শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

শিক্ষা

শিক্ষার মৌল উদ্দেশ্য

মানুষের মন নিস্পন্দ বা অনুভূতিহীন দর্পন নয়। দর্পনে প্রতিমুহূর্তের পরিবর্তনশীল অবস্থা, অনুভূতি ও প্রকৃতির রঙ-বেরঙের বহিঃপ্রকাশ যথাযথভাবে প্রতিবিম্বিত হয়। কিন্তু মানুষের মন সেরূপ নয়। মানব মন কখনই নিষ্ক্রিয় থাকে না। তা প্রতিমুহূর্ত সচেতন ও সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ভাবধারা ও উপাদান-মিশ্রিত অবস্থা ও ঘটনাবলীর একটা বিশেষ প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করে।

এখন প্রশ্ন এই যে, আমাদের চেতনায় অবস্থাসমূহের এই প্রতিবিম্ব বা প্রকৃতির চিত্র কি স্বতঃই গড়ে ওঠতে থাকে এবং চেতনা নিজ থেকেই কি তাতে যেমন ইচ্ছা রঙ লাগায় কিংবা চেতনা তার এই সুসজ্জিত ও অলংকারিত হওয়ার জন্যে বাইরের প্রেরণার মুখাপেক্ষী? দুনিয়ার বিশেষজ্ঞদের নিকট একথা সুস্পষ্ট যে, নিছক চেতনার নিজস্বভাবে এ ধরণের কোন শক্তি বা ক্ষমতা নেই। মানব মন প্রভূত শক্তি ও প্রতিভার উৎস, সন্দেহ নেই। যাচাই-বাছাই, গ্রহণ-বর্জন, বিন্যস্তকরণ ও রূপায়নের বিপুল শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের মনে। তার হৃদয়ানুভূতিকে যতোই Objective বলা হোক এবং বিভিন্ন অবস্থা, ঘটনাবলী ও পর্যবেক্ষণ থেকে আহরিত ফল তার পটভূমি প্রতিচ্ছায়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও সুরক্ষিত বলে যতো দাবিই করা হোকনা কেন, সে দাবি নিরর্থক অহমিকা ও অন্তঃসারশূণ্য আত্মম্ভরিতা ছাড়া আর কিছুই না, এটা বলাই বাহুল্য।

কোন জীবন্ত সত্ত্বা মহাশূণ্যে শ্বাস গ্রহণ করতে পারে না, এ যেমন সত্য, অনুরূপভাবে এ-ও সত্য যে, মানুষের মন আদর্শিক শূণ্যতার মধ্যে কাজ করতে পারে না; এ ক্ষেত্রে বিশ্বাস ও প্রত্যয় হচ্ছে তার একমাত্র অবলম্বন। তারই সাহায্যে তাকে অগ্রসর হতে হয় জ্ঞানান্বেষণের বিশাল বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে। যেসব সুধী নিজেদের চিন্তা-গবেষণায় Objective-এর ওপর গৌরববোধ করেন এবং যাঁরা দাবি করেন যে, তাঁরা অবরোহী চিন্তা-পদ্ধতির (Deductive) আদিম ও প্রচীন পন্থা পরিত্যাগ করে আরোহী চিন্তা-পদ্ধতির (Inductive) আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পন্থা অবলম্বন করেছেন তাঁদের জ্ঞান-তথ্য ও গবেষণালব্ধ ফলগুলো গভীর সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করা হলে নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, তাঁরাও হৃদয়ের মণিকোঠায় প্রচ্ছন্ন বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের দীপ জ্বালিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের বিশাল ও বিস্তীর্ণ প্রান্তরে পদক্ষেপ গ্রহণের দুঃসাহস করেছেন। এ এমন এক মহাসত্য, দুনিয়ার বড় বড় চিন্তাবিদরাও তা মেনে নিতে একান্তভাবে বাধ্য। এ পর্যায়ে John Gaird লিখিত ‘‘An Introduction to Philosophy of Religion’’ নামক গ্রন্থ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে। তিনি বলেছেনঃ

‘‘চিন্তা-গবেষণার প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের মনের নিভৃত গহনে প্রচ্ছন্ন ধারণাসমূহ থেকেই পথ-নির্দেশ লাভ করতে হয়। কেননা আমরা যা কিছুর সন্ধান করি, তার মূল্য ও গুরুত্ব সে সব ধারণা-বিশ্বাসের নিক্তিতে ওজন করেই অনুমান করা যায় আর সে সব ধারণার ভিত্তিতে রচিত মানদণ্ডেই সে সবের সত্যতা ও যথার্থতা পরীক্ষা ও যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। কোন চিন্তা-গবেষণাই নিজস্ব ধারণা-বিশ্বাস ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসম্পর্ক ও নিরপেক্ষ হয়ে পরিচালিত করা কারোর পক্ষেই সম্ভবপর নয়। নিজের ছায়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যেমন কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি চিন্তা-গবেষণার ফল গ্রহণ না করাও কারোর সাধ্য নেই।’’

প্রখ্যাত গ্রন্থকার Beven তাঁর Symbolism of Belief গন্থে এ ধরণের মনোভাব প্রকাশ করে লিখেছেনঃ

‘‘আমরা শুধুমাত্র বাস্তবতার মধ্যে জড়িয়ে থাকতে পারিনা। আমরা যখন কোন বাস্তব জীবনের দিকে পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তখন আমরা আমাদের কর্ম-ক্ষমতা ও তৎপরতা যাচাই করার জন্যে আমাদের নিজস্ব মৌল ধারণা-বিশ্বাসসমূহের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হই। বস্তুত এ এমন একটা সত্য যার স্বপক্ষে বহু চিন্তাবিদের সমর্থন উদ্ধৃত করা যেতে পারে। এ থেকে এ সত্য অতি সহজেই উপলব্ধি করা যেতে পারে যে, মূলত অবস্থা ও ঘটনাবলীর সুসংবদ্ধ অধ্যয়নই হচ্ছে শিক্ষা ও তাকে কোন ব্যক্তি ও জাতির মৌল চিন্তা-ভাবনা ও মতাদর্শ থেকে কোন অবস্থায়ই বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারেনা। এ কারণেই মৌল বিশ্বাসের দিক দিয়ে মানুষে মানুষে যে পার্থক্য ধর্ম-বিশ্বাসের পার্থক্যের দরুন, তাকে স্বীকার করেই বিভিন্ন বিশ্বাস-অনুসারীদের শিক্ষাও বিভিন্ন হতে বাধ্য। এ সত্যকে অস্বীকার করা হলে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং তার জন্যে বিভিন্ন মৌল বিশ্বাসসম্পন্ন মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।’’

জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে অন্যান্য সব রকমের জ্ঞান-শাখাকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র জীব-বিজ্ঞান, প্রকৃতি-বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কেই বলা যেতে পারে, এগুলোর Objectivity সম্পর্কে অনেক দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদ বিজ্ঞানীদের নিকট সর্ব-সমর্থিত মহাসত্য বলে গৃহীত। কিন্তু সকল প্রকার বিদ্বেষ, হৃদয়াবেগ ও আসক্তির আবিলতা থেকে সম্পুর্ণ মুক্ত হয়ে অধ্যয়ন করলে নিঃসন্দেহে প্রতীয়মান হবে যে, এই মতবাদটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের ফসল নয়। এর অনেকগুলো ধারাই ইউরোপীয়দের নিজস্ব অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারপ্রসূত। ধর্মবিমুখ ইউরোপীয়রা একবার যখন নিজেদের মন মগজে এই ধারণা বদ্ধমূল করে নিয়েছে যে, এই বিশ্বলোক স্বয়ম্ভু-এর স্রষ্টা বলে কেউ নেই, এ জগত একটি ধরাবাঁধা ও শাশ্বত নিয়মের অধীনের স্বতঃই চলমান ও প্রবহমান, এর কোন পরিচালকও নেই, এই ক্রমবৃদ্ধি, ইচ্ছামূলক গতিশীলতা, অনুভূতি, চেতনা, মন-মানসের উন্মেষ, স্বজ্ঞা (intuition) সব কিছু বস্তুরই উন্নতিলব্ধ বিশেষত্ব, তখন ক্রমবিকাশ সংক্রান্ত ডারউইনী মতবাদ তাদের নিকট হারানো স্বর্গের পুনঃপ্রাপ্তিরূপে বিবেচিত না হওয়ার কোন কারণই থাকতে পারে না। কেননা এই মতবাদেই তারা বিশ্বলোক সম্পর্কিত তাদের বিশেষ ধারণা ও দৃষ্টিকোণের বাস্তব ব্যাখ্যা পেয়ে গেছে। বহু প্রখ্যাত বিজ্ঞানীই এই সত্যকে অকপটে স্বীকার করেছেন। এখানে মাত্র একজন বিজ্ঞানীর অভিমতই উদ্ধৃত করা যথেষ্ট হবে।

Arnold Lunn তাঁর Revolt against Reason গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেনঃ ডারউইনবাদ বিজ্ঞান নয়। তা একটি পুরোপুরি ধর্মমত, তাতে যুক্তিসঙ্গত সুসংবদ্ধতার দাবি যতই করা হোক না কেন। আর মানুষের নিজেদের রচিত এই ধর্মমতে যুক্তি-প্রমাণের তুলনায় অন্ধ বিশ্বাস ও ভাবাবেগ অধিক প্রবল হয়ে রয়েছে। (পৃষ্ঠা ১৬৭)

শিক্ষার মূল্যায়ন

শিক্ষা সম্পর্কে একটা ধারণা হচ্ছে, তা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের বিকাশ সাধন করে। তাই সূক্ষ্ণ ও সুকোমল হৃদয়াবেগ পরিমার্জিতকরণের উদ্দেশ্যেই শিক্ষা অর্জন করতে হবে। কিন্তু অধুনা এই ধারণা নিতান্তই পুরাতন এবং অনেক সেকেলে-আগের বলে বিবেচিত। আধুনিক কালের প্রবণতা হল শিক্ষাকে ব্যবহারোপযোগী বানাতে হবে; ব্যবহারিক মূল্যের দৃষ্টিতে অধিকতর মূল্যবান, এমন শিক্ষা অর্জনই হবে লক্ষ্য। শিক্ষার আলোয় হৃদয়লোককে উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত ও জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে তোলা আজ আর লক্ষ্যরূপে নির্দিষ্ট থাকেনি। অথচ আজকের দুনিয়ায়ও আমাদের সর্বাধিক প্রয়োজন হচ্ছে এমন শিক্ষা ব্যবস্থার যা আমাদের মনকে সর্বপ্রকার কলুষ থেকে মুক্ত করবে, মানসিক রোগের জীবাণু বিনষ্ট করে দেবে এবং মানবতার সকল দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনা ও লুণ্ঠন বন্ধ করে দেবে; সেই সঙ্গে তা মানবীয় প্রয়োজন পূরণার্থে প্রাকৃতিক উপায়-উপকরণ পূর্ণ মাত্রায় প্রয়োগ করার, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্যে প্রয়োজনীয় খোরাক-পোশাক ও বাসস্থানের ইনসাফপূর্ণ বন্টনের ব্যবস্থা করার, সকল প্রকার প্রকৃতিক বিপর্যয়, ঝড়-তুফান ও বন্যা-প্লাবনের মাত্রা ক্রমাগত হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং সকল শ্রেণীল মানুষের জন্যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ-স্ফূর্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করার যোগ্য হবে। এগুলো একান্তই জরুরী। যে শিক্ষার মাধ্যমে এ কাজগুলো সম্ভব তা যে মানবতার পক্ষে খুবই কল্যাণকর, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটু গভীর চিন্তা-বিবেচনা করলে যে কেউই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য হবেন যে, মানব-প্রকৃতি নিহিত কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য ইত্যাদি স্বভাবজাত রিপুসমূহের কল্যাণময় ও ভারসাম্যপূর্ণ চরিতার্থতাই লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব করে দেবে। এর কোন একটিকেও নির্মূল করার প্রবণতা কারোর মধ্যেই জাগবে না। কাজেই উচ্চতর শিক্ষার চরম লক্ষ্য যদি শুধু এটুকুই হয়, তাহলে এ শিক্ষা তার আসল তাৎপর্যই হারিয়ে ফেলবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, মানবীয় উন্নতি বিধানে যারা উপস্থিত, তাৎক্ষণিক ও দ্রুত সুফল লাভের উদ্দেশ্যে শ্রম করেছে তাদের তুলনায় যারা জ্ঞানার্জনের জন্যে নিজেদের সম্পূর্ণূরূপে সমর্পিত  করে দিয়েছে তারা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছে- এদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন। কাজেই পূর্বোক্ত ধরণের শিক্ষাই মানুষের কাম্য আর তা কেবলমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে পাওয়া জ্ঞান-উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই পাওয়া সম্ভব।

কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই যে, মানুষের জ্ঞানগত পরিধি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সমস্যা ততই জটিল হতে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বস্তুগত অগ্রগতি যত বেশী লাভ করছে, নিত্য-নতুন কামনা-বাসনা, নতুন নতুন সমস্যা ও জটিলতা এবং নানারূপ নৈরাশ্য ও বঞ্চনার হাহাকার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অধুনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি ধ্বংস ও বিনাশের এমন সব হাতিয়ার উদ্ভাবনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যার দরুন মানবতার অস্তিত্বই কঠিন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এটা যে কতবড় মারাত্মক ব্যাপার তা বলে শেষ করা যায় না। পরন্তু একটিকে মানুষ মানবীয় সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি বিধানের চেষ্টায় নিয়োজিত, অপরদিকে সে অত্যন্ত তীব্র গতিতে ভিত্তিহীন ধারণা-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। ফলে মানুষ এক স্থায়ী অশান্তি, দুঃখবোধ ও মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। মানুষ যত তীব্রতা ও আন্তরিকতার সাথে বিশ্ব-প্রকৃতিকে জয় করতে শুরু করেছে, তা আমাদেরকে প্রায় ততটাই ভুলিয়েই দিয়েছে যে, আসলে আমরা কেবল দৈহিক কামনা-বাসনারই অধিকারী, ‘‘আত্মা’’ বলতেও একটি জিনিস আমাদের রয়েছে। দেহের জীবন এবং ক্রমবৃদ্ধির জন্যে যেমন খাদ্য অপরিহার্য,মনের পরিশুদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা বিধানের জন্যে যেমন প্রয়োজন শিক্ষার, তেমনি আত্মার উন্নতি সাধনের জন্যে দরকার ঈমানের আর ঈমান হচ্ছে কতকগুলো মৌল সত্যের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যয়, যে প্রত্যয় শত প্রতিকূল ঝঞ্ঝাবাত্যার আঘাতেও বিন্দুমাত্র নষ্ট বা দুর্বল হবে না। বস্তুত ঈমান বিনষ্ট হওয়া কঠিনতম দৈহিক রোগ অপেক্ষাও অধিক মারাত্মক ও বিপজ্জনক। প্রাচীন মানুষের ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ একথা মেনে নিতে আমাদের বাধ্য করেন যে, বহুসংখ্যক প্রাচীন জাতি ও গোত্র কেবলমাত্র এ জন্যেই পৃথিবীর বুক থেকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যে, তারা তাদের নিজস্ব জীবন পদ্ধতির প্রতি ঈমান ও প্রত্যয় হারিয়ে ফেলেছিল। ইতিহাসের এ এমন এক শিক্ষা যা কোন সময়ই এবং কারোরই ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এরূপ ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি সংঘটিত হওয়া প্রত্যেকটি জাতির জন্যেই অবাঞ্ছনীয়। আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় সত্ত্বার স্থিতি আমাদের কাম্য হলে মূল মানবীয় মূল্যমান ও মূল্যবোধের ওপর নিজেদের প্রত্যয়কে পুনরুজ্জীবিত ও দুঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে শিক্ষা শুধু আমাদের দৈহিক ও বৈষয়িক জীবন রক্ষা ও উন্নতি বিধানের পথ-প্রদর্শন করে ও উপায়-উপকরণ সংগ্রহের প্রযুক্তি শিখায়-কেবলমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষই যার একমাত্র অবদান, সে শিক্ষা আমাদের জন্যে কল্যাণকর হতে পারে না। তাই জাতীয় শিক্ষাকে আমাদের একান্ত নিজস্ব মানবীয় মূল্যমানের প্রতি ঈমানদার বানাতে হবে। কেননা শুধু ঈমানই আমাদের আত্মাকে সুস্থ, সবল, স্বচ্ছ ও সফল করতে সক্ষম।

বর্তমানে আমরা এক নবতর সামষ্টিক ব্যবস্থার রূপায়নে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ সামষ্টিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কি রূপ পরিগ্রহ করবে? এ প্রশ্নের জবাব এই যে, আমরা আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে কোন্ সব মূল্যমান ও মূল্যবোধের চেতনা জাগাতে চাই, তারই ওপর আমাদের বর্তমান সামষ্টিক ব্যবস্থার রূপ-সৌন্দর্য একান্তভাবে নির্ভরশীল। আমরা কি ধরণের মানুষ তৈরী করছি, তারই ওপর শিক্ষার দিক দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত জাতীয় লক্ষ্য ও জাতীয় ভবিষ্যত নির্ভর করে। আমাদের সামষ্টিক সংহতি, সামাজিক সুবিচার ও ন্যায়পরায়নতা এবং ব্যক্তির পরম সাফল্য ও সার্থকতাই হচ্ছে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য। আমরা চাই সকল প্রকার দুর্নীতি, শোষণ ও চরিত্রহীনতামুক্ত এক আদর্শ সমাজ গড়তে-এমন এক সমাজ গড়তে, যেখানে মানুষের মানুষ হিংসা-দ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, লুঠতরাজ ইত্যাদি অমানবিক ও অসামাজিক আচার-আচরণ থাকবে না; যেখানে মানুষ তার মানবিক মর্যাদা ও অধিকার পেয়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হতে হলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষাস্তর পর্যন্ত এমন এক পাঠক্রম ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-সূচী রচনা করতে হবে, যা শুধু ভাল ভাল জ্ঞান-তথ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের মন-মগজ ভরে দেবে না, বরং সেই সঙ্গে আমাদের বালক-বালিকা ও তরুণ-তরুণীদের দেবে বিশ্বলোক, জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সুস্থ, সঠিক ও নির্ভুল চিন্তা-বিশ্বাস, স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিকোণ, সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, কঠোর শ্রমশীলতা ও সুসংগঠিত বিশ্বস্ততার গুণাবলী। তা এমন সব উচ্চতর মানবীয় মূল্যমানের নির্ভুল চেতনা জাগিয়ে দেবে, যা শুধু ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষাই চরিতার্থ করবেনা, ব্যাপকভাবে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষারও বাস্তব রূপায়নের নিয়ামক হবে। একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূলের সা. প্রতি আমাদের যে ঈমান তা-ই হচ্ছে আমাদের ব্যক্তির ও জাতীয় চেতনার মৌল কেন্দ্র-বিন্দু। এ কথা আজ নতুন করে উপলব্ধি করলেও একে সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করতে হবে। এই কেন্দ্রবিন্দুকে উপেক্ষা করে যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি রচিত, তা আল্লাহ-রাসূল তথা ইসলাম-বিশ্বাসীদের পক্ষে কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং তার দ্বারা আদর্শ ও সুনাগরিকও গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে না।

ব্যক্তির মন-মানস ও মেধার উৎকর্ষ সাধনের উদ্দেশ্যে শুধু অনুশীলন ও চর্চার নামই শিক্ষা নয়- শিক্ষার উদ্দেশ্যও নয় তা। শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যক্তির নিজ সত্তার সংকীর্ণ পারিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেননা ব্যক্তি কোন জনসমষ্টি বা জাতির অংশ হয়েই বাঁচতে পারে। সমাজ ও সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনাতীত। যে শিক্ষা ব্যক্তিকে প্রত্যয় ও আদর্শবাদের দিক দিয়ে তার বংশ-পরিবার ও সমাজ-পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তা শিক্ষা নামে অভিহিত হওয়ার অযোগ্য; তা নিছক বন্যতা, অসভ্যতা ও পশুত্ব মাত্র। প্রতিষ্ঠিত সমাজ-সমষ্টির ভিত্তিমূল চূর্ণ বা শিথিল করে যে শিক্ষা, তাকে শিক্ষা না বলে ‘‘ডিনামাইট’’ বলাই যথার্থ। ব্যক্তিকে সমাজ-সমষ্টির একজন উত্তম সদস্যরূপে গড়ে তুলতে হলে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই জাতীয় মতাদর্শ তথা ঈমান, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতিবিম্ব রূপে গড়ে তুলতে হবে।

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা  একটি শিল্পোন্নত সমাজ ও জাতির প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে রচিত। সে শিক্ষার বৈষয়িক জীবন সত্ত্বার স্থিতি, সুখ-সম্ভোগ ও চাকচিক্যই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তার মূলে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও যোগ্যতমের উর্ধ্বতন (Survival of the fittest) লাভের ভাবধারা অত্যন্ত উৎকটভাবে নিহিত। কিন্তু এতদাঞ্চলের চিন্তাবিদগণ তাকে কখনও মনেপ্রাণে গ্রহণ করেননি। ইউরোপ থেকে আমদানী করা জিনিসের প্রতি প্রথম দৃষ্টিতে আকর্ষণ জেগে ওঠলেও, তার চাকচিক্য চোখকে ঝলসিয়ে দিলেও এবং প্রথম দিকে জনমনে একটা প্রবল মাদকতার সৃষ্টি করলেও এতদ্দেশীয় চিন্তাশীল ও সমাজদরদীদের ভুল ভাঙতে কিছুমাত্র বিলম্ব হয়নি। ইংরেজদের তৈরী শিক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক বিষক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ হতে অন্তত মুসলমানদের খুব বেশী সময় লাগেনি। এমন কি কবি রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সমর্থক হয়েও স্পষ্টত অনুভব করেছিলেন যে, এ শিক্ষা ব্যবস্থা এতদ্দেশীয় পরিবেশের সাথে সম্পর্কহীন। তাই পাশ্চাত্য নিয়ম-নীতির প্রতি দাসসুলভ মনোভাব গ্রহণকে আকণ্ঠ বিষপান তুল্য মনে করতে হবে। শিক্ষা যাদের জন্যে, শিক্ষাকে তাদেরই ঈমান, বিশ্বাস, মন-মানস, মূল্যমান, মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও রুচিবোধ এবং সামাজিক ও আত্মিক জীবনের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অতএব শিক্ষা তা-ই গ্রহণযোগ্য, যা নিজেদের দ্বীন ও ঈমান এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বশেষ তথ্য ও মূলনীতি সমন্বিত ভাবধারার ভিত্তিতে রচিত।

শিক্ষার মৌল উদ্দেশ্য ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও সমৃদ্ধি সাধন। যে ব্যক্তি তার সমাজ-সংস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন,  সে কার্যত অস্তিত্বহীন। ব্যক্তি কেবল তখনই প্রকৃত অস্তিত্বের অধিকারী হতে পারে, যখন সে সমাজ-সমষ্টির উদ্দেশ্যাবলীকে নিজের মধ্যে রূপায়িত করবে এবং নিজের সত্তা দিয়ে তার বাস্তব রূপায়ন ঘটাবে। এই জন্যে ব্যক্তির মন-মানসকে সামষ্টিক ও সামগ্রিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণে সমুদ্ভাসিত করে তুলতে হবে। যে সব মতাদর্শ ও দৃষ্টিকোণ ব্যক্তি ও সমষ্টির দৃষ্টিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা শিক্ষার্থীর মনে ও চরিত্রে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তার মূল্যায়ন করে জানা যেতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থা তার ক্ষেত্রে কতটা সাফল্য লাভ করেছে। বৈষয়িক জীবনে কে কতটা সাফল্য লাভ করেছে কিংবা কে কতটা উচ্চতর চাকুরী লাভ করতে ও কতবেশী অর্থোপার্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তা কোন শিক্ষা ব্যবস্থারই সফলতা প্রমাণের মানদণ্ড হতে পারে না। কেননা এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পশুজগতেই শোভন- মানব জগতে নয়।

শিক্ষার দর্শন লক্ষ্য

এ দুনিয়ায় সুষ্ঠু জীবন যাপনের জন্যে মানুষকে নানবিধ কাজ সম্পন্ন করতে হয়। সে কাজগুলোকে যথাযথরূপে আঞ্জাম দেয়ার জন্যে সঠিক কর্মনীতি, নির্ভুল কর্মপন্থা, প্রক্রিয়া-প্রণালী ও ধরণ-ধারণ সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগতি লাভ করা মানুষের জন্যে একান্তই অপরিহার্য। এ সব বিষয়ে পূর্ণ ওয়াকিফহাল না হয়ে কোন কাজ হাতে নেয়ার পরিণাম যেমন সময় ও সামর্থের অপচয়, তেমনি কাজেরও ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু হতে পারেনা। মূলত জ্ঞানই মানুষকে এ পর্যায়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করতে সক্ষম। জ্ঞানের আলোকেই মানুষ সমর্থ হতে পারে জীবন সাধনার সব ক’টি স্তর পূর্ণ সাফল্যের সাথে অতিক্রম করতে। পক্ষান্তরে জ্ঞান অনায়ত্ত থাকলে মানুষ নিঃসীম অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে এবং নিরুদ্দেশের সন্ধানে হাতড়ে বেড়াতে বাধ্য হয়। তাই জ্ঞানই মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে মানুষের জীবন-পথকে আলোকিত করে তোলে। তখন সেই আলোকোজ্জ্বল পথে মনযিলের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি ও জাতির পক্ষেই সহজ হয়ে থাকে। বস্তুত এ জ্ঞানের অবর্তমানতাই মানবতার ললাটে লাঞ্ছনার কলঙ্ক টিকা এঁকে দেয় তার কাঁধে, স্থবিরতা, অকর্মন্যতা, অমানবিকতা ও পাশবিকতার লজ্জাকর অপবাদ চেপে বসে এবং তার উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতার অনিবার্য কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বস্তুত দুনিয়ায় সুন্দর ও সার্থক জীবন যাপনের জন্যে অন্তত দুটি বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন একান্তই অপরিহার্য। একটি হলঃ মানুষকে জানতে হবে তার জীবনের লক্ষ্য কি- কর্তব্য ও দায়িত্ব কি? ….. কোথায় তাকে যেতে হবে এবং সেজন্যে কি কি কাজ কিভাবে ও কি পন্থায় করতে হবে। আর দ্বিতীয় হলঃ মানুষকে তার অবস্থান ও মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব এবং আত্মিক বৈষয়িক প্রয়োজন সম্পর্কে পরিপূর্ণ ও নিঃসন্দেহ অবগতি অর্জন করতে হবে। মানুষকে তার যাবতীয় উপায়-উপকরণ যাচাই করে মনযিলের দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। দুর্গম ও বন্ধুর জীবন-পথে পূর্ণ সাহসিকতার সাথে দ্রুত বেগে অগ্রসর হতে হবে। নিজের যাবতীয় দুর্বলতা ও অক্ষমতা এবং দোষ-ত্রুটি ও বিচ্যুতি সম্পর্কে সচেতনতা লাভ করে ক্রমশ তা দূর করার জন্যে কার্যকর পন্থা অবলম্বন করতে হবে। আর এসব দিক দিয়ে সঠিক ফল লাভের জন্যে নির্ভুল জ্ঞান লাভ একান্তই অপরিহার্য। বস্তুত মানুষের চিত্তবৃত্তি ও মনোভাব যতই নির্দোষ ও নির্মল হোক না কেন- কর্মের প্রেরণা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা যতই প্রবল হোকনা কেন, নির্ভুল জ্ঞানের পথ-নির্দেশ না পেলে তার সব কিছুরই ব্যর্থতা অবধারিত।

শিক্ষা সম্পর্কে নানারূপ চিন্তা-দর্শন তথা মতাদর্শ উপস্থাপিত হয়েছে শিক্ষার অঙ্গনে। এ পর্যায়ে মৌলিক প্রশ্ন হলঃ শিক্ষা হবে কোন্ মতাদর্শ-ভিত্তিক? শিক্ষার দর্শন কি হবে?

শিক্ষা বিজ্ঞানী Sir Percy Nun তাঁর Education, its data and first principles নামক গ্রন্থে বলেছেনঃ ‘‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হলঃ মানুষের স্ব-ব্যক্তিত্বের স্বাধীন লালন ও বিকাশসাধন। শিক্ষা কোন লক্ষ্যের জন্যে হওয়া উচিত নয়। কেননা যত ব্যক্তি, তত লক্ষ্য।’’

অপর একশ্রেণীর চিন্তাবিদের মত হল, শিক্ষা বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হতে হবে। কেননা প্রতিটি সমাজেই তার জাতীয় ও সামগ্রিক উদ্দেশ্যের উৎকর্ষ সাধনের উপযোগী ব্যক্তি গঠনের জন্যে সচেষ্ট হয়ে থাকে খুব স্বাভাবিকভাবে। সেজন্যে জাতির সামনে একটা সুস্পষ্ট জাতীয় ও সামগ্রিক লক্ষ্য উজ্জ্বল ও উদ্ভাসিত থাকা আবশ্যক। আধুনিক কালের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক জাতিগুলোর সামনেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য রয়েছে। এজন্যে সেসব সমাজ নিজ নিজ লক্ষ্যকে সার্থক করে তোলার উপযোগী ব্যক্তি গঠনের জন্যে সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করেছে। এসব সমাজের যুবকদেরকে কোন্ বিশেষ ভঙ্গিতে ও পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হচ্ছে, তা তাদের পাঠ্যতালিকা দেখলেই বুঝতে পারা যায়। এই সব ক্ষেত্রেই শিক্ষাকে জাতির রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা হয়েছে। বার্টাণ্ড রাসেল তাঁর ‘সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষা’ গ্রন্থে ‘শিক্ষার নেতিবাচক দর্শন’ পর্যায়ে লিখেছেনঃ

বর্তমান যুগে শিক্ষার তিনটি পৃথক দর্শন বা মতবাদ রয়েছে। এ তিনটি মতাদর্শের সমর্থকও রয়েছে সমাজে। এদের প্রথম মতাদর্শীদের ধারণা হল, উন্নতির সুযোগ-সুবিধা লাভ ও সে পথের প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করাই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। দ্বিতীয় মতাদর্শীরা বলেন, সমাজের ব্যক্তিদেরকে সংস্কৃতিবান করে তাদের সমগ্র যোগ্যতা-প্রতিভাকে চূড়ান্ত মানে উন্নীত করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর তৃতীয় মতাদর্শীদের বক্তব্য হল, শিক্ষা পর্যায়ে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক চিন্তাকোণ পরিহার করে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে চিন্তা-বিবেচনা করা কর্তব্য এবং সমাজের লোকদেরকে কল্যাণকর প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করা আবশ্যক।

পরে গ্রন্থকার লিখেছেন যে, এ তিনও প্রকারের দর্শন-অনুরূপ শিক্ষা এখন কোথাও দেয়া হচ্ছে না, বরং যে শিক্ষা বর্তমান দুনিয়ায় প্রচলিত, তাতে কম-বশী এ তিন প্রকারের দৃষ্টিকোণই প্রভাবশালী হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে যেসব লোক শিক্ষাকে সামাজিক সংগঠন ও ধর্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেছে, তারা ধর্মকে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অরাজনৈতিক’ এই দুভাগে ভাগ করে নিয়েছে- যেমন খৃস্টধর্মকে ‘অরাজনৈতিক ধর্ম’ বলে মনে করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কন্‌ফুসীয়ন্‌বাদ, ইসলাম ও সমাজতন্ত্রকে তারা মনে করেছে ‘রাজনৈতিক ধর্ম’। অনুরূপভাবে ব্যক্তি ও নাগরিকের মাঝেও পার্থক্য করা হয়েছে। কেননা ‘নাগরিক’ বললে রাজনৈতিক ব্যক্তি বুঝায় আর ‘ব্যক্তি’ বললে একান্তই ব্যক্তি চরিত্র, কার্যকলাপ ও ব্যক্তিত্বের গঠন বুঝায়। অতএব শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় ব্যক্তি-কেন্দ্রিক, তাহলে তাকে ‘ভালো মানুষ’ রূপে গড়ে তোলা কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আর তাকে যদি ‘রাষ্ট্রের একজন ‘উত্তম নাগরিক’ রূপে তৈরী হতে হয়, তাহলে তাকে এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, যাতে করে সে নাগরিকত্বের অপরিহার্য গুণাবলীতে ভূষিত হতে পারবে। দার্শনিক রাসেল ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে ‘ভালো নাগরিক’ হিসেবে গড়ে তোলা পছন্দ করেন না। তিনি বলেন, সমস্ত পশ্চিমা জাতি যীশুর ভক্ত; কাজেই সমাজের লোকদেরকে তেমন ভাবধারায়ই গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বর্তমানে এ যুগ অতীত। এখন এ ধরণের মনোভাবে লোক পাওয়া গেলে বৃটেনের পুলিশ তাকে সন্দেহ করবে এবং সৈনিক হয়ে যুদ্ধে যেতে নারাজ হলে আমেরিকা তাকে নাগিরকত্ব দিতেই অস্বীকার করবে। বস্তুত উপযুক্ত নাগরিকত্ব লাভকে শিক্ষার লক্ষ্য রূপে গ্রহণ করা হলে অন্য দিক দিয়ে মানুষ তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলবে, কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হবে এবং মানুষের জন্যে যে সার্বিকতা ও পরিপূর্ণতা আবশ্যক, সেদিক দিয়ে সে ব্যর্থ হবে।

স্যার পার্সী নান বলেছেন, শিক্ষার তিনটি লক্ষ্য হতে পারে

১. ব্যক্তি চরিত্রের পুনর্গঠন

২. পরিপূর্ণ জীবনের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ

৩. ভালো দেহে ভালো মন বিনির্মাণ

স্যার পার্সী এ তিনটি উত্তর পর্যালোচনা করে বলেছেন, নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারেঃ

লোকেরা যে উদ্দেশে শিক্ষা লাভের জন্যে আসে, সেই উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত কল্যাণকে উৎকর্ষ দান।

শিক্ষা একটি সামাজিক কর্মপদ্ধতি, যার সাহায্যে একটি সামাজিক ইউনিট স্বীয় অস্তিত্বের স্থায়িত্ব ও বিকাশমানতাকে স্থিতিশীল করতে পারে।

শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ও কার্যকারণ হচ্ছে তা, যা জাতিত্ববাদ ও কর্মবাদের পরিবর্তে মূল্যমানের আদর্শিক দর্শন থেকে দানা বেঁধে ওঠে। সততা, সত্যবাদিতা, সৌন্দর্য ও সদাচারকে আধ্যাত্মিক জগতের শৃংখলা বিধানের মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় শামিল করে দেয়া হয়েছে। মানুষ তার উদ্দেশ্যকে পূর্ণমাত্রায় লাভ করতে পারে তখন, যদি সে এ নিরেট তত্ত্বসমূহের সন্ধান করে ও তা আয়ত্ব করে নেয়।

ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টত মনে হয়, সত্যিকারভাবে শিক্ষার কি উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, তা দুনিয়ার শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-বিশেষজ্ঞরা এখনো নির্ভুলভাবে স্থির করতে পারেন নি। উপরন্তু এ ব্যাপারে তাদের মাঝে প্রবল মতবিরোধও রয়েছে এবং এ কারণে মূল শিক্ষার ব্যাপারটিই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক যুগে শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে সাধারণত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণই অধিক প্রভাবশালী। এ কারণে বর্তমান শিক্ষার নিজস্ব কোন তাৎপর্য নেই- নেই কোন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে শিক্ষা নিছক রাজনৈতিক মতাদর্শের বাহন মাত্র। কিন্তু ইসলামের শিক্ষাদর্শন এ থেকে ভিন্নতর এবং একেবারেই আলাদা।

ইসলামী শিক্ষাদর্শনের প্রধান বিষয় হল মানুষের ব্যক্তি-সত্তার উন্নয়ন। অতএব মানুষের মধ্যে ব্যক্তি-সচেতনতা, আত্মানুভূতি এবং দায়িত্ব ও মর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলাই হবে তার জন্যে রচিত শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। ব্যক্তি তার স্ব-প্রতিভায় সমুজ্জ্বল হয়ে, স্বীয় বৈশিষ্ঠ্য ও গুণ-গরিমায় পূর্ণত্ব লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও সমষ্টির জন্যেও এক অনন্য ‘শক্তি’ হয়ে দেখা দেবে, সামাজিক জীবনধারা ও জীবনমানকে উন্নত ও বিকশিত করে তুলবে- ব্যক্তির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মূলে এই লক্ষ্যই হবে প্রবল।

ইসলামী শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার দুটি দিক অবিচ্ছিন্ন

১. একদিক দিয়ে তা শুধু ব্যক্তির সংশোধন ও সংগঠন।

২. কিন্তু অপর দিক দিয়ে তা-ই সামজিক সংশোধন, সামাজিক পুনর্গঠন ও সার্বিক কল্যান বিধান।

ইসলামী শিক্ষাদর্শন অনুসারে শিক্ষার চরম লক্ষ্য হল আল্লাহ প্রতি প্রেম ও ভালোবাসাকে জাগ্রত ও তেজস্বী করে তোলা। এ পর্যায়ে রাসেলের কথাটি যথার্থ। তিনি বলেছেনঃ ইসলাম শুরু থেকেই একটি ‘রাজনৈতিক ধর্মমত’। আমরা বলবোঃ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন- জীবন বিধান। জীবনের সমগ্র দিক ও বিভাগের ওপর তার প্রভাব অপরিহার্য। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন এবং তার সামাজিক ও সামগ্রিক জীবনক্ষেত্র- এ দু’য়েরই যুগপৎ সংশোধন ও পুনর্গঠনের দাবিদার হচ্ছে এই দ্বীন। এ দ্বীন মানুষের সামনে এক সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উপস্থাপন করে। উদ্দেশ্যহীন জীবন দ্বীন-ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য-পশুতুল্য। এ কারণে জীবন-লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরিপূরক নয় যে শিক্ষা, ইসলাম তার প্রবর্তনের বিরোধী শুধু নয়, তা বরদাশত করতেও প্রস্তুত নয়। কুরআন মজীদ মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে এ ভাষায়ঃ

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

 ‘‘আল্লাহ জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন এ উদ্দেশ্যে যে, তারা কেবল আল্লাহরই দাসত্ব ও আনুগত্য করবে।’’ (সূরা যারিয়াতঃ ৫৬)

অন্য কথায়, আল্লাহর দাসত্ব করা-একান্তভাবে তাঁর দাস ও আদেশানুগামী হয়ে জীবন যাপন করাই হল ব্যক্তি-মানুষ ও সামাজিক মানুষের চরম লক্ষ্য।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে জনসমাজকে সম্বোধন করেঃ

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ

 ‘‘তোমরা অতি উত্তম লোকসমষ্টি। মানুষের কল্যাণের জন্যেই তোমাদের সৃষ্টি। তোমরা ন্যায়ের আদেশ দেবে ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে।’’ (সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০)

অর্থাৎ মানবতার কল্যাণ সাধন এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধই হল ব্যক্তি-মানুষ ও সমষ্টিগত মানুষের জীবন-লক্ষ্য।

কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে ব্যক্তির রাজনৈতিক মর্যাদা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরশাদ হয়েছেঃ

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ

 ‘‘এই লোকেরা এমন যে, দুনিয়ায় তাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে আর ন্যায়ের আদেশ দেবে ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে।’’ (সূরা হ্জ্বঃ ৪১)

এ ক’টি আয়াত থেকে ইসলামী শিক্ষাদর্শনের এক উজ্জ্বল দিক আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মানুষের ব্যক্তিগত কর্তব্য ও সামাজিক দায়িত্ব একই সাথে জানা যাচ্ছে এ আয়াত ক’টি থেকে। আর তা হল, মানুষ যেন ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উভয় দিক দিয়েই গোটা মানবতা ও বিশ্বলোকের পক্ষে কল্যাণের নিমিত্ত ও বাহন হয়ে গড়ে উঠতে পারে। আর এটাই হল ইসলামের শিক্ষাদর্শনের গোড়ার কথা। বস্তুত যে শিক্ষা বা যে বিদ্যার কোন প্রতিফলন হয় না ব্যক্তির চরিত্রে, কর্মে এবং যা মানবতার কল্যাণ সাধনের উদ্বোধক হয় না, তা ইসলামের দৃষ্টিতে ‘শিক্ষা’ নামেই অভিহিত হওয়ার যোগ্য নয়। নবী করীম সা. এ ধরণের শিক্ষা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ্ চেয়েছেন। বলেছেনঃ ‘হে আল্লাহ! যে জ্ঞান ও বিদ্যা কোন কল্যাণ দেয় না, আমি তোমার নিকট তা থেকে পানাহ্ চাই।’’

ইসলামী শিক্ষাদর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, তা এক উন্নত জীবন-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে শিক্ষার্থীর সামনে প্রতিভাত করে তোলে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত- প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যন্ত শিক্ষার সর্ব পর্যায়ে ও সর্ব স্তরে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে থাকে। ইসলাম এমন ব্যক্তিদের সন্ধান করে, যারা ব্যক্তিগতভাবে এ বিরাট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। ব্যক্তিগতভাবে তারা হবে উন্নত গুণাবলীসম্পন্ন মানুষ, আদর্শবাদী মানুষ, জনদরদী ও সার্বিক কল্যাণকামী মানুষ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের উপযুক্ত নাগিরক। কেননা যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আদর্শিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জিত হয় না, তা ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়েরই জন্যে ক্ষতিকর এবং মারাত্মক। আল্লামা ইকবাল বর্তমান পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূণ্যতা ও অকল্যাণকারিতাকে সুস্পষ্ট করে তুলবার জন্যে বলেছেনঃ ‘‘গীর্জার কর্তাদের প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা-ব্যবস্থা দ্বীন ও মনুষত্বের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র বই আর কিছু নয়।’’

প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির সাধারণ ত্রুটি

শিক্ষা অর্থ জানা, বুঝা বা হৃদয়ঙ্গম করা। অজানাকে জানা, অবোধ্যকে বুঝা আর অশেখাকে শেখা। বস্তুত শিক্ষাই মানুষকে মানুষ করে। শিক্ষা ব্যতিরেকে মানুষ মানুষ নামের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষা মানুষের জন্যে অপরিহার্য মৌলিক প্রয়োজন।

এ পর্যায়ে সর্বপ্রথম কথা হলঃ আমাদের জানতে হবে নিজেকে, জানতে হবে গোটা ভূমন্ডলকে এবং জানতে হবে মহাকাশকে। বুঝতে হবে বহির্বিশ্বকে, জানতে হবে সৃষ্টির রহস্যকে। সৃষ্টির অন্তরালে যদি কোন মহাসত্য লুকিয়ে থেকে থাকে, তবে তাকেও বুঝতে হবে। এভাবেই শিক্ষার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে।

সব মানুষেরই মনের কোণে কতকগুলো মৌলিক প্রশ্ন এসে উঁকি মারে- সচেতনভাবে কিংবা অবচেতনভাবে। এ সব প্রশ্নকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে। মানুষ স্বভাবতই ভাবে-আমি কে? আমার পরিচয় কি? আমি এখানে কেমন করে এলাম? মানুষ আরো চিন্তা করে- আমার কি কর্তব্য? কি-ইবা করণীয় আছে? আর এখানে থাকব কদ্দিন? চিরকালের জন্যে, না ক্ষণিকের জন্যে? তারপর এখান থেকে কোথায় যাব? সে যাওয়া কি শেষ যাওয়া-চূড়ান্তভাবে বিলীন হওয়া, না তারপরও কোন জীবন আছে- আছে সুখ বা দুঃখের প্রশ্ন?

এসব মৌল প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব আমাকে জানতে হবে। এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর আমাকে বের করতে হবেই। তবেই হবে প্রকৃত ও পরিপূর্ণ শিক্ষা। এ প্রশ্নগুলোকে বাদ দিয়ে কোন শিক্ষাই আমাদের হতে পারে না সঠিক শিক্ষা- পূর্ণ শিক্ষা। এসব প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া হয় যে শিক্ষায়, তাকে আর যা-ই হোক শিক্ষা বলা যায় না। তাকে বড় জোর কারিগরি প্রশিক্ষণ বলা যেতে পারে। তাই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একটা বিরাট শূণ্যতা দৃষ্ট হচ্ছে। একটা বিরাট ফাঁক দেখা যাচ্ছে শিক্ষার সর্বস্তরে, এ জন্যেই শিক্ষার নামে অশিক্ষা বা কুশিক্ষাই প্রবল হয়ে উঠছে আমাদের জীবনে।

একটা নিরুদ্দেশের পানে ছুটে চলছি আমরা। আমাদের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। জন্ম, বৃদ্ধি, মৃত্যু এ-ই যেন শেষ। সমস্ত জীবের- বরং সমস্ত বস্তুরই জন্ম, বৃদ্ধি ও মৃত্যু আছে। কিন্তু মানুষের জীবন-চক্রের কি শুধু এই পরিণতি? তবে মানুষ ও অন্য জীবে পার্থক্য কোথায়? মানুষ ও ইতর জীবের পরিণতি যদি একই হয়ে থকে, তবে এ দুয়ের এ সুস্পষ্ট পার্থক্যের ফল দাঁড়াবে কোথায়?

মানুষের বস্তুগত দিকটাকে বড় করে দেখে পাশ্চাত্যদর্শন আমাদেরকে শিক্ষা দিল- মানুষ জন্তু-জানোয়ারের একটি পরিবর্তিত স্তর বৈ আর কিছু নয়। সমগ্র জীব-জগতে বেঁচে থাকার একটা প্রতিযোগিতা চলছে। যার শক্তি আছে সে-ই টিকে থাকবে, অর্থাৎ যোগ্যতমেরই উর্দ্ধতন! সবল দুর্বলকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, এটাই নাকি নিয়তি। তাই ভোগের সংসারে বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার জন্য যত ইচ্ছা ভোগবিলাস করে যাও।

পক্ষান্তরে আরেকটি দল মানুষের বস্তুগত দিকটাকে বাদ দিয়ে আধ্যাত্মবাদের দিকে চরমভাবে ঝুঁকে পড়েছে। তারা মানুষের দেহের দাবির প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন করছে। তারা বলে, সংসার ঝামেলার স্থান; কাজেই এখানে থেকে পালাও।

এ দুটি প্রান্তিক দলের কেউই আসল মানুষের সন্ধান পায়নি। মানুষ তো শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমষ্টির নাম নয়। আবার আত্মাই মানুষের একমাত্র পরিচয় নয়। দেহ হচ্ছে আত্মার বাহন আর আত্মা দেহের সহিস। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে দেহটি দান করেছেন এ সৃষ্টিকে উপভোগ করার জন্যে। দেহের তাগিদেই সৃষ্টিকে তন্নতন্ন করে নানা রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে মানুষ। আবার দেহের পবিত্রতার জন্য আত্মাকেও সে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখবে।

ইসলামী শিক্ষাদর্শন মানব মনের সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। শুধু উত্তরের জন্যেই উত্তর দেয়া হয়নি’ সত্যকে সত্য বলে ঘোষণা করেছে আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করেছে। মানুষের যাবতীয় প্রয়োজনকে অতি সতর্কতা সহকারে বিবেচনা করে সামঞ্জস্য বিধানের একটা সুষ্ঠূ সঠিক চেষ্টা করা হয়েছে।

ইসলাম বলে, এ সৃষ্টিলোক কোন আকস্মিক বস্তু নয়, বরং সুপরিকল্পিত। এর পেছনে একজন শক্তিশালী সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এটির অস্তিত্ব দান করেছেন। সৃষ্টির সেরা মানবগোষ্ঠী। মানুষের উপকারের জন্যে এ সারা বিশ্ব। সৃষ্টিরাজিকে ব্যবহার করতে হবে- কাজে লাগাতে হবে। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ সৃষ্টিকে বিভিন্ন আকারে ও প্রকারে ব্যবহার করতে পারে।

মানুষ তার বস্তুগত প্রয়োজন মেটাতে কিংবা মানসিক উৎকর্ষ সাধনের নিমিত্ত এ সৃষ্টিলোক নিয়ে চিন্তা-গবেষণা কিংবা কারিগরি শিল্পের উন্নতি বিধান করতে পারে।

ইসলাম বলছেঃ ইহকালই শেষ নয়, বরং অনন্ত জীবনের সূচনা মাত্র। পরকাল সত্য ও অনিবার্য। পরকালের পাথেয় ও সম্বল এ জগত থেকেই আহরণ করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করে এখানে যে যত কাজ করবে সে তত বেশী লাভবান হবে পরকালে।

জীবন-দর্শন ও জীবন-লক্ষ্যকে নানাভাগে বিভক্ত করা চলবে না। একই জীবন-দর্শনের ভিত্তিতে একই জীবন-লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহকে রাজী করার জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন-বিধানকে ব্যক্তি-জীবনে, সমাজ-জীবনে ও আন্তর্জাতিক জীবনে বাস্তবায়িত করে যেতে হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ একটি নৈতিক জীব। নৈতিকতাই তার বৈশিষ্ট্য। তাই তার জ্ঞানের বিকাশের সাথে থাকবে নীতিবন্ধন। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে তাকে অনেক বিষয়েই জ্ঞান আহরণ করতে হবে- জানতে হবে অনেক কিছু। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে কোথাও নৈতিকতাকে হারালে বা ভুলে গেলে চলবেনা।

সমাজে শৃংখলা বজায় রাখার জন্যে তাকে রাজনীতি চর্চা করতে হবে। তার বস্তুগত প্রয়োজন মেটাতে তাকে অর্থনীতির চর্চা করতে হবে। স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের চর্চা করতে হবে। এ ধরণের অসংখ্য প্রয়োজনে অসংখ্য শাস্ত্র তার অধ্যয়ন ও অনুশীলন করতে হবে। কিন্তু সব কিছু আলোচনা ও চর্চা হতে হবে ঐ একই জীবন-দর্শনের ভিত্তিতে।

কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার প্রথম শ্রেণী হতে শেষ পর্যন্ত যা কিছু পড়ানো এবং শেখানো হয়, তার প্রায় সবটুকুই ইসলাম-বিমুখ অনুর্বর মস্তিষ্কের ফসল। তাতে ইসলামের জীবন দর্শন আদৌ প্রতিফলিত হয় না। সত্য বলতে কি, তাতে প্রতিটি ছাত্রের মন-মগজ অনৈসলামী ভাবধারায় পরিপুষ্ট হতে থাকে।

বর্ণ পরিচয় থেকে শুরু করা যাক। অ-তে অজগর, আ-তে আনারস ইত্যাদি। অজগর একটি হিংস্র বিষধর জন্তু। এতে করে সরলমতি কচি শিশুর মনে নিশ্চয়ই কোন মহৎ ভাবের উন্মেষ ঘটবেনা; বরং তার মনে হিংস্র মনোভাবের উন্মেষ ঘটবে। আনারস লোভনীয় খাদ্য-বস্তু। লোভ-লালসার পাশব বৃত্তি জাগিয়ে তোলাই হবে শিশু শিক্ষার উদ্দেশ্য। কিন্তু এখানে যদি অ-তে অযু এবং আ-তে আল্লাহ পড়ানো হত, তাহলে শিশুর মনে এক পরিবত্রতার ছাপ দেয়া সম্ভব হত। আর ইসলাম এ ধরণের পুত-পবিত্র মনোবৃত্তি সৃষ্টিরই প্রয়াস পায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে।

‘‘লেখা পড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই’’- এ শিক্ষা মানুষকে বিলাস-ব্যসনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দুধে পানি মেশানো অংকের মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে ভেজাল ও ধোঁকা দেয়ার প্রবণতা শিক্ষা দেয়া হয়না নাকি! [সাধারণত ক্লাসে অংক দেয়া হয়ঃ এক গোয়ালা সের দুধে আধা সের পানি মিশিয়ে বিক্রি করলে সে অতিরিক্ত কত লাভ করল? এর প্রতিই ইশারা করা হয়েছে] সুদকষা অংকের মাধ্যমে সুদকে একটি লাভজনক হালাল বস্তু হিসেবে পেশ করা হয়না নাকি? [অংক করানো হয়ঃ শতকরা টাকা সুদ হারে লগ্নি করা হলে হাজার টাকায় কত সুদ হবে? এখানে সে দিকেরই ইংগিত] দুধে পানি মেশানো ঐ অংক এবং সুদকষা অংককে ইসলামী ছাঁচে ঢালাই করলে ঐ দুটি অংকের ভাষা ও ভাবকে এমনিভাবে প্রকাশ করা যায়, যাতে করে ঐ দুটি কাজকে দুর্নীতি হিসেবে ছেলেদের মনে জাগিয়ে দেয়া সম্ভব। যেমন ধরুন, গোয়ালা দুধের সাথে পানি মিশিয়ে যে অন্যায় করল তাতে সে ক্রেতাকে কতখানি ঠকালো? মহাজন সুদী কারবারে যে লাভবান হয় তাতে সে কিভাবে অন্যায় শোষণ করে- এমনি ধরণের ভাষা প্রয়োগ করে অংকগুলো সাজানো যেতে পারে। আর একেই বলে সাধারণ শিক্ষার সাথে নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়।

প্রতিটি বিষয় আলোচনাকালে যদি নৈতিক দৃষ্টিকোণ না থাকে, যদি সেগুলো নৈতিকতার রসে সিঞ্চিত না হয়, তবে শুধু আলাদাভাবে দ্বীনিয়াত বা ইসলামিয়াতের লেজুড় জুড়ে দিলেই সাধারণ শিক্ষা ইসলামী শিক্ষা হয়ে যায় না; তা বরং কাকের পুচ্ছে ময়ূরের পালক জুড়ে দেয়ার মতোই হাস্যকর হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরণের সংমিশ্রণে হিতে বিপরীত ফলই হয়ে থাকে। এর ফলে ধর্ম ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার্থী আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতের প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তার সন্ধান পায়না; বরং অন্যান্য ক্ষেত্রে তাকে দেখানো হয় এ বিশ্ব-চরাচরে আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতের কোন প্রয়োজন নেই। এগুলোকে বাদ দিয়েও আমরা সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

প্রকারান্তরে শিক্ষার্থীকে এ কথাই শিখিয়ে দেয়া হয়ঃ আল্লাহ, রসূল ও আখিরাতের কোন অস্তিত্ব নেই আর থাকলেও তাদের কোন প্রভাব মানব জীবনে নেই। মানুষ স্বাধীন সত্তা নিয়ে স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের অধিকারী। আল্লাহকে যদি একান্তই মানতে হয়, তবে তাকে আকাশ-রাজ্যেই স্থান দাও, জমিনে তাঁর কোন প্রভুত্ব নেই।

ঐ একই শিক্ষার্থী যখন ইসলামের সবক নেয় তখন সে জানতে পায়, এ আকাশ-পৃথিবী ও এ দুয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর আইনে চলছে আর মানুষকেও তাই সেই আল্লাহর কানুনেই চলতে হবে।

সাতটি পিরিয়ডের ছয়টি পিরিয়ডেই সে যে বাস্তব শিক্ষা পেল তা আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতের প্রভাবমুক্ত। আর মাত্র একটি পিরিয়ডে সে শিখল খোদাকে উপাস্য ও প্রভূ হিসেবে জীবন মেনে চলতে হবে। তাই পরস্পর-বিরোধী এ দুটি দর্শনের সংঘর্ষে থিওরী পর্যায়ের নামমাত্র ইসলামী শিক্ষারই হার মানতে হয়। বর্তমানে ধর্ম শিক্ষাকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার যে গালভরা বুলি শুনতে পাওয়া যায় তা এমনিভাবেই অর্থহীন- শুধু অর্থহীনই নয়, মারাত্মক হয়ে দেখা দেয় শিক্ষার্থীর জীবনে।

দীর্ঘ ষোলটি বছর ধরে একজন শিক্ষার্থী দেখা ও শেখার মাধ্যমে বুঝে নিল যে, ব্যাংক ব্যতীত দুনিয়া চলেনা আর সুদ ব্যতীত ব্যাংকও চলে না। অতএব সুদ ব্যতীত দুনিয়া অচল। প্রচলিত অর্থনীতি এ ধরণের চিন্তারই সৃষ্টি করে। এই শিক্ষার্থীকে যখন ইসলামিয়াতে শিখান হয় যে, আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন, তখন সে দিশেহারা হয়ে যায়। সে ভাবে, আল্লাহ এ নির্দেশ ঠিক হয়নি (নাউযুবিল্লাহ)। আর যদি ঠিকও হয়ে থাকে তবে এ যুগের জন্যে নয়। হয়তো চৌদ্দশ বছর পূর্বের যামানায় এটা কার্যকর হয়ে থাকবে। এখন এ আদেশ অচল।

আপনি দেখতে পেলেন, প্রচলিত লেজুড়-সর্বস্ব ইসলামী শিক্ষা শিক্ষার্থীর মন-মগজে কিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল। ঐ শিক্ষার্থীকে যদি ইসলামের অর্থনীতি পড়িয়ে দেয়া হতো- যদি বুঝিয়ে দেয়া হতো সুদকে বাদ দিয়েও অর্থনৈতিক লেনদেন সম্ভব আর সে লেনদেন বর্তমান পদ্ধতি হতে বহুতর উন্নত ফল দান করবে, তাহলে সে বেঈমানের ন্যায় ঐরূপ উদ্ভট কথা বলতে পারতনা কিছুতেই।

আমাদের দেশে প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা যদিও একদিক দিয়ে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তবুও বড়ই দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, এ শিক্ষা জাতির পথ-নির্দেশ করতে সক্ষম হচ্ছেনা; জীবন পরিক্রমাকে পারছেনা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এ শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামকে অত্যন্ত পঙ্গু ও খোঁড়া হিসেবে পেশ করছে। ইসলাম যে সামগ্রিক জীবন-বিধান এবং যুগ-সমস্যার একমাত্র সমাধান- এ কথা বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বর্তমান মাদ্রাসা শিক্ষা মাধ্যমে- মাদ্রাসা হতে পাশ করে যারা বেরুচ্ছে, তারা জাতির নেতৃত্বদানে অক্ষমতা প্রদর্শন করছে। তাই আমরা পূর্ণাঙ্গ ইসলামের পরিচয় পাচ্ছি না তাদের মধ্যে- না তাদের জ্ঞানে, না তাদের কর্মজীবনে।

তাই আমাদের শিক্ষা-সমস্যার একমাত্র সমাধান হল এই যে, প্রচলিত দুটি শিক্ষাব্যবস্থাকে একত্রিত করে এমন একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে একটি স্বাধীন মুসলিম দেশের শিক্ষার্থীরা চলতি দুনিয়ার সর্বস্তরে নিজেদের আসন গেড়ে বসতে পারে। আমাদের জাতীয় আদর্শ যে ইসলাম, শিক্ষা সংস্কারের নামে সে কথা ভুলে গেলে চলবে না।

ইংরেজ আমাদের দেশে কতকগুলো কেরাণী তৈরী করতে চেয়েছিল। তারা আরো চেয়েছিল- এ দেশের লোকেরা বংশ পরিচয়ে মুসলমান থাকে থাকুক; কিন্তু মন-মানসে ও চিন্তাধারায় তারা যেন অমুসলিম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তারা যে শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করেছিল, তাতে তারা সফল হয়েছিল।

তারা এখন নেই সত্য; কিন্তু তাদের প্রেতাত্মারা আজো বিরাজ করছে আমাদের মধ্যে। আমরা রাজনৈতিক গোলামী হতে মুক্ত; কিন্তু মানসিক গোলামী হতে আজও  আমরা মুক্ত হতে পারিনি। আমরা আজও  ইংরেজের চোখ দিয়ে জগত ও জীবনকে দেখছি। ইংরেজের মগজ দিয়ে এগুলোকে বুঝতে ও জীবনের আচরণ স্থির করতে চেষ্টা করছি। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে!

এ পর্যায়ে শেষ কথা হলঃ আমরা যারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ভুলভাবে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতে পারছিনা, তাদের জন্যে একমাত্র উপায় হল এই যে, আমাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতে হবে। ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে তাকে কার্যকর করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আর সেই সঙ্গে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গেলে আমাদের এই বাস-ভূমিতে সত্যিকারের ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করা মোটেই অসম্ভব হবে বলে মনে করি না।

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম