জামায়াতে ইসলামীর কর্মনীতি

Slide1

জামায়াতে ইসলামীর কর্মনীতি

অধ্যাপক গোলাম আযম


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

জামায়াতে ইসলামীকে বুঝতে হলে

কোন সংগঠন সম্পর্কে সঠিকধারণা পেতে হলে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের দ্বারা প্রকাশিত বক্তব্য থেকেই তা পাওয়া সম্ভব। যারা বিরোধী মহলের অপপ্রচারকে গুরুত্ব দেন তারা অবশ্যসঠিক ধারণা পেতে আগ্রহী নন। তারাও না জেনেই বিরোধিতা করার নীতি পালন করেন।

বিশেষ করে রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যাপারে অবচেতনভাবেও মানুষ বিরোধী প্রচারে বিভ্রান্ত হতে পারে। কিন্তু কোন চিন্তাশীর ব্যক্তির আচরণ এমন হতে পারে না।

যে সংগঠনের পরিচিতি, গঠনতন্ত্র, মেনিফেষ্টো, সংগঠন পদ্ধতি, প্রস্তাবাবলী, কার্যবিবরণী ও কর্মনীতি সংগঠনের পক্ষথেকে প্রকাশ করা হয় তার সম্পর্কে জানার জন্য অন্য কোন উৎসের উপর নির্ভর করা মোটেই শোভন নয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীএমন একটি সংগঠন যার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পুস্তকাদি নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে এবং ক্রমেই এর সংখ্যা বাড়ছেৎ। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর ত্রিবার্ষিক সদস্য (রুকন) সম্মেলনে “জামায়াতে ইসলামীর কর্মনীতি” শীর্ষক আমার একটি বক্তৃতা এ পর্যায়ে আও একটি নতুন সংযোজন।

যারা জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পেতে চান তাদেরকে নিম্নের পুস্তিকাসমূহ অধ্যয়নের পরামর্শ দিচ্ছি:

১। পরিচিতি- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

২। গঠনতন্ত্র- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

৩। মেনিফেষ্টো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

৪। সংগঠন পদ্ধতি- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

৫। কার্যবিবরণী- প্রথমও দ্বিতীয় খণ্ড

৬। জামায়াতে ইসলামীর বৈশিষ্ট্য

৭। বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী

৮। বাংলাদেশের ভবিষ্যত ও জামায়াতে ইসলামী

৯। গণতান্ত্রিক আন্দোলনও জামায়াতে ইসলামী

গোলাম আযম

মগবাজার

১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রী সদস্য (রুকন) সম্মেলন প্রদত্ত ভাষণ।

ভূমিকা

কোন কাজ সফলতার সাথে সম্পাদন করতে হলে সে কাজটি সঠিকপদ্ধতিতে করা প্রয়োজন। শুধু সাফল্যের আশা করলেই সফল হওয়া যায় না। এমনকি ইখলাসের সাথে কাজ করলেও পদ্ধতি ও কর্মনীতি ভুল হলে সত্যিকার সফলতা হাসিল হয় না।

ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েমের মহান উদ্দেশ্য নিয়েই জামায়াতে ইসলামীকাজ করছে। আসলে এ কাজটি এমনই মহান যে, এর জন্যই যুগে যুগে আল্লাহপাক নবী ও রাসূল (সা) পাঠিয়েছেন। আল্লাহ পাকের নির্দেশ ও সরাসরি পরিচালনায় তাঁরা এ বিরাট দায়িত্ব পালন করছেন।

নবী ও রাসূলগণ যে কর্মনীতি অবলম্বন করেছেন, তা আল্লাহতায়ালাই তাঁদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাই তা যে শুধু নির্ভুল তাই নয়, এ কাজের জন্য তা-ই একমাত্র উপযোগী। যারা ইকামাতে দ্বীনেরকাজ করতে চান, তাদেরকে নতুন করে কর্মনীতি রচনা করতে হবে না। নবী ও রাসূলগণের জীবন থেকে বিশেষ করে শেষ নবী (সা) এর ২৩ বছর দীর্ঘ বিপ্লবী জীবন এবং তাঁরই প্রতিনিধিত্বকারী খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ জীবন থেকে নিষ্ঠার সাথে কর্মনীতি তালাশ করে নেয়াই একমাত্র সঠিক ও নিরাপদ পথ।

কর্মনীতি দ্বারা কি বুঝায়?

কর্মনীতি দ্বারা ব্যাপক অর্থ বুঝায়। ইংরেজী ‘পলিসি’ শব্দটি এর মর্মার্থ অনেকখানি প্রকাশ করে। ‘টেকনিক’ শব্দও এর মর্মার্থে শামিল বলা যায়। কর্মপন্থা, কর্মপদ্ধতি, কর্মকৌশল ও কর্মধারা মিলেই কর্মনতি রচিত হয়। তাই কর্মনতি কথাটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। কুরআনী পরিভাষায় ‘হিকমাত’ শব্দটি কর্মনীতির মধ্যেই গণ্য।

জামায়াতের চার দফা কর্মসূচির ভিত্তিতেই বার্ষিক পরিকল্পনায় ব্যাপক কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তৈরী হয়। একটি বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিকেই কাজ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি  কাজের পেছনে নির্দিষ্ট কর্মনীতি থাকা দরকার। কোন কাজ যদি পলিসি মোতাবেক না হয়, তাহলে সে কাজ মূল উদ্দেশ্যের সহায়ক হতে পারে না। তাই প্রতিটি ব্যাপারে কর্মনীতির গুরুত্ব অপরিসীম।

জামায়াত যে বিরাট উদ্দেশ্যে ইসলামী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তাতের সফলতা অর্জন করতে হলে সচেতনভাবে জামায়াতের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ঐ উদ্দেশ্যের উপযোগী নির্দিষ্ট কর্মনীতি অনুযায়ী হতে হবে। তাই কর্মনীতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের নামে ইখলাসের সাথে অনেক সংগঠনই কাজ করে থাকে। প্রধানত কর্মনীতির পার্থক্যের কারণেই তাদের পক্ষে একই সংগঠনের কাজ করা সম্ভবপর হয় না। এমনকি ইসলামের প্রতি পূর্ণ নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও কর্মপদ্ধতির পার্থক্যের কারণে কর্মসূচিও ভিন্ন হয়ে যায়।

অবশ্য এ সব পার্থক্য ও বিভিননতা সত্ত্বেও দ্বীনী সংগঠন সমূহের মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহাল থাকতে পারে এবং তা থাকাই ইসলামের দাবী। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, কর্মনীতি ও কর্মসূচির পার্থক্যের দরুন তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমেই দ্বীনের খেদমত করতে হয়। এ বিভিন্নতাসহ তাদের পক্ষে এক সংগঠনের কাজ করা বাস্তবেই অসম্ভব। অবশ্য ইসলাম বিরোধী শক্তির মোকাবিলায় এবং ইসলামের ‘কমন ইস্যুতে’ সব ইসলামী সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করা সম্ভব ও প্রয়োজন।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে কর্মনীতি সম্পর্কিত ধারা

বাংরাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৪নং ধারায় বলা হয়েছে-

“জামায়াতের স্থায়ী কর্মনীতি নিম্নরূপ হইবে:

১। কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা কোন কর্মপন্থা গ্রহণের সময় জামায়াত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ ও বিধানের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করিবে।

২। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন কোন উপায় ও পন্থা অবলম্বন করিবে না যাহা সততা ও বিশ্বাস পরায়ণতার পরিপন্থী কিংবা যাহার ফলে দুনিয়ায় ফিতনা ও ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি হয়।

৩। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী উহার বাঞ্ছিত সংশোধন ও সংস্কার কার্যকর করিবার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করিবে। অর্থাৎ ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণ, সংগঠন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মানবি, নৈতিক চরিত্রের সংশোধন এবং বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করিবার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অনুকূলে জনমত গঠন করিবে।

এ ধারায় কর্মনীতি সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জামায়াতের গোটা কার্যক্রম এ নির্দেশিকা মোতাবেক চলছে কিনা তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা জামায়াতের সদস্যগণের (রুকনগণের) কর্তব্য।

মাওলানা মওদূদূ (র) “ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি” নামক পুস্তিকার দ্বিতীয়ার্ধে জামায়াতে ইসলামীর কর্মনীতি সম্পর্কে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন বলেই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

জামায়াতের ৪ দফা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই এখানে প্রতিটি দফায় জামায়াতের কর্মনীতি আলোচনা করা হচ্ছে।

দাওয়াত ও তাবলীগ

জামায়াতের কর্মসূচির পয়লা দফাই দাওয়াত ও তাবলীগ (আহবান ও প্রচার)

দাওয়াতের কর্মনীতি

দাওয়াত মানে আহ্বান বা ডাকা। প্রত্যেক আন্দোলনই মানুষকে নির্দিষ্ট কোন কথার দিকে ডাকে। জামায়াতে ইসলামীর তিন দফা দাওয়াত নবী ও রাসূলগণের শাশ্বত দাওয়াত থেকেই তৈরি করা হয়েছে। সূরা আল-আরাফের অষ্টম রুকু থেকে এবং সূরা হূদের বিচ্ছিন্নভাবে নবীদের নাম উল্লেখ করে দেখান হয়েছে যে, সকল নবী একই দাওয়াত দিয়েছেন। এ দাওয়াতের বক্তব্য সবাই একই ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

(আরবী ***********)

“হে আমার দেশবাসী-একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব কর, তিনি ছাড়া তোমাদের জন্য আর কোন ইলাহ বা মাবুদ (হুকুমকর্তা) নেই।”

এ দাওয়াতের কর্মনীতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়:

১। নবীগণ কোন ব্যক্তি, দল, সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর দিকে মানুষকে ডাকেননি। তাঁরা একমাত্র আল্লাহর দিকেই ডেকেছেন। আল্লাহর দ্বীন কবুল করার দিকেই তিনি তাদের আহ্বান জানিয়েছেন।

২। এ দাওয়াত সকল শ্রেণীর মানুষকেই দেয়া হয়েছে। গোটা মানব সমাজকেই আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান হয়েছে।কোন বিশেষ শ্রেণী, সম্প্রদায়, এলাকা, বর্ণ, গোত্র বা ভাষার লোককে নির্দিষ্ট করে দাওয়াত দেয়া হয়নি। মানব জাতির কোন এক অংশকে আর সব মানুষথেকে আলাদা কোন শ্রেণী হিসেবে তাঁরা দাওয়াত দেননি। নবীগণের দাওয়াত বিশুদ্ধভাবেই সার্বজনীন।

৩। কোন ব্যক্তি, দল বা মানব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষের উদ্দেশে বা কারো বিরুদ্ধে জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলার জন্য দাওয়াত দেয়া হয়নি। নবীগণ মানুষকে ভ্রান্ত মত, পথ, নীতি ও বিধান থেকে বাঁচার জন্য একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করারই দাওয়াত দিয়েছেন এবং যারা ভ্রান্ত পথে চলেছে, তাদেরকেও সে পথ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

৪। দাওয়াত পেশ করার পদ্ধতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। তাই আল্লাহপাক এ বিষয়ে সুস্পষ্ট হিদায়াত দিয়ে ব লেছেন:

(আরবী ***********)

“হে রাসূল! আপনার রবের পথে আহ্বান জানান হিকমত ও উত্তম নসীহতের সাথে। আর লোকদের সাথে বিতর্ক করতে হলে সন্দুরভাবে করুন।” সূরা আন-নাহল-১২৫

এ আয়াতের মর্ম ব্যাপক। এখানে তিনটি হিদায়াত রয়েছে:

(ক) যে ব্যক্তি, দল বা কাওমকে দাওয়াত দেয়া হবে তার অবস্থা ভালভাবে জেনে দক্ষ চিকিৎসকের মতো তার হিদায়াতের উপযোগী বক্তব্য পেশ করতে হবে।

(খ) বক্তব্য এমন সুন্দর উপদেশপূর্ণ হতে হবে যাতে তা মানুষের মনবে আকৃষ্ট করতে পারে এবং তার মধ্যে তাদের কল্যাণ আছে বলে অনুভব করে।

(গ) যদি কারো সাথে তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন হয়, তাহলে এমন শালীনভাবে তা করতে হবে যাতে দাওয়াত কবুল না করলেও তার বিবেক জাগ্রত হয়।

জামায়াতে ইসলামী নবীদের উপরিউক্ত কর্মনীতি অনুযায়ীই দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করছে। জামায়াত কোন নেতার নেতৃত্ব, কোন দলের আনুগত্য, কোন শ্রেণীর প্রাধান্য বা কোন গোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে মানুষকে ডাক দেয় না। একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব ও নবীর আনুগত্য করা এবং আল্লাহর আইন সৎলোকের শাসন কায়েম করার দাওয়াত দেয়।

তাবলীগের কর্মনীতি

তাবলীগ শব্দের অর্থ হলো পৌঁছান। প্রত্যেক আন্দোলনই মানুষের নিকট তাদের মত ও বক্তব্য পৌঁছানোর চেষ্টা করে। জামায়াতে ইসলামীও স্বাভাবিক কারণেই জনগণের নিকট ইসলামের আলো বিতরণ করে। এ বিষয়ে নবীদের কর্মনীতি অনুযায়ীই জামায়াত কাজ করছে:

১। জামায়াতে ইসলামী ইসলামের কোন একদিকের তাবলীগ করে না। জামায়াত পূর্ণ দ্বীন ইসলামের প্রচার করে। ইসলামের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক অর্থাৎ ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবেই জনগণের নিকট পেশ করা হয়।

২। ইসলামের শিক্ষা পরিবেশন করতে গিয়ে গুরুত্বের ক্রম অনুসারেই বিষয় নির্বাচন করা উচিত। ঈমানের শিক্ষা যার নেই তাকে তাকওয়ার তাকীদ দেয়া মোটেই সঠিক নয়। রাসূল (সা) হযরত মায়ায বিন জাবাল (রা) কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় এ হিদায়াতই দিয়েছিলেন যে, মানুষকে পয়লা কালেমা ও ঈমান কবুল করার দাওয়াত দেবে। ঈমান কবুল কলে নামাযের শিক্ষা দেবে। এ ভাবে গুরুত্বের ক্রম অনুযায়ী তাবলীগ করাই সঠিক পদ্ধতি [এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে মওদূদী (র)-এর রচিত “ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি” বইখানি পড়ুন।]

৩। তাবলীগ করার উদ্দেশ্য সঠিক না হলে কর্মনীতি ও সঠিক থাকে না। টাকা পয়সা রোজগারের উদ্দেশ্যে যারা তাবলীগ করে, তারা মানুষকে দ্বীনের আসল শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। তারা শ্রোতাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুখরোচক ওয়াযই করেন। এ জাতীয় ওয়াযে মানুষ মজা পায় কিন্তু হিদায়াত ও দ্বীনের আসল শিক্ষা পায় না।

৪। এ কথা খেয়াল রেখেই তাবলীগ করতে হবে যে, হিদায়ত করার ইখতিয়ার একমাত্র আল্লাহপাকের হাতে। মানুষ হিদায়াত হচ্ছে না বলে তাবলীগের কর্তব্য পালনে অবহেলা করা চলবে না। হিদায়াত কবুল করার আগ্রহ দেখা না গেলে তাবলীগ করে কী লাভ এমন মনোভাব সঠিক নয়। এ জাতীয় ধারণা তাবলীগের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। মানুষ মানতে রাযী থাক বা না থাক তাবলীগের দায়িত্ব পালন করতে থাকতে হবে।

৫। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান দান করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর প্রচেষ্টায় আল্লাহর রহমতের বিপুল সাহিত্য বাংলাভাষায় সৃষ্টি করা হয়েছে। কালেমা, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের হাকিকত থেকে শুরু করে ইসলামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকের জ্ঞান লাভের উপযোগী সাহিত্য তাবলীগের জন্য সব চাইতে শক্তিশালী হাতিয়ার। বিশেষ করে মাওলানা মওদূদী (র) “তাফহীমুল কোরআন” নামে যে তাফসীর রচনা করেছেন, তা বাংলাভাষায় পরিবেশন করায় ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত সহজ হয়েছে।

দাওয়াত ও তাবলীগের আসল লক্ষ্য হলো মানুষের চিন্তার বিশুদ্ধিকরণ ও পুনর্গঠন (আরবী ***********)। মানুষের মন-মগজকে সকল প্রকার জাহিলী চিন্তাধারা থেকে পবিত্র করে ওহীর মাধ্যমে প্রদত্ত সঠিক চিন্তাধারা দ্বারা তা পুনর্গঠন করা। মানুষ যত ভ্রান্ত মত পোষণ করে এবং যত ভ্রান্ত পথে চলে তা বিশুদ্ধ জ্ঞানের অভাবেই করে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর ৪ দফা কর্মসূচির পয়লা দফাই হলো মানুষের চিন্তাকে জাহিলিয়াত থেকে পবিত্র করা ও ইসলামী চিন্তা দ্বার পুনর্গঠন করা।

তানযীম ও তারবিয়াত

জামায়াতে ইসলামীর দ্বিতীয় দফা কর্মসূচি হলো তানযীম (সংগঠন) ও তারবিয়াত (প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং)। এ বিষয়ে জামায়াতের কর্মনীতি সুষ্পষ্ট।

সংগঠিত করার কর্মনীতি

দ্বীনের দাওয়াত যারা কবুল করে, তাদেরকে সংগঠনের শামিল করা দাওয়াতের স্বাভাবিক দাবী। যারা জনগণকে সংগঠিত করার গুরুত্ব বুঝে না, তারা যত যোগ্যতার সাথেই ওয়ায করুন বিনা সংগঠনের দ্বীনকে বিজয়ী করার কল্পনাও করা যায় না। প্রকৃত কথা এই যে, যারা সংগঠন করেন না, তারা দ্বীনের যত খেদমতই করুন, তারা দ্বীনকে কায়েমের কোন পরিকল্পনা রাখেন না।

সাধারণত সমাজের প্রভাবশালী লোকদেরকে পদের লোভ দেখিয়ে হলেও সংগঠনভুক্ত করার প্রথা রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে চালু থাকলেও ইকামাতে দ্বীনের উদ্দেশ্যে কোন সংগঠন এ প্রথা মেনে নিতে পারে না।

যারা ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে দল গঠন করে তাদের কথা আলাদা। যারা দ্বীন কায়েমের মহান উদ্দেশ্যে মানুষকে সংগঠিত করতে চায়, তারা দ্বীনের ভিত্তিতে সংগঠনে লোক ভর্তি করে। ডিগ্রী, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক সঙ্গতি ইত্যাদির ভিত্তিতে দ্বীনী সংগঠনে লোক ভর্তি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এ জাতীয় লোক সংগঠনে ঢুকান হলে দ্বীনের বিজয়ের পথে তারা বাধাই সৃষ্টি করবে।

অবশ্য এ মানের লোক যদি দ্বীনের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হন, তাহলে সোনায় সোহাগা। এ কারণে নবীগণ সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিকটই পয়লা দাওয়াত পৌঁছানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোন নবীর আমলেই এ জাতীয় লোকেরা দ্বীন কবুল করেনি। তারা কায়েমী স্বার্থের ধারক বলেই এ পথে এগিয়ে আসেনি। তবুও তাদের নিকট দাওয়াত দেয়ার গুরুত্ব রয়েছে। তারা দাওয়াত কবুল না  করলেও তাদের নিকট দাওয়াত দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় তারা যে বিরোধিতা করে এর ফলে দাওয়াত জনগণের নিকট সহজেই পৌঁছে।

সমাজে যারা মৌলিক মানবীয় গুণের অধিকারী এবং যারা সৎ থাকার বা হবার আগ্রহ রাখে, তাদেরকে ইসলামী সংগঠনভুক্ত করা দাওয়াতে দ্বীনের প্রধান লক্ষ্য হওয়াই স্বাভাবিক। এ জাতীয় লোকদের মযবুত সংগঠন ছাড়া দ্বীনকে বিজয়ী করার কোন বিকল্প নেই।

এ কারণেই রাসূল (সা) দোয়া করেছিলেন যে, উমর বিন খাত্তাব ও উমর বিন হেশাম (আবু জেহেল) এ দু’জনের অন্তত একজন যেন মুসলিম জামায়াতে শামিল হন যাতে ইসলামী সংগঠন শক্তিশালী হয়।

সমাজের নেক লোকদেরকে যোগ্য বানানোর জন্য এবং যোগ্য লোকগুলোকে নেক বানানোর উদ্দেশ্যে তাদেরকে ব্যাপকভাবে সংগঠনভুক্ত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া ইসলামী আন্দোলনের একটি বিশেষ কর্মনীতি। তাই জামায়াত গুরুত্ব সহকারে এ কর্মনীতি পালন করে।

তারবিয়াতের কর্মনীতি

(****) শব্দটি মূল (***) শব্ত থেকে গঠিত। (****) অর্থ হলো Growth বা বৃদ্ধি। Development বা প্রবৃদ্ধি, গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি।

(***) শব্দটির দু’টো শাব্দিক রূপ আছে:

১। (*****) এর মানে বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে, ক্রমবিকাশ লাভ করেছে ইত্যদি।

২। (******) এর অর্থ গড়ে উঠেছে, বেড়েছে ইত্যাদি। তারবিয়াত শব্দ দ্বারা এ দু’রকম অর্থই বুঝায়।

এছাড়া তারবিয়াত শব্দের মধ্যে (*****) শব্দের কোন কোন অর্থ শামিল আছে। যেমন: লালন-পালন করা, সংশোধন করা। কিন্তু (***) শব্দটি (****) থেকে গঠিত নয়। (****)-(****) শব্দের প্রধান অর্থ প্রভুত্ব করেছে, মালিক হয়েছে, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে, এসব অর্থের সাথে তারবিয়াত শব্দের কোন সম্পর্ক নেই।

যারা ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াত কবুল করে ইসলামী সংগঠনে শামিল হয়, তাদেরকে গড়ে তুলবার কাজটিই হল তারবিয়াত। তাদের ঈমান-আকীদা মযবুত করা, তাদের জন্য দ্বীনের সঠিক ইলম হাসিল করার ব্যবস্থা করা। তাদের আমল-আখলাককে ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলা, আল্লাপর পথে জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করার জন্য তাদের মনে খালেস জযবা পয়দা করা, বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তাদেরকে প্রস্তুত করা, জেল ফাঁসি ও মৃত্যুর ভয় তাদের অন্তর থেকে দূর করা। মোটকথা আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসন কায়েমের জন্য জান, মাল, সময়, শ্রম, আরাম, আয়েশ কুরবানী দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে পূর্ণরূপে তৈরি করাই এ তারবিয়াতের উদ্দেশ্য।

উদ্দেশ্য অনুযায়ীই লোক তৈরি করা হয়

সব কাজের জন্য যোগ্য লোক তৈরি করার দরকার হয়। কিন্তু সব রকম কাজের জন্য একই ধরনের তারবিয়াত দেয়া হয় না। পুলিশের দায়িত্ব পালনের জন্য এক ধরনের ট্রেনিং দেয়া হয়। শিক্ষকের দায়িত্বের জন্য অন্য রকম ট্রেনিং দিতে হয়। সেনা বাহিনীকে দেশ রক্ষার যোগ্য ট্রেনিংই দেয়া হয়।

যে ধরনের লোক তৈরি করার উদ্দেশ্যে, তারই উপযোগ্য তারবিয়াতের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান দান করার জন্য মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম তৈরি হচ্ছে না। কারণ সে শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য ভিন্ন। আবার দেখা যায় মাদরাসার মতো আলেম পয়দা রা তাবলীগ জামায়াতের উদ্দেশ্য নয়। মানুষকে আখিরাতমুখী করাই তাবলীগ জামায়াতের লক্ষ্য। পীরের খানকার মাধ্যমে মাদরাসার মতো আলেম পয়দা হওয়া সম্ভব নয়। খানকায় যে ধরনের মন-মেজাজ ও অভ্যাস সৃষ্টি হয় তা মাদরাসা দ্বারা হয় না।

এসব উদাহরণ দ্বারা এ কথাই স্পষ্ট বুঝা যায় যে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যে রকম লোক তৈরি করতে চায়, সে অনুযায়ীই তারবিয়াতের ব্যবস্থা করে থাকে।

জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য

আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করাই জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য। এ বিরাট উদ্দেশ্যের জন্য এমন একদল বিপ্লবী মুজাহিদ প্রয়োজন যারা সাহায়ে কেরামকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে বাতিল ও তাগুতী শক্তির মোকাবিলায় শহীদ হওয়ার জযবা নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এর জন্য যে সব গুণাবলীর সমন্বয় প্রয়োজন, তা শুধু মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম, তাবলীগের ব্যবস্থা এবং খানকার তারবিয়াত পদ্ধতি দ্বারা পরিপূর্ণরূপে সম্ভব হতে পারে না।

ইকামাতে দ্বীনের জন্য যে সব গুণ, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তার জন্য এর পূর্ণ উপযোগী তারবিয়াতের ব্যবস্থা ছাড়া এ উদ্দেশ্য পূরণ হওয়া অসম্ভব। অবশ্য মাদরাসা পাস আলেম এবং তাবলীগ ও খানকায় তৈরি দ্বীনদার লোক ইসলামী আন্দোলনের মাধ্যমে তারবিয়াত পেলে ঈমান ইলম ও আমলের দিক দিয়ে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হতে পারেন।

জামায়াতের তারবিয়াত পদ্ধতি

রাসূল (স) যে পদ্ধতিতে লোক তৈরি করেছেন জামায়াত হুবহু সে পদ্ধতি অনুযায়ী তারবিয়াতের ব্যবস্থা করেছে। এ পদ্ধতির দু’টো দিক রয়েছে- ইতিবাচক (Positive) ও নেতিবাচক (Nevative)।

রাসূল (স) এর ইতিবাচক ৪ দফা তারবিয়াতী কর্মসূচি কুরআন মজীদে চারটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ আয়াত চারটির মূল বক্তব্য একই। যদিও ভাষায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে এবং দফা চারটি সব আয়াতে একইভাবে সাজানো নয়।

(আরবী ***********)

এ চারটি আয়াতে সাহাবায়ে কেরামকে গড়ে তুলবার ব্যাপারে ৪ দফা তারবিয়াতী কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। এ চারটি কাজের মাধ্যমে রাসূল (স) লোক তৈরি করেছেন। এটা ইতিবাচক কর্মসূচি:

১। আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত

২। আল-কিতাব শিক্ষা দেয়া

৩। হিকমাত শিক্ষা দেয়া

৪। পবিত্রতা সাধন ও সংশোধন

এ চারটি কাজের সরল অর্থ নিম্নরূপ:

১। জিবরাঈল (আ) কুরআনের আয়াতসমূহকে যেভঅবে তিলাওয়াত করে রাসূল (সা) এর নিকট পৌঁছাতেন ঠিক সেভাবেই রাসূল (স) সাহাবায়ে কেরামকে শুনিয়ে দিতেন এবং মুখস্থ রাখার প্রয়োজনে তিলাওয়াত করার তাগিদ দিতেন।

কুরআন এভাবেই একজন থেকে আর একজনকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে উচ্চারণ করে শিখতে হয়। মুখে মুখে শেখা ছাড়া সঠিক উচ্চারণ করে শেখা অসম্ভব। একজনের মুখ থেকে তিলাওয়াত শুনেই আর একজনের পক্ষে তিলাওয়াত করতে শেখা সম্ভব।

২। তারবিয়াতের দ্বিতীয় দফা হলো কুরআনের অর্থ শিক্ষা দেয়া। কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা শিক্ষা দেয়াই যথেষ্ট ছিল না। এর অর্থ শিক্ষা দেয়াও রাসূল (স)-এর দায়িত্ব ছিল। আল্লাহর পক্ষথেকে কুরআনের আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা পেশ করার দায়িত্ব রাসূলেরই। তিনিই কুরআনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য সরকারী ব্যাখ্যাতা। রাসূল (স)-এর ব্যাখ্যার বিরোধী কোন ব্যাখ্যাকেই কুরআনের ব্যাখ্যা বলে গণ্য করা চলে না।

৩। তারবিয়াতের তৃতীয় দফা হলো হিকমাত শিক্ষা দেয়া। রাসূল (সা) হিকমত শব্দের অর্থ করেছেন (********) অর্থাৎ দ্বীন সম্পর্কে পরিষ্কার বুঝ। রাসূল (স) সাহাবায়ে কেরামকে দ্বীনের এ পরিমাণ জ্ঞান দান করতেন যার ফলে জীবনে চলার পথে কুরআনের নির্দেশ পালন করা সম্ভব হয়। কুরআনের আলোতে চলার পথ দেখার যোগ্যতাই হিকমত। অর্থাৎ এতটুকু সমঝ-বুঝ হওয়া যাতে হারাম-হালাল বেছে চলার যোগ্যতা হয়।

৪। তারবিয়াতের ৪র্থ দফা হলো তাযকিয়া। এ শব্দটি যাকাতের মূল শব্দ থেকেই গঠিত। যাকাত দ্বারা মালের পবিত্রতা ও উন্নয়ন বুঝায়। তাযকিয়া মানে আল্লাহর অপছন্দনীয় জিনিস থেকে জীবনকে পবিত্র করা এবং তাঁর পছন্দনীয় পথে উন্নতি করা।

রাসূল (স) এ কাজটি কিভাবে করতেন? তিনি সাহাবয়ে কেরামের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। তাঁদের কথা, কাজ ও আচরণের সামান্য ত্রুটি লক্ষ্য করলে তিনি তাদেরকে সংশোধন করতেন। এটা রাসূল (স)-এর এক বিরাট দায়িত্ব ছিল। তিনি এ দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছেন বলেই তাঁর ‘তাকরীর’ও হাদীস বলে গণ্য। রাসূলের কথা ও কাজ যেমন হাদীস, তাঁর তাকরীরও হাদীস। তাকরীর মানে যে বিষয়ে রাসূল (স) আপত্তি করেন নি।

জামায়াত এ চার দফা তারবিয়াতী প্রোগ্রাম অনুযায়ী সংগঠনভুক্ত লোকদেরকে শুদ্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত করার তাকীদ দিয়ে থাকে। প্রত্যেক কর্মী ও সদস্যের (রুকনের) উপরে প্রতিদিন কুরআনের তাফসীর পড়া বাধ্যতামূলক করেছে। প্রতিদিন কমপক্ষে দশ পৃষ্ঠা ইসলামী সাহিত্য পড়া ও মাসলা-মাসায়েল শিখে হিকমাত শেখার জন্য চাপ দিয়ে থাকে। আর তাযকিয়ার জন্য প্রতিদিন ইহতিসাব বা আত্মসমালোচনা করার ব্যবস্থা দিয়েছে এবং মুহাসাবা বা সমালোচনার মাধ্যমে একে অপরকে সংশোধনের বিধান চলু করেছে।

তারবিয়াতের নেতিবাচক কর্মসূচি

ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই বাতিল ও তাগুতী শক্তির স্বার্থের সম্পূর্ণ বিরোধী। তাই সব নবীর সময়ই যাবতীয় কায়েমী স্বার্থ বিশেষ করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি চরমভাবে বিরোধিতা করেছে। শেষ নবীর মাক্কী জীবনের তেরটি বছর বিরোধী শক্তির যুলুম-নির্যাতনে তিনি যে ধৈর্য, সাহস ও মজবুতীর পরিচয় দিয়েছেন তারই ফলে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও এসব গুণাবলী পয়দা হয়েছে। তিনি নিজেই যদি ঘাবড়িয়ে যেতেন এবং হিম্মতহারা হয়ে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াতেন, তাহলে ইসলামের বিজয় কখনও আসতো না। এটাই নেতিবাচক ট্রেনিং।

মাদ্‌রাসা, তাবলীগ জামায়াত ও খানকার উপর বাতিল ও তাগুত ক্ষিপ্ত হয় না। কারণ তারা এ কথা মনে করে না যে, তাদের ক্ষমতা এ সবের কারণে বিপন্ন হতে পারে বা তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়ে যাবে। অথচ বিরোধী শক্তির পক্ষথেকে যুলুম-নির্যাতন না হলে আন্দোলনে নিঃস্বার্থ, নিষ্ঠাবান ও বিপ্লবী নেতৃত্ব সৃষ্টি হতে পারে না। যারা যুলুম-নির্যাতনে সবর ও হিকমাতের পরিচয় দিতে পারে, তারাই সকল স্বার্থ কুরবানী দিয়েও সংগ্রামে টিকে থাকে। একমাত্র এ নিয়মেই সাহাবায়ে কেরামের মতো কাফেলা তৈরি হওয়া সম্ভব হয়েছে।

এজাতীয় ত্যাগী, নিঃস্বার্থ ও মুখলিস লোকদের হাতে ইসলামী হুকুমাতের ক্ষমতা না আসলে দ্বীন কায়েম হতে পারে না। তাই মক্কী যিন্দেগীর তের বছরে অনেক রকম অগ্নিপরীক্ষার পরও হিজরতের চূড়ান্ত পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হলেন, তাঁদের হাতেই ইসলামের বিজয় হয়েছে।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমন কি ধর্মীয় কায়েমী স্বার্থের পক্ষ থেকে সৃষ্ট হাজারো রকমের বিরোধিতা ইসলামী আন্দোলনে জড়িত সবার জন্য নেতিবাচক ট্রেনিংয়েরই ব্যবস্থা। ইসলাম বিরোধী শক্তির হাতে যাঁরা শহীদ হচ্ছেন, তাঁদের এ শাহাদাত আর সবার জন্য এ পথে চলার হিম্মতই যোগাচ্ছে। এ বিরোধিতার ফলে দুর্বলমনা লোক পিছিয়ে যাচ্ছে এবং শাহাদাতের জযবা নিয়ে সাহসীরা এগিয়ে চলছে।

ব্যক্তি চড়িত্র গড়ার কর্মনীতি

রাসূল (সা) এর লোক তৈরির ইতিহাবচক ও নেতিবাচক কর্মসূচি অনুসরণ করে জামায়াতে ইসলামী এরসংগঠিত জনশক্তিকে গড়ে তুলবার চেষ্টা করছে। এ কর্মসূচির আওতায় আল্লাহর পথে মানুষকে টেনে আনার জন্য জামায়াত বাস্তবে যা করে থাকে তা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যুক্তিসম্মত।

জামায়াতের সদস্য (রুকন) ও কর্মীগণ প্রত্যেকেই অন্যদেরকে ইসলামী আন্দোলনে শরীক হওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কতক লোককে দাওয়াতী টার্গেটভুক্ত করে। তারা টার্গেটভুক্ত লোকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে এবং তাদেরকে ইসলামী বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।কিছুদিন ঘনিষ্ঠ আলোচনা ও মতবিনিময়ের ফলে যখন কেউ দাওয়াত কবুল করে, তখন তাকে সহযোগী সদস্য করে নেয়া হয়।

এরপর এ সহযোগী সদস্যের পেছনে সময় ও শ্রম ব্যয় করে তাকে কর্মী হওয়ার জন্য রাযী করা হয়। কর্মী হতে হলে সাপ্তাহিক বৈঠকে নিয়মিত হাজির হতে হয় ও ইসলামী আন্দোলনের জন্য সাধ্যমত মাসিক অর্থ দান করতে হয়। তাছাড়া কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হলে তাকে  দু’ধরনের কাজ করতে হয়:

১। নিজকে গড়ে তুলবার জন্য রোজ কুরআনের কিছু অংশের তাফসীর পড়তে হয়। রোজ  কমপক্ষে একটি হাদীস শিখতে হয়, রোজ অন্তত দশ পৃষ্টা ইসলামী বই পড়তে হয়, মসজিদে জামায়াতে নামায আদায়ের অভ্যাস করতে হয় এবং প্রতিদিন একটি নির্দিস্ট সময়ে একবার বিগত দিনের আত্মসমালোচনা করে সংশোধনের প্রতিজ্ঞা নিতে হয়।

২। অন্য লোকদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে তাদেরকে এভাবে কর্মী বানানোর সাধনা করতে হয়।

এ দু’ধরনের কাজ যাতে নিয়মিত চলতে থাকে এর হিসাব রাখার জন্য রিপোর্ট বইতে রেকর্ড রাখার ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে কাজের অগ্রগতি বুঝা যায়।

এভাবে কাজ করতে থাকলে এক সময় জামায়াতের সদস্য (রুকন) হওয়ার জন্য অন্তরে প্রেরণা সৃষ্টি হয়। আল্লাহর পথে জান ও মাল কুরবানী করার সিদ্ধান্ত নিয়েই সদস্য (রুকন) হতে হয়।

জামায়াতে কর্মরত থাকা অবস্থায় কিভাবে কর্মীকে ধাপে ধাপে জিহাদ চালিয়ে যেতে হয় এবং ক্রমে আল্লাহর পথে অগ্রসর হয় তা থেকে ব্যক্তি গঠনের কর্মনীতি সহজেই বুঝা যায়।

১। প্রথমত ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি কিছুটা ধারণা জন্মিলে এক ব্যক্তি সহযোগী সদস্য হিসাবে কয়েকটি কথা স্বীকার করে নেয়। এ কথাগুলোই সহযোগী সদস্য ফরমে রয়েছে:

আমি বিশ্বাস করি যে,

** দেশে শান্তি-শৃংখলা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে শাসন-ক্ষমতা ধার্মিক, চরিত্রবান ও নিঃস্বার্থ লোকদের হাতে থাকা প্রয়োজন।

** বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে এ ধরনের সৎ ও যোগ্য লোকের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিতেছে বলিয়া এই সংগঠনকে আমি আন্তরিকভাবে সমর্থন করি।

** রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে আমি জামায়াতে ইসলামীর সহিত সহযোগিতা করিব।

** আমার জীবনকে নৈতিক দিক দিয়া উন্নত করিবার জন্য সর্বদা চেষ্টা করিব।

২। যখন তিনি কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হয়ে যায়। তাকে আগের অনেক অভ্যাস ইসলামসম্মত নয় বলে ত্যাগ করতে হয়। আর ২৪ ঘণ্টার রুটিন নতুনভাবে তৈরি করতে হয়। জামায়াতে ৫ ওয়াক্ত নামায পড়ার অভ্যাস তার জীবনে পরিবর্তন আনতে থাকে। ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান বৃদ্ধির সাথে সাথে আমলও উন্নত হতে থাকে।

তার জীবনের এ বাস্তব পরিবর্তন তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মদের মধ্য কিছুটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাকে আগের মত তাসের আড্ডা ও সিনেমার সাথী হিসাবে না পেয়ে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, ভাই-বোনও চিন্তার ক্ষেত্রে তার সাথী না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী ভাব প্রকাশ করে। এ অবস্থায় তিনি যদি মযবুত হয়ে টিকে থাকতে পারেন, তাহলেএ পথে তার উন্নতি অব্যাহত থাকে। কিন্তু যদি আপনজনের বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে এ পথে টিকে থাকতে পারবেন না।

ব্যক্তি-চরিত্র গঠনের পথে মানুষেরনফস বা দেহের দাবীই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই রূহের শক্তিকে বৃদ্ধি করে দেহকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাই আল্লাহ দিয়েছেন।

রূহই হলো আসল মানুষ। মানুষেরদেহ রূহের বাহন মাত্র। যেমন ঘোড়া হলো মানুষের বাহন। মানুষ লাগাম কষে ঘোড়াকে তার মরযী মতো চালায়। যদি সে লাগাম কষতে না পারে, তাহলে ঘোড়া তাকে কোথাও ফেলে দেবে। ফলে তার গন্তব্যস্থলেসে পৌঁছুতে পারবে না।

আল্লাহ পাক মানুষকে (রূহকে) হুকুম করেছেন যে, সে যেন শরীয়তের লাগাম দিয়ে তার দেহকে কষে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে। ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির এটাই উদ্দেশ্য। কালেমা, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত ঐ লাগামই দেহের উপর লাগায়।

দেহ বস্তু দিয়ে তৈরি। সে দুনিয়ার বস্তুগত মজাই শুধু বুঝে। ভাল-মন্দ বুঝার ক্ষমতা তার নেই। সে যোগ্রতা রূহকে দেয়া হয়েছে। তাই নফসের তাকীদে খারাপ কাজ করলেও মানুষের বিবেক (রূহ) আপত্তি জানায়। মানুষের দেহের (বস্তুসত্তার) উপর তার রূহের (নৈতিক সত্তার) প্রাধান্য সৃষ্টিই শরীয়তের উদ্দেশ্য।

আল্লাহর মরযী মত দেহের সব শক্তিকে কাজে লাগানোর নৈতিক ক্ষমতার নামই তাকওয়া। জামায়াতে ইসলামীর ইতিবাচক ও নেতিবাচক তারবিয়াত পদ্ধতি এমন বলিষ্ঠ চরিত্র সৃষ্টি করতে সক্ষম যা মানুষকে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার প্রেরণা যোগায়। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের এত লোক শহদি হওয়া সত্তেও এ আন্দোলনের কর্মদের মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারেনি। বরং শহীদ হওয়ার জযবা তাদের মধ্যে আরও বেড়েই চলেছে।

৩। জামায়াতে ইসলামী ব্যক্তিচরিত্র গঠনের জন্য কর্মদের উপর নফল যিকর বা তাসবীহ চাপিয়ে দেয় না। নফল ঐ জিনিসেরই নাম যা ফরমায়েশ দিয়ে করাবার কাজ নয়। ফরযের অভ্যাস হলে ক্রমে ফরযের মজবুতীর প্রয়োজনেই নফলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কর্মদের মধ্যে বিশুদ্ধ ঈমান, প্রয়োজনীয় ইলম ও ইলম অনুযায়ী মযবুত আমলের তাকীদ অবশ্যই দেয়া হয়। এরই ফলশ্রুতিতে তাকওয়া ও ইহসানের দিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়।

৪। ব্যীক্তচরিত্র বলিষ্ঠ ও উন্নতরূপ লাভ করার জন্য জামায়াতের কর্মনীতিতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মীদেরকে দায়ী ইলাল্লাহর দিায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা। অপরকে দ্বীনের দিকে ডাকার দায়িত্ববোধ যার মধ্যে সৃষ্টি হয়, তার জীবন ইসলাম মোতাবেক সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক। এ কাজ করতে গেলে তার মধ্যে দ্বীনের দিক দিয়ে যে সব দোষ-ত্রুটি রয়েছে, তা সংশোধন করার সিদ্ধান্তও তাকে নিতে হয়। কারণ মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিলে সবাই তার নিজরে চরিত্রে কতটুকু ইসলাম আছে তা অবশ্যই যাচাই করবে। তার সামান্য ত্রুটিকেও বড় করে দেখবে। তাকে হাজারো প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে।

এ অবস্থায় যদি তিনি এ কাজ অব্যাহত রাখতে চান, তাহলে তাকে আত্মসংশোধনের মাধ্যমে মানুষের নিকট দায়ী ইলাল্লাহ হিসাবে টিকে থাকতে হবে। আর যদি নিজেকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে এ কাজ ক্ষান্ত করতে  বাধ্য হতে হবে।

৫। ইসলামী আন্দোলনের প্রতি পদেই তাকে বাধার সম্মুখীন হতে হবে। কারণ অনৈসলামী সমাজে তিনি ইসলামকে পূর্ণরূপে মেনে চলতে চান।সুদ ও ঘুষ না খেলেও দিতে বাধ্য হতে হয়। হালাল রুযির উপর কায়েম থাকতে গিয়ে সরল জীবন যাপন করতে হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এমন কি পেশা ও চাকরি পর্যন্ত বিপন্ন হয়। এত বাধা সত্ত্বেও যে এ পথে টিকে থাকে, তার মধ্যে এমন মানবিক গুণাবলী বিকাশ লাভ করে যা অন্য কোন উপায়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

[এ বিষয়ে মাওলানা মওদূদী (র)-এর “ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি” পুস্তিকাটি অবশ্যই পাঠ্য।]

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী