শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

জাতীয় জীবনে ইসলামী শিক্ষার ভূমিকা

শিক্ষার তাৎপর্য

শিক্ষা অর্থঃ জানা, বোঝা, শেখা; যা জানা নেই-অজানা অথচ জানা দরকার, তা জানা, শেখা ও বোঝা-ই হল শিক্ষার লক্ষ্য।

শিক্ষার প্রশ্ন কেবল মানুষের বেলায় প্রযোজ্য; মানুষ ছাড়া অন্য কারোর ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ নেই, প্রয়োজনও নেই। জীব-জন্তু অন্ধকারেও দেখতে পারে। কিন্তু মানুষ তার দৃষ্টিশক্তি থাকা সত্ত্বেও বাইরের আলোর প্রতিফলন না হলে কিছুই দেখতে পায় না। তাই মানুষকে বাইরে থেকে জ্ঞানের আলো দান একান্তই প্রয়োজন।

মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীব-জন্তুর জীবন যেহেতু নিতান্ত জৈবিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই তাদের যা কিছু শিক্ষার প্রয়োজন তা স্বাভাবিকতা বা প্রাকৃতিক পরিবেষ্টনীর মধ্যেই অর্জিত হয়ে থাকে। যেমন মুরগীর বাচ্চার কুটকুট করে খাদ্য আহরণ কিংবা হাঁসের বাচ্চার পানিতে সাঁতার কাটা শেখার ব্যাপার মায়ের পথ পদর্শনেই সমাপ্ত হয়। অতঃপর এদের আর কোন শিক্ষার প্রয়োজন হয় না।

জন্তুর ক্ষেত্রে ঘাস খাওয়া বা অন্য জীব ধরে খাওয়ার শিক্ষাটাও স্বাভাবিভাবেই অর্জিত হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষের শিক্ষা নিছক স্বাভাবিকতার মধ্যেই সীমিত থাকতে পারেনা। স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করে বাইরের অনেক কিছুই শেখা-জানা-বোঝা তার জন্যে একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় তার জীবন জৈবিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য। কিন্তু মানুষ তো শুধু জীবমাত্র নয়। জীবের ঊর্ধ্বে তার জীবন সম্প্রসারিত। জীবের জগত তার চতুঃপার্শ্বের মধ্যেই সীমিত। কিন্তু মানুষের জগত পৃথিবী ও গোটা বিশ্বলোক। তা জল-স্থল ও অন্তরীক্ষ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। তাই মানুষ শুধু নিজেকে জেনেই ক্ষান্ত হতে পারে না। তাকে জানতে হয় নিজেকে, এই পৃথিবীসহ গোটা বিশ্বলোক এবং এই সবের স্রষ্টাকেও। মানুষের জ্ঞান শুধু বাহ্যিক প্রপঞ্চ (Phenomenon) পর্যন্ত সীমিত থাকলেই চলবেনা, তাকে জানতে হবে অন্তর্নিহিত সত্তাকে, বাহ্য লোকের অন্তরালে অবস্থিত মহাসত্যকে তথা Absolute reality এবং Absolute truth- কে।

মানুষের আছে মন, যা জীবদের নেই। সে ‘মনে’র আছে নানা জিজ্ঞাসা, কৌতুহল, আশা-আকাংক্ষা, চিন্তা-ভাবনা এবং ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় ও বৈধ-অবৈধের বোধ। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানুষ পশু; কিন্তু শুধুমাত্র জন্তুর ক্রিয়া সম্পন্ন করাই তো আর মানব ধর্ম হতে পারে না। সে দিক দিয়েও নৈতিকতার প্রশ্ন অনপেক্ষণীয়।

মানব মনের মৌলিক জিজ্ঞাসা তিনটি পর্যায়ে বিভক্তঃ

১. প্রথম জিজ্ঞাসা তার নিজের সম্পর্কে, তার গোটা পারিপার্শ্বিকতা তথা পিতামাতা, ভাইবোন সম্পর্কে-যাদের সে নিজের চারপাশে দেখতে পায় জন্মের পর থেকেই। এরা কারা, এদের সাথে তার কি সম্পর্ক এবং সে সম্পর্ক কিভাবে রক্ষা করতে হবে।

২. জিজ্ঞাসা আছে এই পৃথিবী, সূর্য-চন্দ্র, পানি, বাতাস, বৃক্ষ-গুল্ম ইত্যাদি সম্পর্কে; এগুলোর প্রকৃত অবস্থান কোথায় এবং তার সাথে এগুলোর সম্পর্ক কি? সে সম্পর্ক রক্ষার নিয়ম পদ্ধতিইবা কি?

৩. জিজ্ঞাসা আছে তার নিজের জীবন প্রণালী, দায়িত্ব-কর্তব্য ও ভবিষ্যত সম্পর্কে-এই সব জিজ্ঞাসার জবাব তার জানা নেই। অথচ এগুলো না জানতে পারলে তার মনের কৌতুহল যেমন মিটেনা, তেমনি তার জীবনও সঠিক রূপে চলতে পারে না।

কিন্তু অন্যান্য জীব বা উদ্ভিদের স্তরে এসব জিজ্ঞাসা কিংবা কৌতুহলের কোন প্রশ্ন ওঠে না।

আর এটাই হচ্ছে মানুষ ও জীব-জন্তু তথা অন্যান্য সৃষ্টিকুলের মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তি।

অতএব মানুষের জন্যে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন, যা তাকে এই সব বিষয়ে অবহিত করবে এবং এ ক্ষেত্রে জেগে-ওঠা সব সন্দেহ-সংশয় দূর করে দেবে। এতে যেমন জানার প্রশ্ন আছে, তেমনি আছে অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করার এবং শেখারও প্রশ্ন।

শিক্ষার মাধ্যমে কেবল জ্ঞান আহরণই কোন কল্যাণ সাধন করে না; সে জ্ঞানের বাস্তব ও সুষ্ঠু প্রয়োগও দরকার। তাই জানা ও বুঝা দরকার সে জ্ঞান প্রয়োগ করার সঠিক পদ্ধতি কি।

তাই A.N. Whitehead তাঁর The Aims of Education and other Essay’s গ্রন্থের ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ Education is the acquisition of the art of the utilization of knowledge. অর্থাৎ শিক্ষা হল জ্ঞানের প্রয়োগ কৌশল আয়ত্ত করা।

ইসলামী চিন্তাবিদ ইমাম রাগেব লিখেছেনঃ

‘‘জ্ঞান হচ্ছে কোন বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তাকে যথার্থভাবে অনুধাবন করা।’’

এই আহরণ বা অনুধাবন (Allainment-reaching-understanding) দুই পর্যায়ের। একটি হচ্ছেঃ ‘‘কোন বিষয়ের বা জিনিসের অন্তর্নিহিত সত্তাটি জানা বুঝা বা অনুভব করা।

আর দ্বিতীয় হচ্ছেঃ ‘একটি জিনিস সম্পর্কে অপর জিনিসের সাহায্যে সেই জিনিসের থাকা বা না থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।’

ইমাম রাগেবের দৃষ্টিতে ‘আলাম’ এর আর একটি বিভক্তি হচ্ছে তা ‘নাঝরি’ বা Theoritical এবং  ‘আমালি’ Practical.

‘নাঝরি মাজা ইলমি ফাক্বাদ কামালা’- নীতিগত জ্ঞান যখন অর্জিত হল তখন তা পূর্ণত্ব পেল।

আর ‘আমালি মা লা ইয়াতিম্মুল আবিনা ইয়াঅ’মাল’- বাস্তব জ্ঞান সম্পূর্ণতা পায়না যতক্ষণ তা কাজে পরিণত করা না হবে।

প্রথমটির দৃষ্টান্তঃ এই বিশ্বলোকের অস্তিত্ব বা অবস্থিতি সম্পর্কিত জ্ঞান বা জানা। তা জানা হয়ে গেলে এ সংক্রান্ত দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয়ে যায়। সেখানে তার করার কিছু থাকেনা।

কিন্তু দ্বিতীয়টি হলঃ ইবাদাত সংক্রান্ত ইলম। তা শুধু জানলেই হবে না, তা বাস্তবে প্রয়োগও করতে হবে। ইমাম রাগেবের দৃষ্টিতে এর আরও একটি বিভক্তি রয়েছেঃ বিবেক-বুদ্ধিগত ও ঐতিহ্যগত। বিবেক-বুদ্ধিগত বলতে বুঝায় সেই জ্ঞান যা মানুষ চিন্তা-গবেষণা ও অনুমিতির (Inference)-  মাধ্যমে অর্জন করে। আর ঐতিহ্যগত জ্ঞান বলতে বুঝায়, মানুষ যা জানতে পারে পূর্ববর্তী লোকদের নিকট থেকে। আল্লাহর কুরআন, রাসূলে সুন্নাত এবং ইমাম, মুজতাহিদ ও চিন্তাবিদদের নিকট থেকে লাভ করা জ্ঞানও এর অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিতেও শিক্ষা দু’ধরণের অর্থাৎ দুটি সূত্র থেকে লব্ধ। একটি Formal বা আনুষ্ঠানিক আর অপরটি Informal বা অনানুষ্ঠানিক।

বালক-বালিকারা নিজেদের পরিবেশ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা শেখে তা Informal- এ জ্ঞান স্বতঃই অর্জিত হতে থাকে; এর জন্যে কোন চেষ্টা বা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়না। আর যা বই-পুস্তক পড়ে ও শিক্ষালয় থেকে তারা শিক্ষকদের মাধ্যমে শেখে তা Formal বা আনুষ্ঠানিক।

শিক্ষার উদ্দেশ্য লক্ষ্য

শিক্ষার একটা উদ্দেশ্য থাকা একান্তই আবশ্যক। অর্থাৎ শিক্ষা কেন-শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কি অর্জন করব? কিংবা শিক্ষা না হলে ক্ষতি কি? সে ক্ষতির কারণই বা কি? এ বিষয়গুলো আমাদের সামনে পরিষ্কার থাকা দরকার।

আগেই বলেছি, মানুষের জন্যে শিক্ষার একান্তই প্রয়োজন। এর অর্থ, শিক্ষা না হলে মানুষ ‘মানুষ’ পদবাচ্য হতে পারে না। মানুষ যেহেতু নিতান্ত জীব নয়, জীবেরও বহু ঊর্ধ্বে তার স্থান, তাই প্রতিটি মানুষের স্বকীয় মর্যাদা নিয়ে আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে এবং নিজের উজ্জ্বল সুখময় ভবিষ্যত নিশ্চিত করে জীবন যাপন করা একান্ত অপরিহার্য। আর এজন্যে তার এমন শিক্ষার দরকার যে শিক্ষা তাকে উপরোক্ত তিনটি কাজ সম্পাদনে সাহায্য করবে, তাকে যোগ্য বানাবে। ফলে তার পক্ষে একাকী জীবনযাপন করার নয়, বরং একটি জনসমষ্টি এবং আধুনিক ভাষায় একটা জাতি হিসেবে জীবন যাপন করার সম্ভব হবে।

বস্তুত মানুষের জন্যে শিক্ষা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে দুনিয়ার সর্বকালের জ্ঞানী-গুণী ও চিন্তাবিদদের পূর্ণ ঐক্যমত্য রয়েছে। এ বিষয়ে কখনো কোন মত-পার্থক্য হয়নি; কখনই কোন লোক বলেনি যে, মানুষের জন্যে শিক্ষার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু মানুষের জন্যে কি ধরণের শিক্ষার প্রয়োজন, কোন্ ধরণের শিক্ষা দ্বারা মানুষের উপরিউক্ত তিনটি দিক সার্থক হতে পারে? ….অর্থাৎ মানুষের মর্যাদা, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন ও মানুষের উজ্জ্বল সুখময় ভবিষ্যত নিশ্চিতকরণ সম্ভব হতে পারে, এ নিয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।

এ মতভেদের কারণ হচ্ছে, প্রধানত মানব সত্তা ও মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে ধারণার বিভিন্নতা।

কারো কারো মতে মানুষ কোন স্বতন্ত্র বা উন্নত ধরণের জীব নয়। মানুষে সাধারণ জীব পর্যায়েরই একটি সত্তা (Beings)- জীবেরই বংশধর। তাই তাদের মতে মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য বা ভবিষ্যত ঠিক তা-ই যা সাধারণ জীবের।

কারো কারোর মতে মানুষ জীব পর্যায়েরই সত্তা, তবে পার্থক্য এই যে, মানুষ উন্নত ও ক্রমবিকাশপ্রাপ্ত জীব (Evolued Animal); অতএব মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য ও ভবিষ্যতও সেই অনুপাতে উন্নত ও বিকাশপ্রাপ্ত মান অনুযায়ী হবে।

এর কারণ স্বরূপ বলা হয়েছে, মানুষ একটা Rational Animal বা বুদ্ধিমান জীবন। মানুষের বুদ্ধি-বিবেক আছে, সাধারণ জীব-জন্তুর তা নেই; এই যা পার্থক্য। অতএব, সাধারণ জীব-জন্তুর তুলনায় মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য ও ভবিষ্যত শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক বা যুক্তিভিত্তিক হবে মাত্র। তাদের জীবন একান্তভাবে বুদ্ধি-নির্ভর। আর বুদ্ধি-নির্ভর বলেই তারা আল্লাহকেও অস্বীকার করেছে, তাকে অমান্য করে চলেছে। আল্লাহর নিকট থেকে কোন বিধান আসার প্রয়োজন বোধও তারা হারিয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য জগত-তা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজ হোক বা ধর্মহীন স্বৈরতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ-সর্বত্র মানুষ সম্পর্কে উপরিউক্ত ধারণা প্রকটভাবে বিরাজমান। ফলে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি জীবতাত্ত্বিক পর্যায়ের। সে শিক্ষার ফলে উন্নতমানের যোগ্যতাসম্পন্ন জীবনই তৈরী হচ্ছে এবং তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিও নিতান্তই পাশব প্রকৃতির। অন্যকথায়, বুদ্ধিমান ও উন্নত মানের পশুরাই এসব সমাজের নাগরিক, রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং সেনাধ্যক্ষ ও সাধারণ যোদ্ধা।

এ সমাজের সাধারণ ব্যক্তিরা এই চেতনারই ধারক। ফলে তাদের সমন্বয়ে যে জাতি গঠিত, সে জাতিও পাশবিকতার মধ্যেই নিমজ্জিত। আর একারণেই তাদের তৈরী দর্শন ও বিজ্ঞান পাশবিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি- সর্বক্ষেত্রে পাশবিকতারেই প্রকাশ। পশু জগতে যা স্বভাবতঃই আচরি, তাদের জগতে তা-ই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনুসৃত। মৌলকতার দিক দিয়ে এ দু’য়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। ফলে তাদের শিক্ষায় শকুনীর মতো উড্ডয়নশীল, কুমীরের মতো শিকারী, শৃগালের মতো ধূর্ত, ব্যাঘ্রের মতো হিংস্র প্রাণী গড়ে উঠছে। প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী ও মানবিক গুণ-সম্পন্ন মানুষ গড়ে ওঠেনি।

ইসলামের দৃষ্টি বিশ্বলোক

ইসলাম বিশ্বস্রষ্টার নিকট থেকে দুনিয়ার মানুষের জন্যে অবতীর্ণ এক পূর্ণাঙ্গ জীব বিধান। যেদিন থেকে দুনিয়ায় মানুষের বসবাস শুরু ইসলামেরও সূচনা সেদিন থেকেই। কাজেই ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিশ্বলোক স্বয়ম্ভূ বা স্বতঃস্ফূর্ত ও বিকাশপ্রাপ্ত নয়। এর নির্দিষ্ট সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন এবং তা বহু বা একাধিক নয়; তিনি এক ও একক- লা-শরীক।

মানুষ সেই এক ও একক সৃষ্টিকর্তারই একটি বিশেষ সৃষ্টি- উদ্দেশ্যপূর্ণ মাখলুক।

বিশ্বের মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিশেষভাবে কোন্ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন? তিনি নিজেই বলিষ্ঠ ভাষায় এর ঘোষণা দিয়েছেনঃ

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘‘আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবলমাত্র এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি যে, তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমার দাসত্ব করবে।’’ (সূরা যারিয়াতঃ ৫৬)

কোন জিনিসের স্রষ্টা বা নির্মাতা, যে উদ্দেশ্যের বশবর্তী হয়ে জিনিসটি সৃষ্টি বা নির্মাণ করে তার গোটা সত্তায় সেই উদ্দেশ্যের বাস্তব প্রতিলন ঘটবে, এটা যেমন স্বাভাবিকত, তেমনি যুক্তিসংগতও বটে। অতএব, আল্লাহ্ যখন বলেছেন মানুষ সৃষ্টির মৌল উদ্দেশ্যে হচ্ছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেবল তাঁরই দাসত্ব করা, তখন সেই দাসত্বের বাস্তব ও পুর্ণাঙ্গ রূপ মানব জীবনের সর্বদিকে ও বিভাগে প্রতিফলিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এটাও যেমন স্বাভাবিক, তেমনি যুক্তিসঙ্গতও।

এই প্রেক্ষিতেই বলতে হয়, ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘সমগ্র জীবনে এক আল্লাহর দাসত্ব করার যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলা’ যেন তারা শিক্ষা লাভ করে প্রকৃত মানুষের মর্যাদা নিয়ে জীবন যাপন করতে পারে, আল্লাহর দাস হিসেবে যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে সক্ষম হয় এবং তাদের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনকে আলোকমণ্ডিত ও সুখ-শান্তিতে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে। সে শিক্ষার বিষয়বস্তু হচ্ছে এমনসব জ্ঞান যা অর্জন করার মাধ্যমে মানুষের সমগ্র জীবনে এক আল্লাহর দাসত্ব করার যোগ্যতার সৃষ্টি হতে পারে। তাই এক-একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নয, আল্লাহর দাসত্ব স্বীকারকারী লোকদের সমন্বয়ে গঠিত জাতি হিসেবেও এ জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য।

অতএব, যে শিক্ষ মানুষকে মনে-প্রাণে ও বাস্তব জীবনে আল্লাহর দাস বানায়না, আল্লাহর দাস হওয়ার মর্যাদা শেখায়না, আল্লাহর দাস হিসেবে কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করে না এবং আল্লাহর অনুগত দাস হিসেবে ইহকালীন ও পরকালীন জীবন উজ্জ্বল ও সুখময় হওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করে না তা যেমন মানুষ-উপযোগী শিক্ষা নয়, তেমনি নয় ইসলামী শিক্ষাও। বস্তুত ইসলামই মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানুষ বানায়, তাকে পশুর ন্যায় জীবন যাপন করতে নিষেধ করে এবং তার মনে পশুত্বের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণার উদ্রেক করে।

মুসলিম জাতি গঠনে ইসলামী শিক্ষার ভূমিকা

মানুষের ব্যক্তি জীবনে ইসলামী শিক্ষার যে ভূমিকা, জাতীয় জীবনেও ইসলামী শিক্ষার ঠিক সেই ভূমিকা। ইসলামী শিক্ষা প্রথমে ব্যক্তিকে আল্লাহর প্রকৃত দাস তথা অনুগত বান্দাহ বানায়। তারপর সেই অনুগত বান্দাহদের সামষ্টিক জীবনকে প্রকৃত বান্দাহ হিসেবে যাপন করতে অভ্যস্থ করে তোলে। ইসলামী শিক্ষা একটি জাতিকে সবর্তোভাবে-জাতীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগে এবং সকল শাখা ও প্রশাখায় সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য বানায়। তাকে সকল প্রকার পাশবিক চিন্তা-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র ও কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। এভাবে ইসলামী শিক্ষা মানব মনে বিশ্বলোকে নিহিত সকল শক্তি ও উপকরণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যে সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস জন্মায় এবং তা সন্ধান ও আহরণ করে সর্ব মানুষের কল্যাণে প্রয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই শিক্ষাই মানব মনের যাবতীয় জিজ্ঞাসার নিভুর্ল জবাব দিয়ে তার অন্তরে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করে যা অন্য কোন শিক্ষা দ্বারাই সম্ভব নয়।

ইসলামী শিক্ষা মানুষকে কেবল আইনই দেয় না, দেয় একটা শাশ্বত মূল্যমান (Parmanent value)-যা তার জীবনকে সকল পর্যায়ে ও অবস্থায় এক আল্লাহর আনুগত্যে উদ্বুদ্ধ করার সামর্থ্য দান করে।

‘‘এবং তাদের (রাসূলগণ) সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যেন জনগণ ন্যায়পরায়নতা ও সুবিচার সহকারে বসবাস করতে পারে।’’

ইসলামী শিক্ষা ব্যক্তিকে আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ দাসে পরিণত করে এবং অন্য সব শক্তি ও ব্যক্তির দাসত্ব থেকে তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে। এ শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর একান্ত অনুগত বানায়, তাকে অন্য সব কিছুর প্রতি বিদ্রোহী করে তোলে; ফলে সে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করতে, অন্য কারোর আনুগত্য করতে এবং অন্য কারোর সম্মুখে মাথা নত করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে। শুধু অস্বীকার করেই সে ক্ষান্ত থাকতে পারে না, বরং সে জনশক্তি সংগঠিত করে, প্রচলিত সব কিছুই উল্টিয়ে দিয়ে ও উৎপাটিত করে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব-ভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই বিপ্লবী পদক্ষেপের লক্ষ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছেঃ

‘‘যেন বিপর্যস্ত অবস্থার চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং সার্বভৌমত্ব ও জীবন বিধান কেবলমাত্র এক আল্লাহর জন্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়।’’

আল্লাহর এই দাসত্ব স্বীকারকারী ব্যক্তিরা স্বভাবতই একটি সমষ্টি বা জাতিরূপে সংগঠিত হবে। কেননা আল্লাহতে বিশ্বাসী ও তাঁর অনুগত নয় এমন লোকদের সমন্বয়ে যে জাতি বা জাতীয়তা তাকে মেনে নিতে বা তাতে শামিল হতে তারা কখনেই প্রস্তুত হতে পারে না।

সামষ্টিক জীবনের একটি বড় প্রয়োজন হচ্ছে রাষ্ট্র। ইসলামী শিক্ষা আল্লাহর দাসত্ব স্বীকারকারী জাতিকে এমন রাষ্ট্র কায়েমে উদ্বুদ্ধ করে, যার সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট এবং যেকোন আইন মৌলিকভাবে আল্লাহর নাযিল করা বিধান এং যাবতীয় বাধ্যবাধকতা ও সীমা-নিয়ন্ত্রণ রাসূলে কারীম সা.-এর প্রবর্তিত শরী’আতের ভিত্তিতে কাযর্কর। যে রাষ্ট্র আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ওপর স্থাপিত নয়-নয় রাসূলের নিকট থেকে পাওয়া শরী’আত দ্বারা চালিত, তা মেনে নিতে বা তার খেদমত করতে ইসলামী শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও জাতি কখনই প্রস্তুত হতে পারে না।

ইসলামী শিক্ষায় উদ্ভাসিত ব্যক্তি ও জাতি হবে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শের বাস্তব প্রতীক-ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী। যেখানে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়িত নয়, জনগণ নয় ইসলামী আদর্শের অনুসারী, এই চেতনার অগ্রণী সৈনিকরা সেখানকার ব্যক্তি ও জাতিকে ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করবে-তাকে মুক্ত করবে সব অজ্ঞতা, মূর্খতা ও নির্যাতন থেকে।

যে-রাজনীতি ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক নয়, যার লক্ষ্য নয় পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী আইন প্রবর্তন, ইসলামী শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সে রাজনীতি করতে কখনই রাজী হতে পারে না; সে এমন দলের সদস্য হতে বা কর্মী হতেও প্রস্তুত হতে পারে না, যে দল ইসলামী আদর্শ-ভিত্তিক রাজনীতি করে না, করে সেক্যুলার বা সমাজতন্ত্রী রাজনীতি।

ব্যক্তি পর্যায়ে এবং জাতীয় পর্যায়ে সে এমন কোন অর্থ ব্যবস্থা মেনে নিতে ও অনুসরণ করতেও প্রস্তুত হতে পারে না, যার ভিত্তি একান্তভাবে আল্লাহর মালিকানা ও মানুষের আমানতদারীর ধারণারও ওপর ভিত্তিশীল নয়, যা নিরংকুশ ব্যক্তি মালিকানার পুঁজিবাদ বা রাষ্ট্রীয় মালিকানার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ-ভিত্তিক, যা শোষণ ও বঞ্চনা চালায় ব্যক্তি পর্যায়েও, সামষ্টিক ও জাতীয় পর্যায়েও; বরং সে ব্যক্তি ও জাতি এমন একটি অর্থ-ব্যবস্থা গড়ে তোলা কর্তব্য বলে মনে করে, যা মহান আল্লাহর নিরংকুশ মালিকানা ও মানুষের আমানতদারীর (খিলাফতের) আকীদা-ভিত্তিক ও সবর্প্রকার শোষণ ও বঞ্চনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

বস্তুত এইরূপ এক শিক্ষা ব্যবস্থাই ইসলাম শিক্ষা ব্যবস্থা এবং এই শিক্ষা ব্যবস্থাই মানুষের জন্যে মুক্তির সনদ।নিম্নোদ্ধৃত আয়াতদ্বয়ে এই জাতির কথাই বলা হয়েছে আর এ জাতি সম্পর্কেই প্রযোজ্য হবে আল্লাহর ঘোষণাঃ

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ

‘‘তোমরাই হচ্ছ সর্বোত্তম জনসমষ্টি। সমগ্র মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যেই তোমাদেরকে গড়ে তোলা হয়েছে। তোমরাই তো সকল ন্যায়ের আদেশ প্রতিষ্ঠা কর, সকল অন্যায়ের করো নিষেধ ও প্রতিরোধ আর সর্বাবস্থায়ই তোমরা ঈমানদার থাকো এক আল্লাহর প্রতি।’’ (সূরা আলে ইমরানঃ ১১০)

‘‘এমনিভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যম নীতি অনুসরণকারী উত্তম জনসমষ্টি বানিয়েছি যেন তোমরা সমস্ত মানুষের সাক্ষী ও পথপ্রদর্শক হতে পার আর রাসূল হন তোমাদের পথ-প্রদশর্ক ও সাক্ষী।’’

বস্তুত মুসলিম জাতিকে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন ও এই সুমহান দায়িত্ব পালনে নিরত রাখতে হলে কিংবা জনগোষ্ঠিকে অনুরূপ আদর্শের অনুসারী বানাতে হলে ইসলামী শিক্ষাকে পূর্ণরূপে কার্যকর করা একান্তই কতর্ব্য।

এক কথায়, ইসলমী শিক্ষা ছাড়া ইসলামী জাতি অর্থাৎ মুসলিম জাতি গড়ে তোলা এবং মুসলিম জাতিরূপে তাকে রক্ষা করা কখনই সম্ভব নয়।

আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা

আমাদের দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে চালু রয়েছে-বিশেষ করে ‘আধুনিক শিক্ষা’ নামে যা পরিচিত তা-ই হচ্ছে আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা। এই শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদী এবং আমাদের এককালের শাসক ইংরেজদের দ্বারা প্রণীত ও প্রবর্তিত। এ শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তক লর্ড মেক্‌লে সুপারিশ করেছিলেন এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার জন্যে যাতে শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকেরা হবে Indian in blood and colour but English in taste, in opinion, in intellect. অর্থাৎ রক্ত ও বর্ণে ভারতীয়, কিন্তু রুচিবোধ মনোবৃত্তি ও বুদ্ধিমত্তায় ইংরেজ। এ সুপারিশ যে গ্রহীত হয়েছিল এবং এরই ভিত্তিতে উপমহাদেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই যে চালু করা হয়েছিল, তাতো আমরা প্রত্যক্ষ করছি। শুধু তা-ই নয়, সে আমলে তারা সকল স্তরে এই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে বৈষয়িক, রাজনৈতিক ও সামজিক উন্নতি ও অগ্রগতি লাভের চাবিটিও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার-দেশে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তার বাস্তব অর্থ এই ছিল যে, বৃটিশ শাসনে যদি কেউ সামাজিক দিক দিয়ে মর্যাদা, রাজনৈতিক দিক দিয়ে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চাকুরী বা ব্যবসা করে সমৃদ্ধি লাভ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সনদ লাভ করতে হবে। এই সনদই হবে তার উপরিউক্ত ক্ষেত্রসমূহে সর্ববিধ সুযোগ বা স্বীকৃতি লাভের একমাত্র হাতিয়ার।

বাস্তবে হয়েছেও তা-ই। এই শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনের শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকেরাই বৈষয়িক জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্ববিধ সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছে। ফলে গোটা উপমহাদেশীয় জনতা স্বাভাবিকভাবেই এই শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে শিক্ষা লাভের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই শিক্ষা ব্যবস্থাকেই এতদাঞ্চলের লোকেরা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা নামে চিহ্নিত ও অভিহিত করে আসছে। দুই দুই বারের ‘স্বাধীনতাও’ ইংরেজ শাসকদের প্রবর্তিত গোলাম তৈরীর এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমাদেরকে ‘স্বাধীন’ ও মুক্ত করতে পারেনি।

ইংরেজদের প্রবর্তিত এই ‘আধুনিক’ শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব ফল অবিলম্বেই দেখা দিয়েছিল। তার গুরুতর ফল ছিল এই যে, বিশেষ করে মুসলমানদের সার্বিক জীবনে চরম বিকৃতি ও বিপর্যয় দেখা দিল।

এখানে স্মর্তব্য, ইংরেজরা যে সময়ে উপমহাদেশে এই শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল ইউরোপ তখন সর্বতোভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার পর্যায় অতিক্রম করে ধর্মহীনতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। গীর্জার প্রভাব ও কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে গেছে তাদের রাষ্ট্র রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বৈদেশিক নীতি-এককথায় তাদের গোটা ব্যক্তি জীবন ও সামষ্টি জীবন। শুধু তা-ই নয়, গীর্জার এই প্রভাব-মুক্তির সাথে সাথে আল্লাহদ্রোহী চিন্তা-বিশ্বাস ও ভাবধারা সমন্বিত নানা মতবাদ তাদের গোটা জীবনকে পরিবেষ্টিত করে নিয়েছিল। ডারউইনীবিবর্তনবাদ তাদেরকে বানিয়ে দিয়েছিল, আল্লাহ-অবিশ্বাসী, মার্কসীয় দর্শন তাদেরকে বানিয়ে দিয়েছিল নবুয়্যাত, আখিরাত ও কিতাবের প্রতি চরম বিদ্রোহী। মেকিয়াভেলীর রাষ্ট্রদর্শন তাদেরকে বানিয়েছিল ধোঁকাবাজ-প্রতারক ও সুবিধাবাদী এবং ফ্রয়েডীয় নীতিদর্শন তাদের বানিয়ে দিয়েছিল যৌনতাবাদী ও ব্যভিচারী। মোটকথা, ধর্মবিবর্জিত মূল্যমান (Values) তখন তাদের সকল কাজের মানদণ্ড হয়ে গেছে এবং তাদের প্রবর্তিত এদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায়ও এই সকল ভাবধারা উদারভাবে প্রবেশ করেছে। ফলে কথিত শিক্ষাব্যবস্থা এদেশের ধর্মবিশ্বাসী মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধদের কোন্ রসাতলে ঠেলে দিতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

তারা এদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় উপরিউক্ত চিন্তা-বিশ্বাস ও ভাবধারা সমন্বিত রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অথর্নীতি, সমাজবিদ্যা, মনস্তত্ববিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, পদাথর্বিদ্যা ও ভূগোলশাস্ত্রকে শামিল করেছিল। ফলে এই সব চিন্তা-দর্শন বিজ্ঞানের নামাবলী পরে এদেশে জ্ঞান-পিপাপু মুসিলম-হিন্দু-বৌদ্ধ ছেলে-মেয়েদের মনে-মগজে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসার সুযোগ পেয়েছিল।

এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া এদেশের শিক্ষিত লোকদের মননে, জীবনে ও চরিত্রে অবিলম্বে দেখা দির। মুসলিম পরিবারের ঈমানদার ছেলে-মেয়েরা শিক্ষার নামে ঐসব শাস্ত্র গলধঃকরণ করে সম্পূর্ণরূপে বিগড়ে গেল। আল্লহ, রাসূল, কিতাব ও পরকালের প্রতি তারা ঈমান হারিয়ে ফেলল। ইসলামের হালাল-হারাম তাদের নিকট প্রথমে হল অস্বীকৃত এবং পরে উপহাসের বস্তু। অতঃপর এদেশে যে ধরণের বিদ্বানদের জন্ম হতে লাগল, তাদের সাক্ষাত নমুনা স্বরূপ একটি ব্যক্তিত্বের কলমি-চিত্র এখানে উদ্ধৃত করছি। কাজী আবদুল অদুদ প্রসঙ্গে অন্নদাশংকর রায় লিখেছেনঃ

‘‘কাজী আবদুল অদুদ ছিলেন জাতিতে ভারতীয়, ভাষায় বাঙালী, ধর্মে মুসলমান, জীবন দর্শনে মানবতাবাদী, মতবাদে রামমোহনবাদী, সাহিত্যে গ্যেটে ও রবীন্দ্রপন্থী, রাজনীতিতে গান্ধী ও নেহেরুপন্থী, অর্থনৈতিক শ্রেণী বিচারে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক, সামাজিক ধ্যান-ধারণায় ভিক্টোরিয়ার লিবারল।’’ (বিচিত্রাঃ ২১ জানুয়ারী ৭৭)

বলুনতো এই ব্যক্তিটি আসলে কি?

কিছুই নয়; কোন সুনির্দিষ্ট পরিচয়ই তাঁর নেই। [অথচ এই ধরণের পরিচয়হীন লোকেরাই একালে বুদ্ধিজীবি নামে খ্যাত এরাই জাতির কাণ্ডারীর ভূমিকায় অভিনয় করতে সদা প্রয়াসী সম্পাদক]  এটাই হচ্ছে পাশ্চাত্য শিক্ষা পরিণতি। ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা লাভ করে এদেশর মুসলিম সন্তানরা আত্ম-পরিচিতিই হারিয়ে ফেলছে। এ শিক্ষার পরিকল্পনা রচনাকারীর মূল লক্ষ্যই ছিল এদেশের এইরূপ লোক তৈরী করা।

এ শিক্ষায় শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকেরা শিক্ষা নামে স্বীয় ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য আত্মপরিচিতি ও বিশেষত্ব সবই হারিয়ে ফেলছে। এরা প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত নয়; বরং মূর্খ। এদেরকে শুধু মেরুদণ্ডহীন প্রাণীর সঙ্গেই তুলনা করা চলে। এরা হারিয়েছে নিজেদের ঈমান, মূল্যমান ও চরিত্র। তদুপরি ইংরেজ প্রবর্তিত সহশিক্ষা সোনায় সোহাগার কাজ করেছে। ছাত্র-ছাত্রী তথা যুবক-যুবতীর অবাধ মেলামেশার সুযোগ পেয়ে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক লজ্জা-শরমও হারিয়ে ফেলেছে। ন্যায়-অন্যায় ও পাপ-পূণ্যের বোধ হারিয়ে এরা আসলে সর্বহারায় পরিণত হয়েছে। তাদের ইংরেজ প্রভুরা নিজেদের তৈরী পুতুলদেরই লাগিয়েছে এ দেশে তাদের নীতি চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদশের্র ব্যাপক প্রচার কার্যে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এরা চালু করেছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং অর্থনীতিতে চালু করেছে জুলুম-শোষণ, সুদ-ঘুষ ও লুটতরাজ। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর এরাই এইসব অপকর্ম চালিয়েছে অত্যন্ত উৎসাহের সাথে। এরা সরকারী ক্ষমতা ব্যবহার করে এদেশের মানুষের ওপর চালিয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। এরা প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের অহমিকায় সাধারণ মানুষকে মনে করছে ছাগল বা ভেড়ার পাল। এরাই সর্বত্র চরিত্রহীনতার সয়লাব বইয়ে দিয়েছে; মদ্যপানকে ব্যাপক করেছে, ব্যভিচারে দেশটাকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে। এদেরই প্রভাবে জাতির নব্য যুবকরাও একই পথে এগিয়ে চলেছে। ফলে মানুষ বানাবার বড় বড় কারখানা তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতির ভবিষ্যত বংশধরকে ভেড়া ও গাধা বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। বড় বড় শিক্ষাঙ্গনে আজ যা কিছু ঘটছে তা সেই শিক্ষা ও পরিবেশেরই অনিবার্য ফল। এ শিক্ষা থেকে প্রকৃত মানুষ তৈরী হতে পারেনা। মানুষকে গাধা-ভেড়া বা শিয়াল-কুমির বানানো যায় আর তা-ই চলছে বছরের পর বছর ধরে। বর্তমানে জনগণ যে চরম দুরবস্থার মধ্যে নিপতিত, তার মূলে রয়েছে এই শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসাত্মক ভূমিকা; অথচ একেই আমরা জাতীয় শিক্ষা বলি আর এরই জন্যে জাতীয় বাজেটের এক বিরাট অংশ ব্যয় করি। আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা এর সাথে যুক্ত করতে চান প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা কুরআন শিক্ষা। অথচ কাকের পুচ্ছে সাথে ময়ুরের দুটি পালক জুড়ে দিলেই কাক কখনো ময়ুর হতে পারে না।

জাতীয় শিক্ষা নামে এদেশে বৃটিশ আমল থেকে চলে এসেছে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থায় আদর্শিক পরিবর্তন সাধনের জন্য ১৯৪৭ পরবর্তীকালে দেশের আদর্শন-সচেতন জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বার-বার দাবি উঠেছে। কোন কোন সময় সে দাবি এতটা প্রচণ্ড রূপ পরিগ্রহ করেছে যে শাসনদণ্ড ধারণকারী বৃটিশের অন্ধ গোলামরা পর্যন্ত তার কাছে নতি স্বীকার করে শিক্ষাব্যবস্থায় আদর্শিক পরিবর্তন আনার প্রকাশ্য ও বলিষ্ঠ ওয়াদা করতে বাধ্য হয়েছে। সে ওয়াদার পরিপ্রেক্ষিতে একে পর এক শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে; সেসব কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা-গবেষণা চালিয়ে একের পর এক রিপোর্ট তৈরী করেছে। কিন্তু সে সব রিপোর্টের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের কোন প্রস্তাব আদপেই আসেনি অথবা কখনো কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব থাকলেও কার্যত তার দ্বারা সেই কাকের পুচ্ছে ময়ূরের দু-একটি পালক জুড়ে দিয়ে ‘সম্পূর্ণ ময়ূর’ নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা হয়েছে মাত্র। কিন্তু এভাবে কাককে ময়ূরে পরিবর্তিত করা যে আদৌ সম্ভব নয়; বরং তা করতে চাওয়া যে নিতান্তই ধোঁকাবাজি, তা অনুধাবন করার মতো সাধারণ বুদ্ধিটুকুও দেখা যায়নি সে কমিশন সদস্যদের মধ্যে। ফলে এ পর্যায়ের সমস্ত অর্থ ও সময় ব্যয়ই সম্পূর্ণরূপে নিষ্ফল হয়ে গেছে। জাতীয় শিক্ষায় সত্যিকার অর্থে কোন আদর্শিক পরিবর্তনই আসেনি-আসা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়নি, প্রশ্ন করা হলে তার একটিমাত্র জবাবই হতে পারে। আর তাহল, গঠিত শিক্ষা কমিশন বা কমিশনের সদস্যগণ প্রচলিত শিক্ষায়ই শিক্ষিত বলে তাঁরা শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্য কোন আদর্শের কথা চিন্তাই করতে পারেন নি। জাতীয় আদর্শ সম্পর্কে তাঁরা কিছুমাত্র অবহিতও নন এবং ছিলেন না। জনগণের চিন্তা-ভাবনা ও দাবি-দাওয়ার সাথে তাঁদের কোন পরিচিতিও ঘটেনি। ফলে তারা শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার কোন প্রতিফলনই ঘটাতে সক্ষম হননি। এই কথা কেবল যে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেই সত্য তা-ই নয়, এর পূর্বেও যতবারই এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, ততবারই এটা প্রমাণিত হয়েছে। বস্তুত আদর্শহীন শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকেরা যেমন শিক্ষা সংক্রান্ত পরিকল্পনায় কোন রূপ আদর্শিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম নয়, তেমনি জনগণের চিন্তা-ভাবনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকদের পক্ষেও সম্ভব নয় শিক্ষা-পরিকল্পনায় তার কিছুমাত্র প্রতিফলন ঘটানো। বর্তমানেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে বড় বড় গালভরা বুলি কপচানো হচ্ছে তারও পরিণতি যে একইরূপ হবে, তা এ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলী দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। একেতো যাঁরা জাতীয় শিক্ষা পর্যায়ে নতুন পরিকল্পনা বা পরিবর্তনের কথা বলেছেন, তাঁরা নিজেরাই কোন আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত নন- তদুপরি শিক্ষা আদর্শ সম্পর্কেও তাদের আদৌ কোন ধারণা নেই। কাজেই এহেন ব্যক্তিরা শিক্ষায় কোন আদর্শিক পরিবর্তন আনতে সমর্থ হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত তারা এ-ও জানেন না যে, শিক্ষা-ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার গণ-দাবির মূলে কোন্ আদর্শের প্রেরণা কাজ করছে এবং কিরূপ পরিবর্তন জনগণের কাম্য। তাঁরা যা পারবেন তা তো দেখাই গেছে- প্রাথমিক পর্যায়ে আরবী ও ইংরেজী বাধ্যতামূলক করার কথা বলে তাঁরা একদিকে সাধারণ মুসলিম জনতাকে ও অপরদিকে আধুনিক শিক্ষিত পাশ্চাত্যপন্থীদের তুষ্ট করতে চেয়েছেন। কিন্তু মুসলিম জনগণের দাবি যে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা আরবী পড়িয়ে দেয়া নয়, বরং নিম্নস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পরিপূর্ণ ইসলামী আদর্শ-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাই যে একান্তভাবে কাম্য, তা এখনকার শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আদৌ বুঝতে পারেন না। আসলে আরবী ভাষাই কেবল নয়, পুরোপুরি ইসলামী আদর্শ-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করাই হচ্ছে জনগণের দাবি। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু কুরআন-শিক্ষার ব্যবস্থা করলেই এ দাবি পূরণ হতে পারে না। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নীচ থেকে ওপর এবং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঢেলে সাজানোর দাবি করে আসলে এদেশের মুসলিম জনতা। কিন্তু আগের কালের মতো এখনকার শিক্ষা বিভাগীয় কর্মকর্তা ও দেশের কর্তাব্যক্তিরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র করছেন না। আর ভ্রুক্ষেপ করবেন-ই বা কি করে। ডারউইনী থিওরী মতে, মানবাকৃতি লাভের পর মগজের যত উৎকর্ষই হোকনা কেন ‘বানরত্ব’ থেকে তো মুক্তি ঘটেনি এই কর্তাদের। তাই তাঁদের নিকট থেকে ‘মানবত্ব’ তথা প্রকৃত মানবোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা পাওয়ার আশা করাই বৃথা। তাঁরা পারে ঝগড়া বাঁধাতে, ঝগড়ার সৃষ্টি করতে এবং যাদের পক্ষ থেকে ঢিল-পাথর বেশী আসে তাদের নিকটই মাথানত করতে, যদিও দূরে বসে ভ্যাংচাতেও তারা ভোলেন না।

আসলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক ও আদর্শিক পরিবর্তন আনা ছাড়া উপায়ন্তর নেই এবং তা সম্ভব এক সর্বাত্মক বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যম। তাই ইসলামী বিপ্লব একান্তই অপরিহার্য যা একই সাথে সমগ্র জীবনকে-জীবনের সব দিক ও বিভাগকে শুরু থেকেই ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলবে।

ইসলামী শিক্ষা জাতীয় মুক্তির সোপান

পূর্বেকার আলোচনায় আমি একথা সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা পেয়েছি যে, আমাদের বর্তমান জাতীয় শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে জাতীয় শিক্ষা নয়; এ শিক্ষা বিদেশী ও বিজাতীয়-আমাদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক দুশমনদের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা মাত্র। এই শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা উপমহাদেশের অপরাপর ধর্মাবলম্বীরা উপকৃত হয়েছে কি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তা তাদের বিবেচ্য। কিন্তু একজন মুসিলম হিসেবে আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই যে, এই শিক্ষাব্যবস্থা উপমহাদেশের মুসলমানদের শুধু মারাত্মক ক্ষতিই করেনি, তাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও মহামূল্য সম্পদ-তাদের ঈমান ও চরিত্রকে সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করেছে; তাদের জাতিসত্তার মূল ভিত্তিটাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। আমরা একটি আদর্শ-ভিত্তিক জাতি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে আমরা আদর্শহারা, আদর্শ-বিচ্যুত ও আদর্শ-বঞ্চিত। আমরাই ছিলাম দুনিয়ার সেরা চরিত্রবান জনগোষ্ঠী। কিন্তু ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা আমাদের চরিত্রকে সম্পূর্ণরূপে কলুষিত করেছে। চরম নৈতিক বিপর্যয় এনে দিয়েছে আমাদের জীবনের সর্বদিকে।

জাতি হিসেবে আমরা আজ এক কঠিন বিভ্রান্তির মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা চিন্তার ভারসাম্য পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা একদিকে বলছেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টি একান্তই অপরিহার্য; এজন্যে প্রথমিক স্তর থেকেই কুরআন পাঠ ও তরজমা শিক্ষা দিয়ে আধ্যাত্মিক ভাবধারা সৃষ্টি করতে হবে ছাত্রদের মধ্যে। কিন্তু তাঁরাই আবার কোন সঙ্গীত আসরে গানের সুরমাধুর্যে মুগ্ঘ হয়ে ও দিক-দিশা হারিয়ে ঘোষনা করেনঃ প্রাথমিক স্তরেই সঙ্গীত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অন্যদিকে আবার কোন নৃত্যশিল্পীর জন্মোৎসবে যোগ দিয়ে তারা অকপটে বলে ফেলেনঃ নৃত্যশিক্ষা অবশ্যই শিক্ষার অংশ রূপে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এসব কথাবার্তার মাধ্যমে দুনিয়ার সামনে তাঁরা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, একটি মুসলিম দেশের মুসলমান ছেলেমেয়ের শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের কোন নীতি বা আদর্শ নেই; কর্তাব্যক্তিরা যখন যেটা ভাল লাগে, তখন সেটারই জয়গান করেন এবং সেটাকেই শিক্ষার অঙ্গরূপে শামিল করার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। এ থেকে তো এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, চিন্তার দিক দিয়ে আমরা সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে গেছি। এমনকি, এরূপ একটি দেউলিয়া জাতি যে দুনিয়ায় বেশী দিন নিজেদের অস্তিত্বটুকুও টিকিয়ে রাখতে পারেনা-প্রাকৃতিক নিয়মে বরং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াই অবধারিত, তা বুঝবার মত কাণ্ডজ্ঞানও আমাদের কর্তা-ব্যক্তিদের নেই। এরকম ঘোষণাকারীরা আসলে বানরের উপযুক্ত বংশধরের ভূমিকাই পালন করছে। যে যেরকম নাচায়, সেই রকমই এরা নাচে; যে যেরকম ঘোষণা আমাদের দ্বারা দেয়াতে চায়, এরা নির্লজ্জভাবে সেই রকম ঘোষণাই মুখে উচ্চারণ করে। এই প্রেক্ষিতেই বলতে চাই, জাতীয় জীবনে নৃত্য আর সঙ্গীত নিশ্চয়ই এমন কোন প্রয়োজনীয় শিক্ষা নয়, যা না দিলে জাতি চরম দুর্দশার মধ্যে পড়ে যাবে। এযাবত তো ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এগুলোই শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে জাতির দুর্দশা বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়া একবিন্দু লাঘব হয়নি; বরং সত্যকথা এই যে, নাচ আর গান শিখিয়েই জাতির নব্য বংশধরদের চরিত্রকে কলুষিত করা হয়েছে। তারা সাধারণ মানবীয় লজ্জা-শরমও হারিয়েছে, সমাজে নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও যারা এখনো এই বংশধরদেরকে সঙ্গীত নৃত্যকলা শিক্ষা দিতে চায়, তারা এজাতিকে চিরদিন ‘কলা’ই দেখাবে, তার একবিন্দু কল্যাণ সাধন করতে পারবেনা।

বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলমান। এদেশে কিছু সংখ্যক অমুসলিমও বাস করে বটে; কিন্তু তাই বলে সেই স্বল্প সংখ্যক অমুসলিমের দোহাই দিয়ে যারা দেশের বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘মুসলিম’ রূপে বিবেচনা করতে ও বিশেষভাবে তাদের সার্বিক কল্যাণের চিন্তা করতে প্রস্তুত নয়, তারা আসলে মুসলিম নামধারী হয়েও মুসলমানদের দুশমন। এই দুশমনির তাগিদেই তারা মুসলিম সমাজে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র দর্শন আওড়ায়। কিন্তু এই দর্শনটি যে মূলত মুসলিমদের মুসলমানিত্ব খতম করার লক্ষ্যে প্রচারিত, তাদেরকে ‘অমুসলিম’ বানানোর কুটিল উদ্দেশ্যে রচিত এবং দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তা আজ আর কারোর বুঝতে বাকী নেই। তাই এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সচেতন মুসলমানদের প্রধান ও প্রথম কর্তব্য।

একথা অনস্বীকার্য যে, মুসলিম সন্তানদেরকে প্রকৃত মুসলিম রূপে গড়ে তুলতে হলে দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে প্রাথমিক স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আগাগোড়া নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক ক্রমবিকাশ অনুপাতে ইসলামের বিশ্বদর্শন, মানব-দর্শন ও সমাজ-দর্শন সংক্রান্ত জ্ঞান পরিকল্পিত শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে পরিবেশনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তা করতে হবে সহজ থেকে ক্রমশ কঠিন ও উচ্চতর মানে। শিক্ষার স্তর যত উচ্চ হবে জ্ঞানের মানও সেই অনুপাতে উচ্চ হতে থাকবে। অতীব সহজ-সরল বিষয় ক্রমশ উচ্চ মানে উন্নীত হয়ে জটিল ও সূক্ষ্ণ রূপ ধারণ করবে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি এবং গ্রহণ ও ধারণ ক্ষমতার সথে পুরামাত্রায় সামঞ্জস্য রক্ষা করে জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন ব্যাপকতা ও গভীরতা আনতে হবে, তেমনি আনতে হবে জটিলতা ও সূক্ষ্ণতার উচ্চমান। শিক্ষার্থীদের বয়সের সাথেও বিষয়বস্তুতে অবশ্যই সামঞ্জস্যশীল হতে হবে।

প্রাথমিক স্তরে উপরোক্ত তিন পর্যায়ে জ্ঞানের সাথে স্থূল পরিচিতি দানই যথেষ্ট। তাতে শিক্ষার্থীদের মনে বিষয়গুলো আরও গভীর, সূক্ষ্ণ ও বিস্তৃতভাবে জানবার আগ্রহের সৃষ্টি হবে।

এ জ্ঞান-দান পদ্ধতিকে একটি দৃষ্টান্তের সাহায্যে বোঝানো যেতে পারে। এদেশের একজন অধিবাসী কারোর মুখে মক্কা শরীফের কথা শুনল। সে জানতে পারল মক্কা শরীফ নামে একটা শহর আছে; সেখানে কাবা ঘর অবস্থিত। অতঃপর পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক পড়ে মক্কা শহরের ইতিবৃত্ত ও বিস্তারিত বিবরণ জানল। মক্কা থেকে ফিরে আসা লোকদের মুখে সে আরও বিস্তারিতভাবে অনেক কথা জেনে নিল। তারপর একসময় সে নিজেই মক্কায় উপস্থিত হল এবং নিজ চোখে মক্কা শহর, কাবা গৃহ ও অন্য সব কিছু দেখতে পেল। এভাবে বলা যায়, মক্কা সম্পর্কে সে লোকটির জ্ঞানের তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় শুধু জানা বা শোনা জ্ঞান। দ্বিতীয় পর্যায় সুদৃঢ় ও প্রত্যয়পূর্ণ জ্ঞান-‘ইলমে ইয়াকী’। আর তৃতীয় অর্থাৎ সর্বশেষ বা সর্বোচ্চ পর্যায় প্রত্যক্ষদর্শনের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান-‘আইনুল ইয়াকীন’।

একটি বিষয়ের জ্ঞানকে প্রথমিক স্তর থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহজ-সরল থেকে ক্রমশ ব্যাপক, সূক্ষ্ণ ও জটিল পর্যায়ে উন্নীত করা এবং শিক্ষার্থীর বয়োবৃদ্ধির ক্রমিক ধারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার অনুধাবন, গ্রহণ ও ধারণ ক্ষমতার ক্রমবিকাশের সাথে মিল রেখে পরিবেশন করাই ইসলামের শিক্ষা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অনুসরণ করা না হলে শিক্ষার্থীর মানসিক কথা জ্ঞানগত বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। প্রকৃতির বিধানও তা-ই।

এই পর্যায়ে স্মর্তব্য, সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে অজানাকে জানা। কিন্তু ইসলামে শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু অজানাকে জানাই নয়, বরং সব চাইতে বেশী অজানা অথচ সর্বাধিক প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য হচ্ছে আল্লাহকে জানা। আল্লাহকে জানা যায় তাঁর ঘোষিত গুণাবলীর সাথে গভীর ও ব্যাপক পরিচিতি লাভের মাধ্যমে, আল্লাহর সৃষ্টি তত্ত্ব ও সৃষ্টি-কৌশল এবং বিশ্বলোককে জানার সাহায্যে। বিশ্বলোককে যথার্থভাবে জানতে না পারলে মানুষ নিজেকেও জানতে পারে না। আর মানুষ নিজেকে যদি যথার্থভাবে জানতে না পারেন, তাহলে তার জন্ম ও জীবনটাই অর্থহীন।

তাই ইসলামী শিক্ষার বিষয়বস্তুর মধ্যে প্রথমেই শামিল হতে হবে মহান আল্লাহর গুণাবলী জানা-তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি তথা আদেশ ও নিষেধগুলো জানা। সেই সাথে বিশ্ব-প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং একদিকে আল্লাহ ও অপরদিকে বিশ্বলোক ও তার মধ্যকার যাবতীয় জিনিসের সাথে মানুষের সম্পর্কের স্বরূপ ও আচরণ-বিধি ইত্যাদি জানাও আবশ্যিক বিষয় রূপে গণ্য থাকবে। ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষণীয় বিষয়ের এই ব্যাপকতা একান্তই অপরিহার্য। যে শিক্ষা ব্যবস্থা উক্ত বিষয়গুলো এইবিন্যাস সহকারে শিক্ষাদান করছে না, তা ইসলামী শিক্ষা নয়-তা নয় মুসলমানদের গ্রহণযোগ্য শিক্ষা ব্যবস্থা। এরূপ শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে আমাদের দেশে চালু নেই। বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় হয়ত অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আয়োজন রয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে অনেক তথ্য শেখানো হচ্ছে; কিন্তু উপরিউক্ত জরুরী বিষয়গুলো উক্তরূপ বিন্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে শিক্ষা দান করা হয় না বলেই তা সাধারণভাবে মানুষের এবং বিশেষভাবে মুসলমানদের কোন কল্যাণেই আসেনা, বরং মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অতএব, বর্তমানে প্রচলিত এই অকল্যাণকর এবং মারাত্মক ক্ষতিকর শিক্ষা ব্যবস্থাকে খতম করে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা অবিলম্বে প্রবর্তন করাই জনকল্যাণকামী যে কোন সরকারের কর্তব্য। বাংলাদেশের মুসলিম জনতার এটাই ঐকান্তিক দাবি।

এই ভূখণ্ডের মুসলিম জনতার পক্ষ থেকে ইংরেজ শাসন আমল, পাকিস্তান আমল, এবং বর্তমান বাংলাদেশ আমলে বার বার এখানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্যে সম্ভাব্য সকল উপায়েই দাবি জানানো হয়েছে। এ জন্যে অসংখ্য সভা-সম্মেলন, সেমিনার, আলোচনা সভা ও বিক্ষোভ মিছিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এইসব দাবি-দাওয়া উক্ত তিন আমলের কর্তৃপক্ষকে ইসলামী শিক্ষা প্রবর্তনে রাজী করাতে সক্ষম হয়নি। শাসকরা গণদাবির প্রতি কোন গুরুত্বই দেয়নি। তারা মুখে ওয়াদা করলেও সে ওয়াদার বার বারই খেলাফ করা হয়েছে। গণদাবিকে পাশ কাটানোর জন্যে তারা সুস্পষ্টভাবে মুনাফেকী করেছে। ইসলামী জনতাকে নির্লজ্জভাবে ধোঁকা দেয়া হয়েছে। এ দিক দিয়ে পরাধীন আমল ও স্বাধীন আমলের মধ্যে কোনই পার্থক্য হয়নি।

বৃটিশ আমলে ইসলামী শিক্ষা প্রবর্তিত না হওয়ার বোধগম্য কারণ হল ইংরেজ শাসকরা তা কিছুতেই করতে পারে না। কেননা এদেশে যে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রাচীন  মুসলিম শাসন কাল থেকে চলে এসেছিল তাকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে নিজেদের মনোপুত দর্শন ও অসদুদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যেই তারা আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল। তারা মুসলিম সন্তানদেরকে ইসলামী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে নিজেদের পরিকল্পিত শিক্ষা প্রদান করে তাদেরকে ‘খৃষ্টান’ বা ‘অমুসলিম’ বানাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান আমলে এই দাবি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার সুস্পষ্ট কারণ ছিল, শাসকবর্গ ও শিক্ষা বিভাগীয় কর্তারা ছিলেন বৃটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁরা কি করে তাঁদের মন-মানস ও চরিত্রের বিপরীত ইসলামী শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করতে পারেন তাঁদেরই সন্তানকে? আর শেষ কালে স্বাধীন বাংলাদেশেও এই দাবি অস্বীকৃত হওয়ার কারণ হল, স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান মুহুর্ত পর্যন্ত দেশের শাসন ক্ষমতা ও শিক্ষা বিভাগীয় কর্তৃত্ব এমন লোকদেরই কুক্ষিগত রয়েছে যারা নিজেরাই পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, বৃটিশের অন্ধ গোলাম এবং নিজেদেরকে ডারউইনী দর্শন অনুযায়ী লাঙুলবিহীন বানরের বংশধর বলে বিশ্বাস করেন। কাজেই এহেন শাসকরা ‘পরাধীন’ বা প্রায়-স্বাধীন এবং স্বাধীন-এই তিনও অবস্থায় একই প্রকারের ভূমিকা পালন করবে, তাতে আর সন্দেহ কি?

কিন্তু বর্তমান সময়ের ব্যর্থতা যে এর পূর্বের দুই আমলের ব্যর্থতার তুলনায় অনেক বেশি মারাত্মক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা বিদেশী বা বিধর্মীরা যে এদেশের মুসলিম জনগণের দাবির প্রতি কোন গুরুত্ব দেবে না, তা সহজেই বোঝা যায়। পাকিস্তান আমলের ব্যর্থতাও কম বেদনাদায়ক নয়। কেননা পাকিস্তান অর্জিতই হয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্র তথা ইসলামী তাহ্‌যীব ও তামাদ্দুন কায়েমের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে, এটা সকলেরই জানা ছিল। তখনকার প্রকৃত শাসকরা বাংলাদেশী ছিলেন না বটে, কিন্তু মুসলমান তো ছিলেন! সে হিসেবে পাকিস্তান আমলেই ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা ছিল তাদের দ্বীনি দায়িত্ব। আর সর্বশেষে বাংলাদেশের ব্যর্থতা সর্বাধিক দুঃখজনক এই কারণে যে, এখানকার শাসকরা সকলেই এদেশী-বিদেশী নয়। এ দেশীয় শাসকরা এই দেশেরই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত, ঐকান্তিক ও ঐক্যবদ্ধ দাবি মানবে না, তা কিভাবে কল্পনা করা যেতে পারে! শাসকরা সব সময়ই ‘গণতন্ত্র’ ‘গণতন্ত্র’ বলে চিৎকার করেন। দেশের জনগণের দাবি অনুযায়ী কাজ করাই নাকি গণতন্ত্র। তা হলে জনগণের ঐক্যবদ্ধ দাবি দেশী শাসকদের দ্বারা অস্বীকৃত হলে সেটাকে কিভাবে ‘গণতন্ত্র’ বলা যেতে পারে? তার অর্থ, বাংলাদেশের শাসকরা ‘গণতন্ত্রের’ বুলি কপচালেও কার্যত তা অনুসরণ করতে  প্রস্তুত নন।আসলে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করাই হচ্ছে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের যথার্থ রূপ। এটাই ম্যাকিয়াভেলীয় শাসন-নীতি। কিন্ত কথা এখানেই শেষ নয়। এদেশের শাসকরা তো মুসলিমও। শুধু মুসলিমই নন, তাঁরা নাম পড়লে তাঁদেরকে ‘নামাযী’ এবং হজ করলে তাদেরকে ‘হাজী’ না বললে রীতিমত অসন্তুষ্ট হয়ে বসেন। তাঁরা যখন বলেঃ ‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান’ কিংবা ‘এ দেশ পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান হিসেবে ইসলামকে বাস্তবায়িত করা হবে’ তখন এদেশের মুসলিম জনতা শুধু খুশীই হয়না, রীতিমত আশাবাদী হয়ে ওঠে। তাই শাসকরা যখন বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী আদর্শ রূপায়িত হবে, নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা হবে ইত্যাদি, তখন তাকে তো আর অবিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু কাযর্ত যখন দেখা যায় যে, তাদেরই মতো বানর বংশজাত ছেলে-পেলেদের ইট-পাটকেল পড়লে তারা তাদের বলা সব কথা রীতিমত ভুলে যান, তখন চরমভাবে হতাশ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

এই প্রেক্ষিতে আমি দেশবাসীর নিকট চূড়ান্তভাবে বলতে চাই, যারা নিজেদেরকে বানর বংশজাত বলে বিশ্বাস করে এসেছে তাদের দ্বারা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন সম্ভব নয়। আসলে অতীতের ন্যায় এখনও আমরা মারাত্মক ধরণের গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি। বানর-বংশজাত লোকদের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি না পেলে এ গোলকধাঁধাঁ হতে নিষ্কৃতি লাভ কোনদিন সম্ভব হবে না। অতএব মুসলিম জনগণের জন্য একটিমাত্র পথই এখন খোলা আছে আর তা হচ্ছে চূড়ান্তভাবে ইসলামী বিপ্লব সংঘটন। এই আবর্জনার স্তূপ থেকে এদেশকে- এদেশের মানুষকে মুক্তি দিতে পারে, দিতে পারে ইসলামী শিক্ষা, ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, ইসলামী শাসন পদ্ধতি, ইসলামী অর্থনৈতিক ইনসাফ ও নিরাপত্তা এবং ইসলামী সংস্কৃতি একটি সফল ইসলামী বিপ্লব।

এই কথা দেশবাসীর পক্ষে যত শীঘ্র অনুধাবন করা সম্ভব হবে তত শীঘ্রই ইসলামী বিপ্লবের পথ উন্মুক্ত হবে।

ইসলামী শিক্ষাদর্শনের বিশেষত্ব

ইসলামী শিক্ষা-দর্শনের দুটি বিশেষত্ব লক্ষ্যণীয় একটি তার সবর্জনীনতা (Universality) আর দ্বিতীয়টি তার নিরন্তর-নিরবচ্ছিন্ন সত্যানুসন্ধান প্রবণতা (Continuous search for Truth)।

সবর্জনীনতা বা সর্বাত্মকতার অর্থ- নারী-পুরুষ, শহরবাসী-গ্রামবাসী সকলেরই জন্যে শিক্ষা অবাধ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা বিধান, সকলকেই শিক্ষা-দীক্ষায় ভূষিত করে তার নিজের এবং গোটা সমাজ ও জাতির জন্যে কল্যাণকরর করে গড়ে তোলা। এ ব্যাপারে কোন রূপ শ্রেণী-বর্ণ-গোত্রের পার্থক্য বিন্দুমাত্র প্রতিবন্ধক হতে পারেনা।

ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষাকে জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সংক্রান্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে দ্বীন ও দুনিয়া বা অন্য কোন দিক দিয়েও কোন ব্যবধান গ্রাহ্য হবেনা। জীবন ও জগতের সমগ্র দিককেই শিক্ষার আওতার মধ্যে আনতে হবে। তাকে বৈষয়িক ও নৈতিক জীবনের সর্বপ্রকার সমস্যার সমাধান সংক্রান্ত হতে হবে; সকল প্রশ্নের জবাব দেয়ার যোগ্যতাসম্বলিত হতে হবে। তাতে জীবনকে এক অবিভাজ্য একক (Unit) রূপে গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য তাতে জাগতিক বিষয়াদির ওপর আধ্যাত্মিক দিককে-বস্তুগত দৃষ্টিকোণের ওপর নৈতিক দৃষ্টিকোণকে বিজয়ী ও প্রভাবশালী হতে হবে। কেননা ইসলামের ঘোষণা হচ্ছেঃ

‘‘ইহজীবন পরকালীন জীবনের জন্যে কর্মক্ষেত্র স্বরূপ।’’

এই ঘোষণার তাৎপর্য হল, শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকদের পক্ষেই পরকালীন কল্যাণ ও সাফল্যকে লক্ষ্য হিসেবে রেখে সমস্ত বৈষয়িক ব্যাপারে পুরোমাত্রায় অংশ গ্রহণ সম্ভবপর, যেন এক্ষেত্রে কোনরূপ কূপমণ্ডুকতা, অবিমৃষ্যকারিতা এবং অবসাদ ও অসতর্কতা স্থান পেতে না পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে সত্যানুসন্ধান ও তত্ত্বানুসন্ধানে গভীর চিন্তা-ভাবনা-গবেষণা ও সূক্ষ্ণ বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োগের প্রবল তাগিদ থাকতে হবে। উপরন্তু এখানে কোন একটা স্তর বা পর্যায়কে চূড়ান্ত মনে করা যাবে না। ইসলামের মৌল দর্শন হচ্ছে এই সমগ্র বিশ্বলোক এক মহান স্রষ্টার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এই বিস্ময়কর সৃষ্টির অন্তর্নিহিত মহাসত্য ও রূপ-সৌন্দর্য এখনো সম্যকভাবে লোকসমক্ষে উদ্ঘাটিত হয়ে ওঠেনি। বিশ্ব-প্রকৃতিতে নিহিত কল্যাণময় দ্রব্য-শক্তি-সম্ভার এখনো মানুষের কল্যাণে পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার ও প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। সেই প্রচ্ছন্ন সত্য ও সৌন্দর্য এবং সেই অব্যবহৃত দ্রব্য ও শক্তি-সম্ভারকে উদ্ঘাটিত ও আবিষ্কৃত করে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার ও প্রয়োগ করার যোগ্যতা সৃষ্টিকারী জ্ঞান-গবেষণায় নিয়োজিত করার মাধ্যমে মানুষকে ইহকালে সুখময় জীবন যাপনের সুযোগ করে দিতে হবে।

বস্তুত দুনিয়ার সবগুলো সমেুদ্রের পানি যদি মসি হয় আর সমস্ত বৃক্ষ যদি হয় কলম, তা হলেও বিশ্বলোকে বিরাজিত নিয়ম-কানুন ও শক্তি-সামগ্রীর বর্ণনা লিখে শেষ করা যাবে না। তাই তত্ত্ব-অনুসন্ধান ও চিন্তা-গবেষণার যোগ্যতা সৃষ্টিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা ইসলামী শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ববহ।

পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান আল্লাহ-অবিশ্বাস ও বস্তুবাদী ভাবধারার ওপর বিকাশ লাভ করেছে। বস্তুগত সভ্যতা ও সংস্কৃতিই এর প্রাণ। বৈষয়িক সুখ-সুবিধা ও স্বাদ আস্বাদনই এক একমাত্র লক্ষ্য এবং তাকেই মনে করা হয় একমাত্র চরম সাফল্য। তাতে আধ্যাত্মিকতা ও দ্বীনী মূল্যমান (Values) হচ্ছে নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার। সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই। মুসলিম সমাজ নির্বিচারে এই শিক্ষা গ্রহণ করে তার দ্বীনী ভাবধারা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে গোটা সমাজ বর্তমানে এক দুঃখজনক অবস্থার সম্মুখীন; তার জাতিসত্তা আজ  সুসংবদ্ধতা, নৈতিক বিশেষত্ব ও উন্নত আদর্শবাদিতা থেকে বঞ্চিত হয়ে বিপর্যয়ের চরম সীমায় উপস্থিত। প্রকৃত উন্নতি ও উৎকর্ষ লাভের সব পথ তার জন্যে সম্পূর্ণ বন্ধ।

বলা বাহুল্য, আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পূর্ণ কি অসম্পূর্ণ- একথা বলা হচ্ছেনা। আমার বক্তব্য হল, বর্তমানে জীবন ও সমাজ পূর্বের তুলনায় অনেক বিস্তীর্ণ- সম্প্রসারিত আর এই জীবন সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে নিয়েছে পাশ্চাত্যের খোদাদ্রোহীমূলক দর্শন ও জীবন-বিধান। জীবনকে এ রাহু-গ্রাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর বিশ্বাস ও আল্লাহ-প্রদত্ত জীবন বিধানের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা ইসলামী শিক্ষাদর্শনের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলেই মুসলিম ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনকে প্রকৃত কল্যাণে ধন্য করা সম্ভব হবে। তারা বর্তমান পশ্চাদপদতার পরিবর্তে অত্যাধুনিক ও প্রাগ্রসর জাতিগুলোকেও অতিক্রম করে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারবে- লাভ করতে পারবে প্রকৃত উন্নতি ও স্থায়ী অগ্রগতি। কেননা ইসলামী শিক্ষা-সূচীর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীর মন ও মানসিকতার পরিশুদ্ধি, নির্মলতা ও স্বচ্ছতা বিধান এবং সর্বপ্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্বলতা ও অক্ষমতা মুক্তকরণ, অব্যাহত ও নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা-সাধনার ফলে কল্যান-প্রস্রবনের উৎস-মুখ উন্মোচন এবং সমগ্র মানুষকে সে কল্যাণের অংশীদার বানানো।

এ লক্ষ্যে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা পদ্ধতি, পাঠক্রম ও বিষয়-সূচী সম্পূর্ণ নতুনভাবে ঢেলে বিন্যাস করতে হবে। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যারাই তৈরী হবে, তারাই ভবিষ্যত মানব সমাজের নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে এবং দ্রুত অগ্রসরমান মানব-বংশের যথার্থ নেতৃত্ব দান কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব হবে।

অতএব ইসলামী শিক্ষা দর্শনের মূল লক্ষ্য হল, আধুনিক কালের উপযোগী যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ও পুরোপুরি ইসলামী আদশৃবাদী ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরী করা এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলঅ। অন্যকথায় বলা যায়, ইসলামী শিক্ষাদর্শনের দৃষ্টিতে শিক্ষার চরম লক্ষ্য হল ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে আল্লাহর প্রেম-ভালোবাসা এবং আল্লাহ্নুগত্যের প্রবল ভাবধারা জাগ্রত করে তোলা। এ পর্যায়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের কথাটি যথার্থ। তিনি বলেছেনঃ ‘ইসলাম শুরু থেকেই এক রাজনৈতিক ধর্মমত’। আমরা বলবঃ ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। জীবনের সমগ্র দিক ও বিভাগের ওপর তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বর্তমান থাকা অপরিহার্য। ব্যক্তিগতভাবে মুসলমানরা হবে উন্নত গুণসম্পন্ন মানুষ, আদর্শনিষ্ঠ, আদর্শবাদী ও আদর্শানুসারী মানুষ, জনদরদী ও সার্বিক কল্যাণকামী মানুষ এবং ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের উপযুক্ত নাগরিক- পরকালে যারা হবে মহান আল্লাহর চূড়ান্ত বিচারে সর্বতোভাবে উত্তীর্ণ, আল্লাহর সর্বাধিক সন্তুষ্টিতে ধন্য।

ইসলামী শিক্ষার পাঠ্য তালিকা

ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, বিশ্বস্রষ্টা মহান আল্লাহ তা’আলার একত্ব ও অনন্যতার প্রতি বিশ্বাস ও প্রত্যয়কে মানব মনে ও আত্মায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, প্রত্যেক ব্যক্তির হৃদয়-মনে আল্লাহর ভয়কে সদা জাগ্রত ও সক্রিয় প্রভাবশালী রাখা ও প্রত্যয়কে জীবন নিয়ন্ত্রণকারী চেতনায় পরিণত করা যেন প্রতিটি মানুষ তার বাস্তব জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তাঁর নিষিদ্ধ কোন কাজ সম্পাদন না করে। বস্তুত দ্বীন-ইসলামের মূল লক্ষ্যও এটাই।

এই উদ্দেশ্য লাভের জন্যে প্রয়োজন ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ ইসলাম শিক্ষা, যা অর্জন করা প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির জন্যে বাধ্যতামূলক। এরূপ শিক্ষালাভ ব্যতীত ব্যক্তির মন-মানস, জীবন, চরিত্র ও বৈষয়িক কর্মতৎপরতা কখনই ইসলামী আদর্শানুযায়ী উত্তীর্ণ হতে পারেনা। ফলে তার শুধু পরকালীন জীবনই নয়, বর্তমান বৈষয়িক জীবনও প্রকৃত তাৎপর্যের দৃষ্টিতে নিতান্তই ব্যর্থ হয়ে যেতে বাধ্য।

ইসলামী শিক্ষাকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে- ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত। ব্যক্তিগত পর্যায়ের শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিটি ব্যক্তিকে গভীরভাবে সুপরিচিত করাঃ

. এই বিশ্বলোক এবং এখানকার অপরাপর সৃষ্টিকুলের সাথে তার সম্পর্ক,

. জীবনের কর্মকাণ্ডে তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও কর্তব্য,

. অন্যান্য মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য,

. বিশ্বলোক প্রপঞ্চ অনুধাবন এবং তার পিছনে সদা কার্যকর নিয়মাবলী পুংখানুপুংখ রূপে অধ্যয়ন,

. মহান স্রষ্টার সৃষ্টিধর্মী বুদ্ধিমত্তা বা কৌশল, যা মানুষের সৃষ্টিকর্মে পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়েছে- গভীরভাবে অনুধাবন।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে অনুরূপ এক পাঠ্যতালিকা রচনা করা এবং  আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের নিম্নশ্রেণী থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তা পড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রকৃত মুসলিম নাগরিক তৈরীর জন্যে একান্তই আবশ্যক এবং সে রূপ একটি পাঠ্য তালিকা আমরা কুরআন মজীদকে ভিত্তি করে সহজেই রচনা করতে পারি।

এ পর্যায়ের পাঠ্যতালিকায় এমন বিষয়াদি শামিল করতে হবে, যা শিক্ষার্থীর হৃদয় মনে মহান আল্লাহ সম্পর্কে এক সুস্পষ্ট ধারণার সৃষ্টি করবে; এই দুঢ় প্রত্যয় জন্মাবে যে, তিনি এক, একক ও লা-শরীক। তিনিই সমগ্র সৃষ্টিলোকের একমাত্র স্রষ্টা, রক্ষাকর্তা, পরিচালক ও শিক্ষাদাতা এবং প্রতিটি জীব ও প্রাণীর রিযিকদাতা। কেবল তিনিই মানুষের একমাত্র মা’বুদ, তিনি ছাড়া আর কেউই মা’বুদ নেই- হতে পারেনা। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনি শাশ্বত-চিরন্তন। তিনিই একমাত্র আশ্রয়দাতা, ক্ষমাকারী, প্রার্থনা কবুলকারী ও বিপদ থেকে উদ্ধারকারী।

কুরআন মজীদের এই পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক আয়াত রয়েছে। সে আয়াতসমূহ একত্রে পড়ানো ও সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঠদান আল্লাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ও দৃঢ়প্রত্যয়ের সৃষ্টির জন্যে যথেষ্ট হতে পারে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ একটি আয়াত উল্লেখ করা যেতে পারেঃ

إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن طِينٍ – فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ

‘‘স্মরণ করো তোমার রব্ব যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি মানুষকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করব, যখন তাকে পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবয়ব দান করলাম এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দিলাম, তখন সকলেই-সবকিছুই তার জন্যে সিজদায় পতিত হন।’’ (সূরা সাদঃ ৭১৭২)

এ আয়াতের সাহায্যে আল্লাহ, মালায়িকা বা ফেরেশতা, কাদামাটি দিয়ে প্রথম মানুষটির সৃষ্টি, তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকে দেয়া এবং সবকিছুরই তার আনুগত্য স্বীকার সম্পর্কিত বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করার ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ থেকে মানুষ সম্পর্কে এই জ্ঞান লাভ করা যায় যে, মানব দেহ মাটির মৌল উপাদানে তৈরী হলেও তা একান্তভাবে জড় পদার্থ নয়, তাতে রয়েছে আল্লাহর দেয়া বিশেষ রূহ-যা নিছক জীবন বা প্রাণই নয়-আত্মাও। তাই মানুষ জড় (Matter) ও চেতনা (Spirit) উভয়ের সমন্বিত এমন এক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা, যার আনুগত্য করতে- বরং সঠিক কথায় তার হাতে ব্যবহৃত হতে প্রস্তুত গোটা সৃষ্টিলোক। ফলে মানুষ সৃষ্টির জড়বাদী ধারণা সম্পূর্ণ বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ পাশ্চাত্যের মানব সম্পর্কিত ধারণা একান্তই ভুল। সেই সঙ্গে মানুষের আত্মাসর্বস্ব সৃষ্টির ধারণাও কিছুমাত্র সত্য নয়।

অনুরূপভাবে এই বিশ্বলোকে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা আমরা নিঃসন্দেহে নির্ধারণ করতে পারি আল্লাহর ঘোষণা (আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে যাচ্ছি) থেকে। অর্থাৎ মানুষ দুনিয়ার অন্যান্য সব জীব-জন্তু-প্রাণীর মত লক্ষ্যহীন ও দায়িত্বহীন নয়- নয় কোন স্বেচ্ছাচারী সত্তা, বরং তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর এবং উন্নততর এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। সে মর্যাদা হচ্ছে, এই পৃথিবীতে আল্লাহর দেয়া বিধান অনুাযায়ী কার্যসম্পাদন করাই মানুষের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে সব কিছুই তার সহযোগী।

পরবর্তী বাক্যাংশ থেকে আমরা মানুষের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের উৎস সম্পর্কেও জানতে পারি যে, সে জ্ঞান আল্লাহর দেয়া শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত, উত্তরকালে বা ওহীর মাধ্যমে সময়-সময়ে মানুষকে দান করা হয়েছে ফলে মানুষের জ্ঞানের উৎস দু’টি। একটি স্বভাবজাত বা বংশানুক্রমিক আর অপরটি ওহী।

মানুষের জীবন-লক্ষ্য সম্পর্কে আমরা স্থির-নিশ্চিত ধারণা গ্রহণ করতে পারি সূরা আয-যারিয়াতে ৬৫ নম্বর আয়াত থেকে। সেই সাথে মানুষের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি সূরা মরিয়মের শেষ তিন আয়াত থেকেঃ

إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَٰنِ عَبْدًا – لَّقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا – وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا

‘‘আসমান ও জমিনে বসবাসকারী সকলেই মহান দয়াবানের সমীপে একান্ত দাস হিসেবেই আসবে। তিনি তাদের বেষ্টন করে রেখেছেন এবং তাদের ভালোভাবে গণনা করে রেখেছেন। আর তারা সকলেই কিয়ামতের দিন তার সমীপে একক ও নিঃসঙ্গভাবে আসবে।’’ (সূরা মরিয়ামঃ ৯৩৯৫)

তাই ইসলামী শিক্ষার পাঠ্য-সূচীতে মানুষের ব্যক্তিগত-ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদি শামিল থাকা উচিত। প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীদের ধারণ ক্ষমতার মান অনুযায়ী সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমিক ধারায় শামিল থাকতে হবে।

এ শিক্ষায় ব্যক্তি-স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহির পূর্ণাঙ্গ ধারণার ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে জানাতে হবে, ভাল কি, মন্দ কি, হালাল কি, হারাম কি, কোন্ কাজ কিভাবে করলে পরকালে শান্তি বা শাস্তি হবে। এ ফলে তার মধ্যে চিন্তার স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ শক্তি ও বাছাই করার যোগ্যতা বাড়বে। তাদেরকে ভাল স্বভাব-চরিত্র এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কেও শিক্ষাদান জরুরী, যেন তারা এ ক্ষেত্রে উন্নত মানের শোভন ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়। সুস্বাস্থ্য রক্ষার দিকেও তাদেরকে সচেতন বানাতে হবে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরতে হবে। এ পর্যায়ে উল্লেখ্য আয়াতঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

‘‘হে ঈমানদার লোকেরা! এই মদ্য, জুয়া, আস্তানা ও পাশা- এ সবই না-পাক শয়তানী কাজ। তোমরা ইহা পরিহার কর। আশা করা যায় যে, তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে।’’ (সূরা মায়িদাঃ ৯০)

এই দৃষ্টিতে দুনিয়ার খাদ্য, পানীয় ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানবান ও সচেতন করে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি করতে হবে যে, আল্লাহ্ কর্তৃক নিষিদ্ধ খাদ্য-পানীয় ও ব্যবহার্য জিনিস দ্বারা মানুষ সাময়িকভাবে আনন্দ-স্ফূর্তি বা সুখ পেলেও পরিণামে তা মানব জীবনে নিয়ে আসে গভীর দুঃখ ও বেদনা, সামাজিকতার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে তিক্ততা, শত্রুতা ও বিবাদ-বিসম্বাদ।

শিক্ষার্থীদের চিন্তা স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং যুক্তিবিদ্যা শেখাতে হবে, যা নিহিত রয়েছে আল্লাহর সৃষ্টিকর্মে। বিশ্বলোক, বিশ্বলোকে নিহিত প্রকাশমানত  (Phenomenon), প্রকৃতিতে নিহিত রহস্য-জ্ঞান ও নিয়মাদি কুরআনের উপস্থাপনকে অনুসরণ করে তাদেরকে বোঝাতে হবে। বিশ্বলোক আল্লাহর কুদরাত, অনুগ্রহ ও মুজিযা কিভাবে কাজ করছে, সে বিষয়ে তাদের সচেতন বানাতে হবে। প্রকৃতিতে বিরাজিত আল্লাহর নিদর্শনাদিরও বিশদ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকা আবশ্যক পাঠ্য-তালিকায়।

ইসলামী পাঠ্যতালিকা চিন্তা স্বাধীনতাকে উদ্বোধিত করবে। যখন তাকে ভালো-মন্দ ও হালাল-হারাম সম্পর্কিত জ্ঞান পরিবেশন করা যাবে, তখন বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সে নিজের জীবনকে সঠিক পথে চালাতে সক্ষম হবে। সে একজন দায়িত্ব-সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠতে পারবে। কাজেই বিবেক-বুদ্ধির দিক দিয়ে প্রতিটি মানুষকেই স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মনির্ভরশীল বা পর-মুখাপেক্ষীহীন করে গড়ে তোলা এবং গড়ে উঠতে পূর্ণ সহযোগিতা দান একান্তই আবশ্যক।

সামাজিক দায়িত্ববোধ

ইসলামী শিক্ষার পাঠ্য-বিষয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বোধ ও বিশ্বাস জাগাবে যে, ইসলামে সামাজিক শৃংখলা মূলত ঐক্য-একতা, সমতা-সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের ওপর ভিত্তিশীল। তা স্বৈরতন্ত্র ও স্বৈরাচার এবং একনায়কত্ব ও রাজতন্ত্রকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। মুসলিম উম্মাহ এক ও অভিন্ন; ভাষা-বর্ণ, বংশ-অঞ্চল, অর্থ সম্পদ- প্রভৃতির দিক দিয়ে মুসলিমে মুসলিমে কোন পার্থক্যই স্বীকার করেনা। দুনিয়ার মুসলিম-যেখানেই যার বাস-সকলে একই ইমান ও একই অকৃত্রিম সহানুভূতির অংশীদার। গোটা মুসলিম উম্মাহ যেন একটি ব্যক্তিসত্তা। তারা ন্যায়পরায়নতা, সত্যানুসরণ ও আল্লাহর বিধান পালনে পরস্পরের সহযোগিতা করবে এবং খোদাদ্রোহিতা ও শরী’আতের আইন লঙ্ঘনে কোন সহযোগিতা বা সমর্থনকে বরদাশ্‌ত করবেনা।

‘‘আর তাঁর নির্দর্শনাদির মধ্যে রয়েছে আকাশসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি আর তোমাদের ভাষাসমূহ ও তোমাদের বর্ণের পার্থক্য।’’ (সূরা রূমঃ ২২)

تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

‘‘আর গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজ, তাতে কাউকে একবিন্দু সাহায্য ও সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় কর, কেননা, তার শাস্তি অত্যন্ত কাঠিন।’’ (সূরা মায়িদাঃ )

অনুকম্পা পরামর্শ গ্রহণ

এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের দুটি আয়াত উল্লেখ্যঃ

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ

‘‘(হে নবী!) এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহের বিষয় যে, তুমি এই সব লোকের জন্যে খুবই নম্র স্বভাবের লোক হয়েছে। অন্যথায় তুমি যদি উগ্র স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী হতে, তবে এরা তোমার চতুর্দিক হতে দূরে সরে যেত। অতএব এদের অপরাধ মাফ করে দাও, এদের মাগফিরাতের জন্যে দো’আ কর এবং দ্বীন-ইসলামের কাজ-কর্মে এদের সাথে পরামর্শ কর। অবশ্য কোন বিষয়ে তোমার মত যদি সুদৃঢ় হয়ে যায়, তবে আল্লাহর ওপর ভরসা কর। বস্তুত আল্লাহ তাদের ভালবাসেন, যারা তাঁর ওপর ভরসা করে কাজ করে।’’ (সূরা আলেইমরানঃ ১৫৯)

وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ – وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ – وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ

‘‘আর যা কিছু আল্লাহর নিকট রয়েছে তা যেমন উত্তম ও উৎকৃষ্ট, তেমনি চিরস্থায়ীও আর তা সেই লোকদের জন্যে যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের রব্ব-এর ওপর নির্ভরতা রাখে, যারা বড় বড় গুনাহ ও নির্লজ্জ কাজকর্ম হতে বিরত থাকে। আর ক্রোধের সঞ্চার হলে ক্ষমা করে দেয়, যারা নিজেদের রব্ব-এর হুকুম মানে, নামায কায়েম করে এবং নিজেদের যাবতীয় সামষ্টিক ব্যাপার পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে, আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’’ (সূরা শূরাঃ ৩৬৩৮)

ইসলামী শিক্ষার পাঠ্যতালিকায় অবশ্যই এমন বিষয়াদি শামিল থাকতে হবে যা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অনুকম্পাশীল ও দয়ার্দ্রহৃদয় বানাবে এবং অভ্যস্ত বানামে সাথীদের থেকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণে। নিজের মতকে অন্য লোকের উপর চাপিয়ে দেয়ার বা অন্য সবকে নিজের মতের অন্ধ অনুসারী বানানোর প্রবণতা কখনো লালন করবেনা।

একজন শিক্ষিত মুসলিম পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতা ও স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি শুভ আচরণ ও প্রত্যেকের হক আদায়ে আন্তরিকভাবে প্রয়াসী হয়ে গড়ে উঠবে। এ পর্যায়ে আল্লাহর ঘোষণাঃ

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا – وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا –

‘‘তোমার রব্ব ফায়সালা করে দিয়েছেন (এক) তোমরা কারও ইবাদত করবে না-কেবল তাঁরই ইবাদত করবে। (দুই) পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তোমাদের নিকট যদি তাদের কোন একজন কিংবা উভয়ই বৃদ্ধাবস্থায় থাকে, তবে তুমি তাদেরকে ‘উহ!’ পর্যন্ত বলবে না, তাদেরকে ভর্ৎসনা করবে না; বরং তাদের সাথে বিশেষ মর্যাদা সহকারে কথা বলবে।’’ (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ২৩২৪)

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

‘‘তাঁর নিদর্শনাদির মধ্যে এও (একটি) যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদেরই জাতির মধ্যে থেকে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের নিকট পরম প্রশান্তি লাভ করতে পার।’’ (সূরা রূমঃ ২১)

সমাজের অসহায়, অভাবগ্রস্ত ও বিপন্ন লোকদের প্রতি সে নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করবেঃ

وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا – إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

‘‘নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার দাও আর মিসকীন ও সম্বলহীন পথিককে তার অধিকার। তোমরা অপব্যয়-অপচয় করিও না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী লোকেরা শয়তানের ভাই আর শয়তার তার রব্ব-এর প্রতি অকৃতজ্ঞ।’’ (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ২৬২৭)

সামাজিক সংহতি

ইসলামী সমাজের নাগরিকগণ পরস্পরের সাথে গভীর সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। কেউ কারোর আইনসঙ্গত অধিকার, মালিকানা ও মর্যাদায় হস্তক্ষেপ করবেনা। প্রত্যেকেই স্বাধীন ও নির্ভীকভাবে স্বীয় কর্তব্য পালন করবে। কেউ কাউকে শোষণ করবে না-ঠকাবেনা। পাঠ্য বিষয়বস্তু দিয়ে শিক্ষার্থীদের মন-মগজ এভাবেই গড়ে তুলতে হবে। কেউ কাউকে অপমানিত, লাঞ্ছিত বা বিদ্রূপ করবে না, কারোর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করবেনা, কারোর দোষ রটিয়ে বেড়াবেনা। যেমন বলা হয়েছেঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ

‘‘হে ঈমানদার লোকেরা! না কোন পুরুষ অপর পুরুষদের বিদ্রুপ করবে-হতে পারে যে, সে তাদের তুলনায় ভালো হবে। আর না কোন মহিলা অন্যান্য মহিলাদের ঠাট্টা করবে-হতে পারে যে, সে তাদের অপেক্ষা উত্তম হবে। (তোমরা) নিজেদের মধ্যে একজন অপরজনের ওপর অভিসম্পাত করবে না এবং না একজন অপর লোকদেরকে খারাপ উপনামে স্মরণ করবে। ঈমান গ্রহণের পর ফাসিকী কাজে খ্যাতিলাভ অত্যন্ত খারাপ কথা।’’ (সূরা হুজুরাতঃ ১১)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ

‘‘হে ঈমানদার লোকেরা! খুব বেশী খারাপ ধারণা পোষণ হতে বিরত থাক। কেননা কোন কোন ধারণা ও অনুমান গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। তোমরা দোষ খোঁজাখুঁজি করো না আর তোমাদের কেউ যেন কারও গীবত না করে। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যে তাহার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? তোমরা নিজেরাই তো এতে ঘৃণা পোষণ করে থাকো।’’ (সূরা হুজুরাতঃ ১২)

আভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্পর্ক

ইসলামে সমাজের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তৎসত্ত্বেও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ ও প্রবণতা, বিশেষ করে অন্যান্য জাতির সথে সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। তাই পাঠ্যপুস্তকে এ পর্যায়ের বিষয়াদি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক, সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সরকারকে শুভ নীতি-ভঙ্গি, আদর্শ ও কল্যাণময় আইন মেনে চলতে বাধ্যকরণ পর্যায়ের জ্ঞানও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগিয়ে তোলা ইসলামী শিক্ষা-দর্শনের দৃষ্টিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রাষ্ট্রীয় আদর্শ, সরকার ও সরকার-চালক সঠিক ও শুভ না হলে জন-মানুষের জীবন কখনই শুভ হতে পারেনা। তাই ইসলামী শিক্ষার পাঠ্যতালিকায় এই পর্যায়ের বিষয়াদি অবশ্যই শামিল থাকতে হবে। কেননা কুরআন মজীদ উক্ত বিষয়াদির উপর খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছে। এখানে কতিপয় আয়াতে উদ্ধৃতি দেয়া যাচ্ছে।

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ

‘‘বস্তুত সার্বভৌমত্ব ও শাসন-কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যই নয়। তাঁর নির্দেশ এই যে, স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া তোমরা আর কারোরই দাসত্ব ও বন্দেগী করবে না।’’ (সূরা ইউসূফঃ ৪০)

أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ – مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ –

‘‘হে কারাগারের বন্ধুরা আমার! তোমরা নিজেরাই ভাবিয়া দেখ, ভিন্ন ভিন্ন বহু সংখ্যক রব্ব্ ভালো, না সেই এক আল্লাহ যিনি সবকিছুরই ওপর বিজয়ী-মহাপরাক্রমশালী। তাঁকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের বন্দেগী কর, তারা ক’টি নাম ছাড়া আর কিছুই নয়, যা তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা রাখিয়া লইয়াছ। আল্লাহ ওদের জন্য কোনই সনদ নাযিল করেন নাই।’’ (সূরা ইউসুফঃ ৩৯৪০)

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

‘‘যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।’’ (সূরা মায়িদাঃ ৪৪)

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ

‘‘এরা সেই সব লোক, যাদেরকে আমরা যদি জমিনে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দান করি, তবে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে, যাবতীয় ভাল কাজের হুকুম দিবে এবং যাবতীয় অন্যায় কাজে নিষেধ করবে।’’ (সূরা হজ্বঃ ৪১)

اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۗ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ

‘‘হে লোকসকল! তোমাদের রব্ব্-এর তরফ তেকে তোমাদের প্রতি যাকিছু নাযিল করা হয়েছে তা মেনে চল এবং তাঁকে বাদ দিয়ে অপরাপর পৃষ্ঠপোষকদের অনুসরণ ও অনুগমণ করো না।’’ (সূরা আরাফঃ )

وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ ۗ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ

‘‘আমরা তোমাদেরকে জমিনে ক্ষমতা-ইখতিয়ার দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্যে এখানে জীবনের সামগ্রী সংগ্রহ করে দিয়েছি। কিন্তু তোমরা খুব কমই শোকর আদায় কর।’’ (সূরা আ’রাফঃ ১০)

وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا ۗ قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ ۖ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ – قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ –

‘‘এই লোকেরা যখন কোন লজ্জাকর কাজ করে, তখন বলেঃ আমরা আমাদের বাপ দাদাকে এই সব কাজ করতে দেখেছি আর আল্লাহই আমাদেরকে এরূপ করবার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদেরকে বল, আল্লাহ লজ্জাকর কাজের হুকুম কখনই দেন না।’’ (সূরা আরাফঃ ২৮২৯)

আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভূমিকা

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

‘‘হে ইমানদার লোকেরা! আল্লাহর ওয়াস্তে সত্য নীতির ওপর স্থায়ীভাবে দণ্ডায়মান ও ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হও। কোন বিশেষ দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এতদূর উত্তেজিত করে না তোলে যে, (এর ফলে) ইনসাফ ত্যাগ করে ফেলবে। ন্যায়বিচার করো; কেননা খোদাপরস্তির সাথে এর গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে। আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাক। তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি ওযাকিফহাল রয়েছেন।’’ (সূরা মায়িদাঃ )

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ

‘‘হে ঈমানদার লোকেরা! এই কাফিরদের সাথে লড়াই কর, যেন শেষ পর্যন্ত ফিতনা খতম হয়ে যায়।’’ (সূরা আনফালঃ ৩৯)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ

‘‘হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা যখন একটি সৈন্য-বাহিনী রূপে কাফিরদের সম্মুখীন হও, তখন তাদের মুকাবিলা করা হতে কখনই পশ্চাদমুখী হবে না।’’ (সূরা আনফালঃ ১৫)

وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِن قَوْمٍ خِيَانَةً فَانبِذْ إِلَيْهِمْ عَلَىٰ سَوَاءٍ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ

‘‘আর যদি কখনো কোন জাতির পক্ষ হতে তোমরা ওয়াদা ভঙ্গের আশঙ্কা কর, তবে তাদের ওয়াদা-চুক্তিকে প্রকাশ্যভাবে তাদের সম্মুখে ছুঁড়ে মারো; আল্লাহ নিশ্চয়ই ওয়াদা ভঙ্গকারীদের পসন্দ করেন না।’’ (সূরা আনফালঃ ৫৮)

وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِّبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ –

‘‘আর তোমরা যতদূর সম্ভব বেশী পরিমাণ শক্তিমত্তা ও সদাসজ্জিত ঘোড়া (বাহন) তাদের সঙ্গে মুকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুত করে রাখ, যেন তার সাহায্যে আল্লাহর এবং নিজেদের দুশমনদের আর অন্যান্য এমন সব শত্রুদের ভীত-শংকিত করতে পারো যাদেরকে তোমরা জান না; কিন্তু আল্লাহ জানেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরোপুরি বদলা তোমাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তোমাদের সাথে কক্ষনই জুলুম করা হবে না।’’ (সূরা আনফালঃ ৬০)

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ –

‘‘আর মুশরিকদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তি যদি আশ্রয় চেয়ে তোমাদের নিকট আসতে চায় (আল্লাহর কালাম শুনার উদ্দেশ্যে) তবে তাকে আশ্রয় দান কর, যেন সে আল্লাহর কালাম শুনতে পারে। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছিয়ে দাও। এটা এই জন্যে করা উচিত যে, এই লোকেরা প্রকৃত ব্যাপার কিছুই জানে না।’’ (সূরা তওবাঃ )

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُم مِّنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ –

‘‘হে ঈমানদার লোকেরা! যুদ্ধ কর সেই সত্য অমান্যকারী লোকদের বিরুদ্ধে, যারা তোমাদের নিকটবর্তী রয়েছে। তারা যেন তোমাদের মধ্যে দৃঢ়তা ও কঠোরতা দেখতে পায়। আর জেনে রাখ, আল্লাহর মুত্তাকী লোকদের সঙ্গেই রয়েছেন।’’ (সূরা তওবাঃ ১২৩)

ইসলামী পাঠ্যতালিকায় এমন বিষয়বস্তু থাকতে হবে যা শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতায় আদর্শবাদ, আদর্শিক বলিষ্ঠতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও অনমনীয়তার সৃষ্টি করবে এবং নিজেদের আদর্শিক বিজয় সাধনে নির্ভীক ও অগ্রসরমান বানাবে।

আন্তর্জাতিক চুক্তি রক্ষা ও পরস্পরের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে ইসলামের নীতি অত্যন্ত দৃঢ়। বিশ্বশান্তি রক্ষায় এ নীতি অত্যন্ত সহায়ক। কিন্তু কোন রাষ্ট্র যদি সেদেশের মুসলিম সংখ্যালঘুকে দুর্বল ও অসহায় পেয়ে নির্যাতনের শিকার বানায় তাহলে মুসলিম মাত্রই সক্রিয় প্রতিবাদী হয়ে ওঠবে। তখন সে ব্যাপারটি আর সেদেশের ‘আভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ থাকবে না। বরং সে দেশটি আন্তর্জাতিক চুক্তি লংঘনের অপরাধে দায়ী হবে। এ বিষয়ে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্রদেরকে অনমনীয় বানাবার উপযোগী বিষয়াদি শিক্ষা দিবে।

وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا –

‘‘কি কারণ থাকিতে পারে যে, তোমরা আল্লাহর পথে সেই সব পুরুষ, স্ত্রীলোক ও শিশুদের খাতিরে লড়াই করবে না, যারা দুর্বল হওযার কারণে নিপীড়িত হচ্ছে এবং ফরিয়াদ করছে যে, হে আমাদের রব্ব্! আমাদেরকে এ জনপদ হতে বের করে নাও, যার অধিবাসীগণ অত্যাচারী।’’ (সূরা আননিসাঃ ৭৫)

মানুষ বিশ্বলোক

خَلَقَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ۖ وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ وَبَثَّ فِيهَا مِن كُلِّ دَابَّةٍ ۚ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنبَتْنَا فِيهَا مِن كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ

‘‘তিনি আকাশমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন কোনরূপ স্তম্ভ ব্যতীতই, যা তোমরা দেখতে পাও। তিনি জমিনেরর বুকে পর্বতমালা শক্ত করে বসিয়ে দিয়েছেন, যেন তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে। তিনি সব রকমের জীব-জন্তু জমিনের বুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন আর আমরা আসমান হতে পানি বর্ষণ করিয়েছি এবং জমিনের বুকে রকমারি উত্তম জিনিসসমূহ উৎপাদন করিয়েছি।’’ (সূরা লুকমানঃ ১০)

ইসলামী শিক্ষা পাঠ্য-তালিকার জন্যে অনেকগুলো জরুরী বিষয় এ আয়াতটিতে রয়েছে যা প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ানো যেতে পারে। যেমন, আকাশ-মার্গ, যা কোনরূপ সমর্থন ছাড়াই ঊর্ধ্বলোকে দাঁড়িয়ে আছে; গ্রহপুঞ্জের নক্ষত্র ও উপগ্রহাদি, গতি ও গতির নিয়মাবলী, আলো ও অন্ধকার, জীবন ও মৃত্যু, দিন ও রাত- এ সবই আল্লাহর কুদরাতের বাহ্য প্রকাশ মাত্র। পর্বতমালা, যা পৃথিবীকে দোদুল্যমানতা থেকে রক্ষা করছে। অপরিমেয় খনিজ পদার্থ যা মাটির তলায় লুকিয়ে রয়েছে, যেমন রয়েছে লাভা বা প্রস্তরের স্তর। এ ছাড়া আল্লাহর সৃষ্ট অসংখ্য জাতি-প্রজাতি, আকাশে মেঘের সঞ্চার, বৃষ্টিপাত, বৃক্ষ, গুল্মলতার উদ্গম ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় এখানে পাওয়া যাচ্ছে, যার গভীর ও ব্যাপক শিক্ষাদান আবশ্যক।

মোটকথা ইসলামী শিক্ষার পাঠ্যসূচীতে নিম্নোক্ত বিষয়াদি শামিল করার কথা কুরআন থেকেই জানা যায়ঃ

১. একটি ভালো সমাজ গড়ে তোলা সৎকর্মশীল আদর্শ ও চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে, যেখানে সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও সুবিচার কার্যকর থাকবে।

২. এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, প্রীতি-ভালোবাসা, সহৃদয়তা, দয়া-অনুগ্রহ, কল্যাণ কামনা ও সত্যানুসন্ধানের ভাবধারা প্রভাবশালী হবে।

৩. এমন সমাজ, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, আলাপ-আলোচনা, পরামর্শ গ্রহণ ও প্রদান এবং ব্যক্তির মেধা ও কর্মশক্তি তথা যোগ্যতার পূর্ণমাত্রার বিকাশ ও প্রয়োগ সম্ভব হবে।

৪. এমন সমাজ, যেখানে ব্যক্তি পূর্ণমাত্রায় স্বাধীনতা ভোগ করবে চিন্তায় ও প্রকাশে এবং সামষ্টিক দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য হয়ে গড়ে উঠবে।

৫. এমন সমাজ, যেখানে ব্যক্তি নিজ আদর্শ রক্ষা করে পবিত্র, নিষ্কলুষ ও সুখী জীবন যাপনে সক্ষম হবে।

সর্বোপরি, সে সমাজ হবে আল্লাহর অনুগত, আল্লাহর আইন পালনের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টিকামী। এরূপ সমাজ গড়ার উপযোগী জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে পর্যায় ও মান অনুপাতে এবং সে শিক্ষা লাভ সহজ হবে প্রতিটি শিক্ষার্থী নাগরিকের জন্য।

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম