শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সাহিত্য

সাহিত্যে আদর্শবাদ

মানুষের জীবন একটি সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক সত্তা। তার অসংখ্য দিক ও বিভাগ এবং অগণিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে। অপরিমেয় কার্যকারণ মানব জীবনে প্রতিনিয়ত কর্মরত। সাহিত্য এই পর্যায়েরই একটি বিষয় মাত্র। কিন্তু মানব জীবনে সাহিত্যের প্রকৃত অবস্থান কোথায়, তা সন্ধান করে দেখা আবশ্যক। খুঁজে দেখা দরকার যে, জীবনের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক কতটা ওতপ্রোত, সাহিত্য কিভাবে লালিত-পালিত হয়, উন্নতি ও উৎকর্ষ লাভ করে এবং তখন তা কিরূপ পরিগ্রহ করে। সাহিত্যের সঙ্গে কোন্ কোন্ দিক সম্পর্কিত, তার কল্যাণের দিকগুলো থেকে বেশী বেশী ফায়দা লাভ কিভাবে সম্ভব হতে পারে-সম্ভব হতে পারেনা তার ক্ষতির দিকসমূহ থেকে আত্মরক্ষা করা ইত্যাদি বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

হৃদয়-মনের অনুভূতির ভাষাগত রূপায়ণকেই বলা হয় সাহিত্য। আবেগ ও চেতনাকে সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক শব্দের বিন্যাসের মাধ্যমে ব্যক্ত করাই সাহিত্য। তা যেমন বক্তৃতা ও ভাষণরূপে প্রকাশিত হতে পারে, তেমনি কাব্য ও কবিতার ছন্দময় পরিচ্ছদেও সজ্জিত হতে পারে। গদ্য রচনার সম্ভারে বিভিন্ন রূপ নিয়েও আসতে পারে তা জনগণের সম্মুখে।

মানব সমাজের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। জীবনের মূল্যমান নির্ধারণ ও বিনির্মাণে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রবল। মানুষের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যবোধ ও সৌন্দর্য চেতনাকে তা উজ্জীবিত, উচ্ছ্বসিত ও উদ্ভাসিত করে তুলতে সক্ষম। সৌন্দর্য চেতনাকে ভারসাম্যময় এবং জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বানাতে এবং উচ্চ  মানসম্মত লালিত্য ও সুধাময় করে তোলাও সাহিত্যেরই অবদান। মানুষের মধ্যে নৈতিক চেতনা জাগ্রতকরণ এবং তার লালন ও উৎকর্ষ সাধন সাহিত্যেরই কীর্তি। কুপ্রবৃত্তির ওপর সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির বিজয় অর্জন এবং পরিশীলিত রুচিবোধ সৃষ্টি ও তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রে সাহিত্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য অসামান্য। সভ্যতা ও সংস্কৃতির মানকে উন্নত করার দায়িত্বও তারই ওপর অর্পিত। মানব চিত্তের চেতন, অবচেতন ও অচেতন অবস্থার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দুর্বলতাসমূহকে সুস্পষ্টরূপে দেখিয়ে দেয়াও সাহিত্যেরই কাজ।

সাহিত্য আমাদের জীবনের প্রতিটি কোন ও প্রতিটি দিকের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। তা আমাদেরকে আনন্দের সামগ্রী পরিবেশন করে এবং দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়া মনকে হাত ধরে ঊর্ধ্বে তুলে দেয়। দরিদ্র ও সর্বহারার পর্ণকুটিরে যেমন তার স্থান, তেমনি ধনবান ও ক্ষমতাসীনদের বিলাস-বহুল প্রাসাদেও তার অবাধ গতি। সাহিত্য মূলত আমাদের হৃদয় স্পন্দনের ক্ষণতম প্রতিধ্বনি; শব্দের চাকচিক্যময় পোশাক পরে তা আমাদের সামনে শরীরী হয়ে দেখা দেয়। সামগ্রিক দৃষ্টিতে সাহিত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির এমন একটা অংশ, যাকে উপেক্ষা করা যায় না- বিচ্ছিন্ন ও অপ্রয়োজনীয় মনে করাও সম্ভব নয়।

সাহিত্য জীবন ও জীবন-প্রেক্ষিতের প্রতিবিম্ব। একারণেই প্রতি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী ও সমাজের সৃষ্ট সাহিত্য কিছু-না-কিছু ভিন্নধর্মী বিশেষত্বের ধারক হয়ে থাকে, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সমাজের এমন কিছু ঐতিহ্য গড়ে ওঠে যা তার সাহিত্যের জীবনদায়িনী রস হয়ে থাকে। পরিবেশগত স্বাতন্ত্র্য, ঐতিহ্যের বিশেষত্ব এবং চিন্তা ও বিশ্বাসগত সাযুজ্য ও অভিন্নতা সম্মিলিত হয়ে এক-একটি বিশেষ ধরণের চিন্তা-পদ্ধতি দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ সৃষ্টি করে, যা ভিন্নতর সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে কখনই সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না। দৃষ্টিকোণ ও চিন্তা-পদ্ধতির স্বতন্ত্র্য প্রকাশভঙ্গিতে স্বতঃই একটা বিশেষত্ব এনে দেয়। তাই ‘বিশ্বের সব সাহিত্য এক ও অভিন্ন’- কিছু সংখ্যক চিন্তাবিদ ও সাহিত্য দার্শনিকের এই কথা আদৌ সত্য নয়। বৈষয়িক জীবনের মৌলিক সমস্যা অভিন্ন হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু সে সমস্যা বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন ও নীতিগতভাবে তার সমাধান বের করা এবং বাস্তবে সে সমস্যার সমাধান করা, সর্বোপরি তার ফলাফল দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার পন্থা-পদ্ধতি ও ধরণ কখনই অভিন্ন হতে পারে না। এ কারণে তওহীদ-বিশ্বাসী সমাজের সাহিত্য বহুত্ববাদে বিশ্বাসী সমাজের সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হওয়া অবধারিত।

তওহীদ-বিশ্বাসী সমাজের জীবনাদর্শ ইসলাম। তা যেমন ব্যাপক, তেমনি পূর্ণাঙ্গ। তা জীবন যাপনের একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ও ধারাক্রমে জীবন একটি অবিভাজ্য সমগ্র হিসেবেই আচরিত ও প্রবাহিত। দ্বীন ও দুনিয়া কিংবা ইহকাল ও পরকালের কোন বিভক্তি এ পদ্ধতিতে অগ্রহণযোগ্য। বাউল-সন্ন্যাসী ও পাদ্রী-পুরোহিতের জীবনধারা এখানে সম্পূর্ণরূপে অকল্পনীয়। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক জীবন পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডাকারে যাপিত হওয়ার কোন অবকাশই ইসলামী পদ্ধতিতে স্বীকৃত নয়। আনুষ্ঠানিক ইবাদত-বন্দেগীতে ইসলামী রীতি পালন, কিন্তু সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র-পরিচালনায় তাকে অস্বীকার করার একবিন্দু অনুমতি নেই এ জীবন পদ্ধতিতে। যে সাহিত্য মানুষকে আদর্শহীন চরিত্রহীন ও নির্লজ্জ বানায়, তার ফসল ফলানো দূরের কথা, তার চাষ করাও এখানে সম্ভব নয়- তার প্রকাশ ও প্রচলনের তো কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। [এক শ্রেণীর সাহিত্যসেবী মনে করে যে, শিল্পসাহিত্য হচ্ছে নেহাত আনন্দের সামগ্রী; তার কোন সামাজিক মানবিক ভূমিকা নেই তাই শিল্পসাহিত্যকে তাঁরা শুধু চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম রূপে ব্যবহারের পক্ষপাতী কিন্তু ইসলাম এইরূপ দায়িত্বহীন মনোভাবকে কিছুমাত্র সমর্থন করে না সম্পাদক] শুধু তওহীদী জীবন-পদ্ধতির কথা নয়, যে বিধি-বিধানই জীবন ও সমাজের জন্য গৃহীত, তারই অনিবার্য দাবি হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা- জীবনের সমগ্র ক্ষেত্রে পূর্ণ মাত্রার অনুসরণ। এ যেমন সত্য, তেমনি এও অনস্বীকার্য যে, জীবনের এক-একটি ক্ষেত্রে এক এক ধরণের আদর্শ মূল্যমানের অনুসরণ অবাঞ্ছনীয়, যা পরস্পর-বিরোধী ও সাংঘর্ষিক। কোন সুস্থ মানুষ জীবনকে নৈরাজ্যের মধ্যে তো ঠেলে দিতে পারে না। নৈরাজ্যের মধ্যে জীবন-বিকাশ সম্ভব মনে করার বুদ্ধি বিকৃতিরই পরিচায়ক। সেটা যদি সম্ভব হয়ও তাহলে তা নিশ্চয়ই মানুষের জীবন নয়-সেরা সৃষ্টির জীবন নয়, নিতান্তই বন্য ও পাশবিক জীবন। কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষই তার কামনা করতে পারেনা, সে রূপ জীবনের কারণ হতেও প্রস্তুত হতে পারে না- তার আহ্বায়ক বা উদ্ভাবক হওয়া তো দূরের কথা।

জীবনের জন্যে কোন আদর্শ ও নীতির প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। এমন একটা আদর্শ জীবনের জন্যে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, যা বিশ্বলোকে-এই অগণিত সৃষ্টির মধ্যে মানুষের প্রকৃত অবস্থানকে সুনির্ধারিত করবে। মানুষ তো বৃক্ষ-গুল্ম-লতা বা ঝর্ণা-নদী-সমুদ্র নয় যে, তা স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। মানুষ পশু নয়; তাই পাশব-বৃত্তিই তার চালিকা শক্তি হতে পারে না। মানুষ বিবেক-বুদ্ধি ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যবোধসম্পন্ন সত্তা। তাই তার জীবন এসবের সুস্পষ্ট নির্ধারণকারী এক পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনগ্রাহ্য আদর্শ ছাড়া চলতেই পারে না। সে আদর্শই বলে দেবে, এই জীবনে মানুষের দায়িত্বের পরিসীমা কতদূর। তা-ই নির্ধারণ করবে প্রত্যেকের অধিকার ও কর্তব্য। পারস্পরিক বিরোধ-বিসম্বাদ ও মত-বৈষম্যের মীমাংসা করা সেই সর্বজনীন আদর্শের ভিত্তিতেই সম্ভব। আমাদের আলোচ্য সাহিত্যের দর্শন ও রূপরেখাও তারই আলোকে নির্ধারণ করতে হবে অবশ্যম্ভাবীরূপে।

তওহীদী ধর্ম (দ্বীন) ইসলামকে সম্মিলিত জীবনের একক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হলে সমগ্র জীবন তথা ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক জীবন দিয়ে তার মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করতে হবে- তার ব্যাপকতা ও পূর্ণাঙ্গতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। তাই জীবনের কোথাও-সাহিত্য চর্চায়ও-বহুত্বের প্রতি একবিন্দু সমর্থন থাকতে পারবে না। তওহীদ-বিশ্বাসের ঐকান্তিক দাবি হচ্ছে নিজের সমগ্র জীবন দিয়ে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি বিধান। তার সেই সন্তুষ্টি বিধানে যেমন নিয়োজিত করতে হবে ব্যক্তি-সত্তার অন্তর্নিহিত তাবৎ শক্তি ও প্রতিভাকে, তেমনি এই বিশ্বলোকের সমস্ত দ্রব্য ও সামগ্রীকে। এর কোন একটিকেও তার অসন্তোষ ও ক্রোধ উদ্রেককারী কাজে ও নিয়মে ব্যবহার করা যেতে পারে না- তার অধিকারও কারোর নেই।

ক্রোধ, লোভ ইত্যাকার প্রবৃত্তি মানব সত্তায় নিহিত বিভিন্ন গুণ। এই গুণসমূহের শক্তি অদম্য। তাই ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে এই গুণ ও তার শক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সংযত রাখা, তাকে কোনক্রমেই বল্গাহীন না করা- বল্গাহীন হতে না দেয়া বরং নির্দেশিত পথে ও নিয়মে তাকে চরিতার্থ করা। এগুলোর উৎপাদন ও নির্মূল সাধন বৈষ্ণব বা বৈরাগ্যবাদের শিক্ষা। ইসলামে তা সম্পূর্ণরূপে অসমর্থিত।

ক্রোধকে সংযত করা এবং অপরাধীকে ক্ষমা করা কুরআনের শিক্ষা। মানুষের জন্যে তা এক অতীব উচ্চ মানের নৈতিকতা। যারা ক্রোধকে সংযত রাখে এবং অপরাধীকে ক্ষমা করে, তারা মহান স্রষ্টার প্রিয়জন। সাহিত্যের (গদ্য বা কবিতার) সাহায্যে মানুষে মানুষে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে হিংসার আগুন জ্বালানো মানব সমাজের জন্যে ক্ষতিকর এবং এই গুণটিরও চরম অপব্যবহার। জাহিলী যুগে কবি-সাহিত্যিকরা তাদের কাব্য ও সাহিত্য দ্বারা গোত্রসমূহের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার আগুণ উৎক্ষিপ্ত করে তুলতো; প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করতো। অপরাধকে যে ক্ষমা করা যায়, তা ছিল তখনকার মানুষের কল্পনারও অতীত। ইসলাম কাব্য ও সাহিত্যের এই অপব্যবহার বন্ধ করে দেয় এবং মানুষে মানুষে বন্ধুতা-ভালোবাসা ও সদ্ভাব-সম্প্রীতি সৃষ্টির কাজে তার ব্যাপক ব্যবহারের শিক্ষা দেয়। মানুষের জীবনকে তা সম্মানিত ও সম্মানার্হ করে তোলে। এহেন মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধা, অপমান এবং তার ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালানোর প্রতি সমর্থন জানানো হয় যে সাহিত্যে কিংবা যে সাহিত্যে মানুষকে এই কাজে প্রলুব্ধ করে, সে সাহিত্য মানুষের জন্যে কিছুমাত্র কল্যাণকর নয়। ইসলামে এরূপ সাহিত্যের কোন স্থান নেই।

লোভ মানুষকে অন্যায়ভাবে সম্পদ আহরণে প্রবৃত্ত করে। পরাস্বাপহরণ, শোষণ ও বঞ্চনার মূলে সর্বাধিক কাজ করে এই লোভ। তাই মানুষকে লোভাতুর, শোষক ও বঞ্চনাকারী বানানো সাহিত্যের কাজ হতে পারে না। সাহিত্যকে এ কাজে ব্যবহার করা হলে তা যে মানবতার জন্যে চরম দুঃখের কারণ হবে তাতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। ইসলামে লোভকে সংযম ও বৈধতার বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ রাখার শিক্ষা অবিস্মরণীয়।

প্রবৃত্তি মানুষের প্রধান চালিকা শক্তি। তাকে অবশ্যই আদর্শের নিগড়ে বন্দী করতে হবে। অন্যথায় তা মানব সমাজে সেই কঠিন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে, যা একটি ক্ষুধার্ত ও ক্রুদ্ধ শার্দুলকে পিঞ্জরমুক্ত করে দেয়া হলে অনিবার্যরূপে সংঘটিত হতে পারে। এই কারণে ইসলামে শুধু ব্যভিচারই নিষিদ্ধ নয়, ব্যভিচার ঘটাতে পারে এমন পরিবেশ সৃষ্টির আয়োজনও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তার সহায়ক বা সমর্থক কোন পথই উন্মুক্ত থাকতে পারে না ইসলামের দৃষ্টিতে। তাই যৌন-উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সাহিত্যও ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীল এবং সর্বপ্রযত্নে পরিত্যাজ্য। জাহিলী যুগের আরবী কাব্য ইসলামে কোন স্থান পায়নি। তার পরিবর্তে এমন উন্নতমানের কাব্য রচিত হয়েছে যা মানুষকে উচ্ছৃঙ্খল ও চরিত্রহীন হতে দেয় না; বরং মানুষকে বানায় উন্নত ও পবিত্র চরিত্রে ভূষিত। তখনকার সাহিত্য-কাব্য ও গদ্য রচনা উভয়ই ব্যবহৃত হয়েছে এই লক্ষ্যে। প্রধানত গদ্য সাহিত্যের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে কুরআন ও হাদীসের আলোকে মানুষকে ইসলামী আদর্শের আহ্বানের সঙ্গে সুপরিচিত ও একাত্ম করার কাজে। অনেক বড় মাপের কবিও তাঁদের কাব্য প্রতিভাকে এই কাজে ব্যবহার করেছেন। [এই প্রসঙ্গে মহাকবি রুমী, জামী, সাদী ইকবালের অসামান্য খেদমতে কথা স্মরণ করা যেতে পারে সম্পাদক] কেননা ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম পালনই একজন তওহীদ-বিশ্বাসীর কাজ নয়, দুনিয়ার অন্যান্য মানুষের নিকট তার দাওয়াত পৌঁছানোও তার অন্যতম প্রধান কর্তব্য। ‘ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ’ এ সাহিত্যের অন্তর্নিহিত ভাবধারা। তাই ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং শ্লীল-অশ্লীলের মানদণ্ড কুরআন কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত।

মানুষ ও মানুষের মধ্যে বংশ-ধারা, গাত্র-বর্ণ, অর্থ-সম্পদ ইত্যাদির ভিত্তিতে পার্থক্য ও বিভেদ সৃষ্টি মানবতার চরমতম অপমান। ইসলাম তা বরদাশত করতে প্রস্তুত নয়। ইসলামের ঘোষণা হচ্ছে, দুনিয়ার সব মানুষ একই পিতা ও মাতার সন্তান। সকল মানুষের দেহে এক ও অভিন্ন শোণিতধারা প্রবাহমান। সুতরাং মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে যদি কোথাও কোনরূপ পার্থক্য করা হয় তবে তা নিঃসন্দেহে মানবতার শত্রুদের সৃষ্টি-মহান স্রষ্টার নয়। কেউই অন্য কারোর তুলনায় অভিজাত, শ্রেষ্ঠ বা উচ্চ মর্যাদা লাভের কিম্বা অন্যদের থেকে ভিন্নতর হওয়ার অধিকারী নয়। এ ধরণের চিন্তা, বিশ্বাস বা মতাদর্শ মৌলিকভাবেই মানবতা-বিরোধী। তাই যে সাহিত্য মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বিভক্তির প্রেরণা যোগায়, সে সাহিত্য মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রশ্ন ওঠতে পারে, তবে কি কোনরূপ পার্থক্যই করা যাবে না মানুষে মানুষে? করা যাবে, তবে কুরআনের দৃষ্টিতে সে পার্থক্য হবে শুধু নৈতিকতার। আল্লাহ্‌মুখিতার মাত্রা ও মানগত অবস্থার ভিত্তিতে পার্থক্য করা যেতে পারে, করা হবেও। এ পার্থক্য কোন মানুষের নিকটই চিরস্থায়ী বা অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর নয়। আজ যে মন্দ, কাল সে সবার তুলনায় ভালো হতে পারে। আজ যে অসৎ, কাল সে হতে পারে সততায় শীর্ষস্থানীয়। আবার এর বিপরীতটাও সম্ভবপর। এসবই মানুষের আয়ত্তাধীন-ইচ্ছাধীন। এ পার্থক্যকরণ ব্যক্তির উন্নতি বিধানের সহায়ক; উন্নত মানের সমাজ গঠনের জন্য এটি অপরিহার্যও বটে।

যে সমাজ-সমষ্টি ও তার ব্যক্তিগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবে, সে সমাজ সার্বিক কল্যাণে ধন্য হবে-ইহকালেও, পরকালেও। কিন্তু কোন জাতি যদি দুষ্কৃতি, চরিত্রহীনতা, উচ্ছৃঙ্খলতায় নিমগ্ন হয়, বিশ্বস্রষ্টার আদেশ লংঘনে মেতে উঠে, তবে বৈধ-অবৈধ বা ন্যায়-অন্যায়ের সব বন্ধন ছিন্ন করে-অতিক্রম করে যায় নীতি-নৈতিকতার সব সীমা, তখন সে জাতি দুনিয়ার বুকে টিকতে পারে না, তার পতন ও ধ্বংস অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে। কেননা এই বিশ্বলোকে একটি নিরেট ভারসাম্যের ওপর স্থিত। সে ভারসাম্য বিনষ্ট হলে বিপর্যয় অত্যন্ত স্বাভাবিক। একটি জাতি যতই উন্নতির উচ্চাসনে, ক্ষমতার শীর্ষে বা নেতৃত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হোক না কেন, তার ক্ষেত্রেও এ শাশ্বত নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে না। তাই ইসলামের আদর্শ ব্যক্তি গঠনের সাথে সাথে উন্নত মানের চরিত্র ও ন্যায়-নীতির ধারক সমাজ গঠনের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। কুরআন মজীদের এই পর্যায়ের কোন কথাই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলা হয়নি, বলা হয়েছে সমাজ-সমষ্টিকে সম্বোধন করে-বহু বচনে। তাই সাহিত্যকে অবশ্যই এই কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত করতে এবং রাখতে হবে।

আদর্শহীন জনগণকে আদর্শবাদী বানানো, অজ্ঞ-মূর্খ লোকদেরকে প্রয়োজনীয় নির্ভুল জ্ঞান পরিবেশন এবং সাহস ও হিম্মতহীন মানুষকে সাহসী ও নির্ভীক করে গড়ে তোলা সাহিত্যেরই কাজ। সাহিত্যকে এই কাজে ব্যবহার করা কবি-সাহিত্যিকদের মানবিক দায়িত্ব। আদর্শহীন ও বিশৃংখল চিন্তার কুহেলিকা সৃষ্টি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা ও তাদেরকে নিরুদ্দেশের যাত্রী বানানোর কোন অধিকার কবি বা সাহিত্যিকদের থাকতে পারে না। কবি-সাহিত্যিকরা জাতির মেধা ও মননের প্রতিনিধি। জাতির সামগ্রিক কল্যাণের প্রতি তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে, এটাই একান্তভাবে কাম্য। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে এই ভূখণ্ডের মুসলিমগণ ছিল প্রায় সর্বদিক দিয়েই পশ্চাদপদ এবং জাতিত্ববোধ ও আত্মচেতনাহীন। এই সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট মুসলিম কবি ও সাহিত্যিকের সৃষ্ট কাব্য, গান ও সাহিত্যই যে মুসলিম জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং তার ফলে উত্তরকালে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হযেছে, তা কি কেউ অস্বীকার করতে পারে? বর্তমানে যখন বিদেশী ও বিজাতীয় শিক্ষার মাধ্যমে মানবতা বিরোধী নানা ভ্রান্ত মতবাদ, জীবন-দর্শন বা জীবনাচরণ আমাদের বংশধরদেরকে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত ও কলুষিত করে চলছে, তখন এখনকার কবি-সাহিত্যিকদের কর্তব্য যে তাদেরকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করা এবং নিভুল চিন্তা-দর্শন, মতবাদ ও আচার-আচরণে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সাহিত্য সৃষ্টি করা, তা নির্দ্বিধায় বলতে চাই। সর্বপ্রকার নীচতা-হীনতা, ক্ষুদ্রতা, কাপুরুষতা ও সাহসহীনতা থেকে এ জাতিকে রক্ষা করতে পারে আদর্শবাদী কাব্য ও সাহিত্য, এতে কোন সন্দেহ নেই। জীবনীশক্তি রহিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত এ জনতার দেহে জীবনবাদের বলিষ্ঠ ভাবধারা সৃষ্টি করা হলেই এর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব। অন্যথায় ইতিহাসের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া জাতিসমূহের পরিণতি আমাদেরও নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে, তা রোধ করার শক্তি কারোরই নেই। প্রবল শক্তি-সামর্থ্য ও বলিষ্ঠ মন-মানসিকতা এক-একটি জাতির প্রাণশক্তি বা আত্মা স্বরূপ এবং তা মৃতপ্রায় এ জাতির দেহে নতুন করে ফুঁকতে হবে আমাদের লেখক, কবি, সাহিত্যিকদেরই। আজ যে জুলুম, পীড়ন, শোষণ, অপচয়, দুর্নীতি, লুটপাট, অশ্লীলতা ও ব্যাভিচারের সয়লাবে গোটা জাতি ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, কবি-সাহিত্যিকদেরই কতব্য হচ্ছে তার মুখে বাঁধ নির্মাণ, পানি সেঁচা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা। কুরআন তারই নির্দেশ দিয়েছে এ ভাষায়ঃ ‘তোমরা শক্তি-সামর্থ্য সংগ্রহ করো, যুদ্ধযান প্রস্তুত করে রাখো, যেন তোমরা আল্লাহর ও তোমাদের এবং অন্যান্য অজানা বহু শত্রুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পার।’

বর্তমান যুগ চিন্তা, দর্শন ও মতবাদের যুগ। তওহীদ-বিশ্বাসী কবি-সাহিত্যিকদেরকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে এবং এ যুগের চলমান সংগ্রামে উপযুক্ত ভূমিকা পালন করার জন্যে তাদেরকে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। ভুল চিন্তা ও দর্শনকে খণ্ডন করতে হবে, ভ্রান্ত মতাদর্শের সৃষ্ট বিভ্রান্তির মুকাবিলা করতে হবে নির্ভুল চিন্তা-বিশ্বাস ও সত্য-ভিত্তিক মতাদর্শ দ্বারা। এই কাজ মূলত ও প্রধানত সাহিত্যের । এর বিপরীত কাজে সাহিত্যকে ব্যবহার করা হলে তা হবে আত্ম-বিধ্বংসী ব্যাপার। বিশেষ করে তওহীদ-বিশ্বাসী সাহিত্যিকদের আজ সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনের জন্যেই এগিয়ে আসতে হবে। একমাত্র নিরেট ইসলামী আদর্শবাদী ও ইসলামী বিপ্লবী ভাবধারা সস্পন্ন সাহিত্যের পক্ষেই আজকে এই কঠিন দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। কেননা, ইসলাম সম্পর্কে একথা চূড়ান্ত যে, তা সমাগ্রিক জীবনের জন্যে এক পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবী আদর্শ, এক বিশ্বজনীন পুনর্গঠন প্রচেষ্টা, এক সর্বাত্মক সংগ্রামের নাম। তা একটি চিরন্তন ও শাশ্বত জীবন বিধান-একটি আপোষহীন সংগ্রাম। আর প্রতিটি বিপ্লবী আদর্শ সর্বাত্মক সংগ্রাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানই তার পয়গাম সর্বস্তরের মানুষের নিকট পৌঁছাবার জন্যে কাব্য ও সাহিত্যকে ব্যবহার করে, কাব্য ও সাহিত্যকে স্বীয় ভাবধারায় সঞ্জীবিত ও পুনর্গঠিত করে-দেয় তাকে নতুনতর ভাষা ও পরিভাষা। তাই একজন সচেতন তওহীদবাদী লেখকের পক্ষে আকীদা ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে ইসলামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার পর কাব্য ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী চিন্তা-বিশ্বাস, মতবাদ ও ভাবধারা গ্রহণ ও অবলম্বন কোনক্রমেই চিন্তাযোগ্য হতে পারে না। ইসলামী কাব্য ও সাহিত্য তো তা-ই, যাতে মানবতার সার্বিক কল্যাণের জন্যে ইসলাম-নির্ধারিত মূলনীতিসমূহের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে উন্নতমানের ভঙ্গিতে ও ভাষায়, যার মাধ্যমে কুরআন-কাংক্ষিত মানুষের চরিত্র ও বিশেষত্বের নিদর্শনাদিকে উজ্জ্বল ও উদ্ভাসিত করে তোলা হয়েছে, ইসলামের জীবনবাদী মূল্যমানসমূহ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং নৈতিকতার অনৈসলামী মূল্যমানসমূহ পরিত্যাগ করার জন্যে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

বস্তুত ‘শিল্প শিল্পের জন্যে’ এ ধরণার পরিবর্তে ‘শিল্প জীবনের জন্যে’ এ তত্ত্ব এখন সাধারণভাবে গৃহীত হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে ‘শিল্পসহ জীবনের সবকিছুই চূড়ান্তভাবে আল্লাহর জন্যে’ এই তত্ত্বই গ্রহণযোগ্য হতে পারে বিশ্ব-মানবতার সার্বিক কল্যাণের জন্যে এবং তারই আহ্বান জানাতে চেষ্টা করা হয়েছৈ এই স্বল্পপরিসর আলোচনায়।

সাহিত্যে প্রগতি

সাহিত্য চিরকালই প্রগতিশীল। প্রগতি সাহিত্যের মৌল ধর্ম-স্বাভাবিক প্রবণতা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক-এক সময় এক-একজন দিক্পালের আবির্ভাব ঘটে, যিনি সাহিত্যকে নব ধারায় প্রবাহিত করেন। ফলে সাহিত্যে যেমন গতানুগতিকতা টিকতে পারে না, তেমনি থাকেনা স্থবিরতা ও অনগ্রসরতা। সাহিত্যে সৃষ্ট হয় নবতর রস ও প্রবাহ। কেননা কোন সাহিত্যিকই সাধারণভাবে প্রগতি-বিরোধী হন না। কাল ও প্রেক্ষিতের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজ-বিকাশের সঙ্গে তাল রেখে নিত্য-নব উন্মেষিত ভাবধারাকে সম্বল করে তিনি সৃষ্টি করেন নবতর সাহিত্য। পদ্ধতি, স্টাইল ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে ভিন্নতা ও পাথর্ক্য সাহিত্যের ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করে তোলে। ফলে সাহিত্য অতীতকে অনেক পশ্চাতে ফেলে সম্মুখের দিকে এগিয়ে যায় দ্রুত গতিতে। তাই সাহিত্যে প্রগতি অনস্বীকার্য।

তবে প্রগতি সম্পকির্ত ধারণা সব সময় একইভাবে অনড় ও স্থিতিশীল থাকেনা। তা চিরকালই পরিবতির্ত হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও পরিবর্তিত হতে থাকবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আজ যেসব মূল্যমানের প্রশংসায় সমাজ উচ্চকণ্ঠ, আকামীকালকেই তা হতে পারে পরিত্যক্ত। সাহিত্যে যৌনতার চর্চা অতি প্রাচীন; কিন্ত তার সীমালঙ্ঘনমূলক বা অত্যধিক প্রয়োগ সুস্থ মন-মানসিকতার অনিবাযর্ভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে; ফলে ক্রমে তা সাহিত্যের অঙ্গন থেকে বিলীন হয়ে যায়, যেমন ফাল্গুনের ছোঁয়ায় গাছ থেকে ঝরে পড়ে পুরাতন পত্রপল্লব। তা কোন স্থায়ী মূল্যমানের ধারক হয়না বলে শ্রেয়বোধের তাড়নায় আপনা-আপনি খসে পড়তে বাধ্য হয়।

এক কালে ‘শিল্পের জন্যেই শিল্প’ এই দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল সাধারণভাবে কবি-সাহিত্যিকদের ‘মটো’। পরবর্তীকালে তা পরিত্যক্ত হয় এবং সে স্থান দখন করে নেয় ‘শিল্প জীবনের জন্যে’- এই আদর্শ। কিন্তু সূক্ষ্ণ বিচারে উভয় আদশর্ই অসম্পূর্ণ এবং অযথার্থ। কাযর্কারণের এই জগতে কোন জিনিসই নিজের ‘কারণ’ হতে পারেনা। প্রতিটি সাহিত্য-কর্ম অবশ্যই লক্ষ্যাভিসারী হয়ে থাকে- তা অনুভবযোগ্য হোক আর না-ই হোক। দ্বিতীয়ত বিশ্বলোকের হুবহু চিত্রাঙ্কন  এবং ঘটনাবলীর যথাযথ বণর্নাকে কখনই সাহিত্য নামে অভিহিত করা যায় না। তাতে শিল্পীর নিজস্ব ভাবধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার প্রতিফলন একান্তই অনিবার্য। কোন পাঠকই ঘটনার যথাযথ প্রতিবেদনকে সহিত্যের যথাযথ মানে উন্নীত বলে স্বীকার করত রাজী হবেন  না যতক্ষণ না তাতে সাহিত্যস্রষ্টার কল্পনার চিত্তাকর্ষক রং মিশ্রিত হয়। একজন সুসাহিত্যিক শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হতে পারেননা যে, ‘বস্তুটি কি’ বরং কি হওয়া উচিত বা কি হতে পারতো তা বলাও তাঁর নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। এটা তাঁর গভীর মননশীলতা ও চিন্তাশীলতার বিশেষত্ব। অন্যকথায় সাহিত্য জীবনের শুধু দর্পনই নয়, তা জীবন-কাফেলার পথ-প্রদর্শকও। জীবনের গতির সাথে তাল রেখে চলাই তাঁর ধর্ম নয়, জীবনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বও তারই। নিছক বস্তুনিষ্ঠ রচনার প্রাচীরের ওপর আসীন হয়েই প্রগতি বিপ্লব বা পশ্চাদপদতার ছবি তোলা যেতে পারে না। সমাজের পরিবর্তনকামী সাহিত্যই জীবন্ত ও শাশ্বত।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সৌন্দর্যবোধ, কল্পনাপ্রবণতা, ব্যবহারিকতা, বাস্তবতা ও সামষ্টিকতা একই সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র। এগুলোর সাযুজ্যই শিল্প বা সাহিত্যকে পূর্ণ রূপে ও উচ্চ মানে উন্নীত করতে পারঙ্গম। একজন সফল সাহিত্যিক বা শিল্পী আমাদের সৌন্দর্য-বোধকে শুধ চরিতার্থ করেন না, আমাদের চিন্তার রুচিশীলতা ও কর্মের প্রেরণাকেও গতিশীল রাখেন। আমরা যেমন ‘কাল’কে প্রভাবিত করি, তেমনি কালও প্রভাবিত হয় আমাদের দ্বারা। সফল সাহিত্যিক কাল-স্রোতে ভেসে যাওয়াতেই মনুষ্যত্বের সার্থকতা নিহিত বলে মনে করেন না; বরং কাল-স্রোতের গতি পরিবর্তন করে তাকে স্বনির্ধারিত লক্ষ্যপানে প্রবাহিত করাকে নিজের একটা বড় কর্তব্য বলেও মনে করেন।

চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে অতিশয় গুরুত্বের অধিকারী। স্বাধীনতা ব্যক্তির জন্মগত অধিকার, তা-ও কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু স্বাধীনতার যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন এবং তার নীতিমালা ও রূপরেখা নির্ধারণ যার-তার কর্ম নয়। Freedom means resonsibility বা ‘স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়নতা’ একথা অবশ্যই স্বীকৃত।

এইদৃষ্টিতে বলা যায়, নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও হৃদয়াবেগ প্রকাশের  পূর্ণ স্বাধীনতা প্রত্যেক সাহিত্যিকেরই মৌলিক অধিকার বিশেষ, একথা সত্য; কিন্তু তা একটা নিয়মতান্ত্রিকতা ও নৈতিকতার বিধান দ্বারা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। মানব জীবনে এমন সব অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে ঘটে, যা পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করা হলে আমাদের সৌন্দর্যবোধ ও সূক্ষ্ণ হৃদয়াবেগ নিঃসন্দেহে ক্ষুণ্ন ও আহত হবে। অতএব যে বক্তব্য কেবল পাশবিক কামনা-বাসনাকেই উত্তেজিত করে, তা কখনোই সার্থক ও স্থায়ী মূল্যমানসম্বলিত সাহিত্য পদবাচ্য হতে পারে না। কিন্তু তাই বলে সাহিত্যে যৌন-সম্পর্কের একদম প্রবেশাধিকার থাকবেনা, এমন কথা নয়। অনেক সময় রোমান্টিক গল্প, উপন্যাস বা কবিতায় যৌন-সম্পর্কের প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কেননা আমাদের জীবন-বৃক্ষের শিকড় যৌন কামনার মৃত্তিকা-গভীরে বিস্তীর্ণ হয়ে আছে। কিন্তু সাহিত্যে যৌন-সম্পর্ককে উপস্থাপন করতে হবে অত্যন্ত শালীন ও রুচিসম্মতভাবে, তার অশ্লীল ও নগ্নভাবে উপস্থাপন সাহিত্যের মান সংরক্ষণে কখনই সহায়ক হতে পারে না। [নরনারীর যৌন সম্পর্কের বিষয় পবিত্র কুরআনেও উল্লেখিত হয়েছে সে উল্লেখ এতই শালীন শোভন যে, তা পাঠক চিত্তে কোনরূপ ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেনা আমাদের সাহিত্য চর্চায়ও কুরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গিই অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়সম্পাদক]

আসলে মানব জীবনের অন্যান্য সব দিকের ন্যায় সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহ্যকে বাদ দিযে যে সাহিত্য, তা যেমন কালজয়ী হয়না, তেমনি তা মানুষের কোনরূপ কল্যাণ সাধনে কিংবা মানব মনে কোন মহৎ প্রেরণা ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে বাধ্য। মানুষের ঐতিহ্য তার অস্তিত্ব ও ইতিহাসের মূলদর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তার অস্তিত্বের মূলদর্শন হলঃ মানুষ এই বিশ্বলোকে উদ্দেশ্যমূলক এক বিশেষ সৃষ্টি। এখানে তার বিশেষ মর্যাদা তার এই বিশেষ জন্ম-সত্যেরই স্বাভাবিক ফসল। কাজেই বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি হওয়ার কারণে সে উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নে তার গোটা জীবনই নিবেদিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার সাহিত্য যখন সে উদ্দেশ্যের পরিপূরক হয়ে দেখা দিবে তখনই মানব সমাজে তা সাগ্রহে গৃহীত ও আদৃত হবে এবং গণ-মানুষের জন্যে অফুরন্ত কল্যাণ বয়ে আনবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে সাহিত্য মানুষের এ ভাবধারার পরিপোষক নয়, যে সাহিত্য মানুষকে হিংস্রতা পাশবিকতা বা লালসার প্রতিমূর্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, সমাজে নিয়ম-শৃংখলার পরিবর্তে উচ্ছৃংখলতা ও বিপর্যয়ের ইন্ধন যোগায়, তা মানবোপযোগী সাহিত্য হতে পারে না। যেসব রচনা মানুষের মধ্যে যৌন আবেগকে বল্গাহীন করার প্রয়াস পায়, যেসব কবিতা বা গল্প মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাশীলতার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলে, তাকে নাস্তিকতা ও খোদাদ্রোহিতায় উদ্বুদ্ধ করে, সে সাহিত্য মানুষের কল্যাণের সঠিক বাহন বলে স্বীকৃতি পেতে পারে না।

এই প্রেক্ষিতে সাহিত্যকে অতি সহজে এবং অনিবার্যভাবে দু’ভাগে ভাগ করতে হয়। একটি গঠনমূলক সাহিত্য আর অপরটি বিপর্যয়মূলক সাহিত্য। প্রথমটি মানব-প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ইতিহাসে মানবতার বিরাট কল্যাণ সৃষ্টিকারী সাহিত্য রূপে চিহ্নিত এবং চিরস্থায়ী মূল্যমানসম্পন্ন আর দ্বিতীয় প্রকারের সাহিত্য যৌন উত্তেজক মাদকের ন্যায় ধ্বংসের কাজ করে এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে; মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, সুস্থ মন-মানস, পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা এবং পরিশীলিত রুচিবোধকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাই প্রথমোক্ত সাহিত্যের সাথে তার নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠতা খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের সাহিত্যের সাথে তার স্থায়ী কোন একাত্মতা অকল্পনীয়।

সাহিত্যের একটা সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকা একান্তই আবশ্যক। লক্ষ্য না থাকলে যে সাহিত্য সৃষ্টি হবে তা ঝরা পাতার মতই ক্ষয়িষ্ণু। বায়ুপ্রবাহে তা একদিক থেকে অন্য দিকে, ওপর থেকে নিচের দিকে তাড়িত হতে বাধ্য। তা বল্গাহীন অশ্বের মত যেদিকে ইচ্ছা উদ্দাম গতিতে ছুটতে শুরু করবে এবং যেখানে ইচ্ছা মুখ লাগিয়ে দিয়ে যা-ইচ্ছা গ্রাস করবে। তার যা ভালো লাগবে, তাতেই সে মন লাগাবে এবং তার প্রশংসায় চারদিক মুখরিত করে তুলবে। তা যেন পাল তোলা নৌকা-হাওয়ার গতিই তার মূল গতি। এই সাহিত্য মানুষকে কোন শাশ্বত মূল্যমান দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম বলে তা বিস্মৃতির অতল তলে ডুবে যেতে বাধ্য।

বস্তুত সাহিত্য মানব জীবনের জন্যে অতীব মূল্যবান সম্পদ। সাহিত্য মানুষ ব সমাজের প্রতিবিম্বই শুধু নয়, তা মানুষের চরিত্রও। তাই প্রগতির নামে সাহিত্যকে কলূষিত করার অধিকার কারোরই থাকতে পারে না। কেননা সাহিত্যকে কলুষিত করার অর্থ মানব চরিত্রকে ধ্বংস করা।

বর্তমান সময়ে সাহিত্য কোন্ ভূমিকা পালন করছে তা বিচার করে দেখা একান্তই কর্তব্য। এখনকার সৃজনশীল সাহিত্য যদি বাস্তবিকই মানুষের জন্যে কোন কল্যাণময় অবদান রাখতে অক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে তাকে সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে তোলা তো সাহিত্যিকদের দায়িত্ব। একথা সংশ্লিষ্ট সকলেরই স্মরণ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

সাহিত্যে বাস্তবতা

একথা সর্বজন-স্বীকৃত যে, কোন সাহিত্যই স্থান-কালের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে হোক, কি সাহিত্য জীবনের জন্যে-উভয় ক্ষেত্রেই সাহিত্যিককে তার চারপার্শ্বে নিত্য-সংঘটিত ঘটনাবলী ও পরিস্থিতির নিকট থেকে চিন্তার উপকরণ গ্রহণ করতে হয়। মূলত জীবনের বস্তুনিষ্ঠ বিষয়াদির ভিত্তিতেই সাহিত্যিক তার রচনার অবকাঠামো নির্মাণ করেন। অতঃপর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে সে অবকাঠামোর ওপর রচনার অবয়ব নির্মাণে স্বভাবতঃই পার্থক্য সূচিত হয়। যারা ‘সাহিত্য জীবনের জন্যে’ মতাদর্শে বিশ্বাসী তাঁরা সে অবকাঠামোর ওপর রচনার পূর্ণ অবয়ব নির্মাণ করে বাস্তবতা ও যথার্থতার উপকরণ দ্বারা। পক্ষান্তরে ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্য’ মতাদর্শের ধারকগণ কৃত্রিমতা, চিন্তার উচ্চমার্গতা ও কল্পনার আতিশয্যের সাহায্যে প্রস্তুত উপকরণাদির সমাহারে সে অবকাঠামোর ওপর রচনার প্রসাদ গড়ে তোলেন। তখন রচনাটির অতল গহ্বরে নিহিত বাস্তবতা (Reality) পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছানোর জন্যে সে কৃত্রিমতা ও কল্পনার আবরণকে উন্মোচিত করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন  মনে হয, ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে’র পক্ষপাতীরা সম্ভবত জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার খুব একটা ধার ধারেন না। পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ঊর্ধ্বে অবস্থিত বিষয়াদিই তাদের রচনাবলীর ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মূলত এটা একটা মস্তবড় বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমানে প্রায় সব সাহিত্যিকই এই কথা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। সকলেই অকপটে স্বীকার করবেন যে, সাহিত্য  যে মতাদর্শ ভিত্তিকই হোক-চিন্তার যে ধারারই অনুসারী হোক, জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার সাথে তা কোনক্রমেই সঙ্গতিহীন হতে পারেনা।

তাছাড়া সাহিত্য জীবনের শুধু একটিমাত্র দিক বা অংশেরই প্রতিবিম্ব হতে পারেনা। সাহিত্য সমগ্র জীবনেরই ভাষ্যকার। জীবনের সমগ্র রূপই প্রতিফলিত ও প্রতিবিম্বিত হবে সাহিত্যের দর্পনে। ফলে তাতে জীবনের শুধু ভালো-ভালো দিকগুলোরই রূপায়ণ হবেনা, সেই সাথে জীবনের পদস্খলন ও কলংকময় দিকগুলোও সাহিত্যের উপজীব্য হবে। এই কারণে আদর্শবাদী সাহিত্যিকদের রচনাবলীতে অশ্লীলতা ও পাপ-স্পৃহার উল্লেখ থাকবেনা, এমন কথা স্বীকৃতব্য নয়। কেননা, সমাজের পুঞ্জীভূত দোষ-ত্রুটি ও পাপানুষ্ঠানগুলোকে সম্মুখে উপস্থাপন করে তার পর্যালোচনা ও সমালোচনা করা এবং জনমনে এক কলুষমুক্ত ও কল্যাণময় সমাজ গঠনের পিপাসা ও প্রয়োজনীয়তা বোধ তীব্র করে তোলা সাহিত্যের মৌল লক্ষ্য হয়ে থাকে।

ইসলামী আদর্শানুসারী সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। তারা সাহিত্যে যৌনতা ও অশ্লীলতার উল্লেখ করবেন কি করবেন না আর তার উল্লেখ যদি অপরিহার্যই অনুভূত হয়, তা হলে তা কিভাবে, কতটা এবং তাতে কোন সব সীমা রক্ষা করতে হবে, এ বিষয়ে একটা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।

বস্তুনিষ্ট সাহিত্য রচয়িতাবৃন্দ পাপানুষ্ঠানাদির যথাযথ উল্লেখকেই বাস্তবতাবাদী ও বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্য মনে করেন এবং এই ধারণার ভিত্তিতে সাহিত্যে অশ্লীলতা ও নগ্নতার সয়লাব প্রবাহিত করার আদর্শকে একটি আন্দোলনের রূপদান করেছের। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, পাপের প্রচ্ছন্ন ও আসল রূপটিকে নগ্ন করে সম্মুখে উপস্থাপন করা না হলে জনগণ সে বিষয়ে অবহিত হতে পারবে না এবং তা দূর করারও প্রয়োজন বোধ তীব্র হয়ে জাগবেনা তাদের মনে।

বাহ্যত এ যুক্তিকে অকাট্যই মনে হবে। কিন্তু একটু সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিচার-বিবেচনা করলেই সহজেই বুঝতে পারা যাবে, এরূপ যুক্তি দাঁড় করানো পাপানুষ্ঠানের প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণারই ফসল মাত্র। প্রকৃতপক্ষে পাপানুষ্ঠান কোন প্রচ্ছন্ন ও অদৃষ্টিগোচর ব্যাপার নয়। সেদিকে লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে তার বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয়াদিকে প্রতিভাত করে তোলা একান্তই নিষ্প্রয়োজন। তার যথাযথ রূপায়ন ও বিস্তারিত বর্ণনা শুধু অবান্তরই নয়, মারাত্মক ধরণের দৃষ্টিকটুও বটে। তা এতই বিদিত ও সর্বজন পরিচিত যে, তাকে সাহিত্যের রঙীন পরিচ্ছদে মুড়ে চাকচিক্যময়, আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করে তোলা মূল উদ্দেশ্যের পক্ষে মারাত্মকই হয়ে দেখা দিতে পারে অতি স্বাভাবিকভবে। ইসলামী আদর্শবাদের দৃষ্টিতে বলা যায়, এ ধরণের বিষয়ের প্রতি শুধু ইঙ্গিত করাই যথেষ্ট। ‘মল’কে ‘ময়লা’ বললে তা বুঝতে কারোর একবিন্দু অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তা সত্ত্বেও তাকে যখন সোনার চামচে তুলে এনে সবার সম্মুখে পেশ করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা শালীনতার সীমা লংঘন করে যায়। যৌনতা ও অশ্লীলতার প্রতি শুধুমাত্র ইঙ্গিত করা হলে সমজদার পাঠকের পক্ষে তা সহজেই বোধগম্য হতে পারে। অতএব, পাপানুষ্ঠানের পূর্ণ দৃশ্যের ছবি অঙ্কিত না হলে সাহিত্যের বাস্তবতা রক্ষা পায়না কিংবা বাস্তবতাবাদী  সাহিত্যের লক্ষ্যচ্যুতি ঘটে, এরূপ বলা সংকীর্ণতারই পরিচায়ক অথবা রচয়িতার পংকিল হৃদয়াবেগের উদ্ঘাটক মাত্র।

উপরন্তু এরূপ তথাকথিত বাস্তবতাবাদী সাহিত্যের চর্চায় হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এর প্রভাবে চতুর্দিকে পাপানুষ্ঠানেরই প্রাবল্য ও ব্যাপকতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ানোর কথা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারেন না। আর তার পরিণতি সমাজ-মানসে, বিশেষ করে যুব চরিত্রের পক্ষে যে কতখানি মারাত্মক হয়ে দেখা দিতে পারে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন পড়েনা। তাছাড়া পাপানুষ্ঠানের রসালো চর্চা যে পাপ-স্পৃহাকে অনেকাংশে চরিতার্থ করে তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই।

দ্বিতীয়ত বাস্তবতার সফল ও পুংখাপুংখ চিত্রায়নের জন্যে তার গভীর ও সূক্ষ্ণ অধ্যয়ন একান্ত জরুরী- তা সমাজের কোন সৌন্দর্যমণ্ডিত বাস্তবতা হোক, কি কলংকলিপ্ত। সাহিত্যিক যখন তার রচনায় পাপানুষ্ঠানের পুংখানুপুংণ চিত্রায়নের নীতি অবলম্বন করবেন এবং তার বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা-বিশ্লেষণে দক্ষতা প্রমাণে উদ্যোগী হবেন, তখন তার জন্যে অবশ্যই পাপিষ্ঠ ও দুরাচারী লোকদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রক্ষা করা এবং যে সব পথে সাধারণত এই সব ঘটনা ও কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে থাকে সেই সব পথের প্রতিটি বাঁক ও কোণের সাথে নিবিড় পরিচিতি অর্জন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। অন্যথায় তাঁর এ চেষ্টা সফল হবে না-তাঁর বাসনা পূর্ণ পরিণত হতে পারবেনা। কিন্তু সচেতন, নীতিনিষ্ঠ ও আদর্বাদী সাহিত্যিকেই কি নিজেকে সেই পথের পথিক বানাতে প্রস্তত হতে পারেন?

পাপানুষ্ঠানের প্রকৃত রস আস্বাদন কেবল তখনই সম্ভব, যখন পাপ-পংকে আকণ্ঠ অবগাহন লাভ কারোর পক্ষে সম্ভব হবে। কিন্তু সেখানেই ব্যাপারটির ভয়াবহতা সীমিত বা নিঃশেষিত নয়, বরং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। সাহিত্যকের নিজের মন-মানসিকতা ও চরিত্র সে প্রভাবকে কখনই এড়িয়ে যেতে পারবেনা। ফলে এর পরিণতি তার নিজের জন্য কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা কল্পনা করাও হয়ত তার পক্ষে সম্ভব নয়।

প্রতিটি মানুষের প্রকৃতিগত অন্যায় ও পাপের প্রতি ঘৃণা এবং ভালো ও কল্যাণের প্রতি আকর্ষণ বোধ স্বভাবতই বিদ্যমান। স্পষ্টত বুঝা যায়, মানুষকে বিচ্যুতি, পদস্খলন ও চরিত্রহীনতার পংকিল আবর্ত থেকে রক্ষা করার এবং উন্নত মানবিক পবিত্রতা ও সদাচরণের পথে পরিচালিত করার জন্যে বিশ্বস্রষ্টার এ এক মহাকল্যাণময় ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা যতদিন সুস্থ ও কার্যকর থাকবে, মানুষ ততদিন নৈতিকতার উচ্চতর মানের প্রতি দ্রুতগতিতে ও ক্রমাগতভাবে উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করতে থাকবে। পক্ষান্তরে এই ব্যবস্থায় যখনই বিকলত্ব বা বিপর্যয় দেখা দেবে, তখন তার নৈতিকতা ও মানবিকতায় ঠিক ততটাই বিপর্যয় দেখা দেয়া অবধারিত। বস্তুত এ এমন এক মহাসত্য যা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। এর যৌক্তিকতা বোঝাবার জন্যে খুব বেশী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও অপ্রয়োজনীয়।

দুর্গন্ধময় পরিবেশে ক্রমাগত বসবাস কিংবা তার মধ্য দিয়ে বার বার যাতায়াতের ফলে ব্যক্তির মনে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ভাবধারা দুর্বল হয়ে পড়ে অতি স্বাভাবিকভাবেই। প্রথম দিক দিয়ে তা যতটা দুঃসহ মনে হতো, শেষের দিকে তা-ই যেন স্বাভাবিক বলে মনে হয়। অনুরূপভাবে পাপানুষ্ঠানের আনুপূর্বিক বর্ণনা-বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ চিত্রাঙ্কনের ফলেও মানুষের চারিত্রিক অনুভূতি ও নৈতিক সৌন্দর্যচেতনা ভোতা হয়ে যায়। অতঃপর পাপের প্রতি তার মনে কোন ঘৃণাবোধ থাকে না, জাগেনা ভালো ও মঙ্গলের প্রতি কোন আগ্রহ-ঔৎসুক্য আর চরম অবস্থা দেখা দেয় তখন যখন তার দৃষ্টিতে পাপ আর পাপ থাকে না। পাপকে পাপ মনে না করার মানসিক অবস্থা রোগকে রোগ মনে না করা কিংবা মারাত্মক রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা না থাকা-তাকে সুস্বাস্থ্যের নিয়ামক মনে করা একই ধরণের সমান মাত্রার মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পরিস্থিতির এ ভয়াবহতা যে কতখানি সাংঘাতিক, তা ভাষায় বর্ণনা করাও কঠিন। প্রতিটি সচেতন মানুষেরই এই বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা-বিবেচনা করা কর্তব্য।

বস্তুত এরূপ সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ মানুষের আদর্শিক লক্ষ্যের পথে প্রচণ্ড প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। জনগণ খারাপকে খারাপ এবং অন্যায়কে অন্যায় ভাবুক এবং তার মূলোৎপাটনে দায়িত্ববোধ সহকারে তৎপর হোক, সাহিত্যিক মাত্রেরই তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রকৃত কল্যাণ অত্যন্ত প্রবল-অতীব প্রভাবশালী হোক, তা সকলেরই কাম্য। কিন্তু সেজন্যে যে দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করা হয়েছে, তা এই কামনা ও বাসনাকে সফল করতে পারে না। সেজন্যে কেবলমাত্র সে দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয় যা লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। যাতে তা ব্যাহত বা ক্ষুণ্ন হয়, তা নিশ্চয়ই গ্রহণ করা উচিত হতে পারে না।

এই মৌলনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে আমাদের সম্মুখে এ মহাসত্য উদ্ঘাটিত হয় যে, প্রতিটি অন্যায় কাজ ও পাপানুষ্ঠানে কিছুটা আনন্দ ও তৃপ্তির সংমিশ্রণ থাকে। ফলে তার অবিকল চিত্র অঙ্কনে শুধু মুখে বা কাগজের ওপর তার উল্লেখের মধ্যেই সেই আনন্দ ও তৃপ্তি সীমিত থাকে না, তার চিত্রায়ণকারী সাহিত্যিক বা শিল্পীও তার প্রভাব বলয়ে জড়িয়ে পড়ে। [সাহিত্যকে বাস্তবধর্মী করার অজুহাতে আমাদের এদেশেরই কোন কোন কবিসাহিত্যিকের পতিতালয়ে যাতায়াতের ঘটনা কোন গোপন ব্যাপার নয় ফরাসী দার্শনিক অগাষ্ট কোঁতে তো দর্শনের মাহাত্ম্য (?) বুঝানোর নামে পতিতালয়েই পড়ে থাকতেন ধরণের কবিসাহিত্যিক দার্শনিকরা যে মানবতার জন্যে কতখানি বিপজ্জনক, তা সহজেই অনুমেয়সম্পাদক] বাস্তবভাবে সে আনন্দ আস্বাদনে উদ্বুদ্ধ হওয়া একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যুব সমাজ তার প্রত্যক্ষ প্রভাবকে কিছুতেই এড়াতে পারে না। তার অনিবার্য ফল এই দাঁড়াবে যে, মূল লক্ষ্য তো অন্তরালে পড়ে থাকবে সেদিকে কারোরই দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে না; বরং যে উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছে তা-ই সে উদ্দেশ্যের ওপর আঘাত হানবে ও তাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেবে। তা সত্ত্বেও বাস্তবতার নামে এহেন বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্য রচনা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সুস্থ বুদ্ধি-বিবেকের পরিচায়ক নয়।

তবু একটি প্রমাণ অমীমাংসিতই থেকে যায়। সাহিত্যিককে মানবীয় জীবনের সমস্যাদি নিয়েই লেখনী চালনা করতে হয় আর তা করতে গেলে মানব জীবনের অপরিহার্য দিক হিসেবে অন্যায় ও পাপানুষ্ঠানেরও উল্লেখ করতে হয়। এরূপ অবস্থায় কোন্ বর্ণনাভঙ্গি ও বিশ্লেষণ-পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে?

প্রশ্নটি জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। তবে তা নিশ্চয়ই এমন নয়, যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানব জীবনের সর্বপ্রকার বাস্তব সমস্যার ন্যায় এই সমস্যাটিরও সঠিক ও যথার্থ সমাধান কুরআন মজীদ থেকেই আমরা পেতে পারি। কুরআন মজীদ এই ধরণের ব্যাপারে সব সময়ই ইশারা-ইঙ্গিতকেই আদর্শিক ভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ করেছে; কোন ক্ষেত্রেই খুঁটিনাটির বর্ণনা-বিশ্লেষণের পদ্ধতি গ্রহণের কোর প্রয়োজনই বোধ করেনি। যে সাহিত্যিকই কুরআনী প্রকাশ-ভঙ্গি ও বর্ণণা-পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করবেন, সঠিক ও নির্ভুল পথ তার সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠবে; তার ফলে তিনি একটি কলংকমুক্ত পথ ও ভঙ্গি গ্রহণ প্রচেষ্টায় সফলতা অর্জনে সক্ষম হবেন। বিষয়টিকে অধিকতর সুস্পষ্ট করে তোলার মানসে কতিপয় দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছে, যা প্রত্যেক চিন্তাশীল সাহিত্যিকের জন্যেই যথেষ্ট হতে পারে। আরবী ভাষায় নারী-পুরুষের যৌনমিলনকে বোঝাবার জন্যে অসংখ্য শব্দ রয়েছে। কিন্তু কুরআন সে-সবের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ব্যবহার করেছে এমন একটি শব্দ যার অর্থ ‘স্পর্শ করা’। অপর এক স্থানে এই বিষয়টিকে বোঝানো হয়েছে আবৃত বা আচ্ছন্ন করা শব্দ দ্বারা। স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাওয়ার কথা বলেও এই ব্যাপারটিই বুঝানো হয়েছে।

এতদ্ব্যতীত সূরা ইউসুফ-এর একটি অংশে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিবাহিতা এক নারীর যৌন আকাংক্ষার তীব্রতা বোঝাবার জন্যে এই বর্ণনাভঙ্গি অবলম্বিত হয়েছেঃ

‘‘ইউসুফ যে মহিলার ঘরে অবস্থান করছিল সে তাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে শুরু করল। একদিন সে দরোজা বন্ধ করে বললঃ এস, এটাই তোমার জন্যে একটা মস্ত সুযোগ। ইউসুফ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলঃ খোদা-ই আমার সহায়। তিনিই আমাকে একটি বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। আর জালিম কখনই কল্যাণ লাভ করতে পারে না। মহিলাটি পূর্ণ সংকল্প গ্রহণ করেছিল। ইউসুফও সংকল্প করে বসতো যদি সে তার খোদার অকাট্য দলীল প্রত্যক্ষ না করত। ঘটনাটির অবস্থা এরূপ হওয়ার কারণ হচ্ছে, পাপ ও অন্যায়কে তার থেকে দূর করাই ছিল আমাদের ইচ্ছা। মূলত সে আমাদের বাছাই করা বান্দাহদের মধ্যকার একজন। শেষপর্যন্ত উভয়ই অগ্রে-পশ্চাতে দরোজার দিকে ধাবিত হল। মহিলাটি পিছন দিক থেকে ইউসুফের জামা দীর্ণ করে দিল…..।’’ (২৩২৫ আয়াত)

সমস্ত ঘটনাটি যে অতীব সূক্ষ্ণ ইশারা ও ইঙ্গিতময় ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে, তা সহজেই লক্ষ্যণীয়। মূলত এসব ব্যাপারের উল্লেখ সাধারণত আগুনে তেল ঢালার মতই আবেগপূর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু কুরআন অতীব সংযত ভঙ্গি অবলম্বন করে সে আবেগ-উচ্ছ্বাসপূর্ণ ঘটনাটিকে সর্বপ্রকার ক্ষতিমুক্ত করে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু এই অস্পষ্টতা ও ইঙ্গিতময়তা সত্ত্বেও মূল বক্তব্য অনুধাবন কিছুমাত্র ব্যাহত বা বিঘ্নিত হয়নি।

এই প্রেক্ষিতে সহজেই বলা যায়, আদর্শিক লক্ষ্যাভিসারী লেখক-সাহিত্যিকগণ নিজেদের লেখনীকে ময়লা সজ্জায়নের কাজে ব্যবহার না করে কুরআনী বর্ণনা-ভঙ্গির অনুসরণ করলে মানবীয় লক্ষ্যের মহান মর্যাদা সংরক্ষিত হতে পারে। সেই সাথে মহান আল্লাহর দেয়া লেখনী শক্তিকে তাঁরই নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যবহার করে তাঁর নিকট শেষদিনের জবাবদিহি থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে পারা সম্ভব হতে পারে।

বস্তুত আমাদের সাহিত্যকে পাশ্চাত্যের নগ্ন সভ্যতা ও প্রাচ্যের পৌত্তলিক সভ্যতার কলংকময় ভঙ্গি থেকে রক্ষা করার এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম মানের সাহিত্যিক আদর্শ। এ আদর্শ আমাদের সাহিত্যিকবৃন্দ এড়িয়ে যাবেন বা এর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করবেন কোন্‌ কারণে-কোন্ যুক্তিতে?

বস্তুত এ আদর্শ গ্রহণের সাথে সাথে সাহিত্যিকের আদর্শগত মানও হয় উন্নত। তখন তাঁর দৃষ্টিতে ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে’ যেমন মিথ্যা, তেমনি ‘সাহিত্য জীবনের জন্যে’ মতটিও সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। কেননা এসময়ে তাঁর মনে যে প্রশ্ন প্রবল হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে, ‘সাহিত্য জীবনের জন্যে’ বুঝলাম; কিন্তু জীবন কিসের জন্যে? জীবনের লক্ষ্য কি?…. শুধু বেঁচে থাকার তো কোন অর্থ হয় না। কল্যাণময় জীবন যাপনেরই বা সার্থকতা কোথায়? উদ্দেশ্যবাদ তো কোন একটি পর্যায়ে এসে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে না। লক্ষ্যেরও লক্ষ্য থাকে-উদ্দেশ্যেরও থাকে একটা চরম ও পরম উদ্দেশ্য। তাছাড়া কল্যাণময় জীবনে কল্যাণ কিসে-কিসে অকল্যাণ? আর তা নির্ধারণেরই বা মানদণ্ড কি? এইসব প্রশ্নের জবাবে তাঁকে স্বীকারই করতে হয়, জীবন প্রণোদিত হবে পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। যে জীবন-ধারায় তাঁর সন্তুষ্টি তাতেই নিহিত জীবনের সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ। তাঁরই অফুরন্ত রহমত লাভ জীবনের একমাত্র চরম লক্ষ্য। নিছক বেঁচে থাকার যে জীবন, তাতে জীবমাত্রই একাকার আর কল্যাণময় ও সুসমৃদ্ধ জীবনও জীবমাত্রেরই কাম্য। কিন্তু মানুষ তো জীবমাত্র নয়। জীবেরও ঊর্ধ্বে মানুষের স্থান ও মর্যাদা। তাই পরম লক্ষ্য ও চরম উদ্দেশ্য হিসেবে তাকে ঘোষণা করতে হয় কুরআনের ভাষায়ঃ

‘‘আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই নিবেদিত সেই মহান আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র সৃষ্টিলোকের অস্তিত্ব দানকারী, লালন-পালনকারী মালিক ও মনিব। তাঁর শরীক কেউ নেই। (তাঁকে এভাবে গ্রহণ করার এবং এতেই সমর্পিত হওয়ার জন্যে) আমি আদিষ্ট। অতএব, সবার আগে আমি নিজেই আত্মসমর্পিত হচ্ছি।’’ (আনআমঃ ১৬২১৬৩)

এই বিন্দুকে কেন্দ্র করেই সাহিত্যিকের জন্যে একটা বৃত্ত রচিত হয় স্বাভাবিকভাবে এবং সাহিত্যিক সেই বৃত্তের মধ্যে থেকেই চালান জীবনব্যাপী অবিশ্রান্ত সাধনা। এই সাধনার ফলে যে সাহিত্য রচিত হয়, তা-ই হয় সার্থক ও শাশ্বত সাহিত্য। এ সাহিত্যের আবেদন একান্তই মানবিক। বস্তুত এই সাহিত্যই মানব জীবনে নিয়ে আসতে পারে অফুরন্ত কল্যাণ। বাস্তবতাবাদী সাহিত্য কিংবা সাহিত্যে বাস্তবতা বলতে এইরূপ সাহিত্যই গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম