সুবিধাবাদী ধূর্ত প্রকৃতির লোক

৪. ভীরু কাপুরুষ

৫. হাসি-কৌতুক উদ্রেককারী লোক

৬. শুধু আকৃতিতেই মানুষ

৭. প্রশংসাকাংখী

৮. সুবিধাবাদী

৯. অদ্ভূদ অহংকারী

১০. ভীত বেহায়া

১১. দুর্বল মুনাফিক

১২. ওজর আপত্তিকারী

১৩. নির্বোধ প্রতারক

১৪. বিপর্যয় সৃষ্টিকারী

১৫. পার্থিব জীবনের মোহ মোহগ্রস্ত

১৬. গোঁয়ার ও স্থবির প্রকৃতির লোক

১৭. স্বেচ্ছাচারী দল

১৮. সত্য হোক কিংবা মিথ্যে, ঝগড়া তারা করবেই

১৯. কৃপণ

২০. ভেতর ও বাইরের বৈপরীত্য

২১. মুমূর্ষু অবস্থায় তওবাকারী

২২. স্বল্প বুদ্ধির লোক

২৩. প্রকৃত ঈমানদার

২৪. দরিদ্র অথচ অল্পে তুষ্ট

২৫. আল্লাহকে ভয়কারী

২৬. আল্লাহর প্রকৃত বান্দা

২৭. দানশীল ও উদার

২৮. ধৈর্যশীল

২৯. অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দানকারী

৩০. ক্রোধ দমনকারী ও অপরকে ক্ষমাকারী

বারো অধ্যায়

প্রজ্ঞা প্রসূত যুক্তি

আল-কুরআনের সহজ সরল বক্তব্য

তওহীদ (একত্ববাদ) সমস্যা

মৃত্যুর পর ‍পুনরুত্থান

আল-কুরআনের বর্ণনা রীতি

উপসংহার]

আল-কুরআনের বর্ণনাভঙ্গির আরোএকটি বৈশিষ্ট্য

পরিশিষ্ট-১

পরিশিষ্ট-২

আল-কুরআনের সূরা অবতীর্ণের ক্রমধারা

লেখকের কথা

আমি কুরআনকে কিভাবে পেয়েছি?

এ মুহূর্তে আপনার হাতে যে বইটি আছে তা শুরু করার আগে এর আনুসাঙ্গিক একটি ঘটনা বলে নেয়া দরকার। যতোক্ষণ এ বইটি আমার স্মৃতিপটে সংরক্ষিত ছিল, নির্দিষ্ট কোন আকার আকৃতিতে ছিল না, ততোক্ষণ সে ঘটনাটিকে বর্ণনা করার তেমন প্রয়োজনও ছিল না। যখন এটি অস্তিত্ব লাভ করার জন্য ছাপাখানার টেবিলে গেল, তখন ঘটনাটিও আর নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রিইলো না। এখন তা প্রকাশ হওয়াই দরকার।

তখন আমি খুব ছোট্ট। সবেমাত্র কুরআন পড়া শুরু করেছি, কিন্তু এর মর্মার্থ বা পাঠোদ্ধার ছিল আমার আয়ত্বের বাইরে। তাছাড়া এর উচ্চমানের বিষয়বস্তুগুলো আমার জ্ঞানের পরিসীমায় আবদ্ধ করা, তাও ছিল অসম্ভব। তবু আমি এর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করেছি। তিলাওয়াতের সময় আশ্চর্যজনক বহু ঘটনা আমার মনের পর্দায় উঁকি মারতো। এ ছবিগুলো ছিল সাদাসিদা ও রঙহীন। তবু আমি তা আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে বার বার কল্পনা করতাম। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সে ধারা অব্যাহত ছিল এবং আমাকে তা আনন্দ দিত।

সাদাসিদা এ ছবিগুলোর মধ্যে যেগুলো আমার মনমগজে বদ্ধমূলণ হয়ে ছিল তার একটি ছবি নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করা মাত্র আমার সামনে ভেসে উঠতো।

(আরবী**********)

মানুষের মধ্যে এমন কতিপয় লোক আছে যারা প্রান্তিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি পার্থিব কোন স্বার্থ দেখে, সেদিকে ঝুকে পড়ে। আর যদি কোন বিপদ পরীক্ষায় নিমজ্জিত হয় তখন তাদের চেহারাকে ঘুরিয়ে ফেলে। প্রকৃতপক্ষে তারা ক্ষতিগ্রস্ত দুনিয়ায় এবং আখিরাতে। (সূরা আল-হাজ্জ : ১১)

এই খেয়ালী ছবিটি যদি আমি কারো সামনে উপস্থাপন করি, তার হাসা উচিত নয়। এ আয়াত শোনা মাত্র আমার স্মৃতিপটে যখন এ ধরনের ছবি ভেসে ওঠতো তখন আমি এক গ্রামে থাকতাম। গ্রামের পাশে উপত্যকার মাঝে একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে নামায পড়ছে কিন্তু সে সংকীর্ণ টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, তা থর থর করে শুধু কাঁপছে। যে কোন মুহূর্তেই ভেঙ্গে পড়তে পারে। আমি দূরে দাঁড়িযে এ অবস্থা দেখেছি এবং মনে মনে আশ্চর্য ও রোমাঞ্চিত হয়েছি।

এ রকম যে সমস্ত কল্পিত ছবি আমার মানসপটে ভেসে বেড়াতো তার একটি ছবি নিম্নোক্ত আয়াত পাঠে প্রতিভাত হয়ে উঠতো। আয়াতটি হলো:

(আরবী**************)

আর আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন, সেই লোকের অবস্থা, যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলা, অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। আর তার পেছনে লেগেছে শয়তান, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য আমি ইচ্ছে করলে তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম কিন্তু সেতো জমিনের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং নিজের নফসের খাহেস পূরণেই নিমগ্ন হয়। তার অবস্থা কুকুরের মতো। তার ওপর আক্রমণ করলে জিহ্বা বের করে হাঁপাবে আর যদি ছেড়ে দাও তবু জিহ্বা বের করেই রাখবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ১৭৫-১৭৬)

আমি এ আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য বুঝতাম না। কিন্তু তিলাওয়াত করা মাত্রই আমার মনের মুকুরে একটি ছবি এসে উপস্থিত হতো। দেখতাম, এক ব্যক্তি হা করে জিহ্বা বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে আমার কাছে এসে দাড়াতো। আমি অপলক নেত্রে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম না, কেন সে এরূপ করছে। তবে আমি তার কাছে এগিযে যেতে সাহস পেতাম না। এমনি ধরনের হাজারো ছবি আমার খুব ভালো লাগতো। ফলে কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি আমার এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতাম, আর কল্পনার তেপান্তরে সেই ছবি খুঁজে বেড়াতাম।

সেই সময়টি আমার মধুর কল্পনা র বালখিল্যতার সাথেই অতিবাহিত হয়ে গেল। এখন কালের আবর্তনে কিছুটা ইলম ও বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। কিছু তাফসীর গ্রন্থ নিজের প্রচেষ্টায় ও শিক্ষকদের সহায়তায় বুঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সুন্দর, সুমধুর ও মহিমান্বিত কুরআন তিলাওয়াতের সময় শৈশবে কী করেছি তার দিকে কোন দৃষ্টি যায় না। তবে কি আজকের কুরআন শৈশবের সেই কুরআন থেকে ভিন্নতর? এর মধ্যে কি কোন-ই সম্পর্ক নেই? সম্ভবত তা ছিল মনগড়া ব্যাখ্যার তেলসমতি।

আল কুরআনের বেশ কিছু তাফসীর দেখার পরেও মনে হলো, কোথায় যেন একটু ফাঁক রয়ে গেছে। তখন আমি সরাসরি কুরআন থেকে কুরআনকে বুঝার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করলাম। আশ্চর্য হলেও সত্যি, তখনই আমি সেই প্রিয় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত কুরআনের সন্ধান পেলাম। সেই আকর্ষণীয় মনোরম ছবি আবার আমার সামনে ভেসে ওঠলো। শুধু পার্থক্য ছিল তা আগের মতো সাদাসিদা না হয়ে বুঝের পরিপক্কতার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল। তখন আমি বুঝতে পারলাম এ ছবি নয়, উপমা। শুধু কুরআন বুঝার জন্য বর্ণনা করা হয়েছে। মূলত তা কোন বাস্তব ঘটনার প্রতিচ্ছবি নয়। তাই বলে তা অবাস্তব কোন কিছুও নয়।

আলহামদু লিল্লাহ! এবার আমি পূর্ণ মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন শুরু করলাম। হঠাৎ আমার মনে খেয়াল সৃষ্টি হলো, আমি যে ছবিগুলো দেখছি তা সাধারণের সামনে উপস্থাপন করবো, যেন তারা এ থেকে কিছু উপকৃত হতে পারে। তাই ১৯৩৯ সনে ‘আল মুকতাতাফ’ নামক পত্রিকার মাধ্যমে ‘আল-কুরআনের কতিপয় ছবি ও তার শৈল্পিক সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়।

আমি সেখানে প্রমাণ করে দেখিয়েছি, আল-কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সমস্ত ছবি একেছেন তা কোন রঙ্গিন ক্যামেরায় বা কোন শিল্পীর তুলিতে আঁকা সম্ভব নয়। সে এক সমস্যময় মোহিত ছবি। সেখানে আমি এও বলেছিলাম যে, এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি পুস্তক রচনা করাও সম্ভব।

তারপর ক’বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো। এদিকে কুরআনী ছবিগুলো আমার মনে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলতে লাগলো। আমি এর সর্বত্র শৈল্পিক সৌন্দর্যের সন্ধান পেতে থাকলাম। তখন আমি মনে করলাম, আমি একে পরিপূর্ণ ও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাই যে বিষয়ে আজও কেউ কলম ধরেনি। এ উদ্দেশ্যে আল-কুরআন অধ্যয়নে গভীরভাবে মনোনিবেশ করি এবং তা থেকে সেই সূক্ষ্ম ছবিগুলো একত্রিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সত্ত্বেও কাজের গতি মন্থর হয়ে যেতো।

অবশেষে আল্লাহর নাম নিয়ে সংকলনে হাত দিলাম। আমার কাজ ছিল আল-কুরআনের শৈল্পিক ছবিগুলোকে একত্রিত করা এবং তার রচনা শৈলীঅ ও শৈল্পিক সৌন্দর্য সম্পর্কে আলোকপাত করা। আল-কুরআনের শাব্দিক বিশ্লেষণ ও ফিকহী আলোচনা করার কোন উদ্দেশ্য আমার ছিল না।

যখন আমি অগ্রসর হচ্ছি তখন এক নতুন রহস্য আমার সামনে উদ্ভাসিত হলো। লক্ষ্য করলাম আল-কুরআনের আঁকা ছবিগুলো অন্যান্য আলোচনা ও অংশ থেকে পৃথক কিছু নয়। এর আলাদা কোন অবস্থানও নেই। বরং গোটা কুরআনের বর্ণনা ভঙ্গিটাই হচ্ছে দৃশ্য ও ছবির শৈল্পিক বুনিয়াদ। শুধু শরয়ী নির্দেশগুলো এর ব্যতিক্রম। তখন আমি ছবিগুলো একত্রিত করার চেয়ে তার আসল উদ্দেশ্য ও সূত্র উদ্ভাবনে মনোযোগী হলাম, তারপর সেই সূত্র ও তার ব্যাখ্যা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম। যা আজ পর্যন্ত কেউ স্পর্শও করেনি।

সংকলনের কাজ যখন শেষ, তখন মনে হলো কুরআন এক নতুন রূপে আমার মনে আবির্ভূত হলো। আমি এমন এক কুরআনের সন্ধঅন পেলাম যা ইতোপূর্বে আর কখনো পাইনি। আগেও কুরআন আমার কাছে সৌন্দর্যমণ্ডিত ছিল্ তবে তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত আকারে। এখন পুরো সৌন্দর্য যেন অবিচ্ছিন্ন রূপে দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। এ যেন এক বিশেষ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে আশ্চর্য ‍ও বিরল সম্পর্ক বিদ্যমান। যা কোন দিন আমি অনুধাবন করতে পারিনি। যার স্বপ্নও আমি কখনো দেখিনি। এমনকি অন্য কেউ কোন দিন তা কল্পনা করেনি।

আল-কুরআনের এসব দৃশ্যাবলী ও চিত্রসমূহের উপস্থাপনে আমার ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার যথাযথ দাবি আদায় করার ব্যাপপারে যদি আল্লাহ আমাকে তওফিক দেন তাহলে সেটিই হবে এ পুস্তকের পূর্ণাঙ্গ সাফল্যের মাপকাঠি।

প্রথম অধ্যায়

আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি

আল-কুরআন অবতীর্ণের প্রাক্কালে স্বয়ং কুরআনই আরবদেরকে এর সম্মোহনী শক্তিতে সম্মোহিত করেছিল। যার অন্তরকে আল্লাহর ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিল তিনি এবং যাদের মনের ওপর ও চোখের ওপর পর্দা পড়ে গিয়েছিল তারাও এ কুরআনের সম্মোহনী প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যদিও তারা এ কুরআন থেকে কোন উপকৃত হতে পারেনি। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তিত্ব এমন ছিল, যারা শুধুমাত্র নবী করীম (স)-এর স্ত্রী মুহতারামা খাদিজা (রা), তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস হযরত যায়িদ (রা) প্রমুখ। এঁদেরকে ছাড়া প্রাথমিক অবস্থায় যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তখন রাসূল (সা) এতো বেশি শক্তি ও ক্ষমতাশালী ছিল না যে, তাঁরা তাঁর ক্ষমতা ও শক্তিমত্তায় বিমোহিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বরং তাঁদের ইসলাম গ্রহণের মূলে ছিল আল কুরআনের মায়াবী আকর্ষণ।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এবং ওয়ালীদ বিন মুগিরার প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা দু’টো উপরোক্ত বক্তব্যকেই স্বীকৃতি দেয় এবং প্রমাণ করে যে, আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি অত্যন্ত প্রবল। যা শুধু ঈমানদারদেরকেই নয়; বরং কাফিরদেকেও প্রভাবিত করতো।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে আতা ও মুজাহিদ এর রিওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন, যা ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ বিন আবু নাজীহ থেকে সংকলন করেছেন, হযরত উমর (রা) বলেন:

আমি সেদিনও ইসলাম থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেছিলা, শরাব পানে মত্ত থাকতাম। আমাদের এক মিলনায়তন ছিল, যেখানে কুরাইশরা এসে জমায়েত হতো। সেদিন আমি তাদের সন্ধানে গেলাম কিন্তু কাউকে সেখানে পেলাম না। চিন্তা করলাম অমুক শরাব বিক্রেতার নিকট যাব, হয়তো সেখানে তাদেরকে পেয়েও যেতে পারি। কিন্তু সেখানেও তাদের কাউকে আমি পেলাম না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, মসজিদে হারামে গিয়ে তাওয়াফ করিগে। সেখানে গেলাম। দেখলাম হযরত মুহাম্মদ (স) নামাযে মশগুল। তিনি শামের (সিরয়ার) দিকে মুখ করে নামাযে দাঁড়িয়েছেন। কা’বা তাঁর ও শামের মাঝে অবস্থিত। তিনি রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমেনীর মাঝখানে দাঁড়িযে নামায পড়ছেন। তাঁকে দেখে ভাবলাম, আজ রাতে আমি চুপি চুপি শুনবো, তিনি কী পড়ছেন। তাঁকে দেখে ভাবলাম, আজ রাতে আমি চুপি চুপি শুনবো, তিনি কী পড়েন। আবার মনে হলো, যদি শোনার জন্য কাছে চলে যাই তবে তো আমি ধরা পড়ে যাব। তাই হাতিমের দিক থেকে এসে খানায়ে কা’বার গেলাফের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রেইলাম। আমার ও তাঁর মাঝে একমাত্র কা’বার গেলাফ ছাড়া অন্য কোন আড়াল ছিল না। যখন আমি নবী করীম (স)-এর তিলাওয়াত শুনলাম তখন আমার মধ্যে এক ধরনের ভাবান্তর সৃষ্টি হলো। আমি কাঁদতে লাগলাম।আর পরিণতিতে আমার ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য হয়।

ইবনে ইসহাকের আরেক বর্ণনায় আছে- একদিন উমর (রা) রাসূলে করীম (স)-কে হত্যা করার জন্য নগ্ন তরবারী নিয়ে রওয়ানা হলেন। সাফা পাহাড়ের পাদদেশে কতিপয় সাহাবীর সাথে নবী করীম (স) একটি ঘরে বসবাস করতেন। সেখানে প্রায় চল্লিশ জনের মতো পুরুষ ও মহিলা ছিল। পথিমধ্যে নাঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: উমর! কোথায় যাচ্ছ? উমর তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। নাঈম বললেন: বনী আবদে মুনাফের শত্রুতা পরে কারো, আগে নিজের বোন ফাতিমা এবং ভগ্নিপতি সাঈদ বিন যায়িদকে সামলাও। তারা মুসলমান হয়ে গেছে। তখন হযরত ওমর (রা) সেখানে গিয়ে দেখলেন, খাব্বাব (রা) তাদেরকে কুরআন শরীফ পড়াচ্ছেন।

উমর (রা) সরাসরি দরজার ভেতর ঢুকেছিল এবং ভগ্নিপতি সাঈদকে ধরে ফেললেন। নিজের বোন ফতিমাকে মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত করে দিলেন। কিছুক্ষণ বাক-বিতণ্ডার পর তারা যা পড়ছিল, তা দেখতে চাইলেন। তখন সূরা ত্ব-হা থেকে কিছু অংশ পাঠ করে তাকে শুনানো হলো। যখন সূরা ত্ব-হা’র কিছু অংশ ‍শুনালেন, তখন মন্তব্য করলেন, ‘এতো অতি উত্তম কথাবার্তা’। তাপর তিনি রাসূলে করীম (স)-এর নিকট গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হন। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

এ বিষয়ে সমস্ত বর্ণনার মূল কথা একটি। তা হচ্ছে হযরত উমর (রা) কুরআনের কিছু অংশ পড়ে অথবা শুনে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। আমরা তো এ ঘটনা শুনি কিংবা বলি কিন্তু এদিকে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়না যে, হযরত উমর (রা)-এর পরিবর্তন হয়েছিল, তার মূলে ছিল আল-কুরআনের আকর্ষণ ও অপ্রতিরোধ্য সম্মোহনী শক্তি।

ওয়ালীদ বিন মুগিরার ঘটনা

ওয়ালীদ বিন মুগিরা কুরআনে হাকীমের কিছু অংশ শুনে তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এটি দেখে কুরাইশরা বলাবলি শুরু করলো, সে মুসলমান হয়ে গেছে। ওয়ালীদ ছিল কুরাইশদের মধ্যে এক সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত ব্যক্তি। আবু জাহেলকে তার কাছে পাঠানো হলো। যেন সে কুরআনের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের কথা ঘোষণা দেয় যাতে কুরাইশরা তার ঐ কথায় প্রভাবিত হয়। ওয়ালিদ বলতে লাগলো: “আমি কুরআন সম্পর্কে কী বলবো? আল্লাহর কসম! আমি কবিতা ও কাব্যে তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখি কিন্তু মুহাম্মদের কাছে যে কুরআন শুনেছি তার সাথে এগুলোর কোন মিল নেই। আল্লাহর শপথ! তার কাছে যা অবতীর্ণ হয় তা অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর এবং তা প্রাঞ্জল ভাষায় অবতীর্ণ। যা তার সামনে আসে তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ওটি বিজয়ী হওয়অর জন্য এসেছে পরাজিত হতে আসেনি।”

একথা শুনে আবু জাহেল বললো: ‘যতোক্ষণ তুমি কুরআনকে অবজ্ঞা না করবে ততোক্ষণ তোমার কওম তোমার ওপর নারাজ থাকবে।’ ওয়ালীদ বললো: ‘আমাকে একটু চিন্তা করার অবকাশ দাও।’ তারপর সে ঘোষণা দিলো: ‘এতো সুস্পষ্ট যাদু, তোমরা দেখো না, যে এর সংস্পর্শে যায় তাকেই তার পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।[সীরাতে ইবনে হিশাম ও তাফসীরে ইবনে কাসীরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। -লেখক।]

এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে:

(আরবী**************)

সে চিন্তা করেছে এবং মনস্থির করেছে। সে ধ্বংস হোক, কিভাবে সে মনস্থির করেছে, (আবার বলছি) সে ধ্বংস হোক, কিভাবে সে মনস্থির করেছে! দেখেছে, সে আবার ভ্রুকুঞ্চিত ও মুখ বিকৃত করেছে। অতপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে এবং অহংকার করে বলেছে: এতো লোক পরম্পায় প্রাপ্ত যাদু বৈ আর কিছুই নয়। (সূরা আল মুদ্দাসসির: ১৮-২৪)

এ হচ্ছে ঐ ব্যক্তির বক্তব্য যে ইসলামের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করতো। মুহাম্মদ (স)-এর নিকট পৌঁছুলে নিজের অজান্তেই তাদের মন ও মাথা ঝুঁকে পড়ে কিন্তু যখন বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফিরে আসে তখন সম্মান ও প্রতিপত্তি বজায় রাখার জন্য বিদ্রোহ তাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এতেই প্রমাণিত হয়, আল-কুরআনের আকর্ষণী শক্তি কতো তীব্র, যা যাদুকেও হার মানায়।

এবার চিন্তা করে দেখুন, আল-কুরআন হযরত উমর (রা) ও ওয়ালীদ বিন মুগিরা দু’জনের ওপরই প্রভাব ফেললৈা। কিন্তু তাদের আচার-আচরণে আসমান-জমিনের পার্থক্য। হযরত উমর (রা) আল্লাহকে ভয় পাবার কারণে আল্লাহ তাঁর দিলকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন।পক্ষান্তরে ওয়ালীদ বিন মুগিরাকে অহংকার, দাম্ভিকতা ও নেতৃত্বের মোহ ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দিলো।

কুরআন মজীদে কাফিরদের কথার যে উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে, তাও আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তির একটি প্রমাণ।

(আরবী***********)

তোমরা কুরআন শুনবে না এবং কুরআন পাঠের সময় চেঁচামেচি শুরু করবে, তাতে মন হয় তোমরা বিজয়ী হবে। (সূরা হা-মিম সিজদা: ২৬)

এখানেও আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের ভয় ছিল যদি সুষ্ঠুভাবে এ কুরআন শুনতে দেয়া হয় বা শোনা হয় তবে তার প্রভাব শ্রোতার ওপর অবশ্যই পড়বে এবং সে তার অনুসারী হয়ে যাবে। কাজেই সকাল-সন্ধ্যায় যেন কেউ কুরআন শুনে মোহগ্রস্থ হতে না পারে সেজন্যই শোরগোল করা বাঞ্ছনীয়। অবশ্য তাদেরকেও প্রতিনিয়ত কুরআন আকর্ষণ করছিল। কিন্তু যাদের ভেতর সামান্য মাত্রায় হলেও আল্লাহভীতি ছিল শুধু তারাই জাহেলিয়াতের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। যদি তারা এতে প্রভাবিত না হতো কিংবা প্রভাবিত হওয়ার ভয় না করতো তবে অনর্থক কেন তারা কুরআনের বিরুদ্ধে এতো কাঠখড় পোড়ালো? এতেই প্রমাণিত হয়, এ কুরআনের আকর্ষণ কত তীব্র, কতো দুর্নিবার।

আল-কুরআনে সুন্দরভাবে কুরাইশ কাফিরদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। যে বক্তব্য দিয়ে তারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত।

(আরবী***********)

তারা বলে: এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা সে লিখে রেখেছে। এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তাকে শেখানো হয়। (সূরা আল-ফুরকান: ৫)

(আরবী************)

(তারা আল্লাহর কালাম শুনে বলেঃ) ইচ্ছে করলে আমরাও এমন বলতে পারি। এতো পুরোনো দিনের কিচ্ছা-কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়।

(আরবী************)

(এ কুরআন) অলীক স্বপ্ন মাত্র। বরং তার মনগড়া কথা, (না) বরং সে একজন কবি। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৫)

(আরবী*********)

হে রাসূল, তাদেরকে বলে দিন, (যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে) তোমরা এ রকম দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে এসো।

(আরবী***********)

(কিংবা) এ রকম একটি সূরাই তৈরী করে আনো। (সূরা বাকারা: ২৩)

কিন্তু তারা এ চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় একটি সূরাও তৈরী করতে সক্ষম হয়নি। দশটিতো অনেক দূরের কথা। সত্যি কথা বলতে কি, তারা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণই করেনি। অবশ্য নবী করীম (স)-এর ওফাতের পর কতিপয় কুলাঙ্গার নবুওয়াতের দাবি করেছিল বটে, কিন্তু তার পরিণতি ভালো হয়নি। তাদের এ বাতুলতাকে কেউ গুরুত্বই দেয়নি।

রাসূল (স) কর্তৃক ইসলামের দাওয়াতের প্রাক্কালে পূর্ববর্তী নবীর অনুসারীদের মধ্যে যারা সত্যিকার অর্থে আলিমও বুজুর্গ ছিলআল-কুরআনের প্রভাব তাদের ওপর তীব্রভাবেই পড়েছিল। ফলে তাঁরা আল-কুরআনের ছায়াতলে স্থান লাভ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। সেসব ভাগ্যবানদের ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী************)

আপনি সব মানুষের মধ্যে ইহুদী ও মুশরিকদেরকেই মুসলমানদের অধিকতর শত্রু হিসেবে পাবেন। আর মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান বলে। এর কারণ খ্রীস্টানদের মধ্যে আলিম ও দরবেশে রয়েছে যারা অহংকার করে না। তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কথা শুনামাত্র দেখবেন তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেছে। কারণ তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা আরো বলে: হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম, অতএব আমাদেরকে অনুগতদের তালিকাভুক্ত করে নিন। (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮২-৮৩)

জানার তীব্র আকাংখার যে চিত্র পেশ করা হয়েছে তা শুধুমাত্র কুরআন শোনার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে।এমনকি কুরআন শুনে নিজেদের অজান্তেই তাদের চোখের পান পর্যন্ত নির্গত হয়েছে। ফলে তারা সত্যের মুখোমুখি হতে পেরেছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল-কুরআন যে সত্যের দাওয়াত ও শিক্ষা দিতে চায় তা তার নিজস্ব প্রভাব ছাড়া কোন মতেই সম্ভব হতে পারে না। আল-কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে:

(আরবী*************)

যারা পূর্ব থেকেই আলিম, যখন তাদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন তরা নত মস্তকে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। এবং বলে: আমাদের পালনকর্তা পবিত্র মহান। অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা পূর্ণ করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল: ১০৭-১০৮)

কুরআন শুনে আল্লাহকে ভয় করার চিত্র নিম্নোক্ত আয়াতেও তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী**********)

আল্লাহ উত্তম বাণী (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পুনঃ পুনঃ পঠিত। এতে তাদের লোমহর্ষণ হয় যারা তার প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের চামড়া ও অন্তকরণ আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। (সূরা আয-যুমার: ২৩)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, এ কুরআনের মধ্যে এমন এক প্রবাব নিহিত আছে যা তার পাঠক কিংবা শ্রোতাকে প্রভাবিত না করে ছাড়ে না। হৃদয়কে করে উত্তাল, চোখকে করে অশ্রুসজল। যে ঈমান গ্রহণে আগ্রহী সে কুরআন ‍শুনামাত্রই তার আনুগত্যের শির নত হয়ে যায়। এমনকি, যে কুফরী ও হঠকারিতায় নিমজ্জিত সে-ও যদি এ কুরআন শোনে তবে তার ওপরও কুরআন প্রভাব ফেলে, কিন্তু সে এটিকে যাদু মনে করে উড়িয়ে দেয়। লোকদেরকে তা শুনবে বারণ করে। তবু সে এ কুরআনকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহস পায় না।

আল-কুরআনে সম্মোহনী শক্তির উৎস

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল-কুরআন আরবদেরকে কিভাবে পরাজিত করলো এবং ঈমানদার ও কাফিরদের মধ্যে এটি কিভাবে এমন প্রচণ্ড প্রভাব ফেললো?

যে সমস্ত মনীষী কুরআন বুঝার ব্যাপারে বিশেস পারদর্ষিতা অর্জন করেছেন এবং আল-কুরআনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখনী ধরেছেন তারা তাদের সাধ্যমতো এ ব্যাপারে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কতিপয় আলিম ‍কুরআনী বিষয়বস্তুর মিল ও যোগসূত্র সম্পর্কে কিছু না বলে অন্যভাবে কিছুটা আলোচনা করেছেন। যা কুরআন এমন কিছু ঘটনাও বলে দিয়েছে যা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে। তাছাড়া কুরআন বিশ্বপ্রকৃতি ও মানব সৃষ্টি সম্পর্কেও আলোকপাত করেছে ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ আল-কুরআনের প্রচুর বর্ণনা করা হয়েছে। যা আল-কুরআনের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। কিন্তু ছোট ছোট সেই সব সূরার ব্যাপারে বক্তব্য কী, যেখানে কোন শরয়ী বিধান বর্ণনা করা হয়নি? কিংবা যেখানে কোন অদৃশ্য জগতের বিবরণ পেশ করা হয়নি বা পার্থিব জগতের কোন জ্ঞানও বিতরণ করা হয়নি? যদিও ছোট সেই সূরাগুলোতে সব বিষয়ের সামষ্টিক আলোচনা করা হয়নি (যা আল-কুরআনের অনেক সূরায় করা হয়েছে)। তবু আল-কুরআন অবতীর্ণের প্রথম দিকে সেগুলো আরবদেরকে সম্মোহন করেছিল। ঐ সূরাগুলোর মাধ্যমেই এসেছিল তাদের চিন্তার জগতের আলোড়ন এবং তার সৌন্দর্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। একথা স্বীকার করতেই হবে যে, এ ছোট সূরাগুলোর যাদুকরী প্রভাব এতো তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য ছিল, যার কারণে শ্রোতা মোহগ্রস্ত না হয়ে পারতো না। আল-কুরআন স্বীয় বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে কাফির ও মুমিনদেরকে তার প্রভাব বলয়ে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। যারা ইসলাম গ্রহণ করে সৌভাগ্যশালী হয়েছেন, তাদের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে আল-কুরআন। একথা অস্বীকার করার কোন উপায়ই নেই যে, আল-কুরআনের ছোট একটি সূরা কিংবা তার অংশ বিশেষ তাদের জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

অবশ্যি ইসলাম পূর্ণতা প্রাপ্তির পর যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের পেছনে আল-কুরআন ছাড়াও কিছু আচার-আচরণে এবং বাহ্যিক তৎপরতা ক্রিয়াশীল ছিল। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের সৌভাগ্যবান মুমিনদের পেছনে ঈমানের ব্যাপারে যে বস্তুটি ক্রিয়াশীল ছিলতা কেবলমাত্র কুরআন ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইসলাম গ্রহণের মূল চালিকা শক্তি

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবার পর বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যেমন:

(১) কতিপয় লোক রাসূলে আকরাম (সা) ও সাহাবা কিরামের আমল ও আখলাকে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

(২) যারা ইতোপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা সবকিছুর উর্ধ্বে দ্বীনকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারা সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট-নির্যাতন ভোগ করছিল, কতিপয় লোক এ ব্যাপারে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়েছিল।

(৩) কিছু লোক একথা চিন্তা করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল যে, ‍মুহাম্মদ (স) ও তার সঙ্গী সাথীরা সংখ্যায় অল্প কিন্তু তবু কোন পরাশক্তি তাদেরকে পরাস্ত করতে পারে না এটি আল্লাহর সাহায্য ও তত্ত্বাবধান ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না।

(৪) কতিপয় লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল তখন যখন ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ইসলামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার কার্যকরী ছিল। যা তারা ইতিপূর্বে কখনো দেখেননি।

এ রকম আরোম অনেক কারণেই মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তার মধ্যে অন্যতম ছিল আল-কুরআনের প্রাণস্পর্শী আবেদন ও মোহিনী টান। যা ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় এককভাবে অবদান রেখেছে।

আল-কুরআনে সম্মোহনী শক্তির উৎস কোথায়?

একটি কথা ভেবে দেখা দরকার, তখন পর্যন্ত শরীয়ত পরিপূর্ণ ছিল না, অদৃশ্য জগতের খবর ছিল না, জীবন ও জগৎ সম্পর্কেও জোরালোভাবে তেমন কিছু বলা হয়নি, ব্যবহারিক কোন দিক-নির্দেশনা তখনও কুরআন দেয়নি, কুরআনে অতি সামান্য একটি অংশ ইসলামের দাওয়াতী কাজ করার জন্য বর্তমান ছিল। তবু সেখানে যাদু ও সম্মোহনী শক্তির উৎস নিহিত ছিল। যার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তারা বলতে বাধ্য হয়েছে: (আরবী***************)

এতো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।

ওয়ালীদ বিন মুগিরা ইসলাম গ্রহণ করতে চেয়েও তা গ্রহণ না করার ঘটনাটি সূরা আল-মুদ্দাসসিরে বর্ণিত হয়েছে। অবতীর্ণের ধারাবাহিকতায় এ সূরার অবস্থান তৃতীয়। সূরা আলাক এবং সূরা আল-মুজ্জাম্মিল এর পুর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব এ সূরাগুলো কিভাবে ওয়ালীদ বিন মুগরাকে প্রভাবিত করেছিল, এতে এমন কী যাদু ছিল যা তাকে পেরেশান করে তুলেছিল?

মক্কায় অবতীর্ণ ছোট ছোট এ সূরাগুলো যখন আমরা অধ্যয়ন করি তখন সেখানে শরয়ী কোন আইন কিংবা পার্থিব কোন ব্যাপার সামান্যতম ইঙ্গিতও পাই না। অবশ্যই সূরা ‘আলাকে মানব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে সামান্য আলোচনা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষকে জমাট বাধা রক্তপিন্ড থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া পরবর্তী বছরসমূহের ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে। যেমন সূরা রূমে (পারস্য বিজয়ের ব্যাপারে) ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে ওয়ালীদ যেটিকে যাদু বললো, আল-কুরআনে তার শেষ কোথায়?

এর উত্তর হচ্ছে- ওয়ালীদ আল-কুরআনের যে অংশকে যাদু বলে আখ্যায়িত করেছে অবশ্যই তা শরয়ী আহকাম ও পার্থিব কোন জ্ঞানের বহির্ভূত বস্তু ছিল। আলোচনার এমন কোন বিষয় সেখানে ছিল না যে ব্যাপারে সে কোন কথা বলতে পারতো। অবশ্য একথাও ঠিক, ইসলামী আকীদা ও আধ্যাত্মিকতা অর্জনের প্রচেষ্টা ছাড়াই সে তার সূক্ষ্ম রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছিল।

এ বার আসুন, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সূলা আল-‘আলাক সম্পর্কে একটু চিন্তা করে দেখে। প্রথম ১৫টি আয়াতের দিকে সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এর শব্দগুলো জাহিলি যুগের কবি ও সাহিত্যিকদের ব্যবহৃত শব্দের অনুরূপ, যার সাথে গোটা আরব পরিচিত ছিল কিন্তু তাদের লেখায় অনেক সামঞ্জস্যহীন শব্দ ও বাক্যের সমাবেশ ঘটতো। অনেক সময় তাদের সে রচনার মধ্যে কোন অন্তমিল ও প্রসঙ্গ পাওয়া যেত না। কিন্তু সূরা আলাকের ব্যাপারটি কি তেমন?

অবশ্যেই নয়। বরং সেখানে সামঞ্জস্য ও দ্যোতনার এক অপূর্ব সমাহার। প্রতিটি বক্তব্য উন্নত সাহিত্যের মূর্ত প্রতীক। অথচ তা একেবারেই প্রথম দিকে অবতীর্ণ আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে ‘পড়ো’। তবে তা আল্লাহর পবিত্র ও সম্মানিত নামের সাথে হতে হবে। একরা বা পড়ো শব্দ দিযে উদ্দেশ্য হচ্ছে- আলকুরআন তিলাওয়াত বা অধ্যযন। এজন্যই আল্লাহর নাম নেয়ার প্রয়োজন যে, তিনি নিজের নামেরসাথেই দাওয়াত দেন। আল্লাহর এক সিফাতি নাম ‘রব্ব’। অর্থ প্রতিপালক। তাই তিনি প্রতিপালন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণেরজন্য পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথাগুলো আল্লাহর ভাষায়:

(আরবী***********)

পড়ো তোমার ঐ প্রতিপালকের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।

তখন ছিল ইসলামী দাওয়াতের সূচনাকাল। এজন্য রব্ব-এর বিশ্লেষণ হিসেবে এমন একটি শব্দকে বেছে নেয়া হয়েছে যা জীবন শুরুরসাথে চড়িত। অর্থাৎ তিনি একন ‘রব্বা’ (আরবী*****) যিনি সৃষ্টি করেছেন।’

(আরবী***********)-তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন ‘আলাক’ থেকে। অন্য কথায় তিনি মানুষের জীবন শুরু করেছেন জমাট বাধা রক্তপিণ্ড থেকে। কতো ছোট ও সাধারণ অবস্থা দিয়ে সূচনা।

কিন্তু আল্লাহ যেহেতু রব্ব বা প্রতিপালক হওয়ার সাথে সাথে তিনি খালিক (সৃষ্টিকর্তা) ও উঁচু স্তরের মেহেরবান। তাই ছোট্ট একটি মাংসপিণ্ডকে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ এক মানষে রূপায়িত করেন। আর তার প্রকৃতি এমন, তাকে কোন কিছু শিখালে শেখার যোগ্যতা আছে। এজন্যই বলা হয়েছে:

(আরবী*************)

তুমি কুরআন পাঠ করো, তোমার প্রতিপালক অত্যন্ত দয়ালূ। তিনি হাতে কলমেশিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে (তা-ই) শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আ’লাক: ৩০৫)

দেখুন একটি আয়াতে কতো সুন্দরভাবে মানুষের শুরু থেকে পূর্ণতার দিকে নেয়ার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়ের কথা একের পর এক বলা হয়েছে। যেন মানুষের চিন্তা ও সহজাত প্রবৃত্তি সেই দাওয়াতের প্রতি সাড়া দেয়।

বুদ্ধি-বিবেকের দাবি-ই ছিল এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা, কী সে ছিল এবং বর্তমান কোথায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এমনকি হয় না।

(আরবী************)

সত্যি সত্যি মানুষ সীমালংঘন করে, কারণ সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে (অর্থাৎ তার শুরু ও শেষের কথা ভুলে গেছে)। (আলাক: ৬-৭)

 সে অহংকার ও দাম্ভিকতার বশে ভুলে গেছে বিধায় তাকে সতর্কতা ও ভর্ৎসনা মিশ্রিত বাক্যে সতর্ক করা হচ্ছে:

(আরবী***********)

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাদেরকে তোমার প্রভুর দিকেই ফিরিয়ে আনা হবে। (সূরা আল-আলাক: ৮)

মানুষের বিদ্রোহ ও দাম্ভিকতার প্রসঙগ যখন চলছে তখন তাকে পরিপূর্ণ রূপদানের জন্য বলা হয়েছে। তারা শুধুমাত্র নিজেরাই বিদ্রোহী হয় না বরং অন্যদেরকেও বিদ্রোহী বানাবার প্রচেষ্টা করে। (আরবী***********)

তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ, যে নিষেধ করে আল্লাহর এক বান্দাকে যখন সে নামাযে দাঁড়ায়। (সূরা আল আলাক: ৯-১০)

কোন ব্যক্তিকে নামায পড়তে বাধা দেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এ গর্হিত কাজটি তখনই বেশি বেড়ে যায় যখন নামাযী হেদায়েতের পথে অবিচল থাকেন এবং অন্যকে আল্লাহভীতি জাগ্রত করার চেষ্টা করেন।

(আরবী***********)

তুমি কি দেখেছ যদি সে সৎপথে থাকে অথবা আল্লাহভীতি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। (সূরা আল-আলাক: ১৩)

চিন্তা করে দেখুন, মানুষ সবকিছু থেকে অসতর্ক। এমনকি কিভাবে তার জন্ম এবং কোথায় তার শেষ সে খবরটুকু তার নেই।

(আরবী************)

তুমি কি দেখেছ, যদি সে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে কি জানে, আল্লাহ সবকিছু দেখেন (সূরা আল-আলাক: ১৩-১৪)

অতঃপর তাদেরকে শাসানো হয়েছে: (আরবী*************)

কক্ষণ নয়। যদি সে বিরত না হয় তবে আমি তাকে মাথার চুলের গুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবোই- মিথ্যাচারী, পাপীর কেশ গুচ্ছ। (আল আলাক: ১৫-১৬)

এখানে এমনভাবে শব্দ চয়ন করা হয়েছে যে, শব্দ নিজেই তার কাঠিন্যকে প্রকাশ করে দিয়েছে। যদি (****) এর স্থলে সমার্থবোধক শব্দ (****) নেয়া হতো তবে অর্থের দিকে এতো বেশি কাঠিন্য বুঝাতো না, যা (****) দ্বারা বুঝানো হয়েছে। এ শব্দ থেকে ধারণা হয়- এক ব্যক্তি কোন উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে শক্তভাবে কারো চুলের মুঠি ধরে রেখেছে আর সে দ্রুত নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। (*******) এ শব্দটির তাৎপর্য হচ্ছে, কোন বিদ্রোহী কিংবা অহংকারীকে উঁচু স্থান থেকে তার কপালের চুল ধরে হেচকা টানে ভূলুণ্ঠিত করে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া। টেনে হেঁচড়ে নেয়ার সময় অবশ্য সে নিজের সঙ্গী-সাথীদের নিকট চীৎকার কর সাহায্য চাইতে থাকে। যেমন আল্লাহ নিজেই বলেছেন: (আরবী*********)-অতএব সে তার সঙ্গী-সাথীকে আহ্বান করুক। আর (আরবী*******) আমি ডাকবো জাহান্নামের প্রহরীদেরকে।

একথা শুনে শ্রোতাদের ধারণা হয়, সম্ভবত জাহান্নামের পাইক-পেয়াদা এবং ঐ ব্যক্তির সাথীদের মধ্যে সেদিন সংঘর্ষ বেধে যাবে। এটি একটি কাল্পনিক চিত্র, যা কল্পনার জগতকে ছেয়ে ফেলে। রাসূল তাঁর নিজের অবস্থানে অটল থেকে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কেউ যদি তাঁর রিসালাতকে অস্বীকার কর মুখ ফিরিয়ে নেয় সেজন্য তিনি কোন পরওয়া করেন না। ইরশাদ হচ্ছে :

(আরবী*************)

কখনো তুমি তার কথায় প্রভাবিত হয়ো না, ‍তুমি সিজদা করো ও আমার নৈকট্য অর্জন করো। (সূরা আল-আলাক: ১৯)

ইসলামী দাওয়াতের এ ছিল বলিষ্ঠ সূচনা। এ সূলার বাক্যগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিওবা অবিন্যাসিত মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো বিন্যাসিত ও পরস্পর সংশ্লিষ্ট। এ হচ্ছে আল-কুরআনের প্রথম সূরা যার বর্ণনা স্টাইলেই তাঁর অন্তরমিলের দিকটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবার অবতীর্ণের দিক থেকে দ্বিতীয় সূরাটির দিকে লক্ষ্য করুন যা সূরা আল-মুজ্জাম্মিল নামেপরিচিত। অবশ্য ‘সূরা ক্বলমের’ প্রথম দিকের আয়াতগুলো এর পূর্বে অবতীর্ণ হতে পারে। যাহোক ওয়ালীদ সূরা আল-মুজ্জাম্মিলের নিম্নোক্ত আয়াত ক’টি শুনেই কুরআনকে যাদু বলে ‘আখ্যায়িত করেছিল:

(আরবী****************)

যেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবেএবং পর্বতসমূহ হয়ে যাবে বহমান বালুকা স্তুপ। আমি তোমাদের কাছে একজন রাসূলকে তোমাদের জন্য সাক্ষী করে পাঠিয়েছি যেমন পাঠিয়েছিলাম ফিরাউনের কাছে একজন রাসূল। ফিরাউন সেই রাসূলকে অস্বীকার করলো, ফলে আমি তাকে কঠিন শাস্তি দিলাম। অতএব, তোমরা কিভাবে আত্মরক্ষা করবে যদি সেদিনকে তোমরা অস্বীকার করো, যেদিন বালককে বৃদ্ধ বানিয়েদেবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে। তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। (সূরা আল-মুজ্জাম্মিল: ১৪-১৮)

উল্লেখিত আয়াতসমূহে কিয়ামতের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাই এমন এক ভয়ানক চিত্র যেখানে মানুষ কোন ছার গোটা সৃষ্টিলোকই তার আওতায় পড়ে যাবে। সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও ভারী হচ্ছে পৃথিবী ও পর্বতমালা। সেদিন সেগুলো কেঁপে উঠবে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে এবং কাউকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করা হবে না। শুধু তাদেরকেই গ্রেফতার করা হবে, যাদের নিকট রাসুল এসেছিলেন এবংতাঁর দাওয়াত পৌঁছেছে। সেই সাথে যাবতীয দলিল-প্রমাণও পূর্ণ হয়ে গেছে।

মক্কার কাফিরদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য যে রাসূল পাঠানো হয়েছে তিনি রাসূল হিসেবে নতুন ও প্রথম নন, তিনি তাদের মতোই একজন রাসূল, যাঁরা ফিরাউন ও তার মতো অন্যান্যদের নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন। আর তোমাদের শান-শওকত ও ক্ষমতা-ইখতিয়ার নিশ্চয়ই ফিরাউনের চেয়ে বেশিনয়। সে ফিরাউনকে পর্যন্ত কঠিন শাস্তি দেয়া হয়েছে। কাজেই তোমরাও কি চাও সেই রকম শাস্তিতে নিমজ্জিত হতে? যখন পৃথিবীর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তখন তোমরা যারা কুফুরীতে লিপ্ত আছ, তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে কিভাবে বাঁচবে? অথচ সেদিনের ভয়াবহতা দেখে দুশ্চিন্তায় শিশুরা পর্যন্ত বুড়ো হয়ে যাবে। আসমান ফেটে যাবে, পৃথিবী ও পাহাড় পর্বত কেঁপে উঠবে। এ ভয়ঙ্কর চিত্রের ভয়াবহতা থেকে কোন সৃষ্টিই নিরাপত থাকবে না। যখন কল্পনায় সেই বিভিষিকার চিত্র প্রতিফলিত হয় তখন কেউ প্রভাবিত না হয়ে পারে না। আর মানুষের অন্তরই এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর এ ওয়াদা পুরো হবার মতোই একটি ওয়াদা। যা কার্যকরী হওয়ার ব্যাপারে কোন জায়গাও নেই। কাজেই বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে সময় থাকতেই আল্লাহর পথে চলে আসা। সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের রাস্তায় চলার চেয়ে আল্লাহর পথে ছলা অধিকতর সহজ।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে তিনি সূরা ত্ব-হা’র প্রথমদিকে কিছু আয়াত পড়ে বা শুনে ইসলামের দিকে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সূরা ত্বা-হা ছিল অবতীর্ণেল ক্রমানুসারে ৪৫ নং সূরা। এর পূর্বে যে সমস্ত সূরা অবতীর্ণ হয়েছিল তা নিচে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হলো:

(১) সূরা আল-আলাক

(২) সূরা আল-মুজ্জাম্মিল

(৩) সূরা আল-মুদ্দাস্‌সির

(৪) সূরা আল-কলম

(৫) সূরা আল-ফাতিহা

(৬) সূরা আল-লাহাব

(৭) সূরা আল-তাকভীর

(৮) সূরা আল-আ’লা

(৯) সূরা আল-লাইল

(১০) সূরা আল-ফজর

(১১) সূরা আল-দোহা

(১২) সূরা আল-ইনশিরাহ

(১‘৩) সূরা আল-আসর

(১৪) সূরা আল-আদিয়াহ

(১৫) সূরা আল-কাওসার

(১৬) সূরা আল-তাকাসুর

(১৭) সূরা আল-মাউন

(১৮) সূরা আল-কাফিরূন

(১৯) সূরা আল-ফীল

(২০) সূরা আল-ফালাক

(২১) সূরা আন-নাস

(২২) সূরা আল-ইখলাস

(২৩) সূরা আন-নাজম

(২৪) সূরা-আবাসা

(২৫) সূরা আল-কাদর

(২৬) সূরা আশ-শামস

(২৭) সূরা আল-বুরুজ

(২৮) সূরা আল-তীন

(২৯) সূরা আল-কুরাইশ

(৩০) সূরা আল-ক্বারিয়াহ

(৩১) সূরা আল-কিয়ামাহ

(৩২) সূরা আল-হুমাযা

(৩৩) সূরা আল-মুরসালাত

(৩৪) সূরা -ক্বাফ

(৩৫) সূরা আল-বালাদ

(৩৬) সূরা আত-তারিক

(৩৭) সূরা আল-ক্বামার

(৩৯) সূরা আল-আ’রাফ

(৪০) সূরা আল-জ্বিন

(৪১) সূরা ইয়াসীন

(৪২) সূরা আল-ফুরকান

(৪৩) সূরা আল-ফাতির

(৪৪) সূরা আল-মারইয়াম

(৪৫) সূরা আল-ত্বা-হা[বাকী সূরাগুলো অবতীর্ণ ক্রমের তালিকা পরিশিষ্ট-২ দ্রষ্টব্য। -অনুবাদক]

উপরোল্লেখিত সমস্ত সূরাই মক্কায় অবতীর্ণ। অবশ্য এ সূরাগুলো মধ্যে কিছু কিছু আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। আসুন এবার আমরা উল্লেখিত সূরাসমূহের ওপর সাধারণভাবে একটু নজর বুলিয়ে নেই; যেভাবে আমরা ওয়ালীদের ঘটনাটি পর্যালোচনা করেছি, সেভাবে এ সূরাগুলো পর্যালোচনা করা এখানে সম্ভবপর নয়। আমরা শুধু একটুকু আলোচনা করতে চাই, সূরাগুলোর মধ্যে এমন কিযাদু নিহিত আছে যার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পূর্ববর্তীগণ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তখনতো উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের জন্য ইসলামের শক্তি বেড়ে যায়নি কিংবা ইসলাম বিজয়ী অবস্থায়ও ছিল না।

এ সূরাগুলোকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষজ্ঞগণ কুরআনের মর্যাদা ও মাহাত্ব্য বুঝাতে যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন তার বেশির ভাগ বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচ্য সূরাগুলোতে অনুপস্থিত। যদি ধরে নেয়া হয়, সূরা আল-ফাতিরে মানুষের সৃষ্টি রহস্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং সূরা আত্‌ তারিকেও অনুরূপ আলোচনা এসেছে। তবু একথা মেনে নিতে হবে, পার্থিব বিষয়ের আলোচনা সেখানে আসেনি এবং সেখানে শরীয় কোন বিধানের নাম-গন্ধও নেই। কিন্তু এ সত্য প্রতিষ্ঠিত যে, আলোচ্য সূরাগুলো ছাড়া অবশিষ্ট সূরা সমূহে এসব বিষয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় আলোচনা এসেছে। চাই তা মক্কী সূরা হোক কিংবা মাদানী।

আমরাচাই কিছু সময়ের জন্য হলেও (কুরআনে কারীমের দ্বীনের পবিত্রতা, ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে) স্থান-কাল ও পত্রের উর্ধ্বে ওঠে কুরআনে কারীমের সেই শৈল্পিক সৌন্দর্য ও রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করতে যা মৌলিক নীতির মর্যাদা রাখে। যা কুরআনের মতোই শাশ্বত ও চিরন্তনী। শৈল্পিক এ সৌন্দর্য আল কুরআনকে অন্য সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেয়। ফলে দ্বীনি গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করে ধাবিত হয় মনজিলে মাকসুদের দিকে।

এবার দেখা যাক আজ পর্যন্ত মানুষ কোন্‌ দৃষ্টিকোণ থেকে আল কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্যকে দেখে আসছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়

আল-কুরআনের গবেষণা ও তাফসীর

আল-কুরআন অবতীর্ণের সময়ে আরবে যেসব কাফির ও মুশরিক ছিল, তারা এ শৈল্পিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে কখনো এই কুরআনকে কাব্য আবার কখনো একে যাদু বলে আখ্যায়িত করতো। কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমরা একথা ‍দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি না যে, তাদের নিকট শৈল্পিক সৌন্দর্যের মাপকাঠি কী ছিল। অবশ্য একথা আমরা খুব ভালোভাবেই জানি, কুরআন থেকে তারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, কুরআন অবতীর্ণের সময় মুমিন এবং কাফির উভয় গোষ্ঠীর ওপরই এটি যাদুর মতো কাজ করেছে। কেউ এ যাদুর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়েছে। আবার কেউ কেউ এর মায়াজালে আবদ্ধ হয়েও এর থেকে পালিয়ে বেরিয়েছে। তারপর উভয় গোষ্ঠী নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কিন্তু কেউই সুস্পষ্টভাবে বলতে পারেনি, কুরআনের কোন্‌ অংশটি তাদের মায়াবী প্রভাবে ফেললো। হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত এক রিওয়ায়েতে আছে;’ “যখন আমি কুরআন শুনলাম তখন আমার মধ্যে ভাবান্তর হলো, যার কারণে আমি কাঁদতে লাগলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করে ফেললাম।” হযরত উমর (রা)-এর অন্য বর্ণনায় আছে: “আমি বললাম, এ কথাগুলো কতো গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাহাত্ম্য কতো বেশি।”

ওয়ালীদ বিন মুগিরা কুরআন ও রাসূল (স) উভয়কে অস্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, রাসূল (স)-এর সাথে মারাত্মক শত্রুতাও সে পোষণ করতো। তার মুখ থেকেও বের হয়েছে:

আল্লাহর শপথ! কুরআনের মধ্যে মাধুর্যতা পাওয়া যায়। মনে হয় এটি শাশ্বত এক বাণী। সবকিছুকে জয় করে নেয়। সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন কোন কিছুও এর চেয়ে উত্তম হতে পারে না।

ওয়ালীদ বিন মুগিরা আরো বলেছে:

কুরআনের মধ্যে যাদুকরী প্রভাব আছে, তোমরা দেখ না এটি কিভাবে একজন মানুষকে তার আত্মীয়-স্বজন ও সঙ্গী-সাথীদের থেকে পৃথক করে দেয়?

ঈমানদারগণ এ কালাম তিলাওয়াত করার পর যে প্রতিক্রিয়া তাদের ভেতর সৃষ্টি হয়, সে সম্পর্কে খোদ কুরআনই সাক্ষ্য দিচ্ছে:

(আরবী*************)

এতে (অর্থাৎ কুরআন তিলাওয়াতে) তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার ওপর, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের শরীর ও মন আল্লাহর স্মরণে একাকার হয়ে যায়। (সূরা আয-যুমার: ২৩)

যারা আহলে কিতাব এবং ঈমানদার তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যারা পূর্ব থেকে ইলম প্রাপ্ত, তাদের নিকট যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা নতশিরে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং বলে: আমাদের পালনকর্তা পবিত্র-মহান। আমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে। তারা কাঁদতে কাঁদতে নতমস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় ভাব আরো বৃদ্ধি পায়। (সূরা বনী-ইসরাঈল : ১০৭-১০৯)

অপরদিকে কুরাইশ কাফিররা কুফরী ও হঠকারিতায় অটল থেকে বলেছিল:

(আরবী**********)

এবং তারা বলে: এতো পুরাকালের কিচ্ছা-কাহিনী যা সকাল-সন্ধ্যা তাকে পড়ে শুনানো হয়। (সূরা আল ফুরকান: ৫)

নাদর বিন হারিস নামে মক্কায় এক কুলাঙ্গার ছিল। রাসুল (স) যখন মসজিদের মধ্যে লোকদেরকে কুরআন শুনাচ্ছিলেন তখন সে পারস্যের রূপকথা ও কিচ্ছা-কাহিনী আরবীতে বলা শুরু করলো। তার উদ্দেশ্য ছিল লোকদেরকে কুরআন শুনতে বাধা দেয়া। কিন্তু তার এ মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়নি। তবু কাফির কুরাইশরা এ কাজ থেকে বিরত থাকেনি; বরং তারা বলেছে:

(আরবী************)

তোমরা এ কুরআন শুনবে না, যখন এটি তিলাওয়াত করা হয় তখন তোমরা হট্টগোল করবে, এতে সম্ভবত তোমরা বিজয়ী হতে পারবে।

কুরআন সম্পর্কে এ ধরনের কথা ও কাজ তারা সর্বদাই বলতো এবং করতো। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে, কুরআন শৈল্পিক সৌন্দর্য কিভাবে প্রকাশিত হয়? কাফিররা যতোটুকু কুরআন শোনার সুযোগ পেয়েছে আরবীঅ ভাষী হওয়ার কারণে সবটুকুই তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। এরপর তারা ‘লাব্বাইক’ বলে ইসলাম কবুল করেছে, না হয় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে গেছে। উল্লেখ্য যে, শিল্পকলার ব্যাপারে এরূপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীদের যুগে তাফসীর

আল-কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরবর্তী যুগের দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি, তবে দেখতে পাই, সাহাবায়ে কিরাম বিভিন্ন রিওয়ায়াতের মাধ্যমে আল-কুরআনের অনেক জায়গার তাফসীর করেছেন, যা আল-কুরআনের বিষয় ও ভাষ্য সংক্রান্ত সরাসরি রাসুল (স) কর্তৃক বর্ণিত। সাহাবাদের মধ্যে অনেক খুব ভয়ে ভয়ে কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। আবার অনেকে কুরআন ব্যাখ্যাকে গুনাহের কাজ মনে করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে দূরে থেকেছেন। এমনকি সাইয়েদ ইবনু মাইয়িব (রহ)-এর ব্যাপারে কথিত আছে, তাঁর নিকট কুরআনের কোন অংশের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলতেন: ‘আমি কুরআনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না।’

মুহাম্মদ ইবনু সীরীন (রহ) বলেন: ‘আমি হযরত উবাইদাহ (রা)-কে কুরআন সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং সোজা পথে চলো, তারাই নাযাত পাবে, যারা জানতে চেষ্টা করে কুরআন কী উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে।’

হিশাম বিন উরওয়া বিন যুবাইরন (রা) বলেন: আমি আমার পিতাকে কখনো কুরআনের ব্যাখ্যা করতে শুনিনি। [ফজরুল ইসলাম- ড. আহমদ আমীন।]

ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মা হয়, সাহাবা কিরামদের অধিকাংশই কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। এজন্য তাদের সময়ে কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কাংখিত মানে পৌঁছুতে পারেনি।

যখন সাহাবাদের যুগের পর তাবিয়ীদের যুগ এলো, তখন আল-কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আগের চেয়ে কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করলো। তবে তার ধরন ছিল, কোন আয়াতের তাফসীর অনুরূপ কোন বাক্য বা শব্দ দিয়েই তারা সম্পাদন করতেন। যাতে মোটামুটি ভাবটা বুঝা যায়। যেমন: (আরবী**********) –এ আয়াতের তাফসীর এভাবে করতেন (আরবী**********): অর্থাৎ গুনাহ করার ইচ্ছে পোষণকারী হয়ো না। তেমনিভাবে তাঁরা (আরবী**********)-এর তাফসীর করেছেন: জাহিলী যুগে যখন কোন ব্যক্তি সফরে যাবার ইচ্ছে পোষণ করতে তখন দুটো তীর দিয়ে লটারী করতো। তার মধ্যে একটি তীরে লেখা থাকতো (***)-একাজ করো এবং অপরটিতে লেখা থাকতো (***)- একাজ করো না। তাঁরা চোখ বুজে তীর তুলতো এবং তীরের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতো। এ আয়াতে আল্লাহ একাজ করার নিষেধ করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ এর শানেনুযুল বা পটভূমিও বর্ণনা করেছেন। এমনকি তাফসীর করতে গিয়ে ইহুদী ও খ্রীস্টানদের কিছু কাহিনী বর্ণনা করাও তাদের রেওয়াজে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে তাফসীর শাস্ত্রের বিস্তৃতিত ঘটে। কিন্তু কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য বর্ণনার বিষয়বস্তু করার পরিবর্তে সেখানে ইতিহাস, বষ্ফাকরণ, দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের বিষয়বস্তু প্রাধান্য লাভ করে। এভাবে আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য চিহ্নিত করার যে সুযোগ তাদের আসে তারা তা হাতছাড়া করে বসেন।

মুতাআখ্‌খিরীনদের মধ্যে আল্লামা জামাখশারী আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্যের দিকটি কিছুটা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিল। তাই তিন এ ব্যাপারে কিছুটা অগ্রসর হয়েছেন। তেমন তিনি (আরবী**********)- যখন মূসা (আ)-এর রাগ প্রশমিত হলো। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন: “সম্ভবত মূসা (আ) ঐ সমস্ত কাজের ওপর রেগে গিয়েছিল যা তারা তাঁর অনুপস্থিতিতে করেছিল। তিনি নিজের সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বললেন: একি করছো? একথা বলে লিখিত তওরাতের ফলকগুলো নিক্ষেপ করলেন এবং তাঁর ভাইয়ের দাড়ি ধরে নিজের দিকে টানতে লাগলেন।”

তবু বলা যায় জামাখশারী এ কাজে পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করতে পারেননি। কারণ তার বর্ণনা ও উপস্থাপনার গভীরতা কমই পরিলক্ষিত হয়।

এ আয়াতের উত্তম ব্যাখ্যা করতে হলে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। ধরা যেতে পারে (***) (রাগ) একজন মানুষ। যে কথা বলে আবার চুপ করে থাকে। যে মূসা (আ)-কে উদ্বুদ্ধ করে ঠিকই কিন্তু নিজে নেপথ্যে থাকে। মনে হয় প্রকৃত সৌন্দর্য হয় ((***) (রা)কে মানবরূপে কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জামাখশারীর অবশ্য সে অনুভূতি ছিল কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করতে পারেননি। যা কিছু বলেছেন তা সমসাময়িককালের গণ্ডিতে আবদ্ধ।

জামাখশারী সূরা আল-ফাতিহার তাফসীর করেছেন এভাবে: ‘বান্দা যখন তার স্রষ্টা ও অভিভাবকের প্রশংসা করতে গিয়ে বলে (***) তখন বুঝা যায় সকল প্রশংসা একমাত্র তাঁর। অতপর ঐ সত্তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে বলে (******) অর্থাৎ সমস্ত বিশ্বজাহানের প্রতিপালক-মালিক। কোন বস্তুই তার মালিকানা ও প্রতিপালনের আওতার বাইরে নয়। তারপর বলে: (******) ছোট বড় এবং সমস্ত জাতি ও প্রজাতির ওপর অনুগ্রহ প্রদানকারী। এভাবে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের অনুপ্রেরণা অর্জন করে।

যখন বলে উঠে (আরবী**********)-তিনিই তো বিচার দিনের মালিক। এ পর্যন্ত পৌঁছে সে আবেগাপ্লুত হয়ে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে ঐ সত্তার পর সোপর্দ করে দেয় এবং একমাত্র তাঁই সাহায্য ও সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে বলে উঠে: (আরবী**********)- আমি শুধু তোমার ইবাদাত করি এবং কেবলমাত্র তোমার নিকট সাহায্য চাই।

সূরা ফাতিহা অধ্যয়নে যে অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়, তার মধ্যে শৈল্পিক বিন্যাসকে মূর্তমান করে তুলে ধরার এক উত্তম প্রচেষ্টা। কুরআনে কারীমের মধ্যে ছন্দ ও বিষয় বিন্যাসের ধারাবাহিকতা সৃষ্টিতে প্রথম দিকের সূরাগুলোর মধ্যে যে স্টাইল অবলম্বন করা হতো এ সূরাটি তার অন্যতম।

কুরআন শরীফের যে সমস্ত জায়গায় এ ধরনের ছন্দ ও বিন্যাস পাওয়া যায় তা বিশ্লেষণ করতে অনেক তাফসীরকারই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা আদৌ সফলতা লাভ করতে পারেননি। বরং কাজের কাজ এতোটুকু হয়েছে যে, যেখানে একই রকম বিন্যাস ও সাদৃশ্য পাওয়া গেছে তাকে চিহ্নিত করেছেন মাত্র। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা কোন নীতিমালা বর্ণনা করতে পারেননি। অবশ্য এতোটুকু করতেই তাদেরকে গলদঘর্ম হতে হয়েছে।

রইলো বালাগাত ও কুরআনের অলৌকিকত্ব নিয়ে বিতর্ককারী ওলামাগণ। আশা করা হয়েছিল হয়তো তারা এদিকে তাফসীরকারদের চেয়ে অগ্রসর হয়ে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাস ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদানের সামর্থ রাখেন কিন্তু তারা শুধু নিজেদেরকে অনর্থক তর্ক-বিতর্কেই নিয়োজিত রেখেছেন।

যেমন: বালাকাগত (অলংকারীর বিন্যাস) কি শব্দের মধ্যে না অর্থের মধ্যে পাওয়া যাবে, এ নিয়েবিতর্ক। তাদের মধ্যে কতিপয় আলিম এমনও ছিল অলংকার শাস্ত্রের মূল নিয়ম-নীতি যাদের নখদর্পণে ছিল। তার ওপর ভিত্তি করেই তারা কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্যকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো এর মাত্র ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

এবার আল-কুরআনের সামান্য একটি অংশের সৌন্দর্য সম্পর্কি বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য করুন। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী*************)

যদি তুমি দেখতে! অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে নতশির হয়ে দাঁড়ানো। (সূরা আস-সিজদাহ: ১২)

ইসলাম অস্বীকারকারীরা কিয়ামতের দিন অত্যন্ত লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় উঠবে, এ আয়াতটি তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ আয়াতটি তিলাওয়াত করা মাত্র চোখের সামনে ভেসে উঠে এমন এক অপরাদীর চিত্র, যে অত্যন্ত হীন ও নীচ অবস্থায় মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কার সামনে দাঁড়িযে? স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে। এতো শুধু কল্পনাই নয়, যেন বাস্তব ও চাক্ষুষ। এবার একটু চিন্তা করে দেখুন, এ ধরনের যতো আয়াত আছে সে সম্পর্কে বালাগাতের বক্তব্য শুধু একটি। তা হচ্ছে, ‘এ আয়াতে (***) (তুমি দেখবে) শব্দটি সম্বোধন পদ। সম্বোধন মূলত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক সময় অনির্দিষ্ট ব্যক্তিকেও সম্বোধন করা হয়ে থাকে। যেমন বলা যায়, অমুক ব্যক্তি খুব খারাপ। যদি তুমি তাকে সম্মান করো তবে সে তোমাকে অপদস্থ করবে। আর যদি তার সাথে ভালো ব্যবহার করো তবে সে তোমার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করবে।’

এ ধরনের কথোপকথনের জন্য কোন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করা যায় না। একথা বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে, যদি তুমি এরূপ করো তবে সেও এরূপ করবে। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে- তার সাথে এ ধরনের ব্যবহার করা হলে বিনিময়ে এরূপই পাওয়া যাবে। শব্দটি সম্বোধন পদে এজন্য ব্যবহার করা হবে সে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়। এ ধরনের উদাহারণ আল-কুরআনে ভুরি ভুরি আছে। এ আয়াতেও [(আরবী**********)] সাধারণত্ব প্রকাশ করার জন্যই সম্বোধন আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। স্পষ্টই বুঝা যায়, অপরাধীদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হবে। এতো সুস্পষ্ট কথা যেখানে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এ জন্য সেই ভীতিকর অবস্থা দর্শনের সাথে কাউকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। বরং যার মধ্যে দর্শনের উপযোগিতা পাওয়া যাবে সেই সম্বোধনের মধ্যে শামিল।

নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে বিষয়বস্তু যে জীবন্ত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অলংকার শাস্ত্রের (বালাগাতের) সুপণ্ডিতগণ তাকে জটিল করে রেখেছেন। যেরূপ তারা উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। পরিশেষে বালাগাত বিশেষজ্ঞগণ একথা বলে বক্তব্য শেষ করে দেন যে এ আয়াতে অপরাদীদের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। যা সর্বোচ্চ প্রকাশভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া কুরআন মজীদের অন্যান্য আয়াতের ব্যাখ্যার ব্যাপারেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রাখা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ- যে সমস্ত আয়াতে কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের চিত্র অংকন করা হয়েছে সে সমস্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমান ও জমিনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন সে ব্যতীত। অতপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। তক্ষণি তারা দাঁড়িযে দেখতে থাকবে।

(আরবী***********)

যেদিন আমি পর্বতসমূহকে চলমান করবো সেদিন তুমি পৃথিবীকে দেখবে এক উন্মুক্ত প্রান্তর। তারপর আমি সকলকে একত্রিত করবো। (আগের কিংবা পরের) কেউ বাদ পড়বে না। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ৪৭)

(আরবী**************)

জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবে, আমাদেরকে তা থেকে কিছু খাদ্য বা পানীয় দাও, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দিয়েছেন। জান্নাতীগণ বলবে:

আল্লাহ এ উভয় বস্তু কাফিরদের জ ন্য হারাম করে দিয়েছেন। (সূরা আল-আরাফ: ৫)

ওপরের আয়াত ক’টিতে পরিপূর্ণ কিছু ছবি ভেসে উঠেছে। যে ছবিগুলো অত্যন্ত পেরেশানীর ও মর্মান্তিক। চোখ তা দেখে, কান তা শোনে এবং মনের গভীরে তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু আশর্চর্যের বিষয় হচ্ছে- বালাগাতের পণ্ডিতগণ শুধু এ কথাই বলবে যে, ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য বিষয়সমূহকে অতীতকালের শব্দ দিয়ে বুঝানা হয়েছে। যেন বুঝা যায়, এতো ঘটেই আছে।

বালাগাত ও কুরআনের অলৌকিকত্বের প্রবক্তা ওলামাদের মধ্যে একজন আল্লামা জামাখশারীর পূর্বসূরী ছিল। যিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতা প্রদর্শন করেছেন এ সমস্ত ব্যাপারে। তাকে এ ব্যাপারে মুহাককিক বলা যেতে পারে। তিনি হচ্ছেন আবদুল কাহের জুরযানী। অবশ্য এতে কোন সন্দেহ নেই, তাঁর রচিত ‘দালাইলুল ইজায’ এ বিষয়ের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। কিন্তু দুঃখজনক কথা হলো, গোটা পুস্তকটিই আল-কুরআনের শব্দ ও অর্থ সংক্রান্ত বক্তব্যে পরিপূর্ণ। যা থেকে সাধারণের শিক্ষা গ্রহণ করা অত্যন্ত কষ্টকর। তবু বলা যায়, সেটি ঐ সমস্ত ওলামাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম, যারা এ ব্যাপারে লিখনী চালিয়েছেন। এমনকি বর্তমান সময়েও এ বিষয়ে কেউ তার সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।

আবদুল কাহির জুরযানী আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে তিনি যতোটুকু অগ্রসর হয়েছেন আমরা তার উদাহরণ তুলে ধরেছি, যদিও তা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য পাঠকের অত্যন্ত ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। কারণ সাহিত্যে যখন মানতিক (Logic) ও কালাম শাস্ত্র নয়ে আলোচনা হতো তখন তার ব্যাখ্যা ও বর্ণনার এ পদ্ধতিই অনুসরণ করা হতো। আবদুল কাহির জুরযানী লিখেছেন:

“উদ্ধৃতাংশের সুন্দর ও অসুন্দরের বর্ণনা তখনই সম্ভব যখন কোন ব্যক্তি বাক্যের বিন্যাস ও ছন্দ সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা রাখে। আপনারা জানেন, যখন লোক এ আয়াত : (আরবী**********)- মাথায় বার্ধক্যের ছাপ লেগেছে (সূরা মারইয়াম: ৪) তিলাওযাত করে, তখন ঐ অংশের রূপ সৌন্দর্য নির্ভর করে শুধুমাত্র উদ্ধৃতির ওপর। এছাড়া আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। প্রকৃত অবস্থা তা নয়। এ আয়াত শোনামাত্র শ্রবণকারীর ভেতর যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা শুধুমাত্র উদ্ধৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর আসল কারণ হচ্ছে, কোন বাক্যে যদি বিশেষ্যকে কর্তা বানানো হয় তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তাকে পেশ দিতে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটি কর্তা (***) নয়। যদি ঐ বিশেষ্যের পর সম্পর্কযুক্ত আরেকটি বিশেষ্য (****) নেয়া হয় তখন তাই হবে ঐ ক্রিয়ার (***) আসল কর্তা (****)। অর্থাৎ ক্রিয়াকে দ্বিতীয় বিশেষ্যের কারণে প্রথম বিশেষ্যের দিকে সম্পর্ক স্থাপন করা হয় বিধায় দুটো বিশেষ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন:

(আরবী*************)

এ রকম আরো অনেক বাক্য আছে যার ক্রিয়াকে প্রকৃত কর্তার সাথে সম্পর্কেত না করে তার কারণের দিকে সম্পর্কিত করা হয়। কেননা আমরা একথা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত যে, (****) ক্রিয়ার আসল কর্তা হচ্ছে (****) যদিও বাহ্যিকভাবে (****) কে কর্তা মনে হয়। তদ্রুপ অন্য উদাহরণ (****) এর প্রকৃত কর্তা (***) এবং (***) ক্রিয়ার প্রকৃত কর্তা (***) আর (****) এর প্রকৃত কর্তা (****)। এ সমস্ত বাক্যে ক্রিয়াকে এমন বিশেষ্যের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে যা প্রকৃতপক্ষে ঐ ক্রিয়ার কর্তা নয়। উদ্ধৃতাংশের উদাহরণগুলোতে যে সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটেছে তা ক্রিয়াকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে কর্তা নয় এমন বিশেষ্রের সাথে সম্পর্কিত করার কারণেই সম্ভব হয়েছে। যদি এরূপ না করে প্রকৃত কর্তার সাথে সম্পর্কিত করে বলা হতো: (আরবী**********) তাহলে প্রকৃত সৌন্দর্য বিলোপ হয়ে যেত। যদি প্রশ্ন করা হয়, সৌন্দর্য বিলোপের কারণ কি? তার উত্তর হচ্ছে (আরবী**********) বাক্যের মধ্যে যে সাধারণ সৌন্দর্য বিদ্যমান তা (****) বাক্যে নিহিত নেই। প্রথম বাক্যের তাৎপর্য হচ্ছে পুরো মাথাই সাদা হয়ে গেছে, কোন অংশই সাদা থেকে বাকী নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে এ অর্থ বুঝা যায় না, তা থেকে বুঝা যায় তার মাথার কিছু অংশ সাদা হয়ে গেছে, পুরো মাথা নয়। তেমনিভাবে যদি বলা হয়: (আরবী**********) তবে বুঝা যায় পুরো ঘরই আগুনে জ্বলেছে। ঘরের কোন অংশ জ্বলে গেছে। পুরো ঘরে আগুন লাগা এবং পুরো ঘর পুড়ে ছারখার হওয়ার কথা এ বাক্যে বুঝা যায় না। কুরআনে কারীমের আরেকটি দৃষ্টা্ত হচ্ছে এ আয়াতে কারীমাটি

(আরবী**********)

আমরা জমিন বিদীর্ণ করে ঝর্ণা প্রবাহিত করেছি।

এ আয়াতে (****) প্রকৃতপক্ষে (***) শব্দের কর্মকারক (****) কিন্তু দৃশ্যত (***) শব্দকে কর্মকারক (***) বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনিভাবে পূর্বোক্ত আয়াতে (***) কে (***) এর কর্তা হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এর ধরনের পরিবর্তনের কারণে সাধারণভাবে ব্যাপকতা সৃষ্টি করা হয়, তদ্রুপ এ বাক্যেও অনুরূপ ব্যাপকতা তুলে ধরা হয়েছে। বুঝা যাচ্ছে গোটা জমিন বিদীর্ণ করে সকল স্থানে ঝর্ণা সৃষ্টি করা হয়েছে। বাক্যটিকে এভাবে বলা যায় (***) অথবা এভাবেও বলা যায় (আরবী**********) তবে এতে উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয় না। আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে- জমিনের বিভিন্ন জায়গায় ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে একথা বুঝানো। (দালাইলুল ই’জায, জুরযানী)

আল্লাহ তা’আলা আবদুল কাহের জুরযানীর ওপর রহম করুন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরেছিল। কিন্তু সবকিছুকে ভাষায় রূপ দিতে পারেননি। (আরবী**********) এবং (আরবী**********) বাক্যদ্বয়ের মধ্যে যে শৈল্পিক সৌন্দর্য নিহিত তা কালামের শাস্ত্রের দৃষ্টিতে তাই, যা তিনি লিখেছেন। কিন্তু তা ছাড়াও শৈল্পিক সৌন্দর্যের আরেকটি দিক আছে। তা হচ্ছে চিন্তার জগতকে দ্রুত আলোড়িত করা, যাকে (***) শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়েছে। দৃশ্যত সাদা চুলের সম্পর্ক মাথার সাথে করা হয়েছে। যা পুরো মাথায় বিস্তৃতি লাভ করবে। তদ্রুপ (***) বা বিদীর্ণ করার ক্ষেত্রে দ্রুততা পাওয়া যায়। যা মানুষের চিন্তা-চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং প্রভাবিত করে ফেলে।

এতো দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, চিন্তার জগতের আলোড়ন সৃষ্টির জন্র (আরবী**********) বাক্যটি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ এবং শক্তিশালী। এজন্য যে, সাদা চুলের সম্পর্ক যৌবনের সাথে করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যৌবন তার মধ্যে পওয়া যায় না। সৌন্দর্যের মূল উৎস এখানেই নিহিত। যেমন এর প্রমাণ (***) বাক্যটি। এর মধ্যে যে সৌন্দর্য নিহিত আছে তা কুরআনের পূরোবাক্ত আয়াতটির মতোই। সত্যি কথা বলতে কি, উক্ত আয়াতে দু’ ধরনের সৌন্দর্য পরিলক্ষিত হয়।

প্রথমত, যৌবনকে পাকা চুলের সাথে সম্পর্কিত করলে পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, পাকা চুলকে মাথার সাথে সংশ্লিষ্ট করলে পাওয়া যায়।

এ দু’ধরনের সৌন্দর্য একটি আরেকটির পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে কখনো আয়াতের সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা যাবে না।

আবদুল কাহের জুরযানী (র) এখানে এসেই থেমে গেছেন। আগে বাড়তে পারেননি। দৃশ্যত মনে হয় তার লক্ষ্য এতোটুকুই ছিল। কারণ তার বর্ণনায় এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়া যায় না। প্রত্যেক যুগেই ভাষা ও সাহিত্যের একটি স্টাইল থাকে। আমরা আশা করতে পারি না তিনি তার যুগের সেই স্টাইলকে অতিক্রম করে যাবেন।

সত্যি কথা বলতে কি, এ পর্যন্ত কুরআনের তাফসীর ও অলৌকিকত্ব সম্পর্কে ওলামাগণ যে সমস্ত খেদমত আঞ্জাম দিযেছেন তা নির্দিষ্ট এক সীমায় এসে থেকে গেছে। আগে বাড়তে পারেনি। প্রাচীন আরবী ভাষাও সাহিত্যে পর্যালোচনা ও যাচাইয়ের কিছু দিক ছিল। যে কোন রচনা সেই আলোকে যাচাই করা হতো। তার আগে থেকে আগে বেড়ে এমন হয়নি যে, সার্বিক কাজের পর্যালোচনা করে তার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করা হবে। কুরআনী বালাগাতের ব্যাপারটিও ছিল তেমন। আজ পর্যালোচনার বিষয় না বানিয়ে সার্বিকভাবেআলোচনার বিষয় বানাবেন। তাই বালাগাতপন্থী ওলামাগণ করার মধ্যে এই করেছেন যে, তারা কুরআনের সমস্ত শব্দ, ছন্দ ও বিন্যাসের পদ্ধতিকে বালাগাতের বিষয়বস্তু বানিয়ে নিয়েছেন। তারপর এ কথা প্রমাণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন যে, গোটা কুরআনই বালাগাত ও ফাসাহাতে পরিপূর্ণ।

আল-কুরআনের বালাগত নিয়ে যে সমস্ত ওলামায়ে কিরাম আলোচনায় লিপ্ত হতেন তারা ‍কুরআনের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহের ধারে কাছেও পৌঁছুতে পারেননি। অবশ্য যদিও বিচ্ছিন্নভাবে কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য নির্ণয়ের চেষ্টা তারা করেছেন। কিন্তু তা কোন কাজেই আসেনি। যে সম্পর্কে আমি ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, বালাগাতপন্থী সেসব ওলামাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের এবং অপূর্ণাঙ্গ ছিল।

এ বিষয়ে সর্বশেষ কথা হচ্ছে- কোন বক্তব্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাওয়া পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- বালাগাতের আলিমগণ আরবী সাহিত্য কিংবা কুরআনে কারীমের সেই সীমা তারা স্পর্শ করতে পারেননি। কারণ কুরআনে করীমের গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত ও বর্ণনা করার বিষয়টি আজও রহস্যাবৃত হয়েই আছে। এ অলৌকিক গ্রন্থটির দরস ও অধ্যয়নের জন্য এক নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করা এবং তার শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্য সাধারণ মূলনীতির ভিত্তিতে আলোচনা করাকে অপরিহার্য মনে করা হয়েছে এবং অলৌকিক বিষয়সমূহের এমন ধরনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে যা কুরআনে করীমের একক সেই বিষয়সমূহ থেকেই নেয়া।

একটি কথা স্মর্তব্য, এ মহাগ্রন্থ যে বৈশিষ্ট্যের ধারক তা কোন নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গোটা গ্রন্থেই তা সমভাবে বিস্তৃত। সমস্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ধারা বর্ণনা পর্যন্ত এক ও অভিন্ন। যদিও উদ্দেশ্য হচ্ছে- সুসংবাদ দেয়া, আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে ভয় দেখানো, অতীতে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার বর্ণা, ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য কোন বিষয়ের বর্ণনা কাউকে আশ্বস্ত করার অভয় বাণী, ঈমান গ্রহণের আহ্বান, দুনিয়াতে জীবন যাপন সম্পর্কে পথ নির্দেশ দান, কিংবা কোন বিষয়কে বোধগম্য করার জন্য তার চিত্রায়ণ, কিংবা কোন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর বর্ণনা অথবা মনোজগতের মূর্তমান দৃষ্টান্ত, কিংবা অতীন্দ্রিয় কোন বস্তুর বর্ণনা, যাই হোক কেন, বর্ণনা ও বাচনভঙ্গির মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই।

কুরআন মজীদের সমস্ত বর্ণনার মধ্যেই একটি সূত্র বিদ্যমান। যা প্রমাণের জন্যই আমরা এ পুস্তকটি লিখেছি। এ সূত্রটিকে আমি ‘শৈল্পিক চিত্র’ নামে অভিহিত করেছি।

তৃতীয় অধ্যায়

শৈল্পিক চিত্র

চিত্র কুরআন মজীদের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। আল-কুরআনের উদ্দেশ্যকে হৃদয়পটে অংকিত করার এটি একটি উপকরণ। চিত্রের দ্বারা অব্যক্ত ও দুর্বোধ্য বিষয়ের কল্পিত ছবি মনের মুকুরে প্রতিবিম্বিত করা হয়। বিজ্ঞচিত ভাবে চিত্রিত এ চিত্রগুলো জীবন ও কর্মের ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ কল্পিব বিষয় তখন স্বরূপে মূর্তমান হয়ে চোখের সামনে উপস্থিত হয়। মৃত মানুষ জীবিত মানুষে রূপান্তর হয়ে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়।

ছবিতে বর্ণনা, সাক্ষ্য ও ঘটনাবলী দৃশ্যাকারে চোখের সামনে ভেসে উঠে এবং তাতে জীবন ও কর্ম চাঞ্চক্যতা সৃষ্টি হয়। যদি তার মধ্যে সংলাপ ও ভাষা সংযোজন করা যায়, তাহলে তা জীবন্ত অভিনেতা হিসেবে প্রকাশ পায়। এসব কিছুই সেই স্ক্রীন বা পর্দার ওপর প্রতিফলিত হয় যা স্টেইজের ওপর থাকে। শ্রোতা কিংবা পাঠক এতো তন্ময় হয়ে যায় যে, সে ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলে যায়, এতো আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করা হচ্ছে, যেখানে এ ধরনের উদাহরণ দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করার জন্য। বরং সে তখন দিব্য দৃষ্টিতে সমস্ত ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করে। একের পর এক দৃশ্যাবলী পরিবর্তন হতে থাকে। তার মনে হতে থাকে এতো শুধু ছবি নয় এবং এ যেন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

যখন মস্তিষ্কের গোপনীয় কথা, মনোজাগতিক অবস্থা, মানুষের গতি-প্রকৃতির চিত্রায়ণ করা হয় তা শুধুমাত্র প্রাণহীন কিছু বাক্যের মাধ্যমেই প্রকাশ করা হয়। তার মধ্যে কোন রঙ্গের প্রলেপ থাকে না, কিংবা তার মুখ থেকে কোন শব্দ বা বাক্যও নির্গত হয় না। তবু আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না, আল-কুরআনের অলৌকিকতার ও চমক। এমনি ধরনের বিভিন্ন বিষয়ের সার্থক চিত্রায়ণ ও উপমা উৎক্ষেপনে আল-কুরআন পরিপূর্ণ। যে উদ্দেশ্যের কথা আমরা কেটু আগে বলেছি যেখানে সেই রকম কোন উদ্দেশ্যের কথা আমরা একটু আগে বলেছি যেখানে সেই রকম কোন উদ্দেশ্য পাওয়া যাবে সেখানে কুর্ন ও ঢংয়েই তার বর্ণনা পেশ করেছে। -যেমন পুরোনো বিষয় কিংবা মানবিক দৃষ্টান্ত অথবা সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের পুনরালোচনা বা কিয়ামতের দৃশ্য চিত্রায়ণ কিংবা জান্নাতের শান্তি ও জাহান্নামের শাস্তির চাক্ষুষ বিবরণ অথবা বিতর্কের বর্ণনা ইত্যাদি। শুধুমাত্র কুরআনের বাচনভঙ্গিকে আকর্ষণীয় করার জন্য এ কাজ করা হয়নি। এটি কুরআনের নির্দিষ্ট ও বিশেষ এক পদ্ধতি। যাকে আমরা চিত্রায়ণের পদ্ধতি বলে অভিহিত করতে পারি।

আমরা ছবির তাৎপর্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করার চেষ্টা করবো, যাতে বুঝা যায়, আল-কুরআনে শৈল্পিক চিত্রের সীমা-পরিসীমা কী। ছবি তো রঙকুলির সাহায্যে আঁকা যায়, আবার চিন্তা ও ধ্যানের সাহায্যেও আঁকা যায়। আবার সঙ্গীতের রাগিনীর মাধ্যমেও কোন চিত্রের সার্থক পরিস্ফুটন ঘটানো যায়। কখনো এমনও হয় যে, চিত্রের উপকরণ হিসেবে বাক্য, শব্দ, পাঠের ঢং ও আনুসঙ্গিক বিষয়সমূহও ব্যবহৃত হয়। যখন এ ধরনের চিত্র আমাদের ামনে আসে তখন চোখ-কান, চিন্তা-চেতনা, মন-মস্তিষ্ক সবকিছু মিলেই তা উপভোগ করা হয়।

একটি কথা মনে রাখা আবশ্যক, কুরআনী ছবিগুলো স্কেচ ও রঙ্গের সাহায্যে অংকিত হয়নি বরং তা হয়েছে মানুষের জীবন ও জগতের সাহায্যে। এগুলো এমন ছবি যা চেতনা ও অনুভূতি থেকে নিঃসৃত হয়। অর্থগুলো ছবির রঙ হয়ে মানুষের মানসপটে প্রতিবিম্বিত হয়।

এখন আমরা এর কিছু উদাহরণ পেশ করবো।

ভাববে বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ

১. একথা বুঝানো উদ্দেশ্য ছিল, কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে কাফিরদের কোন অভিযোগ কিংবা অনুরোধ গৃহিত হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও জান্নাতে প্রবেশ করাটা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। একথা বুঝানোর জন্র কত সুন্দর এক চিত্র অংকন করা হয়েছে।

(আরবী**************)

যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং এবং এগুলো থেকে অহংকার করেছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা ততোক্ষণ জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না যতোক্ষণ না সূচের ছিত্র দিয়ে উট প্রবেশ করতে পারবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪০)

এ আয়াত পড়া কিংবা শোনামাত্র পাঠকের সামনে দুটো ছবি ভেসে উঠে। একটি আসমানের দরজা খোলার ছবি এবং অপরটি সুইয়ের ছিদ্রপথে প্রবেশ করার জন্য হৃষ্টপুষ্ট এক উটের প্রচেষ্টারত ছবিৎ। অবোধগম্য এক জটিল বিষয়কে বোধগম্য করার জন্য পরিচিত এক চিত্রে পেশ করা হয়েছে। মানুষের মনে এটি শুধু ভাবের সৃষ্টি করে না বরং বাস্তব ও প্রত্যক্ষ ছবিরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠে।

২. আল্লাহ তা’আলা বুঝাতে চান, কিয়ামতের দিন কাফিরদের ভালো কাজসমূহকে এমনভাবে নষ্ট করে দেবেন, মনে হবে তার কোন অস্তিত্বই কখনো ছিল না। নিচের বাক্যে একথাটির সুন্দর এক চিত্র অংকিত হয়েছে:”

(আরবী***********)

আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করবো, তারপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। (সূরা আল-ফুরকান: ২৩)

এ আয়াত পড়ে পাঠক যখন বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার কথা চিন্তা করে তখন তাদের এ আমলের অসারতার চিত্র তার মানসপটে ভেসে উঠে।

৩. নিচের আয়াতটিতেও এ রকম আরেকটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী**************)

যারা তাদের পালনকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, তাদের আমলের উদাহরণ হচ্ছে- সেই ছাই ভস্মের মতো যার ওপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের হস্তগত হবে না। (সূরা ইবরাহীম : ১৮)

ধূলিঝড়ের দিনের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এমন একটি করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি মানুষই কল্পনার চোখে দেখতে থাকে, প্রবল ঝটিকা সব কিছুকে তছনছ করে দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে উড়িয়ে নিয়ে গেল, যা আর শত চেষ্টাতেও একত্রিত করা সম্ভব হলো না। তেমনিভাবেই কাফিরদের আমল নিষ্ফল ও বরবাদ হয়ে যাবে।

৪. আল্লাহ তা’আলা বলতে চান, যদি কোন ব্যক্তি কাউকে কিছু দান করলো কিছু পরে তাকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে হেয় করার চেষ্টা করলো, তাহলে তার এ দান বিফলে গেল। এরই এক চাক্ষুষ জুবন্ত ছবি এ আয়াতটিতে তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী************)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাতকে বরবাদ করে দিয়ো না সেই ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো যার ওপর কিছু মাটি পড়েছিল, কিন্তু এক প্রবল বৃষ্টি তা ধুলে পরিষ্কার করে দিলো। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পাবে না যা তারা উপার্জন করেছে। (সূরা আল-বাকারা: ২৬৪)

এ আয়অতে এক দ্বিমুখী চিত্র অংকন করা হয়েছে। প্রথম চিত্রটি হচ্ছে একটি নগ্ন পাথর যার ওপর মাটির হাল্কা প্রলেব পড়েছে মাত্র কিন্তু এক প্রবল বৃষ্টি তা ধুয়ে পরিষআর করে দিলো। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পাবে না যা তারা উপার্জন করেছে। (সূরা আল-বাকারা: ২৬৪)

এ আয়াতে এক দ্বিমুখী চিত্র অংকন করা হয়েছে। প্রথম চিত্রটি হচ্ছে একটি নগ্ন পাথর যার ওপর মাটির হাল্কা প্রলেব পড়েছে মাত্র কিন্তু বৃষ্টি এলে তা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়, ফলে পাথর পাথরের চেহারা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। এ উদাহরণ হচ্ছে যারা দান করে বলে বেড়ায় তাদের জন্য। পরে বলা হয়েছে যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে- বাগানের মতো। যেখানে কম হোক কিংবা বেশি কোন বৃষ্টিই বৃথা যায় না। তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে। এমনকি যদি কোন বৃষ্টি নাও হয় তবু তা ফল উৎপন্ন করবে।

আমি এখানে একথা বলতে চাই না যে, উপরোক্ত ছবি দুটোতে স্থান ও কালের সামঞ্জস্য কতটুকু। সেগুলোর সাদৃশ্য বিধানে কি ধরনের সৌন্দর্যের পোশাক পরানো হয়েছে। তাছাড়া একথা বলাও আমার উদ্দেশ্য নয় যে, পাথরের ওপর হাল্কা মাটির আস্তরণ বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝান হয়েছে, যে দান-খয়রাত করে আবার দান গ্রহিতাকে কষ্ট দেয় অর্থাৎ সেই দান সাময়িকভাবে তাদের কুৎসিত চেহারাকে ঢেকে রাখে কিন্তু অল্প পরেই তাদের সে চেহারা নগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়ে।

আমি বলতে চাই ছবির উপকরণ সম্পর্কে। অবশ্য এ পুস্তকে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য স্বতন্ত্র একটি অধ্যায়ই রাখা হয়েছে।

৫. এ বিষয়ের আরেকটি চিত্র হচ্ছে:

(আরবী***********)

তারা এ দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করে তার উপমা ঝড়ো হাওয়ার মতো, যাতে রয়েছে তুষারে শৈত্য, যা সেই শস্য ক্ষেতে গিয়ে লেগেছে যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। অতপর সেগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। (সূরা আলে-ইমরান: ১১৭)

এ আয়াতে এমন এক ক্ষেতের দৃশ্য অংকিত হয়েছে, যে ক্ষেতের ওপর দিয়ে তুষার ঝড় প্রবাহিত হয়েছে, ফলে তার সমস্ত ফল-ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্ষেতের মালিকের সমস্ত শ্রম ও মেহনত ব্যর্থ হয়েছে। এতো পরিশ্রমের পরও শস্য ঘরে তুলতে পারলো না। হুবহু এ ধরনর কাজই হচ্ছে, যারা কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে আল্লাহর পথে দান করে বিনিময় পাবার আশা রাখে, কিন্তু কুফরী তাদের সে নেক আমলকে ভূমিসাৎ করে দেয়।

এ ‍দৃশ্যে (**) সির্‌রুন) শব্দটি কতো পরিকল্পিতভাবে চয়ন করা হয়েছে এবং এ শব্দটি দিয়ে দৃশ্যটিকে সৌন্দর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মনে হয় ঠাণ্ডার ছোট ছোট গোলা দিয়ে শস্য ক্ষেতকে ধ্বংস করা হচ্ছে। শব্দটি গোটা চিত্রকে প্রাণবন্ত করে দিয়েছে। এ ধরনের শব্দ চয়ন সম্পর্কে আলোচনার জন্য আমরা স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রেখেছি।

৬. আল্লাহ তা’আলার বুঝাতে চান যদি কেউ তাঁকে ডাকে তবে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন এবং তার মনোবাসনা পুরো করে দেন। তাঁকে ছাড়া যদি আর কাউকে ডাকা হয় তবে সে তার ডাক শুনতেও পায় না এবং তার কোন মনোবাসনা পূর্ণও করতে পারে না। কারণ সে তো আর সবকিছুর মালিক নয়। এ বিষয়ে নিচের আয়াতে কতো সুন্দর এক চিত্র অংকন করা হয়েছে।

(আরবী**************)

সত্যের আহ্বানে একমাত্র তাঁরই এবং তাঁকে ছাড়া যাদেরকে ডাকে, তারা তাদের কোন কাজে আসে না। ওদের দৃষ্টান্ত এমন কেউ দু’হাত পানির দিকে প্রসারিত করলো, যেন পানি তার মুখে পৌঁছে যায়, অথচ পানি কখনোই তার মুখে পৌঁছুবে না। কাফিরদের যতো আহ্বান তা সবই বিফল। (সূরা আর-রা’দ: ১৪)

এটি অত্যন্ত চিত্রাকর্ষক এক ছবি। যা মানুষকে সে দিকে আকর্ষণ করে। কথার দ্বারা এর চেয়ে আকর্ষণীয় কোন চিত্র অংকন করা সম্ভব নয়। দেখুন ছবিটি কতো স্বচ্ছ- এক ব্যক্তি পানির পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে পানিকে আহ্বান করছে তার মুখে প্রবেশ করার জন্য, কিন্তু সে পানি কখনো তার মুখে প্রবেশ করবে না?

৭. উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহকে ছাড়া অন্য যাদের পূজা-অর্চনা করা হয়, সেগুলো না কিছু শুনতে পায়, না কিছু দেখতে পায়, জ্ঞান-বুদ্ধি ও শক্তি থেকে মাহরূম। কাজেই যারা তাদের বন্দেগী করে সে বন্দেগী বিফল হতে বাধ্য। এটি প্রকাশের জন্য যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে তা এমন মর্মস্পর্শী যে, অন্য কোন উপায়ে তা আঁকা সম্ভব নয়।

(আরবী*************)

কাফিরদের উপমা এরূপ, কোন ব্যক্তি এমন কিছু (পশু)-কে আহ্বান করে যারা শুধুমাত্র চীৎকার ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না। তারা বোবা, বধির ও অন্ধ, কিছুই বুঝে না। (সূরা আল-বাকারা: ১৭১)

কাফিররা যেসব মাবুদদেরকে আহ্বান করে তারা আহ্বানে সাড়া দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। তারা না পারে আহ্বানের মূল্যায়ণ করতে আর না পারে তাদের আহ্বানে উদ্দে অনুধাবন করতে। এটি একটি উপমা। এ আয়াতে এমন এক সম্প্রদায়ের চিত্র অংকিত হয়েছে যারা তাদের মাবুদদেরকে আহ্বান করে ঠিকই কিন্তু এর তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাটির পুতুল তো কিছুই বুঝে না। তারা এতো উদাসীন যে, তাদের আহ্বান যথাযথ জায়গায় পৌছুল কিনা কিংবা সে আহ্বানে কোন সাড়া মিললো কিনা এ সম্পর্কে কোন খবরই তারা রাখে না।

৮. এখানে বুঝানো উদ্দেশ্য, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকা হয় এবং যাদের উপাসনা করা হয়, তারা অত্যন্ত দুর্বল। কাজেই যারা নিজেরাই এতো দুর্বল তারা কি করে অপরকে রক্ষা করতে পারে? তারই সুন্দর চিত্র অংকিত হয়েছে এ আয়াতটিতে:

(আরবী*****************)

যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অপরকে অভিভাবক বানায় তাদের উদাহরণ মাকড়সার মতো। সে ঘর বানায়। আর সব ঘরের মধ্যে একমাত্র মাকড়সার ঘরই অত্যন্ত দুর্বল। (সূরা আল-আনকাবুত: ৪১)

আয়াতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে প্রতিপালক মনে করে, তারা তো মাকড়সার ঘরের মতো এক দুর্বল ঘরে আশ্রয় নেয়। যা সামান্য আঘাতেই নষ্ট হয়ে যায়। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, এতা স্থুল দৃষ্টান্তের পরও তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না, তারা মুর্খতা ও অহংকারেই নিমজ্জিত।

৯. এখানে যে কথাটি বুঝানো উদ্দেশ্য তা হচ্ছ- মুশরিকরা এমন এক কাজে জড়িয়ে গেছে তা অসার, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই। এমন একটি বস্তুর সাথে তার তুলনা করা হয়েছে যা ভাসমান কিন্তু তা ভেসে থাকাটাও কষ্টকর।

(আরবী************)

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করলো, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে ছিল। অতপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। (সূরা আল-হাজ্জ: ৩১)

এ আয়াতে মুশরিকদের করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নিজেদের অজান্তেই যেন তারা মুহূর্তের মধ্যে আসমান থেকে ছিটকে পড়ে কিন্তু মাটি স্পর্শ করার পূর্বেই মাংসাসী কোন পাখী তাকে থাবা মেরে নিয়ে যায় অথবা বাতাস তাকে এমন জায়গায় নিরুদ্দেশ্য করে নিয়ে যায় যেখান থেকে আর প্রত্যাবর্তন করা কখনো সম্ভবপর নয়।

১০. ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আহলে কিতাবদের আল্লাহ আসমানী কিতাব দিয়েছিল। তারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনার ঘোষণা এবং শপথও করেছিল। কিন্তু সামান্য পার্থিব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি তারা। ফলে তাদের প্রতিশ্রুতিকে নিজেরা নষ্ট করে ফেলেছিল। তাই কিয়ামতের দিন তারা কতোটা দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে বার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এ আয়াতে কারীমের মাধ্যমে।

(আরবী************)

যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রি করে দেয়, আখিরাতে তাদের কোন অংশ নেই। তাদের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কোন কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টি দেবেন না, এমনকি তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (সূরা আলে-ইমরান: ৭৭)

এখানে আহলে কিতাবদের বদ নসীবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বঞ্চিত বস্তুর উল্লেখ না করে এমন কিছু আলামতের কথা বলা হয়েছে, মেযন স্বতঃই বুঝা যায় যে, বঞ্চিত বস্তুটি কী। যেমন বলা হয়েছে, আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না বা তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। একথাগুলো বলে আল্লাহ বুঝাতে চেয়েছেন যে, তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং চিরসুখে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করা হবে।

মনোজাগতিক চিত্র

১. যে ব্যক্তি তওহীদের ওপর শিরকের জীবনকে বেছে নেয় সে কতটুকু পেরেশানীতে নিমজ্জিত হয় তা বুঝানোর জন্য নিচের আয়াতটি পেশ করা হয়েছে। অনেক ইলাহর মধ্যে কিভাবে তার মনকে ভাগ-বাটোয়অরা করে নেয় এবং তার মনোজাগতিক অবস্থা কেমন হয়, কিভাবে হেদায়েত ও ভ্রষ্টতার মধ্যে তার মন দোদুল্যমান থাকে তার বাস্তব চিত্র এ আয়াতটি:

(আরবী************)

তুমি বলে দাও, আমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুকে আহ্বান করবো, যে আমাদের কোন উপকার কিংবা ক্ষতি কিছুই করতে পারে না। আমরা কি পেছনের দিকে ফিরে যাব আল্লাহর হেদায়েতের পর, ঐ ব্যক্তির মতো যাকে শয়তান বনভূমিতে বিপথগামী করে দিয়েছে, ফলে সে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে? আর তার সহচররা তাকে পথের দিকে ডেকে বলছে। এসো আমাদের কাছে। (সূরা আল-আনআ’ম: ৭১)

এ আয়াতে ঐ ব্যক্তির ছবি আঁকা হয়েছে, যাকে শয়তান বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। তার সাথীরা তাকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করছে কিন্তু সে ভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারভে না, সাথী এবং শয়তান এ দু’দিকের কোন্‌ দিকে সে সাড়া দেবে, পা বাড়াবে।

২. আল্লাহ তা’আলা ঐ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করতে চাচ্ছেন যাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় পথ-নির্দেশ দেয়ার পর সে বহুদূরে পালিয়ে যাবার জন্য বিরামহীন প্রচেষ্টায় লিপ্ত। এ যেন পতনের স্রোতে ভাসিয়ে দেবারই প্রচেষ্টা। এদিকে মানবিক চাহিদা ও লোভ-লালসা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। জ্ঞান এবং মূর্খতা উভয়ই তার জন্য লাঞ্ছনার কারণ। সে মূর্খতার কারণেও শান্তি পাচ্ছে না, আবার জ্ঞানও তাকে কোন কল্যাণ দিকে পারছে না। এ ছবিটি নিচের ক’টি বাক্যে কতো সুন্দরভাবেই না ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

(আরবী************)

তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দাও, সেই লোকের অবস্থা, যাকে আমি আমার নিদর্শন (হেদায়েত) দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। তার পেছনে শয়তান লেগেছে, ফলে সে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে। অবশ্য আমি ইচ্ছে করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে পারতাম সেসব নির্শনের বদৌলতে। কিন্তু সে অধপতিত ও রিপুর বশীভূত হয়ে রিইলো। তার উপমা হচ্ছে সেই কুকুরের মতো, যদি তাকে তাড়া করো তবু হাঁপাবে আর যদি ছোড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। (সূরা আল-আরাফ: ১৭৫-১৭৬)

এ ছবিটি হচ্ছে লাঞ্ছনা ও জিল্লাতীর বাস্তব রূপায়ণ। এটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এক চিত্র। চির ভাস্বর। এটি এমন এক ছবি যা নিজেই প্রকাশ করে দেয় তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এখানে দ্বীনি গুরুত্বের সাথে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব মিলে একাকার হয়ে গেছে। কুরআন আঁকা সবগুলো ছবির মধ্যেই এরূপ মিল পাওয়া যায়।

৩. এবার আল্লাহ তা’আলা বুঝাতে চাচ্ছেন, এমন এক ব্যক্তির কথা যার বিশ্সাব ঠুনকো, হৃদযের গভীরে যা প্রোথিত নয়। দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব। ঈমানের অধিকারী হওয়ার পরও সে ঈমানের পথে জুলুম-নির্যাতন বরদাশত করতে রাজী নয়। নির্ঝঞ্ঝাটে থেকে ঈমান বহাল রাখতে চায়। তার বিশ্বাসে এমন দৃঢ়তা আসেনি যে, সে যে কোন রকম ঝুঁকির মুকাবেলায় অবিচল থাকবে। এমনি ধরনের লাভ-লোকসানের দোলায় দোদুল্যমান এক চিত্র:

(আরবী************)

মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণ প্রাপ্ত হয় তবে ইবাদতের ওপর কায়েম থাকে, আর যদি কোন পরীক্ষায় নিমজ্জিত হয় তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো দুনিয়ায় আখিরাতে। এতো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা হাজ্জ: ১১)

হারফিন (***) বা প্রান্তিক সীমা কথাটি বলেই ছবিটিকে চোখের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। যেখানেদেখা যাচ্ছে দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তি এমনভাবে ইবাদত করে, সে ইবাদতের মধ্যেই প্রমাণ করে দেয় যে, সঠিক পথে স্থির অবিচল থেকে ইবাদত করার যোগ্য সে নয়। এ ছবিটি মানুষের মনে এমনভাবে প্রতিবিম্বিত হয় যা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

আমি যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম তখন কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে এই স্থানে পৌঁছুলেই আমার মনের মুকুরে ভেসে উঠতো একটি জীবন্ত ছবি যার কথা আমি আজও ভুলিনি।

সেদিনের সেই ছবি আর আজকের অনুভূতির মধ্যে খুব একটি ব্যবধান নেই। সেদিন একে শুধুই একটি ছবি মনে করতাম আর আজ মনে হয় এটি একটি উপমামাত্র। সত্যিকারের ছবি নয়।

আমি মনে করি, আল-কুরআন এমন অলৌকিকভাবে তার বক্তব্য পেশ করেছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রতিটি পাঠক তা বুঝতে সক্ষম এবং প্রতিটি পাঠকের কাছেই তা জীবন্ত ছবি হয়ে ভেসে উঠে।

৪. যেসব মুসলমান ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জাহান্নামের গর্তের কিনারায় অবস্থান করছিল, তাদের চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:

(আরবী**************)

তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সম্প্রতি স্থাপন করে দিয়েছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁরই অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই। তোমরা এক আগুনের গর্তের কিনারে অবস্থান করছিলে, তা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। (সূরা আলে-ইমরান: ১০৩)

চিত্রে বুঝানো হয়েছে, তোমরা আগুনের এক গর্তের কিনারে অবস্থান করছিলে। যেখানে সামান্য একটু পা ফসকে গেলেই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতো। অর্থাৎ যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ না করতে তবে জাহান্নাম ছিল তোমাদের জন্য অবধারিত।

এখানে উপমার গ্রহণযোগ্যতা এবং সত্যতা নিয়ে কথা নেই। এখানে যে জিনিসটি গুরুত্বপূর্ন তা হচ্ছে অন্তর্লোকে মুসলমানদের যে ছবিটি প্রতিভাত হয়ে উঠে, মনে হয় তারা ইতোপূর্বে আগুনের গুহায় নিশ্চিত পড়ে যাচ্ছিল। কোন শিল্পিী কি তার রঙ-তুলির সাহায্যে মনোজাগতিক এমন নিখুঁত স্থির ছবি আঁকতে পারতো? অথচ কুরআন রঙ, তুলি এবং ক্যানভাস (চিত্রপট) ছাড়াই কয়েকটি শব্দ দিয়ে কতো সুন্দর এক নিখুঁত ছবি এঁকে দিয়েছে।

আমরা এ ছবিতে দেখতে পাই, আগুরে একটি গর্ত, তার পাশে বসা কতিপয় লো, মাঝের ফাঁকটুকু হচ্ছে দুনিয়ার জীবন, মুসলমান হওয়ার পর তাদের এ গর্তের মাঝে এক বিশাল দেয়াল সৃষ্টি হলো, যা অতিক্রম করে আর ঐ গর্তে পড়ার কোন সম্ভাবনাই রইলো না।

৫. আমরা এ রকম আরেকটি চিত্র দেখতে পাই, যে ব্যক্তি তার যাবতীয় কাজের ভিত্তি তাকওয়ার ওপর না রেখে অন্য কিছুর ওপর রেখেছে:

(আরবী**********)

যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির ওপর, সে তার চেয়ে ভালো কাজ করেছে- যে তার ঘরের ভিত্তি করেছে কোন গর্তের কিনারায়, যা ধ্বসে পড়ার উপক্রম এবং তাকে নিয়ে তা জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়। (সূরা আত্‌-তাওবা: ১০৯)

জাহান্নামে পতিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তের চিত্রটি এ আয়াতে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে: (আরবী*****) অর্থাৎ ঐ দালান তাকে নিয়ে জাহান্নামে পতিত হচ্ছে। এখানে দুনিয়ার জীবনকালকে এতো তুচ্ছ মনে করা হয়েছে যে, তার ইঙ্গিত পর্যন্ত করার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। এখানে (****) শব্দে (***) এর জায়গায় নেয়া যেতো, কিন্তু তা নেয়া হয়নি। কারণ যা ঘটতে সামান্য বিলম্ব আছে এমন কিছু বুঝানোর সময় (***) ব্যবহৃত হয় কিন্তু (**) দিয়ে বুঝানো হচ্ছে, সে দালান পড়ন্ত অবস্থায় আছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তা জাহান্নামের মধ্যে হারিয়ে যাবে। জাহান্নাম এবং পড়ন্ত দালানের মধ্যবর্তী দূরত্বটুকুই হচ্ছে দুনিয়ার জীবনযা ক্রমশ জাহান্নামের নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছে।

মানবিক চিত্র

আল-কুরআন মানুষের মনোজাগতিক ছবি আঁকার সাথে সাথে মানবিক অবস্থার ছবিও তুলে ধরেছে। আমরা ইতোপূর্বে (আরবী*******) প্রসেঙ্গ (যার দ্বিধা-দ্বন্ধে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে…।) আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে নিচে আরো কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:

১. অনর্থক বিতর্ক ও অসার যুক্তি-প্রামাণকে খণ্ডন করে সঠিক দলিল-প্রমাণ তুলে ধরলেও যে কোন ফায়দা নেই তারই এক মনোজ্ঞ চিত্র অংকন করা হয়েছে নিচের আয়াত ক’টিতে।

(আরবী*************)

যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোন দরজা খুলে দেই আর তাতে ওরা দিনভর আরোহন করতে থাকে, তবু ওরা একথাই বলবে যে, আমাদের দৃষ্টি বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে, না হয় আমরা জাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।

অন্যত্র বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যদি আমি কাগজে লিখিত কোন বিষয় তাদের কাছে অবতীর্ণ করতাম, আর সেগুলো তারা হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতো, তবু তারা বলতো: এটি একটি প্রকাশ জাদু ঝারা আর কিছুই নয়। (সূরা আল-আনআ’ম : ৭)

২. এখানে যে বিষযটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা হচ্ছে- মানুষ তখনই তার প্রতিপালককে চেনে যখন সে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়। যখন সুদিন আসে তখন ত্রাণকর্তাকে সে ভুলে বসে। এ কথাগুলোকে সাদাসিদাভাবে বর্ণনা নাকরে এক মনোজ্ঞ চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। চলচিত্রের মত পরিবর্তনের সময় তার মধ্যে এমন এক মানুষের ছবি ভেসে উঠে, যা মানব সমাজে অধিকাংশ পাওয়া যায়।

(আরবী************)

তিনিই তোমাদেরকে জলে ও স্থলে ভ্রমণ করান। যখন তোমরা নৌকায় আরোহণ কর আর তা লোকজনকে নিয়ে অনুকূল হাওয়ায় বয়ে চলে, তারা আনন্দিত হয়। (হঠাৎ) নৌকা তীব্র বাতাসের কবলে পড়ে, আর চতুর্দিক থেকে আসতে থাকে ঢেউয়ের পর ঢেউ। তারা বুঝতে পারে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তখন আল্লাহকে ডাকতে থাকে তার ইবাদতে নিঃস্বার্থ হয়ে। ‘যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দাও তবে আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো।’ অতপর যখন আল্লাহ তাদেরকে বাঁচিয়ে দেন, তখনই তারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অনাচারে লিপ্ত হয়। (সূরা ইউনুস: ২২-১৩)

এভাবেই একে জীবন্ত ও চলমান এক ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নৌকা ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। একবার ওপরে আবার নীচে। মনে হচ্ছে নৌকা পানির তলায় তলিয়ে যাচ্ছে। আরোহীরা মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং মৃত্যু ভয় তাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে। এমতাবস্থায় তারা প্রাণপণে আল্লাহকে স্মরণ করছে। আয়াতের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে মানুষ সম্মোহিত হয়ে পড়ে। পুরো ছবিটি জীবন্ত হয়ে তার সামনে নড়াচড়া করতে থাকে। আমরা বলতে পারি এ আয়াতটি পুরোপুরিভাবে তার বক্তব্য সর্বোত্তম পদ্ধতিতে আমাদের কাছে তুলে ধরতে পেরেছে।

৩. এমন এক ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য, যার বাহ্যিক দিক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মন ভুলোনো। কিন্ত অভ্যন্তরনী দিক অত্যন্ত কুৎসিত ও বিপজ্জনক। দেখুন কতো সুন্দরভাবে সে চিত্র অংকিত হয়েছে।

(আরবী************)

যারা মুমিন তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতপর যখন কোন দ্ব্যর্থহীন সূরা অবতীর্ণ হয় এবং সেখানে জিহাদের উল্লেখ থাকে, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, তুমি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছিত লোকদের মতো তোমার দিকে তাকিযে থাকতে দেখবে। (সূরা মুহাম্মদ : ২০)

মৃত্যু মুহূর্তে মানুষের অবস্থা কেমন হয়তা কি কোন ছবির সাহায্যে বুঝানো সম্ভব? অথচ কতো সুন্দরভাবে উপরোক্ত আয়াতে এ চিত্রটি প্রস্ফুটিত হয়েছে। সেই সাথে তাদের লাঞ্ছিত মুখাবয়বের করুণ ছবিও ভেসে উঠেছে।

৪. অনেক সময় মানুষের এ মানবিক দিকটির চিত্র সাধারণ ঘটনার মাধ্যমে তুলে থরা হয়। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট ঘটনা অতিকৃম করে তা চিরন্তনী এক ছবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

(আরবী***********)

মূসার পর তুমি কি বনী ইসরাঈলের একটি দলকে দেখনি? যখন তারা তাদের নবীর কাছে বললো: আমাদের জন্র একজন বাদশাহ মনোনীত করে দিন, যাতে (তাঁর নেতৃত্বে) আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। নবী বললেন, তোমাদের প্রতিও কি এমন ধারণা করা যায় যে, যুদ্ধের নির্দেশ এলে তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বললো, আমাদের এমন কী হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবো না? অথচ আমরা বিতাড়িত হয়েছি আমাদের ঘর-বাড়ি ও সন্তান সন্তুতি থেকে। অতপর যখন যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হলো, তখন সামান্য ক’জন ছাড়া সবাই ঘুরে দাঁড়ালো। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালো করেই চেনেন। (সূরা বাকারা: ২৪৬)

এখানে স্পষ্ট বুঝা যায় বনী ইসরাঈল যখন বেশ আরাম-আয়েশেছিল তখন তারা বাহাদুরীর মিথ্যা আস্ফালন প্রদর্শন করছিল। জিহাদের নির্দেশ আসা মাত্র তাদের বাহাদুরীর বেলুন চুপসেগেল এবং তাদের কাপুরুষতা প্রকাশ হয়ে ছিল। এটি এমন কোন ঘটনা যা একবারই ঘটে গেল। স্থান ও কালের গণ্ডি পেরিয়ে এ ধরনের ঘটনার বার বার প্রদর্শনী হয়। এমন লোক মানব সমাজেই ছিল, আছে এবং থাকবে।

এতোক্ষণ আমি কেবল সেই উদাহরণগুলো বর্ণনা করলাম যেখানে মনোজাগতিক ও মানবিক অবস্থার ছবিই শুধু পেশ করা হয়নি বরং সেই ছবিগুলোকে জীবন্ত ও চলমান করে তুলে ধরা হয়েছে। এখন আমি এমনকিছু উদাহরণ তুলে ধরতে চাই কুরআন যেখানে সংঘটিত ঘটনাবলী কিংবা প্রবাদ প্রবচন অথবা বিভিন্ন কিস্‌সা-কাহিনীরপ্রাণবন্ত ও চিত্তাকর্ষক ছবি এঁকেছে। উল্লেখ্য যে, সেগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা নেই বরং একটি সাথে আরেকটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান।

সংঘটিত বিপর্যয়ের চিত্র

১. চিন্তা করে দেখুন, আহযাব যুদ্ধে কাফিরদের পরাজয়ের যে ছবি কুরআনে আঁকা হয়েছে, মনে হয় সমস্ত যুদ্ধের ময়দান চোখের সামনে। সেখানে যেসব তৎপরতা চলছিল তা জীবন্ত ও চলমান হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠে। অনুভব কল্পনার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ ছবি দেখে ধারণা করা হয়, আমাদের সামনেই যেন সে যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে, তার কোন অংশই আমাদের দৃষ্টির বাইরে নেই। নিচের শব্দগুচ্ছেরমাধ্যমে আঁকা হয়েছে সেই ছবি।

(আরবী************)

হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। যখন শত্রুবাহিনী তোমাদেরকে ঘিরে ফেলেছিল, তখনআমি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঞ্চাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যা তোমরা দেখতে পাওনি। তোমরা যা করো আল্লাহ দেখেন। যখন তারা তোমাদের কাছাকাছি হচ্ছিল উচ্চভূমি ও নিম্নভূমিথেকে, (তা দেখে) তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছিল, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করা শুরু করেছিলে। সে সময় মুমিনগণ পরীক্ষিত হচ্ছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল। তখন মুনাফিক ও যাদের মনে রোগ ছিল তারা বলতে লাগল: আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। একদল বললো, হে ইয়াসরিববাসী! এটি টিকবার মতো জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চলো। আরেকদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল: আমাদের ঘর-বাড়ি অরক্ষিত। মূলত তা অরক্ষিত ছিল না, পালানোই তাদের উদ্দেশ্য। (সূরা আল-আহযাব: ৯-১৩)

চিন্তা করে দেখুন, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট এবং যুদ্ধের ময়দানের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ঘটনাবলীর কতো নিখুঁত এক চিত্র অংকিত হয়েছে। চোখের সামনে এ ছবি ভেসে বেড়ায়। শত্রুসৈন্য চতুর্দিকে ঘিরে ফেলেছে, মুসলমানগণ দিশেহারা হয়ে শুধু বিস্ফোরিত চাখে তাকিয়ে আছে।তাদের পা পর্যন্ত পিছলে পড়ার উপক্রম। এদিকে মুনাফিকরা বিপর্য সৃষ্টির প্রয়াসে লিপ্ত। তার াবলতেলাগল, রাসূল তোমাদেরকে এতদিন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা মিথ্যের ফানুস মাত্র। তোমরা এদের মুকাবেলা করে ময়দানে টিকে থাকতে পারবে না। সময় থাকতে কেটে পড়ো। কেউ কেউ ঘরবাড়ি অরক্ষিত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করে পালানোর সুযোগ খুঁজতে লাগল।

সত্যি কথা বলতে কি, যুদ্ধের ময়দানের এমন কোন দিক নেই যা এ চিত্রে তুলে ধরা হয়নি। পুরো ময়দানের দৃশ্য হুহবু চোখের সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছিল এক সত্যি ঘটনা, যা সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু তার কুরআনী চিত্র কাফিরদের পরাজয়ের সেই বিরল দৃশ্যে কমবেশি করতে পারে, তবু তা কালোত্তীর্ণ ও চিরন্তনী। যেখানেই দু’দলে সংঘর্ষ বাধে এবং এক পক্ষ পর্যদুস্ত হয়তখনসেই ছবি চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

২. উপরিউক্ত চিত্রের অনুরূপ আরেকটি চিত্র অংকিত হয়েছে নিচের ঘটনাটিতে। যা আগেরটির মতোই কালোত্তীর্ণ ও চিরন্তনী এবং একে পৃথক করে দেখার কোন সুযোগ রাখে না। চিন্তা করে দেখুন।

(আরবী**********)

আর আল্লাহ সেই ওয়াদাকে সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তোমরা তাঁরই নির্দেশে ওদের খতম করছিলে। এমনকি যখন তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছ ও কর্তব্য স্থির করার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হয়েছ। আর যা তোমরা চাইতে তা দেখার পর কৃতঘ্নতা প্রদর্শন করেছ, সেখানে তোমাদের কার কাম্য ছিল দুনিয়া আর কার কাম্য ছিল আখিরাত। অতপর তোমাদেরকে তাদে ওপর থেকে সরিয়ে দিলেন যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। মূলত আল্লাহ তোমাদেরকে মাফ করে দিছেন, কেননা আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল। তোমরা ওপরে উঠে যাচ্ছিলে, পেছন দিকে কারো প্রতি ফিরেও তাকাওনি, অথচ রাসূল তোমাদেরকে পেছন থেকে ডাকছিল। অতপর তোমাদের ওপর নেমে এলা শোকের ওপরে শোক, যেন তোমরা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুর জন্য দুঃখ না করো এবং যার সম্মুখীন হচ্ছ সে জন্য বিমর্ষ না হও। বস্তুত আল্লাহ তোমাদের কাজের ব্যাপারে পূর্ণ অবহিত রয়েছেন। তারপর তোমাদের শোককে শান্তিতে পরিণত করে দিলেন যা ছিল তন্দ্রার মতো। সে তন্দ্রায় তোমাদের কেউ কেউ ঝিমুচ্ছিল আবার কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল। আল্লাহ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মতো। তারা বলছিল, আমাদের হাতে কি করার মতো কিছুই নেই? তুমি বল, সবকিছুই আল্লাহর হাতে। তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে- তোমার কাছে প্রকাশ করে না- তাও। তারা বলে: আমাদের হাতে যদি কিছু থাকতো তবে আমরা এখানে নিহত হতাম না। (সূরা আলে-ইমরান: ১৫২-১৫৪)

এ আয়াতগুলো পড়ে আমার এ ধারণা হচ্ছে যে, সেই লোক এবং সময় সবকিছুই যেন আমি চাক্ষুষ দর্শন করছি। যা যুদ্ধের ময়দানে ছিল। (এ চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে উহুদ যুদ্ধের ময়দান থেকে – অনুবাদক)

রূপক ঘটনাবলীর চিত্র

১. বাগান মালিকদের কাহিনী

এখন আমি রূপক ঘটনাবলীর সেই ছবি নিয়ে উপস্থাপন করবো যা আল-কুরআনে আঁকা হয়েছে।

আমরা এখন বাগান মালিকদের সামনে দাঁড়িয়ে। সেই বাগান আখিরাতের নয় দুনিয়াতেই বিদ্যমান। বাগানের মালিকগণ রাতে কিছু চিন্তা-ভাবনা করছে। ফকীর-মিসকিনরা সেই বাগানের ফল খেত। কিন্তু বাগান মালিকগণ তাদেরকে বঞ্চিত করে শুধু নিজেরাই লাভবান হতে চাচ্ছে। এবার দেখা যাক পরিণতি কি হয়।

(আরবী**********)

আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি, যেমন পরীক্ষা করেছিলাম বাগান মালিকদের। যখন তারা শপথ করেছিল, বাগানের ফল সংগ্রহ করবে। কিন্তু ‘ইনাআল্লাহ’ বললো না। (সূরা আল-কলম: ১৭-১৮)

তারা রাতে সিদ্ধান্ত নিলো খুব ভোরে ফল সংগ্রহ করবে এবং সেখানে ফকীর-মিসকিনের কোন অংশ রাখবে না। এবার আমরা রাতের অন্ধকারে উঁকি দিয়ে দেখি সেখানে কী ঘটছে। শুধুই অন্ধকার। জীবন নাটক সেখানে স্তিমিত। রাতের আঁধারে হঠাৎ কিছু এটা নড়াচড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তা আকার-আকৃতিহীন, কোন অশরীরী বস্তু।

(আরবী*************)

অতপর তোমার পালনকর্তার তরফ থেকে বাগান এক বিপর্যয় নেমে এলো, তখন তরা নিদ্রিত। সকাল পর্যন্ত তাদের সবকিছু ছিন্নভিন্ন খড়-কুটার মতো হয়ে গেলো।

এসব কিছুই তাদের অগোচরে ঘটলো। যখন সকাল হলো তখন একে-অপরকে ডেকে বললো: চলো ফল সংগ্রহ করতে যাই। অথচ তারা জানতেও পারলো না, রাতের আঁধারে কি তাণ্ডব কাণ্ডই না ঘটে গেছে তাদের বাগানের ওপর দিয়ে।

(আরবী********)

সকালে তারা একে-অপরকে ডেকে বললো: ফল সংগ্রহ করতে চাইলে তাড়াতাড়ি বাগানে চলো। তারপর তারা ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে পথ চলতে লাগল। আজ যেন কোন মিসকিন বাগানে প্রবেশ করতে না পারে। (সূরা আল-কলম: ২১-২৪)

এখন কিছু সময়ের জন্য দর্শকদের একটু চুপ থাকা উচিত। কেউ যেন না বলেন, কী ঘটে গেছে তাদের বাগানে। আবার কেউ কৌতুক অনুভব করে হা-হা করে হেসে ফেলাটাও ঠিক হবে না। দর্শকগণ একটু অপেক্ষা করে দেখুন তাদের জন্য কত বড় ধোকা অপেক্ষা করছে। তরা ফিসফিস করে কথা বলছে, যেন কথা শুনে কোন মিসকিন খবর পেয়ে না যায়। দর্শকগণ! আর কতোক্ষণ আপনারা হাসি চেপে রাখবেন। এবার হাসুন। প্রাণখুলে হাসুন। তাদের সাথে বড় কৌতুক হচ্ছে:

(আরবী***************)

তারা (আনন্দের আতিশয্যে) লাফিয়ে চলতে লাগল।

নিঃসন্দেহে তারা অপরকে বঞ্চিত করতে সক্ষম, কিন্তু নিজেদেরকে বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়।

হঠাৎ তারা বাগানের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে চিৎকার করে উঠলো। এ দৃশ্য দেখে দর্শকগণ ইচ্ছেমতো হাসতে পারেন।

(আরবী**********)

যখন তারা তাদের বাগান দেখল, তখন বলতে লাগল: অবশ্যই আমরা আমাদের বাগানের রাস্তা ভুলে (অন্যত্র) চলে এসেছি।

বাগানের অবস্থা দেখে তারা বিশ্বাসই করতে পারল না, তারা বললো:

এটাতো আমাদের সে বাগান নয়, যা ফলে ভরপুর ছিল। অবশ্যই আমরা রাস্তা ভুলে অন্যত্র চলে এসেছি।

(আরবী***********)

না হয়, আমাদের কপাল পুড়েছে। (সূরা আল-কলম: ২৭)

(আরবী*********)

তাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি বললো: আমি কি তোমাদের বলিনি, এখনো তোমরা আল্লাহ তা’আলার পবিত্রতা বর্ণনা করছো না কেন? তারা বললো: আমরা আমাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। অবশ্যই আমরা জুলুম করেছিলাম। (সূরা আল-কলম: ২৮-২৯)

কিন্তু সময় পার করে অনুশোচনা করারয় কি লাভ? এটি একটি রীতি, যখন কোন দুর্ঘটনা ঘরেট তখননিজেরা পরস্পর বাগ-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়এবং একে-অপরকে দোষী করার প্রয়াস পায়। তেমনিভাবে তারাও শুরু করলো একাজ।

(আরবী*********)

অতপর তারা একে-অপরকে ভর্ৎসনা করতে লাগল। (কলাম: ৩০)

তারপর তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছলো।

(আরবী***********)

তারা বললো: হায়! দুর্ভোগ আমাদের, আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী। সম্ভবত আমাদের পালনকর্তা এর পরিবর্তে (এর চেয়েও) উত্তম বাগান আমাদের দেবেন। আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছেই প্রত্যাশা করি। (সূরা আল-কলম: ২১-২২)

]২. দুটো বাগানে মালিকের কাহিনী

এবার আপনাদেরকে আরেকজন বাগান মালিকের কাহিনী শোনাব। তবে তার বাগান একটি নয়, দুটো। আর সেই বাগানও কোন অংশে কম ছিল না, যে বাগানের কাথা আপনারা শুনলেন। এ ঘটনারসাথে আরেক ব্যক্তি জড়িত। কিন্তু তার কোন বাগান নেই, আছে এমন একটি হৃদয় যা ঈমানের নূরে ঝলমলে। উভয়েই নিজেদের মনের কথা খুলে বলছিল। সেখানে দুটো বাগানের মালিককে ঐ ব্যক্তির প্রতীক বানানো হয়েছে, যে নিজের ধন-দৌলতের মোহে পড়ে অহংকারের বশবর্তী হয়ে ঐ শক্তিকেই ভুলে বসেছে যার হাতে তার জীবন, মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ। এর কারণহচ্ছে, বর্তমানে তার শান-শওকত ও ধন-দৌলত এবং শক্তি-সামর্থ প্রচুর। পক্ষান্তরে তার সাথী, যে সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করে, তাঁর কাছেই সাহায্য-সহযোগিতা ায়। এবং সর্বাবস্থায় কুফর ও বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকে।

(আরবী**********)

তুমি তাদেরকে দু’ ব্যক্তির কাহিনী শুনিয়ে দাও। আমি তাদের একজনকে দুটো আঙ্গুরের বাগান দিয়েছিলাম এবং খেজুর গাছ দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিল। আর দু’ বাগানের মাঝে ছিল শস্যক্ষেত। উভয় বাগানই ছিল ফলবাগান। তাতে কিছুমাত্র কমতি ছিল না এবং উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে ছিল প্রবাহিত নহর। (সূরা আল-কাহফ: ৩২-৩৬)

এ আয়াত থেকে দুটো বাগানের দৃশ্য প্রস্ফূটিত হয়ে উঠে, যা ছিল সুজলা-সুফলতা ও সবুজ-শ্যামল। এটি প্রথম দৃশ্য। দ্বিতীয় হচ্ছে:

(আরবী**********)

সে ফল সংগ্রহ করলো। অতঃপর কথা প্রসঙ্গে (একদিন) সাথীকে বললো: আমার মনে হয় না, এ বাগান ধ্বংসহয়ে যাবে।আর আমি মনে করি না, কিয়ামত সংঘটিত হবে।যদি কখনো প্রতিপালকের নিকট আমাকে পৌঁছে দেয়া হয় তবে সেখানে এর চেয়ে আর উৎকৃষ্ট বস্তু পাব। (সূরা আল-কাহফ: ৩৪)

তাদের কথোপকথনে বুঝা যায়, তখনতরা উভয়েই সেই বাগানের দিকে যাচ্ছিল এবং গল্প করছিল। বাগানের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। কারণ তার পরই বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

নিজের প্রতি জুলূম করে সে তার বাগানে প্রবেশ করলো। সে বললো:

আমার মনে হয় না, এ বাগান কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। আর আমি মনেকরি না, কিয়ামত সংঘটিত হবে। যদি কখনো প্রতিপালকের নিকট আমাকে পৌঁছে দেয়া হয় তবে সেখানে এর চেয়ে আরো উৎকৃষ্ট বস্তু পাব। (সূরা আল-কাহফ: ৩৫-৩৬)

আমরা দেখতে পাই, ঐ ব্যক্তি অহংকার ও দাম্ভিকতার শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ভেবে দেখুন, গরীব সঙ্গীটির ওপর তার কথাবার্তার কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল? তার কাছে তো বাগান ছিলনা এবং ধন-সম্পদর প্রাচুর্যও ছিল না। এমনকি দু’জন লোক তার পক্ষে লাঠি ধরবেতাও ছিলনা। একথা ঠিক, তার আর কিছু না থাকলেও ঈমানের মতো সম্পদ ছিল্ যার কারণে সে নিজেকে ছোট মনেকরতো না। প্রতিপালকের সম্মান ও মর্যাদার কথা কখন ভুলেনি। তাই বাগান মালিক সাথীটিকে সে স্মরণ করিয়ে দিলো, চিন্তা করে দেখতুমি কতো নিকৃষ্ট বস্তুর সৃষ্টি। কাজেই গর্ব করা তোমার সাজে না।

(আরবী***********)

তার সঙ্গী তাকে বললো: তুমি তাঁকে অস্বীকার করছো, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, অতপর বীর্য থেকে, তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন তামাকে মানবাকৃঙতিতে? কিন্তু আমিতো একথাই বলি, আল্লাহ আমার পালনকর্তা, তাঁর সাথে শরীক আর কাউকে আমি পালনকর্তা মানি না। যদি তুমিআমাকে ধনে ও জনে তোমার চেয়ে কম মনে করো, তবে বাগানে প্রবেশ করার সময় কেন বললে না: মা-শা-আল্লাহ, লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর শক্তি ছাড়া আর কোন শক্তি নেই)। আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে তোমার বাগানের চেয়েও উত্তম বস্তু দান করবেন এবং তোমার বাগানের ওপর আসমান থেকে আগুন পাঠাবেন, ফলে সকালে তা পরিষ্কার মাঠ হয়ে যাবে। অথবা সকালে তার পানি শুকিয়ে যাবে, কিন্তু তুমি তার সন্ধান পাবে না। (সূরা আল-কাহফ: ৩৮-৪১)

এখানে সাথীদ্বয়ের দৃশ্য শেষ। এক সাথী মোরগের মতো গর্দান উঁচু করে আস্ফালন করছে। বাগ-বাগিচা গর্বে তার পা যেন আর মাটিতেই পড়তে চায় না। অপর পক্ষে আরেক সাথী মুমিন, ঈমানকেই সে বড় ধনদৌলত মনে করে। সাথীকে নসীহত করে বললো: এতো নিয়ামত ভোগ করে তার কী করা উচিত। মনে হয় তার সাথী সেই থায় কোন কান দেয়নি। সাথীর অহমিকা দেখে অন্য সাথীর রেগে যাওয়া, এটিই স্বাভাবিক। এক পর্যায়ে মনের দুঃখে বদ দো’আও করে ফেলল এবং রাগের সাথেই একে অপর থেকে পৃথক হয়ে গেল। এবার দেখব তারপর কি হলো? ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

অতপর তার সমস্ত ফল ধ্বংস হয়ে গেল এবং সে তাতে যা ব্যয় করেছিল তার জন্য সকালে হাত কচলিয়ে আক্ষেপ করতে লাগল। বাগানটি সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছিল। সে বলতে লাগল: হায়! আমি যদি কাউকে আমার পালনকর্তার সাথে শরীক না করতাম। (সূরা আল-কাহাফ: ৪২)

সত্যি কথা বলতে কি, ঐ মুমিন ব্যক্তির দো’আকে আল্লাহ কবুল করে নিয়েছিল। আমরা দেখলাম, ঐ মু’মিন ব্যক্তির সাথীটির দুরাবস্থা ও তার অনুতাপ। বাগান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আফসোস বা অনুতাপে কী আসে যায়? সে একথা বলে দুঃখ প্রকাশ করলো, কেন অন্যকে আল্লাহর সাথে শরীক করলো। আসুন দুঃখ ও ইস্তিগফারের এ দৃশ্য শেষ করি। যবনিকা পতন এবং দৃশ্যের সমাপন।

প্রকৃত ঘটনাবলীর চিত্র

এতোক্ষণ আমরা রূপক ঘটনাবলীর চিত্র উপস্থাপন করলাম। এবার আমরা কয়েকটি প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করবো।

১. হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ): আমরা এখন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কাহিনী চিত্র পেশ করবো। যখন তিনি পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে নিয়ে কা’বা ঘর নির্মাণ করছিল। মনে হয় এ ঘটনা শত শত বছর আগের নয়, এখনই আমরা বাপ-বেটার কা’বা ঘর নির্মাণ এবং তাদের দো’আ প্রত্যক্ষ করছি।

(আরবী***********)

স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিল, (তখন তরা দো’আ করলো): হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের খেদমত কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত। পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে আপনার আজ্ঞাবহ করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি করুন। আমাদেরকে হজ্জের রীতি-নীতি বলে দিন এবং আমাদেরকে মাফ করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী দয়ালূ। হে প্রতিপালক! আমাদের মধ্যে থেকে ই তাদের কাছে একজন রাসল পাঠান, যে তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে। তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র রবে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞানী।

দো’আ শেষ, দৃশ্যের যবনিকাপাত।

খবর থেকে দো’আর দিক প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন। প্রকৃতপক্ষে এ পরিবর্তনই গোটা দৃশ্যটিকে জীবন্ত করে তুলেছে এবং চোখের সামনে হাজির করেছে। খবর হচ্ছে:

(আরবী*********)

যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল আল্লাহর ঘরের ভিত্তি উঁচু করছিল।

খবর থেকে দো’আর দিকে প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন। প্রকৃতপক্ষে এ পরিবর্তনই গোটা ‍দৃশ্যটিকে জীবন্ত করে তুলেছে এবং চোখের সামনে এনে হাজির করেছে। খবর হচ্ছে:

(আরবী***********)

যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল আল্লাহর ঘরের ভিত্তিকে উঁচু করছিল।

এ খবরের পরিণতিতে পর্দা উঠে যায়। মঞ্চ অর্থাৎ খানায়ে কা’বা ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ) চোখের সামনে প্রতিবাত হয়ে উঠেন। পিতা-পুত্র দু’জনই দীর্ঘ দো’আয় মশগুল।

এখানে শৈল্পিক সৌন্দর্য এবং অলৌকিকত্বের যে দিক তা হচ্ছে ঘটনা বর্ণনা শুরু করেই দো’আয় পরিবর্তন করে দেয়া। এখানে এমন একটি শব্দও নেই যা থেকে বুঝা যায়, পিতা-পুত্র নির্মাণ কাজ ক্ষণিকের জন্য বাদ দিয়ে এ দো’আ করেছিল। যদি ধরে নেয়া হয়, ঘটনা এখনো চলমান। শেষ হয়নি। তাহলে এর অলৌকিকত্ব আরো বেড়ে যায়। যদি এভাবে শুরু করা হতো: “যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বা ঘরের দেয়াল গাঁথাছিল তখন এ দো’আ করছিল।” তাহলে এ ধরনের কথায় কোন চমক থাকত না। সেটি গতানুগতিক একটি ঘটনা হিসেবে দাঁড়াত। কিন্তু যে স্টাইলে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তা শুধুমাত্র ঘটনা নয়। তা জীবন্ত ও চলমান একটি দৃশ্য, মনে হয় আজও মঞ্চে তা প্রদর্শিত হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যও মঞ্চ শূণ্য নয়। পুরো দৃশ্যটি চলমান হয়ে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ছবিতে যে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করা হয়েছে তা শুধুমাত্র একটি শব্দ [তারা দো’আ করলো’; (***)] পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়ায় সম্ভব হয়েছে। আল-কুরআনের বিশেষত্বই এখানে।

২. হযরত নূহ (আ)-এর প্লাবন: এখন আমরা হযরত নূহ (আ)-এর প্লাবনের চিত্র তুলে ধরবো। যেখানে বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

আর নৌকাখানি তাদেরকে বহন করে নিয়ে চললো পর্বতসম তরঙ্গমালার মাঝে। (সূরা হুদ: ৪২)

এ বিপজ্জনক মুহূর্তে হযরত নূহ (আ)-এর পিতৃত্ব জেগে উঠায় তিনি অত্যন্ত বিচলিত। কারণ পুত্র এখন সবকিছুকে অস্বীকার করছে। তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন কাফিরদের সাথে পুত্রও সলীল সমাধি লাভ করবে। নূহ (আ) মানবিক দুর্বলতায় পড়ে গেলেন। নূহ (আ)-এর ভেতরের মানুষটি নবীর ওপর প্রাধান্য পেল। তখন অত্যন্ত অনুনয়-বিনয় করে পুত্রকে ডাকলেন।

(আরবী***********)

আর নূহ তাঁর ছেলেকে ডাক দিলেন, সে দূরে সরে ছিল। তিনি বললেন: বেটা! আমাদের সাথে উঠে এসো, কাফিরদের সাথে থেকো না। (সূরা হুদ: ৪২)

কিন্তু পিতার শত অনুনয়-বিনয়কে বেয়াড়া পুত্র কোন পরওয়াই করলো না। যে যৌবন ও শক্তি-সামর্থের গর্বে স্ফীত হয়ে উঠলো।

(আরবী***********)

সে বললো: আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেবো, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। (সূরা হূদ : ৪৩)

পিতা ব্যাকুলচিত্তে সর্বশেষ আহ্বান করলেন:

(আরবী***********)

নূহ বললো: আজ আল্লাহর হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। (সূরা হূদ : ৪৩)

এরপর একটি তরঙ্গ এসে সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

(আরবী***********)

এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সি নিমজ্জিত হয়ে গেল। (সূরা হূদ: ৪৩)

কতো বড় মর্মান্তিক দৃশ্য! ভয়ে শ্রোতদের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে। পাহাড়সম ঢেউয়ের মধ্যে নৌকা চলছে। হযরত নূহ (আ) পেরেশান হয়ে পুত্রকে আহ্বান করছেন। কিন্তু পুত্র শক্তি-সামর্থের বাহাদুরী দেখিয়ে সে আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করছে। এ কথাবার্তা চলা অবস্থায় হঠাৎ এক তরঙ্গ এসে সবকিছুকে তছনছ করে দিলো। এ দৃশ্য অবলোকন করে মানুষের ভেতর সেই অবস্থা সৃষ্টি হয়, যে অবস্থা বাপ-বেটা অর্থাৎ নূহ (আ) ও তার সন্তানের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। শুধু মানুষ কেন অন্য প্রাণীকেও প্রভাবিত এবং বেদনাপ্লুত না করে ছাড়ে না।

কিয়ামতের চিত্র

এখন আমরা প্রথমে কিয়ামতের দৃশ্যাবলী বর্ণনা করবো তারপর কুরআনে কারীমে শান্তি ও শাস্তির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সে সম্পর্কে আলোকপাত করবো। কারণ, শৈল্পিক চিত্রের’ সাথে এগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

১. কিয়ামতের চিত্র অংকন করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন:

(আরবী***********)

যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এবং অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তখন তারা অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন। (সূরা আল-ক্বামার: ৬-৮)

এটি কিয়ামতের দৃশ্যসমূহের মধ্যে একটি দৃশ্য। সংক্ষিপ্ত বটে কিন্তু হৃদয়কে নাড়া দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। পঙ্গপালের উপমায় কতো চমৎকারভাবে চিত্রটিকে উস্থাপন করা হয়েছে। পঙ্গপাল যখন উড়ে তখন বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো মনে হয়। তদ্রূপ মানুষ যখন কবর থেকে উঠে আহ্বানকারীর দিকে ছুটবে তখন তারা দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকবে। মনে হবে কোন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারবে না, কোথায যাচ্ছে বা কেন যাচ্ছে। তাদেরকে অপছন্দনীয় এক বিষয়ের দিকে ডাকা হবে। তাদের চোখ অবনমিত হবে। এ হচ্ছে সর্বশেষ আলামত। যার মাধ্যমে চিত্রটি পূর্ণতায় পৌঁছে যায়।

পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে কাফিররা বলবে এটিতো বড় কঠিন দিন। ছোট ছোট বাক্যে কতো সুন্দর করে পুরো ছবিটিকে তুলে ধরা হয়েছে। শ্রোতার হৃদয়পটে ভেসে উঠে একটি বিশাল মাঠ, মনে হয় সবাই কবর থেকে উঠে একযোগে দৌড়াচ্ছে। সকলের মাথা নিচু। চেহারা ভয়ে বিহ্বল। এ যেন এক জীবন্ত ও চলমান ছবি।

২. এটি হচ্ছে কিয়ামতের দৃশ্য সমূহের মধ্যে দ্বিতীয় দৃশ্য। এ দৃশ্যে মানুষের পালানোর কথাও আছে এবং ভীত-বিহ্বল অবস্থার কথাও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এটি পূর্বের দৃশ্যের চেয়েও করুণ ও ভয়াবহ।

(আরবী***********)

জালিমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না। তাদেরকে তো ঐদিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চোখ ভয়ে বিস্ফোরিত হয়ে যাবে। (মানুষ) উর্ধ্বশ্বাসে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে (হাশরের মাঠের দিকে)। দৃষ্টি তাদের দিকে ফিরে আসবে না, ভয়ে অন্তর উড়ে যাবে। (সূরা ইবরাহীম : ৪২-৪৩)

এখানে চারটি অবস্থার কথা বলা হয়েছে। যা একের পর এক সংঘটিত হবে। একই ঘটনার চারটি দৃশ্য যা পালাক্রমে পদর্শিত হচ্ছে। ভয়, লজ্জা ও লাঞ্ছনায় অবনত মস্তক। তার ওপর দুশ্চিন্তা ও ভয়ের ভায়া দুর্ভাবনায় মন প্রাণ ছেয়ে যায়। এ ছবিটি জীবিতদেরকে দেখানো হচ্ছে, আবার যাদের ছবি দেখানো হচ্ছে তারাও মানুষ। ছবির লোকজন এবং দর্শক-শ্রোতা উভয়ের মাঝেই জাতিগত এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয়ের অনুভূতি পর্যন্ত এক ও অভিন্ন। মনে হয় একদলের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আরেক দলে সঞ্চালন হয়ে তাদের মন-মস্তিষ্ট ছেয়ে যায়। পাঠক মনে করে এ অবস্থা স্বয়ং তার ওপর দিয়েই বয়ে যাচ্ছে।

৩. অতপর ভয় ও আতংকের আরেকটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ চিত্রটি পূর্বের চেয়ে আরো ভয়ংকর। শব্দগুলো যেন সেই ভয়াবহ অবস্থায় পুরোপুরি বর্ণনা দিতে পারছে না। আমরা এ বিভীষিকাময় চিত্রটি তুলে ধরলাম, যেন এটি নিজের অবস্থার নিজেরই প্রকাশ করতে পারে।

(আরবী***********)

হে মানুষ তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তনদানকাররিণী দুধ পানরত সন্তান রেখে পালিয়ে যাবে। ভয়ে গর্ভবতী মহিলার গর্ভপাত ঘটে যাবে। লোকদেরকে তুমি মাতালের মতো দেখতে পাবে কিন্তু তার নেশাগ্রস্ত হবে না। আল্লাহর আযাব এতোদূর ভয়াবহ হবে। (সূরা আল-হাজ্জ: ১-২)

এ বিভীষিকা মানুষকে এমন হতবিহ্বল করে তুলবে যে, স্তনসদানরত মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকেও ভুলে যাবে। গর্ভবতী সবকিছু প্রত্যক্ষ করবে কিন্তু তাকে লক্ষ্য করার মতো কেউ থাকবে না। ছুটোছুটি করবে বটে কিন্তু ছুটোছুটির সেই অনুভূতিও তার থাকবে না। ফলে ভয়ে ও আতংকে তার গর্ভপাত ঘটে যাবে। মানুষ ছুটোছুটি শুরু করবে বটে কিন্তু মনে হবে তাদের পা জমিনে লেগে গেছে। মানুষ সবকিছু সংঘটিত হতে দেখবে কিন্তু এতো দ্রুত তা সংঘটিত হবে, মানুষ কিছুই বুঝে উঠতে পারবে না। জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যাবে। দেখলে মনে হবে তারা মাতাল। অথচ তারা নেশাগ্রস্ত হবে না, কর্তব্য কর্মকে স্থির করতে না পেরে তারা এরূপ আচরণ করবে। এগুলো হচ্ছে আল্লাহর শাস্তির সামন্যতম প্রভাব মাত্র। মনে হবে মানুষ এসব নিজের সামনে সংঘটিত হতে দেখছে। চিন্তাশক্তিও ধারণ করতে চায় কিন্তু ভয়ঙ্কর বিভীষিকা তাকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। এজন্য মনোজগতে তা স্থায়ীভাবে সমাসীন হতে পারে না।

৪ ইতোপূর্বে কিয়ামতের তিনটি বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যার ছবি (জীবন্ত হয়ে) চোখের সামনে ভেসে উঠে। কিন্তু এমন কিছু দৃশ্য আছে, যা শুধু অনুভূতিকে নাড়া দেয় মাত্র:

(আরবী***********)

সেদিন প্রত্যেকেরই এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।

(আরবী***********)

প্রাণের বন্ধু আরেক বন্ধুকেও সেদিন জিজ্ঞেস করবে না।

দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার সংক্ষিপ্ত অথচ হৃদয়গ্রাহী চিত্র এর চেয়ে আর কী হতে পারে? অন্তরে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা ছাড়া আর কিছুর স্থান নেই। দুর্ভাবনা তা হৃদয়-মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সে অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশও পায় না।

৫. কিয়ামত সংঘটিত হওয়া এবং কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবার আরেকটি দৃশ্য। কিছুটা বিস্তৃত এসব ‍দৃশ্য। তবু প্রতিটি ‍দৃশ্যের মাঝে সামান্য বিরতি পরিলক্ষিত হয়।

(আরবী***********)

তারা কেবলমাত্র একটি ভয়াবহ শব্দের অপেক্ষা করছে, যা তাদেরকে আঘাত করবে তাদের বাক-বিতণ্ডাকালে। তখন তারা ওসিয়ত করতেও সক্ষম হবে না এবং তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারবে না। (সূরা ইয়াসীন: ৪৯-৫০)

এখানে প্রথম ‍ফুঁকের কথা বলা হয়েছে। প্রথম শব্দেই শুরু হয়ে যাবে বিপর্যয়। এতো দ্রুত সংঘটিত হবে যে, ওসিয়ত পর্যন্ত করার সময় পাবে না। কবরবাসী কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে। তারপর কি হবে? ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, অমনি তারা কবর থেকে উঠে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটতে থাকবে। তারা বলবে, হায় আফসোস! কে আমাদেরকে নিদ্রা থেকে জাগিযে দিলো? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা করেছিল এবং রাসয়লগণ সত্য বলেছেন। (ইয়াসীন: ৫১-৫২)

এখানে দ্বিতীয় ফুঁকের কথা বলা হয়েছে। প্রথম ফুঁকে তো সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বিতীয় ফুঁকের পর সবাই হয়রান-পেরেশান হয়ে কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে। আশ্চর্য হয়ে (ঈমানদারগণ) বলাবলি করবে, কে আমাদেরকে এমন সুখনিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিলো? তারপর পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বলবে: প্রভু দয়াময় যে ওয়াদা আমাদের নিকট করেছিল এবং নবী-রসূলগণ যে সংবাদ আমাদেরকে প্রদান করেছিল আজ তা সত্য হলো।

(আরবী***********)

এটি তো হবে এক মহানিনাদ। সেই মুহূর্তেই তাদের সবাইকে আমার সামনে উপস্থিত করা হবে। সেদিন কারো প্রতি জুলুম করা হবে না বরং তোমরা যা করবে কেবল তারই প্রতিদান পাবে। (ইয়াসীন: ৫৩-৫৪)

এটি সর্বশেষ ফুঁক, যেন মানুষ আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যায়। সেদিন আমল অনুযায়ী মানুষ সেখানে জমায়েত হবে। এ দৃশ্য আপাতত এখানে শেষ।

এখন যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে সে-ই এসব চিত্র প্রত্যক্ষ করবে। মনে হবে তাকেই যেন লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে: “সেদিন কারো প্রতি জুলুম করা হবে না, শুধু তোমরা যা করবে কেবল তারই প্রতিদান পরবে।”

৬. কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত লোক একত্রিত হবে এবং আল্লাহর দরবারে কৈফিয়ত দিতে থাকবে তখন আমরা এমন একটি দল দেখতে পাই যারা পৃথিবীতে পরস্পর প্রতিবেশী ছিল্ কিন্তু তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না। অহংকার ও দাম্ভিকতায় পরিপূর্ণ ছিল। সে তার প্রতিবেশীকে গুমরাহ বলতো, তাদের মধ্যে অনেক মু’মিনদেরকে কষ্ট দিত। মু’মিনগণ যখন জান্নাতী হবার দাবি করতো তখন তাদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ শুরু করা হতো। সেদিন যখন তাদেরকে দলে দলে জাহান্নামে প্রবেশ করা হবে। তখন একদল প্রবেশের সাথে সাথে আরেক দলের খবর তাদেরকে দেয়া হবে।

(আরবী***********)

এই তো একদল তোমাদের সাথে প্রবেশ করছে। (সূরা ছোয়াদ: ৫৯)

প্রতি উত্তরে বলা হবে: (আরবী***********)

তাদের জন্য কোন অভিনন্দন নেই, তারা তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা ছোয়াদ: ৫৯)

যাকে যালি দিত সে শুনে কি চুপ থাকবে? নিশ্চয় নয়। সে তখন বলবে:

(আরবী***********)

তারা বলবৈ, তোমাদের জন্যও তো অভিনন্দর নেই। তোমরাই আমাদেরকে এ বিপদের সম্মুখীন করেছ। এটি কতোই না ঘৃণ্য আবাসস্থল। (সূরা ছোয়াদ : ৬০)

তারপর সম্মিলিত কণ্ঠে বলে উঠবে: (আরবী***********)

তারা বলবে: হে আমাদের পালনকর্তা! যে আমাদেরকে এর সম্মুখীন করেছে, আপনি তাকে দিগুণ শাস্তি দিন। (সূরা ছোয়াদ: ৬১)

তারপর কি ঘটবে? তারা ঈমানদারদেরকে সেখানে দেখতে পারেব না, যাদেরকে পৃথিবীতে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো এবঙ নিজেদের গায়ের জ্বালা ঝাড়ত। তারা আজ তাদের সাথে জাহান্নামে নেই এ কেমন কথা?

(আরবী***********)

এবং তারা বলবে: আমাদের কি হলো, যাদেরকে আমরা খারাপ মনে করতাম তাদেরকে তো দেখছি না! আমরা কি শুধু শুধুই তাদেরকে ঠাট্টার পাত্র মনে করতাম, না আমাদের চোখ ভুল দেখছে? এ ব্যাপারে জাহান্নামীদের বাক-বিতণ্ডা অবশ্যম্ভাবী। (সূরা ছোয়াদ: ৬২-৬৪)

জাহান্নামীদের ঝগড়া-বিবাদ আমাদের সামনে এমনভাবে উপস্থিত হয়, যেন আমরা প্রত্যেকে তা প্রত্যক্ষ করছি। প্রতিটি মানুষই মনে করে, স্বয়ং তার চিত্রটিকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সে ঐ দূরবস্থা থেকে মুক্তির জন্য চেষ্টা করে। আর এ চেষ্টার ফলে উক্ত দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া হয়তো সম্ভব।

শান্তি ও শাস্তির দৃশ্যাবলী

বিগত আলোচনায় আমরা কবর, কিয়ামত, পুনরুত্থান এবং হাশরের দৃশ্যাবলী অবলোকজন করেছি। এবার আমরা জান্নাত ও জাহান্নামের শান্তি ও শাস্তির কিছু দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবো।

১. জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:

(আরবী************)

কাফিরদের জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। তারা যখন সেখানে পৌঁছবে, তখন তার দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের দ্বাররক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে নবী-রাসূল আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ আবৃত্তি করতো এবং সতর্ক করতো এ দিনের সাক্ষাতের ব্যাপারে? তারা বলবে, হ্যাঁ। কিন্তু কাফরদের প্রতি শাস্তি অবধারত হয়ে গেছে। তারপর বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করো, চিরদিনের জন্য। অহংকারীদের জন্য কতো নিকৃষ্ট স্থান।

জান্নাতীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করতো তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা উন্মুক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন জান্নাতের দ্বারক্ষীগণ তাদেরকে বলবে: তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাক, চিরদিনের জন্য এ জান্নাতে প্রবেশ করো। তারা বলবে: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের প্রতি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এর উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছে সেখানে অবস্থান করবো। (দেখো) মেহনতকারীদের পুরষ্কার কতোই না চমৎকার। (সূরা আয-যুমার: ৭৩-৬৪)

নিচের আয়াতটির মাধ্যমে এ দৃশ্যের যবনিকা টানা হয়েছে:

(আরবী*************)

তুমি ফেরেশতাদেরকে দেখছে, তারা আরশের চারপাশ ঘিরে তাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছে। তাদের সবার মাঝে ন্যায়বিচার করা হবে। বলা হবে যে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর।

এ চিত্রগুলো এতো সুস্পষ্ট যে, এর পৃথক কোন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। বোর আসুন, আমরা জাহান্নাম ও জান্নাতীদের পিছু পিছ গিয়ে তাদের কিছু হাল-অবস্থা জেনে নেই।

২. জাহান্নামীদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ হবে পাপীদের খাদ্য। তা গলিত তামার মতো পেটে ফুটতে থাকবে, যেমন পানি ফুটে। (বলা হবে) একে ধরো এবং টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাও এবংতার মাথার ওপর ফুটন্ত গরম পানির আযাব ঢেলে দাও। (আরও বলা হবে) স্বাদ গ্রহণ করো, তুমিতো সম্মানত, সম্ভ্রান্ত। এ ব্যাপারেতো তোমরা সন্দেহে ছিলে।

সাথে সাথে জান্নাতীদের কথা বলা হয়েছে এভাবে:

(আরবী*************)

নিশ্চয়ই মুত্তাকীগণ নিরাপদ স্থনে থাকবে ঝর্ণা ও বাগানসমূহে। তারা পরিধান করবে চিকন ও পুরু রেশমী বস্ত্র, মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই হবে। আর আমি তাদেরকে সুনয়না হুরদের সাথে বিয়ে দেব। সেখানে তারা শান্তমনে বিভিন্ন ফলমূল চেয়ে পাঠাবে। সেখানে তারা কোন মৃত্যুর ‍মুখোমুখি হবে না প্রথম মৃত্যু ব্যতীত এবং তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্ত রাখা হবে। (সূরা আদ-দোখান: ৫১-৫৬)

৩. আমরা কিয়ামতের দৃশ্যাবলী এমন এক জায়গায় শেষ করেছি যেখান বিপরীতধর্মী দুটো চিত্র ছিল। এখানেও তেমনি ধরনের আরও কয়েকটি চিত্র:

(আরবী************)

জান্নাতীগণ জাহান্নামীদেরকে ডেকে বলবে: আমাদের সাথে আমাদের প্রতিপালক যে ওয়াদা করেছিল, তা আমরা সত্য পেয়েছি। অতএব তোমরাও কি তোমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা সঠিক পেয়েছ? তারা বলবে: হ্যাঁ। অতপর একজন ঘোষক উভয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবে: আল্লাহর অভিসম্পাত জালিমদের ওপর যারা আল্লাহর পথে বাধা দিতো এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করত। তারা পরকালের ব্যাপারেও অবিশ্বাসী ছিল।

(আরবী***********)

উভয়ের মাঝে প্রাচীর থাকবে এবং আ’রাফের ওপরে অনেক লোক থাকবে। তারা প্রত্যেককে তাদের চিহ্ন দেখে চিনে নেবে। তারা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবে: তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা তখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না, কিন্তু প্রবেশ করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামীদের ওপর পতিত হবে তখন তারা বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে জালিমদের সাথী করো না। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪৬-৪৭)

(আরবী*************)

আ’রাফবাসী যাদেরকে তাদের চিহ্ন দেখে চিনতে তাদেরকে ডেকে বলবে: তোমাদের দলবল ও ঔদ্ধত্য তোমাদের কোন কাজেইা এলো না। এরা কি তারাই, যাদের সম্পর্কে তোমরা কসম খেয়ে বলতে যে, আল্লাহ এদেরপ্রতি অনুগ্রহ করবেন না। (বলা হবে) জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমাদের কোন ভয় নেই এবঙ তোমরা কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে না। জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবে: আমাদের নিকট সামান্য খাদও ও পানীয় নিক্ষেপ করো অথবা আল্লাহ যে রিয্‌ক দিয়েছেন তা থেকেই কিছু দাও। জান্নাতীগণ উত্তর দিবে: এগুলো কাফিরদের জন্য আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন।

ওপরের উদ্ধৃতিগুলোতে বেশ কিছু দৃশ্য এসেছে, যা একের পর এক আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে।

আয়াতগুলো পড়ে মনে হয় আমরা জান্নাতী ও জাহান্নামীদের সামনে দাঁড়ানো। জান্নাতীগণ জাহান্নামীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছে: আমাদের প্রতিপালক যে ওয়াদা আমাদের করেছিল আমরা তা সত্য পেয়েছি। আর তোমাদের ব্যাপারে যে ওয়াদা করেছিল তা কি তোমরা সঠিকভাবে পেয়েছ? এ প্রশ্নের মাধ্যমে জাহান্নামীদের সাথে যে উপহাস করা হয়েছে তা সুস্পষ্ট। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা তা অস্বীকার করতে পারবে না; বরং স্বীকার করতে বাধ্য হবে। এমন সময় ঘোষক উভয় দলের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেবে, জালিমদের ওপর আল্লাহর লা’নত।

তারপর আমরা আ’রাফবাসীদের সামনে গিয়ে দেখতে পাই তারা জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। একটি উঁচু দেয়ালের ওপর কিছু লোকের সমাবেশ। যেখান থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম দুটোই দেখা যায়। জান্নাতীদের দেখা মাত্র তারা সালাম ও সম্বর্ধনা দিচ্ছে আর যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামীদের ওপর গিয়ে পড়ছে সাথে সাথে তারা তাদেরকে তিরষ্কার ও ভর্ৎসনা করছে এবং তাদেরকে সম্বাধন করে বলছে: তোমরা তো জান্নাতীদের ব্যাপারে পৃথিবীতে কসম করে বলতে, তাদের ওপর আল্লাহর মেহেরবানী হবে না। আজ দেখতো তারা কোথায়? জান্নাতে কতো শান-শওকত ও সম্মান-মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করছে।

তারপর আমরা দেখতে পাই জাহান্নামীদের কাছে খাদ্য ও পানীয়ের জন্য আবদার করছে। জান্নাতীদের সামনে আল্লাহ সমস্ত নিয়ামত উপস্থিত রেখেছেন কিন্তু তারা একথা বলেই তাদেরকে বিদায় করে দিচ্ছে যে, আল্লাহ কাফিরদের জন্য জান্নাতের খাদ্য ও পানীয় এ উভয়টি হারাম করে দিয়েছেন।

এ হচ্ছে কিয়ামতের দৃশ্য, জান্নাত ও জাহান্নামের শান্তি ও শাস্তির দৃশ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- পাঠকগণ যখন আয়াতগুলো পড়েন তখন কি তারা এ ঘটনাগুলোকে ভবিষ্যতে ঘটবে বলে মনে করেন? না একথা মনে করেন যে, ঘটনাগুলো এ মুহূর্তে এবং আমার চোখের সামনেই ঘটে চলেছে?

আল্লাহর কসম! আমি যখনই এ আয়াতগুলো পড়েছ, তখনই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি সম্পূরণরূপে ভুলে গেছি যে, এ ঘটনাগুলো কুরআনী বিষয়ের আবরণে আমি দেখতে পাচ্ছি। বরং আমার মনে হয়েছে, আমি আমার নিজের চোখে সমস্ত ঘটনা সংঘটিত হতে দেখছি, যে ছবি কল্পনা নয়- চাক্ষুস। সত্যি কথা বলতে কি, এটি আল-কুরআনের অলৌকিক এক কৌশল এবং শিল্প নৈপুণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ আলোচনা এখানে শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে- আল কুরআন যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, তার মধ্যে একটি উদ্দেশ্য এমনও আছে যা বাহ্যত চিত্রায়নের সুত্র থেকে ব্যতিক্রম মনে হয়। তা হচ্ছে কুরআন যুক্তি-তর্কের সাহায্যে দ্বীনের দিকে লোকদেরকে আহ্বান করে।

তা আল-কুরআনের প্রকৃতি এবং চিত্রায়নের উপকরণ বাদ দিয়ে জ্ঞানগত- উপকরণ গ্রহণ করা যায়। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছুতেও আল-কুরআনেরচিত্রায়নের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এ থেকে বুঝা যায় চিত্রায়নের পদ্ধতি কুরআনের অন্যান্য পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। এ অধ্যায়ে আমিসে প্রসঙ্গেই আলোচনা করতে চাই। সংক্ষেপে উদাহরণসহ আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। বিস্তারিত আলোচনা গ্রন্থের শেষ দিকে ভিন্ন এক অধ্যায়ে পেয়ে যাবেন।

৪. প্রাকৃতিক ‍দৃশ্যের মধ্রে স্থির ও চিরন্তনী দৃশ্য হচ্ছে সর্বদা প্রকাশমান আকাশ। মানুষকে আকাশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল-কুরআনে অনেক জায়গায় বলা হয়েছে, দেখ, এটি আল্লাহর কুদরতের এক শক্তিশালী প্রমাণ। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

তিনি আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতপর তা মেঘমালাকে সঞ্চারিত করে। তারপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছে আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে স্তরে স্তরে রাখেন। অতপর তুমি তা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হতে দেখ। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছে তা পৌঁছে দেন, তখন তারা আনন্দিত হয়। তারা প্রথম থেকেই তাদের প্রতি এ বৃষ্টি বর্ষিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিরাশ ছিল্ অতএব, আল্লাহর রহমতের ফল দেখে নাও; কিভাবে তিনি মৃত জমিনকে জীবিত করেন। অবশ্যই তিনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন এবং প্রতিটি বস্তুর ওপরই তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সূরা আর-রূম: ৪৮-৫০)

লক্ষ্য করে দেখুন, কিভাবে আল্লাহর কুদরত কাজ করছে। বাতাস প্রবাহিত হওয়া, তারপর সেই বাতাস কর্তৃক জলীয় বাষ্পকে ধারণ করা, অতপর তা মেঘমালায় রূপান্তর হওয়া এবং সর্বশেষে মেঘ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া। আর তা সাধারণ মানুষের খুশির কারণ হওয়া। উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত-শুষ্ক জমিনকে জীবিত ও তরতাজা করা। এসব দৃশ্য যখন একের পর এক মানসপটে ভেসে উঠে তখন মানুষের অবচেতন মন প্রভাবিত না হয়েই পারে না। পরিশেষে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে

(আরবী*********)

নিশ্চয়ই তিনি মৃতকে জীবিতকারী এবফ প্রতিটি বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান।

৫. ৪নং দৃশ্যের পরিধি ছিল ব্যাপক কিন্তু ৫নং দৃশ্যটি জমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট। দুটো দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। চিন্তা করে দেখুন-

(আরবী**********)

তুমি কি দেখনি, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং সেই পানি জমিনের ঝর্ণাসমূহে প্রবাহিত করেন, তারপর সেই পানি দিয়ে রঙ-বেরঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতপর তা শুকিয়ে যায়, যা তোমরা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ সেগুলো খড়কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয়ই এতে বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশ রয়েছে। (যুমার: ২১)

এটি জমিনর এক চিত্র। এ চিত্রে জমিনের বিভিন্ন অবস্থার কথা বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি অবস্থা মানুষকে চোখে দেখার চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়। দেখুন আসমান থেকে বৃষ্টি হয। সে বৃষ্টিতে জমিন রঙ-বেরঙের ফল-ফসলে ভরে যায়। আবার সে ফসল পেকে বাদামী রঙ ধারণ করে। এক সময় সেগুলো খড়কুটোয় পরিণত হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়। এ আয়াতে (***) (ছুম্মা) শব্দটি যেভাবে ও যে জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে তাতে চোখ ও মনকে চিন্তা-ভাবনার পূর্ণ সুযোগ করে দেয়, দ্বিতীয অবস্থা চোখের সামনে উদ্ভাসিত হওয়ার পূর্বেই। কোন দৃশ্যকে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরতে যে ধরনের বিন্যাস ও উপস্থাপনার প্রয়োজন, তা এখানে বিদ্যমা। (সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে- ইনশাআল্লাহ্‌)

৬. কিছু ছবি তো সম্পূর্ণ জীবন্ত। দেখুন- পাখী পা গুটিয়ে শুধু ডানায় ভর করে আকাশে উড়ে বেড়ায়। আবার অবতরণের মুহূর্তে পায়ে ভর করে দাঁড়ায়। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

তারা কি তাদের মাঝার ওপর পাখী বিস্তারকারী ও পাখী সংকোচনকারী উড়ন্ত পাখীদেরকে লক্ষ্য করে না? রহমান আল্লাহই তাদেরকে স্থির রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপরই দৃষ্টি রাখেন। (সূরা আল-মুলক: ১৯)

এ আয়াতে দুটো দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম পাখী আকাশে ডানা মেলে উড়ে এবং উড়ার সময় সে তার পা গুটিয়ে রাখে। দ্বিতীয়ত, অবততরণের মুহূর্তে সে পায়ে ভর করে দাঁড়ানের জন্য আগেই পা দুটো বের করে নেয়। এ চিত্র মানুষ হর-হামেশাই দেখে থাকে কিন্তু কখনো এ বিষয়ে তারা মাথা ঘামায় না। আল-কুরআন মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আল্লাহর এক কুদরতি নিদর্শন।

৭. জমিনে বারবার আরেকটি দৃশ্যের অবতারণা হয় কিন্তু মানুষ চোখ মেলে তা দেখে না এবং এ ব্যাপারে সে দেখার প্রয়োজন অনুভব করে না। যদি এর রহস্য নিয়ে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করতো তবে রহস্যের নতুন দিগন্ত তার সামনে উন্মোচিত হতো, এটি হচ্ছে শরীরী বস্তুর ছায়া, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে স্থির মনে হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সূক্ষ্মভাবে তা চলমান। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী************)

তুমি কি তোমার পালনকর্তাকে দেখ না, তিনি কিভাবে ছায়া বিস্তৃত করেন? তিনি ইচ্ছে করলে একে স্থির রাখতে পারেন। এরপর আমি সূর্যকে করেছি এর নির্দেশক। অতপর আমি একে নিজের দিকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনি। (সূরা আল-ফুরকান: ৪৫-৪৬)

উল্লেখিত আয়াত দুটো মানুষের চিন্তার জগতে দোলা দেয়। মন ও মানসকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীতে এ ধরনের দৃশ্যের অভাব নেই, যা প্রতিমুহূর্তে আমাদের দৃষ্টিগোচর না হয়। কিন্তু যখন তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় তখন তা এক নতুন বস্তু হিসেবে প্রতিভাত হয়ে উঠে। আর এটি তখনই সম্ভব যখন কোন দৃশ্যকে প্রত্যক্ষ করা হয় চোখ, মন ও মস্তিষ্ক দিয়ে একযোগে।

৮. পৃথিবীতে এমন বহু জিনিস আছে যাকে শিক্ষামূলক মনে করা হয়। কিন্তু মানুষের অনুভূতিতে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় তা হচ্ছে কোন জাতির ধ্বংসাবশেষ। চোখ তা বাহ্যিকভাবে প্রত্যক্ষ করে এবং মনের চোখ তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তাই আল-কুরআন অপরাধীদের পরিণতি সম্পর্কে মানুষের চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলার জন্য তাদেরকে এ দুর্বল দিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং দেখে না, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণামকী হয়েছে? তারা তাদের চেয়ে বেশি শক্তিশাী ছিল, তারা জমি চাষ করতো এবং তাদের চেয়ে বেশি ফসল ফলাত। তাদের কাছে রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে এসেছিল। বস্তুত আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিল না বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। (আর-রূম: ৯)

উপরোক্ত আলোচনা একথাই প্রমাণ করে যে, আল-কুরআন চিত্রায়ণ ও দৃশ্যায়ন পদ্ধতিকে একটি স্টাইল হিসেবে গ্রহণ করেছে। এজন্য চিত্রায়ণ পদ্ধতিটি মূল ভিত্তির গুরুত্ব রাখে। এ পদ্ধতিটি সার্বিক বিষয় ও উদ্দেশ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। এটি কুরআনের এমন এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য যা কুরআন বিশেষজ্ঞগণ আল-কুরআনের ছত্রে ছত্রে তা পেয়ে থাকেন।

চতুর্থ অধ্যায়

কল্পনা ও রূপায়ণ

আমরা বলছি দৃশ্যায়ণ ও চিত্রায়ণের মাধ্যমে নিজস্ব স্টাইলে আল-কুরআন তার বক্তব্য পেশ করেছে। যা আল-কুরআনের বর্ণনা রীতির মূল বা ভীত্তি স্বরূপ। তাই বলে একথার অর্থ এই নয় যে, দীর্ঘ বিষয়বস্তুর গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে, আর আমরা তার পুরোপুরি হক আদায় করে ফেলেছি। বরং বিষয়বস্তুর গুরুত্ব স্বাতন্ত্রভাবে আজও পুরোপুরি বিদ্যমান। সে কথা সামনে রেখেও পৃথক অধ্যায় রচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

প্রশ্ন হতে পারে, এ চিত্রগুলো কোন্‌ ভিত্তির ওপর স্থাপিত? বিগত অধ্যায়ের শুরুতে আমরা এ প্রসেঙ্গ আভাস দিয়েছি। আমরা সেখানে বলেছি, কোন কোন সময় চিন্তার জগৎ থেকে বাস্তব জগতের দিকে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। অর্থাৎ কল্পিত বিষয়কে ইন্দ্রিয়ানুভূতির বিষয়ে পরিণত করা। তেমনিবাবে মানুষের স্বরূপ এবং প্রকৃতিকেও বোধগম্য চিত্রে উপস্থাপন করা হয়। অনেক সময় অনুভবের বিষয়কে কল্পিত চিত্রে প্রকাশ করা হয। তারপর সেই চিত্রকে গতিশীল করার জন্য তার মধ্যে জৈবিক তৎপরতা সৃষ্টি করা হয়। ফলে তা চিন্তার জগৎকে আলোড়িত করে তোলে। তখন ইন্দ্রিয়াতীত বস্তু এক জীবন্ত চলমান ছবি হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠে। চাই তা কোন দুর্ঘটনার ছবি হোক, কিংবা কোন সাদারণ বা ঘটনামূলক ছবিই হোক। জীবন ও গতির সাথে সাথে যদি তাকে বাকশক্তি দেয়া হয়, তবে সেখানে কল্পনার সমস্ত উপাদানই জমা হয়ে যায়, কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। বিগত আলোচনায় আমি যে সমস্ত উদাহরণ ও উপমা পেশ করেছি সেগুলো আমার এ বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে। যদিও সেই অধ্যায়ে ঐগুলো আলোচনা করার উদ্দেশ্য ছিল, বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আল-কুরআন কিভাবে চিত্রায়ণ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে সেই ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু এ অধ্যায় শুধুমাত্র বিগত উপমার উদ্ধৃতিকে আমরা যথেষ্ট মনে করবো না। তার কারণ আল-কুরআন আমাদের কাছে বিদ্যমান। যা নতুন নতুন উদাহরণ ও উপমায় পরিপূর্ণ। আমরা সেখান থেকে এমন কিছু উপমা নির্বাচন করবো যা নির্দিষ্ট বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে নির্দেশ করবে এবং তা হবে কল্পনা ও অনুভবের রূপায়ণের নিয়ম-নীতি সংক্রান্ত।

তাখঈল বা কল্পনা

কুরআনী চিত্রের মধ্যে এমন চিত্র কমই আছে যা নিরব ও নির্বাক অবস্থায় আমাদের সামনে আসে। অধিকাংশ ছবিতেই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উদ্দীপনা পাওয়া যায়। এ উদ্দীপনাই জীবনের স্পন্দন জাগায় এবং তা হয়ে উঠে চলমান। মনে রাখতে হবে, চিন্তাকে আলোড়িত করার ব্যাপারটি শুধুমাত্র কিছু দুর্ঘটনা বা কিয়ামতের দৃশ্য অথবা শান্তি ও শাস্তির দৃশ্যাবলীর মধ্যেই নয় বরং তা এমন জায়গায়ও আছে যেখানে তার আশাও করা যায় না।

আমরা বলতে চাই, এই আলোড়নের ধরন ও প্রকৃতি কী। উল্লেখ্য যে, এ ধরনের জীবন স্পন্দনের কাজরণেই প্রকাশ্য বস্তুসমূহকে জীবন্ত মনে হয়। মানুষের কাছে যে জীবন অদৃশ্য তাও এ উদ্দীপনার বাইরে নয়। এ উদ্দীপনাকে আমরা ‘তাখঈল হাস্‌সী’ বা কল্পিত অনুভূতি বলে অভিহিত করবো। আল-কুরআনের প্রতিটি চিত্রের মধ্যেই এ উদ্দীপনা বিদ্যমান। জীবনের এ স্পন্দন প্রতিটি চিত্রের মধ্যেই এমনভাবে উপস্থিত, যেভাবে জীবনের বিভিন্ন ধারা ও প্রকৃতি পরিলক্ষিত হয়।

তাজসীম বা রূপায়ণ

আল-কুরআনে চিত্রায়ণের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় পাওয়া যায়, যা রূপায়ণ তা তাজসীম-এর ভিত্তি বলে গণ্য করা যায়। এ বিষয়ে কুরআন অগ্রসর হয়ে অনেক দূর পর্যন্ত গেছে। এমনকি যেসব বিষয তার মুল ধারা থেকে পৃথক রাখা প্রয়োজন ইসলাম তাকে উন্মুক্ত করে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। অনেক সময় সেগুলোকেও দৈহিক আকারে উপস্থাপন করা হয। যেমন আল্লাহ্‌ তা’আলার যাত ও সিফাত (সত্তা ও গুণাবলী)। এ থেকে অকাট্যভাবেযে কথাটি আমাদের সামনে চলে আসে তা হচ্ছে- রূপায়ণের স্টাইলকে আল-কুরআন অন্যান্য পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য দিয়েছে। কিন্তু সেই সাথে হুশিয়ার করেও দেয়া হয়েছে যে, রূপায়ণের পদ্ধতি অনেক সময় বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনে। এখন আমি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটিকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করব।

ব্যক্তিরূপে প্রকাশ: ১. কল্পনার একটি প্রকার এমন যাকে আমরা তাশখীস বা ব্যক্তিরূপে প্রকাশ বলতে পারি। তাশখীস বলতে বুঝায়, যে বস্তু জীবন থেকে মুক্ত তাকে জীবন দেয়া। মেযন প্রাকৃতিক দৃশ্য কিংবা অন্য কোন জড়বস্তুকে জীবন্ত বোধগম্য আকৃতিতে উপস্থাপন করা হয়। অনেক সময় সেই জীবনকে উন্নত করে মানুষের মতো বানিয়ে দেয়া হয়। তার মধ্যে বাহ্যিক উপকরণ ও অনুভূতি পর্যন্ত শামিল থাকে। প্রাণহীন বস্তুকে মানবিক আগ্রহ, উদ্দীপনা ও চাঞ্চল্য পদ্রান করা হয। যার বদৌলতে তা মানুষের কাছে আসে এবং তাদের সাথে লেনদেনও করে। তাদের সামনে আবির্ভূত হয় বিভিন্ন রঙ ও পোশাকে। ফলে মানুষ তাকে জীবিত মনে করতে বাধ্য হয়। মনে হয় যেন সেনিজের চোখে তা দেখে এবং ইন্দ্রিয় দিয়ে তা অনুভব করছে। তার সূক্ষ্মানুভূতি ও তৎপরতা দেখে মানুষ ভীত বিহ্বলও হয়ে পড়ে। যেমন- একটি আয়াতে সকাল বেলাকে জীবন্ত মনে করে শ্বাস গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। (আরবী****) –সকাল বেলার শপথ যখন তা শ্বাস গ্রহন করে। (আত-তাকভীর: ১৮)

এ আয়অত পাঠ করলে এ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, সকার বেলা’ এর সময়টা জীবন্ত কোন বস্তু, কারণ সে শ্বাস গ্রহণ করে। এমনকি শ্বাস গ্রহণের সময় তার দাঁতগুলোও যেন দৃষ্টিগোচর হয়। এ জীবন শুধু ‘সকালের’ নয় বরং সকল বিশ্ব ও প্রকৃতির বলে মনে হয়। যেমন বলা হয়েছে, রাত দিনকে ধরার জন্য খুব জোরে তার পেছনে দৌড়াচ্ছে কিন্তু তাকে ধরতে পারছে না। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী*********)

তিনি পরিয়ে দেন রাতের ওপর দিনকে। এমতাবস্থায় দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পেছনে আসে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৪)

রাত ও দিনের পরস্পর দৌঁড়ানোর যেমন শেষ নেই তেমনিভাবে মানুষের চিন্তাশক্তিও এদের পেছনে সমানভাবে দৌড়াচ্ছে। আবার দেখুন, রাতের চলাচলের কথা বলা হয়েছে।

(আরবী*******)

এবং শপথ রাতের যখন তা যেতে থাকে। (সূরা আল-ফজর: ৪)

আয়াতটি পাঠ করা মাত্র পাঠকের চোখে ভেসে উঠে পৃথিবীর সীমাহীন পথে রাত নামক বস্তুটি শুধুমাত্র ভ্রমণ করেই যাচ্ছে। অতি পরিচিত এক চিত্র। আবার দেখুন, জমিন ও আসমানকে বুদ্ধিমান মনে কাতের তাদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছে এবং সাথে সাথে তারা জবাবও দিচ্ছে:

(আরবী*********)

তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন, যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ; অতপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন: তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বললো: আমরা স্বেচ্ছায় এলাম।

পাঠক কল্পনার চোখে দেখুন, আসমান ও পৃথিবীকে ডাকা হচ্ছে। তারা সে ডাকে সাড়াও দিচ্ছে। দেখুন চন্দ্র, সূর্য, রাত ও দিন নিজস্ব পথে ও নিজস্ব গতিতে চলমান। কিন্তু-

(আরবী*************)

সূর্য নাগাল পায় না চাঁদের এবং রাতের আগে চলে না দিনের। (সূরা ইয়াসীন: ৪০)

রাত এবং দিনের এ পরিভ্রমণ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যেন কখনো কেবল রাত আবার কখনো কেবল দিন একটানা হতে না পারে। জমিনের দিকে দেখুন। মৃত জমিন। সেখানে বৃষ্টির পানি পড়ে। আর অমনি তা নবজীবন লাভ করে জেগে ওঠে।

(আরবী***********)

তুমি জমিনকে পতিত ও বিরাণ দেখতে পাও, তারপর আমি যখন সেখানে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা সতেজ৮ ও স্ফীত হয়ে উঠে এবং সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। (সূরা আল-হাজ্জ: ৫)

অন্যত্র বলা হয়েছে:

(আরবী*******)

তাঁর আরেক নিদর্শন এই যে, তুমি জমিনকে দেখবে বিরাণ- অনুর্বর পড়ে আছে। যখন আমি তার ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন সে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে। (সূরা হা-মীম আস-সাজদা: ৩৯)

এভাবে মৃত-বিরাণ জমিন দেখতে না দেখতেই নবজীন লাভ করে।

জাহান্নামের দৃশ্য: এ হচ্ছে জাহান্নাম। কেমন জাহান্নাম? ধ্বংসাত্মক ও মহাযন্ত্রণাদায়ক বস্তু, যা থেকে কেউ বেচে বের হতে পারে না। যেখানে কোন নড়াচড়া পর্যন্ত করা যাবে না, যাদেরকে পৃথিবীতে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করা হতো কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এখন তাদেরকে জাহান্নামের দিকে ডাকামাত্র এসে হাজির হবে। এটি ঐ জাহান্নাম যে অপরাধীদেরকে দেখে রাগে ফেরে পড়বে এবং ভীষণভাবে তর্জন-গর্জন করতে থাকবে। নিচের আয়াত ক’টি থেকেক সে চিত্রে কিছুটা প্রকাশ ঘটেছে:

(আরবী***********)

সেদিন আমি জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবো, তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছো? সে উত্তর দেবে আরো আছে কি (সূরা ক্বাফ: ৩০)

(আরবী**********)

জাহান্নাম যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা তার জর্গন ও হুংকার শুনতে পাবে। (সূরা আল-ফুরকান: ১২)

(আরবী************)

যখন তারা সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তার ক্ষিপ্ত গর্জন শুনতে পাবে। ক্রোধে জাহান্নম ফেটে পড়বে। (সূরা আল মুল্‌ক: ৭-৮)

(আরবী************)

কখনো নয়। নিশ্চয়ই এটি লেলিহান আগুন। যা চামড়া ঝলসে দেয়। তা সেই ব্যক্তিকে ডাকবে যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল ও বিমুখ ছিল। ধন-সম্পদ জমা করে তা আগলে রেখেছিল।

অপরাধীরা যে ছায়ায় আশ্রয়ের জন্য আসবে তার অবস্থা হচ্ছে:

(আরবী*******)

ধূয়ার কুণ্ডুলীর ছায়া, যা শীতলও নয় এবং আরামদায়কও নয়। (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৪৩-৪৪)

সেই ছায়ায় জাহান্নামীদের দম বন্ধ হয়ে আসবে এবং তারা দিশেহারা হয়ে যাবে।সে ছায়া তাদের জন্য শীত কিংবা আরামদায়ক হবে না। এমনকি তা দেখতেও সুন্দর দেখাবে না।

আর দেখুন, বৃষ্টির পানি ভর্তি বায়ুর চলাচল:

(আরবী**********)

আমি পানি ভরা বাসাত পরিচালনা করি এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি। (সূরা আল-হিজর: ২২)

বাতাসকে (***) (বৃষ্টি দ্বারা গর্ভবতী) বলে তার মধ্যে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করা হয়েছে। মনে হয় পানির দ্বারা বাতাস গর্ভবতী হয় এবং বৃষ্টি বর্ষণ করে তা গর্ভমুক্ত হয়।

আবার বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যখন মূসার রাগ পড়ে গেল, তখন তিনি তখতীগুলো তুলে নিলেন।

(আরবী**********)

অতপর যখন ইবরাহীমের আতংক দূর হলো এবং সুসংবাদ এসে গেল, তখন সে আমার সাথে তর্ক শুরু করলো কওমের লূত সম্পর্কে।

দেখুন, উপরোক্ত আয়াত দুটোতে (***) (রাগ)-কে তীব্র আকার ধারণ ও কমে যাওয়া এবং (***) (ভয়)-এর বিদূরিত হওয়া, আর (***) (সুসংবাদ) এর যাওয়অ আসা করার কথা বলা হয়েছে। মনে হয় এগুলো জীবিত কোন বস্তু। যার মধ্যে প্রাণের সাড়া পাওয়া যায়।

২. তাখঈল বা কল্পনার আরেকটির ধরন হচ্ছে, চলমান ছবি হয়ে সামনে উপস্থিত হওয়া। যার মাধ্যমে কোন অবস্থা বা কোন একটি অর্থকে বুঝানো হয়। যেমন- ঐ ব্যক্তির চিত্র, যে প্রান্তিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। অবস্থা ভাল দেখলে সে পরিতৃপ্ত হয় আর যদি কোন পরীক্ষায় নিমজ্জিত হয় তবে ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। অথবা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুসলমানদের চিত্র, যারা আগুনের এক গর্তের কিনারে অবস্থান করছিল। অথবা ঐ ব্যক্তির উদাহরণ- যে তার ঘরের ভিত্তি এমন গর্তের কিনারে স্থাপন করে যা অট্টালিকাসহ তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবে। এগুলো এমন সব চিত্র যা প্রাণ চঞ্চলতায় ভরপুর। শেষ চিত্রটিতো পূর্ণতার শীর্ষে পৌঁছে গেছে। যে সম্পর্কে আমি ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি।

হৃষ্টপুষ্ট এক উট সূচের ছিদ্র পথে প্রবেশের চেষ্টারত চিত্রটি তাখঈলের আরেকটি উদাহরণ। যা কাফিরদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, তারা কোন অবস্থাতেই ক্ষমা পাবে না এবং জান্নাতেও যেতে পারবে না। এমন আজাব চলমান উদাহরণে চিন্তাশক্তি হতবাক হয়ে যায়। কারণ, চিন্তা যতোক্ষণ তার অনুগত থাকবে ততোক্ষণ এর গিত পূর্ণ হতে পারে না এবং তা শরীরী অবস্থায় আসার পরও বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে:”

(আরবী**********)

বলো, আমার পালনকর্তার কথা লিখার জন্য যদি সমুদ্রের পানি কালি হয়, তবে আমার পালনকর্তার কথা লিখা শেষ হওয়ার আগেই তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। যদি তার সাথে আরেকটি সমুদ্রের পানি যোগ করা হয়- তাও। (সূরা আল-কাহ্‌ফ : ১০৯)

এ আয়াত পাঠে সদা চলমান যে ছবিটি চিন্তার জগতকে আচ্ছন্ন করে রাখে তা হচ্ছে- সমুদ্রের পানি দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা লিখা হচ্ছে কিন্তু তা শেষ হচ্ছে না। শেষ করা যাবে না। এ এক গতিশীল বিরামহীন চিত্র। সমুদ্রের পানি শেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আল্লাহর প্রশংসা লিখে শেষ করা যাচ্ছে না। এভাবেই এ গতিশীলতা পূর্ণতায় পৌঁছে যায়।

নিচের আয়াতগুলো থেকে মানসপটে যে ছবিটি ফুটে উঠে তাও উপরোক্ত চিত্রের সাথে মিলে যায়।

(আরবী**********)

তারপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে কৃতকার্য। (সূরা আলে-ইমরান: ১৮৫)

(আরবী**********)

এরূপ আয়ুপ্রাপ্তি তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। (সূরা বাকারাহ: ৯৬)

এ আয়অতে (***) শব্দ থেকেই গতিশীলতা অনুভূত হয় যা কল্পনায় চলমান ছবি হিসেবে প্রতিভাত হয়ে উঠে। এ এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা আমরা আরেকটু সামনে অগ্রসর হয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারবো।

এ গতিশীলতা থেকে কল্পনার চোখে ভেসে উঠে, কোন ব্যক্তি আগুনের গর্তের কিনারে দাঁড়ানো। আর তার লেলিহান শিখা সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে।

৩. তাখঈল বা কল্পনার আরেকটি ধরন হচ্ছে- যা কল্পনায় গতির সৃষ্টি হয়। কতিপয় শব্দের মাধ্যমে তা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়। যেমন-

(আরবী**********)

আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করবো, অতপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলোকণায় পরিণত করে দেব। (সূরা আল-ফুরকান: ২৩)

আমরা ইতোপূর্বে ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি, আমলকে ধুলোকণায় পরিণত করার অর্থ তাদের কৃতকর্মকে নষ্ট করে দেয়া। এটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য একটি চিত্র। এখন আমরা কাদিমনা (***) শব্দটির তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করবো। এ শব্দটি বুঝানো হয়েছে, তাদের সৎকর্মসমূহ ধ্বংস করে দেয়ার পূর্বে সামনে উপস্থিত করা হবে। যদি বাক্য থকে কাদিমনা শব্দটি বিলুপ্তি করা হয় তবে চিন্তার সূত্রটি ছিন্ন হয়ে যায়। সাথে সাথে সমস্ত সৌন্দর্য (যা ঐ শব্দটির সাথে জড়িত) তাও আর অবশিষ্ট থাকে না যদিও ধুলোকণার নড়াচড়া তখনো অব্যাহত থাকে। নিচের আয়াতটিও একটি সুন্দর উদাহরণ।

(আরবী**********)

বল, আমি কি আল্লাহ ছাড়া এমন কোন কিছুকে আহ্বান করবো, যা আমাদের কোন কল্যাণ করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না। আমরা কি পেছন দিকে ফিরে যাব? (সূরা আল-আনআম: ৭১)

এ আয়াতে (******) বাক্যাংশ দিয়ে দ্বীন থেকে ফিরে যাওয়া ইন্দ্রিয়াতীত বস্তু তাকে ইন্দ্রিয়ানুভূত অবস্থায় বর্ণনা করা হয়েছে। এভাবেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। পরবর্তী আয়াতটিও এ রকম একটি উদাহরণ:

(আরবী**********)

আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না, নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা আল-বাকারা: ১৬৮)

উদ্দেশ্য ছিল- ‘তোমরা শয়তানের অনুসরণ করো না’ একথা বলা। কিন্তু (***) অনুসরণ করো না) এবং (***) (পদাংক) শব্দ দুটো দিয়ে শয়তানের চলাচরের ছবি আঁকা হয়েছে। মনে হচ্ছে শয়তান আগে আগে চলছে এবং মানুষ (যারা তার অনুসারী) তার পিছে পিছে পায়ের দাগ অনুসরণ করে চলছে। অদ্ভুদ একটি ছবি। শয়তান এমন এক অশুভ শক্তি যে মানব পিতা আদম (আ)-কে জান্নাত থেকে বের করার ব্যবস্থা করেছিল। তবু মানুষ এখনও তার অনুসরণ করে।

এ রকম আরেকটি আয়াত:

(আরবী**********)

তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দাও, সেই লোকের অবস্থা, যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম, অথচ সে তা পরিচার করে বেরিয়ে গেছে। তার পেছনে লেগেছে শয়তান, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। (সূরা আরাফ: ১৭৫)

এ আয়াত এবং তার আগের আয়াতের মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। এ আয়াতে শয়তানকে গুমরাহ ব্যক্তির পেছনে নেয়া হয়েছে। আগের আয়াতে শয়তানের পেছনে চরা নিষেধ করা হয়েছে, আর এখানে খোদ শয়তানই পিছে লেগেছে।

নিচের আয়াতটিও এ বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে:

(আরবী**********)

(হে বান্দা) যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে লেগে যেও না। (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৬)

এখানে জ্ঞঅনকে দেহ বিশিষ্ট বস্তু কল্পনা করা হয়েছে।

৪. কল্পনার আরেটি ধরন হচ্ছে, তা দ্রুত এবং একের পর এক দৃশ্যমানে হয়। আমরা ইতোপূর্বে এ ধরনের উদাহরণ পেশ করেছি। অর্থাৎ মুশরিকদের তৎপরতা, যাদের সম্পর্কে নিচের আয়াতে বলা হয়েছে।

(আরবী**********)

যে আল্লাহর সাথে শরীক করলো, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল। অতপর মৃতভোজী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। (সূরা হজ্জ: ৩১)

নিচের আয়াতটিতেও একটি সাদৃশ্যতা আছে:

(আরবী**********)

যে ধারণা করে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ কখনো তাঁর রাসুলকে সাহায্য করবেন না, সে যেন একটি রশি আকাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে নেয়, তারপর তা কেটে দেয় এবং দেখে তার এ কৌশল তার আক্রোশকে দূর করতে পারে কিনা? (সূরা আল-হাজ্জ: ১৫)

এ আয়াতে আশ্চর্য এক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি এরূপ কুধারণা পোষণ করে যে, আল্লাহ তাঁর নবীকে সাহায্য করবেন না। সে শুধু শুধু মনকে ব্যাথা ভারাক্রান্ত করে তুলে। যে ব্যক্তি এ অবস্থায় ধৈর্যধারণ করতে পারে না অথবা আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার মানসিকতা রাখে না, তার উচিত অবস্থাকে পরিবর্তন করে কাংখিত মানে নিয়ে যাওয়া। আসলে আসমানে রশি রাগিয়ে তাতে আরোহণ করা যেমন অসম্ভব। অবস্থার পরিবর্তন করাও তার জন্য তেমন অসম্ভব। যদি আসমানেরশি লাগিযে তাতে আরোহণের চেষ্টা করে এবং ব্যর্থ হয়ে রশিকে ছিঁড়ে এবং জমিন পড়ার পর হয়তো তা নিয়ে কিছুটা চিন্তা করার সুযোগ থাকে।

পরবর্তী আয়াতটিতেও এ ধরনের বক্তব্য পেশ করা হয়েছে:

(আরবী**********)

আর যদি তাদের অবজ্ঞা তোমার নিকট কষ্টদায়ক হয়, তবে জমিনে কোন সুরঙগ খুঁজে বের করো কিংবা আকাশে কোন সিঁড়ি লাগিয়ে নাও এবং তাদেরকে কোন নিদর্শন এনে দিতে পার তবে তা নিয়ে এসো। (সূরা আল-আন’আম: ৩৫)

রাসূলে আকরাম (সা)-এর আহ্বানে প্রতি কাফিরদের অবজ্ঞা প্রদর্শন তাঁর কাছেবড় অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিল। তিনি চাইতেন যদি যুৎসই কোন মু’জিযা এনে তাদেরকে দেখাতে পারতেন তবে হয়তো তারা ঈমান এনে সোজা পথে চলতো। এ আয়াত স্বয়ং নবী করীম (স)-কে সম্বোধন করে অবতীর্ণ হয়েছে। এজন্য তাঁর মান-মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে অত্যন্ত শালীন ও মার্জিত ভাষায় এবং সূক্ষ্ম রসিকতার সাথে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এটি কল্পিত চিত্রের উৎকৃষ্ট এক নমুনা, যেখানে শৈল্পিক সৌন্দর্য পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান।

৫. কল্পনার আরেকটি স্টাইল হচ্ছে- জড় বস্তুকে গতিশীল হিসেবে পেশ করা। (আরবী**********)

বার্ধক্যে মাথা সাদা হয়ে গিয়েছে। (সূরা মারইয়াম: ৪)

এ আয়াতে সাদা চুলকে জ্বলন্ত আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সাদা চুলকে কল্পনায় এমন পর্যায়ে পৌঁছান হয়েছে, যেভাবে শুষ্ক খড়কুটা আগুনের হাল্কায় জ্বলে উঠে। এ কারণেই আয়াতটিতে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে। যা আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি।

রূপায়ণ: আগের অধ্যায়ে আমরা রূপায়ণের বেশ কিছু উদাহরণ বর্ণনা করেছি। উপমেয় বাক্য এজন্যই ব্যবহৃত হয় যাতে তার অন্তর্নিহিত অবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট অবয়বে পরিবর্তন করা যায়। এটি তাজসমি বা রূপায়ণের সাথেও সংশ্লিষ্ট। নিচে আমরা কয়েকটি উদাহরণ পেশ করলাম।

(আরবী**********)

যারা তাদের পালনকর্তার সত্তায় বিশ্বাস করে না তাদের কর্মসমূহ যেন ছাইভস্ম, যার ওপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধুলোঝড়ের দিন। (সরা ইবরাহীম: ১৮)

(আরবী**********)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়েনিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ করো না সেই ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। তার দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর কিছু মাটি পড়েছিল।

(আরবী**********)

যারা আল্লাহর রাস্তায় তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং নিজের মনকে দৃঢ় করার জন্য স্বীয় সম্পদ দান করে তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মতো। (সূরা আল-বাকারা: ২৬৫)

(আরবী**********)

তুমি কি লক্ষ্য করো না, আল্লাহ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেন: পবিত্র কথা হচ্ছে বৃক্ষের মতো। তার শেকড় মজবুত এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত। সে পালনকর্তার নির্দেশে অহরহ ফল প্রদান করে। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং নোংরা কথার উদাহরণ হচ্ছে নোংরা বৃক্ষ। একে মাটির ওপর থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। এর কোন স্থিতি নেই। (সূরা ইবরাহীম: ২৪-১৬)

মনে রাখতে হবে, আমাদের মতে শুধু বোধগম্য কোন বস্তুর সাথে তুলনা করার নামই রূপায়ণ নয়। কেননা এতো সাধারণ কথা, ইন্দ্রিয়াতীত কোন বিষয়কে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোন বিষয়ের সাথেতই তুলনা দেয়া হয়। আমাদের কাছে রূপায়ণের অর্থ হচ্ছে- ইন্দ্রিয়াতীত কোন বিষয়কে শুধু তুলনা ও উপমার সাহায্যে মূর্তমান না করে বরং ঘটনার মাধ্যমেই দেহাবয়ব গঠন ও মূর্তমান করে তোলা। যেমন:

(আরবী**********)

যেদনি প্রত্যেকেই চোখের সামনে দেখতে পাবে সে যা ভাল করেছে তা এবং যা মন্দ করেছে তাও। তখন তারা কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের বিস্তর ব্যবধান থাকতো। (সূরা আলে-ইমরান: ৩০)

(আরবী**********)

তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। তোমার রব্ব কারো প্রাতি জুলুম ক রবেন না। (সূরা আল-কাহফ: ৪৯)

(আরবী**********)

তোমরা নিজের জন্য পূর্বে যে ভাল কর্ম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। (সূরা আল-বাকারা: ১১০)

ওপরের উদাহরণগুলো থেকে বুঝা যায়- আমল একটি অদৃশ্য ও আকার-আকৃতিহীন বস্তু। কিন্তু একে সেদিন বোধগম্য আকার-আকৃতিতে পেশ করা হবে। এর-ই নাম রূপায়ণ বা তাজসীম। মনে হয় আমল কোন মানুষের অবয়ব সেদিন তার কাছে এসে হাজির হবে। সেই সাথে একথাও বুঝা যায় পৃথিবীতে আমল করলে তা আল্লাহর নিকট আমানত থাকে এবং কিয়ামতের দিন যা অবয়ব দান করে বান্দাদের ফেরত দেযা হবে।

গুনাহকে সেদিন এক বিরাট আকৃতির বোঝাতে রূপান্তর করা হবে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********) সেদিন তারা নিজেদের গুনাহর বোঝা নিজেদের পিঠে বহন করবে। (সূরা আন’আম: ৩১)

(আরবী**********) সেদিন কেউ কারো বোঝা বহন করবে না। (সূরা আন’আম: ১৬৪)

ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়কে মূর্তমান করে প্রকাশ করা হয়েছে নিচের আয়াতগুলোতেও। যেমন :

(আরবী**********) আর তোমরা পাথেয় সাথে নিও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। (সূরা আল-বাকারা: ১৯৭)

এ আয়অতে তাকওয়াকে পাথেয় বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

(আরবী**********) আমরা আল্লাহর রঙ ধারণ করেছি। আল্লাহর রঙ্গের চেয়ে উত্তম রঙ আর কারো হতে পারে? (সূরা আল-বাকারা: ১৩৮)

এ আয়অতে আল্লাহর দ্বীনকে রঙ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

(আরবী**********)

হে ঈমানদারগণ! ইসলামের মধ্যে পুরোপুরি প্রবেশ করো।

এ আয়অতে প্রবেশ করা যায় এমন আকৃতিতে ইসলামকে পেশ করা হয়েছে।

(আরবী**********)

 তোমরা প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন গুনাহসমূহ পরিত্যাগ করো। (আন আ’ম: ১২০)

এ আয়াতে গুনাহকে প্রকাশ্য ও প্রচ্চন্নতার সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে।

রূপক অর্তে ব্যবহৃত সংকীর্ণতা, দুঃখ-দুর্দশা, চিন্তা-বিমর্ষতা ইত্যাদি বিমূল্ত ও অতীন্দ্রিয় বস্তু, কিন্তু পরবর্তী আয়াতগুলোকে একে মূর্তমান করে তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী**********)

আর অপর তিনজন যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল, আর তারা বুঝতে পারল, আল্লাহ ছাড়া আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। (সূরা আত্‌ তাওবা: ১১৮)

বলা হয়েছে- পৃথিবী তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে এসেছিল। এ সংকীর্ণতাকে জমিনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সংকীর্ণতা ও বিমর্ষতা এক বিমূর্ত ও অতীন্দ্রিয় বস্তু কিন্তু এ আয়াতে তাকে মূর্তমান করে দেখানো হয়েছে। যেসব সাহাবা নবী করীম (স)-এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তাদের অবস্থাকে মূর্তমান করে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা পেছনে থেকে যাওয়ায় এতো লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং এতো বিপর্যস্ত ছিলেন যে, তাদের কোন আশ্রয়স্থল ছিল না। সামান্য সময়ের জন্যও তারা একটু স্বস্থিবোধ করেননি, যতোক্ষণ তাদের তওবা আল্লাহর দরবারে গৃহীত না হয়েছে।

এমনি ধরনের আরেকটি আয়াত:

(আরবী**********)

তুমি তাদেরকে আসন্ন দ্বীন সম্পর্কে সতর্ক করো, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। পাপীদের জন্য কোন বন্ধু এবং সুপারিশকারী নেই, যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (সূরা মু’মিন: ১৮)

এ আয়াত থেকে মনে হয় কাঠিন্যের কারণে প্রাণ আসল জায়গা থেকে স্থানান্তর হয়ে কণ্ঠের কাছে চলে আসবে।

(আরবী**********)

অতপর যদি কারো প্রাণ কণ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৮৩-৮৪)

এ আয়াত থেকে বুঝা যায় রূহ একটি শরীরি বস্তু, যা নড়াচড়া করে গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

(আরবী**********)

কিন্তু যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হয়, তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে চুক্তি আছে অথবা তোমাদের কাছে এভাবে আসে, তাদের অন্তর তোমাদের সাথে এবং স্বজাতির সাথে যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক। (সূরা আন-নিসা: ৯০)

অর্থাৎ এই পেরেশানী ও অনিশ্চয়তার কারণে তারা সংকটে পড়ে যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তারা তোমার সাথে মিলে স্বজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, না স্বজাতির সাথে মিলেমিশে তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

৩. কুরআন কাফিরদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইন্দ্রিয়াতীত অবস্থানসমূহের বর্ণনা তুলে ধরতে চায়। কাফিররা কুরআন তো অবশ্যই শোনে কিন্তু এ থেকে তারা কোন কল্যাণ লাভ করতে পারে না। মনে হয় তারা শুনেইনি। কুরআন সেই ইন্দ্রিয়াতীত ব্যাপারটিকে এমনভাবে তুলে ধরেছে মনে হয় কাফির ও কুরআনের মাঝে এমন এক প্রতিবন্ধকতকা রয়েছে যা তাদেরকে কুরআনের পথে আসতে দেয় না। নিচে কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো:

(আরবী**********)

তাদেরকে তো শ্রবণের জায়গা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। (সূরা আল-শু’আরা: ২২)

(আরবী**********)

আমি তাদের অন্তরেরর ওপর আবরণ ফেলে দিয়েছি যেন তারা একে না বুঝে এবং তাদের কানে বোঝা ভরে দিয়েছি। (সূরা আন’আম: ২৫)

(আরবী**********)

তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না, তাদের অন্তর কি তালাবদ্ধ? (সূরা মুহাম্মদ : ২৪)

(আরবী**********)

আমি তাদের ঘারে চিবুক পর্যন্ত বেড়ী পরিয়ে দিয়েছি। ফলে তাদের মস্তক উর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে। আমি তাদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতপর তাদেরকে আবৃত করে দিয়েছি, তাই তারা দেখে না। (সূরা ইয়াসীন: ৮-৯)

(আরবী**********)

আল্লাত তাদের অন্তর ও কানগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখগুলো পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। (সূরা আল-বাকারা: ৭)

(আরবী**********)

আমার স্মরণ থেকে যাদের চোখে আবরণ পড়ে গেছে, তারা শুনতে সক্ষম নয়। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ১০১)

কাফিররা যে ইন্দ্রিয়াতীত বাধার কারণে আল-কুরআনের পথে আসতে পারেনি তা মূর্তমান হয়ে আমাদের সামনে এসেছে। মনে হয় তা এক সদৃশ্য দেয়াল। এভাবেই প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টিকারী বর্ণনার স্টাইল অবলম্বন করা হয়েছে।

৪. অনেক সময় কোন জিনিসের বর্ণনা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ঢংয়ে করা হয়েছে কিন্তু তার বর্ণনা পদ্ধতি এমন যে, প্রথম সম্বোধনেই তার মধ্যে বলিষ্ঠতা ও পরিপুষ্টতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। যেমন: (আরবী**********)

যেদিন আযাব তাদেরকে ঘেরাও করে নেবে মাথার ওপর এবং পায়ের নিচ থেকে। (সূরা আল-আনকাবুত: ৫৫)

অর্থাৎ আযাব তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে। চতুর্দিক না বরে ‘ওপর-নিচ’ বলার কারণ হচ্ছে- এটি ‘চতুর্দিক’ শব্দের চেয়ে প্রভাব সৃষ্টিতে অধিক কার্যকর।

(আরবী**********)

যখন তারা তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, উচ্চভূমি এবং নিম্নভূমি থেকে। (সূরা আল-আহযাব: ১০)

(আরবী**********)

যদি তারা তওরাত, ইঞ্জিল এবং যা প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, পুরোপুরি পালন করতো তবে তারা ওপর থেকে এবং পায়ের নিচ থেকে খেতে পারতো। (সূরা আল-মায়েদা: ৬৬)

(আরবী**********)

তাদের মুখমণ্ডল যেন ঢেকে দেয়া হয়েছে আঁদার রাতের টুকরো দিয়ে। (সূরা ইউনিস: ২৭)

মনে হয় কাফিরদের মুখমণ্ডল যে কালো রঙ ধারণ করবে তা কোন রঙের প্রবেপ নয়; বরং কালো আঁদার রাতের টুকরো, যা দিয়ে তাদের চেহারাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

৫. তাজসীম বা রূপায়ণের আর একটি পদ্ধতি হচ্ছে- অতীন্দ্রিয় বস্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর সাথে সম্পর্কিত করে বর্ণা করা। যেমন এ আয়াতে আযাব বা শাস্তিকে (***) (শক্ত)-এর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতে দিনকে (***) (ভারী) বলে অভিহিত করা হয়েছে।

 (আরবী**********) তাদের পশ্চাতেও রয়েছে কঠিন আযাব। (সূরা ইবরাহীম: ১৭)

(আরবী**********) এরা ভারী দিনকে পেছনে ফেলে রাখে। (সূরা আদ-দাহর: ২৭)

প্রথম আয়াতে আযাবকে এমন এক বিশেষণে বিশেষিত করা হয়েছে, যা লম্বা, চওড়া ও মোটা বলে অভিহিত করা যায়। অন্য কথায় কঠিন শব্দটি বস্তুর সাথেই প্রয়োগ করা হয়।

দ্বিতীয় আয়াতে দিনকে সময় বলে না বুঝিয়ে ঘনো মোটা ওজনদার বস্তু বলে বুঝানো হয়েছে।

৬. অতীন্দ্রিয় বস্তুকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে এমন কিছু উদাহরণ:

(আরবী**********) আল্লাহ কোন মানুষের পেটে দুটো অন্তর রাখেননি। (সূরা আহযাব: ৪)

(আরবী**********) তোমরা ঐ মহিলার মতো হয়ো না, যে পরিশ্রম করে সূতো কেটে তারপর টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। (সূরা আন-নাহল: ৯২)

(আরবী**********)

কেউ যেন কারো গীবত না করে। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? (সূরা আল-হুজরাত: ১২)

প্রথম আয়াতে বুঝানো হয়েছে, পরস্পর বিরপরীতধর্মী কোন বস্তুকে একই অন্তরে জায়গা দেয়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয় আয়াতে বুঝানো হয়েছে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করা ঐ রকম নিষ্ফল কাজ যেমন এক বুড়ি নিজে সূতো কেটে তারপর তা নষ্ট করে ফেল। তৃতীয আয়াতে গীবতের ওপর ঘৃণা সৃষ্টি করার প্রয়াস পেয়েছে। বলা হয়েছে গীবতকারী তার মৃত ভাইয়ের গোশত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়্ কারণ যে উপস্থিত নেই তাকে মৃতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কাজেই যার অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা করা হলো- এ যেন দোষ আলোচনা নয় বরং খুবলে খুবলে তার গোশ্‌ত খাওয়া।

৭. রূপায়ণ পদ্ধতি একটি সাধারণ মূলনীতির মর্যাদা রাখে। যেমন শেষ বিচারের দিন আমলকে একটি অবয়ব দান করে ওজন করার কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********) আমি কিয়ামতের দিন ন্যায় বিচারের মানদণ্ড স্থান করবো। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৭)

(আরবী**********)

অতএব যার পাল্লাহ ভারী হবে সে সুখী জীবন যাপন করবে এবং যার পাল্লা হাল্‌কা হবে, তার ঠিকানা হবে হাবিয়া। (সূরা ক্বারিয়া: ৬-৯)

(আরবী**********)

যদি কোন আমল সরিষা-দানা পরিমাণ হয়, আমি তাও উপস্থিত করবো এবং হিসেবে গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট। (সূরা আম্বিয়া:ধ ৪৭)

(আরবী**********) তাদের ওপর সুতা পরিমাণ জুলুমও করা হবে না। (সূরা আন-নিসা: ৪৯)

(আরবী**********) তাদের ওপর তিল পরিমাণ জুলুমও করা হবে না। (সূরা নিসা: ১২৪)

ওপরের আয়অতগুলোতে আমল এবং মিযানকে শরীরী বস্তু বলে অভিহিত করা হয়েছে।

কল্পনা ও রূপায়ণের যৌথ সমাবেশ

অনেক সময় আল-কুরআনের একই আয়অতে কল্পনা ও রূপায়ণের যৌথ সমাবেশ ঘটে থাকে। অতীন্দ্রিয় বস্তুটি তখন মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শরীরী ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হিসেবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে সেই শরীরী বস্তুটিত কাল্পনিক গতি সঞ্চারও করে দেয়া হয। আমরা আগে যেসব উদাহরণ পেশ করেছি, সেখানে এর নমুনা আছে। কিন্তু আমরা এ নিয়মের আর কিছু নতুন উদাহরণ দিতে চাই। যেন প্রতিটি নিয়মের একাধিক উদাহরণ আমাদের নিকট থাকে। ইরশাদ হচ্ছে

(আরবী**********)

বরং আমি সত্যকে মিথ্যার ওপর নিক্ষেপ করি, অতপর সত্য-মিথ্যার মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। (সূরা আল-আম্বিয়া: ১৮)

(আরবী**********)তিনি তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন (সূরা আল-আহযাব: ২৬)

(আরবী**********) আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্বেষ ঢেলে দিলাম। (সূরা মায়িদা: ৬৪)

(আরবী**********) তারপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তি তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের প্রতি। (সূরা আত তওবা : ২৬)

(আরবী**********) বিনয় ও নম্রতার সাথে তাদের সামনে ঝুঁকে থাকো। (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৪)

উল্লেখিত আয়াতগুলো বার বার পড়ুন এবং চিন্তা করুন। প্রথম আয়াতে মনে হয় সত্য বুঝি এক ধরনের বাতাসের গুলী যা বাতিলের ওপর পড়েতাকে তছনছ করে দেয়। দ্বিতীয় আয়াতে ভীতি এমন এক কঠিন বস্তুরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দূর থেকে নিক্ষেপ করে অন্তরে প্রবেশ করানো যায়। তৃতীয় আয়াত থেমে মনে হয় বিদ্বেষ-শত্রুতা এমন একটি নিরেট বস্তু যা দু’দলের মধ্যে ছুড়ে দেয়া যায়। চতুর্থ আয়াত থেকে বুঝা যায় সান্ত্বনা এক ধরনের বস্তু যা রাসুলে করীম (স) ও ঈমানদারদের ওপর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল এবং পঞ্চম আয়াত থেকে মনে হয় বিনয় ও নম্রতার জন্য বাহু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা সর্বদা তাদের সামনে ঝুঁকে থাকে।

ওপরের সবগুলো উদাহরণ কল্পনা এবং রূপায়ণের একত্রে সমাবেশ ঘটেছে। কারণ এসব উদাহরণ অশরীরী জিনিসকে শরীরীরূপে তুলে ধরা হয়েছে এবং তার মধ্যে কল্পিত গতি সৃষ্টি করা হয়েছে। আরো কয়েকটি উদাহরণের প্রতি লক্ষ্য করুন।

(আরবী**********)

হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পাপ অর্জন করেছে এবং সে পাপ তাকে পরিবেষ্টন করে নিয়েছে। (সূরা আল-বাকারা: ৮১)

(আরবী**********)

শুনে রাখো, তারাতো (পূর্ব থেকেই) ফিতনায় পড়ে গেছে এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এসব কাফিরদরে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। (সূরা তওবা: ৪৯)

প্রথম আয়াতে গুনাহকে এক নিরেট বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পুনরায় পরিবেষ্টন করে রাখা রকথা বলে তার গতিশীলতার কথা বুঝানো হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াত দ্বারা মনে হয় ফিতনা একটি গর্ত। আর কাফিররা সে গর্তে পড়ে গেছে।

(আরবী**********) তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিলিয়ে দিয়ো না। (সূরা বাকারা: ৪২)

অতএব আল্লাহর যে নির্দেশ তুমি পেয়েছ তা তাদেরকে শুনিয়ে দাও। (সূরা হিজর: ৯৪)

প্রথম আয়াত থেকে বুঝা যায় সত্য ও মিথ্যা দুটো নিরেট পদার্থ। যা একটি আরেকটিকে ঢেকে রাখে। দ্বিতীয আয়াতে (***) (চিরে ফেলা) শব্দটি ব্যবহার করায় মনে হয় আল্লাহর নির্দেশ এমন এক বস্তু, যাকে চিরে ফেলা যায় এবং যা অন্য বস্তুতে মিলান যায়।

(আরবী**********)

যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। (সূরা আল-বাকারা: ২৫৭)

(আরবী**********)

আর যে তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর বিশ্বাস করলো, সে এমন একটি হাতল ধরলো যা কখনো ছিন্ন হবার নয়। (সূরা বাকারা: ২৫৬)

প্রথম আয়াতে হেদায়েতকে আলো এবং গুনাহকে অন্ধকারের সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং বের করা কথাটি বলে চিন্তাকে গতিশীল করার প্রয়াস পেয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতে ঈমানকে কঠিন বস্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে যা ভাঙ্গার কিংবা ছিন্ন হবার ভয় নেই।

বর্ণিত উদাহরণগুলোতে দেয়া যায়, যখন অতীন্দ্রিয় বস্তুকে মূল থেকে পৃথক করে শরীরী ও গতিশীল অবস্থায় পেশ করা হয় তখন সেই অর্থ মূর্তমান হয়ে আমাদের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলে।

কুরআনে হাকীমের ঐ সমস্ত জায়গা, যেখানে আল্লাহ তা’আলার যাত ও সিফাতের বর্ণনা করা হয়েছে এবং যেখানে উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে সেখানেও একই স্টাইলে শরীরী চিত্র অংকিত হয়েছে। যেমন:

(আরবী**********) আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপরে। (সূরা আল-ফাতহ: ১০)

(আরবী**********) তার আরশ (তখন) পানির ওপর ছিল। (সূরা হুদ: ৭)

(আরবী**********) তার আসন (ক্ষমতা) আসমান ও জমিনব্যাপী বিস্তৃত। (সূরা বাকারা: ২২৫)

(আরবী**********) অতপর আরশের ওপর গিয়ে দাঁড়ালেন। (সূরা আল-আরফ: ৫৪)

(আরবী**********) তারপর তিনি আসমানের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন এবং তা ছিল ধুম্রকুঞ্জ। (সূরা হামীম সাজদাহ: ১১)

(আরবী**********)

কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতেট মুঠোয় এবং আসমানসমূহ ভাজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। (সূরা আয-যুমার: ৬৭)

(আরবী**********)

হে নবী! যখন তুমি কংকর নিক্ষেপ করছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ করনি আল্লাহই তা নিক্ষেপ করেছেন। (সূরা আল-আনফাল: ১৭)

(আরবী**********) আল্লাহ সংকীর্ণ করেন এবং বিস্তৃত করেন। (সূরা বাকাহরা: ২৪৫)

(আরবী**********) এবং তোমার পালনকর্তা ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে এসে উপস্থিত হবেন। (সূরা আল-ফজর: ২২)

(আরবী**********)

ইহুদীরা বলে: আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরই হাত বন্ধ হোক। একথা বলার জন্য তাদের প্রতি লা’নত। বরং তাঁর উভয় হস্তকে উন্মুক্ত। (সূরা আল-মায়েদা: ৬৪)

(আরবী**********)

যখন আল্লাহ বলেন: হে ঈসা! আমি তোমাকে দুনিয়ায় থাকার সময়কাল পূর্ণ করবো এবং আমার নিকট উঠিয়ে আনবো। (সূরা আলে-ইমরন: ৫৫)

আসল কথাতো তাই ছিল, ওপরে আমরা যা বর্ণনা করেছি। কিন্তু ভাষা ও বাক্যের প্রয়োগ এবং তার তাৎপর্য নিয়ে বা-বিতণ্ডা করা এক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে তাই উপরোক্ত শব্দসমূহ নিয়েও মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এখানে সেরূপ বাক-বিতণ্ডার কোন অবকাশই ছিল না। কারণ এ সমস্ত বাক্যে বক্তব্য পেশ করার এমন স্টাইল অবলম্বন করা হয়েছে যা কুরআনের সাধারণ স্টাইলণ। অর্থাৎ মূল অর্থকে তাজসীম ও তাখয়ীলের পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর এটি এমন এক স্টাইল যেখানে না আছে কোন পশ্চাৎপদতা আর না আছে কোন বক্রতা।

পঞ্চম অধ্যায়

আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাস

যখন আমরা বলি কুরআনী উপকরণের মধ্যে চিত্রায়ণ পদ্ধতি মূল সূত্রের বা ভিত্তির মর্যাদা রাখে এবং কল্পনা ও রূপায়ণ চিত্রায়ণের উজ্জ্বলতম নমুনা। তো এখানেই কথা শেষ নয়। শুধু একথা বলায় না কুরআনের বিশেষত্ব বর্ণনার হক আদায় হয়ে যায় আর না কুরআনের দৃশ্যায়নের পুরো বৈশিষ্ট্যসমূহ সামনে চলে আসে। সত্যি কথা বলতে কি, চিত্রায়ণ, কল্পনা ও রূপায়ণ ছাড়াও কুরআনে বহু আলংকারিক দিক রয়েছে। যতোক্ষণ সে অরণ্যে প্রবেশ করা নয যাবে ততোক্ষণ কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের কথা বলা যেতে পারে, যা দৃশ্যায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।

শৈল্পিক বিন্যাসের ধরন

শৈল্পিক বিন্যাসের কয়েকটি স্তর আছে। বিন্যাসের শৈল্পিক এবং আলংকারিক কতিপয় দিক এমন আছে, যে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ বিশ্লেষণ করেছেন। আবার এমন কিছু দিকও আছে যে সবের মধ্যে তাদের স্পর্শ পর্যন্ত পড়েনি।

১. বিন্যাসের একটি ধরন, যার সম্পর্ক ইবাদতের বিন্যাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- উপযোগী কিছু শব্দচয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিন্যাস করায়। যার বদৌলতে সে বাক্য কথা বা পরিশীলনে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ বিষয়ে এতো বেশি আলোচনা হয়েছে যে, নতুন করে আর কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা নেই।

২. বিন্যাসের আরেকটি সম্পর্ক হচ্ছে, সুর ও ছন্দের সাথে। যা শব্দের সঠিক চয়ন এবং তাকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে বিন্যাসের দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটি আল-কুরআনে পুরো মাত্রায় দৃষ্টিগোচর হয় এবং কুরআনের শৈল্পিক ভিত্তিতে তা একাকার হয়ে আছে। তবু আগের মনীষীগণের দৃষ্টি বাহ্যিক সুর ও ছন্দ ছাড়িয়ে আগে বাড়তে পারেনি। এমনকি তারা এটিও জানতেন না যে সঙ্গীতের সুর, তাল ও মাত্রার সংখ্যা কতো এবং তা কোন ঢংয়ে কোথায় ব্যবহৃত হয়।

৩. অলংকার শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ আল-কুরানের বিন্যাসের আলংকারিক যেসব দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তার একটি হচ্ছে, আল-কুরআনের আয়অতের শেষ অথবা বক্তব্যের শেষ করা হয়েছে বক্তব্যের সাথে সংগতি রেখে। যেমন- যেসব আয়াতে আল্লাহ তা’আলার যাত ও সিফাতের বর্ণনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: (আরবী**********) বাক্য দ্বারা। আবার যেখানে কোন গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তা শেষ করা হয়েছে: (আরবী**********) বাক্যটি দ্বারা। আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে ইসমে মাওসুল (সংযোজিত পদ) নিয়ে তারপর ছিলাহ বা সংযোজক পদ) ছাড়াই বাক্যকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া। তারপর জাযা বা প্রতিফল বর্হৃনা করা। যেমন:

(আরবী**********)

যারা আমার আয়অতে মিথ্যা বলেছে এবং অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং জান্নাতেও যেতে পারবে না, যতোক্ষণ সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করতে না পারবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ৪০)

তেমিনভাবে যেখানে তা’লীম ও তারবিয়াতের আলোচনা এসেছে সেখানে ‘রব্ব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:

(আরবী**********)

পড় তোমার রব্ব-এর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়, তোমার রব্ব অত্যন্ত দয়ালু যিনি কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আল-আলাক: ১-৫)

যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সম্মান প্রতিপত্তির আলোচনা এসেছে সেখানে (**) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা:

(আরবী**********)

নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। (সূরা লুকমান: ৩৪)

এমনিভাবে (***) শব্দটি স্থান ও কালভেদে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো আল্লাহ শব্দটি একবার বলে পরবর্তী আয়াতসমূহে শুধুমাত্র সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও বাক্যের প্রথমে, আবার শেষে, আবার কোথাও আল্লাহ শব্দ এবং তার সর্বনাম যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় প্রশ্নের অবতারণার জন্য আবার অনেক জায়গায় ইতিবাচক বর্ণনার জন্য নেয়া হয়েছে। এটি অনেক অলংকার শাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিকট আলংকারিক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত।

৪. কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যের অর্থগত ধারাবকাহিকতা থাকে। অতপর একটির উদ্দেশ্যকে অন্যটির উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করার ফলে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাও এক ধরনের শৈল্পিক বিন্যাসের নমুনা। অবশ্য অলংকার শাস্ত্রবিদগণ শৈল্পিক বিন্যাস সম্পর্কে যে নীতির কথা বলেন আল-কুরআন তা থেকে মুক্ত।

৫. সম্ভবত শৈল্পিক বিন্যারেস সর্বোচ্চ স্তর যে সম্পর্কে অলংকার শাস্ত্রবিদগণ এ পর্যন্ত পরিচিতি লাভ করেছেন তা হচ্ছে আল-কুরআনের স্বভাবজাত বিন্যাস, যা কাতিপয় আয়অতের বর্ণনা পরম্পরায় পাওয়া যায়। যেমন সূরা আল-ফাতিহা প্রসঙ্গে আমরা আল্লাম যামাখশারীর লেখা থেকে ‘আল-কুরআনের গবেষণা ও তাফসীর’ অধ্যায়ে উদ্ধৃতি দিয়েছি। অলংকার শাস্ত্রবিগদগণ যে বৈশিষ্ট্যসমূহ নিরূপণ করেছেন, কুরআনী বালাগাতের গবেষক আলিমগণ আজ পর্যন্ত তাকে শৈল্পিক বিন্যাসের উত্তম প্রকাশ বলে ঘোষণা দিয়ে আসছেন। আশ্চর্যের কথা এই যে, তারা শৈল্পিক বিন্যাসের অন্য দিকটির নাগালও পাননি। তারা বেশি অগ্রসর হয়ে করার মধ্যে এই করেছেন, আল-কুরআনের সুর ও ছন্দ নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত তাদের নিকট মনে হয়েছে কুরআনের অন্য কোন বৈশিষ্ট্যই আর নেই। প্রকৃতপক্ষে কুরআনী বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য মাত্র। কিন্তু এখানেই তারা পরিতৃপ্ত হয়ে বসে পড়েছেন।

কেননা বালাগাতের আলিমগণ এর মর্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না যে, চিত্রায়ণ ও দৃশ্যাংকনের মাধ্যমে আল-কুরআনে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তা মুল বা ভিত্তির মর্যাদা রাখে। তাই তারা শৈল্পিক বিন্যাসের ব্যাপারটি ভালভাবে আলোকপাত করতে পারেননি। এ বিষয়ে আমরা আমাদের নতুন চিন্তা-গবেষণা পেশ করবো বলেই এ পুস্তকটি লিখা হয়েছে। পুরোনো বিষয নিয়ে বিবাদ বা তর্ক-বিতর্ক করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাচ্ছি কুরআনের আলংকারিক দিক সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয়েছে তা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার চেষ্টা করা। আমাদের পূর্বসূরীরা যেখানে পৌঁছে থেমে গেছেন তা থেকে আরো সামনে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। কেননা তার প্রচুর অবকাশ আছে। এ বিষয়ে আমরা ঐ সমস্ত উদাহরণকে যথেষ্ট মনে করি, যা আমরা প্রথমদিকে ‘সূরা আল-আলাক’ –এর ব্যাখ্যায় এবং ‘আল কুরআনের সম্মোহনী শক্তির উৎস’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। ঐসব উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল-কুরআনে চিন্তার যোগসূত্রতা এবং বাহ্যিক বিন্যাস প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ ও অবকাশ আছে।

আমরা শুধু একথাটি ইঙ্গিত দিতে চাই, আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী এবং! ঐ সমস্ত স্থান, যা ঘটনার সাথে জড়িত এ দু’য়ের মধ্যে এক অদৃশ্য আত্মিক বন্ধন রয়েছে। সেই সাথে কুরআন সেসব ঘটনার দ্বীনি উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং শৈল্পিক দিকের প্রতিও দৃষ্টি রাখে। এ ধরনের মিল সংক্রান্ত উদাহরণ ‘প্রসঙ্গ: আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী’ শিরোনামে উল্লেখ করা হবে। এছাড়াও কিয়ামতের দৃশ্য, শান্তি ও শাস্তির দৃশ্য, জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কথপোকথনের দৃশ্যাবরীতেও এ ধরনের মিল পাওয়া যায়, যা আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীতে বিদ্যমান। এ সমস্ত বিষয় বর্ণনার সময় একটি ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্রের প্রতিও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তাই বলে মূল উদ্দেশ্যটাকেও সরাসরি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়নি, যে উদ্দেশ্যে ঐ ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে।

মূল কথা হচ্ছে কুরআনে কারীমের অর্থ ও তাৎপর্য এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবঙ অতি উন্নত। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার নিগুঢ় যে সৌন্দর্য, দৃশ্যায়ণ থেকে তার বিস্তৃতি অনেক বেশি। আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় যে, আলোচনার সহজ ও সমতল পথ ছেড়ে অগ্রসর হয়ে এক ঝটকায় কলমের গতি সেই বিষয়বস্তুর সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে উপনীত করবো। এজন্য আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে সেই চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করবো।

[৫.১] কুরআনুল কারীমে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে চিত্রায়ণ পদ্ধতে তার বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, সেখানে বক্তব্য এবং অবস্থার মধ্যে পুরোপুরি মিল পাওয়া যায়। যেমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বর্ণনার এ ঢং অথবা আভিধানিক অর্থ ছবির লক্ষণসমূহ পরিপূল্ণ করতে সহায়ক প্রমাণিত হয়্ এটি এমন একটি বাঁক যা বর্ণনার জন্য ব্যাখ্যা এবং ছবির মধ্যে যোগসূত্রের মর্যাদা রাখে। যেখান থকে হাল্কা ঢংয়ের বর্ণা এবং উঁচু মানের নির্মাণ শৈলীর রাস্তা পৃথক হয়ে যায়। যেমন পরবর্তী আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় নিকৃষ্ট সেইসব মুক ও বধির- যারা উপলব্ধি করে না। (সূরা আল-আনফাল: ২২)

(****) শব্দটি সাধারণ জীবজন্তুর বেলায় ব্যবহৃত হয়। অবশ্য অনেক সময় এ শব্দটি দিয়ে মানুষকে বুঝানো হয়। কেননা (****) শব্দ দিয়ে ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল প্রাণীকেই বুঝায় যেহেতু মানুষও ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করে তাই মানুষের বেলায়ও এ শব্দটি প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু (***) শব্দটি মানুষ অর্থে গ্রহণ করতে বিবেক বাধ্য নয়। এটি স্বাভাবিকতার বিপরীত। এখানে মানুষের জন্য (***) শব্দটি ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে তাদের চরিত্র ও আচার আচরণে পশু সুলভ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়, যা তাদের হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধক। এ থেকেই তাদের গাফলতি ও পশুত্বের ছবি পরিপূর্ণ হয়ে যায় (***) ( তারা উপলব্ধি করে না) শব্দ দিয়ে একথাটিকে আরো পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে।

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

আর যারা কাফির তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো আহার করে, তাদের বাসস্থান জাহান্নাম। (সূরা মুহাম্মদ : ১২)

এ আয়াতে কাফিরদেরকে জন্তু-জানোয়ারের সাথে তুলনা করে এক চমৎকার চিত্র অংকন করা হয়েছে। কারণ তারা অল্প ক’দিনের দুনিয়ায় খুব আনন্দ ফূর্তি করছে এং বিভিন্নবাবে তারা দুনিয়ার রং-তামাসাকে উপভোগ করার প্রয়াস পাচ্ছে। কিন্তু পরকালের শাস্তি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন যা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যে আচরণ একমাত্র জন্তু-জানোয়ারের দ্বারাই শোভা পায়। সেগুলো খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ ফূর্তিতে মশগুল থাকে কিন্তু একবারও ভেবে দেখে না, কসাইয়ের ছুরি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেগুলোর একমাত্র কাজই যেন শুধু খাওয়া- দাওয়া ও আনন্দ-ফুর্তি করা।

আরো একটি উদাহরণ দেখুন:

(আরবী**********)

তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ। নিজেদের ক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছে যাও। (সূরা আল-বাকারা: ২২৩)

এ আয়অতে কয়েক প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য মিল পাওয়া যায়। এখানে স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শকাতর সম্পর্ককে বড় সূক্ষ্ম ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপমা হচ্ছে স্বামসী-স্ত্রীর সম্পর্কে একজন কৃষক ও তার জমির সাথে তুলনা করা হয়েছে। জমি যেমন ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র তদ্রূপ স্ত্রীও সন্তান উৎপাদনে ক্ষেত্র। জমির ফসল দিয়ে যেমন গোলা পরিপূর্ণ করা হয়, তেমনি স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করে বংশধারাকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে গোটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সঠিক ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

[৫.২] অনেক সময় শুধুমাত্র একটি শব্দ-পুরো বাক্য নয়- ছবির আংশিক পূর্ণতার স্বাক্ষর বহন না করে বরং পুরো ছবিটিকেই উদ্ভাসিত করে তোলে। চিত্রায়ণ পদ্ধতিতে এ মিল পূর্বের চেয়েও জোরালো। এটি পূর্ণতার কাছাকাছি প্রায়। এর গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণ পূর্ণবাক্য ব্যতিরেকে শুধুমাত্র একটি শব্দই একটি চিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। সেই শব্দটি কর্ণগোচর হওয়া মাত্র মনের মুকুরে ভেসে উঠে একটি পরিপূর্ণ চিত্র।

(আরবী**********)

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হয়েছে, যখন আল্লহর পথে তোমাদেরকে বের হওয়ার জন্য বলা হয়, তখন তোমরা জমিন আঁকড়ে পড়ে থাক। (সূরা আত-তাওবা: ৩৮)

এ আয়াত পাঠকালে যখন (***) শব্দটি কর্ণগোচর হয় তখনই চিন্তার জগতে একটি ভারী বস্তুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। মনে হয় কোন ব্যক্তি যেন ভারী কোন বস্তুকে উঠানোর জন্য বারবার চেষ্টা করছে কিন্তু তা ভারী হওয়ার কারণে উঠাতে পারছে না। মনে হয় শব্দটি ওজনে কয়েক টন। যদি আয়াতে (***) বলা হতো (মূলত দুটো শব্দের অর্থ একই) তবে পূর্বের শব্দের মতো এতো ভারী বুঝাত না। উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেত। কিন্তু ব্যবহৃত শব্দটির এতো যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে যে, শ্রোতা শোনামাত্র দুঃসাধ্য এক ভারী বোঝার চিত্র তার কল্পনার চোখে ভেসে উঠে।

এ ধরনের আরেকটি আয়াত হচ্ছে:

(আরবী**********)

আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে যারা (ইচ্ছেকৃত) বিলম্ব করবে। (সূরা আন-নিসা: ৭২)

এ আয়াতটি পড়া মাত্র বিলম্বের একটি ধারণা সৃষ্টি হয় বিশেষ করে (***) শব্দটি পাঠ কিংবা শ্রবণ করা মাত্র চোখের সামনে এক চিত্র ভেসে উঠে। তা হচ্ছে সেই কথা বলতে তাদের জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যায়। বহু কষ্টে এবং অনেক বিলম্বৈ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে।

আল-কুরআনে হযরত নূহ (আ)-এর কথাটি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:

(আরবী**********)

(নূহ বললেন: ) হে আার জাতি। দেখ তো আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলিলের ওপর থাকি, তিনি যদি তার পক্ষ থেকে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তার পরেও যদি তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তবে আমি কি তা তোমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি, তোমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে? (সূরা হুদ: ২৮)

এ আয়াতে (*****) শব্দটি পাঠ করা মাত্র অপছন্দ ও পীড়াপীড়ির এক চিত্র ভেসে উঠে মনের মুকুরে। তার সমস্ত চেতনা ও বাকশক্তি পরস্পর এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যেমন (****) বা ঘৃণাকারী সেই জিনিসের সাথে আচরণ করে যা সে ঘৃণা করে। এ আয়াতে শব্দ ও অর্থের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক প্রতিভাত হয় তা বালাগাত ও ফাসাহাতের এক বলিষ্ঠতম প্রয়োগ। যাকে পূর্ব যুগের ও বর্তমান যুগের মুফাসসিরগণ আল-কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে অভিহিত করেছেন।

অন্যত্র বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

আর যারা কাফির,তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশ দেয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি অকৃতজ্ঞদেরকে এভাবেই শাস্তি প্রদান করি। সেখানে তারা আর্ত চীৎকার করে বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান থেকে বের করে দিন, আমরা সৎকাজ করবো, পূর্বে যা করেছি তেমনটি আর করবো না। (সূরা ফাতির: ৩৬-৩৭)

এ আয়াতে (****) শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, জাহান্নামীরা চীৎকার করছে, সে আওয়াজ চতুর্দিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেই সাথে আরেকটিচিত্র ভেসে উঠে- তাদের এ মর্মান্তিক চীৎকার কেউ শুনছে আর না এর কোন প্রতিকার করার জন্য কেউ এগিয়ে আসছে সেই প্রাণান্তকর চীৎকারের কারণে। এ চিত্র থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে, শাস্তির তীব্রতা কতো ভয়াবহ।

যখন একটি মাত্র শব্দ সমস্ত বাক্যের বক্তব্যকে প্রস্ফুটিত করে তোলে তখন তা হয় (***) বা (শৈল্পিক) বিন্যাসের চূড়ান্ত রূপ। যেমন:

(আরবী**********) কঠোর স্বভাব তদুপরি কুখ্যাত। (সূরা ক্বলম: ১৩)

এ আয়অতে (***) শব্দটি কঠোর স্বভাব ও নির্মমতার পূর্ণ চিত্র অংকন করার জন্য যথেষ্ট।

এ রকম আরেকটি আয়াতে কারীমা :

(আরবী**********) কিন্তু এতো দীর্ঘজীবন তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। (সূরা আল-বাকারা: ৯৬)

এ আয়অতে (****) –এর কর্তা হচ্ছে (***) যা পরিপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত একটি চিত্র অংকন করেছে। কথা ক’টি মুখে উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই চিত্র।

পরবর্তী আয়াতটিও একটি উত্তম উদাহরণ:

(আরবী**********)

অতপর তাদেরকে এবং পথভ্রণ্টতের (অর্থাৎ মূর্তি এবং মূর্তিপূজকদের অধোমুকি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং ইবলিস বাহিনীর সকলকেও। ( সূরা আশ-শুআরা: ৯৪-৯৫)

এ আয়াতে (****) শব্দটি জাহান্নামে পতিত হওয়ার যে আওয়াজ তার প্রতিনিধিত্ব করছে।

উল্লেখ্য যে, আয়াত দুটোতে (***) এবং ((***) শব্দদ্বয়ের আক্ষরিক অর্থই গোটা ছবিটিকে চোখের সামনে উদ্ভাসিত করে তোলে। কথা এটি নয় যে, কুরআনের বিশেষ ব্যবহারে তার মধ্যে এ ধরনের ধারণা সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মাত্র যে শব্দগুলো স্মরণ করা হলো তা কুরআনের বিশেষ এক প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে এবং একবার মাত্র তা বর্ণিত হয়েছে। অবশ্যই একথা বলা যায় যে, উল্লেখিত শ্বদ্বয় যে স্থানে প্রয়োগ করা হয়েছে নিঃসন্দেহে তা আলংকরিক বর্ণনাসমূহের মধ্যে উৎকৃষ্ট বর্ণনা হিসেবে গণ্য।

কুরআনে কারীমে কিয়ামতের বিশেষণমূলক যে কটি প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার মধ্যে (****) (বধিরকারিণী) এবং (***) (সকল কিচুর ওপর বিস্তার লাভকারী) শব্দ দুটোও আছে। (***) শব্দের মধ্যে এমন পরিমাণে গর্জন ও কাঠিন্য পাওয়া যায়, শব্দটি শোনামাত্র মনে হয়, সে গর্জনে কান ফেটে যাবে। এ শব্দটি বাতাস ভেত করে কর্ণকুহরে গিয়ে আঘাত করে এবং বধির করে দেয়। তেমনিভাবে (****) শব্দটিও মনে হয় তীব্রবেগে চলমান। এটি ঝড়েরর গতিতে সকল কিছুতে ছেয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলছে। এ রকম আরেকটি আয়াত:

(আরবী**********) সকাল বেলার শপথ, যখন সে শ্বাস গ্রহণ করে (অর্থাৎ উদ্ভাসিত হয়) । (সূরা তাকবীর: ১৮)

আমি (***)-এর মতো সূক্ষ্ম ও মনোরম শব্দ চয়ন দেখে এবং এর বিকল্প প্রতিশব্দের কথা চিন্তা করে ‘থ’ খেয়ে গেলাম। আপনিও কুরআনের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে অবাক হয়ে যাবেন এবং একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দটি নির্বাচনে আল-কুরআনের সৌন্দর্য ও অলৌকিকত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যখন তিনি তোমাদের প্রশান্তির জন্য নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর নিদ্রার চাদর বিছিয়ে দিলেন। (সূরা আল-আনফাল: ১১)

এ আয়অতে নিদ্রাকে (****) (তন্দ্রাবেশ) শব্দ দিয়ে প্রচণ্ড প্রভাবের কথা বুঝানো হয়েছে। মনে হয় নিদ্রা এক ধরনের পাতলা ও সূক্ষ্ম চাদর যা খুব আরাম ও মসৃণতার সাথে ঢেকে দেয়। (***) শব্দ থেকে মনে হয় গোটা পৃথিবীব্যাপী প্রশান্তি ও নিরাপত্তা ছেয়ে আছে।

শব্দ ও উচ্চারণ থেকে চিত্রায়ণ আমরা আল-কুরআনের সর্বশেষ সূরা- সূরা আন- নাসেও দেখতে পাই। চিন্তা করে দেখুন:ঢ়

(আরবী**********)

বলে দাও, আমি মানুষের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। (আশ্রয় চাচ্ছি) লোকদের প্রকৃত বাদশাহরে নিকট। মানুষের ইলাহ্‌র নিকট। শয়তানের খারাপ ওয়াসওয়াসা থেকে (যে আল্লাহর নাম শুনে ভেগে যায়), যে লোকদের অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। চাই সে মানুষের থেকে হোক কিংবা জ্বিনদের মধ্য থেকে। (সূরা আন-নাস: ১-৬)

এ সূলাটিকে বার বার পড়ুন এবং দেখুন আপনার আওয়াজ একটি পরিপূরণ ওয়াসওয়াসার সৃষ্টি করবে যা অবিকল সূরায় বর্ণিত ওয়াসওয়াসার মতো। বিশেষ করে নিম্নোক্ত আয়াত পাঠে সৃষ্টি হয়।

(আরবী**********)

আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

কতো কঠিন তাদের মুখের কথা, তারা যা বলে তাতো সবই মিথ্যে। (সূরা কাহাফ: ৫)

এ আয়াতটিও আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। তবে সামান্য পার্থক্য আছে। এ আয়াতে একটি দোষের কথা বলা হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তান আছে। এ আয়াতে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এ চরম মিথ্যে কথাটিকে খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন প্রথমে (***) কথাটি বলে কর্তকে গোপন রাখা হয়েছে। আবার (***) শব্দটি তমীয ও নাকারা (অনির্দিষ্ট) হিসেবে নিয়ে জঘণ্যতার মাত্রাধিক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর (***) বলে বুঝান হয়েছে, কথাগুলো মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃত এবং অজ্ঞতা প্রসূত বের হয়েছে। (****)এর মাধ্যমে যে ঘৃণা ও নীচতা সৃষ্টি হয় তাকে বলবৎ রাখা হয়েছে। এ শব্দটি উচ্চারণের সময় মুখকে সামান্য ফাঁক করা হয় কিন্তু শেষ মীম (**) টি উচ্চারণের সাথে সাথে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তখনও কণ্ঠনালী থেকে বাতাস বেরিয়ে মুখ ভর্তি থাকে।

এক ধরনের শব্দ আছে, যা বিষয়বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে ঠিকই কিন্তু নিজের বক্তব্য ও আওয়াজকে কানে প্রবেশ করিয়ে নয়। তার চিত্রের পরিধি শুধুমাত্র ঐ ছায়ার মতো যা চিন্তার জগতে সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য যে, শব্দ এবং বাকের নিজস্বএক ছায়া বা প্রতিবিম্ব থাকে, যখন মানুষের দৃষ্টি পড়ে তখন তা দৃষ্টিগোচর হয়। এর উদাহরণ হচ্ছে নিচের এ আয়াতটি:

(আরবী**********)

তাদেরকে ঐ ব্যক্তির অবস্থা শুনিয়ে দাও যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। (সূরা আরাফ: ১৭৫)

এ আয়াতে ‘ফানসালাখা’ (***) শব্দটি দ্বারা অনুমিত হয়, ঐ ব্যক্তিকে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিল সে তা থেকে কিভাবে বেরিয়ে গেছে। নিচের আয়াতটিও আরেকটি উত্তম উদাহরণ: (আরবী**********)

অতপর তিনি প্রভাতে শঞরে ভীত শংকিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। (সূরা কিসাস: ১৮)

এ আয়াতে (***) শব্দে হযরত মূসা (আ)-এর ভীত ও শংকিত হবার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সামনে রাখতে হবে যে, হযরত মূসা (আ) ভয়ের প্রকাশ স্থল ‘ফিল মাদীনাতি’ (***) অর্থা শহরকে মনে করেছেন যা সাধারণ শান্তি ও নিরাপত্তার হয়ে থাকে। যদিও ‘ইয়াত্তারাক্কাবু’ ((*****) ঐ সমস্ত জায়গাকেই বলা হয় যেখানে ভয়-ভীতি লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে শান্তি নিরাপত্তার জায়গাকে ভীতিকর চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আমরা ইতোপূর্বে ‘কল্পনা ও রূপায়ণ’ অধ্যায়ে এ ধরনের উদাহরণ পেশ করেছি, সেগুলোও এর সাথে পূর্ণ সঙ্গতি রাখে।

কখনো কখনো একই শব্দে আওয়াজ এবং প্রভাব একত্রিত হয়ে থাকে। যেমন:

(আরবী**********) যেদিন তাদেরকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ধাক্কিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (সূরা আত-তুর: ১৩)

এ আয়াতে (***) শব্দটি আওয়াজ ও প্রভাবের সাথে সাথে তার তাৎপর্যের চিত্র সৃষ্টি করে। এখানে চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে (***) শব্দের অর্থ জোরের সাথে ধাক্কা দেয়া। যখন খুব জোরে কাউকে ধাক্কা দেয়া হয় তখন তার মুখ থেকে তার অজানে ্ত (***) (ওহ্‌) শব্দটি বেরিয়ে যায়। এ শব্দটি (***) শব্দের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যশীল। নিচের আয়াতটিও লক্ষ্য করুন:

(আরবী**********) একে ধরো এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। (সূরা দুখান: ৪৭)

এ আয়অতে (****) শব্দটির আওয়াজ কানে প্রবেশ করা মাত্র ভাবজগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং একটি জীবন্ত ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে।

এ অধ্যায়ে আমরা সেইসব শব্দের উল্লেখ করতে পারি, যে সম্পর্কে আমরা বলেছিলাম, আওয়াজটাই তার আক্ষরিক অর্থের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন (****) (তন্দ্রা), (***) (শ্বাস গ্রহণ করা), (****) (কিয়ামত)। এসব শব্দ আওয়াজের সাথে সাথে একটি ছায়াও সৃষ্টি করে। কিন্তু এর আওয়াজ ও ছায়ার মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান তার সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। যখন শব্দ তার অর্থ ও ভাবের ছবি অংকন করে তার ধ্বনি ও ভাব একত্রিত হয়ে যায়। তা শুধু অর্থগত দিকে নয় বরং চিন্তা ও চিত্রের দিকেও ধাবিত হয়। আর ঐ জায়গাটিই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্যস্থল।

[৫.৩] আল-কুরআন তার বক্তব্য তুলে ধরার জন্য দৃশ্যায়নের যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তার মধ্যে তাকাবুল বা বৈপরিত্যও একটি। কুরআন যেখানে শব্দের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চিত্র অংকন করতে চায় সেখানে অধিকাংশ সময় তাকাবুল পদ্ধতির অনুসরণ করে থাকে। যেমন :

(আরবী**********)

তার এক নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব প্রাণী ছড়িযে দিয়েছেন। তিনি তখন ইচ্ছে এগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম। (সূরা আশ শুরা: ২৯)

এ আয়াতে (***) (বিক্ষিপ্ত) এবং (***) (একত্রিত করা) শব্দদ্বয় তাকাবুল বা বৈপরিত্যের। বিপরীতমুখী এ শব্দ দুটোকে একই আয়অতে একত্রে প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা হয়েছে। যা চিন্তার জগতে একের পর এক ছবির মতো আবির্ভূত হয়। যদিও শব্দ দুটো বিপরীতার্থক তবু তা সুন্দরভাবে মিলে গেছে।

নিচের আয়াতটিতে জীবন ও মৃত্যু বিপরীতধর্মী দুটো চিত্রকে একত্রিত দেয়া হয়েছে।

(আরবী**********)

এতে কি তাদের চোখ খুলেনি, আমি তাদের পূর্বে অনেক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যাদের বাড়ি-ঘরে এরা বিচরণ করে। অবশ্যই এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে। তারা কি শোনে না? তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি উষর ভূমিতে পানি প্রবাহিত করে শস্য উৎপন্ন করি। যা তারা এবং তাদের পশুগুলো খেয়ে থাকে। তারা কেন এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে না? (সূরা সাজদা: ২৬-২৭)

দেখুন, এ আয়াতে জীবন মৃত্যুর মধ্যে কতো পার্থক্য। প্রথমে ঐ সমস্ত লোকের কথা বলা হয়েছে যার একদিন জমিনের ওপর চলাফেলা করতো। আজ তারা মৃত, তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তাদের আবাসভূমি বিরাণ। আবর পলকের মধ্যে অন্য রকম এক চিত্রের অবতারণা। মৃত জমিনকে সবুজ-শ্যামল করে সুশোভিত করার চিত্র। এখানে তাকাবুল বা বৈপরিত্ব মূলত এক অবস্থার সাথে আরেক অবস্থার মধ্যে নয় বরং জীবন ও মৃত্যুর সাথে।

এ ধরনের ‘তাকাবুল’ (বৈপরিত্য)-এর চিত্র পরকালীন জীবনের শান্তি ও শাস্তি প্রসঙ্গে যেসব জায়গায় বলা হয়েছে সেখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ধরনের কতিপয় উদাহরণ আমরা নিচে বর্ণনা করলাম।

(আরবী**********)

এটি অনুচিত। যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং তোমার প্রতিপালক আবির্ভূত হবেন। ফেরেশতাগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িযে যাবে এবং জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে। কিন্তু এ স্মরণ তার কী কাজে আসবে? সে বলবে : হায় আমিযদি এ জীবনের জন্য আগেই কিছু পাঠিয়ে দিতাম। সেদিন তার শাস্তির মতো শাস্তি কেউ দেবে না এবং সে বাঁধনের মতো বাঁধনও কেউ দেবে না। (সূরা ফজর: ৩০)

এমন বিভিষিকাময় অবস্থায়ও একজন মু’মিনকে দরদ ও স্নেহমাখা বাক্যে আহ্বান করা হবে- ‘হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার রব্ব-এর দিকে ফিরে যাও।’ আর এ ফিরে যাওয়ার মধ্যে ঐ বান্দা এবঙ প্রতিপালকের সাথে গভীর ভালবাসা ও সন্তোষের প্রমাণ পাওয়া যায়। (***) অর্থাৎ উভয়ে উভয়ের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন। এসব শব্দে প্রেম-ভালবাসার যে নিদর্শন পাওয়া যায় মনে হয় পুরো পরিবেশটাই প্রীতিডোরে বাধা। তারপর বলা হয়েছে: (আরবী**********) আমার বিশেষ বান্দাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং তাদের তাদের সাথে হৃদ্যতা সৃষ্টি করো। (আরবী**********) তারপর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। জাহান্নামের বর্ণনা পুরো পরিবেশটিকে ভয় ও পেরেশানীর এক চিত্রে ঘিরে রেখেছিল। এখানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র পাওয়া যায়। যা প্রেম-প্রীতিতে পরিপূর্ণ।

ওপরের উদাহরণটি ছিল কাফির ও মু’মিনের মধ্যে বিপরীতধর্মী এক চিত্র। একন আমি জাহান্নামীদের আযাব ও জান্নাতীদের নিয়ামতের বিপরীতধর্মী এক চিত্র পেশ করছি।

(আরবী**********)

তোমার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? অনেক মুখমণ্ডলণ সেদিন হবে লাঞ্ছিত, ক্লিষ্ট-ক্লান্ত। তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে। তাদেরকে ফুটন্ত নহর থেকে পান করানো হবে, আর কাঁটাযুক্ত ঝাড় ছাড়া তাদের জন্য কোন খাদ্য নেই। এতে তাদের দেহের পুষ্টি সাধন কিংবা ক্ষুধা নিবারণ হবে না। আবার অনেক ‍মুখমণ্ডল সেদিন হবে সজীব। তাদের কর্মের কারণে সন্তুষ্ট। তারা থাকবে সুউচ্চ জান্নাতে। সেখানে কোন অসার কথাবার্তা তারা শুনবে না। সেথায় থাকবে প্রবাহিত ঝর্ণা, উন্নত সুসজ্জিত আসন এবঙ সংরক্ষিত পানপাত্র ও সারি সারি গালিচা এবং বিস্তৃত বিছানো কার্পেট।

আযাব ও নিয়ামতের বিপরীতধর্মী একটি সুন্দর চিত্র পূর্বের আয়াত কটি। এ ধরনের উদাহরণ আল-কুরআনে অনেক।

[৫.৪] ওপরর উদাহরণগুলো ছিল দু’টো বিপরীতধর্মী চিত্র। কিন্তু এবার আমরা এমন কিছু উদাহরণ পেশ করবো যা বিপরীতধর্মী বটে কিন্তু তার একটি অতীতের এবং অপরটি বর্তমানকালের। অতীতকে কল্পনায় বর্তমানে নিয়ে এসে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী ছবি আঁকা হয়েছে। যেমন:

(আরবী**********)

তিনি মানুষকে এক ফোটা বীর্য দিয়ে সৃষ্টি করেচেন। তা সত্ত্বেও সে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। (সূরা আন-নাহল: ৪)

যে অবস্থা বর্তমানে আমাদের সামনে উপস্থিত তা একজন প্রকাশ্য ঝগড়াটে (****) ব্যক্তির, কিন্তু অতীতে সে ছিল সামান্য এক ফোটা বীর্য মাত্র। এ দু’ অবস্থার মধ্যে যে ব্যাপক ব্যবধান তাই এখানে বুঝান উদ্দেশ্য। এজন্র দুটো অবস্থার মধ্যবর্তী অবস্থাকে উহ্য রাখা হয়েছে। যেমন একথা প্রকাশ করা যায় যে, মানুষের শুরু যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে তার ঝগড়া করা সাজে না। অনুরূপ আরেকটি উদাহরণ:

(আরবী**********)

বিত্তবৈভবের অধিকারী মিথ্যারোপকারীদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কিছু অবকাশ দাও। নিশ্চয়ই আমার কাছে আছে শিকল, অগ্নিকুণ্ড, গলগ্রহ হয়ে যায় এমন খাদ্য এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা মুজাম্মিল: ১১-১৩)

এখানেও দুটো অবস্থার মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়। এক অবস্থাতো বর্তমানে উপস্থিত অর্থাৎ বিত্তবৈভবের অহংকার। আরেক অবস্থা বর্তমান অনুপস্থিত ‍শুধু কল্পনার রাজ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। এ উদাহরণ থেকে শৈল্পিক ও দ্বীনি গুরুত্বই প্রকাশ পাচ্ছে। নিচের আয়াতগুলো লক্ষ্য করুন:

(আরবী**********)

পশ্চাতে ও সম্মুখে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ; যে ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে এবং গুণে গুণে হিসেব রাখে। সে মনে করে, তার সম্পদ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কক্ষণ নয়্ সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে ‘হুতামায়’। তুমি কি জান, ‘হুতামাহ’ কি? তা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছুবে। এতে তাদেরকে বেঁধে দেয়া হবে, লম্বালম্বি খুঁটিতে। (সূরা হুমাজাহ: ১-৯)

এ সূরাটিতে বিপরীতধর্মী দুটো অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। একটি দুনিয়ার অবস্থা এবং অপরটি আখিরাতের। কিছু দাম্ভিক ও অহংকারী আছে যারা দুনিয়ার বিত্ত বেসাতে মত্ত হয়ে আখিরাতকে ভুলে গেছে এবং দুনিয়ার রঙ-তামাশায় লিপ্ত আছে। কিন্তু তাদের এ চলার পথের অপর প্রান্তে অপেক্ষা করছে জাহান্নাম। এমন জাহান্নাম যা সবকিছুকে পিষ্ট করে দেয় এবং তার আগুন হৃদয় পর্যন্ত স্পর্শ করে। ঐ হৃদয় যা আজ অহংকার ও দাম্ভিকতায় উন্মাতাল। তাদেরক সেখানে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হবে, যেখান থেকে তারা স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসতে পারবে না ‍কিংবা অন্য কেউ বের করে আনতেও সক্ষম হবে না।

নিচের আয়াতে বলা হয়েছে:

(আরবী*********)

বামপন্থী লোক, (হায়!) বামপন্থী লোকেরা কী আযাবে থাকবে। তারা থাকবে প্রখর বাষ্প ও উত্তপ্ত পানিতে এবং ধুম্রকুঞ্জের ছায়ায়। যা শীতল নয় এবং আরামদায়কও নয়। তারা ইতোপূর্বে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। (সূরা আল-ওয়াকিয়া: ৪১-৪৫)

এখানে দুটো অবস্থাকে মুখোমুখি পেশ করা হয়েছে। এক অবস্থা হচ্ছে জাহান্নামীদের বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ গরম বাষ্প, গরম পানি, ধুয়ার ছায়া যা শুধু নামেমাত্র ছায়া। এ কঠিন অবস্থাকে তাদের পূর্বের অবস্থার (অর্থাৎ সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের) সাথে মুখোমুখি করে পেশ করা হয়েছে।

ওপরে বর্ণিত অবস্থা এবং তার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অবস্থার মধ্যে এক সূক্ষ্ম চিন্তার ব্যাপার আছে। এ আয়াতে যেসব লোকের কথা বলা হচ্ছে তারা রীতিমতো জীবিত এবং দুনিয়ায় বিচরণত। দুনিয়ার সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের করায়ত্ব্ এ অবস্থাটি বর্তমানে বিদ্যমান। আখিরাতে তাদের জন্য য দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে তা পরের কথা। কিন্তু সেই পরের অবস্থাকে কুরআন বর্তমান অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। পাঠক মনে করেন দুনিয়ার লেনদেন চুকিয়ে ঐ অবস্থায় তারা ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে, যে অবস্থা তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। তাদের পেছনের সমস্ত সুখ-সম্ভোগ শেষ হয়ে গেছে। তারা তীব্র আযাবের সম্মুখীন। এমতাবস্থায় তাদের পেছনের কথা, সেই সুখের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে।

মনে হতে পারে, এটি আশ্চরয ধরনের চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু তাতে কি? কুরআন বহু জায়গায় এ ধরনর স্টাইলে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। কুরআনের এ বর্ণনা শৈল্পিক এবং দ্বীনি দুটোরই আবেদন রাখে। শিল্পের অনুসন্ধানী মনে করে- এ শুধু উপমা উৎক্ষেপণ নয় বরং এটি অনুভব ও বোধের সীমানা ছাড়িযে চোখের সামনেই সংঘটিত একটি ঘটনা, যা ঘটে চলছে।

দ্বীনি অনুসন্ধানীদের অনুভূতি হচ্ছে জাহান্নামে সংঘটিতব্য ঘটনাবলীর ওপর এমন দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন) করা উচিত, যেন তা এখনই সংঘটিত হচ্ছে। তার সম্পর্ক উপলব্ধির সাথে। আর এ দৃঢ় বিশ্বাস মানুষকে ঈমানের দাওয়াত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করে।

নিচের আয়াতটিও ওপরের উদাহরণের সাথে সম্পর্ক রাখে।

(আরবী*********)

একে ধরো এবং টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে যাওদ। (এখন) মজা বুঝ। তুমিতো সম্মানত সম্ভ্রানত। (সূরা আদ-দুখান: ৪৭-৪৯)

নিচের আয়াতটিও বিপরীত ধর্মী এক চিত্র পেশ করে:

(আরবী*********)

কখনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে ঝাড়-ফুঁক করবে? আর সে মনে করবে, বিদায়ের মুহূর্তটি এসে গেছে এবং পায়ের গোছা অপর গোছার সাথে জড়িয়ে যাবে। সেদিন তোমার রব্ব-এর কাছে সবকিছু উপস্থিত করা হবে। সে বিশ্বাস করেনি এবঙ নামায পড়েনি। পড়ন্তু মিথ্যা মনে করেছে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। তারপর সে দম্ভভরে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গেছে। (সূরা কিয়ামাহ: ২৬-৩৩)

উক্ত আয়াতগুলোতে দুটো অবস্থার বিপরীতধর্মী চিত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এক, অতীতে যা অতিবাহিত হয়েছে। মন হয় যেন, গোটা সৃষ্টি জগৎ তার সমস্ত সৌন্দর্য হারিয়ে ম্রিয়মান হয়ে গেছে। এমন একটি সময় ছিল- যখন মৃত ব্যক্তি নামায আদায় করেনি, কুরআনের সত্যতা মেনে নেয়নি। এক অবস্থা (অর্থাৎ মৃত্যুর সময়) চোখের সামনে উপস্থিত। আর সে নির্বিকার। মৃত্যুর সময় উপস্থিত, ভয়ে এতোটা বিহ্বল যে, দু’ পা ঠক্‌ঠক করে কাঁপছে। আত্মা গলা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে্ প্রশ্নকারী প্রশ্ন করছে, কোন ঝাড় ফুঁককারী নেই? যে এ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। যেভাবে জ্বিন-প্রেতের আসর থেকে মুক্তির জন্য ঝাড়-ফুঁকের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।

মুমূর্ষ ব্যক্তি মনে করে, আজ আমার পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দিন। বিগত দিনের স্মৃতি তার হৃদয়পটে ভেসে উঠে। নবী করীম (স)-এর দাওয়াত থেকে দাম্ভিকতার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিজের পরিজনের কাছে চলে আসা, তাঁর দাওয়াতকে মিথ্যে মনে করা। দুটো ছবিই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। কিন্তু তাতে কোন কল্যাণ হবে না। কারণ পা তো একটির সাথে আরেকটি পেঁচিয়ে রয়েছে। এখন আর সময় নেই। এখন তো রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য যাত্রা।

ষষ্ঠ অধ্যায়

আল-কুরআনে সুর ও ছন্দ

আল-কুরআনের শব্দে মিল ও সাদৃশ্র সম্পর্কে অন্যান্য লেখকগণ যা কিছু আলোচনা করেছেন, আমিতার ওপর শুধুমাত্র একবার দৃষিট্ট প্রদান করে আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের ঐ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যে সম্পর্কে এখন বিস্তারিত কিচু আলোচনা হয়নি এবং তা এ পুস্তকের বিষয়বস্তুর সাথেও সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে আল-কুরআনের উচ্চারণের সাদৃশ্যতা।

আমি এর আগে আভাস দিযেছি যে, কুরআনে কারীমের মধ্যে সুর ও ছন্দ (শব্দের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা) আছে এবং তার কিছু প্রকার ও ধরন আছে। যা তার বক্তব্য উপস্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সমস্ত কুরআন-ই ছন্দবদ্ধ সেহেতু সর্বত্রই সুর ও তাল বিদ্যমান। দেখা গেছে একই শব্দের বিভিন্ন অক্ষর এবং একই আয়াত ও তার শেষ শব্দ ছান্দিক নিয়ম-কানুন মেন চলে। চাই সে আয়াত ছোট হোক কিংবা বড়। বাক্যের শেষ শব্দের মধ্যে সেই মিল কিভাবে হৎয়, সেসব বাক্য সম্পর্কে আমি আলোচনা করতে চাই। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে:

(আরবী*********)

আমি তাঁকে (অর্থাৎ রাসূলকে) কবিতা বা কাব্য শিক্ষা দেইনি। আর তা তাঁর জন্য শোভাও পায় না। এতো একটি স্মারক যা সুস্পষ্ট কুরআন (হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে।) (সূরা ইয়াসীন: ৬৯)

একথাটি হচ্ছে কাফিরদের ঐ অভিযোগের জবাব, যা সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে:

(আরবী*********) (তারা বলতো) সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না বরং সে একজন কবি। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৫)

আলকুরআন ঠিকই বলেছে, এটি কাব্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আরববাসী যারা একে কবিতা বা কাব্য বলতো তারা কি পাগর ছিল, না কবিতা ও কাব্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল? নিশ্চয়ই নয়। যেহেতু তারা একে কাব্য বলেছে কাজই এর মধ্যে অবশ্যই কবিতা ও কাব্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে যার যাদুকরী আবেশে তারাও মোহাবিষ্ট হয়েছিল। কুরআনের উচ্চারণ সাদৃশ্যতা ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের কোন পরিচিত ছিল, ফলে এটি যে একটি কাব্য তা তারা বুঝতে পেরেছিল। আমরা যদি কেবল মাত্রা ও অন্তমিলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তবু বুঝা যায় কাব্য ও কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য সেখানে বিদ্যমান।

তাছাড়া কুরআন গদ্য ও পদ্য উভয়কেই সুন্দরভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে। আল-কুরআন মাত্রা (****) ও অন্তমিল (****) থেকে স্বাধীন এবং এতে মিল থাকতেই হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা কুরআনের নেই। তবু সেখানে সুর ও ছন্দ বর্তমান। আয়াতের শেষে মিত্রাক্ষরের প্রয়োজন, সে প্রয়োজনও কুরআন অবশিষ্ট রাখেনি। সেই সাথে আমরা ওপরে কাব্যের যে বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করেছি সেগুলোও সে ধারণ করে নিয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কুরআনে গদ্য ও পদ্য উভয় বৈশিষ্ট্যমান। [ডাঃ ত্বা-হা হোসাইন লিখেছেন: কুরআন পদ্যও নয় কিংবা গদ্যও নয়, কুরআন শুধু কুরআন-ই। অবশ্য এতে মাত্রা ও অন্তমিল বিদ্যমান বলে মনে হয় কিন্তা তা শুধু দৃশ্যমান বাহ্যিক অবস্থার সাথেই সীমাবদ্ধ্ আরবী সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআন যে এক উৎকৃষ্ট ও উন্নত মানের গদ্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বিতীয়ত, কুরআনের গদ্যরূপ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্নধর্মী যার কোন ‍উপমা উদাহরণ পেশ করা সম্ভব নয়। -লেখক।]

সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ যখন কুরআন তিলাওয়াত করে তখন বাহ্যিক উচ্চারণে সে মাত্রা ও অন্তমিল দেখে, বিশেষ করে এ ব্যাপারটি ছোট ছোট আয়াত সম্বলিত সূরাগুলোতেই দৃষ্টিগোচর হয়। অথবা ঐ সমস্ত জায়গায় যেখানে কোন ঘটনাচিত্র উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য দীর্ঘ আয়াতের সূরাগুলোতেও এটি আছে তবে তা এতোটা স্পষ্ট নয়। নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করুন, যেখানে সুর, ছন্দ ও মাত্রার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে।

(আরবী*********)

নক্ষত্রের কসম, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট কিংবা বিপথগামী নয় এবং প্রবৃত্তির তাড়নায়ও কথা বলে না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা। সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। (সূরা আল-নজম: ১০৮)

(আরবী*********)

অতপর নিকটবর্তী হলো এবং ঝুলো রইলো, তখন ব্যবধান ছিল দুই ধুনক কিংবা তার চেযে কম। তখন আল্লাহ তার বান্দার প্রতি প্রত্যাদেশ করার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যাসে দেখেছে? (সূরা নজম: ৯-১২)

(আরবী*********)

নিশ্চয়িই সে তাকে আরেকবার দেখেছির, সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার কাছে অবস্থিত বসবারে জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তা দিয়ে আচ্ছন্ন হচ্ছিল। তাঁর দৃষ্টিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয়েই সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে। (সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)

(আরবী*********) তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উজ্জা সম্পর্কে এবং তৃতীয আরেকটি মানাত সম্পর্কে? (সূরা আন-নাজম: ১৯-২০)

(আরবী*********) পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য যার কন্যা সন্তান আল্লাহর জন্য? (সূরা নজম: ২১)

(আরবী*********) এ ধরনের বন্টন তো খুবই অসঙ্গত বন্টন। (সূরা আন-নজম: ২২)

উল্লেখিত আয়াতগুলোর শেষাক্ষরে মাত্রার প্রায় মিল আছে। কিন্তু আরবী ছন্দের মাত্রার চেয়ে তা কিছুটা ভিন্ন। সব আয়াতের শেষেই মিত্রাক্ষর এক ধরনের। মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের বদৌলতে প্রতিটি আয়াতের সাথে অপর আয়াতের একটি মিল সংঘটিত হয়েছে। ফলে বিচ্ছুরণ ঘটেছে অপূর্ব মূর্ছনার। এই যে, মিল ও সাদৃশ্য তার আরেকটি কারণ আছে, অবশ্য তা মাত্রা ও মিত্রাক্ষরের মতো এতোটা উজ্জ্বল নয়। কেননা তা একক শব্দ, অক্ষরের বিন্যাস এবং বাক্যে শব্দসমূহের বিন্যাসের কারণে সৃষ্টি হয়। তার অনুভূতি ও উপলব্ধির পরিধি, দ্বীনি চেতনা এবং সুর ও সঙ্গীতের উপভোগের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য অন্তরার সুরেলা আওয়াজ এবং বেসুরো আওয়াজের মধ্যে পার্থক্য করা যায়, শুধুমাত্র বাক্যান্তে মিত্রাক্ষর হলেই তাকে সুর বা ছন্দ বলে অভিহিত করা যায়।

উল্লেীখত আয়াতগুলো ছোট ছোট বিধায় তা থেকে সৃষ্ট সূর-তরঙ্গের স্থায়িত্বও খুব দীর্ঘ নয়। তবে সব আয়াতের ছন্দ ও মাত্রা এক্ তাই সব আয়াতে মিল আছে। এসব আয়াতে শেষ অক্ষর এক রকম হতে হবে এরূপ কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

যেমন আধুনিক সাহিত্যে কোন গল্প-উপন্যাস লিকার সময় এদিকে নজর দেয়া হয় না, কুরআনী সুর ও ছন্দের বেলায় এসব কিছুকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অনেক আয়াত থেকে তো স্পষ্ট বুঝা যায় বাক্যান্তে মিলের জন্য সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে তা করা হয়েছে। যেমন নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করে দেখুন।

(আরবী*********) যদি এভাবে বর্ণনা না করে নিচের মত করে বর্ণনা করা হতো:

(আরবী*********) তাহলে অন্তমিলে পার্থক্য সৃষ্টি হতো এবং ছন্দপতন ঘটতো। তদ্রূপ নিচের আয়াত:

(আরবী*********) যদি এভাবে উল্লেখ না করে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হতো :

(আরবী*********) তাহলে ছন্দের মিল হতো না। ‘ইযান’ (***) শব্দটি দিয়ে সেই মিলকে পুরো করা হয়েছে।

তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, ‘আল উখরা; (***) এবং ‘ইযান’ (***) শব্দ দুটো ছন্দের মিল ছাড়া আরেোন কারণে নেয়া হয়নি, এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ। আসলে এ দুটো অতিরিক্ত শব্দ নয় বরং কাব্য বিন্যাসের জন্য সূক্ষ্ম অপরিহার্যতার কারণেই এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আল-কুরআনের আরেকটি শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। একটি বিশেষ অর্থে আল-কুরআনে এ ধরনের শব্দ চয়ন করা হয়েছে এবং সাথে সাথে সেই শব্দটি সুর ও তালের মাত্রাকেও ঠিক রাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যেমন আমরা আলোচনা করেছি, আল-কুরআনের এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের উচ্চারণের সময় এক ধরনের ছন্দের মিল লক্ষ্য করা যায় এবং শেষে মিত্রাক্ষর দৃষ্টিগোচর হয়। আবার অনেক জায়গায় শব্দ নির্বাচন এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে একটি শব্দ আগ-পাছ করলেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।

প্রথম অবস্থা: প্রথম অবস্থা হচ্ছে কোন শব্দের স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করার উদাহরণ। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর একথাটি যা কুরআন হুবহু নকল করেছে:

(আরবী*********)

(ইবরাহীম (আ) বললো:) তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের পূজা করে আসছ, তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা? বিশ্ব প্রতিপালক ব্যতীত তারা সবাই আমার শত্রু। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন। আমি আশা করি তিনিই বিচারের দিনে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাপ করে দেবেন। (সূরা আশ-শুয়ারা: ৭৫-৮২)

উল্লেখিত আয়াতে ‘ইয়াহ্‌দিনি’ ইয়াসকিনি; (***) ইয়াশফিনি’ (***) এবং ইউহ্‌ঈনি’ (***) শব্দের শেষ থেকে উত্তম পুরুষের ‘ইয়া’ (**) কে বিলুপ্ত করা হয়েছে কারণ তা’বুদুনা (***) ও ‘আল আকদামুনা’ (***) শব্দদ্বয়ের মতো ‘নুন’ (***)-এর মিত্রাক্ষর বহাল রাখার জন্য।

এমনিভাবে নিচের আয়াত ক’টিতেও ‘ইয়া’ কে বিলুপ্ত করা হয়েছে:

(আরবী*********)

শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতে, শপথ তার যা জোড় ও বেজোড় এবং শপথ রাতের যখন তা গত হতে থাকে। এর মধ্যে আছে শপথ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য। (সূরা আল-ফজর: ১-৫)

উল্লেখিত আয়াতে ‘ইয়াসরী’ (***) শব্দের ‘ইয়া’ কে এজন্য বিলুপ্ত করা হয়েছে, যেন ‘আল-ফাজরি’ (***) ‘আশরীন’ (***) ওয়াল বিতরি’ (***) ইত্যাদি শব্দসমূহের সাথে মিল থাকে।

নিচের আয়াতগুলোও এখানে উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে।

(আরবী*********)

অতএব তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে। তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে, যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে: এটি কঠিন দিন।

এ আয়াতে ‘আদ দায়ি’ (***) শব্দের শেষ থেকে যদি ‘ইয়া’ (**) কে বিলুপ্ত করা না হতো তবে মনে হতো এ পংক্তিতে ছন্দপতন ঘটেছে। আর এ ত্রুটি কারো নজর এড়াত না। তেমনিভাবে নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করুন:

(আরবী*********)

(মূসা বললেন:) আমরাতো এ জায়গাটিই খুঁজছিলাম। অতপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চ ললো। (সূরা আল-কাহফ: ৬৪)

এ আয়াতে যদি (***) শব্দটি এভাবে (***) লিখা হতো তবে মিলের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতো।

তদ্রূপ যদি নিচের আয়াতগুলো থেকে আসল ‘ইয়া’ এবং উত্তম পুরুষের ‘ইয়া’ (***)-এর শেষ থেকে বিরতিসূচক ‘হা’ (**) কে বিলেপ করা হয় তবে অবশ্যই ছন্দ পতন ঘটবে।

(আরবী*********)

আর যার পাল্লাহ হাল্কা হবে, তার ঠিকানা হাবিয়া। তুমি কি জানো তা কি? তা হচ্ছে জ্বলনত আগুন। (সূরা আল ক্বারিয়া: ৮-১১)

নিচের আয়াতটিও লক্ষ্র করুন:

(আরবী*********)

অতপর যার আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতামযে, আমাকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হব। অতপর সে সুখ-স্বাচ্ছন্দের জীবন যাপন করবে। (সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১)

দ্বিতীয অবস্থা: শব্দের সাধারণ অবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন করা হয়নি বটে কিন্তু কৌশলী বিন্যাসে তা হয়ে উঠেছে ছন্দময়। যদি সেই বিন্যাসে সামান্যতম হেরফের করা হয় তবে ছন্দের মিল আর অবশিষ্ট থাকে না। নষ্ট হয়ে যায় সুর ব্যঞ্জনা।

(আরবী*********)

এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তাঁর পালনকর্তাকে নিভৃতে আহ্বান করেছিল এবং বলেছি: হে আমার রব্ব! আমার অস্থি বয়স ভারাবনত হয়েছে। বার্ধক্যেমাথা সুশুভ্র হয়েছে কিন্তু আপনাকে ডেকে কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৪)

ওপরের আয়াতে যদি শুধামাত্র মিন্নী (**) শব্দটিকে পরিবর্তন করে আল আযুম “(***) শব্দের পূর্বে এনে এভাবে বলা হয় যে, (আরবী********) তবে স্পষ্টতই বুঝা যায় উক্ত বাক্যে ছন্দ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র ছন্দ ও মাত্রা ঠিক রাখার জন্যই ‘মিন্নী’ (***) শব্দটিকে যথাস্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এবার দেখুন কতো সুন্দর মিল দেয়া হয়েছে। বাক্যের প্রথম দিকে বরা হয়েছে: (আরবী********) এবং তারপরই বলা হয়েছে: (আরবী********)

এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, আয়াতের ভেতর সুর ও ছন্দ এতো সূক্ষ্ম, শুধু অনুধাবন করা যায় কিন্ত ব্যক্ত করা যায় না। আগেও আমরা এ ব্যাপারে কিছুটা আলোচনা করেছি। এ ধরনের সুর ও তাল একক শব্দ সমষ্টি কিংবা একই বাক্যের বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ্ তা অনুধাবন করতে হলে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েই সম্ভব, অন্য কোনভাবে নয়।

উপরোক্ত আলোচনা একথারই ইঙ্গিত করে যে, আল-কুরআনের বর্ণনা রীতিতে সুর ও ছন্দের ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে হয়। তা এতো স্পর্শকাতর যে, শাব্দিক সাধারণ বিন্যাসের ব্যতিক্রম হলেই ছন্দপতন ঘটে যায। অথচ তা কবিতা বা কাব্য নয়। এমনকি তা কাব্যের নিয়ম-নীতি মেনে চলতেও বাধ্য নয়। কিন্তু মানুষ একে এমনভাবে সাজানো ও বিন্যাসিত দেখতে পায়, যে কারণে তারা একে কাব্য না বলে কি যে বলবে তাও ভেবে পায় না।

বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল

সুর ও ছন্দের মতো বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের কয়েকটি প্রকার আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের সেই প্রকারগুলোর কোন নিয়ম-নীতি আছে কি? এবং তা কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে আবর্তিত হয় কি?

এর উত্তর হচ্ছে- যখন একথা প্রমাণিত হয়েছে, আল-কুরআনে সূর ও ছন্দ বিদ্যমান। তাই আমরা এ প্রশ্নের জবাব সুর ও ছন্দের নিয়মানুযায়ীই দেয়ার চেষ্টা করবো। বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের ধরন বিভিন্ন সূরায় বিভিন্ন রকরে। অনেক সময় একই সূরায় একাধিক নিয়মের প্রয়োগ দেখা যায়। বিভিন্ন সূরার বাক্যান্তে বিরতির যেসব পার্থক্য পাওয়া যায় তা বাক্য ছোট, বড় কিংবা মধ্যম হওয়ার উপর নির্ভর করে। এর স্বরূপ সেই রূপ, যেরূপ কবিতার একই পঙতিতে কোন লাইন ছোট, আবর কোন লাইন বড় হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে শেষ যে কথা বলা যেতে পারে, তা হচ্ছে ছোট সূরার আয়াতন্তে বিরতিও স্বল্প। আর মাঝারি ধরনের আয়াতে বিরতি মধ্যম এবং বড় ধরনের আয়অতে বিরতি (মোটামোটি) দীর্ঘ। আর যদি অন্তমিলের দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখা যায়, ছোট সূরাগুলোতে ছন্দের সাথে উদাহরণগুলো বেশ ঘনিষ্ঠ। আবার বড় সূরাগুলোতে তাদের ঘনিষ্ঠতা কম। আল-কুরআনের সূরাসমূহের মধ্যে যে অন্তমিল পাওয়া যায় এবং যেগুলোর ব্যবহার অত্যাধিক তা হচ্ছে, ‘নূন’ (**) ‘মীম’ (**) বেং তার পূর্বে ‘ওয়াও’ (**) অথবা ‘ইয়া’ (**)। ‍উদ্দেশ্য সুর ও ছন্দের মতো এখানেও বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা।

এখন আরেকটি কথা অবশিষ্ট থেকে যায়, তা হচ্ছে একই অবস্থার বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের পার্থক্য কি জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? এর জবাব হচ্ছে- যে কথার উদাহরণ আমরা কুরআনের অধিকাংশ জায়গায় পেয়ে থাকে, তা শুধুমাত্র বৈচিত্র্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়; বরং তার কিছু উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা আছে। অনেক জায়গায় এ বৈচিত্র্যের কারণ আমরা উপলব্ধি করতে পারি আবার অনেক জায়গায় আমরা তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। যে জায়গায় আমরা ব্যর্থ হই সে জায়গায় আমরা প্রচলিত রীতি-নীতি রক্ষা করে একথা প্রতিষ্ঠিত করার ব্যর্থ প্রয়াস পাই যে, এ পদ্ধতিও চিত্রায়ণ, কল্পনা ও রূপায়ণের মতো একটি পদ্ধতি মাত্র।

যে সমস্ত জায়গায় আমরা বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিলের রহস্য বুঝতে পার তার মধ্যে সূরা মারইয়াম একটি। চিন্তা করুন এ সূরা শুরু হয়েছে হযরত জাকারিয়া (আ) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর ঘটনা্ দিয়ে। তারপর তার সাথে হযরত মারইয়াম ও ঈসা (আ)-এর ঘটনাটি জড়ে দেয়া হয়েছে। এ সূরায় বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল নিম্নরূপ। যা সূরার শুরুতে বর্ণনা করা হয়েছে:

(আরবী********)

এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তার বান্দা জাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তার পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিল নিভৃতে। সে বললো: হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি বয়সে বারাবনত হয়েছে, বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে, হে আমার পালনকর্তা। আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিমুখ হইনি। (সূরা মারইয়াম: ২-৩)

তারপর মাইরয়াম (আ)-এর ঘটনা শুরু হয়েছে এভাবে:

(আরবী********)

এ কিভাবে মারইয়অমের কথা বর্ণনা করো, যখন সে পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে পর্দা করলো। মারইয়াম বললো: আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি, যদি তুমি আল্লাহ ভীরু হও। (সূরা মারইয়াম: ১৬-১৮)

হযরত জাকারিয়া (আ) ও হযরত মারইয়াম (আ)-এর ঘটনা শেষ অক্ষরে পূর্বের অক্ষর বা হরফে-রাী (****) একই বর্ণের মাধ্যমে সমাপ্তি করা হয়েছে। আর যেখানে হযরত ঈসা (আ)-এর ঘটনা শেষকরা হয়েছে সেখানে এ পদ্ধতির কিছুটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।

(আরবী********)

(সন্তান বললো: ) আমিতো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতোদিন জীবিত থাকি, ততোদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে এবং জননীর অনুগত থাকতে। আর আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি, আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হবো। (সূরা মারইয়াম: ৩০-৩৩)

(আরবী********)

এ-ই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্য কথা, যে সম্পর্কে লোক সন্দেহ করে। আল্লাহ এমন নয় যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, ‘তিনি যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বলেন: হও, আর অমনি তা হয়ে যায়। সে আরো বললো, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাত করো, এটি সরল পথ। অতপর তাদের মধ্যে প্রতিটি দল পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করলো। সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফিরদের জন্র ধ্বংস। (সূরা মারইয়াম: ৩৪-৩৭)

ওপরের আয়অতগুলো আপনি নিরীক্ষণ করে দেখুন শেষ আয়াতের বিরতির মধ্যে পরিবর্তন এসেছে এবং তার মধ্যে দীর্ঘতা সৃষ্টি হয়েছে। এমনিভাবে অন্তমিলের সিস্টেমেও পরিবর্তন সুস্পষ্ট। শেষাক্ষরে ‘নূন’ অথবা ‘মীম’ নেয়া হয়েছে এবং তাদের পূর্বাক্ষরে ‘ওয়াও’ অথবা ‘ইয়া’ নেয়া হয়েছে। এমন মনে হয় যে, কিছুপূর্বে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছিল এবং এখন তার সমাপ্তি বর্ণনা করা হচ্ছে, যা স্বয়ং ঐ কাহিনী থেকে নেয়া।

আমরা একথার সত্যতা প্রমাণের জন্য আরো প্রমাণ উপস্থাপন করছি- যেখানে ঐ ঘটনা সমাপ্তি হয়েছে সেখানে বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল প্রথম রীতির দিকে ফিরে আসে। তা এজন্য যে, যেন পুনরায় নতুন ঘটনাবলীর দিগন্ত উন্মোচিত হয়্ ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী********)

অতপর তাদের ভেতরের দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করলো। সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফিরদের জন্য ধ্বংস। সেদিন তারা কি চমৎকার শুনবে এবং দেখবে, যেদিন তারা আমার কাছে আগমন করবে। কিন্তু আজ জালিমরা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে রয়েছে। তুমি তাদেরকে পরিতাপের দিবস সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দাও। যখন সকর ব্যাপারে মীমাংসা হয়ে যাবে। এখন তারা অসাবধানতায় আছে এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছে না। (সূরা মারইয়াম: ৩৭-৩৯)

(আরবী********)

আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকার হবো পৃথিবীর এবং তার ওপর যা আছে তার। আর আমার কাছেই তাদের সকলকে প্রত্যাবর্তন করানো হব্ তুমি এ কিতাবে ইবরাহীমের কথা শুনিয়ে দাও। নিশ্চয়ই সে ছিল সত্যবাদী নবী। যখন সে তার পিতাকে বললো: হে আমার পিতা, যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না, তার ইবাদত করো কেন? হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি, সুতরাং আমার অনুসরণ করো, আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। হে আমার পিতা! আমি আশংকা করি দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শ করবে। অতপর তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।

সূরা নামা’র শুরু ‘নূন’ (**) এবং ‘মীম’ (**) এর অন্তমিল ব্যবহার করে। যেমন:

(আরবী********)

তারা পরস্পর কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? মহাসংবাদ সম্পর্কে, যে সম্পর্কে তারা মতানৈক্য করে, না সহসাই তারা জানতে পারবে। অতরপর না, অতি সত্ত্বর তারা জানতে পারবে। (সূরা নামা: ১-৫)

যেখানে এ বর্ণনা শেষ হয়েছে এবং এর পরিবর্তে তর্ক-বিতর্কের স্টাইলে আলোচনা শুরু হয়েছে, তো হঠাৎ নিয়ম পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। যেমন:

(আরবী********)

আমি কি করিনি ভূমিকে বিছানা এবং পর্বতমালাকে পেরেক? আমি তোমাদের জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। তোমাদের নিদ্রকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী, রাতকে করেছি আবরণ। দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।

সূরা আলে-ইমরানের পুরো সূরাটিতেই ‘নুন’ এবং ‘মীম’-এর অন্তমিল বিদ্যমান। যা আল-কুরআনের সাধারণ একটি রীতি। যখন সূরা সমাপ্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং একদল ঈমানদারের দো’আর প্রসঙ্গ এসছে, তখন অন্তমিলের স্টাইলও পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেমন:

(আরবী********)

(ঈমানদারগণ বলে:) হে পরওয়ারদিগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনার। আমাদেরকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দিন। হে প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আপনি যাকে জাহানামে নিক্ষেপ করলেন তাকে অপমানিত করে ছাড়লেন। আর জালিমদের জন্য তো কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা আলে-ইমরান: ১৯১-১৯২)

বাক্যান্তে বিরতি ও অন্তমিল পরিবর্তনের এ ধারা আল-কুরআনের অনেক জায়গায়ই পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সকল জায়গায় পরিবর্তনের রহস্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা বলতে পারি না। পরিবর্তনের যে ক’টি ধারা সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল সে সম্পর্কে আমি ইঙ্গিত দিলাম। এ প্রসঙ্গে যতোটুকু আলোচনা করা হয়েছে আমার মতে তা-ই যথেস্ট।

একটি কথা অবশিস্ট থেকে যায় তা হচ্ছে আল-কুরআনের সুর ও ছন্দের রীতি-নীতি আলোচ্য বিষয় ও স্থানের (***) পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যায়। তবু আমরা একথা জোর দিয়ে বলতে পারি, কুরআনের সুর ও ছন্দ একটি বিশেষ নিয়মের অধীন। সর্বদা তা বাক্য ও তার পরিধির অনুরূপ হয়ে থাক। এটি এমন এক নীতি যার কোন ব্যতিক্রম ব্যত্যয় ঘটে না। সুর ও ছন্দের প্রকার ও বিশ্লেষণের জন্য তার নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও পরিভাষার জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া তার আলোচনা সম্ভবপর নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে পাঠকদের যেমন পরিভাষাগত জ্ঞানের অভাব আছে তদ্রূপ আমারও। কিন্তু আমি মনে করি, যদি সুর ও ছন্দের ধরন ও সেই সম্পর্কে মৌলিক কিছু আলোচনা করে দেয়া যায়, তাতেই আমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাবে।

সূরা আন-নাযিয়াতে সুর ও ছন্দের দুটো নীতি আছে যা এ সূরায় পাওয়া যায়। তার মধ্যে প্রথম নিয়মটি নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে পাওয়া যায়। সূরার এ অংশটি ছোট ছোট কিছু বাক্যের সমাহর। এ সমস্ত বাক্যে ‍মৃত্যু ও কিয়াতমের ধারা বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেখানে দ্রুত এবং বলিষ্ঠ তৎপরতা পাওয়া যায়।

ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী********)

শপথ সেই ফেরেশতাদের যারা ডুব দিয়ে আত্মা উৎপাটন করে, শপথ তাদের যারা আত্মার বাঁধন খুলে দেয় মৃদৃভাবে, শপথ তাদের যারা সন্তরণ করে দ্রুত গতিতে, শপথ তাদের যারা দ্রুত গতিতে অগ্রসর হয় এবং শপথ তাদের যারা সকল কর্ম নির্বাহ করে। কিয়ামত অবশ্যই হবে। যেদিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পনকারী্ অতপর আসবে পশ্চাতগামী। সেদিন অনেক হৃদয় ভীত-বিহ্বল হবে। (সূরা আন-নাযিয়াত: ১-৮)

(আরবী********)

তাদের দৃষ্টি অবনত হবে। তারা বলে: আমরা কি উল্টো পায়ে প্রত্যাবর্তিত হবোই, গলিত অস্থি যাবার পরও? তবেতো এ প্রত্যাবর্তন সর্বনাশা হবে। (সূরা নাযিয়াত: ৯-১১)

(আরবী********) অতএব তা হচ্ছে এক মহানিনাদ। তখনই তারা ময়দানে উপস্থিত হবে। (সূরা আন-নাযিয়াত: ১৩-১৪)

সুর ও ছন্দের দ্বিতীয প্রকার পাওয়া যায় নিম্নোক্ত আয়াতগুলো। এ আয়াতগুলো মন্থর, ধীরগতিসম্পন্ন এবং দীর্ঘতার দিকে মধ্যমাকৃতির। এ সমস্ত আয়াতের সম্পর্কে ঐ সম্পত আয়াতের মতো যেখানে কোন ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মূসা (আ) সংক্রান্ত যে সমস্ত আলোচনা এসেছে এ আয়াত ক’টি তারই অংশ বিশেষ। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী********)

মূসার বৃত্তান্ত তোমার নিকট পৌঁছেছে কি? যখন তার রব্ব তাকে তুর উপত্যকায় আহ্বান করেছিলেন, (এবং বলেছিলেন) ফিরাউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে সীমালংঘন করছে। অতপর বলো: তোমার পবিত্র হওয়ার আগ্রহ আছে কি? আমি তোমাকে তোমার রব্ব-এর দিকে পথ দেখাব, যেন তুমি তাকে ভয় করো। (সূরা আন নাযিয়াত: ১৫-১৯)

আমি ওপরে দু’ ধরনের সুর ও ছন্দের আলোচনা করলাম। আমার মনে হয়, এ দু’ প্রকারের পার্থক্য ও নিয়ম-নীতি সম্পর্কে বিশদ আলোচনার কোন প্রয়োজন নেই। দুটোর মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। উপরন্তু উভয়টির আলোচনাস্থলও এক এবং অভিন্ন। উভস্থান সুর ও ছন্দ স্বকীয়তার ভাস্বর।

আসুন এবার আমরা সুর ও ছন্দের তৃতীয় প্রকার নিয়ে কিছু আলোচনা করি। এ প্রকারের সুর ও ছন্দ বিশেষ করে দো’আর বাক্যসমূহে পাওয়া যায়। এবং সেখানে নরম সুরে হৃদয়ের আবেগকে তুলে ধরা হয়। অবশ্য এ ধরনের আয়াতগুলো কিছুটা দীর্ঘ। যেমন:

(আরবী********)

(তারা বলে:) হে পরোয়ারদিগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনার, আমাদেরকে আপনি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচান। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয়ই আপনি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করলেন তাকে অপমানিত করে ছাড়লেন। আর জালিমদের জন্র তো কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে। (এই বলে যে,) ‘তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আনো’ তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে প্রভু! তাই আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন এবং আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দিন, আর আমাদের ‍মৃত্যু দিন নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দিন- যা আপনি ওয়াদা করেছেন আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে আপনি অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি ভঙ্গ করবেন অঙ্গীকার।

অন্য এক দো’আয় বলা হয়েছে:

(আরবী********)

হে আমাদের প্রতিপালক! আপনিতো জানেন যা আমরা গোপনে করি এবং প্রকাশ্যে করি। আল্লাহর কাছে পৃথিবীতে ও আকাশে কোন কিছুই গোপন নেই, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা দো’আ শ্রবণ করেন। হে আমার প্রতিপালক আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমা সন্তানদের মধ্য থেকেও্ হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে মাফ করুন, যদিন হিসেব-নিকেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। (সূরা ইবরাহীম: ৩৮-৪০)

সুর ও ছন্দের আগের দুটো ধরনের ব্যতিক্রম এবারের ধরনটি, একথা প্রমাণের জন্য সুর ও ছন্দের কায়দা-কানুন ও তার পরিভাষাগুলো আয়ত্ব করতে হবে এমন নয়। এটি হৃদয় ‍নিঃসৃত এক ঝংকার যা উঁচু-নীচু সুর তরঙ্গে দো’আয় রূপ নিয়েছে।

আমি সুর ও ছন্দের আর একটি ধরন নিয়ে আলোচানার সাহস দেখাব। এ সুর ও ছন্দের দুলায়িত উর্মিমালা এবং তার সুরলহরী বরড় দীর্ঘ। এর প্রকৃতি ওপরে আলোচিত প্রকৃতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আমি ‍পুরো আস্থার সাথেই একথা বলতে পারি যে, এর মধ্যে এবং পূর্বে আলোচিত সুর ও ছন্দের মধ্যে যে পার্থক্য পাওয়া যায় তা দিবালোকের মতোই সুস্পষ্ট।

আমি সুর ও ছন্দের যে প্রকৃতির কথা বলতে চাচ্ছি, সেখানে উর্মিমালার সাথে সাথে গভীরতা ও প্রশস্ততাও পাওয়া যাবে। অধিকন্তু ভয় এবং বিভিষিকাও বিদ্যমান। কেননা এ সুর ও ছন্দ হচ্ছে ঝড়ের, প্লাবনের। চিন্তা করুন:

(আরবী*********)

আর নৌকাখানি তাদের বহন করে চললো পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গমালার সাথে। আর নূহ তার পুত্রকে ডাক দিরো (কারণ) সে সরে রয়েছিল। সে বললো: হে বেটা! তুমি আমাদের সাথে আরোহণ করো, এবং কাফিরদের সাথে থেকো না। পুত্র বললো: আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। নুহ বলরো: আজকের দিনে আল্লাহর হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল। ফলে সে নিমজ্জিত হয়ে গেল। (সূরা হুদ : ৪২-৪৩)

ঝড় ও প্লাবন যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তার সাথে গভীর সাদৃশ্য ‍সৃষ্টির জন্য এ আয়াতে সুর-তরঙ্গের যে অবতারণা করা হয়েছে, ঢেউয়ের মতো দীর্ঘ এবং সদা দুদুল্যমান, কখনো উঁচু এবং কখনো নিচু। এ আয়াতে শব্দ বিন্যাসের যে ধারা পাওয়া যায় তা ঝড়-বন্যা পরিবেষ্টিত বিভিষিকাময় দৃশ্যের সাথে পুরোপুরি সঙ্গত এক চিত্র।

আমরা আরেকটু ধৃষ্ঠতা দেখিয়ে সুর তরঙ্গের আরেকটি ছন্দায়িত ধরন সম্পর্কে আলোচনা করবো। কিন্তু একটি ওপরের উদাহরণের মতো এতো বেশি মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে না। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী*********)

হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার রব্ব-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করো সন্তুষ্ট স্নেহভাজন হয়ে। অতপর আমার বানআদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরা আল-ফজর: ২৭-৩০)

যখন পাঠক উচ্চস্বরে এ আয়াত পাঠ করে তখন এর কোমল সুর তরঙ্গ অনুভূত হয়। এ আয়াতে যে সুর-তরঙ্গ পাওয়া যায় তা ঐ তরঙ্গের মতো যা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ঐ আয়অতে প্রাপ্ত সুর-তরঙ্গ মৃদু ও তীব্র- উভয় অবস্থাই শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। ইয়া’র প্রথম আলিফের আওয়াজ যখন উচ্চস্বরে পৌঁছে এবং ‘আইয়্যু’ কে অপেক্ষাকৃত নিচু আওয়াজে পড়া হয় তখন সেখানে এক ধরনের সুর-তরঙ্গ পরিলক্ষিত হয়্ কিন্তু শুধু একথার দ্বারা সুর-তরঙ্গের সে সৌন্দর্য দৃষ্টিগোচর হবে না। কেননা সেখানে শুধু মাত্রার (***) মধ্যে সমতা সৃষ্টি হয়, স্বরের মধ্যে নয়। তাই সেখান থেকে সঙ্গীতের সুর অবশ্যই প্রভাবিত হয়। প্রবেশরত রূহের ওপর কোন প্রভাব পড়ে না, প্রবেশরত রূহের সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে ঐ বৈশিষ্ট্যের সাথে শব্দসমূহের স্বর ও ধ্বনির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর সন্ধান শুধু ঐ ব্যক্তি লাভ করতে পারে যে চোখ-কান খুলে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে কুরআন পাঠ করে।

আমরা এ প্রসঙ্গের এখানেই যবনিকা টানলাম। যেন সুর-তরঙ্গের অথৈ সাগরে আর হাবু-ডুবু খেতে না হয়।

সপ্তম অধ্যায়

কুরআনী চিত্রের উপাদান

আল-কুরআনের চিত্রায়ণ পদ্ধতে যে শৈল্পিক বিন্যাস দেখা যায়, এবার আমরা তার আরেকটি দিক নিয়ে আলোচনা করবো। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল-কুরআন বিভিন্ন ঘটনাবলীকে দৃশ্যাকারে ও চিত্রাকারে বর্ণনা করে। এজন্য আমরা বলতে চাই, যখন ঐ সমস্ত চিত্রে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ একত্রিত হয়ে যায় তখন তার শৈল্পিক বিন্যাস সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠে।

১. চিত্রে একটি থিম থাকা।

২. স্থান কাল ও পাত্র চিত্রের অনুরূপ হওয়া।

৩.চিত্রের সমস্ত অংশ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।

৪. যে কাগজ বা কাপড়ের টুকরোতে চিত্রাংকন করা হবে তার প্রটি অংশ চিত্রের অংশানুপাতে ভাগ করা।

আমরা ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ে এ প্রসঙ্গে কিছু ইঙ্গিত করেছি। যেখানে আমরা নাম-যশের জন্য ধন-সম্পদ খরচ করার চিত্রটি উপস্থাপন করেছি। সাথে ঐ পাথরটির ছবিও, যার ওপর মাটির হাল্কা আবরণ পড়েছে। সেই সমস্ত লোকের চিত্রের পাশাাশি তাদের চিত্রও অংকনের চেষ্টা করা হয়েছে যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মাল-সম্পদ দান করে। আর ঐ বাগানের ছবিও আমরা দেখিয়েছি, যা একটি চিলার ওপর অবস্থিত। আমরা সেকানে বলেছি, ঐ সমস্ত চিত্রের অংশ এবং তার আনুষঙ্গিক বিষয়াদিতে কী পরিমাণ ভারসাম্য পাওয়া যায়।

আমরা এখন আল-কুরআনের শৈল্পিক বিন্যাসের যে দিকটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই, তা হচ্ছে বিন্যাসের উপায়-উপকরণ। অন্য কথায় বলা যায় এটি হবে সেই তালার চাবি স্বরূপ।

আমাদের দৃষ্টিতে আল-কুরআনের বিন্যাস নিম্নরূপ:

এক: এ বিষয়ে যে কথাটি অত্যন্ত জরুরী তা ‘ওয়াহদাতে নক্‌শ’ (ছবির একক)। চিত্রকর্ম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখেন এমন একজন ব্যক্তিও বুঝতে পারেন যে, ‘ওয়াহদাতে নক্‌শ’ কী? আমরা শুধু একথা বলেই শেষ করতে চাই যে, এটি চিত্রকর্মের মৌলিক ও বুনিয়াদী নিয়মের অন্যতম একটি নিয়ম। যেন এক অংশ আরেক অংশের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

দুই: দ্বিতীয প্রয়োজনীয় কথা হচ্ছে, যে কাগজ কিংবা কাপড়ের টুকরোতে ছবি আঁকা হয় সেখানে ছবির প্রয়োজন অনুসারে তার অংশসমূহ ভাগ করে নেয়া। যেন ছবির আঁকায় কোনরূপ সমস্যা সৃষ্টি না হয়।

তিন: তৃতীয় বস্তু হচ্ছে, ঐ রং যা দিয়ে চিত্রকে আকৃতি প্রদান হয় এবং যার মাধ্যমে সৌন্দর্য পুরোমাত্রায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে এবং চিন্তা ও বিষয়বস্তুর সম্মিলন ঘটায়।

রঙের মাধমে যে ছবি আকৃতি প্রাপ্ত হয়, তার মধ্যে মিল বা অনুকূল তা এতো বেশি প্রয়োজন, যেমন সিনেমা ও থিয়েটারে প্রদর্শনীর জন হয়ে থাকে। কুরআনী ছবির ভিত্তিও একই জিনিসের ওপর স্থাপিত। যদিও তা শুধুমাত্র শব্দ বা বর্ণ সমষ্টির মাধ্যমে আঁকা হয়্ ছবির আঁকার অন্য কোন উপাদান সেখানে থাকে না। তবু কুরআনী চিত্রের চমক ও অলৌকিকত্ব ঐসব চিত্রের ঊর্ধ্বে যা রং-তুলির সাহায্যে ক্যানভাসে আঁকা হয়।

১. আল-কুরআনের ছোট সূরাসমূহের মধ্যে যে সূরা সম্পর্কে কিছু লোকের ধারণা এটি যাদুকরদের যাদুটোনা সম্পর্কিত সূরা। সেই সূরা ফালাক সম্পর্কেই আলোচনা করা যাক। প্রশ্ন হতে পারে, এ সূরাটি কখন পাঠ করা হয়? স্বভাবতই দেখা যায় এটি আশ্রয় প্রার্থনার মুহূর্তে তিলাওয়াত করা হয়। এ সময় ভয়, নিন্দুকের নিন্দা, কিংবা অজানা আশংকা জেগে উঠে। শুনুন এবং চিন্তা করে দেখুন:

(আরবী**********)

আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে। অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়। গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে যাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে। (সূরা আল-ফালাক: ১-৫)

একটু চিন্তা করুন, ‘ফালাক’ (***) কী? যার জন্য তার প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা জরুরী হয়ে পড়ে। অনেকগুলো অর্থের মধ্যে আমরা ‘প্রভাত’ অর্থটি নির্বাচন করেছি। কেননা অন্ধকারকে একমাত্র ‘প্রভাত’ই বিদীর্ণ করে দেয়। তাই প্রভাত অর্থ গ্রহণ করাই এখানে সমীচীন। কারণ, এখানে বিশেষ ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। যার যৌক্তিকতা আমরা সামনে অগ্রসর হলে বুঝতে পারবো।

এ সূরায় সমস্ত সৃষ্টি থেকে প্রভাতের পালনকর্তার নিকট আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে। ‘মা খালাকা’ (****) শব্দে ‘মা’ (**) অক্ষরটি মাওসূলার অর্থ প্রদান করেছে অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টি। মনে হয় সমস্ত সৃষ্টি অন্থকারের গবীরে নিমজ্জিত। (***)-“যখন রাতের আঁধার সবকিছুকে ঢেকে নেয় তখন এক ধরনের বীতিকর অবস্থা দৃষ্টিগোচর হয়।”

(আরবী*******)- ‘যাদুকর মহিলাদের গ্রন্থিকে ফুঁক দেয়ার ঘটনা গোটা পরিবেশকে আরো ভয়ঙ্কর করে তুলে। কারণ ফুঁকের মাধ্যমে যাদু অধিকাংশ সময় রাতের আঁধারে সংঘটিত হয়ে থাকে। (আরবী*******) হাসাব বা হিংসা এক গোপনীয় কাজের নাম, যা মানুষের মনের অন্ধকার কুঠুরীতে লুকিয়ে থাকে। এ অর্থে হিংসাও এক ধরনের ক্ষতিকর এবং ভয়ংকর কাজ। এখানে অন্ধকার, ভয় ও আতংক ইত্যাদি কানায় কানায় পরিপূর্ণ। আশ্রয় প্রার্থনাকারী ঐ সকল অন্ধকার থেকে আল্লাহর আশ্রয়ে আসতে চায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহতো সবকিছুর প্রতিপালক তবে নির্দিষ্ট করে ‘রাব্বিল ফালাক’ বা প্রভাতের প্রতিপালক বলার সার্থকতা কি? এর উত্তর হচ্ছে, সৌন্দর্য সৃষ্টি ও স্থান-কালের সাথে অনুকূলতা সৃষ্টির জন্য এরূপ করা হয়েছে। তবে সাধারণ জ্ঞানের দাবি ছিল, অন্ধকার থেকে ‘রাব্বিন নূর’ বা আলোর প্রবুর কাছে আশ্রয় চাওয়া। কিন্তু এ চিন্তা ঠিক নয়, কারণ এখানে জিনিসকে দেখা গেছে তা স্পর্শকাতর ও রহস্যময় এক ছব। যা আলোর পরশে বিলীন হয়ে যায়। আলো সবকিছুকে স্পষ্ট করে দেয়। যদি অন্ধকারের বিপরীতে আলো বা ‘নূর; (***) শব্দ ব্যবহার করা হতো তবে তা গ্রন্থিতে ফুঁক দেয়া ও হিংসা শব্দদ্বয়ের সাথে খাপ খেতো না। তাই তার পরিবর্তে ‘ফালাক’ শব্দটি দিযে সামঞ্জস্য সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হয়েছে। যা প্রকারান্তরে আলোর কথাই বুঝিয়ে থাক্ ‘ফালাক’ –এর সময়টি প্রভাতের উজ্জ্বলতার পূর্বে আসে যখন আলো-আঁধারী ভাব বিরাজমান থাকে। সে সময়টি অস্পষ্ট ও রোমাঞ্জকরও বটে।

প্রশ্ন হতে পারে, এখানে কি কি বস্তুর সমন্বয়ে চিত্র অংকিত হয়েছে?

উত্তর হচ্ছে, যদি ‘ফালাক’ (***) ও ‘আল গাসিক’ (***) শব্দ দুটোকে লক্ষ্য করা যায় তবেদেখা যাবে এ হচ্ছে প্রকৃতিগত দুটো চিত্র এবং যদি (***)

(****) ও (****) নিয়ে চিন্তা করা হয় তবে দেখা যাবে, এ দু’টো দল আল্লাহর সৃষ্ট মানুষ।

আর যদি ‘ফালাক ও ‘গাছিকিন’ শব্দ দুটোকে পৃথক পৃথক করে দেখা হয় তবে সেখানে দুটো চিত্রই প্রতিভাত হয়ে উঠে। সময়ের বিচারে একটি আরেকটির বিপরীত। অর্থাৎ ‘ফালাক’ অর্থ প্রভাত আর ‘গাসিকিন’ অর্থ রাত। তদ্রূপ ‘আন নাফ্‌ফাসাত’ (***) এবং ‘আল হাসিদ’ (***) শব্দ দুটোও মানুষের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের দু’টো দল। দেখা যাচ্ছে ছবির সব ক’টি উপাদান ক্যানভাসে পর্যাক্রমে বিন্যাস করা হয়েছে। চিত্রপট বা ক্যানভাসে একে-অপরের মুখোমুখি। সমস্ত অংশের রং-ঢং পর্যন্ত এক ও অভিন্ন। সমস্ত অংশের মধ্যেই ভয়-ভীতি মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। অন্ধকার সবকিচুকে গ্রাস করে নিয়েছে। ছবির মূল থিম বিভিন্ন অংশ এবং রঙ সবকিছু একই কেন্দ্রে কেন্দ্রিভূত।

এ আলোচনায় প্রচলিত কোন রীতি-নীতির সাহায্য নেয়া হয়নি এবং এ চিত্রে যে অনুপম সৌন্দর্য পাওয়া যায়, কালের পরিক্রমণে তা ম্লান হবা মতো নয়। কারণ, এখানে কয়েকটি শব্দ এবং চিন্তার বৈপরিত্যের প্রশ্ন নয়। চিত্রের ক্যানভাস, স্থানের বিস্তৃতি ও পরিধি, তার মিল ও ধারাবাহিকতা এবং ছবির থিম যা ছবি আঁকার জন্য বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখন শুধু শব্দ ও বর্ণনা ঐ সমস্ত উদ্দেশ্যকে পুরো করে দেয় তখন তা অলৌকিক এক ছবির রূপ নেয়।

২. কুরআন মজীদ অনাবাদী ও শুষ্ক জমিনকে এক জায়গায় ‘হামিদাতুন’ (***) (মৃত-পতিত) এবং অপর জায়গায় ‘খাশিয়াতান’ (***) (ঝুঁকে পড়া) বলেছে। অনেকেই মনে করেন, ভাষাকে মাধুর্য করে তুলার জন্য পৃথক দুটো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এবার দেখুন, এ দুটো শব্দ কোন্‌ প্রেক্ষিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

‘হামিদাতান’ (***) শব্দটি এসেছে নিম্নোক্ত আয়াতে:

(আরবী*******)

(হে লোক সকল! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করো তবে (ভেবে দেখ) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতি ও অপূর্ণাকৃতি বিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে, তোমাদে কাছে ব্যক্ত করার জন্য। আর আমি নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছে রেখে দেই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশু অবস্থায় (সেখান থেকে ) বের করি। তারপর তোমরা যৌবনে পদার্পণ করো, তোমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করে এবং কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌঁছে দেই। তখন সে জানার পরও জ্ঞাত বিষয়ে সজ্ঞান থাকে না। তুমি ভূমিকে মৃত দেখতে পাও, অতপর আমিযখন তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা সতেজ ও স্ফীত হয়ে যায়। এবং সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। (সূরা আল-হাজ্জ: ৫)

‘খাশিয়াতান’ (***) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে:

(আরবী*******)

তার নিদর্শণসমূহের মধ্যে আছে দিন, রাত, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা করো না, চন্দ্রকে না, আল্লাহর সিজদা করো যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন। যদি তোমরা নিষ্ঠার সাথে তাঁরই ইবাদত করো। অতপর তারা যদি অহংকার করে, তবে যারা তোমার পালনকর্তার নিকট আছে, তারা দিন-রাত তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে কখনো ক্লান্ত হয় না। তাঁর এক নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখবে অবনত হয়ে (অনুর্বর) পড়ে আছে। অতপর যখন আমি তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা সতেজ ও স্ফীত হয়ে উঠে। (সূরা হা-মীম আস-সিজদাহ: ৩৭-৩৯)

উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে ‘হামিদাতান’ (***) এবং ‘খাশিয়াতান’ (***) শব্দ দুটোর পার্থক্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রথম আয়াতে জীবন, জীবনের রূপান্তর ও পুনরুক্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাই সেখানে সেগুলোর সাথে সাস স্য রেখে ‘হামিদাতান’ বা মৃত বলা হয়েছে। আবার মানুষকে যেভাবে পুনরুত্থান ঘটাবেন ঠিক সেইভাবে তিনি জমিনকে পুনরুজ্জীবিত করেন, ফলে সে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে।

পক্ষান্তরে দ্বিতীয আয়াতে ইবাদাত, নম্রতার সাথে আনুগত্য ও সিজদার কথা বলা হয়েছে, তাই সেখানে জমিনকে ‘খাশিয়াতান’ বা বিনয়ে মস্তক অবনত বলে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ জমিন পানির মুখাপেক্ষী হয়ে অধমুখে আল্লাহর পানির প্রতীক্ষা করতে থাকে, যখন পানি পায় তখন তা ফুলে-ফেঁপে উঠে। একথা বলার পর পূর্বোক্ত আয়াতের মতো ফল-ফসল উৎপন্নের কথা বলা হয়নি। কেননা এবাদত ও সিজদার সাথে ফল-ফসল উৎপন্নের কথাটি অসুন্দর ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই এ আয়াতে (*****) (সতেজ ও স্ফীত) শব্দ দুটো সেই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, যে অর্থে পূর্বের আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে শুধু এজন্যই শব্দ ‍দুটো ব্যবহার করা হয়েছে, যেন জমিনের নড়াচড়া প্রমাণিত হয়। কেননা ইতোপূর্বে জমিন নতজানু হয়ে পড়েছিল। এখানে সেই অবস্থার ওপর গতি সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ, এ দৃশ্যে ইবাদতের জন্য সবাই নড়াচড়ার মাধ্যমে অবস্থার পরিবর্তন করছে, এজন্য এটি সম্ভব ছিল না যে, এখানে জমিন স্থির থাকবে। সে জন্য চলমান এ দৃশ্যে ইবাদাতকারীদের সাথে জমিনেরও গতি সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ, ছবিতে সবকিছু চলমান হলে জমিন স্থির থাকবে কেন? এখানে অতি সূক্ষ্ম এক সৌন্দর্য কিংবা দর্শকের চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দেয়।

‘হুমুদুন’; (***) এবং ‘কুশুয়ুন’ (***) শব্দ ‍দুটো অর্থের দিক দিয়ে অভিন্ন। এ দুটো শব্দের অর্থের মধ্যেই পুনরায় জীবন লাভের ইঙ্গিত রয়েছে। শুধু বর্ণনায় নতুনত্ব আনার জন্য এ দুটো শব্দ প্রয়োগের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু কুরআন যেহেতু বক্তব্যের সাথে সাথে শুধু চিন্তার জগতেই নয় বরং মনের মুকুরেও একটি প্রতিচ্ছবি ফেলতে চায় তাই এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। যাতে পুরো বক্তব্যের মধ্যে একটি যোগসূত্র পাওয়া যায় এবং সবগুলোর সমন্বয়ে একটি চিত্রও পূর্ণতা লাভ করে।

উল্লেখিত আয়াতসমূহে শব্দের বিভিন্নতা একতার অকাট্য প্রমাণ বহন করে যে, আল-কুরআনের চিত্রায়ণ পদ্ধতিটি বর্ণনা-বিশ্লেষণের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। তাছাড়া কুরআন শুধামাত্র বোধগম্য একটি অর্থ বলে দিয়েই তৃপ্ত নয় বরং অর্থের সাথে সাথে একটি জীবন্ত চিত্রও সে উপস্থাপন করে। এ কারণেই স্থান-কাল ও পাত্র ভেদে কুরআনের শব্দচয়নেও সূক্ষ্ম পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

এবার আমরা দেখচ ঐ দুটো ছবি এবং তার অংসসমূহের মধ্যে কোন ধরনের স্বাতন্ত্র্য বর্তমান। প্রথম চিত্রের ভিন্নতা হচ্ছে তার মধ্যে এমন কতিপয় বস্তুর বর্ণনা করা হয়েছে যা অস্তিত্বহীন ছিল, তাদেরকে আকার-আকৃতি দিয়ে জীবন দান করা হয়েছে। অর্থাৎ তার মধ্যে প্রাণের স্পন্দন জাগিযে দৃশ্যমান করা হয়েছে। তার অংশের মধ্যে একটি হচ্ছে বীর্য যা বিভিন্ন পর্যায়ে অতিক্রম করে একটি পর্যায়ে উপনীত হয়। আরেকটি হচ্ছে মৃত জমিন, বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে জীবন্ত হয়ে উঠে। আস্তে আস্তে তা ফল-ফসলে ভরে যায়। বস্তুত সবকিছু মিলে যে অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতার সৃষ্টি করা হয়েছে, তা জীবনের।

দ্বিতীয চিত্রের প্রাকৃতিক কিছু বর্ণনা করা হয়েছে। এও বলা যায় যে, কতিপয় প্রাকৃতিক চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। এ চিত্রের অংশগুলো হচ্ছে রাত, দিন, চাঁদ, সূর্য এবং জমিন যারা আল্লাহর নিকট আনুগত্যের মস্তক ঝুঁকিয়ে রয়েছে। জমিনের ওপর জীবন্ত দুটো দলকে পাওয়া যায় যাদের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু দৃশ্যত এক। একদল হচ্ছে মানক সমাজ যারা আল্লাহর ইবাদত থেকে উদাসীন। অপর দল হচ্ছে ফেরেশতাগণ, যারা রাত-দিন সারাক্ষণ আল্লাহর ইবাদতে মশগুল। এ সমস্ত অংশ মিলে যে ছবিটি পরিদৃষ্ট হয় তা ইবাদতের চিত্র। এ চিত্রের বিশাল ক্যানভাসে তার প্রটি অংশকেই যথাযথভাবে সংযোজন করা হয়েছে।

৩. আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ঐসব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক আলোচনারই নিয়াতের এক সার্বিক বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে এক ধরনের বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়। আমরা ‍ুদাহরণ স্বরূপ দুটো জায়গার উল্লেখ করছি। যেমন:

(৩.ক)

(আরবী*******)

আল্লাহ তোমাদের ঘরকে অবস্থানের জায়গা এবং চতুষ্পদ জন্তুর চামড়া দিয়ে তোমাদের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তোমরা সেগুলোকে সফরকালে এবং বাড়িতে অবস্থানকারলেও পা। ভেড়ার পশম, উটের বাবরিচুল ও ছাগলের লোম দিযে কতো আসবাবপত্র ও ব্যবহারের সামগ্রী তৈরী করেছেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। আল্লাহ তোমাদের জন্য সৃজিত বস্তু দ্বারা ছায়া করে দিয়েছেন এবং পাহাড়সমূহে তোমাদের জন্য আত্মগোপনের জায়গা করেছেন এবং তোমাদের জন্য পোশাক তৈরী করে দিয়েছেন। যা তোমাদেরকে গ্রীস্ম ও বিপদের সময় রক্ষা করে। এমনিভাবে তিনি তোমাদের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহের পূর্ণতা দান করেন, যেন তোমরা অনুগত হও। (সূরা আন-নাহল: ৮০-৮১)

(আরবী*******)

তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে চিন্তার খোরাক আছে। আমি তোমাদেরকে পান করাই উদরস্থিত বস্তুসমূহের মধ্য থেকে গোবর ও রক্ত নিঃসৃত দুগ্ধ যা পানকারীদের জন্য উপাদেয় এবং খেজুর বৃক্ষ ও আঙ্গুর ফল থেকে তোমরা উত্তম খাদ্য তৈরী করে থাকো, এতে অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। তোমার রব্ব মৌমাছিকে নির্দেশ দিয়েছেন: পাহাড়-পর্বতের গায়ে, বৃক্ষ বা উঁচু ডালে ঘর তৈরী করো। তারপর সর্বপ্রকার ফল থেকে ভক্ষণ করো এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিষেধক। এতে নিদর্শন আছে যারা চিন্তাশীল তাদের জন্য। (সূরা আন নাহল: ৬৬-৬৯)

ওপরে আমরা ‘ক’ ও ‘খ’-তে দু’প্রকারের আয়তের উদ্ধৃতি দিয়েছি। উভয় প্রকারের আয়অতেই ঐসব নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যা আল্লাহর বান্দার জন্য দিয়েছেন। এবার আমরা দেখব উভয় প্রকার আয়াতের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কিনা, আর যদি থাকে তবে তা কি ধরনের?

প্রথম আয়াত ক’টিতে (৩.ক) এমন বস্তুর বর্ণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে মানুষ আশ্রয় লাভ করে থাকে। অথবা যে ছায়া থেকে উপকৃত হয় কিংবা তা পরে লজ্জা আবৃত করে। যেমন- ঘর, ছায়া, কাপড়-চোপড় এবং এ ধরনের অন্যান্য সামগ্রী। উপরোক্ত আয়াতের মূল বক্তব্য তাই। এ চিত্রে চতুষ্পদ জন্তু বর্ণনাও এক বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত। যেমন তার চামড়া দিয়ে মানুষ তাঁবু তৈরী করে যা সহজে বহনযোগ্য। পশম দিযে চাদর ও অন্যান্য পোশাক তৈরী করা হয়। বস্তুত এ চিত্রে স্থান, চাদর এবং ছায়ার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয আয়াত ক’টিতে (৩.খ) পানীয় তৈরীর বর্ণনা দেয়া হয়েচে। যেমন মাদকদ্রব্য (যা ফল থেকে তৈরী করা হয়), দুধ, মধু (যা মৌমিাছি থেকে তৈরী হয়) এবং ঐসব জন্তুর বর্ণনা করা হয়েছে যা থেকে মানুষ পানীয় পেয়ে থাকে।

মূলত ওপরে অতি সূক্ষ্ম এক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যা কোন সাধারণ চিত্র নয়, এক অসাধারণ চিত্র। দেখুন, মাদক দ্রব্য ফল থেকে তৈরী করা হয়, কিন্তু তার ধরন ও প্রকৃতি ঐ ফল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আবার মধু ফুল থেকেই সংগৃহীত হয় কিন্তু তার সাথে এর কোন সাদৃশ্যতা নেই। দুধ গোবর ও রক্তের মধ্য ধেকে সৃষ্টি হয় কিন্তু দুধের প্রকৃতি ও গুণাগুণের সাথে গোপর ও রক্তের সামান্যতম সম্পর্কও নেই। এ সমস্ত পানীয় অন্য বস্তু থেকে সৃষ্টি। চিন্তা করলে পুরো দৃশ্যেই প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যায।

বর্ণিত আয়অতসমূহে স্বতন্ত্রতার যে সূক্ষ্ম চিত্র প্রতিবাত হয়েছে তার প্রতিটি অংশেই একের সাথে অপরের সাদৃশ্যতা ও সমতা বর্তমান। তার মধ্যে একদিকে যেমন সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। অপরদিকে তা আশ্চর্যের বিষয়ও বটে। এ ধরনের উপমার সংখ্যা কুরআনে নেহায়েত কম নয়। আমরা নিচের আরেকটি উদাহরণ তুলে ধরছি, যা এ বিষয়ের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করে।

(আরবী**********)

যারা তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপরে রয়েছে। অতএব যে শপথ ভঙ্গ করে অবশ্যই সে নিজের ক্ষতি ডেকে আনে, আর যে আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করে আল্লাহর অচিরেই তাকে মহাপুরষ্কার দানে ধন্য করবেন। (সূরা আল-ফাতাহ: ১০)

এ আয়অতে যে চিত্র আঁকা হয়েছে, তা হচ্ছে হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণের। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: (আরবী**********)-আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপরে রয়েছে’। এখানে এক বিশেষ মুহূর্তে যাচাই ও পরখ করা হচ্ছ। কিন্তু ‘ইয়াদুল্লাহি’ (আল্লাহর হাত) বলে রূপায়ণ পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য প্রাসঙ্গিকতা ও বাক্যের সামঞ্জস্যতা বিধান করা। অলংকার শাস্ত্রের ওলামাদের কাছে এর পারিভাষিক নাম হচ্ছে- ‘মুরাআতুন নযীর’ বা মনোযোগ আকৃষ্টকারী উপমা। কিন্তু অলংকার শাস্ত্রের ওলামাগণ বাহ্যিক অবস্থার ওপরই দৃষ্টি প্রদান করেন। তাই ছবি তাদের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়্ কিন্তু আমরা তাদের সে পরিভাষা ছাড়াও দৃশ্যাংকনে ছন্দ, বিন্যাস এবং থিম এর পুরো সম্মিলন দেখতে পাই। এ সম্মিলন এজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে চিত্রের অংশাবলী পুরো দৃশ্যটার সাথেই খাপ খেয়ে যায়।

কিন্তু একথা স্মরণ রাখা দরকার, আল-কুরআন এ দৃশ্যাংকনে শুধু পারস্পরিক সূক্ষ্ম সম্পর্কে সাহায্য নেয়নি বরং অনেক সময় দূরের সম্পর্ককেও সে কল্পনার মাধ্যমে খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। আমরা মূলত চিত্রায়ণ ও দৃশ্যাংকনের ভাষায় কথা বলছি। কারণ আমরা আমাদের বক্তব্য উপস্থাপনের পূর্বেই একটি চিত্রের মুখোমুখি হই (যা ওপরের আয়াতে পেশ করা হয়েছে)। দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় আসমান ও জমিনকে একত্র করে উপস্থাপন করা হয়। অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং জীবিত প্রাণিকে একই পরিসরে একত্রিত করে দেয়া হয়। আর এটি ঐ জায়গায়ই হয়ে থাকে যেখানে চিত্রপটে প্রশস্ততা ও বিস্তৃতির অবকাশ থাকে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না, কিভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং পাহাড়ের দিকে, তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে? এবং পৃথিবীর দিকে, দেখ, কিভাবে তা সমতল করা হয়েছে? (গাশিয়া: ১৭-২০)

দেখুন, শিল্পীর তুলি একই ছবির মধ্যে কতো সুন্দরভাবে জমিন, আসমান, উট এবং পাহাড়কে একত্রে সাজিয়ে দিয়েছে। ছোট পরিরে দিগন্ত বিস্তৃত কে ছবি। এখানে যে বস্তুর বর্ণনা করা উদ্দেশ্য তা বিশাল, পুরো ভয়ানক ঐ বস্তুগুলো দেখলেই নিজের অজান্তে মনের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে যায়। যে চিত্র এখানে উপস্থঅপন করা হয়েছে তা আসমান থেকে শুরু করে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত। অপরদিকে বিশাল আকাশচুম্বী পাহাড় এবং উঁচু কুঁজওয়ালা উট, সবকিছুকে ছোট একটি ক্যানভাসে পিুঁণভাবে সাজানো হয়েছে। যা বড় মাপের শিল্পী ছাড়া আর কাউকে দিয়েই সম্ভব নয়। একজন বড় মাপের শিল্পীই পারে এরূপ কারুকাজ ও সূক্ষ্মতা সৃষ্টি করতে।

দ্বিতীয়ত, যাকে শুধুমাত্র শিল্পীর চোখেই দেখে থাকে তা হচ্ছে, পুরো ক্যানভাসের একিদকে আসমান অপরদিকে জমিন, মাঝে বিশালায়তনের পাহাড়, তার মধ্যে জীবন্ত প্রাণী উট- যে দিগন্ত প্রসারী মরুভূমিতে চড়ে বেড়ায়। যাকে পাহাড় চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।

৪. সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া নিচের এ আয়াত ক’টিও ওপরের বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্ক রাখে।

(আরবী**********)

নিশ্চয়ই আমি আকাশে ‍দূর্গ সৃষ্টি করেছি এবং তাকে দর্শকদের জন্য সুশোভিত করে দিয়েছি। আমি আকাশকে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান থেকে নিরাপদ করে রেখেছি। কিন্তু যে চুরি করে শুনে পালায়, তার পশ্চাদ্ধাবন করে উজ্জ্বল উল্কাপিণ্ড। আমি ভূপৃষ্ঠকে বিস্তৃত করেছি এবং তার ওপর পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু সুপরিকল্পিতভাবে উৎপন্ন করেছি। আমি তোমাদের জন্র সেখানে জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করেছি এবং তাদের জন্যও যাদের রিযিকদাতা তোমরা নও।

এ আয়াতে বলা হয়েছে, আসমানে বড় বড় দুর্গ ও উল্কাপিণ্ড আছে। যে উল্কাপিণ্ড বিদ্রোহী শয়তানকে ওপর নিক্ষেপ করা হয়। বিস্তৃত জমিনের ওপর মজবুত পাহাড় স্থাপন করা হয়েছে, আবার জমিনের ওপর উৎপন্ন করা হয়েছে বিভিন্ন উদ্ভি, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং যথাযথভাবে। এজন্য ‘মাওযুন’ (***) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বাহীয’ (****) কিংবা ‘লাতীফ’ (***) শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সৃষ্টিকে ‘মাআয়িশ’ আধিক্যবাচক বহুবচনের শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। আর বলা হয়েছে জমিনে এমন সব প্রাণীও আছে যাদেরকে মানুষ প্রতিপালন করে না। কিন্তু কথাটি উহ্য রাখা হয়েছে।

গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে বুঝা যায়, এ আয়াতগুলোতে যে দৃশ্য ও চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা বিশাল আয়তনের এবং ভারী। সবকিছুকে ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও তাৎপর্যপূর্ণ করে এমনভাবে গেঁথে দেয়া হয়েছে, যেভাবে বিশাল আয়তনের পুরো এক বইতে একটি ফিতার ওপর সবগুলো ফর্মা সেলাই করে গেঁথে দেয়া হয়।

৫. অনেক সময় ছবির বিস্তৃতি ও প্রশস্ততা সৃষ্টির জন্য ক্যানভাসের প্রস্থের দিককে ওপরে ও নীচে করে দেয়া হয়। তবু তার মধ্যে চিত্রের সবকিছুকে শামিল করা কষ্টকর হয়ে যায়। তাই ক্যানভাসের পুরো কাপড়টিই ব্যবহার করে ছবি আঁকা হয়। এ রকম এক ছবির উাদাহরণ হচ্ছে নিচের আয়াতটি:

(আরবী**********)

নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোথায় সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সকল বিষয়ে অবহিত। (সূরা লুকমান: ৩৪)

দেখুন এ আয়াতে ক্যানভাস বা চিত্রপট সাধ্যাতীত বিস্তৃত। এর মধ্যে স্থান ও কাল, বর্তমান ও ভবিষ্যত, অদৃশ্য জগতের খবরাখবর, কিয়ামত, বৃষ্টি, জরায়ুর মধ্যে লুক্কায়িত ভ্রুণ ইত্যাদি শামিল করা হয়েছে। সেই সাথে ভবিষ্যতে অর্জিত হবে এমন রিযিকের কথাও এসেছে। তা অর্জনের সময় খুব এটা দূরে নয়। চোখের সামনেই। মৃত্যু কখন আসবে এবং কোথায় দাফন কাফন হবে এ দৃশ্যটি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে নিয়েছে।

এ ছবি সময় ও পরিসীমা উভয় দিকেই বড় বিস্তৃত। তার পরিসীমা এবং চতুর্পাশ অদৃশ্য বিষয়ের আড়ালে হাড়িয়ে গেছে। এ সবকিছু মনে হয় ছোট একটি তাকের সামনে দাঁড়ানো, আর তাকের দরজা বন্ধ। যদি সেখানে সুঁইয়ের ছিদ্রের মতো সূক্ষ্ম কোন ছিদ্র দৃষ্টিগোচর হয় তবে দেখা যাবে- যে বস্তু অনেক দূরে তা অতি নিকটে যে কোন বস্তু কাছে তা পেছনেই দণ্ডায়মান, উভয়ের মাঝে কোন ফাঁক নেই। অর্থাৎ এসব বস্তু দূরত্বের শেষ সীমায় অবস্থান করছে ঠিকই কিন্তু অদৃশ্য বস্তুটিই কোন এক সময়ে চেখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে ‍উঠে। তখন সবকিছুকেই একত্রে একই প্লাটফর্মে উপস্থিত মনে হয়।

শৈল্পিক বিন্যাসের একটি সূক্ষ্ম দিক

কুরআনী দৃশ্যসমূহের মধ্যে শৈল্পিক যে মিল ও বিন্যাস পাওয়া যায়, তার আর একটি দিক নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করবো। এ পর্যন্ত শৈল্পিক বিন্যাস ও তার সংগতি নিয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে তা ছবি ও দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়েছিল্ তাছাড়া সেটি পরিপূর্ণ শৈল্পিক বিন্যাস ছিল যা ছবির কোন অংশে কিংবা পুরো ছবিতে পাওয়া যেতো। কিন্তু আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব ও মাহাত্ম্য এখানে এসেই থেমে যেতে পারে না। অনেক সময় তা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি কিংবা চলমান কোন দৃশ্যাকারে প্রতিভাত হয়। আবার কখনো সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে এক সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে, যা তার চারিদিকের সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তা থেকে যে পরিণতি সৃষ্টি হয় তা নিচের উদাহরণ থেকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। যেমন:

(আরবী**********)

শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রাতের যখন তা গভীর হয়। তোমার প্রভু তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি তিনি বিরূপ নন। পূর্বের চেয়ে পরের অবস্থা উত্তম। তোমার প্রতিপালক শীঘ্রই তো তোমাকে দেভেন যেন তুমি সন্তুষট হয়ে যাও। তিনি কি তোমাকে ইয়াতিম পাননি? অতপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। তুমি ছিলে পথহারা, তিনিই তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। তিনি তোমাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেয়ে অভাবমুক্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং ইয়াতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না, ভিক্ষুককে ধমক দিয়ো না এবং তোমার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা প্রকাশ করো। (সূরা দোহা: ১-১১)

উল্লেখিত আয়াতগুলোতে অনুগ্রহ ও অনুকম্পা, দুশ্চিন্তা ও অসহায়তের্বর এক সম্মিলিত আবহ প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। যেমন: (আরবী**********) আয়াত পর্য়ন্ত রহম ও করম এবং দুঃখ ও হতাশার যে সুর মুর্ছনা সৃষ্টি করা হয়েছে তা যেন হৃদয়বীণার সূক্ষ্ম তন্ত্রীর প্রলয়ংকরী ঝংকর। বক্তব্য উপস্থাপনে উপযুক্ত হাল্কা ও করুণ সুরের সমাবেশ ঘটান হয়েছে। যেখানে দুশ্চিন্তার করুণ রাগিণী বেজে চলছে অবিরত। মধ্যাহ্ন (***) এবং কালো পর্দা বিস্তৃতিকারী রাতকে দিয়ে সেই সুরকে ঘিরে দেয়া হয়েছে। মধ্যাহ্নের এ সময়টি রাত ও দিনের মধ্যে সর্বোত্তম সময়। আর দুঃখ-বেদনার প্রতীক হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে রাতকে। রাত যেমন অন্ধকারের হাল্কা আবরণ দিয়ে সবকিছুকে ঢেকে দেয় তদ্রূপ ইয়াতিমী এবং দারিদ্রতা নামক দুঃখের এক সূক্ষ্ম চাদর রাসূলে আকরাম (সা)-কে ঢেকে দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে সে চাদর সরে যাচ্ছে। এবং সুখের প্রভাত উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে মধ্যাহ্নে পৌঁছে যাচ্ছে।

(আরবী**********)

তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেননি। তোমার প্রতি তিনি বিরূপও নন। আগের চেয়ে পরের অবস্থা ভাল। অচিরেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে যা দেবেন, তুমি খুশী হয়ে যাবে।

এ সুসংবাদ শুনানো হচ্ছে। এভাবেই ছবিটি পরিবেশ পরিস্থিতি, রং, ঢং এবং উপমা-উৎক্ষেপণ সবকিছু পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।

খ. এখন আরেক ধরনের সুর শুনুন। এর প্রেক্ষাপট ও ছবির দুটোই ভিন্নধর্মী।

(আরবী**********)

শপথ ঊর্ধ্বাশ্বাসে চলমান অশ্বসমূহের। অতপর ক্ষুরাঘাতে অগ্নিবিচ্ছুরক অশ্বসমূহের। অতপর প্রভাতকালে আক্রমণকারী অশ্বসমূহের ও যারা সে সময় ধূলি উৎক্ষিপ্ত করে। অতরপ যারা শত্রুদলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। নিশ্চয় মানুষ তার পালকর্তার অকৃতজ্ঞ এবং সে অবশ্যই এ বিষয়ে অবহিত এবং সে নিশ্চিত ধন-সম্পদের ভালবাসায় মত্ত। সে কি জানে না, যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত হবে এবং অন্তরে যা আছে তা বের করা হবে? সেদিন তাদের কি হবে সে সম্পর্কে তাদের পালনকর্তা সম্যক অবহিত। (সূরা আল-আদিয়াত: ১-১১)

এ সূরার সুর ও ছন্দের ঢং সূরা আন-নাযিয়াতের অনুরূপ। তবে এখানে ‘আন-নাযিয়াতের’ চেয়ে কাঠিন্য ও তীক্ষ্মতা অনেক বেশি। তাছাড়া এখানে কর্কষতা, ভীতি, রাগ ও শোরগোলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ সূরাটি স্থঅন, কাল ও পাত্রের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। যখন মৃত ব্যক্তি কবর থেকে উঠবে তখন শোরগোল সৃষ্টি হবে এবং তার মনের যাবতীয গোপন জিনিসকে মূর্তমান করে বের করে রাখা হবে। এখানে এক প্রকার কাঠিন্যের সৃষ্ট করা হয়েছে। যা অকৃতজ্ঞা, ঔদ্ধত্য ও সংকীর্ণতার পরিবেশের সাথে পূর্ণ মিল আছে। য্যখন এ পুরো সৌন্দর্যের জন্য একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রেক্ষাটের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে তখনই সেইরূপ কোলাহলপূর্ণ একটি পরিবেশকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং দ্রুতগামী ঘোড়ার পদধূলি এবং হ্রেসা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে সে প্রেক্সাপট। সেগুলো প্রাতঃকালে দুশমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চিত্রের সাথে প্রেক্ষাপট এবং প্রেক্ষাপটের সাথে চিত্র চমৎকারভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এভাবেই গোটা ছবিটি তার প্রতিটি অংশ নিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে।

গ. আমরা ইতোপূর্বে ছবির দুটো প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করলাম। দুটোই স্বতন্ত্র এবং পরস্পর ভিন্নধর্মী। তবে এ দুটো ছবির রং-ঢং একটি অপরটির সাথে সাদৃশ্য রাখে। প্রেক্ষাপট সবসময় একই রঙ-ঢং সীমাবদ্ধ থাকে না বরং বিভিন্ন ধরনের ও রঙের হয়ে’ থঅকে এবং তার মধ্যস্থিত যে ছবি, তাও অনুরূপ হয়। যেমন:

(আরবী**********)

শপথ রাতের যখন সে আচ্ছন্ন করে, শপথ দিনের যখন সে আলোকিত হয় এবং শপথ তাঁর যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা ভিন্ন ভিন্ন। অতএব, যে দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে ও উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে আমি তার সুখের জন্য সহজ পথ দান করবো। আর যে কৃপণতা করে ও বেপরোয়া হয় এবং উত্তম বিষযকে মিথ্যে মনে করে আমি তার কষ্টের জন্য সহজ পথ দান করবো। যখন সে ধ্বংসে নিপতিত হবে, তখন তার সম্পদ তার কোন কাজেই আসবে না। আমার দায়িত্ব পথ-প্রদর্শন করা। আমিই ইহকাল ও পরকালের মালিক। অতএব, আমি তোমাদেরকে প্রজ্জ্বলিত আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি। এতে নিতান্ত হতভাগ্য ব্যক্তিই প্রবেশ করবে, যে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ থেকে দূরে রাখা হবে মুত্তাকী ব্যক্তিকে, যে আত্মশুদ্ধির জন্র তার ধন-সম্পদ দান করে এবং তার ওপর কার কোন প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না তার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্ট অন্বেষণ ছাড়া। সে অচিরেই সন্তুষ্টি লাভ করবে। (সূরা আল-লাইল।: ১-২১)

এ সূরায় যে ছবি আঁকা হয়েছে, তার মধ্যে সাদা ও কালো (অর্থাৎ পাপ ও পুন্য) দুটোই বর্তমান। সেকান (****)- ‘যে দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে।’ যেমন বলা হয়েছে, তেমনি পাশাপাশি এও বলা হয়েছে যে, (***) ‘যে কৃপণতা করে ও বেপরোয়া হয়।’ তেমনিভাবে (****) ‘আমি তার সুখের জন্য সহজ পথ দান করবো’ বলা হয়েছে। তদ্রূপ (আরবী**********)-‘হতভাগ্য সে, যে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়’-এর সাথে সাথে বলা হয়েছে: (আরবী**********)-‘আল্লাহভীরু ব্যক্তি যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধন-সম্পদ দান করে।’ এভঅবেসাদা এবং কালায় গোটা ছবির প্রেক্ষাপট নির্বাচন করা হয়েছে।

যেমন একদিকে বলা হয়েছে (****)-‘রাতের শপথ যখন তা আচ্ছন্ন করে নেয়।’ ঠিক তেমনিভাবে বলা হয়েছে: (******)-‘দিনের শপথ যখন সে আলোক উদ্ভাসিত হয়ে যায।’ এখানে ‘আল লাইল’ (***) এর সাথে ‘ইয়াগ্‌শা’ (***) শব্দ বেছে নেয়া হয়েছে কিন্তু সূরা দ্বোহায় নেয়া হয়েছে ‘সাজা’ (***) শব্দটি। সম্ভবত রাত ও দিনের মুখোমুখি অবস্থানকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্যই এরূপ করা হয়েছে। আবার (****)-এর মধ্যে নর ও নারী একই জাতি কিন্তু একে অপরের বিপরীত। এজন্যই বলা যায়, এ প্রেক্ষাপট ছবির সম্পূর্ণ আনুকুল্যে।

সূরা আল-লাইলে যে সুর-ছন্দ পাওয়া যায় তা সূরা দ্বোহার চেয়ে অনেক উন্নত। কিন্তু সেই সুর ব্যঞ্জনায় নির্দয়তা ও মনের গহন বেদনা নেই। কারণ বর্ণনা ও প্রেক্ষাপটের দাবিও তাই। এ ঐক্য ও মিল তর্কতীতভাবেই বড় চমৎকার।

কুরআনী চিত্রের স্থায়ীত্বকাল

আল-কুরআনে যে শৈল্পিক সঙ্গতি পাওয়া যায়, এখন আমরা তার আরেকটি দিক নিয়ে আলোচনা করবো।

আল-কুরআনের দৃশ্য ‍ও ছবি সম্পর্কে শুধু একথা বলেই শেষ করা যায় না যে, ছবি ও দৃশ্যের বিভিন্ন অংশ ও রঙের মধ্যে মিল কেরে দিলে, সুর ও ছন্দের এমন তাল সৃষ্টি করে দিলেই হয়ে যাবে যা প্রেক্ষাট বা মূল থিমের অনুকূলে। বরং দৃশ্যকে আকর্ষণীয় শিল্প মানের পরিপূর্ণতা এবং স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির প্রয়াসকে সামনে রেখে আরেকটু অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। কারণ, ঐ দৃশ্যকে কল্পনার জগতে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সময়কে স্থিরকরণ একান্ত প্রয়োজন। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, কুরআনেকারীম এ প্রয়োজনটাকেও অত্যন্ত সুন্দর ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করেছে।

আল-কুরআনের উপস্থিাপিত কিছু দৃশ্য তো চোখের পলকেই হারিয়ে যায়, যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার অবকাশটুকটুও থাকে না। কিছু ছবি এতো দর্ঘস্থায়ী হয়, পাঠক মনে করে এ দৃশ্য আর কখনো চোখের আড়াৎল হবে না। কিছু ছবি চলমান আবার কিছু স্থির। দৃশ্যের অভন্তরে পাওয়া যায়। তাছাড়া কুরআনের সাধারণ উদ্দেশ্যও সেকানে সমভাবে প্রতিফলিত হয়। কোন দৃশ্যের দীর্ঘতা কিংবা সংক্ষিপ্ততা একটি বিশেষ উপায়ে সংঘটিত হয়। তার মধ্যস্থিত সমস্ত উপায় ও উপকরণ দৃশ্যের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে পূর্ণতা দান করে।

এ নতুন ময়দানে আমাদের প্রদক্ষেপ, এখন আমরা পর্যায়ক্রমে তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরবো:

১. কুরআন মানুষেরা সামনে এ দৃশ্য উস্থাপন করতে চায় যে, এ পৃথিবীর সময়কাল কতো কম- যা মানুষকে পরকালের জীবন সম্পর্কে উদাসীন করে দেয়। এ দৃশ্যকে কুরআন উপস্থাপন করেছে:

(আরবী**********)

তাদেরকে পার্থিব জীবনের উপমা শুনিয়ে দাও, তা পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি। অতপর তার সংমিশ্রণে জমিন থেকে লতা ও ঘাস-পাতার অংকুরোদম হয়। তারপর তা শুষ্ক হয়ে ভূসির মতো বাতাসে উড়ে যায়। আল্লাহর সবকিছু করতেই সক্ষম। (সূরা আল-কাহাফ: ৪৫)

এখান তিনটি কথা বলা হয়েছে। ১. পানি আকাশ থেকে বর্ষিত হওয়া। ২. পানি ও মাটির সংমিশ্রণে উর্বরা শক্তির বিকাশ এবং ৩. তারপর তা শুকিয়ে ভূসির মতো বাতাসে উড়ে যাওয়া।

এ তিনটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে একথাই বলা হয়েছে যে, তিনটি ‍দৃশ্যেই পার্থিব জীবন শেষ হয়ে গেছে। আহা! জীবন কতো সংক্ষিপ্ত!

সংক্ষিপ্তভাবে উদ্ভিদের যাবতীয় বিবর্তন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে কোন দিকই বাদ পড়েনি। অবশ্য দ্বিতীয় অবস্থার কথাটা বলা হয়নি। প্রথমে পানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা ফসল উৎপাদনক্ষম করে তুলে। তারপর এক পর্যায়ে ফসল পেকে যায় এবং শুকিয়ে খড়কুটোগুলো বাতাসে উড়ে যায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে উদ্ভিদের দ্বিতীয অবস্থার কথা ছাড়া আর কী বাদ পড়েছে”?

উল্লেখিত আয়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা, দৃষ্টিকাল এবং সৌন্দর্য সুষমা সব উপকরণই জমা হয়ে’ গেছে। বর্ণনা পদ্ধতি তো এতো সুস্পস্ট ও বলিষ্ঠ যে, তার মাধ্যমে যা কিছু বুঝানোর উদ্দেশ্য ছিল তার সামান্যও আর অবশিষ্ট নেই যাতে দ্বীনি উদ্দেশ্য পুরা হতে পারতো। দর্শন-কাল এ চিত্রকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিয়েছে যা সৌন্দর্য সুষমার সীমাতিক্রম করে চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে তুলে।

এ দৃশ্যকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করার জন্য শব্দ বিন্যাস এবং শৈল্পিক উপকরণ দুটোরই সাহায্য নেয়া হয়েছে। যেমন ‘ফাখ্‌তালাতা’ (****) শব্দের অনুসরণীয় ‘ফা’ যা ঘটনার ধারাবাহিকতা প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। এ অক্ষরটি পুরো দৃশ্যটিকে পরিপূর্ণতা এবং দ্রুততার সাথে উপস্থাপন করেছে। এ ‘ফা’ অক্ষরটি হতেই প্রতীয়মান হয় যে, পতিত পানি প্রকৃতপক্ষে জমিনের সাথে না মিলে বরং জমিন থেকে সৃষ্ট লতাগুল্ম ও উদ্ভিদের সাথে মিলে যায়। এমন ঢঙে তা উপস্থাপন করা হয়েছে যা কাংখিত দ্রুততাকে প্রতিস্ঠিত করে দিয়েছে।

২. প্রায় এ রকম আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে নিচের আয়াতটি। অর্থ, উদ্দেশ্য ও দৃষ্টি আকর্ষণের ধরন ও পদ্ধতি একই কিন্তু কিছুটা ভিন্ন স্টাইলে উপস্থাপন করা হয়েছে।

(আরবী**********)

তোমরা জেনে রেখ, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা ও ধন-জনের প্রাচুর্য ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন বৃষ্টি, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে উৎফুল্ল করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটো হয়ে যায়।

এ আয়াতে নশ্বর দুনিয়ার যে ছবি আঁকা হয়েছে তা আগের আয়াতের সাথে মিল আছে। অনেকে মনে করতে পারেন এ ছবিতে চিত্রের কোন গড়মিল নেই। আসলে এ দুটো আয়অতের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। তা হচ্ছে কাফিররা দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়ার কারণ হচ্ছে এখানে খেলাধূলা ও হাসি-তামাশার পরিবেশের ন্যায় পরিবেশ এবং আনন্দ-ফূর্তির যাবতীয উপায়-উপকরণ হাতের মুঠোয়- যা একটু পরিশ্রমেই লাভ করা যায়। ধন-সম্টদ ও জনবলে পরস্পর প্রতিযোগিতা করা যায়। আল্লাহ বলেন: কাফিররা যেসব বিষয়ে মত্ত আছে এবং জীবনকে অনেক দীর্ঘ উপভোগ্য মনে করছে, মূলত তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও ধ্বংসশীল। যেমন বৃষ্টি মাটিকে উর্বর করে এবং বিভিন্ন ধরনের ফল-ফল উৎপন্ন করে, কৃষকরা উৎফুল্ল হয়, কিন্তু দেখা যায় সেসব উদ্ভিদ একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকে শুকিয়ে যায় এবং খড়কুটোর মতো বাতাসে উড়ে যায়। ‍দুনিয়ার অবস্থাও ঠিক এমন।

আল-কুরআনে যে সমস্ত আয়াত দেখতে এরকম মনে হয় সে সবের মধ্যে ওপরে আলোচিত পার্থক্যের মতো সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। দেখতে এক রকম এরূপ দুটো আয়অতের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়। অবশ্য এ পার্থক্যটা সাধারণ হতে পারে আবার গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে। ঐ সমস্ত আয়াতের মাধ্যমে যেমন দাওয়াতী কাজ হয়, তেমনিভাবে তা শৈল্পিক সৌন্দর্য ও সৌকর্যের বাহনও বটে। তাছাড়া ঐ সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণে যেমন তার মধ্যে নতুনত্বের সৃষ্টি হয় আবার তা একটি প্রকার হিসেবেও গণ্য হয়।

৩. আগের দুটো উদাহরণে দেখা গেছে দ্বিতীয অবস্থঅকে বিলোপ করে বর্ণনার সংক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু এখন এমন একটি উদাহরণ পেশ করবো যা আগের উদাহরণের মতোই দুনিয়ার সময়কে সংক্ষিপ্ত করে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ সংক্ষিপ্ততা পূর্বের (উদাহরণের) চেয়েও বেশি। এখানে দুনিয়ার দুটো অবস্থাকে (শুরু ও শেষ) এক মুহূর্তের মধ্যেই একত্র করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে বুঝানো হয়েছে যে, দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়টি কী পরিমাণ দীর্ঘ। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফিল করে রাখে। এমনিভাবে তোমরা কবরের সাক্ষাত পেয়ে যাবে। (সূরা আ-তাকাছুর: ১-২)

এ আয়অতে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা জীবনের পরিসীমার একটি চিত্র। যার শুরু ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের অনুসন্ধান দিয়ে এবং শেষ কবর। জীবনের শেষ সীমা সম্পর্কে এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ চিত্র, বর্ণনার কিংবা চিন্তার মাধ্যমে আর কিভাবে আঁকা সম্ভব? এ ছবির আরেকটি দিক হচ্ছে জীবনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত যে সময়টি তাও দুনিয়ার খেল-তামাশায় লিপ্ত হয়ে শেষ হয়ে যায়। ‘হাত্তা’ (***) শব্দটি ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে যে, তার দীর্ঘতার শেষে সীমা কোথায়। এতো স্বল্প সময়েও মানুষ অপ্রয়োজনীয় কাজে লিপ্ত হয়ে যায়, অথচ সে জানে তার জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত ‍দুটো আয়াত দিয়ে পুরো উদ্দেশ্যটিকে ‍সুন্দর ও সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৪. নিচের আয়াতটিও এ ধরনের বিষয়বস্তু সম্বলিত, কিন্তু এর উদ্দেশ্য ভিন্ন।

(আরবী**********)

কিভাবে তোমরা আল্লাহকে অস্বীকার করতে পার? তোমরা ছলে নিষ্প্রাণ অতপর তিনিই তোমাদের প্রাণ দান করেছেন। আবার মৃত্যু দেবেন, তারপর আবার তোমাদের জীবিত করবেন। অতপর তার দিকেই তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা আল-বাকারা: ২৮)

একই আয়াতের চারটি অংশে সৃষ্টি চার অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। প্রথম অবস্থা হচ্ছে সৃষ্টিপূর্ব অব্থা, দ্বিতীয অবস্থা সৃষ্টির পর দুনিয়ার জীবনে বিচরণ সংক্রান্ত, তৃতীয অবস্থা হচ্ছে এ ‍পৃথিবী থেকে অবশ্যই একদিন চলে যেতে হবে এবং চতুর্থ অবস্থা হচ্ছে, দুনিয়ার জীবনের পর আরেকটি জীবন আছে এবং সেখানে সবাইকে উপস্থিত হতে হবে।

দুনিয়ার জীবনের পূর্ব অবস্থাকে বলা হয় আযল। অস্তিত্ব লাভকরার পরের অবস্থা ও অবস্থানকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, যার নাম হায়াত বা জীবন। তারপর মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর শুরু হবে আখিরারেত জীবন। সংক্ষিপ্ততার জন্য চারটি অবস্থাকে মাত চারটি শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু চিন্তাশক্তি একে অনেক দীর্ঘসময় মন করে অথচ কুদরতে আযীমের নিকট এ দীর্ঘ সময়টুকু চোখের একটি পলকের ন্যায়মাত্র। কুদরতে আযমা একটি জিনিসকে শুধু বলেন,‘হয়ে যাও’ আর অমনি তা হয়ে যায়। সেই দ্রততাকেই আরো উজ্জ্বল করে উপস্থাপন করেন। বিশেষ করে সেই দীর্ঘ সময়কে যখন চোখের পলক পরিমাণ সময়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। তাহ
লে কিভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করা যায়? আর কিভাবে তার বিরুদ্ধাচরণ করা যায়? তিনিইতো সেই সত্তা যিনি প্রথম থেকেই তোমাদের সবকিছুর মালিক। আবার শেষ পর্যন্ত তিনিই মালিক থাকবেন। আর তোমরা তার নিকটই ফিরে যাবে।

পরের আয়াতে সংক্ষিপট্ততাকে পূর্ণ রূপ দেয়া হয়েছে:

(আরবী**********)

তিনিই সেই সত্তা যিনি পৃথিবীর সবকিছুকে তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেচেন তারপর তিনি মনোযোগ দিয়েছেন আকাশের দিকে, আকাশ সাতটি স্তরে সৃষ্টি করেছেন। (সূরা আল-বাকারা: ২৯)

এভাবে এক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি পৃথিবীর সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোযোগ দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই তা সাত স্তরে বিন্যাস করে সৃষ্টি করেছেন। আল-কুরআনের যেসব জায়গায় এ বিষয়ের বর্ণনা করা হয়েছে সেসব আয়াতে আসমান-জমীনের সৃষ্টির বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

৫. এ পর্যন্ত দৃশ্যাবলীতে সংক্ষিপ্ততার সাহায্য নেয়া হচ্ছিল। এসব দৃশ্যে কোথাও মধ্যবর্তী অবস্থার কথা বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে আবার কোথাও এক অবস্থাকে আরেক অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। এখন আমরা সংক্ষিপ্ততার এমন একটি উদাহরণ পেশ করবো যেখানে প্রকৃতির শিল্পী তাঁর নিপুণ শিল্পকর্মে সুন্দর এক কলা প্রদর্শন করেছেন, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী তুলির সাহায্যে নেয়া হয়েছে। সেখানে তুলির বিক্ষিপ্ত স্পর্শে এমন এক অবিস্মরণীয় ছবি ভাস্বর হয়ে উঠেছে, যার দিকে দৃষ্টি দিলে মনে হবে এখানে কিছুই ছিল না। যখন কল্পনাশক্তি সেই ক্যানভাসে দৃষ্টি প্রদান করে তখনই মনে হয় সেখানে কিছুই ছিল না।

(আরবী**********)

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করলো, সে যেন আকাশ তেকে ছিটকে পড়ল, অতপর মৃতভোজী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। (আল-হাজ্জ: ৩১)

কতো দ্রুত এটি সংঘটিত হচ্ছে, জমিন থেকে ছিটকে পড়া, তাৎক্ষনাৎ কোন মাংশাসী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়া কিংবা বাতাস তাকে দূর-দূরাস্তে উড়িয়ে নিয়ে ফেলে দেয়া। এবার এমন একটা চিত্র চোখের সামনে রয়ে যায় মনে হয় এখানে কোনকালেই কিছু ছিল না।

একটু চিন্তা করুন, ছো মেরে নেয়ার ক্ষিপ্রতার মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে? এর রহস্য হচ্ছে, কেউ যেন মনে না করেন যে, মুশরিকদের কোন ঠিকানা বা স্থায়ীত্ব আছে। তবু পৃথিবীতে তাদেরকে ক্ষণিকের জন্য যায়গা দেয়া হয়েছে। মুশরিকদের বংশ পরিচয় কেমন, তারা কতোটুকু শান-শওকতের অধিকারী, তাদের গোত্রের শাখা-প্রশাখা এবং জনবল কেমন- এসব বিষয় কোন ধর্তবব্যই নয়, তারা অজানা স্থান থেকে এসে আবার চোখের পলকে আরেক অজানায় চলে যায়। দুনিয়ার জীবনে স্থির হয়ে বসা তাদের নসীবেই নেই।

এবার আমরা কিছু দীর্ঘ চিত্র পেশ করব।

দীর্ঘ চিত্র

১. আমরা সেই আয়াতের আলোচনা করেছি, যেখানে বলা হয়েছে বৃষ্টির পানি আকাশ থেকে বর্ষিত হয়। তারপর জমিন থেকে নানা ধরনের উদ্ভিদের অংকুরোদগম হয়। এক পর্যায়ে সেগুলো পেকে শুকিয়ে খড়কুটোয় পরিণত হয় এবং বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যায়। গোটা দৃশ্যটিকে চোখের পলকে উপস্থান করা হয়েছে। এখন আমরা দেখবো যে, এ ধরনের দৃশ্যকে অনেক জায়গায় কতো ধীরে-সুস্থে বর্ণনা করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:

(ক)

(আরবী************)

তিনি আল্লাহ যিনি বাতাস প্রেরণ করেন এবং তা মেঘমালাকে সঞ্চারিত করে। অতপর তিনি মেঘমারাকে যেভাবে ইচ্ছে আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে স্তরে স্তরে রাখেন। এরপর তুমি তার মধ্য থেকে বৃষ্টি হতে দেখ। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছে তা পৌঁছান, তখন তারা আনন্দিত হয়। (সূরা আর-রূম: ৪৮)

এ আয়াতটি প্রথম অবস্থার অন্তর্ভুক্ত যেখানে বৃষ্টির পানি জমিন পর্যন্ত পৌঁছার কথা বলা হয়েছে। যেমন বৃষ্টি মেঘ আকারে আকাশে বাতাসে সাথে ভেসেবেড়ায়। যখন আল্লাহ চান তখন তা ভারী করে দেন এবং বৃষ্টি আকারে জমিনে নেমে আসে। মানুষ প্রথমে নিরাশ হলেও পরে বৃষ্টি দেখে খুশি হয়। আসুন এবার দেখি বৃষ্টির বর্ষণের পরে কি হয়?

(খ)

(আরবী************)

তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন এবং সে পানি দিয়ে বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতপর তা শুকিয়ে যায় ফলে তোমরা সেগুলো পীতবর্ণ দেখতে পাও? তারপর আল্লাহ সেগুলোকে খড়কুটোয় পরিণত করে দেন। নিশ্চয়ই এতে বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশ আছে। (সূরা আয-যুমার: ২১)

দেখুন এখানে সব কাজ ধীরে-সুস্থে পরিচালিত হচ্ছে। পানি আকাশ থেকে বর্ষিত হয় কিন্তু সাথে সাথেই জমিনে অংকুরোদগম হয় না। বরং সে পানি নদী বা ঝর্ণা বয়ে যায়। (আরবী*(*******)-‘অতপর তা থেকে ফসল উৎপন্ন হয়।’ যা বিভিন্ন রঙে পরিবর্তি হয়। রঙের পরিবর্তনই অবকাশের দাবি রাখে। তারপর তা আন্দোলিত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পেকে যায় এবং পীতবর্ণ ধারণ করে। এখানে সুস্পষ্ট যে, এ অবস্থা একটি সময় উত্তীর্ণ হওয়পার পর সংঘটিত হয়, ‘ছুম্মা’ (***) শব্দ দিয়ে তাই বুঝা যায়। (***)-অতপর তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়’ বাক্য দিয়ে বুঝা যায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করার কাজটিও একটু সময় নিয়ে করা হয়। এখানে (***) শব্দটি বর্তমান/ভবিষ্যতকালের শব্দ নেয়া হয়েছে। অন্যত্র (***)-চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে’ এবং (***) –‘চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়’ বলা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে কারো হস্তক্ষেপ ছাড়া একাকী তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এখানে বলা হয়েছে, তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয় এবং সে অবস্থায়ই রয়ে যায়। কিন্তু আরেক জায়গায় বলা হয়েছে: (****)-‘বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।’ তারপর তার আর কোন স্মৃতি চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে না।

এ ধীর-স্থিরতা ও দীর্ঘতার মধ্যে রহস্য হচ্ছে, এ আয়াতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কথা আলোচনা করা হয়েছে। এজন্য নিয়ামতের কথা বলতে গিয়ে ধীরে ধীরে বলা হয়েছে যাতে দর্শকগণ ধীরে-সুস্থে এ দৃশ্য অবলোকন করতে পারে এবং তা থেকে উপকৃত হতে পারে, কোন আকাঙ্ক্ষাই যেন আর অবশিষ্ট না থাকে। শুধু এ কারণেই দৃশ্যকে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে।

২. আরেকটি দৃশ্য দেখুন, যেখানে নবী করীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকে একটি ক্ষেত ও ফসলের সাথে তুলনা করে বলা হয়েছে:

(আরবী************)

তওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা বলা হয়েছে যেমন একটি চারাগাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়। তারপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং দৃঢ়ভাবে কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে যায়। চাষীকে আনন্দে অভিভূত করে যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। (সূরা আল-ফাতহ্‌: ২৯)

এ আয়াতে যে ক্ষেতের কথা বলা হয়েছে সে ক্ষেতের ফসল শুকিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে বাতাসে উড়ে যায় না। বরং তা অটল ও অনড় থাকে। এ ছবি চিরন্তনী। কখনো মন ও চিন্তা থেকে এটি বিলীন হয়ে যায় না। এটি এমন এক ছবি যা মন ও চিন্তার জগতে সুদীর্ঘ প্রভাব ফেলে।

এখানে একটি কথা চিন্তা করা প্রয়োজন, ছবিটি দীর্ঘ একটি ছবি বটে কিন্তু তার প্রাথমিক অংশগুলো দ্রুত সংঘটিত হয়ে যায়। যেমন একটি ক্ষেতে বীজ ফেলা মাত্র অংকুরোদগম হয়ে খুব তাড়াতাড়ি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। এতে বেশি বিলম্ব হয় না। তারপর এক পর্যায়ে গিয়ে তা আপন কাণ্ডের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িযে যায়। এ হচ্ছে মুসলমানদের প্রাথমিক অবস্থা। প্রথমতঃ তারা ইসলাম গ্রহণ করতে বিলম্ব করেননি। দ্বিতীয়তঃ তারা ঐ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত রইলেন। তাদের অবস্থা পূর্ণতায় পৌঁছার পর আর সেখানে কোন পরিবর্তন সূচিত হলো না।

৩. আমরা এর আগে যে দৃশ্যের উল্লেখ করেছি, সেখানে মানুষের গোটা জিন্দেগীর (অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) এমন একটি চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছিল যা চোখের পলকে শেষ হয়ে গিয়েছিল। এবার আমরা দেখবো আরেকটি দৃশ্য, গোটা জিন্দগীর নয়। জীবনের একটি অংশ বিশেষের, কিন্তু দীর্ঘতার দিকে তা অনেক বেশি। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী************)

আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আঁধারে স্থাপন করেছি। অতপর আমি শুক্রবিন্দওকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি। এরপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি, তারপর সে মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতপর অস্থিতে মাংস দ্বার আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে এক নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কতো কল্যাণময়।

দেখুন মানুষের জীবনের শুধু একটি অধ্যায়ের আলোচনা কতো দীর্ঘ। এখানে গর্ভধারণের পর থেকে প্রসবের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের আলোকপাত করা হ য়েছে। এর মাধ্যমে যে উপদেশ যা নসীহত করা হয়েছে তা প্রতিটি বিবেকের ওপর প্রবাব ফেলার জন্য যথেষ্ট। তাই বলা যায় এ দীর্ঘতা এখানে অপসন্দনীয় নয়।

৪. যে সমস্ত ‍দৃশ্য দীর্ঘস্থায়ী করে চিত্রায়ণ করা হয়েছে, তার মধ্যে কিয়ামতের দিনের এবং জাহান্নামের শাস্তির দৃশ্যগুলো অন্যতম। যখন সেই কাজ নির্দিষ্ট হয়ে যায় এবং তার চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজন হয়ে পড়ে তবে তা দীর্ঘস্থায়ী চিত্রের সাহায্যে তুলে ধরা হয়। যেন সেই ছবি প্রতিটি মানুষের চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং তার ভয়াবহ পরিণতি যার ছাপ বিবেকের প্রভাব পড়তে পারে।

কিছু চিত্রকে দীর্ঘায়িত করার জন্য কতিপয় উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। নিচে তার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি। যদি পুস্তকের কলেবর বৃদ্ধি আশংকা না থাকতো তবে এ বিষয়ে স্বতন্ত্র এক অধ্যায় সংযোজন করে দিতাম।

[৪.১] অনেক সময় কোন দৃশ্য দীর্ঘতার সাথে উপস্থাপনের জন্য এমন শব্দে এবং স্টাইলে তা পেশ করা হয়, যা থেকে পুনরাবৃত্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়্ যেমন:

(আরবী************)

যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করবে তাদেরকে আমি অচিরেই আগুনে দগ্ধ করাবো। আগুন যখন তাদের চামড়াকে ঝলসে দেবে তখন আমরা তার পরিবর্তে নতুন চামড়া তৈরী করে দেব, যেন তারা শাস্তিকে পুরোপুরি অনুভব করতে পারে। (সূরা আন-নিসা: ৫৬)

এ আয়অতে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। কল্পনার চোখ বার বার এ দৃশ্য অবলোকন করে এবং ভয়-ভীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। যখন পেরেশানী ও দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় তখন বার বার তার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। কারণ, যখন নফস সীমাতিক্রম করার প্রয়াস পায় তখন এ ভীতিকর চিত্র তাকে বাধা দান করে এবং আল্লাহর আনুগত্য করতে উৎসাহ প্রদান করে।

[৪.২] অনেক সময় শাব্দিক বিন্যাস ও তারতীবের মাধ্যমে দীর্ঘতা সৃষ্টি করা হয়। যেমন- একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়, তারপর তার অংশ বিশেষের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী************)

আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে তা ব্যয় করে না তাদের জন্য কঠিন আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। যেসদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের ললাট, পার্থ্ব ও পৃষ্ঠদেশে ছ্যাঁকা দেয়া হবে। আর বলা হবে: এগুলো তোমরা জমা করে রেখেছিলে অতএব আজ এ পরিণতির স্বাদ-অস্বাদন করো। (তওবা: ৩৪-৩৫)

প্রথমে (******)-‘তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও’ বলে শাস্তি সম্পর্কে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। সামান্য সময়ের জন্য বর্ণনার ধারাবাহিকতা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, যেন শ্রোতা আযাবের বিস্তারিত বর্ণনা শোনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। তারপর সেই আযাবের ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। স্বর্ণ ও রৌপ্যের আধিক্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দ্বিবচন-এর পরিবর্তে বহুবচন-এর শব্দ নেয়া হয়েছে। এভাবে তাদের আধিক্য বুঝানো হয়েছে। এমনিভাবে (***) না বলে (****) বলা হয়েছে। দেখুন সোনা ও রূপাকে আগুনে গরম করার পর তা গলে গেল না, তা দিয়ে শুরু করা হলো এক যন্ত্রণাদায়ক আযাব। প্রথমে তা দিয়ে কপালে ছ্যাঁকা দেয়া হচ্ছে। কপারে ছ্যাঁকা দেয়ার কাজ শেষ হলো। এবার দুই বাহুকে সামনে এনে ছ্যাঁকা দেয়াও শেষ হলো। মনে করছেন এখানেই শাস্তি শেষ হয়ে গেল। দাঁড়ান। এখানে এ দৃশ্য শেষ হয়নি। এবার কল্পনার জগতে ভেসে উঠে, একাধিক দলকে পর্যায়ক্রমে আযাবের আওতায় আনা হচ্ছে এবং বার বার তার পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। আর বলা হচ্ছে:

(আরবী************) এগুলো তোমরা জমা করে রেখেছিলে। অতএব আজ এ পরিণতির স্বাদ-অস্বাদন করো। (সূরা আত-তওবা: ২৫)

[৪.৩] অনেক সময় ঘটনার তৎপরতার বিস্তারিত বর্ণনা ও সংখ্যার কারণে দৃশ্য দীর্ঘ হয়ে যায়। সেই সাথে যে সমস্ত শব্দ সেখানে ব্যবহৃত হয় তার মধ্যেও পুনরুক্তির ধারণা সৃষ্টি হয়। যেমন এ আয়াতে কারীমা:

(আরবী************)

এই দুই বাদী-বিবাদী তারা তাদের পালনকর্তা সম্পর্কে বিতর্ক করে। অতএব যারা কাফির তাদের জন্য আগুনের পোশাক তৈরী করা হয়েছে। তাদের মাথার ওপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়া হবে। ফলে তাদের পেটে যা আছে তা এবং তাদের চামড়া গলে বের হয়ে যাবে। তাদের জন্য আরো আছে লোহার হাতুড়ী। তারা যখনই যন্ত্রণয় অতিষ্ট হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে চাবে, তখনই তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হবে। বলা হবে- দহনের স্বাদ অস্বাদন করো। (সূরা আল-হাজ্জ: ১৯-২২)

এ এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য, যা এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। শোরগোল ও পুনঃপৌনিকতায় ভরপুর। একদিকে আগুনের পোশাক, আরেক দিকে টগবগ করে ফোটা গরম পানি যা মাথায় ঢালা হবে। যার কারণে পেটের ভেতরের সবকিছু এবং চামড়া গলে পড়ে যাবে। অতিষ্ঠ হয়ে যদি কেউ পালাতে চেষ্টা করে, তখনই লোহার হাতুড়ী দিয়ে পিটিয়ে তাকে পূর্বাবস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে এবং বলা হবে দহনের স্বাদ আস্বাদন রো। এ চিত্রটি কল্পনার আয়নায় বার বার প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে কাফিররা বের হতে চাচ্ছে এবং তাদেরকে পিটিয়ে ঢুকান হয়েছে। এ দৃশ্যটি মনে হয় শ্রোতা ও পাঠকদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে।

[৪.৪] অনেক সময় কোন দৃশ্য দীর্ঘায়িত করার জন্য তার মধ্যস্থিত সমস্ত তৎপরতাকে থামিয়ে দেয়া হয়। যেমন ধরুন কিয়ামতের ময়দানে এক জালিম দাঁড়ানো। সম্পূর্ণ একা। বার বার লজ্জা ও দুঃখ প্রকাশ করছে। মনে হয় আপনি তাকে দেখে একথা বলবেন যে, আরে ভাই ক্ষান্ত হও, একন লজ্জা ও দুঃখ প্রকাশ করে আর কী হবে? দৃশ্য সংঘটিত হওয়ার সময় খুব কম কিন্তু আপনার মনে হবে তা অনেক দীর্ঘ। যেমন-

(আরবী************)

জালিম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে: হায় আফসোস! আমি যদি রাসূলের সাথে পথ চলতাম, আহা! আমি যদি অমুককে বন্ধু বানিয়ে না নিতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল, শয়তান মানুষকে সময় বুঝে ধোঁকা দেয়। (সূরা আল-ফুরকান: ২৭-২৯)

উল্লেখিত আয়াতে অতীতকালের ক্রিয়াকর্মের ওপর একজন কাফিরের অনুতাপ প্রকাশের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে ব্যথার এমন কুরণ রাগিণী ধ্বনিত হয়েছে, যা থেকে আপনা-আপনিই চিত্রের দীর্ঘতা ফুটে উঠে। তার শব্দ অল্প, বেশি নয়। তবু তা থেমে যখন ঘৃণা, ক্ষোভ ও দুঃখের অবস্থার দীর্ঘতা সৃষ্টি হয়েছে তাই কোন ব্যক্তিই তার প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকতে পারে না। বস্তুত এটিই ছিল এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। স্মর্তব্য যে, অপরাধী অপরাধের স্বীকারোক্তির স্থান ও কাল, দুঃখ ও লজ্জার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। চিন্তা করুন, অপরাধীদের এক দলকে জিজ্ঞেস করা হবে:

(আরবী************) তোমরা কেন জাহান্নামে পড়ে গেলে? (সূরা আল-মুদ্দাসরিস: ৪২)

তারা প্রত উত্তরে বলবে: (আরবী************)

তারা বলবে: আমরা নামায পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য তিদাম না, আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করতাম এবং আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম, যতোক্ষণ না এ বিষয়ে বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে (অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত)। (সূরা আল মুদ্দাস্‌সির: ৪৩-৪৭)

অপরাধীরা শুধু একথা বলে দিলেই পারতো যে, আমরা অবিশ্বাস করতাম এবং মিথ্যে মনে করতাম। কিন্তু তা করে অপরাধের স্বীকারোক্তির সময়কে দীর্ঘায়িত করার মধ্যেও এক ধরনের সৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

[৪.৫] অনেক সময় এমনওদেখা যায় কোন দৃশ্যকে দীর্ঘায়িত করার জন্য পূর্বোল্লেখিত যাবতীয় উপকরণের সাহায্য নেয়া হয়। যেমন শাব্দিক বিন্যাস ও মিলের সহযোগিতা নেয়া কিংবা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা অথবা কখনো দৃশ্যকে স্থির করে দেয়া। নিচের উদাহরণগুলো লক্ষ্য করুন:

(আরবী************)

যখন সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে একটি মাত্র ফুঁক। তখন পৃথিবী ও পর্বতমালাকে উত্তোলন করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে। সেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ ও বিক্ষিপ্ত হবে এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আটজন ফেরেশতা তোমার পালনকর্তার আরশকে ঊর্ধ্বে বহন করবে। সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোন কিছুই গোপন থাকবে না। (সূরা আল-হাক্কাহ: ১৩-১৮)

(আরবী************)

অতপর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও, তোমরা আমলনামা পড়েগ দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসবের সম্মুখীন হতে হবে। অতপর সে সুখী জীবন যাপন করবে সুউচ্চ জান্নাতে। তার ফলসমূহ অবনমিত হবে। (বলা হবে) বিগত দিনে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে তার প্রতিদানে তোমরা খাও এবং পান করো তৃপ্তি সহকারে।

(আরবী************)

যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে: হায়! আমার আমলনামা যদি না-ই দেয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসেব! হায় আমার মৃত্যুই যদি শেষ হতো। আমার ধন-সম্পদ আমার কোন উপকারেই এলো না। আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল। ফেরেশতাদের বলা হবে: ধর একে, গলায় বেস্থি পরিয়ে দাও। তারপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। অতপর তাকে সত্তর গজ শিকল দিয়ে বেঁধে ফেল। নিশ্চয় সে মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাসী ছিল না এবং মিসকিনকে খাদ্য প্রদানে উৎসাহিত করতো না। অতএব আজকের দিনে এখানে তার কোন সুহৃদ নেই এবং তার জন্য কোন খাদ্যও নেই, ক্ষত নিঃসৃত পুঁজ ছাড়া। গুনাহগার ছাড়া আর কেউ তা খাবে না। (সূরা আল-হাক্কাহ: ২৫-২৭)

উল্লেখিত দৃশ্য উপস্থাপন করতে কয়েকটি পদ্ধতির সাহায্য নেয়া হয়েছে এখানে, বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে, সুরের রেশও বেশ দীর্ঘ। দৃশ্যের কিছু অংশকে গতিশীল না করে স্থির করা হয়েছে। পুরো দৃশ্যের রঙের মধ্যেও সামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয়। সত্তর গজ শিকরের বর্ণনা চিন্তাকে বিস্তৃত করে দেয়। বস্তুত এ সবকিছুই দীর্ঘতার দাবি রাখে।

৫. যেখানে বিপরীতধর্মী কোন বিষয় আলোচনা, যেমন পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের সাথে তুলনা করা হয়েছে- সেই দৃশ্যগুলোকে দীর্ঘ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার উদাহরণ হচ্ছে নিচের আয়াত কটি:

(আরবী************)

নিশ্চয় সৎলোকের আমলনামা আছে ইল্লিয়্যনে । তুমি কি জান ইল্লিয়্যন কি? এটি লিপিবদ্ধ খাতা। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ একে প্রত্যেক্ষ করে। নিশ্চয় সৎলোকগণ থাকবে পরম সুখে, সিংহাসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের চিহ্ন দেখতে পাবে। তাদেরকে মোহার করা বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। তার মোহর হবে কস্তুরীর। এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। তার মিশ্রণ হবে তাসনীমের পান। এটি একটি ঝরণা, যার পানি পান করবে নৈকট্যশীলগণ। (সূরা আল-মুতাফ্‌ফিফীন: ১৮-২৮)

(আরবী************)

যারা অপরাধী তারা বিশ্বাসীদের উপহাস করতো এবং তারা যখন তাদের কাছ দিয়ে যেত তখন পরস্পরে চোখটিপে ইশারা করতো। তারা যখন তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরত তখনও হাসাহাসি করে ফিরত। আর যখন তারা বিশ্বাসীদেরকে দেখত তখন বলতো নিশ্চয় এরা বিভ্রান্ত। অথচ তারা বিশ্বাসীদের তত্ত্বাবধায়করূপে প্রেরিত হয়নি। আজ যারা বিশ্বাসী তারা কাফিরদরেকে উপসাহ করছে।

উল্লেখিত আয়াতসমূহে দীর্ঘ দুটো দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এক দৃশ্যে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ বিভিন্ন নিয়ামত ভোগে লিপ্ত এবং দ্বিতীয দৃশ্যে দেখানো হয়েছে কাফিররা মুমিনদের সাথে দুনিয়ায় কিরূপ আচরণ করতো। মুমিনদের সাথে হাসি-তামাশা করা কিভাবে তাদের নেশায় পরিণত হয়েছিল। দুটো দৃশ্যই দীর্ঘ। বিশেষ করে দ্বিতীয় দৃশ্যটি। তার শেষ অংশটি তো অনেক মর্মস্পর্শী। আর এ জিনিসটি বুঝানোই এখানে আসল উদ্দেশ্য।

৬. কুরআনে কারীমের যে জায়গায় ঈমানদারগণ এবং তাদের সৎকাজের ছবি আঁকা হয়েছে সে দৃশ্য অনেক দীর্ঘ। সেই দীর্ঘতা বিবেককে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করে। এ সমস্ত আয়াতে যারা দৃষ্টি প্রদান করে তাদেরকে আহ্বান জানান হয় যে, তারা যেন ঈমানদারদের সাথে ইকবাদতে শরীক হয়ে যায়, যা দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে। এ রকম উদাহরণ আল-কুরআনে অনেক। এখানে আমরা মাত্র একটি উদাহরণ পেশ করলাম।

(আরবী**********)

নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে। (তারা বলে:) পরওয়ারদিগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি, সকল পবিত্রতা আপনার, আমাদেরকে আপনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচান। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করলেন তাকে অপমানের চূড়ান্ত করে ছাড়লেন। আর জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে। (এই বলে) ‘তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন’ তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমারেদ রব্ব! অতএব আমাদের সকল অপরাধ মাফ করে দিন এবং আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দিন, আর আমাদের মৃত্যু দিন নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দিন, যা আপনি ওয়াদা করছেন আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে অপমানিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি ভঙ্গ করেন না অঙ্গীকার। (আলে ইমরান: ১৯০-১৯৫)

(আরবী**********)

অতপর তাদের পালনকর্তা তাদের এ দো’আ (এই বলে) কবুল করে নিলেন, আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না। তা সে পুরুষ হোক কিংবা মহিলা। তোমরা পরস্পর এক। তারপর যারা হিজরত করেছে, নিজেদের দেশ থেকে যাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং যাদেরকে উৎপীড়ন করা হয়েছে আমার পথে। আর যারা লড়াই করেছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে অবশ্যই তাদের ওপর থেকে অকল্যাণকে অপসারি করবো এবং তাদরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো। যার তলদেশে নদী-নালা প্রবাহমান। এ হচ্ছে বিনিময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম বিনিময়। (সূরা আলে ইমরান: ১৯৫)

কোন্‌ ব্যক্তি এমন আছে, যে খুশুখুজুতে ভরপুর এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী এ দৃশ্য দেখে তার মন বিগলিত হবে না এবং সে ঐ জ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে তাদের মতো দরবারে বারী তা’আলায় হাত উঠিয়ে নিজেকে ঐ রকম বিনয় ও নম্রতার চরম শিখরে আরোহণ করাবে না। বিশেষ করে যখন ঈমানদারদের ত্যাগের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং পরকালের নেয়ামতের জন্য তাদের প্রতীক্ষায় থাকার কথা বলা হচ্ছে। মহান দয়ালু আল্লাহ ঐ ব্যক্তির দো’আকে কবুল না করেই পারেন না। অবশ্যই তাকে যেসব বস্তু প্রদান করবেন যা ঈমানদারদেরকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যখনই পুরোপুরি মনোযোগ ও আগ্রহ সহকারে কুরআন অধ্যয়ন করা হবে তখনই এ ধরনের অগণিত জীবন্ত দৃশ্যসমূহ লক্ষ্য করা যাবে। আল কুরআনের একজন পাঠক যখন চুলচেরা বিশ্লেষণসহ কুরআন অধ্যয়ন করতে থাকে তখন তার সামনে জ্ঞান ও রহস্যের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। শব্দ ও অর্থের সামঞ্জস্যতা, ছন্দ ও বিন্যাসের সৌন্দর্য, মনোহরী বর্ণনা এবং তার সম্মোহনী প্রভাব, বিষয়সমূহের যোগসূত্র ও সন্নিবেশিতা, বক্তব্য উপস্থাপনের সূক্ষ্মতা ও তার স্টাইল, ঘটনাবলীর শৈল্পিক চিত্র, মনমোহনী সুর, এক অংশের সাথে আরেক অংশের সম্পর্ক উপস্থাপনের নতুন নতুন ধরন ও পদ্ধতি ইত্যাদি যেগুলোর সমন্বয়ে আল-কুরআনের অলৌকিকতা ও রহস্যময়তা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেছে।

অষ্টম অধ্যায়

প্রসঙ্গঃ আল কুরআনের বর্ণিত ঘটনাবলী

একথা স্মরণ রাখা উচিত যে, কিস্‌সা-কাহিনী বর্ণনা করা আল-কুরআনের মূল উদ্দেশ্য নয়। যদিও এর মধ্যে সেই বিসয়বস্তু এবং স্টাইল অবলম্বন করা হয়, যা গল্প-উপন্যাস লেখার জন্য অপরিহার্য। গল্প-উপন্যাস লেখার সেই শৈল্পিক দিকটি অনুসরণ করা আমাদের একান্ত প্রয়াজন। কিন্তু এখানকার ব্যাপারটি কিছুটা ভিন্ন।আল-কুরআন দ্বীনি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আনুসঙ্গিক যেসব উপকরণ গ্রহণ করেছ ঘটনাবলী সেসব উপকরণের অন্যতম একটি উপকরণ। কুরআনর মূল লক্ষ্য হচ্ছে দাওয়াতে দ্বীন এবং কাহিনী চিত্র হচ্ছে ঐ দাওয়াতকে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় মানুষের নিকট পৌঁছানোর একটি মাত্র। কুরআন যে উদ্দেশ্যে কিয়ামত ও আখিরাতে সওয়াবের চিত্র তুলে ধরেছে, যে উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের তথ্য পেশ করেছে, যে উদ্দেশ্যে শরীয়তের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য উদাহরণ উপমা বর্ণনা করেছে, ঠিক সেই একই উদ্দেশ্যে কাহিনী চিত্রও উপস্থাপন করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনি দাওয়াতকে মানুষের নিকট হৃদয়গ্রাহী করে পৌঁছে দেয়া।

সত্যি কথা বলতে কি, কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী ও তার বিষয়বস্তু নিজস্ব স্টাইলে এবং নিখুঁতভাবে দ্বীনি উদ্দেশ্যকে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌছে দিয়েছে। (সামনে আমরা তার ধরন ও নমুনা বর্ণনা করবো।) তাই বলে দ্বীনি উদ্দেশ্যের অধীন হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ঘটনাবলী উপস্থাপনের সময় শৈল্পিক দিকটির প্রতি লক্ষ্যই রাখা হবে না। বরং ঘটনাবলী দ্বীনি উদ্দেশ্যকে পুরো করার সাথে সাথে শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যসমূহও ধারণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে আল-কুরআনের বর্ণনা ও উপস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণিই হচ্ছে চিত্রায়ণ। মযা বর্ণনার অপরিহার্য বিশেষ।

ইতোপূর্বে আমরা বলেছি আল-কুরআনের প্রতিটি নিয়ম দ্বীনি ও শৈল্পিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপূরক। আল-কুরআনে উপস্থাপিত প্রতিটি ছবি ও দৃশ্য উভয় গুণেই গুণান্বিত্ আমরা আরও বলেছিলাম, আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য মানুষের মনোজগতের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ মনোজগতের সেই দ্বীনি অনুভূতিকে শৈল্পিক সৌন্দর্যের ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রকাশ থাকে যে, দ্বীন এবং শৈল্পিকতা একে অপরের পরিপূরক এবং তার অবস্থান মানুষের মনের গভীরে। সে জন্য মানুষের বিবেক তখনিই তা গ্রহণ করে যখন শৈল্পিক সৌন্দর্য সর্বোচ্চ চূড়ায় গিয়ে উপনীত হয় এবং তার সাথে সাথে মান ও মানস সেই সৌন্দর্য সুষমার আহবানে সাড়া দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে।

আমরা ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ে কাহিনী চিত্রের দুটো উদাহরণ পেশ করেছি। সেখানে প্রকৃতি তার তুলি দিয়ে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ছবি এঁকেছ। যা মানুষকে প্রভাবিত না করে পারে না। আমরা সেখানে এর বিস্তারিত আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এখন আমরা সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করবো। ইনশা আল্লাহ।

আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

আমরা পূর্বে বলেছি, একমাত্র দ্বীনি উদ্দেশ্যকে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্ত পৌঁছে দেয়া লক্ষ্যেই আল-কুরআনে বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সেই দ্বীনি উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করার জন্যই ঘটনাসমূহ বর্ণনা করেছে। যমন ওহী ও রিসালাতের স্বীকৃতি, তাওহীদ, বিভিন্ন নবীদের দ্বীন এক, সমস্ত নবীদের সাথে আচরণের পদ্ধতি এক ও অভিন্ন, কুদরতের বহিঃপ্রকাশ, ভাল ও মন্দের পরিণতি, ধৈর্য ও স্থৈর্য, শোর ও কুফর এবং আরো অনেক উদ্দেশ্যকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়ার জন্য কুরআন কাহিনী চিত্রের সাহায্য নিয়েছে।

১. ওহী ও রিসালাতের স্বীকৃতি: আমরা আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করবো। তার পরিধি ও বিস্তৃতিকে করায়ত্ব করার জন্য নয়। আল-কুরআনে ঘটনাবসমূহ বর্ণনা করার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ওহী ও রিসালাতের স্বীকৃতি এবং তার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের যুক্তি উপস্থাপন করা।

উল্লেখ্য যে, নবী করীম (স) প্রচলিত অর্থে কোন লেখাপড়া জানতেন না। এমনকি ইহুদী কিংবা খ্রীস্টান কোন আলিমের সাথেও তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। যাতে তিনি কুরআনের মাধ্যমে এমন কিছু ঘটনা বর্ণনা করতে পারেন। অনেক ঘটনাতো তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন আবার কোন কোনটি আংশিক যেমন, হযরত ইবরাহীম (আ), হযরত ইউসুফ (আ), হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা। কুরআনে এসব ঘটনার আলোচনা একথাই প্রমাণ করে যে, এগুলো তাঁকে ওহীর মাধ্যমে জানান হয়েছে। কুরআন তো এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। যেমন সূরা ইউসুফের শুরুতেই বলা হয়েছে।

(আরবী**********) আমি এ কুরআনকে আরবীতে অবতীর্ণ করেছি যেন তোমরা বুঝতে পার। (সূরা ইউসুফ: ২)

(আরবী**********)

আমি তোমার নিকট একটি উত্তম কাহিনী বর্ণনা করেছি, যেভাবে আমি এ কুরআনকে তোমার নিকট অবতীর্ করেছি। অবশ্য তুমি এর পূর্বে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। (সূরা ইউসুফ: ৩)

সূরা কাসাসে হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা বর্ণনার পূর্বে বলা হয়েছে:

(আরবী**********) আমি তোমার কাছে মূসা ও ফিরাউনের ঘটনাবলী যথাযথভাবে বর্ণনা করছি ইমানদার সম্প্রদায়ের জন্য (সূরা আল-কাসাস: ৩)

যেখানে এ ঘটনা শেষ হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

মূসাকে যখন আমি নির্দেশ দিয়েছিলা, তুমি পশ্চিম প্রান্তে ছিলে না এবং তা প্রত্যক্ষও করনি। কিন্তু আমি অনেক জাতি সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদের অনেক যুগ অতিবাহিত হয়েছে। আর তুমি মাদইয়ানবাসীদের মধ্যেও ছিলে না, যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো। কিন্তু আমিই ছিলাম রাসল প্রেরণকারী। আমি যখন মূসাকে আওয়াজ দিয়েছিলা, তখন তুমি তুর পর্বতের পাশে ছিলে না। কিন্তু এটি তোমার পালনকর্তার রহমত স্বরূপ। যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে ভীতি প্রদর্শন করতে পার, যাদের কাছে ইতোপূর্বে আর কোন ভীতি প্রদর্শনকারী আসেনি। যেন তা স্মরণ রাখে। (সূরা আল-কাসাস: ৪৪-৪৬)

হযরত মারইয়াম (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয় সূরা আলে-ইমরানে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

এ হলো গায়েবী সংবাদ যা আমি তোমাকে প্রদান করে থাকি। আর তুমিতো সে সময় ছিলে না যখন তারা প্রতিযোগিতা করছিল, কে মরিয়মের অভিভাবকত্ব লাভ করবে। আর তখনও তুমি ছিলে না যখন তারা ঝগড়া-বিবাদ করছিল। (সূরা আলে ইমরান: ৪৪)

হযরত আদম (আ)-এর ঘটনা বর্ণনার পূর্বে সূরা সা’দ-এ বলা হয়েছে:

(আরবী**********) বলো, এটি এক মহাসংবাদ, যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। ঊর্ধ্বজগত সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান ছিল না, যখন ফেরেশতারা কথাবার্তা বলছি। আমার কাছে এ ওহী-ই আসে যে, আমি একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। (সূরা সা’দ : ৬৭-৭১)

সূরা হুদে নূহ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

এটি গায়েবের খবর, আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে জানাচ্ছি। ইতোপূর্বে এটি তোমার ও তামার জাতির জানা ছিল না। (সূরা হুদ: ৪৯)

২. এক ও অভিন্ন দ্বীন: আল-কুরআনে একথা সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সকল দ্বীন-ই আল্লাহর থেকে প্রাপ্ত। ঈমানদারগণ এক উম্মত বা দল। আর আল্লাহর সবার প্রতিপালক। আল-কুরআনের অনেক জায়গায় বিভিন্ন নবীদের ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। সমস্ত নবীদের দ্বীনও যে এক এবং অভিন্ন একথা বলাও ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য। এজন্য সামান্য রদবদল করে নবীদের কাহিনী আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে। যেন মানুষ বুঝতে পারে, সমস্ত নবী ও রাসূলগণ একই দায়িত্ব নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন। নিচে আমরা কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

আমি মূসা ও হারুনকে দান করেছিলাম মীমাংসাকারী গ্রন্থ আলো ও উপদেশ, আল্লাহভীরুদের জন্য। যারা না দেখেই তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কিয়ামতের ভয়ে শংকিত হয়। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৮-৪৯)

(আরবী**********)

এট কল্যাণকর নসীহ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, তবু কি তোমরা তা অস্বীকার করবে? আর আমি ইতোপূর্বে ইবরাহীমকে সত্যাশ্রয়ী করেছিলাম এবং আমি তার সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। যখন সে তাঁর পিতা ও সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিল। এ মূর্তিগুলো কী, তোমরা যাদের পূজারী হয়ে বসে আছ? (সূরা আল-আম্বিয়া: ৫১-৫২)

(আরবী**********)

আমি তাকে (ইবরাহীম) ও লুতকে উদ্ধার করে সেই দেশে পৌঁছে দিলাম, যেখানে আমি বিশ্বের জন্য কল্যাণ রেখেছি। আমি তাকে দান করলাম ইসহাক এবং পুরষ্কার স্বরূপ দিলাম ইয়াকুবকে এবং প্রত্যেককে সৎকর্মশীল বানালাম। আমি তাদেরকে নেতা করলাম। তারা আমার নির্দেশ অনুযায়ী পথ প্রদর্শন করতো। আমি তাদের প্রতি ওহী নাযিল করতাম- সৎকাজ করার, নামায কায়েম করার ও যাকাত আদায়ের জন্য। তারা আমার ইবাদতে মশগুল ছিল। (সূরা আম্বিয়া: ৭১-৭৩)

(আরবী**********)

এবং আমি লুতকে দিয়েছিলাম পজ্ঞা ও জ্ঞান। আর তাকে এ জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলাম। যারা নোংরা কাজে লিপ্ত ছিল। তারা মন্দ ও নাফরমান সম্প্রদায় ছিল। আমি তাকে আমার অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। সে ছিল সৎকর্মশীলদের একজন।

(আরবী**********)

এবং স্মরণ কর নূহকে, যখন সে এর পূর্বে দো’আ করেছিল এবং আমি তার দো’আ কবুল করেছিলাম। তারপর তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে মহাসংকট থেকে উদ্ধার করেছিলাম। আমি তাকে ঐ সম্প্রদায়ের বিপক্ষে সাহায্য করেছিলাম, যারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করেছিল। নিশ্চয়ই তারা ছিল দুষ্ট সম্প্রদায়; এজন্য তাদের সকলকে ডুবিয়ে মেরেছিলাম। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৬-৭৭)

(আরবী**********)

এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলাইমানকে, যখন তারা শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল। সেখানে রাতে কিছু লোকের মেষ ঢুকে পড়েছিল, তাদের বিচার আমার সামনে ছিল। অতপর আমি সুলাইমানকে সে ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম্ আমি পর্বত ও পাখীকূলকে দাঊদের অনুগত করে দিয়েছিলা, তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতা। এ সমস্ত আমিই করেছিলাম। আমি তাকে তোমারেদ জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে। তবে কি তোমরা কৃতজ্ঞ হবে? (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৮-৮০)

(আরবী**********)

আর সুলাইমানের অধীন করেছিলাম প্রবল বায়ুকে। তা তার আদেশে প্রবাহিত হতো ঐ দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ দান করেছিলাম। আমি সব বিষয়েই সম্যক অবগত আছি। আর অধীন করে দিয়েছিলাম শয়তানদের কতককে যারা তার জন্য ডুবুরীর কাজ করতো। এছাড়া অন্য আরো অনেক কাজ করতো। আমি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতাম। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮১-৮২)

(আরবী**********)

স্মরণ করো আইউবের কথা যখন সে তার পালনকর্তাকে আহ্বান করে বললো: ‘আমি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চেয়ে সর্বশ্রেস্ঠ দয়াবান’। আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এ বং তার দুঃখ-কষণ্ট দূর করে দিলাম। আর তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে তার সমপরিমাণ আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত। বস্তুত এটি ইবাদতকারীদের জন্য একটি স্মারক। (সূরা আম্বিয়া: ৮৩-৮৪)

(আরবী**********)

আর ইসমাঈল, ইদ্রিশ ও যুলকিফ্‌লের কথা স্মরণষ করো, তারা প্রত্যেকেই ছিল সবরকারী। আমি তাদেরকে আমার রহমত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। তারা সবাই ছিল সৎকর্মশীল। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৫-৮৬)

(আরবী**********)

এবং মাছওয়ালার কথা স্মরণ করো, সে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিল আর মনে করেছিল যে, আমি তাকে পাকড়াপও করতে পারবো না। অতপর সে অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলো, ‘তুমি চাড়া কোন ইলাহ নেই, তুমি নির্দোষ আমি গুনাহগার, তারপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। এমনিভাবে বিশ্বাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকে। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭০-৮৮)

(আরবী**********)

এবং যাকারিয়ার কথা স্মরণ করো, যখন সে তার পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিল: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা রেখ না। তুমি তো উত্তম ওয়ারিশ। অতপর আমি তার দো’আ কবুল করেছিলাম, তাকে দান করেছিলাম ইয়াহ্‌ইয়কে এবং তার জন্য তার স্ত্রীকে সন্তান ধারণের যোগ্য বানয়ে দিয়েছিলাম, তারা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তো, তারা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকতো এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।

(আরবী**********)

এবং সেই নারীর (অর্থাৎ মারইয়ামের) কথা স্মরণ করো, যে তার কাম-প্রবৃত্তিকে বশে রেখেছিল, অতপর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে বিশ্বাসীর জন্য নিদর্শন বানিয়েছিলা। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৯১)

(আরবী**********) তারা সকলেই তোমাদের দ্বীনের-একই দ্বীনে বিশ্বাসী এবং আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমার ইবাদত করো।

আল-কুরআনের কিস্‌সা-কাহিনী বর্ণনা করার আসল উদ্দেশ্য এটিই। এছাড়া আর যতো উদ্দেশ্য আছে তা মুখ্য নয় গৌণ।

৩. আল্লাহর ওপর ঈমান : আল-কুরআনে কাহিনী বর্ণনার উদ্দেশ্য শুধু এই নয় যে, সমস্ত দ্বীন লা-শরীক এক আল্লাহর নিক থেকে এসেছে একথা প্রমাণ করা; বরং একথাও প্রমাণ করা যে, এ সবগুলো দ্বীনের ভিত্তিও এক। সব নবীদের কাহিনী একত্রিত করলে বুঝা যায়, তাদের সর্বপ্রথম দাওয়াত ছিল ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর ওপর ঈমানের। যেমন : সূরা আল-আ’রাফে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

নিশ্চয়ই আমি নূহকে তাঁর জাতির কাছে পাঠিয়েছি। সে বললো: হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা আল্লহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই। আমি তোমাদের জন্য এক কঠিন দিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি। (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯)

(আরবী********)

আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছি। সে বললো: হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তোমরা কি ভয় করবে না?

(আরবী**********)

সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহকে। সে বললো: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন উপাষ্য (ইলাহ) নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের রব্ব-এর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে গেছে।

(আরবী***********)

আমি মাদইয়ানবাসীর জন্য তাদের ভাই শু’আইবকে পাঠিয়েছি, সে বললো: হে আমার জাতির লোকেরা! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। (সূরা আল-আ’রাফ: ৮৫)

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইসলামী আকীদাসমূহের মধ্যে তাওহীদ হচ্ছে মূল বা ভিত্তি। আর সমস্ত আম্বিয়ায়ে কিরামই তাওহীদের মুবাল্লিগ ছিলেন। যেহেতু তাদের সকলের উদ্দেশ্য ছিল এক তাই তাদের ঘটনাবলীর মধ্যেও সামঞ্জস্য দেখা যায়।

৪. সমস্ত নবী-রাসূল একই পদ্ধতিতে দাওয়াত দিয়েছেন: ওপরে আলোচনা থেকেও একথা বুঝা যায় যে, প্রত্যেক নবীর দাওয়াতের পদ্ধতি ছিল এক ও অভিন্ন। আর প্রত্যেক নবীর জাতি তাদের সাথে যে আচরণ করেছে তাও প্রায় একই রকম। কারণ, সকল নবীর দ্বীন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং সকল দ্বীনের ভিত্তিও এক। এ কারণেই নবীদের কাহিনীগুলো অধিকাংশ জায়গায় একত্রে এসেছে এবং তাদের একই ধরনের কার্যকলাপের বিবরণ বার বার পেশ করা হয়েছে। যেমন সূরা হুদে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

অবশ্যই আমি নূহকে তাঁর জাতির কাছে পাঠিয়েছিলাম। (সে জাতিকে বললো:) নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী। তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। কেননা আমি তোমাদের ব্যাপারে এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের শান্তির ভয় করছি। তখন তার সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসী গোত্রপতি ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বললো: আমরা তো তোমাকে আমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই মনে করি না। আর আমাদের মধ্যে যারা নিঃস্ব ও নির্বোধ তারা ছাড়া আর কাউকে তোমার আনুগত্যও করতে দেখি না। তাছাড়া আমারেদ ওপর তোমার কোন প্রাধান্যও নেই বরং তোমাকে আমরা মিথ্যেবাদী মনে করি।

নূহ (আ) বললেন: (আরবী***********)

হে আমার জাতির লোকেরা! তোমাদের কাছে কোন ধন-সম্পদ চাই না। আমি একমাত্র আল্লাহর নিকটই আমার পারিশ্রমিক চাই। (সূরা হুদ: ২৯)

নূহ (আ)-এর জাতি বললো:

(আরবী***********)

হে নূহ! আমাদের সাথে তুমি তর্ক করছ এবং অনেক ঝগড়া-বিবাদ করছ। এখন তুমি তোমার সেই আযাব নিয়ে এসো, যে সম্পর্কে তুমি আমাদেরকে সতর্ক করছ। যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক। (সূরা হুদ: ৩২)

(আরবী***********)

আর আ’দ জাতির প্রতি তাদের ভাই হূদকে পাঠিয়েছি, সে বললো:” হে আমার জাতির লোরো! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ভিন্ন তোমাদের আর কোন মা’বুদ নেই। তোমরা সবাই মিথ্যারোপ করছ। হে আমার জাতি! আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক তো তাঁর কাছেই, যনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তবু তোমরা কেন বুঝ না? হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর প্রতি মনোনিবেশ করো। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি উত্তর-উত্তর বৃদ্ধিথ করবেন। তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মতো হয়ো না। তারা বললো: হে হূদ! তুমি আমাদের নিকট কোন প্রমাণ নিয়ে আসনি, কাজেই আমরা তোমার কথায় আমাদের দেব-দেবীদের বর্জন করতে পারি না। আর আমরা তোমাকে বিশ্বাস করতেও পারি না। বরং আমরা মনে করি তোমার ওপর আমাদের কোন দেবতার মার পড়েছে। হূদ বললো: আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক, আমার কোন সম্পর্ক নেই তাদের সাথে যাদেরকে তোমরা শরীক করছ। তাঁকে ছাড়া। তোমরা সবাই মিলে আমার অনিষ্ট করার প্রয়াস চালও, অতপর আমাকে কোন অবকাশ দিয়ো না। (হূদ : ৫০-৫৫)

(আরবী***********)

আর সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বললো: হে আমার জাতি! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তিনি জমিন থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যেই তোমাদেরকে বসবাস করাচ্ছেন। অতএব, তাঁর কাছে মাফ চাও এবং তাঁর দিকেই ফিরে চল। আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, কবুল করে থাকেন সন্দেহ নেই। তারা বললো: হে সালেহ! ইতোপূর্বে তোমার নিকট আমাদের বড় আশা ছিল। আমাদের বাপ-দাদা যাদের পূঁজা করতো, তুমি তা থেকে আমাদেরকে বারণ করছ? কিন্তু যার প্রতি তুমি আমাদেরকে আহ্বান করছ, তাতে আমাদের এমন সন্দেহ রয়েছে যে, মন মোটিই সায় দিচ্ছে না। (সূরা হুদ: ৬১-৬২)

৫. প্রত্যেক নবী-রাসূলদের দ্বীনের যোগসূত্র: আল-কুরআনে কাহিনী বর্ণনার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী করীম (স)-এর দ্বীন এবং হযরত ইবরাহীম (আ)সহ অতীতের সকল নবীর দ্বীন যে একই সূত্রে বাধা। বিশেষ করে বনী ইসরাঈল ও উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে দ্বীনের যোগসূত্র অন্যাস্য নবীর দ্বীনের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী তা প্রমাণ করা। এজন্য আল-কুরআনের যেখানে হযরত ইবরাহীম (আ), হযরত ঈসা (আ)-এর ঘটনাগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন:

(আরবী***********) এটি লিখিত আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে, (বিশেষ করে) ইবরাহীম ও মূসার কিতাবে। (সূরা আল-আ’লা: ১৮-১৯)

(আরবী***********)

তাকে কি জানান হয়নি, যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে, যে তার দায়িত্ব পালন করেছিল? কিতাবে এই আছে যে, কোন ব্যক্তি কারো গুনাহ নিজে বহন করবে না। (নাজম: ৩৬-৩৮)

(আরবী***********)

মানুষের মধ্যে যারা ইবরাহীমের অনুসরণ করেছিল তারা আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইবরহাীমের ঘনিষ্ঠতম। আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু। (সূরা আলে ইমরান: ৬৮)

(আরবী***********) তোমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম। তিনিই তোমাদের নাম মুসলিম রেখেছেন। (সূরা আল-হাজ্জ: ৭৮)

(আরবী***********)

আমি তাদের পেছনে মারইয়াম তনয় ঈসাকে পাঠিয়েছি। সে পূর্ববর্তী তওরাত গ্রন্থের সত্যায়নকারী ছিল। আমি তাকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি। এতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়ন করে, পথ প্রদর্শন করে এবং এটি আল্লাহভীরুদের জন্য হেদায়েত ও উপদেশ বাণী। ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিত আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা পাপাচারী। আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। সত্যগ্রন্থ। যা পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। (সূরা আল-মায়েদা: ৪৬-৪৮)

৬. নবী-রাসূলদের সফলতা ও মিথ্যেবাদীদের ধ্বংস: আল-কুরআনে কাহিনী বর্ণনার আরেক উদ্দেশ্য হচ্ছে আম্বিয়ায়ে কিরামের সফলতা ও মিথ্যেবাদীদের ধ্বংসের কথা তুলে ধরা। যেন তা নবী করীম (স)-এর জন্য সান্ত্বনার কারণ এবং তাদের জন্যও সান্ত্বনা এবং আদর্শ হয় যারা ঈমানের পথে লোকদেরকে আহ্বান করে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

আমি নবী-রাসূলদের সব বৃত্তান্তই তোমাকে বলেছি, যা দিয়ে তোমার অন্তরকে মজবুত করেছি। আর এভাবে তোমার নিকট মহাসত্য এবং ঈমানদারদের জন্য নসীহম ও স্মারক এসেছে। (সরা হুদ : ১২০)

কুরআন মজীদে যেখানেই নবীদের কথা ও তাদের সফলতার কথা বলা হয়েছে, তার পরটপরই ঐ সমস্ত কাফির মুশরিকদের পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যারা নবীদেরকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করতো। যেমন:

(আরবী***********)

আমি নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে সাড়ে নয়শ বছর তাদের সাথে ছিল। তারপর তাদেরকে মহাপ্লাবনে এসে ধ্বংস করে দিলো কেননা তারা ছিল পাপী। অতপর আমি নূহকে ও নৌকার আরোহীদেরকে বাঁচিয়ে দিলাম এবং নৌকাটিকে বিশ্ববাসীর জন্য নিদর্শন বানিয়ে রাখলাম।

(আরবী***********)

স্মরণ করো ইবরাহীমকে। যখন সে তার সম্প্রদায়কে বললো: তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাকে ভয় করো। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝ। (সূরা আল-আনকাবুত: ১৬)

(আরবী***********)

আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। যখন সে তার জাতিকে বললো: তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করোনি। তোমরা কি সমকামে লিপ্ত হচ্ছো, রাহাজানি করছ এবং নিজেদের মজলিসে গর্হিত কর্ম করছ? তার জবাবে তাঁর জাতি কেবল একথা বললো: আমাদের ওপর আল্লাহর আযাব আনো যদি তুমি সত্যবাদী হও।….. যখন প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের কাছে পৌঁছল তখন তাদের কারণে সে বিষণ্ণ হয়ে পড়ল এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বললো: ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না, আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করবোই, শুধু আপনার স্ত্রী ছাড়া। সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের দলভুক্ত থাকবে। আমরা এ জনপদের অধিবাসীদের ওপর আকাশ থেকে আযাব নাযিল করবো তাদের পাপাচারের কারণে। আমি বুদ্ধিমান লোকদের জন্য এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি।

(আরবী***********)

আমি মাদইয়ানবাসীদের প্রতি তাদের ভাই শু’আইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বললো: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, শেষ দিবসের আশা রাখ এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যেবাদী বললো। অতপর তারা ভুমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো এবং নিজেদের গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। (আনকাবুত: ৩৬-৩৭)

(আরবী***********)

আমি আ’দ ও সামুদ জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের বাড়িঘর দেখেই তাদের অবস্থা তোমাদের জানা হয়ে গেছে। শয়তান তাদের কর্মকে তাদের নিকট আকর্ষণীয় করে তুলেছিল এবং তাদেরকে সৎপথ অবলম্বনে বাধা দিয়েছিল, তারা ছিল হুশিয়ার। আমি কারূন, ফিরাউন ও হামানকে ধ্বংস করে দিয়েছি। মূসা তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আগমন করেছিল কিন্তু তারা দম্ভ-অহংকারে লিপ্ত ছিল, তাই বলে তারা জিতে যায় নি। আমি প্রত্যেককেই তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কারো কাছে পাঠিয়েছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে পেয়েছে বজ্রপাত, কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিলেন না। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। (সূরা আনকাবুত: ৩৮-৪০)

৭. সুসংবাদ ও সতর্কীকরণের সত্যতা: আল-কুরআনে ঘটনাবলী বর্ণনার আরেকটি কারণ হচ্ছে- ঈমানদারকে জান্নাত ও তার নিয়ামতসমূহের সুসংবাদ ও তার সত্যতার প্রমাণ করা এবং অবিশ্বাসীদের জন্য জাহান্নাম ও তার দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তার সত্যতা প্রমাণ করা। যেমন-

বলা হয়েছে:

(আরবী***********) (হে নবী!) তুমি আমার বান্দাদের জানিয়ে দাও, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল-দয়ালূ। আর আমার শাস্তি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। (সূরা আল-হিজর: ৪৯-৫০)

এ আয়াতের পরপরই ক্ষমা ও শাস্তির সত্যতা সংক্রান্ত ও ঘটনাটি বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

তুমি তাদেরকে ইবরাহীমের মেহমানদের অবস্থা বানিয়ে দাও। যখন তারা তার বাড়িতে আগমন করলো এবং বললো: সালাম। সে বললো: আমরা তোমাদের ব্যাপারে ভীত। তারা বললো: ভয় করবেন না। আমরা আপনাকে একজন জ্ঞানবান ছেলের সুসংবাদ দিচ্ছি। (হিজর: ৫১-৫৩)

তারপরই আল্লাহর রহমতের ফাল্গুধারা প্রকাশিত হচ্ছে:

(আরবী***********)

অতপর যখন প্রেরিতরা লূতের গৃহে পৌছল, সে বললো: তোমরা তো অপরিচিত লোক। তারা বললো: না বরং আমরা আপনার কাছে ঐ বস্তু নিয়ে এসেছি যে সম্পর্কে তারা বিবাদ করতো। আমরা আপনার নিক সত্য বিষয় নিয়ে এসেছি এবং আমরা সত্রবাদী। অতএব আপনি শেষ রাতে পরিবারের সকলকে নিয়ে চলে যাবেন এবং আপনি তাদের পশ্চাদনুসরণ করবেন না। আর আপনাদের মধ্যে কেউ যেন পেছন ফিরে না দেখে। আপনারা যেখানে যাবার নির্দেশ পেয়েছেন সেখানে যাবেন। আমি লূতকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেই যে, সকাল হলেই তাদেরকে সমূলে বিনাশ করে দেয়া হবে। (সূরা আল-হিজর: ৬১-৬৬)

উল্লেখিত আয়াতে হযরত লূত (আ)-এর ওপর রহম এবং তাঁর জাতিরকে ধ্বংস করে দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। একটু সামনে অগ্রসর হয়ে এ সূরায়ই বলা হয়েছে:

(আরবী***********)

নিশ্চয়ই হিজরের বাসিন্দারা পয়গম্বরগণের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে। আমি তাদেরাকে নিজের নিদর্শনাবলী দিয়েছি কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তারা পাহাড়ে নিশ্চিন্তে ঘর খোদাই করতো। অতপর একদিন সকাল বেলা তাদেরকে একটি শব্দ এসে আঘাত করলো, তখন কোন উপকারেই এল না, যা তারা উপার্জন করেছিল। (সূরা হিজর: ৮০-৮৪)

এসব আয়অতে মিথ্যাবাদীদেরকে যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়েছে। আল্লাহর ওয়াদা সঠিক ও কার্যকরী তাও প্রমাণ করে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এ ঘটনাগুলো সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে যেবাবে তা সংঘটিত হয়েছে।

৮. নবী-রাসূলদের প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের বর্ণনা: নবী ও রাসূলদের ওপার যেসব অনুগ্রহ ও নিয়ামত প্রদান করা হয়েছে তা বর্ণনার জন্যও আল-কুরআনে কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে। যেমন হযরত দাউদ (আ), হযরত সুলাইমান (আ), হযরত আইউব (আ), হযরত ইবরাহীম (আ), মারইয়াম ও হযরত ঈসা (আ)-এর ঘটনাবলী। এ সমস্ত কাহিনী আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ সূরায় আলোচিত হয়েছে। প্রথম লক্ষ্য নিয়ামত ও অনুগ্রহের বর্ণনা দেয়া, সেই সাথে অবশ্য তাদের কিচু কার্যাবলীর বর্ণনাও প্রাসঙ্গিকভাবে চলে এসেছে।

৯. আদম সন্তানকে শয়তানের শত্রুতা থেকে সতর্ক করা: কুরআন মজীদে যেসব কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে তার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে- হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত যতো লোক পৃথিবীতে এসেছে এবং আসবে শয়তান তাদের প্রত্যেকের শত্রু, এ কথাটি বুঝিয়ে দেয়া। প্রতিটি মুহূর্তে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। কস্মিনকালেও সে মানুষের মঙ্গল চায় না। তারই জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে হযরত আদম (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় শয়তানের অপতৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১০. অন্যান্য আরও কতিপয় কারণ: আল-কুরআনে উপরোক্ত কারণ ছাড়াও নিম্নোক্ত কতিপয় কারণে বিভিন্ন ঘটনাবলী ও কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। যথা:

[১০.১] আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ- যেমন আদম ও ঈসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা, হযরত ইবরাহীম (আ) ও পাখির ঘটনা, ঐ ব্যক্তির ঘটনা [হযরত উযাইর (আ)] যে মরার একশ’ বছর পর জীবিত হয়েছিলেন। এ রকম আরও কিছু ঘটনাবলী।

[১০.২] ভাল ও কল্যাণকর কাজ এবং খারাপ ও অকল্যাণকর কাজের পরিণতি বর্ণনা, যেমন- আদম (আ)-এর দুই ছেলের ঘটনা, দুই বাগান মালিকের ঘটনা, বনী ইসরাঈলের ঘটনা, আসহাবে উখদুদের ঘটনা ইত্যাদি।

[০১.৩] মানুষের স্বভাব তাড়াহুড়া করা এবং তাড়াতাড়ি পাবার প্রচেষ্টা। এজন্য সে যা নগদ পায় অথবা যার বাস্তবতা আছে তার জন্য প্রচেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ তাদেরকে প্রকৃত কল্যাণের জন্য অপেক্ষা ও ধৈর্যের গুরুত্ব প্রদান করেছেন। এজন্য মানুষের তাড়াহুড়া ও আল্লাহর ধীর-স্থিরতার পরিণতি সম্পর্কেও কুরআনে বিভিন্ন কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন- হযরত মূসা (আ) ও আল্লাহর এক বান্দর (খাজা খিযিরের) ঘটনা। যে সম্পর্কে আমরা সামনে আলোচনা করবো। এ ধরনের বিষয়বস্তুর ওপর আল-কুরআন অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছে। যা তার উদ্দেশ্যকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিয়েছে।

নবম অধ্যায়

আল-কুরআনের ঘটনাবলী দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার প্রমাণ

১. আমরা ইতোপূর্বে বলেছি, যে সমস্ত ঘটনাবলী আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তা দ্বীনি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপূরক। ঘটনাগুলো যে দ্বীনের অনুগামী তার প্রমাণ কাহিনীগুলোতেও বিদ্যমান। আমি নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রমাণ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। সেসব ঘটনাবলী দ্বীনি উদ্দেশ্যের পরিপূরক হওয়ার প্রথম প্রমাণ হচ্ছে- একই ঘটনা বিস্তারিত কিংবা সংক্ষিপ্ত আকারে কয়েক জায়গায় তার পুনরাবৃত্তি।

কিন্তু ভাবনার বিষয় হচ্ছে, সেখানে পুরো ঘটনা বর্ণিত হয়নি, বর্ণিত হয়েছে ঘটনার বিশেষ বিশেষ অংশ।– খাস করে ঐ অংশগুলো বর্ণিত হয়েছে যেখানে উপদেশ ও শিক্ষা বর্তমান- সম্পূর্ণ ঘটনা একই সাথে বর্ণিত হয়েছে কদাচিত উপদেশ ও শিক্ষা বর্তমান- সম্পূর্ণ ঘটনা একই সাথে বর্ণিত হয়েছে কদাচিত এমন ঘটেছে। তা-ও করা হয়েছে বিশেষ কারণ, পরম্পরা ও উপযোগিতাকে সামনে রেখে। অবশ্যই ঘটনার বর্ণনার সময় আমি এ ব্যাপারে আভাস দিয়েছি।

যখন পাঠক ঘটনার পুনরাবৃত্তির অংশগুলো পাঠ করেন এবং তার পূর্বাপরের দিকে দৃষ্টি নিক্সেপ করেন তখন পুরো ঘটনাটিকেই সংগতিপূর্ণ বলে দখেতে পান। পাঠক মনে কনে যেখানে যে অংশ নেয়া হয়েছে এবং যে পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে তা যথার্থ। তিনি বিস্মৃতি হন না যে, আল-কুরআন মূলত একটি দাওয়াতী কিতাব। এজন্য ঘটনার যে অংশ যেখানে বর্ণিত হয়েছে তা দাওয়াতী বিষয়ের সাথে পুরোপুরি মিল রেখেই বর্ণিত হয়েছে। আর ঘটনার মিলটাও আল-কুরআনের অন্যতম লক্ষ্য। সবসময়ই এমন হয়। কিন্তু ঘটনার শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ তা থেকে প্রভাবিত হতে দেখেন না।

একই ঘটনার বিভিন্ন অংশ বার বার উপস্থাপনের জন্য গোছাপন একটি নীতিমালাও আছে। যে ক্রমানুসারেন আল-কুরআনের সূরা অবতীর্ণ হয়েছে সেই ক্রমানুসারে সূরাগুলো এবং ঘটনার অংশগুলো মিলিয়ে পড়লেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। অধিকাংশ সূত্রপাত হয়েছে সামান্য ইঙ্গিত দিয়ে। পরে পর্যাক্রমে তা পূর্ণত্বের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যেখানে বর্ণনা শেষ করা হয়েছে সেখানে পাঠক পৌঁছলেই পুরো চিত্রটি তার সামনে ভেসে উঠে।

উদাহরণ স্বরূপ আমরা হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা বলতে পারি। কেননা আল-কুরআনে যে সমস্ত ঘটনা বার বার বলা হয়েছে তার মধ্যে এ ঘটনাটি অত্যাধিকবার বর্ণিত হয়েছে। তার সংখ্যা প্রায় ত্রিশের মতো হবে। আমরা তার মধ্যে উল্লেকযোগ্য কয়েকটি স্থান নিয়ে আলোচনা করবো এবং সে স্থানগুলোও চিহ্নিত করবো যেখানে শুধুমাত্র মূসা (আ)-এর ঘটনার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে কিন্তু বিস্তারিত কিছু বর্ণনা করা হয়নি। আমরা সূরাসমূহ অবতীর্ণের ক্রমানুসারে তার আলোচনা করবো।

[১.১] সূরা আল-আ’লা যার অবস্থান অবীর্ণের ক্রমানুসারে ৮ম। সেখানে মূসা (আ)-এর ঘটনার সামান্য ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে: (আরবী***********)]

এটি লিীখত আছে পূর্ববর্তী কিতাবসূহে, ইবরাহীম ও মূসার কিতাবে।

এরূপ সম্মিলিত ইঙ্গিত সূরা আন-নাজমেও দেয়া হয়েছে এবং তা অবতীর্ণর দিক দিয়ে ২৩তম সূরা।

[১.২] সূরা আল-ফজর, অবতীর্ণের ক্রমানুসারে ১০ম সূরা। এখানে ফিরাউনের কথা বর্ণিত হয়েছে কিন্তু মূসা (আ)-এর কথা নয়। অবশ্যই আ’দ ও সামুদ জাতির কথাও বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

এবং বহু কীলকের অধিপতি ফিরাউনের সাথে। যারা দেশে সীমালংঘন করেছিল, ফলে সেখানে সাংঘাতিক অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল্ অতপর তোমার রব্ব তাদেরকে শাস্তির কষাঘাত করলেন।

এ ধরনের ইঙ্গিতসূচক বর্ণনা সূরা আল-বুরুজেও করা হয়েছে। যার অবতীর্ণের ক্রমধারা সাতাইশ।

[১.৩] সূরা আল-আ’রাফ, অবতীর্ণের ক্রমধারা ঊনচল্লিশ। এ সূরায় বেশ কিছু নবী-রাসূলদের আলোচনা এসেছে, তার মধ্যে মূসা (আ)-এর ঘটনাটিও মোটামুটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেসব নবীদের কথা বর্ণিত হয়েছে, যারা তাদের জাতির কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং সবাই নিজেদের নবীকে মিথ্যেবাদী বলেছে এবং পরিণতিতে তারা আল্লাহর আযাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।

সূরা আল-আ’রাফে ঘটনার শুরু হয়েছে হযরত মূসা ও হারুন (আ)-কে নবী করে ফিরাউনের কাছে পাঠানোর প্রসঙ্গ নিয়ে। তারপর লাঠি ও হাত উজ্জ্বল হওয়ার মুজিযা সম্পর্কে বলা হয়েছে। তাপর যাদুকরদের জমায়েত ও মূসা (আ)-এর বিরুদ্ধে যাদু প্রদর্শন। মূসা (আ) তাদের মুকাবিলায় বিজয় লাভ করা, যাদুকরদের ঈমান গ্রহণ, তারপর ফিরাউন কর্তৃক বনী ইসরাঈলকে নির্যাতনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে, ফিরাউন ও তার সম্প্রদায়কে কি কি মুসিবত দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে টিড্ডি, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা ছিল অন্যতম। প্রতিবারই হযরত মূসা (আ)-কে দিয়ে দো’আ করিয়ে পরিত্রাণ লাভ। পুনরায় আবার বনী ইসরাঈলের প্রতি নির্যাতন, তারপর মূসা (আ)- এর নেতৃত্বে বনী ইসরাঈলের মিসর ত্যাগ। তারপর তারা মূসা (আ)-কে বললো: মিসরীয়দের যেমন অনেক মাবুদ তদ্রূপ আমাদেরও থাকা উচিত। অতপর মূসা (আ)-এর তুর পাহাড়ে গমন ত্রিশরাত পর আল্লাহ তা’আলার সাক্ষাত লাভ এবং মেয়াদ বাড়িয়ে চল্লিশ রাত করা এবং চল্লিশ রাত অতিহাহিত হওয়া, আল্লাহর দর্শনের জন্য হযরত মূসা (আ)-এর আবেদন, পাহাড় খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া, মূসা (আ)-এর বেহুশ হওয়া, তারপর জ্ঞান ফিরে পাওয়া। নিজের সম্প্রদায়ের কাছে এসে দেখেন তারা গো-শাবক বানিয়ে তার পূজা করছে, ভাইকে ভর্ৎসনা, পুনরায় আল্লাহর দর্শনের জন্য ৭০ জনের পরীক্ষা, যখন তারা তূর প্রান্তরে আল্লাহর দীদারের জন্য পীড়াপীড়ি করলো তখন তূর পাহাড়কে তাদের ওপর তুলে ধরা। তারপর তাদেরকে আল্লাহর রহমত দানে ধন্য করা হলো এবং বলে দেয়া হলো, আল্লাহর রহমত তারাই পাবে যারা নবীর আনুগত্য করে।

[১.৪] তারপর অবতীর্ণের ক্রমানুসারে ৪২তম সূরা, সূরা আল-ফুরকান ও ৪৪তম সূরা, সূরা মারইয়ামে সম্মিলিত কিছু ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সে ঘটনাবলীতে নবীদের রিসালাত ও তাদেরকে যারা মিথ্যেবাদী বলেছৈ তাদের পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

[১.৫] অবতীর্ণের ক্রমধারায় ৪৫তম সূরা, সূরা ত্বা-হা’র মধ্যেও মোটামুটি বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। সূরা আ’রাফে হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা শুরু হয়েছিল নবুওয়াত ও রিসালাতের কথা বলে। অর্থাৎ সে ঘটনাটি ছিল নবুওয়াতের পরের আর সূরা ত্বা-হা’য় নবুওয়াতের পূর্বের ঘটনা দিয়ে শুরু করা হয়েছে। তূর পাহাড়ের প্রান্তহ থেকে আলো প্রদর্শনের কথা দিয়ে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী***********)

তোমার কাছে মূসার বৃত্তান্ত পৌঁছে কি? সে যখন আগুন দেখলো, তখন পরিবারবর্গকে বললো: তোমরা এখানে অবস্থান করো, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবত আমি তা থেকে তোমাদের কাঝে কিছু আগুন জ্বালিয়ে আনতে পারবো অথবা আগুনে পৌঁছে পথের সন্ধান পাব। অতপর যখন সে আগুনের কাছে পৌঁছল তখন আওয়াজ এলো, হে মূসা! আমিই তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি জুতো খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তুয়ায় অবস্থাণ করছ। আমি তোমাকে মনোনীত করেছি, কাজেই যে প্রত্যাদেশ হয় শুনতে থাক। (সূরা ত্বা-হা: ৯-১৩)

হযরত মূসা (আ) ফিরাউনকে দাওয়াত দেয়ার জন্য আদিষ্ট হলেন তখন তিনি আল্লার নিকট ফরিয়াদ করলেন- আমার ভাই হারুনকে আমার সহযোগী করে দিন যেন সে আমার জন্য সাহস ও শক্তির কারণ হয়। আল্লাহর হযরত মূসা (আ)-কে যে নিয়ামত দিয়েছেন এবং তাঁর ওপর যে দয়া করেছেন তার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। শৈশবের ঘটনা এবং তা৭র মা’কে তার কাছে প্রত্যাবর্তন করানোর ঘটনা। পরবর্তী ঘটনা বর্ণিত হয়েছে সূরা আল-আ’রাফের মতো। তবে টিড্ডি, উকুন, ব্যাঙ এবং রক্তের শাস্তির কথা বাদ দেয়া হয়েছে। তেমনিভাবে ফিরাউন কর্তৃক বনী ইসরাঈলকে দেয়া প্রিতিশ্রুতি এবং তা ভঙ্গের ঘটনাও বিবৃত করা হয়নি। তকেবসূরা ত্বা-হা’য় অন্য একটি ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে। তা হচ্ছে- সামেরী নামে এক ব্যক্তি যে বাছুর তৈরী করেছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা।

[১.৬] সূরা শু’আরা অবতীর্ণক্রম অনুযায়ী ৪৬তম সূরা। এ সূরায়ও হযরত মূসা (আ)-এর রিসালাতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তারপর বনী ইসরাঈলের মিসর ত্যাগের ঘটনা বলা হয়েছে। তবে এ সূরায় দুটো কথা নতুন বলা হয়েছে।

এক: মূসা (আ) এক কিবতীকে হত্যা করেছিলেন। তারপর তিনি ধরা পড়ার ভয়ে মিসর ত্যাগ করেন। যখন পুনরায় ফিরাউনের কাছে তাকে পাঠানো হয় তখন ফিরাউন মূসা (আ)কে শৈশবে প্রতিপালনের কথা এবং কিবতীকে হত্যা করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

দুই : সমুদ্র দু’ভাগে ভাগ হয়ে তলদেশে রাস্তা হয়ে যাওয়া এবং মূসা (আ) ও ফিরাউনের বিতর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। মূসা (আ) কর্তৃক আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনা এবং যাদুকরদের সাথে যে কথোপকথন হয়েছিল তা নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনা।

[১.৭] অবতীর্ণক্রমে ৪৮তম সূরা, সূরা আন-নামল। এ সূরায় নবী রাসূলদেকে মিথ্যাবদী বলা এবং যারা বলেছৈ তাদের পরিণতি সম্পর্কে কিছু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

[১.৮] সূরা আল-কাসাস, অবতীর্ণের ক্রমানুসারে ৪৯তম সূরা। এখানে হযরত মূসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত থেকে শুরু করা হয়েছে। ফিরাউনের দোর্দণ্ড প্রতাপের সময় মূসা (আ)-এর জন্ম, সিন্দুকে ভরে নদীতে নবজাতককে ভাসিয়ে দেয়া, ফিরাউনের ঘনিষ্ঠজন কর্তৃক সেই সিন্দুক উত্তোলন, মূসা (আ)-এর বোনের সংবাদ সংগ্রহ, তারপর ফিরাউনেকে ধাত্রী মায়ের সন্ধান দেয়া, যার বদৌলতে মূসা (আ) মায়ের কাছে প্রতিপালিত হবার সুযোগ লাভ করেন।

হযরত মূসা (আ) যৌবনে পদার্পণ করে একদিন এক মিসরীকে হত্যা করেন। আরেকজনকে হত্যা করতে চাইলে আগের হত্যার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে হুমকি দেয়া, এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে তাকে সংবাদ দেয়া যে, শহরে আপনার হত্যাকাণ্ডের কথা ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি মিসর থেকে মাদইয়ানের দিকে পাড়ি জমান। সেখানে শু’আইব(আ)-এর মেয়ের সাথে পরিচয় এবং তাঁর ছাগলকে পানি পান করানো, তাদের বাড়িতে ফিরে পিতাকে ঘটনা খুলে বলা, মূসা (আ) নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত শু’আইব (আ)-এর কাছে চাকুরী করা। তার শর্ত সাপেক্ষে তার কন্যার সাথে মূসা (আ)-এর বিয়ে এবং নিজের পরিবার নিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন, পথিমধ্যে আগুনের সন্ধানে গিযে (এ সম্পর্কে সূরা ত্বা-হা’য় বলা হয়েছে) নবুওয়াত লাভ।

অবশ্যই সূরা আল-কাসাসে নতুন একটি দিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তা হচ্ছে ফিরাউনকে দাওয়াত দেয়ার পর তার হাসি-তামাশামূলক প্রতিক্রিয়া:

(আরবী***********)

ফিরাউন বললো: হে হামান! তুমি ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো যেন আমি মূসার প্রতিপালককে উঁকি মেরে দেখতে পারি। (সূরা আল-কাসাস: ৩৮)

[১.৯] সূরা আসরা (বনী ইসরাঈল) অবতীর্ণক্রম পঞ্চাশ। এখানে ফিরাউনের সলিল সমাধি এবং বনী ইসরাঈলের সমুদ্র পার হওয়া সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত করা হয়েছে।

[১.১০] সূরা ইউনুস, অবতীর্ণক্রম একান্ন। এখানে নবী-রাসূলদেরকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করার পরিণাম করা হয়েছে। তার মধ্যে হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনাটিও সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে যাদুকরদের কথা, বনী ইসরাঈলের সমুদ্র পারাপার এবং ফিরাউনেসর নিমজ্জিত হওয়ারও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারপর নিম্নোক্ত কথাটি অতিরিক্ত সংযোগ করা হয়েছে। যা আর কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।

(আরবী***********)

যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করলো তখন বললো: এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি কোন ইলাহ নেই তাকে ছাড়া যার ওপর বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। বস্তুত আমিও তাঁর অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। এখন একথা বলছ! অথচ তুমি ইতোপূর্বে নাফরমানি করছিলে! এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত চিলে। অতএব আজকে আমি তোমার দেহকে সংরক্ষণ করবো যা তোমার পশ্চাদযাত্রীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। (সূরা ইউনুস: ৯০-৯২)

[১.১১] সূরা হুদ, অবতীর্ণক্রম বায়ান্ন। এ সূরায় মিথ্যেবাদীদের ধ্বংসের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে মূসা (আ)-এ ঘটনাও বর্ণনা করা হয়েছে।

[১.১২] সূরা আল-মু’মিন, অবতীর্ণক্রম ষাট। এ সূরায়ও হযরত মূসা (আ) এবং ফিরাউনের মধ্যকার কথোপকথনের উল্লেখ আছে। তবে নিচের কথাটি অতিরিক্ত বলা হয়েছে। যা আর কোথাও বলা হয়নি।

(আরবী***********)

(বিতর্কের এক পর্যায়ে) ফিরাউন বললো: আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসাকে হত্যা করবো, সে তার প্রতিপালককে ডাকুক। (সূরা মুমিন: ২৬)

তারপর ফিরাউনের এমন এক সভাসদদের কথা বলা হয়েছে যে ঈমান এনেছিল ঠিকই কিন্তু সে তা গোপন করে রেখেছিল্ সে লোকদেরকে বললো: মূসা (আ)-কে হত্যা করো না, হতে পারে তার রাস্তাই সঠিক। এ কথাটিও শুধুমাত্র এ সূরায়ই বর্ণিত হয়েছে।

[১.১৩] সূরা ফুস্‌সিলাতে (সূরা হা-মীম আস-সিজদা) অবতীর্ণক্রম একষট্টি হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনার সামান্য ইঙ্গিত করা হয়েছে। তদ্রূপ সূরা যুখরুফেও (অবতীর্ণক্রম তেষট্টি) এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত আলোচনা এসেছে। তবে সেখানে নিম্নোক্ত কথা কয়টি অতিরিক্ত বলা হয়েছে যা আর কোথাও বলা হয়নি একমাত্র সূরা যুখরুফ ছাড়া। ফিরাউন বললো:

(আরবী*********)

আমি মিসরের অধিপতি নই? এ নদীগুলো আমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় তোমরা কি দেখ না? আমি শ্রেষ্ঠ এ ব্যক্তি থেকে, যে নিচ এবং ভাল করে কথা বলতেও সক্ষম নয়। (সূরা আয-যুখরুফ: ৫১-৫২)

[১.১৪] সূরা আয-যারিয়াতে (অবতীর্ণক্রম সাতষট্টি) হযরত মূসা (আ)-কে ফিরাউনের কাছে রাসুল হিসেবে প্রেরণ, ফিরাউন কর্তৃক তাঁকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করা এবং ফিরাউনের ধ্বংস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।

[১.১৫] সূরা আল-কাহাফে (অবতীর্ণক্রমে ঊনসত্তর) বর্ণিত হয়েছে, হযরত মুসা (আ) এমন এক ব্যক্তির সাক্ষাত এবং সাহচর্য পেয়েছিলেন, যাকে আল্লাহ বিশেষ ইলম দান করেছিলেন। মূসা (আ) তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁকে যেন তাঁর সাহচর্যে রেখে একটু উপকৃত হবার সুযোগ দেন। তিনি উত্তর দিলেন, আপনি ধৈর্যের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হবেন। মূসা (আ) ধৈর্য ও স্থৈর্যের ওয়াদা করে তাঁর সঙ্গ নিলেন কিন্তু বেশিদিন ধৈর্যধরে তার সঙ্গে থাকতে পারলেন না। কারণ তিনি এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হতে দেখলেন যার সঠিক তাৎপর্য তিনি অনুধাবন করতে পারলেন না। ফলে দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ অবধারিত হয়ে গেল। আল-কুরআনে এ ঘটনাটি শুধুমাত্র এক জায়গায়ই বর্ণিত হয়েছে।

[১.১৬] সূরা ইবরাহী (অবতীর্ণ বাহাত্তর) ও সূরা আল-আম্বিয়া (অবতীর্ণ তিয়াত্তর) নামক সূরা দুটোতে মাদ্র দু’ জায়গায় এ ঘটনার ইঙ্গিত করা হয়েছে। দ্বিতীয সূরায় ইঙ্গিতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সেখানে তাওরাতকে ‘ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) বলা হয়েছে।

[১.১৭] সূরা আল-বাকারা (অবতীর্ণক্রম সাতাশি) বনী ইসরাঈলের ওপর প্রদত্ত আল্লাহর নিয়মতসমূহ এবং তাঁর অবজ্ঞা প্রদর্শন সংক্রান্ত আলোচনা পেশ করা হয়েছে। সেখানে মোটামুটি বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়ে। এ সূরায় মূসা (আ)-এর ঘটনা একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছ। একপর্যায়ে তাদেরকে যে ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’ প্রদান করা হয়েছিল এবং বনী ইসরাঈল তার বিনিময়ে অন্য খাদ্য সামগ্রী চেয়েছিল তার কথাও এসেছে। আবার অন্য জায়গায় গাভী যবেহ করার ঘটনা বিবৃত হয়েছে। সোজা নির্দেশ ছিল একটি গাভী যবেহ করার কিন্তু তারা তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে জটিল করে ছাড়ল। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

(আরবী**********) অতপর তারা সেটি যবেহ করলো অথচ যবেহ করবে বলে মনে হচ্ছিল না। (সূরা আল-বাকারা: ৭১)

গাভী যবেহ করার ঘটনাটি এ সূরায় সম্পূর্ণ নতুন, যা ইতোপূর্বে কোন সূরায় বর্ণিত হয়নি।

[১.১৮] সূরা আন-নিসা (অবতীর্ণক্রম বিরানব্বই) বলা হয়েছে, বনী ইসরাঈল বিনা অন্তরালে আল্লাহকে দেখার জন্য গো ধরেছিল।

[১.১৯] সূরা আল-মায়িদা (অবতীর্ণক্রম একশ’ বার) বনী ইসরাঈলের ঘটনা বর্ণনা করদে গিয়ে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

তারা বললো: হে মূসা! সেখানে একটি প্রবল পরাক্রান্ত জাতির রয়েছে। আমরা কখনো সেখানে যাব না, যে পর্যন্ত না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। তারা যদি সেখান থেকে বের হয়ে যায় তবে অবশ্যই আমরা সেখানে প্রবেশ করবো। (সূরা আল-মায়িদা: ২২)

একটু অগ্রসর হয়ে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

তারা বললো: হে মূসা! আমরা জীবনে কখনো সেখানে যাব না, যতোক্ষণ তারা সেখানে থাকবে। অতএব, তুমি ও তোমার প্রতিপালক সেখানে যাও এবং যুদ্ধ করো। আমরা এখানেই বসলাম। মূসা বললো: হে আমার পালনকর্তা! আমি শুধু নিজের ওপর ও ভাইয়ের ওপর ক্ষমতা রাখি। কাজেই আল্লাহ বললেন: এ দেশ তাদের জন্য চল্লিশ বছর পর্যন্ত হারাম করে দেয়া হলো। তারা ভূপৃষ্ঠে উদ্ভ্রান্তের মতো ফিরবে। অতএব, তুমি অবাধ্য সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করো না।

তারপর তাদেরকে এক মরুপ্রান্তরে ছেড়ে দেয়া হয় এবং সেখানেই তাদের বসতি গড়ে উঠে। এরপর মূসা (আ) ও বনী ইসরাঈল সম্পর্কে আর কিছু বলা হয়নি। অবশ্য বনী ইসরাঈল ঈসা (আ)-এর সাথে শত্রুতা পোষণ করতো সে কথা বলা হয়েছে।

একমাত্র হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনাটিই আল-কুরআনে সর্বাধিক বর্ণিত হয়েছে। ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, পুনরাবৃত্তির ধরনটি কেমন। ছয় জায়গায় ছাড়া আর সবগুলো জায়গায় খুব সংক্ষেপে কিংবা শুধুমাত্র ইঙ্গিতে ঘটনা বিবৃত করা হয়েছে। তবে সে সমস্ত জায়গায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে সেখানে কোন না কোন নতুন বক্তব্য অবশ্যই বলা হয়েছে। এখন যদি কোন পাঠক কুরআন পাঠ করার সময় ঘটনার নতুনত্ব খুঁজে না পান তবে তাতে আল-কুরআনের দোষ কী?

২. আল-কুরআনের ঘটনাগুলো দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে- যেখানে যতোটুকু ঘটনা (পুনরাবৃত্তি ছাড়া) বর্ণিত হয়েছে সেখানে ঠিক ততোটুকু উদ্দেশ্য পূরণে যথেষ্ট। শুধু সেই অংশেরই বর্ণনা করা হয়েছে বিষয়বস্তুর সাথে যা সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন কখনো ঘটনার প্রথম অংশ আলোচনা করা হয়েছে আবার কোথাও ঘটনার শেষাংশ আলোচনা করা হয়েছে আবার কখনো শুধু ততোটুকু আলোচনা করা হয়েছে যতোটুকু শিক্ষা ও উপদেশের সাথে সংশ্লিষ্ট। কারণ ইতিহাস বর্ণনা করা কুরআনের উদ্দেশ্য নয় উদ্দেশ্য হচ্ছে ইতিহাসের আলোকে শিক্ষা প্রদান করা। কতিপয় উদাহরণ উল্লেখ করা হলো-

[২.১] অনেক সময় কোন ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে দেখা গেছে ঘটনার নায়কের জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে। কারণ সে জন্ম বৃত্তান্তের মধ্যে শিক্ষনীয় অনেক ঘটনা বিদ্যমান থাকে। যেমন- হযরত আদম (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত। হযরত আদম (আ)-এর জন্মের ঘটনাটিতে আল্লাহর কুদরত এবং দয়া-অনুগ্রহের পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। সাথে সাথে ইবলিসের যে ঘটনা বলা হয়েছে তার পেছনেও দ্বীনি উদ্দেশ্য নিহিত আছে।

তেমনিভাবে হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্তের কথা উল্লেখ করা যায়। এ ঘটনাটি কুরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ ঈসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা, যা এক বিরাট মুজিযা। তাঁর জন্ম বৃত্তান্ত এমন ছিল, যা সমস্ত যুক্তি-তর্কের বিপরীত। ইসলাম প্রকাশ হওয়ার আগে এবং পরে ঈসা (আ) সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক সমস্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আবার হযরত মারইয়াম (আ)-এর ঘটনাটিও উল্লেখযোগ্য। তাকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল। হযরত মারইয়াম (আ) হযরত জাকারিয়া (আ)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন, শৈশবেই তিনি আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম রিযিক পেতেন। একবার তিনি দেখতে পেলেন মারইয়াম (আ)-এর নিকট অনেক ফল-মূল। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

যখনই জাকারিয়া মিহরাবে প্রবেশ করতেন তখনই তার কাছে খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেতেন। একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে মারইয়াম! তুমি এগুলো কোথায় পেলে? সে উত্তর দিলো: এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন। (সূরা আলে ইমরান: ৩৭)

এ ঘটনার সবটুকু তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্তের কথাও এসেছে। হযরত ঈসা (আ)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশের বর্ণনা এখানে করা হয়েছে। এমনিভাবে হযরত মূসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্তও আল-কুরআনে বলা হয়েছে। তার কয়েকটি দিক ও কারণ আছে-

ক. হযরত মূসা (আ)-এ জন্ম ঐ সময়ে হয়েছিল, যখন ফিরাউন বনী ইসরাঈলের ওপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছিল।

খ. ফিরাউন বনী ইসরাঈলের কোন পুত্র সন্তানকে জীবিত রাখত না।

গ. আল্লাহ তা’আলা অলৌকিকভাবে মূসা (আ)-কে বাঁচিয়ে দিলেন এবং ফিরাউনের ঘরে প্রতিপালনের ব্যবস্থা করলেন।

উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে বুঝা যায় মূসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে। আল্লাহ দেখিয়ে দিলেন, যাকে নবুওয়াতের জন্য সৃষ্টি করা হলো তাকে সে লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়া হলো। কেউ কোন ক্ষতি করতে পারলো না। জন্ম বৃত্তান্ত ছাড়াও জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার হযরত ইসমাঈল (আ) ও হযরত ইসহাক (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্তও কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ তাদের জন্মের সাথেও নসীহত ও শিক্ষা জড়িয়ে আছে। হযরত ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম ঐ সময় হয়েছিল যখন হযরত ইবরাহীম (আ) বুড়ো হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর সহায়তায় তিনি কা’বা ঘর নির্মাণ করেছেন। বার্ধক্য যখন পূর্ণ মাত্রায় প্রতিফলিত তখন হযরত ইসহাক (আ)-এর জন্ম। তেমনিভাবে হযরত ইয়াহ্‌ইয়া (আ)-এর জন্মও হয়েছিল হযরত জাকারিয়া (আ)-এর বৃদ্ধ বয়সে। তখন তার চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল।

[২.২] আমরা কুরআনে এমন কিছু ঘটনাও পাই যেখানে জন্মের পরের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। জন্ম বৃত্তান্ত বলা হয়নি। যেমন হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা। যার শুরু হয়েছে শৈশবের ঘটনা দিয়ে। তিনি শৈশবে এমন এক স্বপ্ন দেখলেন যা অবশিষ্ট জীবনের প্রতিচ্ছবি। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, এগারোটি তারা, চাঁদ ও সুরুজ। বিজ্ঞ পিতা এ স্বপ্নের মর্মার্থ বুঝে ফেললেন এবং তাকে আগের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখাশুনা করতে লাগলেন। তার ভাইয়েরা হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরতে লাগলো। তারপর ঘটনা আপন গতিতে চললো।

হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঘটনাও শৈশব থেকে শুরু হয়েছে।

শৈশবে একদিন তিনি আকাশের দিকে চেয়ে এক তারকা দেখে মনে করলেন হয়তো এটিই তাঁর প্রতিপালক। যখন তা ডুবে গেল তখন বললেন- যা ডুবে যায় তা আমি পসন্দ করি না। চন্দ্র উদিত হলো তখন মনে করলেন এটি অনেক বড় কাজেই এটিই আমার প্রতিপিালক। রাত্রি শেষে যখন চাঁদ অস্তমিত হয়ে গেল এবং গোটা পৃথিবী আলোকি করে সূর্য উদিত হলো, তখন তিনি বললেন: এটি যখন সবচেয়ে বড় এবং উজ্জ্বল কাজেই এটি ইলাহ না হয়ে যায় না। কিন্তু দিবাবসানে যখন সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল তখন তিনি প্রকৃত আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন। যাকে দেখা যায় না শুধু অনুভব করা যায়। তারপর তিনি নিজের কাওম ও পিতাকে সেই ইলাহর দিকে আহ্বান জানালেন কিন্তু তারা সে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলো।

হযরত ইবরহীম (আ) একদিন তাদের অসতর্কতার সুযোগে তাদের পূজা মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে দিলেন। লোকজন বললো: এ কাজ ইবরাহীম নামক যুবক ছাড়া আর কেউ করেনি। তখন তারা তাঁকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে দিলেন। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

আমি নির্দেশ দিলা, হে আগুন তুমি ঠাণ্ডা হয়ে যাও, যে রূপ ঠাণ্ডা ইবরহীমের জন্য উপযোগী হয়। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)

হযরত দাঊদ (আ)-এর ঘটনাও তাঁর শৈশব থেকে শুরু করা হয়েছে। তিনি প্রসিদ্ধ হয়েছিল জালুত নামক এক অত্যাচারী বাদশাহকে হত্যা করে। যা ছিল সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কুদরত। ব্যস! এভাবেই হযরত দাঊদ (আ)-এর ঘটনা শুরু করা হয়েছে। হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে তার যৌবনকাল থেকে। যখন তাঁর পিতা দাঊদ (আ)-এর এক ফয়সালার মুকাবিলায় তিনি নতুন ফয়সালা দিয়েছিলেন। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

যখন তাতে কিছু মেঘ ঢুকে পড়েছিল, তাদের বিচার আমার সামনে ছিল। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৮)

[২.৩] কুরআনে কারীমে এমন কিছু ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যেখানে শুধুমাত্র শেষ কিস্তি বর্ণিত হয়েছে। যেমন- হযরত নূহ (আ), হযরত হূদ (আ), হযরত সালেহ (আ), হযরত লূত (আ), হযরত শু’আইব (আ) প্রমুখ আম্বিয়ায়ে কিরাম। এদের ব্যাপারে উল্লেখিত অংশের বাইরে অতিরিক্ত আর কোন আলোচনা করা হয়নি। কারণ তাদের ঘটনার সেই অংশটুকুই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার মধ্যেই শিক্ষা ও উপদেশ নিহিত।

কাহিনীর সংক্ষেপ ও বিস্তৃতি

এতোক্ষণ আমরা যা আলোচনা করলাম, সে কাহিনী কোথা থেকে শুরু করা হয়েছে সে সম্পর্কে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন আমরা আলোচনা করবো, আল-কুরআনের অনেক ঘটনা দীর্ঘ ও বিস্তারিত এবঙ অনেক ঘটনা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার শিক্ষণীয় দিকটি কী পরিমাণ বিস্তৃত। নিচে আমরা তার কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।

১. হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এজন্য আল-কুরআনে তা আদ্রপ্রান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। কাহিনীর শুরু মূসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত দিয়ে এবং শেষ পবিত্র ভূমির কাছে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসাসের মাধ্যমে। সেখানে তাঁর জাতি চল্লিশ বৎসর অস্থান করার নির্দেশপ্রাপ্ত হয়। যা ছিল বনী ইসরাঈলের বাড়াবাড়ির প্রতিফল। এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে এজন্য বলা হয়েছে যে, তার প্রতিটি অংশেই দ্বীনি শিক্ষা ও উপদেশের প্রকাশ ঘটেছে। উপরন্তু তা কুরআনী দাওয়াত এবং উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

ঈসা (আ)-এর ঘটনাটিও বিস্তারিত, তবে মাঝের কিছু অংশ সংক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁর জন্ম বৃত্তান্ত ও মুজিযাসমূহ বিস্তারিত বলা হয়েছে, হাওয়ারীগণ কর্তৃক সহযোগিতা এবং ইহুদী কর্কৃত তাঁকে মিথ্যেবাদী আখ্যায়িত করে শূলে চড়ানোর প্রচেষ্টা, তারপর আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া। তাঁকে উঠিয়ে নেয়ার পর বনী ইসরাঈলের দলাদলি ও বিচ্ছিন্নতার ঘটনাও কুরআন বর্ণনা করেছে। কুরআনে একথাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন ঈসা (আ)-কে জিজ্ঞেস করা হবে কেন তাঁকে ও মারইয়ামকে আল্লাহর সমকক্ষ বানান হয়েছে? হযরত ঈসা (আ) উত্তর দেবেন:

আমিতো তাদেরকে নির্ভেজার তওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলাম। তারপর গোটা জাতিকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে বলবেন: আপনি ইচ্ছে করলে তাদের মাফ করে দিন কিংবা শাস্তি দিন।

হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা একই সাথে ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। ভাইদের ষড়যন্ত্র, মিসরে তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি, মিসরের গভর্ণর আজীজের হস্তগত হওয়া, তার স্ত্রী কর্তৃক ফুসলানো, কারাগারের অসহনীয় যন্ত্রণা, দু’ কয়েদীর স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান, বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান এবং কারাগার থেকে মুক্তি লাভ, মিসরের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন, ভাইদের মিসরে আগমন, বিন ইয়ামিনের সাথে হযরত ইউসুফ (আ)-এর সাক্ষাত, বিন ইয়ামিনকে আটক করে পিতা-মাতাকে মিসরে হাজির করা এবং মিসরে সপরিবারে বসবাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের করার পর কাহিনীর যবনিকা। এ ঘটনা বর্ণনার পেছনে দু’টো উদ্দেশ্য আছে- এক: ওহী ও রিসালাতের স্বীকৃতি। দুই: গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষা।

হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঘটনা শুরু করা হয়েছে শৈশবে তাঁর ঈমান গ্রহণের ঘটনা দিয়ে। তারপর পিতা ও জাতির সাথে বিতর্ক, মূর্তি ভাঙ্গা, দেশান্তর, ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্ম, স্বপ্নে পুত্র কুরবানীর নির্দেশ প্রাপ্তি, কা’বা ঘর নির্মাণ এবং হজ্জ অনুষ্ঠানের ঘোষণা প্রদান, অন্তরের প্রশান্তির জন্য আল্লাহর কাছে মৃত ও জীবন দানের ঘটনা প্রত্যক্ষের আবেদন, আল্লাহর নির্দেশে চারটি পাখী যবেহ করে তাদের গোশতগুলো মিলিয়ে রাখার পর সেসব পাখীদের জীবিত হওয়া।

হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনাও বিস্তারিতভাবে কুরআনে বলা হয়েছে। ক্ষেত সংক্রান্ত ফয়সালা, সাম্রাজ্য পরিচালনা, উত্তম ঘোড়ার মাধ্যমে পরীক্ষা, জ্বিন ও বাতাসে তাঁর অধীনস্ত করে দেয়া, হুদহুদ, পিপিলিতা ও রাণী বিলকিসের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনাসমূহ, সর্বশেষ মৃত্যুর পর লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং এ ব্যাপারে জ্বিনদের বেখবর থাকার ঘটনা বর্ননা করে কাহিনীর ইতি টানা হয়েছে। গোটা কাহিনী গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশে ভরপুর।

২. আল-কুরআনের কিছু ঘটনা এমন, যা জীবনের একটি অংশের তৎপরতার সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- হযরত নূহ (আ)-এর ঘটনা। শুধুমাত্র নবুওয়াত ও রিসালাতের বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দ্বীনের দাওয়াত প্রদান, জাতির কর্তৃক প্রত্যাখ্যান, নৌকা তৈরী, প্লাবন, নূহ (আ) এর ছেলের সলিল সমাধি (আমলে সালেহ ছাড়া নবী তনয়ও আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পায়নি)। এমনিভাবে হযরত আদম (আ)-এর সৃষ্টি, জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠান, তওবা কবুল ইত্যাদি ঘটনা বিবৃত হয়েছে। আবার মারইয়াম (আ) ও ঈসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্তও বলা হয়েছে। তবে এ ঘটনাগুলো পূর্বে বর্ণিত ঘটনাগুলো পূর্বে বর্ণিত ঘটনাগুলোর মতো বিস্তারিত নয়। তবু একে বিস্তারিত ঘটনা বলা চলে। হযরত দাঊদ (আ)-এর ঘটনাও মোটামুটি উল্লেখযোগ্য। তবে তা হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনার মতো এতো বিস্তারিত নয়। তবু হযরত দাঊদ (আ)-এর ঘটনাটি বেশ কয়েকটি অংশে বর্ণিত হয়েছে।

৩. আল-কুরআনের কিছু ঘটনাকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেমন- হযরদ হুদ (আ), হযরত সালেহ (আ), হযরত লুত (আ), হযরত শু’আেইব (আ) প্রমুখ নবীদের ঘটনা। শুধামাত্র রিসালাত ও নবুওয়াত সংক্রান্ত ঘটনাবলী সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম, কুরবানী এবং পিতা-পুত্র মিলে কা’বা ঘর তৈরীর কথা সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। হযরত ইয়াকুব (আ)-এর কিচু বর্ণনা এসেছে হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায়। তাছাড়া অন্যত্র ইয়াকুব (আ)-এর অন্তিম মুহূর্তের ওসীয়তের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ অংশটি এজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, এর মধ্যে তওহীদর কথা বিবৃত হয়েছে, যে কথা তিনি অন্তিম মুহুর্তে ওসীয়ত হিসেবে বলে গেছেন।

৪. কোন কোন ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। যেমন- হযরত জাকারিয়া (আ)-এর কাহিনী, ইয়াহইয়অ (আ)-এর জন্ম ও মারইয়অম (আ)-এর অভিভাকত্বের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। হযরত আইউব (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে রোগগ্রস্ত হওয়া, আল্লাহর দরবারে ধর্ণনা এবং পরিত্রাণ লাভ সংক্রান্ত অধ্যায়টুকু। হযরত ইউনুস (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে জাতিকে দাওয়াত দেয়োর পর জাতি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হতে দেশান্তর হওয়ার প্রচেষ্টা, আছে গিলে ফেলা, বিজন ভূমিতে মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ এবং তার জাতি কর্তৃক ইসলাম গ্রহণ পর্যন্ত অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ।

৫. কিছু কিছু ঘটনা বিস্তারিত না বলে শুধুমাত্র ইঙ্গিত দেয়াকে যথেস্ট মনে করা হয়েছে। যেমন- হযরত ইদ্রিস (আ), হযরত আল-ইসাআ’, যুলকিফল প্রমুখ। এরা নবীদের অন্তর্ভুক্ত শুধু এ কথার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।

৬. এমন কিচু কাহিনী বলা হয়েছে, যা পৃথক অন্য কোন ঘটনার সাথে সংশ্লিস্ট। যেমন- আসহাবে উখদুদ, আসহাবে কাহ্‌ফ, আদম (আ)-এর দু’ ছেলের ঘটনা, দুই বাগান মালিকের ঘটনা, বাগান মালিকদের ঘটনা ইত্যাদি। এর মধ্যে কিছু ঘটনার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে এবং সামনেও কিছু ঘটনার আলোচনা করা হবে। এখন আমরা এখানেই প্রসঙ্গ শেষ করতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু একথা বলা- আল কুরআন কোন ঘটনার শুধু ঐ অংশটুকুই আলোচনা করেছে যা দ্বীনি উদ্দেশ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। আমাদের সেই উদ্দেশ্র পূর্ণ হয়ে গেছে।

উপসংহার ও পরিণতি বর্ণনা

আল-কুরআন বর্ণিত কাহিনীগুলো দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে- ঘটনা বর্ণনার সাথেই কিছু দ্বীনি হেদায়েত এবং সেই কাহিনীর পরিণতিও বর্ণনা করা হয়েছে। তা কখনো কাহিনীর প্রথমে, কখনো শেষে বা কখনো মূল কাহিনীর সাথেই বর্ণিত হয়েছে।

শুরুতে শিক্ষণীয় ঘটনা বলে পরে কাহিনী শুরু করা হয়েছে। এমন দুটো উদাহরণ নিয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। অবশ্য তার দুটো দিক রয়েছে:

১. ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ওহী ও রিসালাতের প্রমাণ উপস্থাপন করা। অর্থাৎ বলে দেয়া হয়েছে, এ ঘটনা ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত। যেমন: হযরত ইউসুফ (আ) ও হযরত আদম (আ)-এর ঘটনাবলী। যেখানেই তা বলা হয়েছে সেখানে প্রথমে ওহীর স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

২. প্রথমে ঘটনার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, তারপর ঘটনার বর্ণনা করে তার সত্যতা প্রমাণ করা হয়েছে। যেমন:

(আরবী**********)

আমার বান্দরেদ জানিয়ে দাও, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দায়ালূ। আবার আার শাস্তি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। (সূরা আল-হিজর: ৪৯-৫০)

এ আয়াতে রহম ও আযাবের কথা বলে তারপর রহম ও আযাবের প্রমাণ স্বরূপ পুরো ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।

আবার ঘটনা বর্ণনা শেষে তার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হয়েছে এমন দুটো ঘটনাও আমরা উল্লেখ করেছি। তারও দুটো কারণ আছে:

১. সমস্ত ঘটনা ওহীর মাধ্যমে জানান হয়েছে একথার প্রমাণ করা এবং ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, স্বয়ং ঘটনাই সে কথার প্রমাণ দেয়। যেমন- সূরা আল-কাসাসে মূসা (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পর মূল বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। তেমনিভাবে সূরা হূদে হযরত নূহ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনার পর আসল বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

২. আল্লাহ (নাউযুবিল্লাহ) জালিম নন এবং কোন সম্প্রদায়ের কাছে নবী রাসূল না পাঠিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেননি এ কথার প্রমাণ করা। যেমন- সূরা আল-আনকাবুতে নবী-রাসূলদের কথা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

আমি প্রত্যেককেই তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে পেয়েছে বজ্রপাত, কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের ওপর জুলুমকারী ছিলেন না, কিন্‌তু তারা নিজেরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। (সূরা আল-আনকাবুত: ৪০)

সত্যি কথা বলতে কি, যে বক্তি কুরআনের এ কাহিনীগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে সেই এর রহস্য অনুধাবন করতে পারবে এবং বুঝতে সক্ষম হবে যে, কুরআন প্রত্যেকটি ঘটনার সাথেই তার পরিণতি ও শিক্ষা বর্ণনা করেছে।

এবার আমরা এমন কয়েকটি উদাহরণ বা ঘটনা আলোচনা করবো, যেখানে ঘটনা বলার সাথে সাথে শিক্ষণীয় দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

১. আল-কুরআনে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

(তুমি কি সে লোককে দেখনি?) যে এমন এক জনপদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যার বাড়ি-ঘরগুলো ভেঙ্গে ভিত্তির ওপর পড়েছিল। সে বললো: কেমন করে আল্লাহ মরণের পর একে জীবিত করবেন? তখন আল্লাহ তাকে একশ’ বছর মৃত অবস্থায় রাখলেন, তারপর তাকে উঠালেন। বললেন: তুমি কতোদিন এভাবে ছিলে? সে উত্তর দিলো: একদিন কিংবা তার চেয়ে কম সময়। আল্লাহ বললেন: ত নায়, তুমি একশ’ বছর মৃত ছিলে। এবার তোমার খাদ্র ও পানীয়ের দিকে চেয়ে দেখ, তা অবিকৃত আছে। গাধার দিকে চেয়ে দেখ- আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি- তার হাড়গুলো আমি কেমন করে জুড়ে দেই এবং সেগুলোর ওপর মাংসের আবরণ পরিয়ে দেই। যখন তা ঘটে গেল তখন সে বললো: আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বশক্তিমান। (সূরা বাকারা: ২৫৯)

দেখুন আল্লাহ তা’আলা ঘটনার মধ্রেই (*****)- “আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চাই” আয়াতটি দিয়ে উদ্দেশ্র ব্যক্ত করেছেন এবং ঘটনার শেষে (আরবী**********)-‘আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সকল বিষয়েই সর্বশক্তিমান” বলে প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।

২. হযরত সুলাইমান (আ) এবং রানী বিলকিসের ঘটনায় হুদহুদের কণ্ঠে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

আমি এক নারীকে সাবা জাতির ওপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার একটি বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখলাম, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের কাছে তাদের কাজকর্মকে আকর্ষণীয় করে দিয়েছে এবং তাদের সৎপথ থেকে নিবৃত্ত রেখেছে। কাজেই তারা সৎপথে নেই। তারা আল্লাহকে সিজদা করে না কেন, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর গোপন বিষয়ের খবর রাখেন এবঙ তোমরা যা প্রকাশ করো এবঙ গোপন রাখ তাও তিনি জানেন। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি বিশাল আরশের মালিক। (সূরা আন-নমল: ২৩-২৬)

ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে এ সমস্ত কথা হুদহুদের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ হুদহুদের কথা শুনে প্রভাবিত হয়ে যাবে।

৩. হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় হযরত ইউসুফ (আ) বাদশাহর দু’ অনুচরের স্বপ্নের ব্যাখ্যা পদান করেন, তখন তিনি বলেন:

(আরবী**********)

এ জ্ঞান আমার পালনকর্তা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি ঐসব লোকের ধর্ম পরিত্যাগ করেছি যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং পরকালের প্রতিও কোন বিশ্বাস রাখে না। (সূরা ইউসুফ: ৩৭)

(আরবী**********)

আমি আপন পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্মের অনুসরণ করছি। আমাদের জন্য শোভা পায় না কোন বস্তুকে আল্লাহর অংশীদার করি। এটি আমাদের প্রতি এবং অন্য সব লোকের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ লোক সে অনুগ্রহ স্বীকার করে না। (সূরা ইউসুফ: ৩৮)

মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, কাহিনী বর্ণনার সাথে সাথে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষামূলক উপদেশ বর্ণনা করা। তবে তা এমনভাবে কাহিনীর সাথে একাকার করে দেয়া হয়েছে, মনে হয় এ কথাগুলোও মূল কাহিনীর অংশ। কাহিনীর পাঠকগণ ঘটনার মধ্যে সর্বত্রই এ ধরনের বর্ণনা পেয়ে থাকেন।

দ্বিতীয কথা হচ্ছে, তার স্টাইল এ রকমই হোক কিংবা কিছুটা ব্যতিক্রম তাতে কিছু যায় আসে না কিন্তু একটি কথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, এ বিষয়টি কাহিনী বর্ণনা মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। সত্যি কথা বলতে কি দ্বীনি কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছাড়া আল-কুরআনে কাহিনী বর্ণনার কোন প্রশ্নই আসতে পারে না।

কাহিনী বর্ণনায় দ্বীনি ও শৈল্পিক সংমিশ্রণ

আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি, কাহিনী দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্তরায়। আমরা এখন বলতে চাই, দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার ফলে, ঐ বৈশিষ্ট্যকে শৈল্পিক জগতে গল্পের মূল ভিত্তি গণ্য করা হয়। এ অধ্যায়ের শুরুতে আমরা যে কথা বলেছিলাম, সেখানেও একথার সমর্থন পাওয়া যায়। তা হচ্ছে:

আল-কুরআন বিবেকের ওপর প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে শৈল্পিক সৌন্দর্যকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ আল-কুরআন দ্বীনি চেতনা প্রভাবিত করার জন্য শৈল্পিক সৌন্দর্যের উপকরণ ব্যবহার করেছে। নিচে আমরা ঘটনাবলীর শৈল্পিক বিশেষত্ব নিয়ে আলোচনা করবো, ‘কাহিনীর শৈল্পিক রূপ’ শিরোনামে।

কাহিনীর শৈল্পিক রূপ

১. কুরআনে হাকীমের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনার অন্যতম উদ্দেশ্য- দ্বীন, নবী-রাসূল এবং তাঁদের অভিন্নতা এবং প্রতিটি নবী-রাসূলের সাথে কাফির-মুশরিকদের এক ও অভিন্ন আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা। অবশ্য এ সম্পর্কে পূর্বের অধ্যায়েও আলোচনা করা হয়েছে।

আল-কুরআনের ঘটনাবলীতে যে বক্তব্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠে, তা হচ্ছে- প্রত্যেক নবী ও রাসূলের দ্বীন ছিল এক এবং তাঁরা প্রত্যেকে একই দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। আবার প্রত্যেক নবীর জাতি যারা একমাত্র দ্বীনকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করেছে মনে হয় তা একই সূতোয় গাঁথা। নবীগণ যখনই এসেছেন তখনই সেই গোষ্ঠীর মুকাবিলা করতে হয়েছে। আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় সেসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কিন্তু সেই পুনরাবৃত্তির মধ্যেও এক ধরনের শৈল্পিক সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় এরা ভিন্ন ভিন্ন বী নয় বরং একজন নবী এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতি নয় বরং একই জাতি। তদ্রূপ মিথ্যে প্রতিপন্নকারীরাও দীর্গ সময় ও অবস্থার ব্যবধানেও মনে হয় সকলে একই মানসিকতার অধিকারী। প্রত্যেক নবী এসেছেন এবং কালিমার দাওয়াত দিয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। আর গুমরাহ মানুষগুলো সবসময়ই তাদেরকে মিথ্যেবাদী বলেছে এবং তাঁর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে। নিচের আয়াতগুলো লক্ষ্য করুন:

(আরবী**********)

আমি নূহকে তার জাতির নিকট পাঠিয়েছি। সে বললো: হে আম র জাতির লোকেরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ্‌ নেই। আমি তোমাদের জন্য এক মহাদিবসের শাস্তির ভয় করি। তার জাতির সর্দাররা বললো: আমরা তোমাকে সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। সে বললো: হে আমার জাতি! আমি কখনো গোমরাহ্ নই, আমি তো রাব্বুল আলামীনের সদুপদেশ দেই। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে সেসব জিনিস জান, যা তোমরা জান না। তোমরা কি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ এ কারণে যে, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদেরই এক ব্যক্তি উপদেশ নিয়ে এসেছে- যাতে সে তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে, যেন তোমরা সংযত হও এবং অনুগৃহীত হও। অতপর তারা তাকে মিথ্রে প্রতিপন্ন করলো। আমি তাকে জাহাজের আরোহীদেরকে রক্ষা করলাম, আর যারা মিথ্যে প্রতিপন্ন করছিল তাদেরকে ডুবিয়ে দিলাম। নিশ্চয়ই তারা ছিল অন্ধ। (সূরা আরাফ: ৫৯-৬৪)

(আরবী**********)

আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হূদকে পাঠিয়েছি। সে বললো: হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তার জাতির নেতৃবৃন্দ বললো: আমরা দেখছি, তুমি একজন নির্বোধ, আর আমরা তোমাকে মিথ্যেবাদী মনে করি। সে বললো: হে আমার সম্প্রদায়! আমি মোটেই নির্বোধ নই বরং আমি রাব্বুল আলামীনের পয়গাম্বর। তোমাদেরকে প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছে দেই এবং আমি তোমাদের হিতাকাংখী-বিশ্বস্ত। তোমরা কি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ এ কারণে যে, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এবং তোমাদেরই এক ব্যক্তি উপদেশ নিয়ে এসেছে যেন সে তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে। তোমরা স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে নূহের জাতির পর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেহাকৃতিও বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করো যাতে তোমাদের মঙ্গল হয়।

তারা বললো: তুমি কি আমাদের কাছে এজন্য এসেছ, আমরা এক আল্লাহর ইবাগদ করি এবং আমাদের বাপ-দাদা যাদের পূজা করতো আমরা তাদেরকে ছেড়ে দেই? তাহলে তুমি যার ভয় আমাদেরকে দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। যদি তুমি সত্যবাদী হও। সে বললা: অবধারিত হয়ে গেছে তোমারেদ ওপর তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে শাস্তি ও ক্রোধ। আমার সাথে ঐসব নাম সম্পর্কে কেন তর্ক করছো যেগুলো তোমার ও তোমাদের বাপ-দাদারা রেখেছ। আল্লাহ এদের কোন মন্দ অবতীর্ণ করেননি। অতএব তোমরা অপেক্ষা করো আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষায় রইলাম। অতপর আমি তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে রক্ষা করলাম এবং যারা আমার আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করতো তাদের মূল কেটে দিলাম। কারণ তারা বিশ্বাসী ছিল না। (সূরা আল-আরাফ: ৬৫-৭২)

(আরবী**********)

সামুদ সম্প্রদায়ের নিকট তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছি। সে বললো: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি প্রমাণ এসে গেছে। এটি আল্লাহর উটনী। অতএব একে ছেড়ে দাও, আল্লাহর জমিনে চরে বেড়াবে। অসৎ উদ্দেশ্যে একে স্পর্শও করবে না। নইলে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পাকড়াও করেবে। স্মরণ করো, তোমাদেরকে আ’দ জাতির পরে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তোমাদেরকে পৃথিবীতে ঠিকানা দিয়েছেন। তোমরা নরম মাটিতে অট্টালিকা নির্মাণ করো এবং পর্বত-গা খোদাই করে প্রকোষ্ট নির্মাণ করো। অতএব তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্বীকার করো এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক নেতৃবৃন্দ দরিদ্র ঈমানদারকে জিজ্ঞেস করলো: তোমরা কি বিশ্বাস করো, সালেহকে তার পালনকর্তা প্রেরণ করেছেন? তারা বললো: আমরা তো তার আনিত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসী। অহংকারীরা বললো: তোমরা যে বিষয়ে বিশ্বাস করছো আমরা তা বিশ্বাস করি না। তারপর তারা উটনীকে হত্যা করে ফেললো এবং স্বীং প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করলো। তারা আরও বললো: হে সালেহ! নিয়ে এসো তোমার সেই শাস্তি যর ভয় আমাদেরকে দেখাচ্ছ যদি তুমি রাসূল হয়ে থাক। অতপর তাদেরকে পাকড়াও করলো ভূমিকম্প। ফলে সকালবেলায় নিজ নিজ গৃহে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে রইলো। (সূরা আল-আরাফ: ৭৩-৭৮)

আল-কুরআনের যেখানেই এ ধরনের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে সেখানেই সকল নবী-রাসূলের সাথে মিলে যায়। এ অবস্থা প্রত্যেক নবীর সময়ই চলেছে। চলতে চলতে অবশেষে মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। কল্পনার চোখে আমাদরে সামনে ভেসে উঠে সেই দৃশ্য- কাফিরদের সামনে তিনি কালিমার দাওয়াত পেশ করেছন ঠিক সেইভাবে, যেভাবে অতীতের নবী-রাসূলগণ পেশ করেছেন। এদিকে কাফিররা তাঁর সাথে ঠিক সেই আচরণই করছে যে আচরণ পূর্ব থেকে চলে আসছিল্ নবী-রাসূলদের এ সমস্ত ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে এর মধ্যে অবারিত সৌন্দর্য ও সুষমা দৃষ্টিগোচর হয়।

২. কাহিনী দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার আরেকটি পরিণতি এটিই ছিল যে, ঘটনার ঠিক ততোটুকুই উপস্থাপন করা হয যতোটুকু উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ। এ ব্যাপারে আল-কুরআন এক বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে যা একটি বিশেষ নিয়ম হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। যেমন সূরা অবতীর্ণের ক্রমানুসারে ঘটনাবলী বর্ণনা করার পর যে সূরায় গিয়ে শেষ কিস্তি বর্ণিত হয়েছে সেখানে দ্বীনি উদ্দেশ্যের সাথে সাথে শৈল্পিক দিকটিও পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আবার এমনও দৃষ্টিগোচর হয়, শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাহিনী শেষ করা হয়েছে কিন্তু সেখানে দ্বীনি উদ্দেশ্যের বর্ণনা নেই।

আমরা হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনায় দেখেছি, সূরা আল-মায়িদায় যার শেষ কিস্তি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বনী ইসরাঈলের ওপর বিভিন্ন অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে, যেসব অনুগ্রহ আল্লাহ বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে করেছিলেন। কিন্তু এতো অনুগ্রহ প্রাপ্তির পরও তাদের সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধও ছিল না। তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও তারা পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে রাজী হয়নি। তাই তাদেরকে তীহ্‌ প্রান্তরে নির্বাসন দিযে এমন শাস্তির সম্মুখীন করা হয়েছিল, একমাত্র মৃত্যুই ছিল সেখান থেকে পরিত্রাণের উপায়।

এখানে একটি দ্বীনি উদ্দেশ্য ছিল। তীহ্‌ প্রান্তরের দৃশ্যে ঘটনার যবনিকাপাতের মাধ্যমে শৈল্পিক সৌন্দর্যের উচ্চতর বিকাশ ঘটান হয়েছে। তীহ্‌ প্রান্তরের দৃশ্য ছাড়া অন্য কোথাও এ কাহিনী শেষ করলে তা এতো চমকপ্রদ হতো না।

আসু আমরা আরও কতিপয় ঘটনাবলীতে উপরিউক্ত সূত্রটি সন্ধান করি।

[২.১] হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঘটনাবলী আল-কুরআনে প্রায় বিশ জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। সর্বশেষ কিস্তি বর্ণনা করা হয়েছে সূরা আল-হাজ্জে। এ ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে এভাবে:

(আরবী**********)

যখন আমি ইবরাহীমকে বাইতুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম: আমার সাথে আর কাউকে শরীক করো না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, নামাযে দণ্ডয়মান এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য। আর মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা করে দাও। তারা তোমার কাছে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে আসবে দূর-দূরান্ত থেকে। (সূরা হজ্জ: ২৬-২৭)

দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেক দেখলে দেখা যায়, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দ্বীনে হাজ্জের রুকন (শর্তাবলী) তাই ছিল যা নবী করীম (স)-এর শরীয়তে ফরয করা হয়েছে। তারই উল্লেখ করা এখানে উদ্দেশ্য। তদ্রূপ সূরা আল-হাজ্জের শেষ দিকে (অবতীর্ণক্রম একশত তিন) হযরত ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীনে কায়েম থাক। তিনিই তোমাদের নাম মুসলিম রেখেছেন পূর্বে (এবং এ কুরআনেও)। (সূরা হাজ্জ: ৭৮)

যদি নির্ভেজাল শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় তবে দেখা যাবে- যে জায়গায় এবং যেভাবে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঘটনা শেষ করা হয়েছে, এর চেয়ে ভাল কোন দৃশ্য আর ছিল না। যেখানে এ ঘটনা শেষ করা হয়েছে, এর চেয়ে ভাল কোন দৃশ্য আর ছিল না। যেখানে এ ঘটনা শেষ করা হয়েছে, এর চেয়ে ভাল কোন দৃশ্য আর ছিল না। যেখানে এ ঘটনা শেষ করা যেত এবং দ্বীনি উদ্দেশ্যও পূর্ণমাত্রায় সফল হতো। অবশ্য সেখানেও এ ঘটনা শেষ করা যেত যেখানে কা’কবা নির্মাণের পর হাজ্জের জন্য লোকদেরকে আহ্বান কিংবা কা’বা নির্মাণের আগে কলিজার টুকরো শিশু ইসমাঈল (আ)-কে এক নির্জন উপত্যকায় রেখে আসা হচ্ছিল। কিন্তু তাতে দ্বীনি উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হতো না।

[২.২] হযরত ঈসা (আ)-এর ঘটনা দেখুন যা আল-কুরআনে আট জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। সর্বশেষ কিস্তি বর্ণিত হয়েছে সূরা আল-মায়িদায়। (অবতীর্ণের ক্রমধারা-১১২)। সেখানে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

যখন আল্লাহ বলবেন: হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে এবং আমার মাকে উপাস্য বানিয়ে নাও? ঈসা বলবে: আপনি পবিত্র, আমার শোভা পায় না যে, আমি একথা বলি আর তা বলার অধিকারও আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি তবে আপনি অবশ্যই তা অবহিত। আপনি তো আমার মনের কথাও জানেন এবঙ আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত। আমিতো তাদেরকে কিছুই বলিনি, শুধু তাই বলেছি যা আপনি বলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো, যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা। আমি তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম যতোদিন তাদের সাথে ছিলাম। যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকেই আপনিই তাদের সম্পর্কে অবগত আছেন। আপনি সর্ববিষয়ে পরিজ্ঞাত। যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা আপনা বান্দা, আর যদি তাদেরকে মাফ করে দেন তবে আপনিই প্রবল পরাক্রান্ত মহাবিজ্ঞ। (সূরা আল-মায়িদা: ১১৬-১১৮)

দেখুন, হযরত ঈসা (আ)-এর ঘটনার উপসংহারও টাসনা হয়েছে দ্বীনি ও শৈল্পিক উভয়টির সমন্বয়ে।

একদিকে দ্বীনি উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে শৈল্পিক সৌন্দর্যও পূর্ণতা লাভ করেছে। ঈসা (আ)-এর জন্মের ব্যাপারটিই ব্যতিক্রম- অলৌকিক। সেই জটিলতার। শেষ মুহূর্তে তিনি সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়িযে নিজের দাসত্বের স্বকিারোক্তি এবং জাতিকে যে কথা বলা হয়েছে তার সাক্ষ্য প্রদান এবং সর্বশেষ এ ব্যাপারটি পরাক্রমশালী ও মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর নিকট সোপর্দ করা।

যেখানে এ কাহিনী শেষ করা হয়েছে শৈল্পিক দাবিও ছিল কাহিনীটি সেখানেই শেষ হোক। এ কাহিনী শেষ কার জন্য এর চেয়ে ভাল কোন জায়গা আর ছিল না।

[২.৩] হযরত আদম (আ)-এর ঘটনা কুরআনের সব ক’টি জায়গায়ই তাঁকে পৃথিবীতে পাঠানোর বর্ণনার মাধ্যমে শেষ করা হয়েছে। তার সাথে শুধু এতোটুকুন বর্ধিত করা হয়েছে, তিনি অপরাধের মা’ফ চেয়েছেন এবঙ আল্লাহ তাকে মা’ফ করে দিয়েছেন। তারপর আল-কুরআন নীরব- (যদিও তওরাতে আরেকটি বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে) তার কারণ- হযরত আদম (আ) তাঁর পুরনো দুশমন শয়তানের পরামর্শ গ্রহণ এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পরিণতিতে পৃথিবীতে প্রেরণ। এখানেই দ্বীনি উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায়।

শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে, প্রতিটি সমাপ্তি বিন্দুতে সেই জিনিস বর্তমান, যার অনুসন্ধান একজন শিল্পী করে থাকে। একজহন শিল্পীর জন্য শুধু এ কথাই যথেষ্ট, হযরত আদম (আ) নিজের অপরাধের কারণে জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তারপর মানুষের চিন্তা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি চিন্তা করতে পারেন- হযরত আদম ও হাওয়া আনাড়ীভাবে কোথায় কোথায় ঘুরেছেন? তাদের জীবনযাত্রা এবং অর্থনৈতিক লেনদেন কেমন ছিল? এরূপ নানা প্রকার খেয়ালী প্রশ্ন। এ ঘটনার সাথে এসব বিষয় আলেঅচনায় এলে শৈল্পিক সৌন্দর্য ভাটা পড়তো। তাই যেখানে শেষ করা হয়েছে সেখানে শৈল্পিক সৌন্দর্য কোন ভাটা পড়েনি।

[২.৪] হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনা আল-কুরআনে মোট তিন জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। সর্বশেষ যে সূরায় এ ঘটনার বিবৃত হয়েছে তা সূরা আল-আম্বিয়া (অবতীর্ণক্রম তিয়াত্তর)। এ সূরায় ঘটনার শেষ কিস্তি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:

(আরবী**********)

এবং স্মরণ করো, দাউদ ও সুলাইমানকে, যখন তারা শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল। তাতে রাতে কিছু মেষ ঢুকে পড়েছিল। তাদের বিচার আমার সামনে ছিল। অতপর আমি সুলাইমানকে সে ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমি উভয়কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম। আমি পর্বত ও পাখীকূরকে দাউদের অনুগত বানিয়ে দিয়েছিলাম, তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করতো। এগুলো আমিই করেছিলাম। আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মান শিক্ষা দিয়েছিলাম যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে? আর বায়ুকে সুলাইমানের অধীন করে দিয়েছিলাম, তা তার নির্দেশে প্রবাহিত হতো ঐ দেশের ‍দিকে, যেখানে আমি কল্যাণ দান করেছি। আমি সব বিষয়েই সম্যক অবগত রয়েছি। আর শয়তানের কতককে তার অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা তার জন্য ডুবুরীর কাজ করতো এবঙ এছাড়া অন্য আরও অনেক কাজ করতো। আমি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতাম। (সূরা আম্বিয়া: ৭৮-৮২)

হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনায় বেশি বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য পাওয়া যায়। সেখানে দ্বীনি হিকমত এবং প্রজ্ঞাও বিদ্যমান। কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় ঘটনার সমাপ্তিতে দ্বীনি উদ্দেশ্য ও শৈল্পিক বিষয়ের মধ্যে কোন সংগতি নেই। শৈল্পিক দাবি ছিল হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনা ঐ দৃশ্যে সমাপ্তি টানা যেখানে তাঁর মৃত্যুর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং তিনি মৃত্যুর পরও লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

নিঃসন্দেহে এ দৃশ্য কাহিনী শেষ করার জন্য যথার্থ ছিল। হযরত সুলাইমান (আ)-এর জীবনে শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশাসন ও প্রজ্ঞা উভয়ই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছিল। হযরত সুলাইমন (আ) যেমন একজন বিচারক ঠিক তেমনি একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। কুরআনে বর্ণিত দৃষ্টান্তে যেমন আল্লাহ প্রদত্ত বিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার প্রকাশ ঘটেছে। অপরদিকে বিশাল সাম্রাজের প্রাশাসনের দিকটিও এসেছে। বস্তুত কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে এমন এক উপসংহারের মাধ্যমে যেখানে গোটা জিন্দেগীর ওার সার-সংক্ষেপ আলোচনা করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের তৎপরতার বর্ণনা এসেছে এবং সবকিছুকে এক কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়েই ঘটনার সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

[২.৫] আল-কুরআনের অনেক জায়গায় বিভিন্ন নবী-রাসূলের ঘটনাবলী সংক্ষিপ্তকারে বর্ণনা করা হয়েছে, তার সমাপ্তিও হয়েছে শৈল্পিক দাবি অনুযায়ী এবং সেখানে দ্বীনি উদ্দেশ্যও প্রকাশিত। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

তারা যদি তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে বলুক, তাদের পূর্বেও মিথ্যেবাদী বলেছে নূহ, আদ, সামুদ, ইবরাহীম ও লূতের সম্প্রদায় এবং মাদইয়ানের অধিবাসীরা এবং মূসার সম্প্রাদায়ও তাদেরকে মিথ্যেবাদী বলেছৈ। তারপরও আমি কাফিরদেরকে সুযোগ দিয়েছিলাম। পরে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি। দেখ, কী ভীষণ ছিল আমাকে অস্বীকৃতির পরিণাম। (সূরা হজ্জ: ৪২-৪৩)

এতে কোন সন্দেহ নেই, এ সমাপ্তিতে দ্বীনি উদ্দেশ্য ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের পূর্ণমাত্রায় বিকাশ ঘটেছে এবং তা সঠিক জায়গায় সমাপ্ত হয়েছে।

[২.৬] হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টি করেছে। যার শুরু হয়েছে ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্নের মাধ্যমে এবং শেষ হয়েছে স্বপ্নকে পূর্ণতা দিয়ে। হযরত ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের লজ্জাবনত মস্তকে উপস্থিতি এবং পিতা-মাতার প্রত্যাবর্তন ও মিলনের মাধ্যমে ঘটনার সমাপ্তি টানা হয়েছে। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা হয়নি। কারণ ঘটনা বর্ণনার যে দ্বীনি উদ্দেশ্য ছিল তা পুরা হয়ে যাওয়ায় অন্যত্র এ কাহিনীর পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়নি।

৩. কাহিনী বর্ণনার দ্বীনি উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে আরেকটি দাবি ছিল, তা স্থান কাল ও পাত্রের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে, যেখানই তা বর্ণনা করা হোক না কেন। এদিক থেকে এটি একই রঙ ও শিল্পের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করে, যে প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে আমরা আলা এক অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। সেই অধ্যায়ে আমরা কুরআনী চিত্রের বিভিন্ন রঙ ও অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি।

ঘটনায় বর্ণিত বিষয়ের মধ্যে যে পরিমাণ মিল ও সামঞ্জস্য পাওয়া যেতে পারে আমরা তা কুরআনী কাহিনী দ্বীনি উদ্দেশ্যের অনুগামী হওয়ার দির্শন’ শিরোনামে আলোচনা করেছি এবং সেখানে নিম্নোক্ত আয়াতটি দিয়ে উদাহরণও দিযেছি:

(আরবী************)

তুমি আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দাও, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল দয়ালু এবং আমার শাস্তিও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা হিজর: ৪৯-৫০)

তারপর এমন একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে সেখানে উপরোক্ত বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হয়। এখন আমরা আরও কিছু উদাহরণ বর্ণনা করবো যেখানে দ্বীনি উদ্দেশ্য এবং শৈল্পিক বিন্যাস একটি আরেকটি পরিপূরক।

[৩.১] সূরা আল-আ’রাফে হযরত আদম (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:

(আরবী************)

আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর আকার-অবয়ব তৈরী করেছি। পরে আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি আদমকে সিজদা করো, তখন সবাই সিজদা করেছে কিন্তু ইবলিস সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আল্লাহ্‌ বললেন: আমি যখন নির্দেশ দিযেছি, তখন কিসে তোকে সিজদা থেকে বিরত রাখল? সে বললো: আমি তা চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। আল্লাহ বললে: তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নেই, বেরিয়ে যা। তুই নীচ ও হীনদের অন্তর্ভুক্ত। সে বললো: আমাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেন: তোকে সময় দেয়া হলো। সে বললো: আপনি আমাকে যে উদভ্রান্ত করেছেন আমিও অবশ্য তাদের জন্য আপনার সরল পথের ওপর বসেথাকব। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডানে থেকে এবং বাম থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। আল্লাহ বললেন: বেরিয়ে যাও এখান থেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। তাদের যে-কেউ তোর পথে চলবৈ, অবশ্যই আমি তাদের দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করবো। হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো। অতপর সেখান থেকে যা ইচ্ছে খা। তবে ঐ বৃক্ষের কাছেও যেও না। তাহলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অতপর শয়তান তাদের উভয়কে প্ররোচিত করলো, যাতে তাদের অঙ্গ- যা গোপন ছিল- তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়। সে বললো: তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেননি, তবে তা এ কারণে যে, তোমরা না আবার ফেরেশতা হয়ে যাও। কিংবা হয়ে যাও চি রকাল বসবাসকারী। সে তাদের কাছে কসম খেবেয় বললো: আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাংখী। অতপর প্রতারণার দ্বারা তাদেরকে সম্মত করে ফেললৈা। অনন্তর যখন তারা বৃক্ষ আস্বাদন করলো, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে খুলে গেল এবং তারা নিজের ওপর জান্নাতের পাতা জড়াতে লাগল। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেন: আমি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং বলিনি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? তারা উভয়ে বললো: হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে মাফ না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। আল্লাহ বললেন: তোমরা নেমে যাও, তোমরা একে অপরের শত্রু। তোমাদের জন্য পৃথিবীতে বাসস্থান আছে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সেখানে থাকতে হবে। আরও বললেন: তোমরা সেখানেই জীবন ধারণ করবে, মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখানেই পুনরুত্থিত হবে। (সূরা আল-আ’রাফ: ১১-২৫)

এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রসঙ্গ অব্যাহত রাখা হয়েছে। আদম সন্তানকে শয়তানের প্রতারণা থেকে বাঁচার নসিহত করে বলা হয়েছে: ‘হে আদম! তোমরা শয়তানের ধোঁকায় পড়ো না, যেভাবে তোমাদের পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া) পড়েছিল। ফলে তারা জান্নাত থেকে বহিস্কৃত হয়েছে।’

মানুষকে বলা হয়েছে যে, মুবাহ জিনিস থকেও সতর্ক থাক এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করে নিও না। যেসব নবী-রাসূলদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠান হয়েছিল তাঁদের আনুগত্য করো। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: ‘আমরা শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি যারা ঈমান গ্রহণ করে না।’ তারপর কিয়ামতের চিত্র পেশ করা হয়েছে। যারা আল্লাহর পাঠানো হেদায়েত অনুযায়ী চলেছিল তারা আল্লাহর দরবারে উপস্থিত। এমনিভাবে যারা শয়তানের অনুসরণ করেছিল তারাও জবাবদিহির জন্য আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান। এর শেষ হয়েছে এভাবে, একদল জান্নাতে প্রবেশ করলো এবং আরেক দল জাহান্নামে। আরও সামনে অগ্রসর হয়ে বলা হ য়েছে আরাফবাসীগণ অন্যদেরকে ডেকে বলবে: ‘ভয়-ভীতি ছাড়া সরাসরি জান্নাতেগ প্রবেশ করে যাও।’ অন্যদিক থেকে ফেরেশতাগণ ডেকে বলবে: ‘এটি ঐ জান্নাত যা তোমাদের নেক আমলের বিনিময়ে তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।’ যে সম্পর্কে আমরা ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি।

আসল কথা হচ্ছে, শয়তানের অনুসরণ করার কারণেই তাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে আবার শয়তানের অনুসরণ না করার কারণেই জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। তাদের প্রত্যাবর্তন ঐ ব্যক্তির প্রত্যাবরতনের মতো যে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে গেল এবং কিছুদিন পর পুনরায় নিজের বাড়ি চলে এলো। এখানে ‘বের হওয়া এবং প্রবেশ করার’ মধ্যেই শৈল্পিক সৌন্দর্য নিহিত। এ প্রসঙ্গে আলোচনার আসল জায়গা সেইটি যেখানে আমরা ‘শৈল্পিক বিন্যাস’ সম্পর্কে আলোচনা করেছি।

আমরা এ আলোচনা এখানে শেষ করলাম এ আশায়, পাঠকগণ এরই আলোকে অন্যান্য ঘটনাবলী যাচাই করতে পারবেন।

দশম অধ্যায়

কাহিনীর শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য

এখন আমি এমন সাধারণ শৈল্পিক বৈশিস্ট্য বর্ণনা করতে চাই, যা পাওয়া গেলে কোন ঘটনার দ্বীনি উদ্দেশ্য, শৈল্পিক সৌন্দর্য সুষমার পথ ধরে পুরো হয়ে যায় এবং শৈল্পিক সৌন্দর্য-সুষমা সেই কাহিনীকে মন-মস্তিষ্ক এবং চিন্তা-চেতনার ওপর বেশি প্রভাব বিস্তারকারী বানিয়ে দেয়। যার ফলে মানুষের মন অতি সহজেই তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এ ধরনের বর্ণনার জন্য চারটি শৈল্পিক মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যথা :

১. বর্ণনা বিভিন্নতা: শৈল্পিক বিশেষত্বের মধ্যে প্রথম প্রকার হচ্ছে কাহিনী বর্ণনার পদ্ধতিগত পার্থক্য। কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলী আমরা বর্ণনা করতে গিয়ে তার চারটি ধরন সম্পর্কে অবহিত হই। নিচে পর্যায়ক্রমে তা আলোচনা করা হলো।

[১.১] যেমন আসহাবে কাহফের ঘটনা আল-কুরআনে শুরু করা হয়েছে এভাবে:

(আরবী************)

তুমি কি মনে করো, গুহা ও গুহার অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল? যখন যুবকগণ পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে তথন দো’আ করেছিল: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে আপনার নিকট থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজকে আমাদের জন্য সহস করে দিন। তখন আমি কয়েক বছরের জন্য গুহায় তাদের কানের ওপর (নিদ্রা) পর্দা ফেলে দিলাম। তারপর আমি তাদেরকে পুনরুত্থিত করি একথা জানার জন্য, দুই দলের মধ্যে কে তাদের অবস্থান সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে। (সূরা আল-কাহফ: ৯-১২)

এ হচ্ছে ঘটনার সার-সংক্ষেপ। এরপর ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা শুরু হয়েছে। যেমন- গুহায় প্রবেশ করার পূর্বে পরস্পর পরামর্শ, গুহায় প্রবেশের অবস্থা, তাদের গুম ও জাগ্রত হওয়া, তাদের একজনকে খাদ্য ক্রয়ের জন্য পাঠানো, শহরে তাকে নিয়ে আলোচনা ও কানা-ঘুষা, তার প্রত্যাবর্তন, আসহাবে কাহ্‌ফের মৃত্যু। তাদের কবরে ওপর সৌধ নির্মাণ, এ সম্পর্কে লোকদের মতান্তর ইত্যাদির বর্ণনা। ঘটনার শুরুতে এমনভঅবে সার-সংক্ষেপ বর্ণনা করা হয়েছে পাঠক তা পড়ামাত্র পরের ঘটনা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে।ৎ

[১.২] অনেক সময় কোন ঘটনার উপসংহার বা পরিণতি বর্ননা করা হয়, তারপর পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলা হয়। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা, যা সূরা কাসাসে বর্ণিত হয়েছে। তার শুরু হয়েছে এভাবে:

(আরবী************)

আমি তোমার কাছে মূসা ও ফিরাউনের ঘটনা সত্য সহকারে বর্ননা করছি ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য। ফিরাউন তার দেশে উদ্ধৃত হয়েছিল এবং সে দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে তাদের একটি দলকে দুর্বল করে দিয়েছিল্ সে তাদের পুত্র সন্তানকে হত্যা করতো এবং নারীদেরকে জীবিত রাখতো। নিশ্চয়ই সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। দেশে যাদেরকে দুর্বল করা হয়েছিল, আমার ইচ্ছে হলো তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার, তাদেরকে নেতা, দেশের উত্তরাধিকারী এবং তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় অসীন করার। যেন ফিরাউন, হামান ও তাদের সেনাবাহিনীকে দেখিয়ে দেয়, যা তারা দুর্বল দলের পক্ষ থেকে আশংকা করতো। (সূরা কাসাসা: ২-৬)

এরপর হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন- জন্ম, প্রতিপালন, দুধপান করানো, যৌবনে পদার্পণ, এক কিতবীকে হত্যা করে দেশামন্তর হওয়া ইত্যাদি। তারপর শুরু হয়েছে পরবর্তী ঘটনাবলী যা শুরুতেই বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটনার শুরু এমনভাবে করা হয়েছে যে, পাঠকের ব্যাকুলতা বেড়ে যায়। আগ্রহের অতিশয্যে তাদের মনে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়- এমতাব্থায় মূসা (আ) কী করলেন?

হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনাও একই রূপ। ঘটনার শুরু হয়েছে স্বপ্নদর্শন থেকে। স্বপ্ন দেখে তিনি তার পিতার নিকট বর্ণনা করছেন। পিতা বুঝতে পারছেন এ স্বপ্ন পৃথিবীতে তার প্রতিষ্ঠিত ও সুনাম অর্জনের ইঙ্গিত। ঘটনার শুরু এভাবে:

(আরবী************)

যখন ইউসুফ পিতাকে বললো: আব্বাজান! আমি স্বপ্নে দেখলাম এগারটি নক্ষত্র, চন্দ্র এবং সূর্য আমাকে সিজদা করছে । পিতা বললো: বেটা! তুমি তোমার ভাইদের সামনে এ স্বপ্নের কথা বলো না। তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। কেননা শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। এমনিভাবে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তাঁর বাণীসমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন এবং তোমার প্রতি ইয়াকুব পরিবারের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন। যেমন ইতোপূর্বে তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্ণ করেছেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা ইউসুফ: ৪-৬)

তারপরই ঘটনার শুরু হয়ে গেছে। ঘটনার আর কিছু নয়, তাঁর স্বপ্নের প্রতিফলন মাত্র। যে সম্পর্কে পিতা ইয়াকুব (আ) আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ঘটনা শেষ হয়ে গেছে স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সুন্দর পরিসমাপ্তির পর আল-কুরআন নীরব। ঐসব বক্তব্য সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি যা তওরাতে বর্ণিত।

[১.৩] অনেক সময় ঘটনাসমূহ বিনা ভূমিকায় কিংবা সার-সংক্ষেপ বর্ণনা ছাড়াই সরাসরি শুরু করা হয়েছে। আবার হঠাৎ করেই তা শেষ করা হয়েছে। যেমন- হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে মারইয়াম (আ)-এর ঘটনা বিনা ভূমিকায় বর্ণিত হয়েছে। তেমনিভাবে হযরত সুলাইমান (আ) ও সম্রাজ্ঞী বিলকিসের ঘটনার মধ্যে হঠাৎ করে হুদহুদ ও পিপিলিকার বর্ণনা চলে এসেছে।

[১.৪] আবার এমনও দেখা যায়, ঘটনা বর্ণনায় কল্পনার রঙ দেয়া হয়েছে। ঘটনা শুরু হলো, ঘটনা বিবরণ চলছে এমনি সময় নায়কের মুখ দিয়ে কতিপয় আবেনদ করানো হলো। যেমন- আমরা ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর ঘটনার দৃশ্যাবলী তুলে ধরেছি। যেখানে বলা হয়েছে:

(আরবী************)

স্মরণ করো যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিল, (তখন বললো:) পরওয়ারদিগার! আমাদের থেকে কবুল করো। নিশ্য়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। (সূরা আল-বাকারা: ১২৭)

এটি অনেক বড় দৃশ্য। আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাবলীতে এ ধরনের অনেক উপমা-উদাহরণ পাওয়া যায়।

২. হঠাৎ রহস্রের জট খোলা: দ্বিতীয প্রকার হচ্ছে, হঠাৎ কোন ঘটনার রহস্যের জট খুলে যাওয়া।

[২.১] অনেক সময় ঘটনার রহস্য পাঠক কিংবা নায়ক উভয়ের কাছেই অজানা থাকে। কিন্তু ঘটনার কোন এক জায়গায় গিয়ে হঠাৎ তা পাঠকের সামনে প্রতিভাত হয়ে উঠে। এর উদাহরণ হচ্ছে হযরত মূসা (আ)-এর ঘটনা, যখন তিনি একজন সৎ ও জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট গিয়েছিলেন। যা সূরা আল-কাহ্‌ফে বর্ণিত হয়েছে:

(আরবী************)

যখন মূসা তার যুবক (সঙ্গী)-কে বললো: দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছা পর্য়ন্ত আমি থামবো না, যুগ যুগ ধরে বলতে থাকবো। অতপর যখন দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে পৌঁছল, তখন তারা নিজেদের মাছের কথা ভুলে গেল। মাছটি সমুদ্রে সুড়ঙ্গপথ সৃষ্টি করে নেমে গেল। সে স্থঅনটি অতিক্রম করে গিয়ে মূসা সঙ্গীকে বললো: আমাদের নাস্তা আনো। আমরা এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সে বললো: আপনি কি লক্ষ্র করেছেন, আমরা যখন প্রস্তর খণ্ডে বিশ্রাম নিয়েছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিযেছিলাম। শয়তানেই আমকে একথা স্মরণ রাখা থেকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিয়েছে। মূসা বললো: আমরা তো সেই স্থানটিই খুঁজেছিলাম। অতপর তারা নিজেদের চিহ্ন ধরে ফিরে বললো। তারপর তারা আমাদের বান্দাদের মধ্রে এমন একজনের সাক্ষাৎ পেল, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম ও আমার পক্ষ থেকে দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান। মূসা তাকে বললো: আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি, সত্য পথের যে জ্ঞান আমাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন? সে বললো: আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করে থঅকতে পারবেন না। যে বিষয় (বুঝা) আপনার আয়ত্বাধীন নয়, তা দেখে আপনি ধৈর্য ধরবেন কেমন করে? মূসা বললো: আল্লাহ চাহেতো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোন আদেশ অমান্য করবো না। সে বললো: যদি আপনি আমার অনুসরণ করেনই তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত আমি নিজেই সে সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলি। অতপর তারা চলতে লাগল। অবশেষে যখন তারা নৌকায় আরোহণ করলো তখন সে তাতে ছিদ্র করে দিলো। মূসা বললো: আপনি কি এর আরোহীদের ডুবিয়ে মারার জন্য এতে ছিদ্র করে দিলেন? নিশ্চয়ই আপনি গুরুতর অপরাধ করলেন। সে বললো: আমি কি বলিনি যে, আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না? মূসা বললো: আমাকে ভুলের জন্য অপরাধী করবেন না। তারপর তারা আবার চ লতে লাগল। অবশেষে একটি বালকের সাক্ষাৎ পেল, সে তাকে হত্যা করে ফেললো। মূসা বললো: আপনি কি একটি নিষ্পাপ জীবন শেষ করে দিলেন প্রাণের বিনিময় ছাড়াই? নিশ্চয়ই আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন। সে বললো: আমি কি বলিনি আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না? মূসা বললো: এরপর যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করি, আপনি আমাকে সাথে রাখবেন না। আপনি আমার পক্ষ থেকে অভিযোগমুক্ত হয়ে গেছেন। অতপর তারা চলতে লাগলো। অবশেষে যখন একটি জনপদের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে খাবার চাইল, তারা আথিয়েতা করতে অস্বীকার করলো। অতপর তারা সেখানে খাবার চাইল, তারা আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করলো। অতপর তারা সেখানে একটি পতন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেল, সেটি সে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলো। মূসা বললো: আপনি ইচ্ছে করলে তাদের কাছ থেকে এর পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। সে বললো এখানেই আমার ও আপনার বিচ্ছেদ ঘটল। এখন যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, আমি তার তাৎর্য বলে দিচ্ছি। (সূরা কাহ্‌ফ: ৬০-৭৮)

উল্লেীখত আয়াতে ধারণকৃত উপাদান যা আমাদের জন্য রহস্যের সৃষ্টি করেছে, তার কোন কুলকিনারা আমরা পাই না। সেই রহস্যের সামনে আমরা তেমনি লা-জবাব যেন ঘটনার নায়ক হযরত মূসা (আ)। আমরা এটিও জানি না অত্যাশ্চার্যজনক ঘটনা যিনি ঘটালেন তিনিই বা কে। এমনতি আল-কুরআন বা তার নাম প্রকাশেরও প্রয়োজনবোধ করেনি। তার নাম প্রকাশের প্রয়োজনই বা কি? ঐ ব্যক্তিতো আল্লাহর কুদরতে এরই তাঁরই নির্দেশে সমস্ত কাজ আনজাম দিয়েছেন। আর আল্লাহ সেই মামলার পরিণতি সেই রকম করবেন না। যা আমাদের সামনে ঘটে গেল, আমরা দেখলাম। কারণ, তাঁর দৃষ্টিতো সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য পানে নিবদ্ধ। যেখানে আমাদের দৃষ্টি পৌঁছে না। তদ্রূপ তার নাম উল্লেখ না করার ব্যাপারটিও ঘটনার রহস্যময়তার সাথে পুরো সামঞ্জস্যশীল।

এতে কোন সন্দেহ নেই, ঘটনার শুরু থেকেই অজানার এক অদৃশ্য পর্দা ছিল। মূসা (আ) সৎ বান্দাকে দেখার উৎসুক্য, তাঁর সন্ধানে পথ চলা, মূসা (আ)-এর যুবক সাথী কর্তৃক পাথরের নিকট মাছ চলে যাওয়ার ব্যাপারটি ভুলে যাওয়া, ভুলের মাসুল আদায়ের জন্য পুনরায় পাথরের নিকট চলে আসা, সৎ ব্যক্তির সাক্ষাৎ লাভ। যদি ফিরে না আসতেন তহবে আর কখনো তাঁর সাক্ষাৎ তিনি পেতেন না। যে ঘটনা সংঘটিত হলো তাও রহস্যাচ্ছন্ন। যিনি এ ঘটনা ঘটালেন তার নাম পর্যন্ত জানা গেল না।

সবেমাত্র সহস্যের জট খুলছে। এখন মূসা (আ) জানতে পারবেন কেন এ ঘটনাগুলোর অবতারণা করা হলো। সাথে সাথে আমাদেরও কাছেও তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

নৌকাটির ব্যাপার- সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির। তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করতো, আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে ইচ্ছে করলাম, কারণ তাদের অপরদিকে ছিল এক বাদশাহ, সে বল প্রয়োগে প্রত্যেকটি নৌকা ছিনিয়ে নিত। বালকটির ব্যাপার- তার পিতা-মাতা ছিল ঈমানদার। আমি আশংকা করলাম, সে অবাধ্যতা ও কুফুরী দিয়ে তাদেরকে প্রভাবিত করবে। অতপর আমি ইচ্ছে করলাম, তাদের পালনকর্তা তাদেরকে মহত্তর, তার চেয়ে পবিত্রতায় ও ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর একটি শ্রেষ্ঠ সন্তান দান করুক। প্রাচীরের ব্যাপার- সেটি ছিল নগরের দু’জন পিতৃহীন বালকের। এর নিচে ছিল তাদের গুপ্ত ধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াপরবশ ইচ্ছে করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ মতে এটি করিনি। আপনি যে বিষয়ে ধৈর্যধারণে অক্ষম ছিলেন, এই হলো তার ব্যাখ্যা। (সূরা আল-কাহাফ: ৭৯-৮২)

উল্লেীখত ঘটনায় যে রহস্যের সৃষ্টি করা হয়েছে তা সৎ ব্যক্তি কাশ্‌ফ কিরামতের রহস্য উন্মোচন হওয়পার পর পাঠক কিছুটা সম্বিত ফিরে পান। জিজ্ঞেস করেন- তিনি কে? উত্তর পাওয়া যায় না। রহস্য রহস্যই থেকে যায়। তিনি প্রথমও যেমন রহস্যাচ্ছন্ন ছিলেন এখনও তাই। এ ঘটনায় অত্যন্ত শক্তিশালী হিকমতের প্রকাশ ঘটেছে। যার সামান্য এক ঝিলিক আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো, অতপর তা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল আমাদের দৃষ্টির আড়ালে।

[২.২] অনেক সময় এমনও দেখা যায়, ঘটনার রহস্য দর্শকদের নিকট পরিষ্কার কিন্তু তখনও তা নায়কের কাছে অজানা। তবু সে তার কাজহ করেই যায়। অবশ্য দর্শক জেনে যান তা কিভাবে ঘটেছে, কেন ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে তখন, যখন কাউকে উপসাহ বা হাসিঠাট্টার ছলে কিছু বলা হয়। দর্শকগণ শুরু থেকেই তাদের তৎপরতা দেখেন, তা নিয়ে হাসাহাসিও করেন। ইতোপূর্বে আমরা বাগান মালিকদের ঘটনা বলেছি। সে ঘটনা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

যখন তারা শপথ করেছিল, সকালে বাগানের ফল সংগ্রহ করবে। কিন্তু তারা ‘ইনশা আল্লাহ’ বললো না। অতপর তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে বাগানে এক বিপদ এসে পতিত হলো, তখন তারা নিদ্রিত ছিল। ফলে সকাল পর্যন্ত তা হয়ে গেল ছিন্নভিন্ন তৃণসম।

আমরা তো ঘটনা জানলাম কিন্তু এখনো বাগান মালিকগণ বেখবর। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

সকালে তারা একে-অপরকে ডেকে বললো: তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও, তবে সকাল সকাল ক্ষেতে চল। অতপর তারা চললো ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে: আজ যেন কোন মিসকিন তোমাদের কাছে বাগানে প্রবেশ করতে না পারে। তারা সকালে লাফিয়ে লাফিয়ে সজোরে রওয়ানা হলো। (সূরা আল-কলম: ২১-২৫)

আমরা দর্শকগণ যখন মুচকি মুচকি হাসি, যখন তারা ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে বাগানের দিকে রওয়ানা দেয়। ওদিকে বাগানকে তছনছ করে দেয়া হয়েছে। যখন আমরা হাসিতে লুটিপুটি খাই, তখন কেবল তাদের কাছে রহস্যের জট খুলতে শুরু করে।

(আরবী**********)

অতপর যখন তারা বাগান দেখল, তখন বললো: আমরা পথ ভুল করেছি, না হয় আমরা বঞ্চিত হলাম। (সূরা আল-কলম: ২৬-১৭)

অবশ্যই যারা মিসকিনদেরকে বঞ্চিত রাখতে চায় তাদের জন্য এটি যথার্থ শাস্তি।

[২.৩] অনেক সময় এমনও হয়, দর্শকদেরকে ঘটনার আংশিক অবগত করানো হয়কিন্তু ঘটনার মূর অবস্থা তখনও দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায় এবং এ ঘটনার একটি অঙশ এমন থাকে, যা দর্শক এবং নায়ক কেউই ওয়াকিফহাল নয়। তার উদাহরণ সম্রাজ্ঞী বিলকিসের সিংহাসন। যা চোখের পলকে হাজির করা হয়েছিল। আমরা এও জানি, তা হযরত সুলাইমান (আ)-এর সামনেই সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু সে সম্পর্কে রানী বিলকিস মোটেও অবহিত ছিনে না। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: এটি কি আপনার সিংহাসন? তিনি উত্তর দিলেন এটি যেন সেইটি-ই। এটি এমন এক রহস্য যা আমরা প্রথম থেকেই অবগত আছি। কিন্তু কাঁচের প্রাসাদের ব্যাপারটি বিলকিসের মতো আমরাও অন্ধকারে ছিলাম। বিলকিসের সাথে সাথে আমরওাও ঠিক তখনই ব্যাপারটি বুঝতে পারলাম যখন বিলকিস পানির হাউস অতিক্রম করার জন্য পায়ের গোছার ওপর কাপড় তুলে ধরেছেন। হযরতহ সুলাইমান (আ) তা দেখে বললেন: এটি পানির হাউজ নয়। এটি প্রসাদ, যার নিচে কাঁচের দ্বারা এরূপ করা হয়েছে। [পরবর্তীতে আমরা তা সবিস্তারে বর্ণনা করবো।]

[২.৪] অনেক সময় দেখা যায়, রহস্যের কোন ঘটনা নয়, সাদাসিদা ঘটনা, প্রথমে তা সুস্পষ্ট থাকে না কিন্তু হঠাৎ করে তা পাঠক ও নায়ককে হতচকিত করে দিয়ে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠে। যেমন হযরতহ মারইয়াম (আ)-এর ঘটনা। হযরত মারইয়াম (আ) পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী যাচ্ছিলেন। এমন সময় জিবরাঈল (আ) মানবরূপে আবির্ভূত হন। হযরত মারইয়াম (আ) বলেন: যদি আপনি সৎলোক হয়ে থাকেন তবে আমি আপনার কাছ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি। আমরা ঘটনা শুনেই বুঝতে পারি, তিনি জিবরাঈল (আ)। কিন্তু অল্পক্ষণ পরই তিনি নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন: আমি তোমার প্রবুর পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত। তোমার জন্য একজন সৎ পুত্রের সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। তারপর হঠাৎ এ ঘটনা আমাদের সামনে চলে আসে, প্রসব বেদনায় কাহির হয়ে মারইয়াম (আ) একটি খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নেন এবং বলেন: হায়! যদি আমি এর পূর্বেই মরে যেতাম। আমাকে সবাই ভুলে যেত। তখন নিচ থেকে ফেরেশতা আওয়াজ দিয়ে বললেন: ‘দুশ্চিন্তা করো না। তোমার পালনকরাতা তোমার নিচ দিকে কএকটি ঝর্ণনা প্রবাহিত করে দিয়েছেন।’ আয়াতের শেষ পর্যন্ত।

৩. দৃশ্যান্তরে বিরতি: কাহিনীর তৃতীয় শৈল্পিক বৈশিস্ট্য হচ্ছে- বর্ণিত ঘটনার মাঝে মাঝে সূক্ষ্ম বিরতি। যেমন আজকাল থিয়েটারে ও সিনেমায় বিরতির সময় পর্দা ফেলে দেয়া হয়, এভাবেই এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যের পার্থক্য করা হয়। আল-কুরআনে যতো ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সকল ঘটনার মধ্যেই এ ধরনে বিরতি বিদ্যমান। ইতোপূর্বে আমরা যেসব ঘটনার উল্লেখ করেছি সেখানে সহজভাবেই তা অনুসন্ধান করা যেতে পারে। এখন আমরা উদাহরণ স্বরূপ হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করবো। সর্বমোট ২৮টি দৃশ্যে এ ঘটনা শেষ করা হয়েছে। তবে আমরা সবগুলো দৃশ্য নিয়ে আলোচনা না করে বিশেষ কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করবো।

হযরত ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা রেশন সংগ্রহের জন্য দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর কাছে যান। তিনি তখন খাদ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ভাইদের পুনরায় এলে তার আপন ভাইকে সাথে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দেন। হযরত ইয়অকুব (আ)-এর সম্মাতি না থাকা সত্ত্বেও তারা বিন ইয়ামিনকে নিয়ে মিসরে যায় রেশনের জন্য। হযরত ইউসুফ (আ) শস্য পরিমাপের সময় একটি পেয়ালা তার ভাইয়ের পোত্রে লুকিয়ে রাখেন। তারপর তাকে চোর সাব্যস্ত করে কৌশলে নিজের নিকটে রেখে দেন। তখন ভাইয়েরা পরামর্শ করে অন্য কাউকে আটকে রাখার আবেনদ করে কিন্তু তিনি তা বলিষ্ঠভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

অতপর যখন তারা তাঁর কাছ থেকে নিরাশ হয়ে গেল তখন পরামর্শের জন্য এক জায়গায় বসলো। তাদের ভড় ভাই বললো: তোমরা কি জান না পিতা তোমার কাছ থেকে আল্লাহর নামে শপথ নিয়েছেন এবং পূর্বে ইউসুফের ব্যাপারেও তোমরা অন্যায় করছো? অতএব, আমি তো কিছুতেই এদেশ ত্যাগ করবো না, যে পর্যন্ত পিতা আমাকে আদেশ দেন কিংবা আল্লাহ আমার পক্ষে কোন ব্যবস্থা করে দেন। তিনিই সর্বোত্তম ব্যবস্থাপক। তোমরা তোমাদের পিতার কাছে ফিরে যাও এবং বলো: আব্বাজন, আপনার ছেলে চুরি করেছে। আমরা তাই বলে দিলাম যা আমাদের জানা ছিল এবং অদৃশ্য বিষয়ের প্রতি আমাদের লক্ষ্য ছিল না। জিজ্ঞেস করুন ঐ জনপদের লোকদেরকে যেখানে আমরা ছিলাম এবং ঐ কাফেলাকে, যাদের সাথে আমরা এসেছি। অবশ্যই আমরা সত্য কথা বলছি। (সূরা ইউসুফ: ৮০-৮২)

পর্দা পড়ে গেল। এখন আমরা হযরত ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের সাথে অন্য এক ‍দৃশ্যে মিলবো। তবে তা মিসরের কোন শহরে নয়। আমরা মিলবো, যখন তারা পিতার সামনে দাঁড়িয়ে কৈফিয়ত দানে ব্যস্ত। পর্দা উঠে গেল। আমরা সেখানে তাদের পিতা হযরত ইয়অকুব (আ)-কে নিম্নোক্ত মন্তব্য করতে দেখি।

(আরবী**********)

ইয়াকুব বললো: এসব কিছুই নয়। তোমরা শুধু মনগড়া একটি কথা নিয়ে এসেছ। এখন ধৈর্যধারণই উত্তম। সম্ভবত আল্লাহ তাদের সবাইকে একই সাথে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। তিনি ‍সুবিজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। (সূরা ইউসুফ: ৮৩)

পর্দা পড়ে গেল। এখন আমরা হযরত ইউসুফ (আ) ও তাঁর ছেলেদেরকে অন্য একটি দৃশ্যে দেখবো। সেখানে দেখা যাবে ইয়াকুব (আ) গভীরভাবে চিন্তামগ্ন। ছেলেরা পিতার অবস্থা দেখে পেরেশান। পর্দা উঠে গেল।

(আরবী**********)সে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বললো: হায় আফসোস ইউসুফের জন্য! দুঃখে তার চোখ ঘোলাটে হয়ে গেল। অসহনীয় মনস্তাপে সে ছিল ক্লিষ্ট। তারা বলতে লাগল: আল্লাহর কসম! আপনি তো ইউসুফেল স্মরণ থেকে নিবৃত হবেন না। যে পর্যন্ত মরণাপন্ন হয়ে যান কিংবা না মৃত্যুবরণ করেন। সে বললো: আমিতো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি এবং আল্লাহর পক্ষথেকে আমি যা জানি তা তোমরা জান না। বেটারা! যাও ইউসুফ ও তাঁর ভাইকে তালাশ করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। একমাত্র অবিশ্বাসী ছাড়া আর কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। (সূরা ইউসুফ: ৮৪-৮৭)

এখন আবার পর্দা পড়ে যাবে। ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা রওয়ানা দিলো। এরপর আর কিছু আমাদের জানা নেই। যখন পুনরায় পর্দা উঠলো তখন আমরা মিসরে হযরত ইউসুফ (আ)-এর নিকট তাদেরকে উপস্থিত হয়ে বলতে শুনি:

(আরবী**********)

অতপর যখন তারা ইউসুফের নিকট পৌঁছল তখন বললো: হে আমীর! আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে পড়েছি এবং আমরা অপর্যাপ্ত পুঁজি নিয়ে এসেছি। অতএব আপনি আমাদের পুরোপুরি বরাদ্দ দিন এবং আমাদেরকে দান করুন। আল্লাহ দাতাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন। (সূরা ইউসুফ: ৮৮)

আসহাবে কাহ্‌ফ, হযরত মারইয়অম (আ)-এর ঘটনা হযরত সুলাইমান (আ)-এর ঘটনাবলীও একই স্টাইলে বর্ণিত। আমরা সামনে আরও আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ্‌।

৪. ঘটনার মাধ্যমে দৃশ্যাংকন: আমরা ইতোপূর্বে কাহিনীর তিনটি শৈল্পিক বৈশিস্ট নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন আমরা আলোচনা করবো কিভাবে ঘটনার মাধ্যমে দৃশ্যাংকন করা হয়েছে। এ প্রকারটি আলোচ্য পুস্তকের ‘শৈল্পিক চিত্র’ অধ্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। সেখানে আমরা বলেছি, আল-কুরআনে যে সমস্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যদিও তা অতীতকালের কিন্তু পাঠকগণ যখন তা পাঠ করেন কিংবা শ্রোতাগণ তা শ্রবণ করেন তখন তাদের নিকট সমস্ত চিত্রটি মুর্তমান হয়ে উপস্থিত হয়। মনে হয় ঘটনাটি বর্তমানে তার চোখের সামনেই সংঘটিত হচ্ছে।

এখন আমরা যা বলতে চাই তা হচ্ছে, ঘটনাবলীর মাধ্যমে যে দৃশ্য বা ছবি আঁকা হয়। তা বিভিন্ন স্টাইলের হয়ে থাকে। যেমন ঘটনার মাধ্যমে কোন ছবি জীবন্ত হয়ে প্রতিভাত হওয়া। কিংবা সেই ছবিতে আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ হওয়া, অথবা ব্যক্তিত্বের ছাপ পরিলক্ষিত হওয়া। কোন কোন সময় ঘটনা বা কাহিনীতে দু’ ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকলেও একটি অন্যটির চেয়ে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠে। ফলে ঐ ঘটনাটিকে সেই নামেই আখ্যায়িত করা হয়। সমস্ত কাহিনীর দৃশ্যেই এসব শৈল্পিক সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। আমরা এগুলোর শুধুমাত্র শব্দের মাধ্যমে আলোচনা না করে উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চাই।

আমরা এর আগে বাগান মালিকদের ঘটনা বর্ণনা করেছি। এমনকি আমরা সে ঘটনার চিত্রায়ণও দেখেছি। হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-কে কা’বা ঘরের সামনে দাঁড়ান দেখেছি। হযরত নূহ (আ) ও তাঁর পুত্রকে দেখেছি প্লাবনের মুহূর্তে। এ চিত্রগুলো সর্বদা জীবন্ত, চিরন্তনী। এসব ঘটনার পাঠক কিংবা শ্রোতা মনে করেন ঘটনাটি তার চোখের সামনই সংঘটিত হচ্ছে। এখন আমরা আরও কিছু উদাহরণ বর্ণনা করছি।

যখন আসহাবে কাহ্‌ফ (হুগার অধিবাসীগণ) মুশরিকদের দল থেকে বেরিয়ে তওহীদের পথে এলেন, তখন তার পরস্পর একটি পরামর্শ করেছিলেন। যা কুরআন আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। যখনই আমরা তা পাঠ করি কিংবা শুনি মনে হয়, তারা যেন আমাদের চোখের সামনেই পরামর্শ করছে এমনকি তাদের কথাবার্তা পর্যন্ত আমরা শুনছি।

(আরবী**********)

আমি তোমার কাছে তাদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের সৎপথে বলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তাদের মনকে দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িযেছিল। তারা বলবে: আমাদের প্রতিপালক আসমান ও জমিনের পালনকর্তা, আমরা কখনো তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহ্বান করবো না। যদি করি তা হবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এরা আমাদেরই স্বজাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে না কেন? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যে উদ্ভাবন করে, তার চেযে বড় জালিম আর কে? তোমরা যখন তাদের থেকে ‍পৃথক হলে এবং আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকে, তখন গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের ওপর রহম করবেন এবং তোমরা কাজকর্মকে ফলপ্রসু করার ব্যবস্থা করবেন। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ১৩-১৬)

এখানে এ দৃশ্য শেষ, পর্দা পড়ে যায়। বিশং শতাব্দীর সিনেমা-থিয়েটারের মতোই এখানে দৃশ্যান্তরে বিরতি। যখন পর্দা সরে যাবে তখন আমরা দেখতে পাব, পরামর্শ শেষে তারা পরস্পর গুহায় ঢুকে পড়েছে। আমরা নিজের চোখে তাদেরকে গুহায় প্রবেশ করতে দেখছি। এতে কোন সন্দেহ নেই। এমন দৃঢ় বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। আল-কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার দাবিও তাই।

(আরবী**********)

তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদরে গুহা থেকে পাশ কেটে ডানে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায় তাদের থেকে পাশ কেটে বামে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত।

একেই বলে কোন কিছুকে চোখের সামনে হাজির করে দেয়া। বর্তমানে থিয়েটারে যেভাবে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে দৃশ্যকে স্পষ্ট করা হয় এখানেও সূর্যের আলোর মাধ্যমে তাই করা হয়েছে। সূর্যের চলমানতা এ ‍দৃশ্যকে সচল করে তুলেছে। কিন্তু যখন সূর্য উঠে কিংবা যখন তা ডুবে, কোন সময়ই তার আলো গুহার ভেতর প্রবেশ করে না। দিনের সারাক্ষণ সেখানে চলে আলো-আঁধারীর খেলা। ‘তাযাওয়ারু’ (****) শব্দ দিয়ে সে কথাই বুঝানো হয়েছে। কতো সহজভাবে চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে, এ দৃশ্যটি সিনেমার পর্দায় দেখাতে কতো কষ্টই না করা হতো।

আসুন, আসহাবে কাহ্‌ফকে দেখুন। বলা হয়েছে:” (আরবী**********)- ‘তারা গুহার প্রশস্ত জায়গার মধ্যে অবস্থিত’ একথাটি একটি অনুপম সংযোজন। যা মুজিযা’র চেয়ে কোন অংশে কম নয়। একথা কয়টি আমাদের সামনে গোটা চিত্রটিকে জীবন্ত ও সচল করে তুলেছে। মনে হয় তারা আমাদের চোখের সামনেই নড়াচড়া করছে।

(আরবী**********)

তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডানদিকে ও বামদিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটো গুহামুখে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছনে ফিরে পালাতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তে। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ১৮)

এ কয়টি শব্দের মাধ্যমে আঁকা ছবিটি একেবারেই জীবন্ত, চলমান।

হঠাৎ আসহাবে কাহ্‌ফের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন ঘটলো। আসুন দেখা যাক এবার কি ঘটে:

(আরবী**********)

আমি এমনিভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললো: তোমরা কতোদিন অবস্থান করেছ? তাদের কেউ বললো: একদিন কিংবা তারচে’ কিচু কম। কেউ কেউ বললো: তোমাদের প্রতিপালকই ভাল জানেন, তোমরা কতোকাল অবস্থান করেছে। এখন তোমাদের একজনকে এ মুদ্রাসহ শহরে পাঠাও, সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র, তারপর তা থেকে কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য। সে যেন নম্রতার সাথে যায় আর কিছুতেই তোমাদের খবর কাউকে না জানায়। তারা যদি তোমাদে খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেনে তোমাদেরকে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদরে ধর্মে ফিয়ে নেবে। তাহলে আর তোমরা সফলতা লাভ রতে পারবে না। (সূরা আল-কাহফ: ১৯-২০)

এ হলো তৃতীয় দৃশ্য অথবা দ্বিতীয় দৃশ্যের শেষাংশ। এখন তারা সবাই জাগ্রত। সর্বপ্রথম তাদের জিজ্ঞাসা, কতোদিন তারা ঘুমিয়েছিলেন? উত্তর পাওয়া গেল, একদিন কিংবা তার চেয়ে কম। অথচ আমরা জানি তাঁরা দীর্ঘ সময় গুহায় অবস্থান করেছেন। ঘটনার সার-সংক্ষেপ থেকে আমরা জানতে পেরেছি। তারা ক্ষাধার্ত ছিলেন, তাই তারা ব্যাপারটি নিয়ে এতো মাথা ঘামাননি। এখন ঐ মুমিন ব্যক্তি যিনি বলেছিলেন: (আরবী**********)-“তোমাদের প্রতিপালক জানেন, তোমরা কতোদিন ঘুমিয়েচিলে”। তিনি কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক করে একজনকে খাদ্য কেনার নির্দেশ দিলেন। তিনি সতর্ক করে বললেন: অত্যন্ত নম্রতার সাথে শহরে যেতে হবে, কাউকে এ জায়গার কথা ফাঁস করে দেয়া যাবে না, খাদ্য ভাল ও পবিত্র দেখে কিনতে হবে। যদি কেউ খবর জেনে ফেলে তাবে তারা হয়তো তাদেরকে মেরে ফেলবে কিংবা পিতৃপুরুষের ধর্মে জোর করে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এ কথাগুলো তো গুহাবাসী (আসহাবে কাহ্‌ফ) বললেন। আমরা জানি কয়েকশ’ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এমন কেউ আর এখন অবশিষ্ট নেই যে, তাদেরকে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড দেবে কিংবা পৈতৃক ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। কারণ, তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আসুন পরের দৃশ্যে আমরা তাদের প্রতিনিধির কার্যাবলী দেখি।

এর পরের দৃশ্য কোথায়? এখানে অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন আছে। আমরা জানি, তাদের কথা লোকেরা জেনে ফেলেছিল। কিন্তু তাঁরা যে কাফিরদের ভয় করেছিলেন প্রকৃতপক্ষে তখন সেসব কাফির-মুশরিক ছিল না। ঐ সময় সবাই ঈমানদার হয়ে গিয়েছিল।

(আরবী**********)

এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জানতে পারে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কিয়ামত হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ২১)

এখানে পৌঁছে ঘটনা দ্বীনি উদ্দেশ্য প্রকাশ পেয়েছে। সাথে সাথে শৈল্পিক দিকটিও পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে। এখন আমাদের চিন্তার জগতে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খায তা হচ্ছে- যাকে শহরে পাঠান হলো তাঁর অবস্থা কি হলো? যখন লোকজন তার রহস্য জেনে ফেললেন, তখনই বা তিনি কি করলেন?

এখানেও এক সূক্ষ্ম বিরতি। তারপর বুঝা যায়, তখন তাদেরকে মৃত্যু গ্রাস করে নিল। তখন লোকজন গুহার বাইরে দাঁড়িযে বিতর্ক শুরু করে দিলো যে, তারা কেন্‌ দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

(আরবী**********)

যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করেছিল, তখন তারা বললো: তাদের ওপর সৌদ নির্মাণ করো। তাদের পালকন্তা তাদের বিষয়ে ভাল জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো, তারা বললো: আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে মসজিদ নির্মাণ করবো। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ২১)

আবার বিরতি। এখন যদি কেউ চায় তবে সে কল্পনায় তাদের মাযারের ওপর মসজিদ নির্মাণ করতে পারে। এদিকে লোকদের অবস্থা ছিল- তারা বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক শুরু করলো। কারো বিতর্ক তারা সংখ্যায় কতোজন ছিল, আবার কারো বিতর্কের বিষয হচ্ছে- তারা কতোদিন ঘুমিয়েছিল?

(আরবী**********)

অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবে: তারা ছিল তিনজন চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর। আবার কেউ বলবে: তারা ছিল পাঁচজন, তাদের কুকুর ছিল ষষ্ঠ। আবার এমন বলবে: তারা ছিল সাতজন, অষ্টম ছিল তাদের কুকুরটি। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ২২)

যখন আসহাবে কাহ্‌ফকে জীবিত করার পর দ্বীনি উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেল তখন পুনরায় তাদেরকে রহস্যের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো:

(আরবী**********)

বলো: আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভাল জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবে না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞেসও করবে না।

ঘটনা পূর্ণতা প্রাপ্তির পর কুরআন তার দ্বীনি ‍উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছে। আসহাবে কাহ্‌ফকে পুনর্জীবন দান করার পর আল্লাহর যে কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার দিকে ইঙ্গিত করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হচ্ছে:

(আরবী**********)

তুমি কোন কাজের বিষয়ে বলবে না যে, টি আমি ‘আগামীকাল করবা’। ইনশাআল্লাহ (আল্লাহর ইচ্ছা করলে) একথা বলা ছাড়া। যখন ভুলে যাও, তখন তোমার পালনকর্তাকে স্মরণ করো এবং বলো: আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চেয়েও নিকটতম সত্যের পথ-নির্দেশ করবেন। (সূরা আল-কাহফ: ২৩-২৪)

এখানে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে একটি বিশেষ কথা বলা হয়েছে। আমাদের সে আলোচনায় গিয়ে কাজ নেই। এতোটুকুনতো বুঝ কুরআন যেভাবে ঘটনা বর্ণনার সাথে সাথে দ্বীনি উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্ট করে দেয়, এখানেও তেমন দিয়েছে। শিক্ষামূলক উপদেশের জন্য এর চেয়ে উত্তম সুযোগ আর কী ছিল?

সর্বশেষ তারে গুহায় অবস্থান কালের সঠিক তথ্য দেয়া হয়েছে, যা এ ঘটনায় আমাদেরও বক্তব্য। অবশিষ্ট থাকে তাদের সংখ্যা। তা আজও- স্বয়ং আসহাবে কাহ্‌ফের মতো- এক রহস্য।

(আরবী**********) গুহায় তাদের উপর তিনশ’ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ২৫)

এ ঘটনার অন্তরালে যে দ্বীনি শিক্ষা নিহিত তা নিম্নের শব্দমালায় প্রকাশ ঘটেছে:

(আরবী**********)

বলো: তারা কতোকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভাল জানেন। আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কতো চমৎকার দেখন ও শুনেন। তিনি ছাড়া তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না। তোমার প্রতি তোমার প্রবু যে কিতাব ওহী করা হয়েছে তা পাঠ করো। তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই। তাঁকে ছাড়া তোমার কোন আশ্রয়স্থলও নেঈ। (সূরা আল-কাহ্‌ফ: ২৬-২৭)

আমি কাহিনীর সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলো অনুসন্দানের চেষ্টা করেছি, তারপর তা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম। একটি কথায় কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, আল-কুরআনে ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা পাঠ করা মাত্র পাঠকের চোখের সামনে ছবির মতো সবকিছু ভেসে উঠে। এটিই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আর কেন বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

আবেগ অনুভূতির চিত্র

এখন আমরা কাহিনীর দৃশ্যায়নের আরেকটি দিকে দৃষ্টি দেবো।তা হচ্ছে- আবেগ ও মনের ঝোঁক প্রবণতার ছবির বহিঃপ্রকাশ।

আগে আমরা দু’ বাগান মালিক এবং তার সাথীর কথোপকথনের ঘটনা বর্ণনা করেছি। তেমনিভাবে হযরত মূসা (আ) ও একজন সৎলোকের ঘটনাও আমরা বর্ণনা করেছি। এ দুটো ঘটনায় আবেগ ও অনুভূতির ছবিতো আছেই সেই সাথে ব্যক্তিত্বের ছবিও উপস্থাপন করে সেই সকল ‍দৃশ্যাবলকেমূর্তমান করে চোখের সামনে তুলে ধরে। এখন আমি এ রকম আরেকটি ঘটনা আপনার সামনে পেশ করছি। হযরতমারইয়াম (আ) যখন হযরত ঈসা (আ)-কে প্রসব করেন তখনকার ঘটনা। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

এ কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করো, যখন সে তার পরিবারের সদস্যদের থেকে পৃথকহয়ে পূর্বদিকে একস্থানে আশ্রয় নিল। তখনতাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে পর্দা করলো। (সূরামারইয়াম: ১৬-১৭)

হযরতমারইয়অম একাকী নির্জনবাসে সন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ একদিন তিনি মগ্নচিত্তে গোসলকানার দিকে যাচ্ছিলেন এমতাবস্থায় সেখানে এক যুবককে দেখলেন।ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন, কল্পনারজগৎ নিমিষে বদলে গেল।

(আরবী**********)

অতপর আমিতার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম। সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলো। মারইয়াম বললো: আমিম তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয়প্রার্থনা করছি,, যদি তুমি আল্লাহভীরু হও। (সূরা মারইয়াম: ১৭-১৮)

এ কথাগুলো হচ্ছে ঐ রকম, যেমন কোন কুমারী নিরালয় একাকী বসে আছে, অকস্মাৎসেখানে এক ব্যক্তি এসে ধমকে উঠলো, তখন সে কোন উপায়ান্তর না দেখে তার মধ্যে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করার চেষ্টা করলো।

যদিও আমরা বুঝতে পারি, সে আগন্তুক যুবক নয় স্বয়ং ফেরেশতা জিবরাঈল আমীন। কিন্তুমারইয়াম (আ) মনে করেছিলেন, সে একজন অপরিচিত যুবক। চিন্তা কের দেখুন, এক অপরিচিত যুবক এমন এক পবিত্রা কুমারী মেয়ের কাছে কেন আসবে, যে অত্যন্ত উঁচু পরিবারের ময়ে। যার সমস্ত আচার-আচরণদ্বীনের গণ্ডিতেসীমাবদ্ধ। যার অভিভাবক স্বয়ং হযরত জাকারিয়া (আ)। তার মা তাকে দ্বীনেরজন্যে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। এটি প্রথম অংশ।

(আরবী**********)

সে বললো: আমিম তোমার প্রতিপালকের দূত। তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব। (সূরা মারইয়াম: ১৯)

লজ্জাবনত কোন কুমারীকে তার একাকীত্বের সুযোগে কেউ এসে ভড়কে দিলে তার মানসিক অবস্থা ও অনুভূতিত কেমনহয়,তা চিন্তাশক্তি সহজেইঅনুমান করতেত পারে। যদিওসে নিজেকে আল্লাহর দূত (অর্থাৎ ফেরেশতা) হওয়ার কথা বলে।তবু তিনি পুরোপুরি বিশ্বাসকরতে পারলেন না। শুধু একটি কথাইবারবার তার চিন্তার জগতে ঘুরপাক খেতে থাকে যে, তার সরলতার সুযোগ নিয়ে হয়তো সে তারকুমারীত্বকে নষ্ট করতে চায়। নইলে সে তাকে একটি সন্তানের সংবাদ দিচ্ছে এমন এক পদ্ধতিতে আজ পর্যন্ত যার কোন দৃষ্টান্ত নেই। এটি দ্বিতীয় অংশ।

এবার মারইয়াম (আ) এমন এক সাহসী মেয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণহলেন, যে বিপদে না ঘাবড়ে সাহসিকতারসাথে তারমুকাবিলা করে।

(আরবী**********)

তিনি বলে উঠলেন: কিভাবে আমার পুত্র হবে অথচ কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শকরিনি? আর আমি কখনো ব্যভিচারিণীও ছিলাম না? (সূরামারইয়াম: ২০)

মারইয়াম (আ) বড়ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কথা কয়টি বললেন। এখনো মারইয়ামম (আ) এবং উল্লেখিত যুবক একাকী দাঁড়িযে। অবশ্য ইতোমধ্যে মারইয়মা (আ) আগন্তুকের আগমনের উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গমকরতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝতেত পারছেন না, কিভাবে তাসম্ভবপর হতে পারে? তারসান্ত্বনার কথা একটিই,তাহচ্ছে ভদ্রলোকের বক্তব্য- আমি তোমার প্রতিপালকের দূত। তবু মনে হয় এতে কোন ধোঁকাবাজের ধোঁকাওহতে পারে। যে প্রসঙ্গে আমরা প্রথমে আলাপ করেছি। এটি কোন লজ্জা-শরমেরকাজ নয়। কথা আরো সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। তাই জিবরাঈল (আ) বললেন:

(আরবী**********)

সে বললো: এমনি করেই হবে। তোমার প্রতিপালক বলেছেন: এটি আমার জন্য অত্যন্ত সহজ কাজ এবং আমি তাকেমানুষেরজন্য একটি নিদর্শন ও আমর পক্ষ থেকে একে রহমত স্বরূপকরতেচাই। এটি একটি স্থিরকৃত ব্যাপার। (সূরামারিইয়াম: ২১)

তার কি হলো? এখানে দীর্ঘ এক শৈল্পিক বিরতি। কিন্তু এ বিরতির মুহূর্তে পাঠকদের চিন্তার জগতে একটিকা বারবার প্রতিধ্বনিতহয়, মারইয়াম (আ)-এর কি হলো? আবার কাহিনীর পট পরিবর্তন। এবারও আমরা মারইয়াম (আ)-কে আরেক ব্যাপারে উদ্বিগ্ন দেখতে পাই। যা আগের চেয়েও বেশি।

(আরবী**********)

অতপর তিনিগর্ভে সন্তান ধারণ করলেন। তারপর তিনি দূরবর্তী এক জায়গায় চলে গেলেন। প্রসব বেদনা তাঁকে এক খেজুর গাছের পাদদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করলো। তিনি বললেন: হায়! আমি যদি এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতাম। (সূরা মারইয়াম:২৩)

এটি তৃতীয অংশ।

প্রথমাবস্থায় হযরত মারইয়াম (আ)-এর সামনে শুধু নিজ স্বত্ত্বা ছিল। পাক-পবিত্র পরিবেশে লালিত-পালিতহয়েছিলেন। কিন্তু অবশেষে তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক অবস্থারমুখোমুখি হলেন।বর্তমান আচরণও ভিন্নতর। তিনি এখন জাতিরত কাছে লাঞ্ছিত-অপমানিত, শুধু মানসিক দিকেই নয় শারীরিক দিকেও তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। কেননা প্রসব বেদনার দরুন তিনি একটি খেজুর গাছের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এখঅনে তিনি একা। দ্বিতীয় কোন লোক তার কাছে নেই। তাছাড়া প্রথম সন্তান সম্ভবা নারীর যে সমস্ত অসুবিধা হয়ে থাকে হযরতমারইয়াম (আ)-এরও সেসব অসুবিধা হচ্ছে, এমন অবস্থায় কি করতে হবে সেই ধারণাটুকুও নেই। সামান্য একটুসহযোগিতা করবে এমন একজন লোকও নেই। তাই তিনি আক্ষেপ করে বললেন: “হায় এ অবস্থার পূর্বে আমি কেন মনে গেলাম না এবংমানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলাম না।” একথা থেকে তার শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণাএবংতাঁর দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে আমরা অবহিত হতে পারি। আমরা দেখতে পাচ্ছি তিনি কতো বড় বিপদে নিমজ্জিত। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)অতপর ফেরেশতা তাকে নিম্মদিক থেকে আওয়াজ দিলো, তুমি দুঃখ করো না। তোমার রব্ব তোমার পায়ের তলায় একটি নহর প্রবাহিত করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কাণ্ড নাড়া দাও, তোমার ওপর পাকা খেজুর পতিত হবে। তা থেকে খাও, পান করো এবং চোখ জুড়িয়ে নাও। যদি মানুষের মধ্যেকাউকে তুমি দেখ, তবে বলে দিও: আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোযা মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনমানুষের সাথে কথা বলবো না। (সূরামারইয়াম: ২৪-২৬)

এটি চতুর্থ অংশ।

এ ঘটনা এমন আশ্চর্যও পেরেশানীর যে, ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা [মারইয়াম (আ) নয়] দৌড়ে পালাতে প্রস্তুত। হঠাৎ সন্তান ভূমিষ্ঠহওয়া, নিচ থেকে ফেরেশতার আওয়াজ, এমন সন্তান যামারইয়াম (আ)-এর জন্য যন্ত্রণা ও তিরষ্কারের উৎস। তৎক্ষণাৎ খাদ্য ও পানীয়ের সুবন্দোবস্ত, নিঃসন্দেহে এটি একটি আজব ঘটনা।

আমাদের ধারণা, হযরত মারইয়াম (আ)-ও আশ্চার্যান্তিব হয়েছেন। দুর্বল শরীরে খেজুরের ডাল নাড়ানো, সেখান থেকে তরতাজা পাক খেজুর সংগ্রহ করে খাওয়া।তারপর একটু শক্তি সঞ্চয় করে বাড়ির দিকে যাত্রা। কিন্তু চিন্তার আরেকটি সেতু এখানে অতিক্রম করতে বাকী।

(আরবী**********) অতপর সে তার সন্তানকে নিয়ে নিজসম্প্রদায়ের নিকট ফিরে এলো। (সূরা মারইয়াম: ২৭)

এবার মারইয়াম (আ)মানসিক তৃপ্তি লাভ করার পর তার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনাঅন্যদের কাছে হস্তান্তর করা উচিত।

(আরবী**********)

তারাবললো: হে মারইয়াম! তুম একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। সে হারূনের বোন! তোমার পিতা অসৎ এবং মাতাব্যভিচারিণী ছিলেন না। (সূরামারইয়াম: ২৭-২৮)

গোত্রের লোকজন তাকে ভর্ৎসনাকরতে লাগলো।উপহা কতের তাকে ‘হারূনের বোন’ হিসেবে সম্বোধন করছে এবংবলছে- তুমি এমন সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে, যে বংশে ইতোপূর্বে এ রকম কোন ঘটনা ঘটেনি। তাছাড়া তোমার পিতা-মাতাও এমন ছিলেন না। তুমি কি করে বংশেরমুখে কালিমাম লেপন করলে?

মারইয়াম (আ) ভারাক্রান্ত হৃদয়েনিরুত্তর থেকে,সন্তানের দিকে ইঙ্গিতকরেবলতেন:আমকে জিজ্ঞেসনা করে একে জিজ্ঞেস করো জবাব পাবে। মনেহয় মামরইয়াম (আ)-এরএ বিশ্বাস ছিল তার সন্তানের দ্বারা কোন মুজিযা সংঘটিতহবে।এজন্যই তিনি সন্তানের দিকে ইঙ্গিতকরেছিলেন। লোকজন শুনেআশ্চর্যহয়ে আরো বেশি তিরষ্কার করতে লাগলো। কেননালোকজনতা হতবাক।কুমারী মেয়ে সন্তান ধারণকরেছে এবং সে এ সন্তাতনেরপ্রতি খুশী। তারপর গভীর আত্মবিশ্বাসেরসাথে লোকদেরকে তাচ্ছিল্যভাবে সন্তানকে দেখিয়ে দেয়া ইত্যাদি লোকদেরকেআশ্চর্যের শেষ প্রান্তে উপনীত করলো।

(আরবী**********) তারা বললো: কোলের শিশু তার সাথে আমরা কিভাবেকথা বলবো?

তখন অলৌকিকভাবে হযরত ইসা (আ) বলে উঠলেন:

(আরবী**********)

শিশু বলে উঠলো: আমি আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতোদিন জীবিতথাকি ততোদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে এবং মায়ের আনুগত্যকরতে।আমাকে তিনউদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি সালাম, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন‍মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন পুনরুজ্জীবত হয়ে উত্থিতহবো। (সূরা মারইয়াম:; ৩০-৩৩)

আমরাকিছুক্ষণ আগে এ ঘটনা যদি না শুনতাম, তাহলে এ ঘটনা শুনে ঘাবড়ে ভেগে যেতাম। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমুতে পারতাম না। আমাদেরমুখমণ্ডলে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ে যতো। কিন্তু আমরা ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তাই দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে’ যেমন চোখের পানিটপ টপ করেঝরে পড়ে, আবার আনন্দের আতিশয্যেহাততালি দিতেও ইচ্ছে করে। এমন সময় পর্দা পড়ে গেল। অবস্থা এমন হয়ে গেল ঘটনার মর্মান্তিকতায় চোখ থেকে টপ টপ করে পানিঝরছে আবার আনন্দে হাততালি দেয়া হচ্ছে। হৃদয়ের তন্ময়তায় নাড়া দিয়ে এক আওয়াজ শোনা গেল। ঘোষক ঘোষণা করছে:

(আরবী**********)

এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা! সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা সতর্ককরে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তানগ্রহণ করবেন। তিনি পবিত্র ওমহিমাময় সত্তা। যখন তিনি কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন বলেন: ‘হও’ আর অমনিতা হয়ে যায়। (সে শিশু আরো বললো:) নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও। অতএব, তোমরা তাঁর ইবাদত করো, এটিই সরল-সোজা পথ। (সূরা মারইয়াম: ৩৪-৩৬)

এখানেপৌঁছে দ্বীনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং সেই সাথে ঘটনার দৃশ্য ও ছবি দুটোই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে যে কথাটি বলা যায়, তা হচ্ছে এটি আবেগ-অনুভূতির সর্বোত্তম একটি চিত্র।সমস্ত ঘটনায় এ রঙ ছেয়ে আছে। যারকারণে অন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ ম্লান হয়ে গেছে।

কাহিনীতে ব্যক্তিত্বের ছাপ

এবার আমরা আল-কুরআনের ‍দৃশ্যায়নের তৃতীয প্রকার নিয়ে আলোচনা করছি। একটি চিত্রায়ণের অন্যান্য প্রকারেরমধ্যে একটি, তবু এটিকে পৃথক করবর্ণনাকরার প্রয়াসস পাচ্ছি। এটিব্যক্তিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট।

ইতোপূর্বে বর্ণিত দুই বাগানমালিক ও তার সাথী হযরতমূসা (আ) ও একজন সৎলোকের কাহিনী দুটোতেও ব্যক্তিত্বেরছাপ পুরোপুরি পরিলক্ষিত হয়। ঘটনাব্যক্তিত্বের সাথে জড়িত। তাই ঘটনা বর্ণনায় ব্যক্তিত্বের প্রকাশ অত্যন্ত উঁচুমানের শিল্প। পুরোকাহিনীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যক্তিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট।চাই সেস ঘটনা- কুরআনের সাথে সংশ্লিষ্ট হোক কিংবা শিল্পকলার সাথে।

যদিও কুরআনে শুধুমাত্র দ্বীনের দাওয়াতের প্রয়োজনেই বিভিন্ন ঘটনা ও কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। তাই যে কোন ঘটনাবা কাহিনীর প্রধান লক্ষ্যহচ্ছে দাওয়াতে দ্বীন। তবুব্যক্তিত্ব চিত্রণকে তা থেকে পৃথক করে দেখা যায়না। এ বৈশিষ্ট্যটি কুরআনের সমস্তকাহিনীতেই বিদ্যমান। ব্যক্তিকে মানবিক উপমা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কুরআনে এমন কিছুব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যারা ব্যক্তিত্বের সীমা ছড়িয়ে ‘উপমার মানুষ’ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। আমরা এ প্রসঙ্গে নিচেকয়েকটি ঘটনারপর্যালোচনা করবো।

১.চঞ্চল প্রকৃতির নেতা

উদাহরণ স্বরূপ আমরা মূসা (আ)-এরকথা বলতে পারি। তিনি ছিলেন একজন চঞ্চলপ্রকৃতির নেতা।

হযরত মূসা (আ) ফিরাউনেরপ্রাসাদে লালিত-পালিত হয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন। তিনিছিলেন সুঠাম ও সবল দেহের অধিকারী।

(আরবী**********)

একদিন সে শহরে প্রবেশ করলো, তখন তার অধিবাসীরা ছিল বেখবর। সেখানে দুই ব্যক্তিকে লড়াই করতে দেখল। এদের একজন ছিল তার ‍নিজ দলের এবং অন্যজন তার শত্রুদলের। অতপর যে তার নিজদলের সে তার শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধেতারকাছেসাহায্য প্রার্থনা করলো।তখন মূসা তাকে ঘুষি মারল, তাতেই লোকটি অক্কা পেল। (সূরা আল-কাসাস: ১৫)

এ ঘটনায় দুটো কথা স্পষ্টহয়ে উঠেছে। এক: হযরত মূসা (আ) –এর জাতিপ্রীতি। দুই :চঞ্চল প্রকৃতিরস্বভাব।কারণ তার জাতির একজন লোক তাঁর সাহায্য চাইল আর অমনি তিনিতাঁর পক্ষ নিয়ে ঘুষি মেরেতারজীবনলীলা সাঙ্গকরে দিলেন। তারপর তিনি লজ্জিত হয়েবললেন:

(আরবী**********)

মূসাবললো: এটি শয়তানের কাজ। নিশ্চয়ই সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। সে আরো বললো: হে আমার প্রতিপালক! আমিতো নিজের ওপরজুলুম করে ফেলেছি। অতএব, আমাকে ক্ষমাকরে দাও।আল্লাহ তাঁকেক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনিক্ষমাশীল, দয়ালু।সেবললো: হে আমার পরওয়ারদিগার! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহকরেছেন,এরপর আমিকখনওঅপরাধীদের সাহায্যকারীহবো না। (সূরাকাসাস:১৫-১৮)

তারপরবলা হয়েছে:

(আরবী**********) অতপর সে প্রভাতে সেই শহরে ভীত-সন্ত্রস্তঅবস্থায় উঠলো। (সূরা কাসাস:১৮)

এ আয়াতে অতি পরিচিত এক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যখনমানুষ ঘাবড়ে যায় তখন সে এদিক-ওদিক তাকায় এবং পথ চলে। কারণ সে আর পুনরায় এ অবস্থার মুখোমুখি হতেচায় না।চঞ্চল প্রকৃতির মানুষের অবস্থা এমনইহয়ে থাকে।

হযরতমূসা (আ) ওয়াদাকরেছিলেনআর কাউকে তিনি বিপদে সাহায্য করবেন না। আসুন আমরা দেখি, তিনকতোটুকু স্তির চিলেন তাঁরএ সিদ্ধান্তে। হঠাৎ তিনি দেখলেন:

(আরবী**********)

হঠাৎ সে দেখলো, গতকাল যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল, সে চিৎকারকরে তার সাহায্য প্রার্থনা করছে। মূসা তাকে ব ললো: তুমি তো একজন প্রকাশ্র পথভ্রষ্ট ব্যক্তি। (সূরা আলকাসাস:ড় ১৮)

কিন্তু তিনি ভুলে গেলেন তার প্রতিশ্রুতি। তিনি তার দিকে এগিয়ে গেলেন। আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতেচাইলেন।কারণ তিনি ছিলেনচঞ্চল প্রকৃতির মানুষ। এজন্য তিনি ভুলে গেলেন যে, এ ধরনের কাজ থেকে তিনি লজ্জিত হয়ে দরবারে ইলাহীতে মাফ চেয়েছেন। যখন তাঁকে অতীতের অপরাধের কথা স্মরণকরিয়ে দেয়াহলো, তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন।

(আরবী**********)

অতপর মূসা যখন উভয়েরশত্রুকে শায়েস্তাকরতে চাইল, তখন সে বললো: গতকাল তুমিম যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে তেমন আমাকও কি তুমিহত্যা করতেচাও? তুমিতো পৃথিবীতে স্বৈরাচারী হতে চলছো, তুমি সংশোধনকারী হতে চাও না। (সূরা কাসাস:১৯)

এমন সময এক ব্যক্তি এসে তাকে শহর থেকে পালিয়ে যাবার জন্য পরামর্শ দিলো। আমরা জানি তিনি এ পরামর্শ ‍অনুযায়ী দেশান্তরহলেন। আপাতত তাকে ছেড়ে দিন। আসুন, দশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা তাঁর সাথে মিলিত হেই। এ দীর্ঘ সময়ে কি তাঁর স্বভাবে কোন স্থিতিশীলতা এসেছিল? তিনি কি শান্ত ও স্থিরচিত্তের অধিকার হতে পেরেছিলেন?

নিশ্চয়িই নয়। তাঁর স্বভাব-প্রকৃতিতেমৌলিক কোন পরিবর্তন হয়নি। যখন তুর পাহাড়ের ডান প্রান্ত থেকে আওয়াজ হলো: তোমার লাঠি নিক্ষেপ করো। তিনি তা নিক্ষেপ করলেন কিন্তু যখন লাঠি চলমান সাপে রূপান্তর হয়ে গেলে, তা দেখে তিনি ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে লাগলেন। একারও তিনি পেছন ফিরে দেখলেন না। পরিণত বয়সেও তিনি পূর্বের অভ্যাস ত্যাগ করতে পারলেন না।– অবশ্য ঐ অবস্তায় সবাই দৌড়াবে- কিন্তু তিনি সবার আগে দৌড়ালেন। এক মুহূর্তের জন্য থেমে তিনি দেখার চেষ্টা করলেন না, সেখানে কি ঘটছে।

যাদুকরদের ওপর বিজয়ী হলেন, বনী ইসরাঈলকে ফিরাউনের নির্যাতনের কবল থেকে উদ্ধার করলেন। তাদেরকে সমুদ্র পার করে দিলেন, তারপর নির্দিষ্ট সময়ে তুর পাহাড়ে পৌঁছলেননবুওয়াতের কল্যাণ লাভের জন্য। কিন্তু তবু তিনিতুর পাহাড়ে গিয়ে আল্লাহর নিকট এক আযব বায়না ধরলেন:

(আরবী**********)

মূসা বললো: প্রভু আমার!আমাকে দেখা দাও। আমি তোমাকে দেখবো। আল্লাহ বললেন:তুমি আমাকে কখনো দেখতে পাবে না। তুমি পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাক, যতি তা স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে তবে তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। (সূরা আল-আরাফ: ১৪৩)

তারপর যা ঘটলো তা শুধু মূসা (আ) কেন, পৃথিবীর কোন মানুষই হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম নয়।

(আরবী**********)

অতপর যখন তার রব্ব পাহাড়ের ওপর আপন জ্যোতির বিকিরণ ঘটালেন সাতে সাথে বিধ্বস্ত হ য়ে গেল এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল। যখন জ্ঞান ফিরে পেল তখন বললো: হে পরোয়ারদিগার! তোমার সত্তা পবিত্র, আমি তোমার কাছে তওবা করছি এবং আমিই সবার আগে বিশ্বাস করলাম। (সূরা আল-আ’রাফ: ১৪৩)

মূসা (আ) তাই করলেন, যা একজনচঞ্চল প্রকৃতির লোক করে থাকে।

এখানেই শেষ নয়। যখন তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন, তাঁর কওম একটি বাছুর পূজা করছে, হাতে তওরাতের তখতী ছিল, যা প্রভু তাঁকে দিয়েছিলেন, তিনি কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই তা সজোরেমাটিতে নিক্ষেপ করে ভাইয়ের দাড়ি ধরে তাকে টানা-হেঁচড়াকরতে লাগলেন। তাঁর কথা পর্যন্ত শুনতে রাজী হলেন না। তাই বলতে লাগলেন:

(আরবী**********)

হে আমর জননী তনয়! আমার দাড়ি ও মাথার চুল ধরে টানাটানি করো না, আমি ভয় করেছিলম, তুমি বলবে: তুমি বনী ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছো এবং আমার কথা স্মরণ রাখনি। (সূরা ত্ব-হা: ৯৪)

যখন তিনিজানতে পারণে, বাছুর পূজার ব্যবস্থা করেছে সামেরী নামক এক ব্যক্তি, তখন তাঁর সমস্ত আক্রোশ তার দিকে পতিত হলো। তিনি সামেরীকে লক্ষ্য করে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন:

(আরবী**********)

মূসা বললো: দূর হ, তোর জন্য সারা জীবন এ শাস্তি রইলো, তুই বলবি আমাকে স্পর্শ করো না। তোরজন্য একটি নির্দিষ্ট ওয়াদা আছে, যার ব্যতিক্রম হবে না। তুই তোর সেই ইলাহ্‌র প্রতি লক্ষ্য কর যাকে তুই আগলে থাকতি। আমরা তাকে জ্বালিয়ে দেবো এবং বিক্ষিপ্ত করে সাগরে ছুড়িয়ে দেবো। (সূরা ত্ব-হা: ৯৭)

হযরত মূসা (আ) এসব কিছুই করেছিলেন রাগের বশবর্তী হয়ে। আসুন আমরা তাঁকে আরও ক’বছরের অবকাশ দেই।

মূসা (আ)-এর জাতি তীহ প্রান্তরে অবস্থান করছে। আমাদের ধারণা যখন তিনি তাঁর জাতি থেকে পৃথক হন তখন তিনি পৌঢ়ত্বে পা দিয়েছিলেন। এক সৎব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তাঁর সাহচর্যে থেকে উপকৃত হবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আমরা জানি সেখানেও তিনি ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারেননি। যা হোক অবশেষে সৎব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত আচরণের ব্যাখ্যা প্রদান করতঃ তাঁকে পৃথক করে দেন।

এ ছিল হযরত মূসা (আ)-এর ব্যক্তিত্ব। যা কাহিনীর পরতে পরতে উপমার মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

২. কোমল হৃদয়- সহনশীল ব্যক্তিত্ব

হযরতমূসা (আ)-এর চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র হযরত ইবরাহীম (আ)-এর। হযরত ইবরাহীম (আ) ছিলেন কোমল হৃদয় ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********) নিঃসন্দেহে ইবরাহীম ছিলেন বড় কোমল হৃদয় সহনশীল ব্যক্তি। (সূরা তওবা: ১১৪)

তিনি শৈশবেই আল্লাহর সন্ধান লাভের প্রচেষ্টা করতে গিয়ে গভীরভাবেচিন্তা-ভাবনা করেছিলেন এভাবে। ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

যখন রাতের আঁধার তাকে আচ্ছন্ন করে নিল, তখন সে একটি তারকা দেখতে পেল। বললো: এ আমার প্রতিপালক। অতপর যখন তা অস্তমিত হলো, তখন বললো: আমি অস্তগামীদেরকে ভালবাসি না। তারপর যখন ঝলমলে চাঁদ দেখল, তখন বললো: এটিই আমার প্রতিপালক। অনন্তর যখন তা অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন বললো: যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথপ্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। তারপর যখন আরও উজ্জ্বল সূর্যকে দেখল, বললো: এ-ই আমার প্রতিপালক, এ সবচেয়ে বড়। যখন তা-ও অস্তমিত হয়ে গেল, তখন বললো: হে আমার জাতি, তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক করো আমি সেসব থেকে মুক্ত। আমি একমুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্ত্বারদিকে ফিরলাম যিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিক নই। তাঁর সাথে তাঁর জাতির লোকেরা বিতর্কে লিপ্ত হলো। সে বললো: তোমরা আমার সাথে আল্লাহরএকত্ববাদ নিয়ে বিতর্ক করছো? অথচ তিনি আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তোমরা যাদেরকে শরীক করো আমি তাদেরকে ভয় করি না তবে যদি আমার পালনকর্তা কোনকষ্ট দিতে চান তা ভিন্ন কথা। আমার পালনকর্তা প্রত্যেক বস্তুকেই স্বীয় জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। তোমরা কি চিন্তা-ভাবনা করো না? (সূরা আল-আনআম: ৭৬-৮১)

যখন হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলেন, তখন অত্যন্ত নরম সুরে ও মহব্বতের সাথে তিনি সর্বপ্রথম পিতাকে তওহীদের দিকে আহ্বান জানালন:

(আরবী**********)

যখন সে তাঁর পিতাকে বললো: হে আমার পিতা! যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না তার ইবাদত করো কেন? হে আমার পিতা! আমার কাছে এমনজ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। সুতরাং আমার অনুসরণ করো, আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। পিতা! শয়তানের অনুসরণ করো না, শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শ করবে, অতপর তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে। (সূরা মারইয়াম: ৪২-৩৫)

কিন্তু ইবরাহীম (আ)-এর পিতা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো এবং ধমকের সুরে বললো:

(আরবী**********)

বললো: হে ইবরাহীম! তুমি আমার ইলাহদের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যতি তুমি বিরত না হও, আমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে তোমাকে হত্যা করবো। তুমি চিরতরে আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও।

কিন্তু পিতার এ শক্ত আচরণেও তাঁকে ধৈর্য ও সহনশীলতারসীমা পরিহার করতে দেখা যায়নি এবং তাঁকে উদ্ধ্যত প্রকাশ করতেও দেখা যায়নি। বরং ভদ্র ও নম্রভাবে উত্তর দিলেন:

(আরবী**********)

ইবরাহীম বললো: তোমার ওপর শান্তিবর্ষিত হোক। আমি আমার রব্বের কাছে তোকারজন্য ক্ষমা প্রার্থন করবো। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি মেহেরবান। আমি পরিত্যাগ করছি তোমাদেরকে এবং তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করো তাদেরকে, আমি আমার পালনকর্তার ইবাদত করবো। আশা করি আমি আমার পালনকর্তার ইবাদত করে বঞ্চিতহবো না। (সূরা মারইয়াম: ৪৭-৪৮)

তারপর হযরত ইবরাহীম (আ) মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দিলেন। সম্ভবত এটিই একমাত্রকাজ যা তিনি কঠোর মনোভাব নিয়ে সম্পাদন করেছিলেন। আল্লাহর অপার মহিমার বদৌলতেই তিনি মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করতে পেরেছিলেন। আর এ ধারণা করেছিলেন, যখন তাঁর জাতি মূর্তিগুলো বিধ্বস্ত-বিক্ষিপ্ত দেখবে তখন তারা একথা মনে করতে বাধ্যহবে, মূর্তি তো কখনো নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কারণে নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। অতএব অবশ্যই কেউ তাদেরকে ধ্বংসকরেছে। তিনি মনে করেছিলেন এভাবে তাঁরজাতি ঈমান আনবে। অবশ্যই তারা মনে মনে বললো:

(আরবী**********) অতপর তারা মনে চিন্তা করলো এবং বললো: লোক সকল! তোমরাই জালিম। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৪)

যখন তাঁর জাতিতাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নিলতখন আল্লাহ বললেন:

(আরবী**********)আমি বললাম: হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের ওপর ঠাণ্ডা নিরাপদহয়ে যাও। (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)

অতপর হযরত ইবরাহীম (আ) ঈমানদারদেরকে নিয়ে হিজরত করলেন। ঈমানদারদের মধ্যে তাঁর ভাতিজা হযরত লূত (আ)-ও চিলেন।তারপর বার্ধক্যেআল্লাহ হযরত ইসমাঈল নামক এক পুত্র সন্তান দান করেন। কিন্তু ঘটনা অন্যদকে মোড় নেয়, তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে অন্যত্ররেখে আসতে বাধ্য হন। আল-কুরআন তার কারণ সম্পর্কে নিরব। শুধুমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাদেরকে একনির্জন ভূমিতে রেখে আসেন। তখন অত্যন্ত অনুনয়-বিনয় ও কাতরকণ্ঠে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেন।

(আরবী**********)

হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমার পালনকর্তা! যাতে তারা নামায কায়েম রাখে। আপনি কিছু লেকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিন এবং তাদেরকে ফলমূল রিযিক প্রদান করুন। সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। (সূরা ইবরাহীম: ৩৭)

হযরত ইসমাঈল (আ) তখনও যৌবনে পদার্পণ করেননি, সবেমাত্র কিশোর। এমতাবস্থায় হযরত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে দেখেন, তিনি ইসমাঈল (আ)-কে যবেহকরচেন। স্বপ্ন ভঙ্গের পর তিনি ঈমানের পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তখন আল্লাহ তাঁর ওপর দয়াপরবশ ইসমাঈল (আ)-এর পরিবর্তে ‘যবহে আযীম’ বাবড়কুরবানী প্রদান করেন।

বস্তুতহযঙরত ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে যতো ঘটনাবা উপাখ্যান পাওয়া যায়, তা থেকে একটি কথাই প্রতীয়মান হয়, তিনি অত্যন্ত কোমল স্বভাবের এবং সহনশীল প্রকৃতির লোক ছিলেন। এসম্পর্কে স্বয়ং কুরআন সার্টিফিকেট দিচ্ছে:

(আরবী**********) নিঃসন্দেহে ইবরাহীম ছিল- বড়ই ধৈর্যশলী, কোমল হৃদয় ও আল্লাহপন্থী (সূরা হূদ : ৭৫)

৩. হযরত ইউসুফ (আ)]

হযরত ইউসুফ (আ) একজন জ্ঞানী ও বিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের প্রতিভূত ছিলেন।

দেখুন আজীজের স্ত্রী তাকেকুকর্ম করার জন্য ফুসলাচ্ছিল এবং তার কথা না শোনারজন্য তাকে ভয়ও দেখাচ্ছিল। কিন্তু তিনি দৃঢ়তার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আজীজের বাড়ীতে থাকতেন তাই তিনি সবাইকে সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। তাই এমন কোন কথা যেন না হয় যাতে তার মান-সম্মান ভূলুণ্ঠিত হতে পারে সর্বদা তিনি সেই প্রচেষ্টা করতেন।

ইরশাদ হচ্ছে:

(আরবী**********)

নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিল এবং সে-ও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করতা, যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শন দেখত এভঅবে, আমি তার থেকেমন্দ নির্লজ্জ বিষয়সমূহ সরিয়ে দেই। নিশ্চয়ই সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন। (সূরা ইউসুফ: ২৪)

একটু আগে বেড়ে দেখুন মহিলার আসল চেহারা:

(আরবী**********)

তারা উভয়ে ছুটে দরজার দিকে গেল এবং মহিলা ইউসুফের জামা পেছন থেকে ছিঁড়ে ফেললো। (সূরা ই্উসুফ: ২৫)

হঠাৎ ঐ আওয়াজ পেল, যে আওয়াজে স্ত্রী ভয় পেত।

(আরবী**********) এবং তারা উভয়ে মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল।

একানে মহিলা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তিনি ইউসুফ (আ)-এর ওপর অপবাদ দিলেন:

(আরবী**********) মহিলা বললো: যে তোমার পরিজনের সাথে কুকর্ম করার ইচ্ছে পোষণ করে।

যেহেতু মহিলা হযরত ইউসুফ (আ)-এর জন্য প্রেম উন্মাদিনী ছিলেন তাই তিনি চাইতেন না, এজন্য ইউসুফ (আ)-এর কঠিন কোন শাস্তি হয়ে যাক। এজন্য নিজেই একটু হাল্কা শাস্তির আভাস দিয়ে বললেন:

(আরবী**********) তাকে কারাগারে পাঠান কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি চাড়া (আর কি শাস্তি দেয়া যায়)। (সূরা ইউসুফ: ২৫)

ভদ্রভাবে সত্য কথাটি বলে দিলেন।

(আরবী**********) সে বললো: সে-ই আমাকে আত্ম